Sunday, November 3, 2019

‘সাংবাদিকদের সেলফ সেন্সরশিপ সাংঘাতিক বেড়ে গেছে’ :-মাহফুজ আনাম

সাংবাদিকদের সেলফ সেন্সরশিপ সাংঘাতিক বেড়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক দ্যা ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। বলেছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা এখন এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আর মানহানির মামলা- এই দুটো জিনিস আমাদের সাংবাদিকতা জগতে বিরাট ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। সেজন্য সাংবাদিকদের সেলফ সেন্সরশিপ সাংঘাতিক বেড়ে গেছে। এখন বেশির ভাগ সংবাদ আমরা ছাপি না।  দৈনিক প্রথম আলোর কাছে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেন। আগামীকাল পত্রিকাটির ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মাহফুজ আনাম এই সাক্ষাতকার দেন।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি সাক্ষাতকারে বর্তমান সাংবাদিকতার অবস্থা, চ্যালেঞ্জ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, চ্যালেঞ্জ উত্তরণে করনীয়- এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
তিনি বলেন, মানহানির মামলা আগে থেকেই ছিল, কিন্তু এত ব্যাপকভাবে এটার প্রয়োগ হতো না।
মানহানির মামলা দুই রকমের হয়- একটা ফৌজদারি মানহানি, অন্যটা দেওয়ানি আদালতে মানহানির মামলা। সাধারণ নাগরিক কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মানহানি মামলা করতে গেলে আদালত হয়তো মামলা গ্রহণ করবেন না; কিন্তু কোনো প্রভাবশালী বা টাকাওয়ালা লোক মামলা করতে যান, তাহলে তার মামলা নেয়া হবে এবং সেটা নেয়া হবে  ফৌজদারি আইনে; সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবে। তাছাড়া, আইনে স্পষ্ট লেখা আছে, মামলা করতে পারবেন শুধু সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি, অন্য কেউ নয়। যার মানহানির অভিযোগ উঠল, শুধু তিনিই মামলা করতে পারবেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তার বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী, সমর্থক, অনুসারীরা মামলা করে এবং সেসব মামলা গ্রহণ করা হয়। তিনি বলেন, ম্যাজিস্ট্রেটরা কিন্তু এসব মামলা না নিলেও পারেন, আইনে তাদের সেই ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এসব মামলা গ্রহণ করেন। এতে একই অভিযোগে ১০-১৫-২০টা মামলা হয়। নিজের ওপর দায়ের করা মামলার কথা উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, আমার বিরুদ্ধে হয়েছে ৮৪টা মামলা।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি বলেন, আইনে আরও বলা হয়েছে যে, একটা মানহানির ঘটনায় একের বেশি মামলা হতে পারবে না। সেখানে একাধিক মামলা হয় কীভাবে? কিন্তু আমাদের দেশে সেটাও হয়ে আসছে।
সাংবাদিকতা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বলেও মন্তব্য করেন ডেইলি স্টার সম্পাদক। স্বাধীনতা চর্চার দিক থেকে সাংবাদিকতা এখন সারা বিশ্বে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমেরিকার উদাহরণ টেনে মাহফুজ আনাম বলেন, সে দেশে সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মতো একটা অনন্য বিধান আছে, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। সেই দেশেই এখন প্রেসিডেন্ট কথায় কথায় সাংবাদিকদের বকাঝকা করেন। সংবাদমাধ্যমে যা কিছু তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশিত হয়, তাকেই তিনি ফেক নিউজ বলেন। তিনি প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের নিকৃষ্টতম জীবদের অন্যতম বলছেন। এভাবে সাংবাদিকদের ও সাংবাদিকতা পেশাকে হেয় করা হচ্ছে। শুধু আমেরিকা নয়, পশ্চিমা দেশগুলো ছিলো স্বাধীন সাংবাদিকতার তীর্থস্থান; তাদের সাংবাদিকতার মূল্যবোধ ও স্বাধীনতার চর্চা থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের সাংবাদিকেরা অনুপ্রাণিত হতাম। সেটা এখন সাংঘাতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলেও সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে মনে করেন মাহফুজ আনাম। বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসার ফলে একজন পাঠকের সামনে সংবাদের অনেক পথ উন্মোচিত হয়েছে। সে এখন আর খবরের কাগজ, টেলিভিশন ও রেডিওর ওপর নির্ভরশীল নয়। যেকোনো খবর সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎক্ষণাৎ জেনে ফেলছে। শুধু জেনে ফেলছে না, সে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের অভিমত দেয়ারও সুযোগ পাচ্ছে। সর্বসাধারণের মতপ্রকাশের এত ব্যাপক স্বাধীনতা পৃথিবীর ইতিহাসে কখনো ছিল না। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যে ব্যাপক স্বাধীনতা ও বিস্তৃতি, সেই তুলনায় এর দায়িত্বশীলতার ঘাটতি বিরাট। সাংবাদিকতায় যেটাকে বলা হয় এডিটোরিয়াল কন্ট্রোল বা সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেটা নেই। ফলে এই মাধ্যমে খবর আদান-প্রদানের অভিজ্ঞতায় লোকজন আস্থার সংকটে ভোগে। ভাবে, আমি যে খবরটা পেলাম, এটা ঠিক না বেঠিক; এটা গুজব বা ফেক নিউজ কি না।
মাহফুজ আনাম বলেন, তবে পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য এটা বিরাট সুযোগ। আমরা যদি পাঠক-দর্শকদের আস্থা আরও দৃঢ় করতে সঠিক সাংবাদিকতা করতে থাকি, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যতই ব্যাপক হোক না কেন, তারা আমাদের কাছেই ফিরে আসবে।
সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ হিসেবে তৃতীয় আরেকটি বৈশ্বিক প্রবণতার কথা তুলে ধরেন তিনি। সেটা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বহীন তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ নিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ভোলা ও রামুর মতো ঘটনা যখন ঘটতে পারছে, যা বিদেশেও ঘটছে, তখন তো একটা নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। এটার একটা যৌক্তিকতা আছে। কিন্তু এটার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকার অত্যন্ত কঠোর আইনকানুন তৈরি করছে, কিছু কিছু দেশে প্রয়োগও করছে। তার ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মাহ্ফুজ আনাম বলেন, যে তিন ধরনের চ্যালেঞ্জের কথা বলা হলো, বাংলাদেশে আমরা এই তিনটারই শিকার। তবে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা বা রাষ্ট্রনেতারা এখনো আমাদের ট্রাম্পের ভাষায় আখ্যায়িত করেননি। কিন্তু আমাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এ দেশে ডিজিটাল ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যেসব আইন করা হয়েছে, সেগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ভীষণ প্রতিকূল। সবচেয়ে কঠোর আইনটি হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আমরা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এবং সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে এর প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছি। এ আইনের প্রতিটি ধারা আমরা ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছি, এটা কী সাংঘাতিক আইন। সরকার যদি এ আইন প্রয়োগ নাও করে, এ আইনের অস্তিত্বই সাংবাদিকদের সব উদ্যম নষ্ট করে দিতে পারে। এ আইনে ১৯ ধরনের শাস্তিযোগ্য অপরাধ আছে, সেগুলোর মধ্যে ১৪টাই জামিনের অযোগ্য। তাহলে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যদি মামলা হয়, যেহেতু তিনি জামিন পাবেন না, বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর আগেই তাকে ছয় মাস, এক বছর কারাগারে কাটাতে হবে। একজন সাংবাদিকের মাথায় যদি এই দুশ্চিন্তা থাকে, তাহলে তার পক্ষে কীভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতা করা সম্ভব। তাছাড়া, এ আইনে পুলিশকে খুব বেশি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কোনো অপরাধ সংঘটনের প্রয়োজন নেই, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার যদি মনে হয় যে কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠানের দ্বারা সে রকম কিছু করার সম্ভাবনা আছে, তাহলেই তিনি সেই সংবাদ প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ করে নিয়ে যেতে পারবেন।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা এখন বেশি করে ঝুঁকছে ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যমের দিকে। সারা বিশ্বেই এটা ঘটছে। এতে মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমের বিজনেস মডেল সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর অনেক দেশে নামকরা অনেক সংবাদপত্রের ছাপা সংস্করণ বন্ধ হয়ে গেছে, তারা শুধু অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করছে। টেলিভিশনের দর্শকও ভীষণভাবে কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও ব্যবসায়িক- তিন দিক থেকেই একটা ক্রান্তিকাল।
মাহ্ফুজ আনাম বলেন, সাংবাদিকতার সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, এর মধ্যেই বিরাট সুযোগ লুকিয়ে আছে। এখন আমাদের নৈতিক সাংবাদিকতা সুদৃঢ়ভাবে রক্ষা করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি মানুষ যে অনাস্থা বোধ করছে, সেই অনাস্থা যদি পেশাদার সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হয়, তাহলে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। তাই আমাদের আস্থা অটুট রাখা, বরং তা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। আমরা হলাম সঠিক সংবাদদাতা- এই অবস্থানে সম্পূর্ণভাবে অটল থাকতে হবে। এটা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে জনগণ সত্য সংবাদের জন্য, সঠিক তথ্যের জন্য আমাদের কাছেই ফিরে আসবে; পেশাদার সাংবাদিকতাই বিকল্পহীন বলে প্রমাণিত হবে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আইইএম ইউনিট: কর্মশালার নামে লুট by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আইইএম ইউনিট অনিয়মে ভর করেছে। এখানে নয়ছয় করে বিভিন্ন কর্মশালার নামে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করে সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনিয়মের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে এসেছে। মন্ত্রী ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।
জানা যায়, স্কুল-মাদ্রাসা শিক্ষকদের বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কিশোর-কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে অবহিতকরণ বিষয়ে কর্মশালার আয়োজন করার কথা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আইইএম ইউনিটের। এরই অংশ হিসেবে আইইসি অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের উপজেলা পর্যায়ে ৪৮৬টি  কর্মশালা পরিচালনা করার কথা। এ জন্য বরাদ্দও ছিল ৭ কোটি টাকা। যদিও আইইএম ইউনিটের পরিচালকের বিচক্ষণতায় এসব কর্মশালা হয়েছে। তবে তা বাস্তবে নয়; কাগজে কলমে।
অধিদপ্তরের আইইএম ইউনিটের পরিচালক আশরাফুন্নেছা তার দুরদর্শীতার মাধ্যমে কর্মশালা না করেই এই টাকা উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মীদের। এক্ষেত্রে তিনি কর্মশালার নামে কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল এবং ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে সব টাকা উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ এসেছে।
অধিকাংশ বিল ভাউচারের প্রতিষ্ঠানেরই কোন অস্তিত্ব নেই। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আইইএম ইউনিটে সম্প্রতি অভিযান পরিচালনা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানে দুদক কর্মকর্তারা দেখেন, গত অর্থ বছরে উপজেলা পর্যায়ে ৪৮৬টি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে তথ্য দেখানো হয়েছে। কিন্তু এসব কর্মশালার বিল-ভাউচার পর্যালোচনায় অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। অভিযানে দুদক কর্মকর্তারা আরো দেখেন-আমদানি-রপ্তানিকারকের লাইসেন্সধারী ‘সুকর্ন ইন্টারন্যাশনাল কোং’ এবং ‘মেসার্স রুহী এন্টারপ্রাইজ’ নামে দু’টি প্রতিষ্ঠানকে বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজ দেয়া হয়েছে। দরপত্রের শর্ত লংঙ্ঘন করে এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বিল দেয়া হয়েছে বলে দুদক দলের কাছে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের অনুমতি চেয়ে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আ খ ম মহিউল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত দল প্রাথমিক তদন্তে এসেছিল। তারা কিছু কাগজপত্র চেয়েছেন। আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে পুরো মাত্রায় সব ধরনের সহযোগিতা করতে নির্দেশ দিয়েছি। অভিযোগ যেহেতু এসেছে তাই ডেফিনেটলি বিষয়টি দেখতে হবে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আইইএম ইউনিট সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে বিভিন্ন জেলা উপজেলায় ৪৮৬টি কর্মশালার নামে কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল এবং ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে সব টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কর্মশালার ব্যয়বাবদ তিনি যে সব বিল ভাউচার ব্যবহার করেছেন তার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই কোন অস্তিত্ব নেই। কর্মশালায় ব্যবহারের জন্য কেন্দ্রীয় ভাবে কোন ধরনের টেন্ডার বা কোটেশন ছাড়াই কিছু ব্যাগ, কলম, প্যাড ক্রয় করে আইইএম ইউনিট। তিনটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইইএম পরিচালকের মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতে এসব পণ্য সরবরাহ করে। যেখানে ব্যাগের জন্য ৩৭০ টাকা এবং কলম ও প্যাড যথাক্রমে ১০ ও ২০ টাকা মূল্য নির্ধারন করা হয়। অথচ বিল ভাউচারে ব্যাগের দাম দেখানো হয়েছে ১ হাজার ৫০ টাকা, প্যাড ৭০ টাকা এবং কলম ৮০ টাকা। এছাড়া কর্মশালায় রিসোর্স পার্সনদের সম্মানী ভাতা আয়করসহ ১ হাজার ৬৮০ টাকা, স্থানীয় সমন্বয়কারীদের সম্মানী আয়করসহ ১ হাজার টাকা, অংশ্রগহণকারীদের ভাতা বাবদ ৭শ’ টাকা দেখিয়ে উত্তোলন করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে, মৌলভীবাজারে অনুষ্ঠিত কর্মশালার জন্য ‘মেসার্স আচল পেপার, স্টেশনারী এন্ড লাইব্রেরী’ থেকে ব্যাগ, প্যাড কলম কেনা হয়েছে। যার ঠিকানা স্টেশন রোড, মৌলভীবাজার। ক্যাশ মেমোতে ক্রেতার নাম ঠিকানা লেখা হয়েছে, ‘পরিচালক আইইএম এবং প:প: অধি, ঢাকা’। এছাড়া ‘সাম্পান রেস্টুরেন্ট এন্ড ক্যাটেরিং’ নামে একটি ক্যাশ মেমোতে ক্রেতার একই ঠিকানা ব্যবহার করে আপ্যায়ন উদ্বোধনী ও আপ্যায়ন সমাপনী নামে বিল করা হয়েছে। কিন্তু কোন পণ্যের নাম সেখানে নেই। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মৌলভীবাজারে স্টেশন রোড নামে কোন সড়ক নেই। এমনকি ‘মেসার্স আচল পেপার, স্টেশনারী এন্ড লাইব্রেরী’ ‘সাম্পান রেস্টুরেন্ট এন্ড ক্যাটেরিং’ নামে কোন প্রতিষ্ঠানও নেই।
একই ঘটনা ঘটেছে দেশের প্রায় বেশিরভাগ উপজেলায়। মাত্র ৩ দিনে ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি জেলার ৩৩টি উপজেলায় কর্মশালা সম্পন্ন করা হয়েছে। বাস্তবে যা অসম্ভব। উপজেলা পর্যায়ে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের সম্মানী প্রদানের তালিকার নাম ও স্বাক্ষর ঢাকা অফিসে বসেই ইচ্ছেমতো বসিয়ে এসব টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানান, কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের ব্যাগ প্রদানের জন্য কেন্দ্রীয় ভাবেও ব্যাগ কেনেন পরিচালক আশরাফুন্নেসা। তবে কোন ধরনের টেন্ডার বা কোটেশন ছাড়াই তিনজন সরবরাহকারীকে তিনি ব্যাগ প্রদানের জন্য মৌখিক নির্দেশ দেন। তার প্রেক্ষিতে উইমেক্স ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, জারিন এন্টারপ্রাইজ এবং এমআর এন্টারপ্রাইজ যথাক্রমে ৮ হাজার, ৩ হাজার ৪’শ এবং ২ হাজার ব্যাগ সরবরাহ করে। কিন্তু ৩৭০ টাকা থেকে ৪শ’ টাকায় ব্যাগ সরবরাহ করলেও তিনি সরবরাহকারীদের অর্ধেক টাকা পরিশোধ করলেও বাকী টাকা দিতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে কোন কাজ না করেই ৪৮টি কোটেশনের মাধ্যমে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন আশরুফুন্নেসা। যার কোন নথিপত্র নেই। ভুয়া কার্যাদেশ তৈরি করে বিলের সঙ্গে সংযুক্ত করে এসব বিল এজি অফিস থেকে পাশ করানো হয়েছে। যদিও সরকারি নিয়মানুযায়ী একজন পরিচালক বছরে ৬টির বেশি কোটেশন করার কোন নিয়ম নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নিজের ভাগ্নের প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহের রুহি এন্টারপ্রাইজের ট্রেড লাইসেন্সে ‘আমদানিকারক’ উল্লেখ থাকলেও তিনি অধিদপ্তরের শর্ত ভঙ্গ করে এই প্রতিষ্ঠানকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচারের কাজ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে দরপত্রে উল্লিখিত ৩ বছরের অভিজ্ঞতার শর্তও মানা হয়নি। তেমনিভাবে কাজ দিয়েছেন নিজের চাচাতো ভাইয়ের ময়মনসিংহের প্রতিষ্ঠান সুকর্ণ ইন্টারন্যাশনালকে। ভাগ্নে ও চাচাতো ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান নামে হলেও মূলতঃ ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার এই দুটি কাজ তিনি নিজেই করছেন। বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে দরপত্রে উলিখিত শর্তও ভঙ্গ করেছে এই দুটি প্রতিষ্ঠান। সূত্র জানায়, শিক্ষা ক্যাডার থেকে প্রশাসন ক্যাডারে আসা এই কর্মকর্তা ইতিপূর্বে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। দুর্নীতির কারণে তাকে সেই সময় ওএসডি করা হয়। সার্বিক বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (আইইএম) আশরাফুন্নেছার সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মার্কেটে। কথা বলতে পারবো না।

নিষিদ্ধপল্লীতে সেক্স রোবট!

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে মানুষের জীবনাচরণ। গৃহস্থালি থেকে শুরু করে জটিল অপারেশন সব জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে রোবট। তাদেরকে দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জটিল কাজকে সহজ করা হচ্ছে। কিন্তু মানুষের যে জৈবিক চাহিদা সেখানেও রোবট! হ্যাঁ, এ ধারা শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকেই। সেক্স ডল বা রোবট নারী মানুষের একাকীত্বকে দূর করছে। ফলে বহু পুরুষ নারীর ওপর নির্ভর না করে বেছে নিচ্ছেন এসব রোবট নারী। এ নিয়ে মাঝেমাঝেই বিতর্ক শোনা যায়, মানুষের সন্তান জন্মদান ছাড়া ভবিষ্যতে হয়তো নারীতে-পুরুষে যৌন সম্পর্ক হারিয়ে যাবে।
কারণ, মানুষ যেভাবে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে তাতে তার মধ্যে যে বিষন্নতা কাজ করবে, বিরক্তি কাজ করবে, সময়ের অভাব দেখা দেবে বা দিচ্ছে, তাতে শারীরিক সম্পর্ক হারিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছাবে এক সময়। বিভিন্ন জরিপেও এমনটা আভাষ মিলেছে। এমন অবস্থায় মানুষকে রোবট নারী বা সেক্স রোবটের ওপর নির্ভর করতে হবে। পশ্চিমা অনেক দেশে গড়ে উঠেছে রোবটের পতিতালয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদায় এমনই এক পতিতালয়ে রোবটের ব্যবহার হচ্ছে। নেভাদার পতিতালয় এমনিতেই পরিচিত। সেখানে বিশ্বের  বিভিন্ন প্রান্তের পুরুষ বা নারী ছুটে যান।
নেভাদার ‘এলিয়েন ক্যাটহাউজ’ সব সময়ই এই বিশ্বের বাইরের এমন এক প্রস্তাব তুলে ধরে তার খদ্দেরদের। এবার সেখানে যুক্ত হয়েছে ইউএফও-থিমের পতিতালয়। এর ফলে খদ্দেররা মানবীয় সাহচর্য্যরে পাশাপাশি পাবেন সেক্স রোবটের স্পর্শ, সঙ্গ। এ প্রসঙ্গে ক্যাটহাইজের রড থম্পসন বলেছেন, অনেক খদ্দের আছেন তারা নারীর স্পর্শের প্রতি আগ্রহী নন। এসব খদ্দেরের মনের যাতনা মেটাতে পারে এসব রোবট। ফলে দু’ রকমের সুবিধা থাকবে এখানে। এলিয়েন ক্যাটহাউজের অনেক খদ্দের আসেন তারা পর্নো তারকাদের সঙ্গী হতে চান। তাই আমরা এসব রোবট প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। তাছাড়া এখানে যেসব নারী আছেন, তারাও খুব উৎসাহিত। কারণ, তারা মনে করেন এখানে শুধু নারী-পুরুষে প্রতিযোগিতা নয়। প্রতিযোগিতা হবে এমন একটি প্রতিযোগীর সঙ্গে যারা স্বাভাবিক নয়।

বিকল্প জ্বালানির বাণিজ্যিক উৎপাদনের কতটা কাছে বিশ্ব?

কার্বনমুক্ত বিকল্প জ্বালানির কথা বহু বছর ধরেই ভাবছে বিশ্ব। হালে এই খোঁজাখুঁজির কারণ হিসেবে পরিবেশ ও প্রকৃতির সুরক্ষার কথা এলেও শুরুতে কারণটি ছিল সম্পদের সীমা। এখন পর্যন্ত মোটাদাগে শক্তির উৎস ওই খনি। কিন্তু খনি তো আর অসীম নয়। সেখানে থাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুত, যা টিপে টিপে খরচ করতে হয়। তাই একটা সময় এই মজুত ফুরিয়ে যাবে—এ বিবেচনাতেই প্রথম নবায়নযোগ্য বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধানে নামে মানুষ। এ ক্ষেত্রে মানুষ বরাবরই তাকিয়ে ছিল ওই সূর্যের দিকে, যাকে আদি থেকেই মানুষ বিবেচনা করে এসেছে শক্তির এক অফুরান উৎস হিসেবে।
এই সূর্যই অবশ্য শক্তির একটি বড় উৎসের সন্ধান দেয় মানুষকে। আর তা হলো ফিউশন রিঅ্যাক্টর। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ১৯২০ সালে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন প্রথম এই উৎসের খোঁজ দেন। ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি তুলে ধরেন তারকাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামো। সেখানে তিনি সূর্যের ঔজ্জ্বল্যের উৎস সম্পর্কে আলোকপাত করেন।
শক্তির এক অফুরান উৎস হিসেবে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে আর্থার এডিংটন বলেন, এই উৎস বিস্ময়কর হলেও রয়েছে সব বস্তুর মধ্যেই। মানুষ একদিন এই শক্তিকে মুক্ত করার কৌশল নিশ্চয় শিখবে। আর এটি সম্ভব হলে মানুষ পেয়ে যাবে এমন এক মজুতাগার, যার সঞ্চয় কখনো ফুরোয় না।
এডিংটন সেই সময়েই হাইড্রোজেনের সংযোগে হিলিয়াম তৈরি হওয়ার সময় শক্তির মুক্ত হওয়ার কথা বলেন, যা সূর্যের শক্তির উৎস। সেই সময় বিখ্যাত E=mc2 সমীকরণ দিয়ে এর ব্যাখ্যাও হাজির হলো। অন্য বিজ্ঞানীরা সন্তুষ্ট হলেন। নেমে গেলেন এই অফুরান শক্তি উৎসকে বশে আনতে। কিন্তু ওটুকুই। আজও এর দেখা মেলেনি। মাঝখানে চলে গেছে একটা গোটা শতাব্দী। এখনো ভারত, চীন থেকে শুরু করে ইউরোপের প্রতিটি দেশ এবং অতি অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের বহু প্রতিষ্ঠান এমন একটি ফিউশন চুল্লি তৈরির স্বপ্ন দেখছে, যা থেকে শক্তির বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই পুরোনো কৌতুককে হার মানাতে পারেনি কেউ, যেখানে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক ফিউশন শক্তির উৎপাদন থেকে বিজ্ঞানীরা সব সময়ই ৩০ বছর দূরে থাকবে।
এখন পর্যন্ত এ ধরনের রিঅ্যাক্টর তৈরি সম্ভব হয়নি। কোনো বাণিজ্যিক উৎপাদন তো দূরের কথা; মূল সংকট ব্যয় ও মুনাফার সমীকরণ না মেলা। কিন্তু আশা রয়ে গেছে। বর্তমানে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বহু দেশের প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী। তাদের আশা, অচিরেই একটি লাভজনক রিঅ্যাক্টরের নকশা তাদের হাতে চলে আসবে। আর তারপর শুধু মুনাফা আর মুনাফা।
কথা হচ্ছে—ফিউশন কী? ফিউশন মিউজিক তো চেনেন? ওই যে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সংগীত মিলিয়ে একটা নতুন স্বাদের সংগীত। সে রকমই একটা ব্যাপার। তবে তা ঘটে পরমাণু নামক অতি ক্ষুদ্র কণার ভেতর মহলে। দুটি হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস মিলে একটি হিলিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াস তৈরি—এটাই ফিউশন।
প্রথম দিকে ফিউশন রিঅ্যাক্টর তৈরির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সূর্যের দিকেই তাকিয়েছিলেন। সেখানে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস তৈরির পথে বিপুল পরিমাণ শক্তির নির্গমন হয়। আর এই ঘটনা ঘটে দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে দুটি ইলেকট্রনের (ঋণাত্মক কণা) কক্ষত্যাগের মধ্য দিয়ে, যা প্রতিকণা (অ্যান্টিমেটার) পজিট্রনের প্ররোচনায় ঘটে থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো পরমাণুর কেন্দ্র নিউক্লিয়াসে এই বিক্রিয়া ঘটতে গড়ে শতকোটি বছর লাগে। সৌভাগ্য এই যে একটি শর্টকাটের দেখা পেয়ে যান বিজ্ঞানীরা। আর তা ধরা দেয় হাইড্রোজেনের দুটি আইসোটোপ ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়ামের হাত ধরে।
পৃথিবীতে প্রতি ছয় হাজার কণায় একটি করে ডিউটেরিয়ামের দেখা মেলে। তবে ট্রিটিয়াম তেজস্ক্রিয় হওয়ায় এর দেখা সহজে মেলে না। কিন্তু এরও একটা সুরাহা হলো ট্রিটিয়ামের পরীক্ষাগার সংশ্লেষ সম্ভব হওয়ায়, যা পৃথিবীতে বিদ্যমান লিথিয়ামসহ বিভিন্ন কাঁচামালের প্রাচুর্যের কারণে সহজও। এই ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম প্রোটনের (ইলেকট্রনবিহীন ধনাত্মক চার্জযুক্ত হাইড্রোজেন পরমাণু) চেয়ে ঢের গতিতে বিক্রিয়া করে। আর কোনো পজিট্রনের উপস্থিতির প্রয়োজন পড়ে না। এই সংযোগের ফলে হিলিয়াম যেমন পাওয়া গেল, তেমনি ‘হাতের পাঁচ’ হিসেবে পাওয়া গেল একটি নিউট্রন। অর্থাৎ, মোটামুটি ফিউশন মানুষের দখলে এল। এখন শুধু দরকার একটি চুল্লি বা রিঅ্যাক্টরের, যা ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়ামের একটি অত্যনুকূল মিশ্রণ ও নির্দিষ্ট তাপমাত্রা নিয়ে কাজ করতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত উৎপন্ন করতে পারবে সরবরাহকৃত শক্তি থেকে বেশি শক্তির। সুবিধাটি হলো এই, অত্যনুকূল মিশ্রণ ও প্রয়োজনীয় অবস্থাটি সম্পর্কে মানুষ এরই মধ্যে অবগত জন লসনের কল্যাণে, যিনি ভারতে জেটা প্রকল্পের সঙ্গে ছিলেন।
বর্তমানে জন লসনের প্রস্তাবিত এই বিশেষ অবস্থা অর্জনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে টোকাম্যাক নামের একটি যন্ত্র। এই টোকাম্যাক সম্পর্কে প্রথম ধারণাটি দিয়েছিলেন আন্দ্রেই সাখারভ সেই ১৯৫০-এর দশকে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের এই পদার্থবিদের দেখানো পথেই এখনো হাঁটছেন বিজ্ঞানীরা। এই পথ ধরেই দেখা দিয়েছে বেশ কয়েকটি ফিউশন চুল্লির সম্ভাব্য নকশা। এরই একটি হচ্ছে কমনওয়েলথ ফিউশন সিস্টেম (সিএফএস), যা হাজির করেছে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) পরীক্ষাগার। আর টোকাম্যাক নামেই আরেকটি নকশা হাজির করেছে ব্রিটেনের কালহামের অ্যাটমিক এনার্জি অথোরিটি, যা ১৯৫০-এর দশকে স্থাপিত হারওয়েল ল্যাবরেটরির উত্তরসূরি বলা যায়।
টোকাম্যাকের নকশাটি দাঁড়িয়ে আছে একটি টোরাস আকৃতির কাঠামোর ওপর। টোরাস কাঠামোটি সহজভাবে বুঝতে ডোনাটের কাঠামোটি মাথায় আনলেই হবে। এই টোরাসের চারপাশে এবার কল্পনা করুন একটি ভীষণ শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র। এই টোরাসেই থাকবে জ্বালানি। আর জ্বালানি বলতে ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়ামের প্লাজমা, যা একটি গ্যাসীয় দশা, যেখানে ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস পৃথকভাবে অবস্থান করে। চৌম্বক ক্ষেত্রটি এই প্লাজমাকে উত্তপ্ত করতে ও তাকে ওই টোরাসের দেয়াল স্পর্শ থেকে বিরত রাখতে ভূমিকা রাখে। কারণ, টোরাসের গায়ে লেগে গেলেই প্লাজমার তাপমাত্রা যাবে কমে, আর হবে শক্তির অপচয়। এই টোকাম্যাক কিন্তু ছোটখাটো কোনো যন্ত্র নয়। এর মূল কাঠামো টোরাসেরই আয়তন হতে পারে ৮৩০ ঘনমিটার। এই আকৃতির টোরাস ব্যবহার করে আরেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইটার’স। তবে সিএফএসের টোরাসের আকার এর ৬০ ভাগের ৫ ভাগ। এই ক্ষুদ্র টোরাসের জন্য সিএফএসের অবশ্য অনেক বেশি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রয়োজন পড়ে। তুলনামূলক উচ্চ তাপমাত্রায় এই চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তিমত্তা বাড়ে। সময় বুঝে একে ঠান্ডা করে আনলেই হলো। ঠান্ডা করার জন্য ব্যবহার করা হয় তরল নাইট্রোজেন, যা আরেক কুলার হিলিয়ামের চেয়ে অনেক সস্তা।
এখন অবশ্য সর্পিলাকার টোরাসের ধারণা এসেছে। এর প্রতি অনেক গবেষকই আগ্রহী। কারণ, এ আকৃতির টোরাসে প্লাজমা অনেক বেশি স্থিতিশীল আচরণ করবে বলে মনে করেন তাত্ত্বিকেরা। ফলে, ডোনাট আকৃতির টোরাসকে এ ধরনের টোরাস প্রতিস্থাপন করতে যাচ্ছে বলাই যায়। এরই মধ্যে টোকাম্যাক এনার্জি এ ধরনের কিছু প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে। সর্বশেষ এসটি ৪০ নামের নকশায় এখন পর্যন্ত প্লাজমার তাপমাত্রা ১৫ এম ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করা গেছে। শক্তি উৎপাদনের জন্য এটি নিতে হবে ১৫০ এম ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বোঝাই যাচ্ছে, এখনো কত দূরে মানুষ। প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য কয়েক বছরের মধ্যেই ১০০ এম ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর লক্ষ্য ঠিক করেছে।
এখানে বলা দরকার, টোকাম্যাকই একমাত্র রিঅ্যাক্টর নয়। কানাডার ভ্যাঙ্কুভারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান জেনারেল ফিউশন যেমন কাজ করছে ভিন্ন আরেক ধরনের ফিউশন চুল্লি নিয়ে, যাকে তারা বলছে ‘ম্যাগনেটাইজড টার্গেট ফিউশন’ হিসেবে। এতে প্লাজমায় বিদ্যমান চার্জগুলো দিয়েই চৌম্বক ক্ষেত্র উৎপাদনের কথা বলা হচ্ছে। এতে করে লসন নির্ধারিত তাপমাত্রা উৎপন্ন করা তুলনামূলক সহজ বলে মনে করেন জেনারেল ফিউশনের প্রধান ক্রিস্টোফার মোরি। তাঁরা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই সুসংবাদ দিতে পারবেন বলে আশাবাদী। আবার ক্যালিফোর্নিয়ার টিএই টেকনোলজিস কাজ করছে নতুন আরেক ধরনের নকশা নিয়ে। সব মিলিয়ে এখন সারা বিশ্বেই নতুন নতুন চুল্লির নকশা নিয়ে কাজ চলছে। কোনটি শেষ পর্যন্ত কাজ করে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলার কিছু নেই। এমনকি আদৌ কোনোটি কাজ করবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।
সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক নকশাটি নিয়ে এসেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট লাইট ফিউশন। তারা যে নকশাটির প্রস্তাব করছে, তা উঠে এসেছে প্রকৃতি থেকেই। সামুদ্রিক এক ধরনের চিংড়িই মূল ভিত্তি। এ চিংড়ি শিকারের জন্য নিজের শুঁড়গুলো দিয়ে অনেকটা তালির মতো দেয়, যা এতটাই জোরে যে তা কিছু বাবলের সৃষ্টি করে। এগুলো ফেটে গেলে একটি শকওয়েভের সৃষ্টি হয়, যার কারণে চিংড়িটির উদ্দিষ্ট শিকার মারা যায়। এই ভিত্তিটির দিকেই তাকিয়ে ফার্স্ট লাইট ফিউশন। এই বছরই এর সাফল্য-ব্যর্থতা সম্পর্কে জানা যাবে।
এখন পর্যন্ত ফিউশন শক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২৫-৩০ সালের মধ্যে একটি আশাব্যাঞ্জক ফল এনে দেওয়ার কথা বলছে। অনেক বিনিয়োগও আসছে। টিএইতেই যেমন এসেছে ৬০ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ। জেনারেল ফিউশন নতুন করে পেয়েছে ১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগগুলো থেকে মুনাফা গুনতে বসে আছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। সেটি কতটা সম্ভব হবে, তা সময়ই বলে দেবে। সম্ভব হলে তা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বের চেহারা বদলে দেবে।
সূর্য শক্তির একটি বড় উৎসের সন্ধান দেয় মানুষকে। আর তা হলো ফিউশন রিঅ্যাক্টর। ছবি: এএফপি/নাসা

‘রাজনৈতিক আগ্রহই আমাকে অর্থনীতিতে নিয়ে এসেছিল’ -অমর্ত্য সেন

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে পারাটা খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার। এখানেই আমি শিক্ষক জীবন শুরু করি। সুতরাং, এখানে আসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আমার গভীর কৃতজ্ঞতা। সেই সঙ্গে এই আলোচনাটির সভাপতিত্ব করার জন্য পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও আমি খুবই কৃতজ্ঞ।

১৯৫১-র জুলাই মাসের এক বৃষ্টিভেজা দিনে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে এসে ভর্তি হই; পড়বার বিষয় অর্থনীতি, সঙ্গে গণিত। আমার স্কুলের পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে। ভেবেছিলাম সেখানকার স্কুলের পড়া শেষ করে কলকাতায় এসে পদার্থবিদ্যা ও গণিত পড়ব। আমার মত-বদলের পিছনে একটা কারণ ছিল আমার রাজনৈতিক আগ্রহ ও সে বিষয়ে চিন্তা; আমার মনে হয়েছিল, অর্থনীতির অধ্যয়ন এ ব্যাপারে বেশি করে কাজে লাগবে। ইতিমধ্যেই আমি এক ভিন্নতর ভারতের ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছিলাম। নাছোড় সেই ধারণায় আমার ভারতবর্ষ ছিল দারিদ্র, বৈষম্য ও অন্যায় থেকে মুক্ত। সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়ে চিন্তা করার জন্য অর্থনীতি বিষয়ে কিছুটা ধারণা যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, এই ভাবনাটা আমার পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

আমার অর্থনীতি পড়ার সিদ্ধান্তটার পিছনে অধ্যাপক অমিয় দাশগুপ্তের সঙ্গে আলোচনারও প্রভাব ছিল। অধ্যাপক দাশগুপ্ত ছিলেন খুব বড় মাপের অর্থশাস্ত্রী। তিনি আমাদের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধুও ছিলেন— ওঁকে আমি কাকা ডাকতাম। অর্থনীতি পড়ার সিদ্ধান্তটা আরও পাকা হয় সুখময় চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের পথ ধরে। আমি যখন শান্তিনিকেতনে ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্স (আইএসসি) পড়ছি, সুখময় তখনই প্রেসিডেন্সিতে, ও পড়ছিল ইন্টারমিডিয়েট আর্টস (আইএ)।  সুখময়কে মেধাবী বললে তার সম্পর্কে অত্যন্ত কম বলা হয়। অবিশ্বাস্য ক্ষুরধার বুদ্ধি ও সুতীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী ক্ষমতা তো তার ছিলই, সেই সঙ্গে সে ছিল প্রায় সব বিষয়েই ওয়াকিবহাল, তাই সব মিলিয়ে অনন্য। আমার মতোই সুখময়ও ছিল রাজনৈতিক দিক দিয়ে বামপন্থা ঘেঁষা। ও আমাকে বলেছিল, ওর অর্থনীতিকে বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ ছিল গভীর রাজনৈতিক আগ্রহ এবং বিশেষ করে মার্ক্সীয় চিন্তার প্রতি জোরদার টান। সুখময় বলত, আমাদের চারপাশের দুনিয়াটাকে একেবারেই মেনে নেওয়া যায় না। বলা বাহুল্য, এ ব্যাপারে তার সঙ্গে আমার দ্বিমত পোষণের কোনও কারণ ছিল না। সুখময় প্রায়ই শান্তিনিকেতনে আসত। ওর সঙ্গে কথাবার্তার সুবাদে আমার অর্থনীতি ও গণিত পড়বার ইচ্ছাটা ধীরে ধীরে, কিন্তু প্রবল ভাবেই, পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে।

প্রেসিডেন্সিতে পৌঁছেই কলেজের মূল সিঁড়িটাতে সুখময়কে দেখতে পাই। এই সিঁড়িটা দিয়েই আমরা দোতলায় ক্লাসে যেতাম। এটা ছিল প্রেসিডেন্সির একটা বিশেষ সম্পদ। যে-সব ঐতিহাসিক কারণে এই সিঁড়ি বিখ্যাত হয়ে আছে তার মধ্যে একটা হল, এখানে দাঁড়িয়েই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর ছাত্রাবস্থায় কলেজের ইংরেজ প্রিন্সিপালকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কত খারাপ সে বিষয়ে বেশ কড়া একটা বক্তৃতা শুনিয়ে দিয়েছিলেন। শোনা যায়, প্রিন্সিপালকে হেনস্থা করার কাজেও তিনি জড়িয়ে পড়েন, যদিও এ-বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। তো, সেই প্রথম দিনেই সুখময় আমাকে দেখে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল এবং আমাকে চারপাশটা ঘুরিয়ে দেখাল। প্রেসিডেন্সিতে আসা, এখানে অর্থনীতি পড়া, এবং অবশ্যই সুখময়ের সান্নিধ্য, সব মিলিয়ে আমি চট করে ওখানে বেশ স্বচ্ছন্দ বোধ করেছিলাম।

সুখময় আমাকে কফি হাউসে ধরে নিয়ে গেল। তখন কফি হাউস ছিল শ্রমিকদের এক সমবায়— ওয়ার্কার্স কো-অপারেটিভ। পরে এটি ইন্ডিয়ান কফি বোর্ডের অধীনে যায়, কিন্তু, আমি যত দূর জানি, এখন আবার সমবায় হিসেবেই চলছে। কফি হাউস ছিল এক চমৎকার জায়গা। সেখানে আড্ডা মারার আনন্দ পাওয়া থেকে শুরু করে গুরুগম্ভীর বিষয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে নানা জিনিস শিখতে পারার সুযোগটা সত্যিই একটা খুব বড় ব্যাপার ছিল। আমার মনে আছে, রাজনীতি নিয়ে যে-সব হাজার রকমের তর্ক হত, তার কিছু কিছু আমাদের বক্তব্যের যুক্তি সরবরাহ করত। এই আড্ডাগুলো থেকে আমি যে কী পরিমাণ উপকৃত হয়েছি তা বোঝানো সহজ নয়। এর বেশির ভাগটাই আমি পেয়েছি সহপাঠীদের কাছ থেকে। তাদের কাছ থেকে আমি জানতাম তারা কী ভাবছে, কিংবা কে নতুন কী পড়ল, বা অন্য কোথাও থেকে কিছু জানতে পারল। বিভিন্ন ক্লাসে পড়ানো ইতিহাস থেকে অর্থনীতি, নৃবিজ্ঞান থেকে জীববিজ্ঞান বা পদার্থবিদ্যা পর্যন্ত নানা বিষয় ছিল সেই জানার অঙ্গ।

-----২-----

বিভিন্ন বিষয়ে টুকরোটাকরা জ্ঞানের সরাসরি আদানপ্রদানের চেয়েও বড় ব্যাপার ছিল নানা বিষয়ে অত্যন্ত সুসংবদ্ধ তর্ক। ক্ষুরধার যুক্তির সাহায্যে সেই তর্কগুলোতে একে অন্যের মত ও বিশ্বাসকে খণ্ডন করা হত। আমার চেয়ে কয়েক বছর আগে প্রেসিডেন্সিতে পড়া, অনন্য ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী কফি হাউসের এই আড্ডা সম্পর্কে যা লিখেছিলেন, কিছুটা অত্যুক্তি থাকলেও তা মোটের ওপর খুব একটা ভুল নয়: ‘আমাদের মধ্যে অনেকেই যা শিখেছি এই ‘জ্ঞানপীঠ’-এ [কফি হাউসে], আমাদের সহপাঠীদের কাছ থেকে, রাস্তার ওপারে কলেজে গিয়ে ক্লাসে বসার আর প্রয়োজনই হত না।’ (দ্য ওয়ার্ল্ড ইন আওয়ার টাইম, নয়ডা ও লন্ডন, হার্পার কলিন্স, ২০১১, পৃ. ১৫৪)

কেবল প্রেসিডেন্সি থেকেই নয়, কফি হাউসের আড্ডায় যোগ দিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, এবং আশপাশের বিভিন্ন কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। কলেজ স্ট্রিটের অনেকটা জুড়ে ছিল, প্রেসিডেন্সির পাশেই, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। এই এলাকায় ছিল মেডিক্যাল কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, স্কটিশ চার্চ কলেজ, সেন্ট্রাল ক্যালকাটা কলেজ (যার পূর্বতন নাম ছিল ইসলামিয়া কলেজ, এবং পরে নাম বদলে হয় মৌলানা আজাদ কলেজ) এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। প্রেসিডেন্সি ও কফি হাউসের মাঝখানে কলেজ স্ট্রিট।

কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসের দিকটাকে কলেজ স্কোয়ারও বলা হত। সেখানকার সারি সারি বইয়ের দোকানগুলো ছিল একই সঙ্গে আনন্দ ও পড়াশোনার আর একটা জায়গা। আমার প্রিয় বইয়ের দোকান ছিল দাশগুপ্ত। এটা আমার কাছে ছিল খানিকটা লাইব্রেরির মতো। সেখানে দাঁড়িয়ে বা টুলের ওপর বসে দোকানের তাক থেকে যে কোনও বই তুলে নিয়ে পড়ার ব্যাপারে মালিক দাশগুপ্তবাবু আমাদের খুবই প্রশ্রয় দিতেন। কখনও কখনও তিনি সুখময় ও আমাকে এক রাতের জন্য বই ধারও দিয়ে দিতেন, তবে শর্ত ছিল, বইতে যেন কোনও দাগ না লাগে। বই দেওয়ার আগে তিনি অনেক সময় খবরের কাগজের মলাট দিয়ে দিতেন। তিনি ভালই জানতেন যে, আমরা বই বড় একটা কিনব না, কেবল পড়ব। এক বার এক বন্ধু আমার সঙ্গে সেই দোকানে গিয়েছিল। সে দাশগুপ্তবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, অমর্ত্য তো বই কিনতে পারে না, তাতে আপনি ওকে কিছু বলেন না?” দাশগুপ্তবাবু উত্তর দিয়েছিলেন, “যদি শুধু পয়সাই রোজগার করতে চাইব, তা হলে গয়নার দোকান না দিয়ে আমি বইয়ের দোকান করলাম কেন?”

------৩-----

প্রেসিডেন্সির ছাত্রদের মধ্যে বেশির ভাগই রাজনৈতিক ভাবে খুব সক্রিয় ছিল। সেটা ছিল প্রধানত বামপন্থী রাজনীতির গোড়ার দিকের উত্থানের পর্ব। কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট উৎসাহ নিজের মধ্যে জাগাতে পারিনি বটে, কিন্তু বামপন্থীদের মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও তাঁদের সমতার প্রতি দায়বদ্ধতা আমাকে খুবই আকৃষ্ট করেছিল। প্রেসিডেন্সি যদিও প্রধানত উচ্চবর্গীয়দের কলেজ, কিন্তু আমার অনেক বন্ধু ও সহপাঠীর মধ্যেও বামপন্থার আবেদন বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। শান্তিনিকেতনে স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমার মধ্যে কিছু আকাঁড়া চিন্তাভাবনা গড়ে ওঠে, যেগুলোর তাগিদে আমি আশপাশের সাঁওতাল গ্রামগুলোতে নিরক্ষর ছেলেমেয়েদের জন্য নিয়মিত নাইট ইস্কুল চালাতাম। প্রেসিডেন্সিতে এসে সেই আকাঁড়া চিন্তাভাবনাগুলোকে সুব্যবস্থিত ভাবে সামাজিক দিক দিয়ে প্রসারিত করে তোলার এবং রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনটা খুব বেশি করে অনুভব করলাম।

রাজনীতিতে আগ্রহী যে-সব সহপাঠীর সঙ্গে আমি মেলামেশা করতাম তাদের অনেকেই, আমার মতোই, স্টুডেন্টস ফেডারেশনের মধ্য দিয়ে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, কিন্তু অধিকাংশই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়নি। কিছু বাঁধাধরা ধারণার নিগড়ে বাঁধা দলীয় শৃঙ্খলার ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ অস্বস্তিকর ছিল। তা সত্ত্বেও— সেই সময়ে— বামপন্থার মধ্যে সাম্য ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি এমন এক দায়বদ্ধতা ছিল, অন্য কোনও ছাত্রগোষ্ঠী যার কাছাকাছিও আসতে পারত না। মননচর্চা ও সংস্কৃতির দিক থেকে কলকাতার বিপুল সমৃদ্ধি সত্ত্বেও তার চার পাশে অবিচ্ছিন্ন ও অসহনীয় দারিদ্র উপেক্ষা করা প্রেসিডেন্সির মতো উচ্চবর্গীয় কলেজের পক্ষেও সম্ভব ছিল না।

স্বাভাবিক ভাবেই আমি বামপন্থীদের ছাত্র শাখাটির দিকে ঝুঁকেছিলাম, কিন্তু একই সঙ্গে এর নিষ্প্রশ্ন গোঁড়ামি এবং কট্টরপন্থী বামেদের কোনও যুক্তিযুক্ত কারণ না দেখিয়েই সংসদীয় গণতন্ত্রকে ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ বলে গাল পাড়ার ব্যাপারটা মন থেকে মেনে নিতে পারিনি। অবশ্য বামপন্থার এই মিশ্র চরিত্র আমাদের অনেকের কাছেই স্টুডেন্টস ফেডারেশনে যোগ দেওয়ার এবং তাতে বিশেষ ভূমিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ১৯৫২-৫৩ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে বামপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বেশ কয়েকটি পদে প্রতিষ্ঠিত হন; এটা বলা ভুল হবে না যে, এই নির্বাচনে আমার কিছু নেতৃস্থানীয় ভূমিকা ছিল।

-----৪-----

১৯৫৩ সালে আমি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাই। ১৯৫৫’তে স্নাতক হওয়ার পর ওখানেই পিএইচ ডি করার জন্য নাম লেখাই। নেহাত বরাতজোরে— কোনও বিশেষ প্রতিভার গুণে নয়— আমি খুব দ্রুত কিছু গবেষণার ফলাফল পেয়ে যাই, যেগুলো নিয়ে লেখা কয়েকটি প্রবন্ধ অর্থনীতি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পত্রিকায় প্রকাশনার জন্য চট করে গৃহীত হয়। আমার শিক্ষক মরিস ডব দেখে বললেন, এই লেখাগুলো একত্র করে একটি পিএইচ ডি থিসিস হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, পিএইচ ডি’র জন্য নাম লেখানোর প্রথম বছরের শেষেই কার্যত আমার থিসিস লেখা হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা হল, কেমব্রিজের নিয়ম অনুযায়ী তিন বছরের আগে আমি থিসিস জমা দিতে পারব না। মানে থিসিস জমা দেওয়ার জন্য আমাকে দু’বছর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে। বেশ হতাশাজনক অবস্থা। তার ওপর কলকাতা ও তার মননচর্চার জগতের জন্য মনটা ছটফট করছিল। আমার জীবনে যাদবপুরের আগমন এই জটিল পরিস্থিতির ফল— আমার পক্ষে বেশ চমৎকার ফলই বলতে হবে।

প্রথম ধাপটা ছিল কেমব্রিজ ছেড়ে কলকাতা পৌঁছনো। কেমব্রিজ কর্তৃপক্ষের কাছে আমি দু’বছরের জন্য ভারতে ফিরে যাওয়ার একটা প্রস্তাব পেশ করলাম। আমি তাঁদের বললাম, দেশে ফিরে আমি আমার গবেষণায় পাওয়া তত্ত্বগত ফলাফলগুলো ভারতের তথ্যের সঙ্গে খুব যত্ন করে মিলিয়ে দেখব (আমার থিসিসটাকে বয়স বাড়ানোর জন্য কেমব্রিজে রেখে এলাম, মদের গুণ বাড়াতে যেমন তাকে পুরনো হতে রেখে দেওয়া হয়!)। যাদবপুর তখনও একটি বিশিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, তবে সেই সময় এটিকে পুরোদস্তুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করার কাজ চলছিল। হঠাৎ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যের কাছ থেকে আমি একটা চাকরির প্রস্তাব-সহ চিঠি পাই। চিঠি পেয়ে আমি কিছুটা বিস্মিত এবং তার চেয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ি। তাঁরা আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগটি গড়ে তোলার দায়িত্ব দিতে চান। চ্যালেঞ্জটাতে ভয় পাওয়ার কারণ ছিল— তখন আমার বয়েস তেইশ বছর, প্রফেসর বা বিভাগীয় প্রধান হওয়ার কথা একেবারেই ভাবিনি। কিন্তু আমি তো অনেক দিন ধরে অর্থনীতির পাঠ্যসূচি কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে কলকাতা ও কেমব্রিজের লোকেদের বক্তৃতা শুনিয়ে জ্বালিয়ে মেরেছি, এখন যখন সত্যিই কাজটা করার পালা এসেছে, আমার কাছে পালিয়ে বাঁচার কোনও ভদ্রস্থ কারণ রইল না।

যা-ই হোক, প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে উঠে অগস্ট মাসের এক বৃষ্টিভেজা দিনে যাদবপুরে যোগ দিলাম এবং অর্থনীতির ছাত্রছাত্রীদের জন্য সিলেবাস তৈরির কাজে লেগে পড়লাম। সেই সঙ্গে শুরু হল আমার সহকর্মী জোগাড় করার কাজ। অর্থনীতি বিভাগটা গড়ে ওঠার সময়ে শিক্ষক কম থাকার কারণে আমাকে প্রচুর ক্লাস নিতে হত। যখন শিক্ষক নিয়োগের কাজটা চলছিল, আমার মনে আছে, আমাকে অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে সপ্তাহে আটাশটা পর্যন্ত লেকচার দিতে হয়েছে। এতে খুবই ধকল যেত, কিন্তু একই সঙ্গে এর মধ্যে ছিল বড় একটা চ্যালেঞ্জ, আর কিছু মজাও। ছাত্রদের পড়াবার জন্য প্রস্তুতির প্রচেষ্টায় অর্থনীতির বিভিন্ন ব্যাপারে অনেক কিছু জানা হয়ে যেত। আমার পক্ষে পড়ানোর অভিজ্ঞতাটা ছিল খুবই শিক্ষাপ্রদ, এবং আমার আশা, ছাত্ররাও সেগুলো থেকে কিছু না কিছু পেত। এই অভিজ্ঞতার সূত্রে আমি নির্ধারণ করলাম, কোনও বিষয় যতক্ষণ না পড়াচ্ছি, ততক্ষণ সেই বিষয়টা ভাল ভাবে আয়ত্ত করেছি এ রকম মনে করাটা উচিত নয়।

অধ্যাপনার মতো কাজের বিচারে আমার বয়সটা তখন নিতান্ত কম। তার ওপর আবার অনেক আলোচনা চলছিল যে, নিজের যোগ্যতায় নয়, আমি চাকরিটা পেয়েছি খুঁটির জোরে। স্বাভাবিক কারণেই এ নিয়ে বেশ জল ঘোলা হল। অনেকে আবার এর মধ্যে রাজনীতির গন্ধ পেয়ে গেলেন— মাত্র তিন বছর আগেই তো প্রেসিডেন্সি কলেজে বামপন্থী ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে আমার সক্রিয় সংযোগ ছিল— বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আমার দায়বদ্ধতা এই সন্দেহকে গাঢ় করে তুলল। এর মধ্যে সব থেকে তীক্ষ্ণ আক্রমণটা এসেছিল ‘যুগবাণী’ নামক একটি পত্রিকা থেকে। অত্যন্ত দক্ষিণপন্থী এই কাগজটাতে প্রায় এমন একটা আশঙ্কা প্রকাশিত হল, যেন যাদবপুরে আমার চাকরি পাওয়ার মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে প্রলয় ঘনিয়ে আসছে! এই সব খবর আমার পক্ষে খুব সুখপাঠ্য ছিল না ঠিকই, কিন্তু পত্রিকায় ছাপা একটা কার্টুন দেখে বেশ মজা পেয়েছিলাম, তাতে দেখানো হয়েছিল আমি সিধে দোলনা থেকে উঠে প্রফেসর হয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে চক হাতে দাঁড়িয়ে গিয়েছি।

এই প্রতিকূলতার মুখে ছাত্রদের উদ্দীপনাই আমাকে জোর দিয়েছিল। তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। আমি অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী পেয়েছিলাম। যেমন, সৌরীন ভট্টাচার্য, যে পরে বিদ্যাবেত্তা ও লেখক হিসেবে নিজের বিশিষ্টতার পরিচয় রেখেছে। নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার সাহস যাঁদের হয়েছিল তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন প্রতিভাবান। যাদবপুর ছাড়ার পরেও বহু দিন পর্যন্ত এদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। তারা নিজেদের মধ্যেও যোগাযোগ রেখে চলত (সৌরীনের স্ত্রী রেবাকেও আমার প্রথম ব্যাচে পেয়েছিলাম, এবং সে-ও দারুণ ছাত্রী ছিল)।

----৫----

বহু দিন ধরে বিশিষ্ট এক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে চলে আসার কারণে বুদ্ধিচর্চার দিক দিয়ে যাদবপুর ছিল চমৎকার এক জায়গা। এখানকার সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ দুটোই আমি সানন্দে গ্রহণ করি। সব বিভাগে ছিলেন এক জন করে প্রফেসর তথা বিভাগীয় প্রধান। আমাকে বাদ দিয়ে বাকি সব বিভাগের নবনিযুক্ত প্রধানরা সবাই ছিলেন বেশ প্রতিষ্ঠিত এবং বিশিষ্ট। বয়সেও তাঁরা আমার চেয়ে বেশ বড় ছিলেন। ইতিহাস বিভাগের প্রধান ছিলেন সুশোভন সরকার। আমি যখন প্রেসিডেন্সিতে অর্থনীতি পড়ছিলাম তিনি তখন সেখানকার ইতিহাস বিভাগে পড়াতেন। সুশোভনবাবু ছিলেন অসামান্য শিক্ষক ও বড় রকমের চিন্তাবিদ। তাঁর প্রভাবটা আমার ওপর খুব বেশি করেই পড়েছিল— প্রেসিডেন্সিতে ডিপার্টমেন্টের বেড়া ভেঙে আমি নিয়মিত তাঁর ক্লাসে যেতাম। সুশোভনবাবুর সহকর্মী হতে পারাটা আমার কাছে ছিল বিরাট একটা সুযোগ। যাদবপুরে আমার বয়সি কাউকে অধ্যাপক হিসেবে মেনে নেওয়া কঠিন ছিল! এমন একটা অবস্থায়, আমার প্রতি তাঁর স্নেহের কারণে, আমি প্রায়শই তাঁর কাছ থেকে এক জন অল্পবয়সি অধ্যাপক হিসেবে আমার কী করা— এবং কী না করা— উচিত, সে বিষয়ে নিয়মিত অত্যন্ত কার্যকর পরামর্শ পেতাম।

তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের প্রধান ছিলেন সকলের সুপরিচিত লেখক বুদ্ধদেব বসু, কবিতা এবং উদ্ভাবনী গদ্য লিখনের সুবাদে যিনি খুবই খ্যাতিমান। আমি তাঁর কাজের বিশেষ অনুরাগী ছিলাম। তাঁকে ব্যক্তিগত ভাবেও চিনতাম, কেননা, তাঁর কন্যা মীনাক্ষী— মিমি— ও তার স্বামী জ্যোতি প্রেসিডেন্সিতে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল।

বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন সুশীল দে। তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত হিসেবে অতীব সম্মানিত। সুশীলবাবু ও বুদ্ধদেব বসু দু’জনেই আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন, তাঁরা আমার বাবার সহকর্মী ছিলেন। বিপদের কথা হল, সুশীল দে আমার ঠাকুরদাকেও ভাল ভাবে চিনতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নীতি বিষয়ে প্রায়শই তাঁর সঙ্গে আমার মতের অমিল হত— সুশীলবাবু খুব রক্ষণশীল ছিলেন— এবং তখন তিনি মাঝে মাঝেই আমাদের বয়সের পার্থক্য বিষয়ে দু’একটা কথা বলতেন এবং আমাকে মনে করিয়ে দিতেন যে, তিনি আমার থেকে অন্তত চল্লিশ বছরের বড়। সেই প্রসঙ্গেই তিনি তাঁর যুক্তিগুলোর সঙ্গে আমার বংশলতিকাটি জুড়ে দিতেন (তখন অসহায় বোধ করা ছাড়া আমার কিছুই করার থাকত না)। এক বার তিনি বললেন, “তোমার ঠাকুর্দা খুবই বিজ্ঞ লোক ছিলেন; তুমি যে বিষয়টা বুঝতে পারছ না, তিনি কিন্তু সেটা খুব সহজেই ধরে ফেলতেন।” এখানে জানিয়ে রাখি, অধ্যাপক দে-র সঙ্গে আমার যখনই কোনও তর্ক হত, তার সব ক’টাতে তিনিই জিততেন।

----৬----

আমাদের সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন আশ্চর্য রকমের উদ্ভাবনী চিন্তাসম্পন্ন ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ, যিনি পরে ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক ইতিহাস চর্চায় সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ় (নিম্নবর্গের ইতিহাস) নামক অত্যন্ত প্রভাবশালী ধারাটির প্রবর্তন করেন (মার্ক্সীয় চিন্তার দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত এই ধারা পরে ভিন্নতর একটা পথ নেয়)। আমি ওঁকে রণজিৎদা বলে ডাকতাম— বয়সে খুবই তরুণ হলেও তিনি আমার থেকে কয়েক বছরের বড় ছিলেন। যাদবপুরে ক্লাস শুরু হওয়ার পর-পরই এক দিন ক্যাম্পাসে রণজিৎদার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমার বেজায় আনন্দ হল— আমি ওঁর সম্পর্কে এবং ওঁর চিন্তার অসাধারণ মৌলিকতা বিষয়ে আগে থেকেই অবহিত ছিলাম।

প্রথম দর্শনেই রণজিৎদা বললেন, “ইউনিভার্সিটি নাকি আপনাকে প্রফেসর হিসেবে নিয়ে মস্ত ভুল করেছে, চতুর্দিকে আপনার প্রচণ্ড নিন্দে শুনছি, আপনি তো খুবই প্রসিদ্ধ লোক।” তার পর বললেন, “চলুন কোথাও একসঙ্গে বসা যাক,’’ বলেই আমাকে রাত্রে খাওয়ার নেমন্তন্ন করে বসলেন। সেই সন্ধেতেই ওঁর সঙ্গে ওঁর পণ্ডিতিয়া রোডের ফ্ল্যাটে গেলাম, আর তার পর থেকে ওটা হয়ে উঠল আমার এক নিয়মিত আড্ডার জায়গা। আগে রণজিৎদা কমিউনিস্ট পার্টিতে খুব সক্রিয় ছিলেন, কিন্তু আমার সঙ্গে যখন তাঁর দেখা হয় তত দিনে তিনি নির্ধারণ করেছিলেন যে, কমিউনিস্ট পার্টিতে থাকাটা ভুল হবে। তবে তিনি বিপ্লবীই থেকে গিয়েছিলেন— কিছুটা নীরবে এবং সম্পূর্ণ

অহিংস ভাবে— এবং কাজ করে চলেছিলেন সমাজের পিছনে পড়ে থাকা অবহেলিত মানুষের জন্য। কিন্তু, স্তালিনবাদে কলকাতার প্রচণ্ড উৎসাহ সত্ত্বেও, তার ওপরে এবং কমিউনিস্ট সংগঠনের ওপরে তিনি একেবারে আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। রণজিৎদার স্ত্রী ছিলেন মার্তা। তিনি পোলান্ডের লোক। তাঁরা প্রায়ই বন্ধুদের নেমন্তন্ন করতেন, সেখানে আমারও ডাক পড়ত। কত সন্ধ্যায় যে

তাঁদের বাড়িতে নানা সুখাদ্য সহযোগে চায়ের আসর বসেছে তার ইয়ত্তা নেই। আর তার সঙ্গে চলত নির্ভেজাল আড্ডা— আগে থেকে ঠিক না করা নানা বিষয়ে আলোচনা।

সে-সময় রণজিৎদা তাঁর প্রথম বই ‘আ রুল অব প্রপার্টি ফর বেঙ্গল’ লেখার কাজ করছিলেন। এই বই-ই তাঁকে এক বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ এবং অসামান্য কল্পনাশক্তি ও ভবিষ্যদ্দৃষ্টি সম্পন্ন মেধাজীবীর স্বীকৃতি এনে দেয়। লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালে বাংলার ওপর যে মারাত্মক ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ চাপিয়ে দেন, তার পিছনে কী ধরনের চিন্তাভাবনার প্রভাব পড়েছিল, রণজিৎদা এ-বইতে সেই দিকটা নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেশের ভয়ানক ক্ষতিসাধন করে। (অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিতে দেখলে এই ক্ষতিটা হয় কৃষির উন্নতির জন্য যে সব ইনসেন্টিভ বা প্রোৎসাহন দরকার তার সবগুলোকেই লুপ্ত করে দেওয়ার, এবং জমির মালিকানা-ভিত্তিক অসাম্যকে চিরস্থায়ী করে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে।)

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি নিয়ে অন্যান্য গবেষণাগুলো থেকে রুল অব প্রপার্টি একেবারে আলাদা, এবং অসাধারণ মৌলিক একটি কাজ। সেই সময় সাম্রাজ্যবাদের আলোচনায় লোভ ও স্বার্থের ভূমিকার ওপর জোর পড়ত, সেটাই ছিল তখনকার প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি। রণজিৎদা সেখানে এর পিছনে আইডিয়া-র (ধারণা) ভূমিকাটাকে সামনে তুলে আনলেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পক্ষে প্রদর্শিত কারণ এবং এর পিছনের যৌক্তিক ধারণাগুলোর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার ছিল, কেননা— সুপ্রচেষ্টা সত্ত্বেও— এই বন্দোবস্তের ফল হয়েছিল ভয়ঙ্কর। রণজিৎদা যে ব্যাপারটাতে আলোকপাত করেন সেটাতে খুবই অভিনবত্ব ছিল। তিনি সাম্রাজ্যবাদী শোষণ এবং ভারতীয় প্রজাদের উপর ব্রিটিশ স্বার্থের আধিপত্যের দিক থেকে সরে গিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন বাংলায় ভূমি বন্দোবস্তের পিছনে সক্রিয় বিভিন্ন চিন্তার উপর, যে চিন্তাগুলির উদ্দেশ্য ভালই ছিল, কিন্তু তাদের এলোপাতাড়ি প্রয়োগ শেষ পর্যন্ত কর্নওয়ালিসের প্রলয়ঙ্কর ব্যবস্থাকে ডেকে আনে।

তবে রণজিৎদা যে কাজের জন্য এখন সবচেয়ে বিখ্যাত, সেটা রুল অব প্রপার্টি নয়। সেটা হল তাঁর শুরু করা এবং তাঁরই নেতৃত্বে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ় বা নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা। এর প্রথম খণ্ডটি প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। (এই সঙ্কলনের একটি প্রবন্ধ ছিল পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা।) নিম্নবর্গের ইতিহাস ছিল তাঁর প্রথম বইয়ের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ইতিহাসের উচ্চবর্গীয় ব্যাখ্যার সামগ্রিক বিরোধিতা আছে এর অন্তর্গত প্রবন্ধগুলোতে। রণজিৎদার ইতিহাসদর্শনে নিহিত প্রধান সমালোচনাটা হল এই যে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসবীক্ষায় দীর্ঘকাল ধরেই উচ্চবর্গীয় আধিপত্য বজায় আছে। এর মধ্যে ঔপনিবেশিক এবং জাতীয়তাবাদী উভয় ধরনের উচ্চবর্গীয়তারই দেখা মেলে। আর রণজিৎদার কাজ হল এই আধিপত্যগুলোকে ভাঙা। উচ্চবর্গীয়দের কীর্তির ওপর কেন্দ্রীভূত ইতিহাসচর্চার ধারা থেকে সরে এসে নতুন করে ভারতীয় ইতিহাস রচনার— কার্যত সাধারণ ভাবেই ইতিহাস রচনার— এই কাজটি ছিল বাস্তবিকই খুব বড়।

>>>৫ জুলাই ২০১৯, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত বক্তৃতা (ক্যালকাটা আফটার ইন্ডিপেনডেন্স: আ পার্সোনাল মেমোয়ার)

মৌলভীবাজারে এক জায়গায় মুসলমান, হিন্দু এবং খ্র্রিষ্টানদের সমাধি

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একই সমাজে নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ বসবাস করে। তবে সাধারনত: মৃত্যুর পর তাদের জন্য থাকে আলাদা আলাদা সমাধির ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের মৌলভীবাজারে রয়েছে এমন একটি কবরস্থান যেখানে ধর্ম-নির্বিশেষে মুসলমান, হিন্দু এবং খ্র্রিষ্টানদের মরদেহ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ীই দাফন কিংবা সৎকার করা হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, সব ধর্মের মানুষের মাঝে সৌহার্দের দৃষ্টান্ত হিসেবেই এই সমাধিস্থলটি গড়ে উঠেছে।