Monday, September 9, 2013

দেশের বোকাদের জন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি! by শাহনেওয়াজ বিপ্লব

বাংলাদেশে অনেক চালাক-চতুর লোকের ভিড়ে কিছু বোকা মানুষের মুখ জেগে থাকে মনের আয়নায়, যাদের কথা ভোলা যায় না, যাদের কথা ভুলতে পারি না কখনও। মনে পড়ে আমাদের চাটগাঁর সীতাকুণ্ডের মাছ ব্যবসায়ী কাদের ভাইয়ের কথা। ফরমালিন মিশিয়ে মাছ বিক্রি করলে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়- এ কথা ভেবে যিনি কোনোদিন ফরমালিন মেশাননি মাছে। মাছের ব্যবসা হারিয়ে এখন পথে পথে ঘুরে বেড়ানো সেই মানুষটির করুণ মুখ বেশ মনে পড়ে। মনে পড়ে আইসক্রিম বিক্রেতা প্রদীপ কাকুর কথা। স্কুল থেকে সরকারি বৃত্তির টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে হারিয়ে যাওয়া আমার ৬০০ টাকা পেয়ে যিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। গতবার বাড়ি গিয়ে লোকটিকে ভিক্ষা করতে দেখে অশ্র“সজল হয়ে সব সময় তার সততার কথা ভাবি। এ রকম আরও কয়েকজন সৎ লোকের কথা বলতে পারি, যারা আমার জানা মতে তাদের সততার খেসারত দিচ্ছেন আজও। ভাবি, কোনো কোনো মানুষ আমাদের দেশে এত বোকা হয় কী করে? যে দেশে মিথ্যা বলা মহাপাপ, জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো, যৌতুক দেয়া ও নেয়া সমান অপরাধ ইত্যাদি আপ্তবাক্য শুধু বইপত্রেই বসবাস করে, জীবনযাপনে মানা হয় না; যে দেশ দুর্নীতিতে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ স্থানের অধিকারী, যে দেশে রাজনীতিক, পুলিশ, আমলার বেশিরভাগই দুর্নীতিপরায়ণ, সে দেশে এ অল্প কয়েকজন মানুষ এত সৎ অথবা অন্যভাবে বললে এত বোকা কেন?
সে প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি আজ বহুকাল পরে হলমার্ক কেলেংকারির ভেতর। কীভাবে? হলমার্ক কেলেংকারির এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সে কথাই আপনাদের বলছি আজ। হলমার্ক কেলেংকারি উদঘাটিত হওয়ার পর সোনালী ব্যাংকের দোষী সব কর্মকর্তা-কর্মচারী আর সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের প্রতি যখন ঘৃণা আর নিন্দা বর্ষিত হচ্ছে পত্রিকাগুলোতে, তখন বেশ অজ্ঞাতই রয়ে গেছে সোনালী ব্যাংকের তিনজন কর্মকর্তার নাম, যারা হলমার্ক কেলেংকারি উদঘাটনে জীবন আর জীবিকাকে বাজি রেখেছিলেন। তার ভেতর অন্যতম সোনালী ব্যাংকের প্রধান অফিসের অডিট বিভাগের জিএম মাশরুরুল হুদা সিরাজী, যার সাহসী পদক্ষেপের ফলে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যাংক লুটের ঘটনা- হলমার্ক কেলেংকারি উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। তার সঙ্গে আরও ছিলেন অডিট বিভাগের ডিজিএম আবু জাফর ও এজিএম শওকত আলী। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত হলমার্কের আড়াই হাজার কোটি টাকার কেলেংকারি জানার পরও যখন না জানার ভান করেছিলেন সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ সব কর্মকর্তা, তখন এই মাসরুরুল হুদা সিরাজীই প্রথম সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় অডিটের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পত্রিকাগুলো লিখেছে, জিএম সিরাজীর সঙ্গে মিলে ডিজিএম আবু জাফর ও এজিএম শওকত আলী সোনালী ব্যাংকের এমডি মইনুল হকের কাছে অডিট করার অনুমতি প্রদানের আবেদন করলে তিনি তাদের ধমক দিয়ে অডিট বন্ধ রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু এমডির ধমক খেয়েও দমে যাননি এ তিন কর্মকর্তা। বরং এমডি ছুটিতে গেলে সেই সুযোগে তারা ইস্যু করে দেন অডিট নোট।
আর তারপর? তারপর শুরু হয় দিনে-রাতে ধমক আর হুমকি। একদিকে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতারা, সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ আর অন্যদিকে ব্যাংকের তিন নিরীহ কর্মকর্তা। দেয়া হয় তাদের ঘুষের অফারও। কিন্তু কোনো কিছু দিয়েই যখন তাদের বশ মানানো যাচ্ছিল না, ঠিক তখন অডিট শুরুর আগের রাতে এই তিন কর্মকর্তাকেই বদলি করে দেয়া হয় কুমিল্লায়। বদলি তারা হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু বদলির ঠিক আগে আগেই তারা অডিট অর্ডার জারি করে দিয়ে এসেছিলেন এবং শুধু এই তিন লোকের কারণেই অনেক হুমকি-ধামকি আর লোভ উপেক্ষা করে উদঘাটিত হতে পেরেছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যাংক লুটের ঘটনা- হলমার্ক কেলেংকারি।
অথচ এই আড়াই হাজার কোটি টাকা লুটপাটের কথা জেনেও এই তিন সৎ কর্মকর্তা যদি চুপচাপ থাকতেন অন্য সহকর্মীদের মতো, তাহলে এতদিনে তাদের আরও এক ধাপ পদোন্নতি হতো। তাদের পকেটেও থাকত এখন কয়েক কোটি টাকা, সে টাকায় ঢাকায় বিলাসবহুল বাড়ি কিনে বসবাসও করতে পারতেন। আর তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাতে পারতেন ঢাকার নামকরা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। অথচ একটা সৎ কাজ করার অপরাধে তারা এখন বদলি হয়েছেন সুদূর কুমিল্লায়। তাদের হয়তো স্ত্রীদের ঝগড়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এখন প্রতিদিন, স্বামীর বোকামির খেসারত তাদেরও দিতে হচ্ছে বলে। তাদের সন্তানরাও হয়তো বাবাদের ভুল বুঝছে- এ রকম বোকাসোকা একটা কাজ করার জন্য।
তবুও আমার শ্রদ্ধা সোনালী ব্যাংকের এই বোকা তিন কর্মকর্তার জন্য! যারা বাংলাদেশের অগণিত চালাক লোকের মতো পকেট ভারি না করে সৎ আর নির্মোহ থেকেছেন। আর কেউ এই তিনজন লোকের কথা ভাবুক আর না-ই ভাবুক আমি কিন্তু সব সময় তাদের কথা ভাবি। ভাবি, আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে বেড়াতে গেলে সুদূর কুমিল্লায় গিয়ে খুঁজে বের করব এই বোকা লোকগুলোকে। আর তাদের পা ছুঁয়ে সালাম করে বলব, আপনাদের মতো জনাকয়েক সৎ লোক এখনও এদেশে আছে বলেই ভূমিকম্প এখনও ধ্বংস করে দেয়নি বাংলাদেশকে। প্রবল বন্যা এসে এখনও ভাসিয়ে নিয়ে যায়নি দেশটাকে। আপনাদের মতো কিছু সৎ আর বোকা (?) লোক আছে বলেই বসন্ত এলে বাংলাদেশে আজও ফুল ফোটে। পাখিরা গান গেয়ে যায় আজও। আপনাদের জানাই অন্তরের অন্তস্থল থেকে গভীর শ্রদ্ধা।
শুধু আপনাদের মতো কিছু লোক বাংলাদেশে এখনও আছে বলেই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার মতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহরে বসবাস করেও বাংলাদেশে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে; ফিরে আসি বারবার।
শাহনেওয়াজ বিপ্লব : অস্ট্রিয়া প্রবাসী গবেষক ও গল্পকার

ক্ষমতার পালাবদল, না রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন? by বিভুরঞ্জন সরকার

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে অনেকেই এ কথা বলেছিলেন যে, দেশের তরুণ সমাজ বা নতুন ভোটাররা ব্যাপকভাবে পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন বলেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বড় ধরনের বিজয় অর্জন করেছে। অপরাধমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা তরুণদের মধ্যে প্রবল বলেই ধারণা করা যায়। পুরো ধারার রাজনীতি তাদের কাম্য নয়। তাছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তরুণ সমাজের অনেকেই বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছে। দেশের রাজনীতির ব্যাপারে তরুণদের একেবারেই আগ্রহ নেই বলে এতদিন যা বলা হয়েছে তা হয়তো যথার্থ নয়। বিদ্যমান রাজনীতি নিয়ে, দেশ পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে, প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনৈতিক মানসিকতা নিয়ে তরুণদের মধ্যে নিশ্চয়ই প্রশ্ন আছে, আছে দ্বিধা-সংশয়। তবে সব ব্যাপারে যে তারা একেবারে উদাসীন নয়, দেশ ও সমাজ নিয়ে তাদের কোনো ভাবনা-চিন্তা নেই তেমনটি ভাবার কারণ নেই। ২০০৮-এর নির্বাচনে তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থেকে বোঝা গেছে, তারা যথেষ্ট সমাজমনস্ক। তাদের এ সমাজমনস্কতার সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে এ বছর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ যারা সংঘটিত করেছিলেন, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে তরুণরা প্রমাণ করেছেন, তারা দেশভাবনায় কতটা আন্তরিক ও অগ্রসর।
এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, দেশের রাজনীতিতে সুস্থ ধারা বিকশিত হচ্ছে না, গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার বিকাশের পরিবর্তনে স্বেচ্ছাচারী মনোভাব, ইচ্ছাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উৎকট প্রতিযোগিতা চলছে। কালো টাকা, পেশিশক্তির দাপটে সৎ ও ত্যাগী রাজনীতিবিদরা ক্রমেই পর্দার আড়ালে চলে যাচ্ছেন। হিংসা-বিদ্বেষ-হানাহানি-রেষারেষি এবং আধিপত্য বিস্তারের কদর্য প্রতিযোগিতা রাজনীতিকে গ্রাস করে নেয়ায় কেবল তরুণ সমাজ কেন, অনেকেই রাজনীতি থেকে আগ্রহ হারিয়েছেন। ভোগলিপ্সার চরম বিস্তার, বিত্তবান হওয়ার রাক্ষুসে প্রবণতা ব্যাপক জনগোষ্ঠীকেই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উচ্চ আশা পোষণ থেকে বিরত রেখেছে। ‘এই দেশের কিচ্ছু হবে না, দেশে থেকে কিচ্ছু করা যাবে না’ এমন মানসিকতা তরুণ সমাজকে ব্যাপকভাবেই পেয়ে বসেছে। দেশপ্রেম, স্বাজাত্যবোধ মন থেকে বিতাড়িত হওয়ায় যে কোনো উপায়ে বিদেশে পাড়ি জমানোর মানসিকতায় আচ্ছন্ন হয়েছে অনেকেই। তবে টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলা এবং জঙ্গিবাদের বিস্তারের পর পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি সম্ভবত এদেশের তরুণদের আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করাতে এবং কিছুটা দেশমুখী হতে সহায়তা করেছে। বিদেশ মানেই উন্নত জীবনের হাতছানি, নিশ্চিত ভালো থাকা- এ বিশ্বাসে ফাটল ধরেছে। সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য দেশকেই প্রথমে আপন করে নিতে হবে- এ ভাবনা থেকেই তরুণরা আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়ে শেকড়ের সন্ধানে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এজন্যই হয়তো বাঙালির জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে তারা অনুসন্ধিৎসু হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের সম্পর্কে তাদের মনের মধ্যে ঘৃণাবোধ জন্মেছে।
মুক্তিযুদ্ধের যারা বিরোধিতা করেছে, যারা পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করেছে, রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনী গঠন করে বাঙালি নিধনে সক্রিয় সহযোগিতা করেছে, তাদের বিচারের দাবি উঠলে অনেককেই বলতে শোনা যায়, ‘এত বছর পরে এসে অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে জাতিকে বিভক্ত করা ঠিক না। এখন পেছনে না তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’ এসব কথা এক ধরনের চালাকি। এভাবে সব ক্ষেত্রে অতীতকে উপেক্ষা করার ফল ভালো হয় না। ইতিহাসের একটি বড় সত্য ভুলে থেকে, এদেশের কিছু কুলাঙ্গারের দেশদ্রোহী ভূমিকাকে অস্বীকার করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ মসৃণ হতে পারে না। জাতির বিভক্তিও এভাবে দূর হয় না। কঠিন হলেও সত্যের মুখোমুখি না হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় না।
এটা ঠিক যে, ক্ষমতায় গিয়ে কথা না রাখার ঐতিহ্য তৈরি করার জন্যই তরুণ সমাজসহ অনেকেই রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর জন্যই তরুণরা গত নির্বাচনে ব্যাপকভাবে ভোট দিয়েছে। তারা রাজনীতিতে পালাবদল দেখতে চেয়েছে। যারা নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস হারিয়ে ফেলেছিলেন, তারাও গত নির্বাচনের পর কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়, তারপর নব্বইয়ের পরিবর্তনের সময় মানুষের মধ্যে যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছিল, সক্রিয়তা দেখা দিয়েছিল, তা স্থায়ী হয়নি নেতৃত্বের ভুলের কারণেই। মানুষের শক্তির ওপর নির্ভর না করে রাজনীতি কালো টাকা, পেশিশক্তি, আমলাতন্ত্র, ধর্মব্যবসায়ীসহ নানা রকম অপশক্তিনির্ভর হওয়ায় মানুষের হতাশা দূর হচ্ছে না। শেখ হাসিনার এবারের সরকারও রাজনীতিতে নতুন হাওয়া যোগ করতে পারলেন না। তিনিও নিজেকে পুরনো ধারায়ই শামিল করলেন।
