Wednesday, November 4, 2015

বাংলাদেশে আতঙ্ক, নিস্তব্ধতা by এলেন বেরি

বাংলাদেশে টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলে দুটি টকশো উপস্থাপনা করেন মিথিলা ফারজানা। কিন্তু তার মনে আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে। চলমান সময়ে তার পাশ দিয়ে কোন পুরুষ চলে গেলে তিনি সতর্ক হন। ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান তিনি। সেখানে কাউকে দেখলে তিনি পাশে সরে দাঁড়ান। হৃদয় কেঁপে ওঠে। তিনি সরে দাঁড়ান যাতে শিক্ষার্থীরা চলে যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য তার স্বামী এখন আর তাকে গাড়ি নিতে দেন না। এর কারণ, যে শহরে জঙ্গিদের ভাল নেটওয়ার্ক রয়েছে সেখানে একজন চালকও সহজে তাকে অন্যের হাতে তুলে দিতে পারে। তাই তাকে তার স্বামী নিজেই গাড়ি চালিয়ে নামিয়ে দিয়ে আসেন। এর আগে ফারজানা পেশাগত দূরত্ব বহায় রেখে ঝুঁকির বিষয়ে সার্ভে করতে পারতেন। যখনই কোন কট্টরপন্থি কোন একজন ব্লগারকে হত্যা করেছে তখনই তার সত্য কাহিনী তুলে ধরতেন তিনি। ব্লগারদের হত্যার দায় স্বীকারকারী গ্রুপগুলোর একটি গত মাসে আড়ালে থেকে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে চিঠি পাঠায়। নারী সাংবাদিকরা যদি পর্দানশীন না হন তাহলে তাদেরকে নিউজ মিডিয়া থেকে বাদ না দিলে এর জন্য ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেয়া হয়। গত শনিবার সন্ত্রাসীরা ধর্মনিরপেক্ষ নন এমন দু’জন প্রকাশকের ওপর পর পর হামলা চালায়। এ দু’জন প্রকাশক তেমন প্রচারে না থাকা ব্যবসায়ী। তারা দেশের খ্যাতনামা লেখকদের বই বোদ্ধা মহলে সরবরাহ করছিলেন। মিথিলা ফারজানার বয়স এখন ৩৭ বছর। তিনি ভুলতে পারেন না যে, এর পেছনে একটি নীলনকশা আছে। কেউ একজন, কোন জায়গায় টার্গেটের তালিকায় তার নামটিও যোগ করে থাকতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে আমি আসলেই শঙ্কিত। আমার মনে হচ্ছে, হতে পারে তারা এখন একজন নারীকে হত্যা করে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এখন আপনার একক কোন ধারণা থাকার কথা নয় যে, আসলে সব মিলিয়ে কি হতে যাচ্ছে। হয়তো হতে পারে, আপনি টার্গেট হয়েছেন, যা আপনি কখনো জানেন না।
চারজন ব্লগার ও একজন প্রকাশককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বাংলাদেশে। এ দেশটি ১৬ কোটি মানুষের ছোট্ট একটি দেশ। কিন্তু বেনামি হুমকি এখন সাধারণ বিষয়। সব মিলে মানসিক যে অবস্থা তৈরি হয়েছে তাতে সন্ত্রাসী হুমকির বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা থেকে সুখ্যাত, সুপরিচিত সাধারণ মানুষগুলো দূরে সরে যাচ্ছেন। পেন ইন্টারন্যাশনালস রাইটারস ইন প্রিজন কমিটির চেয়ারম্যান সলিল ত্রিপাঠি। গত মে মাসে একজন ব্লগার হত্যার পর মন্তব্যের জন্য বাংলাদেশী লেখকদের একটি লম্বা তালিকা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সবাই তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। জবাবে তারা বলেছেন, এ বিষয়ের সঙ্গে তাদের নাম যুক্ত হওয়া হবে ভীষণ ভয়ানক। ‘পেন নেম’-এর আওতায় একজন বিদেশী কলাম লেখকের একটি কলাম প্রকাশে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
সলিল ত্রিপাঠি ‘দ্য কর্নেল হু উড নট রিপেন্ট’ নামের বইয়ের লেখক। এ বইটি পাকিস্তানের কাছ থেকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিতে লেখা। সলিল বলেছেন, বুদ্ধিজীবীদের (ইন্টেলেকচুয়ালস) হুমকি দিয়ে আপনি মত প্রকাশকে নীরব করে দিতে, মতকে নিজের মতো করে দেয়ার চেষ্টা করছেন। আমি মনে করি তাই ঘটছে। স্পর্শকাতরা এত বেশি হয়ে পড়েছে যে, বাংলাদেশী অনেক বন্ধু তাকে অনুরোধ করেন যেন তিনি ফেসবুক পোস্ট ট্যাগ না করেন, যেখানে ব্লগারদের হামলা নিয়ে আলোচনা আছে। সলিল বলেন, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এ ইস্যুতে নিজের নামে লিখছেন এমন কোন বাংলাদেশী বোদ্ধার নাম আমি মনে করতে পারছি না।
গত এক মাস ধরে বিভিন্ন মাত্রায়, বিশেষ করে সামাজিক মিডিয়ায় বেনামি একাউন্টস থেকে বিদেশী, নারী সাংবাদিক এমন কি দেশের সংখ্যালঘু শিয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়া হচ্ছে। শনিবার ‘হু ইজ নেক্সট’ শীর্ষক একটি বিবৃতি দেয়া হয়েছে আনসার আল ইসলামের পক্ষ থেকে। এরা আল কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্টের বাংলাদেশী শাখা। হুমকিতে তারা টার্গেটের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। এ হুমকিতে রয়েছেন সুপরিচিত কবি, বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনের সম্পাদক, অভিনেতা ও সাংবাদিক। এ মাসের শেষের দিকে ঢাকা লিট (লিটারেচার) ফেস্ট নামের একটি আয়োজন হওয়ার কথা। এতে ৭০ জনের মতো লেখক যোগ দেবেন বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু এ সংখ্যা নেমে ১০ এ আসতে পারে বলে শঙ্কায় আয়োজকরা। এরই মধ্যে অনেক লেখক ও মতামত দানকারীরা প্রকাশ্য জীবনযাপন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। ২০১৩ সালের ‘হিট লিস্ট’এ নাম ছিল ৪৫ বছর বয়সী ঔপন্যাসিক আহমাদ মোস্তাফা কামালের। তিনি বলেন, অফিসের বাইরে যান না বললেই চলে। প্রকাশ্যে কোথাও বক্তব্য রাখার আমন্ত্রণ পেলেই নিয়মিতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করছেন। তিনি বলেন, আমার জীবন পুরোপুরি নিঃসঙ্গ। একজন লেখক সব সময়ই সব স্থানে যাওয়ার তাগিদ বোধ করেন। তাদেরকে কথা বলতে হয়। তাদেরকে সাধারণ মানুষের ভিড়ে যেতে হয়। পাঠকের সঙ্গে তাদেরকে কথা বলতে হয়। তিনি কখনও পুলিশের কাছে এ হুমকির বিষয়ে রিপোর্ট করেন নি। এর কারণ, তিনি জানেন তারা তাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলবে। এমন সম্ভাবনার কথা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু গত সপ্তাহের হামলার পর তার বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। আহমাদ মোস্তাফা কামাল বলেন, এক রাতে আমার ছেলে আমার সঙ্গে কথা বলছিল। সে আমার কাছে জানতে চাইলÑ বাবা তারা কি তোমাকেও হত্যা করবে? মোস্তাফা কামাল বলেনÑ এই হলো আমার ছেলে। একজন কিশোর। সে আমার কাছে জানতে চাইছে আমাকে হত্যা করা হবে কিনা। এক্ষেত্রে আমার উত্তর কি হতে পারে?
একই রকম শিহরণ অনুভূত হচ্ছে একাত্তর টিভিতে। এর প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু। তিনি রিপোর্টার ও উপস্থাপক হিসেবে নারীদের নিয়োগ দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছেন। কারণ তিনি বলেন, নারীরা শক্তিধর পুরুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে। এটা আমি পছন্দ করি। তার রিপোর্টাররা অধিক অধিক সতর্ক। তার চ্যানেলের সবচেয়ে সুপরিচিত মুখগুলোর অন্যতম নবনীতা চৌধুরী। তিনি গত জুনে তার নাম দেখতে পান ২৫ সেলিব্রেটির হিট লিস্টে, যারা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। বর্তমানে নবনীতা টেলিভিশন থেকে দূরে রয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি স্বাস্থ্যগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার ভাই এক্ষেত্রে অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। সে বলেছে, এসব কাজ বাদ দাও। আমার সঙ্গে বাসায় থাক।
এই টেলিভিশন স্টেশনের আরেকজন রিপোর্টার ফারজানা রুপা (৩৮)। তিনি বলেছেন, প্রকাশকদের ওপর গত সপ্তাহে হামলার পর তা নিয়ে রিপোর্ট না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তার ফেসবুকে বিশ্বাসযোগ্য হুমকি দেয়া হয়েছে। এ জন্য তিনি নিজে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু যে চালককে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন তিনি অব্যাহতি নিয়েছেন। এ নিয়ে ৬ জন চালক এমনটা করলেন। তারা মনে করেন, ফারজানার সঙ্গে কাজ করা তাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সম্প্রতি ফারজানা রুপা তার ৮ বছর বয়সী মেয়ে ও বাসার অন্য শিশুদের সঙ্গে এ নিয়ে খোলামেলা কথা বলা শুরু করেছেন। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বলি যে, বর্তমান সময়ে মায়ের যেকোন কিছু ঘটতে পারে। তাই তোমাকে স্বাধীনভাবে বাঁচা শিখতে হবে। শনিবারের পর থেকে বিপদের বিষয়টি বাদ দিয়ে অন্য কিছু ভাবা চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে ফারজানার কাছে। তার মনে একটি প্রশ্ন বিস্ময় সৃষ্টি করছে। তা হলো যদি তাকে হত্যা করা হয় তাহলে রাস্তায় চলাচলকারী পুরুষরা কি  বলবে।
ফারজানা বলেন, হৃদয়ের গভীর থেকে বলছি, যদি এমনটাই ঘটে তাহলে লোকজন বলবে কেন সে সীমা লঙ্ঘন করেছে? মানুষজন ভাববে: কেন এসব নারী পর্দার বাইরে বেরিয়ে এসেছে? কেন এসব নারী এত কথা বলে? কেন তারা এত খোলামেলা কথা বলে?
(নিউ ইয়র্ক টাইমসে ৩রা নভেম্বর প্রকাশিত ‘ফিয়ার অ্যান্ড সাইলেন্স ইন বাংলাদেশ অ্যাজ মিলিট্যান্টস টার্গেট ইন্টেলেকচুয়ালস’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ)

যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের সতর্কতা!

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে এক বৈঠকে
চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাং ওয়ানকুয়ান। ছবি: রয়টার্স
চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাং ওয়ানকুয়ান বলেছেন, দক্ষিণ চীন সাগরে গত সপ্তাহে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের তৎপরতা তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে।
চীনের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে—এমন আর কোনো বিপজ্জনক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন ওয়ানকুয়ান।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, গতকাল মঙ্গলবার কুয়ালালামপুরে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশ কার্টারের উদ্দেশে এমন মন্তব্য করেছেন চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী। আজ বুধবার চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ-সংক্রান্ত তথ্য জানানো হয়েছে।
এদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল হ্যারি হ্যারিস বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনে সিদ্ধ এমন যেকোনো স্থানে তৎপরতা চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ চীন সাগরও এর বাইরে নয়।
দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ অংশে চীনের কৃত্রিম দ্বীপপুঞ্জের কাছ দিয়ে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ অতিক্রমের ঘটনার এক সপ্তাহ পর গতকাল চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে ওই মন্তব্য করেন হ্যারিস।
ওই দ্বীপপুঞ্জের কাছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে চীন। দেশটি প্রতিবাদ জানাতে বেইজিংয়ে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকেও তলব করে। এ ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

ভারত-নেপাল সীমান্তে বিক্ষোভ অব্যাহত, উত্তেজনা

ভারতের নিকটবর্তী নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তে উত্তেজনা থামেনি। দফায় দফায় বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। সোমবার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে এক ভারতীয় নিহত হয়। পরদিনও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। নতুন সংবিধান নিয়ে বিক্ষোভরত নেপালের মাধেসি সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংবিধানটি প্রণয়ন করা হলে তা মাধেসি সম্প্রদায়কে কয়েকটি প্রদেশে ছড়িয়ে দেবে।
অথচ মাধেসিরা নিজেদের নিয়ে একটি বড় প্রদেশ গঠন করতে চাইছে, যেখানে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এ অবস্থায় নতুন সংবিধান বাতিলে দক্ষিণাঞ্চলীয় নেপালে তারা বিক্ষোভ গড়ে তুলেছে। শুধু তাই নয়, সীমান্ত আটকে রাখার কারণে দেশজুড়ে মারাত্মক জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েক মাসের এ বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। আর আহতের কোনো সরকারি হিসাব নেই। মঙ্গলবার সকালের দিকে সীমান্ত অঞ্চল থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নিতে সক্ষম হয় নেপাল পুলিশ।

ছাত্রলীগের ‘শুভেচ্ছা’ সংঘর্ষে আহত ৫০

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল ছাত্রলীগের
দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় শাহজালাল হলের
তৃতীয় তলার বারান্দায় রামদায় শাণ দিতে দেখা যায়
কয়েকজন যুবককে। ছবি -প্রথম আলো
ভর্তি-ইচ্ছুক পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানানো নিয়ে গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে চার পুলিশসহ অন্তত ৫০ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি আবাসিক হলে তল্লাশি চালিয়ে ৩৫ জন নেতা-কর্মীকে আটক এবং দুটি অস্ত্র, প্রায় ৭০টি রামদাসহ কয়েক বস্তা পাথর ও লাঠিসোঁটা উদ্ধার করে পুলিশ।
ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যেই গতকাল সকালে স্নাতক প্রথম বর্ষের প্রকৌশল অনুষদ এবং বিকেলে মৎস্য ও সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার কারণে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ভয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকেন। তবে গতকাল সংঘর্ষ হলেও পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ভর্তি পরীক্ষা চলবে বলে জানান উপাচার্য অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী।
এদিকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও (চুয়েট) গতকাল ছাত্রলীগের দুই পক্ষে সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবাস ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর টিপু এবং সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বীর অনুসারীরা গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর এলাকায় ভর্তি-ইচ্ছুক পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানাতে পৃথকভাবে অবস্থান নেন। এ সময় লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তা পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় রূপ নেয়। এ সময় সভাপতি পক্ষের অনুসারীরা সাধারণ সম্পাদক পক্ষকে ধাওয়া দিয়ে মূল ফটক থেকে বের করে দেয়। কিছুক্ষণ পর সভাপতির অনুসারী নেতা-কর্মীরা শাহজালাল হলের সামনে এবং সাধারণ সম্পাদক পক্ষের নেতা-কর্মীরা শাহ আমানত হল এলাকায় অবস্থান নেন। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে আবারও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পুলিশ ফাঁকা গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় নেতা-কর্মীদের ছোড়া ইটে হাটহাজারী থানার ওসি মোহাম্মদ ইসমাইল, পুলিশ সদস্য নুরে আলম, এনামুল হক এবং ছাত্রলীগের দুই পক্ষের অন্তত ২০ নেতা-কর্মী আহত হন।
এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ ছাত্রলীগের দুই পক্ষকে বারবার শান্ত হওয়ার অনুরোধ করে। পরে বেলা সোয়া একটার দিকে দুটি হলে ব্যাপক লাঠিপেটা করে শুরু করে পুলিশ। তখন শাহজালাল হলের সভাপতি পক্ষের নেতা-কর্মীরা এবং শাহ আমানত হলে সাধারণ সম্পাদক পক্ষের নেতা-কর্মীরা অবস্থান করছিলেন। ছাত্রলীগের দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতা লাঠিপেটার শিকার হন। এ সময় নেতা-কর্মীদের ছোড়া ইটে পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (সদর) মো. শহীদুল্লাহ হাতে আঘাত পান।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী বলেন, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর উসকানিতে এ ঘটনা ঘটেছে। যারা বিশৃঙ্খলা করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। সভাপতি পক্ষের সঙ্গে হয়তো প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর যোগসাজশ থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে সভাপতি আলমগীর টিপু বলেন, সংগঠনের জুনিয়র কর্মীদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি থেকে এ ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, হয়তো ছাত্রলীগের মধ্যে ছাত্রশিবিরের এজেন্ট ঢুকে থাকতে পারে। তারাই হয়তো ছোট ঘটনাটি লম্বা করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) কাজী মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ ৬৬ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম বলেন, সংঘর্ষে আহত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ১৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিরা হয়তো অন্য কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
জানতে চাইলে পুলিশের হাটহাজারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মশিউদৌল্লাহ রেজা প্রথম আলোকে বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় ৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে। শাহজালাল ও শাহ আমানত হলে তল্লাশি চালিয়ে একটি এলজি, একটি কাটাবন্ধুক, প্রায় ৭০টি রামদাসহ কয়েক বস্তা লাঠিসোঁটা ও পাথর উদ্ধার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোহাম্মদ আলী আজগর চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে দায়ী ছাত্রদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপাচার্য ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভর্তি-ইচ্ছুক ও তাঁদের অভিভাবকদের ভয়ের কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আমরা বরদাশত করব না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আজ (সোমবার) অসাধারণ ভূমিকা রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছেন, ভবিষ্যতে তাঁরা আরও কঠোর হবেন।’
চুয়েট বন্ধ ঘোষণা: ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের জের ধরে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. জাহাঙ্গীর আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) ফজলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এ আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল বিকেল পাঁচটার মধ্যে ছাত্ররা হল ছেড়ে যান। মঙ্গলবার (আজ) সকাল ১০টার মধ্যে ছাত্রীদের হলত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল থেকে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। দুপুরের দিকে ছাত্রলীগের দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় তিন কর্মীকে কুপিয়ে আহত করা হয়। তাঁরা হলেন রিয়াজ উদ্দিন, ইশরাক হোসেন ও মো. সানজিদ। তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির নায়েক আবদুল হামিদ জানান, তিনজনের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কোপের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, নাহিদ পারভেজ ও শাহনেওয়াজ তানভীরের অনুসারীদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনায় গত শনিবার রাতে দুই দফায় সংঘর্ষ হয়। এর জের ধরে রোববার দুপুরেও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয়। কিন্তু গতকাল পুলিশের উপস্থিতিতেই দুই পক্ষ আবারও সংঘর্ষে জড়ায়।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ গতকাল রাতে জানান, ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ ৭৯টি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি।
এদিকে হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করায় বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইনজামাম-উল-হক রাতে প্রথম আলোকে জানান, আগামী বুধবার দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের শেষ পরীক্ষা ছিল তাঁর। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা হওয়ায় এখন পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. জাহাঙ্গীর আলম গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তিন দিন ধরে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল তারা আবারও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
পরীক্ষা দিতে এসে গতকাল ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়েন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা। এ সময় অনেক শিক্ষার্থীকে প্রবেশপত্র উঁচিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রের দিকে যেতে দেখা যায়। ছবিটি বেলা দেড়টার দিকে তোলা l প্রথম আলো

আখাউড়া দিয়ে ট্রানজিটের প্রথম চালান

বাংলাদেশ ও ভারতসহ সার্কের চারটি দেশের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে যান চলাচল শুরু হয়েছে। এ ট্রানজিট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ভারতীয় ভোডা ফোনের ইলেক্ট্রনিকস সরঞ্জাম ভর্তি একটি (কাভার্ডভ্যান) ট্রাকের প্রথম চালান মঙ্গলবার দুপুরে আখাউড়া স্থলবন্দর সীমান্ত পথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় প্রবেশ করে। এ সময় ত্রিপুরার আগরতলা স্থলবন্দরের কাস্টমস কর্মকর্তা বাণিক বত্ত চক্রবর্তী বাংলাদেশের আখাউড়া স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার (এসি) মিহির কুমার চাকমার কাছ থেকে ভোডা ফোনের ইলেক্ট্রনিকস সরঞ্জামসংক্রান্ত কাগজপত্র বুঝে নেন।
ট্রানজিট সুবিধার আওতায় পরীক্ষামূলক এই ভারতীয় পণ্য সামগ্রী নিয়ে ট্রাকটি রোববার বিকালে কলকাতা থেকে বেনাপোল স্থলবন্দরে আসে। ট্রাকটি সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় বেনাপোল থেকে আখাউড়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। আখাউড়া স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সার্ক জোটের চারটি দেশ- বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান এবং নেপালের মধ্যে পণ্যবাহী যান চলাচলের জন্য সম্প্রতি সম্পাদিত (বিবিআইএন)’র চুক্তির আওতায় পরীক্ষামূলক যান চলাচল শুরু হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় পশ্চিম বঙ্গের কলকাতা থেকে ভারতীয় ভোডা ফোনের ইলেক্ট্রনিকস সরঞ্জাম ভর্তি (কাভার্ডভ্যান) ট্রাকের প্রথম চালান মঙ্গলবার বেলা ১টায় আখাউড়া স্থলবন্দর সীমান্ত পথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় পৌঁছায়।

খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম কমেছে

টানা তিন মাস ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর খাতুনগঞ্জে স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে পেঁয়াজের বাজার। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্যটির দাম কমেছে কেজিতে ৩০-৩৫ টাকা। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সম্প্রতি ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ বাড়তির দিকে রয়েছে। ফলে কমতির দিকে রয়েছে পেঁয়াজের দাম। অন্যদিকে ১৫ দিনের ব্যবধানে খাতুনগঞ্জে পাম অয়েলের দাম কমেছে মণে ২২০ টাকা পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং দর কমে যাওয়ার পাশাপাশি আসন্ন শীত মৌসুমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজারে পড়তি চাহিদার কারণে পণ্যটির দাম নিুমুখী রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম বাড়তির দিকে ছিল। এর মধ্যে ভারতে হঠাৎ পণ্যটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ মজুদ থাকা সত্ত্বেও দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে পুরো পেঁয়াজের বাজার। এ সময় ভারত ছাড়াও মিসর, চীন, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেন দেশী আমদানিকারকরা।
টানা তিন মাস এ ঊর্ধ্বমুখী ভাব আস্তে আস্তে কমে এখন স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসছে। দেশের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে দুই সপ্তাহ আগেও প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজের দাম ছিল ৫৫-৬০ টাকা। মঙ্গলবার তা লেনদেন হয় ২০-২৫ টাকায়। ১৫ দিন আগে ভারতীয় পেঁয়াজের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৬০-৬৫ টাকা, যা গতকাল ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ৩০-৩৫ টাকা। খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজের পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহ ধরে ওঠানামার মধ্যে রয়েছে পেঁয়াজের দর। গতকাল প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজ ৪০-৪৫ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ ৩০-৩৫, মিসরের ২৫-২৮ ও পাকিস্তানি পেঁয়াজ ২৫-২৬ টাকায় বিক্রি হয়। খাতুনগঞ্জের আমির মার্কেটের চৌধুরী টেডার্সের মালিক ইলিয়াছ চৌধুরী জানান, তিন-চার মাস আগে ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশেও এর প্রভাব পড়েছিল। এরপর আমদানিকারকরা অন্যান্য দেশ থেকে পণ্যটি আমদানি শুরু করেন। সম্প্রতি ভারত থেকেও পণ্যটির আমদানি বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বাজারে। ভারত থেকে পেঁয়াজ সড়কপথে চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই দেশে আসতে পারে। কিন্তু মিসর থেকে আমদানি করতে ঋণপত্র খোলা ও জাহাজিকরণসহ সময় লাগে এক মাসেরও বেশি।

খুলনারই শেষ হাসি

শেষবার খুলনা শেষ হাসি হেসেছিল ২০১২-১৩ মৌসুমে। দুই মৌসুম পর আবারও শিরোপাসিক্ত হল তারা। আর প্রথম স্তর থেকে দ্বিতীয় স্তরে অবনমন হল গতবারের চ্যাম্পিয়ন রংপুরের। কারও অবনমন মানেই অন্যের উত্তরণ। সেই সৌভাগ্য হল বরিশালের। তারা দ্বিতীয় স্তর থেকে ওঠে গেল প্রথম স্তরে। জাতীয় ক্রিকেট লীগের ষষ্ঠ ও শেষ রাউন্ডে চারদিনের ম্যাচের শেষদিন ছিল কাল। এদিন চট্টগ্রামে খুলনার প্রথম ইনিংস শেষে ড্র মেনে নেন দুই অধিনায়ক। খুলনার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উৎসব বর্ণিল হয়েছে ইমরুল কায়েসের শতকে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম দুটি ওডিআইতে সুযোগবঞ্চিত ইমরুল খানিকটা জ্বালা জুড়িয়েছেন ১০৪ বলে ১০৭ রান করে। তার ঝড়ো ইনিংসে ১৩টি চার ও তিনটি ছয়। তবে ম্যাচসেরা হয়েছেন প্রথম ইনিংসে শতক (১০৫) এবং দুটি উইকেট নেয়া রংপুরের তানভির হায়দার। সাত উইকেটে ৩২৪ রান নিয়ে চতুর্থদিনের খেলা শুরু করে রংপুর। তাতে আর ২০ রান যোগ করেই অলআউট হয় তারা ৩৪৪ রানে। পাঁচ উইকেট নেন খুলনার অধিনায়ক আবদুর রাজ্জাক। চার উইকেট পান মুরাদ খান। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে দ্বিতীয় ইনিংস ব্যাট করার সুযোগই পায়নি দু’দল।
প্রথম স্তরে বরিশাল
খুলনার শিরোপা জয়ের দিনে বরিশাল উঠল প্রথম স্তরে। শাহরিয়ার নাফীসের জোড়া শতকে (১৬৮ ও ১৭৪) চট্টগ্রামের বিপক্ষে ড্র হওয়া ম্যাচ শেষে ৫৯ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্তরে সবার উপরে বরিশাল। এ রাউন্ডে তারা প্রথম ইনিংসে লিড নেয়ার সুবাদে প্রথম স্তরে উঠে যায়। এদিকে আগেরদিন সিলেটের বিপক্ষে ১০ উইকেটে জয়ী রাজশাহী দ্বিতীয় স্তরে দ্বিতীয় স্থানে রইল। তাদের পয়েন্ট ৫৪। তৃতীয় স্থানে সিলেট (৩৮ পয়েন্ট)। সবার নিচে থেকে জাতীয় লীগ শেষ করেছে চট্টগ্রাম (৩৫ পয়েন্ট)। মঙ্গলবার বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে ৪২৩/৮-এ চতুর্থদিনের খেলা শুরু করে চট্টগ্রাম। প্রথম ইনিংসে ৪৯৮ করা বরিশাল তখনও ৬৬ রানে এগিয়ে। এদিন মাত্র ১৮ বল স্থায়ী হয় চট্টগ্রামের ইনিংস। পাঁচ উইকেট নেন বরিশালের অফ-স্পিনার সোহাগ গাজী। ৬৪ রানে এগিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করা বরিশাল দ্বিতীয় ইনিংসে ৩০৩ রান করে ছয় উইকেটে। এরপরই ড্র মেনে নেন দুই অধিনায়ক। শামসুরের সেঞ্চুরি টানা তিন দিন বৃষ্টিতে খেলা ভেসে যাওয়ায় ঢাকা ও ঢাকা মেট্রোর ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল আগেই। কাল শেষদিনে ৭৫ ওভার খেলা হয়। এ সময়েই সেঞ্চুরি করেছেন ঢাকা মেট্রোর উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান শামসুর রহমান। কক্সবাজারের শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই সৈকত আলীকে হারায় ঢাকা মেট্রো। এরপর মেহেদি মারুফকে নিয়ে শামসুর দ্বিতীয় উইকেটে ২০৯ রানের জুটি গড়েন। ১৮২ বলে ১০৫ রান করেন তিনি। ৫২ রানে অপরাজিত থাকেন মেহরাব হোসেন জুনিয়র। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে বিসিবি একাদশে থাকা মেহেদি আহত হয়ে মাঠ ছাড়ার আগে করেন ৯৯ রান। ঢাকা মেট্রো তিন উইকেটে ২৮৬ রান করার পর ড্র মেনে নেন দুই অধিনায়ক।
জাতীয় ক্রিকেট লীগের রোল অব অনার
মৌসুম চ্যাম্পিয়ন
১৯৯৯-২০০০ চট্টগ্রাম
২০০০-২০০১ বিমান বাংলাদেশ
২০০১-২০০২ ঢাকা
২০০২-২০০৩ খুলনা
২০০৩-২০০৪ ঢাকা
২০০৪-২০০৫ ঢাকা
২০০৫-২০০৬ রাজশাহী
২০০৬-২০০৭ ঢাকা
২০০৭-২০০৮ খুলনা
২০০৮-২০০৯ রাজশাহী
২০০৯-২০১০ রাজশাহী
২০১০-২০১১ রাজশাহী
২০১১-২০১২ রাজশাহী
২০১২-২০১৩ খুলনা
২০১৩-২০১৪ ঢাকা
২০১৪-২০১৫ রংপুর
২০১৫-২০১৬ খুলনা
সংক্ষিপ্ত স্কোর
খুলনা ও রংপুর
রংপুর প্রথম ইনিংস ৩৪৪ (ধীমান ঘোষ ৬৯, তানভির হায়দার ১০৫, সোহরাওয়ার্দী শুভ ৬৬। আবদুর রাজ্জাক ৫/১২৭, মুরাদ খান ৪/৬৬)।
খুলনা প্রথম ইনিংস ২৮৬ (ইমরুল কায়েস ১০৭, জিয়াউর রহমান ৬২*। তানভির হায়দার ২/৫৬)। ফল : ম্যাচ ড্র।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ : তানভির (রংপুর)।
চট্টগ্রাম ও বরিশাল
বরিশাল প্রথম ইনিংস ৪৮৯ (শাহরিয়ার নাফীস ১৬৮, ফজলে মাহমুদ ১৩৩, আল-আমিন ৬০। বেলাল হোসেন ৩/১৩২, নাবিল সামাদ ৪/১০১)।
চট্টগ্রাম প্রথম ইনিংস ৪২৫ (নাফিস ইকবাল ৫৬, মুমিনুল হক ২৩৯। সোহাগ গাজী ৫/১৩৪, মনির হোসেন ৩/৬৫)।
বরিশাল দ্বিতীয় ইনিংস ৩০৩/৬ (শাহরিয়ার নাফীস ১৭৪, আল-আমিন ৬৮। ডলার মাহমুদ ২/৩২)।
ফল : ম্যাচ ড্র।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ : মুমিনুল হক (চট্টগ্রাম)
ঢাকা মেট্রো ও ঢাকা
ঢাকা মেট্রো প্রথম ইনিংস ২৮৬/৩ (শামসুর রহমান ১০৫, মেহেদি মারুফ ৯৯, মেহরাব হোসেন জুনিয়র ৫২*। মাহবুবুল আলম ১/২৭)। ফল : ম্যাচ ড্র।

এবার খাঁচায় বন্দি জয়া

দেশভাগের গল্প শুনিয়ে কলকাতায় শ্রীজিত মুখার্জীর ‘রাজকাহিনী’ ছবিতে বাংলাদেশের জয়ার যে মাতম চলছিল, সেটা অনেকটাই থেমে গেছে ছবিটি মুক্তির পর। ছবির পুরোটা সময় জয়াকে পর্দায় দেখা গেলেও তার মুখে সংলাপ রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি। বরং খুব বেশি খোলামেলা হয়েছেন নগন্য একটি চরিত্রের জন্য। যেখানে বাংলাদেশে রয়েছে তার তুমুল জনপ্রিয়তা। সেটাকে ধুলোয় মাড়িয়ে কেন এ ধরনের একটি গুরুত্বহীন চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে বিকিয়ে দিলেন জয়া, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। অনেকে আবার বলেছেন, বাংলাদেশী কোনো ছবিতে এ ধরনের চরিত্রে তাকে অভিনয়ের জন্য বলা হলে একবাক্যেই তিনি নির্মাতাকে ফিরিয়ে দিতেন।
রাজকাহিনীর স্মৃতি গত হয়েছে মাসখানেক হয়ে গেল। এবার নতুন করে দেশভাগের গল্প নিয়ে বাংলাদেশী নির্মাতা আকরাম খান তৈরি করছেন ‘খাঁচা’ নামের একটি ছবি। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সম্প্রতি চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন জয়া। এ ছবিটির গল্পও একই। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাস। অবশ্য এটি একটি সরকারি অনুদানের ছবি। জয়াকে খাঁচায় বন্দি করতে পেরে পরিচালকও যারপরনাই খুশি। যদিও রাজকাহিনীর মতো অতটা খুলতে পারবেন না। তথাপিও দেশত্যাগ কিংবা দেশভাগ- যা-ই বলুন না কেন, জয়া সেখানে একদম ফিট। হাসান আজিজুল হকের খাঁচা গল্প অবলম্বনে ছবিটি নির্মিত হচ্ছে। চিত্রনাট্য লিখেছেন আকরাম খান ও আজাদ আবুল কালাম।

বিদেশি হত্যাকাণ্ড ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব by আসিফ নজরুল

বিদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ড যেকোনো দেশের জন্য বিব্রতকর। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশেও বিদেশি নাগরিকেরা সব সময় নিরাপদ থাকেন না। বিদেশের মাটিতে বর্ণবাদী বা পেশাদার অপরাধী চক্রের শিকার হয়ে বাংলাদেশ বা অন্য দেশের মানুষ নিহত হওয়ার বহু ঘটনা এখনো ঘটে থাকে। প্রতিপক্ষ সংগঠনের স্বগোত্রীয়দের হাতে বা পারিবারিক বিরোধের জের হিসেবে খুন হওয়ার ঘটনাও খুব বিরল নয় ইউরোপ বা আমেরিকায়। পড়াশোনা করতে গিয়ে আমি যে পাঁচ-ছয় বছর ইউরোপে ছিলাম, তখন দেখেছি যে বাংলাদেশের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন শারীরিকভাবে অনেক শক্তিশালী গুন্ডা প্রকৃতির আক্রমণকারীদের নিয়েও।
বাংলাদেশ সে তুলনায় বিদেশিদের জন্য অনেক নিরাপদ একটি দেশ। এ দেশে দুজন বিদেশি নাগরিকের হত্যার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারপরও আলাদা করে গুরুত্ব পেয়েছে। হত্যাকাণ্ডগুলো ষড়যন্ত্রমূলক মনে হওয়ার কারণ রয়েছে বলেই এমন হয়েছে। হত্যাকাণ্ডগুলো কোনো বর্ণবাদী আক্রমণের ঘটনা নয়, বাংলাদেশে সে অর্থে বর্ণবাদের অস্তিত্বই নেই। হত্যাকাণ্ডের শিকার দুই বিদেশির সঙ্গে কারও বিরোধ বা স্বার্থ-সংঘাত খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে এগুলো ছিঁচকে অপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত বলেও ধারণা করা যাচ্ছে না। ফলে এগুলোর পেছনে ষড়যন্ত্রমূলক কিছু রয়েছে বলে আশঙ্কা করার কারণ রয়েছে।
ষড়যন্ত্র থাকলে এর লক্ষ্য হতে পারে যে কেউ, যেকোনো সময়ে। ষড়যন্ত্র থাকলে ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য কী, কারা করছে এসব ষড়যন্ত্র, ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনের ক্ষমতা বা নিয়ত সরকারের রয়েছে কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া গেলে সার্বিক নিরাপত্তাহীনতা কাটবে না। আর তা না কাটলে এ দেশে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজে বিদেশিদের অংশগ্রহণ ব্যাহত হওয়া অনেক দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে, দেশের ইমেজের জন্যও তা দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
২.
দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের আগে-পরের ঘটনাগুলোও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। ঢাকার গুলশানে ইতালির নাগরিক হত্যার আগেই এ দেশে নিরাপত্তাহীনতার কথা বলে সফর স্থগিত করেছিল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল। আকস্মিক এই সফর বর্জন অযৌক্তিক মনে হয়েছিল। দুই বিদেশি হত্যার পরও বাংলাদেশ কোনো ক্রিকেট দলের সফরের জন্য একেবারে নিরাপত্তাহীন হয়ে গেছে—এটি আমরা অনেকেই মানতে চাইব না। হত্যাকাণ্ডগুলোর জের হিসেবে যেভাবে পশ্চিমা দূতাবাসগুলো সতর্কতা জারি করেছে, তাদের কিছু কর্মরত নাগরিক দেশে ফিরে গেছেন, ব্যবসায়ী দল সফর বাতিল করেছে, তা সাদা চোখে দেখলে বাড়াবাড়িও মনে হতে পারে।
তবে আমরা বা আমাদের সরকার কী ভাবছে, তা-ই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বৈশ্বিক রাজনীতি আর কূটনীতি আমাদের সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, পশ্চিমা বিশ্বের পারসেপশন, তা যদি আরোপিত বা মিথ্যেও হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অনেক ক্ষেত্রে। আরোপিত ধারণা ও প্রচারণার ভিত্তিতে অন্য দেশে ব্যাপক সামরিক হামলা, সরকার উৎখাত এবং বিভিন্ন ধরনের অবরোধের ঘটনা বিশ্বে ঘটে চলেছে। কোনো দেশে স্বৈরাচার আর দুঃশাসন চেপে বসলে আন্তর্জাতিক বৈরিতা ঘটার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। এসব বাস্তবতাকে মাথায় রেখে সরকারকে সৎ ভাবে ও দক্ষতার সঙ্গে দুই বিদেশি হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে।
৩.
দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ড তদন্তে সরকার আন্তরিক রয়েছে বলে বারবার বলা হচ্ছে। তবে দুঃখজনকভাবে হলেও সত্যি যে সরকারের পক্ষ থেকে দুই বিদেশি হত্যার ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের কিছু প্রবণতাও লক্ষ করা যাচ্ছে। সিজার তাবেলা হত্যাকাণ্ডের পর কোনো গ্রেপ্তার এমনকি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের আগেই এ জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ করা হয়েছে। সরকারপ্রধান নিজে যখন এ ধরনের কথা বলে ফেলেন, তখন বাংলাদেশের গোয়েন্দা বা পুলিশ সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই তদন্তকাজ সাজানোর চেষ্টা করে, এমন নজির আমরা বিভিন্ন আমলে দেখেছি। এতে আর যা-ই হোক সুষ্ঠু তদন্ত সম্ভব হয় না।
বিএনপি নেতা মঈন খানের বাসায় পশ্চিমা কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের নৈশভোজনের ঠিক পরদিন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল সফর বর্জন করেছিল, এর সূত্র ধরে পশ্চিমা নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। সরকারের লোকদের অভিযোগ শুনে মনে হয়েছে মঈন খানের কথায় পশ্চিমারা একযোগে তা করেছে! এটি কি আদৌ সম্ভব? বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে নিজস্ব অবলোকন ব্যবস্থা প্রতিটি শক্তিশালী বিদেশি রাষ্ট্রের রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তারা শুধু একজন রাজনীতিকের কথায় রাতারাতি এমন পদক্ষেপ নিয়ে ফেলবে? বিদেশি একটি দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যেই বলা হয়েছে যে তারা নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথা সরকারকে আগেই জানিয়েছিল। সেটি কি সরকার বিবেচনায় নিয়েছে?
সরকারের মন্ত্রীরা দুই বিদেশি হত্যায়ও বিএনপির হাত রয়েছে বলে চলেছেন। এই অভিযোগ বা সন্দেহ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু একই সন্দেহ আরও বহু মহলের বিরুদ্ধে করা যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত এখন হনন স্পৃহার পর্যায়ে চলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশে সরকার বা বিএনপি যে কাউকে বিপদে ফেলার চেষ্টা হতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ওপর আরও বেশি আন্তর্জাতিক খবরদারি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকেও কোনো গোষ্ঠী এই ঘটনা ঘটাতে পারে। দুই বিদেশি খুনের ঘটনার পরপরই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এই ইঙ্গিতকে শিরোধার্য ভেবে সরকারের এজেন্সিগুলো বাকি সব সম্ভাবনা বাদ দিয়ে বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শুধু বিএনপিকে জড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। এমন আশঙ্কা বিএনপির নেতারা বেশ কয়েকবার প্রকাশ করেছেন।
দুই বিদেশির হত্যাকাণ্ড স্পর্শকাতর ঘটনা। যেভাবে এর আগে-পরে পশ্চিমারা এবং অন্য কিছু ওইসিডি (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো–অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) জোটভুক্ত দেশ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা এই হত্যাকাণ্ডগুলোর গুরুত্বকে আরও অনেক বাড়িয়ে তুলেছে। হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্ত থেকে কোনো রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের চিন্তা থাকলে সরকারকে তা বাদ দিতে হবে। কোনো একটি পূর্বানুমানকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা না করে সব পূর্বানুমান ও সন্দেহের সুচারুভাবে তদন্ত করতে হবে।
আমরা জানি, বাংলাদেশে বহু চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের কোনো সুরাহা হয়নি (যেমন সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড)। গুলশান-বনানীর নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে বিএনপি নেতা রিয়াজ রহমানের ওপর প্রকাশ্য আক্রমণের কোনো সুষ্ঠু তদন্তই হয়নি। অন্যদিকে বহু ঘটনায় বিরোধী দলের নেতাদের ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে, অনেকের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এসব একটি পুরোনো সত্যকেই প্রমাণ করে। তা হচ্ছে, এ দেশে যেকোনো সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড ও সহিংস ঘটনায় গোয়েন্দারা ক্ষমতাসীন সরকারের অভিলাষ মোতাবেক তদন্তকাজ পরিচালনা করে। এমন এক পরিপ্রেক্ষিতে দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ড তদন্তে সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ার আগে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করলে বরং তদন্তকাজের সততা নিয়ে গোড়া থেকে সন্দেহ থাকবে। এটি দীর্ঘ মেয়াদে কারও জন্যই ভালো হবে না।
৪.
দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে আমাদের আরেকটি বিষয়ে বোধোদয় হতে হবে। আমরা অতীতে এই সরকারকে বাংলাদেশে আইএস, আল-কায়েদা এ ধরনের জঙ্গি আছে বলে বলতে শুনেছি। প্রধানত বিরোধী দলকে ঘায়েল করতেই এ ধরনের প্রচারণা চালানো হতো বলে অভিযোগ ছিল। এ জন্য আমরা এমনকি বিদেশে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনায়ও বিএনপি-জামায়াত জড়িত বলে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতাকে বলতে শুনেছি।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আইএস যদি এ দেশে থেকেই থাকে তাহলে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর কেন সরকার বারবার বলছে যে এ দেশে এমন কোনো গোষ্ঠী নেই? আর না থেকে থাকলে কেন অতীতে এসব প্রচারণা চালানো হয়েছে? অপপ্রচারণা দিয়ে বিরোধী দলকে সাময়িকভাবে ঘায়েল করা সম্ভব। বহু দেশেই এটি হয়। কিন্তু তা নিজ দেশের এমনকি নিজ সরকারের স্বার্থকে কীভাবে বিপন্ন করতে পারে, এমন উদাহরণও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে। রাজনৈতিক বৈরিতা বা সংঘাত এমন পর্যায়ে তাই যেতে দেওয়া উচিত না, যা দেশের স্বার্থকে বিপন্ন করতে পারে। সরকার ও বিরোধী দল দুই পক্ষকেই এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে। বিদেশি হত্যাকাণ্ড, বিদেশি বয়কট আর বিদেশি প্রচারণার বিরুদ্ধে পরস্পরকে সহায়তা করতে হবে। নিজের চেয়ে দেশকে বেশি মূল্যবান ভাবলে এটি না করার কোনো বিকল্প নেই।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শোকাহত বাবার আহ্বান কি আমরা শুনছি? by আলী রীয়াজ

