Tuesday, August 18, 2026
ইরান ও ইউক্রেন যেভাবে সমুদ্রপথে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করছে by ওমর আশুর
সাম্প্রতিক সময়ের হামলা ও পাল্টা হামলা এই বাস্তবতা তৈরি করেনি, বরং এটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ওয়াশিংটন হয়তো এখন স্থলভাগে সেনা অভিযান, ইরানের বিদ্যুৎ-জ্বালানির মতো জরুরি অবকাঠামোতে হামলা, কিংবা ইসফাহান প্রদেশের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর গভীরে লুকিয়ে থাকা পরমাণু কেন্দ্রে আঘাত হেনে সংঘাত বাড়াতে পারে।
এসব পদক্ষেপে ইরানের ব্যাপক ক্ষতি হবে এবং যুদ্ধও ছড়াবে, সন্দেহ নেই। তবে এতে সমুদ্রজুড়ে ছড়িয়ে রাখা ইরানের নৌ প্রতিরক্ষাব্যূহ ধসে পড়বে না, কিংবা প্রণালি হিসেবে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্বও কমবে না।
গত মাসেই তেহরানে দেখা গেছে এই যুদ্ধের এক রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবন। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল শোক পালনের অনুষ্ঠান ছিল না; ভয়াবহ হামলা, শীর্ষ নেতৃত্ব হারানো আর বোমাবর্ষণের পর ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধারাবাহিকতা কতখানি বজায় রাখতে পেরেছে, এটি ছিল তারই এক শক্তি প্রদর্শন।
এই টিকে থাকার শক্তি কেবল সমুদ্র তৈরি করেনি, তবে সমুদ্র সেই শক্তিকে ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নিজের আকাশসীমা সুরক্ষিত না থাকা সত্ত্বেও ইরান পশ্চিমাদের ভারী আক্রমণ হজম করতে পেরেছে একটি বড় কারণে—সমুদ্রে তাদের একটি জবরদস্তিমূলক দর-কষাকষির ক্ষমতা ছিল। আকাশে চালানো প্রতিটি হামলার একটি বিশাল মূল্য দিতে হবে ওয়াশিংটন, উপসাগরীয় রাজধানী, বিমা কোম্পানি ও বিশ্ব জ্বালানির বাজারকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশাসন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে বিষের পেয়ালায় চুমুক দিতে বাধ্য করতে পারেনি—যেমনটা একসময় রুহুল্লাহ খোমেনি করেছিলেন।
দেখা গেল, ট্রাম্প নিজেই নিজের তৈরি করা ফাঁদে পড়েছেন। ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা শতভাগ ধ্বংস করা হয়েছে’—নিজের এই অসত্য দাবির পর একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি পিছু হটেছেন। ইরানের সঙ্গে ১৪ দফার যে মধ্যবর্তী চুক্তি হলো, তা কিন্তু ওয়াশিংটনের কাছে তেহরানের আত্মসমর্পণ নয়; বরং এটি ছিল সমুদ্রের এক কঠিন বাস্তবতার কূটনৈতিক রূপান্তর।
একে হয়তো চিরাচরিত অর্থে কোনো ‘জয়’ বলা যাবে না। তবে এটি ছিল ওয়াশিংটনের যুদ্ধচেষ্টাকে কৌশলগতভাবে নস্যাৎ করে দিয়ে নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর এক নিখুঁত উদাহরণ।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানশক্তি ইরানের বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করতে পেরেছে, অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে, শীর্ষ সামরিক কর্তাদের হত্যা করেছে। কিন্তু সরকার পতন, ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা কিংবা পুরোপুরি সামরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো উদ্দেশ্যগুলো অর্জিত হয়নি।
ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী ‘অরতেশ’-এর পদাতিক শক্তিতে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরেনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ইরান তাদের সামরিক কাঠামোর যে অংশকে সুরক্ষিত আকাশের ওপর নির্ভর না করে তৈরি করেছিল—অর্থাৎ তাদের উপকূলীয় নৌ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনব্যবস্থা—তা তার সামরিক কার্যকারিতা ও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার ক্ষমতা, দুটোই অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
ইতিহাসের শিক্ষা
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যে কতটা বিপজ্জনক, ইতিহাস তা বহুবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে হ্যানয়ে এক মার্কিন কর্নেল হ্যারি জি সামারস জুনিয়র তাঁর উত্তর ভিয়েতনামি প্রতিপক্ষকে বলেছিলেন, ‘তোমরা কিন্তু আমাদের যুদ্ধের ময়দানে কখনোই হারাতে পারোনি।’
উত্তর ভিয়েতনামের কর্নেল টু এর উত্তর দিয়েছিলেন খুব সংক্ষেপে, ‘কথাটা সত্যি হতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিকতাহীন।’
২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধের যেকোনো মূল্যায়নে কথোপকথনটি বড় এক শিক্ষা হয়ে ওঠার কথা। এ কথার পেছনের যুক্তি খুব সহজ, আকাশপথে আপনি কতটা একচ্ছত্র আধিপত্য দেখাচ্ছেন, তা দিয়ে যুদ্ধ জয় নিশ্চিত হয় না, যদি না আপনি শত্রুর কৌশলগত অবস্থান ও তার মানসিক শক্তিতে ফাটল ধরাতে পারেন।
একই কথা সমুদ্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ১৯৮০-এর দশকের ট্যাংকার যুদ্ধের কথা ধরা যাক। সাত বছরের রক্তক্ষয়ী ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরান যখন এমনিতেই ক্লান্ত, ঠিক তখন আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে একাধিক অভিযানের মাধ্যমে—আর্নেস্ট উইল, প্রাইম চ্যান্স, নিম্বল আর্চার এবং সর্বশেষ প্রেয়িং ম্যান্টিস।
১৯৮৮ সালের এপ্রিলে এক দিনের অভিযানে মার্কিন বাহিনী মূল ইরানি নৌসম্পদ ও তেল প্ল্যাটফর্মের কমান্ড পোস্টগুলো ধ্বংস করে এক বিরাট জয় পেয়েছিল। কিন্তু সেই জয় এসেছিল এক অভিজ্ঞতাশূন্য, ক্লান্ত ইরানি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ এসকর্ট, মাইন অপসারণ ও আক্রমণের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল।
সেগুলো ছিল শাসনক্ষমতা বদলানোর মতো বড় উদ্দেশ্যের তুলনায় অনেকটাই সীমিত এবং এক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত মিশন।
কিন্তু আজকের পরিস্থিতি মার্কিন বাহিনীর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান তাদের নৌশক্তিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। একদিকে নিয়মিত নৌবাহিনী ‘নেদাজা’, যারা গভীর সমুদ্রে নিজেদের অবস্থান জাহির করতে চায়; অন্যদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী ‘নেদসা’, যারা পারস্য উপসাগরকে এক কঠিন ও অনিশ্চিত রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
নেদাজা মূলত একটি প্রথাগত ও মর্যাদার নৌবাহিনী। কিন্তু নেদসা হলো এমন এক ব্যবস্থা, যা শত্রু প্রতিরোধ, হয়রানি, ধোঁয়াশা ও কৌশলগত কার্যকারিতার জন্য তৈরি।
প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ের মতো ভৌগোলিক অবস্থানও এক নিরপেক্ষ ব্যাপার। এটা বন্ধু বা শত্রু, যে কারোর কাজেই লাগতে পারে। কিন্তু কৌশল, কাজের পদ্ধতি, যুদ্ধ উপকরণের অভিযোজন এবং কমান্ড কালচার দিয়ে সেই ভূগোলকে কতটা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়। ইরান এ শিক্ষা আকাশের চেয়ে সমুদ্রেই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে।
এগুলো কোনো বিমানবাহী রণতরি নয়। এগুলো হলো সমুদ্রে বসানো একেকটি অদম্য দুর্গ এবং অনিশ্চয়তা তৈরির কারখানা।
সমুদ্রের দাবার চাল
ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে সমুদ্রের লড়াই স্থলযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া হাতছাড়া হওয়ার পর ইউক্রেন তাদের নৌসম্পদের বড় অংশ হারায়, আর ২০২২ সালের মধ্যে তাদের প্রথাগত কোনো নৌবাহিনীই অবশিষ্ট ছিল না।
তা সত্ত্বেও ইউক্রেন উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইল, বিশেষ অভিযান, ড্রোন বোট এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভর করে কৃষ্ণসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশকে রাশিয়ার জন্য এক নিষিদ্ধ এলাকায় পরিণত করে।
এর ফলাফল শুধু কৌশলগত নয়, ছিল সুদূরপ্রসারী। ইউক্রেন রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে তাদের সেভাসতোপোল ঘাঁটি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এতে রাশিয়ার অবাধ নৌ চলাচল বন্ধ হয়েছে এবং ইউক্রেন ওদেসা বন্দর দিয়ে নিজেদের পণ্য রপ্তানি পথ আবার চালু করতে পেরেছে।
মূলত সাগরে সম্পূর্ণ আধিপত্য না থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেন রাশিয়ার বড় বড় উদ্দেশ্য—যেমন ইউক্রেনকে অবরুদ্ধ করা, ওদেসায় চাপ সৃষ্টি করা এবং ক্রিমিয়াকে সুরক্ষিত রাখা—ব্যর্থ করে দিতে পেরেছে।
ইরানের উপসাগরীয় রণকৌশলও ঠিক আমেরিকার বিরুদ্ধে এই একই ব্যবস্থার এক রূপ। তেহরানের উদ্দেশ্য মার্কিন নৌবাহিনীকে সম্মুখযুদ্ধে হারানো নয়। তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বিশাল শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে এসেও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে হেরে যেতে পারে।
এ থেকে শিক্ষা স্পষ্ট, দুর্বল শক্তির জন্য সমুদ্রকে অবরুদ্ধ করা কেবল এক বিকল্প পথ নয়, এটিই এখন যুদ্ধ জয়ের বড় অস্ত্র। কৃষ্ণসাগরে এই কৌশল ব্যবহার করে ইউক্রেন যেমন এক পরাশক্তিকে রুখে দিয়েছে, ঠিক তেমনি উপসাগরে ইরানও কোনো বড় নৌযুদ্ধ না জিতেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
অবশ্য ইউক্রেন ও ইরানের ঘটনা হুবহু এক নয়। ইউক্রেন সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে এবং বাণিজ্যপথ সচল রাখতে এসব ব্যবহার করেছে। আর ইরান তা ব্যবহার করেছে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে—বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে, বিমা মাশুল বাড়াতে এবং ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দিতে যে বিমান হামলার একটা বড় আর্থিক মূল্য সমুদ্রেই চোকাতে হবে।
ইরানের এই পথ কোনো প্রথাগত নৌসংগ্রাম নয়; এটি হলো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে নৌ অবরোধের এক চতুর মিশ্রণ।
পরিস্থিতি তাই এক বড় বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ইরান হয়তো আকাশে অনেক লড়াইয়ে হেরেছে, কিন্তু সমুদ্রের কারণে তাদের কৌশলগত দর-কষাকষির ক্ষমতা কমেনি। যুক্তরাষ্ট্র আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখালেও সমুদ্রকে অপ্রাসঙ্গিক করতে পারেনি।
ইউক্রেন বিশ্বকে দেখিয়েছে, নৌবহর না নিয়েও একটি বিশাল নৌবাহিনীকে ঠেকিয়ে দেওয়া যায়। আর ইরান দেখিয়ে দিল, একটি বড় নৌযুদ্ধ না জিতেও কীভাবে এক পরাশক্তির মূল উদ্দেশ্যগুলোকে সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দেওয়া যায়।
* ড. ওমর আশুর, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
![]() |
| হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌযানের টহল। ফাইল ছবি: এএফপি |
Thursday, July 30, 2026
ইউক্রেনে পাল্টা হামলার পরিকল্পনা করেছিল ইরান
গত শনিবার কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ওই হামলায় ইরানের এক বেসামরিক নাবিকও নিহত হন। এর পরদিনই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইউক্রেনের এই পদক্ষেপকে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান যে এই ঘটনা ‘জবাবহীন রাখা সম্ভব নয়।’
পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, ইরান হয়তো বড় ধরনের ক্ষতি না করে একটি প্রতীকী জবাব দিতে ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরে কম ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়ারহেডযুক্ত ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি ইরান থেকে ইউক্রেন ভূখণ্ডে যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনাকে আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বড় ধরনের যুদ্ধের রূপ দিতে পারত।
কূটনৈতিক তৎপরতায় বরফ গলার ইঙ্গিত
তবে চরম সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার ইউক্রেনীয় কূটনীতিকদের উদ্যোগে আলোচনা শুরু হলে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সাথে টেলিফোনে কথা বলেন। ফোনালাপের পর ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সিবিহা কাস্পিয়ান সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাটিকে ‘অনিচ্ছাকৃত ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ফোনালাপ প্রসঙ্গে আরাঘচি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেন, ‘ইরানও সংঘাত বৃদ্ধি করতে চায় না, তবে আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি যে আমাদের নাগরিক বা স্বার্থের ওপর যেকোনো হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এই ঘটনার সঠিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’ পরবর্তীতে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কাল্লাসের সাথেও আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেহেদী রহমতি জানান, ইরানি সরকারের একটি অংশ শুরুতেই ইউক্রেনের ওপর পাল্টা সামরিক হামলার বিরোধিতা করেছিল। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেন কোনো ছোট বা দুর্বল দেশ নয়। তাদের সামরিক অভিজ্ঞতা আছে এবং তারা আমেরিকা ও ইউরোপের লজিস্টিক সহায়তা পাচ্ছে। নতুন একটি যুদ্ধের ফ্রন্ট তৈরি করে ইরানের কোনো লাভ হবে না।’