প্রতিহিংসার রাজনীতি, ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে দেশের রাজনীতি যে বেরিয়ে আসতে পারল না, সেটা এক গভীর বেদনার বিষয়। দিনবদলের অঙ্গীকার করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন খুব একটা আনতে পারেনি। মানুষের সৃজনশীলতা ও সুকুমার বৃত্তিগুলোকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারিত না করে এক ধরনের মূঢ়তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার প্রচলিত ব্যবস্থাকে বর্তমান সরকারও অনুসরণ করেছে। এ সরকার উন্নয়নমূলক কাজকর্ম যথেষ্ট করেছে, কিন্তু সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়েনি। একদিকে ভালো কাজ, অন্যদিকে খারাপ মানুষদের প্রশ্রয় দেয়া- এ বিপরীত দুই ঘটনা মানুষকে আহত করেছে। তাদের বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে। সরকার কতটা ভালো করেছে, আর খারাপ কতটা- সে সম্পর্কে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক করা যেতে পারে, ধারাবাহিক গবেষণাও চলতে পারে। তবে তাতে মানুষ উৎসাহ বোধ করবে না। এ মুহূর্তে যা করণীয় তা হল, রাজনীতিকে বেশি বেশি জনসম্পৃক্ত করার উপায় খুঁজে বের করা। মানুষকে দূরে ঠেলে নয়, কাছে টেনেই পরিবর্তনের দিকে রাজনীতির মুখ ফেরাতে হবে। ভবিষ্যতে যারা জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন তারা যাতে অধিকাংশ সময় জনগণের সঙ্গেই থাকেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সংসদ অধিবেশন চলার সময় বা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচনী এলাকার বাইরে অবস্থান নিরুৎসাহিত করতে হবে। নির্বাচনী এলাকায় যারা অতিথি হয়ে যাওয়া-আসা করেন তাদের আর মনোনয়ন দেয়া চলবে না- এ অতিথি রাজনীতিবিদদের কারণেই মূলত এলাকায় পোড় খাওয়া কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়, গড়ে ওঠে বিশেষ কোটারিগোষ্ঠী। কোনো জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা থাকে না বলে এরা সাধারণত ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতেই সচেষ্ট থাকে। ব্যক্তিগতভাবে এরা লাভবান হয় ঠিকই কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় দল ও সরকার। এ ধারা বদলানোর অঙ্গীকার এবার নির্বাচনের আগে করতে হবে।
দেশের রাজনীতির ইতিহাসটাও নতুন প্রজন্মের কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা দরকার। ক্রমাগত বিকৃত প্রচার-প্রচারণার ফলে অনেকের মধ্যেই স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে নানারকম বিভ্রান্তি আছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বের প্রথম সরকারের কাজকর্ম নিয়ে যেমন স্বচ্ছ ধারণার অভাব আছে, তেমনি পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনীতি নিয়েও আছে ভ্রান্তি। বঙ্গবন্ধু এবং তার সরকারের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু সে জন্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার মতো জঘন্য কাজ করে ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিয়ে কারা উপকৃত ও লাভবান হয়েছে সে সম্পর্কে দেশবাসীর সামনে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা দরকার। কাউকে দেবতা কিংবা কাউকে দানব বানানো নয়, যিনি যেমন তাকে সেভাবেই চিত্রিত না করলে সঠিক ইমেজে দাঁড় করানো যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, জিয়াউর রহমান কোন বিবেচনায় প্রশংসিত এবং নন্দিত? কোন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জিয়া দেশের শাসন ক্ষমতা কব্জা করেছিলেন? জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক অসততার অভিযোগ হয়তো নেই, কিন্তু দেশে সবধরনের রাজনৈতিক অসততার জনক তো তিনিই। জিয়াউর রহমান দেশের প্রথম সামরিক শাসক। তিনি দালাল আইন প্রত্যাহার করেছেন। নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কুখ্যাত গোলাম আযমকে দেশে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছেন। রাজাকার-আলবদরদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শাহ আজিজ, মাওলানা মান্নানকে প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী বানিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের চাকরি দিয়ে বিদেশে নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ করে দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে প্রহসনের বিচারে ফাঁসি দিয়েছেন। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে সেনাবাহিনীতে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছেন। হ্যাঁ-না ভোটের আয়োজন করে ভোট দুর্নীতির সূচনা করেছেন। মেধাবী ছাত্রদের হিজবুল বাহারে চড়িয়ে বিপথগামী করেছেন। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য নিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। দল ভাঙার রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু করেছেন। আরও কত কী! এসব প্রশ্ন বাইরে রেখে রাজনীতি সুস্থ করা যাবে না।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় এসেও রাজনীতিতে ভালো কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। অবশ্য পুরনো ব্যবস্থা, চিন্তাধারা, মনমানসিকতা বদলে ফেলাটা খুব সহজ কাজ নয়। এর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকা দরকার। সেটা শেখ হাসিনার সরকারেরও নেই। দল ক্ষমতায় এলেই একশ্রেণীর নেতাকর্মীর মধ্যে লোভ-প্রলোভন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এরা সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চেয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে অতি তৎপর হয়। এগুলো সবার চোখে লাগে। আমাদের সম্পদ সীমিত। তাছাড়া সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থাও সুষম নয়। ধনী-গরিবের উৎকট বৈষম্য কোনোভাবেই আড়াল করা যায় না। যায় না সবাইকে খুশি করা। তৈরি হয় ক্ষোভ-হতাশা। অন্যদিকে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যেও রয়েছে প্রবল মতপার্থক্য, বিভাজন। দেশের অগ্রগতি-উন্নতির প্রশ্নে ঐকমত্য গড়ে ওঠে না। এ দুই দলের মধ্যে বন্ধুসুলভ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে শত্র“তামূলক মনোভাব অত্যন্ত প্রকট। বঙ্গবন্ধু হত্যা, একুশ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা ইত্যাদি বিষয়ে বিএনপির অবস্থান দুই দলের মধ্যে দূরত্ব কমানোর পথে বড় অন্তরায়। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট থেকেই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জটিলতার নিরসন করা না যায়, তাহলে দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে বলেও আশংকা প্রকাশ করা হচ্ছে। সরকার চায় সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে। বিরোধী দল চায়- নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। বিরোধী দলের দাবির পক্ষে জনমতের পাল্লা ভারি বলেই মনে হয়। কী অদ্ভুত আমাদের যুক্তিবোধ! আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে মানুষ অবাধে ভোট দিতে পারবে না বা সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়- এ বক্তব্যের সমর্থনে কেউ কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারছে না। অথচ অনুমাননির্ভর একটি অভিযোগ দিয়েই রাজনীতিতে চলছে তোলপাড়। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এলে দেশে গণতন্ত্র থাকবে না। এ আশংকাকে যদি সত্য বলে ধরে নেয়া হয়, তাহলে বলতে হবে, আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি কি অধিক গণতন্ত্রী দল? এ ধরনের অসত্য প্রচারণা চালিয়ে ক্ষমতার পালাবদল হলেও রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হবে কি? অতীতে অপপ্রচার, মিথ্যাচার আমাদের রাজনীতির অনেক ক্ষতি করেছে। আগামী নির্বাচনে ভোটাররা বিশেষ করে নারী এবং তরুণ ভোটাররা আবেগ, নাকি যুক্তিবুদ্ধি দ্বারা তাড়িত হয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে, তার ওপর রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের অনেক কিছুই নির্ভর করবে।
বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

নির্বাচন নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে জাতি বিভ্রান্ত by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে আলো-আঁধারের খেলাটা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে নির্বাচন নিয়ে ধূম্রজাল। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে একেক সময় একেক রকম বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। একবার বলা হচ্ছে নির্বাচন অক্টোবরে হবে, আবার বলা হচ্ছে জানুয়ারিতে হবে; একবার বলা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হবে, আবার বলা হচ্ছে দলীয় সরকারের অধীনে হবে। একবার বলা হচ্ছে সংসদ ভেঙে দিয়ে হবে, আবার বলা হচ্ছে পৃথিবীর যেসব দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র আছে, সেসব দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় বাংলাদেশেও আগামী নির্বাচন সেভাবেই হবে। সর্বশেষ গত ২ আগস্ট সচিবদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে যে কোনো একদিন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি এ-ও বলেছেন, বর্তমান সংসদ ও মন্ত্রিসভা বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচন হবে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তীও নয়, নির্দলীয়ও নয়; বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
অন্যদিকে দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলে বর্তমান সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারেন। সংবিধান নাকি প্রধানমন্ত্রীকে এই অসীম ক্ষমতা দিয়েছে। এখানে নির্বাচন না হওয়ার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একই দিনে শাসক দলের দুই নেতার দু’ধরনের বক্তব্যে নির্বাচন নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল। তাছাড়া গত ২৩ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়েই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে; ২৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় বলেছিলেন, বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে ২০১২ সালের ৩০ জুলাই লন্ডনে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনকালে বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সরকারের মন্ত্রিসভায় বিরোধী দল চাইলে অংশ নিতে পারে। এর কয়েক সপ্তাহ পর ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব থেকে সরে আসেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী পদে তিনি বহাল থাকা অবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, সংসদ ভেঙে দিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসব পরস্পরবিরোধী ও সাংঘর্ষিক বক্তব্যে জাতি বিভ্রান্ত। এসব বক্তব্যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের অপরিহার্যতার বিষয়টি অনিবার্যভাবে জাতির সামনে পরিস্ফুটিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সরকার ফেঁসে গেছে। এ কারণেই নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য ব্যক্তিরা সাম্প্রতিককালে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন এবং অহেতুক রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা সৃষ্টি করছেন; যাতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলা হয়, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। কারণ নির্বাচন না হলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে স্বপদে বহাল থাকার এখতিয়ার পঞ্চদশ সংশোধনীতে সুনিশ্চিত করা হয়েছে। এই সংশোধনী একটি দুরভিসন্ধিকে সামনে রেখেই করা হয়েছে, যাতে দেশে নির্বাচন না হলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অনন্তকাল পদে বহাল থাকতে পারেন। এমন সুবিধা সংবিধান যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছে, সেখানে পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে কেন তিনি নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে যাবেন?
প্রধানমন্ত্রী যখন মনে করবেন তার দল নির্বাচনে জেতার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন তিনি নির্বাচনের কথা চিন্তা করতে পারেন- ‘প্রধানমন্ত্রী সংসদের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারেন’ কথার তাৎপর্য এখানেই। এখন প্রশ্ন হল, প্রধানমন্ত্রী কি দেশে নির্বাচন না দিয়ে পারবেন? তখন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কি তার হাতে থাকবে? সব দল নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিলে তিনি একা কী করবেন?
জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের প্রচেষ্টায় রাজনীতিতে যে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল, নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই আশা নিরাশায় পর্যবসিত হবে; রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়বে। এমনিতেই দেশ চরম সংকটে নিপতিত। সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা কারও কাছেই স্পষ্ট নয়। অনেকে বলছেন, দেশে একটি গৃহযৃদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠছে। এমনটি হলে ধ্বংস হবে মানুষের সব স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। কাজেই সরকারকে অপরিণামদর্শী রাজনীতি ত্যাগ করতে হবে। সহনশীল রাজনীতির আবহ তৈরি করতে হবে। সমঝোতার পথ রুদ্ধ করা সরকারের জন্য মোটেই সমীচীন হবে না। এতে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তাতে নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্ষমতাসীন দল। কারণ জনগণের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে অতীতে কোনো শাসক লাভবান হয়নি। জনগণ চায় নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। নির্বাচন নিয়ে শংকা দূর হোক।
শান্তিতে নেই ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরাও। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ছে, উৎপাদন কমে যাচ্ছে; রফতানি বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এ অবস্থায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হলে আমদানি-রফতানি খাতে দেখা দেবে বিপর্যয়। বন্ধ হবে কল-কারখানা। কর্ম হারিয়ে বেকার হবে হাজার হাজার শ্রমিক। দেখা দেবে সামাজিক বিশৃংখলা। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ হবে রুদ্ধ। কাজেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়ার আগে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হবে; মনে রাখতে হবে, পক্ষপাতহীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কেবল নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত করা সম্ভব। দলীয় সরকারের অধীনে এটি আশা করা অবান্তর। ওই নির্বাচনে বিরোধী দল কোনোভাবেই অংশ নেবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া সরকারকে পরিষ্কার জানিয়ে রেখেছেন, বিএনপিকে বাইরে রেখে দলীয় সরকারের অধীনে যে কোনো নির্বাচন প্রতিহত করা হবে। এর প্রস্তুতি নেয়ার জন্য তিনি তার দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের নির্দেশও দিয়ে রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ঘোষণা খালেদা জিয়াকে নিঃসন্দেহে পয়েন্ট অব নো রিটার্নে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফিরে আসা তার পক্ষে আর কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। কঠোর আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া সরকার বিরোধী দলের সামনে আর কোনো পথ খোলা রাখল না।
লক্ষণীয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে তৈরি হয় সন্দেহ-সংশয়। এর প্রভাব পড়ে পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। অপ্রত্যাশিতভাবে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয় প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন প্রতিপক্ষের কাছে। এতে প্রতীয়মান হয়, এ দেশের মানুষের মাঝে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার খুব ভালোভাবেই জায়গা করে নিয়েছে; এর প্রয়োজনীয়তা এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় মানুষের মুখের ভাষা উপলব্ধিতে আনাই দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচায়ক। এটিই গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। গণতন্ত্রকে পরিপক্ব করতে হলে মানুষের এ ভাষার প্রতি শাসকদের অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে এবং সহানুভূতিশীল হতে হবে; সর্বোপরি দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখতে হবে। রাজনীতিতে পরাজয়কে সহজভাবে মেনে নিতে হবে, জয়কে সহিষ্ণুতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই জনগণের কাছে শাসক দলের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। হারানো জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। মানুষ শাসক দলকে নতুন চোখে দেখবে।
শুধু শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন দিয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আশা করাও অবান্তর। ইচ্ছা থাকলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সেটি সম্ভব নয়। কেননা, সারাদেশে প্রায় ৬০ হাজার ভোট কেন্দ্রের ৯ কোটির ওপর ভোটারের ভোট নিশ্চিত করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্ভর করে তাদের নির্বাচনের আয়োজন করতে হয় আর দলীয় সরকারের অধীনে এসব প্রশাসনযন্ত্র কোনোভাবেই নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। সুতরাং বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখতে ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এই নির্মোহ সত্যটি শাসক দল যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবে, ততই তাদের ও দেশের মঙ্গল।
রাজনৈতিক সহিংসতায় গত কয়েক মাসে অনেক সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একই জাতি ও ধর্মের মানুষের মধ্যে একটি নির্বাচন নিয়ে এমন আত্মঘাতী ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, ক্ষমতার পালাবদলকে কেন্দ্র করে জেনেশুনে কৌশলে জাতিকে ভয়ানক বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে; যাতে এ জাতি বিপন্ন জাতিকে পরিণত হয়, বাইরের অপশক্তির হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রকে বিপন্ন করে কোনো রাজনীতি হতে পারে না। রাজনীতি করতে গিয়ে রাষ্ট্রই যদি বিপন্ন হল, তাহলে রাজনীতি কার স্বার্থে? কাজেই রাজনৈতিক সহিংসতায় আর যেন কোনো প্রাণ ঝরে না যায়, কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

নির্বাচন, আন্দোলন, না কারজাই মার্কা সরকার? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আমাকে একজন সবজান্তা সাংবাদিক ভেবে অনেকেই যে কথাটা আমার কাছে জানতে চান, সে কথা জানতে আমার নিজেরও খুব ইচ্ছে। দেশে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হচ্ছে কি হচ্ছে না? আগামী ঈদের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে বিরোধী জোট বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনে যাচ্ছে কি যাচ্ছে না? আন্দোলনের নামে দেশে আবার সন্ত্রাস ও ভাংচুর শুরু হলে দেশের রাজনীতিতে অচলাবস্থা, না কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তির অভ্যুদয় ঘটবে?
কী আছে আমাদের কপালে? কেউ বলতে পারে না। আমি নিজেও জানি না। কেবল অনুমান করতে পারি এবং আর দশজনের মতো সেই অনুমাননির্ভর আলোচনা করতে পারি। এটা একটা শুভ লক্ষণ দেশে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে এবং প্রধান দুটি দলই নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে গেছে। বিএনপি এখন আর হরতালের নামে ভাংচুরের পথে যাচ্ছে না। খালেদা জিয়া যেসব কথা বলছেন, তা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সভায় তার সরকারের উন্নয়ন কাজের ফিরিস্তি দিচ্ছেন এবং দেশের মানুষের কাছে নৌকার জন্য ভোট চাইতে শুরু করেছেন।
কিন্তু এই শুভ লক্ষণ পাল্টাতে কতক্ষণ? বাংলাদেশের প্রকৃতির মতো তার রাজনীতির চরিত্রও ‘ভোলাটাইল’। কেউ কেউ বলেন, ‘আনপ্রেডিকটেবল’। এই দেখা গেল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছে। তারপরই হঠাৎ দেখা যেতে পারে, অবস্থা পাল্টে গেছে। দু’দলই রণসাজে সজ্জিত এবং ভাংচুর চলছে রাজপথে।
গত বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় এক টেলিভিশন টকশোতে রাজনীতিক এবং সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি কথা বলেছেন। তার বক্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘বিরোধী দল গোলপোস্টটি খুঁজে পাচ্ছে না। ক্ষমতাসীনরা গোলপোস্ট এতবার সরিয়ে নিচ্ছেন যে, তাতে কেউ যত ভালো খেলোয়াড় হোন গোল দিতে পারছেন না। সবাই শুধু মাঠে দৌড়াদৌড়ি করছেন। গোলপোস্টের কাছে গেলেই সেটা ফট করে সরে যাচ্ছে।’
এটা পরিস্থিতির একটা কাছাকাছি চিত্র। প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে গোলপোস্টটা কি? একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান, না সেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদ্ধতি নিয়ে অনন্তকাল দ্বন্দ্ব? বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, যেমন দলীয় সরকারের অধীনে, তেমনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও কারচুপি, কারসাজি হয়েছে। প্রথম খালেদা সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত মাগুরা উপনির্বাচনে এবং ১৯৯৬ সালের ফেব্র“য়ারির তথাকথিত সাধারণ নির্বাচনে যে নির্লজ্জ ভোট জালিয়াতি হয়েছিল, তার ফলে দেশব্যাপী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি উঠেছিল। তাও অনন্তকালের জন্য নয়, পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকবারের জন্য।
সেই পরীক্ষায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সততা ও নিরপেক্ষতা প্রমাণিত হয়নি, বরং বিএনপি ও তাদের দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের সহযোগে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটিকে যেভাবে কলুষিত করা হয়েছিল, তাতে এ ব্যবস্থার ওপর প্রধান উদ্যোক্তা দল আওয়ামী লীগও আস্থা হারায়। তখনই দাবি ওঠে পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, তাতে ফিরে যাওয়ার। কেবল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনটি যে নিñিদ্রভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করতে হবে।
বর্তমানে কোনো সামরিক শাসকের কলমের আঁচড়ে নয়, একটি নির্বাচিত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমেই সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বাভাবিক ও প্রচলিত পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া হয়েছে। অমনি চারদিকে হইচই পড়েছে- না, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান চলবে না। কারণ তাতে নাকি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা নেই।
আমার প্রশ্ন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনেই কি নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হওয়ার নিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়নি? সিটি কর্পোরেশনগুলোর সাম্প্রতিক পাঁচটি নির্বাচন, পৌরসভাগুলোর নির্বাচন এবং জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনগুলোতে কি এই নিশ্চয়তা বর্তমান সরকার সৃষ্টি করেনি? বর্তমান আওয়ামী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো ধরনের একটি নির্বাচন সম্পর্কেও তো বিএনপি কোনো প্রকার কারচুপির অভিযোগ তুলতে পারেনি।
প্রথমদিকে তারা এই ধুয়া তুলে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন বর্জন করলেও পরবর্তী সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনগুলো বর্জন করেনি, বরং নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হবে জেনেই তাতে অংশ নিয়েছে এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। তারপরও দলীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হবে না, বাতিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হবে বলে তাদের এই জেদ ধরা কেন? মজার ব্যাপার এই যে, বিএনপির এই জেদ ধরার কাজে দেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞ হওয়ার দাবিদার এক ব্যক্তিও তাল দিচ্ছেন।
এখানেই আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে আমার একটু মতপার্থক্য। তার বর্ণিত গোলপোস্টটি যদি একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনকে বোঝায়, তাহলে ক্ষমতাসীন দল তা সরাচ্ছে না বা সেই লক্ষ্য থেকে তারা নিজেরাও সরে যাচ্ছে না। সরে যাচ্ছে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদ্ধতির প্রশ্নে দুই দলেরই অবস্থান। এখন দুই দলেরই গোলপোস্ট নির্বাচন নয়, নির্বাচনের পদ্ধতি বলে অনুমিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির দাবিতে বিএনপি অনড় থাকার ভাব দেখালেও বুঝতে অসুবিধা হয় না, শেখ হাসিনাকে সরকারপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে যে কোনো ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থাতেও তারা নির্বাচনে যেতে রাজি।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা বিএনপির খেলাটা বুঝে ফেলেছেন। ২০০১ সালে শেখ হাসিনা যথাসময়ে, সরল আন্তরিকতার সঙ্গে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। এই সরকারের রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন তারই মনোনীত ব্যক্তি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন তারই পছন্দ করা বিচারপতি লতিফুর রহমান।
তারপরই নাটকীয়ভাবে পটপরিবর্তন। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় বসেই শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনের টেলিফোন ও বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয়। তার নিরাপত্তা রক্ষীদের প্রত্যাহার করে। সাহাবুদ্দীন-লতিফুর দুই বিচারপতিই আওয়ামীবিদ্বেষী একজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ, তথাকথিত সুশীল সমাজের সদস্য, নিরপেক্ষতার ভেকধারী সম্পাদক- অর্থাৎ একটি বিশেষ কোটারি দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পড়েন এবং তাদের পরামর্শে চালিত হতে থাকেন। এই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের সময়েই আওয়ামী লীগের কর্মী, নির্বাচন-প্রার্থী, ভোটার ও সমর্থকদের ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। এ সময় পূর্ণিমা শীলদের মতো নাবালিকাদের ওপর পৈশাচিক গণধর্ষণের কাহিনী তো এখন ইতিহাস।
২০০১ সালে শেখ হাসিনা দেখেছেন কীভাবে তার সরলতা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যের সুযোগ নিয়ে বিএনপি-জামায়াত তারই হাতে গড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টাকে নানা কৌশলে ও প্রলোভনে হাতের মুঠোয় নিয়ে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটিকেই ব্যর্থ করেনি, আওয়ামী লীগের ওপর নির্যাতন চালানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। পরবর্তী নির্বাচনের সময়ও তারা দেখেছে, দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে ম্যানুপুলেট করে কীভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটিকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এবং গোটা পদ্ধতিটিকেই ব্যর্থ ও কলুষিত করা হয়েছিল। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারই কোটির ঊর্ধ্বে জাল ভোটার সংবলিত ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং একটি তাঁবেদার নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছিল। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বনিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টার অবৈধ কার্যকলাপের প্রতিবাদেই চারজন উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের উচ্চকণ্ঠ সমর্থক, হঠাৎ বুদ্ধিজীবী, সাবেক আমলা আকবর আলি খানও।
শেখ হাসিনা বারবার আছাড় খেয়ে বর্তমানে পথচলা শিখেছেন। তিনি যে নির্বাচন চলাকালেও যে কোনো ধরনেরই সরকারের প্রধান থাকতে চান, তার উদ্দেশ্য নির্বাচনে কোনো প্রকার প্রভাব বিস্তার বা তা ম্যানুপুলেট করা নয়; সে ক্ষমতা নির্বাচনকালীন সরকারের থাকবে না সে কথা আগেই তিনি বলে দিয়েছেন। তিনি চান নির্বাচনকালে বিএনপি-জামায়াত জোট এবং তাদের সমর্থক তথাকথিত সুশীল সমাজটি যাতে ২০০১ সালের মতো আবার ঘোট পাকাতে না পারে এবং চক্রান্ত দ্বারা আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করে ফেলতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখা এবং তা ব্যর্থ করা। এ জন্য সংসদ বাতিল না করেই নতুন সংসদ নির্বাচনের কথা বলছেন।
এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। নির্বাচন যাতে অবাধ ও নিরপেক্ষ হয় এবং দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলেও নির্বাচনে যাতে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সে জন্য নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার ব্যবস্থা আলোচিত হতে পারে। নির্বাচনই হচ্ছে এ সময়ের গোলপোস্ট, নির্বাচন পদ্ধতি গোলপোস্ট নয়। আর শেখ হাসিনা নির্বাচন-সংক্রান্ত যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছেন, তার লক্ষ্য গোলপোস্ট সরানো নয়। বরং নির্বাচন পদ্ধতির সুযোগে ২০০১ সালের মতো ফাউল গেম দ্বারা বিএনপি ও তথাকথিত সুশীল সমাজটি যাতে গোলরক্ষকবিহীন অবস্থায় গোলপোস্টে তাদের বলটি একতরফাভাবে ঢুকিয়ে দিতে না পারে তার ব্যবস্থা করা। এ ব্যবস্থা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কিছুমাত্র অন্তরায় বিবেচিত হলে অবশ্যই তা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা হতে পারে। সে জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাতিল ব্যবস্থায় ফিরে যেতে হবে কেন?
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ২০০১ সালে যে তথাকথিত সুশীল সমাজ, চরিত্রভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া এবং নানা কিসিমের দলছুট ও জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিকরা মিলে আওয়ামী লীগবিরোধী শিবির তৈরি করে সাহাবুদ্দীন-লতিফুর রহমান সরকারকে ঘেরাও করে ফেলে তাদের পরামর্শমতো চলতে বাধ্য করেছিল, ২০০৮ সালে এক-এগারোর সেনাতাঁবেদার তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন দিয়ে তাদের মাইনাস টু থিওরি সফল করার কাজে সাহায্য জুগিয়েছিল। সেই পরিচিত মুখগুলো, একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট, আইনজীবী- ২০১৩ সালেও আরেকটি নির্বাচন সামনে নিয়ে জোট বেঁধেছেন এবং ব্যর্থ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বিএনপিকে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করে প্রয়োজনে জামায়াত ও হেফাজতিদের ক্ষমতায় যেতে সাহায্য জোগাতে দ্বিধাগ্রস্ত নন।
বিএনপি যদি এই সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদীদের পরামর্শে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে অনড় থেকে নির্বাচনে না যায় তাহলে ভুল করবে। আন্দোলনের নামে জামায়াত ও হেফাজতিদের সাহায্যে জনপদে, রাস্তাঘাটে ভাংচুর করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটাতে পারবে না এ কথা গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝে ফেলেছে। তারা যা করতে পারে তা হচ্ছে দেশে একটি রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি করা এবং তার সুযোগে বিদেশী পৃষ্ঠপোষকদের সহায়তায় তথাকথিত সুশীল সমাজকে (ইউনূস সেন্টারসহ) দেশে একটি অনির্বাচিত কারজাই মার্কা সরকার চাপিয়ে দেয়ার কাজে সাহায্য জোগানো। তাতে বিএনপি লাভবান হবে না, নিজের অস্তিত্ব ধ্বংস করবে।
আমার বিশ্বাস (এবং একান্ত প্রার্থনা) দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন হবে এবং তা সুষ্ঠু ও অবাধ হবে। বিএনপি এবং সব দলের অংশগ্রহণেই নির্বাচনটি হবে। এখন যারা বিএনপির ঘোষিত ও অঘোষিত সমর্থক হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সরকারবিরোধী ভূমিকায় নেমেছেন এবং বাঘ সেজে খালি মাঠে তর্জন-গর্জন করছেন, নির্বাচন এলেই দেখা যাবে এরা পোষা পেপার টাইগার, আসল টাইগার নয়।

ভূমধ্যসাগরে ফের রাশিয়া ৪ যুদ্ধজাহাজ পাঠাল

রাশিয়ার নৌবাহিনী পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সিরিয়া উপকূলের কাছে আরও চারটি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন এ আরব দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন এসব জাহাজ সেখানে পাঠানো হল। এদিকে, তৃতীয় আরেকটি রুশ ল্যান্ডিং শিপ ‘বিশেষ কার্গো’ নেয়ার জন্য কৃষ্ণসাগরের নভোরোসিস্ক বন্দরে স্বল্প সময়ের জন্য থেমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও এ কার্গো সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো বিবরণ দেয়া হয়নি। রুশ সূত্র থেকে বলা হয়েছে, এ জাহাজটি নভোরোসিস্ক বন্দরে থামবে এবং বিশেষ মালামাল তুলবে, তারপর কম্ব্যাট ডিউটি পালনের জন্য জাহাজটি ভূমধ্যসাগরের পূর্বনির্ধারিত এলাকায় যাবে। এছাড়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে শিগগিরই ডেস্ট্রয়ার স্মেতিভি পাঠাবে মস্কো। এ খবরে আরও বলা হয়েছে, রুশ সাবমেরিন বিধ্বংসী জাহাজ অ্যাডমিরাল প্যান্তেলিয়েভ, নাতসতোইচিভি শ্রেণীর ডেস্ট্রয়ার, তিনটি ল্যান্ডিং শিপ আলেকজান্ডার শাবালিন, অ্যাডমিরাল নেভেলস্কি এবং পেরেসভেত এরই মধ্যে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে, মার্কিন সরকার সিরিয়ার ওপর হামলার কাজে বি-২ ও বি-৫২ বোমারু বিমান ব্যবহার করবে। ওয়াশিংটনের সিরিয়া যুদ্ধ বিষয়কনীতি নির্ধারণকারী একজন পদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন। এবিসি নিউজ চ্যানেল জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা সিরিয়ায় বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর আগে ওবামা দাবি করেছিলেন,
সিরিয়ায় ‘সীমিত আকারে’ হামলা হবে। অন্যদিকে, সিরিয়ার ওপর মার্কিন হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিুকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের দোদুল্যমানতা নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা চাপ বৃদ্ধি পরিকল্পনা নিয়েছেন। আর এ লক্ষ্যে সিরিয়া বিষয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন তিনি। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার কথা রয়েছে ওবামার। সিরিয়া হামলার পক্ষে-বিপক্ষে এখনও যেসব কংগ্রেস সদস্য কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি, এ ভাষণের ফলে সৃষ্ট জনমতের চাপে তারা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন বলে ধারণা করছে ওবামার উপদেষ্টা পরিষদ। আগামী সপ্তাহে কংগ্রেসের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ওই অধিবেশনে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে ভোটাভুটি হওয়ার কথা। রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিন ছিল শুক্রবার। এদিন সম্মেলনে অংশ নেয়া ওবামা জানিয়েছেন, সিরিয়ায় হামলা চালানোর বিষয়ে জনমত তৈরি ও কংগ্রেসের সমর্থন আদায়ে কঠিন লড়াই করতে হচ্ছে তাকে।
সংকট নিরসনে নিরাপত্তা পরিষদকে ভূমিকা রাখতে হবে : চীন
সিরিয়া সংকট নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে চীন। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোং লি শনিবার নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সিরিয়া সংকট যথাযথভাবে নিরসনের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে চীন তা সমর্থন করে। সিরিয়া সংকট শান্তিপূর্ণভাবে নিরসন করা সম্ভব বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন হোং লি। তথ্য সূত্র : প্রেস টিভি, রয়টার্স।

সংগ্রামে অটল মালালা

‘সবাই স্কুলে যেতে পারবে’ এমন একটি পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে আরও দৃঢ়ভাবে নিজের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তানের মানবাধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাই। নেদারল্যান্ডের হেগে দ্য আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার-২০১৩ গ্রহণ করার পর এক প্রতিক্রিয়ায় সে নিজের এই লক্ষ্যের কথা জানায় বলে জানিয়েছে।
দ্য ডন। মালালার হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন ২০১১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইয়েমেনের সাংবাদিক ও সমাজকর্মী তাওয়াক্কাল কারমান। কারমান বলেন, ‘তুমি (মালালা) আমার নায়ক। তুমি চিৎকার করে বলেছো : কেউ আমাকে থামাতে পারবে না অথবা কোনো মেয়েকে শিক্ষা গ্রহণ থেকে থামানো যাবে না।