Saturday, September 7, 2013

তথ্যপ্রযুক্তি দেশে কতটা অবদান রাখছে by লোকমান হাকিম

বাংলাদেশে বিশ্বায়ন যে কীভাবে ঢুকে পড়েছে, তা বোঝা যায় মোবাইল ফোনের ব্যবহার দেখে। শহরের প্রতিটি বাড়িতে প্রত্যেক সদস্যের হাতে মোবাইল ফোন। গ্রামও পিছিয়ে নেই। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মোবাইল ফোন আছে। এক বাড়িতে একাধিক ফোন আছে এমন বাড়ির সংখ্যাও এখন কম নয়। দূরে থাকা স্বজন, প্রবাসী সন্তান বা ভাই-ভগ্নির সঙ্গে এখন নিত্যদিন যোগাযোগ হচ্ছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। এই ফোন যে শুধু আত্মীয়স্বজনের খবরাখবর নেয়ার মাধ্যম হয়েছে তাই নয়; কৃষক তার ফসল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিষয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগাযোগ করতে পারছেন। দোকানি তার ব্যবসার কাজে ফোনের ব্যবহার করছেন। মাছের ব্যাপারী থেকে কাঁচাবাজারের দোকানদার সবাই এই ফোন ব্যবহার করে লাভবান হচ্ছেন। ছাত্রছাত্রীরা তাদের লেখাপড়ার কাজে ইন্টারনেট সার্চ করছে। ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সরকারি-বেসরকারি আমলা- সবাই এখন ব্যাপকভাবে ইন্টারনেটের সহায়তা নিচ্ছেন। এছাড়া ফেসবুক, সাইবার ক্যাফের মাধ্যমে তথ্য বিনিময় ও গসিপ হচ্ছে প্রচুর। শিশুরাও পিছিয়ে নেই, তারাও কম্পিউটারে খেলছে বিভিন্ন ধরনের খেলা। মোটামুটিভাবে শিশু থেকে প্রবীণ সবাই বিভিন্নভাবে জড়িয়ে গেছি তথ্যপ্রযুক্তির জগতে। আর তথ্যপ্রযুক্তির কারণেই একধরনের আন্তর্জাতিক রুচিবোধ ও মানসিকতা আমাদের বাঙালিয়ানাকে স্পর্শ করছে, প্রভাবিত করছে।
এখন দেখব আমাদের বেকার তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি কতটা সহায়ক। মোটামুটিভাবে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিবছর ২৭ লাখ মানুষ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের জগতে। এর মধ্যে ৫ লাখ কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ যাচ্ছে। এতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে বটে, তবে তথ্যপ্রযুক্তি নিজেই যে একটা বিশাল কর্মকাণ্ডের বাজার, সেখানে আমরা এখনও আশানুরূপভাবে স্থান করে নিতে পারিনি। বর্তমানে দেশে আইটি বাজারের পরিমাণ আনুমানিক ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং এ খাতে ৭০ হাজার শিক্ষিত জনবল কাজ করছে। অথচ সারাবিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির বাজারের পরিমাণ ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশাল এ বাজারে অন্যান্য দেশ যেভাবে ঢুকে পড়েছে, সে তুলনায় বাংলাদেশের গতি অনেকটাই শ্লথ।
সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট ওয়াবিকহাল। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে বাড়ানোর জন্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পৃথক তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এর অধীনে আছে কম্পিউটার কাউন্সিল, আছে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও প্রাইভেট সেক্টরে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে, তার অধিকাংশেই তথ্যপ্রযুক্তিতে উচ্চ ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সরকার ভারতের সিলিকন ভ্যালির আদলে গাজীপুরে আইটি ভিলেজ গড়ে তোলার প্রকল্প নিয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আইটি প্রফেশনাল গড়ে তোলার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল সারা বছর ধরে বিভিন্ন কোর্স পরিচালনা করে। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকেই সরকারি-বেসরকারি কাজে ঢুকে যায়। আর কেউবা কাজ করে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে। দেশে সংবাদপত্র ও টিভি রিপোর্টিংয়ে বহু ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। এছাড়া প্রাইভেট সেক্টরে অনেক কলসেন্টার গড়ে উঠেছে। কলসেন্টারগুলো রির্সোসপার্সন নিয়োগ করছে। তাদের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছে। আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণের জন্য একটি সুসংবাদ রয়েছে। দেশে ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে আউটসোর্সিংয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য সরকার একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। দেশের ভেতরে ছাড়াও বাইরে প্রশিক্ষিত জনবল সরবরাহ করার ব্যাপারে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্য পূরণে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় ২০ হাজার আইসিটি গ্র্যাজুয়েট এবং ১০ হাজার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে এ প্রকল্পের আওতায়। যেসব জেলায় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ রয়েছে, সেখান থেকে উপযুক্ত আইসিটি বা সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট সংগ্রহ করার জন্য সরকার ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে।
সরকার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা কারিকুলামে কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি কোর্স চালু করেছে। শিশুরা শৈশব-কৈশোর থেকে যাতে তথ্যপ্রযুক্তি রপ্ত করতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে একটি করে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি করে দিচ্ছে। ক্লাসরুমগুলো বিদ্যুৎ সংযোগসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক ল্যাপটপ ও কম্পিউটার দ্বারা সজ্জিত করা হচ্ছে। বিশেষ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ১৫০০টি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি করা হয়েছে।
সচিবালয়সহ সরকারি অফিসগুলো ওয়াইফাই নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হচ্ছে। এসব অফিসে থাকা কম্পিউটার, প্রিন্টারের মতো ইলেট্রনিক ডিভাইজগুলো তারের পরিবর্তে রেডিও ওয়েভের মাধ্যমে সংযুক্ত হবে। ন্যাশনাল আইসিটি ইনফ্রা নেটওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট নামে ১ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ সম্প্রতি অনুমোদন করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় সচিবালয়সহ সব সরকারি অফিসে ২৫ হাজার ট্যাব কম্পিউটার সরবরাহ করা হবে। বাংলাদেশ সচিবালয়, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, ৭টি বিভাগীয় সহ-দফতর এবং জেলা দফতর ও ৪৮৫টি উপজেলার সরকারি অফিসগুলোতে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এ প্রকল্পে চীন ১ হাজার ৮৭ কোটি টাকা দেবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, জেলা প্রশাসক ও উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসের ট্রেনিং সেন্টারসহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে মোট ৮০০টি ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেমও স্থাপন করা হবে এ প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পের কাজ জুন, ২০১৫ নাগাদ শুরু করার সময়সীমা নির্ধারিত করা আছে।
বেসরকারি খাতে দেশের আইটি প্রফেশনালদের সংগঠন বেসিস দেশে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি না হওয়ার জন্য চিহ্নিত করেছে তথ্যপ্রযুক্তি বিপণন-সংক্রান্ত জ্ঞান ও দক্ষতার অভাবকে। জুলাইয়ে বেসিস হোটেল র‌্যাডিসনে আয়োজন করেছিল দেশের প্রথম আইটি মার্কেটিং ফোরাম। বেসিস মনে করে, তথ্যপ্রযুক্তি বিপণন কৌশলের সঠিক ব্যবহারই আগামীতে আইটি কোম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে পারবে। আইটি কোম্পানিগুলোতে কর্মরত প্রত্যেক ব্যক্তির আবশ্যিকভাবে কোম্পানির পণ্য ও সেবা একটি ব্র্যান্ড হিসেবে বিপণনের সম্যক ধারণা থাকতে হবে। দেশে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পকে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সামনে সঠিকভাবে উপস্থাপনের কৌশল জানতে হবে।
নিবন্ধটি শেষ করব অত্যন্ত গৌরবজনক ও বিস্ময়কর একটি সংবাদ দিয়ে। সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লেখাতে যাচ্ছে বাংলাদেশের এক ক্ষুদে কম্পিউটার জিনিয়াস রূপকথা। এই বিস্ময় বালকের পুরো নাম ওয়াশিক ফারহান রূপকথা। মাত্র ৭ বছর বয়সী রূপকথা ইতিমধ্যে প্রোগ্রামিংয়ে সি, সি++, ভিজ্যুয়াল বেসিক, জাভা, পাইথন, উইন্ডোজ এক্সপি, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড (দ্রুত গতিতে কম্পোজ), ফটোশপ, পাওয়ার পয়েন্ট, এডবি ফ্লাস ইত্যাদিতে দক্ষতা অর্জন করেছে। রূপকথার বাবা গুলশানের অধিবাসী। তার বয়স যখন ১ বছর, তখন তাকে কিছু খাওয়াতে চাইলে কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে খাওয়াতে হতো। ১ বছর বয়সে সে মাউস নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করে। ২ বছর বয়সে সে এমএস ওয়ার্ড টাইপিং শিখে ফেলে। সে এখন প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা কম্পিউটারে নিমগ্ন থাকে। ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ওয়ার্ল্ড নিউজ এজেন্সি রূপকথাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্র প্রোগ্রামার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী প্রোগ্রামার হিসেবে অভিহিত করে তাকে নিয়ে বিবিসি সচিত্র প্রতিবেদন প্রচার করে। তাকে নিয়ে লেখালেখি হয় ক্যার্লিফোনিয়া অবজারভার, নিউইয়র্ক টাইমস, নিউইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউন, স্টেট নিউজ, চিলড্রেন পোস্ট, জিনিউজ, হিন্দুস্তান টাইমসসহ অনেক বিদেশী পত্রপত্রিকায়। বাংলাদেশে অষ্টম শ্রেণীর ইংলিশ ফর টু ডে টেক্সট বইয়ে রূপকথাকে মডেল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
২০১১ সালে ‘রিপলিস বিলিভ ইট ওর নটে’ অন্তর্ভুক্ত হয় এই বিস্ময় বালক। গিনেস বুকে নাম প্রকাশের নিয়ম অনুযায়ী গত ১৬ মে একটি ভিডিও ডকুমেন্টেশন তৈরি করা হয়েছে। ওই ভিডিওসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্র গিনেস কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, কর্তৃপক্ষ রূপকথার নাম অচিরেই গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার চূড়ান্ত ঘোষণা দেবে।
বাংলাদেশে এমন আরও অনেক রূপকথার জন্ম হবে এবং তারা গোটা বিশ্বকে বিমোহিত করবে- এই প্রত্যাশা নিয়ে রূপকথার জন্য শুভ কামনা রেখে শেষ করছি।
লোকমান হাকিম : সাবেক অতিরিক্ত সচিব, প্রাবন্ধিক

