Friday, March 29, 2019

সৌদি পারমাণবিক কর্মসূচির অনুমোদন দিল যুক্তরাষ্ট্র

সৌদি আরব পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করছে। সেখানে সাহায্য করছে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কোম্পানি। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী রিক পেরি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কোম্পানিকে পারমাণবিক শক্তি প্রযুক্তি বিক্রি ও সহযোগিতার জন্য ছয়টি বিষয়ে গোপন অনুমোদন দিয়েছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন নীরবেই সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য বড় ধরনের চুক্তি করতে যাচ্ছে। এর মধ্যে কমপক্ষে দুটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের বিষয়টিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও সৌদির কাজ পেতে দক্ষিণ কোরিয়া ও রাশিয়া দৌড়ঝাঁপ করেছিল। এ বছরের শেষ দিকে বিজয়ী দেশের নাম প্রকাশ করা হবে।
পেরির অনুমোদনের বিষয়টি ‘পার্ট ৮১০ অথোরাইজেশন’ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে কোনো চুক্তির আগে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাথমিক কাজ করার অনুমতি পাবে। তবে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো যন্ত্রাংশ নিতে পারবে না।
যেসব কোম্পানি অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে তাদের পরিচয় গোপন রেখেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর আগে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় ‘পার্ট ৮১০ অথোরাইজেশন’–এর বিষয়গুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখত।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, অনুরোধের মধ্যে মালিকানা তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং অনুমোদনের বিষয় একাধিক এজেন্সির অনুমোদনের মধ্যে দিয়ে হচ্ছে।
এর আগে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবের কাছে দ্রুত স্পর্শকাতর পারমাণবিক ক্ষমতা স্থানান্তর করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের উদ্বেগ থেকে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি পরিষদের প্যানেল একটি তদন্ত করছে।
বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, ওই প্যানেলের কাছে অনেকেই গোপনে তথ্য দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঘটালে মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ওই প্রযুক্তি স্থানান্তরে চাপ দেওয়ার কথা উঠেছে।
মার্কিন আইনপ্রণেতারা ওই পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলছেন, অস্ত্র নির্মাণ কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রযুক্তি স্থানান্তর সে দেশের আইনের পরিপন্থী। সৌদি আরবকে স্পর্শকাতর পারমাণবিক সক্ষম করে তুললে অস্থিতিশীল ওই অঞ্চল আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে, বিদ্যুতের উৎস ও প্রয়োজনীয় জ্বালানির চাহিদা মেটাতে তাদের পরমাণু কর্মসূচিতে যেতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো বলছে, প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে বলে উদ্বেগে রয়েছে সৌদি। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৮০ বিলিয়ন বা ৮ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তির জন্য দৌড়ঝাঁপ করছিলেন যুবরাজ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক স্থাপনার নকশা কিনতে চাইছিলেন। এ চুক্তির বিষয়টি নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল।
সৌদির সঙ্গে গোপন চুক্তি নিয়ে গত মার্চ মাসে কংগ্রেসে প্রশ্ন করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী রিক পেরি তা কৌশলে এড়িয়ে যান। সৌদির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে বারবার নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশে ব্যবহার করা যায়। আর্থসামাজিক উন্নয়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যকে সব ধরনের পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

যক্ষ্মা: ২৬ শতাংশ রোগী শনাক্তের বাইরে by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

বাড়ছে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে ২৪ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্য যক্ষ্মারোগীসহ শিশু যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে দেশে। যক্ষ্মা শনাক্তকরণের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে এই সংখ্যা বেশি চিহ্নিত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। দেশে যক্ষ্মা চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য আশাব্যঞ্জক হলেও ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা বা মাল্টি ড্রাগ রেজিসটেন্ট টিউবারকিউলোসিস (এমডিআর) নিয়ন্ত্রণ এখনো বড় একটি চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে কারণ হলো ডায়াগনসিস সংক্রান্ত জটিলতা।
এখনো এ ধরনের রোগীদের আনুমানিক ৮০ শতাংশই শনাক্তের বাইরে থাকছে। আর সব ধরনের যক্ষ্মা চিকিৎসার আওতাবহির্ভূত থাকছে ২৬ শতাংশ রোগী।
তবে, শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে সমস্যা থাকলেও জীবাণুযুক্ত ফুসফুসে যক্ষ্মার চিকিৎসায় সাফল্যের হার ৯৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। বর্তমানে দেশে ১২৪০ জন এমডিআর-টিবি শনাক্তকরণ হয়েছে। টিবি আক্রান্ত ৫ থেকে ১৫ শতাংশ রোগীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
২০১৫ সালে যেখানে শিশু যক্ষ্মা রোগী ছিল ৭ হাজার ৯৮৪ জন, সেখানে ২০১৭ সালে তা বেড়ে নতুন দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬২ জন। শতকরা হিসেবে দুই বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ২৬ শতাংশের উপরে। শিশুসহ ২০১৬ সালে দেশে শনাক্ত হওয়া মোট যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ২৯০ জন। আর ২০১৭ সালে তা দাঁড়ায় ২ লাখ ৪২ হাজার ৯৬৮ জন। এই সংখ্যা ২০১৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ২৭৬ জনে। গেল বছর শিশু (১৫ বছরের নিচে) রোগী শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৩৫২ জন। বিশেষজ্ঞরা জানান, এমডিআর রোগী শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে যে সংখ্যক জিন এক্সপার্ট মেশিন থাকার কথা, তা নেই। তাছাড়া সচেতনতার অভাব ও চিকিৎসাব্যয় বেশি বলে অনেকের পক্ষে নিয়মিত ওষুধ খাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে এর সফলতা তুলনামূলক কম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল টিবি রিপোর্ট-২০১৮ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রতি লাখে যক্ষ্মার কারণে মৃত্যু হয় ৩৬ জনের। প্রতি বছর প্রতি লাখে নতুন যক্ষ্মারোগী আক্রান্ত হচ্ছে ২২১ জন। ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা চিকিৎসার সাফল্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরো অগ্রগামী। এক্ষেত্রে বিশ্বে যেখানে সাফল্যের হার ৫৪ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে সাফল্যের হার ৭৭ শতাংশ। এই রোগ নির্মূল করতে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০৩৫ সালে যক্ষ্মায় মৃত্যুর হার ৯৫ শতাংশ ও প্রকোপের হার ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে ব্র্যাকসহ ২৭টি বেসরকারি সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর আরো এক লাখের বেশি যক্ষ্মা রোগী শনাক্তের বাইরে থাকে। এই হিসাব মিলে এই সংখ্যা ১৫ থেকে ১৭ লাখ উপরে হবে। আক্রান্তদের মধ্যে প্রতিজনের দুই বছর মেয়াদি চিকিৎসায় সরকারের খরচ হয় ৩ লাখ টাকা। টিবি বিশেষজ্ঞরা বলেন, যক্ষ্মা একটি বায়ুবাহিত রোগ। মানুষের হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। যক্ষ্মা দু’প্রকার। ফুসফুসের যক্ষ্মা এবং ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মা। যক্ষ্মা রোগের প্রাথমিক লক্ষণ কাশি ও জ্বর। ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়ায় খাওয়ার রুচি থাকে না। শরীরের যে কোনো স্থানে যক্ষ্মা রোগ হতে পারে। তবে শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ যক্ষ্মা রোগ ছড়ায় ফুসফুসে। নিয়মিত ওষুধ সেবন ও চিকিৎসকের পরামর্শে এ রোগ ভালো হয়। তিন সপ্তাহ বা তার অধিক সময় ধরে কাশি হলে পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া একান্ত জরুরি। তারা বলেন, কফে জীবাণুযুক্ত রোগীদের আরোগ্য লাভ করার সংখ্যাই বেশি। এটি ইতিবাচক বলে তারা মন্তব্য করেন। আর বাকি ৬ শতাংশ, যারা অনিয়মিত, লস টু ফলোআপ এবং মৃত্যুবরণ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এনটিপি) পরিসংখ্যান মতে, ২০১৫ সালে ২ লাখ ৬ হাজার ৯১৫ জন, ২০১৪ সালে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৭৯৭ জন, ২০১৩ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৯৩ জন, ২০১২ সালে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮০৭ জন এবং ২০১১ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৫৭ জন।
প্রতি বছর এই রোগে বিশ্বে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। সারা বিশ্বে ১০টি মৃত্যুজনিত কারণগুলোর মধ্যে যক্ষ্মা অন্যতম। তাই জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় যক্ষ্মা রোগ নির্মূলে অধিকতর সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকার আদায়ে এই দিবসটির গুরুত্ব অনেক। সূত্র মতে, সরকার জিন এক্সপার্ট মেশিন (নতুন যক্ষ্মা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি) সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে ২০৩টি জিন এক্সপার্ট এর মাধ্যমে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চলছে।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক এক অধ্যাপক বলেন, টিবি রোগীর একটি সংখ্যা শনাক্ত না হওয়ার বিষয়টি সঠিক। এজন্য টিবি রোগীর সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন। তিনি বলেন, এটা প্রি-ডায়াগনসিস ও পোস্ট ডায়াগনসিস হওয়ার কারণে হয়ে থাকে। যক্ষ্মা রোগীর যে সংখ্যাটা শনাক্তের বাইরে থাকছে এটা অবশ্যই দুশ্চিন্তার বিষয়। এতে সমাজের ক্ষতি হবে। রয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলনতাও। সংশ্লিষ্টদের এদিকে নজর দিতে হবে বলে তিনি পরামর্শ দেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে দেশে আগামীকাল বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালন করা হচ্ছে। এবারের যক্ষ্মা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- ‘এখনই সময় অঙ্গীকার করার, যক্ষ্মামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার।’

ঢাকায় গাড়ি চোরের ৫০ সিন্ডিকেট by শুভ্র দেব

রাজধানী ঢাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গাড়ি চুরির অর্ধশতাধিক চক্র। বেপরোয়া এসব চক্রের সদস্যরা প্রকাশ্য দিনের আলোতে চুরি করে নিয়ে যায় সিএনজি চালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, জিপসহ অন্যান্য গাড়ি। রাতে তারা হয়ে উঠে আরো ভয়ঙ্কর। বেপরোয়া গাড়ি চোর চক্রের সদস্যরা প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গ্রেপ্তার হয়। তবে মূল হোতারা থাকে অধরা। তাই এসব হোতারাই চক্রের সদস্যদের জামিনে মুক্ত করে আনে। জামিনে বের হয়ে ফের তারা একই কাজে জড়িয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকায় গড়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি গাড়ি চুরি হয়।
এসব চুরির ঘটনায় থানায় অভিযোগের সংখ্যা নিতান্তই কম। হয়রানির অভিযোগে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করেন না। চক্রের সদস্যরা মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে টাকার বিনিময়ে তারা গাড়ি মুক্ত করে নিয়ে আসে।
গোয়েন্দা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ও আশেপাশের এলাকায় গাড়ি চোর চক্রের সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে কানা শহীদ, শ্যামপুরের ফারুক, স্বপন, আসলাম, সবুজ, জনি, হোসেন, আবুল, মিন্টু, শিপন, ইয়াকুব, শাহাজাহান, আলমগীর, সেন্টু, লাল মিয়া, কামাল, মাসুম, গিয়াস, লোকমান, শাহীন, ফেরদৌস, আলী, আলম, ফরিদ, টঙ্গির মজিবুর, আকতার মোল্লা, রনি, জাহিদ, ইদ্রিস, মামুন, রিয়াজ, আজমত, মোস্তফা, রফিক, লিংকন, মুন্না, সালাম, হাশেম, মনোয়ার, রইছ, নুর হোসেন, জলিল, হাফিজ, রহমত, কাশেম অন্যতম। তারা প্রত্যেকেই এক একটি চক্রের সর্দার হিসাবেই পরিচিত। এসব চক্র ছাড়াও আরো নামে বেনামে আরো একাধিক হোতা রয়েছে। প্রতি সর্দারের অধীনে আবার ২০ থেকে ২৫ জন করে সদস্য থাকেন। তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা কাজ থাকে।
গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, চক্রটি সাধারণত চারটি ধাপে তাদের কাজ করে। প্রথম ধাপে থাকে চক্রের প্রধান হোতা যাদের বলা হয় সর্দার। তার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে চক্র নিয়ন্ত্রণ করেন। চক্রের কেউ গ্রেপ্তার হলে তাদের জামিনে মুক্ত করা। নিজস্ব সোর্স মারফত তথ্য সংগ্রহ, আয়ের টাকা ভাগভাটোয়ারা, এলাকা নিয়ন্ত্রণ, গ্যারেজ ভাড়া, বিক্রি, চক্রে নতুন সদস্য নিয়োগ, তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, দায়িত্ব বণ্টনের কাজ করা। দ্বিতীয় ধাপে থাকে মিডিয়া বা মধ্যস্থতাকারী। তাদের কাজ হলো  চুরি করে আনা গাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার বিনিময়ে ফিরিয়ে দিতে মিডিয়া হিসাবে কাজ করা। আর মাঠপর্যায়ে গাড়ি চুরির কাজে থাকেন আরো কিছু সদস্য।
যেভাবে চুরি হয় গাড়ি: ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার (ডিবি) কাছে আটক গাড়ি চোররা বিভিন্ন সময় গাড়ি চুরির বর্ণনা দিয়েছে। চক্রের সদস্যরা খুব ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ওই সময় সড়কে জনসমাগম কম থাকায় তারা এই সময়টাকে বেছে নেয়। গোয়েন্দারা বলছেন সম্প্রতি যেসব গাড়ি চুরি হচ্ছে তার বেশির ভাগই সিএনজি। বিভিন্ন এলাকার চা বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সিএনজি চালকদের ফাঁদে পেলে তারা গাড়ি চুরি করে। চক্রের সদস্যরা আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। প্রতিটি চক্রের মাঠ পর্যায়ে ৫/৭ জন সদস্য কাজ করে। তাদের মধ্যে একজন গ্যারেজ থেকে চালক সেজে সিএনজি ভাড়া নেয়। অন্য সিএনজি চালকদের সঙ্গে চায়ের দোকানে বসে তারা যাত্রী অথবা চালক সেজে গল্প করে। চক্রের সদস্যরা টার্গেটকৃত চালককে চায়ের দাওয়াত করে। ওই চালক রাজি হলে তাকে নিয়ে অন্যরা বিভিন্ন রকম গল্প করে সময় কাটায়। আর এই সুযোগেই চক্রের অন্য সদস্যরা চায়ের সঙ্গে চেতনানাশক কিছু মিশিয়ে খাইয়ে দেয়।
চা পর্ব শেষ হলে চক্রের সদস্যরা কোথাও যাওয়ার জন্য ভুক্তভোগী চালককে ভাড়া করে। কিছুদূর যাওয়ার পর যখন ওই চালকের ঝিমুনি আসে তখন কৌশলে কিছু কেনার উদ্দেশ্য তারা সিএনজি থামিয়ে আরো সময় নষ্ট করে। ততক্ষণে চেতনা হারিয়ে ফেলে ওই চালক। আর চক্রের সদস্যরা তাকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে সিএনজি নিয়ে চম্পট দেয়। 
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সর্দাররা সুবিধাজনক বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই গ্যারেজ ভাড়া করে রাখেন। ধরা পড়ার ভয়ে তারা একাধিক এলাকায় গ্যারেজ ভাড়া করেন। শুধু ঢাকার ভেতরে নয় গাজীপুর, নরসিংদি, নারায়ণগঞ্জ এলাকায় গ্যারেজ ভাড়া করেন সর্দাররা। চুরি করা গাড়ি সরাসরি এসব গ্যারেজে নেয়া হয়। কিছু কিছু গ্যারেজের মালিকের সঙ্গে সর্দারদের চুক্তি থাকে। পরে চক্রের মধ্যস্থতাকারীরা সিএনজিতে থাকা কাগজপত্র থেকে তথ্য নিয়ে মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এক্ষেত্রে মালিককে থানা পুলিশের ঝামেলা যাতে না করে সেজন্য সতর্ক করে দেয়।
আর গাড়ির কন্ডিশন বুঝে মালিকের কাছে টাকার পরিমাণ বলা হয়। এরপর শুরু হয় দর কষাকষি। সাধারণত চুরি হওয়া সিএনজি ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। বিকাশে অথবা রকেটে টাকা পাওয়ার পর ফিরিয়ে দেয়া হয় গাড়ি। আবার অনেক সময় এসব গাড়ির নম্বর প্লেট পরিবর্তন করে ভুয়া নম্বর প্লেট ও কাগজপত্র তৈরি করে বিক্রি করে দেয়া হয় মফস্বল এলাকায়। চুরি করা গাড়ি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে অথবা বিক্রি করে যে আয় হয় তার ভাগ সবাইকে দেয়া হয়। এ ছাড়া ওই টাকা থেকে একটি অংশ সর্দাররা রেখে দেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যদি কোন চোর ধরা পড়ে তবে সেই টাকা দিয়ে তাদের জামিনের ব্যবস্থা করা হয়।
ভুক্তভোগী গাড়ি চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চক্রের সদস্যরা নকল চাবি তৈরি করে তাদের সঙ্গে রাখে। কিছু কিছু চাবি দিয়ে একাধিক গাড়ির লক খোলা যায়। চক্রের সদস্যদের কাছেও একাধিক চাবি থাকে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রো চুরির ক্ষেত্রে তারা এসব নকল চাবি ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে তারা আগে থেকেই গাড়ি টার্গেট করে রাখে। অনেক দিন নজরদারির পর তারা মিশনে নামে। এ ছাড়া রাতের আঁধারে যাত্রী সেজে গাড়ি চোরেরা গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে যায়। সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে চালককে মারধর আবার কখনও হত্যা করে গাড়ি নিয়ে চলে যায়।
গোয়েন্দাসূত্র বলছে, গাড়ি চুরির অভিযোগে প্রায়ই অনেক চোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এসব চোরের বেশির ভাগই ছিঁচকে চোর। তাদের উপরে আরো কয়েকটি ধাপ থাকে। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে তারা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে গ্রেপ্তারকৃতদের দেয়া তথ্যমতে অনেক সময় অভিযান চালিয়ে সর্দারদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না। কারণ চক্রের কেউ গ্রেপ্তার হলে সে খবর পেয়ে সর্দাররা গা-ঢাকা দেয়। আড়ালে আবডালে থেকেই আবার গ্রেপ্তারকৃতদের জামিনে মুক্ত করে আনে। পাশাপাশি সর্দাররা  নতুন নতুন সদস্য নিয়োগ দেয়। এতে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসব গাড়ি চোরদের অনেক সময় শনাক্ত করতে পারেন না।  চলতি বছরের ১৯শে জানুয়ারি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার উত্তর বিভাগের গুলশান জোনাল টিম গাড়ি চোর চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন- মো. অলী (২৩), তানভীর ইসলাম (২৪), নুর মোহাম্মদ (৩৭), মো. তাইজুউদ্দিন (৪৫), মো. জাকির (৪৫) ও মো. শিপলু (৩০)।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার উত্তর বিভাগের গুলশান জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার গোলাম সাকলায়েন মানবজমিনকে বলেন, সিএনজি চুরির ঘটনা এখন অহরহ। ঢাকা মেট্রো এলাকায় নম্বর প্লেটসহ সিএনজির মূল্য অনেক বেড়ে গেছে। কোনোভাবে একটা সিএনজি চুরি করে নিয়ে গেলে মালিক সেটা লাখ টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক সময় চুরি করে তাদের গ্যারেজ পর্যন্ত নিয়ে যেতে হচ্ছে না। যাওয়ার পথেই অনেক সময় মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা টাকার বিনিময়ে সিএনজি বুঝিয়ে দেয়। সাকলায়েন বলেন, ভুক্তভোগীরা বেশির ভাগ সময় পুলিশকে এ বিষয়ে অভিযোগ করেন না।
গাড়ি চোর চক্রের কবলে পড়ে অনেক গাড়ি চালকের মৃত্যু হচ্ছে। গত বছরের জানুয়ারি মাসে ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে এক সিএনজি চালকের মরদেহ উদ্ধার করে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। এ ঘটনায় পরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পশ্চিম বিভাগের একটি টিম মো. লিটন ও মো. জসিম নামের দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। ডিবি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা দিয়েছে সিএনজি চালকের কাছ থেকে গাড়ি চুরির ভয়ঙ্কর তথ্য। তারা জানিয়েছে, ঘটনার দিন তারা আগারগাঁওয়ের বাণিজ্যমেলা এলাকা থেকে সিএনজি ভাড়া করে ফার্মগেট এলাকায় যায়। রাস্তায় যানজট থাকায় তারা সিএনচি চালকের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। একপর্যায়ে তারা ফার্মগেট নেমে ওই চালককে চা খাওয়ার প্রস্তাব দেয়। এ সময় চায়ের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে তারা চালককে খাইয়ে দেয়। তার কিছুক্ষণ পর চালক অসুস্থতা বোধ করে। তখন তারাই তাকে হাসপাতালে নেয়ার উদ্দেশ্য ওই সিএনজিতে তুলে রওনা দেয়। মানিক মিয়া এভিনিউতে যাওয়ার পর তারা ওই চালক মারা গেলে তাকে ফেলে দিয়ে তারা সিএনজি নিয়ে চলে যায়।
গাড়ি চোরের গুরু কানা শহীদ: কানা শহীদ পেশায় এক সময় সিএনজি চালক ছিলেন। একটি দুর্ঘটনায় তার চোখ নষ্ট হয়ে তাকে সবাই কানা শহীদ নামেই ডাকে। এরপর থেকে সিএনজি চালানো ছেড়ে দিয়ে তিনি নামেন সিএনজি চুরিতে। প্রথম দিকে একা একাই চুরি করতেন। বর্তমানে তিনি সিএনজি চালকদের জন্য এক আতঙ্ক। ঢাকার অনেক থানায় তার নামে গাড়ি  চুরির একাধিক মামলা রয়েছে। বেশ আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে ফের গাড়ি চুরির কাজ শুরু করে। ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে এখন সে চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি চুরির কাজে জড়িত থেকে কানা শহীদ কোটি টাকার মালিক হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম মানবজমিনকে বলেন, গাড়ি চোরদের ধরার জন্য নিয়মিতই আমাদের অভিযান চলে। তারপরও ডিজিটাল নম্বর প্লেটবিহীন সিএনজি মোটরসাইকেল চুরি অব্যাহত আছে। ফলে একদিকে ডিজিটাল নম্বর প্লেট না থাকতে চুরি বাড়ছে আবার সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি গাড়ি চোর চক্রের পুরো নেটওয়ার্ক ধরার জন্য। কারণ যখন অভিযান চালানো হয় তখন চক্রের সবাইকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না। যারা ধরা পড়ে তারা জামিনে বের হয়ে এসে আবার নতুন চক্র গড়ে তুলে। এছাড়া যাদেরকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না তারা চক্রে নতুন সদস্য নিয়োগ দেয়।

