Friday, August 22, 2025

নতুন বাংলাদেশে আমরা শেখ মুজিবকে কীভাবে দেখব by সাইমুম পারভেজ

বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান একটি বিশেষ চরিত্র। স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে শেখ মুজিব যেমন বাংলাদেশিদের কাছে একটি প্রেরণাদায়ক ব্যক্তিত্ব, তেমনি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, বাক্‌স্বাধীনতা হরণ ও বিরোধী মত দমনের কারণে আশাভঙ্গের কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে তাঁর একদল বাকশালভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেশ শাসনে যেমন ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, তেমনি রাষ্ট্রের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিরোধীদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্যও তাঁর শাসনামলকে দায়ী করা যায়।

জনপ্রিয়তার উচ্চ শিখর থেকে মুজিব দেশ শাসনের যাত্রা শুরু করেছিলেন, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই জনপ্রিয়তার পারদ নিচে নামতে শুরু করে। তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে যদি একটি গণ-অভ্যুত্থান ঘটত অথবা জনসম্পৃক্ত কোনো গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর পতন হতো, তবে হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাসে মুজিবকে ভিন্নভাবে দেখা হতো। কিন্তু সামরিক বাহিনীর একটি অংশের হত্যাকাণ্ড, যেখানে নারী ও শিশুরাও রক্ষা পায়নি, শেখ মুজিবকে অনেকের কাছেই ‘ট্র্যাজিক হিরো’তে পরিণত করে। শেখ মুজিব ও তাঁর অবদানকে পুনর্নির্মাণ করা হয়, ইতিহাসে তাঁর পুনর্জন্ম হয়।

আমার দেখেছি, এর পরের কয়েক দশকে সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে ও জনপরিসরে মুজিবকে এমন একটি ব্যক্তিত্বে পরিণত করা হয়, যিনি সব ধরনের দোষের ঊর্ধ্বে এবং প্রশ্নাতীত। প্রথম দিকে এ প্রক্রিয়া ধীরে শুরু হয় এবং সীমাবদ্ধ ছিল কেবল দলীয় ও নাগরিক উদ্যোগে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মুজিবের ইমেজ তৈরিকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ও দলীয় অঙ্গসংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে বাধ্য করে।

২০০৮ থেকে ২০২৪-এ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পতনের আগপর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে শেখ হাসিনার সরকার ‘শেখ মুজিব বিনির্মাণ প্রজেক্টে’ বিনিয়োগ করে গেছে। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের শেষ দশকে শেখ মুজিবের সমালোচনা করার জন্য অনেকে কারাগারে গেছেন, জুলুমের শিকার হয়েছেন। এমনকি শিশুরাও এই নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ব্যবহার করে শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারকে সমালোচনা করা একটি ‘ব্লাসফেমি’তে পরিণত করা হয়। মুজিব শতবর্ষ পালনে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করা হয়। মুজিবকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনী( রিচুয়াল), মুজিবীয় আইকন ও প্রতীক তৈরি করে তা উদ্‌যাপন এবং প্রশ্ন করা যাবে না—এমন ডিসকোর্স (গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ বা মহা বয়ান) তৈরি করে সমালোচনাকে শাস্তিযোগ্য বানিয়ে তোলা হয়।

রিচুয়াল, আইকন ও ডিসকোর্সের এ কার্যক্রম একটি রাজনৈতিক দেবত্বকরণ প্রক্রিয়ার দিকে ইঙ্গিত দেয়। বৈশ্বিক রাজনীতিতে ‘রাজনৈতিক দেবতা’ বিষয়টি নতুন নয়। ‘রাজনৈতিক দেবতা’ বলতে এমন ক্যারিশমাটিক রাজনৈতিক নেতাকে বোঝানো হয়, যাঁদের দেবতাদের মতো ‘সুপার-হিউম্যান’ ক্ষমতা থাকে বলে তাঁদের ভক্তরা মনে করেন। অধ্যাপক মৌমিতা সেন, শারিকা থিরাঙ্গামা ও কেনেথ নিলসন দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক দেবতাদের কথা তাঁদের গবেষণায় উল্লেখ করেছেন (দেখুন সেন ও নিলসন, ২০২২, গডস ইন দ্য পাবলিক স্ফেয়ার: পলিটিক্যাল ডেইফিকেশন ইন সাউথ এশিয়া)।

