Saturday, October 25, 2014

বিনা ভোটের সাংসদদের বিশ্বজয়! by কামাল আহমেদ

ভোটারবিহীন নির্বাচন থেকে পাওয়া দশম সংসদের স্পিকার এবং একজন বহুল পরিচিত সাংসদ পার্লামেন্টারিয়ানদের দুটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, যাঁকে প্রধানমন্ত্রী ‘গণতন্ত্রের বিশ্বজয়’ বলে অভিহিত করেছেন। গণতন্ত্রের বিশ্বজয় তো বটেই, কেননা তাঁরা সেখানে নির্বাচনে গোপন ব্যালটে জিতেছেন। তাঁদের মধ্যে সাবের হোসেন চৌধুরীকে প্রথম দফায় দুবার জিততে হয়েছে, কেননা প্রথমবারের ব্যবধানটা যথেষ্ট ছিল না। তাঁরা দুজনে নিজ দেশে অটো-সাংসদ বা বিনা ভোটে পদস্থ হলেও বৈশ্বিক ওই দুই প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত হতে সেখানকার সদস্যদের ভোট তাঁদের প্রয়োজন হয়েছে। তাঁদের এই ঈর্ষণীয় সাফল্য উদ্যাপনে সরকার এবং জাতীয় সংসদ কেউ কোনো কার্পণ্য করেনি। অন্যের সাফল্যকে খাটো করার জন্য ঈর্ষাকাতর বাঙালির যে দুর্নাম আছে, এ ক্ষেত্রে তা যে আরও বিস্তৃত হয়নি, সেটা নিশ্চয়ই একটা স্বস্তির বিষয়। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের তিক্ত অভিজ্ঞতার পটভূমিতে এই কথাটি মনে আসা নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক নয়।

>>প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সিপিএর সভানেত্রী শিরীন শারমিন চৌধুরী ও আইপিইউর সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী
দেশে ‘অনির্বাচিত’ কিন্তু বিদেশে নির্বাচিত আমাদের এই দুই গুণী সাংসদের সাফল্য উদ্যাপনে ক্ষমতাসীন দলের উৎসাহের রাজনৈতিক তাৎপর্য খুবই স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বেশ জোরগলায় বলছেন যে বৈশ্বিক পরিসরে তাঁদের এই সাফল্য বর্তমান সংসদের প্রতি বহির্বিশ্বের স্বীকৃতির প্রতিফলন। ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে বিশ্ব পরিসরে গ্রহণযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে সরকার যেসব কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ নেয়, তার একটি কৌশল ছিল বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে নির্বাচনে অংশগ্রহণ।
অবশ্য, সমালোচকের বক্তব্য আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সভাপতি পদে সাবের হোসেন চৌধুরীর নির্বাচনটি হচ্ছে সরকারের বাড়তি পাওয়া। যুক্তিটা হচ্ছে, এই পদটি সরকারের হিসাবে থাকলে স্পিকারকে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনে প্রার্থী না করে আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নে (আইপিইউ) তাঁকে দাঁড় করানোটাই হতো যুক্তিযুক্ত। বৈশ্বিক পরিসরে সংগঠন হিসেবে কমনওয়েলথ এবং ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের কার গুরুত্ব কতটা, তা নিশ্চয়ই কারও বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। সাফল্যের ভাগীদার অনেকেই হয়, কিন্তু সাফল্য অর্জনের পেছনে যে কাঠখড় পোড়াতে হয়, সেটার শরিক খুব বেশি একটা পাওয়া যায় না।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে স্পিকারের পক্ষে নানা জায়গায় লবিংয়ে সরকারিভাবে যতটা তৎপরতা চালানো হয়েছে, সাবের চৌধুরীর জন্য ততটা তৎপরতা দৃশ্যমান ছিল না। কমনওয়েলথ ফোরামে স্পিকারের প্রার্থিতার কথা কয়েক মাস আগেই সংসদ সচিবালয় এবং সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সাবের চৌধুরীর প্রার্থিতার কথা প্রথম জানা যায় আইপিইউর ৯ অক্টোবরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে, সংস্থাটির বার্ষিক সম্মেলনের তিন দিন আগে, যা পরদিন ১০ অক্টোবরের প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়। তখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কিংবা সংসদ সচিবালয় থেকে তাঁর প্রার্থিতার বিষয়ে ঢাকায় কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ২০০৭ সালের সেনা–সমর্থিত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের যে কয়জন নেতা সংস্কারপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে দলীয় প্রধানের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, সাবের চৌধুরী তাঁদের একজন। বাতাসে কথা চালু আছে, ওই কারণে ঢাকায় মেয়র পদে তাঁর দলীয় মনোনয়নের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়েছে। অথচ বিজয়ী হতে পারেন এমন সম্ভাব্য বিকল্প প্রার্থী দলে না থাকায় সংস্কারের অজুহাতে ছয় বছর ধরে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। একই কারণে বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়ন ও প্রসারে তাঁর উত্তরসূরিদের তুলনায় তিনি অনেক বেশি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখার পরও বোর্ডের সভাপতি পদে গত নির্বাচনে তিনি সরকারের আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হন। পেছনের সারির সাংসদেরা পতাকা বা পদ ছাড়াও যে অনেক কিছু করতে পারেন বলে সাবের চৌধুরী সংসদ প্লাজায় অনুষ্ঠিত সংবর্ধনায় মন্তব্য করেছেন, তা কি কিছুটা ইঙ্গিতপূর্ণ নয়?
স্পিকার এবং সাংসদ চৌধুরীর সাফল্যকে ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি ও দশম সংসদের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইতেই পারে। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই? সংগঠন হিসেবে কমনওয়েলথের পরিধি যেহেতু ততটা বিস্তৃত নয়, তাই ওই প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে বিশদ আলোচনা না করলেও তেমন একটা ক্ষতি নেই। তবে প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া যায় আইপিইউর ওয়েবসাইটে। সংগঠনটির সদস্য কারা থাকতে পারেন বা পারেন না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব হচ্ছে এর পরিচালনা পরিষদ বা গভর্নিং কাউন্সিলের। ২০১২ সালের ২৪ অক্টোবর এই পরিচালনা পরিষদের ১৯১তম অধিবেশনে আইপিইউর সদস্যপদ নিয়ে যে আলোচনা হয়, তার ধারাবিবরণীতে দেখা যায় যে বলা হচ্ছে, ‘যদিও নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি মৌলিক উপাদান, তা সত্ত্বেও সংগঠনটির সদস্যপদের জন্য মৌলিক চাহিদা হিসেবে পার্লামেন্টটি নির্বাচিত হতে হবে, এমন শর্তের অন্তর্ভুক্তি থেকে আইপিইউ বিরত থাকছে। সুতরাং সদস্যপদের জন্য এটি কোনো আবশ্যকতা হিসেবে বিবেচিত হবে না।’ ওই একই সভার বিবরণীতে সংগঠনটির সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিলের বিষয়ে আলোচনার বিস্তারিত লেখা আছে। তাতে দেখা যায়, অসাংবিধানিক পন্থায় পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হলে সেই দেশের সদস্যপদ স্থগিতের বিধান তারা প্রয়োগ করতে পারে। আইপিইউর সাধারণ নীতি হচ্ছে, কোনো দেশে কোনো ধরনের সামরিক অভ্যুত্থান হলে তার সদস্যপদ স্থগিত করে দেওয়া। কিন্তু সম্প্রতি সেই অবস্থান থেকেও তারা সরে এসেছে। মিসর, লিবিয়া ও তিউনিসিয়ার ক্ষেত্রে অসাংবিধানিক পন্থায় পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার পরও সংগঠনটি তা করেনি এবং যুক্তি দিয়েছে যে গণতন্ত্রায়ণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ওই সব পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে। গণতন্ত্র সমুন্নত রাখার কৃতিত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কোনো সার্টিফিকেট জারির অবস্থানে যে প্রতিষ্ঠানটি আছে, তা বলার অবকাশ নেই।
সোয়া শ বছরের এই বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানটি নিঃসন্দেহে অনেক মর্যাদাপূর্ণ এবং ঐতিহ্যের অধিকারী। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ৪৫ হাজার এমপির প্রতিনিধিত্ব করে এই সংগঠন। তাই একজন বাংলাদেশির এই সংগঠনটির নেতৃত্বের আসন লাভে সব বাংলাদেশিই যে আনন্দিত হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তবে বিষয়টিকে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির বিজয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা আসলে তাঁদের রাজনৈতিক দৈন্যের কথাই সবাইকে মনে করিয়ে দেবে। বিশ্ব পরিসরে ভোটের বিজয় দেশের ভেতরে ভোটহীন ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশের উপলক্ষ বা মাধ্যম কোনোটিই হতে পারে না। সাবের চৌধুরীর বিজয়ের পর আইপিইউর আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে অ্যামনেস্টির ঘোষিত ‘বিবেকের বন্দী’ সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০২ সালে সাবের চৌধুরী বিনা বিচারে আটক থাকার সময়ে তাঁকে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি বিবেকের বন্দী বলে অভিহিত করেছিল। এখন তিনি যে সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন, সেই সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো সভায় উপস্থিতি অর্ধেকের কম হলে সেই সভা কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে ভোট নিতে পারে না। আশা করা যায়, বৈশ্বিক পরিসরে গণতান্ত্রিক আচার-রীতির এসব ধারা প্রয়োগ করার সময় নিজ দেশের জন্য তাঁর বিবেক নিশ্চয় দীর্ঘকাল নির্বিকার থাকবে না এবং তিনি জাতীয় রাজনীতিতে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় তাঁর ক্ষমতা ও প্রভাবকে কাজে লাগাবেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির যে করুণ অবনতি দৃশ্যমান, তা নিয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনা ও বিতর্কের শেষ নেই। কিন্তু এসব সমালোচনার মধ্যেই মঙ্গলবার বাংলাদেশ অন্য ১৫টি দেশের সঙ্গে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের সদস্য হিসেবে আগামী তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। ওই নির্বাচনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেছেন যে বাংলাদেশ যে সঠিক পথে রয়েছে, এসব নির্বাচনের সাফল্য তার প্রমাণ (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২২ অক্টোবর, ২০১৪)। জাতিসংঘ এবং তার সহযোগী সংস্থাগুলো জাতিসংঘ সনদ এবং অন্যান্য বৈশ্বিক সনদ ও নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করছে কি না, তার ওপর নজরদারি করার একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ইউএন ওয়াচ। মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত ও নিন্দিত দেশগুলোর জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ ও রেকর্ডের তালিকা এই ইউএন ওয়াচ নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে। নিকট অতীতে ইরান, সিরিয়া, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সুদানের মতো দেশগুলোর মানবাধিকার পরিষদ ও তার বিভিন্ন কমিটিতে নির্বাচিত হওয়ার কঠোর সমালোচনার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বহুবার খবরের শিরোনাম হয়েছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে নির্বাচিত হলেই দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে—এই ধারণা নিয়ে মানবাধিকারবিষয়ক উদ্বেগগুলো নিরসনের চেষ্টা না করলে তাতে নিজেদের রেকর্ডে যে উন্নতি ঘটবে না, সেটা নিশ্চয়ই আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন। কেননা, তাঁকেই তো বহির্বিশ্বে এসব বিষয়ে অপ্রীতিকর প্রশ্নগুলোর মুখে পড়তে হয়।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

লতিফ সিদ্দিকীর ভুল সিদ্ধান্ত: কাফফারা কে দেবে? by মোহাম্মদ রেজাউল করিম

পাট রপ্তানি বন্ধ রাখার একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তৎকালীন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। তাঁর নির্দেশে ২০০৯ সালের ৭ ডিসেম্বর এক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কাঁচা পাট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ব্যতিরেকে স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। শুধু তা-ই নয়, একই প্রজ্ঞাপনে রপ্তানির লক্ষ্যে বন্দরে আনা কিন্তু এখনো জাহাজীকরণ হয়নি, এরূপ পাটও (কাঁচা ও পাকা বেল) নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত করা হয়েছে।
আকস্মিকভাবে এই প্রজ্ঞাপনটি ছিল পাট রপ্তানিকারক তথা আমদানিকারক দেশগুলোর ক্রেতাদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের শামিল। কেননা, কাঁচা পাট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) সঙ্গে কোনো রকম আলাপ-আলোচনা ছাড়া বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত তাদের হতবাক করেছে। যে সংগঠনের সদস্য ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকেরা অভ্যন্তরীণ পাটকলগুলোর চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে পাট রপ্তানি করে হাজার কোটি টাকার ওপর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে, এমনকি রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা জারির আগে ২০০৯ সালের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বিশ্বের ২০টি দেশে আট লাখ ৭৭ হাজার বেল কাঁচা পাট রপ্তানি করে ৫২৯ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে, সে সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ ব্যাপারে একটিবারের জন্যও আলাপ-আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী। পাট ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর মৌসুমের শুরুতে কৃষকদের কাছ থেকে উপযুক্ত দাম দিয়ে লাখ লাখ মণ কাঁচা পাট কিনে থাকেন, যখন সরকারি-বেসরকারি পাটকলগুলো পাট কেনায় এগিয়ে আসতে পারে না।
এ রকম একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল আজ থেকে ৩০ বছর আগে, যার খেসারত আমরা এখনো দিয়ে যাচ্ছি। ১৯৮৪ সালের ১৯ অক্টোবর বিজেএর সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়া হঠাৎ পাট রপ্তানি বন্ধ করা হয়। তখন কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল বন্যার দরুন পাটের উৎপাদন হ্রাসের কথা। কিন্তু বছর শেষে দেখা যায়, প্রায় ১০ লাখ বেল পাট উদ্বৃত্ত রয়েছে। সেই সময় পাট রপ্তানি বন্ধের ফলে ডান্ডিসহ বিশ্বের বহু জুট মিল পাটের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তী সময়ে সিনথেটিকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ-দেশীয় পাট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের অনেকে কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে অনেকে দেউলিয়া হয়ে যান, অনেকে ব্যাংকের দেনায় জর্জরিত হয়ে পথে বসে পড়েন। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পাট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের চূড়ান্তভাবে সাহায্য বা সহযোগিতা কোনো সরকারের আমলেই পাওয়া যায়নি।
২৫ বছর পর আবারও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল ২০০৯ সালে। এর ফলে পাট রপ্তানিকারকদের আর্থিক ক্ষতিসহ সব দায়দায়িত্ব কি তৎকালীন পাটমন্ত্রীর ওপর বর্তায় না? যিনি আমাদের বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত তিনি নিজ দায়িত্বে নিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কোনো অনুমোদন নেননি। তাহলে প্রশ্ন হলো, যে দোহাই দিয়ে তিনি পাট রপ্তানি বন্ধের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন, তা কোন তথ্যের ভিত্তিতে? বলা হয়েছে কাঁচা পাটের সরবরাহ নিশ্চিত করতে। ২০০৯ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় একটি জাতীয় দৈনিকে বিজেএমসির এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে, যাতে বলা হয়েছে, দেশে পাট উৎপাদন এ বছর ৫৫ লাখ বেল হয়েছে। তাহলে উৎপাদন হ্রাস কোথায় হলো? বিজেএর সূত্রমতে, ২০০৮-২০০৯ মৌসুমে উদ্বৃত্ত পাট আনুমানিক সাত লাখ বেল, ২০০৯-১০ মৌসুমের পাট উৎপাদন ৫৭ লাখ বেল, মোট সম্ভাব্য প্রাপ্যতা ৬৪ লাখ বেল, মোট অভ্যন্তরীণ বাজারজাত এ পর্যন্ত ৩৮ লাখ বেল, মোট মজুত রয়েছে ২৬ লাখ বেল, জুট মিলের জন্য প্রয়োজন ১৬ লাখ বেল, অভ্যন্তরীণ গৃহস্থালি ব্যবহার দুই লাখ বেল, উদ্বৃত্ত থাকবে আট লাখ বেল। তাহলে পাট রপ্তানি বন্ধের যুক্তিই নেই।
কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধের কারণে বিশ্বের প্রধান প্রধান ক্রেতা ভারত, চীন, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে এবং ওই দেশের মিলগুলো সংগত কারণে বাংলাদেশের কাঁচা পাটের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে এবং পুনরায় সিনথেটিক বা অন্য বিকল্প কোনো পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়লে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, এসব উল্লেখ করে ২০০৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া/ক্ষতি কী হবে, সব বিস্তারিত জানিয়ে বিজেএর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী এর বিরূপ ফলাফল জানতে পেরে কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন এবং নির্দেশে তিনি উল্লেখ করেন, ‘পাট রপ্তানি বন্ধ রাখার যুক্তি নাই। রপ্তানি শুরু করা যায়।’
কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্নভাবে টালবাহানা করে তৎকালীন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী কাদের স্বার্থ রক্ষার্থে নির্দেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব করেন, জানা নেই। ২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে জারীকৃত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাঁচা পাট রপ্তানির ওপর ২০০৯ সালের ৭ ডিসেম্বর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধের এ ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে শতাধিক কাঁচা পাট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকের শত শত কোটি টাকা লোকসানের দায়দায়িত্ব কি তৎকালীন পাটমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর ওপর বর্তায় না?
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী থাকা অবস্থায় লতিফ সিদ্দিকী আরও একটি মারাত্মক ক্ষতি করেছেন পাট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের তথা দেশ ও জাতির, তা হলো, নবম সংসদে তাঁর প্রস্তাবে ভুলভাবে আইন পাস হয়েছিল। ২০০৯ সালের ১২ অক্টোবর সংসদে ‘দ্য জুট’ (সংশোধন) বিল পাস করা হয়। ‘মণ’কে ‘কেজিতে’ রূপান্তরের জন্য ওই বিল আনা হয়। বিলে পাঁচ মণের পরিবর্তে ১৫০ কেজি করা হয়। বাস্তবে যা হওয়ার কথা ১৮২ দশমিক ২৫ কেজি। বিলটি পাসের পর নয় মাস গুদামে পাটের বেল বাঁধার কাজ বন্ধ থাকে। কারণ, বেল বাঁধার যন্ত্রগুলো পাঁচ মণের উপযোগী। এতে পাট রপ্তানি ও সরবরাহের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর ২০১০ সালের ৭ জুন নতুন করে বিল উত্থাপন হয় সংশোধনের জন্য, যা ১৩ জুলাই পাস হয়।
লতিফ সিদ্দিকীর এ খামখেয়ালিপনা ও একগুঁয়েমি মনোভাবের দরুন এবং ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের কারণে পাট ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের শত শত কোটি টাকা লোকসানের দায়ভার কে নেবে? শুধু তা-ই নয়, দেশও বঞ্চিত হয়েছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে।
মোহাম্মদ রেজাউল করিম: সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএ) ও চেয়ারম্যান, শিপার্স কাউন্সিল অব বাংলাদেশ।
SN_JUTE@HOTMAIL.COM

