Showing posts with label বিশ্ব অর্থনীতি. Show all posts
Showing posts with label বিশ্ব অর্থনীতি. Show all posts

Thursday, September 19, 2024

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিদেশে ‘সরানো’ দুই লাখ কোটি টাকার খোঁজে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে পাচার হওয়া অর্থ-সম্পদের হদিস পেতে সে দেশের সরকারের দ্বারস্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সহযোগীদের সম্পদ যুক্তরাজ্যে পাচার করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে অন্তর্বর্তী সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের সদস্যদের ওপর নতুন সরকার যে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্রিটিশ গণমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, নতুন প্রশাসন তদন্ত করছে যে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১৩ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩০০ কোটি পাউন্ডের সমপরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা বিদেশে সরানো হয়েছে কি না। যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের সাবেক সরকারের সহযোগীরা সম্পদ গড়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে। যুক্তরাজ্য ছাড়াও সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য সরকার ‘বেশ সহায়তা’ করছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছিলেন; তাঁরা অনেক কারিগরি সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন।

বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রীর কেনা ১৫০ মিলিয়ন বা ১৫ কোটি পাউন্ডের সম্পত্তির অর্থের উৎস সম্পর্কে বাংলাদেশ জানতে চেয়েছে বলে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, এসব সম্পদ বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার করতে চায়; সে লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা; কিন্তু বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁরা কিছু বলতে রাজি হননি।

শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ করে আসছেন বাংলাদেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক বিধিনিষেধ আছে। প্রতি বছর বাংলাদেশের নাগরিকেরা বৈধভাবে মাত্র কয়েক হাজার ডলার বিদেশে নিতে পারেন।

আহসান মনসুর বলেন, ‘এই বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রধানমন্ত্রীর অজ্ঞাতসারে দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।’ তবে তিনি এ–ও বলেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। তিনি ভারতের কোথায় আছেন তা জানা যায়নি। ফলে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের পক্ষে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তবে এসব অভিযোগ যুক্তরাজ্যের স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টির সরকারের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর হতে পারে। শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক লেবার সরকারের সিটি মিনিস্টার, যদিও এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি যে টিউলিপ সিদ্দিক এসব অপকর্মের সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত ছিলেন। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য টিউলিপ সিদ্দিকের সঙ্গে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেননি।

শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসও ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে এক সাক্ষাতে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সহায়তা চেয়েছেন।

মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ দেশটি থেকে ‘চুরি হওয়া ও বিদেশে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনবে। সরকারের যেসব অগ্রাধিকার রয়েছে, এটি তার মধ্যে অন্যতম।’

শেখ হাসিনা দুই দশক বাংলাদেশ শাসন করেছেন; কিন্তু তাঁর শাসনামলে ভোট চুরি, অধিকার লঙ্ঘন ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ থেকে ছাত্রবিক্ষোভ সৃষ্টি হয়; পরিণতিতে হাসিনা সরকারের পতন হয়।

চলতি বছরের শুরুতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউকে জানায়, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন কোম্পানির সম্পত্তি আছে। সে দেশে যে বাংলাদেশিদের এ রকম ‘অব্যাখ্যাত সম্পদ’ আছে, এটি তার নজির। তারা বলেছিল, যুক্তরাজ্য সরকারের উচিত হবে, এসব খতিয়ে দেখা।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস যুক্তরাজ্যের ভূমি নিবন্ধন দপ্তর ও কোম্পানি–সংক্রান্ত দপ্তরের নথি খতিয়ে দেখেছে। তাদের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ১৫ কোটি পাউন্ডের বেশি মূল্যের অন্তত ২৮০টি সম্পত্তি কিনেছে।

এসব সম্পদ ২০১৬ সালের পর থেকে কেনা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ভূমি কার্যালয়ের তথ্যানুসারে, বেশির ভাগ সম্পদ কেনা হয়েছে ২০১৯ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে। সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিমন্ত্রী ছিলেন।

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সম্পদ কিনেছেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী। এর মধ্যে ফ্রিহোল্ড বা চিরকালীন মালিকানার অধিকারের সম্পদ আছে, যার মধ্যে রয়েছে লন্ডনের মূলকেন্দ্রের ফিটজ্রোভিয়া এলাকার এমারসন বেইনব্রিজ হাউস, পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটে ৬১টি বাড়ি ও ব্রিস্টলে একটি সমবায় সুপারমার্কেট।

যুক্তরাজ্যে এসব সম্পদ কেনার অর্থ কোত্থেকে এসেছে তা পরিষ্কার নয়। যদিও নথিপত্র দেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, কিছু সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে বন্ধকি ঋণ নেওয়া হয়েছে।

সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আইনজীবী আজমালুল হোসেন ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, তাঁর মক্কেলের ‘লুকানোর কিছু নেই’ এবং তিনি কোনো কিছু চুরি করেননি। তিনি আরও বলেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী চতুর্থ প্রজন্মের ব্যবসায়ী। রাজনীতিতে আসার আগে সেই ১৯৯০-এর দশক থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে সম্পদ কিনছেন।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী চলতি বছরের শুরুতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যবসার অর্থ থেকে তিনি বিদেশে সম্পদ কিনেছেন। আজমালুল হোসেন বলেন, ড. ইউনূসের ‘অসাংবিধানিক সরকার’ আওয়ামী লীগ সদস্য ও নেতাদের নিপীড়ন করছে। তিনি আরও বলেন, যথেষ্ট আশঙ্কা আছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আরাফাত ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, তদন্ত হলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহযোগীরা নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। তিনি আরও বলেন, ‘(নতুন সরকার) সব কিছুকে বড় দুর্নীতি হিসেবে দেখাতে চাইছে। তাঁরা সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দোষী করতে চাইছেন। তবে এটা ভালো যে যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা হচ্ছে ...এসব অভিযোগ তাঁদের প্রমাণ করতে হবে।’

যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ করেছে কি না, সে বিষয়ে তারা কিছু বলবে না। এ বিষয়ে তাদের অনেক পুরোনো নীতি রয়েছে।

ছবি : সংগৃহীত

Friday, November 18, 2011

ওয়াল স্ট্রিট দখল কেন by ফারুক মঈনউদ্দীন

আমেরিকার অর্থনৈতিক রাজধানী নিউইয়র্কে হঠাৎ করে যে বিক্ষোভ সংঘটিত হয়ে গেল, সেটাকে আপাতদৃষ্টিতে মার্কিনিদের সহজাত বিচ্ছিন্ন হুজুগের মতো মনে হতে পারে অনেকের কাছে। প্রায় নেতৃত্ববিহীন স্বতঃস্ফূর্ত অর্থপূর্ণ অথচ অসংগঠিত এই বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল অনেক। তবে মূল কথাটি ছিল পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে পুঁজিপতি ও বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থলোভ, সীমাহীন দুর্নীতি, সরকারি নীতিনির্ধারণে ধনবাদী পরিবার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যায় প্রভাব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনা। এসবের বিরুদ্ধেই ছিল বিক্ষোভকারীদের মূল প্রতিবাদ। ওয়াল স্ট্রিট দখল করার স্লোগানটি অবশ্যই প্রতীকী। কারণ, এই ওয়াল স্ট্রিটেই অবস্থিত নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ। প্রতিবাদকারীদের মতে, যখন লাখ লাখ আমেরিকান চাকরি, শিক্ষা, বেকারভাতা, গৃহঋণ ইত্যাদি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে—এমনকি সরকারও তার নাগরিকদের এসব মৌলিক সুবিধা বহাল রাখতে সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন ওয়াল স্ট্রিট তথা বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কেবল তাদের মুনাফা বাড়াতে ব্যস্ত। শুধু তা-ই নয়, শেয়ার ব্যবসায় লাখ-কোটি ডলার উৎপাদনবিহীন আয় করলেও তারা আয়কর রেয়াত পাচ্ছে।
এসবের বাইরে বিক্ষোভকারীরা আরও যেসব দাবি তুলেছে, সেগুলোর মধ্যে আছে পূর্ণ কর্মসংস্থান, ঋণাত্মক আয়কর, (যার অর্থ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়ের নিচে হলে সরকারকে উল্টো সেই আয়কারীকে অর্থসাহায্য দিতে হবে), সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি। তবে প্রতিবাদকারীদের দাবিনামাকে সাধারণ দৃষ্টিতে অসংলগ্ন মনে হলেও, খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি দাবি সে ধারণাকে বদলে দেয়। এ নিয়ে গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা তেমন উচ্চবাচ্য না করলেও এই দাবি দুটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেশ গভীর। দাবি দুটি হচ্ছে—টোবিন ট্যাক্স চালু করা এবং গ্লাস-স্টিগাল ব্যাংকিং আইনের পুনর্বহাল।
টোবিন ট্যাক্সের ধারণাটি দিয়েছিলেন আমেরিকার নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জেমস টোবিন, যার মধ্যে ছিল ফটকা উদ্দেশ্যে মুদ্রা ব্যবসার ওপর কর বসানোর পরামর্শ। আমরা জানি, শেয়ারবাজারে যেমন শেয়ার কেনা-বেচা হয়, তেমনই আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে বিভিন্ন উন্নত অর্থনীতির মুদ্রা কেনা-বেচা হয় স্বল্পমেয়াদে মুনাফা লাভের জন্য। টোবিন উপদেশিত করারোপের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন মুদ্রারবাজার ও সুদের হারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০০ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক এই ব্যবসা করতে গিয়ে শত শত কোটি টাকা লোকসান দিয়েছিল।
গ্লাস-স্টিগাল ব্যাংকিং আইনের পুনর্বহালবিষয়ক দাবিটিও অর্থবহ। ১৯২৯ সালে আমেরিকার শেয়ারবাজারের মহাধস ও অর্থনীতিতে মহামন্দার পর নীতিনির্ধারক মহল উপলব্ধি করে, এই বিপর্যয়ের মূল হোতা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কারণ, তারা মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম উপেক্ষা করে বেশি উৎসাহী ছিল শেয়ারবাজারে লগ্নি করতে। এমনকি নিজস্ব পুঁজি বিনিয়োগের পর তারা আমানতকারীদের অর্থ শেয়ারবাজারের মতো একটা ঝুঁকিবহুল খাতে বিনিয়োগ করে নিয়েছিল সীমাহীন ঝুঁকি। এ রকম মহাবিপর্যয় সৃষ্টিকারী কার্যকলাপ থেকে ব্যাংকগুলোকে বিরত রাখতে ১৯৩৩ সালে প্রণীত হয়েছিল গ্লাস-স্টিগাল অ্যাক্ট, যেটা দিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিনিয়োগ ব্যাংকের মধ্যে সুস্পষ্ট ভেদরেখা তৈরি করা হয়। আমেরিকার সাবেক ট্রেজারি সেক্রেটারি ও ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের প্রতিষ্ঠাতা কার্টার গ্লাস ছিলেন এই উদ্যোগের আবিষ্কর্তা। তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন ব্যাংকিং ও মুদ্রা কমিটির চেয়ারম্যান হেনরি স্টিগাল। তিনি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদেরও সদস্য ছিলেন। এ আইনের আওতায় ব্যাংকগুলোকে বেছে নিতে বলা হয়েছিল, তারা কি ব্যাংকিংয়ের মূলধারায় থাকতে চায়, নাকি বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ে বিশেষায়িত হয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে চায়? তবে এখানে একটা ব্যতিক্রম দেওয়া হয়েছিল, অবিক্রীত সরকারি বন্ড কেনার (আন্ডার রাইটিং) ব্যাপারে এই আইন প্রযোজ্য হবে না।
সর্বকালের সব ভালো আইনের বিরুদ্ধে একটা শক্তি যে রকম সোচ্চার থাকে, এই আইনের বিপক্ষেও ছিল তেমনই শক্তি, যারা এই আইন অপসারণের জন্য সক্রিয় কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। ফলে ৬৬ বছর পর ১৯৯৯ সালে আইনটি বিলুপ্ত করা হয়, আর তার বিপরীতে চালু করা হয় নতুন আইন; যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে আবার সক্ষম হয় নিজস্ব ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে। তবে ব্যাংকের বিশাল পুঁজি ও বৃহৎ কার্যক্রম শেয়ারবাজারে অপরিমেয় ভূমিকা রাখতে পারে বলে একটা সংবিধিবদ্ধ ভেদরেখা টানা হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিনিয়োগ ব্যাংকের মাঝখানে। ওয়াল স্ট্রিট দখলকারীদের কাছে সেই ভেদরেখা খুব কার্যকর কিছু নয় বলে তাদের একটা দাবি ছিল গ্লাস-স্টিগাল ব্যাংকিং আইনের পুনর্বহাল। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক মহাধসের পর ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী ভূমিকাও হয়ে উঠেছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তাই চলতি বছরের তারল্যসংকট ইত্যাদি কারণে বিভিন্ন ব্যাংকের মুনাফা হ্রাস পেলেও পুঁজিবাজারে অতিতৎপর ব্যাংকগুলোর মুনাফা পতনের হার সবচেয়ে বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুস্পষ্ট নীতিনির্দেশনা অনুযায়ী শেয়ারবাজারে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নটি স্পষ্টতর হওয়ার পরও ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ও সন্তুষ্টি আসেনি।
ওয়াল স্ট্রিট দখলকারীদের অনেকগুলো দাবির মধ্যে এই দুটি দাবির গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার মুখ্য উদ্দেশ্য উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন একটা শ্রেণীর বাণিজ্য ও অপরিমেয় মুনাফা অর্জনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের একটা সুস্পষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করা। শিল্পায়নের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহের জন্য একটা সুস্থ শেয়ারবাজার প্রয়োজন—এ কথা যেমন সত্য, তেমনই এই শেয়ারবাজারের মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ মুনাফা পেশাদার শেয়ার ব্যবসায়ীরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তুলে নেন—সেটাও সত্য। শেয়ার ব্যবসায়ীদের এই মুনাফার সঙ্গে কিন্তু শেয়ার ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের লাভ কিংবা উৎপাদনের কোনো সম্পর্ক নেই। এ কারণে পুরো প্রক্রিয়াটা দাঁড়ায় প্রকৃত উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন একটা মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীর সম্পদ আহরণে। একইভাবে মুদ্রা ব্যবসায়েও শুধু মুনাফা সংগৃহীত হয় বিভিন্ন মুদ্রার বিনিময় মূল্যের উদ্বৃত্ত থেকে, যার সঙ্গে প্রকৃত উৎপাদনের কোনো সম্পর্ক নেই। এ দুটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উচ্চবিত্ত একটা শ্রেণী কোনো কিছু উৎপাদন না করেও বিশাল অঙ্কের মুনাফা ঘরে তুলে নিতে পারে—এমনকি কারসাজির মাধ্যমে বাজার প্রভাবিত করে কয়েক গুণ বৃদ্ধি করতে পারে এই মুনাফা। ওয়াল স্ট্রিট দখলকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল এই শ্রেণীটি।
ওয়াল স্ট্রিটের অপরিমেয় মুনাফার বিপরীতে আমেরিকার বিশাল একটা জনসংখ্যা নিমজ্জিত হয়ে আছে দারিদ্র্যে এবং এই মুনাফার পেছনে নেই কোনো উৎপাদনপ্রক্রিয়া। তাই ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ বিক্ষোভকারীদের এই দাবি দুটির পেছনের মূল উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন মুদ্রা ও শেয়ার ব্যবসা সম্পর্কিত আইনগুলো বাস্তবায়ন করা। বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্বহীনতা, দাবির অসংলগ্নতা ইত্যাদি সত্ত্বেও এই দাবি দুটির মাধ্যমে যে বক্তব্যটি উঠে আসে, সেটি হচ্ছে—অনুৎপাদক খাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের বিশাল মুনাফার উৎস বন্ধ করা। স্পষ্টতই এসব দাবিনামার মূল প্রতিপাদ্য ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং পুঁজিবাদী শোষণ, সম্পদের পুঞ্জীভবন ও সরকার ও তার নীতির ওপর বৃহৎ করপোরেটদের অন্যায় প্রভাবের বিরুদ্ধে। তবে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্য যত মহৎ ও বিশাল হোক না কেন, আমেরিকার বাস্তবতায় ও হুজুগে হয়তো এই আন্দোলন হালে পানি পায়নি। কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথাগত এই প্রতিবাদের ভিন্ন মাত্রাটি প্রতিফলিত হয়েছে মুদ্রা ও শেয়ার ব্যবসা সম্পর্কিত উপরিউক্ত দুটি আইন প্রবর্তনের দাবির মাধ্যমে। আমেরিকার সচেতন মানুষের প্রতিবাদ অন্যান্য দেশের মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে যে কেবল মুনাফাই একটা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে পারে না ।
এ কথা হয়তো সত্যি অথবা সত্যি নয় যে ওয়াল স্ট্রিট দখল করো আন্দোলনের মূল প্রেরণা ছিল সাম্প্রতিক ‘আরব গণজাগরণ’। কারণ, আমেরিকায় ও ইউরোপের দেশে দেশে গণবিক্ষোভের মূল বক্তব্য মূলত অর্থনৈতিক হলেও তার কৌশলটি পথপ্রদর্শক আরব বিক্ষোভকারীদের মতো। ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু আরব গণজাগরণের উৎস ছিল তিউনিসিয়া। দেশটির পুলিশ বাহিনীর দুর্নীতি ও দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এক নগণ্য নাগরিকের আত্মাহুতি থেকে সৃষ্ট ব্যাপক গণজাগরণের ফলে উৎখাত হয় সরকার। তার পর মিসর, লিবিয়া, আলজেরিয়া, বাহরাইন, ওমান, কুয়েত, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, জর্ডান, মরক্কো, লেবানন, মৌরিতানিয়া, সুদান প্রভৃতি দেশেও শুরু হয় গণতন্ত্রকামী মানুষের বিক্ষোভ ও আন্দোলন। এই গণজাগরণের ফলে তিউনিসিয়া, মিসর ও লিবিয়ার সরকার উৎখাত হয়। এ ছাড়া সুদান, ইরাক, জর্ডান ও ইয়েমেনের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানেরা বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি নতজানু হয়ে বিভিন্ন শর্তে এবং বিভিন্ন মেয়াদে ক্ষমতা ছাড়ার মুচলেকা দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন।
কঠোরভাবে অগণতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক আরব বিশ্বের এই গণজাগরণ ছিল অভূতপূর্ব ও অকল্পনীয়। তবুও হাজার হাজার অকুতোভয় বিক্ষোভকারী বিভিন্ন দেশের রাজপথে নেমে প্রতিবাদে মুখর হয়েছে, কোনো কোনো দেশে আদায় করে নিয়েছে তাদের দাবি। আবার কোথাও কঠোর হাতে দমন করা হয়েছে বিক্ষোভ। আরব বিশ্বের মতো চরম অগণতান্ত্রিক দেশে এ জাতীয় আন্দোলনের সফলতা বা ব্যর্থতার চেয়ে যে বিষয়টি মূল বিবেচ্য তা হচ্ছে, অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে নিপীড়িত মানুষের জেগে ওঠা। আরব গণজাগরণের দাবিগুলোর মধ্যে অর্থনীতি ও রাজনীতি দুটিই ছিল; যেমন—সরকারি দুর্নীতি, একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক মন্দা—এসব। ওয়াল স্ট্রিট দখলকারীদের দাবি ছিল মূলত অর্থনৈতিক। সম্পদশালী ১ শতাংশের বিরুদ্ধে বিত্তহীন ৯৯ শতাংশের এই জাগরণ অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের এত বছর পর সেই সুরে কথা বলা কিংবা অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরাসরি রাজপথে নেমে আসার বিষয়টি আর বোধ হয় উপেক্ষা করার উপায় নেই।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।
fmainuddin@hotmail.com

Sunday, July 4, 2010

একুশ শতকের মহামন্দা - পল ক্রুগম্যান

মন্দা (রিসেশন) সচরাচর দেখা যায়, কিন্তু মহামন্দার (ডিপ্রেশন) দেখা মেলে কদাচিৎ। আমি শুধু এতটুকুই বলতে পারি যে অর্থনৈতিক ইতিহাসে মাত্র দুবার এমন অবস্থা তৈরি হয়েছিল, যাকে সেই সময় ব্যাপকভাবে ‘মহামন্দা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে: ১৮৭৩ সালের আতঙ্ক-পরবর্তী মূল্য সংকোচন ও অস্থিতিশীলতার বছরগুলোতে একবার, আরেকবার ১৯২৯-৩১ সালের অর্থনৈতিক সংকট-পরবর্তী গণবেকারত্বের বছরগুলোতে।
১৯ শতকের ‘লং ডিপ্রেশন’ কিংবা ২০ শতকের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ যে সময়ের কথাই বলা হোক, এর কোনো যুগেই অর্থনীতি একটানা নিম্নমুখী হয়ে চলেনি। বরং এই দুই যুগের মধ্যেই এমন কিছু সময় ছিল, যখন অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কিন্তু শুরুর ধসের ফলে যে ক্ষতি হয় তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য অর্থনৈতিক উন্নতির এই পর্যায়গুলো কখনোই যথেষ্ট ছিল না।
আমার আশঙ্কা, আমরা এখন তৃতীয় মহামন্দার প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। এই মহামন্দা সম্ভবত ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর মতো তীব্র না হয়ে অনেকটা ‘লং ডিপ্রেশন’-এর মতো হবে। বিশ্ব অর্থনীতিকে এবং চাকরির অভাবে বিবর্ণ লাখ লাখ মানুষকে এ জন্য অপরিমেয় মূল্য দিতে হবে।
আর এই তৃতীয় মহামন্দা হবে মূলত নীতিরই ব্যর্থতা। দুনিয়াজুড়ে সরকারগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ে মেতে আছে এমন এক সময়ে, যখন সত্যিকারের হুমকি মূল্য সংকোচন; মিতব্যয়ী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে তারা নসিহত করছে, যখন সত্যিকারের সমস্যা অপর্যাপ্ত ব্যয়। সর্বশেষ জি-২০ সম্মেলনটিও এ ব্যাপারে ছিল সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক।
২০০৮ ও ২০০৯ সালে মনে হয়েছিল, আমরা বোধহয় ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছি। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আগের বছরগুলোর মতো সুদের হার বাড়ানোর পথে যায়নি ফেডারেল রিজার্ভ এবং ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের নেতারা। তাঁরা ঋণবাজারকে সহায়তায় উদ্যোগী হয়েছিলেন। অতীতের সরকারগুলো অর্থনীতির নিম্নমুখিতার সময়ে বাজেটকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু বর্তমান সরকারগুলো সে পথ অনুসরণ না করে ঘাটতি বাড়তে দিয়েছে। আর অধিকতর ভালো নীতি গ্রহণ দুনিয়াকে সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের দিকে অগ্রসর হওয়া এড়াতে সহায়তা করেছে: অর্থনৈতিক সংকটের ফলে যে মন্দা (রিসেশন) এসেছিল, সেটি বহুজনের মতে গত গ্রীষ্মে শেষ হয়েছে।
কিন্তু ভবিষ্যতের ঐতিহাসিকেরা আমাদের বলবেন যে তৃতীয় মহামন্দার শেষ এটা ছিল না, ঠিক যেমন করে ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর সমাপ্তি ছিল না ১৯৩৩ সালে এসে ব্যবসায়ের ঊর্ধ্বমুখিতা। বেকারত্ব, বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব, এখন যে স্তরে রয়ে গেছে, সেটিকে মাত্র কিছুদিন আগেও বিপর্যয়কর হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। বেকারত্বের হার দ্রুত কমে আসারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ উভয়ই জাপানের মতো মূল্য সংকোচনের ফাঁদের দিকে ধাবিত হওয়ার পথে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে।
এমন ভয়ানক অবস্থায়, লোকে প্রত্যাশা করে নীতিনির্ধারকেরা উপলব্ধি করবেন যে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কাজ এগিয়ে নিতে তাঁরা এখনো যথেষ্ট কাজ করেননি। কিন্তু না, গত কয়েক মাসে কাঁচা টাকা এবং ভারসাম্য বাজেট গোঁড়ামির বিস্ময়কর পুনরাবির্ভাব ঘটেই চলেছে।
ভাষাগত দিক থেকে এই পুরোনো আমলের কথামালার ফিরে আসা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে ইউরোপে। ইউরোপের কর্মকর্তারা হারবার্ট হুভারের বক্তৃতামালা থেকে তাঁদের আলোচ্য বক্তব্যগুলো পাচ্ছেন বলে মনে হয়। তাঁরা যখন দাবি করেন যে কর বৃদ্ধি এবং ব্যয় হ্রাসের ফলে ব্যবসায়ে আস্থার উন্নতি ঘটানোর মাধ্যমে আসলে অর্থনীতি বিস্তৃত হবে, তখন হারবার্ট হুভারের কথাই মাথায় আসে। অবশ্য, বাস্তবিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রও তেমন ভালো করছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ-ব্যবস্থা মূল্য সংকোচনের ঝুঁকি বিষয়ে সচেতন বলেই মনে হয়; কিন্তু এসব ঝুঁকির ব্যাপারে এর প্রস্তাবনা কী? না, কোনো প্রস্তাবনা তো নেই। ওবামা প্রশাসন বোঝে অকালীন আর্থিক কৃচ্ছ্রসাধনের বিপদ—কিন্তু যেহেতু কংগ্রেসের রিপাবলিকান এবং রক্ষণশীল ডেমোক্র্যাটরা রাজ্য সরকারগুলোকে বাড়তি সহায়তা অনুমোদন করবেন না, তাই রাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে বাজেট বরাদ্দ কমানোর আকারে কৃচ্ছ্রসাধন তো এসেই যাচ্ছে।
নীতিগত প্রশ্নে এই ভুল পথে যাত্রা কেন? চরমপন্থীরা তাঁদের কর্মকাণ্ডের ন্যায্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে গ্রিস ও ইউরোপের সীমান্তবর্তী অন্য দেশগুলো যে সমস্যা মোকাবিলা করত, সেসবের কথা বলেন। এটা তো সত্যি যে বন্ড বিনিয়োগকারীরা দুর্দমনীয় ঘাটতিতে থাকা সরকারগুলোর ওপর বৈরী। কিন্তু মন্দাভারাক্রান্ত অর্থনীতি মোকাবিলায় স্বল্প সময়ের আর্থিক কৃচ্ছ্রতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে, সেটিরও কোনো লক্ষণও তো নেই। উল্টো, গ্রিস কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনে সম্মত হওয়ার ফলে দেখতে পাচ্ছে যে ঝুঁকি শুধু বেড়েই চলেছে। আয়ারল্যান্ড সরকারি ব্যয় নির্মমভাবে ছেঁটে দেওয়ার নীতি আরোপ করেছে, ফলে বাজারের কাছে আয়ারল্যান্ড শুধু হয়ে উঠেছে স্পেনের চেয়েও ঝুঁকিপূর্ণ, যেই স্পেন এসব চরমপন্থীর দাওয়াই গিলতে অনেক বেশি অনিচ্ছুক।
অবস্থা দেখে মনে হয়, আর্থিক বাজার যা বুঝতে পারে তা নীতিনির্ধারকেরা যেন বোঝে না। দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পাশাপাশি কোনো মহামন্দার সময় ব্যয় প্রচণ্ডভাবে কমানোর পদক্ষেপ, যা সেই মহামন্দাকে গভীরতর করে এবং ব্যয় সংকোচনের পথ করে দেয়, আসলে নিজেই ব্যর্থতার বীজ বহন করে।
তাই আমি মনে করি না এটা আসলে গ্রিসের অথবা ঘাটতি ও চাকরির মধ্যে আপসের কোনো বাস্তবসম্মত উপলব্ধির ব্যাপার। উল্টো, এটা সেই গোঁড়ামিরই বিজয়, যে গোঁড়ামি যৌক্তিক বিশ্লেষণের ধার ধারে না, যার মূল বিশ্বাস হলো কঠিন সময়ে আপনি আপনার নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন অন্য মানুষের ওপর ভোগান্তি চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
গোঁড়ামির এই বিজয়ের দাম দিতে হবে কাকে? উত্তর: কোটি কোটি কর্মসংস্থানহীন মজদুরকে। তাদের অনেককে বছরের পর বছর কাজহীন থাকতে হবে আর কেউ কেউ আর কোনো দিনও কাজ পাবে না।
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
পল ক্রুগম্যান: নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট ও লেখক