রাজনৈতিক দাবা খেলায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়াচক্র by মুহাম্মদ রুহুল আমীন

২৭ আগস্ট হঠাৎ করে ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশী রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা এবং জাতিসংঘসহ এর অঙ্গসংস্থার কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। এর পর থেকে বিশ্লেষক মহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক বৃহৎ শক্তিগুলোর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। এ লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দাবা খেলায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়াচক্রের কলাকৌশলের স্বরূপ বিশ্লেষণ করা। তাত্ত্বিকভাবে দেখলে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অপর কোনো রাষ্ট্রের ‘ইতিবাচক সংশ্লিষ্টতা’ তেমন ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয় না। বিশেষত, বিশ্বায়নের ‘বৈশ্বিক গ্রাম’ (গ্লোবাল ভিলেজ) চেতনা ধারণ করে বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন সাধনের লক্ষ্যে ইতিবাচক বহিঃসংযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো বিভিন্ন কারণে উন্নত দেশ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা গ্রহণ করে বলে দরিদ্র দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ধনী দেশগুলো হস্তক্ষেপ করে থাকে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল পি টোডারো এ ধারায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের বৈদেশিক হস্তক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। তৃতীয়ত, উন্নয়নের ‘বৈদেশিক সাহায্য তত্ত্ব’ বিশ্লেষণ করে ছকবাদী (স্ট্রাকচারাল) অর্থনীতিবিদরা সাহায্য দান ও সাহায্য গ্রহণের মধ্যে ‘নির্ভরশীলতার’ অনিরাময়যোগ্য বিকার আবিষ্কার করেছেন। অর্থাৎ দাতা দেশগুলো গ্রহীতা দেশের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে এমন হস্তক্ষেপ করে থাকে, যা থেকে গ্রহীতা দেশ কখনও মুক্ত হতে পারে না। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ‘জবর শাসন তত্ত্ব’ (হেজিমোন থিওরি) অনুযায়ী বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিতে আন্তর্জাতিক ‘শাসন-শোষণ’ অবস্থাকে ব্যবহার করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নানাভাবে জড়িয়ে পড়ে।
একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতায় একথা বিশ্বাস করার তেমন কোনো কারণ নেই যে, বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলো ইতিবাচক কারণে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দরিদ্র দেশগুলোতে ধনী দেশগুলো প্রতিনিয়ত যেভাবে জড়িয়ে পড়ছে, তা খুব নেতিবাচক ফলাফলই বয়ে আনছে। এ বাস্তবতা ঐতিহাসিক, এ সত্য অনস্বীকার্য। ঊনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বেশি সাড়া জাগানো সমাজ দর্শনিক কার্ল মার্কস তাই এ স্বচ্ছ সত্যটিকে ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং বৈদেশিক রাষ্ট্রগুলোর সংশ্লিষ্টতা কি উপরের কোনো তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়? এ বিষয়ে বেশ ভাবার সময় এখন এবং এখনই। নির্বাচন কমিশনে বিদেশীরা কেন ঢুকলেন এমন প্রশ্ন যেমন অনেকের, আবার তাদের এখানে আসার প্রয়োজন ছিল এমন উত্তরও অনেকের। অনেকে স্তম্ভিত, অনেকে দ্বিধান্বিত, অনেকে হতাশাগ্রস্ত, আবার অনেকে আশান্বিত। এমন বহুমুখী মনোজাগতিক ও সমন্বয়হীন মিশ্র অনুভূতি একটি দেশ ও জাতির জন্য যে কত ক্ষতিকর পরিণতি বয়ে আনে, তা পৃথিবীর অনেক দেশের ইতিহাস থেকে অবগত হওয়া যায়।
বাংলাদেশ একটি দরিদ্র, উন্নয়নশীল, সাহায্যগ্রহীতা দেশ হিসেবে এখানকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বৈদেশিক সংশ্লিষ্টতা থাকবে। কিন্তু সেই আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা যেন কোনোভাবে বহিঃহস্তক্ষেপের করাল থাবায় বিস্তৃত হতে না পারে, তার কৌশল অবলম্বন করা উচিত ছিল অনেক আগেই। এই একটি জায়গায় মনোনিবেশ না করার কারণে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ইতিবাচক ফলাফলের পরিবর্তে বৈশ্বিক হস্তক্ষেপের অভিশাপ নেমে আসছে বলে মনে হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনে ১৪-১৫টি দেশের শীর্ষ কূটনীতিক, জাতিসংঘ, ইইউ কর্তাব্যক্তিরা এসে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও অভিনব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা বিরল ও হতাশাব্যঞ্জক হলেও তা বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনভিপ্রেত বা অস্বাভাবিক নয়। ২৯ আগস্ট একটি সংবাদপত্রে ড. কামাল হোসেন, ড. আকবর আলি খান, ড. শাহদীন মালিক, সিএম শফি সামি, ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রমুখ বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা থাকবে না বাংলাদেশের।
সেদিন বিদেশীরা কেন এসেছিলেন ইসি কার্যালয়ে? পত্রিকা মারফত জেনেছি, নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণে তারা নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন শংকা ও দ্বন্দ্ব নিয়ে কথা বলতে এসেছিলেন। একটি টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার আমাকে বলেছিলেন, ইউএনডিপির আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সম্রাট আলেকজান্ডারের মতো আমার অবচেতন মন সে মুহূর্তে বলে উঠেছিল, ‘সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এ দেশ!’ বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত জননেত্রীদ্বয় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুজনে একসঙ্গে চা খেতেও বসতে পারলেন না, আর ‘পলাশীর আম্রকাননে’র সেই বন্ধুদের (!) সঙ্গে নির্বাচন কমিশনারদের কী মহব্বতের আলাপটিই না জমে উঠল!
এ বৈঠকের কথা জেনে আমার মনে খুবই অস্বস্তি জেগে উঠছিল। বড় অপমান বোধ হচ্ছিল। অসহায় লাগছিল। তবু এ যে আমাদের নিয়তি! বড় নিষ্ঠুর নিয়তি। আমাদের হাতে গড়া নিয়তি। আমি সেদিন একটি টিভি আলোচনায় বলেছি, বাহ্যিকভাবে ইসি-বিদেশী কূটনীতিক বৈঠক আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশী হস্তক্ষেপ বলে মনে হলেও এমন একটা ঘটনা আমাদের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিস্ফোরন্মোখ মুহূর্তে অস্বাভাবিক নয়। মনে হয় সে কারণে এম হাফিজউদ্দীন খানসহ অনেকে এ ঘটনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। কেন? আমাদের রাজনৈতিক নেতারা বিশেষত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোনোভাবেই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক দূর করতে সক্ষম হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, এ নিয়ে বিএনপি শংকিত হলেও সরকারের বা আওয়ামী লীগের কোনো মাথাব্যথা নেই। এর আগে বহুবার এটাসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানের জন্য দাতা সংস্থা ও দাতা দেশ থেকে নানা অনুরোধ ও চাপ দেয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ সফর করেছেন। ইইউ ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের অনেক কূটনীতিকও একই সুরে সরকার ও বিরোধী দলকে সব বিতর্ক দূর করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে বলেছেন। কিন্তু সব আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ভেস্তে যেতে দেখে ওই দেশগুলোই শেষ পর্যন্ত বিশ্বফোরাম জাতিসংঘের মহাসচিবকে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে ফোন করেছেন। সম্ভবত কোরীয় বান কি মুনের নম্র-ভদ্র কণ্ঠস্বর বাঙালি নেত্রীদ্বয়ের কর্ণকুহরে বৈশ্বিক অশনিবার্তা পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা ঢাকায় অবস্থানরত তাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে এ কাজে ইসিতে পাঠিয়েছেন। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের জন্য এটাই শেষ সুযোগ। এরপর অনাগত এক আশংকাময়, অভিশপ্ত ভাগ্য হয়তো নেমে আসবে জাতীয় জীবনে।
রাজনীতির দরকষাকষি ও দ্বন্দ্বের বিশ্লেষণ চমৎকারভাবে করা যায় ক্রীড়া তত্ত্বের (গেইম থিওরি) দ্বারা। ক্রীড়া তত্ত্বের ‘চিকেন মডেলে’ সরু রাস্তায় দু’জন কিশোর খেলোয়াড়ের প্রত্যেকেই যদি অবুঝের মতো প্রবল বেগে গাড়ি চালিয়ে সামনে যায়, তাহলে এক সময় উভয়ে মারাÍক দুর্ঘটনায় মারা যায়। এদের একজন যদি রাস্তার পাশে সরে দাঁড়ায়, সে চিকেনে পরিণত হয়। আর যে সোজা গাড়ি চালিয়ে যায়, সে বীরে পরিণত হয়। এ তিন বিকল্পের কোনটা বেছে নেবেন রাজনৈতিক খেলোয়াড়রা? এ এক বিরাট সিদ্ধান্ত, কঠিন পদক্ষেপ! আমাদের দু’নেত্রী উভয়েই বীর হতে চান। তাই তারা রাজনীতির সরল পথে ভীষণ বেগে গাড়ি চালাচ্ছেন। কেউ-ই সরে আসতে চান না। কেউ-ই চিকেন হতে চান না। আমরা চিন্তিত, বিষণœ; দু’নেত্রীর কাউকে আমরা হারাতে চাই না। তবে তাদের কে চিকেন হবেন আর কে বীর হবেন, তা নির্ভর করছে জনগণের ওপর, তাদের ওপর নয়। তাই এখানে ক্রীড়া তত্ত্ব প্রযোজ্য নয়!
সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের। জাতিসংঘ ও কূটনীতিকদের পদক্ষেপ বাংলাদেশকে রাজনীতির ১০ নম্বর মহাসংকেত পৌঁছে দিয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদের আগেই দু’দলের সংলাপ জরুরি, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে ঐকমত্য অপরিহার্য। এ বিষয়ে সংসদে আলোচনা তেমন উপযোগী হবে না। কারণ তা ‘হ্যাঁ বলুন’, ‘না বলুন’ প্রক্রিয়ায় জোড়াতালির সমাধান নিয়ে আসবে, মূল সংকটের গভীরতা আরও বাড়বে। সরকারি দল, বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হল, এমন একটি নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার কাঠামোর প্রস্তাব করা, যা বিএনপিসহ অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কোনো রাজনৈতিক প্রস্তাব না করে অকপটতা ও সততার সঙ্গে গ্রহণযোগ্য রূপরেখা প্রণয়ন করে তিনি জাতিকে সমূহ বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে পারেন।
পরিশেষে আমরা অনুরোধ করব- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী উভয়েই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করুন। জয়-পরাজয় তো ঐতিহাসিক সত্য। তাতে যিনি বীর হিসেবে গৃহীত হবেন, তাকে আমরা অভিবাদন জানাব। আর যিনি চিকেনের আসনে অধিষ্ঠিত হবেন, তাকে ধন্যবাদ জানাব।
মুহাম্মদ রুহুল আমীন : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের রাজনীতি ও জাতিসংঘ by ফরহাদ মজহার

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনীতির ফুটবল খালেদা জিয়ার পায়ের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। এবার বিরোধী নেত্রীর খেলার পালা। কিন্তু বল তিনি ধরতে পারেননি, কিংবা তার কাছে আসেনি, সেটা ফিরতি পদাঘাতে চালান হয়ে গেছে জাতিসংঘে। এই বল ফিরে আসার সম্ভাবনা খুব কম, সেটা বিরোধী নেত্রীর নির্দেশে হয়েছে, নাকি তিনি অন্য কারও খেলার ঘুঁটি হয়েছেন, সেটা বাইরে থেকে আমাদের জানার উপায় নেই। বিএনপির ভবিষ্যৎ বিএনপিই নির্ধারণ করবে, সে ব্যাপারে বলার কিছু নেই। কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশীদেরই নির্ধারণ করতে হবে, তার জন্য পরিস্থিতি আসলে কী দাঁড়াচ্ছে তা বিবেচনার জন্য এ লেখা। কিভাবে শেখ হাসিনা বল চালান করলেন? সেটা তো তিনি বহু আগেই করেছেন। তিনি বারবার পরিষ্কার করে বলছেন, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। বিএনপি তার কথা সিরিয়াসলি নেয়নি। আসলে শেখ হাসিনার দিক থেকে এটা ছিল বিরোধী দলের প্রতি চ্যালেঞ্জ। বলা হল, বিএনপির যদি হিম্মত থাকে তাহলে আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আদায় করুক। তিনি নিজেও খালেদা জিয়ার আমলে আন্দোলন করেই আদায় করেছিলেন। আর আন্দোলন করতে নামলে জেল-জরিমানা, গুলি, টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড আর পিস্তল-কাঁটাবন্দুক-চাপাতি সজ্জিত ছাত্রলীগ ক্যাডাররা আছে। বিএনপি যে চ্যালেঞ্জ বোঝেনি তা নয়, তারা রাস্তা ছেড়ে ঘরে ঢুকে গেছে। জিত হয়েছে শেখ হাসিনার। খালেদা জিয়াকে বোঝানো হয়েছে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। একটা সমঝোতা হবেই। আর নির্বাচন হলে তো বিএনপিই জিতবে। অতএব চিন্তার কী আছে। ইজ্জত বাঁচিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা যায় এমন একটা আপস ফর্মুলা কূটনৈতিক মহলই বের করে দেবে। বিএনপি রাস্তা থেকে ঘরে এবং ঘর থেকে ঢাকার কূটনৈতিক মহলে এবং এখন জাতিসংঘের বান কি মুনের কাছে ধরনা দিচ্ছে। এ মাসের মাঝামাঝি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন। সেখানে সরকারি প্রতিনিধি তো থাকবেই, তারপরও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দু’জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করার কথা। এই সুযোগে জাতিসংঘ চাইবে বাংলাদেশকে সংঘাত-সংকুল দেশ হিসেবে প্রমাণ করা, যে দেশ নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করতে পারে না; শুধু নিজের অস্তিত্বের জন্য বাংলাদেশ বিপন্ন নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও বাংলাদেশ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার কূটনৈতিক মহল ও জাতিসংঘ এই সিদ্ধান্তই এখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করবে। হুশিয়ার না থাকলে জাতিসংঘে দেনদরবার এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকতে পারে যাতে বাংলাদেশ যতটুকু সার্বভৌমত্ব আছে তাও হারিয়ে জাতিসংঘের অধীনস্থতা মানতে বাধ্য হয়। স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে পরাশক্তির পরাধীনতা মেনে নেয়। আর, জাতিসংঘ যদি রাজি থাকে, পরাশক্তির শাসন নিজ দেশের সেনাবাহিনী দিয়েও কায়েম হতে পারে। আশা করি রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের সে জায়গায় নেবে না। কিন্তু ভরসা রাখতে পারছি না। বাংলাদেশের জনগণ যদি দ্রুত সচেতন না হয়ে ওঠে, তাহলে বিপদ খুব দ্রুতবেগেই ধেয়ে আসবে।
বিপদই বটে। কোনো মীমাংসার আলো ছাড়া নির্বাচন কমিশনও সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছে। সংসদ আগে ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার দিন থেকে পরের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার কথা। কিন্তু নির্বাচন কমিশন জানে, শেখ হাসিনা সংসদ ভেঙে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করবেন না, তিনি পূর্ণ মেয়াদেই ক্ষমতায় থাকবেন। শেখ হাসিনা কোনো অবস্থাতেই ছাড় দেবেন না। নির্বাচন কমিশন সেভাবেই অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে আসছে। তবে সংবাদপত্রের খবর হিসেবে তা চাউর হয়েছে সম্প্রতি। আর, ইতিমধ্যে শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হবে। বোঝা যাচ্ছে, শেখ হাসিনার কথা অনুযায়ী যা হওয়ার হয়েছে, তার কথা অনুযায়ী যা হওয়ার নির্বাচনেও তাই হবে। নির্বাচন করতে চাইলে বিরোধী দলকে এখন প্রধানমন্ত্রীর ছক মেনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে, অথবা আন্দোলনে যেতে হবে। কিন্তু বিএনপি আন্দোলনে যাবে না, যদি যেত এতদিনে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। আন্দোলনে যাবে না বলে বিএনপি জাতিসংঘে গেছে। প্রথম আলো তিন কলামে সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে ঠিকই লিখেছে, ‘বিএনপির দৃষ্টি এখন জাতিসংঘের দিকে’। তারা বলছে, ‘সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে হলেও সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিতে চায়।’ এটা বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই। আওয়ামী লীগ কোনো ছাড় না দিলেও বিএনপির মধ্যে একটি বড় অংশ বসে আছে যারা খালেদা জিয়াকে ত্যাগ করে হলেও নির্বাচনে যেতে চাইবে। তখন ঢাকার কূটনৈতিক মহল ও জাতিসংঘ বলবে, আমরা ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করব। করবেনও, যাতে শেখ হাসিনা জিতে আসেন এবং বিরোধী দল এখনকার চেয়ে কিছু বেশি আসন সংসদে পেলেও পেতে পারে। এ রকম একটি সম্ভাবনা মাথায় রেখে খালেদা জিয়া কী সিদ্ধান্ত নেবেন সেটা এ মুহূর্তে বোঝা মুশকিল। তবে এক-এগারোর সেনা সমর্থিত সরকারের অধীন নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তার ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তিনি এখন জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ক্ষমতায় আসার যে চেষ্টা করছেন, সেটা তার জন্য বুমেরাং হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্যও।
কিন্তু বিএনপি একটি নির্বাচনী দল। শেখ হাসিনা কোনো আপস না করলে নির্বাচনে যাওয়া বিরোধী দলের জন্য অমর্যাদাকর। অন্যদিকে আন্দোলন করে শেখ হাসিনার কাছ থেকে দাবি আদায় করার শক্তি বিএনপির নেই। সেটা চাইলে ইসলামপন্থীদের সঙ্গে আঁতাত আরও আদর্শগত জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। কিভাবে সেটা বিএনপির রাজনীতি বিসর্জন না দিয়ে করা সম্ভব, বিএনপি তা জানে না। ফলে বিএনপি ইসলামপন্থীদের কাছ থেকে দূরে থাকাই উত্তম বলে গণ্য করছে। এতে হেফাজতের উত্থানে ভীত ঢাকার কূটনৈতিক মহলকে বিএনপি কিছুটা আশ্বস্ত করতে পারবে। বিএনপি ধরে নিয়েছে ইসলামপন্থীরা তাদেরই ভোট দেবে। সেটা অসম্ভব নয়। যে কারণে বিএনপি ভাবছে, যে কোনোভাবে চূড়ান্ত ছাড় দিয়ে হলেও একটা সমঝোতা হোক। যেন বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে।
শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেই বিএনপি নির্বাচনে যেতে পারে
কোনো সংঘাত ও সংঘর্ষ ছাড়া বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা অটুট রেখে নির্বাচন হোক- এটা সুশীলদেরও রাজনীতি। কূটনৈতিক তৎপরতা ও জাতিসংঘের উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশে সুশীল সমাজ নামে যারা পরিচিত, তারা যুক্ত থাকবে এটা আন্দাজ করা যায়। কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারাও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চান, যেন কোন হৈ-হাঙ্গামা না হয় বিশেষত জামায়াতি, হেফাজতি, ইসলামপন্থী কিংবা কোনো ‘অশুভ’ শক্তি তাদের সাজানো বাগান যেন নাস্তানাবুদ করে না দেয়।
সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে মীমাংসার নানান ছক ও ফর্মুলা পেশ করা হচ্ছে। প্রতিভাবান প্রত্যেকেই নিজ নিজ প্রতিভা প্রমাণের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। মন্দ না। শেখ হাসিনা বলে দিয়েছেন, তিনি একচুলও নড়ছেন না। এ পরিস্থিতিতে সুশীল সমাজের কাজ হচ্ছে বিএনপিকে যেভাবেই হোক শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ছকের মধ্যে ধরে রাখা। নির্বাচন না হলে সংঘাত ও রক্তপাতের আশংকা অমূলক নয়, শাহদীন মালিক তার কলাম ‘ইদানীং রাজনীতি’তে তার উৎকণ্ঠা ব্যক্ত করেছেন সিরিয়ার বর্তমান গৃহযুদ্ধের অবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভেবে। বলেছেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে ঢাকা থেকে দামেস্কের দূরত্ব হয়তো অনেক বেশি। আমার কাছে অনেক কম। আর সময় তার থেকেও কম।’ তিনি শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে নতুন নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবও দিয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী প্রতি নয়জন নির্বাচিত মন্ত্রীর জন্য একজন অনির্বাচিত ব্যক্তি মন্ত্রী হতে পারেন। এই বিধানটির সুবিধা শাহদীন মালিক নিতে চান। সেটা হবে এ রকম যে, আঠারো জনের নির্বাচিত মন্ত্রিসভার সঙ্গে দু’জন অনির্বাচিত মন্ত্রী থাকবেন। তাদের হাতে থাকবে স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। নির্বাহী ক্ষমতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। আর সেই দু’জন হবেন বিএনপিরও আস্থাভাজন। এই দুই মন্ত্রীকে দলীয় মন্ত্রিসভার নাগালের বাইরে রাখা হবে আর সংসদ ভেঙে দেয়া হবে। তাহলে ‘জোড়াতালির অথচ মোটামুটি গ্রহণযোগ্য’ একটা ব্যবস্থা দাঁড় করানো যায়, সে প্রস্তাব তিনি পেশ করেছেন। (দেখুন ‘নির্বাচন নিয়ে জটিলতা কি বাড়ল?’ ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩)। তাই বলছিলাম, নানান ফর্মুলা পেশের চেষ্টা এখনও চলছে। বাকি আল্লাহ ভরসা।
প্রবীণ সাংবাদিক দুই নেত্রীর ‘চুলোচুলি’তে খুবই শরমিন্দা হয়েছেন। আসলেই। কিন্তু তার ভয়, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করে ফেলতে পারেন। এমনকি পঞ্চদশ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা গ্রহণ না করা পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকেও যেতে পারেন। ‘বেগতিক’ দেখলে শেখ হাসিনা সংবিধানে নতুন সংযোজিত এ ধারার ‘কৌশলী’ ব্যবহার করতে পারেন। এবিএম মূসা এতে সঙ্গত কারণেই উদ্বিগ্ন। আর এটা যে সম্ভব, আইনবিদ শাহদীন মালিক তার লেখায় ধরিয়েও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংবিধানে জাতীয় সংসদের মেয়াদের কথা আছে, কিন্তু সরকারের মেয়াদ নিয়ে কোথাও কিছু বলা নেই। অর্থাৎ সংসদ ভেঙে দিলেও শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। সেটা তিনি আসলেই পারবেন কি-না সেটা রাজনৈতিক প্রশ্ন, সাংবিধানিক নয়। অর্থাৎ তার ক্ষমতায় থাকাটা অসাংবিধানিক হবে না। তবে সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক এবিএম মূসার সরল প্রস্তাব হচ্ছে, শেখ হাসিনা যদি পঞ্চদশ সংশোধনী আনতে পারেন, তাহলে ‘ষোড়শ’ সংশোধনী আনতে পারবেন না কেন? নিশ্চয়ই পারবেন, কিন্তু তিনি তো একচুলও নড়বেন না। মুশকিল তো আসলেই এখানে। (দেখুন ‘পঞ্চদশ হলে ষোড়শ নয় কেন?’ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৩)।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকট সুশীল সমাজ কিভাবে দেখে, সেটা বোঝার জন্য সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের ‘বিএনপির বিকল্প ও মির্জার সঙ্গে এক ঘণ্টা’ লেখাটি খুবই কাজের হতে পারে। লেখাটি পড়ে আমি খুবই আনন্দবোধ করেছি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের কারণ সম্পর্কে মিজানের বিশ্লেষণ হচ্ছে ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা’র সমস্যা। শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা করেন না, খালেদা জিয়াও মুজিব কন্যাকে ইজ্জত করেন না। অতএব আমরা এখন যে সংকট দেখছি সেই সংকট সৃষ্টি হতোই। ‘আমরা দীর্ঘদিন থেকে বলে আসছি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলুপ্ত না করলেও চলমান রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতো,’ পঞ্চদশ সংশোধনী শুধু বাড়তি ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর কারণ প্রধান দুই দল এখনও পর্যন্ত পারস্পরিক ন্যূনতম শ্রদ্ধা দেখানোর জায়গা থেকে দূরে সরে আছে। তারা পরস্পরকে ইজ্জত করলেই এখনকার রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয়ে যায়। জনাব খান মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রথম আলো একথা ‘দীর্ঘদিন ধরে’ বলে আসছে। এবিএম মূসা ও শাহদীন মালিকের বক্তব্য তাদের ব্যক্তিগত। কিন্তু মিজানুর রহমান খান প্রথম আলোর নিজস্ব সাংবাদিক। তিনি তাদের নীতির জায়গা থেকেই লিখে থাকেন। তার বক্তব্যকে এ কারণেই আমি গুরুত্ব দিচ্ছি। গুরুত্ব দেয়া উচিতও বটে।
জনাব খানের প্রায় লেখাতেই বিএনপির বিরুদ্ধে নিন্দা ও বিষোদগার থাকে। এক্ষেত্রে প্রথম আলোর প্রধান অভিযোগ হচ্ছে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও ইসলামপন্থীদের সম্পর্ক। বিএনপি সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও ইসলামী জঙ্গিবাদের প্রশ্রয়দাতা ইত্যাদি। প্রথম আলোর নীতি-নির্ধারণী জায়গা গোঁড়া আওয়ামী লীগ ও দিল্লির আঞ্চলিক রাজনীতির সমর্থকদের দখলে। এই প্রথম খেয়াল করলাম বিএনপিকে আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীদের ‘জঙ্গিবাদের কারখানা’, ‘দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ’ লালন করা পার্টি ইত্যাদি গালির জন্য আপত্তি করা হচ্ছে। হঠাৎ প্রথম আলোর হুঁশ হয়েছে সরকারি দলের এই গালাগালি হচ্ছে, ‘একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার আÍঘাতী প্রবণতা।’ অথচ এ মহৎ কাজটি প্রথম আলো দীর্ঘদিন ধরেই নিয়মিত করে আসছে। লেখাটির গুরুত্ব এদিক থেকেও। বিএনপির প্রতি অতিরিক্ত দরদটা সহজেই চোখে পড়ার মতো। ‘কথাটা পরিষ্কার করা উচিত যে, যখন যখন দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিকের সমর্থিত বিরোধী দলকে পাইকারিভাবে অভিযুক্ত করা হবে, তখন জাতি হিসেবে আমরা খাটো হব।’ এ সুবুদ্ধির উদয়ে আমোদিত হওয়া উচিত। এরপরই অবশ্য বলা হয়েছে, পাইকারিভাবে অভিযুক্ত করার অপরাধ বিএনপিও করেছে। কিভাবে? ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের কুৎসা রটিয়েছে বিএনপি। ভারতের প্রতি আওয়ামী লীগের নীতির সমালোচনা করা যাবে না। সেটা কিন্তু ‘কুৎসা’।
কিন্তু বিএনপির প্রতি সুশীল রাজনীতির মূল প্রস্তাব অন্যত্র। সেটা পরিষ্কারভাবেই বলা হয়েছে, ‘বিএনপির উচিত শেখ হাসিনার অধীনেও নির্বাচনে যাওয়ার বিকল্প খুলে রাখা।’ বিএনপি বা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কী করবেন সেটা আমরা জানি না, কিন্তু বিএনপি সুশীল সমাজের হাত ধরার দরকারে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে পারে। সে সম্ভাবনা পুরো মাত্রাই বর্তমান। মির্জা জনাব খানকে এই ধারণাই দিয়েছেন যে, বিদ্যমান ‘সংবিধানের মধ্যে নির্দলীয় সরকার পেলেও তাদের চলে’। এ ইঙ্গিতও দেয়া হয়েছে যে, গওহর রিজভী ও শমসের মবিন খানের গোপন মিটিং আবার সচল করলে বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। বেশ।
বর্তমান নির্বাচনী সংকটের পরিস্থিতিতে সুশীল সমাজ ও নির্বাচনী রাজনীতির সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা আমরা পেলাম। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে পারে বিএনপি, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এই সুযোগে গণমানুষের রাজনীতি আর সুশীল রাজনীতির মধ্যে মোটা দাগের পার্থক্য সম্পর্কে দু’-একটি কথা বলে শেষ করি।
গণমানুষের রাজনীতি বনাম সুশীল রাজনীতি সুশীল বা ভদ্রলোকের সমাজ আর তাদের রাজনীতি শ্রেণী ও মতাদর্শের দিক থেকে পর্যালোচনা করা দরকার। এ কাজটি হয়নি। কিছু চেনা গণমাধ্যম, বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তির সমালোচনার সস্তা রাজনীতি আমরা পরিহার করতে চাই। কারণ বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পর্যালোচনা ছাড়া ব্যক্তি নিন্দা ও বিমূর্তভাবে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে কোনো রণনৈতিক ও রণকৌশলগত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে না। আপাতত বলে রাখা যায়, ইংরেজিতে যাকে নিউ লিবারেলিজম বলা হয়, তারই বাংলাদেশীয় সংস্করণ হিসেবে আমরা সুশীলতাকে ব্যাখ্যা করতে পারি। লিবারেলরা গণতন্ত্রের কথা বলে, ব্যক্তির অধিকার, মানবতা ইত্যাদি মধুর সব কথাই তারা বলে, কিন্তু গণতন্ত্র বা গণমানুষের রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে হলে বিদ্যমান গণবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে পাল্টা গণশক্তির বা জনগণের বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে, সেটা তারা স্বীকার করে না। অর্থাৎ গণবিরোধী রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বিকল্প নেই এটা তারা মানে না; তারা দাবি করে, তাদের বেঁধে দেয়া নিয়ম মেনে, জনগণের অধিকার হরণকারী দুশমনদের তৈরি সাংবিধানিক বা আইনি ব্যবস্থার মধ্যে দেন-দরবার করে নাগরিক ও মানবিক অধিকার আদায় করা সম্ভব। সোজা কথায়, বিদ্যমান গণবিরোধী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম রেখে, ওর খাপের মধ্যে বন্দি থেকেই নাগরিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়। এর চেয়ে অবাস্তব, অনৈতিহাসিক আর মিথ্যাচার আর কী হতে পারে। সুশীল রাজনীতির সঙ্গে গণমানুষের এক নম্বর বিরোধ এখানে।
দ্বিতীয় স্তরের বিরোধ আদর্শিক বা দার্শনিক। এ স্তরের বিরোধ সবচেয়ে প্রকট ধর্মের প্রশ্নে। সুশীল সমাজের রাজনীতির মূল কথা হচ্ছে, ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার। ধর্ম সম্পর্কে সুশীল সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাশ্চাত্য ইতিহাস ও চিন্তার দ্বারা অন্ধ। ফলে অধিকাংশ সময় তাদের ধর্মের বিরোধিতা ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ বা ঘৃণায় পর্যবসিত হয়। ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে ধর্মের যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা দার্শনিক মোকাবেলার প্রয়োজন রয়েছে, সুশীল রাজনীতি তা মনে করে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের এ কালে এই মোকাবেলা কঠিন হয়ে পড়েছে। সুশীল রাজনীতি পরাশক্তির সূত্র মেনে মনে করে, ইসলামপন্থীদের নির্দয়ভাবে দমন করাই বাংলাদেশকে ‘সুশীল’ সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিণত করার একমাত্র পথ। অথচ গণমানুষের রাজনীতির কাছে ধর্ম আপদ হতে পারে না, বরং সম্পদ। সাম্রাজ্যবাদ এবং বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপান্তরের ক্ষেত্রে ধর্ম কী ভূমিকা গ্রহণ করে, তার দ্বারাই ধর্মের রাজনৈতিক ভূমিকার বিচার হতে পারে। ধর্ম মাত্রই পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল- এই অবস্থানের পক্ষে কোনো শক্ত দার্শনিক যুক্তি নেই। কারণ তা নির্ভর করছে কিভাবে মানুষ ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বের ব্যাখা করে তার ওপর।
শুধু ধর্ম নয়, এ স্তরের বিরোধ আরও গভীরে। সুশীল সমাজের ‘গণতন্ত্র’ ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করে, ফলে তা অচিরেই ব্যক্তিতান্ত্রিকতা বা ব্যক্তিপূজায় পর্যবসিত হয়। সমাজের মধ্যে কিংবা সমাজের জন্য ব্যক্তি নয়, বরং সমাজের স্বার্থ বলি দিতে হয় ব্যক্তির স্বার্থে। ব্যক্তিই সার্বভৌম ও একমাত্র সত্য হয়ে ওঠে। সুশীল সমাজে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারকে ব্যক্তিস্বাধীনতা হিসেবে প্রশ্রয় দেয়া হয়। ফলে শুধু সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা নয়, ব্যক্তির বিকাশও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অন্যদিকে আবার সমাজ বা সমষ্টির বিমূর্ত স্বার্থের কথা বলে ব্যক্তির ওপর জোর খাটালে সেই সমাজও টেকে না। ব্যক্তির নিজের বিকাশ ও আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে তাকে উপলব্ধি করতে হয় যে মানুষ সমাজের মধ্যেই বাস করে, সমাজের বাইরে নয়। এ উপলব্ধি হলেই ব্যক্তি বুঝতে পারে, সমাজ বা সমষ্টির স্বার্থের মধ্যেই তার নিজের স্বার্থ নিহিত। এই উপলব্ধি ছাড়া ব্যক্তি সামাজিক হয়ে ওঠে না, কিংবা সমাজও ব্যক্তির স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। এতে সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়। গণশক্তি ব্যক্তির অঙ্গীকার, শক্তি ও অনেকের সঙ্গে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই গণশক্তি হয়ে ওঠে। শুরু থেকেই ব্যক্তি ও সমষ্টির সম্পর্ক চর্চার মধ্য দিয়ে গণশক্তির বিকাশ ঘটে, নইলে নয়। ব্যক্তির ইচ্ছা ও অভিপ্রায় গণশক্তির ভিত্তি। কিন্তু এই রাজনৈতিক কর্তাশক্তি জনগণের সামষ্টিক শক্তি দিয়েই পরিগঠিত হয়। এখানেই গণশক্তির রাজনীতির সঙ্গে সুশীল রাজনীতির মৌলিক আদর্শিক বা দার্শনিক ফারাক। বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির পথ হচ্ছে গণশক্তির বিকাশের পথ, বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা নয়। তাকে বদলে দেয়া, তার রূপান্তর ঘটিয়ে গণশক্তিকে রাষ্ট্রশক্তিতে রূপান্তরই এখনকার কাজ।
সুশীল সমাজের রাজনীতি আওয়ামী লীগকে মাঝেমধ্যে সমালোচনা করে, কিন্তু মোটা দাগে এ রাজনীতি আওয়ামীপন্থী। তারপরও আওয়ামী লীগ ও তার অধীনে জোটভুক্ত দলগুলোর তারা সমালোচনা করে, যেন সুশীলতার মানদণ্ডের বাইরে তারা চলে না যায়। তারা চায় বিএনপিও ইসলামপন্থীদের ছেড়ে দিক, ‘সুশীল’ হয়ে উঠুক এবং তাদের সমর্থনে একটা প্রতিযোগিতামূলক সুশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলুক। বলা বাহুল্য, সুশীল রাজনীতি আÍপরিচয়ের দিক থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বৃত্তের মধ্যেই বাস করে। যদিও জাতীয়তাবাদী উগ্রতায় ব্যথিত হয়ে তারা পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার পক্ষে নির্বিচার ওকালতি করে, কিন্তু তাদের সমস্যার সমাধান করে না। পাহাড়িদের সমস্যা জমি এবং তাদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের নিঃশর্ত পক্ষাবলম্বন। কিন্তু যে রাষ্ট্র তার কোনো নাগরিকেরই অধিকার রক্ষা করে না, বরং হরণ করে সে রাষ্ট্র কিভাবে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও তাদের অন্তর্গত বাংলাদেশের নাগরিকদের রক্ষা করবে? বাংলাদেশে গণমানুষের রাজনীতির বিকাশের অর্থ হচ্ছে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের লড়াইয়ে শামিল করে নেয়া। বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে সমতল বা পাহাড়ের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সমস্যার কোনো সমাধান নেই।
আর্থ-সামাজিক দিক থেকে সুশীল সমাজ আর গণমানুষের পার্থক্য হচ্ছে প্রকট শ্রেণীভেদ। সুশীল সমাজ মূলত ধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী দিয়ে পরিগঠিত। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন ও বিদ্যমান অবাধ বাজারব্যবস্থার তারা সুবিধাভোগী। এর বিপরীতে রয়েছে নিুবিত্ত মানুষ, শ্রমিক, কৃষক ও খেটে খাওয়া জনগণ। যারা এ ব্যবস্থায় শোষিত ও নির্যাতিত। সুশীল সমাজের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও মতাদর্শিকভাবে তারা দুর্বল। সাধারণত সমাজ ও ইতিহাস সচেতন বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীরা জনগণকে সংগঠিত করে, শত্র“-মিত্র চেনায় এবং বর্তমানের রাজনৈতিক কর্তব্য বুঝিয়ে দেয়। সমাজ একটা বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্তাসত্তার আবির্ভাবও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। ফলে গণমানুষের রাজনীতির বিকাশ অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং জাতীয় রাজনীতিতে সুশীল ছকে ঘুরপাক খেতে থাকে।
এ পরিস্থিতিতে সুশীল রাজনীতির ছক থেকে বেরিয়ে আসা সহজ কাজ নয়। সুশীল রাজনীতির মোকাবেলা করতে হলে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে গণমানুষের রাজনীতির মতাদর্শিক বয়ান কী হবে? যে বয়ানের মধ্যে অবশ্যই ধর্মের ভূমিকা থাকবে। একই সঙ্গে মানবেতিহাসে ইউরোপীয় অর্জনকেও অস্বীকার করার প্রয়োজন পড়বে না। এ সত্য এখন স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের জনগণের কাছে ইসলাম গত কয়েক দশকে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেভাবে হাজির হয়েছে, তাকে আর উপেক্ষা করার জো নেই।
আগেই বলেছি সুশীল সমাজের রাজনীতির বিরুদ্ধে গণমানুষের রাজনীতির বয়ান দুর্বল। কিন্তু নিপীড়িত, নির্যাতিত মজলুম জনগণ ইসলামের ঝাণ্ডা নিয়ে হাজির হলে তাতে আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। ইসলামের যে বয়ান নিয়ে জনগণ সুশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, তার দুর্বলতার জন্য সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা দায়ী, জনগণ নয়। কিন্তু জনগণ যখন তাদের সংঘবদ্ধ শক্তির কিছু নমুনা দেখায়, সুশীল সমাজ তাতে আতংকিত হয়ে ওঠে।
গণমানুষের রাজনীতি যারা করেন ও করবেন, তাদের কাজ হচ্ছে নির্ভয়ে কান পাতা ও সাধারণ মানুষের কথা সাধারণ মানুষের ভাষায় ও বয়ানে শোনা এবং বোঝার ক্ষমতা অর্জন করা। একে আক্ষরিকভাবে বুঝলে চলবে না। গণমানুষের ঐতিহাসিক ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা ও সংকল্প বোঝা এবং ঠিক নিশানা দেখিয়ে দেয়ার ওপর নির্ভর করছে আমরা আগামী দিনে কোন দিকে যাব।
আমি সব সময়ই আশাবাদী। কারণ আমি সাধারণ মানুষের শক্তি ও ক্ষমতার ওপর নির্ভর করি। বিশেষত যখন জানি, সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ক্ষমতা সাধারণ মানুষের অসাধারণ। রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপান্তর আর যাই হোক ডিনার পার্টি হবে না, এটা নিশ্চিত।
গণশক্তির জয় হোক।

‘বিচারের নামে হেরা তামাশা করলো’

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত ফেলানী হত্যা মামলার রায়ে অভিযুক্ত বিএসএফ হাবিলদার অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

সাকার রায়ের জন্য বিশেষ আগ্রহ by মেহেদী হাসান পিয়াস

একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ অপেক্ষমাণ রয়েছে সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার রায়।

সুমি কেন আসামি? by মবিনুল ইসলাম

পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের পরির্দশক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান জোড়া খুনের আসামি হিসাবে নিহত দম্পতির মেয়ে ঐশীর সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া বাসার গৃহকর্মী খাদিজা খাতুন সুমিকে আসামি হিসাবে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেওয়া নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে লেখালেখি ও আলোচনা চলছে।

স্কুল শিক্ষক পান্নার পর এবার সরকারী মহিলা কলেজের এক অধ্যাপকের সাথে ছাত্রীর অনৈতিক সর্ম্পকের ঘটনা নিয়ে কুষ্টিয়ায় তোলপাড় by শামসুল আলম স্বপন

কুষ্টিয়াসহ দেশব্যাপী বহুল আলোচিত সেই লম্পট শিক্ষক হেলাল উদ্দিন পান্নার যৌন কেলেংকারীর ঘটনার রেষ কাটতে না কাটতেই এবার নিজ প্রতিষ্ঠানেরই এক ছাত্রীর সাথে া সরকারী মহিলা কলেজের এক শিক্ষকের অনৈতিক সর্ম্পকের ঘটনা নিয়ে কুষ্টিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে।

তারকাদের আলোচিত সেক্স স্ক্যান্ডাল

তারকাদের জীবনে স্ক্যান্ডাল কখনো আশীর্বাদ, কখনো অভিশাপরূপে আসে। শুধু সেক্স স্ক্যান্ডাল দিয়ে রাতারাতি বড় তারকা বনে গেছেন হলিউডের কিম কার্দেশিয়ানের মতো আরো অনেক তারকা।

সহবাসের পর

সহবাসের পরে দু’জনেরই উচিত কমপক্ষে এক পোয়া গরম দুধ, একরতি কেশন ও দুইতোলা মিশ্রি সংযোগে সেবন করা। সহবাসে কিছু শক্তির হ্রাস হ’তে পারে।

সেক্সের উত্তম স্থান ট্যাক্সি ক্যাব!

প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক ভারতীয় পুরুষ প্রতি ৬ সেকেণ্ডে একবার সেক্সের কথা ভাবেন। তবে বেশিরভাগ ভারতীয় পুরুষ আছেন যারা সপ্তাহে একবারও তার স্ত্রী বা পার্টনারের সঙ্গে সেক্স করেন না।

ফের নগ্ন হবে কিম

কিম কার্ডাশিয়ান সম্প্রতি জানিয়েছেন, তিনি প্লেবয় ম্যাগাজিনের জন্য বিবসনা হয়ে ফটো শুট করতে চান।

যৌন পরীক্ষায় পাশ

নাবালিকাকে যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত আশারাম বাপুর ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিল জোধপুরের এক আদালত।

সুসময়ে দীপিকা

বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানের বিপরীতে ‘ওম শান্তি ওম’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বলিউডে অভিষেক হয়েছিল দীপিকা পাড়ুকোনের।

সুবিচারে রাষ্ট্রকেই পদক্ষেপ নিতে হবে

সীমান্তে কিশোরী ফেলানী হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া একমাত্র অভিযুক্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্য অমিয় ঘোষের  ‘সুবিচারে’ রাষ্ট্রকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রাণে বাঁচলেন মিসরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মিসরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইব্রাহিমের গাড়িবহর লক্ষ্য করে গাড়িবোমা হামলা চালানো হয়েছে। তবে সৌভাগ্যক্রমে এ হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে গেছেন তিনি। দেশটির নিরাপত্তা কর্মীরা এ খবর নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইব্রাহিম হত্যার চেষ্টায় চালানো এ হামলায় কমপক্ষে চারজন আহত হয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আল আহরাম এবং মেনার খবরে বলা হয়েছে, নাসর সিটি জেলার মোস্তাফা আল নাহাস সড়কে মন্ত্রী নিজ বাসভবন থেকে মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার পথে তার গাড়ি বহর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে এ হামলা চালানো হয়। এদিকে, মিসরের পুলিশ দাবি করেছে যে, তারা দু’জন বোমা হামলাকারীকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইব্রাহিম সাংবাদিকদের বলেন, তাকে সন্ত্রাসীদের হত্যা পরিকল্পনা নস্যাৎ করা হয়েছে। এজন্য নিরাপত্তা কর্মীদেরদের প্রশংসা করেন। তথ্যসূত্র : বিবিসি।

প্রধানমন্ত্রিত্ব নয় চাই মুখ্যমন্ত্রীত্ব : মোদি

বিজেপি মোদিতে আস্থা রেখেছে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির পক্ষে গুজরাটের মায়া কাটিয়ে ওঠা বুঝি মুশকিল হয়ে উঠেছে। একথা বলছেন খোদ মোদিই। বৃহস্পতিবার শিক্ষক দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০১৭ পর্যন্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীই হয়ে থাকতে চান মোদি। অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় প্রশ্ন ওঠে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এভাবেই ছাত্রদের মাঝে আসবেন কিনা? মোদির জবাব, আমাকে ২০১৭ পর্যন্ত আপনাদের কাজ করে যেতে হবে, আমি সেটাই করছি। গুজরাটের মানুষের রায় অনুযায়ী তাদের মুখ্যমন্ত্রীর মেয়াদ পূরণ করাকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন মোদি। এদিন গান্ধীনগরের অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন,
‘আমার কেউ হওয়ার স্বপ্ন নেই, কিন্তু কিছু করার ইচ্ছে আছে।’ শুনতে ভালো। কিন্তু মোদির এই মন্তব্যের অন্য মানে বের করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তিনি যে আর ‘পিএম ওয়েটিং’ হয়ে থাকতে চান না তেমনটাই বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন গুজরাট মুখ্যমন্ত্রী। চাপ বাড়ানোর চেষ্টা বিজেপিতে, শিগগিরই তার নাম প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হোক।এদিন ছাত্রদের বেশকিছু কঠিন প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হয় মোদিকে। রেগে গেলে চাপ কমাতে ঠিক কী করেন মুখ্যমন্ত্রী? জবাবে মোদি জানান, ‘আমিও মানুষ। মানুষের স্বাভাবিক খামতির সবকটাই আমার মধ্যে আছে। আমার মনে হয় চাইলেই রাগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শুধু সেই মুহূর্তটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, অন্যের ওপর রাগ দেখানো মানে তুমি হেরে যাচ্ছ। যত তোমার ধৈর্য বাড়বে, তত রাগ কমবে। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

হাসনাতকে মি. ওয়ান্ডারফুল ডাকতেন ডায়ানা

পাকিস্তানি প্রেমিক চিকিৎসক হাসনাত খানের মোহে প্রেমান্ধ ছিলেন বিশ্বনন্দিত ব্রিটিশ রাজবধূ প্রিন্সেস ডায়ানা। এক সময়ের বহুল আলোচিত এ গোপন প্রেম কাহিনীটি যেমন কারও অজানা নয়, তেমনি চমকের যেন শেষ নেই। সম্প্রতি আরও নতুন নতুন তথ্য ডানা মেলছেÑ বিশ্ব পুরুষের স্বপ্নকন্যা ছিলেন যে নারী তিনিই নাকি তার ভিনদেশী প্রেমিকপুরুষ হাসনাতের গুণমুগ্ধতায় তাকে ‘মি. ওয়ান্ডারফুল বয়’ ডাকতেন। ডায়ানা ও হার্ট সার্জন হাসনাত খানের গোপন প্রেমকাহিনী নিয়ে ২০০১ সালে রচিত কেট লের ‘ডায়ানা : হার লাস্ট লাভ’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ডায়ানা চলচ্চিত্রে এমনটাই দেখানো হয়েছে। এবার সেই বই অবলম্বনে ডায়ানার মৃত্যুর ১৭ বছর পর নির্মিত হল বহুল আলোচিত ‘ডায়ানা’ চলচ্চিত্রটি । ব্রিটিশ রাজপরিবারের বধূ প্রিন্সেস ডায়ানা (প্রিন্স চার্লস যাকে বলতেন ‘নিষ্কণ্টক গোলাপ’) ১৯৯৭ সালে ৩১ আগস্ট প্যারিসে একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় যবনিকাপাত ঘটে এই রাজবধূর। গল্প এখানেই শেষ নয়।
তার মৃত্যুর বেশ ক’টা বছর পর জানা যায় হার্ট সার্জন হাসনাত খানের সঙ্গে তার গোপন প্রণয়ের কথা। ভালোবেসে গভীর আকাক্সক্ষায় ডায়ানা জনাব খানকে ডাকতেন ‘মি. ওয়ান্ডারফুল’ বলে। ডায়ানার বন্ধুরা জানায়, ডায়ানা তার ‘মি. ওয়ান্ডারফুল’কে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুই বছরের এই প্রেমের বন্ধন ডায়ানার মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগেই ভেঙে যায়। ধারণা করা হয়ে থাকে, ডায়ানা দোদি আল ফায়েদের সঙ্গে জুটি বেঁধেছিলেন কেবল জনাব খানকে ঈর্ষান্বিত করার উদ্দেশ্যে। প্যারিসে সড়ক দুর্ঘটনার সময় এই ফায়েদই ছিলেন ডায়ানার সঙ্গে। অন্যদিকে ৫৪ বছর বয়সী জনাব খান প্রতিজ্ঞা করেছেন তিনি এই ছবিটি কখনও দেখবেন না। তার অভিযোগ, ছবিটির দৃশ্যপটসমূহ ‘সম্পূর্ণরূপে ভুল’ এবং ‘নিদারুণ মিথ্যা’ কাহিনীর ভিত্তিতে নির্মিত। ডেইলি মেইল।