অধ্যাপক আরিল্ড রুড তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, কীভাবে বাংলাদেশে শেখ মুজিবকেন্দ্রিক ‘সিভিল রিলিজিয়ন’ বা নাগরিক ধর্ম নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়, ব্যক্তি মুজিবকে ও দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে একই পবিত্র ও সার্বভৌম চিহ্নে পরিণত করা হয়, যেখানে মুজিব নিজেই দেশের মতো সার্বভৌম চরিত্রে পরিণত হন এবং দেশের বাকি সব প্রজার কাছে বিশ্বস্ততার দাবিদার হয়ে ওঠেন (দেখুন রুড, ২০২২, বঙ্গবন্ধু অ্যাজ দ্য ইটারনাল সভেরেইন: অন দ্য কনস্ট্রাকশন অব আ সিভিল রিলিজিয়ন)।

এখানে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো মুসলিমপ্রধান দেশে ভারতের মতো খোলাখুলিভাবে কাউকে দেবতা হিসেবে দেখানো বা দেবত্ব আরোপ করা সম্ভব কি না। সেই বিবেচনায় কভার্ট ডেইফিকেশন বা ‘গুপ্ত দেবত্বকরণ’ ধারণাটিকে আমার এই ক্ষেত্রে যথাযথ বলে মনে হয়।

এ ধারণা অনুযায়ী, দেবত্বকরণের সব বৈশিষ্ট্য এ প্রক্রিয়ায় থাকলেও তা অপ্রকাশিত বা গুপ্ত থাকবে, অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো সরাসরি তাঁকে দেবতা বলা হবে না। কিন্তু রাজনৈতিক দেবত্বকরণ প্রক্রিয়ার মূল মেকানিজমগুলো, যেমন রিচুয়াল, আইকন ও ডিসকোর্স তৈরি (অবশ্য পালনীয় কিছু রীতি প্রতিষ্ঠা, তাঁকে প্রতীকে পরিণত করা ও তাঁর পক্ষে বয়ান তৈরি করা) করে নিয়মিত ও প্রাত্যহিক জীবনে মুজিবকে উদ্‌যাপন করা, মুজিবকে সার্বভৌম ও প্রশ্ন করা যাবে না, সমালোচনা করা যাবে না—এমন ব্যক্তিত্বে পরিণত করা। মুজিবের সমালোচনাকে শাস্তিযোগ্য করে তোলা এবং সর্বোপরি তাঁর চরিত্রকে খুঁতহীন ও অসাধারণ করে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া আমরা বাংলাদেশে বিগত হাসিনা আমলে দেখতে পাই।

মুজিবের ‘দেবতা’সুলভ বৈশিষ্ট্যকে সামনে নিয়ে আসতে ৭ মার্চে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ ও ‘মুজিব ছাড়া দেশ স্বাধীন হতো না’—এ বয়ানকে সামনে নিয়ে আসা হয়। সমসাময়িক অন্য বড় রাজনৈতিক নেতাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানকে ছাপিয়ে শেখ মুজিবকে ‘একক নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়, যাঁর বক্তৃতা, তর্জনী, চশমা, কোট ও পাইপকে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে প্রতীকী উপস্থাপন শুরু হয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পরিসরে শেখ মুজিবের সর্বময় উপস্থিতি—টাকার নোট, বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড, সংবাদপত্র, পাঠ্যবই, টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ও নেতাদের বক্তৃতায় প্রতিদিন, বারবার উল্লেখ করে মুজিবকে একটি ‘অদৃশ্য শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এই সর্ববিরাজমানতা একটি দৃশ্যমান কিন্তু গুপ্ত দেবত্বকরণ তৈরি করে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে, স্বাধীনতার আগে ও পরে, যত গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন, তাঁদের বনসাই করে মুজিবকে বটবৃক্ষের মতো মহিরুহ করে। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের মতে, জাতি একটি ইমাজিনড কমিউনিটি (কাল্পনিক সমাজ), যা সেই সমাজের এলিট অংশ সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা দিয়ে তৈরি করে। এ ধারণা তৈরি হতে পারে তাদের মধ্যে, যাদের একটি ভূখণ্ডে কমন অ্যানিমি (সাধারণ শত্রু), একই ধরনের বঞ্চনা ও বৈষম্য, ভাষা, সংস্কৃতি বা মূল্যবোধ রয়েছে বলে তারা মনে করে।

বর্তমান যে বাংলাদেশ, সেই ভূখন্ডভিত্তিক জাতির ধারণাটি নতুন এবং তা ১৯৪৭-এর কিছু আগে থেকে বিভিন্ন পরিসরে চিন্তা করলেও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে এসে চূড়ান্ত রূপ পায়। এই জাতি গঠনের যাত্রার বিভিন্ন বাঁকে বেশ কয়েকজন নেতা তাঁদের ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে তাঁদের সবার ভূমিকাই অনস্বীকার্য। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা চিন্তা করলেও নিশ্চিত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জিয়াউর রহমান যুদ্ধ শুরু করেছেন ও রণাঙ্গনে অবদান রেখেছেন এবং সাংগঠনিকভাবে তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু বাকি সবার অবদানকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু মুজিব ও বাংলাদেশের অস্তিত্বকে এক করে ফেলার মাধ্যমে একদিকে যেমন দেবত্বকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়, আরেক দিকে মুক্তিযুদ্ধের জনযুদ্ধ বৈশিষ্ট্যকে ছোট করে দেখা হয়।

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে সুযোগ এনে দিয়েছিল শেখ মুজিবের দেবত্বকরণ প্রক্রিয়াকে প্রশ্ন করার এবং মুক্তিযুদ্ধের জনসম্পৃক্ততার ইতিহাসকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী ঘটনাবলি, বিশেষ করে শিক্ষার্থী নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, গণতন্ত্রের পক্ষ হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব ও চরম ডানপন্থীদের উত্থান সেই সুযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম শক্তি ছিল সাংস্কৃতিক, যা মুজিবের দেবত্বকরণের বাইরে একটি নতুন ও সতেজ দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু তীব্র ডানপন্থার কবলে পড়ে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তচিন্তা ও বাংলাদেশি নাগরিক জাতীয়তাবাদের জায়গা থেকে সরে যাচ্ছেন অনেকেই। মব সৃষ্টি করে মাজারে হামলা, নারীদের হয়রানি, ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর হামলা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা নতুন বাংলাদেশকেন্দ্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা তো দূরের কথা, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির হাতকে শক্তিশালী করছে। এর ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি একে অপরের অস্তিত্বকে শক্তিশালী এবং কার্যক্রমের ন্যায্যতা তৈরি করছে।

মুজিবের রাজনৈতিক দেবত্বকরণ জোর খাঁটিয়ে থামানোর বিষয় নয়। বরং নতুন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থপতিকে স্বীকৃতি এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের জনযুদ্ধের রূপকে সামনে এনে তার ধারাবাহিকতায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে দেখার মাধ্যমেই বাংলাদেশি জাতির ধারণার জনসম্পৃক্ততা বিনির্মাণ করা সম্ভব।

* ড. সাইমুম পারভেজ, নরওয়ের স্কুল অব থিওলজি অ্যান্ড রিলিজিয়নের জ্যেষ্ঠ গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-20%2Fnorjroj2%2Fmujibcornerkk.JPG?rect=13%2C0%2C605%2C403&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক পরিসরে শেখ মুজিবের সর্বময় উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। ছবি ” সংগৃহীত

শেখ হাসিনা কেন ভারতে, তাঁকে ফেরত পাঠানো হোক: ওয়েইসি

ভারতের হায়দরাবাদ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়েইসি বৃহস্পতিবার বলেছেন, সরকার সত্যি সত্যিই যদি অবৈধ বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠাতে আগ্রহী হয়, তাহলে এখনই শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো হোক। তাঁকে দিয়েই শুরু হোক এ অভিযান।

আসাউদ্দিন ওয়েইসি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ‘আইডিয়া এক্সচেঞ্জ’ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। ওয়েইসি অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনেরও (এআইএমআইএম) প্রধান।

ওয়েইসি ওই অনুষ্ঠানে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন এ দেশে রয়েছেন? তিনিও তো বাংলাদেশি, তাই না? তাঁকেও ফেরত পাঠানো হোক।

২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে বসবাস করছেন।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার ‘আইডিয়া এক্সচেঞ্জ’ অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথিদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তাঁদের অভিমত জানতে চাওয়া হয়। হাসিনা–সম্পর্কিত প্রশ্নটি উঠেছিল অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাভাষীদের যেভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, সীমান্তে নিয়ে জবরদস্তি ফেরত পাঠানো হচ্ছে, সে বিষয়ে।

ওয়েইসি এ প্রসঙ্গে বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘দেশকে অনুপ্রবেশকারীমুক্ত করতে হলে শেখ হাসিনাকে দিয়েই শুরু করা উচিত। আমরা কেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে দেশে রেখেছি? তিনিও তো বাংলাদেশি? তাঁকে ফেরত পাঠানো হোক।’

লোকসভার এই সদস্য বলেন, বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভ্যুত্থানকে ভারতের মেনে নেওয়া উচিত। নতুন সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার।

নিজের মন্তব্যের ব্যাখ্যায় ওয়েইসি বলেন, ‘একদিকে একজন বাংলাদেশিকে আমরা এ দেশে থাকতে দিচ্ছি। তিনি নানা ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন, বিবৃতি দিচ্ছেন। সমস্যা সৃষ্টি করছেন। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, মুর্শিদাবাদ জেলার দরিদ্র বাংলাভাষী নাগরিকদের পুনে থেকে উড়োজাহাজে চাপিয়ে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং সীমান্তে গিয়ে নো ম্যানস ল্যান্ডে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তারা সত্যিই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী কি না, সেটা যাচাই পর্যন্ত করা হচ্ছে না।

ওয়েইসি বলেন, দেশে যিনিই বাংলা ভাষায় কথা বলছেন, তিনি বাংলাদেশি হয়ে যাচ্ছেন। কী ধরনের বিদেশাতঙ্ক কাজ করছে, এ থেকে বোঝা যায়। এসব মানুষকে বন্দিশালায় আটকে রাখার অধিকার পুলিশকে কে দিয়েছে? এখানে সবাই পাহারাদার হয়ে গেছে।

ওয়েইসির সমালোচনার লক্ষ্য বিজেপি ও তার নীতি। বিহারে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে যা চলছে, সেটার বিরোধিতা করেন ওয়েইসি। তিনি বলেন, ভোটার তালিকা থেকে বৈধ নাগরিকদের, বিশেষ করে মুসলিমদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। প্রকৃত নাগরিকদের নাম বাদ গেলে তখন তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

বিহারে এর আগের নির্বাচনে তাঁর নিজের দলের সমর্থকদের এ অভিজ্ঞতা হয়েছে বলে ওয়েইসি জানান।

অনুপ্রবেশকারীদের জবরদস্তি বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে অবনতি ঘটেছে। প্রধানত, পশ্চিমবঙ্গ, আসামের সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এ কাজ করছে। এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধ তীব্র হয়েছে।

বাংলাভাষী ভারতীয় মুসলিমদের যাঁরা ভিনরাজ্যে কোনো না কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত, বিশেষ করে মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে যাঁরা শ্রমিক হিসেবে রয়েছেন, তাঁদের নিত্য হয়রানি সহ্য করতে হচ্ছে। হেনস্তা হতে হচ্ছে।

বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতেই এই ধরপাকড় বেশি হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস সংসদেও প্রতিবাদ করছে। বাংলাভাষী ভারতীয়দের হেনস্তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-21%2Fv2hwqm1g%2FUntitled-3.jpg?rect=0%2C0%2C978%2C652&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
শেখ হাসিনা ও আসাদউদ্দিন ওয়েইসি। ফাইল ছবি

গাজা সিটি দখল শুরু করেছে ইসরাইল

গাজা সিটি দখল করে নেয়া শুরু করেছে ইসরাইল। এরই মধ্যে তারা শহরের বেশ কিছু এলাকা দখলে নিয়েছে। অনলাইন বিবিসি ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে। এক সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছে, সেনারা ইতিমধ্যেই জয়তুন এবং জাবালিয়া এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ মঙ্গলবার এই অভিযানের অনুমোদন দিয়েছে। এ সপ্তাহের শেষের দিকে নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিসভায় তা উপস্থাপন করা হবে। তবে পুরোপুরি অভিযান শুরু হবে সেপ্টেম্বরে। তখন প্রায় ৬০ হাজার রিজার্ভ সেনাকে ডাকা হবে। তারা মাঠপর্যায়ে অভিযানে থাকা সেনাদের দখল অভিযানে সক্রিয় বা সহযোগিতা দেবে।

ওদিকে হামাস ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে দেয়ার অভিযোগ এনে বলেছে, ইসরাইল নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নির্মম যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। গাজা সিটির কয়েক লাখ ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণ গাজার আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন বুধবার বলেছেন, ইসরাইলের এই পরিকল্পনা দুই জাতির জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং পুরো অঞ্চলকে স্থায়ী যুদ্ধের চক্রে ঠেলে দেবে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি সতর্ক করে বলেছে, নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ও সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি গাজার ২১ লাখ মানুষের জন্য ইতিমধ্যেই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে। ইসরাইল সরকার গত মাসে হামাসের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির প্রক্রিয়া ভেঙে যাওয়ার পর পুরো গাজা দখলের ঘোষণা দেয়।

বুধবার টেলিভিশন ব্রিফিংয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেছে, ২২ মাসের যুদ্ধের পর হামাস ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সে আরও বলে, আমরা গাজা সিটিতে হামাসের ক্ষতি আরও গভীর করব, যা ওই সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রশাসনিক ও সামরিক সন্ত্রাসের ঘাঁটি। আমরা ভূপৃষ্ঠের ওপরে ও নিচে সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংস করব এবং জনগণের হামাসের ওপর নির্ভরতা ছিন্ন করব। ডেফরিন জানায়, সেনারা ইতিমধ্যে শহরের প্রান্তে অবস্থান করছে। জয়তুন এলাকায় দুটি ব্রিগেড কাজ করছে এবং সেখান থেকে অস্ত্রভর্তি একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ খুঁজে পেয়েছে। জাবালিয়া এলাকায় আরও একটি ব্রিগেড অভিযান চালাচ্ছে। সে দাবি করে, বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষতি কমানোর জন্য তাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দেয়া হবে। গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত সিভিল ডিফেন্স সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, জয়তুন ও সাবরা এলাকায় পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অসহনীয়। বুধবার ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ২৫ জন নিহত হয়েছেন বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিনটি শিশু ও তাদের বাবা-মা ছিলেন। ডেফরিন বলে, হামাসের হাতে থাকা ৫০ জন জিম্মিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সেনারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে তাদের পরিবারগুলো আশঙ্কা করছে, গাজা সিটিতে স্থল অভিযান শুরু হলে জিম্মিরা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

রেডক্রস সতর্ক করে বলেছে, সামরিক কার্যক্রম তীব্র হলে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক এবং জিম্মিদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, মাসের পর মাস সংঘাত আর বারবার বাস্তুচ্যুতিতে গাজার মানুষ সম্পূর্ণরূপে ক্লান্ত। তাদের প্রয়োজন স্বস্তি, ভয় নয়। তাদের মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার জন্য প্রয়োজন খাদ্য, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি এবং নিরাপদ আশ্রয়। সামরিক অভিযান আরও বাড়লে কেবল ভোগান্তি বাড়বে, পরিবারগুলো ছিন্নভিন্ন হবে এবং এক অপূরণীয় মানবিক সংকট তৈরি হবে। জিম্মিদের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়বে। এজন্য তারা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং গাজায় বাধাহীন মানবিক সহায়তা প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী কাতার ও মিশর ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও প্রায় অর্ধেক জিম্মি মুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে। হামাস তা সোমবার গ্রহণ করে। তবে ইসরাইল আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। ইসরাইলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা আর আংশিক কোনো চুক্তি মানবে না; বরং সব জিম্মি মুক্তির ব্যাপারে সমঝোতা চায় তারা। হামাস বুধবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে মধ্যস্থতাকারীদের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব উপেক্ষা করার অভিযোগ এনে বলেছে, সে যে কোনো চুক্তির প্রধান বাধা।

mzamin

ইসরায়েলের মিত্ররা কি ‘ডুবন্ত জাহাজ’ ত্যাগ করছে by জোসেফ মাসাদ

জায়োনিজমবিরোধী ও অন্যান্য বামপন্থী ইহুদি সংগঠন শুরু থেকেই ইসরায়েলের গণহত্যার নিন্দা জানিয়েছে ও প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু সম্প্রতি ইসরায়েলের মিত্র বেশ কিছু দেশ এবং ইসরায়েলপন্থী ইহুদি সংগঠনগুলোও তাদের সুর কিছুটা পরিবর্তন করেছে। তাদের এ অবস্থান পরিবর্তনের নেপথ্যের কারণ নিয়ে লিখেছেন জোসেফ মাসাদ

হঠাৎ করে একধরনের আতঙ্ক বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের সমর্থকদের গ্রাস করেছে। পশ্চিমা নব্য-ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী, যার মধ্যে রয়েছে শ্বেতাঙ্গ উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড। এ দেশগুলো সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত এশিয়ার শেষ ইউরোপীয় উপনিবেশিক রাষ্ট্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে।

ইসরায়েল–সমর্থক ব্রিটিশ ও আমেরিকান ইহুদি সংগঠনগুলোও এই নতুন উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে ও পরে সংঘটিত ইসরায়েলের চলমান অপরাধগুলোকে সম্পূর্ণ সমর্থন দিয়ে এসেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় অব্যাহত বোমাবর্ষণ ও আগুনঝরা হামলার পাশাপাশি জীবিত ফিলিস্তিনিদের পরিকল্পিতভাবে গণ-অনাহারের মধ্যে রাখার ঘটনাগুলো তাদের মধ্যে নৈতিক দ্বিধার সঞ্চার করেছে।

জায়োনিজমবিরোধী ও অন্যান্য বামপন্থী ইহুদি সংগঠন শুরু থেকেই ইসরায়েলের গণহত্যার নিন্দা জানিয়েছে ও প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু ব্রিটিশ ও আমেরিকান প্রো-ইসরায়েলি ইহুদি সংগঠনগুলোর অধিকাংশই এ পর্যন্ত ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দেখিয়েছে।

গত দুই সপ্তাহে এ অবস্থার পরিবর্তন দেখা গেছে। সমন্বিত ও প্রায় একই সময়ে দেওয়া একাধিক বিবৃতিতে তারা গাজায় দুর্ভিক্ষ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

অতিশয় কঙ্কালসার শিশুদের ছবি, সামরিক নিয়ন্ত্রিত সাহায্যকেন্দ্রে ভিড় জমানো হতাশ জনতা আর খাদ্যের সন্ধানে দৌড়ে আসা ফিলিস্তিনিদের হত্যাযজ্ঞ—এসব দৃশ্য ইসরায়েলপন্থী পশ্চিমা সরকার ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ইসরায়েলের অপরাধকে বৈধতা দেওয়া বা এই মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা উপেক্ষা করা অসম্ভব করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতাকে বাদ দিলে এখন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, ইসরায়েলের অবশিষ্ট অল্প কয়েকজন মিত্রও গণহত্যা ও গাজার পুনর্দখলের পথে প্রত্যাশিত মাত্রায় তাদের সমর্থন দিতে প্রস্তুত নয়, বরং কেউ কেউ হয়তো ইতিমধ্যে ‘ডুবন্ত জাহাজ’ ছেড়ে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিলম্বিত উৎকণ্ঠা

ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত দেশটির সমর্থকেরা সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধ নিয়ে তাদের উল্লাস কিছুটা স্তিমিত করেছে এবং ‘মানবিকতার প্রতি কৃত্রিমভাবে মাথা নেড়ে’ তারা চেষ্টা করছে যেন ইসরায়েলের গণহত্যামূলক অভিযান বৈশ্বিক ক্ষোভ সত্ত্বেও অবাধে চলতে পারে।

২৭ জুলাই প্রো-ইসরায়েল আমেরিকান জিউইশ কমিটি (এজেসি) এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের ‘হামাস নির্মূল ও অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্ত করার জন্য ন্যায্যযুদ্ধ’ সমর্থন করে। একই সঙ্গে তারা ‘ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের ওপর এই যুদ্ধে পড়া গুরুতর ক্ষতির জন্য গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করে এবং গাজায় ক্রমবর্ধমান খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ জানায়।

এজেসি একই সঙ্গে গাজায় সাহায্য প্রবাহ ও বণ্টন বাড়াতে ইসরায়েলের ঘোষিত ‘একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপকে’ স্বাগত জানায়।

তারা আহ্বান জানায়, ইসরায়েল, গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন, জাতিসংঘ এবং সাহায্য বিতরণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ যেন সহযোগিতা ও সমন্বয় বাড়ায়, যাতে গাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের কাছে মানবিক সাহায্য পৌঁছায়।

ফিলিস্তিনিদের জন্য এই বিলম্বিত উদ্বেগ প্রকাশের লাইনে এজেসি একা নয়। একই সপ্তাহে নিউইয়র্কভিত্তিক র‌্যাব্বিনিকাল অ্যাসেম্বলি, যা ইহুদি ধর্মের রক্ষণশীল অংশের প্রতিনিধিত্ব করে—এ সংগঠনটিও ‘গাজায় ক্রমশ অবনতিশীল মানবিক সংকট’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা ‘নাগরিক ভোগান্তি লাঘব ও সাহায্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ’ নেওয়ার দাবিও জানিয়েছে।

অ্যাসেম্বলি আরও আহ্বান জানিয়েছে: ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায়, মর্যাদা ও নিরাপত্তাভিত্তিক এক ভবিষ্যৎ গড়া এবং মানবিক সাহায্য যাতে প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছায়, তার জন্য ইসরায়েল যেন সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি ইঙ্গিত করে তারা বলে, ‘ইহুদি ঐতিহ্য আমাদের আহ্বান জানায় খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে।’

তাদের সঙ্গে যোগ দেয় ইউনিয়ন ফর রিফর্ম জুডাইজম। এটি উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় ইহুদি ধর্মীয় সংগঠন, যা ১৯৪০-এর দশক পর্যন্ত জায়নবাদের কঠোর বিরোধী ছিল।

২৭ জুলাই প্রকাশিত এক বিবৃতিতে রিফর্ম মুভমেন্ট বলেছে, ‘সামরিক চাপ বাড়ানো বা মানবিক সাহায্য সীমিত করার মাধ্যমে ইসরায়েল জিম্মি চুক্তির কাছাকাছি আসতে পারেনি কিংবা যুদ্ধ শেষও করতে পারেনি।’ তারা আরও যোগ করেছে: ইসরায়েল তার নৈতিক অবস্থান বিসর্জন দিতে পারে না… গাজার বেসামরিক মানুষকে অনাহারে রাখা ইসরায়েলকে হামাসের বিরুদ্ধে যে ‘সম্পূর্ণ বিজয়’ চাইছে, তা এনে দেবে না আর এটি ইহুদি মূল্যবোধ বা মানবিক আইনের দ্বারা কোনোভাবেই ন্যায্যতা পেতে পারে না।

এর কয়েক দিন পর বিশ্বের বিভিন্ন মতাদর্শিক শাখার এক হাজার রাব্বির স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ঘোষণা করা হয় যে তারা অসংখ্য নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ বেসামরিকদের গণহত্যা কিংবা যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে অনাহার ব্যবহারের অনুমোদন দিতে পারেন না। তাঁরা লিখেছেন, ‘এটি শুধু ইসরায়েলের নয়, বরং ইহুদিধর্মেরই নৈতিক সুনামের প্রশ্ন—যে ইহুদিধর্মকে আমরা আমাদের জীবন উৎসর্গ করেছি।’

ক্ষয়ক্ষতি সামলানো

ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগের বিবৃতি এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে আরও ছড়িয়ে পড়েছে। ২৯ জুলাই যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় ইহুদি সংগঠন বোর্ড অব ডেপুটিজ গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘সব উপলব্ধ চ্যানেলের মাধ্যমে দ্রুত, বাধাহীন ও টেকসইভাবে সাহায্য বাড়ানোর’ আহ্বান জানায়; যুদ্ধাপরাধের সমালোচনা করায় মাত্র এক মাস আগে নিজেদের সদস্যদের শাস্তি দেওয়ার পরই তারা এ অবস্থান নিল।

সেদিনই ৩১ জন বিশিষ্ট ইসরায়েলি ফিলিস্তিনিদের অনাহারে রাখার দায়ে ইসরায়েলের ওপর ‘অত্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানান। এই আহ্বান আসে তার এক দিন পর, যখন দুটি ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বেতসেলেম এবং ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরায়েল বিশ্বসম্প্রদায়ের সঙ্গে এককাতারে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

সাম্প্রতিক এক ফোনকলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর চিৎকার করে বলেন, তিনি যেন দুর্ভিক্ষের বিষয়টি অস্বীকার করা বন্ধ করেন, এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

এরপরও কেউ যেন না ভাবে যে এই মনোভাব সর্বজনীন। কারণ তা বাস্তব নয়; সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৯ শতাংশ ইসরায়েলি ইহুদি গাজায় দুর্ভিক্ষ ও ভোগান্তির খবরে ‘খুব একটা বিচলিত নন’, কেউ কেউ ‘একেবারেই বিচলিত নন’।

ইসরায়েলি নীতির বিরুদ্ধে আপত্তি এসেছে অধিকাংশ পশ্চিমা সরকারের পক্ষ থেকেও। বিশেষত ইসরায়েলের নবঘোষিত গাজা পুনর্দখল পরিকল্পনা নিয়ে। এমনকি ইসরায়েলপন্থী ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান–এর প্রধান অনেক লেখকও তীব্র আতঙ্ক প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন। তাঁরা বলেছেন যে এ পদক্ষেপ ইসরায়েলের জন্য ক্ষতিকর। কারণ, এটি ‘কোনো সামরিক বিজয় নিশ্চিত করে না’ বরং ‘হামাসের সঙ্গে সংঘাতকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায়, যার কোনো সমাপ্তি নেই।’

ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্ররা ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও অন্যরা—পুনর্দখলের বিরোধিতায় একত্র হয়েছে।

তাদের এই প্রতিবাদ এসেছে নেতানিয়াহুর দাবির পরও, যেখানে তিনি বলেছেন, তাঁর লক্ষ্য কেবল ‘গাজাকে হামাস থেকে মুক্ত করা এবং সেখানে একটি শান্তিপূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেওয়া’।

অক্টোবর ২০২৩ থেকে প্রতিটি ইসরায়েলি পদক্ষেপকে সমর্থন করা উগ্র ইসরায়েলপন্থী জার্মান সরকারও এখন গণহত্যারত এই রাষ্ট্রের কাছে নতুন কোনো অস্ত্র বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছে, যা চলমান নিধনযজ্ঞে ব্যবহৃত হতে পারত।

এর পাশাপাশি পশ্চিমাদের নতুন কৌশল হলো আগামী মাসে জাতিসংঘে এক কাল্পনিক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া, যা ইসরায়েলি ঔপনিবেশকে নিজ থেকেই বাঁচানো এবং গণহত্যায় পশ্চিমা প্রকাশ্য ও সক্রিয় সমর্থনকে আড়াল করার এক মরিয়া প্রচেষ্টা।

একইভাবে পশ্চিমাদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত আরব দেশের একনায়কেরাও, যারা গণহত্যা শুরুর পর থেকে বাস্তবিকভাবে (যদিও সব সময় বক্তব্যে নয়) ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। তারা এসব পদক্ষেপের সহযোগী হচ্ছে।

ডুবন্ত জাহাজ

জাতিসংঘের স্বাধীন র‌্যাপোর্টিয়ার এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেরিতে হলেও গাজায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এরপর পশ্চিমা সরকার ও মূলধারার গণমাধ্যম, এমনকি কিছু ইসরায়েলি সংগঠনের জন্য গাজার ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ডের মাত্রাকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করা, অস্বীকার করা বা সন্দেহ তৈরি করা অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে। গত কয়েক মাসে এ ধরনের বয়ান ক্রমেই অ–টেকসই হয়ে পড়েছে।

তার ওপর হামাসের বিরুদ্ধে কিংবা ইরানের বিরুদ্ধেও যুদ্ধে জয়লাভে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা মূলত বেসামরিক মানুষ হত্যার মধ্যেই সীমিত অথচ তাদের বশ্যতা স্বীকার করাতে ব্যর্থ—এই বাস্তবতা পশ্চিমা সরকারগুলোর জন্য একটি বড় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

পশ্চিমাদের প্রতিদিনের সামরিক, গোয়েন্দা, আর্থিক ও কূটনৈতিক সহায়তা ছাড়া ইসরায়েল এই গণহত্যা চালাতে পারত না; এমনকি আবার তাদের দশকের পর দশক ধরে শত্রু বানানো দেশগুলোর আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারত।

অধিকাংশ ইসরায়েলি ইহুদি ভোটারের সমর্থনে গঠিত ইসরায়েলি সরকার যেসব নীতি চালিয়ে যাচ্ছে, তা দেশের পশ্চিমা জনমতের
কাছে দেশটির অবস্থানকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে; পশ্চিমাদের জন্য আঘাতের ওপর আঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর ফলে সাম্প্রতিক ব্যর্থতাগুলো দেখে ইসরায়েলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইসরায়েলের বাকি মিত্রদেশগুলো ‘লাইফবোট’ খুঁজতে শুরু করেছে, তারা হয়তো ডুবন্ত জাহাজের সঙ্গে তলিয়ে যেতে চাইছে না।

১৯৫০-এর শেষ ও ১৯৬০-এর শুরুতে আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধের শেষে যেমন ফরাসি জনগণ উপনিবেশ রক্ষার শেষ চেষ্টায় আলজেরীয়দের বিরুদ্ধে এবং ফ্রান্সের ভেতরে ফরাসি বসতিদের চালানো বর্বর সহিংসতায় ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল, ইসরায়েলি ঘটনাতেও আমরা তেমন প্রবণতা লক্ষ করছি।

পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে জরিপগুলো দেখাচ্ছে, ডান থেকে বাম পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ইসরায়েলের নৃশংসতাকে নিন্দা করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও শুধু বাম নয়, ট্রাম্পপন্থী ডানপন্থীরাও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রটিকে পরিত্যাগ করেছে এবং এর প্রতি মার্কিন সমর্থনের বিরোধিতা করছে।

ইসরায়েলের একগুঁয়ে পশ্চিমা সমর্থকদের আশঙ্কা হচ্ছে, এর পরিণতি ফরাসি আলজেরিয়ার মতো হতে পারে। নেতানিয়াহু নিজেও এক দশক ধরে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে ইসরায়েল হয়তো তার শততম জন্মদিন পর্যন্ত টিকে থাকবে না; এটি এই ভয়কে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে যে ইসরায়েল নিজেই নিজের পতনকে দ্রুততর করছে।

* জোসেফ মাসাদ, নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব রাজনীতি ও বৌদ্ধিক ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি বেশ কিছু বই এবং একাডেমিক ও সাংবাদিকতামূলক প্রবন্ধের লেখক।
- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

ইসরায়েলের হামলায় গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে
ইসরায়েলের হামলায় গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ফাইল ছবি: এএফপি