Tuesday, January 22, 2019

আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরাজয় -মার্কিন থিংকট্যাংকের সতর্কবার্তা

আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। চূড়ান্তভাবে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ত্যাগ করলে এর আশেপাশের দেশগুলো আবারো এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এর ফলে পাকিস্তান আরো সক্রিয়ভাবে তালেবানদের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন থিংকট্যাংক র‌্যান্ড করপোরেশন।
হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তানে মার্কিন সেনার উপস্থিতি অর্ধেকে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছেন। আরেক সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল সিরিয়া থেকেও পুরোপুরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেয়ার নির্দেশনা দিলেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে তিনি আফগানিস্তান থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহারের মনোবাসনা জানিয়েছিলেন। র‌্যান্ড করপোরেশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ২০০১ সালের পর থেকে বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। সেখানকার আঞ্চলিক অংশীদার রাশিয়া, ইরান, ভারত ও উজবেকিস্তান অতীতে আফগাস্তিানে হস্তক্ষেপ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র আকস্মিকভাবে দেশটি থেকে তাদের সেনা সরিয়ে নেয়ার ফলে আফগানিস্তানে এসব দেশগুলোর আবারো দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে প্রতিবেশী দেশগুলো দেশটিতে অতীতের মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
২০০১ সাল থেকে কাবুলের সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে রাশিয়া ও ইরান। তবে প্রতিবন্ধকতার মুখে সম্প্রতি তারা তালেবানকে সহায়তা দেয়া সীমিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে তালেবানরা পাকিস্তানি ভূখণ্ড ব্যবহার করছে। কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করলে পাকিস্তান তালেবানদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে আরো উদার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।
আফগাস্তিান থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের গুটিয়ে নিলে আরো কিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে। দৃশ্যপট থেকে ন্যাটো সেনারাও বিদায় নিতে পারে। কাবুলে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক বেসামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেতে পারে। পাশাপাশি দেশটিতে বিদেশি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা কমে যাবে। কাবুলের সরকার ক্রমেই তাদের প্রভাব ও বৈধতা হারাতে শুরু করবে। বিপরীতে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো নিজেদের সংগঠিত করার সুযোগ পাবে। আবারো তারা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূ-খণ্ডসহ আঞ্চলিক স্থাপনাগুলোতে হামলার চেষ্টা করবে।
বর্তমানে আফগানিস্তান সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় তালেবানদের বেশ আগ্রহী দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি কমলে জঙ্গি গোষ্ঠীটি যুক্তরাষ্ট্র ও আফগানিস্তান সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। তারা আফগান জনগণ ও ভূ-খণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালাবে। যা আফগানিস্তানকে আবারো গৃহযুদ্ধের দিতে ঠেলে দেবে। এখন সব পক্ষই একমত হয়েছে যে, আফগান যুদ্ধে কোনো সামরিক সমাধানে পৌঁছা সম্ভব না। তবে এটা আংশিক সত্য। কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই আফগানিস্তান ত্যাগ করলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেকটা পরাজয় মেনে নেয়ার মতো।
আফগানিস্তানে তালেবান হামলায় কমপক্ষে ১২৬ সেনা সদস্য নিহত
আফগানিস্তানে সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তালেবানদের হামলায় কমপক্ষে ১২৬ সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ঘটনা ঘটেছে ময়দা ওয়ারদাক প্রদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টরেট অর সিকিউরিটির প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। প্রথমে হামলাকারীরা বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর কমপক্ষে দু’সশস্ত্র অস্ত্রধারী সেনাদের দিকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। এক পর্যায়ে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
কাবুলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, সামরিক বাহিনীর ওই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভিতরে বিস্ফোরণে কমপক্ষে ১২৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন আটজন স্পেশাল কমান্ডো।
স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, সেনা সদস্য ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বিভাগের অনেক সদস্য রয়েছেন নিহতের মধ্যে। তবে সরকারিভাবে হতাহতের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়া হয় নি।

আবার কি মেতে উঠবে মুম্বইয়ের ড্যান্স বার!

মুম্বইয়ের রাতের জীবনের এক বড় অধ্যায় ড্যান্স বার। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব বার-এ জমে উঠতো নর্তকীদের কোমর দোলানো। সেই সঙ্গে নেচে উঠতেন নামী, দামী তারকারা। আবার জুয়াড়িরা পেতে বসতেন ব্যবসা। দেহ অপসারিণীদেরও সেখানে অবাধ যাতায়াতের কথা শোনা যায় মিডিয়ায়। অনেকবার পুলিশ এমন বার-এ হানা দিয়ে আটক করেছে যুবতীদের। তারা মুখ ঢেকে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন। সেই ড্যান্সবারগুলোর আলো নিভে গেছে।
সেখানে আর যাতায়াত নেই নর্তকী বা তাদের খদ্দেরদের। ড্যান্সবারকে কেন্দ্র করে যেসব দোকান গড়ে উঠেছিল আশপাশে তাও বন্ধ হয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের দেয়া এক রায়ে নতুন জীবন পেতে পারে মুম্বইয়ের ড্যান্স বার। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, ড্যান্সবার চলতে এবং সেখানে পানীয় চলতে পারে। এখন কি তবে জমে উঠবে আবার সেই ড্যান্সবার। এ নিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া একটি বিশাল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
২০০৫ সাল। তারই এক রাতে মুম্বইয়ের ভিলে পারলেতে অবস্থিত দীপা বার-এ অভিযান চালায় পুলিশ। ওই বারটির সঙ্গে বলিউড-ক্রিকেটার-জুয়াড়ি, আন্ডারওয়ার্ল্ডের কানেকশন থাকার কথা বেরিয়ে আসে পুলিশের তদন্তে। আটক করা হয় কয়েকজন নামীদামী তারকাকে। তদন্তে দেখা যায়, ওই বারটির একজন নর্তকী তারান্নুম জুয়াড়ি ও ক্রিকেটারদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যম হয়ে উঠেছেন।
এক সময় মুম্বইয়ের দাদার এলাকায় বিখ্যাত ছিল কারিশমা নামের ড্যান্স বার। তা এখন একটি পারিবারিক রেস্তোরাঁয় রূপ নিয়েছে। তবে গ্রান্ট রোডে অবস্থিত টোপাজ এখন একটি ‘অর্কেস্ট্রা বার’। ওয়ারলির কার্নিভাল ও দাদার এলাকার বেওয়াচ নামের বারগুলো এখন সব ‘অর্কেস্ট্রা বার’। তারা প্রতিটি প্রতি বছর প্রায় ৪ কোটি রুপির বড় ব্যবসা করছে। এর প্রতিটিতে কর্মরত ১৩০ জন মানুষ। তাদের আগে যে ব্যবসা ও কর্মী ছিল তা এখন অর্ধেক হয়ে গেছে। রাতারাতি চাকরি হারিয়েছেন ৬৫ হাজার নারী ও ৪৫ হাজার পুরুষ। তাদের অনেকেই শহর ছেড়ে গেছেন।
‘অর্কেস্ট্রা বার’গুলোতে লাইভ বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। সেটা হয় আইনগতভাবে অথবা চতুরতার সঙ্গে। এসব বার-এ গায়ক বা গায়িকা নয় এমন ব্যক্তিরা লাইভ ব্যান্ডের সঙ্গে অঙ্গ নাচান। গোঁ গোঁ শব্দ করেন। মঞ্চের পাশে নাচতে থাকেন উত্তেজিত ব্যক্তিরা। চলে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা অথবা কোনো গোপন চুক্তি করার চেষ্টা।
সাম্প্রতিক সময়ে মুম্বইয়ের এই বর্ণিল ড্যান্সবারগুলোর শাটার যখন বন্ধ হয়ে যায় তার আগে এটা ছিল মুম্বইয়ের বিনোদন শিল্পের এক অখন্ড অংশ। যাদের বয়স ৭০ এর কোটায় তারা শহরে ড্যান্স বারের আবির্ভাব দেখেছেন। আর নব্বইয়ের কোটায় যারা তারা শহরটি উদারীকরণ হতে দেখেছেন। ১৯৭২ সালে প্রথম ড্যান্স বার সোনিয়া মহল তার দরজা উন্মুক্ত করে। এটি নরিমন পয়েন্টে একটি অফিসের টাওয়ারে ছিল। এর মালিক ছিলেন একজন জগতিয়ানÑ তিনি হার্টের সমস্যাওয়ালা একজন বয়সী ভদ্রলোক। তিনি মাঝে মাঝেই মজা করতেন এ নিয়ে যে, ড্যান্সাররা হলেন তার পেসমেকার। শহরের একেবারের শুরুর ড্যান্সবারটি ডিজাইন করা হয়েছিল গ্লাস ব্যবহার করে। কিন্তু নর্তকীরা উপযুক্ত পরিবেশের অভাব বোধ করতেন। ফলে তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হতো। ড্যান্স বারের ছায়াঘেরা কোণার মধ্যে চুক্তি হতো অথবা চুক্তি ভঙ্গ হতো। ‘ভাই’দের জন্য অপেক্ষায় থাকতেন ‘যুবতীরা’। এসব স্থানে যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাতরা যেতেন না তেমন না। এখানে উল্লেখ্য, দাউদ ইব্রাহিমের ভাই সাবির ও পাঠান গ্যাংদের মধ্যে প্রথম যে সংঘাত শুরু হয়েছিল তা ওই সোনিয়া মহলেই।
জগতিয়ান যে প্রবণতা শুরু করেছিলেন তা সহজেই লুফে নেয় উচ্চাভিলাষী শেঠিরা। তারা প্রচুর অর্থের মালিক ছিলেন। ঘাটকোপারের সুরেশ শেঠি আরো একধাপ এগিয়ে গেলেন। তিনি খুলে দিলেন একটি ক্লাব। নাম দিলেন মেঘরাজ। সেখানে বনি এমের জন্য নাচ করতেন বিকিনি পরা নর্তকীরা। অন্যদিকে মুম্বইয়ের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে বিলাসবহুল সমুদ্র ড্যান্স বার শুরু করেন শেখর শেঠি। এই ড্যান্স বার এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় যে, এর বাইরে একজন পানওয়ালাও এক রাতে ৩০০ পান বিক্রি করতেন। প্রভাদেবীতে সঙ্গম নামে ড্যান্সবারে প্রথম চালু হয় ব্যাটারিচালিত মিনি ফ্যান, যাতে এগুলো দিয়ে ড্যান্সারদের কাছে অর্থ উড়িয়ে আনা যায়। পুলিশও এই বারটিকে খুব পছন্দ করতো।
এই ব্যবসায় কিছুটা ছন্দ পতন ঘঠায় টোপাজ বার অ্যান্ড রেস্তোরাঁ। এটি গ্রান্ট রোডে নোভেলটি সিনেমা হলের কাছে। এই বারটি মারবেল পাথর, গ্লাস ও মিরর ব্যবহার করে সমৃদ্ধশালী হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এখানে ছিল তিনটি ভিআইপি হল। এর একটি ব্যবহার করতে পারতেন সাধারণ মানুষ। যা থেকে প্রতি রাতে গড়ে আয় হতো ৫ লাখ রুপি। এক সময়ে এই বারটি জনপ্রিয় ছিল ডায়মন্ড ব্যবসায়ী, বিদেশী পর্যটক, সফরকারী ক্রিকেটারদের কাছে। সেই বারটি এখন তারপুলিনের শিট ও দোকানপাটে ঢাকা পড়েছে। এখানকার কর্মী সংখ্যা ৭০ থেকে কমে ৩২ এ এসে দাঁড়িয়েছে। 
১৭ই জানুয়ারি সেখানকার একজন কর্মী বলেন, ড্যান্স বার বন্ধ করার রায়ের ফলে আমাদের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টোপাজ কখন আবার তার জীবন ফিরে পাবে তা অনিশ্চিত। আমরা এখন এটা খুলি স্থানীয় সময় বিকাল ৩টায়। আমাদের আছে ১৫ জন সঙ্গীতশিল্পী। তারা রাত সাড়ে ৯টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত গান করেন।
ড্যান্স বারস এসোসিয়েশনের ভারত ঠাকুর বলেন, ভিলে পারলের দীপার মতো অনেক বড় বড় বার বন্ধ হয়ে গেছে। আমার জানামতে, ওই স্থানগুলো ভাড়া দেয়া হয়েছে যোগব্যায়ামের কেন্দ্র হিসেবে। আর মালিকরা চলে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে চলে গেছেন রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায়।
ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ১৭ই জানুয়ারি যে রায় দিয়েছেন তাতে নতুন করে আশা জেগে উঠেছে। তবে বার মালিকরা বলেছেন, রাত সাড়ে এগারটার মধ্যে বার বন্ধ করতে বলা হয়েছে। কোনো আপত্তিকর নাচ করা যাবে না বলে বলা হয়েছে। এসবই অনুৎসাহিত করার মতো বিষয়। ড্যান্স বার কারিশমার মালিক মানজিৎ সিং শেঠি বলেছেন, আমরা দাদার-এ ভাল ব্যবসা করছিলাম। এখন আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান একটি রেস্তোরাঁয় রূপ নিয়েছে। তা দিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি।
ভারত ঠাকুর বলেছেন, যেসব ড্যান্স বারে নর্তকীরা আপত্তিকর নাচ করবেন সেইসব বারের মালিকদের তিন বছরের জেল অনুমোদন করেছেন সুপ্রিম কোর্ট। তার প্রশ্ন, কোন নাচটা আপত্তিকর তা নির্ধারণ করতে পারে কে? এ নিয়ে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই জেলে গিয়ে জীবন কাটানোর চেয়ে আমাদের এ ব্যবসা বন্ধ রাখাই ভাল। 
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি। এদিন নতুন সবেমাত্র নিজেদের দরজা খুলেছে তিনটি ড্যান্স বার। তবে এক বছরের মাথায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওই তিনটি বারই বন্ধ করে দেয় পুলিশ। অনিয়মের অভিযোগে পুলিশ তাদের লাইসেন্স বাতিল করে। পুলিশের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা ১৭ই জানুয়ারি বলেছেন, ওই তিনটি বার-এর কোনোটিকেই এখন পর্যন্ত অনুমোদন দেয়া হয় নি। তাদেরকে নতুন নিয়মের অধীনে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। ওই বারগুলো চাহিদা পূরণ করতে পারে নি। তাই তাদেরকে লাইসেন্স দেয়া হয় নি- বলেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা।

সিরিয়ায় রাতভর ইসরাইলের সামরিক হামলা

সিরিয়ায় ইরানি সেনাদের অবস্থানস্থলের ওপর রোববার দিবাগত রাতভর সামরিক হামলা চালিয়েছে ইসরাইলের সেনাবাহিনী। এ বিষয়ে সোমবার সকালে বিরল এক বিবৃতি দিয়েছে ইসরাইল। এতে বলা হয়েছে, তারা সিরিয়ার দামেস্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে সোমবার দিনের শুরুতেও বিমান হামলা চালায়। তবে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় মিডিয়া বলেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। ইন্টারফ্যাক্স নিউজ এজেন্সি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে উদ্ধৃত করে বলেছে, সিরিয়ার সেনাবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরাইলের ৩০টিরও বেশি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা ধ্বংস করে দিয়েছে। বিমানবন্দরে একটি হামলায় নিহত হয়েছেন সিরিয়ার ৪ জন সেনাসদস্য। আহত হয়েছেন ৬ জন। তবে বৃটেনভিত্তিক পর্যবেক্ষক গ্রুপ সিরিয়ান অবজার্ভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, ওই হামলায় নিহতের সংখ্যা ১১।
সোমবার ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভলিন বলেন, ইসরাইলের ভূমিতে প্রথমে রকেট হামলা চালিয়েছে ইরান। এর জবাবেই গতকালের এ হামলা পরিচালনা করে ইসরাইল।
সোমবার দিনের শুরুতে এক বিবৃতিতে ইসরাইলের সেনাবাহিনী বলেছে, আমরা সিরিয়া ভূখণ্ডে ইরানি কুদস’কে টার্গেট করে হামলা শুরু করেছি। ইসরাইলি বাহিনী বা ভূখণ্ডের ক্ষতি করে এমন বিষয়ে আমরা আগেই সিরিয়ান সশস্ত্র বাহিনীকে সতর্ক করেছি।
উল্লেখ্য, কুদস ফোর্স হলো ইরানের বিপ্লবী গার্ডসের বিদেশি অপারেশনের দায়িত্বে থাকা বাহিনী। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ও তার বাহিনীকে বড় সমর্থনদানকারী দেশের মধ্যে অন্যতম ইরান। ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চল ইলাত থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক হ্যারি ফসেট বলেছেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনী এমন হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। এ ধরনের হামলা খুবই অস্বাভাবিক।
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক থেকে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, রাতের আকাশে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে তাতে দেখা গেছে, শহরের কাছে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে ভূপাতিত করা হয়েছে। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা বলেছে, রোববার রাতে শত্রুদের টার্গেট বানচাল করে দিয়েছে দেশের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তার অনেকগুলোকে ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানানো হয়নি।
রোববার আন্তঃসীমান্তে হামলার পর এ ঘটনা ঘটেছে। সিরিয়া বলেছে, তারা ইসরাইলি বিমানবাহিনীর আক্রমণের জবাব দিয়েছে। ইসরাইল বলেছে, তারা দখলীকৃত গোলান উপত্যকায় ছোড়া রকেট ভূপাতিত করেছে। তবে কোথা থেকে ওই রকেট ছোড়া হয়েছিল সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। গোলানের উত্তরাঞ্চলেই রয়েছে লেবাননের সীমান্ত।

মেয়েদের কুমারিত্ব নিয়ে কলকাতার অধ্যাপকের বক্তব্য নিয়ে যে কারণে বিতর্ক

মেয়েদের কুমারিত্বকে সিল্ড বোটল বা সিল্ড প্যাকেটের সঙ্গে তুলনা করে ফেসবুকে এক পোস্ট দিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছেন কলকাতার এক অধ্যাপক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক কনক সরকার গত রোববার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন মেয়েদের কুমারিত্ব নিয়ে। সেই পোস্ট নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। ফেসবুকেই অধ্যাপককে আক্রমণ করে পাল্টা পোস্ট দেওয়া শুরু হয়। প্রবল সমালোচনার মুখে অধ্যাপক তার বিতর্কিত পোস্টটি ডিলিট করে দিয়েছেন। কি লিখেছিলেন অধ্যাপক? তিনি ফেসবুকে ‘ভার্জিন ব্রাইড-হোয়াই নট?’ (ভ্যালু ওরিয়েন্টেড সোশ্যাল কাউন্সেলিং ফর এডুকেটেড ইউথ) শিরোনামে যে পোস্ট দিয়েছিলেন তাতে বলেছিলেন, কুমারি মেয়ে হচ্ছে ‘সিল্ড বটল’ কিংবা ‘সিল্ড প্যাকেট’-এর মতো। অনেক  ছেলে এখনও বোকা, যারা কুমারি মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করার কথা ভাবে না। এখানেই থেমে থাকেননি ওই অধ্যাপক।
লিখেছিলেন, একটি মেয়ে কুমারিত্ব নিয়ে জন্মায় এবং সেই কুমারি স্ত্রী দেবদূতের মতো। তবে অধ্যাপক সরকার সমালোচনার মুখে অনঢ় থেকেছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের সকলের নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। আমিও সেটাই করেছি। অন্যেরা তা গ্রহণ করবেন কি না, সেটা তাঁদের ব্যাপার। তবে নারীবাদীরা অধ্যাপকের রুচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এমনকি শিক্ষকতা করার যোগ্য কিনা তিনি সেই প্রশ্নও তুলেছেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপারসন লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, এক জন অধ্যাপক কীভাবে এমন কথা বলতে পারেন? তাঁর কাছ থেকে পড়–য়ারা কী শিক্ষা পাচ্ছে? উনি নিজের পরিবারের মহিলাদেরও কি এ ভাবেই দেখেন? যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বলেছেন, আমরা কর্র্তৃপক্ষের কাছে এই ধরণের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাব। অভিযুক্ত অধ্যাপকের সহকর্মীরাও যে পোস্টের সঙ্গে একমত নন তা জানিয়েছেন।  সমাজকর্মী শাশ্বতী ঘোষ বলেছেন, ‘‘সিল্ড বটলের সঙ্গে তুলনা করলে তো উনি বোঝাতে চাইছেন, একটি করে ‘সিল্ড’ বোতল খুলে সেটাকে ব্যবহার করে আবার ফেলে দেওয়া। উনি কি সে-দিকেই সম্পর্কগুলিকে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করছেন? তা হলে তো মানবিক সম্পর্কের কোনও জায়গা নেই।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী থাকতে থাকতে আমরা ক্রমশ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকে পড়েছি -সাক্ষাৎকারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় by সাজ্জাদ শরিফ

কলকাতার জনপ্রিয় সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল এবিসি রেডিওর জন্য, ২০১২–এর ৪ জানুয়ারি। সাক্ষাৎকারে নিজের সাহিত্য ও জীবন সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন খোলামেলা কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সাজ্জাদ শরিফ
সাজ্জাদ শরিফ: আমাদের কলকাতার প্রয়াত কবিবন্ধু জয়দেব বসু লিখেছিল, ১৯৫০-এর দশকের কবিদের মতো আত্মবিজ্ঞাপনে পারদর্শী আর কেউ নন। আপনার প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশ-এর নায়কের নাম সুনীল কেন?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: নতুন ধরনের একটা কিছু করার জন্য। বাংলা ভাষায় লেখকেরা সাধারণত নিজের নাম দেয় না। লেখকেরা নিজেরা জীবনে অনেক রকম কাণ্ড করে, কিন্তু লেখায় সেগুলো গোপন করে যায়। আমি ভাবলাম, লেখার সঙ্গে জীবনের তফাত থাকবে না। প্রথম দিকে যে উপন্যাসগুলো আমি লিখি, সব নিজের জীবনের কথা। চাপে পড়ে যখন অনেক লিখতে আরম্ভ করলাম, তখন দেখলাম, বারবার নিজের জীবন ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে পারা যাবে না। অল্প বয়স থেকে আমার প্রিয় বিষয় হচ্ছে ইতিহাস। ঊনবিংশ শতকের যে সময়টাকে আমাদের এখানে পুনর্জাগরণ বলা হয়ে থাকে, ভাবলাম, সেই সময়টাকে নিয়ে লিখি না কেন? স্বপ্নে দেখলাম, মাইকেল মধুসূদনের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের ঝগড়া হচ্ছে। ভাবলাম, এঁদের জীবন্ত করে লিখলেই তো হয়। এঁদের জীবনী লেখা হয়েছে, কিন্তু এঁদের তো উপন্যাসের চরিত্র করে লেখা হয়নি। সেভাবে সেই সময় উপন্যাসের শুরু।
সাজ্জাদ: আত্মপ্রকাশ উপন্যাসে আপনি লিখেছেন যে উপন্যাসের নায়ক চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছে। বাস্তবেও কি তেমন কিছু করেছিলেন?
সুনীল: হ্যাঁ, চৌরঙ্গীর মোড়ে একদিন দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। তখন ওটাকে সাহেবপাড়া বলা হয়। এ ছাড়া সব বড়লোক সেজেগুঁজে ওই পাড়ায় ঘুরে বেড়াত। আমাদের তো তখন তরুণ বয়স। আড্ডা দিতে, ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছা করে প্রতিদিন। কিন্তু সেসব করতে তো পয়সার প্রয়োজন অনেক। আমাদের ভেতর একজন বলে উঠল, ভিক্ষা করলে কেমন হয়? কথামতোই কাজ শুরু হয়ে গেল। দাঁড়িয়ে পড়লাম রাস্তার মোড়ে হাত পেতে। কিন্তু কেউ দেখি ভিক্ষা দিতে চায় না। সবাই ‘হুড়হুড়’ করে তাড়িয়ে দেয়। তখন আমরা চালাকি করে ইংরেজি বলতে শুরু করলাম। লোকজন তো অবাক। আরে! এ দেখি ইংরেজি বলা ভিখিরি।
সাজ্জাদ: আপনার আগে লেখা উপন্যাসগুলো তরুণদের মন স্পর্শ করেছিল। এখনকার তরুণদের মন কি আপনি বুঝতে পারেন?
সুনীল: যারা সাহিত্য পছন্দ করে, তেমন তরুণ-তরুণীদের কথা আলাদা। সাহিত্যের সেরা রূপটাই ওরা পছন্দ করবে। কিন্তু এখনকার যেসব তরুণ পড়াশোনা করে, চাকরি করে, ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তাদের ভাষা বা মন-মানসিকতা আমি জানি না। এখনকার তরুণেরা তাদের কথার ভেতরে অর্ধেকটা ইংরেজি বলে, হিন্দিও বলে। আমরা এমনটা করতাম না। তাদের যে জীবনযাত্রা, যে মূল্যবোধ, সেটা আমাদের সঙ্গে মেলে না।
সাজ্জাদ: আপনার উপন্যাসে কি সে কারণেই তরুণ-তরুণীদের চরিত্র কমে আসছে?
সুনীল: ওদের ব্যাপার তেমন একটা বুঝি না বলেই সেভাবে আমি কিছু লিখি না। লিখলেও চেষ্টা করি স্মৃতিকাতরতা এনে একটু ইতিহাস মিশিয়ে দিতে।
সাজ্জাদ: আপনার ইতিহাসভিত্তিক পূর্ব-পশ্চিম উপন্যাসটি নিয়ে কিন্তু পাঠকদের মধ্যে সমালোচনা আছে। এর বহু চরিত্রকে আমরা জানি, ঘটনাগুলো দেখেছি। ফলে উপন্যাসের সঙ্গে বাস্তবের যে ব্যবধান, তার অভিজ্ঞতা পাঠককে বিড়ম্বিত করেছে।
সুনীল: খুব বেশি বাস্তববিমুখ কখনো হয়েছি বলে তো মনে পড়ে না। সব সময় চেষ্টা করেছি জীবনের সত্য ঘটনাই উপন্যাসের চরিত্রে ফুটিয়ে তোলার। তবে প্রতিটি পাঠকের কিন্তু ঘটনা বোঝার জন্য আলাদা আলাদা বাঁক রয়েছে। কোন পাঠক কোন উপন্যাসকে কীভাবে চিন্তা করছেন, কী তিনি ভাবছেন—তা বোঝা মুশকিল। আর সেই সময় নিয়ে তো তখন বেশ আইনি জটিলতা হয়েছিল। উপন্যাসটিকে সরকারি পুরস্কার দিতে গিয়েও তারা সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে। কারণ, আমি দেখিয়েছিলাম যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছাত্রজীবনে সমকামী ছিলেন। আমাদের দেশে তো যাঁরা একবার বিখ্যাত হয়ে যান, তাঁদের কোনো দোষ আমাদের চোখে পড়ে না। তাঁরা আমাদের চোখে মহাপুরুষ হয়ে যান। তাঁদের নিয়ে সত্যি কিছু বললেও মানুষ সহ্য করতে পারে না। তবে আমি কখনো এসবের পরোয়া করিনি। আমি তাঁদের সব সময় রক্ত–মাংসের সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছি।
সাজ্জাদ: আপনি আত্মজীবনীমূলক লেখা লিখেছেন অনেক। সেসব পড়ার সময় বারবার মনে হয়েছে, স্পর্শকাতর বিষয়গুলো আপনি এড়িয়ে গেছেন। বাইরের ঘটনার কথা অনেক বললেও নিজের অন্তরঙ্গ কথা কমই বলেছেন। এর কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?
সুনীল: নিজের সব কথা তো আর মানুষকে বলা যায় না। এ জন্যই আত্মজীবনীর নাম দিয়েছিলাম অর্ধেক জীবন। এর মানে এটা নয় যে আমি আমার অর্ধেক জীবনের গল্প বলেছি সেখানে। আমার জীবনের যেসব গল্প মানুষকে বলা যায়, সেগুলোই আমি বলার চেষ্টা করেছি। সব গল্প তো আর মানুষকে বলা যাবে না। আর লেখার সময় আমি ঠিক করেছিলাম, কোনোভাবেই কারও সম্পর্কে খারাপ কোনো মন্তব্য করব না।
সাজ্জাদ: আপনি আপনার প্রেমের কথাও তেমন লেখেননি। আপনার আর মার্গারিটের প্রেমের গল্প যদিও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
সুনীল: বিয়ের পর কি আর কেউ আগের প্রেমের কথা বলবে, বলো? স্বাতীর সঙ্গে যখন আমার বিয়ের আলোচনা চলছিল, তখন আমি ওকে মার্গারিটের কথা বলেছিলাম। তাকে বলেছিলাম, মার্গারিট নামে একটা মেয়ের সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব। একরকম প্রেমই বলা চলে। তখন ও আমাকে বলল, ‘শোনো, বিয়ের আগে যা করেছ করে ফেলেছ। সেটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। বিয়ের পর যেন আর কিছু না শুনতে হয় আমাকে।’
সাজ্জাদ: তাঁর কথা কি রাখতে পেরেছিলেন?
সুনীল: সে কথা তোমায় বলব কেন?
সাজ্জাদ: স্বাতীর সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে হয়েছিল?
সুনীল: আমার লেখা পড়ে ও আমাকে চিঠি লিখত। আমিও চিঠির উত্তর দিতাম। চিঠি থেকেই আমাদের আলাপ শুরু হয়। আমি তখন দমদমে খোলামেলা এক পরিবেশে থাকি। সেখানকার রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। হঠাৎ দেখি গাড়ি করে এক ভদ্রলোক এসেছেন। সঙ্গে বিভিন্ন বয়সের তিন ভদ্রমহিলা। তিনি এসেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনাদের এখানে কৃত্তিবাস কিনতে পাওয়া যায়?’ আমি তো অবাক। আরে, আমি কি এখানে কৃত্তিবাস বিক্রি করি নাকি? ওসব তো স্টলে কিনতে পাওয়া যায়। যা-ই হোক, তাঁরা কী বুঝলেন কে জানে। চলে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটা মেয়ে রহস্যজনকভাবে পেছন ফিরে প্রশ্ন করল, ‘আপনাকে একটা প্রশ্ন করি?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, করুন।’ মেয়েটি ‘আচ্ছা থাক, পরে’ বলে হঠাৎ গাড়িতে উঠে চলে গেল। তার কয়েক মাস পরের কথা। আমি তখন আনন্দবাজার-এ নিয়মিত ফিচার লিখছি। একদিন দেখি তিন ভদ্রমহিলা তাঁদের পরিচিত একজন মানুষের সঙ্গে অফিসে এসেছেন। খবরের কাগজের অফিস দেখতে কেমন হয়, সেটা দেখতে এসেছে আরকি। একজন আমার কাছে তাঁদের নিয়ে এল আলাপ করানোর জন্য। কথা বলতে গিয়ে দেখি, ওই তিন মেয়ের ভেতরে সেই ‘আচ্ছা থাক’ বলা মেয়েটিও আছে। পরে জানতে পেরেছি, সেই মেয়েটিই আমাকে নিয়মিত চিঠি লিখত। তারপর আমার সঙ্গে ওর বিয়ে। ওর বাড়ির লোকের অনেক আপত্তি ছিল। আমি তো চিরকালই বাউন্ডুলে। কখন বাড়ি ফিরি না-ফিরি তার ঠিক থাকে না। তা ছাড়া আমি বাঙাল। ওরা ছিল খাঁটি কলকাতার মানুষ। এখন তো আমরা এত মিলেমিশে গেছি যে আর ভেদ করা যায় না।
সাজ্জাদ: আপনি সব সময় বলে এসেছেন যে আপনার প্রথম প্রেম হলো কবিতা। একসময় ‘ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি’ কবিতায় আপনি লিখেছিলেন, গুজরাটের বন্যার সময় প্রকৃতির বিধ্বংসী রূপ দেখতে গিয়ে তাঁর মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতে পারে, ‘বাহ্​, কী সুন্দর।’ কবিতাটি নিয়ে পরে কিছু হয়েছিল?
সুনীল: না, তা হয়নি। আমি নিজেই একবার হেলিকপ্টারে করে বন্যার সময় গিয়েছিলাম। বন্যাপ্লাবিত এলাকা, কিন্তু হেলিকপ্টার থেকে দেখে মনে হয়েছিল, বাহ্, ওপর থেকে তো বেশ সুন্দর দেখায়। বন্যায় মানুষের যে এত কষ্ট-দুঃখ, সেটা তো আর ওপর থেকে বোঝা যায় না। কী সুন্দর জলের মধ্যে গাছগুলো, ছোট ছোট ঘর মাথা তুলে আছে। তখন ভাবলাম, ইন্দিরা গান্ধীর মতো রাজনীতিবিদেরা তো বন্যা হলে প্রায়ই যান। সেখান থেকে ফিরে পরে তাঁরা বিবৃতিও দেন। আমি ভাবলাম, তিনিও যদি কোনো দিন আমারই মতো করে ভেবে বসেন, বাহ্, কী সুন্দর। এটা ভেবেই আসলে কবিতাটা লেখা। এই কবিতাটা নিয়ে তোমাকে একটা ছোট মজার কথা বলি। ওই কবিতায় এমন একটা লাইন ছিল:
তোমার শুকনো ঠোঁট, কত দিন সেখানে চুম্বনের দাগ পড়েনি,
চোখের নিচে গভীর কালো ক্লান্তি...
‘চুম্বনের দাগ পড়েনি’ বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছি যে তাঁর মেজাজ খুব তিরিক্ষি হয়ে থাকে। এ রকম একটা লাইন দেশের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে ব্যঙ্গ করে লিখে ফেললাম। পরবর্তী সময়ে এই কবিতার ইংরেজি অনুবাদ একটা পত্রিকায় ছাপা হয়। ফলে পত্রিকাটি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। দিল্লির আরেকটা ম্যাগাজিনেও এই কবিতাটার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী তখন একটা লিটল ম্যাগাজিনের প্রদর্শনী উদ্বোধনী করতে গেছেন। সেখানে এক তরুণ তাঁর সামনে গিয়ে হঠাৎ ওই পত্রিকাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম, এটা পড়ুন।’ ইন্দিরা গান্ধী সেটা পড়লেন। পড়ে মন্তব্য করলেন, ‘নটি, ভেরি নটি।’ বলে চলে গেলেন। এমন কিন্তু নয় যে এর জন্য আমাকে শাস্তি দিয়েছিলেন বা কিছু।
সাজ্জাদ: আপনার সঙ্গে কি এরপর আর কখনো দেখা হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর?
সুনীল: দু-তিনবার দেখা হয়েছে। তবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার মতো কিছু নয়।
সাজ্জাদ: একজন সাধারণ সাহিত্যিক হিসেবে আপনার জীবন শুরু হয়েছিল। তারপর অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। শুরুর দিকের জীবন আপনি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে কাটাননি। পরবর্তী সময়ে বড় বড় জায়গায় কাজ করতে গিয়ে নিজের চিন্তার স্বকীয়তা কি আদৌ ধরে রাখতে পেরেছিলেন? নাকি নিজের মধ্যে সব সময় দোদুল্যমান অবস্থায় জীবন কেটেছে?
সুনীল: আজ যদি আমার বয়স ৩২ হতো, তাহলে আমি সাহিত্য একাডেমির এই সভাপতির পদ নিয়ে উপহাস করতাম। কিন্তু প্রতিষ্ঠানবিরোধী থাকতে থাকতে আমরা ক্রমশ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকে পড়েছি। যেমন আমাদের বয়সী অনেককেই চাকরির জন্য, জীবিকার জন্য আনন্দবাজার পত্রিকায় যেতে হয়েছে; প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মেনে কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আসলে অনেক কিছু রোধ করা যায় না। যেমন ধরো, সাহিত্য এডাডেমির সভাপতি আমি হতে চাইনি। এটা তো সারা ভারতবর্ষের জন্য একটাই। সবাই বলে উঠল, অনেক দিন কোনো বাঙালি আসেনি। এই বাঙালির দোহাই দিয়ে তারা আমাকে পদটিতে বসিয়ে দিল। তবে এর ফলে আমি প্রচুর ঘোরাঘুরি করতে পেরেছি। আমাকে ভারতের বিভিন্ন শহরে যেতে হয়। ভারতের বাইরেও সাহিত্যিকদের সঙ্গে দেখা করতে যেতে হয়। একসময় ঘোরাঘুরি খুব ভালো লাগত। এখন আর ভালো লাগে না। আর নিজের লেখালেখিও তো বেশ কমে গেছে। আমি পড়তে খুব ভালোবাসি। এখন তো ঠিকমতো পড়ার সময়ও পাই না।

ইরান-ইসরাইল হামলা, পাল্টা-হামলা

ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত সিরিয়ার গোলান উপত্যকায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। পাল্টা আঘাত হিসেবে সোমবার সিরিয়ায় ইরানি লক্ষ্যবস্তু লক্ষ্য করে একাধারে কয়েকটি বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এ তথ্য দিয়েছে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী। দুই চীর-প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ২৪ ঘণ্টাব্যপী উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গেছে। আরও আঘাত, পাল্টা আঘাতের আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে সিএনএন।
ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোনাথান কনরিকাস বলেছেন, তার দেশের বাহিনী সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের ভেতর ও আশেপাশের ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও অন্তর্ভূক্ত। তার ভাষ্য, রাতভর চালানো এই হামলার লক্ষ্য ছিল গোলাবারুদ ডিপো, গোয়েন্দা চৌকি ও প্রশিক্ষণ শিবির।
দামেস্ক বিমানবন্দরে অবস্থিত ইরানি গুদামেও হামলা চালানো হয়েছে। কনরিকাস জানান, হামলার পর সেখানে ফের বিস্ফোরণ ঘটে। অর্থাৎ গোলাবারুদের বিস্ফোরণ হয়।
হামলা চালানোর সময় ইরানের বিমান-বিধ্বংসী অস্ত্র থেকে গোলা ছোড়া হলে, সেখানেও হামলা চালায় ইসরাইল, এমনটা দাবি করেছেন কনরিকাস। হামলার আগে ইসরাইল সিরিয়াকে বার্তা পাঠায় যে, ইসরাইল শুধু ইরানি বাহিনীকে টার্গেট করছে। সুতরাং, সিরিয়া ইসরাইলি বিমান লক্ষ্য করে যাতে গুলি না করে।
ইসরাইলের এই ব্যাপক হামলার কারণ হলো ইসরাইল দখলকৃত গোলান উপত্যকায় রোববার বিকেলে চালানো মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। কনরিকাসের বক্তব্য, এই ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের তৈরি। এটি ছুঁড়েছেও ইরানি বাহিনী। তিনি যোগ করেন, এবারই প্রথম এত ভারি কোনো গোলা ইসরাইলে ছুড়েছে ইরান। এটি দামেস্কের নিকটবর্তী কোনো এলাকা থেকে ছোড়া হয়। এটি গোলান উপত্যকার ৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। যদিও রাশিয়া এর আগে ইসরাইলকে আশ্বস্ত করেছিল যে, ইরানি বাহিনী ইসরাইলের এত কাছে আসবে না।
এদিকে রাশিয়ার রাষ্ট্র-চালিত সংবাদ সংস্থা রিয়া-নভোস্তি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ইসরাইলের হামলায় ৪ সিরিয়ান সৈন্য নিহত ও ৬ জন আহত হয়েছে।
লন্ডন-ভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস (এসওএইচআর) জানিয়েছে, হামলায় ২ সিরিয়ান নাগরিক সহ ১১ জন নিহত হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, ইসরাইলের চালানো এই হামলা ছিল ২০১৮ সালের মে মাসের পর থেকে ক্ষয়ক্ষতির দিক দিয়ে সিরিয়ান সরকার ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে চালানো সবচেয়ে সহিংস ও তীব্র হামলা। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের মে মাসে ইসরাইলের দিকে কয়েক ডজন রকেট নিক্ষেপের পর সিরিয়ায় ব্যাপক আকারে হামলা চালিয়েছিল ইসরাইল।

এখনো মান্টো

এখনো সরব উপমহাদেশের নন্দিত লেখক সাদত হাসান মান্টো। তাঁর জীবন সম্প্রতি আবার আলোচনায় এসেছে নন্দিতা দাসের মান্টো সিনেমার মাধ্যমে। ভারত ভাগের নির্মম শিকার ক্ষণজন্মা এই কথাসাহিত্যিকের আজ জন্মদিন। তাঁকে নিয়ে আয়োজন।
সাদত হাসান মান্টো (১১ মে ১৯১২—১৮ জানুয়ারি ১৯৫৫)। অলংকরণ: প্র স্টুিডও
সাদত হাসান মান্টোর জন্মদিনে আজ ছাপা হলো তাঁর একগুচ্ছ গল্প এবং তাঁকে নিয়ে একটি লেখা। রক্ত, দাঙ্গা আর অশ্রুর গাথা দিয়ে মোড়ানো এই গল্পগুলো প্রথমবারের মতো অনূদিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। আসছে ফেব্রুয়ারির বইমেলায় জাভেদ হুসেনের অনুবাদে প্রথমা প্রকাশন থেকে বের হচ্ছে মান্টোর গল্পের বই কালো সীমানা । ‘মোমবাতির অশ্রু’ গল্পটি ছাড়া এখানকার সব গল্পই ওই বইয়ের অন্তর্ভুক্ত। গল্পগুলোর অনুবাদসহ এই আয়োজনে মান্টোকে নিয়ে লিখেছেন জাভেদ হুসেন
এ আয়োজনটি অলংকরণ করেছেন সব্যসাচী মিস্ত্রী
মান্টোর বিভীষিকার নন্দনতত্ত্ব
রাষ্ট্র, ধর্মবাদী থেকে প্রগতিশীল—সবাই একযোগে সাদত হাসান মান্টোকে খারিজ করে দিলেও তিনি গল্পকার হিসেবে নিজের অবস্থান জানতেন। মৃত্যুর এক বছর আগে লেখা নিজের এপিটাফে তিনি বলে গেছেন, ‘এখানে সমাধিতলে শুয়ে আছে মান্টো এবং তাঁর বুকে সমাহিত হয়ে আছে গল্প বলার সব কৌশল আর রহস্য।’ কখনো ফতোয়া এসেছে, অশ্লীলতার জন্য মামলা হয়েছে ছয়বার, বন্ধুরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, কিন্তু মান্টোর চারপাশে বয়ে চলা জীবনের প্রতি আকর্ষণ আর তাঁর কলম কেউ থামাতে পারেনি।
বেঁচেছেন মাত্র ৪৩ বছর। কিন্তু লিখে গেছেন কী প্রবল উদ্যমে! ২২টি ছোটগল্পের সংকলন, ১টা উপন্যাস, রেডিও নাটকের ৭টা সংগ্রহ, ৩টা প্রবন্ধ সংকলন আর ২টা চেনা মানুষদের স্মৃতিকথা! তাঁর লেখা সিনেমার চিত্রনাট্যগুলো এক করে ছাপানো হয়েছে বলে জানা যায় না। এগুলোর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ লিখেছেন দুই দানবের জন্য—মদ আর সংসার।
তবে এসবের মধ্যে তিনি ভারত ভাগের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও শুনিয়ে যাচ্ছেন রক্ত হিম করা গল্প। গল্পগুলো শোনাচ্ছেন সেই দেশগুলোতে, যেখানে ইতিহাস হিসাব করে অবহেলা করা হয়, যে দেশগুলোতে বর্তমানের শাসন অনুযায়ী অতীতও পাল্টে যায়। এই ইতিহাস প্রকল্পের সামনে মান্টো একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। বেঁচে থাকতে তিনি যেমন অনেকের কাছে অস্বস্তিকর ছিলেন, মরে গিয়ে ঝাঁজ আরও বেড়েছে। সাময়িক কর্তার খায়েশ অনুযায়ী বদলে যাওয়া ইতিহাসের আসল পাঠ নিতে গেলে মান্টোর তুলনা নেই; বিশেষ করে, যে ইতিহাস এমন অস্বস্তিকর, অনিশ্চিত আর বিপজ্জনক বর্তমান তৈরি করেছে। মান্টো নিজে সে কথা জানতেন।
সে জন্য তখন যা ঘটেছে, মান্টো তাতে কোনো পক্ষাবলম্বন না করে কেবল লিখে রেখে গেছেন। তাতে কোনো তত্ত্ব বিশ্লেষণ নেই, কোনো বেদনাবোধও নেই যেন। মান্টো যেন ১৯৪৭ সালের দাঙ্গার চলমান ছবি তুলে রাখছেন কাগজে আর কলমে! এমন নিস্পৃহ কিন্তু নির্মম কাজ কেন করলেন মান্টো? মানুষের মন আর কদর্যতার বহু মাত্রা তুলে আনতে মান্টোর কোনো জুড়ি নেই। তিনি দেখেছেন যে বর্তমান যখন অতীত হয়, তখন সবকিছু কেমন প্রয়োজনমতো বদলে দেওয়া হয়। তাই কি তিনি কেবল যা ঘটেছে, তার অবিকল ফটোগ্রাফমাত্র রেখে গেছেন, তাতে কোনো পক্ষের, ঘৃণার বা সহমর্মিতার কোনো রং না লাগিয়ে? অতীত যখন পাল্টে যাওয়ার নিরন্তর হুমকির মুখে থাকে, তখন মান্টোর এই ছবি মারাত্মক হয়ে হাজির হতে পারে কারও কারও জন্য।
তিন মেয়ের সঙ্গে সাদত হাসান মান্টো। ছবি: সংগৃহীত
এমন এক মানবিক বিপর্যয়ের পর সিয়াহ হাশিয়ে লেখার সময় মান্টো নিজেই-বা কোথায়, কেমন আছেন? তিনি তখন বোম্বে (মুম্বাই) ছেড়ে লাহোর পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর ভালোবাসার বোম্বের সিনেমাজগৎ, তাঁর বন্ধু আর চেনা মুখগুলো সহসা অচেনা হয়ে যাওয়ার শহর ছেড়ে তিনি যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছেন। লাহোরের সিনেমাজগৎ তখন সবে বুঝতে শুরু করেছে যে তার সামনে বিশাল সম্ভাবনা। কিন্তু তা বাস্তব হয়ে উঠতে অনেক দেরি। মান্টো তত দিনে প্রগতিশীল ঘরানা থেকে ধর্মবাদী আর রাষ্ট্র—সবার সমান চক্ষুশূল। সংসার চালানোর টাকা জোগাড় করা কঠিন হচ্ছে দিন দিন। প্রিয় বন্ধু ইসমত চুগতাইয়ের কাছে তিনটি চিঠিতে মান্টো বলছেন—কোনোভাবে আমাকে ফেরত নিয়ে যাও, এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।
মদের প্রতি আকর্ষণ ছিল আগেও। এই পরবাসে এসে বন্ধু আর সহায়হীন হয়ে তা হয়ে গেল নেশা। বুদ্ধিমান লেখকেরা তখন সরকারের কাছ থেকে বাড়ি, ব্যবসা ইত্যাদি বরাদ্দ নিয়ে নিচ্ছেন। এতটা বাস্তববুদ্ধি মান্টোর কোনোকালেই ছিল না। একমাত্র অবলম্বন পত্রিকায় লিখে রোজগার। তা-ও কি সহজ? কোনো কিছুই তখনো বোঝা যাচ্ছে না। ইংরেজ সরকারের আমলের অশ্লীলতার অভিযোগে করা মামলা নতুন দেশের সরকার উঠিয়ে নেয়নি। আমৃত্যু সেই বোঝা তাঁকে বইতে হয়েছে। তাঁর লেখা ছাপতে পত্রিকার সম্পাদক ভয় পান, কখন পত্রিকা বন্ধের খাঁড়া নেমে আসে, কে জানে!
বিকেল হলেই বেরিয়ে পড়েন মান্টো। পত্রিকা অফিসে গিয়ে নাছোড়বান্দার মতো টাকা চান, পরে লিখে শোধ করে দেবেন। এমন হিসাবে তো পত্রিকা চলে না। সম্পাদক কাগজ-কলম এগিয়ে দিয়ে বলেন—মান্টো সাহেব, কিছু একটা লিখে দিন। মদ আর বাজার খরচের টাকার জন্য দুশ্চিন্তিত লেখক সদ্য দেখা দাঙ্গার গল্প লিখে দেন কাঁপা কাঁপা হাতে। সেই গল্প কখনো কেবল এক লাইন, বেশি হলে পৃষ্ঠা দেড়েক। এভাবে লেখা ৩২টা গল্প নিয়ে ১৯৪৮ সালে বের হয় সিয়াহ হাশিয়ে, মানে কালো সীমানা। এই নাম দ্ব্যর্থবোধক। এক অর্থে কালো সীমান্ত, নতুন দেশের বর্ডার, মান্টো যাকে কালোই বলতেন; আরেক অর্থ হলো, পত্রিকায় কোনো শোকসংবাদ বা দুঃখের সংবাদ যে কালো বর্ডারে ছাপা হয়, সেই কালো সীমানা।
এই বই মান্টো আর প্রগতিশীল লেখক সংঘের মধ্যে বিচ্ছেদেরও কারণ হলো। মান্টো এই বইয়ের ভূমিকা লিখতে দিলেন হাসান আসকারিকে। আসকারি নতুন পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে দায়িত্ব পেয়েছিলেন নতুন রাষ্ট্রের পরিচয় কী হবে, সে ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়ার। তিনি ছিলেন লেখক সংঘের সাহিত্য দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী। লেখক সংঘের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সরদার জাফরি, আহমদ নাদিম কাসমি মান্টোকে অনুরোধ করলেন আসকারিকে দিয়ে ভূমিকা না লেখাতে। মান্টো চুপ রইলেন। আসকারির ভূমিকাসহই বই বের হলো। প্রগতিশীল লেখক সংঘের সঙ্গে মান্টোর বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়ে গেল। মান্টো বন্ধুহীন হয়ে পড়লেন। বন্ধু বলতে রইল তারা, যারা তাঁকে সস্তা মদ জোগাড় করে দেয়, যারা তাঁর মৃত্যু এগিয়ে নিয়ে এসেছিল।
দেশভাগের প্রতিদিনের বাস্তবতা, তার আতঙ্ক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে ছাপিয়ে আমাদের আজকের চেতনা আর অবচেতনায় সমানভাবে হানা দেয়। সমকালে রামুতে পোড়া মন্দিরের ছাইয়ের মধ্যে স্মিত হাসির বুদ্ধ, গুজরাটের দাঙ্গা, পাকিস্তানের শিয়া মহল্লায় নির্বিচার আগুন বা খ্রিষ্টানদের প্রার্থনার সময় নির্বিচার গুলিবর্ষণ মান্টোকে বারবার ফিরিয়ে আনে। কিন্তু তিনি আজ সহজে কোনো শরীর খুঁজে পান না, যে শরীর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার সাহস রাখবে।প্রথমা প্রকািশতব্য বইয়ের প্রচ্ছদ
মান্টোর একগুচ্ছ গল্প
জবাই আর কোপ
‘আমি লোকটার গলায় ছুরি ধরলাম, ধীরে ধীরে পোচ দিয়ে জবাই করলাম।’
‘এ তুই কী করলি!’
‘কেন?’
‘জবাই করলি কেন?’
‘এভাবেই তো মজা!’
‘মজার বাচ্চা, তুই কোপ দিয়ে মারলি না কেন? এইভাবে...’
আর জবাই করনেওয়ালার গলা এক কোপে আলাদা হয়ে গেল।
জেলি
ভোর ছয়টার সময় পেট্রলপাম্পের কাছে ঠেলাগাড়িতে বরফ ফেরিওয়ালার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। সাতটা পর্যন্ত লাশ পড়ে রইল রাস্তায়। ঠেলা থেকে বরফ গলে গলে পানি হয়ে পড়তে থাকল।
সোয়া সাতটা বাজলে পর পুলিশ লাশ উঠিয়ে নিয়ে গেল। বরফ আর রক্ত সেই রাস্তায়ই পড়ে থাকল।
পাশ দিয়ে একটা টাঙ্গা চলে গেল। তাতে বসা ছোট একটা বাচ্চা রাস্তায় জমে থাকা উজ্জ্বল থকথকে রক্তের দিকে তাকাল। ওর জিভে জল এসে পড়ল। সে তার মায়ের হাত টেনে আঙুল দিয়ে সে দিকে দেখিয়ে বলল, ‘দেখ মা, জেলি!’
যথাযথ পদক্ষেপ
যখন মহল্লায় হামলা হলো, কিছু কম বুদ্ধির লোক মারা পড়ল। যারা বাকি ছিল, তারা প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে বাঁচল। একজন লোক আর তার বউ নিজের ঘরের তলকুঠুরিতে গিয়ে লুকিয়ে রইল।
খুনিরা কখন আসে—দুই দিন দুই রাত মিয়া-বিবি এই ভয়ে দমবন্ধ করে কাটিয়ে দিল। কিন্তু কেউ এল না।
কেটে গেল আরও দুই দিন। কমতে লাগল মৃত্যুর ভয়। খিদে আর পিপাসার কষ্ট তার চেয়েও বেশি হতে লাগল।
আরও চার দিন কেটে গেল। জীবন-মৃত্যু নিয়ে আর কোনো আগ্রহ রইল না মিয়া-বিবির। তাদের আশ্রয় ছেড়ে বের হয়ে এল দুজন।
মিয়া খুব দুর্বল কণ্ঠে বাইরে থাকা লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, ‘আমরা নিজেই ধরা দিচ্ছি ...আমাদের মেরে ফেলো।’
যার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো, সেই লোক চিন্তায় পড়ে গেল, ‘আমাদের ধর্মে তো জীবহত্যা পাপ।’
এরা সবাই ছিল জৈন। তাই তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে যথাযথ পদক্ষেপের জন্য মিয়া-বিবিকে পাশের মহল্লার লোকদের হাতে তুলে দিল।
মোমবাতির অশ্রু
ভাঙা দেয়ালের ওপর বানানো নোংরা তাকের ওপর মোমবাতি সারা রাত কেঁদে কাটায়।
মোম গলে কামরার ভেজা মেঝেতে ঠান্ডায় কুঁকড়ে যাওয়া আবছা বিন্দুর মতো ছড়িয়ে পড়ে। ছোট্ট লাজো মুক্তার মালার জন্য জেদ ধরে কাঁদা শুরু করল। ওর মা মোমবাতির জমে যাওয়া অশ্রুগুলো একটা সুতোয় গেঁথে মালা বানিয়ে দিল। ছোট্ট লাজো সেই মালা পরেই খুশি। হাততালি দিয়ে সে নাচতে নাচতে বাইরে চলে গেল।
রাত এল...নতুন মোমবাতি জ্বলল ধুলোভরা তাকের ওপর। কামরার অন্ধকার দেখে অবাক হয়ে চমকে উঠল একচক্ষু মোমবাতি। তবে সে সামলে নিল একটু পরেই। তারপর ঘরের নীরবতার সঙ্গে এক হয়ে দেখা শুরু করল নিজের চারপাশ।
ছোট্ট লাজো ঘুমাচ্ছিল একটা ছোট চৌকির ওপরে। স্বপ্নে সে বান্ধবী বিন্দুর সঙ্গে ঝগড়া করছিল। বিন্দুর পুতুলের সঙ্গে তার মেয়েকে কোনোভাবেই বিয়ে দেবে না সে। কারণ পুতুলটি দেখতে বিশ্রী।
লাজোর মা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিস্তব্ধ আধো অন্ধকার রাস্তায় ফেলে রাখা আবর্জনার দিকে কী আশায় যেন তাকিয়ে ছিল। সামনে বন্ধ শুড়িখানার বাইরে একটা চুলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ছিল জেদি শিশুর মতো কয়লার স্ফুলিঙ্গ।
ঢং ঢং করে বারোটা বাজল ঘণ্টাঘরে। বারোটা বাজার শেষ ঘণ্টার আর্তনাদ ডিসেম্বরের ঠান্ডা রাতে কিছুক্ষণ কেঁপে আবার নৈঃশব্দ্যের কাঁথা গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তার আগে সে লাজোর মায়ের কানেও গুনগুন করে শুনিয়ে গেল ঘুমের সুন্দর বার্তা। কিন্তু সেই গুনগুনের অন্তরা তার মনে অন্য কোনো কথা শুনিয়ে দিয়েছিল।
হঠাৎ করে শীতল হাওয়ার ঝাপটায় নূপুরের মৃদু ঝনঝন শব্দ ওর কানে এল। সে কান পাতল সেই আওয়াজ ভালো করে শোনার জন্য।
রাতের নীরবতায় নূপুরের শব্দ বাজছিল যেন কোনো মূমূর্ষু মানুষের গলায় আটকে যাওয়া শেষনিশ্বাস। শান্ত হয়ে বসে পড়ল লাজোর মা । বাইরে রাস্তায় ক্লান্ত ঘোড়ার শ্বাস রাতের নীরবতায় কেমন শিহরণ জাগিয়ে তুলছিল। একটা টাঙ্গা এসে দাঁড়াল গ্যাসবাতির খাম্বার কাছে। টাঙ্গাওয়ালা নিচে নামল। ঘোড়ার পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে সে জানালার দিকে তাকাল। জানালার পর্দা ছিল ওঠানো। একটা আবছা ছায়াও লটকে ছিল দেয়ালের গায়ে।
নিজের মোটা কর্কশ কম্বল ভালো করে গায়ে জড়িয়ে টাঙ্গাওয়ালা নিজের পকেটে হাত ঢোকাল। সাড়ে তিন টাকা ভাড়া পেয়েছে। এর থেকে এক টাকা চার আনা সে নিজের কাছে রাখল। বাকি টাকা রেখে দিল টাঙ্গার গদির নিচে। এবার সে এগোল সিঁড়ির দিকে।
লাজোর মা চান্দো দরজা খুলে দিল।
মাধব টাঙ্গাওয়ালা ভেতরে ঢুকে দরজার শিকল টেনে দিয়ে চান্দোকে জড়িয়ে ধরল। ‘ভগবান জানে, আমি তোকে কত ভালোবাসি...যৌবনকালে তোর দেখা পেলে এই টাঙ্গা ঘোড়া সব বেচতে হতো!’ এই বলে সে চান্দোর হাতে এক টাকা গুঁজে দিল।
চান্দো জিজ্ঞেস করল, ‘বাস, এই?’
‘এই ধর, আরও দিলাম’, মাধব এবার রূপোর চার আনা ওর দ্বিতীয় হাতে রাখল। ‘কসম, এই ছিল আমার কাছে।’
রাতের ঠান্ডায় বাজারে দাঁড়িয়ে ঘোড়া কাঁপছিল। আগের মতোই ঝিমাচ্ছিল গ্যাসবাতির খাম্বা।
মাধব বেহুঁশ পড়ে ছিল সামনে ভাঙা চৌকিতে। তার পাশেই চান্দো চোখ খুলে শুয়ে। দেখছিল মোম গলে গলে ভেজা মেঝেতে পড়ে ছোট ছোট মুক্তোর বিন্দুর মতো জমছে। হঠাৎ করে সে পাগলের মতো উঠে বসে পড়ল লাজোর চৌকির কাছে গিয়ে। ঘুমন্ত লাজোর গলায় মোমের বিন্দু নিশ্বাসের সঙ্গে দুলছিল। চান্দোর ঝাপসা চোখে মনে হলো যেন মোমবাতির এই জমে যাওয়া বিন্দুগুলোতে তার লাজোর অনাগত যৌবনের অশ্রু লুকিয়ে বাসা বেঁধেছে। তার কাঁপা কাঁপা হাত এগিয়ে লাজোর গলার মালা ছিঁড়ে ফেলল।
গলে শেষ হওয়া মোমবাতি থেকে জ্বলন্ত সুতো পিছলে নিচে পড়ে মেঝেকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘরে নিস্তব্ধতার সঙ্গে নেমে এল অন্ধকারও।
খবরদার
দাঙ্গাকারীরা বড় কষ্টে বাড়ির মালিককে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এল। কাপড় থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে সে উঠে দাঁড়াল। তারপর দাঙ্গাবাজদের সাবধান করে দিয়ে বলল, ‘চাইলে আমাকে মেরে ফেলো, কিন্তু খবরদার আমার টাকাপয়সায় হাত দেবে না!’
একেবারে ছুটি
 ‘ধর...ধর...পালাতে না পারে!’
একটু ছোটাছুটির পর শিকার ধরা পড়ল। বর্শা দিয়ে তাকে এ ফোঁড়-ও ফোঁড় করতে একজন এগিয়ে গেল। কাঁপা কাঁপা গলায় ধরা পড়া মানুষটা মিনতি করে বলল, ‘আমাকে মেরো না, আমাকে মেরো না...আমি ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি।’
চ্যালেঞ্জ
আগুন লাগল যখন, সারা মহল্লা জ্বলে ছাই হলো...কেবল একটা দোকান বেঁচে গেল, সেই দোকানের ওপরে সাইনবোর্ডে এই তখনো পড়া যাচ্ছিল...‘এখানে বাড়ি বানানোর মাল-সামান পাওয়া যায়।’
জুতো
জটলা দিক বদলে স্যার গঙ্গারামের মূর্তির দিকে রওনা হলো। মূর্তির ওপর লাঠির বাড়ি পড়ল, ইট ছোড়া হলো। একজন গিয়ে মূর্তির মুখে আলকাতরা মেখে দিল। আরেকজন অনেকগুলো পুরোনো ছেঁড়া জুতো জমা করে মালা বানিয়ে মূর্তির গলায় পরানোর জন্য সামনে এগোল। কিন্তু এর মধ্যে এসে পড়ল পুলিশ। গুলি চালানো শুরু হলো।
জুতোর মালা বানানেওয়ালা জখম হলো। চিকিৎসার জন্য তাকে ‘স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালে’ পাঠানো হলো।
গল্পের সূত্র: ‘মোমবাতির অশ্রু’ গল্পটি ১৯৪১ সালে লাহোরের প্রকাশনা সংস্থা ‘মাকতবায়ে উর্দু’ প্রকাশিত মান্টো কে আফসানে বা মান্টোর গল্প থেকে অনূদিত। আর ‘জেলি’, ‘জবাই আর কোপ’, ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘যথাযথ পদক্ষেপ’, ‘একেবারে ছুটি’, ‘খবরদার’ ও ‘জুতো’—এই সাতটি গল্প অনুবাদ করা হয়েছে সিয়াহ হাশিয়ে বা কালো সীমানা থেকে। এ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫২ সালে, লাহোরেরর ‘মাকতাবায়ে জাদিদ’ থেকে।

ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ by মাসুদ মিলাদ

  • • জাহাজ নির্মাণশিল্প রক্ষায় দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাংকঋণ পরিশোধের সুযোগ করে দিয়েছে সরকার।
  • • ঋণের সুদের ওপর ৪ শতাংশ হারে ভর্তুকি দেওয়া হবে।
  • • ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
ইউরোপের আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে জাহাজ নির্মাণশিল্পে মন্দা শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে। একটানা পাঁচ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল এ খাত। ২০১৭ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে মন্দা কাটতে শুরু করলেও বাংলাদেশে রপ্তানি খাতে গতি ফেরেনি। এর বড় কারণ ঋণের জালে আটকে পড়েছিল দেশীয় রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো। ঠিক এমন সময়ে আটকে থাকা ঋণ দীর্ঘ মেয়াদে পরিশোধের সুযোগ দিয়ে এ খাতকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের হিসাবে, গত বছরের জুন পর্যন্ত ২৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জাহাজ নির্মাণশিল্পের অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ পরিশোধের চাপে জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কার্যাদেশ নিতেও হিমশিম খাচ্ছিল। দেশে ব্যবহারের ছোট জাহাজ নির্মাণ করে এবং কর্মী ছাঁটাই করে খরচ কমিয়েও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি প্রতিষ্ঠানগুলো।
এ শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য সুখবর হয়ে আসে সরকারি নীতি ও আর্থিক সহায়তা। তিন বছর কোনো ডাউনপেমেন্ট পরিশোধ ছাড়া এবং ১০ বছর মেয়াদে (ত্রৈমাসিক কিস্তিতে) ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থ মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সব তফসিলি ব্যাংককে এ সিদ্ধান্ত অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। গত জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ধাপে ধাপে বেশির ভাগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। আবার এ খাতে নেওয়া ঋণের সুদের ওপর ৪ শতাংশ হারে ভর্তুকি দেওয়ারও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। সুদের ওপর ভর্তুকি প্রদান কার্যকর হলে এই শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করেন উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশের আগে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জাহাজ নির্মাণশিল্প সুরক্ষা দিতে নানা পদক্ষেপ নেয়। যেমন ভারত সরকার ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জাহাজের রপ্তানি মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা অনুমোদন করেছে। চীনের উদ্যোক্তারা স্বল্প সুদে ঋণের পাশাপাশি নিজেদের কাঁচামাল ব্যবহারে ভর্তুকি পাচ্ছে। মন্দা থেকে এই ভারী শিল্প খাতকে সুরক্ষা দিতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয় দেশগুলোতে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক খবিরুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি উদ্যোগ খুবই আশাব্যঞ্জক। তবে নীতি সহায়তার পাশাপাশি জাহাজ নির্মাণশিল্পকে এগিয়ে নিতে আলাদা সংস্থা গঠন করা উচিত। তাহলে এই খাতের সমস্যা সময়মতো গুরুত্ব দিয়ে দেখা সম্ভব হবে। এখন হয়তো এক-দুটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি করছে। জাহাজ নির্মাণে সক্ষমতা থাকার পরও এই খাত যেন এক-দুটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটি দেখতে হবে।
জাহাজ নির্মাণ খাতের সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশে এমন সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যখন বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণ খাতে প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের রিভিউ অব মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটানা পাঁচ বছর শ্লথগতির পর ২০১৭ সালে জাহাজ নির্মাণশিল্পে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে গ্যাস পরিবহনকারী জাহাজে। বিশেষায়িত এই জাহাজের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের বেশি। প্রবৃদ্ধিতে এর পরেই রয়েছে জ্বালানি তেল পরিবহনকারী জাহাজ।
জাহাজ নির্মাণে মান তদারককারী সংস্থা ফ্রান্সভিত্তিক ব্যুরো ভেরিতাসের বাংলাদেশের প্রধান কর্মকর্তা মো. হারুনর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, মন্দার পর ২০১৭ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে জাহাজ নির্মাণশিল্পে ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।
রপ্তানিমুখী জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড শিপ বিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশের (এইওএসআইবি) তথ্যানুযায়ী, দেশে রপ্তানিযোগ্য জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ১০টি। গত ১০ বছরে ১৭ কোটি ডলারের ৪০টি জাহাজ রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে ১১ কোটি ডলারের জাহাজ রপ্তানি হয় মন্দার আগে। বিশ্বের ১২টি দেশে এসব জাহাজ রপ্তানি করেছে তারা।
উত্থান-পতন
এ খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে জাহাজ রপ্তানি শুরু হয় ২০০৮ সালে। ঢাকার আনন্দ শিপইয়ার্ড ডেনমার্কে এমভি স্টেলা মরিস নামের ছোট আকারের একটি জাহাজ রপ্তানি করে। এর পরেই যুক্ত হয় চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। তারা জার্মানির গ্রোনা শিপিং কোম্পানির কাছ থেকে ৮৫ মিলিয়ন ডলারের আটটি জাহাজ নির্মাণের কার্যাদেশ পায়। এ দুটি প্রতিষ্ঠান যখন জাহাজ রপ্তানিতে যুক্ত হয়, তখন জাহাজ নির্মাণের বিশ্ববাজার ছিল চাঙা। রপ্তানির বাজার ধরতে তখন এগিয়ে আসে দেশীয় আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। শুধু ২০০৮ সালে ৫০টি জাহাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি পায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।
তবে পাঁচ বছরের মাথায় ইউরোপে আর্থিক সংকট শুরু হয়ে যায়। বাংলাদেশে উঠতি শিল্পটি বৈশ্বিক মন্দার কারণে আক্রান্ত হয়। কারণ, এই শিল্পে বড় রপ্তানি আদেশ আসত ইউরোপের দেশগুলো থেকে। আর্থিক সংকটের কারণে এ সময় ইউরোপের ব্যাংকগুলো জাহাজ নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়। ফলে ইউরোপের আমদানিকারকেরা বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও তাদের অনেক রপ্তানি আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হয়।
তবে রপ্তানি–বাণিজ্যের এ ধাক্কা সামাল দিতে রপ্তানিমুখী জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বাজারের জন্য জাহাজ নির্মাণে ঝুঁকে পড়ে। কর্মী ছাঁটাই করে খরচ কমিয়ে আনে। পাশাপাশি ইউরোপের বাজারের বদলে আফ্রিকার বাজার ধরার চেষ্টা করে তারা। মধ্যপ্রাচ্যের জাহাজ রপ্তানির বাজারেও প্রবেশ করে। এ সময় চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে জাহাজ রপ্তানির বেশ কিছু কার্যাদেশ পায়। এরপরও ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি কেউ। তবে সরকারি নীতি সহায়তায় এই খাত এখন ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।
জানতে চাইলে এইওএসআইবির সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি উদ্যোগের কারণে এই শিল্পের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপ থেকেও এখন রপ্তানি আদেশ আসা শুরু হয়েছে। প্রায় ৮০০ কোটি টাকার চারটি বিশেষায়িত জাহাজের রপ্তানি আদেশ পাওয়ার কথা জানিয়ে এ উদ্যোক্তা বলেন, এখন রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পর জাহাজ নির্মাণের জন্য ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল’ দরকার। ব্যাংকগুলো এগিয়ে এলে নতুন নতুন রপ্তানি আদেশ পেতে সমস্যা হবে না।

গরু-ছাগলে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ by ইফতেখার মাহমুদ

  • দেশে প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে গবাদিপশুর খামার বাড়ছে।
  • ছোট-বড় মিলিয়ে এখন খামারের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।
  • তিন বছরে দেশে গরু-ছাগলের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০ লাখ।
সংকট থেকে যে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে, তার বড় উদাহরণ বাংলাদেশের গবাদিপশু খাত। চার বছর আগেও দেশের চাহিদার বড় অংশ মিটত প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করে। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ করে দেয়। এতেই বাজারের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশে গবাদিপশুর লালনপালন ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। গরু ও ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।
শুধু কোরবানি ঈদের আগে দেশে ২০ থেকে ২২ লাখ গরু-ছাগল বৈধ-অবৈধ পথে বাংলাদেশে আসত। সারা বছরে এই সংখ্যা ৩০ লাখে ছুঁয়ে যেত। ভারত থেকে গবাদিপশু আসা বন্ধ হওয়ার পর দেশে প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে গবাদিপশুর খামার বাড়ছে। ছোট–বড় মিলিয়ে এখন খামারের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। গত তিন বছরে দেশে গরু-ছাগলের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০ লাখ। পাশাপাশি মহিষের উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
চার বছর আগেও শুধু কোরবানির ঈদের সময় প্রায় ২২ লাখ গরু-ছাগল ভারত ও মিয়ানমার থেকে এসেছিল। গত ঈদে এসেছিল মাত্র দেড় লাখ। গত তিন বছরে চিত্র এমনই পাল্টেছে যে গত কোরবানির ঈদের হাটে প্রায় ১২ লাখ গরু-ছাগল অবিক্রীত ছিল।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেখতে পেয়েছি, গবাদিপশু পালনে দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন হয়। একই সঙ্গে দেশের মাংসের চাহিদা মেটে, বিদেশি মুদ্রার সাশ্রয় হয়। ফলে গবাদিপশুর সংখ্যা বৃদ্ধি সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি, বিশেষত গ্রামীণ অর্থনীতিকে বদলে দিচ্ছে।’
গরু-ছাগলের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে স্বাভাবিকভাবে এ খাতে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থানেরও উন্নতি হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছাগলের সংখ্যা, মাংস ও দুধ উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সূচকে ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে। এই খাতে শীর্ষে রয়েছে ভারত ও চীন। বাংলাদেশ ছাগলের দুধ উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়। আর ছাগলের সংখ্যা ও মাংস উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। সামগ্রিকভাবে ছাগল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ হচ্ছে ভারত ও চীন। আর গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া মিলিয়ে গবাদিপশু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের ১২তম।
শুধু উৎপাদনের দিক থেকেই নয়, গবাদিপশুর জাতগত বৈচিত্র্যের দিক থেকেও বাংলাদেশকে বেশ সমৃদ্ধিশালী দেশ বলছে এফএওসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ২০১৫ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বের অন্যতম সেরা জাত। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের যমুনাপারি ছাগলকে বিশ্বের অন্যতম সেরা জাত হিসেবে মনে করছে সংস্থা দুটি।
পিকেএসএফের সহায়তায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে ছাগল লালনপালন নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংস্থা ওয়েব ফাউন্ডেশন। তাদের হিসাবে, শুধু চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও রাজশাহীতে ২০ হাজার খামারে প্রায় ৫০ লাখ ছাগল লালনপালন করা হচ্ছে। এসব ছাগলের অধিকাংশই বাংলাদেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের। পিকেএসএফের অর্থায়নে চলতি বছর গরু লালনপালন করা হয়েছে ১০ লাখ। যেগুলোর আবার বিমাও করা হয়।
গরু আমদানি কমে যাওয়ায় দেশি জাতের গরুর খামার করার হার বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কোরবানি ঈদে দেশি গরুর বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় এবং ভালো দাম পাওয়ায় এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বাংলাদেশের গবাদিপশুর জাতগত বৈচিত্র্য নিয়ে একটি গবেষণা করছেন। তাতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের গরুর চারটি জাত বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উন্নত জাত। চট্টগ্রামের লাল গরু, পাবনা গরু, উত্তরবঙ্গের ধূসর গরু ও মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিমের গরুর মাংসের মান ও স্বাদ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সেরা।
জানতে চাইলে ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের গরু-ছাগল ছাড়াও ভেড়া, ঘোড়া ও মহিষের অনেকগুলো ভালো জাত আছে। সেগুলো থেকে উন্নত মানের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব। বিদেশ থেকে গরু আমদানি বন্ধ হওয়াকে ইতিবাচক বর্ণনা করে তিনি বলেন, দেশে নতুন নতুন গরুর খামার গড়ে উঠছে। সেখানে দেশি জাতের গরু-ছাগল পালিত হচ্ছে। এতে একই সঙ্গে দেশি জাতগুলো রক্ষা পাচ্ছে এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসায় গরু–ছাগল লালনপালন, বিশেষ করে কেনাবেচায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে গেছে। লালনপালনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে এই খাতে অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পিকেএসএফ।
এ বছর শুধু পিকেএসএফের মাধ্যমে উৎপাদন হওয়া ১০ লাখ গরুর মধ্যে ৬ লাখ গরু বিক্রি হচ্ছে অনলাইন, সরাসরি খামার থেকে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে দুই লাখ গরু।
বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ইমরান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের উচিত বিদেশ থেকে গরু আমদানি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। আর দেশি জাত উন্নয়নের গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো। তাহলে দেশি জাত দিয়েই আমরা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব।’

যেমন ছিল নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক: সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

টানা তৃতীয় মেয়াদের সরকার। নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক। মন্ত্রীদের বেশিরভাগই নতুন মুখ। তাদের দিকনির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশবাসীর জন্য কাজ করার পরামর্শের পাশাপাশি বিতর্কমুক্ত থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। বিত্ত-বৈভবের পেছনে না ছুটে মানুষের জন্য কাজ করার কথা বলেছেন। ন্যায়-নীতিহীন কাজে আখেরে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে- এমন কড়া বার্তা দিয়েছেন মন্ত্রীদের। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন মন্ত্রীরাও তাদের নিজ নিজ পরিচয় তুলে ধরার পাশাপাশি নিজেদের অঙ্গীকার ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী নতুন মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেন, অনেক বড় পরিবর্তন এনে নতুন মন্ত্রিসভা করেছি। নতুনদের স্থান দিয়েছি। আপনাদের ওপর যে আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে মন্ত্রিসভায় এনেছি, আশা করি, আপনারা সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে প্রমাণ করবেন যে, আপনাদের ওপর আমার আস্থা ও বিশ্বাস সঠিক ছিল।
যদি সেটা না করতে পারেন তবে আমার উদ্দেশ্য সফল হবে না। অনেকে নানা কথা বলবে, শুনতে হবে, অনভিজ্ঞদের নিয়ে আসার কারণে এটা হয়েছে। এ কারণে আপনারা সততা রেখে চলবেন। বিত্ত-বৈভব অনেক করতে পারবেন। কিন্তু সেটা করতে গেলে পচে যাবেন। বৈঠকের শুরুতে টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। ফুলেল শুভেচ্ছার পর মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। নিজেদের পরিচয় দেয়ার পাশাপাশি আগামীতে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত বক্তব্য দেন। বিভিন্ন এজেন্ডার মাঝখানে অনানুষ্ঠানিক কথা বলেন। বৈঠকে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শ. ম. রেজাউল করিম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়াকে ঘিরে বঙ্গবন্ধুর নামে মডেল সিটি করার প্রস্তাব করেন। এ প্রস্তাবের স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে শ. ম. রেজাউল করিম বলেন, বিশ্বের ২০টির মতো দেশের স্বাধীনতার নায়ক এবং জাতীয় নেতা, যার নেতৃত্বে ওসব দেশ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেসব দেশে তাদের নেতার নামে সিটি আছে। ভিয়েতনামে হো চি মিনের নামে হো চি মিন সিটি, যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ওয়াশিংটনের নামে ওয়াশিংটন সিটিসহ অনেক দেশেই জাতির পিতার নামে সিটি আছে। এরপর ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ চট্টগ্রামে নির্মাণাধীন কর্ণফুলী টানেল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামকরণের প্রস্তাব করেন।
দেশের জন্য বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এমনটা করার প্রস্তাব দেন তিনি। এদিকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাজ ফেলে না রেখে তা দ্রুত করতে মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের নির্দেশ দেন। বৈঠকের বিষয়ে সচিবালয়ে ফিরে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। প্রথম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার সদস্যদের উদ্দেশ্যে কী বলেছেন- জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী বরাবর যে কথাগুলো বলে আসছেন, সেগুলোই বলেছেন। প্রথম হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। সব জায়গায় সুশাসন কায়েম করা। সততা ও দক্ষতা- এগুলোর সঙ্গে কাজ করা। জনবান্ধব জনপ্রশাসন তৈরি করা; মানে কাজ ফেলে রাখা যাবে না, দ্রুত শেষ করতে হবে। শফিউল আলম বলেন, বাংলাদেশকে একচল্লিশের (২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তর) জায়গায় নিয়ে যেতে হলে আমাদের স্পিডে কাজ করতে হবে।
মন্ত্রিসভার সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আপনারা নিশ্চয়ই পড়েছেন, আমার দাদা তাকে যে কথাটা বলেছিলেন; যে কাজই করো না কেন, সিনসিয়ারিটি অব পারপাস অ্যান্ড অনেস্টি অব পারপাস। আমি মনে করি এই দুটি কথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মন্ত্রিপরিষদ এ কথাটি মনে রেখে যে কাজই করবে, নিষ্ঠার সঙ্গে ও সততার সঙ্গে কাজ করবে। প্রতিটি কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করতে হবে- এ কথাটি মনে রাখতে হবে। জনগণের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব, কর্তব্য রয়েছে- সেটা পালন করতেই আমরা এখানে এসেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সততার শক্তি অপরিসীম, সেটা আমরা বারবার প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। তাহলেই আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে এবং যে অগ্রযাত্রা আমরা শুরু করেছি সেটা আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বৈঠকের শুরুতে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের স্মৃতিচারণে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকের প্রথম এজেন্ডা হিসেবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আজ আমাদের মাঝে নেই, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আশরাফকে ছোটবেলা থেকেই আমি চিনি, কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। সে ছাত্রলীগ করতো। আমাদের মধ্যে একটা পারিবারিক সম্পর্কের মতোই ছিল। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর প্রবাসে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করা এবং পরে দেশে এসে সৈয়দ আশরাফের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট যে ভাষণ দেবেন, তার খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে বছরের শুরুতে যে সংসদ বসে সেটাতে এবং সরকার গঠনের পর প্রথম বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ভাষণ দেবেন। সেটা মন্ত্রিসভা ঠিক করে দেয় এবং তিনি চূড়ান্ত অনুমোদন দিলে সেটা সংসদে পাঠ করা হয়। তিনি বলেন, মূল ভাষণে ৭৫ হাজার শব্দ থাকছে। সংক্ষিপ্ত ভাষণে প্রায় ছয় হাজার শব্দ রাখা হয়েছে। বড় ভাষণটি টেবিলে দেয়া থাকবে। মূল ভাষণের একটি ইংরেজি সংস্করণও তৈরি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর গত ৭ই জানুয়ারি চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ  নেন শেখ হাসিনা। ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং তিনজন উপমন্ত্রীকে নিয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠন করেন তিনি।

মামলার প্রস্তুতিতে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা by কাফি কামাল

ভোট জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা। নির্বাচনের পরপরই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর এ প্ল্যাটফরম। এই দাবিতে নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দেয়ার পাশাপাশি কূটনীতিকদের কাছে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনের দিন ও আগে-পরে সংঘটিত অনিয়ম, হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার-হয়রানি, হতাহতের ঘটনাসহ ৮টি বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ছবি-অডিও-ভিডিওর সমন্বয়ে সিডিসহ কেন্দ্রীয় দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন ধানের শীষের প্রায় পৌনে দুইশ’ প্রার্থী। পাশাপাশি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ করেছেন।
এখন কেন্দ্রের নির্দেশনা পেলে প্রার্থীরা একযোগে মামলা দায়ের করবেন। তবে কবে নাগাদ ট্রাইব্যুনালে মামলাগুলো দায়ের করা হবে সে ব্যাপারে পরিষ্কার কিছুই বলতে পারছেন না নেতারা। এদিকে নির্বাচনের পরপরই মামলার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফ্রন্টের নেতারা। কিন্তু এখনো সে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।
এখন তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন। বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরামের দুই সদস্যসহ ধানের শীষের বেশ কয়েকজন প্রার্থী আলাপে এমন তথ্য জানিয়েছেন। তবে বেশ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, মূলত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের ফলাফলের কাগজপত্র হাতে না পাওয়ায় মামলার উদ্যোগটি আটকে আছে। এ ছাড়া আলাদাভাবে তিনটি কমিটি গঠন করে মামলা-হামলা- গ্রেপ্তারের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে বিএনপি।
নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। অন্যদিকে বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, নির্বাচনী অনিয়ম ও মামলা-হামলার ঘটনার তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ইতিমধ্যে পৌনে দুইশ’ আসনের প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা হয়েছে। আশাকরি বাকি আসনগুলোর প্রতিবেদনও দুয়েকদিনের মধ্যে জমা পড়বে। ট্রাইব্যুনালে মামলার ব্যাপারে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত হলে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা-৭ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, ট্রাইব্যুনালে মামলার জন্য বেশিরভাগ প্রার্থীই ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সেরেছেন। কিছু বিষয় এখন বাকি আছে। আমরা এসব নিয়ে আলোচনা করছি। চলতি সপ্তাহেই একযোগে মামলাগুলো দায়ের করা হবে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের কাগজপত্র হাতে পাইনি। এসব কাগজপত্রের জন্য অপেক্ষা করছি। কাগজপত্র পেলেই মামলার উদ্যোগ নেয়া হবে। আগামী ৩০শে জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে মামলার শেষদিন। বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আগামী ৩০শে জানুয়ারির মধ্যে এসব কাগজপত্র যদি না দেয় তাহলে প্রমাণিত হবে দেশে আইন-আদালত বলতে কিছু নেই।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক জানান, ২০দলীয় জোটের প্রধান শরিক দল বিএনপির নির্দেশনা অনুযায়ী আমার নির্বাচনী আসনের সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ৮ই জানুয়ারি একটি প্রতিবেদন ও সিডি জমা দিয়েছি। নির্বাচনে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে আমি টকশোতে কথা বলেছি, আমার কলাম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত লিখছি। এখন আগামী দিনের পথচলা কী রকম হবে তা নিয়ে নির্দেশনার জন্য আমরা আমাদের ২০দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপির দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় আছি। ধানের শীষের সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও খুলনা-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, তার নির্বাচনী আসনের ভোট কারচুপির তথ্য-প্রমাণসহ একটি প্রতিবেদন তিনি জমা দিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেই সঙ্গে অডিও-ভিডিওর একটি সিডিও জমা দেয়া হয়েছে। বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর সদর আসনে ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, নির্বাচনের পর তিনি নেতাকর্মীদের জামিন তৎপরতা নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন। পরে কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী নানা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গত সপ্তাহে ১১ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে  ছবি, অডিও-ভিডিও ক্লিপিংসহ একটি পেনড্রাইভ ও মামলার এফআইআর-রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগের কপিগুলোর সংযুক্তি দিয়েছেন। অমিত জানান, ট্রাইব্যুনালে মামলার ব্যাপারে প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা পেলে মামলাটি দায়ের করবো।
যে ৮ বিষয়ের ভিত্তিতে প্রতিবেদন
ধানের শীষের প্রার্থীদের আটটি বিষয়ের ভিত্তিতে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল বিএনপি। সে নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রার্থীরা নির্বাচনের দিন ও আগে-পরে হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি, হতাহত এবং ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম ও কারচুপির তথ্য, লিখিত বর্ণনা, অডিও-ভিডিওসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্র জানায়, কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচনে সহিংসতা, অনিয়ম, ভোট কারচুপিসহ ৮টি বিষয়ের তথ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই প্রতিবেদন। বিষয়গুলো হচ্ছে-
১. ভোটের আগের রাত ও ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে সংঘটিত ভোট জালিয়াতি;
২. প্রার্থীর নিজের ও পরিবারের অবরুদ্ধ থাকা বা হামলায় আহত ও সহায়-সম্পদের ক্ষতির তথ্য ও ছবি;
৩. নির্বাচনের দিন ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট, প্রার্থীর সমন্বয়কারী, সমর্থক ও নেতাকর্মীদের সরকারি বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী কর্তৃক ভয়ভীতি প্রদর্শন, অন্যায় আচরণ, মারধর ও কেন্দ্র থেকে জোর করে বের করে দেয়া এবং গ্রেপ্তার;
৪. ভোট কেন্দ্রে প্রকৃত ভোটের চেয়ে প্রদর্শিত ভোট সংখ্যা অধিক বা প্রায় সমসংখ্যক হয়ে থাকলে কেন্দ্রের নাম সহ প্রকৃত হিসাব।
৫. নির্বাচনের আগে-পরের সহিংসতায় সরকারি বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের আক্রমণে ধানের শীষের নেতাকর্মী, সমর্থকসহ যারা নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের নাম-পরিচয়, ঠিকানা এবং আক্রান্তের ছবিসহ ঘটনার বিবরণ;
৬. নির্বাচনের আগে-পরে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যেকোনো ধরনের অপরাধের আইনানুগ প্রতিকার লাভের জন্য থানা বা আদালতে জিডি-মামলা করা হয়ে থাকলে বা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ কর্তৃক জিডি-মামলা গ্রহণে প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকলে তার কপি;
৭. তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনের আগে-পরে গ্রেপ্তার অভিযানে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকসহ গ্রেপ্তারকৃতদের নাম- ঠিকানা ও পরিচয় এবং
৮. নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন বা অন্য যেকোনো ধরনের অভিযোগের বিষয়ে রিটার্নিং অফিসার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে থাকলে তার ফটোকপি। নেতারা জানিয়েছেন, প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও একটি তথ্যচিত্র তৈরি করা হবে। যা পরে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যম ও বিদেশি কূটনীতিকদের কাছেও তা তুলে ধরা হবে।
তথ্য সংগ্রহে বিএনপির তিন কমিটি গঠন
দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে হামলা-মামলা ও লুটপাটের তথ্য সংগ্রহে আলাদা তিনটি কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুযায়ী ইতিমধ্যে কমিটিগুলো তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। সারা দেশে মামলা-হামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য সংগ্রহ ৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। মামলা- গ্রেপ্তারের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আইনগত সুবিধার বিষয়টি দেখবে এই কমিটি। অন্যদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, আহত-নিহতের সংখ্যা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, দলের কার্যালয় ভাঙচুর সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে ৬ সদস্যবিশিষ্ট আরেকটি কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন দলের প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী। দলের স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানাকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটি তথ্য সংগ্রহ করবে নারী প্রার্থী ও নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা-মামলা বিষয়ে।

ক্রিকেট জুয়ায় কাঁপছে দেশ by শুভ্র দেব

শনিবার সিলেট স্টেডিয়ামে চলছিল বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের (বিপিএল) ২১তম ম্যাচ। মাঠের লড়াইয়ে রংপুর রাইডার্স ও সিলেট সিক্সার্স। ১৯তম ওভারের খেলায় ম্যাচের জয়-পরাজয় নিশ্চিতের লড়াই চলছে। টান টান উত্তেজনা দুই পক্ষের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মাঝে। এর চেয়ে ঢের উত্তেজনা বাজিকরদের মাঝে। কাওরান বাজারের একটি চায়ের দোকানে ওই ওভারে ৮ রান হবে বলে সহকর্মী বাবুল মিয়ার সঙ্গে বাজি ধরেছিলেন আল আমিন। বাবুল মিয়া বলছিলেন ১৫ রানের বেশি হবে। আল আমিন বলেছিলেন সর্বোচ্চ আট রান।
যে জিতবে পাবেন ৫ হাজার টাকা। ওভার শেষে বাজিতে জিতে বাবুল হাতে পান ৫ হাজার টাকা। শুধু বাবুল বা আল আমিনই নন বিপিএল নিয়ে মাঠের বাইরে এমন বাজিতে মজছেন বহু মানুষ। ক্রিকেট জুয়ায় জড়ানোর অভিযোগ আছে খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধেও। খেলার বাইরে এই অনৈতিক বাজি ঠেকাতে তৎপর বিপিএল কর্তৃপক্ষও। তাদের কর্মীরা চোখ রাখছেন গ্যালারিতে। মাঠে বসে জুয়া খেলারত অবস্থায় ২৪টি ম্যাচে ৪৫ জনকে আটক করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। তাদের মধ্যে ২০ জন বিদেশি নাগরিক। এছাড়া নেট দুনিয়ায় বাজি ধরা হয় এমন ১২টি সাইট বন্ধ করে দিয়েছে বিটিআরসি।
যদিও এসব সাইটের বেশির ভাগই প্রক্সি সার্ভারে চালাচ্ছে জুয়াড়িরা। বিপিএল নিয়ে বছর বছর বাড়ছে বাজিকরদের তৎপরতা। গতবছর ক্রিকেট খেলা নিয়ে বাজি ধরে ঢাকার বাড্ডায় এক শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালে বিপিএলের দ্বিতীয় আসরে জুয়াড়িদের ফাঁদে পড়ে স্পট ফিক্সিংয়ে ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুল। খেলা ঘিরে ছোট-বড় চায়ের দোকান,  শহরের অলিগলি, ক্লাব, বার, এমনকি পাঁচ তারকা হোটেলে বসে বাজির আসর। বিপিএলের একেকটি ম্যাচে কোটি কোটি টাকার বাজি ধরা হচ্ছে।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসাবো এলাকার একটি সিএনজি অটো রিকশার গ্যারেজে সন্ধ্যার পর থেকে জড়ো হন চালকরা। সেখানে সবাই মিলে বিপিএল এর ম্যাচ দেখেন। আড্ডা আলোচনার সঙ্গে ওভারে ওভারে চলে জমজমাট বাজি। প্রতি বাজিতে একশ থেকে পাঁচ শ’ টাকা লেনদেন হয়।
সেখানে বাজি ধরেন এমন একজন আবুল হোসেন বলেন, কয়েক বছর ধরেই বিপিএল খেলা নিয়ে আমরা বাজি খেলি। সারা দিন কাজ করে অবসর সময়ে এখানে বসে আড্ডার ফাঁকেই চলে বাজি। কেউ হারে কেউ জিতে। এখানে আমরা সবাই চালক। বাইরের কেউ আসে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের বিপিএলে বিদেশি তারকা খেলোড়ারের ছড়াছড়ি। তাই প্রথম ম্যাচ থেকেই বাজিকররা একটু বেশিই মেতেছেন। ভারত-পাকিস্তানের জুয়াড়িরা প্রথম থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। বিপিএলকে সামনে রেখে অন্তত পাঁচ শতাধিক বিদেশি জুয়াড়ি দেশে অবস্থান করছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। ৫ই জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিপিএলের প্রথম তিন দিনে মিরপুর স্টেডিয়াম থেকে ২০ জন জুয়াড়িকে আটক করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে চার হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।
ক্রিকেট বাজিতে জড়িত এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে নানা তথ্য। রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর বলেন, বাজি খেলাটা মূলত প্রথম স্কুল জীবনে শুরু হয় নিজেদের ক্রিকেট খেলা থেকে। দুই দল যখন ক্রিকেট খেলতো তখন বন্ধুরা মিলে বাজি ধরতাম। এভাবেই ধীরে ধীরে এই লাইনে আসা। এখন বাজি ধরাটা যেন নেশায় পরিণত হয়েছে। অনেকবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাজি ছেড়ে দেবো। কিন্তু বাজিকরদের ফোন আসায় আবার সেই ধারায় চলে যেতে হয়। একবার মেস ছেড়েছিলাম যাতে আর বাজি খেলতে না হয়। কিন্তু নতুন মেসে যেয়েও জড়িয়ে পড়ি বাজিতে। বাজি খেলে লাভ হয় কিনা জানতে চাইলে আরেকজন বলেন, দুইজন যেহেতু খেলছি লাভ লসতো হবেই। তবে লাভের টাকার ভাগিদার বেশি হয়। আর লাভের টাকা যতই বেশি হোক না কেন কোনো না কোনো ভাবে তা খরচ হয়ে যায়। আরেকজন আক্ষেপ করে বলেন, বাজির টাকায় আমার কেনা মোটরবাইক হয়েছে চুরি।
ল্যাপটপ কিনলাম সেটা বিক্রি করে হারা ম্যাচের টাকা পরিশোধ করলাম। বিপিএল সূত্রে জানা গেছে, এবারের বিপিএলে মাঠের ভেতরের জুয়াড়িদের রুখতে বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। কারণ, জুয়াড়িদের বেপরোয়া আচরণে অনেকটা অস্বস্তিতে আছে বিপিএল কর্তৃপক্ষ। তাই এই টুর্নামেন্টের অন্য দিকগুলোর মতো জুয়া ও জুয়াড়ি ঠেকানোতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।  পোশাকে ও সাদা পোশাকে দুর্নীতি দমন ইউনিটের সদস্যরা কাজ করছেন। এ ছাড়া খেলা চলাকালীন ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘুরে বেড়ায় গ্যালারিতে। দীর্ঘসময় মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকা দর্শকদের সন্দেহভাজন হিসাবে আটক করা হচ্ছে। যাচাই বাছাই করে যদি জুয়ার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে কোনো খেলোয়াড় যাতে স্পট ফিক্সিংয়ে না জড়ায় সেদিকে বাড়তি নজরদারি রয়েছে।
খেলোড়ারদের হোটেল রুম, ড্রেসিং রুম, এমনকি মাঠেও যাতে কোনো জুয়াড়ি তাদেরকে প্রভাবিত করতে না পারে তার জন্য আলাদা আলাদা টিম কাজ করছেন। সব মিলিয়ে বিপিএলে বাজি রুখতে অন্তত সহস্রাধিক সদস্য কাজ করছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক ও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের গভর্নিং কাউন্সিলিংয়ের সদস্য সচিব ইসমাঈল হায়দার চৌধুরী বলেন, বিপিএল জুয়া ও স্পট ফিক্সিং নিয়ে আমাদের অবস্থান খুবই স্ট্রিট। এসব কারণে আমরা এক বছর খেলা বন্ধ রেখেছি। এ বছর সিভিল ও ফরমাল পোশাকে প্রায় ১ হাজার কর্মী বাজি প্রতিরোধে কাজ করছে। হোটেল রুম থেকে শুরু করে, ড্রেসিং রুম, মাঠের ভেতরে নজরদারি চলছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন বিদেশি জুয়াড়িকে আটক করা হয়েছে। যাদেরকে আটক করা হচ্ছে সঙ্গে তাদের জরিমানা করে থানায় নেয়া হচ্ছে। অনেককে জেলে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, আইনে আছে এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ ৮/১০ দিনের জেল ও জরিমানা করা যাবে। পাশাপাশি আটক বিদেশিদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।
এদিকে বিপিএল বাজি বন্ধ করতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতি দমন ইউনিট ১২টি বিদেশি বেটিং সাইট বাংলাদেশে বন্ধের জন্য চিঠি দিয়েছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ও  নিরাপত্তা বিভাগকে। সাইবার ক্রাইম ইউনিট সেসব সাইট বন্ধের জন্য চিঠি সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে অবগত করেছে। ইতিমধ্যে সেসব সাইট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বন্ধ করা সাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে বেটিং সাইট রেবটওয়ে ডটকম, বেটফ্রিড ডটকম, ডাফাবেট ডটকম, বেটফেয়ার ডটকম, সাইট ৩৬৫ ডটকম, ৮৮ স্পোর্টস ডটকম, ইউনিবেট ডটকম, বেট ভিক্টর ডটকম, নেটবেট ডটকম, টাইটানবেট ডটকম, উইনার ডটকম ও পেডি পাওয়ার ডটকম। এদের মধ্যে বেটিং সাইট ৩৬৫ ডটকম যেকোনো ধরনের খেলার বাজির জন্য জনপ্রিয়। বিশ্বের ২০০টি দেশের ১ কোটি ৯০ লাখের বেশি বাজিকর নিয়মিত এই সাইট ব্যবহার করেন। তবে বাংলাদেশে এসব সাইট বন্ধ করে দেয়ার পরও থেমে নাই জুয়াড়িরা। ভিপিএন, প্রক্সি সার্ভার ও অ্যাপ দিয়ে তারা এই সাইটগুলো ব্যবহার করছেন।
লেনদেনের জন্য তারা ব্যাংক থেকে শুরু করে পেপাল, পেওনিয়ার, মাস্টার, ডেবিট ও ক্রেডিটকার্ড ব্যবহার করছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের অনলাইনভিত্তিক কার্ড ও ক্রিপকারেন্সিতে লেনদেন চলছে। বিশ্বের প্রায় ২৮টি দেশের মুদ্রায় তাদের লেনদেন হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ও নিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নাজমুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, প্রক্সির মাধ্যমে যদি জুয়া খেলে এগুলো আটকানোর পথ তেমন একটা নাই। এই দিকে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এগুলো আটকানোর জন্য বিপিএলের আলাদা একটি কমিটি রয়েছে। তারাই এগুলো দেখভাল করবে। তারপরেও তারা চাইলে পুলিশ তাদের সাহায্য করবে। কিন্তু বিপিএল কমিটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি।
মোবাইলে, ম্যাসেঞ্জারে ও সরাসরি অনেকে জুয়ার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। এবারে  আসর চলাকালে এ ধরনের অপরাধে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, মাঠের বাইরে জুয়া চলে ঠিক। কিন্তু মাঠে ম্যাচ চলাকালীনও অনেক জুয়ার কার্যক্রম চলে। এগুলো বের করা উচিত বিপিএল কমিটির। এর সঙ্গে পুলিশের এটা টিমও কাজ করলে ভালো হতো। পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি সোহেল রানা মানবজমিনকে বলেন, শুধু জুয়া নয় যেকোনো ধরনের অপরাধ রোধে পুলিশ বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। বিপিএল নিয়ে মাঠে ও মাঠের বাইরে জুয়া চলছে বলে আমরা ইতিমধ্যে অবগত হয়েছি। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট এ নিয়ে কাজ করছে। যদি কাউকে হাতেনাতে আটক করা যায় তবে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, এটি একটি মানসিক ব্যাধি। তাই এটি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
সমাজ বিজ্ঞানী নেহাল করিম মানবজমিনকে বলেন, যারা বাজি ধরে এটা তাদের রুচির বিষয়। তাদের কাছে হয়তো এত অর্থ আছে খরচ করার জায়গা পাচ্ছে না তাই বাজি ধরে খরচ করে। বাজি ধরার মূল উপাদান টাকা। যার টাকা আছে সে বাজি ধরবে। তিনি বলেন, ধীরে ধীরে পশ্চিমা সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতিকে গ্রাস করছে। একসময় আমাদের দেশে যারা ডাংগুলি খেলত তারাই  এখন পোল খেলে। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, উন্নত দেশে যেভাবে বৈধভাবে অনেক কিছু করার সুযোগ আছে আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থা নাই। তাই চুরি করে অনেকেই জুয়া খেলছে। অনেকটা গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটকও করতে পারছেন না।

‘ইতিবাচক ধারায়’ ফিরলে ছাত্রদলকে সহাবস্থানের সুযোগ দেবে ছাত্রলীগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিবেশ সংসদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় চার ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। এসময় তিনি পরিবেশ সংসদের সদস্য ছাত্র সংগঠনগুলো কর্তৃক উত্থাপিত মতামত গ্রহণ করেন। সেগুলো সিন্ডিকেটে তুলে যৌক্তিক হলে মেনে নেয়ার ঘোষণা দেন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের ভিসি কার্যালয় সংলগ্ন আব্দুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল রুমে সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভিসির সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সামাদ, প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রাব্বানীসহ বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষগণ উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের দুই গ্রুপ, জাসদ ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রমৈত্রী, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র আন্দোলনসহ ১৪টি ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকগণও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও জাসদ ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সব সংগঠন হলের বাইরে ফ্যাকাল্টিতে ভোটকেন্দ্র স্থাপন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের জন্য ভোটকেন্দ্রে সিসি টিভি স্থাপন, ক্ষমতার ভারসাম্য, সহাবস্থান ও প্রার্থিতার ক্ষেত্রে বয়স শিথিলের দাবি করে। অন্যদিকে ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন ছাড়া সভায় উপস্থিত থাকা অন্য নেতারাও প্রার্থিতার ক্ষেত্রে বয়স শিথিল করে ৩০ বছর করার দাবি করেন।
অন্যদিকে সাদ্দাম হোসাইন যারা কেবল নিয়মিত ছাত্র তাদেরই নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এছাড়া ছাত্রলীগ হলে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবি করে। এদিকে সভা শেষে ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, সভায় গঠনতন্ত্র ও আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গঠনতন্ত্র নিয়ে যে সুপারিশ করা হয়েছে তা সিন্ডিকেট সভায় উঠবে।
সেখানে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এসময় তিনি আগামী মার্চে নির্বাচন প্রদানের আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, আমরা একটা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে তফসিল দেয়া হবে। আমরা এবং আমাদের সিন্ডিকেট সদস্যরা একটা বিষয়ে একমত যে, যারা ভোট দিতে পারবে তারা যেন প্রার্থী হতে পারে। আচরণবিধির বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা সে বিষয়টি দেখবেন। জানা গেছে, সভায় যারা দ্বিতীয়বারের মতো মাস্টার্স করছে, যারা ডাকসু এবং হল সংসদের ফি দেয়, এদেরকে ভোটার করার দাবি জানান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী। তিনি সান্ধ্যকালীন ছাত্রদেরও ভোটার করার দাবি জানান। এসময় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও চাকরির বয়সের (৩০) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভোটার করা হোক। আর সেখানেই এর বিরোধিতা করে কেবল নিয়মিত শিক্ষার্থীদের নির্বাচনের পক্ষে মত দেন ছাত্রলীগের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক। আলোচনাসভা শেষে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম হল কেন্দ্রিক তাই ভোটকেন্দ্র হলের মধ্যে করা হোক।
ক্যাম্পাসে সহাবস্থান আছে কিন্তু ছাত্রদলকে ইতিবাচক ধারায় আসতে হবে। তাহলে তারা সহাবস্থান করতে পারবেন। বয়স নিয়ে তিনি বলেন, যে কেউ প্রার্থী হতে পারে। তবে তাদের বয়সসীমা ৩০ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ছাত্রদল অন্তর্কোন্দলের কারণে ক্যাম্পাস ছেড়েছে। তাদের মধ্যে যারা নিয়মিত শিক্ষার্থী তারা প্রভোস্টের মাধ্যমে হলে থাকলে আমাদের সমস্যা নেই। ডাকসু নির্বাচনে নিয়মের বাইরে দুর্নীতি করে এখানে কোনো কিছু হওয়া সম্ভব নয়। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসাইন বলেন, ছাত্রদলসহ সব ছাত্র সংগঠনের পক্ষে থেকে মধুর ক্যান্টিন, আবাসিক হলগুলোতে সহাবস্থানের দাবি করা হয়েছে। ভোটার এবং প্রার্থিতার ক্ষেত্রে যারা ডাকসুর ফি প্রদান করে তাদের সবাইকে সুযোগ দিতে হবে। এখানে কোনো প্রতিবন্ধকতা করা যাবে না। ভোটকেন্দ্র একাডেমিক ভবনে স্থানান্তরের জন্য গঠনতন্ত্র সংশোধনের দাবি জানানো হয়েছে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্য করার দাবি জানানো হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে। তার পাশে উপস্থিত থাকা ছাত্রলীগ নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে আসলে ছাত্রলীগ নেতারা আমাদের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সময় মারধর করে। এসময় তিনি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন। তিনি ডাকসুর সভাপতির (ভিসি) ক্ষমতার ভারসাম্য আনা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীয় করার দাবিও জানান।
এসময় ছাত্রদল নিয়মিত মধুর ক্যান্টিনে যাবে বলে ঘোষণা দেন আকরাম হোসাইন। ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, ভোটকেন্দ্র ক্যাম্পাসের একাডেমিক ভবনে আনার জন্য প্রশাসনের কাছে অধিকাংশ ছাত্র সংগঠন দাবি জানিয়েছেন। আমরাও একই দাবি জানিয়েছি। একই সঙ্গে যারা ডাকসু ও হল সংসদের জন্য ফি দেন, তাদেরকে ভোটার ও প্রার্থী করার দাবি জানানো হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স বলেন, আমরা ক্যাম্পাসে ভোটকেন্দ্র করার দাবি জানিয়েছি। যাতে সবার জন্য সহাবস্থান থাকে। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আচরণবিধি কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা শুনেছি যারা এই দুই কমিটিতে দায়িত্ব পেয়েছেন তারা সবাই একটা দলের। আমরা চাই সব সংগঠনের নেতাদের পরামর্শ নিয়ে এসব কমিটি গঠন করা হোক।

ক্ষমতার এ দফায় কী চাইছেন শেখ হাসিনা

ঢাকায় শনিবার তার দলের নির্বাচনী বিজয় উদযাপনের সময়, বহু মানুষের চোখ ছিল নির্বাচনী কারচুপির বিস্তর অভিযোগ নিয়ে কী বলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তা নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি তিনি।
সমালোচনার ক্ষুরধার জবাব দেওয়া যার সহজাত, তার এই মৌনতা অনেককেই অবাক করেছে।
শনিবারের ভাষণে শেখ হাসিনা বরঞ্চ চতুর্থ দফার শাসনে তিনি কী করতে চান, তার একটি ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, এবারেও তার প্রধান লক্ষ্য হবে মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। সেইসাথে জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছেন দুর্নীতি এবং মাদক সমস্যাকে তিনি বিশেষভাবে টার্গেট করবেন।
পরের দিন অর্থাৎ আজ (রোববার) সচিবালয়ে গিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে দুর্নীতি এবং মাদক নিয়ে তার মনোভাব স্পষ্ট করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রওনক জাহান মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন নিয়ে বিরোধীদের আলোচনাকে ঘুরিয়ে ভিন্ন জনপ্রিয় কিছু ইস্যুর দিকে নিয়ে যেতে চাইছেন যেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ - দুর্নীতি, মাদক ইত্যাদি।
"সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়ন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, সুশাসন তেমন গুরুত্ব পায়নি। এবার মনে হয় তিনি সেই বিষয়টিকে সামনে আনতে চাইছেন।"
"দেশের সবাই জানে প্রধানমন্ত্রী একচ্ছত্র ক্ষমতাধর, তার দলও পুরোপুরি তার ওপর নির্ভরশীল, অতএব তিনি সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে আশ্বাস দিতে চাইছেন তিনি এবার সুশাসন দেবেন।"
সেই ইঙ্গিত শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই।
"মন্ত্রিসভাকেও তিনি বলেছেন আমি তোমাদের ওপর নজর রাখবো। বার্তা দিতে চেয়েছেন যে জবাবদিহিতা তিনি এবার আদায় করে নেবেন।"
ড. জাহান মনে করেন, শেখ হাসিনা তার এবার তার মন্ত্রীদের কাছ থেকে নিজেকে কিছুটা দুরে রাখার চেষ্টা করছেন যাতে তার হুমকি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে।
'ইতিহাসে জায়গা চাইছেন শেখ হাসিনা'
সিনিয়র সাংবাদিক এবং প্রধানমন্ত্রী তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী হাসিনা এ দফায় এমন কিছু করতে চান যাতে তিনি ইতিবাচক একটি ইতিহাসের অংশ হতে পারেন।
"যে মাত্রার জয় তার হয়েছে তাতে তিনি আপ্লুত, তাই তিনি জনগণকে প্রতিদান দিতে উদগ্রীব।"
"রেকর্ড চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তিনি । এটাই হয়তো তার শেষ প্রধানমন্ত্রীত্ব।
তিনি হয়তো চাইছেন যে তার বাবার মতো ইতিহাসে যেন অবশ্যই তার জায়গা হয়।"
মি চৌধুরীর মতে, সে কারণেই দুর্নীতি এবং মাদকের মত ইস্যুকে প্রধান একটি টার্গেট করেছেন তিনি।
'শাসন ব্যবস্থা তো ব্যক্তি নির্ভর হতে পারেনা'
কিন্তু যে সুশাসনের কথা শেখ হাসিনা বলছেন তার বাস্তবায়নের জন্য তাকে নির্ভর করতে হবে তার দলের লোকের ওপর, প্রশাসনের ওপর, পুলিশের ওপর। সেখানে তো কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাহলে তার এসব কথায় মানুষ কতটা ভরসা করতে পারবে?
ইকবাল সোবহান চৌধুরী মনে করেন, দলের ভেতর এবং বাইরে যে অসামান্য কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রী প্রতিষ্ঠা করেছেন, ব্যক্তিগতভবে যে নৈতিক উচ্চতা বজায় রেখেছেন তাতে তিনি চাইলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
"প্রথম কথা এখন পর্যন্ত দুর্নীতির প্রশ্নে ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনো বিতর্কে পড়েননি। এরপর তার দল তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বিরোধী দল এখন অত্যন্ত দুর্বল। তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ নেই। কাকে তিনি ভয় পাবেন?"
"আর মাথা যখন কাজ করে, হাতে-পায়ে কিছু সমস্যা থাকলেও খুব সমস্যা হয়না।"
তবে কিছুটা সন্দিহান ড রওনক জাহান। "সফল হবেন কিনা তা কোটি টাকার প্রশ্ন।"
"একজন ব্যক্তি যত ভালো নেতাই তিনি হোন না কেন, একটি শাসন ব্যবস্থা তো ব্যক্তি নির্ভর হতে পারেনা।"
তাঁর মতে, সবকিছু একটি 'সিস্টেমের' মধ্যে আনতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। তার মতে, সেটাই একটি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
"নেতা যতই ভালো হোন, তিনি তো একজন ব্যক্তি। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্ত না হলে, একজন ব্যক্তির পক্ষে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়," বলছেন তিনি।

গণতন্ত্রের আয়নায় নিজেকে দেখুন -প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে দুদু

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে বলবো আপনি গণতন্ত্রের আয়নায় নিজেকে দেখেন। তাহলে দেখবেন আপনি স্বৈরাতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আপনার এই চেহারা গণতন্ত্রের সঙ্গে যায় না, ৭১ সালের স্বাধীনতার সঙ্গে যায় না। আজ দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন’ আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
দুদু বলেন, ৩০ তারিখে যে নির্বাচন হয়েছে এটা লজ্জার নির্বাচন। নির্বাচনের নামে একটি তামাশা হয়েছে দেশে। এটাকে নির্বাচন বলা যায় না। কোনো সুষ্ঠু স্বাধীন গণতান্ত্রিক জাতি এবং এদেশের মানুষও এটাকে মেনে নেয়নি।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভে তিনি বিজয় উৎসবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। আমি তাকে সর্মথন করতাম যদি তিনি নির্বাচনের আগে পদত্যাগ করতেন।
প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, এদেশের সবচেয়ে বড় দুর্নীতিটা হয়েছে ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর। এই নির্বাচনকে ভোট ডাকাতি বলেন, ভোট চুরি বলেন যাই বলেন, এরকম একটি নির্বাচনকে যারা জায়েজ করে তারা দুর্নীতির বিচার করতে পারবেন, দুর্নীতি বাদ দিতে পারবেন এটা আমরা মনে করি না।
তিনি বলেন, ৩০ তারিখে ভোট হয়নি, ভোট হয়েছে ২৯ তারিখ মধ্যরাতে। ৩০ তারিখে ভোট হলে আপনাকে অভিনন্দন জানাতাম। আপনি পুলিশকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে  রেখেছেন। পুলিশ এখন সমাজে মুখ দেখাতে পারে না। আমার প্রশ্ন পুলিশ তো সরকারি চাকরি করে। কেনো তাকে এরকমভাবে ব্যবহার করলেন। আপনারা র‌্যাব, ডিসি, এসপি ইএনও, টিএনও যারা মর্যাদাশীল, জাতির সামনে এতো ছোট করলেন কেনো? তাদেরকে  কেনো বাধ্য করলেন তথাকথিত ভোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে?
আয়োাজক সংগঠনের সভাপতি কে এম রকিবুল ইসলাম রিপন সভাপতিত্বে এবং বিএনপি নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান কামালের সঞ্চালনায় প্রতিবাদ সভায় বিএনপি’র প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন সহ-শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক  হেলেন জেরিন খান, নির্বাহী কমিটির সদস্য হায়দার আলী লেলিন, মো. শাফিন, জিনাফের সভাপতি লায়ন মিয়া, মো. আনোয়ার, ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এজমল   হোসেন পাইলট প্রমুখ বক্তব্য দেন।