Thursday, November 27, 2014

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশটি যেন বাস্তবায়িত হয় by একে এম শাহনাওয়াজ

ছাত্রলীগের উন্মত্ত সন্ত্রাসের সর্বশেষ ঘটনায় (প্রার্থনা করি লেখা প্রকাশের আগ পর্যন্ত সর্বশেষ শব্দটি বজায় থাকুক) খুনোখুনির মধ্য দিয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার ও দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে অপরাধ আড়াল করার নানা চেষ্টা থাকে। ছাত্রলীগের সুবোধ নেতাকর্মীদের ভেতর ছদ্মবেশী অন্য দলের সন্ত্রাসীরা ঢুকে গেছে ধরনের থিওরিও কোনো কোনো পর্যায় থেকে উচ্চারিত হয়েছে। তারপরও এবার একটু স্বস্তির কারণ ঘটেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২৪ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশ কমিশনারকে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা সূত্রে নির্দেশ দিয়েছেন, এসব ঘটনা যারা ঘটাবে, দল-পরিচয় না দেখে যেন তাদের ব্যাপারে অ্যাকশন নেয়া হয়। এ নির্দেশে আমরা একটু আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো বড় দলের নীতিনির্ধারক যারা প্রায় পালাক্রমে দেশের ভাগ্যবিধাতা হন, তারা নষ্ট রাজনীতির স্বার্থে পেশিশক্তিনির্ভর হয়ে পড়েন। অপূর্ণ গণতান্ত্রিক আচরণের কারণে প্রকৃত জনসম্পৃক্ত নয় এই দলগুলো। তাই জনগণের ওপর আস্থা রেখে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দলীয় নেতৃত্বের নেই। ফলে গণশক্তি নয়, পেশিশক্তি হয়ে যায় তাদের প্রধান অবলম্বন। সরকারে যারা থাকেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার বড় দায় তাদের। জনজীবনে নিরাপত্তা বিধানের প্রধান আধিকারিক তারাই হন। নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যদি ঘা হয়ে যায়, তবে কোমল পেলব মলম লাগিয়ে নিজেদের আত্ম রক্ষা করা যাবে? গ্যাংগ্রিন হয়ে যাওয়ার পর সরষে ফুল দেখে লাভ কী! পুরনো কথা বাদ দিলাম, আওয়ামী লীগ সরকারের আগের পর্ব ও বর্তমান পর্বে ছাত্রলীগের দুর্দমনীয় সন্ত্রাসী আচরণে শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে জনজীবন বারবার হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খুনোখুনি তো কম হয়নি, হচ্ছে না! বিপন্ন হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। কী অ্যাকশন হয়েছে?
অপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশে শাসকশ্রেণী তাদের কাণ্ড-অপকাণ্ডের সমালোচনা শুনতে পছন্দ করে না অথবা ভয় পায়। তাই তাদের যত রাগ গণমাধ্যমের ওপর। সাংবাদিক, কলামিস্ট ও টকশোর বিশ্লেষকদের ওপর। এখন তো সংবাদমাধ্যমের ওপর দোষ চাপানো একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এসব অসুস্থ বয়ান এখন নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদেরও প্রভাবিত করছে। সংবাদমাধ্যম থেকে জানলাম সেদিন সজীব ওয়াজেদ জয় বলছিলেন, ছাত্রলীগ সম্পর্কে শুধু নেতিবাচক কথা সংবাদপত্রে লেখা হয়, তাদের ভালো কাজগুলোর কথা প্রচার পায় না। আমি ক্যাম্পাসের দীর্ঘ অবস্থান অভিজ্ঞতা দিয়ে খুঁজে ফিরলাম, অন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের সহকর্মীদের কাছ থেকে তথ্য পেতে চাইলাম। ফলাফল একই ঘটল। কোনো সরকারের আমলেই ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের আচরণে উল্লেখ করার মতো কল্যাণধর্মী কাজে যুক্ত হওয়ার উদাহরণ খুঁজে পেলাম না। ছাত্রকল্যাণধর্মী কর্মসূচি গ্রহণের যেকোনো দায় আছে, তা হয়তো এসব সংগঠনের নেতাকর্মীর জানা থাকে না। স্খলনটি তো হঠাৎ হয়নি। অতীতেও একই অস্বস্তি আমরা দেখেছি।
১৪ বছর আগের একটি স্মৃতিচারণ করতে ইচ্ছে হচ্ছে। নষ্ট সময়ে নির্মোহ থেকে দলীয় বা ব্যক্তিস্বার্থ চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে দেশপ্রেম আর বিবেকের তাড়নায় সামান্য শব্দ চয়ন যখন দুর্লভ হয়ে পড়েছিল, তখন সে সময়ের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল ন্যায় আর সত্যের শব্দাবলী। প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রপতি তার বিচারপতির প্রজ্ঞা নিয়ে ছাত্র রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন দেখে মুখ খুলেছিলেন। সচেতন অথচ ক্ষমতাহীন এ দেশের অসংখ্য মানুষের হৃদয়ের কথা জাতির বিবেক হয়ে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন। বাস্তব অবস্থা মূল্যায়ন করেই তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তথাকথিত ছাত্র রাজনীতির রাহুগ্রাসমুক্ত করার জন্য জাতীয় রাজনীতির কাণ্ডারিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। বেঁচে গিয়েছিলেন সে সময়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি। কারণ এ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের শ্রদ্ধা আর আস্থা ছিল তার ওপর। তাই রাজনীতির বণিকরা রে রে করে তেড়ে আসতে পারেননি। তবে সমালোচনা করতেও ছাড়েননি অনেকে। ভাবখানা এমন, জীবনভর আইন-আদালত নিয়ে ছিলেন তিনি- রাজনীতির বোঝেন কী! তাই রাজনীতিকদের কেউ কেউ এ বিজ্ঞ বিচারপতিকে তাত্ত্বিকের ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন, কত বড় ভুল তিনি করছেন! ছাত্ররা রাজনীতি না করলে রাজনীতির চর্চা হবে কী করে! সমাজ সচেতনতা সৃষ্টি করবে কারা? ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতির হাল ধরবে কে? এসব বড় তত্ত্বকথা দিয়ে ডান বামের প্রাজ্ঞ রাজনীতিকরা রাষ্ট্রপতির চিন্তার সীমাবদ্ধতাকে দেখাতে চেয়েছেন। তারা বুঝতে চাননি (বুঝে গেলে সুবিধার বল নিয়ে খেলা যাবে না ভেবে) যে, রাষ্ট্রপতির দুশ্চিন্তা চিরায়ত ছাত্র রাজনীতি নিয়ে নয়, ছাত্র রাজনীতির নামে আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ক্যাডারতন্ত্রের যে আধিপত্য তা নিয়ে। আমাদের তথাকথিত রাজনীতির তাত্ত্বিক ও রাজনীতি সচেতন বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রপতির আহ্বানের সারবত্তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন তুলেছেন; কিন্তু একবারও বলেননি ক্যাডারতন্ত্রের আধিপত্যের ভেতর থেকে সুস্থ রাজনীতি বেড়ে উঠতে পারে না। তাই স্বপ্নের ছাত্র রাজনীতি তথা তাত্ত্বিকদের ছাত্র রাজনীতিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত ও লালন করতে হলে ক্যাডারতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। ক্যাডারতন্ত্র আর সুস্থ রাজনীতির চর্চা পাশাপাশি চলতে পারে না। বইপড়া জ্ঞান আর চোখে দেখা জ্ঞানে তো পার্থক্য থাকতেই পারে। ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্ট আমরা তো প্রতিদিনই দেখছি, মেধাবী তরুণ শিক্ষার্থীরা স্বভাবতই দূরে সরে যাচ্ছে রাজনীতি থেকে।
সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রত্যাশিত ভালো কাজের সুযোগ কোথায় ছাত্রলীগের তরুণদের? অর্থ আর পেশিশক্তি লোভী ক্যাডারদের নেতৃত্বে এখন যারা ছাত্র রাজনীতির ধ্বজা ধরে আছে ক্যাম্পাসে, তাদের একটা সূত্রের মধ্য ফেলে চেনা যায়। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক তাদের চেনেন এভাবে যে, এ শ্রেণীর তরুণ কদাচিৎ ক্লাস বা টিউটোরিয়ালে উপস্থিত থাকে। নিজের বা বন্ধুদের পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো না থাকলে পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনের জন্য চাপ দেয়। চাপ গ্রাহ্য না করলে পরীক্ষার হলে তালা দেয়। পরীক্ষা দিতে আসা বন্ধুদের ধমকে তাড়িয়ে দেয়। হলের কলাপসিবল গেটে তালা দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্লাস পরীক্ষার ক্ষতি করে দলীয় মিছিলে অংশ নিতে বাধ্য করে।
ক্যাম্পাসের চা-সিগারেটের দোকানদার আর ক্যান্টিন মালিক চেনেন এভাবে যে, এসব তরুণের নামের পাশে হিসাবের খাতায় হাজার হাজার টাকা বাকি পড়ে। বাকি শোধ দিতে বললে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়।
ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা জানে, সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের ক্যাডারদের কখনও পাওয়া যায় না। বরঞ্চ মতের মিল না হলে বা যথা সম্মানপূর্বক আমন্ত্রণ না জানালে তারা অনুষ্ঠানমঞ্চ তছনছ করে দিতে দ্বিধা করে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারপাশে ব্যবসায়ী, পুকুর লিজ নেয়া মাছ চাষী আর নির্মাণকাজের ঠিকাদাররা চেনেন এভাবে যে, এসব তরুণের জন্য চাঁদা বরাদ্দ রাখতে তারা বাধ্য। আর ক্যাম্পাস তথা দেশবাসী চেনে এভাবে যে, এ ধারার তরুণরা হয়ে থাকে সন্ত্রাসী এবং তাদের হাতে থাকে অস্ত্র। পুলিশ ও প্রশাসন তাদের টিকি ছুঁতে পারে না। সবাই দেখে ছাত্রলীগের ক্যাডার (বিএনপি আমলে ছাত্রদলের ক্যাডার) প্রকাশ্যে পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে ছোটাছুটি করে।
সুতরাং ছাত্র রাজনীতির নামে প্রতিষ্ঠিত এ ক্যাডারতন্ত্র নিষিদ্ধ করতে যদি সে যুগে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ আহ্বান জানিয়ে থাকেন, তবে তার বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি আমাদের অতি মেধাবী রাজনীতিকরা কীভাবে করবেন! ঘা খেয়েও কোন মোহে জাতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রকরা ক্যাডারতন্ত্র উচ্ছেদ করতে চাইছেন না, তা আমাদের বোধের অগম্য। তারা কেন জানি বুঝতে পারছেন না দুধ-কলা দিয়ে কেমন করে কাল সাপ পুষছেন; ওরা যে গোকুলে বাড়ছে তাদেরই বধিতে।
সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সংস্কৃতি, তার জীবনচর্চার সঙ্গে রাজনীতি আবশ্যিক অঙ্গ হিসেবে জড়িয়ে আছে। তাই ছাত্র সমাজ- যারা আগামীতে রাষ্ট্র, প্রশাসন, অর্থনীতি, রাজনীতি সবকিছুর নেতৃত্বে আসবে- তাদের রাজনীতি অচেতন থাকা আত্মঘাতী কাজেরই নামান্তর। এ কারণে মেধাবী তরুণ শিক্ষার্থীদের শুধু রাজনীতি সচেতন নয়, সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতির চর্চা করাও জরুরি। এ চিন্তার সঙ্গে সচেতন যে কেউ একমত পোষণ করবেন, সন্দেহ নেই। আজ মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রচলিত ধারার ছাত্র রাজনীতির মধ্যে বিরাট ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। এরা বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছে ছাত্র রাজনীতির প্রতি। এ বাস্তবতা ভয়ংকর পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। ছাত্র রাজনীতির প্রতি একটি সর্বজনীন আকর্ষণ ও শ্রদ্ধা সৃষ্টি করতে না পারলে ইতিবাচক প্রবাহ তৈরি করা সম্ভব নয়।
ঘরপোড়া গরু তো সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাবেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃশ্যত কম চেষ্টা করেননি। ছাত্রলীগের তাণ্ডবে একসময় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি সাংগঠনিক নেতৃত্বের সম্পর্ক ছেদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাতে কি সুবোধ হয়ে গিয়েছিল ছাত্রলীগ? চারপাশ থেকে কি প্রশ্রয় পাওয়া বন্ধ হয়েছিল ছাত্রলীগের? অধুনা এইচটি ইমাম সাহেবরা তো প্রকাশ্যে প্রশ্রয়ের কথা জানিয়েই দিলেন। বোতল তো একই, শুধু মদের তারতম্য। মনে পড়ে বিএনপি আমলে হাওয়া ভবনের যুগে আমার এক ছাত্রের জবানী। সে একটি হল শাখার ছাত্রদলের সভাপতি। স্বস্তির সঙ্গে জানাল, হাওয়া ভবন থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছে, লিখিত পরীক্ষায় পাস করে এলে তার পুলিশের চাকরি নিশ্চিত। একই সঙ্গে জানাল, লিখিত পরীক্ষায় পাস করার সহজ রাস্তাও তাদের আছে।
তারপরও আমরা এ বিপন্ন দশায় এসে আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চাই। তবে অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ মানুষ এত সহজে আশ্বস্ত হতে পারবে বলে মনে হয় না। এ জন্য প্রয়োজন দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের বাস্তবায়ন। আশা করব, কোনো পর্যায় থেকেই যেন পিছুটান না থাকে। এ সুযোগে আমরা অন্যায়কারীকে দলীয় পরিচয়ে দেখার অসুস্থ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আর তা না পারলে সাধারণ মানুষ মনে করবে, হয় আমাদের আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে গলদ রয়েছে, না হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

দোহাই, আমাদের শিশুদের ক্রিমিনাল বানাবেন না by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

এত দুঃখ নিয়ে আমি এর আগে কখনও কাগজ-কলম হাতে বসিনি। গত বছর যখন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সবাই মিলে চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলাম তখন একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলে গেছে, আসলে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি, কিছু কিছু ‘সাজেশন’ প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ঘটনাক্রমে মিলে গেছে মাত্র। যারা এটা বলেছেন তারা নিজেরাও জানেন, দেশের মানুষ এত বড় নির্বোধ নয় যে তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ কথাগুলো বিশ্বাস করবে। আমরা ভেবেছিলাম, যথেষ্ট চেঁচামেচি করার কারণে এবার হয়তো সবাই একটু বাড়তি সতর্ক থাকবে, প্রশ্নপত্র হয়তো এবার ফাঁস হবে না।
আবারও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। আমার কাছে আগের রাতে পাঠানো হয়েছে, পরের দিন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি। কেউ যদি বিশ্বাস না করেন, নিজের চোখে দেখতে পারেন (ছবি)। আমি যখন এ লেখাটি লিখছি তখন আবার আমার কাছে প্রশ্নপত্রসহ ই-মেইল এসেছে, ইচ্ছা করলে কাল মিলিয়ে দেখতে পারব, কিন্তু আর রুচি হচ্ছে না।
যারা আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা চালান, আমি অনুমান করতে পারি এ দেশের লেখাপড়া নিয়ে তাদের নিশ্চয়ই বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। যদি থাকত তাহলে নিশ্চয়ই তারা এরকম একটা কিছু ঘটতে দিতেন না। আমাদের শিক্ষানীতিতে পঞ্চম শ্রেণীর শিশুদের জন্য কোনো পাবলিক পরীক্ষার কথা বলা নেই, আমলারা নিজেদের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে এটি বের করে জোর করে তা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাবা-মায়েরা আগে আরও বড় হওয়ার পর ছেলেমেয়েদের কোচিং করতে পাঠাতেন। এখন এ শিশুদেরই গোল্ডেন ফাইভ পাওয়ার জন্য কোচিং করতে পাঠাচ্ছেন। তাতেই শেষ হয়ে যায়নি- এখন তাদের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করা হচ্ছে, ছোট ছোট শিশুদের হাতে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন ধরিয়ে দিয়ে পরীক্ষা দিতে পাঠানো হচ্ছে, সেই ছোট ছোট শিশুদের অন্যায় করতে শেখানো হচ্ছে। সারা পৃথিবীর কোথাও এ নজির নেই, যেখানে একটি রাষ্ট্র তার দেশের শিশুদের অন্যায় করতে শেখায়। একটা দেশের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেয়ার এর চেয়ে পরিপূর্ণ কোনো পদ্ধতি আছে কি? নাই। সারা পৃথিবীতে কখনও ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। শুধু আমাদের দেশেই, কিছু আমরা আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, একটা শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার একটা প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। যে জাতি শৈশবে অন্যায় করতে শিখে বড় হয় সেই জাতি দিয়ে আমরা কী করব?
এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার হর্তাকর্তা বিধাতারা, আপনাদের কাছে করজোড়ে প্রার্থনা করি, আমাদের দেশের শিশুদের আপনারা মুক্তি দিন। এসব শিশু যদি কোনো পরীক্ষা না দিয়ে শুধু বইগুলো নাড়াচাড়া করে সময় কাটিয়ে দিত, তাহলে অন্তত তাদের একটা সুন্দর শৈশব থাকত, তারা অন্তত অন্যায় করা শিখত না।
আমাদের শিশুদের লেখাপড়ার দরকার নেই, দোহাই আপনাদের, তাদের ক্রিমিনাল করে বড় করবেন না!
মুহম্মদ জাফর ইকবাল : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ডাক দিয়ে যায় মিলন by ডা. কামরুল হাসান খান

২৭ নভেম্বর ১৯৯০। ঝকঝকে সকাল। মিষ্টি রোদে শীতের আগমনী বার্তা। এদিন গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল এবং চিকিৎসকদের ২৩ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের আন্দোলনের এক পর্যায়ে সারা দেশের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি এবং পিজি হাসপাতালে কেন্দ্রীয় চিকিৎসক সমাবেশের কর্মসূচি নেয়া হয়। কয়েকদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ছিল উত্তপ্ত এবং সমাবেশ-মিছিল স্লোগানমুখর। বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি, বোমাবাজি চলছে থেকে থেকে। এমনই এক উত্তপ্ত পরিবেশে চলছিল বিএমএ’র চূড়ান্ত পর্যায়ের কর্মসূচি। ডা. মিলন সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পিজি হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়ে বিএমএ’র তৎকালীন মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সঙ্গে তার দেখা হয়। ডা. মিলন নিজের রিকশা ছেড়ে ডা. জালালের রিকশায় উঠে বসেন। রিকশা ছাড়তেই মিলন বললেন, ‘দেখেন তো জালাল ভাই কী হল, আমাকে একটু ধরেন জালাল ভাই, আমি পড়ে যাচ্ছি।’
এগুলোই ছিল মিলনের জীবনের শেষ শব্দ উচ্চারণ। মিলনকে ধরে রাখতে পারলেন না ডা. জালাল। মিলন হারিয়ে গেলেন আমাদের মাঝ থেকে, অবস্থান নিলেন ইতিহাসের পাতায়। থ্রি নট থ্রি’র একটি বুলেট তার ফুসফুস ও হৃদপিণ্ড ভেদ করে জায়গা করে নিয়েছিল বুকের পাঁজরের ভেতর। ঢাকা মেডিকেল কলেজে যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হল, তখন মিলন কেবলই প্রাণহীন, শব্দহীন একটি দেহ। মুহূর্তেই চারদিকে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই মর্মান্তিক সংবাদ। গর্জে ওঠে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজপথ। আন্দোলন ঝড়ের গতি পায়। চিকিৎসক আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন এবং সর্বদলীয় আন্দোলন একাকার হয়ে যায়। সেদিন সন্ধ্যায় সরকার জরুরি আইন ঘোষণা এবং কারফিউ জারি করে। অবশেষে সরকার পদত্যাগের ঘোষণা দেয় এবং ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।
ডা. শামসুল আলম খান মিলন একজন দেশপ্রেমিক, সাহসী ও প্রগতিশীল চিকিৎসক ছিলেন। সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি প্রগতিশীল, আধুনিক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন করাই ছিল তার স্বপ্ন। ডা. মিলন তৎকালীন বিএমএ’র যুগ্মসম্পাদক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ, কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রভাষক, প্রকৃচি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন।
মিলনের রক্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিজয় সূচিত করেছে। এতে দেশবাসীর কাছে চিকিৎসক সমাজ বহুগুণে গৌরবান্বিত হয়েছে। আজ শহীদ ডা. মিলনের ২৪তম শাহাদৎ বার্ষিকীতে প্রশ্ন জাগে, আমরা চিকিৎসক সমাজ কি তার রক্তস্নাত গৌরব ধরে রাখতে পারছি? স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজ দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ৭২ হাজার, উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক রোগ নির্ণয়ের সুবিধাসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পৌঁছে গেছে। চিকিৎসকদের নিয়োগ, পদোন্নতি রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। প্রায় হাজার দশেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সরকারি মেডিকেল ২৯টি, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ৫৬টি, বিস্তৃত হয়েছে চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ, ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে চিকিৎসাসেবায় সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু চিকিৎসকদের গৌরবের জায়গাটা ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ’৪৭ থেকেই এদেশের চিকিৎসক সমাজ রাজনৈতিকভাবে সচেতন যা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। এখন আবার সময় এসেছে এ পরিচয় নতুন করে দেয়ার। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যে দেশ, সে দেশের চিকিৎসকরা কেন মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে দিতে পারবে না? একটা বিষয় স্বীকার করা ভালো- চিকিৎসকদের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কেন বেড়ে চলেছে এর অনেক ব্যাখ্যা আছে, যার কোনো কোনোটি চিকিৎসকদের নির্দোষ প্রমাণ করবে। যে অবস্থায়ই হোক, চিকিৎসা ব্যবস্থার দায়ভার চিকিৎসকদের এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কেবল দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই পাল্টে দিতে পারে গোটা চিকিৎসা ব্যবস্থা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা পেয়েও আমরা চিকিৎসকরা জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে যদি গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়াস না নেই, তবে মিলনের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে। আজ শহীদ ডা. মিলন দেশের চিকিৎসকদের জেগে ওঠার সেই ডাক দিয়ে যাচ্ছেন।
ডা. মিলনসহ শহীদদের কাছে এদেশের প্রগতিশীল রাজনীতিকরা কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের ক্ষমা করবে না। আজ জরুরি হয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র বিরোধী শক্তিকে সুদৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করা- শহীদ মিলনের রক্ত আজ সেই ডাকই দিয়ে যায়।
অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান : মহাসচিব, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ; সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন; সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি

সার্ক দেশগুলোর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ by শেষ কান্ত ক্যাফেল

দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যা ১৭০ কোটি, যার ৭০ শতাংশেরও বেশি বসবাস করে দারিদ্র্যের মধ্যে। পানি, খনিজ পদার্থ, বন, উৎপাদনশীল উর্বর ভূমি এবং পরিশ্রমী মানুষসহ বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চল রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল নেতৃত্ব, প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারে অক্ষমতা এবং ঘন ঘন দুর্যোগ- এসব কারণে অনুন্নত রয়ে গেছে।
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) সব সদস্য রাষ্ট্র জল-আবহাওয়াজনিত এবং ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বন্যা, ভূমিধস, খরা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, সুনামি ইতাদি। অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। এর কারণ, এসব দুর্যোগে ক্ষতির ব্যাপকতা ও মাত্রা অনেক বেশি। এর ফলে সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। এর পরে রয়েছে যথাক্রমে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও নেপাল। দারিদ্র্য, মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা এবং প্রস্তুতির অভাবকে এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা যেতে পারে। বহুবিধ মৃত্যুসূচকে (মাল্টিপল মরালিটি ইনডেক্স) মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশ ও ভারতে এবং সবচেয়ে কম
মালদ্বীপ ও ভুটানে। ভারত, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং নেপাল ও শ্রীলংকার কিছু অংশ খরাপ্রবণ। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় নিয়মিত বন্যা হয়। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলংকায়। ভূমিধসের ঘটনা ঘটে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, ভুটান ও শ্রীলংকার পার্বত্য অঞ্চলে। মালদ্বীপ, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার উপকূলীয় এলাকাগুলো তলিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে দুর্বল স্বাস্থ্য শিক্ষা, সচেতনতা ও স্বাস্থ্য সুবিধার অভাবে এ অঞ্চলের মানুষের রোগাক্রান্ত হওয়ার হারও বেশি। সাম্প্রতিক ওয়ার্ল্ড ডিজাস্টার রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি এ অঞ্চলে।
নদীর পানির স্তর বৃদ্ধিজনিত ‘বন্যা’ হল এ অঞ্চলের সবচেয়ে ঘনঘন দেখা দেয়া, উচ্চ ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টিকারী এবং ব্যাপক বিস্তৃত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ২০০৮ সালে নেপাল ও ভারতে কোশি নদীর বন্যা; ২০০৯, ২০১০ ও ২০১৪ সালে পাকিস্তান ও ভারতে বন্যায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্থানচ্যুত হয়েছে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ শত শত কোটি ডলার। বন্যার বিপর্যয়-ঝুঁকি নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে কেন্দ্রীভূত। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বে বন্যার কারণে যত লোকের মৃত্যু হয়, তার ৭৫ শতাংশ ঘটে শুধু বাংলাদেশ, ভারত ও চীনে। ভূমিধসে মৃত্যুর দিক থেকে শীর্ষ দশে রয়েছে নেপালে। ভূমিধস দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুর প্রধান কারণ না হলেও ভূমিধসের ঘটনায় নিহত, আঘাতপ্রাপ্ত ও স্থানচ্যুত হওয়ার হার এ অঞ্চলে অনেক বেশি। খরা একটি নীরব ঘাতক এবং জীবিকার ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে খরার কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সার্কভুক্ত প্রায় সব দেশই খরা আক্রান্ত। ভূমিকম্প দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিপর্যয়কর প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর অন্যতম। এ অঞ্চলের অধিকাংশ ভূমিকম্পের উৎপত্তি টেকটনিক।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এর পরের অবস্থান যথাক্রমে ভারত ও পাকিস্তানের। গত ৩০ বছরে এসব দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে অন্তত ২ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। নগরায়ন, পরিবেশের অবক্ষয় এবং শক্তিশালী শাসনের অভাব এ অঞ্চলের দেশগুলোর ঝুঁকি বাড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসের (ডিআরআর) জন্য একটি আঞ্চলিক রোডম্যাপ এবং এ অঞ্চলের উন্নয়ন খাতগুলোয় একে প্রধান উপজীব্য করতে একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে এজন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়েছে এবং তাদের এ সংক্রান্ত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে সার্কের অন্য দেশগুলোয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে এবং গঠন করা হয়েছে বিশেষ সংস্থা।
সার্কভুক্ত সব দেশেই ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য আইনি কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা সব দেশে সমান নয়। এক্ষেত্রে সক্ষমতা ও যোগাযোগ স্থাপনের দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে আছে ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ।
ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। ভারতের একাদশতম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সব উন্নয়ন খাতে ডিআরআরকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং সব মন্ত্রণালয়কে একে খাতোয়ারি পরিকল্পনায় একীভূত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নের কোনো উপযুক্ত প্রক্রিয়া নেই। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ডিআরআর সংক্রান্ত সম্পদের অভাব রয়েছে। প্রতিটি পর্যায়ে সমন্বয়ের বিষয়টিও একটি চ্যালেঞ্জস্বরূপ। একটি দেশে দক্ষ ও কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তোলার পূর্বশর্ত হল যথাযথ ও প্রাসঙ্গিক নীতিমালা, কৌশল ও কাঠামো প্রণয়ন এবং এগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন। ২০০৫ সালে কোবে সম্মেলনের পর সার্ক অঞ্চলে এ সংক্রান্ত বহু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের মধ্যে রয়ে গেছে বিরাট ফারাক। এ কারণে দেশগুলোর উচিত একটি ত্রুটিহীন দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তোলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুসমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা।
নেপালের সংবাদপত্র দ্য হিমালয়ান টাইমস থেকে ভাষান্তরিত
শেষ কান্ত ক্যাফেল : ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সমন্বয়কারী

শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না by আকমল হোসেন

কাঠমান্ডুতে দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থার ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন চলছে। ১৯৮৫ সালে শুরু হয়ে সার্ক ২৯ বছর পার করছে এ বছর। যে কোনো সংগঠনের ক্ষেত্রে নিজেকে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরার জন্য এ সময় নেহায়েত কম নয়। কিন্তু অন্যান্য সফল আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার তুলনায় সার্ক অত্যন্ত দুর্বল এক উদাহরণ হয়ে আছে। সনদ অনুযায়ী সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বার্ষিক ভিত্তিতে অর্থাৎ প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। কোনো সংস্থার ব্যাপ্তিকাল ও শীর্ষ সম্মেলনের সংখ্যার ফারাক দিয়ে তার সবলতা বোঝা যায়। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিরাজমান অবিশ্বাস ও বৈরী সম্পর্ক সার্ক শীর্ষ সম্মেলন নিয়মিত অনুষ্ঠানের পথে একটি বাধা। সংস্থার আট সদস্যের মধ্যে প্রভাবশালী দুই সদস্য ভারত ও পাকিস্তানের বৈরিতা এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
প্রত্যেক শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো একটি ঘোষণা প্রকাশ করে থাকে, যা সম্মেলনস্থলের নামে পরিচিত হয়ে থাকে। যেমন এবার কাঠমান্ডু ঘোষণা সম্মেলনের শেষদিন প্রকাশ করা হবে। প্রতিটি সম্মেলনের ঘোষণায় সহযোগিতা সম্পর্কে অনেক প্রত্যয়দীপ্ত কথার সঙ্গে নতুন নতুন লক্ষ্যও স্থির করা হয়। তবে সেসব ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে দেখা যায় দুস্তর পার্থক্য। সহযোগিতার কথা মুখে যত উচ্চারণ করা হয়, কার্যক্ষেত্রে সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ না করায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি সবল হয়নি এবং এ অঞ্চলের জনগণের জীবনে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। এটা বলা কোনো অতিকথন হবে না যে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হলেও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে নিজস্ব স্নায়ুযুদ্ধ বিদ্যমান থাকায় এ অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতার বলিষ্ঠ ছাপ পড়ছে না।
আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে দক্ষিণ এশিয়া পিছিয়ে আছে- এ উপলব্ধি থেকে যে দুটি বাণিজ্য সহযোগিতা চুক্তি যথাক্রমে সাপটা ও সাফটা স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে দেশগুলো ব্যর্থ হওয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এর পেছনে যেমন কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা, তেমনি মনস্তাত্ত্বিক বাধাও কাজ করে থাকে। বিশেষ করে ভারতের বৃহৎ বাজারে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার সহজ না হলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পিছিয়ে থাকবে। পাকিস্তান ছাড়া সার্কের অন্য সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি ক্ষুদ্র থাকার প্রেক্ষাপটে তাদের বাজারে ভারতের প্রবেশাধিকারের তুলনায় ভারতের বাজারে তাদের সহজ প্রবেশাধিকারের তাৎপর্য ভিন্ন।
১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ক স্লোগান হচ্ছে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যে কোনো আঞ্চলিক সহযোগিতার পেছনের তাগিদ হচ্ছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, যা জনগণের জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম। শাসকশ্রেণীর জীবনের উন্নতি বা সমৃদ্ধিকে রাষ্ট্রের ভিত্তি গণ্য করার দিন অনেক আগেই গত হয়েছে। বর্তমান যুগের কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণা এর জনগণের সার্বিক জীবনমানের উন্নতির ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে শান্তি প্রত্যয়টি দ্বারা শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি বোঝায় না। এর সঙ্গে জনগণের জীবনমানের উন্নতিও সম্পর্কিত। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের বসবাস। অতএব সার্ক সহযোগিতা কাঠামো ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের জীবনে সমৃদ্ধি আনার আকাক্সক্ষা স্বাভাবিক।
এবার আঞ্চলিক সংযোগ বা কানেক্টিভিটির ধারণা অবলম্বন করে সার্ক সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রেল যোগাযোগ এবং পণ্য ও যাত্রীবাহী মোটরযান চলাচল সংক্রান্ত দুটি চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বাণিজ্য বৃদ্ধির তাগিদ থেকে এ ধরনের সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে। রাজনৈতিক সীমানা টানার আগে এ অঞ্চলে মানুষ ও পণ্য চলাচলের অবাধ গতি ছিল। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর রাজনৈতিক জটিলতা ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলায় এ গতি বাধাগ্রস্ত হতে হতে এক পর্যায়ে বন্ধ হয়েও গিয়েছিল। সবচেয়ে সফল আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়ন আজ যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, তা দীর্ঘকালের প্রচেষ্টার ফল। সংযোগের এ ধরনের ধারণার সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যের সম্পর্ক যে ঘনিষ্ঠ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পারস্পরিক অবিশ্বাস-সন্দেহ থেকেই যার যার সীমান্ত সুরক্ষা করার চিন্তার উদ্ভব হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় সুরক্ষিত সীমান্ত তৈরির চিন্তার উপস্থিতি প্রবল। যেমন, ভারত ও পাকিস্তান নিজ নিজ নিরাপত্তা চিন্তা থেকে সীমান্তকে সুরক্ষা করার উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখার ভারতীয় চিন্তার উদ্ভব এভাবেই হয়েছে।
অন্যদিকে বাণিজ্য সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে অর্থনীতিকে সবল করার ভাবনা প্রকাশ পায়। মানুষের সহজ গমনাগমনের মাধ্যমে পারস্পরিক চেনাশোনা বাড়ে বলে তারও গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জনগণ সহজে একে অপরের দেশে যেতে পারলে নানা ধরনের কল্পিত ধারণার অবসান হয়। তাই এবারের শীর্ষ সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে কানেক্টিভিটির যে আলোচনার কথা আছে, তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ১৯৪৭ সালের পর থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেল সংযোগ বিদ্যমান ছিল। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর অন্যান্য সহজ সংযোগের মতো রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নতুন করে এ ধরনের সংযোগের উদ্যোগ জনগণের মধ্যে আস্থা যেমন তৈরি করতে পারে, একই সঙ্গে তা নেপাল ও ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশের জন্য সমুদ্রপথে বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে পণ্য চলাচলে বাংলাদেশকে যেমন দিল্লির প্রয়োজন, তেমনি পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগের জন্য ঢাকার প্রয়োজন ভারতের রেলপথ ও সড়কপথ ব্যবহারের সুযোগ। তাই পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে এ ধরনের সংযোগের কথা চিন্তা করা যেতে পারে।
আশির দশকে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাসংবলিত যে ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করেছিল, তাতে সহযোগিতা যাতে একপেশে না হয়ে যায় তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। আজ ২৯ বছর পরও তা প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। তবে সহযোগিতাকে এগিয়ে নিতে সদস্য দেশগুলোর যে পরিমাণ উদ্যোগ নেয়া দরকার ছিল তার অভাব আছে। বিশেষত ভারত এক্ষেত্রে যে নেতৃত্ব দিতে পারত, সেটা লক্ষ্য করা যায়নি। ভারতে দল নির্বিশেষে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তারা ভারতের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা বলে প্রতিবেশীদের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি করতে চায় তা একপেশে হয়ে যায়। পাকিস্তান তার চির বৈরী প্রতিবেশী ভারতকে মোকাবেলা করার নামে যে বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করে, তাও আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখে না।
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতাকে শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে প্রকৃত অর্থে জনগণের স্বার্থ অর্জনের মাধ্যমে পরিণত করতে হলে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিক আধিপত্য কায়েমের চিন্তা বাদ দিয়ে ইতিমধ্যে চিহ্নিত সহযোগিতার বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগী হতে হবে। তা না হলে শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতার জন্য জনগণের করের অর্থ খরচ করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
ড. আকমল হোসেন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তাহলে হেলমেটের কাজ কী?

ফিল হিউজের দুঃখজনক মৃত্যু প্রশ্নবিদ্ধ করেছে হেলমেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে। মাথায় হেলমেট থাকার পরও কীভাবে সে দিন শন অ্যাবটের বাউন্সার হিউজকে এমন মারাত্মক আঘাত করল সেই প্রশ্ন এখন সবার। ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের মাথার শতভাগ নিরাপত্তা যে বর্তমান নকশার হেলমেট দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, সেটাও প্রমাণ হয়ে গেছে হিউজের এই দুঃসহ পরিণতির মধ্য দিয়ে। সেদিন শেফিল্ড শিল্ডের ম্যাচটিতে হিউজ এমন একটি নকশার হেলমেট পরেছিলেন, যা তাঁর মাথার নিচের দিকের অংশের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। অ্যাবটের বাউন্সারটি সরাসরি গিয়ে আঘাত করে হিউজের কানের নিচের অংশে। অনেকে হিউজের আঘাতটিতে ‘বিরল’ বা ‘ব্যতিক্রম’ বললেও বর্তমান ক্রিকেটে প্রচলিত হেলমেটের নকশার দুর্বলতার ব্যাপারটিই প্রকাশ্য হয়ে উঠছে বারবার।
হেলমেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য হেলমেটের নকশার এই দুর্বলতার জন্য দায়ী করছেন ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টদের ‘ঐতিহ্য-প্রীতি’র বাতিককেই। তারকা ক্রিকেটারদের কাছে হেলমেট প্রস্তুতকারীরা অনেক সময় নতুন নতুন নকশা উপস্থাপন করলেও তাঁরা সব সময়ই নাকি পুরোনো নকশার প্রতিই পক্ষপাত প্রদর্শন করে এসেছেন। ক্রিকেটারদের অনীহার কারণেই বহু গবেষণালব্ধ নকশার হেলমেট বাজারে আনতে পারেনি প্রস্তুতকারীরা। ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যালবিওন লিমিটেডের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টদের ঐতিহ্য প্রীতির কারণেই আমরা হেলমেটের নতুন নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে আছি। ক্রিকেটে নতুন কিছু গ্রহণ করার প্রবণতাটা অনেক কম। এই বিনিয়োগটা বেসবল ও সাইক্লিংয়ের মতো খেলার সরঞ্জামাদির পেছনে করাটাই আমাদের কাছে বেশি লাভজনক। কারণ, এই খেলাগুলো নতুন প্রযুক্তির ব্যাপারে ক্রিকেটের মতো রক্ষণশীল নয়।’
২০০৯ সালে একটি ওয়ানডে ম্যাচে নতুন ধরনের একটি হেলমেট পরে মাঠে নেমেছিলেন অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার ব্রিস ম্যাকগ্রেইন। অ্যালবিওন কোম্পানির তৈরি হেলমেটটি ছিল গবেষণালব্ধ নকশার ওপর ভিত্তি করে বানানো। ওটা ব্যবহার করে ম্যাকগ্রেইন ও অন্যান্য ক্রিকেটাররা মতামত দেওয়ার পরই অ্যালবিওন তা বাজারে ছাড়ত। নতুন ওই নকশাটি ম্যাকগ্রেইনের বেশ পছন্দ হয়। পুরো মাথার সুরক্ষা বিধান করা ওই হেলমেটটি কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজারে আনতে পারেনি অ্যালবিওন। ম্যাকগ্রেইনের পছন্দ হলেও তা পছন্দ হয়নি ‘ঐতিহ্যপন্থী’ অন্যান্য ক্রিকেটারদের। ম্যাকগ্রেইন তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি ওটা পরে মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের বিদ্রূপের শিকার হই। আমার সতীর্থরাও অদ্ভুত নকশার হেলমেটটি না পরার অনুরোধ করেছিল। শুনেছি, টেলিভিশন ধারাভাষ্যকাররা নাকি আমাকে “রোবোকপ” অভিধা দিয়েছিলেন।’
বেশির ভাগ ক্রিকেটার পছন্দ না করার জন্যই নাকি ওই নকশাটি বাজারে আনতে পারেনি অ্যালবিওন। অথচ অনেক গবেষণা করে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ সুরক্ষার ব্যবস্থাই ছিল ওই নকশায়।
এ ব্যাপারে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসির ভূমিকাও কম গোলমেলে নয়। ক্রিকেট মাঠে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার ব্যাপারে আইসিসির ভূমিকাটা নাকি কখনোই জোরালো নয়। মাত্র গত বছর আইসিসি ক্রিকেট হেলমেটের ব্যাপারে একটি বিশেষ নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। এই বিশেষ নিরাপত্তা মানের ব্যাপারটি হলো হেলমেটের গ্রিল-সংক্রান্ত। এতে প্রস্তুতকারীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, ফাঁকা অংশ দিয়ে বল যেন কোনোভাবেই ব্যাটসম্যানের মুখাবয়বকে আঘাত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ২০১৩ সালে গ্রহণ করা এই সুপারিশটি ছিল গত ১৫ বছরে এ-সংক্রান্ত প্রথম কোনো সিদ্ধান্ত। ক্রিকেট মাঠে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার ব্যাপারে আইসিসি যে কতটা উদাসীন, তার একটা বড় উদাহরণ হতে পারে এই তথ্যটি।
হিউজের মৃত্যু এ ব্যাপারে আইসিসিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে কি না, সেটা সময়ই বলে দেবে। সংস্থাটির সাবেক সভাপতি জগমোহন ডালমিয়া এই দুঃখজনক ঘটনার পর দাবি তুলেছেন, ক্রিকেটের সুরক্ষা-সরঞ্জামাদির পুনর্মূল্যায়নের। বলেছেন, ‘হিউজের ঘটনা এ ব্যাপারটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে।’ সূত্র: রয়টার্স।

মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেও পারলেন না হিউজ

ক্রিকেট মাঠে ঘটল আরও একটি মৃত্যুর ঘটনা। ক্রিকেট খেলায় ব্যবহৃত পাঁচ আউন্স ওজনের বলটি যে মাঝে-মধ্যে খেলোয়াড়দের জন্য কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তারই আরেকটি নমুনা দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। বোলারের বাউন্সারের ছোবলে আহত হয়ে দুই দিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কাটিয়ে অবশেষে মৃত্যুর মুখোমুখি হলেন প্রতিশ্রুতিশীল অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার ফিলিপ হিউজ। আজ বৃহস্পতিবার সিডনির একটি হাসপাতালে কোমায় অচেতন অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
পঁচিশ বছর বয়সী এই অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার দেশের হয়ে ২৬টি টেস্ট ও ২৫টি ওয়ানডে ম্যাচের অভিজ্ঞতায় ছিলেন ঋদ্ধ। জীবনের শেষ খেলাটিতেও দারুণ ব্যাট করছিলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেট প্রতিযোগিতা-শেফিল্ড শিল্ডের একটি ম্যাচে মঙ্গলবার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নিউ সাউথওয়েলসের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন হিউজ। ৬৩ রানে অপরাজিত থাকার সময় প্রতিপক্ষের বোলার শন অ্যাবোটের একটি বাউন্সারই ওলট-পালট করে দেয় সবকিছু। কানের পাশে আঘাত পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারান তিনি। হাসপাতালে নিবিড়-পরিচর্যাকেন্দ্রে দু’দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেও ফিরতে পারলেন না তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ঘটনার নায়ক হয়েই জীবনের ওপারে যাত্রা করলেন তিনি।
সিডনির হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল তাঁর মস্তিষ্কে।আঘাতটা এতটাই গুরুতর ছিল যে অস্ত্রোপচারটা কোনো কাজেই এল না তাঁর।। মৃত্যুর সময় হিউজের সঙ্গে ছিলেন তাঁর মা, বোন ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন।
২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবার্গের তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়। ২৬ টেস্টে ৩২.৬৫ গড়ে ১৫৩৫ রান করা এই ক্রিকেটারের আছে তিনটি সেঞ্চুরি আর সাতটি ফিফটি। অভিষেক সিরিজেই ডারবানে পরপর দুটি সেঞ্চুরি করে দারুণ সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন হিউজ। তবে ফর্মের ধারাবাহিকতা না থাকার কারণে অস্ট্রেলীয় দলের কখনোই নিয়মিত হতে পারেননি। ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ টেস্ট খেলা হিউজ ভারতের বিপক্ষে আসন্ন টেস্ট সিরিজে নির্বাচকদের বিবেচনায় ছিলেন।অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের চোট তাঁর দলে ফেরা মোটামুটি নিশ্চিতই করে দিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ ফর্মেই ছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবারের ঘটনা শেষ অবধি তাঁকে নিয়ে গেল সব জাগতিক আশা-আকাঙ্খা আর প্রত্যাশা-প্রাপ্তির উর্ধ্বেই।

ট্রাফিক আইন মানেন না যাঁরা by মোর্শেদ নোমান

(ছবি:১-পুলিশ সদস্যরাও সড়কের উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি চালান। ছবিটি ফার্মগেট থেকে তোলা। ছবি:১-উল্টোপথে গাড়ি চালিয়ে প্রভাবশালীরা দ্রুত সড়ক পাড়ি দেন। ছবিটি আবদুল গণি রোড থেকে তোলা। ছবি:১-পুলিশ সদস্যরাও সড়কের উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি চালান। ছবিটি আবদুল গণি রোড থেকে তোলা। ছবি:১-ট্রাফিক আইন না মেনে অনেক প্রভাবশালী সড়কের উল্টোদিক দিয়ে গাড়ি চালান। ছবিটি ফার্মগেট পুলিশ বক্সের সামনে থেকে তোলা হয়েছে। ছবি: জাহিদুল করিম ও মনিরুল আলম) ২৪ নভেম্বর সোমবার, বেলা সাড়ে ১১টা। ফার্মগেট এলাকার খামারবাড়ির সামনে পুলিশ বক্সের মোড়। সেখান থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের মোড় পর্যন্ত গাড়ির লম্বা সারি। অনেক গাড়ি আধা ঘণ্টারও বেশি সময় সিগন্যালে আটকে আছে রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায়। হঠাৎ করেই ঢাকা মেট্রো-ঠ-১৩-০৯৬০ নম্বরের একটি গাড়ি পাশের সড়ক দিয়ে এসে রাস্তা পার হওয়ার জন্য এগিয়ে এল। ট্রাফিক সদস্যরা উল্টোপাশের সিগন্যালের গাড়ি আটকে ওই গাড়িটিকে পার করে দিলেন। একই দিন বেলা দুইটা। রাজধানীর আবদুল গণি রোড। সচিবালয় এলাকার এ সড়কে হঠাৎ করেই দেখা গেল উল্টো দিক থেকে একটি গাড়ি আসছে। ঢাকা মেট্রো-ঘ-সিরিজের ওই গাড়িটি ট্রাফিক সদস্যদের সামনে দিয়ে উল্টো দিক থেকে বেরিয়ে গেল। রাজধানীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই। প্রতিদিনই রাজধানীর প্রতিটি সড়কেই ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার দৃশ্য দেখা যায়। আইন ভাঙার এ দলে মন্ত্রী, সাংসদ, আমলা, রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমের কর্মীসহ অনেকেই রয়েছেন।
জানতে চাইলে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা আইন মানার কথা, তাঁরাই যদি আইন ভঙ্গ করেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের কাছে ভুল বার্তা যাবে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) মোসলেহ উদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ট্রাফিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আইন অমান্য করার এ প্রবণতাটি বন্ধে ইতিমধ্যেই ট্রাফিক সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা মানা হচ্ছে কি না, সেটা তদারক করবেন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা।
উল্টোপথে যাওয়া, হেলমেট ছাড়া রাস্তায় চলাচলসহ আইন অমান্য করার কারণে অনেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
যানজটের মহানগর ঢাকায় প্রতিদিনই নগরবাসীকে একটি বড় সময় রাজপথেই কাটাতে হয়। ঢাকার কয়েকজন ট্রাফিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যেদিন রাস্তায় বের হন, সেদিন যানজটের পরিমাণ যেন অনেকটাই বেড়ে যায়। তাঁদের নিরাপত্তার কথা ভেবে অবশ্য বেশির ভাগ মানুষ এ দুর্ভোগ মেনে নেন। সমালোচনাও কম হয় না।
অনেক প্রভাবশালী মানুষই রাস্তায় যানজট এড়িয়ে নির্বিঘ্নে যাওয়ার চেষ্টায় থাকেন। তা করতে গিয়ে সড়কের অন্য অংশগুলোতে যান চলাচলের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে হয়। তখনই ওই অংশে যানজটের পরিমাণ বেড়ে যায়।
একই সঙ্গে সাইরেন বাজিয়ে সাংসদদের গাড়িগুলো যখন উল্টোপথে আসে, তখন ট্রাফিক সদস্যদের কিছুই করার থাকে না; বরং অন্য গাড়িগুলোকে থামিয়ে এসব গাড়ি পার করে দেন তাঁরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট বলেন, এসব গাড়ি এক মিনিট দেরি করালে নিজেদের চাকরির ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেক ট্রাফিক সদস্যকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে বলে জানান তিনি।
ফার্মগেট পুলিশ বক্সের সামনে কাজী আলমগীর হোসেন নামের একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টি অনেক বড়। তাই তাঁরা যখন চলাচল করেন, তখন খারাপ লাগে না। কিন্তু যখন এমপি-মন্ত্রী-আমলারা রাস্তায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি তৈরি করে নিজেরা আরামে চলতে চান, সেটা খুব খারাপ লাগে।’
ট্রাফিকের আরেক সদস্যের ভাষ্য, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, সাংসদ, আমলার পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তাদের গাড়ি চলাচলের সময়ও তাঁরা দ্রুত পার করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে এসব কর্মকর্তার এ সুবিধা পাওয়ার কথা না থাকলেও তাঁদের সেই সুবিধা দেওয়া হয়। ট্রাফিকের ওই সদস্য বলেন, ওই সময় সড়কের ওপর সাধারণ মানুষ যখন বিভিন্ন কটু মন্তব্য করেন, তখন খুব খারাপ লাগে।
সাজিয়া ইসলাম নামের একজন ব্যাংক কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘আমাদের নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে পৌঁছাতে হয়। হঠাৎ করে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে প্রভাবশালীদের পার করে দেওয়ার বিষয়টি খুব কষ্ট দেয়।’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘তাঁদের সময়ের মূল্য আছে, আমাদের নেই?’
পল্টন, শেরাটন মোড়, কাকরাইল, শাহবাগ এলাকায় বেশ কয়েকজন ট্রাফিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের গাড়ির চালক ও সংবাদকর্মীরাও আইন ভাঙার তালিকায় বড় আকারে রয়েছেন। দ্রুত অফিস বা অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়ার কথা বলে তাঁরাও অনেক ক্ষেত্রে উল্টোদিকের সড়ক ব্যবহার করে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন। প্রভাবশালীদের গাড়ি আটকানোর ক্ষেত্রে যে ধরনের ভীতি থাকে, সংবাদকর্মীদের বেলায়ও একই অনুভূতি কাজ করে ট্রাফিক সদস্যদের মধ্যে। চাইলেও কিছু করতে পারেন না বলে জানান এসব ট্রাফিক সদস্য।
রাজধানীতে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত ব্যবস্থা থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণ করা হয় হাতে। এর মাধ্যমেই প্রভাবশালীদের নির্বিঘ্নে পারাপারের ব্যবস্থা করতে পারেন ট্রাফিক সদস্যরা। এক মিনিট পর যে সিগন্যাল চালু হওয়ার কথা, সেই সিগন্যাল চালু করা হয় কয়েক মিনিট পর। সাধারণ মানুষকে পড়তে হয় দীর্ঘ যানজটের বিড়ম্বনায়।
ইলিয়াস কাঞ্চন আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, আইন ভঙ্গকারীর পরিচয় বিবেচনা না করে তাদের শাস্তি দিলে সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাবে। আর তখনই সাধারণ মানুষ আইন মানার বিষয়ে সচেতন হবে।

হিউজের মৃত্যু: হেলমেটের সুরক্ষা নিয়েই প্রশ্ন?

হেরে গেলেন হিউজ। দুদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে অষ্ট্রেলিয়ান এ ক্রিকেটার আজ সিডনির একটি হাসপাতালে মারা যান। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ২৬ টেস্ট ও ২৫ ওয়ানডে খেলা এই ক্রিকেটারের বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর। গত ২৫শে নভেম্বর ঘরোয়া ক্রিকেটের খেলায় প্রতিপক্ষের বোলারের বাউন্সারে সংজ্ঞা হারান হিউজ। মাথায় হেলমেট থাকা সত্ত্বেও কী ভাবে ফিল হিউজেস সিডনিতে বাউন্সারে মাথায় চোট পেলেন, তা খতিয়ে দেখছে তার হেলমেট প্রস্তুতকারক সংস্থা মাসুরি৷ প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, হিউজেস পুরোনো মডেলের হেলমেট পরেছিলেন৷ সেই মডেলের হেলমেটে ব্যাটসম্যানের মাথা পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকে না৷ অনেকের মতে, হিউজেস নতুন মডেলের হেলমেট পরলে এই দুর্ঘটনা ঘটত না। ইংল্যান্ডের সংস্থা মাসুরি এখন ‘দ্য ভিশন সিরিজ’ বলে যে হেলমেট বের করেছে, তা নাকি সব দিক দিয়ে সুরক্ষিত। নতুন হেলমেট পরলে যে এমন হত না, এমন দাবি অবশ্য মাসুরির পক্ষ থেকে করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, টিভি ফুটেজ দেখে বিশেষজ্ঞরা  বোঝার চেষ্টা করছেন, কেন এমন হল। এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘ভিশন সিরিজের হেলমেটে ঘাড়ও অনেকটা সুরক্ষিত থাকবে। সে ভাবেই এর নকশা করা হয়েঠে।’ সত্তরের দশকে ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটসম্যানরা হেলমেটের ব্যবহার শুরু করেন। এই ব্যাপারে পথিকৃৎ ছিলেন ইংল্যান্ডের ওপেনার ডেনিস অ্যামিস। তিনি বলেছেন, ‘আমার প্রথম হেলমেটটা ছিল মোটরসাইকেলের  হেলমেট। তখন হেলমেটে গ্রিল থাকত না। পরে এসব আসা শুরু হয়।’ ১৯৭৫ সালে পিটার লিভারের বাউন্সারে ইওয়ান চ্যাটফিল্ডের লুটিয়ে পড়া দেখেছেন অ্যামিস। ইংল্যান্ডের ফিজিও বানার্ড টমাস সে বার চ্যাটফিল্ডকে বাঁচিয়েছিলেন। যে যা-ই বলুন, হিউজেসের ঘটনার পরে বিশ্ব ক্রিকেটে ফের নতুন করে উঠে পড়েছে বাউন্সারের সামনে ব্যাটসম্যানের সুরক্ষার প্রশ্ন। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেকানিক্স বিশেষজ্ঞ এডুয়ার্ড ফার্নান্দো বলেছেন, ‘হেলমেটের ভিতরে স্কালক্যাপ ব্যবহার করার কথা উঠঠে। কিন্তু শতকরা ১০০ ভাগ সুরক্ষা তার পরেও পাওয়া কঠিন। কারণ বল বেকায়দায় লাগতেই পারে। এটা অনেকটা ফর্মুলা ওয়ান রেসিংয়ের মতো। আপনি সুরক্ষা ব্যবস্থা বাড়াতেই পারেন, কিন্তু তাতেও দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।’ দুবাইয়ে এক সভায় যোগ দিতে আসা বিতর্কিত আইপিল চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার সুন্দর রামন আবার ব্যাটসম্যানের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন। ‘সব দেশের ক্রিকেট বোর্ড এবং আইসিসি-র সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। খেলায় দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে, কিন্তু সুরক্ষাটা যত বেশি সম্ভব, নিশ্চিত হওয়া দরকার।

ঢাকার মাঠও সাক্ষী এমন মৃত্যুর

রমন লাম্বার সঙ্গে কী দেখা হবে ফিল হিউজের। দুজনই তো এখন একই জগতের বাসিন্দা। হাসি-আনন্দে ঠাসা এই দুনিয়া থেকে দুজনের বিদায়ের ধরনটাও যে প্রায় একই। দুজনই যে ক্রিকেট মাঠকে ভালোবেসে এই মাঠকেই বানিয়েছেন মৃত্যুর মঞ্চ। সবচেয়ে বড় কথা—দুজনই ক্রিকেট খেলাটার ভয়ংকর দুই ট্র্যাজেডির নায়ক। আজ থেকে ১৬ বছর আগে বাংলাদেশ সাক্ষী হয়েছিল দুঃসহ এক ক্রিকেট-ট্র্যাজেডির। হ্যাঁ, রমন লাম্বার মৃত্যুর প্রসঙ্গেই বলা হচ্ছে কথাটা। লাখো-কোটি মানুষের আনন্দ-উপলক্ষ ক্রিকেট ১৬ বছর আগে এই বাংলাদেশের মাটিতেই লিখে দিয়েছিল এক অসম্ভব প্রতিভাবান ক্রিকেটারের মৃত্যুগাথা। আজ এত বছর পরেও এ দেশের ক্রিকেটকে দুঃস্বপ্নের মতোই তাড়িয়ে বেড়ায় লাম্বার ওই মৃত্যু। এ দেশের ক্রিকেটকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া লাম্বার ওই মৃত্যুর দুঃস্বপ্ন যেন আজ অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার হিউজের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে স্তব্ধ করে দিল এ দেশের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষকে। টেস্ট-পূর্ব যুগে ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেট ছিল খুবই জমজমাট। আবাহনী, মোহামেডানের মুখোমুখি হওয়াটা ছিল ওই যুগে এ দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে সবচেয়ে আরাধ্য উপলক্ষ। ১৯৯৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এমনই এক আবাহনী-মোহামেডান লড়াইয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটার রমন লাম্বা। আশি-নব্বইয়ের দশকে এ দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত পারফর্মার লাম্বার মৃত্যু সেদিন নাড়া দিয়েছিল গোটা দেশকে। শোকস্তব্ধ করেছিল সবাইকে।
আবাহনী-মোহামেডানের ওই ম্যাচে লাম্বা খেলছিলেন আবাহনীর হয়ে। ওই সময় ঢাকার প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে প্রতি মৌসুমেই আবাহনীতে খেলতে আসতেন লাম্বা। মোহামেডানের বিপক্ষে ওই ম্যাচে শর্ট লেগে ফিল্ডিং করতে গিয়ে মোহামেডান ব্যাটসম্যান মেহরাব হোসেনের একটি পুলের আঘাতে আহত হয়ে কয়েকদিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন লাম্বা। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সেরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও তাঁকে আর জীবনে ফেরানো যায়নি। ঢাকার মাঠকে ভালোবেসে ছিলেন, এই মাঠের টানেই বারবার ফিরে আসতেন। তিনি কী জানতেন এই মাঠই একদিন তাঁর মৃত্যুর মঞ্চ হতে চলেছে! এই ভয়াবহ ঘটনার ঘানি এ দেশের ক্রীড়াঙ্গন টেনে যাবে অনন্তকাল ধরেই।
কীভাবে আহত হয়েছিলেন লাম্বা? মোহামেডানের হয়ে ব্যাটিংয়ে তখন মেহরাব হোসেন। নন স্ট্রাইকিং এন্ডে দাঁড়িয়ে আমিনুল ইসলাম। আবাহনীর ফিল্ডাররা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। বোলার সাইফুল্লাহ খান জেম। হঠাৎ কী মনে করে সাইফুল্লাহর একটি ওভারের মাঝপথে শর্ট লেগে নিজেকে নিয়ে এলেন লাম্বা। অনেকেই নাকি লাম্বাকে তখন হেলমেট পরার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রিকেট যিনি হৃদয় দিয়ে খেলেন, সেই লাম্বা সব আহ্বান তুচ্ছ করেই শর্ট লেগে দাঁড়ান। মেহরাবের সঙ্গে নাকি একটু কথা-বার্তাও বিনিময় হয়েছিল তাঁর। এমন একটা সময়ে হঠাৎই মেহরাবের পুল আঘাত করে তাঁর মাথার পেছন দিকে। মুহূর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও সংজ্ঞা হারাননি তিনি। নিজেকে সামলে উঠেও দাঁড়ান। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ড্রেসিং রুমে গিয়ে বমি করতে করতে জ্ঞান হারান তিনি। তাঁর সংজ্ঞা আর কোনো দিনই ফেরেনি।
স্টেডিয়াম থেকেই তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অনেক সময় ধরে অস্ত্রোপচারও হয়। দেশের সেরা চিকিৎসকেরা দিন-রাত পরিশ্রম করেও তাঁকে আর জীবনে ফেরাতে পারেননি। তাঁর আইরিশ স্ত্রী কিম ঘটনার পরপরই ঢাকায় এসেছিলেন। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন দিল্লির একজন বিখ্যাত নিউরো-সার্জনকেও। কিন্তু তিনি ঢাকায় এসেই বলেছিলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা তাঁর আঘাতের ধরন অনুযায়ী সম্ভাব্য সেরা চিকিৎসাটাই দিয়েছেন। তাঁর বাঁচার আর কোনোই আশা নেই। আহত হওয়ার পাঁচ দিন পর পারিবারিক সম্মতিতেই খুলে দেওয়া হয় তাঁর কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসযন্ত্র।
ঘটনাটি অনেক দিন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে মেহরাব হোসেনকে। একদিনের ক্রিকেটে দেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান লাম্বার এই অকাল মৃত্যুর জন্য নিজেকেই দায়ী করেছেন। থেকে থেকেই নিজেকে দিয়েছেন অভিসম্পাত। মানসিক অবসাদে ভুগেছেন বহুদিন। ঘটনার এত বছর পর আজও হয়তো মেহরাবের অবচেতনেই লুকিয়ে থাকেন লাম্বা। শুধু মেহরাব কেন, লাম্বা লুকিয়ে থাকেন এ দেশের প্রায় সব ক্রিকেটপ্রেমীর অবচেতনেই!

ফার্গুসন সংকটে বিপাকে ওবামা

ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের ফার্গুসন শহর। সেই উত্তাপ গিয়ে লাগছে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার গদিতে। দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টের আমলে নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ তরুণকে গুলি করে হত্যার পর অভিযোগ থেকে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের অব্যাহতি ভালো চোখে দেখা হচ্ছে না। এ ঘটনা বর্ণবৈষম্যের চিরায়ত বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি ও সংকটে পড়েছেন ওবামা। তাঁর প্রতি কৃষ্ণাঙ্গদের আস্থা টলছে। এটি বোঝার পরও নিজেকে সাদা-কালো সব মানুষের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছেন তিনি।
৯ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত হন ১৭ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ মাইকেল বাউন। নিরস্ত্র ব্রাউনকে বিনা প্রয়োজনে গুলি করে হত্যার অভিযোগে তখনই প্রতিবাদ শুরু হয়। এরপর এ ঘটনায় গ্র্যান্ড জুরি হত্যাকারী পুলিশের শ্বেতাঙ্গ সদস্য ড্যারেন উইলসনকে অভিযুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিলে স্থানীয় সময় গত সোমবার রাতে ফার্গুসনে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। বোস্টন, নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলস, ডালাস, আটলান্টা অঙ্গরাজ্যসহ অন্যান্য নগরেও বিক্ষোভ হয়। দেশজুড়ে দেখা দেয় গণবিক্ষোভ। পরিস্থিতি সামাল দিতে আধা সামরিক বাহিনীর দুই হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জে নিক্সন। ফার্গুসন শহরের সেন্ট লুইস শহরতলি থেকে চার শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
ফার্গুসনে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন ওবামা। তিনি বলেন, এ ধরনের কাজ যাঁরা করেছেন, তাঁরা অপরাধী। তাঁদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
ওবামার এ কথা কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষুব্ধ করেছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওবামা নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে এই কৃষ্ণাঙ্গদের অবদান আছে। বর্ণবৈষম্যসহ নানা বৈষম্যের শিকার এই জনগোষ্ঠী ভেবেছিল, ওবামা তাদের কষ্ট বুঝতে পারবেন। তাদের উন্নয়নে কাজ করবেন। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের পর ওবামার প্রতি তাদের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে।
বর্ণবাদ উসকে উঠতে পারে, এমন ভাবনা থেকে ওবামা এখন পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি কোনো পক্ষে না গিয়ে নিজেকে সবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সামনে রাখতে চাইছেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়ে এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পুলিশ সদস্য ড্যারেন উইলসন বলেছেন, ‘আমি জানি, আমি সঠিক কাজ করেছি।’ তাঁর এমন বক্তব্য কৃষ্ণাঙ্গদের আরও ক্ষুব্ধ করে তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে ওবামার এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

স্বজনের নির্মমতায় পাঁচ বছরে এক মিনিটের জন্যও সূর্যের আলো দেখেনি মা-ছেলে

বিচিত্র নির্মমতার কাহিনীতে এবার যোগ হল আপন মামার কারাগারে মা- সহ এক হতভাগ্য শিশুর পাঁচ বছর ধরে বন্দী জীবনের চাঞ্চল্যকর বিচিত্র ইতিহাস । পাঁচ বছরে এক মিনিটের জন্যও মা-ছেলে সূর্যের আলো দেখেনি। অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা। ফেনী শহরের রামপুর শাহীন অ্যাকাডেমি সড়কের জনাকীর্ণ এলাকায় বছরের পর বছর বিশালাকার একটি বাড়ির কে মামার নিষ্ঠুরতার শিকার ওই মা ও শিশুর খোঁজ নেয় না কোনো আত্মীয়স্বজনও।
অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন-যাপন করেছে তারা। স্থানীয় একটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশেরে পর বুধবার বিকাল ৪টার দিকে ওই নারী ও তার শিশু সন্তানকে উদ্ধার করেছে ফেনী থানা পুলিশ।
ফেনী মডেল থানার ওসি মাহবুব মোর্শেদ জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে ইডেন কলেজে শিক্ষকতা করেছেন জাহানআরা বেগম রোজী (৪৫)। স্বামী উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আবুল কালাম আজাদ ভূঞা। বর্তমানে তিনি সিলেট সদর উপজেলায় কর্মরত।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, পৈত্রিক সম্পত্তি আত্মসাৎ করতেই শেরশাহ শিশু সন্তানসহ তার বোনকে মানসিক প্রতিবন্ধি সাজিয়ে তালাবন্দি করে রেখেছিল।
ফেনী মডের থানার ওসি মাহবুব মোর্শেদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
শহরের বিশাল বাড়ীতে দুটি পাকা ঘরের একটিতে দীর্ঘদিন ধরেই তালা দেওয়া দেখতে পান এলাকাবাসী। এই ঘরে শেরশাহ মাঝেমধ্যে আসতেন বলে স্থানীয়রা জানান। অন্যঘরের দুটি কক্ষ ভাড়া দেয়া হয়। ভাড়ার চার হাজার টাকা দিয়ে চলে রোজী ও তার সন্তানের ভরন-পোষণ সব।
ভাড়াটিয়ারা জানান, তালাবন্ধ ওই কক্ষের জানালা দিয়ে চাল-ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হতো মা-ছেলেকে। এভাবেই কোনক্রমে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটে তাদের। কেননা ভাড়াটিয়ারা না থাকলে ওদের মাঝে মাঝে না খেয়েই থাকতে হয়েছে।ভুতুড়ে ওই কক্ষের ভিতরে একটি লাইট থাকলেও ইলেকট্রিক পাখাটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। কক্ষে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না থাকায় উৎকট গন্ধ বের হয়। ফুটফুটে জিমুন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটে। এক প্রতিবেশী জানান, একসময়ে ছেলেটি বেশ চঞ্চল ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্দি থাকায় ধীরে ধীরে শারিরীক প্রতিবন্ধি হয়ে যাচ্ছে।
তারা আরও জানান, সব হারিয়ে রোজিও এখন মানসিক প্রতিবন্ধী। কেউ আসলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। তবে জিমুন ভিতর থেকে কথা বলার চেষ্টা করে। পাশের ভাড়াটিয়াদের থেকে জানালা দিয়ে সংগ্রহ করে পত্রিকা ও নানা রকম বই পড়ে। এক ভাড়াটিয়া জানায়, জিমুন অত্যন্ত মেধাবি। কোন ধরনের বই পেলে সহজে মুখস্ত হয়ে যায় তার।
জিমুন জানায়, পড়ালেখার প্রবল আকাঙ্খা থাকলেও সে প্লে-নার্সারির পর আর পড়তে পারেনি। কথা বলতে চাইলেও মায়ের বাধায় জিমুন থেমে যায়। একপর্যায়ে একটি চিরকুট ধরিয়ে দেয়। এতে লেখা রয়েছে- ‘আমি মেহেদি ইসলাম। আমার আম্মুর সঙ্গে ২০১০ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত পাঁচ বছর যাবত আমার মামা অন্যায়ভাবে আটকে রেখেছে। পড়তে চাই, আমি খেলতে চাই। আমি মুক্তি চাই।’
- দেশে এমন নিষ্ঠুর ও লোভী লোক রয়েছে ভাবতে অবাক লাগে, এদের দৃষ্টান্তমূলক শাসিত দেওয়া হউক।

মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজ পরিদর্শনে সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন

তথ্য অধিদপ্তরের সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন গতকাল ২৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ক্লাসনির্ভর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজ পরিদর্শনে গেলে তাদের শুভেচ্ছা ও স্বাগতম জানান অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ। উপস্থিত ছিলেন মেরন সান স্কুল এন্ড কলেজ চকবাজার ক্যাম্পাসের উপাধ্যক্ষ রাজেশ কান্তি পাল, চীফ একাডেমিক কর্ডিনেটর সিহাব ইকবাল, শিক্ষক শহিদুল ইসলাম, শিক্ষক দেবাশীষ বড়ুয়া। এসময়  সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনের সাথে উপস্থিত ছিলেন সহকারী তথ্য অফিসার জি এম সাইফুল ইসলাম, প্রধান সহকারী গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ খোরশেদ আলম। উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আমাদের  চট্টগ্রাম'র সম্পাদক ও প্রকাশক মিজানুর রহমান চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার বজলুল হক, ঢাকা বুরো প্রধান মাহফুজুর রহমান, জিএসএমনিউজ24ডটকম এর রিপোর্টার ইদ্রিস হায়দার প্রমুখ।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রতিবাদের ঝড়

যুক্তরাষ্ট্রের ফার্গুসনে নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ তরুণকে গুলি করে হত্যা করা
শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত না করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ
চলছে। গত মঙ্গলবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে হোয়াইট
হাউসের সামনেও বিক্ষোভ হয়। ছবি: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের ফার্গুসন থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে অন্যান্য নগরে। নিউইয়র্ক, বোস্টন, ওয়াশিংটন ডিসি, লস অ্যাঞ্জেলেসসহ অন্তত ১৭০টি নগরে মঙ্গলবার রাজপথে নেমেছে মানুষ। তবে সহিংসতার মাত্রা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা আগের দিনের চেয়ে কিছুটা কম ছিল। ফার্গুসনে গত ৯ আগস্ট শ্বেতাঙ্গ এক পুলিশ কর্মকর্তার গুলিতে নিহত হন নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ মাইকেল ব্রাউন। এ ঘটনায় গঠিত গ্র্যান্ড জুরি গত সোমবার সিদ্ধান্ত দেয়, পুলিশ কর্মকর্তা ড্যারেন উইলসন আত্মরক্ষার জন্যই গুলি করার ফলে ব্রাউনের মৃত্যু ঘটেছে। এ কারণে তাঁকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়নি। এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ফার্গুসনের মানুষ। বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি ছাড়াও হিউস্টন, ফ্লোরিডা, ফিলাডেলফিয়া, শিকাগো, ডেট্রয়েটসহ বড় বড় নগরে রাজপথে নেমে আসে বিক্ষোভকারীরা। তবে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। কৃষ্ণাঙ্গরা ছাড়াও নাগরিক ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা এসব বিক্ষোভে যোগ দেন। তাঁদের হাতে ছিল পুলিশের নির্যাতন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান লেখা ব্যানার-ফেস্টুন। বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু ফার্গুসনে মঙ্গলবারও পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে লুটপাট ও সহিংসতার মাত্রা সোমবারের চেয়ে কিছুটা কম ছিল। গ্রেপ্তারের সংখ্যাও ছিল কম। কোথাও পুলিশকে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা যায়নি। স্থানীয় সেন্ট লুইস কাউন্টির পুলিশ প্রধান জন ব্লেমার বলেন, ‘আমরা খুব আশাবাদী হচ্ছি না। তার পরও বলব, সোমবারের রাতের তুলনায় মঙ্গলবারের রাতে তুলনামূলক ভালো পরিস্থিতি থাকবে।’ ফার্গুসনে মঙ্গলবার ৪৪ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জর্জিয়ার আটলান্টায় একজন বিক্ষোভকারী বলেন, ‘তারা আমাদের ন্যায়বিচার দিতে পারেনি। আমরাও তাদের শান্তিতে থাকতে দেব না।’ ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের একজন বিক্ষোভকারী বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তা উইলসনকে বিচারের আওতায় না আনার মানে হলো বিচারব্যবস্থায় কৃষ্ণাঙ্গ জীবনের কোনো দাম নেই।’ বিভিন্ন নগরে বিক্ষোভ থেকে নাগরিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে শতাধিক লোককে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে। সোমবার রাতেই প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। মঙ্গলবার শিকাগোতে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য দেন।
সেখানে ওবামা বলেন, বিক্ষোভের নামে যারা লুটপাট, ভাঙচুর করছে তাদের প্রতি কোনো সমবেদনা নেই। তিনি বলেন, গাড়ি পুড়িয়ে কোনো নাগরিক অধিকার আইন, অভিবাসন আইন বা স্বাস্থ্যসেবা আইন আসেনি। এসব অর্জিত হয়েছে জনগণের ঐক্যবদ্ধ জাগরণের মাধ্যমে। নিহত ব্রাউনের পরিবার বলেছে, গ্র্যান্ড জুরির সিদ্ধান্ত দুঃখজনক। তবে তারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য বিক্ষোভকারীদের আহ্বান জানায়। গ্র্যান্ড জুরি নিয়ে বিতর্ক: বিভিন্ন দেশের বিচার-প্রক্রিয়ায় গ্র্যান্ড জুরির ব্যবস্থা আছে। গ্র্যান্ড জুরি হলো বিশিষ্ট কিছুসংখ্যক নাগরিকের সমন্বয়ে গঠিত আইনি সংস্থা, যারা অপরাধের ঘটনা বিশদ খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত দেয় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে কি না। তবে গ্র্যান্ড জুরি কাউকে বিচারের আওতায় না আনার সিদ্ধান্ত দিলেও কৌঁসুলিরা যদি মনে করেন, বিচারের আওতায় আনার পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ রয়েছে, তাহলে বিচার করা যায়। গ্র্যান্ড জুরির শুনানিকে কেন্দ্র করে রাখঢাক করায় প্রশ্ন তুলেছে মাইকেল ব্রাউনের পরিবার ও তাদের প্রতি সমব্যথীরা। এ ছাড়া তারা এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি রবার্ট ম্যাককুলোচকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছে। তারা বলেছে, ম্যাককুলোচের পুলিশ কর্মকর্তা বাবা ১৯৬৪ সালে একজন কৃষ্ণাঙ্গের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। তাই এ মামলায় তিনি নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না। অন্যভাবেও বিচার সম্ভব: গ্র্যান্ড জুরি নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দিলেও ব্রাউনের পরিবার ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারে ব্রাউনের নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার মামলায়। এতে জিতলে পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে লাখো ডলার পেতে পারে তারা। সাম্প্রতিক অতীতে নিউইয়র্ক সিটি, শিকাগো, ক্যালিফোর্নিয়ায় এ ধরনের মামলার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন বিচার বিভাগ ব্রাউন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইতিমধ্যে নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছে। ব্রাউনের নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না বা ফার্গুসন পুলিশ বর্ণবৈষম্য করেছে কি না, তা এই তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।

জিও নিউজের মালিকের ২৬ বছরের দণ্ড

ধর্ম অবমাননার দায়ে পাকিস্তানের জিও নিউজের মালিক মির শাকিল-উর-রেহমান ও অভিনেত্রী বিনা মালিককে ২৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। গিলগিট শহরের একটি আদালত তাঁদের এ সাজা দেন। খবর এএফপি ও রয়টার্সের। জিও নিউজ কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা ওই রায় ও সাজার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবে। জিও নিউজ টেলিভিশন চ্যানেলে গত মে মাসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মেয়ের বিয়ে নিয়ে গাওয়া একটি গানের সঙ্গে নাচের দৃশ্য প্রচার করা হয়।
এতে বিনা মালিক ও তাঁর স্বামী একদল সুফি সংগীতশিল্পীর সঙ্গে দলীয় নৃত্যে অংশ নেন। ওই অনুষ্ঠান প্রচারের পর চ্যানেলটির বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠে। গিলগিটের আদালত রায়ে বলেছেন, ‘অপরাধীদের এ খারাপ কাজে দেশের মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে, যা হালকাভাবে নেওয়া যেতে পারে না।’ তবে খবরে বলা হয়েছে, দেশের অন্য অঞ্চলের ওপর গিলগিটের ওই আদালতের এখতিয়ার নেই। জিও নিউজের একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর এজন্য প্রভাবশালী সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকে (আইএসআই) দায়ী করার পরপরই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তোলা হয়েছিল। দৃশ্যত, সামরিক বাহিনীর চাপে গত জুনে চ্যানেলটি ১৫ দিনের জন্য বন্ধও রাখা হয়।

সাগরের বুকে শহর!

সাগরের ভেতরে আস্ত শহরের মডেল
জাপানি আবাসন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শিমিজু করপোরেশন সাগরের মধ্যে আস্ত শহর গড়ে তোলার কথা ভাবছে। সেটি হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ জনবসতি। একে বলা হচ্ছে এ যুগের আটলান্টিস-গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর কিছু লেখায় উল্লেখ থাকা ‘কল্পিত’ সেই দ্বীপ। খবর ইনডিপেনডেন্টের। শিমিজু জানিয়েছে, ওশান স্পাইরাল নামের ওই প্রকল্পে থাকবে পানিনিরোধক একেকটি আবাসিক এলাকা। বিশাল সর্পিল আকৃতির পথ দিয়ে একটি অপরটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।
স্বচ্ছ বলের মতো দেখতে প্রতিটি আবাসিক এলাকায় কমবেশি পাঁচ হাজার লোক বাস করতে পারবে। সূর্যের আলোর সুবিধা নিতে এগুলো সাগরপৃষ্ঠের ওপরে রাখা যাবে। তবে আবহাওয়া খারাপ হলে সেগুলোকে স্রোতের নিচে গুটিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। শিমিজু বলছে, পাঁচ বছরেই বানিয়ে ফেলা সম্ভব এ রকম শহর। আর প্রথমটির জন্য খরচ পড়তে পারে এক হাজার ৬০০ কোটি ডলার। পরেরগুলোর জন্য খরচ অনেক কমে যাবে।

জাতিসংঘ ‘টেকনোলজি ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার শীর্ষ প্যানেলে বাংলাদেশী

স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে দারিদ্র্য সীমা থেকে বের করে আনার লক্ষ্যে যথাযথ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণের জন্যে প্রস্তাবিত ‘টেকনোলজি ব্যাংক’র কার্যকারিতা ও সুযোগ-সুবিধাসমূহ বিশেষভাবে খতিয়ে দেখার পাশাপাশি এই ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামো ও প্রশাসনিক পদ্ধতি কী ধরনের হওয়া উচিত সে জন্য বিস্তারিত সুপারিশমালা তৈরীর জন্যে জাতিসংঘ মহাসচিবের শীর্ষ প্যানেলে বাংলাদেশী ড. ফেরদৌসী কাদরীও রয়েছেন। ড. কাদরী ২৫ বছর যাবত রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত ‘আইসিডিডিআর’র পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন এবং উন্নয়নশীল বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারে বিশেষ অবদানের জন্যে গত বছর ‘দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্সস’ কর্তৃক ‘সিএনআর রাও’ এওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন।
উত্তর এবং দক্ষিণের উন্নয়ন অংশিদার দেশসমূহের ৫ মহিলা এবং ৫ পুরুষের সমন্বয়ে ১০ সদস্যবিশিষ্ট এ প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন সুদানের মোহাম্মদ হাসান, যুক্তরাষ্ট্রের ব্র“স লেহম্যান, সাউথ আফ্রিকার টেবেলো নিকং, ডেনমার্কের ডর্টে ওলেসেন, নেপালের পোশ রাজ পান্ডে, হাইতির মিশেল ডুভিভিয়ের পিয়েরে-লুইস, চীনের ফ্যাঙ জিন, তুরস্কের হ্যাকান কারাতাস এবং স্ব্েপান্নত দেশ, ল্যান্ডলক ডেভেলপিং কান্ট্রিজ এবং ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ সমূহের জন্যে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারী জেনারেল গায়েন চন্দ্র আচার্য। এ শীর্ষ প্যানেলের চেয়ারম্যান হবেন ইটালির ট্রিয়েস্টের ‘ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স’র নির্বাহী পরিচালক রোমেইন মুরেঞ্জি। রোমেইন মুরেঞ্জি হচ্ছেন রুয়ান্ডার নাগরিক। জাতিসংঘ মহাসচিবের একজন মুখপাত্র ২৬ নভেম্বর বুধবার সন্ধ্যায় এনআরবি নিউজকে এ তথ্য জানান।
প্রস্তাবিত ব্যাংকটির নাম হচ্ছে ‘টেকনোলজি ব্যাংক এন্ড সায়েন্স, টেকনোলজি এন্ড ইনোভেশন সাপোর্টিং মেকানিজম’। এই শীর্ষ প্যানেলের কাছে মহাসচিব বান কি-মুন আহবান জানিয়েছেন স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রসমূহের টেকসই উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত পরিবর্তনের চলমান কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে বাস্তবতার আলোকে কী করা উচিত সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা তৈরীর জন্যে। মহাসচিবের উদ্ধৃতি দিয়ে তার মুখপাত্র  আরো জানিয়েছেন যে, আসছে ফেব্র“য়ারিতে এ প্যানেল বৈঠকে মিলিত হবেন এবং ২০১৫ সালের জুলাইয়ের মধ্যেই মহাসচিব বরাবরে তাদের সুপারিশমালা পেশ করবেন ।
এ ব্যাপারে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড. এ কে এ মোমেন ২৬ নভেম্বর বুধবার রাতে এনআরবি নিউজকে বলেন, এই টেকনোলজি সেন্টার তথা ব্যাংকের সদর দফতর ঢাকায় স্থাপনের চেষ্টা করছি আমরা। ২০১১ সালে মহাসচিব বান কি-মুনের ঢাকা সফরের সময়েও বাংলাদেশ এ প্রস্তাব রেখেছে। কারণ, বিশ্বের সপ্তম বৃহ্ত্তম ভাষাভাষী মানুষের দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের বড় কোন অফিস হয়নি। রাষ্ট্রদূত মোমেন এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করেন, আসছে ফেব্র“য়ারিতে ঢাকায় ‘জাতিসংঘ সাউথ সাউথ কো-অপারেশন’র শীর্ষ সম্মেলন হবে। সে সময় আমরা ঢাকায় টেকনোলজি সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কাজও শুরু করে দেব। যাতে করে পরবর্তীতে ঐ সেন্টারকেই জাতিসংঘ টেকনোলজি ব্যাংকের  সদর দফতরে রূপান্তরিত করা যেতে পারে।

সীমান্ত চুক্তি অনুমোদন হচ্ছে, তিস্তায় জোর চেষ্টা -বৈঠকে শেখ হাসিনাকে নরেন্দ্র মোদি by রাহীদ এজাজ

স্থলসীমান্ত চুক্তি দ্রুত অনুমোদন আর তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সইয়ের জন্য দিল্লি জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, সীমান্ত চুক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা ছিল, এখন তিনি এর পক্ষে মত দিয়েছেন। তাই এটা খুব দ্রুত হয়ে যাবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রী গতকাল বুধবার কাঠমান্ডুতে সন্ত্রাসবাদ দমন আর নিরাপত্তা প্রসঙ্গ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নেপালের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি বৈঠক করেন। দুই নেতা প্রায় ৪৫ মিনিট আলোচনা করেন।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল উপস্থিত ছিলেন।
হাসিনা-মোদির বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী র্যাডিসন হোটেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদ দমনের কথা তুললে মোদি তাঁর সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে এই অঞ্চলের সব দেশকে একযোগে কাজ করা উচিত। বর্ধমানের বোমা বিস্ফোরণের উল্লেখ করে মোদি বলেন, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় করা জরুরি। শেখ হাসিনা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও উন্নয়নের অন্তরায় এই জঙ্গিবাদ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন প্লাটিনাম হোটেলে আয়োজিত পৃথক ব্রিফিংয়ে জানান, সন্ত্রাসবাদ দমন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জানান, দ্বিপক্ষীয় অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে মোদি নিজেই আলোচনা শুরু করেন। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সই এবং স্থলসীমান্ত চুক্তি কার্যকর করার বিষয়ে তিনি বলেন, তিস্তা এবং স্থলসীমান্ত চুক্তি নিয়ে তিনি জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
শেখ হাসিনা নরেন্দ্র মোদিকে আবারও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি বলেন, ‘আমি আসব, এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।’ ঢাকা সফরের সময় তিস্তা ও স্থলসীমান্ত চুক্তির বিরোধিতাকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার শীতকালীন অধিবেশনে স্থলসীমান্ত চুক্তি বিলটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য ভারতীয় সংবিধান সংশোধন করতে হবে। গত মঙ্গলবার ভারতের রাজ্যসভার শীতকালীন অধিবেশন শুরু হয়েছে। এ অধিবেশন শুভ বড়দিনের আগে শেষ হওয়ার কথা। বিজেপি সরকার এ অধিবেশনে সীমান্ত চুক্তি কার্যকর করতে এ বিলটি পাসের প্রস্তুতি নিয়েছে। ইতিমধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি সর্বসম্মতভাবে বিলটি চূড়ান্ত করেছে।
নওয়াজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী জানান, শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ তাঁকে অভিনন্দন জানান। তিনি শেখ হাসিনার জঙ্গিবাদ দমন এবং বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান করার জন্য ভূয়সী প্রশংসা করেন। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের কৌশল জানতে পাকিস্তানের একটি প্রতিনিধিদল আসবে বলে উল্লেখ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ-সংকট এবং জঙ্গিবাদ আমাদের প্রধান সমস্যা। জঙ্গিবাদের জন্য পাকিস্তানের ১০৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান নওয়াজ।
পাকিস্তানের গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করা এবং গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য শেখ হাসিনা নওয়াজ শরিফের প্রশংসা করেন। তাঁর স্ত্রী এবং মেয়ে শেখ হাসিনার ভক্ত বলে উল্লেখ করেন নওয়াজ।
বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খানের বিরূপ মন্তব্য নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা ও আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির সঙ্গেও বৈঠক করেন।

সড়ক আটকে ধান মাড়াই

(রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের দুদুখান পাড়া এলাকার গোয়ালন্দ-ফরিদপুর-তাড়াইল সড়ক আটকে গত মঙ্গলবার থেকে ধান মাড়াই করা হচ্ছে। এতে খড় ও ধুলা উড়ায় বিপাকে পড়েছেন পথচারীরা l প্রথম আলো) রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দুদুখান পাড়া এলাকার সড়ক আটকে ধান মাড়াইয়ের যন্ত্র বসিয়ে ব্যবসা করায় বেকায়দায় পড়ছেন পথচারীরা। ফরিদপুরের দুর্গাপুর গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তি এ ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলেন, উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের দুদুখান পাড়া এলাকায় গোয়ালন্দ-ফরিদপুর-তাড়াইল সড়ক আটকে ফরিদপুরের ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের জুলহাস শেখ (৪৫), কাসেম মীর (৫০) ও মান্নান মীর (৪০) গত মঙ্গলবার ধান মাড়াইয়ের যন্ত্রটি বসান। সড়কে ধান মাড়াই করায় খড় ও ধুলাবালিতে পথচারীদের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে কয়েক শ বাস ও পথচারী চলাচল করেন।
সরেজমিনে গতকাল বুধবার দেখা যায়, মালিকসহ কয়েকজন নারী ও পুরুষ মাড়াই কাজে ব্যস্ত। আরেকজন কয়েক ফুট ওপরের পাইপ দিয়ে যন্ত্রে পিষ্ট হওয়া ধুলা জড়ানো খড় আলাদা করছেন। মাড়াই করতে আসা নারী-পুরুষ মিলে ধান ও খড় পৃথক করছেন। আর এ সময় বের হওয়া খড় ও ধুলায় পথচারীদের পোশাক নষ্ট হচ্ছে।
দক্ষিণ উজানচর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোজাফফর আহমেদ ওই সড়ক পার হওয়ার সময় বলেন, ‘এভাবে পুরো সড়ক আটকে যদি ধান মাড়াই করা হয় তাহলে মানুষজন চলাচল করবে কীভাবে? এতে ধুলাবালিও নাকে-মুখে ঢুকছে।’
গোয়ালন্দের ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা এক হাতে মুখ চাপা দিয়ে অন্য হাতে মোটরসাইকেল চালিয়ে পার হওয়ার সময়ে বলেন, এভাবে ধান মাড়াই করা হলে চলাচল বন্ধ করে দেওয়া লাগবে।
যন্ত্রের মালিক জুলহাস শেখ ও কাসেম মীর বলেন, আশপাশে কোথাও জায়গা না থাকায় সড়কের ওপর ধান মাড়াই করছেন। প্রতিদিন প্রায় ৫০ মণ করে ধান মাড়াই করছেন তাঁরা। প্রতি মণ মাড়াই করে তিন কেজি করে ভাড়া পান।
সাহাজদ্দিন মাতুব্বর পাড়া থেকে মাড়াই করতে এসেছেন কৃষক লুৎফর মোল্লা। তিনি বলেন, প্রায় এক বিঘা জমির ধান এনেছেন। সনাতন পদ্ধতিতে গরু দিয়ে ধান মাড়াই করতে অনেক সময় লাগবে তাই এখানে এসেছেন।
উজানচর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গোলজার হোসেন মৃধা বলেন, ‘এ ধরনের বিষয় আমাদের জানা নেই। খোঁজ নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করব।’

ঝুঁকির জীবন, অভ্যাস উপেক্ষার by কমল জোহা খান

(জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই কারওয়ান বাজার রেলগেট ও রেললাইন দিয়ে চলাচল করছেন। ছবি: মনিরুল আলম) দিনটি ছিল ২৫ নভেম্বর সকাল সাতটা। রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেললাইন দিয়ে অসংখ্য মানুষের ভিড়ে মাথায় সবজিভর্তি ঝুড়ি নিয়ে মগবাজারের দিকে যাচ্ছিলেন কুটি মিয়া। রেললাইনে হাঁটতে ভয় লাগে না? প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ট্রেন আইলে আইব। মরণ আইলে আইব। কিন্তু সদাই নিয়া মগবাজার যাইতে এক ঘণ্টা লাগব। রেললাইনে হাঁটলে লাগব আধা ঘণ্টা।’ অথচ কারওয়ান বাজার রেলগেটের পাশে মাছবাজারে ১১ সেপ্টেম্বরের ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান চারজন।
ট্রেন দুর্ঘটনার পর মাছবাজারটি উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু মানুষের ভিড় আছে আগের মতোই। এর সঙ্গে বেড়েছে ট্রেন চলাচল। তাই থেকেই যাচ্ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। রেলগেটে দায়িত্বরত কর্মী, ব্যবসায়ী ও ট্রাফিক সদস্যরা এমন আশঙ্কা নিয়েই কাজ করছেন প্রতিদিন। এ পথে প্রতিদিন গড়ে ৮০টি ট্রেন আসা-যাওয়া করে।
সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, সূর্য ওঠার আগেই কারওয়ান বাজার রেলগেটের ওপর দিয়ে মানুষের ছুটে চলা শুরু হয়। খুচরা ব্যবসায়ীদের মাথায় থাকে কারওয়ান বাজার থেকে কেনা ঝুড়িভর্তি সবজি, মুরগি কিংবা মাছসহ নানা পণ্য। আর বাজার করতে আসা অসংখ্য সাধারণ মানুষ কিংবা কর্মজীবীরা তো আছেনই। সহজে গন্তব্যে যেতে সবাই ঝুঁকি মাথায় নিয়ে হাঁটছেন রেললাইন ধরে।
এত মানুষের ভিড়। এর মধ্যেই ১০-১৫ মিনিট পরপর তীব্র গতিতে একেকটি ট্রেন আসা-যাওয়া করছে। সিগন্যালের ঘণ্টা বাজলেও রেললাইন থেকে সরে যাওয়ার তাগাদা কারও মধ্যে থাকে না। দায়িত্বরত আনসার সদস্যরাও পথচারীদের সতর্ক করেন না। তাঁরা নিজেরাই উল্টো রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় ব্যস্ত থাকেন। ট্রেনটি একেবারে কাছাকাছি না আসা পর্যন্ত পথচারীরা রেললাইন থেকে সরছেন না।
বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কারওয়ান বাজার রেলগেটে যান চলাচল বাড়তে থাকে। তাই সোনারগাঁও ক্রসিং ও মগবাজার হয়ে আসা বাস-প্রাইভেট কার নিয়ম ভেঙে রেললাইনের ওপরই ইউটার্ন নিতে থাকে।  শুধু তা-ই নয়, রেলগেটের চারটি ব্যারিকেড ফেলার পরও অনেক মোটরসাইকেলচালক নিয়ম উপেক্ষা করে পথ চলতে ব্যস্ত।
এ প্রসঙ্গে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ এমদাদ হোসেন বলেন, ‘নিয়ম নাই। কিন্তু আমরা ঠেকাতে পারি না। আর যদি ঠেকাই তাহলে রাস্তার দুই পাশে যানজট হবে।’
কারওয়ান বাজার রেলগেটের গেটম্যান মো. রেজাউলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই রেলক্রসিং হয়ে প্রতিদিন ৮০টি ট্রেন আসা-যাওয়া করে। সেই হিসাবে গড়ে ১৮ মিনিট পর পর একটি করে ট্রেন এই রেলগেট পার হয়।
ক্ষোভের সঙ্গে রেজাউল বলেন, ‘এখানে মাছবাজার উচ্ছেদ হলেও মানুষ রেললাইন দিয়ে এখন বেশি হাঁটছে। ট্রেন চলতাছে বেশি। রেললাইনের পাশে বস্তির লোকও বাড়ছে। তাই এখন বিপদও বাড়ছে।’

তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় পাচ্ছে সেনাবাহিনী by মোশতাক আহমেদ

তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। তিনটিই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সবুজসংকেত পেয়ে এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এ জন্য প্রক্রিয়াও শুরু করেছে ইউজিসি। প্রস্তাবিত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো: বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, কুমিল্লা; বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, কাদেরাবাদ-নাটোর এবং বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, সৈয়দপুর।
ইতিমধ্যেই এই তিনটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, কোষাধ্যক্ষ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ প্রথম শ্রেণির বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। গত ২৮ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে এই বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের আগে জনবল নিয়োগের এই বিজ্ঞপ্তি নজরে আসায় ইউজিসি আর বিজ্ঞপ্তি প্রচার না করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ দিয়েছে বলে ইউজিসির একটি সূত্র জানিয়েছে।
ইউজিসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, এখন প্রস্তাবিত এই বিশ্ববিদ্যালয়-গুলোর ব্যাপারে শিগগিরই সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটি সারসংক্ষেপ আকারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর আদেশ জারি করা হবে। জানতে চাইলে শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। এর বাইরে তিনি কিছু বলেননি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যেহেতু সরকারের উচ্চপর্যায় ইতিবাচক, তাই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত শেষ করে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হবে। আইনানুয়ায়ী মন্ত্রণালয়ে আবেদনের পর প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ইউজিসি সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ সুযোগ-সুবিধা আছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করে। এরপর অনুমোদন দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে ইউজিসির পরিচালক (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) মো. সামছুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এখন কমিটি গঠন করে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করা হবে। ইউজিসির কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাই অনুমোদন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের কিছুটা হেরফের হতে পারে। এর কারণ হিসেবে ইউজিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী শাখা ক্যাম্পাস নিষিদ্ধ। এখন একই নামে একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হলে সে ক্ষেত্রে মনে হতে পারে আউটার ক্যাম্পাসের আদলেই হচ্ছে। সে জন্য নাম সামান্য হেরফের হতে পারে।
এর আগে সর্বশেষ ‘সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছিল সরকার। কুমিল্লার কোটবাড়িতে অবস্থিত প্রস্তাবিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে আছেন ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু। তিনি বর্তমানে অনুমিত হিসাব-সস্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। এ নিয়ে মহাজোট ও বর্তমান সরকারের আমলে এখন পর্যন্ত ২৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে কয়েকটি বাদে প্রায় সবগুলোর পেছনেই মন্ত্রী, সাংসদসহ ক্ষমতাসীন দলের লোকজন জড়িত।
বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ২৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় দলীয় বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া হয়। এমনকি জোট সরকারের শেষ কর্মদিবসেও চট্টগ্রামে বাড়ি বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকায় বেসরকারি একটি সংস্থাকে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে দেশে এখন ৮০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। নতুন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৩তে দাঁড়াবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, আরও ১৩৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ইউজিসি সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রায় ১০০টির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। আবেদন করা প্রস্তাবিত এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে ক্ষমতাসীন দলের ব্যক্তিরা যেমন আছেন, তেমনি আছেন বিভিন্ন ব্যবসায়ীও।

‘দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়’ -খালেদা জিয়া

দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী জোট নেতা  ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।  বলেছেন, আপনারা দেখেছেন নীলফামারী, নাটোর ও কিশোরগঞ্জ জনসভায় কত লোক হয়েছে। এসব জনসভা একটির চেয়ে আরেকটি বড় হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় দেশের মানুষ বিএনপি পক্ষে আছে। সরকারের পক্ষে নেই। সারা পরিবর্তন চায়। গত রাতে চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বগুড়া জেলা বিএনপি আয়োজিত তারেক রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে ‘অকুতোভয় দেশনায়ক’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। খালেদা জিয়া বলেন, দেশ এখন গুম-খুনের আতঙ্কে রয়েছে। কেউ নিরাপদ নয়। পরিবারের সবাই আতঙ্কে দিনযাপন করছে। স্বজনরা বাইরে থেকে ঘরে ফিরে আসবে কিনা এ নিয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। মানুষ সরকারের এ নিপীড়ন নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে চায়। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পরির্বতন আনবে হবে। সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে পতন আন্দোলনে নামতে হবে। বইটির সম্পাদনা করেছেন বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম। প্রকাশনা করেছেন বগুড়া জেলা বিএনপির প্রচার ও প্রকাশনা বিয়ষক সম্পাদক মেহেদী হাসান হিমু । অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বক্তব্য রাখেন।

মার্কিন মন্ত্রীর তিন দিনের ঢাকা সফর শুরু

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা বিসওয়াল ২৭-২৯শে নভেম্বর বাংলাদেশ সফর করবেন। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বুধবার তার সফরসূচি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তিন দিনব্যাপী সফরে নিশা বিসওয়াল সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়িক সম্প্রদায়, তৈরী পোশাক শিল্পখাতের নেতৃবৃন্দ ও কর্মী এবং বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ঢাকায় তার কার্যক্রম ছাড়াও তিনি গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পীস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং (বিপসট) সফর করবেন। তিনি ২৯শে নভেম্বর বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন। নিশা বিসওয়াল ২০১৩ সালের ২১শে অক্টোবর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং তাজিকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে তিনি “ইউএসএআইডি” এশিয়ার সহকারী প্রশাসক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তিনি মধ্য এশিয়া থেকে প্যাসিফিক আইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত ২২টি দেশের সহায়তায় ১২০ কোটি ডলারের একটি তহবিল, একটি দপ্তরের ব্যবস্থাপনা এবং ১২শ’রও বেশি উন্নয়ন কর্মীর  দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।  তার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে ইউএসএআইডি বার্মায় এর কার্যক্রম পুনরায় চালু করে এবং  ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও কাজাখস্তানের মতো  দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতায় সম্মিলিত কর্মসূচির মাধ্যমে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে।

মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন হিউজ

দুদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে অবশেষে হেরে গেলেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ফিলিফ হিউজ। আজ  সিডনির একটি হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ২৬ টেস্ট ও ২৫ ওয়ানডে খেলা এই ক্রিকেটারের বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫। ২৫শে নভেম্বর  ঘরোয়া ক্রিকেটের খেলায় প্রতিপক্ষের বোলারের বাউন্সারে সংজ্ঞা হারান হিউজ। সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়।  দুদিন ‘কোমা’য় থেকে মৃত্যুর কাছে পরাজয় বরণ করেন তিনি। গত মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেট প্রতিযোগিতা-শেফিল্ড শিল্ডের একটি ম্যাচে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নিউ সাউথওয়েলসের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন হিউজ। ৬৩ রানে অপরাজিত থাকার সময় প্রতিপক্ষের বোলার শন অ্যাবোটের একটি বাউন্সারই ওলট-পালট করে দেয় সবকিছু। কানের পাশে আঘাত পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সংজ্ঞা হারান তিনি। হাসপাতালে নিবিড়-পরিচর্যাকেন্দ্রে দু’দিন মৃত্যুর সঙ্গে  লড়াই করেও ফিরতে পারলেন না তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম ট্র্যাজিক ঘটনার নায়ক হয়ে মৃত্যুর কাছে হেরে যান তিনি। সিডনির হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল তাঁর মস্তিষ্কে। আঘাতটা এতটাই গুরুতর ছিল যে অস্ত্রোপচারটা কোন কাজেই এল না তার। মৃত্যুর সময় হিউজের সঙ্গে ছিলেন তার মা,  বোন ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন। ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবাগের তার টেস্ট অভিষেক হয়। ২৬ টেস্টে ৩২.৬৫ গড়ে ১৫৩৫ রান করা এই ক্রিকেটারের আছে তিনটি সেঞ্চুরি আর সাতটি ফিফটি। অভিষেক সিরিজেই ডারবানে পরপর দুটি সেঞ্চুরি করে দারুণ সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন হিউজ। তবে ফর্মের ধারাবাহিকতা না থাকার কারণে অস্ট্রেলীয় দলের কখনোই নিয়মিত হতে পারেননি। ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ টেস্ট খেলা হিউজ ভারতের বিপক্ষে আসন্ন টেস্ট সিরিজে নির্বাচকদের বিবেচনায় ছিলেন। অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের চোট তার দলে ফেরা মোটামুটি নিশ্চিতই করে দিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ ফর্মেই ছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবারের ঘটনা শেষ অবধি তাঁকে নিয়ে গেল সব জাগতিক আশা-আকাক্সক্ষা আর প্রত্যাশা-প্রাপ্তির উর্ধ্বেই।

আমেরিকায় দাঙ্গা, লুটপাট

যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের ফার্গুসনে কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর মাইকেল ব্রাউনকে হত্যার রায়ের প্রতিবাদে মঙ্গলবার দাঙ্গা ও লুটপাট শুরু হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ বিক্ষোভকারীদের থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছে। গ্র্যান্ড জুরি কৃষ্ণাঙ্গ ওই কিশোরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়মুক্তি দিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন না করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ফার্গুসনের বাসিন্দারা সহিংস এ বিক্ষোভ করছে। ৯ আগস্ট শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ড্যারেন উইলসনের গুলিতে মাইকেল ব্রাউন (১৮) নিহত হয়। ওই পুলিশ কর্মকর্তা ব্রাউনকে লক্ষ্য করে কমপক্ষে ছয়টি গুলি করেন। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ চলে এবং পুলিশের সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষ হয়। সোমবার গ্র্যান্ড জুরি গুলিবর্ষণকারী পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ফার্গুসন ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভ, দাঙ্গা ও লুটপাট শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ওবামা বলেন, আমিও ব্রাউনের বাবা-মা’র সঙ্গে মিলিতভাবে আহ্বান জানাচ্ছি এ বিক্ষোভ যাতে শান্তিপূর্ণ থাকে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সামলাতে ফার্গুসন ও এ অঞ্চলের আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদেরও আমি সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছি। ফার্গুসনের সেন্ট লুইস এলাকার পুলিশ প্রধান জন বেলমার বলেন, কৃষ্ণাঙ্গ ওই কিশোর নিহত হওয়ার পর গত আগস্টে যে ধরনের সহিংসতা হয়েছিল এখন সম্ভবত তার চেয়ে বেশি সহিংসতা হচ্ছে। তিনি বলেন, জনতার দিক থেকে কমপক্ষে ১৫০টি গুলি ছোড়ার শব্দ শোনা গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি সেখানে রাতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখিনি এবং পুরো ঘটনায় আমি হতাশ। দুর্ভাগ্যক্রমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’ পুলিশ প্রধান বলেন, বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিক্ষোভকারীদের দেয়া আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। পুলিশের দুটি গাড়ি প্রকৃতপক্ষে পুড়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা অপ্রস্তুত ছিলাম না। তবে আমরা ধৈর্য ধারণ করেছি। আমাদের ১০ হাজার পুলিশ সদস্য ছিল।’ আফ্রিকান আমেরিকান কমিউনিটির অনেকে পুলিশ কর্মকর্তা ড্যারেন উইলসনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনার আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত জানার জন্য ফার্গুসন শহরে দুপুর থেকে লোকজন জড়ো হতে থাকে। তবে জুরি বোর্ড রায়ে উল্লেখ করেছে, পুলিশ কর্মকর্তা আত্মরক্ষার্থে গুলি করার ফলে ব্রাউন মারা যান। তাই অভিযোগ থেকে পুলিশ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেয়া হল। এই ঘোষণার পরেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ফার্গুসনের বাসিন্দারা। বিক্ষোভকারীরা বলতে থাকে, জুরি বোর্ডের এ সিদ্ধান্ত বৈষম্যমূলক। বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি স্থানে ব্যারিকেড দেয় এবং পুলিশকে বিদ্রুপ করতে থাকে। রায়কে কেন্দ্র করে সোমবার রাত থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। নিউইয়র্কের টাইম স্কয়ার থেকে শুরু করে শিকাগো, ডেট্রোয়েটসহ কৃষ্ণাঙ্গদের বসবাসরত এলাকায় রাতেই ব্যাপক বিক্ষোভ, সমাবেশ হয়। তবে অন্য এলাকাগুলোতে বিক্ষোভ, সমাবেশ শান্তিপূর্ণ হলেও ফার্গুসন শহরের অবস্থা ভিন্ন। সেখানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছে। ফার্গুসন শহরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। সোমবার মধ্য রাত পর্যন্ত সেখানকার তিনটি ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অনেক দোকানপাটে ভাংচুর এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এএফপি।

কাশ্মীরে প্রথম দফার ভোট শেষ

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরে বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর নির্বাচন বয়কটের মধ্যে মঙ্গলবার প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাঁচ দফার এই বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। জম্মু-কাশ্মীরের ৮৭টি আসনের মধ্যে ১৫টি আসনে প্রথম দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডে ভোটগ্রহণ হয় ১৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে। এই নির্বাচনে জয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য বিধানসভার এ নির্বাচনকে ঘিরে গোটা এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কাশ্মীরের ১৫ আসনে ভোটারের সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাত মন্ত্রীসহ শাসক দলের ১২ বিধায়ক। মোট ১২৩ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হবে প্রথম দফার ভোটে। অন্যদিকে, ঝাড়খণ্ডের ১৩টি বিধানসভা কেন্দ্রই মাওবাদী প্রভাবিত হওয়ায় নিরাপত্তার দিকে বাড়তি নজর রাখা হয়। ঝাড়খণ্ডের বিধানসভার নির্বাচনে রয়েছেন ১৯৯ প্রার্থী। ভোটার প্রায় ৩৪ লাখ। প্রথম দফায় তেরোটির মধ্যে বারোটি আসনে বিজেপি প্রার্থী দিয়েছে। লোহারডাগা আসনটি তারা দিয়েছে জোটসঙ্গী এজেএসইউকে। অন্যদিকে জোট গড়ে লড়ছে কংগ্রেস, আরজেডি এবং জেডিইউ।
কাশ্মীরে স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশ এ ভূখণ্ড তাদের নিজেদের বলে দাবি করে। এ নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে দু’বার যুদ্ধও হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর নেতৃত্বে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সঙ্গে মূল লড়াই পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (পিডিপি) হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ভোটের লড়াইয়ে রয়েছে বিজেপি এবং কংগ্রেসও। এদিকে ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছে হুরিয়ত কনফারেন্স, জেকেএলএফের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো। একইসঙ্গে সাধারণ ধর্মঘটও চলছে। এই অবস্থায় ভোট গ্রহণ নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ প্রশাসন তৎপর ছিল। মোতায়েন করা হয় ৪০০ কোম্পানি নিরাপত্তা রক্ষী। বিজেপি জম্মু ও কাশ্মীরের ৮৭ সদস্যের বিধানসভায় জয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। ট্রাল শহরে বৃহস্পতিবার নির্বাচনী প্রচারণাকালে কাশ্মীরে বিজেপির প্রার্থী অবতার সিং ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রীর উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার গডফাদার মোদি জি’র বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের কারণে কাশ্মীরে জয়ের ব্যাপারে আমি দৃঢ় আশাবাদী।’ কাশ্মীরের স্বাধীনতা বা পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার জন্য ১৯৮৯ সাল থেকে বেশ কয়েকটি বিদ্রোহী সংগঠন ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। সহিংসতায় হাজার হাজার লোক নিহত হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক।

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লন্ডনে বিতর্ক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে লন্ডনে লর্ডসভায় বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিতর্কে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং মানবাধিকার নেতারা অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে এক সেমিনারে অংশ নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে কথা বলেন ঢাকা থেকে আসা দুই দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ লর্ডসভার বাংলাদেশ সংক্রান্ত অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্র“প লর্ডসভার অভ্যন্তরেই একটি কমিটি রুমে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন লর্ড এভিবেরি এবং অ্যান মেইন এমপি। আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন, তারানা হালিম এমপি প্রমুখ। বিএনপি প্রতিনিধিদলে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপির সহসভাপতি সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমশের মবিন চৌধুরী এবং সাংবাদিক সজিব চৌধুরী। এ সেমিনারে লর্ডসভার সদস্য এবং মানবাধিকার নেতারাও বক্তব্য রাখেন। লর্ডসভার প্রতিনিধিদের মধ্যে লর্ড কারলাইন, জেমস ল্যাম্বার্ট, চার্লস টনক প্রমুখ। মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আব্বাস ফয়েজ। বুধবার এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে লর্ড কারলাইন বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার চরমভাবে ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে। দেশটিতে বর্তমানে আইনের শাসন বলতে কিছুই নেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি প্রশ্ন রাখেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা বিদেশে একসঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা করতে পারলে বাংলাদেশে বসে কেন আলোচনা করতে পারবে না। লর্ড এভিবেরি বলেন, বাংলাদেশে বৈধভাবে নির্বাচন হয়েছে এবং বিধি মোতাবেক আগামী পাঁচ বছর পর আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মনিরপেক্ষ সরকার হওয়ায় সেখানে রাষ্ট্র ধর্ম কীভাবে ইসলাম থাকবে। এটা স্ববিরোধিতা।
জবাবে এইচটি ইমাম বলেন, বাংলাদেশের মানুষ গোড়া থেকেই ধর্মভিরু। সেখানে ইসলাম ধর্ম পালন এবং রাষ্ট্রীয় ধর্ম থাকবে।

সিভিল সার্জন মোজাহারের বেপরোয়া দুর্নীতি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদ্য বদলি হওয়া সিভিল সার্জন ডা. মোজাহার হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বদলি বাণিজ্য থেকে পথ্য সরবরাহ এবং জেলার বিভিন্ন ক্লিনিক থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকেও ঘুষ নিয়েছেন নগদে। খেয়েছেন ফ্রি খাবার। পথ্য সরবরাহে একাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ দিয়েছেন যে বেশি টাকা দিয়েছে তাকে। এ নিয়ে কয়েকজন ঠিকাদার তার নামে লিখিত অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। ঠিকাদাররা এখন টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিচ্ছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডা. মোজাহার হোসেন। যুগান্তরকে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা। বর্তমান সিভিল সার্জন পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তৈরি করে ছড়াচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগের অনুলিপি এসেছে যুগান্তরের কাছেও। এতে দেখা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতাল ও ৪ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের পথ্য সরবরাহের জন্য ১৯ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রায় কোটি টাকার এ কাজে ২৫টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেন। এসময় ডা. মোজাহার ঘোষণা দেন যে বেশি (ঘুষ) দেবে তাকেই কাজ দেবেন তিনি। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চলতি ঠিকাদারদের কাছ থেকে দুই লাখ করে এবং সদর হাসপাতালের ঠিকাদারের কাছ থেকে ৫ লাখ করে টাকা ঘুষ নেন।
এক ঠিকাদার যুগান্তরকে বলেন, সদর হাসপাতালের পথ্য সরবরাহের কাজ দেবেন বলে আমার কাছ থেকে তিন মাস আগে টাকা নিয়েছেন। ১৩ নভেম্বর সকালে ডা. মোজাহার গোপনে সদর হাসপাতালের পথ্য সরবরাহের কার্যাদেশ দেন উদয় এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। ওইদিন সকালে কাজ দেয়া হলেও বিকালে আমি ফোন করলে তিনি বলেন, চিন্তা করবেন না আমি আপনাকেই কাজ দেব। একই অভিযোগ শিবগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালের এক সাবেক ঠিকাদারেরও। তিনি বলেন, এভাবে আমাদের বোকা বানিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গোপনে চলে যান নওগাঁ। ডা. মোজাহার হোসেন অনিয়মের মাধ্যমে রাজশাহীর একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছে শিবগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালের। ঠিকাদাররা তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে দিনক্ষণ দিয়ে আর টাকা ফেরত দিচ্ছেন না তিনি।
একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে একটি এমএলএসএসর চাকরি দিয়েছেন ডা. মোজাহার।
জানতে চাইলে বর্তমান সিভিল সার্জন ডা. আলাউদ্দিনযুগান্তরকে বলেন, পথ্য সরবরাহের টেন্ডারে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। কীভাবে কাজ দেয়া হয়েছে সেগুলো পুনঃমূল্যায়নের জন্য তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। অনিয়ম ধরা পড়লে কার্যাদেশ বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হবে।
১৯ আগস্ট ৪ স্যানিটারি ইন্সপেক্টরকে একযোগে বদলি করেন ডা. মোজাহার। এদের একজন শিবগঞ্জের তাজকেরাতুন নেসা। তিনি জানান, বৃদ্ধা শাশুড়ির সেবাযত্নের জন্য সদরে থাকার অনুরোধ করি সাবেক সিভিল সার্জনকে। কিন্তু তাতে রাজি না হয়ে বদলি বাতিলের জন্য তিনি আমার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। শেষে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে ৪ সেপ্টেম্বর তিনি বদলি আদেশ বাতিল করেন। বাকি ৩ জনের কাছ থেকেও তিনি টাকা নেন বদলি আদেশ বাতিলে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের উদয়ন মোড়ের শাজাহান হোটেলের মালিক বলেন, সাবেক সিভিল সার্জনের নাস্তাসহ সব খাবারই আমাদের হোটেল থেকে যেত। কখনো টাকা দিতেন কখনো দিতেন না। একদিন দুপুরে খাবারের সঙ্গে ডাল না দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে সিভিল সার্জন অভিযান চালান হোটেলে। তিনি আরও বলেন, মাসে ৫০ হাজার টাকা করে মাসোহারার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আমাদের হোটেলের খাবারের মান ভালো বলে আমরা তার প্রস্তাবে রাজি হতে পারিনি। তারপরও তাকে ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছিল।
নিজের বদলির আদেশ পাওয়ার পর ডা. মোজাহার হোসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের মডার্ন, আল হেরা, জনসেবা ও নুরজাহান ক্লিনিক থেকে ১ লাখ টাকা করে আদায় করেন। লাইসেন্স বাতিলের ভয় দেখিয়ে এ টাকা নেয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন।
বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় সদস্য ডা. মোজাহার হোসেন ছাত্রজীবনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ছিলেন। সাবেক বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে লোভনীয় এই পদে থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ টাকা অবৈধভাবে কামাই করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নওগাঁ-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনি। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন হিসেবে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন বিএনপির এ সক্রিয় নেতা। ১৯ অক্টোবর নওগাঁ-১ এমপি ও মন্ত্রী এমাজউদ্দিন প্রামাণিককে ম্যানেজ করে বদলি হয়ে যান নিজের জেলা নওগাঁয়। মান্দা উপজেলায় ডা. মোজাহার হোসেনের বাড়ি।

মৃত ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড

মৃত্যুর এক বছর পর বিনোদ বিহারি চৌধুরী নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন চট্টগ্রামের একটি আদালত। ৬ বছরের শিশুকে অপহরণের পর হত্যার অভিযোগে বিনোদ বিহারির বিরুদ্ধে বুধবার এ রায় দেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোহাম্মদ রেজাউল করিম। দণ্ডিত বিনোদ বিহারি বাঁশখালী উপজেলার বাণীগ্রামের হরিরঞ্জন চৌধুরীর ছেলে। মামলা দায়ের পর পলাতক থাকাবস্থায় এক বছর আগে তার মৃত্যু হয়। রায় ঘোষণার পর আদালত মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে আসামির মৃত্যুর বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেন।
আদালত সূত্র জানায়, ২০০৫ সালের ১৩ জানুয়ারি বাঁশখালী উপজেলার বাণীগ্রামের সমীর কান্তি দের শিশুপুত্র রাজেশকে (৬) প্রতিবেশী বিনোদ বিহারি অপহরণের পর দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। ১৫ জানুয়ারি শিশুটির বাবা বাদী হয়ে বাঁশখালী থানায় মামলা করেন। ১ অক্টোবর চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আদালত বুধবার এ রায় দেন।
ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি জেসমিন আক্তার জানান, পুলিশ আসামির মৃত্যুসংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল না করায় বিষয়টি সম্পর্কে আদালত অবগত ছিলেন না।

দোহার থানায় ওপেন হাউস ডে প্রতিবাদ সভায় রূপান্তর

রাজধানীর অদূরে দোহার থানায় ওপেন হাউস ডে রূপান্তরিত হয় প্রতিবাদ সভায়। ওসি মাহমুদুল হকের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে দোহারের কোনো ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বার ওসির ডাকা এই ওপেন হাউস ডেতে যোগ দেননি। আসেননি বীর মুক্তিযোদ্ধা কিংবা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও। তবে ওসির খয়েরখাঁ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সরব উপস্থিতি দেখা গেছে এ অনুষ্ঠানে। যে কারণে সভাটি শেষ পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে সরকারি দলের কয়েকজন নেতার চা চক্রে রূপ নেয়। জানা যায়, দোহারের বিতর্কিত ওসি মাহমুদুল হক নিজের অপকর্ম ঢাকতে বৃহস্পতিবার সকালে থানায় ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এতে তার নিজস্ব বলয়ের কিছু লোক এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের দাওয়াত করা হয়। এরপরও তাদের কয়েকজনের তোপের মুখে পড়েন ওসি। উপস্থিত অনেকে এলাকায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, পুলিশের বেপরোয়া চাঁদাবাজি, বখাটেদের উৎপাত, থানায় মামলা না নেয়া, ঘুষ-বাণিজ্য এমনকি জিডি এন্ট্রি করতেও ঘুষ নেয়ার অভিযোগ তোলেন। এক পর্যায়ে ওসি দাবি করে বলেন, দোহারের কোথাও মাদক নেই। পুলিশ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি ভালো আছে। এটুকু বলেই সবাইকে চা খেতে বলেন ওসি।
এদিকে অনুষ্ঠানে না যাওয়া প্রসঙ্গে মুকসুদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল হালিম যুগান্তরকে বলেন, ওসি মাহমুদুল হক তার মোবাইল ফোনে এসএমএস (ক্ষুদে বার্তা) পাঠিয়ে ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠানের কথা জানান। শুধু একটি এসএমএসের ওপর ভিত্তি করে একজন জনপ্রতিনিধি সেখানে যেতে পারেন না। তাছাড়া একজন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে এটি শোভনীয় আচরণও নয়। এছাড়া এই ওসির কারণে যেখানে দোহারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে তাই তিনি তার এ ধরনের লোক দেখানো সভায় যোগ দিতে চান না।
নয়াবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান শামীম আহমেদও জানান, ওসি এসএমএস পাঠিয়ে ওপেন হাউস ডের কথা জানিয়েছে। তিনি অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব সভায় যোগ দিয়ে কোনো লাভ হবে না। ওসি যোগ দেয়ার পর যা শুরু করেছেন তাতে এ ধরনের সভায় যোগ দিলে সাধারণ মানুষের তোপের মুখে পড়তে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি এলাকায় সম্মানিত ব্যক্তি। তাকে ওপেন হাউস ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে হাজির হওয়ার জন্য চিঠি বা আমন্ত্রণপত্র পাঠানো উচিত। সময়-সুযোগের অভাবে সেটা সম্ভব না হলে অন্তত ফোনে বলা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে একটি এসএমএস পাঠিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা অশোভনীয় ও অভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে। ফলে তারা ওসির অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে হয়রানি ও ঘুষ-বাণিজ্যের বিস্তর যে অভিযোগ রয়েছে তাতে ওসির সভায় যোগ দিলে তাদের ভোট কমে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠানে যারা গিয়েছেন তাদের অনেকে ওসির খয়েরখাঁ হিসেবে পরিচিত। কেউ কেউ ওসির ঘুষ-বাণিজ্যেরও সহযোগী। অথচ ওপেন হাউস ডে করা উচিত ভুক্তভোগী মানুষ ও স্থানীয় সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, রাজনৈতিক দলের নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে। যাতে তারা অসঙ্কোচে তাদের ক্ষোভ ও আইনি সহযোগিতা না পাওয়ার বিষয় তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু দোহার থানায় ওপেন হাউস ডের ক্ষেত্রে সেটি করা হয়নি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল হুদা, ভাইস চেয়ারম্যান মাসুদ পারভেজ, থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম বাবুল, সাধারণ সম্পাদক আলী আহসান খোকন ও কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা।