Friday, October 23, 2009

ঝাড়খন্ডে ‘ডাইনি’ অভিযোগে পাঁচ নারীর ওপর নির্যাতন

ভারতের ঝাড়খন্ডে ‘ডাইনি’ সন্দেহে পাঁচজন নারীর ওপর ন্যক্কারজনক নির্যাতন চালিয়েছে গ্রামবাসী। উগ্র গ্রামবাসী তাঁদের বিবস্ত্র করে শত শত লোকের সামনে হাঁটতে বাধ্য করেছে। এ সময় বেদম পেটানো হয়েছে তাঁদের। শুধু তাই নয়, ওই পাঁচজন নারীকে মানুষের মল খেতে বাধ্য করেছে গ্রামবাসী। স্থানীয় পুলিশ বলেছে, নির্যাতিত ওই নারীরা মুসলিম বিধবা। স্থানীয় পুরোহিতেরা এসব নারীকে ‘ডাইনি’ বলে ঘোষণা দেওয়ার পরপরই তাঁদের ওপর এই অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়।
ঝাড়খন্ডের দেওঘর জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পাথরঘাটিয়ায় গত রোববার এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ওই গ্রামে গিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত চারজনকে প্রেপ্তার করেছে। এ ঘটনায় ১১ জন গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ওই গ্রামে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশের কর্মকর্তা মুরারি লাল মিনা জানান, রোববার সকালে ওই পাঁচজন নারীকে একটি খেলার মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা দেখতে শত শত লোক ভিড় করে। তিনি বলেন, যখন নারীদের বিবস্ত্র করে পেটানো হচ্ছিল, তখন কেউ তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। নির্যাতিত নারীরা এখন পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, পাথরঘাটিয়া গ্রামের লোকজন বিশ্বাস করে যে ওই গ্রামের কিছু নারীর মধ্যে ‘পবিত্র আত্মা’ রয়েছে। তাঁরা ‘ডাইনি’ শনাক্ত করতে পারেন। এসব নারীই সম্প্রতি ওই পাঁচজন বিধবাকে ‘ডাইনি’ বলে চিহ্নিত করেন। তাঁদের এই ঘোষণার পর গ্রামবাসী ওই পাঁচজন নারীর বাড়িতে ছুটে যায়। গ্রামবাসী তাঁদের টেনেহিঁচড়ে পিটিয়ে পাশের একটি খেলার মাঠে নিয়ে যায়।
ভারতে ‘ডাইনি’ সন্দেহে এর আগে শত শত নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কুসংস্কারই হচ্ছে এসব নির্যাতনের পেছনের মূল কারণ। কিন্তু এই নির্যাতনের জন্য সাধারণত বিধবা নারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। কারণ, বিধবাদের মেরে ফেললে তাঁদের জমি ও সম্পদ সহজেই স্বার্থান্বেষী মহল দখল করে নিতে পারে।

যারা স্বাবলম্বী হতে চায় তাদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে- রংপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান বলেছেন, দেশে ইতিমধ্যে দিনবদলের কাজ শুরু হয়েছে। এক দিনে অবশ্য তা হবে না। তবে দিনবদল একদিন হবেই। তিনি বলেন, ‘যারা দেশকে বদলাতে চায় এবং নিজেদের অভাব দূর করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে চায়, তাদের পাশে আমাদের সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়াতে হবে।’
তিনি গতকাল বুধবার রংপুরে বেগম রোকেয়া মিলনায়তনে আরডিআরএস আয়োজিত ‘খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এ কথা বলেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আরডিআরএসের পরিচালক সেলিমা রহমান। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্থার পরিচালক শামসুজ্জামান। সেমিনারে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
আতিউর রহমান বলেন, ‘বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে আমাদের দেশ। ইতিমধ্যে আমাদের দেশের যে ক্ষতি হয়েছে তার জন্য আমরা ক্ষতিপূরণ চাই। এ জন্য উন্নত বিশ্বকে তহবিল দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যাওয়ার আগে আমরা এই তহবিলের ব্যাপারে আগাম ঘোষণা চাই।’
গভর্নর বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকার ‘গ্রিন এনার্জি তহবিল’ গঠনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে নতুন করে বনায়নের বিষয়ে জোর দিতে হবে।
আতিউর রহমান রংপুর অঞ্চলের চিরাচরিত মঙ্গা দূরীকরণে যারা সৃজনশীল ও সম্ভাবনাময় কাজ করছে, তাদের পাশে থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কৃষিঋণ প্রদান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চুপি চুপি কাগজের মাধ্যমে আর কৃষিঋণ দেওয়া যাবে না। প্রকাশ্যে ঋণ দিতে হবে। এ জন্য কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণা করা যাবে না।

প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই চাতলাপুর স্থলবন্দরে by মুজিবুর রহমান

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভারতীয় সীমান্তে অবস্থিত চাতলাপুর স্থলবন্দরে নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। খোলা আকাশের নিচে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে কার্যক্রম পরিচালনা করেন শুল্ক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ইমিগ্রেশন অফিসে নেই বিদ্যুত্সুবিধা।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর স্থলবন্দর ও বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার চাতলাপুর শুল্ক স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয় শমশেরনগর সড়ক ব্যবহার করে।
আর চাতলাপুর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে শমশেরনগর বাজারে একটি ভাড়া করা দুই কক্ষের ঘরে চাতলাপুর স্থলবন্দর শুল্ক অফিস রয়েছে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে শমশেরনগর থেকে শুল্ক কর্মকর্তারা চাতলাপুর চেকপোস্টে গিয়ে কার্যক্রম চালান।
ব্যবসায়ীরা জানান, তাঁরা যখন ট্রাকে করে চিপ পাথর, ইট ও মাছ নিয়ে চাতলাপুর স্থলবন্দরে যান, তখন শমশেরনগর থেকে শুল্ক কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে যান।
এ প্রসঙ্গে চাতলাপুর স্থলবন্দর শুল্ক কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতে যোগাযোগের জন্য সিলেট বিভাগের স্থলবন্দরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো হলো চাতলাপুর স্থলবন্দর। অথচ চাতলাপুর স্থলবন্দরে শুল্ক কর্মকর্তাদের বসে কাজ করার মতো কোনো ঘর নেই। রপ্তানিযোগ্য মালামাল খালাসের সময় তাঁরা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মালামাল পরীক্ষা করে কাগজপত্র সই করেন।’
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, এই স্থলবন্দরের বাংলাদেশ ও ভারতীয় অংশে কোনো ডাম্পিং স্টেশন (যেখানে মালামাল রেখে পণ্য পরিবহন করা হয়) নেই। তাই রপ্তানিমুখী সিমেন্ট, চিপ পাথর ও ইট খালাসে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। এতে ব্যবসায়ীদের বাড়তি অর্থ গুনতে হয়।
চাতলাপুর স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের উত্তর ত্রিপুরার জেলা কৈলাসহরে নিয়মিত রপ্তানি করা হচ্ছে সেভেন রিং ও ফ্রেস সিমেন্ট, প্রচুর পরিমাণে চিপ পাথর ও ইট। ভারতের ত্রিপুরায় এসব সামগ্রীর চাহিদার কারণে উত্সাহী বাংলাদেশি কয়েকজন রপ্তানিকারক নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে সিমেন্ট, চিপ পাথর, ইট ও মাছ রপ্তানি করছেন।
১৭ অক্টোবর দুপুরে সরেজমিনে চাতলাপুর স্থলবন্দর এলাকা ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
কথা হয় বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী খন্দকার এন্টারপ্রাইজের মালিক খন্দকার আতিক সেলিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ত্রিপুরায় বাংলাদেশি পণ্য ও নির্মাণসামগ্রীর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই তাঁরা চাতলাপুর স্থলবন্দর দিয়ে ত্রিপুরার ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো সিমেন্ট, চিপ পাথর, ইট ও মাছ রপ্তানি করছেন।’
অন্যদিকে ভারতীয় ফল কমলা লেবু, আদা, কাঁঠাল, কলাসহ অন্যান্য সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশে। তবে আমদানিকারকেরা জানান, কৈলাসহরের ব্যবসায়ীরা মানসম্পন্ন কমলা লেবু, আদা, কাঁঠাল ও কলা সরবরাহ করতে পারছেন না। তাই তাঁরা আপাতত আমদানি করতে পারছেন না।
ব্যবসায়ীরা বলেন, চাতলাপুর স্থলবন্দরের তেমন কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। বাংলাদেশি অংশে নেই কোনো ডাম্পিং স্টেশন। তবে মুক্তিযোদ্ধা এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. সালাউদ্দিন বলেন, তিনি অনেক কষ্টে চাতলাপুর স্থলবন্দরের বাংলাদেশ অংশে একটি ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের অনুমতি পেয়েছেন। তিনি আরও জানান, ভারতীয় অংশে কৈলাসহরেও নেই কোনো ডাম্পিং স্টেশন। তাই বাংলাদেশ অংশের রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে রেখে পরে ভারতীয় শ্রমিক দিয়ে তাঁদের ট্রাকে পণ্য তুলতে হয়।
বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা আরও বলেন, বিএসএফের কারণে পণ্যবাহী বাংলাদেশি ট্রাক ভারতীয় অংশে প্রবেশ করে মালামাল খালাস করতে পারছে না।
চাতলাপুর স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা এসআই কবির আহমদ বলেন, শমশেরনগর থেকে চাতলাপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্ত করা প্রয়োজন। প্রয়োজন স্থলবন্দর এলাকায় একটি ওয়্যার হাউস নির্মাণ ও বৈদ্যুতিক সুবিধা বৃদ্ধি করা। আর এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে স্থলবন্দরটির ব্যবহারোপযোগিতা বাড়বে।
এই বন্দর ব্যবহারকারী খন্দকার এন্টারপ্রাইজ, ক্রিসেন্ট ট্রেডিং, তাহরিম এন্টারপ্রাইজ, পিংকি ট্রেডাসের্র স্বত্বাধিকারীরাও তাঁদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে বন্দর উন্নয়নে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর সেপ্টেম্বর মাসে সিমেন্ট, ইট, চিপ পাথর ও মাছ রপ্তানি করে এই বন্দর ১৭ হাজার ৫১৬ ডলার আয় করেছে।

কিছু ছাড় দিয়েও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে ভারত -আগামী মাসে শেখ হাসিনার দিল্লি সফর নিয়ে ভারতীয় পত্রিকা

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। আগামী মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরকালে এসব প্রস্তাব দেবে ভারত সরকার। এবার ক্ষমতায় আসার পর এটিই হবে শেখ হাসিনার প্রথম ভারত সফর।
কলকাতাভিত্তিক দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ এ খবর পরিবশেন করেছে। এতে বলা হয়েছে, ভারত ত্রিপুরার সঙ্গে রেললাইন স্থাপনসহ বাংলাদেশের রেল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের প্রস্তাব দেবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, সিরামিক ও টাইলস পণ্য, পাদুকাসামগ্রী এবং ক্রীড়া সরঞ্জাম আমদানির বিষয়েও ইতিবাচক অবস্থান নিতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশি উত্পাদকেরা ভারতে এসব পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না।
নেতিবাচক বা স্পর্শকাতর পণ্যের তালিকা ছোট করার অংশ হিসেবে এসব পণ্য বাংলাদেশ থেকে আমদানির সুযোগ তৈরি করতে চায় ভারত।
ভারতের তৈরি স্পর্শকাতর পণ্য তালিকায় বর্তমানে ৪০০টি পণ্য রয়েছে। এ সংখ্যা আগে ছিল ৭০০। তবে তালিকাটি কাটছাঁট করে ছোট করা হলেও এতে তৈরি পোশাক ও ফুটওয়্যারের মতো পণ্যগুলো না থাকায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ রয়েছে। কারণ এগুলো বিশেষ করে তৈরি পোশাক হচ্ছে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য।
এদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনার সফরের সময় একটি বড় ধরনের চুক্তি সম্পাদন এবং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর কিছু বিষয় সমাধানের পরিকল্পনা আছে ভারতের।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসার ব্যাপারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাঁর অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিকেই সামনে এগিয়ে দিতে চান। এ ছাড়া তিনি রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও আলোচনার টেবিলে রাখতে আগ্রহী।
দিল্লিতে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রণব মুখার্জি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুসম্পর্কটাকেই কাজে লাগাতে চায় কেন্দ্রীয় সরকার। ভারত সরকার এবার প্রয়োজনে বাংলাদেশকে কিছু ছাড় দিতেও রাজি আছে বলে উল্লেখ করেন দিল্লির সরকারি কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ বরাবরই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ভারতের অনুকূলে থাকার কথা বলে আসছে। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতার দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে—এমন ধরনের অন্তত ২৭টি পণ্য ভারতে রপ্তানি করতে পারছে না। অর্থাত্ ভারতে এসব পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ।
২০০৭-০৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ৩৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই বছর ভারত থেকে প্রায় ১০ গুণ মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। ওই বছর ভারত থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে ৩৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য।
শেখ হাসিনার সফরকালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা ও বাংলাদেশের আখাউড়ার মধ্যে রেল যোগাযোগ চালুর ব্যাপারে আলোচনা করবে দিল্লি।
বাংলাদেশ অবশ্য ভিসাব্যবস্থা উন্মুক্ত করার কথা বললেও এর অপব্যবহার হবে—এমন আশঙ্কায় ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বিরোধিতা করে আসছে। তবে ভারত সরকার এবার মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা প্রদানের শর্ত শিথিল করতে পারে।

ঘাটতি কমাতে জাপানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পরামর্শ by সুনীতি বিশ্বাস

এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশ জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। জাপানের বাজারে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেও তা পরিমাণের দিক থেকে কম হওয়ায় ঘাটতি কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায় মনে করে, জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। আর রপ্তানি বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগও রয়েছে। এ জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বাজার উন্নয়নে সরকারকে ভূমিকা নিতে হবে। তা ছাড়া জাপানের মতো উন্নত দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করলে তা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে।
কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ সফরকালে জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (জেবিসিসিইসি) চেয়ারম্যান তোশিহিতো তামবা দুই দেশের মধ্যে এফটিএ করার প্রস্তাব দেন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি ছিল ৪০ কোটি ১২ লাখ ডলার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এ ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ কোটি ২৮ লাখ ডলার। অর্থাত্ ১০ বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জাপান থেকে ১০১ কোটি ৫৪ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। আগের ২০০৭-০৮ অর্থবছরে জাপান থেকে ৮৩ কোটি ২৪ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছিল। অর্থাত্ এক বছরের ব্যবধানে আমদানির পরিমাণ ২২ শতাংশ বেড়েছে।
একই সময় বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানির পরিমাণও কিছুটা বেড়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জাপানে ২০ কোটি ২৬ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়। তার আগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে জাপানে ১৭ কোটি ২৬ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। অর্থাত্ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানির পরিমাণও ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে জাপান থেকে ৪৯ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। আর এ সময় জাপানে নয় কোটি ২৮ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়। অর্থাত্ এ অর্থবছরে বাংলাদেশের ঘাটতি ছিল ৪০ কোটি ১২ লাখ ডলার।
ইপিবির তথ্যানুসারে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জাপানে প্রধান প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে পাঁচ কোটি ২৪ লাখ ডলারের ওভেন পোশাক, দুই কোটি ২০ লাখ ডলারের নিট পোশাক, এক কোটি ৬৪ লাখ ডলারের হিমায়িত খাদ্য, এক কোটি ৪৮ লাখ ডলারের চামড়া, এক কোটি ৪১ লাখ ডলারের পাট পণ্য রপ্তানি করা হয়। অন্যদিকে জাপান থেকে মূলত গাড়ি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়ে থাকে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘাটতি কমাতে হলে রপ্তানি বাড়াতে হবে। জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের নিট ও ওভেন পোশাক, পাদুকা, হিমায়িত খাদ্য প্রভৃতির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। ওভেন পোশাক রপ্তানিতে এক স্তরবিশিষ্ট রুলস অব অরিজিন সুবিধা পাওয়া গেলেও নিট পোশাকের রপ্তানিতে তিন স্তরবিশিষ্ট রুলস অব অরিজিন রয়েছে। ইউরোপের বাজারের মতো জাপানের বাজারেও দুই স্তরবিশিষ্ট রুলস অব অরিজিন সুবিধা পাওয়া গেলে নিট পোশাকের রপ্তানি প্রচুর পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব হবে। তিনি এ সুবিধা আদায়ের জন্য সরকারি পর্যায়ে আলোচনার দাবি জানান।
মো. ফজলুল হক বলেন, আগামী ২ নভেম্বর থেকে ঢাকায় তিন দিনব্যাপী নিট পোশাকের মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এই খাতে জাপানের ৩০ সদস্যবিশিষ্ট একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদল আসবে। তারা সফরকালে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি ও বিনিয়োগ সুবিধা খতিয়ে দেখবে।

বাংলাদেশের পাটসুতা এখন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন বাজারে by হানিফ মাহমুদ

দড়ি, কার্পেট, বস্তা এগুলোর বাইরে পাট যে উপকারে লাগতে পারে, এ কথা এক দশক আগেও কারও মুখে শোনা যেত না। সনাতনি এসব পাটপণ্য আশি ও নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিক বাজারে সিনথেটিকের সঙ্গে টিকতে পারছিল না। তখন প্রাকৃতিক এ তন্তুটি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাকৃতিক এই তন্তুটি এখন ফ্যাশন, বিলাস ও স্বস্তিদায়ক সব পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হতে শুরু করেছে। আর এই বাজারে প্রবেশ করছে বাংলাদেশের পাট বিশেষত, পাটসুতা।
বাংলাদেশের সরকারি পাটকলগুলো এখনো পাটের সনাতনধর্মী পণ্য দড়ি ও বস্তা তৈরি করলেও বেসরকারি খাতের একদল উদ্যোক্তা আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের সুতার যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, সেই বাজার ধরে ফেলেছেন। তাঁদের কারখানায় তৈরি পাটসুতা এখন রপ্তানি হচ্ছে তুরস্ক, সিরিয়া, চীন, ভারত, উজবেকিস্তান ও ইউরোপে।
দেশের অভ্যন্তরে ইতিমধ্যেই পাটসুতা ব্যবহার করে শাল বা চাদর তৈরি করা হচ্ছে। তবে পোশাক তৈরি সেভাবে শুরু হয়নি।
কিন্তু ভারতে এবং ইউরোপ-আমেরিকায় পাটসুতা ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের পোশাক। এ জন্যই বাড়ছে পাটসুতার চাহিদা।
পাটের তৈরি ফ্যাশনেবল পণ্যে সরু সুতার দরকার হয়। যেসব মিল উত্পাদকদের চাহিদা মেটাতে এখন সরু পাটসুতা তৈরি করছে, তাদের তালিকায় আছে আব্দুল মালেক জুট মিল, জনতা জুট মিল, সোনালী আঁশ জুট মিল, পূবালী জুট মিল প্রমুখ। দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা মোতাবেক এসব কারখানা উন্নতমানের পাটসুতা সরবরাহ করছে বলে বিজেএসএ সূত্রে জানা গেছে।
বহুমুখী বিচিত্র ব্যবহার: আমেরিকা, জাপান ও ইউরোপের বিখ্যাত মোটরগাড়ি নির্মাতারা গাড়িকে আরও পরিবেশবান্ধব করার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে গাড়ির আসন ও ম্যাটে পাটের তন্তু ব্যবহার শুরু করেছে। গাড়ির এসব আনুষঙ্গিক সামগ্রীর কাজ চলে প্রধানত, সিনথেটিক দিয়েই।
উন্নত বিশ্বে সব সময় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) পরিবেশে গাড়ি চালানো হয়। দীর্ঘ সময় এসি চালানোর ফলে গাড়ির ভেতরে যে গ্যাস নির্গমন হয়, তা কমাতে কিছু গাড়ির ভেতরে পাটের ব্যবহার করা হচ্ছে।
আবার তুলা ও পাটের সুতা মিলিয়ে তৈরি কাপড় অধিক স্বস্তিদায়ক। পাটের তন্তুর সঙ্গে পলিয়েস্টার, অ্যাক্রেলিক ও রেয়নের মিশ্রণে তৈরি হতে পারে উন্নতমানের কাপড়। পাটের সুতার জ্যাকেট ও প্যান্ট ইতিমধ্যেই ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
আমেরিকায় কাঠের বাড়ির দেয়ালে পাটের ছালা সেঁটে দিয়ে অধিক শীত ও গরম থেকে বাড়ির ভেতরের পরিবেশকে স্বস্তিদায়ক করা হচ্ছে।
এভাবে পাটের তন্তু ও পণ্য ব্যবহারের নতুনত্ব আসায় পাট আবার হারানো গৌরব ফিরে পেতে শুরু করেছে। জাতিসংঘ ২০০৯ সালকে প্রাকৃতিক তন্তুর বছর হিসেবে ঘোষণা করেছে।
বাংলাদেশের চিত্র: বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুসারে, বিগত পাঁচ বছরে তাদের সমিতির অধীনে মিল মালিকদের রপ্তানি দ্বিগুণ হয়েছে। এরাই মূলত বাংলাদেশ থেকে পাটের সুতা রপ্তানি করে থাকে। সংগঠনের সদস্যদের অধীনে ৫০টিরও অধিক মিল বর্তমানে সচল।
সংগঠনটির সূত্র অনুসারে, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে পাটের সুতা রপ্তানি হয়েছে ১০ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, যা ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ২৩ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে।
জার্মানির হামবুর্গ শহরে ডব্লিউজিসি নামের একটি সংস্থা সারা বিশ্বের প্রাকৃতিক তন্তুর যাবতীয় বাজারের মাসিক তথ্য জোগাড় ও সংরক্ষণ করে থাকে।
পাট-সম্পর্কিত তাদের ২০০৯ সালের আগস্ট মাসের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে যারা ভালো পাটসুতা তৈরি করে, তাদের সিংহভাগ কারখানারই পর্যাপ্ত কাজ আছে এবং তাদের পক্ষে নতুন করে আর কোনো কার্যাদেশ নেওয়া সম্ভব নয়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহমেদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে পাটের সুতা দিয়ে বহুমুখী পণ্য তৈরি হচ্ছে। মেয়েদের শাড়ির পাড় থেকে শুরু করে পাঁচতারা হোটেলের সংবাদপত্র রাখার ব্যাগ, ঘরের জানালার পর্দার কাপড়, সোফার কুশন কভার—এ সবকিছুতেই পাটের সুতা ব্যবহূত হচ্ছে
আহমেদ হোসেন অবশ্য এও বলেন, এটি দেশের মোট সুতা রপ্তানি বা দেশীয়ভাবে যে ব্যবহার, তার তুলনায় তেমন কিছু না। তবে বাংলাদেশে যারা সরু পাট সুতা তৈরি করে, তারা প্রত্যেকেই মনে করছে একটা ভালো যাত্রা শুরু হয়েছে।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পাট নিয়ে তাদের সমীক্ষায় বলেছে, সরকারের আর নতুন করে পাটকল বন্ধ করা উচিত হবে না। মিল কলকারখানাগুলো চালু রেখেই এগুলোকে সংস্কার, যন্ত্রপাতি নবায়ন ও জনবলকে যৌক্তিক করতে হবে। সরকারকে সামনে থেকে বেসরকারি খাতকে বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে। পাটশিল্পের উদ্যোক্তাদেরও নতুন নতুন পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হবে। শুধু সনাতন পণ্য নয়, নতুন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন নতুন পণ্য তৈরি করতে হবে।
বেসরকারি উদ্যোক্তাসহ সমাজের বিভিন্ন মহলের দাবিকে স্বাগত জানিয়ে সরকার গত মে মাসে ২২ সদস্যের একটি পাট কমিশন গঠন করেছে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি কাজী খলীকুজ্জমান আহমদকে এই কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।
কমিশন পাট ও পাটপণ্যের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চফলনশীল পাটবীজ উত্পাদন ও সংগ্রহ; সরকারি ও বেসরকারি পাটকলগুলোর বিদ্যমান সমস্যা নিরসন এবং পাটের নতুন বাজার সৃষ্টি ও বিদ্যমান বাজারকে ধরে রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে।
পাশাপাশি দেশে ও বিদেশে পাটের মেলা, বহুমুখী পাটপণ্যের উত্কর্ষ সাধনের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন, পাট খাতের প্রণোদনার জন্য শুল্ককাঠামো নিরূপণে সরকারকে সহায়তা দেওয়ারও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কমিশনকে।

গুরুতর অসুস্থ হুমা আকরাম

লাহোর থেকে বিমানটা উড়াল দিয়েছিল সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে। কিন্তু এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাঁর অবস্থা এতটা খারাপ হয়ে যায় যে জ্বালানির জন্য চেন্নাইয়ে থেমে ওখানেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে ওয়াসিম আকরামের অসুস্থ স্ত্রীকে।
লাহোর অ্যাপোলো হাসপাতালে ব্রেন টিউমারের চিকিত্সা চলছিল হুমার। মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পথেই ঘটে ওই ঘটনা। চেন্নাই থেকে সিঙ্গাপুর আরও চার ঘণ্টার পথ। চেন্নাইয়ে থামার পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ডাক্তাররা হুমা খানকে তাত্ক্ষণিকভাবে হাসপাতালে ভর্তি করাতে বলেন। চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে তাঁকে। তবে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, আকরামের স্ত্রীর অবস্থা ধীরে ধীরে আরও আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ছে। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে তাঁকে।
হুমার সঙ্গে বর্তমানে চেন্নাইয়ে আছেন স্বামী পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম ও তাঁর ভাই। চেন্নাইয়ে সাবেক ভারতীয় ওপেনার কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্তের ছেলের বিয়েতে আসা আরেক ভারতীয় ক্রিকেটার রবি শাস্ত্রীও খবর পেয়ে ছুটে গেছেন হাসপাতালে।

লারার উইন্ডিজ দুশ্চিন্তা

আগামী মাসেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তিন টেস্টের সিরিজ। ২৬ নভেম্বর ব্রিসবেনে শুরু হতে যাওয়া সিরিজে কেমন খেলবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল? ২০০৭ বিশ্বকাপ খেলে ক্রিকেট থেকে বিদায় নেওয়ার আগে ক্যারিবীয় ক্রিকেটের আশা-ভরসার প্রতীক হয়ে ছিলেন যিনি, সেই ব্রায়ান লারা কিন্তু আশাবাদ শোনাচ্ছেন না। বরং তাঁর শঙ্কা, অস্ট্রেলিয়ার দাপটে চিঁড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে যাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়া ক্যারিবীয়রা আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি থেকে বিদায় নিয়েছে প্রথম রাউন্ডেই। এর পর অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের পারফরম্যান্স কেমন হবে, সেটা অনুমান কারার জন্য ‘লারা’ হতে হয় না। তবে ১১৯৫৩ টেস্ট এবং ১০৪০৫ ওয়ানডে রানের মালিক বলছেন, গেইল-সারওয়ানরা ফিরলেও আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
কেন পারবে না, সেটাও যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিক। এক, বোর্ডের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই গেইলরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। জাতীয় দলে তাঁদের আবার ডাকা হলেও দীর্ঘ একটা সময় একত্রে না খেলার প্রভাব পড়বে তাঁদের পারফরম্যান্সে।
দুই, অ্যাশেজ হারের জ্বালা নিয়েই এই সিরিজ খেলবে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাশেজ হারের যন্ত্রণাটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওপর দিয়েই যাবে বলে শঙ্কা লারার, ‘অ্যাশেজ হারের পর চাপে থাকা অধিনায়কের নেতৃত্বে সিরিজ খেলবে তারা। চেষ্টা করবে দলকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসার। আমার ভয়, এতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের লেজেগোবরে অবস্থা হবে।’
প্রথম পছন্দের খেলোয়াড়েরা ফিরলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের পারফরম্যান্স কিছুটা ভালো হবে, তবে সেটা অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে বলে মনে করেন না লারা, ‘ভালো ক্রিকেট খেলতে পারলে, টেস্ট পাঁচ দিনে টেনে নিয়ে যেতে পারলে এবং হারার আগেই না হেরে বসলেই খুশি হব আমি।’
শুধু দলের অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের ভবিষ্যত্ নিয়েও ভাবছেন লারা। ক্যারিবীয় ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে স্যার ভিভ রিচার্ডস, গর্ডন গ্রিনিজদের মতো গ্রেট ক্রিকেটারদের পাশাপাশি নিজেরও বড় ভূমিকা রাখার প্রয়োজন অনুভব করছেন লারা, ‘অদূর ভবিষ্যতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটে আমাদের সবাইকে গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রাখতে হবে।’ শুধু ‘হবে’তেই থেমে থাকলেন না, অচিরেই ক্যারিবীয় ক্রিকেটের উন্নয়নে তাঁকে মাঠেও দেখা যাবে বলে জানালেন লারা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের চলমান অচলাবস্থা নিরসনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড ও প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের আলোচনায় আশার আলো দেখা যাচ্ছে বলেই খবর। ক্রিস গেইলের কণ্ঠেও আগের অনড় অবস্থান থেকে সরে আসার সুর, ‘আমাকে যদি কাজটা (নেতৃত্ব) চালিয়ে নিতে বলা হয়, আমি দায়িত্ব নিয়েই তা করব। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়কত্ব করাটা সব সময়ই সম্মানের। আমি সেটা করার জন্য সব সময়ই আগ্রহী।’
রামনরেশ সারওয়ান তো জাতীয় দলে ফিরতে রীতিমতো মুখিয়ে আছেন, ‘আবার মাঠে নামার সুযোগ পাওয়াটা আমাদের জন্য দারুণ হবে। এই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করাটা মিস করছি আমরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে এবং চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে খেলতে দেখা এবং সে দলে নিজের না থাকাটা ছিল অদ্ভুত একটা অনুভূতি। কিন্তু আমরা সমন্বিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এবং সে সিদ্ধান্তের পক্ষেই দাঁড়াতে হয়েছে আমাদের।’ একটা সমাধান যে আর বেশি দূরে নয়, সেটিও বোঝা গেছে সারওয়ানের কথায়, ‘আমরা এটা জেনে খুব খুশি যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড এবং প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন একটা সমঝোতায় আসতে পেরেছে এবং চূড়ান্ত সমাধানের জন্য কাজ চলছে।’
তাহলে কি অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই দেখা যাচ্ছে গেইল-সারওয়ানদের? ওয়েবসাইট।

পুসকাসের নামে পুরস্কার

ফুটবলে নতুন এক পুরস্কারের প্রবর্তন করেছে ফিফা। হাঙ্গেরির কিংবদন্তি ফুটবলার ফেরেঙ্ক পুসকাসের নামানুসারে এই পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে ‘পুসকাস অ্যাওয়ার্ড’। পুরস্কারটি দেওয়া হবে বছরের সুন্দরতম গোলের জন্য।
হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের কাছেই ফেলসুট গ্রাম। পুসকাস ফুটবল একাডেমিটাও এই গ্রামেই। পরশু এই গ্রামেই ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্ল্যাটার ঘোষণা করলেন পুসকাস অ্যাওয়ার্ডের। তখন পাশে ছিলেন পুসকাসের বিধবা স্ত্রী আর্জসেবেট পুসকাস। তিন বছর আগে ৭৯ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে ওপারে চলে গেছেন রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক স্ট্রাইকার।
পঞ্চাশের দশকে ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’ নামে বিখ্যাত হাঙ্গেরি দলের প্রাণপুরুষ ছিলেন পুসকাস। সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হাঙ্গেরির জার্সি গায়ে ৮৪ ম্যাচে গোল করেছেন ৮৩টি। মাঠে তাঁর ব্যতিক্রমী চলাফেরার কারণে ইংলিশরা তাঁর নাম দিয়েছিল ‘দ্য গ্যালোপিং মেজর’ আর বাঁ পায়ে গোলার মতো শটের কারণে রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকেরা ডাকত ‘বুমিং ক্যানন’ বলে। আর খর্বকায় ছিলেন বলে হাঙ্গেরিয়ানরা আদর করে ডাকত ‘লিটল ব্রাদার’।

ম্যাচপ্রতি সাড়ে ৩১ কোটি!

একটি ক্রিকেট ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচারের জন্য সাড়ে ৩১ কোটি রুপি! বাজারটা ভারত বলে কথা। ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠেয় একেকটি ম্যাচ দেখানোর জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বোর্ড বিসিসিআইকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেবে নতুন করে চার বছরের জন্য বিসিসিআইয়ের প্রচার-স্বত্ব পাওয়া নিম্বাস কমিউনিকেশনস। ২০১০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০১৪ সালের ৩১ মার্চ—এই মেয়াদকালের জন্য বিসিসিআইকে প্রায় ২ হাজার কোটি রুপি (৪৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) দেবে নিম্বাস। নিম্বাসের সঙ্গে ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিসিসিআইয়ের বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আগামী মার্চে।
আগের চুক্তিটি ছিল ৬১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের, নানা কারণে যা পরে কমে দাঁড়ায় ৫৪৯ মিলিয়নে। খোলা চোখে দেখলে তাই মনে হবে অর্থের অঙ্ক আগের চেয়ে কমেছে। কিন্তু রমরমা এই বাজারে বিসিসিআই নিশ্চয়ই আগের চেয়ে কম দরে ক্রিকেট বিক্রি করবে না! আসলে এবারের চুক্তির মধ্যে নেই ইন্টারনেট-স্বত্ব। এই খাত থেকে বাড়তি আরও ১০০ মিলিয়ন ডলার আয় হবে বলে আশা করছে বিসিসিআই। তা ছাড়া এবার ক্রিকেটের প্রতিটি সংস্করণের ম্যাচের জন্য একই পরিমাণ অর্থ পাবে বোর্ড। অর্থাত্ টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি—যাই হোক না কেন, বিসিসিআই ম্যাচপ্রতি পাবে সাড়ে ৩১ কোটি রুপি করে। আগামী চার বছরের ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রাম (এফটিপি) এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এফটিপিতে এবার ভারতের মাটিতে ম্যাচ আগের চেয়ে কম থাকতে পারে। সব মিলিয়ে তাই আগের চেয়ে বর্তমান চুক্তিতে বাড়তি লাভ হতে যাচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ।
বিসিসিআইয়ের বিপণন কমিটি দলীয় স্পনসরের জন্যও নতুন টেন্ডার আহ্বান করতে যাচ্ছে। বর্তমানে ভারতের দলীয় স্পনসর সাহারা।

ভারতকে সমীহই করছেন পন্টিং

মাত্রই চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতেছে অস্ট্রেলিয়া। আর ভারত সেমিফাইনালেই উঠতে পারেনি। ভারতের বিপক্ষে সাত ওয়ানডের সিরিজ খেলতে মুম্বাইয়ে পৌঁছে কাল অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক তারপরও বললেন, ভারতকে মোটেই হালকাভাবে নিচ্ছে না অস্ট্রেলিয়া।
‘ওয়ানডেতে ভারত খুব ভালো আর শক্তিশালী দল এবং আমরা তাদের খাটো করে দেখছি না’—বলেছেন পন্টিং। ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে অস্ট্রেলিয়া এখন এক নম্বর। তাদের পরই আছে ভারত। কাগজ-কলমে পিঠাপিঠি দুই দলের লড়াই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেটের প্রদর্শনী হবে বলেই ধারণা পন্টিংয়ের। অ্যাশেজ বললে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড বোঝায়। ভারত-অস্ট্রেলিয়া দ্বৈরথ সে রকম কোনো নামে পরিচিত না হলেও অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক বলছেন, ‘ভারতে এসে ভারতের বিপক্ষে খেলাটা সব সময়ই উপভোগ করি আমরা। কয়েক বছর ধরে আমাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যই সেটা ভালো।’
চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার আগে ভারত-অস্ট্রেলিয়া দুদলের জন্যই ভালো সময় যাচ্ছিল ওয়ানডেতে। অ্যাশেজে হারলেও সাত ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে অস্ট্রেলিয়া জিতেছে ৬-১-এ। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় তিন জাতি সিরিজ জিতেছিল ভারত। কিন্তু বীরেন্দর শেবাগ আর যুবরাজ সিংবিহীন ভারতের জন্য চ্যাম্পিয়নস ট্রফিটা হয়ে দাঁড়ায় ব্যর্থতার পাঁচালি। অস্ট্রেলিয়ার জন্য দুঃসংবাদ—ওয়ানডেতে আরও বেশি বিধ্বংসী এই দুই ব্যাটসম্যানই ফিরছেন আসন্ন সিরিজে। সেটা হয়তো মাথায় আছে পন্টিংয়ের। তবে ভারতকে নিয়ে না ভেবে সতীর্থদের মনে করিয়ে দিতে চাইলেন তাঁদের দায়িত্ব, ‘ইংল্যান্ড সফর এবং চ্যাম্পিয়নস ট্রফি মিলিয়ে গত কয়েক মাসে ওয়ানডেতে আমরা দারুণ খেলছি। উন্নতির এই ধারা আমাদের ধরে রাখতে হবে এবং পুরো সিরিজে সেরা খেলা খেলতে হবে।’
২০০৭ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত দুদলের সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় সিরিজটা জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু সে দলের মাইকেল ক্লার্ক ও অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস এবার দলে নেই। পিঠের ব্যথা সেরে গেলে ক্লার্ক অবশ্য সিরিজের মাঝপথে যোগ দিতে পারেন। তবে না দিতে পারলেও সমস্যা দেখছেন না পন্টিং। ক্লার্কের অনুপস্থিতিটাকে তিনি দেখছেন অনভিজ্ঞ তরুণদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে। অস্ট্রেলিয়া দলে একদমই নতুন খেলোয়াড় আছেন ভিক্টোরিয়ার বাঁহাতি স্পিনার জন হল্যান্ড। চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলতে ভারতেই আছেন তিনি।
ভারতীয় কন্ডিশনে অস্ট্রেলিয়ার জন্য বরাবরের সমস্যাটা এবারও আছে। স্পিন সহায়ক উইকেট নিয়েই যত ভয় পন্টিংয়ের। হল্যান্ডসহ আরও যাঁরা চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলছেন, ভারতীয় কন্ডিশনে তাঁদের ওপর তাই আস্থা রাখতে চাইছেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক, ‘তাঁরা এই কন্ডিশনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এটা আমাদের জন্য ভালো। তবে আরও ভালো হবে, যদি তাদের আমরা একটু তাড়াতাড়িই আমাদের সঙ্গে পেয়ে যাই। স্পিন বোলারদের আমাদের মিডল-অর্ডার কীভাবে সামলাবে সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ। আশার কথা, মাইক হাসি এখানে অনেক ক্রিকেট খেলেছে। আর শেন ওয়াটসন ও টিম পেইন তো স্পিন ভালোই খেলে।’

রফিক-তাণ্ডবে শিরোপা আবাহনীর by তারেক মাহমুদ

শামসুল হক
কী ছিল না এই ম্যাচে! দর্শক, দর্শকদের আবেগের বাড়াবাড়ি, আতশবাজির বর্ণচ্ছটা, ফানুস, টি-টোয়েন্টির উন্মাতাল ব্যাটিং কিংবা ক্রিকেটীয় শিহরণ—বিগ বস টি-টোয়েন্টি প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেটের আলোয় ভরা ফাইনাল এক মঞ্চে তুলে ধরল সবই। আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ ছাড়াও যে ফাইনাল হয় এবং সেই ফাইনাল দেখতে স্টেডিয়াম হয়ে যায় জনসমুদ্র—জানল বাংলাদেশের ক্রিকেট। আর ফাইনালের এই রং সবচেয়ে বেশি লাগল আবাহনীর গায়ে। গাজী ট্যাংককে ৫ উইকেটে হারিয়ে এবারের বর্ণিল টি-টোয়েন্টি লিগের শিরোপা-উত্সবটা যে তারাই করল।
একটা পর্যায়ে মনে হচ্ছিল গাজী ট্যাংকের দেওয়া ১৪৫ রানের টার্গেটও চোখ রাঙাবে আবাহনীকে। ৫৭ রানে নেই ৪ উইকেট, যাঁদের মধ্যে আছেন সেমিফাইনালের ম্যান অব দ্য ম্যাচ ইমরুল কায়েস, অধিনায়ক সাকিব আল হাসানও। কিন্তু আসল চমক নিয়ে যে অপেক্ষা করছিলেন মোহাম্মদ রফিক। পুরো টুর্নামেন্টেই যিনি ব্যাট হাতে অনুজ্জ্বল, ফাইনালে তিনিই হয়ে উঠলেন মহানায়ক। ২১ বলে অপরাজিত ৫০, ২টি চারের সঙ্গে ৬টি ছক্কা। রাজ্জাকের করা ১৮তম ওভারে ওঠা ২৩ রানে তাঁর একারই ২২! প্রথম বলে নাসির হোসেনের সঙ্গে প্রান্ত বদলের পরের বলে চার। এরপর পর পর তিন ছক্কা। অলক কাপালির করা ১৯তম ওভারে এল ১৪ রান, আরও দুটি ছক্কা। শেষ ৩ ওভারে প্রয়োজন ছিল ৪১ রান। ১৮ ও ১৯তম ওভারের তাণ্ডবের পর শেষ ওভারে আবাহনীর প্রয়োজনটা নেমে এল মাত্র ৪ রানে। জিয়ার প্রথম বলেই লং অফ দিয়ে রফিকের আরেকটি ছক্কা—বিজয়ের উত্সবে মাতোয়ারা আবাহনী।
মাতোয়ারা শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের দর্শকেরাও। খেলার শেষ দিক থেকেই কিছুটা নিয়ন্ত্রণহারা তারা। গ্যালারির এদিক-সেদিক দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে মাঠে ঢুকে পড়ার চেষ্টা, বোতল ছুড়ে মারা। স্বল্পসংখ্যক নিরাপত্তারক্ষী সাময়িকভাবে সে চেষ্টা আটকাতে পারলেও শেষ রক্ষা হয়নি। আতশবাজির উত্সবের পর পুরো মাঠই দর্শকারণ্য! সেখানে কে আবাহনী কে বা গাজী ট্যাংক, বোঝার উপায় ছিল না।
আবাহনী-মোহামেডান বললে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আর কোনো সমীকরণ লাগে না। নাম দুটোই যথেষ্ট চিরায়ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বোঝাতে। সেই অর্থে আবাহনী-গাজী ট্যাংক নিতান্তই একটা রুটিন ফাইনাল। তবে লড়াইয়ের উপাত্ত চাইলে এখানেও খুঁজতে পারেন। ‘আইসিএল বিদ্রোহ’ এখন অতীত অধ্যায় হলেও গাজী ট্যাংকের অলক কাপালি-শাহরিয়ার নাফীসদের নামের সঙ্গে ‘আইসিএল’ ব্যাপারটা চলেই আসে। অন্যদিকে আইসিএল খেলা আরেক ক্রিকেটার মোহাম্মদ রফিক ও মাহবুবুল করিমকে বাদ দিলে আবাহনী অনেকটাই প্রতীকী বাংলাদেশ দল। ইনজুরির কারণে খেলতে না পারলেও জাতীয় দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা আবাহনীর। আছেন সহ-অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। আছেন ইমরুল কায়েসও। কে জানে, দুই দলের আর কোনো শাখা-প্রশাখায়ও হয়তো লুকিয়ে আছে পক্ষ-প্রতিপক্ষ ব্যাপারটি।
টি-টোয়েন্টির অভিজ্ঞতায় কাগজ-কলমে আবাহনীর চেয়ে এগিয়েই ছিল গাজী ট্যাংক। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ঢেউটা যেখান থেকে প্রথম উঠল সেই আইসিএলে খেলা অলক কাপালি, শাহরিয়ার নাফীস, নাজিমউদ্দিন, ফরহাদ রেজারা এই দলে। অলক তো এক মৌসুম আইসিএল খেলেই হিট! আইসিএলের প্রথম সেঞ্চুরিয়ানও। প্রিমিয়ার ডিভিশন টি-টোয়েন্টি লিগে শুরু থেকে সেই ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিং ধরে রাখলেও কাল ফাইনালে আইসিএল-ফেরতদের কেউ নন, গাজীর ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এগিয়ে সোহ্রাওয়ার্দী আর নাঈম ইসলাম। ৮.৫ ওভারে ৬৬ রান তুলতে ৪ উইকেট হারালেও পঞ্চম উইকেটে ৭৮ রানের জুটি গড়ে এই দুই ব্যাটসম্যান অবিচ্ছিন্ন থাকলেন শেষ পর্যন্ত।
কিন্তু আইসিএল-সতীর্থদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মোহাম্মদ রফিক যে আবাহনীতে! শিরোপাও তাই আবাহনীর।

এমিলিকে পুরস্কার উত্সর্গ বুকোলার

পরশু রাতে স্থানীয় একটা হোটেলে চলছিল মোহামেডানের ডিনার পার্টি। ফেডারেশন কাপের শিরোপা ধরে রাখার আনন্দটা তাত্ক্ষণিকভাবে ওভাবেই পালন করেছে সাদা-কালোরা। ওই অনুষ্ঠানে খাওয়া-দাওয়া আর হইহুল্লোড়ের মধ্যে সবাইকে থামিয়ে হঠাত্ ঘোষণা দিলেন নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার বুকোলা—টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার ট্রফিটা তিনি একজনকে উত্সর্গ করবেন। কাকে?
তাঁরই সতীর্থ স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলিকে।
কাল এমিলিই খুলে বললেন পুরো ঘটনাটা, “টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম, সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার জন্য একে অন্যকে সহযোগিতা করব। মাঠে এমন যাতে না হয়, একজন অন্যজনকে বল দেব না। কাল ডিনার পার্টিতে সেই কথাটাই বলল বুকোলা। আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেছে, ‘এমিলি তোমাকে পুরস্কারটা উত্সর্গ করলাম আমি।’’
এবার ফেডারেশন কাপের গ্রুপ পর্বে ৩ ম্যাচে ১৯ গোল করেছে মোহামেডান। ১২টিই বুকোলা-এমিলি জুটির। সমান ৬টি করে। সব মিলিয়ে ৬ ম্যাচে ২৪ গোল, যার ১৫টিই এই জুটির। গত বি-লিগে ১৮ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা বুকোলা এই ফেডারেশন কাপেও ৮ গোল করে পেলেন সেই স্বীকৃতি। কাকতালীয়ভাবে, গত ফেডারেশন কাপেও ৮ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন বুকোলা। এবার এমিলির গোল ৭টি।
এমিলিকে এবার পাশে পেয়ে খুবই খুশি বুকোলা, ‘ও দারুণ স্ট্রাইকার। আমার সঙ্গে ভালো বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। আমি ফেডারেশন কাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছি এমিলির মতো খেলোয়াড়ের সঙ্গে জুটি গড়তে পেরে। এ জন্যই ভাবলাম, ওকেই পুরস্কারটা উত্সর্গ করে সম্মান জানাই। নিজেও সম্মানিত বোধ করছি।’
বুকোলা-এমিলি জুটির কাছ থেকে আসন্ন বাংলাদেশ লিগে আরও গোল চাইবে মোহামেডান। তবে আপাতত ফেডারেশন কাপ জয়ের আনন্দটাই উপভোগ করছে দলটি। কাল দিনের বেলা ছুটি দেওয়া হলেও রাতে আবার ডিনার হওয়ার কথা ছিল। রাত ৯টা নাগাদ খেলোয়াড়দের ক্লাবে চলে আসার জন্য বলে দেওয়া হয়। এই অনুষ্ঠানে খেলোয়াড়রদের জন্য বোনাস ঘোষণা দেওয়ার কথা শোনা গেছে বিকেলে ক্লাবে গিয়ে। তবে কাল অনুষ্ঠানটি হয়নি, আজ হবে।
ঠিক উত্সব বলতে যা বোঝায়, তার কিছু ছিল না কাল মোহামেডান ক্লাবে। সাংবাদিক এসেছে দেখে কর্মকর্তা লোকমান হোসেন এক কর্মীকে ডেকে মিষ্টি আনতে বললেন। মিষ্টি খাওয়া-খাওয়ি ভালোই হচ্ছে। ক্লাবে কেউ এলে তাঁকে মিষ্টিমুখ না করিয়ে ছাড়া হচ্ছে না। এরই ফাঁকে ‘মোহামেডানের হুজুর’ নামে পরিচিত আওলাদ হোসেনকে পাওয়া গেল ক্লাবের ভেতরে এক রুমে। এক সাংবাদিক তখন তাঁকে রসিকতা করে বললেন, ‘খুব আনন্দে আছেন মনে হচ্ছে। আপনার ছবিও দেখলাম ছাপা হয়েছে কাগজে।’ হুজুরের উত্তরে ছিল খানিক হতাশাই, ‘কই, আমার ছবি। কাইটা দিছে...।’
আবাহনী ক্লাবে ছিল শোকের আবহ। স্থানীয় খেলোয়াড়দের বেশিরভাগই ক্লাবে ছিলেন না। চার ঘানাইয়ান ইব্রাহিম, সামাদ, শেরিফ, আওয়ালরা নিজেদের রুমে টিভিতে সিনেমা দেখছিলেন। কেউ ইংরেজি ছবি, কেউ আবার হিন্দি ছবি দেখায় মগ্ন! ‘ভালো খেলেও টাইব্রেকারে হেরেছি আমরা। এটা নিছক দুর্ঘটনা’—এই বলে সিনেমা দেখায় মন দিলেন ইব্রাহিম।
সেখানে তাঁর মন বসছে বলে অবশ্য মনে হলো না!

কোপার সেরা ইনিয়েস্তা

গত বছর প্রশ্ন ছিল একটাই—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো না লিওনেল মেসি? কে পাবেন ইউরোপ-সেরার পুরস্কার? এবার রোনালদোর নামটা একটু কমই উচ্চারিত হচ্ছে। অনেকেরই ধারণা, এবার এই পুরস্কারটা আর্জেন্টিনার ‘ছোট্ট’ জাদুকর মেসির অধিকারেই যাবে।
তবে ব্যালন ডি’অর জয়ী রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক কিংবদন্তি রেমন্ড কোপা এই দলে নেই। সাবেক ফরাসি স্ট্রাইকারের মতে, এবারের ইউরোপ-সেরার পুরস্কারটা পাওয়া উচিত মেসির বার্সেলোনা সতীর্থ আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার। ‘এই মুহূর্তে আমার সেরা ইনিয়েস্তা। আমাকে বললে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই আমি ব্যালন ডি’অরটা ওকে দিয়ে দেব। মেসিকে রাখব দ্বিতীয় স্থানে’—ফ্রান্সের লেকিপ পত্রিকাকে বলেছেন ফ্রান্সের হয়ে ৪৫ ম্যাচ খেলে ১৮ গোল করা কোপা।
ইনিয়েস্তাকে কেন সেরা বলছেন ১৯৫৮ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ী ব্যাখ্যা করেছেন সেটিও, ‘অনেকবারই ইনিয়েস্তা ওর দলের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ওর কারণেই বার্সেলোনা অনেকগুলো প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।’ গত বছর বার্সেলোনার ‘ট্রেবল’ জয়ের পথে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইনিয়েস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই কোপার চোখে সেরা বানিয়েছে তাঁকে।
তিনি রেমন্ড কোপা বলেই তাঁর মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই। ১৯৫৬ সালে ইতিহাসের প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে খেলেছিলেন ফরাসি দল রিমসের হয়ে। সে ম্যাচে রিমস ৩-৪ গোলে হারলেও তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ রিয়াল তাঁকে দলে টেনে নেয়। আলফ্রেড ডি স্টেফানো ও ফেরেঙ্ক পুসকাসের সঙ্গে রিয়ালে দারুণ এক ত্রয়ী গড়েন কোপা। রিয়ালের পরের তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ জয়েও বড় ভূমিকা ছিল তাঁর। ১৯৫৮ সালে তো জিতেছেনই, আরও তিনবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন এই পুরস্কারের জন্য।

মেসি এবার রোনালদোরও ফেবারিট

বার্সেলোনা রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে ভালো, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চেয়ে লিওনেল মেসি—এমন মন্তব্য কার? ভাবছেন কোনো রিয়ালবিদ্বেষী পাঁড় বার্সা সমর্থকের? মোটেও না। খোদ রোনালদোর স্বীকারোক্তি এটি। ফ্রান্স ফুটবল ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় স্বীকার করে নিয়েছেন, রিয়ালের চেয়ে বার্সেলোনা অনেক ভালো খেলছে।
‘এটা সত্যি, বার্সেলোনা আমাদের চেয়ে ভালো খেলছে। কিন্তু এর কারণ তারা অনেক দিন ধরে একসঙ্গে খেলছে’—ওই সাক্ষাত্কারে বলেছেন রোনালদো। কিন্তু এই কথা শুনেই বার্সা সমর্থকদের আহ্লাদে আটখানা আর রিয়াল সমর্থকদের মুখ গোমড়া করার কারণ নেই। কারণ পরের বাক্যেই পর্তুগিজ উইঙ্গার বলে দিয়েছেন, “বার্সেলোনা এখন হয়তো আমাদের চেয়ে ভালো দল। কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো, ‘শেষ পর্যন্ত কারা হবে সেরা?’ আমাদের এর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”
এই মৌসুমের শুরুতে রিয়ালের খেলোয়াড় তালিকায় বেশ ওলটপালট হয়েছে। রোনালদোর পাশাপাশি কাকা, করিম বেনজেমা, জাভি আলোনসোর মতো তারকা খেলোয়াড়দের কিনে এনে দ্বিতীয় ‘গ্যালাকটিকোস’ গড়ে তুলেছে রিয়াল। কোচও পাল্টেছে। দায়িত্ব নিয়েছেন ম্যানুয়েল পেল্লেগ্রিনি। নতুন সব খেলোয়াড়, নতুন কোচ—পারস্পরিক বোঝাপড়ায় একটু সময় তো লাগবেই।
রোনালদো তাই বলছেন, ‘আমরা এখনো দল হিসেবে খেলছি না। এ জন্য আমাদের আরও পরিশ্রম করতে হবে। তবে আমরা সঠিক পথেই আছি। দলের মধ্যে দারুণ চেতনাবোধ কাজ করছে। কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা দারুণ দল হয়ে উঠব।’
ফ্রান্স ফুটবল ম্যাগাজিনটিই ইউরোপের বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার ব্যালন ডি’অর দিয়ে থাকে। গতবার যে পুরস্কার জিতেছিলেন রোনালদো নিজে। এবার সম্ভাব্য বিজয়ীর তালিকায় নাম আছে তাঁর। তবে রোনালদো জানিয়েছেন, গত মৌসুমের পারফরম্যান্স আর দলগত অর্জন বিবেচনায় পুরস্কারটা মেসির হাতেই ওঠা উচিত, ‘মেসিই ফেবারিট। কেন নয়? সে যদি জেতে, যোগ্যতম খেলোয়াড়টির হাতেই পুরস্কারটা উঠবে।’
গতবার বার্সেলোনা জিতেছিল শিরোপাত্রয়ী। দলে নতুন যোগ দেওয়া জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচসহ তাদের ছয়জন খেলোয়াড়ের নাম আছে ব্যালন ডি’অরের জন্য প্রাথমিকভাবে মনোনীতদের তালিকায়। রোনালদো বলছেন, ‘অনেক খেলোয়াড়ই আছে, এটা জিততে পারে। যেমন ধরুন জাভি হার্নান্দেজ, স্যামুয়েল ইতো, কিন্তু যুক্তিসংগতভাবে মেসিই ফেবারিট। সে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে, স্প্যানিশ লিগ জিতেছে। বার্সেলোনার খেলোয়াড়েরাই ফেবারিট। কারণ এ ধরনের পুরস্কার জিততে হলে আপনাকে বেশ কিছু ট্রফি যেমন লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে হয়। এ কারণে বার্সেলোনার অনেকেই এবার এটি জিততে পারে।’
এদিকে ইংলিশ ট্যাবলয়েড দ্য সানকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে রিয়াল আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জীবনের তুলনা করেছেন রোনালদো। জানিয়েছেন, রিয়ালে তিনি বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছেন, ‘মাদ্রিদে আপনি বেশি চাপ অনুভব করবেন। কিন্তু আমি এটা ভালোবাসি। এটাই আমাকে সামনে এগোতে সাহায্য করে। আমার কোচ ম্যানুয়েল পেল্লেগ্রিনি অবশ্যই স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের চেয়ে আলাদা। আসলে এখানে আমি অনেক বেশি স্বাধীন। নির্দিষ্ট ম্যাচগুলোতে আমি মাঠে অনেক বেশি জায়গা নিয়ে খেলছি।’
ম্যানইউয়ের হয়ে সব জিতেছেন রোনালদো। ব্যক্তিগত প্রাপ্তিও ছিল। কিন্তু রিয়ালে নতুন করে সব শুরু করতে চান বলেই জানালেন, ‘আমার মনে হয় আমি যেন সদ্যই জন্ম নেওয়া একটা শিশু। আমার যেন পুনর্জন্ম হয়েছে। ইউনাইটেডের হয়ে আমি ব্যালন ডি’অর বা বিশ্বসেরা খেলোয়াড় হয়েছি মানেই নয় আমার সব পাওয়া হয়ে গেছে। বরং আমার তো মনে হয় নিজের ক্যারিয়ার মাত্রই শুরু হলো আমার।’

হার্ভার্ডে বাংলাদেশ সম্মেলন -অন্য দেশ by ইব্রাহীম চৌধুরী

বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বিশ্বে নানামুখী প্রভাব রাখার জন্য খ্যাতিমান এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ক্যামব্রিজ নগরের খ্যাতি এ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই। ৯ ও ১০ অক্টোবর হার্ভার্ড চত্বরে সমবেত হয়েছিলেন বাংলাদেশি প্রাজ্ঞজনেরা। দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি, যাঁরা জ্ঞানে-গবেষণায় নিজস্ব পরিমণ্ডলে খ্যাতিমান, তাঁদের সমাবেশ ঘটেছিল হার্ভার্ডে। ‘পরবর্তী দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন: ধারণা এবং উদ্ভাবন’ বিষয়ে দুই দিনব্যাপী সম্মেলন হয়ে গেল।
জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশকে নিয়ে সম্ভাবনাময় সব গভীর আলোচনা, দেশের সার্বিক উন্নয়ন, সমস্যা ও অগ্রগতি নিয়ে গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ এবং প্রস্তাবনা প্রণয়নই ছিল এ সম্মেলনের লক্ষ্য।
সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (বিডিআই), ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (ডিডিবিএফ) এবং হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের এশ ইনস্টিটিউট অব ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি অলাভজনক সংগঠন হিসেবে ১৯৮৮ সালে বিডিআই যাত্রা শুরু করে। প্যানসেলভেনিয়া অঙ্গরাজ্য থেকে পরিচালিত এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষাবিদেরা। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিনিময়ে কাজ করার পাশাপাশি বাংলাদেশ নিয়ে এ সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কাজ করে আসছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানসম্পন্ন উত্পাদন, শ্রমমান বৃদ্ধি এবং জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে বিডিআই কাজ করছে। বোস্টনভিত্তিক বাংলাদেশি শিক্ষাবিদদের পৃথক সংগঠন ডিডিবিএফ। দলনিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার লক্ষ্য তাঁদের। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিসহ বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ডিডিবিএফ কাজ করে আসছে। বিশ্বময় গণতান্ত্রিক শক্তিকে জোরদার করার কাজে জড়িত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাশ ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইনোভেশন। গবেষণা, প্রকাশনা, প্রশিক্ষণ ও বিশ্বজুড়ে আন্তসংযোগের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশে এ ইনস্টিটিউট খ্যাতিমান। বৈষয়িক সমসাময়িক জটিল বিষয় নিয়ে সামাজিক গবেষণা, সমাধানের উপায় উদ্ভাবনে হার্ভার্ডের এ প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ যৌথ আয়োজন স্বভাবতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে যেসব বাংলাদেশি জড়ো হয়েছিলেন, নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাঁরা বিশেষজ্ঞ। স্বপ্রণোদিত হয়ে তাঁরা সময় দিয়েছেন দেশের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যন্ত অঙ্গরাজ্য থেকে তাঁরা ছুটে এসেছিলেন ক্যামব্রিজ নগরে। নিজেদের লব্ধ জ্ঞান-গবেষণাকে দেশের কাজে লাগানোর অদম্য ইচ্ছা থেকেই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলন উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে এসে যোগ দেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বেশ কয়েকজন বিজ্ঞ ব্যক্তি; সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক দুজন উপদেষ্টা, পত্রিকার সম্পাদক, মিডিয়া ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে হার্ভার্ড সম্মেলন হয়ে উঠেছিল তারকাময়। ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুদিনের সম্মেলনে সার্বক্ষণিক উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব ছিল এ সম্মেলনে।
বাংলাদেশ বিষয়ে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনে নানা বিষয়ে প্রায় দুই ডজন সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, সরকার পরিচালনা, শিক্ষা, অর্থনীতি, রপ্তানি, বিদ্যুত্, জ্বালানি, জলবায়ু, সংবাদমাধ্যমসহ মৌলিক ও জরুরি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। এসব আলোচনা শুধু বক্তব্য রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, প্রতিটি বিষয়ের গভীর পর্যালোচনা, তথ্য-উপাত্তসহ চুলচেরা বিশ্লেষণ ছিল সেমিনারগুলোতে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্জন ও পাহাড়সম প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেশের অদম্য জনগোষ্ঠীর সাফল্যকে চিহ্নিত করেই প্রতিটি আলোচনা গৃহীত হয়েছে। প্রতিটি আলোচনা ও সেমিনার ছিল নির্মোহ দলনিরপেক্ষ। কোনো রাজনৈতিক বিভাজন বা ভাবাদর্শের প্রভাব ছিল না এসব আলোচনা ও সুপারিশে।
বিষয়-বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণকারীদের কর্মযজ্ঞে সম্মেলনটি হয়ে উঠেছিল রীতিমতো আন্তর্জাতিক মানের। প্রতিটি বিষয় নিয়ে আলাদা গ্রুপে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা—মত পাল্টা মত উপস্থাপিত হচ্ছে, কখনো বিতর্ক করছেন প্রাজ্ঞজনেরা; সুপারিশ বেরিয়ে আসছে নতুন সব ধারণার সমন্বয়ে।
গণতন্ত্র ও সুশাসনবিষয়ক আলোচনাগুলো জমে উঠেছিল নানামুখী বিতর্কে। রাজনীতিতে পরিবর্তনের তীব্র জন-আকাঙ্ক্ষার কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। বেশির ভাগ আলোচকেরাই বলেছেন, একটি নির্দিষ্ট চক্রেই দেশের রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনীতির এ অচলায়তন ভাঙার তাগিদ এসেছে কোনো কোনো আলোচকের বক্তব্যে। গণতন্ত্রের যাত্রাপথ দীর্ঘ ও ধৈর্য ধারণের। আলোচকেরা বলেছেন, নানা অমসৃণ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ক্রমবিকাশমান। অগ্রযাত্রার মধ্য দিয়েই জনগণের সুনেতৃত্বের উন্মেষ ঘটবে বলে জোরালো আশাবাদ উচ্চারিত হয়েছে আলোচকদের কথায়।
দেশের শিক্ষানীতি নিয়ে সমন্বিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে জাতীয় অনৈক্য আমাদের বিপর্যয় বাড়াবে এমন আশঙ্কা উচ্চারিত হয়েছে দৃঢ়তার সঙ্গে। পর্যালোচনা ও বিলম্ব প্রক্রিয়ার ফলে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আলোচনায় একজন সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা বলেছেন, বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ণে ব্যর্থ হলে তা আর কখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের বিস্ফোরণ নিয়ে নানা সব কথা উচ্চারিত হয়েছে। সব বিষয় নজরদারি করার দায়িত্ব যাদের, তাদের নজরদারি কে করবে? প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম চমত্কার স্বাধীনতা ভোগ করছে বলে বক্তারা বলেন। ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে দ্রুত বিস্ফোরণ ঘটায় একটি অগোছালো অবস্থা বিরাজ করছে। সেমিনারে আলোচিত হয়েছে দেশের সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব আচরণবিধি (কোড অব কনডাক্ট) নিয়ে। আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা আন্তরিক, তা নিয়েও কথা উঠেছে। প্রেস কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার ব্যাপারে অনেকেই অভিমত প্রকাশ করেছেন।
হার্ভার্ড সম্মেলন থেকে গুরুত্বপূর্ণ সব প্রস্তাবনা বেরিয়ে এসেছে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এসব প্রস্তাবনা ও সুপারিশকে পাশ কাটানোর কোনো অবকাশ নেই। পরিবর্তনশীল বিশ্বের আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক উদ্ভাবনী ধারণায় প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করেছেন অংশগ্রহণকারীরা।
সম্মেলনের আয়োজকেরা জানিয়েছেন, তাঁদের এসব প্রস্তাবনা ও সুপারিশ সরকার, বিরোধীদলসহ বাস্তবায়নসংশ্লিষ্ট সব মহলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সরকারি দলের নেতৃস্থানীয় লোক, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘে নিযুক্ত দেশের স্থায়ী প্রতিনিধি। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকেও সম্মেলনকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছাড়াও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপস্থিতি ছিল সার্বক্ষণিক।
দেশের উন্নয়নবিষয়ক এসব মূল্যবান প্রস্তাবনা ও সুপারিশ বাস্তবায়নে যাঁরা জড়িত, বিষয়টি তাঁরা কতটা গুরুত্বসহকারে দেখছেন, তাই এখন দেখার বিষয়। দেশের উন্নয়নধারণায় এসব প্রস্তাবনা ছিল রাজনীতি-নিরপেক্ষ ও নির্মোহ। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব প্রস্তাবনা যাঁরা বাস্তবায়ন করবেন, স্বদেশে তাঁরা রাজনৈতিক পরিচয়ে চরমভাবে বিভক্ত। রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে শুরু করে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন, আন্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়নসহ বেশির ভাগ বিষয়েই বিভক্ত আমাদের রাজনীতিবিদেরা—হার্ভার্ডে সমবেত হওয়া বিজ্ঞজনদের কাছে এ বিষয়টি হয়তো বিবেচনায় ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্কতায় অংশগ্রহণকারীরা দেশের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁদের মধ্যে চিন্তা-চেতনার ঐক্য ছিল লক্ষণীয়। দেশের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে একাডেমিক পর্যায়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার সূত্র হতে পারে হার্ভার্ডে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সম্মেলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ এ সমাবেশটি। সম্মেলনে ভিন্ন পক্ষকেও সম্পৃক্ত করার কোনো উপায়-অবকাশ আছে কি না—এ নিয়ে আয়োজকেরা ভাবতে পারেন।
ইব্রাহীম চৌধুরী: প্রথম আলোর নিউইয়র্ক প্রতিনিধি।
ibrahim.chowdhury@gmail.com

শতবর্ষী কবির সম্মাননা -চারদিক by আরিফুল হক

কবি নূরুল ইসলাম। নামের শেষে যুক্ত রয়েছে কাব্যবিনোদ। তাঁকে সবাই কাব্যবিনোদ করে সম্বোধন করেন। অনেকেই আবার নানা বলে ডেকে থাকেন। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি ১০০ বছর পূর্ণ করেছেন। আর এ বছর অক্টোবরে এসে বাংলা একাডেমী তাঁকে সম্মাননা দেয়।
কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ রংপুর বেতারে স্ক্রিপট রাইটার ছিলেন। এ ছাড়াও বেতারের জনপ্রিয় দর্শকশ্রোতা ধারাবাহিক নিন্দালু ও ক্ষেতেখামারে অনুষ্ঠানে অভিনয় করে সুনাম কুড়িয়েছেন।
লিখেছেন অনেক কবিতা। রংপুরের মানসম্পন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে কবিতা পড়তে দেখা গেছে সব সময়। কবিতার সংকলনগুলোয় তাঁর কবিতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বয়সের ভারে তিনি এখন চলাফেরা করতে পারেন না। এর পরও বার্ধক্য শরীর নিয়েও যেন ছুটে যেতে চান অনুষ্ঠানগুলোতে। বয়সের ভারে বার্ধক্য হলেও মনে কিন্তু তিনি চিরসবুজ।
এই তো দুই বছর আগেও তিনি প্রতিদিন ভোরবেলা শহরময় হেঁটে বেড়িয়েছেন। তাও আবার খালি পায়ে। এ বিষয়ে কিছু একটা জানতে চাইলে উত্তর মিলেছে, ‘আমরা হইলাম মাটির মানুষ, মাটির গন্ধ ও স্বাদ নিতে নগ্ন পায়ে হাঁটার কী যে স্বাদ।’ হাঁটার সময় তাঁর হাতে দেখা যেত একটি গোলাপ ফুল।
কখনো তাঁকে মুখ ভার করে থাকতে দেখা যায়নি। সব সময় ছিলেন হাসি-খুশি। সবার সঙ্গেই করতেন তামাশা ও দুষ্টুমি। যেন শিশুর মতো স্বভাবসুলভ আচরণ ছিল তাঁর। কবির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই হলো গুলশান, শেফালী, পেয়ারা, হামার রংপুর।
বাংলা একাডেমী ১৪ অক্টোবর রংপুর টাউন হলে শতবর্ষী কবিকে সম্মাননা দেয়। এ উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী বইমেলাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মু. আব্দুল জলিল মিয়া। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক বি এম এনামুল হক।
বিকেলে কবিকে সম্মাননা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে এক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কারমাইকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. রেজাউল হক। কবি ও কবিতা নিয়ে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। অন্যান্যের মধ্যে আলোচনা করেন বাংলা একাডেমীর পরিচালক ড. আব্দুল ওয়াব ও শাহিদা খাতুন।
এ ছাড়াও রংপুরের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে আলোচনা করেছেন প্রবীণ সহিত্যিক ও লেখক সংসদের সভাপতি মতিউর রহমান বসনিয়া, ছান্দসিক সাহিত্যগোষ্ঠীর সভাপতি রোমেনা চৌধুরী, সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক মুহম্মদ আলীম উদ্দিন, নতুন সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক মহফিল হক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি কাজী মো. জুননুন, অভিযাত্রিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি এম এ বাশার, অঞ্জলিকা সাহিত্যপত্রের সম্পাদক দিলরুবা শাহাদত্, সাংস্কৃতিক সংগঠক মফিজুল ইসলাম, নজরুল মৃধা ও বাংলা একাডেমীর কর্মকর্তা আবিদ করিম।
দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছেন ছান্দসিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর শিল্পীরা।
কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ বর্তমানে বসবাস করছেন মেয়ের বাসায়। নতুন শালবনের ওই বাসাটির নামও তিনি দিয়েছেন ‘কবিকুঞ্জ’। কথা হয় তাঁর সঙ্গে। অনেক গল্পকথা। শেষমেশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার দুটি পঙিক্ত বলে উঠলেন, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’

হার্ভার্ডে বাংলাদেশ সম্মেলন -অন্য দেশ by ইব্রাহীম চৌধুরী

বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বিশ্বে নানামুখী প্রভাব রাখার জন্য খ্যাতিমান এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ক্যামব্রিজ নগরের খ্যাতি এ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই। ৯ ও ১০ অক্টোবর হার্ভার্ড চত্বরে সমবেত হয়েছিলেন বাংলাদেশি প্রাজ্ঞজনেরা। দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি, যাঁরা জ্ঞানে-গবেষণায় নিজস্ব পরিমণ্ডলে খ্যাতিমান, তাঁদের সমাবেশ ঘটেছিল হার্ভার্ডে। ‘পরবর্তী দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন: ধারণা এবং উদ্ভাবন’ বিষয়ে দুই দিনব্যাপী সম্মেলন হয়ে গেল।
জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশকে নিয়ে সম্ভাবনাময় সব গভীর আলোচনা, দেশের সার্বিক উন্নয়ন, সমস্যা ও অগ্রগতি নিয়ে গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ এবং প্রস্তাবনা প্রণয়নই ছিল এ সম্মেলনের লক্ষ্য।
সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (বিডিআই), ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (ডিডিবিএফ) এবং হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের এশ ইনস্টিটিউট অব ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি অলাভজনক সংগঠন হিসেবে ১৯৮৮ সালে বিডিআই যাত্রা শুরু করে। প্যানসেলভেনিয়া অঙ্গরাজ্য থেকে পরিচালিত এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষাবিদেরা। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিনিময়ে কাজ করার পাশাপাশি বাংলাদেশ নিয়ে এ সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কাজ করে আসছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানসম্পন্ন উত্পাদন, শ্রমমান বৃদ্ধি এবং জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে বিডিআই কাজ করছে। বোস্টনভিত্তিক বাংলাদেশি শিক্ষাবিদদের পৃথক সংগঠন ডিডিবিএফ। দলনিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার লক্ষ্য তাঁদের। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিসহ বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ডিডিবিএফ কাজ করে আসছে। বিশ্বময় গণতান্ত্রিক শক্তিকে জোরদার করার কাজে জড়িত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাশ ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইনোভেশন। গবেষণা, প্রকাশনা, প্রশিক্ষণ ও বিশ্বজুড়ে আন্তসংযোগের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশে এ ইনস্টিটিউট খ্যাতিমান। বৈষয়িক সমসাময়িক জটিল বিষয় নিয়ে সামাজিক গবেষণা, সমাধানের উপায় উদ্ভাবনে হার্ভার্ডের এ প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ যৌথ আয়োজন স্বভাবতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে যেসব বাংলাদেশি জড়ো হয়েছিলেন, নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাঁরা বিশেষজ্ঞ। স্বপ্রণোদিত হয়ে তাঁরা সময় দিয়েছেন দেশের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যন্ত অঙ্গরাজ্য থেকে তাঁরা ছুটে এসেছিলেন ক্যামব্রিজ নগরে। নিজেদের লব্ধ জ্ঞান-গবেষণাকে দেশের কাজে লাগানোর অদম্য ইচ্ছা থেকেই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলন উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে এসে যোগ দেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বেশ কয়েকজন বিজ্ঞ ব্যক্তি; সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক দুজন উপদেষ্টা, পত্রিকার সম্পাদক, মিডিয়া ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে হার্ভার্ড সম্মেলন হয়ে উঠেছিল তারকাময়। ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুদিনের সম্মেলনে সার্বক্ষণিক উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব ছিল এ সম্মেলনে।
বাংলাদেশ বিষয়ে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনে নানা বিষয়ে প্রায় দুই ডজন সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, সরকার পরিচালনা, শিক্ষা, অর্থনীতি, রপ্তানি, বিদ্যুত্, জ্বালানি, জলবায়ু, সংবাদমাধ্যমসহ মৌলিক ও জরুরি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। এসব আলোচনা শুধু বক্তব্য রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, প্রতিটি বিষয়ের গভীর পর্যালোচনা, তথ্য-উপাত্তসহ চুলচেরা বিশ্লেষণ ছিল সেমিনারগুলোতে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্জন ও পাহাড়সম প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেশের অদম্য জনগোষ্ঠীর সাফল্যকে চিহ্নিত করেই প্রতিটি আলোচনা গৃহীত হয়েছে। প্রতিটি আলোচনা ও সেমিনার ছিল নির্মোহ দলনিরপেক্ষ। কোনো রাজনৈতিক বিভাজন বা ভাবাদর্শের প্রভাব ছিল না এসব আলোচনা ও সুপারিশে।
বিষয়-বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণকারীদের কর্মযজ্ঞে সম্মেলনটি হয়ে উঠেছিল রীতিমতো আন্তর্জাতিক মানের। প্রতিটি বিষয় নিয়ে আলাদা গ্রুপে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা—মত পাল্টা মত উপস্থাপিত হচ্ছে, কখনো বিতর্ক করছেন প্রাজ্ঞজনেরা; সুপারিশ বেরিয়ে আসছে নতুন সব ধারণার সমন্বয়ে।
গণতন্ত্র ও সুশাসনবিষয়ক আলোচনাগুলো জমে উঠেছিল নানামুখী বিতর্কে। রাজনীতিতে পরিবর্তনের তীব্র জন-আকাঙ্ক্ষার কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। বেশির ভাগ আলোচকেরাই বলেছেন, একটি নির্দিষ্ট চক্রেই দেশের রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনীতির এ অচলায়তন ভাঙার তাগিদ এসেছে কোনো কোনো আলোচকের বক্তব্যে। গণতন্ত্রের যাত্রাপথ দীর্ঘ ও ধৈর্য ধারণের। আলোচকেরা বলেছেন, নানা অমসৃণ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ক্রমবিকাশমান। অগ্রযাত্রার মধ্য দিয়েই জনগণের সুনেতৃত্বের উন্মেষ ঘটবে বলে জোরালো আশাবাদ উচ্চারিত হয়েছে আলোচকদের কথায়।
দেশের শিক্ষানীতি নিয়ে সমন্বিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে জাতীয় অনৈক্য আমাদের বিপর্যয় বাড়াবে এমন আশঙ্কা উচ্চারিত হয়েছে দৃঢ়তার সঙ্গে। পর্যালোচনা ও বিলম্ব প্রক্রিয়ার ফলে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আলোচনায় একজন সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা বলেছেন, বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ণে ব্যর্থ হলে তা আর কখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের বিস্ফোরণ নিয়ে নানা সব কথা উচ্চারিত হয়েছে। সব বিষয় নজরদারি করার দায়িত্ব যাদের, তাদের নজরদারি কে করবে? প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম চমত্কার স্বাধীনতা ভোগ করছে বলে বক্তারা বলেন। ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে দ্রুত বিস্ফোরণ ঘটায় একটি অগোছালো অবস্থা বিরাজ করছে। সেমিনারে আলোচিত হয়েছে দেশের সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব আচরণবিধি (কোড অব কনডাক্ট) নিয়ে। আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা আন্তরিক, তা নিয়েও কথা উঠেছে। প্রেস কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার ব্যাপারে অনেকেই অভিমত প্রকাশ করেছেন।
হার্ভার্ড সম্মেলন থেকে গুরুত্বপূর্ণ সব প্রস্তাবনা বেরিয়ে এসেছে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এসব প্রস্তাবনা ও সুপারিশকে পাশ কাটানোর কোনো অবকাশ নেই। পরিবর্তনশীল বিশ্বের আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক উদ্ভাবনী ধারণায় প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করেছেন অংশগ্রহণকারীরা।
সম্মেলনের আয়োজকেরা জানিয়েছেন, তাঁদের এসব প্রস্তাবনা ও সুপারিশ সরকার, বিরোধীদলসহ বাস্তবায়নসংশ্লিষ্ট সব মহলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সরকারি দলের নেতৃস্থানীয় লোক, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘে নিযুক্ত দেশের স্থায়ী প্রতিনিধি। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকেও সম্মেলনকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছাড়াও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপস্থিতি ছিল সার্বক্ষণিক।
দেশের উন্নয়নবিষয়ক এসব মূল্যবান প্রস্তাবনা ও সুপারিশ বাস্তবায়নে যাঁরা জড়িত, বিষয়টি তাঁরা কতটা গুরুত্বসহকারে দেখছেন, তাই এখন দেখার বিষয়। দেশের উন্নয়নধারণায় এসব প্রস্তাবনা ছিল রাজনীতি-নিরপেক্ষ ও নির্মোহ। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব প্রস্তাবনা যাঁরা বাস্তবায়ন করবেন, স্বদেশে তাঁরা রাজনৈতিক পরিচয়ে চরমভাবে বিভক্ত। রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে শুরু করে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন, আন্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়নসহ বেশির ভাগ বিষয়েই বিভক্ত আমাদের রাজনীতিবিদেরা—হার্ভার্ডে সমবেত হওয়া বিজ্ঞজনদের কাছে এ বিষয়টি হয়তো বিবেচনায় ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানমনস্কতায় অংশগ্রহণকারীরা দেশের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁদের মধ্যে চিন্তা-চেতনার ঐক্য ছিল লক্ষণীয়। দেশের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে একাডেমিক পর্যায়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার সূত্র হতে পারে হার্ভার্ডে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সম্মেলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ এ সমাবেশটি। সম্মেলনে ভিন্ন পক্ষকেও সম্পৃক্ত করার কোনো উপায়-অবকাশ আছে কি না—এ নিয়ে আয়োজকেরা ভাবতে পারেন।
ইব্রাহীম চৌধুরী: প্রথম আলোর নিউইয়র্ক প্রতিনিধি।
ibrahim.chowdhury@gmail.com

দ্বিভাষী থেকে ভাষাহীন, অবশেষে দুর্বৃত্ত! -যুক্তি তর্ক গল্প by আবুল মোমেন

ব্রিটিশ আমলে ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালির উদ্ভব। এই শিক্ষিত বাঙালি ছিল দ্বিভাষী। তখন স্কুলের গণ্ডি পেরুলেই মোটামুটি মানের বাংলা ও ইংরেজি শেখা হয়ে যেত। সে আমলের অনেক মেট্রিকুলেটের ইংরেজি ভাষায় দখল ছিল রীতিমতো ঈর্ষণীয়।
তাঁদের কেবল ভাষায় দখল হতো না, ভাষা শেখার সূত্রে তাঁরা বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হতেন। এমনকি ইংরেজির সূত্রে পশ্চিমের জ্ঞানবিজ্ঞান ও মননচর্চার সঙ্গে গভীরভাবে একাত্ম হয়ে যেতেন। তাঁরা সাহিত্য এবং জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ কৃতীর সঙ্গেও পরিচিত হয়ে যেতেন।
আজ যে আমরা মূল্যবোধের অবক্ষয়ে, নীতি-আদর্শের দৈন্যে হাহাকার করি তার পেছনে শিক্ষার দৈন্য ও শিক্ষার অবক্ষয় যে বড় ভূমিকা রাখছে তা যেন ধরতে পারছি না।
স্কুলশিক্ষাকে ভাষা, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার মূল কাজ থেকে সরিয়ে নানা তথ্য-উপাত্ত ও সমস্যা জানা এবং সেসব মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ায় সীমাবদ্ধ করেছি। ফলে স্কুল দীর্ঘ দশ বছরেও ছাত্রকে মানুষ হওয়ার মূল উপাচার জীবনবোধ, বিচারবোধ, বিবেকবোধ ইত্যাদির জোগান দিতে পারে না। সেকালে স্কুলে স্কুলে এমন অনেক শিক্ষকই থাকতেন যাঁরা জ্ঞানচর্চার (এবং জীবনচর্চার) ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি তিনটি ভাষাতেই বা মাধ্যমেই হতেন দক্ষ। তাঁদের ইংরেজি, বাংলা ও গণিতে সমান পারদর্শিতা দেখা যেত। জ্ঞানচর্চা ও তার বাহনে দক্ষতার চর্চায় তাঁরা যেমন আনন্দ পেতেন, তেমনি জীবনের সার্থকতার বোধও পেতেন।
কাল বদলেছে, সেটা মানতেই হবে। কিন্তু জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব বা জ্ঞানচর্চার বাহনে দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব তাতে হ্রাস পেতে পারে না। আর মানুষের জন্য জীবনবোধ, বিচারবোধ, বিবেকবোধেরওবা গুরুত্ব হ্রাস পাবে কী করে?
মানুষের অর্থের প্রয়োজন বাড়তে পারে, চাকরির ধরন বদলাতে পারে, জীবনযাপনে পরিবর্তন আসতে পারে, চাহিদা-প্রয়োজনে নানা রূপান্তর ঘটতে পারে—কিন্তু এসব তো কোনোভাবেই মনুষ্যত্বের মৌলিক গুণাবলির পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। ফলে শিক্ষার উদ্দেশ্যের একটা চিরায়ত রূপ থাকার কথা, যা আমরা বিস্মৃত হচ্ছি কিংবা গুরুত্ব দিচ্ছি না।
জাতীয়ভাবে আমাদের জ্ঞানচর্চা ও জীবনসাধনার অবক্ষয়ের ইতিহাস নাড়াচাড়া করলে আমরা একে শিক্ষার অবক্ষয়ের ফলাফল হিসেবেও দেখতে পারি। আমরা যেন একদিক গোছাতে গিয়ে অন্যদিক সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েছি বারবার। তাতে অগ্রযাত্রা ভারসাম্যপূর্ণ হয়নি, হয়নি টেকসই।
ষাটের দশকের মধ্যভাগ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটতে থাকে। বাঙালির সে অবিস্মরণীয় জাগরণের ফলে শেষ পর্যন্ত আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পেয়েছি। বাংলা ভাষার পরিণতি, ভাষাগত দক্ষতা-পূর্ণতা অর্জন বিলম্বিত হয়েছে কারণ বাংলা বস্তুত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কখনো সরকারি ভাষা (বা রাষ্ট্রভাষা) ছিল না।
সংস্কৃত, পালি হয়ে ফার্সিও অনেককাল দরবারি ভাষা ছিল। পরে ইংরেজি এল এবং তার হাত ধরে এ দেশে ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন এবং বাংলা ভাষা-সাহিত্যের দ্রুত বিকাশ ঘটেছে।
এদিক থেকে বলা যায়, বাঙালির আধুনিক মন-মানসের বিকাশে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য এবং পাশাপাশি মাতৃভাষা বাংলার ছিল মূল ভূমিকা। ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতায় এ মানসের সূচনা হলেও শিক্ষার মাধ্যমে তা-ই সারা বাংলায় ছড়িয়েছে। ১৯১৪ সালে মাদ্রাসাশিক্ষায় নিউস্কিম প্রকল্প প্রবর্তনের ফলে মুসলিম সমাজেও এই একই মনমানসের বিস্তার ঘটে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রশ্নটা স্বীকৃতির পর্যায়ে চলে আসে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান গৃহীত হলে তাতে বাংলা উর্দুর সঙ্গে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। তবে তার পরও কেন্দ্রীয় সরকারের সব কাজকর্ম চলছিল ইংরেজি ভাষায়। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে ক্রমে ক্রমে বাঙালি জাতীয়তার চেতনা জোরদার হয়ে ওঠে এবং আন্দোলনের একপর্যায়ে জাতীয় বিকাশের প্রশ্ন তীব্রতর হতে থাকলে জাতীয় জীবনে ক্ষমতার রাজনীতি বা ক্ষমতাদখলের রাজনীতি জোরদার হয় ও মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে। এই সময় থেকে ছাত্রদের জীবনে এবং শিক্ষিত নাগরিক জীবনে রাজনীতি চরম ও পরম বিষয় হয়ে উঠতে থাকে। জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য পাঠ কিংবা জীবনচর্চার বৃহত্তর, ব্যাপ্ততর ও গভীরতর অনুষঙ্গগুলো গুরুত্ব হারাতে থাকে। বলা যায়, এ সময় থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের বিশাল সম্ভাবনা ও প্রাপ্তির নিচে জীবনসাধনার গভীর-সূক্ষ্ম বিষয়গুলো যেন হারিয়ে গেল। স্বাধীনতার পরে সংগত কারণেই বাংলা সরকারি ভাষা বা রাষ্ট্রভাষার যথার্থ মর্যাদা পেল। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জন-প্রাপ্তির টালমাটাল সময়ে সমাজ বিনির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র শিক্ষা সঠিক গুরুত্ব পায়নি, ভাষাচর্চা একেবারেই উপেক্ষিত হলো। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ইংরেজির অবস্থান দুর্বল হলো আর রাষ্ট্রশক্তির দূরদর্শিতার অভাবে ইংরেজি-বাংলা সব ভাষাচর্চা, সাহিত্যপাঠ এবং জীবনসাধনার বিষয়গুলো চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল আর ভোগ-বিলাসের দিকে ঝুঁকতে থাকল। সেই ধারা উত্তরোত্তর কেবল বেগবান হয়েছে এবং পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
এই অবক্ষয়ের ফলে একটি দ্বিভাষী শিক্ষিত সমাজ দৃশ্যত একভাষী হয়ে গেল আর কার্যত ভাষাহারা হয়ে পড়ল। কারণ স্বাধীনতা-উত্তর নৈরাজ্য ও ডামাডোলে আদতে ভাষাচর্চাই গুরুত্ব হারিয়ে বসেছিল, এবং সাহিত্যের সহযোগ ব্যতীত ভাসা-ভাসাভাবে নিছক ভাষার চর্চা ছাত্রদের মানসলোকে কোনো স্থায়ী দাগ কাটেনি, তাদের সাংস্কৃতিক চেতনার উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। ফলে জাতি এক অর্থে ভাষাহারা এবং জীবনবোধ-হারা হয়ে পড়েছে। এ বাস্তবতায় বরং শিক্ষার আলো ও সুবিধাবঞ্চিত বিরাট দরিদ্র জনগোষ্ঠীই তাদের মাটিসম্পৃক্ত লোকজ সংস্কৃতির মাধ্যমে আমাদের সমাজকে কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে। ঠিক যেভাবে বিপুল দরিদ্র কৃষকসমাজ তাদের উদয়াস্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড সোজা রেখে চলেছে আজ বহুকাল। জিডিপির সিংহভাগ জোগানদাতা তারাই।
এদিকে গত শতাব্দীর শেষের দিক থেকে প্রথমে ঢাকায় ও পরে সারা দেশে ইংরেজি শেখার ধুম পড়ে যায়। প্রথমে এটা ধনীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, ক্রমে তা মধ্যবিত্ত হয়ে এখন নিম্ন মধ্যবিত্ত পর্যন্ত পৌঁছেছে। বাঙালি হুজুগে জাতি—এটা আমরা সবাই জানি। একবার হুজুগে মেতে উঠে ইংরেজিকে চরম অবহেলা করেছে, এমনকি বাংলা ভাষা চর্চায়ও প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেয়নি। বাঙালি হুজুগে মেতে জাতীয়তাবাদী হলেও জীবনে আর ধ্যানধারণায় সে আজ একেবারে সর্বাংশে পশ্চিমের মুখাপেক্ষী। পশ্চিম থেকে নানা ধুয়া শুনে সে দোহারকির কাজ করে তা এ দেশে চালানোর চেষ্টা শুরু করে। এখন স্কুলশিক্ষায় সাহিত্য কৌলীন্য খুইয়ে ব্রাত্যজন, বৃত্তি-পেশা এমনই গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে যে জীবনসাধনার প্রাথমিক রসদগুলোও আর স্কুল থেকে অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-উকিল-ব্যবসায়ী-প্রশাসক মিলছে ভূরি ভূরি কিন্তু মানুষের আকাল কেবলই বেড়ে চলেছে।
একজন মানুষের খাঁটি মানুষ হওয়ার জন্য শিকড়ও চাই, সঠিক বাতাবরণও প্রয়োজন। সেটাই সংস্কৃতি। স্কুল সে কাজ করা থেকে বিরত রয়েছে আজ বহুকাল। একালে শিক্ষার একটাই ফসল—তা হলো পরীক্ষায় সাফল্য। এই ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করে শিক্ষকেরা শিক্ষাকে তাঁদের জীবনমান বাড়ানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করে চলেছেন। ফলে শিক্ষককে কেন্দ্র করে স্কুলে যে শিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে ওঠার কথা সে কাজ হতে পারে না। ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্রীদের শতকরা ৯৯ জনের পক্ষে এ জীবনে আর বঙ্কিম-শরত্চন্দ্র-মীর মশাররফ-তারাশঙ্কর-বিভূতি-মানিক পড়ার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। থাকবে না মাইকেল-লালন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ-জসীমউদ্দীন-শামসুর রাহমানের কবিতার রস আস্বাদনের উপায়।
এদের ডিঙিয়ে যখন বাউল গানে ভক্তি দেখা যায় তখন তা ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি একজন বিদেশির কৌতূহলী উত্সাহের সঙ্গেই তুলনীয়। কারণ ভাষার যে ব্যঞ্জনা, নানা ভাবগত, ইতিহাসগত অনুষঙ্গ থাকে এবং যা ভাষার ব্যবহারিক প্রকাশে অনবরত বিস্তৃত-সমৃদ্ধ হতে থাকে, যা সাহিত্যের মাধ্যমে সঞ্জীবিত-সৃজিত হতে থাকে তা ক্রমেই এদের কাছে দুর্বোধ্য অচেনা হয়ে পড়বে। এরা কেবল অল্প কিছু চেনা শব্দের মাধ্যমে কোনোমতে কথাটুকু বলতে পারবে। কান পাতলেই এবং খেয়াল করলেই ধরা পড়বে যে এসব বঙ্গসন্তানের শব্দভাণ্ডার কতই ক্ষীণ, প্রমিত বাংলায় মনের ভাব প্রকাশে কতটা অক্ষম হয়ে পড়ছে তারা।
আবার যে ইংরেজি শেখা হচ্ছে তা কথা বলায় পারদর্শিতাটুকুই এনে দিচ্ছে কিন্তু গভীর জটিল মৌলিক ভাবনা লেখার মতো দক্ষতা তাতে অর্জিত হয় না। কারণ ভাষা তো সজীব প্রাণবন্ত বিষয়, তাই জীবন্ত-সংস্কৃতির যোগ ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় মৌলিক কিছু লেখা কঠিন।
এভাবে আমরা সমৃদ্ধ দ্বিভাষী শিক্ষিত সমাজকে কখনো একভাষী কখনো ভাষাহীন (অর্থাত্ বোবা), কখনো বা ভাষাবিকৃতি-কবলিত, আর কখনো ভাষা-সংস্কৃতিহীন মানুষে রূপান্তরিত করছি। এভাবে আমরা মানুষ হিসেবে কেবল দীন হচ্ছি তা নয়, গুণগতভাবে খারাপ হয়ে পড়ছি।
দেশে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন দুর্বৃত্তের সংখ্যা এমনি এমনি বাড়ছে না।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

বাংলাদেশে সমাজকর্মে উচ্চশিক্ষা -শিক্ষা by মুহাম্মদ সামাদ

১৮৯৮ সালে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে এবং বিশ শতকের গোড়া থেকে ইউরোপসহ বিশ্বের উন্নত-উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সমাজকর্ম একটি ব্যবহারিক সামজিক বিজ্ঞান হিসেবে পঠিত ও অনুশীলিত হয়ে আসছে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকা শহরে অভিবাসী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রচলিত সামাজিক সেবাব্যবস্থা অনেকটা অপ্রতুল ও অকার্যকর প্রতীয়মান হয়। ফলে শহরের সামাজিক সেবা খাতকে উন্নত, কার্যকর ও সহজলভ্য করার লক্ষে সমাজকর্মের পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ১৯৫৪ সালে তত্কালীন সরকারের উদ্যোগে ও জাতিসংঘের সহায়তায় বংলাদেশে প্রথম সমাজকর্মের পেশাগত প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এ প্রশিক্ষণ ছিল নয় মাস মেয়াদি। এ প্রশিক্ষণ চলাকালেই সমাজকর্ম বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাস্টার্স কোর্স চালুর প্রস্তাব গৃহীত হয়। অতঃপর ১৯৫৮ সালে ঢাকায় ‘কলেজ অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এ দেশের সমাজকর্মের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৩ সালে এটি ‘সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট’রূপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত হয়ে অদ্যাবধি সমাজকল্যাণ বা সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি দিয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯২ সালে জগন্নাথ কলেজ, ১৯৯৩ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পর্যায়ক্রমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন কলেজে সমাজকর্মে উচ্চশিক্ষা চালু হয়েছে।
এ বছর আমেরিকা তথা সারা বিশ্বের সমাজকর্মশিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সংস্থা ‘কাউন্সিল অন সোশ্যাল ওয়ার্ক এডুকেশন (সিএসডব্লিউই)’ পরিচালিত ‘ক্যাথেরিন ক্যানডাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যাল ওয়ার্ক এডুকেশন’-এ আমার একটি ফেলোশিপ করার সৌভাগ্য হয়। আমার গষেণার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সমাজকর্ম শিক্ষা ও সিএসডব্লিউইর অ্যাক্রিডিটেশন অভিজ্ঞতা’। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমাজকর্ম একটি পেশাগত বিষয় এবং এর পাঠদানে সিএসডব্লিউইর অ্যাক্রিডিটেশন বা অনুমোদন বাধ্যতামূলক। বর্তমানে সিএসডব্লিউইর অনুমোদন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয় সমাজকর্ম বিষয়ে উচ্চশিক্ষা দিয়ে আসছে।
এবার আসি অনুশীলন বা পেশাগত দিকে। যুক্তরাষ্ট্র বা যেসব দেশে সমাজকর্মের পেশাগত স্বীকৃতি রয়েছে, সেসব দেশে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর দুই বছর শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে হয়। তারপর চিকিত্সক-আইনজীবীদের মতো লাইসেন্সপ্রাপ্ত হলে তাঁরা পেশাদার সমাজকর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। অনেকে ব্যক্তিগত ক্লিনিক খুলে মনোসামাজিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাউন্সেলিং করে ভালো আয় করেন। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থসামাজিক সমস্যা সমাধানে সমাজকর্মের জ্ঞান ও দক্ষতা খুবই কার্যকর। এশিয়ার মধ্যে সমাজসেবা ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ায় পেশাদার সমাজকর্মী নিয়োগের হার সম্ভবত সর্বোচ্চ হবে। এ বছরের ১৫-১৮ এপ্রিল দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত ‘সমাজকর্ম শিক্ষার উন্নয়ন ও অনুশীলন’ শীর্ষক এশিয়া-প্যাসিফিক (অস্ট্রেলিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই পর্যন্ত) অঞ্চলের ২১টি দেশের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সিউল সম্মেলনে বাংলাদেশের সমাজকর্মশিক্ষার ওপর একটি প্রবন্ধ পাঠের সুযোগ হয়েছিল আমার। এ সম্মেলন থেকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ধনী-দরিদ্র স্ব দেশেই সমাজকর্মশিক্ষার উন্নয়ন এবং সরকার ও এনজিও পরিচালিত সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমে পেশাদার সমাজকর্মী নিয়োগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যেমন—দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার; শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পুষ্টি, গণতন্ত্র-মানবাধিকার, অপরাধ-কিশোর অপরাধ, মানব পাচার, পরিবেশ-জীববৈচিত্র সংরক্ষণ প্রভৃতি বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে সমাজকর্মের জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োগ অধিক ফলপ্রসূ। উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারের সমাজসেবা বিভাগে ‘সমাজসেবা কর্মকর্তা’ পদটি সমাজকল্যাণ বা সমাজকর্মের স্নাতকদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। পরে তা সব বিষয়ের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশে পেশাগত সমাজকর্ম বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। উপযুক্ত পেশাদার সংগঠনের অভাবে বাংলাদেশে কর্মরত এনজিও নেতৃত্বকেও আমরা এ গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক সামাজিক বিজ্ঞানের কার্যকারিতা সম্পর্কে জানাতে পারিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে করা আমার ছোট গবেষণাকর্মের উদ্দেশ্যই হচ্ছে, বাংলাদেশে পেশাগত সমাজকর্মের যাত্রাকালের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার লক্ষে সমাজকর্মশিক্ষার উন্নয়ন ও প্রয়োগ সম্পর্কিত করণীয় নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করা। এ কাজটি করতে গিয়ে আমি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাক্রিডিটেশন-সংক্রান্ত ম্যানুয়েল-বই-দলিলপত্র ঘেঁটেছি; ওয়াশিংটনের হাওয়ার্ড, জর্জ ম্যাসন, ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়; পেনসিলভেনিয়ার ওয়েস্ট চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়; টেক্সাসের হিউজটন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিনেসোটার উইনোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল ওয়ার্ক স্কুলের ডিন ও অধ্যাপকদের সঙ্গে আলোচনা করেছি; সিএসডব্লিউইর অ্যাক্রিডিটেশন বা ক্যান্ডিড্যাসি কর্মশালায় অংশ নিয়েছি।
আলোচনার সূত্রপাত এ অর্থে যে ১৯৫৮ সালে থেকে বাংলাদেশে সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি কোর্স চালু হলেও এটি এখনো পেশাগত স্বীকৃতি লাভ করেনি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো অ্যাক্রিডিটেশনের ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশে সমাজকর্মের পেশাগত স্বীকৃতি এবং সমাজকর্মশিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হলে অ্যাক্রিডিটেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এবং তা করতে হলে আমাদের ছাত্র ভর্তিপদ্ধতি, কারিকুলাম, সিলেবাস, বিষয়সূচিতে পরিবর্তন-পরিমার্জনা জরুরি। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে ‘ইচ্ছা ও মনোভঙ্গি পরীক্ষা’ (Attitude and Aptitude Test) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; পাঠ্যসূচিতে একদিকে যেমন সিএসডব্লিউইর নির্দেশনা অনুসরণ করে নতুন কোর্স যুক্ত করতে হবে; অন্যদিকে তেমনি দেশ বা স্থানীয় সমস্যা মোকাবিলার লক্ষে দেশজ সাহিত্য বা জ্ঞানকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন কোর্স তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর পরস্পরের একাডেমিক সফর, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও ছাত্র-শিক্ষক শিক্ষা বিনিময়; স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার-ওয়ার্কশপের আয়োজন করা একান্ত আবশ্যক। আর সমাজকর্মশিক্ষা ও অনুশীলনের মান উন্নয়ন এবং যুগোপযোগী করার লক্ষে বিশ্বব্যাপী যেসব সংস্থা যেমন—সিএসডব্লিউই, ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব সোশ্যাল ওয়ার্কারস (এনএএসডব্লিউ), এশিয়া প্যাসিফিক অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল ওয়ার্ক এডুকেশন (এপিএএসডব্লিউ) প্রভৃতির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপন ও একযোগে কাজ করতে হবে।
এসব করতে হলে বাংলাদেশের সব কটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বা সমাজকর্ম বিভাগ থেকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে এখনই। আর তা যদি সম্ভব হয়, তবেই বাংলাদেশে সমাজকল্যাণ বা সমাজকর্ম শিক্ষা ও অনুশীলনের মান উন্নয়ন সম্ভব হবে। এভাবে একদিকে যেমন সরকারের সমাজসেবা বিভাগ ও দেশের এনজিও সেক্টরে সমাজকল্যাণ বা সমাজকর্মের স্নাতকদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে তেমনি দেশের সামাজিক উন্নয়ন খাত সমৃদ্ধ হবে। তাই আর কালবিলম্ব না করে বাংলাদেশে সমাজকল্যাণ বা সমাজকর্মের উচ্চশিক্ষা ও অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত (সরকারি-বেসরকারি সমাজসেবা খাতে কর্মরত) সবাইকে নিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখতে চাই।
ড. মুহাম্মদ সামাদ: অধ্যাপক ও পরিচালক; সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

কাবুলে প্রহসন, পাকিস্তানে বিপর্যয় -আফগানিস্তান by তারিক আলী

আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং কারজাইয়ের শাসন বৈধ—কয়েক সপ্তাহ আগে এমন বক্তব্য প্রদান করেন কাবুলে জাতিসংঘের প্রধান কর্তাব্যক্তি। নির্বোধ এই নরওয়েজীয় ভদ্রলোকের ডেপুটি পিটার গলব্রেইথ এতে প্রচণ্ড বিরক্ত হন, জনসমক্ষে তাঁর মতামত তুলে ধরেন। গলব্রেইথ আসলে কাবুলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অনানুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘে কাজ করছিলেন। একসময় মার্কিনিরাই কারজাইকে সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু আজ তারা কারজাইয়ের ওপর বেশ নাখোশ। প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার ফলে গলব্রেইথকে চাকরিচ্যুত
করা হয়।
জাতিসংঘে অনানুষ্ঠানিক মার্কিন প্রতিনিধিদের এমন আচরণের ঘটনা অনেক ঘটেছে। কিন্তু সব গল্পের শেষটা এমন হয় না। সম্প্রতি জাতিসংঘ সমর্থিত আফগান নির্বাচন তদারকি প্রতিষ্ঠান বলেছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে। দ্বিতীয় দফা ভোট নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে তারা। পশতুনদের হাসির শব্দের প্রতিধ্বনি নিশ্চয় শোনা গেছে হিন্দুকুশ পর্বতমালায়।
আফগানিস্তানের জনগণ নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। আর দেশ যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী ন্যাটোর দখলে, তখন তো গুরুত্ব দেওয়ার কথাও নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা আগের মতো থাকলে কারজাইকে কবে সরিয়ে দেওয়া হতো। তালগোল পাকিয়ে ফেলায় যেমন করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের স্বৈরশাসকদের।
যে দখলদাররা তাঁকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল তারা যেমন, কারজাইও তেমনি এখন এক মস্ত বিপর্যয়ের মুখে। ভুলে ভরা এক যুদ্ধ চলছে; বিরাট এলাকার নিয়ন্ত্রণ এখন বিদ্রোহীদের কবজায়। এমন এক সময়ে কারজাইকে বানানো হচ্ছে বলির পাঁঠা। যে অপকর্মের দায় একচেটিয়াভাবে তাঁর ওপর বর্তায় না, তার জন্য সাজা পেতে হচ্ছে তাঁকেই।
একটি সমাধানের কথা আমরা কল্পনা করতে পারি। সমাধানটি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জাতিসংঘ কর্তৃক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া। সে ক্ষেত্রে স্পষ্টই পিটার গলব্রেইথ হবেন সেই পছন্দের ব্যক্তি। এই কাজটা হবে অনেক সোজাসাপ্টা, আর প্রধান নির্বাহী মন্ত্রিসভা নিয়োগ দিতে পারেন। মন্ত্রিসভার দুর্বৃত্ত সদস্যদের থাকবে আফিম ব্যবসার ভাগ-বাটোয়ারার অংশ। দেশের ভেতর জনগণের জন্য খরচের অর্থ কমাবেন তাঁরা। আর এভাবে তাঁরা কারজাই পরিবারের আর্থিক একচেটিয়ার অবসান ঘটাবেন।
অনুগত এক হাতের পুতুলকে জনগণের সামনে এমনভাবে লাঞ্ছিত করার একমাত্র কারণ, দখলদারদের অন্য সব দোসরের সঙ্গে ক্ষমতা ও অর্থ ভাগ করতে কারজাইয়ের অস্বীকৃতি। আমার মনে হয়, তাঁকে ক্ষমতায় থাকতে দিলে তিনি অন্যদের চেয়ে বেশি অংশ দখলদারদের দিতে রাজি থাকবেন। এ এলাকা থেকে ন্যাটোর কোনো নিষ্ক্রমণ-কৌশল না থাকলে এর ফলে অবস্থার কোনো অগ্রগতি ঘটবে না।
কাবুলে যখন প্রহসন চলছে, সেই সময় প্রতিবেশী পাকিস্তানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জারদারির সরকার (মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যান ডব্লিউ পেটারসন দক্ষতার সঙ্গে তা পরিচালনা করছেন) আফগান সীমান্তের কাছাকাছি দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান থেকে তালেবান উচ্ছেদ করতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে।
এই অভিযানও ব্যর্থ হবে। নিরপরাধ বহু মানুষ মারা যাবে, আরও অনেক উদ্বাস্তু যোগ হবে বর্তমানে ক্যাম্পে বসবাসরত ২০ লাখ অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর (ইন্টারনালি ডিসপ্রেসড পারসনস) সঙ্গে। পরিণতিতে তিক্ততা সৃষ্টি হবে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তা ছড়াবে; ঘৃণা বাড়বে আর বাড়বে প্রতিশোধমূলক হামলা এবং পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ভেতর আরও অশুভ উত্তেজনা সৃষ্টি হবে।
আফগান যুদ্ধের বিস্তার ঘটিয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার কারণেই দেশটির সংকট যে তীব্রতর হয়েছে, এটি বুঝতে ব্যর্থ ওবামা প্রশাসনের নির্দেশনা পাকিস্তানের সংকট কেবল বাড়াতেই পারে।
কাউন্টার পাঞ্চ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
তারিক আলী: পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক ও নিউ লেফট রিভিউ-র অন্যতম সম্পাদক।

বিজ্ঞাপন তেলেসমাতি -গণমাধ্যম by শাহদীন মালিক

আমাদের ইদানীংকালের ‘মুক্তবাজার’ অর্থনীতিতে বিজ্ঞাপন বাজারও ভীষণভাবে ‘মুক্ত’।
দেশের লক্ষ মানুষের মতো আমি পত্রিকা পড়ি, টিভি চ্যানেল দেখি, আর আজকাল মাঝেমধ্যে এফএম রেডিও শুনি। সব দেশেই মিডিয়ার প্রাণ-সঞ্জিবনী হলো বিজ্ঞাপন। এটাই স্বাভাবিক। দুনিয়ার সব দেশেই টেলিভিশন দেখতে হলে বিজ্ঞাপন দেখতে হবে, পত্রিকা পড়তে হলে বিজপনেও চোখ পড়বে।
বিজ্ঞাপন অবশ্যই প্রয়োজনীয় এবং আবশ্যকীয়। বাড়ি, গাড়ি, টেলিভিশন, প্লট কিনতে আমরা সবাই, যাকে বলে, বিজ্ঞাপনের দারস্থ হই। হতেই হবে। মুক্তবাজারের মুক্ত বিজ্ঞাপনের যৌক্তিকতা সহজ ও সরল। কোনো পণ্য ক্রয়ের আগে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে খরিদদার গুণগতমান, মূল্য ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করে নিজের প্রয়োজন ও পকেটের স্বাস্থ্য অনুযায়ী সঠিক জিনিসটি বেছে নেবে।
উত্তম ব্যবস্থা। তবে ‘কিন্তু’ আছে। অনেক দেশে, বিশেষত উন্নত দেশে, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করার সংস্থা থাকে—সরকারি-বেসরকারি উভয় ধরনের। মনগড়া বিজ্ঞাপনে খদ্দের বা ক্রেতা যাতে প্রতারিত না হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্য।
অবশ্য ইদানীং আমাদের প্রেক্ষাপটে ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটা পড়ে অনেক পাঠকের চোখে যদি মাননীয় বাণিজ্য মন্ত্রীর চেহারা ভেসে ওঠে, তাহলে দুষিব কেমনে? অবশ্য গত কয়েক দিন বাজার নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত মাননীয় মন্ত্রীর আশ্বাসবাণী টিভি চ্যানেলের খবরগুলোয় শুনতে না পেরে ভীষণ উত্কণ্ঠায় ছিলাম। বাজার নিয়ন্ত্রণের আর কোনো ব্যবস্থাই কি সরকার নিচ্ছে না। উত্কণ্ঠা দূর হলো যখন সংবাদমাধ্যমের বদৌলতে জানলাম, মন্ত্রী মহোদয় দেশের বাইরে। দেশে ফিরে এসে নিশ্চয়ই ত্বরিতগতিতে এবং সব চ্যানেলের মাধ্যমে আমাদের আবার আশ্বস্ত করবেন।
বিজ্ঞাপনবাজার নিয়ন্ত্রণে কেউ আছে বলে জানা নেই। ১৯ অক্টোবরের প্রথম আলোর ১১ পাতায় চোখ বুলিয়ে দেখলাম, বড় বড় ১৫টা বিজ্ঞাপন, তার প্রায় অর্ধেকই ইউকে ভিসাসংক্রান্ত—ভাবখানা বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানটির দুয়ারে পা রাখলেই ইউকের কলেজে ভর্তি, তারপর ভিসাসংক্রান্ত ঝুটঝামেলা আপনার হয়ে অতি আগ্রহে নিজ ঘাড়ে নিয়ে নেবে বিজ্ঞানদাতা প্রতিষ্ঠানটি। পুরো পত্রিকায় গোটাবিশেক এ ধরনের লোভনীয় ‘অফার’।
ছোটবেলার পাঠ্যপুস্তকে পড়েছিলাম—‘সদা সত্য কথা বলিবে’। সেটা ছিল সেকাল, এখন একাল। বিজ্ঞাপন দেখি চ্যানেলে, শুনি রেডিওতে—একটা পানীয় পান করলে সঙ্গে সঙ্গে সত্যি কথা, তা যতটাই বেফাস হোক না কেন, বলা শুরু হয়ে যাবে। বাচ্চাদের নৈতিকা শেখানোর বোধহয় আর দরকার নেই। একটা টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করলেই বাচ্চারা সত্যি কথা বলে। এত প্রসাধনীতে চামড়া ফর্সা হওয়ার কথা এতকাল থেকে বলা হচ্ছে যে আমরা সবাই কেন এখনো ইউরোপ-আমেরিকার লোকজনের মতো সাদা চামড়ার হয়ে গেলাম না, তার সদুত্তর খুঁজতে হবে।
আর একটা কিনলে তিনটা ফ্রি পাবেন এমন জিনিসে তো বাজার সয়লাব। ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ—আমার টেলিভিশনটা এখন ‘ঐতিহ্যবাহী’র পর্যায়ভুক্ত হতে চলেছে, বয়স তার ১৪ বছর। একটা ফ্ল্যাটও কেনা হয়ে ওঠেনি। তাই তক্কে তক্কে আছি—যখন বিজ্ঞাপন দেখব টেলিভিশন সেট কিনলে সঙ্গে পাবা ‘ফ্রি’ ফ্ল্যাট, সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়ব। টেলিভিশন কিনে ফ্ল্যাট পাব। এক ঢিলে দুই পাখি মারার এমন মোক্ষম সুযোগ যদি আসে, মোটেই হাতছাড়া করব না। সেই আশায় প্রতিনিয়ত বিজ্ঞাপন পড়ি, দেখি, শুনি।
শুধু ইউকে নয়, অন্যান্য দেশে যাওয়ার অতি সহজ-সস্তা পন্থার বিজ্ঞাপন এন্তার চোখে পড়ে। বিজ্ঞাপিত অনেক দেশেই গিখেছি, তবে সবচেয়ে বেশিবার বোধহয় ইংল্যান্ডে—প্রথম ১৯৭৬ সালের জুলাই-আগস্টে, সপ্তাহ দুয়ের জন্য। ইদানীং টিভি চ্যানেলের খবরে রিপোর্ট দেখেছি, কীভাবে স্টুডেন্ট ভিসায় যাওয়া ছেলেরা প্রায় না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সাতসমুদ্দুর তের নদী পাড়ি দেওয়ার আগে এই ছেলেদের আসল কথা বলার কেউ নেই। তাদের সম্ভবত একমাত্র সম্বল অর্থাত্ তথ্য ছিল বিজ্ঞাপন।
আর সব বাবা-মায়ের বোধহয় এখন উচিত হবে, বিজ্ঞাপিত টুথপেস্ট দিয়ে বাচ্চাদের দাঁতমাজা নিশ্চিত করা। তাতেও যদি কাজ না হয়, তাহলে সত্য কথা বলার জন্য বিশেষ পানীয়টি পান করানো, ঠেসে খাওয়াবেন।
দু-একটা টিভি চ্যানেলে ‘খানকা শরিফ’ নাকি ‘মাজার শরিফ’-এর বিজ্ঞাপনও চোখে পড়েছে। ‘ওরস মোবারক’ তো কমন। আরও চোখে পড়ে ‘বার এট ল ডিগ্রি’ লাভ। যতদূর জানি ও বুঝি—ডিগ্রি দিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়। বার এই ল ডিগ্রিটা কোন বিশ্ববিদ্যালয় দেয় তার হদিস এখনো পাইনি। আর সেকেলে বলেই বোধহয় আইনটাকে পেশা হিসেবে জানি। আমাদের ওকালতিসংক্রান্ত আইনে বলা আছে যে এটা পেশা, ব্যবসা নয়। সে জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া নিষেধ। ধর্ম যেমন ব্যবসা হয়ে গেছে অনেক ক্ষেত্রেই, সেভাবেই হয়তো আমাদের পেশাটাও ব্যবসা হয়ে গেছে।
এক কথা, দু কথা থেকে অনেক কথা চলে আসে। বিচারকদের ভিজিটিং কার্ডে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লাল-সবুজ সিলটি থাকে। অনেকটা যার জন্য চুরি করি, সেই বলে ‘চোর’! অর্ধেক দশক ধরে আধা ডজন মামলা করলাম—নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মামলা, যেগুলোকে ভদ্র ভাষায় সবাই বলে ‘জনস্বার্থে মামলা’—নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ পৃথক করার জন্য। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এই পৃথককরণ সাধিত হয়েছে। কিন্তু বিচারকেরা অন্তত অনেকেই নিজেদের সরকারি কর্মকর্তা ছাড়া বোধহয় অন্য কোনো কিছু ভাবতে রাজি নয়। ভিজিটিং কার্ডে সরকারের সিল ছাড়াও বাসার নম্বর, মোবাইল নম্বর সবই পাওয়া যায় অনেকের। বিজ্ঞাপন ‘প্রলোভন’ হয়ে হয়ে যাচ্ছে। খেয়াল রাখার কেউ নেই।


গত এক সপ্তাহে বসুন্ধরার বিজ্ঞাপনের বন্যায় দেশ সয়লাব হওয়ার উপক্রম। প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশকদের যে এত পারদর্শিতা, তা এতকালে ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। বসুন্ধরার বিজ্ঞাপন থেকে ‘অবগত হইলাম’ (!) যে উনারা দেশের পোলট্রিসহ বৃহত্ প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের চক্রান্তকারী; ওয়ান ইলেভেনের রূপকার; আর তার থেকে অনেক বড় পারদর্শিতা হলো, মাস পাঁচেক আগের বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে যে ভয়াবহ আগুন লেগেছিল, সেটার অগ্নিসংযোগকারী!
শুধু বিজ্ঞাপন নয়, আগুন লাগানোর অপরাধে অভিযুক্ত করে মামলাও নিয়ে গিয়েছিলেন আদালতে।
টাকা-পয়সা থাকলে সুযোগ-সুবিধা যে অনেক সেটা তো আজকাল শিশুরাও বোঝে। হাজার হলেও তারাও তো মুক্তবাজারের যুগে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠছে। আর অর্থ-বৈভব যদি অঢেল হয়, তাহলে দেশের সব পত্রিকায়, চ্যানেলে বিজ্ঞাপন ছাপানো যায়। প্রথম আলোকে শায়েস্তা করার এই ‘বিজ্ঞাপনী পন্থা’ এখন বসুন্ধরা গ্রুপ জোরেশোরে এস্তেমাল করছে।
আজকাল সরকারই আইনের তোয়াক্কা করে না, তাই বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আইন-নৈতিকতা মেনে চলবে—সে প্রত্যাশার গুড়ে বালি। বলা বাহুল্য বহু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আছে যারা আইন ও নিয়নকানুন মেনে চলে।
প্রথম আলোর বসুন্ধরাবিরোধী রিপোর্টে অসত্য থাকলে বসুন্ধরা প্রতিবাদ পাঠাতে পারত, প্রেস কাউন্সিলে যেতে পারত। কোর্টেও যেতে পারত। অবশ্য এখন আমাকেও আগুনদাতা, ষড়যন্ত্রকারী বলে আগামীকাল আধা ডজন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপায় যে শাহদীন মালিক পাগল বা বিদেশি দালাল বা দেশের শত্রু, তাহলে আমার কি-ই বা করার আছে।
বসুন্ধরা বিজ্ঞাপনের অব্যবহারের নতুন একটা মাত্রা দেশের মিডিয়ায় যোগ করেছে।
অবশ্য সম্পূর্ণ নতুনই বলি কীভাবে। বিশেষত, বিটিভির খবরের তুলনায় অন্যান্য চ্যানেলে খবর দেখার মধ্যে অনেক সময় ধরে বিজ্ঞাপন। আর বিটিভির খবর তো পুরোটাই সরকারের বিজ্ঞাপন। অবশ্য কিছু চ্যানেল মনে হচ্ছে এখন সরকারেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছে। খবরের নামে কিছু টিভি চ্যানেলের মালিক তাদের স্ব স্ব চ্যানেলে অহরহ বিজ্ঞাপিত হচ্ছেন। বিটিভিতে খবর নামক বিজ্ঞাপনের জন্য যেমন সরকারের কোনো পয়সা খরচ হয় না, তেমনি মালিকেরা তাঁদের নিজেদের ঢাকঢোল পেটানোকে আজকাল মনে করা হয় ‘টিভি খবর’ বাহ্ বেশ!!
শাহদীন মালিক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে -বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৯ মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে। উচ্চশিক্ষার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্র নিয়ে কম বাণিজ্য হয়নি বাংলাদেশে। বেসরকারি মানেই যে বাণিজ্যের লাগামছাড়া চলন নয়, তা বোধ করি ভুলে যাওয়া হয়েছিল। দেশের ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৮টিরই বৈধতার মেয়াদোত্তীর্ণ দশা এরই প্রমাণ। নতুন আইনের কার্যকারিতার প্রত্যাশা এখানেই।
সব বিচারেই বেসরকারি পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার মান ও নিয়ম রক্ষার স্বার্থে সরকারি তদারকির ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সাত বছর ধরে চেষ্টা চললেও চূড়ান্ত কোনো বিধিমালা প্রণয়ন করা যায়নি। কারণটি স্বয়ং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের বাধা, যাঁরা একে আর দশটা ব্যবসার মতো বিবেচনা করে যেকোনোভাবে মুনাফা করার চেষ্টা করে আসছেন। এ ধরনের ব্যবসায়ীদের নানা বাধা সত্ত্বেও গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রণীত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ২০০৮ জারি করা হয়। বর্তমান জাতীয় সংসদ সেই অধ্যাদেশকে পাশ কাটিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে এবং তা মন্ত্রিসভার অনুমোদনও পেয়েছে।
প্রথম আলোর গত মঙ্গলবারের এ-বিষয়ক সংবাদ বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের কিছুটা ছাড় দিয়েই নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যেমন, দূরশিক্ষণের নামে নিতান্তই সনদ বিক্রি কিংবা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস নাম দিয়ে ব্যবসা করা আগের আইনে নিষিদ্ধ ছিল। নতুন আইনে তা শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদনের বিধি রাখা হয়েছে। একইভাবে আগে যেখানে পাঁচ বছর পর্যন্ত সাময়িক সনদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চালানো যেত, এখন তা ১২ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অভিজ্ঞতা বলে, ‘শর্ত’ পূরণ করিয়ে নেওয়া এবং অনুমোদনের সময় বাড়ানোর সুযোগেই অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত কাজকর্ম করা হয়ে থাকে।
তবে নতুন আইনে সরকারি নজরদারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনা বিধিকে গণতান্ত্রিক করার চেষ্টা হয়েছে। উপাচার্যকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান করা এবং ছাত্র ফি ও বেতনকাঠামো মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন পাওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষাদান, পাঠক্রম ও পরীক্ষা পদ্ধতিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রশ্নটি। শিক্ষক ও শিক্ষাদানের মান, উপযুক্ত পাঠ্যসূচি এবং মানসম্পন্ন পরীক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারলে এই আইন বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং আইনটির খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করে উল্লিখিত ত্রুটিগুলো দূর করাই শ্রেয়।
২০০০ সালে যেখানে দেশে ১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, ২০০৯ সালে তা দাঁড়ায় ৫১টিতে। এখন প্রায় দেড় লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী এখানে পাঠরত। দেশে উচ্চশিক্ষিত মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা লক্ষণীয়। কিন্তু বাণিজ্যিক শিক্ষা যেন কালো টাকা সাদা করার লীলাক্ষেত্র না হয়, বাণিজ্যই যেন এর প্রধান চালিকাশক্তি না হয়, তা দেখার দায়িত্ব সরকারের। ব্যবসাকে প্রধান লক্ষ্যের স্থান থেকে অপসারণ করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি শিক্ষার মানের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ যেন এতে না থাকে।

এবার দেখা যাবে অন্য শাহাদাতকে!

অভিযোগগুলো এক দিক দিয়ে গুরুতরই। ওয়েস্ট ইন্ডিজে টেস্ট খেলে ফিরে আসার পর শাহাদাত হোসেনকে ফিটনেস ট্রেনিংয়ের যে সূচি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো তিনি অনুসরণ করেননি। ‘এ’ দলের হয়ে মহারাষ্ট্র সফরেও নাকি ‘সিরিয়াস’ ছিলেন না। জিম্বাবুয়ে সিরিজের দলে ডাক পাওয়ার পর জোর গলায় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শাহাদাতের পাল্টা হুঙ্কার, ‘সুযোগ যখন পেয়েছি, কাজে লাগাব। জাতীয় দল থেকে যাতে আর কেউ আমাকে বাদ দিতে না পারে।’
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গত বছর ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছেন শাহাদাত। তাহলে মাঝখানে কী এমন ঘটল যে শাহাদাতকে দলে ফিরিয়ে আনা হলো? প্রধান নির্বাচক রফিকুল আলমের উত্তর, ‘মহারাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচে পারফর্ম করতে না পারলেও পরের দিকে সে ভালো খেলেছে।’
আর শাহাদাতের ‘সিরিয়াস’ না থাকার ব্যাপারটা? প্রধান নির্বাচক সেটা স্বীকার করলেন, আবার করলেনও না, ‘আগে দু-একটা অভিযোগ শাহাদাতের বিরুদ্ধে ছিল। সেগুলোর জন্য তাকে সতর্ক করা হয়েছে। তবে দু-তিন মাস ধরে সে খুবই সিরিয়াস।’ আর শাহাদাত সরাসরিই বলে দিলেন, ‘এই অভিযোগ ঠিক না। মহারাষ্ট্রের বিপক্ষে পারফরম্যান্সের জন্যই তো আবার দলে ফিরলাম! আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে ফেরার পর আমি অনেক দিন অসুস্থ ছিলাম, একদিন তো হাসপাতালেও থাকতে হয়েছে।’ শাহাদাতের দাবি, ‘জিম্বাবুয়ে সফরে ডলারকে পাঠানোর আগে আমাকে অনেক খুঁজেছিল বোর্ড। কিন্তু আমি অসুস্থ ছিলাম।’
শাহাদাতও মনে করেন, সমালোচনাটা শাহাদাত আর আগের শাহাদাত নেই বলেই হচ্ছে, ‘সবাই চায়, আমি জোরে বল করি। মাঝখানে বলের গতি কমে যাওয়াতেই দল থেকে বাদ পড়ি, এত সমালোচনা। এবার খেলার সুযোগ পেলে আবার আগের মতো বল করব।’
কিন্তু ওয়ানডেতে যে শাহাদাত বরাবরই পেছনের সারির বোলার! ৪৩টি ম্যাচ খেলে এখন পর্যন্ত ৪১.২৪ গড়ে উইকেট ৪১টি। তাহলে কি এবার নতুন কোনো শাহাদাতকে দেখবে ওয়ানডে?

জিয়াউল হকের দুর্নীতি মামলার কার্যক্রম স্থগিত

জোট সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী জিয়াউল হক জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতির একটি মামলার কার্যক্রম ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. রইস উদ্দিনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে এ আদেশ দেন।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থানায় ৩২০ মেট্রিক টন চাল অত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলাটি দায়ের করে। গত ১৯ আগস্ট এ মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়।
অভিযোগের বৈধতা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আজ আবেদন করেন জিয়াউল হক জিয়া। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ রায় দেন। একই সঙ্গে আদালত অভিযোগ গঠন কেন বাতিল করা হবে না, এ মর্মে সরকার ও দুদকের প্রতি রুল জারি করেছেন এবং চার সপ্তাহের মধ্যে এর জবাব দিতে বলেছেন।

বঙ্গবন্ধুর ও জিয়ার হত্যাকাণ্ড একই ধরণের ছিল

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় পাঁচ আসামির আপিলের ওপর আজ বৃহস্পতিবার চতুর্দশ দিনের শুনানি শেষ হয়েছে। আজকের শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী খান সাইফুর রহমান বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ও জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড একই ধরণের বলে মন্তব্য করেন।
আজকের শুনানিতে খান সাইফুর রহমান তৃতীয় বিচারপতির দেওয়া হাইকোর্টের রায়, দেরিতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়ের ও সেনা বিদ্রোহ এই তিনটি বিষয়ের ওপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। আগামীকাল এই হত্যাকাণ্ডটি ষড়যন্ত্র কি না এ বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করা হবে।
আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চে সকাল নয়টা ৪৫ মিনিটে এ শুনানি শুরু হয়। শেষ হয় দুপুর একটা ২০ মিনিটে। এ বিশেষ বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন মো. আবদুল আজিজ, বিজন কুমার দাশ, মো. মোজাম্মেল হোসেন ও সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

তাপসের উপর হামলা : জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ জনকে আটক

আওয়ামী লীগের সাংসদ ফজলে নূর তাপসের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে বাংলার বাণী ভবনের পাঁচজন নিরাপত্তাকর্মীকে আটক করেছে। পুলিশ জানায়, তাপসকে লক্ষ্য করেই বুধবার রাতে বোমা হামলা হয়। সেটা ছিল শক্তিশালী বোমা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার মইনুল হক আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, বোমাটি দূর থেকে ছোড়া হয়েছে। ঘটনার সময় সাংসদ তাপস ছাড়া উল্লেখ করার মতো আর কেউ সেখানে ছিলেন না।
বুধবার রাতে মতিঝিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাতিজা তাপসের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়। তিনি বেঁচে গেলেও এতে ১৩ জন আহত হন।
পুলিশ কর্মকর্তা মইনুল বলেন, ঘটনাটি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে। পুলিশও বিষয়টি দেখছে। এ পর্যন্ত ৮-১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে। তিনি বলেন, সাংসদ তাপসকে লক্ষ্য করে নিক্ষপ্তি বিস্ফোরকটি গ্রেনেড নয়।
মইনুল বলেন, বিস্ফোরণের পর উদ্ধার করা স্পি্লন্টার দেখে এবং আহত ব্যক্তিদের শরীরের ক্ষত দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এটা গ্রেনেড নয়। হাতে তৈরি শক্তিশালী বোমা।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ঘোষণা

জিম্বাবুয়ের জন্য আসন্ন ওয়ানডে সিরিজের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল আজ বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়েরা হলেন: সাকিব আল হাসান (অধিনায়ক), মুশফিকুর রহিম (সহ-অধিনায়ক), মোহাম্মদ আশরাফুল, তামিম ইকবাল, আবদুর রাজ্জাক, শাহদাত হোসেন, নাঈম ইসলাম, মাহমুদউল্লাহ, এনামুল হক জুনিয়র, রকিবুল হাসান, জুনায়েদ সিদ্দিকী, ডলার মাহমুদ, রুবেল হোসেন ও নাজমুল হোসেন।
মূল অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ইনজুরির কারণে জিম্বাবুয়ে সিরিজে খেলতে পারবেন না।

আগামী এপ্রিলে পৌরসভা ও জুন-জুলাইয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন: সিইসি

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ টি এম শামসুল হুদা বলেছেন, আগামী বছর মার্চে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন শেষ করা হবে। এর পরই ওই বছরের এপ্রিলের মধ্যে সারা দেশে পৌরসভাগুলোর নির্বাচন এবং জুন-জুলাইয়ের মধ্যে সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে ফেনীতে সার্ভার স্টেশনের জন্য প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ কথা বলেন।
সিইসি বলেন, সার্ভার স্টেশনগুলো স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর যেকোনো সময় যেকোনো লোক ভোটার হতে পারবেন। আগে একবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ হলে আবার ভোট হওয়ার জন্য চার বছর অপেক্ষা করতে হতো। এখন থেকে এসব সমস্যা থাকবে না। সারা বছরই ভোটার হওয়া যাবে।
এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে ছিলেন জাতীয় সার্ভার স্টেশন প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোয়াজ্জেম হোসেন, ফেনীর জেলা প্রশাসক মো. আবদুল কুদ্দুস খান, জেলা পুলিশ সুপার মল্লিক ফখরুল ইসলাম, ফেনী সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান, ফেনী পৌরসভার মেয়র নূরুল আবসার, কুমিল্লা অঞ্চলের উপনির্বাচন কমিশনার আনোয়ার হোসেন, ফেনী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুল ওয়াদুদ প্রমুখ।

বিএনপি নেতা আমান জামিনে মুক্তি পেলেন

বিএনপি নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমানউল্লাহ আমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেল থেকে আমানকে মুক্তি দেওয়া হয়।
ব্যবসায়ী ওসমান গণি হত্যাচেষ্টা মামলায় গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর জজ আদালত থেকে জামিন পান আমান। সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরার পর গত ২৯ সেপ্টেম্বর জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকার কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ী ওসমান গণি অভিযোগ করেন, আমানউল্লাহ আমান হত্যার উদ্দেশ্যে গত ২৯ মে তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছেন।

তাপসের ওপর বোমা হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা

আওয়ামী লীগের সাংসদ শেখ ফজলে নূর তাপসের ওপর বোমা হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে ফজলে নূর তাপস নিজে বাদী হয়ে মামলাটি করেন। তবে মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি।
সাংসদ শেখ ফজলে নূর তাপস রাজধানীর ধানমন্ডি (ঢাকা-১২) থেকে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সাংসদ। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাইয়ের ছেলে।
গতকাল রাতে মতিঝিলে তাঁর গাড়িতে বোমা হামলা হয়। তিনি বেঁচে গেলেও এতে আহত হন ১৩ জন।