Showing posts with label বাতায়ন. Show all posts
Showing posts with label বাতায়ন. Show all posts
Sunday, November 16, 2014
ইউনেস্কোর ৭০ বছর : ঢাকা ঘোষণা by কাজী ফারুক আহমেদ
নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও বিপরীতমুখী প্রতিকূল বিশ্বরাজনীতির মোকাবেলা করে ইউনেস্কো আজ ৭০ বছরে পদার্পণ করছে। ১৯৪৫ সালের ১৬ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের এ বিশেষায়িত সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা-সংকৃতির বিকাশ, শান্তির পক্ষে অবস্থান নির্মাণ, বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা, পরিবেশ সুরক্ষায় অব্যাহতভাবে কাজ করে চলেছে। আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত সংগ্রামের স্মারক মহান একুশে ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দানকারী এবং বিশ্বের ৬ হাজার ভাষাকে বিলুপ্তি থেকে রক্ষাকারী ইউনেস্কো অব্যাহতভাবে তার কর্মকাণ্ডের দিগন্ত সম্প্রসারিত করে চলেছে। ১৯৮৮ সালে ইউনেস্কোর ৫ম সাধারণ অধিবেশনে দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করা হয় : ষাটের দশক থেকে বিশ্বে সূচিত বিশাল পরিবর্তনের ধারায় এ সত্য আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, শিক্ষকের মর্যাদা নির্ভর করে শিক্ষার অবস্থানের ওপর, শিক্ষার অবস্থান নির্ভর করে শিক্ষকের মর্যাদার ওপর। প্রতিষ্ঠালগ্নে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জাতিগুলোর মধ্যে অবদান রাখা এবং সেজন্য পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধন, ন্যায়বিচারের প্রতি সর্বজনীন শ্রদ্ধাবোধ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জাতিসংঘ সনদে স্বীকৃত মৌলিক মানবাধিকারগুলোর সংরক্ষণ ও বিকাশ নিশ্চিত করাকে ইউনেস্কো তার লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে। বলা হয়, যেহেতু মানুষের মনেই যুদ্ধ-ভাবনার সূত্রপাত, তাই সেখানেই শান্তির পক্ষে অবস্থান নির্মাণ করতে হবে।
১৯৪৬ সালে ইউনেস্কোর অধিবেশনেই শিক্ষকদের নৈতিক, বৈষয়িক ও পেশাগত স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে একটি বিশ্ব শিক্ষক সনদ রচনার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। দীর্ঘ আলোচনা ও বৈঠকের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে সদস্য দেশগুলোর আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিশমালা গৃহীত হয়। আবার ইউনেস্কোর সাধারণ সভার ২৬তম অধিবেশনে এ মর্মে সিদ্ধান্ত হয় যে, ১৯৬৬ সালে প্যারিসে গৃহীত শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিশমালার স্মরণে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হবে। সে সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৯৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে।
ইউনেস্কোর সদর দফতর প্যারিসে। সদস্য রাষ্ট্র, সহযোগী সদস্য ও পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণে দুবছর পরপর অনুষ্ঠিত সাধারণ অধিবেশন এবং ৫৮ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী বোর্ডের সিদ্ধান্তক্রমে মহাপরিচালকের নেতৃত্বে সচিবালয়ের মাধ্যমে ইউনেস্কো তার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। বর্তমানে মহাপরিচালক প্রতি ৪ বছর পরপর নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তবে প্রথম মহাপরিচালক জুলিয়ান হাক্সলি ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ দুবছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন। ইরিনা বোকোভা ইউনেস্কোর দশম মহাপরিচালক হলেও এ শীর্ষপদে তিনিই বিশ্বের প্রথম নারী। বাংলাদেশে মহাপরিচালকদের মধ্যে বেশ পরিচিত ফেডেরিকো মেয়র জারাকোজা (১৯৮৭-১৯৯৯) এবং কাইচিরো মাতসুরা (১৯৯৯-২০০৯)। বিভিন্ন দেশের ২ হাজার ১০০ জন বর্তমানে এ বিশ্ব সংস্থায় কর্মরত। এর দুই-তৃতীয়াংশ প্যারিসে সদর দফতরে এবং অন্যরা বিভিন্ন দেশে ফিল্ড অফিসে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে ইউনেস্কো তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও বাস্তবায়ন করে থাকে। ইউনেস্কোর বিভিন্ন ইন্সটিটিউট ও কেন্দ্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য : প্যারিসে আন্তর্জাতিক শিক্ষা পরিকল্পনা ইন্সটিটিউট, জেনেভায় আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যুরো, হামবুর্গে জীবন শিক্ষা ইন্সটিটিউট, মেলবোর্নে ওশানিয়া উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, মস্কোতে তথ্যপ্রযুক্তি ইন্সটিটিউট, ভেনিজুয়েলায় উচ্চশিক্ষা ইন্সটিটিউট, বনে আন্তর্জাতিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বুখারেস্টে ইউরোপীয় উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, নেদারল্যান্ডসে পানিসংক্রান্ত শিক্ষা ইন্সটিটিউট, ইতালিতে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র, মন্ট্রিয়ালে ইউনেস্কো পরিসংখ্যান ইন্সটিটিউট। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণে ইউনেস্কোর বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। তবে আমার মতে, ইউনেস্কোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি হল বিজ্ঞান চর্চা, গবেষণা, নারী-পুরুষ সমতা অর্জন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। বর্তমান মহাপরিচালক বিজ্ঞানকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের তথা সায়েন্স ডিপ্লোমেসির যে ধারণা বিশ্ব পরিসরে তুলে ধরেছেন তা যথার্থই প্রণিধানযোগ্য।
জাপানে শিক্ষা সম্মেলন : ১০ নভেম্বর থেকে জাপানের এইচি নগোয়ায় শুরু হয়েছে বিশ্ব শিক্ষা সম্মেলন। ইউনেস্কো ও জাপান সরকার এর যৌথ উদ্যোক্তা। আজ ১৬ নভেম্বর এ সম্মেলন শেষ হবে। এর উদ্বোধনী অধিবেশনে আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভবিষ্যৎ গঠন শিরোনামে ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে বর্তমান দশকে শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জন, ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরে ২০১৫ পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে মতামত ও সুপারিশ চাওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে ১০টি প্রধান ক্ষেত্র চিহ্নিত করে শিক্ষাকে উন্নয়নের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে দেখানো হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নয়নের নীতি ও লক্ষ্য নির্ধারকদের টেকসই শিক্ষা উন্নয়নের সমর্থনে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা বাস্তবায়নে নিশ্চিত করতে হবে সুপ্রসারিত প্রত্যক্ষ ও ফলপ্রসূ পরিবেশ। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমর্থন অপরিহার্য। বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের ৭৫ জন মন্ত্রী, মন্ত্রীর মর্যাদায় ২৮ জন, ইউনেস্কোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো ও এনজিও প্রতিনিধি, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বেসরকারি উদ্যোক্তা, তরুণ সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞসহ এক হাজারের বেশি প্রতিনিধি এখন এ সম্মেলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বিশ্বের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাই জাপানের এ সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ ঘোষণার অপেক্ষায় আছেন।
৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা ঘোষণা : ইউনেস্কোর উদ্যোগ ও সহযোগিতায় মাস্কাট ও ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি শিক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে ইউনেস্কো এ বছর ঢাকায় আয়োজন করে দিনব্যাপী কর্মসূচি। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা এবং বিভিন্ন দেশের বেশ কজন মন্ত্রী, শিক্ষা কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এতে অংশগ্রহণ করেন। ইরিনা বোকোভার এটি বাংলাদেশে দ্বিতীয় সফর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মেয়েশিশুদের অভিগম্যতা বৃদ্ধি, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ও অর্জনের কথা বিবেচনায় নিয়ে ইউনেস্কো এ বছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদযাপনের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয়। আমার সৌভাগ্য, ব্যাংককে তিনটি শিক্ষা সম্মেলন ও ঢাকায় ইউনেস্কো আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছি। ইরিনা বোকোভার সঙ্গে মতবিনিময় করতে পেরেছি। দিনভর বিভিন্ন আলোচনা-মতবিনিময় শেষে ৮ সেপ্টেম্বর যে ঢাকা ঘোষণা প্রকাশিত হয়, তা ছিল তথ্যপূর্ণ ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘোষণার প্রায় পাঁচ দশক পর বিশ্বে সাক্ষরতার হার ৬০ শতাংশ (১৯৬০) থেকে ৮৪ শতাংশে (২০১২) উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এখনও ৭৮ কোটি ১০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক, যার তিন ভাগের দুই ভাগ নারী, বিশ্বের উন্নয়ন অভিযাত্রায় অংশ নিতে পারছে না শুধু নিরক্ষরতার শৃংখলে আবদ্ধ থাকার কারণে। ১২ কোটি ১০ লাখ শিশু এখনও মৌলিক শিক্ষা শেষ করতে পারছে না। স্কুলে গেলেও ১৩ কোটি শিশু পড়তে, লিখতে ও অংক করতে জানে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা ঘোষণায় বলা হয় : আমরা বিশ্বাস করি অপচয় করার মতো সময় আমাদের কারও নেই। আসুন, সবাই একসঙ্গে কাজ করি। বর্তমান অবস্থায় পরিবর্তন নিয়ে আসি। জ্ঞান অর্জন সাক্ষরতা ও শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করি। শিক্ষা তথা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন এবং বৈষয়িক ও নৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে ইউনেস্কোর কার্যক্রমে বর্ণ, অঞ্চল, বিশ্বাস নির্বিশেষে সব দেশের সব মানুষের সহযোগিতা কাক্সিক্ষত হলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিবদমান বিভিন্ন শক্তির প্রতিযোগিতার কারণে তা কোনো কোনো সময় প্রত্যাশার সীমা স্পর্শ করতে পারে না। তারপরও ইউনেস্কোর অব্যাহত উদ্যোগ মানব প্রগতির ধারায় যে নিত্যনতুন অবদান রেখে চলেছে, তার মূল্য অপরিসীম।
অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : শিক্ষাবিদ; ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান
১৯৪৬ সালে ইউনেস্কোর অধিবেশনেই শিক্ষকদের নৈতিক, বৈষয়িক ও পেশাগত স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে একটি বিশ্ব শিক্ষক সনদ রচনার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। দীর্ঘ আলোচনা ও বৈঠকের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে সদস্য দেশগুলোর আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিশমালা গৃহীত হয়। আবার ইউনেস্কোর সাধারণ সভার ২৬তম অধিবেশনে এ মর্মে সিদ্ধান্ত হয় যে, ১৯৬৬ সালে প্যারিসে গৃহীত শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিশমালার স্মরণে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হবে। সে সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৯৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে।
ইউনেস্কোর সদর দফতর প্যারিসে। সদস্য রাষ্ট্র, সহযোগী সদস্য ও পর্যবেক্ষকদের অংশগ্রহণে দুবছর পরপর অনুষ্ঠিত সাধারণ অধিবেশন এবং ৫৮ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী বোর্ডের সিদ্ধান্তক্রমে মহাপরিচালকের নেতৃত্বে সচিবালয়ের মাধ্যমে ইউনেস্কো তার কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। বর্তমানে মহাপরিচালক প্রতি ৪ বছর পরপর নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তবে প্রথম মহাপরিচালক জুলিয়ান হাক্সলি ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ দুবছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন। ইরিনা বোকোভা ইউনেস্কোর দশম মহাপরিচালক হলেও এ শীর্ষপদে তিনিই বিশ্বের প্রথম নারী। বাংলাদেশে মহাপরিচালকদের মধ্যে বেশ পরিচিত ফেডেরিকো মেয়র জারাকোজা (১৯৮৭-১৯৯৯) এবং কাইচিরো মাতসুরা (১৯৯৯-২০০৯)। বিভিন্ন দেশের ২ হাজার ১০০ জন বর্তমানে এ বিশ্ব সংস্থায় কর্মরত। এর দুই-তৃতীয়াংশ প্যারিসে সদর দফতরে এবং অন্যরা বিভিন্ন দেশে ফিল্ড অফিসে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে ইউনেস্কো তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও বাস্তবায়ন করে থাকে। ইউনেস্কোর বিভিন্ন ইন্সটিটিউট ও কেন্দ্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য : প্যারিসে আন্তর্জাতিক শিক্ষা পরিকল্পনা ইন্সটিটিউট, জেনেভায় আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যুরো, হামবুর্গে জীবন শিক্ষা ইন্সটিটিউট, মেলবোর্নে ওশানিয়া উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, মস্কোতে তথ্যপ্রযুক্তি ইন্সটিটিউট, ভেনিজুয়েলায় উচ্চশিক্ষা ইন্সটিটিউট, বনে আন্তর্জাতিক কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বুখারেস্টে ইউরোপীয় উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, নেদারল্যান্ডসে পানিসংক্রান্ত শিক্ষা ইন্সটিটিউট, ইতালিতে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র, মন্ট্রিয়ালে ইউনেস্কো পরিসংখ্যান ইন্সটিটিউট। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণে ইউনেস্কোর বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। তবে আমার মতে, ইউনেস্কোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি হল বিজ্ঞান চর্চা, গবেষণা, নারী-পুরুষ সমতা অর্জন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। বর্তমান মহাপরিচালক বিজ্ঞানকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের তথা সায়েন্স ডিপ্লোমেসির যে ধারণা বিশ্ব পরিসরে তুলে ধরেছেন তা যথার্থই প্রণিধানযোগ্য।
জাপানে শিক্ষা সম্মেলন : ১০ নভেম্বর থেকে জাপানের এইচি নগোয়ায় শুরু হয়েছে বিশ্ব শিক্ষা সম্মেলন। ইউনেস্কো ও জাপান সরকার এর যৌথ উদ্যোক্তা। আজ ১৬ নভেম্বর এ সম্মেলন শেষ হবে। এর উদ্বোধনী অধিবেশনে আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভবিষ্যৎ গঠন শিরোনামে ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে বর্তমান দশকে শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জন, ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরে ২০১৫ পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে মতামত ও সুপারিশ চাওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে ১০টি প্রধান ক্ষেত্র চিহ্নিত করে শিক্ষাকে উন্নয়নের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে দেখানো হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নয়নের নীতি ও লক্ষ্য নির্ধারকদের টেকসই শিক্ষা উন্নয়নের সমর্থনে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা বাস্তবায়নে নিশ্চিত করতে হবে সুপ্রসারিত প্রত্যক্ষ ও ফলপ্রসূ পরিবেশ। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমর্থন অপরিহার্য। বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের ৭৫ জন মন্ত্রী, মন্ত্রীর মর্যাদায় ২৮ জন, ইউনেস্কোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো ও এনজিও প্রতিনিধি, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বেসরকারি উদ্যোক্তা, তরুণ সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞসহ এক হাজারের বেশি প্রতিনিধি এখন এ সম্মেলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বিশ্বের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাই জাপানের এ সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ ঘোষণার অপেক্ষায় আছেন।
৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা ঘোষণা : ইউনেস্কোর উদ্যোগ ও সহযোগিতায় মাস্কাট ও ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বেশ কয়েকটি শিক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে ইউনেস্কো এ বছর ঢাকায় আয়োজন করে দিনব্যাপী কর্মসূচি। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা এবং বিভিন্ন দেশের বেশ কজন মন্ত্রী, শিক্ষা কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এতে অংশগ্রহণ করেন। ইরিনা বোকোভার এটি বাংলাদেশে দ্বিতীয় সফর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মেয়েশিশুদের অভিগম্যতা বৃদ্ধি, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ও অর্জনের কথা বিবেচনায় নিয়ে ইউনেস্কো এ বছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদযাপনের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয়। আমার সৌভাগ্য, ব্যাংককে তিনটি শিক্ষা সম্মেলন ও ঢাকায় ইউনেস্কো আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছি। ইরিনা বোকোভার সঙ্গে মতবিনিময় করতে পেরেছি। দিনভর বিভিন্ন আলোচনা-মতবিনিময় শেষে ৮ সেপ্টেম্বর যে ঢাকা ঘোষণা প্রকাশিত হয়, তা ছিল তথ্যপূর্ণ ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক। এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘোষণার প্রায় পাঁচ দশক পর বিশ্বে সাক্ষরতার হার ৬০ শতাংশ (১৯৬০) থেকে ৮৪ শতাংশে (২০১২) উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এখনও ৭৮ কোটি ১০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক, যার তিন ভাগের দুই ভাগ নারী, বিশ্বের উন্নয়ন অভিযাত্রায় অংশ নিতে পারছে না শুধু নিরক্ষরতার শৃংখলে আবদ্ধ থাকার কারণে। ১২ কোটি ১০ লাখ শিশু এখনও মৌলিক শিক্ষা শেষ করতে পারছে না। স্কুলে গেলেও ১৩ কোটি শিশু পড়তে, লিখতে ও অংক করতে জানে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা ঘোষণায় বলা হয় : আমরা বিশ্বাস করি অপচয় করার মতো সময় আমাদের কারও নেই। আসুন, সবাই একসঙ্গে কাজ করি। বর্তমান অবস্থায় পরিবর্তন নিয়ে আসি। জ্ঞান অর্জন সাক্ষরতা ও শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করি। শিক্ষা তথা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন এবং বৈষয়িক ও নৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে ইউনেস্কোর কার্যক্রমে বর্ণ, অঞ্চল, বিশ্বাস নির্বিশেষে সব দেশের সব মানুষের সহযোগিতা কাক্সিক্ষত হলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিবদমান বিভিন্ন শক্তির প্রতিযোগিতার কারণে তা কোনো কোনো সময় প্রত্যাশার সীমা স্পর্শ করতে পারে না। তারপরও ইউনেস্কোর অব্যাহত উদ্যোগ মানব প্রগতির ধারায় যে নিত্যনতুন অবদান রেখে চলেছে, তার মূল্য অপরিসীম।
অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : শিক্ষাবিদ; ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান
কাক এখন কাকের মাংস খায়! by ইকতেদার আহমেদ
পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের পাখি রয়েছে। অধিকাংশ পাখি গাছে বাসা বাঁধে। কিছু পাখিকে শৌখিন মানুষেরা তাদের গৃহে বা গৃহের আঙিনায় পুষে থাকে, এরা পোষা পাখি। এমন কিছু পাখি আছে যেগুলো মানুষের শেখানো বুলি আওড়াতে পারে। চড়ুই ও কবুতর- এ দুটি পাখি গাছের ডালে বাসা না বেঁধে মানুষের গৃহের চালের
কোণে বাসা বাঁধতে সচ্ছন্দবোধ করে। সব ধরনের পাখি নিজের পাড়া ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়।
এর মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম হল কোকিল।
কোকিল অত্যন্ত কৌশলে কাকের বাসা থেকে কাকের ডিম ফেলে দিয়ে সেখানে ডিম পাড়ে এবং পরবর্তীকালে কোকিলের ডিমে তা দিয়ে কাক কোকিলের জন্ম দেয়।
কাক পাখি হলেও এ পাখিটিকে কেউ পোষা পাখি হিসেবে লালন-পালন করে না। কাকের গায়ের বর্ণ কালো। আমাদের দেশে দু’ধরনের কাক দেখা যায়। এর একটি হল দাঁড়কাক এবং অপরটি পাতি কাক। দাঁড়কাক আকৃতিতে একটু বড়; তবে সংখ্যার বিবেচনায় আমাদের চারপাশে পাতি কাক অধিক পরিলক্ষিত হয়। স্বভাবগতভাবে কাক নোংরা প্রকৃতির। কাক সাধারণত ময়লা-আবর্জনা থেকে তার খাবার সংগ্রহ করে। খাওয়ার ব্যাপারে কাকের তেমন একটা বাছবিচার নেই। তবে কোনো বাছবিচার না থাকলেও কাক নিজের মাংস খায় না। এ ব্যাপারে কাকের নীতিবোধ ও নৈতিকতা প্রবল। কাকের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হল, পাখিটি খুব বেশি সমব্যথী। যে কোনো দুর্ঘটনায় একটি কাকের মৃত্যু ঘটলে আশপাশের সব কাক সেটিকে ঘিরে কা কা রবে সমবেদনা জানাতে থাকে। আবার দেখা যায়, একটি কাক অন্য কোনো পাখি বা প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হলে অপরাপর কাক সম্মিলিতভাবে আক্রান্তের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে এসে আক্রান্তকারীকে প্রতিহত করতে সচেষ্ট হয়।
পৃথিবীর যে কোনো দেশে চিকিৎসা পেশায় যারা নিয়োজিত, তারা মানবসেবার মহান ব্রত নিয়ে পেশাটিকে বেছে নেন। চিকিৎসকদের অনেকে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত, আবার অনেকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা করে থাকেন। সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও অফিসের নির্ধারিত সময়ের বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে রোগী দেখায় বিধি-নিষেধ নেই। চিকিৎসকরা মানুষের রোগ নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা রেখে থাকলেও তারা নিজেরা রোগ থেকে মুক্ত, এ কথা বলা যাবে না। বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের রোগ এবং মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসক রয়েছেন। এখন অধিকাংশ মানুষ রোগ নির্ণয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎকদের দ্বারস্থ হয়। সুদূর অতীত থেকে দেখা গেছে, কোনো চিকিৎসক রোগে আক্রান্ত হলে একই পেশায় নিয়োজিত অপর চিকিৎসক তাকে বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দিতেন। এ সেবার পরিধি থেকে অনেক সময় দেখা যায় চিকিৎসকদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পিতা-মাতা বাইরে নয়। যে নীতিবোধ ও নৈতিকতা থেকে অতীতে চিকিৎসকরা রোগ
নিরাময়ে সেবার হাত প্রশস্ত করতেন, বর্তমানে নীতিবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে সে সেবার হাত আর প্রশস্ত নয়।
সুদূর অতীতে যারা আইন পেশায় নিয়োজিত হতেন, তাদের প্রায় সবাই নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। এমন অনেক নীতিবান ও দৃঢ় চরিত্রের আইনজীবীর কথা শোনা যায়, যারা মক্কেল কর্তৃক নিয়োজিত হওয়ার পর মামলা সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মক্কেল কর্তৃক দেয় টাকা ব্যয় করতে দ্বিধাবোধ করতেন। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা পরিচালনায় যারা নিষ্ঠাবান ও পারদর্শী হিসেবে খ্যাত, আগে তাদের জিপি বা পিপি অথবা তাদের সহযোগী হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেয়া হতো। একটি জেলার আইনজীবী হিসেবে জিপি বা পিপি পদ যে কোনো আইনজীবীর জন্য সম্মানের হলেও অতীতে অনেক প্রথিতযশা ও ন্যায়নিষ্ঠ আইনজীবী নিজের আইন পেশার ক্ষতি হবে- এ বিবেচনায় জিপি বা পিপি পদের প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু অতীতের সেই আÍত্যাগ আজ খুব একটা দেখা যায় না। বিগত চার দশকের বেশি সময় থেকে দেখা যাচ্ছে, জিপি ও পিপি হওয়ার জন্য আইনজীবীদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা হচ্ছে এবং একজন আইনজীবীর পেশাগত সততা ও দক্ষতার চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি তার রাজনৈতিক আনুগত্য জিপি বা পিপি নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিক বিবেচিত হচ্ছে। একজন জিপি বা পিপি রাষ্ট্র বা সরকারের স্বার্থ সমুন্নত রাখার ব্যাপারে সদাসর্বদা সচেষ্ট থাকবেন, এটি কাক্সিক্ষত হলেও তা যে বর্তমানে প্রতিনিয়ত উপেক্ষিত হচ্ছে, তা বোধকরি আইন পেশায় সংশ্লিষ্ট ও দেশবাসীর বোঝা হয়ে গেছে।
অতীতে একজন আইনজীবী অপর আইনজীবীর ব্যক্তিগত মামলা বিনা পারিশ্রমিকে পরিচালনা করে নীতি ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত সমুজ্জ্বল রাখতেন। বর্তমানে বিভিন্নমুখী অবক্ষয়ের কারণে সে সমুজ্জ্বলতা মলিন। এখন আইনজীবীরা যেসব রাজনৈতিক মামলা পরিচালনা করলে পদ ও ক্ষমতা পাওয়ার জন্য সহায়ক হবে, সেসব মামলা ছাড়া কদাচিৎ বিনা পারিশ্রমিকে অন্য মামলা পরিচালনা করেন। বিভিন্ন জেলায় সরকার প্রদত্ত আইনগত সহায়তা তহবিলে অসহায় মানুষের মামলা পরিচালনার জন্য সরকারের
পক্ষ থেকে সম্ভাব্য অর্থের সংস্থান করা হলেও অধিকাংশ আইনজীবী ওই তহবিলের অর্থ দ্বারা মামলা পরিচালনার
ক্ষেত্রে অনীহা দেখান। এর পেছনের কারণ, মামলা পরিচালনার ব্যয় হিসাবে যে অর্থ দেয়া হয় তা আকর্ষণীয় নয়।
আমাদের দেশে যারা বিচার কার্যে নিয়োজিত, তাদের সবাই আইন বিষয়ে ডিগ্রিধারী। এদের অনেকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভের আগে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বিচারকরা সমাজেরই অংশ। একজন বিচারকের পারিবারিক, সামাজিক ও জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধে জড়িত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভের আগে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিচারকরা নিয়োগ লাভের পর যে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে পারছেন এটি আজ কোনো কোনো বিচারকের ক্ষেত্রে সত্য নয়। একজন বিচারকের প্রধান কাজ ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা করা। এ সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে একজন বিচারকের কোনো ধরনের অন্যায়ের আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ নেই। পেশাগত কারণে একজন বিচারকের সৎ হওয়া অত্যাবশ্যক। তাই একজন বিচারক সৎ- এ কথাটি বললে তা অপরাপর বিচারকের জন্য বিব্রতকর হিসেবে দেখা দেয়। আমাদের সমাজে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে যে অবক্ষয়ের ছোঁয়া লেগেছে, তা থেকে বিচারকসমাজ অবমুক্ত নন। একজন বিচারক জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়লে তার পৈত্রিক সম্পত্তি রক্ষার জন্য সুবিচার প্রাপ্তির প্রত্যাশায় নীতিবান ও আদর্শ বিচারককে কখনও অনুরোধ করে থাকলে তাকে বিফল হতে হয় না। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় তখন, যখন একজন বিচারক নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন। এরূপ বিচারক অবৈধ অর্থের মোহে সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে আইনকানুনের থোড়াই তোয়াক্কা করেন।
এদের কাছে কোনো সহকর্মী বিচারক সঙ্গত
অনুরোধ করলে তাদের বলতে শোনা যায়, এটি বিচার বিভাগ, এখানে বিচারকদের কোনো ধরনের অনুরোধ করা যায় না।
যে কোনো সমাজের অবক্ষয় হলে তা সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে স্পর্শ করে। মানুষকে আল্লাহপাক যে বুদ্ধি-বিবেক দিয়েছেন তা অন্য কোনো প্রাণীকে দেননি। তাই জন্মগতভাবে একটি প্রাণীর ক্ষেত্রে যা সহজাত, তা মানুষরূপী প্রাণীর ক্ষেত্রে নয়। কাক কাকের মাংস খায় না- এটি জন্মগত সহজাত গুণ হিসেবে চির সত্য। পৃথিবীতে যতদিন কাকের অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন এ সত্যের অন্যথা হবে না। কিন্তু আমাদের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে যারা স্বজাতির ব্যথায় সমব্যথী বা সহমর্মী নন, বরং অন্যায় বা অনৈতিকভাবে প্রাপ্তির যোগ না থাকায় মুখ ফিরিয়ে নেন, ‘কাক কাকের মাংস খায় না’- এ প্রবাদটি তাদের ক্ষেত্রে সত্য নয়, এমনটি বলা যাবে কি? আর বলা না গেলে বলতে বাধা কোথায়- কাক এখন কাকের মাংস খায়!
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
কোণে বাসা বাঁধতে সচ্ছন্দবোধ করে। সব ধরনের পাখি নিজের পাড়া ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়।
এর মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম হল কোকিল।
কোকিল অত্যন্ত কৌশলে কাকের বাসা থেকে কাকের ডিম ফেলে দিয়ে সেখানে ডিম পাড়ে এবং পরবর্তীকালে কোকিলের ডিমে তা দিয়ে কাক কোকিলের জন্ম দেয়।
কাক পাখি হলেও এ পাখিটিকে কেউ পোষা পাখি হিসেবে লালন-পালন করে না। কাকের গায়ের বর্ণ কালো। আমাদের দেশে দু’ধরনের কাক দেখা যায়। এর একটি হল দাঁড়কাক এবং অপরটি পাতি কাক। দাঁড়কাক আকৃতিতে একটু বড়; তবে সংখ্যার বিবেচনায় আমাদের চারপাশে পাতি কাক অধিক পরিলক্ষিত হয়। স্বভাবগতভাবে কাক নোংরা প্রকৃতির। কাক সাধারণত ময়লা-আবর্জনা থেকে তার খাবার সংগ্রহ করে। খাওয়ার ব্যাপারে কাকের তেমন একটা বাছবিচার নেই। তবে কোনো বাছবিচার না থাকলেও কাক নিজের মাংস খায় না। এ ব্যাপারে কাকের নীতিবোধ ও নৈতিকতা প্রবল। কাকের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হল, পাখিটি খুব বেশি সমব্যথী। যে কোনো দুর্ঘটনায় একটি কাকের মৃত্যু ঘটলে আশপাশের সব কাক সেটিকে ঘিরে কা কা রবে সমবেদনা জানাতে থাকে। আবার দেখা যায়, একটি কাক অন্য কোনো পাখি বা প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হলে অপরাপর কাক সম্মিলিতভাবে আক্রান্তের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে এসে আক্রান্তকারীকে প্রতিহত করতে সচেষ্ট হয়।
পৃথিবীর যে কোনো দেশে চিকিৎসা পেশায় যারা নিয়োজিত, তারা মানবসেবার মহান ব্রত নিয়ে পেশাটিকে বেছে নেন। চিকিৎসকদের অনেকে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত, আবার অনেকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা করে থাকেন। সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও অফিসের নির্ধারিত সময়ের বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে রোগী দেখায় বিধি-নিষেধ নেই। চিকিৎসকরা মানুষের রোগ নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা রেখে থাকলেও তারা নিজেরা রোগ থেকে মুক্ত, এ কথা বলা যাবে না। বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের রোগ এবং মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসক রয়েছেন। এখন অধিকাংশ মানুষ রোগ নির্ণয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎকদের দ্বারস্থ হয়। সুদূর অতীত থেকে দেখা গেছে, কোনো চিকিৎসক রোগে আক্রান্ত হলে একই পেশায় নিয়োজিত অপর চিকিৎসক তাকে বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দিতেন। এ সেবার পরিধি থেকে অনেক সময় দেখা যায় চিকিৎসকদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পিতা-মাতা বাইরে নয়। যে নীতিবোধ ও নৈতিকতা থেকে অতীতে চিকিৎসকরা রোগ
নিরাময়ে সেবার হাত প্রশস্ত করতেন, বর্তমানে নীতিবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে সে সেবার হাত আর প্রশস্ত নয়।
সুদূর অতীতে যারা আইন পেশায় নিয়োজিত হতেন, তাদের প্রায় সবাই নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। এমন অনেক নীতিবান ও দৃঢ় চরিত্রের আইনজীবীর কথা শোনা যায়, যারা মক্কেল কর্তৃক নিয়োজিত হওয়ার পর মামলা সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত মক্কেল কর্তৃক দেয় টাকা ব্যয় করতে দ্বিধাবোধ করতেন। দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা পরিচালনায় যারা নিষ্ঠাবান ও পারদর্শী হিসেবে খ্যাত, আগে তাদের জিপি বা পিপি অথবা তাদের সহযোগী হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেয়া হতো। একটি জেলার আইনজীবী হিসেবে জিপি বা পিপি পদ যে কোনো আইনজীবীর জন্য সম্মানের হলেও অতীতে অনেক প্রথিতযশা ও ন্যায়নিষ্ঠ আইনজীবী নিজের আইন পেশার ক্ষতি হবে- এ বিবেচনায় জিপি বা পিপি পদের প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু অতীতের সেই আÍত্যাগ আজ খুব একটা দেখা যায় না। বিগত চার দশকের বেশি সময় থেকে দেখা যাচ্ছে, জিপি ও পিপি হওয়ার জন্য আইনজীবীদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা হচ্ছে এবং একজন আইনজীবীর পেশাগত সততা ও দক্ষতার চেয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি তার রাজনৈতিক আনুগত্য জিপি বা পিপি নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিক বিবেচিত হচ্ছে। একজন জিপি বা পিপি রাষ্ট্র বা সরকারের স্বার্থ সমুন্নত রাখার ব্যাপারে সদাসর্বদা সচেষ্ট থাকবেন, এটি কাক্সিক্ষত হলেও তা যে বর্তমানে প্রতিনিয়ত উপেক্ষিত হচ্ছে, তা বোধকরি আইন পেশায় সংশ্লিষ্ট ও দেশবাসীর বোঝা হয়ে গেছে।
অতীতে একজন আইনজীবী অপর আইনজীবীর ব্যক্তিগত মামলা বিনা পারিশ্রমিকে পরিচালনা করে নীতি ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত সমুজ্জ্বল রাখতেন। বর্তমানে বিভিন্নমুখী অবক্ষয়ের কারণে সে সমুজ্জ্বলতা মলিন। এখন আইনজীবীরা যেসব রাজনৈতিক মামলা পরিচালনা করলে পদ ও ক্ষমতা পাওয়ার জন্য সহায়ক হবে, সেসব মামলা ছাড়া কদাচিৎ বিনা পারিশ্রমিকে অন্য মামলা পরিচালনা করেন। বিভিন্ন জেলায় সরকার প্রদত্ত আইনগত সহায়তা তহবিলে অসহায় মানুষের মামলা পরিচালনার জন্য সরকারের
পক্ষ থেকে সম্ভাব্য অর্থের সংস্থান করা হলেও অধিকাংশ আইনজীবী ওই তহবিলের অর্থ দ্বারা মামলা পরিচালনার
ক্ষেত্রে অনীহা দেখান। এর পেছনের কারণ, মামলা পরিচালনার ব্যয় হিসাবে যে অর্থ দেয়া হয় তা আকর্ষণীয় নয়।
আমাদের দেশে যারা বিচার কার্যে নিয়োজিত, তাদের সবাই আইন বিষয়ে ডিগ্রিধারী। এদের অনেকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভের আগে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বিচারকরা সমাজেরই অংশ। একজন বিচারকের পারিবারিক, সামাজিক ও জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধে জড়িত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিচারক হিসেবে নিয়োগ লাভের আগে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিচারকরা নিয়োগ লাভের পর যে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে পারছেন এটি আজ কোনো কোনো বিচারকের ক্ষেত্রে সত্য নয়। একজন বিচারকের প্রধান কাজ ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা করা। এ সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে একজন বিচারকের কোনো ধরনের অন্যায়ের আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ নেই। পেশাগত কারণে একজন বিচারকের সৎ হওয়া অত্যাবশ্যক। তাই একজন বিচারক সৎ- এ কথাটি বললে তা অপরাপর বিচারকের জন্য বিব্রতকর হিসেবে দেখা দেয়। আমাদের সমাজে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে যে অবক্ষয়ের ছোঁয়া লেগেছে, তা থেকে বিচারকসমাজ অবমুক্ত নন। একজন বিচারক জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়লে তার পৈত্রিক সম্পত্তি রক্ষার জন্য সুবিচার প্রাপ্তির প্রত্যাশায় নীতিবান ও আদর্শ বিচারককে কখনও অনুরোধ করে থাকলে তাকে বিফল হতে হয় না। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় তখন, যখন একজন বিচারক নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন। এরূপ বিচারক অবৈধ অর্থের মোহে সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে আইনকানুনের থোড়াই তোয়াক্কা করেন।
এদের কাছে কোনো সহকর্মী বিচারক সঙ্গত
অনুরোধ করলে তাদের বলতে শোনা যায়, এটি বিচার বিভাগ, এখানে বিচারকদের কোনো ধরনের অনুরোধ করা যায় না।
যে কোনো সমাজের অবক্ষয় হলে তা সমাজের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে স্পর্শ করে। মানুষকে আল্লাহপাক যে বুদ্ধি-বিবেক দিয়েছেন তা অন্য কোনো প্রাণীকে দেননি। তাই জন্মগতভাবে একটি প্রাণীর ক্ষেত্রে যা সহজাত, তা মানুষরূপী প্রাণীর ক্ষেত্রে নয়। কাক কাকের মাংস খায় না- এটি জন্মগত সহজাত গুণ হিসেবে চির সত্য। পৃথিবীতে যতদিন কাকের অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন এ সত্যের অন্যথা হবে না। কিন্তু আমাদের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে যারা স্বজাতির ব্যথায় সমব্যথী বা সহমর্মী নন, বরং অন্যায় বা অনৈতিকভাবে প্রাপ্তির যোগ না থাকায় মুখ ফিরিয়ে নেন, ‘কাক কাকের মাংস খায় না’- এ প্রবাদটি তাদের ক্ষেত্রে সত্য নয়, এমনটি বলা যাবে কি? আর বলা না গেলে বলতে বাধা কোথায়- কাক এখন কাকের মাংস খায়!
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
Saturday, November 15, 2014
গাঁয়ের যোগী ভিখ পায় না! by মোহাম্মদ কায়কোবাদ
কবি নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন, এই দুর্ভাগা জাতি দেশের ঠাকুর রেখে বিদেশী কুকুর বরণ করতে কুণ্ঠা করবে না। তাই নিজের স্বপ্নের কথা বলেছেন- ‘কতরূপে স্নেহ করি দেশের কুকুর ধরি বিদেশের ঠাকুর ত্যাজিয়া’। আমরা মধ্য আয়ের দেশ হতে চাই। আমরা অচিরেই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে চাই। আমরা স্বাবলম্বী হতে চাই। তবে সব ক্ষেত্রেই বিদেশী পরামর্শক প্রয়োজন। যদিও বিদেশী পরামর্শক আর বিশেষজ্ঞ যে শুধু কাড়ি কাড়ি টাকা নিতে পারে এবং যুগ যুগ ধরে সমস্যা জিইয়ে রাখে, তার ভূরিভূরি উদাহরণ রয়েছে। এই তো সেদিন বাংলাদেশ বিমানকে লাভের মুখ দেখানোর জন্য এক বিদেশী ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা হয়েছিল। পত্রিকান্তরে জানা গেল, বিমানকে বেহাল রেখেই তিনি সরে পড়েছেন। যমুনা সেতু তৈরির কিছুদিনের মধ্যেই ফাটল ধরেছে। বিদেশী বিশেষজ্ঞরা নির্বাচন কমিশনে একই কাজ করার জন্য একাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকেও মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে সম্ভবত বিএ পাস বিশেষজ্ঞ আকাশ স্পর্শ করা বেতনে চাকরি করেছেন, সঙ্গে তার স্ত্রীও চড়া বেতনে।
আমরা শুধু ভারত থেকে নয়, এখন শ্রীলংকা থেকেও কম্পিউটারের পরামর্শক আনা শুরু করেছি। মিয়ানমার আর নেপাল শুধু সময়ের ব্যাপার। অন্তত সেই প্রকল্পগুলো যে সফলতার মুখ দেখেনি, তা না জেনেও বলা যায়। কারণ, সফল হলে শুধু তারা নয়, তাদের উত্তরাধিকারীরাও আমাদের দেশের সস্তা রোজগার থেকে নিজেদের বঞ্চিত করত না। রাজনৈতিক হানাহানির দেশে যখন বিদেশের ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ অনিশ্চিত পরিবেশে পরামর্শক হিসেবে আসে, তখন বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কোনো কারণ নেই যে, নিজের দেশে তাদের কাজের অভাব, উপরন্তু আমাদের দেশে আকাশচুম্বী বেতন।
একবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে একজন প্রবাসী বাংলাদেশীর চাকরির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। অনেক টাকা বেতন। কিন্তু যখন তার সার্টিফিকেট দেখতে চাচ্ছিলাম, তা আর পাওয়া যাচ্ছিল না। যাও একটা পাওয়া গেল তার চল্লিশ ভাগ লেখা মুছে গেছে। আমি ভালো একটি কপি দাবি করে চলে এলাম। পরদিন সকালে একজন এসে আমার বিভাগে মাস্টার্স করার সম্ভাবনা যাচাই করছিল। তার সার্টিফিকেট আর ওই দামি প্রবাসী বিশেষজ্ঞের শিক্ষা জীবনের শেষ সার্টিফিকেট এক হওয়ায় আমি ধারণা পেলাম, নিজের দেশে নিজেদের কী পরিমাণ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেই না আমরা চলেছি। অথচ আমাদের স্নাতকেরা বিদেশে সুনামের সঙ্গে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নয়, ইন্ডাস্ট্রিতেও কাজ করছে এবং অনেকেই শুধু আমাদের ডিগ্রি নিয়েই। স্বদেশী পণ্য এবং উৎপাদনমুখী নীতি অনুসরণ করে মানসম্পন্ন ব্লেড তৈরিতে অপারগ ভারত প্রথম এশীয় দেশ হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে মঙ্গল গ্রহে রকেট পাঠিয়েছে। এর আগে তাদের রকেট চাঁদে পানির অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করেছে। আমরা আগেও বিদেশী পণ্য, বিশেষজ্ঞ ও সেবায় ধন্য হয়েছি, এখনও তাই। ব্যবধান এটুকু যে, আগে বিদেশ বলতে জাপান, জার্মানি, আমেরিকা বোঝাত; আর এখন বিদেশ আমাদের অনেক কাছে- মালয়েশিয়া, ভারত, শ্রীলংকা কিংবা থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ।
কয়েকদিন আগে যে সারা দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটল, তার সমাধান নাকি বিদেশী পরামর্শক নিয়োগ! টিভিতে তাই দেখতে পেলাম। ২০০৭ সালেও এমন বিপর্যয় ঘটেছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা সমস্যা চিহ্নিত করে সুপারিশও করেছিলেন, যার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বাঙালরা কি আর এ সবকিছু বোঝে? বিদেশী হলে অবশ্য যে কোনো রঙের হলেও পারে! অথচ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ গর্ব করার মতো মেধাবী শিক্ষকে সমৃদ্ধ। এই বিভাগের স্নাতকদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আইইই-এর ফেলো, বার্কলেসহ নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আবার আমেরিকার বিখ্যাত ইলেকট্রিক পাওয়ার রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. আরশাদ মনসুর হলেন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নামকরা গবেষক। এবারের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পরপরই জনপ্রিয় সাহিত্যিক-কলামিস্ট আনিসুল হক এ সমস্যায় তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আমাদের দেশেও প্রয়োজনে তার সহযোগিতার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।
আমরা দেশটি ঠিকঠাকই চালাতে পারছি, তবে শুধু গর্বের প্রতীক আদমজী জুট মিল চালাতে না পেরে বন্ধ করে দেই, কখনওবা বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মতো একেবারেই গৃহস্থালির কাজও বিদেশীদের দিয়ে করানোর উদ্যোগ নেই, অথবা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা থাইদের হাতে ছেড়ে দিতে চাই। এ কাজগুলো বিদেশীদের দিলে কখনও নিজেরা শিখতে পারব না। কোনো দেশই আমাদের সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তাদের কাজ ছেড়ে দেবে না। নিজেদের কাজ নিজেদেরই করতে হবে, তা যত আনাড়িভাবেই আমরা পারি না কেন। এক প্রজন্মের ত্যাগ ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের গোড়াপত্তন করবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আর ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা না থাকলে জন্মজন্মান্তর আমাদের উত্তরসূরিরা উন্নয়নশীল দেশের ছাপ কপালে নিয়ে নিগৃহীত হবে।
স্বাধীনতার পর ৪০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। এভাবে পরমুখাপেক্ষী থাকায় কোনো গৌরব নেই, বরং বিস্তর গ্লানি আছে। জাতি হিসেবে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চাই। আমাদের মেরুদণ্ড যতই দুর্বল হোক না কেন, এর ওপর ভর করেই শির উন্নত করে আমরা দাঁড়াতে চাই। বিদেশ-বিভূঁইয়ে অনাত্মীয় পরিবেশে, এমনকি উন্নত চিকিৎসার জন্য শুধু নিজেরা নয়, আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতাদেরও মরতে দিতে চাই না। নিজের দেশে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে মরতে মরতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বাঁচাতে ও বাঁচতে শিখে যাবে।
ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
আমরা শুধু ভারত থেকে নয়, এখন শ্রীলংকা থেকেও কম্পিউটারের পরামর্শক আনা শুরু করেছি। মিয়ানমার আর নেপাল শুধু সময়ের ব্যাপার। অন্তত সেই প্রকল্পগুলো যে সফলতার মুখ দেখেনি, তা না জেনেও বলা যায়। কারণ, সফল হলে শুধু তারা নয়, তাদের উত্তরাধিকারীরাও আমাদের দেশের সস্তা রোজগার থেকে নিজেদের বঞ্চিত করত না। রাজনৈতিক হানাহানির দেশে যখন বিদেশের ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ অনিশ্চিত পরিবেশে পরামর্শক হিসেবে আসে, তখন বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কোনো কারণ নেই যে, নিজের দেশে তাদের কাজের অভাব, উপরন্তু আমাদের দেশে আকাশচুম্বী বেতন।
একবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে একজন প্রবাসী বাংলাদেশীর চাকরির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। অনেক টাকা বেতন। কিন্তু যখন তার সার্টিফিকেট দেখতে চাচ্ছিলাম, তা আর পাওয়া যাচ্ছিল না। যাও একটা পাওয়া গেল তার চল্লিশ ভাগ লেখা মুছে গেছে। আমি ভালো একটি কপি দাবি করে চলে এলাম। পরদিন সকালে একজন এসে আমার বিভাগে মাস্টার্স করার সম্ভাবনা যাচাই করছিল। তার সার্টিফিকেট আর ওই দামি প্রবাসী বিশেষজ্ঞের শিক্ষা জীবনের শেষ সার্টিফিকেট এক হওয়ায় আমি ধারণা পেলাম, নিজের দেশে নিজেদের কী পরিমাণ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেই না আমরা চলেছি। অথচ আমাদের স্নাতকেরা বিদেশে সুনামের সঙ্গে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নয়, ইন্ডাস্ট্রিতেও কাজ করছে এবং অনেকেই শুধু আমাদের ডিগ্রি নিয়েই। স্বদেশী পণ্য এবং উৎপাদনমুখী নীতি অনুসরণ করে মানসম্পন্ন ব্লেড তৈরিতে অপারগ ভারত প্রথম এশীয় দেশ হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে মঙ্গল গ্রহে রকেট পাঠিয়েছে। এর আগে তাদের রকেট চাঁদে পানির অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করেছে। আমরা আগেও বিদেশী পণ্য, বিশেষজ্ঞ ও সেবায় ধন্য হয়েছি, এখনও তাই। ব্যবধান এটুকু যে, আগে বিদেশ বলতে জাপান, জার্মানি, আমেরিকা বোঝাত; আর এখন বিদেশ আমাদের অনেক কাছে- মালয়েশিয়া, ভারত, শ্রীলংকা কিংবা থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ।
কয়েকদিন আগে যে সারা দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটল, তার সমাধান নাকি বিদেশী পরামর্শক নিয়োগ! টিভিতে তাই দেখতে পেলাম। ২০০৭ সালেও এমন বিপর্যয় ঘটেছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা সমস্যা চিহ্নিত করে সুপারিশও করেছিলেন, যার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বাঙালরা কি আর এ সবকিছু বোঝে? বিদেশী হলে অবশ্য যে কোনো রঙের হলেও পারে! অথচ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ গর্ব করার মতো মেধাবী শিক্ষকে সমৃদ্ধ। এই বিভাগের স্নাতকদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আইইই-এর ফেলো, বার্কলেসহ নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আবার আমেরিকার বিখ্যাত ইলেকট্রিক পাওয়ার রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. আরশাদ মনসুর হলেন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নামকরা গবেষক। এবারের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পরপরই জনপ্রিয় সাহিত্যিক-কলামিস্ট আনিসুল হক এ সমস্যায় তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আমাদের দেশেও প্রয়োজনে তার সহযোগিতার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।
আমরা দেশটি ঠিকঠাকই চালাতে পারছি, তবে শুধু গর্বের প্রতীক আদমজী জুট মিল চালাতে না পেরে বন্ধ করে দেই, কখনওবা বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মতো একেবারেই গৃহস্থালির কাজও বিদেশীদের দিয়ে করানোর উদ্যোগ নেই, অথবা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা থাইদের হাতে ছেড়ে দিতে চাই। এ কাজগুলো বিদেশীদের দিলে কখনও নিজেরা শিখতে পারব না। কোনো দেশই আমাদের সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তাদের কাজ ছেড়ে দেবে না। নিজেদের কাজ নিজেদেরই করতে হবে, তা যত আনাড়িভাবেই আমরা পারি না কেন। এক প্রজন্মের ত্যাগ ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের গোড়াপত্তন করবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আর ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা না থাকলে জন্মজন্মান্তর আমাদের উত্তরসূরিরা উন্নয়নশীল দেশের ছাপ কপালে নিয়ে নিগৃহীত হবে।
স্বাধীনতার পর ৪০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। এভাবে পরমুখাপেক্ষী থাকায় কোনো গৌরব নেই, বরং বিস্তর গ্লানি আছে। জাতি হিসেবে আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চাই। আমাদের মেরুদণ্ড যতই দুর্বল হোক না কেন, এর ওপর ভর করেই শির উন্নত করে আমরা দাঁড়াতে চাই। বিদেশ-বিভূঁইয়ে অনাত্মীয় পরিবেশে, এমনকি উন্নত চিকিৎসার জন্য শুধু নিজেরা নয়, আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতাদেরও মরতে দিতে চাই না। নিজের দেশে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে মরতে মরতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বাঁচাতে ও বাঁচতে শিখে যাবে।
ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
মধ্যবর্তী নির্বাচন চাইলেই হবে না কীভাবে সেটাও বলতে হবে by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার
বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক সংকট চলমান রয়েছে। সংকটটি জন্ম নিয়েছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনটি ছিল গণতান্ত্রিক বিশ্বের সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে নজিরবিহীন। নির্বাচনটি এমনই ব্যতিক্রমী ছিল যে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী একটি দল সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করে। প্রধান বিরোধী দলের বর্জনের কারণে এবং অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দল নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় একটি বড় দলকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ওই দলের কিছুসংখ্যক নেতাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়ে তাদের দিয়ে সংসদে একটি অভূতপূর্ব ও বিচিত্র বিরোধী দল সৃষ্টি করা হয়। এ নির্বাচনের অনিয়ম এবং নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর ভূমিকা দেখার পর সাধারণ মানুষ নির্বাচনটির প্রতি একেবারেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এসব কারণে নামকাওয়াস্তের এ নির্বাচনটি যুগপৎ দেশে-বিদেশে একটি সাধারণ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মতো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। সে কারণে এ নির্বাচনের ওপর ভর করে গঠিত সরকারও দেশে সমালোচনা ও আন্দোলন এবং বিদেশে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। বিরোধী দল থেকে এবং বন্ধুপ্রতিম গণতান্ত্রিক দেশগুলো থেকেও বারংবার একটি অংশগ্রহণমূলক স্বচ্ছ নির্বাচনের আয়োজন করতে বলা হচ্ছে। নাগরিকদের অনেকেই ভাবছেন, সরকার একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিলে হয়তো চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে এবং দেশ আবার শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনের মধ্য দিয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।
সাধারণ মানুষের এ ধারণা একেবারেই ভুল। কারণ, একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আয়োজন করলেই কেবল চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে না। পঞ্চদশ সংশোধনী-উত্তর সংবিধানের বিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে ও বর্তমান চরিত্রের নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে একটি কেন, পাঁচ-দশটি মধ্যবর্তী নির্বাচন করেও চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করা যাবে না। আর ওই রকম নির্বাচনে সংসদের বাইরের প্রধান ও প্রকৃত বিরোধী দল বিএনপি হয়তো অংশগ্রহণও করবে না। কারণ, এমন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে বিরোধী দলের পক্ষে মুখ রক্ষা করা সহজ হবে না। তখন বিএনপিকে স্বীকার করতে হবে যে, তারা তাহলে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে ভুল করেছিল। আরও স্বীকার করে নিতে হবে যে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন করে দলটি ভুল করেছিল এবং ওই আন্দোলন করতে গিয়ে যারা আহত ও নিহত হয়েছিলেন এবং যে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল সেজন্য তারাই দায়ী। এ রকম স্বীকারোক্তি করা আর নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা একই কথা। এ কাজ করলে দলটির জনসমর্থন কমে যাবে এবং দলটি নির্বাচনেও ভালো করতে পারবে না। এমন নির্বাচনে যদি তারা ভুল করে অংশগ্রহণ করেও, তাহলে দলটির জণসমর্থনও কমে যাবে। অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বিএনপির পক্ষে ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে না। আর প্রকৃত প্রধান বিরোধী দল ছাড়া কেবল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং শওকত হোসেন নিলুরা অংশগ্রহণ করলে ওই রকম মধ্যবর্তী নির্বাচন আবারও গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
কাজেই সরকার যদি চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আন্তরিক হতে চায়, তাহলে দলীয় সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের চিন্তা বাদ দিতে হবে। কারণ, এমন নির্বাচন করলে ওই নির্বাচনের স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা দিলেও কেউ বিশ্বাস করবে না। আর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকায় নির্বাচন যে কতটা দুর্নীতি-কারচুপিমুক্ত এবং অবাধ হতে পারবে সে বিষয়টি যুগপৎ দশম সংসদ নির্বাচন এবং তৎপরবর্তী চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। কাজেই সরকার যদি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে চলমান সংকটের সমাধান করতে চায়, তাহলে তাকে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে কেমন সরকারের অধীনে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। সরকারকে জনগণের মধ্যে এ বিশ্বাস আনতে হবে, যে মধ্যবর্তী নির্বাচন তারা করবে তা দশম সংসদ বা চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মতো হবে না। এ কাজটি করতে হলে সরকারকে আগামী সংসদ নির্বাচন কেমন সরকারের অধীনে হবে, তার রূপরেখা তৈরি করতে হবে। এ কাজ করতে বেশ সময় লাগবে। সেজন্য সরকার যদি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে চায়, তাহলে তাকে খুব বেশি দেরি না করেই ওই নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে এবং সে লক্ষ্যে এখনই নির্বাচনকালীন সরকারের একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ শুরু করতে হবে।
চলমান রাজনৈতিক সংকটটি যেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা তৈরি করেছেন, কাজেই এর সমাধানও তাদেরই বের করতে হবে। এ লক্ষ্যে বিদেশীদের ওপর নির্ভর করে তাদের বেশি গুরুত্ব না দেয়াই ভালো। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এ দেশে এ ধরনের সংকট বিদেশীরা দূর করতে পারেনি। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে স্যার নিনিয়ান স্টিফেন এবং ২০১৩ সালে অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা দেশবাসী বিস্মৃত হননি। কাজেই বিদেশীদের মাধ্যমে আলোচ্য সমস্যার সমাধান করার প্রচেষ্টা নিলে তাতে কেবল সময় নষ্ট করা হবে। তবে সরকার যদি বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে ও জামায়াত-হেফাজতকে নিষ্ক্রিয় করার প্রয়াস নিয়ে চলমান সংকটের সমাধানে গড়িমসি করে, তাহলে সরকারি ফর্মুলায়ই যে রাজনৈতিক অংক চলবে এমনটি নাও হতে পারে। ভোটবঞ্চিত সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে মোনাফেকি করে নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পর আরেকটি নির্বাচন না দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে যে কোনো সময় যে কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ হওয়ার সম্ভাবনাটি নাকচ করার মতো নয়। সরকার যদি এ বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়নের প্রলোভন দেখিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করার বিষয়টি অবহেলা করে, তাহলে তা এক রকমের বোকামি হবে।
বিশ্বায়নের যুগে বিদেশীদের দেশীয় রাজনীতিতে গুরুত্ব দিতে না চাইলেও তাদের একেবারেই উপেক্ষা করে একাকী যা খুশি তা করার দিন আজ নেই। যেহেতু অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে মিলিমিশেই বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে, সে কারণে বহির্বিশ্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের দেশে যা খুশি তাই করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। নিজে যা খুশি তাই করতে গেলে যে অনেক সময় তা সম্ভব হয় না সে বিষয়টি পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা প্রদান প্রত্যাহার করার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। কাজেই বিরোধী দলকে আন্দোলন করতে না দিয়ে এবং তাদের হামলা-মামলায় পর্যুদস্ত করে এককভাবে দেশ পরিচালনা করতে চাইলে বিদেশী গণতান্ত্রিক বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো যে এ ব্যাপারে চুপ থাকবে না তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে বিদেশী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সরকারকে বারবার সে ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা অর্থবহ সংলাপ করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দিলেও সরকার সে পরামর্শ গায়ে মাখছে না।
গণতান্ত্রিক বিশ্বের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে প্রথম থেকেই প্রশংসা করেনি। আজও ওই দেশগুলো তাদের সে অবস্থানে অনড় রয়েছে। গত ১১ মাসে যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই তারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে তাদের মনোভাব জানিয়ে দিয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও নেতারা বিদেশ সফর করলে তাদের বারবার নতুন করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দেয়া হচ্ছে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী লিন ফেদারস্টোন ঢাকা সফরে এলে অবাধ নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে ওই রকম নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারের তরফ থেকে এ রকম কোনো সংলাপের উদ্যোগ না থাকায় এ ব্রিটিশমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করে গেছেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তার আগের অবস্থানে অনড় থেকে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে অবিলম্বে সব পক্ষের অংশগ্রহণে একটি ইনক্লুসিভ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ প্রদান অব্যাহত রেখেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার কোনো পরিবর্তন পরবর্তীকালে যে হয়নি, সে বিষয়টি অক্টোবরে ওয়াশিংটন ডিসিতে আমেরিকান সিকিউরিটি প্রজেক্ট আয়োজিত বাংলাদেশ : প্রসপেক্টস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস শীর্ষক সেমিনারে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের উপ-সহকারী মন্ত্রী ট্যাড ব্রাউন আবারও নিশ্চিত করেছেন। এ মাসের শেষ সপ্তাহে কাঠমুন্ডুর সার্ক সম্মেলন শেষ করে দুদিনের জন্য আবারও ঢাকায় আসছেন সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। তিনি ঢাকা এসে একই সুরে আবারও যে চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও সে লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্থবহ সংলাপের তাগিদ দিয়ে যাবেন, তা আগেই বলে দেয়া যায়।
ভোটাধিকারবঞ্চিত সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ায় এবং বন্ধুপ্রতিম গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মনোভাবে কোনো পরিবর্তন না দেখে সরকার বুঝতে পেরেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ওপর ভর করে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার প্রচেষ্টা যুগপৎ দেশে ও বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে। সেজন্য সরকারের অনেক নেতা-মন্ত্রী ২০১৯ সালের আগে সংসদ নির্বাচন হবে না বলে বক্তব্য দিলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্য ঘুরে এসে নির্বাচন সময়মতো হবে বলে বক্তব্য দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের মধ্যে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অংশগ্রহণমূলক মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইঙ্গিত খুঁজে পাচ্ছেন। আবারও বলতে হচ্ছে, সরকার কেবল মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে কোনো সাফল্য দাবি করতে পারবে না এবং এমন নির্বাচনে চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধানও হবে না। সরকার চলমান সংকট নিরসনের কৃতিত্ব কেবল তখনই দাবি করতে পারবে, যখন সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে একটি নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার উদ্ভাবন করতে পারবে।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সাধারণ মানুষের এ ধারণা একেবারেই ভুল। কারণ, একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আয়োজন করলেই কেবল চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে না। পঞ্চদশ সংশোধনী-উত্তর সংবিধানের বিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে ও বর্তমান চরিত্রের নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে একটি কেন, পাঁচ-দশটি মধ্যবর্তী নির্বাচন করেও চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করা যাবে না। আর ওই রকম নির্বাচনে সংসদের বাইরের প্রধান ও প্রকৃত বিরোধী দল বিএনপি হয়তো অংশগ্রহণও করবে না। কারণ, এমন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে বিরোধী দলের পক্ষে মুখ রক্ষা করা সহজ হবে না। তখন বিএনপিকে স্বীকার করতে হবে যে, তারা তাহলে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে ভুল করেছিল। আরও স্বীকার করে নিতে হবে যে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন করে দলটি ভুল করেছিল এবং ওই আন্দোলন করতে গিয়ে যারা আহত ও নিহত হয়েছিলেন এবং যে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল সেজন্য তারাই দায়ী। এ রকম স্বীকারোক্তি করা আর নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা একই কথা। এ কাজ করলে দলটির জনসমর্থন কমে যাবে এবং দলটি নির্বাচনেও ভালো করতে পারবে না। এমন নির্বাচনে যদি তারা ভুল করে অংশগ্রহণ করেও, তাহলে দলটির জণসমর্থনও কমে যাবে। অর্থাৎ দলীয় সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও বিএনপির পক্ষে ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে না। আর প্রকৃত প্রধান বিরোধী দল ছাড়া কেবল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং শওকত হোসেন নিলুরা অংশগ্রহণ করলে ওই রকম মধ্যবর্তী নির্বাচন আবারও গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
কাজেই সরকার যদি চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আন্তরিক হতে চায়, তাহলে দলীয় সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের চিন্তা বাদ দিতে হবে। কারণ, এমন নির্বাচন করলে ওই নির্বাচনের স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা দিলেও কেউ বিশ্বাস করবে না। আর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকায় নির্বাচন যে কতটা দুর্নীতি-কারচুপিমুক্ত এবং অবাধ হতে পারবে সে বিষয়টি যুগপৎ দশম সংসদ নির্বাচন এবং তৎপরবর্তী চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। কাজেই সরকার যদি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে চলমান সংকটের সমাধান করতে চায়, তাহলে তাকে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে কেমন সরকারের অধীনে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। সরকারকে জনগণের মধ্যে এ বিশ্বাস আনতে হবে, যে মধ্যবর্তী নির্বাচন তারা করবে তা দশম সংসদ বা চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের মতো হবে না। এ কাজটি করতে হলে সরকারকে আগামী সংসদ নির্বাচন কেমন সরকারের অধীনে হবে, তার রূপরেখা তৈরি করতে হবে। এ কাজ করতে বেশ সময় লাগবে। সেজন্য সরকার যদি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে চায়, তাহলে তাকে খুব বেশি দেরি না করেই ওই নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে এবং সে লক্ষ্যে এখনই নির্বাচনকালীন সরকারের একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ শুরু করতে হবে।
চলমান রাজনৈতিক সংকটটি যেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা তৈরি করেছেন, কাজেই এর সমাধানও তাদেরই বের করতে হবে। এ লক্ষ্যে বিদেশীদের ওপর নির্ভর করে তাদের বেশি গুরুত্ব না দেয়াই ভালো। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এ দেশে এ ধরনের সংকট বিদেশীরা দূর করতে পারেনি। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে স্যার নিনিয়ান স্টিফেন এবং ২০১৩ সালে অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা দেশবাসী বিস্মৃত হননি। কাজেই বিদেশীদের মাধ্যমে আলোচ্য সমস্যার সমাধান করার প্রচেষ্টা নিলে তাতে কেবল সময় নষ্ট করা হবে। তবে সরকার যদি বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে ও জামায়াত-হেফাজতকে নিষ্ক্রিয় করার প্রয়াস নিয়ে চলমান সংকটের সমাধানে গড়িমসি করে, তাহলে সরকারি ফর্মুলায়ই যে রাজনৈতিক অংক চলবে এমনটি নাও হতে পারে। ভোটবঞ্চিত সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে মোনাফেকি করে নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পর আরেকটি নির্বাচন না দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে যে কোনো সময় যে কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ হওয়ার সম্ভাবনাটি নাকচ করার মতো নয়। সরকার যদি এ বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়নের প্রলোভন দেখিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করার বিষয়টি অবহেলা করে, তাহলে তা এক রকমের বোকামি হবে।
বিশ্বায়নের যুগে বিদেশীদের দেশীয় রাজনীতিতে গুরুত্ব দিতে না চাইলেও তাদের একেবারেই উপেক্ষা করে একাকী যা খুশি তা করার দিন আজ নেই। যেহেতু অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে মিলিমিশেই বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে, সে কারণে বহির্বিশ্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের দেশে যা খুশি তাই করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। নিজে যা খুশি তাই করতে গেলে যে অনেক সময় তা সম্ভব হয় না সে বিষয়টি পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা প্রদান প্রত্যাহার করার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। কাজেই বিরোধী দলকে আন্দোলন করতে না দিয়ে এবং তাদের হামলা-মামলায় পর্যুদস্ত করে এককভাবে দেশ পরিচালনা করতে চাইলে বিদেশী গণতান্ত্রিক বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো যে এ ব্যাপারে চুপ থাকবে না তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে বিদেশী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সরকারকে বারবার সে ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা অর্থবহ সংলাপ করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দিলেও সরকার সে পরামর্শ গায়ে মাখছে না।
গণতান্ত্রিক বিশ্বের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলো ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে প্রথম থেকেই প্রশংসা করেনি। আজও ওই দেশগুলো তাদের সে অবস্থানে অনড় রয়েছে। গত ১১ মাসে যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই তারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে তাদের মনোভাব জানিয়ে দিয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও নেতারা বিদেশ সফর করলে তাদের বারবার নতুন করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দেয়া হচ্ছে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী লিন ফেদারস্টোন ঢাকা সফরে এলে অবাধ নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে ওই রকম নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসার পরামর্শ দিয়েছেন। সরকারের তরফ থেকে এ রকম কোনো সংলাপের উদ্যোগ না থাকায় এ ব্রিটিশমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করে গেছেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তার আগের অবস্থানে অনড় থেকে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে অবিলম্বে সব পক্ষের অংশগ্রহণে একটি ইনক্লুসিভ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ প্রদান অব্যাহত রেখেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার কোনো পরিবর্তন পরবর্তীকালে যে হয়নি, সে বিষয়টি অক্টোবরে ওয়াশিংটন ডিসিতে আমেরিকান সিকিউরিটি প্রজেক্ট আয়োজিত বাংলাদেশ : প্রসপেক্টস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস শীর্ষক সেমিনারে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের উপ-সহকারী মন্ত্রী ট্যাড ব্রাউন আবারও নিশ্চিত করেছেন। এ মাসের শেষ সপ্তাহে কাঠমুন্ডুর সার্ক সম্মেলন শেষ করে দুদিনের জন্য আবারও ঢাকায় আসছেন সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। তিনি ঢাকা এসে একই সুরে আবারও যে চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও সে লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্থবহ সংলাপের তাগিদ দিয়ে যাবেন, তা আগেই বলে দেয়া যায়।
ভোটাধিকারবঞ্চিত সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ায় এবং বন্ধুপ্রতিম গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মনোভাবে কোনো পরিবর্তন না দেখে সরকার বুঝতে পেরেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ওপর ভর করে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার প্রচেষ্টা যুগপৎ দেশে ও বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে। সেজন্য সরকারের অনেক নেতা-মন্ত্রী ২০১৯ সালের আগে সংসদ নির্বাচন হবে না বলে বক্তব্য দিলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্য ঘুরে এসে নির্বাচন সময়মতো হবে বলে বক্তব্য দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের মধ্যে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অংশগ্রহণমূলক মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইঙ্গিত খুঁজে পাচ্ছেন। আবারও বলতে হচ্ছে, সরকার কেবল মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে কোনো সাফল্য দাবি করতে পারবে না এবং এমন নির্বাচনে চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধানও হবে না। সরকার চলমান সংকট নিরসনের কৃতিত্ব কেবল তখনই দাবি করতে পারবে, যখন সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে একটি নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার উদ্ভাবন করতে পারবে।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
Thursday, November 13, 2014
মোড়ে পৌঁছেছি, এবার টার্ন নিতে হবে by মেজর (অব.) সুধীর সাহা
একটি দেশের অগ্রগতির জন্য, সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ৪০-৫০ বছর খুব বেশি সময় নয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উন্নতি নয়, একটি দেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে অনেক শর্ত থাকে। যেসব দেশ সামনে এগিয়ে গেছে, সেগুলোর প্রতিটিরই সময় লেগেছে। তবে কোনো কোনো দেশের কথা আলাদা। সেগুলোর কোনো কোনোটি সোনার চামচ কিংবা তেলের ঝাঁপা মাথায় করে জন্ম নিয়েছে। তাই তাদের প্রাকৃতিক সম্পদই তাদের সামনের দিকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের কপাল তত ভালো ছিল না। অন্যদিকে, পুরো পাকিস্তানের সময়টুকুতে বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানকে দাবিয়ে রাখার সব চেষ্টাই করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকচক্র। ফলে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার প্রাক্কালে আমাদের খালি হাতেই একটি নতুন রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য যখন উঁকি দিচ্ছিল আমাদের জানালায়, ঠিক সেই সময়ে পাকিস্তানের পিশাচের দল আমাদের অনেক সূর্যসন্তানকে হত্যা করেছিল। নতুন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার চক্রান্তের একটি নীল নকশা ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড। যেহেতু স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত, রাশিয়া আমাদের পাশে ছিল, তাই যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তান বৈরী মনোভাব নিয়েই দেখছিল আমাদের স্বাধীনতার পর থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব পরবর্তী সময়ে কিছুটা পরিবর্তিত হলেও বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের মনোভাবের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি আজ অবধি। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশ নিয়ে কৌতুক করে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেই সময়ের বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে একটি জটিল ও নাজুক উন্নয়ন সমস্যার দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।
বিশ্বের নানা দেশে ভ্রমণের সময় যাত্রীরা যদি লাইনের বাইরে দাঁড় করানো কোনো হতভাগ্য যাত্রীকে দেখতে পেয়ে করুণার দৃষ্টিতে তাকাত, তবে সে যে বাংলাদেশের কোনো যাত্রী হবে এমনটা অনুমান করা যেত। বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী লোকটি অস্পৃশ্য, তাকে লাইনের বাইরে নিয়ে ম্যাগনিফায়িং গ্লাসে পরীক্ষা করতে হবে। কঠিন ও তীর্যক প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া যেন বাংলাদেশীদের ভাগ্যের লিখন। কখনও তারা ছাড়া পেত, প্লেন ধরতে পারত। আবার কখনও কখনও প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই প্লেনটি তার নাকের ডগা দিয়ে চলে যেত। পরবর্তী প্লেনের জন্য তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। ইংরেজিতে বোঝাতে না পেরে বাংলাদেশের কত যাত্রী যে ভোগান্তিতে পড়েছে তা হিসাব করে বলার উপায় নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো শহর থেকে প্লেনে উঠলেই শত শত বাঙালি শ্রমজীবী কর্মী পাবেন। বিমানে বসা থেকে শুরু করে খাওয়া- সর্বত্রই তাদের ব্যবহারিক সমস্যা আছে। তারা চিৎকার করে কথা বলে। অযথাই হাঁটাহাঁটি করে। তাদের ব্যবহার নিয়ে বিমানবালাদেরও বিরক্তির শেষ নেই। এয়ারপোর্ট সংক্রান্ত কোনো ফরম পূরণ করতে হলে তারা সমস্যায় পড়ে। পাশের কোনো শিক্ষিত লোককে অনুরোধ করে তার ফরমটি পূরণ করে দিতে। এসব সমস্যা আমাদের আছে দীর্ঘদিন ধরে। শ্রীলংকা, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন থেকেও বিদেশে যায় প্রচুর শ্রমিক। তবে তাদের জানার পরিধি আমাদের শ্রমিকদের থেকে বেশি হওয়ায় তারা রাস্তায় কোনো সমস্যায় পড়ে না। শ্রমিকদের শিক্ষা, কারিগরি জ্ঞান, ব্যবহার, কোনো কিছুর প্রশিক্ষণেই আমাদের রাষ্ট্র খুব বেশি মনোযোগী ছিল না কখনও। তাই তো গ্রামবাংলার অশিক্ষিত শ্রমিক যখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশে যাচ্ছে, তাদের কাঁচা স্বভাব পরিবর্তন করার সুযোগ সে পাচ্ছে না। এমন অপরিপক্ব জ্ঞানের জন্য কাকে দায়ী করা যায় সে প্রশ্ন রয়েই যাবে। তবে পাশাপাশি সাফিয়ার মতো আমাদের বীর গৃহকর্মীও আছেন, যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। আমিরাতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন সাফিয়া। সাফিয়া নিজের জীবন দিয়ে আবুধাবির সমুদ্র সৈকতে ডুবন্ত চার শিশুকে প্রাণে বাঁচান। মনিবের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে সাফিয়া নিজের জীবন দান করে গেছেন। এই সাফিয়া আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না। কিন্তু তিনি হাজার সাফিয়াকে উদ্বুদ্ধ করে গেলেন নিজের জীবন দিয়ে।
ভদ্রলোক বাংলাদেশের। অনেক বছর বিশ্ব সংস্থার বিভিন্ন দেশে চাকরি করে বিশ বছর ধরে কানাডায় থাকেন। গ্রীষ্মে কানাডা এবং শীতে বাংলাদেশে থাকবেন এই আশায় তিনি ঢাকার বনানীতে একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় করেন। তিন বছর কাটে এভাবে। কিন্তু তিন বছর পর গত বছর থেকে ভদ্রলোক বনানীর অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করে মালয়েশিয়ায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় করে শীতের সময় বাংলাদেশের পরিবর্তে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে বসবাস শুরু করেন। কেন বাংলাদেশ ছাড়তে হল এমন একটি প্রশ্ন করে, আমার মনে হল, আমি যেন মৌচাকে ঢিল দিয়ে বসেছি। ভদ্রলোক ঢাকা, বাংলাদেশ এবং তার পরিচিত ঢাকাবাসীকে নিয়ে যত নেগেটিভ কথা বলা যায় সবই বলে গেলেন একদমে। তার কাছে তার মাতৃভূমি একেবারেই বসবাসের অনুপযোগী মনে হয়েছে। রাস্তার যানজট, প্রতিবেশীর মন্দ ব্যবহার, সরকারি অফিসের দুর্নীতি, চলাচলের পরাধীনতা, খাবার জিনিসে ভেজাল, রাজনৈতিক সহিংসতাসহ অনেক বিষয়ই তার বিরাগের কারণ হিসেবে কাজ করেছে। ভদ্রলোক বেশ কয়েকটি বাস্তব অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে নিজ দেশের প্রতি এমন বিরাগভাজন হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করছিলেন।
এসব বাস্তবতা স্বীকার করেও বলতে ইচ্ছা হয়, বাংলাদেশ সামনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নেই, দুর্নীতি একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম আর অব্যবস্থা বিদ্যমান। তারপরও বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে ধাবিত হচ্ছে দ্রুতগতিতে। গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম (জিএনআই) হল মধ্যম আয় মাপার মাধ্যম। নিু আয় ধরা হয় ১,০২৫ ডলার পর্যন্ত। নিু মধ্যম আয় ১,০২৬ থেকে ৪,০৩৫ ডলার। বাংলাদেশের বর্তমান মাথাপিছু জিএনআই ৮৫১ ডলার। এই জিএনআই অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশের ৫০তম স্বাধীনতাবার্ষিকীতে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ঘোষণা দেয়া সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বন্যা, দুর্যোগ মোকাবেলা করছে প্রতিনিয়ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর অবস্থা নাজুক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর নিত্যসঙ্গী। বাংলাদেশের রাজনীতি সংঘাতময়। শাসন ব্যবস্থা এখানে দুর্বল। এরপর আছে বিশ্ব সমাজের প্রভাবশালীদের চাপ। সবকিছু সত্ত্বেও বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। স্বাধীনতার পর যেসব দেশ বিরূপ মন্তব্য করেছিল, বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই তাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ বাংলাদেশও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব করেছে; সুলভ শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে রফতানিনির্ভর অর্থনীতি রেখেছে সমুন্নত। অনেক সামাজিক সূচকে প্রতিবেশী জায়েন্ট
ভারতকে বৃদ্ধাঙুলি দেখাতে পেরেছে বাংলাদেশ। প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল যেখানে ভারতে ৬৬, সেখানে বাংলাদেশে ৬৯। শিশু মৃত্যুর হার ভারতে ৪৪ এবং বাংলাদেশে ৩৭। জন্মহার ভারতে ২ দশমিক ৫ আর বাংলাদেশে ২ দশমিক ২। নারীশিক্ষার হার ভারতে ৭৪ আর বাংলাদেশে ৮০। অপুষ্টির হার ভারতে ১৮ আর বাংলাদেশে ১৭। বাংলাদেশে সামাজিক সূচকের উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা এবং নারী-পুরুষের সমতা বিষয়ে বাংলাদেশের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে। সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংকসহ অন্যান্য এনজিও এবং নারী উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খুব বড় করে ধন্যবাদ পেতে পারেন। প্রথমবারের জন্য নারী জাগরণের বাঁশিটি প্রকৃতপক্ষে তিনিই অফিসিয়ালি বাজিয়েছেন।
আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন আর পৃথিবীর রাস্তাঘাটে বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের অযথা নাজেহাল হতে হবে না। বাংলাদেশের শ্রমিকরা আর দৌড়াবে না বিদেশের মাটিতে। বরং নিজের দেশে তারা শ্রম দেবে নিরলসভাবে। সাফিয়ারা আর দুবাই-আবুধাবিতে মনিবের শিশুকে উদ্ধার করতে গিয়ে সাগরে প্রাণ দিবে না। কানাডার বাঙালি ভদ্রলোকের মনের ক্ষোভ আর অন্য কোনো প্রবাসীর মনে জেগে উঠবে না। বাংলাদেশ জেগে উঠবেই একদিন। আর সেদিন এখন আর কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া আগামী দিনের বাস্তবতা। এটা আরও ত্বরান্বিত হবে যদি আমরা রাজনীতিকে কিছুটা সংঘাতহীন করতে পারি, দুর্নীতির রশিকে কিছুটা টেনে রাখতে পারি এবং সুশাসনের বলয় উপহার দিতে পারি। ১৯৭১-এর বাংলাদেশ ২০১৪-তে দাঁড়িয়ে সত্যি সত্যি একটি শক্ত অবস্থানের ঘোষণা দিচ্ছে।
মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক
বিশ্বের নানা দেশে ভ্রমণের সময় যাত্রীরা যদি লাইনের বাইরে দাঁড় করানো কোনো হতভাগ্য যাত্রীকে দেখতে পেয়ে করুণার দৃষ্টিতে তাকাত, তবে সে যে বাংলাদেশের কোনো যাত্রী হবে এমনটা অনুমান করা যেত। বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী লোকটি অস্পৃশ্য, তাকে লাইনের বাইরে নিয়ে ম্যাগনিফায়িং গ্লাসে পরীক্ষা করতে হবে। কঠিন ও তীর্যক প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া যেন বাংলাদেশীদের ভাগ্যের লিখন। কখনও তারা ছাড়া পেত, প্লেন ধরতে পারত। আবার কখনও কখনও প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই প্লেনটি তার নাকের ডগা দিয়ে চলে যেত। পরবর্তী প্লেনের জন্য তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। ইংরেজিতে বোঝাতে না পেরে বাংলাদেশের কত যাত্রী যে ভোগান্তিতে পড়েছে তা হিসাব করে বলার উপায় নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো শহর থেকে প্লেনে উঠলেই শত শত বাঙালি শ্রমজীবী কর্মী পাবেন। বিমানে বসা থেকে শুরু করে খাওয়া- সর্বত্রই তাদের ব্যবহারিক সমস্যা আছে। তারা চিৎকার করে কথা বলে। অযথাই হাঁটাহাঁটি করে। তাদের ব্যবহার নিয়ে বিমানবালাদেরও বিরক্তির শেষ নেই। এয়ারপোর্ট সংক্রান্ত কোনো ফরম পূরণ করতে হলে তারা সমস্যায় পড়ে। পাশের কোনো শিক্ষিত লোককে অনুরোধ করে তার ফরমটি পূরণ করে দিতে। এসব সমস্যা আমাদের আছে দীর্ঘদিন ধরে। শ্রীলংকা, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন থেকেও বিদেশে যায় প্রচুর শ্রমিক। তবে তাদের জানার পরিধি আমাদের শ্রমিকদের থেকে বেশি হওয়ায় তারা রাস্তায় কোনো সমস্যায় পড়ে না। শ্রমিকদের শিক্ষা, কারিগরি জ্ঞান, ব্যবহার, কোনো কিছুর প্রশিক্ষণেই আমাদের রাষ্ট্র খুব বেশি মনোযোগী ছিল না কখনও। তাই তো গ্রামবাংলার অশিক্ষিত শ্রমিক যখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশে যাচ্ছে, তাদের কাঁচা স্বভাব পরিবর্তন করার সুযোগ সে পাচ্ছে না। এমন অপরিপক্ব জ্ঞানের জন্য কাকে দায়ী করা যায় সে প্রশ্ন রয়েই যাবে। তবে পাশাপাশি সাফিয়ার মতো আমাদের বীর গৃহকর্মীও আছেন, যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। আমিরাতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন সাফিয়া। সাফিয়া নিজের জীবন দিয়ে আবুধাবির সমুদ্র সৈকতে ডুবন্ত চার শিশুকে প্রাণে বাঁচান। মনিবের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে সাফিয়া নিজের জীবন দান করে গেছেন। এই সাফিয়া আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না। কিন্তু তিনি হাজার সাফিয়াকে উদ্বুদ্ধ করে গেলেন নিজের জীবন দিয়ে।
ভদ্রলোক বাংলাদেশের। অনেক বছর বিশ্ব সংস্থার বিভিন্ন দেশে চাকরি করে বিশ বছর ধরে কানাডায় থাকেন। গ্রীষ্মে কানাডা এবং শীতে বাংলাদেশে থাকবেন এই আশায় তিনি ঢাকার বনানীতে একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় করেন। তিন বছর কাটে এভাবে। কিন্তু তিন বছর পর গত বছর থেকে ভদ্রলোক বনানীর অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করে মালয়েশিয়ায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয় করে শীতের সময় বাংলাদেশের পরিবর্তে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে বসবাস শুরু করেন। কেন বাংলাদেশ ছাড়তে হল এমন একটি প্রশ্ন করে, আমার মনে হল, আমি যেন মৌচাকে ঢিল দিয়ে বসেছি। ভদ্রলোক ঢাকা, বাংলাদেশ এবং তার পরিচিত ঢাকাবাসীকে নিয়ে যত নেগেটিভ কথা বলা যায় সবই বলে গেলেন একদমে। তার কাছে তার মাতৃভূমি একেবারেই বসবাসের অনুপযোগী মনে হয়েছে। রাস্তার যানজট, প্রতিবেশীর মন্দ ব্যবহার, সরকারি অফিসের দুর্নীতি, চলাচলের পরাধীনতা, খাবার জিনিসে ভেজাল, রাজনৈতিক সহিংসতাসহ অনেক বিষয়ই তার বিরাগের কারণ হিসেবে কাজ করেছে। ভদ্রলোক বেশ কয়েকটি বাস্তব অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে নিজ দেশের প্রতি এমন বিরাগভাজন হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করছিলেন।
এসব বাস্তবতা স্বীকার করেও বলতে ইচ্ছা হয়, বাংলাদেশ সামনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নেই, দুর্নীতি একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম আর অব্যবস্থা বিদ্যমান। তারপরও বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে ধাবিত হচ্ছে দ্রুতগতিতে। গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম (জিএনআই) হল মধ্যম আয় মাপার মাধ্যম। নিু আয় ধরা হয় ১,০২৫ ডলার পর্যন্ত। নিু মধ্যম আয় ১,০২৬ থেকে ৪,০৩৫ ডলার। বাংলাদেশের বর্তমান মাথাপিছু জিএনআই ৮৫১ ডলার। এই জিএনআই অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশের ৫০তম স্বাধীনতাবার্ষিকীতে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ঘোষণা দেয়া সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বন্যা, দুর্যোগ মোকাবেলা করছে প্রতিনিয়ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর অবস্থা নাজুক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর নিত্যসঙ্গী। বাংলাদেশের রাজনীতি সংঘাতময়। শাসন ব্যবস্থা এখানে দুর্বল। এরপর আছে বিশ্ব সমাজের প্রভাবশালীদের চাপ। সবকিছু সত্ত্বেও বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। স্বাধীনতার পর যেসব দেশ বিরূপ মন্তব্য করেছিল, বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই তাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ বাংলাদেশও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব করেছে; সুলভ শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে রফতানিনির্ভর অর্থনীতি রেখেছে সমুন্নত। অনেক সামাজিক সূচকে প্রতিবেশী জায়েন্ট
ভারতকে বৃদ্ধাঙুলি দেখাতে পেরেছে বাংলাদেশ। প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল যেখানে ভারতে ৬৬, সেখানে বাংলাদেশে ৬৯। শিশু মৃত্যুর হার ভারতে ৪৪ এবং বাংলাদেশে ৩৭। জন্মহার ভারতে ২ দশমিক ৫ আর বাংলাদেশে ২ দশমিক ২। নারীশিক্ষার হার ভারতে ৭৪ আর বাংলাদেশে ৮০। অপুষ্টির হার ভারতে ১৮ আর বাংলাদেশে ১৭। বাংলাদেশে সামাজিক সূচকের উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা এবং নারী-পুরুষের সমতা বিষয়ে বাংলাদেশের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে। সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংকসহ অন্যান্য এনজিও এবং নারী উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খুব বড় করে ধন্যবাদ পেতে পারেন। প্রথমবারের জন্য নারী জাগরণের বাঁশিটি প্রকৃতপক্ষে তিনিই অফিসিয়ালি বাজিয়েছেন।
আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন আর পৃথিবীর রাস্তাঘাটে বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের অযথা নাজেহাল হতে হবে না। বাংলাদেশের শ্রমিকরা আর দৌড়াবে না বিদেশের মাটিতে। বরং নিজের দেশে তারা শ্রম দেবে নিরলসভাবে। সাফিয়ারা আর দুবাই-আবুধাবিতে মনিবের শিশুকে উদ্ধার করতে গিয়ে সাগরে প্রাণ দিবে না। কানাডার বাঙালি ভদ্রলোকের মনের ক্ষোভ আর অন্য কোনো প্রবাসীর মনে জেগে উঠবে না। বাংলাদেশ জেগে উঠবেই একদিন। আর সেদিন এখন আর কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া আগামী দিনের বাস্তবতা। এটা আরও ত্বরান্বিত হবে যদি আমরা রাজনীতিকে কিছুটা সংঘাতহীন করতে পারি, দুর্নীতির রশিকে কিছুটা টেনে রাখতে পারি এবং সুশাসনের বলয় উপহার দিতে পারি। ১৯৭১-এর বাংলাদেশ ২০১৪-তে দাঁড়িয়ে সত্যি সত্যি একটি শক্ত অবস্থানের ঘোষণা দিচ্ছে।
মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক
স্কুল শিক্ষার গাঁথুনিটা শক্ত হওয়া চাই by একে এম শাহনাওয়াজ
সবকিছুর রাজনীতিকরণ সুস্থ ধারার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। অবস্থার বাস্তবতায় একে রাজনীতিকরণ না বলে কুরাজনীতিকরণ বলা শ্রেয়। কে যে আমাদের ক্ষমতাসীন দলগুলোকে বুঝিয়েছে বেশিসংখ্যক প্রথম বিভাগ না পেলে শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের কৃতিত্ব প্রকাশ পাবে না। অবশ্য নিজ মেধায় অনেক বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী উজ্জ্বল ফলাফল করলে কোনো বাধা নেই। কিন্তু বলপূর্বক বা কৌশলে মেধাবী বানানোতে রয়েছে সংকট।
অধুনা প্রথম-দ্বিতীয় বিভাগের যুগ নেই। এখন গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফলাফল হয়। উর্বর ভাবনা এ পদ্ধতিতেও আছে। ধরি যদি ৭০ ভাগ বি, ২০ ভাগ এ আর ১০ ভাগ বি প্লাস পায় তাহলে চলবে না- ফলাফলে বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে। এ আর এ প্লাসে যত সয়লাব করে ফেলা যাবে, তত শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর সরকারের কৃতিত্বের আলো ছড়াবে। এ কারণেই স্কুলের শিক্ষকদের কাছে কৌশলী বার্তা নাজিল হয়, ছাত্রছাত্রীরা কষ্ট করে কিছু লিখলেই পরীক্ষকের কলম সচল করতে হবে হাত খুলে নম্বর দিতে। স্কুলগুলোতে শতভাগ পাসের রেকর্ড গড়তে হবে। এভাবেই পাস, এ, এ প্লাস আর স্বর্ণ মোড়ানো এ প্লাসের জোয়ারে মেধাবী শিক্ষার্থীরা মেধাচর্চার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। পুরোটা কেড়ে নিয়েছে জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতা। ঘাড়ের ওপর একের পর এক প্রাইভেট টিউটরের নিঃশ্বাস। একের পর এক শিক্ষকের বাড়ি আর কোচিং সেন্টারে ছোটাছুটি। এভাবে ছকেবন্দি হয়ে গেছে পড়াশোনা। ছক পূরণ করতে করতে সময় শেষ। ফলে সিলেবাসের বাইরে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকে জানা হয় না। সুকুমার রায় অচেনা থেকে যান। হ্যান্ডস ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসন আর পড়ার টেবিলে থাকে না। বাঙালির হাজার বছরের সভ্যতা-সংস্কৃতি জানার অবকাশ কোথায় এ দুর্ভাগা শিক্ষার্থীদের!
এই ছকবন্দি লেখাপড়ার পরিণতি কেমন, আমরা যারা দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি তারা টের পাচ্ছি। মেধা বিস্ফোরণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাবীদের মুখ থুবড়ে পড়া নিয়ে এবার বেশ বিতর্ক জমেছিল। যারা রাজনীতির বদ্ধ জলাশয়ে ঘোরাফেরা করেন, তারা দায়ী করছেন পরীক্ষা পদ্ধতি ও প্রশ্নপত্রের অন্যায় কড়াকড়িকে। অন্যপক্ষ বলতে চাচ্ছে, জিপিএ-৫ ধরনের ফলাফল প্রমাণ করছে না এসব শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত যতটুকু মেধাচর্চা করে আসার কথা তা করে আসতে পারছে। এর অর্থ এই নয় যে, সব শিক্ষার্থীর মেধার ঘাটতি বয়েছে। বরঞ্চ তারা যে শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে, তাতে সিলেবাসের ছকের বাইরে জানার জগৎ শানিত করার তেমন সুযোগ নেই বললেই চলে।
গলদ তো একটা আছেই। আমাদের শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়ন করছি না, তবে ওদের দুর্ভাগ্য নিয়ে ভাবছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাচ্ছে ফলাফলে আলোকোজ্জ্বল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সরকারের কৃতিত্ব সাধারণ্যে প্রকাশ পাক। ভর্তিযুদ্ধে উচ্চ গ্রেড পাওয়ার একটি ভূমিকা আছে, আবার অভিভাবকদের মধ্যে ছেলেমেয়ের ফলাফলের সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা রক্ষার তাড়নাও রয়েছে। তাই শিক্ষার্থী জানার জন্য নিজেকে কতটা শানিত করতে পারল সেটা মোটেও বিবেচনায় আনা হচ্ছে না। ছকবন্দি পদ্ধতিতে ফলাফল কতটা উজ্জ্বল হল সেটাই বিবেচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ কারণে এখনকার উজ্জ্বল ফলাফল করা ছাত্রছাত্রীদের অনেক ছেঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার পর দেখা যায় তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম অল্প কিছুসংখ্যক বাদ দিলে অধিকাংশের পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে জানার সঞ্চয় খুবই কম। গুণগত দিক থেকে তাদের অধিকাংশই মেধাবী এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ভুল পদ্ধতিতে এ, এ প্লাসের প্রতিযোগিতায় ছিল বলে যৌক্তিকভাবে নিজেকে তৈরি করতে পারেনি। তাই এ শূন্যতা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাকে প্রচণ্ডভাবে তাড়িয়ে বেড়ায়। জাতিও সামগ্রিক অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখি, দুদশক আগেও যেসব ছাত্রছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেত তাদের ভিত্তিটা অনেক বেশি সবল ছিল। এটি আমি সাধারণীকরণ করে বলছি। অন্তত প্রথমবর্ষের ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি, বাংলা উভয় ক্ষেত্রে ভাষা ও বানান জ্ঞান অনেক ভালো ছিল। এখন তো সদ্য ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশের অনুশীলনী পরীক্ষায় বাংলা বানানের ভুল কাটতে কাটতে পৃষ্ঠা লাল হয়ে যায়। তখন ভাবতে হয়, এ অবস্থা নিয়ে এ ছাত্র বা ছাত্রীটি স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরোল কী করে!
উত্তর কিছুটা জানা ছিল। তবে একটি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলে পাঠকের অনুধাবনে সুবিধা হবে। তার আগে আমি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বন্ধুদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। মাস তিনেক আগে একজন স্নেহভাজন কলেজ শিক্ষিকা কোনো এক গ্রন্থ প্রকাশকের পক্ষ থেকে আমাকে অনুরোধ করল একটি পাঠ্য বই রচনা সম্পন্ন হয়েছে, প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে আমি যাতে পাণ্ডুলিপিটি দেখে দিই। আমি আমার ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কথা জানিয়ে অপারগতা প্রকাশ করলাম। ওরা নাছোড়বান্দা। বলল, স্যার আপনার তেমন একটা পরিশ্রম করতে হবে না। এ বইটির এক এক ইউনিট দেশের নামকরা কলেজের এক একজন শিক্ষক লিখেছেন। তারপরও বেশ কয়েকজন শিক্ষক মিলে সম্পাদনা করেছেন। তারা সবাই পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করেছেন যথেষ্ট ঝাড়াই বাছাই করে। প্রায় পঁচিশ-ত্রিশজন শিক্ষক যুক্ত রয়েছেন এ গ্রন্থ রচনায়। এখন ছাপার জন্য প্রেসে যাওয়া বাকি। সুতরাং আপনি একবার চোখ বুলিয়ে আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই আমরা আনন্দ পাব। অগত্যা রাজি হলাম। পাণ্ডুলিপি এলো। ফুলস্কেপ কাগজে চমৎকার টাইপ করা ৪০০ পৃষ্ঠার বেশি সুবিশাল পাণ্ডুলিপি। প্রথম ১০ পৃষ্ঠা দেখে আমি ভীত হয়ে পড়লাম। প্রকাশককে খবর দিলাম। বিনয়ের সঙ্গে বললাম, দয়া করে পাণ্ডুলিপিটি ফেরত নিয়ে যান। কিছুটা ভাষাগত আর বেশিরভাগ ভুল বানান কাটতে কাটতে পৃষ্ঠাগুলো রীতিমতো লাল হয়ে গেছে। ৪০০ পৃষ্ঠার মহাসমুদ্রে আমি সাঁতার দেব কেমন করে! অবস্থা বুঝে প্রকাশক থ। এবার হাজার অনুরোধের জালে আমাকে আটকে ফেললেন। বললেন, আপনার কাছে না আনলে তো এ অবস্থায় ছাপা হয়ে যেত। এখন আপনি না দেখে দিলে বই প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে আপনাকে রাজি হতে হবে। পেশায় শিক্ষক হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে নিলাম। দীর্ঘ পরিশ্রমে প্রুফ সংশোধন করতে হল। পাঠক, বিস্মিত হলেও বিশ্বাস করবেন, এ ৪০০ পৃষ্ঠার মধ্যে একটি পৃষ্ঠাও নির্ভুল পেলাম না!
এরপর থেকে আমার কাছে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে এত ভালো ফলাফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের এ দশা কেন। আমার কাছে স্কুলের শিক্ষকদের গড়পড়তা অবস্থা কী তা জানার মতো উদাহরণ নেই। যখন দেখি মানবেতর জীবনযাপনের উপযোগী বেতন কাঠামোতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়, তখন এর চেয়ে ভালো আশা করব কেন!
আমরা মনে করি, প্রকৃত শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করতে হলে স্কুলগুলোর সার্বিক মানোন্নয়নে নজর দিতে হবে। এ নজরদারি সবচেয়ে বেশি থাকবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। যেখানে শিক্ষার্থীর মান ও মেধার প্রথম ভিত্তি তৈরি হবে। দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষকের বেশি প্রয়োজন এখানে। সুতরাং এমন যোগ্যদের আকর্ষণ করতে হলে শিক্ষকের বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সবার আগে ভাবতে হবে।
নতুন শিক্ষা কাঠামোর কিছু কিছু দিক নিয়ে আমরা অনেকেই প্রশংসা করেছি। এর একটি সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেয়া। ভাবা হয়েছিল, এবার গাইডবই মুখস্থ করা থেকে সরে আসতে হবে। শিক্ষার্থীর সৃজনশীল ক্ষমতা বাড়বে। মাথা খাটিয়ে উত্তর লিখতে হবে। এ কারণে শিক্ষার্থীর গুণগত মান বাড়বে। কিন্তু অন্যায়-দুর্নীতি আর মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দেশে কি আর শুভ আয়োজন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়! জানা গেল, সৃজনশীল প্রশ্ন-উত্তরের গাইডবই তৈরি হয়ে গেছে। এ ধারার একজন প্রকাশক জানালেন, এখন প্রকাশকরা স্কুল কেনেন। আমার কৌতূহল বাড়ল। তিনি বুঝিয়ে দিলেন। অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ বিশেষ কিছুর বিনিময়ে সৃজনশীল প্রশ্নের কোনো বিশেষ গাইড তাদের স্কুলে পাঠ্য করে দেয়। সেই বইতে যে সৃজনশীল প্রশ্ন ও তার উত্তর দেয়া আছে, স্কুলের নির্বাচনি পরীক্ষাগুলোতে তা-ই আসবে। অতএব মুখস্থ বিদ্যাই লিখে দিয়ে আসবে শিক্ষার্থী। জানি না এ বিবরণ কতটা সত্য। সত্য হলে শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের সব আয়োজন ভেস্তে যাবে।
স্কুল শিক্ষার হযবরল অবস্থার আরেকটি কারণ বিনা পয়সায় সরবরাহকৃত এনসিটিবি কর্তৃক প্রকাশিত বইগুলোয় তথ্যগত ভুলের ব্যাপক উপস্থিতি, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়কেই বিভ্রান্ত করছে। কিছুদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে এ সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় গ্রন্থে মুদ্রিত ভুলের ফিরিস্তি দেয়া হয়েছে। বছরের পর বছর এসব ভুল পড়ে যেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অথচ এ নিয়ে কোনো পক্ষের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। স্কুল শিক্ষকরা এসব ব্যাপারে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন কিনা জানি না। পত্রিকায় এ ধরনের কোনো রিপোর্ট বা পত্র প্রকাশিত হয়েছে কিনা তাও আমার জানা নেই। আমি নিজ কৌতূহল নিবারণের জন্য উল্লিখিত জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি জানালেন, শিক্ষক বা কোনো পক্ষের অভিযোগে নয়, তিনি তার নিজের গরজেই অনুসন্ধান করেছেন।
ক্লাস টুতে পড়া এক পুত্রের মা টেলিফোনে জানালেন তিনি বিপাকে পড়েছেন। পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছে, কোন মাসে নবান্ন হয়। ছেলেটি জানে তার এনসিটিবি থেকে প্রকাশিত আমার বাংলা বইতে বলা আছে হেমন্তকালে নবান্ন হয়। ও জানে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস মিলে হেমন্ত ঋতু। একটি মাস চাওয়ায় ছেলে লিখে দিয়ে এসেছে কার্তিক মাস। মা চিন্তিত। তিনি জানেন, কার্তিক হচ্ছে মরা কার্তিক। তখন তো খাদ্যের আক্রা। নবান্ন উৎসব হয় কেমন করে! আমাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার বাংলাপিডিয়া খুললেন তিনি। সেখানে লেখা আছে, নবান্ন হয় পৌষ মাসে। এখন গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছেন এ অভিভাবক। আমি উত্তর দিতে পারিনি। সম্ভবত আমিও গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছি।
স্কুল শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন নিয়ে ভাবতে গেলে যেসব অসঙ্গতি ও অসম্পূর্ণতার ছবি ভেসে ওঠে, তারই কয়েকটি ছিটেফোঁটা উপরে উল্লেখ করা হল। এতে বোঝা গেল সংকট একমুখী নয়, বহুমুখী। ফলে এ সত্য মানতে হবে, স্কুল শিক্ষার মানন্নোয়ন প্রকৃত অর্থে যদি আমরা চাই, তবে বাগাড়ম্বর আর বাহাদুরি নয়- বাস্তবতার উঠোনে দাঁড়িয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
অধুনা প্রথম-দ্বিতীয় বিভাগের যুগ নেই। এখন গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফলাফল হয়। উর্বর ভাবনা এ পদ্ধতিতেও আছে। ধরি যদি ৭০ ভাগ বি, ২০ ভাগ এ আর ১০ ভাগ বি প্লাস পায় তাহলে চলবে না- ফলাফলে বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে। এ আর এ প্লাসে যত সয়লাব করে ফেলা যাবে, তত শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর সরকারের কৃতিত্বের আলো ছড়াবে। এ কারণেই স্কুলের শিক্ষকদের কাছে কৌশলী বার্তা নাজিল হয়, ছাত্রছাত্রীরা কষ্ট করে কিছু লিখলেই পরীক্ষকের কলম সচল করতে হবে হাত খুলে নম্বর দিতে। স্কুলগুলোতে শতভাগ পাসের রেকর্ড গড়তে হবে। এভাবেই পাস, এ, এ প্লাস আর স্বর্ণ মোড়ানো এ প্লাসের জোয়ারে মেধাবী শিক্ষার্থীরা মেধাচর্চার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। পুরোটা কেড়ে নিয়েছে জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতা। ঘাড়ের ওপর একের পর এক প্রাইভেট টিউটরের নিঃশ্বাস। একের পর এক শিক্ষকের বাড়ি আর কোচিং সেন্টারে ছোটাছুটি। এভাবে ছকেবন্দি হয়ে গেছে পড়াশোনা। ছক পূরণ করতে করতে সময় শেষ। ফলে সিলেবাসের বাইরে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকে জানা হয় না। সুকুমার রায় অচেনা থেকে যান। হ্যান্ডস ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসন আর পড়ার টেবিলে থাকে না। বাঙালির হাজার বছরের সভ্যতা-সংস্কৃতি জানার অবকাশ কোথায় এ দুর্ভাগা শিক্ষার্থীদের!
এই ছকবন্দি লেখাপড়ার পরিণতি কেমন, আমরা যারা দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি তারা টের পাচ্ছি। মেধা বিস্ফোরণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাবীদের মুখ থুবড়ে পড়া নিয়ে এবার বেশ বিতর্ক জমেছিল। যারা রাজনীতির বদ্ধ জলাশয়ে ঘোরাফেরা করেন, তারা দায়ী করছেন পরীক্ষা পদ্ধতি ও প্রশ্নপত্রের অন্যায় কড়াকড়িকে। অন্যপক্ষ বলতে চাচ্ছে, জিপিএ-৫ ধরনের ফলাফল প্রমাণ করছে না এসব শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত যতটুকু মেধাচর্চা করে আসার কথা তা করে আসতে পারছে। এর অর্থ এই নয় যে, সব শিক্ষার্থীর মেধার ঘাটতি বয়েছে। বরঞ্চ তারা যে শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে, তাতে সিলেবাসের ছকের বাইরে জানার জগৎ শানিত করার তেমন সুযোগ নেই বললেই চলে।
গলদ তো একটা আছেই। আমাদের শিক্ষার্থীদের অবমূল্যায়ন করছি না, তবে ওদের দুর্ভাগ্য নিয়ে ভাবছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাচ্ছে ফলাফলে আলোকোজ্জ্বল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সরকারের কৃতিত্ব সাধারণ্যে প্রকাশ পাক। ভর্তিযুদ্ধে উচ্চ গ্রেড পাওয়ার একটি ভূমিকা আছে, আবার অভিভাবকদের মধ্যে ছেলেমেয়ের ফলাফলের সঙ্গে সামাজিক মর্যাদা রক্ষার তাড়নাও রয়েছে। তাই শিক্ষার্থী জানার জন্য নিজেকে কতটা শানিত করতে পারল সেটা মোটেও বিবেচনায় আনা হচ্ছে না। ছকবন্দি পদ্ধতিতে ফলাফল কতটা উজ্জ্বল হল সেটাই বিবেচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ কারণে এখনকার উজ্জ্বল ফলাফল করা ছাত্রছাত্রীদের অনেক ছেঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার পর দেখা যায় তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম অল্প কিছুসংখ্যক বাদ দিলে অধিকাংশের পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে জানার সঞ্চয় খুবই কম। গুণগত দিক থেকে তাদের অধিকাংশই মেধাবী এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ভুল পদ্ধতিতে এ, এ প্লাসের প্রতিযোগিতায় ছিল বলে যৌক্তিকভাবে নিজেকে তৈরি করতে পারেনি। তাই এ শূন্যতা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাকে প্রচণ্ডভাবে তাড়িয়ে বেড়ায়। জাতিও সামগ্রিক অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখি, দুদশক আগেও যেসব ছাত্রছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেত তাদের ভিত্তিটা অনেক বেশি সবল ছিল। এটি আমি সাধারণীকরণ করে বলছি। অন্তত প্রথমবর্ষের ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি, বাংলা উভয় ক্ষেত্রে ভাষা ও বানান জ্ঞান অনেক ভালো ছিল। এখন তো সদ্য ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশের অনুশীলনী পরীক্ষায় বাংলা বানানের ভুল কাটতে কাটতে পৃষ্ঠা লাল হয়ে যায়। তখন ভাবতে হয়, এ অবস্থা নিয়ে এ ছাত্র বা ছাত্রীটি স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরোল কী করে!
উত্তর কিছুটা জানা ছিল। তবে একটি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলে পাঠকের অনুধাবনে সুবিধা হবে। তার আগে আমি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বন্ধুদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। মাস তিনেক আগে একজন স্নেহভাজন কলেজ শিক্ষিকা কোনো এক গ্রন্থ প্রকাশকের পক্ষ থেকে আমাকে অনুরোধ করল একটি পাঠ্য বই রচনা সম্পন্ন হয়েছে, প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে আমি যাতে পাণ্ডুলিপিটি দেখে দিই। আমি আমার ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কথা জানিয়ে অপারগতা প্রকাশ করলাম। ওরা নাছোড়বান্দা। বলল, স্যার আপনার তেমন একটা পরিশ্রম করতে হবে না। এ বইটির এক এক ইউনিট দেশের নামকরা কলেজের এক একজন শিক্ষক লিখেছেন। তারপরও বেশ কয়েকজন শিক্ষক মিলে সম্পাদনা করেছেন। তারা সবাই পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করেছেন যথেষ্ট ঝাড়াই বাছাই করে। প্রায় পঁচিশ-ত্রিশজন শিক্ষক যুক্ত রয়েছেন এ গ্রন্থ রচনায়। এখন ছাপার জন্য প্রেসে যাওয়া বাকি। সুতরাং আপনি একবার চোখ বুলিয়ে আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই আমরা আনন্দ পাব। অগত্যা রাজি হলাম। পাণ্ডুলিপি এলো। ফুলস্কেপ কাগজে চমৎকার টাইপ করা ৪০০ পৃষ্ঠার বেশি সুবিশাল পাণ্ডুলিপি। প্রথম ১০ পৃষ্ঠা দেখে আমি ভীত হয়ে পড়লাম। প্রকাশককে খবর দিলাম। বিনয়ের সঙ্গে বললাম, দয়া করে পাণ্ডুলিপিটি ফেরত নিয়ে যান। কিছুটা ভাষাগত আর বেশিরভাগ ভুল বানান কাটতে কাটতে পৃষ্ঠাগুলো রীতিমতো লাল হয়ে গেছে। ৪০০ পৃষ্ঠার মহাসমুদ্রে আমি সাঁতার দেব কেমন করে! অবস্থা বুঝে প্রকাশক থ। এবার হাজার অনুরোধের জালে আমাকে আটকে ফেললেন। বললেন, আপনার কাছে না আনলে তো এ অবস্থায় ছাপা হয়ে যেত। এখন আপনি না দেখে দিলে বই প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে আপনাকে রাজি হতে হবে। পেশায় শিক্ষক হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে নিলাম। দীর্ঘ পরিশ্রমে প্রুফ সংশোধন করতে হল। পাঠক, বিস্মিত হলেও বিশ্বাস করবেন, এ ৪০০ পৃষ্ঠার মধ্যে একটি পৃষ্ঠাও নির্ভুল পেলাম না!
এরপর থেকে আমার কাছে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে এত ভালো ফলাফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের এ দশা কেন। আমার কাছে স্কুলের শিক্ষকদের গড়পড়তা অবস্থা কী তা জানার মতো উদাহরণ নেই। যখন দেখি মানবেতর জীবনযাপনের উপযোগী বেতন কাঠামোতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়, তখন এর চেয়ে ভালো আশা করব কেন!
আমরা মনে করি, প্রকৃত শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করতে হলে স্কুলগুলোর সার্বিক মানোন্নয়নে নজর দিতে হবে। এ নজরদারি সবচেয়ে বেশি থাকবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। যেখানে শিক্ষার্থীর মান ও মেধার প্রথম ভিত্তি তৈরি হবে। দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষকের বেশি প্রয়োজন এখানে। সুতরাং এমন যোগ্যদের আকর্ষণ করতে হলে শিক্ষকের বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সবার আগে ভাবতে হবে।
নতুন শিক্ষা কাঠামোর কিছু কিছু দিক নিয়ে আমরা অনেকেই প্রশংসা করেছি। এর একটি সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেয়া। ভাবা হয়েছিল, এবার গাইডবই মুখস্থ করা থেকে সরে আসতে হবে। শিক্ষার্থীর সৃজনশীল ক্ষমতা বাড়বে। মাথা খাটিয়ে উত্তর লিখতে হবে। এ কারণে শিক্ষার্থীর গুণগত মান বাড়বে। কিন্তু অন্যায়-দুর্নীতি আর মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দেশে কি আর শুভ আয়োজন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়! জানা গেল, সৃজনশীল প্রশ্ন-উত্তরের গাইডবই তৈরি হয়ে গেছে। এ ধারার একজন প্রকাশক জানালেন, এখন প্রকাশকরা স্কুল কেনেন। আমার কৌতূহল বাড়ল। তিনি বুঝিয়ে দিলেন। অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ বিশেষ কিছুর বিনিময়ে সৃজনশীল প্রশ্নের কোনো বিশেষ গাইড তাদের স্কুলে পাঠ্য করে দেয়। সেই বইতে যে সৃজনশীল প্রশ্ন ও তার উত্তর দেয়া আছে, স্কুলের নির্বাচনি পরীক্ষাগুলোতে তা-ই আসবে। অতএব মুখস্থ বিদ্যাই লিখে দিয়ে আসবে শিক্ষার্থী। জানি না এ বিবরণ কতটা সত্য। সত্য হলে শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের সব আয়োজন ভেস্তে যাবে।
স্কুল শিক্ষার হযবরল অবস্থার আরেকটি কারণ বিনা পয়সায় সরবরাহকৃত এনসিটিবি কর্তৃক প্রকাশিত বইগুলোয় তথ্যগত ভুলের ব্যাপক উপস্থিতি, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়কেই বিভ্রান্ত করছে। কিছুদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে এ সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় গ্রন্থে মুদ্রিত ভুলের ফিরিস্তি দেয়া হয়েছে। বছরের পর বছর এসব ভুল পড়ে যেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অথচ এ নিয়ে কোনো পক্ষের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। স্কুল শিক্ষকরা এসব ব্যাপারে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন কিনা জানি না। পত্রিকায় এ ধরনের কোনো রিপোর্ট বা পত্র প্রকাশিত হয়েছে কিনা তাও আমার জানা নেই। আমি নিজ কৌতূহল নিবারণের জন্য উল্লিখিত জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি জানালেন, শিক্ষক বা কোনো পক্ষের অভিযোগে নয়, তিনি তার নিজের গরজেই অনুসন্ধান করেছেন।
ক্লাস টুতে পড়া এক পুত্রের মা টেলিফোনে জানালেন তিনি বিপাকে পড়েছেন। পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছে, কোন মাসে নবান্ন হয়। ছেলেটি জানে তার এনসিটিবি থেকে প্রকাশিত আমার বাংলা বইতে বলা আছে হেমন্তকালে নবান্ন হয়। ও জানে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস মিলে হেমন্ত ঋতু। একটি মাস চাওয়ায় ছেলে লিখে দিয়ে এসেছে কার্তিক মাস। মা চিন্তিত। তিনি জানেন, কার্তিক হচ্ছে মরা কার্তিক। তখন তো খাদ্যের আক্রা। নবান্ন উৎসব হয় কেমন করে! আমাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার বাংলাপিডিয়া খুললেন তিনি। সেখানে লেখা আছে, নবান্ন হয় পৌষ মাসে। এখন গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছেন এ অভিভাবক। আমি উত্তর দিতে পারিনি। সম্ভবত আমিও গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছি।
স্কুল শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন নিয়ে ভাবতে গেলে যেসব অসঙ্গতি ও অসম্পূর্ণতার ছবি ভেসে ওঠে, তারই কয়েকটি ছিটেফোঁটা উপরে উল্লেখ করা হল। এতে বোঝা গেল সংকট একমুখী নয়, বহুমুখী। ফলে এ সত্য মানতে হবে, স্কুল শিক্ষার মানন্নোয়ন প্রকৃত অর্থে যদি আমরা চাই, তবে বাগাড়ম্বর আর বাহাদুরি নয়- বাস্তবতার উঠোনে দাঁড়িয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Wednesday, November 12, 2014
শিশুমৃত্যু কমাতে সঠিক সময়ে চিকিৎসা জরুরি by ডা. সাদিয়া শবনম ও জায়েদ বিন ইসলাম
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৪ অনুযায়ী পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুমৃত্যু হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে উপনীত হয়েছে। বিশ্বের যে ছয়টি মাত্র দেশ ১৯৯০ সালের তুলনায় বর্তমান শিশুমৃত্যুর হার দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। তবে এখনও পাঁচ বছরের কমবয়সী অনেক শিশু প্রতিরোধযোগ্য ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার কারণে মারা যায়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিশুমৃত্যু ও অসুস্থতার একটি প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক নিরীক্ষা অনুযায়ী এখনও বিশ্বব্যাপী শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। যেমন শুধু ২০১২ সালে শিশুমৃত্যুর শতকরা ১৭ ভাগ বা ১১ লাখ মৃত্যুর জন্য নিউমোনিয়াই দায়ী। এসব মৃত্যুর শিকার শিশুদের ৮০ শতাংশের বয়সই দুই বছরের নিচে। নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুর বেশিরভাগই ঘটে উন্নয়নশীল দেশে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, শতকরা ৭৫ ভাগই ঘটে মাত্র ১৫টি দেশে। বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের মৃত্যুর শতকরা ২৫ ভাগই নিউমোনিয়ার কারণে হয়ে থাকে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিউমোনিয়া প্রতিরোধ ও প্রতিকারযোগ্য। টিকা প্রদান, পুষ্টিকর খাবার এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং নিউমোনিয়া প্রতিকারে রয়েছে সাশ্রয়ী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে সঠিক সময়ে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা যায় না। দরিদ্র দেশগুলোয় এ সমস্যাটা আরও বেশি। যেমন নিউমোনিয়া চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্র্ণ নিউমোনিয়া ভ্যাকসিন অনেক সময়ই পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১১-এর তথ্য অনুযায়ী, যেসব শিশুর মধ্যে নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যায় তার মাত্র ৩৫ শতাংশ মানসম্মত চিকিৎসা কেন্দ্র বা দক্ষ চিকিৎসকের চিকিৎসা পেয়েছে, ৪৬ শতাংশ শিশু অদক্ষ চিকিৎসকের কাছে সেবা নিয়েছে এবং ১৭ শতাংশ শিশু কোনো চিকিৎসাই পায় না। এছাড়া যেসব অভ্যাস নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে যেমন ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ পান, ছয় মাস পূরণ হওয়ার পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি বয়স অনুসারে পারিবারিক বাড়তি খাবার খাওয়ানো, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, বায়ুদূষণ কমানো ইত্যাদি দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশে তেমনভাবে প্রচলিত নয়। ফলে এসব দেশে শিশুমৃত্যুর হার আরও বেশি।
রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য নিরাপদ, কার্যকর ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থা থাকলেও তা সঠিক সময়ে মানুষের কাছে পৌঁছায় না। নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ দেখা দেয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা বিদ্যমান প্রথাগত চিকিৎসা ব্যবস্থায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। তাই রোগাক্রান্ত পরিবারের মধ্যে ফলপ্রসূ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়া আসলেই একটি চ্যালেঞ্জ, যেখানে কমিউনিটিভিত্তিক মডেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের নিউমোনিয়া ঘটিত মৃত্যুহার কমাতে নব্বইয়ের দশক থেকে কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ব্র্যাক বিদ্যমান চিকিৎসা ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার বা স্বাস্থ্যসেবিকাদের এ কাজে অন্তর্ভুক্ত করে প্রশিক্ষণ প্রদান করছে, যার ফলে আরও বেশিসংখ্যক শিশুকে নিউমোনিয়া চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
ব্র্যাক ১৯৯২ সালে নিউমোনিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সারা দেশে এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছে। বর্তমানে তাদের ৯৭ হাজার স্বাস্থ্যসেবিকা শহর ও গ্রামাঞ্চলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিবিধ সেবা দিচ্ছে। এরা নিউমোনিয়া শনাক্তকরণ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা প্রদানে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। নিজেরা চিকিৎসা প্রদান ছাড়াও তারা মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে শনাক্ত করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে রেফার করে থাকে।
প্রতিবছর ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবিকারা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নিউমোনিয়া রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসা প্রদান করে, পাশাপাশি আরও প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে রেফার করে থাকে। এভাবেই তারা বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু এবং শিশু রোগের হার কমাতে সরকারের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
ব্র্যাক স্বাস্থ্যসেবিকা মডেল এটাই প্রমাণ করে যে, কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারদের অন্তর্ভুক্তি ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে নিউমোনিয়া রোগ প্রতিরোধ ও মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। তবে এ কাজে সাফল্য অর্জনের জন্য যথাযথ মনিটরিং, তত্ত্বাবধান এবং লজিস্টিক সাপোর্ট অপরিহার্য।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সাফল্য ধরে রাখতে হলে আমাদের অবশ্যই শিশুমৃত্যুর হার আরও কমাতে হবে। এ লক্ষ্যে আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করে যাব- বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস ২০১৪ উপলক্ষে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
ডা. সাদিয়া শবনম ও জায়েদ বিন ইসলাম : সদস্য, ব্র্যাক স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচি
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিশুমৃত্যু ও অসুস্থতার একটি প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক নিরীক্ষা অনুযায়ী এখনও বিশ্বব্যাপী শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। যেমন শুধু ২০১২ সালে শিশুমৃত্যুর শতকরা ১৭ ভাগ বা ১১ লাখ মৃত্যুর জন্য নিউমোনিয়াই দায়ী। এসব মৃত্যুর শিকার শিশুদের ৮০ শতাংশের বয়সই দুই বছরের নিচে। নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুর বেশিরভাগই ঘটে উন্নয়নশীল দেশে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, শতকরা ৭৫ ভাগই ঘটে মাত্র ১৫টি দেশে। বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের মৃত্যুর শতকরা ২৫ ভাগই নিউমোনিয়ার কারণে হয়ে থাকে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিউমোনিয়া প্রতিরোধ ও প্রতিকারযোগ্য। টিকা প্রদান, পুষ্টিকর খাবার এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং নিউমোনিয়া প্রতিকারে রয়েছে সাশ্রয়ী অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে সঠিক সময়ে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা যায় না। দরিদ্র দেশগুলোয় এ সমস্যাটা আরও বেশি। যেমন নিউমোনিয়া চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্র্ণ নিউমোনিয়া ভ্যাকসিন অনেক সময়ই পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১১-এর তথ্য অনুযায়ী, যেসব শিশুর মধ্যে নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যায় তার মাত্র ৩৫ শতাংশ মানসম্মত চিকিৎসা কেন্দ্র বা দক্ষ চিকিৎসকের চিকিৎসা পেয়েছে, ৪৬ শতাংশ শিশু অদক্ষ চিকিৎসকের কাছে সেবা নিয়েছে এবং ১৭ শতাংশ শিশু কোনো চিকিৎসাই পায় না। এছাড়া যেসব অভ্যাস নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে যেমন ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ পান, ছয় মাস পূরণ হওয়ার পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি বয়স অনুসারে পারিবারিক বাড়তি খাবার খাওয়ানো, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, বায়ুদূষণ কমানো ইত্যাদি দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশে তেমনভাবে প্রচলিত নয়। ফলে এসব দেশে শিশুমৃত্যুর হার আরও বেশি।
রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য নিরাপদ, কার্যকর ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থা থাকলেও তা সঠিক সময়ে মানুষের কাছে পৌঁছায় না। নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ দেখা দেয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা প্রদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা বিদ্যমান প্রথাগত চিকিৎসা ব্যবস্থায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। তাই রোগাক্রান্ত পরিবারের মধ্যে ফলপ্রসূ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়া আসলেই একটি চ্যালেঞ্জ, যেখানে কমিউনিটিভিত্তিক মডেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের নিউমোনিয়া ঘটিত মৃত্যুহার কমাতে নব্বইয়ের দশক থেকে কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ব্র্যাক বিদ্যমান চিকিৎসা ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার বা স্বাস্থ্যসেবিকাদের এ কাজে অন্তর্ভুক্ত করে প্রশিক্ষণ প্রদান করছে, যার ফলে আরও বেশিসংখ্যক শিশুকে নিউমোনিয়া চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
ব্র্যাক ১৯৯২ সালে নিউমোনিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু করে এবং ধীরে ধীরে সারা দেশে এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছে। বর্তমানে তাদের ৯৭ হাজার স্বাস্থ্যসেবিকা শহর ও গ্রামাঞ্চলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিবিধ সেবা দিচ্ছে। এরা নিউমোনিয়া শনাক্তকরণ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা প্রদানে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। নিজেরা চিকিৎসা প্রদান ছাড়াও তারা মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে শনাক্ত করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে রেফার করে থাকে।
প্রতিবছর ব্র্যাকের স্বাস্থ্যসেবিকারা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নিউমোনিয়া রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসা প্রদান করে, পাশাপাশি আরও প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে রেফার করে থাকে। এভাবেই তারা বাংলাদেশে শিশুমৃত্যু এবং শিশু রোগের হার কমাতে সরকারের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
ব্র্যাক স্বাস্থ্যসেবিকা মডেল এটাই প্রমাণ করে যে, কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারদের অন্তর্ভুক্তি ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে নিউমোনিয়া রোগ প্রতিরোধ ও মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। তবে এ কাজে সাফল্য অর্জনের জন্য যথাযথ মনিটরিং, তত্ত্বাবধান এবং লজিস্টিক সাপোর্ট অপরিহার্য।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সাফল্য ধরে রাখতে হলে আমাদের অবশ্যই শিশুমৃত্যুর হার আরও কমাতে হবে। এ লক্ষ্যে আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করে যাব- বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস ২০১৪ উপলক্ষে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
ডা. সাদিয়া শবনম ও জায়েদ বিন ইসলাম : সদস্য, ব্র্যাক স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচি
সবাই মুক্তিযোদ্ধা হতে চায়! by মামুন রশীদ
কবি সত্তা নেই যাদের তাদের কবিতা লেখার সাধ দেখে এক বিখ্যাত কবি খেদোক্তি করে লিখেছিলেন, সবাই কবি হতে চায়। আমি নিশ্চিত সেই কবি যদি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতেন, অস্ত্র হাতে লড়াই করতেন, তাহলে ক্রমবর্ধমান মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট জালিয়াতি কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দেখে দুঃখভরা হৃদয়ে লিখতেন, সবাই মুক্তিযোদ্ধা হতে চায়!
প্রায় ৭-৮ বছর আগে ঢাকার বাইরে এক বিচারপতির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করার একটি উদ্যোগ দেখলাম। পরে জেনেছিলাম সেই বিচারপতি যদিও অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, সৎ ও উদ্যোগী বিচারক ছিলেন; কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ না থাকায় মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট পাওয়া কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার মতো যোগ্য ছিলেন না তিনি। বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের সুবিখ্যাত কবিতা রয়েছে- তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা কিংবা রাজাকার মন্ত্রীর শকটে উড়ছে আমার প্রাণের পতাকা। এসব কবিতার রচয়িতা হওয়া সত্ত্বেও শামসুর রাহমানকে আমরা তার মৃত্যুর পর যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে কারণ দেখানো হয়েছিল, তিনি যা করলে একজন মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেতে পারেন এবং একজন সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভূষিত হতে পারেন, তেমন কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন না। আমরা দুঃখ সত্ত্বেও মেনে নিয়েছিলাম, কারণ এই দেশ সৃষ্টির পেছনে যারা অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন; যারা প্রবাসী সরকার গঠনে, স্বাধীন বাংলা সরকার গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন, যারা ভারতকে সঙ্গে নিয়ে, বিশ্বের অপরাপর অনেক শক্তিশালী দেশকে সঙ্গে নিয়ে, গণতন্ত্রকামী সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশটি সৃষ্টি করেছিলেন, তারা যে সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন, অন্যরা সেই সম্মান পেতে পারেন না। ভাষা মতিন খ্যাত আবদুল মতিন যখন মৃত্যুবরণ করলেন তখন যে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া গেল না, আমরা দুঃখ পেয়েছি; আমরা মনে করেছিলাম তিনিও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত হতে পারতেন। তারপরও আমরা মেনে নিতে পেরেছি, কারণ সেই যে বললাম, যারা অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন, জীবন বাজি রেখে এই বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য কাজ করেছেন, তারা তো একটু ভিন্নধর্মী হবেনই। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, স্বাধীন বাংলাদেশ থাকবে, তাদের এই সম্মানটুকু আমাদের দিতেই হবে এবং আমি নিশ্চিত, যারাই সরকারে থাকুন না কেন, ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ অর্থাৎ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে এই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু তাদের দেখানো হবে।
বছর দুয়েক আগে আমি গিয়েছিলাম আমার ভগ্নিপতির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার অন্তিম ইচ্ছা অনুসারে তাকে তার পিতৃভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার একটি গ্রামে সমাহিত করা হয়েছিল। সেখানে দেখেছি তাকে তিন ধরনের সম্মান দেয়া হয়েছিল। প্রথমত, তিনি যে স্কুলে পড়তেন সেই স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীরা সম্মান দেখিয়েছিলেন; আরেকটি সম্মান দেখানো হয়েছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার দিয়ে, তার শবদেহকে জাতীয় পতাকা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল। আর তৃতীয় সম্মানটি ছিল এমন : যারা তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের অনেকে সেখানে উপস্থিত থেকে তাদের কমান্ডারকে বিদায় জানিয়েছিলেন। তখন আমার একটা বিষয় অত্যন্ত ভালো লেগেছিল যে, তার একটা বিশেষ পরিচয় রয়েছে- সেটি হচ্ছে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাই যেমন আমি মেনে নিয়েছি, ভাষা মতিন এবং বাংলাদেশের প্রধান কবির এত অবদান থাকার পরও তারা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেলেন না; যেমন আমি অনেক দিনের বন্ধুত্বকে ঝুঁকিতে ফেলে সেই বিচারপতির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়াটাকে অযৌক্তিক ও বেমানান মনে করে তার সুযোগ্য সন্তানকে নাস্তানাবুদ করেছিলাম- সেই একই প্রেক্ষাপটে এখন যখন দেখি অনেকেই শুধু সরকারের উচ্চপদে থাকার কারণে, কোনো যুদ্ধ না করে, অস্ত্র হাতে না নিয়ে, প্রবাসী সরকার গঠনে কোনোরকম অবদান না রেখে, আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়ে বিন্দু পরিমাণ উদ্যোগ না নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার খেতাবপ্রাপ্ত, তখন ওই কবির মতো দ্রোহে, ক্ষোভে আমারও লিখতে ইচ্ছে করে, সবাই মুক্তিযোদ্ধা হতে চায়।
আমরা এখন স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমি নিশ্চিত বিশ্বাস করি, যদি বাংলাদেশ নামক দেশটি না হতো তাহলে আমার মতো পূর্ব পাকিস্তানের অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে জন্ম নেয়া একটি শিশু কখনও একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হতে পারত না। আজকে আমরা যখন চারপাশে তাকাই, দেখতে পাই অনেক বাংলাদেশী ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অনেক উচ্চপদে পৌঁছেছেন এবং আগামী দিনগুলোয় অনেক বাংলাদেশী এসব পদে যাবেন। এমনকি ভারতীয়দের মতো বাংলাদেশীরাও মাইক্রোসফট, অ্যাপেল কিংবা কোকাকোলা, পেপসি কিংবা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বা সিটি গ্রুপ কিংবা যে কোনো প্রযুক্তি কোম্পানি কিংবা যে কোনো আর্থিক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা যে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পদে আসীন হবেন। সে ক্ষেত্রে তার প্রধান পরিচয় কী? তার প্রধান পরিচয় হচ্ছে তিনি একজন বাংলাদেশী। তিনি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত একজন প্রধান নির্বাহী। এটি কখনোই হতো না যদি একাত্তর সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ না হতো। এত বাংলাদেশী পূর্ব পাকিস্তানের কোটায় পিএইচডি করতে যেতে পারত না, এত বাংলাদেশী কখনও বড় বড় পদে আসীন হতে পারত না, এত বাংলাদেশী মন্ত্রী হতে পারত না, এত বাংলাদেশী সচিব হতে পারত না, এত বাংলাদেশী জেনারেল হতে পারত না সামরিক বাহিনীতে, কারণ আমরা জানি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সর্বোচ্চ পদে আসীন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন একজন কর্নেল পর্যায়ের লোক। সুতরাং ব্রিগেডিয়ার, মেজর জেনারেল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমাদের হওয়া ছিল স্বপ্নেরও অতীত। মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার ফলে কৃষকের, আধা বেলা খাওয়া শ্রমিকের, গ্রামের মানুষটির কী উপকার হয়েছে আমি জানি না; তবে অনেক বেশি লোক ভিসা নিয়ে বিদেশে পড়তে যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে এক্সপোর্ট করছে, অনেক বেশি লোক উদ্যোক্তা হচ্ছে। সুতরাং আমি মনে করি, অবশ্যই কৃষক-শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনে আমাদের সহায়তা করা প্রয়োজন। তবে স্বাধীনতার সবচেয়ে উপকারভোগী শ্রেণী হচ্ছে আমি, আপনারা, আমার আশপাশের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন। কিন্তু আমায় পীড়া দেয়, যখন দেখি দেশপ্রেমের প্রশ্নে তাদের দায়বদ্ধতা অনেক অনেক কম। এটা ভেবে একদিকে কিছুটা ভালো লাগছে যে, স্বাধীনতার এত বছর পরও উচ্চপদের সরকারি কর্মকর্তারা যে কোনোভাবে জাল সার্টিফিকেট নিয়েও মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার এটা ভেবে দুঃখও পাই, পীড়িত হই, না জানি আরও কত জাল সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন।
মনে আছে, ১৯৮০ সালে কলেজ থেকে পাস করে বেরিয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। ট্রেনে আমাদের সঙ্গে একজন ভদ্রলোকের দেখা হল, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পা হারিয়েছেন। আমাদের তখন যে তারুণ্যের আবেগ, সেই আবেগের বশবর্তী হয়ে তাকে অনেক দেখভাল করেছিলাম, আমরা আমাদের বাসায় তাকে নিয়ে খাইয়েছিলাম। পরবর্তীকালে আবিষ্কার হল, মুক্তিযুদ্ধে সেই লোকটির ভূমিকা ছিল একজন রাজাকারের। তিনি রাজাকার হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পা হারিয়েছেন। তখন এক বন্ধু আরেক বন্ধুর গালে চপেটাঘাত করে কিছুটা হলেও নিজেদের দায়মুক্তির চেষ্টা করেছিলাম। আজকে যখন আমার সিনিয়র ভাই সরকারি কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট জালিয়াতি করেছেন, আর কিছু ভাইয়ের বিচার হচ্ছে, তখন এই চপেটাঘাত কাকে করব? এই চপেটাঘাত কি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারকে করব? এই চপেটাঘাত কি তাদের সহকর্মী যারা, তাদের করব? এই চপেটাঘাত কি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের গালে করব? এই চপেটাঘাত কি আইনশৃংখলা বাহিনীর গালে করব? নাকি এই চপেটাঘাত সজোরে আমার নিজের গালেই করব?
একটা ভালো দিক হল, মানুষ মনে করছে সচিব হওয়ার পরও কী জানি নেই। মানুষ মনে করছে একজন সম্মানিত বিচারপতি হওয়ার পরও তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় তার সন্তানের কাছে যেন কী পাননি। সেটা কী? একজন মুক্তিযোদ্ধার সম্মান। তখন একদিকে ভালো লাগে যে, একজন বাংলাদেশীর জন্য সর্বোচ্চ সম্মান হচ্ছে একাত্তরে লড়াই করে বাংলাদেশ সৃষ্টির সম্মান। এ কারণেই বাংলাদেশ টিকে থাকবে, এ কারণেই বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে।
আমার ভালো লাগছে, এত বছর পরও যারা বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতা করেছে, যারা নিরপরাধ লোকদের নির্বিচারে হত্যা করেছে, যারা মানবতাবিরোধী কাজ করেছে, মা-বোন-শিশুকে যারা অকাতরে হত্যা করেছে, আজ তাদের বিচার হচ্ছে। হোক মৃত্যুদণ্ড, হোক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, হোক মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাভোগের আগেই মৃত্যু। অন্তত আমরা জেনে যাচ্ছি, এ লোকটি মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করার জন্য অভিযুক্ত। আমার আরও ভালো লাগছে, বাংলাদেশের একটি প্রধান দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল অনেক বছর পর জামায়াতে ইসলামী দলের আহূত হরতালকে সমর্থন করছে না। তারা কিন্তু গোলাম আযমের মৃত্যুতে কোনো শোক প্রস্তাব নেননি, তারা এমনকি একসময় তাদের দলে থাকা আবদুল আলিমের মৃত্যুতেও কোনো শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। অনেক দিন পর হলেও আস্তে আস্তে আমরা মনে করতে পারছি, বাংলাদেশে যারাই সরকার গঠন করুন না কেন, তাদের একটি বিষয় মীমাংসা করে আসতে হবে, সেটি হচ্ছে তাদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হতে হবে, তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তি হতে হবে। আমি মনে করি, এই দলটি যাতে ডানপন্থী থেকে কট্টর ডানপন্থী না হতে পারে, তারা যাতে তাদের রাজনৈতিক দলের মধ্যে উদার গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারে, সেই দায়িত্বটি আপনার, আমার, আমাদের সবার ওপরেই বর্তায়। আমি মনে করি, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে তাদের মৃত্যুর আগে অন্তত তারা যে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত, এটা চিহ্নিত করা উচিত।
আমি মনে করি, অচিরেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে বৃহত্তর থেকে বৃহত্তম ঐক্য গড়ে উঠবে, শক্তি গড়ে উঠবে। সেখানে সবচেয়ে বেশি রসদ জোগাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী তরুণ প্রজন্ম, যাদের কাছে শিক্ষা রয়েছে, যাদের কাছে প্রযুক্তি রয়েছে। হয়তো তারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি; কিন্তু রাজনৈতিক কারণে, অর্থনৈতিক কারণে, সামাজিক কারণে, তাদের নিজস্ব অগ্রগতির কারণে, আন্তর্জাতিক সমাজে তাদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করার কারণে তারা আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কাছে ফিরে যাবে। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম, যেদিন আর কখনও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী কোনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে সরকার পরিচালনা করবে না এবং সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের দলগুলো জাতীয়তাবাদী শক্তিতেও রূপান্তরিত হবে। আমরা সেই দিনের অপেক্ষা করছি যেদিন কোনো মুক্তিযোদ্ধা কবিকে, মুক্তিযোদ্ধা লেখককে ক্ষোভে-দুঃখে লিখতে হবে না, সব শালা মুক্তিযোদ্ধা হতে চায়।
মামুন রশীদ : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
প্রায় ৭-৮ বছর আগে ঢাকার বাইরে এক বিচারপতির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করার একটি উদ্যোগ দেখলাম। পরে জেনেছিলাম সেই বিচারপতি যদিও অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, সৎ ও উদ্যোগী বিচারক ছিলেন; কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ না থাকায় মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট পাওয়া কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার মতো যোগ্য ছিলেন না তিনি। বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের সুবিখ্যাত কবিতা রয়েছে- তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা কিংবা রাজাকার মন্ত্রীর শকটে উড়ছে আমার প্রাণের পতাকা। এসব কবিতার রচয়িতা হওয়া সত্ত্বেও শামসুর রাহমানকে আমরা তার মৃত্যুর পর যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে কারণ দেখানো হয়েছিল, তিনি যা করলে একজন মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেতে পারেন এবং একজন সনদপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভূষিত হতে পারেন, তেমন কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন না। আমরা দুঃখ সত্ত্বেও মেনে নিয়েছিলাম, কারণ এই দেশ সৃষ্টির পেছনে যারা অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন; যারা প্রবাসী সরকার গঠনে, স্বাধীন বাংলা সরকার গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন, যারা ভারতকে সঙ্গে নিয়ে, বিশ্বের অপরাপর অনেক শক্তিশালী দেশকে সঙ্গে নিয়ে, গণতন্ত্রকামী সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশটি সৃষ্টি করেছিলেন, তারা যে সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন, অন্যরা সেই সম্মান পেতে পারেন না। ভাষা মতিন খ্যাত আবদুল মতিন যখন মৃত্যুবরণ করলেন তখন যে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া গেল না, আমরা দুঃখ পেয়েছি; আমরা মনে করেছিলাম তিনিও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত হতে পারতেন। তারপরও আমরা মেনে নিতে পেরেছি, কারণ সেই যে বললাম, যারা অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন, জীবন বাজি রেখে এই বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য কাজ করেছেন, তারা তো একটু ভিন্নধর্মী হবেনই। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, স্বাধীন বাংলাদেশ থাকবে, তাদের এই সম্মানটুকু আমাদের দিতেই হবে এবং আমি নিশ্চিত, যারাই সরকারে থাকুন না কেন, ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ অর্থাৎ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে এই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু তাদের দেখানো হবে।
বছর দুয়েক আগে আমি গিয়েছিলাম আমার ভগ্নিপতির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার অন্তিম ইচ্ছা অনুসারে তাকে তার পিতৃভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার একটি গ্রামে সমাহিত করা হয়েছিল। সেখানে দেখেছি তাকে তিন ধরনের সম্মান দেয়া হয়েছিল। প্রথমত, তিনি যে স্কুলে পড়তেন সেই স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীরা সম্মান দেখিয়েছিলেন; আরেকটি সম্মান দেখানো হয়েছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার দিয়ে, তার শবদেহকে জাতীয় পতাকা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছিল। আর তৃতীয় সম্মানটি ছিল এমন : যারা তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের অনেকে সেখানে উপস্থিত থেকে তাদের কমান্ডারকে বিদায় জানিয়েছিলেন। তখন আমার একটা বিষয় অত্যন্ত ভালো লেগেছিল যে, তার একটা বিশেষ পরিচয় রয়েছে- সেটি হচ্ছে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাই যেমন আমি মেনে নিয়েছি, ভাষা মতিন এবং বাংলাদেশের প্রধান কবির এত অবদান থাকার পরও তারা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেলেন না; যেমন আমি অনেক দিনের বন্ধুত্বকে ঝুঁকিতে ফেলে সেই বিচারপতির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়াটাকে অযৌক্তিক ও বেমানান মনে করে তার সুযোগ্য সন্তানকে নাস্তানাবুদ করেছিলাম- সেই একই প্রেক্ষাপটে এখন যখন দেখি অনেকেই শুধু সরকারের উচ্চপদে থাকার কারণে, কোনো যুদ্ধ না করে, অস্ত্র হাতে না নিয়ে, প্রবাসী সরকার গঠনে কোনোরকম অবদান না রেখে, আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়ে বিন্দু পরিমাণ উদ্যোগ না নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার খেতাবপ্রাপ্ত, তখন ওই কবির মতো দ্রোহে, ক্ষোভে আমারও লিখতে ইচ্ছে করে, সবাই মুক্তিযোদ্ধা হতে চায়।
আমরা এখন স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমি নিশ্চিত বিশ্বাস করি, যদি বাংলাদেশ নামক দেশটি না হতো তাহলে আমার মতো পূর্ব পাকিস্তানের অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে জন্ম নেয়া একটি শিশু কখনও একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হতে পারত না। আজকে আমরা যখন চারপাশে তাকাই, দেখতে পাই অনেক বাংলাদেশী ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অনেক উচ্চপদে পৌঁছেছেন এবং আগামী দিনগুলোয় অনেক বাংলাদেশী এসব পদে যাবেন। এমনকি ভারতীয়দের মতো বাংলাদেশীরাও মাইক্রোসফট, অ্যাপেল কিংবা কোকাকোলা, পেপসি কিংবা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বা সিটি গ্রুপ কিংবা যে কোনো প্রযুক্তি কোম্পানি কিংবা যে কোনো আর্থিক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা যে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পদে আসীন হবেন। সে ক্ষেত্রে তার প্রধান পরিচয় কী? তার প্রধান পরিচয় হচ্ছে তিনি একজন বাংলাদেশী। তিনি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত একজন প্রধান নির্বাহী। এটি কখনোই হতো না যদি একাত্তর সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ না হতো। এত বাংলাদেশী পূর্ব পাকিস্তানের কোটায় পিএইচডি করতে যেতে পারত না, এত বাংলাদেশী কখনও বড় বড় পদে আসীন হতে পারত না, এত বাংলাদেশী মন্ত্রী হতে পারত না, এত বাংলাদেশী সচিব হতে পারত না, এত বাংলাদেশী জেনারেল হতে পারত না সামরিক বাহিনীতে, কারণ আমরা জানি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সর্বোচ্চ পদে আসীন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন একজন কর্নেল পর্যায়ের লোক। সুতরাং ব্রিগেডিয়ার, মেজর জেনারেল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমাদের হওয়া ছিল স্বপ্নেরও অতীত। মুক্তিযুদ্ধ হওয়ার ফলে কৃষকের, আধা বেলা খাওয়া শ্রমিকের, গ্রামের মানুষটির কী উপকার হয়েছে আমি জানি না; তবে অনেক বেশি লোক ভিসা নিয়ে বিদেশে পড়তে যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ ভ্রমণে যাচ্ছে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে এক্সপোর্ট করছে, অনেক বেশি লোক উদ্যোক্তা হচ্ছে। সুতরাং আমি মনে করি, অবশ্যই কৃষক-শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনে আমাদের সহায়তা করা প্রয়োজন। তবে স্বাধীনতার সবচেয়ে উপকারভোগী শ্রেণী হচ্ছে আমি, আপনারা, আমার আশপাশের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন। কিন্তু আমায় পীড়া দেয়, যখন দেখি দেশপ্রেমের প্রশ্নে তাদের দায়বদ্ধতা অনেক অনেক কম। এটা ভেবে একদিকে কিছুটা ভালো লাগছে যে, স্বাধীনতার এত বছর পরও উচ্চপদের সরকারি কর্মকর্তারা যে কোনোভাবে জাল সার্টিফিকেট নিয়েও মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার এটা ভেবে দুঃখও পাই, পীড়িত হই, না জানি আরও কত জাল সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন।
মনে আছে, ১৯৮০ সালে কলেজ থেকে পাস করে বেরিয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। ট্রেনে আমাদের সঙ্গে একজন ভদ্রলোকের দেখা হল, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পা হারিয়েছেন। আমাদের তখন যে তারুণ্যের আবেগ, সেই আবেগের বশবর্তী হয়ে তাকে অনেক দেখভাল করেছিলাম, আমরা আমাদের বাসায় তাকে নিয়ে খাইয়েছিলাম। পরবর্তীকালে আবিষ্কার হল, মুক্তিযুদ্ধে সেই লোকটির ভূমিকা ছিল একজন রাজাকারের। তিনি রাজাকার হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পা হারিয়েছেন। তখন এক বন্ধু আরেক বন্ধুর গালে চপেটাঘাত করে কিছুটা হলেও নিজেদের দায়মুক্তির চেষ্টা করেছিলাম। আজকে যখন আমার সিনিয়র ভাই সরকারি কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট জালিয়াতি করেছেন, আর কিছু ভাইয়ের বিচার হচ্ছে, তখন এই চপেটাঘাত কাকে করব? এই চপেটাঘাত কি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারকে করব? এই চপেটাঘাত কি তাদের সহকর্মী যারা, তাদের করব? এই চপেটাঘাত কি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের গালে করব? এই চপেটাঘাত কি আইনশৃংখলা বাহিনীর গালে করব? নাকি এই চপেটাঘাত সজোরে আমার নিজের গালেই করব?
একটা ভালো দিক হল, মানুষ মনে করছে সচিব হওয়ার পরও কী জানি নেই। মানুষ মনে করছে একজন সম্মানিত বিচারপতি হওয়ার পরও তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় তার সন্তানের কাছে যেন কী পাননি। সেটা কী? একজন মুক্তিযোদ্ধার সম্মান। তখন একদিকে ভালো লাগে যে, একজন বাংলাদেশীর জন্য সর্বোচ্চ সম্মান হচ্ছে একাত্তরে লড়াই করে বাংলাদেশ সৃষ্টির সম্মান। এ কারণেই বাংলাদেশ টিকে থাকবে, এ কারণেই বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে।
আমার ভালো লাগছে, এত বছর পরও যারা বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতা করেছে, যারা নিরপরাধ লোকদের নির্বিচারে হত্যা করেছে, যারা মানবতাবিরোধী কাজ করেছে, মা-বোন-শিশুকে যারা অকাতরে হত্যা করেছে, আজ তাদের বিচার হচ্ছে। হোক মৃত্যুদণ্ড, হোক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, হোক মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাভোগের আগেই মৃত্যু। অন্তত আমরা জেনে যাচ্ছি, এ লোকটি মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করার জন্য অভিযুক্ত। আমার আরও ভালো লাগছে, বাংলাদেশের একটি প্রধান দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল অনেক বছর পর জামায়াতে ইসলামী দলের আহূত হরতালকে সমর্থন করছে না। তারা কিন্তু গোলাম আযমের মৃত্যুতে কোনো শোক প্রস্তাব নেননি, তারা এমনকি একসময় তাদের দলে থাকা আবদুল আলিমের মৃত্যুতেও কোনো শোক প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। অনেক দিন পর হলেও আস্তে আস্তে আমরা মনে করতে পারছি, বাংলাদেশে যারাই সরকার গঠন করুন না কেন, তাদের একটি বিষয় মীমাংসা করে আসতে হবে, সেটি হচ্ছে তাদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হতে হবে, তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তি হতে হবে। আমি মনে করি, এই দলটি যাতে ডানপন্থী থেকে কট্টর ডানপন্থী না হতে পারে, তারা যাতে তাদের রাজনৈতিক দলের মধ্যে উদার গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারে, সেই দায়িত্বটি আপনার, আমার, আমাদের সবার ওপরেই বর্তায়। আমি মনে করি, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে তাদের মৃত্যুর আগে অন্তত তারা যে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত, এটা চিহ্নিত করা উচিত।
আমি মনে করি, অচিরেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে বৃহত্তর থেকে বৃহত্তম ঐক্য গড়ে উঠবে, শক্তি গড়ে উঠবে। সেখানে সবচেয়ে বেশি রসদ জোগাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী তরুণ প্রজন্ম, যাদের কাছে শিক্ষা রয়েছে, যাদের কাছে প্রযুক্তি রয়েছে। হয়তো তারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি; কিন্তু রাজনৈতিক কারণে, অর্থনৈতিক কারণে, সামাজিক কারণে, তাদের নিজস্ব অগ্রগতির কারণে, আন্তর্জাতিক সমাজে তাদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করার কারণে তারা আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কাছে ফিরে যাবে। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম, যেদিন আর কখনও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী কোনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে সরকার পরিচালনা করবে না এবং সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের দলগুলো জাতীয়তাবাদী শক্তিতেও রূপান্তরিত হবে। আমরা সেই দিনের অপেক্ষা করছি যেদিন কোনো মুক্তিযোদ্ধা কবিকে, মুক্তিযোদ্ধা লেখককে ক্ষোভে-দুঃখে লিখতে হবে না, সব শালা মুক্তিযোদ্ধা হতে চায়।
মামুন রশীদ : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
Tuesday, November 11, 2014
ধর্মীয় মেলবন্ধনের অনন্য দৃষ্টান্ত by চৌধূরী মনজুর রুমি
একটি দৃশ্যপট কল্পনা করুন। সিঁড়িতে বা লিফটে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীদের দেখা হচ্ছে অহরহ। একজন আরেকজনকে অভিবাদন জানাচ্ছেন হাসিমুখে। শান্তির ধরণী গড়ার লক্ষ্যে এবং সন্তানদের সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ উপহার দেয়ার বাসনায় চমৎকার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মহড়া চলছে একই ছাদের নিচে। এ দৃষ্টান্তই একদিন সারা পৃথিবীতে ছড়াবে আলোকচ্ছটা। যেখানে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি এবং এক আদর্শে বিশ্বাসী অন্য আদর্শে বিশ্বাসীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজ বিশ্বাস ও আদর্শ প্রচার করবেন, অশান্তির পথে নয় কখনোই। সবাই একে অপরকে শুধু বলবেন, ‘আপনার ওপর শান্তি আসুক।’
জার্মানির রাজধানী বার্লিনের পেট্রিপালটজে নির্মিত হচ্ছে ‘হাউস অব ওয়ান’- এক ছাদের নিচে তিন ধর্মের উপাসনালয়। বিশ্বব্যাপী যখন ধর্মীয় দ্বন্দ্ব-বিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে- তখন মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের মধ্যে একতা আনার উদ্দেশ্যে এমন একটি প্রস্তাব রাখা হয়েছিল, যা একসময় সব ধর্মের মাঝে সৃষ্টি করবে সহমর্মিতা। যে স্থানে এটি নির্মিত হচ্ছে, সেখানে সম্প্রতি প্রতীকী ইট হাতে দেখা গেছে মুসলিম ইমাম কাদির সানচি, খ্রিস্টান ধর্মযাজক গ্রেগর হোবার্গ এবং ইহুদি রাব্বি (ধর্মযাজক) তোভিয়া বেন-চোরিনকে। এটি নতুন এক উদ্যোগের অংশ, যার উদ্দেশ্য ধর্মীয় যোগসূত্র স্থাপন। এমন আরেকটি উদ্যোগের বাস্তবায়ন এগিয়ে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমাতে, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘ট্রাই ফেইথ ইনিশিয়েটিভ’। সেখানে সম্প্রতি নির্মিত একটি সিনাগগের (ইহুদিদের উপাসনালয়) পাশাপাশি একটি চার্চ এবং একটি মসজিদ নির্মাণের প্রচেষ্টা চলছে।
বার্লিনের উদ্যোগটি নেয়া হয়েছে মূলত দুটি কারণে- ভবিষ্যতে আন্তঃসাংস্কৃতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং এ শহরের মানুষের ধর্মের প্রতি অনীহার অবসান ঘটানো। এ শহরের বেশিরভাগ বাসিন্দা আজকাল কোনো ধর্মেরই অনুসারী নয়। এ প্রেক্ষাপটে মুসলিম ইমাম চাইছেন ‘ইন্টারকালচারাল ডায়ালগে’র মাধ্যমে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করতে। খ্রিস্টান রেভারেন্ড পূর্ব জার্মানির দমনপীড়ন প্রত্যক্ষ করেছেন, দেখেছেন বার্লিনের পতনের পর ঐক্যের ক্ষমতা। এমনি এমনি তো আর বলা হয় না ‘ইউনিটি ইজ স্ট্রেংথ’। তিনিও চান পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের মহিমা ফিরিয়ে আনতে। আর ইহুদি রাব্বি, যিনি যে কারণেই হোক ইসরাইলের হয়ে তিনটি যুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলেন, তিনি এখন ফিলিস্তিনের প্রতি অন্যায়ের ক্ষত নিরাময়ে আÍনিয়োগ করছেন। তার এ দৃষ্টান্ত হয়তো বিশ্বে ইসরাইলের ঔদ্ধত্য কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে ভূমিকা রাখবে।
এক ধর্মবিশ্বাসীদের প্রতি অন্য ধর্মবিশ্বাসীর শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ধারণাটি যে একেবারেই অভিনব তা নয়। উনিশ শতকের মহান মানবতাবাদী সাধক স্বামী বিবেকানন্দের একটি কথা উদ্ধৃত করা যায়। ১৯০০ সালের ২৫ মার্চ আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোর বে অঞ্চলে তিনি তার বিখ্যাত ‘মুহাম্মদ’ ভাষণে ইসলামের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে চিহ্নিত করেছিলেন ‘সাম্যবাদের আচার্য’ হিসেবে। প্রখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লেভ তলস্তয় তার শেষ জীবনে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মৃত্যুর পর তার পকেটে পাওয়া গিয়েছিল স্যার আবদুল্লাহ্ সোহরাওয়ার্দীর বাছাইকৃত হাদিসের সংকলন। ১৯৩৮ সালের ২৪ মার্চ এর দ্বিতীয় সংকলনের মুখবন্ধে মহাত্মা গান্ধী লিখেছিলেন, ‘মোহাম্মদের (সা.) বাণী মানব জাতির সম্পদ।’ বিখ্যাত জার্মান কবি গ্যাটে ইসলাম সম্পর্কে গভীর লেখাপড়া করে বলেছিলেন, ‘এই যদি হয় ইসলাম, তাহলে আমাদের প্রত্যেক চিন্তাশীল ব্যক্তিই হচ্ছে মুসলমান।’
আসলে সব ধর্মেরই মূলকথা হল নম্রতা। ধর্মগুলোর মধ্যে দৃশ্যত পার্থক্য থাকলেও মানুষকে একত্রিত ও সংঘবদ্ধ রাখতে ধর্মানুভূতির প্রায়োগিক ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। কারণ মানুষে মানুষে বন্ধন সৃষ্টির যেসব
উপাদান রয়েছে, সেগুলোর মূলে রয়েছে ধর্ম-সংস্কৃতি।
কিন্তু আজ ধর্মকে শান্তির পথ থেকে বিচ্যুত করতে পৃথিবীব্যাপী নানা ধরনের অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই ধর্মকে ঘিরে এক শান্তিপূর্ণ আদান-প্রদান ও সহমর্মিতা আজকের পৃথিবীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সব ধর্মের মানুষই রাখতে পারে অবদান।
এবার শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই, যিনি নারী শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন এবং ভারতের কৈলাস সত্যার্থী, যিনি কাজ করেন শিশু অধিকার নিয়ে। প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে নিজের সন্তানদের গড়তে একজন মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই শিক্ষিত ও সচেতন মা-ই পারে তার সন্তানকে শান্তির পতাকাবাহী হিসেবে গড়ে তুলতে। আমরা তো স্বপ্ন দেখতেই পারি, একজন মুসলমান ও একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীর এই শান্তি পুরস্কার অর্জন পৃথিবীতে সহমর্মিতার সংস্কৃতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সর্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগ আমরা দেখতে পেয়েছি বিভিন্ন ধর্মের মেলবন্ধনের প্রয়াস থেকে, যা এ লেখার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য ধর্মাবলম্বীর প্রতি সহমর্মিতার অনন্য দৃষ্টান্তটি রেখে গেছেন ইসলামের মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)। আমরা সবাই সে ঘটনাটি জানি। এক বিধর্মী বৃদ্ধা প্রতিদিন তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন। নবীজি নীরবে সেই পথ দিয়ে হেঁটে চলে যেতেন। একদিন তিনি দেখলেন পথের মাঝে কাঁটা নেই। নবীজির মন অজানা আশংকায় ভরে গেল। তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই বৃদ্ধার কিছু হয়েছে। প্রতিবেশীদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন ওই বৃদ্ধা অসুস্থ। নবীজি বৃদ্ধাকে দেখতে তার বাসায় গেলেন। বৃদ্ধা ভাবলেন, এবার বুঝি নবীজি প্রতিশোধ নেবেন। কিন্তু নবীজি বললেন, তিনি অসুস্থ জেনে তাকে দেখতে এসেছেন, তার শুশ্রূষা করতে এসেছেন। বিধর্মীর প্রতি ভালোবাসার এমন উদাহরণ থাকার পরও আজও কিছু মানুষ ধর্মের নামে পৃথিবীতে সহিংসতা ছড়ায়। তাই আজ এ ধরনের উদাহরণ ছড়িয়ে দিতে হবে সারা বিশ্বে।
এ লেখা শেষ করব উইলিয়াম ল-এর ‘The Spirit of Prayer’ অভিসন্দর্ভের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘ধর্মগুলোর মধ্যকার পার্থক্য শুধু বাহ্যিক। মানুষের পাপমুক্তির পথ একটিই আর তা হচ্ছে মানুষের আত্মায় ঈশ্বরের অধিষ্ঠান নিশ্চিত করা। ধর্মবিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের পথ কি ভিন্ন? এটা হতে পারে না। ঈশ্বর এক, মানব প্রকৃতি এক, পাপ মুক্তির পথও এক। পাপ মুক্তিতে আত্মাকে ঈশ্বর পানে ধাবিত করাই হচ্ছে পথ।’
ধর্ম ও অন্যান্য আদর্শের দ্বন্দ্বের অবসানে সত্যিকার শান্তির পথটি খুঁজে বের করাই হচ্ছে আজকের প্রধান কাজ। মানুষ এ পথেই অগ্রসর হবে, এ প্রত্যাশা করি।
চৌধূরী মনজুর রুমি : ব্যাংকার
জার্মানির রাজধানী বার্লিনের পেট্রিপালটজে নির্মিত হচ্ছে ‘হাউস অব ওয়ান’- এক ছাদের নিচে তিন ধর্মের উপাসনালয়। বিশ্বব্যাপী যখন ধর্মীয় দ্বন্দ্ব-বিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে- তখন মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদিদের মধ্যে একতা আনার উদ্দেশ্যে এমন একটি প্রস্তাব রাখা হয়েছিল, যা একসময় সব ধর্মের মাঝে সৃষ্টি করবে সহমর্মিতা। যে স্থানে এটি নির্মিত হচ্ছে, সেখানে সম্প্রতি প্রতীকী ইট হাতে দেখা গেছে মুসলিম ইমাম কাদির সানচি, খ্রিস্টান ধর্মযাজক গ্রেগর হোবার্গ এবং ইহুদি রাব্বি (ধর্মযাজক) তোভিয়া বেন-চোরিনকে। এটি নতুন এক উদ্যোগের অংশ, যার উদ্দেশ্য ধর্মীয় যোগসূত্র স্থাপন। এমন আরেকটি উদ্যোগের বাস্তবায়ন এগিয়ে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমাতে, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘ট্রাই ফেইথ ইনিশিয়েটিভ’। সেখানে সম্প্রতি নির্মিত একটি সিনাগগের (ইহুদিদের উপাসনালয়) পাশাপাশি একটি চার্চ এবং একটি মসজিদ নির্মাণের প্রচেষ্টা চলছে।
বার্লিনের উদ্যোগটি নেয়া হয়েছে মূলত দুটি কারণে- ভবিষ্যতে আন্তঃসাংস্কৃতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং এ শহরের মানুষের ধর্মের প্রতি অনীহার অবসান ঘটানো। এ শহরের বেশিরভাগ বাসিন্দা আজকাল কোনো ধর্মেরই অনুসারী নয়। এ প্রেক্ষাপটে মুসলিম ইমাম চাইছেন ‘ইন্টারকালচারাল ডায়ালগে’র মাধ্যমে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করতে। খ্রিস্টান রেভারেন্ড পূর্ব জার্মানির দমনপীড়ন প্রত্যক্ষ করেছেন, দেখেছেন বার্লিনের পতনের পর ঐক্যের ক্ষমতা। এমনি এমনি তো আর বলা হয় না ‘ইউনিটি ইজ স্ট্রেংথ’। তিনিও চান পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের মহিমা ফিরিয়ে আনতে। আর ইহুদি রাব্বি, যিনি যে কারণেই হোক ইসরাইলের হয়ে তিনটি যুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলেন, তিনি এখন ফিলিস্তিনের প্রতি অন্যায়ের ক্ষত নিরাময়ে আÍনিয়োগ করছেন। তার এ দৃষ্টান্ত হয়তো বিশ্বে ইসরাইলের ঔদ্ধত্য কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে ভূমিকা রাখবে।
এক ধর্মবিশ্বাসীদের প্রতি অন্য ধর্মবিশ্বাসীর শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ধারণাটি যে একেবারেই অভিনব তা নয়। উনিশ শতকের মহান মানবতাবাদী সাধক স্বামী বিবেকানন্দের একটি কথা উদ্ধৃত করা যায়। ১৯০০ সালের ২৫ মার্চ আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোর বে অঞ্চলে তিনি তার বিখ্যাত ‘মুহাম্মদ’ ভাষণে ইসলামের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে চিহ্নিত করেছিলেন ‘সাম্যবাদের আচার্য’ হিসেবে। প্রখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লেভ তলস্তয় তার শেষ জীবনে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মৃত্যুর পর তার পকেটে পাওয়া গিয়েছিল স্যার আবদুল্লাহ্ সোহরাওয়ার্দীর বাছাইকৃত হাদিসের সংকলন। ১৯৩৮ সালের ২৪ মার্চ এর দ্বিতীয় সংকলনের মুখবন্ধে মহাত্মা গান্ধী লিখেছিলেন, ‘মোহাম্মদের (সা.) বাণী মানব জাতির সম্পদ।’ বিখ্যাত জার্মান কবি গ্যাটে ইসলাম সম্পর্কে গভীর লেখাপড়া করে বলেছিলেন, ‘এই যদি হয় ইসলাম, তাহলে আমাদের প্রত্যেক চিন্তাশীল ব্যক্তিই হচ্ছে মুসলমান।’
আসলে সব ধর্মেরই মূলকথা হল নম্রতা। ধর্মগুলোর মধ্যে দৃশ্যত পার্থক্য থাকলেও মানুষকে একত্রিত ও সংঘবদ্ধ রাখতে ধর্মানুভূতির প্রায়োগিক ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। কারণ মানুষে মানুষে বন্ধন সৃষ্টির যেসব
উপাদান রয়েছে, সেগুলোর মূলে রয়েছে ধর্ম-সংস্কৃতি।
কিন্তু আজ ধর্মকে শান্তির পথ থেকে বিচ্যুত করতে পৃথিবীব্যাপী নানা ধরনের অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই ধর্মকে ঘিরে এক শান্তিপূর্ণ আদান-প্রদান ও সহমর্মিতা আজকের পৃথিবীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সব ধর্মের মানুষই রাখতে পারে অবদান।
এবার শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই, যিনি নারী শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন এবং ভারতের কৈলাস সত্যার্থী, যিনি কাজ করেন শিশু অধিকার নিয়ে। প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে নিজের সন্তানদের গড়তে একজন মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই শিক্ষিত ও সচেতন মা-ই পারে তার সন্তানকে শান্তির পতাকাবাহী হিসেবে গড়ে তুলতে। আমরা তো স্বপ্ন দেখতেই পারি, একজন মুসলমান ও একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীর এই শান্তি পুরস্কার অর্জন পৃথিবীতে সহমর্মিতার সংস্কৃতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সর্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগ আমরা দেখতে পেয়েছি বিভিন্ন ধর্মের মেলবন্ধনের প্রয়াস থেকে, যা এ লেখার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য ধর্মাবলম্বীর প্রতি সহমর্মিতার অনন্য দৃষ্টান্তটি রেখে গেছেন ইসলামের মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)। আমরা সবাই সে ঘটনাটি জানি। এক বিধর্মী বৃদ্ধা প্রতিদিন তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন। নবীজি নীরবে সেই পথ দিয়ে হেঁটে চলে যেতেন। একদিন তিনি দেখলেন পথের মাঝে কাঁটা নেই। নবীজির মন অজানা আশংকায় ভরে গেল। তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই বৃদ্ধার কিছু হয়েছে। প্রতিবেশীদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন ওই বৃদ্ধা অসুস্থ। নবীজি বৃদ্ধাকে দেখতে তার বাসায় গেলেন। বৃদ্ধা ভাবলেন, এবার বুঝি নবীজি প্রতিশোধ নেবেন। কিন্তু নবীজি বললেন, তিনি অসুস্থ জেনে তাকে দেখতে এসেছেন, তার শুশ্রূষা করতে এসেছেন। বিধর্মীর প্রতি ভালোবাসার এমন উদাহরণ থাকার পরও আজও কিছু মানুষ ধর্মের নামে পৃথিবীতে সহিংসতা ছড়ায়। তাই আজ এ ধরনের উদাহরণ ছড়িয়ে দিতে হবে সারা বিশ্বে।
এ লেখা শেষ করব উইলিয়াম ল-এর ‘The Spirit of Prayer’ অভিসন্দর্ভের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি বলেছেন, ‘ধর্মগুলোর মধ্যকার পার্থক্য শুধু বাহ্যিক। মানুষের পাপমুক্তির পথ একটিই আর তা হচ্ছে মানুষের আত্মায় ঈশ্বরের অধিষ্ঠান নিশ্চিত করা। ধর্মবিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের পথ কি ভিন্ন? এটা হতে পারে না। ঈশ্বর এক, মানব প্রকৃতি এক, পাপ মুক্তির পথও এক। পাপ মুক্তিতে আত্মাকে ঈশ্বর পানে ধাবিত করাই হচ্ছে পথ।’
ধর্ম ও অন্যান্য আদর্শের দ্বন্দ্বের অবসানে সত্যিকার শান্তির পথটি খুঁজে বের করাই হচ্ছে আজকের প্রধান কাজ। মানুষ এ পথেই অগ্রসর হবে, এ প্রত্যাশা করি।
চৌধূরী মনজুর রুমি : ব্যাংকার
ময়লা by মাহবুব কামাল
আমেরিকায় যারা থাকেন অথবা ভ্রমণ করেন, তারা সেখানে একটি শব্দ নিয়মিতভাবেই শুনে থাকবেন। শব্দটি মধৎনধমব, বাংলা অর্থ ময়লা বা জঞ্জাল। প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, এত পরিচ্ছন্ন একটি দেশ, সেখানে ময়লা এলো কোত্থেকে? না, এই ময়লা বস্তুগত নয়; মনোজাগতিক, বলা যেতে পারে বায়বীয়। অনিয়ম, অসঙ্গতি, চিন্তার দৈন্য, আচরণের অশিষ্টতা ইত্যাদির ক্ষেত্রে এই শব্দের শ্লেষাত্মক ব্যবহার হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের বস্তুজগতের ময়লা তো কহতব্য নয়। রুমাল ছাড়া পথ হাঁটাই মুশকিল। একটা চমৎকার দেয়ালের দিকে তাকাব, দেখব সেখানেও কেউ একজন চুন মেখে রেখেছে। ইউরোপ-আমেরিকায় যাওয়ার দরকার নেই, এশিয়ার সিঙ্গাপুরের রাস্তায়ই এক টুকরো পরিষ্কার কাগজও পাওয়া যাবে না, ঢাকার রাস্তায় ময়লাযুক্ত কাগজগুলো টোকালে সেগুলো দিয়ে এক হাজার হাতির শরীর মোড়ানো সম্ভব। থাকগে, বস্তুজগতের ময়লা নিয়ে পরিবেশবাদীরা ভাবুন, আমরা কথা বলব মনোজগতের আবর্জনা নিয়ে।
প্রকৃতপক্ষে, আমরা সবাই নানা রঙের মনোজাগতিক ময়লার মধ্যেই বাস করছি- কালো, ধূসর, এমনকি রঙিনও। গত শতাব্দীর আশির দশকে কালারড টেলিভিশনের সূচনা হয়েছিল যখন, এক বিদগ্ধ লেখক বলেছিলেন- এবার বিটিভির আবর্জনাগুলো রঙিন হল! কুড়ি বছর আগে, আমি একটি সাপ্তাহিকীতে নিয়মিত কলাম লিখে যাচ্ছিলাম, একদিন কানাডাফেরত এক পাঠক, তসলিম যার নাম, আমাকে একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁয় খাওয়াতে খাওয়াতে বলেছিলেন- দেশের ময়লা সাফ করার দায়িত্ব নিয়েছেন? কই দেখি ঝাড়ুটা? ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিন, পারবেন না। তাই তো! কীভাবে তা সম্ভব?
চিন্তার ময়লাটা একটু দেখুন। নারীসঙ্গবিলাসী কিংবা নির্বিচার যৌনতায় লিপ্ত যে, সে হচ্ছে দুশ্চরিত্র, দুর্নীতিপরায়ণ নয়! আর আর্থিক কেলেংকারি ঘটিয়ে চলেছে যে, সে দুর্নীতিবাজ; কিন্তু দুশ্চরিত্র নয়। কী বুঝলেন? অর্থাৎ সচ্চরিত্র থেকেও দুর্নীতিবাজ হওয়া যায় এবং দুর্নীতিবাজ হয়েও সচ্চরিত্র থাকা যায়! আরেক ধরনের ময়লার কথা বলি। যারা বেশি বেশি টেলিভিশন দেখেন, তারা বলতে পারবেন আমি ঠিক বলছি, কী বেঠিক। টেলিভিশনের পর্দায় যত ধরনের ময়লা ভেসে বেড়ায়, তার একটি হল শোবিজ তারকাদের নিয়ে টকশো। তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী সবাই তারকা; তবে আলোটা বেরোয় ড্যাজলিং পোশাক থেকে, চিন্তা থেকে নয়। অবশ্য চিন্তা অনেক পরে, কথাটাই কি শুদ্ধ করে বলতে পারে তারা? 'so'-এর পর 'that' বসালে অর্থটা আর সুতরাং থাকে না, যেন অথবা যাতে হয়ে যায়। অথচ নির্বিবাদে তারা বলে যাচ্ছে-so that, আমি এই পেশা বেছে নিয়েছি। skillকে বলছেskillness; কনফিডেন্স না বলে বলছে- এ ব্যাপারে আমার কনফিডেন্ট আছে। একদিন তো থ মেরে গেলাম। বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় অন্তত প্রিলিমিনারি সিলেকশনে টিকে যাবে, এমন এক সুন্দরী বলছে- আমাদের village womansiv এখন অনেক ফ্রিডম। একটা মাত্র বাক্য, কত ভুল! woman-এর বহুবচন women। 's' যোগ করে না হয় প্লুরাল করল; সেক্ষেত্রে iv কেন? একসঙ্গে দুটো প্লুরাল! village-এর জায়গায় যে rural হবে- এই ভুল মাফ করে দেয়া ছাড়া উপায় কী! শেষ হল না। আরে মেয়ে, freedom মানে স্বাধীনতা, স্বাধীন নয়। পরিষ্কার কাপড় পরে এভাবে ময়লাযুক্ত কথা বললে কী আর সুন্দর থাকা যায়! ওই মেয়েটিকে বলতে পারলাম না, স্মার্ট হতে হলে ইংরেজি বলার কিংবা ফ্যাশনদুরস্ত হওয়ার দরকার নেই, মাতৃভাষায় শুদ্ধভাবে কোনো বিষয়ে মতামত দিতে পারলেই স্মার্ট হওয়া যায়। তরুণ-তরুণীরা কথা বলে আর অনবরত হাসে, ভাবে সমগ্র জাতিই বুঝি তাদের কথায় হাসছে। যা নিয়ে হাসে তারা, সেখানে হিউমার তো নেই-ই, বুদ্ধিমত্তাও নেই। তবু হাসে। মাথার ময়লা চাপ দেয়, তারা কী করবে?
রাজনীতির টকশোগুলোর উপযোগিতা কী, বুঝি না। এসব তো চায়ের স্টলেই আলোচিত হয়। ব্যতিক্রম ব্যতিক্রমই, ইংরেজিতে বললে exception justifies the rule- ব্যতিক্রম নিয়মটিকে আরও যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যাংকর কি খেয়াল করেন, একসময় তার সামনে আবর্জনার স্তূপ জমা হয়ে যায়? অশুদ্ধের ছড়াছড়ি- অশুদ্ধ শব্দ, অশুদ্ধ বাক্য, অশুদ্ধ যুক্তি, অশুদ্ধ চিন্তা। জার্মানিতে একসময় বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে পলেমিক্স হতো। এই পলেমিক্স দর্শনশাস্ত্রকে সমৃদ্ধ করেছে, সভ্যতাকে দিয়েছে প্রচুর। এ দেশের রাজনীতি-বিশ্লেষকরা তাদের মতো পলেমিক্স দূরের কথা, রিমিক্স করতেও জানে না। তারপরও টকশোগুলো জনপ্রিয়! ময়লা তো শুধু টকারদের মাথায়ই নেই, লিসেনারদের মাথায়ও আছে।
আমার মেয়েটি খুব cultured অথবা আমার বাবা খুব ব্যক্তিত্ববান- এ দুটি বাক্য শোনার পর খোঁজ নিলে দেখা যাবে, মেয়েটি শুধু হারমোনিয়াম বাজাতে জানে আর সেই বাবা কম কথা বলেন, গম্ভীর। হারমোনিয়াম ও গাম্ভীর্য যে যথাক্রমে সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্বের খুব নগণ্য কম্পোনেন্ট, এটা কথকদ্বয়কে বোঝাবে কে? কথা ও আচরণের শিল্প এবং জীবনসংগ্রামের গড় প্রকাশই হচ্ছে একজনের সংস্কৃতি। আর ব্যক্তিত্ববান? এমন কথা বলেন না, মানুষে কয় ঝুট; এমন জায়গায় বসেন না, কেউ কয় উঠ্। এবং আরও, তিনি ভালো ও মন্দের প্রভেদ করে ভালোর পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে থাকেন।
চিন্তার ময়লা কোথায় নেই? একদিন আড্ডায় এক অনুজপ্রতিম জিজ্ঞেস করেছিল- আপনি ঈর্ষা করেন কাকে? বললাম- নেইল আর্মস্ট্রং ও কার্লো পন্টিকে (তখন সোফিয়া লরেনে আসক্ত আমি)। সে এরপর বলল- করুণা? বলেছিলাম- করি, মাদ্রাসার ছাত্রকে। খুব মায়া হয় এদের জন্য। আমাদেরই সন্তান, অথচ ফ্যাশন বলতে পাঞ্জাবির বোতামটা ভালো হওয়া চাই, সেই পাঞ্জাবিতে পারফিউমের বদলে আতর। কেন এই দুর্দশার মধ্যে ফেলা হয়েছে তাদের? আমরা যারা মাদ্রাসা শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করি, তারা কি নিজেদের সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠাই? গোলাম আযমের কোন্ ছেলে অথবা মেয়েটি মাদ্রাসায় পড়েছে? এই চালাকি কি আমরা বুঝি না? এটা এক ধরনের ম্যানিপুলেশন, যা শেয়ারবাজার ম্যানিপুলেশনের চেয়েও মারাত্মক। পরিকল্পিতভাবে মানবগোষ্ঠীর একটি নির্দোষ অংশকে পরজীবী, কুয়োর ব্যাঙ, অনুৎপাদনশীল শ্রেণীতে পরিণত করা হচ্ছে না শুধু, সভ্যতাবিরোধী মারণাস্ত্র (মাদ্রাসা ছাত্রদের অনেকেই জঙ্গি হয়ে উঠছে) হিসেবেও তৈরি করা হচ্ছে তাদের। যার পক্ষে অমর্ত্য সেন কিংবা স্টিফেন হকিং হতে পারাটা বিচিত্র কিছু ছিল না, সে কি-না মিলাদ পড়িয়ে নিচ্ছে ১০০ টাকা! জ্ঞানের বিস্তার যে কতটা বিস্তারিত হতে পারে, এরা ভাবতেও পারে না; লাদেনের (বর্তমানে আইএস) ভিডিও বার্তাই তাদের কাছে আলটিমেট নলেজ! অন্যকিছু ভাববে কীভাবে? মাথা ময়লার কারণে আঁটো হয়ে আছে না? কেন এমনটা করছি আমরা? বুদ্ধিমান সন্তানটিকে পাঠাচ্ছি ইংলিশ মিডিয়ামে আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধীকে মাদ্রাসায়। প্রতিবন্ধী সন্তানের মাথাটা যাতে খোলে, সেজন্য দরকার ছিল আধুনিক শিক্ষার, অথচ তা না করে সেই মাথা করে তুলছি আরও অকার্যকর। কোনোই মায়া নেই তার জন্য? গ্রামের বালিকাটি বিয়ের পর পরের ঘরে চলে যাবে বলে সে-ও যেতে পারবে না স্কুলে? যাবে মাদ্রাসায়? বড় জমাটবাঁধা মাথার এই ময়লা।
এবার রাজনীতিক। রাজনীতি বোধকরি এমন এক কর্ম যে, যতই তুমি নির্মল করো প্রার্থনা করি না কেন, মলিন মর্ম থেকে পরিত্রাণ নেই। রাজীব গান্ধী মি. ক্লিন উপাধি পেয়েছিলেন। পরে দেখা গেল, তার শার্টের নিচে ছিল বোফর্সের কলংকমাখা মলিন গেঞ্জি। রাজনীতি কেম্ব্রিজ-শিক্ষিত রাজীবকে দূষিত করেছে; ওদিকে দেখুন অক্সফোর্ড-শিক্ষিত ইমরান খান কীভাবে গায়ে ময়লা মেখেছেন। একদা আধুনিক এই গ্ল্যামার বয় এখন আগাপাশতলা অনাধুনিক। তার পরনে কাবুলি পোশাক, হাতে চোঙা, মুখে ধর্মীয় রাজনীতি। আজানুলম্বিত তার ওই কাবুলি পাঞ্জাবি যতই শুভ্র, ফিনফিনে দেখাক, ওটা আসলে ময়লাযুক্ত ত্যানা।
পাঠক হয়তো এতক্ষণে ভাবা শুরু করেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিক থাকতে পাক-ভারত নিয়ে টানাটানি কেন? আসলে এদের নিয়ে কিছু লেখার নেই। কয়লা ধুলে ময়লা যায় না- এই প্রবাদটির অর্থ বুঝি না আমি। পরিষ্কার কোনো কিছুর সঙ্গে লেগে থাকলেই না সেটা ময়লা! কয়লার আবার ময়লা কী!
পুনশ্চঃ এ লেখায় চরিত্রহীন শব্দটি ব্যবহার না করে লিখেছি দুশ্চরিত্র। চরিত্রহীন সহজপ্রবেশ্য শব্দ, তারপরও দুশ্চরিত্র কেন লিখলাম, তার কারণ আছে নিশ্চয়ই।
স্কুল জীবনের শেষ দিকে ধুন্ধুমার শরৎ পড়ছি। চরিত্রহীন উপন্যাসটি হাতে পাওয়ার পর খটকা লাগল। চরিত্র মানে ধর্ম, স্বভাব অথবা বৈশিষ্ট্য। তাই যদি হয়, তাহলে জড় অথবা জীব- চরিত্রহীন বলে আছে নাকি কিছু কোথাও? অভিধান খুললাম, সেখানে চরিত্রহীন-এর অর্থ দেয়া আছে লম্পট। ছুঁড়ে মারলাম অভিধান। প্রথমত, এমন একটি শব্দ থাকবে কেন অভিধানে? থাকলেও তার অর্থ হতে হবে- যার চরিত্র নেই। কে জানে, অবস্তুগত কোনো ধারণা (concept) চরিত্রহীন হয় যদি। কিন্তু সতত ক্রিয়াশীল একটি লিভিং বডি- মানুষ, তার কোনো ধর্ম নেই, স্বভাব নেই, চরিত্র নেই! ভাবলাম, শরৎ বাবু নিশ্চয়ই চরিত্রহীন বলতে দুশ্চরিত্র বুঝিয়েছেন। উপন্যাস শেষ করে দেখলাম, আমার ধারণাই ঠিক।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
বাংলাদেশের বস্তুজগতের ময়লা তো কহতব্য নয়। রুমাল ছাড়া পথ হাঁটাই মুশকিল। একটা চমৎকার দেয়ালের দিকে তাকাব, দেখব সেখানেও কেউ একজন চুন মেখে রেখেছে। ইউরোপ-আমেরিকায় যাওয়ার দরকার নেই, এশিয়ার সিঙ্গাপুরের রাস্তায়ই এক টুকরো পরিষ্কার কাগজও পাওয়া যাবে না, ঢাকার রাস্তায় ময়লাযুক্ত কাগজগুলো টোকালে সেগুলো দিয়ে এক হাজার হাতির শরীর মোড়ানো সম্ভব। থাকগে, বস্তুজগতের ময়লা নিয়ে পরিবেশবাদীরা ভাবুন, আমরা কথা বলব মনোজগতের আবর্জনা নিয়ে।
প্রকৃতপক্ষে, আমরা সবাই নানা রঙের মনোজাগতিক ময়লার মধ্যেই বাস করছি- কালো, ধূসর, এমনকি রঙিনও। গত শতাব্দীর আশির দশকে কালারড টেলিভিশনের সূচনা হয়েছিল যখন, এক বিদগ্ধ লেখক বলেছিলেন- এবার বিটিভির আবর্জনাগুলো রঙিন হল! কুড়ি বছর আগে, আমি একটি সাপ্তাহিকীতে নিয়মিত কলাম লিখে যাচ্ছিলাম, একদিন কানাডাফেরত এক পাঠক, তসলিম যার নাম, আমাকে একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁয় খাওয়াতে খাওয়াতে বলেছিলেন- দেশের ময়লা সাফ করার দায়িত্ব নিয়েছেন? কই দেখি ঝাড়ুটা? ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিন, পারবেন না। তাই তো! কীভাবে তা সম্ভব?
চিন্তার ময়লাটা একটু দেখুন। নারীসঙ্গবিলাসী কিংবা নির্বিচার যৌনতায় লিপ্ত যে, সে হচ্ছে দুশ্চরিত্র, দুর্নীতিপরায়ণ নয়! আর আর্থিক কেলেংকারি ঘটিয়ে চলেছে যে, সে দুর্নীতিবাজ; কিন্তু দুশ্চরিত্র নয়। কী বুঝলেন? অর্থাৎ সচ্চরিত্র থেকেও দুর্নীতিবাজ হওয়া যায় এবং দুর্নীতিবাজ হয়েও সচ্চরিত্র থাকা যায়! আরেক ধরনের ময়লার কথা বলি। যারা বেশি বেশি টেলিভিশন দেখেন, তারা বলতে পারবেন আমি ঠিক বলছি, কী বেঠিক। টেলিভিশনের পর্দায় যত ধরনের ময়লা ভেসে বেড়ায়, তার একটি হল শোবিজ তারকাদের নিয়ে টকশো। তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী সবাই তারকা; তবে আলোটা বেরোয় ড্যাজলিং পোশাক থেকে, চিন্তা থেকে নয়। অবশ্য চিন্তা অনেক পরে, কথাটাই কি শুদ্ধ করে বলতে পারে তারা? 'so'-এর পর 'that' বসালে অর্থটা আর সুতরাং থাকে না, যেন অথবা যাতে হয়ে যায়। অথচ নির্বিবাদে তারা বলে যাচ্ছে-so that, আমি এই পেশা বেছে নিয়েছি। skillকে বলছেskillness; কনফিডেন্স না বলে বলছে- এ ব্যাপারে আমার কনফিডেন্ট আছে। একদিন তো থ মেরে গেলাম। বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় অন্তত প্রিলিমিনারি সিলেকশনে টিকে যাবে, এমন এক সুন্দরী বলছে- আমাদের village womansiv এখন অনেক ফ্রিডম। একটা মাত্র বাক্য, কত ভুল! woman-এর বহুবচন women। 's' যোগ করে না হয় প্লুরাল করল; সেক্ষেত্রে iv কেন? একসঙ্গে দুটো প্লুরাল! village-এর জায়গায় যে rural হবে- এই ভুল মাফ করে দেয়া ছাড়া উপায় কী! শেষ হল না। আরে মেয়ে, freedom মানে স্বাধীনতা, স্বাধীন নয়। পরিষ্কার কাপড় পরে এভাবে ময়লাযুক্ত কথা বললে কী আর সুন্দর থাকা যায়! ওই মেয়েটিকে বলতে পারলাম না, স্মার্ট হতে হলে ইংরেজি বলার কিংবা ফ্যাশনদুরস্ত হওয়ার দরকার নেই, মাতৃভাষায় শুদ্ধভাবে কোনো বিষয়ে মতামত দিতে পারলেই স্মার্ট হওয়া যায়। তরুণ-তরুণীরা কথা বলে আর অনবরত হাসে, ভাবে সমগ্র জাতিই বুঝি তাদের কথায় হাসছে। যা নিয়ে হাসে তারা, সেখানে হিউমার তো নেই-ই, বুদ্ধিমত্তাও নেই। তবু হাসে। মাথার ময়লা চাপ দেয়, তারা কী করবে?
রাজনীতির টকশোগুলোর উপযোগিতা কী, বুঝি না। এসব তো চায়ের স্টলেই আলোচিত হয়। ব্যতিক্রম ব্যতিক্রমই, ইংরেজিতে বললে exception justifies the rule- ব্যতিক্রম নিয়মটিকে আরও যুক্তিগ্রাহ্য করে তোলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যাংকর কি খেয়াল করেন, একসময় তার সামনে আবর্জনার স্তূপ জমা হয়ে যায়? অশুদ্ধের ছড়াছড়ি- অশুদ্ধ শব্দ, অশুদ্ধ বাক্য, অশুদ্ধ যুক্তি, অশুদ্ধ চিন্তা। জার্মানিতে একসময় বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে পলেমিক্স হতো। এই পলেমিক্স দর্শনশাস্ত্রকে সমৃদ্ধ করেছে, সভ্যতাকে দিয়েছে প্রচুর। এ দেশের রাজনীতি-বিশ্লেষকরা তাদের মতো পলেমিক্স দূরের কথা, রিমিক্স করতেও জানে না। তারপরও টকশোগুলো জনপ্রিয়! ময়লা তো শুধু টকারদের মাথায়ই নেই, লিসেনারদের মাথায়ও আছে।
আমার মেয়েটি খুব cultured অথবা আমার বাবা খুব ব্যক্তিত্ববান- এ দুটি বাক্য শোনার পর খোঁজ নিলে দেখা যাবে, মেয়েটি শুধু হারমোনিয়াম বাজাতে জানে আর সেই বাবা কম কথা বলেন, গম্ভীর। হারমোনিয়াম ও গাম্ভীর্য যে যথাক্রমে সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্বের খুব নগণ্য কম্পোনেন্ট, এটা কথকদ্বয়কে বোঝাবে কে? কথা ও আচরণের শিল্প এবং জীবনসংগ্রামের গড় প্রকাশই হচ্ছে একজনের সংস্কৃতি। আর ব্যক্তিত্ববান? এমন কথা বলেন না, মানুষে কয় ঝুট; এমন জায়গায় বসেন না, কেউ কয় উঠ্। এবং আরও, তিনি ভালো ও মন্দের প্রভেদ করে ভালোর পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে থাকেন।
চিন্তার ময়লা কোথায় নেই? একদিন আড্ডায় এক অনুজপ্রতিম জিজ্ঞেস করেছিল- আপনি ঈর্ষা করেন কাকে? বললাম- নেইল আর্মস্ট্রং ও কার্লো পন্টিকে (তখন সোফিয়া লরেনে আসক্ত আমি)। সে এরপর বলল- করুণা? বলেছিলাম- করি, মাদ্রাসার ছাত্রকে। খুব মায়া হয় এদের জন্য। আমাদেরই সন্তান, অথচ ফ্যাশন বলতে পাঞ্জাবির বোতামটা ভালো হওয়া চাই, সেই পাঞ্জাবিতে পারফিউমের বদলে আতর। কেন এই দুর্দশার মধ্যে ফেলা হয়েছে তাদের? আমরা যারা মাদ্রাসা শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করি, তারা কি নিজেদের সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠাই? গোলাম আযমের কোন্ ছেলে অথবা মেয়েটি মাদ্রাসায় পড়েছে? এই চালাকি কি আমরা বুঝি না? এটা এক ধরনের ম্যানিপুলেশন, যা শেয়ারবাজার ম্যানিপুলেশনের চেয়েও মারাত্মক। পরিকল্পিতভাবে মানবগোষ্ঠীর একটি নির্দোষ অংশকে পরজীবী, কুয়োর ব্যাঙ, অনুৎপাদনশীল শ্রেণীতে পরিণত করা হচ্ছে না শুধু, সভ্যতাবিরোধী মারণাস্ত্র (মাদ্রাসা ছাত্রদের অনেকেই জঙ্গি হয়ে উঠছে) হিসেবেও তৈরি করা হচ্ছে তাদের। যার পক্ষে অমর্ত্য সেন কিংবা স্টিফেন হকিং হতে পারাটা বিচিত্র কিছু ছিল না, সে কি-না মিলাদ পড়িয়ে নিচ্ছে ১০০ টাকা! জ্ঞানের বিস্তার যে কতটা বিস্তারিত হতে পারে, এরা ভাবতেও পারে না; লাদেনের (বর্তমানে আইএস) ভিডিও বার্তাই তাদের কাছে আলটিমেট নলেজ! অন্যকিছু ভাববে কীভাবে? মাথা ময়লার কারণে আঁটো হয়ে আছে না? কেন এমনটা করছি আমরা? বুদ্ধিমান সন্তানটিকে পাঠাচ্ছি ইংলিশ মিডিয়ামে আর বুদ্ধি প্রতিবন্ধীকে মাদ্রাসায়। প্রতিবন্ধী সন্তানের মাথাটা যাতে খোলে, সেজন্য দরকার ছিল আধুনিক শিক্ষার, অথচ তা না করে সেই মাথা করে তুলছি আরও অকার্যকর। কোনোই মায়া নেই তার জন্য? গ্রামের বালিকাটি বিয়ের পর পরের ঘরে চলে যাবে বলে সে-ও যেতে পারবে না স্কুলে? যাবে মাদ্রাসায়? বড় জমাটবাঁধা মাথার এই ময়লা।
এবার রাজনীতিক। রাজনীতি বোধকরি এমন এক কর্ম যে, যতই তুমি নির্মল করো প্রার্থনা করি না কেন, মলিন মর্ম থেকে পরিত্রাণ নেই। রাজীব গান্ধী মি. ক্লিন উপাধি পেয়েছিলেন। পরে দেখা গেল, তার শার্টের নিচে ছিল বোফর্সের কলংকমাখা মলিন গেঞ্জি। রাজনীতি কেম্ব্রিজ-শিক্ষিত রাজীবকে দূষিত করেছে; ওদিকে দেখুন অক্সফোর্ড-শিক্ষিত ইমরান খান কীভাবে গায়ে ময়লা মেখেছেন। একদা আধুনিক এই গ্ল্যামার বয় এখন আগাপাশতলা অনাধুনিক। তার পরনে কাবুলি পোশাক, হাতে চোঙা, মুখে ধর্মীয় রাজনীতি। আজানুলম্বিত তার ওই কাবুলি পাঞ্জাবি যতই শুভ্র, ফিনফিনে দেখাক, ওটা আসলে ময়লাযুক্ত ত্যানা।
পাঠক হয়তো এতক্ষণে ভাবা শুরু করেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিক থাকতে পাক-ভারত নিয়ে টানাটানি কেন? আসলে এদের নিয়ে কিছু লেখার নেই। কয়লা ধুলে ময়লা যায় না- এই প্রবাদটির অর্থ বুঝি না আমি। পরিষ্কার কোনো কিছুর সঙ্গে লেগে থাকলেই না সেটা ময়লা! কয়লার আবার ময়লা কী!
পুনশ্চঃ এ লেখায় চরিত্রহীন শব্দটি ব্যবহার না করে লিখেছি দুশ্চরিত্র। চরিত্রহীন সহজপ্রবেশ্য শব্দ, তারপরও দুশ্চরিত্র কেন লিখলাম, তার কারণ আছে নিশ্চয়ই।
স্কুল জীবনের শেষ দিকে ধুন্ধুমার শরৎ পড়ছি। চরিত্রহীন উপন্যাসটি হাতে পাওয়ার পর খটকা লাগল। চরিত্র মানে ধর্ম, স্বভাব অথবা বৈশিষ্ট্য। তাই যদি হয়, তাহলে জড় অথবা জীব- চরিত্রহীন বলে আছে নাকি কিছু কোথাও? অভিধান খুললাম, সেখানে চরিত্রহীন-এর অর্থ দেয়া আছে লম্পট। ছুঁড়ে মারলাম অভিধান। প্রথমত, এমন একটি শব্দ থাকবে কেন অভিধানে? থাকলেও তার অর্থ হতে হবে- যার চরিত্র নেই। কে জানে, অবস্তুগত কোনো ধারণা (concept) চরিত্রহীন হয় যদি। কিন্তু সতত ক্রিয়াশীল একটি লিভিং বডি- মানুষ, তার কোনো ধর্ম নেই, স্বভাব নেই, চরিত্র নেই! ভাবলাম, শরৎ বাবু নিশ্চয়ই চরিত্রহীন বলতে দুশ্চরিত্র বুঝিয়েছেন। উপন্যাস শেষ করে দেখলাম, আমার ধারণাই ঠিক।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
Monday, November 10, 2014
নূর হোসেন অনন্ত প্রেরণার উৎস by মাহমদুর রহমান মান্না
১০ নভেম্বর নূর হোসেনকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। বর্তমান সময়ে নূর হোসেনকে স্মরণ করার প্রয়োজন এ কারণে যে, সম্ভবত তিনি বাংলাদেশের আন্দোলনগুলোর মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি, যিনি জেনে-বুঝে বুকে পিঠে ফুলকি এঁকে বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দুর্বিনীত নূর হোসেন বলেছিলন, দরকার লাগলে জান দিয়া দিমু। ধরে নেয়াই যায়- জীবন চলে যেতে পারে জেনেই তিনি রাজপথের লড়াইয়ে নেমেছিলেন।
আন্দোলনে রক্ত-ঘাম ঝরানো নির্যাতন সহ্য করা, জেল খাটা, এমনকি জীবন দেয়ার ঘটনা তো আছেই। কিন্তু সেসব ঘটনা পরম্পরায় নিশ্চিত বন্দিত্ব জেনে, মৃত্যুকে দেখে সাধারণ কেউ পা বাড়ায় না। নূর হোসেন সেদিক দিয়ে সবার থেকে আলাদা। এ দুর্বিনীত সাহসের আজ খুবই প্রয়োজন। নূর হোসেনের মৃত্যু দিবসে আজ এ ভাবনাই সবচেয়ে আগে আসে। আশির দশকের আন্দোলনের পরে আরও অনেকেই জীবন দিয়েছেন। এরশাদের আধিপত্যের পতন হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্র কি মুক্তি পেয়েছে? এ বছরের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে যে প্রহসন হয়েছে, তাতে একথাই বরং বলতে হবে যে, নির্বাচন এখন এরশাদের আমলের নির্বাচনের চেয়েও বড় প্রহসনে পরিণত হয়েছে। এমন একপক্ষীয় ভোটারহীন নির্বাচন একবার খালেদা জিয়াও করেছিলেন। এবার শেখ হাসিনাও করলেন। কবরের নিচে নূর হোসেন সম্ভবত এখন পাশ ফিরে কিংবা উপুড় হয়ে কাঁদতে শুরু করেছেন- হায়রে এজন্যই কী জীবনটা দিলাম! তখন তো চক্ষুলজ্জা বলে একটা জিনিস ছিল, এখন তাও চলে গেছে। স্বনির্বাচিত এ সরকার এখন দম্ভ করে বলছে- নির্বাচন যেমনই হোক, আমরা তো সংবিধানের বাইরে কিছু করিনি। আমাদের অবৈধ তো বলা যাবে না। সারা বিশ্ব এখন আমাদের মেনে নিয়েছে। জনসমর্থনহীন এ সরকার এখন পুলিশ আর র্যাবের ওপর নির্ভর করে দেশ চালাচ্ছে। দুটো দলের বিরুদ্ধেই এখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ঘুষ, দুর্নীতিসহ অজস্র অভিযাগ। পুলিশ তো এখন জনগণকে সভা করতে দেয়া না দেয়ার মালিক হয়ে গেছে। তারাই এখন মাইক ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার মালিক হয়ে বিরোধী দলের কণ্ঠ চেপে ধরছে। সরকারের সমালোচনাকারীরা সরকারের সমালোচনা করার জন্য ঢাকা মহানগরের কোথাও মাইক ব্যবহারের অনুমতি পাচ্ছেন না। যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না সেখানে গণতন্ত্র থাকে না। সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের গণতন্ত্র আওয়ামী জোটের ক্ষমতার বালাখানায় বন্দি, নূর হোসেনসহ শহীদরা এখন বিকট শব্দে ঠা ঠা করে হাসছে।
আজকের এই দিনে ভাষা আন্দোলনের নেতা আবদুল মতিনকেও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। ভারত বিভক্তির এক বছরের মাথায় মুসলিম জাতীয়তাবাদের জোয়ারে প্লাবিত, সিক্ত, প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সামনে দাঁড়িয়ে আবদুল মতিন উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা- এ বক্তব্যের প্রতিবাদে না বলেছিলেন। এ এক অনন্য সাহসিকতার নজির। তখন জিন্নাহর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। মুসলিম লীগের কাছাকাছি জনপ্রিয় কোনো দলই ছিল না। জিন্নাহর সামনে দাঁড়িয়ে যে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে, তা ভাবাই অসম্ভব ছিল। ভাষা মতিন তাই করেছিলেন। সেই সাহস শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন তৈরি করেছিল। কোনো ইতিহাস রচিত হয় যখন, তখন সমসাময়িকতা তা ধরতে পারে না। সময়ে তা ফুটে ওঠে। ১৯৪৮-এ মতিন এত বড় ছিলেন না। ১৯৫২-তে কিংবা ১৯৭১-এও নয়। কিন্তু আজ আবদুল মতিন আমাদের কাছে একটি আইকন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস ও শক্তি আমরা তার কাছে পাই। এখনও নূর হোসেনকে আমরা পাদপ্রদীপের আলোয় আনিনি। কারণ আমরা যারা এরপর থেকে ক্ষমতায় ছিলাম- আওয়ামী লীগ বা বিএনপি- কেউই তিন জোটের রূপরেখার প্রতি সম্মান জানাইনি। দেশে এখন স্বেচ্ছাচার চলছে- আগামীতে যে গণতন্ত্রের আন্দোলন হবে, তাতে নূর হোসেন বারে বারে ফিরে আসবে।
মাহমুদুর রহমান মান্না : আহ্বায়ক, নাগরিক ঐক্য
আন্দোলনে রক্ত-ঘাম ঝরানো নির্যাতন সহ্য করা, জেল খাটা, এমনকি জীবন দেয়ার ঘটনা তো আছেই। কিন্তু সেসব ঘটনা পরম্পরায় নিশ্চিত বন্দিত্ব জেনে, মৃত্যুকে দেখে সাধারণ কেউ পা বাড়ায় না। নূর হোসেন সেদিক দিয়ে সবার থেকে আলাদা। এ দুর্বিনীত সাহসের আজ খুবই প্রয়োজন। নূর হোসেনের মৃত্যু দিবসে আজ এ ভাবনাই সবচেয়ে আগে আসে। আশির দশকের আন্দোলনের পরে আরও অনেকেই জীবন দিয়েছেন। এরশাদের আধিপত্যের পতন হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্র কি মুক্তি পেয়েছে? এ বছরের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের নামে যে প্রহসন হয়েছে, তাতে একথাই বরং বলতে হবে যে, নির্বাচন এখন এরশাদের আমলের নির্বাচনের চেয়েও বড় প্রহসনে পরিণত হয়েছে। এমন একপক্ষীয় ভোটারহীন নির্বাচন একবার খালেদা জিয়াও করেছিলেন। এবার শেখ হাসিনাও করলেন। কবরের নিচে নূর হোসেন সম্ভবত এখন পাশ ফিরে কিংবা উপুড় হয়ে কাঁদতে শুরু করেছেন- হায়রে এজন্যই কী জীবনটা দিলাম! তখন তো চক্ষুলজ্জা বলে একটা জিনিস ছিল, এখন তাও চলে গেছে। স্বনির্বাচিত এ সরকার এখন দম্ভ করে বলছে- নির্বাচন যেমনই হোক, আমরা তো সংবিধানের বাইরে কিছু করিনি। আমাদের অবৈধ তো বলা যাবে না। সারা বিশ্ব এখন আমাদের মেনে নিয়েছে। জনসমর্থনহীন এ সরকার এখন পুলিশ আর র্যাবের ওপর নির্ভর করে দেশ চালাচ্ছে। দুটো দলের বিরুদ্ধেই এখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ঘুষ, দুর্নীতিসহ অজস্র অভিযাগ। পুলিশ তো এখন জনগণকে সভা করতে দেয়া না দেয়ার মালিক হয়ে গেছে। তারাই এখন মাইক ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার মালিক হয়ে বিরোধী দলের কণ্ঠ চেপে ধরছে। সরকারের সমালোচনাকারীরা সরকারের সমালোচনা করার জন্য ঢাকা মহানগরের কোথাও মাইক ব্যবহারের অনুমতি পাচ্ছেন না। যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না সেখানে গণতন্ত্র থাকে না। সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের গণতন্ত্র আওয়ামী জোটের ক্ষমতার বালাখানায় বন্দি, নূর হোসেনসহ শহীদরা এখন বিকট শব্দে ঠা ঠা করে হাসছে।
আজকের এই দিনে ভাষা আন্দোলনের নেতা আবদুল মতিনকেও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। ভারত বিভক্তির এক বছরের মাথায় মুসলিম জাতীয়তাবাদের জোয়ারে প্লাবিত, সিক্ত, প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সামনে দাঁড়িয়ে আবদুল মতিন উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা- এ বক্তব্যের প্রতিবাদে না বলেছিলেন। এ এক অনন্য সাহসিকতার নজির। তখন জিন্নাহর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। মুসলিম লীগের কাছাকাছি জনপ্রিয় কোনো দলই ছিল না। জিন্নাহর সামনে দাঁড়িয়ে যে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে, তা ভাবাই অসম্ভব ছিল। ভাষা মতিন তাই করেছিলেন। সেই সাহস শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন তৈরি করেছিল। কোনো ইতিহাস রচিত হয় যখন, তখন সমসাময়িকতা তা ধরতে পারে না। সময়ে তা ফুটে ওঠে। ১৯৪৮-এ মতিন এত বড় ছিলেন না। ১৯৫২-তে কিংবা ১৯৭১-এও নয়। কিন্তু আজ আবদুল মতিন আমাদের কাছে একটি আইকন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস ও শক্তি আমরা তার কাছে পাই। এখনও নূর হোসেনকে আমরা পাদপ্রদীপের আলোয় আনিনি। কারণ আমরা যারা এরপর থেকে ক্ষমতায় ছিলাম- আওয়ামী লীগ বা বিএনপি- কেউই তিন জোটের রূপরেখার প্রতি সম্মান জানাইনি। দেশে এখন স্বেচ্ছাচার চলছে- আগামীতে যে গণতন্ত্রের আন্দোলন হবে, তাতে নূর হোসেন বারে বারে ফিরে আসবে।
মাহমুদুর রহমান মান্না : আহ্বায়ক, নাগরিক ঐক্য
নূর হোসেনের রক্তের ঋণ শোধ হয়নি by মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
বাঙালি জাতির সাম্প্রতিক ইতিহাসে দুটি বীরত্বপূর্ণ অর্জন লিপিবদ্ধ রয়েছে। এর একটি হল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়া আর দ্বিতীয়টি হল নব্বইয়ের ঐতিহাসিক বিজয়। ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়েছে। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, শহীদ নূর হোসেন তাদের প্রতীক হয়ে আছেন। বহু মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও দুর্ভাগ্যজনক হল আমরা আমাদের অর্জনগুলো ধরে রাখতে পারিনি। দেশে আজ চলছে দুই জোটের আধিপত্যের রাজনীতি। এক জোটের সঙ্গে স্থান করে নিয়েছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি রাজাকার বাহিনী। অপর জোটে স্থান পেয়েছে নব্বইয়ের পরাজিত শক্তি। দেশে আজ স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন খণ্ডিত, তেমনি গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক চেতনা পদদলিত। চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি আজ ভূলুণ্ঠিত ও বহুলাংশে পরিত্যক্ত। এ থেকে এটাই স্পষ্ট, জনগণের মুক্তির সংগ্রাম আজও শেষ হয়নি।
নূর হোসেন, আমিনুল হুদা টিটুসহ যারা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রক্তদান করেছেন, তাদের আত্মদানকে সার্থক করতে সংগ্রামের অসমাপ্ত পর্ব সম্পন্ন করাই আমাদের ঐতিহাসিক কর্তব্য। এই কর্তব্য পালনে আমাদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
নূর হোসেন, আমিনুল হুদা টিটুসহ যারা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রক্তদান করেছেন, তাদের আত্মদানকে সার্থক করতে সংগ্রামের অসমাপ্ত পর্ব সম্পন্ন করাই আমাদের ঐতিহাসিক কর্তব্য। এই কর্তব্য পালনে আমাদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
টেকসই উন্নয়ন ও বাংলাদেশ by সালমা ইসলাম
প্রলম্বিত বিশ্বমন্দা সব ধরনের উন্নয়ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এখন সব দেশেই উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার জন্য বাড়তি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলো বর্তমানে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে চলেছে- সেসব বিষয়ে নতুন কোনো সুখবর নেই। গতানুগতিক মানের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে দ্রুত এগিয়ে যেতে হলে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যখন নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উন্মুখ হয় তখন উন্নয়নের গতিতে কাক্সিক্ষত মাত্রা আসে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ের অভাব হলে উন্নয়নের গতি মুখ থুবড়ে পড়ে। উন্নয়ন বিষয়ক উল্লিখিত শর্ত পূরণের পাশাপাশি আরও বহুসংখ্যক শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করা সম্ভব না হলে টেকসই উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উন্নত দেশগুলোতে অনেক আগে যাত্রা শুরু হলেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছা কত কঠিন- সাম্প্র্রতিক বিশ্বমন্দার সময় তা স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশে দেশে এত গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করার পরও মন্দা পরিস্থিতি এমন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ থেকে মোটামুটিভাবে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হল, আগামীতেও সব দেশের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া বিশ্বমন্দা সফলভাবে মোকাবেলা করা অত্যন্ত কঠিন হবে এবং সব দেশের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিটি দেশকে আলাদাভাবেও সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
যে কোনো দেশের উন্নয়নে দেশটির বিভিন্ন সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো অনেক দেশেই খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের স্বল্পতা সত্ত্বেও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ও জনগণের প্রচেষ্টায় উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। পৃথিবীতে খনিজ ও বেশিরভাগ প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদ সীমিত। একমাত্র মানুষের কর্মদক্ষতাই অসীম। অর্থাৎ মানুষের সব সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হলে দেশের উন্নয়নে বিশেষ গতি আসবে, যা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিশেষভাবে সহায়তা করবে। আগামী দিনের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিদেশী বিনোয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বর্তমানে যে প্রতিযোগিতা চলছে এ অবস্থায় সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের বিষয়টি কী প্রভাব ফেলবে তা বিবেচনায় নিয়ে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে যে হারে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে এ ধারা অব্যাহত থাকলে ১০০ বছর পর পৃথিবীতে জ্বালানির কী সংকট দেখা দেবে- আইপিসিসির (The intergovernmental panel on climate change) পক্ষ থেকে এ বিষয়েও ইতিমধ্যে সতর্ক করা হয়েছে। কাজেই উল্লিখিত সংকট তীব্র আকার ধারণ করার আগেই আগাম সতর্কতামূলক বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ ১০০ বছর পর যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে না হয় সেজন্য বিকল্প জ্বালানির প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। কেবল উচ্চতর গবেষণা অব্যাহত থাকলেই এ বিষয়ে সম্ভাব্য সুখবর মিলতে পারে। অন্যথায় ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে। ১০০ বছর পর জীবাশ্ম জ্বালানির মজুদ না ফুরালেও গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা
না হলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই
বিশ্ববাসীকে দূষণবিষয়ক কী ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে বিজ্ঞানীরা তা ইতিমধ্যে বিস্তারিতভাবে ব্যাখা করেছেন- যা মিডিয়ায় বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
দুই.
আমাদের দেশের উন্নয়নের প্রধান বাধাগুলোর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। যানজট, স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ না পাওয়া, জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরতা, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার- এ রকম অনেক কারণে বিনিয়োগকারীরা ক্রমশ আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। দেশে বিনিয়োগ না বাড়লে নিত্যপণ্যের চহিদা মেটানোর জন্যও আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। কেবল ভয়াবহ যানজট সমস্যার কারণে বছরে হাজার কোটি টাকার তেল নষ্ট হয়। যানজটের কারণে সারা দেশের মানুষের যে কর্ম-ঘণ্টা জীবন থেকে হারিয়ে যায়- এ ক্ষতি পূরণের উপায় কী? রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে গণপরিবহনের সংখ্যা না বাড়ালে যানজট কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে- এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বহুবার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরমুখী মানুষের স্রোত বন্ধ না হলে আগামীতে আরও বহুমুখী সংকট দেখা দেবে। মানুষ যাতে মূল শহরের বাইরে বিভিন্ন জায়গা থেকে অল্প সময়ে শহরে নিজ কর্মস্থলে এসে পৌঁছাতে পারে তা নিশ্চিত করা হলে অনেকেই শহরের বাইরে বিভিন্ন এলাকায় থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। কারণ মূল শহরে বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় কেবল বাড়িভাড়ায়। গ্রামীণ জনপদে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না বাড়ালে মানুষের শহরমুখী স্রোত কমবে না।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল সব দেশের উন্নয়নের অন্যতম বাধা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিভিন্ন দেশ নানা মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উন্নত দেশগুলো যত সহজে অল্প সময়ে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে তা সম্ভব হয় না। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে তা বিশ্বের প্রভাবশালী মিডিয়ায়ও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণের জন্য অনেক আশ্বাস দিলেও বাস্তবে উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্র“তি রক্ষা করছে না। এমনকি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণেও উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। কিয়োটো প্রটোকলে বর্ণিত শর্তগুলো যথাযথভাবে মানলে তা সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যই স্বস্তির বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো। যেহেতু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর সহসা নির্ভরতা কমানোর লক্ষণ স্পষ্ট নয়, কাজেই ধরে নেয়া যায় বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের বর্তমান ধারা আরও কয়েক দশক অব্যাহত থাকবে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিও অব্যাহত থাকবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন শাকসবজির নতুন জাত সময়মতো আবিষ্কার করতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এরকম আনুষঙ্গিক অনেক বিষয় সফলভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে টেকসই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিন.
বাংলাদেশের কৃষি খাতের উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্যের তুলনায় কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেনি। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, কৃষিতে নানাবিধ অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন কারণে কৃষকদের জীবনমানের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মিঠাপানির মাছের বিচরণভূমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়ির পাশের সহজলভ্য মাছ একসময় দরিদ্র মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে বিশেষ অবদান রাখত। মাছের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হতে হতে এখন অবস্থা এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, খাল-বিল দূরের কথা- অনেক নদীও এখন মৎস্যশূন্য। শুধু তাই নয় কোনো কোনো নদীর পানি এতটাই দূষিত হয়েছে যে- ওই পানিতে কোনো জলজ প্রাণীই দেখা যায় না। অনেক দরিদ্র মানুষ বাধ্য হয়ে এই দূষিত পানি ব্যবহার করার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। এই দূষিত পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের ফলে এসব দূষণ কৃষিপণ্যের মাধ্যমে মানবদেহে কী প্রভাব ফেলতে পারে- এ বিষয়ক গবেষণা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পানি দূষণ রোধে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পানি দূষিত হলে জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হয়। জীববৈচিত্র্য নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের
ওপর কী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এ বিষয়ক উচ্চতর গবেষণা অব্যাহত রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে যেভাবে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে এতে আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ কতটা হুমকির মুখে পড়তে পারে এ নিয়ে সচেতন মানুষের উদ্বেগের অন্ত নেই।
চার.
যে কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরিবেশের ওপর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। যেসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিবেশের ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে সেসব প্রকল্প সংকুচিত করে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প সম্প্রসারণে সবাইকে মনোযোগী হতে হবে। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ আমদানি করে তৈরিকৃত পণ্য রফতানি করলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় বটে কিন্তু এতে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়- এ ব্যয় কী করে কমানো যায় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশীয় পণ্য ব্যবহারে মনোযোগী হওয়ার ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। তবে দেশে মানসম্মত পণ্য উৎপাদিত না হলে বিদেশী পণ্যের প্রতি আগ্রহ কমবে না। যেসব শিল্পোদ্যোক্তা ব্যাপক পরিসরে
বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করেন- তারা যাতে তাদের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন এ ব্যাপারে সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
অনেক বেকার তরুণ বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু যে কোনো সময় তারা চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থা কত ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে- মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় আমরা তা লক্ষ্য করেছি। বর্তমানে স্বল্পদক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকরা বিভিন্ন দেশে গিয়ে কোনো না কোনো কর্মে নিযুক্ত হচ্ছে। এ সুযোগ আগামী দিনগুলোতে কী হারে সংকুচিত হবে- তা বিবেচনায় রেখে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক তরুণদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের সুব্যবস্থা করতে হবে। অনেক তরুণ ভিটেমাটি বিক্রি করে নিজের সর্বস্ব দালালের হাতে তুলে দিয়ে যে কোনো মূল্যে বিদেশে যেতে উদগ্রীব হয়ে পড়ে। এসব তরুণের কেউ কেউ বিদেশে গিয়ে অতি অল্প বেতনে চাকরি করতে বাধ্য হয়। আবার অনেকে প্রতারণার শিকার হয়। বর্তমানে সরকারিভাবে বিদেশে জনশক্তি রফতানি হলেও বিপুলসংখ্যক তরুণকে এ প্রক্রিয়ায় উপকৃত হওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষায় যাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে তাদের কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়েই অবৈধ পথে বিদেশ গমনের চেষ্টা করে। এসব তরুণের অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়। তরুণরা যাতে বিভ্রান্ত না হয় এ ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে হবে। অবৈধ পথে বিদেশে গমন করলে তরুণরা অচেনা পরিবেশে সম্ভাব্য কী ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে পারে তা তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। বিভিন্ন দেশে আগামীতে কী ধরনের জনশক্তির চাহিদা বাড়বে এ ব্যাপারে সরকারিভাবে ব্যাপকভিত্তিক গবেষণাকর্ম অব্যাহত রাখতে হবে এবং আগামী দিনের চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। তবে এ ব্যাপারে অতিরিক্ত নির্ভরতা কাম্য নয়। তরুণদের বোঝাতে হবে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে না গিয়ে গবেষক হিসেবে যেতে পারলে অসময়ে কর্মচ্যুত হওয়ার আশংকা কমে এবং একই সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি বাড়ে।
পাঁচ.যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পকে লাভজনক করার জন্য প্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কোনো শিল্পকারখানায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালে হঠাৎ বিপুলসংখ্যক কর্মী সাময়িকভাবে কর্মহীন হওয়ার আশংকা থেকেই যায়। এসব কর্মী পরবর্তী কর্মে যোগদানের আগে অন্তর্বর্তী সময়ে কর্মহীন থাকলে এদের কেউ কেউ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। সাময়িকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া এ ধরনের কর্মীদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আওতায় আনার জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত থাকাও জরুরি।
প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে যে কোনো বয়সী
কর্মীর কর্মদক্ষতার পরিধি বেড়ে যায়। ফলে অতি সহজে একজন কর্মী নিজের ও পরিবারের
অসচ্ছলতা দূর করতে সক্ষম হন। সাময়িক অসচ্ছলতা দূর করার পর নিজের কর্মপরিধির আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে যে কোনো কর্মী যাতে তার সর্বোচ্চ
দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পায়, সেজন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহুমুখী কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে।
টেকসই উন্নয়নের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য বিভিন্ন দেশে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আমাদের দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামনেও তুলে ধরার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে একজন নাগরিকের কাছে স্পষ্ট হবে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিযোগিতার জন্য কী ধরনের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কোনো তরুণ সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখার পরও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেক দেরি হতে পারে যদি শিক্ষা খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেয়া না হয়।
ছয়.
বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় শ্রমনির্ভর শিল্পকারখানায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ ধারা কতদিন অব্যাহত রাখা দরকার, এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। কারণ বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় শ্রমনির্ভর শিল্পকারখানায় বিশেষ গুরুত্বারোপ বেশি দূর এগোনো সম্ভব নয়। উচ্চতর প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকারখানার যুগে প্রবেশের জন্য আমাদের আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। কাজেই আমাদের দ্রুত চলার গতি যাতে অব্যাহত থাকে এ ব্যাপারে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রতিটি দেশেই বিদ্যমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আগামী দিনের চাহিদা পূরণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকে। এসব কর্মসূচির পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিভিন্ন দেশের সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো কতভাবে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, এ বিষয়ে উচ্চতর পর্যায়ে গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে।
সাত.
প্রলম্বিত বিশ্বমন্দার কারণে কম-বেশি প্রায় সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বমন্দার এই ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে এবং এ অঞ্চলের দেশগুলো বাণিজ্য ও অন্যান্য খাতে কতভাবে লাভবান হতে পারে তা খুঁজে বের করতে হবে। দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতাসহ অন্য অভিন্ন সমস্যার সমাধানে এ অঞ্চলের দেশগুলোর যৌথ উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিশেষত স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান সমসাগুলো কত দ্রুত সমাধান করা যায় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
উন্নত দেশগুলো যে কোনো সময় চিকিৎসা খাতে এককভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে পারে, যা এককভাবে বরাদ্দ করা এ অঞ্চলের অনেক দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এ খাতে আগামী দিনের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি না নিলে অর্র্থনীতিতে কী ধস নামতে পারে, সাম্প্রতিক ইবোলা আতংকের মাধ্যমেই তা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে। অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে ইবোলা আতংকের মতো যে কোনো চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। এটা বিবেচনায় নিয়ে যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে হবে। এ অঞ্চলের দেশগুলোর যৌথ উদ্যোগে চিকিৎসাবিষয়ক উচ্চতর গবেষণা শুরু হলে এ অভিজ্ঞতা অন্য অনেক খাতে কাজে লাগানো যাবে, যা এ অঞ্চলের দেশগুলোর সার্বিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করবে।
আট.
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিশ্বে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে। এতে আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা হুমকির মুখে পড়তে পারে তা বিবেচনায় নিয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলো দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়ভাবে উপকৃত হওয়ার যেসব সম্ভাবনা আছে তা কাজে লাগানোর যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে জলবিদ্যুতের ক্ষেত্রে নেপাল, ভুটান, ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রকল্পের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। এ ছাড়া বিনিয়োগ ও বাণিজ্য খাতে এ ধরনের আর কী কী সম্ভাবনা আছে তা খুঁজে সেসব সম্ভাবনা কাজে লাগানোর যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারত দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে উপকৃত হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সেসব সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কী কী উদ্যোগ অব্যাহত রাখা দরকার তা খুঁজে বের করা জরুরি। বিশেষ করে দুদেশের জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্যও বিভিন্ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা দরকার। দারিদ্র্য দূরীকরণে যে কোনো সফল মডেল এ অঞ্চলের সব দেশেরই কাজে লাগবে। তাই দ্রুততম সময়ে পারস্পরিক তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের দেশগুলো যাতে উপকৃত হতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
নয়.
সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক। আমাদের দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ অক্ষুণ্ন না থাকলে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ সংকুচিত করার চিন্তা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কাজেই দেশে যাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। বিভিন্ন খাতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যেসব সুযোগ পাবেন, দেশী বিনিয়োগকারীরা যাতে তা পান, সেটি নিশ্চিত করা না হলে দেশী শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। দ্রুততম সময়ে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণসহ সমুদ্রের বিস্তীর্ণ এলাকার সম্পদ আহরণে ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। কাজটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই আমাদের সমুদ্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য কী কী সম্পদের মজুদ রয়েছে, এ বিষয়ক জরিপটি দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন। সমুদ্রবিষয়ক গবেষণায় ইতিমধ্যে যেসব দেশ ব্যাপক সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গবেষণা শুরু করে দ্রুততম সময়ে যাতে স্বাধীনভাবে গবেষণার সক্ষমতা অর্জন করা যায়, তেমন কর্মসূচি নিতে হবে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্র থেকে বিভিন্ন মূল্যবান সম্পদ আহরণের সক্ষমতা অর্জনের জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
দশ.
আমরা লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সামুদ্রিক ঝড় বয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য আমাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্প্রতি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা এবং তীব্রতা বেড়েই চলেছে। এতে আগামী দিনগুলোতে উপকূলীয় এলাকার জনগণের যে অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে তা মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ভারতের মহাকাশ গবেষণায় সাফল্য আমাদের যেমন আশাবাদী করে একই সঙ্গে দেশটির দরিদ্র মানুষের সংগ্রামের কথা শুনে আমরা উদ্বিগ্ন হই, নেপালের জলবিদ্যুতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ব্যাপক লোডশেডিংয়ে দেশটির উন্নয়নে স্থবিরতা দেখা দেয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তায় নেপালের জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো হলে দেশটি প্রচুর বিদ্যুৎ রফতানিও করতে পারবে। এ অঞ্চলের দেশগুলোকে আগামীতে সম্ভাব্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে এ বিষয়ক গবেষণা অব্যাহত রাখা জরুরি। বিদ্যমান সমস্যা ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে। জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় প্রতিবেশী দেশের প্রয়োজনীয় সহায়তা নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিতে দেরি করলে এ অঞ্চলের যে কোনো দেশে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ব্ল্যাক আউটের মতো বিপর্যয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
যেহেতু এ অঞ্চলের দেশগুলোর জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা প্রায় একই রকম তাই পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উল্লিখিত দেশগুলোর জনগণ কতভাবে লাভবান হতে পারে- তা খুঁজে বের করতে বহুমুখী পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রম কেবল উচ্চতর পর্যায়ের গবেষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রান্তিক জনগণ যাতে সরাসরি উপকৃত হতে পারে, ওই ধরনের প্রকল্পের পরিধি বাড়াতে হবে। এ অঞ্চলের কোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিলে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব অন্য দেশগুলোর ওপরও পড়বে। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে গঠিত বিদ্যমান সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড গতিশীল করার জন্যও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
এগার.
২ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে ব্রিটেনের গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত তিন দশকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪২ কোটি পাখি কমেছে। ২৫টি দেশের ১৪৪ প্রজাতির পাখির ওপর পরিচালিত এক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। কৃষিজমির পরিমাণ দ্রুত বাড়ানোর ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে পাখির খাবার সংকট এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই বিপুলসংখ্যক পাখি কমেছে, এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে। উল্লিখিত তথ্য থেকে এটাও স্পষ্ট হয়, প্রতিকূল পরিবেশে অন্য অনেক প্রাণীর সংখ্যায়ও ব্যাপক তারতম্য ঘটতে পারে। আমাদের চারপাশের পরিবেশ মানুষের বসবাসের জন্য কতটা উপযোগী তা প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন উপকারী প্রাণীর উপস্থিতি থেকেও বোঝা যায়। যেহেতু ইউরোপের দেশগুলোতে ব্যাপক সংখ্যক পাখি কমেছে, তাই উল্লিখিত দেশগুলোর পরিবেশে প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে যথাযথ পর্যবেক্ষণে তা স্পষ্ট হবে। আমাদের এ অঞ্চলেও এ ধরনের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। সামুদ্রিক প্রাণীর ওপরও বিভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। জীববৈচিত্র্যে ব্যাপক পরিবর্তন যে আগামী দিনের কোনো বিপর্যয়ের সম্ভাবনাকে জোরালো করে, এ বিষয়ে গবেষকরা বারবার হুশিয়ার করে দিয়েছেন। কাজেই আমাদের চারপাশের উপকারী প্রাণীর সংখ্যায় কী পরিবর্তন এল সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
পাখিসহ বিভিন্ন উপকারী প্রাণী বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণী ও উপাদান খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কোনো একটি উপকারী প্রাণীর স্বাভাবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়লে পরিবেশ মানুষের বসবাসের কতটা অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে তা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বারো.
সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি নয়জনে একজন দীর্ঘমেয়াদে অভুক্ত থাকে। এফএও (The Food and Agriculture Organization of the United Nations)-এর তথ্য উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটন পোস্টের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- ১৯৯২ সালের তুলনায় বিশ্বে অপুষ্টির শিকার মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও এখনও বিশ্বে ৮০০ মিলিয়ন মানুষ দীর্ঘমেয়াদে অভুক্ত থাকে। চরম দারিদ্র্যের শিকার এই বিপুল জনগোষ্ঠীর অনেকেই বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের জায়গা দখলের চেষ্টা করবে। এতে যে কোনো সময় বাংলাদেশে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। জাপানের ফুকুশিমার দুর্যোগ, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হারিকেন স্যান্ডি, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সিডর- এ ধরনের যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাতে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে তা বিবেচনায় নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি না নিলে যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়তে পারে। উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়া সম্ভাব্য আর কী কী কারণে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন হুমকির মুখে পড়তে পারে- এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের গবেষণা অব্যাহত রাখা জরুরি।
কোনো বিবেকহীন মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে আমাদের চারপাশের উপকারী প্রাণীর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার আশংকা দেখা দিতে পারে। কাজেই যে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যাতে পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আমাদের সামান্য ভুল বা অদূরদর্শিতার জন্য যাতে প্রকৃতি থেকে কোনো উপকারী প্রাণী হারিয়ে না যায়, সেদিকেও সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ হাজার বছরের চেষ্টার পরও পরিবেশের ক্ষতি পূরণের বিষয়টি অনিশ্চিত থেকে যায়।
ইবোলা বিস্তারের মতো কোনো কঠিন পরিস্থিতি উন্নয়নশীল কোনো দেশের একার পক্ষে মোকাবেলা করা কত কঠিন তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই যে কোনো জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য জাতীয় ও আঞ্চলিক উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণেও সব দেশকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে যে কোনো বড় চ্যালেঞ্জও স্বল্পতম সময়ে সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি : প্রকাশক, যুগান্তর
যে কোনো দেশের উন্নয়নে দেশটির বিভিন্ন সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো অনেক দেশেই খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের স্বল্পতা সত্ত্বেও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ও জনগণের প্রচেষ্টায় উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। পৃথিবীতে খনিজ ও বেশিরভাগ প্রাকৃতিক সম্পদের মজুদ সীমিত। একমাত্র মানুষের কর্মদক্ষতাই অসীম। অর্থাৎ মানুষের সব সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হলে দেশের উন্নয়নে বিশেষ গতি আসবে, যা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিশেষভাবে সহায়তা করবে। আগামী দিনের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিদেশী বিনোয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বর্তমানে যে প্রতিযোগিতা চলছে এ অবস্থায় সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের বিষয়টি কী প্রভাব ফেলবে তা বিবেচনায় নিয়ে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে যে হারে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে এ ধারা অব্যাহত থাকলে ১০০ বছর পর পৃথিবীতে জ্বালানির কী সংকট দেখা দেবে- আইপিসিসির (The intergovernmental panel on climate change) পক্ষ থেকে এ বিষয়েও ইতিমধ্যে সতর্ক করা হয়েছে। কাজেই উল্লিখিত সংকট তীব্র আকার ধারণ করার আগেই আগাম সতর্কতামূলক বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ ১০০ বছর পর যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে না হয় সেজন্য বিকল্প জ্বালানির প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। কেবল উচ্চতর গবেষণা অব্যাহত থাকলেই এ বিষয়ে সম্ভাব্য সুখবর মিলতে পারে। অন্যথায় ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে। ১০০ বছর পর জীবাশ্ম জ্বালানির মজুদ না ফুরালেও গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা
না হলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই
বিশ্ববাসীকে দূষণবিষয়ক কী ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে বিজ্ঞানীরা তা ইতিমধ্যে বিস্তারিতভাবে ব্যাখা করেছেন- যা মিডিয়ায় বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
দুই.
আমাদের দেশের উন্নয়নের প্রধান বাধাগুলোর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। যানজট, স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ না পাওয়া, জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরতা, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার- এ রকম অনেক কারণে বিনিয়োগকারীরা ক্রমশ আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। দেশে বিনিয়োগ না বাড়লে নিত্যপণ্যের চহিদা মেটানোর জন্যও আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। কেবল ভয়াবহ যানজট সমস্যার কারণে বছরে হাজার কোটি টাকার তেল নষ্ট হয়। যানজটের কারণে সারা দেশের মানুষের যে কর্ম-ঘণ্টা জীবন থেকে হারিয়ে যায়- এ ক্ষতি পূরণের উপায় কী? রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে গণপরিবহনের সংখ্যা না বাড়ালে যানজট কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে- এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বহুবার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরমুখী মানুষের স্রোত বন্ধ না হলে আগামীতে আরও বহুমুখী সংকট দেখা দেবে। মানুষ যাতে মূল শহরের বাইরে বিভিন্ন জায়গা থেকে অল্প সময়ে শহরে নিজ কর্মস্থলে এসে পৌঁছাতে পারে তা নিশ্চিত করা হলে অনেকেই শহরের বাইরে বিভিন্ন এলাকায় থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। কারণ মূল শহরে বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় কেবল বাড়িভাড়ায়। গ্রামীণ জনপদে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না বাড়ালে মানুষের শহরমুখী স্রোত কমবে না।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল সব দেশের উন্নয়নের অন্যতম বাধা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিভিন্ন দেশ নানা মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উন্নত দেশগুলো যত সহজে অল্প সময়ে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে তা সম্ভব হয় না। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে তা বিশ্বের প্রভাবশালী মিডিয়ায়ও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণের জন্য অনেক আশ্বাস দিলেও বাস্তবে উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্র“তি রক্ষা করছে না। এমনকি বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণেও উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। কিয়োটো প্রটোকলে বর্ণিত শর্তগুলো যথাযথভাবে মানলে তা সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্যই স্বস্তির বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো। যেহেতু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর সহসা নির্ভরতা কমানোর লক্ষণ স্পষ্ট নয়, কাজেই ধরে নেয়া যায় বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের বর্তমান ধারা আরও কয়েক দশক অব্যাহত থাকবে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিও অব্যাহত থাকবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন শাকসবজির নতুন জাত সময়মতো আবিষ্কার করতে না পারলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এরকম আনুষঙ্গিক অনেক বিষয় সফলভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হলে টেকসই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিন.
বাংলাদেশের কৃষি খাতের উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্যের তুলনায় কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেনি। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, কৃষিতে নানাবিধ অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন কারণে কৃষকদের জীবনমানের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মিঠাপানির মাছের বিচরণভূমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়ির পাশের সহজলভ্য মাছ একসময় দরিদ্র মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে বিশেষ অবদান রাখত। মাছের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হতে হতে এখন অবস্থা এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, খাল-বিল দূরের কথা- অনেক নদীও এখন মৎস্যশূন্য। শুধু তাই নয় কোনো কোনো নদীর পানি এতটাই দূষিত হয়েছে যে- ওই পানিতে কোনো জলজ প্রাণীই দেখা যায় না। অনেক দরিদ্র মানুষ বাধ্য হয়ে এই দূষিত পানি ব্যবহার করার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। এই দূষিত পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের ফলে এসব দূষণ কৃষিপণ্যের মাধ্যমে মানবদেহে কী প্রভাব ফেলতে পারে- এ বিষয়ক গবেষণা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পানি দূষণ রোধে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পানি দূষিত হলে জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হয়। জীববৈচিত্র্য নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের
ওপর কী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এ বিষয়ক উচ্চতর গবেষণা অব্যাহত রাখা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে যেভাবে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে এতে আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ কতটা হুমকির মুখে পড়তে পারে এ নিয়ে সচেতন মানুষের উদ্বেগের অন্ত নেই।
চার.
যে কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরিবেশের ওপর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। যেসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিবেশের ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে সেসব প্রকল্প সংকুচিত করে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প সম্প্রসারণে সবাইকে মনোযোগী হতে হবে। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ আমদানি করে তৈরিকৃত পণ্য রফতানি করলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় বটে কিন্তু এতে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়- এ ব্যয় কী করে কমানো যায় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশীয় পণ্য ব্যবহারে মনোযোগী হওয়ার ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। তবে দেশে মানসম্মত পণ্য উৎপাদিত না হলে বিদেশী পণ্যের প্রতি আগ্রহ কমবে না। যেসব শিল্পোদ্যোক্তা ব্যাপক পরিসরে
বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করেন- তারা যাতে তাদের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন এ ব্যাপারে সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
অনেক বেকার তরুণ বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু যে কোনো সময় তারা চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থা কত ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে- মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় আমরা তা লক্ষ্য করেছি। বর্তমানে স্বল্পদক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকরা বিভিন্ন দেশে গিয়ে কোনো না কোনো কর্মে নিযুক্ত হচ্ছে। এ সুযোগ আগামী দিনগুলোতে কী হারে সংকুচিত হবে- তা বিবেচনায় রেখে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক তরুণদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানের সুব্যবস্থা করতে হবে। অনেক তরুণ ভিটেমাটি বিক্রি করে নিজের সর্বস্ব দালালের হাতে তুলে দিয়ে যে কোনো মূল্যে বিদেশে যেতে উদগ্রীব হয়ে পড়ে। এসব তরুণের কেউ কেউ বিদেশে গিয়ে অতি অল্প বেতনে চাকরি করতে বাধ্য হয়। আবার অনেকে প্রতারণার শিকার হয়। বর্তমানে সরকারিভাবে বিদেশে জনশক্তি রফতানি হলেও বিপুলসংখ্যক তরুণকে এ প্রক্রিয়ায় উপকৃত হওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষায় যাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে তাদের কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়েই অবৈধ পথে বিদেশ গমনের চেষ্টা করে। এসব তরুণের অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়। তরুণরা যাতে বিভ্রান্ত না হয় এ ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে হবে। অবৈধ পথে বিদেশে গমন করলে তরুণরা অচেনা পরিবেশে সম্ভাব্য কী ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে পারে তা তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। বিভিন্ন দেশে আগামীতে কী ধরনের জনশক্তির চাহিদা বাড়বে এ ব্যাপারে সরকারিভাবে ব্যাপকভিত্তিক গবেষণাকর্ম অব্যাহত রাখতে হবে এবং আগামী দিনের চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। তবে এ ব্যাপারে অতিরিক্ত নির্ভরতা কাম্য নয়। তরুণদের বোঝাতে হবে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে না গিয়ে গবেষক হিসেবে যেতে পারলে অসময়ে কর্মচ্যুত হওয়ার আশংকা কমে এবং একই সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি বাড়ে।
পাঁচ.যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পকে লাভজনক করার জন্য প্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কোনো শিল্পকারখানায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালে হঠাৎ বিপুলসংখ্যক কর্মী সাময়িকভাবে কর্মহীন হওয়ার আশংকা থেকেই যায়। এসব কর্মী পরবর্তী কর্মে যোগদানের আগে অন্তর্বর্তী সময়ে কর্মহীন থাকলে এদের কেউ কেউ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। সাময়িকভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া এ ধরনের কর্মীদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আওতায় আনার জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত থাকাও জরুরি।
প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে যে কোনো বয়সী
কর্মীর কর্মদক্ষতার পরিধি বেড়ে যায়। ফলে অতি সহজে একজন কর্মী নিজের ও পরিবারের
অসচ্ছলতা দূর করতে সক্ষম হন। সাময়িক অসচ্ছলতা দূর করার পর নিজের কর্মপরিধির আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে যে কোনো কর্মী যাতে তার সর্বোচ্চ
দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পায়, সেজন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহুমুখী কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে।
টেকসই উন্নয়নের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য বিভিন্ন দেশে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আমাদের দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামনেও তুলে ধরার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে একজন নাগরিকের কাছে স্পষ্ট হবে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিযোগিতার জন্য কী ধরনের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কোনো তরুণ সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখার পরও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেক দেরি হতে পারে যদি শিক্ষা খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেয়া না হয়।
ছয়.
বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় শ্রমনির্ভর শিল্পকারখানায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ ধারা কতদিন অব্যাহত রাখা দরকার, এ বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। কারণ বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় শ্রমনির্ভর শিল্পকারখানায় বিশেষ গুরুত্বারোপ বেশি দূর এগোনো সম্ভব নয়। উচ্চতর প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকারখানার যুগে প্রবেশের জন্য আমাদের আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। কাজেই আমাদের দ্রুত চলার গতি যাতে অব্যাহত থাকে এ ব্যাপারে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রতিটি দেশেই বিদ্যমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আগামী দিনের চাহিদা পূরণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকে। এসব কর্মসূচির পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিভিন্ন দেশের সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো কতভাবে উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, এ বিষয়ে উচ্চতর পর্যায়ে গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে।
সাত.
প্রলম্বিত বিশ্বমন্দার কারণে কম-বেশি প্রায় সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বমন্দার এই ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে এবং এ অঞ্চলের দেশগুলো বাণিজ্য ও অন্যান্য খাতে কতভাবে লাভবান হতে পারে তা খুঁজে বের করতে হবে। দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতাসহ অন্য অভিন্ন সমস্যার সমাধানে এ অঞ্চলের দেশগুলোর যৌথ উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিশেষত স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান সমসাগুলো কত দ্রুত সমাধান করা যায় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
উন্নত দেশগুলো যে কোনো সময় চিকিৎসা খাতে এককভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে পারে, যা এককভাবে বরাদ্দ করা এ অঞ্চলের অনেক দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এ খাতে আগামী দিনের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি না নিলে অর্র্থনীতিতে কী ধস নামতে পারে, সাম্প্রতিক ইবোলা আতংকের মাধ্যমেই তা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে। অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে ইবোলা আতংকের মতো যে কোনো চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। এটা বিবেচনায় নিয়ে যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে হবে। এ অঞ্চলের দেশগুলোর যৌথ উদ্যোগে চিকিৎসাবিষয়ক উচ্চতর গবেষণা শুরু হলে এ অভিজ্ঞতা অন্য অনেক খাতে কাজে লাগানো যাবে, যা এ অঞ্চলের দেশগুলোর সার্বিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করবে।
আট.
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিশ্বে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে। এতে আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা হুমকির মুখে পড়তে পারে তা বিবেচনায় নিয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলো দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়ভাবে উপকৃত হওয়ার যেসব সম্ভাবনা আছে তা কাজে লাগানোর যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে জলবিদ্যুতের ক্ষেত্রে নেপাল, ভুটান, ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রকল্পের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। এ ছাড়া বিনিয়োগ ও বাণিজ্য খাতে এ ধরনের আর কী কী সম্ভাবনা আছে তা খুঁজে সেসব সম্ভাবনা কাজে লাগানোর যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারত দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে উপকৃত হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সেসব সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কী কী উদ্যোগ অব্যাহত রাখা দরকার তা খুঁজে বের করা জরুরি। বিশেষ করে দুদেশের জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্যও বিভিন্ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা দরকার। দারিদ্র্য দূরীকরণে যে কোনো সফল মডেল এ অঞ্চলের সব দেশেরই কাজে লাগবে। তাই দ্রুততম সময়ে পারস্পরিক তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের দেশগুলো যাতে উপকৃত হতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
নয়.
সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক। আমাদের দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ অক্ষুণ্ন না থাকলে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ সংকুচিত করার চিন্তা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কাজেই দেশে যাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। বিভিন্ন খাতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যেসব সুযোগ পাবেন, দেশী বিনিয়োগকারীরা যাতে তা পান, সেটি নিশ্চিত করা না হলে দেশী শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। দ্রুততম সময়ে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণসহ সমুদ্রের বিস্তীর্ণ এলাকার সম্পদ আহরণে ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। কাজটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই আমাদের সমুদ্রের বিস্তীর্ণ এলাকায় সম্ভাব্য কী কী সম্পদের মজুদ রয়েছে, এ বিষয়ক জরিপটি দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন। সমুদ্রবিষয়ক গবেষণায় ইতিমধ্যে যেসব দেশ ব্যাপক সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গবেষণা শুরু করে দ্রুততম সময়ে যাতে স্বাধীনভাবে গবেষণার সক্ষমতা অর্জন করা যায়, তেমন কর্মসূচি নিতে হবে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্র থেকে বিভিন্ন মূল্যবান সম্পদ আহরণের সক্ষমতা অর্জনের জন্যও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
দশ.
আমরা লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সামুদ্রিক ঝড় বয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য আমাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্প্রতি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা এবং তীব্রতা বেড়েই চলেছে। এতে আগামী দিনগুলোতে উপকূলীয় এলাকার জনগণের যে অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে তা মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ভারতের মহাকাশ গবেষণায় সাফল্য আমাদের যেমন আশাবাদী করে একই সঙ্গে দেশটির দরিদ্র মানুষের সংগ্রামের কথা শুনে আমরা উদ্বিগ্ন হই, নেপালের জলবিদ্যুতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ব্যাপক লোডশেডিংয়ে দেশটির উন্নয়নে স্থবিরতা দেখা দেয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তায় নেপালের জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো হলে দেশটি প্রচুর বিদ্যুৎ রফতানিও করতে পারবে। এ অঞ্চলের দেশগুলোকে আগামীতে সম্ভাব্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে এ বিষয়ক গবেষণা অব্যাহত রাখা জরুরি। বিদ্যমান সমস্যা ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে। জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় প্রতিবেশী দেশের প্রয়োজনীয় সহায়তা নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিতে দেরি করলে এ অঞ্চলের যে কোনো দেশে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ব্ল্যাক আউটের মতো বিপর্যয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
যেহেতু এ অঞ্চলের দেশগুলোর জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা প্রায় একই রকম তাই পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উল্লিখিত দেশগুলোর জনগণ কতভাবে লাভবান হতে পারে- তা খুঁজে বের করতে বহুমুখী পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রম কেবল উচ্চতর পর্যায়ের গবেষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রান্তিক জনগণ যাতে সরাসরি উপকৃত হতে পারে, ওই ধরনের প্রকল্পের পরিধি বাড়াতে হবে। এ অঞ্চলের কোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিলে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব অন্য দেশগুলোর ওপরও পড়বে। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে গঠিত বিদ্যমান সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড গতিশীল করার জন্যও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
এগার.
২ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে ব্রিটেনের গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত তিন দশকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪২ কোটি পাখি কমেছে। ২৫টি দেশের ১৪৪ প্রজাতির পাখির ওপর পরিচালিত এক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। কৃষিজমির পরিমাণ দ্রুত বাড়ানোর ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে পাখির খাবার সংকট এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই বিপুলসংখ্যক পাখি কমেছে, এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে। উল্লিখিত তথ্য থেকে এটাও স্পষ্ট হয়, প্রতিকূল পরিবেশে অন্য অনেক প্রাণীর সংখ্যায়ও ব্যাপক তারতম্য ঘটতে পারে। আমাদের চারপাশের পরিবেশ মানুষের বসবাসের জন্য কতটা উপযোগী তা প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন উপকারী প্রাণীর উপস্থিতি থেকেও বোঝা যায়। যেহেতু ইউরোপের দেশগুলোতে ব্যাপক সংখ্যক পাখি কমেছে, তাই উল্লিখিত দেশগুলোর পরিবেশে প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে যথাযথ পর্যবেক্ষণে তা স্পষ্ট হবে। আমাদের এ অঞ্চলেও এ ধরনের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। সামুদ্রিক প্রাণীর ওপরও বিভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। জীববৈচিত্র্যে ব্যাপক পরিবর্তন যে আগামী দিনের কোনো বিপর্যয়ের সম্ভাবনাকে জোরালো করে, এ বিষয়ে গবেষকরা বারবার হুশিয়ার করে দিয়েছেন। কাজেই আমাদের চারপাশের উপকারী প্রাণীর সংখ্যায় কী পরিবর্তন এল সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
পাখিসহ বিভিন্ন উপকারী প্রাণী বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণী ও উপাদান খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কোনো একটি উপকারী প্রাণীর স্বাভাবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়লে পরিবেশ মানুষের বসবাসের কতটা অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে তা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বারো.
সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি নয়জনে একজন দীর্ঘমেয়াদে অভুক্ত থাকে। এফএও (The Food and Agriculture Organization of the United Nations)-এর তথ্য উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটন পোস্টের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- ১৯৯২ সালের তুলনায় বিশ্বে অপুষ্টির শিকার মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও এখনও বিশ্বে ৮০০ মিলিয়ন মানুষ দীর্ঘমেয়াদে অভুক্ত থাকে। চরম দারিদ্র্যের শিকার এই বিপুল জনগোষ্ঠীর অনেকেই বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিকদের জায়গা দখলের চেষ্টা করবে। এতে যে কোনো সময় বাংলাদেশে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। জাপানের ফুকুশিমার দুর্যোগ, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হারিকেন স্যান্ডি, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সিডর- এ ধরনের যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাতে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে তা বিবেচনায় নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি না নিলে যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়তে পারে। উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়া সম্ভাব্য আর কী কী কারণে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন হুমকির মুখে পড়তে পারে- এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের গবেষণা অব্যাহত রাখা জরুরি।
কোনো বিবেকহীন মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে আমাদের চারপাশের উপকারী প্রাণীর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার আশংকা দেখা দিতে পারে। কাজেই যে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যাতে পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আমাদের সামান্য ভুল বা অদূরদর্শিতার জন্য যাতে প্রকৃতি থেকে কোনো উপকারী প্রাণী হারিয়ে না যায়, সেদিকেও সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ হাজার বছরের চেষ্টার পরও পরিবেশের ক্ষতি পূরণের বিষয়টি অনিশ্চিত থেকে যায়।
ইবোলা বিস্তারের মতো কোনো কঠিন পরিস্থিতি উন্নয়নশীল কোনো দেশের একার পক্ষে মোকাবেলা করা কত কঠিন তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই যে কোনো জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য জাতীয় ও আঞ্চলিক উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণেও সব দেশকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে যে কোনো বড় চ্যালেঞ্জও স্বল্পতম সময়ে সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।
অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি : প্রকাশক, যুগান্তর
Sunday, November 9, 2014
বার্লিন প্রাচীর ধসের ২৫ বছর by দাউদ হায়দার
জেলার নাম ভেডিং। ভূগোল এরকম : বার্নাউয়ার স্ট্রাসে (সড়ক)। মেট্রো রেলওয়ে স্টেশন। সামনে-পেছনে, ডাইনে-বাঁয়ে আরও চারটি প্রশস্ত সড়ক। বার্নাউয়ার স্ট্রাসে থেকে এক কিলোমিটার দূরেই হিটলারের সবচেয়ে শক্ত, মজবুত, পাথুরে-কংক্রিট বাংকার (মিত্রবাহিনী দুই হাজার টন বোমা ফেলেও ভাঙতে পারেনি)। ভেডিং জেলাসহ দক্ষিণ বার্লিন ফ্রান্সের দখলে। পশ্চিম বার্লিন আমেরিকার, উত্তর ব্রিটেনের। অর্থাৎ, অ্যালায়েড ফোর্সের ভাগে বার্লিন। তিন রকম প্রশাসন। সাধারণত বলা হয়, পশ্চিম বার্লিন। পূর্ব বার্লিনসহ গোটা পূর্ব জার্মানিই সোভিয়েত ইউনিয়নের দেখভালে। যদিও আলাদা সরকার, আলাদা প্রশাসন। পলিটব্যুরো আলাদা। পূর্ব জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির সরকারি নাম সিইডি (সোসালিস্ট ইউনিয়ন অব ডেমোক্রেটিক)। দেশের নাম ডিডিআর (ডিডিআর- ডয়েচে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক। পশ্চিম জার্মানির নাম এফআরজি- ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি)।
বলা নেই কওয়া নেই, এত জায়গা রেখে কেন বার্নাউয়ার স্ট্রাসে বেছে নেয়া হল বার্লিন দেয়াল নির্মাণের (দেয়াল নির্মাণ ১৩ অগাস্ট ১৯৬১। দু’দিন আগে ১১ ও ১২ তারিখে কাঁটাতারের বেড়া) জন্য? এখনও কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি। এমনকি স্টাসির (গুপ্ত পুলিশ) দফতরেও। বলা হচ্ছে, অনেক নথির সঙ্গে ওই নথিও গায়েব। তবে একটি নথি পাওয়া গেছে, বার্লিন দেয়াল নির্মাণের হুকুমদাতা ক্রুশ্চভ। তিনি ও কোসেগিন (তিন বছর পর কোসেগিন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী) বার্লিন দেয়াল নির্মাণ কতটা সম্পন্ন, কতটা পাকাপোক্ত- দেখতে আসেন, তথা পরিদর্শন করেন। দেখে সুখী। পাঁচ মিটার উঁচু। পাঁচ ফুট চওড়া। কোনো কোনো দেয়ালের পাঁচিলের উপরে আবার তিন ফুট উঁচু কাঁটাতার। ১৬১ কিলোমিটার বার্লিন দেয়াল। পূর্ব জার্মানি-পশ্চিম জার্মানির সীমান্তে পাঁচিল নেই, দশ ফুটের কাঁটাতার। আগস্ট ১৯৬১ থেকে জুলাই ১৯৮৯ পর্যন্ত বেড়া-দেয়াল টপকে সীমান্ত অতিক্রমণের সময় পূর্ব জার্মানির ১৯১ জন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। বার্লিনেই নিহত হয় ৩০ জনের বেশি।
পশ্চিম বার্লিনকে বলা হয় (দেয়াল ধসের আগে) মিউজিয়াম। কেউ বলেন, দেয়ালঘেরা শহর। মিথ্যে নয়। আছি ১৯৮৭ সাল থেকে, পশ্চিম বার্লিনে। পশ্চিম জার্মানির যে অঞ্চল থেকেই আসুন- হোক তা গাড়িতে, ট্রেনে, প্লেনে- পূর্ব জার্মানি ক্রস করতেই হবে। একমাত্র প্লেন ছাড়া গাড়িতে বা ট্রেনে পশ্চিম বার্লিনে আসছেন, ঢোকার আগে চেকপয়েন্ট। বৈধ পাসপোর্ট দেখাতেই হবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। চেকপয়েন্টের পুলিশের মেজাজ মিলিটারির। কথা বলে না, চোখের ইশারা।
পশ্চিম বার্লিনে প্রৌঢ়-বুড়োবুড়ির চেয়ে জোয়ানজোয়ানির সংখ্যা বেশি (দেয়াল ধসের আগের কথা বলছি)। হেতু, ১৮ বছর হলেই দুই বা তিন বছরের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগদান, প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক, পশ্চিম জার্মানির যে অঞ্চলেই থাকুন না কেন। বাদ শুধু পশ্চিম বার্লিনের রেসিডেন্ট পারমিটধারী হলে। এ ছাড় অ্যালায়েড ফোর্সের।
বার্লিন দেয়াল ধসের ঘটনায় কোনো বিপ্লবী নেতা ছিল না। জনগণই নেতা, জনগণই বিপ্লবী। শুরু হয়েছিল পূর্ব বার্লিনেই। ফ্রাউ (শ্রীমতী) বারবেল বোলাই, প্রত্যেক রোববার পূর্ব বার্লিনসহ পূর্ব জার্মানির বিভিন্ন গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা শেষে বক্তৃতা করেন বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, অবাধ যাতায়াতের। গ্রেফতারও হন, ছাড়াও পান তিন মাস পর (১৯৮৮ সালে)। কিন্তু দমে যাননি। ডয়েচে ভেলের জন্য সাক্ষাৎকার নিই। প্রথম কথা, কেন দমে যাব, দমলে বিপ্লব হয় না।
পোল্যান্ডের বিখ্যাত দৈনিক গাতসেটা ভ্যেইবোরতসরার সম্পাদক আডাম মিচনিক লিখেছেন (৫ অক্টোবর ১৯৮৯), মে ও আগস্টে (১৯৮৮) গণবিক্ষোভ হয় পূর্ব বার্লিনে, ওয়ারশয়, প্রাগে, বুদাপেস্টে একই সঙ্গে, একই দিনে, কাকতালীয়ভাবে। কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই। এই বিক্ষোভ-মিছিলেই পরিষ্কার হয়ে যায় পূর্ব ইউরোপের ভাগ্য।
১৯৮৯ সালের বিপ্লবের ঘটনাসূত্র, পরম্পরা দেখুন পূর্ব ইউরোপে।
১. ৯ অক্টোবর (১৯৮৯)। পূর্ব জার্মানির লাইপজিগে, বেলা ৩টার আগেই ৭০ হাজারের বেশি মানুষ রাস্তায়, বিক্ষোভে। সন্ধ্যার আগে তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিক্ষোভ, মিছিল, সমাবেশ, মিটিং পরিচালনা করছেন লাইপজিগের নিকোলাইকির্সের (নিকোলাই গির্জা) ধর্মযাজক ক্রিস্টিয়ান ফ্যুয়েরার। ডয়েচে ভেলের জন্য টেলিফোনে রিপোর্ট করছি। বিবিসির জন্যও। ক্রিস্টিয়ানের দাবি (পরে) বার্লিন দেয়াল ধসের সূচনা ৯ অক্টোবর, ৯ নভেম্বর নয়।
২. ১০ নভেম্বর। বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট নেতা তুদোর তিসফকোভ রক্তপাতহীন বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত।
৩. ১৭ নভেম্বর। চেকোস্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাগ, ভেলভেট রেভ্যুলেশন। ৫ লাখ মানুষ। বিক্ষোভ, মিছিল। নেতা বহুমান্য নাট্যকার ভাসলাভ হাভেল।
৪. ২৭ নভেম্বর। চেকোস্লোভাকিয়া সরকারের পতন।
৫. ১৬ ডিসেম্বর। রুমানিয়ায় শাসক নিকোলাই চসেস্কুর বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন।
৬. ২২ ডিসেম্বর। রুমানিয়ার সৈন্যরা চসেস্কুর বিরুদ্ধে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান কার্যালয় ঘিরে ফেলে বিদ্রোহী জনতা। একনাগাড়ে পাঁচ দিন। ধূলিস্যাৎ করার নির্দেশ দেন চসেস্কু; শুধু অমান্যই নয়, সৈন্যরাই চসেস্কুর বাড়ি দখল করে।
৭. ২৫ ডিসেম্বর। চসেস্কুর সংক্ষিপ্ত বিচার। একেবারে পাবলিকলি হত্যা, স্ত্রীসহ।
বলতে ভুলে গেছি, ১২ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) ১৯৮৯, পূর্ব জার্মানি থেকে শতাধিক মানুষ হাঙ্গেরিতে গিয়ে অস্ট্রিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে। ছুটে যান চ্যান্সেলর হেলমুট কোল এবং হান্স গেনশার (পররাষ্ট্রমন্ত্রী)। স্বাগত জানান। পশ্চিম জার্মানিতে আসার অনুমতি দেন। সেই সঙ্গে প্রত্যেককে ১০ হাজার ডয়েচ মার্ক, চাকরি এবং বাড়ি বরাদ্দের অঙ্গীকার।
বার্লিন দেয়াল ধ্বংস করার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না পূর্ব বার্লিনের মানুষের। করেওনি। করেছে পশ্চিম বার্লিনের মানুষ এবং পশ্চিম জার্মান সরকার। ৯ নভেম্বর হাজার হাজার মানুষ ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনের দেয়ালের ওপরে। লাফিয়ে পড়ছে পূর্ব বার্লিনের ঘেরা দেয়া অংশে, যদিও নো ম্যানস ল্যান্ড। পশ্চিম বার্লিনের মানুষই হাতুড়ি-শাবল দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করে, পাথর-কংক্রিটে তৈরি, এক লহমায় বা একদিনে ধ্বংস করা সহজ নয়। হাতুড়ি-শাবলে কিছু টুকরো ভাঙে বৈকি। সপ্তাহখানেক পর পশ্চিম জার্মান সরকারের নির্দেশে (মূলত হেলমুট কোলের নির্দেশে) বোর্নহোলমার স্ট্রাসের চেকপয়েন্ট খোলা হয় প্রথম, ৮ নভেম্বর রাত ৮টায়। তাও মাত্র কয়েকজনকে প্রবেশের অনুমতি, অধিকাংশই যুবক-যুবতী। হাতে পূর্ব জার্মানির পাসপোর্ট। রাত ১১টার পর কয়েকশ’। বার্লিনের প্রতিটি চেকপয়েন্ট খোলা হয় রাত ১২টার পর। প্রত্যেকের হাতেই পূর্ব জার্মানির পাসপোর্ট। বাংলাদেশের খালেকুজ্জামান বলেন, পাসপোর্ট ছাড়াই তিনি প্রবেশ করেন। এই প্রতিবেদকও। সারা রাত ইচ্ছেমতন অবাধ বিচরণ। বলার কেউ নেই। যেহেতু রাত ১২টার পর, সেই হিসাবে তারিখ ধরা হয় ৯ নভেম্বর।
বার্লিন দেয়ালে যে গ্রাফিটি, তা এঁকেছে পৃথিবীর নানা দেশের শিল্পী। ছবির নিচে কারও নাম নেই। দেয়ালের পশ্চিমাংশেই ছবি, পূর্বাংশে নয়। পূর্ব বার্লিনের কোনো ছবি আঁকিয়ের ছবি নেই। অসম্ভব। কারণ, দেয়ালের কাছে ঘেঁষলেই পুলিশের গুলি, মৃত্যু। পোটসডামার প্লাতসের দেয়ালে নানা আঁকিবুকির মধ্যে চোখ আটকায়, বিশাল অক্ষরে কে যেন কাঁচা হাতে বাংলায় লিখেছে : শালা।
দাউদ হায়দার : জার্মানি প্রবাসী কবি
বলা নেই কওয়া নেই, এত জায়গা রেখে কেন বার্নাউয়ার স্ট্রাসে বেছে নেয়া হল বার্লিন দেয়াল নির্মাণের (দেয়াল নির্মাণ ১৩ অগাস্ট ১৯৬১। দু’দিন আগে ১১ ও ১২ তারিখে কাঁটাতারের বেড়া) জন্য? এখনও কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি। এমনকি স্টাসির (গুপ্ত পুলিশ) দফতরেও। বলা হচ্ছে, অনেক নথির সঙ্গে ওই নথিও গায়েব। তবে একটি নথি পাওয়া গেছে, বার্লিন দেয়াল নির্মাণের হুকুমদাতা ক্রুশ্চভ। তিনি ও কোসেগিন (তিন বছর পর কোসেগিন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী) বার্লিন দেয়াল নির্মাণ কতটা সম্পন্ন, কতটা পাকাপোক্ত- দেখতে আসেন, তথা পরিদর্শন করেন। দেখে সুখী। পাঁচ মিটার উঁচু। পাঁচ ফুট চওড়া। কোনো কোনো দেয়ালের পাঁচিলের উপরে আবার তিন ফুট উঁচু কাঁটাতার। ১৬১ কিলোমিটার বার্লিন দেয়াল। পূর্ব জার্মানি-পশ্চিম জার্মানির সীমান্তে পাঁচিল নেই, দশ ফুটের কাঁটাতার। আগস্ট ১৯৬১ থেকে জুলাই ১৯৮৯ পর্যন্ত বেড়া-দেয়াল টপকে সীমান্ত অতিক্রমণের সময় পূর্ব জার্মানির ১৯১ জন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। বার্লিনেই নিহত হয় ৩০ জনের বেশি।
পশ্চিম বার্লিনকে বলা হয় (দেয়াল ধসের আগে) মিউজিয়াম। কেউ বলেন, দেয়ালঘেরা শহর। মিথ্যে নয়। আছি ১৯৮৭ সাল থেকে, পশ্চিম বার্লিনে। পশ্চিম জার্মানির যে অঞ্চল থেকেই আসুন- হোক তা গাড়িতে, ট্রেনে, প্লেনে- পূর্ব জার্মানি ক্রস করতেই হবে। একমাত্র প্লেন ছাড়া গাড়িতে বা ট্রেনে পশ্চিম বার্লিনে আসছেন, ঢোকার আগে চেকপয়েন্ট। বৈধ পাসপোর্ট দেখাতেই হবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। চেকপয়েন্টের পুলিশের মেজাজ মিলিটারির। কথা বলে না, চোখের ইশারা।
পশ্চিম বার্লিনে প্রৌঢ়-বুড়োবুড়ির চেয়ে জোয়ানজোয়ানির সংখ্যা বেশি (দেয়াল ধসের আগের কথা বলছি)। হেতু, ১৮ বছর হলেই দুই বা তিন বছরের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগদান, প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক, পশ্চিম জার্মানির যে অঞ্চলেই থাকুন না কেন। বাদ শুধু পশ্চিম বার্লিনের রেসিডেন্ট পারমিটধারী হলে। এ ছাড় অ্যালায়েড ফোর্সের।
বার্লিন দেয়াল ধসের ঘটনায় কোনো বিপ্লবী নেতা ছিল না। জনগণই নেতা, জনগণই বিপ্লবী। শুরু হয়েছিল পূর্ব বার্লিনেই। ফ্রাউ (শ্রীমতী) বারবেল বোলাই, প্রত্যেক রোববার পূর্ব বার্লিনসহ পূর্ব জার্মানির বিভিন্ন গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা শেষে বক্তৃতা করেন বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, অবাধ যাতায়াতের। গ্রেফতারও হন, ছাড়াও পান তিন মাস পর (১৯৮৮ সালে)। কিন্তু দমে যাননি। ডয়েচে ভেলের জন্য সাক্ষাৎকার নিই। প্রথম কথা, কেন দমে যাব, দমলে বিপ্লব হয় না।
পোল্যান্ডের বিখ্যাত দৈনিক গাতসেটা ভ্যেইবোরতসরার সম্পাদক আডাম মিচনিক লিখেছেন (৫ অক্টোবর ১৯৮৯), মে ও আগস্টে (১৯৮৮) গণবিক্ষোভ হয় পূর্ব বার্লিনে, ওয়ারশয়, প্রাগে, বুদাপেস্টে একই সঙ্গে, একই দিনে, কাকতালীয়ভাবে। কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই। এই বিক্ষোভ-মিছিলেই পরিষ্কার হয়ে যায় পূর্ব ইউরোপের ভাগ্য।
১৯৮৯ সালের বিপ্লবের ঘটনাসূত্র, পরম্পরা দেখুন পূর্ব ইউরোপে।
১. ৯ অক্টোবর (১৯৮৯)। পূর্ব জার্মানির লাইপজিগে, বেলা ৩টার আগেই ৭০ হাজারের বেশি মানুষ রাস্তায়, বিক্ষোভে। সন্ধ্যার আগে তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিক্ষোভ, মিছিল, সমাবেশ, মিটিং পরিচালনা করছেন লাইপজিগের নিকোলাইকির্সের (নিকোলাই গির্জা) ধর্মযাজক ক্রিস্টিয়ান ফ্যুয়েরার। ডয়েচে ভেলের জন্য টেলিফোনে রিপোর্ট করছি। বিবিসির জন্যও। ক্রিস্টিয়ানের দাবি (পরে) বার্লিন দেয়াল ধসের সূচনা ৯ অক্টোবর, ৯ নভেম্বর নয়।
২. ১০ নভেম্বর। বুলগেরিয়ার কমিউনিস্ট নেতা তুদোর তিসফকোভ রক্তপাতহীন বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত।
৩. ১৭ নভেম্বর। চেকোস্লোভাকিয়ার রাজধানী প্রাগ, ভেলভেট রেভ্যুলেশন। ৫ লাখ মানুষ। বিক্ষোভ, মিছিল। নেতা বহুমান্য নাট্যকার ভাসলাভ হাভেল।
৪. ২৭ নভেম্বর। চেকোস্লোভাকিয়া সরকারের পতন।
৫. ১৬ ডিসেম্বর। রুমানিয়ায় শাসক নিকোলাই চসেস্কুর বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন।
৬. ২২ ডিসেম্বর। রুমানিয়ার সৈন্যরা চসেস্কুর বিরুদ্ধে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান কার্যালয় ঘিরে ফেলে বিদ্রোহী জনতা। একনাগাড়ে পাঁচ দিন। ধূলিস্যাৎ করার নির্দেশ দেন চসেস্কু; শুধু অমান্যই নয়, সৈন্যরাই চসেস্কুর বাড়ি দখল করে।
৭. ২৫ ডিসেম্বর। চসেস্কুর সংক্ষিপ্ত বিচার। একেবারে পাবলিকলি হত্যা, স্ত্রীসহ।
বলতে ভুলে গেছি, ১২ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) ১৯৮৯, পূর্ব জার্মানি থেকে শতাধিক মানুষ হাঙ্গেরিতে গিয়ে অস্ট্রিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে। ছুটে যান চ্যান্সেলর হেলমুট কোল এবং হান্স গেনশার (পররাষ্ট্রমন্ত্রী)। স্বাগত জানান। পশ্চিম জার্মানিতে আসার অনুমতি দেন। সেই সঙ্গে প্রত্যেককে ১০ হাজার ডয়েচ মার্ক, চাকরি এবং বাড়ি বরাদ্দের অঙ্গীকার।
বার্লিন দেয়াল ধ্বংস করার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না পূর্ব বার্লিনের মানুষের। করেওনি। করেছে পশ্চিম বার্লিনের মানুষ এবং পশ্চিম জার্মান সরকার। ৯ নভেম্বর হাজার হাজার মানুষ ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনের দেয়ালের ওপরে। লাফিয়ে পড়ছে পূর্ব বার্লিনের ঘেরা দেয়া অংশে, যদিও নো ম্যানস ল্যান্ড। পশ্চিম বার্লিনের মানুষই হাতুড়ি-শাবল দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করে, পাথর-কংক্রিটে তৈরি, এক লহমায় বা একদিনে ধ্বংস করা সহজ নয়। হাতুড়ি-শাবলে কিছু টুকরো ভাঙে বৈকি। সপ্তাহখানেক পর পশ্চিম জার্মান সরকারের নির্দেশে (মূলত হেলমুট কোলের নির্দেশে) বোর্নহোলমার স্ট্রাসের চেকপয়েন্ট খোলা হয় প্রথম, ৮ নভেম্বর রাত ৮টায়। তাও মাত্র কয়েকজনকে প্রবেশের অনুমতি, অধিকাংশই যুবক-যুবতী। হাতে পূর্ব জার্মানির পাসপোর্ট। রাত ১১টার পর কয়েকশ’। বার্লিনের প্রতিটি চেকপয়েন্ট খোলা হয় রাত ১২টার পর। প্রত্যেকের হাতেই পূর্ব জার্মানির পাসপোর্ট। বাংলাদেশের খালেকুজ্জামান বলেন, পাসপোর্ট ছাড়াই তিনি প্রবেশ করেন। এই প্রতিবেদকও। সারা রাত ইচ্ছেমতন অবাধ বিচরণ। বলার কেউ নেই। যেহেতু রাত ১২টার পর, সেই হিসাবে তারিখ ধরা হয় ৯ নভেম্বর।
বার্লিন দেয়ালে যে গ্রাফিটি, তা এঁকেছে পৃথিবীর নানা দেশের শিল্পী। ছবির নিচে কারও নাম নেই। দেয়ালের পশ্চিমাংশেই ছবি, পূর্বাংশে নয়। পূর্ব বার্লিনের কোনো ছবি আঁকিয়ের ছবি নেই। অসম্ভব। কারণ, দেয়ালের কাছে ঘেঁষলেই পুলিশের গুলি, মৃত্যু। পোটসডামার প্লাতসের দেয়ালে নানা আঁকিবুকির মধ্যে চোখ আটকায়, বিশাল অক্ষরে কে যেন কাঁচা হাতে বাংলায় লিখেছে : শালা।
দাউদ হায়দার : জার্মানি প্রবাসী কবি
মন্তব্য করার আগে ইতিহাসটা জানা দরকার by ইকতেদার আহমেদ
সুদূর অতীত থেকে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ভিত্তিতে ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলমান জনগোষ্ঠী বসবাস করে আসছিল। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকরা বাংলা দখলের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে তাদের শাসনের সূচনা করে এবং সমগ্র ভারতবর্ষে তাদের শাসনক্ষমতার বিস্তৃতি ঘটাতে এক শতাব্দী সময় লেগে যায়। ১৭৫৭ সালে বাংলা ইংরেজদের পদাবনত হলেও দিল্লি তাদের হস্তগত হয় এর শত বছর পর অর্থাৎ ১৮৫৭ সালে। ইংরেজরা ভারতবর্ষে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সময় এখানে মুসলমানদের শাসনকার্য বলবৎ ছিল। ভারতবর্ষে ইংরেজদের আগমনের আগে মুসলিম শাসকরা ছয় শতাধিক বছর ধরে এ দেশটি শাসন করেন। মুসলিমদের আগমনের আগে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল বিচ্ছিন্নভাবে হিন্দু রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়ে আসছিল। ভারতবর্ষের কিছু অঞ্চল কিছু কাল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাজারাও শাসন করেন।
ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকরা হিন্দু শাসকদের পরাভূত করে এ দেশের শাসনক্ষমতা দখল করায় ইংরেজ শাসকরা এ দেশে তাদের শাসনক্ষমতার সূচনা ও বিস্তারে হিন্দুদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছিলেন। ইংরেজদের শাসনকালের সূচনালগ্ন থেকেই হিন্দুরা ইংরেজি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাতে থাকলে চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য উভয় ক্ষেত্রে তারা এ দেশের অপর ধর্মীয় সম্প্রদায় মুসলমানদের চেয়ে প্রাধান্য পেতে থাকে। এ দেশের মুসলমানদের ইংরেজ শাসনের প্রথমদিকে ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে অনীহা থাকলেও তাদের শাসনের শেষ দিকে সেই অনীহাভাব ছিল না।
ইংরেজ শাসনামলে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলায়ও হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস ছিল; তবে বাংলার পশ্চিমাংশ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, অপরদিকে বাংলার পূর্বাংশ অর্থাৎ পূর্ব বাংলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। ইংরেজ শাসনামলে কলকাতা বাংলার রাজধানী ছিল। সে সময় কলকাতাকে কেন্দ্র করেই কলকারখানা গড়ে উঠেছিল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। ইংরেজ শাসনামলে পূর্ব বাংলার অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল। এতদাঞ্চলে কোনো শিল্পকারখানা গড়ে না উঠায় এবং পূর্ব বাংলার মানুষ, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায় শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসায় হিন্দুদের চেয়ে পশ্চাৎপদ হওয়ায় এ অঞ্চলের মুসলিম নেতাদের মধ্য থেকে বাংলা ও আসাম সমন্বয়ে পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল গঠনের দাবি ওঠে। উভয় বাংলার হিন্দু নেতারা প্রথম থেকেই এ দাবির বিরোধিতা করতে থাকেন। কিন্তু পূর্ব বাংলার মুসলমানদের অনগ্রসরতার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চলের দাবিটি ইংরেজদের কাছে যৌক্তিক বিবেচিত হলে তারা পূর্ব বাংলা ও আসাম সমন্বয়ে একটি পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল সৃষ্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইংরেজদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯০৫ সালে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ব বাংলা ও আসাম সমন্বয়ে একটি প্রশাসনিক অঞ্চল গঠন করা হয়। এ অঞ্চলটি তাত্ত্বিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বাংলার নেতৃস্থানীয় এবং পূর্ব বাংলার কিছু হিন্দু নেতা তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতাকারী হিন্দু নেতাদের অন্যতম ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার বড় ভাইয়ের কন্যাজামাতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র। বঙ্গভঙ্গ রবীন্দ্রনাথকে এতই ব্যথিত ও মর্মাহত করেছিল যে, ক্ষোভ, দুঃখ, অপমান ও অভিমানে বাংলার অখণ্ডতাকে অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়াসে বঙ্গভঙ্গের বছর অর্থাৎ ১৯০৫ সালে তিনি আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি এ গানটি রচনা করেন।
উভয় বাংলার নেতৃস্থানীয় হিন্দুদের আন্দোলন ও বিরোধিতার কারণে বঙ্গভঙ্গ স্থিতিশীল হতে পারেনি এবং এতদাঞ্চলের মুসলমানদের চরম হতাশা ও ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ইংরেজরা ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করে। বঙ্গভঙ্গ রদের কারণে এতদাঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে যে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল তা প্রশমনে ইংরেজরা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইংরেজদের এ সিদ্ধান্তটিও রবীন্দ্রনাথসহ হিন্দু নেতাদের বাধার সম্মুখীন হয়। যাহোক সব বাধা অতিক্রম করে বঙ্গভঙ্গ রদের ১০ বছরের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করতে পেরেছিল।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে এ দেশের হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্য থেকে স্বাধীনতার দাবি উচ্চারিত হতে থাকে। এ দেশের মানুষজন প্রথমে কংগ্রেসের পতাকাতলে সমবেত হয়ে স্বাধীনতার দাবি তোলে। অতঃপর ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য মুসলিম লীগ থেকে পৃথক আবাসভূমির দাবি ওঠে। হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলের কংগ্রেস নেতারা প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিমদের এ দাবিটির বিরোধিতা করলেও শেষ অবধি তাদের সে বিরোধিতা ফলপ্রসূ হয়নি।
১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে ভারতবর্ষে মুসলমানদের জন্য যে পৃথক আবাসভূমির কথা বলা হয়, সেখানে এক বা একের অধিক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উল্লেখ ছিল। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষ ভাগ করে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান নামক যে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়েছিল তা মূলত ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছিল। পূর্ব বাংলার মুসলমানরা জাতিগতভাবে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক হলেও ধর্মীয় জাতিসত্তাই প্রায় এক হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত ভারতবর্ষের দুটি পৃথক অঞ্চলকে একটি রাষ্ট্র কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিল। যা হোক পাকিস্তানের সে রাষ্ট্র কাঠামোটি বেশি দিন টেকেনি। ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান ২৩ বছরের মাথায় বিভাজিত হয়ে জাতিসত্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পত্তন ঘটায়।
১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভকারী দল আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা হস্তান্তর করা হলে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির সূত্রপাত নাও ঘটতে পারত। এ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ কর্তৃক যে ছয় দফা দেয়া হয়েছিল তা পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোকে স্বীকার করেই দেয়া হয়েছিল। নির্বাচনে বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা না পাওয়ার পেছনে তখনকার সামরিক শাসকরা যতটুকু না দায়ী ছিল, পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভকারী পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর দায় তার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।
বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম চলাকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে অন্তরীণ থাকলেও আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুর নামেই পরিচালিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু কেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হওয়ার পূর্বক্ষণে আত্মগোপনে গেলেন না অথবা ভারতে আশ্রয় গ্রহণপূর্বক মুক্তি সংগ্রাম বা স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনায় আগ্রহী ছিলেন না তা অনুধাবন করতে হলে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থটি অধ্যয়ন অত্যাবশ্যক। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ গ্রন্থটি প্রকাশে উদ্যোগী হওয়ার কারণে দেশবাসী অনেক অজানা তথ্যসহ বঙ্গবন্ধুর আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্ব কত প্রবল ছিল, সে বিষয়ে সম্যক ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে তার বাবাকে উদ্ধৃত করে উল্লেখ করা হয়েছে, আমার মনে হয় পাকিস্তান না আনতে পারলে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর বইটি পাঠান্তে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুকে ১৯৩৮ সালে, তিনি যখন ১৮ বছরের যুবক তখন গোপালগঞ্জের কিছু হিন্দু নেতা মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার, এ অভিযোগে জেলে যেতে বাধ্য করেছিলেন। হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানরা কীভাবে অবজ্ঞা ও উপেক্ষার শিকার তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন, একদিনের একটি ঘটনা আমার মনে দাগ কেটে দিয়েছিল, আজও সেটা ভুলি নাই। আমার এক বন্ধু ছিল ননী কুমার দাস। একসাথে পড়তাম, কাছাকাছি বাসা ছিল, দিনভরই আমাদের বাসায় কাটাত এবং গোপনে আমার সাথে খেতো। ও ওর কাকার বাড়ীতে থাকতো। একদিন ওদের বাড়ীতে যাই। ও আমাকে ওদের থাকার ঘরে নিয়ে যায়। ওর কাকিমাও আমাকে খুব ভালোবাসত। আমি চলে আসার কিছু সময়ের পর ননী কাঁদো কাঁদো অবস্থায় আমার বাসায় এসে হাজির। আমি বললাম ননী কি হয়েছে? ননী আমাকে বলল, তুই আর আমাদের বাসায় যাস না। কারণ, তুই চলে আসার পর কাকিমা আমাকে খুব বকেছে তোকে ঘরে আনার জন্য এবং সমস্ত ঘর আবার পরিষ্কার করেছে পানি দিয়ে ও আমাকেও ধুতে বাধ্য করেছে।
বঙ্গবন্ধুর আÍজীবনীমূলক গ্রন্থটির পাঠ থেকে জানা যায়, মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে তখনকার অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নির্দেশে এবং নিজ বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে কলকাতার দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমানদের জানমাল রক্ষায় তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ গণ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। শুধু তাই নয় দাঙ্গায় আক্রান্ত বিহারের মুসলিমদের উদ্ধারে তিনি পাটনায় ছুটে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে আহত
ও ক্ষতিগ্রস্তদের ট্রেনে করে আসানসোলে নিয়ে এসেছিলেন।
পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি সৃষ্টির জন্য যারা আন্দোলন করেছিলেন তাদের অধিকাংশই মুসলিম লীগের হয়ে কাজ করেছিলেন। পরবর্তীকালে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও আরও অন্যান্য দলের জন্ম হয়। বাংলাদেশের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ থাকলেও দলটির নেতারা নিজ দেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করে মুক্তি বা স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করতে পারেননি। এ কথা অনস্বীকার্য যে, আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রাম ভারতের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিসমাপ্ত না হলে আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রাম দীর্ঘায়ত হতো; তবে কত দিন বা কত মাস বা কত বছর দীর্ঘায়ত হতো তা বলা কঠিন।
আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দলগতভাবে মুসলিম লীগ ও জামায়াতের অবস্থান বঙ্গভঙ্গ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দর্শনের মতো ভারতের বিপক্ষে ছিল। আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন মুসলিম লীগ ও জামায়াতের বহু নেতা মুক্তিযোদ্ধাদের তথা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছিলেন। ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতে আমাদের পূর্ব বাংলার যেসব নেতা বঙ্গভঙ্গ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের উত্তরসূরিরাই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যে দর্শনের ভিত্তিতে বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল এবং ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়েছিল, সে দর্শন যদি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় ব্যর্থ হয়; তবে সে একই দর্শন ভারতের অখণ্ডতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। ভারতবিদ্বেষী বিএনপি ও জামায়াতের অনেক নেতাকে পাকিস্তানপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধী বলে আখ্যা দেয়া হয়। কিন্তু ইতিহাস অবলোকনে এ কথাটি ভুলে গেলে চলবে না, ভারত বিরোধিতা ও স্বাধীনতা বিরোধিতা এক নয়। ভারত বিরোধিতার কারণেই আমাদের পূর্বসূরিরা বঙ্গভঙ্গ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় এবং মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তিতে সফল হয়েছিলেন। এ সাফল্যের মধ্যে লুকিয়ে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ। তাই ভারতবিরোধীদের স্বাধীনতাবিরোধী বলা হলে তাতে আমাদের পূর্বসূরি যেসব নেতা বঙ্গভঙ্গ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় এবং পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের অবদান খাটো হয়ে যায়।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকরা হিন্দু শাসকদের পরাভূত করে এ দেশের শাসনক্ষমতা দখল করায় ইংরেজ শাসকরা এ দেশে তাদের শাসনক্ষমতার সূচনা ও বিস্তারে হিন্দুদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছিলেন। ইংরেজদের শাসনকালের সূচনালগ্ন থেকেই হিন্দুরা ইংরেজি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাতে থাকলে চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য উভয় ক্ষেত্রে তারা এ দেশের অপর ধর্মীয় সম্প্রদায় মুসলমানদের চেয়ে প্রাধান্য পেতে থাকে। এ দেশের মুসলমানদের ইংরেজ শাসনের প্রথমদিকে ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রে অনীহা থাকলেও তাদের শাসনের শেষ দিকে সেই অনীহাভাব ছিল না।
ইংরেজ শাসনামলে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলায়ও হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস ছিল; তবে বাংলার পশ্চিমাংশ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, অপরদিকে বাংলার পূর্বাংশ অর্থাৎ পূর্ব বাংলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। ইংরেজ শাসনামলে কলকাতা বাংলার রাজধানী ছিল। সে সময় কলকাতাকে কেন্দ্র করেই কলকারখানা গড়ে উঠেছিল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। ইংরেজ শাসনামলে পূর্ব বাংলার অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল। এতদাঞ্চলে কোনো শিল্পকারখানা গড়ে না উঠায় এবং পূর্ব বাংলার মানুষ, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায় শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসায় হিন্দুদের চেয়ে পশ্চাৎপদ হওয়ায় এ অঞ্চলের মুসলিম নেতাদের মধ্য থেকে বাংলা ও আসাম সমন্বয়ে পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল গঠনের দাবি ওঠে। উভয় বাংলার হিন্দু নেতারা প্রথম থেকেই এ দাবির বিরোধিতা করতে থাকেন। কিন্তু পূর্ব বাংলার মুসলমানদের অনগ্রসরতার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চলের দাবিটি ইংরেজদের কাছে যৌক্তিক বিবেচিত হলে তারা পূর্ব বাংলা ও আসাম সমন্বয়ে একটি পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল সৃষ্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইংরেজদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯০৫ সালে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ব বাংলা ও আসাম সমন্বয়ে একটি প্রশাসনিক অঞ্চল গঠন করা হয়। এ অঞ্চলটি তাত্ত্বিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বাংলার নেতৃস্থানীয় এবং পূর্ব বাংলার কিছু হিন্দু নেতা তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতাকারী হিন্দু নেতাদের অন্যতম ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার বড় ভাইয়ের কন্যাজামাতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র। বঙ্গভঙ্গ রবীন্দ্রনাথকে এতই ব্যথিত ও মর্মাহত করেছিল যে, ক্ষোভ, দুঃখ, অপমান ও অভিমানে বাংলার অখণ্ডতাকে অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়াসে বঙ্গভঙ্গের বছর অর্থাৎ ১৯০৫ সালে তিনি আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি এ গানটি রচনা করেন।
উভয় বাংলার নেতৃস্থানীয় হিন্দুদের আন্দোলন ও বিরোধিতার কারণে বঙ্গভঙ্গ স্থিতিশীল হতে পারেনি এবং এতদাঞ্চলের মুসলমানদের চরম হতাশা ও ক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ইংরেজরা ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করে। বঙ্গভঙ্গ রদের কারণে এতদাঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে যে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল তা প্রশমনে ইংরেজরা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইংরেজদের এ সিদ্ধান্তটিও রবীন্দ্রনাথসহ হিন্দু নেতাদের বাধার সম্মুখীন হয়। যাহোক সব বাধা অতিক্রম করে বঙ্গভঙ্গ রদের ১০ বছরের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করতে পেরেছিল।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে এ দেশের হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্য থেকে স্বাধীনতার দাবি উচ্চারিত হতে থাকে। এ দেশের মানুষজন প্রথমে কংগ্রেসের পতাকাতলে সমবেত হয়ে স্বাধীনতার দাবি তোলে। অতঃপর ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য মুসলিম লীগ থেকে পৃথক আবাসভূমির দাবি ওঠে। হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলের কংগ্রেস নেতারা প্রাথমিক পর্যায়ে মুসলিমদের এ দাবিটির বিরোধিতা করলেও শেষ অবধি তাদের সে বিরোধিতা ফলপ্রসূ হয়নি।
১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে ভারতবর্ষে মুসলমানদের জন্য যে পৃথক আবাসভূমির কথা বলা হয়, সেখানে এক বা একের অধিক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উল্লেখ ছিল। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষ ভাগ করে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান নামক যে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়েছিল তা মূলত ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতেই গঠিত হয়েছিল। পূর্ব বাংলার মুসলমানরা জাতিগতভাবে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক হলেও ধর্মীয় জাতিসত্তাই প্রায় এক হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত ভারতবর্ষের দুটি পৃথক অঞ্চলকে একটি রাষ্ট্র কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিল। যা হোক পাকিস্তানের সে রাষ্ট্র কাঠামোটি বেশি দিন টেকেনি। ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান ২৩ বছরের মাথায় বিভাজিত হয়ে জাতিসত্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পত্তন ঘটায়।
১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভকারী দল আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা হস্তান্তর করা হলে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির সূত্রপাত নাও ঘটতে পারত। এ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ কর্তৃক যে ছয় দফা দেয়া হয়েছিল তা পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোকে স্বীকার করেই দেয়া হয়েছিল। নির্বাচনে বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা না পাওয়ার পেছনে তখনকার সামরিক শাসকরা যতটুকু না দায়ী ছিল, পাকিস্তানের পশ্চিমাংশে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভকারী পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর দায় তার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না।
বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম চলাকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে অন্তরীণ থাকলেও আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুর নামেই পরিচালিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু কেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হওয়ার পূর্বক্ষণে আত্মগোপনে গেলেন না অথবা ভারতে আশ্রয় গ্রহণপূর্বক মুক্তি সংগ্রাম বা স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনায় আগ্রহী ছিলেন না তা অনুধাবন করতে হলে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থটি অধ্যয়ন অত্যাবশ্যক। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ গ্রন্থটি প্রকাশে উদ্যোগী হওয়ার কারণে দেশবাসী অনেক অজানা তথ্যসহ বঙ্গবন্ধুর আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্ব কত প্রবল ছিল, সে বিষয়ে সম্যক ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে তার বাবাকে উদ্ধৃত করে উল্লেখ করা হয়েছে, আমার মনে হয় পাকিস্তান না আনতে পারলে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর বইটি পাঠান্তে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুকে ১৯৩৮ সালে, তিনি যখন ১৮ বছরের যুবক তখন গোপালগঞ্জের কিছু হিন্দু নেতা মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার, এ অভিযোগে জেলে যেতে বাধ্য করেছিলেন। হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানরা কীভাবে অবজ্ঞা ও উপেক্ষার শিকার তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন, একদিনের একটি ঘটনা আমার মনে দাগ কেটে দিয়েছিল, আজও সেটা ভুলি নাই। আমার এক বন্ধু ছিল ননী কুমার দাস। একসাথে পড়তাম, কাছাকাছি বাসা ছিল, দিনভরই আমাদের বাসায় কাটাত এবং গোপনে আমার সাথে খেতো। ও ওর কাকার বাড়ীতে থাকতো। একদিন ওদের বাড়ীতে যাই। ও আমাকে ওদের থাকার ঘরে নিয়ে যায়। ওর কাকিমাও আমাকে খুব ভালোবাসত। আমি চলে আসার কিছু সময়ের পর ননী কাঁদো কাঁদো অবস্থায় আমার বাসায় এসে হাজির। আমি বললাম ননী কি হয়েছে? ননী আমাকে বলল, তুই আর আমাদের বাসায় যাস না। কারণ, তুই চলে আসার পর কাকিমা আমাকে খুব বকেছে তোকে ঘরে আনার জন্য এবং সমস্ত ঘর আবার পরিষ্কার করেছে পানি দিয়ে ও আমাকেও ধুতে বাধ্য করেছে।
বঙ্গবন্ধুর আÍজীবনীমূলক গ্রন্থটির পাঠ থেকে জানা যায়, মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা হিসেবে তখনকার অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নির্দেশে এবং নিজ বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে কলকাতার দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমানদের জানমাল রক্ষায় তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ গণ্য করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। শুধু তাই নয় দাঙ্গায় আক্রান্ত বিহারের মুসলিমদের উদ্ধারে তিনি পাটনায় ছুটে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে আহত
ও ক্ষতিগ্রস্তদের ট্রেনে করে আসানসোলে নিয়ে এসেছিলেন।
পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি সৃষ্টির জন্য যারা আন্দোলন করেছিলেন তাদের অধিকাংশই মুসলিম লীগের হয়ে কাজ করেছিলেন। পরবর্তীকালে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও আরও অন্যান্য দলের জন্ম হয়। বাংলাদেশের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ থাকলেও দলটির নেতারা নিজ দেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করে মুক্তি বা স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করতে পারেননি। এ কথা অনস্বীকার্য যে, আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রাম ভারতের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিসমাপ্ত না হলে আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রাম দীর্ঘায়ত হতো; তবে কত দিন বা কত মাস বা কত বছর দীর্ঘায়ত হতো তা বলা কঠিন।
আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দলগতভাবে মুসলিম লীগ ও জামায়াতের অবস্থান বঙ্গভঙ্গ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দর্শনের মতো ভারতের বিপক্ষে ছিল। আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন মুসলিম লীগ ও জামায়াতের বহু নেতা মুক্তিযোদ্ধাদের তথা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছিলেন। ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতে আমাদের পূর্ব বাংলার যেসব নেতা বঙ্গভঙ্গ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের উত্তরসূরিরাই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যে দর্শনের ভিত্তিতে বঙ্গভঙ্গ হয়েছিল এবং ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়েছিল, সে দর্শন যদি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় ব্যর্থ হয়; তবে সে একই দর্শন ভারতের অখণ্ডতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। ভারতবিদ্বেষী বিএনপি ও জামায়াতের অনেক নেতাকে পাকিস্তানপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধী বলে আখ্যা দেয়া হয়। কিন্তু ইতিহাস অবলোকনে এ কথাটি ভুলে গেলে চলবে না, ভারত বিরোধিতা ও স্বাধীনতা বিরোধিতা এক নয়। ভারত বিরোধিতার কারণেই আমাদের পূর্বসূরিরা বঙ্গভঙ্গ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় এবং মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তিতে সফল হয়েছিলেন। এ সাফল্যের মধ্যে লুকিয়ে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ। তাই ভারতবিরোধীদের স্বাধীনতাবিরোধী বলা হলে তাতে আমাদের পূর্বসূরি যেসব নেতা বঙ্গভঙ্গ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় এবং পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের অবদান খাটো হয়ে যায়।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
Subscribe to:
Posts (Atom)
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2065)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
বিনোদন
শেষের পাতা
ক্রিকেট খেলা
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
দেশে দেশে
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
আমার দেশ
ইসরায়েল
ফুটবল খেলা
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
ফিলিস্তিন
Lead
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
ইরান
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
কালবেলা
সারা দেশ
চট্টগ্রাম
বিশাল বাংলা
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
মুসলিম
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
জাতিসংঘ
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
রাশিয়া
সাক্ষাৎকার
মুক্তিযুদ্ধ
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
ইউরোপ
খেলা ধুলা
সৌদি আরব
ছাত্রলীগ
ইতিহাস
প্রতিবেদন
জামায়াতে ইসলামী
সোহরাব হাসান
অমানবিক
পশ্চিমবঙ্গ
আলোকিত চট্টগ্রাম
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
জাতীয় সংসদ
নারী ধর্ষণ
আনন্দ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
আফ্রিকা
মাদক
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
সংখ্যালঘু
প্রবাস
ছুটির দিনে
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
তুরস্ক
সৈয়দ আবুল মকসুদ
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
আফগানিস্তান
গোল্লাছুট
বইপত্র
অন্য আলো
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ইউক্রেন
ব্যবসা বাণিজ্য
দুর্ঘটনা
অপহরণ
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
স্বাস্থ্য
ফূটবল খেলা
হিন্দু
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
নেপাল
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
জ্যোতির্বিজ্ঞান
সড়ক দুর্ঘটনা
আলী রীয়াজ
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
রংপুর
Exclusive
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
শিল্প ও সাহিত্য
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
কক্সবাজার
এ এম এম শওকত আলী
ঢাকা
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
গবেষণা
বাংলাদেশ
মিসর
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
শোক
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
সংস্কৃতি
ইয়েমেন
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
শুভ্র দেব
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
ফ্রান্স
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
জীবনযাপন
কিশোরগঞ্জ
লেবানন
আবদুল মান্নান
জাপান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
কুমিল্লা
শিল্প
মুক্তমত
মাহমুদুর রহমান
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
পার্বত্য চট্টগ্রাম
ময়মনসিংহ
সংবাদ২৪.নেট
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
ইরাক
কাজের খবর
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
যশোর
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
চিকিৎসা
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
কলকাতা
মেহেদী হাসান
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
তথ্য প্রযুক্তি
বরগুনা
আনু মুহাম্মদ
কাজী সোহাগ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
স্মৃতিচারণ
কুলদীপ নায়ার
ব্রাজিল
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
মারুফ কিবরিয়া
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
মসজিদ
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
বরিশাল
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
রোকনুজ্জামান পিয়াস
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
রণজিৎ বিশ্বাস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
উত্তর কোরিয়া
একরামুল হক
জলবায়ু ও পরিবেশ
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
তুহিন ওয়াদুদ
কালি ও কলম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
জনস্বাস্থ্য
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
কুষ্টিয়া
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
জাতীয় নাগরিক পার্টি
ঝিলিমিলি
নিবন্ধ
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
উচ্চশিক্ষা
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
প্রযুক্তি
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
আদিবাসী
গোলাম মর্তুজা
দিল্লি
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
কাতার
কালের খেয়া
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
ঝড় ও দুর্যোগ
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
শিশির মোড়ল
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
হুমায়ূন আহমেদ
আবুল হাসনাত
আল আমিন
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
হারুন হাবীব
অমিত বসু
ওমর ফারুক
জার্মানি
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
লাতিন আমেরিকা
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
আরব আমিরাত বা দুবাই
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
ব্যবসা
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
ইসলাম
এবনে গোলাম সামাদ
দক্ষিণ কোরিয়া
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
লিবিয়া
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
আসজাদুল কিবরিয়া
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
Hot Topic
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
জোহরান মামদানি
Fantastic
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
মহাকাশচারী
নিয়ন আলোয়
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
ইতালি
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
নরসিংদী
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
জলবায়ু পরিবর্তন
ঝালকাঠি
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
যৌন অপরাধ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
কিশোর আলো
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
WikiInterview
আকবর হোসেন
ইসলামী ছাত্রশিবির
ইহুদি
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
চুয়াডাঙ্গা
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
ধর্মঘট
স্পেন
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গণমাধ্যম
গদ্যকার্টুন
পিরোজপুর
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
প্রবাসী শ্রমিক
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
শিশুমৃত্যু
সুশাসনের জন্য নাগরিক
সোমালিয়া
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কলম্বিয়া
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
চিঠিপত্র
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
বেলজিয়াম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
হংকং
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কুয়েত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চুক্তি
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বন্য প্রাণী
বিশ্বকাপ ফুটবল
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সমাজ
সামাজ
সুজন সুপান্থ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
ওমান
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
জঙ্গি
জর্দান
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শেরপুর
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সিঙ্গাপুর
সুইডেন
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
আহমেদ মুনির
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
রাজবাড়ী
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অমানবিকতা
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
পোল্যান্ড
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আলজেরিয়া
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রিস
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নীহারুল ইসলাম
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রকিব হাসান
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট