Friday, February 26, 2016

ভিন্নমত মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ নয়

বৃহস্পতিবার দু’ ঘন্টা ধরে চলছিল বিক্ষোভ। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ঢল যেন থামছিলই না। তারা দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) ও ভারতের আরও ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রতিবাদকারীদের হাতে হাতে লাল গোলাপ আর জাফরন। সঙ্গে গর্জে উঠছে গলা, তবে ধীরলয়ে, বলিষ্ঠ কণ্ঠে। মিছিল থেকে শ্লোগান উঠছে স্বাধীনতা, সমতা আর স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকারের দাবিতে। অনেকের হাতে প্ল্যাকার্ড। একটিতে লেখা: ‘ভিন্নমত মানেই রাষ্ট্রদ্রোহ নয়’।
কিন্তু, বিজেপি’র বিষমাখা মিথ্যা আর সহিংস ছদ্ম-জাতীয়তাবাদী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এই ফুল আর আশার বাণী বড্ড অপর্যাপ্ত। জাতপ্রথা, লিঙ্গভিত্তিক হাউজিং নিতিমালা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে বিজেপি-পন্থীদের নিয়োগ, ইত্যাদি নিয়ে শিক্ষার্থীরা দিনকে দিন কেবল সোচ্চার হয়েছে। বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) হর্তাকর্তারা সংলাপের পন্থা অবলম্বন করেননি। বরং নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছেন। সমঝোতার পথে আসেন নি, দমনপীড়নকে হাতিয়ার করেছেন।
১৩ই ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে গ্রেপ্তার হন জেএনইউ ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কানাইয়া কুমার। অবহেলিত একটি জাত থেকে তার উঠে আসা। আফজাল গুরুকে ফাঁসি দেয়ার তৃতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। ২০০১ সালে ভারতের পার্লামেন্টে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত থাকার দায়ে আফজাল গুরুর ফাঁসি হয়েছিল। এই ফাঁসি ও মৃত্যুদ-াদেশ বহাল রাখতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এখনও বড় একটি বিতর্কের বিষয়।
কানাইয়া কুমারকে গ্রেপ্তারের পরই বিজেপির নেতারা ঘোষণা দিলেন, সরকার কোন ‘দেশবিরোধী’ কর্মকা- সহ্য করবে না। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের যোগসূত্র থাকার অভিযোগ করলেন, দাবি জানালেন জেএনইউ বন্ধ করে দিতে। নিউজএক্স নামের একটি টিভি চ্যানেল প্রচার করে একটি ভিডিও ফুটেজ। সেখানে দেখানো হয়, কানাইয়া কুমার বিভিন্ন রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক শ্লোগান দিচ্ছেন। টাইমস নাউ টিভি’র এক উপস্থাপক বাগাড়ম্বরের সঙ্গে দাবি করলেন, ওই অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক উমর খালিদ একজন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ ও ‘দেশপ্রেমহীন’ ব্যক্তি।
এবিপি নিউজ পরে প্রমাণ করেছে, ওই ফুটেজগুলো ছিল জাল! হ্যাঁ, কিছু প্রতিবাদকারী চিৎকার করে বলেছিল: ‘যত আফজালকে তোমরা খুন করো, তত আফজালের জন্ম এ মাটিতে হবে’। এমনকি ভারতের পতনের ডাক দিয়েছেন তারা। তবে এটি ¯পষ্ট নয়, উপস্থিত শিক্ষার্থীরাই এমন করছিলেন, নাকি বহিরাগতরা। তবে এদের মধ্যে কানাইয়া কুমার ছিলেন না।
নিজের বক্তৃতায় কানাইয়া কুমার বলেছিলেন, ‘আমরা এ দেশের। ভারতের মাটিকে আমরা ভালোবাসি। আমরা ভারতের ৮০ শতাংশ মানুষের জন্য লড়াই করি, যারা গরিব।’ এ সময় তিনি ‘আজাদি’ বা স্বাধীনতা দাবি করেন। কিন্তু, এ শব্দটিই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও নারী অধিকারকর্মীদের কাছে এটি একটি জনপ্রিয় শব্দ।
রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যা নিয়েও কথা বলেছিলেন কুমার। হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ দলিত ছাত্রটি কয়েক সপ্তাহ ধরে চাপ সহ্যের পর আত্মহত্যা করেন গত মাসে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বৃত্তি বন্ধ করে দিয়েছিল। দলিত শিক্ষার্থীদের একটি গ্রুপের সঙ্গে এক ডানপন্থী ছাত্রনেতার রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে তাকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে কানাইয়া কুমারকে শুনানির জন্য নিয়ে যাওয়া হলে, তার ওপর আক্রমণ হয়। তারও কয়েকদিন আগে, একই আদালতে সাংবাদিক ও জেএনইউ শিক্ষকদের ওপর হামলা চালিয়েছে একদল আইনজীবী। পুলিশ ওই সহিংসতা থামাতে কিছুই করেনি। ওই আক্রমণের নেতৃত্ব দেয়া আইনজীবী বিক্রম চৌহান নিজেকে বিজেপি’র কর্মী হিসেবে দাবি করেন। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বরং, ইন্ডিয়া গেট-মুখী স্বঘোষিত দেশপ্রেমিকদের একটি মিছিলের নেতৃত্ব দেন তিনি। বার্তাটা পরিষ্কার: উগ্র-জাতীয়তাবাদের নামে সহিংসতা হলে, সেটি মেনে নেয়া হবে। আদালতও আর নিরাপদ জায়গা নয়।
তবে অস্বস্তি শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে আমজনতার মাঝেও ছড়িয়েছে। বৃহ¯পতিবার দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে বিক্ষোভ হয়েছে। উপস্থিত ছিলেন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। শামিল হয়েছিল অফিস কর্মী থেকে শুরু করে অবসরভোগী কর্মকর্তা, আইনজীবী, তৃণমুলের জাতপ্রথা বিরোধী কর্মী, স্থানীয় শ্রমিক ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো।
রোহিত ভেমুলার ‘সুইসাইড লেটারে’ লেখা ছিল: ‘একজন মানুষের মর্যাদাকে তার পরিচয়ে অবনমিত করা হয়েছে। তার পরিচয় হলো, একটি ভোট, একটি সংখ্যা, একটি বস্তু। কখনও কোন মানুষকে একটি মনন হিসেবে বিচার করা হয়নি।’
বৃহ¯পতিবারের প্রতিবাদে একদল শিক্ষার্থীর হাতে থাকা পোস্টারে ভেমুলার সেই কথাগুলোই ছিল, তবে হতাশার অক্ষরকে সেখানে বদলে দিয়েছে আশার বর্ণমালা। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমরা আর কেবল একটি ভোট নই, সংখ্যা নই, নই কোন বস্তু। আমরা তরুণ। ভবিষ্যৎ আমাদেরই।’ কিন্তু সত্যিকার গণতন্ত্র আর সমতার এই কাঙ্খিত ভবিষ্যৎ এখন রুদ্ধ।
(নিউ ইয়র্ক টাইমস)

ভারতীয় গণতন্ত্রে কলঙ্ক আফজাল গুরু by অরুন্ধতী রায়

দিল্লিতে বসন্ত তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। সূর্য তাপ ছড়াতে শুরু করেছে। আর আইন গতিশীল তার নিজের পথে। এমন একটা সময় এক ভোরে ভারত সরকার আফজাল গুরুর ফাঁসি কার্যকর করল। ২০০১ সালে পার্লামেন্ট ভবনে হামলার প্রধান অভিযুক্ত তিনি। সে বছরই গ্রেফতার করা হয় তাকে। দীর্ঘ ১২ বছর নির্জন এক সেলে একা ছিলেন। স্ত্রী বা ছেলেকে তার কোনো খবর জানানো হয়নি। এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রসচিব জানান, চিঠি দিয়ে তার পরিবারকে জানানো হয়েছে। তারা এ চিঠি পেয়েছেন কি না তা খোঁজ নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জম্মু ও কাশ্মিরের পুলিশের মহাপরিচালককে। তবে সে খবর তাদের কাছে পৌঁছেনি। এটা কোনো বড় বিষয় নয়, কারণ কাশ্মিরের এক সন্ত্রাসী পরিবারকে তার ধরা পড়ার খবর জানানোর দায় সরকারের নেই।
এই ফাঁসি কার্যকর করার বিষয়ে ভারতের প্রধান দলগুলোর মধ্যে বিস্ময়কর ঐক্যবদ্ধ মনোভাব দেখা গেছে। কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসিস্ট) যেন এই একটি বিষয়ে আইনের শাসন কার্যকরে একেবারে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব বা যথাযথ সময় কোনো প্রতিবন্ধকতাই তৈরি করেনি। ঘটনা নয়, ঘটনার প্রতিক্রিয়ার সরাসরি সম্প্রচার চলছিল টিভি চ্যানেলগুলো থেকে। স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে নানা কিছুর মিশেল ছিল। আর ছিল ‘গণতন্ত্রের জয়গান’। ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা তার ফাঁসি উদযাপন করতে মিষ্টি বিলিয়েছে, কাশ্মিরিদের পিটিয়েছে (এ ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে)। এরা দিল্লিতে বিক্ষোভ করার জন্য জড়ো হয়েছিল। ততক্ষণে আফজাল গুরু মৃত। কিন্তু টিভি চ্যানেলগুলোর স্টুডিওতে গলাবাজদের কথার ঝড় আর রাস্তায় হঠকারীদের তৎপরতা দুই-ই সমানতালে চলছিল। তাদের এত বেশি কথা বলার বা তৎপরতার নেপথ্যে হয়তো বিষয়টি এমন যে, গভীর বোধে তাদের এ উপলব্ধি ছিল, কোথাও না কোথাও তারা ভুল করছে।
তাহলে সত্যটা কী? ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাঁচ ব্যক্তি একটি গাড়ি চালিয়ে পার্লামেন্ট ভবনের গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে। ওই গাড়িতে বোমা ছিল। চ্যালেঞ্জ করা হলে গাড়ি থেকে বের হয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করে তারা। তাদের গুলিতে আট নিরাপত্তারক্ষী ও এক মালী নিহত হন। বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ওই পাঁচজনও। ধরা পড়ার পর পুলিশ হেফাজতে আফজাল গুরু নানা রকম স্বীকারোক্তি দেয়। বা বলা যেতে পারে, তার কাছ থেকে আদায় করা হয়। তার মধ্যে একটিতে সে জানায়, পার্লামেন্ট ভবনের অভিযানে অংশ নিয়েছিল মোহাম্মদ, রানা, রাজা, হামজা ও হায়দার। তাদের সম্পর্কে আমাদের হাতে থাকা তথ্য এটুকুই। এদের নামের কোনো প্রথমাংশ বা শেষাংশ নেই। তৎকালীন বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানি বলেছিলেন, ‘দেখে মনে হয় এরা সবাই পাকিস্তানি (তিনি নিজে একজন সিন্ধি, কাজেই তিনি অবশ্যই জানেন পাকিস্তানিরা দেখতে কেমন)। শুধু গুরুর পুলিশের কাছে দেয়া স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর করে সরকার পাকিস্তানে নিযুক্ত রাষ্ট্্রদূতকে প্রত্যাহার করে। একই সাথে পাকিস্তান সীমান্তে প্রায় পাঁচ লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়। দুই দেশের মধ্যে পরমাণুযুদ্ধের রবও ওঠে। বিদেশী দূতাবাসগুলো ভ্রমণ-সতর্কতার পাশাপাশি দিল্লিতে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলাফেরায় সতর্কতা জারি করে। কয়েক মাস ধরে এই পরিস্থিতি চলতে থাকে। ভারত এসব নানাবিধ তৎপরতায় হাজার কোটি রুপি খরচ করে।
ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিল্লির স্পেশাল পুলিশ সেল (অযথাই বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য এদের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে, সন্ত্রাসী সন্দেহে এরা বহু লোককে ‘এনকাউন্টার’ করেছে) জানায়, এই মামলা তারা মীমাংসা করে ফেলেছে। ১৫ ডিসেম্বর তারা এ ঘটনার ‘নাটের গুরু’ অধ্যাপক স্যার গিলানিকে দিল্লি থেকে এবং শওকত গুরু ও তার খালাতো ভাই আফজাল গুরুকে কাশ্মিরের শ্রীনগর থেকে গ্রেফতার করে। শওকতের স্ত্রী আফসান গুরুকেও আটক করা হয়। তবে ভারতের গণমাধ্যম সে সময় অতি উৎসাহী হয়ে পুলিশে বক্তব্য প্রচার করতে থাকে। কিছু শিরোনাম ছাপা হয় অনেকটা এমন, ‘দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় প্রভাষকের সন্ত্রাসী পরিকল্পনা’, ‘ফিদায়িনদের পথনির্দেশনায় ভার্সিটি ডন’, ‘ক্লাসের বাইরে সন্ত্রাসের শিক্ষক ছিলেন ডন’। দেশজুড়ে প্রচারিত জিটিভি ওই সময় ‘১৩ ডিসেম্বর’ নামে একটি ‘ডকুড্রামা’ প্রচার করে। তাদের দাবি, ‘পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে এই সত্যনির্ভর নাটক তারা নির্মাণ করেছে (পুলিশের বক্তব্যই সঠিক হবে তাহলে আর আদালতের কী প্রয়োজন)। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদভানি প্রকাশ্যে এই নাটকের প্রশংসা করেন। সর্বোচ্চ আদালতও এর প্রচার স্থগিত করার আবেদন বাতিল করে দেন। তাদের বক্তব্য ছিল, গণমাধ্যম বিচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। দ্রুত বিচার আদালত গিলানি, আফজাল ও শওকতকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে এটি প্রচার করা হয়। পরবর্তীকালে আদালত অবশ্য গিলানি ও আফসান গুরুকে নির্দোষ সাব্যস্ত করে মুক্তি দেন। সুপ্রিম কোর্টও এই রায় বহাল রাখেন। তবে ২০০৫ সালের ৫ আগস্ট আদালত আফজাল গুরুকে তিন দফা যাবজ্জীবন ও ডাবল মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।
বিজেপি এই রায়ের তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন দাবি করে। তাদের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম স্লোগান ছিল, ‘দেশ আভি শারমিন্দা হ্যায়, আফজাল আভি জিন্দা হ্যায়’। অর্থাৎ আফজাল বেঁচে থাকায় ভারত লজ্জিত। এর মধ্যেই গণমাধ্যমে নতুন প্রচার শুরু হয়। বর্তমানে বিজেপির এমপি চন্দন মিত্র সে সময় পাইওনিয়ার পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি লেখেন, ‘২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর পার্লামেন্টে সন্ত্রাসী হামলায় আফজাল গুরুই প্রথম গুলি ছুড়তে শুরু করেন। তার গুলিতেই ছয় রক্ষীর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়।’ এমনকি পুলিশের অভিযোগপত্রেও আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হয়নি।
প্রশ্ন জাগে, পার্লামেন্টে হামলার মামলায় আমাদের সম্মিলিত মত কে তৈরি করে দিলো? পত্রিকায় যা ছাপা হচ্ছে সেটাই কি একমাত্র সত্য? অথবা যে নাটক আমরা টিভিতে দেখেছি সেটা? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জয় উদযাপনের আগে আসুন একটু দেখার চেষ্টা করি, ওই সময় কী ঘটেছিল? যারা আফজালের ফাঁসিকে আইনের শাসন হিসেবে দেখছেন তাদের যুক্তি হলো, গিলানিকে মুক্তি দেয়াতেই প্রমাণ হয়, বিচার নিরপেক্ষ হয়েছে। তাই কি?
দ্রুত বিচার আদালত কাজ শুরু করেন ২০০২ সালের মে মাসে। তখনো বিশ্ব ৯/১১-এর ধাক্কায় দুলছিল। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার আফগানিস্তানে তারা বিজয়ী হয়েছে বলে দাবি করে। যে জয় প্রকৃতপক্ষে ছিল অপরিণত। গুজরাটে পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় মুসলিম নিধন চলছিল। পুরো পরিবেশ আর বাতাস সাম্প্রদায়িক ঘৃণায় ভারী হয়েছিল। এ দিকে পার্লামেন্টে হামলার মামলাটিও চলছিল। জটিল এক ফৌজদারি মামলা। এই মামলায় নির্জন কারাগারে বন্দী আফজাল গুরুর কোনো আইনজীবী ছিল না- এমনটি বলাই যুক্তিযুক্ত। আদালত একজন জুনিয়র আইনজীবীকে তার পক্ষে নিয়োগ করেন। তিনি কখনো আফজাল গুরুর সাথে দেখা করেননি। কোনো সাক্ষীকে ডাকেননি। সাক্ষ্য দিতে আসা লোকদের জেরাও করেননি। প্রমাণ উপস্থাপন, সাক্ষীকে জেরা, যুক্তি উপস্থাপন- সবই চলছিল এ অবস্থাতেই। তার পরও মামলাটি ধুঁকছিল। এর বহু উদাহরণ রয়েছে। দু’টি দেয়া যাক- আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে পাওয়া প্রমাণগুলোর অন্যতম ছিল তাকে গ্রেফতারের সময় জব্দ তার সেলফোন ও ল্যাপটপ। এগুলো পাওয়ার পরপরই সিল করা হয়নি। নিয়মানুযায়ী যা স্বাভাবিক ছিল। বিচারকাজ চলার সময় জানা গেল জব্দ করার পর হার্ডডিস্কে কাজ করা হয়েছে। এতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রলায়ের জাল পাস এবং পার্লামেন্টে হামলাকারীদের জাল পরিচয় পাওয়া যায়। জিটিভির নাটকে যেমনটি দেখানো হয়েছিল। পুলিশের দাবি ছিল, গুরু তার সব তথ্য মুছে ফেলে শুধু এ দু’টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রেখে দিয়েছিল! পুলিশের উপস্থিত করা এক সাক্ষী জানান, তিনি গুরুর কাছে ফোনের সিমকার্ড বিক্রি করেছিলেন। এই সিমকার্ড দিয়েই গুরু সব ‘সন্ত্রাসীর’ সাথে যোগাযোগ করেন। সেটা ২০০১ সালের ৪ ডিসেম্বর। তবে প্রসিকিউশনের রেকর্ডে দেখা যায়, সে বছর ৬ ডিসেম্বর সিম চালু করা হয়।
তাহলে আফজাল পর্যন্ত পুলিশ কী করে পৌঁছল? পুলিশের দাবি, গিলানির কাছ থেকে তারা আফজালের তথ্য পান। তবে আদালতের নথিতে দেখা যায়, গিলানিকে আটক করার আগেই আফজালকে গ্রেফতার করা হয়। আদালত একে ‘তথ্যগত বিভ্রান্তি’ হিসেবে অভিহিত করলেও বিষয়টি নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
গিলানির গ্রেফতারি স্মারকে দেখা যায়, তার ভাই বিসমিল্লাহর স্বাক্ষর। তিনি দিল্লিতে থাকেন। জব্দ তালিকায় সই করেন জম্মু ও কাশ্মির পুলিশের দুই ব্যক্তি।
এই মামলায় এ ধরনের বিভ্রান্তি অসংখ্য। প্রমাণগুলো মিথ্যা আর বিভ্রান্তিতে ভরা। এসব বিভ্রান্তি আর মিথ্যাচারের জন্য পুলিশকে মৃদু তিরস্কার ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি। পার্লামেন্টে হামলার রহস্য উদঘাটনে আগ্রহী হলে যে-কারো পক্ষে এসব বিভ্রান্তি বোঝা সম্ভব। তবে সে চেষ্টাতে কেউ যায়নি। যার ফলাফল হলো, এই বীভৎস ঘটনার প্রকৃত রচয়িতা অচেনা-আজানা থেকে তদন্তের বাইরেই রয়ে গেল।
প্রকৃতপক্ষে যা ঘটেছে এবং আফজাল গুরুর দুর্ভাগ্য শুধু আদালত কক্ষে আটকে থাকার বিষয় নয়। বাস্তব জানতে আমাদের যেতে হবে কাশ্মির উপত্যকায়। বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকীকৃত এলাকা এটি। প্রায় পাঁচ লাখ ভারতীয় সেনা এখানে দায়িত্ব পালন করে (প্রতি চারজন কাশ্মিরির জন্য একজন করে সেনা)। এখানে সেনাক্যাম্প ও নির্যাতনশিবিরের পরিস্থিতি আবুগারিব কারাগারকেও ছাপিয়ে যাবে। কাশ্মিরিদের ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র শেখানোর কেন্দ্র হচ্ছে এগুলো। ১৯৯০ সাল থেকে কাশ্মিরের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন সশস্ত্র হয়। এর পর থেকে উপত্যকার ৬৮ হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছে। নিখোঁজ হয়েছে ১০ হাজার আর নির্যাতনের শিকার হয়েছে আরো অন্তত এক লাখ মানুষ। এসব লোকের চেয়ে গুরুর মৃত্যু একটু অন্য রকম। গুরু তাদের মতো কারাগারের আঁধারে প্রাণ হারায়নি। তার জীবন-মৃত্যু নিয়ে খেলা হয়েছে দিনের আলোয়। যেখানে ভারতের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ছিল। শুধু খেলা নয়, তার মৃত্যুতেও প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা রেখেছে।
তার মৃত্যু কার্যকরের পর কি আমাদের বিবেক শান্তি পেয়েছে, নাকি আমাদের রক্তভর্তি পেয়ালা কেবল অর্ধেক পূর্ণ হলো?
অনুবাদ : তানজিলা কাওকাব