তাজরীন অগ্নিকাণ্ড- প্রধানমন্ত্রীর কবে সময় হবে? by সায়দিয়া গুলরুখ, নাজনীন শিফা ও মাহমুদুল সুমন

আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে শাহিদা বেগম ও তাঁর স্বামী আতিকুল ইসলামের বাড়ি। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই গার্মেন্টস শ্রমিক। সাত বছর আগে জীবিকার সন্ধানে তাঁরা ঢাকায় এসেছিলেন। তিলে তিলে গড়ে তোলা সংসারে নতুন সদস্যের আগমনের অপেক্ষায় দিন কাটছিল। শাহিদা বেগম আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সন্ধ্যা ছয়টা ৩৮ মিনিটে শাহিদাকে ফোন করেন আতিকুল, ‘ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগেছে, দোয়া কোরো।’ আবার ফোন করেন সাতটা ২ মিনিটে, ‘আমি তিনতলায় আটকা পড়েছি, মনে হয় বের হতে পারব না।’ রাত সাতটা ৩৩ মিনিটে শেষ ফোন করেন তিনি, ক্ষীণ কণ্ঠ, ‘আমি মরে যাচ্ছি, ক্ষমা করে দিয়ো।’ তাৎক্ষণিকভাবে আতিকুল ইসলামের লাশ শনাক্ত করা যায়নি। অগ্নিকাণ্ডের তিন মাস পর ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে কবর চিহ্নিত হয় (৩০ জানুয়ারি, ২০১৩)। তাঁর পাঁচ মাস পর প্রধানমন্ত্রী শাহিদার হাতে সাত লাখ টাকার চেক তুলে দেন (৭ মে, ২০১৩)। পাঁচ মাস বয়সের মেয়েকে কোলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বেরিয়ে আসেন শাহিদা, দেবরের হাতে চেকটি তুলে দেন, কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, ‘আমার জীবনটাই পুড়ে ছাই হয়ে গেল, আমার বাচ্চাটা জন্মের আগেই বাবা হারাল। আমরা ঢাকায় এসেছি বেঁচে থাকার তাগিদে, কত অবহেলা? তাই বলে কি একবারে মেরেই ফেলতে হবে?’ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীরা ইশারায় বলতে থাকেন, এবার চলে যান। উপস্থিত এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে শাহিদা বলেন, ‘আমি স্বামী হারিয়ে বিধবা, আমার সন্তান জন্ম থেকে পিতৃহারা, এ ক্ষতির পূরণ নাই। যে আগুন জ্বলছে, তা টাকায় নেভে না। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ, টাকার দরকার আমাদের।’
২৩ মাস আগে আশুলিয়ায় অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে আগুন লেগে ১১২ জনের অধিক শ্রমিক নিহত হন। নিহত শ্রমিকদের মধ্যে ৫৩ জন শ্রমিকের দেহ আগুনের লেলিহান শিখায় ঝলসে যায়। সকালে যে শ্রমিক হেঁটে ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিলেন, পরদিন (২৫ নভেম্বর, ২০১৩) ভ্যানগাড়িতে সাদা বডিব্যাগে করে যে শ্রমিকের পোড়া হাড়গোড় আর কঙ্কাল বের করে আনা হয়েছিল, তা দেখে স্বজনেরা চিনতে পারেননি তাঁদের প্রিয়জনকে। সরকারের নির্দেশে অশনাক্তকৃত লাশ থেকে ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করে কবর দেওয়া হয় জুরাইন গোরস্থানে। অগ্নিকাণ্ডের তিন মাস পর শাহিদার স্বামীসহ ৪২ জন শ্রমিকের কবর শনাক্ত করা গেলেও বাদবাকি হাড়-কঙ্কাল হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের ভাগ্য নির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে চলছে দীর্ঘসূত্রতা।
তাজরীন অগ্নিকাণ্ড ও রানা প্লাজার ভবনধসের পর ডিএনএ পদ্ধতির মাধ্যমে অশনাক্তকৃত শ্রমিকের পরিচয় নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দুটি ঘটনায় নিখোঁজ/অশনাক্তকৃত ২৫০ জন শ্রমিকের কবর শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে আমাদের দেশের যে দুর্বল ও অদক্ষ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো, তা ডিএনএ টেস্টের মতো একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। যেমন: মৃতদেহ উদ্ধার, সংরক্ষণ ও পরিবহনের প্রক্রিয়া যদি ত্রুটিসম্পন্ন হয়, তাহলে তা ডিএনএ পদ্ধতির ফলাফলকে প্রভাবিত করবে। রানা প্লাজা ও তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে আমরা এটি ঘটতে দেখেছি, একটি বডিব্যাগে দুজন শ্রমিকের লাশের অংশবিশেষ থাকার কারণে একই কবরে দুজন শ্রমিকের ডিএনএ ম্যাচ করতে দেখা গিয়েছে। তাই ডিএনএ পদ্ধতির পাশাপাশি পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে এবং অশনাক্তকৃত/নিখোঁজ শ্রমিকের পরিবারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য দাবি আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
তাজরীন অগ্নিকাণ্ডে অশনাক্তকৃত নিহত শ্রমিকদের পরিচয় ও ওয়ারিশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমনই একটি উদ্যোগ আমরা নিতে দেখেছি। হাইকোর্টের একটি রুলিংয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার সহযোগিতায় শ্রম মন্ত্রণালয় ১০ জন অশনাক্তকৃত শ্রমিকের পরিচয় নির্ধারণ করতে পেরেছে। এই মর্মে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বরাবর নিহত শ্রমিকদের অনুদান প্রদানের জন্য যথাযথ উদ্যোগের আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠি দেন (প্রথম আলো, আগস্ট ৩১, ২০১৪)। সরকারি তদন্তের মাধ্যমে শনাক্তকরণের পর ১০ মাস পার হতে চলল, অথচ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে অনুদানের টাকা দেওয়ার জন্য এই শ্রমিক পরিবারগুলোর সঙ্গে আজ পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।
তাজরীন ফ্যাক্টরি যখন জ্বলছে দাউ দাউ করে, রেহানাও তাঁর ভাই মতিকুল ইসলামকে ফোন করেছিলেন। বেঁচে ফেরার কোনো আশা নেই বুঝে ভাইকে অনুরোধ করেছিলেন, ‘সুমনকে (রেহানার সাত বছরের সন্তান) দেখে রাখিস ভাই।’ মতিকুল নিজেও গার্মেন্টস শ্রমিক ছিলেন, বোনের মৃত্যুর পর আর গার্মেন্টসে ফিরে যাননি। তিনি বোন হত্যার বিচার চান, ভাগনেটাকে মানুষের মতো মানুষ করতে চান। গত মে মাস থেকে বহুবার শ্রম মন্ত্রণালয়ে ফোন করে অনুদানের টাকার খোঁজ করেছেন। বারবার তাঁকে বলা হয়েছে, চেক প্রস্তুত আছে, প্রধানমন্ত্রী নিজে চেক বিতরণ করবেন, তাই একটু দেরি হচ্ছে। শেষবার যেদিন মতিকুল ফোন করলেন, প্রধানমন্ত্রী তখন আসেম সম্মেলনে যোগদান করতে ইতালির মিলান শহরে। মতিকুলের মতো হেনা, মাহফুজা, রেহানা, আহিনুর, রোজিনা, আকলিমা, সালমা, আসমা, শিলা, শাহানা, সবুজ মিঞা, শমসের, ও সাদেকুলের পরিবারের সবার একটাই প্রশ্ন, যার সদুত্তর কেউ দিতে পারছে না, ‘প্রধানমন্ত্রীর কবে সময় হবে, আমরা আর কত দিন অর্ধাহারে-অনাহারে থাকব?’
এই দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সায়দিয়া গুলরুখ, নাজনীন শিফা ও মাহমুদুল সুমন
লেখকেরা অ্যাক্টিভিস্ট নৃবিজ্ঞানীর সদস্য।

নাইকোর চক্রে উল্টো প্যাঁচে বাংলাদেশ by বদরূল ইমাম

নাইকো রিসোর্সেস, ভিনদেশি এক তেল কোম্পানি। বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলন কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় ভিলেন। এই কোম্পানি সুনামগঞ্জের ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে ২০০৫ সালের জানুয়ারি মাসে একটি এবং ওই বছরেরই জুলাই মাসে অপর একটি গ্যাসকূপ দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বিপুল গ্যাস ও পরিবেশ বিনষ্ট করে। এর ক্রমধারায় পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীকে জড়িয়ে নাইকো দুর্নীতির যে চাল চেলেছিল, তাতে বাংলাদেশে তার ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। কেবল তা-ই নয়, বরং তার নিজ দেশ কানাডায় এই দুর্নীতির অপরাধে নাইকো আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হয়েছিল। বাংলাদেশ নাইকোর কাছে ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে বিনষ্ট গ্যাস ও পরিবেশের ক্ষতিপূরণ বাবদ একটি রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী যে অর্থ দাবি করেছিল, তার প্রতি নাইকো কেবল বৃদ্ধাঙ্গুলিই প্রদর্শন করেছে। উপরন্তু, বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে নাইকোর উৎপাদিত গ্যাসমূল্য পরিশোধ করা স্থগিত রাখার যে ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছিল, তা বাতিল করতে নাইকো আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা করে। ওয়াশিংটনভিত্তিক এই আদালত ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট বা সংক্ষেপে ইকসিড নামে পরিচিত।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে আদালত নাইকোর পক্ষে রায় ঘোষণা করেন যে বাংলাদেশকে নাইকোর পাওনা ২১৬ কোটি টাকা সুদসহ পরিশোধ করে দিতে হবে। এদিকে নাইকোর কাছে ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের যে দাবি বাংলাদেশ করে রেখেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নাইকোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে কোনো মামলা করেনি। আর দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে ঢাকায় স্থানীয় আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলার রায়ে যে নির্দেশনা পাওয়া যায়, সেটি মান্য করার কোনো তাগিদ নাইকোকে স্পর্শ করেনি। নাইকো সম্পদ ও পরিবেশ বিনষ্ট করে এবং ক্ষতিপূরণ না দিয়ে বাংলাদেশের হাতে একটি প্যাঁচ মেরেই ক্ষান্ত হয়নি, উপরন্তু বাংলাদেশকে গ্যাসমূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য করার ব্যবস্থা নিয়ে সে যেন অপর হাতটিতেও উল্টোমুখী প্যাঁচ কষেছে।
আরও বিস্ময়ের কথা এই যে নাইকো কেবল তার গ্যাস বিক্রির পাওনা টাকা আদায়ের জন্যই আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে মামলা করেনি, বরং ওই আদালতে দ্বিতীয় একটি মামলা করেছে। দ্বিতীয় মামলাটির লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশে নাইকো যে দুই দুটি গ্যাসকূপ দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে, তার জন্য যে সে দায়ী নয়, সে মর্মে আদালতে রায় চাওয়া। ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম: কালু নামে এক লোক বুলু নামক যুবকটিকে খুন করল। তারপর কালু আদালতে গিয়ে নিজেই একটি মামলা করল যেন আদালত এই মর্মে দায়মুক্তি দেন যে কালু বুলুকে খুন করেনি। এখানে তুলনাটা এ কারণেই প্রযোজ্য যে বাংলাদেশ নাইকোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে গ্যাসকূপ দুর্ঘটনার জন্য নাইকোকে দায়ী করে বা কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করে কোনো মামলা করেনি। কিন্তু তবু নাইকো কালুর মতোই আদালতে গিয়ে আগে থেকেই একটি রায় বের করে নিয়ে আসতে চায় যে সে কূপ দুর্ঘটনায় নির্দোষ।
অনেকের মনেই এ প্রশ্ন যে বাংলাদেশ কেন আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে তার ক্ষতিপূরণ আদায় করার জন্য মামলা করেনি। দীর্ঘ নয় বছর বাংলাদেশ তার সমূহ ক্ষতিপূরণ দাবিকে শূন্যে ঝুলিয়ে রেখে কী আশায় বসে আছে। কেনই–বা এই দীর্ঘ সময় নাইকোকে বাংলাদেশের মাটিতে অবস্থান করতে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটানো এবং সম্পদ বিনষ্ট করার জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত অনুসন্ধান কমিটি কর্তৃক নাইকো দায়ী সাব্যস্ত হওয়ার পরও কেন নাইকোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়নি। বাংলাদেশ বর্তমানে যখন গ্যাস তথা জ্বালানিসংকটে নিমজ্জিত, তখন ছাতকের মতো উৎপাদনক্ষম গ্যাসক্ষেত্রটিকে পঙ্গুত্বের বেড়ি পরিয়ে রেখে আর কত দিন নাইকো বাংলাদেশকে তার নিজস্ব গ্যাসসম্পদ থেকে বঞ্চিত করে রাখবে।
বাংলাদেশের নরম হাত নাইকোকে শক্ত করেছে: পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তেল কোম্পানি কর্তৃক গ্যাস বা তেল কূপ দুর্ঘটনা ঘটানো এবং সম্পদ ও পরিবেশের ক্ষতি করার পরিপ্রেক্ষিতে তেল কোম্পানিকে যে দায় বহন করতে হয়, তা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরে তেল কূপ ‘হরাইজন’ দুর্ঘটনা পতিত হলে বিপুল তেলসম্পদ ও পরিবেশের যে ক্ষতি হয়, তার জন্য ওই কূপ খননকারী ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানিকে ১১ বিলিয়ন ডলার (৮০ হাজার কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। তেল কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মার্কিন সরকার ও নাগরিক সমাজের যৌথ চাপ এতটাই প্রকট ছিল যে কোম্পানিটির প্রধান কর্মকর্তাকে তার প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব রক্ষার শঙ্কায় মেক্সিকো উপসাগরের তীরে হাঁটু গেড়ে নতজানু হয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। কূপ দুর্ঘটনার দায় মেটাতে গিয়ে বহু তেল কোম্পানির যে বেহাল অবস্থা হয়ে থাকে, তার মূল কারণ এই যে তেল-গ্যাস দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বা জনপথ কর্তৃক তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান।
এর ব্যতিক্রম ঘটে বাংলাদেশে। নাইকো কর্তৃক গ্যাসকূপ দুর্ঘটনা–পরবর্তী সময়ে দেশের বিশেষজ্ঞ দল (কোম্পানির প্রতিনিধিসহ) গঠিত অনুসন্ধান কমিটির রিপোর্টে নাইকোর কারিগরি ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতাকে দুর্ঘটনার জন্য সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলেও বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপে কোনো শক্ত হাতের চিহ্ন মেলে না। আর এর কয়েকটি নমুনা নিম্নরূপ:
ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে যে সম্পদ ও পরিবেশের বিনষ্ট করা হয়েছে, দাবি করা ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়ে অনেক কম। যে গ্যাসস্তরটি দুর্ঘটনাকবলিত, নাইকোর হিসাবমতে, তার মধ্যে গ্যাস ছিল ১১৫ বিলিয়ন ঘনফুট, যার মূল্য প্রায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এই গ্যাসের পুরোটাই দুর্ঘটনার ফলে ভূগর্ভে নিজ স্থান থেকে বেরিয়ে গিয়ে ওপরে নরম বালুস্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে, যা কিনা আর কখনো উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। নাইকো দুর্ঘটনার পর এই নয় বছরে এটি থেকে এক বিন্দু গ্যাস উৎপাদন করে দেখাতে পারেনি যে এটির অস্তিত্ব বিদ্যমান। সেটি সম্ভব হলে সে তা করে দাবি করা ক্ষতিপূরণের হিসাবে তর্কের অবতারণা করত নিশ্চয়ই। আর বাংলাদেশ পরিবেশের যে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে, তাও নেহাত আংশিক। দৃশ্যত পরিবেশদূষণ ছাড়াও আন্তর্জাতিক রীতিতে মানুষের ক্ষতি তা পারিপার্শ্বিক, ভৌত বা মানসিক—সবই অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ২০০৫ সালে এক পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবে দাবি করে, নাইকো কূপ দুর্ঘটনায় ক্ষতির মোট পরিমাণ তিন হাজার কোটি টাকা থেকে সাত হাজার কোটি টাকা (আবুল বারকাত ২০০৫)। উল্লিখিত হিসাবের তুলনায় বাংলাদেশ কর্তৃক ৭৫০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি নেহাতই কম।
ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য বাংলাদেশ নাইকোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে মামলা করেনি। নাইকোর কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে তা আদায়ে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ২০০৮ সালে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে ৭৫০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করে। আদালত ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করে এবং ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত নাইকোর ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে কেনা গ্যাসের মূল্য পরিশোধ না করার আদেশ দেন। কিন্তু বিদেশি কোম্পানি নাইকো বাংলাদেশের আদালতের রায়কে গ্রাহ্য করার করার কারণ খুঁজে পায়নি বিধায় ক্ষতিপূরণ না দিয়ে কেবল প্রদত্ত রায়কে উপেক্ষা করে।
ওদিকে নাইকো ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত ইকসিডে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে। একটি মামলা ‘পেমেন্ট ক্লেম’, যার রায়ে (সেপ্টেম্বর ২০১৪-তে প্রদত্ত) বাংলাদেশকে গ্যাসের মূল্য পরিশোধ করতে বলা হয়েছে, আর অপরটি ‘কম্পেনসেশন ক্লেম’ যেটিতে নাইকো কূপ দুর্ঘটনার জন্য নিজের দায় অস্বীকার করে দায়মুক্তি প্রার্থনা করেছে (যার রায় আগামী মাসে দেবে বলে ধারণা করা হয়)। যেখানে স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশ তার ক্ষতিপূরণের জন্য নাইকোকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে দেখা যায় যে নাইকো বাংলাদেশকে আদালতে নিয়ে গিয়ে তার স্বার্থ রক্ষায় রায় বের করে আনে। বাংলাদেশের এই দুর্বল আইনি ব্যবস্থাপনা অগ্রহণযোগ্য।
নাইকোর অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতায় দুর্ঘটনা ঘটানো, বিপুল সম্পদ ও পরিবেশ বিনষ্ট করে তার ক্ষতিপূরণ না দেওয়া এবং বড় আকারের দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া—এসব কার্যকলাপের পরও তার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পাদিত জেভিএ চুক্তিটি আজ প্রায় ১০ বছর পরও বাতিল করা হয়নি। এসবই বাংলাদেশের দুর্বলতার সাক্ষ্য বহন করে।
বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস তথা জ্বালানিসংকটের সময়ে ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের মতো উৎপাদনক্ষম ক্ষেত্র নাইকোর মতো দুষ্ট চক্রে ঘেরা এক কোম্পানির কাছে কেন জিম্মি হয়ে থাকছে, তা বোধগম্য নয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দুর্বল আইনি তৎপরতা ও ব্যবস্থাপনা ইতিমধ্যেই জাতীয় স্বার্থকে পর্যুদস্ত করেছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের পক্ষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং ত্বরিত কর্মতৎপরতার মাধ্যমে নাইকোর অশুভ ছায়া থেকে জাতিকে রেহাই দেওয়া অত্যাবশ্যক।
ড. বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শহীদ মিনারে নূরুল কবির

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির। ভাষা সৈনিক আবদুল মতিনের স্মরণসভায় অংশ নিয়ে তিনি বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। টকশো আলোচক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে নেয়াকে কেন্দ্র করে ভূঁইফোড় কয়েকটি সংগঠন তিন বিশিষ্ট সাংবাদিকসহ ৯ বিশিষ্ট নাগরিককে শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। এরপর বিভিন্ন মহল থেকে এর তীব্র সমালোচনা হয়। গতকাল সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে তিন সাংবাদিককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করায় তীব্র নিন্দা জানানো হয়। এ ঘটনা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই নূরুল কবির শহীদ মিনারে অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন। স্মরণসভায় বক্তারা আবদুল মতিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, তার সামনে অনেক পথ খোলা ছিল। তিনি আইনজীবী হতে পারতেন, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হতে পারতেন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে আমলা হতে পারতেন। এ সবকিছু বাদ দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের স্বার্থে সারাজীবন ত্যাগ করে গেছেন। যদি এদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস ও যথার্থ ইতিহাস লিখতে হয়, তাহলে সেখানে ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন থাকবেন। তিনি ইতিহাসের মধ্যে ছিলেন এবং ইতিহাসকে বদল করতে চেয়েছিলেন। সভার শুরুতে ভাষা মতিনের বিদেহী আত্মার শান্তি ও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। স্মরণসভার আহ্বায়ক ভাষা সৈনিক আহমদ রফিকের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন কমিটির সদস্য সচিব কামাল লোহানী, আবদুল মতিনের সহধর্মিণী গুল বদুন্নেছা মনিকা, ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মোহাম্মদ, অধ্যাপক আকমল হোসেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ডা. শহিদুল্লাহ চৌধুরী, নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর, ইউসিএলবির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন নান্নু, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি প্রমুখ। সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমাদের দেশে এখন অল্প কিছু মানুষ আছে যাদেরকে যোদ্ধা বলতে পারি। বেশির ভাগ মানুষই এখন ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছে। ধনীরা, প্রতিষ্ঠিতরা এবং সাধারণ মানুষরা ভিক্ষুক। যারা এই ব্যবস্থাকে মেনে নেয় এবং তা থেকে সুযোগ নিতে চায়, তারা ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছে। আমাদের রাষ্ট্র একটি ভিখারি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের যারা কর্তা তারা বিদেশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের সাহায্য চায়, অনুগ্রহ চায়, সার্টিফিকেট চায়। এখানে আবদুল মতিন ছিলেন সমাজ পরিবর্তনের যোদ্ধা এবং সে তার পরিচিত এই সমাজ এবং রাষ্ট্র ওইভাবে উজ্জ্বল করে তুলে ধরেননি। তিনি বলেন, রাষ্ট্র আবদুল মতিনকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। এটা আমরা বলি, এটা খুব স্বাভাবিক। রাষ্ট্র আবদুল মতিনকে হয় উপেক্ষা করবে, নয়তো তাকে নিপীড়ন করবে। অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, ভাষা সৈনিক আদুল মতিন যে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করেছিলেন সেই বাংলা ভাষা এখন প্রান্তিক ভাষায় পরিণত হয়েছে। বাংলা ভাষাকে যথার্থ মর্যাদা আমরা দিতে পারিনি। গুল বদুন্নেছা মনিকা বলেন, নতুন প্রজন্ম যেন আবদুল মতিনের জীবনে থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের জন্য কাজ করে সেটিই আমার বড় চাওয়া। সাধারণ মানুষ তার প্রতি যে শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন তাতে আমি মুগ্ধ।

তেল বিক্রি থেকে আইএসের দৈনিক আয় ১০ লাখ ডলার

আইএস কালোবাজারে তেল বিক্রি করে প্রতিদিন অন্তত ১০ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ আয় করে। তা ছাড়া মুক্তিপণ ও চাঁদাবাজি থেকে গোষ্ঠীটি মাসে কোটি কোটি ডলার আয় করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি আন্ডারসেক্রেটারি ফর টেররিজম অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ডেভিড কোহেন বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানান।
কোহেন বলেন, অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর চেয়ে আইএস অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্পদ সংগ্রহ করছে। এ কারণে তাদের কাছে অর্থ সরবরাহ বন্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এমন কোনো গোপন অস্ত্র নেই যা দিয়ে রাতারাতি আইএসের ভাণ্ডার শূন্য করে ফেলব। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি লড়াই হবে। আর এই মুহূর্তে আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছি।’ আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওবামা প্রশাসনের যে দলটি কাজ করছে কোহেন সেই দলের অন্যতম সদস্য।
দ্য কার্নেগি এনডাউমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল পিসের ভাইস প্রেসিডেন্ট মারওয়্যান মুয়াশের বলেন, ‘আইএসকে এখন বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী ও আর্থিকভাবে বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন আধুনিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা যায়’। গোষ্ঠীটি চলতি বছর মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে দুই কোটি মার্কিন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে সাংবাদিক ও ইউরোপীয়দের অপহরণ করে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ তারা সংগ্রহ করেছে।
চলতি বছরের জুন থেকে ইরাক ও সিরিয়ার বৃহৎ অঞ্চলের দখল নিতে থাকে আইএস। ইরাকি সেনাবাহিনীকে হটিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র মসুল বাঁধের নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। এ ছাড়া ইরাকি বাহিনীর কাছ থেকে য্ক্তুরাষ্ট্রের দেয়া আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রগুলোও ছিনিয়ে নেয় আইএস যোদ্ধারা। সিরিয়া ও ইরাকের বিশাল অংশ দখল করে নেয়া এলাকাকে ইসলামি খেলাফত বলে ঘোষণা দেয় তারা।
১৭০০ বোমা ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র
এদিকে পেন্টাগন বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরাক এবং সিরিয়ার আইএসের বিরুদ্ধে এক হাজার সাত শ’র বেশি বোমা ফেলেছে। গত ১০ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিমানগুলো প্রায় ৬৬০০ দফা অভিযান চালিয়েছে বলেও জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। অবশ্য মার্কিন জঙ্গি বিমানগুলোই বেশির ভাগ হামলা করেছে উল্লেখ করে এ বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ৬৩২ বোমা হামলার মধ্যে মার্কিন মিত্ররা মাত্র ৭৯টিতে অংশ নিয়েছে।
গত মাসের শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আরব মিত্ররা সিরিয়ায়  আইএসআইএলের অবস্থানের ওপর বিমান হামলা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এ হামলায় যোগ দিয়েছে সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, জর্দান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। অবশ্য জাতিসঙ্ঘের কোনো ম্যান্ডেট ছাড়াই এ হামলা চালান হচ্ছে।

ব্রিগেন বৃত্তান্ত by মুহাম্মদ রোকনুদ্দৌলাহ্

নরওয়ের ব্রিগেন সাংস্কৃতিক কারণে ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্য স্থানের মর্যাদায় ভূষিত হয় ১৯৭৯ সালে। ব্রিগেন বলতে বোঝায় একধরনের অবকাঠামো বা স্থাপনা, যা কোনো পোতাশ্রয়ের উপকূলে জাহাজে মাল ভরা ও খালাসের কাজে ব্যবহার করা হয়। এতে থাকে সারিবদ্ধ বিশেষ ধরনের দালান বা পণ্যসামগ্রীর গুদাম। তার মানে ব্রিগেন হচ্ছে বিশেষ ধরনের বন্দর। একে টিস্কেব্রিগেনও বলা হয়। ব্রিগেন মধ্যযুগের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিস্ময়কর স্থাপনা। নরওয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বার্গেনে আসার পথে ফজোর্ডের পূর্ব ধারে এর অবস্থান। ফজোর্ড হচ্ছে একধরনের দীর্ঘ ও সরু জলাশয়, যার ধার বেশ খাড়া। বার্গেন শহর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১০৭০ সালে। আর এখানে হ্যানসিটিক লিগের একটি কন্টর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৩৬০ সালে। হ্যানসিটিক লিগ বলতে বোঝায় উত্তর ইউরোপের নগরগুলোর বাণিজ্যিক সঙ্ঘ, যা টিকে ছিল ১৩ থেকে ১৭ শতক পর্যন্ত। আর কন্টর হচ্ছে বৈদেশিক বাণিজ্যকেন্দ্র। ধরা যাক, হ্যানসিটিক লিগের যুগে জার্মানির হামবুর্গ শহর নরওয়ের বার্গেন নগরে একটি বাণিজ্যকেন্দ্র খুলল। তাহলে সাধারণ অর্থে এটি হলো বার্গেনে হামবুর্গের একটি কন্টর। একসময় ব্রিগেনের প্রশাসনিক ভবনগুলোয় অনেক কেরানির বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়েছিল। এরা হ্যানসিটিক লিগের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছিল। তবে বেশি এসেছিল জার্মানি থেকে। ব্রিগেনের গুদামগুলো পণ্যসামগ্রীতে ভরা থাকত। এখানে বেশি পাওয়া যেত নরওয়ের মাছ এবং ইউরোপের অন্যান্য এলাকার শস্যকণা। ইতিহাসের যুগপরিক্রমায় বার্গেন শহর বহুবার আগুনে পুড়েছে। এখানকার বেশির ভাগ বাড়ি ছিল কাঠের তৈরী। বার্গেনের অগ্নিকাণ্ডের বিশেষ কারণ ছিল ব্রিগেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৭০২ সালে ব্রিগেন অগ্নিদগ্ধ হয়। এর ফলে বার্গেন হয় ক্ষতিগ্রস্ত। ১৯৫৫ সালে সর্বশেষ ব্রিগেন পোড়ে। তবে ঐতিহ্য ঠিক রেখে এটি পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করা হয়। এখন ব্রিগেনের পুরনো ভূদৃশ্যসহ মাত্র ৬২টি বাড়ি টিকে আছে। আর এগুলোই বিশ্বঐতিহ্যের বিশেষ অংশ হিসেবে পরিচিত।

সমুদ্র দেখতে কক্সবাজার, অতঃপর থাইল্যান্ডের জঙ্গলে by রোকনুজ্জামান পিয়াস

দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা মনে করে এখনও শিউরে ওঠে নবম শ্রেণীর ছাত্র সজীব, রনি ও তাদের জুনিয়র শহিদুল। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য দেখতে গিয়েছিল তারা। কথা ছিল তিনদিন পরই ফিরে আসবে। ফিরে অবশ্য এসেছে। তবে তিনদিন নয়, দীর্ঘ ১০ মাস পর। আর সঙ্গে নিয়ে এসেছে দুর্বিষহ দিনগুলোর নানা ঘটনা। পাচারকারীর খপ্পরে পড়ে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল তারা। নানা ঘটনার জন্ম দিয়ে অবশেষে ধরা পড়ে থাইল্যান্ড পুলিশের হাতে। এরপর কেটে যায় ১০টি মাস। আর প্রতারক দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারানো ইমান আলীও স্বাভাবিক হতে পারছেন না। থাইল্যান্ডের জঙ্গল ও জেলে কাটানো ভয়াবহ স্মৃতি এখন তার সঙ্গী। দালালচক্র তাকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে ফিরে এসেছে দেশে। এ ধরনের নানা ঘটনার শিকার হয়ে গত সোমবার বিকালে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরেছেন ৩৬ জন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় তারা দেশে ফেরেন। এখনও ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন শত শত বাংলাদেশী।
গাজীপুরের মৌচাক এলাকার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র সজীব জানায়, সে, সহপাঠী রনি ও তাদের জুনিয়র শহিদুল মিলে গত বছর ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে সমুদ্র সৈকত দেখতে গিয়েছিল কক্সবাজারে। সেখানে হামিদ পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি তাদেরকে টেকনাফ নিয়ে যায়। এরপর তাদেরকে শাহাবুদ্দিন দ্বীপে আটকে রাখে ৩ দিন। এ সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ও টাকা পয়সা ছিনিয়ে নেয়া হয়। পরদিন তাদেরকে ২০ হাজার টাকায় একটি দালালচক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। ওই চক্রটি একটি ট্রলারে জোর করে তাদের তুলে নিয়ে গভীর সমুদ্রের দিকে রওনা দেয়। ওই ট্রলারে ছিল ১৪১ জন যাত্রী। এরা সবাই কোন না কোনভাবে পাচারের শিকার। এরপর বেশ কয়েকটি ট্রলার পরিবর্তন করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় থাইল্যান্ডের একটি জঙ্গলে। সেখানে তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। পাচারকারীরা তাদের বাড়িতে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণ না দিলে তাদের ছাড়া হবে না বলেও জানিয়ে দেয়। এমনকি মেরে ফেলার হুমকি দেয়। না খাইয়ে রাখা হয়। ৪ দিন সেখানে থাকার পর থাইল্যান্ড পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। এ সময় কৌশলে পালিয়ে যায় পাচারকারীচক্র। পুলিশ তাদেরকে নিয়ে থাইল্যান্ডের শনখলা এলাকার একটি সরকারি অফিসে বন্দি করে রাখে। সেখানে আরও ৬শ’র মতো বাংলাদেশী আটক ছিল। ১০-১২ দিন পরে ৪০০ জনকে সরিয়ে অন্যত্র নেয়া হয়। সজীব জানায়, প্রায়ই তাদেরকে রোহিঙ্গা বলে নির্যাতন করা হতো। পুলিশ বিশ্বাস করতো না যে তারা বাঙালি। তারা অনেক রোহিঙ্গাকে বিক্রি করে দিতো। তাদেরকে ভয়ভীতি দেখানো হতো। আটক থাকার ৫৪ দিন পর ব্যাংককস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা সেখানে যান। তাদের সঙ্গে কথা বলেন। ঠিকানা জানার পর তিনি আশ্বাস দেন ২ মাস পর তাদেরকে দেশে পাঠানো হবে। তবে সময় পার হয়ে গেলেও আর দেখা মেলেনি ওই কর্মকর্তার। তাদেরকে খেতে দেয়া হতো শুকনো শসার সঙ্গে এক মুঠো ভাত। পান করতে দেয়া হতো নোংরা পানি। এতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয় তারা। সজীবের অভিযোগ, বাঙালিদের ওপর পুলিশ নির্যাতন করতো। রোহিঙ্গাদের ওষুধ সরবরাহ করলেও বাঙালিদের দেয়া হতো না। পুলিশ বলতো, রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ আছে কিন্তু বাঙালিদের জন্য কোন বরাদ্দ নেই। প্রায় ৩ মাস পার হওয়ার পর বাংলাদেশীরা আন্দোলন করে খাবার এবং দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য। সজীবের পরিবার থেকেও যোগাযোগ করা হয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সজীবের পিতা এবং গার্মেন্ট কর্মী মা ছেলেকে ফেরত আনতে টিকিটের জন্য ১৬ হাজার টাকা জোগাড় করেন। সজীবের মা জানান, ৩ হাজার টাকা নিজের কাছে ছিল আর ১৩ হাজার টাকা ধারদেনা করেছি। ছেলেকে ফিরে পেয়েছি এটাই বড় কথা। সজীব আরও জানায়, যে শাহাবুদ্দিন দ্বীপে তাদের আটক রাখা হয়েছিল সেখানে সবাই পাচারের সঙ্গে জড়িত। পালিয়ে গেলেও অন্য পাচারকারীরা তাদের আটক করে ফেলতো। এছাড়া মেরে ফেলারও হুমকি দেয়া হতো তাদের।
কুমিল্লা জেলার হোমনার বাহের কলামিনা গ্রামের ইমান হোসেন। দালাল বাবুল মিয়ার খপ্পরে পড়ে এখন তিনি সর্বস্বান্ত। খুইয়েছেন প্রায় ৭ লাখ টাকা। এর সবটাই প্রায় ধারদেনা করে সংগ্রহ করেছিলেন তিনি ও তার পরিবার। টেকনাফের বাসিন্দা বাবুল মিয়ার শ্বশুরবাড়ি ইমান আলীর গ্রামে। সেই সূত্রে পরিচয়। বাবুল মিয়া টার্গেট করে ইমান আলীকে। তাকে প্রলোভন দেখায় সাগরপথে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার। সেখানে ভাল কাজ দেয়ার। সে মোতাবেক চুক্তি হয়। আপাতত ১৫ হাজার টাকা দাবি করে বাবুল মিয়া। মালয়েশিয়া পৌঁছানোর পর দিতে হবে আরও ২ লাখ ৫ হাজার। বাবুল মিয়ার কথামতো এ বছরের জানুয়ারি মাসে ট্রলারে ওঠেন তিনি। ওই ট্রলারে তার মতো আরও ২৫০ জন ছিলেন। ৬টি ট্রলার পরিবর্তন করে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় থাইল্যান্ডের জঙ্গলে। সেখানে তাদের আটকে রেখে বাড়িতে ফোন দিয়ে বাকি টাকা দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। দালালচক্র তাদেরকে বলে বাকি টাকা না দিলে তাদেরকে মালয়েশিয়া পৌঁছানো হবে না। এমনকি মৃত্যুর ভয়ও দেখানো হতো। সে মোতাবেক বাবুল ও অপর দালাল আলম তার পরিবারের কাছ থেকে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা নিয়ে আসে। তাদেরকে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত আনোয়ার নামে এক বাংলাদেশীর কাছে হস্তান্তর করার কথা। ওই জঙ্গলে অবস্থানকালেই ২৫শে জানুয়ারি থাইল্যান্ড পুলিশের হাতে আটক হন তারা। দীর্ঘ ১০ মাস কারাগারের অন্ধকারেই ছিলেন ইমান আলীসহ শত শত বাংলাদেশী। এ সময়েও তাকে ফিরিয়ে দেয়ার শর্তে দালাল বাবুল ও আলম পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে প্রায় ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই টাকা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে দালালদের দিয়েছিল তার পরিবার। পরে ব্যাংককস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় ফিরে এসেছেন ইমান আলী। ৪০ বছর বয়সী দুই ছেলে ও এক মেয়ের পিতা ইমান আলী এখন এক প্রকার নিঃস্ব। এদের মতো শত শত বাংলাদেশী এখনও সে দেশের জেলে অথবা জঙ্গলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। অনেকের খোঁজ আছে আবার অনেকেরই নেই। এসব দালালচক্রকে শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছে পুলিশে অপরাধ তদন্ত বিভাগ। মানব পাচার প্রতিরোধ সেলের দায়িত্বরত কর্মকর্তা এএসপি সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশে ফেরত আসা কর্মীদেরকে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করতে অনুরোধ করা হয়েছে। কোন থানায় মামলা নিতে না চাইলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগেরও পরামর্শ দেন তিনি। তিনি আরও জানান, মামলা হওয়ার পরই কেবল এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব।

কাজের খোঁজে মালদ্বীপের রাস্তায় বাংলাদেশীদের অপেক্ষা by দীন ইসলাম

দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের রাজধানী মালে, হোলেমালে দ্বীপসহ বিভিন্ন স্থানে কাজের খোঁজে বাংলাদেশীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। প্রতিদিন সকালে মালের প্রাণকেন্দ্র মাজিদা সড়ক, হোলেমালের বিভিন্ন বাঙালি গেস্ট হাউজে তারা কাজের জন্য অপেক্ষা করেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ একদিনের জন্য বিক্রি হয়ে যান। যারা বিক্রি হতে পারেন না, তাদের হতাশা দীর্ঘ হয়। মালে ও হোলেমালে দ্বীপে সরজমিন গিয়ে শোনা যায়, অনেক স্বপ্ন নিয়ে তারা মালদ্বীপে এসেছিলেন ভাগ্য বদলানোর আশায়। দালালদের মাধ্যমে তারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে এসেছিলেন। কিন্তু কাজ পাননি। তাই দিনভিত্তিক কাজের আশায় এখানে ভিড় করেন তারা। মালদ্বীপের যেসব জায়গায় দিনভিত্তিক শ্রমিক পাওয়া যায় ওই জায়গার নাম প্রবাসী বাংলাদেশীরা বলেন, ‘আমিলার বাজার’ (আমিলা অর্থ যাদের কোন কাজ নেই, কাগজপত্র নেই)। মুন্সীগঞ্জের নজরুল ইসলাম, চাঁদপুরের শাহাবুদ্দিন, টাঙ্গাইলের আবদুস সামাদ, কুমিল্লার আলাল হোসেনসহ শতাধিক মানুষের সঙ্গে গত ৮ই অক্টোবর কথা হয়। বাংলাদেশের সাংবাদিক পরিচয় জেনে তারা তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতে থাকেন। প্রবাসীরা জানান, প্রতিদিন সকালে কয়েক হাজার বাংলাদেশী কাজের আশায় মালদ্বীপের বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হন। সকাল ছয়টা থেকে নয়টার মধ্যে নিয়োগকর্তারাও ওই সব স্পটে আসেন। সারা দিন কাজ করিয়ে ১০০ থেকে ১৫০ রুপি (১ রুপি সমান বাংলাদেশী সাড়ে চার টাকা) পর্যন্ত দেবেন এমন আশ্বাসে তাদের কাজে নিয়ে যান নিয়োগকর্তারা। বেশির ভাগ লোক নেয়া হয় বিভিন্ন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু অনেক সময় কাজ করিয়ে কেউ কেউ টাকা দেন না। টাকা চাইলে তোর কাগজপত্র নেই বলে পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখানো হয়। হোলেমালে দ্বীপের একটি গেস্ট হাউজে বসবাস করেন কুমিল্লার কামাল হোসেন। তিনি দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন। কামাল হোসেন জানান, দুই লাখ টাকা খরচ করে দুই বছর আগে এসেছিলাম। বাংলাদেশে দালালেরা বলেছিল, ফাইভ স্টার হোটেল অর্থাৎ অনেক ভাল চাকরি। কিন্তু এখানে এসে জানতে পারি সব ভুয়া। এখন তাদের কাজ খুঁজে নিতে হয়। এমনকি মালে পুলিশও কাজ করতে তাদের নিয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় বেতনই দেয় না। তাদের অনেকেই রাত কাটান রাস্তায়। আমিলার বাজারে কাজের অপেক্ষায় থাকা মুন্সীগঞ্জের শামীম বিন মাহবুব বলেন, দেড় লাখ টাকা খরচ করে এক বছর আগে মালদ্বীপে এসেছিলাম। এসে জানতে পারি, এখানে আমার জন্য কোন কাজের ব্যবস্থা নেই। দেশে ফিরে যাবো ওই অবস্থাও নেই। তাই অবৈধ হয়ে এখানে কাজ করে যাচ্ছি। মালদ্বীপে নিজেদের দুরবস্থার কথা বলতে গিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের বাসিন্দা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ভাই দেশে যে জীবন ছিল, সেই জীবন এর চেয়ে অনেক ভাল। এখন না পারি সইতে, না পারি দেশে চলে যেতে। প্রবাসী এই বাংলাদেশীদের প্রায় সবারই অভিযোগে, মালদ্বীপের বাসিন্দারা ইদানীং তাদের কাজ করিয়ে টাকা দিচ্ছেন না। কেন এ ঘটনা ঘটছে জানতে চাইলে তারা বলেন, মালদ্বীপে এখন যত লোক দরকার, তার চেয়ে অনেক বেশি বাংলাদেশী চলে এসেছেন।

সৌদি আরবে বিদেশীদের বেতন নিয়ে হতাশা

সৌদি আরবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত বিদেশী শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা- তারা সময়মতো বেতন-ভাতা পান না। এতে নিদারুণ দুর্ভোগে পড়তে হয় তাদের। এর কারণ, প্রতি মাসের এই বেতন দিয়েই শোধ করতে হয় তাদের নানা রকম বিল, বাসা ভাড়া, স্কুলপড়ুয়া বাচ্চার ফি, কিনতে হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য। কিন্তু সময়মতো তারা বেতন-ভাতা না পেয়ে কঠিন সংগ্রাম করছেন রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে। গতকাল এ খবর দিয়েছে সৌদি গেজেট। উল্লেখ্য, সৌদি আরবে বিদেশী শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশী, ভারতীয়, পাকিস্তানি, মিশর সহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক। ফলে এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশীরা মুক্ত নন। যার যার দেশে এসব শ্রমিকের বেশির ভাগেরই রয়েছে পরিবার। সেখানে রয়েছে পিতামাতা, স্ত্রী-সন্তান। তারা সৌদি আরবে নিয়োজিত স্বজনের দিকে তাকিয়ে থাকেন- তিনি কখন টাকা পাঠাবেন। কখন ঋণের টাকা শোধ করবেন। কখন স্কুলের বেতন দেবেন। কখন দোকানের বাকি পরিশোধ করবেন। কখন সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরবে। কিন্তু নিয়মমতো বেতন না পাওয়ায় সৌদি আরবে নিয়োজিত স্বজনও থাকেন উদ্বেগে। তিনি তার কষ্টের কথা কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন না। তিনি জানেন দেশে তার দিকে তাকিয়ে আছেন সবাই। মারাত্মক এক মনোকষ্টে ভুগতে থাকেন দু’দিকে দু’পক্ষ। বিদেশে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকরা বা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। তবে বেশির ভাগ সময়ই তারা সময়মতো বাসা ভাড়া দিতে পারেন না। এর ফলে বাসার মালিক তাদেরকে বাসা ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেন। জেদ্দায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আইটি সহকারী হিসেবে কর্মরত এক ভারতীয় নাগরিক। তিনি বললেন, কোন কারণ ছাড়াই কমপক্ষে ১০ দিন বিলম্ব করে কোম্পানি পরিশোধ করে শ্রমিকদের বেতন। কখনও তা ১৫ দিনে গিয়ে ঠেকে। তিনি বললেন, প্রতি মাসে সময়মতো বেতন না পেয়ে প্রচণ্ড দুর্ভোগ পোহাতে হয় আমাকে। এতে ভীষণ কষ্ট করতে হয়। বাসা ভাড়া দিতে দেরি হওয়াতে একবার বাসা ছেড়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন বাড়িওয়ালা। বাসা ভাড়া পরিশোধের জন্য প্রতি মাসের বেতন থেকে সামান্য অংশ জমা করি। ওই হুমকি দেয়ার পর সেই টাকা দিয়ে ভাড়া পরিশোধ করি।

বারবার আমার কোম্পানিকে সময়মতো বেতন দেয়ার অনুরোধ করেছি। কারণ, দেশে আমার পরিবার আছে। তাদেরকে টাকা পাঠাতে হবে। কিন্তু আমার অনুনয় জলে গেছে। প্রতি মাসেই স্ত্রীকে অনুরোধ করি আর ক’টা দিন অপেক্ষা কর। এখনও আমার বেতন হয়নি। তিনি বলেছেন, অনেক সময় তিনি অন্য একটি চাকরিতে যোগ দেবেন। কিন্তু আকামা পরিবর্তনের বিষয়টিকে তারা জটিল করে দেবে বলে হুমকি দিয়েছে। অশান্ত সিরিয়ার নাগরিক নগি মুহাম্মদ। তিনি বলেন, সৌদি আরবে যাওয়ার পর থেকে তিনি সময়মতো কখনও বেতন পাননি। তার ভাষায়- সৌদি আরবে পৌঁছার পর কোন কন্টাক্ট ছাড়াই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। কোন মাসেই ঠিক সময়মতো বেতন পাই না। আমার অন্য কোথাও কাজের কোন কন্টাক্ট নেই। একথা জেনে তারা হয়তো আমার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। আমি যে কঠিন সময় পার করছি সে বিষয়ে কোম্পানি মোটেও কর্ণপাত করছে না। এমনও হয়েছে যে, দু’মাস পরে বেতন পেয়েছি আমি। ফলে বাধ্য হয়ে পরিচিতজনদের কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়ে চলতে হয়েছে। খরচ যোগাতে বাধ্য হয়ে একটি পার্ট-টাইম কাজ খুঁজে নিতে হয়েছে। উপরন্তু, দেশে রয়েছেন পিতামাতা, আমার ভাই ও তার স্ত্রী। তাদের সবার খরচ আমাকেই যোগাতে হচ্ছে। মিশরীয় প্রকৌশলী সা’দ আহমেদ। তিনি চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। একটি গাড়ি নিয়েছিলেন তিনি কিস্তিতে। কিন্তু বেতন না পেয়ে সেই গাড়ি ফেরত দিতে হয়েছে। অনেক সময় দু’মাস পর্যন্ত বেতন বিলম্বিত হয় তার। তার ভাষায়- নিয়ম অনুযায়ী যদি দু’মাস কিস্তি দিতে না পারি তাহলে কোম্পানি গাড়ি ফেরত নিয়ে নেবে। প্রতি মাসে বেতন দেয়ার ক্ষেত্রে আমার কোম্পানি একটা না একটা অজুহাত দাঁড় করায়। ফলে অনেক সময় বন্ধুদের কাছ থেকে অর্থ ধার করি। না হয় বাবার কাছ থেকে টাকা নিই। এখন আমি আরেকটি কাজ খুঁজছি। আমি দেশে একটি বাড়ি ও একটি গাড়ি কিনেছি। তার কিস্তি দিতে হবে। এখন আতঙ্কে আছি বিলম্বে কিস্তি দেয়ার কারণে যদি সেগুলো হাতছাড়া হয়ে যায়!

ধন্যবাদ, শারমিন আহমদ by আমিরুল ইসলাম কাগজী

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদ প্রথম আলো পত্রিকায় ‘স্বাধীনতার অখণ্ডিত ইতিহাস ভবিষ্যতের পাথেয়’ শীর্ষক প্রতিক্রিয়া লিখে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে নতুন কিছু বলার চেষ্টা করেছেন যা তার বইতে উল্লেখ আছে বলে তিনি দাবি করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামালপুরের জনসভায় দেয়া বক্তব্য তুলে ধরে একচোট নেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘আমার লেখা তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা বইটি, যার কিছু ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ ুদ্র ব্যক্তি ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার জন্য যেসব রাজনীতিবিদ খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করছেন এবং তাদের প্রতি যারা আমার বইটিকে সম্পূর্ণ না পড়েই অথবা বইয়ে উল্লিখিত বিবরণ সত্য হলেও তার মধ্যে কিছু অংশ তাদের পছন্দনীয় না হওয়ায়, তারা কোনো যুক্তিবুদ্ধির অবতারণা না ঘটিয়ে, তথ্যে কোথায় ভুল উল্লেখ না করে, তারা এই লেখকের বিরুদ্ধে অশালীন, নির্লজ্জ, মিথ্যা প্রচারণা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ চালিয়েছেন।’
পরের অংশে লিখেছেন, ‘সম্প্রতি বিএনপির সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জামালপুরের জনসভায় (২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪) তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা বই থেকে আমার লেখার উদ্ধৃতি (৫৯-৬০ পৃষ্ঠা) দিয়ে বলেছেন, তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে এনেছিলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেননি। তিনি সচেষ্ট থাকেন এ কথা প্রমাণ করতে যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। বক্তব্যে তিনি অনুল্লিখিত রাখেন আমার বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে উল্লিখিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাকি অংশগুলোর বর্ণনা। বঙ্গবন্ধু আমার বাবা বা দলকে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও তিনি যে ভিন্ন মাধ্যমে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা তথ্য ও সারাৎসারসহ আমার বইয়ে স্পষ্ট উল্লিখিত (তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা ১৪৭-১৪৮, ২৭৪-২৯১, ৩০১-৩১০ পৃষ্ঠা)।’
শারমিন, আপনাকে ধন্যবাদ অনেক কষ্ট করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক বইটি উপহার দেয়ার জন্য। তবে সবাই যে আপনার বইটি সম্পূর্ণ পড়বে এমনটি আশা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কেউ যে আপনার বইটি সম্পূর্ণ পড়েনি এমন ভাবারও অবকাশ নেই। রাজনীতিবিদেরা আপনার বই হয়তো সম্পূর্ণ পড়েননি। কিন্তু যেটুকু তাদের দরকার সেখান থেকে উদ্ধৃত করতে ভুল করেছেন কি না সেটাই বিবেচ্য হওয়া উচিত। খালেদা জিয়া সে ক্ষেত্রে কোনো ভুল করেননি।
শেখ মুজিব যে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, তা আপনার পিতা তাজউদ্দীন আহমদ স্পষ্ট করে দিয়েছেন। মেজর জিয়াউর রহমানই যে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং প্রথম স্বাধীন বাংলার সরকার গঠন করেছিলেন সেটা তার ১০ এপ্রিলের ভাষণেই উল্লেখ আছে (আপনার বইয়ের ৩৯৭ পৃষ্ঠায় ১০ এপ্রিল প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠনের দিনটিতে তাজউদ্দীন আহমদের সম্পূর্ণ ভাষণ উল্লিখিত হয়েছে)। মঈদুল হাসান মূলধারা ৭১ এবং অতি সম্প্রতি এ কে খন্দকার তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন, তিনি ২৭ মার্চ রেডিওতে প্রথম মেজর জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শোনেন (স্বাধীনতার দলিল খণ্ড ১৫)।
এ ছাড়া তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটি বক্তব্যে আছে সে কথা। তিনি ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ভাষণ দেন তাতে তিনি বলেন, The cry for Independence (of Bangldesh) arose after Sheikh Mujib was arrested and not before.He (Mujib) himself, so far as I know, has not asked for Independence even now…অর্থাৎ স্বাধীনতার প্রশ্ন ওঠে (বাংলাদেশের) শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর, তার আগে নয়। আমি যত দূর জানি আজ পর্যন্ত শেখ মুজিব স্বাধীনতা দাবি করেননি। (অলি আহাদ : জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ খেকে ৭৫)।
এসব উল্লেখযোগ্য কোনো নেতার কথায় বিশ্বাস রাখতে পারেননি শারমিন আহমদ। তাই তিনি ছুটে গিয়েছেন শেখ মুজিবের পারসোনাল এইড হাজী গোলাম মোরশেদের বাসায় যাকে তিনি শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণার একমাত্র জীবিত সাক্ষী বলে মনে করেন। কিন্তু সেখানে তিনি একরাশ হতাশা ছাড়া আর কিছুই উপহার দিতে পারেননি। কারণ হাজী গোলাম মোরশেদ এই ঘোষণাপত্রটির গ্রহণকারী হিসেবে যার নাম উল্লেখ করেছেন, চট্টগ্রামের সেই আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান এমন ঘোষণাপত্র গ্রহণ করার কথা তার জীবদ্দশায় বলে যাননি (দেখুন, মুক্তিযুদ্ধের দলিল খণ্ড ১৫)। আর যে প্রকৌশলীর কথা বলা হয়েছে যিনি ট্রান্সমিটার সাপ্লাই দিয়েছেন বলে ধরা হয়, সেই ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হকের আপন খালাতো ভাই আমিনুল হক বাদশা ২৫ মার্চ রাতে কী ঘোষণা দিয়েছিলেন সেটা একবার দেখা যাকÑ শেখ মুজিবের নির্দেশে তার প্রেস সচিব আমিনুল হক বাদশা (রাশেদুল হক নবার বড় ভাই) ২৫ মার্চ রাতে সাংবাদিকদের ডেকে সারা দেশে হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের প্রতিবাদে ২৭ মার্চ সর্বাত্মক হরতালের কথা জানিয়ে দেন।
ওই রাতে আওয়ামী লীগের আরো বহু বড় বড় নেতা ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাড়িতে গিয়েছিলেন। কাউকেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বলে যাননি; এমনকি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ফাঁসানো হবে বলে সবক দিতেও তিনি ভুল করেননি।
তবে শারমিন আহমদ এই লেখায় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তার পিতার ভাষণের কথা উল্লেখ করে কিছুটা হলেও আওয়ামী বুদ্ধিজীবী মহলের তোতা মুখ ভোঁতা করে দিয়েছেন। তাজউদ্দীন আহমদের সে দিনের ভাষণের পুরো অংশ তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই নির্বাচিত অংশ তুলে ধরছি, ‘এই প্রাথমিক বিজয়ের সাথে সাথে মেজর জিয়াউর রহমান একটি বেতার কেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং সেখান থেকে আপনারা শুনতে পান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর। এখানেই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। আপাতত আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মুক্ত এলাকায় (সূত্র : তাজউদ্দীন আহমদ : নেতা ও পিতা-পৃষ্ঠা ৩৯৯)।
তাজউদ্দীন তার ভাষণের মধ্য দিয়ে দুটো বিষয় স্পষ্ট করেছেন :
০১. মেজর জিয়াউর রহমানই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কণ্ঠস্বর অর্থাৎ তিনিই স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক। ০২. চট্টগ্রামেই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়া হয় এবং জিয়াউর রহমানই সেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সরকারপ্রধান অর্থাৎ প্রথম প্রেসিডেন্ট। তার ভাষায় বলতে গেলে, ২৬ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী সরকার শপথ নেয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনিই ছিলেন প্রেসিডেন্ট। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্প্রতি লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে এই দাবি করেছেন বলে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের গাত্রদাহ হয়েছিল। ০৩. মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি এ কে খন্দকার তার লেখা ১৯৭১ : ভেতরে বাইরে বইটিতে লিখেছেন ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান প্রথম যে ঘোষণা দেন, সেখানে তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা করেছিলেন, তবে পরে তিনি সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
শারমিন, আপনাকে আরেকবার ধন্যবাদ জানাতে চাই খালেদা জিয়ার আরেকটি বক্তব্যের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য। সেটা এখানে তুলে ধরছি, “বেগম জিয়া তার সে দিনের বক্তব্যে আরো বলেন, ‘জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে দেশ স্বাধীন হতো না। শেখ সাহেব জেল থেকে বের হতেন কি না, সেটাও সন্দেহ ছিল।’ তার এই বক্তব্য ইতিহাসনির্ভর নয়। এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করে, তখন জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কারো স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য তারা অপেক্ষা করেনি। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা নিঃসন্দেহে জনগণের মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু বিশ্ব ইতিহাস এটাই বলে যে, স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই তো একটি দেশ স্বাধীন হয়ে যায় না। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ধাপে ধাপে মুক্তির আকাক্সায় পরিণত হয়ে স্বাধীনতার দুয়ারে পৌঁছেছিল দীর্ঘকালের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ফলে (৭১ পৃষ্ঠা)।
এ প্রসঙ্গে এ কে খন্দকার বলেন, ‘মেজর জিয়ার এই ঘোষণাটি প্রচারের ফলে সারা দেশের ভেতরে ও সীমান্তে যারা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তাদের মধ্যে এবং সাধারণ মানুষের মনে সাংঘাতিক একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে জিয়ার ভাষণটি বিভ্রান্ত ও নেতৃত্বহীন জাতিকে কিছুটা হলেও শক্তি ও সাহস যোগায়। যুদ্ধের সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে শুনেছি এবং যুদ্ধের পরবর্তী সময়ও শুনেছি, মেজর জিয়ার ঘোষণাটি তাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে কতটা উদ্দীপ্ত করেছিল। মেজর জিয়ার ঘোষণায় মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, হ্যাঁ, এইবার বাংলাদেশ সত্যিই একটা যুদ্ধে নেমেছে। ’
শারমিন আহমদ, আপনি আপনার বইতে ২৫ মার্চ রাতে ৩২ নম্বর রোডে আপনার ‘মুজিব কাকু’র কাছে আপনার পিতার স্বাধীনতার ঘোষণাসংবলিত ক্যাসেট নিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে কিংবা লিখিত বিবৃতি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে কোনো অন্যায় করেননি। আপনি ইতিহাসের সত্যটাই তুলে ধরেছেন মাত্র। এ কথাগুলো ইতঃপূর্বে অনেকেই বলেছেন, কিন্তু অবস্থানগত কারণে সেগুলো এত আলোচনায় আসেনি। আপনার সাথে আমিও একমত যে, বিগত শতাব্দীতে আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। সেই মুক্তিযুদ্ধকে কখনোই খণ্ডিতভাবে দেখতে চাই না। কিন্তু আপনি আপনার অজান্তেই স্বাধীনতার ইতিহাসকে খণ্ডিত করেছেন। আপনার লেখা দিয়ে আপনি আপনার পিতার অবদান ষোল আনা আদায় করে নিয়েছেন। আপনার মুজিব কাকুর অবদানও স্বীকার করেছেন। শুধু জিয়াউর রহমানের অবদান খাটো করতে গিয়ে শেখ মুজিবের পার্সোনাল এইড গোলাম মোরশেদকে মহীয়ান করতে ভুলে যাননি।
শেষ করব যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাসের কথা বলে। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই আমেরিকা যখন গ্রেট ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, তখন সেখানে যার যতটুকু অবদান তার ততটুকু মর্যাদা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রবাসী। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দান এবং স্বাধীনতার দলিলে স্বাক্ষর করার জন্য পাঁচজন নেতা জাতির পিতার স্বীকৃতি পান; তারা হলেন শেরম্যান, ফ্রাঙ্কলিন, জেফারসন, অ্যাডামস ও লিভিংস্টোন।
লেখক : সাংবাদিক

কবির সুমনকে ভণ্ড বললেন তসলিমা

এবার ভারতে বিখ্যাত গায়ক কবির সুমনের বিরুদ্ধে খেপেছেন বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। গতকাল এক টুইটার বার্তায় তিনি কবির সুমনকে ‘মিথ্যাবাদী, ভণ্ড, নারীবিদ্বেষী ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে আখ্যায়িত করেন। সেখানে তিনি বলেন, গায়ক কবির সুমন একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম এবং ইসলামী জঙ্গিদের পক্ষাবলম্বনকারী। উল্লেখ্য, সমপ্রতি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণ হয়। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা চলছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক এমপি কবীর সুমন প্রায়ই দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করলেও, বর্ধমান বোমা বিস্ফোরণের পেছনে বিজেপি’র হাত রয়েছে বলে দাবি করেন। তার মতে, এটি সমপূর্ণই বিজেপি’র কাজ! টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এ খবরের লিংক নিজের টুইটারে শেয়ার করে কবির সুমনের বিরুদ্ধে ওই বিষোদগার করেন তসলিমা নাসরিন। এরপর একজনের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তসলিমা আবার লেখেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব ফতোয়া জারি করা হয়েছিল, তা সমর্থন করেছিল কবির সুমন। আমার বই নিষিদ্ধ করা ও আমাকে নির্বাসনে পাঠানোও সমর্থন করেছিলেন তিনি। এরপর আরেকজনের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি লেখেন, কবির সুমন বলেছিলেন যে, একজন মুসলিম হিসেবে তিনি তার নবীকে ভালবাসেন। তার নবীকে নিয়ে কিছু বলার অধিকার আমার নেই। আমাকে মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখা উচিত। এ নিয়ে গতকাল বেশ তোলপাড় হয় মিডিয়ায়। এর আগে তসলিমা নাসরিন তার নতুন বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে অন্তরঙ্গ একটি ছবি প্রকাশ করে আলোচনায় আসেন। বিভিন্ন পত্রিকায় শিরোনাম হন। জানিয়ে দেন তার চেয়ে ২০ বছরের ছোট নতুন এই বয়ফ্রেন্ড।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা যেন হয় by মো: মোস্তাফিজুর রহমান

সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভূমিকা পালনকারী বীর ও বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত তালিকা প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন। দেশের সর্বশ্রেণীর জনগণ তার এ মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। যদিও স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যেন কিয়ামত পর্যন্তও তা সঠিক ও যথার্থ হবে কি না, সন্দেহ রয়েছে। সে হিসেবে বর্তমান মন্ত্রী মহোদয়ের প্রণীত তালিকাও কি প্রশ্নাতীত হবে? হ্যাঁ, হতেই পারে; যদিও তিনি সমসাময়িক লেখক-গবেষকদের উদ্ধৃতি ও মতামতের ভিত্তিতেই তা প্রণয়ন করেন। এখানে অতি সংক্ষেপে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বক্তব্য ও মতামত হুবহু উল্লেখ করছি, যেন এর আলোকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়ন করা হয়।
১৯৭১-এর ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বক্তব্য মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। লেখক কামাল হোসেন তা হুবহু উল্লেখ করেছেন এভাবে, ‘তিনি বলেন, সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী ঐক্যবদ্ধভাবে যে আন্দোলন শুরু করেছে, দেশমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তা থামবে না। একজন বাঙ্গালীও জীবিত থাকা পর্যন্ত এ সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। বাঙ্গাালীরা শান্তিপূর্ণভাবে সে অধিকার আদায়ের জন্য চরম ত্যাগ স্বীকারেও তারা প্রস্তুত।’ ( কামাল হোসেন, ‘তাজউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তারপর’, পৃষ্ঠা ২৪৫)।
মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক তাজউদ্দীন আহমদের বক্তব্য থেকেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা স্পষ্ট হয়। লেখক মুহম্মদ নুরুল কাদির উদ্ধৃত করেছেন, ‘ঐ সময়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ এক ভাষণে বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রত্যেকেই মুক্তিযোদ্ধা এবং মাতৃভুমির প্রতি ইঞ্চি পবিত্র ভূমি উদ্ধারে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ ( মুহম্মদ নুরুল কাদির, দু’শ ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা, পৃষ্ঠা ৩০৭)।
রাশেদ খান মেননও তার গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘দেশের মানুষের কার্যত সকল অংশই মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছিল। ক্যান্টনমেন্টের বিদ্রোহী সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ থেকে একজন সাধারণ কৃষক পর্যন্ত কেউই বাদ থাকেনি এই মুক্তিযুদ্ধে।’ ( রাশেদ খান মেনন, রাজনীতির কথকতা, পৃষ্ঠা ১৫)।
মেজর জেনারেল (অব:) এম এ মতিন বীর প্রতীক উল্লেখ করেছেন, ‘এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক মহত্তর ও পবিত্র জাতীয় সংগ্রাম। কোনো দলীয় কর্মী হিসেবে কোনো মুক্তিযোদ্ধা যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে যাননি, তেমনি তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে যাননি কোনো গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থরক্ষা তথা কোনো দলীয় আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে অর্জিত বিজয় এ জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ফসল তাই সমগ্র জাতির; মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে বিজয়মাল্য আমরা ছিনিয়ে এনেছি, তা দেশমাতৃকারÑ এ বিষয়ে বিতর্কের বিন্দুমাত্র অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না।’ (মেজর জেনারেল (অব:) এম এ মতিন বীর প্রতীক, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা, পৃষ্ঠা ৭১)।
মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ুর রহমান রেন্টু উল্লেখ করেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মাত্র নয় মাসের মাথায় ভারতের সাথে পাকিস্তানের যুদ্ধ বেধে গেল। এক দিকে মুক্তিযোদ্ধা-জনগণ মিলে সাড়ে সাত কোটি মুক্তিবাহিনী, তার সাথে যোগ হলো ভারতীয় সেনাবাহিনী। মুক্তিবাহিনী আর ভারতীয় বাহিনী মিলেমিশে হলো মিত্রবাহিনী। ৬ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করল। নির্বাসনে আসা দিশেহারা পাক হানাদার বাহিনী মাত্র দশ দিনের মাথায় ১৬ ডিসেম্বরে অসহায়ের মতো পরাজয় বরণ করলো।’ ( মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ুর রহমান রেন্টু, আমার ফাঁসি চাই, পৃষ্ঠা ২৪)।
ইতিহাস গবেষক অধ্যাপক মুনতাসির মামুন উল্লেখ করেছেন,‘স্বাধীনতা কারো দান নয়, অশেষ আত্মত্যাগের বিনিময়ে তা অর্জিত এবং গুটিকয়েক মুক্তিযোদ্ধা, দেশত্যাগীর নয়, মুক্তিযুদ্ধ ছিল গোটা বাংলাদেশের আপামর বাঙ্গালীর।’ ( মুনতাসির মামুন, মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১, পৃষ্ঠা ১০১)।
অধ্যাপক আব্দুল গফুর উল্লেখ করেছেন, ‘একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ। আর এ যুদ্ধে অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছে তারা ছাড়াও প্রায় নয় কোটি মানুষ সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নানা পর্যায়ে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। কেউ খাবার দিয়ে, কেউ আশ্রয় দিয়ে, কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ অস্ত্র দিয়ে, কেউ পরামর্শ দিয়ে, কেউ শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে গোপন খবরাদি সরবরাহ করে এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে।’ ( অধ্যাপক আব্দুল গফুর, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, পৃষ্ঠা ২০৩)।
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। জনগণের যুদ্ধ। দেশপ্রেমিক প্রতিটি বাঙ্গালী এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। এটা শুধুমাত্র এককভাবে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে অন্য একটি সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ ছিল না।’ ( অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, মুক্তিযুদ্ধ : উপেক্ষিত গেরিলা, পৃষ্ঠা ৬৩)।
লেখক আতিউর রহমান উল্লেখ করেছেন, ‘সকল অর্থেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। খেটে-খাওয়া সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, ছাত্র-জনতা সবাই একাত্তরে যুদ্ধে নেমেছিলেন মৌলিক কিছু আকাক্সা বুকে নিয়ে।’ (আতিউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, পৃষ্ঠা ১৫৪)।
লেখিকা পপি চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, ‘আমি যুদ্ধ দেখেছি, বিজয় দেখেছি। বাংলাদেশের সে স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ।’ ( পপি চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা, পৃষ্ঠা ৪৮)।
এখানে বঙ্গবন্ধুসহ সব মুক্তিযোদ্ধা ও লেখকের বক্তব্যে বা উদ্ধৃতিতে স্পষ্টভাবে ১৯৭১ এর তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীকেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ওই সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর মধ্যেই রয়েছেন ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন। এ বত্রিশ লাখ আত্মত্যাগী কি মুক্তিযোদ্ধা নন? একইভাবে বঙ্গবন্ধু ও মওলানা ভাসানীর মতো লাখ লাখ বাঙালি যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান ও ভারতে অসহায় ও আবদ্ধ ছিলেন। এ যুদ্ধে জীবন দিয়েছেন অনেক ভারতীয় সেনা সদস্য। সমসাময়িক ভারতীয় প্রচার অনুযায়ী প্রায় এক কোটি বাঙালি ভারতে শরণার্থী হয়ে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন। এরাও কি মুক্তিযোদ্ধা নন? এমনিভাবে উপরিউক্ত উদ্ধৃতি অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে দেশে অবস্থানকারী আপামর জনতাই যে যেভাবে পেরেছে ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি নারী-শিশু-বৃদ্ধ ও কয়েদিসহ সবাই যুদ্ধকালীন অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করে এ যুদ্ধে নিজেদের অবদানের স্বাক্ষর রেখেছেন। এসব শ্রেণীর মধ্যে কোনো শ্রেণীকে কি মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দেয়া যায়? কখনো নয়। এদেরকে বাদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা করা হলে সঠিক হবে না।

সালামাত দাতাং ডি ইন্দোনেশিয়া by ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ

ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের তথা ইউএসএআইডি’র আমন্ত্রণে ইন্দোনেশিয়ার মাদরাসা শিাকার্যক্রম পরিদর্শনের এক স্টাডি ট্যুরে গত ১৪ সেপ্টেম্বর জাকার্তায় পৌঁছি। পাঁচতারকা হোটেল গ্রান্ড হায়াতে যখন পৌঁছলাম, তখন স্থানীয় সময় রাত সাড়ে বারোটা। পরদিন সকাল আটটায় ইন্দোনেশিয়ার মিনিস্ট্রি অব রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স কার্যালয়ে মাদরাসা শিা পরিচালকের সভাকে ধর্মসচিব প্রফেসর ড. এইচ নুর সিয়ামের সাথে আমরা বৈঠকে মিলিত হই। আমাদের শিক্ষা সফরে বাংলাদেশের শিা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হোসনে আরা বেগম এবং প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়ের সহকারী প্রধান মোহাম্মদ জালাল হাবিবুর রহমানও ছিলেন। জোহরের নামাজ পড়তে যাই ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় মসজিদ ইসতেকলাল বা স্বাধীনতা মসজিদে। দণি-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় এ মসজিদে একসাথে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। দৈর্ঘ-প্রস্থ-উচ্চতায় মসজিদের বিশালতায় নিজেকে খুবই ক্ষুদ্র মনে হলো।
ওই দিন সন্ধ্যায় প্লেনে চেপে জাকার্তা থেকে সেন্ট্রাল জাভা প্রদেশের রাজধানী সেমারাং পৌঁছলাম। উঠলাম গাজা মাদা স্ট্রিটের হোটেল গুমাইয়াতে। পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে দশটার দিকে সেন্ট্রাল জাভার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রধান ড. এইচ খাইরুদ্দিনের কার্যালয়ে পৌঁছলাম। এখানে মাদরাসা শিা বিভাগের প্রধান ড. এইচ জামুন এফেন্দিও উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, ইন্দোনেশিয়ার মাদরাসা শিা এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ইসলাম ধর্ম শিা কার্যক্রম সে দেশের ধর্ম মন্ত্রণালয় দেখাশোনা করে। ড. খাইরুদ্দিন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রাদেশিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজিতে না বলে বাহাসা ইন্দোনেশিয়া ভাষায় কথা বললেন। দোভাষীর মাধ্যমে আমরা তার কথা বুঝলাম। প্রশ্নোত্তর পর্বও চলল দোভাষীর মাধ্যমে। সরকারি একটা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রাদেশিক প্রধান ইংরেজি জানেন না, এটা কি দোষের? আমি তো মনে করি, এটা মোটেও দোষের নয়। ইরানেও দেখেছি, বড় বড় পদস্থ কর্মকর্তা ইংরেজি জানেন না। শুনেছি জাপানে এমন অনেক বড় বিজ্ঞানী আছেন, যারা মাতৃভাষা ছাড়া আর কোনো ভাষাই জানেন না। ইংরেজি না জানার কারণে কি তারা পিছিয়ে আছেন? মোটেও না। ইংরেজি জানার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মেধার পাচার হয়, অপর দিকে ইংরেজি শিার চাপের কারণে অনেক মেধার অপমৃত্যুও ঘটে। ইন্দোনেশিয়ায় মাতৃভাষায় শিা দেয়া হয়। এমনকি মাদরাসাতেও পড়ালেখা হয় মাতৃভাষা বাহাসা ইন্দোনেশিয়ার মাধ্যমে। তারা মাতৃভাষার মাধ্যমে লেখাপড়া করে যতটুকু এগিয়েছে, আমরা মাতৃভাষার কম গুরুত্ব দিয়ে তার ধারেকাছেও যেতে পারিনি। তবে আমি ইংরেজি পড়ার বিরুদ্ধে নই।
ড. খাইরুদ্দিন তার বক্তৃতার মাঝে বললেন, বহির্দেশ থেকে অপবাদ দেয়া হয়েছে, আমাদের আবাসিক মাদরাসাগুলোতে জঙ্গিচর্চা হয়। আপনারা মাদরাসাগুলো যখন পরিদর্শন করবেন, তখন একটু ভালো করে দেখবেন, বাস্তবে এখানে তেমন কিছু হচ্ছে কি না। ইন্দোনেশিয়ার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রাদেশিক প্রধানের মুখে জঙ্গিবাদের কথা শুনে চমকে উঠলাম। এখানেও সেই জুজুবুড়ির কিসসা! মনে পড়ল বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর ওপর ভিত্তিহীন এই অপবাদের কথা। ওই মাদরাসাগুলো জঙ্গি প্রজননকেন্দ্র, জঙ্গি তৈরির কারখানা প্রভৃতি অপবাদ শুনতে শুনতে আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। কওমি মাদরাসাগুলোতে বহু তদন্ত হয়েছে। স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে। এমনকি আন্তর্জাতিকভাবেও হয়েছে। সব তদন্তের ফলাফল হচ্ছে, কওমি মাদরাসা জঙ্গি কারখানা নয়। এর পরও আমাদের জুজুর ভয় দেখানোর জন্য প্রাচীন কল্পকাহিনীর মুখস্থ কথা শুনতে হয়। ইন্দোনেশিয়ার আবাসিক মাদরাসাগুলোকে শুধু বাইরের দেশ থেকে অপবাদ শুনতে হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর ওপর দেশের ভেতর থেকেই একের পর এক অপবাদের ঢিল ছোড়া হয়। যারা অপবাদ দেয়, তাদের কোনো-না-কোনো স্বার্থ অবশ্যই আছে। যারা দেশের ভেতরে থেকে এই অপবাদে লিপ্ত, কখনো কি তারা ভেবে দেখেছে, কওমি মাদরাসাকে জঙ্গিবাদের কারখানা প্রমাণ করতে গিয়ে প্রকারান্তরে
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এরা দেশকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলছে। বাংলাদেশে কওমি মাদরাসাকে বলা হয় ‘জঙ্গিদের নিরাপদ আস্তানা’। অথচ এ কথা প্রমাণিত, কওমি মাদরাসায় কোনো সময় সামরিক ট্রেনিং দেয়ার ব্যবস্থা ছিল না এবং এখনো নেই। বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনসিসির অধীনে যে সামরিক প্রশিণ দেয়া হয়, তারও কোনো ব্যবস্থা কওমি মাদরাসায় নেই। এমনকি এ ধরনের মাদরাসাগুলোতে শরীরচর্চারও কার্যক্রম নেই। তা সত্ত্বেও কওমি মাদরাসাকে জঙ্গি তৈরির উর্বর ত্রে হিসেবে প্রমাণ করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া নয়, ভারত-পাকিস্তানসহ সারা বিশ্বে মাদরাসা শিা তথা ইসলামি শিাকেন্দ্র মূলত আবাসিক। সর্বত্রই এ মাদরাসাগুলোকে ‘জঙ্গিবাদের
আস্তানা’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য ধর্মীয় শিা প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রায় আবাসিক। আমরা কিন্তু সেগুলোর বিরুদ্ধে কোনো সহিংসতা বা জঙ্গিপনার অভিযোগ কখনো শুনিনি। ইসলামি শিাকেন্দ্রগুলো পরিদর্শন ও তদন্তের নিমিত্তে সর্বদা সবার জন্য উন্মুক্ত। পান্তরে অন্যান্য ধর্মের এমন অনেক ধর্মীয় শিা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোতে প্রবেশাধিকার সবার জন্য উন্মুক্ত নয়।
প্রশ্ন করলাম, ইন্দোনেশিয়ায় জঙ্গিবাদের অভিযোগ কিভাবে মোকাবেলা করা হচ্ছে? ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রাদেশিক প্রধান ড. এইচ খাইরুদ্দিন জানালেন, তারা সমালোচনার দিকে না তাকিয়ে বরং মাদরাসা শিাকে সুন্দরভাবে পরিচালনার পাশাপাশি এর মান আরো উন্নত করার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। এর পাশাপাশি জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়েছেন। তিনি আরো জানালেন, এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের ভিত্তিতে এক ইন্দোনেশিয়া গড়ার স্লোগান নিয়ে দেশের সামগ্রিক শিাব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করলেন, ইন্দোনেশিয়ায় সাড়ে সতেরো হাজারা বড়-ছোট দ্বীপ রয়েছে। কেউ যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক রাষ্ট্রের ঘোষণা না দেয়, তাই এক ইন্দোনেশিয়া গড়ার কথা বলা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮৭ ভাগ মুসলমান। এ জন্য এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের ভিত্তিতেই ‘এক ইন্দোনেশিয়া’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দেশটি এগিয়ে চলেছে। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে পূর্ব তিমুর ইন্দোনেশিয়া থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এরপর থেকেই ইন্দোনেশিয়া সরকার ‘এক ইন্দোনেশিয়া’ গড়ে তোলার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে করে পূর্ব তিমুরের মতো আর কেউ পৃথক হয়ে না যায়।
বাতাং জেলার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের জেলা প্রধান ও জেলা শিা কর্মকর্তার সাথেও আমাদের বৈঠক হলো। অনেক মাদরাসাও ঘুরে দেখলাম। যেখানেই গেছি, সেখানেই আমাদের উষ্ণ সংবর্ধনা ও আতিথেয়তা দেয়া হয়েছে। সর্বত্রই ইন্দোনেশিয়ান বাহাসা ভাষায় ‘সালামাত দাতাং’ বলে আমাদের শুভেচ্ছা জানানো হয়। সালামাত দাতাং অর্থ স্বাগতম। ‘সালামাত দাতাং ডি ইন্দোনেশিয়া’ অর্থ ইন্দোনেশিয়ায় স্বাগতম। বাহাসা ইন্দোনেশিয়া ভাষা আমার কাছে খুব সহজ মনে হলো। বাংলায় ব্যবহৃত সংস্কৃত (তৎসম) শব্দ এ ভাষায় প্রচুর রয়েছে। আরবি ও ফার্সি ভাষার শব্দও রয়েছে অনেক। ল্যাটিন অরে লেখা এ ভাষায় ১০ হাজারের মতো ইংরেজি মিশ্রিত ডাচ শব্দ রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় বেসরকারি মাদরাসাগুলো বিভিন্ন কমিউনিটির মাধ্যমে পরিচালিত। তন্মধ্যে মুহাম্মাদিয়া ফাউন্ডেশন, মাআরিফ ও নাহদাতুল উলামা উল্লেখযোগ্য। আমরা বাতাং জেলার কারাঙ্গাসেমে অবস্থিত মুহাম্মাদিয়া ফাউন্ডেশনের মাদারাসা ইবতিদায়িয়্যাহতে প্রবেশের সময় ছাত্রছাত্রীরা দুই দিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বাগতম জানায়। এ সময় আমাদের বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি...’ বেজে ওঠে। জাতীয় সঙ্গীত জীবনে অনেক গেয়েছি, শুনেছি। কিন্তু এ বিদেশ বিভুঁইয়ে ভিনদেশী পরিবেশে জাতীয় সঙ্গীত হৃদয়ে অন্য রকম অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। প্রতিটি কাসের দরজায় ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা দেখে আরো অবাক হলাম। সর্বত্র ঘুরে  ইন্দোনেশিয়ার মাদরাসা শিার অগ্রগতি দেখলাম। শিার অগ্রগতির মাধ্যমে তারা এগিয়ে যেতে চাচ্ছে। এ েেত্র সরকারের সহায়তা বেশ ইতিবাচক ও আন্তরিকতাপূর্ণ। জঙ্গিবাদের অপবাদ ঘুচিয়ে আমাদেরকেও মাদরাসা শিায় অগ্রগতি আনতে হবে। এ েেত্র সরকারের পর্যাপ্ত ভূমিকা খুবই প্রয়োজন।
লেখক : গবেষক ও অনুবাদক
ahmadimtiajdr@gmail.com

আইবিএ মানবাধিকার পুরস্কার পেলেন আদিলুর রহমান

‘মানবাধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের’ জন্য ইন্টারন্যাশনাল বার এসোসিয়েশন (আইবিএ) হিউম্যান রাইটস এওয়ার্ড জিতলেন আদিলুর রহমান খান। গতকাল জাপানের রাজধানী টোকিওতে আইবিএন বার্ষিক সম্মেলনে তার হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন আইবিএ’র প্রেসিডেন্ট মাইকেল রেনল্ড। রুল অব ল’ সিম্পোজিয়ামে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ বিষয়ে আইবিএ একটি বিবৃতি দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন এডভোকেট আদিলুর রহমান খান। তিনি বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অধিকারের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি। তার ক্যারিয়ারে আদিলুর রহমান খান নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো সহিংসতার বিরুদ্ধে নিরলসভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৯৪ সালের ১০ই অক্টোবর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন অধিকার। এ সংস্থা এরই মধ্যে অনেক সত্য উদঘাটন করেছে। বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে রিপোর্ট করেছে। এর ফলে, তিনি ও তার পরিবারকে কর্তৃপক্ষের হাতে হয়রানি ও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০১৩ সালের ১০ই অক্টোবর তাকে ‘মিথ্য ছবি ও তথ্য প্রকাশের’ দায়ে আটক ও অভিযুক্ত করা হয়। বলা হয়, তার এ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিঘ্ন ঘটানো হয়েছে। ২০১৩ সালের জুনে অধিকার একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাতে মতিঝিলে ওই বছরের মে মাসে হেফাজতে ইসলামীর একটি র‌্যালিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৬১ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এ কারণে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তার বিরুদ্ধে এ মামলাটি এখনও আছে মুলতবি অবস্থায়। ফলে তিনি, তার পরিবার ও সহকর্মীরা রয়েছেন টানা নজরদারির মধ্যে। তারা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের হাতে হয়রান হচ্ছেন। পুরস্কার বিতরণকালে আদিলুর রহমান খানের কাহিনীর গুরুত্ব বিশ্বের আইনজীবীদের উদ্দেশে মাইকেল রেনল্ড তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা বলতে চাই যে, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ন্যায়বিচার, মানবাধিকারে সহায়তা করার ক্ষেত্রে ও আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে আইনজীবীদের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আদিলুর রহমান খানের সাহস, দৃঢ় সংকল্প ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা যে কোন স্থানের আইনজীবীদের জন্য একটি উৎসাহ হয়ে থাকবে। পুরস্কার গ্রহণ করে আদিলুর রহমান খান বলেন, আমার দেশে আইনের শাসন মারাত্মক হুমকির মুখে। নির্যাতিত ও তার পরিবারের প্রতি যে মানবাধিকারের লঙ্ঘন করা হচ্ছে তাতে তারা সুবিচার পাচ্ছে না। তাদের অভিযোগ জানানোর জায়গা নেই। তা সংবিধানে যা-ই লেখা থাকুক না কেন। দমনমূলক আইন বিদ্যমান। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতিকরণের কারণে স্বাধীন বিচার বিভাগও আক্রান্ত। এখন বাংলাদেশে প্রতিটি মানুষ তার জীবন নিয়ে আতঙ্কে। এই যে পুরস্কার এটা শুধু আমাকে আমার কাজ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে উৎসাহই যোগাবে না, এটা অধিকার-এর সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে যেসব মানবাধিকার কর্মী রয়েছেন তাদের সবার শক্তি বৃদ্ধি করবে, অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

পারিবারিক হত্যাকাণ্ড দেশের জন্য অশনি সঙ্কেত by ইফতেখার আহমেদ টিপু

দেশে পারিবারিক হত্যাকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। পত্রপত্রিকার পাতা খুললে এখন হরহামেশাই দেখা যায়, সন্তানের হাতে বাবা খুন, বাবা বা মায়ের হাতে সন্তান কিংবা ভাইয়ের হাতে ভাই খুন এমন সংবাদ। অথচ পরিবার হলো মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু এখন পরিবারের মধ্যেও নিরাপত্তা খুঁজে পাওয়া দায় হয়ে পড়েছে। সামাজিক অবয়ের অপপ্রভাবে পরিবারের সদস্যদের একের প্রতি অপরের মমত্ববোধ কমে যাওয়ায় ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য আপনজনের প্রাণ কেড়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সারা দেশে তিন হাজার ৬১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় রাজধানীতে খুন হয়েছে ১৭২ জন। যার মধ্যে পারিবারিক ও সামাজিক কারণে খুন হয়েছেন ১৬২ জন। নৈতিক মূল্যবোধের অবয়, দাম্পত্য কলহ, অর্থলিপ্সা, মাদকাসক্তি ও অবৈধ  দৈহিক সম্পর্কের কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণা।
রাজধানীসহ সারা দেশে বাবা-মায়ের হাতে সন্তান হত্যার ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি সন্তানের হাতে জন্মদাতা বাবা-মায়ের প্রাণহানিও ঘটছে। পরকীয়ার কারণে স্বামীর হাতে স্ত্রী এবং স্ত্রীর হাতে স্বামীর খুন হওয়ার ঘটনাও কম নয়। ভাই-বোনও একে অপরকে হত্যা করে পথের কাঁটা সরিয়ে দিচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক অবয়ের পরিণতিতে।
স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের হাতে গত পাঁচ বছরে এক হাজার ১৭৫ জন নারী প্রাণ হারিয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আগের মতো বাংলাদেশে যৌথ পরিবার প্রথা নেই। মানুষ ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এর সাথে প্রযুক্তি ও বিত্ত-বৈভব মানুষের আবেগ ও মূল্যবোধে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এখন মানুষ যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ কারণে আপন মানুষটিকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না।
আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো সামাজিক অপরাধগুলোর মূল কারণ আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবয়। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজের অবয় এতটা মারাত্মক রূপ লাভ করেছে যে, তা আইন জারি করে বা শাস্তি দিয়ে দূর করা যাবে না। কারণ এই সমস্যাটি যতটা না শারীরিক, তারচেয়েও বেশি মনস্তাত্ত্বিক। এই ব্যাধি দূর করতে হলে অবশ্যই আমাদের পাশ্চাত্য সংস্কৃতির এই অবাধ আগ্রাসন রোধ করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে আমাদের ঐতিহ্যময় ধর্মীয় অনুশাসন ও মূল্যবোধ। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারই পারে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে। কারণ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ করা কেবল রাষ্ট্রশক্তির পইে সম্ভব।
বিভিন্ন কারণে বর্তমান সময়ে পারিবারিক বন্ধন অনেক শিথিল হয়ে পড়েছে। মূলত এ শিথিলতার কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। দেশে সামাজিক স্বাস্থ্য সুরা বা উন্নয়নের কোনো পরিকল্পিত পদপে নেই। শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে আলোচনা না করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সুশীলসমাজকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিজ নিজ জায়গা থেকে সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য গণমাধ্যমগুলোতে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচারের ওপরও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল এ সমাজের সাথে মধ্যবিত্ত সমাজ খাপ খাওয়াতে পারছে না। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে, বিভিন্ন সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতিতে। অভিভাবকেরা সন্তানদের ভাষা বুঝতে পারছেন না। এরা অনেক সময় সন্তানের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করছেন না, আলাপ-আলোচনায় সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন না। ফলে সন্তানের সাথে অভিভাবকের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। আগে গ্রামে বা শহরে শিশু-কিশোররা কী করছে, সে সম্পর্কে পাড়া-প্রতিবেশী খবর রাখতেন। শিশুদের সামাজিকায়ন হতো খোলা মাঠে। কিন্তু এখন আর সে সুযোগ নেই। শিশুরা বাড়ি থেকে স্কুল, স্কুল থেকে কোচিং সেন্টারে যাচ্ছে। তারা কাদের সাথে মিশছে, অভিভাবকেরা তা জানতে পারছেন না। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরো যতœশীল হতে হবে। কোনো সন্তানের আচরণ যদি অস্বাভাবিক মনে হয় তবে ভালো করে খোঁজখবর নিতে হবে। যদি দেখা যায়,
সন্তান মাদকাসক্ত, তখন আর  দেরি না করে মনোবিজ্ঞানীর শরণাপন্ন হতে হবে অথবা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুরা অতি আদর বা অনাদরে বখে যেতে পারে। মা-বাবার সাথে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা জরুরি। পারিবারিক হত্যাকাণ্ড দেশের আইনশৃঙ্খলার জন্য যেমন অশনি সঙ্কেত হয়ে দেখা দিচ্ছে, তেমনি অবয়ের চরম অবস্থারই জানান দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে রা পেতে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিতে হবে।
লেখক :  চেয়ারম্যান ইফাদ গ্রুপ।
Email: chairman@ifadgroup.com

মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী স্মরণে

মাওলানা মনিরুজ্জমান ইসলামাবাদী জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে অবিস্মরণীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সাহিত্য, রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সমাজসেবার েেত্র যিনি অপরিসীম অবদান রেখেছেন, তাকে ভুলে যাওয়া মানে ইতিহাসের একটি অধ্যায়কে ভুলে যাওয়া। ১৯৫০ সালের ২৪ অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন ১৯৫৭ সালে ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত স্মরণসভায় মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বলেছিলেনÑ ইসলামাবাদীকে স্মরণ করার অর্থ হলো; আজ জাতি তার অতীতকে ভালোবাসতে আরম্ভ করেছে এবং অতীতের সংগ্রাম, দেশনায়ক, মনীষী ও কৃতীদের প্রতি সশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘মাওলানা ইসলামাবাদী’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে লিখেছেনÑ ‘মাওলানা ইসলামাবাদী, মওলানা আকরম খাঁ প্রমুখ ব্যক্তির সাথে ১৯১৩ সালে আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাঙ্গালা প্রতিষ্ঠা করেন। আমিও ওই সমিতির সাথে যুক্ত ছিলাম। আঞ্জুমানের কাজে আমাকে মাওলানা সাহেবের অনেক সংশ্রবে আসতে হয়। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন, আমিও তাকে ভক্তি করতাম। এর ভেতরের কথা হচ্ছে, আমরা উভয়েই যুক্তিবাদী ইসলামে বিশ্বাসী ছিলাম। ১৯১৪ সালে আমি বিএ পাস করি। সেই বছরে তার (ইসলামাবাদী) নির্দেশক্রমে আমি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে শিকের পদ গ্রহণ করি। ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাঙ্গালার তৃতীয় অধিবেশনে আমি মাওলানার আমন্ত্রণে যোগদান করি। ১৯১৯ সালে মাওলানা সাহেব আঞ্জুমানে ওলামার কার্য উপলে আসাম গমন করেন। তিনি খাসিয়া জাতির মধ্যে খ্রিষ্টান মিশনারিদের কার্যের সফলতা দেখে সেখানে একটি ইসলাম মিশন কায়েম করার উদ্যোগী হন। তিনি আমাকে এই কার্য্যভার গ্রহণ করতে পত্র লিখেছিলেন। আমি সানন্দে তার প্রস্তাব গ্রহণ করি। ১৯২৩ সালে যখন উত্তর ভারতে শুদ্ধি আন্দোলন শুরু হয়, তার ফলে কয়েক হাজার মুসলমান মালকানা রাজপুত হিন্দু হয়ে যায়। মাওলানা ইসলামাবাদী আলেম ছিলেন; কিন্তু অন্ধবিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি যুক্তিবাদী, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পপাতী। তিনি ছিলেন সমাজসেবক ও সমাজের কর্মী। নানা অর্থকষ্টের মধ্যেও তিনি সাহিত্যসাধনা ও সমাজসেবা করে গিয়েছেন। তাঁর শেষ কাজ ছিল চট্টগ্রামে একটি এতিমখানা স্থাপন, আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চট্টগ্রামের নিকটবর্তী দেয়াং পাহাড়ে বিস্তৃত জমিও সংগ্রহ করেছিলেন।’ তার সম্পাদিত সোলতান কাগজ পড়ে। মাওলানা সাহেব বাংলার মুসলিম সমাজকে জাগানোর জন্য কাগজকে বড় অস্ত্র মনে করতেন। তিনি ইংরেজি ও বাংলা আপন সাধনায় শিখে ১৮টি গ্রন্থ এবং বাংলা, আরবি, ফার্সি, ইংরেজিতে বহু প্রবন্ধ রচনা করেন। 
সোহেল মো: ফখরুদ্দীন
লেখক : নির্বাহী পরিচালক, প্রত্নতত্ত্ব আলোকচিত্র মিউজিয়াম, চট্টগ্রাম

শহীদ মিনার তুমি কার? by রাজু আহমেদ

পিয়াস করিমের লাশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়ার সিদ্ধান্ত  নেয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ভুঁইফোড় সংগঠন এতে বাধার সৃষ্টি করে। তাদের প্রতিবাদের কারণ হিসেবে তারা ড. পিয়াস করিমকে দেশের স্বাধীনতাবিরোধী বলে উল্লেখ করে। পরিস্থিতি যখন ঘোলাটে হয় তখন ড. পিয়াস করিমের পরিবার থেকে তার লাশ শহীদ মিনারে নেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে তাকে কবর দেয়া হয়। তাকে কবরে শায়িত করার মাধ্যমে উদ্ভূত এ বিতর্কের সমাধান হয়নি, বরং আরো বিতর্ক দানা বাঁধতে শুরু করেছে। যারা পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে ঢুকতে না দেয়ার পে আন্দোলন করেছিল, তারাই ড. পিয়াস করিমের স্ত্রীসহ দেশের ৯ জন বিশিষ্ট নাগরিককে শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। ড. পিয়াস করিমসহ যে বিশিষ্ট নাগরিকদের শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে, এরা দেশের স্বাধীনতাবিরোধী না থাকলেও এরা আওয়ামী লীগবিরোধী ধরে নিয়েই এমনটি করা হয়েছে। এসব ব্যক্তি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দুঃশাসন এবং অন্যায় অপরাধের সমালোচনা করেছেন কিংবা এখনো করছেন। সুতরাং এসব বিশিষ্ট ব্যক্তিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার পেছনে শুধু ভুঁইফোড় সংগঠনগুলো নয় আওয়ামী লীগের স্পষ্ট মদদ যে রয়েছে, তা বোঝার জন্য খুব বেশি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না।
শহীদ মিনার তুমি কার? যদি শুধু আওয়ামী লীগের হও তবে কোনো কথা নেই। আর যদি দাবি করো, তুমি সবারÑ তাহলে তোমার সাথে বহু কথা আছে। ড. পিয়াস করিমের লাশ তোমার বুকে স্থান পায়নি, সে জন্য তুমিও যেমন ব্যথিত আমরাও তেমন। তোমাকে কোনো এক তকমার বিনিময়ে যারা নিজেদের দাবি করতে চাচ্ছে, এরা তাদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তোমাকে কতটা ভালোবাসে, তা একবারো কি ভেবেছ? শহীদ মিনার এ দেশের সব মানুষের। প্রশাসন এটাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ইজারা দেয়নি, বরং দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছে মাত্র; কিন্তু বাম সংগঠনগুলো ড. পিয়াস করিমের লাশকে কেন্দ্র করে যে আচরণটি করল তা দেশের মানুষ কোনো দিনও কি ভুলতে পারবে? ড. পিয়াস করিমের লাশ তোমার বুকে রাখলে নাকি তুমি অপবিত্র হয়ে যেতে। জানতে ইচ্ছা করে, পিয়াস করিমের লাশ রাখলে যদি তোমার বুক অপবিত্র হয় তবে পবিত্র হবে কার লাশ রাখলে কিংবা কার পদধূলিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন উপাচার্য তোমার বুকে জুতা পায়ে হেঁটেছিল, সে দৃশ্য তুমি ভুলে যেতে পারো, কিন্তু আমরা আজো ভুলিনি। ফরহাদ মাজহারসহ যে বিশিষ্ট নাগরিকদের নকল তকমা লাগিয়ে তোমার থেকে দূরে রাখার দাবি করা হচ্ছে, সেই তাদের ছাড়া তুমি কি পূর্ণাঙ্গ? না তোমায় ছাড়া তারা? তোমার নসিব ভালো, যদি তোমার ভাষা থাকত আর তুমি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে তবে তোমারও এ বঙ্গে জায়গা হতো কি না সন্দেহ। আইএসআইয়ের এদেশীয় চর অপবাদ দিয়ে তোমাকেও প্যাকেট করে পাকিস্তানে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হতো। এটাই আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতি। যতণ কেউ পে থাকবে ততণ তার সাত খুন মাফ আর বিপে গিয়ে পান থেকে চুন খসলেই সোজা শ্রীঘরে স্থায়ী ঠিকানা। পরমতসহিষ্ণুতার এত অভাব বিশ্বের অন্য কোনো জাতির মধ্যে নেই যতটা আমাদের মধ্যে। পৃথিবীতে কোনো শাসক গোষ্ঠীর মতাই আজ পর্যন্ত চিরস্থায়ী হয়নি। এ েেত্র স্বৈরতান্ত্রিকেরা যেভাবে মতাচ্যুত হয়েছে সেভাবে গণতান্ত্রিকেরাও কম হেনস্তার শিকার হয়নি। কাজেই বাংলাদেশের েেত্রও কারো মতা চিরস্থায়ী বলা যাবে না। শহীদ মিনারের মতো পবিত্র স্থানগুলো নিয়ে যদি রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়, তবে তা এ জাতির জন্য কোনো দিনও মঙ্গল বয়ে আনবে না। আজ যে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে, সেই একই অভিযোগ তুলে ভবিষ্যতে যদি অন্য কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসে অন্য কোনো মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বিশিষ্টজনদেরকে শহীদ মিনারে
নিষিদ্ধ করে তখন করার থাকবে কী? এভাবে পারস্পরিক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চললে এ দেশে শান্তি আসবে কোন পথে? সুতরাং যাদেরকে শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে এবং যাদের ছত্রছায়ায় তারা এ কাজ করেছে, তাদেরকে ওইসব ব্যক্তির কাছে মা চাওয়া উচিত। ড. পিয়াস করিমের লাশ শহীদ মিনারে স্থান না পেয়ে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র স্থান মসজিদে স্থান পেয়েছে এটা একার্থে অনেক কল্যাণের, তবুও শহীদ মিনারে তার স্থান পাওয়া উচিত ছিল। সুতরাং এ জন্যও অনুশোচনা করা উচিত। ব্যক্তি শেখ হাসিনা শুধু আওয়ামী লীগের প্রধান হতে পারেন, কিন্তু যখন তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তখন এ দেশের প্রত্যেক মানুষের। সুতরাং তাকেই এ দেশের সব মানুষের স্বার্থ রা করতে হবে। এখানে নিজ দল কিংবা বিরোধী দলের মধ্যে পার্থক্য করা উচিত নয়।
raju69mathbaria@gmail.com

পিয়াস করিমের ভার বইবে না শহীদ মিনার! by ইয়াছিন মাহমুদ

ড. পিয়াস করিমের মৃত্যুতে  অনেকে উল্লসিত হয়েছেন। কারণ স্যার যে হক কথাগুলো জাতির সামনে তুলে ধরতেন। এমনকি বহুবার তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে।  নানাভাবে হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। তার মৃত্যুর পরও তা থেমে ছিল না। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, যে দেশে গুণীর কদর নেই; সে দেশে গুণী জন্মায় না। ড. পিয়াস করিম বরাবরই এ দেশের মাটি ও মানুষের কল্যাণে কথা বলেছেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথা বলেছেন। ড. পিয়াস করিমের মতো বুদ্ধিজীবীকে শহীদ মিনারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। আজ জানতে বড় ইচ্ছা করে স্বাধীনতা ও শহীদ মিনার শুধু কি একটা গোষ্ঠীর? নাকি গোটা জাতির? এটা কি কারো  পৈতৃক সম্পত্তি? কারো আজ বুঝতে বাকি নেই ড. পিয়াস করিম স্যার যদি আওয়ামী লীগের মিথ্যা সাফাই গাইতেন তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী হতে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথা হতো। কিন্তু সেটি তিনি করেননি। তাই আজ তাকে রাজাকার হতে হলো। এ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপরে ঘোষণা শুনে অবাক হয়েছি। ড. পিয়াস করিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সাবেক একজন ছাত্র হিসেবে তার লাশ শহীদ মিনারে  নেয়াটা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপরে গৌরবের বিষয়। কিন্তু আমরা দেখলাম তার উল্টোটা। সেই ছেলেবেলার কথা ২৬ মার্চ, কিংবা ২১শে ফেব্র“য়ারিতে সব বন্ধুরা মিলে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যেতাম। কেউ তো আমাদের ঠেলে দিত না।  কিংবা নিষেধ ছিল না। ভাবতাম শহীদ মিনার সবার জন্য। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু আজ কী দেখতে হচ্ছেÑ শহীদ মিনার মানে আওয়ামী লীগ। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তারা ছাড়া আর কেউ জানে না। এ দিকে শহীদ মিনার এলাকায় সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার, মানবজমিন সম্পাদক ও জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরী, নিউএজ সম্পাদক ও টকশো আলোচক নূরুল কবির। সাপ্তাহিক-এর সম্পাদক গোলাম মোর্তজা, আইনজীবী ড. তুহিন মালিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। সরকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপরে নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত স্থাপন ইতিহাস কখনো মা করবে না। এভাবে আর কত দিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফেরিওয়ালাদের দাম্ভিকতা দেখতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক

সমুদ্রপথে মানবপাচার- দায় নিতে হবে সরকারকে

বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে মানবপাচার এখন বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক তরুণ কম খরচে বেআইনিভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশে সমুদ্রপথে রওনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সাথে জড়িত কিছু দালাল অত্যধিক ঝুঁকির এ রুটে তরুণদের প্রলুব্ধ করছে। ভালো কর্মসংস্থানের আশায় তারা জমি আর ভিটেবাড়ি বিক্রি করে দালালদের হাতে সর্বস্ব তুলে দিচ্ছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের আশ্রয় হচ্ছে থাইল্যান্ডের সমুদ্র উপকূলে, সেখানে তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আবারো নির্যাতন করা হচ্ছে। নয়া দিগন্তের এক খবরে বলা হয়েছে, কক্সবাজার এলাকায় দুই শতাধিক তরুণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পর থেকে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে এরা থাইল্যান্ড উপকূলে কোনো চক্রের হাতে আটক হয়ে আছে। এদের অনেকে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার সময় অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে। মানবপাচারকারীদের মুক্তিপণ আদায়ে নির্যাতনের শিকার হয়েও অনেকে মারা গেছে। কক্সবাজারে উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা থাইল্যান্ড সফরকালে মানবপাচারকারীদের হাতে আটক হওয়া ব্যক্তিদের দেখে এসেছেন। তিনি যে ছবি তুলেছেন তা এক কথায় ভয়াবহ। এর আগে থাইল্যান্ডে আমরা বাংলাদেশী দাসশ্রমিকদের নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হতে দেখেছি।
নয়া দিগন্তের রিপোর্টে কক্সবাজার থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে নিখোঁজ রয়েছেন, এমন একাধিক পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি নির্যাতন বা অবৈধপথে যাওয়ার পর কারাগারে আটক ব্যক্তিদের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল মানবপাচারকারী চক্রের জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনিতেই মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চালানোর কারণে এদের অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মিয়ানমার ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। এদের সাথে বাংলাদেশীরা যোগ দিচ্ছে।
বাংলাদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। এ দেশের নাগরিকেরা যাতে মানবপাচারকারী চক্রের হাতে না পড়ে, সেজন্য উপকূল নিরাপদ রাখা জরুরি; কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। কিভাবে শত শত তরুণ উপকূল অতিক্রম করল, তা একটি বিরাট প্রশ্ন। এ কথাও সত্য যে, শুধু নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পার হচ্ছে, তারা বিদেশে ভালো কাজের আশায় এই ঝুঁকি নিয়েছে। দেশের তরুণদের যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা হয়, এই ঝুঁকি থেকেই যাবে। আমরা মনে করি, মানুষ যাতে আর ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে বিদেশ যেতে না পারে সেজন্য উপকূলে নিরাপত্তা আরো বাড়ানো দরকার। একই সাথে বেকার তরুণ যুবকদের কর্মসংস্থানের দিকে সরকারের মনোযোগী হতে হবে। মানুষের যদি কর্মসংস্থান না থাকে তাহলে ‘কসমেটিক উন্নয়ন’ দেশের কোনো কাজে আসবে না।

বিরোধী জোটের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি- এ অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে

বিরোধী জোটের আন্দোলনের প্রশ্নে আবারো কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আন্দোলনের নামে ‘হত্যা-অরাজকতা’ চললে সরকার কঠোর হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে ট্রানজিট গভর্নমেন্ট হিসেবে ছিলাম। তখন অনেক কিছু করতে পারিনি। এখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায়। এবার একটা মানুষের গায়ে হাত দিয়ে দেখুক। দেখবেন, এর পরিণতি কী হয়। গত বৃহস্পতিবার গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। বিএনপির সাথে সংলাপ নিয়ে আর প্রশ্ন না করার জন্য সাংবাদিকদের পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বারবার খুনিদের সাথে সংলাপে বসতে এত তাগিদ কেন? ‘তারা আপনাদের কী দিয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। গত ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচন ছিল একটি ভোটারবিহীন, প্রতিদ্বন্দ্বীহীন, অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এই বাস্তবতায় দেশ বিদেশ থেকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বারবার। দেশে সরকারবিরোধী ২০ দলীয় জোট ও সরকারের বাইরে থাকা প্রায় সব দল সব দলের অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে যাওয়ার কথা বলছে, রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে বিরোধী জোটের নেতানেত্রীদের সাথে সংলাপে বসার কথা বলছেÑ তখন প্রধানমন্ত্রী বিরোধী জোটের প্রতি এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন।
তিনি আরো বলেছেন, বিএনপি নেত্রীর পায়ের নিচে মাটি নেই। তারা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তারা খুনি। এদের সাথে কোনো সংলাপ নয়। রাজনীতি-বিজ্ঞান বলে, একটি রাজনৈতিক দলের যাবতীয় শক্তি নির্ভর করে জনসমর্থনের ওপর। বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, এমন সাক্ষ্যপ্রমাণ সরকারের হাতে আছে বলে মনে হয়। বৃহস্পতিবার নীলফামারীতে বেগম জিয়ার জনসভায় মানুষের ঢল নামতে দেখা গেছে। সরকারের সমর্থক একটি জাতীয় দৈনিকে ‘জনসভায় জনস্রোত’ শিরোনামের এক খবরে বলা হয়Ñ ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জনসভা ঘিরে মিছিলের নগরীতে পরিণত হয় নীলফামারী। জনসভাস্থল, আশপাশের সড়ক, বাসাবাড়ির ছাদ ছিল লোকে লোকারণ্য। মাটিতে দাঁড়ানোর জায়গা না পেয়ে গাছের ওপরে উঠেও জনসভায় অংশ নেয় অসংখ্য মানুষ।’ এই বাস্তবচিত্র প্রমাণ করে, বিরোধী দলের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়নি। বিএনপি নেত্রী নিজেও সে ব্যাপারে আস্থাশীল বলেই হয়তো সব দলের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জোর দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন। অথচ সরকার ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বলে এ নির্বাচনের পর মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে বিরোধী জোটের সাথে ‘কোনো সংলাপ নয়, ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন নয় এবং সে নির্বাচন হবে বর্তমান সরকারের অধীনেই’ এমন ঘোষণা দিয়ে চলেছে। এর পাশাপাশি চলছে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেফতার ও মামলা। ছাত্রদলের নতুন কমিটির ২২ জন নেতাকর্মীকে ও গতকাল যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ ৮৩ জন বিএনপি নেতাকর্মীকে আটকের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আরো কঠোর হওয়ার হুমকি বাস্তবায়নের প্রতিফলন ঘটেছে।
আমরা মনে করি, দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রায় প্রতিদিন যেভাবে, যে ভাষায় কথা বলছেন, তা তার পদ ও পদবির জন্য মোটেও মানানসই নয়। তা ছাড়া, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সূত্রে যে রাজনৈতিক অসন্তোষ ও ক্ষোভ দানা বাঁধছে, তা দেশের জন্য অস্বস্তিকর। এ সমস্যা সমাধানের শান্তিপূর্ণ উপায় হচ্ছে, বিরোধী মতাবলম্বীদের সাথে সংলাপে বসে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পন্ন করা। জনগণের মনে স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগছেÑ আওয়ামী লীগ যদি মনে করে বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, বিএনপি নেত্রীর পায়ে নিচ থেকে মাটি সরে গেছে, তাহলে সবার অংশগ্রহণে অবিলম্বে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বাধা কোথায়? সে ধরনের নির্বাচনে যেতে সরকার এত অনিচ্ছুক কেন? সরকার কি তাহলে নিজেকেই জনবিচ্ছিন্ন ভাবছে? এটা ভুল প্রমাণ করতে চাইলে ক্ষমতাসীন দলকে সংলাপের পথে এবং অযৌক্তিক বক্তব্য থেকে সরে আসতে হবে। দেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার স্বার্থে এর বিকল্প নেই।

নৃশংস খুনের ছড়াছড়ি- সরকার শৃঙ্খলা বাহিনী নির্লিপ্ত কেন

সমাজে নিষ্ঠুরতা বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। একেবারে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা প্রিয়জনদের হত্যা করছে। এর মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে খুনের ঘটনা ঘটছে বেশি। স্ত্রীকে বাদ দিয়ে স্বামী সম্পর্ক তৈরি করছে পর নারীর সাথে। একইভাবে স্বামীকে পাশ কাটিয়ে স্ত্রী সম্পর্ক তৈরি করছে পরপুরুষের সাথে। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে একে অন্যজনকে হত্যার সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে। কেউ বা পূর্বশত্রুতার জের ধরে নিকটাত্মীয়কে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। জমিজমা, অর্থসম্পত্তি ভোগদখলও এ ধরনের খুনের পেছনে কাজ করছে। একটি আইনশৃঙ্খলাবিহীন আদিম সমাজের দিকে যেন আমরা যাত্রা শুরু করলাম। এক ভয়াবহ বিকৃতি যেন ক্রমেই আমাদের ওপর ছেয়ে যাচ্ছে। শাসক শ্রেণীর অতিরিক্ত অর্থ ও ক্ষমতালিপ্সা সমাজে এ রক্তের খেলাকে সহজ করে তুলছে।
১৮ অক্টোবর সিলেটে পিতা ও সৎমায়ের হাতে খুন হয় একটি শিশু। ১৯ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের সিঙ্গাইরে ছেলের হাতে খুন হন বাবা-মা। আর গণপিটুনিতে নিহত হন ছেলে। ১৯ অক্টোবর রাজশাহীতে শাশুড়িকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে খুন হন জামাতা। ১৪ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়ায় এক কিশোরকে প্রেমিকার স্বজনেরা হত্যা করেন। ১০ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুরের ভাসানটেকে বোনকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় খুন করা হয় ভাইকে। ১৬ অক্টোবর রাজধানীর কল্যাণপুরে স্বামীকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন স্ত্রী। ১৯ অক্টোবর গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে স্বামীর হাতে খুন হন স্ত্রী। ১০ অক্টোবর ময়মনসিংহের নান্দাইলে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে তোফাজ্জল হোসেন ও স্বপন মিয়া নামে দুই ভাইকে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। ১৫ অক্টোবর চাঁদপুরে বেয়াইনের ছুরিকাঘাতে খুন হন বেয়াই। ১২ অক্টোবর মহেশখালীতে বিয়েবাড়িতে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় সাবেক এক ছাত্রদল নেতাকে। ১৮ অক্টোবর গাজীপুরে এক মাইক্রোবাসচালককে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা তার গাড়ি নিয়ে যায়। ৯ অক্টোবর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে অপহৃত এক স্কুলছাত্রীর ভাইকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১১ অক্টোবর চুনারুঘাটে জমি নিয়ে বিরোধে দু’জনকে হত্যা করা হয়। ১৪ অক্টোবর মাদারগঞ্জে বাসরঘরে খুন করা হয় নববধূকে।
নয়া দিগন্তের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২১ দিনে দেশে অন্তত ১০০ নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে খুন হয়েছেন ৪০৩ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩২৮, মার্চে ৩৬৯, এপ্রিলে ৪০১, মে মাসে ৩৭০, জুনে ৩৯২, জুলাইয়ে ৪০৬, আগস্টে ৩৯২ জন ও সেপ্টেম্বরে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৩৭৪টি। ২০১০ সালে দেশে খুনের সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৯৮৮টি, ২০১১ সালে তিন হাজার ৯৬৬টি, ২০১২ সালে চার হাজার ১১৪টি ও ২০১৩ সালে চার হাজার ৩৯৩টি।
কেন এমনটি হচ্ছে? এর আরো গভীরতর অনুসন্ধান এবং সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন। অবশ্যই বর্তমান জীবনব্যবস্থা এ ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির জন্য অনেকখানি দায়ী।
সবচেয়ে আতঙ্কের ব্যাপার হচ্ছে, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা। পুলিশের দাবি পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্য দিকে, সরকার এমন পরিস্থিতিকে একেবারে স্বাভাবিক ঠাওর করছে। এই ফাঁকে খুনিরা শাস্তি না পেয়ে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এরই প্রভাবে হত্যার এমন বন্য উৎসব চলছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন না করলে বিচারহীনতার আদিমতা আরো চেপে বসবে। মানুষ এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চায়। দায়িত্বশীলরা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে প্রতিপালন করছেন না তার প্রতিফলন বলে মনে করা অস্বাভাবিক হবে না। সরকারের বোধোদয় প্রয়োজন মানুষের মুক্তির জন্য।

আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের নিরাপত্তা চাই by এবনে গোলাম সামাদ

ভারতের একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট আবুল পাকির জয়নুলাবেদিন আবদুল কালাম ঢাকায় এসে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বললেন, বাংলাদেশ ভারতের প্রাকৃতিক বন্ধু। ‘প্রাকৃতিক’ কথাটা বলতে ঠিক কী বুঝতে হবে, সেটা অনেকের কাছেই স্পষ্ট করতে পেরেছেন বলে মনে হচ্ছে না। কেননা, ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বয়ে আসছে ছোট-বড় প্রায় ৫৪টি নদী। ভারত একতরফাভাবে এসব নদী থেকে নিয়ে নিচ্ছে পানি। ফলে বাংলাদেশ ভুগছে পানির অভাবে। তাই ভারতকে বাংলাদেশ এখন কতটা প্রাকৃতিক বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, সেটা নিয়ে দেখা দিচ্ছে প্রশ্ন। বাংলাদেশের অনেকের কাছে ভারত এখন প্রাকৃতিক বন্ধু হিসেবে বিবেচিত না হয়ে, প্রতিভাত হতে পারে প্রাকৃতিক বৈরী শক্তি হিসেবে। আমরা জানি, ভারত ১৯৫১ সাল থেকে গঙ্গার ওপর নির্মাণ আরম্ভ করে বিখ্যাত ফারাক্কা ব্যারাজ। ১৯৭৫ সালে আরম্ভ হয় ফারাক্কা ব্যারাজের কার্যকারিতা। আমরা জানি, এর ফলে বিশেষভাবে নষ্ট হয়েছে পদ্মা নদীর নাব্যতা। পদ্মা নদীতে আগের মতো পানি আসছে না বলে এতে ধরা পড়ছে না আগের মতো মাছ। যেহেতু পদ্মা নদীতে স্রোতের মাত্রা কমে গেছে, তাই পদ্মা এবং তার শাখানদীতে এখন আর আগের মতো বেগে পানি প্রবাহিত হতে পারছে না। ফলে ঊষর হয়ে উঠছে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষিভূমি। কেননা, সমুদ্র থেকে জোয়ারের পানি লবণ বহন করে আনছে। আগের মতো তা আর ধুয়ে যেতে পারছে না পানির স্রোতে। ফলে বাংলাদেশে ঘনিয়ে উঠছে বিশেষ প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়। শোনা যাচ্ছে, গঙ্গার উজানে ভারত নাকি গড়তে যাচ্ছে আরো ১৬টি ব্যারাজ। ভারতের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পদ্মায় আর কোনো পানি আসবে বলে মনে হয় না। এ রকম এক পরিস্থিতিতে ঢাকায় এসে কালাম সাহেব বললেন, ভারত হলো বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বন্ধু। কথাটিকে আমাদের মনে হচ্ছে একটা বিরাট প্রহসন। কালাম সাহেব এ দেশে বক্তৃতা দিতে আসার আগে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে যদি যথাযথভাবে জেনে আসতেন, তবে মনে হয়, তার বক্তৃতার ধরন হতে পারত অনেক পৃথক। আর তা আমাদের কাছে হতে পারত অনেক যুক্তিসহ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রাকৃতিক বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে হলে ভারতকে দিতে হবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের নিরাপত্তা। আমরা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের নিরাপত্তা চাই।
এপিজে আবদুল কালাম ভারতের একাদশতম প্রেসিডেন্ট। এর আগে যারা প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, তারা কেউই ছিলেন না প্রযুক্তিবিদ। কিন্তু কালাম সাহেব হলেন ভারতের প্রথম প্রযুক্তিবিদ প্রেসিডেন্ট। তিনি রকেট নির্মাণের েেত্র একজন বিশেষ পারদর্শী ব্যক্তি। বাংলাদেশে এসে কালাম সাহেব বোঝাতে চেয়েছেন, ভারত হলো একটি শান্তিবাদী দেশ। কিন্তু তিনি যখন ঢাকায় বক্তৃতা করছিলেন, তখন ভারত আকাশে উৎপেণ করছিল ক্রুজ মিসাইল (পেণাস্ত্র), যা পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সম। ভারত এক দিকে বলছে শান্তির কথা, সেই সাথে আবার করে চলেছে সমরায়োজন। ভারতে চলেছে আত্মরার নামে আক্রমণের প্রস্তুতি। ভারতে অনেক নেতা ভাবছেন বৃহত্তর ভারত গড়ার কথা। এই বৃহত্তর ভারত গড়ার পরিকল্পনার মধ্যে কেবল যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দখলের কথাই আসছে, তা নয়। থাকছে দণি-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে আনার স্বপ্ন। ভারত ইতোমধ্যে নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে গড়ে তুলেছে পারমাণবিক অস্ত্রসংবলিত নৌঘাঁটি, যা ইন্দোনেশিয়ার প্রায় লাগোয়া। ইন্দোনেশিয়া ভারত জয়ের কোনো স্বপ্ন দেখছে না। তাই তার গা ঘেঁষে এ রকম নৌঘাঁটি নির্মাণ সমর্থনীয় নয়।
এপিজে আবদুল কালাম ঢাকায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে যখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মৈত্রী বন্ধন গড়ে তোলার কথা বলছিলেন, তখন আমাদের কাছে এসে পৌঁছাল জয়রাম জয়ললিতার জামিনলাভের কথা। তিনি এখন কারাবন্ধনমুক্ত। কালাম সাহেব জয়ললিতার ভক্ত নন। তিনি দল হিসেবে হলেন ভারতের ইন্দিরা কংগ্রেসের সাথে সংশ্লিষ্ট। তিনি জন্মেছেন তামিলনাড়–তে। তামিলনাড়–র মানুষ এখন চাচ্ছে ভারত থেকে যেন পৃথক হয়েই যেতে। ভারতে প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে আর্য-দ্রাবিড় বিরোধ। ভারতের একতা বজায় রেখেছিল কংগ্রেস। এখন তার স্থলে বিজিপি এই একতা কতটা বজায় রাখতে সম হবে, সেটা অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে না। সব দ্রাবিড় ভাষাভাষী অঞ্চলে বিজিপি মোটেও জনপ্রিয় নয়। আর্য-দ্রাবিড় সঙ্ঘাত বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র যথেষ্ট বদলে দিতেই পারে। বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতি যতটা না মেলে উত্তর ভারতের আর্য সংস্কৃতির সাথে, তার চেয়ে অনেক বেশি মেলে দণি ভারতের দ্রাবিড় ভারতের সাথে। দ্রাবিড় ভারত যদি একটা পৃথক রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তবে অনেক সহজ হবে তার সাথে বাংলাদেশের স্বাভাবিক মৈত্রী। মুঘল শাসনামল থেকেই বাংলাদেশের মানুষের মনে বিরাজ করছে দিল্লিবিরোধী মনোভাব। এটা এখনো হয়ে আছে বেশ সুস্পষ্ট। ‘জাতি’ বলতে বোঝায়, ইতিহাসের ধারায় গড়ে ওঠা একটি জনসমষ্টিকে। আমাদের ইতিহাসের ধারা এবং হিন্দিভাষী উত্তর ভারতের ইতিহাসের ধারা এক নয়। একসময় বাংলাদেশে ছিল একটি পৃথক স্বাধীন মুসলিম সালতানাত। সে আমলে মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল বাংলা ভাষা। সৃষ্টি হতে পেরেছিল একটি পৃথক স্থাপত্যরীতি, যা হলো বাংলাদেশের বিশেষ সংস্কৃতির পরিচয়। আমাদের সংস্কৃতি দিল্লিনির্ভর ভারতীয় সংস্কৃতি নয়।
এ পি জে আবদুল কালাম বলছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐক্য। কিন্তু তিনি এটা বলতে পারছেন বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস না জানার কারণে। কালাম সাহেবের বক্তব্যের সাথে যথেষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে ভারতের বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির চিন্তাচেতনার। প্রণব মুখার্জি সম্প্রতি বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশ আসলে নাকি একই দেশ। কিন্তু তিনি যেটা ভুলে গেছেন তা হলো, ভারতের রাষ্ট্রভাষা হলো হিন্দি আর বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। হিন্দি আর বাংলা এক ভাষা নয়। কালাম সাহেব বলছেন, বাংলাদেশকে জোর দিতে হবে গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর। এ কথা আমরা স্বীকার করি। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি আমাদের কাছে যথেষ্ট বিবেচনা পাচ্ছে। আমাদের অর্থনীতি এখনো হয়ে আছে মূলত কৃষিভিত্তিক। বাংলাদেশের মানুষ কৃষিকাজকে কখনো খাটো করে দেখেনি বা এখনো দেখে না। বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ ধান উৎপাদক দেশ। প্রথম ধান উৎপাদক দেশ হলো চীন। তারপর হলো ভারত। এর পরে আসে জাপানের নাম। জাপানের পরেই বাংলাদেশের স্থান। বাংলাদেশের কৃষকেরা ধনী নন। এ দেশের কৃষকেরা ধান উৎপাদন করেন অনেক কম খরচে। এর প্রশংসা না করে পারা যায় না। আমাদের গ্রাম্য অর্থনীতি ভারতের তুলনায় কম অগ্রসর নয়। বরং ভারতের গ্রামীণ জনসমষ্টির চেয়ে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনসমষ্টি বেশি খেয়ে পরেই জীবনধারণ করছে। কালাম সাহেবের বক্তব্য তাই আমাদের কাছে মোটেও প্রাসঙ্গিক নয়।
ভারত চাচ্ছে শিল্প অর্থনীতি জোরদার করতে। ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই ভারতে চলেছে এই প্রয়াস। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে টাটা কোম্পানির মতো ইস্পাত উৎপাদন প্রতিষ্ঠান। যে অঞ্চল নিয়ে বাংলাদেশ গঠিত, সেখানে ছিল না লৌহ আকর; সেখানে ছিল না লোহা গলানোর জন্য কয়লার খনি। পাকিস্তান হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানে আবিষ্কৃত হয় প্রাকৃতিক গ্যাস। এ গ্যাস ব্যবহার করে ফেঞ্চুগঞ্জে প্রস্তুত হতে থাকে নাইট্রোজেনঘটিত সার। এর প্রয়োগে বাড়তে পারে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন। কৃষি উৎপাদন এই দেশে হয়নি অবহেলিত। পাকিস্তান আমলেই আরম্ভ হয় এ েেত্র যথেষ্ট গুরুত্বারোপ। আর এখনো আমরা আমাদের কৃষি অর্থনীতিকে করতে চাচ্ছি না অবহেলা। তাই কালাম সাহেবের উপদেশ আমাদের অনেকের কাছেই মনে হয়েছে একান্তভাবেই অবান্তর। তিনি যেসব কথা বলেছেন, আমাদের অর্থনীতিবিদেরা সে সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন হয়েই আছেন।
ভারত হয়ে উঠতে চাচ্ছে একটি সমরবাদী দেশ। ভারত এখন প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে সমরাস্ত্র নির্মাণে। কিন্তু যুদ্ধ কেবল সমরাস্ত্রনির্ভর নয়। যুদ্ধকে অনেকে তুলনা করেন একটি সমত্রিবাহু ত্রিভুজের সাথে। এর একটি বাহুকে বলা যায়, সুবিন্যস্ত সেনাবাহিনী। আর একটি বাহুকে বলা যায়, প্রয়োজনীয় রণসম্ভার। আর অপর একটি বাহুকে বলতে হয়, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক সঙ্গতি। এই তিন বাহুর যেকোনো একটি দুর্বল হলেই যুদ্ধে ঘটতে পারে একটি দেশের পরাজয়। দু-দু’টি বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের একটি বড় কারণ হলো খাদ্যাভাব। জার্মানি বৃদ্ধি করতে পারেনি তার খাদ্যশস্যের উৎপাদন। ফলে যুদ্ধের সময় তাকে রুটি তৈরির ময়দার সাথে মেশাতে হয় করাতের গুঁড়ো, যা খেয়ে সৈন্যরা হয়ে পড়তে থাকে অসুস্থ। ভারত তার সমরায়োজনে সৈন্যবল বৃদ্ধি করছে, বাড়ছে সমর উপকরণ। কিন্তু সেভাবে বাড়াতে পারছে না তার খাদ্যশস্যের উৎপাদন। তাই ভারত যদি কোনো প্রলম্বিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাবে সে তার সেনাবাহিনীকে যথাযথভাবে রসদ সরবরাহ করতে পারবে বলে মনে হয় না। ভারত আকাশে ক্রুজ মিসাইল ছুড়ছে। কিন্তু তার এই অস্ত্রসম্ভার বৃদ্ধি সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধে তাকে জয়ের নিশ্চয়তা দেবে, এ রকম কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করা চলে না। ১৯৭১ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় বাহিনী যুদ্ধে জয়ী হয়েছিল। এই জয়ী হওয়ার একটি কারণ হলো, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ তখন ছিল ভারতের প।ে কিন্তু এখন অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। জনমত এখন ভারতের পে নয়। বাংলাদেশের মানুষ চাচ্ছে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাখতে; ভারতের সাথে মিশে যেতে নয়। তা বাংলাদেশের সম্পর্কে ভারতের নেতারা যতই এক জাতি, এক প্রাণ একতার কথা বলেন না কেন।
এ পি জে কালাম একজন প্রথম শ্রেণীর প্রযুক্তিবিদ। কিন্তু একটি দেশের মানুষের জাতীয়তাবোধ কেবল তার প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে তার জাতীয় মনমানসিকতার ওপর। ভারতের জাতীয়তাবাদ আর বাংলাদেশের মানুষের জাতীয়তাবাদ একসূত্রে বাঁধা পড়েনি। ১৯৭১-এর অবস্থা ও আজকের অবস্থা বিশেষভাবেই হয়ে উঠেছে ভিন্ন।

পূজা দেখে ফেরার পথে ধর্ষণের পরে হত্যা মাদ্রাসা ছাত্রীকে

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় ভিটিপাড়া সার্বজনীন পূজামন্ডপে কীর্তন ও পূজানুষ্ঠানে  গিয়ে লাশ হয়ে ফিরলো স্থানীয় এক মাদ্রাসা ছাত্রী। নিহত ইলমি আক্তার (১০) স্থানীয় মচিারপাড়া ইসলামীয়া দাখিল মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ও নুর মোহাম্মদের মেয়ে ছিল।

শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মজিদ জানান, বাড়ির পাশেই কালীপূজা উপলক্ষে ভিটিপাড়া সার্বজনীন পূজামন্ডপে কীর্তনের আয়োজন করা হয়। শুক্রবার রাত ৭টার দিকে পূজামন্ডপে কীর্তন ও পূজানুষ্ঠান  দেখতে বাড়ি থেকে বের হয় ইলমি। পরে রাত ১০টার দিকেও সে বাড়িতে না ফেরায় বাড়ির লোকজন তাকে খুজাখোঁজি করে। পরদিন শনিবার এলাকাবাসী স্থানীয় সোবাহান ফকিরের ফুল বাগানের ভেতর তার লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশ ও স্বজনদের খবর দেয়। তার মুখে কামড়ের দাগ ছিল। পরনের হাফ প্যান্টটিও লাশের পাশে পরা ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তাকে কেউ ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যার পর তার লাশ ওই বাগানে ফেলে গেছে। সকাল ১০টার দিকে সুরুতহাল করে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে মামলার প্রস্তুতি চলছে। প্রহ্লাদপুর ইউনয়িনের ৬নং ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুল মজিদ জানান, শিশুটির লাশ দেখে ধর্ষনের মতো আলামত পাওয়া গেছে এবং গলায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
নাঈমার নানী আকলিমা আক্তার জানান, শুক্রবার রাত ৭টার দিকে ইলমি ও তার ছোট বোন নাঈমাকে (৭) নিয়ে তিনি ওই পূজা মন্ডপে গিয়েছিলেন। তাদের মন্ডপে রেখে পাশের একটি  দোকানে বসেছিলেন তিনি (নানী) । পরে  স্থানীয় কদমা এলাকার আব্দুল মান্নানের ছেলে মন্টু (৩৪) নাঈমাকে পাঁচ টাকা দিয়ে তার নানীর কাছে পাঠিয়ে দেয়। নানী নাঈমার কাছে ইলমির কথা জানতে চাইলে সে জানায়, আপু মিন্টু মামার সাথে আছে। মিন্টু মামা আমাকে চকলেট খেতে পাঁচ টাকা দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। প্রায় দুই ঘন্টা পরও ইলমি ফিরে না আসায় মন্ডপ এলাকায় খুঁজতে থাকি। কেথাও না পেয়ে মিন্টুর বাড়িতে যাই। কিন্তু মিন্টুকে তার বাড়িতে পাওয়া যায়নি। পরদিন ফুল বাগানে তার নাতনীর লাশ পেয়েছি।