তেরেসার শেষ সুযোগ

চরম এক নাটকীয়তা বৃটিশ রাজনীতিতে। ব্রেক্সিট ইস্যুতে নিজ দলের ভেতরে বিদ্রোহের মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। অন্যদিকে সরকারের হাতছাড়া হয়ে গেছে পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ। এমন অবস্থায় বিস্ময়কর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার উত্থাপিত ব্রেক্সিট চুক্তিকে সমর্থন দিয়ে পার্লামেন্ট পাস করলে নির্ধারিত সময়ের আগে পদত্যাগ করবেন তিনি। তবে কবে নাগাদ পদত্যাগ করবেন সে বিষয়ে কিছু বলেন নি।
বেশ কিছুদিন ধরেই তার পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছিল নিজের দল কনজারভেটিভের বিদ্রোহী ও বিরোধী লেবার দলের পক্ষ থেকে। বলা হচ্ছিল, তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলে ব্রেক্সিট চুক্তিতে সমর্থন দেবেন তারা।
এমন অবস্থায় বুধবার রাতে ব্রেক্সিটের বিকল্প আটটি প্রস্তাবের ওপর পার্লামেন্টে বিতর্কের পর ভোট হয়। কিন্তু কোনো প্রস্তাবের পক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়ে নি। ফলে ব্রেক্সিট ইস্যুতে তালগোল পাকিয়ে গেছে বৃটিশ রাজনীতি। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে উভয় সংকটে পড়েছেন বলে রিপোর্ট করেছে অনলাইন স্কাই নিউজ।
বিবিসি লিখেছে, বুধবার পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট ইস্যুতে এমপিরা যে আটটি বিকল্প প্রস্তাব এনেছিলেন, তার কোনোটিই নিম্ন-কক্ষের  ভোটে স্পষ্ট সমর্থন আদায় করতে পারেনি। এর আগে কনজারভেটিভ পার্টির এমপিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। সেখানে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনকে বের করে আনতে তিনি যে চুক্তি করেছেন তাতে পার্লামেন্ট যদি সমর্থন দেয়ার নিশ্চয়তা দেয় তাহলে নির্ধারিত সময়ের আগেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যাবেন। তার এ ঘোষণায় কনজারভেটিভ দলের যেসব সদস্য তার বিরোধিতা করেছিলেন এর আগে, তারা নমনীয় হয়েছেন। ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা তেরেসা মে’কে সমর্থন দিতে পারেন। তবে ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। তারা বলেছে, তেরেসা মে ব্রেক্সিট ইস্যুতে যে চুক্তি করেছেন অব্যাহতভাবে তার বিরোধিতা করে যাবে তারা।
ব্রেক্সিট ইস্যুতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে তেরেসা মে’র ওপর। তার এই চুক্তির বিকল্প হিসেবে এমপিরা বেশকিছু প্রস্তাব উত্থাপন করেন হাউস অব কমন্সে। সেখান থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ইউনিয়ন করে থাকা এবং যেকোনো চুক্তির বিষয়ে গণভোট সহ বাছাই করা আটটি প্রস্তাব কমন্সে অনুমোদন করেন স্পিকার বারকাউ। এ নিয়ে বিতর্ক হয়। তারপর ভোট হয়। এ ভোটে কোনো একটি প্রস্তাবও পাস হয় নি। ধারণা করা হয়েছিল, কীভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করতে হবে সে বিষয়ে একটি ঐকমত্য সৃষ্টি হবে এর মধ্যকার কোনো একটি প্রস্তাব থেকে। তাতে পার্লামেন্টে সৃষ্ট অচলাবস্থার অবসান ঘটবে। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে।
এ অবস্থায় ব্রেক্সিট বিষয়ক মন্ত্রী স্টিফেন বারক্লে বলেছেন, ওই ভোটের ফল মন্ত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তিশালী করেছে। বোঝা গেছে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই শ্রেষ্ঠ।
বিবিসি’র প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি কাস্টমস ইউনিয়নের প্রস্তাব, চুক্তি অনুমোদনের জন্য গণভোটের আহ্বান, নো-ডিল ব্রেক্সিটের প্রস্তাব থেকে শুরু করে ইইউ’র সঙ্গে শুল্ক কাঠামো রক্ষা করে ব্রেক্সিট চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তাব সবই বাতিল হয়ে গেছে বুধবারের ভোটে। এ কারণে বৃটেনের একদিনের নাটকীয় পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। বুধবারের এই ভোটে ব্রেক্সিট ইস্যুতে পার্লামেন্টের এতদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করলেও কোনো নির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছাতে না পারার ব্যাপারটিকে সমালোচকরা ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ব্রেক্সিট গণভোটের রায় অনুযায়ী এ বছরের ২৯শে মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ব্রেক্সিট পরবর্তীকালে ইইউ’র সঙ্গে বৃটেনের সম্পর্ক  কেমন হবে তেমন কিছু শর্ত নির্দিষ্ট করে একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে তা সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপির সমর্থন আদায় করতে পারেনি। ভয়াবহ ভোটের ব্যবধানে তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এরপর ১২ই মার্চ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ইইউ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে এমপিদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে এমন একটি চুক্তি পার্লামেন্টে উপস্থাপন করেন। কিন্তু সেটাও পরাজিত হয়। এতে বড় রকমের অবমাননার শিকার হন তেরেসা মে।
এখন তিনি তৃতীয়বারের মতো ব্রেক্সিট চুক্তি পার্লামেন্টে উত্থাপন করতে চাইছেন। তবে তার আগে তিনি যথেষ্ট সংখ্যক এমপির সমর্থন নিশ্চিত করতে চান। এবার তিনি নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেয়ায় কনজারভেটিভ পার্টির অনেক এমপি তার চুক্তির প্রতি সমর্থন দিতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেলেও ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই চুক্তির বিরোধিতা করে যাবে।
 তেরেসা মে নিজ দলের সদস্যদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আমাদের দেশ এবং আমাদের দলের জন্য যা সঠিক তা করার উদ্দেশ্যে আমি আমার দায়িত্ব আগে থেকেই ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, তিনি জানেন যে কনজারভেটিভ দলের এমপিরা তাকে আর  ব্রেক্সিটের পরবর্তী আলোচনার নেতৃত্বে  দেখতে চান না এবং তিনিও সেই পথেই দাঁড়াবেন না বলে জানান। তবে তিনি কমিটির সভায় তার পদত্যাগের কোনো দিনক্ষণ উল্লেখ করেন নি।
যে আটটি বিকল্প প্রস্তাবে এমপিরা ভোট দিয়েছেন
ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়ে বিতর্ক শুরু করেছিলেন বৃটিশ আইন প্রণেতারা। এর আগে পার্লামেন্টে ১৬টি বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করা হলেও স্পিকার আটটি প্রস্তাব বেছে নেন। বিতর্কের পর আইন প্রণেতাদের প্রত্যেকের সামনে আটটি বিকল্প প্রস্তাব সংক্রান্ত কাগজ তুলে দেয়া হয়। এরমধ্যে যে প্রস্তাবগুলোতে তাদের সম্মতি থাকবে, সেগুলোকে তারা ‘হ্যাঁ’ হিসেবে, আর  যেগুলোতে তাদের আপত্তি থাকবে  সেগুলোকে ‘না’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই ভোটে মন্ত্রিপরিষদ বাদে কনজারভেটিভ দলের সব সদস্য ভোট দেয়ার অধিকার ভোগ করেছেন। অর্থাৎ তাদেরকে ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেয়া হয় নি। নিচে প্রস্তাবগুলো ও তার পক্ষে-বিপক্ষে কি পরিমাণ ভোট পড়েছে তা তুলে ধরা হলো-
কাস্টমস ইউনিয়ন- পক্ষে: ২৬৪, বিপক্ষে: ২৭২ ভোট।
নিশ্চিত গণভোট (কনফার্মেটরি রেফারেন্ডাম)- পক্ষে: ২৬৮, বিপক্ষে: ২৯৫ ভোট।
১২ই এপ্রিল চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন- পক্ষে: ১৬০, বিপক্ষে: ৪০০ ভোট।
একক বাজার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব- পক্ষে: ১৮৮, বিপক্ষে: ২৮৩ ভোট।
ইএফটিএ এবং ইইএ সদস্যপদ- পক্ষে: ৬৫, বিপক্ষে: ৩৭৭ ভোট।
চুক্তিহীনতা এড়াতে ৫০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা- পক্ষে: ১৮৪, বিপক্ষে: ২৯৩ ভোট। 
লেবার পার্টির প্রস্তাবিত ব্রেক্সিট পরিকল্পনা- পক্ষে: ২৩৭, বিপক্ষে: ৩০৭ ভোট।
মল্টহাউজ প্ল্যান বি- পক্ষে: ১৩৯, বিপক্ষে: ৪২২ ভোট।

এতে সবচেয়ে বেশি সমর্থন পাওয়া প্রস্তাবটি হলো ক্রস পার্টি প্ল্যান, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন রক্ষণশীল দলের সাবেক চ্যান্সেলর কেন ক্লার্ক।  যেখানে ব্রেক্সিটের পরও বৃটেনের সঙ্গে ইইউ-এর শুল্কমুক্ত বাণিজ্য অব্যাহত থাকবে বলে বলা হয়েছে। এই চুক্তিতে সমর্থন দিয়েছেন কনজারভেটিভ পার্টির ৫ জন মন্ত্রী মার্ক ফিল্ড, স্টিফেন হ্যামন্ড, মার্গট জেমস, অ্যান মিলটন ও রোরি স্টিওয়ার্ট।  ব্রেক্সিট সম্পন্ন হওয়ার পর কনজারভেটিভ দলের নেতৃত্বের লড়াই হতে পারে বলে জানা  গেছে। সেটা কবে নাগাদ হবে তা নির্ভর করবে রক্ষণশীল দলের ওপর। দলীয় সদস্যদের মাধ্যমে নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন।
ক্ষমতাসীন দলের কট্টর ব্রেক্সিটপন্থি আইন-প্রণেতাদের বিরোধিতার কারণে বৃটিশ পার্লামেন্টে দুই দফায় প্রত্যাখ্যাত হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর ব্রেক্সিট চুক্তি। এই চুক্তি নিয়ে নিজ দল রক্ষণশীল দলের সংসদ সদস্যদেরও বিরোধিতার মুখে পড়েন তিনি। তবে প্রধানমন্ত্রী এবার তার চুক্তির পক্ষে নিজ দলের এমপিদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ ব্যাপারে তিনশ’ জনেরও বেশি কনজারভেটিভ দলের এমপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আমি এই কক্ষের প্রত্যেককে চুক্তিটির প্রতি সমর্থন  দেয়ার জন্য বলছি, যাতে আমরা আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পূর্ণ করতে পারি, যেন বৃটিশ জনগণের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা একটি মসৃণ ও সুষ্ঠু উপায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যেতে পারি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ২৯শে মার্চের পরিবর্তে ১২ই এপ্রিল যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন ইউরোপীয়  নেতারা। তেরেসা মে’র চুক্তি অনুমোদন  পেলে ব্রেক্সিট কার্যকরের সময়সীমা ২২শে মে পর্যন্ত বাড়াতো ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে  কোনো বিকল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলে ১২ই এপ্রিলেই কোনো চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট সম্পন্ন করতে হবে।

বনানী ট্র্যাজেডি: মৃত্যুর কাছাকাছি থেকে তাদের বাঁচার অপেক্ষা by কাফি কামাল

ভবনে হঠাৎ আগুন। প্রতিটি ফ্লোরে নানা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়গুলো দারুণ কর্মব্যস্ত তখন। আগুনের ধোঁয়ার সঙ্গে মৃত্যু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ভবনজুড়ে। ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ। বন্ধ হয়ে আসছে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস। আগুনের তীব্রতায় নিচে নেমে আসতে পারছেন না সিঁড়ি বেয়ে। প্রতিমুহূর্তে উত্তাপ বাড়ছে  ভবনের। উপরের দিকের ফ্লোরগুলোতে অবস্থানকারীরা নিঃশ্বাস নিতে আর সাহায্যের আকুতি জানাতে জানালার কাঁচ ভেঙেছেন।
কাঁচভাঙা জানালা দিয়ে হাত নাড়িয়ে আর চিৎকার করে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন। জীবনের আকুতি নিয়ে বাড়ানো হাতগুলো অনেক উপরে। ভবনের ১০ম তলা থেকে উপরে। কিন্তু উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়া লোকজন নিচে রাস্তায়। সাহায্য করতে না পেরে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়া অনেকেই দোয়া করছিলেন উপরের দিকে হাত তুলে। আর আটকে পড়ারা তখন স্বজনদের কাছে ফোন করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাহায্য চাইছেন।
ভবনটির ৬ থেকে ৯ তলায় তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছানোর আগেই উদ্ধার কাজে যুক্ত হন আশেপাশের বিভিন্ন অফিসের লোকজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পৌঁছানোর পর তাদের চেষ্টা ছিল প্রাণান্তকর। তারা আটকে পড়াদের আশ্বস্ত করছেন। উঁচু ফ্লোরগুলোতে আটকে পড়াদের উদ্ধারে পাঠানো হচ্ছে ক্রেন লেডার (যন্ত্রচালিত মই)। কিন্তু সে লেডার কাছাকাছি গিয়েও উদ্ধার করতে পারছেন না।
দুয়েকজন ভাগ্যবান  লেডারের সাহায্যে উদ্ধার পেলেও অন্যদের ভাগ্য তখনও দোদুল্যমান। ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না দীর্ঘ সময়ে। ধোঁয়া থেকে বাঁচার জন্য নিচ থেকে পাঠানো হচ্ছে ভেজা টাওয়াল। আতঙ্কে কেউ ভবনের উপরের ফ্লোরের দিকে ছুটছেন। কেউ কেউ চেষ্টা করছেন পাশের ভবনে যাবার। অনেকেই নিচে নেমেছেন উঁচু ভবনে ঝুলে থাকা ক্যাবল বেয়ে। জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ নিচে লাফিয়ে পড়ছেন। ফায়ার সার্ভিস কর্মীসহ উৎসুক জনতার চোখের সামনে তারা আহত হচ্ছেন। অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করছেন।
এভাবেই বিভীষিকাময় পরিবেশে মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের অপেক্ষায় কাটাতে হয়েছে উদ্ধারের আশায়। উদ্ধার পেতে যখন আটকে পড়ারা হাত নাড়াচ্ছেন তখন নিচে অপেক্ষারত স্বজনসহ উৎসুকদের অশ্রুতে ভিজছে কপোল। চারদিকে তখন কেবলই বাঁচার আকুতি। বাঁচানোর তাগিদ। এমন দৃশ্য ছিল বনানীর ১৭ নম্বর রোডের বহুতল ভবন এফআর টাওয়ারের। আতঙ্ক কেবল আগুন লাগা এফআর টাওয়ারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বন্ধ করে দেয়া হয় আশেপাশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় বিদ্যুৎসহ জরুরি সেবার সংযোগ।
এক পর্যায়ে দমকল কর্মীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ভবনের উপর থেকে বালি, গ্যাস ও পানি দিয়ে বিমান বাহিনী ও নিচ থেকে সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ শুরু করেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতার কাজই করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। কিন্তু এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ধোঁয়ার তীব্রতার কথা বলেছেন তাদেরই একজন। এক উদ্ধারকর্মী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আগুনের চেয়ে ধোঁয়া বেশি। আর এই ধোঁয়ার কারণে ব্যাঘাত ঘটছে উদ্ধারে। উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি অগ্নিদগ্ধ ও আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন প্রভা হেলথ নামে একটি সংস্থার কর্মীরা।
প্রভা হেলথের কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান বলেন, ‘এখানে আমরা সাতজন ডাক্তার, ১৪ জন নার্স ও ২০ জন সাপোর্ট স্টাফ আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছি।’ আগুন লাগার পরপরই নিজের ফেসবুকে পোস্ট দেন ওই ভবনে কর্মরত একজন মডেল ও অভিনেতা। তার নাম রিপন আহমেদ। তিনি ওই ভবনের লিফটে আটকে পড়েছেন উল্লেখ করে লেখেন- ‘আগুন, আগুন। হতে পারে এটা আমার লাস্ট (শেষ) পোস্ট। আমি এফআর টাওয়ারের লিফট ১৩’তে আছি। ক্ষমা করে দিয়েন।’ প্রথম পোস্টের এক ঘণ্টা পরে রিপন আরেকটি পোস্টে লেখেন- ‘মাফ করে দিয়েন। লিফট ১৩ বনানী এফআর টাওয়ার।’ পরে জানা গেছে, বিকালের দিকে দমকল বাহিনীর সদস্যরা রিপনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।
এফআর টাওয়ারের ভেতর থেকে নিজের ফেসবুকে একটি ভিডিও আপলোড করেন সেজুতি স্বর্ণা নামে একজন। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই ফ্লোরে অবস্থানরত সবাই নাকে-মুখে কাপড় চেপে ধরে হাঁটছেন, ভেতরটা ধোঁয়ায় পুরোটাই অন্ধকার। এ সময় তিনি সাহায্য চেয়ে বলছিলেন- ‘আমাদের সিঁড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। সিঁড়ি না পাঠালে আমরা ধোঁয়ায় মারা যাবো।’
পাশের ভবনে কর্মরত একজন জানান, বাঁচার আকুতি নিয়ে অনেকেই নিচে নামছিলেন ঝুলন্ত ক্যাবল বেয়ে। এভাবেই নিচে নামছিলেন এক তরুণী। কয়েক ফুট নামার পরপরই হাত ফসকে পড়ে যান নিচের এক ভবনের এসির ওপর। ভাগ্যক্রমে ক্যাবল ধরে ঝুলে রইলেন তিনি। সেখানে ক্যাবল ধরে ঝুলে থাকা আরেকজন লোক সেই তরুণীকে  নামতে সাহায্য করলেন। কিছুক্ষণ বাদে এক তরুণ একইভাবে নামছিলেন। আগুনের লেলিহান শিখা তার খুব পাশেই যেন। কয়েক সেকেন্ড বাদেই হাজার হাজার মানুষ ভয়ার্ত চিৎকার করে উঠলেন। হাজারো মানুষের চোখের সামনেই ৮তলা উঁচুতেই কয়েক পাক খেয়ে নিচে পড়ে গেলেন সেই তরুণ।
বনানীর সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ সহযোগিতা করছেন এফআর ভবন থেকে নামানো আহতদের উদ্ধার তৎপরতায়। ভবনটিতে তখন আটকে পড়েছিলেন তারই চাচাতো ভাই সুমন হোসেন। উদ্ধার তৎপরতায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি কাঁদছিলেন চিৎকার করে। বলছিলেন- ‘আল্লাহ তুমি তাদের বাঁচিয়ে দাও। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই ওদের। কতগুলো মানুষ ভেতরে তা আমরা জানি না। বাঁচার জন্য অনেক মানুষ হাত বাড়াচ্ছেন। তাদের তুমি নিচে নামার ব্যবস্থা করো।’
এফআর টাওয়ারের ১২ তলায় ডাট গ্রুপে কাজ করতেন আইটি ইঞ্জিনিয়ার ফাহাদ ইবনে কবীর। আগুন লাগার পরপরই ফাহাদ তার মাকে ফোন দিয়ে বলেছেন- ‘ভেতরে আগুনের ধোঁয়ায় আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আমি দম নিতে পারছি না।’ ছেলের ফোন পেয়েই সেখানে ছুটে যান তার মা ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে ছেলের ফোনালাপের কথা বলে আর্তনাদ করছিলেন, আর ছেলের জন্য দোয়া করছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন- ‘ছেলের সঙ্গে এক ঘণ্টা আগে আমার কথা হয়েছে। এখন মোবাইল নম্বর বন্ধ পাচ্ছি।’
দুপুরে এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার পর ওই ভবনে কর্মরত হাসনাইন আহমেদ রিপন বাঁচার আকুতি জানিয়ে ফেসবুকে দুটি পোস্ট দেন। প্রথম পোস্টে তিনি লেখেন- ‘আগুন আগুন, এটা শেষ পোস্ট হতে পারে। প্লিজ ফরগিভ মি (এফআর টাওয়ার লিফট ১৩)।’ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন কক্ষের ভেতরের সেলফিসহ দ্বিতীয় পোস্টে তিনি আপনজনদের বিদায় জানিয়ে লেখেন- ‘মা, মিনা, মিলন, আপু, ফাহিম ভাই সবাই আমারে মাফ করে দিস। আগুন এফআর টাওয়ার, লিফট ১৩।’ তবে ভাগ্যক্রমে উদ্ধার পেয়েছেন তিনি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ক্রেন লেডারের মাধ্যমে যাদের উদ্ধার করেছেন তাদের একজন রিপন। রিপনের বন্ধুরা ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, উদ্ধারের পর বর্তমানে ইউনাইটেড হাসপাতালে চলছে তার চিকিৎসা।
রাজধানীর বনানীর এফআর টাওয়ারের নিরাপত্তা প্রহরী জাহাঙ্গীর আলম ২২তলা ভবনের ছাদে অবস্থান করছিলেন। যেখানে এ ভবনের নিরাপত্তা প্রহরীদের থাকার জায়গা। ডিউটি না থাকায় ছাদেই ছিলেন তিনি। আগুন লাগার কথা জেনেই নিচে নামার চেষ্টা করলেও নবম তলায় পৌঁছে তীব্র গরম আর ধোঁয়ায় বাধাগ্রস্ত হন। পরে ছাদে ফিরে গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে লাফিয়ে চলে যান লাগোয়া পাশের বিল্ডিংয়ে। জাহাঙ্গীর বলেছেন- ‘সাত ও আট তলায় আগুন লাগছে বইল্যা মনে হয়। পরে এইটা নয়তলায় গিয়া লাগে।’
এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে এসেছিলেন হাবিবুর রহমান নামে একজন। কারণ সেখানে ২০তলায় কাশেম গ্রুপে কর্মরত ছিলেন তার ফুফাতো ভাই আহসান হাবিব। তার মোবাইলটি ছিল বন্ধ। এক অজানা আশঙ্কায় ছটফট করছিলেন তিনি। এমন সময় হঠাৎ করেই সুস্থ অবস্থায় তার সামনে এসে দাঁড়ায় আহসান হাবিব। ভাইকে অক্ষত পেয়ে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাবিবুর। অফিসের বাইরে থাকায় তিনি নিরাপদ থাকলেও তার সহকর্মীদের ব্যাপারে কিছু বলতে পারেননি। আহসান হাবিব জানান,  ‘বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অফিসের কাজে তাকে পাঠানো হয় বাংলামোটরে। অগ্নিকাণ্ডের সময় বাইরে থাকায় তিনি বিপদমুক্ত আছেন।’
টাওয়ারে স্ক্যান ওয়্যার নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন মির্জা আতিকুর রহমান। অগ্নিকাণ্ডের পর তিনি স্ত্রীকে ফোন করে জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান তার স্ত্রী অ্যানি আক্তার পলি। সেখানে তার খোঁজ না পেয়ে আর্তনাদ করছিলেন পলি। পরে তিনি স্বামীর খোঁজে ছুটে যান কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে।
আগুনের উত্তাপ ও ধোঁয়ার তীব্রতা যখন ক্রমেই বাড়ছিল তখন জীবন বাঁচাতে ভবন থেকে লাফ দেন রেজাউল আহমেদ নামে একজন। নিচে পড়ে হাত-পা ভেঙে যাওয়া রেজাউল বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রেজাউলের মামাশ্বশুর জনি সাংবাদিকদের জানান, ‘যখন আগুন বাড়তে থাকে, তখন রেজাউল ওইখান থেকে লাফ দেন। হাসপাতালে নেয়ার পর জ্ঞান ফিরলে রেজাউল আমাকে জানায়, এমুন গরম হইছে আমি আর টিকতে পারছিলাম না। তাই লাফ দিছি।’
এফআর টাওয়ারের ১৪তলায় মিকা সিকিউরিটিস লি. কোম্পানিতে কাজ করতেন লালমনিরহাটের পাটগ্রামের আবু বকর সিদ্দিক বাচ্চুর ছেলে আবির। আগুন লাগার পর মোবাইলে একবার যোগাযোগ করতে পারলেও পরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তিনি। আবিরের ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন তার চাচা সাংবাদিক শিমুল রহমান।
অল্পের জন্য মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছেন ডিএইচএল-এর ডেলিভারিম্যান সুজন সরকার। যখন আগুন লেগেছে তখন তিনি নিচে মোটরসাইকেল পার্ক করে এফআর টাওয়ারের ৮ম তলার একটি অফিসে যেতে লিফটে উঠছিলেন। ঠিক এমন সময় লিফট থেকে বেরিয়ে একজন তাকে বলেন, উপরে আগুন লেগেছে। সেটা শুনেই তিনি ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। 
অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন ১২ তলায় ইইউআর সার্ভিস বিডি লিমিটেডের সেলস ম্যানেজার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক। উদ্ধারের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলেও শরীরের ৯০ভাগ পুড়ে যাওয়া ফারুককে বাঁচাতে পারেননি চিকিৎসকরা। হাসপাতালে গিয়ে ফারুককে শনাক্ত করেন তার বন্ধু ও পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম রাজু। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ফারুক ডেমরা এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। ফেসবুক প্রোফাইলে ছোট্ট কন্যাকে কোলে নিয়ে হাসিমুখে যে ছবিটি দিয়েছিলেন সেটাই এখন ভাসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

বহুতল ভবনে জরুরি নির্গমন পথ নেই কেন?

রাজধানীর বনানীতে এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার ঘটনায় শতসহস্র প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে দৃশ্যমান মূল সমস্যাটি ছিল—ওই ভবন থেকে বেরিয়ে আসার জরুরি কোনো পথ ছিল না। ফায়ার এক্সিট বা আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জরুরি নির্গমন পথ থাকলে হয়তো এত প্রাণহানি ঘটত না। কিংবা আগুন নেভানোর নিজস্ব ভালো ব্যবস্থা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি এতটা হতো না। এখন সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, রাজধানীতে গড়ে ওঠা এসব ভবন নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত নিয়মকানুন মানা হচ্ছে কী?
ঢাকায় দিনের পর দিন বহুতল ভবন গড়ে উঠছে। এসব ভবনে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা রাখাসহ নিয়মকানুন মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, যেকোনো ভবন সাততলার ওপর হলেই সেটিকে বহুতল ভবন হিসেবে গণ্য করা হয়।
এ জন্য এসব ভবনে মেনে চলতে হয় কিছু নিয়মকানুন। রাখতে হয় অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা। বহুতল ভবন গড়তে হলে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের কাছ থেকে ফায়ার সিস্টেমের অনুমোদন নিতে হয়। সব কাজ সম্পন্ন হলে নিতে হয় সনদ। ফায়ার সার্ভিসের সদ্য বিদায়ী মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, অনুমোদন নিয়ে বাস্তবায়নের পর সনদ নিতে হয়।
আরও যেসব কাজ করতে হয় তাহলো হাইড্রেন্ট সিস্টেম। এরপর রাখতে হয় স্প্রিংলার সিস্টেম। এই পদ্ধতিতে কোনো তলায় ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর তাপমাত্রা হলেই ওই পাইপ থেকে ঝরনার মতো পানি ছিটিয়ে পড়ে। ১০ ফুট পরপর স্প্রিংলার সিস্টেম বসাতে হয়। এই পদ্ধতিতে নিচে তিনটি পানির পাম্প থাকে, এই পাম্প স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায়। ফায়ার পাম্প চলে বিদ্যুতে। বিদ্যুৎ না থাকলে স্ট্যান্ড বাই পাম্প জেনারেটর চালু হবে, না হলে জকি পাম্প থাকে। জকি পাম্প প্রতিটি ফ্লোরে সমান গতিতে পানি ছিটিয়ে দেয়। এরপর রয়েছে পিএ সিস্টেম। এই পদ্ধতিতে নিচে একটি কন্ট্রোল রুম বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকবে। সেই কক্ষ থেকে কন্ট্রোলার ওই ভবনের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা বিএবিএক্সের মাধ্যমে কোন তলায় আগুন লেগেছে তা জানিয়ে দেবেন।
থাকতে হবে স্মোক ডিটেক্টর বা ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র। এই যন্ত্র বসানো হলে কোনো তলায় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর ওপরে উঠে গেলেই একটি শব্দ করে ভবনের সবাইকে সতর্ক করে দেবে। থাকবে হিট ডিটেক্টর সিস্টেম। এই যন্ত্র বসানো হলে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সবাইকে জানিয়ে দেবে। এ ছাড়া একজন অগ্নিনির্বাপক কর্মকর্তা থাকবেন, যিনি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সবকিছু তদারক করবেন। সুউচ্চ ভবনে হেলিপ্যাড থাকা বাধ্যতামূলক। প্রতি সাড়ে ৫০০ বর্গফুট আয়তনের জন্য একটি করে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকতে হবে। এরপরও প্রতি তিন মাস পরপর ফায়ার ড্রিল বা অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সুউচ্চ ভবনে কমপক্ষে দুটি সিঁড়িপথ থাকবে।
অনেক সময় দেখা যায়, কোনো ভবনে আগুন লাগলে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে লোকজন দিশেহারা হয়ে যায়। ধোঁয়ার কারণে বের হতে পারে না। ফলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। এ কারণে প্রতি তলায় ‘এক্সিট সাইন বা প্রস্থান চিহ্ন’ থাকা আবশ্যক। এটি থাকলে বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও অটোমেটিক বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে এটি আলো জ্বেলে পথ নির্দেশ করবে, যাতে অগ্নিকাণ্ডের শিকার বা কবলে থাকা ব্যক্তি সহজে ওই নির্দেশ অনুসরণ করে বের হয়ে যেতে পারবে। এখন প্রশ্ন হলো, বহুতল ভবনে এসব নিয়মকানুন মেনে চলা হচ্ছে কি?
ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী, এসব নিয়ম সুউচ্চ বা বহুতল ভবনগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক।

ভেনিজুয়েলায় পৌঁছেছে রুশ সেনারা: যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি সত্ত্বেও ভেনিজুয়েলায় পৌঁছে গেছে রুশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল একটি দল। ইতিমধ্যে এটি নিশ্চিত করেছে দুই দেশই। বৃহস্পতিবার ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী জানিয়েছে, রুশ সেনারা পৌঁছালেও এখনো সামরিক কোনো অভিযানে তারা অংশ নিচ্ছে না। এদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, ভেনিজুয়েলা সরকারের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে তাদের একটি বিশেষ দল পাঠানো হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
গত শনিবার রাজধানী কারাকাসের কাছেই একটি বিমানবন্দরে রুশ বিমান বাহিনীর দুটি বিমান অবতরণ করে। সেখানে ১০০ রুশ সেনা ছিল। তবে রাশিয়া সেনা পাঠানোকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি স্বীকার করতে নারাজ।
দেশটি জানিয়েছে, রুশ সেনারা শুধু ভেনিজুয়েলার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করতে সেখানে গেছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বৃহস্পতিবার তার সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাশিয়া লাতিন আমেরিকার ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো আমরা কাউকে হুমকি দিচ্ছি না। রুশ সেনারা পূর্ব নির্ধারিত আলোচনার জন্যেই ভেনিজুয়েলায় অবস্থান করছে।
উল্লেখ্য, ভেনিজুয়েলার চলমান রাজনৈতিক সংকটে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অনবরত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া ও চীন। অপরদিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো বিরোধী নেতা হুয়ান গাইডোকে সমর্থন দিচ্ছে। নির্বাচনে সমাজতন্ত্রী নিকোলাস মাদুরো বড় ব্যবধানে জয় লাভ করলেও সে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ আখ্যায়িত করে নিজেই নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিয়েছেন হুয়ান গাইডো।
যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি
এদিকে, ভেনিজুয়েলায় সেনা পাঠানোয় রাশিয়াকে হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়াকে সাবধান করে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তাদের সামনে এখনো সেনা ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। মার্কিন প্রশাসন দাবি করেছে, রাশিয়া যে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে তারা স্পেশাল ফোর্স ও সাইবার নিরাপত্তা সদস্য। ভেনিজুয়েলার শুধু সেনাশক্তি ছাড়া আর কিছুই নেই বলেও মন্তব্য করেন ডনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির কঠিন জবাবও দিয়েছে রাশিয়া। জাতিসংঘে রাশিয়ার সহকারী স্থায়ী প্রতিনিধি দিমিত্রি পলিয়ানস্কি টুইটারে বলেন, একটা রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রকে কে দিয়েছে! এটি শুধু ভেনিজুয়েলার মানুষ ও তাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর হাতেই রয়েছে।

চীনের বন্দিশিবিরে মার্কিন নাগরিকদেরও আটক রেখেছে চীন

চীনের জিনজিয়াংয়ে বন্দিশিবিরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও আটক রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সূত্রের বরাত দিয়ে শুক্রবার সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্র বলেছে, আটককৃতদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আইনি মর্যাদা দেওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে মার্কিন নাগরিক অথবা আইনি মর্যাদা পাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা অনেক বেশি কিনা জানতে চাইলে বলা হয়েছে , ‘নেহাৎ কম নয়।’
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক অ্যাম্বেসেডর অ্যাট লার্জ স্যাম ব্রাউনব্যাক জানিয়েছেন, তার কাছে অসমর্থিত সূত্রের খবর রয়েছে যে, ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা এক ব্যক্তির বাবা, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ নাগরিক, জিনজিয়াংয়ে যাওয়ার পর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘তার এখানে আইনি অবস্থান আছে, ক্যালিফোর্নিয়াতে ছেলের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি জিনজিয়াংয়ে ফেরত গিয়েছিলেন। এরপর থেকেই তার কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি কোথায় আছেন, তার কী চিকিৎসা হচ্ছে এ নিয়ে তিনি (ছেলে) উদ্বিগ্ন। তার একাধিক পুরাতন ব্যাধি আছে। তার বয়স ৭৫ এবং তিনি একজন তাত্ত্বিক।’
গত বছর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন ‘ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলতে জোর করে আট লাখ থেকে সম্ভবত ২০ লাখ উইঘুর, যারা জাতিগত ভাবে কাজাখ ও অন্যান্য মুসলমানকে বন্দিশিবিরে আটক করে রেখেছে।’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন ও প্রাক্তন বন্দিরা জানিয়েছে, বন্দিশিবিরের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বন্দিদের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন চালায় এবং কিছু বন্দিকে হত্যাও করেছে।’

যেভাবে হত্যা করা হয় আবরারকে- ৭ দিনে কী বদলালো by শুভ্র দেব

বিইউপি’র শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী হত্যার বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে সাত দিনের আল্টিমেটাম শেষ হচ্ছে আজ। এই সাত দিনে কতটা পাল্টেছে ঢাকার সড়কের চিত্র। দাবিই বা পূরণ হয়েছে কতটা। এর মূল্যায়ন করতে আজ বৈঠকে বসছেন বিইউপি শিক্ষার্থী, ঢাকা উত্তরের মেয়র ও ডিএমপি কর্মকর্তারা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলছেন, দাবি পূরণে দৃশ্যমান কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। এই সময়ে একই ধরনের কয়েকটি ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে শুধু প্রতিশ্রুতি নয় কার্যকর কিছু দেখতে চান তারা।
গত ১৯শে মার্চ আবরার  নিহত হওয়ার পরই সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে নামেন বিইউপির শিক্ষার্থীরা। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন আশপাশের আরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রথম দিন দিনভর বিক্ষোভ ও অবস্থানের পর দ্বিতীয় দিনে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর আরও কয়েকটি এলাকায়।
দিনভর বিক্ষোভ শেষে বিকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। বৈঠকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাত দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেয়া হয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আজ আবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন মেয়র ও পুলিশ কর্মকর্তারা। আন্দোলনের সময় আট দফা দাবি পেশ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। সাত দিনের মধ্যে এসব দাবি পূরণ বা ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছিলেন শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, কিছু উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু এই সময়ে আবরার হত্যার মতো আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে সড়কে। মিরপুরে একজনকে বাস চাপায় হত্যা করা হয়েছে। সিলেটে বাস থেকে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছে। কুমিল্লায় মারা গেছে আরও দুই শিক্ষার্থী। এসব ঘটনায় আতঙ্ক কিছুতেই কাটছে না।
শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবির মধ্যে ছিল পরিবহন সেক্টরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে, প্রতি মাসে বাস চালকের লাইসেন্সসহ সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেক করতে হবে, আটক চালক ও সম্পৃক্ত সকলকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনতে হবে, ফিটনেসবিহীন বাস ও লাইসেন্সবিহীন চালককে দ্রুত সময়ের মধ্যে অপসারণ করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সকল স্থানে আণ্ডার পাস, স্পিড ব্র্রেকার ও ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করতে হবে, সড়কে হত্যার সঙ্গে জড়িত সবাইকে সর্বোচ্চ আইনের আওতায় আনতে হবে, প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চলাচল বন্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে বাসস্টপ এবং যাত্রী ছাউনি করার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই কয় দিনে অগ্রগতির মধ্যে আছে ঘাতক বাস চালক ও সহকারীকে গ্রেপ্তার, আবরার নিহত হওয়ার স্থানে তার নামেই ফুটওভার ব্রিজের ভিত্তি স্থাপন এবং বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে রাজধানীতে অবৈধ যান ও চালকের বিরুদ্ধে অভিযান। এসব অভিযানে রাজধানীতে অবৈধ যান চলাচল কমেছে। তবে নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামা ও যাত্রী উঠানোর নির্দেশনা এখনও মানা হচ্ছে না। গাড়িতে গাড়িতে রেষারেষির দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে নিয়মিত।
এছাড়া ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পথচারীদের মধ্যে নতুন কোনো সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে রাজধানীতে শৃঙ্খলা আনতে ধানমন্ডি ও আজিমপুর এলাকায় গতকাল থেকে চক্রাকার বাস চলাচল শুরু হয়েছে। এয়ারপোর্ট থেকে গুলিস্তান রুটে নামানো হয়েছে বিআরটিসির দ্বিতল বাস। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ডিএমপির পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। পরিস্থিতি নিয়ে অনেকটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেও ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া নিজেই ছুটে বেড়াচ্ছেন নানা কর্মসূচিতে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা দৃশ্যমান হবে।
যেভাবে হত্যা করা হয় আবরারকে: অন্যান্য দিনের মতো ১৯শে মার্চ ভোরবেলা সদরঘাট থেকে গাজীপুরার উদ্দেশ্য রওনা দেয় সুপ্রভাত পরিবহনের ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৪১৩৫ নম্বরের বাস। চালকের আসনে তখন ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। আর সঙ্গে ছিলেন কন্ডাক্টর মো. ইয়াসিন আরাফাত ও চালকের সহকারী মো. ইব্রাহিম। বাসটি গুলিস্তান, পল্টন, কাকরাইল, মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, নতুন বাজার পর্যন্ত ঠিকঠাক যাচ্ছিল। কিন্তু শাহজাদপুর বাঁশতলা এলাকার পৌঁছার পর ঘটে বিপত্তি।
সেখানকার সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা মিরপুর আইডিয়াল গার্লস কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সিনথিয়া সুলতানা মুক্তাকে চাপা দেন চালক সিরাজুল ইসলাম। মারাত্মকভাবে আহন হন ওই শিক্ষার্থী। এতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা জনতা ও ওই বাসের যাত্রীদের তোপের মুখে পড়েন চালক সিরাজুল। পরে ওই এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের কাছে সিরাজুলকে সোপর্দ করেন উত্তেজিত যাত্রীরা। তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল থেকে বাসটি নিয়ে রওনা দেয় চালকের সহকারী ইয়াসিন আরাফাত। তাড়াহুড়ো করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে গিয়ে তার ঠিক একটু সামনে নর্দ্দা এলাকায়  ইয়াসিন চাপা দেয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীকে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার (ডিবি) ক্যান্টনমেন্ট জোনাল টিম কর্তৃক ঘাতক ওই বাসের চালক, কন্ডাক্টর, চালকের সহকারী আটকের পর এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এর আগে মঙ্গলবার ডিবির ওই টিম চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি থানার একটি ইটভাটায় কন্ডাক্টর ইয়াসিনের অবস্থান শনাক্ত করে তাকে গ্রেপ্তার করে। আর সহকারী মো. ইব্রাহিমকে মধ্য বাড্ডা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন।
ডিবির কাছে আটক ওই তিন ঘাতক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। বাতেন বলেন, আবরারকে চাপা দেয়ার পর প্রাথমিকভাবে সবাই ধরে নেয় সুপ্রভাত বাসের মূল চালক সিরাজুলই ঘাতক। কারণ চালক সিরাজ বাস চালিয়ে দুর্ঘটনার কথা স্বীকার করেছে পুলিশের কাছে। কিন্তু ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে বের হয়ে আসে প্রকৃত রহস্য। শাহজাদপুর এলাকায় কলেজছাত্রী সিনথিয়া সুলতানা মুক্তাকে চাপা দিয়ে আহত করার পর বেকায়দায় পড়ে তারা। উপস্থিত জনতা ও ওই বাসের যাত্রীরা চালক সিরাজুল ইসলামকে মারধর দিয়ে ট্রাফিক পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। এ ছাড়া যাত্রীদের তোপের মুখে অসহায় হয়ে পড়েন বাসের কন্ডাক্টর ও চালকের সহকারী। উত্তেজিত জনতা বাসটি পুড়িয়ে বা ভাঙচুর করতে পারে এমন ভয়ে কন্ডাক্টর ইয়াসিন যোগাযোগ করেন মালিক ননী গোপাল সরকারের সঙ্গে। পরে ননী গোপালই জনতার হাত থেকে বাসটি বাঁচানোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কন্ডাক্টর ইয়াসিনকে চালকের আসনে বসার নির্দেশ দেন। অথচ ইয়াসিনের ভারী যানবাহন চালানোর কোনো লাইসেন্সই ছিল না।
বাতেন বলেন, ইয়াসিন চালকের আসনে বসার পরপরই দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করার চেষ্টা করে। এমন সময় নর্দ্দা এলাকায় এসে চাপা দেয় বিইউপির শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীকে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় আবরারের। এ সময় বাসটি রেখে পালিয়ে যায় ইয়াসিন ও ইব্রাহিম। পরে শাহজাদপুরে কলেজছাত্রী সিনথিয়া সুলতানা মুক্তাকে মারাত্মক জখম ও আবরার নিহত হওয়ার ঘটনায় গুলশান থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়। আগে থেকে আটক সুপ্রভাত বাসের মূল চালক সিরাজুল ইসলামকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডে আনে পুলিশ। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তদন্তভার দেয়া হয়েছে ডিবির কাছে। চালক সিরাজুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বের হয়ে আসে ঘটনার আদ্যোপান্ত। তিনি বলেন, দুটি মামলারই আলাদা আলাদা তদন্ত হচ্ছে। এবং ইয়াসিনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়ার পর আগামী এক মাসের মধ্যে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দেয়া হবে। এ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন কন্ডাক্টর ইয়াসিনকে চালকের আসনে বসার নির্দেশদাতা ননী গোপাল সরকারকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
আবরার হত্যার ভিডিও প্রকাশ: বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীকে বাস চাপা দেয়ার একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। ভিডিও ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নেয়া হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রবেশ গেটের ঠিক উল্টো পাশের সড়কে ওই সময়টাতে যানবাহনের তেমন চাপ ছিল না। ফুটপাথ দিয়ে দুই চারজন পথচারী হেঁটে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখন বেপরোয়া গতির একটি বাস ধাক্কা দেয় আবরারকে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটে পড়ে আবরার। মাটিতে লুটে পড়ার পরও ঘাতক বাসের চালক বাস না থামিয়ে রাস্তার বাম পাশ থেকে দ্রুত গতিতে আবরারকে চাপা দিয়ে চলে যায় মাঝ সড়কে। ততক্ষণে রক্তাক্ত অবস্থায় মাঝ সড়কে পড়ে থাকে আবরারের নিথর দেহ। তার ঠিক কয়েক হাত দূরে পড়েছিল তার কাঁধের ব্যাগ। ঘাতক বাসটি তখনও পালানোর উদ্দেশ্যে আরো গতি বাড়িয়ে দেয়। ঘটনাটি সস্ত্রীক এক পথচারীর নজরে আসে। তিনিই প্রথম রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ি আটকিয়ে ছুটে যান আবরারের কাছে। তার কয়েক সেকেন্ড পরেই দুজন ট্রাফিক পুলিশকে ঘাতক বাসের পেছনে ছুটতে দেখা গেছে।
কন্ডাক্টর ও চালকের সহকারী সাত দিনের রিমান্ডে: বিইউপির শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী হত্যার আসামি সু-প্রভাত বাসের কন্ডাক্টর ইয়াছিন আরাফাত ও চালকের সহকারী মো. ইব্রাহিমকে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর আগে ঘটনার আরো তদন্ত ও বাস মালিককে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম দশ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। পরে শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াছিন আহসান চৌধুরী সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। শুনানিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, বাসের কন্ডাক্টর ইয়াসিন বাসচাপা দিয়ে আবরারকে মেরে ফেলেন। ঘটনার রহস্য উদঘাটনের জন্য আসামিদের রিমান্ডে নেয়া জরুরি। এ সময় আসামি পক্ষের কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না।
প্রসঙ্গত, গত ১৯শে মার্চ সকাল ৭টায় রাজধানীর প্রগতি সরণির বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেটের উল্টোপাশে সু-প্রভাত কোম্পানির একটি বাস চাপা দেয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহম্মেদ চৌধুরীকে। এ খবর ছড়িয়ে গেলে প্রতিবাদে নেমে সড়ক অবরোধ করে তার সহপাঠীরা। তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন থেকে তারা ৮ দফা দাবি জানায়। পরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের আশ্বাসে ঘরে ফিরে যায় শিক্ষার্থীরা। ঢাকার সড়কে আর সু-প্রভাত বাস চলবে না বলে জানান মেয়র। বাতিল করা হয় ওই বাসের রেজিস্ট্রেশন।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৯শে জুলাই রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম ও আবদুল করিম রাজীব জাবালে নুর বাস চাপায় নিহত হওয়ার পর নজিরবিহীন শিক্ষার্থী আন্দোলন হয় রাজধানীতে। যা পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় নিরাপদ সড়কের ৯ দফা দাবি তুলে শিক্ষার্থীরা। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয় ট্রাফিক পুলিশ ও সিটি করপোরেশন। তখন সড়কে দৃশ্যত কিছু শৃঙ্খলা ফিরলেও পরে ধীরে ধীরে তা ভেঙে পড়ে।

সেই নৌসেনা এখন মুসলিম

নৌসেনা হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটি উন্নতমানের বিস্ফোরক ডিভাইস তৈরি করেন রিচার্ড ম্যাকিনি। ডিভাইসটি ব্যবহার করে কাছের এক মসজিদ উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। লক্ষ্য ছিল ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটানোর। কিন্তু তিনিই এখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে একজন আদর্শ মুসলিম হিসেবে জীবন-যাপন করছেন বলে কানাডিয়ানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা স্টেটের নাগরিক রিচার্ড জানান, ছোটবেলায় হলিউড ছবি ‘র‌্যাম্বো’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নায়কে মতো হতে চেয়েছিলেন। তাই পরে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। এরপর মধ্যপ্রাচ্যসহ একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্বরত ছিলেন। নৌসেনা হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে রিচার্ড বলেন, ‘শিশুদের মৃত্যু দেখা সবচেয়ে ভয়ানক ছিল।’
তবে এই করুণ বাস্তবতা এড়িয়ে নিজের সহকর্মীদের সঙ্গ দিতে বলা হয় তাকে। তার গায়ে চোখের পানির ফোটা সদৃশ ২৬টি ট্যাটু করা আছে। প্রতিটি ট্যাটু তার হত্যা করা মানুষের সংখ্যা প্রকাশ করে। তবে রিচার্ড যুদ্ধক্ষেত্রে বেশিদিন প্রতিপক্ষকে হত্যা করা মেনে নিতে পারেননি। তিনি চাকরি ছেড়ে দেন।
রিচার্ড বলেন, ‘একদিন আমার দোকানে দুজন বোরকাপরা নারী আসেন। আমি তাদের দেখে কান্নায় ভেঙে পরলাম এবং প্রার্থনা করতে লাগলাম, আমি যেন একটুকু শক্তি পাই যেন তাদের দুজনের ঘাড় মটকে দিতে পারি। আমি খুব রাগান্বিত ছিলাম এবং তাদের খুব ঘৃণা করতাম।’
‘সে সময় প্রতি দুদিনে আমি হাফ গ্যালন ভদকা পান করতাম। তখনই আমি বাসায় বসে আইইডি (বাসায় নির্মিত বোমা) বানিয়ে ফেলি। আমি চেয়েছিলাম ইন্ডিয়ানা স্টেটের মুন্সি শহরের একটি মুসলিম সেন্টারে এর বিস্ফোরণ ঘটাতে। এতে কমপক্ষে দুশতাধিক মানুষ নিহত হতে পারতো। আমি চেয়েছিলাম, এই হামলার মধ্য দিয়ে শেষবারের মতো আমার দেশের জন্য কিছু করতে। এটাই ছিলো আমার হামলার যুক্তির ব্যাখ্যা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানতাম এই হামলার জন্য আমাকে কারাদন্ড দেওয়া হতো এবং সর্বশেষ আমার হাতে সুঁই ফুটানো হতো। কিন্তু এতে আমার কিছু আসে যায় না। ইসলামের প্রতি ঘৃণাই যেন আমাকে জীবিত রেখেছিলো।’
মার্কিন এই নাগরিক বলেন, ‘একদিন আমার ছোট মেয়ে বাসায় এসে আমাকে বললো, সে স্কুল থেকে আসার সময় একটা ছেলেকে দেখেছে যার মা মুখে স্কার্ফ পরে সারা শরীর আবদ্ধ করে তাকে নিতে এসেছিলেন। তার কেবল চক্ষুগোলক ব্যতীত কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না।’
মেয়ের মুখ থেকে হিজাবি নারীর কথা শুনে রিচার্ড খুব রেগে যান। এক পর্যায়ে সন্তানদের সামনে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন তিনি। তবে বাবার এমন ব্যবহার দেখে কিছু বলেনি ছোট মেয়ে। কেবল মেয়েটি রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে এমন একটা ভঙ্গিমা দিলেন যেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিংস্র মানব হচ্ছেন তার বাবা।
রিচার্ড বলেন, ‘তার এই চাহনি দেখেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই মুসলিম স¤প্রদায়কে আরও একটি সুযোগ দিবো। এরপর আমি নিকটস্থ একটি মসজিদে গেলাম এবং দেখলাম, একজন মুসলিম ব্যক্তি নিজের জুতো খুলে সেখানে প্রবেশ করলেন। সে আমার দিকে তাকিয়ে একটি হাসি দিলেন। আমাকে প্রশ্ন করলেন, “আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি?”
জবাবে রিচার্ড বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি চাই আপনি আমাকে ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা দিন। এরপর তিনি আমাকে কোরআন দিলেন। ওই ব্যক্তি আমাকে বলেন, “আপনি এটি পড়েন এবং পড়া শেষে কোনো প্রশ্ন থাকলে বলুন।”’
‘বইটি পড়ে একের পর এক প্রশ্ন পাই আমি এবং তাদের কাছে ব্যখ্যা চাই। তারাও আমাকে ব্যাখ্যা করছিলেন। এটা ছিল এক ধরনের সজাগ হওয়া। মসজিদে প্রবেশের ঠিক আট সপ্তাহ পর আমি মুসলমান হই।’
এ ঘটনার তিন বছর পর মুনসি ইসলামিক সেন্টারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন রিচার্ড।
সর্বশেষে রিচার্ড বলেন, ‘আমি একজন মুসলিম। একজন দক্ষ সেনা ও গর্বিত মার্কিন নাগরিক। আমি শিখেছি যে, আমার ধারণাগুলো পুরোপুরি ভ্রান্ত ছিলো। আপনি জানেন, ইহুদী ধর্মে একটি বার্তা আছে, খ্রিস্টান ধর্মেও বার্তা আছে একইসঙ্গে ইসলাম ধর্মেও একটি বার্তা আছে। তবে বিষয়টি হাস্যকর হলেও সত্য যে, প্রত্যেক ধর্মের বার্তাই এক। সব ধর্মেই বলা হয়েছে শান্তি-ভালোবাসার কথা।’
তিনি বলেন, ‘আমার এখন একটাই লক্ষ্য, ঘৃণা বন্ধ করা। ঘৃণা থেকে ভালো কিছু আসে না। আমি অনেক কিছু করেছি। আমি অনেক মানুষের ক্ষতি করেছি এবং এই বোঝা নিয়েই আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। তবে আমি যদি অন্য কাউকে থামাতে পারি তাহলেই আমি জিতে যাবো।’
যুক্তরাষ্ট্রে একজন মুসলিম নাগরিক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা এভাবেই জানালেন রিচার্ড।

