Sunday, October 27, 2019

কফিন কন্টেইনার, হ্যান্ডেলে রক্তের দাগ, অনেকেই ছিলেন নগ্ন

ধাতব কন্টেইনারের ভিতর তখন মাইনাস ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। তার ভিতর একটি শিশুসহ ৩৯ জন মানুষ। তারা আর্তনাদ করছেন। ধাক্কাচ্ছেন বের হওয়ার দরজার হ্যান্ডেল ধরে। আস্তে আস্তে শক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। কেউ কেউ বাড়িতে জীবন বাঁচানোর জন্য ম্যাসেজ পাঠান মোবাইলে। কিন্তু তাদের সেই আর্তনাদ ওই কন্টেইনারের বাইরের দুনিয়ার কোনো মানুষের কানে পৌঁছার মতো কোনো উপায় ছিল না। ফল যা হবার তাই হলো।
একে একে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন সবাই। শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে পানি জমে বরফ হয়। সেখানে মাইনাস ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে কিভাবে বাঁচবেন ওইসব মানুষ! ফলে কঠিন এক ট্রাজেডি রচিত হয়েছে বৃটেনের এসেক্সে। গত বুধবার এ কাহিনী উদঘাটনের পর একের পর এক বেরিয়ে আসছে তথ্য। তা নিয়ে বৃটিশ মিডিয়া গুরুত্ব দিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করছে। এতে ফুটে উঠেছে নিজেদের জীবনকে শতভাগ ঝুঁকির মুখে ফেলেও কিভাবে মানুষ বৃটেন বা ইউরোপ বা উন্নত দেশে পাড়ি জমাচ্ছে।
উদ্ধার করা কন্টেইনারের দরজার ভিতরে হ্যান্ডেলে রক্তাক্ত হাতের ছাপ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তারা ওই কন্টেইনারের নাম দিয়েছেন ‘কফিন কন্টেইনার’। বেলজিয়ামের জিব্রুজে একটি ফেরিতে উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল ওই মানুষসহ কন্টেইনার। তার ভিতরে আস্তে আস্তে তাপমাত্রা কমতে থাকে। এর শেষ অধ্যায় উন্মোচিত হয় এসেক্সের একটি বন্দর এলাকায়।
নিহত ওইসব অভিবাসীদের মধ্যে ৬ জন ভিয়েতনামি রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ সময় তারা ছিলেন নগ্ন। কোনো পোষাকই ছিল না পরনে। অথবা সামান্য পোশাক ছিল। তারা ছিলেন ভিয়েতনামের উত্তরাঞ্চলীয় ক্যান লোক-এর বাসিন্দা। মারা যাওয়ার আগে তারা দরজায় ধাক্কা দিয়েছেন। আঘাত করেছেন বাইরের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে। কিন্তু না, ফ্রিজ যেমন হয়, ঠিক তেমনই। ভিতরের কোনো শব্দ বাইরে পৌঁছেনি।
ওদিকে এই পাচারে জড়িত থাকার সন্দেহে স্ট্যানস্টেড এয়ারপোর্টে গ্রেপ্তার করা হয়েছে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ৪৮ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে। আস্তে আস্তে বেরিয়ে এসেছে সব কথা। মারা যাওয়ার আগে ভিয়েতনামের একজন যুবতী ফাম থি ট্রা মাই তার মার কাছে ধারাবাহিক ম্যাসেজ পাঠিয়েছেন। তাতে তিনি মাকে বলেছেন তাকে তিনি কতটা বেশি ভালবাসেন। মাকে বলেছেন, তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। মারা যাচ্ছেন। তার পরিবারের দাবি, ২৬ বছর বয়সী এই যুবতী উন্নত জীবনের আশায় চীন হয়ে বৃটেনে যাওয়ার জন্য পাচারকারীদের দিয়েছেন ৩০ হাজার পাউন্ড। এমন ১০টি ভিয়েতনামি পরিবার আশঙ্কা করছেন তাদের স্বজনরাও রয়েছেন মৃতদের তালিকায়। নুয়েন দিনহ লুওংয়ের আত্মীয়রা বলেছেন, নিহতদের মধ্যে তিনি থাকতে পারেন। তারা বলেছেন, নুয়েনের বিষয়ে জানেন এমন দু’টি স্থান থেকে তারা জরুরি বার্তা পেয়েছেন। ভিয়েতনামের ১৯ বছর বয়সী একজন তরুণী নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার আত্মীয়রা। তারা বলেছেন, মঙ্গলবার সকাল ৬টা ২০ মিনিটে তারা ফোন পেয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, ওই তরুণী কন্টেইনারে উঠছেন। তারপর থেকেই তার ফোন বন্ধ।
মানব পাচারের এই ভয়াবহতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ওই কন্টেইনারবাহী লরির চালক মাউরিস মো রবিনসনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। ওয়ারিংটনের দম্পতি জোয়ানা মেহের (৩৮) ও তার স্বামী থমাস (৩৮)কে এই ষড়যন্ত্রে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দর থেকে সর্বশেষ গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে।

‘প্রবাসে কেউ কারও নয়’ by মো. মুখলেছুর রহমান (মুকুল)

পরিবারের স্বচ্ছলতাসহ সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে নিজ মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটাতে হয় প্রবাসজীবন। হয়তো একেই বলে এক ধরনের দেয়ালবিহীন কারাগার। প্রবাসে সবাই ব্যস্ত যে যার কাজে। সবার একই চিন্তা কীভাবে বেশি উপার্জন করা যায়। মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানদের মান অভিমান পূরণ করতে গিয়ে তারা ভুলে যান নিজের শখ।
‘দীর্ঘ প্রবাস জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু লিখছি। হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন পরবাসে আমার মতো দুখী আর কেউ নেই। ভাবাই স্বাভাবিক, সত্যিই আমি দুখী পরবাসী। বলতে পারেন কষ্টবিলাসী। দেশে সবাই থাকার পরও প্রবাসে আমি একা বড়ই একাকিত্ব। হায়রে! জীবন।’
প্রবাসে কেউ কারো নয়, নিজেই নিজের আপন। প্রবাসীদের সব থেকে বড় সমস্যা হলো একাকিত্ব, আর এ কারণেই অনেক সময় অনেক ছোট সমস্যাগুলোও অনেক বেশি অস্থির ও যন্ত্রণা দেয়। আর প্রবাসীদের তার আপনজন বা প্রিয়জন কষ্ট দিলে সেটা সহ্য করার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলে। অনেকে একাকিত্বের কারণে আত্মহত্যাও করে। প্রবাসীরা তাদের আপনজন কত ভালবাসে সেটা শুধু সে নিজেই জানে।
প্রবাসীরা দুঃখ বিলাসী হবার কোনো অবকাশ নেই কারণ আমরা তো একটু সুখের আশায় পাড়ি দিয়েছি অজানার দেশে। আমাদের দুটি চোখ এক চিলতে সুখ দেখার জন্য অপলকে চেয়ে আছে দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর। দুঃখ নিয়ে বিলাসীতা করার সুযোগ আমাদের নেই।
দুঃখ নিবারণ করার ইচ্ছা নিয়ে মা মাটি ছেড়ে অজানা অচেনা এক দেশের মাটিতে আশার ঘর বেঁধেছি, আমরা দুঃখ বিলাসী নই, আমরা সুখের কাঙাল। বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সুখ খুঁজে বেড়াই। ঘুরে বেড়াই পরদেশের এপার-ওপার। কতকিছুই না করি সবকিছু তো লিখে বোঝানো সম্ভব নয়, অনুভবে আমাদের কষ্ট বোঝা যাবে।
দুঃখ বিলাসী ওরাই হয় যাদের জীবনে সুখের ছোঁয়া লাগে, যাদের জীবনে সুখ শান্তির নেই কোনো অন্ত নেই কোনো অভাব। ‘আমি তাদের কেউ নই, আমি এতটুকু সুখ সন্ধানী একজন খেটে খাওয়া মানুষ আমার জীবনে সুখের ছোঁয়া লাগেনি। প্রবাসী নিঃসঙ্গ জীবনে সুখ আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। সুখ খুঁজতে গিয়ে অবশিষ্ট সুখটুকু আমি হারিয়ে ফেলেছি।’
হাজারে একজনের ভাগ্যে যদি সুখ থাকে ৯৯৯ জন বুকভরা হাহাকার নিয়ে এই প্রবাসে ধুকে ধুকে মরছে, আমি ৯৯৯ জনের একজন তাই আমি আমার কথা বলবো ৯৯৯ জনের কথা বলবো। দু’একজনের সুখের কাহিনি নাইবা শুনলেন। আমাদের কথা শুনুন এবং জেনে রাখুন যারা প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার লড়াই করে, যারা সুখের তরে সুখ হারায় ওদের কথা জেনে রাখা খুবই জরুরি কারণ ওদের ত্যাগ তিতিক্ষার ফসল হলো দেশবাসী আপনজনের মুখের নির্মল হাসি।
সত্যি কথা বলতে কি, প্রবাসীর কষ্ট প্রবাসী ছাড়া আর কেউ বোঝে না। অনুমান করে সব কষ্ট বোঝা যায় না। অনুমান করে যদি প্রবাসীদের কষ্ট বোঝা যেত তাহলে এই লেখার প্রয়োজন হত না। আমি এসব কেন লিখছি? কেন প্রবাসীদের প্রতি আমার এই দুর্বলতা? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো আমি তাদের একজন।
প্রবাসীরা ভালো থাকুক। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সেই আমাদের অর্থনীতির চাকা হয় বেগবান। আমরা সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছি। সম্মান করা উচিত সব প্রবাসী ভাইদের। আর কোনো প্রবাসী ভাই যেন দুঃশ্চিন্তা করে বিদেশের মাটিতে প্রাণ না হারায় সেই কামনা। ভালো থাকুক প্রবাসীরা।

কেন ডেনিস পুরুষদের বিয়ে করছেন থাই মেয়েরা?

ডেনমার্কের ছোট্ট একটি একটি জেলা থাই যেখানে প্রায় ১০০০ থাই নারী বসবাস করছে। এটি মূলত বেড়েছে গত দশ বছরে কারণ সেখানে সোমাই নামে একজন সাবেক যৌনকর্মী আরো অনেক থাই নারীকে ডেনিশ সঙ্গী খুঁজে পেতে সাহায্য করেছেন।
সেক্স ট্যুরিজমের জন্য পরিচিত থাইল্যান্ডের পাতায়া শহরে পঁচিশ বছর আগে ভ্রমণে গিয়ে ছিলেন ডেনমার্কের নেইলস মলবায়েক। সেখানে তার পরিচয় হয় থাই নারী সোমাইয়ের সাথে।
সে সম্পর্কে নেইলস নিজেই বলছেন, ‘২৪ বছর আগে সেসব কিছুই আপনার মাথায় আসবে না, কেবল প্রেম ছাড়া।’
এখন একতলা একটি বাসায় তাদের আবাস সেখানে বসে যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন সোমাইয়ের পাশে তার দুই ভাগ্নি, যাদেরকে তিনি বড় করেছেন।
তাদের পাশেই বসা তার প্রাক্তন স্বামীর বোন। এবং তার পরেই উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডে তার নিজের গ্রাম থেকে আসা এক বান্ধবী।
টেবিলে যিনি খাবার পরিবেশন করছিলেন তিনি সোমাইয়ের ভাগ্নের সাবেক স্ত্রী যিনি সম্প্রতি এই শহরে এসেছেন।
এই টেবিলে বসা সকল নারীকে ডেনিশ পুরুষদের সাথে বিয়ের মাধ্যমে সঙ্গী খুঁজে দিয়েছেন সোমাই।
খবরের কাগজে সে থাই নারীদের প্রোফাইল দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতেন, এরপর তার বাড়িতেই সম্ভাব্য পাত্রদের সাথে তাদের প্রথম সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতেন এবং ভিনদেশের মাটি ও ভাষার মাঝে তাদের নতুন জীবন শুরুর জন্য বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
৩০ বছর আগে এই প্রত্যন্ত মৎস্য-প্রধান জেলাটিতে সোমাই ছিলেন একমাত্র থাই নাগরিক।
এখন সে এলাকাটি জুড়ে প্রায় এক হাজার জন থাই নারী, যাদের বেশিরভাগই বৈবাহিক সূত্রে বাসিন্দা।
ডেনিশ রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ মাধ্যম ডিআর-এর তথ্য মতে, পুরো দেশে ১২ হাজার ৬২৫ জন থাই নাগরিক রয়েছেন আর তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৪৯৫ জন নারী।
‘সোমাই কতজন থাই নারীকে বিয়েতে সহায়তা করেছেন?’- এ প্রশ্ন তাকে প্রায়ই শুনতে হয়। কিন্তু তার উত্তর, ‘আমি গণনা ছেড়ে দিয়েছি।’
১০ বছরের বেশি সময় ধরে বহু থাই-ডেনিশ জুটির ওপর নজর রাখার পর দুই পরিচালক সাইন প্লামবিচ এবং জানুস মেটয হার্টবাউন্ড নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন।
গতবছর টরোন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেটির প্রিমিয়ার শো হয়।
অ্যামেরিকান অ্যানথ্রোপলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ নৃবিজ্ঞানী বিষয়ক ফিচার ফিল্ম হিসেবে এবং ডাবলিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে হিউম্যান রাইটস ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড পায় ।
অন্য ধরনের ভালোবাসা
সোমাই পাতায়ায় কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হওয়া হবু বরের কাছ থেকে ১৯৯১ সালে পাওয়া চিঠি দেখান, যেখানে লেখা- ‘আমি উপলব্ধি করলাম যে আবার যদি তোমাকে দেখতে না পাই আমার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। তুমি চাইলে আমার সাথে এসে থাকতে পারো এবং ডেনমার্কে জীবন কেমন সেটাও জানতে পারবে।’
বর্তমানে ৬৬ বছর বয়সী সোমাই বাস্তব জীবনেও হুবহু যেন তথ্যচিত্রের চরিত্র, এখনো প্রাণবন্ত এবং সক্রিয়।
নিজের জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তার বক্তব্য, ‘আমি বিদেশীদের বোঝাতে চাই যে আমরা এখানে শুধু টাকার জন্যই আসিনি। থাই মেয়েরা এখানে আসে কাজের জন্য এবং আমরা প্রচুর পরিশ্রম করি। এটা ফুল বিছানো কোনো পথ নয়।’
সোমাইর কথা যেন তথ্যচিত্রেরই প্রথম দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেবে। যেখানে দেখা যায়, তার ভাগ্নি কেবলমাত্র দেশ ছেড়ে এসেছে এবং একজন ডেনিশ পুরুষের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আর তাদের মাঝখানে একমাত্র সেতুবন্ধন একটি থাই-ডেনিশ অভিধান।
১০ বছর ধরে নৃ-বিজ্ঞানী প্লামবিচ এবং পরিচালক মেটয থাইল্যান্ড ও ডেনমার্কে বহু দম্পতিকে অনুসরণ করেন।
সোমাইর ভাগ্নি যে বিয়ের জন্য এসেছে, একজন থাই নারীর সাথে বিয়ে বিচ্ছেদের পর একজন ডেনিশ পুরুষের দুর্দশা, একজন যৌনকর্মী যাকে পরিবারের দায়িত্ব নিতে থাইল্যান্ডে নিজের গ্রামে ফিরে যেতে হয়েছে। এবং সোমাই নিজে যিনি এখন থাইল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন।
২৫ বছর আগে সোমাই প্রথম একটি থাই-ডেনিশ জুটিকে গাঁটছড়া বাধার উদ্যোগ সম্পন্ন করেন।
মেয়েটি ছিল স্বামীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার তার গ্রামের একটি মেয়ে।
এবং এরপর ‘একটার পর একটা, আমার কাজিন, প্রাক্তন স্বামীর বোন এবং একই গ্রামের কেউ না কেউ। এরপর আমার ভাগ্নি।’ এভাবে আরো অনেককে তিনি আনেন থাইল্যান্ডে থেকে।
প্রক্রিয়া সম্পর্কে সোমাই জানান, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, সেসব কোপেনহেগেন থেকে কেউ না কেউ দেখে। এরপর আগ্রহী কাউকে কাউকে বাসায় আসতে বলা হয়।
জুটি মিলিয়ে দেয়ার কাজটি করলেও, এসবের বিনিময়ে কোনোদিন কোনোকিছু চাননি কিংবা পাননি সোমাই।
‘আমি কারো জন্য ভালোকিছু করতে পেরেছি যেটা তার পরিবারের আরো উন্নতির জন্য কাজে লেগেছে এতেই আমি গর্ববোধ করি। এমনো নারীরা আছে যাদের আগে কিছুই ছিল না, কিন্তু এখন তারা তাদের বাবা-মাকে খাবার কিনে দিতে পারছে, তাদের জন্য ঘর বানিয়ে দিচ্ছে।’
থাইল্যান্ডে এখনো যারা বিদেশীদের বিয়ে করে তাদের বিরুদ্ধে একধরনের কুসংস্কারপূর্ণ ধারণা প্রচলিত আছে, এমনকি আজকের যুগেও।
তথ্যচিত্রে দেখা যায়, অন্যান্য ডেনিশ নাগরিকদের পাশাপাশি সোমাই কঠোর পরিশ্রম করছেন।
এটাই কি ভালোবাসা?
জানতে চাইলে সোমাই বলেন, ‘এটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। আমরা যখন অল্পবয়সী ছিলাম বিষয়টি হয়তো তখন বিষয়টি একরকম ছিল না। এটা কঠিন বিষয়, এটা গভীর বন্ধন। একে অপরের প্রতি যত্নশীল হওয়া। অন্য ধরনের ভালোবাসা।’
১৯৯৯ সাল থেকে ডেনিশ পুরুষ ও থাই নারীর মধ্যে গড়ে প্রতিবছর ২৫৩টি বিয়ে হয়। বিচ্ছেদের হার ছিল ৬০-৬৫%।
দারিদ্র্য
শুধু থাই নারীদেরই নয়, যেকোনো দেশে নারীদের বিদেশী পুরুষদের বিয়ে করা এবং তাদের সাথে বিদেশে চলে যাওয়ার মানে হল দেশটিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য দায়ী।
১০ জনের পরিবারের জন্য খাবার জোটাতেই একদিন পাতায়ায় কাজের খোঁজে বের হয়ে গিয়েছিলেন সোমাই। যদিও কী কাজ করে তাকে এই অর্থ উপার্জন করতে হবে সেটা সম্পর্কেও তার পূর্ণ ধারণা ছিল। সেটা ছিল যৌনকর্মীর পেশা।
কবে থেকে থাই নাগরিকেরা বিদেশীদের বিয়ে করতে শুরু করে তার আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই। তবে এই ধারাটি চালু হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থেকে যখন থাইল্যান্ডকে আমেরিকা সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতো।
এসব নারীদের তাদের নিজেদের দেশ যা দিতে পারেনি ডেনমার্কে অভিবাসন তাদের সেটাই জুটিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু একইসাথে এটা কারো ব্যক্তিগত পছন্দ এবং বিশ্বায়নের অংশ।
সোমাই জানান, তার মতো যে কারো ক্ষেত্রে যেকোনোমূল্যে দেশ ছাড়ার চিন্তার পেছনে অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সন্তানদের শিক্ষা এবং বাবা-মায়ের সুস্বাস্থ্য।
থাইল্যান্ডে বসবাস দারুণ, কেউ মারা যাচ্ছে না। কিন্তু সেটা এর চেয়ে আর ভালো হবে না। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পর্যন্ত এমনই থাকবে।
>>>নয়া দিগন্ত,
সোমাইয়ের একজন ভাগ্নি এবং তার ডেনিশ স্বামী ও সন্তান - ছবি : বিবিসি

ইরানের পাথুরে গুহাময় ঐতিহাসিক গ্রাম কান্দোভন

কান্দোভন গ্রামে রয়েছে জীবনের সকল আয়োজন
ইরানের পূর্ব আজারবাইজানের ওস্কু উপশহরের একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবহুল ও ঐতিহাসিক গ্রামের নাম কান্দোভন। তাব্রিয শহর থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, ওস্কু শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সাহান্দ পর্বতের পাদদেশে এটি অবস্থিত। সাহান্দ পর্বতের আগ্নেয়গিরির প্রভাব এবং চমৎকার আবহাওয়াময় এই এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য গ্রামটির শোভা আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বের প্রস্তরময় বা পাথুরে গুহাময় তিনটি বিখ্যাত গ্রামের একটি হলো কান্দোভন। এ বিষয়টি কান্দোভনকে নজিরবিহীন সৌন্দর্যে ভূষিত করেছে। কান্দোভনের আরেকটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো- এখানে মানুষজন বসবাস করে অর্থাৎ এখানে জীবনের সকল আয়োজন রয়েছে
ইরানের কান্দোভন পল্লীতে জীবনের সাড়া আছে বহুকাল আগে থেকেই। পুরাতাত্ত্বিকগণ এই গ্রামটিকে ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকেই মানব বাস উপযোগী ছিল বলে মনে করেন। এখানে রয়েছে বড় বড় টিলা। এসব টিলার কোনো কোনোটির উচ্চতা চল্লিশ মিটারের মতো। এগুলোর বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে গোয়ালঘর, গুদাম এবং ছোটো ছোটো কামরা। দেখতে খুবই সুন্দর এগুলো। আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থার পর্যটকগণ এই গ্রামটি দেখে এটিকে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনগুলোর তালিকাভুক্ত করেছেন।
 
কান্দোভনের গ্রামগুলোতে মসজিদ, হাম্মাম, মাদ্রাসা, যাঁতাকলসহ সকল প্রয়োজনীয় সুবিধাদি রয়েছে। যে গুহাটিতে মসজিদ আছে ওই গুহাটি এখানকার সবচেয়ে বড় গুহা বা গহ্বর।
কান্দোভন গ্রামে ইরানের শীতপ্রধান পার্বত্য এলাকাগুলোর মতো কোথাও কোথাও মূল কক্ষেও তন্দুর রুটি তৈরির চুল্লি রয়েছে। তবে কান্দোভনের অধিকাংশ পরিবার সাধারণত ঘরের বাইরেই তন্দুর তৈরির চুল্লি ব্যবহার করে।
কান্দোভনের উপত্যকাগুলো বিশেষ করে উত্তর এবং দক্ষিণের শ্যামল উপত্যকাগুলো ইরানের পার্বত্য অঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো আবহাওয়াময় অঞ্চল বলে মনে করা হয়। এ উপত্যকায় মোটামুটি বড় একটা নদী এবং অনেকগুলো ঝর্ণাধারা বহমান। এই ঝর্ণাগুলো বিশুদ্ধ পানির উৎস। কান্দোভনের ঝর্নার খনিজ পানির কিছু ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বলা হয়ে থাকে কিডনির পাথর দূর করার ক্ষেত্রে এই ঝর্ণার পানি খুবই কার্যকর। কান্দোভনের আশেপাশের উপত্যকাগুলো পশুপালনের জন্যে খুবই উপযোগী।
মধু এবং দুগ্ধজাত পণ্যাদির জন্যে কান্দোভনের ব্যাপক সুখ্যাতি রয়েছে। এখানকার স্থাপত্যগুলোও বেশ আকর্ষণীয়। ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় কান্দোভনের নাম বহু আগেই স্থান পেয়েছে।

চাকরির জন্য যেসব প্রয়োজনীয় দক্ষতায় পিছিয়ে বাংলাদেশের তরুণরা

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে হ্যাট ওড়াচ্ছেন শিক্ষার্থীরা
বাংলাদেশের স্কুল-কলেজগুলো থেকে তরুণ-তরুণীরা যে শিক্ষা পাচ্ছে, তাতে তারা কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে আসে।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, বিআইজিডি এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এ জরিপটি চালায়।
সারা বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী চার হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণীর ওপর এ জরিপ পরিচালনা করা হয়।
সেখানে দেখা যায় যে, এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম্পিউটার ও ইংরেজি ভাষায় আত্মবিশ্বাসী মাত্র ১৬ শতাংশ।
এছাড়া অংশগ্রহণকারীদের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ মনে করেন যে, তাদের শিক্ষা চাকরি পাবার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
জরিপের গবেষকদের একজন নিম্মি নুসরাত হামিদ বলেন, বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশই তরুণ-তরুণী, যারা আগামীতে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে।
"তাই এই তরুণদের চাওয়ার পাওয়া বা সমস্যার বিষয়গুলো জানতে এবং কোন ধরণের ক্ষেত্রগুলোয় কাজ করলে তাদের সুবিধা হবে- সেই বিষয়গুলো তুলে ধরতে গবেষণাটি বেশ সময়োপযোগী।"
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আজকালকার তরুণরা কোন দিকটায় ভাল, তারা কোন বিষয়গুলো নিয়ে বেশি ভাবে সেই ব্যাপারে তাদের মতামত জানাটা জরুরি।"
দক্ষতার দিক থেকে এখনও পিছিয়ে আছেন বাংলাদেশের নারীরা
গবেষণা পরিচালনা করতে গিয়ে দেখা গেছে, শুধুমাত্র চাকরি নয়, কেউ যদি উদ্যোক্তা হতে চান, তাহলে তারা ব্যবসা করার পুঁজি কোথা থেকে পাবে, এমনকি নিজেদের চাহিদাগুলোর ব্যাপারে বেশিরভাগ তরুণ সচেতন না বলে জানান তিনি।
এক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মিজ হামিদ।
তিনি বলেন, "বাংলাদেশের যুব সমাজ স্কুল কলেজে যে শিক্ষা পাচ্ছে, সেটা তাদেরকে কর্মজীবনের জন্য পরিপূর্ণ রূপে তৈরি করতে পারছে না।"
"কেননা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরণের দক্ষতার শিক্ষার অভাব রয়েছে। আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তারা যেই দক্ষতা অর্জন করছে সেই দক্ষতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত চাকরি নেই।"
"আবার যেই চাকরিগুলো রয়েছে, সেগুলোয় ভাল করার জন্য যে দক্ষতা প্রয়োজন। সেই দক্ষতা আমাদের যুব সমাজের নেই," বলেন এই গবেষক।
যেমন কম্পিউটার পরিচালনায় দক্ষতা, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা অথবা কারিগরি যেকোন ধরণের প্রশিক্ষণ।
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ১৪% তরুণ-তরুণী কারিগরি প্রশিক্ষণ পেয়েছে।
আবার এই দক্ষতার মাপকাঠিতে দক্ষ তরুণের হার ২৪%- অর্থাৎ তারা তাদের কম্পিউটারে দক্ষতার ব্যাপারে বেশ আত্মবিশ্বাসী।
অথচ নারীদের কম্পিউটারে দক্ষতার হার মাত্র ১০%।
অন্যদিকে ইংরেজিতে দক্ষতায় এগিয়ে ২১% তরুণ। যেখানে নারীদের এই ভাষাগত দক্ষতার হার মাত্র ১৪%। অর্থ্যাৎ দক্ষতার দিক থেকে নারীরা এখনও অনেকটাই পিছিয়ে আছে।
এই ব্যবধান শহরের চাইতে গ্রামে আরও বেশি চোখে পড়ে।
এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, স্কুলে শিক্ষার মান তেমন উন্নত হয়।
আবার যেসব স্কুলে মানসম্মত পড়ালেখা হয়, সেখানে ভর্তি হওয়ার মতো সুযোগ বা সামর্থ্য নেই অনেকের।
গবেষণায় উঠে এসেছে, যেসব তরুণ-তরুণীরা এখনও লেখাপড়া করছেন, তাদের মূল লক্ষ্য থাকে পড়াশোনা শেষে দেশের বাইরে যাওয়া।
দেশে কর্মমূখী শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
কারণ দেশে থেকে কিছু করার ব্যাপারে তারা একদমই আশাবাদী না।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া পাড়ি জমাতে চান সবচেয়ে বেশি।
আবার যারা ইংরেজি ভাষা এবং কম্পিউটারে বেশ দক্ষ, তারা যেতে চায় অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশে।
এই দেশ ছাড়ার মূলে রয়েছে এই দেশের তরুণ সমাজের জন্য এখনও বড় ধরণের কোন রোল মডেল নেই। অন্তত ৫৪% শিক্ষার্থী তাই মনে করে।
এক্ষেত্রে সরকারের নেটওয়ার্কিং বাড়িয়ে এই শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের যুক্ত করতে আরও দক্ষ করে তোলা প্রয়োজন বলে মনে করেন মিজ হামিদ।
"সরকারি চাকরি তো সবাই করে। কিন্তু সরকারি চাকরির বাইরেও এই তরুণদের আরও অনেক সম্ভাবনাময় সুযোগ রয়েছে সেগুলো তাদের খুঁজে দিতে হবে।"
"তরুণ-তরুণীদের হতাশার অন্যতম কারণ, তারা মনে করে যে তাদের কথাগুলো শোনার মত কেউ নেই। অথচ এই তরুণরাই আমাদের পথ দেখাবে।"
পাঁচ ভাগের এক ভাগ শিক্ষার্থী মনে করেন যে তাদের শিক্ষা চাকরি পাবার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।