Tuesday, June 3, 2014

রাহুলকে এবার ‘সার্কাসের এমডি’ বলায় কংগ্রেস নেতা বহিষ্কৃত

রাহুল গান্ধী
ভারতে কংগ্রেস দলের সহসভাপতি রাহুল গান্ধীকে ‘কংগ্রেসের সার্কাস দলের এমডি’ অভিহিত করে এবার দল থেকে বহিষ্কৃত হলেন রাজস্থান বিধানসভার সদস্য ভানওয়ার লাল শর্মা৷ গতকাল রোববার দল থেকে তাঁকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে৷ এর আগে রাহুলকে ‘জোকার’ (ভাঁড়) বলে বহিষ্কৃত হয়েছেন দলের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা টি এইচ মুস্তফা৷ খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার৷ রাজস্থানের চুরু জেলার সারদা শহর আসন থেকে বিধানসভার ছয়বারের নির্বাচিত সাংসদ ভানওয়ার শর্মা৷ গত শনিবার রাহুল গান্ধীর কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন,
কংগ্রেসকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য নেতা রাহুল নন৷ দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরে নতুন নেতৃত্ব ঠিক করা প্রয়োজন৷ পুরো দলের মধ্যে গণতন্ত্র থাকতে হবে৷ ভানওয়ার রাহুলকে ঘিরে থাকা নেতাদের জোকার (ভাঁড়) আখ্যা দিয়ে তাঁকে ‘কংগ্রেসের সার্কাস দলের প্রধান’ বলে উল্লেখ করেন৷ বহিষ্কৃত হওয়ার পরও নিজের অবস্থানে অনড় ভানওয়ার শর্মা৷ গতকাল তিনি দাবি করেন, তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে দলের অনেক নেতাই একমত৷ এর আগে রাহুলকে জোকার বলে অভিহিত করেন কেরালার নেতা ও অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির (এআইসিসি) সদস্য টি এইচ মুস্তফা৷ লোকসভা নির্বাচনে দলের শোচনীয় পরাজয়ের জন্য রাহুলকে দায়ী করে তিনি বলেছিলেন, রাহুল স্বেচ্ছায় দলীয় পদ না ছাড়লে তাঁকে অপসারণ করা উচিত৷ এই মন্তব্যের জন্য মুস্তফাকে দল থেকে বহিষ্কার করে দলের রাজ্য কমিটি৷

ইউটিউবে গ্যাংনামের রেকর্ড

ইউটিউবে গ্যাংনামের রেকর্ড
দক্ষিণ কোরিয়ার র৵াপ গায়ক সাইয়ের ‘গ্যাংনাম স্টাইলের’ ভিডিওটি িনয়ে প্রথমে হইচই শুরু হয় ২০১২ সালের জুলাইয়ে৷ এরপর দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে৷ ভিডিও আদান-প্রদানের মাধ্যম ইউটিউবে রেকর্ড গড়ে ফেলেছে সাইয়ের সেই িভডিওটি৷ সর্বাধিক ২০০ কোটিবার মানুষ সাইয়ের ভিডিওটি দেখেছে ইউটিউবে৷ এর আগে সবচেয়ে বেশিবার দেখা ভিটিওটি ছিল মার্কিন গায়ক জাস্টিন বিবারের৷ তাঁর ‘বেবি’ শিরোনামের গানটি ইউটিবে মানুষ দেখে ১০০ কোটিবার৷ খবর বিবিসির৷
সাইয়ের ‘ঘোড়া-নৃত্য’ জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন থেকে শুরু করে ফিলিপাইনের কারাগারের কয়েদি পর্যন্ত সবার কাছে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়৷ গ্যাংনাম স্টাইলের ওই নাচের পরে তাঁর প্রকাশিত ‘জেন্টেলম্যান’ নামে একটি গানও ইউটিউবে প্রায় ৭০ কোটিবার দেখা হয়৷ ইউটিউবে এই গানটি এক দিনে রেকর্ডসংখ্যক তিন কোটি আশি লাখবার দেখা হয়৷ সাইয়ের জন্ম দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সউলের গ্যাংনাম শহরে৷ রেকর্ডের অধিকারী গ্যাংনাম স্টাইলের গানটি তাঁর ষষ্ঠ অ্যালবামের৷ ইউটিউবে সবচেয়ে বেশিবার দেখা ১৫টি ভিডিওর তিনটিই তাঁর৷ ইউটিউবে জাস্টিন বিবারের পর ‘চার্লি বিট মাই ফিঙ্গার’ নামে একটি ভিডিও দেখা হয় ৭১ কোটি ১০ লাখবার৷ নিজের ভিডিওগুলোর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সম্পর্কে ৩৬ বছর বয়সী সাই বলেন, ‘সমস্যা হলো যে, আমার চেয়ে আমার মিউজিক ভিডিওগুলো বেশি জনপ্রিয়৷’ গানের জগতে তাঁর বিচরণ শুরু হয় ১৩ বছর আগে৷ ২০১২ সালে ওংওয়ান অর্ডার অব কালচারাল মেরিট নামে দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক সম্মাননা অনুষ্ঠানে অংশ নেন সাই৷ তিনি প্রেসিডেন্ট পার্ক জিউন-হাইয়ের অভিষেক অনুষ্ঠানেও গান করেন৷

বিজেপি সরকার- নতুন লক্ষ্যে ভারত by যশোবন্ত সিং

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবারই প্রথম নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করল। এ নির্বাচনে আগের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কংগ্রেস নিম্নকক্ষে ৫৪৩টি আসনের মধ্যে মাত্র ৪৪টি আসন পেয়েছে, ফলে তারা অতীতের ছায়ায় পরিণত হয়েছে। এ নির্বাচনে ভারতের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতিই নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপির তুরুপের তাস হিসেবে কাজ করেছে, আগামী দিনে ভারতের বিদেশনীতিতেও তা একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। মোদ্দা কথা, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সন্দিগ্ধ ও ভীরুতাপূর্ণ নীতির যুগ শেষ হলো, যা প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ততার পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।
ভারতের নতুন সরকারের সামনে বহিঃস্থ চ্যালেঞ্জের কমতি নেই। ইউপিএ সরকার ২০০৪ সালে ক্ষমতায় এসে জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে আগের বিজেপি সরকারের গৃহীত ইতিবাচক অবস্থানকে লক্ষ্যহীনভাবে বিনষ্ট করেছে। বিজেপি সরকার যে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা করেছিল, সেগুলোকে তারা অবহেলা করেছে। ইউপিএ জোটের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কারণে এটা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের বিরোধিতার কারণে ইউপিএ সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি। অথচ এই চুক্তির বাস্তবায়ন যথেষ্ট দ্রুত গতিতেই চলছিল। একই সঙ্গে তাঁরা ‘নিউক্লিয়ার লায়াবিলিটি বিল’কেও ক্রমাগতভাবে খাটো করেছে। বাস্তবে এই বিল এখনো নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে আছে। মোদিকে শিগগিরই তা শোধরাতে হবে।
সাহসী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে মোদির বেশ সুবিধাই হবে, কারণ সংসদে বিজেপি বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে (বিজেপি নিজেই পেয়েছে ২৮২টি আসন, জোটভুক্ত অন্য দলগুলো পেয়েছে আরও ৫০টি আসন)। প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি তাঁর রাজনৈতিক পুঁজি কাজে লাগিয়ে ভারতের স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাবেন? মোদির সরকার একটি জোরালো আন্তর্জাতিক অবস্থান নিলেও তা যেন ঘুণাক্ষরেও কোনো নিরপেক্ষ জায়গায় না যায়, সে বিষয়ে তাঁর সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। এমনকি ‘কৌশলগত নিজস্বতা’র নীতিও নেওয়া যাবে না। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঐক্যের ক্ষেত্রেও তাঁকে বৈশ্বিক ধারা অনুসরণ করতে হবে।
অর্থনৈতিক কূটনীতি মোদির কার্যক্রমের একটি বড় অংশ দখল করে থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সর্বোপরি, ভারতের আন্তর্জাতিক বিশিষ্টতা অর্জিত হয়েছে দেশটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে। ভারতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পাশের বাড়ির প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন। মোদি ইতিমধ্যে বলেছেন, তিনি সার্ককে একটি ‘ক্রিয়াশীল সংস্থা’ হিসেবে দেখতে চান, কংগ্রেস সরকারের আমলে যেটা অনেকাংশেই ঝিমিয়ে পড়েছিল। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অকারণে তলোয়ার ঘোরানো বন্ধ করতে হবে, আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এ যুক্তিতেই তিনি হয়তো তাঁর শপথ অনুষ্ঠানে নওয়াজ শরিফসহ সার্ক নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেটা করতে হলে মোদিকে আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করতে হবে, ব্যক্তিপর্যায়ে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ছাড়া নিশ্চিত করা যাবে না। এ অঞ্চলে এটা কঠিনই বটে, কারণ ভারত-পাকিস্তানসহ পুরো অঞ্চলেই বহুদিনের বিরাজমান উত্তেজনা ও রাষ্ট্রীয় মদদে পরিচালিত সন্ত্রাস এ ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ভারত-চীনের মধ্যকার সীমান্ত বিরোধের কারণে বিষয়টি আরও খারাপের দিকে যাবে। কাছাকাছি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে চলমান ডামাডোলও এতে তেল-জল জোগাবে। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। সে কারণে ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এ মুহূর্তে সহযোগিতা ও ঐক্যের ক্ষেত্রে সহায়ক নয়।
আরও উজ্জ্বল ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য মোদিকে কৌশলের দিক থেকে একটি সুচারু ও বিশ্বাসযোগ্য জায়গায় যেতে হবে। সন্ত্রাসী ও তাঁদের মদদদাতাদের প্রতি কোনো সহনশীলতা দেখানো চলবে না, যাকে বলে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখাতে হবে। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাত গুটিয়ে নেওয়ার ফলে ভারতকে তার নিজ স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট হতে হবে—যেমন ‘ব্লু ওয়াটার’৷ নৌসক্ষমতা গড়ে তুলে ভারতের জ্বালানি বাণিজ্যের নৌপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
আসিয়ানের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কোন্নয়ন করতে হবে, কংগ্রেস সরকার যেটা করতে বরাবরই অনাগ্রহী ছিল। আঞ্চলিক সম্পর্ক সুস্থিত জায়গায় আনতে গেলে এর বিকল্প নেই। আসিয়ান ও এর সদস্য দেশগুলোসহ আরও ছয়টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ‘রিজিয়নাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’-এ ভারতের অন্তর্ভুক্তি সঠিক লক্ষ্যেই হয়েছে, তবে আরও বহুদূর যেতে হবে। কিন্তু ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্ব হচ্ছে মর্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। সমস্যা হচ্ছে, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বিষয়টি ধরতে পারেননি, ফলে সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টিসহ ভারতকে এর জন্য কঠিন মূল্য দিতে হয়। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মোদির সম্পর্কও ভালো নয়, কারণ, ওই দেশটির কর্তারা গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অনেক মুসলমান মারা যাওয়ার ঘটনায় মোদিকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। মোদি সে সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।
এ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বের কথা বিবেচনায় রাখলে, মোদিকে অবশ্যই সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, যত শিগগির সম্ভব। ভারত-মার্কিন বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক তাঁকে চাঙা করতে হবে। বিশেষত ভারতের দুর্বল বুদ্ধিবৃত্তিক-সম্পদ সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ও ভারতের তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় মার্কিন অভিবাসন আইন সংস্কার নিয়ে যে ভীতি কাজ করছে, এ দুটো বিষয়ের ওপর তাঁকে কাজ করতে হবে। উভয় পক্ষের ধৈর্য ও আপসকামী মনোভাবের ওপর সফলতা নির্ভর করছে। আস্থা সৃষ্টির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা আরও জোরদার হবে। ভারত কিছু কাজ করতে পারে, যেমন কর ব্যবস্থার বাস্তব সংস্কার সাধন ও ‘ট্রান্সফার প্রাইসিং’ এবং অতীতের জন্য আরোপিত করের বিধান বাতিল করা।
মোদির পররাষ্টনীতির ক্ষেত্রে শেষ বাধা হচ্ছে রাশিয়া। এ দেশটিকেও মনমোহন সিং সরকার উপেক্ষা করেছে। পুতিনের প্রশাসন ক্রমেই ভীষণ আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠছে৷ এ প্রক্ষাপটে সেই দেশের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক হবে তা নিরূপণ করতে হবে। আর পুতিন যে এশিয়ায় চীনকে একমাত্র কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখছেন তা মোটেও ভারতের জন্য সুবিধাজনক নয়, এটা মোদিকে বুঝতে হবে। রাশিয়া, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে হলে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে, আরও বেশি হারে যৌথ উৎপাদনের সুযোগ রেখে এটা করা যেতে পারে। আর সেটা হলে, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রেও একই নীতি কেন নেওয়া হবে না?
নিঃসন্দেহে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে মোদির সামনে অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু একটি স্বচ্ছ, আত্মবিশ্বাসী ও আস্থা বৃদ্ধিকারী নীতির মাধ্যমে তিনি ভারতকে শান্তি এবং সমৃদ্ধির পথে বহুদূর নিয়ে যেতে পারেন—তাঁর সামনে এটা এক বিরল সুযোগই বটে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০১৪, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
যশোবন্ত সিং: ভারতের সাবেক অর্থ, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

ফরমালিন ও রাজনীতি by সৈয়দ আবুল মকসুদ

রাজনীতির সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক দীর্ঘকালের। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে ফরমালিনের মতো রাসায়নিকের সম্পর্কের কথা কস্মিনকালেও কেউ শোনেনি। এখন তা শোনা যাচ্ছে। সব দেশের রাজনীতির সঙ্গে ফরমালিনের কোনো সম্পর্ক নেই। বঙ্গীয় রাজনীতি আজ ফরমালিনমিশ্রিত। দেশের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী, বড় ও ছোট, ডান ও বাম—সব দলের নেতাদের মুখে সমস্বরে ধ্বনিত হচ্ছে একটি শব্দ: ফরমালিন।
ফরমালিন রাসায়নিকটি একসময় মৃতদেহের পচন রোধে এবং কোনো নমুনা সংরক্ষণে ব্যবহৃত হতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও রসায়নবিজ্ঞানীরা তা হাসপাতালে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করতেন। একদিন বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যের লোকেরা খোঁজ পান এই অমূল্য দ্রব্যটির। এখন খাদ্যসামগ্রীর ভোক্তা ও মাছের বাজারের ক্রেতাদের মুখে মুখে উচ্চারিত ফরমালিন শব্দটি। মাছে ফরমালিন; আম, আঙুর, আপেলে ফরমালিন; আটা, ময়দা, দুধ, সেমাই, রসগোল্লায় ফরমালিন। আজ এমন মানুষ নেই, যার শরীরে ফরমালিন পাওয়া যাবে না। রাজনীতিকেরাও আমাদের মতো মানুষ। মাছ, দুধ, মিষ্টিমণ্ডা, ফলমূল যেহেতু তাঁরা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি খান, তাই তাঁদের শরীরে ফরমালিন যে কিঞ্চিৎ বেশি থাকবে, তা পরীক্ষা না করে অনুমানেই বলা যায়। কিন্তু রাজনীতি কোনো মানুষও নয়, প্রাণীও নয়; তার মুখ নেই, দেহ নেই—তার মধ্যে ফরমালিন ঢুকল কীভাবে?
প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর করে দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিএনপি পচে গেছে, ‘এখন তো সব জায়গায় ফরমালিন। ফরমালিন দিয়ে তাজা রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে তাজা রাখার চেষ্টা করছি। তা না হলে এত কথা কীভাবে বলছেন।’ [যুগান্তর] বিএনপির নেতারা চুপ থাকতে পারেন না। তাঁরা প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বাঁচিয়ে রাখার কথা বলে তিনিই এখন দেশের বিষাক্ত ফরমালিনে পরিণত হয়েছেন।’ [আমাদের সময়]

শব্দটি যদি দুই দলের নেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে কোনো কথা ছিল না। কারণ, দুই দলের নেতাদের ভাষা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ওয়াকিবহাল। তাঁদের বাক্য গঠন, শব্দ প্রয়োগ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা ব্যবহারের বিষয়ে তাঁরা পরিচিত৷ টেলিভিশনের মাধ্যমে তাঁরা প্রতিদিন হুবহু তা শুনছেন। কিন্তু একই দিনে ফরমালিন শব্দটি প্রয়োগ করলেন প্রখ্যাত সংবিধানবিশেষজ্ঞ রাজনীতিক ড. কামাল হোসেন। নাগরিক ঐক্যের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ফরমালিন দূর করতে হবে। খাবারে ফরমালিন দিয়ে পচা ও নষ্ট জিনিসকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, আমাদের রাজনীতিতেও সেভাবে ফরমালিন দেওয়া হচ্ছে। [প্রথম আলো] কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের কাছে রুশ বিপ্লব ও মাও ঝেদোঙের লংমার্চের চেয়ে কম বিপ্লবী কিছু গ্রহণযোগ্য নয়। সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ নিপাতে তাঁরা সোজাসাপটা কথা বলেন। বাক্যে কোনো মেটাফর প্রয়োগ করেন না। তাঁরা পর্যন্ত বলছেন, শাসকশ্রেণি ও তাদের সরকার নিজেই একপ্রকার ফরমালিনে ডুবে থেকে নিজেকে কোনোরকমে রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, পুরো জাতি এখন ফরমালিন সিনড্রোমে আক্রান্ত। ফরমালিন একটি স্লো পয়জন। দেহে গেলে এক দিনেই মানুষ মরে না, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। এমনভাবে হয় যে হৃষ্টপুষ্ট মানুষটি টেরও পায় না।
রাজনীতিতে ফরমালিনের কোনো আক্ষরিক অর্থ হয় না। ভাবার্থ হলো, রাজনীতি দূষিত হয়ে গেছে, বিষাক্ত হয়ে গেছে। ওই রাজনীতির ফলে জাতি মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে পারে। শুধু সরকারি ও বিরোধী বড় বড় দলের রাজনীতি যে দূষিত হয়েছে তা-ই নয়, ছোট দলগুলোর রাজনীতিও দূষণমুক্ত নয়। তারা সরকারি ও প্রধান বিরোধী দলের সমালোচনা করে, কিন্তু নিজেদের চেহারার দিকে তাকায় না। জাতির এই দুর্দিনে তারা কী ভূমিকাটা পালন করছে? সারা দেশ ঘুরে এই অবস্থাটা থেকে পরিত্রাণের জন্য কী কাজটা করছে?
এই উপমহাদেশে রাজনীতিতে তরুণদের ভূমিকাই ছিল প্রধান, নেতৃত্বে থাকতেন প্রবীণেরা। সেটা ব্রিটিশ আমলে কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও, মুসলিম লীগের ক্ষেত্রেও। পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রেও। তারুণ্যের অংশগ্রহণ ছাড়া আইয়ুব খানের একনায়কত্বের অবসান ঘটানো যেত না উনসত্তরে। তারুণ্যের আত্মত্যাগ ছাড়া একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সফল হতে পারত না। প্রবীণেরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে খুব বেশি দূর যেতে পারতেন না। বর্তমান ব্যবস্থায় তরুণ-তরুণীরা অনেকেই হতাশ, অধিকাংশই বিরক্ত, কিন্তু তাঁরা জোরালো প্রতিবাদে ফেটে পড়ছেন না। অবশ্য নেতৃত্ব ছাড়া বিদ্রোহ হয় না। নেতৃত্বহীনতার কারণে বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই মেনে নিচ্ছেন অনেকে। যদিও বুদ্ধিমান তরুণেরা জানেন, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাঁদের কোনো সুন্দর ভবিষ্যৎ নেই। বিদ্রোহী না হয়েও এই ব্যবস্থাকে যে ঘৃণা করবেন, তা করছেন না।
অথচ এই রাজনীতি তরুণদের নিয়ে ব্যবসা করছে। শাসকশ্রেণি গুন্ডাপ্রকৃতির তরুণদের বেছে নিচ্ছে। পাস করার আগেই তাঁদের লাখ লাখ টাকা উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। মেধা তাঁদেরও ছিল। কিন্তু মেধার ব্যবহার নয়, তাঁদের পেশিশক্তির ব্যবহার করছে বর্তমান রাজনীতি। দলীয় ক্যাডারদের মধ্যে যারা মারামারিতে অভ্যস্ত নয়, তারা খোশামুদিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। তোষামোদি করে তারা চাকরি বাগিয়ে নিচ্ছে, যোগ্যরা বাদ পড়ছেন। দয়ায় পাওয়া চাকরির লোকদের দিয়ে মানসম্মত ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বেড়েছে ঘুষ-দুর্নীতি।
প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে না থাকলেও সব দেশের রাজনীতিতে শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকা থাকে। স্বাধীনতার আগে প্রগতিশীল রাজনীতিতে তা দেখা গেছে। আজ আমাদের বিশাল শ্রমিকশ্রেণি৷ পোশাকশিল্প ও অন্যান্য কলকারখানার শ্রমিকেরা তুচ্ছ ব্যাপারে কারখানায় ভাঙচুর করেন, আগুন দেন, মালিকপক্ষের লোকদের মারধর করেন। এসব করেন হতাশা থেকে। সুস্থ রাজনীতি ও ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে এসব হতে পারত না। যা করার বার্গেইনিং এজেন্টরাই করত শ্রমিকদের স্বার্থে।
পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের অধিকাংশই গ্রামের ভূমিহীন পরিবারের সদস্য। গ্রামেও তাঁদের ঠাঁই নেই, শহরেরও তাঁরা কেউ নন। বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য গৃহীত কোনো কর্মসূচি তাঁদের সামনে তুলে ধরা হয়নি। তা ছাড়া সময়সাপেক্ষ কর্মসূচিতে তাঁদের সায় নেই। তাঁরা চান তাৎক্ষণিক সুবিধা। তাতে যদি তাঁদের কারখানা বন্ধও হয়ে যায়, তাতেও তাঁদের দুশ্চিন্তা নেই। কারণ, তাঁরা দেখছেন যে মালিকেরাও নগদ প্রাপ্তিতে বিশ্বাসী। বিদেশে টাকা পাচার করেন। সেখানে বাড়িঘর কেনেন। জাতির দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণের চিন্তা তাঁদের মাথায় নেই। ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ নিয়ে তাঁরা একদিন সপরিবারে বিদেশে পালিয়ে গেলে রাষ্ট্র তাঁদের লোমটিও ধরতে পারবে না। মালিকদের অধিকাংশই কোনো না কোনো বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। দূষিত রাজনীতি শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করছে, অন্যদিকে তাঁরা বিষাক্ত রাজনীতির সুযোগ নিচ্ছেন। ফলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি না হয়ে একটি দূষিত চক্র তৈরি হচ্ছে।
ফরমালিনযুক্ত রাজনীতির আশীর্বাদে ১৯৮৫ সালের ট্রাকের হেলপার ’৮৭ সালে ড্রাইভার হন। সেটা খুবই স্বাভাবিক। বঙ্গীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির বরাতে তিনি ১৯৯১-তে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হন। ২০১২-তে নির্বাচিত হন কাউন্সিলর। তাঁর ‘মালিকানাধীন নারায়ণগঞ্জ-চিটাগাং রোডে চলাচলকারী এবিএস পরিবহনের ৩২টি লাক্সারি বাস রয়েছে। শিমরাইল মৌজায় ৩৭৩ নম্বর দাগে প্রায় ১১ শতাংশ জমির ওপর সাত কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা, ৭২ ও ৭৩ নম্বর দাগে ১০ শতাংশ জমির ওপর পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়তলা ও ৩১২ নম্বর দাগে ১০ তলা ফাউন্ডেশনের ওপর ছয়তলা বাড়ি নির্মাণ করছেন। রসুলবাগে সাড়ে আট কাঠা জমির ওপর রয়েছে তাঁর সাততলা ভবন। এ জমির অর্ধেকই সরকারি। এ ছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জ মৌজায় ১০ শতাংশ জমির ওপর সাততলা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে।...রাজধানীর গুলশান ২-এ রয়েছে দুটি ফ্ল্যাট। গুলশান লেকের বিপরীতে তিন হাজার ৬০০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি বনানী ও ধানমন্ডিতেও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে চারটি। তিনি কমপক্ষে ৫০ বিঘা জমির মালিক। এর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ আঁটি মৌজায় রয়েছে দুই বিঘা জমি।’ [বণিক বার্তা]

যাঁর এইটুকু সম্পত্তি রয়েছে, তিনি সাত বা ১৭ জনকে হত্যা করাতে ছয় কোটি কেন, ৬০ কোটিও ব্যয় করতে পারেন। তাঁকে বিদেশে নিরাপদ আস্তানায় জানেসালামতে পাঠানোর দায়িত্ব তো ফরমালিনযুক্ত রাজনীতির। যাঁর অত ধনদৌলত, তাঁকে শুধু কলকাতায় কেন, তিনি যদি এস্কিমোদের দেশে যেতে চান, যেখানে তিনি কুকুরে টানা গাড়িতে ঘুরে বেড়াবেন, ফরমালিনের রাজনীতি ও রাজনীতিক কর্মকর্তারা তাঁকে সেখানেই পাঠাবেন। বাংলাদেশের একটি বালকও বোঝে, ২০ বছরে যিনি এই সম্পত্তি করতে পারেন, তিনি তাঁর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের কী পরিমাণ অর্থ বা অন্য কিছু উপহার দিয়েছেন! তাঁর পাশে রাজনীতি দাঁড়াবে না তো যেসব সৎ সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক ও কলমপেষা সাংবাদিক বাজারে গিয়ে ফরমালিনবিহীন পাবদা মাছের ভাগার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন, কিনতে পারেন না, তাঁদের মতো হতভাগাদের সঙ্গে থাকবে?
বাংলাদেশে দুদক নামের একটি প্রতিষ্ঠান আছে। তা যে আছে তা প্রতিদিন সন্ধ্যার সংবাদে আমরা দেখতে পাই। তার কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ওই কৃতী পুরুষের ‘সম্পদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি’। বলেছেন খুব নরম গলায়। আরও আশ্বস্ত করেছেন জাতিকে এই বলে যে ‘হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হলে তা অবশ্যই খতিয়ে দেখবে দুদক।’ সম্পদ এত বেশি যে ওসব খতিয়ে দেখতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। তা ছাড়া দুদকের আরও বহু জরুরি কাজ রয়েছে। সেসব আশু কাজের আভাসও দিয়েছেন। দুদক এখন দুর্নীতির তথ্য অনুসন্ধানের চেয়ে ‘মুখোশ’ উন্মোচনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সে জন্যই গত হপ্তা থেকে রাস্তার লোকজন বলছে, দুদক ওরফে মুউক (মুখোশ উন্মোচন কমিশন)।
চেয়ারম্যান গোলাম রহমান চলে যাচ্ছিলেন মেয়াদ শেষে। নতুন কারও নিয়োগ হবে। টিভি স্ক্রলে দেখলাম একজন কমিশনারের নাম। পরদিন জানা গেল, মো. সাহাবুদ্দিন সাহেব নন, বদিউজ্জামান সাহেব নিয়োগ পেয়েছেন। সাহাবুদ্দিন সাহেবের মতো কঠোর মানুষেরই চেয়ারম্যান পদটি প্রাপ্য ছিল। বুধবার দেখলাম তাঁর রুদ্রমূর্তি। টিআইবির অর্থের উৎস ও গবেষণা নিয়ে গবেষণা করছে দুদক। কটমট করে তাকিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বিদেশ থেকে টাকা এনে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তথাকথিত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের এসব কাজের স্বচ্ছতা কী? এমন একদিন আসবে, যেদিন টিআইবির মুখোশ উন্মোচন করতে দ্বিধা করা হবে না।’ [কালের কণ্ঠ]
দ্বিধা করা একেবারেই উচিত নয়। বিদেশ থেকে গবেষণার নামে আনা টাকায় এম হাফিজউদ্দিন খান, সুলতানা কামাল, ইফতেখারুজ্জামান গুলশান লেকের পারে দুটো করে ফ্ল্যাট কিনেছেন কি না। উত্তরার আশপাশে জমি কিনেছেন কি না। এবং বাজারে গিয়ে হালি হিসেবে মেঘনার বড় ইলিশ কেনেন কি না। এসব তথ্য উদ্ঘাটন করে তঁাদের ‘মুখোশ’ উন্মোচন করা দরকার বৈকি৷ ওই অনুষ্ঠানেই সাহাবুদ্দিন সাহেব জনাব কোকোর ফিরিয়ে আনা টাকা দুদক ফান্ডে জমা দেননি বলে বর্ষীয়ান ও শ্রদ্ধেয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকেও ধমক মেরেছেন। তাঁর ওই রুদ্রমূর্তি খুব শোভন মনে হয়নি। বিএনপির নেতা মওদুদ আহমদের বাড়ির মামলার দিনও তাঁর রুদ্রমূর্তি দেখেছি। পারলে তক্ষুনি তাঁকে বাড়ি থেকে ঠেলে বের করে দেন।
রাজনীতি-অর্থনীতি যাতে ফরমালিনমুক্ত থাকে, সে জন্য টিআইবি, সুজন, সিপিডি প্রভৃতি তাদের সাধ্যমতো গবেষণা করে। রেহমান সোবহান, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ইফতেখারুজ্জামান, বদিউল আলম মজুমদাররা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত করেন, এমন প্রমাণ নেই। তাঁদের গবেষণায় দুদকের মতো সংস্থা বরং উপকৃত হতে পারে। আমরা যে যেখানে আছি, সরকারের অথবা সরকারের বাইরে, চেষ্টা করলে রাজনীতিতে ফরমালিন কমিয়ে আনা সম্ভব।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে প্রাপ্তি কী by মিজানুর রহমান খান

জাপানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ব্যাঘ্র কূটনীতি’ সফল বলা যেতে পারে৷ কিন্তু তাকে ‘অত্যন্ত সফল’ আখ্যা দেওয়া চলে না৷ টোকিও ‘পরীক্ষিত বন্ধুত্বের’ ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে৷ গত ৩১ মে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ২৬ মে টোকিওতে স্বাক্ষরিত যৌথ বিবৃতির মধ্যে বিস্তর রকমফের দেখতে পাই৷
বাংলাদেশকে জাপানের ৬০০ বিলিয়ন ইয়েন সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতিকে ‘এবারের সফরের সবচেয়ে বড় সফলতা’ হিসেবে দাবি করা হয়েছে৷ টোকিও থেকে পাঠানো বাসসের সংবাদ এবং প্রধানমন্ত্রীর লিখিত ভাষণে সতর্কতার সঙ্গে ৬০০ বিলিয়ন ইয়েনকে ‘সহায়তা’ বলা হয়েছে৷ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারকে৷ অথচ ৬০০ বিলিয়ন ইয়েন প্রধানত ঋণ৷ অবশ্য এটা কৃতিত্ব এই অর্থে যে ৩৫ বছরে (১৯৭২-২০০৬) বাংলাদেশ যেখানে ইয়েন ঋণ পেয়েছে ৬০০ বিলিয়নের কিছু কম, সেখানে এবারের এক সফরেই প্রতিশ্রুতি মিলেছে সমপরিমাণের ঋণ৷ এই ঋণ-অঙ্গীকারকে যেভাবে একান্ত দ্বিপক্ষীয় বাতাবরণে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাতে পুরো সত্য প্রকাশ পায় না৷ কারণ, এই ৬০০ বিলিয়ন ইয়েন প্রসঙ্গটি প্রধানত রিজিওনাল কানেকটিভিটির মতো ‘ব্যাপকতর আঞ্চলিক উন্নয়নের’ পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছে৷ তাই মনে হচ্ছে, জাপান এই সহায়তা ঘোষণা কেবল ঢাকার দিকেই তাকিয়ে নয়, এই অঞ্চলের অন্যান্য রাজধানীর দিকেও নজর রেখে করে থাকতে পারে৷ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী আসনে জাপানের সফল প্রার্থী হতে চাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তো আছেই৷
আমাদের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার হয়েও বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ কম৷ তবে অাওয়ামী লীগ সরকারের তুলনামূলক সাফল্য বিরাট৷ গত ৫ বছরে জাপানে মোট রপ্তানি বেড়েছে আড়াই গুণ, পোশাকে এই হার ২০ গুণ৷ এ রকম রকেটগতিতে বেড়ে রপ্তানির অঙ্কটা এক বিলিয়ন ছুঁয়েছে৷ জাপানি কোম্পানির সংখ্যা গত পাঁচ বছরে আড়াই গুণ বেড়ে তবে ১৭৬ হয়েছে৷ এখন যাঁরা বিএনপির সঙ্গে তুলনা করবেন, তাঁরা সুখানুভূতি পাবেন৷ কিন্তু সীমান্তের বাইরে তাকালে আত্মজিজ্ঞাসার মুখে পড়বেন৷

কারণ, ২০১২ সালে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ যখন দেড় বিলিয়ন ডলারেও পৌঁছায়নি, তখন ওই বছরটিতে আমাদের মতোই চিতাভস্ম থেকে ফুঁড়ে ওঠা ভিয়েতনামে জাপানি বিনিয়োগ ৩১৭টি প্রকল্প নিয়ে চার বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে৷ বাংলাদেশ এই প্রথম পাঁচ বছর ধরে খরচের শর্তে অনধিক ছয় বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পেল৷ অার ভিয়েতনাম ইিতমধ্যে প্রায় দুই দশক ধরে বছরে এক বিলিয়ন ডলার জাপানি ঋণ ব্যবহারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে৷ বাংলাদেশি নেতা যখন ২০১৪ সালে এসে সংবাদ সম্মেলনে বড় মুখ নিয়ে (সেটা যথার্থ কারণ পাঁচ বছর আগে ছিল ২০০ মিলিয়ন) এক বিলিয়ন ডলার রপ্তানির তথ্য দেন, তখন জাপানে ভিয়েত-রপ্তানি তিন বছর আগেই সাত বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার নজির সৃষ্টি হয়েছে৷
বিদেশে জাপানের চেয়ে বাংলাদেশি পণ্যের আরও ১০টি বড় বাজার আছে৷ বিদেশি বিনিয়োগে জাপানের স্থান আটে৷ তবে রপ্তানির ৯০ ভাগই জুড়ে আছে মাত্র সাত-আটটি পণ্য৷ সুশাসনের ঘাটতি ও শাসনগত অদক্ষতাই এ ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টির জন্য দায়ী৷ ঢাকা-টোকিও সম্পর্ক নিরঙ্কুশভাবে রয়ে গেছে সাহায্য ও অনুদাননির্ভর৷ যে সম্পর্ক কোনো এক পক্ষের বদান্যতানির্ভর হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে আত্মমর্যাদার বিষয়টি ধরে রাখা কঠিন৷ বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের বাণিজ্য ঘাটতি ৬৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার৷ টোকিও তার বিশ্ব বাণিজ্যের মাত্র দশমিক ১ শতাংশ করে ঢাকার সঙ্গে৷ তাদের সঙ্গে বাণিজ্য নব্বই দশকে যে পিছু হটা শুরু করল, তা আর অগ্রসর হলো না৷ ঢাকার জাপানি রাষ্ট্রদূত ২০১১ সালের জুলাইয়ে বলেছিলেন, তাঁরা আসিয়ানসহ চীন, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম থেকে তাঁদের গামে৴ন্টস কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তর করবেন৷ এই বিষয়ে কোনো অগ্রগতির উল্লেখ দেখি না৷ অথচ এসবই প্রকৃত অর্জন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা৷
টোকিওতে দুই নেতার যৌথ বিবৃতির সবচেয়ে লক্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হচ্ছে, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি বা তাদের আগ্রহের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়ে জাপান প্রকারান্তরে বাংলাদেশকেই অভিযুক্ত করেছে৷ এবং তাতে বাংলাদেশ আত্মপক্ষ সমর্থনেরই চেষ্টা করেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে৷ সোজা করে বললে দাঁড়ায়, জাপানের এই দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী নেতা, যিনি ২০০৭ সালেও প্রধানমন্ত্রীর পদে ছিলেন, তিনি কার্যত আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মুখের ওপর বলে দিলেন, বিনিয়োগ তো করতে চাই৷ কিন্তু পরিবেশ তো নেই৷ সেটা আগে ঠিক করুন৷ বাংলাদেশ তরফে উত্তরটা সম্ভবত মুখরক্ষা ধরনের৷
টোকিওর যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ রাজনীতির বর্তমান অচলাবস্থার কথা নেই৷ গত ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের কথা নেই৷ এই নেই মানে সেটা কোনো স্বস্তির বিষয় নয়৷ যতদূর বোঝা যাচ্ছে, বিবৃতিতে সেটা অাক্ষরিক অর্থে না থাকলেও আছে৷ কীভাবে আছে, ঢাকার সংবাদ সম্মেলনে তা খোঁজার চেষ্টা ছিল বলে মনে হয় না, বরং ফরমালিনীকরণ গুরুত্ব পেয়েছে৷ ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে কিংবা গাওয়াতে পেরে মিডিয়াকে উৎফুল্ল মনে হয়েছে৷ কারণ, তাদের কপালে চটকদার শিরোনাম জুটেছে৷
বিবৃতির ৯ ও ১২ দফায় জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে যতটা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সর্বাগ্রে ‘বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ’ উন্নয়নে তাগিদ দিয়েছেন, তার চেয়ে পরিষ্কার করে আর রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের কথা বলার তো দরকার পড়ে না৷ জাপানি কূটনীতিকেরা দারুণ কূটনৈতিক দক্ষতা দেখিয়েছেন৷ কারণ, তাঁরা হাসতে হাসতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নিয়েছেন যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ অনুপস্থিত৷ এই দুটি দফার সঙ্গে গত ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত শিরো সাদোশিমার বিবৃতির যোগসূত্র অনুধাবন করি৷
জাপান ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন হিসেবে মেনে নেয়নি, বরং তারা এই নিব৴াচনের ফলাফলকে সোজাসাপটা নাকচ করেছে৷ তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাপান বিশ্বাস করে যে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন যে যেমন অবস্থানেই থাকুন (এর অর্থ হতে পারে আপনি প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকুন আর আপনি বিরোধী দলের নেতা থাকুন আর না থাকুন), তাঁদের উচিত হবে অবিলম্বে বাংলাদেশের জনগণকে ভোটদানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে গুরুত্বের সঙ্গে উদ্যোগ গ্রহণ করা৷ বাংলাদেশের জনগণ যাতে তাদের রাজনৈতিক পছন্দ এমনভাবে বেছে নিতে পারে, যাতে তাদের ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটে৷’
এখন দেখুন যৌথ বিবৃতিতে দুই প্রধানমন্ত্রী কী বলছেন৷ ৯ দফা বলেছে, ‘অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে শিনজো আবে ও শেখ হাসিনা বলেন যে, বাংলাদেশে জাপািনসহ বিদেশি িবনিয়োগ অাকৃষ্ট করতে হলে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন প্রয়োজন৷’ এরপর বিবৃতি যা বলেছে, তাতে ধরে নেওয়া কষ্টকল্পনা নয় যে জাপান পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলকাণ্ড মনে রেখেছে৷ তাই তারা বলেছে, ‘৬০০ বিলিয়ন ইয়েন আগামী ৪ থেকে ৫ বছর মেয়াদে খরচ করা হবে৷ তবে সেটা করতে গিয়ে প্রকল্পগুলোর যথাযথ এবং মসৃণ বাস্তবায়ন সম্পূর্ণরূপে বিবেচনায় নেওয়া হবে৷’ এই কথাটি গত পাঁচ বছরে ক্ষমতাসীন দলের প্রকল্প বাস্তবায়নের রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নিলেই হলো৷ শর্ত পূরণ সাপেক্ষে টাকা ছাড় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকে ঠোঁট আর চায়ের কাপের ব্যবধান বললে কম বলা হবে৷ এ ক্ষেত্রে আমরা ভারতের প্রতিশ্রুত ১ বিলিয়ন ডলার ঋণের বড় অংশ অব্যবহৃত থাকার কথাও স্মরণ করতে পারি৷
প্রধানমন্ত্রী গত শনিবারের বিবৃতিতে ১২ দফার বরাতে জাপানি বিনিয়োগ পেতে আবে যে ‘অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহের’ শর্ত দিয়েছেন, তা উল্লেখ করেছেন৷ কিন্তু তিনি সেখানে কী বলেছেন, তা বলেননি৷ তিনি বলেছেন, ‘বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের জরুরি প্রয়োজনীয়তা’ তিনি স্বীকার করেন এবং এ জন্য তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন৷ তবে আমরা জানি, সাধারণ জ্বালানি সরবরাহ যেখানে কণ্টকিত, সেখানে ‘স্থিতিশীল সরবরাহ’ প্রায় অসম্ভব৷ সুতরাং, প্রধানমন্ত্রীর মুখে জাপানি ব্যবসায়ীদের উেদ্দশে ‘আমার সরকারের অনুসৃত নীতির’ কারণে বাংলাদেশে ‘জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনার’ কথা কতটা বাস্তবসন্মত?
তবে সন্দেহ নেই যে ‘উচ্চাভিলাষ’ বলা সত্ত্বেও গঙ্গা ব্যারাজ, যা রূপায়ণে মমতার সহায়তা লাগবেই, যমুনার বুকে আরেকটি রেল, ইস্টার্ন বাইপাস ও ঢাকার চার নদী দূষণমুক্তকরণের মতো প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে জাপানি মিশনের আসন্ন ঢাকা সফরের খবর অসাধারণ প্রাপ্তি৷ তবে জাপানি বার্তাটা ভালোভাবে পাঠ করতে হবে৷ সেটা হলো ঢাকায় জাপানি রাষ্ট্রদূত ৭ জানুয়ারি উল্লিখিত যে বার্তা দিয়েছিলেন, সেটা প্রধানমন্ত্রীর ‘অত্যন্ত সফল’ সফরের কারণে একেবারে নাকচ হয়নি, বরং নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে৷
‘জাপানি অনুদান ও ঋণের সিংহভাগই এসেছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে’—এটা কি তথ্যনির্ভর? তারা তিন ধরনের ‘সহায়তা’ দেয়৷ গ্রান্ট এইড, কারিগরি সহযোগিতা ও ওডিএ৷ এর মধ্যে বিশুদ্ধ ঋণ ওডিএ৷ প্রতিশ্রুত ৬০০ বিলিয়ন এই ওডিএ গোত্রের৷ এটা নিলে ফেরত দিতে হবে৷ ১৯৭২-২০০৬ গ্রান্ট ৪৫৫ বিলিয়ন, কারিগরি ৪৬ বিলিয়ন আর ওডিএ ৫৯৮ বিলিয়ন ইয়েন৷ এটাই বড় সত্য যে ব্যক্তি কিংবা দলের মুখ চেয়ে সম্পর্ক করা টোকিওর নীতি নয়৷ অপশাসনের জন্য বেশি সমালোচিত বিএনপির গত আমলে বাংলাদেশ জাপানি গ্রান্ট লাভে বৃহত্তম গ্রহীতার খেতাব কুড়ায়৷ সেটা কী প্রমাণ করে? ২০০৪ সালে মাত্র ১ দশমিক ৪২১ বিলিয়ন ডলার নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সবে৴াচ্চ ওডিএ গ্রহীতা ছিল পাকিস্তান৷ ১ দশমিক ৪০৪ বিলিয়ন নিয়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয়৷ মাত্র ৬৯১ মিলিয়ন ইয়েন নিয়ে ভারত তৃতীয়৷ আর সেটাই ছিল ভারতের হিম্মত-নির্দেশক৷
‘ঋণং ঘৃতং পিবেৎ’—চূড়ান্ত অর্থে কোনো রাষ্ট্রের বিদেশনীতির সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার নয়৷ তদুপরি এর সার্থক ব্যবহার দেখলে আমরা বর্তে যাব৷
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

অর্ধনগ্ন মল্লিকা

গত মাসে কান চলচ্চিত্র উৎসবের রেড কার্পেটে হাঁটেন বলিউডের সেক্সসিম্বল অভিনেত্রী মল্লিকা সারাওয়াত। এই উৎসবের বিশেষ অতিথি হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ভারতীয় প্যাভিলিয়ন উদ্বোধন করার মতো সম্মানও সেখানে দেয়া হয় তাকে। তাই কানের সেই সুখকর স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে এখন রয়েছেন মল্লিকা। বর্তমানে তিনি ব্যস্ত সময় পার করছেন বেশ কিছু ছবির কাজ নিয়ে। তবে তার মধ্যে এখন তিনি শুটিং করছেন প্রিয়দর্শন পরিচালিত নাম না ঠিক হওয়া একটি ছবিতে। এ ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে দেখা যাবে মল্লিকাকে। তবে নতুন খবর হলো, এ ছবিতে দীর্ঘদিন পর নতুন একটি আইটেম গানে পারফর্ম করতে দেখা যাবে তাকে। আর এই আইটেম গানে অনেকটা অর্ধনগ্ন হয়েই পারফর্ম করেছেন তিনি। গানটির একটি দৃশ্যে তাকে শুধু তোয়ালে পরা অবস্থায় বাথটাবে দেখা যাবে। এরই মধ্যে এ গানটির দৃশ্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে। গানটি গেয়েছেন সুনিধি চৌহান ও কোরিওগ্রাফি করেছেন গণেশ আচার্য। রোমান্টিক-কমেডিনির্ভর এ ছবিতে মল্লিকা অভিনয় করছেন রিতেশ দেশমুখের বিপরীতে। এদিকে মল্লিকার করা আইটেম গানটি দিয়েই ছবির প্রচারণা শুরু হবে। ছবিটি মুক্তির কথা রয়েছে সেপ্টেম্বরে। খুব শিগগিরই এই আইটেম গানটির একটি প্রমো অনএয়ার শুরু হবে চ্যানেলগুলোতে। সেখানেই দর্শকরা দেখতে পাবেন অর্ধনগ্ন মল্লিকাকে। এ গান ও ছবিটি নিয়ে বেশ এক্সাইটেড এই অভিনেত্রী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, কান উৎসবে অংশ নেয়ার পরপরই দেশে ফিরে এ ছবিটির কাজ শুরু করেছি। প্রিয়দর্শনের ছবিতে আমি আগেও কাজ করেছি। তবে এবারের ছবির কাহিনী অনেক ভিন্নধর্মী। অনেক কমেডি, রোমান্স থাকবে এখানে। আর ছবির জন্য একটি আইটেম গানের কাজ করেছি। এখানে আবেদনময়ী রূপেই দেখা যাবে আমাকে। আশা করছি ভাল লাগবে সবার।

‘জিয়াউর রহমান মরে বেঁচে গিয়েছেন’ -শেখ হাসিনা

প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের একজন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি মরে বেঁচে গেছেন। বেঁচে থাকলে তাকে আসামি করতাম। গতকাল আওয়ামী লীগের যৌথ সভার সূচনা বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে সন্ধ্যায় এ বৈঠকে যোগ দেন। এতে দলের উপদেষ্টা পরিষদ, কার্যনির্বাহী সংসদ ও দলীয় সংসদ সদস্যরা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, আসন্ন বাজেট ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। এতে দলের নেতা ও এমপিদের সার্বিক বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া দলের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে। সূচনা বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনি  মোশ্‌তাক সেনাপ্রধান করে জিয়াকে । মোশ্‌তাক বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী, তার মানে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়ার সম্পৃক্ততা আছে। তিনি হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের একজন ছিলেন। ’৭৫-এর পর তিনি বিচারপতি সায়েমকে ভয় দেখিয়ে নিজে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। এরপর তার পুরো সময়ে রাতে কারফিউ থাকতো। এটি চলে ’৮৬ সাল পর্যন্ত। তখন মানুষ বলতো দেশে কারফিউ গণতন্ত্র চলছে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া এমপিদের নিয়ে হাইকোর্টে করা রিট এবং এই রিটের কৌঁসুলি আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে কিছু লোক আছে যারা এক সময় আমাদেরই দলেই ছিল- তারা এখন এই আনকন্টেস্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ’৭০ ও ’৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেয়া আসনে তিনিও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখন তিনি এই আনকন্টেস্টের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। এ সময় দলের নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা ভাল করে খোঁজ নেন। আমার যতটুকু মনে পড়ে তিনি দুইবারই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হয়েছিলেন। আমরা আমাদের যেখানে প্রার্থী ছিল না সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হয়েছেন। নির্বাচনের  বৈধতার প্রসঙ্গ এনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনে ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে। এই ৪০ ভাগ ভোটের নির্বাচন যদি বৈধ না হয় তাহলে অস্ত্র ঠেকিয়ে যখন প্রেসিডেন্ট হলেন তখন কি তা বৈধ ছিল?
বাকস্বাধীনতা নিয়ে সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এ নিয়ে সমালোচনা করেন তাদের সেই সমালোচনাই তো প্রমাণ করে মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে। এই স্বাধীনতা কি রকম তা তো টিভি টকশো দেখলেই বোঝা যায়। যে যার মতো কথা বলছে। আমরা এতগুলো টেলিভিশন, মিডিয়া দিয়েছি। পাচ্ছি কি? সবাই আমাদের পিছে লেগে আছে। তবে তারা যার যার কথা বলুক, আমরা দেশের জন্য কাজ করে যাবো।
একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের অনেক চিন্তাবিদ আছেন যারা উল্টা দিকে যাচ্ছেন। তারা কেয়ারটেকারের টেক কেয়ারে ছিলেন। আমাদের কাছে দেশের মানুষের গুরুত্ব আছে। উনাদের ও রকম নেই। উনাদের কোন কিছুতেই ভাল লাগে না। যদি কোন অসাংবিধানিক সরকার আসে ওটাই তাদের চিন্তা। আমরা বলেছি ৬ ভাগ প্রবৃদ্ধি হবে। তারা সব সময় নেতিবাচক বলে। কিন্তু দেশ তো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গত নির্বাচন প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন ঠেকানোর জন্য তারা মানুষ পুড়িয়ে মারলো। পুলিশ পুড়িয়ে মারলো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলো। কিন্তু নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। আমরা দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সেতু নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। এখন এই সেতুর কাজ শুরু করেছি। এর কাজ শেষ হবে। আমি বলেছিলাম দেশীয় অর্থেই সেতু করবো। দেশের অর্থেই সেতুর কাজ শুরু হচ্ছে।
সরকারের উন্নয়ন কাজ মিডিয়ায় প্রতিফলিত হয় না উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দলের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, এটি মানুষকে জানাতে হবে। কোথায় কি হয়েছে তা বলতে হবে। উন্নয়নের কথা মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে।
সভায় সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ, আবুল মাল আবদুল মুহিত, প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, মোহাম্মদ নাসিম, সতীশ চন্দ্র রায়, সাহারা খাতুন, নূহ উল আলম লেনিন ও ইঞ্জিনিয়ার  মোশাররফ হোসেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর পাশে মঞ্চে ছিলেন। সূচনা বক্তব্যের পর দলের নেতা ও এমপিদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। বৈঠকে সাম্প্রতিক সময়ে গুম-খুনের ঘটনা, দলীয় কোন্দল ও সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা হয়। এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন দলীয় সভানেত্রী।

বার্মা টাইমস-এর খবর- পার্বত্য চট্টগ্রাম দখলে নেয়ার প্রত্যয়

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর মর্টার শেলে মিয়ানমারের কমপক্ষে ৪ সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তিনজন। ৩০শে মে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলির সময় বিজিবি ওই মর্টার ছোড়ে। ওদিকে, বাংলাদেশের মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে বার্মিজ ইউনাইটেড আর্মড ইউনিট (বিইউএইউ)। তারা টেকনাফ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত দখলে নিতে বদ্ধপরিকর। গোয়েন্দা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে গতকাল এ খবর দিয়েছে অনলাইন বার্মা টাইমস। এতে বলা হয়, ইয়াঙ্গনের এক মেজর বলেছেন, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে পশ্চিম গেটে বাংলাদেশীদের গতিবিধি লক্ষ্য করছে সে দেশের সেনারা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পেট্রল টিম (বিজিবিপিটি) সামনে অগ্রসর হলে তার কড়া জবাব দিতে প্রস্তুত বিইউএইউ। এতে আরও বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাদের তুলনায় বাংলাদেশে রয়েছে এক-চতুর্থাংশ সেনা সদস্য। ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কোন ব্যবস্থা নিলে মিয়ানমারের ‘তাতমাড’ (সেনারা) টেকনাফ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাদের দখলে নিতে বদ্ধপরিকর। নেপিড’র সূত্রমতে, বার্মিজ ইউনাইটেড আর্মড ইউনিটে রয়েছে আধাসামরিক বাহিনী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড, নৌবাহিনী, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগ। ইতিমধ্যে তারা বাংলাদেশী বিজিবির অগ্রগমন প্রতিরোধের জন্য মিয়ানমারের পশ্চিম গেট এলাকায় টহল দিচ্ছে। এ ঘটনায় পশ্চিমগেট (মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত) এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গারা ভয়াবহ এক পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। তাদের মিয়ানমারের বিইউএইউ-এর ভারি জিনিসপত্র বহন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা অধিবাসীরা আতঙ্কে রয়েছেন যে, তাদের ব্যাপক হারে গ্রেপ্তার করতে পারে বিইউএইউ। ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, বেশ কিছু রোহিঙ্গাকে বিইউএইউ-এর জন্য নির্ধারিত পোশাক পরিয়ে পশ্চিমগেটে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বার্মিজ বর্ডার পুলিশ যে সব স্থানে তাদের তাঁবু পেতেছে ভয়ে সে সব স্থানের মানুষ পাহাড়ি জঙ্গল থেকে ফিরে আসছেন না। ওদিকে একই ওয়েবসাইট আরেক রিপোর্টে বলেছে, গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলেছে, বিজিবির মর্টারশেলের আঘাতে মিয়ানমারের কমপক্ষে ৪ সেনাসদস্য নিহত হয়েছে। সূত্র বলেছে, যখন বিজিবি নিহত নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানের মৃতদেহ গত বুধবার আনার চেষ্টা করে তখন মিয়ানমারের বাহিনী তাদের ওপর প্রকাশ্যে তিন দিক থেকে গুলি করে বর্ডার পিলার ৫২ এলাকায়। ওই সময় বিজিবি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ আহমেদ আলী, আঞ্চলিক কমান্ডার (চট্টগ্রাম)। তার সঙ্গে ছিলেন বিজিবির অন্য সিনিয়র কর্মকর্তা। এর মধ্যে ছিলেন কর্নেল ফরিদ হাসান খন্দকার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল শফিকুর রহমান। মিয়ানমারের আক্রমণের জবাবে বিজিবি পাল্টা হামলা চালায়। এতে পাঁচ ঘণ্টা লড়াই চলে। দু’পক্ষই ব্যবহার করে মর্টার, রকেট লঞ্চার ও ভারি মেশিন গান।

সীমান্তে উত্তেজনা কমেনি
রাসেল চৌধুরী, কক্সবাজার থেকে জানান, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে উত্তেজনা কমেনি। সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত গ্রামবাসীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এখনও তাদের বাড়িতে ফেরেনি। এদিকে উত্তেজনার মুখে সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের শক্তি বাড়ানোর খবরে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। স্থলসীমান্তে শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশী জলসীমার কাছাকাছি সাগরে তিনটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের খবরে সীমান্তের এপারে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। তবে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের খবর সত্য নয় বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার ১৭ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম। তিনি বলেন, এটি মিডিয়ার প্রচার। এ ধরনের কোন তথ্য তার জানা নেই। তবে এ ঘটনার পর থেকে সীমান্তে বিজিবি’র টহল  জোরদার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রুমা, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন থেকে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য সীমান্তের বিওপিগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে।
সীমান্তের লোকজন জানিয়েছেন, গত রোববার লাশ হস্তান্তরের আগে ও পরে ৫২ নম্বর পিলারের কাছে শক্তি বৃদ্ধি করে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা। পাশাপাশি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সেনাসমাবেশ ঘটিয়েছে ওই এলাকাসহ পুরো সীমান্তে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাভাবিক তৎপরতায় সীমাবদ্ধ রেখেছে সীমান্ত পাহারার ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি বিশেষ সূত্র জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমারের জলসীমায় সে দেশের তিনটি যুদ্ধজাহাজ টহল দেয়ার খবর তারা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী এ ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের জলসীমায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের নিয়মিত টহল আরও জোরদার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশনের কমান্ডার লে. কাজী হারুন-উর রশিদ বলেন, মিয়ানমারের জলসীমায় তাদের নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ টহল দিচ্ছে বলে আমরা শুনেছি। তবে এর সত্যতা পাইনি। এ ব্যাপারে আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। তিনি বলেন, টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে যাত্রীবাহী জাহাজ ও ট্রলারগুলোকে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
এদিকে নিহত বিজিবি’র সদস্য নায়েক মিজানুর রহমানের প্রথম জানাজা নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন জোন সদর মাঠে গতকাল সোমবার সকাল ৯টায় হয়েছে। এরপর সকাল ১১টায় নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বিজিবি থেকে হেলিকপ্টারযোগে কুমিল্লার দেবিদ্বারের বেলা নগর ঈদগা ময়দানে দ্বিতীয় দফা জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নির্ধারিত সময়ে দ্বিতীয় দফা জানাজা হয়।
হেলিকপ্টারে মিজানের লাশের সঙ্গে তার সহকর্মী ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের সুবেদার আবদুর রহমান ও মিজানের দুই শ্যালক জালাল হোসেন এবং মোবারক হোসেন ছিলেন। বিজিবি’র কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হাসান জানিয়েছেন, ওই দিন দুপুর ২টায় জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিজানুরের লাশ দাফন করা হয়। নাইক্ষ্যংছড়ি জোন সদরে মিজানের প্রথম জানাজায় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মিজানের সহযোদ্ধারা জানিয়েছেন, পিতার মতোই অতি সাহসী ছিলেন নায়েক মিজান। অসময়ে সীমান্তের এ অতন্দ্র প্রহরীর চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। বীরত্বের সঙ্গে চলে যাওয়া মিজান স্বর্ণাক্ষরে স্মরণীয় এবং ইতিহাস হয়ে রবে।
বিজিবি সদস্য মিজানের লাশ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন
মো. রফিকুল ইসলাম রাজু, দেবিদ্বার (কুমিল্লা) প্রতিনিধি জানান, বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)-এর সদস্যদের গুলিতে নিহত বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের (বিজিবি) নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সোমবার দুপুর আড়াইটায় নিজ গ্রাম কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বেলানগর গ্রামের ঈদগা মাঠে বিজিবি’র ব্যবস্থাপনায়  রাষ্ট্রীয়  সম্মান প্রদর্শন, পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। তার মরদেহ বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার যোগে বান্দরবান থেকে দুপুর ১.০৫ মিনিটে  কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ছয়গড়িয়া নামক স্থানে আনা হয়। এ সময় বিজিবি’র সরাইল জোনের রিজিওনাল কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আনিসুর রহমান, কুমিল্লার জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, কুমিল্লা বিজিবি’র সেক্টর কমান্ডার কর্নেল জিল্লুল হক, ১০ বিজিবি’র অধিনায়ক  লে. কর্নেল শহিদুর রহমান, কুমিল্লা পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তী, দেবিদ্বার নির্বাহী অফিসার  মোহাম্মদ হোসেন, দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান সহ বিজিবি’র পদস্থ কর্মকর্তা এবং চান্দিনা ও দেবিদ্বার উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে বিজিবি’র একটি এম্বুলেন্সে মরদেহ ৬ কিমি দূরে  দেবিদ্বারের বেলানগর গ্রামে তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। দুপুর ২.৩০টায় বাড়ির পাশের ঈদগাহ ময়দানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মান প্রদর্শন, বিজিবি’র পক্ষ থেকে কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে শহীদ মিজানের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠানে  বিজিবি কর্মকর্তাগণ ছাড়াও কুমিল্লা-৪ দেবিদ্বারের সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম শহীদ ও মিজানের চাচা আবুল কাশেমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য রাখেন। বিজিবি’র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আনিসুর রহমান জানান, শহীদ মিজানের পরিবারকে বিজিবি’র পক্ষ থেকে আপাতত নগদ ৫ লাখ টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ওই পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে সকল প্রকার সহায়তা দেয়া হবে। কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত মিজানের সন্তানদের লেখাপড়াসহ সকল সহায়তা দেয়া হবে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মিজানুর রহমানের পিতা আবদুল হাফিজ সেনাবাহিনীতে ল্যান্স কর্পোরাল পদে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধে তিনি  শহীদ হন। এ সময় মিজানুর রহমান ছিলেন মায়ের গর্ভে। মিজানুর রহমান ১৯৮৮ সালে চাকরিতে যোগ দেন। গত ২ মাস আগে লালমনিরহাট থেকে তাকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে বদলি করা হয়। তিনি নাইক্ষ্যংছড়ির দোছড়ি ইউনিয়নের পানছড়ির বিজিবি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। নিহত মিজানের পুত্র সন্তান নেই। ৪ মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে ফাতেমা আক্তার বিবাহিত, দ্বিতীয় মেয়ে হালিমা আক্তার স্থানীয় ভৈষেরকোট দাখিল মাদরাসায় ৭ম শ্রেণীতে ও তৃতীয় মেয়ে সিমু ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে। ছোট মেয়ে হাবিবা আক্তারের বয়স ৪ বছর। পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তিকে হারিয়ে সন্তান ও বৃদ্ধা শাশুড়িকে নিয়ে মিজানের স্ত্রী শামীমা আক্তার পারুল এখন দিশাহারা। স্থানীয় বড়কামতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হারুন-অর রশীদ জানান, নিহত মিজান ছিলেন পরিবারটির একমাত্র অবলম্বন, তাই তিনি সরকারিভাবে ওই অসহায় পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ আর্থিক সহায়তার দাবি করেন। নিহত মিজানের মা রাবিয়া বেগম জানান, ’৭১ সালে স্বামীকে হারিয়েছি, এখন দেশের জন্য জীবন দিয়েছে সন্তান, তবু কোন আফসোস নেই, কিন্তু  মিজানের ৪ মেয়ে ও স্ত্রীর জন্য সরকার যেন আর্থিক সহায়তা এবং ভবিষ্যতে মেয়ের জন্য চাকরির  পদক্ষেপ নেয়।

নেশা ও সমাজ by প্রফেসর ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক

ঐশীর কথা ভাবতে শরীর শিউরে ওঠে। গা জ্বালা দিয়ে ওঠে। সে তার মা-বাবাকে নিজ হাতে হত্যা করে। প্রথমে মদ খেয়ে নিজকে তৈরি করে নেয়। এরপর দু’ধারী ছুরি নিয়ে ঘুমন্ত মায়ের পেটে ছুরিকাঘাত করে। মা চোখ খুলে যখন দেখলো ঐশী তাকে ছুরি মেরেছে সে করুণ সুরে বললো: ঐশী মা, তুমি আমাকে ছুরি মারছো, আমি কি তোমার মা নই? মায়ের এ করুণ আকুতি তার ভাল লাগলো না। সে মায়ের গলায় ছুরি দিয়ে তার কথা বলা বন্ধ করে দিলো। মায়ের দেহ খাট থেকে নিচে পরে রক্তাক্ত করে দিলো চারদিক। যখন সে নিশ্চিত হলো, তার মা আর বেঁচে নেই, তখন সে এই ছুরি নিয়ে অন্য কক্ষে তার ঘুমন্ত পিতার কাছে গেল। সে আর পেটে ছুরি মেরে বিড়ম্বনা বাড়াতে চায়নি। প্রথমেই আঘাত করলো পিতার গলায়। কেটে দিলো তার শ্বাসনালি। যখন তার বাবার মৃত্যু নিশ্চিত হলো তখন সে আনন্দে হুইস্কি পান করলো।

ঐশী কেন এটা করলো তা তদন্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে চার্জশিটও দেয়া হয়েছে। তবে ইতিমধ্যে যা বেরিয়ে এসেছে তা হলো এই যে, সে মাদকসেবী ছিল। ইয়াবা গ্রহণ করতো। মদ পান করতো। এ নেশা তার জ্ঞান ও বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে। প্রবৃত্তি তার ওপর বিজয়ী হয়। মদের নেশায় বয়ফ্রেন্ডদের সঙ্গে সময় কাটাতে তার ভাল লাগে। তার মা বাবা তাকে এসব পথ থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। কাজেই তার আনন্দের পথের বাধা সে দু’ধারী ছুরি দিয়ে শেষ করে দিলো। জগতে শুধু একজন ঐশী নয়, বরং লাখো ঐশী মানব-সমাজকে বিষাক্ত করে তুলেছে। আর অপরদিকে সর্বত্র নেশার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি হয়ে গেছে। তবে পাশ্চাত্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সমাজগুলোর আচরণ হাস্যকর। তারা হয়তো কোন এক সমাবেশে নেশার বিরুদ্ধে কথা বলছে, আর সে সমাবেশেই পরিবেশন করা হচ্ছে মদ। এটাই হলো আজকের বিশ্ব সংস্কৃতি।

এখন প্রশ্ন, নেশা ও মদে মানুষের জন্য কি ক্ষতি রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় নেশা ও মদের যেসব ক্ষতি প্রমাণিত হয়েছে তা সংক্ষেপে এখানে বলা হলো: (১) নেশা ও মদ গ্রহণ করতে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পাকস্থলি ক্রমেই দুর্বল ও তার কার্যক্ষমতা দুর্বল হতে থাকে। (২) চেহারার লাবণ্য নষ্ট হয়। (৩) বার্ধক্য ত্বরান্বিত হয়। (৪) চিন্তাশক্তি আচ্ছন্ন হয় এবং বাকশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (৫) নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির সন্তান দুর্বল হয় এবং বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী হতে পারে। (৬) মদ ও নেশায় নানা ধরনের রোগ হয়। বিশেষ করে ক্যানসার ও হার্টের সমস্যা দেখা দেয়। এগুলো হলো মদ ও নেশার দৈহিক ও শারীরিক ক্ষতি।

যে সব দেশে মদ ও নেশার ছড়াছড়ি আছে তেমন একটি দেশের গবেষণায় নেশা ও মদের কুফল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানে অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণার কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো। প্রতি বছর সেখানে দুই কোটি মানুষের মধ্যে ৩০০০ ব্যক্তি অতিরিক্ত মদ্য পানে মারা যায়। বছরে ৬৫০০০ লোক অতিরিক্ত মদ-পানের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়। মদের কারণে বছরে ২৫০০ ব্যক্তির মস্তিষ্ক ক্ষরণ হয়। দেশের জঘন্য অপরাধীর ৪৭% নেশাগ্রস্ত। যারা এরূপ জঘন্য অপরাধের শিকার হয় তাদের মধ্যে ৪৩% হলো নেশাগ্রস্ত। দেশে আগুন জনিত জখম বা আঘাতে আহত মানুষের ৪৪% হলো নেশাগ্রস্ত। যারা কোন উঁচু স্থান থেকে পড়ে অথবা পানিতে ডুবে মারা যায় তাদের ৩৪% হলো নেশাগ্রস্ত। সড়কে ৩০% গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটে নেশার কারণে। দেশের ১৬% শিশু-অপরাধ হয় নেশাগত কারণে। দেশে কল কারখানায় যত দুর্ঘটনা হয় তার ৭% হলো নেশাগত কারণে। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাজ্যে ক্যানসারের যত লোক মারা যায় তার ৬% হলো নেশাগত কারণে। এ পরিসংখ্যান থেকে মদ ও নেশার এক অত্যন্ত করুণ চিত্র ভেসে উঠেছে। বাংলাদেশে গোপনে ইয়াবাসহ নানা ধরনের নেশার প্রচলন দেদার বিস্তার লাভ করছে। আনন্দের বিষয়, সরকার নেশা ও মদের বিরুদ্ধে ভাল অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সর্বত্র রয়েছে অগণিত গডফাদার। তাদের চেলারা অক্টোপাসের মতো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে তারা নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকার বানিয়ে নিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, কোন কোন অনুমোদিত কোমল পানীয়ের মধ্যেও নেশার মিশ্রণ রয়েছে। এগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। ইয়াবাসহ যত প্রকার নেশা জনিত পণ্য আছে তা সমাজ থেকে নির্মূল করা উচিত। আর তা করা উচিত আমাদের জাতির স্বার্থে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে।

ফরমালিন ও রাজনীতি by ড. মাহফুজ পারভেজ

খা  দ্যের পচন রোধে অপব্যবহৃত-ক্ষতিকর ফরমালিন এখন রাজনীতির দরবারেও আলোচিত হচ্ছে। অর্থাৎ কাঁচাবাজার থেকে ফরমালিন এসে পৌঁছেছে রাজনীতির মহাহাটে। কথাটা এখন খোদ রাজনীতিবিদরাই বলছেন। বর্ষীয়ান ড. কামাল হোসেন বলেছেন। এমনকি, ফরমালিন ও রাজনীতি নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীও মুখ খুলেছেন। বিশিষ্ট সংবিধান প্রণেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিষাক্ত ফরমালিন দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, ‘বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ফরমালিন দূর করতে হবে। খাবারে ফরমালিন দিয়ে পচা ও নষ্ট জিনিসকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, আমাদের রাজনীতিতেও সেভাবে ফরমালিন দেয়া হচ্ছে।’ অন্যদিকে, ‘সরকারকে পচতে সময় দিয়েছি’, খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শেখ হাসিনা জাপান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আহূত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপিই পচে গেছে। এখন ফরমালিন দিয়ে আমরাই বিএনপিকে তাজা রাখছি।’ কাগজে আরও দেখলাম, শিশুদের ফরমালিনের কবল থেকে বাঁচাতে মানববন্ধন হয়েছে। মনে হচ্ছে, ফরমালিনই এখন দেশের শীর্ষ আলোচ্য বিষয়।

খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের উপদ্রব নতুন নয়। মাছে-মাংসে-ফলে-মূলে-শাকসবজিতে ফরমালিন ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য ফরমালিন শনাক্ত করার পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষের কাছে প্রচার করা হচ্ছে এবং মাঝেমধ্যেই ফরমালিনবিরোধী অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু রাজনীতিতে ফরমালিনের বিষয়টি সদ্য উত্থাপিত হয়েছে। ফলে সেটি শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধের বিষয়টি এখনও ব্যাপকতা পায়নি। খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন যেমন শরীর-স্বাস্থ্যের বারোটা বাজাচ্ছে, রাজনীতির ফরমালিনও সমাজ আর রাজনীতির বিরাট ক্ষতি করবে, এতে সন্দেহের কোন কারণ নেই। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, বাজারে ফরমালিনবিরোধী অভিযান যতটা সরব, রাজনীতিতে ততটা নয়।
প্রায়ই রাজনীতিকে দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত করার কথা শোনা যায়। এখন ফরমালিনমুক্ত করার কথাও শোনা যাচ্ছে। এতে যদি রাজনীতির গুণগত মান বৃদ্ধি পায়, তবে তো ভালই। রাজনীতির পাশাপাশি নেতাদেরও ফরমালিনের আওতা থেকে বের করতে হবে। পচা মাছ যেমন ফরমালিন দিলেও স্বাস্থ্যকর হয় না, দূষিত নেতারাও ফরমালিন দিয়ে পাপ ঢাকতে পারবেন না। বরং ফরমালিনযুক্ত খাদ্যের মতোই ফরমালিনযুক্ত রাজনীতি ও নেতৃত্ব সমাজের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বাজার ও রাজনীতির যৌথ বিপদ মানুষ ও সমাজের জন্য বড়ই ভয়ের বিষয়। মানুষকে বাজারে যেতেই হবে; রাজনীতিতেও সংশ্লিষ্ট থাকতেই হবে। আর সেখানেই যদি ওত পেতে থাকে ফরমালিনের প্রলেপ দেয়া ভেজাল, পচা, বাসী মাল, তাহলে তো সবার নাভিশ্বাস।
একদা সুখাদ্যের জন্য বাংলা বিখ্যাত ছিল। বিদেশীরা বলতেন, স্বর্গের মতো দেশ। গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরুর কথাও আছে। অতীত ও ইতিহাসে ভেজাল ও পচা মালের বিবরণ বলতে গেলে নেই। অন্যদিকে, অতীতের ইতিহাসে রাজনীতি ও নেতারা মানুষ ও সমাজের জন্য আদর্শস্বরূপ ছিলেন। তাদের ত্যাগ, পরহিত, কৃচ্ছসাধন ছিল প্রবাদপ্রতিম। তাদের প্রতি রাজনৈতিক কারণে কিছু সমালোচনা ছিল বটে; কিন্তু এমন কোন দুর্গন্ধ ও পচনশীলতা তাদের ছিল না যে, আতর বা ফরমালিন ব্যবহার করে তারা নিজেকে রক্ষা করতেন। এখন ফেনী, নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরে যেসব নেতার কথা শোনা যাচ্ছে এবং যেরূপ রাজনীতি দেখা যাচ্ছে, সেটাকে কি বলা যায়? শেকড় থেকে শীর্ষ পর্যন্ত রাজনীতি ও নেতৃত্বের দুর্গন্ধ ও পচনশীলতার কার্যকারণগত সম্পর্কও মানুষের অজানা নেই। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, বাজারে বা রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান সমস্যা ও বিপদ নিয়ে এন্তার লেখালেখি, আলাপ-আলোচনা হলেও কর্তৃপক্ষ পারস্পরিক দোষারোপের কাজেই ব্যস্ত। অপরের দিকে দোষ ঠেলে দেয়াই যেন সমস্যার সমাধান! সম্মিলিতভাবে সমস্যা ও বিপদ মোকাবিলার কথা কেউ বলছেন না। ঐক্যে যে লাভ, সেটাই মনে হয় অনেকে বিশ্বাসই করেন না। অথচ বারবার বলা হচ্ছে ঐক্য ও সমঝোতার কথা। সেটা গণতন্ত্র বাঁচানো, বিনিয়োগ বাড়ানো, দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিতে বা বাজার ও রাজনীতি থেকে ফরমালিন হটাতেও সত্য। এ সত্যটিই এখন বিস্মৃত হয়েছে। বরং মিথ্যাকে ফরমালিন দিয়ে সত্যের মাথায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে। পচা মাছ, পচা রাজনীতি, পচা নেতা, পচা কথা (মিথ্যা)  ইত্যাদি যদি ফরমালিনের জোরে জনতা ও সমাজের মাথায় চেপে বসে, তাহলে খাঁটি ও আসলের উপায় কি? রূপকথায় সিন্দাবাদের কাঁধে চেপেছিল দৈত্য। সে আর নামতে চায়নি। আমাদের কাঁধে চেপে বসেছে ফরমালিন মাখানো ভেজাল, পচা, দুর্গন্ধযুক্ত মালামাল। দৈত্য সিন্দাবাদকে বিব্রত করেছিল,  জীবনের হানি করেনি। আজকের ফরমালিনযুক্ত মালামাল শুধু বিব্রতই করছে না, জীবন বিপন্ন করার মতো স্বাস্থ্যগত, সমাজগত, আইনশৃঙ্খলাগত-রাজনৈতিক কারণও ঘটাচ্ছে। সর্বত্র বিরাজমান ও ফরমালিনে চুবানো এই আধুনিক-বীভৎস দৈত্যকুলের কবল থেকে মানুষ ও সমাজের মুক্তির উপায় কি?

জামায়াতের বিচার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি দুর্বল

গত ৩১ মের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বেশ কিছু মন্তব্য করেন৷ তাঁর বক্তব্যে অগ্রাধিকার পায় জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা না-করা, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বৈধতা, নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধের সুহৃদদের দেওয়া সম্মাননা ক্রেস্টের সোনা জালিয়াতির বিষয়৷ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক সমাজের দুই প্রতিনিধির প্রতিক্রিয়া এখানে প্রকাশ করা হলো:
৩১ মে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের অনেকগুলো দিকই মনঃপূত হয়নি৷ সাদামাটাভাবে যত বড়ই হোক না কেন, তাঁর মতামত গ্রহণ না-করা, সমালোচনা করা কিংবা মতের সঙ্গে দ্বিমত করা—এসব মিলিয়েই গণতন্ত্র৷ সেই গণতন্ত্রচর্চার অংশ হিসেবেই আমার এই প্রতিক্রিয়া৷ প্রথমেই আসে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দ জামায়াতে ইসলামীর বিচার প্রসঙ্গ। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, এই মুহূর্তে বিচার সম্ভব নয়৷ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে তাঁর আইনমন্ত্রীই সঠিক বলেছেন৷ প্রধানমন্ত্রী এ-ও বলেছেন যে তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হলে সেটা বিভ্রান্তি ছড়ানো হবে৷ একমত না হওয়াটাই গণতন্ত্র। সেটাকে বিভ্রান্তি বলা অসাধুতা এবং গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়। জামায়াতের বিচার না-করা প্রসঙ্গে যে আইনি যুক্তিগুলো দেখানো হয়েছে, তার যে কোনো ভিত্তিই নেই, আমি সেই দাবি করছি না। তবে যুক্তিগুলো দুর্বল। বিশেষ করে এক মামলা থাকলে আরেক মামলা হবে না অর্থাৎ জামায়াতের নিবন্ধন-সংক্রান্ত একটি মামলা বিচারাধীন আছে, জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের মামলার রায়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালও জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে কিছু মন্তব্য করেছেন—এ সবই সত্য। কিন্তু অন্য আদালতে মামলার কারণে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর এখন বিচার করা যাবে না, এটা গ্রহণযোগ্য আইনি যুক্তি নয়। শাস্তির ব্যাপারে আইনের ২০ ধারায় কিছুটা অস্পষ্টতা আছে৷ কিন্তু এই অস্পষ্টতা দূর করার জন্য, জুতসই আইনি ব্যবস্থা দেওয়া খুব কঠিন বলে মনে হচ্ছে না। আর বিচার না করার পক্ষে যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েই থাকে এবং সেই সিদ্ধান্তকে আইনি মোড়কে দেশবাসীকে উপহার দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাতে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সততা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। র্যাবের তিন কর্মকর্তাকে হাইকোর্টের আদেশে গ্রেপ্তার করায় প্রধানমন্ত্রী যে খুশি হননি, সেটা তাঁর কয়েক দিন আগের মন্তব্যেই আঁচ করা গিয়েছিল। ৩১ মের সংবাদ সম্মেলনে সেটি আরও স্পষ্ট হলো।
প্রথমবারে উষ্মা প্রকাশ পেয়েছিল রিট আবেদনকারী আইনজীবীর প্রতি, এবারে তিনি নাখোশ হলেন গ্রেপ্তারের আদেশ দেওয়া বিচারপতিদ্বয়ের প্রতি। হাইকোর্টের আদেশে এই তিন কর্মকর্তার গ্রেপ্তারে দেশবাসী যখন স্বস্তি পেয়েছে, তখন সেটা প্রধানমন্ত্রীর কেন বেপছন্দ হলো, তা বোধগম্য নয়। আজকাল আমরা প্রধানমন্ত্রীর কটাক্ষ আর সময়ে সময়ে বেফাঁস কথায় হকচকিয়ে যাই না। মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা ক্রেস্টের সোনা নিয়ে যে দুর্নীতি ও জালিয়াতি হয়েছে এবং তাতে সারা বিশ্ববাসীর কাছে লজ্জায় আমাদের মাথা নিচু হয়ে গেছে। আমাদের মন্ত্রী, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বিশ্ববাসীর কাছেও প্রামাণিক দলিল হয়ে আছে৷ কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটা কোনো বড় ব্যাপারই নয়। আসল হোক নকল হোক, সম্মাননা তো দেওয়া হয়েছে, এই বলে তিনি আমাদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। আসল ও নকলের ফারাকটা তাঁর কাছে বড় না-ও হতে পারে। কিন্তু অভাগা আমজনতা ওই সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, আসল-নকল—এই সবকিছুই এক চোখে দেখে না। সৎ কর্মে অর্থ আয় আর ঘুষ খেয়ে টাকা জমানোর মধ্যে ইহকাল-পরকালের মতো ফারাক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেটি বুঝতে না পারলেও ধারণা করি, সম্মাননাপ্রাপ্ত বিদেশি বন্ধুরা ক্রেস্টের জালিয়াতি জানার পরে তাঁদের গর্বে ভরে ওঠা বুকটা নিশ্চয়ই অনেক সংকুচিত হয়ে গেছে এবং আমাদের প্রতি তাঁদের কৃতজ্ঞতার মাত্রাটাও হয়তো অনেক কমে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর চোখে বিএনপির বড় দোষ ছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়া। এখন আরও বড় দোষ হয়েছে আবার নির্বাচন চাওয়া। বিএনপির দোষ-গুণের চেয়ে নাগরিকের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোট দিতে পারা না-পারাটা। আমরা আবার কখন ভোট দিতে পারব, আদৌ পারব কি না এবং পারলেও সেটা পাতানো নির্বাচনে হবে কি না; এসব বিএনপি নির্বাচনে এল না গেল, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের ভোট না পেয়ে, ভোট পেয়েছে—সেটা ধরে নেওয়ার সরকার জনগণের খুব বেশি কল্যাণ করতে পারবে বলে মনে হয় না। আর এই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন যে গত নির্বাচনে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব—সবই তাঁর সঙ্গে ছিল। একদম হক কথা। ছিল না শুধু জনগণ৷
শাহদীন মালিক: জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; পরিচালক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি ইউনিয়নের
পাইনছড়ি সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় বিজিবির সদস্যরা।
জামায়াতের বিচার থেকে সরে আসছে সরকার?
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে মুক্তিযুদ্ধকালে অপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার করা আপাতত সম্ভব নয়৷ আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তিনটি কারণ উল্লেখ করে প্রথম আলোকে এ কথা বলেন৷ এর সমালোচনা করে পাঠক শিকদার দস্তগীর লিখেছেন: আবেগপ্রবণ নতুন প্রজন্মকে বোকা বানিয়ে যা করেছে তাতে আওয়ামী লীগের অরিজিনাল রূপটা ক্রমেই নতুনভাবে তাদের কাছে ফুটে উঠছে। এস এম আল শাহরিয়ার: দুই দিন যেতে দিন স্লোগান হবে, লীগ-জামায়াত ভাই ভাই, বিএনপির রক্ষা নাই। ফজলুল হক ভূঁইয়া: ক্ষমতা পাঁচ বছরের জন্য পাকাপোক্ত। এখনই এত তাড়াহুড়ো করলে পাঁচ বছর কাটবে কীভাবে? নাজমুল হোসেইন: যদি আওয়ামী লীগ বিচারকাজ শেষ করে, ভবিষ্যতে রাজনীতি করবে কী বলে। ওরা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে কিন্তু কাজ করে সব মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী শফিক রহমান: অনেক ভেবে দেখলাম, আওয়ামী লীগ জনগণের সঙ্গে নির্বাচন, ভোট, যুদ্ধাপরাধীর বিচার, পদ্মা সেতু, শেয়ারবাজার ইত্যাদি নিয়ে যা করেছে, তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। সালাউদ্দিন আইয়ুবি: বিচারটা কি যুদ্ধাপরাধীদের হচ্ছে, নাকি মানবতাবিরোধী অপরাধের? যুদ্ধাপরাধীদের তো ছেড়ে দিয়েছি। তাই নির্বাচনের আগে ভোট বাক্স স্ফীত করার উপায় হিসেবে মানবতাবিরোধী প্রকল্প চালু হলো। এখন ভোটেরও দরকার নেই। তাই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারেরও প্রয়োজন নেই। এই সোজা কথাটা বুঝতে কি খুব অসুবিধা?
‘বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে তাজা রাখার চেষ্টা করছি’
বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে তাজা রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চার দিনের জাপান সফর নিয়ে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শনিবার প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ ব্যাপারে পাঠক দীন মোহাম্মদ লিখেছেন : যে জায়গায় প্রধানমন্ত্রী ফরমালিন দেন, সেই জায়গায় ব্যবসায়ীরা দেবেন না কেন? মেজবাহ খান: বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখে আপনার লাভ কী? জামান: আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার সরকার নিজেই ফরমালিন দ্বারা টিকে আছে। মো. শামসুল আলম: ৫% ভোটে নির্বাচিত সরকার, যাদের নিজেদের পচন থেকে বেঁচে থাকার জন্য ফরমালিনের দরকার, তারা অন্যকে ফরমালিন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবে কীভাবে? জনসমর্থনহীন সরকার জনগণের কাছে সব সময় পচা। প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের ওপর প্রথম আলোর আজকের পাঠকের মতামত দেখলে বোঝা যাবে, কাদের জন্য ফরমালিন অধিক প্রয়োজন। মাহমুদ হাসান: শেখ হাসিনা এমন নতুন সব শব্দ ব্যবহার করেন, যা আগে শুনিনি। যেমন ধরুন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, স্থূল কারচুপি, রাজনৈতিক দলকে ফরমালিন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা ইত্যাদি। এসব আবিষ্কার এমনই যে, ওসব শুনলে হাসিও পায়, আবার দুঃখও পায়। জাহিদুল: কিছু ফরমালিন মজুত করে রাখুন। শেষে এমন অবস্থা না হয় যে আপনাদের নিজেদের জন্য ফরমালিন পাওয়া যাচ্ছে না।
ঢাকায় খালেদাকে কর্মসূচি করতে দেবে না সরকার
গুম, খুন, অপহরণে জেরবার সরকার বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর ওপর চড়াও হওয়ার কৌশল নিয়েছে। গুম, খুন ও অপহরণের ঘটনা পুঁজি করে যাতে বিরোধীরা সংগঠিত হতে না পারে, সে জন্য ঢাকায় তাদের কর্মসূচি করতে দেবে না সরকার। বিশেষ করে, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আপাতত ঢাকায় কোনো কর্মসূচি করতে দেওয়া হবে না। এর সমালোচনা করে পাঠক হাবিবুর রহমান লিখেছেন: আওয়ামী লীগ বিনা ভোটে জিতল, তার প্রতিবাদে কোনো মিছিলও হয়নি। এখানে বড় বড় কথা বলে লাভ নেই। মাসুদ আল মাহমুদ: এটা স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র...। আর মেরুদণ্ডহীন বিরোধী দলের জন্য সরকার আরও বেশি স্বৈরাচারী হওয়ার সাহস পেয়েছে। মাহফুজা বুলবুল: বিএনপির আন্দোলনের আসলে কিছু নেই। পদ্মা সেতুর বিশ্বব্যাপী দুর্গন্ধ ছড়ানো দুর্নীতির কেলেঙ্কারি, হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, মধ্যরাতে কালো বিড়ালের বস্তা ভরা টাকা, ক্রেস্টের সোনা কেলেঙ্কারি, দেশব্যাপী অপহরণ, গুম, খুন, শীতলক্ষ্যায় সাতটি লাশ, র্যাবের সম্পৃক্ততা, সবশেষে ফেনীতে লোমহর্ষক খুন—এত ইস্যু থাকতে কোনো কিছুতেই আন্দোলন এগিয়ে নিতে পারল না বিএনপি। অথচ বিএনপির স্থানে আওয়ামী লীগ থাকলে দেশে আন্দোলনের বান ডেকে ফেলত।
কেয়ামত হয়ে যেত দেশে। মো. শাহ আলম : তা আওয়ামী লীগ কি বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দিয়ে খালেদাকে সেই সভায় পৌঁছে দেবে? মিষ্টি কথায় রাজনীতি হয় না। আওয়ামী লীগ কী ১৯৯৬ সালে অসহযোগ আন্দোলনের অনুমতি নিয়েছিল? নেয়নি। তো আওয়ামী লীগের জনসমর্থন কমে গিয়েছিল? তাও তো যায়নি। তবে এখন বিএনপি এত ভদ্রতা কার জন্য দেখাচ্ছে? বন্দুকের নলকে ভয় পেলে রাজনীতি কেন? খালেদা রাজপথে নামলে একসময় বন্দুকধারী ভয় পাবেই। কারণ জনগণ খালেদাকে সমর্থন দেবে। মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন: গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হচ্ছে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকতে হবে। এ সরকারে কোনো বিরোধী দল নেই, আবার এরা সামরিক শাসন জারি করেও ক্ষমতায় আসেনি, এরা একবার ক্ষমতায় এসে নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতা আঁকড়েও থাকেনি, সমজাতীয় দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করে একটা আইওয়াশ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে আছে অর্থাৎ এরা হচ্ছে গণতন্ত্রের আড়ালে ‘নব্য বাকশাল’। মীর মনিরুল হক: বিএনপির মতো অথর্ব দল আর দেখিনি। সরকারের আচরণে সাধারণ জনগণ ত্যক্তবিরক্ত হলেও বিএনপি এই সুবিধা নিতে পারেনি। হরতালের নামে মানুষ পোড়ানো ছাড়া আর কিছু এ দলটা থেকে দেখলাম না।
বাংলাদেশি নিহতের তথ্য নিশ্চিত করেছে মিয়ানমার
বিজিবির এক সদস্য নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। বিজিপির আরাকান রাজ্যের সিতুইয়ের পুলিশ কর্নেল তুনও শুক্রবার দেশটির দ্য ইরাবতি পত্রিকাকে বলেন, ‘২৮ মে সংঘর্ষ শুরু হলে অন্য পক্ষের (বাংলাদেশ) একজন আমাদের পুলিশ বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন।’ এর কঠোর সমালোচনা করে পাঠক উত্তম কুমার সাহা মন্তব্য করেন: মিয়ানমারও বাংলাদেশকে ছোট করে দেখে! কী করে সরকার কিছু বুঝি না!!! ফজলুল হক ভূঁইয়া: কোনো ক্ষতি হয়নি। এটা ছোট একটা সীমান্ত। মাঝেমধ্যে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। এখন সর্বোচ্চ সহনশীলতা দেখিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা চলছে। সব সীমান্তে শুধু বাংলাদেশিরাই কেন মরে? শামসুল আলম সুরমা: ঘটনা লজ্জাজনক। দুর্বল কে, বিজিবি না বাংলাদেশ সরকার?

এশিয়া যে পথে হাঁটছে

জেজু ফোরামে জুলিয়া গিলার্ড
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ডকে দেখাল আকর্ষক এক মডেলের মতো৷ কে বলবে তাঁর এখন ৫২ চলছে? নিখুঁত আর পরিপাটি ঘন নীল রঙের জামা তাঁর দীর্ঘ ছিপছিপে শরীরটিকে ফ্রেমবদ্ধ করে রেখেছে৷ মাথা থেকে ঘাড়ের কাছে এসে থেমে গেছে লালচে সুবিন্যস্ত চুল৷ মঞ্চে উঠলেন মডেলের মতো, সটান দাঁড়িয়ে এশিয়া নিয়ে তাঁর ভাবনা প্রকাশ করলেন ধারালো কণ্ঠে৷ ‘নতুন এশিয়ার রূপায়ণ’-এর কার্যকর উপায় খুঁজতে দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে ভাবনা-বিনিময়ের আসর বসেছে৷ এই আসরে উদ্বোধনের পরের দুই দিনে অধিবেশন বসল মোট ৬০টি৷
রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি বিশ্ববাণিজ্যের হর্তাকর্তা, দিকপাল বিশেষজ্ঞ আর বাণিজ্য-সহযোগীরা সেখানে এশিয়ার বিকাশ আরও দ্রুত, ফলপ্রসূ ও সুস্থায়ী করার নতুন নতুন উপায়ের কথা বললেন৷ কেন্দ্রীয় অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল জুলিয়া গিলার্ড আর চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি ঝাওজিংকে৷ তবে তাঁদের আগে শুভেচ্ছাবার্তা জানাতে উঠলেন ফিলিস্তিনের সাবেক ও স্বল্পকালীন প্রধানমন্ত্রী সালাম ফাইয়াদ৷ বললেন, পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিচিত্র উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে৷ কিন্তু মুক্তি, ইনসাফ আর সাম্য—মানুষের এই তিন চাহিদা মেটাতে না পারলে কোনো উদ্যোগই স্থায়ী শান্তি আনতে পারবে না৷ মানুষ যে নতুন বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে, তাও তো দুই দশকেরও বেশি হয়ে গেল৷ তাদের জীবনে শান্তি আর সমৃদ্ধির বার্তা কোথায়৷ বললেন, ‘আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ কারণ, তা না হলে গোটা বিশ্বব্যবস্থাই একসময় ভেঙে পড়বে৷ জুলিয়া গিলার্ড বললেন, পৃথিবীতে এখন এসেছে পরস্পর-নির্ভর বিকাশের যুগ৷ এশিয়ায় এক চীনই তার অর্থনৈতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে আশপাশের দেশের আর্থিক গতিশীলতার ধরন পাল্টে দিয়েছে, ভেঙে দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের ভবিষ্যৎ ভাবনার ছক৷ এ শতকের প্রথম ভাগের মধ্যে চীন পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠবে৷ চীনের অর্থনৈতিক বিকাশ যেমন অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলেছে, তেমনি তা নতুন কিছু ঝুঁকিও সৃষ্টি করেছে৷ জুলিয়া বললেন, আরব বসন্ত দেখিয়ে দিয়েছে, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি যে শূন্যতা তৈরি করে, তার পথ দিয়ে ভালো কিছু আসা কঠিন হয়ে পড়ে৷ অর্থনীতিতে চীন যা ঘটিয়েছে, তা অলৌকিক৷
কিন্তু সেখানে গণতন্ত্র না এলে এবং মানবাধিকারের ভিত্তি না গড়তে পারলে এ অর্থনীতি এশিয়া ও বিশ্বের জন্য আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে৷ উত্তর কোরিয়া যে নতুন পারমাণবিক হুমকি হয়ে উঠেছে, তার পেছনের শক্তি তো চীনই বটে৷ এ ব্যাপারে জুলিয়ার নিদান হলো, বিশ্বসম্প্রদায়ের মধ্যে এ ব্যাপারে একটি সমঝোতা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে, আর তাতে মুখ্য ভূমিকা রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে৷ জুলিয়ার ভবিষ্যদ্বাণী হলো, ভবিষ্যৎ পৃথিবী কোন চেহারা নেবে, সেটি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের ওপর৷ সম্পর্কটি আর আগের মতো সরল হবে না, হবে জটিল ও বহুস্তরীয়৷ বিশ্বসম্প্রদায়ের কর্তব্য হবে এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করা৷ চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি ঝাওজিং মঞ্চে উঠে প্রথমেই এশিয়া সম্পর্কে সবার পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর অনুরোধ করলেন৷ বললেন, বিশ্ব-অর্থনীতিতে এশিয়ার একার অবদানই এখন এক-তৃতীয়াংশ৷ এশিয়া একটি স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত মহাদেশ৷ বাইরে থেকে কেউ এসে এতে আঘাত করা অন্যায় হবে৷ স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটেছে বলা হলেও তার রেশ রয়ে গেছে৷ তিনি বেশ শক্তভাবে বললেন, এশীয় দেশগুলোর সংগত পদক্ষেপে বহিরাগত কেউ যেন বাধা না দেয়৷ লি ঝাওজিং এর পরে যোগ করলেন, তার পরও সব রাষ্ট্রের একটি সাধারণ স্বার্থের জায়গা আছে৷ নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও তাই সংলাপভিত্তিক এই আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রসার ঘটছে৷ এশিয়ার বর্তমান সাফল্যগাথার পেছনেও আছে এই সংলাপ৷ জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে সর্বোচ্চ প্রাপ্তির জন্য নানাপক্ষীয় সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে৷ জেজু ফোরামের সেমিনারে, একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে জুলিয়া গিলার্ড ও লি ঝাওজিং নিজেদের স্বতন্ত্র মতামত যেমন বেশ স্পষ্ট করেই জানালেন, আবার সব বিরোধ সত্ত্বেও সহযোগিতা ও সংলাপের ওপরও জোর দিলেন একটু তীব্রভাবে৷
সোউল, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে
সাজ্জাদ শরিফ: কবি, সাংবাদিক৷