ওবামাই কি আমেরিকার শেষ প্রেসিডেন্ট? by মাসুম খলিলী

বিশ্বের ভবিষ্যৎ ঘটনা সম্পর্কে এক বুলগেরীয় নারীর নানা বক্তব্য নিয়ে ইন্টারনেটে তোলপাড় চলছে। তুরস্কের উসমানীয় খেলাফতের অধীন মেসিডোনিয়ায় ১৯১১ সালে জন্মগ্রহণকারী এ মহিলার কথা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল এর আগেও একাধিকবার। ৮৫ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে ৫০ বছর ধরে বিভিন্ন সন-তারিখ উল্লেখ করে বিশ্বের অনেক বড় বড় ভবিষ্যৎ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি। অর্থোডক্স খ্রিষ্টান পরিবারে জন্ম নেয়া এই নারীর ঘনিষ্ঠজনেরা তাকে বিশেষ মর্যাদাবান হিসেবে তুলে ধরেন। বাবা ভাঙ্গা (Baba Vanga) নামে এই মহিলা বলতেন, ভবিষ্যতে সময়ের এসব কথা তাকে সৃষ্টিকর্তাই জানিয়েছেন। ফলে কোনো আলাদা ধর্মবিশ্বাস বা বাণী প্রচার ছাড়াই তাকে ‘স্রষ্টার বার্তা বহনকারী’ হিসেবে তুলে ধরেন তার ভক্তরা।
বাবা ভাঙ্গার উল্লেখযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণীর একটি ছিল, ২০০১ সালের টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনা। ২০০৮ সালে একজন আফ্রিকান আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবেন বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। এই প্রেসিডেন্টই ‘আমেরিকার সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট’ হবেন বলেও মন্তব্য রয়েছে তার এই ভবিষ্যদ্বাণীতে। চলতি বছর, অর্থাৎ ২০১৬ সাল হলো বাবা ভাঙ্গার দৃষ্টিতে এক উল্লেখযোগ্য বছর। এ সময় বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হবে মধ্যপ্রাচ্যে। তিনি বলেছেন, পুরো ইউরোপ জনশূন্য হয়ে যাবে আর সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে মুসলমানদের। এরপর আমেরিকানরা আবহাওয়া পরিবর্তনের এক অস্ত্র আবিষ্কার করবে। এই অস্ত্রের জোরে ইউরোপে আবার খ্রিষ্ট আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। এরপর একসময় ইউরোপ ও বিশ্বের অন্যত্র ফিরে আসবে কমিউনিজম। আর একপর্যায়ে পৃথিবীর সব কিছুই মারা যাবে। মানুষ চলে যাবে নতুন এক নক্ষত্রব্যবস্থায়।
কথিত বার্তাবাহক বাবা ভাঙ্গা জন্ম নিয়েছিলেন মেসিডোনিয়ার স্ট্রুমিকায় এক অপরিপক্ব শিশু হিসেবে। প্রথম যখন শিশুটি কেঁদে ওঠে তখন সেখানকার রীতি অনুযায়ী তাকে এক গৃহবধূ রাস্তায় নিয়ে যান নাম রাখার জন্য। প্রথম আগন্তুকের নাম পছন্দ না হওয়ায় দ্বিতীয় আগন্তুকের দেয়া নাম থেকে আসে ‘বাবা ভাঙ্গা’ নামটি। শৈশবে তার ছিল বাদামি চোখ ও স্বর্ণালি চুল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার পিতাকে বাধ্যতামূলক বুলগেরীয় সেনাবাহিনীতে যেতে হয়। এরপরই তার মা মারা যান। পরে সৎমায়ের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন তিনি। তার জীবনে টার্নিং পয়েন্ট ছিল একটি টর্নেডো। এ ঝড়ে ঘূর্ণিবাতাস তাকে উঠিয়ে নিয়ে এক কর্দমাক্ত মাঠে ফেলে। সেখান থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধারের পর বাবা ভাঙ্গা ক্রমান্বয়ে চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাতে হারাতে একপর্যায়ে অন্ধ হয়ে যান। এরপর সৎমাকে হারালে বাবা একেবারে দরিদ্র অবস্থায় পড়ে গেলেন। একসময়ে এক কঠিন অসুখে পড়লে ডাক্তাররা তিনি অচিরেই মৃত্যুবরণ করবেন বলে জানান। কিন্তু অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে যান। এর পর তাকে ভবিষ্যতের অনেক ঘটনা সম্পর্কে বলতে দেখা যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেকে বাবা ভাঙ্গার কাছে আসতে থাকেন তাদের স্বজনদের সন্ধান পেতে কিছু জানার জন্য। ১৯৪২ সালে বুলগেরীয় তৃতীয় জার বাবা ভাঙ্গার কাছে আসেন। এ সময় বুলগেরিয়ার অনেক রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী তার কাছে আসতেন। এমনকি সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভ তার প্রতিনিধির সাথে কথা বলতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের আগস্টে বাবা ব্রেস্ট ক্যান্সারে মারা যান। এর আগে তার বিভিন্ন সময় করা ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল।
বাবা ভাঙ্গা ১৯৫০ সালেই বলেছিলেন, বিশ্ব উষ্ণ হতে শুরু করবে এবং ২০০৪ সালে এক বৃহৎ উপকূলজুড়ে সুনামি হবে। উষ্ণায়ন অবশ্য ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আর তার উল্লিখিত সময়ে সুনামিও হয়েছে। ১৯৮৯ সালে তিনি বলেছিলেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে ইস্পাত পাখির আক্রমণের ঘটনা ঘটবে। আর নেকড়েরা ঝোপের (bush) মধ্যে আর্তনাদ করবে এবং নির্দোষ মানুষের রক্ত ঝরবে। টুইন টাওয়ারে সেই ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮০ সালে ভাঙ্গা বলেছিলেন, ২০০০ সালে কুরস্ক রাশিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিন পানিতে নিমজ্জিত হবে। নতুন শতাব্দীর প্রাক্কালে ১৯৯৯ বা ২০০০ সালের আগস্টে পারমাণবিক ডুবোজাহাজ কুরস্ক পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
এ সময়ের জন্য ভাঙ্গার আলোচিত ভবিষ্যদ্বাণীটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার ৪৪তম প্রেসিডেন্ট হবেন একজন আফ্রিকান-আমেরিকান। এর সাথে তার আরো মন্তব্য ছিল- তিনিই হবেন আমেরিকার শেষ প্রেসিডেন্ট। ভাঙ্গার মৃত্যুর এক যুগ পর বারাক ওবামা ৪৪তম প্রেসিডেন্ট ঠিকই হয়েছেন। কিন্তু তিনি শেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি না সেটিই দেখার বিষয়। ২০১৬ সালেরই ৪ নভেম্বর আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট মনোনয়নের জন্য তীব্র লড়াই চলছে। রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে এমন একজন এ পর্যন্ত ‘প্রাইমারি’তে এগিয়ে আছেন যিনি অতীতে কোনো দিন জেনারেল, মন্ত্রী, সিনেটর, গভর্নর এমনকি কংগ্রেসম্যানও ছিলেন না। ট্রাম্পের বড় পরিচয় হলো- তিনি ক্যাসিনোর মালিক এবং নিউ ইয়র্কের বিলিওনিয়ার আবাসন ব্যবসায়ী। এই আলোচিত ব্যক্তি রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন দৌড়ে অনেক ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। অন্য দিকে দেশটির প্রথম মহিলা প্রার্থী হয়ে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার নিয়েও ডেমোক্র্যাট মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন হিলারি। নিজেকে সমাজতন্ত্রী হিসেবে দাবি করা প্রতিপক্ষ প্রার্থী সেন্ডার্স ক্রমেই শক্তিমান হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। বারাক ওবামা আমেরিকার শেষ প্রেসিডেন্ট হওয়ার মতো অলৌকিক কোনো লক্ষণ এখনো নেই। তবে কিছু গোলমেলে অবস্থার আলামত দেখা যাচ্ছে।
ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে ২০১৬ সাল হলো আলোচিত বছর। চলমান এই বছরটির ব্যাপারে বাবার চাঞ্চল্যকর সব কথা রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, মুসলিমরা ইউরোপে অভিযান চালাবে এ বছর। পুরো ইউরোপ এক প্রকার জনশূন্য হয়ে যাবে। কিন্তু এই জনশূন্য হওয়ার কারণ কি আবহাওয়া পরিবর্তন নাকি মুসলিম আক্রমণ- এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। ২০১৫ সালে ইউরোপে মুসলিম শরণার্থীর স্রোত ছিল এক আলোচিত ঘটনা। এ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্য ভেঙে পড়ার অবস্থা হয়। একই সাথে ব্রিটেনের জোট ত্যাগের পাল্লা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। ব্রেক্সিটের গণভোটে যেকোনো ফলাফল আসতে পারে। তবে এ নিয়ে ক্যামেরনের সাথে ইইউর একধরনের সমঝোতাও হয়েছে। অন্য দিকে ফ্রান্সে আইএসের নামে বোমা হামলার পর পুরো ইউরোপের অবস্থা পাল্টে যায়। গুজব ছড়িয়ে পড়ে শরণার্থীদের মধ্যে আইএসও থাকতে পারে। ইউরোপের দেশে দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলো শক্তিমান হয়ে উঠতে থাকে। শরণার্থী নিয়ে উত্তেজনায় পুরো অভিবাসনপ্রক্রিয়া শ্লথ হয়ে যায়। এই উত্তেজনার মধ্যে অনানুষ্ঠানিক গণমাধ্যমে বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণী মুসলিম আক্রমণ ও ইসলামভীতি পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে দেয়। আতঙ্ক এবং হিংসা দুটোই ছড়ায় মুসলিমদের ব্যাপারে। আবার এটিও ঠিক যে, আবহাওয়া পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ইউরোপ হতে পারে এর অন্যতম প্রধান শিকার। এর বিস্তীর্ণ অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি উচ্চতায় রয়েছে।
বাবা ভাঙ্গার অনেক ভবিষ্যদ্বাণী বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আবার কোনো কোনোটি তিনি আদৌ বলেছেন কি না, তা নিয়েও ঘনিষ্ঠ সহচরদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। এ রকম একটি ছিল বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে। সেবার দুই ‘বি’-এর মধ্যে ফাইনাল হওয়ার কথা বলা হয়। এর মধ্যে এক ‘বি’ অর্থাৎ ব্রাজিল ফাইনালে যায়, কিন্তু আরেক ‘বি’ বা বুলগেরিয়া সেমিফাইনালেই ইতালির কাছে পেনাল্টিতে হেরে যায়।
আবার বাবা ভাঙ্গার কিছু কিছু কথা রয়েছে যেগুলোর অর্থ বোঝা যায় না। টুইন টাওয়ারের ঘটনা ঘটার আগে বুশ বা ঝোপ এবং ইস্পাত পাখির হামলায় যমজ ভাইয়ের ধ্বংসের অর্থ কী তা বোঝা ছিল কঠিন। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অবশ্য তিনি কী বলতে চেয়েছেন তা বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, ২০২৩ সালে পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তন হবে। এর অর্থ আসলে কী তা বোঝা মুশকিল। এ ধরনের কোনো প্রাকৃতিক পরিবর্তনের প্রভাব পৃথিবীর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ না হলে তা একপ্রকার আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
কিন্তু ২০২৫ সালের ব্যাপারে ভাঙ্গা যা বলেছেন, তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বেশ আলোচনার মতো। এ সময়ে পুরো ইউরোপের জনসংখ্যা একপ্রকার শূন্যে এসে দাঁড়াবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ২০১৬ সালের সাথে মিলিয়ে দেখা হলে এর সাথে সম্পর্ক থাকার কথা মনে হবে মুসলিম এবং ইসলামের। ২০২৫ সালে ইউরোপে এখন যা আছে তাই যদি থাকে, তাহলে এই অন্ধ মহিলার ভবিষ্যৎ বক্তব্যের হয়তো কোনো মূল্যই থাকবে না। কিন্তু এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে ইসলামোফোবিয়া চাঙ্গা হয়ে আছে এবং এটাকে কেন্দ্র করে যে নানা ঘটনা ঘটছে, সেটিকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। একসময় ইরাকে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্রের কথা বলে পুরো ইরাককে আমেরিকার সামরিক অভিযানে বিরান করে দেয়া হয়েছে। এখনো শত শত লোকের রক্ত ঝরছে সেখানে। কিন্তু তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ নিজেই স্বীকার করেছেন- গণবিধ্বংসী অস্ত্র সাদ্দামের হাতে থাকার গোয়েন্দা রিপোর্ট সঠিক ছিল না। আজকের মধ্যপ্রাচ্যের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ ইরাকে সেদিনের মার্কিন হামলা।
প্রকৃতিগত কিছু ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন বাবা ভাঙ্গা। তিনি বলেছেন, ২০২৮ সালে পৃথিবীর মানুষ জ্বালানির সন্ধানে শুক্র গ্রহে উড়ে যাবে। আর মাত্র এক যুগ পরের কথা এটি। জ্বালানির সন্ধানে মানুষ অনেক অসাধ্য সাধনের চেষ্টা করছে। কিন্তু শুক্র গ্রহে যাওয়ার বিষয়টি এখনো অলৌকিকই মনে হচ্ছে। ২০৩৩ সালের কথাটি অবশ্য বাস্তবসম্মত। এ সময়ে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হতে থাকবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
এর পরের কথাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ২০৪৩ সালে পুরো ইউরোপে ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে। রোম হবে এর রাজধানী। বিশ্ব অর্থনীতি চলে যাবে মুসলিম নিয়ন্ত্রণে। বিশ্বব্যাপী ইসলামের ব্যাপারে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ার মতো ভবিষ্যৎ বক্তব্য এটি। এর মধ্যে ইরাক-সিরিয়ায় আইএসের কথিত খেলাফত রাষ্ট্র নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপ-আমেরিকার যৌথ উদ্যোগে রাজনৈতিক ইসলামের নামে ইসলামি দলগুলোকে শক্তিহীন করার যে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তার পেছনে এ ধরনের একটি উদ্বেগ থাকতে পারে। ইসলামিস্টদের ব্যাপারে যেকোনো দমন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক তৎপরতা চালানোর যুক্তি হিসেবে এ ধরনের একটি আতঙ্ক বেশ কার্যকর। আতঙ্কের পাশাপাশি ইউরোপের জন্য ‘আশাবাদী’ কথাও শুনিয়েছেন বাবা। তিনি বলেছেন, ২০৬৬ সালে আমেরিকা আবহাওয়া বদলে দেয়ার অস্ত্র বানাবে। আর যুক্তরাষ্ট্র্র রোম দখল করে সেটিকে আবার খ্রিষ্টবাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে। ২০৭৬ সালে ইউরোপ এবং পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে কমিউনিজম ফিরে আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। এতে বামপন্থীরা আশ্বস্ত হতে পারেন।
বাবার বক্তব্য মতে, ২০৮৪ সালে প্রকৃতির নবজন্ম হবে। এ নবজন্ম কেমন হবে, সেটি তিনি বিস্তারিত বলেননি। তবে পরের কথায় এর কিছুটা আভাস পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, ২১০০ সালে মানুষের তৈরি কৃত্রিম সূর্য এই গ্রহের অন্ধকার অংশকে আলোকোজ্জ্বল করবে। আর ২১৩০ সালে বাইরের শক্তির সাহায্যে পানির নিচে মানুষের বসবাস সম্ভব হবে।
বাবার বক্তব্য মতে, ২১৭০ সালে বিশ্বব্যাপী বড় রকমের খরা হবে। আর ২১৮৭ সালে দু’টি বৃহৎ অগ্ন্যুৎপাত সফলভাবে বন্ধ করা যাবে। তবে ২২০১ সালে সূর্যের তাপ বিকিরণ প্রক্রিয়া শ্লথ হয়ে তাপমাত্রা কমে যাবে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব মানবসভ্যতায় কী হবে, এ ব্যাপারে কিছু বলেননি তিনি। এর অর্ধশতক পরের কথাও বলেছেন তিনি। বাবার মতে, ২২৬২ সালে গ্রহ ধীরে ধীরে কক্ষপথ পরিবর্তন করবে। একটি ধূমকেতুর আঘাতে হুমকির মুখে পড়বে মঙ্গল। এর প্রায় এক শতাব্দী পর ২৩৫৪ সালে কৃত্রিম সূর্যের দুর্ঘটনায় পৃথিবীতে খরা আরো বিস্তৃত হবে। ২৪৮০ সালে দুই কৃত্রিম সূর্যে সংঘর্ষ হবে আর পৃথিবী অন্ধকারে ছেয়ে যাবে।
চতুর্থ সহস্রাব্দ পর্যন্ত সময়ের কথা বলেছেন বাবা ভাঙ্গা। তার মতে, ৩০০৫ সালে মঙ্গলের একটি যুদ্ধ গ্রহ নক্ষত্রের নির্দিষ্ট আবর্তন পথ পরিবর্তন করে দেবে। ৩০১০ সালে একটি ধূমকেতু চাঁদকে আঘাত করবে। পৃথিবী শিলা ও ছাই দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পড়বে। বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে মনে হতে পারে, এটিই হয়তোবা কেয়ামতের ধ্বংসলীলা। তিনি এরপর বলেছেন, ৩৭৯৭ সালের মধ্যে পৃথিবীর সব কিছু মরে যাবে। তবে মানবসভ্যতা এমন একপর্যায়ে যাবে যাতে তারা নতুন একটি তারকা জগতে নিজেদের সরিয়ে নিতে পারবে। বাবা বলেননি, এটিই চিরন্তন পরবর্তী জগৎ হবে কি না। তবে অনেকের কল্পনায় চলে আসতে পারে এটি।
বাবা ভাঙ্গাকে নিয়ে কেন এত দিন পর বিশেষভাবে আলোচনা হচ্ছে, সেটি এক রহস্যের ব্যাপার। ইসলামে পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালাই কেবল ভবিষ্যৎদ্রষ্টা- এমনটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হয়। আল্লাহ নবীদের অতীত ও ভবিষ্যতের অনেক ঘটনা সম্পর্কে জানিয়েছেন। এভাবে তারা ভবিষ্যৎ নানা ঘটনা সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলেন। তবে প্রবণতা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা প্রকাশ করাকে দোষের মনে করা হয় না। বাবা ভাঙ্গা দাবি করেন, তাকে সৃষ্টিকর্তা এসব জানিয়েছেন। স্রষ্টার জানানো কোনো কিছু মিথ্যা হয় না। ওবামা যদি সত্যিই আমেরিকার শেষ প্রেসিডেন্ট হয়ে পড়েন, তাহলে বাবার খ্যাতি বাড়বে। মুসলমানদের ইউরোপ জয়কেও অনেকে সম্ভাবনা হিসেবে ভাববেন। তা না হলে এসব ভবিষ্যদ্বাণীর পেছনে বিশ্বনিয়ন্ত্রক কোনো শক্তির উদ্দেশ্যমূলক সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেই ধারণা করা হবে। এর সবচেয়ে বড় শিকার মুসলিমরাই হয়তো হবেন। এটি হতে পারে অজ্ঞাত এক নারীর ভবিতব্যবিষয়ক কথাবার্তাকে এভাবে ছড়িয়ে দেয়ার মাহাত্ম্য।

শুধু বিএনপির নয়, বিদ্রোহী প্রার্থীরাও ভয় পেয়েছেন! by মিজানুর রহমান খান

পৌরসভা নির্বাচনের পরদিন লিখেছিলাম, আমাদের সমাজে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটতে যাচ্ছে কি না? এই প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হলো ৭১টি ইউনিয়ন পরিষদে বিএনপির প্রার্থী দিতে না পারা এবং ২৫টিতে আওয়ামী লীগ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার পথে থাকার ঘটনায়। মনে হচ্ছে, আরও বহু জায়গায় প্রকৃত নির্বাচন হবে না। গোপন সমঝোতা, চাপ ও ‘স্বপ্রণোদিতভাবে’ নির্বাচনে থেকেও কৌশলগতভাবে সরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটবে। তিন স্তরে নির্বাচন হবে। কিন্তু নির্বাচনী আত্মা থাকবে না।
এমনিতে আমরা সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও সামাজিক ফোরামগুলোতে বিভক্তি দেখতে পাই। এমন একটি উদাহরণও আমাদের সামনে নেই, যেখানে আগে দুই বড় দলের সমর্থক গ্রুপ ছিল, সেখানে আর কোনো দলাদলি নেই। সাদা কি নীলের ভাগাভাগি আর নেই। সাদা ও নীল মিলে এখন একটি রং ধারণ করেছে। এটা কোথাও শুনি না। বরং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির মতো বিভক্ত সংগঠনগুলোর বিভক্তি আগের মতোই রয়ে গেছে। যেকোনো বেসরকারি জরিপে এই ইঙ্গিত অত্যন্ত স্পষ্ট যে বিভক্তিটা বজায় আছে। বাংলাদেশ আগের মতোই দুটি প্রধান মতাদর্শগত জায়গায় ভাগ হয়ে আছে। তার থেকেও বড় কথা হলো, এখন পর্যন্ত যেকোনো অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনায় যখন প্রশ্ন ওঠে যে এখনই যদি নির্দলীয় সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন হয়, তাহলে তার সম্ভাব্য ফল কী হবে। এর যে উত্তর তা নিয়ে নানাজন নানা মত দেবেন। কিন্তু অনুমান করি কেউ হয়তো এমন চিত্র তুলে ধরবেন না, যা কিনা আমরা গত পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফলে ফুটে উঠতে দেখেছি। আমরা দেখলাম বিএনপি শুধু ভেসেই যায়নি, তারা ক্ষমতাসীন দলের বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে এতটা কম ভোট পেয়েছে, যা অভাবনীয়। কোনো একটি শহরে যদি কারা বিএনপির সমর্থক আছেন, তাঁদের প্রকাশ্যে হাত তুলতে বলা হয়, তাহলেও বিএনপির পরাজিত মেয়র প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে সেই সংখ্যাটা বেশি হওয়ার কথা। এখন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ফলাফলের আগেই সম্ভাব্য ফল কী হতে যাচ্ছে, সেটা আর কষ্টসাধ্য অনুমান নয়।
আমাদের দেশের মানুষ কি সত্যিই ভোটের হাতিয়ার ব্যবহার করে রাজনীতিকদের শাস্তি দিতে শিখে গেছে? বাগেরহাটের ৭৪টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ১৯টিতেই বিএনপির প্রার্থী নেই। এই জেলার আওয়ামী লীগের সভাপতির বরাতে ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোয় এর একটি ব্যাখ্যা ছাপা হয়েছে। তাতে তিনি বলেছেন, ‘এই জেলায় বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি খুবই দুর্বল। এসব ইউপিতে তাঁরা প্রার্থী দেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাননি। এ জন্যই আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা এসব জায়গায় জেতার পথে।’ প্রথম কথা হলো, ইউনিয়ন পর্যায়ে সাধারণভাবে কোনো বড় দলেরই তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক তৎপরতা কখনো ছিল না। আর গ্রামীণ ব্যবস্থার নির্বাচনে সব থেকে কম প্রভাব বিস্তার করে রাজনৈতিক মতাদর্শ। এখানে গোষ্ঠী, পাড়া, গ্রাম, কোন্দল ইত্যাদি যেকোনো নির্বাচনে অনুঘটকের কাজ করে। সুতরাং প্রার্থী পাওয়া না-পাওয়ার সঙ্গে তথাকথিত সাংগঠনিক শক্তির সম্পর্ক আলগা হতে বাধ্য।
উপরন্তু, আমরা মনে রাখব যে দুই বড় দলই তৃণমূলে সংঠনগতভাবে ইতিহাসের যেকোনো পর্যায়ের তুলনায় দুর্বল এবং কম গণতান্ত্রিক। এর বড় প্রমাণ হলো বিপুলসংখ্যক সাংগঠনিক জেলায় তারা বছরের পর বছর ধরে পকেট কমিটি করে রেখেছে। আগের চেয়ে অবস্থার আরও অবনতি ঘটার আরও প্রমাণ হলো, তারা আগে কাউন্সিল করে পূর্ণাঙ্গ পকেট কমিটি ঘোষণা দিতে পারত। এখন তারা তা পারে না। কেবল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের, আবার কোথাও আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে চালায়। সব থেকে উদ্বেগজনক হলো তারা এসব কমিটি গঠনে ব্যালট বা অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল কোনো ব্যবস্থায় যাওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে না। এই ব্যর্থতার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনের একগুঁয়েমিকে বহুলাংশে দায়ী করতে পারি। এটা যে একটা বৃহত্তর প্রক্রিয়া এবং সেটা যে দলের হিসাব নিরীক্ষা ও তার কমিটি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও গতিশীলতার প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, তা তারা বুঝতে চাইছে না।
আমরা লক্ষ করব নির্বাচন কমিশন বিএনপি নামের সংগঠনটির রাজনৈতিক শুদ্ধতার প্রশ্ন তুলছে না। অথচ তাদের সেটা করা উচিত। এই রকমের একটি অগণতান্ত্রিক ও ভাঙাচোরা দল দিয়ে তারা কী করে মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। আমরা এমন কোনো দলীয় গঠনতন্ত্র কল্পনা করতে পারি না, যেটি আমাদের সংবিধানে স্বীকৃত ‘পিপলস রিপাবলিক’–এর মূল চেতনাকে আঘাত করে। বিএনপিকে তারা যে এসব বিষয়ে কিছু বলছে না, সেটা বিএনপির প্রতি তাদের কোনো সুচিন্তিত অনুকম্পা নয়, এখানে তারা স্থিতাবস্থা বজায় রাখছে কারণ তারা অত্যন্ত সংবেদনশীল, যাতে তাদের কোনো ‘অপরিণামদর্শী’ পদক্ষেপের ফলে প্যান্ডোরার বাক্সটা উন্মুক্ত না হয়ে পড়ে। বিএনপিকে উন্মুক্ত করলে অন্যান্য দলও উন্মোচিত হবে।
সুতরাং আমরা দেখি দেশব্যাপী ইউপি নির্বাচন নিয়ে এত বড় একটা বিশাল রাজনৈতিক যজ্ঞ ঘটে গেল, চার হাজারের বেশি ব্যক্তি প্রথমবারের মতো ‘দলীয়ভাবে’ মনোনীত হলেন, কিন্তু তা নিয়ে কোথাও কোনো উৎসবের আমেজ নেই। সরকারি দলের টিকিটধারীরা বলছেন, একেই আমরা বিজয় হিসেবে দেখি। কিন্তু তার কোনো উত্তাপ নেই। কর্মী ও সমর্থকদের মনে আনন্দের বন্যা নেই। তার মানে দলীয়ভাবে ইউপি নির্বাচন করে আমরা সমাজে কী নতুন উপাদান যুক্ত করলাম। তৃণমূলে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির নবজাগরণ কোথায়? নাকি দলীয় নির্বাচনের নামে নতুন করে ভয়ের সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে গেল? এই আশঙ্কা যদি অমূলক না হয়, তাহলে আমরা কি ভাবব না যে শতাব্দী প্রাচীন সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ সমাজে যে অবস্থান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা ধীরে ধীরে ভেঙে যাবে। সে জন্য এখনই উচিত হবে রাষ্ট্র গঠনের প্রধান শর্ত ক্ষমতার পৃথক্করণ বা সেপারেশন অব পাওয়ারকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত এবং তার প্রয়োগের দিকে নজর দেওয়া। বিচার বিভাগ পৃথক্করণের শর্তেই চেয়ারম্যানকে আর গ্রাম আদালতের প্রধান বিচারক রাখা যাবে না।
পৌরসভা ও ইউপি যেন দলীয় অফিসে পরিণত না হয়। এটা করতে ব্যর্থ হলে গুরুতর সামাজিক বিপর্যয় দেখা দেবে। চেয়ারম্যান ও মেয়ররা আগেও দল করতেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পরে তাঁরা যতটা সম্ভব একটা নির্দলীয় চরিত্র বজায় রাখতেন। এটা ভেঙে দিলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আরও বেশি হিমশিম খাবেন। আমাদের দরকার এমন একটি গ্রামীণ অবকাঠামো, যেখানে আদালতের বাইরে বিরোধ মেটানো যাবে। এখন অস্বচ্ছতার সঙ্গে মনোনয়নপত্রপ্রাপ্ত দলীয় চেয়ারম্যানরা গ্রাম আদালতকে আরও বেশি কলুষিত করতে পারেন। সুতরাং গ্রাম আদালতের পুনর্গঠন দরকার। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদের সুপারিশ অনুযায়ী উপজেলায় বিচার বিভাগকে নিতে হবে।
কৌতূহলবশত গতকাল কথা বলেছি প্রথম আলোর বাগেরহাট সংবাদদাতা আহাদ হায়দারের সঙ্গে। বড় বিস্ময় হলো যে সেখানে ক্ষমতাসীন দলের পূর্ণাঙ্গ পকেট কমিটি তিন বছরেও অনুমোদন পায়নি। সেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীর গর্জন নেই। অথচ এর আগে মানুষ বিএনপির নির্বাচিত মেয়র এবং বিদ্রোহীদের পরিণতি দেখেছে। বাগেরহাটের ৭৪টি ইউপির মধ্যে ক্ষমতাসীন চেয়ারম্যানরাই সিংহভাগ পুনরায় প্রার্থী। মাত্র ২১টিতে নতুন মুখ এসেছে। গোপন ব্যালটে বাছাই হলে এর চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় নতুন মুখ দেখা যেত। তবে অনুমান করি, এবার বিএনপির তো বটেই, ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহীরাও নিজ কাণ্ডজ্ঞান গুণে নিজেদের সংযত করে থাকবেন। তদুপরি বিদ্রোহী হয়তো মিলবে, আগামী কয়েক দিনে এই চিত্রটি পরিষ্কার হবে।
বাগেরহাটে একজনও বিদ্রোহী নেই, কেন? সম্ভবত অন্যতম বড় কারণ গত মেয়র নির্বাচনে দলের বিদ্রোহীদের করুণ পরিণতি। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে মাত্র ১৪৪ ভোটে হারেন। সেখানে ভালো ভোট হয়েছিল। বিএনপি প্রার্থীর ১ হাজার ১০০ ভোট পাওয়া দেখে অনেকের সন্দেহ বিএনপি-জামায়াতের ভোট তাঁর বাক্সে পড়েছিল। তো ফল ঘোষণার রাতেই বিস্ফোরক মামলায় বিদ্রোহী প্রার্থী গ্রেপ্তার ও তাঁর বাড়িতে হামলা হয়। সেই থেকে তিনি জেলে (সম্প্রতি তাঁর কারণে সদর থানা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সম্পাদকও জেলে গেছেন) আর তাঁর সমর্থক নেতা-কর্মীদের অন্তত ৪০ জন এলাকাছাড়া। পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সম্পাদকও তাঁর কারণে বহিষ্কৃত হন, বাড়িতে হামলা চলে। এসব সহিংস হামলার ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। বিদ্রোহী প্রার্থীর পৃষ্ঠপোষক স্থানীয় সাংসদও কোণঠাসা। সুতরাং শুধু বিএনপির নয়, এটা বিশ্বাস করার কারণ থাকবে যে বিদ্রোহী প্রার্থীরাও ভয় পেয়েছেন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক
mrkhanbd@gmail.com

মাহফুজ আনামের উপলব্ধি, অতঃপর by ফরহাদ মজহার

এক এগারোর সময় পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে নিজের ভূমিকার ভুলের কথা মাহফুজ আনাম একটি টেলিভিশান টকশোতে স্বীকার করেছেন। তাঁর এই উপলব্ধিকে আন্তরিক মনে না করার কোন যুক্তি নাই। সরকারপক্ষের টেলিভিশান চ্যানেলটি তাঁকে কথার ফাঁদে ফেলবার জন্যই তাঁদের অনুষ্ঠানে নিয়েছিল কি না সেটাও আমরা ভাবতে পারি। কিন্তু যে উপলব্ধির জায়গা থেকে মাহফুজ আনাম সম্প্রতি ভুল স্বীকার করেছেন তাকে স্বাগত জানাবার জন্যই এই লেখাটি।
মাহফুজ আনামের উপলব্ধি ও স্বীকারোক্তি হচ্ছে এজেন্সির চাপের কাছে একটি পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে তাঁর নতি স্বীকার করা ঠিক হয়নি- এ কথা একটি টেলিভিশান চ্যানেলে কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন। তবে তিনি যে শুধু শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে এজেন্সির দেয়া তথ্য ছেপেছেন তা নয়, খালেদা জিয়া ও বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন রিপোর্ট করেছেন। কিন্তু খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপির বিরুদ্ধে তাঁর লেখালিখির কথা তিনি চেপে গিয়েছেন। এখনো উল্লেখ করেন নি। এটা অন্যায় এবং হিপোক্র্যাসি।
তারপরও আমি তাঁর এই উপলব্ধিকে স্বাগত জানাই। ফলে তাঁর এই উপলব্ধির সুযোগ নিয়ে তাঁকে অযথা হয়রানি ও তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলারও তীব্র নিন্দা জানাই।
মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানকে হয়রানি আমি একটা অশনি সংকেত হিসাবে দেখি। শেখ মুজিবর রহমান দলীয় পত্রিকা ছাড়া বাকশালী আমলে সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা যেভাবে একদলীয় শাসন চালাচ্ছেন তাতে তিনি এখনো দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকবেন কি না তা নিশ্চিত হতে পারছেন না। অতএব তিনি মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানকে তাঁদের এক এগারোর ভূমিকার জন্য এখন কাটছাঁট করে দেবেন। আওয়ামী লীগের দলীয় স্বার্থের অধীনস্থ না থাকলে কোনো গণমাধ্যমই শেখ হাসিনা রাখবেন না। এই পরিস্থিতি বাকশালের চেয়েও ভয়াবহ হবে। যারা নাগরিক ও মানবিক অধিকারে বিশ্বাস করেন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তাঁদের উচিত এই হয়রানির প্রতিবাদ জানানো। দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এই সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সব মামলার জামিন হবার পরেও নতুন মামলা দেখিয়ে তাঁকে এখনো কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানের উচিত ছিল মাহমুদুর রহমানের নাগরিক ও মানবিক অধিকারের পক্ষে সুদৃঢ় ভাবে দাঁড়ানো। তাঁরা নাম কা ওয়াস্তে বিবৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কোন নীতিগত দৃঢ়তা তাঁদের মধ্যে আমরা দেখি নি। কিন্তু সে কারণে তাঁকে যখন ক্ষমতাসীনরা হয়রানি করছে আমরা চুপ করে থাকতে পারি না।
এক এগারোর সময় ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ও প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সেনা সমর্থিত সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে তাঁরা বদল ঘটাতে পেরেছিলেন। এটা তাঁদের শক্তির পরিচয় ছিল, সন্দেহ নাই। এর আগে থেকেই সিপিডিসহ এনজিওদের একাংশকে নিয়ে তাঁরা সৎ মানুষের খোঁজে জাতীয় রাজনীতি প্রবর্তনের প্রয়াস চালিয়েছিলেন। তখনই সুশীলসমাজ নামক সমাজের এই অংশের রাজনৈতিক অজ্ঞতা কিম্বা হিপোক্রাসি ধরা পড়তে শুরু করে। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যা নিছক সৎ মানুষের অভাব নয়। বাংলাদেশে রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। তারই ফল বাকশালী দুঃশাসন, সেনাশাসকদের কুকীর্তি এবং রাজনীতির দুর্বৃত্তপনা ও দুর্নীতি। এগুলো বাইরের দিক। গোড়ায় রয়েছে আর্থসামাজিক সম্পর্ক ও ব্যবস্থা এবং পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রান্তিক দেশ হিসাবে বাংলাদেশের জনগণের লড়াই-সংগ্রাম জয়-পরাজয়ের ইতিহাস।
তদুপরি ক্ষমতা, শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্রকাঠামো ইত্যাদি সম্পর্কে সমাজের চিন্তাভাবনা অতিশয় দুর্বল। দলবাজি করা বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে অতি নিম্নপর্যায়ের দালালী ছাড়া কোন স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক বা সাংবাদিকতার চর্চার দেখা পাওয়া কঠিন। ইত্যাদি নানা কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসের মন্দ চরিত্রের দিকটা স্রেফ রাজনীতি বা রাজনৈতিক দলের দোষ হতে পারে না। বরং সেই ক্ষেত্রে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ যাদের আমরা ‘সুশীল’ বলে অভিহিত করি তাঁদের দায়িত্বটাই সমধিক। অথচ তাঁরা নিজেদের সবসময়ই সমাজ ও রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে ভেবেছেন এবং এখনও ভাবেন, যার ফলে বাংলাদেশের সকল মন্দের জন্য রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলকেই শুধু দোষারোপ করেন। এটা একটা বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের ভূমিকা বিচার করে দেখবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ও প্রতিভা সুশীলদের মধ্যে দেখা যায় না। এদের চিন্তার দৌড় কতটা সংকীর্ণ সেটা আমরা বুঝতে শুরু করি যখন তারা এক এগারোর আগে দোর্দণ্ড প্রতাপে সৎ মানুষ খোঁজ করতে শুরু করেছিলেন এবং রাজনীতির দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের বিপরীতে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনদের আবিষ্কার করেছিলেন।
মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানের দুটো দৈনিক পত্রিকা পড়লে আমরা বুঝতে পারি ইতিহাস ক্ষমতা ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর চিন্তাভাবনা কতটা অপরিপক্ব ও সংকীর্ণ। যদি তাঁরা আসলেই উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার প্রবর্তন চাইতেন এবং কিভাবে বাংলাদেশে তা কায়েম করা সম্ভব সে সম্পর্কে আন্তরিক ভাবে ভাবতেন তাহলে বাংলাদেশে আর যাই হোক একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সরকার কায়েম হোত না। সেই ক্ষেত্রে তাঁদের নিজেদের চিন্তার সমস্যা কোথায় সেটা আগে তাঁরা নিজেরা পর্যালোচনা করতেন, কিম্বা নিদেন পক্ষে পর্যালোচনা করবার হিম্মত প্রদর্শন করতেন।
মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান দুটো ফর্মুলা নিয়ে কাজ করেছেন। এক. কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, সৎ মানুষদের রাজনীতিতে বসিয়ে দিলেই বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান হবে। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গণতন্ত্র, সাম্য, ইনসাফ ইত্যাদি মৌলিক রাজনৈতিক ধারণার বিকাশ ঘটানোরও কোন দরকার নাই। এদেশে বহুজাতিক কোম্পানি বা করপোরেট স্বার্থ কায়েম করা গেলেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। এটা করতে গিয়ে তারা বাংলাদেশের শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীদের পক্ষে দাঁড়ান নি। বরং উল্টাটা করেছেন। দাঁড়িয়েছেন বিদেশী বহুজাতিক কম্পানির স্বার্থে। এমনকি সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যবস্থা রক্ষার ন্যূনতম দরদ আমরা তাঁদের মধ্যে দেখি না। ডেইলি স্টার তাদের প্রথম পাতায় মনসান্টোর বিটিবেগুন ও সিনজেন্টার গোল্ডেন রাইসের পক্ষে দাঁড়ায়। এই অবস্থান বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের সর্বনাশ ঘটায়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ও পরিবেশের সুরক্ষার দিক থেকে এই দু’টি পত্রিকার ভূমিকা এ কারণে নেতিবাচক। এই সমালোচনা আমরা করে যাবো। কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা তাঁদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পত্রিকা দু’টিকে হয়রানি করবে আমরা তা হতে দিতে পারি না।
তাঁদের দ্বিতীয় ফর্মুলা হচ্ছে পাশ্চাত্যের ওয়ার অন টেররের সঙ্গী হয়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক ভাবে ক্ষমতাবান হওয়া। এদেশে তাদের মতাদর্শিক বা রাজনৈতিক দুষমন হিসাবে তারা তাই জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের মতো ইসলামকেই শত্রু গণ্য করেন। যে কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁরা বিএনপি ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বিরোধী ছিলেন। বিএনপি ও ইসলামপন্থীদের অবশ্যই সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু সেকুলারিজমের দোহাই দিয়ে তাঁরা সমর্থন করেছেন জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের। এই দুই সস্তা ফর্মুলা চর্চা করতে গিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে শেষাবধি বাংলাদেশে তাঁরা যে বদল ঘটালেন তার কুফলই তাঁরা এখন ভোগ করছেন। বিএনপি ও বিরোধীদলীয় জোটকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে মাইনাস করবার কাজেও তাঁরা শেখ হাসিনার হাতকেই শক্ত করেছিলেন।
এই সব চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের গলদকে সুনির্দিষ্ট ভাবে চিহ্নিত না করে একজন সৎ মানুষকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিলেই বাংলাদেশের রাজনীতির সমস্যা মিটে যাবে এর চেয়ে আজগুবি, অবাস্তব ও অদূরদর্শী চিন্তা আর কিছুই হতে পারে না। বাংলাদেশে ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন যেকোনো নাগরিকই তাদের সুশীল রাজনীতির এই ফাঁপা দিকটা বুঝতে পেরেছিল। সে ক্ষেত্রে সংস্কার নাকি খোলনলচে বদলে দিয়ে সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ তর্কের বিষয় হতে পারত। ধরে নিচ্ছি সেই তর্কে তাঁরা নিয়মতান্ত্রিক, উদার ও অহিংস রাজনীতির পক্ষে থাকতেন। কারণ ক্ষমতা, রাষ্ট্রকাঠামো কিংবা সামাজিক সম্পর্কের বৈপ্লবিক রূপান্তরের রাজনীতির পক্ষের মানুষ তাঁরা নন। এতে কোন দোষ নাই। কিন্তু পরাশক্তির স্বার্থের সাথে গাঁটছড়া বাঁধা এবং তাঁদের ‘গুড গভর্নেসের’ রাজনীতির ফেরিওয়ালা বা নির্বিচার এজেন্ট হওয়া শুধু দোষের না বরং মারাত্মক অপরাধ। এক এগারোর সময় কোন সুনির্দিষ্ট অবস্থান না নিয়ে বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য কী ধরনের রাজনৈতিক পথ নেয়া যেতে পারে তা নিয়ে ফলপ্রসূ তর্কের পরিবেশ তাঁরা তৈরি করতে পারতেন। তার সমূহ সুযোগ ও সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই দুই পত্রিকার সম্পাদক সেসময় তার চর্চা করেননি। এখনো করেন না। বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার আদালতে এরা তাঁদের ভূমিকার কারণেই অপরাধী হিসাবেই থেকে যাবেন। এটাই ইতিহাস।
ফলে তাদের ‘সৎ মানুষের সন্ধান’ এবং ‘বদলে যাও বদলে দাও’ জাতীয় স্লোগান ও বিল বোর্ড সাধারণ মানুষ ভালো চোখে দেখেনি। সেই সময় কূটনীতিক মহলের ‘ট্যুস ডে গ্রুপ’, বিভিন্ন কূটনীতিবিদদের হাঁকডাক, ক্ষমতাসীন বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করবার প্রতিটি প্রচেষ্টাই সাধারণ মানুষ বঙ্গীয় সুশীলদের বগলে নিয়ে পরাশক্তির ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখেছে। তাঁদের অনুমান মিথ্যা হয় নি। দেখা গেল সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে মাহফুজ আনাম দাবি করলেন তাঁদের লেখালিখির কারণেই মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকার ক্ষমতায় এসেছে।
সৎ মানুষ হিসাবে তারা ডক্টর ইউনূসকে খুঁজে পেয়েছিলেন। ডক্টর ইউনূস প্রকাশ্যে না এসে পেছনে থেকে সমর্থন যুগিয়েছিলেন। এতে তাঁর মান আজও কিছুটা রক্ষিত আছে। কিন্তু এরাই তাঁকে জরুরী অবস্থার অধীনে থেকে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পরামর্শ দিয়েছিল। তিনি ভুল পথে পা বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু একসময় সেই পথে আর এগোলেন না। বললেন, যাঁরা তাঁকে নামিয়েছিল তাঁরা তাঁকে নামিয়ে পিছু হটে গিয়েছে। সেটা রাজনৈতিক দল না করবার বাহানা হিসাবে হয়তো বলেছেন। এভাবে একটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোন পরিবর্তন আনা যায় না, এই উপলব্ধি ডক্টর ইউনূসের আছে কি না জানি না। কিন্তু জরুরী অবস্থার অধীনে রাজনৈতিক দল না করে স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারতেন। কিন্তু একটা সময়ে তিনি প্রকাশ্যে দলীয় রাজনীতিতে আগ্রহী নন সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার ইউনূস-বিদ্বেষ উৎকট সন্দেহ নাই সময়ে তা মিথ্যা বেহুদা অভিযোগ হলেও ডক্টর ইউনূসের বিরুদ্ধে মুজিব কন্যার গোস্বা করবার সঙ্গত কারণ অবশ্যই আছে। যেখানে প্রধান প্রধান জাতীয় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ সেখানে ডক্টর ইউনূস তাদের স্থান পূরণ করতে রাজনৈতিক দল করতে নেমেছিলেন। এর ফলে তাঁর গায়ে যে ময়লা লেগে গিয়েছে সেটা টের পেয়ে তিনি রাজনীতি থেকে দ্রুত সরে এলেও এখনও তা ধুয়ে ফেলা যাচ্ছে না। তাঁকে যারা রাজনীতিতে নামিয়েছিল তাঁদের দলে মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানও আছেন। ডক্টর ইউনূস ছিলেন তাঁদের ‘সৎ মানুষ’ মার্কা রাজনৈতিক ক্যান্ডিডেট। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির টানাপড়েনের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডক্টর ইউনূসের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ভুল রাজনৈতিক চিন্তা ও ভুল পদক্ষেপ তা নষ্ট করে দিয়ে গেছে। গণমাধ্যম সরকার গঠনে ও সরকার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। তেমনি রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্রগঠনেও গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আগামি দিনেও বাংলাদেশকে শক্ত হাতে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের বিচক্ষণ ভূমিকার প্রয়োজন হবে। এর কোন বিকল্প নাই। মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান অতীতে ভুল করেছেন বলে আগামিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন না বা রাখতে পারবেন না এটা আমি মনে করি না। এক এগারোতে কেন তাঁরা উদার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখেন নি তার ব্যাখ্যা তাঁরাই শুধু জানেন। নিয়ম কিংবা সাংবিধানিক বিধিবিধান না মেনে সেনাবাহিনীর ঘাড়ে চড়ে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মী ও ব্যবসায়ীদের কেন তাঁরা শায়েস্তা করতে নেমেছিলেন তার একটা ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই তাঁদের আছে। এ ব্যাপারে তাঁদের উপলব্ধিও নিশ্চয়ই আছে।
গণমাধ্যমের ভুলত্রুটি কিম্বা অন্যের লেখালিখির পর্যালোচনা আমরা করতেই পারি। যখনই তা করি তার উদ্দেশ্য বাংলাদেশে সামগ্রিক ভাবে চিন্তা বিকশিত করবার সুযোগগুলো –বিশেষত রাজনৈতিক পরিসর, রাজনৈতিকতা, ক্ষমতা, রাষ্ট্র ইত্যাদি সম্পর্কে সমাজের চিন্তাচেতনা যথাসম্ভব পরিচ্ছন্ন করে তোলা। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা স্রেফ ক্ষমতার জোরে আমাদের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার বিরোধীদের নিগৃহীত করবে এটা মেনে নেওয়া হবে চিন্তা, বিবেক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আত্মঘাতী। আমি অতএব আহ্বান জানাবো যাঁরা ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর রাজনীতির বিরোধিতা করেন তাঁরাও নীতিগত জায়গা থেকে রাষ্ট্র যখন যাকে তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হবেন। এই অতি প্রাথমিক নীতিগত জায়গা বিনষ্ট হলে গণতন্ত্র দূরে থাকুক বাংলাদেশে কোন ভাবেই আমরা কোন প্রকার ‘রাজনৈতিক পরিসর’ নির্মাণ করতে পারবো না। আমি জানি মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান ভাবেন নি ক্ষমতাসীনরা যখন মাহমুদুর রহমানকে অন্যায় ভাবে শাস্তি দিচ্ছে, দীর্ঘ দিন কারাগারে বিচার ছাড়া আটকে রেখেছে... সেই প্রকার দুর্দশার শিকার তাঁরা হবেন না। মাহমুদুর রহমানের নাগরিক ও মানবিক অধিকারের পক্ষে পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাদের যে দৃঢ় নীতিগত অবস্থান জারি রাখা জরুরি ছিল, সেই অবস্থান তাঁরা নেন নি। আজ তাঁরা নিজেরাই ক্ষমতাসীনদের রোষের শিকার হয়েছেন।
রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ হচ্ছে গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। এর সহজ অর্থ হচ্ছে সমাজে সমষ্টির স্বার্থ নিয়ে কথা বলবার পরিসর তৈরি করা। সমাজের অনেকের সঙ্গেই আমাদের চিন্তা, মত, সিদ্ধান্ত, ভাবনা ইত্যাদির বিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু আমরা সকলেই যদি সমাজের অন্তর্গত হয়ে থাকি তাহলে যাঁদের মতের সঙ্গে আমাদের মতের বিরোধ চরম তাঁদের কথা শোনার ও কথা বলার পরিসর নির্মাণের গুরুত্বকে যেন আমরা উপেক্ষা না করি। পরস্পরের মধ্যে কথা বলার মধ্য দিয়েই সমষ্টির ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষা রূপ লাভ করে। যদি আমরা মনে করি মতাদর্শিক ভাবে বিরোধীদের কথা বলার সুযোগ বন্ধ করে দিলেই সেই মতাদর্শ মরে যাবে তাহলে বুঝতে হবে আমরা গভীর কুয়াশার সাম্রাজ্যে বসবাস করছি। চিন্তাকে চিন্তা দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে আর তা করতে হলে সমাজে কথা বলার পরিসর শক্তিশালী করতে হবে। হবেই। এর কোনো বিকল্প নাই। আর এটা সফল ভাবে গণমাধ্যমই করে ও করতে পারে। কেন এক-এগারোর সময় মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি নির্মূল করবার জন্য মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনকে ক্ষমতায় আনলেন সে সম্পর্কে আমার নিজের ব্যাখ্যা আছে। দুই একটি লেখায় আমি তা উল্লেখও করেছি। সেটা হোল বাংলাদেশে লিবারেলিজম বা উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো উদার রাজনীতিতে আস্থাশীল নয়। এটা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চিন্তা চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে বড় সড় বিপদের জায়গা। তারা উদার রাজনৈতিক চিন্তার পক্ষের শক্তি নয়। এক এগারোর সময় দেখা গেলো তারা নিয়মতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক চিন্তা-চেতনারও বিরোধী। দ্বিতীয়ত দুটো পত্রিকাই রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ এবং সমাজে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জারি রাখার গুরুত্বকে খাটো করে দেখে। সুশীলদের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে তারা রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করে, কিম্বা নিজেরা রাজনৈতিক দলের বিকল্প হতে চায়। এই উচ্চাশা ভয়ঙ্কর। এই দুটো পত্রিকার রাজনৈতিক চেতনার অভাব পত্রিকা দুটিকে এক এগারোর সময় আওয়ামী লীগের ভাষায় অসাংবিধানিক পথে রাজনৈতিক দল বিলোপ... বিশেষত শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে নির্মূল করবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গিয়েছিল। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার রাজনীতি বাংলাদেশকে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনায় পর্যবসিত করেছে- এতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু তার সমাধান তাদের নির্মূল করা নয়। বরং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরো সচল ও সজীব করে তোলা। দলবাজি নয়, বরং রাজনীতির সজীব প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই নতুন রাজনীতির পথ বের করে আনা। সেটা সম্ভব। অবশ্যই সম্ভব, যদি সুশীলদের বিরাজনীতিকরণের চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে আমরা সাধারণ মানুষকে আস্থায় নিতে পারি। তাঁদের আবেগ, ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা, সংকল্প, ইত্যাদির প্রতি মনোযোগী থেকে তাকে প্রকাশের ও তর্কবিতর্কের সুযোগ তৈরি করি। সামষ্টিক ইচ্ছা ও অভিপ্রায় নির্মাণের প্রক্রিয়া জারি রাখি। ইত্যাদি। দৈনিক প্রথম আলোর জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে পত্রিকাটির গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু এই শক্তিকে ইতিবাচক ভাবে কাজে না খাটিয়ে দৈনিক প্রথম আলো একদিকে তাদের পত্রিকার অভ্যন্তরে সক্রিয় আওয়ামী ও দিল্লি প্রেমিকদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। খেয়ে না খেয়ে খালেদা জিয়া ও তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের বিরোধিতা করা তার খাসিলত হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে তাঁরা যুক্ত থেকেছে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার পরিবারকে রাজনীতি থেকে নির্মূল করবার তৎপরতায়। যার ফল কারো জন্যই শুভ হয়নি এটা খোদ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের কাজটাই গোড়ায় মেরে ফেলার শামিল।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপির রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশ ও গতিশীল উন্নয়নের পথে বাধা। নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার দিক থেকে দেখলেও এদের সমালোচনা বা বিরোধিতা মোটেও অযৌক্তিক নয়। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা ও দুর্নীতির জায়গা থেকে দেখলে এই দুটি দলের রূপান্তর কিম্বা এদের হাত থেকে নিষ্কৃতি ছাড়া বাংলাদেশের গতিশীল বিকাশ সম্ভব নয়। এসব নিয়ে তর্ক বা আপত্তি করবার কিছু নাই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে। সেটা নিশ্চয়ই এই ধরনের দলের বিপরীতে সেনা সমর্থিত সরকার কায়েম করা নয়। এদের বিপরীতে জয়ী হতে হলে বাংলাদেশকে বেশ দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জারি রেখে তার ভেতরেই রাজনৈতিক সচেতনতা নির্মাণের পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। একেই আমি রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ বলে থাকি। গণমাধ্যম এই ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো সে কাজে নিবিষ্ট না থেকে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনকে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছে। এই দুই সম্পাদকের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার রুষ্ট হবার এটাই প্রধান কারন। যদিও শেখ হাসিনা নিজেও দাবি করেছেন এক এগারো সরকার তাঁদেরই আন্দোলনের ফল। এবং এক এগারোর সরকারের সকল অপকর্ম তাঁরা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এরপর থেকে মাহফুজ আনামকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দোষে অভিযুক্ত করবার যুক্তি থাকে না। কিম্বা থাকলেও খাটো হয়ে যায়। শেখ হাসিনা যদি মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনকে ক্ষমা করে দিতে পারেন তো মাহফুজ মতিউরকে ক্ষমা করতে পারছেন না কেন?
এর একটা প্রহসনমূলক দিক আছে। মাঝে মধ্যে ইতিবাচক অর্থে উদার বা লিবারেল চিন্তাভাবনার নমুনা দেখালেও ডেইলি-স্টার প্রথম আলো শেষাবধি দুটো অঘটন ঘটায়। একটি হচ্ছে দলবাজ ভূমিকা পালন করার কাজে নিজেদের নামিয়ে আনা। সেটা তারা করে সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে তাদের অনুমানের জন্য। এই অনুমান হচ্ছে বাংলাদেশে সেকুলারিজম রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করতে হবে। দাঁড়াতে হবে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে, এদের নির্মূলের কাজে। বাংলাদেশের সেকুলারদের জন্মগত অসুখের কারণে তাঁরা মনে করে ইসলামের সঙ্গে কিম্বা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে গণতন্ত্র ও ‘ধর্ম নিরপেক্ষতার’ প্রশ্নে কোনো নেগোশিয়েশান্স, চিন্তার পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠনের কোন সুযোগ নাই। ইসলামপন্থীদের সাথে কোন রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ, বোঝাপড়া তৈরি করার কোনো সুযোগ তৈরি করতে এরা চায় না। বরং তাঁদের কাজ হচ্ছে খেয়ে-না-খেয়ে ইসলাম সংশ্লিষ্ট যেকোনো কিছুর বিরোধিতা করা। এটাই প্রহসনের জায়গা। দুটো পত্রিকাই মূলত বিএনপির রাজনীতির বিরোধিতা করে। কিন্তু তাতেও দুই সম্পাদক শেখ হাসিনার মন জয় করতে পারেননি। পারেননি কারণ তাঁরা খোদ শেখ হাসিনাকেই নির্মূল করে বোঝাতে চেয়েছেন শেখ হাসিনার ইসলাম নির্মূলের কাজটা তাঁরা আরো ভালো পারবেন।
ইদানীং প্রথম আলোতে দেখছি ইসলাম সম্পর্কে ভুল চিন্তা সামাল দেবার জন্য তাঁদের সম্পাদকীয় পাতায় ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বয়ান দেওয়া। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে লেখালিখি দেখে আমি খুশি হয়েছি। কিন্তু দেখলাম এটা নিছকই ধর্ম প্রচার মাত্র। ইসলামের আদৌ কোনো আদর্শগত ও রাজনৈতিক চিন্তা প্রথম আলোর উদার রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না তার বিচার নয়। সম্ভবত তারা ইসলামপন্থীদের সহানুভূতি চাইছে। তবে সেটা করতে গিয়ে ইসলাম সম্পর্কে পর্যালোচনামূলক লেখালিখি না করে ধর্ম শিক্ষা বা ধর্মপ্রচারকের ভূমিকায় নামাটা হচ্ছে প্রথম আলোর সবচেয়ে হাস্যকর ভূমিকা। এই সব জায়গাতেই প্রথম আলোর চূড়ান্ত হিপোক্রাসি ধরা পড়ে। সত্য এই যে ‘ইসলাম’ একাট্টা কিছু নয়। ইসলাম নানান কিসিমের নানান মতাদর্শের নানান রাজনীতির। প্রশ্ন হচ্ছে উদার ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য ইসলাম প্রণোদিত কী ধরনের চিন্তা ডেইলি স্টার বা প্রথম আলোর দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ? তাকে তারা কিভাবে হাজির করে সেটাই মুখ্য বিষয়। ইসলাম প্রচার তাদের কাজ না। ধর্মের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সমাজে ইতিবাচক কথাবার্তা ও ডায়ালগের শর্ত তৈরি করা এখনও বড় একটি কাজ। যে কাজ রাজনৈতিক পরিসর গড়ে ওঠার শর্ত নিশ্চিত করে। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের সমালোচনা অব্যাহত থাকবে। উভয়েই করপোরেট স্বার্থের পাহারাদার। সেটা ভিন্ন একটি বিতর্ক। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে গণমাধ্যমের সঙ্গে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্পর্ক বিচার না করে বিচ্ছিন্ন ভাবে শুধু দুটো পত্রিকার কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার চরিত্র আলোচনা সঙ্গত হবে না। বরং এখন মাহফুজ আনামকে যেভাবে ক্ষমতাসীনরা শায়েস্তা করতে চাইছে তার বিরোধিতা কর্তব্য।
শেষ করবার আগে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ‘দৈনিক আমার দেশ’ বন্ধ করে দেবার পর তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ৩ জুন ২০১০ তারিখে মাহফুজ আনাম যে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন পাঠকদের তা মনে করিয়ে দিচ্ছি।
'As a newspaper upholding journalistic professionalism and freedom, we have, however, found it difficult at times to appreciate the brand of journalism that the Amar Desh was pursuing. Still it is our firm conviction that a dissenting voice, however venomous and thinly founded, must be allowed space because it is an integral part of a functioning democracy, a touchstone of free press and an axiom that the people will be the ultimate judge of all opinions. No matter how opaque or squinted or biased a report and a view-point maybe for or against somebodz it must get a free play not only to enrich environment of free press but also strengthen the institutions of democracy'.
‘যে সাংবাদিকতার পেশা ও স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাসী সেই দিক থেকে দৈনিক আমার দেশ-এর সাংবাদিকতা আমাদের পক্ষে সবসময় প্রশংসা করা কঠিন, তবুও এটা আমাদের বিশ্বাস যে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তা যতোই বিষোদ্গারী হোক ও হালকা ভিত্তির ওপর দাঁড়াক- তাকেও অবশ্যই জায়গা করে দিতে হবে। কারণ তা গণতন্ত্র সক্রিয় রাখার জন্য জরুরি, স্বাধীন সংবাদপত্র আছে কি না তা বিচারের কষ্টিপাথরও এটা আর জনগণই শেষ বিচারক এই নৈতিক মানদণ্ড কার্যকর কি না তার প্রমাণও এটাই। অস্পষ্ট, একচোখা অথবা পক্ষপাতদুষ্ট হোক বা না হোক সাংবাদিকতাকে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে দিতে হবে, যেন শুধু মুক্ত সংবাদপত্রের পরিবেশ বিরাজ করা নয়, একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণতন্ত্রকেও তা শক্তিশালী করে’।
বলা হচ্ছে দৈনিক আমার দেশ এবং মাহমুদুর রহমানের সাংবাদিকতা অস্পষ্ট, অপরিচ্ছন্ন, একচোখা, পক্ষপাতদুষ্ট ইত্যাদি। বিরোধী মতাদর্শ হিসাবে দৈনিক আমার দেশও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো সম্পর্কে একই কথা বলতে পারে। ভিন্ন মতাদর্শের বিরোধিতা ডেইলি স্টার করতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ডেইলি স্টার কি আদৌ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে সংহত করবার কাজ করে? বা করেছে? যে দাবি তারা করছে তা মোটেও সত্য নয়। যদি এটা সত্য হোত তাহলে গোয়েন্দাদের দেয়া প্রতিবেদন ছাপাতে ডেইলি স্টার অস্বীকার করত। কই, মাহমুদুর রহমান তো ছাপেন নি। এক এগারোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন মাহমুদুর রহমান। তাহলে সাংবাদিকতায় অস্পষ্ট, পক্ষপাতদুষ্ট ও একচক্ষু কারা? দৈনিক আমার দেশ নয়, বরং ডেইলি স্টার। ডেইলি স্টার এখানে যা লিখেছে তা তাদের হিপোক্র্যাসির একটা নজির, মাত্র। তার সঙ্গে আমি একমত নই, কিন্তু এখানে যে নীতিগত প্রশ্ন তোলা হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তোলার জন্য তার মূল্য আছে। মাহমুদুর রহমানের সমালোচনার আগে ডেইলি স্টারকে ভাবতে হবে তাদের ইসলামবিদ্বেষের বিষ মোটেও কম ভয়ঙ্কর ও বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য কম ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এর বিচার জনগণকেই করতে দেওয়া উচিত। ডেইলি স্টার যা বলছে তা তারা নিজেরা মানে না জানি, তবু এই নীতির আমি দৃঢ় সমর্থক। এই কারণেও মাহফুজ আনামকে সমর্থন করা নাগরিক হিসাবে আমার নৈতিক কর্তব্য মনে করি। এটাই সকলের স্পিরিট হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে উদার বা সত্যকারের লিবারেল চিন্তাচেতনার ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ডেইলি স্টার ও দৈনিক প্রথম আলোর রাজনীতি যতোটা এই রাজনীতিকে সততার সঙ্গে বহন করতে পেরেছে তাদের সাফল্যও সেই মাত্রাতেই ঘটেছে। কিন্তু যখনই তারা উদার রাজনীতি পরিহার করে অনুদার রাজনৈতিক নীতি ও কৌশল অবলম্বন করেছে তখনি তা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে।
এই উপলব্ধিটুকু শুধু সবার ঘটুক, আমরা যেন এগিয়ে যেতে পারি।
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। ১৩ ফাল্গুন ১৪২২। শ্যামলী।

জনগণ ও রাজনীতিক by এমাজউদ্দীন আহমদ

বাংলাদেশের জনগণের কাছে গণতন্ত্রের আবেদন অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গণতন্ত্রের প্রতি তাদের দুর্বলতা প্রবল। যুগে যুগে তাই জনগণ গণতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। গণতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আদর্শ ব্যবস্থা বলে সব সময় চিহ্নিত করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সৈনিকরূপে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ত্যাগ স্বীকারও করেছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশীদার হয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রণোদনা লাভ করে পাকিস্তানের বলদর্পী শাসনকারী এলিট গোষ্ঠী যখন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার পথ রুদ্ধ করে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় এভাবে যখন পেশিশক্তির মাধ্যমে জনগণের রায়কে বিধ্বস্ত করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এখন পর্যন্ত গণতন্ত্র রয়ে গেছে তাদের আকাঙ্ক্ষায়, তাদের প্রত্যাশায়। শুধু বিদ্যমান রয়েছে তাদের দুচোখ ভরা স্বপ্নে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাদের কাছে এখনো সেই মোহনীয় সোনার হরিণ। আকর্ষণীয় কিন্তু বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। কাক্সিক্ষত, কিন্তু তাদের জীবনকে স্পর্শ করেনি।
পাশ্চাত্যের উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্র সফল হয়েছে প্রধানত দু’টি কারণে। এক. যে সামাজিক উপত্যকায় গণতন্ত্রের সুর ঝঙ্কৃত, তা মোটামুটিভাবে মসৃণ এবং সমতল। বৈষম্য, তা সম্পদসৃষ্ট হোক আর জাতিগত বা ধর্মের ভিন্নতাজনিত হোক, ওই সব সমাজে অনতিক্রম্য নয়। নয় অজেয়। আজ যিনি নির্ধন, আগামীকাল সমাজপ্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার ফলে তিনিও শীর্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন। জাতি-ধর্ম বা নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা তার অগ্রগতির অভিযাত্রা রুদ্ধ করতে সক্ষম নয়। তাই সমতল সমাজ ভূমিতে নাগরিকদের জীবন হয়ে উঠেছে শ্যামল, সমৃদ্ধ, সুষমামণ্ডিত।
দুই. অর্থনৈতিক সুখ-সুবিধাও ওই সব সমাজে এমনভাবে বিস্তৃত যে, প্রত্যেকেই জীবনের সর্বনিম্ন চাহিদা মিটিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন। যার কোনো কর্মসংস্থান নেই, তিনিও দরিদ্র্যের অভিশাপে অভিশপ্ত নন। এসব ক্ষেত্রে সমাজই এগিয়ে আসে ওই সব দুস্থ ও দরিদ্র্যের সর্বনিম্ন প্রয়োজন মেটানোর জন্য, সহায়তার ডালা সাজিয়ে। দেশের আইন এমনভাবে বিন্যস্ত যে, শুধু আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেই সবাই মানবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম। এসব সমাজে কাউকে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হতে হয় না। সুতরাং উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হোন, দেখবেন গণতন্ত্রকে সফলভাবে বাস্তবায়নের সব শর্তই প্রায় সামাজিক, রাজনৈতিক নয়। নয় রাজনৈতিক কাঠামো বা রাজনৈতিক কার্যক্রম সংক্রান্ত।
কার্যত পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল সামাজিক এক ব্যবস্থারূপে। সমাজেই তার দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়। পরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার সার্থক প্রয়োগ ঘটে। আগে সমাজ গণতান্ত্রিক হয়েছে। দেখাদেখি পরে রাষ্ট্র হয়েছে গণতান্ত্রিক। বাংলাদেশ, এমনকি বিশ্বের এই অংশে রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, বৈষম্যক্লিষ্ট হাজারো প্রকরণে বিভক্ত, জাতি-ধর্মের ভিন্নতাপীড়িত সমাজে। এসব জনপদে সামাজিক মূল্যবোধ এখনো গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি। হয়ে ওঠেনি পারস্পরিক সমঝোতা ও সহিষ্ণুতার অমৃতরসে সিক্ত। সহনশীলতার পাঠ সমাজজীবনে এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। তাই এসব সামাজিক মূল্যবোধহীন জনপদে রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতি পদে হোঁচট খাচ্ছে। প্রতিটি ক্ষণ টিকে রয়েছে টলটলায়মান অবস্থায়, হাজারো অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। তাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার নির্দেশনা হলো- সৃজনশীল রাজনৈতিক নেতাদের গতিশীল নেতৃত্বের আলোকে গণতন্ত্রের সঠিক বিকাশের জন্য সমাজে গণতন্ত্রের জন্য উর্বর ক্ষেত্র রচনা করা। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, রাজনৈতিক নেতারা এখনো তেমন সৃষ্টিশীল উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। এ দিকে দৃষ্টি দেয়ার সময়ও পাননি। এসব বিষয়ে খেয়ালও করেননি। এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রের এমন মহামূল্যবান মণি-মুক্তা তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতাকে তারা শুধু দেখেছেন ব্যক্তিগত এবং দলীয় পর্যায়ে প্রভাব-বৈভব অর্জনের মাধ্যমরূপে। কখনো ভেবে দেখেননি, রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে পুরো সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ ভুলটি প্রায় সবাই কমবেশি করছেন এবং করেছেন। যারা ক্ষমতা দখলে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তারাও এ বিষয়ে সজ্ঞাত নন।
বাংলাদেশের জন্মক্ষণ থেকেই এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কোনো পর্যায়ে এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে বলে মনে হয় না। পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য জনগণের সচেতনতা যতটুকু ভূমিকা রেখেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভূমিকা ছিল রাজনৈতিক নেতাদের গণতন্ত্রকে সফল করা তথা সাংবিধানিক নিয়মতান্ত্রিকতাকে বাস্তবায়িত করার দৃঢ়সঙ্কল্প এবং সৃজনশীল মনমানসিকতার।
বাংলাদেশে প্রথমটি বিদ্যমান থাকলেও দ্বিতীয়টির বড় আকাল দেখা যায় সব সময়। এই অভাবটা পূরণ করতে হবে আমাদের রাজনীতিকদের। আমার বিশ্বাস, তারা তা পারবেন। তাদের শুধু একটু আকাশমুখী হতে হবে। মাত্র দুই হাজার ফুট উঁচুতে উঠে এই মাটিকে যেমন সুদৃশ্য ছবির মতো সুন্দর মনে হয়, তেমনি আদর্শিক অঙ্গীকারের খানিকটা ধারণ করে অগ্রসর হলে যে সমস্যাগুলোকে সবচেয়ে জটিল বলে মনে হয়, তা-ও নিয়ন্ত্রণে আসবে। পারবেন কি আমাদের রাজনীতিকেরা এ দেশের গণতন্ত্রকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে? জনগণ কিন্তু চেয়ে রয়েছে তাদেরই দিকে।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

