Monday, May 27, 2013

সম্মেলনকে সহিংসতা বন্ধের সুযোগ মনে করে সিরিয়া

সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ মুয়াল্লেম বলেছেন, প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনকে রক্তপাত বন্ধের সুযোগ বলে মনে করে তাঁর সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ ইরাক সফরে গিয়ে বাগদাদে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন। সিরিয়ায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা সহিংসতা বন্ধে আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ও তাঁর বিরোধীরা উভয়েই এ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। আগামী মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, আসন্ন শান্তি সম্মেলন সিরিয়া-সংকট সমাধানে একটি দারুণ সুযোগ। তবে পৃথিবীতে এমন কোনো শক্তি নেই, যারা সিরিয়ার ভবিষ্যৎ ঠিক করবে। এটা ঠিক করার ক্ষমতা শুধু সিরিয়ার জনগণেরই রয়েছে।’ ওয়াশিংটন সিরিয়ার বিদ্রোহীদের শান্তি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে চূড়ান্তভাবে রাজি করতে কাজ করে যাচ্ছে। বাশারবিরোধী শীর্ষস্থানীয় নেতারা এ সম্মেলনের ব্যাপারে ইতিমধ্যে ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানালেও তাঁদের মূল দাবি পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিরোধীদের মূল দাবি হলো, প্রেসিডেন্ট বাশারকে অবশ্যই আগে পদত্যাগ করতে হবে। বাশারবিরোধী বৈঠক চতুর্থ দিনে: তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বাশারবিরোধী জোটের বৈঠক গতকাল রোববার চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। নির্ধারিত তিন দিনে বিভিন্ন বিষয়ে মতৈক্য না হওয়ায় গতকাল অনির্ধারিত দিনে আলোচনা করেন নেতারা। বাশারবিরোধীরা মূলত আসন্ন শান্তি সম্মেলন ও জোটের পরবর্তী নেতা ঠিক করার জন্য এ বৈঠকে বসেন। তবে বৈঠকে সিরিয়া সংঘাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। বিরোধী জোট ন্যাশনাল কোয়ালিশনের মুখপাত্র খালেদ আল-সালেহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আশা করি শেষ দিনে ভালো কিছু ঘোষণা দিতে পারব।’ কুশায়েরে লড়াই চলছে: সিরিয়ার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর কুশায়েরে বাশার বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের লড়াই অব্যাহত রয়েছে। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস অভিযোগ করেছে, শনিবারও কুশায়ের শহরের প্রধান সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে তিন বেসামরিক লোকসহ অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছে।

লেবাননে হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে রকেট হামলা

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে শিয়া-অধ্যুষিত এলাকায় গতকাল রোববার দুটি রকেট হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, সিরিয়ায় জয়ী না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহর ঘোষণার এক দিন পর এ হামলার ঘটনা ঘটল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কেউ এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। প্রতিবেশী সিরিয়ায় দুই বছরের বেশি সময় আগে সংঘাত শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত বৈরুতের ওই এলাকায় হামলা চালানো হলো। স্থানীয় লোকজন জানান, একটি রকেট ব্যস্ত এলাকা চিহারে এক গাড়ি বিক্রির দোকানের সামনে পড়ে। এর ১০০ মিটার দূরে অন্য রকেটটি আঘাত হানে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হন। লেবাননের কট্টরপন্থী শিয়া সংগঠন হিজবুল্লাহর সদস্যরা সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষে লড়াই করছে, বিশেষ করে সিরিয়ার কুশায়ের শহরে। শহরটি আলাবি শিয়াগোষ্ঠীর সদস্য বাশার পরিবারের শক্ত ঘাঁটি। সেখানে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বাশার বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের ভয়াবহ সংঘর্ষ চলছে। গত সপ্তাহে লেবাননের ত্রিপোলি এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন নিহত হয়। এ সংঘর্ষকে সীমান্তসংলগ্ন কুশায়ের শহরের লড়াইয়ের জের বলে মনে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লঁরা ফ্যাবিয়াস লেবাননে সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। গতকাল আবুধাবিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ফ্যাবিয়াস বলেন, সিরিয়ার সহিংসতা কোনোভাবেই লেবাননে ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া যাবে না।

নতুন সহায়তা ও পুরোনো ঋণ মওকুফের আশ্বাস

মিয়ানমারকে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ ও দুই কোটি ৩০ লাখ ডলারের উন্নয়ন সহায়তা দেবে জাপান। মিয়ানমার সফরের শেষ দিন গতকাল রোববার এ ঘোষণা দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। জাপান মিয়ানমারের ১৭৪ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ মওকুফ করবে বলেও জানানো হয়েছে। গতকাল মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব তথ্য জানায়। বিবৃতিতে জানানো হয়, জাপানের প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের অবহেলিত অর্থনৈতিক খাতসহ অন্যান্য খাতের উন্নয়ন নিয়ে থেইন সেইনের সঙ্গে আলোচনা করেন। মিয়ানমার ও জাপানের মধ্যকার বন্ধুত্বের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালের পর থেকে এটিই জাপানের কোনো প্রধানমন্ত্রীর প্রথম মিয়ানমার সফর। বিবৃতিতে আরও জানানো হয়েছে, জাপানের দেওয়া নতুন ঋণের অর্থ দিয়ে মিয়ানমারের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ এবং ইয়াঙ্গুনে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ছাড়া উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ দিয়ে মিয়ানমারের পানিব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিদেশে বৃত্তি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের কাজ করা হবে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী গতকাল ইয়াঙ্গুনের কাছে ছয় হাজার একর জমিতে নির্মাণাধীন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পটি ঘুরে দেখেন। ওই প্রকল্পের জন্য জাপানের তিনটি ও মিয়ানমারের নয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বলে সরকারি পত্রিকা নিউ লাইট অব মিয়ানমার জানিয়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সফরসঙ্গী হিসেবে দেশটির ৪০টি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর প্রধান উপস্থিত ছিলেন।

নতুন সরকার পুরো মেয়াদ থাকুক

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) সদ্য মনোনীত নেতা সৈয়দ খুরশিদ আহমেদ শাহ বলেছেন, তাঁর দল চায়, পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) নেতৃত্বাধীন সরকার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করুক। পিপিপি মনে করে, পিএমএল-এন পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারলে ‘একনায়কতন্ত্রের দরজা চিরতরে বন্ধ হবে’। জাতীয় পরিষদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার পর গত শনিবার পিপিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে খুরশিদ আহমেদ শাহ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, পিএমএল-এন তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারলে কোনো অপশক্তি গণতন্ত্রকে বিচ্যুত করার চিন্তা করতে পারবে না। পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি নির্বাচিত সরকার মেয়াদ পূর্ণ করার পর সম্প্রতি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ ঘটনাকে গণতন্ত্রের পথে দেশটির ভঙ্গুর যাত্রায় একটি বিশাল অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। খুরশিদ শাহ সাংবাদিকদের বলেন, নতুন সরকার জনস্বার্থের সঙ্গে আপস করছে বলে যতক্ষণ পিপিপির মনে না হবে, ততক্ষণ পিপিপি সরকারের কাজে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। এমনকি সরকার যদি জনস্বার্থে সংবিধান সংশোধন করতে চায়, তাতেও পিপিপি সহযোগিতা করবে। তিনি বলেন, নির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পিপিপি গণতন্ত্রের স্বার্থে ভোটের ফল মেনে নিয়েছে। এদিকে, সিন্ধুর প্রভাবশালী দল মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম) বলেছে, তারা পিএমএল-এন সরকারের জোটে যোগ দেবে কি না, তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

আবার মোশাররফকে হত্যার হুমকি দিল পাকিস্তানি তালেবান

পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফকে গতকাল রোববার নতুন করে হত্যার হুমকি দিয়েছে ‘তেহরিক-ই-তালেবান’। পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনটি এর আগে গত মার্চে মোশাররফ দেশে ফিরে আসার আগে তাঁকে একবার হত্যার হুমকি দিয়েছিল। বর্তমানে মোশাররফ গৃহবন্দী অবস্থায় বিচারাধীন। তেহরিক-ই-তালেবানের ওয়েবসাইটে দেওয়া একটি ভিডিও বার্তায় সংগঠনটির মুখপাত্র এহসানুল্লাহ এহসান বলেন, ‘মোশাররফের কৃতকর্মের শাস্তি হিসেবে তাঁকে হত্যা করা হবে। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি দেশজুড়ে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন।’ উল্লেখ্য, ক্ষমতায় থাকার সময় মোশাররফ যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অংশ হিসেবে তালেবান দমনে অংশ নেন। এ ছাড়া ২০০৭ সালে পাকিস্তানের লাল মসজিদে জঙ্গি দমন অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। ওই অভিযানে কয়েক শ ছাত্র মারা যায় বলে তালেবান দাবি করে। আর এর পর থেকেই পাকিস্তানে জঙ্গি হামলার জোয়ার শুরু হয়। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ই (১৯৯৯-২০০৮) মোশাররফের ওপর তিনবার হামলা হয়। পারভেজ মোশাররফ বর্তমানে ইসলামাবাদের কাছে তাঁর খামারবাড়িতে গৃহবন্দী আছেন। বেনজির ভুট্টো হত্যার ষড়যন্ত্র, কয়েকজন বিচারককে গৃহবন্দী, ২০০৬ সালে বেলুচিস্তানের এক নেতাকে হত্যা প্রভৃতি অভিযোগে তাঁর বিচার চলছে।

এবার ফ্রান্সে সেনা সদস্যের ওপর হামলা

লন্ডনে ছুরিকাঘাতে এক সেনাসদস্য নিহত হওয়ার কয়েক দিন পর ফ্রান্সে প্রায় একই ধরনের হামলায় আহত হলেন এক সেনাসদস্য। ছোরা বা এ ধরনের কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর ঘাড়ে আঘাত করেই পালিয়ে যায় হামলাকারী। গত শনিবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের শহরতলীতে ঘটা এ হামলাকে ফরাসি কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবাদী হামলা হিসেবে দেখছে। সেদ্রিক কহদিয়ে নামের ওই সেনাসদস্যকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল। সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনীর সদস্য কহদিয়ে তাঁর দুই সহকর্মীর সঙ্গে টহল দিচ্ছিলেন। এ সময় পেছন থেকে হামলা চালানো হয়। পুলিশ বলেছে, ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারী দীর্ঘদেহী এবং তাঁর মুখে দাড়ি ছিল। আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী লোকটি জোব্বা পরিহিত। ইথিওপিয়ায় সফররত ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বলেন, পুলিশ ওই হামলাকারীকে খুঁজছে। ফ্রান্সের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সন্ত্রাসবিরোধী বিভাগ এই হামলার বিষয়টি তদন্ত করছে।

কায়ানির আশ্বাস

আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে পাকিস্তান। দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি এ আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি গত শনিবার রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা সদর দপ্তরে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহায়তা বাহিনীর (আইএসএএফ) কমান্ডার জেনারেল জোসেফ এফ ডানফোর্ডের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই জেনারেল পারস্পরিক সম্পর্ক ও আফগান-পাকিস্তান সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো সেনা প্রত্যাহারের কৌশলের ব্যাপারেও তাঁরা মতবিনিময় করেন।

‘ম্যান্ডেলা বেশি সদয়’

দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা শ্বেতাঙ্গদের প্রতি অতিরিক্ত সদয় বলে মন্তব্য করেছেন জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে। এক প্রামাণ্যচিত্রে তিনি এ কথা বলেন। এতে মুগাবে তাঁর ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং টনি ব্লেয়ার ও ব্রিটিশ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। আগামী রোববার দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এটি সম্প্রচারিত হবে। প্রতিবেশী দক্ষিণ আফ্রিকায় এখনো শ্বেতাঙ্গ-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান থাকার জন্য ম্যান্ডেলার সমালোচনা করে মুগাবে বলেন, তিনি কঠোর হতে পারেননি বলেই এমনটি হয়েছে।

মৌসুমি ফল by খন রঞ্জন রায়

রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়ার কারণে এ সময় আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, তরমুজ, লেবু, পেঁপে, আনারস, পেয়ারা, জামরুল, বেল, কতবেল ও ডেউয়া আমাদের জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে সম্পৃক্ত হয়। ইতিমধ্যে রাস্তাঘাট, হাটবাজার ও ফুটপাত গরমের তৃষ্ণা নিবারণী বৈচিত্র্যময় ফলের সমাহারে লোভাতুর আবেশ তৈরি করেছে। সংক্ষিপ্ত সময়ের ফল লিচু। অনন্য বৈশিষ্ট্য ও বিচিত্র স্বাদের কালীপুরের লিচু দু-তিন দিনেই উধাও। আগমন ঘটেছে উত্তরাঞ্চলের রসে টসটস লালচে মাংসল লিচুর। হয়তো পাওয়া যাবে সপ্তাহ খানেক। এর মধ্যেই অসাধারণ লিচুর নিবেদিতপ্রাণ গৌরবময় স্বাদ আস্বাদন করে নিতে হবে।
চার হাজার বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ ‘আম’ বর্তমানে ৩৫ রকম স্বাদ, গন্ধ, রস ও জাতের পাওয়া যায়। গোপালভোগ, মালভোগ, ল্যাংড়া, সুন্দরী, ভবানী, চম্পা, দাউনিয়া, সুরম্পা, বৈশাখী, পাঞ্চাছন্দ, সরঙ্গম, সিঁদুরকোটা, বউভোলানি, হিমসাগর, কাজলী, কলাবতী, বিবিপছন্দ ইত্যাদি নামের আম রয়েছে।
অপরিসীম গুরুত্ব, অর্থনৈতিক বিকাশ ও বিনিয়োগ-বাণিজ্যের সম্ভাবনা বিবেচনায় দেশব্যাপী আমগাছের সার্থক জনপ্রিয়তার কারণে এই গাছকে সরকার জাতীয় বৃক্ষের স্বীকৃতি দিয়েছে। আমের স্বাদ, গন্ধ, রং ও আকার বিবেচনায় মনোলোভা আমাদের এই ফল চাষ শুরু করেছে চীন, থাইল্যান্ড, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিলসহ অনেক দেশ। বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে চাষাবাদ করে বিশ্বব্যাপী আমের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভারত। আমরা ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে ধারণ করে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, নাটোর আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত আমকে লালন করছি।
মৌসুমি ফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাপনার অভাবে হাতছাড়া করছি। বঞ্চিত হচ্ছি এর স্বাদ আস্বাদন ও পুষ্টিমান রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম গ্রহণ করা থেকে। দু-তিন মাস পরই আর দেখা মিলছে না বাজার সয়লাব হওয়া ভিন্ন মাত্রায় দেশীয় ফলমূলের। বাজার তখন দাপটের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করে আমদানি করা ফরমালিন, কার্বাইড, মিপসিন, মার্শাল, কার্বোফুরান, ইথরিল ও ডাই-এলড্রিনযুক্ত স্বাদ-গন্ধ-বর্ণহীন বিজাতীয় ফল।
ভাবতে অবাক লাগে, অপার সম্ভাবনার এই ফলমূলকে সংরক্ষণ করার কোনো কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়নি। দু-চার দিন সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থাও নেই। এ কারণে নষ্ট হয় আমাদের জাতীয় ঐতিহাসিক ফলমূল। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা কয়েক দিন না পচার ব্যবস্থা করতে মানবস্বাস্থ্যের অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রোফাইল গেনেট, বিএইচএ, হেপটাইল পারাবেন, বিএইচটি, সোডিয়াম নাইট্রেট, সোডিয়াম বেনজায়েট, সালফাইড ইত্যাদি মিশ্রণ স্প্রে করছেন; তা প্রকাশ্যে ও অবলীলায়। তরিতরকারি আর সবজি সংরক্ষণে দেশে কোল্ডস্টোরেজ রয়েছে মাত্র ২৮০টি; তা-ও ঢাকাকেন্দ্রিক। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এসব কোল্ডস্টোরেজও পরিচালিত হয় ম্যানুয়ালি অ্যানালগ পদ্ধতিতে।
দেশের বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক নানা জাত ও স্বাদের মৌসুমি ফল উৎপাদিত হয়। সেসব এলাকা চিহ্নিত করে আম, জাম, আনারস, লিচু, কাঁঠাল, তরমুজ, বাঙ্গি, পেঁপে ইত্যাদির বিষয়ভিত্তিক প্রক্রিয়াকরণ টেকনোলজি শিক্ষা চালু করে দক্ষ লোকবল তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। উপকরণ আমদানি করে বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নষ্ট হওয়া রোধ করতে হবে এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে মনোযোগী হতে হবে।
আমাদের ঐতিহ্যের এসব ফল সংক্ষিপ্ত সময়ের না হয়ে বছরব্যাপী উপভোগ করব রবীন্দ্রনাথের ‘আমসত্ত্ব’ কবিতার আদলে। সংরক্ষিত ফল মধ্যপ্রাচ্যের গুটি কয়েক দেশ ছাড়াও দূরপ্রাচ্যের দেশে চাহিদা অনুযায়ী তরতাজাভাবে রপ্তানি করতে সক্ষম হব। বর্তমানে ফল রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৪০০ কোটি টাকা না হয়ে চার হাজার কোটি টাকায় উপনীত হবে—বিষয়টি আশ্চর্যের নয়, বাস্তবের।
খন রঞ্জন রায়
চকবাজার, চট্টগ্রাম।

বাধা নয়, বিবেচনাচাই

অনলাইনে প্রথম আলো (prothom-alo.com) নিয়মিত পড়া হয় ১৯০টি দেশ থেকে। পড়ার পাশাপাশি পাঠকেরা প্রতিদিন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, খেলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মতামত দেন। তাঁদের এ মতামত চিন্তার খোরাক জোগায় অন্যদের। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠকদের কিছু মন্তব্য ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে ছাপা হলো।
‘গ্রামীণ’ নামে নিবন্ধন বন্ধ, বিদেশি বিনিয়োগে বাধা
শান্তিতে নোবেলজয়ী ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার আওতায় ‘গ্রামীণ’ নাম নিয়ে কোনো বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ প্রস্তাব ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে মতামত জানিয়ে মোহাম্মদ শাহ আলম লিখেছেন: সবকিছু যখন স্রোতের দিকে ছোটে, তখনো আমাদের সরকার স্রোতের উল্টো দিকে ধাবমান। এভাবে কত দিন তারা ছুটতে পারবে? একসময় সরকার হয়তো দেখবে তার চারপাশে কেউ নেই, তখন তাদের আর কিছুই করার থাকবে না। ‘গ্রামীণ’কে শত্রু না ভেবে দেশের উন্নয়নের সহযোগী ভাবলে সরকারেরই লাভ হতো এবং কর্মসংস্থান বেড়ে দেশের উন্নয়ন হতো। ড. ইউনূসের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয়ে তাঁকে সাদরে গ্রহণ করলে, সরকার অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেত।
শফিক: এ ধরনের কৌশল তৃতীয় বিশ্বের জন্য কাম্য নয়। আমাদের দিকে এগিয়ে আসা আশীর্বাদকে পায়ে ঠেলে দিলাম। কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। এ জেড নাসিম রাতুল: আমাদের রাজনীতিকেরা ভাষণে এমনভাবে কথা বলেন যেন মনে হয়, এ দেশকে তাঁদের চেয়ে আর কেউ বেশি ভালোবাসে না। অথচ এই তার নমুনা!
খুনের দায়ে সাজাপ্রাপ্তরা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা চান
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর রাষ্ট্রপতি বিশেষ ক্ষমতাবলে দেশের কোনো নাগরিকের সাজা মওকুফ করতে পারেন। দেশের দাগি আসামিরা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগে রাষ্ট্রপতির এ বিশেষ ক্ষমতার সুবিধা নিচ্ছেন। এ খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আবদুল মজিদ কাজী লিখেছেন: রাষ্ট্রপতি তখনই সাজা মওকুফ করবেন, যখন তিনি মনে করবেন আদালতের রায়টি সঠিক নয়। এভাবে গড়পড়তা মওকুফ করতে থাকলে দেশে অপরাধের প্রবণতা বাড়তে থাকবে।
রহমতুল্লাহ বাবু: বাংলাদেশে প্রচলিত সাক্ষ্য আইন, বিচারিক নিয়মাবলি—সবকিছুতে বাদীর চেয়ে আসামি বেশি সুবিধা ভোগ করে। যেকোনো তর্কসাপেক্ষ বিষয়ে সুবিধা ভোগ করে আসামি, বাদী নয়। ফলে এমনিতেই বিচার-প্রক্রিয়ায় আসামির অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর পরও যদি মহামান্য রাষ্ট্রপতি এভাবে ক্ষমা করতে থাকেন, তবে অপরাধের মাত্রা বাড়তেই থাকবে। রাষ্ট্রপতির উচিত হবে এ ধরনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা।
সুপারিশ ছাড়া কিছু করার নেই: মিজানুর রহমান
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেছেন, বিচারবহির্ভূত গুম-খুনে সরকারকে সুপারিশ করা ছাড়া কমিশনের আর কিছু করার ক্ষমতা নেই। তাঁর এ বক্তব্যের ব্যাপারে এম সাজ্জাদ হোসেন মন্তব্য করেছেন: যদি তাই হয়, তবে পদে বসে থাকা কেন? রাষ্ট্রের অপরাধে আপনার প্রতিষ্ঠানটি কলঙ্কিত হচ্ছে।
ইবনে মিজান: মানবাধিকার সংস্থা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে, কোথায় কোথায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তা তুলে ধরবে এবং সরকারকে তা প্রতিকার করতে বলবে। এটাই বা কম কিসে? শুধু সরকারের কাজ নয়, বিরোধী দলের জ্বালাও-পোড়াও, সাভারে দুর্ঘটনা, হেফাজতের আন্দোলন দমন—এমন ঘটনায় কমিশন নিশ্চুপ ছিল। আমরা আশা করি, এ প্রতিষ্ঠানটি নিরপেক্ষ হয়ে কাজ করবে এবং নির্যাতিত ব্যক্তিদের পক্ষে ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলবে।
ছাত্রদল, যুবদল, শিবির সহিংসতা ঘটায় টাকা দেয় ১৮-দলীয় জোট
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, মতিঝিল-পল্টন এলাকায় হেফাজতে ইসলামের অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগে ছাত্রদল, যুবদল ও জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা অংশ নেন। এই সংবাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আয়াজ মন্তব্য করেছেন: অপরাধ সংঘটন বা সংঘটনের ষড়যন্ত্র করা ফৌজদারি অপরাধ। যদি তাই হয়, তবে জুনায়েদের ভাষ্যমতে ১৮ দলের শীর্ষনেতারা ৫ মের ধ্বংসযজ্ঞের হুকুমের আসামি এবং তাঁদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা দরকার। যদি সরকার এই বিচার করতে না পারে, তবে তাদেরও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
প্রদীপ: বাস্তবতা হলো বাবুনগরী সাহেবরা এত দিন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে কাটিয়েছেন। তাই রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝেন না। তাঁদের সরলতার সুযোগে আশ্রয়দাতা বিএনপি ও জামায়াত তাঁদের ধ্বংসাত্মক পথে নিয়ে গেছে।
পুলিশের কাছ থেকে অস্ত্রধারীকে ছিনিয়ে নিল ছাত্রলীগ
সিলেটের এমসি কলেজের সংঘর্ষে অস্ত্র হাতে অংশ নেওয়া গোলাম রহমান চৌধুরীকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে
নিয়েছেন সিলেটের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে হেলাল লিখেছেন: সবশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলবেন, ‘এরা ছাত্রলীগের কেউ নয়, এরা বহিরাগত।’ আর দেশবাসী যদি এসব দুর্বৃত্তের গ্রেপ্তার ও বিচারের জন্য বেশি চাপাচাপি করে তবে তিনি হয়তো বলবেন, ‘এদের আগেই ছাত্রলীগ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, তাই এদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই।’ সরকার কি এভাবেই তাদের নানা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চালাতে চাইছে?
এ এস মাহমুদ: এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা আগেও হয়েছে। সরকারি দলের ক্ষেত্রে এটা নতুন কিছু নয়।
ঢাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল এলাকায় ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে ঢাকায় সব সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ-সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আরিফুর রহমান লিখেছেন: সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। বিরোধী দলকে ঠেকাতে গিয়ে নিজেরাই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে ও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
শাহীন রেজা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি কি এমন যে আপনি বললেন, আর আমরা সমস্বরে চেঁচিয়ে বললাম, ‘মারহাবা’? ভাগ্যিস আপনি পার্কের বেঞ্চিতে পা দুলিয়ে দুলিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার বাদাম চিবানো নিষিদ্ধ করেননি বা ফুটপাতের ওপরে পসরা সাজিয়ে জোঁকের তেল বেচা নিষিদ্ধ করেননি। চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতাসংক্রান্ত সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের ‘যুক্তিসংগত বাধানিষেধ’-এর বলে বলীয়ান হয়ে আপনি এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, এ নিষেধাজ্ঞার অন্তর্নিহিত অর্থটি কী দাঁড়ায়?
সাইদুর রহমান: জোর করে ক্ষমতায় থাকা যায়, একদলীয় নির্বাচনও করা যায়, কিন্তু মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। সভা-সমাবেশ করা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। সরকারের এমন ঘোষণার পর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু বলছে না কেন?
 (পাঠকের মন্তব্য বিস্তারিত পড়তে ও আপনার মতামত জানাতে ভিজিট করুন prothom-alo.com)

শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব

সাভারের ভবনধসে হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও বেশি।  দুর্ঘটনা-পরবর্তী বিভিন্ন আলোচনায় ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কথা উঠে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশি একজন পোশাকশ্রমিকের জীবনের মূল্য কতখানি? কর্মক্ষম একজন মানুষের মৃত্যু তাঁর পরিবারকে যে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়, কতটুকু আর্থিক ক্ষতিপূরণ সেই বিপর্যয় সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট? অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই মূল্যমান যাচাইয়ের কাজটি প্রায় অসম্ভব। তবু ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারগুলোকে যাতে আর্থিকভাবে বঞ্চিত করা না হয়, সে লক্ষ্যে পরিসংখ্যানগত কাঠামোর ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের সর্বনিম্ন অঙ্ক পরিমাপ করা প্রয়োজন।
সরকারি মন্ত্রণালয় ও বস্ত্রশিল্প সমিতিগুলোর নথিপত্র ও ইন্টারনেটের বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করে আমরা এই বিশ্লেষণটি করেছি। একজন শ্রমিক কর্মস্থলে দুর্ঘটনার শিকার হলে, প্রথমে যে ক্ষতিটি আর্থিকভাবে পরিমাপযোগ্য তা হলো দুর্ঘটনার ফলে শ্রমিকটি যে উপার্জন হতে বঞ্চিত হলো, সেই পরিমাণটা। এই অর্থনৈতিক ক্ষতি পরিমাপ করার জন্য প্রথমে আমাদের জানতে হবে দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকটির বয়স এবং বাংলাদেশে শ্রমিকদের অবসর গ্রহণের গড় বয়স। শ্রমিকটি বেঁচে থাকলে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত যত উপার্জন করতেন, সেই উপার্জনকে আমরা ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিবেচনা করেছি। মোট মজুরির সঙ্গে বর্তমান বাজারদর, মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হারের সামঞ্জস্য রেখে ক্ষতিপূরণের একটি অনুমিত সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরসহ আরও কিছু উন্নত দেশের মানবসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, কর্মরত কোনো শ্রমিক দায়িত্ব পালনকালে মারা গেলে তাঁদের বয়সের ওপর ভিত্তি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবেই কম বয়স্কদের জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বেশি হয়। সাভারের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা হিসাবটি করেছি এভাবে—ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বয়স ২০ বছর বা এর নিচে হলে তাঁর জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হবে ৩০ বছরের হারানো উপার্জনের সমপরিমাণ। ২১-২৫ বছর বয়সীদের জন্য ২৫ বছর, ২৬-৩০ বছর বয়সীদের জন্য ১৫ বছর এবং ৩১-৩৫ বছর বয়সীদের জন্য ১০ বছরের হারানো উপার্জনের সমান ক্ষতিপূরণ ধরা হয়েছে। শ্রমিকদের অবসর গ্রহণের গড় বয়স ৫০ বছর ধরা হয়েছে, যা অবসর গ্রহণের জাতীয় গড়ের চেয়ে কম। অনুমান করে নেওয়া হয়েছে অন্তত প্রতি পাঁচ বছরে একবার গ্রেডভিত্তিক পদোন্নতি হবে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, কর্মরত ব্যক্তিরা মূলত দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত। যাঁরা রপ্তানি বস্ত্র প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে জড়িত (শ্রমিক) এবং যাঁরা সরাসরি জড়িত নন (কর্মচারী)। কর্মচারীদের বেতনকাঠামো চারটি গ্রেডে বিভক্ত। শ্রমিকদের বেতনকাঠামো সাতটি গ্রেডে বিভক্ত। যত ওপরের গ্রেডে পদোন্নতি হয়, মজুরি ও অন্যান্য সুবিধা তত বৃদ্ধি পায়। যেমন গ্রেড-৭-এর অন্তর্ভুক্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট সুইং মেশিন অপারেটর, অ্যাসিস্ট্যান্ট নিটিং মেশিন অপারেটরদের বেতন মাসিক তিন হাজার টাকা। অন্যদিকে গ্রেড-১-এর প্যাটার্ন মাস্টার, চিফ কাটিং মাস্টারদের বেতন মাসিক নয় হাজার ৩০০ টাকা। অদক্ষ ও নতুন শ্রমিকেরা শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজে যোগ দেওয়ার সাধারণত তিন-চার মাস পরে গ্রেড-৭ শ্রমিক হিসেবে পদোন্নতি পান।
তথ্য-উপাত্তের সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের কিছু অনুমানের ভিত্তিতে হিসাব করতে হয়েছে। ক্ষতিপূরণ হিসাবের সময় মূল মজুরি গণনা করা হয়েছে। ওভারটাইম, উৎসব বোনাস ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়নি। আমরা অনুমান করেছি যে নতুন শ্রমবছরের শুরুতে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি হয় গত ২৫ বছরের গড় মুদ্রাস্ফীতির সমান হারে (৬ দশমিক ২৮ শতাংশ, তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড ব্যাংক)। বাস্তবে শ্রমিকদের বেতন বছর বছর বাড়ে না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ক্ষতিপূরণ এককালীন দেওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। এ জন্য আমরা শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ বার্ষিক মজুরির বর্তমান মূল্য (প্রেজেন্ট ডিসকাউন্টেড ভ্যালু) হিসাব করেছি। এই রেট ধরা হয়েছে গত ২৫ বছরের গড় রিয়েল ডিসকাউন্টেড রেটের সমান (২ দশমিক ৭২ শতাংশ, তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড ব্যাংক) হিসেবে।
এই আলোচনা অনুযায়ী আমাদের বিস্তারিত হিসাবটি ইন্টারনেটে রয়েছে (http://savartragedz.wordpress.com)। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, ২০ ও ২০ বছরের কম বয়সীদের জন্য ক্ষতিপূরণ সর্বনিম্ন ২৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা (দুর্ঘটনার সময় গ্রেড-৭) এবং সর্বোচ্চ ৫৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা (দুর্ঘটনার সময় গ্রেড-৩)। ২১-২৫ বছর বয়সের শ্রমিকদের জন্য সর্বনিম্ন  ১৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। যাঁদের বয়স ২৬-৩০ বছর, তাঁদের জন্য ক্ষতিপূরণ ১২ লাখ ৫৮ হাজার এবং ৩৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের জন্য ক্ষতিপূরণ নয় লাখ ৭৮ হাজার এবং সর্বোচ্চ ২৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। যাঁদের বয়স ৩৫ বছরের বেশি, তাঁদের জন্য ক্ষতিপূরণ সর্বনিম্ন আট লাখ ৯৯ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
এই হিসাব কেবল নিহত শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য। আহত শ্রমিকদের জন্য হিসাবের কাঠামো ভিন্ন হবে। আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের খরচও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন, যা জটিলতা পরিহার করতে আমাদের হিসাবে ধরা হয়নি। কাঠামোগত কিছু রদবদল করে আমরা বিভিন্ন মাত্রার অঙ্গহানি বা শারীরিক ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের হার হিসাব করতে পারি, যা অন্যান্য উন্নত দেশে ব্যবহূত হচ্ছে। যাঁরা আহত অবস্থা থেকে অল্প সময়েই সেরে উঠবেন, তাঁদেরও ন্যূনতম দুই-তিন মাসের মজুরি এবং অন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া দরকার।
স্বল্পপরিসরে কাজ করার কারণে আমাদের হিসাব-প্রক্রিয়ায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়কেও বিবেচনায় আনা উচিত। সমস্যা হলো মানসিক আঘাতের মূল্যমান নিরূপণ করা দুঃসাধ্য একটি কাজ। দুর্ঘটনায় আটকে পড়া শ্রমিকদের অনেকেই বিভিন্ন মাত্রায় মানসিক আঘাত পেয়েছেন এবং তাঁদের জন্য একই কাজের পরিবেশে ফিরে যাওয়া কষ্টকর।
লেখকেরা: যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন-সিয়াটল, ইউনিভার্সিটি অব অ্যালবার্টা, সেন্ট লুইস ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় উচ্চশিক্ষারত।
bdsavartragedz@gmail.com

বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কার পাওয়ার ৪০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু শান্তি রক্ষার কথা বলেননি, এক-এগারোর পর যাঁরা শান্তির অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের কঠোর সমালোচনাও করেছেন। তাঁর এই সমালোচনার সঙ্গে আমরা দ্বিমত করছি না। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে জবরদখলকারী সরকারের তুলনা হতে পারে না। তবু প্রধানমন্ত্রী সেই তুলনা টেনে বলেছেন,  আমরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি। কিন্তু দুই বছরের শাসনামলে সেনা-সমর্থিত সরকারকে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়নি। সে সময়ে বিরোধী দল ছিল না ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রধানমন্ত্রী চ্যালেঞ্জ বলতে বিরোধী দলের আন্দোলন কিংবা হরতালকে বুঝিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, গণতান্ত্রিকব্যবস্থায় বিরোধী দল সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে কেন? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী সরকার ও বিরোধী দল মিলেই গণতন্ত্র এবং সেখানে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, প্রতিপক্ষ নয়। যেসব দেশে ক্ষমতাসীনেরাই শুধু গণতন্ত্র রক্ষা এবং লালন করার দায়িত্ব নেয়, সেসব দেশে গণতন্ত্র টেকে না।
একটি গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে জবরদখলকারী সরকারের পার্থক্যই হলো, প্রথমটি বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে রাষ্ট্রীয় নীতি ও কৌশল ঠিক করে। আর দ্বিতীয়টি রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে জায়গা দেয় না, দিতে চায় না। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশে আদৌ গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে কি না, সেটি বিতর্কের বিষয়। পাঁচ বছর পর পর একটি সংসদ নির্বাচন করে ৩০০ প্রতিনিধিকে সংসদে পাঠানোই গণতন্ত্র নয়।
এই মুহূর্তে বর্তমান আমলের উদাহরণ টানলে ক্ষমতাসীনেরা গোসসা করবেন বলেই আমি খালেদা জিয়ার পূর্ববর্তী দুই আমলের উদাহরণটি আগে উল্লেখ করতে চাই। সে সময়ে রাষ্ট্রীয় নীতি-কৌশল নির্ধারণে সরকার কি বিরোধী দল কিংবা বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করেছে? এর জবাব—না। কিন্তু একই প্রশ্ন যদি বর্তমানে ক্ষমতাসীনদের কাছে করি শেখ হাসিনার দুই শাসনামলে রাষ্ট্রীয় নীতি-কৌশল নির্ধারণে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে কি? এরও উত্তর হবে—না। এই ‘না’-এর গণতন্ত্রই আমরা দুই দশক ধরে চর্চা করে আসছি। বিএনপি-জামায়াত যে পদ্ধতিতে সংসদ ও সরকার চালিয়েছে, আওয়ামী লীগ তার থেকে উন্নত পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, এ রকম দৃষ্টান্ত নেই।
প্রধানমন্ত্রী যা-ই বলুন, কোনো গণতান্ত্রিক দেশেই বিরোধী দল চ্যালেঞ্জ হতে পারে না। গণতন্ত্রের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি, বলপ্রয়োগ, সন্ত্রাস ও আইনের শাসনের অভাব। গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ হলো দলপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি। গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ হলো বিচারহীনতা। গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ হলো মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা। শেষের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শেখ হাসিনার সরকার কৃতিত্ব দেখালেও আগেরগুলোতে তাদের সূচক মোটেই সন্তোষজনক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সূচকগুলো পর্যালোচনা করলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। বিএনপির আমলে দলীয়করণ ছিল, এখনো আছে। বিএনপির আমলে দুর্নীতি ছিল, এখনো আছে। বিএনপির আমলে সন্ত্রাস ছিল, এখনো আছে। বিএনপির আমলে দুর্নীতির কারণে বিশ্বব্যাংক জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে ঋণ বন্ধ করে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতু আটকে আছে। বিএনপির আমলে ফিনিক্স ভবন ধসে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের আমলে রানা প্লাজা ধসে পড়ল। বিএনপির আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলেও হচ্ছে। বিএনপির নেতা-কর্মী-সাংসদেরা ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সাংসদেরা এর বাইরে, সে কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না।  তাহলে মানুষ দুই সরকারের মধ্যে পার্থক্যটি কীভাবে করবে?
তবে প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন বিরোধী দল একের পর এক হরতাল ডেকে সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রাখছে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। জনজীবনে বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। কিন্তু কেন বিরোধী দল হরতাল আহ্বান করছে? গত সাড়ে চার বছরে বিরোধী দল জনজীবনের সমস্যা, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা পদ্মা সেতু না হওয়ার প্রতিবাদে হরতাল ডেকেছে বলে মনে পড়ে না। তারা দুই বছর ধরে হরতাল-লংমার্চ-সমাবেশ-মহাসমাবেশ করছে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে। তাদের দাবি যৌক্তিক না অযৌক্তিক, তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু সেই দাবি করলেই কেউ গণতন্ত্রবিরোধী হবে—এ রকম চিন্তাভাবনা স্বৈরতান্ত্রিক। ক্ষমতাসীনদের মনে রাখতে হবে, ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল না করেও বিএনপি তথা চারদলীয় জোট নির্বাচন করতে পারেনি। বরং নির্বাচনকে নিজেদের মতো করে সাজাতে গিয়ে তারা দেশ ও জাতির পাশাপাশি নিজেদেরও সর্বনাশ করেছে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। তাঁরা সকালে সংলাপের কথা বলেন, বিকেলে সংঘাতের তোপ দাগেন। আজ এক মন্ত্রী এক কথা বলেন, কাল আরেক মন্ত্রী সেটি উল্টে দেন।
প্রধানমন্ত্রী হেফাজতের চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন। এটাকে আমরা আসলেই চ্যালেঞ্জ মনে করি। বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি—পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক ধারার তিন কুশীলবই হেফাজতকে নিয়ে খেলেছে। তারা নিজ নিজ অবস্থান থেকেই অরাজনৈতিক সংগঠটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছে। এর মধ্যে কোন দল কত বেশি সক্রিয় ছিল, সরকারের দায়িত্ব তা খতিয়ে দেখা। চক্রান্তকারীদের মুখোশ উন্মোচন করা। কিন্তু এখানেও সরকার দ্বৈতনীতি নিয়েছে। তারা বিএনপি-জামায়াতের  বিরুদ্ধে বুলন্দ আওয়াজ তুললেও মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি সম্পর্কে একটি কথাও বলছে না। একটি তথ্য দেওয়া জরুরি যে, ৫ মের সহিংসতায়  বিএনপির কোনো নেতা-কর্মী নিহত না হলেও জাতীয় পার্টির দুই নেতা নিহত হয়েছেন। সেই সূত্র ধরেও সরকার সেদিন যারা সহিংসতা ঘটিয়েছে, তাদের খুঁজে বের করতে পারে। বাইরের শত্রুর চেয়ে ঘরের শত্রু আরও ভয়ংকর।
গত সাড়ে চার বছরে সরকারের ভালো পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ শেষ করা, জঙ্গি দমন, শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন, নারী উন্নয়ন নীতি গ্রহণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন, মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি এবং  যুদ্ধাপরাধের বিচার। এর মধ্যে এক যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালে জামায়াতের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে বিরোধী দল  আঁটসাঁট বেঁধে সরকারের বিরুদ্ধে নেমেছে—এ রকম উদাহরণ নেই। আর যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা করে তারাই বেশি ধিক্কার কুড়িয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলের কাছ থেকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ আসার কারণ দেখি না। তবে মেয়াদের শেষে এসে সরকারের সামনে শক্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি ও দলীয় সন্ত্রাসের লাগাম টেনে ধরতে না পারা। 
প্রধানমন্ত্রী ওই দিনের বক্তব্যে দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছেন সেটি হলো, ‘ব্যর্থদের কথা কেন সরকার শুনবে।’ তিনি বলেছেন, ‘দেশে এক-এগারোর পর যাঁরা সাধারণ নির্বাচনই দিতে পারেননি, আমরা কেন তাঁদের সবক শুনব?’  
প্রধানমন্ত্রী এক-এগারোর পরের নয়, সম্ভবত আগের উপদেষ্টাদের কথা বলেছেন। কেননা, এক-এগারোর পরের উপদেষ্টারা তো নির্বাচন করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর দল ক্ষমতায়। এর আগে তিনি বলেছিলেন, যাঁরা একটি নির্বাচন করতে পারেননি তাঁরাই নির্বাচনকালীন সরকারের নানা ফর্মুলা দিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তুলছেন। ফর্মুলা একটি প্রস্তাব মাত্র। এটি মুগুর নয় যে ঠুকে দিলেই সরকারের মাথা ভেঙে যাবে। যে কেউ ফর্মুলা দিতে পারেন। সেটি গ্রহণ বা বর্জন করা সরকারের মর্জি। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দেব ১৯৯৪-৯৫ সালে এবং ২০০৬ সালে সংকট নিরসনে দেশি-বিদেশি বহু ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান সমঝোতার বহু প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া কিংবা তাঁর উপদেষ্টাদের কেউ সেসব মানেননি, যার ফলও আমরা জানি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাঁরা (উপদেষ্টা) নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সেই ব্যর্থতার কারণেই কিন্তু ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশবাসীর ওপর বিএনপির সাজানো নির্বাচন চাপিয়ে দিতে পারেননি। তাঁদের এই ব্যর্থতাকে মহৎ ব্যর্থতাই বলা যায়। প্রধানমন্ত্রী আজ উপদেষ্টাদের ব্যর্থ বলে নিন্দা-মন্দ করছেন। কিন্তু সেদিন তিনি ও তাঁর দল ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। ২০০৬ সালের ১১ ডিসেম্বর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে চার উপদেষ্টা যথাক্রমে আকবর আলি খান, শফি সামি, সুলতানা কামাল ও হাসান মশহুদ চৌধূরী পদত্যাগ করেন। ওই দিনই আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছিলেন, ‘তাঁর (প্রধান উপদেষ্টা) কার্যক্রমের জন্য উপদেষ্টারাও তাঁকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। দেশবাসী কীভাবে তাঁকে বিশ্বাস করবেন? আর অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি না হলে আমরা কোন ভরসায় নির্বাচনে যাব?’
একই দিন দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল ১৪ দলের এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এই চারজন উপদেষ্টা অবাধ নির্বাচনের একটি চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা পারেননি। এ রকম নিরলস চেষ্টার জন্য চার উপদেষ্টাকে ১৪ দলের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই। তাঁরা বিবেকের তাড়নায় পদত্যাগ করেছেন।’ (প্রথম আলো, ১২ ডিসেম্বর, ২০০৬)
উপদেষ্টারা যদি সেদিন ব্যর্থ হয়েই থাকেন তার বিনিময়ে গণতন্ত্র জয়ী হয়েছে। চার উপদেষ্টা চোখে আঙুল দিয়ে দেশবাসীকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়। সেদিন যদি তাঁরা সে রকম একটি সাজানো নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়ে থাকেন তাহলে প্রধানমন্ত্রীর উচিত তাঁদের অভিনন্দন জানানো। এর অর্থ এই নয় যে পরবর্তীকালে এই উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে যদি কেউ না-হক কাজ করে থাকলে পার পেয়ে যাবেন। তাই বলে উপদেষ্টাদের সেই মহৎ ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন করা বা তাঁদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় নয়।
সেদিন চার উপদেষ্টার পদত্যাগের শক্তি যে ১৪ দলের সংঘবদ্ধ আন্দোলনের চেয়ে মোটেই কম ছিল না, সে কথা প্রধানমন্ত্রী আজ অস্বীকার করলেও সেদিন কিন্তু স্বীকার করে নিয়েছিলেন। গত চার দশকে বাংলাদেশে অনেক সফল ও কীর্তিমান সরকার আমরা পেয়েছি। এবার আমরা একটি ব্যর্থ সরকার চাই, যার ব্যর্থতার বিনিময়ে দেশবাসী একটু শান্তি ও স্বস্তি পেতে পারে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

ছাত্রলীগের খেয়াল খুশি

ছাত্রলীগের কাউন্সিলের সময় হয়ে এলেও কাউন্সিল হচ্ছে না। মনে হয় সংগঠনটির নেতৃত্ব সরকারের শেষ সময়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কাজে’ ব্যস্ত। প্রায়ই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাঁদের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। দখলদারি ও অস্ত্রবাজি যে সংগঠনের বৈশিষ্ট্য, সেখানে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র থাকার কথা নয় এবং নেইও। তারই প্রতিফলন ঘটল মেয়াদের শেষ মুহূর্তে কাউন্সিল না করেই ইচ্ছামতো পদ বণ্টনের মাধ্যমে।
গতকাল রোববারের প্রথম আলো জানাচ্ছে যে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে ছাত্রলীগের কমিটির আকার বাড়ানো হয়েছে। যখন সংগঠনটির কাউন্সিলের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, তখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত গণতন্ত্র বিসর্জনেরই দৃষ্টান্ত। ছাত্রসংগঠন মানে তরুণ নাগরিকদের মঞ্চ। এই মঞ্চ থেকেই তাঁদের যেখানে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও আচরণ শেখার কথা, সেখানে তাঁরা শিখছেন কীভাবে সম্মেলন না করেও নেতা হওয়া এবং নেতা বানানো যায়। কীভাবে পদ বণ্টন করে সমালোচকদের মুখ বন্ধ রাখা যায়।
ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত সংগঠনে পদ পাওয়া হাতে চাঁদ পাওয়ার মতোই সৌভাগ্যজনক ঘটনা। অনেক সুযোগ-সুবিধাই তাঁদের জন্য অবারিত হয়ে যায়। এ কারণেই ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের কমিটি যতটা না প্রতিনিধিত্বমূলক, তার থেকে বেশি অনুগ্রহমূলকই হয়ে থাকে। নেতারা এখানে শীর্ষ নেতৃত্বের অনুগ্রহ ও আনুগত্যের ভিত্তিতে মনোনয়ন পান। এই অনুগতদের কাজ হলো ‘নেতা’র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হওয়া। এরই দৃষ্টান্ত দেখা গেল চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ নামধারী কিছু যুবকের থানায় গিয়ে হম্বিতম্বি করার মাধ্যমে। চট্টগ্রামে শিবির সন্দেহে ২৫ জনকে পুলিশ আটক করলে কতিপয় নেতা আবির্ভূত হন তাঁদের ছাত্রলীগের কর্মী বলে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য। পুলিশ এতে কান না দিলে তাঁরা পুলিশের কর্মকর্তার সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিও করেন। দৃশ্যত, লীগ আর শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক শত্রুতা থাকলেও একে অন্যের সহায়ও হতে পারে। নইলে শিবিরের কর্মী বলে অভিযুক্তকে ছাড়াতে বেপরোয়া হবেন কেন তাঁরা?
দুটি ঘটনাই প্রমাণ করে, ছাত্রলীগ আর ছাত্রদের সংগঠন নেই। অগণতান্ত্রিক ও বলপ্রয়োগভিত্তিক সংগঠনের দ্বারা কীভাবে তরুণদের সুনাগরিকত্বের পথে চালিত করা সম্ভব, তা তাই বোধগম্য নয়।