নিহত দীপনের পিতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন
যে এই হত্যাকাণ্ড বা হত্যাচেষ্টা রাজনীতির বাইরে নয়
লক্ষ্য ছিল হত্যা করার, এ বিষয়ে কোনো রকম বিভ্রান্তির কারণ নেই। এটা কোনো আবিষ্কার নয় যে জাগৃতি ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও হত্যার চেষ্টা ‘পরিকল্পিত’ এবং তা শোনার জন্য আমাদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের অপেক্ষা করার দরকার হয় না। শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে আহমেদুর রশীদ চৌধুরী (টুটুল) ও জাগৃতি কার্যালয়ে ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়। আহমেদুর রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে সেই সময়ে থাকা দুজন লেখক তারেক রহিম ও রণদীপম বসুর জীবন বিপন্ন হয়, কিন্তু তাঁদের উপস্থিতির কারণে আহমেদুর রশীদ চৌধুরীর জীবন রক্ষা হয়েছে। হামলা হয়েছে দিনদুপুরে, হামলার ধরন একই, হামলার পর কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাও একই রকম। অতীতে হামলার ঘটনা ঘটেছে একেক দিন একেক জায়গায়। এবার তার মাত্রা দ্বিগুণ হয়েছে। শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে পুলিশ যথাসময়ে না পৌঁছালে হারাতে হতো তিনজনকে, মৃত্যুর সঙ্গে তাঁরা লড়ছেন এখন; দীপনকে সেই লড়াই করতে হয়েছে একাই।
আততায়ীরা যে সাফল্য ছাড়া ঘরে ফিরতে চায়নি, সেটা প্রায় একই সময়ে পরিচালিত হামলা থেকেই স্পষ্ট। তারা যেন নিশ্চিত করতে চেয়েছে যে ৩১ অক্টোবরে তাদের চাই একটি হলেও নিস্পন্দ মানুষ, যে মানুষটি অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক, তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যাকে সহজেই একটি ধারার সঙ্গে যুক্ত বলে চেনা যায়। কিন্তু অন্য অনেকের মতো আমার মনে এই প্রশ্ন—এই সাহসের উৎস কোথায়? কীভাবে এই আততায়ীরা ভাবতে পারে যে দিনদুপুরে এই ধরনের উদ্ধত অভিযান চালিয়ে তারা নিরাপদে সরে যেতে পারবে? বিশেষ করে সেই সময়ে, যখন বিদেশি নাগরিকদের হত্যা এবং তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার’ পুনঃপুন আশ্বাসের কথা সবাই জানেন। নাশকতার সব ঘটনা বন্ধ করা যাবে না, সব চোরাগোপ্তা আক্রমণ প্রতিহত করা যাবে না—এই বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক নেই। তারপরও একটার পর একটা ঘটনার মধ্যে যেখানে ‘এসকেলেশনের’ বা তীব্রতা ও মাত্রা বৃদ্ধির লক্ষণ সুস্পষ্ট, সেখানে এই যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য? কীভাবে তা ব্যাখ্যা করা যাবে? নাগরিকদের জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক, সেই প্রশ্ন না হয় না-ই তুললাম।
দুই.
বাংলাদেশ সময় রোববার সকাল পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই হত্যা ও হত্যাচেষ্টার জন্য কাউকে দায়ী করা হয়নি, যদিও আওয়ামী লীগের নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘জামায়াত-শিবির ও বিএনপির খণ্ডিত অংশ জড়িত।’ তিনি বলেছেন, ‘কেউ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, কেউ জেএমবি, কেউ হরকাতুল জিহাদ, কেউ হুজি—বিভিন্ন নাম দিয়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করছে।’ অতীতের ঘটনার পরে সরকারি ভাষ্যের সঙ্গে এর কোনো পার্থক্য নেই। ইতিমধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদা বা একিউআইএসের ‘বাংলাদেশ শাখা’ বলে দাবিদার আনসার আল ইসলাম এই হত্যার দায় স্বীকার করেছে। এই সংগঠনের অস্তিত্ব ও তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিদের যোগাযোগ বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত। কিন্তু বাংলাদেশে যেসব জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি রয়েছে বলে বলা হয়, তাদের অন্যতম হচ্ছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। সম্প্রতি আওয়ামী ওলামা লীগ বলে দাবিদার সংগঠনের এক পক্ষ সংবাদ সম্মেলনে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে এই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগ করেছিল, তা কি খতিয়ে দেখা হয়েছে? জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন যেখানে জড়িত, যেখানে নিয়মিতভাবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কর্মী বলে পরিচিত ব্যক্তিরা অস্ত্র ও বোমাসহ আটক হচ্ছেন, সেখানে এই ধরনের অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়ার অবকাশ থাকে কি? কিন্তু এই বিষয়ে সরকার তাগিদ অনুভব করছে বলে মনে হয় না।
তিন.
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক শুভবুদ্ধির প্রত্যাশা করে বলেছেন, ‘যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যাঁরা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা।’ আমরা যখন আমাদের শোক, আমাদের ক্ষোভ কাটিয়ে উঠব, তখনো আমরা কি তাঁর এই কথাগুলো মনে করতে পারব?
ফয়সল আরেফিন দীপনের বাবা আবুল কাসেম ফজলুল হক আমার শিক্ষক। ক্লাসরুমে বসে তাঁর কাছ থেকে পাঠগ্রহণের সুযোগ আমার হয়নি, কেননা আমি ভিন্ন বিভাগের ছাত্র ছিলাম। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁকে কাছ থেকে দেখার, সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। পরে সহকর্মী হওয়ার সূত্রে তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি জানার-শেখার সুযোগ হয়েছে। শিক্ষক হিসেবে, মানুষ হিসেবে তিনি নির্বিরোধী; চিন্তার স্বচ্ছতায়, বিবেকতাড়িত একজন লেখক হিসেবে তিনি আদর্শস্থানীয়। সেই মানুষ, সেই শিক্ষক আজ তাঁর সন্তানের হত্যাকাণ্ডের পর যা বলেছেন, সেই কথাকে আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—‘হত্যাকারীদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই না। কেননা, বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক।’ বাংলাদেশে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেখানে দীপন হত্যার বিচার হবে, সেই আশা নাগরিক হিসেবে সম্ভবত ফজলুল হক স্যার করেন না, অন্যরাও করেন না। ফলে আমরা যদিও দাবি করব এই হত্যার বিচার হোক, দেশে যত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে, তার বিচার হোক; আমরা সম্ভবত আশাবাদী হতে পারি না, তা হবে।
ফজলুল হক স্যার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে এই হত্যাকাণ্ড, এই হত্যাচেষ্টা, দেশে সংঘটিত অন্য হত্যা—কোনোটাই রাজনীতির বাইরে নয়। ফলে তার মোকাবিলা শক্তি দিয়ে হবে না, রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠিয়ে, অসহিষ্ণুতা—তা ধর্মের নামেই হোক বা জাতীয়তাবাদের নামেই হোক—তাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে হবে না। যে রাজনীতি এই ধরনের সহিংস চরমপন্থার চর্চা করে, তার পথ উন্মুক্ত করে তার বিপরীতে সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণের রাজনীতি হচ্ছে তার সমাধান। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক শুভবুদ্ধির প্রত্যাশা করে বলেছেন, ‘যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যাঁরা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা।’ আমরা যখন আমাদের শোক, আমাদের ক্ষোভ কাটিয়ে উঠব, তখনো আমরা কি তাঁর এই কথাগুলো মনে করতে পারব? আমরা কি প্রস্তুত হয়েছি এই বিষয়ে সবার অংশগ্রহণে আলোচনা করতে? আমরা কি আমার মতকেই শেষ কথা বলে, ঐশ্বরিক বা ঐতিহাসিক বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে প্রস্তুত হয়েছি?
চার.
আজ থেকে তিন দশকেরও বেশি সময় আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীদের হামলায় আহত ও রক্তাক্ত হয়ে ছুটে পথ পেরিয়ে যে গৃহকে নিরাপদ আশ্রয় জেনে উঠেছিলাম, সেটি আমার শিক্ষক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের বাসা। স্নেহে ও মমতায় জড়িয়ে ধরে স্যার ও ভাবি আমার মাথা থেকে বেরোনো রক্তের ধারা তোয়ালে দিয়ে বেঁধে দিয়েছিলেন, নিশ্চিত করেছিলেন যেন আমি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে পারি। আজ সেই নিরাপদ গৃহের সন্তান, ফয়সল আরেফিন দীপন যখন কর্মস্থলে রক্তের স্রোতে ভেসে গিয়েছিলেন, তাঁকে কেউ জড়িয়ে ধরেনি, কেউ তাঁর রক্তের ধারা তোয়ালে দিয়ে বেঁধে দেয়নি। হাজার মাইল দূরে বসে আমি কেবল সংবাদ শুনেছি, আমার এই অসহায়ত্বের ভার আমার একার। কিন্তু আমরা যে সেই দেশ তৈরি করতে পারলাম না, যেখানে দীপনেরা, অভিজিতেরা, সাধারণ মানুষেরা নিরাপদ জীবন যাপন করেন, যেন মানুষ নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারেন, ভিন্নমত প্রকাশ যেন নিজের মৃত্যুপরোয়ানার স্বাক্ষরচিহ্ন না হয়, যেন মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি পায়, তা আমরা কবে বুঝতে পারব? আমার শিক্ষক, একজন শোকাহত বাবা, আজ তাঁর সন্তান হত্যার বিচার চাননি; শুভবুদ্ধির উদয়ের প্রত্যাশা করেছেন মাত্র। আমরা কি তা শুনতে পাচ্ছি?
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

দিল্লির কেরালা ভবনে পুলিশের অভিযান
কেন্দ্র–রাজ্য বিরোধের জন্ম দেয়
গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ করতে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলো যেভাবে অতি উৎসাহী হয়ে উঠছিল, তা নিয়ে এই কাগজে একটা নিবন্ধ লিখেছিলাম কিছুদিন আগে। সেই সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছিলেন, কে কী খাবে সেটা মানুষের ওপর জবরদস্তি চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। সর্বোচ্চ আদালতের ওই অভিমত একটা ভরসা জুগিয়েছিল। মনে হয়েছিল, দেশে এবার হয়তো গরু-সংক্রান্ত পাগলামি কমবে, মানুষ ঠান্ডা মাথায় সবদিক খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে এবং অযথা উত্তেজনা সৃষ্টিতে উসকানি দেবে না। সেই মনে হওয়াটা যে ভুল ছিল, অল্প দিনেই তা বোঝা গেল। আরও বোঝা গেল ঐতিহ্য, আদর্শ, নীতি ও সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে কিছু মানুষ এই দেশের চরিত্রটা বদলে দিতে উঠেপড়ে নেমেছে। তাতে হাওয়া দিচ্ছে দেশের শাসকশ্রেণির একটা বড় অংশ।
ওই নিবন্ধ প্রকাশের পরপরই বেশ কয়েকটা ঘটনা ঘটে যায়। অযথা কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে। অনর্থক অশান্তি সৃষ্টি হয় রাজ্যে রাজ্যে। দেশজুড়ে শুরু হয়ে যায় বিতর্ক। সেই বিতর্ক আজও অব্যাহত। গরু-বিতর্কে দেশটা যে এত তাড়াতাড়ি এভাবে টানটান হয়ে উঠবে, তখন বোঝা যায়নি। এখন বুঝছি, গরু অতি বিষম বস্তু।
প্রথম ঘটনাটা ঘটল রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে উত্তর প্রদেশের দাদরি এলাকার বিসাদা গ্রামে। সেই গ্রামে স্মরণকালের মধ্যে কোনো দিন হিন্দু-মুসলমানে মারামারি হয়নি। দাঙ্গা তো দূরের কথা। বরং দোল-দীপাবলি—ঈদ দুই সম্প্রদায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উদ্‌যাপন করে এসেছে। এ রকম একটা গ্রামে মোহাম্মদ ইকলাখ নামে মাঝ-পঞ্চাশের এক প্রৌঢ়কে গ্রামেরই পরিচিতরা পিটিয়ে মেরে ফেলে স্রেফ একটা গুজব শুনে। গুজবটা গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে। এরই পিঠাপিঠি জম্মু-কাশ্মীরের উধমপুর এলাকায় একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা ছোড়া হয়। অভিযোগ, ট্রাকে করে গরু পাচার হচ্ছিল। সেই ঘটনায় এক মুসলমান যুবকের মৃত্যু হয়। পুলিশ তদন্ত করে দেখে দুটি ঘটনারই অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। আরও একটি ঘটনা ঘটে উত্তর প্রদেশেই। একটি গরুর চামড়া ছাড়াচ্ছিল দুই যুবক। কিছু মানুষ তা দেখে তাদের বেদম প্রহার করে। পরে জানা যায় গরুটির স্বাভাবিক মৃত্যুর পর তার মালিক ওই যুবকদের ছাল ছাড়ানোর কাজে লাগিয়েছিল। প্রায় নিয়মিত কোনো না-কোনো দিন দেশের কোথাও না-কোথাও এই ধরনের গরু-বৃত্তান্ত শোনা যাচ্ছে। সুস্থ মানুষ প্রতিবাদ জানালেও অসুস্থ মানুষজন ভ্রুক্ষেপ করছে না। এ এক বিতিকিচ্ছির পরিস্থিতি।
পরিস্থিতি কতটা ঘোরাল, তা বোঝা গেল খোদ রাজধানীতে কেরালা ভবনের ঘটনায়। নয়াদিল্লি দেশের রাজধানী এবং সেখানে রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিদের অনবরত আসতে হয় বলে স্বাধীনতার কিছু কাল পরে প্রতিটি রাজ্য সরকারকে সেখানে সস্তায় জমি দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য, রাজ্যগুলো তাদের টাকায় সেই জমিতে ভবন তৈরি করুক। সেখানে সস্তায় থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত করুক, যাতে যারাই সেখানে থাকবে তাদের থাকা ও খাওয়ায় অসুবিধা না হয়। কেরালা ভবনও তেমন আর পাঁচটা ভবনের মতো। এই ভবনগুলোর চৌহদ্দি রাজ্য সরকারের এখতিয়ারে। থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মালিক রাজ্য সরকারই।
সেই কেরালা ভবনের ক্যানটিনে বহু বছর ধরেই গরুর মাংস বিক্রি হয়ে আসছে। গরু বলতে অবশ্য মহিষের মাংস। লোকজন চেটেপুটে খায়। অযোধ্যায় বিজেপির রামমন্দিরের আন্দোলনের সময় দেশের আনাচকানাচে বেশ কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে যায়। সেই রকমই একটা অতি অল্পপরিচিত সংগঠন, যার নাম হিন্দু সেনা, তারই দু-একজন নেতা পুলিশকে জানায়, কেরালা ভবনে খুল্লাম খুল্লা গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। পুলিশও খবর পাওয়ামাত্রই বিশাল এক বাহিনী নিয়ে কেরালা ভবনে চলে যায় এবং অধিকারের বেড়া টপকে সোজা ক্যানটিনে গিয়ে ‘বিফ ফ্রাই’ বিক্রি বন্ধের হুকুম জারি করে। এ যেন কানে হাত দিয়ে না দেখে চিলের পেছনে ছোটার গল্প। নির্বোধ পুলিশ এটা করে নিজেদের টেনে আনে বিতর্কের আবর্তে। শুরু হয় কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদ। পুলিশ কমিশনার নিজে আইনের দোহাই দিয়ে গলা উঁচিয়ে যা-করেছি-ঠিক-করেছি সাফাই গেয়ে নিজেকে নির্বোধ পুলিশের নির্বোধ নেতা প্রতিপন্ন করে ফেললেন। বুঝলেন না, রাজ্যের এখতিয়ারে ওই ভাবে নাক না গলিয়ে তাঁর উচিত ছিল আগে কেরালা ভবনের সরকারি কর্তাদের সঙ্গে কথা বলা। এই কদিন হলো, দিল্লি পুলিশ সার্কুলার জারি করে বলেছে, কোনো রাজ্যের ভবনে প্রবেশের আগে যেন কর্তাদের সঙ্গে কথা বলা হয়।
গরু নিয়ে এই কাণ্ড-কারখানা শুরুর এক মাস আগে দেশের অতিপরিচিত যুক্তিবাদী লেখক এম এম কুলবর্গী নিজের বাড়ির সামনে খুন হন। এই মৃত্যুর আগে একইভাবে অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা খুন করেছে যুক্তিবাদী লেখক গোবিন্দ পানসারে ও নরেন্দ্র দাভোলকরকে। তদন্তকারী পুলিশের সন্দেহ, এসব খুনের পেছনে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের যোগ রয়েছে। সংগঠনের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিরা সবাই সুপরিচিতই শুধু নন, কেউ কেউ সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তও। অথচ সাহিত্য একাডেমি মূক ও বধির সেজে বসে! দেশের লেখককুল যখন এই অসহিষ্ণুতায় চঞ্চল, তখনই ঘটে যায় বিসাদা গ্রামের হত্যাকাণ্ড। দেখা গেল, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিজেপির দলীয় সভাপতি কেউই ঘটনার নিন্দা করে কড়া কোনো বিবৃতি দিচ্ছেন না। ক্ষুব্ধ ও ক্ষিপ্ত অশীতিপর নয়নতারা সায়গল প্রথম প্রতিবাদী হয়ে ফিরিয়ে দিলেন সাহিত্য একাডেমির পুরস্কার। তাঁর দেখাদেখি অন্যরা।
বিষয়টা শুধু লেখকদের মধ্যেই আবদ্ধ থাকল না। দিন দিন অসহিষ্ণুতার মাথাচাড়া দেওয়া এবং এই প্রবণতাকে রুখতে প্রধানমন্ত্রীর দিক থেকে কোনো কড়া নিদান না আসায় সুস্থ মানুষ অসহায় বোধ করতে থাকলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মৌনব্রতের কারণে তাঁরই দল ও সমভাবাপন্ন সংগঠনগুলোর কর্তারা উৎসাহী হয়ে দ্বিগুণ তেজে এমন সব কথাবার্তা শুরু করলেন, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে আশঙ্কিত করে তুলল। উদ্বিগ্ন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি শেষ পর্যন্ত মুখ খুললেন। বহুত্ববাদী চরিত্রই যে ভারতের শক্তি এবং সেটাই যে উত্তরণের একমাত্র পথ, খুব স্পষ্ট করে সেই বার্তা তিনি দিলেন। একবার নয়, দুবার নয়, তিন তিনবার। এরপরও প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে এমন কোনো বার্তা দেননি, যা মানুষজনকে আশ্বস্ত করতে পারে। যা তিনি বলেছেন, তা সরাসরি কোনো বার্তা নয়, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলা। কিন্তু সেই বলার মাঝেও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এসব ঘটনার জন্য কেন কেন্দ্রীয় সরকারকে দোষী ঠাওরানো হবে?
বিতর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার এই কৌশল নরেন্দ্র মোদি কেন নিয়েছেন তার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দুটি। প্রথমটি হলো তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্বাস, যা তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের কাছ থেকে আয়ত্ত করেছেন। সেই বিশ্বাসের সঙ্গে দেশের বহুত্ববাদী চরিত্রের স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে, যা তাঁরা সরাসরি বলেও থাকেন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার পর সেই বিশ্বাসের সঙ্গে কর্তব্যের অনিবার্য সংঘাতে তিনি তাঁর প্রকৃত ভূমিকাটা আঁকড়ে ধরতে পারছেন না। দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন। রাষ্ট্রের কর্তব্য তাঁর মাধ্যমেই পালিত হওয়ার কথা। সেই কর্তব্য করতে গেলে বিশ্বাসকে জলাঞ্জলি দিতে হয়। ফলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তিনি নিজেকে অসহায় করে তুলেছেন।
দ্বিতীয় কারণটি বিহারের ভোট। লক্ষ করলে দেখা যাবে, অসহিষ্ণুতা মাত্রাছাড়া হওয়া ও সেই ধোঁয়ায় বাতাস দেওয়া শুরু বিহারের ভোট-পর্ব এগিয়ে আসার সময় থেকে। ২০ বছরের শত্রুতা শিকেয় তুলে লালু প্রসাদ ও নীতিশ কুমার যে জোট বাঁধবেন এবং সেই জোটের শরিক করবেন তাঁদের এযাবৎকালের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কংগ্রেসকে, বিজেপি তা বুঝতে পারেনি। হেলায় লঙ্কা জয়ের মতো মোদি-হাওয়ায় ভর করে লোকসভার মতো বিধানসভাতেও বিজেপি বিহারের দখল নেবে, বিজেপির এই ভাবনাটা ক্রমেই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে যায়। লড়াইটা যত কঠিন হতে থাকে, ততই দানা বাঁধতে থাকে গরু-বিতর্ক। মাথাচাড়া দিতে থাকে অসহিষ্ণুতা। তুচ্ছ তুচ্ছ অজুহাত সৃষ্টি করতে থাকে অহেতুক ও অপ্রয়োজনীয় সংঘাতের, যা ধর্মীয় মেরুকরণের পথ প্রশস্ত করার পক্ষে যথেষ্ট। নরেন্দ্র মোদিও কড়া ভাষায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সাংবিধানিক চরিত্র অটুট রাখার কথা বলছেন না পাছে বিহার হাত থেকে ফসকে যায়, সেই আশঙ্কায়। তিনি বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন, বিহার তাঁর ও টিম মোদির কাছে মরণ-বাঁচনের লড়াই। এই লড়াইয়ে হার মানে তাঁর জৌলুশ ফিকে হয়ে যাওয়া। প্রধানমন্ত্রীর কিন্তু মনে রাখা দরকার, দেশের মানুষ ভোটটা দিয়েছে স্রেফ তাঁকে দেখে। দিয়েছে সুশাসনের আশায়। তিনিও প্রথম দিন থেকেই বোঝাতে চেয়েছেন, নিছকই দলীয় নেতা নন, তিনি একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক হতে চান, যা সবদিক থেকে ভারতের ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বলতর করে তুলবে।
মোদির মৌনতা ও অসহিষ্ণুতা প্রতিবাদীদের বৃত্তটিকে দিন দিন বাড়িয়ে তুলেছে। লেখকদের পর এবার প্রতিবাদী স্বর শোনা যাচ্ছে বিজ্ঞানী মহল, ঐতিহাসিক, শিক্ষাবিদ ও বিনোদনের জগৎ থেকে। বিজেপি কিন্তু এখনো এই প্রবণতাকে সমস্যা বলে স্বীকার করতে রাজি নয়। বরং গলা উঁচিয়ে তারা যা বলছে, তার সারকথা, প্রতিবাদীরা সবাই কংগ্রেস ঘরানার মানুষ। বিজেপি-বিরোধিতাই যাদের ধর্ম। রাজনৈতিক যুক্তি রাজনীতির মানুষজন দেবেনই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও টিম মোদির এটা জানা দরকার, অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না।
আরও জানা দরকার, ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার দরুন আন্তর্জাতিক দুনিয়াতেও প্রশ্ন উঠছে। বহির্বিশ্ব দেখছে, নরেন্দ্র মোদির কথায় ও আচরণে বিস্তর ফারাক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশ্ন তুলেছে, জার্মানিতে সংশয় দানা বাঁধছে, পাকিস্তান পর্যন্ত খোঁটা দিতে ছাড়ছে না। এই যে ঘটা করে ইন্ডিয়া-আফ্রিকা ফোরামের শীর্ষ বৈঠক হয়ে গেল, সেখানেও নিভৃতে গরু-বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সারকথাটি শুনিয়েছে বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘রেটিং এজেন্সি’ মুডিজ। ভণিতা না করে তারা সোজাসাপটা বলে দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি দলীয় সদস্যদের রাশ টানতে না পারেন, তা হলে দেশে ও বিদেশে তিনি দ্রুত নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবেন।
মোদি আর যাই হোন উটপাখি নন। ভোটে জেতার আগে থেকে ভারতকে তিনি যে উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নের কথা শুনিয়ে আসছেন, তা সফল করতে তাঁকে জাগতেই হবে। মুডিজ সরাসরি সেই ‘ওয়ার্নিং’ তাঁকে দিয়ে রাখল।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

‘পারলে গলায় পাড়া দিয়া ট্যাকা নেয়’ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

জীবিকার প্রয়োজনে অথবা অন্য দরকারে মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াত করতে হয়। নিজস্ব যানবাহন আছে খুব কম মানুষের। গণপরিবহন বাস-মিনিবাস প্রভৃতিতে যাতায়াত করে ৯০ শতাংশ মানুষ। তাদের ৭০ শতাংশ অতি নিম্ন আয়ের মানুষ। অধিকাংশই সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অল্প ও মাঝারি আয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। গণপরিবহনে যাতায়াতকারীদের একটি বিরাট অংশ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। আধা বেকার যুবক-যুবতী, যাঁরা জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করেন—বাস-মিনিবাস প্রভৃতির যাত্রীদের একটি অংশ তাঁরাও।
বাংলাদেশের অধিপতি শ্রেণির মানুষ, যাঁদের নিজস্ব গাড়ি রয়েছে এবং কোনো কোনো পরিবারে কয়েকটি গাড়ি, তাঁদের পক্ষে গণপরিবহনে যাতায়াতকারী মানুষের দুর্ভোগের মাত্রাটি উপলব্ধি করা একেবারেই সম্ভব নয়। বর্তমান বাজারে যাঁর গড় আয় ১০-১২ হাজার টাকা, তাঁকে যদি হঠাৎ মাসে এক-দেড় হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়, তা তাঁর ওপরে জুলুম। বর্তমানে গণপরিবহনে যাতায়াত ও বাড়তি ভাড়া নিয়ে যে নৈরাজ্য চলছে, তাতে সেই রকম জুলুমের শিকার কোটি কোটি মানুষ। অসহায় মানুষের সেই দুর্দশা দেখে নাগরিক সমাজের আমরা নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারি না। সে জন্য যাত্রীদের মুখে তাঁদের দুর্দশার কথা শুনতে আমরা গণশুনানির আয়োজন করেছি।
পোশাকশিল্পে কাজ করে এমন একটি মেয়ে বলল, ‘বাসভাড়ায় এখন কুড়ি টাকা আগের চেয়ে বেশি লাগতেছে। বাজার করুম কী দিয়া?’ অর্থাৎ যাঁর মাসিক আয় সাত হাজার টাকার মতো, তাঁর যদি হাজার দেড়েক টাকা বাসভাড়াতেই চলে যায়, তিনি খাবেন কী? ফার্মগেটে এক নারী বিবিসির সংবাদদাতাকে বললেন, ‘পারলে গলায় পাড়া দিয়া ট্যাকা নেয়।’
বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ বাস-মিনিবাসে যাতায়াত করতে বাধ্য হয়। তাতে জোর-জুলুম করে বর্ধিত ভাড়া আদায় বাস মালিক-কর্মচারীদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ভাড়া সরকার নির্ধারণ করেছে বড় বাসের জন্য সাত টাকা, সেখানে যাত্রীদের থেকে আদায় করা হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকা। প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ১০ পয়সা। সে হিসাবে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে বাড়তি দিতে হতে পারে এক থেকে তিন টাকা, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে পাঁচ থেকে আট টাকা বেশি।
আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের কোনো ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব নেই। আমরা গণপরিবহনের মালিকদের ন্যায্য ভাড়া নিতে বাধ্য করতে পারি না। কর্মচারীরা কেন অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে—সে কথাও আমরা কোনো বাস-মিনিবাস চালক বা হেলপারকে জিজ্ঞেস করি না। সে অধিকার আমাদের নেই। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা শুধু জিজ্ঞেস করে কোন জায়গা থেকে কোন দূরত্বে নির্ধারিত ভাড়া কত আর যাত্রীদের থেকে আদায় করা হচ্ছে কত?
পরিবহন ক্ষেত্রের এই নৈরাজ্যের মূলেও দুর্নীতি। খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় যেসব বাস-মিনিবাস-লেগুনা-টেম্পো রাস্তায় দেখা যায়, বিদেশি পর্যটকদের চোখে বাংলাদেশকে হেয় করার জন্য সেগুলোই যথেষ্ট অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুধু বাস-মিনিবাসে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকা ও তার আশপাশের সড়কে লেগুনা, টেম্পো, হিউম্যান হলার, পিকআপ ভ্যান প্রভৃতির ভাড়াও অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। কেন অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, তা যাত্রীরা জিজ্ঞেস করলে মারামারি-হাতাহাতি পর্যন্ত হচ্ছে যাত্রীদের সঙ্গে যানবাহনের কর্মচারীদের।
বাসভাড়া বাড়ানোর আগে ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটি বিচার-বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে যাত্রীসাধারণের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। এবার তিন বছর পর ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। বাসে ১.৬০ থেকে ১.৭০ পয়সা এবং মিনিবাসে ১.৫০ থেকে ১.৬০ পয়সা। সেটা কাগজে, বাস্তব অবস্থা একেবারেই অন্য রকম। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কৌশল মালিক-শ্রমিকদের ভালো জানা। গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বলে দুটি চাতুর্যের আশ্রয় নিচ্ছে তারা। গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বলে কোনো জিনিসের অনুমোদন নেই সরকারের। সবই সাধারণ। লোকাল বাস, শুধু এসি বাস ছাড়া। ইচ্ছামতো গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বলে মানুষকে প্রতারিত করে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে। এই অবৈধ কাণ্ড সরকার বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। চলছে লোকালের মতো, বলছে সিটিং সার্ভিস। ভাড়া দ্বিগুণ বা তারও বেশি। এই অবৈধ তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু রেখেছে। তা নিয়েও তুলকালাম কাণ্ড। বাংলাদেশে আইন প্রয়োগ চলবে না। দু-চারজন বাস কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করায় এবং কয়েক দিনের জেল দেওয়ায় এক দিন ঢাকা নগর অচল করে দেওয়া হয়। সরকার নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট চারজন। কয়েক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মামলা হয়েছে অনেকগুলো। কিছু গাড়িকে ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়েছে। অবস্থার উন্নতি হয়নি। মালিক-শ্রমিকেরা জরিমানাও দিচ্ছে, অতিরিক্ত ভাড়াও নিচ্ছে।
মালিকপক্ষ ও সরকার মনে করছে, কয়েক দিন এভাবে চললে মানুষ বাধ্য হয়ে বর্ধিত ভাড়াই মেনে নেবে। হয়তো নেবে কিন্তু মানুষের ভেতরের অসন্তোষ বন্ধ হবে না। একটি অবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। ক্ষমতাসীন দলগুলোর তাতে কিছুই আসে যায় না। দলকে চাঁদা দেয় পরিবহন মালিকেরা, জনগণ নয়। সুতরাং সরকারকে মালিকদের স্বার্থই রক্ষা করতে হয়—জনগণের স্বার্থ নয়।
শুধু সরকারকেই বা দোষ দেব কেন? রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা হতাশাজনক। জনস্বার্থ রক্ষায় তাদের ভূমিকা দেখি না। ২০-৩০ বছর আগে এভাবে ভাড়া বাড়ালে এবং অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত ভাড়া নিলে দলগুলো রাস্তায় নামত বা ধর্মঘট ডাকত। ক্ষমতাসীন দলগুলোর নীরবতা অর্থবহ, কিন্তু বিরোধী দল বলে যারা দাবি করে, বিশেষ করে বাম দলগুলো তারাও একটি বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব পালন করেছে।
গণপরিবহনে অরাজকতা নতুন নয়, দীর্ঘদিনের। আশির দশক থেকে অবস্থার অবনতি ঘটেছে। কোনো সরকার এদিকে দৃষ্টি দেয়নি, অতি নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি দলসহ বিভিন্ন বড় দল চাঁদা তুলেছে। গত ৩০ বছরে ঢাকায় মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণ, গণপরিবহনের সংখ্যা কমেছে অর্ধেক। অদ্ভুত বৈপরীত্য। পরিবহন মালিকদের সূত্রে জানলাম, ১৫ বছর আগে ঢাকায় বাস ছিল সাত হাজার, বর্তমানে কমে হয়েছে চার হাজার। চট্টগ্রামে বাস চলছে দেড় হাজার মাত্র। অতি কষ্টে যাত্রীরা দাঁড়িয়ে বা দরজার হাতলে বা বাম্পারে ঝুলে যাতায়াত করে। ভাড়া নেওয়া হয় খেয়ালখুশিমতো।
বর্তমানে ঢাকায় গণপরিবহনে যাতায়াত করে প্রায় এক কোটি মানুষ। তাদের চার ভাগের এক ভাগ নারী এবং আর এক ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। কর্মজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। গণপরিবহনে তাদের যাতায়াতে যে লাঞ্ছনা ও দুঃখ সইতে হয়, তা সীমাহীন। তাদের বসার নির্দিষ্ট আসন নেই। বঙ্গীয় পুরুষের সৌজন্যবোধ নেই। নারী দেখলে উঠে দাঁড়ায় না। জানালা দিয়ে উদাস দৃষ্টিতে আকাশে তাকিয়ে থাকে না দেখার ভান করে। কেউ একটু বসার জায়গা চাইলে খেঁকিয়ে জবাব দেওয়া হয়। বাসের কর্মচারীদের থেকেও তারা সহানুভূতি পায় না। ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন তুললে অশ্লীল ভাষায় কথা শোনানো হয়। কিশোরী-যুবতীদের গায়ে হাত পর্যন্ত দেওয়া হয়। নিরুপায় হয়ে ও লজ্জায় তারা তা হজম করে।
বাস-মিনিবাসের ড্রাইভার-হেলপারদের জীবনও খুবই দুঃখের। হেলপারদের অনেকেরই বয়স খুব কম। বলতে গেলে কিশোর। তারা অবহেলিত-বঞ্চিত। বেতন সামান্য। সারা দিন পরিশ্রম করতে হয়। বিশ্রামের অভাব। থাকার জায়গা নেই। যাত্রীদের অনেকেই তিরিক্ষি মেজাজের। ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষির সময় মেজাজ ঠিক রাখা কঠিন। ফলে যাত্রীদের সঙ্গে ‘হেলপার’দের শুধু কথা-কাটাকাটি নয়, মারামারি পর্যন্ত ঘটে।
পরিবহন মালিকদেরও সমস্যা থাকতে পারে। সেসব দেখাও সরকারের দায়িত্ব। যেকোনো সমস্যাই আলোচনার মাধ্যমে যুক্তিগ্রাহ্যভাবে সমাধান সম্ভব। তবে কোনো অজুহাতেই সরকারি নীতিমালা অমান্য করার অধিকার কোনো পক্ষেরই নেই। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত রেখে কাঙ্ক্ষিত আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
ঢাকা বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর শুধু নয়, বৃহত্তম নগর এবং প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। রাজধানী নগরের পরিবহনব্যবস্থা কী রকম হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো সরকারেরই কিছুমাত্র ধারণা ছিল বলে মনে হয় না। থাকলে অবস্থাটা এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করত না। স্বাধীনতার আগে বিআরটিসির বাস ছিল সবচেয়ে সুন্দর ও আরামদায়ক গণপরিবহন। নষ্ট রাজনীতি ও দুর্নীতির ধাক্কায় সেটা ধ্বংস করা হয়েছে। পরিবহন ক্ষেত্রের এই নৈরাজ্যের মূলেও দুর্নীতি। খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় যেসব বাস-মিনিবাস-লেগুনা-টেম্পো রাস্তায় দেখা যায়, বিদেশি পর্যটকদের চোখে বাংলাদেশকে হেয় করার জন্য সেগুলোই যথেষ্ট।
এই নৈরাজ্য ও সমস্যার সমাধান কোথায়? গণপরিবহন যে একটি জটিল সমস্যা, স্বীকার করে নিয়ে তা সমাধানে গোত্র ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। থাকতে হবে যথাযথ অঙ্গীকার। সরকার একা পারবে না। মালিক-শ্রমিকসহ সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নাগরিক সমাজকেও সম্পৃক্ত করা বাঞ্ছনীয়। বর্তমানে নৈরাজ্য-অনাচার বন্ধ করতে সরকার যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জনগণ তা সমর্থন দেবে। অকারণে কঠোর হওয়ার দরকার নেই, আইনের যথাযথ প্রয়োগই সমস্যার সমাধান করতে পারে। সেই সঙ্গে দরকার সরকারি নীতিনির্ধারক এবং কর্তৃপক্ষের জনগণের বেদনা উপলব্ধি করা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

সিরিয়ার সেনাবাহিনীর কথা ভুললে চলবে না by রবার্ট ফিস্ক

সিরিয়ার কমান্ডাররা এখন রাশিয়ার
প্রতিটি বিমান হামলা সমন্বয় করছে
মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার দুঃসাহসী অভিযান নিয়ে পৃথিবী এখনো রাগে গরগর করছে। রাশিয়া সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ব্যাপারে নাক গলানো থেকে বঞ্চিত করেছে, কোন একনায়ক বেঁচে থাকবে আর কোন জন মারা যাবে। কিন্তু এই ডামাডোলের মধ্যে আমরা একটি প্রতিষ্ঠানের কথা ভুলে যাচ্ছি। সেটি হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা সেই রাষ্ট্রের মধ্যে ক্রিয়াশীল আছে, রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে, যে রাষ্ট্রকে আবার মস্কো রক্ষা করতে চায়। সেই প্রতিষ্ঠানটি হলো সিরিয়ার সেনাবাহিনী। রাশিয়া নিজের ক্ষেপণাস্ত্রের প্রচারণা দিচ্ছে, আর সিরিয়ার সেনাবাহিনী মাস কয়েক আগেও লোক ও অস্ত্রবলে কমজোর থাকলেও হঠাৎ করেই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। আমরা মনে করতে পারি, এ বছরের শুরুর দিকে এই সেনাবাহিনী প্রায় অকেজো হয়ে গিয়েছিল, বাশার আল-আসাদের সরকার নিজের শেষ দেখে ফেলেছিল।
ক্ষমতার পালাবদল ঘটানোর জন্য আমরা ঘুণে ধরা সেনাবাহিনীকে নামিয়েছিলাম। সিরিয়ার সেনাবাহিনী জিসর আল-সুগুর ও পালমিরায় হারছিল। ফলে আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম, বাশারের রাষ্ট্র এমন জায়গায় চলে গিয়েছিল, যেখানে আর সামান্য কিছু হলেই তার পতন হতে পারে।
এরপর ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র বহর নিয়ে হাজির হলেন, আর পুরো পরিস্থিতি বদলে গেল। আমরা যখন গোঁৎ গোঁৎ করছিলাম যে রাশিয়া মধ্যপন্থী বিদ্রোহীদের ওপর বোমাবর্ষণ করছে, তখন আলেপ্পো ও ওরোন্তসের উপত্যকার আশপাশে সিরিয়ার সেনাবাহিনী নুসরা ফ্রন্টের বিরুদ্ধে যে অভিযান চালাচ্ছে, সেদিকে আমরা নজর দিইনি। অথচ মার্কিন জেনারেলরা বলেছিলেন, মধ্যপন্থীদের অস্তিত্ব নেই।
সিরিয়ার কমান্ডাররা এখন রাশিয়ার প্রতিটি বিমান হামলা সমন্বয় করছে। তারা প্রতি রাতে ২০০ থেকে ৪০০টি হামলা সমন্বয় করছে। এখন সে সংখ্যাটা প্রায়ই ৮০০-তে চলে যাচ্ছে। না, রুশরা যে মানচিত্রের প্রতিটি রেফারেন্স অনুসারেই হামলা করছে, ব্যাপারটা তা নয়। সিরিয়া দেখেছে, রুশরা ঘনবসতিপূর্ণ স্থানে হামলা করতে চায় না, তারা আফগানিস্তানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের কাছে সিরিয়ার জ্বলন্ত হাসপাতাল ও মৃত বরযাত্রীদের রেখে যেতে চায়। তবে নীতির পরিবর্তন যেকোনো সময় হতে পারে। বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণে বেসামরিক মানুষ নিহত হবে না, তা হতে পারে না। আর সেটা করতে হলে অন্য দেশের সীমানাও অতিক্রম করতে হয়।
যৌক্তিক পরম্পরায় রুশরা তুর্কিদের বলেছে, এই যুদ্ধ সমন্বয়ের তথ্যটা মার্কিনদের হাতে যাওয়া উচিত। আরও উল্লেখযোগ্য খবর হচ্ছে, সিরিয়ার ভূমধ্যসাগর উপকূলে রুশদের ঘাঁটির সঙ্গে তেল আবিবের ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে হটলাইন যোগাযোগ চালু হয়েছে। আরও অবিশ্বাস্য খবর হচ্ছে, ইসরায়েলের বিমানবাহিনী একসময় গোলান উপত্যকায় সিরিয়া ও ইরানের বেসামরিক মানুষের ওপর বোমা হামলা চালালেও হঠাৎ করেই তারা আকাশ থেকে উধাও হয়ে গেছে। অন্য কথায় বললে, রাশিয়া এক বড় অভিযানে নেমেছে, সিরিয়ায় তারা এক মাসের জন্য ঘুরতে আসেনি। এটা অনেক দিন ধরে চলবে বলেই মনে হয়।
সিরিয়া আসলে পালমিরা পুনর্দখলের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিল, আইএস গত মে মাসে সেটি দখল করেছিল। কিন্তু রুশরা আলেপ্পো অঞ্চলের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে, এর আংশিক কারণ হচ্ছে তারা মনে করে, লাতাকিয়া উপকূলের আশপাশে তাদের ঘাঁটি দুর্বল। নুসরা ফ্রন্ট লাতাকিয়া ও তারতুসের দিকে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, আর মস্কো চায় না যে তার বিমানবাহিনী ভূমিতেই অন্য কারও লক্ষ্যবস্তু হোক। কিন্তু সিরিয়ার সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ চারটি ইউনিট মোতায়েন করেছে, তারা এখন তুরস্ক সীমান্তের দিকে এগোচ্ছে: প্রথম ও চতুর্থ ডিভিশন, রিপাবলিকান গার্ড ও স্পেশাল ফোর্সেস।
আইএসের রাজধানী রাকায় রাশিয়ার বিমান হামলায় আইএস আক্রান্ত হতেও পারে আবার নাও হতে পারে, যদিও সিরিয়া এ কথা বলে বুক ফোলায় যে ওই শহর থেকে তারা অনেক গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে। ব্যাপারটা সত্য হলে তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক হবে, কারণ আইএস ‘সরকারের চরদের’ নির্যাতন করে মেরে ফেলার ব্যাপারে ওস্তাদ। ফলে যে-ই দামেস্কে তথ্য পাঠাক না কেন, তাকে অনেক সাহসী হতে হবে। তারপরও ভ্রমণকারীদের কথা সত্য হতে পারে। রাকা থেকে দামেস্ক পর্যন্ত একটি নিয়মিত বেসামরিক যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে, এ এক অদ্ভুত ব্যাপার, কারণ বেসামরিক বাস সাধারণত যুদ্ধরেখা অতিক্রম করে থাকে। আর যাত্রীরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বললেও বাড়ি পৌঁছে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে দেয়।
হ্যাঁ, এসবই পুতিনের অভিযানের শুরু মাত্র। ইদানীং তিনি মধ্যপ্রাচ্যে বেশ যাতায়াতও শুরু করেছেন। এই অঞ্চলের আরেক স্তম্ভ মিসরের ফিল্ড মার্শাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনি বন্ধুত্ব পাতিয়েছেন, যিনি নির্বাচনে ৯৬ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন, যিনি এখন মিসর শাসন করেন। কিন্তু মিসরীয় সেনাবাহিনী সিনাইয়ে ছোট একটি যুদ্ধে লিপ্ত হলেও বড় যুদ্ধের কৌশলগত অভিজ্ঞতা তার নেই। আবার সৌদি আরব, আমিরাত ও জর্ডানের বর্তমান সামরিক বাহিনী ইয়েমেন, লিবিয়া, সিরিয়া ও সুযোগমতো অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে আকাশ থেকে ছেলেখেলা প্রকৃতির হামলা চালালেও একটি প্রকৃত যুদ্ধ কীভাবে লড়তে হয়, সে অভিজ্ঞতা কি তাদের আছে? লিবিয়ার সেনাবাহিনী ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ওদিকে ইরাকের সেনাবাহিনী ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ণ লড়াই করতে পারেনি।
কিন্তু একটি তথ্য এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
সিরিয়ার সেনাবাহিনী যদি এই যুদ্ধে জেতে, নিজেদের ধরে রাখতে পারে, সেনাসংখ্যা বজায় রাখতে পারে, তাহলে তারাই হবে এ অঞ্চলের সবচেয়ে সমর-প্রশিক্ষিত, নির্মম ও সমর-অভিজ্ঞ সেনাবাহিনী। এ মুহূর্তে তাদের লোক ও অস্ত্রবল দুটোই কম। সিরিয়ায় প্রতিবেশীরা যদি এ কথা ভুলে যায়, তাহলে তাদের কপালে দুঃখ আছে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

মুম্বাই হামলা ও ক্রমাগত বদলে যাওয়া ভারত by এম সাখাওয়াত হোসেন

সপ্তাহ খানেক আগে কয়েক দিনের জন্য সস্ত্রীক মুম্বাই, পুরোনো নাম বোম্বে, গিয়েছিলাম বেড়াতে। মুম্বাই ভ্রমণের পেছনে আমার একটা কৌতূহল কাজ করছিল। আর তা হলো ১৯৯৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মুম্বাই শহরে একাধিক সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে এবং এসব ঘটনায় শত শত নিরীহ নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে। সর্বশেষ ভয়াবহ, অবিশ্বাস্য হামলা হয়েছিল ২০০৮ সালে। এই হামলা সম্বন্ধে প্রায় পাঠকই অবগত আছেন। এরপরও সংক্ষিপ্ত এই ভ্রমণের সময় আমার কৌতূহল ছিল কী কারণে ও কী উদ্দেশ্যে ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রায় ১২টি ঐতিহাসিক স্থাপনায় একযোগে সন্ত্রাসী হামলা হয় তা অনুধাবনের চেষ্টা করা। ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় যে হামলা শুরু হয়, শেষ হয় ২৯ নভেম্বর। তার মানে, প্রায় চার দিন ধরে এ হামলা চলে। যেসব জায়গায় হামলাগুলো হয়েছে, তার সবই ঐতিহাসিক তো বটেই, মুম্বাই তথা ভারতের জাতীয় প্রতীকসম।
আমরা যে জায়গায় থেকে এই কয়েক দিন কাটিয়েছি, তা ছিল দক্ষিণ মুম্বাইয়ের কোলাবা বন্দর এলাকায় কোলাবা থানার অন্তর্গত স্থান। ২০০৮ সালে ১২ জায়গায় সন্ত্রাসী হামলার প্রতিটিই প্রায় সাত-আট কিলোমিটারের মধ্যে আরব সাগরের ব্যাক বে-সংলগ্ন। এই হামলার অন্যতম টার্গেট ছিল ভারতের সবচেয়ে দর্শনীয় ও বিলাসবহুল তাজমহল প্যালেস হোটেল। হোটেলটি ভারত তথা মুম্বাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দর্শনীয় স্থান গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া এবং সাগরসংলগ্ন। সামনে মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ও দর্শনীয় মেরিন ড্রাইভের একাংশ। এখানে পুরো দিন ও সকালব্যাপী বিদেশি, দেশি পর্যটক ও শহরের মানুষের ভিড় থাকে। আবহাওয়ার কারণে এই সময়ে পর্যটকের সমাগম হয় বেশি। আমাকে স্থানীয় একজন জানিয়েছিলেন, সম্পূর্ণ মেরিন ড্রাইভের চওড়া ফুটপাত আর সাগরের ধারে প্রাচীরের সঙ্গে তৈরি বসার স্থানগুলোতে সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে ভোর পর্যন্ত মানুষের সমাগম থাকে। আমাদের হোটেলটি ছিল সেই বিখ্যাত তাজমহল প্যালেসের দুই লেন পরে জনাকীর্ণ রাস্তার ধারের পুরোনো বাজারের মধ্যে ডিপ্লোম্যাট হোটেল, যার সরাসরি অপর পারে কোলাবা পুলিশ থানা। তাজমহল প্যালেস হোটেল ওই থানা থেকে আধা কিলোমিটার আর হামলার আরেক লক্ষ্যবস্তু লিওপোল্ড ক্যাফেটি থানার প্রধান ফটক থেকে ২০ মিটার রাস্তার অপর প্রান্তে।
এ দুই জায়গা ছাড়াও ২০০৮-এর সন্ত্রাসী আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুগুলো ছিল ভারতের অন্যতম দর্শনীয় রেলওয়ে স্টেশন পূর্বতন ভিক্টোরিয়া, বর্তমানে ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাল, তাজ হোটেল থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের পারে নািরমান পয়েন্ট, ওেবরয় ট্রাইডেন্ট হোটেল, তারই কাছাকাছি নািরমান হাউস (জায়গাটি মুম্বাইয়ের ইহুদি জনগোষ্ঠীর কেন্দ্র ওই চত্বরটিতে ছিল এক ইহুদি পরিবার, যারা সিনাগ্যগ ও কেন্দ্রটি দেখাশোনা করত), কাছেই কামা হাসপাতাল, মেট্রো সিনেমা ও সেন্ট জোভিয়ার কলেজ। মোটামুটি সব জায়গাই, শুধু ওেবরয় হোটেল ছাড়া, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের স্থাপনা এবং এর মধ্যে ছয়টি স্থাপনা ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’।
বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো। বিজেপির দৃষ্টি এখন বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে। এ তিনটি রাজ্যে হিন্দুত্বের প্রভাব পড়লে তা ভারতের অন্যতম প্রতিবেশী বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলবে এসব স্থানের কয়েকটি দেখে আমি কল্পনাই করতে পারছিলাম না যে কীভাবে সন্ধ্যার সময় এমন একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী ঘটনা ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানীতে ঘটতে পারল। যতবার তাজমহল প্যালেস হোটেলের সামনে দাঁড়িয়েছি, ততবারই আমার ভাবতে অবাক হতে হয়েছে যে কীভাবে ১০ থেকে ১২ জন সন্ত্রাসী সম্পূর্ণভাবে অস্ত্রায়িত, গ্রেনেড, বিস্ফোরক ও স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হোটেলে প্রবেশ করে প্রায় চার দিন একধরনের যুদ্ধ চালিয়ে জিম্মি করে রেখেছিল। সবচেয়ে অবাক হতে হয়েছে যখন লিওপোল্ড ক্যাফেতে সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে ১১ জনকে হত্যা করতে পারল। আমি ওই ক্যাফেতে খেতে গিয়ে বুলেটের দাগগুলো দেখেছি। ক্যাফেটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭১ সালে। এখানে পর্যটক ও মধ্যবিত্তদের সমাগম হয় বেশি, তবে বেশির ভাগই পার্সি সম্প্রদায়ের মানুষ।
এই হামলা চালিয়েছিল লস্কর-ই-তাইয়েবা নামক পাকিস্তানের কাশ্মীর অঞ্চলের স্থিত সন্ত্রাসীগোষ্ঠী। গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এই ১০-১২ জন যখন রাবারের স্পিডবোটে মুম্বাইয়ের তীরবর্তী এলাকায় প্রবেশ করে, তখন স্থানীয় জেলেরা তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বকাঝকা করেছিল। সে খবর মুম্বাই পুলিশকে জানালেও তারা কোনো ধরনের সতর্কতা অবলম্বন তো করেইনি বরং বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়েছিল। ওই তাজমহল প্যালেস হোটেলে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কমিটির একটি সদস্য দল অবস্থান করছিল। তবে কেউ হতাহত হননি। কারণ, অনেকেই হোটেলে ছিলেন না আবার অনেকেই বিভিন্ন তলায় বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করে ছিলেন।
এ ঘটনার মাত্র দুই বছর আগে বাবরি মসজিদ ভাঙার ১৪ বছর পূর্তির দিনে ২০০৬ সালে লস্কর-ই-তাইয়েবা শহরের এ প্রান্তে ব্যাপক বোমা হামলা চালায়, যাতে প্রায় ৭০০ লোকের মৃত্যু হয়। তারপরও মুম্বাই পুলিশ সন্দেহজনক খবর পেয়ে কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা নেয়নি কেন, তা প্রায় সাত বছর পর ঘটনাস্থল দেখে এখনো আমার বোধগম্য হচ্ছে না। ওই হোটেল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপে নৌবাহিনীর উপস্থিতি এখনো চোখে পড়ার মতো। মুম্বাইয়ে এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা ছিল অত্যন্ত সুপ্রশিক্ষিত কমান্ডো হামলা। এদের ট্রেনিং ও সহযোগিতা করেছিল পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, তেমনটাই প্রমাণিত। আর এর প্রধান হোতা জাকিউর রহমান লাকভিকে পাকিস্তানের আদালত জামিনে মুক্ত করেছেন, সেটাও এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে এ বিষয় নিয়েও উত্তেজনা বিদ্যমান।
ওই হামলায় শুধু পাকিস্তানই নয়, বাংলাদেশের নামও জড়ানো হয়েছিল। প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছিল যে যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোনের যে সিম কার্ড ব্যবহার করা হয়েছিল, তা বাংলাদেশি কোনো গোষ্ঠীর মাধ্যমে সীমান্ত থেকে ক্রয় করা হয়েছিল। এমনকি প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশকে জড়াতে চেয়েছিল এই বলে যে এসব সন্ত্রাসী বাংলাদেশ থেকে এসেছিল। তবে কাসাবের আদালতে স্বীকারোক্তির পর পাকিস্তান তাদের সামরিক গোপন সংস্থার সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্য স্বীকার না করলেও সন্ত্রাসীরা যে পাকিস্তানি নাগরিক, তা আর অস্বীকার করতে পারেনি। আহত অবস্থায় ধৃত একমাত্র সন্ত্রাসী সদস্য আজমল কাসাব যদিও বাংলাদেশের নাম নেয়নি, তথাপি মুম্বাইয়ে বাংলাদেশিদের ভ্রমণ তেমন সহজতর নয়। বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও বহু ক্ষেত্রে পুলিশের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়। তেমনটাই আমাকে হোটেলের এক কর্মচারী জানানোর চেষ্টা করছিল।
এ হামলায় লস্কর-ই-তাইয়েবা সমগ্র মহারাষ্ট্রের তথা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থারও মূল ভিতে নাড়া দিয়েছিল। তাজমহল প্যালেস হোটেল পুনর্দখল করতে দিল্লি থেকে ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডকে (এনএসজি) তলব করতে হয়েছে। মহারাষ্ট্র সরকার একধরনের অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েছিল। সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের তত্ত্বাবধানে এ কর্ম সম্পাদন করলেও প্রশ্ন থাকে ভারতের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংগঠন ‘র’-এর কার্যকারিতার ওপর। মারাঠা জেলেরা পুলিশকে খবর দিলেও মুম্বাই পুলিশ এ তথ্যের ওপর কোনো গুরুত্বই দেয়নি; যে কারণে লস্কর তাদের মিশন সম্পন্ন করতে পেরেছিল। এটি ছিল সম্পূর্ণ ‘আত্মঘাতী’ সন্ত্রাসী হামলা।
২.
এই হামলার পর থেকে বদলাতে থাকে মুম্বাই শহরের ও ভারতের রাজনীতি। ক্রমেই বালঠাকরে ও তাঁর পরিচালিত শিবসেনা মহারাষ্ট্র, বিশেষ করে মুম্বাইয়ের রাজনীতিতে দারুণ শক্তিশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। হিন্দুত্বের হাত শক্ত হয়। মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে পাকিস্তানের খুরশিদ মোহাম্মদ কাসুরির একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে বিজেপির সমর্থক সুধেন্দ্র কুলকার্নির মুখে ও শরীরে কালি মেখে দিয়েছিল, যা ভারতের লেখকদের দারুণভাবে মর্মাহত করেছে। এর আগে উপমহাদেশের প্রখ্যাত গজল গায়ক গোলাম আলীর মুম্বাই সফর বানচাল করেছে। ‘শিবসেনা’র এসব বিষয় অনেক দূর গড়িয়েছে। যদিও মহারাষ্ট্রে বিজেপি সরকার রয়েছে, তথাপি মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাদনাভিস ‘শিবসেনা’দের এহেন কার্যকলাপকে ভারতের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করে কুলকার্নির পক্ষ নিয়েছেন। তথাপি ‘শিবসেনা’র বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেননি। অপর দিকে কিছুদিন চুপ থাকার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মুখ খুললেও শিবসেনা তাঁকে মনে করিয়ে দেয় যে ভারতব্যাপী তাঁর উত্থানের পেছনে গুজরাটের গোদরা ও দাঙ্গার সম্পর্ক রয়েছে। শিবসেনার মতে, এ দুই কারণ না হলে আজ নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না (টাইমস অব ইন্ডিয়া)। মোদিকে এ মন্তব্য হজম করতে হয়েছে।
ভারতে এখন ক্রমেই হিন্দুবাদীদের উত্থান হচ্ছে। গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে এবং গরুকে কেন্দ্র করে এ উত্থান লক্ষণীয়। দাদরার ঘটনার পর হিমাচল প্রদেশে গরু পাচারকারী অভিযোগে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ তেমন কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা যায়নি। ইতিমধ্যে হরিয়ানা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন যে ভারতে থাকতে হলে মুসলমানদের গোমাংস খাওয়া বন্ধ করতে হবে। তাঁর এ বক্তব্য ভারতের কংগ্রেস পার্টিসহ সেক্যুলারপন্থীদের মধ্যে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। এখানে উল্লেখ্য যে গোমাংস ভারতে শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ই নয়, খ্রিষ্টান, উপজাতীয় এবং বহু ভারতীয়র সস্তা প্রোটিন ও ফাইবার জোগান দেওয়ার খাদ্য।
যা-ই হোক, ভারতে ক্রমেই হিন্দুত্ববাদীদের উত্থান হচ্ছে, বাড়ছে অসহিষ্ণুতা। ক্রমেই হারাচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণ। যদিও বিজেপি থেকে থেকে নিজেদের কট্টরপন্থী হিন্দুবাদীদের থেকে দূরে থাকার বার্তা দেয়, তথাপি শিবসেনা, বজরং দল এবং আরএসএসের মতো হিন্দুত্ববাদী ধর্মভিত্তিক শক্তিশালী সংগঠনগুলোর সংস্রব কাটাতে পারছে না। বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো। বিজেপির দৃষ্টি এখন বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে। এ তিনটি রাজ্যে হিন্দুত্বের প্রভাব পড়লে তা ভারতের অন্যতম প্রতিবেশী বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলবে। অতীতেও হিন্দুত্বের উত্থানের কারণে ভারতের দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে দারুণ প্রভাব এবং বাংলাদেশে সামান্য হলেও প্রভাব পড়েছিল। মুম্বাইসহ ভারতের অন্যান্য স্থানে বিদেশি জঙ্গি হামলার পেছনে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাটি কাজ করেছে বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কাজেই পুনরায় হিন্দুত্বের এই উত্থান ঠেকাতে না পারলে ভারতের চরিত্রে যেমন আমূল পরিবর্তন আসবে, তেমনি উপমহাদেশে জঙ্গিবাদ দারুণভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে—এমন তথ্যও রয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

রাজনীতিতে ব্যবসায়ী নাকি ব্যবসার নাম ‘রাজনীতি’ by এ কে এম জাকারিয়া

গণতান্ত্রিক দেশে যে কেউই তঁার খেয়ালখুশিমতো রাজনীতিতে আসতে পারেন, এসে এই পেশায় থিতুও হতে পারেন। আবার কেউ দীর্ঘদিনের রাজনীতি ছেড়ে ভিন্ন পেশাও ধরেন। এখানে কোনো বাধা নেই। রাজনীতি করাটা শুধু পেশাদার রাজনীতিবিদের মধ্যে আটকে থাকার বিষয় নয়। তবে কিছু পেশার প্রাধান্য থাকে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন আইনজীবী অথবা পেশাদার রাজনীতিক। তবে ব্যবসায়ী, কৃষক, সেনা কর্মকর্তা, অধ্যাপক বা এমনকি অভিনয় পেশার লোকজনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।
এত পেশার লোকজনের ভিড়ে কারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভালো করেছেন তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জরিপ হয়েছে। ফলাফল মোটামুটি একই। ওয়াশিংটন, জেফারসন, লিঙ্কন, ফ্রাঙ্কলিন, রুজভেল্ট, উইলসন, ট্রুম্যান ও আইজেনহাওয়ারের নাম সব সময়ই তালিকার শুরুতে জায়গা পেয়েছে। আর একদম শেষের দিকে জায়গা পাওয়া নামগুলো হচ্ছে হেরবার্ট হুভার, কেলভিন কুলিজ, জর্জ ডব্লিউ বুশ ও ওয়ারেন জি হার্ডিং। হার্ডিং ব্যবসায় খুবই সফল হয়েছিলেন কিন্তু ধারাবাহিকভাবে খারাপ প্রেসিডেন্ট হিসেবে রায় পেয়েছেন। জর্জ ডব্লিউ বুশও ব্যবসায়ী ছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যর্থ বলেই রায় পেয়েছেন। ট্রুম্যানও ব্যবসায়ী ছিলেন, তবে ব্যবসায় সফল হননি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবশ্য তিনি মহান বলেই বিবেচিত। এসব নানা জরিপ বিবেচনায় নিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর এক সাবেক কর্নেল উইলিয়াম জি ক্যাম্পবেল একটি লেখা লিখেছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ব্যবসায়ী পেশা থেকে যাঁরা এসেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁরা খুব খারাপ করেছেন। আমাদের মনে আছে, থাইল্যান্ডের সফল ব্যবসায়ী থাকসিন সিনাওয়াত্রা দেশটির প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু রাজনীতিতে সফল হতে পারলেন না।
বাংলাদেশ বা ভারতের মতো গণতন্ত্রে রাজনীতিতে আসার সুযোগটা আরও ছড়ানো। নানা পেশার লোকজন তো আছেই, এসব দেশে এমনকি ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড নিয়েও দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করা যায়। তাঁরা নির্বাচনে মনোনয়ন পান, নির্বাচিতও হন। ভারতের বর্তমান ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের পর কারা নির্বাচিত হয়েছেন তা নিয়ে কাটাছেঁড়া করে একটি প্রতিষ্ঠান (অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্ম) যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে ৩৪ শতাংশেরই ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান দশম সংসদের নির্বাচিত সাংসদদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০.৩৩ শতাংশের বিরুদ্ধে চলমান মামলা ও ৪৬ শতাংশের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা ছিল। (তথ্যসূত্র: সুজন)
গণতন্ত্রে রাজনীতি আসলেই মুক্ত বিষয়। রাজনীতির দরজা সবার জন্যই খোলা। ব্যবসায়ীদের জন্যও খোলা। তবে রাজনীতিতে কোনো পেশার লোকজনের দাপট বাড়ছে বা রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে চলে যাচ্ছে সেটা অবশ্যই আলোচনা, পর্যালোচনা ও গবেষণার বিষয়। দেশের গণতন্ত্রের মান, অবস্থা ও এর ভবিষ্যতের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের এখানে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার কারণ রাষ্ট্রের দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাম্প্রতিক মন্তব্য। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সম্প্রতি বলেছেন, ‘রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে। এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয়।’ (প্রথম আলো, ১৩ অক্টোবর) এর দিন কয়েক আগে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অনুষদের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের ৯০ শতাংশ সদস্য আইনের ছাত্র। বাংলাদেশের সংসদের ৮০ ভাগই ব্যবসায়ী। আইনের শাসন ও গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে আইনের ছাত্রদের এগিয়ে আসতে হবে (প্রথম আলো, ৪ অক্টোবর)।
ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজনীতির একটি সম্পর্ক সব সময়ই রয়েছে। বিশ্বের সব দেশেই রাজনীতিবিদ ও দলগুলোর চাঁদা ও অনুদানের বড় অংশের জোগান দেয় ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশে সেই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যখন রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম, তখনো রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থের উৎস ছিলেন ব্যবসায়ীরা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে নির্বাচিতদের পেশা-পরিচিতি থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী নির্বাচনগুলো বিবেচনায় নিলে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ‘অংশগ্রহণ’ বা বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে তাঁদের ‘দাপট’ কতটা বেড়েছে তা আমরা টের পাব।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। এর প্রায় ২০ বছর পর অনুষ্ঠিত ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ শতাংশে। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের সময়ে ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নির্বাচিতদের মধ্যে ব্যবসায়ী ছিলেন ৩৪ শতাংশ। মাত্র ছয় বছরে বেড়েছে ২১ শতাংশ। স্বৈরশাসক এরশাদের আমলেও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। সামরিক শাসকেরা নিজেরা দল করার জন্য বা তাদের ক্ষমতা বৈধ করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে ভিড়িয়েছেন। সামরিক শাসন বাংলাদেশে রাজনীতিতে যেসব স্থায়ী ক্ষতি করে গেছে, ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে নিয়ে আসা তার অন্যতম। একবার যা শুরু হয়, তা থেকে পেছানো কঠিন। এখন যেন ব্যবসায়ীদের রাজনীতি করাই নিয়ম বা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদে নির্বাচিতদের মধ্যে ব্যবসায়ী ছিলেন ৪৮ শতাংশ। ২০০১ সালে অষ্টম সংসদে ৫২ দশমিক ১০। আর ২০০৯ সালের নবম সংসদে ৬৩ শতাংশ। (তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৫)। ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ও দশম সংসদের নির্বাচন আগেরগুলোর মতো অংশগ্রহণমূলক হয়নি। অর্ধেকেরও বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এই নির্বাচনেও প্রার্থী মনোনয়ন ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে একই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা তাঁদের নির্বাচনী হলফনামায় যে তথ্য দিয়েছেন তাতে দেখা যাচ্ছে যে ৫৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রার্থীর পেশা ব্যবসা। (তথ্যসূত্র সুজন) আমরা ধারণা করতে পারি যে এই হার আরও বেশি হবে, কারণ হলফনামায় উল্লেখ না করলেও বেনামে বা পরিবার-পরিজনের নামে ব্যবসা করার রীতি আমাদের দেশে রয়েছে।
আগেই বলেছি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনীতি করার অধিকার যে কারোরই আছে। ব্যবসায়ীদেরও আছে। ভারতের বর্তমান লোকসভায় নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়ী রয়েছেন ২০ শতাংশ। আর পেশা হিসেবে রাজনীতি ও সামাজিক কাজে জড়িত সদস্যের সংখ্যা ২৪ শতাংশ (সূত্র: অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্ম)। ভারতে ব্যবসায়ীরা আমাদের দেশের মতো এখনো রাজনীতিতে পুরোপুরি দখলদারি কায়েম করতে পারেননি। বর্তমান মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষ মিলিয়ে সদস্যদের মধ্যে ৩৯ দশমিক ৫৫ ভাগ ব্যবসায়ী। (সূত্র: কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস) আর ১৯৭৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলেছে, পার্লামেন্টে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কখনো ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়নি (সূত্র: দ্য ব্রিটিশ জেনারেল ইলেকশন অব ২০১০ অ্যান্ড প্রিভিয়াস এডিশনস)।
বাংলাদেশের অবস্থা সেদিক থেকে অস্বাভাবিকই। রাজনীতি এভাবে ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাওয়া দেশ, দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির উদ্বেগের কারণটা আমরা অনুমান করতে পারি। প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে ইঙ্গিত আছে, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন রক্ষায় বিশেষ পেশার গুরুত্ব রয়েছে। আমরা জানি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ জীবনভর রাজনীতিই করে গেছেন, ছিলেন আইনজীবীও। রাজনীতি ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে যাওয়ার বিষয়টি তিনি মানতে পারছেন না। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘যেভাবেই হোক এ অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।’
আমাদের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের জড়িয়ে পড়া ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এবং রাজনৈতিক দলগুলো এর পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছে। রাজনীতিতে যোগ দিয়েই ব্যবসায়ীরা কেন সহজে পদ ও মনোনয়ন পেয়ে যান, তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। ব্যবসায়ীদের শক্তি তাঁদের টাকাপয়সা। নির্বাচনের খরচ দিনে দিনে যত বেড়েছে, নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে ব্যবসায়ীদের দামও তত বেড়েছে। দলগুলোতে মনোনয়ন-বাণিজ্যের সংস্কৃতিও শুরু হয়েছে এসব কারণেই। ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করতে এসে দেখেছেন যে রাজনীতি করলে ব্যবসায় সুবিধা মেলে। সবকিছুই হাতের মুঠোয় চলে আসে। এমন পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করবে, এটাই তো স্বাভাবিক।
নির্বাচিত হওয়া মানেই ব্যাংক, বিমা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক হওয়ার পথ খুলে যাওয়া। কনটেইনারবাহী জাহাজের লাইসেন্স পাওয়া থেকে শুরু করে সব ব্যবসা ও ব্যবসার পথই সহজ হয়ে যাওয়া। কেউ পাঁচ বছরে পাঁচ কোটি টাকায় ৭০ একর জমি কিনেছেন। ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করেছেন কোটি কোটি টাকা। যিনি ২০ একর জমির মালিক ছিলেন, পাঁচ বছরে তিনি হয়েছেন ২ হাজার ৮৬৫ একর জমির মালিক। ব্যাংকে টাকা বেড়েছে ৫৮৬ গুণ, জমি বেড়েছে ১৪৩ গুণ, বার্ষিক আয় বেড়েছে ৭৯ গুণ। কারও কারও স্ত্রীর সম্পদ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। আগের নির্বাচনে দেওয়া হলফনামার সম্পদের হিসাবের সঙ্গে পরের নির্বাচনে দেওয়া সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দায়দেনার হিসাবেই এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এসব কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ভারতের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের হারের সঙ্গে আমাদের হারের এত বড় তফাত। আসলে বাংলাদেশের পরিস্থিতিটি এখন আর ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের হার বা এসব হিসাব-নিকাশের মধ্যে আটকে নেই। এখানে রাজনীতিই এখন বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র ও ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। শুধু ব্যবসায়ীরাই যে রাজনীতিতে আসছেন বা রাজনীতি দখল করে নিচ্ছেন তাই না, পেশাদার রাজনীতিকেরাও রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসায় জড়াচ্ছেন। নির্বাচন করে জেতার পর ব্যবসা করাটা এখানে খুব সহজ হয়ে যায়। এভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি বাস্তবে এখন প্রায় শতভাগই ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মাননীয় রাষ্ট্রপতি ‘যেভাবেই হোক’ ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে যাওয়া রাজনীতিকে এই অবস্থা থেকে মুক্ত করার আশা করছেন। বলেছেন, ‘সততা বজায় না রাখলে একজন রাজনীতিবিদ কিছুই করতে সক্ষম হবেন না। কেউ যদি অর্থবিত্ত করতে চান, তাহলে তঁাদের জন্য অনেক উপায় আছে। তঁাদের রাজনীতিতে আসা উচিত না।’ দীর্ঘ ৫০ বছর যিনি শুধু রাজনীতিই করে গেছেন, রাজনীতির বর্তমান দশায় তাঁর কষ্টটা আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু কোনো দেশে রাজনীতিই যদি একটা ব্যবসায় পরিণত হয়, তবে সে দেশের রাজনীতিকে ব্যবসায়ীদের পকেট থেকে বের করে আনা কি আদৌ সম্ভব!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com