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও রাশিয়ার ভূমিকা:
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারস্য উপসাগরীয় ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপের পর রাশিয়ার সাথে কাস্পিয়ান সাগর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও রসদ সরবরাহ তেহরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সময়ে, রাশিয়ার কাছে ইরানি ড্রোন বিক্রির অভিযোগ এনে কিয়েভ দীর্ঘদিন ধরেই তেহরানের ওপর ক্ষুব্ধ।
ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে এক বৈঠকে অংশ নেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সেখানে জেলেনস্কি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের নজরদারির সুবিধার্থে রাশিয়া কর্তৃক স্যাটেলাইট ছবি সরবরাহের বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্পের কাছে উপস্থাপন করেন বলে জানা গেছে।
আপাতত দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আলোচনার মাধ্যমে রক্তক্ষয়ী পাল্টা আক্রমণের হুমকি এড়ানো গেলেও, অঞ্চলটির বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই ক্ষণস্থায়ী শান্তি কতদিন স্থায়ী হবে—তা নিয়ে সংশয় কাটেনি।

Friday, July 24, 2026
ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করল রাশিয়া
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে লাভরভ রুবিওকে জানান, কিয়েভ সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রায় আধাঘণ্টার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে ভালো ও খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। তবে আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করেননি তিনি।
ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের মাধ্যমে অস্ত্র বিক্রি করে এবং এ নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
গত বছর চালু হওয়া একটি কর্মসূচির আওতায় ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা সামরিক সরঞ্জাম ইউক্রেনকে সরবরাহ করতে পারে।
রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন এখনো যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তার ভাষায়, আমরা শান্তিচুক্তি চাই। আমরা চাই যুদ্ধের অবসান হোক। তবে এমন একটি সমাধান প্রয়োজন, যাতে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই সম্মত হতে পারে। এজন্য আরও অনেক কাজ করতে হবে।
অন্যদিকে, রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে লাভরভ বলেন, ইউক্রেন সংকটের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানে মস্কো এখনো প্রস্তুত রয়েছে।
বৈঠকের কিছুক্ষণ আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, স্থবির হয়ে পড়া শান্তি প্রচেষ্টা পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে এসব হামলা যুদ্ধের অবসান ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হতে পারে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার অগ্রযাত্রা কিছুটা ধীর করতে সক্ষম হয়েছে এবং একই সঙ্গে রুশ ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কমে যাওয়ার সুযোগে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও জোরদার করেছে রাশিয়া।
বৃহস্পতিবার রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে তিনজন নিহত হন। একই দিনে রাশিয়া ও রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের হামলায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় আসে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইরানবিরোধী হামলার নিন্দা জানিয়েছে মস্কো।
![]() |
| বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার আলোচকবৃন্দ। ছবি : সংগৃহীত |
Friday, June 12, 2026
প্রথম বিশ্বযুদ্ধকেও ছাড়িয়ে গেল রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত
গত বৃহস্পতিবার সেই অচিন্তনীয় বিষয়টিই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ আজ ১,৫৬৯তম দিনে পদার্পণ করেছে, অর্থাৎ এই সংঘাত ৪ বছর ৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এর মাধ্যমে স্থায়িত্বের দিক থেকে এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে পেছনে ফেলে দিল।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেনে সেনা পাঠিয়েছিলেন, তখন তার ধারণা ছিল মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দেশটির পতন ঘটবে। কিন্তু ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ সেনাদের প্রতিহত করার পর যখন এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রূপ নেয়, তখন খোদ যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা লড়াকু সৈনিকেরাও ভাবেননি যে এই সংঘাত এতটা দীর্ঘ হবে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের ছদ্মনাম ‘ফ্রান্স’ ব্যবহার করা এক ইউক্রেনীয় সেনা বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম বড়জোর দুই বা তিন বছর চলবে, তারপর রাজনীতিবিদরা কোনো একটি সমঝোতায় পৌঁছাবেন।’
কিন্তু যুদ্ধ থামেনি। শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় অদূর ভবিষ্যতে এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণও নেই। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ইউক্রেনীয় বিশ্বাস করেন যে আগামী বছরের আগে এই যুদ্ধ শেষ হবে না। আর তেমনটা হলে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বের (৬ বছর) কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। অনেক ইউক্রেনীয় অবশ্য মনে করেন, এই যুদ্ধ আসলে ২০১৪ সালেই শুরু হয়েছিল, যখন রুশ সেনারা ক্রিমিয়া দখল করে নেয়।
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে দুই যুদ্ধের প্রভাব
ইতিহাসবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে এই সংঘাতের হুবহু তুলনা করার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্বযুদ্ধের পরিধি ছিল বৈশ্বিক এবং সেখানে একাধিক যুদ্ধক্ষেত্র ও বিশাল সেনাবাহিনী জড়িত ছিল, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির তুলনা করা কঠিন। তাছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
তবুও, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো ইউক্রেন যুদ্ধও আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে মনে করেন ইউক্রেনীয় ইতিহাসবিদ ইয়ারোস্লাভ রিৎসাক। দুটি যুদ্ধই সামরিক জোটের পুনর্গঠন এবং গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর মাধ্যমে ইউরোপের ভূরাজনীতিকে বদলে দিয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, উভয় যুদ্ধই প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে যুদ্ধকৌশলের ধরন বদলে দিয়েছে। এক শতাব্দী আগে যেখানে যুদ্ধবিমান এবং ট্যাঙ্কের আবির্ভাব ঘটেছিল, আজ সেখানে আকাশ, সমুদ্র এবং স্থলে ড্রোনের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। দুই ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির এই অগ্রগতি মানুষের জন্য যুদ্ধকে আরও বেশি নির্মম করে তুলেছে।
ফরাসি সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল ও সামরিক ইতিহাসবিদ মিশেল গোয়া বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই ইউক্রেনের এই যুদ্ধটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।’
শুরুর ধাক্কা থেকে ট্রেন্স যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি
উভয় যুদ্ধের শুরুর দিকের কৌশলে দারুণ মিল রয়েছে। ১৯১৪ সালে জার্মানি দ্রুত প্যারিস দখলের উদ্দেশ্যে একটি ঝটিকা অভিযান শুরু করেছিল। ২০২২ সালে কিয়েভ অভিমুখে রাশিয়ার অভিযানের উদ্দেশ্যও ছিল একই। দুই ক্ষেত্রেই আক্রমণকারীরা লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
পরবর্তীতে দুটি যুদ্ধই একটি স্থবির ও প্রায় হিমায়িত ফ্রন্টলাইনে পরিণত হয়। ২০২২ সালের শেষের দিকে যখন ইউক্রেনীয় সেনারা পরিখা এবং বাঙ্কারে অবস্থান নেয়, তখন ইতিহাসবিদরা একে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আমলের 'ট্রেঞ্চ ওয়ারফেয়ার'-এর প্রত্যাবর্তন হিসেবে আখ্যা দেন।
পূর্ব ইউক্রেনের পরিখাগুলোর দৃশ্য এক শতাব্দী আগের উত্তর ফ্রান্সের যুদ্ধক্ষেত্রের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল। ইউক্রেনীয় এবং রুশ সেনারা মাত্র কয়েকশ গজ দূরত্বে অবস্থান করত, কখনও কখনও একে অপরকে দেখাও যেত। তীব্র কামানের গোলাবর্ষণের মাধ্যমে শত্রুকে কোণঠাসা করে পদাতিক বাহিনী দিয়ে পরিখা দখল করাই ছিল প্রধান কৌশল।
মিশেল গোয়া বলেন, ‘সাধারণত ফ্রন্টলাইন যখন স্থবির হয়ে যায়, তখন আপনি আবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধেই ফিরে যান।’ তিনি আরও যোগ করেন, কামানের গোলার তীব্রতার কারণেই মূলত দুই পক্ষ পরিখা খনন করতে বাধ্য হয়। ‘নিজেকে বাঁচাতে আপনাকে মাটির নিচে লুকিয়ে যেতেই হবে।’
ড্রোন যুগের আগমন: বদলে যাওয়া রণকৌশল
ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পরিখার সেই চেনা সমীকরণটি বদলে গেছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ড্রোনের নজরদারি এবং নিখুঁত হামলার কারণে উন্মুক্ত পরিখাগুলো এখন আর নিরাপদ নয়।
ইউক্রেনীয় সেনারা জানিয়েছেন, এখন টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো আরও ছোট এবং আরও গভীরে অবস্থান নেওয়া। বিশাল পরিখা ব্যবস্থার পরিবর্তে সেনারা এখন এমন ছোট ডাগআউট বা বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছে যেখানে মাত্র কয়েকজন সেনা থাকতে পারে। এই বাঙ্কারগুলো আকাশ থেকে সহজে চেনা যায় না এবং বোমার আঘাত সহ্য করার মতো গভীর।
ড্রোনের আধিপত্যের কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো মুখোমুখি পরিখা ব্যবস্থার পরিবর্তে এখন মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত একটি ‘কিল জোন’ তৈরি হয়েছে। এই জোনের মধ্যে যেকোনো ধরনের নড়াচড়া দেখলেই ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। ফলে এক শতাব্দী আগের মতো বিশাল সৈন্যদল নিয়ে একসঙ্গে আক্রমণ করা এখন অসম্ভব। তার বদলে মাত্র এক বা দুজন সেনা নিয়ে ছোট ছোট আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
এমনকি ১৯১৬ সালে প্রথম ব্যবহার হওয়া ট্যাঙ্ক, যা এই যুদ্ধের প্রথম দিকেও বেশ ভীতি জাগানিয়া অস্ত্র ছিল, তা এখন ড্রোন হামলার সহজ নিশানা হয়ে উঠেছে। ফলে রণক্ষেত্রে ট্যাঙ্কের ব্যবহার অনেক কমে গেছে।
ধ্বংসযজ্ঞের তীব্রতা ও বর্তমান গতিহীনতা
রণক্ষেত্রের কৌশল বদলে গেলেও ধ্বংসের পরিমাপ কিন্তু একই রয়ে গেছে। ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইন থেকে ড্রোনের পাঠানো লাইভ ফুটেজে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই চেনা দৃশ্যই দেখা যায়—ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া গাছপালা, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি এবং কামানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া ফসলের মাঠ।
ন্যাটোর সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার ট্রান্সফরমেশন অ্যাডমিরাল পিয়েরে ভ্যান্ডিয়ার এই বসন্তে ইউক্রেন সফর শেষে জানান, ড্রোনের ব্যবহার ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতোই মারাত্মক ও প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
এই যুদ্ধ কতটা ধীরগতির হয়ে পড়েছে তা রাশিয়ার অগ্রযাত্রার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্প্রতি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর পোক্রোভস্ক দখলে রাশিয়ার দৈনিক গড় অগ্রযাত্রা ছিল মাত্র ৭৫ গজ—যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ‘ব্যাটল অব দ্য সোম’-এর অগ্রগতির চেয়েও ধীরগতির।
অচলাবস্থা ভাঙার উপায় কী?
প্রশ্ন হলো, এই অচলাবস্থা কে ভাঙবে? প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনী জার্মানির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং একের পর এক সামরিক চাপ প্রয়োগ করে জয়লাভ করেছিল।
ইউক্রেনের বর্তমান কৌশলও কিছুটা সেই পথেরই প্রতিফলন। রাশিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তেল শোধনাগার ও সম্পদগুলোর ওপর ড্রোন হামলা চালিয়ে মস্কোর যুদ্ধকালীন তহবিল সংকটে ফেলার চেষ্টা করছে কিয়েভ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো বিশাল সৈন্যবাহিনী দিয়ে আক্রমণ করার মতো জনবল ইউক্রেনের নেই, তবে তারা যুদ্ধক্ষেত্রকে ছোট ছোট আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে, যাতে রুশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন করা যায়।
ইতিহাসবিদ রিৎসাক সংক্ষেপে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটি মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধই, তবে ড্রোনের সংস্করণে।’ -নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

Tuesday, March 31, 2026
চেরনোবিলে রহস্যজনক নীল কুকুর
চেরনোবিল নিষিদ্ধ অঞ্চলে এখন প্রায় ৭০০টি কুকুর বসবাস করছে। এরা মূলত সেই পোষা প্রাণীদের বংশধর, যাদের মালিকরা ১৯৮৬ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর এলাকা খালি করার সময় ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে সংস্থাটি বলেছে, কুকুরগুলোর এই নীল রঙের কারণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মতে, সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো- কুকুরগুলো কোনো রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে এসেছে, যেমন কোনো লিক হওয়া পোর্টেবল টয়লেটের নীল তরল। এদিকে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুকুরগুলো সম্পূর্ণ সুস্থ ও সক্রিয় আছে, যদিও তাদের শরীরের রঙ অস্বাভাবিক। কর্মীরা নীল কুকুরগুলোকে ধরার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন, যাতে পরীক্ষার মাধ্যমে এ রহস্যের সঠিক কারণ নির্ণয় করা যায়।

Thursday, February 12, 2026
যুদ্ধে মারা গেছেন ভেবে মৃতদেহ সৎকার করল পরিবার, দুই বছর পর মা পেলেন ছেলের ফোন
এমনকি ২০২৩ সালে পশ্চিম ইউক্রেনের একটি গ্রাম্য কবরস্থানে তাঁরা নাজার ভেবে একজনের মরদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াও করেছিলেন।
ওই ঘটনার প্রায় দুই বছর পর ঘটল সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা। সম্প্রতি সেই নাজারই তাঁর মাকে ফোন করেছেন। জানিয়েছেন, তিনি শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও ক্লান্ত হলেও বেঁচে আছেন।
সম্প্রতি বন্দিবিনিময়ের আওতায় রুশ বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেয়েছেন নাজার।
সেই সেনাসদস্যের মা নাতালিয়া বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমার আবেগ খুব তীব্র ছিল।’ তিনি এখনো ঘোরের মধ্যে আছেন।
প্রথম সেই ফোনকল পাওয়ার পর পুরো পরিবারের যে আনন্দ, তা ভিডিওতে ধরা পড়েছে, যা দেখে যে কারও মন ছুঁয়ে যাবে।
নাতালিয়া তাঁর ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি অক্ষত আছেন কি না। তিনি জানতে চাচ্ছিলেন, ‘তোমার হাত-পা সব ঠিক আছে তো?’ তিনি বলেছেন, ‘আমার সোনা বাচ্চা, আমি কত দিন ধরে তোমার অপেক্ষায় ছিলাম।’
ভিডিওর শেষের অংশে নাজারের চাচাতো বোন রোকসোলানাকে আনন্দে চিৎকার করতে ও লাফাতে দেখা যায়। নাতালিয়া বলেন, ‘বিষয়টি ছিল বেশ অদ্ভুত। কারণ, আমার ছেলে নিহত হয়েছিলেন। আমি নিজে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ছিলাম। অথচ এখন তাঁর কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি। একজন মায়ের সেই সময়ের অনুভূতিগুলো কী হতে পারে, আপনি কল্পনা করতে পারেন? আনন্দ! ভীষণ আনন্দ! আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলাম না।’
সমাধি থেকে নাজারের ফিরে আসার পুরো গল্প অকল্পনীয়। বিশেষ করে দেশ যখন যুদ্ধের এই ডামাডোলের মধ্যে, এমন সুসংবাদ ইউক্রেনীয়দের কাছে দারুণ খুশির।
২০২২ সালে যখন রাশিয়া পুরোমাত্রায় ইউক্রেন আক্রমণ শুরু করে, ৪২ বছর বয়সী নাজার সরাসরি রণক্ষেত্রে চলে যান। তিনি ইতিমধ্যে ২০১৪ সালে যুদ্ধ করেছিলেন। তাই তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ।
নাজারের চাচাতো বোন বিবিসিকে বলেন, তাঁর মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। তিনি তৎক্ষণাৎ যুদ্ধে চলে যান।
কিন্তু যুদ্ধের প্রথম বছরে মে মাসেই রণাঙ্গনে নিখোঁজ হন নাজার।
এরপর নাজারের মা রুশ ভাষায় কথা বলা এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি ফোন পান। সেই ব্যক্তি বলেন, নাজারকে বন্দী করা হয়েছে, কিন্তু ‘সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে’।
সেই রহস্যময় কণ্ঠটি নাজার কোথায় আছেন, কারা তাঁকে আটকে রেখেছে, কিংবা তিনি আহত কি না, সে সম্পর্কে কিছুই বলেনি। পরিবার বুঝে উঠতে পারছিল না, তাঁর কথাগুলো বিশ্বাস করবে কি না। আর সরকারিভাবেও নাজারের পরিবার কোনো খবর পাচ্ছিল না।
নাজারের পরিবারের এমন অবস্থা এক বছর চলেছিল। পরে নাতালিয়াকে জানানো হয়েছিল, তাঁর দেওয়া ডিএনএ নমুনা ব্যবহার করে দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের একটি মর্গে একটি মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়েছে।
রোকসোলানা ব্যাখ্যা করেন, দেহটি মারাত্মকভাবে পুড়ে গিয়েছিল। একটি পোড়া বাসের ভেতর থেকে তারা বেশ কয়েকটি মরদেহ খুঁজে পেয়েছিল। যখন তারা নিখোঁজ সৈনিকদের তালিকা দেখতে শুরু করল, তখন তথ্যটি মিলে যায়।
রোকসোলানা বলেন, তাঁরা সেই মরদেহটিকে নাজার হিসেবেই শনাক্ত করেন।
এরপর পরিবারটি সেই মরদেহ গ্রহণ করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে। পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া।
এরপর গত সেপ্টেম্বরে নাতালিয়া জীবনের সবচেয়ে বড় চমকটি পান।
রাশিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া এক ইউক্রেনীয় সেনা তাঁদের ফোন করে জানান, নাজার বেঁচে আছেন। তিনি তাঁকে কারাগারে দেখেছেন।
সে সময়ের অনুভূতি মনে করে রোকসোলানা বলেন, ‘আমরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, এটা বিশ্বাস করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু তিনি কেনই–বা মিথ্যা বলবেন?’
তবুও নাজারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা বা তাঁকে দেখা ছাড়া, তাঁরা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না।
অবশেষে চলতি সপ্তাহে, নাজার ফোন করেন, তিনি ইউক্রেনের মাটিতে ফিরেছেন।
নাতালিয়ার ছেলে দীর্ঘ ৩ বছর ৯ মাস নিখোঁজ ছিলেন।
যখন নাতালিয়ার পরিবারের সদস্যরা তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় পুনর্মিলনের জন্য অপেক্ষা করছেন, তখন তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নাজারের শেষকৃত্যের তথ্য সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন, যাতে তিনি (নাজার) কষ্ট না পান।
নাতালিয়ার পরিবারকে গ্রামের ‘নিহত বীরদের’ প্রদর্শনী থেকেও নাজারের ছবিটি নামিয়ে ফেলতে হয়েছে।
কীভাবে এমন মর্মান্তিক ভুল হলো, তা খতিয়ে দেখতে এখন তদন্ত চলছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে পরিবারটির মনোযোগ দেওয়ার মতো আরও অনেক বিষয় রয়েছে।
নাজারের মা তাঁর সন্তানের প্রিয় সব খাবার রান্না করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রোকসোলানা বলেন, ‘আমি চাই, আমাদের মতো অন্য পরিবারগুলোও এমন ইতিবাচক খবর পাক। সবার প্রিয়জনেরা যেন ঘরে ফিরে আসে।’
ইউক্রেনে বর্তমানে সরকারিভাবে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিখোঁজ, যাঁদের বড় অংশই সেনাসদস্য। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা গেছেন এবং তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি।
তবে অনেকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটকে আছেন এবং তাঁদের পরিবারের কাছে নাজারের এই ফিরে আসা আশার ক্ষীণ আলো হয়ে থাকবে।
নাতালিয়া বলেন, ‘আমি চাই, সব নারী, মা ও সন্তান যেন আমাদের মতো এমন একটি ফোনকল আর এমন আনন্দের দেখা পান।’
নাতালিয়া বলেন, ‘আমি এখন শুধু আমার ছেলের অপেক্ষায় আছি, ওকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। আমি ওকে অনেক ভালোবাসি।’
| বিবিসির প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট। Tausif Ahmed |
Monday, January 26, 2026
জেলেনস্কিকে ‘বিভ্রান্ত ক্লাউন’ বললেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে আরাগচি লেখেন, বিশ্ব এখন বিভ্রান্ত ক্লাউনদের দেখছে। তিনি আরও বলেন, ইরানিরা নিজেদের রক্ষা করতে জানে এবং বিদেশিদের কাছে সাহায্যের জন্য ভিক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই তাদের। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, জেলেনস্কি মার্কিন ও ইউরোপীয় করদাতাদের অর্থ দিয়ে নিজের দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত জেনারেলদের পকেট ভরছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেয়া এক বক্তব্যে জেলেনস্কি বলেন, ইরানের নেতৃত্ব যদি ক্ষমতায় টিকে যেতে পারে, তবে তা হবে প্রত্যেক দাদাগিরি করা শাসকের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। তার ভাষায়, ইরানে এই রক্তপাতের পর দেশটি কোন পথে দাঁড়াবে? যদি এই শাসন টিকে যায়, তবে বার্তাটি পরিষ্কার- যথেষ্ট মানুষ হত্যা করেও ক্ষমতায় থাকা যায়।
প্রায় চার বছর ধরে পূর্ণমাত্রার রুশ আগ্রাসনের মুখে থাকা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি পশ্চিমা বিশ্বের নিষ্ক্রিয়তারও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো রক্তে ডুবে গেছে। বিশ্ব ইরানি জনগণকে যথেষ্ট সাহায্য করেনি, বরং নিরবে দাঁড়িয়ে থেকেছে।
ইংরেজিতে দেয়া ওই ভাষণে তিনি আরও বলেন, বড়দিন ও নববর্ষের ছুটি শেষে রাজনীতিকরা কাজে ফেরার আগেই আয়াতুল্লাহরা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।
ইরানের দাবি, ইসলামি প্রজাতন্ত্রবিরোধী বিক্ষোভে ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং এই সহিংসতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মদদ ছিল। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নিহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

Saturday, January 24, 2026
গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেনকে এক সুতায় বাঁধল কে by সাইমন টিসডাল
ওয়াশিংটন পোস্ট–এর হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে মোট ৩০ হাজার ৫৭৩টি ‘মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি’ করেছিলেন। অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ২১টি মিথ্যা তিনি বলেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সেই অভ্যাসে কোনো ছেদ পড়েনি। প্রতিদিনই তিনি মার্কিন জনগণ এবং বিশ্ববাসীর কাছে সত্য বিকৃত করছেন। মিনিয়াপোলিসে প্রাণঘাতী গুলির ঘটনার পর তাঁর ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়া আবারও দেখিয়ে দিয়েছে—জনজীবনে সত্য ও সততার প্রতি তাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এই অবজ্ঞা শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, গভীরভাবে অনৈতিক এবং বিপজ্জনক।
যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মতোই বিশ্বের বহু নেতা ট্রাম্পের এই দীর্ঘস্থায়ী মিথ্যাচারের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এই মিথ্যাকে মেনে নেওয়ার, চুপ করে থাকার বা এর বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়ার মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—এই তিন জটিল আন্তর্জাতিক সংকটে ট্রাম্পের মিথ্যা ও প্রতারণা একটি সাধারণ, উত্তেজনা বাড়ানো উপাদান হিসেবে কাজ করছে।
গ্রিনল্যান্ডের কথাই ধরা যাক। ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছেন, চীন ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ নাকি গ্রিনল্যান্ডজুড়ে ছড়িয়ে আছে আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে ‘নিয়ন্ত্রণ’ নেওয়া দরকার। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন, কোথায় সেই জাহাজ? তিনি তো নিজেই ওই স্বশাসিত দ্বীপে গেছেন। গ্রিনল্যান্ডবাসী ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে সরাসরি আজগুবি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ডেনমার্ক স্পষ্ট করে বলেছে, তারা গ্রিনল্যান্ডে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং সেখানে চীনা বিনিয়োগের ‘স্রোত’ যাচ্ছে বলে ট্রাম্প যেসব কথা বলছেন, তা তাঁর বানানো গল্প। জনমত জরিপ বলছে, গ্রিনল্যান্ডের মানুষ ট্রাম্পের কাছে দ্বীপ বিক্রি বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরোধী। তারা চায় স্বাধীনতা। যুক্তরাষ্ট্র রাজা তৃতীয় জর্জকে তাড়িয়ে দিয়ে স্বাধীন হয়েছিল। তারা এখন স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদ্যাপন করছে। ফলে তাদের তো বিষয়টি বোঝার কথা। ট্রাম্প বলেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডকে ‘নিরাপদ’ করতে চান। বাস্তবে তিনি চান এর খনিজ সম্পদ এবং আমেরিকাকে আবার বড় করতে।
ভেনেজুয়েলায় পরিস্থিতি আরও রক্তাক্ত। গত সপ্তাহান্তের অভ্যুত্থানের আগে মিথ্যার এক ভয়াবহ স্রোত বয়ে যায়। ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই দেশটির নেতা নিকোলা মাদুরোকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন। এই অভিযোগ তুলে ট্রাম্পের প্রশাসন মাদক পাচারের সন্দেহে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে ১০০ জনের বেশি মানুষকে নৌকায় হত্যা করে কোনো যাচাই–বাছাই ছাড়াই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধে আছে’ বলে ঘোষণা দেন এবং এর মাধ্যমে তিনি কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা অবৈধভাবে দখল করেন।
আসলে, ২০১৮ সালে মাদুরো সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতা চলছে। ট্রাম্প এখন স্বীকারও করেছেন, এই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য গণতন্ত্র ফেরানো নয়; যদিও দেরিতে হলেও তিনি বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছেন। ট্রাম্পের লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার জনগণকে ‘উদ্ধার’ করা নয়, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নয়। লক্ষ্য একটাই—তেল। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই, নির্মমভাবে দেশটি লুট করছেন। সঙ্গে সঙ্গে মেক্সিকো, কিউবা ও কলম্বিয়াকেও হুমকি দিচ্ছেন।
এবার ইউক্রেন। আরেকটি অচলাবস্থার মুখে পড়া ভূমি। এখানে ট্রাম্পের সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে না পারার অক্ষমতা ভয়াবহ ক্ষতি করছে। তিনি মিছেমিছি বলেছিলেন, ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করে দেবেন। ব্যর্থ হয়ে তিনি বারবার ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার হুমকি দেন। আর পুতিন (আরেকজন পেশাদার মিথ্যাবাদী) ট্রাম্পকে সামান্য তোষামোদ করে আবার বোমাবর্ষণ শুরু করেন। প্রতিবারই ট্রাম্প পিছু হটেন, আর প্রায়ই দোষ চাপান ইউক্রেনের নির্দোষ নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর।
গ্রিনল্যান্ড, ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেন—এই তিন সংকটে ট্রাম্পের মিথ্যাচার ছাড়াও আরেকটি বিষয় স্পষ্ট। সেটি হলো ইউরোপীয় নেতাদের ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুর্বলতা ও বিভক্তি। এখন অন্তত ইউরোপের বোঝা উচিত—এই প্রেসিডেন্টকে বিশ্বাস করা যায় না, তাঁর ওপর নির্ভর করা যায় না। এই প্রেক্ষাপটে ব্রেক্সিট আর শুধু ভুল সিদ্ধান্ত মনে হয় না; এটি প্রায় আত্মঘাতী বলে মনে হয়।
মার্ক টোয়েনের কথাকে একটু বদলে বললে বলা যায়, ‘মিথ্যা তিন প্রকার—মিথ্যা, মারাত্মক মিথ্যা আর ডোনাল্ড ট্রাম্প।’
● সাইমন টিসডাল, দ্য গার্ডিয়ান-এর পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
![]() |
| ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। ফাইল ছবি: এএফপি |
Saturday, December 27, 2025
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ভূখণ্ড বিনিময়ের ইঙ্গিত পুতিনের
রাশিয়ার প্রথম সারির দৈনিক কমেরসান্ত-এর ক্রেমলিন সংবাদদাতা আন্দ্রেই কোলেসনিকভ জানান, ২৪ ডিসেম্বর রাতে ক্রেমলিনে এক বৈঠকে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের কাছে এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন পুতিন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুতিন ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেছেন যে রাশিয়া এখনো ‘অ্যাঙ্কোরেজ’ সম্মেলনে দেওয়া ছাড়গুলো মেনে নিতে প্রস্তুত। অর্থাৎ দনবাস রাশিয়ারই থাকবে—এই নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। কোলেসনিকভ লিখেছেন, দনবাসের বাইরে অন্য অঞ্চলে রুশ নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডের আংশিক অদলবদল বা হস্তান্তরের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি পুতিন।
এদিকে বুধবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, গত সপ্তাহে মায়ামিতে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ২০ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পথে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল অনেকটাই এগিয়েছে। তবে জেলেনস্কি স্পষ্ট করেছেন যে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা দনবাসের অবশিষ্ট অংশ রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো ঐকমত্য হয়নি। এ ছাড়া বর্তমানে রুশ সেনাদের দখলে থাকা জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও বিতর্ক রয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী ইউরোপের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নে তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার রাশিয়া, ইউক্রেন ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত আগস্টে আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে পুতিন ও ট্রাম্পের শীর্ষ বৈঠকে কী কী বিষয়ে ‘বোঝাপড়া’ হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
রাশিয়ার দাবি ও বর্তমান অবস্থান
রাশিয়ার হিসাব অনুযায়ী, তারা বর্তমানে ২০১৪ সালে সংযুক্ত করা ক্রিমিয়া ছাড়াও দনবাসের ৯০ শতাংশ এবং জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। পুতিন এর আগে শর্ত দিয়েছিলেন যে শান্তিচুক্তির জন্য ইউক্রেনকে দনবাস, খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া থেকে পুরোপুরি সেনা সরিয়ে নিতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের আশা ত্যাগ করতে হবে।
কমেরসান্ত আরও জানিয়েছে, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে ইউরোপের বৃহত্তম পারমাণবিক স্থাপনা জাপোরিঝঝিয়া নিয়ে পুতিন কথা বলেছেন। তিনি জানান, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এই কেন্দ্রের কাছে ক্রিপ্টো মাইনিং বা ডিজিটাল মুদ্রা উৎপাদনে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং কেন্দ্রটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ ইউক্রেনকেও সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
![]() |
| রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: এএফপি |
Wednesday, December 24, 2025
ইউক্রেনের দখল করা ভূখণ্ড নিয়ে কোনো আপস নয়: বছরের শেষ সংবাদ সম্মেলনে পুতিন
পুতিন বলেন, ‘জেলেনস্কির বিভিন্ন বক্তব্য থেকে আমরা জানি, তিনি ভূখণ্ড-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত নন।’ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁদের সংবিধানে ভূখণ্ড হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পুতিন দাবি করেন, তাঁর দেশের সেনারা ইউক্রেনের যে চারটি অঞ্চলের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, সেগুলো রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি ২০১৪ সালে দখল করে নিজেদের দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা ক্রিমিয়ার দাবিও ইউক্রেনকে ছেড়ে দিতে হবে।
রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম আরটির প্রতিবেদনে বলা হয়, আজ মস্কোর ‘গস্তিনি দভর প্রদর্শনী হল’–এর সংবাদ সম্মেলনে পুতিন প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কথা বলেন। দেশ-বিদেশের ৭০টির বেশি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরাও অংশ নেন।
সাংবাদিকের পাশাপাশি পুতিন ফোনে রুশ নাগরিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন। ফোন, খুদে বার্তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা ২০ লাখের বেশি রুশ নাগরিক পুতিনকে প্রশ্ন করেছিলেন। সেখান থেকে বিষয়ভিত্তিক কিছু প্রশ্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পুতিন সেগুলোর উত্তর দেন।
ভূখণ্ডের পাশাপাশি পুতিনের আরও কিছু দাবি রয়েছে। তাঁর দাবি, দনবাসের যেসব এলাকা রুশ সেনারা এখনো দখল করতে পারেনি, তা-ও রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
দনবাসের এসব এলাকায় তীব্র লড়াই চলছে। এখানে যেসব ভূখণ্ড এখনো নিজেদের দখলে রয়েছে, তা রাশিয়ার কাছে হস্তান্তরের দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে কিয়েভ।
‘যুদ্ধের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ এখনো সম্পূর্ণ রাশিয়ার’ সেনাদের হাতে দাবি করে পুতিন বলেন, চলতি বছর শেষ হওয়ার আগে তাঁদের সেনারা আরও ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নেবে।
পশ্চিমাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক কয়েক মাসে রাশিয়ার সেনাবাহিনী রণক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে অল্প অল্প করে এগোচ্ছে। প্রতিদিন তারা প্রায় ১২ থেকে ১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করছে।
পুতিনের এই বার্ষিক সংবাদ সম্মেলন বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা কর্মকর্তারা এটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পুতিন রাশিয়ার জনগণের কাছে পরিস্থিতি কীভাবে তুলে ধরছেন, তাঁরা তা বোঝার চেষ্টা করেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সর্বাত্মক হামলা শুরু করে রাশিয়ার সেনারা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধে উভয় পক্ষের সেনাসহ ২০ লাখের বেশি মানুষ হতাহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। তবে কোনো পক্ষই হতাহত ও নিখোঁজের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করেনি।
| বছরের সর্বশেষ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মস্কোর ‘গস্তিনি দভর প্রদর্শনী হলে’, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স |
ট্রাম্পের কথামতো আসলেই কি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হচ্ছে
বার্লিনে দুই দিনের উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠকের পর কূটনীতিকেরা অন্য জটিল বিষয়গুলোর মধ্যে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ সামরিক হুমকি থেকে ইউক্রেনকে কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বৈঠকের আগে জেলেনস্কি বলেন, পশ্চিমা সামরিক জোটে (ন্যাটো) যোগ দেওয়ার আশা ত্যাগের বিনিময়ে ইউক্রেন আইনি বাধ্যবাধকতার সঙ্গে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায়। ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলে তাদের তৎপরতা আরও বাড়বে, এমন যুক্তি দেখিয়ে রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলা চালায়।
তবে ইউরোপের নেতারা বলেছেন, মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে ভূখণ্ড–সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্যের সমাধান হয়নি এখনো। তাই প্রশ্ন উঠছে, একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি শেষ পর্যন্ত সম্ভব কি না?
বার্লিন বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হলো
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার বার্লিন বৈঠকে অংশ নেন। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ন্যাটোর প্রধান নেতারাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে ইউরোপীয় নেতারা একটি বিবৃতি দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁরা ইউরোপের নেতৃত্বে একটি ‘বহুজাতিক বাহিনী’ গঠনের প্রস্তাব দেন। ওই বাহিনীকে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এই বাহিনী ইউক্রেনের ভেতরে কাজ করবে। পাশাপাশি ইউক্রেনের বাহিনীকে সহায়তা করা, আকাশসীমার নিরাপত্তা দেওয়া এবং নিরাপদ জলসীমা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ইউক্রেনের সুরক্ষা প্রস্তাবটি ন্যাটোর ‘অনুচ্ছেদ–৫’–এর আদলে করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো সদস্যদেশের ওপর হামলা হলে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে।
বার্লিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জেলেনস্কি বলেন, সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির আওতায় ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিয়েভের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। নিশ্চয়তায় কার্যকর যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের বিষয়টি থাকতে হবে।
তবে কীভাবে এ ধরনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বেশ সতর্ক। কারণ, ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেয়েছিল ইউক্রেন। তা সত্ত্বেও ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল ও ২০২২ সালে রাশিয়ার হামলা ঠেকানো যায়নি।
জার্মান চ্যান্সেলর ফেডরিখ মার্ৎস বলেছেন, বৈঠকে ওয়াশিংটন উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা দেওয়ার নিশ্চয়তার প্রস্তাব দিয়েছে। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আইনি ও ভৌত নিশ্চয়তার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র যা তুলে ধরেছে, তা সত্যিই উল্লেখ করার মতো।
তবে রাশিয়া এ প্রস্তাবের বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ইউরোপীয় নেতাদের নিয়ে কড়া ভাষায় কথা বলেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও নিজের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট বুধবার বলেছেন, কূটনীতির মাধ্যমে বা সামরিক শক্তি খাটিয়ে—যেভাবেই হোক না কেন, ইউক্রেনে নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করবে মস্কো।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প কী বলেছেন
গত সোমবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ইউরোপীয় নেতাদের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছি। তারা এই যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আমরা অনেক আলোচনা করেছি। আমি মনে করি, আমরা এখন চুক্তির যতটা কাছাকাছি পৌঁছেছি, তা আগে কখনো হয়নি। এখন দেখব আমরা কী করতে পারি।’
জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প। এ জন্য ইউক্রেনকে কিছু বিষয়ে ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছেন।
জেলেনস্কি কী বলেছেন
উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে বৈঠকের প্রতি ইঙ্গিত করে সোমবার জেলেনস্কি এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘এ ধরনের বৈঠক আগে হলে আরও বেশি অগ্রগতি হতো। ভূখণ্ড–সংক্রান্ত বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আমাদের ভিন্ন অবস্থান। এটি স্বীকার করতে হবে এবং এ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা উচিত। আমি বিশ্বাস করি, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প প্রস্তাব করবে, যাতে অন্তত একমত হওয়া যায়।’
জেলেনস্কি আরও বলেন, ‘আমরা ভূখণ্ড ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ইউক্রেনকে পুনর্গঠনের জন্য ক্ষতিপূরণের অর্থসহ সব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পেতে সম্ভাব্য সব চেষ্টা চালাব। এই অর্থের উৎস সম্পর্কে জানাটা খুব জরুরি।’
আগে ইউক্রেন ইঙ্গিত দিয়েছিল, পশ্চিমা নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিনিময়ে তারা ন্যাটো জোটে যোগ দেওয়ার আশা ত্যাগ করতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনও কিয়েভের ন্যাটো সদস্যপদের বিরোধী ছিল।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা করছি। যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সেনাবাহিনী এবং সাধারণ মানুষ—সবার স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কেমন হবে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
তবে ইউক্রেন কী ধরনের বিশেষ নিরাপত্তা পাবে এবং কোন কোন দেশ নিরাপত্তা প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে, তা এখনো অস্পষ্ট।
যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই ‘খুব সন্নিকটে’
লন্ডনের চিন্তক প্রতিষ্ঠান চাথাম হাউসের রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞ কিয়ার জাইলস আল–জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, শান্তিচুক্তি খুব কাছাকাছি, তবে সেটি স্থায়ী কোনো চুক্তি ছাড়াই।
ইতালির ইস্তিতুতো আফারি ইন্টারনাজিওনালির পরিচালক টোকসি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির সম্ভাবনা একদম কম। আমার মনে হয়, চলমান যুদ্ধ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা বেশি।’ এর কারণ ভূখণ্ড ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ের সমাধান এখনো হয়নি।
বর্তমানে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে। ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর পিছু হটা ও সামরিক সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে ধীরে ধীরে রাশিয়া আরও ভূখণ্ড দখল করছে। এর আগে ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল দখল করে রাশিয়া।
চাথাম হাউসের কিয়ার জাইলস বলেছেন, এখনো কয়েকটি দিক থেকে আলোচনার প্রক্রিয়া চলছে। একটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে, আরেকটি ইউক্রেন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে। তবে এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে চলছে—এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই।
জাইলস আরও বলেন, কোনো বিষয়ে সমঝোতা হলেই রাশিয়া তা মেনে নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এমনকি যেসব বিষয়ে সমঝোতা হতে পারে, সেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য কি না—সেটিও নিশ্চিত নয়। যুদ্ধবিরতির মূল শর্ত আগের মতোই রয়ে গেছে। রাশিয়া তখনই যুদ্ধ বন্ধে রাজি হবে, যখন তারা মনে করবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে যুদ্ধবিরতিতে তাদের লাভ বেশি হবে।
ইউক্রেন যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে
জাইলস বলেন, এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে—এর উত্তর সব সময় যেমন ছিল, এখনো তেমনই রয়েছে। একদিকে রাশিয়াকে পিছু হটতে বাধ্য করা, অন্যদিকে ইউক্রেনকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।
জাইলস বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন একই শর্তে যুদ্ধবিরতিতে একমত হতে পারছে না। কারণ, তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের লক্ষ্য এতটাই ভিন্ন যে আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রমী।
এই বিশ্লেষক বলেন, ট্রাম্প একাধিকবার ক্রেমলিনের অনেক দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছেন। যার মধ্যে ইউক্রেনকে ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার দাবিও রয়েছে। যুদ্ধ শেষ করতে ট্রাম্পের প্রাথমিক ২৮ দফা পরিকল্পনায় রুশ যুদ্ধাপরাধের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার একটি ধারা ছিল। যদিও জেলেনস্কি এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন।
জাইলস বলেন, ট্রাম্পের ২৮ দফা পরিকল্পনা ইউরোপীয় নেতাদের বিরোধিতার কারণে সংশোধন করা হয়েছে। রাশিয়া মনে করছে, এটি তাদের জন্য সুবিধাজনক নয়।
জাইলস আরও বলেন, ‘রাশিয়া শুধু তখনই যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নেবে, যখন তারা বিশ্বাস করবে যে চুক্তিটি ইচ্ছামতো লঙ্ঘন করা যাবে। সেই সুযোগ আবার যুদ্ধ শুরু করার জন্য সুবিধাজনক হবে।’
![]() |
| ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়ায় রাশিয়ার হামলায় একটি ভবনে আগুন ধরে যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। ১৬ ডিসেম্বর। ছবি: এএফপি |
Thursday, December 18, 2025
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে নতুন শান্তি প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে, শিগগিরই হাতে পাবে রাশিয়া: জেলেনস্কি
যুদ্ধ বন্ধে সবশেষ জার্মানির রাজধানী বার্লিনে ইউক্রেনের সঙ্গে বৈঠক করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র। এর দুই দিন পর গত সোমবার মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান সমস্যার ৯০ শতাংশের সমাধান হয়ে গেছে। এরপরও শিগগিরই যুদ্ধ বন্ধ হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কারণ, বর্তমান আলোচনায় রাশিয়া অনুপস্থিত রয়েছে।
আজ জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধ বন্ধের পর ইউক্রেনের জন্য প্রস্তাব করা নিরাপত্তা নিশ্চয়তাগুলো নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে ভোটাভুটি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর ‘আজ বা আগামীকালের’ মধ্যে চূড়ান্ত নথিপত্র প্রস্তুত করা হবে। সেগুলো প্রস্তুত হলে এ নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসবে যুক্তরাষ্ট্র। এ আলোচনা চলতি সপ্তাহান্তেই শুরু হতে পারে।
এ নিরাপত্তা নিশ্চয়তাগুলো পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অনুচ্ছেদ–৫–এর মতো বলে উল্লেখ করেন জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ‘আমরা পাঁচটি নথি নিয়ে কাজ করছি। এর মধ্যে কিছু ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে। সেগুলো নিয়ে আবার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই সেগুলো মার্কিন কংগ্রেসে ভোটাভুটির মাধ্যমে অনুমোদিত হতে হবে।’
সেনা মোতায়েন নিয়ে রাশিয়ার আপত্তি
এ নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মধ্যে কী কী রয়েছে, তা জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ বন্ধের পর রাশিয়া যদি আবার ইউক্রেনে হামলা চালায়, তখন কী হবে, তা–ও বলা হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তারা শুধু বলেছেন, ইউক্রেনে মার্কিন সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই তাঁদের। যদিও বার্লিন আলোচনার পর কিয়েভের ইউরোপীয় মিত্ররা বলেছে, ইউক্রেনের নিরাপত্তার জন্য দেশটিতে সেনা মোতায়েন করতে চায় তারা।
এ নিরাপত্তা নিশ্চয়তাগুলো এখনো ক্রেমলিন দেখেনি বলে জানিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী সের্গেই রিবকভ। তিনি বলেন, নিশ্চয়তার মধ্যে যদি ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ন্যাটো সদস্যদেশগুলোর সেনাদের মোতায়েনের কথা বলা থাকে, তাহলে তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না রাশিয়া। যুদ্ধের আগে থেকেই এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে মস্কো।
তবে যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে যে বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের সবচেয়ে বড় সমস্য, তা হলো ইউক্রেনে রাশিয়ার দখল করা ভূখণ্ড। যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে ইউক্রেনের পুরো দনবাস অঞ্চল চায় রাশিয়া। তা আবার মানতে নারাজ কিয়েভ। এটি এখনো স্পষ্ট নয় এর সমাধান কীভাবে হবে। আর সপ্তাহান্তের আলোচনায় ইউক্রেনের প্রস্তাব রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কীভাবে নেবেন, তা–ও অজানা।
ক্ষতিপূরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক কমিশন
এদিকে যুদ্ধে ইউক্রনের ক্ষতিপূরণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক কমিশনের কার্যক্রম শুরু করতে আজ নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে উপস্থিত হয়েছেন জেলেনস্কিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাসও। এর আয়োজন করেছে নেদারল্যান্ডস ও অধিকারবিয়ষক সংস্থা কাউন্সিল অব ইউরোপ।
এই কমিশনের বিষয়ে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ভ্যান উইল বলেন, ‘জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া একটি সংঘাতের কখনো পুরোপুরি সমাধান হয় না। আর ওই জবাবদিহির অংশ হলো ক্ষতিপূরণ দেওয়া। তাই আমি মনে করি, আজ আমরা একটি ক্ষতিপূরণ দাবির যে কমিশন গঠন করছি, এ নিয়ে একটি চুক্তি করছি—এটি একটি বড় পদক্ষেপ।’
রাশিয়ার কাছ থেকে এ ক্ষতিপূরণ কীভাবে নেওয়া হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে এর আগের বিভিন্ন আলোচনায় বলা হয়েছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে জব্দ করা রুশ সম্পদ থেকে এ ক্ষতিপূরণের অংশ আসবে। নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো এই দাবির ন্যায্যতা দেওয়া যে রাশিয়াকে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’
এই কমিশনের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ক্রেমলিনের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইউক্রেনে কোনো যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও নাকচ করে আসছে তারা। আর জব্দ করা রুশ সম্পদ দিয়ে ইউক্রেনের ক্ষতিপূরণের যে প্রস্তাব ইউরোপীয় ইউনিয়ন দিয়েছে, তা অবৈধ বলে উল্লেখ করেছে মস্কো।
![]() |
| ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
ইউক্রেন নিয়ে জার্মানির নতুন পরিকল্পনা
জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, ইউক্রেনে বহুজাতিক ফোর্স মোতায়েনের ক্ষেত্রে শুধু ইউরোপের দেশই যুক্ত থাকবে না, এতে কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও একাধিক দেশ অংশ নেবে।
গত দুই দিন ধরে জার্মানির বার্লিনে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর এমন সিদ্ধান্তের কথা জানালেন ফ্রেডরিক মের্ৎস। ইউরোপের নেতৃত্বধীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত এই বাহিনী ইউক্রেনের আকাশ ও সমুদ্র নিরাপত্তায় কাজ করবে। তবে পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই হুমকি দিয়ে আসছেন তিনি ইউক্রেনে বিদেশি কোনো সৈন্য মোতায়েন মেনে নেবেন না।
তবে জার্মান চ্যান্সেলর জানান, তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন যাতে রাশিয়া এই প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়। এদিকে ইউরোপের কাছে থাকা রুশ সম্পদ জব্দ করা নিয়ে বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে বৈঠকে বসছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা। এতে ২৭ দেশের নেতারা অংশ নেবে।
এদিকে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপে সবচেয়ে বড় একটি মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ নিয়ে সহজে সমাধান মিলবে কিনা তা নিয়ে জোর আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

Wednesday, December 17, 2025
বার্লিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে আলোচনায় কী পেল ইউক্রেন
গতকাল সোমবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারসহ ইউরোপের নেতারা নিরাপত্তা নিশ্চয়তার একটি তালিকা সামনে এনেছেন। এতে বলা হয়েছে, কিয়েভ বাহিনীকে সহায়তা এবং দেশটির আকাশ ও জলসীমা রক্ষার জন্য ইউরোপের নেতৃত্বে একটি বাহিনী গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে হামলা থেকে ইউক্রেনকে রক্ষা করার জন্য আইনি প্রতিশ্রুতি দেবে ইউরোপ।
তালিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইউক্রেনের যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের সমর্থনের কথা বলা হয়েছে। ইউক্রেনের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও দেশটিকে সহায়তা করবে ইউরোপ। এই বাহিনীর সেনাসংখ্যা আট লাখের মধ্যে সীমিত থাকবে। যদিও একটি শান্তিচুক্তির জন্য ইউক্রেনের এর চেয়ে অনেক কম সেনা থাকতে হবে বলে দাবি করে আসছে মস্কো।
ইউক্রেনের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে। সেটি হলো রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করবে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন একটি ব্যবস্থা। ইউক্রেনে ভবিষ্যতে কোনো হামলার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা দেবে তারা। এ ছাড়া তালিকায় ইউক্রেনের পুনর্গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আসতে পারে জব্দ করা রুশ সম্পদ থেকে।
এর আগেও শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে ইউক্রেনের সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা হয়েছে। তবে কিয়েভের সুরক্ষার জন্য বার্লিনে ইউরোপীয় নেতাদের তুলনামূলক বেশি জোর দিতে দেখা গেছে। এবারের বৈঠকে কিয়েভে জন্য সবচেয়ে ভালো বিষয়টি হলো নিজেদের সুরক্ষার জন্য ইউক্রেনের মাটিতে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর সেনাদের পেতে পারে তারা।
নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওই তালিকায় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানি ছাড়াও ইউরোপের আরও সাত দেশের নেতারা সই করেছেন। দেশগুলোর ভাষ্য, যুদ্ধ বন্ধে রাজি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেনে বিরাট নিরাপত্ত নিশ্চয়তা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সহায়তা দেবে এই তালিকা। আর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বলেছেন, ‘এখন আমাদের সত্যিকারের শান্তিপ্রক্রিয়ার সুযোগ রয়েছে।’
তাহলে কি এখন যুদ্ধ থেমে যাবে? এখনই তা বলা যাচ্ছে না। কারণ, আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার এখন এই তালিকা রাশিয়ার কাছে নিয়ে যাবেন। এটা এখনো স্পষ্ট নয় যে ইউরোপের দেওয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তার এই তালিকা আদৌ ক্রেমলিন মেনে নেবে কি না।
কারণ, প্রথমত, রাশিয়া চায় না ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ন্যাটোর কোনো সেনা মোতায়েন করা হোক। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনে রাশিয়ার দখলে থাকা অঞ্চলগুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। শিগগিরই হবে বলেও মনে হয় না। এরপরও মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা বলছেন, চুক্তির ৯০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে তাঁরা গুছিয়ে এনেছেন। এ বক্তব্যের সঙ্গে মাঠের চিত্র মেলালে সামনে শুধু অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
![]() |
| রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে বার্লিনে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিয়েভের আলোচনা। ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, December 16, 2025
ইউক্রেন-রাশিয়ার ওপর হতাশ ট্রাম্প, দনবাস নিয়ে নতুন প্রস্তাব
প্রায় চার বছর ধরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে। এ যুদ্ধ ঘিরে ট্রাম্পের অসন্তোষ নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিত। তিনি বলেন, এই যুদ্ধের দুই পক্ষকে নিয়েই ব্যাপক হতাশ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি এ নিয়ে আর কোনো আলোচনা করতে চান না। তিনি কাজ চান। তিনি চান এই যুদ্ধ যেন শেষ হয়।
চলতি বছর ক্ষমতায় বসার পর থেকে এই যুদ্ধ থামাতে কম চেষ্টা করেননি ট্রাম্প। সম্প্রতি ২৮ দফা শান্তি পরিকল্পনাও দিয়েছিলেন। তবে ওই পরিকল্পনা মস্কোঘেঁষা—এমন দাবি করে আপত্তি তুলেছিল কিয়েভ। পরে তা সংস্কার করে ২০ দফা করা হয়। যদিও সবশেষ এই পরিকল্পনা নিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করে মার্কিন প্রতিনিধিরা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি।
‘মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের’ প্রস্তাব
রাশিয়া ও ইউক্রেনের সমঝোতায় সবচেয়ে বড় বাধা দনবাস অঞ্চল। এর প্রায় সবটুকু নিয়ন্ত্রণ করছে রুশ বাহিনী। যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে পুরো দনবাসকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে চায় রাশিয়া। তবে তা মানতে নারাজ ইউক্রেন। এরই মধ্যে গণভোটের মাধ্যমে ইউক্রেনের দনবাস, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করেছে রাশিয়া। তবে তা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি।
এই ভূখণ্ড নিয়ে ট্রাম্পের নতুন এক প্রস্তাব সম্পর্কে বৃহস্পতিবার কথা বলেছেন জেলেনস্কি। কিয়েভে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দনবাসে যেটুকু অঞ্চল ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে আছে, ‘মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তোলার কথা বলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অঞ্চল থেকে ইউক্রেনের সেনাদের সরে যেতে হবে। সেখানে রুশ বাহিনীও প্রবেশ করবে না। তবে এই অঞ্চল কে শাসন করবে, তা বলা হয়নি।
এ ছাড়া নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী ইউক্রেনের দক্ষিণে যেসব অঞ্চলে রুশ সেনারা অবস্থান করছেন, তাঁরাও সরে যাবেন না বলে উল্লেখ করেছেন জেলেনস্কি। তবে দেশটির উত্তরাঞ্চলে নিজেদের দখল করা এলাকাগুলো ছেড়ে দেবে মস্কো। জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনের কোনো ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে সে দেশের মানুষের মতামত বা গণভোটের প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই প্রস্তাব নিয়ে আরও একটি আপত্তি তুলেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। ইউক্রেনীয় সেনারা মূলত অবস্থান করছেন দনবাসের দোনেস্কের একটি ছোট অঞ্চলে। জেলেনস্কি বলেন, ‘যুদ্ধের অপর পক্ষ (রাশিয়া) কেন উল্টো দিকে একই দূরত্বে পিছিয়ে যাবে না?’ ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব ঘিরে ‘অনেক বড় বড় প্রশ্নের এখনো’ সুরাহা হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আগামী সপ্তাহ গুরুত্বপূর্ণ
ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাবের পর এ নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সে আলোচনা করেছে ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্ররা। এরপর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এটি ইউক্রেন ও দেশটির মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। এই সঙ্গে ইউরোপ-আটলান্টিক অঞ্চল ঘিরে আমাদের যে নিরাপত্তার বিষয় রয়েছে, তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’
ইউক্রেনের জন্য একটি ন্যায্য ও টেকসই শান্তির পথ খুঁজে পেতে আগামী সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বৃহস্পতিবার উল্লেখ করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, টেকসই মানে এমন একটি শান্তিচুক্তি, যাতে ভবিষ্যৎ সংঘাতের এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো অস্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টায় ইউরোপকে একপ্রকার দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। তিনি তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারের কূটনীতির মাধ্যমে রাশিয়ার ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধের বিষয়ে সরাসরি সমঝোতা করতে চান। একটি চুক্তির জন্য যদিও কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। তবে বড়দিনের আগেই একটি সমাধানে যাওয়ার ইচ্ছা ওয়াশিংটনের।
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Sunday, December 14, 2025
ট্রাম্প-পুতিনের ইউক্রেন ছকের বিরুদ্ধে কতক্ষণ টিকবে ইউরোপ by মার্টিন কেটল
তবে যে পরিস্থিতিতে এ আলোচনা হয়েছে, তা এখন আরও স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। প্রক্রিয়াটি যে মার্কিন ও রুশ স্বার্থ দ্বারা চালিত, তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং মাঠের সংঘর্ষ আরও তীব্র হচ্ছে।
এই সপ্তাহে অগ্রগতি না হওয়ার অর্থ হলো খুব শিগগির যুদ্ধ বন্ধের আরেকটি চেষ্টা হবে। তারপর হয়তো আরও একটি চেষ্টা চালানো হবে। এভাবে একদিন এমন একটি মার্কিন-সমর্থিত সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে, যা মোটামুটি রাশিয়ার পক্ষেই যাবে।
এই প্রচেষ্টার পেছনে যে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করছে, তা এতটাই স্পষ্ট ও ধারাবাহিক যে একে উপেক্ষা করা যায় না।
জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই এটি বারবার দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি এক দিনেই যুদ্ধ শেষ করে দেবেন। বাস্তবে তা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে (যেদিন ট্রাম্প প্রথমবার পুতিনের সঙ্গে সরাসরি ইউক্রেন নিয়ে কথা বলেন) তাঁর উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি একই আছে।
এখন তা বদলাবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং মঙ্গলবারের অচলাবস্থা হয়তো তাঁদের আরও একবার চেষ্টা করতে উৎসাহ দেবে।
এ অবস্থায় যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তার ভেতরের যুক্তিও এখন সবার কাছে পরিচিত। ট্রাম্প ইউক্রেনকে অস্ত্র দিতে অস্বীকার করেছেন। এর বদলে তিনি পুতিনের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তির চেষ্টা করেছেন, যাতে ইউক্রেনের কিছু ভূখণ্ড হারানোর বিনিময়ে যুদ্ধ থামানো যায়।
রাশিয়া ইউক্রেনে বোমা হামলা চালায় এবং ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করে। ইউক্রেন ও তার অন্য মিত্ররা রাশিয়াপন্থী চুক্তির বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র তাদের আপত্তি বিবেচনায় নিয়ে নিজের পরিকল্পনা কিছুটা বদলায়। এ নিয়ে আলোচনা হয়। পুতিন চুক্তিতে ‘না’ বলেন। যুদ্ধ চলতে থাকে, কিন্তু কূটনৈতিক তৎপরতাও চলতে থাকে।
এই প্রক্রিয়া যখন বারবার চলতে থাকবে, তখন দুটি পরিণতির একটিই ঘটতে পারে। হয় এই প্রক্রিয়াকে একেবারে ব্যর্থ বলে মেনে নিয়ে চুক্তির উদ্যোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে। নয়তো এর কোনো না কোনো দিক বদলানো হবে, যাতে কোনো ফল পাওয়া সম্ভব হয়।
প্রথম বিকল্পটি, অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়া বাতিল করা যদি সম্ভব হয়ও, তা হলেও তা ট্রাম্পের জন্য বড় অপমানের কারণ হবে। এর আরেকটি ফল হবে—যুদ্ধ আরও তীব্র, আরও প্রাণঘাতী, আরও ধ্বংসাত্মক, আরও অস্থির হয়ে উঠবে। তখন যুদ্ধ বন্ধের চাপ আবার বাড়বে। আর সেই চাপ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আবার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করবে।
দ্বিতীয় বিকল্পটি (অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়ার কোনো অংশ বদলে দেওয়া বা কিছুটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা) সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় বলে মনে হচ্ছে। এর ফলে ন্যাটো ও ইউরোপ সরাসরি মস্কোর, আর কিছুটা ওয়াশিংটনেরও নজরদারি ও চাপের মুখে পড়বে।
এ কারণেই গতকাল ক্রেমলিন ইঙ্গিত দিয়েছে, এখনো কিছু চুক্তি করা সম্ভব। অর্থাৎ এমন চুক্তি সম্ভব, যা হবে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। কিন্তু তাতে ইউরোপ থাকবে না।
পুতিন খুব স্পষ্টভাবেই দেখিয়েছেন, তিনি ইউরোপকে ট্রাম্পের দুর্বল জায়গা হিসেবে দেখেন। এই সপ্তাহে উইটকফের সঙ্গে আলোচনার আগে তিনি বলেন, ‘ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনকে ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে দিচ্ছে না।’ কিছুক্ষণ পর তিনি বলেন, ‘তারা যুদ্ধের পক্ষে আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু ইউরোপ যদি শুরু করে, আমরা এখনই প্রস্তুত।’
এ কথার কিছু অংশ অর্থহীন। কিন্তু পুতিনের একটি মূল ধারণা ঠিক আছে। ইউরোপ (আরও নির্দিষ্ট করে বললে, যুক্তরাষ্ট্রবিহীন ন্যাটো) সত্যিই ট্রাম্পকে পুতিনের সঙ্গে নিজের পছন্দমতো চুক্তি করতে বাধা দিচ্ছে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর এই ধারাবাহিক অবস্থান খুব একটা প্রকাশ্যে প্রশংসা পায়নি। কারণ, তারা ট্রাম্পকে খেপাতে চায় না। কিন্তু বিষয়টি স্পষ্টভাবেই চোখে পড়ে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওভাল অফিসে জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্প ও জেডি ভ্যান্সের প্রকাশ্য অপমানের ঘটনার পর থেকেই এই প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে। আর মোটামুটি তা সফলও হয়েছে।
এই তথাকথিত ‘ইচ্ছুক দেশগুলোর জোট’ বা ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পরিকল্পনায় আঘাত করতে পারে। কিন্তু সে ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের হাতে নেই।
এই জোটে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ ও কানাডা রয়েছে। তারা সবাই যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনকে অর্থনৈতিক ও বাস্তব সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তাদের প্রচেষ্টা অনেকটাই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয়েছে এবং আংশিকভাবে ন্যাটোর ভেতরেই সমন্বয় করা হয়েছে। যেমন ৩ ডিসেম্বর ব্রাসেলসে ন্যাটোর সদর দপ্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যে বৈঠক হয়েছে, সেখানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্টভাবেই অনুপস্থিত ছিলেন।
যেভাবেই দেখা হোক, ইউক্রেনের পক্ষে ইউরোপের এই মরিয়া উদ্যোগ বারবার ট্রাম্প ও পুতিনের বিপক্ষে একটি দেয়াল তৈরি করেছে।
এ সপ্তাহে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আগে উইটকফের প্রস্তাবে যখন কিছু পরিবর্তন আনা হয়, তখন তা হয়েছে। ওভাল অফিসের ওই বিপর্যয়কর ঘটনার পর থেকেই জেলেনস্কির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়া এই কৌশলের একটি বড় অংশ।
সব দেখে মনে হয়, মিত্রদেশগুলো জেলেনস্কির প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপেই ঘনিষ্ঠভাবে পরামর্শ ও নির্দেশনা দিচ্ছে।
আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, যদি কোনো দিন জেলেনস্কির বার্তা, নোট, বৈঠক ও সফরের একটি বিস্তারিত তথ্যভান্ডার প্রকাশ পায়, তাহলে সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েলের প্রভাবশালী ভূমিকা স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।
তবু এটি চিরকাল চলতে পারে না। ইউক্রেন ও ইউরোপের জন্য মূল সমস্যা হলো, ২১ শতকের ক্ষমতার ভারসাম্য তাদের বিরুদ্ধে গেছে।
যুদ্ধ–পরবর্তী পশ্চিমাদের ধারণা হয়তো মৃত নয়, কিন্তু এখন তা ‘ইনটেনসিভ কেয়ার’-এ আছে। ইউরোপীয় ও কিছু আমেরিকান বিশেষজ্ঞ তাঁদের সব দক্ষতা নিয়ে এটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। সত্যি কথা হলো, ট্রাম্প চাইলে এক দিনেই এটিকে শেষ করতে পারতেন।
যদি সত্যিই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে রাশিয়ার সেনাদের লন্ডনের হোয়াইট হল পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের প্রধান সড়ক খ্রেশচাটিক অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। ট্রাম্প এটা ঠিকভাবে বোঝেন কি না বা বুঝলেও গুরুত্ব দেন কি না, তা বলা কঠিন।
জেলেনস্কি ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, ইউক্রেনে যদি একটি কার্যকর সরকার টিকে থাকে, তাহলে দেশটি কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। তারা আন্তর্জাতিক মিত্রদের কাছ থেকে অর্থ ও সামরিক সহায়তা পেতেও পারে, যাতে যুদ্ধের পর নতুন করে গড়ে তোলা যায়। তবে এ সবকিছুর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে এক বড় প্রশ্নের ওপর। সেটি হলো পশ্চিমা দেশগুলো যে ২৫৩ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করে রেখেছে, তা কি কিয়েভ পাবে, নাকি সে অর্থ আবার মস্কোতে ফিরে যাবে?
যা–ই হোক না কেন, তখন ন্যাটো আগামী দিনের হুমকি মোকাবিলায় হয়তো আর কার্যকর সংগঠন থাকবে না। এটি তখন হয়ে যেতে পারে ‘গতকালের সমাধান’। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর কাছে তখনো অস্ত্র ও সেনাবাহিনী থাকবে। তারা স্বাধীন ইউক্রেন এবং নিজেদের মূল্যবোধের পক্ষে থাকবে। লন্ডনের ইতিহাসবিদ জর্জিওস ভারুক্সাকিস যেমন বলেছেন, তাদের মধ্যে ‘নিজেদের ভুল স্বীকার ও সংশোধনের ক্ষমতা’ও থাকবে।
তবু সত্য হলো, যদি যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে ইউরোপকে একাই হাতে বড় কৌশলগত পরিবর্তন আনতে হবে। সেটা হবে খুবই কঠিন। এর মূল্য এত বেশি হতে পারে যে অনেক ইউরোপীয় দেশ ও তাদের নাগরিকেরা তা মেনে নিতে চাইবে না।
সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো ইতিহাস ইউরোপকে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ানোর বড় দায়িত্ব দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ইউরোপ সেই দায়িত্ব প্রয়োজনীয় মাত্রায় পালন করতে পারছে না।
* মার্টিন কেটল, দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক।
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: এএফপি |
Friday, December 12, 2025
ইউরোপের প্রতি কেন এতটা ক্ষুব্ধ ট্রাম্প, এতে লাভ হচ্ছে কার
ট্রাম্প আরও বলেন, ইউক্রেনে যুদ্ধের ক্ষেত্রে রাশিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধের জন্য এখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকেই এগিয়ে আসতে হবে। তাঁকেই ‘বিভিন্ন বিষয় মেনে নেওয়া শুরু’ করতে হবে। কারণ, তিনি পরাজিত হতে যাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র গত সপ্তাহে নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশ করেছে। সেখানে ইউক্রেনকে সমর্থন করার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারের সমালোচনা করা হয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, ‘ইউরোপীয় কর্মকর্তারা যুদ্ধ নিয়ে বাস্তববাদী নন, তাঁরা শান্তিচুক্তির পথে বাধা তৈরি করছেন।’
নথিতে আরও বলা হয়েছে, বেশির ভাগ ইউরোপীয় মানুষ শান্তি চান। কিন্তু সে আকাঙ্ক্ষাটুকু নীতিতে রূপান্তর করা হয় না।
গতকাল জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস নিরাপত্তা কৌশলটির সমালোচনা করেছেন। এদিন এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এর (নিরাপত্তা কৌশল) কিছু অংশ বোঝা যায়, কিছু অংশ গ্রহণযোগ্য, আর কিছু অংশ আমাদের জন্য ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়।’
ফ্রিডরিখ আরও বলেন, ইউরোপের গণতন্ত্র রক্ষা করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।
রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্থিতিশীল সম্পর্কের পথে ইউরোপকে একটি অগণতান্ত্রিক বাধা হিসেবে দেখাতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। আর তা রাশিয়ার কর্মকর্তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়েছে।
রাশিয়ার ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (ডিআইএফ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিরিল দিমিত্রিয়েভ এই সুযোগকে কাজেও লাগিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একাধিক পোস্ট দিয়েছেন। তিনি ইউরোপকে নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছেন।
ইউরোপীয় অনলাইন কনটেন্ট বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকেরা গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সকে ১৪ কোটি ডলার জরিমানা করেছে। এ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ইউরোপকে নিয়ে নানা সমালোচনা করেন।
জরিমানা করার প্রতিক্রিয়ায় এক্সের মালিক ইলন মাস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ‘বিলুপ্ত’ করার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন।
ইউরোপীয়রা গণতন্ত্র চর্চার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে বলে ট্রাম্প প্রশাসন যে অভিযোগ তুলেছে, তাকে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করাটা একটু হাস্যকরই বলা চলে। কেননা, দীর্ঘ সময় ধরে রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকাকালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করেছেন।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও নাই করে দিয়েছেন পুতিন। তার ওপর রাশিয়া কার্যত ফেসবুক ও এক্সের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় প্রবেশাধিকার বন্ধ করে রেখেছে। অথচ দিমিত্রিয়েভের মতো প্রভাবশালী রুশ কর্মকর্তারা ইংরেজিতে নিজেদের বক্তব্য ছড়িয়ে দিতে এসব প্ল্যাটফর্মই ব্যবহার করেন।
মনে হচ্ছে এখানে রাশিয়ার একটি পরিকল্পিত কৌশল আছে। তারা ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপের সমর্থন কমাতে চাচ্ছে এবং ন্যাটো জোটের শক্তি নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নিরাপত্তা কৌশল মস্কোকে তথ্যযুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মানুষের মনোভাব প্রভাবিত করতে পারার মতো সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইউরোপীয় নেতাদের সমর্থন দৃঢ় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। একই সময়ে ইউরোপকে উদ্দেশ করে রুশ সতর্কবার্তার সুর আরও জোরালো হচ্ছে।
রুশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কট্টরপন্থী রুশ রাজনীতি বিশ্লেষক সের্গেই কারাগানভ বলেন, ‘রাশিয়া ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, কোনো দুর্দশাগ্রস্ত, করুণ অবস্থায় থাকা, ভুল পথে চালিত ইউক্রেনের সঙ্গে নয়।’
কারাগানভের দাবি, তিনি পুতিনের হয়ে কথা বলেন না, তাই নির্দ্বিধায় নিজের মত জানাতে পারেন। তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ শেষ হবে না, যতক্ষণ না আমরা ইউরোপকে নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করতে পারছি।’
তবে কারাগানভ রুশ সরকারের হয়ে কথা না বললেও এটা পরিষ্কার যে তিনি আসলে পুতিনেরই হুমকির ভাষারই পুনরাবৃত্তি করছেন।
গত সপ্তাহে মস্কোয় ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জারেড কুশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের আগেই পুতিন সতর্ক করে বলেছিলেন, এখনই ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো প্রস্তুতি রাশিয়ার আছে। তবে দেশটি যুদ্ধ শুরুর পরিকল্পনা করছে না।
পুতিন বলেন, ‘আমরা ইউরোপের সঙ্গে যুদ্ধের পরিকল্পনা করছি না। আমি এ বিষয়ে শতবার কথা বলেছি। কিন্তু ইউরোপ যদি হঠাৎ আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় এবং যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে বলব আমরা এখনই প্রস্তুত।’
এই হুমকির ভাষা কাকে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে, তা স্পষ্ট। ক্রেমলিন চাচ্ছে ইউরোপীয়রা আতঙ্কিত হোক। কারণ, এসব কথা তাদের ট্রান্স–আটলান্টিক সম্পর্ককে নড়বড় করে দিচ্ছে।
![]() |
| মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি |
Wednesday, December 10, 2025
ইউক্রেনকে যুদ্ধে সহায়তা বন্ধ করে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প জুনিয়র
ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে দীর্ঘ এক ক্ষুব্ধ বক্তব্যে ট্রাম্প জুনিয়র বলেন, ইউক্রেনের দুর্নীতিগ্রস্ত ধনীরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন আর যুদ্ধ করার জন্য তাদেরই ফেলে গেছেন, যাদের ‘তারা চাষাভুষা বলে মনে করেন’।
ট্রাম্প জুনিয়রের তাঁর বাবার প্রশাসনে কোনো আনুষ্ঠানিক পদ নেই। কিন্তু তিনি মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) মুভমেন্টের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তার এই মন্তব্য ইউক্রেনীয় সরকারের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের কিছু মানুষের অনীহাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এ ছাড়া ট্রাম্প জুনিয়র এমন সময় এ মন্তব্য করেছেন, যখন ট্রাম্পের মধ্যস্থতাকারী দল কিয়েভকে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
ট্রাম্প জুনিয়র বলেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছেন। কারণ তিনি জানেন, যুদ্ধ শেষ হলে তিনি কখনোই কোনো নির্বাচনে জিততে পারবেন না। তিনি বলেন, জেলেনস্কি বামদের কাছে প্রায় দেবতার মতো। কিন্তু ট্রাম্প জুনিয়র বলেন, রাশিয়ার চেয়ে ইউক্রেন অনেক বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসেরও কড়া সমালোচনা করেন ট্রাম্প জুনিয়র। তিনি বলেন, ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞাগুলো কাজ করছে না। কারণ এটি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যা থেকে রাশিয়া যুদ্ধের খরচ চালাতে পারছে। তিনি ইউরোপীয় পরিকল্পনাটিকে এভাবে বর্ণনা করেন, ‘আমরা রাশিয়ার দেউলিয়া হওয়ার জন্য অপেক্ষা করব—এটা কোনো পরিকল্পনা হতে পারে না।’
ট্রাম্প জুনিয়র বলেন, ২০২২ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ভোটারদের কাছে যাওয়ার সময় তিনি মাত্র তিনজন লোকের দেখা পেয়েছেন, যাঁরা ইউক্রেন যুদ্ধকে গুরুত্বপূর্ণ ১০ ইস্যুর একটি বলে মনে করতেন। তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার নৌকার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল নামক মাদক প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ছে। ইউক্রেন বা রাশিয়ায় যা কিছু ঘটছে, তার চেয়েও এটি অনেক বেশি সুস্পষ্ট এবং দোরগোড়ায় হাজির হওয়া বিপদ।
তথ্যপ্রমাণ না দিয়েই ট্রাম্প জুনিয়র দাবি করেন, তিনি এই গ্রীষ্মে মোনাকোতে এক দিনেই দেখেছেন বুগাটি ও ফেরারির মতো বিলাসী গাড়িগুলোতে ৫০ শতাংশই ইউক্রেনীয় নম্বর প্লেট। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আপনি কি মনে করেন যে ইউক্রেনে আয় করা অর্থে এসব হয়েছে?’
ট্রাম্প জুনিয়রের বাবা ইউক্রেনে শান্তি আনতে পারবেন দাবি করে নির্বাচনে লড়েছিলেন। তাঁর পক্ষে এখান থেকে সহজেই সরে যাওয়া সম্ভব কি না, জানতে চাইলে ট্রাম্প জুনিয়র বলেন, হয়তো তিনি তা করবেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর বাবা এমন একজন রাজনীতিক, যাঁর বিষয়ে আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। তিনি অঙ্গীকার করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রকে আর ‘চেকবুক হাতে বোকা সেজে থাকতে দেবেন না’।
![]() |
| ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র। ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, December 9, 2025
যুক্তরাষ্ট্র বলছে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানো গেছে, প্রস্তাবে বড় পরিবর্তন আনতে বলছে রাশিয়া
যুক্তরাষ্ট্র বলছে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানো গেছে, প্রস্তাবে বড় পরিবর্তন আনতে বলছে রাশিয়া
চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানোর তথ্য জানিয়েছেন ইউক্রেনবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত কেইথ কেলগ। আগামী জানুয়ারিতে এই পদ থেকে সরে যাচ্ছেন তিনি। গতকাল শনিবার ক্যালিফোর্নিয়ায় রেগ্যান ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোরামে কেলগ বলেন, সংঘাতের সমাধান করার প্রচেষ্টা ‘শেষ ১০ মিটার দূরে রয়েছে।’ এই শেষ সময়টা সবচেয়ে কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আর দুটি বাধা অতিক্রম করতে হবে বলে জানান কেলগ। এর একটি হলো ভূখণ্ডবিষয়ক—বিশেষ করে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে দনবাস নিয়ে। অপরটি হলো ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র। ইউরোপের সবচেয়ে বড় এই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে রাশিয়ার দখলে রয়েছে। কেলগ বলেন, এই দুটি বিষয়ের সমাধান হলে অন্য সমস্যাও কেটে যাবে।
এর আগে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ওই বৈঠকের পর পুতিনের পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান সহকারী ইউরি উশাকভ বলেছিলেন, ভূখণ্ড নিয়ে সমস্যাগুলো আলোচনা হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির জন্য ইউক্রেনে পুরো দনবাস অঞ্চল চায় মস্কো।
দনবাসের অন্তত ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চল এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ভাষ্যমতে, এই অঞ্চলগুলো রাশিয়ার হাতে তুলে দিলে সেখান থেকে ইউক্রেনের আরও গভীরে হামলা চালাতে পারবে মস্কো। আজ রোববার উশাকভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাবে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। যদিও এ নিয়ে বিস্তারিত বলেননি তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে তিন দিনের আলোচনার আয়োজন করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে। শনিবার ছিল আলোচনার শেষ দিন। এদিন জেলেনস্কি বলেন, আলোচনার তৃতীয় দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ‘বাস্তবসম্মত ও গঠনমূলক’ আলোচনায় নিজ দেশে প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি যোগ দিয়েছিলেন।
বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ টেলিগ্রামে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, সত্যিকারের শান্তি আনতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সততার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইউক্রেন। ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার পরবর্তী ধাপ এবং কাঠামো সম্পর্কে একমত বিভিন্ন পক্ষ। জেলেনস্কি আরও বলেন, যেকোনো গঠনমূলক অগ্রগতির বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে মস্কোর ওপর।
এদিকে আগামীকাল সোমবার যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে সেখানে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। মস্কো যেন শান্তির পথে ফিরে আসে, সে জন্য চাপও দেবেন তাঁরা।
৭০০ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
যুদ্ধ বন্ধে দফায় দফায় আলোচনা ও দর-কষাকষির মধ্যে ইউক্রেনে ৭০০ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের শনিবারের আলোচনার আগে রাতভর এই হামলা চালানো হয়। ইউক্রেনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো ও রেলসম্পদকে এ হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
হামলায় ইউক্রেনের হাজার হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ ও পানিসংকট দেখা দেয়। হামলার পর ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ‘হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল আমাদের জ্বালানি অবকাঠামোগুলো। ইউক্রেনের লাখ লাখ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলাটাই রাশিয়ার লক্ষ্য।’ বিশাল এই হামলার কথা স্বীকার করেছে ক্রেমলিনও।
তবে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা অস্বীকার করেছে মস্কো। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, তারা শুধু ইউক্রেনের সামরিক শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। সব লক্ষ্যবস্তুতেই সফলভাবে আঘাত হানতে পেরেছে তারা।
![]() |
| ইউক্রেন সামরিক বাহিনীর ট্রাংকের বহর। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Friday, December 5, 2025
ট্রাম্প আসলে ইউরোপের পিঠে ছুরি মেরেছেন by হ্যারল্ড জেমস
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাথমিক কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ ২৮ দফা পরিকল্পনা চারটি আলাদা ঘটনার পরে আসে, যেগুলো প্রতিটিই একেকটি মোড় ঘোরানোর মতো অবস্থা তৈরি করেছিল।
প্রথমত, ইউক্রেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নেতৃত্বকে দুর্বল দেখানোর জন্য এবং ইউক্রেনের সরকার পরিবর্তনের দাবি তোলার জন্য ইউক্রেনের নিজস্ব দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলো থেকে আসা এসব অভিযোগকে ব্যবহার করা হয়।
দ্বিতীয়ত, রাশিয়া পশ্চিমা দেশগুলোকে লক্ষ্য করে আরও তীব্র ও অযৌক্তিক পারমাণবিক হামলার হুমকি দিচ্ছে। তারা এমন অস্ত্র পরীক্ষা করেছে বলে দাবি করছে, যা নাকি যুক্তরাজ্যসহ উত্তর ইউরোপের সমুদ্রতীরবর্তী নিচু এলাকার ওপর তেজস্ক্রিয় ‘সুনামি’ তৈরি করতে পারে। ক্রেমলিন বলছে, তাদের ‘বুরেভেস্তনিক’ নামের পারমাণুচালিত ক্রুজ মিসাইল কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে থামানো যাবে না। এসব হুমকির উদ্দেশ্য ইউরোপকে ভয় দেখানো, যাতে তারা ইউক্রেনকে আর সামরিক সহায়তা না দেয়।
তৃতীয়ত, ইউরোপের নানা দেশে ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ বা প্রথাবিরোধী জনতাবাদী দলগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসরের বিভিন্ন পক্ষ যুদ্ধ বন্ধ করাকে তাদের প্রধান দাবি বানিয়েছে।
এদিকে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের সরকারগুলোকে দুর্বল, অকার্যকর ও দিশাহারা দেখাচ্ছে। তারা বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করবে, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া কাটিয়ে উঠবে, কিংবা নিজেদের ভাঙা সমাজগুলোকে আবার একত্র করবে।
ফলে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইউরোপে এমন এক নতুন রাজনীতির যুগ শুরু হচ্ছে, যেখানে মারিঁ লো পেনের ন্যাশনাল র্যালি ফ্রান্সে, অলটারনেটিভ ফিউর ডয়চল্যান্ড জার্মানিতে আর নাইজেল ফারাজের রিফর্ম ইউকে ব্রিটেনে ক্ষমতায় যেতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপ ও ইউরোপীয় রাজনীতি নিয়ে নানা ধরনের ভুল তথ্য (ডিজইনফরমেশন) ছড়াচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন নাকি রাশিয়ার তেল কিনে নিষেধাজ্ঞা ভাঙছে। বাস্তবে, রুশ তেল কেনা এখন সীমাবদ্ধ মাত্র দুটি দেশে। এর একটি হলো হাঙ্গেরি; অপরটি স্লোভাকিয়া। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে হাঙ্গেরি। তাদের প্রকাশ্য ক্রেমলিনপন্থী সরকার ট্রাম্পের কাছে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা অব্যাহত রাখার অনুমতি চেয়েছিল। আর ট্রাম্প তাদের সে অনুমতি দিতে কোনো আপত্তিই করেননি।
সর্বশেষ মার্কিন শান্তি প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিভ্রান্তিকর বর্ণনা। এটি কিছু পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক বহুদিন ধরে তুলে ধরছেন। তাঁদের দাবি হলো, ন্যাটো নাকি রাশিয়ার জন্য হুমকি, আর রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকে দেওয়া পশ্চিমা নিরাপত্তা-গ্যারান্টি নাকি রাশিয়ার সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ।
তাঁদের মতে, ১৯৯০-এর দশকে ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণই সেই বিস্ফোরক, যা ২১ শতকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে উড়িয়ে দেয় এবং রাশিয়াকে ২০১৪ সালে ‘প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে’ নামায় এবং ২০২২ সালে সে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়।
যাঁরা মনে করেন ন্যাটোর বিস্তারই ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণ, তারা মূলত ক্রেমলিনের কথাই বিশ্বাস করছেন। অর্থাৎ তাঁরা বিশ্বাস করেন, ন্যাটো রাশিয়ার জন্য আসল হুমকি। কিন্তু তারা আসল হুমকিটিকে, অর্থাৎ সফল গণতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে উপেক্ষা করছেন।
ক্রেমলিন এখনো উনিশ শতকের তিনটি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে: অর্থোডক্স খ্রিষ্টিয়ানিটি, স্বৈরতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদ। এই মানদণ্ডে রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মানে অন্য দেশের আত্মনিয়ন্ত্রণ দমন করার অধিকার।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন আসে—সংঘাত কি ‘স্থির’ অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব? কার্যকর যুদ্ধবিরতি হলে মানুষকে পুনর্বাসন করা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করা যেত। কিন্তু এই যুদ্ধবিরতি যদি রাশিয়ার চাপানো রাজনৈতিক সমাধান থেকে আসে, তাহলে ইউক্রেন, ইউরোপ এবং পুরো বিশ্বের জন্য এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।
সংশোধিত ট্রাম্প পরিকল্পনায়ও গুরুতর সমস্যা আছে। সেখানে স্পষ্ট ও শক্তিশালী ন্যাটো-ধরনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি নেই। রাশিয়া আবার আক্রমণ করলে ঠিক কী করা হবে, তার বদলে শুধু বলা আছে—‘আলোচনা হবে’। এই অস্পষ্টতা পুরো পরিকল্পনাটিকে খুবই বিপজ্জনক করে তোলে।
ইউক্রেনের দৃষ্টিতে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা ছিল একধরনের ‘পেছন থেকে ছুরি মারা’। ইউক্রেনের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত না হলেও এই পরিকল্পনা কার্যকর হলে দেশটি যুদ্ধেই হার মানবে। তখন ইউক্রেনের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করবে—এর দায় কার? এতে দেশের ঐকমত্যনির্ভর রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং দেশ আবার স্বৈরশাসনের দিকে হোঁচট খেতে পারে।
ট্রাম্পের মূল পরিকল্পনা ইউরোপ, ইউরোপের প্রতিষ্ঠান এবং তার বিশ্বদৃষ্টিকেও দুর্বল করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তখন কাগুজে বাঘ হিসেবে দেখা হবে। সবাই মনে করবে, তার বড় বড় কথা ও বড় বড় ধারণা আছে, কিন্তু বাস্তবে তা প্রয়োগ করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা নেই। এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়লে ইউরোপীয় রাজনীতিবিদেরা বেশি করে নতিস্বীকার করবে ডানপন্থী (এবং কিছু ক্ষেত্রে বামপন্থী) সেই শক্তিগুলোর কাছে, যারা অতীতের জাতীয় সার্বভৌমত্বকেই ফিরিয়ে আনতে চায়।
বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়া দুই শক্তিশালী দেশ জার্মানি ও ফ্রান্সের জন্য এমন পরিবর্তন অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে। বাকি বিশ্বের জন্যও মার্কিন অবস্থান ভয়াবহ ইঙ্গিত বহন করে। রাশিয়ার ইতিহাস বর্ণনাকে এমন সরলভাবে গ্রহণ করা জানিয়ে দেয়—বিশ্বে আমেরিকার ক্ষমতা ও প্রভাব এখন চূড়ান্ত পতনের দিকে। এর মধ্য দিয়ে যে বার্তা পাওয়া যায়, তা খুবই স্পষ্ট: এখন আমেরিকা কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করে না, তাই তাকে সহজেই কিনে ফেলা যায়।
● হ্যারল্ড জেমস, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
![]() |
| ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা মূলত পুতিনের হাতকেই শক্তিশালী করছে। ছবি : রয়টার্স |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...












