Sunday, November 26, 2017

‘রোহিঙ্গাদের কান্নার আওয়াজ শুনতে হবে’

রোহিঙ্গাদের কান্না, মানবতার কান্না। এই কান্নার আওয়াজ শুনতে হবে। পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের ক্যাথলিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একমাত্র কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’রোজারিও এ কথা বলেছেন। শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, বিশ্ব সম্প্রদায়ের ত্রাণ তৎপরতা এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক; তবে, কতদিন তা চলমান থাকবে? তিনি বলেন, এই সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে যেমন উদারতা দেখা গেছে, সেটা স্থায়ী হবে না।
পোপ ফ্রান্সিসের বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফরকে সামনে রেখে বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন কার্ডিনাল প্যাট্রিক।
পোপের এই সফর রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিরসনের পদক্ষেপগুলোকে আরো শক্তিশালী করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনে করি বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গাদের দেখভাল করতে পারবে না। তাদের ফেরত যেতে হবে। কিন্তু, নিজেদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, ভুমির অধিকার, আশ্রয়ের অধিকার এবং মানসিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে তারা যাবে না।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে এখন বিশ্বের সবথেকে বৃহৎ রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সেখানে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ মানুষের মধ্যে কিছু সংখ্যক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দু’দেশের চুক্তি হয়েছে গেল সপ্তাহে। তা সত্ত্বেও, কার্ডিনাল প্যাট্রিক সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এখনও রীতিমতো বিস্ফোরক অবস্থা বিরাজ করছে। এর সমাধা করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব বলে আমি আশাবাদী। বিশ্ব সম্প্রদায়ও এটা চায়। আর, হলি ফাদারের সফর বহু মানুষের মন ও হৃদয়কে সেই লক্ষ্যে প্রস্তুত করবে।’
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর বলেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলো নেই। আর শনিবার বাংলাদেশ ইঙ্গিত দিয়েছে যে, প্রাথমিকভাবে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে রাখার পরিকল্পনা মিয়ানমারের।
কঠিন এই পরিস্থিতিতেও পোপের সফরে আশা দেখছেন কার্ডিনাল প্যাট্রিক। প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে পোপ ফ্রান্সিস বাংলাদেশের ৩ লাখ ৬০ হাজার ক্যাথলিকদের মধ্যে প্রথম কার্ডিনাল নিয়োগ দেন প্যাট্রিক ডি’রোজারিওকে।
সফরসূচী অনুযায়ী, সোমবার মিয়ানমার পৌঁছাবেন পোপ। বাংলাদেশ আসবেন বৃহস্পতিবার। সূচীতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন না থাকলেও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে পোপের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হবে ঢাকায়। আন্ত-ধর্মীয় একটি সভায় আনা হবে একদল রোহিঙ্গাকে।
কার্ডিনাল প্যাট্রিক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুই দিন সময় কাটিয়েছেন। জাতিসংঘ আখ্যায়িত জাতিগত নিধনের পরিকল্পিত সহিংসতা ও নিপীড়নের মুখে রাখাইনে নিজ বাড়িঘর থেকে বাধ্য হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। মি. প্যাট্রিক বলেন, ‘ওদেরকে যেটা বলা জরুরি তা হলোÑ আমরা তোমাদের পাশে আছি।’ চার্চের ভূমিকা ফিল্ড হাসপাতালের মতো হওয়ার উচিত বলে পোপ ফ্রান্সিস প্রায়ই যে মন্তব্য করেন সেখান থেকে অনুপ্রেরণা ধারণ করেন কার্ডিনাল প্যাট্রিক।
চার্চের মানবিক ও দাতব্য অঙ্গ কারিটাস শরণার্থী ক্যাম্পে ৪০ হাজার পরিবারের খাওয়ার সংস্থান করতে সহায়তা করছে। সংখ্যায় সেটা হবে আনুমানিক ৩ লাখ মানুষ। প্যাট্রিক বলেন, ‘ভাবুন তোÑ আমাদের মতো ছোট্ট একটি চার্চ এক তৃতীয়াং শরণার্থীকে দেখভাল করছে।’
বাংলাদেশের ছোট খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে গর্ব প্রকাশ করলেও তিনি স্বীকার করলেন যে, ভবিষ্যতটা খুব বেশি ভালো বোধ হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের পক্ষে একা এটা সামাল দেয়া সম্ভব না। ভবিষ্যত অত্যন্ত অনিশ্চিত।’
কার্ডিনাল প্যাট্রিক আরো বলেন, শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবিদার।

‘ডিপ্লোম্যাটিক মাইনফিল্ডে’ আসছেন পোপ, তাকিয়ে বিশ্ব

ষষ্ঠ পোপ ফ্রান্সিসের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারে পেতে রাখা ‘কূটনৈতিক বোমাক্ষেত্র’ (ডিপ্লোম্যাটিক মাইন-ফিল্ড) সফরে যাচ্ছেন তিনি। কঠিন সমস্যা সেখানে তিনি কিভাবে মোকাবিলা করেন সেদিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ব। রোববার মিয়ানমার সফরে আসছেন তিনি। অবস্থান করবেন ২রা ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সময়ে তিনি মিয়ানমারের বেসামরিক ও সামরিক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
বিশেষ করে তার আলোচনায় প্রাধান্য পাবে রোহিঙ্গা ইস্যু। এ ইস্যুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ তো একে জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এ ইস্যুকে পোপ কিভাবে মোকাবিলা করেন এখন কূটনৈতিক বিশ্ব সেদিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ভয়েস অব আমেরিকা ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতি নিধনের অভিযোগ এনেছে। এমন প্রেক্ষিতে সেখানে সফরে আসছেন সারা বিশ্বে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে সিনিয়র ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিস। রয়টার্স লিখেছে, তিনি বাংলাদেশও সফর করবেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে আখ্যায়িত করেছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, জোর করে বাস্তুচ্যুত করাসহ নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে। এর জন্য দায়ী করা হয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে। তবে তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পোপ ফ্রান্সিসের এ সফরটি এতটাই স্পর্শকাতর যে, তার উপদেষ্টারা এ সময়ে তাকে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে করে কূটনৈতিক টানাপড়েনের সৃষ্টি হয় এবং তার প্রেক্ষিতে দেশটির সেনাবাহিনী ও সরকার সংখ্যালঘু খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে চলে যায়। তার সফরের সবচেয়ে উত্তেজনাকর বা স্পর্শকাতর মুহূর্ত হতে পারে সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে এবং আলাদা করে বেসামরিক নেত্রী অং সান সুচির সঙ্গে প্রাইভেট বা ব্যক্তিগত বৈঠকের সময়। উল্লেখ্য, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে অভিহিত করে না। তারা তাদেরকে বাঙালি হিসেবে অভিহিত করে। তাদের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী। তাই তাদের কোনো নাগরিকত্ব দেয় না মিয়ানমার। ফলে পোপ ফ্রান্সিস এখন এক উভয় সংকটের মধ্যে পা রেখে এই ‘মাইন ফিল্ডের’ ভেতর পা রাখছেন। মিয়ানমারের ৫ কোটি ১০ লাখ মানুষের দেশে মাত্র ৭ লাখ হলো রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। এ বিষয়ে রিলিজিয়ন নিউজ সার্ভিসের একজন প্রথম সারির মার্কিন লেখক ও গবেষক ফাদার থমাস রিস বলেছেন, তার নৈতিকতা নিয়ে তাকে এই সফরে সমঝোতা করতে হবে। না হয় ওই দেশে বসবাসকারী খ্রিষ্টানদের তিনি বিপদের মুখে ফেলে দেবেন। তাই তার সামনে এখন ঝুঁকি। তিনি বলেন, পোপের প্রতি ও তার ক্ষমতার প্রতি আমার ভীষণ শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে এই সফর নিয়ে তাকে কারো পরামর্শ দেয়া উচিত। ভ্যাটিক্যানের সূত্রগুলো বলছে, হলি সি বিশ্বাস করে, পোপের এই সফরটা খুব দ্রুততার সঙ্গে তাড়াহুড়া করে নেয়া হয়েছে মে মাসে। পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর অং সান সুচির সফরে সময় এ সিদ্ধান্ত হয়। ব্রুকলিনস ইন্সটিটিউশনের সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া পলিসি স্টাডিজের ফেলে লিন কুওক বলেছেন, সব ফ্রন্টের সঙ্গে কথা বলতে হবে পোপকে। একদিনে নিরাপত্তা বা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া সহিংসতা থামানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে সুচিকে একদম মুক্তহস্ত করে দেয়াও ঠিক হবে না। পোপের এই সফরের শেষ প্রান্তে তিনি ঢাকায় অবতরণ করবেন। সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলবেন। গত সপ্তাহে মিয়ানমারের কাছে একটি ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন পোপ। এতে তিনি বলেছেন, তিনি প্রত্যাশা করেন এই সফর হবে পুনরেকত্রীকরণ, ক্ষমা করে দেয়া ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। তবে এখানে লক্ষণীয় এ বছর ভ্যাটিকান থেকে দু’দফা রোহিঙ্গা ইস্যুতে আপিল করা হয়েছে। তাতে প্রতিবারই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এ শব্দটি কি মিয়ানমারে উচ্চারণ করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ভ্যাটিকানের মুখপাত্র গ্রেগ বারকি। তিনি বলেছেন, পোপ ফ্রান্সিসকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছেন। গুরুত্বের সঙ্গে এসব পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
‘পোপের বাংলাদেশ সফরে ডিএমপি’র নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে’
খ্রিষ্ট ধর্মের রোমান ক্যাথলিক শাখার প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস আগামী ৩০ নভেম্বর তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে আসছেন। তাঁর (পোপ) আগমন উপলক্ষে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে সবধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। ডিএমপি’র সদর দপ্তরে আজ রোববার নিরাপত্তা, আইন-শৃংখলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পুলিশ কমিশনার বলেন, পোপ ফ্রান্সিস বিশ্বের অন্যতম একজন সম্মানিত ব্যক্তি। জাতীয় স্বার্থে তাঁকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়া হবে। এজন্য সফরের সকল ভেন্যু, হোটেল ও বিমানবন্দর কেন্দ্রিক থাকবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
গমনাগমনকালে পোশাকে এবং সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এছড়া স্ট্যান্ডবাই হিসেবে প্রস্তুত থাকবে সোয়াট ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা। তিনি বলেন, ধর্মগুরু পোপের আগমন সফল করতে আগত বিদেশী অতিথিদের জন্য নির্ধারিত হোটেল, সম্মেলনস্থলসহ প্রত্যেকটি ভেন্যু সুইপিংসহ সিসি ক্যামেরা দিয়ে মনিটরিং করা হবে। আর্চওয়ে স্থাপন এবং পুরুষের পাশাপাশি মহিলা স্বেচ্ছাসেবক থাকবে। আবাসনস্থল ও যাতায়াত রাস্তা নিরাপত্তা ব্যবস্থা, রুফটপ ডিউটি, মোবাইল ডিউটি মোতায়েন থাকবে।

গুম আর জোর করে গুম এক নয় by মাইকেল সাফি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্রেও নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে মানুষ গুম হয়। তিনি বলেন, প্রতি বছর বৃটেনে দুই লাখ ৭৫ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন।
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান হারে গোপন, রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট অপহরণের বিরুদ্ধে সম্প্রতি সতর্কতা উচ্চারণ করেছে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ ও জাতিসংঘ। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় তখন তাদের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনীতিক ও সমালোচকদের অপহরণের অভিযোগ আছে। ঢাকাভিত্তিক মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ অধিকার দাবি করেছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২০০৯ সাল থেকে কমপক্ষে ৪০২ জন মানুষ নিখোঁজ (ডিজঅ্যাপিয়ার) হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্লামেন্টে বলেছেন, অবশ্যই নিজের জনসাধারণকে রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব।
কিন্তু বাংলাদেশই একমাত্র দেশ নয়, যেখানে নাগরিকরা মাঝেমধ্যে লাপাত্তা হয়ে যান। ২০০৯ সালের এক পরিসংখ্যান মতে, দু’লাখ ৭৫ হাজার বৃটিশ নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন। এখনো জানা যায়নি তার মধ্যে ২০ হাজার মানুষ কোথায়। যদি আপনি আমেরিকার কথা বলেন, সেখানকার পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ।
শেখ হাসিনা বলেন, প্রায় ১৬ কোটি মানুষের উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশ। সে তুলনায় বৃটেনের জনসংখ্যা ৬ কোটি ৫০ লাখ। তাই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় আমাদের অবস্থা ভালো। যখনই কোনো নিখোঁজের ঘটনা ঘটে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই।
বৃটেন সম্পর্কে তিনি যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন তা দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৯ সালে। এ রিপোর্টে কোনো ইঙ্গিত নেই যে, কোনো একটি নিখোঁজের সঙ্গে বৃটিশ সরকার জড়িত।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলি। তিনি বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তি আর জোর করে গুম করে দেয়াকে এক করে দেখছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের আইন জোর করে গুম করে দেয়াকে স্বীকৃতি দেয় না। এ রকম কোনো রীতিও নেই। তবে এখানে কেউ গুম (ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স) হলে তার আত্মীয়-স্বজনকে শুধু নিখোঁজ (মিসিং) দেখিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে দেয়া হয়। এমনকি যখন পরিবারের সদস্যরা বলেন যে, তাদের নিকটজনকে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা তুলে নিয়ে গেছেন, তারা এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেও তাদের অভিযোগ নেয়া হয় না।
পরে যখন অপহৃত ব্যক্তিকে নিরাপত্তা হেফাজতে দেখানো হয় তখনো তাদেরকে অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আওয়ামী লীগ সরকার।
এ মাসের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ব্যক্তিগত কারণে অথবা সরকারকে বিব্রত করতে লোকজন গুমের ভুয়া অভিযোগ করে। অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়ে যান। কারণ, তারা ঋণ শোধ করতে পারেন না। আবার কেউ কেউ নিখোঁজ হয়ে যান সামাজিক কারণে। অনেকে জানে তারা গুরুতর অপরাধ করেছে, আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের লোকজন তাদের খুঁজছে- এমন ব্যক্তিরা মাঝে মাঝে নিখোঁজ হয়ে যান।
তবে সুপরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশেষ নিখোঁজ হয়েছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বের হাসান। শীর্ষ স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জার্নালে সন্ত্রাস নিয়ে তার অনেক গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
মোবাশ্বের হাসানের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, তারা তার কথা শুনতে পেয়েছেন সর্বশেষ ৭ই নভেম্বর। তখন তিনি ঢাকায় জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিটিং করছিলেন। তারপর থেকে আর তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন নি তারা। তার বন্ধুরা ভারতীয় মিডিয়াকে বলেছেন, তারা সন্দেহ করেন মোবাশ্বের হাসানকে ধরে নিয়েছে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এ অভিযোগ অস্বীকার করছে কর্তৃপক্ষ।
ফরহাদ মজহার একজন কলামনিস্ট ও কবি। এ বছরের জুলাই মাসে নিখোঁজ হওয়ার ১২ ঘণ্টারও পরে তার দেখা মেলে। তিনি অভিযোগ করেছেন, তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল অস্ত্রধারী একটি গ্রুপ। কিন্তু তার অভিযোগে সন্দেহ প্রকাশ করেছে পুলিশ। এ মাসের শুরুর দিকে তারা বলেছে, মিথ্যা বক্তব্য দেয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে তারা মামলা করবে।
বাংলাদেশে বিশেষ আধাসামরিক বাহিনীর অভিজাত ইউনিট র‌্যাব। বেশির ভাগ গুমে তারা জড়িত বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো। এপ্রিলে সুইডিশ ন্যাশনাল রেডিও একটি গোপন রেকর্র্ডিং প্রচার করে। এতে তারা বলে, একজন র‌্যাব কর্মকর্তা বেশ কিছু খুনের কথা স্বীকার করেছেন।
২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নিম্ন পর্যায়ের এক নেতার নির্দেশে জোরপূর্বক গুম ও হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে জানুয়ারিতে এ বাহিনীর ২৬ জনের একটি গ্রুপ থেকে সাবেক ১৫ জন সদস্যকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জুলাই মাসের রিপোর্ট বলছে, ২০১৬ সালে গোপনে আটক করা হয় ৯০ জনকে। কিন্তু তার মধ্যে ২১ জনকে পরে পাওয়া গেছে মৃত অবস্থায়। কমপক্ষে ৯ জন রয়েছেন নিখোঁজ। অধিকার বলছে, এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৪ জন গুম হয়েছেন। এ অভিযোগ নিশ্চিত করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
ফেব্রুয়ারিতে জোরপূর্বক বা স্বেচ্ছায় গুম বিষয় নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ নিজের নাগরিকদের অপহরণ ও গোপনে আটক রাখা বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি।
বাংলাদেশের পুলিশ প্রধান একেএম শহিদুল হক এ মাসের শুরুর দিকে বলেছেন, গোপনে অপহরণ হলো দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির একটি পুরোনো রীতি। বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার যুগ থেকেই জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটে আসছে।
এ বিষয়ে শেখ হাসিনার অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল তাদের মন্তব্যের জন্য।
(অনলাইন গার্ডিয়ানে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

২০১৬ থেকে আসা রোহিঙ্গারাই শুধু ফেরত যাবে

যৌক্তিক সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করতে দুইপক্ষ সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচএম মাহমুদ আলী। গত ২২ থেকে ২৩শে নভেম্বর মিয়ানমারে দ্বিপক্ষীয় সফর শেষে গতকাল দেশে ফেরেন মন্ত্রী। সফরকালে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা ও একটি দ্বিপক্ষীয় আরেঞ্জমেন্ট
স্বাক্ষরিত হয়। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার গতবছর ৯ই অক্টোবর এবং চলতি বছরের ২৫শে আগস্টের পরে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী বাস্তুচ্যুত রাখাইন রাজ্যের অধিবাসীদের ফেরত নেবে। এই চুক্তির অধীনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পর গত বছরের ৯ই অক্টোবরের আগে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বর্তমান চুক্তি স্বাক্ষরের দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে। মন্ত্রী আরো জানান, মিয়ানমার সফরের আগে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর নির্মাণে তিনি ভারত ও চীন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারা এই ক্ষেত্রে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। মিয়ানমার সরকারকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে এবং মিয়ানমার সরকার এ বিষয়ে রাজি হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রত্যাবাসনকারীদের সাবেক আবাসস্থল বা তাদের পছন্দ অনুযায়ী কাছাকাছি কোনো স্থানে পুনর্বাসিত করা হবে। প্রাথমিকভাবে তাদের আশ্রয়স্থলে সীমিত সময়ের জন্য রাখা হবে। মন্ত্রী জানান, এ সফরে সম্ভাব্য প্রত্যাবাসন চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ২২শে নভেম্বর পূর্বাহ্ণে দু’দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ আলোচনা করেন। একই দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলরের দপ্তরের মন্ত্রী খসড়াটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আলোচনা করে। দীর্ঘ আলোচনা শেষে খসড়াটি চূড়ান্ত হয়। চুক্তিটি বৃহস্পতিবার বিকালে স্বাক্ষরিত হয়। স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার গত বছরের ৯ই অক্টোবর এবং চলতি বছরের ২৫শে আগস্টের পরে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী বাস্তুচ্যুত রাখাইন রাজ্যের অধিবাসীদের ফেরত নেবে। এই চুক্তির অধীনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পর চলতি বছরের ৯ই অক্টোবরের আগে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী বাস্তুচ্যুত রাখাইন রাজ্যের অধিবাসীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বর্তমান চুক্তি স্বাক্ষরের দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ লক্ষ্যে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে এবং টার্মস অব রেফারেন্স চূড়ান্ত করা হবে। মাঠ পর্যায়ে প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট ফর রিপ্যাট্রিয়েশন’ নামে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ এই চুক্তি বাস্তবায়নে কাজ করবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করবে। দু’পক্ষই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআর-এর সহায়তা নিতে সম্মত হয়েছে। মিয়ানমার প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত সময়ে ইউএনএইচসিআরকে প্রক্রিয়ায় যুক্ত করবে। চুক্তি অনুযায়ী জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এ সফরে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচি’র সঙ্গে বৈঠক করেন এএইচএম মাহমুদ আলী। বৈঠকে শিক্ষা, জ্বালানি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাছাড়া দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ কাঠামো স্থাপনে বিসিআইএম প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার বিষয়ে দু’দেশ একমত পোষণ করেছে। এ সফরকালে নাফ নদের স্থায়ী সীমানা নির্ধারণের উপর ২০০৭-এ চূড়ান্তকৃত একটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। তাছাড়া ১৯৯৮ সালে স্বাক্ষরিত নাফ নদের উত্তরে স্থলভাগের সীমানা নির্ধারণ চুক্তির ‘‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব রেটিফিকেশন” বিনিময় করা হয়। এছাড়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জন্য বাংলাদেশের উপহার হিসেবে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স মিয়ানমারের সমাজসেবা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মন্ত্রী বলেন, এটা একটা প্রাথমিক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে সবকিছু হবে না। এর পরে আরো পদক্ষেপ আছে। আমরা আশা করছি, তাড়াতাড়ি সেগুলো হবে। এখন দু’মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু হবে। আজকে যদি কিছু ফেরত যায় তাহলে বেশিরভাগ গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে তারা কোথায় যাবে? এটা বাস্তবে তো সম্ভব না। ভারত এবং চীন সরকারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের বাড়িঘর স্থাপনে যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। দুই দেশই তাদের সম্মতি জানিয়েছেন। মিয়ানমারের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনায় বলেছি ভারত এবং চীন সহায়তায় রাজি আছে। মিয়ানমারের মন্ত্রী সোয়ে তিনি বলেছেন, তারা এতে সম্মত। শিগগিরই ওই দুই দেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবেন। আমিও তাদের বলবো যেন তারা মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করেন। চুক্তির ধরন সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, প্রথমে তারা বলেছিল সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) হবে। পরে তারাই আবার বলেছে অ্যারেঞ্জমেন্ট হবে। এটাতে কিছু যায় আসে না। এটা মানার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইন থাকার পরেও তা লঙ্ঘন হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কোনো দেশ বা রাষ্ট্র এটা অনুসরণ করে কিনা। তারপরও যুদ্ধ হচ্ছে।
উপযুক্ত সময় একটি ভেক টার্ম কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন- এটা অবশ্যই ফেক টার্ম। এটার টাইম ফ্রেম দেয়া যায় না। এরকম টাইম ফ্রেম দিয়ে কোনো লাভও নেই। আমরা চেষ্টা করব। গোটা পৃথিবী আমাদের সঙ্গে। তারা বলেছে, এটা শেষ করতে হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই চুক্তিকে হাস্যকর বলেছে। এবিষয়ে মন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইচ্ছা। বাস্তবায়ন তো হিউম্যান রাইটস ওয়াচ করবে না। করবে মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মন্ত্রী বলেন, ১৯৯২ সালের চুক্তিই মিয়ানমার অনুসরণ করতে চায়। সেভাবেই করা হয়েছে। বাংলাদেশ এ চুক্তির বিরোধিতা করেনি। আমরা শুধু বলেছি, এবারের সংখ্যা বেশি। অল্প সময়ের মধ্যে বেশি লোক এসেছে। গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এদের ফেরত পাঠানো। এর খুঁটিনাটি, ত্রুটিবিচ্যুতি, এটা-ওটা নেই, কেন নেই, কী হবে- এসব কথা বলে তো কোনো লাভ নেই। গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো, রোহিঙ্গাদের তারা ফেরত নিতে চেয়েছেন। মিয়ানমারের সঙ্গে এই চুক্তিতে দেশের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে- এমন বিতর্কের ব্যাপারে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, যে চুক্তিটি হয়েছে, তাতে তিনি সন্তুষ্ট। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যে স্বার্থ উপেক্ষা করার কথা বলা হয়েছে, এই মন্তব্য অত্যন্ত চমৎকার। আমার মনে হয়, এটি হাস্যকর মন্তব্য। মন্ত্রী প্রশ্ন করে বলেন, স্বার্থ কে ঠিক করে? যে সরকার ক্ষমতায়, সে সরকারই ঠিক করে। আমরা স্বার্থ ঠিক রেখেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো। এদেরকে নিজের জায়গায় নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।

ইরান-সৌদি আরব বাকযুদ্ধ

বাকযুদ্ধ চলছে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে। নতুন করে এতে দু’দেশের সম্পর্কে আরো টান লেগেছে। সর্বশেষ ইরানের সুপ্রিম নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের হিটলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। এর পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরান। তারা বলেছে, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ‘অপরিপক্ব’। তাকে এডভেঞ্চারিস্ট হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়।
উল্টো তাকেই মধ্যপ্রাচ্যের সুপরিচিত স্বৈরাচারদের পরিণতি সম্পর্কে ভাবার আহ্বান জানানো হয়েছে ইরানের পক্ষ থেকে। এ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইরান ক্রমাগাত মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এ জন্য ইরানকে মধ্যাপ্রাচ্যের ‘ইউরোপ’ হিসেবে ব্যাঙ্গ করেন সালমান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে একটি সাক্ষাতকার দিয়েছেন। তাতে বলেছেন, ইরানকে তার প্রভাব বিস্তার করতে দেয়া হবে না। এ সময়ে তিনি আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমরা ‘ইউরোপ’ থেকে শিখতে পেরেছি যে, প্রশংসা কাজ করে না। মধ্যাপ্রাচ্যের ‘ইউরোপে’ যা ঘটেছিল তা নতুন করে ঘটনাতে আমরা ইরানের নতুন হিটলারকে অনুমোদন দিতে পারি না। তার এমন বক্তব্যে ফুঁসছে ইরান। রাজনীতিবিদ, জনগণের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের এমন আক্রমণের জবাব দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি এক বিবৃতিতে বলেছেন, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স এডভেঞ্চারপ্রিয়। তিনি অপরিণত। অবিবেচক। তার মন্তব্য ও কথাবার্তা ভিত্তিহীন। তিনি আরো বলেন, আমি তাকে দৃঢ়তার সঙ্গে উপদেশ দিচ্ছি, গত কয়েক বছরের মধ্যে আঞ্চলিক সুপরিচিত স্বৈরাচারদের পরিণতি সম্পর্কে জানুন। এখন তিনি তো তাদের নীতি গ্রহণ করছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি তাদের রোল মডেল হয়ে উঠছেন। এসব খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, সৌদি আরবের কার্যত নেতা এখন মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি ইরানের বিুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। দু’বছরের মতো তিনি ক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। এর পর থেকেই ইরান বিরোধী অবস্থান তার। এ মাসের শুরুর দিকে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। বলেছেন, প্রতিবেশী দেশ ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল। এর মাধ্যমে যুদ্ধের সমান কর্মকান্ড করছে ইরান। তবে এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে ইরান। উল্লেখ্য, সুন্নীপ্রধান মুসলিম দেশ সৌদি আরব ও শিয়া প্রধান ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সৌদি আরবের অভিযোগ, ইয়েমেনে শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের সহায়তা করছে ইরান। এই ইয়েমেনেই ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে লড়াই করছে একটি জোট। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান ও ইয়েমেনের বিদ্রোহীরা। ওদিকে ইয়েমেনে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার সঙ্কটের জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করা হয়। বিশ্বে সবচেয়ে বড় মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে ইয়েমেনেÑ এমনটা বলছে জাতিসংঘ। ওদিকে ইরাকে ইরান ক্রমবর্ধমান হারে প্রভাব বিস্তার করছে এমন অভিযোগ এনে তাদেরকে সতর্ক করেছে সৌদি আরব। শুধু তা-ই নয়, লেবাননকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টার জন্য এক দেশ আরেক দেশকে দায়ী করে।  লেবাননে সৌদি আরবপন্থি প্রধানমন্ত্রী এমন একটি জোট সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যাতে রয়েছে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ গ্রুপ।

একজন আইএস যৌনদাসীর অগ্নিপরীক্ষা

জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস তাদের সর্বশেষ শক্ত ঘাঁটি হারিয়েছে। কিন্তু তাদের হাতে একসময় বন্দি থাকা নাদিয়া মুরাদের জন্য শুরু হতে যাচ্ছে নতুন এক যুদ্ধ। তিন বছর ধরে আইএসের হাতে যৌনদাসী হিসেবে বন্দি ছিলেন তিনি। এই সময়টুকুতে তাকে পার করতে হয়েছে বহু অগ্নিপরীক্ষা। মুক্ত হয়ে এখন সেসব কথাই প্রকাশ করছেন তার আত্মজীবনী ‘দ্য লাস্ট গার্ল’ বইয়ের মাধ্যমে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে তার কথা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মুরাদ ইয়াজিদি জাতিগোষ্ঠীর নারী। আইএসের হাতে অন্যান্য ইয়াজিদির সঙ্গে বন্দি হয়েছিলেন তিনিও। নিজের দুর্ভোগের কথা নিজেই প্রকাশ করতে চাইছেন। আর এ বিষয়ে তাকে সহায়তা করছেন মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী আমাল ক্লুনি। ইয়াজিদিদের ওপর আইএস যে অত্যাচার চালিয়েছে তার মধ্যে যুদ্ধ-অপরাধ ও গণহত্যাও রয়েছে। মুরাদ আইএস সদস্যদের সেসব অপরাধের জন্য শাস্তির আওতায় আনার জন্য কাজ করছেন। লন্ডন হোটেল থেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি এটা বাছাই করে নেইনি। কাউকে এই গল্পগুলো বলতে হতো। এটা সহজ নয়। ২০১৪ সালে ইরাকের উত্তরাংশে হামলা চালায় আইএস। তাদের হাতে খুন হয় হাজার হাজার ইয়াজিদি। আরো কয়েক হাজারকে অপহরণ করা হয়- তাদের মধ্যে নারী ও মেয়েরাও ছিল যাদেরকে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ইয়াজিদিদের ওপর চালানো আইএসের নির্যাতন গণহত্যার সমান। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরাকে আইএস যে অত্যাচার চালিয়েছে তার প্রমাণ জোগাড় করতে একটি দল গঠন করেছে। ২০১৬ সালে মানব পাচার থেকে বেঁচে আসা মানুষদের জন্য শুভেচ্ছা দূতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুরাদ। বর্তমানে তিনি তার বইয়ের মাধ্যমে ওইসব হাজার হাজার ইয়াজিদি নারী ও মেয়েদের উদ্ধারের জন্য সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছেন- যারা হয়তো এখনো বন্দি অবস্থায় আছে। পাশাপাশি তিনি বন্দিদশা থেকে বেঁচে আসা মানুষদের দুর্ভোগের কথাও প্রচার করছেন। তিনি আশা করেন, তাদেরকে শিবির থেকে সরিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। মুরাদ বলেন, এই বইয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইয়াজিদিদের সঙ্গে যা ঘটেছে ও তারা কিভাবে নির্যাতিত হয়েছে সে বিষয়ে সবাইকে জানানো। আমার মতো আর অনেকে আছেন যারা বেঁচে এসেছেন এবং স্বপ্ন দেখেন যে তারা একদিন সাক্ষ্য দেবেন- আইএস তাদের সঙ্গে কি করেছে। আমাদের গল্পগুলো পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।  ইরাকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় মুরাদ একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তার গ্রামে একটি শান্ত জীবন পার করছিলেন। তিনি বলেন, সবাই দরিদ্র ছিল। আমরা আমাদের সরল, নম্র জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম। আমরা শান্তিপ্রিয়, খোলামনের মানুষ ছিলাম। তার গ্রাম কচোতে আইএসের আগমন ঘটে ২০১৪ সালে। তারা এসেই সবাইকে স্থানীয় স্কুলের ভেতর যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সেখান থেকে পুরুষদের অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর বন্দুকের আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। শত শত পুরুষকে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে মুরাদের ছয় ভাইও ছিল। তার আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অন্যান্য যুবতী মেয়েদের সঙ্গে তাকে একটি বাসে ঢোকানো হয়। এরপরই সবাইকে ধর্ষণ করা শুরু করে দেয় ওই পিশাচরা। এক জঙ্গি এসে তার শার্টের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দেয়। আর এরপর এমন সব কাজ করে,  যা বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘটে থাকে। জঙ্গিরা এসে তার মা’কে নিয়ে যায় মেরে ফেলার জন্য। একজন বৃদ্ধার গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। জীবন্ত পুড়ে মারা যান তিনি। একসময় মুরাদ ও আরো কয়েকজন যুবতী মেয়েকে মসুলের একটি ধনী পরিবারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পুরুষরা দলে দলে তাদের টেনে নিয়ে যায়। এক ব্যক্তি মুরাদের পেটে একটি জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। অপর এক ব্যক্তি তিন মেয়েকে পছন্দ করে কিনে নেয়। তাদের জন্য মার্কিন ডলারে অর্থ পরিশোধ করে। বাকিদের স্থানীয় বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়। পিশাচরা মুরাদকে টেনে নিয়ে যায় পাশবিকতা চালানোর জন্য। তিনি বলেন, আমি ঘটনাগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা বইয়ে লিখেছি যাতে করে এগুলো আমায় বারবার না বলতে হয়। আইএস নেতারা ইয়াজিদি নারী ও মেয়েদের ওপর চালানো অত্যাচারকে ন্যায্য হিসেবে প্রমাণ করার জন্য তাদের নিজস্ব ধর্মীয় যুক্তি আবিষ্কার করে নিয়েছে। তাদের অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অনেক নারী আত্মহত্যা করেছে। মুরাদ একবার পালিয়ে আসার চেষ্টা করে, কিন্তু ধরা পড়ে যায়। শাস্তি হিসেবে তাকে গণধর্ষণ করা হয়। তিনি বলেন, সংখ্যায় হাজার না হলেও বন্দি দশায় থাকা ওই কয়েক শ’ মেয়েই আমাকে শক্তি জুগিয়েছে। আমি নিজেকে বলেছি, আমরা এখান থেকে বেঁচে বের হতে পারবো। একদিন সে সুযোগ এলো। একদিন এক বন্দুকধারী তাকে এক বাড়িতে একা রেখে চলে যায়। একটি খোলা দরজাও খুঁজে পান মুরাদ। ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে বের হন তিনি। দেয়াল টপকে রাস্তায় নেমে আসেন, ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে। তিনি বলেন, এটা সাহসের বিষয় ছিল না। আমার মধ্যে মৃত্যুভয় ছিল। নির্যাতিত হওয়ার ভয় ছিল। তখন শুধু একটাই চিন্তা মাথায় ছিল- বাঁচতে হবে। মসুলের আধা-অন্ধকার রাস্তায় দৌড়াচ্ছিলেন মুরাদ। তার মুখ ঢাকা ছিল লম্বা এক ওড়নায়। এক বাড়ির সামনে গিয়ে জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দেন তিনি। দরজা খুললে আশ্রয় ভিক্ষা চান। ওই পরিবার তাকে আশ্রয় দেয়। একদিন আইএসের নাকের ডগা থেকে পালিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়। এক ব্যক্তির স্ত্রী হিসেবে মসুল ছাড়েন মুরাদ। চেকপয়েন্টে এসে তিনি দেখতে পান, তার ও আরো কয়েকজনের ছবিসহ একটি পোস্টার, যেটিতে লেখা- ওয়ান্টেড। সেখান থেকে মুরাদ পালিয়ে একটি শরণার্থী শিবিরে পৌঁছায়। ২০১৫ সালে জার্মানিতে তাকে একজন শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করে নেয়া হয়। বর্তমানে তিনি তার বোনের সঙ্গে স্টুটগার্টে বাস করেন। তার বোন একজন যুদ্ধ-বিধবা। ফেলে আসা ইয়াজিদিদের অসহায়ত্বের চিন্তা এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় মুরাদকে। তিনি বলেন,  মসুলে মোট ২০ লাখ মানুষ ছিল। আর অপহরণ করে আনা মেয়ের সংখ্যা ছিল ২ হাজার। মসুলে এমন হাজার হাজার পরিবার ছিল যারা ওইসব মেয়েদের সাহায্য করতে পারতো। কিন্তু তারা করেনি। নারীদের পর্দা দিয়ে মুখ ঢেকে চলতে হতো সেখানে। এইভাবে ইয়াজিদি নারীদের সহজেই বের করে আনা যেত। অনেক পরিবার ইয়াজিদিদের পালাতে সহায়তা করার বদলে হাজার হাজার ডলার চেয়েছে। মুরাদ বলেন, তাকে নিরাপদে বের করে আনতে তার বোনের পরিবারকে ২০ হাজার ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। গত গ্রীষ্মে একজন বীরের বেশে নিজের শহরে ফেরত যান মুরাদ। তার ধংস হয়ে যাওয়া বাড়িতে প্রবেশ করে দু’চোখ বেয়ে অশ্রু নামে তার। তার এক বক্তব্যে তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম যে, আমাদের পরিণতি পুরুষদের মতোই হবে- আমাদের মেরে ফেলা হবে। কিন্তু তার বদলে সৌদি আরবীয়, ইউরোপীয়, তুনিশীয় পুরুষ ও অন্যান্য জঙ্গিরা এসে আমাদের ধর্ষণ করছে। বিক্রি করে দিয়েছে। মুরাদ আশা করেন যে, একদিন তাদেরকে ধর্ষণের দায়ে তিনি ওইসব পুরুষদের চোখে চোখ রেখে শাস্তির কাঠগড়ায় নিয়ে যাবেন। আর তিনিই হবেন সর্বশেষ মেয়ে (দ্য লাস্ট গার্ল) যাকে এ ধরনের নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তার আরো একটি ইচ্ছা আছে। তিনি একজন মেকআপ আর্টিস্ট হতে চান। হেয়ার ড্রেসার (নরসুন্দর) হতে চান। সম্ভব হলে নিজের একটি সেলুন খুলতে চান। এমন একটি জায়গা যেটি প্রচলিত চিন্তা-ধারায় নারীদের কাছে নিরাপদ স্বর্গের সমান। তিনি বলেন, হয়তো মানুষ আমাকে একজন স্টাইলিস্ট হিসেবে মনে রাখবে, আইএসের কবল থেকে বেঁচে আসা কোনো নারী হিসেবে নয়। তারা সেটা ভুলে যাবে।

দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত হচ্ছে ওষুধ by এম এম মাসুদ

দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদন করছে। ওষুধ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক। সাম্প্রতিক সময়ে ওষুধ রপ্তানির গতি বাড়ায় দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করেন। এছাড়া এক সময় চাহিদার ৭০ শতাংশ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি হতো। আর এখন দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ মিটিয়ে বিশ্বের ১২৭ দেশে বাংলাদেশের প্রস্তুত ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে।
বিশ্বমানের ওষুধ এত কম দামে আর কোথাও পাওয়া যায় না। এ ছাড়া ওষুধ প্রযুক্তি ও কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরেই প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজার। আর বছরে প্রায় ১০০০ কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি হয়। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বিএএসএস)-এর প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে দেশের দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ব্র্যান্ডের ৮ হাজারের বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে, যার মধ্যে বড় ১০ কোম্পানি দেশের চাহিদার ৮০ শতাংশ মিটিয়ে থাকে। বড় ২০ কোম্পানি বিবেচনায় নিলে তারা মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ সরবরাহ করছে। আর ৪০ কোম্পানি ১৮২টি ব্র্যান্ডের সহস্রাধিক রকমের ওষুধ রপ্তানি করছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১৫.৬৩ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রপ্তানি হয়েছিল ১ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের ওষুধ। আর গত বছর পুরো সময়ে আয় হয়েছে ৮ কোটি ২১ লাখ ডলার বা ৬৫০ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রথম তিন প্রান্তিকে দেশের ৬ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ৮২ লাখ ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা ছয় কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রায় সাত কোটি ডলারের, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭ কোটি ২৬ লাখ ডলারের, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ৮ কোটি ২১ লাখ ডলারের ওষুধ বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, স্বল্প মূলধন ও ওষুধের গুণগত মান বজায় রাখায় বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ওষুধের দাম অনেক কম। আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বের ওষুধবাণিজ্যের ১০ শতাংশ দখল করা সম্ভব। এতে ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। একই সঙ্গে এ খাতে ২ লাখেরও বেশি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ওষুধশিল্প সবদিক দিয়ে পরিপক্বতা অর্জন করেছে। মান বেড়েছে, সরকারের নিয়ন্ত্রণও উন্নত হয়েছে। এখন ওষুধশিল্প উড়াল দেয়ার পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ১০-১২টি কোম্পানি বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন পেয়েছে। বিশ্বে ওষুধের রপ্তানি বাজার ১৭০ বিলিয়ন ডলারের। এর ১০ শতাংশ ধরা গেলে রপ্তানি আয় ১৭ বিলিয়ন ডলার হবে।
সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান আইএমসি ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরে অর্থাৎ ওষুধ শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতকরা বত্রিশ ভাগ। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এটি সম্ভব হয়েছে।
ওষুধশিল্প সমিতির মহাসচিব এসএম শফিউজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎকৃষ্টমানের ওষুধ উৎপাদন করে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানিতে অগ্রগামিতা অর্জনের মাধ্যমে আঞ্চলিক পর্যায়ে ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, ওষুধ রপ্তানিতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই পোশাক খাতকে ধরতে পারবো। করণে ওষুধ রপ্তানি প্রতি বছরেই বাড়ছে। ফলে আমরা বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হতে বেশি লাগবে না বলে আমরা আশা করছি। ২০৩০ সাল নাগাদ ওষুধ রপ্তানিতে বাংলাদেশ এক নম্বর দেশ হতে পারে, এমন সম্ভাবনা আছে। তিনি বলেন, মুন্সীগঞ্জের এপিআই পার্ক পূর্ণাঙ্গ চালু হলে ওষুধশিল্পের কাঁচামালের জন্য আর কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না।
এদিকে সম্প্রতি তুরস্কে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশে বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। তুরস্কের বাংলাদেশ দূতাবাস এবং বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে বেক্সিমকো ফার্মার সিইও এসএম রাব্বুর রেজা বাংলাদেশের ওষুধের গুণগত ও আন্তর্জাতিক মান, বহির্বিশ্বে এর চাহিদা এবং ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওষুধের পরিসংখ্যানগত অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টর বাংলাদেশের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল একটি শিল্প খাত এবং ২৫৭টি ওষুধ কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধের বর্তমান বাজার মূল্য বার্ষিক ২ বিলিয়নের উপরে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে ৫৪টি ওষুধ রপ্তানিকারি প্রতিষ্ঠান ১২৭টি দেশে রপ্তানি করে থাকে। ২০১১ সালে রপ্তানিকারী দেশের সংখ্যা ছিল ৪৭টি। এর পর কয়েক বছর কোনো প্রতিষ্ঠান চালু হয়নি। কিন্তু ২০১৫ সালে কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১১৩টিতে। বর্তমানে ১২৭টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকার উত্তর ও দক্ষিণের ২৫টি দেশে। ইউরোপের ২৬টি, অস্ট্রেলিয়ার ৫টি, আফরিকার ৩৪টি ও এশিয়ার ৩৭টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হয়।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ২০১৫ সালের জুন মাসে দেশের প্রথম ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি হিসেবে ইউএস এফডিএ কর্তৃক নিরীক্ষিত ও অনুমোদিত হয়। বর্তমানে কোম্পানিটি ৫০টিরও বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। বেক্সিমকো ফার্মা ইউএস এফডিএ, এজিইএস (ইইউ), টিজিএ অস্ট্রেলিয়া, হেলথ কানাডা, জিসিসি এবং টিএফডিএসহ বিশ্বের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গেল কয়েক বছরের দেশ থেকে ওষুধ রপ্তানি উল্লেখ্যযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১১ সবমিলিয়ে ওষুধ রপ্তানি হয় ৪২৬ কোটি টাকা। ১২ সালে রপ্তানি হয়েছে ৫৫১ কোটি টাকা। ১৩ সালে ৬১৯ কোটি টাকা। ১৪ সালে ৭৩৩ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে রপ্তানি হয়েছে ৮৩২ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত বছর ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশে থেকে ওষুধ রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, দেশে বিশ্বমানের ওষুধ পরীক্ষাগারের কাজ চলছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। এসব কাজ শেষ হলে এ শিল্পের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের বিকাশ খুবই আশাব্যঞ্জক। বছর কয়েক আগেও জীবনরক্ষাকারী ৫০ শতাংশেরও বেশি ওষুধ আমদানি করতে হতো। এখন সেটি অনেক কমে এসেছে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখনো দেশের বেশিরভাগ ওষুধের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে ওষুধের কাঁচামালের বাজার প্রায় ১২০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের অগ্রযাত্রার মূল কারণ আমাদের ওষুধ নীতির যথার্থ বাস্তবায়ন। ১৯৮২ সালে এদেশে যে ওষুধ নীতি করা হয় তার সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। দেশে ওষুধ প্রস্তুতের কাঁচামাল উৎপাদন বাড়াতে পারলে উৎপাদন ব্যয়ও কমবে, ওষুধের দামও মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে।
বিজিএমইএ’র তথ্যে দেখা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরে ২,৮১৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। তার আগের ২০১৫-১৬ অর্থবছর ২,৮০৯ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.১৪ শতাংশ।