স্বাধীন মত প্রকাশকারীদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ

স্বাধীন মত প্রকাশকারীদের জন্য ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমনের এক ধরনের গতিধারা (প্যাটার্ন) দেখা যাচ্ছে দেশটিতে। তীব্র চাপের মুখে রয়েছে নিরপেক্ষ গণমাধ্যম। হত্যা করা হয়েছে কয়েকজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার ও প্রকাশককে। কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করার ওপর আইনগত নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছে এনজিওসমূহ। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৫/১৬-এ বাংলাদেশ সমপর্কে এসব বলা হয়েছে। ৪০৯ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গত বছরের রাজনৈতিক সহিংসতা ও দেশের মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা। বিশেষ করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুম, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার, পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি, নারী ও মেয়েদের ওপর সহিংসতা, মৃত্যুদণ্ড ও আইসিটি’র বিচার প্রক্রিয়া, ইত্যাদি প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ অনুচ্ছেদের ভূমিকায় বলা হয়েছে, সরকারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে যাত্রীবাহী বাস ও অন্যান্য যানবাহনে পেট্রোল বোমা হামলা হলে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। বিভিন্ন মেয়াদে কারাগারে অন্তরীণ হন শত শত বিরোধী দলীয় সমর্থক। প্রায়ই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কারণে এসব করা হয়েছে। ৯ জন ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার ও প্রকাশকের ওপর হামলা হয়েছে। এদের পাঁচজন মৃত্যুবরণ করেছেন। ৪০ জনেরও বেশি মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে বিরোধী দল বিএনপি’র নেতৃত্বে একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন সহিংস আকার ধারণ করে। কয়েক শ’ বাস ও অন্যান্য যানবাহনে হামলা চালানো হয়। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে হামলায় পেট্রলবোমা ব্যবহারের অভিযোগ উঠে। বহু যাত্রী এতে হতাহত হয়। কিন্তু এসব হামলায় সরাসরি জড়িত কাউকেই বিচারের আওতায় আনা হয়নি। পুলিশ বিএনপি’র জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দকে আটক করে অগ্নিসংযোগের দায়ে অভিযুক্ত করে। এদের মধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও রয়েছেন। ওই সময় প্রায়ই কয়েক সপ্তাহ বা মাসের জন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হতো। বিরোধী দলের শত শত নেতাকর্মীকে বহুদিন এমনকি মাসখানেক আটক রেখে মুক্তি দেয়া হয়েছে। এদের কারও বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দেশটিতে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিক। ২৮শে সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ই নভেম্বরের মধ্যে এক ইতালিয়ান ত্রাণকর্মী ও এক জাপানি নাগরিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। বন্দুক হামলা হলেও প্রাণে বেঁচে গেছেন এক ইতালিয়ান ডাক্তার। জুলাইয়ে চুরির দায়ে প্রকাশ্যে সামিউল ইসলাম রাজন নামে ১৩ বছরের একটি শিশুকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এতে দেশজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম নেয়। শিগগিরই সরকার এ হত্যার ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গণহারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত অন্তত ১৬ জনের বিচার গত বছরের শেষ পর্যন্ত চলছিল। তবে স্বাধীনতাপন্থিদের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়নি।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা: কর্তৃপক্ষের সমালোচনাকারী নিরপেক্ষ গণমাধ্যমগুলো তীব্র চাপে পড়েছে। অক্টোবরে সরকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে দেয়, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে বিজ্ঞাপন দেয়া হলে শাস্তি দেয়া হবে। এ দু’টি পত্রিকা তাদের সমালোচনামূলক অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল। নভেম্বরে একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সুপারিশ করে যে, সংসদের সমালোচনা করায় দুর্নীতি-বিরোধী বেসরকারি সংস্থা টিআইবির নিবন্ধন বাতিল করা উচিত। ঢাকার একটি আদালত নাগরিক সমাজের ৪৯ জন সদস্যের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনে। এই ৪৯ জন বিচার প্রক্রিয়াকে অন্যায্য বলে সমালোচনা করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান ও অন্যান্য যোগাযোগের অ্যাপ্লিকেশন নভেম্বরে বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এটি নিষেধাজ্ঞা আরোপের শামিল।
ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করায় ব্লগারদের ওপর হামলা হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমে এসেছে, উগ্রপন্থিরা ওই হামলা চালিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে চাপাতি হাতে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে অভিজিৎ রায়কে। তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা বেঁচে যান। আগস্টে ওয়াশিকুর রহমান, নিলয় নীল ও অনন্ত বিজয় দাস নামে আরও তিন ব্লগারকে হত্যা করা হয়। অক্টোবরে, ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যের এক প্রকাশককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আরেক প্রকাশক ও দুই ধর্মনিরপেক্ষ লেখক হামলায় বেঁচে যান। ব্লগার ও প্রকাশকদের বিরুদ্ধে লেখালেখির মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী সহ সরকারি কর্তৃপক্ষ।
গুম: সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বহু মানুষকে আটক করেছে। কিন্তু পরে তাদেরকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালিত একটি জরিপে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশে অন্তত ৪৩ জন ব্যক্তি গুম হয়েছে। এদের মধ্যে দুইজন নারীও রয়েছেন। ছয়জনকে পরে মৃত পাওয়া গেছে। চারজনকে আটক করে পরে মুক্তি দেয়া হয়েছে। পাঁচ জনকে পুলিশের হেফাজতে পাওয়া গেছে। বাকি ২৮ জনের সমপর্কে এখনও কিছু জানা যায়নি। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ৭ ব্যক্তিকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে আটক র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচার অব্যাহত রয়েছে। এ মামলার বাইরে অন্য ঘটনায় জড়িত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও কর্মকর্তাদের কাউকেই বিচারের আওতায় আনা হয়নি।
নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার: পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের প্রচলন অনেক বেশি। নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করার ঘটনা বিরল। মার্চে, জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষাকবজ নিয়ে নালিশ জানিয়েছিল। পুলিশ কর্তৃপক্ষ যুদ্ধাবস্থায়, যুদ্ধের হুমকি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জরুরি অবস্থার সময় করা নির্যাতন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। এ সময় জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ও বেসামরিক প্রশাসনের নির্দেশে নির্যাতন হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম: জানুয়ারিতে সরকারের জারিকৃত নির্দেশনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে মানুষের সফর ও অনুষ্ঠান আয়োজনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ‘ইন্ডিজেনাস’ জনগণের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে সরকারের বাধ্যবাধকতা, বৈষম্য থেকে মুক্তি, স্বাধীনভাবে চলাচলের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ আয়োজন ও সংগঠন করার স্বাধীনতার লঙ্ঘন ওই নির্দেশনা।
নারীর প্রতি সহিংসতা: বাংলাদেশ জাতীয় নারী আইনজীবী সমিতির মতে, জানুয়ারি ও মে মাসের মধ্যে ২৪০টিরও বেশি ধর্ষণের অভিযোগ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, জ্ঞাত ধর্ষণের ঘটনা সামপ্রতিক সময়ে বেড়েছে, তবে অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা খুবই কম। সময়োপযোগী ও কার্যকরী তদন্তের অভাবের কারণেই এমনটি ঘটছে। অনেক নারী ও মেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে ধর্ষণের ঘটনা জানাতে অনাগ্রহী। ধর্ষণের শিকার নারী ও মেয়েদের প্রমাণ করতে হয়, তাদের ওপর জোর প্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়েও তাদের যেতে হয়।
মৃত্যুদণ্ড: সামিউল আলম রাজন হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ছয়জন সহ বিভিন্ন মামলায় অন্তত ১৯৮ জনকে ফাঁসির সাজা দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে ঐশী রহমান, যিনি ২০১৩ সালে নিজের পিতা-মাতাকে হত্যার দায়ে ফাঁসির সাজা পান। তার আইনজীবীদের যুক্তি, কথিত খুনের সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছরেরও কম। তাই তার ফাঁসির সাজা হতে পারে না। তবে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ঐশীর বয়স ১৮ ছিল বলে উপসংহার টানা হয়েছে। আদালত ওই সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার ঘটনা তদন্তে প্রতিষ্ঠিত দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আরও চার ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দিয়েছে। এ ট্রাইব্যুনালের কার্যপ্রণালিতে গুরুতর অনিয়ম ও ন্যায়বিচারের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে একটি সাংবিধানিক অনুচ্ছেদের মাধ্যমে এ আদালতের বিচারিক এখতিয়ারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গতকাল তাদের এই বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে ২০১৫ সালে বিশ্বের ১৬০টি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার খর্ব হওয়ার এক ধরনের গতিধারা পরিলক্ষিত হয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব সলিল শেঠি বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বলেছেন, ‘আপনার অধিকার হুমকির মুখে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আমাদের অধিকারই নয় আমাদেরকে রক্ষা করার আইনকানুন ও ব্যবস্থাও হুমকির মুখে।’

‘ইউসুফ নবী’ কোনো প্রেম করেননি by মাসুদ মজুমদার

১৪ ফেব্রুয়ারি ‘ভালোবাসা দিবস’ পালিত হয়েছে। আয়োজন ছিল বহুমাত্রিক। প্রয়োজন ছিল সীমিত। বহুজাতিক কোম্পানি ও বণিকদের কাছে এসব দিবসের মাহাত্ম্য কম, প্রয়োজন বেশি। ঈদ, পূজা, বৈশাখসহ বিভিন্ন দিবসের বাণিজ্যিক মূল্য বেশুমার। মানুষ আগ্রহী না হলেও বণিকেরা বাণিজ্যের স্বার্থে এর আয়োজন রমরমা করে তুলবে। তাই প্রতিরোধ বা এড়ানোর চিন্তা না করে এসব দিবসকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে কিছু ভালো কাজের প্রতিযোগিতার দিকে মনোযোগ দেয়া ভালো। এক সময় এর প্রয়োজন ফুরাবে। নতুন অবয়বে নয়া ধারণা প্রাধান্য পাবে। আগে উদযাপিত হতো এখন হয় না, এমন অনেক দিবস হারিয়ে গেছে। নতুন যোগ হয়েছে অনেক কিছু। আজ যা আছে তাও এক সময় থাকবে না। তাই ‘গেল গেল’ রব না তুলে নির্দোষ বিনোদনটুকু আর কল্যাণকর দিকগুলো আত্মস্থ করে পরিমার্জিত রূপ দেয়া ভালো। এই দেশে ভালোবাসা দিবসের রূপকার ‘যায়যায়দিন’ ও লাল গোলাপ খ্যাত শফিক রেহমান। তার সোজাসাপটা কথা- ‘আসলে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বলে কিছু নেই।’ একই সাক্ষাৎকারে তিনি ভালোবাসার একটা কালজয়ী সংজ্ঞাও দিয়েছেন। তার মতে- ‘মমত্ববোধ এবং শ্রদ্ধাবোধের মিশ্রণই হচ্ছে ভালোবাসা।’
কিছু বনি আদম ও নানা কিসিমের প্রযুক্তি বণিক ভালোবাসাকে যৌন উৎপীড়ন পর্যন্ত নামিয়ে দিয়েছে। মজার ব্যাপার যে, ভালোবাসার রঙ ছড়ানো বক্তব্যে ধর্মকেও সাক্ষীসাবুদ বানানো হয়েছে। রাধা-কৃষ্ণ এবং কিছু দেবদেবীর প্রসঙ্গ তোলা হয়। কথায় বলে ‘আমার জন্য যা পাপ, দেবদেবীর জন্য সেটা প্রেমকেলি বা লীলাখেলা।’ বলা হয়Ñ ‘প্রেম করেছে ইউসুফ নবী, তার প্রেমে জুলেখা বিবি গো।’ কারো কারো কাছে এ গানও যেন ভালোবাসা দিবসের প্রেরণা হয়ে ধরা দিয়েছে। অথচ ইউসুফ আ: কোনো প্রেম করেননি, বরং একতরফা পরকীয়া ও প্রেমের নামে নষ্টামির মায়াবী জাল ও ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে আল্লাহর নবীর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। প্রেমে প্রলুব্ধ হওয়ার চেয়ে কারাজীবন শ্রেয় ভেবেছেন। তার প্রেম বিষয়ক ডাহা মিথ্যা কথাটি কুরআন-বাইবেলও চ্যালেঞ্জ করেছে। বাইবেলে ‘জোসেফ’ অর্থাৎ হজরত ইউসুফ আ: বহুবার আলোচিত হয়েছেন। এ ছাড়া যেসব প্রেমকাহিনী, নাটক ও উপন্যাস চরিত্র আমাদের আকর্ষণ করে, তারা উল্লেখযোগ্য নাট্যকার ও ঔপন্যাসিকের অমর সৃষ্টি। বিভিন্ন গ্রিক, রোমান, আরব্য পুরাণ কাহিনী ও ভারতীয় লোকগাথা আর রূপকথারই সমষ্টি। প্রেম বিষয়ক বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। কিছু যৌবনের তাড়না। কিছু সঙ্গদোষের বাহানা। নারী-পুরুষের অসংযত ও সহজাত প্রবৃত্তিও প্রভাব ফেলে। বাস্তবে প্রেমপ্রীতি-ভালোবাসা একধরনের আবেগ। কিছু ভালো লাগা বস্তুতান্ত্রিক ভাবনার ঊর্ধ্বে যায় না। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। তার পরও ক’টি নাটক-উপন্যাসের আলোচিত সাহিত্য, মানে অমর প্রেমকাহিনী সম্পর্কে খানিকটা আলোকপাত করা যাক।
পুঁথিসাহিত্য ও সিনেমা শিল্পে ইউসুফ-জুলেখার যে প্রেমগাথা আবেগমথিত ভাষায়, কাব্যরসে সিক্ত করে উপস্থাপন করা হয়, সেটা কল্পনার বিষয়। নবী-রাসূলদের নিয়ে এ ধরনের কাহিনী একেবারেই উদ্ভট, যার কোনো ভিত্তি নেই। কেউ কেউ পারস্যের কবিদের বরাতে এবং মোহাম্মদ সগিরের নামে বাংলায় কাহিনীকাব্যের মধ্যে একটি সরস গল্প ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছেন; যার সাথে পয়গম্বর হজরত ইউসুফ আ:-এর কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ আগ্রহী হলে পবিত্র কুরআনের ১২ নম্বর সূরা ইউসুফ পড়ে দেখতে পারেন। তাতে গল্পের আমেজ পাবেন। প্রকৃত সত্যটাও উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। শিরি-ফরহাদও একটি কল্পিত চরিত্র। অবশ্য পারস্যের সাসানীয় বংশের শাসক দ্বিতীয় খসরু পারভেজের স্ত্রীর নাম ছিল শিরি। তবে ফরহাদ নামটি পুরোটাই কল্পিত। মহাকবি ফেরদৌসির শাহনামায় এ গল্পটির প্রকৃত অবয়ব কী, তা জানি না।
লাইলি-মজনু আরব্য উপন্যাসের একটি অমর প্রেমগাথা বা কাহিনী। উমাইয়া শাসনামলের একটি ঘটনা, যা সপ্তম শতকের, সেটি দ্বাদশ শতকে ডালপালা গজিয়ে মহাকবির কলমে সাহিত্য চরিত্রের মর্যাদা পায়। নিখুঁত সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে এমন এক সংবেদনশীলতা দিয়ে চরিত্রগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে পাঠক অবচেতন মনেই একধরনের বাস্তবতার ছোঁয়া অনুভব করতে থাকেন। লাইলির শরীরের ব্যথা ও কষ্ট মজনু অনুভব করত। লাইলিও অনুভব করত মজনুর শরীরের কষ্ট ও ব্যথা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর সমর্থন হয়তো মিলবে না, কিন্তু সাহিত্যের আবেগ আলাদা বিষয়। কিংবদন্তি হচ্ছে, মজনুর নাম কায়েস। তবে কায়েস নামে প্রেমে উন্মাদ এক বেদুইনের বর্ণনা পাওয়া যায় আরব্য উপন্যাসে। এটাকে স্বর্গীয় প্রেমের রূপক ও উপমা দেয়া হয়। ‘দুই দেহ এক আত্মা’র প্রেমকাহিনী দিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা। রচিত হয় গান। নানাভাবে বিভিন্ন ভাষায় গানটি স্থান পেয়েছে। ব্যর্থ প্রেমের এ কাহিনী শেষ পর্যন্ত লোকগাথা হয়ে নানাভাবে পুঁথিসাহিত্যকেও সমৃদ্ধ করেছে। জাতীয় কবি নজরুলও আলোড়িত হয়ে তার গানে তুলে আনেন, ‘লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনু গো, আঁখি খোল।’
জগৎ ও শতাব্দী খ্যাত ইংরেজ লেখক উইলিয়াম শেক্সপিয়রের কালজয়ী নাটক ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’। প্রেমের গল্পগুলোর মধ্যে সেরা ও অসাধারণ। বিষপানে মৃত্যুর মাধ্যমে নাটকটিতে নায়ক-নায়িকার বিয়োগাত্মক পরিণতি দেখানো হয়েছে, যা দর্শকমনে রেখাপাত করে। নায়ক-নায়িকার প্রেমের বাধা, সংশয়, টানাপড়েন, ভুল বোঝাবুঝির পথ ধরে ত্যাগ ও তিতিক্ষার উপমা হয়ে এটি যেন জীবন্ত এক প্রেমকাহিনী হয়ে উঠেছে। অথচ এটি একটি কালজয়ী নাটক মাত্র। রোমিও-জুলিয়েট এখন প্রেমিক-প্রেমিকার রূপক।
একইভাবে ‘অ্যান্টোনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা’ শেক্সপিয়রের আরেকটি অমর সৃষ্টি। নায়িকা ক্লিওপেট্রা অনিন্দ্য সুন্দরী মিসরীয় রানী। নায়ক তার প্রধান সেনাপতি অ্যান্টোনি। তাদের প্রেমকাহিনী-নির্ভর এই গল্পের একটি দূরতম ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে বলে মনে করা হয়। এ ঐতিহাসিক চরিত্র দু’টির গভীরতাও রয়েছে। রানী ক্লিওপেট্রাকে জানানো হয়েছিল ভুল তথ্য। এক দিকে যুদ্ধরত অ্যান্টোনিকে জানানো হয়, শত্রুরা রানীকে হত্যা করেছে। এটা করা হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি অ্যান্টোনির মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্য। গুজব হলেও ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর খবর শুনে অ্যান্টোনি নিজের ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এ তথ্য রানীর কাছে পৌঁছলে রানীও নিজ ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। শেক্সপিয়র তার বিখ্যাত উক্তি ‘গ্রেট লাভ ডিমান্ডস গ্রেট স্যাক্রিফাইস’- অ্যান্টোনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রাকে মাথায় রেখেই করেছিলেন।
রাজকুমারী হেলেন ও যুবরাজ প্যারিসের প্রেমকাহিনীর স্রষ্টা মহাকবি হোমার। গ্রিক পুরাণের কাহিনী নিয়েই হোমার ‘ইলিয়ড’ রচনা করেন। ট্রয় নগরী ধ্বংসের কাহিনী, যা ‘ওয়ার ফর হেলেন’ বা ‘হেলেন অব ট্রয়’-এর সাথে গ্রিক পুরাণের ভাষ্যকেই বিধৃত করে। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী, এসব যুদ্ধে গ্রিকের দেবদেবীরাও অংশ নিয়েছে। প্রেমের জন্য এত রক্ত ঝরার কাহিনী আর নেই। রক্ত আর ধ্বংস দিয়েই পৃথিবীবিখ্যাত মহাকাব্য ইলিয়ড রচিত। হোমারের এই কালজয়ী সৃষ্টি এক যুগ ধরে চলা যুদ্ধ আর গ্রিক দেবদেবীর ধ্বংসলীলার অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
দেবদাস ও পার্বতী নিয়ে বাংলা সাহিত্যকে একটি কালজয়ী উপন্যাস উপহার দিয়েছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ‘দেবদাস’ উপন্যাস যেন লেখকসৃষ্ট চরিত্র নয়, হৃদয়ছোঁয়া এক বাস্তবতা। প্রেমের রূপনগরে এই জুটি যেন বাঙালির অতি চেনা।
মোগল সম্রাট আকবর দি গ্রেট-এর পুত্র সেলিম আনারকলি নামে অনিন্দ্য সুন্দরী এক নর্তকীর প্রেমে পড়েছিলেন। সম্রাট আকবর পুত্রের এই অসম প্রেম মেনে নেননি। তাতে রুষ্ট, ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী সেলিম পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে হেরে গেলে তার জন্য মৃত্যুদণ্ড সাজা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেলিমকে বাঁচাতে নর্তকী আনারকলি তার দায় স্বীকার করে সেলিমের প্রাণভিক্ষা চাইলে সেলিমের সামনে আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হলো। অমর এই প্রেমগাথা উপমহাদেশের সব ক’টি অঞ্চলের মানুষকে আলোড়িত করে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও কাশ্মিরে আনারকলি মার্কেটগুলো যেন সেলিম-আনারকলির প্রেমের জয়গাথা হয়ে আছে।
বাবর, হুমায়ুন, আকবর ও জাহাঙ্গীরের পর পঞ্চম মোগল সম্রাট ছিলেন শাহজাহান। সম্রাট হওয়ার আগ পর্যন্ত তার নাম ছিল খুররম। খুররম বা শাহজাহান ছিলেন পিতামহ আকবরের স্নেহধন্য। শাহজাহান-মমতাজ প্রেমকাহিনী যেন পবিত্রতার ছোঁয়া পাওয়া এক জীবন্ত কাব্য। অমাত্য আসফখাঁর কন্যা আরজুমান্দবানু নামের এক বালিকার সাথে ১৫ বছর বয়সী (খুররম) শাহজাহানের বিয়ে হয়েছিল ১৬১২ সালে। তাদের বাগদান হয়েছিল ১৬০৭ সালে। আরজুমান্দ সম্রাট শাহজাহানের ১৪ জন সন্তানের জননী। সম্রাট প্রিয়তমা স্ত্রী আরজুমান্দের নাম পাল্টে রাখেন মমতাজমহল।
১৬২৯, মতান্তরে ১৬৩১ সালে প্রিয়তমা স্ত্রী চতুর্দশ সন্তান গহর বেগমের প্রসবকালে মারা গেলে সম্রাট শাহজাহান প্রিয় স্ত্রীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি অনবদ্য স্থাপত্য নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সেটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল ২২ বছর। তার সেই ভালোবাসার নিদর্শন তাজমহল এখনো আগ্রায় যমুনার তীরে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য হিসেবে মানুষের অমোঘ আকর্ষণ হয়ে বিরাজ করছে। এই মোগল সম্রাটের শেষ জীবন কেটেছে নিঃসঙ্গভাবে। তিনি আরো একটি স্মৃতিসৌধ গড়তে চেয়েছিলেন। সেটা হতো কালো মর্মরপাথরের। তার সন্তান আওরঙ্গজেব অর্থের অপচয় ভেবে তাতে বাদ সাধেন এবং বৃদ্ধ পিতাকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে আটকে রাখেন। ফলে কালো মর্মরপাথরের নতুন স্থাপনার বাস্তবতা দেখার সুযোগ শাহজাহানের হয়নি। শাহজাহানকে যে ঘরে আটকে রাখা হতো, সেটাও ছিল যমুনার তীরে- তাজমহলের লাগোয়া। শাহজাহান যেন সেখান থেকে প্রিয়তমা স্ত্রীর কবর তাজমহল দেখতে পারেন, সেজন্য একটি জানালা তৈরি করে দেয়া হয়েছিল। মৃত্যুর পর শাহজাহানকেও কবর দেয়া হয়েছিল মমতাজমহলের পাশে।
প্রেম বিষয়ক কাব্য লেখা কিংবা সমালোচনা, কোনোটিই আমাদের কাজ নয়। ভালোবাসা নিয়ে কোনো বাড়তি শ্লাঘাবোধও করি না। তবে তারুণ্যে প্রেমের আবেগ ও আবেশ নিরেট বাস্তবতা। প্রেম-ভালোবাসা মৌলিক গুণ। ভালোবাসা আর মমত্ববোধ সবার কাম্য। তবে ‘প্রেম করেছিলেন ইউসুফ নবী’ বলে যে গান গাওয়া হয়, যে সিনেমা দেখানো হয়, তা রূপকথা; সত্য নয়। বাস্তবে হজরত ইব্রাহিম আ:-এর চতুর্থ অধস্তন পুরুষ হজরত ইউসুফ আ:। তার বাবা ইয়াকুব আ:, তার দাদা হজরত ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম আ:। খ্রিষ্টানদের বাইবেল এবং ইহুদি ধর্মগ্রন্থ যবুরেও তিনি একজন সম্মানিত নবী। মধ্যপ্রাচ্যের সব ধর্মাবলম্বীর কাছে উল্লেখিত চার নবীর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। ‘জোসেফ সান অব জ্যাকব’Ñ এ চারটি শব্দ ইসরাইলের সব গোত্রের কাছে পরিচিত ও সম্মানিত। অন্যান্য নবী-রাসূল পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরায় আলোচিত হয়েছেন, কিন্তু হজরত ইউসুফ আ: তথা জোসেফ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও আলাদা একটি সূরা রয়েছে। ইউসুফ আ: সম্পর্কে তার পিতা হজরত ইয়াকুবের (বা জ্যাকব) স্বপ্নের কথা ওল্ড টেস্টামেন্টেও রয়েছে। জুলেখা যে মিসরীয় শাসক পটিপারসের স্ত্রী, এটাও ওল্ড টেস্টামেন্টে তুলে ধরা হয়েছে। পারস্যের লেখকেরা এটি নিয়ে অনেক বেশি উৎসাহ দেখিয়েছেন। একজন সম্মানিত নবী সম্পর্কে মিথ্যা আরোপের পর প্রতিবাদ করার জন্যই আমাদের এটুকু প্রচেষ্টা।
masud2151@gmail.com

ন্যুব্জ সংবাদমাধ্যম ও দুর্বল গণতন্ত্র by মনজুরুল হক

জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কয়েকটি বিষয় আমাকে পড়াতে হয়, তার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকার ও সংবাদমাধ্যম’। জাপান একটি অগ্রসর গণতান্ত্রিক দেশ এবং জাপানের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমাদের পাঠক্রম নির্ধারিত করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আবশ্যকীয় একটি উপাদান হচ্ছে সংবাদমাধ্যম। সরকারের ভেতরে কী ঘটছে, জনগণের কাছে রাখা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকার কীভাবে অগ্রসর হচ্ছে এবং সেই ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা কতটুকু, সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হচ্ছে সেসব বিষয়ে জনগণকে অবগত করার মধ্য দিয়ে সঠিক পথে সরকারকে পরিচালিত করায় সহায়তা করা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, জনসংযোগের মতো সরকারের সুনির্দিষ্ট কিছু বিভাগ নিজে থেকেই সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম হওয়ায় সংবাদমাধ্যমকে কেন আগ বাড়িয়ে তা করতে হবে? জনসংযোগের কাজ যেহেতু হচ্ছে ব্যর্থতাকে আড়াল করে রেখে সাফল্যের ঢোল পেটানো, ফলে সে রকম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে সরকারের ব্যর্থতার দিকগুলো সম্পর্কে জানতে পারা নাগরিকদের পক্ষে একেবারেই সম্ভব নয়। আর এখানেই এসে যায় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বের প্রসঙ্গটি এবং একই সঙ্গে যা ফুটিয়ে তোলে সাংবাদিকতার সঙ্গে জনসংযোগের যোজন দূরত্বের পরিষ্কার ছবি।
ফলে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের অবস্থান অপেক্ষাকৃত দুর্বল, সে রকম গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব আরও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে দেখা দেয়। জাপানের এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাহ্যিক বেশ কিছু মিল সহজেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব। দুই দেশেই ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ায় দলের স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ সংবাদমাধ্যমজুড়ে বিস্তৃত। তবে গুণগত পার্থক্য এ রকম, জাপানের সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ সেই উদ্বেগ সম্পর্কে দেশবাসীকে জোর গলায় সতর্ক করে দেওয়ায় নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে না যে এদের গলা টিপে ধরো, কিংবা মামলার মারপ্যাঁচে কুপোকাত করে দিয়ে নাভিশ্বাস তুলে দাও এর মালিক বা সম্পাদকদের। সরকার বরং সমালোচনার পরোক্ষ জবাব দিয়ে চলেছে সরকার–সমর্থক সংবাদমাধ্যমে নানা রকম বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা ও সংলাপের মধ্য দিয়ে, যা-ও কিনা কোনো অবস্থাতেই অতিক্রম করছে না শালীনতার গণ্ডি।
জাপানের সংবাদমাধ্যমের মধ্যে দৈনিক সংবাদপত্রকে রাজনৈতিক দিক থেকে অনেক বেশি প্রভাবশালী গণ্য করা হয়। জাতীয় পর্যায়ের দৈনিক সংবাদপত্রগুলো মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। বর্তমান সরকারের দক্ষিণপন্থী অবস্থানের সমর্থনে আছে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত দৈনিক ইওমিউরি শিম্বুন-এর পাশাপাশি কট্টর জাতীয়বাদী চেতনায় অনুপ্রাণিত দৈনিক সাঙ্কেই শিম্বুন। অন্যদিকে, সরকারবিরোধী শিবিরে নেতৃত্বের অবস্থানে আছে প্রচার সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে অবস্থানকারী দৈনিক আসাহি ও মায়নিচি শিম্বুন। সরকারের অনুসৃত কতিপয় নীতি নিয়ে দুই শিবিরের কলমযুদ্ধ বলা যায় হাড্ডাহাড্ডি পর্যায়ের। একে অন্যকে ঘায়েল করার জন্য দোষত্রুটি খুঁজে বের করে তা নিয়ে ফলাও প্রচারেও পিছিয়ে নেই এরা।
ঠিক তেমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল আসাহির বিরুদ্ধে যৌনদাসী-সংক্রান্ত বানোয়াট প্রতিবেদন প্রকাশের অভিযোগ ইওমিউরির উত্থাপন করা নিয়ে। জাপান সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইওমিউরি যৌনদাসীদের অস্তিত্ব অনেকটাই অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে আসাহি নানা রকম ঐতিহাসিক দলিলপত্রের ভিত্তিতে সেই সত্যতা প্রমাণের চেষ্টা অনেক দিন থেকে করে আসছে। সেই প্রক্রিয়ার একটি বিচ্যুতি ছিল ত্রুটিপূর্ণ সেই প্রতিবেদন, যেটিকে পুঁজি করে কোমর বেঁধে নেমেছিল ইওমিউরি। আসাহি অবশ্য ভুল স্বীকার করে নিলেও উল্লেখ করেছিল যে একটিমাত্র প্রতিবেদনের মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে পুরো বিষয়টির অর্থহীনতা প্রমাণিত হয় না। একপর্যায়ে ইওমিউরির সঙ্গে গলা মিলিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কঠোর ভাষায় আসাহির সমালোচনা করলে জাপানের জনগণ এবং সার্বিকভাবে সংবাদমাধ্যম সেটাকে সহজভাবে নিতে পারেনি এবং বিতর্কের বাইরে থাকার ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রীর কাছে তারা পৌঁছে দিয়েছিল। সেই একবারের কঠোর সমালোচনার পর প্রধানমন্ত্রীও বুঝে গিয়েছিলেন, সংবাদমাধ্যমের মধ্যে চলা বিতর্কে সরকারের আগ বাড়িয়ে নাক গলাতে নেই এবং এর পর থেকে সে রকম কঠোর কোনো মন্তব্য তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হয়নি। আসাহিকেও ভুল স্বীকার করে নেওয়ার জন্য জড়িয়ে পড়তে হয়নি একের পর এক মামলার ফাঁদে।
এবার আমরা একটু পেছন ফিরে অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আরও যে একটি বিষয়ে বাংলাদেশের অল্প কিছুদিন আগের পরিস্থিতির সঙ্গে জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের মিল কিছুটা হলেও খুঁজে পাব, সেটা হলো স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে সংবাদমাধ্যমের আচরণ। একালের আসাহি আর ইওমিউরি একে অন্যের বিপরীতে অবস্থান নিলেও জাপানের সেই যুদ্ধের দিনগুলোয় এরা ছিল দেশের সামরিক আগ্রাসনের কট্টর সমর্থক। যুদ্ধের পর অবশ্য সবাই আগের সেই অবস্থানের জন্য দলবদ্ধভাবে ক্ষমা চেয়ে উল্লেখ করেছিল যে কঠোর সেন্সরশিপের আওতায় এর বাইরে কোনো কিছু করার পথ তাদের সামনে বন্ধ ছিল।
সামরিক শাসন বা স্বৈরতন্ত্র ক্ষমতাসীন হয়েই প্রথম যে কাজটি করে তা হলো সংবাদমাধ্যমকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। পাঠক হয়তো ভুলে যাননি সেই পাপিষ্ঠ কণ্ঠ: ‘আমি মেজর ডালিম বলছি।’ বঙ্গবন্ধুকে খুন করে খুনির দল প্রথমেই ছুটে গিয়েছিল বেতার কেন্দ্রে এবং বেতারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর গলা টিপে ধরেছিল সব কটি সংবাদপত্রের। ফলে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতাসীন নতুন সরকারকে স্বাগত না জানানোর কোনো উপায় সেদিন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ছিল না।
২০০৭ সালে বেসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আড়ালে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের বেলায়ও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি লক্ষ করা গেছে। সেদিন এমন কোনো সংবাদপত্র ছিল কি, যেটা কিনা সরকারের সমালোচনা করে সেই সরকারকে অবৈধ আখ্যায়িত করেছিল? যদি না থাকে, তবে কেন মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে সম্মিলিত এই বিষোদ্গার। সবাই যে কাজ করেছে, সেই একই কাজ তাঁকেও করতে হয়েছে এবং এর পক্ষে কোনো রকম সাফাই না গেয়ে তিনি বরং নিজের সেই অক্ষমতার জন্য অনুতপ্ত হওয়ার প্রকাশকেই তুলে ধরেছেন। এটাকে তো মনে হয় সৎ সাংবাদিকতার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখা উচিত, মামলার প্যাঁচে তাঁকে ঘায়েল করে দেওয়ার মতো বেইমানি হিসেবে নয়।
মাহ্ফুজ আনামের সমালোচনায় যাঁরা মুখর, তাঁরা অবশ্য বলে থাকেন যে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণ এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে নেতৃত্বশূন্য করে তোলায় চালানো প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে জঘন্য অন্যায় কাজ তিনি করে ফেলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এত দিন আপনারা কোথায় ছিলেন? ঘটনা ঘটে যাওয়ার প্রায় আট বছর পর অতীতের একটি ভুলের জন্য দোষ স্বীকার করে নেওয়ার অর্থ অবশ্যই এ রকম নয় যে তাঁর সব রকম পদক্ষেপই তখন ছিল কলঙ্কিত।
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

সব মেঘে ঢাকা by লবী রহমান

ঝর্নার মৃদু চঞ্চল প্রান্তরে নূপুর বাজিয়ে অনুষ্টুপ ছন্দে যে সময় কাটত, তা যেন আজ প্রকৃতির মতো প্রশান্ত। বর্ণহীন চঞ্চলতা, আনন্দ আজ আর নেই। ফুল ঝরে শুকিয়ে গেছে উন্মুক্ত সবুজ চত্বরে। দূর্বাদলের মৃদু শিহরণ আজ বিদায় নিয়েছে। গিরিললিত জীবন স্পন্দের শিশির বিন্দু শুকিয়ে গেছে  করালগ্রাসী সূর্যোদাহের তার সাথে হারিয়ে গেছে হেমন্তের ঝরা ফসলের মতো আমার সোনালী দিন যা আর কখনো ফিরে আসবে না।
ঠিক যেন শৈলচূড়ার বরফের আলো ঠিকরায়ে পড়েছে। কিন্তু বরফ এখনো গলল না। আমি জানি সে ছিল অবলন্ধ শুভ্র, সে কী নিবিড় পবিত্র, সাড়া দেয়া বিজয়ের পর বিসর্জনের পর বিসর্জনের সানাইয়ের সুরের মাঝে শুনতে পাই সেই ভরান কণ্ঠে মধুর ডাক-লবী তুমি কোথায়? এ কি হলো! এমন তো কথা ছিল না। এতগুলো প্রাণ অকালে কেনই বা কেড়ে নিল হায়েনার থাবায়? এই অপূরণীয় ক্ষতির মাসুল কি সম্ভব? কাকে করবো এ প্রশ্ন? কে ছিল এই লোমহর্ষক কাহিনীর নেপথ্যে? কি ছিল তার স্বার্থ? গত সাত বছরেও মিলল না তার হদিস। কিসের উপর চালিয়ে ছিল ব্রেকহীন বুলডোজার? স্তব্ধ করে দিল ৫৭টি পরিবারের জীবনের চলমান গতি। ভাবছেন বলব প্রশ্ন করুন বিবেককে। জানি বিবেকের বিকৃত লাশ এখন নর্দমার ভেতর। হ্যাঁ সেদিন ছিল ২৫শে ফেব্রুয়ারি। নিয়মিত উঠেছিল সূর্য, দিন শেষে অস্তও গেল। কিন্তু আমার জীবনে সুখের সূর্যটা কালের করাল গ্রাসে অস্ত হলো অনন্তকালের জন্য, যা আর কখনও উঁকি দেবে না। এখন একমাত্র অবলম্বন হলো স্মৃতি, আমরা সেই মধুর স্মৃতিচারণ করে নিজেকে সান্ত্বনা দেই-
‘পৃথিবীটা সুন্দর ছিল
তুমি ছিলে বলে
আজও আছো সুন্দর
সেই পৃথিবী
অনুভবে তুমি আছো বলে’
জীবনের নিয়মই হচ্ছে সকাল, কাকডাকা ভোরে ঘুম ভাঙছে সবার। দক্ষিণা জানালাও খুলছে সবাই। হিমেল স্নিগ্ধ বাতাসও বইছে, ঘরে কল্পনার রঙে রাঙাচ্ছে সবার জীবন। দীর্ঘ সুখময় ক্লান্তি শেষে ঘুমাচ্ছে সবাই আর আমার অন্তর্দহনে জ্বলছে বুক, বইছে ঘরামরী বিষবাষ্প ভরা দূষিত বাতাস। আর নয়ন গড়ানো জলে ভিজছে বালিশ, যার সর্বক্ষণই ভেজা।
সে সঙ্গে চিন্তা ক্লান্তি শেষে লম্বা দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু কেন? কি ছিল আমাদের অপরাধ? সততার তো কোনো ঘাটতি ছিল না। শপথ অনুযায়ী ছিল কর্মতৎপরতা। অন্যায়ের সঙ্গে ছিল না কোনো আপস। তবে কি এটাই ছিল অপরাধ? মাঝে মাঝে মনে হয় কবর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে চিৎকার করে বলি আর এক দিনের জন্য জেগে ধরো অস্ত্র। নির্দেশ দাও তোমার প্লাটুনকে সবার মুখোশ দাও খুলে করো না তাদের কোনো ক্ষমা। শেষ করে দাও সেই রক্ত পিপাসু পিশাচদের কালো হাত এসব ভেবে আবার ক্লান্ত হয়ে যাই। আর অস্থিরতায় এপাশ ওপাশ করি।
জানি সারাজীবন কলম চালিয়ে আমার লেখা শেষ হবে না। জানতেও পারবো না কাকে লিখব লিখে আর জানিয়েও কোনো লাভ নেই কেননা এভাবেই কেটে গেল ৭টি বছর। পূরণ হবে না সে ক্ষতির এ বিষ বাষ্প পূর্ণ সমাজ শুধু ব্ল্যাক হোলের মতো কেড়ে নিতেই জানে। জানে না কিছু দিতে। যারা করেছে আমাদের এ হাল তাদের বলছি। আজ যদি জানতে ভালো লাগার মানুষকে এভাবে কেড়ে নিলে যে কি যন্ত্রণা হয় তাহলে করতে না এ তাণ্ডবলীলা ডানা ভাঙ্গা পাখির মতো এতগুলো পরিবারকে করতে না সর্বস্বান্ত এ যে কী কষ্ট! প্রতিটি নিঃশ্বাসেই শুধু হতাশা হাহাকার আর্তনাদ ইলাহী তোমাকেই লিখছি।
জানি না তো শুনছ কি ওপার বসে আমার এ বেদনার ডাক
তোমায় পেয়েও যদি সব হারাতাম
মিছে যতথাক পড়ে যাক
সেই মধু ডাক,
আজও প্রতিটি প্রহর জুড়ে
প্রতি নিঃশ্বাসে আমি করি যে স্মরণ
যে দিন থেমে যাবে করতে স্মরণ
জেনে নিও সেদিনই হবে
সাথীহারা এ হৃদয়ের মৃত্যুবরণ।
লবী রহমান
শহীদ কর্নেল কুদরত ইলাহী রহমান শফীকের স্ত্রী

বাহুবল ট্র্যাজেডিঃ অপরাধের ষোলকলা পূর্ণ রুবেল-জুয়েলের by শামীমুল হক ও নূরুল ইসলাম মনি

ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, হামলা, ভাঙচুর, চুরি-ডাকাতির পর এবার খুনির খাতায় নাম লিখিয়ে ষোলকলা পূর্ণ করলো দুই ভাই রুবেল ও জুয়েল। তাদের ভয়ে কোনো কিশোরী শিক্ষার্থী একা স্কুলে যেতে ভয় পেতো। ফলে দলবেঁধে তারা বিদ্যালয়ে যেত। তারপরও রক্ষা হতো না তাদের। হঠাৎ কাউকে আগলে ধরে খাতা টেনে নিয়ে ফোন নম্বর লিখে বলতো- ফোন নাম্বার লিখে দিলাম। রাতে ফোন না দিলে তোর খবর আছে। তোরে আমি ভালোবাসি। কাউকে প্রকাশ্যে জাপটে ধরে বলতো, আজ সন্ধ্যায় বাড়ির পশ্চিম পাশে মাঠে আসবি- তোরে আমি ভালোবাসার কথা কইমু। ফয়জাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের কোনো সুন্দরী মেয়েকে দেখলেই এভাবে উত্ত্যক্ত করতো রুবেল। আর তার ভাই জুয়েল রাস্তায় বসে থাকতো। এ দুই ভাইয়ের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল সুন্দ্রাটিকি গ্রামবাসী। ওই গ্রামের চার শিশু হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করার পর গ্রামবাসী নড়েচড়ে বসেছে। একে একে মুখ খুলতে শুরু করেছে তারা। বলছেন, অপরাধ জগতে এ দু’ভাই ষোলকলা পূর্ণ করেছে। রুবেল ও জুয়েল আবদুল আলী বাগালের ছেলে। পিতার প্রভাবে তারা এলাকায় হয়ে উঠেছিল বেপরোয়া। কত কিশোরী, যুবতী যে তাদের হাতে নিগৃহীত হয়েছে এর ইয়ত্তা নেই। তিনবার জেএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করা রুবেল এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। বয়স সবে বিশ বছর পার করেছে। আর জুয়েল মিরপুর আলীফ সোবহান চৌধুরী ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তার বয়স ২৩ বছর। আদালতে রুবেলের জবানবন্দি দেয়ার পর হতবাক ফয়জাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এ চার শিশু হত্যার পরও সে এসএসসির দুটি পরীক্ষা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, লাশ উদ্ধারের পর এক শিক্ষিকা শিশুদের দেখতে গেলে রুবেল সবাইকে সরিয়ে শিক্ষিকাকে লাশ দেখার সুযোগ করে দেয়। বলে, আসুন ম্যাডাম দেখে যান। সুন্দ্রাটিকি গ্রামের তালুকদার পঞ্চায়েতের চার শিশু জাকারিয়া আহমেদ শুভ, তাজেল মিয়া, মনির মিয়া ও ইসমাঈল মিয়াকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পিতা আবদুল আলী বাগালসহ তারা জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে রুবেল ও জুয়েল। এলাকাবাসী তাদের এই উগ্রতা ও বেপরোয়া হওয়ার পেছনে তার পিতা আবদুল আলী বাগালকে দায়ী করছেন। ২০১৪ সালের দুর্গাপূজার মেলায় গিয়ে রশিদপুর চা বাগানের এক শ্রমিকের কন্যাকে ইভটিজিং করে তারা। করে যৌন নির্যাতন। চা শ্রমিকরা ঘটনার প্রতিবাদ জানালে ক্ষুব্ধ হয়ে সেখানে হামলা চালায়। ৩৫টি বাড়িতে আক্রমণ করে। ঘরের টিনের চালা রামদা দিয়ে কুপিয়ে ফালা ফালা করে। বাগান পঞ্চায়েত প্রধান পিয়ারী রবি দাসের বাড়িতে হামলা চালালে তার নয় মাসের গর্ভবতী পুত্রবধূ রবি রীনা দাস পালাতে গিয়ে পড়ে যান। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। তিনদিন হাসপাতালে চিকিৎসার পর মারা যায় পিয়ারী রবি দাসের মেয়ের ঘরের নাতনি দুই বছরের সারথি রবিদাস। এ ঘটনায় আহত হন কমপক্ষে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। ঘটনার পরই চা-শ্রমিক জয়রাম লোহার বাদী হয়ে দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা করেছিলেন। পরে দুজনের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলার প্রস্তুতি নেয়ার সময় আপস প্রস্তাব আসে। পিয়ারী দাস এ ঘটনাকে নারকীয় তাণ্ডব উল্লেখ করে বলেন, আমরা চা শ্রমিক। সেদিন যে অত্যাচার করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এমন দেখিনি। পিয়ারী রবি দাস বলেন, আমরা তো নিরীহ মানুষ। বাগানে কাম করি, মিলেমিশে থাকতে চাই। আমরার মন না মানলেও শেষ পর্যন্ত জনগোষ্ঠীর  কথা চিন্তা করে আপস করতে অইছে। এ ঘটনায় ৬ই অক্টোবর বাহুবল থানায় দ্রুত বিচার আইনে মামলা (নম্বর ০৪/১৮২) হয়। তাতে চার শিশু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সুন্দ্রাটিকি গ্রামের আবদুল আলী বাগাল, তার ছেলে রুবেল মিয়াসহ ৫০ জন আসামি ছিলেন। কিন্তু দুজনের মৃত্যুর ঘটনায় চা-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগে আরেকটি মামলা করতে গেলে সুন্দ্রাটিকি গ্রামের পঞ্চায়েতের আট পক্ষ এক হয়ে বৈঠক ডেকে আপসের প্রস্তাব দেয়। ভাদেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের সভাকক্ষে ২রা নভেম্বর উভয় পক্ষে আপসরফার চুক্তি হয়। এ ব্যাপারে ভাদেশ্বর ইউপি চেয়ারম্যান মো. মত্তাছিল মিয়া বলেন, ওই আপস সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত মন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী, জেলা পরিষদ প্রশাসক ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী, স্থানীয় এমপি এমএ মুনিম চৌধুরী বাবু, সংরক্ষিত আসনের এমপি আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী, নবীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আলমগীর চৌধুরী, বাহুবল উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আবদুল হাই। চেয়ারম্যান মো. মুত্তাচ্ছির মিয়া বলেন, ওই সভায় সুন্দ্রাটিকি গ্রামের আশপাশের ৫০ গ্রামের মুরব্বিরা। সভায় আবদুল আলী বাগাল ও তার ছেলেদের দায়ী করা হয়। আর চা-শ্রমিকদের ছয় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সভায় উপস্থিত থাকা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া বলেন, এ আপসরফা নিয়ে আমি তীব্র বিরোধিতা করেছি। আমি মনে করি সন্ত্রাসী ও বখাটেদের বাঁচাতে এই আপস করা হয়েছে। সেদিন যদি তাদের কঠোর শাস্তি দেয়া হতো তাহলে আজকের এ ঘটনা ঘটতো না।
আবদুল আলী বাগালের ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও দুই বছরে আজও জরিমানার এক টাকাও পাননি পিয়ারী রবি দাস। তিনি বলেন, ভয়ে আবদুল আলীর কাছে টাকা চাওয়ার সাহস পাইনি আমরা। পিয়ারী লাল বলেন, সেদিনের ঘটনার বিচার শক্তভাবে হলে আজ আমাদের সামনে চার শিশুর লাশ দেখতে হতো না। অথচ সুন্দ্রাটিকি গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধানরা গতকাল বলেছেন, এই ৬ লাখ টাকা আমাদের জমি বিক্রি করে আবদুল আলী বাগালকে দেয়া হয়েছে চা-শ্রমিকদের দেয়ার জন্য। তাদেরও প্রশ্ন এ টাকা চা-শ্রমিকরা না পেলে গেল কোথায়?
ওই সালিশ সম্পর্কে সুন্দ্রাটিকি গ্রামের তালুকদার পঞ্চায়েতের প্রধান হাজি আবদুল খালিক মাস্টার বলেন, পঞ্চায়েত করি গ্রামে শান্তির জন্য। আবদুল আলী বাগাল ও তার ছেলেদের কু-কর্মের দায় সুন্দ্রাটিকি গ্রামের উপর বর্তে ছিল। তাই এটাকে এ ভাবে শেষ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, আপসরফায় ছয় লাখ টাকার জমি বিক্রি করে আবদুল আলী বাগালের কাছে দিয়েছিলাম। কিন্তু আবদুল আলী এক টাকাও দেননি।
এর পরের ঘটনা আরও ভয়াবহ। ফয়জাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর এক ছাত্রী স্কুলে যাচ্ছিল। রুবেল তার পথ আগলে দাঁড়ায়। খাতা টেনে নিয়ে এতে তার ফোন নাম্বার লিখে দেয়। বলে আজ রাতে আমাকে ফোন না দিলে তোর খবর আছে। গত বছরের ২৭শে অক্টোবরের ঘটনা এটি। রুবেল ক্লাস টেনের ছাত্র। ওই ছাত্রী বিদ্যালয়ে গিয়ে ঘটনা জানালে বিদ্যালয়ের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক রুবেলকে ডেকে শাসিয়ে দেন। বলেন, তোর অভিভাবক নিয়ে আসিস। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রুবেল তার লোকজন নিয়ে বিদ্যালয়ে হামলা চালায়, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ ভাঙচুর করে। বিদ্যালয়ের সভাপতিসহ সকল শিক্ষককে দুই ঘণ্টা আটকে রাখে। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। ফয়জাবাদ বিদ্যালয়ের সভাপতি হারুন অর রশীদ বলেন, সেদিন যা দেখেছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। এই বিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হয়ে এমন করতে পারে তা ভাবলে গা শিহরে উঠে। এ ব্যাপারে ভাদেশ্বর ইউপি চেয়ারম্যান মত্তাছির মিয়া বলেন, রুবেলকে তার অভিভাবক নিয়ে পরদিন আসতে বলেছিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পরদিন সকালে রুবেল তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে স্কুলে হামলা চালায়। শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যুতের তার ও লাঠি দিয়ে প্রহার করে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেন। তাদের ওপরও হামলা করে তারা। একপর্যায়ে অভিভাবকরা মিলে তাদের ধাওয়া করলে ফিরে যায়। কিন্তু রুবেল গ্রামে গিয়ে খবর দেয় পূর্ব ভাদেশ্বর গ্রামের লোকজন তার ওপর হামলা চালিয়েছে। এ খবরে আবদুল আলী বাগালের লোকজন জড়ো হয়ে তীর-ধনুক, দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অভিভাবকদের ওপর আক্রমণ করে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ফাঁকা গুলি চালায়।       
সংঘর্ষের খবর পেয়ে ছুটে যান বাহুবল উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হাই, এএসপি (সার্কেল) সাজ্জাদ ইবনে রায়হান । তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ব্যাপারে বাহুবল মডেল থানার ওসি মোশাররফ হোসেন পিপিএম বলেন, রুবেল ও জুয়েল বখাটে। তাদের নিয়ে এলাকাবাসী আতঙ্কে ছিল। এবার আর তারা ছাড় পাবেনা।
এ ব্যাপারে ফয়জাবাদ হাই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ বলেন, এ ঘটনায় দীর্ঘদিন আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসেনি। ফলে পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আনতে মাইকিং করা হয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে পরামর্শ সভা করা হয়েছে।  সভায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হাই, ভাদেশ্বর ইউপি চেয়ারম্যান মত্তাছির মিয়া, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হারুন অর রশিদ, সদস্য হেলাল উদ্দিন, সফর উদ্দিন, মনিরুজ্জামান ফারুক, আব্দুল খালিক মাস্টার, প্রধান শিক্ষক অসিত কুমার দেব, ফয়জাবাদ পরগনার নেতা হুমায়ূন কবীর হিরণ, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাসিম, রশিদপুর চা বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি পিয়ারী লাল দাস। সিদ্ধান্ত হয় বিষয়টি সালিশে নিষ্পত্তির।  উভয়পক্ষ সালিশে সম্মত  হয়। এ সালিশেও আবদুল আলী বাগাল ও তার পুত্রদের দায়ী করা হয়। ভাঙচুর করা স্কুলের কক্ষ ও দরজা জানালা মেরামতের দায়িত্ব উপজেলা চেয়ারম্যান নিজে  নেন। এ পর্যন্তই শেষ। গতকাল সরজমিন বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে ভাঙ্গা দরজা জানালা এখনও ভাঙ্গাই রয়েছে। ফয়জাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হারুন অর রশীদ বলেন, ওই সালিশে আমাদের বলে দেয়া হয় কাকে কাকে দাওয়াত করা যাবে। কাকে কাকে দাওয়াত করা যাবেনা। ফলে সেই আপস সভায় আমাদের পক্ষের কাউকে বলতেও পারিনি। এ ব্যাপারে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী বলেন, আমি ব্যর্থ। অনেকবার পুলিশকে পাঠিয়েছি তাদের ধরতে। শুনেছি তাদের ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু পথিমধ্যে অদৃশ্য ফোনে তাদের ছেড়ে দিতে হয়েছে। ওইসব অদৃশ্য ব্যক্তিরাই সুন্দ্রাটিকি গ্রামে অশান্তির মূল। তাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে আবদুল আলী বাগাল ও তার পুত্ররা বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। ছিচকে চুরি ও ডাকাতির সঙ্গেও জড়িত ছিল রুবেল ও জুয়েল। গত কদিন আগে সুন্দ্রাটিকি গ্রামের এক প্রবাসীর বাড়িতে ডাকাতি হয়। সে ঘটনায়ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
সর্বশেষ পঞ্চায়েতের কর্তৃত্ব নিয়ে আবদুল আলী বাগাল ও তার পুত্র রুবেল, জুয়েল তাদের সঙ্গীদের নিয়ে সুন্দ্রাটিকি তালুকদার পঞ্চায়েতের চার শিশু শুভ, ইসমাঈল, তাজেল ও মনিরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। হত্যাকা ের ঘটনায় দেশব্যাপী আলোচনায় চলে আসে বাহুবল ও সুন্দ্রাটিকি গ্রাম। এর সঙ্গে আলোচনায় আসে আবদুল আলী বাগাল ও তার পুত্রদের কুকীর্তির কথা। ওদিকে এ ঘটনার পর বাহুবলের বিসি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একুশে ফেব্রুয়ারিতে শপথ নিয়েছে। তারা আর এলাকায় কোন রুবেল, জুয়েল সৃষ্টি হতে দেবেনা। তাদের প্রতি ঘৃণা স্বরুপ আর কারও নাম রুবেল-জুয়েল না রাখার ঘোষণাও দেন তারা। 
লাশ পাওয়ার স্থান দেখতে গেলেন সন্তানহারা চার মা: বুধবার সকালে গ্রামের ২০/২৫ জন মহিলাসহ নিহত তাজেলের মা আমেনা খাতুন, মনিরের মা ছুলেমা খাতুন, শুভর মা পারুল বেগম ও ইসমাঈলের মা মিনারা খাতুন গ্রামের পার্শ্ববর্তী ইছাবিলের সেই বালির গর্তের পাশে যান। যেখান থেকে ৮ দিন আগে তাদের সন্তানদের লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছার পর কেউ একজন আঙ্গুল তোলে ওই স্থানটি দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে পুত্র শোকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। এ সময় তাদের বুকফাটা আর্তনাদ দেখে উপস্থিত সবার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে।
এদিকে, বিকালে হবিগঞ্জ ছাত্র সমন্বয় ফোরাম নামে একটি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সুন্দ্রাটিকি গ্রামের শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে যান। এ সময় সংগঠনের সভাপতি শেখ সুলতান মো. কাওসার নিহতের ৪টি পরিবারকে ৩৬ হাজার টাকা এবং বাহুবল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হাই ৪০ হাজার টাকা অনুদান দেন। এছাড়াও রশিদপুর চা বাগানের ডিজিএম তাসকিন এ চৌধুরী অনুদান দেন তাদের। ওদিকে, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার উপজেলার ১০১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক এবং কিশলয় কিন্ডারগার্টেন মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবে।