Thursday, November 12, 2015

মধ্যরাতে জেলে ঢুকল কালো কাচের এসইউভি

কাকপক্ষীও টের পায়নি। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও জেনেছেন অনুপ চেটিয়া ভারতে চলে যাওয়ার পরে।
ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক কর্তা জানাচ্ছেন, কাল গভীর রাতে কালো কাচে ঢাকা টয়োটার একটি এসইউভি গাড়ি ঢোকে কাশিমপুর কারাগারে। মিনিট কুড়ি পরে বেরিয়ে এসে সেটি দ্রুত গতিতে পৌঁছে যায় ভারতীয় হাই কমিশনের দফতরে। সেখানে নামেন অনুপ চেটিয়া ও আরও দুই আলফা নেতা— যাঁরা এত দিন তাঁর সঙ্গেই কারাগারে ছিলেন। গাড়িটি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। তিন আলফা নেতাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে কথা বলেন হাই কমিশনের এক পদাধিকারী। আবার তিন জনকে তোলা হয় এসইউভি-তে। রাত সাড়ে তিনটের সময়ে সেটি দৌড় দেয় বেনাপোল সীমান্তের দিকে। আড়িচাঘাটে তৈরিই ছিল বিশেষ ফেরি। পদ্মা পেরিয়ে মাগুরা, যশোর হয়ে আজ সকাল সাড়ে ন’টায় বেনাপোল সীমান্ত পেরোয় সেই গাড়ি। সেখানে অপেক্ষা করছিল সিবিআইয়ের একটি বিশেষ দল। অনুপদের নিজেদের গাড়িতে তুলে সিবিআই অফিসারেরা পৌঁছে যান দমদম বিমানবন্দরে। সেখান থেকে বিশেষ বিমানে সোজা দিল্লি। বেলা আড়াইটে নাগাদ দিল্লি পৌঁছন অনুপ।
গোয়েন্দাদের অন্য একটি সূত্র অবশ্য বলছে— বেনাপোল নয়, সিলেটের ডাউকি দিয়ে ভারতে ফেরানো হয়েছে অনুপকে। তবে বেনাপোলেও বন্দোবস্ত ছিল। অসম থেকে বিশেষ বিমানে অনুপকে দিল্লি নিয়ে গিয়েছে সিবিআই।
বাংলাদেশ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে ঢাকায় প্রায়ই দেখা যেত রোগা পাতলা চেহারার এক তরুণকে। দু-এক জন বামপন্থী ছাত্র নেতার সঙ্গে হাজির হতেন জাতীয় প্রেস ক্লাবে। তিনি যে অসম থেকে আসছেন, অসমকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, সে সব কথা আড্ডার ছলে অক্লেশে বলে যেতেন। ঢাকার সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, তাঁদের নানা বইপত্র দিতেন। অনেকে তাঁর কথা শুনে অবাক হতেন, কেউ বা বাতুলতা বলে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু ঠান্ডা মাথার ছেলেটি তাঁর সংগঠন ‘উলফা’-র (তিনি এই নামই বলতেন) অগাধ ক্ষমতার কথা বলেই যেতেন। তিনিই অনুপ চেটিয়া।
বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৯৭-এ তাঁকে গ্রেফতার করার পর থেকে বাংলাদেশের নানা জেল তাঁর স্থায়ী বাসস্থান হয়ে ওঠে। ভারত সরকার ১৮ বছর ধরে বার বার ঢাকার কাছে দাবি করে এসেছে— আলফার সাধারণ সম্পাদক অনুপ চেটিয়াকে হস্তান্তর করা হোক। অসমে তাঁর বিরুদ্ধে খুন, গণহত্যা, তোলাবাজির অজস্র মামলা রয়েছে। ভারতের আদালতে সেগুলির বিচার হোক। কিন্তু সাত বছর কারাবাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও বাংলাদেশ সরকার তাঁকে নিরাপদ হেফাজতে ঢাকার কাশিমবাজার জেলেই রেখে দেয়। আদালত অনেক বার জানতে চেয়েছে, তিনি কি দেশে ফিরতে চান? অনুপের উত্তর ছিল— না।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মে মাসে ঢাকায় এসে চেটিয়াকে ফেরানোর বিষয়ে শেখ হাসিনাকে রাজি করিয়ে যান। এর আগে দিল্লির সুনির্দিষ্ট খবরের ভিত্তিতে বাংলাদেশ থেকে আলফার সব ঘাঁটি উচ্ছেদ করেছে হাসিনা সরকার। অরবিন্দ রাজখোয়া-সহ আলফার অন্তত সাত জন বড় নেতাকে আটক করে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। ভারতে গিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করেছেন আলফা নেতারা। পরেশ বরুয়া আলাদা দল গড়েছেন। এখন অনুপও আলোচনাপন্থী। মাস তিনেক আগে লিখিত ভাবেই বাংলাদেশ সরকারকে জানান, তিনি দেশে ফিরতেই চান।
অবশেষে ফিরলেন চেটিয়া।

চেটিয়াকে এনে এক মাসেই শান্তি চুক্তি চায় বিজেপি

ব্রডগেজ ট্রেন, হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব, ছয়টি জনগোষ্ঠীকে উপজাতি তালিকাভুক্ত করা এবং আলফার সঙ্গে শান্তি চুক্তি— অসমে আগামী বিধানসভা ভোটে আটঘাট বেঁধে নামতে এইগুলিই হল বিজেপির বড় হাতিয়ার। প্রথমটির পরিকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ। ‘উপযুক্ত’ সময়ে ট্রেন চালু করলেই হল। নাগরিকত্ব প্রদান ও উপজাতি তালিকাভুক্ত করার ব্যাপারে খসড়া বিল তৈরি। বাকি ছিল শান্তি চুক্তি। যেখানে এনডিএ-র কাছে বড় কাঁটা ছিল দু’টি। অনুপ চেটিয়াকে ফেরানো এবং পরেশ বরুয়াকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া। সেই ক্ষেত্রেও আজ অনেকটাই এগিয়ে গেল কেন্দ্র। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, প্রায় এক দশক ধরে ঝুলে থাকা অনুপ চেটিয়ার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে ‘অতি-সক্রিয়তা’ না দেখালে এই বছরও তাকে হাতে পাওয়া যেত না। পিছিয়ে যেত কেন্দ্র-আলফা শান্তি আলোচনা। পরের বছর সম্ভবত বিহুর পরেই অসমে নির্বাচন। অনুপকে পাওয়ায় এই বছরের মধ্যে শান্তি চুক্তি সেরে ফেলতে চাইছে কেন্দ্র।
আজ অনুপ চেটিয়ার প্রত্যর্পণের কথা ঘোষণা করার সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেণ রিজিজু বিশেষ জোর দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগ’-এর উপরে। তিনি বলেন, ‘‘কেন্দ্র আলফা সমস্যার সমাধানে খুবই আন্তরিক। তাই প্রধানমন্ত্রী নিজে চেটিয়াকে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।’’ আলফা শান্তি আলোচনায় সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিল অসমের ছ’টি জনগোষ্ঠী কোচ-রাজবংশী, চা শ্রমিক, তাই-অহোম, মরান, মটক ও চুতিয়াদের উপজাতি তালিভুক্ত হওয়ার উপরে। রিজিজু জানান, উপজাতি তালিকাভুক্ত করা সংক্রান্ত ফাইল এখন প্রধানমন্ত্রীর দফতরে রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়ার পর নভেম্বর মাসে লোকসভা অধিবেশনের আগেই বিষয়টি চূড়ান্ত করে ফেলা যাবে।
আলফার আলোচনাপন্থী নেতা মৃণাল হাজরিকা বলেন, ‘‘কেন্দ্র আমাদের আশ্বাস দিয়েছে নভেম্বরের শেষে পরের দফার শান্তি আলোচনাতেই চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত করে ফেলা হবে। আমাদের প্রধান দাবিগুলি মোটামুটি মেনে নিয়েছে কেন্দ্র। আশা করি এই বছরই চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যাবে।’’
ঘটনার পিছনের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে সতর্ক হয়ে মুখ খুলছেন আলফা নেতারা। আত্মসমর্পণ করা এক আলফা নেতার মতে, সশস্ত্র সংগ্রামে থাকার সময়ও শাসক বা বিরোধী দল আমাদের সাহায্যের উপরে নির্ভর করেছে। আলফা সমস্যার সমাধান হলে বা শান্তি চুক্তি হলে তার একটা ইতিবাচক প্রভাব তো থাকবেই। মানুষের মনে এখনও আলফার প্রতি একটা সহানুভূতি রয়েছে। ভোটের আগে সেই সহানুভূতিটাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে। তবে তাঁর কথায়, ‘‘আলফা কোনও রাজনৈতিক দলকে সুবিধা পাইয়ে দিতে তিন দশকের লড়াই চালায়নি। এত হাজার প্রাণের বিনিময়ে যে বোঝাপড়া হয়েছে, তাকে রাজনৈতিক নেতাদের ফায়দা লোটার অস্ত্রে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।’’
অসমের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ অবশ্য চেটিয়াকে অসমে স্বাগত জানিয়ে দাবি করেন, যে প্রত্যপর্ণ চুক্তির মাধ্যমে চেটিয়ার ভারতে ফেরা— সেই চুক্তির কাজ ইউপিএ আমলেই হয়েছে। তিনি নিজে এই প্রত্যর্পণের বিষয়টি নিয়ে বার বার কেন্দ্রকে চাপ দিয়েছিলেন।
কিন্তু পরেশ বরুয়াকে বাদ দিয়ে আলফার সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে সত্যিই কী লাভ? পুলিশের মতে, চেটিয়াকে ফিরিয়ে এবং শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করিয়েও পুরোপুরি শান্তি আনা সম্ভব হবে না। কারণ, আলফার মূল সামরিক শক্তিই পরেশ বরুয়ার হাতে। তিনি লড়াই চালাতে অনড়। ঘটনাক্রমে পরেশ ও অনুপ জেরাই গাঁওয়ে প্রতিবেশী।
মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য দাবি করছেন, অনুপ চেটিয়া শান্তি আলোচনায় যোগ দিলে পরেশ আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বেন। তিনি বলেন, ‘‘অসমের মানুষ শান্তি চান। তাঁরা নাশকতায় ক্লান্ত। আমি কেন্দ্রকে অনুরোধ জানাচ্ছি চেটিয়াকে দ্রুত অসমে পাঠানো হোক।’’
সুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

জাতীয় সমঝোতায় বসতে সু চির প্রস্তাব

দল ভূমিধস বিজয় অর্জনের পথে। এ অবস্থায় ‘জাতীয় সমঝোতার’ জন্য আলোচনায় বসতে সেনাপ্রধানসহ ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের প্রতি লিখিত আহ্বান জানিয়েছেন মিয়ানমারের বিরোধী নেত্রী অং সান সু চি। সেনাসমর্থিত বর্তমান সরকার বলছে, পূর্ণাঙ্গ ফল এলেই বৈঠকে বসবেন তারা। তবে, গতকাল সরকারের তরফ থেকে অং সান সু চি ও তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি, এনএলডিকে নির্বাচনে সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানানো হয়েছে। এ খবর দিয়েছে মিয়ানমার টাইমস ও বিবিসি। মঙ্গলবার সকালে
প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হলেইং ও সংসদের বিদায়ী স্পিকার শ মানের কাছে পৃথক চিঠি পাঠান সু চি। এতে তিনি জনগণের আকাঙ্ক্ষার শান্তিপূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহে বৈঠকে বসার আহ্বান জানান। শ মান ফেসবুকে ঘোষণা দেন যে, তিনি সামনের সপ্তাহে বৈঠকের আয়োজন করবেন। এর কিছুক্ষণ পরই প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ইউ তুত বলেন, নির্বাচন কমিশন সকল আসনের ফল ঘোষণা করলেই সমঝোতা বৈঠকের আয়োজন করবে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেনাপ্রধান মিনের কাছ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া আসেনি। এদিকে, নির্বাচনের ফল প্রকাশ ইচ্ছা করে বিলম্ব করা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র। এখন পর্যন্ত ৪০ শতাংশ আসনের ফল প্রকাশ করা হয়েছে। আর এর ৯০ শতাংশই জিতেছে এনএলডি। রোববার নির্বাচনের পর ৪ দিন পরও মাত্র ৪০ শতাংশ আসনের ফল আসায় সু চি’র সমর্থকরা অধৈর্য হয়ে পড়ছে। একইভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর কতটা শান্তিপূর্ণ হবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে সরকার শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নির্বাচনের সাফল্যে এনএলডিকে অভিনন্দন জানিয়ে ইয়ে তুত বলেন, দেশের নাগরিকদের সম্মানে সরকার নির্ধারিত সময়ে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করবে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় হয়েছে বুঝতে পেরেও অং সান সু চি সতর্কভাবে এগুচ্ছেন। তিনি মেপে কথা বলছেন। কারণ ১৯৯০ সালে সর্বশেষ নির্বাচন নিয়ে সু চি’র চরম তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল। সেবারও এনএলডি জিতেছিল, কিন্তু সেনাসমর্থিত সরকার ওই নির্বাচন বাতিল করে সু চি’কে গৃহবন্দি করে। এদিকে, রোববারের নির্বাচনে সু চি তার নিজ আসনে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি ইয়াঙ্গুনের কাওমু সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচন করেন। গতকাল আসনটির ফল ঘোষণা করা হয়। মিয়ানমার টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সু চি জাতীয় সমঝোতার লক্ষ্যে সরকারের প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছেন তা দ্রুত সময়ের মধ্যে দেখতে চান মিয়ানমারের অপর রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আরাকান ন্যাশনাল পার্টির একজন পৃষ্ঠপোষক আয় থার অং ইরাবতীকে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, পরবর্তী পার্লামেন্টে এনএলডির আধিপত্য থাকার বিষয়টি ইতিমধ্যে নিশ্চিত। আর চার দলীয় বৈঠক যত দ্রুত সম্ভব হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, আমরা একতা চাই। প্রত্যেক পক্ষের একটি কার্যকর আলোচনায় বসা প্রয়োজন। আমি চাই অং সান সু চি সকল জাতিগত দলকে নিয়ে বৈঠকে বসবেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান থু ওয়াই মনে করেন, আলোচনা থেকে ইতিবাচক ফল বের হয়ে আসবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়ান মিয়ো থেইন বলেন, রোববারের নির্বাচনে এনএলডি যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছে তা স্পষ্ট। তার দৃষ্টিতে জাতীয় ঐকমত্যের জন্য সু চি সেনাপ্রধানসহ রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছেন তা একটি সঠিক সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের বাইরেও মানুষের জন্য তাদের একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হওয়া উচিত। অং সাং সু চি’র চিঠি অনুযায়ী, ওই বৈঠকে জাতীয় সমঝোতার ভিত্তিতে সরকার গঠনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। একারণে আমি যত দ্রুত সম্ভব এ বৈঠক দেখতে চাই।’ মিয়ানমারের মিডিয়া সহ বিদেশী সব মিডিয়া বলছে, এনএলডি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। ফলে সু চি’র নেতৃত্বাধীন এনএলডি যে নতুন সরকার করছেন তা একরকম নিশ্চিত করেই বলা যায়। সংবিধান অনুযায়ী তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। তবে সু চি নিজেই পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, ‘এর ফলে আমাকে সব সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে থামানো যাবে না’। তিনি বলেছেন, তিনি থাকবেন প্রেসিডেন্টের ওপরে। সব সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন। এদিকে, মিয়ানমারের নির্বাচনকে সফল বলে আখ্যায়িত করেছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। কার্টার সেন্টারের পর্যবেক্ষক জেসন কার্টার বলেছেন, সার্বিক সাংবিধানিক কাঠামোতে গুরুতর কিছু ত্রুটি রয়েছে। মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক ক্ষমতার হাতবদল একেবারে পরিপূর্ণ নয়। তা চলমান। তবে ৮ই নভেম্বর আমরা যা দেখেছি তা অস্বীকার করা যাবে না। প্রতিশ্রুতি রাখা হয়েছে। দ্য কার্টার সেন্টার, দ্য এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী মিশন আলাদা আলাদা বিবৃতি দিয়েছে। তারা নির্বাচনকে ইতিবাচক বলে আখ্যায়িত করেছেন।

দ্রুত বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট, সু চিই প্রেসিডেন্ট হবেন? by সোহরাব হাসান

নির্বাচনের ফল প্রকাশ শেষ না হতেই মিয়ানমারের রাজনৈতিক দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ফলাফল নিয়ে যে সংশয় ও অনিশ্চয়তা ছিল, বুধবার অধিকাংশ আসনের ফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে তা কেটে গেছে। এখন কেউ মনে করেন না যে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নির্বাচনের ফল উল্টে দেওয়া কিংবা স্থগিত রাখা সম্ভব। এমনকি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে অং সান সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন অনেকে। সু চিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন সেনাসমর্থিত প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন। প্রভাবশালী সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংও সু চির দল এনএলডির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার বিষয়টি এদিন স্বীকার করে নেন। এটাই ছিল ভোটের পর থেকে সেনাপ্রধানের প্রথম আনুষ্ঠানিক মন্তব্য। এর আগে ‘জাতীয় সমঝোতা’র জন্য সংলাপে বসতে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন, সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং ও স্পিকার শোয়ে মানকে চিঠি দেন সু চি। প্রেসিডেন্ট এবং সেনাপ্রধান তাতে সাড়াও দিয়েছেন। যদিও আলোচনার দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। গতকাল ইয়াঙ্গুনের কূটনীতিক ও পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন বার্তা সংস্থার খবরে এসব তথ্য জানা গেছে। মধ্যরাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের যে ২৯৯টি আসনের ফল ঘোষণা করা হয়, তার মধ্যে এনএলডি পেয়েছে ২৫৬টি। আর ক্ষমতাসীন ইউএসডিপি পেয়েছে মাত্র ২১টি। এনএলডির সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, তারা ৮০ শতাংশের বেশি আসন পাবে। এক দিন আগে এনএলডির নেত্রী সু চি বলেছিলেন, তাঁরা ৭০ শতাংশ আসনে জয়ী হবেন বলে আশা করছেন।
এক দিন আগেও প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের মুখপাত্র বলেছিলেন, নির্বাচনের পুরো ফল প্রকাশের পরই কেবল তিনি বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানাবেন। কিন্তু অং সান সু চির পক্ষ থেকে সমঝোতা বৈঠকের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর ক্ষমতাসীন মহল নড়েচড়ে বসে। গতকাল তথ্যমন্ত্রী উ রে থোয়া প্রেসিডেন্টের পক্ষে এক বিবৃতিতে সু চিকে অভিনন্দন জানান এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের আশ্বাস দেন।
মিয়ানমারের প্রভাবশালী সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংও এনএলডির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। গতকাল রাতে ফেসবুকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ আসনেই জয়ী হওয়ায় আমরা এনএলডিকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।’ আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো ফল ঘোষণা হওয়ার পর তিনি সু চির সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বলেও জানিয়েছেন।
ইয়াঙ্গুনে সু চির নিজের আসনের ফল গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে যায়। থেইন সেইন সরকারের সমর্থক বলে পরিচিত পত্রিকাগুলোর হঠাৎ এনএলডির প্রতি ঝুঁকে পড়ার ঘটনাও ইঙ্গিত দেয় যে সু চিই সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন।
স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, নির্বাচনের পরদিন থেকে ইয়াঙ্গুনসহ মিয়ানমারের সবখানে সবকিছু স্বাভাবিক। গত দুই দিন ফলাফল নিয়ে যে জল্পনা চলছিল, তা-ও অনেকটা কেটে গেছে। এখন বিদেশি কূটনীতিক, দাতা সংস্থা—সবাই মানসিকভাবে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যে এনএলডির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কেউ কেউ যোগাযোগ করেছেন বলে গত রাতে প্রথম আলোকে টেলিফোনে জানিয়েছেন একটি বেসরকারি সংস্থার প্রধান। পেশাগত কারণে তিনি গতকালই ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
এই কর্মকর্তা গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, এবারের নির্বাচনে যে ফল হয়েছে, তাতে ক্ষমতাসীন মহল হকচকিত। কেননা, গত চার বছর থেইন সেইন সরকার দেশে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক অধিকারবঞ্চিত মিয়ানমারবাসী এবারের নির্বাচনকে নিয়েছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ হিসেবে। ভোট দেওয়ার সময়ে তাঁরা উন্নয়নের বিষয়টি সেভাবে আমলে নেননি।
তবে পর্যবেক্ষকেরা এ-ও মনে করেন, নির্বাচনে এনএলডির বিপুল বিজয় তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। ক্ষমতাসীনদের পাশাপাশি আঞ্চলিক দলগুলো এত কম আসন পেয়েছে যে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। নতুন সরকার কীভাবে আঞ্চলিক দল ও জাতিগোষ্ঠীগুলোর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এখন যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা হলো, সু চি সামনে একজন ‘পুতুল প্রেসিডেন্ট’ রেখে নিজে দেশ চালাবেন, নাকি নিজেই প্রেসিডেন্ট হবেন? পর্যবেক্ষকদের মতে, সু চি ও সেনাবাহিনী একে অপরকে ছাড় দিতে পারেন। এমনও হতে পারে যে সংবিধান সংশোধন করে সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ উন্মুক্ত করতে সেনাবাহিনী সম্মতি দিতে পারে। বিনিময়ে সু চি সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক ক্ষমতা পুরোপুরি কাটছাঁট না-ও করতে পারেন।
তবে মিয়ানমারের একজন সাংবাদিক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সু চি যে এককভাবে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেবেন বলে মন্তব্য করেছেন, সেটি তাঁর শুভানুধ্যায়ী ও দলীয় নেতা-কর্মীরা সুনজরে দেখেননি। তাঁদের প্রশ্ন, তাহলে সামরিক সরকারের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য কী থাকল?

যাঁরা দল করেন না, তাঁদের চাকরি কে দেবে? by আলী ইমাম মজুমদার

বিষয়টি এখন বাংলাদেশের প্রশাসনে একটি মৌলিক প্রশ্ন হিসেবে আসছে। এ সংস্কৃতির সূচনা প্রায় দেড় দশক আগে থেকে। এর আগে কমবেশি কিছু থাকলেও এখন অনেকটা ব্যাপক ও খোলামেলা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে পেয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। দেশে রাজনৈতিক দল আছে, থাকবেও। এগুলোর নেতা, কর্মী, সমর্থকও আছেন অনেকে। তবে সব নাগরিকই কিন্তু সরাসরি দলগুলোর কর্মী বা সমর্থক নন। হওয়ার বাধ্যবাধকতা কিংবা প্রয়োজনীয়তাও নেই। তাঁরা দলনিরপেক্ষ। নির্বাচন এলে দলগুলোর পূর্বাপর ভূমিকা, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে প্রার্থীর গুণাগুণ বিবেচনায় ভোট দেন। প্রভাব থাকে আঞ্চলিকতা, সম্প্রদায় ও গোত্রের। বলা অসংগত নয় যে কোনো কোনো স্থানের নির্বাচনে ফলাফলে দলের ভূমিকা গৌণই হয়ে যায়। এভাবে প্রকৃতপক্ষে বেশ কিছু স্থানে দল বা ব্যক্তির নির্বাচনের ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিরাই।
তবে তাঁরা কোনো দলের সদস্য বা স্থায়ীভাবে সমর্থকও নন। তাঁরা কিন্তু এখন মহা মসিবতে আছেন। সরকার প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধায় তাঁরা পেছনের কাতারে। চাকরির বাজারে তাঁদের প্রবেশাধিকার সীমিত। বেসামরিক চাকরিতে পিএসসির মাধ্যমে পরীক্ষায় মেধার কিছুটা ভূমিকা থাকে। তবে তা–ও সময়ান্তরে প্রান্তিক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। আর অন্যান্য চাকরিতে দলের নাম করে নেতা-কর্মীদের সনদ ছাড়া প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। সেই সনদ অবশ্য ভিন্ন দলের লোকেরাও ক্ষেত্রবিশেষে জোগাড় করেন নানা কৌশলে। কোথাও কোথাও টাকাপয়সার লেনদেন বড় রকম ভূমিকা রাখে বলে পত্রপত্রিকায় অভিযোগ আসে। আর এর সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাও আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তিরা হয়ে পড়ছেন অচ্ছুত। তাঁদেরও আজ দুঃসময় চলছে।
সম্প্রতি ঢাকার একটি দৈনিকে খবর এসেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী নিয়োগ প্রসঙ্গে। রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি দাবি করেছেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি আওয়ামী লীগ করেন বলেই এ পদ লাভ করেছেন। তাঁর এ বক্তব্য যথার্থ বলেই ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়। শুধু রাজশাহীতে নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়েছে এবং হচ্ছে। আর এ নিয়মটাই এখন অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দফাতেই ৫৪৪ জন দলীয় সদস্যকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর এ বক্তব্যও তথ্যভিত্তিক। পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করেছেন, বর্তমানে পাঁচ শতাধিক শূন্য পদের মধ্যে ‘স্বাধীনতার পক্ষের দেড়-দুই-আড়াই শ ছেলেকে কি চাকরি দেওয়া যায় না?’
এখন যাঁরা বিরোধী দলে আছেন, তাঁরাও হয়তো রাজনৈতিক পালাবদলের আশায় অপেক্ষা করছেন। ‘সুদিন’ এলে সুদাসলে পুষিয়ে দেবেন!
যিনি এ বক্তব্যটি দিয়েছেন, তিনি শুধু ক্ষমতাসীন দলের মহানগর কমিটির সভাপতি নন, পাঁচ বছর এ মহানগরীর নির্বাচিত মেয়রও ছিলেন। তিনি জেলহত্যার শিকার স্বাধীনতাসংগ্রামের অগ্রনায়ক চার নেতার একজনের সন্তান। এসব বিবেচনায় অতি সম্মানিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক তিনি। সুতরাং তাঁর বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
প্রথমেই দেখা দরকার, তিনি স্বাধীনতার পক্ষের লোক বলতে কাদের বোঝাতে চাইছেন। এ বিষয়ে খুব গভীরে না গেলেও বলা চলে, সম্ভবত তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের কথাই বলতে চেয়েছেন। অনস্বীকার্য, তাঁর দল স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে রাখতেও তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। এর বাইরে যেসব দলীয় বা নির্দলীয় লোক আছেন, তাঁদের পাইকারিভাবে নিশ্চয়ই স্বাধীনতাবিরোধী বলা যাবে না। দেশপ্রেমিক যে-কেউ হতে পারেন। এমনকি নেতারা যাঁদের চেনেন না বা জানেন না, তাঁরাও। দেশের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্বের বিপরীতে কারও অবস্থান থাকলে তাঁর স্থান তো আইনানুগভাবে প্রমাণ সাপেক্ষে হওয়ার কথা কারাগার। এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে কেউ এ ধরনের বিভাজনের কর্তৃত্ব নিতে পারেন না। আজ স্বাধীনতার পক্ষের নাম দিয়ে যাঁদের চাকরি দেওয়ার কথা উঠেছে, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই ক্ষমতাসীন দলের কোনো অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী বা তাঁদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তি। অবশ্য তিনি পুরো শূন্য পদের বিপরীতে তাঁর তালিকা দেননি। তবে নিয়োগপর্ব শুরু হলে তাঁর দলের এমনকি অঙ্গসংগঠনের অন্য নেতারাও বসে থাকবেন না। সক্রিয় হবেন জোটের অন্য দলের কোনো কোনো নেতাও।
এমনটাই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর সংখ্যা শূন্য পদকেও ছাড়িয়ে যায় প্রায় কিছু ক্ষেত্রে। তখন কর্তৃপক্ষ কী করবে? আর এভাবে শুধু তালিকা ধরেই যদি চাকরি দিয়ে দিতে হয়, তাহলে নিয়োগের এত ধরনের বিধিবিধান কেন? হতে পারে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকতে তখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন দলীয় বিবেচনায় এ ধরনের নিয়োগ দিয়েছে। আর এরই কারণে তো তারা ২০০৮–এর নির্বাচনে চরম খেসারতও দিয়েছে। এখনো দিয়ে চলছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের থাকা উচিত। নিয়মনীতির বাইরে গিয়ে এ ধরনের নিয়োগ দেওয়া সমীচীন মনে করবে না দেশের সচেতন মহল। আর আগের সরকারের সময়েও তা করেনি। এ ধরনের নিয়োগ গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে বারংবার। সেই ধারাবাহিকতা ভাঙা আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকারই ২০০৮ সালে মহাজোটের মহাবিজয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।
অবশ্য দুর্ভাগ্য, অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষেত্রেই। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের শূন্য পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হলে রাজনৈতিক নেতারা তালিকা ধরিয়ে দেন। এর বিপরীতে অবস্থান নিলে পরীক্ষাকেন্দ্র ভাঙচুর, দায়িত্বরত কর্মকর্তারা নাজেহাল আর জেলা প্রশাসককে হয়রানিমূলক বদলির শিকার হতে হয়। ঠিক তেমনই অবস্থা পুলিশ কনস্টেবল ও এসআই নিয়োগের ক্ষেত্রে। নিয়োগের পর্ব শুরু হলে কোনো কোনো এসপি ছুটি নিয়ে রেহাই পেতে চান বিড়ম্বনা থেকে। একই ‘তালিকা আখ্যান’। আর এ তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য বড় অঙ্কের লেনদেনের কাহিনিও গণমাধ্যমে বারংবার আসে। এই ধারাবাহিকতা চলছে বেসামরিক প্রশাসনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রসারের উদ্দেশ্যে বিধি সংশোধন করে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তো বটেই, বেসরকারি স্কুল-কলেজেও নিয়োগের ক্ষেত্রে চলছে একই সংস্কৃতি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করে নিবন্ধের সূচনা। তবে অন্য বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়েও এমনটা ঘটে চলেছে। এ ধরনের চাপ দিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় শাসক দলের ছাত্রসংগঠন।
তাহলে যাঁরা এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট হতে পারছেন না, তাঁরা যাবেন কোথায়? এর জবাব অন্য কেউ দেবে না। খুঁজতে হবে আমাদের নিজেদেরই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকবে। মনে হয়, তারা সবাই ধরে নিচ্ছে ক্ষমতায় গেলে শুধু তাদের কর্মী-সমর্থকদের চাকরি হবে। এখন যাঁরা বিরোধী দলে আছেন, তাঁরাও হয়তো রাজনৈতিক পালাবদলের আশায় অপেক্ষা করছেন। ‘সুদিন’ এলে সুদাসলে পুষিয়ে দেবেন! আর আরও বুদ্ধিমানেরা এর জন্য অপেক্ষা করেন না। তাঁরা রং বদলান দ্রুত। এমনকি দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মী-সমর্থকদেরও পেছনে ফেলে বা বাদ দিয়ে তাঁদের স্থান হয় নেতাদের তালিকায়। এমন অভিযোগ কিন্তু একেবারে কম নয়।
স্বাধীনতার চেতনা ধারণের কথা বলা হয় অনেক ক্ষেত্রে। এমন বলাটা অসংগত নয়। সেই চেতনারই তো ফল আমাদের সংবিধান। সংবিধানের প্রস্তাবনাতেই এর প্রণেতারা ঘোষণা করেছেন রাষ্ট্রের সব নাগরিকের জন্য সামাজিক সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত করার। প্রস্তাবনার ধারাবাহিকতায় এর মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত অধ্যায়ে প্রজাতন্ত্রের পদে নিয়োগলাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের প্রণেতারা দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এ প্রজাতন্ত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় থেকেই এসব বিধান সংযোজন করেছেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটে চলেছে এর বিপরীত চিত্র। আর যাঁরা এমনটা করছেন, তাঁরা আঘাত করছেন সংবিধানের প্রত্যয়ে। বস্তুতপক্ষে, এ ধরনের আঘাত স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিকও বটে। আর যে দল ক্ষমতায় আসে, তারা সবাই এরূপ করলেই এটা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। ভবিষ্যতেও হবে না। চাকরির অধিকার তো থাকা উচিত দল–মতনির্বিশেষে সব যোগ্য ব্যক্তির।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

মিয়ানমারের নির্বাচন: সামরিক বাহিনী ক্ষমতা ছাড়বে কি? by ডেলফিন স্ক্র্যাঙ্ক

উল্লাস করছে সু চির সমর্থকেরা
মিয়ানমারের ইতিহাসে সবচেয়ে উন্মুক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সরকারি ফলাফলের অংশ মাত্র প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য খবর হচ্ছে, অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিপুল বিজয় অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর সেনা-সমর্থিত ক্ষমতাসীন দলের ব্যাপক ভরাডুবি হতে যাচ্ছে।
এনএলডির সমর্থকেরা বলছেন, নির্বাচনে তাঁদের দলের জয়ের মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার, সে দেশের মানুষের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। জনগণ আড়াই দশকের সেনা শাসনের অবসান চেয়েছিল।
কিন্তু আসল পরীক্ষা এখনো আসেনি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে সামরিক কর্তৃপক্ষ জনগণের আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করবে কি না, যে জনগণের মধ্যে আছে কৃষক, কবি ও র‌্যাপ গায়ক। আর নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের যে শম্বুকগতি দেখা যাচ্ছে, তাতে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে যে সেনাবাহিনী এই পরাজয় মেনে নিতে অনাগ্রহী। নিয়ম হচ্ছে নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকারিভাবে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। এনএলডির ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে, যত আসনে ভোট হয়েছে, তারা সেটার ৮০ শতাংশ জিতবে।
ফল প্রকাশে দেরির কারণ জানতে চাইলে দেশটির ইউনিয়ন ইলেকশন কমিশন কর্মকর্তা মিন্ট নাইং বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে তথ্য সংগ্রহে জটিলতা থাকায় ফল প্রকাশে দেরি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। প্রতিটি নির্বাচনী কেন্দ্রে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, তথ্য ও নথির জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কত দিন লাগবে, সেটা বলা মুশকিল।’
অতীত যদি শুরু হয়, তাহলে আগামী কয়েকটা দিন খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। ১৯৯০ সালে এনএলডি এমনই এক উন্মুক্ত নির্বাচনে একইভাবে বিপুল বিজয় লাভ করেছিল। দুই মাস পর সামরিক বাহিনী বলে বসল, ওই নির্বাচনটা আসলে সংসদীয় আসন বণ্টনের জন্য অনুষ্ঠিত হয়নি, সংবিধান সভা গঠনের জন্য হয়েছিল। এরপর সেই জান্তাই ক্ষমতায় থেকে যায়, আর এনএলডির নেতারা সেই ঘোষণার প্রতিবাদ করায় তাঁদের জেলে পোরা হয়।
১৯৯০ সালের পর পরিস্থিতির প্রভূত পরিবর্তন হয়েছে। সেবারের নির্বাচন স্বৈরশাসক নে উইনের বিরুদ্ধে দুই বছরের জনবিক্ষোভের পরিণতি হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যিনি কিনা নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে আরেক জান্তার হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে বিদায় নেন। কিন্তু এই নির্বাচনের চার বছর আগে জান্তা ক্ষমতা ছেড়ে ২০০৮ সালের সংবিধানের আলোকে গঠিত আধা বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, যে সংবিধান সংসদের এক-চতুর্থাংশ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রেখেছে। আবার সেই সংবিধানের ধারা বলে সু চি দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না।
মিয়ানমার জার্নালিজম ইনস্টিটিউটের বর্ষীয়ান সাংবাদিক থিহা স বলেছেন, ‘আমাদের সবার নজর এখন এই ক্রান্তিকালের দিকে।’ তিনি আরও বলেন, ১৯৯০ সালের সহিংস পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে, তেমন আশঙ্কা আপেক্ষিকভাবে কম। সরকার তো আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ডেকে এনেছিল, আর তারা এটা দেখাতে খুব সচেতন ছিল যে নির্বাচন সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে। এনএলডির মিছিল ও সমাবেশ এবং অং সান সু চির জনপ্রিয়তা দেখেই বোঝা গিয়েছিল, তাঁদের জয় অবশ্যম্ভাবী। ফলে প্রকৃত প্রশ্নটা ছিল, তাঁরা কত ব্যবধানে জিতবেন।
এনএলডির ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে যত আসনে ভোট হয়েছে, তারা সেটার ৮০ শতাংশ জিতবে ওদিকে বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেহেতু সংসদের ২৫ শতাংশ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রয়েছে, সেহেতু সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে তারা বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে। ফলে মিয়ানমারে পুরোপুরি বেসামরিক শাসন চালু হতে আরও বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে। আবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা থাকবে, ফলে তারা মরণকামড় দিতে পারে। আর এনএলডি ও বিরোধীরা যদি সেনাবাহিনীর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, তাহলে বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের হারানোর অনেক কিছুই আছে।
মিয়ানমারে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের ফল ঘোষণা করতে গিয়ে প্রতি ঘণ্টায় নানা টালবাহানা করেছে, তবে এর মধ্যে তারা উচ্চ ও নিম্নকক্ষের ৪৯৮টি আসনের অর্ধেকের ফলাফল ঘোষণা করেছে। আর এনএলডি বিপুলসংখ্যক আসনে জিতেছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এনএলডির প্রচারণা কর্মকর্তা ইউ উইন হেতেইন বলেছেন, তাঁরা দলগতভাবে কেন্দ্র থেকে যে তথ্য সংগ্রহ করেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, এনএলডি ৮২ শতাংশ আসনে এগিয়ে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, ইউএসডিপির সব রথী-মহারথীর পতন হয়েছে, তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে নিজ নিজ আসনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন।
এই হেতেইন একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা, তিনি ১৯৮৮ সালে এনএলডিতে যোগ দেন। তিনি আরও হাজার হাজার এনএলডি নেতার সঙ্গে ১০ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। তিনি বলেন, এটা আসলে হলিউডের সিনেমার চেয়েও ভালো।
রোববার রাতে এনএলডির সদর দপ্তরের সামনে শত শত কর্মী লাল কাপড় পরে জড়ো হয়েছিলেন, তাঁরা সেখানে স্থাপিত বিশাল এলইডি পর্দায় ভোট গণনার দৃশ্য দেখেছেন। তাঁরা নেচেগেয়ে রক ও র্যাপ গানের ছন্দের তালে ক্যামেরা নাড়িয়েছেন। জনপ্রিয় শিল্পীদের গান ভোট গণনার একঘেয়ে অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য এনেছে। প্রতিবার এনএলডির প্রার্থীর নাম বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, আর কর্মী-সমর্থকদের হর্ষধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠেছে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর থেকে নেওয়া
ডেলফিন স্ক্র্যাঙ্ক: মার্কিন সাংবাদিক।

জয়ে অগণন তারার আলো by পবিত্র কুন্ডু

অমাবস্যার রাতে আকাশে তারা ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ যখন প্রতিপক্ষকে আরেকটি ধবলধোলাইয়ের হাতছোঁয়া দূরত্বে এসে দাঁড়িয়েছে, গ্যালারিতে জ্বলে উঠল অগণন তারা। সেটি আবার কী? মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এটিই যে বাংলাদেশের কালকের জয়ের সবচেয়ে রহস্যময় এবং রোমাঞ্চকর গল্প।
মুস্তাফিজুর রহমান তৃতীয় স্পেলে বোলিং করতে এসে ফিরিয়ে দিলেন সিকান্দার রাজা ও জঙ্গুয়েকে। হ্যাটট্রিকটা ঠেকিয়ে দিলেন ক্রেমার। তবে মুস্তাফিজ ৫ উইকেট ঠিকই পেলেন। পরের ওভারে পানিয়াঙ্গারা তাঁর পঞ্চম শিকার। আর তারপরই অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ঠিক করলেন, তাঁর এই পেসরত্নকে অন্য রকম একটু সম্মান জানাবেন। স্লিপ বেষ্টনীতে দাঁড় করালেন আট ফিল্ডারকে, স্লিপে পাঁচজন, গালিতে তিন। এই অভাবিত দৃশ্যকে কে না চাইবে সেলফোনে বন্দী করে রাখতে!
হাজার মুঠোফোনের আলো জ্বলে উঠল গ্যালারিতে। তাদের মুঠোফোনগুলো আলোকিতই হয়ে রইল। মুস্তাফিজকে ‘বঞ্চিত’ করে জিম্বাবুয়ে ২১৫ রানে শেষ হলো সানির বাঁহাতি স্পিনে। তবু আলো ছড়িয়েই গেল কিছু মুঠোফোন। এই জয়োৎসবের মুহূর্তটি যে বাংলাদেশের ক্রিকেটে আলোরও উৎসব। প্রতিপক্ষকে ১১তম বারের মতো ধবলধোলাই করল বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়েকে তৃতীয়বারের মতো। জিম্বাবুয়ের মতো হতদরিদ্র হয়ে পড়া এক ক্রিকেটশক্তিকে ধবলধোলাই করে মনের মধ্যে উপচে পড়া আনন্দের জলকল্লোল হয়তো অনুভব করা যায় না, তবু তো বাংলাদেশ জয়ের রথে ভেসে চলা এক ক্রিকেট অভিযাত্রী!
সেই অভিযাত্রায় আবারও নেতৃত্বে মাশরাফি। প্রতিটি ম্যাচেই সামনে থেকে অনুপ্রেরণাদায়ী নেতৃত্ব। কাল তাই বাংলাদেশ দলটা যেমন জনতার মুঠোফোনের আলোয় ধরা থাকল, তেমনি মাশরাফির নামটাও বাঁধাই হয়ে গেল সোনার হরফে। সেই সোনা খাঁটি ২৪ ক্যারেটের। মাশরাফি ওয়ানডেতে যেন দিগ্বিজয়ী বীর। অস্ট্রেলিয়া আসেনি বলে জিম্বাবুয়েকে ডেকে আনা হয়েছে এই সিরিজে। মাশরাফির দলের মধ্যে সবাই হয়তো চাইছিলেন অস্ট্রেলীয় মানসিকতার জাগরণ। সেটি হয়তো পুরোপুরি হয়নি, তবে কালকের শেষ মুহূর্তটিই জাগিয়ে তুলল ওই ভাবনাটিকে। প্রতিপক্ষকে কোনো সুযোগ দিয়ো না, একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দাও।
যদিও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জিততে ইদানীং সেই মানসিকতার খুব একটা প্রয়োজনই পড়ছে না। সেলুকাস, এ এক বিচিত্র দল। আপনি হয়তো আগেই জেনে বসে থাকেন, এরা বাংলাদেশের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যকে তাড়া করতে গিয়ে মোটামুটি ছুটবে। হাতে যখন ৬টি উইকেট থাকবে, মনে হবে এরা জিতে যেতে পারে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে লেজেগোবরে করে ফেলবে। এ ম্যাচেও তাই হলো, শেষ ৯০ বলে ৯৫ রান করতে হবে, হাতে ৬ উইকেট, সেখান থেকেই ভেঙে পড়ল তারা। এখানে ওয়ালারকে আউট করে ধাক্কাটা দিলেন আল আমিন। তার আগে শন উইলিয়ামসের সঙ্গে ৮০ রানের জুটি গড়ার পর বিদায় নিয়েছেন বিপদ ছড়াতে থাকা চিগুম্বুরা। শেষ পর্যন্ত মুস্তাফিজের তোপে ধ্বংস হয়ে গেছে জিম্বাবুয়ে। ৮ রানে পড়েছে শেষ ৪ উইকেট।
বিজয়ের মুহূর্তে দলকে সম্মানের একুশ তোপধ্বনিতেই বরণ করে নেওয়া উচিত। ক্রিকেট-জনতা তা নিয়েছেও। তারপরও বড় রান না করতে পারায় মাশরাফির দলেরই অতৃপ্তি থেকে যাবে।
নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসের ১৪তম শত রানের ওপেনিং জুটি। ২৯.৩ ওভারে তামিম ও ইমরুল করে ফেললেন ১৪৭। এমন আলোকিত মঞ্চে কত বড় হতে পারত বাংলাদেশের ইনিংস? আপনার কল্পনাশক্তিকে লাগাম পরানো হলেও বলত, তিন শ রানের কম কিছুতেই নয়। শেষ পর্যন্ত হলো ২৭৬। কেউ কাউকে ছাপিয়ে যাবেন না পণ করে দুই ওপেনারেরই ৭৩। নিজেকে ফিরে পেয়ে মাহমুদউল্লাহ আগ্রাসন ও কবজিসৃজিত শিল্প থেকে করলেন ৫২। রানআউট হওয়ার আগে মাশরাফির সঙ্গে সপ্তম উইকেট জুটিতে তাঁর ৩৭ রানই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি। সম্ভাবনা জাগিয়েও কেন বড় হলো না স্কোর, সেটি তো বুঝতেই পারছেন।
এর আগে এই মাহমুদউল্লাহর বিপক্ষেই একটি রানআউট সিদ্ধান্ত নিয়ে স্টেডিয়াম দেখেছে মস্ত একটি নাটক। সিকান্দার রাজার থ্রো স্টাম্পে লাগার আগেই বেল ফেলে দিয়েছেন উইকেটকিপার চাকাভা। আম্পায়ার আলিম দার অবশ্য আঙুল তুলে দিয়েছেন। রানআউট ভেবে হাঁটাও শুরু করে দেন মাহমুদউল্লাহ। কিন্তু সীমানাদড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন ড্রেসিংরুমে থাকা সতীর্থদের হাত ইশারায়। দাঁড়িয়ে থাকেন তো দাঁড়িয়েই থাকেন। টিভি আম্পায়ার এনামুল হক রিপ্লে দেখছেন তো দেখছেনই। মিনিট দশেক পর নটআউট ঘোষণা করা হয় মাহমুদউল্লাহকে।
ততক্ষণে অধৈর্য জিম্বাবুয়ে দল চরম অসন্তুষ্ট, সিদ্ধান্তে অসম্মত। তাদের খেলায় ফেরাতে দুই আম্পায়ার তো বটেই, বাংলাদেশের অধিনায়ককেও এগিয়ে আসতে হয়। এরপর মাহমুদউল্লাহ করেছেন আরও ২০ রান, ফিরেছেন রানআউট হয়েই।
তবে বাংলাদেশের ইনিংসে এর চেয়েও কি আলোচিত তিনটি স্টাম্পিং? ইমরুল, তামিম, মুশফিক—দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান যেমন করেছেন প্রথম তিন ব্যাটসম্যান, তিনজনই হয়েছেন স্টাম্পড। এমন ঘটনার দৃষ্টান্ত খুঁজে বের করতে ক্রিকেট ইতিহাসটাই ঢুঁড়ে ফেলতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাবে না।
এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তখন ইতিহাস ঢুঁড়ে খারাপ কিছু খুঁজে নিতে চাইছে না মানুষ। তারা জয়ধ্বনি করছে ম্যান অব দ্য ম্যাচ তামিমের নামে, ম্যান অব দ্য সিরিজ মুশফিকের নামে। মাশরাফির দল তাদের অন্তরে! জয় এক আশ্চর্য সম্মোহন। সবকিছুকেই সে ভুলিয়ে দেয়।
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৭৬/৯
জিম্বাবুয়ে: ৪৩.৩ ওভারে ২১৫
ফল: বাংলাদেশ ৬১ রানে জয়ী
ছবিতে বাঘ কয়টি? ‘একটি’ কিন্তু ভুল উত্তর! সিরিজ জয়ের পর আরও একটি ট্রফি নিয়ে বাংলাদেশ দল। এ সময়ের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য গতকাল আরও একবার ধরা পড়ল ক্যামেরায় l ছবি: শামসুল হক

বিহারি গণতন্ত্রের আসল ছবি by মিজানুর রহমান খান

কোনো সন্দেহ নেই, বিহারের নির্বাচন শাসক বিজেপির অহংকার ও ঔদ্ধত্য উভয়কে চূর্ণ করেছে। নরেন্দ্র মোদি-অমিতের লাখো কোটি টাকার উন্নয়ন উৎকোচকে বিহারের মানুষ না বলেছে। প্রমাণিত হয়েছে গরু দুধ দেয় ভোট দেয় না। দাদরি কাণ্ড, শাহরুখ খান, মুসলিম জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, গোমাংস ভক্ষণ করলে হয় পাকিস্তানে নির্বাসন অথবা মুণ্ডুচ্ছেদ থেকে শুরু করে ‘বিজেপি হারলে পাকিস্তানে বাজি ফাটবে’ মর্মে দলের নেতা, মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদেরাও যে ক্রমাগত বিভাজন ও ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়েছিলেন, তার একটা উচিত শিক্ষা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হতেই পারে।
তবে ভারতীয়সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যতটা উৎসাহ-উদ্দীপনায় বিহারের নির্বাচনে বিজেপির ‘ভরাডুবির’ চিত্র তুলে ধরেছে এবং এর ফলাফলকে অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িকতা, বিশেষ করে গরুর রাজনীতির বিরুদ্ধে আমজনতার গণরায় হিসেবে দেখানোর প্রবণতাকে ফুটিয়ে তুলেছে, তা-ই পুরোটা নয়, বরং খণ্ডিত। মিডিয়া প্রধানত যেকোনো সমাজের প্রগতিশীল অংশের ধ্যানধারণাকে সামনে আনার স্বাভাবিক প্রবণতা দেখিয়ে থাকে। হিন্দু মৌলবাদী দর্শন থেকে বিচ্যুত না থাকা বিজেপির ‘ভরাডুবির’ খবর প্রকাশের ধরন সেটাই মনে করিয়ে দিল।
প্রকৃতপক্ষে এই নির্বাচনে বিজেপি বিহারের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পেয়ে একক দল হিসেবে বিজেপিই সর্বাধিক ভোট পেয়েছে। যদিও ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় তাদের ভোট কমেছে। কিন্তু লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন ভিন্ন খেলার বিষয়। ভারতের ইতিহাসে গত লোকসভা নির্বাচনটি মোদি-জাদুর কল্যাণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রূপ নিয়েছিল। বোদ্ধারা যখন একমত যে মোদি-জাদুর ইন্দ্রজাল ছিন্ন হতে চলেছে, তখন দেখার বিষয় হলো বিহারে বিজেপি গত লোকসভা নির্বাচনের তুলনায়ও মাত্র ৫ শতাংশ ভোট খুইয়েছে। সুতরাং আমাদের দেশের সাধারণ নির্বাচনের পরে পরাজিত দলকে ‘জনগণ প্রত্যাখ্যান’ করেছে মর্মে যে আজগুবি ও গণতন্ত্রবিরোধী শিরোনাম করা হয়, সেটা বিজেপির ক্ষেত্রে খাটবে না। তবে ব্যক্তি মোদির শাসনগত অযোগ্যতা ও ব্যর্থতার বিরূপ প্রভাব যে বিহারে পড়েছে এবং অন্যান্য নির্বাচনে আরও পড়বে, সে বিষয়ে আর সন্দেহ কী।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে পাটিগণিতের হিসাবে আওয়ামী লীগ হেরে গিয়েছিল। বিএনপির চেয়ে বেশি ভোট পেলেও তারা সংসদে আসনসংখ্যা বিএনপির চেয়ে কম পেয়েছিল। তাই আওয়ামী লীগ সরকার গড়তে পারেনি, সরকার গড়েছে বিএনপি। পাটিগণিতের জোর তাই বলে কম নয়, নিশ্চয় এর তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেদিন সরকার গড়তে পারেনি বলে সমাজে তার শক্তিকে খাটো করে দেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। ঠিক তেমনিভাবে বিহারে বিজেপি সরকার গড়তে পারেনি বলে সেখানে তার শক্তিকে খাটো করে দেখা যাবে না। সুতরাং বিহারের নির্বাচনে আসন ও ভোটসংখ্যা উভয় দিক বিবেচনায় না নিলে বিহারি গণতন্ত্রের আসল ছবি চোখের আড়ালে থেকে যাবে।
বিজেপির সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের নীতি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হম্বিতম্বির প্রতিবাদ জানাতে ভারতজুড়ে প্রথিতযশা লেখক-সাহিত্যিকেরা পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল বেরোনোর কারণেও বিজেপির প্রতি নাগরিক সমাজের পুরোনো জনপ্রিয় নেতিবাচক মনোভাবটা আবার মিডিয়ায় জায়গা পেতে শুরু করেছে। মোদি-জাদুতে সম্মোহিত মিডিয়া প্রায় ভুলিয়ে দিতে বসেছিল যে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দলের অনেক বাঘা নেতার বিরুদ্ধে অতীতে কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী কথাটি স্বাভাবিক বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বিজেপি ধর্মনিরপেক্ষ ও পরমতসহিষ্ণু শক্তিতে পরিণত হয়েছিল বলে ভারতবাসী মোদিকে দুই হাত ভরে ভোট দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সরকারের কীর্তিকলাপ দেখে জনগণের ঘুম ভেঙেছে, আর তাই বিহারে তাঁরা প্রতিশোধ নিয়েছেন— বিষয়টি হয়তো এমন নয়। তবে এ রকম দৃষ্টিভঙ্গির ভিত একেবারেই যে নেই, তা নয়। আমাদের দেখতে হবে যে ১৯৪৭ থেকে এ পর্যন্ত বিহার কখনো বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী দেখেনি। ১৯৯০ সালের মার্চে সবশেষ কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রীর জমানা শেষ হওয়ার পরে এই রাজ্য আর কখনো কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রীর অধিষ্ঠান দেখেনি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গড়বে কি গড়বে না, সেটা কখনো আলোচনারই যোগ্য বিষয় ছিল না। তাদের প্রার্থীরা হরদম জামানত খোয়াতেন। সেই দিন ধীরে হলেও বিজেপির অনুকূলে বদলাচ্ছে। আজ বিহারে বিজেপির তথাকথিত ভরাডুবির খবর যেভাবে ফলাও করে বিশ্ব মিডিয়ায় জায়গা করে নিয়েছে, আসলে তাতে দলটির কেবলই দুর্বলতা নয়, বরং শক্তির উত্থানও দেখা যায়। সংক্ষেপে মানেটা দাঁড়াচ্ছে, বিজেপি এখন বিহারে সরকার গঠন করবে, সেটাই স্বাভাবিক ছিল, আর এখন হেরে গেছে বলেই বড় শিরোনাম হয়েছে। অথচ সত্য এটাই, বিহারে বিজেপি কখনো এককভাবে সরকার করতে পারেনি। বিহার এখনো বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পায়নি। কিন্তু জাতপাতের প্রাধান্যধর্মী বিহারি রাজনীতিতে বিজেপির জনপ্রিয়তা অব্যাহতভাবে ক্রমবর্ধমান।
বিজেপি নেতা অমিত শাহ বলেছিলেন, ক্ষমতাসীন জনতা দলের মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমারকে একটি ভোট দেওয়ার অর্থ হবে পাকিস্তানকে খুশি করা। নিতীশের বিজয় পাকিস্তানিরা উদ্যাপন করবে। এটা কেবলই বিদ্বেষপ্রসূত নয়, ভোটারদেরও আহত ও অপমান করা। বিজেপিকে সরকার গড়তে না দিয়ে জনগণ তার সমুচিত জবাব দিয়েছেন। কিন্তু আমরা মনে রাখব, জনতা দলের নিতীশ কুমারের সঙ্গে বিজেপির আপস ও সমঝোতার রাজনীতি কিন্তু নিকট অতীতের বিষয়। ২০১০ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে ছবিটি আরও স্পষ্ট হবে। ওই বছরে নিতীশ কুমারের সংযুক্ত জনতা দলের সঙ্গে জোট বেঁধে বিজেপি প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে বিজেপির ভোট বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। নিতীশ এবার তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী। ২০০৫ সালে প্রথম বাজপেয়ি ও আদভানির আশীর্বাদ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে ২০০০ সালেও সাত দিনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। সেই হিসাবে বলা যায়, নিতীশ আমলে বিজেপির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের এমন অবনতি ঘটবে না, যাতে তাঁর পক্ষে সরকার পরিচালনা করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। ২০০৫ ও ২০১০ সালে নিতীশ তাঁর রাজ্য মন্ত্রিসভায় যথাক্রমে বিজেপির ৮ ও ১০ জনকে মন্ত্রিত্ব দিয়েছিলেন। জনতা-বিজেপি জোটের নির্বাচনে ২০০৫ সালে জনতা দল ৫৫ ও বিজেপি ৩৭টি আসন পেয়েছিল। ২০১০ সালেও তারা জোট করে নির্বাচন করে। তবে উভয়ের আসন বাড়ে। জনতা ১১৫ ও বিজেপি ৯১টি আসন পায়। এবারেও বিজেপি পেয়েছে ৫৮টি।
পরিহাস হলো, বিহারে নিতীশের দলের সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক ও সরকার পরিচালনাগত ঐক্য একটানা ১৭ বছর টিকে থাকার পরে ২০১৩ সালে ভেঙে গেল নরেন্দ্র মোদিকে বিজেপির কেন্দ্রীয় নির্বাচনী প্রচারণা কমিটির প্রধান হিসেবে প্রস্তাব অনুমোদনের ঘটনায়।
বিহারের নির্বাচনী ফলের জাতীয় প্রভাব কী, তার চেয়ে বিহারের রাজনীতিতে তার প্রভাব কী, সেটাই বেশি কৌতূহলের সঙ্গে দেখার বিষয়। ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির প্রতিভূ হিসেবে বিবেচিত এবং ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর সেনানীর ছেলে নিতীশ কুমার ১৭ বছর ধরে রাজ্যের উন্নয়ন ও স্থিতিশীল বিধানসভা ও সরকার পরিচালনার স্বার্থে বিজেপির সঙ্গে কর্মসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। যদিও নিতীশ মোদির বিরুদ্ধে তাঁর প্রকাশ্য উষ্মার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সব সময় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। মোদির উপস্থিতি কাম্য নয় বলে তিনি টানা তিন বছর জ্যেষ্ঠ বিজেপি নেতাদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেননি। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে রাজ্য বিজেপিকে নিতীশ আলটিমেটাম দিয়েছিলেন যে তাঁদের সঙ্গে থাকতে হলে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য সেক্যুলার মনোভাবের কাউকে প্রার্থী করতে হবে। সুতরাং দেখার বিষয় হলো মতাদর্শগতভাবে বিপরীত মেরুর দলের সঙ্গে সরকার করা চলে। হয়তো নিতীশ গোড়াতেই বুঝতে পেরেছেন যে রাজনৈতিক বা সরকারব্যবস্থাটায় কোনো ব্যক্তি বা দলের একচেটিয়া অধিকার নেই। আমাদেরও উচিত বিহারের পাঠ নেওয়া।
এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতেই হয় যে খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা করার সুযোগ হাতছাড়া করেছিলেন। ইনডেমনিটি বিল বাতিল, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের প্রশ্রয় না দিয়ে আগস্ট ও জেলহত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান ঘটানোর মতো বিষয়ে খালেদা জিয়া কোনো ধরনের কার্যকর সমঝোতায় যেতে চাননি। আওয়ামী লীগ পঞ্চম সংসদকে অকার্যকর করে দিয়েছিল। তারা যে সংখ্যায় বিএনপির চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল, সেটাই তারা জোর গলায় প্রচার চালিয়েছে।
বিহারে দেখার বিষয়, বিজেপি কীভাবে তাদের পাটিগণিত পরাজয় থেকে শিক্ষা নেয়। কারণ, সময়টা একনায়কসুলভ আচরণ প্রদর্শনের। গোমাংস বিতর্কের আড়ালে অনেকটা নিজেদের ‘বর্ণগত’ শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার প্রবণতা আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছিলাম। বহুত্ববাদের পরিবর্তে আমিত্ব প্রকটভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। জায়গা করে নিচ্ছে অন্ধত্ব। গোমাংস বিতর্কে ইন্দ্রদেব গোমাংস খেতেন বলে অনেকে বিজেপিকে সংবরণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু যুক্তিতে কান দেওয়ার মতো কান নেই হয়তো। এর কারণটা বলেছেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মাইদুল ইসলাম, যিনি বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর গবেষণা করেছেন। গতকাল তাঁর লেখা এক নিবন্ধে তিনি বলেন, ‘কারণ, তাঁরা ইন্দ্রদেবের থেকে নরেন্দ্রদেবের ওপরে বেশি আস্থা রাখেন।’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

অনুপ চেটিয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তর

উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক অনুপ চেটিয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার দিবাগত গভীর রাতে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের হাতে তাঁকে তুলে দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে তাঁর দুই সহযোগী লক্ষ্মী প্রসাদ গোস্বামী ও বাবুল শর্মাকেও হস্তান্তর করা হয়।
দুই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশের কারণে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই তিনজনকে হস্তান্তর করা হয়। পরে সীমান্ত দিয়ে তাঁদের ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তাঁরা ভারত সরকারের হেফাজতে আছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকের মাত্র পাঁচ দিন আগে অনুপ চেটিয়াকে ভারত সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হলো।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় ও ফেব্রুয়ারি মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে অনুপ চেটিয়াকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়। সর্বশেষ গত ৭ মে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে অনুপ চেটিয়া এবং তাঁর দুই সহযোগীকে সর্বোচ্চ মানবিক বিবেচনায় ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এর আগে গত এপ্রিল মাসে ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারা এই তিনজনের সঙ্গে কারাগারে দেখা করেন। তখন তাঁরা দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
অনুপ চেটিয়া ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশের কারাগারে বন্দী ছিলেন। হস্তান্তরের আগে তিনি কাশিমপুর কারাগারে ছিলেন।
অতীতে বিভিন্ন সময় অনুপ চেটিয়াকে হস্তান্তর করতে বাংলাদেশের ওপর ভারতের চাপ ছিল। কিন্তু তিনি বাংলাদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে ২০০৩ সালের ২৩ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করেন। এরপর তাঁর পক্ষে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে। ওই আবেদনে অনুপ চেটিয়ার সাজা শেষ হলে তাঁকে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর অনুমতি চাওয়া হয়।
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার মহাসচিব সিগমা হুদা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা অনুপ চেটিয়ার পক্ষে রিট আবেদন করেছিলেন। কয়েক বছর ধরে আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ নেই।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, অনুপ চেটিয়া দীর্ঘদিন কারাগারে আটক ছিলেন। তাঁর আটকাদেশ শেষ হয়েছে। তিনি ভারতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এ জন্য তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল সকালে তিনি বাংলাদেশের সীমান্ত পার হয়েছেন।
এদিকে কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক (আইজি-প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি সেল থেকে ভারতীয় দূতাবাসের দুই প্রতিনিধির কাছে উলফা নেতা অনুপ চেটিয়া ও তাঁর দুই সহযোগীকে হস্তান্তর করা হয়। ২০০৪ সালের পর থেকে তাঁরা মুক্ত কয়েদি (রিলিজ প্রিজনার) হিসেবে কারাগারে ছিলেন। এর আগেও বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের বন্দীকে ভারতীয় দূতাবাস নিয়েছে।
১৯৯৭ সালের ২১ ডিসেম্বর ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) অন্যতম শীর্ষ নেতা অনুপ চেটিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান এবং অবৈধভাবে বিদেশি মুদ্রা ও একটি স্যাটেলাইট ফোন রাখার অভিযোগে তিনটি মামলা হয়। আদালত তিনটি মামলায় তাঁকে যথাক্রমে তিন, চার ও সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একসঙ্গে তিন মামলার সাজা কার্যকর হওয়ায় সাত বছর পরই ২০০৪ সালে তাঁর সাজার মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু তারপর থেকে তিনি কারাগারে আটক ছিলেন।
এরপর অনুপ চেটিয়ার ভাগ্য দুই দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে। ভারতের চাওয়া মেনে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে গতকাল হস্তান্তর করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অফিস থেকে একটি টুইটে গতকাল জানানো হয়, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁকে দীপাবলির শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি জানান, অনুপ চেটিয়ার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি ভারত সরকার খুব গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন করে। তবে পরে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরণ রিজিজু সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এটা এক বিরাট সাফল্য। এর ফলে অনেক মামলার সুরাহা হবে। ভারতের দাবি মেনে অনুপ চেটিয়ার প্রত্যর্পণের জন্য তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারকে ধন্যবাদ জানান। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, এই প্রত্যর্পণের ফলে সরকারের সঙ্গে উলফার আলোচনা প্রক্রিয়া গতি পাবে।
আর অনুপ চেটিয়ার ছেলে জুরম সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, খবরটি সত্য হলে তাঁরা আনন্দিত হবেন। অনেক বছর পরে বাবার সঙ্গে দেখা হবে ভেবে তাঁর ভালো লাগছে।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অনুপ চেটিয়ার প্রত্যর্পণের ফলে উলফার বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা শুধু পরেশ বড়ুয়ার অনুগামীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। অনুপ চেটিয়া ও পরেশ বড়ুয়া একসময় একই সংগঠনে ছিলেন। মতপার্থক্যে আলাদা হয়ে যান। কিন্তু বাংলাদেশের কড়া নজরদারির ফলে পরেশ বড়ুয়াও খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ হলে আসাম তো বটেই, গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তার একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
২০০৯ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে উলফার চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়া, চিত্রবন হাজারিকা, শশধর চৌধুরীসহ আটজন নেতাকে গ্রেপ্তার করে বিএসএফ। পরে এই নেতাদের সহযোগিতায় উলফার সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করে ভারত সরকার। তবে গত প্রায় দুই বছর এ আলোচনা বন্ধ আছে। অনুপ চেটিয়া যুক্ত হলে এ আলোচনা গতি পেতে পারে বলে আসাম ও ভারত সরকার মনে করছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের স্বাধীনতার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে গঠিত হয় উলফা। এরপর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সশস্ত্র তৎপরতা চালায় সংগঠনটি। অনুপ চেটিয়া উলফার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। তাঁর আসল নাম গোলাপ বড়ুয়া। আর সাংগঠনিক নাম অনুপ চেটিয়া।

ছড়ি ঘুরিয়েই যাবে সেনাবাহিনী! -মিয়ানমারের নির্বাচন নিয়ে বার্তা সংস্থা এপির বিশ্লেষণ

ইয়াঙ্গুনে এনএলডি সদর দপ্তরের বাইরে
পত্রিকা পড়ছেন এক ব্যক্তি। ৮ নভেম্বরের
ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে অং সান সু চির
এনএলডি বিপুল ব্যবধানে জয়ের পথে রয়েছে
মিয়ানমারে ঐতিহাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর তিন দিন পার হয়ে গেল গতকাল বুধবার। কিন্তু ফলাফল ঘোষণায় চলছে শম্বুকগতি। যদিও এরই মধ্যে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) কাছে ঐতিহাসিক পরাজয় বরণ করতে যাচ্ছে সেনা-সমর্থিত ক্ষমতাসীন ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)।
আর নির্বাচনের আগে থেকেই এটা জানা ছিল, মিয়ানমারের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর যে সম্পৃক্ততা সেটার বেড়াজাল থেকে নির্বাচনের ফলাফলও বাদ থাকবে না। ১৯৬২ সালে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করা সেনাবাহিনী বছরের পর বছর গণতন্ত্রপন্থীদের ওপর নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালানোর পর নির্বাচিত কোনো বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা ছাড়ার পথ সুগম করে দেয় ২০১১ সালে। তবে তখনো ক্ষমতার সুতোটা তাদের হাতেই ছিল।
অবশ্য এবারের নির্বাচন যে গত কয়েক দশকের মধ্যে ছিল সবচেয়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সন্দেহ আছে স্পষ্ট বিজয়ের পথে এগিয়ে যাওয়া গণতন্ত্রকামীদের কাছে মসৃণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা ও পরবর্তী সময়ে স্বাধীনভাবে তাঁদের দেশ চালাতে দেওয়া নিয়ে।
এ রকম সন্দেহ-সংশয় ফুটে উঠেছে অনেক বিশ্লেষকের কথায়। তাঁদের একজন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেন পলিসি ইনিশিয়েটিভের অ্যালেন বর্ক। বলছিলেন, ‘রোববারের নির্বাচন বার্মায় গণতন্ত্রের বিজয়কে প্রতিফলিত করে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক বছর থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সেনাবাহিনী ও তার রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা (ক্ষমতাসীন দল) দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্তরণে প্রকৃত আগ্রহী নন।’
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর ও নির্বাচিত সরকারকে নিজেদের মতো করে কাজ চালিয়ে যেতে দেওয়া নিয়ে সেনাবাহিনী ও সেনাসমর্থিত ক্ষমতাসীনদের মনে রয়েছে নানা শঙ্কা। ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের দাগ জান্তার শঙ্কার অন্যতম কারণ। সু চি অবশ্য সব পক্ষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও অহিংস নীতি প্রতিষ্ঠার ওপরই জোর দিয়েছেন। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আলোচনায় বসার জন্য গতকাল তিনি প্রেসিডেন্ট এবং প্রভাবশালী সেনাপ্রধানের কাছে আহ্বানও জানিয়েছেন।
নির্বাচনী ফলাফল অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নেওয়ার ব্যাপারে নরম সুরে কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ও সেনা-কর্মকর্তারাও। এ অবস্থায় অং সান সু চি শেষ পর্যন্ত যদি ক্ষমতাও পান তবে ‘ঘোর শত্রু’ প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করেই চলতে হবে তাঁকে। কেননা, দেশটির সংবিধান, পার্লামেন্ট ও শাসনব্যবস্থা সামরিক উর্দি পরিহিত শাসকেরা এমনভাবে সাজিয়েছে যে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ছড়ি ঘোরানোর শিকার হওয়া থেকে সু চির মুক্তি নেই।
আবার, মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা জারি হলেও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন বিশেষ গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কবজায় নিতে পারবে, সে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, ‘২০০৮ সালে সাবেক জান্তা প্রণীত সংবিধানে মিয়ানমারের রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয় যে, সু চি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না এবং সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা বা সুযোগ-সুবিধা পাকাপোক্ত থাকবে। যেমন-সেনাবাহিনীর জন্য ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষণ, সংবিধান সংশোধনে তিন-চতুর্থাংশ আইনপ্রণেতার প্রয়োজনীয় সমর্থন, সামরিক বাজেটে পার্লামেন্টারি নিরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা না রাখা এবং প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষাবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভার পদগুলো কেবল সেনাসদস্যদের জন্য সংরক্ষিত রাখা ইত্যাদি বিষয়।’
‘তাই জনগণ যতই তাঁর পেছনে থাকুক না কেন, অং সান সু চিকে সমস্যা মোকাবিলা করতেই হবে। কেননা, তিনি যদি সেনাবাহিনীকে টেক্কা দিয়ে এগোতে চান, তাহলে তা হবে তাঁর জন্য দেয়ালে মাথা ঠুঁকার মতোই’—বললেন রবার্টসন।

রুশ ‘শান্তি পরিকল্পনায়’ সংস্কারের প্রস্তাব- আলেপ্পোয় বাশার বাহিনীর বড় সাফল্য

বাশার আল আসাদ
সিরিয়া নিয়ে রাশিয়ার ‘শান্তি পরিকল্পনায়’ দেশটির সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। ১৮ মাস ধরে ওই সংস্কার প্রক্রিয়া চলবে। এরপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। তবে সংস্কার চলার সময় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতায় থাকবেন কি না, সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। খবর বিবিসির।
এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সিরিয়ার সরকারি বাহিনী দেশটির আলেপ্পো শহরে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দীর্ঘদিনের অবরোধ ভেঙে গত মঙ্গলবার একটি বিমান ঘাঁটিতে প্রবেশ করেছে।
বিবিসি জানায়, সিরিয়া নিয়ে রাশিয়ার ওই ‘শান্তি পরিকল্পনা’ জাতিসংঘে দেওয়া হয়েছে। আগামী শনিবার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। ওই আলোচনায় সিরিয়ার বিদ্রোহীদেরও অংশ নেওয়ার কথা। তার আগে রাশিয়ার ‘শান্তি পরিকল্পনার’ প্রস্তাব জানা গেল।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, শনিবারের বৈঠকের আগে ঠিক করতে হবে বিদ্রোহীদের মধ্যে কারা সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশীদার হবেন, আর কারা ‘সন্ত্রাসবাদী’ এবং গ্রহণযোগ্য নন।
রাশিয়ার ‘শান্তি পরিকল্পনার’ আটটি পয়েন্টের মধ্যে প্রেসিডেন্ট বাশার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না—এমন কোনো কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে বলা হয়েছে, সংস্কার প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে বাশার থাকবেন না। সব পক্ষের সিদ্ধান্তে ওই নেতৃত্ব ঠিক হবে। কিন্তু সিরিয়ার কোনো কোনো বিদ্রোহী পক্ষের অবস্থান হলো বাশারকে রেখে সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
রাশিয়া তার ‘শান্তি পরিকল্পনায়’ সিরিয়ার সরকার ও ‘বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সমন্বিত প্রতিনিধিদের’ মধ্যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করতে জাতিসংঘের বিশেষ দূত স্টেফান ডি মিসতুরার প্রতি আহ্বান জানায়। ২০১২ সালে জেনেভায় সিরিয়া নিয়ে বিশ্ব শক্তিগুলোর আলোচনায় দেশটিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। মূলত ওই আলোচনার ওপর ভিত্তি করেই নতুন করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার আহ্বান জানায় মস্কো।
মিসতুরা গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে বলেন, তিনি সিরিয়া সংকট সমাধানের জন্য নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনা শুরু করতে বিশ্ব শক্তিগুলোর সহায়তা চান।
এদিকে রয়টার্সের খবরে বলা হয়, প্রায় দুই বছর ধরে আইএসের হাতে অবরুদ্ধ আলেপ্পোর কেইরেস বিমান ঘাঁটিতে গত মঙ্গলবার ঢুকে পড়েছে সরকারি বাহিনী। অবরুদ্ধ কয়েক শ সামরিক সদস্যকে মুক্ত করা হয়েছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে রুশ অভিযান শুরুর পর সরকারি বাহিনীর এটাই সবচেয়ে বড় বিজয় বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।
অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত একজন সেনাসদস্য সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘আমরা এই বিজয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের প্রতি উৎসর্গ করছি। অঙ্গীকার করছি, আইএসের হাত থেকে সিরিয়া মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।’

সু চিকে কি দেশ চালাতে দেবে সেনাবাহিনী? -দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

মিয়ানমারে ২৫ বছর আগের সাধারণ নির্বাচনেও অভূতপূর্ব জয় পেয়েছিল অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। ১৯৯০ সালের সেই নির্বাচনে ৮৫ শতাংশ আসনেই বিজয়ী হয় এনএলডি। কিন্তু সামরিক শাসকেরা সেই ফল মেনে নেননি।
১৯৯০ সালের নির্বাচনের পর সু চিকে গৃহবন্দী করা হয়। তাঁর দল এনএলডির হাজারো নেতা-কর্মীর ভাগ্যে জোটে কারাবাস। অনেকের ওপরই চালানো হয় নিষ্ঠুর নির্যাতন। সঙ্গে দেশের মানুষের ওপর অব্যাহতভাবে চলে দমন-পীড়ন।
সেই থেকে ২৫ বছরে ঘটনা অনেক দূর এগিয়েছে। দেশি-বিদেশি চাপের মুখে সামরিক শাসকেরা রাজনৈতিক সংস্কারকাজ হাতে নিয়েছেন। দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা দেশটির বন্ধ দুয়ারও খুলে দিয়েছেন। মূলত ২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারে সামরিক জান্তার জবরদস্তিমূলক শাসন-নিপীড়ন কমে আসতে শুরু করে। তার আগের বছর সু চির প্রায় দুই দশকের অন্তরীণ অবস্থার অবসান হয়। ওই বছরই অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন বর্জন করে সু চির দল। তবে ২০১২ সালে পার্লামেন্টের ৪৫ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে সু চিসহ তাঁর দলের ৪৩ জন প্রার্থী জয়ী হন। পার্লামেন্টের বিরোধী দলের নেতা হন গণতন্ত্রপন্থী নোবেল বিজয়ী এ নেত্রী।
সু চির দল গত রোববার অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক আরেক নির্বাচনে আবার বিজয়ীর বেশে আবির্ভূত হচ্ছে। মিয়ানমারের এ নির্বাচনকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ বলে ধরা হচ্ছে। এত কিছুর পর এখন যে প্রশ্নটি সামনে আসছে তা হলো, সামরিক উর্দি পরা শাসকেরা কি এবার জনগণের রায় মেনে নিয়ে সু চিকে দেশ চালাতে দেবেন? তাঁরা অবশ্য জনগণের রায় মেনে নেবেন বলেই মুখে বলছেন।
নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার ব্যাপারে সাবেক জেনারেল ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন অকপটেই বলেছেন, ‘ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা আমাদের মেনে নিতে হবে। তবে যিনিই দেশের নেতৃত্ব দিন না কেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন।’ থেইন সেইনের এ কথাবার্তা শুনতে যেন অনেকটা অবসরে যেতে মনস্থির করা হতাশাগ্রস্ত একজন মানুষের মতোই। গণতন্ত্র কেড়ে নিতে ফের অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকা কোনো সেনা কর্মকর্তার মতো নয়। অন্যদিকে সেনাবাহিনী সমর্থিত মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) নেতা এইচটে উ তো বলেই ফেলেছেন, ‘আমরা হেরে গেছি। আমাদের হারার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। কোনো আপত্তি ছাড়াই আমরা ফলাফল মেনে নেব।’
সেনা-সমর্থিত এই নেতাদের কথার সুর যত নরমই হোক না কেন, তা সু চির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ এখনই মসৃণ হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে তাদের মনে রয়েছে নানা শঙ্কা। সু চি অবশ্য সব পক্ষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও অহিংস নীতি প্রতিষ্ঠার ওপরই জোর দিয়েছেন। ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের দাগ জান্তার শঙ্কার অন্যতম কারণ।
অং সান সু চি শেষ পর্যন্ত দেশ চালানোর ক্ষমতা পেলেও তাঁকে ‘ঘোর শত্রু’ প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করেই চলতে হবে। কেননা, দেশটির সংবিধান, পার্লামেন্ট ও শাসনব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনাবাহিনীর নাক গলানো থেকে তাঁর রেহাই নেই।
মিয়ানমারে নির্বাচনের ফলাফল দেখানো হচ্ছে বড় পর্দায়। নিজেদের জয়ের খবরে উল্লাস করছেন অং সান সু চির দল এনএলডির নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। ইয়াঙ্গুনে দলটির প্রধান কার্যালয়ের বাইরে থেকে গত রোববার রাতে তোলা l এএফপি

উচ্চশিক্ষায় ভালো অবস্থানে বাংলাদেশ -ইউনেসকোর বৈশ্বিক প্রতিবেদন by শিশির মোড়ল

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো বলছে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বেশ কিছু দেশ। এদের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হতে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ দেশে শিক্ষার মান বেড়েছে। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়েন। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এই হার এশিয়ার সর্বোচ্চ দেশের তালিকায় আছে।
ইউনেসকোর বৈশ্বিক বিজ্ঞান প্রতিবেদন ২০১৫-এ এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে দেশে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য ১৮ লাখ ৪০ হার শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৫০ হাজার। এই সময়ে প্রকৌশলে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৮ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউনেসকো বলছে, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তির হার বেশি হলেও খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থী পিএইচডি ডিগ্রির (গবেষণা) জন্য ভর্তি হন। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম প্রকৌশলীরা। ২০০৯ সালে ১৭৮ জন প্রকৌশলী পিএইচডি ডিগ্রির জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। ২০১২ সালে ভর্তির সংখ্যা বেড়ে হয় ৫২১। প্রতিবেদেন বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৭ হাজার ৯০ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী আছেন। অন্যদিকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ১৮ লাখ ৩৬ হাজার ৬৫৯ জন।
এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। বাংলাদেশ ২০১২ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কায়কোবাদ ইউনেসকোর প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা জমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় খুবই কম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা ছাড়া, এই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
‘ইউনেসকো সায়েন্স রিপোর্ট: টুয়ার্ডস ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক দেশ জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে যুক্ত করেছে। ২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পরও গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। প্রতিবেদনে কিছু বৈশ্বিক প্রবণতার কথা বলা হয়েছে। দেখা গেছে, ফলিতবিজ্ঞানে বিনিয়োগ বেশি হচ্ছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে বিজ্ঞান ও গবেষণা খাতে সরকারি ব্যয় কমে গেছে। এই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আগের মতো আছে বা বেড়েছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে উত্তর-দক্ষিণের ব্যবধান কমেছে। তৃতীয়ত, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন পৃথিবীতে বিজ্ঞানীর সংখ্যা বেশি এবং তাঁরা এক জায়গায় স্থির নন। ২০০৭ সালের চেয়ে ২০১৪ সালে গবেষক ও বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার সংখ্যা ২০ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের শিক্ষার মান বেড়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হচ্ছে, ২০১০ সালে মাধ্যমিক স্তরে শ্রেণিকক্ষে গড়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৭২। ২০১৩ সালে কমে ৪৪ জনে দাঁড়ায়। প্রাথমিক স্তরে পুনর্ভর্তির হার ১৩ থেকে কমে ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধিবিষয়ক প্রকল্পের (২০০৯-২০১৮) মধ্যবর্তী মূল্যায়নে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষার মানে সন্তোষজনক অগ্রগতি হচ্ছে।
অধ্যাপক কায়কোবাদ বলেন, এ দেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম, মোট জাতীয় আয়ের মাত্র ২ শতাংশ। বরাদ্দ বাড়ানো গেলে শিক্ষার পরিস্থিতি আরও ভালো হতো।
ইউনেসকোর ৮২০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে অন্যান্য বেশ কিছু দেশের মতো বাংলাদেশ বিষয়ে পৃথকভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, কৃষিপ্রযুক্তি বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা ত্বরান্বিত করেছে। ৪৭টি নতুন প্রযুক্তি ১৩ লাখ ১০ হাজার কৃষক ব্যবহার করছেন, ২০০টি ফলিত গবেষণায় অর্থায়ন করা হচ্ছে, কৃষিতে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ১০৮ জন নারী ও পুরুষ বিজ্ঞানীকে বৃত্তি দেওয়া হয়েছে, কৃষকদের জন্য ৭৩২টি তথ্য ও পরামর্শ কেন্দ্র খোলা হয়েছে, শস্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ৩৪টি প্রযুক্তি ১৬ হাজার কৃষক ইতিমধ্যে গ্রহণ করেছেন।
২০০৫ সালে বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ছিল ২৮৩টি। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৯৪-এ। ইউনেসকো বলছে, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখার সময় বাংলাদেশি বিজ্ঞানী বা গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সহপ্রবন্ধকার হিসেবে সঙ্গে রাখছেন। অন্যদিকে দেশে অবস্থানরত বিজ্ঞানী বা গবেষকদের চেয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মেধাস্বত্বের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী।
প্রতিবেদনে ইউনেসকোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা বলেছেন, ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রথমবারের মতো টেকসই উন্নয়নের চালক হিসেবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

সংসদ নজরদারির বাইরে নয় by কামাল আহমেদ

যত দূর মনে পড়ে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পার্লামেন্ট ওয়াচ কার্যক্রম যখন শুরু হয়েছিল, সেটি ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শাসনামল। অষ্টম সংসদের সময় থেকে সংসদের কার্যক্রম নিয়ে এই সমীক্ষা তারা নিয়মিতই প্রকাশ করে আসছে। ফলে আমরাও জানতে পেরেছি কোন সাংসদ কয় দিন অধিবেশনে উপস্থিত থেকেছেন, আর কয় দিন হাজির না হলেও বেতন-ভাতা পেয়েছেন। নবম সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়ার সংসদে অনুপস্থিতির বিষয়ে টিআইবির হিসাবই সম্ভবত এরপর থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সাবেক মহাজোটের নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে বারবার উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁরা কেউ সংসদ সচিবালয়ের হাজিরা খাতা যাচাই করেছেন—এমনটি কখনো শুনিনি। সেই একই সংস্থা, টিআইবি তার সাম্প্রতিক রিপোর্টে ‘বর্তমান জাতীয় সংসদকে নিয়মরক্ষার সংসদ এবং ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র ভুবনে পরিণত হওয়ার’ কথা বলে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
কিন্তু এবারের রিপোর্টে ক্ষুব্ধ হয়ে বর্তমান সাংসদেরা টিআইবির মূল্যায়নকে সংবিধান পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। সোমবার এক অনির্ধারিত আলোচনায় সংসদের সমালোচনা করার এখতিয়ার কোনো এনজিওর আছে কি না, এই প্রশ্ন তুলে তাঁরা টিআইবিকে সংসদে তলব করে শাস্তি দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। অনেক প্রবীণ সাংসদ তাঁদের বক্তব্যে টিআইবিকে সংসদের বাইরের বিরোধী দল বিএনপির পকেট সংগঠন বলেও অভিহিত করেছেন। তাঁরা বলেছেন, শাস্তি এড়াতে হলে টিআইবিকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাইতে হবে।
অবশ্য পুরো পর্যবেক্ষণই প্রত্যাহার করতে হবে কি না অথবা ক্ষমা চাওয়ার জন্য কোনো সময়সীমা আছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কেননা, সংসদের আলোচনায় সাংসদদের অনেকেই নানা ধরনের হুমকির সুর তুললেও কোনো প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা জানা যায় না। এরপর মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়–বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আবারও টিআইবিকে একহাত নিয়েছেন। এনজিওগুলোতে বিদেশি অর্থায়নের বিষয়ে সরকারের প্রস্তাবিত নতুন আইনের খসড়ায় সংসদ, সংবিধান ও রাষ্ট্র নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দিলে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান যুক্ত করার কথা বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে টিআইবি সংসদের বর্তমান অবস্থা বর্ণনায় ‘পুতুলনাচের নাট্যশালা’র যে রূপক ব্যবহার করেছে, সেটিকেই সাংসদরা বড় করে দেখাচ্ছেন। কিন্তু কার্যকর বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে দেশবাসী যে তাঁদের ভূত-ভবিষ্যৎ নির্ধারণ প্রশ্নে সংসদে গণতান্ত্রিক বিতর্ক ও জবাবদিহি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সাংসদেরা সেই সমালোচনার কোনো জবাব দিতে আগ্রহী নন।
সাংসদদের এই প্রতিক্রিয়ার জবাবে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘টিআইবি কিছু অসত্য বলে থাকলে ওনারা বলুক, আমরা দুঃখ প্রকাশ করব, সংশোধনী দেব, প্রত্যাহার করব। কিন্তু জাতীয় সংসদ সম্পর্কে কথা বলার অধিকার নেই, এটা মানছি না। সংসদ নিয়ে কথা বলতে না পারাটা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ।’
সুলতানা কামাল যথার্থই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে বিএনপি আমলে তাঁদের সংস্থাকে আওয়ামী লীগের পকেট সংগঠন বলে অভিযোগ করা হয়েছিল এবং তখনো টিআইবির বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক, ইফতেখারুজ্জামান অবশ্য একটু বিনয়ী জবাব দিয়ে বলেছেন যে সংসদের আলোচনাকে তাঁরা তাঁদের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
সংসদের অবমাননা হয়েছে এমনটি মনে হলে সংসদে বিতর্ক অস্বাভাবিক কিছু নয়। ব্যক্তিগতভাবে সাংসদদের কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হলে সে বিষয়েও সংসদে আলোচনা হতে পারে এবং তিনি সংসদের অভিভাবক স্পিকারের কাছে তার প্রতিকার চাইতে পারেন। কিন্তু সংসদের মর্যাদা সবার ওপরে—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিেকরা একক বা গোষ্ঠীগতভাবে সংসদের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও তার সমালোচনা করার অধিকার রাখেন না, এটি মনে করার কোনো সুযোগ আধুনিক রাষ্ট্রে থাকতে পারে না।
নাগরিকদের কাছে সংসদেরও যে জবাবদিহির প্রশ্ন আছে, সেটি পার্লামেন্টের নবাগত কেউ নাও জানতে পারেন। কিন্তু অভিজ্ঞ, প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান ও পেশাদার রাজনীতিকেরা তা অস্বীকার করলে সেটাকে আর নিরীহ অজ্ঞতা বলা চলে না, বরং তাতে ভোটারদের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং অবজ্ঞারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অন্তত পার্লামেন্টারিয়ানদের বৈশ্বিক সংগঠন ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) ঘোষিত নানা নীতিমালায় সে রকম কথাই বলা আছে।
নাগরিকেরা যাতে সংসদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, সে জন্য অনেক দেশেই সংসদ ভবন এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যে ভবনটির বাইরে থেকেও অধিবেশনকক্ষের ভেতরে নজরদারি করা যায়। বার্লিনে জার্মান সংসদ ভবন তার একটি দৃষ্টান্ত। আবার আমাদের জাতীয় সংসদের মতো যেসব ভবনে বাইরে থেকে অধিবেশনকক্ষে চোখ রাখার সুযোগ নেই, সেসব জায়গায় প্রেস গ্যালারি ও দর্শক গ্যালারি থেকে সাংসদদের ওপর নজরদারির ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত আছে। সম্প্রতি ভারত ও ব্রিটেনে অধিবেশনকক্ষে বসে ট্যাবলেট বা আইপ্যাডে নীল ছবি (পর্নোগ্রাফি) দেখার চিত্র অন্যের ক্যামেরায় ধরা পড়ার পর সভা থেকে তাঁদের সাময়িক বহিষ্কারের খবর এটিই প্রমাণ করে যে কার্যকর গণতন্ত্রে সাংসদদের ওপর নাগরিক নজরদারির আলাদা গুরুত্ব আছে।
এ তো গেল সংসদ বা পার্লামেন্টের স্থাপনা বা অবকাঠামোতে নাগরিকদের নজরদারির সুবিধা রাখার প্রশ্ন। কিন্তু পার্লামেন্টে নজরদারির আইনগত ব্যবস্থাও একাধিক দেশে আছে। আমাদের পরে গণতন্ত্রায়ণ ঘটেছে—এমন দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় আইন করে নাগরিকদের সংসদের অধিবেশনে যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে (সূত্র: পার্লামেন্ট অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি: আ গাইড টু গুড প্র্যাকটিস, প্রকাশক: ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন, আইপিইউ, ২০০৬)।
গণতন্ত্রের তীর্থকেন্দ্র বা মাদার অব অল পার্লামেন্ট খ্যাত ব্রিটিশ সংসদ, ওয়েস্টমিনস্টারে সাংসদদের নৈতিকতার বিষয়টিতে নজরদারি করার জন্য আছে স্বাধীন সংস্থা, ইনডিপেনডেন্ট পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি, আইপিএসএ। টেলিগ্রাফ পত্রিকা দেশটির এমপিদের নানা অজুহাতে খরচ হিসেবে অন্যায়ভাবে নানা ধরনের ভাতা নেওয়ার যে হিসাব তুলে ধরেছিল, তার কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে থাকবে। এমপিদের ওই কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ ঠেকানোর জন্য সেখানেও কিছু এমপি-মন্ত্রী হুংকার দিয়েছিলেন যে সংসদের অবমাননা গ্রহণযোগ্য নয়। সে সময়ে এমপিদের নীতিনৈতিকতার বিষয়টি ছিল পার্লামেন্টের নিজস্ব এখতিয়ার। সেই স্বশাসন (সেলফ রেগুলেশন) কাজে না আসায় শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালে আইন করে প্রতিষ্ঠিত হয় আইপিএসএ (সূত্র: আইপিএসএ ওয়েবসাইট)। বাইরের লোক, বিশেষ করে হিসাব বিশেষজ্ঞদের নজরদারিতে ওয়েস্টমিনস্টারের অবশ্য কোনো মানহানি হয়নি।
আমরা গর্ব করি যে সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী বিশ্বের ১৬৬টি দেশের সংসদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন আইপিইউর সভাপতি এবং স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) চেয়ারপারসন। সোমবার জাতীয় সংসদের বিতর্কে এই দুটি মহান সংগঠনের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সাংসদদের কেউ আইপিইউর প্রকাশনাটি পড়ে দেখেছেন কি না সন্দেহ।
পার্লামেন্ট অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি: আ গাইড টু গুড প্র্যাকটিস-এর মুখবন্ধে সাবের হোসেন চৌধুরীর একজন পূর্বসূরি পিয়ের ফার্দিনান্দো ক্যাসিনি লিখেছেন, ‘আমাদের সময়ের গোলকধাঁধা (প্যারাডক্স) হচ্ছে আমরা যখন গণতন্ত্রের বিজয়কে স্বাগত জানাই, তখন অনেক দেশেই গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান পার্লামেন্ট বৈধতার সংকটে ভুগছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাহী বিভাগের প্রাধান্য এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে তাতে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অভাব ঘটছে এবং মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে যে বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও পার্লামেন্ট তাদের বৈচিত্র্যময় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম কি না।’ কোনো সংসদ গণতান্ত্রিক কি না, তা যাচাইয়ের জন্য তিনি পাঁচটি শর্ত পূরণের কথা বলেছেন। এগুলো হলো প্রতিনিধিত্ব, স্বচ্ছতা, সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা।
নাগরিকদের কাছে জবাবদিহির জন্য সাংসদের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে তাঁকে অপসারণের ব্যবস্থাও চালু আছে উগান্ডার মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে। এতটা গণতান্ত্রিক সংস্কার আমাদের দেশে সহসা যে সম্ভব নয়, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু পার্লামেন্ট ওয়াচের মতো সীমিত নজরদারির অধিকারটুকুও যদি নাগরিকদের না থাকে, তাহলে কি এ কথা বলা যাবে যে আমরা একুশ শতকের গণতন্ত্রে আছি?
গণতন্ত্র শুধু সংসদ আর রাজনৈতিক দলকে নিয়ে নয়, গণতন্ত্রে এখন নাগরিক গোষ্ঠীগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই নাগরিক সংগঠন বা এনজিওগুলোকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ভয়ভীতি দেখানো কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। গণতন্ত্রায়ণে গত দুই দশকে এনজিও বা সুশীল সমাজের কাছ থেকে যেসব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাহায্য-সমর্থন নিতে হয়েছে, সেগুলোর কথা ক্ষমতাসীনেরা এত দ্রুত বিস্মৃত হন কীভাবে তা সত্যিই একটা বিস্ময়। ব্রিটেনে প্রকৃত বিরোধী দলকে আলংকারিক ভাষায় বলা হয় ‘হার রয়াল অপজিশন’ কেননা, দেশটি রাজতান্ত্রিক ও রাজ্যের সিংহাসনে আসীন আছেন রানি এলিজাবেথ। কিন্তু আমাদের দেশে? এখানে যদি অপজিশন হয় ‘হার (প্রধানমন্ত্রীর) লয়াল (অনুগত) অপজিশন’, তাহলে কোনো নাগরিক গোষ্ঠী সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাকে কীভাবে ‘অসত্য’ অভিহিত করা যায়?
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর পরামর্শক সম্পাদক।

জঙ্গি জামিনে যেন অপরাধ চিন্তা করা হয় -বিচারকদের প্রধানমন্ত্রী

সংসদে প্রধানমন্ত্রী। ছবি: ফোকাস বাংলা
জঙ্গি ও অপরাধীদের অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে সাজা নিশ্চিত করার ব্যাপারে মনোযোগী হওয়ার জন্য বিচারকদের অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জঙ্গি ও অপরাধ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের জানমাল রক্ষায় এবং দেশের প্রয়োজনে যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সরকার তাই নেবে। জঙ্গিরা যাতে দ্রুত জামিন না পায় সে বিষয়ে সচেতন থাকার জন্য বিচারকদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
জাতীয় সংসদে আজ বুধবার প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।
সরকারির দলের কামাল আহমেদ মজুমদারের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় গোয়েন্দা সংস্থা এবং পুলিশ মাসের পর মাস পরিশ্রম করে, অনেক টাকা খরচ করে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করে। ছয় মাস, এক বছর চেষ্টা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হলো, তারপর দেখা গেল ১৫ দিনের মধ্যে জামিন পেয়ে তারা বেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের বিচার-ব্যবস্থা স্বাধীন। এ জন্যই বিচারকেরা জামিন দিচ্ছেন। তবে আমার আহ্বান, জামিন যখন দিচ্ছেন, তারা যে অপরাধ করেছে, অপরাধের মাত্রাটা একটু চিন্তা করে যেন জামিনের ব্যবস্থা করা হয়। এদের সাজা নিশ্চিত করার ব্যাপারে বিচারকেরা যদি মনোযোগী হন, তাহলে দেশকে অনেক অপরাধের হাত থেকে বাঁচানো যায়। ছয় মাস বা এক বছরের প্রচেষ্টায় একজন অপরাধীকে ধরার পর যদি ১৫ দিনের মধ্যে জামিন হয়ে যায়, তাহলে আমাদের কিছু করার থাকে না। সেটা যাতে না হয়, সে জন্য বিচার বিভাগের কাছে আমাদের অনুরোধ, তারা যেন আর একটু সচেতন হন।
আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনজীবীরা আইনি সহায়তা দেবেন। তবে তাঁদের দেশের মানুষের কথা ও দেশের নিরাপত্তার কথা একটু চিন্তা করতে হবে। বিচার না পেলে সরকারের দোষ, জামিন পেলেও সরকারের দোষ। ভবিষ্যতে আরও কঠোরভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।
জঙ্গি ও সন্ত্রাসী ধরতে ভাইবার-হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ
স্বতন্ত্র সাংসদ হাজি মোহাম্মদ সেলিমের সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব ভালোর মধ্যে কিছু খারাপও চলে আসে। এটা স্বাভাবিক। ডিজিটাল বাংলাদেশ করার পর কিছু মানুষ অপরাধ করছে। তাই কিছুদিনের জন্য হলেও ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের ধরতে হবে। এটা হওয়া দরকার। তিনি বলেন, যখনই ধরা পড়ছে, দেখা যাচ্ছে, তারা বিভিন্ন সময় জামায়াত-শিবির ও বিএনপি করত। বিভিন্ন নামে একটার পর একটা ঘটনা ঘটাচ্ছে। তিনি সাংসদসহ গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যে যেখানেই পারেন তাঁদের ধরিয়ে দিন। সাংবাদিকদের কেবল সংবাদ লিখলেই হবে না, তথ্য দিয়ে তাঁদের ধরিয়েও দিতে হবে। তাহলেই মানুষের শান্তি আসবে।
সন্ত্রাস-সহিংস জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ দায়িত্বশীল রাষ্ট্র
সরকারি দলের মমতাজ বেগমের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সব সময়ই সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে আসছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূখণ্ড যাতে কেউ সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ সম্পর্কিত কোনো কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যাপারে সরকার বদ্ধপরিকর। এ কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদ দমনে একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
দুই বিদেশি নাগরিক হত্যাকারীদের বিচারের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপ সংক্রান্ত এম এ আউয়ালের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মহানগর এলাকায় ইতালির নাগরিক হত্যার দায়ে ২ নভেম্বর পর্যন্ত চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্তভার গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর রংপুরে জাপানি নাগরিক হত্যার দায়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য বিশেষ পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে।
গাজী গোলাম দস্তগীরের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক যেসব নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন, যারা নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন সেসব বীরাঙ্গনাদের অমর ও অক্ষয় করে রাখার জন্য তাঁদের অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, সম্মানী ভাতা ও বাসস্থানসহ সরকার প্রদত্ত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পরিকল্পনা সরকারের আছে।
১৫ বছরে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন হবে
কামরুল আশরাফ খানের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার আগামী ১৫ বছরে ৩০ হাজার হেক্টর জমির ওপর একশটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
জাতীয় পার্টির সেলিম উদ্দিনের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের বিনিয়োগ করার জন্য সব রকম সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তাদের এনআরবি ব্যাংক করে দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবাসীদের বিনিয়োগ করার অনেক সুবিধা। ওয়ার্কার্স পার্টির ইয়াছিন আলীর অপর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবজি উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ তৃতীয় এবং মৎস্য ও ধান উৎপাদনে চতুর্থ। সবজি সংরক্ষণে বেসরকারি বিনিয়োগকারী এগিয়ে এলে সরকার সহায়তা দেবে। উত্তরবঙ্গে এটা হতে পারে। নেদারল্যান্ডসে সবজি সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে।