Thursday, March 26, 2026

সাদ্দাম থেকে মাদুরো: ইতিহাস কেন বারবার ফিরে আসে by আব্দুলরহমান আল রাশেদ

ভেনেজুয়েলার দুই ‘সাবেক’ নেতা প্রয়াত হুগো চাভেজ এবং তাঁর উত্তরসূরি নিকোলা মাদুরোকে অনেক দিক থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের কিছু পরিচিত চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তুলনা করা যায় সাদ্দাম হোসেন, আয়াতুল্লাহ খোমেনি কিংবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সঙ্গে। তাঁরা সবাই ছিলেন বক্তৃতা, জনতুষ্টির স্লোগান ও অর্জনহীন শাসনের জন্য পরিচিত।

জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে নিয়ে চাভেজের সেই বিখ্যাত মন্তব্য কেই–বা ভুলতে পারে! তিনি বলেছিলেন, গতকাল এখানে শয়তান এসেছিল এবং আজও গন্ধটা সালফারের মতো রয়ে গেছে। অন্যদের মতো তিনিও অবাস্তব লড়াইয়ে নেমেছিলেন। বাস্তবে তাঁর শাসনকাল কেটেছে অবরুদ্ধ অবস্থায় এবং শেষ পর্যন্ত পরাজয়ই ছিল তাঁর পরিণতি।

বাক্পটু চাভেজের পর এলেন মাদুরো। একজন সাধারণ মানুষ। পেশায় ছিলেন বাসচালক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। তিনি পূর্বসূরির পথেই হাঁটলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিদ্রূপ করাই তাঁর প্রিয় বিষয় হয়ে উঠল।

কিন্তু হোয়াইট হাউসে বসা নতুন শাসকের চরিত্র  মাদুরো বুঝতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে ধরতে পারবেন না। আলোচনার পথে না গিয়ে তিনি নিজেকে প্রাসাদে বন্দী করলেন এবং প্রেসিডেন্ট ভবনকে ভারী অস্ত্রসজ্জিত দুর্গে পরিণত করলেন। এরপর মাদুরোর পরিণতি হয়েছে অনেকটা ২০০৩ সালের সাদ্দামের মতো।

ইরাকের নেতা সাদ্দাম বিস্ময়ে দেখেছিলেন, মার্কিন সেনাদের বহর দজলা নদীর পাড় ধরে বাগদাদের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসছে। তখন সাদ্দাম তড়িঘড়ি পালিয়ে যান। তবে খুব শিগগির নিজের লোকের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি ধরা পড়েন এবং মার্কিন সেনাদের হাতে বন্দী হন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকেও একইভাবে পায়জামা পরা অবস্থায় নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট বললেন, মাদুরোর পরিণতি অন্য নেতাদের জন্য শিক্ষা। কিউবা, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টদের জন্য এটি মাদক পাচারকে প্রশ্রয় না দেওয়ার সতর্কবার্তা।

লাতিন আমেরিকার সমাজ আরব সমাজের মতোই। সেখানে দেশগুলোকেও আত্মমগ্ন ও জনতুষ্টিবাদী নেতাদের বোঝা বইতে হয়। আমি ২০০৭ সালে কারাকাস গিয়েছিলাম। তখন শহরটিকে সুন্দর ও পরিষ্কার মনে হয়েছিল। শহরটিকে ঘিরে বেশ কিছু বস্তি ছিল। আমাদের গাইড আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বস্তিবাসীরা সবাই অভিবাসী। উন্নত জীবনের আশায় লাখ লাখ মানুষ এই তথাকথিত ধনী দেশে এসে জড়ো হয়েছে।

বিপ্লবী সরকারের নীতির ফলে জীবনযাত্রার মান দ্রুত খারাপ হতে থাকে। শহরে সশস্ত্র লোকজন দেখা যেত প্রায়ই। তারা পুলিশ ছিল না। ছিল নির্দিষ্ট ভবন পাহারা দেওয়ার জন্য ভাড়া করা বেসামরিক লোক। আমাদের হোটেলের পার্কিংয়ের প্রবেশপথেও তারা ছিল। তখন এক ডলার সমান ছিল দুই বলিভার। চাভেজ এবং পরে মাদুরোর শাসনে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যায়। মুদ্রার মান নেমে আসে ১ ডলারে বা প্রায় ৫০০ বলিভারে। দারিদ্র্যের চাপে ৫০ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ কেন মহাদেশজুড়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে! কেন একজন প্রেসিডেন্ট শীতল যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যাওয়া বিপ্লবী ভঙিমা আঁকড়ে থাকবেন! দৃশ্যটা ছিল লিবিয়ার মতোই। সম্পদে ভরপুর কিন্তু বাস্তবে দরিদ্র একটি দেশ। মাদুরো এখন আটক। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি চাভেজের ছায়ায় ছিলেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি চাভেজকে অনুকরণ করে শাসন করেছেন; কিন্তু মাদুরো যেখানে একজন সাধারণ মানুষ, সেখানে চাভেজ ছিলেন গভীর ও আদর্শ দ্বারা চালিত একজন নেতা। তিনি তেলসমৃদ্ধ দেশে বিপ্লবী বাগ্মিতাকে বৈধতা দেন। মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বের করে দেন। বড় বিনিয়োগ জাতীয়করণ করেন।

চাভেজ নিজেকে একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে তুলে ধরতেন। কবি ও লেখকদের দ্বারা নিজেকে ঘিরে রাখতেন। লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসও ছিলেন তাঁর বন্ধুদের একজন। চাভেজ নিজেকে ভেনেজুয়েলার ঐতিহাসিক নেতা সিমন বলিভারের উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করতেন। প্রেসিডেন্ট হয়েও তিনি সাপ্তাহিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান করতেন। একবার টানা আট ঘণ্টা কথা বলেছিলেন।

অবশ্য তাঁর কথার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান ছিল বিশাল। দারিদ্র্য বাড়ছিল। বেকারত্ব বাড়ছিল। গ্রেপ্তারও বাড়ছিল। চাভেজ ৫৮ বছর বয়সে কিউবার একটি ক্লিনিকে ক্যানসারে মারা যান। যদিও কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, তাঁর শরীরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। তাঁর জায়গায় আসেন মাদুরো। তিনি রাজনীতিতে চাভেজকে অনুকরণ করলেও চাভেজের বাগ্মিতা মাদুরোর ছিল না।

আমরা জানি, ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরিদের মতো নেতা নন। তাঁর আগের প্রেসিডেন্টরা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক একঘরে করার নীতিতে ভরসা করেছিলেন। ট্রাম্প ভিন্ন পথ নেন। তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ে এক আঘাতেই সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। তিনি সরকার পরিবর্তন চাননি। বরং মাদুরোকেই লক্ষ্য করেন এবং ভেনেজুয়েলার উপপ্রধানের সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হন। যে নেতারা ট্রাম্পের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, তাঁদের জন্য কারাকাসের ঘটনা একটি স্পষ্ট বার্তা। সতর্ক থাকুন, ট্রাম্প জেতার জন্য সবই করতে পারেন।

* আব্দুলরহমান আল রাশেদ, মধ্যপ্রচ্যের সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ।
- আরব নিউজ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-03%2F4jc7ok6i%2FVenezuela-1.jpg?rect=0%2C0%2C1774%2C1183&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নিকোলা মাদুরো। ছবি: রয়টার্স

‘বেরাদারান-ই-মিল্লাত’ বলার পরপরই দুই গুলিতে মঞ্চে ঢলে পড়লেন লিয়াকত আলী খান by শামিমা নাসরিন

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে তীব্র সংঘর্ষে দুই পক্ষের প্রায় ২৫০ জন নিহত হন। সীমান্তে এই সংঘর্ষ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। যদিও দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এই বৈরীভাব নতুন নয়। স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে ভরা জনসমাবেশে, এক লাখ মানুষের সামনে গুলি করে হত্যা করেছিলেন এক আফগান।

দিনটি ছিল ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে চার বছর আগে স্বাধীনতা লাভ করেছে পাকিস্তান। স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। তিনি জনসভায় ভাষণ দেবেন, জনগণের সামনে নিজের দেশ পরিচালনা নীতির ব্যাখ্যা দেবেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনতে সারা দেশ থেকে দলে দলে মানুষ রাওয়ালপিন্ডি আসছিলেন। পাকিস্তান মুসলিম লিগ (রাওয়ালপিন্ডি) ওই জনসমাবেশের আয়োজন করেছিল।

ভাষণে প্রধানমন্ত্রী কী বলবেন, তা জানতে যেমন সেদিন দেশের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, তেমনি লিয়াকত আলী নিজেও জনগণকে বিস্ময় উপহার দিতে চেয়েছিলেন। রাওয়ালপিন্ডি রওনা হওয়ার আগে স্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, এটা হবে একটি নীতিনির্ধারণী ভাষণ।

পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনে লিয়াকত আলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। দেশটির জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ডান হাত বলে পরিচিত ছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তার কমতি ছিল না।

তারপরও কেন লিয়াকত আলী খানকে খুন হতে হলো, সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।

লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ড ঘিরে সে সময় সবচেয়ে বেশি রহস্যময় আচরণ করেছিল পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। ঠিক কী কারণে, কার ইশারায় জনপ্রিয় এই প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে খুন হতে হলো, তা খুঁজে বের করা নিয়ে তাদের মধ্যে ‘অনীহা’ দেখা গিয়েছিল।

দেশে-বিদেশে অনেক সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক এ রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করছেন। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে কয়েকটি ষড়যন্ত্র তত্ত্বও আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান হত্যা রহস্যের কিনারা কেউ করতে পারেনি।

যেদিন খুন হন

১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর, রাওয়ালপিন্ডির কোম্পানিবাগ সকাল থেকে জনারণ্য। বিকেলে সেখানে বক্তৃতা দেবেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। সমাবেশ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সেদিন প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনতে কোম্পানিবাগে প্রায় এক লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন।

বিকেল চারটার দিকে সমাবেশস্থলে আসেন প্রধানমন্ত্রী। প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঞ্চে বক্তৃতা দিতে ওঠেন তিনি।

সেদিনের সেই মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল লিয়াকত আলীর ব্যক্তিগত নির্দেশে। তিনি আয়োজকদের স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, তিনি যখন ভাষণ দেবেন, তখন মঞ্চে তাঁর পাশে আর কেউ থাকবে না। মঞ্চে তিনি একা থাকবেন এবং মঞ্চের ওপর কোনো শামিয়ানা থাকবে না।

সারা দেশ থেকে অসংখ্য ভক্ত ও অনুরাগীর পাঠানো চিঠির জেরে লিয়াকত আলী এসব নির্দেশনা দিয়েছিলেন। চিঠিতে সবাই অনুরোধ করেছিলেন, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে নিজ চোখে ভালো করে দেখতে চান।

তাই মঞ্চের ওপর রাখা হয়েছিল একটি মাইক্রোফোন, একটি চেয়ার ও একটি টেবিল। মঞ্চের উচ্চতা ছিল প্রায় সাড়ে চার ফুট।

কে জানতে, এভাবে অনুসারীদের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে লিয়াকত আলী খুনির সহজ নিশানায় পরিণত হবেন। মঞ্চে উঠে সবে তিনি বলেছেন ‘বেরাদারান-ই-মিল্লাত’...।

তখনই পরপর দুটি গুলির শব্দ, উপস্থিত জনতা দেখলেন মঞ্চের ওপর ঢলে পড়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। সে নীরবতা ভাঙে তৃতীয় গুলির শব্দে।

লোকজন ছুটতে শুরু করেন, সবার মুখে এক কথা, ‘কায়েদ-ই-মিল্লাত মারা গায়া’ (প্রধানমন্ত্রী মারা গেছেন)।

হামলাকারীর ছোড়া একটি গুলি লিয়াকত আলীর বুকের বাঁ পাশে লাগে। তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়, করা হয় অস্ত্রোপচার। কিন্তু তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তখন লিয়াকত আলীর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।

লিয়াকত আলী খান খুন হওয়ার পর কোম্পানিবাগের নাম বদলে রাখা হয় লিয়াকত গার্ডেন। লিয়াকত আলী খুন হওয়ার ঠিক ৫৬ বছর পর ২০০৭ সালে এই লিয়াকত গার্ডেনেই গুপ্তহত্যার শিকার হন পাকিস্তানের আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো।

লিয়াকত আলীর আফগান খুনি

লিয়াকত আলী খান খুন হওয়া নিয়ে ভারতীয় লেখক এম এস ভেঙ্কটারমনি তাঁর বই ‘দ্য আমেরিকান রোল ইন পাকিস্তান’–এ লেখেন, লিয়াকত আলী খানের খুনির ছোড়া একটিমাত্র বুলেট দেশটির রাজনীতির পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে প্রমাণিত হয়।

লিয়াকত হত্যাকাণ্ডের পরপরই পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সাঈদ আকবর বাবরাক নামে একজনকে প্রধানমন্ত্রীর খুনি বলে ঘোষণা করেন। শুরুতে সংশয় থাকলেও পর তাঁরা বলেন, সাঈদ আফগানিস্তানের নাগরিক।

কিন্তু আফগান সরকার পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ওই দাবি অস্বীকার করে। রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য সাঈদের আফগান নাগরিকত্ব আগেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান তাঁরা।

সাঈদ ১৯৪৭ সালের জানুয়ারিতে অবিভক্ত ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন। সে সময়ের ব্রিটিশ শাসকেরা সাঈদকে শরণার্থীর মর্যাদা দিয়ে নর্থ ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সে (বর্তমানে খাইবার পাখতুনখাওয়া) আশ্রয় দেন। ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে শরণার্থী হিসেবে সাঈদকে ভাতা দেওয়া হচ্ছিল।

ঘটনাস্থলেই কেন হত্যা করা হয় হামলাকারীকে

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ মঞ্চের ঠিক উল্টো দিকে দর্শক আসনের একেবারে সামনের সারি থেকে গুলি চালিয়েছিলেন সাঈদ। দর্শক আসনের ওই সারি রাখা ছিল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) কর্মকর্তাদের জন্য। একজন সাধারণ মানুষ হয়ে সাঈদ সেখানে কীভাবে পৌঁছালেন?

সাঈদ প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার পরপর আশপাশের লোকজন তাঁর ওপর তীব্র আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মৃতদেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয়। হাজারো আঘাতের সঙ্গে সাঈদের মৃতদেহে তিনটি গুলির ক্ষতচিহ্ন ছিল। ভিড়ের মধ্যে কে সাঈদকে গুলি করে?

পরে সেখানে উপস্থিত এক পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেন, তাঁর ছোড়া অন্তত একটি গুলি সাঈদের গায়ে লেগেছে। একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি খুনিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছেন।

ঘটনাস্থলে হামলাকারীর মৃত্যু লিয়াকত হত্যারহস্য জটিল করে তোলে

সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বলা হয়, গণপিটুনি থেকে বাঁচিয়ে সাঈদকে জীবিত আটকের সুযোগ পুলিশের হাতে ছিল। সাঈদের মৃত্যু লিয়াকত হত্যারহস্যকে গভীর অন্ধকারে ঠেলে দেয়। প্রশ্ন ওঠে, সাঈদকে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে খুন করার পর মুখ বন্ধ করতে তাঁকেও কি ঘটনাস্থলে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়?

হত্যার পর সাঈদের পকেটে প্রায় ২ হাজার রুপি পাওয়া যায়। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে তাঁর বাড়ি তল্লাশি করে পাওয়া যায় আরও ১০ হাজার রুপি। তখনকার প্রেক্ষাপটে এটা বেশ বড় অঙ্কের অর্থ। সাঈদের কাছে এত রুপি পাওয়ায় কেউ কেউ ধরে নেন, তিনি ভাড়াটে খুনি ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীকে খুন করতেই তাঁকে ভাড়া করা হয় এবং মুখ বন্ধ করতে তাঁকেও ঘটনাস্থলে হত্যার বন্দোবস্ত করেন চক্রান্তকারীরা।

যদিও এমন ধারণার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

লিয়াকত হত্যা নিয়ে যত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

কার ইশারায়, কী কারণে গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছিলেন লিয়াকত আলী খান, তা নিয়ে বেশ কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পাওয়া যায়। অনেকের মতে, তাঁকে হত্যার পেছনে বিদেশি শক্তির হাত ছিল। কেউ কেউ বলেন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল।

লিয়াকতের কমিউনিস্টবিরোধী ও পশ্চিমাপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসকেরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র লিয়াকতকে খুন করিয়েছে।

লিয়াকত হত্যার ৬৪ বছর পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক গোপন নথি প্রকাশ পায়। সেখানে দাবি করা হয়, তৎকালীন আফগান সরকারের সহায়তায় লিয়াকত আলীকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।

ওই নথিতে আরও দাবি করা হয়, গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ইরানে তেল-সংশ্লিষ্ট চুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য লিয়াকত আলী খানকে অনুরোধ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় লিয়াকতের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু লিয়াকত যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে রাজি হননি; বরং তিনি পাকিস্তান থেকে মার্কিন বিমান ঘাঁটি সরানোর দাবি তোলেন। এ কারণে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে সিআইএ।

কেউ কেউ আবার খুনি সাঈদ আকবরের ব্যক্তিগত ক্ষোভের কথাও বলেন। সাঈদ আফগান পশতু ছিলেন। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকতের মৃত্যু একটি ঐক্যবদ্ধ পাখতুনিস্তান (পশতুনিস্তান) গঠনের পথ প্রশস্ত করতে সহায়তা করবে।

এসব তত্ত্বের কোনোটিই কেউ প্রমাণ করতে পারেনি।

তদন্ত কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু

লিয়াকত আলী খান হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার ছিল নবাবজাদা এইতজাজউদ্দিনের হাতে। নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্ক জানাতে তিনি আকাশপথে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু পথে বিমানের ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায় এবং সেটি বিধ্বস্ত হয়। সব আরোহী মারা যান। সেই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায় তদন্তের সব নথিপত্রও।

সংবাদমাধ্যমের রহস্যজনক ভূমিকা

প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত হত্যার খবর প্রকাশ নিয়ে সে সময় পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলো রহস্যজনক আচরণ করেছিল। তারা হত্যার কারণ না খুঁজে সন্দেহভাজন খুনি সাঈদের ওপর খবর প্রকাশে বেশি মনোযোগ দেয়।

প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেই সময় পাকিস্তান সরকার থেকে দেওয়া নানা বিবৃতিও ছিল পরস্পরবিরোধী। যে কারণে সরকারের ওপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে যায়।

পরদিন পাকিস্তানের জাতীয় দৈনিক এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত খবরও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। বিকেল প্রায় সাড়ে চারটার দিকে গুলি খান প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে হাসপাতালে নিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় নেওয়া হয়। হাসপাতালে নিতে দেরি হওয়ায় প্রচুর রক্তক্ষরণে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা আরও গুরুতর হয়ে পড়েছিল।

হাসপাতালে নেওয়ার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে মারা যান প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ সন্ধ্যার মধ্যেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন দেশের বেশির ভাগ জাতীয় দৈনিকে লিয়াকতের অবস্থা নিয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য জনগণ পায়নি।

ওই সময়ে উর্দু ভাষায় প্রকাশিত পাকিস্তানের দুই শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র দৈনিক ইমরোজ (করাচি) ও দৈনিক জমিদার (লাহোর) প্রধানমন্ত্রীকে গুপ্তহত্যা নিয়ে কোনো খবর প্রকাশ করেনি।

১৭ অক্টোবর ১৯৫১ সালে ডেইলি পাকিস্তান টাইমস অথবা ডেইলি সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গেজেটে আগের দিনের ঘটনা নিয়ে কোনো ছবি ছাপা হয়নি।

তবে কি পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় কিছু আড়াল করতে চেয়েছিল? কেন ১৬ অক্টোবরের ঘটনার ছবি জনগণের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল?

লিয়াকত হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে কি তাহলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের গোপন আঁতাত ছিল?

সে সময় ওঠা এমন আরও অনেক প্রশ্নের জবাব আজও পাওয়া যায়নি।

আইয়ুব খানের স্মৃতিকথা

পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান তাঁর স্মৃতিকথা ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বইয়ে লিয়াকত আলী খান হত্যা–পরবর্তী পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। মেজর জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রথম সেনাপ্রধান। লিয়াকত আলী খান তাঁকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

আইয়ুব খান তাঁর স্মৃতিকথায় লেখেন, ‘পাকিস্তানে ফিরে আমি করাচির নতুন মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তাঁদের মধ্যে ছিলেন (নতুন) প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, মুস্তাক আহমদ গুরমানিসহ আরও কয়েকজন। তাঁদের কেউই লিয়াকত আলী খানকে নিয়ে কোনো কথা বলেননি। এমনকি আমি তাঁদের কারও মুখ থেকে সমবেদনা বা দুঃখ প্রকাশ করে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে শুনিনি।’

লিয়াকত আলী খান খুন হওয়ার সময় আইয়ুব খান লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

পাকিস্তানে ফিরে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের আচরণ দেখে আইয়ুব খানের মনে হয়েছিল, দেশের একজন প্রখ্যাত ও যোগ্য প্রধানমন্ত্রী যে খুন হয়েছেন, সেই সত্যের বিষয়ে তিনি যেন কিছুই অবগত নন।

প্রধানমন্ত্রী খুন হওয়া তাঁদের পেশাজীবনে নতুন এক সূচনা এনে দিয়েছিল বলেই মনে হয়েছিল আইয়ুব খানের।

আইয়ুব খান আরও লেখেন, ‘এটা ঘৃণ্য ও বিদ্রোহপূর্ণ ছিল। এটি হয়তো কঠোর শোনাবে, কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে হচ্ছিল, তাঁরা সবাই যেন স্বস্তি বোধ করছেন। মনে হচ্ছিল, তিনি (লিয়াকত আলী) একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, যিনি তাঁদের শাসনে রাখতে পারতেন। এখন তিনি দৃশ্যপট থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছেন।’

এরপর সময় অনেক গড়িয়েছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের রাজনীতি থেকে পাকিস্তান ও দেশটির সরকার আর বের হতে পারেনি। স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রী নিজের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। মেয়াদ শেষের আগেই তাঁদের ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্য ডন, ব্রিটানিকা, কোরা ডটকম, দ্য পাকিস্তান টাইমস (লাহোর)

পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান
পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। ছবি: পাকিস্তান সরকারের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

‘প্রাচ্যের নক্ষত্র’ উম্মে কুলসুম কীভাবে মোসাদের লক্ষ্যবস্তু হলেন

মিডল ইস্ট আই, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ১৯৭৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ভোরের সেই লগ্নে থমকে গিয়েছিল গোটা আরব বিশ্ব। মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের পর কায়রোর রাজপথে দ্বিতীয় বৃহত্তম শোকমিছিল দেখা গিয়েছিল সেদিন। প্রিয় শিল্পীকে শেষবিদায় জানাতে রাস্তায় নেমেছিলেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ।

উম্মে কুলসুমকে স্মরণ করা হয় ‘লেডি অব অ্যারাবিক সং’ বা আরবি সংগীতের সম্রাজ্ঞী হিসেবে। কয়েক দশক ধরে তাঁর কণ্ঠ এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল আরব বিশ্বকে। রেডিওতে তাঁর মাসিক লাইভ কনসার্টের প্রচার চলাকালে শহরগুলোর ব্যস্ততা থমকে যেত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রেম, বিরহ আর আকুলতার ভাষা হয়ে উঠেছিল তাঁর গান।

তবে কুলসুমের প্রভাব শুধু মঞ্চেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মৃত্যুর ৫০ বছর পর সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা কিছু তথ্য নতুন করে আলো ফেলছে এ কিংবদন্তির জীবনের ওপর। দাবি করা হচ্ছে, তাঁর কণ্ঠস্বর এতটাই শক্তিশালী ছিল যে কয়েক দশক আগেই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ‘হিট লিস্ট’ বা গুপ্তহত্যার তালিকায় নাম উঠেছিল তাঁর।

ফিলিস্তিনের ‘প্রাচ্যের নক্ষত্র’

ব্যাপক সংঘাতে সীমান্তগুলো এত বিভক্ত হওয়ার আগে লেভান্ট অঞ্চলে (ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলীয় মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল) সংযোগের সেতু হিসেবে কাজ করত উম্মে কুলসুমের গান। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে তিনি অন্তত তিনবার ফিলিস্তিন সফর করেন। জাফা, হাইফা ও জেরুজালেমের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে গান গেয়েছেন তিনি।

বিখ্যাত ফিলিস্তিনি সংগীতশিল্পী ওয়াসিফ জওহরিয়ার নথিতে উম্মে কুলসুমের সেই সফরের বর্ণনা পাওয়া যায়। ট্রেনের বগিতে শহর থেকে শহরে ঘুরে তিনি গেয়েছেন ‘এন কোন্ত আসমেহ’–এর (যদি আমি ক্ষমা করি) মতো কালজয়ী গানগুলো। জনশ্রুতি আছে, ফিলিস্তিনের এক থিয়েটারে তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে এক ভক্ত চিৎকার করে তাঁকে ‘কাওকাব আল-শার্ক’ বা ‘প্রাচ্যের নক্ষত্র’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

কুলসুমের এই পরিবেশনাগুলো ছিল সমৃদ্ধ ফিলিস্তিনি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রমাণ। সেখানে প্রাণবন্ত থিয়েটার ও সাহিত্যজগৎ গড়ে উঠেছিল। জামিল আল-বাহরি ও নাজিব নাসসারের মতো ব্যক্তিত্বরা ছিলেন সেই অঙ্গনের অংশ। ১৯৪৮ সালের নাকবার (ফিলিস্তিনিদের ওপর নেমে আসা বিপর্যয়) পর এই জগৎ অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে যায়।

জাতীয় মিশন ও মোসাদের নজর

ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উম্মে কুলসুমকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়। ১৯৪৯ সালের জুলাইয়ে মিসরীয় সংবাদপত্র ‘আল বালাগ’ খবর প্রকাশ করে যে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় রেডিওতে উম্মে কুলসুম ছাড়াও সালিমা পাশা মুরাদ, সিহাম রিফকিসহ বেশ কয়েকজন আরব শিল্পীর বিরুদ্ধে ‘মৃত্যুদণ্ড’ ঘোষণা করা হচ্ছে।

এই শিল্পীদের ‘অপরাধ’ ছিল, ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় আরব সেনাবাহিনী ও জনগণের মনোবল চাঙা করা। ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর সেই কথিত দণ্ড তুলে নেওয়া হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ উম্মে কুলসুমের গানকে নিছক বিনোদন নয়; বরং নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেছিল।

তবে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পরাজয় বা ‘নাকসা’র পর উম্মে কুলসুমের রাজনৈতিক ভূমিকা আরও বলিষ্ঠ হয়। পরে তিনি সেই সময়ের কথা স্মরণ করেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে আল-হিলাল ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘১৯৬৭ সালের নাকসার পর আমি হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করিনি। আমার সামনে দুটো পথ ছিল। চুপ করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অথবা আমার অস্ত্র—“আমার কণ্ঠ” নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ও যুদ্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা দেওয়া। আমি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলাম।’

মিসরীয় সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠনের জন্য কুলসুম ব্যাপক তহবিল সংগ্রহের অভিযান শুরু করেন। একে তিনি অভিহিত করেন ‘জাতীয় মিশন’ হিসেবে। এই মিশন তাঁকে আরব বিশ্বের বিভিন্ন মঞ্চে নিয়ে যায়। ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে তিনি প্যারিসের অলিম্পিয়া থিয়েটারেও গান পরিবেশন করেন। সেখানে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।

এ কনসার্ট ছিল ব্যতিক্রমী। ইতিহাসবিদ নামিক সিনান তুরান বলেন, প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গলের অনুরোধে অলিম্পিয়ার পরিচালক ব্রুনো কোকাত্রিক্স কুলসুমকে আমন্ত্রণ জানান। অলিম্পিয়া থিয়েটারে গান পরিবেশনের আগে মিসরের বেতার উপস্থাপক জালাল মোয়াওয়াদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আজ প্যারিসে গাইছেন উম্মে কুলসুম, কাল গাইবেন অধিকৃত জেরুজালেমে’।

এ কথা শুনে থিয়েটারের পরিচালক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পর্দার পেছনে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু উম্মে কুলসুম নিজ অবস্থানে অটল ছিলেন। কুলসুম দৃঢ়ভাবে বলেন যে তিনি একটি জাতীয় মিশনে রয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এতে যদি আপনাদের লজ্জা হয়, তবে আমরা সব গুছিয়ে চলে যাব।’ শেষ পর্যন্ত তিনি সেই দ্বন্দ্বে জয়ী হন। ঘোষণাটি আবার দেওয়া হয় এবং দর্শকদের তুমুল করতালিতে থিয়েটার মুখর হয়ে ওঠে।

‘অপারেশন কাউ’স আইজ’

সাংবাদিক তৌহিদ মাগদির লেখা ‘উম্মে কুলসুম অ্যান্ড দ্য মোসাদ: সিক্রেটস অব অপারেশন কাউ’স আইজ’ বইয়ে মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা নথির বরাতে বলা হয়, মোসাদ কীভাবে তাঁর ওপর নজরদারি চালাত। কায়রোতে কুলসুমের বাড়িতে আড়িপাতার চেষ্টা থেকে শুরু করে তাঁকে ভয় দেখিয়ে তহবিল সংগ্রহ বন্ধ করার নানা ছক এঁকেছিলেন ইসরায়েলি গোয়েন্দারা।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, উম্মে কুলসুম একক প্রচেষ্টায় ১২টি আধুনিক ট্যাংক বা পাঁচটি যুদ্ধবিমান কেনার মতো অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। বইটিতে দাবি করা হয়েছে, মোসাদ তাঁকে হত্যার জন্য একজন গ্রিক এজেন্টকে নার্স সাজিয়ে পাঠানোর পরিকল্পনাও করেছিল। তাঁর হাঁটুর দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সুযোগ নিয়ে বিষপ্রয়োগে হত্যার সেই চেষ্টা সফল হয়নি। অভিযানটি ব্যর্থ হলেও এটি প্রমাণ করে যে আরব প্রতিরোধের স্তম্ভ হিসেবে তাঁর অবস্থান কতটা উঁচুতে ছিল।

বিতর্ক ও উত্তরাধিকার

২০২০ সালে ইসরায়েলের লোদ ও হাইফা পৌরসভা উম্মে কুলসুমের নামে রাস্তার নামকরণের সিদ্ধান্ত নিলে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। সমালোচকেরা তাঁর বিরুদ্ধে ‘ইহুদি নিধনের’ গান গাওয়ার বানোয়াট অভিযোগ আনেন। মূলত বিতর্কটি ছিল ১৯৬৮ সালের ‘আসবাহা আনদি আলানা বুন্দুকিয়াহ’ (আমার এখন একটি রাইফেল আছে) গানটি নিয়ে। সিরীয় কবি নিজার কাব্বানির লেখা সেই গানে প্রকৃতপক্ষে ছিল (আরব) প্রতিরোধ ও ঘরবাড়ি হারানোর আর্তনাদ।

ব্যক্তিগত জীবনে উম্মে কুলসুম অনেক ইহুদি শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন। সুরকার দাউদ হোসনি ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ। তাঁর এক প্রিয় বন্ধু ছিলেন ইহুদি অভিনেত্রী রাকিয়া ইব্রাহিম। তবে রাজনৈতিকভাবে কুলসুম ছিলেন জায়নবাদ ও উপনিবেশবাদের ঘোর বিরোধী। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে তিনি তাঁর শিল্পকে আলাদা করেননি।

১৯৭০–এর দশকের শুরুর দিকে উম্মে কুলসুমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাঁর শেষ পরিবেশনা ‘লাইলাত হোব’ (ভালোবাসার এক রাত)–এ সংগীতশিল্পীরা লক্ষ করেন, প্রকৃতির শক্তির মতো যে কণ্ঠ একসময় গর্জে উঠত, তাতে ভঙ্গুরতা দেখা দিয়েছে। শেষবারের মতো পর্দা নামার পর মঞ্চে নেমে আসে এক ‘সীমাহীন নীরবতা’।

মৃত্যুর অর্ধশতক পরও উম্মে কুলসুম শুধু একজন গায়িকা নন। তিনি রেডিওর প্রতিধ্বনি, হারিয়ে যাওয়া বহু সাংস্কৃতিক ফিলিস্তিনের প্রতীক এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি গানও যে দুর্গের মতো শক্তিশালী হতে পারে; তার স্মারক হয়ে আছেন।

অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্‌

মিসরের গায়িকা, গীতিকার ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী উম্মে কুলসুমের প্রতিকৃতি। তিনি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত হন। ছবিটি তোলা হয় ২০২৪ সালের ২ জুলাই কায়রোর একটি ক্যাফেতে আয়োজিত প্রদর্শনীতে
মিসরের গায়িকা, গীতিকার ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী উম্মে কুলসুমের প্রতিকৃতি। তিনি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত হন। ছবিটি তোলা হয় ২০২৪ সালের ২ জুলাই কায়রোর একটি ক্যাফেতে আয়োজিত প্রদর্শনীতে। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র বলছে আলোচনা চলছে, ইরান বলছে ‘না’: কে আসলে সত্য বলছে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ জোরালো গলায় বলছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে প্রায় এক মাস আগে তিনি যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা শেষ করতে ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার তাঁর এ দাবি অস্বীকার করেছেন।

যুদ্ধের দামামা আর সব পক্ষের প্রচার-প্রচারণার ভিড়ে কার কথা বিশ্বাসযোগ্য, তা বোঝা কঠিন। তবে প্রতিটি পক্ষ আলোচনা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি থেকে কী পেতে পারে, তার একটি বিশ্লেষণ থেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার খোলার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্প বলেছিলেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি ‘শীর্ষ’ কর্মকর্তার সঙ্গে ‘খুব ভালো’ আলোচনার পর ‘ঐকমত্যের বড় কিছু জায়গা’ তৈরি হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি ইরানকে ইতিবাচক সাড়া দিতে যে পাঁচ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তা চলতি সপ্তাহের শেয়ারবাজারের লেনদেন শেষ হওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়।

অনেকে এই সময়ের বিষয়টিকে বাঁকা চোখে দেখছেন। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে গত সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলে ১২০ ডলারে উঠেছিল। ট্রাম্পের এই আলোচনার কথা বলার উদ্দেশ্য হতে পারে বাজারকে স্থিতিশীল করা।

একই সঙ্গে, ওয়াশিংটন যদি ইরানি ভূখণ্ডে কোনো ধরনের স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তবে এই আলোচনার খবরটি মার্কিন সেনাদের সেখানে পৌঁছানোর জন্য বাড়তি কিছু সময়ও দিতে পারে।

ট্রাম্পের উদ্দেশ্য নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ—যাঁকে অনেকে ট্রাম্পের উল্লেখ করা সেই শীর্ষ কর্মকর্তা বলে মনে করছেন। গালিবফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, তা থেকে বাঁচতেই এই ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে।’

শেয়ারবাজার ও তেলের দামের এই প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্পের জন্যই নয়, ইরানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তার ওপর নির্ভর করছে তেহরানের সুবিধা–অসুবিধা।

ইরান চায়, এই যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সমস্যার মুখে পড়ুক। এর ফলে ভবিষ্যতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর হামলার আগে অন্তত দুবার ভাববে। ফলে বাজার শান্ত করতে আলোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া যেমন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ, তেমনি আলোচনাকে অস্বীকার করে বাজারকে অস্থির রাখা এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে কোনো স্বস্তি না দেওয়াও ইরানের কৌশলের অংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের লাভ কী

আলোচনা নিয়ে দুই পক্ষই যার যার মতো বয়ান দিচ্ছে। তাদের প্রকাশ্য মন্তব্য থেকে আসলে বোঝার উপায় নেই, আড়ালে কোনো আলোচনা হচ্ছে কি না, হলেও তা কোন পর্যায়ে আছে। তবে এসব মন্তব্য এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, আলোচনা এবং এই মুহূর্তে যুদ্ধ শেষ হলে কার কী লাভ হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তার পরিণাম এবং ইরানের টিকে থাকার ক্ষমতা নিয়ে তিনি সম্ভবত ভুল হিসাব করেছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, ‘তারা (ইরান) যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর ওপর এভাবে চড়াও হবে... তা কেউ ভাবেনি।’ এমনকি সেরা বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি বিশ্বাস করেননি বলে তিনি দাবি করেন।

যদিও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আগেই বারবার এমন সতর্কতা দিয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প তা উপেক্ষা করেছিলেন। এখন বাস্তবতা তাঁকে সেই পরিণাম সম্পর্কে সচেতন করেছে, যা তিনি আগে পাত্তা দেননি। তাঁর কিছু মিত্র ও সমর্থক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিলেও, ট্রাম্প আগে দেখিয়েছেন, কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের হতে তিনি আপস বা চুক্তি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রেও তেমন কিছু হওয়া অবাস্তব নয়।

ইতিমধ্যেই তেলের দাম কমাতে ট্রাম্প তাঁর সরকারকে ইরানের কিছু তেলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম ইরান তাদের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরাতে সক্ষম হলো।

ইরান এটা ভালো করেই বোঝে, উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার ফলেই এই ছাড় মিলেছে। কারণ, বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ আগে থেকেই অজনপ্রিয় ছিল। এখন সাধারণ মানুষ পেট্রলের দাম ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব সরাসরি টের পাচ্ছে। সামনেই মধ্যবর্তী নির্বাচন, যেখানে ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের ফল খারাপ হওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। হয়তো এই যুদ্ধ টেনে নিয়ে যাওয়া এবং তার বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য চোকানো, নয়তো সমালোচনা সহ্য করেও একে নিজের ভাষায় একটি ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ হিসেবে শেষ করে দেওয়া।

ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি

ট্রাম্প যা-ই চান না কেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন পুরোপুরি তাঁর হাতে নেই। এক বছরের কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বার হামলার শিকার হওয়া ইরান এখন কার্যকর সমাধান ছাড়া যুদ্ধ থামাতে খুব একটা আগ্রহী নয় বলে মনে হচ্ছে। তারা চায় এমন এক দেয়াল তুলে দিতে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ তাদের ওপর হামলা করার সাহস না পায়।

মার্কিন স্থাপনায় আগে থেকে বার্তা দিয়ে হামলা বা ধাপে ধাপে উত্তেজনার পারদ চড়ানোর দিন এখন শেষ। শুরু থেকেই একটি বিষয় পরিষ্কার, ইরান তাদের পুরোনো কৌশল বদলেছে। এবার তারা সংযম প্রদর্শনে মোটেও আগ্রহী নয়। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এখন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা জিইয়ে রাখা তেহরানের জন্য লাভজনক হতে পারে।

ইরানের নীতিনির্ধারকদের মনে এমন বিশ্বাসও জন্মাতে পারে, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত ফুরিয়ে আসছে। ফলে এখন আঘাত হানলে তা আরও কার্যকর হবে। বিশেষ করে ইরানের বর্তমান ক্ষমতায় থাকা নেতারা মনে করছেন, এখনই থেমে গিয়ে ইসরায়েলকে তাদের প্রতিরক্ষা মজুত আবার গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে; ইরান নিজেও চরম ভুগছে। সরকারের তথ্যমতে, দেশজুড়ে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা হতে পারে পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু। পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও তলানিতে ঠেকেছে। ইরানের উপর্যুপরি হামলার কারণে এই সংঘাত শেষে সম্পর্ক আগের জায়গায় ফেরা দুষ্কর।

ইরানের উদারপন্থীরা অবশ্য মনে করছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাঁদের যুক্তি হলো, কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিরোধ নিশ্চিত করা গেছে এবং এখনই আলোচনার মোক্ষম সময়। যদি ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা বা হরমুজ প্রণালিতে বাড়তি কোনো কর্তৃত্ব পাওয়া যায়, তবে তেহরান হয়তো শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে রাজি হওয়ার কথা ভাবতে পারে।

ইসরায়েলের তেল আবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক উদ্ধারকর্মী। ২৪ মার্চ ২০২৬
ইসরায়েলের তেল আবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক উদ্ধারকর্মী। ২৪ মার্চ ২০২৬ ছবি: রয়টার্স


তিন যুগ আগে রোগীদের সেবা দিতে যেভাবে যাত্রা শুরু করে ল্যাবএইড

এমবিবিএস করার পর পেশাগত জীবন শুরু করতেই এম এ শামীম খেয়াল করেন, দেশে মানসম্মত সেবা দেওয়াটা খুব চ্যালেঞ্জিং। চিকিৎসকেরা আস্থা রাখতে পারেন, এমন ল্যাব খুঁজে পাওয়াটাই মুশকিল। সেই ভাবনা থেকে ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে তিনি এমন একটি উদ্যোগ নেন, যাতে বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক একই জায়গায় সেবা দিতে পারেন। সেখান থেকে ১৯৮৯ সালে যাত্রা শুরু করে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

১৯৮৯ সালে ডায়াগনস্টিক সেন্টার হিসেবে যাত্রা শুরু করে ল্যাবএইড। এক ছাদের নিচে হৃদ্‌রোগীদের বিশেষায়িত সেবা দিতে ২০০৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায় ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল। এরপর ২০০৬ সালে ঢাকায় সব রোগের চিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় বিশেষায়িত ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল। চট্টগ্রামেও রয়েছে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল। দেশের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শাখা। ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার এই প্রতিষ্ঠানের আধুনিকতম সংযোজন। বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রয়াসেই ল্যাবএইডের এই দীর্ঘ পথচলা।

দিনে-রাতে জরুরি সেবা

আকস্মিক মৃত্যুর অন্যতম কারণ হার্ট অ্যাটাক। উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে পারলে বেঁচে যায় অমূল্য প্রাণ। এ জন্য প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে দ্রুততম সময়ে এনজিওগ্রাম করা যায়। এনজিওগ্রাম দেখে দ্রুততম সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন একজন বিশেষজ্ঞ। নেওয়া হয় স্টেন্টিং বা রিং পরানোর মতো ব্যবস্থা। কিন্তু ২০০৪ সালের আগে দিনে-রাতে যেকোনো সময় হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ দেখা দিলে এত সব ব্যবস্থা গ্রহণের উপায় সে অর্থে দেশে ছিলই না। অথচ হুট করে হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক সমস্যা হতে পারে যে কারও। কম বয়সীদেরও রয়েছে এমন বিপদের ঝুঁকি। বিপন্ন জীবন বাঁচাতে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অবিরাম সেবা দিয়ে চলেছে ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল। শিশুর জন্মগত ত্রুটি সংশোধনসহ হৃৎপিণ্ডের সূক্ষ্ম ও জটিল শল্যচিকিৎসা যত্নসহকারে সম্পন্ন হচ্ছে।

‘উইনিং ক্যানসার’

ক্যানসার এমন এক রোগ, যাতে কেবল একজন রোগীই ভোগেন না, নানাবিধ ভোগান্তিতে পড়ে পুরো পরিবার। রোগীর শারীরিক কষ্টটা অপরিমেয়। মানসিক আর আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে বহু পরিবার। কম খরচে চিকিৎসা পেতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে যান ক্যানসারে আক্রান্ত বহু মানুষ। কিন্তু উপচে পড়া ভিড় ঠেলে চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অথচ সময়মতো চিকিৎসা করালে নিরাময় হয় বহু ক্যানসার। ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের মূলমন্ত্র ‘উইনিং ক্যানসার’। ক্যানসার মানেই জীবনের শেষ নয়। ক্যানসারের সঙ্গে লড়েও জয়ী হন বহু মানুষ। আর লড়াইয়ের পরও যাঁদের মেনে নিতে হয় মৃত্যুর পরিণতি, তাঁদের এই মৃত্যুও যেন হয় উপশমমূলক। এমনটা যেন না হয় যে হাল ছেড়ে দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর জন্য ভয়ার্ত চোখে প্রতীক্ষা করছেন একজন মানুষ। এমন ভাবনাকে উপজীব্য করেই এই বিশেষায়িত সেন্টারে সেবা দেন কর্মীরা।

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা

বর্তমানে স্ট্রোক বাংলাদেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। স্ট্রোক–পরবর্তী সবচেয়ে আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি যেমন থ্রম্বোলাইসিস ও থ্রম্বেকটমিও হচ্ছে ল্যাবএইডের অত্যাধুনিক স্ট্রোক সেন্টারে। আর মুমূর্ষু রোগীদের জন্য ল্যাবএইডের অত্যাধুনিক নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ) ও সিসিইউ তো আছেই।

হৃদ্‌রোগ ও ক্যানসার ছাড়াও এখানে পাবেন যেকোনো সমস্যার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের খোঁজ। দীর্ঘদিন ধরে হিপ জয়েন্ট (ঊরুসন্ধি) বা নি জয়েন্ট (হাঁটু) প্রতিস্থাপনের কাজটি সাফল্যের সঙ্গে হয়ে আসছে এই প্রতিষ্ঠানে। প্রসবকালীন জটিলতা মোকাবিলায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনসহ (আইভিএফ) বন্ধ্যত্বের আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা এখানে আছে। সাফল্যের হার উন্নত বিশ্বের মতোই।

ধারাবাহিকতা ও সাফল্যের স্বীকৃতি

কলেজ অব আমেরিকান প্যাথলজিস্টের (সিএপি) স্বীকৃতি পেয়ে আসছে ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ল্যাবরেটরির মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এটি একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের (বিএবি) তালিকার সেরার মধ্যেই থাকে ল্যাবএইড। রয়েছে আন্তর্জাতিক আরও নানা স্বীকৃতি। ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের রয়েছে জয়েন্ট কমিশন ইন্টারন্যাশনালের (জেসিআই) স্বীকৃতি। চট্টগ্রামের ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল আবার আমেরিকান অ্যাক্রেডিটেশন কমিউনিকেশন কাউন্সিল (এএসিআই) স্বীকৃতির শেষ ধাপে আছে। ন্যাশনাল অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড ফর হসপিটালস অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রোভাইডারসের (এনএবিএইচ) স্বীকৃতি পেয়েছে ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল এবং ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল।

অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সুযোগ

জীবন বাঁচাতে অঙ্গ প্রতিস্থাপন এক গুরুত্বপূর্ণ শল্যচিকিৎসা। ২০১০ সালে লিভার প্রতিস্থাপন শুরু করে ল্যাবএইড হাসপাতাল। ছয়জন রোগীর লিভার প্রতিস্থাপন করা হয় সে সময়। নিয়মিত কিডনি প্রতিস্থাপনও হয়েছে। পরে বাংলাদেশে অঙ্গ প্রতিস্থাপনবিষয়ক নীতিমালার জটিলতায় পড়ে থমকে গেছে এই উদ্যোগ। বাংলাদেশ থেকে বহু রোগী অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য বাইরে যান। বাইরের কিছু প্রতিষ্ঠানের অঙ্গ প্রতিস্থাপন নীতিমালাও প্রশ্নবিদ্ধ। তবু বাধ্য হয়ে সেসব প্রতিষ্ঠানেই ছুটছেন মানুষ। সরকারিভাবে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে রোগীরা এ ধরনের বিশেষায়িত সেবা পাওয়ার সুযোগ দেশেই পাবেন। ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো জটিল শল্যচিকিৎসার জন্য যে দক্ষ লোকবল ও বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি প্রয়োজন, সবই তাদের আছে। কেবল সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।

স্বপ্ন যখন রোবোটিক শল্যচিকিৎসা

বিশ্বে জনপ্রিয় হচ্ছে রোবোটিক শল্যচিকিৎসা। আধুনিকতম এই প্রযুক্তির ব্যবহারে জটিল সব শল্যচিকিৎসায় সাফল্যের হারও বাড়ছে। দেশের বাইরে এই চিকিৎসার জন্য যে খরচ হবে, তার এক–পঞ্চমাংশ খরচে দেশেই করা সম্ভব এমন চিকিৎসা। দেশের মানুষের জন্য তেমন দারুণ কোনো সুযোগ সৃষ্টির আশা নিয়েই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছে ল্যাবএইড। 

ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

তালেবান নিয়ে বড় ভুলের মাশুল দিচ্ছে ইসলামাবাদ by সাঈদ শাহ

২০২১ সালে তালেবান যখন ঝড়ের বেগে ক্ষমতা দখল করল, তার কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানের তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ কাবুলে হাজির হয়েছিলেন। পাকিস্তানের অনেকের চোখে এটি ছিল একপ্রকার বিজয়-পরিক্রমা।

আফগান রাজধানীর বিলাসবহুল হোটেলের লবিতে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সাংবাদিকদের জেনারেল ফয়েজ বলেছিলেন, ‘চিন্তার কিছু নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

তবে এই সপ্তাহেই স্পষ্ট হয়ে গেল, তালেবানের ওপর ভরসা করার হিসেব কষতে গিয়ে পাকিস্তান কত বড় ভুল করেছে। ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালিয়েছে, দুই দেশের সেনার মধ্যে সীমান্তে সংঘর্ষও হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ জানিয়ে দিয়েছেন, বারবার অনুরোধ করার পরও তালেবান যদি আফগান ভূখণ্ডকে পাকিস্তানি জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার বন্ধ না করে, তবে ধৈর্যের সীমা তো একদিন শেষ হবেই। তাঁর কথায়, সেই ধৈর্যই এবার ফুরিয়েছে।

পরিস্থিতির বিদ্রূপটা চোখে পড়ার মতো। ২০২১-এর আগে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলত—তালেবানকে পাকিস্তান নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে।

আর এখন যেন তারই উল্টো প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। আজ পাকিস্তান অভিযোগ করছে, তালেবান শাসিত আফগানিস্তান পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিদের জন্য নিরাপদ ঘাঁটি হয়ে উঠেছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ পরিচালক কামরান বুখারি বলেন, ‘এটা বড়সড় “ব্লোব্যাক”। আপনি যদি এমন প্রক্সি শক্তিকে সমর্থন করেন, যারা আপনার জাতীয় পরিচয় বা জাতীয় বয়ানকেই চ্যালেঞ্জ করে, আপনাকে আদর্শগতভাবে বৈধ মনে করে না—তাহলে তারা যে একদিন আপনার দিকেই বন্দুক ঘুরিয়ে দেবে, সেটা শুধু সময়ের অপেক্ষা।’

২০১১ সালে পাকিস্তান সফরে গিয়ে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন কথাটা আরও সোজাসুজি বলেছিলেন: ‘আপনি নিজের উঠোনে সাপ পুষে রেখে এই আশা করতে পারেন না যে, তারা শুধু আপনার প্রতিবেশীকেই দংশন করবে।’

বুখারির মতে, আফগানিস্তানই পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তের একমাত্র সমস্যা নয়। ইরান দুর্বল হয়ে পড়লে সেই সীমান্তেও অস্থিরতা জ্বলে উঠতে পারে। তেহরান আর আগের মতো অবস্থানে নেই যে তালেবান-সংকট সামলাতে পাকিস্তানকে সাহায্য করবে।

তালেবান অবশ্য বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে যে তাদের ভূখণ্ড পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। শুক্রবারও তারা ইসলামাবাদকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)—এর সঙ্গে আলোচনায় বসতে আহ্বান জানিয়েছে।

২০০৭ সালে আত্মপ্রকাশ করা টিটিপি এক দশক ধরে পাকিস্তান জুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তবে তালেবান কাবুল দখল করার আগে কয়েক বছরে তাদের শক্তি কিছুটা কমেছিল। কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানে তাদের হামলার সূচক আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তালেবান ও টিটিপি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। পাকিস্তানে নিজেদের ‘জিহাদি ভাইদের’ আশ্রয়ও দিয়েছে টিটিপি। এখন তালেবান ক্ষমতায়। তাই টিটিপির কাছে তা যেন ‘ঋণ শোধের’ সময়।

টিটিপির দাবি, তারা পাকিস্তানে নিজেদের কট্টর ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায়। অথচ পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশই মুসলিম, এবং সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে—দেশের সব আইন ইসলামের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

পাকিস্তান বলছে, আফগানিস্তানে দশক ধরে চলা অস্থিতিশীলতার সামনে তাদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। ৯ / ১১ হামলার পর ও যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান আগ্রাসনের পর ইসলামাবাদ কাবুলে ভারতের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তান একসময় এমন একটি বন্ধুত্বপূর্ণ আফগানিস্তান চেয়েছিল, যেখানে ইসলামাবাদ আরামসে কাজ করতে পারবে এবং সেই লক্ষ্য পূরণের একমাত্র কার্যকর উপায় হিসেবে তাঁদের কাছে তালেবানকেই পছন্দসই মনে হয়েছিল।
যদিও ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে তখনো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রই ছিল।

পাকিস্তান তখন ভাবেনি, আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ার সিদ্ধান্তের ফলেই দেশের ভেতরে তীব্র উগ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। সেই প্রতিক্রিয়ার নেতৃত্বে উঠে আসে টিটিপি। এই সংগঠনটি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল।তারাই একটি স্কুলে ১৩০ জনের বেশি শিশুকে হত্যা করেছিল। এরাই সোয়াত ভ্যালি দখল করেছিল এবং স্কুলছাত্রী মালালা ইউসুফজাইকে গুলি করেছিল।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তখন মনে করেছিল, আফগানিস্তানের তালেবানকে ‘ভালো’ জিহাদি বলা যায়। কারণ তারা নাকি আলাদা প্রকৃতির। আর পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কাছে দেশের ভেতরের টিটিপির মতো গোষ্ঠীগুলো ‘খারাপ’ জিহাদি, যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।

কিন্তু শুরু থেকেই এই বিভাজন খুব শক্ত ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের পার্থক্য প্রায় মুছে গেছে।

বিশেষ করে আফগানিস্তানে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেক তালেবান সদস্য টিটিপিতে যোগ দিচ্ছেন। ফলে ‘ভালো’ আর ‘খারাপ’—এই তত্ত্ব এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ জায়েদ বলছেন, এটাকে পাকিস্তানের জন্য ‘শাস্তি’ বা ‘ফলভোগ’ বলা ঠিক হবে না। তাঁর বক্তব্য হলো, পাকিস্তানের অবস্থান সব সময়ই এক—দেশের ভেতরে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ হতেই হবে।

লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট (রুসি)-র গবেষক আন্তোনিও জিউস্টোজির মতে, পাকিস্তান ভেবেছিল আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়ে এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তালেবানকে নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করা যাবে; এমনকি প্রয়োজনে শীর্ষ আফগান নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বও নড়বড়ে করা যাবে।

কিন্তু আফগানিস্তানে বোমাবর্ষণ উল্টো ফল দিয়েছে। কারণ হাইবাতুল্লাহ যদি পাল্টা জবাব না দিতেন, তবে তাঁর নিজের ভাবমূর্তি দুর্বল হয়ে যেত।

কাবুল পাল্টা জবাব দেওয়ায় আফগানিস্তানে জাতীয়তাবাদী আবেগ আরও জোরদার হয়েছে। এটি হাইবাতুল্লাহকেই বেশি শক্তিশালী করেছে।

জিউস্টোজি আরও বলেন, তালেবান এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে।

এমনকি পাকিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান প্রদেশকে আলাদা রাষ্ট্র করতে চাওয়া একটি ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহী আন্দোলনকেও তারা সমর্থন করছে।

এদিকে টিটিপি গত কয়েক বছর ধরে নূর ওয়ালি মেহসুদের নেতৃত্বে অনেকটা সংগঠিত হয়েছে। তিনি দলটির ভাঙা অংশগুলোকে একত্র করেছেন এবং কৌশলও বদলেছেন। এখন তারা সাধারণ মানুষকে নয়, সরাসরি সেনাবাহিনী ও পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

পাকিস্তানের প্রাক্তন বিশেষ দূত আসিফ দুররানি জানিয়েছেন, তালেবানের সামনে একসময় স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল—পাকিস্তান না টিটিপি, একটিকে বেছে নিতে হবে। আর তালেবান শেষ পর্যন্ত টিটিপিকেই বেছে নিয়েছে।

দুররানির মন্তব্য, তালেবান এখনো সরকার হিসেবে ভাবতে শেখেনি। তারা এক ধরনের ‘যুদ্ধ অর্থনীতি’র মধ্যে রয়েছে। তাদের আচরণ এখনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মতোই—রাষ্ট্র পরিচালনার মতো নয়।

এই ধরনের প্রতিবেশী পাকিস্তানকে বড় ধরনের ভোগান্তিতে ফেলবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

* সাঈদ শাহ, দ্য গার্ডিয়ান-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক রিপোর্টার।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া
- অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে পাকিস্তানি বিমান হামলার আশঙ্কায় বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র হাতে সতর্ক তালিবান সদস্যরা।
আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে পাকিস্তানি বিমান হামলার আশঙ্কায় বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র হাতে সতর্ক তালিবান সদস্যরা। ছবি: এএফপি

এপস্টিন–অনিল আম্বানির ফাঁস হওয়া বার্তায় ‘দীর্ঘাঙ্গী সুইডিশ স্বর্ণকেশী’

প্রয়াত কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের প্রভাববলয় যুক্তরাষ্ট্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। নতুন করে ফাঁস হওয়া মার্কিন বিচার বিভাগের নথিতে দেখা গেছে, ভারতের শিল্পপতি অনিল আম্বানির সঙ্গে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গালফ নিউজ বলছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এপস্টিন ও অনিল আম্বানির মধ্যে আদান–প্রদান হওয়া একাধিক বার্তায় ব্যবসা, বিশ্ব পরিস্থিতি, নারী এবং সরাসরি সাক্ষাতের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
২০১৭ সালের মার্চে পাঠানো এক বার্তায় অনিল আম্বানি এপস্টিনের কাছে জানতে চান—‘তুমি কার কথা বলবে?’ জবাবে এপস্টিন লেখেন, ‘একজন দীর্ঘাঙ্গী সুইডিশ স্বর্ণকেশী নারী, যেন সফরটা মজার হয়।’এর পরপরই আম্বানির উত্তর ছিল—‘ওটার ব্যবস্থা করো।’

প্যারিস ও নিউইয়র্কে বৈঠকের পরিকল্পনা

নথিতে প্যারিসে সাক্ষাতের পরিকল্পনা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যাপারে ২০১৮ সালে দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে।

২০১৯ সালের মে মাসে অনিল আম্বানি নিউইয়র্ক সফরের পরিকল্পনা করলে এপস্টিন তাঁকে ম্যানহাটনে নিজের বাসায় আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে তিনি লেখেন, ‘যদি তুমি কারও সঙ্গে একান্তে দেখা করতে চাও, আমাকে জানিও।’

আম্বানি পরিবার ও হলিউড সংযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপস্টিন আম্বানি পরিবারের ব্যবসায়িক ইতিহাস সম্পর্কেও আগ্রহী ছিলেন। এ কারণে তিনি ‘আম্বানি অ্যান্ড সন্স’ ও ‘স্ট্রর্মস ইন দ্য সী উইন্ড: আম্বানি ভার্সেস আম্বানি’ বই দুটি সংগ্রহ করেছিলেন।

আদান–প্রদান হওয়া বার্তাগুলো থেকে জানা গেছে, হলিউডে আম্বানির যোগাযোগের ব্যাপারে জানতে চাইতেন এপস্টিন। এক কথোপকথনে তিনি জানতে চান, ‘এমন কোনো অভিনেত্রী বা মডেল আছে, যিনি আম্বানির রুচির প্রতিনিধিত্ব করেন? আশা করছি মেরিল স্ট্রিপ না। এ ক্ষেত্রে আমি কোনো সহযোগিতা করতে পারব না।’

জবাবে অনিল আম্বানি বলেন, তাঁর রুচি আরও ভালো। তাঁদের পরবর্তী সিনেমায় স্কারলেট জোহানসন অভিনয় করবেন। জবাবে এপস্টিন লেখেন, ‘আমি খুশি যে তুমি বয়স্কদের চেয়ে তরুণ স্বর্ণকেশী পছন্দ করো।’

রিলায়েন্স এন্টারটেইনমেন্ট সহপ্রযোজনায় নির্মিত ‘ঘোস্ট ইন দ্য শেল’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন স্কারলেট জোহানসন।

৬৬ বছর বয়সী অনিল আম্বানি রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের নিয়ন্ত্রণ তাঁর ভাই ৬৮ বছর বয়সী মুকেশ আম্বানির হাতে। বর্তমানে তিনি এশিয়ার ধনীতম ব্যক্তি। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৯৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।  

গত এক দশকে এই দুই ভাইয়ের আর্থিক অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। অনিল আম্বানি বর্তমানে আর্থিক সংকটে পড়েছেন এবং ভারতে কথিত ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

পরামর্শ নিয়ে, আটঘাট বেঁধে

এসব বার্তা চালাচালি বলছে, এপস্টিন তাঁর বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতে চাইতেন—এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও। এই লক্ষ্যে তিনি আম্বানি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করেন।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনিল আম্বানি সম্পর্কে ভারতীয় বংশোদ্ভুত মার্কিন গুরু দীপক চোপড়া এপস্টিনকে বলেন, তিনি অত্যন্ত ধনী। খুব বেশি পরিচিতি হতে আগ্রহী ও সেলিব্রিটি–সচেতন। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, দুই ভাই অনিল ও মুকেশ আম্বানির মধ্যে সম্পর্ক ভালো নয়।

আম্বানি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে এপস্টিন টম প্রিটজকার ও পিটার থিয়েলের মতো ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের কাছ থেকেও পরামর্শ নেন। প্রিটজকার পরামর্শ দেন, অনিলের সঙ্গে পিটার থিয়েলের পরিচিত হওয়া উচিত।

২০১৯ সালের মে মাসে নিউইয়র্কে সাক্ষাতের পর এপস্টিন অনিল আম্বানিকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আজকের দিনটা দারুণ ছিল, তোমার সঙ্গে দেখা করে ভালো লাগল।’

জেফরি এপস্টিন ও অনিল আম্বানি
জেফরি এপস্টিন ও অনিল আম্বানি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশে এআইভিত্তিক আইনি প্ল্যাটফর্ম ফাইন্ড মাই অ্যাডভোকেট চালু by রাহিতুল ইসলাম

সমস্যার ধরন অনুযায়ী সঠিক আইনি পরামর্শ ও আইনজীবীর সহায়তা নেওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করতে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) ডিজিটাল আইনি প্ল্যাটফর্ম ‘ফাইন্ডমাইঅ্যাডভোকেট’। নতুন এ প্ল্যাটফর্মে এআই প্রযুক্তি যুক্ত থাকায় ঘরে বসেই দেশের যেকোনো প্রান্তে থাকা বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করার সুযোগ মিলে থাকে।

প্ল্যাটফর্মটি মূলত বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের মধ্যে একটি ডিজিটাল সেতু হিসেবে কাজ করছে। প্ল্যাটফর্মটির বিশেষত্ব হলো ‘এআই-পাওয়ার্ড সার্চিং অ্যান্ড চ্যাটিং’ সিস্টেম, যা ব্যবহারকারীদের আইনি সমস্যার ধরন বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপযুক্ত আইনজীবীর সন্ধান দিয়ে থাকে। শুধু তা–ই নয়, প্ল্যাটফর্মটিতে সার্বক্ষণিক চালু থাকা ‘এআই লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’ কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক আইনি পরামর্শও জানা যায়।

ফাইন্ডমাইঅ্যাডভোকেট প্ল্যাটফর্মের তথ্যভান্ডারে বর্তমানে দেশের সব জেলায় আইনি সেবা দেওয়া নিবন্ধিত আইনজীবীদের তথ্য রয়েছে। ফলে ঘরে বসে সহজেই দেওয়ানি, ফৌজদারি, কর ও ভ্যাট, দলিল লেখক, বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারসহ সাইবার অপরাধবিষয়ক আইনি সহায়তা পেতে আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ পাওয়া যাবে। প্ল্যাটফর্মটিতে আইনজীবীদের অভিজ্ঞতা, রেটিং ও অবস্থানের তথ্য যুক্ত থাকায় ব্যবহারকারীরা স্বচ্ছন্দে সঠিক আইনজীবী নির্বাচনের সুযোগ পেয়ে থাকেন।

ফাইন্ডমাইঅ্যাডভোকেট প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. হায়দার তানভীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রয়োজনের সময় আইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে ঝামেলাপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ। একাধিকবার আইনজীবীর চেম্বারে যেতে হয়, তারপর নির্ধারিত তারিখ পাওয়া যায়—এভাবে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ ও হয়রানিমূলক প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি দিতেই চালু করা হয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।’

ফাইন্ডমাইঅ্যাডভোকেট প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের ইহান চৌধুরীর তৈরি ‘সাইট্যাক্স এআই’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটিতে আইনজীবীর সন্ধান পাওয়ার পাশাপাশি মুঠোফোনেই আইনি পরামর্শ—ভিডিও কল, চেম্বার সাক্ষাৎ ও বাসায় আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করা যায়। আইনজীবীদের জন্যও প্ল্যাটফর্মটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে। নতুন ও অভিজ্ঞ আইনজীবীরা এখানে প্রোফাইল তৈরি করে অনলাইনে তাঁদের প্র্যাকটিস পরিচালনার পাশাপাশি সময়সূচি ব্যবস্থাপনা করতে পারছেন।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি। গ্রাফিকস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি

বিরল অর্ধগোলাপি হীরার খোঁজ by জাহিদ হোসাইন খান

আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানার করোয়ে খনিতে এক বিস্ময়কর অর্ধগোলাপি হীরা আবিষ্কৃত হয়েছে। হীরার ওজন প্রায় ৩৭ দশমিক ৪১ ক্যারেট (৭ দশমিক ৫ গ্রাম)। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ হীরাটি ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গোলাপি হীরা হতে পারে। এ হীরাটি দৈর্ঘ্যে এক ইঞ্চি। এতে মলিন গোলাপি ও বর্ণহীন অংশের মধ্যে একটি তীক্ষ্ণ বিভাজন রেখা দেখা যায়।

হীরা বিশেষজ্ঞ ও ডায়মন্ড কাটিং প্রতিষ্ঠান এইচবি অ্যান্টওয়ার্পের সহপ্রতিষ্ঠাতা ওডেড মানসোরি বলেন, ‘এ পাথরটি পলিশ করার পর এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত গোলাপি হীরার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে। এর গাঢ় রং করোয়ে খনির ভূতাত্ত্বিক অনন্যতার সাক্ষ্য বহন করছে।’

এ ধরনের রঙের হীরা অত্যন্ত বিরল। হীরা গঠনের জন্য তাপমাত্রা ও চাপের সঠিক শর্ত পূরণ করা বেশ জরুরি। এ হীরাটি প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর গভীরে পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২০০ কিলোমিটার নিচে তীব্র তাপ ও চাপে কার্বন পরমাণুর শক্ত ল্যাটিসে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে এটি পৃষ্ঠে উঠে আসে। অন্যান্য হীরা ভেতরের অপদ্রব্যের মাধ্যমে রং ধারণ করে। আর গোলাপি হীরা তৈরি হয় কাঠামোগত বিকৃতির ফলে। ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর কাঠামো পরিবর্তিত হলে গোলাপি রং তৈরি হয়। অবশ্য অতিরিক্ত বিকৃতি হীরাকে বাদামি করে তোলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভবত গোলাপি অংশটি প্রথমে গঠিত হয়েছিল এবং বর্ণহীন অংশটি পরে বিকাশ লাভ করে। যদিও এটি প্রথম আবিষ্কৃত অর্ধগোলাপি হীরা নয়। জেমোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট অব আমেরিকার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এর আগে যেসব গোলাপি হীরা পরীক্ষা করা হয়েছে, তা দুই ক্যারেটের (শূন্য দশমিক ৪ গ্রাম) বেশি ছিল না।

যে বতসোয়ানা করোয়ে খনি থেকে এ হীরাটি পাওয়া গেছে, তা এর আগেও বেশ কয়েকটি দর্শনীয় রত্নের উৎস ছিল। এর আগে ১ হাজার ৭৫৮ ক্যারেটের সেওয়েলো, ৫৪৯ ক্যারেটের সেথুনিয়া আর সম্প্রতি আবিষ্কৃত ২ হাজার ৪৮৮ ক্যারেটের মটসওয়েদি রয়েছে। কানাডীয় খনি প্রতিষ্ঠান লুকারা উন্মোচিত মটসওয়েদি বিশ্ববিখ্যাত কুল্লিনান হীরা আবিষ্কারের পর গত ১২০ বছরে দেখা সবচেয়ে বড় হীরা। ১৯০৫ সালে প্রতিবেশী দক্ষিণ আফ্রিকায় আবিষ্কৃত ৩ হাজার ১০৬ ক্যারেটের কুল্লিনান পাথরটি ৯টি আলাদা পাথরে কাটা হয়েছিল; যার মধ্যে অনেক টুকরা এখন ব্রিটিশ ক্রাউন জুয়েলসের অংশ।

নতুন অর্ধগোলাপি হীরাটির মূল্য এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে এর মূল্য নির্ধারণের সময় এর ওজন, কাট, রং, স্বচ্ছতাসহ বিভিন্ন কারণ বিবেচনা করা হবে। বর্তমানে এটি এইচবি অ্যান্টওয়ার্পের কাছে রয়েছে। ২০২২ সালে সবচেয়ে মূল্যবান ও উজ্জ্বল গোলাপি হীরা হিসেবে বিবেচিত একটি বিরল গোলাপি হীরা নিউইয়র্কের সোথেবিসের ৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার দামে বিক্রি হয়েছিল।

সূত্র: ডেইলি মেইল

অর্ধগোলাপি হীরা
অর্ধগোলাপি হীরা। ছবি: এইচবি অ্যান্টওয়ার্প