Showing posts with label বায়ুদূষণ. Show all posts
Showing posts with label বায়ুদূষণ. Show all posts

Tuesday, April 7, 2026

ডায়াবেটিসসহ নানা রোগ বাড়াচ্ছে বায়ুদূষণ, ঢাকাসহ কয়েক শহর ঝুঁকিতে by পার্থ শঙ্কর সাহা

ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য, ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু ঝুঁকিসহ নানা রোগের কারণ হিসেবে বায়ুদূষণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চলতি বছরের মধ্য–ফেব্রুয়ারির এক সকাল। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের বহির্বিভাগে দাঁড়িয়ে আছেন ৬৫ বছরের আবুল কাশেম। তিনি দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টের রোগী। শীতের শেষ সময়ে তা আরও বেড়েছে। নগরীর আদাবরের বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ‘শীতটা আগের চেয়ে কমেছে, কিন্তু কাশি থামে না।’ চিকিৎসকেরা তাঁকে বলছেন, তাঁর সমস্যা শুধু বয়সজনিত নয়, বাতাসের দূষণও বড় কারণ।

কাশেমের মতো রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে টিবি হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৭২। আর গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৮ হাজার ৬১১। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে চার শতাধিক। চিকিৎসকেরা বলছেন, বক্ষব্যাধি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগীর এই ঊর্ধ্বগতি বিচ্ছিন্ন নয়; এর পেছনে বায়ুদূষণের ভূমিকা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

বায়ুদূষণ যে শুধু ফুসফুসের রোগের কারণ, তা নয়। গবেষণা বলছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি, ডায়াবেটিসের আশঙ্কা, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি, এমনকি বিষণ্নতার ছায়াও। বাংলাদেশে বায়ুদূষণ নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বলছে, বিষয়টি কেবল পরিবেশগত সংকট নয়। এটি এক গভীর জনস্বাস্থ্য সংকট।

ঢাকা, রাজশাহী, গ্রামীণ এলাকা—বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে পরিচালিত গবেষণাগুলো একসঙ্গে যে চিত্র তুলে ধরছে, তা উদ্বেগজনক। দূষণ বাড়ছে। বাড়ছে দূষণজনিত অসুখ–বিসুখ। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও। দূষণ নিয়ে নানা প্রকল্প আর সেগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতার মধ্যে চাপা পড়ছে মানুষের কষ্টের কথা। এ ছাড়া শীত মৌসুমে যে সামান্য বৃষ্টি হতো, তা–ও কমছে। ধুলাবালুর এ সময়ে বৃষ্টিতে দূষণ কিছুটা কমার সুযোগও কমে যাচ্ছে।

ধূলিকণার সঙ্গে বাড়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

বাংলাদেশে দ্রুত ডায়াবেটিস বাড়ার পেছনে সাধারণত কারণ হিসেবে বেশি শোনা যায় খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম, স্থূলতা, বংশগত ঝুঁকি, মানসিক চাপ ইত্যাদি। কিন্তু নতুন একটি গবেষণা বলছে, ডায়াবেটিস বাড়ার পেছনে আরেকটি বড় ‘অদৃশ্য’ চালক হিসেবে কাজ করতে পারে বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম ধূলিকণা।

এই গবেষণা করা হয়েছে দেশব্যাপী পরিচালিত জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (২০২২) তথ্য নিয়ে। ফলাফলে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বাতাসে খুব সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পিএম ২ দশমিক ৫ যত বাড়ে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও তত বাড়ে। বিশেষভাবে, পিএম ২ দশমিক ৫ যদি প্রতি ঘনমিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম করে বাড়ে, তাহলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি গড়ে ১০ শতাংশ বেশি বাড়ে।

গবেষকেরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, বাংলাদেশ যদি বাতাসকে কিছুটা পরিষ্কার করতে পারে (অর্থাৎ বছরজুড়ে পিএম ২ দশমিক ৫ কমিয়ে আনতে পারে), তাহলে জনসংখ্যা পর্যায়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

পিএম ২.৫ আসলে কী

পিএম ২.৫ বলতে বোঝায় বাতাসে থাকা এমন সূক্ষ্ম কণা, যার ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার কম। মানুষের চুলের তুলনায়ও বহুগুণ ছোট, যা চোখে দেখা যায় না। কিন্তু নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে রক্তপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষকেরা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এসব ধূলিকণা শরীরে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং ইনসুলিন কাজ করার প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি করতে পারে। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গবেষণায় কী পাওয়া গেল

গবেষণাটি করেছেন বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা। এর নেতৃত্ব দিয়েছেন কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির রোগতত্ত্ব বিষয়ের গবেষক জুয়েল রানা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই জরিপে দুই ধাপে নমুনা নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক ১৫ হাজার ২৪৯ জন জরিপে অংশ নেন। পরবর্তী ধাপে যাঁদের ডায়াবেটিসের ওষুধ নেওয়ার তথ্য নেই, তাঁদের বাদ দিয়ে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে রাখা হয় ১৩ হাজার ৯৬৫ জন (নারী ৭ হাজার ৭১২; পুরুষ ৬ হাজার ২৫৩)।

জুয়েল রানা প্রথম আলোকে বলেন, এসব ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি ২০২২ সালের পর থেকে পরের তিন বছর কতটুকু বায়ুদূষণের সংস্পর্শে এসেছেন, তা নির্ণয় করা হয়। তাঁরা যে এলাকায় বাস করেছেন, যে বাসায় থেকেছেন, সেখানে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি পরিমাপ করা হয়েছে।

প্রশ্ন ছিল এভাবে যে ডায়াবেটিক রোগীর বায়ুদূষণের প্রভাব দেখা হয়েছে এর জীববৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী? উত্তরে জুয়েল রানা বলেন, যখন দূষিত বায়ু কেউ নিশ্বাসের মাধ্যমে নেয়, তখন শরীরের মধ্যে একধরনের প্রদাহ তৈরি হয়। মানুষের শরীরে যে ইনসুলিন তৈরি হয়, তার কার্যকারিতা কমে আসে। আর ব্যাহত হলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। আর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লেই ডায়াবেটিস বেড়ে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসে পিএম ২.৫ যদি ১০ ইউনিট বাড়ে, তাহলে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। যেসব এলাকায় বাতাস সবচেয়ে দূষিত, সেখানে ডায়াবেটিসের হারও সবচেয়ে বেশি। মহিলা, ওজন বেশি, উচ্চ রক্তচাপ আছে, বয়স বেশি এবং যাঁরা শহরে থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বায়ুদূষণজনিত ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আরও বেশি। যেমন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীর মতো জেলাগুলোয় বায়ুদূষণ ও ডায়াবেটিস—দুটিই একসঙ্গে বেশি দেখা গেছে।

যদি বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারে, তাহলে দেশে ডায়াবেটিসের হার ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক মানুষ, শহরের বাসিন্দা, স্থূল ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে থাকা মানুষ সুফল পাবেন সবচেয়ে বেশি হবে।

সরকারের নির্ধারিত বায়ুমান লক্ষ্য (১৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে) অর্জন করা গেলে দেশের ২৫টি জেলায় ডায়াবেটিস কমার হার জাতীয় গড় (৬ দশমিক ৬ শতাংশ) থেকেও বেশি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি উপকার দেখা গেছে সেই জেলাগুলোয়, যেখানে ডায়াবেটিসের হার বেশি এবং একই সঙ্গে বায়ুদূষণের মাত্রাও অত্যন্ত বেশি। যেমন নারায়ণগঞ্জে ডায়াবেটিস কমার সম্ভাবনা প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। যেসব জেলায় এই স্বাস্থ্যগত লাভ বেশি হতে পারে, সেসব এলাকায় বায়ুদূষণের উৎসও আলাদা ধরনের। এর মধ্যে রয়েছে যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া, ইটভাটা, বন্দরভিত্তিক দূষণ, খনিশিল্প, সীমান্ত পেরিয়ে আসা দূষণ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জাহাজভাঙাশিল্প। কিছু এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা জাতীয় গড়ের কাছাকাছি হলেও স্বাস্থ্যগত লাভ বেশি হতে পারে।

২৬ কোটির বেশি কর্মদিবস নষ্ট হয় দূষণে

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (ক্রিয়া) বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘বাংলাদেশে সূক্ষ্ম কণাদূষণের জনস্বাস্থ্য প্রভাব’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন গত বছরের ১৮ জানুয়ারি ক্রিয়ার নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেন ড্যানিয়েল নেসান, হুবার্ট থিয়েরিও ও জেমি কেলি। সম্পাদক ছিলেন জোনাথন সাইডম্যান।

গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান পিএম ২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকালমৃত্যু ঘটছে। এর বড় অংশই হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ফুসফুস ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণেই বছরে প্রায় ৫ হাজার ২৫৮ জনের মৃত্যু হচ্ছে।

এ ছাড়া বছরে প্রায় ৬ লাখ ৬৮ হাজার হাঁপানিজনিত রোগে জরুরি বিভাগে ভর্তি, প্রায় ২৬ কোটির বেশি কর্মদিবস নষ্ট, ৯ লাখের বেশি অপরিণত (সময়ের আগে) জন্ম এবং প্রায় ৭ লাখ কম ওজনের নবজাতকের জন্মের সঙ্গে সূক্ষ্ম কণাদূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

গবেষণাটি বলছে, যদি বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় মান (ঘনমাত্রা ৩৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে) অর্জন করতে পারে, তবে অকালমৃত্যু প্রায় ১৯ শতাংশ কমতে পারে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের নির্দেশিকা (৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে) অর্জিত হলে মৃত্যুহার প্রায় ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

গবেষণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে দূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি হলেও দেশের কোনো অঞ্চলই নিরাপদ সীমার মধ্যে নেই। সুতরাং কঠোর বায়ুমান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন ছাড়া এই স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

বায়ুদূষণ ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি: দুই শহরের গল্প

বায়ুদূষণ যে শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, তা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা দেখিয়েছে, সূক্ষ্ম দূষিত কণা (পিএম ২.৫) মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে ঢাকার মতো উচ্চ দূষণপ্রবণ নগরে। ‘এয়ার পলিউশন অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ ইন ঢাকা অ্যান্ড রাজশাহী’ শীর্ষক এ গবেষণায় ঢাকা ও রাজশাহীর তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বায়ুদূষণ ও বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে। বিশ্বখ্যাত নেচার সাময়িকীতে এ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি।

গবেষণাটি ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত একটি ক্রস-সেকশনাল পর্যবেক্ষণভিত্তিক সমীক্ষা। দুই শহর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অংশগ্রহণকারী নির্বাচন করা হয় নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করে। সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

বায়ুদূষণের তথ্য নেওয়া হয় সরকারি পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের উপাত্ত থেকে। গড় বার্ষিক পিএম ২.৫ মাত্রা ছিল ঢাকায় প্রায় ৭৬–৮২ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার আর রাজশাহীতে প্রায় ৪২–৪৮ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার। অর্থাৎ ঢাকায় সূক্ষ্ম দূষিত কণার মাত্রা রাজশাহীর তুলনায় প্রায় ১.৭ গুণ বেশি।

গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় ৪৬–৫০ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতার উপসর্গ পাওয়া গেছে। রাজশাহীতে এ হার ছিল ২৮ থেকে ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ঢাকায় বিষণ্নতার হার অন্তত ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেশি।

গবেষণা অনুযায়ী ঢাকায় ৪০ থেকে ৪৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা গেছে। কিন্তু রাজশাহীতে বিষণ্নতা দেখা গেছে ২৫ থেকে ২৯ শতাংশ ব্যক্তির মধ্যে। রিগ্রেশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, পিএম ২.৫ মাত্রা প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বৃদ্ধিতে উদ্বেগ স্কোর ০.৮ থেকে ১.২ পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবক নিয়ন্ত্রণের পরও।

ঢাকায় মানসিক চাপ ৩৫ থেকে ৩৮ শতাংশ মানুষের মধ্যে। রাজশাহীতে এই হার ২০ থেকে ২৩ শতাংশ। গবেষণায় ব্যবহৃত মাল্টিভেরিয়েট রিগ্রেশন মডেলে দেখা গেছে, উচ্চ দূষণপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের মাঝারি–তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ১.৬ থেকে ১.৯ গুণ বেশি। বয়স, আয়, শিক্ষা ও ধূমপানের মতো ভেরিয়েবল নিয়ন্ত্রণ করার পরও এই সম্পর্ক তাৎপর্যপূর্ণ থাকে। নারী, নিম্ন আয়ের মানুষ ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা যায়, ঢাকার উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। রাজশাহীর তুলনায় ঢাকায় বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং এই পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে প্রতিষ্ঠিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্তের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ১৬ জুন যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রাজশাহীর বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণা (১০ মাইক্রোমিটার আকারের) প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ছিল ১৯৫ মাইক্রোগ্রাম। এটা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে ২০১৬ সালে দাঁড়ায় ৬৩ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রামে। দুই বছর আগে এ শহরে আরও ক্ষুদ্র ধূলিকণা (২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার আকারের) প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ছিল ৭০ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৬ সালে এটি প্রায় অর্ধেক হয়ে দাঁড়ায় ৩৭ মাইক্রোগ্রাম।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের যে ১০টি শহরে গত (২০১৫ ও ২০১৪) দুই বছরে বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণা কমেছে, এর মধ্যে রাজশাহীতে কমার হার সবচেয়ে বেশি। এর পরিমাণ ৬৭ শতাংশ।

সেই উদাহরণ সৃষ্টিকারী শহরের বায়ুদূষণ এখন প্রবল আর এতে মানুষের ওপর প্রভাবও পড়ছে ব্যাপক হারে, এমনটাই মনে করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেসপেরটরি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দূষণের প্রভাবে আগে শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার রোগী যেমন ছিল গত দুই–তিন বছরে তা অনেক বেড়েছে। এ সংখ্যা বাড়ছেই।

হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে

ঢাকায় বায়ুদূষণের সূক্ষ্ম কণা (পিএম ২.৫) যত বাড়ছে, হৃদ্‌রোগে মৃত্যুঝুঁকিও তত বাড়ছে—এমনটাই প্রমাণ করেছে ‘ইফেক্টস অব ফাইন পার্টিকুলেট ম্যাটার এয়ার পলিউশন অন কার্ডিওভাসকুলার মর্টালিটি ইন ঢাকা ২০০২–২০২৪’ শীর্ষক গবেষণা।

২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, পিএম ২.৫ প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বৃদ্ধি পেলে একই মাসে হৃদরোগজনিত মৃত্যু গড়ে ৩.১ শতাংশ বাড়ে। এখানে মোট হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১৬ শতাংশ এই দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। শীতকালে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে প্রায় ২৮.৭ শতাংশ হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যু পিএম ২.৫-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ, বায়ুদূষণ ঢাকায় হৃদ্‌রোগের একটি বড় এবং তাৎক্ষণিক ঝুঁকির কারণ।

গবেষকেরা ২০২০–২০২৪ সময়ে ঢাকার চারটি প্রধান সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মাসভিত্তিক হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করেন। একই সময়ের পিএম ২.৫ মাত্রার উপাত্ত নেওয়া হয় পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে। আবহাওয়া–সংক্রান্ত তথ্য (তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ইত্যাদি) সংগ্রহ করা হয় নাসা পাওয়ার প্রকল্প থেকে, যাতে আবহাওয়ার প্রভাব বিশ্লেষণে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

মোট মৃত্যু ও ঝুঁকির পরিমাণ

গবেষণার ব্যাপ্ত সময়ে মোট ১৭ হাজার ৫৩১টি হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যু নথিভুক্ত হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পিএম ২.৫ মাত্রা প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বৃদ্ধি পেলে একই মাসে হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যু ৩.১ শতাংশ বৃদ্ধি পায় (৯৫ শতাংশ বিশ্বাসযোগ্যতা সীমা: ১.১ শতাংশ থেকে ৫.২ শতাংশ)। অর্থাৎ এই সম্পর্কটি পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

গবেষণার অনুমান অনুযায়ী, মোট হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১৬ শতাংশ পিএম ২.৫ এক্সপোজারের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ দূষণমাত্রা কমানো গেলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অকালমৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব।

ঋতুভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শীতকালে পিএম ২.৫-এর প্রভাব বেশি তীব্র। শীতকালে হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর ২৮.৭ শতাংশ পিএম ২.৫-এর সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে গরমকালে এই হার ছিল মাত্র ৭.১৫ শতাংশ। অর্থাৎ দূষণ ও নিম্ন তাপমাত্রার সম্মিলিত প্রভাবে শীতকালে স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণে বাড়ে।

ডেঙ্গুর মৃত্যুহার বাড়াচ্ছে দূষণ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সঙ্গে যে বায়ুদূষণের সম্পর্ক আছে, তা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক গবেষণায়। এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন সাময়িকীতে গত ২৯ জানুয়ারি এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী শাকিরুল খান এ গবেষণার নেতৃত্ব দেন। তিনি জাপানের ওইতা ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল অ্যান্ড লোকাল ইনফেকশাস ডিজিজ সেন্টারে শিক্ষকতা করছেন। গবেষণায় যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ও জাপানের ১২ জন বিজ্ঞানী।

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশসহ যেসব দেশে বায়ুদূষণ বেশি, সেসব দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বিশ্বের গড় মৃত্যুহারের চেয়ে অনেক বেশি। আবার এসব দেশের যেসব এলাকা বেশি দূষিত, মৃত্যুহারও সেসব এলাকায় বেশি।

গবেষণায় বাতাসে থাকা অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা বা পিএম ২.৫ এবং দূষণকারী অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকির পরিসংখ্যানগতভাবে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, ফুসফুস ও রক্তনালিতে প্রদাহ বাড়ে। এর ফলে ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেছেন।

২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ডেঙ্গুপ্রবণ ২০টি দেশে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুর তথ্যের সঙ্গে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া পিএম ২.৫–এর মান এবং সামাজিক–অর্থনৈতিক ও জলবায়ুগত সূচক একত্র করে এ গবেষণা করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি পিএম ২.৫–এর সংস্পর্শ ও ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণে ‘জেনারালাইজড লিনিয়ার মিক্সড–ইফেক্টস মডেল’ ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার প্রধান লেখক শাকিরুল খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি প্রথম বৈশ্বিক গবেষণা, যেখানে প্রমাণ করা হয়েছে যে বায়ুদূষণের কারণে ডেঙ্গু যেমন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। আমরা দেখেছি, দূষণপ্রবণ দেশগুলোয় ডেঙ্গু তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রাণঘাতী। ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমরা এত দিন মূলত মশা নিয়ন্ত্রণের দিকেই গুরুত্ব দিয়েছি। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে, বায়ুদূষণ কমানোও ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে।’

বৃষ্টি কমে আসা ও উষ্ণতর শীত

শুধু দূষণ নয়, জলবায়ুর পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশক বা তার বেশি সময়ে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমছে, শীতের তীব্রতা হ্রাস পাচ্ছে, মৌসুমি ধরন বদলাচ্ছে।

সাম্প্রতিক উপাত্ত বলছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অথচ এ মাসে সাধারণত ৪২ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে থাকে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বৃষ্টি হয়েছিল ৩ মিলিমিটার। অথচ এ মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ ৯ মিলিমিটার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্বাভাবিকের চেয়ে ৯৮ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস বৃষ্টিশূন্য ছিল। অথচ জানুয়ারিতে সাধারণত ৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।

শীতকালে বৃষ্টি কম হলে বাতাসে জমে থাকা দূষিত কণিকা ধুয়ে নামার সুযোগ কমে যায়। ফলে উচ্চমাত্রার দূষণ দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ, তাপমাত্রার উল্লম্ব স্তরবিন্যাস ও কম আর্দ্রতা—সব মিলিয়ে শীতকালে দূষণ আটকে থাকে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ দীর্ঘ সময় ধরে দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। তিনি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, দুই দশক ধরেই বিশেষ করে দেশের মধ্যাঞ্চল, উত্তর–পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে কমছে শীতের দিনের সংখ্যা। বাড়ছে উষ্ণতা। বায়ুদূষণে এর প্রভাব পড়ছে।

দূষণ যেভাবে শরীর ক্ষয় করছে

এ প্রতিবেদন শুরু হয়েছিল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের টিবি হাসপাতালের চিত্র তুলে ধরে। হাসপাতালের পরিচালক আয়েশা সিদ্দিকা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার যে রোগী ভর্তি হয়েছে, তা গত পাঁচ বছরে হয়নি। দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এখানে আসা রোগীরা কাছাকাছি এলাকার। কিন্তু এ অবস্থা রাজধানীর সর্বত্র। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দেশেরও সর্বত্র।’

খ্যাতনামা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আসিফ মুজতবা মাহমুদ বলেন, দূষিত বায়ু সরাসরি ফুসফুসের মধ্যে যায়। ফুসফুসের একটা স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা রয়েছে। তার মধ্যে অনেকগুলো কোষ আছে যেগুলো এই সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে। পিএম ২.৫–সহ নানা ধরনের দূষক যখন ফুসফুসে যায়, তখন কর্মরত কোষের ক্ষতি ঘটিয়ে থাকে। স্বাভাবিক যে অক্সিজেনের প্রবেশ ও কার্বন ডাই–অক্সাইড বের হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া, তা ব্যাহত হয়। ফলে শুধু ফুসফুস নয়, হৃৎপিণ্ড, অগ্ন্যাশয় ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। এতে মস্তিষ্কের ওপরও প্রভাব পড়ে।

দূষণ কেবল পরিবেশের বিষয় নয়; শ্বাসকষ্টের রোগীর সঙ্গে এখন হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে জটিল স্বাস্থ্যচিত্র তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যানবাহনের ধোয়া নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, শিল্পকারখানায় মানদণ্ড কঠোর করা, ইটভাটা সংস্কার, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও নগর সবুজায়ন—সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি বদলানো কঠিন। একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও শুষ্ক মৌসুমে দূষণ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অংশ হওয়া প্রয়োজন।

ডা. আয়েশা সিদ্দিকা বললেন, ‘রোগী আসছেন চিকিৎসা দিচ্ছি। ওষুধ তো আছে, কিন্তু বাতাস? তাকে শুদ্ধ করবে কে?’

প্রশ্নটি শুধু এক চিকিৎসকের নয়—এটি এক শহরের, এক দেশের। প্রতিদিনের নিশ্বাসে যদি অদৃশ্য ঝুঁকি ঢুকে পড়ে, তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা যতই শক্তিশালী হোক, সংকট কমবে না। দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন—এই দুই সংকটকে মাথায় রেখেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

নদীর পাড় ঘেঁষে বানানো হয়েছে ইটভাটা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধলেশ্বরী সেতুসংলগ্ন এলাকায়
নদীর পাড় ঘেঁষে বানানো হয়েছে ইটভাটা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধলেশ্বরী সেতুসংলগ্ন এলাকায়। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

Friday, December 5, 2025

দিল্লির দূষিত বায়ুতে তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ২ লাখের বেশি মানুষ

দিল্লির বিষাক্ত বায়ু জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। ভারত সরকার জানিয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দিল্লির ছয়টি সরকারি হাসপাতালে তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি রোগীকে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

এতে বলা হয়, শীত আসলেই দিল্লি ও তার উপশহরগুলোতে বায়ুদূষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ নেয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই দিল্লির বায়ুর মান ইনডেক্স (একিউআই) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে ২০ গুণ বেশিতে অবস্থান করছে। বিশেষ করে পিএম ২.৫ কণার মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। যা সরাসরি শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে ফুসফুসে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

দূষণের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। শিল্পকারখানার নির্গমন, যানবাহনের ধোঁয়া, তাপমাত্রা হ্রাস, বাতাসের গতি কমে যাওয়া এবং আশপাশের রাজ্যগুলোতে কৃষিজমির খড় পোড়ানোর মতো নানা কারণে পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির ছয়টি প্রধান হাসপাতালে ২০২২ সালে ৬৭ হাজার ৫৪টি, ২০২৩ সালে ৬৯ হাজার ২৯৩টি এবং ২০২৪ সালে ৬৮  হাজার ৪১১টি শ্বাসকষ্টের মামলা নথিভুক্ত হয়। সরকারের ভাষ্য, দূষণের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে জরুরি বিভাগে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির একটি সম্পর্ক দেখা গেছে, তবে এটি সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখানো সম্ভব নয়।

গত এক দশকে বেশ কয়েকবার দিল্লির গড় একিউআই ‘গুরুতর’ ৪০০-এর উপরে উঠেছে। যা সুস্থ মানুষদের জন্যও ক্ষতিকর এবং অসুস্থদের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ। বুধবার সকালে সরকারি সমর্থিত ‘সফর’ অ্যাপ জানায়, দিল্লির গড় একিউআই ছিল প্রায় ৩৮০।

গত সপ্তাহে বিবিসি জানিয়েছে, দিল্লি ও আশপাশের হাসপাতালগুলোতে দূষিত বায়ুর কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া শিশুদের ভিড় বাড়ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপের দাবিতে দায়ের করা এক পিটিশনের শুনানি বুধবার দিল্লি হাই কোর্টে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। একই সঙ্গে দেশটির সুপ্রিম কোর্টও গত কয়েক বছর ধরে দিল্লির অবনতিশীল বায়ুমান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

mzamin

Tuesday, November 18, 2025

কালচে হয়ে যাচ্ছে মোগল আমলের লালকেল্লা

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থাপনাগুলোর একটি লালকেল্লা। মোগল আমলে নির্মিত লালচে রঙের দুর্গটি নিমেষেই নজর কাড়ে মানুষের। তবে রূপ হারাচ্ছে দুর্গটি। এর দেয়ালে সৃষ্টি হচ্ছে ‘কালো রঙের আস্তরণ’। গবেষকেরা বলছেন, এই আস্তরণের জন্য দায়ী নয়াদিল্লির তীব্র বায়ুদূষণ।

লালকেল্লা নিয়ে এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গবেষণাটি করেছেন ভারত ও ইতালির গবেষকেরা। গত জুন মাসে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী হেরিটেজ–এ গবেষণাটি প্রকাশ করা হয়। লালকেল্লার ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব নিয়ে এটিই বড় পরিসরে করা প্রথম গবেষণা।

গবেষকেরা বলেছেন, বাতাসের বিভিন্ন দূষণকারী পদার্থ ও দুর্গটির দেয়ালের লাল বেলে পাথরের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া হচ্ছে। এতে দেয়ালের ওপর শূন্য দশমিক শূন্য ৫ থেকে শূন্য দশমিক ৫ মিলিমিটার পুরু কালো আস্তরণ পড়ছে। এখনই যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে দুর্গের দেয়ালে খোদাই করা কারুকাজের ক্ষতি হতে পারে।

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে একটি নয়াদিল্লি। গবেষণার জন্য ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শহরটির বায়ুর মান পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাতাসে থাকা দূষণ সৃষ্টিকারী অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণা ‘পিএম–২.৫’ ও ‘পিএম–১০’ দেয়ালে এমন দাগ সৃষ্টি করার জন্য দায়ী।

১৭ শতকে লালকেল্লা নির্মাণ করেছিলেন মোগল সম্রাট শাহজাহান। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতার দিন এখান থেকেই জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। তখন থেকে ভারতের প্রতি স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে ভাষণ দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রীরা।

এর আগে মোগল আমলের আরেক নিদর্শন তাজমহলও দূষণের কবলে পড়ার খবর সামনে আসে। ২০১৮ সালের ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিলেন, বায়ু ও পানিদূষণের কারণে সাদা মার্বেল পাথরের স্থাপনাটি হলুদ ও সবুজাভ–বাদামি রং ধারণ করছে। ১৭ শতকের এই স্থাপনাটি সংরক্ষণ করতে সে সময় উত্তর প্রদেশ সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-17%2Ft7ztgiln%2FRedFortAFPlatestnews.webp?rect=94%2C0%2C1080%2C720&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
লালকেল্লা। ফাইল ছবি: এএফপি

Tuesday, May 6, 2025

ঢাকায় এয়ার পিউরিফায়ারের মতো স্বপ্নবিলাসী প্রকল্প কেন by সুবাইল বিন আলম ও মার্জিয়া মিথিলা

ঢাকার বায়ুদূষণের কথা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। পরিবেশ উপদেষ্টা বায়ুদূষণের ৩০ শতাংশ দায় পাশের দেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। হ্যাঁ! বিভিন্ন গবেষণায় এ দাবির সত্যতা এসেছে। কিন্তু তাই বলে কি আমরা বাকি ৭০ শতাংশ নিয়ে কাজ করব না?

সেই কাজ করতে গিয়েই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নিয়ে এসেছে এক কুইক ফিক্স প্রজেক্ট। তারা ঢাকা শহরে ৫০টি এয়ারপিউরিফায়ার (যাকে বলে স্মগ টাওয়ার) বসিয়ে বাতাস ঠিক করবে।

বলা হচ্ছে, একেকটি পিউরিফায়ার ১০০টি গাছের সমান বাতাস পরিষ্কার করতে পারে। তা–ই যদি হয়, তাহলে এই বিশাল যজ্ঞ না করে পাঁচ হাজার গাছ ঢাকা শহরে লাগানো কি খুব কষ্টের কাজ?

ঢাকার দূষণ কোনো পৃষ্ঠের ধুলো নয়, বরং গভীর কাঠামোগত সমস্যা। পরিবেশ অধিদপ্তর (ডিওই) এবং বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, ৫৮ শতাংশ পিএম ২.৫ (অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার উপাদান) আসে ইটভাটা থেকে, ১৮ শতাংশ আসে যানবাহন থেকে, ১০ শতাংশ আসে নির্মাণকাজের ধুলো থেকে এবং ১৪ শতাংশ আসে বর্জ্য পোড়ানো, জৈব জ্বালানি ও শিল্প থেকে। এই দূষণ সার্বক্ষণিক তৈরি হচ্ছে।

এখন হিসাব করে দেখি পিউরিফায়ার আমাদের কী কাজে লাগবে। একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পিউরিফায়ার ঘণ্টায় ৩০ হাজার ঘনমিটার বাতাস পরিষ্কার করতে পারে, যা ২৪ ঘণ্টায় করে ৭ দশমিক ২ লাখ ঘনমিটার। ১ বর্গকিলোমিটার এলাকার বাতাসের আয়তন (১০ মিটার উচ্চতা ধরে) হচ্ছে ১ কোটি ঘনমিটার।

তাহলে ১ বর্গকিলোমিটার এলাকার বাতাস পরিষ্কার করতে সময় লাগবে ১৪ দিন। ঢাকার আয়তন ৩০৬ বর্গকিলোমিটার হলে প্রতিদিন এই শহরের বাতাস পরিষ্কার করতে প্রয়োজন≈৪ হাজার ২৫০টি পিউরিফায়ার।

প্রতিটি পিউরিফায়ারের আনুমানিক দাম এক লাখ মার্কিন ডলার। তাহলে ঢাকার বাতাস পরিষ্কার করতে পিউরিফায়ার কিনতে খরচ হবে ৪২৫ মিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে যুক্ত হবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, সরকার মাত্র ৫০টি পিউরিফায়ার বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা মোট চাহিদার ১ দশমিক ১৭ শতাংশ।

একটি পিউরিফায়ার ২৪ ঘণ্টা চালানোর জন্য দরকার ১৫০ থেকে ২৫০ ওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুৎ। সেই হিসাবে বার্ষিক খরচ হবে ১ হাজার ৩১৪ থেকে ২ হাজার ১৯০ কিলোওয়াট/ঘণ্টা। এ হিসাবে ৪ হাজার ২৫০টি পিউরিফায়ারের জন্য বছরে খরচ হবে ৫ দশমিক ৫৮ থেকে ৯ দশমিক ৩১ মিলিয়ন কিলোওয়াট/ঘণ্টা। একটি বাংলাদেশি পরিবার বছরে ২৫০ থেকে ৩০০ কিলোওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। এই প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে ২০ থেকে ৩০ হাজার পরিবারের সমান বিদ্যুৎ খরচ হবে এর পেছনে।

পিউরিফায়ারের রক্ষণাবেক্ষণকাজও অত্যন্ত সংবেদনশীল। ধুলোয় ফিল্টার দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়, বর্ষা ও বন্যায় ক্ষতি হয়, বিদ্যুৎ–বিভ্রাট সমস্যা করে, নিয়মিত পরিষেবা ও কারিগরি সাপোর্ট প্রয়োজন। এ ছাড়া ঢাকায় যেখানে ম্যানহোলের ঢাকনা, বৈদ্যুতিক তার পর্যন্ত চুরি হয়; সেখানে একটি পিউরিফায়ারে থাকে দামি ধাতু ও ইলেকট্রনিক অংশ, সহজে বিক্রয়যোগ্য ফিল্টার ও খোলা তার। চীনে প্রতি ২ মিলিয়ন ডলারের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ধরা হয় প্রতিবছর ৩০ হাজার ডলার। বাংলাদেশে এর খরচ আরও বেশি হবে বলেই ধারণা করা যায়। রক্ষণাবেক্ষণের কাজ যে কোম্পানি পাবে, তাদের লাভের অঙ্কটা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে।

আরও একটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। বাতাসের প্রবাহ সর্বদা চলমান। মাত্র ২ মিটার/সেকেন্ড গতির বাতাস কয়েক মিনিটে দূষিত বাতাস ছড়িয়ে দিতে পারে। দিল্লির ২০১৯ সালের পরীক্ষায় দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (সিপিসিবি) বলেছে, এ ধরনের পিউরিফায়ারের প্রভাব ‘অতি সামান্য থেকে নেই বললেই চলে’। দিল্লির স্মগ টাওয়ার প্রকল্পে ২০ কোটি রুপি (২.৪ মিলিয়ন ডলার) খরচ হয়েছিল। প্রতিশ্রুতি ছিল, ১ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে দূষণ ৫০ শতাংশ কমাবে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে সিপিসিবি রিপোর্ট করে কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি নেই। দূষণ কমানোর প্রভাব কয়েক শ মিটারের মধ্যেই মিলিয়ে যায়। উপরন্তু করতে হয় ফিল্টার ব্লক। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিশাল খরচ।

বিশ্বে বেইজিং হচ্ছে বায়ুদূষণ রোধের জীবন্ত উদাহরণ। তারা কয়লাভিত্তিক শিল্প স্থানান্তর করেছে, জীবাশ্ম জ্বালানিকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর করেছে, গণপরিবহনব্যবস্থা উন্নত করেছে এবং কঠোরভাবে নির্গমন মানদণ্ড প্রয়োগ করেছে। ৫ বছরে তারা পিএম ২.৫ হ্রাস করেছে ৩৫ শতাংশ। (ইউএনইপি, ২০২১)। এ জন্য বেইজিংকে কোনো পিউরিফায়ারের ওপর নির্ভর করতে হয়নি।

আমাদের দরকার অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা, বৈদ্যুতিক ও গণপরিপরিবহন বাড়ানো, বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ, নির্মাণ প্রকল্পের ধুলো নিয়ন্ত্রণ, গাছ লাগানো ও সবুজ এলাকা সম্প্রসারণ, স্কুল ও হাসপাতালে এইচইপিএ ফিল্টার বসানো, শিল্প ও আবাসিক এলাকা আলাদা করা, জনসচেতনতা ও বায়ু পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

৪ হাজার ২৫০টি এয়ার পিউরিফায়ার দিয়ে যে পরিমাণ বাতাস পরিষ্কার করা যাবে, মাত্র ৪ লাখ ২৫ হাজার দেশীয় ফলের গাছ (ফুল বা বিদেশি গাছ নয়) লাগিয়েই সেটা করা সম্ভব। বাতাস বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এক বছরে যে খরচ, তা দিয়েই ঢাকায় এই পরিমাণ গাছ লাগানো সম্ভব। ঢাকার খালগুলো উদ্ধার করে, সেগুলো পুনঃখনন করে চারপাশে প্রচুর গাছ লাগানো যায়। এর জন্য দরকার একটা সমন্বিত পরিকল্পনা।

বিগত সরকারের আমলে সিটি করপোরেশন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ–চালিত ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি, ফুটওভার ব্রিজে এস্কেলেটর বসানোর মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়েছিল। সব জিনিস এখন নষ্ট হয়ে বেকার পড়ে আছে। আর আমরা ঋণের সুদ ঠিকই শোধ করে যাচ্ছি। ঢাকার জন্য দরকার একটা মানবিক নীতি। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সেটা আশা করছিলাম। কিন্তু পপুলিস্ট প্রকল্প নিয়ে তারা নিজেদের যোগ্যতাকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করছে।

* সুবাইল বিন আলম, টেকসই উন্নয়নবিষয়ক কলামিস্ট

* মার্জিয়া মিথিলা, সাস্টেইনেবিলিটি প্রফেশনাল (সাউথ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র)

ঢাকায় ৫৮ শতাংশ পিএম ২.৫  আসে ইটভাটা থেকে
ঢাকায় ৫৮ শতাংশ পিএম ২.৫ আসে ইটভাটা থেকে। ছবি : রয়টার্স

Friday, May 2, 2025

ঢাকায় ৫০টি জায়গায় বসছে ‘এয়ার পিউরিফায়ার’, কতটা কাজে লাগবে by সৈয়দ রিফাত মোসলেম

রাজধানীর বায়ুদূষণ রোধে নগরীর অন্তত ৫০টি জায়গায় ডিএনসিসির এয়ার পিউরিফায়ার (বায়ু পরিশোধন যন্ত্র) স্থাপনের পরিকল্পনা স্বল্পমেয়াদি প্রচেষ্টা হিসেবে প্রশংসনীয় হলেও দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই সমাধান নয় বলে বলছেন বায়ুগবেষকেরা। বায়ুদূষণ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে মূল কারণগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরামর্শ তাঁদের।

গত সোমবার গুলশানে ঢাকা উত্তর সিটির নগর ভবনে এক পলিসি ডায়ালগে এসব যন্ত্র বসানোর পরিকল্পনার কথা জানান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। প্রতিটি যন্ত্র ১০০ গাছের সমপরিমাণ বায়ু পরিশোধন ও শীতলীকরণে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে।

ডিএনসিসি প্রশাসক আরও জানান, এ উদ্যোগের জন্য পৃষ্ঠপোষক বা স্পনসর পাওয়া গেছে এবং চলতি মাসেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তি সইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সিটি করপোরেশনের কোনো অর্থ খরচ হবে না।

এদিকে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন মোহাম্মদ এজাজ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমরা একটি পাইলট প্রকল্প করে দেখতে চাই, ফলাফল কী আসে। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে আমরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসব। যদি ইতিবাচক না হয়, আমরা ভিন্ন উদ্ভাবনের দিকে যাব।’

ঢাকায় কোন ধরনের এয়ার পিউরিফায়ার বসছে

এয়ার পিউরিফায়ার ক্ষুদ্র ধূলিকণা, জীবাণু ও দূষণ সৃষ্টিকারী গ্যাসীয় পদার্থ শোষণ করে বাতাসকে পরিশুদ্ধ করে। যন্ত্রগুলোতে সাধারণত ফিল্টার, কার্বন ফিল্টার বা ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এয়ার পিউরিফায়ারের বড় আকারের ইউনিটগুলো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বায়ু শোধনে সক্ষম হলেও এগুলোর প্রভাব মূলত সীমিত এলাকাজুড়ে।

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, এইচডিসিটি ৫১০০০ মডেলের ৫০টি স্থির বায়ু পরিশোধন যন্ত্র বসানো হবে রাজধানীতে, যা প্রতি মিনিটে ৩০ হাজার ঘনফুট বায়ু পরিশোধন করতে পারবে। যন্ত্রটি বাতাসে থাকা অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পরিশোধন করতে সক্ষম বলে যন্ত্র বিবরণী থেকে জানা গেছে।

একেকটি যন্ত্রের ওজন ১ হাজার ৫০০ কিলোগ্রাম, যা গড়পড়তা একটি টয়োটা করোলা গাড়ির সমান। যন্ত্রটি চালাতে ২২০ ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে, অর্থাৎ এটি বাসাবাড়িতে চালানো ফ্রিজ বা ওয়াশিং মেশিনের মতো ভোল্টেজে চলবে।

যন্ত্রটির বিবরণীতে বলা হয়েছে, এটি উচ্চ জনসমাগম এলাকাগুলোর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশিকা অনুযায়ী, এটি বাতাসে অতিক্ষুদ্র কণার উপস্থিতির স্তর স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।

যন্ত্রটি যানবাহন ও শিল্প খাতের ধোঁয়াসহ সিগারেটের মতো ক্ষতিকর ধোঁয়া বাতাস থেকে টেনে নিতে সক্ষম।

ঢাকার বায়ুমান

ঢাকার বায়ুমানের সূচক বা একিউআইয়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গত ২২ এপ্রিল কিছু তথ্য প্রকাশ করে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)। কেন্দ্র জানায়, রাজধানীতে বসবাসকারী মানুষ গত ৯ বছরে (৩ হাজার ১১৪ দিনের হিসাব) মাত্র ৩১ দিন নির্মল বাতাসে শ্বাস নিতে পেরেছেন।

এ সময়ে ৮৫৩ দিনের বাতাস ছিল অস্বাস্থ্যকর। আর খুব অস্বাস্থ্যকর ও দুর্যোগপূর্ণ ছিল যথাক্রমে ৬৩৫ দিন ও ৯৩ দিন। ক্যাপস জানায়, দেশে প্রতিবছরই বায়ুদূষণ আগের চেয়ে বাড়ছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের ‘বৈশ্বিক বায়ুমান প্রতিবেদন ২০২৪’ বলছে, বায়ুদূষণে ওই বছর দেশ হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। আর নগর হিসেবে তৃতীয় স্থানে ছিল ঢাকা।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বলছেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এ ধরনের পিউরিফায়ার স্থাপন করে সামগ্রিক বায়ুমানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনা কঠিন। বায়ুদূষণ রোধে স্বীকৃত উপায়গুলোর মধ্যে এয়ার পিউরিফায়ার নেই। এটি ছোট পরিসরে সাময়িক স্বস্তি পেতে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো যেতে পারে।

দূষণ ঠেকাতে এয়ার পিউরিফায়ার স্থাপন কার্যকর পদক্ষেপ নয় বলে মন্তব্য করেছেন বায়ুদূষণবিষয়ক গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বড় দেশগুলোও এয়ার পিউরিফায়ার স্থাপনের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্প নিয়ে খুব একটা সফল হতে পারেনি। হয়তো প্রাথমিকভাবে বেসরকারি কোম্পানি ব্যয় বহন করছে, তবে একটা সময় আমাদের এগুলো কিনতে হবে। সেদিকে না গিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে দূষণের উৎস খুঁজে বের করে সেগুলো বন্ধ করতে।’

একই কথা বলেন বেসরকারি স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আহমেদ কামরুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘মাঠপর্যায়ে এখনো এয়ার পিউরিফায়ার টেকসই সমাধান নয়। কিছু জনপরিসরে এটি পরীক্ষামূলক একটি পদক্ষেপ হতে পারে। তবে বড় সমস্যা সমাধানের পথ নয়।’

অধ্যাপক কামরুজ্জামান বলেন, দেশের অর্থসামাজিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় এয়ার পিউরিফায়ার এখনো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট। যে দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বাতাস সেবন করছে, সে দেশে এয়ার পিউরিফায়ারকে আলাদা করে প্রমোট (উৎসাহিত) করার বিষয়টি ন্যায্যতার ঘাটতি ও বৈষম্যও বটে।

‘তবে নগর প্রশাসন বায়ুদূষণ নিয়ে ভাবছে, সমাধানের পথ খুঁজছে, বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি,’ যোগ করেন কামরুজ্জামান।

সফল হয়নি দিল্লির স্মগ টাওয়ার প্রকল্প

বিশ্বে বিভিন্ন শহরে বড় আকারের এয়ার পিউরিফায়ার স্থাপন করে দেখা গেছে, এগুলোর প্রভাব মূলত স্থানীয় পর্যায়ের ও সীমিত। ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে দিল্লির কনট প্লেসে স্থাপন করা হয় ২৪ মিটার উচ্চতার একটি স্মগ টাওয়ার। এটি ৫০ মিটারের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বায়ুদূষণ কমাতে সক্ষম হলেও ৩০০ মিটারের বাইরে এর প্রভাব ছিল না বললেই চলে।

২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর এনডিটিভির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দিল্লির পরীক্ষামূলক স্মগ টাওয়ার বায়ুদূষণ হ্রাসে কার্যকর নয় বলে মত দেয় দিল্লি দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটি। একই সঙ্গে ব্যয়বহুল বিশাল এয়ার পিউরিফায়ার চালানোর যৌক্তিকতা নেই বলেও দেশটির জাতীয় পরিবেশ আদালতকে জানায় সংস্থাটি।

এনডিটিভির খবর অনুযায়ী, সে সময় সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, স্মগ টাওয়ার বায়ুদূষণ সমস্যার কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।

টেকসই সমাধান কী

এত আলোচনার পরও বায়ুদূষণ বন্ধ হয় না কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, ‘সমাধান আসে না। কারণ, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কথা বেশি বলি, কিন্তু কাজ করি কম। বায়ুদূষণ না কমার কারণ এটাই। শীতকালে যখন দূষণ বেড়ে যায়, তখন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করা হয়, টাস্কফোর্স করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো আর নেওয়া হয় না।’

বায়ুদূষণ মোকাবিলায় মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরামর্শ দেন এই গবেষক। কার্যকর সমাধানগুলোর মধ্যে রয়েছে—পুরোনো ও কালো ধোঁয়া ছাড়ানো যানবাহন নিয়ন্ত্রণ; নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ; অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা; সবুজায়ন ও নগর–পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব নীতিমালা গ্রহণ এবং বায়ুর গুণমান মনিটরিং স্টেশন স্থাপন করে দূষণের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।

বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত জনজীবন
বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত জনজীবন। ফাইল ছবি

Friday, February 14, 2025

অস্বাভাবিক বায়ুদূষণ থেকে বাঁচতে কী করবেন by আনিকা তায়্যিবা

২০২৪ সালের নভেম্বর থেকেই ঢাকার বায়ুর মান ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে। ডিসেম্বরেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এ বছরের জানুয়ারিতে বায়ুদূষণ আরও মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়, যা আগের বারের তুলনায় সবচেয়ে বেশি।

রাজধানীর পরিবেশকল্যাণবিষয়ক সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাটমসফেরিক পলিউশন স্টাডিজের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দূষিত শহরের মধ্যে ছিল।

তবে এই পরিস্থিতেও বাইরে বের না হয়ে উপায় নেই। ব্যস্ত জীবনে কাজের সূত্রে বা কোনো প্রয়োজনে নিত্যদিন যদি আপনাকে ঢাকার রাস্তায় চলাচল করতে হয়, কিছু আগাম সতর্কতা মানতে ভুলবেন না। বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত সংস্থা আমেরিকান লাং অ্যাসোসিয়েশন কিছু সহজ ও কার্যকর উপায় বাতলে দিয়েছে। জেনে নিন সেসব।

১. প্রতিদিনের বায়ুদূষণের পূর্বাভাস দেখুন


বাইরে বের হওয়ার আগে আপনার এলাকায় দৈনিক বায়ুদূষণের পূর্বাভাস দেখে নিন। আইকিউএয়ারের ওয়েবসাইট থেকে সহজে তা দেখে নিতে পারবেন। পূর্বাভাস আপনাকে জানিয়ে দেবে বাতাস কখন স্বাস্থ্যকর নয়। এ ছাড়া বায়ুর মান সম্পর্কে তথ্য পেতে পত্রিকা, রেডিও ও টিভির আবহাওয়া প্রতিবেদনেও চোখ রাখতে পারেন।

২. দূষণ বেশি থাকলে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন

যখন বাতাসের মান অত্যধিক খারাপ থাকে, তখন বাইরে যাওয়া পারতপক্ষে এড়িয়ে চলুন। যদি জিমে যাওয়ার থাকে বা শপিং করার দরকার হয়, চেষ্টা করুন বাড়িতে বসে করা যায় কি না বা অনলাইনে কাজটি সারা যায় কি না। বিশেষ করে শিশুদেরও দূষিত বাতাসে বাইরে খেলাধুলা বা ঘুরতে দেওয়া থেকে বিরত রাখা উচিত। একান্ত যেতেই হলে মুখে মাস্ক পরুন।

৩. জ্বালানিচালিত যানবাহন ব্যবহার সীমিত করুন

নাগরিক হিসেবে যার যার জায়গা থেকে সচেতন থাকার চেষ্টা করুন। বায়ুদূষণ কমাতে হলে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তাই এ সময় যতটা সম্ভব গাড়ির ব্যবহার সীমিত করুন। গণপরিবহন, যেমন বাস, রেল, মেট্রোরেল ব্যবহার করুন।

৪. কাঠ বা আবর্জনা পোড়ানো এড়িয়ে চলুন

জ্বালানির জন্য কাঠ বা আবর্জনা পোড়ানো অনেক অঞ্চলে বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি। শীতকালে আমাদের দেশে কাঠ পুড়িয়ে আগুন পোহানো হয়। এটি বাতাসে ক্ষতিকর কণার পরিমাণ বাড়ায়, যা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই যথাসম্ভব এটিও এড়িয়ে চলুন।

৫. ঘরের বাতাসের গুণগত মান নিশ্চিত করুন

শুধু বাইরেই নয়, ঘরের ভেতরের বায়ুমানও সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে বিভিন্ন বায়ু পরিশোধনকারী ইনডোর প্ল্যান্ট রাখতে পারেন। যেমন স্নেক প্ল্যান্ট, স্পাইডার প্ল্যান্ট ইত্যাদি।

৬. সর্বোপরি সচেতনতা বৃদ্ধি করুন


দূষণ কমাতে ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সবারই দায়িত্ব আছে। সরকারের সব স্তরের নীতিনির্ধারক যেন এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়, তার জন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় এনে নিরাপদ পরিবেশ ও পরিষ্কার বাতাস নিশ্চিত করতে হবে।

সূত্র: আমেরিকান লাং অ্যাসোসিয়েশন

এ বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দূষিত শহরের মধ্যে ছিল
প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। তবে এ বছরের দূষণের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ধরনের বায়ুদূষণের রেকর্ড হয়েছে এবার। এ বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দূষিত শহরের মধ্যে ছিল। ছবি: আশরাফুল আলম

Wednesday, January 29, 2025

বিশ্লেষণ: বায়ুদূষণের ভয়াবহতা বনাম আমাদের অপারগতা by খলিলউল্লাহ্

বায়ুদূষণ বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের মাত্রা অতিক্রম করে গেছে। শিশুদের জন্য বায়ুদূষণ এতটাই ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে যে মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেও তারা আক্রান্ত হচ্ছে। বায়ুদূষণের ভয়াবহতা এবং এ বিষয়ে আমাদের অপারগতা নিয়ে লিখেছেন খলিলউল্লাহ্

বায়ুমানের স্কোর ৩০০ পার হলে সেটাকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ ধরা হয়। কিন্তু ৫ জানুয়ারি সকালে ঢাকার স্কোর ৪৯৩ পর্যন্ত উঠেছিল। হরহামেশাই এখন ঢাকায় বায়ুর মানের স্কোর ৩০০ পার হচ্ছে। সারা বিশ্বের মধ্যে বায়ুদূষণে আমরা ঘুরেফিরেই শীর্ষে উঠে আসছি। বিগত ৯ বছরের ডিসেম্বর মাসগুলোর মধ্যে সর্বশেষ ডিসেম্বর ছিল ঢাকায় সবচেয়ে দূষিত মাস। তা ছাড়া ২০১৬-২৪ সময়ের মধ্যে গত বছর ছিল সবচেয়ে দূষিত বছর।

বায়ুদূষণের ভয়াবহতা

বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল বলছে, কতটা ভয়ানক হুমকির মুখে আমরা রয়েছি। এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে ১৩ কোটি মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। আবহাওয়ার ধরনের কারণে স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ ও ফুসফুসের রোগের সঙ্গে ক্যানসারজনিত মৃত্যু ১৪ শতাংশ বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়।

অন্যদিকে স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার তাদের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বব্যাপী শুধু ২০২১ সালেই ৮০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বায়ুদূষণের কারণে। আর বাংলাদেশে এই মৃত্যুর সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার। অথচ করোনার মতো অতিমারিতেও বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ২৯ হাজার ৪৯৯। একটা দেশের এত বিপুল মানুষের মৃত্যু যদি হয় বায়ুদূষণের কারণে, তাহলে এটাকে জরুরি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে আশু পদক্ষেপ কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না?

সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো, বায়ুদূষণে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। পৃথিবীতে কেবল ২০২১ সালেই বায়ুদূষণে ৫ বছরের কম বয়সী ৭ লাখ শিশু মারা গেছে। মানবশিশুর জন্য সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান হলো মায়ের গর্ভ। কিন্তু শিশুদের জন্য বায়ুদূষণ এতটাই ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে যে মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেও তারা আক্রান্ত হচ্ছে, যার প্রভাব সারা জীবন এসব শিশুকে বয়ে বেড়াতে হতে পারে।

তা ছাড়া সাধারণত শিশুরা বড়দের চেয়ে বেশি দূষণের শিকার হয়। কারণ, তাদের শরীর, ফুসফুস ও মস্তিষ্ক যখন গঠিত হতে থাকে, তখন তাদের বড়দের চেয়ে বেশি বায়ু গ্রহণ করতে হয়। ফলে বায়ু যদি দূষিত হয়, তাহলে দূষিত উপাদানও তারা বেশি গ্রহণ করে; অর্থাৎ আমরা শুরুতেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামর্থ্য নষ্ট করে দিচ্ছি।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণের অবস্থা এতটাই নাজুক যে এ কারণে মানুষের গড় আয়ু কমেছে ৬ দশমিক ৯ বছর। অথচ তামাকদ্রব্যের কারণে আয়ু কমেছে এর চেয়েও কম, ১ দশমিক ৬ বছর। বায়ুদূষণের অন্যতম উপাদান পিএম ২ দশমিক ৫ আয়তনে মানুষের চুলের চেয়ে ৩০ গুণ ছোট। তাই সহজেই এগুলো মানুষের ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আর এটাই ভয়াবহতার অন্যতম কারণ।

বায়ুদূষণ কি নতুন

এটা ঠিক যে বায়ুদূষণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রাচীন মিসর, পেরু ও গ্রেট ব্রিটেনে মানবদেহের মমি থেকে দূষণে কালো হয়ে যাওয়া টিস্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রাচীন রোমের বাসিন্দারা বায়ুদূষণের শিকার হয়েছিলেন বলে ধারণা করা যায়। তৎকালীন রোমের বিচারক অ্যারিস্টো এক রায়ে চিজের দোকানের ধোঁয়া ভবনের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছিলেন।

মধ্যযুগে বায়ুদূষণের মূল উৎস ছিল ধাতু গলিয়ে অস্ত্র ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি তৈরি। কিন্তু সব রেকর্ড ভেঙে শিল্পবিপ্লবের পর দূষণের নতুন যুগে প্রবেশ করে পৃথিবী, বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ কার্ল পোলানি ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত দ্য গ্রেট ট্রান্সফরমেশন: দ্য পলিটিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক অরিজিনস অব আওয়ার টাইম গ্রন্থে দেখিয়েছেন, শিল্পবিপ্লবের ফলে সৃষ্ট বাজার অর্থনীতি কীভাবে আমাদের সমাজ ও পরিবেশ—দুটিরই অস্বাভাবিক ধ্বংস করেছে। এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের জীবনসহ অমূল্য সব বনজঙ্গল, উদ্ভিদ, প্রাণী ইত্যাদি প্রাকৃতিক পরিবেশের সবকিছুকে পণ্যে রূপান্তর করা হয়। মুনাফার লক্ষ্যে চলে এসবের যথেচ্ছ ব্যবহার। আর এটিই হলো আমাদের সময়ের সামাজিক ও পরিবেশগত দুর্যোগের মূল কারণ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া হিসেবে বায়ুদূষণ বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের মাত্রা অতিক্রম করে গেছে। উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের একটা দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক আছে, সন্দেহ নেই। আর তাই এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের মতো ধারণা এসেছে। ভুটানের মতো দেশ তো প্রবৃদ্ধির ধারণা থেকেই বের হয়ে এসেছে।

তা ছাড়া জিডিপির ধারণার বাইরে মানব উন্নয়ন সূচক ব্যবহারের পক্ষেও মতো জোরালো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো সামগ্রিক কল্যাণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো দেশে পরিবেশগত মূল্যায়ন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দায়সারাভাবে করা হয়। জিডিপির বিকল্প ভাবনাগুলো নিয়েও জোরালো কোনো আলাপ নেই।

দূষণের উৎস বন্ধে অগ্রগতি নেই

ঢাকার বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশের জন্য দায়ী শহরের আশপাশের ইটভাটাগুলো। পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানালেও বহু ইটাভাটা অনুমোদনবিহীনভাবে চলছে। তা ছাড়া পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার নিয়ে নানা আলাপ-আলোচনা হলেও এর প্রচলন নেই বললেই চলে। অথচ সরকার চাইলে সরকারি প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে পারে। দেশে নির্মাণকাজের বেশির ভাগই সরকারি প্রকল্প। নির্মাণকাজে বায়ুদূষণের সরকারি হিস্যাও তাই বেশি। পরিবেশবান্ধব ইট যদি সরকারি প্রকল্পে ব্যবহার শুরু হতো, তাহলে বেসরকারিভাবেও এর প্রচলন বাড়ত।

২০১৫ সালে গৃহীত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইট তৈরিতে মাটির ব্যবহার ২০২০ সালের মধ্যে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার পাঁচ বছর পার হলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ে না। ইটভাটায় মাটির উপরিভাগ কেটে পোড়ানো হচ্ছে। মাটির পুষ্টি উপাদানের কারণেই ফসল উৎপাদন হয়। আর পুষ্টি থাকে এই উপরিভাগেই, যা গঠনে হাজার বছর সময়ও লাগতে পারে। অথচ কি অবলীলায় নিমেষেই আমরা মাটির উপরিভাগ নষ্ট করছি ইটভাটার চুল্লিতে পুড়িয়ে! জাতিসংঘের হিসাবমতে, বর্তমান হারে মাটির উপরিভাগ ধ্বংস হতে থাকলে আর ৪৫ থেকে ৬০ বছর পর তা শেষ হয়ে যাবে; অর্থাৎ আমরা আর ফসল ফলাতে পারব না।

অথচ বালু-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি ব্লক ইটের বিস্তার ঘটাতে পারলে কৃষিজমি যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি বায়ুদূষণও কমবে। অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে নদী থেকে বালু তুলে এসব ইট বানালে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে। অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও উত্তোলিত বালু ব্যবহার করা যাবে। এই পদ্ধতির প্রচলন ঘটাতে পারলে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ড্রেজার ব্যবহার করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা যাবে। অবৈধ বালু উত্তোলনে বর্তমানে নদীর প্রতিবেশ নষ্ট হয়ে জলজ প্রাণীরা যেমন হুমকির মুখে, তেমনি নদীভাঙনের শিকার হয়ে অসংখ্য মানুষ হচ্ছে বাস্তুহারা।

অন্যদিকে ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া শহরে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানে আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখছি না। শহর এলাকার বায়ুদূষণ রোধে মেক্সিকো আর চীনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে যানবাহনের লাইসেন্সের নম্বর অনুযায়ী এক দিন পরপর এগুলোকে রাস্তায় নামার অনুমতি দিয়ে বায়ুদূষণ কমানো হয়। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু মানুষের জীবনের চেয়ে তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।

প্রতিদিন চলতে-ফিরতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে পড়ে আছে নির্মাণকাজের ইট-বালু-সুরকির স্তূপ। সেগুলো গড়িয়ে পড়ছে রাস্তার ওপর। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও স্তূপ করে রাখা মাটিও বায়ুদূষণের বড় উৎস। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত, ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর ইত্যাদি সরকারি সংস্থাগুলো যদি সমন্বয় করে কাজ করত, তাহলে শহরের রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনদুর্ভোগ যেমন কমত, তেমনি এসব উৎস থেকে দূষণ কমানোও সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব ক্ষেত্রে কাউকেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা করতে দেখা যায় না। আইন প্রয়োগের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানে কোনো উদ্যোগ পর্যন্ত নেওয়া হয় না।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল দূষণের উৎসগুলো বন্ধ করে বায়ুমানের উন্নতির পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা। বায়ুদূষণ রোধে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু কয়েক মাস গত হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। এদিকে বায়ুদূষণজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর বা সিটি করপোরেশনের মতো সংস্থা, যারা বায়ুদূষণের উৎসগুলো ঠেকানোর দায়িত্বে রয়েছে, তারা বিভিন্ন সময় বলেছে যে তাদের যথেষ্ট জনবল নেই। এত বড় একটা জনস্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান যদি জনবলের ঘাটতির কারণে আটকে থাকে, তাহলে জনবল কেন বাড়ানো হচ্ছে না? প্রয়োজনে বছরের যে মাসগুলোয় বায়ুদূষণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে, সে সময়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ দিয়েও এর সমাধান করা যায়।

আইন-আদালতের দুর্বলতা

পরিবেশ রক্ষায় দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনসহ অন্য যেসব আইন ও বিধিমালা রয়েছে, সেগুলো আবার জাতীয় স্বার্থে ‘বরখেলাপ’ করা যায়। যেমন পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট বা রাস্তা বানাতে হাজার হাজার গাছ কাটা হয়ে থাকে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আইনে দেওয়া হয়নি। ফলে গোড়াতেই একটা গলদ রয়ে গেছে। তা ছাড়া যা-ও আইন আছে, তা প্রয়োগের ঘাটতি তো রয়েছেই। জাতিসংঘের পরিবেশ–সংক্রান্ত সংস্থা ইউএনইপির হিসাব (২০১৯) অনুযায়ী, পরিবেশ বিষয়ে অনেক আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই যেসব দেশে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম।

পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ অনুযায়ী, প্রতিটি জেলা সদরে পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাইরে পরিবেশ আদালত নেই। তা ছাড়া এই আইনের সীমাবদ্ধতা হলো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি এই আইনে মামলা করতে পারেন না, পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে করতে হয়। আবার এসব আদালতে পরিবেশ–সংক্রান্ত মামলার চেয়ে অন্যান্য মামলাই বেশি।

২০২১ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, ঢাকার পরিবেশ আদালতে মোট মামলার মাত্র ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায়। চট্টগ্রামে এই হার কিছুটা বেশি, ১৩ শতাংশ। এর ব্যাখ্যায় দায়িত্বরত ব্যক্তিরা বলে থাকেন, পরিবেশ অধিদপ্তর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। তাই পরিবেশ আদালতে মামলা কম যায়।

২০২১ সালের ১৩ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, পরিবেশ আদালত এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত—দুটিতেই অপরাধীদের কারাদণ্ডের চেয়ে অর্থদণ্ড বেশি দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর সেই অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১০ বছরে নিষ্পন্ন হওয়া ২০০ মামলার মধ্যে ১৪৭টি মামলায় পরিবেশ আদালত অর্থদণ্ড দিয়েছেন। আর পরিবেশ অধিদপ্তর পাঁচ বছরে ৪ হাজার ৪৪০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাত্র ১৬৬ জনকে কারাদণ্ড দিয়েছে। কিন্তু দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই আপিল করে ছাড়াও পেয়ে যান। বাংলাদেশ আইন কমিশনের একটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ৯৮ শতাংশ মামলার রায় আপিল আদালতে বাতিল হয়ে যায়।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির সৃষ্টি না হলে পরিবেশ ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ড থামবে না। প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল প্রশ্ন রেখেছিলেন, শহরের কতজন ছিঁচকে চোর ধর্ম বা নৈতিকতার ভয়ে চুরি থেকে বিরত থাকে আর কতজন রাষ্ট্রের ডান্ডাবাড়ি খাওয়ার ভয়ে বিরত থাকে?

আমাদের মতো দেশের আরেকটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ দেশে আইন-বিচার-রাষ্ট্রকাঠামোর দুর্বলতা যেমন আছে, তেমনি অপরাধের বিরুদ্ধে একধরনের সামাজিক প্রতিরোধও আছে। সাধারণ মানুষই সম্মিলিতভাবে অনেক অপরাধ ঠেকিয়ে দেন। মানুষের ভূমিকার কারণে অপরাধীদের বিরত থাকার অনেক নজিরও আছে। কিন্তু পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা কম থাকায় এ-সংক্রান্ত অপরাধ ঠেকাতে সামাজিক এমন প্রতিরোধ জোরালোভাবে কাজ করে না। পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন জোরদার করা।

-খলিলউল্লাহ্ প্রথম আলোর জলবায়ু প্রকল্প ব্যবস্থাপক

বায়ুদূষণ
বায়ুদূষণ। অলংকরণ: আরাফাত করিম

Thursday, November 21, 2024

কলকাতা কথকতা: আতঙ্ক শুধু দিল্লি নয়, দূষণে জেরবার কলকাতা-হাওড়াও by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

আতঙ্ক কি শুধু দিল্লি নিয়েই? একিউআই-এর মাত্রা বলছে দূষণে জেরবার শহর কলকাতাও। কলকাতার বেশকিছু জায়গায় মাত্রা ছাড়িয়েছে বাতাসের দূষণ। দূষণ সূচকে  কলকাতা পৌঁছে গিয়েছিল ২২৮-এ। অন্যদিকে কলকাতা পার্শ্ববর্তী হাওড়া জেলার শিবপুরে দূষণ সূচক সর্বোচ্চ ২৮৯-এ পৌঁছেছিল।   কলকাতা লাগোয়া সব প্রধান এলাকায় দূষণ সূচক সারাদিন ধরেই ছিল বিপদ সীমার উপরে। বাতাসের গুণগত মানের সূচক হল একিউআই। একিউআই কোথায় ভাল, কোথায় খারাপ বা অত্যন্ত খারাপ- তা নিয়ে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (সিপিসিবি) নির্দেশিকা রয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী, বাতাসের গুণগত মানের সূচক যদি শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকে তা হলে তা ভাল পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। ৫১-১০০ সন্তোষজনক, ১০১-২০০ সামান্য খারাপ, ২০১-৩০০ খারাপ, ৩০১-৪০০ খুব খারাপ, ৪০১-৫০০ অতি ভয়ানক।

ইতিমধ্যেই দিল্লির দূষণ উদ্বেগ বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের। দিল্লিতে দূষণ তো আছেই, দোসর হচ্ছে ঘন ধোঁয়াশাও। ফলে দৃশ্যমানতা নামছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ধোঁয়াশার দাপট তেমন না দেখা গেলেও, শহর কলকাতার বাতাস কতটা নিরাপদ সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে। কলকাতার মূলত সাতটি এলাকার দূষণ পরিমাপ করে সিপিসিবি। তার মধ্যে রয়েছে, বালিগঞ্জ, বিধাননগর, ফোর্ট উইলিয়াম, যাদবপুর, রবীন্দ্র সরোবর, ভিক্টোরিয়া এবং রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।

কলকাতার সাতটি এলাকার মধ্যে দু’টিতে অর্থাৎ ফোর্ট উইলিয়াম এবং বালিগঞ্জে বাতাসের গুণগত মানের সূচক যথাক্রমে ২২৭ এবং ২০৩। যা খারাপ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। তবে শহরের বাকি পাঁচ এলাকার বাতাসের গুণগত মানের সূচক ১০০-র উপরে কিন্তু ২০০-র নীচে। এদিকে হাওড়ার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের বাতাসের স্বাস্থ্য উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সাধারণের মধ্যে। পরিবেশ প্রযুক্তিবিদ সৌমেন্দ্র মোহন ঘোষ বলছেন, বোটানিক্যাল গার্ডেনে এত গাছ থাকা সত্বেও, সবুজ ক্ষেত্র থাকা সত্বেও বাতাসের দূষণের মাত্রা বড় চিন্তার বিষয়। এতে গাছগুলিও ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মত তাঁর।

mzamin

Wednesday, November 20, 2024

দিল্লিতে ভয়াবহ দূষণ: একদিনের বাতাসে ৪৯টি সিগারেটের সমান ক্ষতি!

ভারতে দিল্লির আকাশে ধোঁয়া আর দূষণের ঘনত্ব এমন এক মাত্রায় পৌঁছেছে, যা ৪৯টি সিগারেট খাওয়ার সমান। এ পরিস্থিতি নগরবাসীর জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (১৮ নভেম্বর) সকাল ১২টা ৩০ মিনিটে রাজধানীতে বায়ু দূষণের সূচক ছিল ৯৭৮, যা ‘বিপজ্জনক’ স্তরের মধ্যে পড়ে এবং প্রায় ৪৯টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতিকর।

এদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত দিল্লির চারপাশের পরিবেশ ছিল ঘন ধোঁয়ায় ঢাকা, যেখানে মাটির দিকে নেমে আসা ধূলিকণার সঙ্গে মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিশেষভাবে, মুন্ডকা, দ্বারকা সেক্টর ৮ এবং রোহিনীর মতো এলাকা ছিল সবচেয়ে বেশি দূষিত, যেখানে বায়ু দূষণের সূচক যথাক্রমে ১৫৯১, ১৪৯৭ এবং ১৪২৭ রেকর্ড করা হয়েছে।

এদিকে, দিল্লির পার্শ্ববর্তী হরিয়ানায় বায়ু দূষণের সূচক ছিল ৬৩১, যা প্রায় ৩৩টি সিগারেট খাওয়ার সমান এবং উত্তরপ্রদেশে এই সূচক ছিল ২৭৩, যা ১০টি সিগারেট খাওয়ার সমান। দূষণের কারণে রাজধানী ও আশপাশের এলাকার পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ২৮টি ট্রেন দেরিতে চলছে এবং ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৬০টির বেশি ফ্লাইট সকাল সাড়ে ৮টার আগেই উড়তে পারেনি।

দিল্লিতে দূষণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সুপ্রিম কোর্ট আবারও কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যানের চতুর্থ স্তরের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, দিল্লি সরকারকে এই অবস্থায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দিল্লিতে অতিরিক্ত দূষণ নিয়ন্ত্রণে, সোমবার থেকে প্রশাসন নির্মাণকাজ, মাটি কাটার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, স্কুলগুলোতে অনলাইনে ক্লাস চলছে এবং কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এমন ভয়াবহ দূষণের ফলে জনস্বাস্থ্যের ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি এবং শ্বাসযন্ত্রের অন্যান্য সমস্যায় আক্রান্তদের জন্য এটি এক বড় হুমকি। নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখতে এ ধরণের দূষণ নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছে বিশেষজ্ঞরা।

বাতাসে ধোঁয়া আর দূষণের ঘনত্ব প্রতিদিন ৪৯টি সিগারেট খাওয়ার সমান। ছবি : সংগৃহীত
বাতাসে ধোঁয়া আর দূষণের ঘনত্ব প্রতিদিন ৪৯টি সিগারেট খাওয়ার সমান। ছবি : সংগৃহীত


Tuesday, November 5, 2024

আনারকলি’র শহর বায়ুদূষণের ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন

পাকিস্তানের লাহোর, যা ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে পরিচিত, বর্তমানে বায়ুদূষণের চরম সমস্যায় আক্রান্ত। বিশেষ করে আনারকলি, যেখানে জীবন্ত ইতিহাসের ছোঁয়া রয়েছে, এখন বায়ুদূষণের ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে গেছে।

দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে পরিচিত এই নগরী, যা প্রাচীন বাজার ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর জন্য বিখ্যাত, এখন দূষণের রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।

রোববার (৩ নভেম্বর) লাহোরের স্থানীয় সরকার ঘোষণা করে, শহরের সব প্রাথমিক বিদ্যালয় এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হবে।

পাঞ্জাবের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেব এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ভারতের দিক থেকে দূষিত বাতাস লাহোরের দিকে আসছে, তাই মন্টেসরি, প্লে গ্রুপ ও পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে এক সপ্তাহের ছুটি দেওয়া হচ্ছে।’ এই সিদ্ধান্তটি শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত কয়েকদিন ধরে প্রায় দেড় কোটি মানুষের এই শহর ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন। কুয়াশার সঙ্গে নিম্নমানের ডিজেলের ধোঁয়া, মৌসুমি কৃষিজমির খড় পোড়ানোর ধোঁয়া এবং শীতের সময় ঠান্ডা তাপমাত্রার ফলে তৈরিকৃত গ্যাসগুলো মিলিয়ে এ ধোঁয়াশা সৃষ্টি হচ্ছে।

বায়ুদূষণের পরিস্থিতি নিয়মিতভাবে তুলে ধরে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার। তাদের তথ্যমতে, লাহোরের বায়ুর মান সূচক এক হাজারেরও বেশি, যা ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাঞ্জাব সরকার আজকের বায়ুর মানের স্কোর রেকর্ড করেছে যা ‘নজিরবিহীন’ বলে মনে করা হচ্ছে।

দেশটির আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আগামী ছয় দিন বাতাসের পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকার কথা বলা হয়েছে। লাহোরের পরিবেশ সুরক্ষাবিষয়ক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আনোয়ার এএফপিকে বলেন, এই কারণে সব সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ থাকবে।

মরিয়ম আওরঙ্গজেব শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এই ধোঁয়াশা শিশুদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিদ্যালয়গুলোতে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং উচ্চতর শ্রেণির শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা হচ্ছে।

বায়ুদূষণজনিত স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো অন্তর্ভুক্ত শ্বাসপ্রশ্বাসের রোগ, হৃদ্‌রোগ, ফুসফুস ক্যানসার, শিশু জন্মের সমস্যা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং অপমৃত্যু। শিশুরা বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী, কারণ তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি, তাই তারা দূষিত বায়ু বেশি পরিমাণে গ্রহণ করে।

লাহোরের আনারকলি এখন শ্বাসকষ্ট ও অসুস্থতার এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ক্ষতি করছে। এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতের প্রজন্ম একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।

সূত্র : এএফপি

অরেঞ্জ লাইন মেট্রো লাহোর শহরে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে ট্রেনটির যাত্রা। ছবি : সংগৃহীত

Sunday, October 13, 2019

বায়ু দূষণ কমানো গেলে কীভাবে উপকৃত হবে বাংলাদেশ? by সায়েদুল ইসলাম

৪ এপ্রিল ২০১৯, বিবিসি বাংলা, ঢাকা: বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার একটি গ্রাম কল্যাণপুরের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত, যে গ্রামটিতে বিদ্যুৎ এসেছে কিছুদিন আগে।
এই গ্রামের একজন বাসিন্দা মোঃ হারুন অর রশিদ বলছেন, পাঁচ বছর আগেও যেখানে তাদের গ্রামের বাতাস অনেকটা পরিষ্কার বলে মনে হতো, সেখানে কয়েক বছর আগে আশেপাশে কয়েকটি ইটভাটা তৈরি হওয়ার পর থেকে যেন বাতাস অনেকটা বদলে গেছে।
তিনি বলছেন, আশেপাশে ইটের ভাটা হওয়ার পর ভাটাওয়ালারা মাটি কিনে নিয়ে যাচ্ছে, আবার তারা যে ইট পোড়ায় তাতে কালো ধোঁয়া বের হয়।
"এসব ভাটায় সারাক্ষণ ইঞ্জিনের গাড়ি যাতায়াত করে, সেগুলো থেকেও সারাক্ষণ ধোঁয়া বের হয়, শব্দ হয়। আমাদের গ্রামের বাতাসটা যেন মনে হয় আগের চেয়ে ভারী হয়ে যাচ্ছে।"
তিনি জানান, গ্রামের মানুষের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার কষ্ট বা কাশি বাড়ার মতো সমস্যাও দেখা যাচ্ছে।
শুধু গ্রামেই নয়, বায়ু দূষণের এই সমস্যা এখন সমগ্র বাংলাদেশের।
বায়ু দূষণ নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংস্থা 'স্টেট অফ গ্লোবাল এয়ার' তাদের প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে।
সেখানে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বাসিন্দাদের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ কোন না কোন ভাবে বায়ু দূষণের মধ্যে বাস করছে।
এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ কোন দূষিত এলাকায় বাস করে।
বায়ু দূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর মারা যাচ্ছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ আর ভারত ও চীনে মারা গেছে ১২ লাখ মানুষ।
সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে বলছে, ২০১৭ সালের হিসাবে প্রতি ১০জনের মধ্যে একজন বায়ুদূষণের কারণে মারা যাচ্ছে।
বায়ু দূষণের স্বীকার হয়ে যে দশটি দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে, সেসব দেশের মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।
সংস্থাটি বলছে, সড়ক দুর্ঘটনা বা ধূমপানের কারণে মৃত্যুর হারের তুলনায় ২০১৭ সালে বায়ুদূষণের ফলে বেশি মানুষ মারা গেছে।
এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।
বায়ু দূষণের স্বীকার হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় প্রতিটি শিশুর ৩০মাস করে আয়ু কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি, যদিও উন্নত দেশগুলোয় এই হার গড়ে পাঁচ মাসের কম।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের শিকার
দূষিত বাতাসের কারণে যেসব রোগ হতে পারে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বায়ুতে ক্ষতিকর বস্তুকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেয়া সীমার দশগুণের বেশি।
ঢাকার একজন বাসিন্দা নেওয়াজ চৌধুরী বলছেন, সবসময়ে ধোঁয়া, ধুলার ভেতর দিতে যাতায়াত করার কারণে তার মাঝে মাঝে শ্বাসকষ্ট হয়।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসের মধ্যে থাকলে যেসব রোগ হতে পারে, তার মধ্যে আছে -
  • হৃদরোগ
  • কাশি, নিউমোনিয়াসহ ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগ
  • ফুসফুসের সংক্রমণ
  • ফুসফুসের ক্যান্সার
  • ডায়াবেটিস
  • অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্ট জনিত নানা রোগ
  • স্ট্রোক
  • চোখে ছানি পড়া
  • শিশু ও গর্ভবতী নারীদের সমস্যা
বায়ু দূষণের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক দেখতে পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি প্রজন্ম যদি দীর্ঘসময় বায়ুদূষণের মধ্যে কাটিয়ে দেয়, তার মারাত্মক প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর।
বায়ু দূষণ কমানো গেলে ৫ ভাবে উপকৃত হবে বাংলাদেশ
বায়ু দূষণ রোধ করা গেলে মোটামুটি পাঁচটি উপায়ে উপকৃত হবে বাংলাদেশ।
১. গড় আয়ু বাড়বে।
স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার বলছে, বায়ু দূষণ রোধ করতে পারলে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়বে এক বছর তিন মাসের বেশি।
২. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা।
এদিকে অধ্যাপক আবদুস সালাম বলছেন, বায়ু দূষণ রোধ করা গেলে সবচেয়ে বড় যে উপকারটি হবে সেটি হবে 'জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহায়তা'। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রকোপ রোধে বায়ু দূষণ রোধ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৩. রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা।
বায়ু দূষণের জন্য মানুষের শরীরে যেসব রোগের সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে, সেগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে যদি দূষণ রোধ করা যায়।
ড. সালাম বলেন, "মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা কমিয়ে দেবে। ফুসফুসের সমস্যা, হৃদরোগ, চর্মরোগসহ অনেক রোগ কমে যাবে।"
৪. প্রতিবন্ধী সমস্যা।
প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেয়ার সংখ্যা কমে যাবে, তেমনি শিশু ও মানুষের গড় আয়ু বাড়বে।
মি. সালাম বলছেন, একটি প্রজন্ম যদি দীর্ঘসময় ধরে বায়ু দূষণের ভেতর দিয়ে যায়, তাহলে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম অনেক ক্ষতির মুখোমুখি হবে। সেটা কাটিয়ে ওঠা যাবে দূষণ রোধ করতে পারলে।
৫. অর্থনৈতিক সুবিধা।
বায়ু দূষণ কমানো গেলে একদিকে যেমন মানুষের অসুস্থতা কমবে, গড় আয়ু বাড়বে, সময় সাশ্রয় হবে, পাশাপাশি বেড়ে যাবে জিডিপিও।
ড. সালাম বলছেন, ' নিজেদের আর্থিক সাশ্রয় যেমন হবে, তেমনি জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে।''
যেসব কারণে বাংলাদেশে বায়ু দূষণ এতো বেশি?
বায়ু দূষণ নিয়ে গবেষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম।
তিনি বলছেন, গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের দেশ হওয়ায় শীতের সময়ে হিমালয়ের পরের সব দূষণ এদিকে চলে আসে।
"কিন্তু তার সঙ্গে যোগ হয় আমাদের নিজেদের অনেক দূষণ।"
বাংলাদেশের শহরগুলোর যানজটের কারণে বায়ুদূষণ বাড়ছে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
দূষণ রোধে কর্তৃপক্ষের জোরালো পদক্ষেপের অভাবে বায়ু দূষণের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা, ঢাকার মতো বড় শহরের চারপাশে ইটভাটা, শহরের মধ্যে নানা কারখানা স্থাপন তো বায়ু দূষণের একটি কারণ।
''সেই সঙ্গে শহরের প্রচুর ধুলা এবং নির্মাণ কাজের বায়ু দূষণ হচ্ছে। ট্রাফিক জ্যামের কারণে গাড়িগুলো রাস্তায় অতিরিক্ত সময় ধরে চলছে, সেগুলো অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করছে, এসবও বায়ু দূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।''
তিনি বলছেন, বায়ু দূষণের কারণে পরিবেশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে, সেই গরম ঠাণ্ডা করার জন্য মানুষ অতিরিক্ত এসি ব্যবহার করছে, আবার তাতে বায়ু দূষণ আরো বাড়ছে।
বায়ুদূষণ কীভাবে কমানো যেতে পারে?
ড. আবদুস সালাম বলছেন, বায়ু দূষণ কমাতে প্রত্যক্ষ আর অপ্রত্যক্ষ ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাগুলো হলো রাস্তায় পানি দিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বা ময়লাগুলো পুড়িয়ে ফেলার মতো নানা ব্যবস্থা।
বায়ু দূষণের দিক থেকে শীর্ষ পাঁচটি দেশের একটি বাংলাদেশ।
  • পরিকল্পিতভাবে কারখানাগুলোর ধোঁয়া কমিয়ে আনা।
  • কারখানাগুলো শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়া।
  • ট্রাফিক জ্যামের সমাধান।
  • উন্নত জ্বালানি ব্যবহার করা।
  • এয়ার কন্ডিশনার কম ব্যবহার করা।
অপ্রত্যক্ষ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে:
  • প্রচুর বনায়ন করা, কারণ গাছ বায়ুদূষণ প্রতিরোধে জোরালো ভূমিকা রাখে।
  • বাড়িঘর ও আবাসিক এলাকাগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা, যেখানে উদ্যান ও পুকুর থাকবে।
  • নির্মাণ কাজগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে করা, যাতে সেটি দূষণের কারণ না হয়।
বিশ্বজুড়ে বায়ু দূষণের চিত্র
*বায়ু দূষণের কারণে প্রতি বছর ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।
*পৃথিবীর ৯১ শতাংশ মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করে যেখানে বায়ু দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি।
*পৃথিবীর যে ২০টি শহর সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষণের মধ্যে আছে তার মধ্যে ভারতের ১৪টি শহর রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কানপুর শহর এ তালিকায় সবচেয়ে উপরে।
*বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০জনের মধ্যে নয়জন দূষিত বায়ু গ্রহণ করে।
গবেষকরা বলছেন, যেসব বয়স্ক মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম তারা সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষণের ঝুঁকিতে আছেন। কারণ তারা প্রায়ই ঘরের বাইরে নানা ধরণের কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন।
বায়ু দূষণের কারণেও অসুস্থ হয়ে পড়ছে মানুষ।

Saturday, June 22, 2019

রাজধানীতে বায়ু দূষণ বাড়ছে, প্রতিরোধে শিগগিরই হচ্ছে আইন by দেবদুলাল মুন্না

ঢাকাতে গাড়ির ধোঁয়া, ধুলো-বালি নানা কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বায়ু দূষণ। বাতাসে বাড়ছে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক পিএম ২.৫ এর মাত্রা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে ফুসফুসজনিত নানা রোগসহ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে।সমস্যা সমাধানে বায়ু দূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার তাগিদ পরিবেশবিদদের।নিজেদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর।রাজধানীসহ সারা দেশে বায়ু দূষণ রোধে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
ইতোমধ্যেই আইনের খসড়া প্রণযন চুড়ান্ত হয়েছে বলে জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সচিব আবদুল্লাহ আল মহসিন চৌধুরী।তিনি জানান,‘বায়ু দূষণ নিয়ে আগে কোনো আইন ছিল না। পরিবেশ অধিদফতর পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে বায়ু দূষণ রোধে কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বায়ু দূষণ রোধে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি ২০১৯ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত মোট ৩৫৮টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ১০ কোটি ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৭৫টি ইটভাটার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।যানবাহন সৃষ্ট কালো ধোঁয়া নির্গমন হ্রাসের জন্য ২০ বছরের পুরনো যানবাহনসহ ঢাকাসহ শহরের রাস্তা থেকে প্রত্যাহার এবং যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদানকালে যানবাহন নিঃসৃত কালো ধোঁয়া পরীক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।’
বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্প থেকে দেশের আটটি শহরের বায়ুর মান প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাতে দুই মাস ধরে ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও খুলনা শহরের বায়ুর মান মারাত্মক ও খুব অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।এর মধ্যে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর হলো রাজধানী ঢাকা। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু প্রকল্পের পরিচালক মনজুরুল হান্নান খান বলেন,‘রাজধানীসহ দেশের প্রধান শহরগুলোর আশপাশে গড়ে ওঠা প্রায় ছয় হাজার ইটভাটা ও গাড়ি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী।

Friday, April 12, 2019

দেশের শতভাগ মানুষের বাস দূষিত বায়ুতে by ইফতেখার মাহমুদ

**বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ।
**প্রতিবেদনে বায়ুদূষণে গড় আয়ু কমা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে প্রাধান্য।
**বাংলাদেশের বায়ুর মান মানমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে।
**২০১৭ সালে দেশে মারা গেছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ।

বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, তার একটি বাংলাদেশ। আর বায়ুদূষণজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম। এ কারণে ২০১৭ সালে দেশে মারা গেছে ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ। গতকাল বুধবার প্রকাশিত বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলাম্বিয়া, টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশন ও হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট যৌথভাবে ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু কমা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বর্তমান সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের গড় আয়ু ২০ মাস কমবে। বাংলাদেশের বায়ুর মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে। সংস্থাটির বেঁধে দেওয়া সীমার মধ্যে বায়ুর মান ধরে রাখতে পারলে যে দেশগুলো লাভবান হবে, তার মধ্যে সবার ওপরে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু তখন বাড়বে ১ দশমিক ৩ বছর। আর ভারত, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ায় গড় আয়ু এক বছর করে বাড়বে।
বায়ুদূষণ পরিস্থিতি নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, বায়ুদূষণ রোধে সরকার অনেক ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে। রাস্তায় ধুলা কমাতে পানি দিচ্ছে। বায়ু দূষিত হলে জনগণকেও দায়িত্ব পালন করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, মুখে মাস্ক পরলে ব্যক্তিগতভাবেও দূষণ থেকে মানুষ রক্ষা পাবে।
মূলত বায়ুতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম-২.৫ ও পিএম-১০-এর পরিমাণ মেপে বায়ুর মান নির্ধারণ করা হয়েছে। বাতাসে পিএম-২.৫-এর পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা দেশগুলো দক্ষিণ এশিয়ার। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণে হৃদ্‌রোগ, শ্বাসকষ্টজনিত জটিল সমস্যা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও ক্যানসারের মতো রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষত শিশু ও গর্ভবতী নারীরা বায়ুদূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে। ইটভাটা, অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া ধোঁয়া ও ধুলার কারণে ওই দূষণ ঘটছে।
এর আগে গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এয়ারভিজ্যুয়ালের ‘বিশ্ব বাতাসের মান প্রতিবেদন ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিশ্বে সবচেয়ে বায়ুদূষণের কবলে থাকা শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা শহরের অবস্থান ১৭ তম। আর রাজধানী শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এই শহরের বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম ২.৫) পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বেঁধে দেওয়া মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বায়ুর সঙ্গে কী ধরনের দূষিত পদার্থ নিচ্ছি, তা যদি দেখা যেত, তাহলে অনেকে হয়তো নিশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিত। বিশ্বের বেশির ভাগ বড় শহরে বায়ুদূষণের মানমাত্রা অতিক্রম করলে নানা ধরনের সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়। যেমন বাচ্চাদের স্কুলে না যাওয়া, মাস্ক পরা, দূষিত এলাকায় না যাওয়া। দেশে বায়ুদূষণ রোধে একটি আইন প্রণয়ন করে দ্রুত তা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন তিনি।

Saturday, April 6, 2019

বাংলাদেশে বিষাক্ত বাতাস কেড়ে নিচ্ছে শিশুদের ৩০ মাসের আয়ু

একটি শিশু জন্ম নিয়ে এই পৃথিবীতে নিঃশ্বাস নিলে তার আয়ু অন্তত ২০ মাস কমে যাবে। আর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুরা এই বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়ে হারাবে ৩০ মাসের আয়ু। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০১৯ এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দূষিত এই বাতাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গিয়েছে, যে শিশুর জীবনধারণে বাতাসের প্রয়োজন, সেখানে সেই বাতাসই আয়ু কমিয়ে দিবে। দক্ষিণ এশিয়ার শিশুদের জন্য আরও ভয়াবহ সংবাদ হচ্ছে, এদের জীবন থেকে এই দূষিত বায়ু কেড়ে নিতে যাচ্ছে ৩০টি মাস।
২০১৭ সালে প্রতি ১০ জন মানুষের মৃত্যুর মধ্যে একজনের প্রাণ গিয়েছে বায়ুদূষণের ফলে। গবেষণায় বলা হচ্ছে, মৃত্যুর জন্য সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা ম্যালেরিয়া মহামারিকে ছাপিয়ে বায়ুদূষণ ভয়াবহ কারণ হয়ে সহাবস্থানে রয়েছে ধূমপানের সঙ্গে। বিশ্ব জুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে প্রাপ্তবয়স্করাও। বায়ু দূষণের কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে পঞ্চাশোর্ধ মানুষের ক্ষেত্রে। গবেষকরা বলেছিলেন যে, আগামী বছরগুলোতে বিশ্বের অনেক অংশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
হেলথ এফেক্টস ইনস্টিটিউটের প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটিতে রবার্ট ও কিফে বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে একটা বড় ধাক্কা হিসেবে শিশুদের জীবন সংক্ষিপ্ত হবার এই তথ্য পাওয়া যায়।’ বিশ্বে রোজ জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রমাণ মিলছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে, তবুও বিশ্বনেতাদের কোনো ন্যূনতম পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না এই সংকট মোকাবিলায়। রবার্ট বলছেন, ‘এখানে কোন ম্যাজিক বুলেট নেই তবুও সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’ তিনি চীনের বায়ু দূষণের মাত্রা নির্দেশ করেছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমতে শুরু করেছে। চীনে কর্তৃপক্ষ বায়ু মানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং কয়লা নির্ভরতা কমাতে এবং শিল্প ক্লিনার তৈরির ব্যবস্থা চালু করেছে। তারা কিছু কিছু শহরে যানবাহনের সংখ্যা সীমাবদ্ধ করেছে এবং ক্লিন এনার্জির জন্য তহবিল সংগ্রহ শুরু করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে ফুসফুসজনিত রোগের ৪১ শতাংশ, টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ২০ শতাংশ, ফুসফুস ক্যান্সারের ১৯ শতাংশ, ইস্কিমিক হার্ট ডিজিজের ১৬ শতাংশ এবং স্ট্রোকের ১১ শতাংশ রোগ মৃত্যুর কারণ হিসেবে ঘটেছে যা বায়ু দূষণের ফলেই সৃষ্টি। বিশ্বব্যাপী বায়ু দূষণের ফলে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাবগুলোর সবচেয়ে নিয়মিত কারণ।

Monday, November 19, 2018

বায়ুদূষণে কেমন আছেন দিল্লির রিক্সাওয়ালা!

‘আমার চোখ জ্বালাপোড়া করে, যখন রিক্সার চালাই তখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। শরীর আর চলে না। দিল্লির বিষাক্ত কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবার কথা বলে আমার শরীর। কিন্তু পরিবারকে চালানোর জন্য আমাকে এ কাজ চালিয়ে যেতেই হবে। কোথায়  যাবো আমি? রাস্তাই তো আমাদের ঘর।’-  দিল্লির রাস্তায় রিক্সা চালানোর এমন অভিজ্ঞতায় বিবিসিকে জানিয়েছেন সঞ্জয় কুমার নামের একজন রিক্সাচালক। বলছিলেন বায়ু দূষণের মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাদের জীবনযাত্রা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে।
সঞ্জয় জানান, পাঁচ বছর আগে তিনি চাকরির খোঁজে বিহার থেকে দিল্লিতে যান।
কিন্তু চাকরি না পেয়ে অবশেষে পেটের দায়ে আর পরিবারের কথা  ভেবে রিক্সা চালানো শুরু করেন। রিক্সা চালিয়ে তিনি যা আয় করেন তা দিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকা সম্ভব নয়। তাই তিনি ফুটপাতে থাকতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, আমি বিছানায় ঘুমানোর আশা করি। কিন্তু জানি সেটা অনেক দূরের স্বপ্ন। আমি ভালো খাবার আশা করি। কিন্তু সেটাও দু®প্রাপ্য। এসব কিছু না হোক, কমপক্ষে বিশুদ্ধ বায়ুতে নিঃশ্বাস নেবার আশা করতেই পারি। কিন্তু শীতের সময়টাতে সেটাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আপনার আরামদায়ক একটি  বাড়ি আছে। আর আমাকে তো সব সময় রাস্তাতেই থাকতে হয়।

দিল্লির বায়ু দূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিবছর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পার্শ্ববর্তী রাজ্য পাঞ্জাবের কৃষকরা ফসলি জমি পরিষ্কার করার জন্য আগুন লাগিয়ে দেবার কারণে বায়ু দূষণের মাত্রা আরো খারাপ হয়ে যায়। এছাড়া দিওয়ালিতে বাজি পোড়ানোর কারণে বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস মিশে দূষণ আরো তীব্রতর করে।
সঞ্জয় কুমারের মতো আরো এক রিক্সাচালক জয় চাঁদ যাদব। পশ্চিম বাংলা থেকে সাত বছর আগে দিল্লিতে গেছেন। বলছিলেন, বিরতি নেয়ার কোনো সুযোগ নাই। আমি দিনে ৩০০ রুপি আয় করি। তার কিছু অংশ দিয়ে পরিবারের জন্য খাবার কিনি, আর বাকিটা সঞ্চয় করি। আমার পরিবার আমার উপর নির্ভরশীল। তাই নিঃশ্বাস নিতে যত কষ্টই হোক না কেন, কাজ চালিয়ে যেতেই হবে।
তিনি আরো বলেন, আমি মাঝেমধ্যে না খেয়েই রিক্সা চালাই। আমি সেটা কোনোভাবে চালিয়ে নিতে পারি। কিন্তু বায়ুর অবস্থা এতোটাই খারাপ যে, আমার মনে হয় বুকের উপর ৫০ কেজি নিয়ে আমি রিক্সা চালাচ্ছি।

সঞ্জয় কুমার আর জয় চাঁদ যাদবের মতো দিল্লিতে হাজার হাজার রিক্সাচালক রয়েছেন। শীতকালে দিল্লির বায়ু দূষণের মাত্রা গ্রহণযোগ্য মাত্রা থেকে ৩০ গুণ দূষিত হয়ে পড়ে। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রিক্সাচালকরা। রিক্সা চালানোর সময় শ্বাসযন্ত্রে বেশি চাপ পড়ে। এতে করে বাতাসে মিশে থাকা পিএম২.৫ নামের বিষাক্ত ক্ষুদ্র কণা শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করে রক্তে মিশে যায়। এতে করে তাদের শারীরিক পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও বিষয়টি আমলে  নিয়েছে। রায়ু দূষণ স¤পর্কে সম্প্রতি এক শুনানিকালে আদালত সরকারকে বলেছেন, ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়া কোনো সমাধান নয়। রিক্সাচালকদের এটা বলা সম্ভব নয় যে, বাইরে কাজ করতে যাওয়া নিরাপদ নয়। আপনাকে ঘরে থাকতে হবে। এটি খুবই সংকটময় পরিস্থিতি। বিচারক বলেন, যত রিক্সাচালককে আমি দেখেছি, তারা সবাই কাঁশছে অথবা শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করছে। কিন্তু এসব কিছুর পরও রিক্সাচালকরা এখনও রাস্তাতেই রয়েছে। কুয়াশাচ্ছন্ন বিষাক্ত বায়ুর মধ্যেই রিক্সা চালাচ্ছে।

Wednesday, May 2, 2018

বায়ুদূষণে প্রতিবছর প্রাণ হারায় ৭০ লাখ মানুষ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

বিশ্বে প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে নয়জন বিপজ্জনক মাত্রার দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে। আর প্রতিবছর বায়ুদূষণজনিত কারণে বিশ্বজুড়ে প্রাণ হারাচ্ছেন প্রায় ৭০ লাখ মানুষ। বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিইএইচও) প্রকাশিত নতুন এক রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, এসব মৃত্যুর ৯০ শতাংশ ঘটে থাকে দরিদ্র দেশগুলোতে। বিশেষজ্ঞদের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেন্ডেন্ট বলছে, বায়ুদূষণের কারণে সরাসরি মানুষের মৃত্যু না হলেও বিভিন্ন রোগ ও জীবনকাল কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে তা ভয়ানক প্রভাব ফেলে।
২০১৬ সাল থেকে বিশ্বের এক হাজারেরও বেশি শহরের বায়ুদূষণ মাত্রা পর্যবেক্ষণ শুরু করে ডব্লিউএইচও। প্রতিনিয়ত সেই সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে পর্যবেক্ষণে রাখা শহরের সংখ্যা চার হাজার তিনশ’। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলো থেকে পর্যবেক্ষণে নেওয়া শহরের সংখ্যা বেড়েছে। সংস্থাটি মূলত হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার ও স্ট্রোকের মতো রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দূষণকারী উপাদানগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে বায়ু পর্যবেক্ষণ করে। নতুন প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য বিশ্বের ১০৮টি দেশের চার হাজার ৩০০ শহরের বায়ুর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ডা. টেডরস আদানন গ্রেবিয়েসিস বলেছেন, বায়ুদূষণ আমাদের সবার জন্যই হুমকি, তবে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষেরা সবচেয়ে বেশি হুমকি মোকাবিলা করে।
ডব্লিউএইচও’র নতুন রিপোর্টে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটারের বায়ুদূষণ নিয়ে এর অধিবাসীদের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানকার মানুষ বায়ুদূষণের ভয়ানক ক্ষতিকর প্রভাবের মুখে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে ওই রিপোর্টে। জাতিসংঘের আরেক বিশেষায়িত সংস্থা ইউনিসেফ প্রণীত বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় রয়েছে উলানবাটার।
ডা. টেডরস বলেন, ভালো খবর হলো আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ ও তা কমিয়ে আনার কাজে যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকার। এছাড়াও স্বাস্থ্য, পরিবহন, আবাসন ও এনার্জি সেক্টর থেকেও এই বিষয়ে বৈশ্বিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ডব্লিউএইচও’র জনস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রধান ডা. মারিয়া নেইরার মতে, বেইজিং, দিল্লি, জাকার্তার মতো বিশ্বের অনেক মেগাসিটির বাতাস তাদের সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার চেয়ে পাঁচগুণ বেশি দূষিত।
ডা. মারিয়া নেইরা বলেন, ‘আজকের দিনে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বায়ুদূষণই একমাত্র পরিবেশগত হুমকি নয়। তবে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এ মুহূর্তে জনস্বাস্থ্যের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

Friday, September 11, 2009

নগরে শব্দ ও বায়ুদূষণ নখদন্তহীন অভিযান কি ফল বয়ে আনবে

নগরবাসী ভালো নেই, এ কথা নতুন কোনো ব্যঞ্জনা তৈরি করে না। বছরের পর বছর ধরে নানা দূষণ, ভেজাল আর বঞ্চনার মাঝে বাস করা এই নগরবাসীর জন্য কোনো সুখবর যেন নেই। কখনো যদি প্রতিকারের আশা জাগে, সে আশা মিইয়ে যেতে সময় লাগে না। কোনো চেষ্টা যদিবা চোখে পড়ে, তাও এমনই অকার্যকর যে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কোনো আঁচড়ও কাটতে পারে না। শব্দ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি তা আরও স্পষ্ট করে।
ঢাকা শহরে শব্দদূষণ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে বহু আগেই। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৬০ ডেসিবেল তীব্রতার শব্দে আধাঘণ্টা বা এর বেশি সময় একটানা থাকলে কেউ সাময়িকভাবে বধির হয়ে যেতে পারে। আর ১০০ ডেসিবেল শব্দ দিতে পারে স্থায়ী বধিরতা। খুব কাছ থেকে তিন বছরের কম বয়সী কোনো শিশু যদি ১০০ ডেসিবেল তীব্রতার শব্দ শ্রবণ করে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই সে বধির হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ঢাকার ব্যস্ত এলাকাগুলোতে প্রায় সময়ই শব্দের তীব্রতা থাকে ১০০ ডেসিবেলের ওপরে।
ঢাকা শহরে শব্দ ও বায়ুদূষণের অন্যতম অনুঘটক পাবলিক বাস এবং ট্যাক্সি-সিএনজি অটোরিকশা। দূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। দুঃখের বিষয়, যানবাহনের দূষণবিরোধী অভিযানে সেই আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না বললেই চলে। চলতি অভিযানে ১৯৮৩ সালের আইনে দূষণ সৃষ্টিকারী যানবাহনকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে, যা বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে অপ্রতুল। কোনো আইন প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য যুক্তির অভাব হয় না, এবারও তাই দেখা গেল। পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকবল, প্রক্রিয়া, প্রস্তুতি ও সময়ের অভাবকে যুক্তি হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না নিয়ে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে কি ফল পাওয়া যাবে?
কারোর অজানা থাকার কথা নয় যে শব্দদূষণ বধিরতা তৈরি ছাড়াও রক্তচাপ বাড়ায়, হজম করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে এবং বয়স্কদের মেজাজ খিটমিটে করে দেয়। কিন্তু এসব ব্যাপার কেউ গুরুত্ব দেয় বলে মনে হয় না। এ অবস্থা সহ্য করে যাওয়াই যেন নগরবাসীর নিয়তি। তাদের দুর্ভোগ আর সমস্যার কোনো শেষ কি আছে?