Wednesday, February 15, 2017

অদম্য বাইয়েত্তি

লুসিয়ানো বাইয়েত্তির বয়স ৭০ বছর। ইতালির রাজধানী রোমের কাছাকাছি আলবান হিলস এলাকার ভেলেত্রি শহরে থাকেন। ছোট্ট বাড়ি এবং বাগানে খুঁটিনাটি কাজ করেই সারা দিন কাটিয়ে দেন। কিন্তু রাত তিনটায় উঠে এখনো পাঠ্যবই নিয়ে বসেন নিয়মিত। এটাই তাঁর পড়াশোনার অভ্যাস। ইতালির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাইয়েত্তি এ পর্যন্ত ১৫টি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সনদ পেয়েছেন। ইতিমধ্যে ষোড়শ সনদ অর্জনের চেষ্টাও শুরু করে দিয়েছেন। বর্ষীয়ান এই ছাত্র বললেন, ‘বইপত্রকে ধন্যবাদ। নিজেকে মুক্ত মনে হয়। সর্বোপরি শব্দগুলোর উৎস তো একই।’ তিনি ইতালীয় শব্দ ‘লিব্রো’ (বই) এবং ‘লিবেরো’র (মুক্তি) কথা বলছিলেন। অর্জিত সনদ তাঁর ঘরের দেয়ালে ঝুলছে। পাশেই ১৯ শতকের ফরাসি প্রবন্ধকার লুই-ফ্রাঁসোয়া বের্তাঁর ছবি। বাইয়েত্তি বললেন, তাঁর ওপর বের্তাঁর প্রভাব অনেক। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন সংস্কৃতিমান ও বিদ্বান ব্যক্তি। বাইয়েত্তি একসময় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ২০০২ সালে অষ্টম বিশ্ববিদ্যালয় সনদ অর্জনের পরই গিনেস বুক অব রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছেন। সেটা ছিল মোটরগাড়ির দক্ষতার ওপর তাঁর পড়াশোনার স্বীকৃতি। তত দিনে তিনি সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্য, আইন, রাজনীতিবিজ্ঞান এবং দর্শনশাস্ত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করেছেন। বেশির ভাগ সনদ পেয়েছেন রোমের মর্যাদাপূর্ণ লা সাপিয়েনজা ইউনিভার্সিটি থেকে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। সেই থেকে এ পর্যন্ত বাইয়েত্তি আরও সাতটি সনদ পেয়েছেন। এসবের মধ্যে অপরাধবিজ্ঞানের একটা সনদও আছে।
এটা ছিল তুরিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামরিক কৌশলের ওপর দূরশিক্ষণ কোর্স। সর্বশেষ তিনি নেপলস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পর্যটন বিষয়ে একটি অনলাইন কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। চলতি মাসের শুরুতেই তিনি এই সনদ পেয়েছেন। ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন বাইয়েত্তি। বললেন, প্রতিটি কোর্স শুরুর সময় তিনি নতুন একটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেন। ভাবতেন, দেখে নেওয়া যাক তাঁর শরীর ও মস্তিষ্ক কত দূর যেতে পারে। বাইয়েত্তির এ রকম ব্যতিক্রমী শখের যাতনা তাঁর চেয়ে বয়সে প্রায় ৩০ বছরের ছোট স্ত্রীকে সইতে হয়। ভালোবেসে তিনি সেটা মেনে নিয়েছেন। বললেন, তাঁর স্বামীকে এ রকম স্বভাবের জন্যই শহরের সবাই চেনে। বাইয়েত্তি একসময় দিনে রেডক্রসের চাকরি আর রাতে পড়াশোনা করেছেন। চিরকালীন শিক্ষার্থী বাইয়েত্তি ১৯৭২ সালে প্রথম সনদ অর্জন করেন। সেটা ছিল শারীরিক শিক্ষার ওপর। তারপর শিক্ষাজগতের আকর্ষণে একটানা নিমগ্ন হয়ে পড়েন। সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত কোর্সটি। তখন সামরিক পোশাক পরে তাঁকে অপরাধবিজ্ঞানের মাস্টার্স পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এখন তিনি পড়ছেন খাদ্যবিজ্ঞান। ভোরের আগে উঠে কেন পড়তে বসেন? বাইয়েত্তি বলেন, ওই সময় মাথাটা পড়াশোনার জন্য বেশি উন্মুক্ত থাকে। আর এতে স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনযাপনটাও নির্বিঘ্ন হয়।

বিতর্ক ফ্লিনের জন্য নতুন কিছু নয়

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছিলেন মাইকেল ফ্লিন। ‘নিয়েছিলেন’ বলতে হচ্ছে। কারণ, পদে থিতু হওয়ার আগেই নিয়মবহির্ভূতভাবে রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করার অভিযোগ ওঠার জেরে পদত্যাগ করেছেন তিনি। বিতর্কিত কাজের জেরে এভাবে পদ থেকে সরে যাওয়া সাবেক জেনারেল মাইকেল ফ্লিনের জন্য নতুন কিছু নয়। দুই বছর আগে পেন্টাগনের গোয়েন্দা সংস্থা ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) প্রধানের পদ থেকেও সরে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ফ্লিনের দাবি, ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদের’ বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে ‘সত্যি’ কথা বলার জন্যই তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তিনি মনে করেন,
ওই বৈশ্বিক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে। তবে পেন্টাগনের ভেতরের খবর, ডিআইএকে একেবারে ঢেলে সাজানোর যে অজনপ্রিয় পরিকল্পনা ফ্লিন করেছিলেন, সেটির জন্যই তাঁকে সরে যেতে হয়েছিল। ডিআইএর দায়িত্ব থেকে বাদ পড়ার সময় অনেকেই মনে করেছিলেন ফ্লিনের দিন শেষ। কিন্তু মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক এ কর্মকর্তা সে বিপর্যয়ের বছর দুয়েক না যেতেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। যদিও জীবনের বেশির ভাগ সময় ডেমোক্রেটিক দলের সমর্থক ছিলেন তিনি। ট্রাম্পের মতোই রাশিয়াকে ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে করেন ফ্লিন। আর প্রেসিডেন্টের মতো বিতর্কের মধ্যেই তাঁর বাস। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে একাধিকবার বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন ফ্লিন। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক টুইট বার্তায় তিনি লিখেছিলেন, ‘মুসলিমদের ভয় পাওয়া যুক্তিসংগত’। ওই বছরেরই জুলাইয়ে নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ইসলামি বিশ্ব সম্পূর্ণভাবেই ব্যর্থ।’ তবে যুক্তরাষ্ট্রে অনেকে ফ্লিনের পক্ষও নিয়েছেন। কারণ, তিন দশকের বেশি সময় ধরে সেনাবাহিনীতে কাজ করা এ ব্যক্তি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সামলাতে বেশ দক্ষ বলেই বিবেচিত।

দুবাইতে আসছে উড়ন্ত ট্যাক্সি!

বিচিত্র ও ব্যয়বহুল জিনিস আর কার্যকলাপের জন্য সুপরিচিত দুবাইতে এবার আসছে উড়ন্ত ট্যাক্সি। আকাশপথে একজন যাত্রীর উপযোগী এ ড্রোনজাতীয় যানকে বলা হচ্ছে হোভার ট্যাক্সি। যান্ত্রিকভাবে আগে থেকে ঠিক করা নির্ধারিত গন্তব্যে আরোহীকে পৌঁছে দেবে চীনের তৈরি স্বয়ংক্রিয় এই যান। একেকবারে ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলতে পারবে হোভার ট্যাক্সি। আর গতি হবে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে এটিকে পরীক্ষামূলকভাবে চালানোও হয়েছে। দুবাইয়ের পরিবহন কর্তৃপক্ষ গত সোমবার জানিয়েছে, আগামী জুলাই মাসের মধ্যে এটি পুরোদস্তুর নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র দুবাই ২০৩০ সালের মধ্যে এর যানবাহনের এক-চতুর্থাংশকেই স্বয়ংক্রিয় করার কথা ভাবছে। এর অংশ হিসেবে চালু করা হচ্ছে হোভার ট্যাক্সি। চীনের ড্রোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইহাং খুদে আকাশযানটি তৈরি করেছে। তারা এক বিবৃতিতে বলেছে, এই ট্যাক্সি ৩০০ মিটার উঁচু দিয়ে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে উড়ে আরোহীকে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সক্ষম। এর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হবে মাটিতে থাকা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে। এই ট্যাক্সির আটটি পাখা ও অতি উন্নতমানের সেন্সর রয়েছে। আর একে নতুন করে চার্জ করতে লাগবে দুই ঘণ্টা। দুবাই পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রধান মাত্তার আল-তায়ের গত সোমবার বলেন, ‘ইহাং ১৮৪ মডেলের আকাশযানটি ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট সামিটে প্রদর্শন করা হয়েছে। এটি কেবল মডেল নয়। দুবাইয়ের আকাশে এটি চালিয়েই দেখা হয়েছে। যানজট কমাতে এই ট্যাক্সি-সেবা এ বছরের জুলাইতে চালু করার সর্বাত্মক চেষ্টাও করা হচ্ছে।’

শশীকলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন অধরা

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন এ যাত্রায় অধরাই থেকে গেল জয়ললিতার ছায়াসঙ্গী শশীকলা নটরাজনের। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে এখন তাঁকে কর্ণাটকের জেলে বন্দিজীবন কাটাতে হবে। হিসাববহির্ভূত সম্পত্তি রাখার মামলায় ভারতের বেঙ্গালুরুর বিশেষ আদালত তামিলনাড়ু রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা, তাঁর বান্ধবী শশীকলা ও অন্যদের বিরুদ্ধে যে রায় দিয়েছিলেন, গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট তা বহাল রাখলেন। ৬১ বছর বয়সী শশীকলাকে এখন চার বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। ভারতের নতুন আইন অনুযায়ী দুই বা তার বেশি সময়ের জন্য কারও সাজা হলে সেই ব্যক্তি সাজা ভোগের পরবর্তী ৬ বছর পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে ৪ বছরের সাজা ও পরের ৬ বছর ধরলে আগামী ১০ বছর শশীকলার কাছে নির্বাচনে দাঁড়ানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। সর্বোচ্চ আদালত তাঁকে কর্ণাটক পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন।
শশীকলার ঘনিষ্ঠ মহল অবশ্য জানিয়েছে, তারা এই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন জানাবে। চূড়ান্ত রায় দেওয়ার আগে মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার মৃত্যু হয়। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটিয়ে আয়বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের যে অভিযোগ জয়ললিতা, তাঁর দত্তক-পুত্র সুধাকরণ, বান্ধবী শশীকলা ও আত্মীয় ইলাবরসির বিরুদ্ধে উঠেছিল, তা বহাল থাকায় সম্মানহানির হাত থেকে প্রয়াত নেত্রী রেহাই পেলেন না। শশীকলার জেলযাত্রা এখন অনিবার্য হয়ে ওঠায় তামিলনাড়ুর শাসক দল এআইএডিএমকের ক্ষমতার লড়াই অন্য মাত্রা পেল। দলের ১১৯ জন ‘অনুগামী’ বিধায়ককে চেন্নাইয়ের অদূরে এক বিলাসবহুল রিসোর্টে কয় দিন ধরে ‘বন্দী’ রেখে শশীকলা মুখ্যমন্ত্রিত্বের দাবি জানিয়ে রাজ্যপালের আমন্ত্রণের অপেক্ষায় ছিলেন। জেলযাত্রা অবধারিত বুঝে যাওয়ার পরই গতকাল সকালে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ ই পালানিসামিকে পরিষদীয় দলের নেতা নির্বাচন করেন। একই সঙ্গে তিনি অন্তর্বর্তী মুখ্যমন্ত্রী বিদ্রোহী পনিরসেলভামকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। এরপরই শশীকলার নির্দেশে রাজ্যপাল বিদ্যাসাগর রাওকে চিঠি দিয়ে পালানিসামি সরকার গঠনের আরজি জানান। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর পনিরসেলভামের অনুগামীরা নতুন আশায় বুক বাঁধলেও তিনি রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে সরকার গঠনের দাবি জানাননি। রায় শুনে প্রথমে তিনি বলেন, রাজ্যের মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি সাবধানী হয়ে বলেন, ‘দলে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা চলছে, আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’ সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোনোর আগে থেকেই অবশ্য শশীকলার শিবির থেকে একজন-দুজন করে বেরিয়ে এসে পনিরসেলভাম শিবিরে যোগ দিয়েছেন। রায় বেরোনোর পর পনিরসেলভাম শিবির থেকে দাবি জানানো হয়, আরও ১১ জন বিধায়ক তাঁর দিকে আসতে উন্মুখ।
এই অবস্থায় রাজ্যপালের ভূমিকা আলোচনার স্তরে উঠে এসেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতির চিঠি থাকলেও শশীকলাকে কেন এত দিন সরকার গড়তে ডাকা হয়নি, কেনই বা তিনি অনর্থক সময় নিচ্ছেন, সেই প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এই পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল কী করবেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহতগি গত সোমবার রাজ্যপাল বিদ্যাসাগর রাওকে এক দিনের বিশেষ বিধানসভার অধিবেশন ডাকার পরামর্শ দিয়েছেন। সেই অধিবেশনে দুই শিবিরকেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ রাখার সুপারিশ করেছেন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, দুই শিবিরই গরিষ্ঠতার দাবি জানাচ্ছে বলে দুটি ভিন্ন প্রস্তাবের ওপর গোপন ভোটাভুটি করা দরকার। এই ক্ষেত্রে তিনি উত্তর প্রদেশ বিধানসভার এক দৃষ্টান্ত উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। ১৯৯৮ সালের সেই ঘটনায় লোকতান্ত্রিক কংগ্রেসের জগদম্বিকা পাল ও বিজেপির কল্যাণ সিং দুজনেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের দাবি জানিয়েছিলেন। রাজ্যপাল বিধানসভা কক্ষে গোপন ভোটের বন্দোবস্ত করেছিলেন। জিতেছিলেন কল্যাণ সিং। কিন্তু কী করবেন রাজ্যপাল? এই মুহূর্তে তা নিশ্চিত নয়। অচলাবস্থা কাটাতে রাজ্যপাল বিধানসভা জিইয়ে রেখে স্বল্প সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতির শাসনও জারি করতে পারেন। মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মহম্মদ সাঈদের মৃত্যুর পর সম্প্রতি জম্মু-কাশ্মীরে এই সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।

কিম জং-উনের সৎভাই কিম জং-নামকে বিষ দিয়ে হত্যা?

উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং-উনের সৎভাই কিম জং-নাম মালয়েশিয়ায় খুন হয়েছেন বলে দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সূত্র খবর দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি সূত্র দাবি করেছে, উত্তর কোরিয়ার গোয়েন্দা বা গুপ্তচরেরাই গত সোমবার কিম জং-নামকে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করেছে। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কিম জং-নাম (৪৫) ‘হামলার’ শিকার হন বলে বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছে। মালয়েশিয়ার পুলিশ বলছে, নিহত ব্যক্তির কাছে থাকা পাসপোর্টে তাঁর নাম লেখা আছে কিম-চল এবং তাঁর বয়স ৪৬। পুলিশ অবশ্য বলেছে, এর আগে ভ্রমণের জাল কাগজপত্র থাকার কারণে আটকও হয়েছিলেন কিম জং-নাম। একসময় উত্তর কোরিয়ার বর্তমান নেতা কিম জং-উনের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী মনে করা হতো কিম জং-নামকে। তবে তিনি নিজে কমিউনিস্ট দেশটিতে বংশানুক্রমিকভাবে নেতা নির্বাচনের যে চল রয়েছে, প্রকাশ্যেই তার কঠোর সমালোচনা করতেন।
কিম জং-নামের হত্যার খবর নিশ্চিত করা হলে তা হবে কিম জং-উনের আমলে ২০১৩ সালে তাঁর চাচা জং সং-থায়েকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর থেকে দেশটিতে সবচেয়ে উঁচু পর্যায়ের কারও খুন হওয়ার ঘটনা। মালয়েশিয়ার পুলিশ কর্মকর্তা ফাদজিল আহমাত বলেছেন, কিমের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে গতকাল পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি। এই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার ম্যাকাও যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন কিম। সেখানে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার টিভি চ্যানেল চোসান দাবি করেছে, দুজন নারী কিমকে সুই দিয়ে বিষপ্রয়োগ করে ট্যাক্সিতে করে পালিয়ে যান। চ্যানেলটির প্রতিবেদনে ওই দুই নারীকে উত্তর কোরিয়ার গোয়েন্দা বলে দাবি করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন সরকারি সূত্রও এ দাবিকে সমর্থন করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি সূত্র বলেছে যে, তাঁরা মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার গোয়েন্দারাই এ ‘হত্যাকাণ্ড’ ঘটিয়েছে। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কিম জং-নাম দেশের বাইরে ছিলেন। একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কিমের জীবন ঝুঁকিতে ছিল বলে মনে করত যুক্তরাষ্ট্র। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা এ ব্যাপারে মন্তব্য করেননি।

সহিষ্ণুতার পরীক্ষায় জাকার্তা

ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার গভর্নর নির্বাচন আজ বুধবার। কিন্তু এবার এটি কেবল নিছক গভর্নর নির্বাচন থাকছে না। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ইন্দোনেশীয় সমাজের জন্য সহিষ্ণুতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে তা। এতে প্রার্থী বর্তমান গভর্নর খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী বাসুকি তিজাহাজা পুরনামা। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আছেন দুজন মুসলমান প্রার্থী। জাকার্তার প্রথম চীনা বংশোদ্ভূত খ্রিষ্টান গভর্নর পুরনামা।
পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ মাথায় নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বর্তমান গভর্নর পুরনামা। তাঁর বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে ইন্দোনেশিয়ার তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র কিন্তু উচ্চকণ্ঠ উগ্রপন্থী সংগঠন ইসলামিক ডিফেন্ডারস ফ্রন্ট (এফপিআই)। এই ব্যাপারটিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে পূর্ণ দেশটির চেতনার প্রতি হুমকি হিসেবেই দেখছেন অনেকে। এফপিআইসহ কয়েকটি ইসলামপন্থী সংগঠন পুরনামাকে আজ ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছে, মুসলিমরা কোনো অমুসলিম শাসকের অধীনে থাকতে পারে না। তবে ইন্দোনেশিয়ার অনেক ইসলামি ব্যক্তিত্ব এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছেন। গভর্নর পুরনামা ওই আহ্বানের প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, যাঁরা পবিত্র কোরআনের আয়াতের নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করছেন, তাঁরা জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন। গভর্নরের ওই মন্তব্যের পর কট্টরপন্থীরা তাঁর বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ তোলেন। গভর্নর পরে মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে এফপিআই তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যায়। নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ইন্দোনেশিয়ার নানা পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে গুজব। বলা হচ্ছে, এর অধিকাংশই ধর্মীয় ও জাতিগত বিরোধ উসকে দেওয়ার জন্য ছড়ানো হচ্ছে।
অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কায় নির্বাচনের দিন রাজধানীতে নিরাপত্তা বাহিনীর ২৭ হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবে। জাকার্তাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক তোবাইস বাসুকি বলেন, ‘এই নির্বাচন ইন্দোনেশিয়ার জন্য বড় ধরনের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষা হবে আমরা সহিষ্ণুতা, না অসহিষ্ণুতার পথে?’ পুরনামার আইনজীবী সিরা প্রাজুনা বলেছেন, ‘হয়তো অসতর্কভাবে মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া একটি কথাই এখন বিশাল ব্যাপার হয়ে পড়েছে। কিন্তু এখন বিষয়টি আর পুরনামার বিচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা আমাদের দেশের মানুষের সহিষ্ণুতা ও বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সহাবস্থানের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করতে পারি না। তাঁদের মূলমন্ত্র ছিল বিনেকা তুগাল ইকা (বৈচিত্র্যের মধ্যেই একতা)।’ বাসুকি পুরনামার সমর্থকেরাও নির্বাচনের দিন তাঁর পক্ষে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। তারা লাশ, সাদা ও নীল রঙের শার্ট পরে মাঠে থাকবে।

আশুলিয়ায় দুর্বৃত্তের ধারালো অস্ত্রে নিহত ১

ঢাকার আশুলিয়ায় এক দুর্বৃত্তের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তিনজন। আজ বুধবার ভোররাত চারটার দিকে আশুলিয়ার বাংলাবাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম বাবুল হোসেন (৩০)।
আহত তিনজন হলেন মাহবুবুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আসমা বেগম ও তাঁদের কিশোরী মেয়ে মেহরুন। এই পরিবারটির স্বজন বাবুল। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহসিনুল কাদির বলেন, ভোররাতে মাহবুবুরের টিনশেড বাসায় রাসেল নামের এক তরুণ ঢুকে পড়েন। তিনি মাহবুবুরের প্রতিবেশী। তাঁকে দেখে ফেলেন বাবুল। এ সময় রাসেল ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাবুলসহ অন্যদের আঘাত করেন। এতে চারজন আহত হন। রাসেল পালিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার পথে বাবুল মারা যান। পুলিশ জানায়, এই ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাসেলের বাবা ও মাকে আটক করা হয়েছে। মামলা হবে।

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আহম্মেদ তায়েবুর রহমানকে গতকাল মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেলোয়ার আহমেদ বলেন, গতকাল রাত পৌনে ১২টার দিকে গৌরীপুর উপজেলা পরিষদের পাশের দোকান থেকে তায়েবুরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, তায়েবুরের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও নেত্রকোনার পূর্বধলা থানায় সহিংসতার অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। পূর্বধলা থানার একটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গৌরীপুর থানার ওসি দেলোয়ার আহমেদ বলেন, আজ বুধবার তায়েবুরকে আদালতে হাজির করা হবে।

পাবনায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১

পাবনার বেড়া উপজেলায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে উপজেলার ঢালারচরে এই ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়। পুলিশের তথ্যমতে, বন্দুকযুদ্ধে নিহত ব্যক্তির নাম নিস্তার ওরফে নিজাম (৪০)। বাড়ি পাবনা সদর উপজেলায়। বেড়া উপজেলার আমিনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাজুল হুদা বলেন, নিহত নিস্তার ওরফে নিজাম চরমপন্থী দলের নেতা ছিলেন। পুলিশের ভাষ্য,
চরমপন্থীদের দুটি দলের মধ্যে গতকাল রাতে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির খবর পায় পুলিশ। এর ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। দুই পক্ষকে হটিয়ে দিতে পুলিশ গুলি ছোড়ে। এ সময় পুলিশ ও চরমপন্থীদের দুটি দলের মধ্যে ত্রিমুখী বন্দুকযুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে চরমপন্থীরা পিছু হটে যায়। পরে ঘটনাস্থলে নিস্তারের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ জানায়, লাশ উদ্ধার করে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হচ্ছে। পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

লোকবল কম, তদন্ত–বিচারে ধীরগতি

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত ও বিচার চলছে ধীরগতিতে। ছয় বছরে ৯৬১টি মামলা হলেও তদন্তকাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৪৫টির। রায় হয়েছে ২৭টি মামলার। এর মধ্যে ছয়জন শীর্ষ অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ২৮। বিচারাধীন আছে ৮টি। এ ছাড়া আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে ১৬টি, আসামি পলাতক থাকায় ৫টি মামলায় আপিল হয়নি, ২টিতে আপিল চলাকালে আসামির মৃত্যু ঘটেছে। তদন্তের এই ধীরগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়কারী এম এ হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, লোকবলের অভাবের কারণে মামলার তদন্তকাজ দ্রুত শেষ করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে সংস্থায় ২৩ জন তদন্ত কর্মকর্তা রয়েছেন। এঁদের মধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ করেন এমন কর্মকর্তা ১৭ জন। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠিত হলেও তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয় ২০১১ সালের জানুয়ারিতে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে জামায়াতের নেতা কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় গণজাগরণ মঞ্চের ব্যানারে দেশব্যাপী আন্দোলন হয়। এরপর রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে উচ্চ আদালত কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও আপিলে উচ্চ আদালত দণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। উচ্চ আদালত আরও যে পাঁচ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেন, তাঁরা হলেন জামায়াতের নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামান ও মীর কাসেম আলী এবং বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
বর্তমানে বিচারাধীন মামলার আসামিরা হলেন সৈয়দ মো. হুমাউন (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), নিয়ামত হোসেন (হবিগঞ্জ), আবু ছালেহ মো. আজিজ মিয়া (গাইবান্ধা), আলবদর কমান্ডার সরকার শামসুল হক (মৌলভীবাজার), আকমল আলী তালুকদার (মৌলভীবাজার), আমির আহমেদ (নোয়াখালী), এম এ হান্নান (ময়মনসিংহ) ও রিয়াজ উদ্দিন ফকির (ময়মনসিংহ)। এর মধ্যে প্রথম তিনটি ও পঞ্চম মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। একটি মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানির তারিখ ছিল ৩১ জানুয়ারি এবং আরেকটির পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের আদেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাংসদ মোসলেমউদ্দিনের (ময়মনসিংহ) বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতে একটি মামলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের কোনো সাংসদের বিরুদ্ধে এটাই প্রথম মামলা। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, কিন্তু বিচারকাজ শুরু হয়নি এমন মামলার সংখ্যা ১০। এর মধ্যে ব্যক্তি বাদে সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীও রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করলেও রাষ্ট্রপক্ষ এখন পর্যন্ত আদালতে তা দাখিল করেনি। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, সরকার আইনের মাধ্যমে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করবে এ রকম ঘোষণা দেওয়ায় মামলাটি ঝুলে আছে। অন্যদিকে তদন্তাধীন পাঁচটি মামলার আসামি গ্রেপ্তার হওয়ায় আদালতে বিচারকাজ চলছে। তদন্তাধীন মামলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন গিয়াস কাদের চৌধুরী, মেজর (অব.) মোহাম্মদ ওবায়দুল হক। রাজনগরের আলবদর কমান্ডার শামসুল হকের তদন্ত প্রতিবেদন গত ২০ অক্টোবর দাখিল করা হলেও তিনি পলাতক আছেন। জাতীয় পার্টির সাংসদ এম এ হান্নান ও তাঁর ছেলে মো. কবির সাজ্জাদের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে গত বছরের ১৭ জুলাই। তদন্ত সংস্থা যেসব মামলা আমলে নিয়েছে,
তার মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ২০১টি এবং রংপুর বিভাগে সর্বনিম্ন ৩৩টি মামলা রয়েছে। অন্যান্য বিভাগে মামলার সংখ্যা যথাক্রমে ঢাকায় ৬৯, চট্টগ্রামে ১০২, রাজশাহীতে ৭৩, সিলেটে ৬৬, বরিশালে ৬৪, ময়মনসিংহে ৮৩। এসব মামলায় মোট আসামি ৩ হাজার ৬৬৩ জন। এত বিপুলসংখ্যক মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ কবে নাগাদ শেষ হবে, জানতে চাইলে প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা এম এ হান্নান বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেলে প্রথমেই অপরাধের মাত্রা বিচার করি। আমরা এমন কোনো মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিইনি, যাতে আসামিরা খালাস পেতে পারেন।’ আওয়ামী লীগের সাংসদ মোসলেমউদ্দিনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচারিক আদালতে করা এই মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতের কাছ থেকে তদন্তের নির্দেশ পেলে তদন্তকাজ শুরু হবে। মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির মনে করেন, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে অবিলম্বে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালটি চালু হওয়া প্রয়োজন। ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম আইনজীবী ড. তুরিন আফরোজ বলেছেন, কেবল ট্রাইব্যুনাল বাড়ালে হবে না, সেই সঙ্গে আইনজীবী ও তদন্ত কর্মকর্তাও বাড়াতে হবে।

বই-বসন্তে ভালোবাসা

কৃষ্ণকলির সঙ্গে দেখা হলো আচমকা! গায়ের বরন কালো, চোখ দুটো টানা টানা; ‘কৃষ্ণকলি আমি তারে বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই যে লিখেছিলেন গানে, সেই কৃষ্ণকলির সঙ্গে আমাদের দেখা হয়ে গেল গতকাল, বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আদতে তাঁর নাম কৃষ্ণকলি নয়, মাকসুদা আক্তার। তবে এই মাকসুদার সঙ্গে রবিঠাকুরের কৃষ্ণকলির চেহারা যেন মিলে যায়। কিন্তু মাথায় বর্ণিল ফুলের টায়রা পরা এই মেয়ের হাতে তো দেখা যাচ্ছে হুলমায়ূন আহমেদের বই নবনী। বইটির দিকে তাকাতেই সলজ্জ হাসি দিয়ে বললেন, ‘ও কিনে দিয়েছে।’ এবার আমরা ‘ও’র দিকে তাকাই। আরিফুল ইসলাম, মাকসুদার হবু স্বামী। আর কদিন বাদে মাকসুদা-আরিফুলের বিয়ে।
ভালোবাসা দিবসের আনন্দক্ষণে তাঁরা এসেছিলেন বইমেলায়, দুজন দুজনকে বই উপহার দেবেন বলে। একে বসন্তের ছোঁয়া—ফাল্গুনের উতাল বাতাস, তার ওপর ভালোবাসা দিবস। বইমেলার ১৪তম দিনে তাই দেখা মিলল অসংখ্য ‘জুটি’র। এসব জুটির অনেকেই গতকাল একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা জানিয়েছেন পরস্পরকে বই উপহার দেওয়ার মাধ্যমে। আহা, বই-বসন্তে ভালোবাসার আবাহন কতই না মনোহর! ‘ভালোবাসার এই দিনে প্রিয় মানুষকে বই দিলাম, সম্পর্কের ভিত্তি শক্ত হবে।’ অন্যপ্রকাশের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ডাক্তারি পড়ুয়া আরিফুল যখন কথাটি বলছিলেন, মাকসুদার মুখ তখন আবারও লাল। বেশ কয়েক বছর বইমেলা হুেমায়ূন আহমেদহীন, কিন্তু কোথায় নেই তিনি! ইডেন কলেজে পড়েন ত্রপা চক্রবর্তী, তাঁর হাতে হিমুসমগ্র। আবার যশোরের অভয়নগর থেকে এক দিনের ছুটিতে এসেছিলেন যে এস এম জাকারিয়া, তিনিও সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন এক গাঁটরি হুেমায়ূন। অন্যপ্রকাশের অন্যতম পরিচালক সিরাজুল কবির চৌধুরী বললেন, ‘হ্‌ুমায়ূন আহমেদের বই এখনো সবার প্রথম পছন্দ। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়ে, যাঁরা হ্‌ুমায়ূনের প্রথম দিককার বই পড়েননি, তাঁরাই বইগুলো বেশি কেনেন। হু‌মায়ূন এখনো সচল।’ প্রকৃতির বসন্তের সঙ্গে সংগতি রেখে বইমেলায়ও বইছে বাসন্তী হাওয়া। এখন অব্দি বিক্রি মন্দ নয়। প্রকাশকেরা কথাটি বলছেন বেশ সন্তুষ্টির সঙ্গে। তাঁদের ভাষ্য, বিক্রির দিক দিয়ে এগিয়ে আছে উপন্যাস ও সায়েন্স ফিকশন। মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন ও আনিসুল হক তরুণ ক্রেতাদের পছন্দ। বলছিলেন অবসর প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক মাসুদ রানা।
অনন্যার স্বত্বাধিকারী মনিরুল হকের কথা, মিলনের নয়মাস উপন্যাসটি বেশ যাচ্ছে। আর প্রথমা প্রকাশন থেকে বের হওয়া আনিসুল হকের উপন্যাস প্রিয় এই পৃথিবী ছেড়ে পাঠকের পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে—এমনটিই জানালেন প্রথমার বিক্রয় ব্যবস্থাপক মুহম্মদ ইউসুফ। এই লেখকদের বাইরে আন্দালিব রাশদী, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মোিহত কামাল, মোস্তফা কামালের বইয়েরও রয়েছে নির্দিষ্ট পাঠকগোষ্ঠী। যেমন পরীবাগ থেকে এসেছিলেন আনোয়ার চৌধুরী। তিনি খুঁজছিলেন প্রথমা থেকে প্রকাশিত আন্দালিব রাশদীর উপন্যাস মোনালি। আবার অন্যপ্রকাশের স্টলের সামনে দেখা গেল সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের একাত্তর ও অন্যান্য গল্প এবং মোহিত কামালের বিষাদনদী উপন্যাসটির খোঁজ করছেন বেশ কয়েকজন পাঠক। মেলায় ঢোকার মুখেই সৈয়দ শামসুল হক চত্বর। বিকেলের ফুরিয়ে আসা আলোয় সেখানে সেলফি তোলায় ব্যস্ত ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল আদনান ও তাঁর বন্ধু প্রিয়তা। ছবি তোলা শেষে তাঁদের বলা হলো, বই কিনেছেন? ফয়সালের কাট কাট জবাব, ‘ফেসবুকে আমি বেশ কয়েকজন তরুণ লেখকের ফলোয়ার। আজ কিনি কাল কিনি, তাঁদের বই-ই কিনব। রাজীব হাসানের হরিপদ ও গেলিয়েন আর সাদাত হোসেনের মানবজনম উপন্যাস দুটি কিনব।’ গল্প-উপন্যাস ছাড়া আত্মজীবনী, গবেষণা, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই ও ধ্রুপদি সাহিত্যের পাঠক বেড়েছে। কথাপ্রকাশের জাফরুল ইসলামের ভাষায়, ‘পাঠক নানা রকম। তরুণেরা যেমন গল্প-উপন্যাসে আগ্রহী, তেমনি একটু বয়োজ্যেষ্ঠ পাঠকেরা খোঁজেন আত্মজীবনী, প্রবন্ধ ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক বই।’ প্রায় একই কথা যেন শোনা গেল মনিরুল আলম খানের গলায়। তিনি থাকেন ইতালিতে। বইমেলা উপলক্ষে সপরিবার এসেছেন দেশে। বললেন, ‘আত্মজীবনী আমার খুব প্রিয়, প্রিয় মুক্তিযুদ্ধের বইগুলোও। আর যদি উপন্যাস কিনি, কিনতে চাই তারাশঙ্কর,
মানিক ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই।’ বিকেল মিলিয়ে যাচ্ছে, জমে উঠছে মেলা। এর মধ্যেই হয়তো আরও অনেক কৃষ্ণকলি প্রিয় মানুষটির কাছ থেকে পেয়ে গেছেন বই উপহার, সব খবর কি আমরা জানি? বই-বসন্তে, ভালোবাসার দিনে তো কত কিছুই ঘটে! মেলায় প্রথমা প্রকাশন এনেছে ফারুক চৌধুরীর অনাবিল মুখচ্ছবি। একই প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে শিশির ভট্টাচার্য্যের বাংলা ব্যাকরণের রূপরেখা। সময় প্রকাশন এনেছে আবদুল মান্নান সৈয়দের নির্বাচিত কবিতা। প্রকাশক ফরিদ আহমেদ বললেন, লেখক এই জীবনকালে কিছু কবিতা নির্বাচন করে গিয়েছিলেন, বাকিগুলো তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে নির্বাচন করা হয়েছে। চন্দ্রাবতী একাডেমি এনেছে আবুল মোমেনের চার বেহারার পালকি। এতে ছোটদের উপযোগী চারটি নাটক আছে। কথাপ্রকাশ এনেছে রাজীব সরকারের বহুমাত্রিক বুদ্ধদেব বসু: বৈচিত্র্যে বৈশিষ্ট্যে। অবসর এনেছে শান্তিরঞ্জন ভৌমিকের আমি নজরুল, রকিব হাসানের কিশোর মুসা রবিন: সাগরতলে। সাউন্ড বাংলা এনেছে মো. সাদেকুর রহমানের জীবন কাব্য, হাফিজুর রহমান শাকিলের মেঘের পরে আনন্দের রোদ। বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বইমেলার ১৪তম দিনে নতুন বই এসেছে ১৪৬টি এবং ২৩টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এদিন বিকেলে মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের একুশের সংকলন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি ও গানের পরিবেশনা। আজ মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘সমর সেনের জন্মশতবার্ষিকী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

খাটের নিচে মিলল নিখোঁজ ২ শিশুর বস্তাবন্দী লাশ

ছোট শিশু সুমাইয়া খাতুন (৭) ও মেহজাবিন আক্তার (৬) সহপাঠী। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বাইরে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় তারা। এর দুদিন পর গতকাল মঙ্গলবার প্রতিবেশী এক ব্যক্তির বাড়ির শোবার ঘরে খাটের নিচে বস্তাবন্দী অবস্থায় তাদের লাশ পাওয়া গেছে। এ ঘটনা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নামোশংকরবাটীর ভবানীপুর-ফতেপুর মহল্লার। নিহত সুমাইয়া খাতুনের খালাতো ভাই আবু তালেব প্রথম আলোকে বলেন, সুমাইয়া ভবানীপুর-ফতেপুর মহল্লার মিলন রানার মেয়ে ও পৌর এলাকার ছোটমণি বিদ্যানিকেতনের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সহপাঠী মেহজাবিন প্রতিবেশী আবদুল মালেকের মেয়ে। রোববার বেলা ১১টার দিকে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে বাইরে খেলতে যায় তারা। পরে আর বাড়ি ফেরেনি। সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খুঁজেও তাদের পাওয়া যায়নি। এরপর গতকাল বিকেলে সুমাইয়ার স্বজনেরা প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজা শুরু করেন।
তাঁরা সাড়ে পাঁচটার দিকে প্রতিবেশী ভ্যানচালক মো. ইয়াসিনের বাড়িতে যান। সেখানে তাঁর প্রবাসী ছেলে মো. ইব্রাহীমের (৩৫) স্ত্রী লাকী আক্তার (২৪) ইতস্তত শুরু করেন। এতে সন্দেহ দেখা দিলে জোর করে তাঁরা ঘরে ঢুকে লাকীর শোয়ার ঘরে খাটের নিচ থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় সুমাইয়া ও মেহজাবিনের লাশ পান। পুলিশকে খবর দিলে তাঁরা এসে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে লাশ উদ্ধার করে। আবু তালেব জানান, সুমাইয়া, মেহজাবিন ও লাকী আক্তারের মেয়ে ইমন সহপাঠী। তিন শিশুই একসঙ্গে খেলাধুলা করত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাযহারুল ইসলাম বলেন, লাকী আক্তারসহ চারজনকে এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিখোঁজ শিশু দুটির সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকারের লোভে এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। শিশু দুটি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ওই দিনই মেহজাবিনের বাবা আবদুল মালেক থানায় একটি মামলা করেন। ওসি আরও বলেন, গতকাল গ্রেপ্তার হওয়া লাকী, ইয়াসিন ও ইয়াসিনের স্ত্রী তানজিলা বেগম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এর আগে শিশু দুটি নিখোঁজ হওয়ার পর গীতা রানী নামে আরেক প্রতিবেশীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

একটি ইশতেহার ও একটি ধর্মঘট

একুশের প্রস্তুতি পর্বে ১৯৪৮ সালের মার্চের আন্দোলনের উত্তাপ বহন করে পরবর্তী প্রতিটি বছর, অর্থাৎ ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১। সেসব ঘটনার কোনোটি বড় (যেমন মূলনীতিবেরাধী আন্দোলন), কোনোটি একেবারে সাদামাটা কিন্তু তাৎপর্য ছোট নয়। আবার কোনোটির চরিত্র সাংগঠনিক—যেমন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ গঠন (১৯৫১ মার্চ)। এই সংগঠন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে প্রদেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
তেমনি একটি ইশতেহার ও একটি স্মারকলিপির গুরুত্বও অগ্রাহ্য করার মতো ছিল না। ১৯৫১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক-সাংবাদিক ও নানান পেশাজীবী, এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের একাংশের তরফ থেকে ‘অবিলম্বে পূর্ববঙ্গে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের’ দাবি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের কাছে একটি স্মারকলিপি পাঠানো হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. কাজী মোতাহার হোসেনসহ দেশের বিশিষ্টজনের স্বাক্ষর ছিল এই স্মারকলিপিতে। এর পাশাপাশি ১৯৫১ সালে ভাষা সংগ্রাম পরিষদের নতুন কর্মসূচি হিসেবে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১১ মার্চ সব শিক্ষায়তনে ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানানো হয়। এই ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, ‘বন্ধুগণ,...আসুন ১১ই মার্চ নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও সভা করে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করে পুনরায় লৌহদৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে ঘোষণা করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করি।’ এই আহ্বানে ভালো সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে দিবসটি ব্যাপক প্রতিবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটিয়ে পালিত হয়। নারায়ণগঞ্জ এদিক থেকে ঢাকার পরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ছাত্রদের হরতাল-মিছিলের পর ছাত্র-জনতার সম্মিলিত বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ঢাকা থেকে একাধিক ছাত্র-যুব নেতা যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শেখ মুজিবুর রহমান ও মোহাম্মদ তোয়াহা। মূলত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের আগ্রহে ও পৃষ্ঠপোষকতায় উর্দুবাদীদের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা, প্রচার ও চাপের প্রতিক্রিয়ায় বাংলা ভাষার পক্ষে কর্মতৎপরতা সমাজে যথেষ্ট বিস্তার লাভ করে। মধ্যপন্থী বা নিরপেক্ষ শিক্ষিত বিশিষ্টজন অনেকে বাংলার পক্ষে সোচ্চার হতে থাকেন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৬ মার্চ (১৯৫১) কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত অধ্যাপকদের সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে কোনো ধরনে রাখঢাক না করে বলেন, ‘বাংলা ভাষা অবহেলিত হইলে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিদ্রোহ করিব।’ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতো পণ্ডিতপ্রবরের এমন বলিষ্ঠ উক্তির গুরুত্ব বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বাংলাদেশে ‘মীরজাফরি বদরক্তের’ ধারকদের তো অভাব ছিল না। তাই ১৯৫১ সাল যখন প্রতিবাদে অগ্নিঝরা হয়ে ওঠে, তখনো কিছুসংখ্যক বিশিষ্ট বাঙালি উর্দুর পক্ষে তদবির করতে থাকেন। যেমন ১৫ এপ্রিল (১৯৫১) করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান উর্দু সম্মেলনে মওলানা আকরম খাঁ সভাপতির ভাষণে উর্দুর পক্ষে এতটা জবরদস্ত ওকালতি করেন যে এর প্রতিবাদ ছিল তাৎক্ষণিক। পাকিস্তান অবজারভার ১৮ এপ্রিলের সম্পাদকীয়তে কড়া ভাষায় মওলানার ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ করে এই বলে যে ‘রিপোর্ট অনুযায়ী মওলানা আকরম খাঁ উর্দু সম্মেলনে বলেছেন যে পূর্ব বাংলায় যারা উর্দুর বিরোধিতা করে, তারা ইসলামের শত্রু। ধরে নেওয়া যেতে পারে যে তিনি এই শত্রুদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতো (ব্যক্তিকেও) অন্তর্ভুক্ত করবেন।’ রাষ্ট্রভাষাকে ঘিরে এমন এক বাদ-প্রতিবাদমূলক পরিস্থিতি নিয়ে ১৯৫১ সাল শেষ হয়। আগেই বলা হয়েছে, বছরটি একুশের বিস্ফোরক প্রকাশে, অর্থাৎ এর প্রস্তুতি পূর্বে সর্বাধিক ভূমিকা পালন করেছিল। এ বছর অনুঘটক শক্তিসম্পন্ন ঘটনার সংখ্যাও ছিল যথেষ্ট। এভাবে তৈরি হয় একুশের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ এবং আন্দোলন দানা বাঁধার ক্ষেত্র।

তিউনিসীয় মায়ের কণ্ঠেও একই গল্প

মায়ের খুব ন্যাওটা ছিলেন বেলজিয়ামের সাবরি বেন আলি। সেই ছেলেই একদিন ঘর ছেড়ে সোজা সিরিয়ায়। আইএসের হয়ে যুদ্ধ করবেন! যেমন হুট করে ঘর ছাড়া, তেমনি হঠাৎ অপরিচিত একজন ফোনে জানায়, সাবরি নিহত হয়েছেন। সময়টা ২০১৩ সালের। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে সাড়ে ১৮ বছরের ছেলের এভাবে চলে যাওয়ার কাহিনি শোনাছিলেন মা সালিহা বেন আলি। ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে তিউনিসীয় বংশোদ্ভূত এই নারী অবিরাম বলে চলেছেন একই গল্প। উদ্দেশ্য, সাবরির মতো কেউ যেন আর ভুল পথে পা না বাড়ান। সাবরির গল্প শোনাতে গিয়ে সালিহার গলা কেঁপে কেঁপে ওঠে, ‘হায় সাবরি! সে তো আর দশটা ছেলের মতোই ছিল। স্কুলে যেত। গান ভালোবাসত। খেলাধুলা করত। সেই ছেলে হঠাৎ বদলে গেল।...নানা প্রশ্ন মাথায় কিলবিল করত ওর। জবাব পায়নি। ভুল সময়ে ভুল মানুষের খপ্পরে পড়েছিল। ‘সাবরি তখন স্কুল ছেড়ে কাজ খুঁজছিল। পেল না। সেনাবাহিনীতে নিল না, ফায়ার ফাইটার হতে চেয়েছিল।
তারাও পরে যোগাযোগ করতে বলল। সাবির বলছিল, “আমি তিনটি ভাষা জানি, কিন্তু কাজ পাই না। সব সময় নজরদারি। পুলিশ এত চেক করে কেন? বাসে ওঠার সময় তো বটেই, বান্ধবীকে নিয়ে সিনেমা থেকে ফেরার পথেও। কিছু শিক্ষক সাম্প্রদায়িক। আমাকে আমার মতো যারা, তাদের কাছে যেতে হবে।” তখনই সে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ে। উত্তর খোঁজে ধর্মীয় নানা বিষয়ের। কিন্তু প্রশ্নের জবাব দেবে কে? মসজিদের ইমাম নামাজ পড়ান। এর বাইরে কথা বলেন না। সাবরি ডাচ ও ফ্রেঞ্চ ভাষা জানত। ইমাম ওই ভাষা দুটি বুঝতেন না। ওই সুযোগটাই কাজে লাগায় একদল সুযোগসন্ধানী।’ সালিহা বলেন, ‘...তারপর ২০১৩ সালের আগস্টের এক সকালে দেখা গেল সাবরির বিছানা শূন্য। সে বাড়ি ছেড়েছে। সেখানে পৌঁছে সাবরি ফেসবুকে তাঁকে খবরটা জানিয়েছিল। তিনি তাঁকে ফিরতে বললেন। তখন সাবরি জানায়, ফিরে আসার কথা বললে সে আর কথা বলারই সুযোগ পাবে না।’ ঠিক কোন অবস্থায় সাবরির মৃত্যু হয়েছিল, ওখানে তাঁর জীবনটা আসলে কেমন ছিল জানতে চান সালিহা। কিন্তু সাবরি তো নেই। আইএস সম্পর্কে সালিহার জানার সুযোগ হয়নি। বাংলাদেশেরও অনেকেরই হতো না, যদিও এখান থেকে বেশ কিছু লোকের সিরিয়ায় আইএসের হয়ে লড়াই করতে যাওয়ার অভিযোগ আছে। এদের একজন গাজী কামরুস সালাম সোহান যদি না ফিরে আসতেন। আইএসের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তাঁর মনে। জানতে পারেন, আইএস চাইছে যতটুকু এলাকা আইএসের দখলে, সেগুলোকে রক্ষা করা এবং এলাকা বাড়ানো। এর জন্য যদি মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধও করতে হয়, তারা পরোয়া করে না। বুঝতে পারেন,
তিনি একটা রাজনৈতিক চালের মধ্যে পড়ে গেছেন। আইএসের যোদ্ধাদের কাছ থেকে শোনেন দাসী কেনাবেচার কথা। দাসীদের ভরণপোষণের জন্য প্রত্যেকে ৫০ ডলার করে পেতেন। নারীদের ওপর এই যৌন নির্যাতন একটা ‘ঘৃণ্য’ কাজ বলে মনে হয় তাঁর কাছে। সালিহা বা কামরুস সালামের এই অভিজ্ঞতা কীভাবে কাজে লাগাবে বাংলাদেশ? বৈষম্যসহ আরও নানা অনুযোগের ব্যাপারে কিশোর-তরুণদেরই বা কী জবাব দেবেন অভিভাবকেরা। এমন প্রশ্নের জবাবে সালিহা বলেন, ‘আমি স্কুল-কলেজে যাই। যেসব পরিবারের ছেলেদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাদের সঙ্গে কথা বলি। কখনো ধর্মীয় কোনো বিষয়ে কথা বলি না। আমি তাদের কাছে গিয়ে সন্তানহারা মায়ের কষ্টের কথা বলি। মা ও সন্তানের যে সম্পর্ক, তা এতই নিখাদ যে সেখানে আর সবকিছু গৌণ হয়ে যায়।’ গাজী কামরুস সালাম সোহান এখন বাংলাদেশের কারাগারে। বছরখানেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকার পর ১৭ নভেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ নিয়ে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, ভালো হতো, যদি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তরুণেরা জানতেন। মোহ থেকে মুক্তি পেতেন তাঁরা।

পছন্দমতো শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য কক্ষ ভাঙচুর!

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিশেষ কোটায় শিক্ষার্থী ভর্তি করাকে কেন্দ্র করে ভর্তি কমিটির আহ্বায়কের কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। সকালে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে (সম্মান) প্রথম বর্ষে মুক্তিযোদ্ধা, উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, হরিজন ও প্রতিবন্ধী ভর্তি উপকমিটির আহ্বায়ক শেলীনা নাসরীনের কক্ষে এ ঘটনা ঘটে। পছন্দমতো শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ভাঙচুর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত কুমার দাসের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে যান। সেখানে শেলীনা নাসরীনের কক্ষে প্রবেশ করেন। তবে সেখানে তিনি ছিলেন না। এ সময় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ভাঙচুর করেন। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মাহবুবর রহমান পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
সন্ধ্যায় মুঠোফোনে শেলীনা নাসরীন বলেন, ‘তাঁরা পছন্দের শিক্ষার্থী ভর্তি করার দাবি করছেন। আমরা সবকিছু নিয়ম মেনে একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করছি। ভাঙচুরের বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিশেষ কোটায় অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হচ্ছে। বিষয়টি আগেও প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। তারপরও কোনো সুরাহা হচ্ছে না। গতকাল সকালে ভর্তি কমিটির আহ্বায়কের কক্ষ গিয়েছিলাম। তাঁকে সেখানে পাওয়া যায়নি। সেখান থেকে চলে আসার পর কী হয়েছে, জানি না।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মাহবুবর রহমান বলেন, ‘ছেলেদের সঙ্গে কথা বলেছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। উপাচার্য ক্যাম্পাসের বাইরে আছেন। তিনি ফিরলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলার অবকাশ নেই: আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার কোনো অবকাশ নেই বাংলাদেশের। কিন্তু বিশ্বব্যাংক আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাঁদের আইনি পরামর্শ নেওয়া উচিত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ল রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী এ কথা বলেন।
পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে আনিসুল হক বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা বলেছিলেন, দুর্নীতির ষড়যন্ত্র নিয়ে বিশ্বব্যাংক দুদকের মাধ্যমে তাদের লোক দিয়ে তদন্ত করাবে। অনুসন্ধান করবে। আমরা তখন বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসলাম। বললাম, যে বিষয়টি দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত করার কথা, সেটা অন্য কোনো বিদেশি সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করানোর নিয়ম নেই। এ রকম হলে মামলাই করা যাবে না। মামলা টিকবে না। এটা যখন বললাম, তখন তাঁরা বললেন, ঋণ দেবে না বিশ্বব্যাংক। পরে ঋণ বাতিল করা হলো।’ আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে আসামি করতে বলে। এজাহারে তাঁর নাম দিতে বলে। প্রতিনিধিদলের একজন বললেন, এজাহারে আবুল হোসেনের নাম দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করিয়ে রিমান্ডে নিলে সব বের হয়ে যাবে। বিশ্বব্যাংকের দলিলপত্রে আছে, আবুল হোসেনের সঙ্গে একটা কোম্পানির চারজন দেখা করেছেন।
এ ছাড়া আর কোনো কথা সেখানে নেই।’ অনুষ্ঠানে পদ্মা সেতুর মামলা নিয়ে দুদকের কাছে যেসব দলিলপত্র রয়েছে, তা প্রকাশ করতে অনুরোধ করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বিচার বিভাগের জন্য যা যা করা দরকার, তা এই সরকার করবে। কিন্তু সেটা প্রয়োজন মাফিক। বিচারিক কাজে বিচার বিভাগের যে স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতার ওপর সরকার কিন্তু কখনোই কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই, সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। আমরা শুধু দাপ্তরিক কাজ করে থাকি। সেটা আমরা করে যাব।’ হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগে আইন করার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে একটা আইন করার কথা আছে। সেই ব্যাপারে আমরা ইতিমধ্যে একটা আইনের খসড়া দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। এই সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এ রকম একটা আইন করে ফেলব।’ অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ল রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি আশুতোষ সরকার, সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলমসহ আরও অনেকে।

বিক্ষোভ, দলীয় কার্যালয়ে তালা, এজাজের কুশপুত্তলিকা দাহ

খুলনা জেলা বিএনপির নতুন কমিটি প্রত্যাখ্যান করে গতকাল মঙ্গলবার নগরে বিক্ষোভ করেছেন দলটির একাংশ নেতা-কর্মী। সকাল থেকে তাঁরা দলীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। তাঁরা দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং নতুন সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খানের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন।
আজ বুধবারের মধ্যে সাধারণ সম্পাদককে অপসারণ করা না হলে কাল বৃহস্পতিবার থেকে আরও কঠোর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা। গত সোমবার রাতে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে খুলনা জেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণার বিষয়টি জানানো হয়। এতে শফিকুল আলমকে সভাপতি ও আমীর এজাজ খানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। আট বছর পর সম্মেলন ছাড়াই কমিটি ঘোষণা হওয়ায় ক্ষুব্ধ পদ না পাওয়া নেতারা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ৩০ নভেম্বর পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই নগরের একটি অভিজাত হোটেলে খুলনা জেলা বিএনপির দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে সময়কার সম্মেলনে দলের নয়টি উপজেলা ও একটি পৌরসভা কমিটির ৩০ জন কাউন্সিলরের মধ্যে বেশির ভাগ অনুপস্থিত ছিলেন। ওই সম্মেলনে দলের জেলা কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে যথাক্রমে অধ্যাপক মাজিদুল ইসলাম, শফিকুল আলম, আমীর এজাজ খানসহ পাঁচজনের নাম ঘোষণা করা হয়। নবগঠিত আংশিক ওই কমিটির বিরুদ্ধে তখন খুলনা সদর সহকারী জজ আদালতে মামলা হয়। এরপর জেলা বিএনপি নিয়ে চলে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি। আংশিক কমিটি গঠনের প্রায় ১০ মাসের মাথায় ঘোষণা করা হয় খুলনা জেলা বিএনপির ১৫১ জনের নির্বাহী কমিটি। তবে কমিটি ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই মাজিদুল ইসলাম নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। পরিবার নিয়ে থাকতেন ঢাকায়। নেতা-কর্মীরা তাঁকে সহজে কাছে পেতেন না। আর আমীর এজাজ খান ২০১৫ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের শুরুর দিকে থাকলেও ধরপাকড়ের ভয়ে পরে ঢাকায় চলে যান। বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা বলেন, শফিকুল আলম গত আট বছর জেলা বিএনপি চালিয়েছেন। আন্দোলনের পুরোটা সময় আমীর এজাজ খান দলীয় কর্মকাণ্ডে ছিলেন অনুপস্থিত। তাঁকে নিয়ে আগে থেকেই দলের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এবার তাঁকে সাধারণ সম্পাদক করায় সেই ক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনকারীদের পক্ষে জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক মনিরুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘নবনির্বাচিত সভাপতির প্রতি আমাদের সবারই আস্থা রয়েছে। তবে আমীর এজাজ খান আন্দোলনের পুরোটা সময় দলীয় কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত ছিলেন। নেতা-কর্মীদের দুঃসময়ে তিনি কারও পাশে ছিলেন না।
চরম সুবিধাবাদী এই নেতাকে সাধারণ সম্পাদক বানিয়ে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের অপমান করা হয়েছে।’ সদ্য বিলুপ্ত জেলা বিএনপির সহসভাপতি জুলফিকার আলী বলেন, ‘এজাজকে বহাল রাখা হলে দলীয় কর্মসূচিতে জেলা বিএনপির নেতা-কর্মীরা অংশগ্রহণ করবেন না। আমরা তাঁর অপসারণের দাবি জানাচ্ছি। তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি। এই কমিটি বাতিল না করলে গণপদত্যাগ করা হবে।’ নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদককে অপসারণের দাবিতে গতকাল সকাল ১০টা থেকে ৬ নম্বর কে ডি ঘোষ রোডে জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা। তাঁরা দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। সমাবেশ শেষে এজাজ খানের কুশপুত্তলিকা পোড়ান নেতা-কর্মীরা। জানতে চাইলে নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আন্দোলন সংগ্রামে না থাকলে আমার বিরুদ্ধে কীভাবে চারটি মামলা হয়েছে? আন্দোলনের সময় বিএনপির বিরুদ্ধে মামলা হলেই আমার নাম আসা শুরু করল। তখন দলের স্বার্থেই একটু নিরাপদে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ সম্পাদকের পদ একটিই। অনেকেই পদটি প্রত্যাশা করতে পারে, না পেয়ে তাদের কেউ কেউ কিছুটা ক্ষুব্ধ। তবে দল আমাকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছে। সবাইকে নিয়েই কাজ করতে চাই।’ নবনির্বাচিত সভাপতি শফিকুল আলম বলেন, কমিটি ঘোষণার পর ক্ষোভ প্রকাশ স্বাভাবিক। সবার সঙ্গে কথা বলে এই ক্ষোভ প্রশমন করা হবে।

বারবার ভাঙনের শিকার স্কুল, ফসলি জমিতে পাঠদান

চারদিকে ফসলের মাঠ। মাঝখানে ৩৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রশস্ত ছাপরাঘর। এর চারপাশ খোলা। বাঁশের খুঁটি ও টিনের চালার নিচে শিশুরা বসে আছে তিন ভাগে। দুজন শিক্ষিকা চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পাশে জটলা করে বসে আছে। ঠান্ডা বাতাসে শিশুদের জবুথবু অবস্থা। এ দৃশ্য শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের কাঁকড়াভোগ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। নাম কলমিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত বছরের ২৬ আগস্ট কলমিরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন পদ্মায় বিলীন হয়। এরপর বিদ্যালয়টির স্থায়ী কোনো জায়গা কিংবা ভবন মেলেনি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কাঁকড়াভোগ গ্রামে ১৬ শতাংশ ফসলি জমি ভাড়া নিয়ে টিনের চালা দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। কলমিরচর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বলেন, কুন্ডেরচর ইউনিয়নের কলমিরচর গ্রামটি পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত। ২০০৭ সালের ১৮ আগস্ট বিদ্যালয়ের চার কক্ষের একটি পাকা ভবন নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। এরপর ওই গ্রামের মাঝখানের একটি টিনের ঘরের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চলছিল।
গত ২৬ আগস্ট নদীভাঙনে বিদ্যালয়ের টিনের ওই ভবনটিও বিলীন হয়ে যায়। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে পাশের কাঁকড়াভোগ গ্রামের কালু ব্যাপারীর কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় তিন মাস বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহানাজ বেগম বলেন, কাঁকড়াভোগ গ্রামের জসিম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে বার্ষিক ৮ হাজার টাকায় ১৬ শতাংশ জমি ভাড়া নেওয়া হয়। ওই টাকার সংস্থান করেন শিক্ষকেরাই। পরে সেখানে বাঁশ ও টিনের চালা দিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু চারপাশে কোনো বেড়া দেওয়া যায়নি। সেখানেই গত ৭ জানুয়ারি থেকে পাঠদান চালছে। বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিফ মোল্লা বলে, স্কুলের চারপাশ খোলা হওয়ার কারণে ঠান্ডা বাতাসে বেশ কষ্ট হয় তাদের। একটি ঘরের মধ্যে সব শ্রেণির ক্লাস হওয়ায় তাদের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বর্ষা আক্তার বলেন, ২০১৬ সালে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ২৯০ জন। বর্তমানে ১১৫ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। শৌচাগার না থাকার কারণে শিশুদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক বলেন, জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা অনুদান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা দিয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি। এই টাকা দিয়ে ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হবে। শরীয়তপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ওই বিদ্যালয়ের একটি ভবন নির্মাণ করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি অনুদান নিয়ে শিগগিরই একটি ঘর নির্মাণ করে শিশুদের মনে আনন্দ ফিরিয়ে দিতে পারব।’

খুলনায় শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মেনন

কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া আমৃত্যু শ্রমিক ও শ্রমিকশ্রেণির মানুষের স্বার্থে লড়াই করেছেন। তিনি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সরকারি কলকারখানা ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে এবং সব সময় পাট, বস্ত্রকলের শ্রমিকদের রুটি-রুজির আন্দোলনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি কোনো কিছুতেই শ্রমিকদের দাবি আদায় থেকে বিচ্যুত হননি। তাই তিনি সারা দেশের শ্রমিকদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। গতকাল মঙ্গলবার সকালে খুলনার শহীদ হাদিস পার্কে ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ও খুলনা জেলা সভাপতি কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়ার প্রথম জানাজা শেষে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনকালে এসব কথা বলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বেসরকারি বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। সকাল ১০টায় হাফিজুর রহমানের মরদেহ শহীদ হাদিস পার্কে আনা হয়।
কেন্দ্রীয় ওয়ার্কার্স পার্টি ছাড়াও সেখানে বিভিন্ন জেলা ও মহানগর ১৪ দল, আওয়ামী লীগ, খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র, সিপিবি, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, ন্যাপ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি, নাগরিক ফোরাম, কৃষক লীগ, ছাত্রমৈত্রী, যুবমৈত্রী, জাতীয় কৃষক সমিতি, নারী মুক্তি সংসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল; পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। এ সময় অন্যদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা, আনিসুর রহমান, মাহমুদুর রহমান, নূর আহমেদ, ইকবাল কবির, হাফিজুর রহমান এমপি, মোস্তফা লুৎফুল্লাহ এমপি, টিপু সুলতান এমপি, ইয়াসিন আলী এমপি, দীপংঙ্কর সাহা ও মনোজ সাহা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন পার্টির খুলনা জেলা সাধারণ সম্পাদক মিনা মিজানুর রহমান। জানাজা শেষে হাফিজুর রহমানের মরদেহ তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ দৌলতপুর শহীদ মিনার, ইস্টার্ন জুট মিলস শ্রমিক ময়দান ও ফুলতলা নিয়ে যাওয়া হয়।

সুন্দরবনকে যেকোনো মূল্যে বাঁচাতে হবে

‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে সুন্দরবনকে ভালোবাসুন’ স্লোগানে গতকাল মঙ্গলবার খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় পালিত হয়েছে ‘সুন্দরবন দিবস’। এ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, সুন্দরবন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে। এটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ। তাই যেকোনো মূল্যে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে। প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, আঞ্চলিক কার্যালয় ও সংবাদদাতার পাঠানো খবর:
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশের গুরুত্ব ও ভূমিকা সম্পর্কে সব মহলে ব্যাপক সচেতনতা ও আগ্রহ সৃষ্টি করা, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন সংরক্ষণে বন বিভাগ ও বেসরকারি উদ্যোগকে সহায়তা করার উদ্দেশ্য সামনে রেখে ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি খুলনায় সুন্দরবন দিবস পালিত হয়। পরের বছর থেকে উপকূলীয় অন্য জেলাগুলোতেও দিবসটি পালন করা হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে গতকাল খুলনা নগরের জাতিসংঘ শিশুপার্কে আলোচনা সভা হয়। সেখানে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণার দাবি জানানো হয়। খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুস সামাদের সভাপতিত্বে এ সভায় বক্তব্য দেন খুলনা-২ আসনের সাংসদ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদ, খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক জহির উদ্দিন আহমেদ, সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাঈদ আলী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক দিলীপ দত্ত প্রমুখ। সাংসদ বলেন, সুন্দরবন এ অঞ্চলের মাটি ও মানুষকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে। এই বনকে রক্ষা করতে হবে। অনুষ্ঠানে ‘জীববৈচিত্র্যে ভরা সুন্দরবন, করব মোরা সংরক্ষণ’ বিষয়ে বক্তৃতা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় আয়োজন করা হয়। এর আগে জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসানের নেতৃত্বে রয়েল মোড় থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। সেটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে জাতিসংঘ শিশুপার্কে এসে শেষ হয়। এদিকে গতকাল সকালে বাগেরহাট প্রেসক্লাব থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার প্রেসক্লাবে এসে শেষ হয়।
পরে প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আলোচনা সভা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাগেরহাট-৪ আসনের সাংসদ মোজাম্মেল হোসেন। প্রেসক্লাবের সভাপতি আহাদ উদ্দিন হায়দারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার শাহাদাৎ হোসেন, সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের সদর রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শমসের আলী প্রমুখ। বক্তারা বলেন, ‘সুন্দরবন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ। যেকোনো মূল্যে আমাদের প্রাকৃতিক এই সুরক্ষা দেয়ালকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে সুন্দরবনের ক্ষতি হয়, এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে হবে।’ গতকাল সকাল ১০টায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চত্বরে সমাবেশ করা হয়। বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা বেল্লাল হোসেনের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ভবতোষ কুমার মণ্ডল। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা রেঞ্জের কুপ অফিসার শ্যামা প্রসাদ রায়, বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি বিশ্বাস, বাঘ সংরক্ষক প্রকল্পের কর্মসূচি কর্মকর্তা জুবায়েত হাসান প্রমুখ। বক্তারা বলেন, সুন্দরবন না বাঁচলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন সমস্যায় পড়বে। এ জন্য যেকোনো মূল্যে সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে। সমাবেশের আগে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়।

বিলুপ্ত প্রজাতির দুটি লক্ষ্মীপ্যাঁচা উদ্ধার

ঠাকুরগাঁওয়ে বিলুপ্ত প্রজাতির দুটি লক্ষ্মীপ্যাঁচা উদ্ধার করা হয়েছে। সদর উপজেলার বোচাপুকুর পোকাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে গতকাল মঙ্গলবার প্যাঁচা দুটি উদ্ধার করা হয়। বিদ্যালয় সূত্র জানায়, ওই বিদ্যালয়ে গতকাল মিস্ত্রিরা টিনের চাল মেরামত করছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে লক্ষ্মীপ্যাঁচা দুটি শিক্ষার্থীদের নজরে আসে। পরে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বিদ্যালয়ের পিয়ন কাম নৈশপ্রহরী সাজু ইসলামকে জানায়। সাজু প্যাঁচাগুলোর কথা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আখতার হামিদ খানকে জানালে তিনি প্যাঁচা দুটিকে উদ্ধার করে বিদ্যালয়ের একটি ঘরে রেখে দেন। পরে তিনি বিষয়টি মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে জানান।
এই প্রতিবেদক বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে ফরেস্ট্রার মাহবুবুর রহমানকে লক্ষ্মীপ্যাঁচা দুটি উদ্ধারের অনুরোধ জানান। পরে তিনি বিষয়টি নিয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা হরিপদ দেবনাথের সঙ্গে কথা বলেন। সে সময় রেঞ্জ কর্মকর্তা লক্ষ্মীপ্যাঁচা দুটি উদ্ধারে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘দ্রুত লোক পাঠিয়ে প্যাঁচাগুলোকে উদ্ধার করে সিংড়া বনে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছি।’ প্যাঁচা দুটির ছবি দেখে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাজেদ জাহাঙ্গীর বলেন, এটি বিলুপ্ত প্রজাতির লক্ষ্মীপ্যাঁচা। ডিম পাড়ার আগে এরা সাধারণত পাকা ভবন বা বাড়িঘরের পরিত্যক্ত কার্নিশে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে। আর এ সময়ে এরা গভীর বন থেকে লোকালয়ে এলেও এখানকার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। এ ছাড়া কাকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখিও এদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তাই এ সময় তারা ভীষণ অসহায় হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা হরিপদ বলেন, বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে শিক্ষক আখতার হামিদ খানের শহরের বাড়িতে গিয়ে প্যাঁচা দুটিকে এনে বন বিভাগ কার্যালয়ে রাখা হয়েছে।

যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই তদন্তকাজ শুরু করি

এম এ হান্নান খান আন্তর্জাতিক (অপরাধ) ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত তদন্ত সংস্থার সমন্বয়কারী। অতিরিক্ত ডিআইজি পদ থেকে অবসর গ্রহণকারী এই অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা এর আগে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলহত্যা মামলার তদন্তেও প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও তদন্ত বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথমআলোরসঙ্গে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সোহরাব হাসান
প্রথম আলো l যুদ্ধাপরাধ বিচারের তদন্ত কার্যক্রমে কীভাবে যুক্ত হলেন? এর প্রথম প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল মতিনকে নিয়ে তো বেশ বিতর্ক হয়েছিল। কীভাবে এ রকম একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে তদন্ত সংস্থার প্রধান করা হয়েছিল?
এম এ হান্নান খান l ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচার করা হবে বলে অঙ্গীকার ছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশনে এ ব্যাপারে সর্বসম্মতিক্রমে একটি আইনও পাস হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক (অপরাধ) আদালত গঠিত হয় ২০১০ সালের ২৫ মার্চ। বিচার বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে আবদুল মতিনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যখন জানা গেল, আবদুল মতিন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ছিলেন এবং বরিশালের বিএম কলেজে তিনি বর্তমান শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছেন, তখন বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ উঠল এবং তিনি পদত্যাগ করলেন। এই প্রেক্ষাপটে তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠিত হয় এবং ২০১১ সালের জানুয়ারি আমি তদন্ত সংস্থার সমন্বয়কারী হিসেবে যোগ দিই।
প্রথম আলো l আপনাদের প্রথম তদন্তকাজ কোনটি ছিল?
হান্নান খান l আমি তদন্ত সংস্থায় যোগ দেওয়ার আগেই কিছু কিছু কাজ শুরু হয়েছিল। তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন স্থানে চিঠিপত্র লেখা হয়েছিল। ইতিমধ্যে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আইনে আছে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরাও তদন্তকাজে অংশ নিতে পারবেন। তাঁরা কাজটি শুরুও করলেন। এতে কিছুটা বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখা দেয়। তখন আমি তদন্ত সংস্থার পক্ষে চিঠি দিয়ে আইনের ধারা ও বিধি উল্লেখ করে চিঠি দিই। বিষয়টি তাঁরাও বুঝতে পারেন। অবশ্য আমরা তদন্তকাজে সহায়তার জন্য তাঁদের সঙ্গে নিয়ে যাই। আমাদের প্রথম তদন্ত হয় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার। তৃতীয় মামলা ছিল গোলাম আযমের।
প্রথম আলো l এর আগে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাসহ যেসব মামলা তদন্ত করেছেন, প্রতিটিই ছিল প্রচলিত আইনে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচার মামলার তদন্ত ছিল ব্যতিক্রম?
হান্নান খান l পুলিশ বিভাগের বা অন্য যেকোনো তদন্ত সংস্থা তদন্ত করে থাকে সিআরপিসির অধীনে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধ বিচার আইনে বলা আছে, সিআরপিসি চলবে না। প্রচলিত সাক্ষ্য আইনও এখানে প্রযোজ্য নয়। আমাদের তদন্ত করতে হয়েছে প্রধানত সাক্ষ্যসাবুদের ভিত্তিতে। এই মামলার ব্যাপারে সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন থাকলেও যাঁরা এসব ঘটনার শিকার হয়েছেন, তাঁদের স্বজনেরা ভয়ভীতিতে ছিলেন। আবার বিবাদীপক্ষও তৎপর ছিল। সাঈদীর মামলায় আমরা জানতে পারলাম, যে ভদ্রমহিলা সে সময়ে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন, তিনি ভারতে আছেন। আমরা লোক পাঠালাম। কিন্তু তাঁরা যাওয়ার আগে বিবাদীপক্ষ সেখানে গিয়ে হাজির হয়। সাঈদী বা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী উভয়েরই অর্থবিত্ত ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। তাঁদের আন্তর্জাতিক লবিও বিচার–প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে চেষ্টা করেছে। ব্রিটিশ আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানকে বিবাদীপক্ষ লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। তিনি আদালতকক্ষেও গিয়েছেন। তাঁর আচরণের কারণে একবার তাঁকে কাঁধে করে আদালত কক্ষের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এরপর আর তাঁকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আবার বিচার–প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে কোনো কোনো বিদেশি লেখক লেখালেখিও করেছেন।
প্রথম আলো l প্রথম দিকে তদন্তের বাধাগুলো কী ছিল?
হান্নান খান l বাইরে থেকে অনেকে এসে বলতে থাকল, মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ হয়েছে ঠিক, কিন্তু তোমাদের বিচারটি আন্তর্জাতিক মানের হচ্ছে না। আমাদের এখানে বিচার হচ্ছে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক (অপরাধ) ট্রাইব্যুনাল আইনে। এই আইনটি যাঁরা করেছিলেন, তাঁরা অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শী ছিলেন। এ আইন ও বিধিতে আসামিপক্ষের সব অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে এখন অনেক দেশ বাংলাদেশকে অনুসরণ করছে। উগান্ডা থেকে একটি দল আমাদের কাছে এসেছিল। বারাক ওবামার মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিশেষ দূত স্টিফেন র‍্যাপ একাধিকবার এসেছেন। তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং শেষ পর্যন্ত তদন্ত সংস্থা ভালো কাজ করছে বলে স্বীকারও করেছেন।
প্রথম আলো l আওয়ামী লীগের সাংসদ মোসলেমউদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা হয়েছে। মামলা করেছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। এটি আপনারা তদন্ত করছেন কি না।
হান্নান খান l তদন্ত এখনো শুরু হয়নি। মামলাটি করেছে বিচারিক আদালতে এবং তাঁরা যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল আমাদের কাছে পাঠালে আমরা তদন্ত করব। এটা ঠিক যে মোসলেমউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ফুলবাড়িয়া থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর তিনি পাকিস্তান বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন অথবা আত্মসমর্পণ করেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
প্রথম আলো l অভিযোগ আছে তাঁর নির্দেশেই তিনজন মানুষকে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
হান্নান খান l আমরা সেটি তদন্ত করে দেখব। তবে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করল আপনি সে সময় কোথায় ছিলেন, তিনি যেসব বাড়ির নাম বলেছেন, পাকিস্তানি বাহিনী সেসব বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল। এটি তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে হয়েছে, না হুমকির মুখে বলেছেন, সেটি দেখতে হবে।
প্রথম আলো l কীভাবে আপনারা মামলা তদন্ত করেন? আদালতের নির্দেশে না এফআইআরের ভিত্তিতে?
হান্নান খান l সিআরপিসির ভিত্তিতে করা এফআইআর এখানে প্রযোজ্য নয়। যখনই সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার হবে বলে ঘোষণা দিল, তখন বিভিন্ন স্থানে মামলা হলো। মামলার পর আসামিদের কেউ কেউ হাইকোর্ট থেকে জামিনও নিলেন। কিন্তু বিচারিক আদালত তো এসব মামলা গ্রহণ করতে পারেন না। তাঁরা এগুলো আন্তর্জাতিক (অপরাধ) ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দিলেন। অভিযোগের হেফাজতকারী হলো তদন্ত সংস্থা। দু-তিনটি জায়গা থেকেই মামলাগুলো আসে। অনেক মামলা আদালতে হয় এবং আদালত তদন্তের জন্য আমাদের কাছে পাঠান। আবার কেউ সরাসরি আমাদের সঙ্গে অভিযোগ করে থাকেন। এমনকি তদন্ত কর্মকর্তা কোনো মামলার তদন্ত করতে গিয়ে নতুন কারও সম্পর্কে তথ্য পেলে তা-ও তদন্ত করে দেখতে পারেন।
প্রথম আলো l মামলাটি সঠিক না উদ্দেশ্যমূলক কীভাবে নির্ধারণ করেন?
হান্নান খান l যুদ্ধাপরাধ বিচার আইনেই বলা আছে তদন্তকারী দল শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিচার করবে। এমনকি ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালেও কিন্তু একটি মামলায় ২৪ জনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ওই মামলায় ২৪ জনই আসামি ছিলেন। কিন্তু আমাদের আইনে প্রিন্সিপাল অ্যাকিউজড বা মূল অপরাধী সম্পর্কে কিছু বলা নেই। সে ক্ষেত্রে আমরা দেখি, অপরাধটি কতটা ভয়াবহ ছিল। আমরা যখন তদন্তের দায়িত্ব নিই তখন ৪২৫টি মামলা ছিল। এখন মামলার সংখ্যা ৬৯১টি। আমরা যদি লঘু অভিযোগের মামলাগুলো নিতাম তাহলে সর্বোচ্চ শাস্তি হতো না। আমাদের প্রতি মানুষ আস্থা রাখত না। যে বিচারের সঙ্গে সমগ্র দেশবাসীর আবেগ জড়িত সেই বিচার নিয়ে আমরা ছেলেখেলা করতে পারি না। আমাদের লক্ষ্য ছিল মানুষের আস্থা অর্জন। এ কারণে যেসব মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি হবে সেই মামলাগুলোই তদন্ত করেছি।
প্রথম আলো l বিএনপি নেতা ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকের মামলাটি কোন পর্যায়ে আছে?
হান্নান খান l এ মামলার তদন্ত একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু শিক্ষকের স্বাধীনতাবিরোধী কাজের সূত্র ধরেই মামলার সূত্রপাত। তদন্ত সংস্থা ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি কাগজ সংগ্রহ করেছে, যাতে স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তিদের নামধাম ছিল। তার মধ্যে ওসমান ফারুকের নামও আছে।
প্রথম আলো l অন্য কোনো দলের কোনো নেতা সম্পর্কে তদন্ত করছেন কি?
হান্নান খান l এখন কে কোন দল করছেন, সেটি আমরা দেখছি না। দেখার বিষয় একাত্তরে কার কী ভূমিকা ছিল। জামায়াতের সাবেক সাংসদ খালেক মণ্ডল ও আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে অনীত অভিযোগ আমরা তদন্ত করেছি। জাতীয় পার্টির সাংসদ এম এ হান্নানের বিচার চলছে। বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আবদুল আলীমের বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ আদালতে আওয়ামী লীগের নেতা মোবারকের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।
প্রথম আলো l বিভিন্ন মামলায় আদালত তাঁদের রায়ের পর্যবেক্ষণে তদন্ত কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের দুর্বলতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
হান্নান খান l যুদ্ধাপরাধ বিচার আদালত কিন্তু আমাদের ব্যর্থতার কথা বলেননি। আপিল বিভাগ বলেছেন। যেমন সাঈদীর বিরুদ্ধে আগে যে মামলা হয়েছিল, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য আমরা জেলা প্রশাসন থেকে পাইনি। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজে মহাফেজখানায় গিয়ে কিছু পাননি। আমি বলব, আমরা বড় কোনো ভুল করিনি।
প্রথম আলো l মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে তদন্ত সংস্থা ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিল?
হান্নান খান l প্রথম দিকে থাকলেও পরবর্তীকালে কাটিয়ে উঠেছি। এখন কোনো সমন্বয়হীনতা নেই।
প্রথম আলো l তদন্ত করতে গিয়ে এখন কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন?
হান্নান খান l ৪৫ বছর আগের ঘটনা। অনেক আলামতই খোয়া গেছে। অনেক আসামি মারা গেছেন। সাক্ষী ও ভুক্তভোগীও মারা গেছেন। পঁচাত্তরের পর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থানের ফলে অপরাধীরা অনেক আলামত নষ্ট করে ফেলেছেন। যখন কোনো মামলার ব্যাপারে তদবির বেশি হয়, আমরা ধরে নিই এর পেছনে উদ্দেশ্য আছে। প্রাথমিক তদন্ত করে যদি বুঝতে পারি মামলার ভিত্তি আছে, তাহলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত  করি। আমাদের লোকবল খুবই কম। মোট ৭৪টি মামলা আমরা তদন্ত করেছি বা করছি। কিন্তু মোট মামলার সংখ্যা ৬৯১।
প্রথম আলো l তাহলে কি একসময় বিচার কার্যক্রম বন্ধ করতে বলবেন?
হান্নান খান l না, বন্ধ করতে বলব না। জার্মানিতে কিছুদিন আগেও ৯৩ বছর বয়সী এক যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে। সরকার যদি এটি দ্রুত শেষ করতে চায়, তাহলে আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। অন্তত বিভাগীয় শহরে একটি করে আদালত স্থাপন করতে হবে। তদন্তের জন্য লোকবল বাড়াতে হবে। যে ব্যক্তি অভিযোগ করলেন, রাষ্ট্রের দায় আছে, তার প্রতিকার করার। না হলে রাষ্ট্র দায়বদ্ধ থাকবে।
প্রথম আলো l সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়ে আপনারা কী করেছেন?
হান্নান খান l অনেক সাক্ষীই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন। আমরা সরকারকে সাক্ষী সুরক্ষা আইন করার জন্য লিখেছি। সরকার সেটি এখনো করেনি; তবে জেলা পর্যায়ে যে ডিসি-এসপির নেতৃত্বে সাক্ষী সুরক্ষা কমিটি আছে, তাদের ব্যবস্থা নিতে বলেছে। ওই কমিটির কাছে যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়ে কেউ আমাদের জানালে আমরাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ব্যবস্থা নিতে বলি। এতগুলো ঘটনার মধ্যে পিরোজপুরে মাহবুব নামে একজন সাক্ষী আক্রমণের শিকার হয়েছেন বলে মামলা হয়েছে।
প্রথম আলো l যুদ্ধাপরাধীর বিচার আদালতে যাঁরা সর্বোচ্চ শাস্তি পেয়েছেন, তাঁদের কারও কারও নামে ১৯৭২ সালের দালাল আইনে মামলাই ছিল না। এর কারণ কী?
হান্নান খান l না হওয়ার একটা কারণ, এঁদের অনেকে দেশে ছিলেন না। অনেকের নাগরিকত্ব বাতিল হয়েছিল। আবার সামাজিক-পারিবারিক কারণেও অনেকে সুবিধা পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে যত দ্রুত বিচার করা গেছে, দালাল আইনে সেটি সম্ভব ছিল না।
প্রথম আলো l আপনি বললেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের প্রধান লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী। তাদের বিচার করা যাবে কি?
হান্নান খান l ø আমি তো বাধা দেখছি না। তাদের অপরাধের তথ্য-উপাত্ত এখনো আসছে। সব মামলার তদন্তেই পাকিস্তানি বাহিনীর সেনা কর্মকর্তাদের নাম আসে। এসব তথ্য-উপাত্ত আমরা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছি। সরকার বিচারের সিদ্ধান্ত নিলে তাদেরও বিচার হতে পারে।
প্রথম আলো l আপনাকে ধন্যবাদ।
হান্নান খান l আপনাকেও ধন্যবাদ।

ইসরায়েল শান্তি চায় না

ইসরায়েল যেন আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে, বা ব্যাপারটা অন্তত সে রকম মনে হয়। ২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব ২৩৩৪ পাস হয়েছে, যেখানে এই ব্যাপারটা আবারও নিশ্চিত করা হয়েছে যে ইসরায়েলের বসতি স্থাপন অবৈধ। এই ভোট দুটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আগের প্রস্তাবগুলোর মতো ওবামা প্রশাসন এতে ভেটো দেয়নি। তারা বরং ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। দ্বিতীয়ত, এতে বোঝা গেল, ইসরায়েলের এই বসতি স্থাপন যে অবৈধ ব্যাপার, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য আছে। এটা দেখিয়ে দিল বসতি স্থাপন শান্তির পথে অন্তরায়। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বরের এক বক্তৃতায় এই ব্যাপারটিতে আবারও জোর দিয়েছেন।
এরপর এ বছরের জানুয়ারিতে প্যারিসে যে শান্তি সম্মেলন হলো, সেখানেও তিনি একই কথা বলেছেন। উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে এটা ছিল সবচেয়ে বড় শান্তি সম্মেলনগুলোর একটি। সত্য হচ্ছে, ইসরায়েলের সবচেয়ে কট্টর সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রও নিশ্চিত করেছে, এই বসতি স্থাপনের ব্যাপারটা অবৈধ। কিন্তু তারপরও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার একই গীত গেয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে দেখা গেল, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস হওয়ার পর ইসরায়েল তাড়াহুড়ো করে ফিলিস্তিনের ভূমিতে আরও বেশি করে অবৈধ বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। এক মাসের মধ্যে ইসরায়েলি সরকার ছয় হাজারের বেশি গৃহ নির্মাণে সবুজ সংকেত দেয়। সত্য হলো, পুরো ২০১৬ সালেও ইসরায়েলি সরকার এত বসতি স্থাপনের অনুমতি দেয়নি। এর সঙ্গে ইসরায়েলি সংসদে এক আইন পাস করা হলো, যার নাম ‘নিয়মিতকরণ আইন’, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ভূমি দখল আইন। এর মাধ্যমে বসতি স্থাপনকারীরা ‘বৈধভাবে’ ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করতে পারবে। এর মাধ্যমে বসতি স্থাপন প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে। এই আইন বিদ্যমান পর্যবেক্ষণ-ফাঁড়িগুলোকে ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিতে পারে, যেটা ইসরায়েলি আইনেই অবৈধ। তা ছাড়া, আন্তর্জাতিক আইনে বসতি স্থাপন ও পর্যবেক্ষণ-ফাঁড়ি উভয়ই অবৈধ। প্রকৃত অর্থে,
বৈধ বসতি স্থাপন বলতে কিছু নেই। অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েল সরকার ও বসতি স্থাপনকারীরা প্রায় আধা শতক ধরে বসতি স্থাপন ও পর্যবেক্ষণ-ফাঁড়ি নির্মাণ করে যাচ্ছে, এই আইন বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করে গেছে। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল আভিচাই ম্যানডেলব্লিট ঘোষণা দিয়েছেন, এই আইন চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের পরিপন্থী। তিনি এ-ও বলেছেন, আইনটি যদি ইসরায়েলি আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তাহলে তিনি এর সপক্ষে দাঁড়াবেন না। ইসরায়েল ক্রমাগতভাবে বসতি স্থাপন করতে থাকায় স্বনির্ভর ও সংযুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে, যার কারণে দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। কিন্তু বসতি স্থাপন এমন ইস্যু নয়, যা ভবিষ্যতে আলোচনার জন্য ঘড়ায় তুলে রাখা যায়। এখনই ফিলিস্তিনিদের জীবনে এর মারাত্মক প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণের কারণে ফিলিস্তিনিরা সি অঞ্চল থেকে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, যা পশ্চিম তীরের ৬০ ভাগ, যেটা এখন পুরোপুরি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। বসতি স্থাপনকারীরা নিয়মিতই আশপাশের ফিলিস্তিনিদের হামলা করে। তাদের সম্পত্তি ভাঙচুর করে। তবে এর জন্য তাদের বিচার হয় না। বলা যায়,
তারা পুরোপুরি দায়মুক্তি পেয়ে গেছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে, ইসরায়েলিরা সি অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনিদের সরে যেতে বাধ্য করছে, যাতে তারা জনবহুল শহরগুলোতে চলে যায়। এ ছাড়া নতুন বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইসরায়েলি বুলডোজারগুলো নিয়মিতই সি অঞ্চলের বাইরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস করছে। এতে কৃষক ও বেদুইনরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। তারা ঐতিহ্যবাহী পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। ফলে তারা জীবিকা হারিয়েছে। কথা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলের এই বসতি স্থাপনের উন্মত্ততা উপেক্ষা করতে পারে না। বিশ্বশক্তি, অধিকারভিত্তিক সংগঠন ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলের নতুন করে বসতি স্থাপনের ঘোষণা ও তথাকথিত ‘নিয়মিতকরণ আইন’-এর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এসব বিবৃতি অকার্যকর। এগুলো ইসরায়েলকে কখনোই নিবৃত্ত করতে পারেনি। তাই জাতিসংঘের এই ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাব সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। কারণ, এটি জাতিসংঘ সনদের ষষ্ঠ অধ্যায়ের আলোকে গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মানে হচ্ছে, ইসরায়েল যদি এই বিধান লঙ্ঘন করে, তাহলে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারবে না। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আগের চেয়ে আরও বেশি করে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন, তারা ইসরায়েলের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। এটা শুধু নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, সবার স্বার্থেই এটা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সিংহভাগই প্রণীত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার পরিপ্রেক্ষিতে। এর লক্ষ্য হচ্ছে, এরূপ বিয়োগান্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। যে দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন (সেটা করে আবার পার পেয়ে যাচ্ছে) এবং মৌলিক মানবাধিকার অকার্যকর করে দিচ্ছে, তারা প্রকৃত পক্ষে মানবতাকে অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যখন উপনিবেশ ও জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণ একপ্রকার রীতিতে পরিণত হয়েছিল। ইসরায়েলের বসতি স্থাপন প্রক্রিয়ার কারণে ফিলিস্তিনিরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে আমরা সবাই এতে আক্রান্ত হব।
আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত।
রামি হামদাল্লাহ্: ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী।

টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা অনুচিত কেন?

‘মামাবাড়ির আবদার’ নামক বাগ্ধারাটির সঙ্গে পাঠক সুপরিচিত। এর মর্মকথাও অনেকেরই জানা। ঠিক এ ধরনেরই কিছু দাবি করে থাকে আমাদের দেশের কোনো কোনো সংগঠন। ক্ষেত্রবিশেষে তারা জোর তদবিরও করে। সরকারের ওপরের পর্যায়ে কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তিও সময়ে সময়ে এসব বিষয়ে সমর্থন দেন। কখনো বা সফল হয়ে যান। ঠিক এ ধরনের একটি দাবি নিয়ে চাপাচাপি করছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। তাদের দাবি অনেক।
এর মধ্যে একটি জোরালো দাবি, ফ্ল্যাট ক্রেতাদের কাছে তাঁদের আয়ের উৎস জানতে চাওয়া যাবে না। এখানে কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার জন্যও তারা প্রস্তাব রাখছে। রিয়েল এস্টেট ও হাউজিং খাতে বড় ধরনের মন্দা চলছে বলে এর কারণ খতিয়ে দেখা ও সমস্যা উতরাতে সম্ভাব্য সহায়তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। এটি একটি শ্রমঘন শিল্প। বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহৃত হয় এ খাতে। সেগুলো থেকে পাওয়া যায় শুল্ক ও ভ্যাট। উদ্যোক্তারা নিজস্ব অর্থের সঙ্গে ঋণ করা টাকাও জোগান দেন মূলধন হিসেবে। সময়ে সময়ে ক্রেতাদের অগ্রিমও ব্যয় হয়। এত কিছুর পরও যথেষ্টসংখ্যক ক্রেতার অভাবে অবিক্রীত থাকছে অনেক ফ্ল্যাট। এ শিল্পে স্থবিরতার নেতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পড়ার কথা। তাই সমস্যাটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। তাই বলে কি ফ্ল্যাট ক্রেতার আয়ের উৎস দেখা যাবে না? কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে এ খাতে? নিকট অতীতে লম্বা সময় কালোটাকাকে নামমাত্র কর দিয়ে আইনানুগ করার সুযোগ ছিল সব ক্ষেত্রেই। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটা দুর্নীতির প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। আমরা সবাই দেশ থেকে দুর্নীতির মূল উত্পাটনের কথা বলি। এটাও জানি যে দুর্নীতি আমাদের শতকরা প্রবৃদ্ধি দেড় থেকে ২ শতাংশ কমিয়ে দিচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ঢালাওভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ চলে যায়।
তবে আয়ের বৈধ উৎস দেখাতে পারলে জরিমানা ও আয়কর দিয়ে আগে আয়কর না দেওয়া টাকা সাদা করার সুযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, আবার কালোটাকার বিশাল অংশ ঘুষ, চাঁদাসহ বিভিন্ন অবৈধ উৎস থেকে আসা। এর ভোগের ক্ষেত্র সীমিত করা দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক একটি কাজ। আর কালোটাকার একটি অংশই যায় প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি, বাগানবাড়ি, গাড়ি ইত্যাদিতে। বলা হয় কালোটাকাকে আইনানুগ করতে না দিলে বিদেশে চলে যাবে। চলে যাচ্ছেও। যখন এ ধরনের সুযোগ অবারিত ছিল, তখনো গেছে। এটা আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি দুর্বলতা। তার জন্য এ ধরনের সুযোগ দিতে হবে—এমন দাবি যৌক্তিক নয়। বিদেশে যাতে টাকা পাচার হতে না পারে, তার কার্যক্রম জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ। ফ্ল্যাট ক্রয়ের টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন না করার দাবি যাঁরা করছেন, তাঁদের মতে গৃহনির্মাণে রড, সিমেন্ট, টাইলস, কমোড, গ্লাস, ডোরসহ ২৫০ ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এগুলোতে ট্যাক্স ও ভ্যাট রয়েছে। তারপরও ফ্ল্যাট হস্তান্তরে ১৪ শতাংশ রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয়। বলা হচ্ছে, এরপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ফ্ল্যাট ক্রেতাদের টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা উচিত নয়। কথাটি শুধু রিহ্যাবই বলছে না। বলছেন সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। নির্মাণসামগ্রীর কোনোটির ওপর যদি ট্যাক্স, ভ্যাটের পরিমাণ অযৌক্তিক বেশি থাকে, তা কমানোর দাবি করা যায়। রেজিস্ট্রেশন ফি কমানোর দাবি করাও অন্যায্য হবে না। তবে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের আয়ের উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা কেন উচিত নয়, তা বোধগম্য নয়। ফ্ল্যাট ক্রেতারা টাকা দিয়ে নির্মাণশিল্পকে চাঙা রাখছেন, এটা সত্য।
এ রকম তো অন্য সব খাতের ভোক্তারাও করছেন। তাঁদের আয়ের উৎস দেখা গেলে ফ্ল্যাট ক্রেতাদেরও দেখা যাবে। এটা নৈতিক দিক বিবেচনায়ও যৌক্তিক। ফ্ল্যাট কেনায় অনেক ক্রেতা এমনিতেই কিছু টাকা গোপন করার সুযোগ পান। সরকারের ভুল নীতির কারণে প্রকৃত মূল্য দলিলে খুব কম ক্ষেত্রেই দেখানো হয়। সাধারণত অর্ধেক বা ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কম-বেশি থাকে দলিলমূল্য। এতে সরকার ন্যায্য রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হয়। সে ক্ষেত্রে ফ্ল্যাটটির শুধু দলিলে দেখানো দামটির তথ্যই চাইতে পারে এনবিআর বা দুদক। আর এতেও আপত্তি! রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় মন্দাটা বিগত বেশ কয় বছরের। আর অনেকেই বিবেচনা করেন এ খাতে মন্দার জন্য অংশত দায়ী নির্মাতাদের একটি অংশ। রিয়েল এস্টেট খাতের উদ্যোক্তাদের দেশের আবাসন-সংকট নিরসনে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক ভূমিকার জন্য আমরা প্রশংসা করি। তবে ক্রেতাদের সামর্থ্য ও প্রকৃত বাজারচাহিদা বিবেচনা না করে দলে দলে লোক নেমে পড়েন এ ব্যবসায়। জমির মালিকদের অবাস্তব অংশীদারত্ব ও নগদ টাকা দেওয়ায় ইউনিটপ্রতি ফ্ল্যাট নির্মাণে ব্যয় বৃদ্ধি পায় অনেক। শুধু রাজধানী বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহর নয়, জেলা-উপজেলায়ও নির্মাতারা এ ধরনের ফ্ল্যাট নির্মাণ করতে শুরু করেন। কতৃপক্ষও নির্বিচারে অনুমোদন দেয় বহুতল ভবনের।
দুটো রিকশা পাশাপাশি চলে না, এমন রাস্তার পাশেও ছয়তলা ভবন হয়। এভাবে যাঁদের জমি নেওয়া হলো, তাঁরা বেশ কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে হন গৃহহীন। ফ্ল্যাট নির্মাণ শুরুই করতে পারেননি বা কিছুটা এগিয়ে সরে পড়েছেন—এ রকম নির্মাতার সংখ্যাও একেবারে কম নয়। জমির মালিককে প্রতিশ্রুত বাড়িভাড়া দিচ্ছেন না। এমন ঘটনা আছে অনেক। নির্মিত ফ্ল্যাটগুলোর জন্যও ক্রেতা জুটছে না। এ দুর্দশা শুধু অলিগলি বা মফস্বল শহরেই সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানী ঢাকার পরিকল্পিত এলাকাগুলোতেও এখন ‘ফর সেল’ লেখা নতুন ফ্ল্যাটের ছড়াছড়ি। রিয়েল এস্টেট খাতের মন্দা কাটাতে কোনো কোনো নির্মাণসামগ্রীর কর-ভ্যাট কিছুটা হ্রাস করলে একটু সহায়ক হবে, এর তালিকা করে রিহ্যাব সরকারের কাছে দাবি জানাতে পারে। ফ্ল্যাট ক্রেতাদের কম সুদে ব্যাংকঋণ–প্রাপ্তির দাবিও অযৌক্তিক হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাপ দিলে ‘কস্ট অব ফান্ড’-এর ওপর কিছু মার্জিন রেখে এ খাতে ঋণ দেওয়া যায়। এমনকি সরকারের একটি তহবিল খুব কম সুদে ব্যাংকগুলোকে দিলে তারা এক অঙ্কের ঘরেই এ ঋণসুবিধা দিতে পারে। তবে মূল সমস্যাটি জমির দামে। জমির দাম অত্যন্ত বেশি ধরা হয়। এটা ফ্ল্যাটের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। চুক্তিবদ্ধ প্লটগুলো নিয়ে কী করা হবে, তা আমাদের অজানা। তবে নতুন চুক্তিতে বাস্তববাদী না হলে সমস্যাটি শুধু চলমানই থাকবে না, বরং ঘনীভূত হবে। জমির মালিক ও নির্মাতার অনুপাত এবং অগ্রিম কোন অঞ্চলে কত হবে, তা বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার।
প্রতিযোগিতা করে জমি নেওয়ার প্রবণতা থেকে দূরে সরে আসার সময় এখনই। আমরা সমাজ থেকে দুর্নীতি ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে চাই। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা হয়েছে। এর মাঝে এনবিআর আর দুদকের ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এককালে তো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের নামের তালিকায় আমরা তলানিতে ছিলাম। বেশ কয়েক বছর বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে কিছুটা ওপরে উঠতে পেরেছি। তবে আমরা বেশ কিছু ক্ষেত্রে কপট আচরণ করি। দুদক যখন অন্যকে ধরে, তখন বাহবা দিই। আর নিজের ঘরের দিকে আসতে থাকলে হইচই করি। নেমে পড়ি বিরোধিতায়। দুদক ও এনবিআরও জনভোগান্তির কারণ যেন না হয়, এটাও দেখা দরকার। তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রমের প্রতিও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি জোরদার করতে হবে। আমাদেরও এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি বাড়াতে হবে সমর্থনের মাত্রা। দেশের স্বার্থে এদের শক্তিশালী অবস্থান দরকার। এ কারণেই রিয়েল এস্টেট ব্যবসার বর্তমান সমস্যা মেটাতে প্রতিষ্ঠান দুটোকে তাদের আইনি অধিকার ও কর্তব্য ছেড়ে দিয়ে বসে থাকার ‘আবদার’ যথাযথ নয়, বরং আপত্তিকর।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com