রোহিঙ্গাদের ভাষানচরে স্থানান্তর নিয়ে অনিশ্চয়তা

প্রত্যাবাসন স্থগিতের পর এবার রোহিঙ্গাদের ভাষানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও ভেস্তে যেতে বসেছে। রোহিঙ্গাদের ‘স্বেচ্ছায়’ যেকোনো স্থানে যেতে আগ্রহী হতে হবে! এমন আন্তর্জাতিক শর্তই এ পথের জন্য কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্য এপ্রিলে গাদাগাদি করে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন আশ্রয় ক্যাম্পে বসবাস করা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মধ্য থেকে ৩০ হাজার পরিবারের প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরের নব প্রতিষ্ঠিত পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার।
তার আগে মধ্য নভেম্বরে প্রায় ২২০০ রোহিঙ্গাকে রাখাইনে ফেরত পাঠানোর (প্রত্যাবাসন) পরিকল্পনাও আটকে যায় তাদের স্বেচ্ছায় ফিরতে রাজি না হওয়ায়। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে একের পর এক সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে, তখন গোটা বিষয়টি ঝুলে যাচ্ছে বলছেন পেশাদাররা। বলাবলি আছে, অনেকেই চায় রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের ক্যাম্পেই থাকুক। এতে দেশি-বিদেশি কতিপয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিল হয়! মধ্য এপ্রিলে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে গতকাল সংশয় প্রকাশ করেন খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের প্রেক্ষিতে বুধবার মন্ত্রী মোমেন বলেন, গাদাগাদি করে কক্সবাজারে জেলার বিভিন্ন ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের সাময়িক সুবিধার জন্যই সরকার একটি অংশকে ভাসানচরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ক্যাম্প এলাকায় আসন্ন বর্র্ষায় নানা রকম অসুবিধা হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, সেখানে ভূমিধস হতে পারে। মানুষও মারা যেতে পারে। এসব বিবেচনায় সরকার ১ লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং ওই লক্ষ্যে সেখানে প্রয়োজনীয় ঘর-বাড়িও তৈরি করেছে। তাদের জন্য ভাসানচর প্রস্তুত জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কিন্তু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন বলছে সেখানে গেলে না-কী তাদের অসুবিধা হবে। সবাই যদি মনে করে অসুবিধা হবে, তাহলে আমরা (সরকার) রোহিঙ্গাদের সেখানে পাঠাবো না। এ সময় অপর এক প্রশ্নের জবাবে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। কবে নাগাদ তাদের স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হবে বা আদৌ এটি করা সম্ভব হবে কি-না? তা নিয়ে আগাগোড়ায় সংশয় প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, আমরা চিন্তা করেছিলাম এপ্রিলে পাঠাবো, কিন্তু এখন তারা (জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থা) শর্ত দিলে সমস্যা তৈরি হবে। এ অবস্থায় কবে নাগাদ পাঠানো যাবে জানি না!
সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমসহ দেশীয় খবর প্রচারে বিদেশস্থ ৭৮টি মিশনে ব্লু-বক্সের মাধ্যমে বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল (আইপিটিভি ভার্সন) সম্প্রচারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সেখানে কানাডায় থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন বিষয়েও জানতে চান সংবাদকর্মীরা। জবাবে মন্ত্রী বলেন, এটি সরকারের অনেকদিনের প্রচেষ্টা, বর্তমানে তা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তিনি আশা করেন এ প্রক্রিয়ায় সরকার সফল হবে। এ সময় দণ্ডাদেশ নিয়ে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফেরত আনার সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি আছে কি-না? জানতে চান সাংবাদিকরা। জবাবে মন্ত্রী জানান, বিদেশে পালিয়ে থাকা সব দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকেই দেশে ফেরাতে চায় সরকার। আর এ কারণেই তারা তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। প্রশ্ন আসে কোনো দেশ যদি কোনো দণ্ডপ্রাপ্তকে ফেরত পাঠাতে রাজি না হয়, সেক্ষেত্রে ওই দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে কোনো টানাপড়েন হবে কি-না? মন্ত্রী এ নিয়ে সরাসরি কোনো জবাব দেননি। তবে তিনি এটা বোঝানোর চেষ্টা করেন যে ‘সম্পর্কে টানাপড়েন’ এক বিষয়, ‘আইনি প্রক্রিয়া’ ভিন্ন বিষয়।
রোহিঙ্গাদের চাওয়া, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান: গত ১৫ই নভেম্বর রোহিঙ্গাদের নির্ধারিত দলকে রাখাইনে পাঠানোর মাধ্যমে প্রত্যাবাসন শুরু করতে চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় এ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। এ অবস্থায় রোহিঙ্গারাও আদি নিবাসে ফিরতে রাজি হয়নি। তারা কক্সবাজারে থাকাটাই নিরাপদ মনে করে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ১১ লাখেরও বেশি  রোহিঙ্গা এখন কক্সবাজারের উখিয়া ও  টেকনাফের ৩০টি ক্যাম্পে অবস্থান করছে যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় আশ্রয়শিবির।
আন্তর্জাতিক চাপ ও সরকারের নানা তৎপরতায় তাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে দু’দেশের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮ হাজার ৩২ জনের তালিকা দেয়া হয়েছিল তা থেকে বাছাই করে ৪ হাজার ৬০০ জনকে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে সম্মতি দেয় মিয়ানমার। প্রথম ধাপে ২ হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্ত মতে, প্রতিদিন গড়ে দেড়শ’ জন করে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু প্রত্যাবাসন তালিকায় থাকা রোহিঙ্গা, তাদের স্ব-জাতি অন্য নারী-পুরুষদের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যায়। অবশ্য প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই এর বিরোধিতায় ছিল শরণার্থী বিষয়ক বিভিন্ন সংস্থা এবং সহায়তা সংস্থাগুলো। তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমারে ফিরে  গেলে আবারও নিরাপত্তা সংকটে পড়বে  রোহিঙ্গারা। এদিকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চালুর পাশাপাশি এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও এগিয়ে চলে।
প্রত্যাবাসন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ায় স্থানান্তর পরিকল্পনায় গতি বাড়ে। সরকারের নীতি নির্ধারকরা মনে করেছিলেন, ভাসানচরে বিকল্প পুনর্বাসন কেন্দ্রে যেতে রাজি হবে রোহিঙ্গারা। তারা আশা করেছিলেন, ওই কেন্দ্রকে ঘিরে তাদের কৃষিকাজ ও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের যে সুযোগ সরকার সৃষ্টি করেছে তাতে হয়তো রোহিঙ্গারা আকৃষ্ট হবে। কিন্তু না, রোহিঙ্গাদের মধ্যে সেটির কোনো আকর্ষণ তৈরি করতে পেরেছে মর্মে এখনও কোনো রিপোর্ট মিলেনি। বরং তারা সেখানেও ফিরতে রাজি না হওয়ায় সংবাদও আসছে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে। ফলে স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি ঝুলে গেল বলা বাহুল্য হবে না- এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। উল্লেখ্য, গ্লোবাল ট্রেন্ডস ২০১৭, ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুসারে, বিশ্বে যত উদ্বাস্তু আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় আশ্রয় পাওয়া দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। বাংলাদশে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের বিষয়ে নিয়মিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে আপডেট জানান জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার বার্গেনা। দু’-একদিনের মধ্যে তিনি ফের বাংলাদেশ সফরে আসছেন পরিস্থিতি সরজমিন দেখতে। ৩১শে মার্চ তার কক্সবাজার ক্যাম্প পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
জানুয়ারিতেই ভাসানচরে স্থানান্তর পরিকল্পনা স্থগিত করার অনুরোধ করেছিল জাতিসংঘ: এদিকে ভাসানচর এলাকা পরিদর্শনকারী মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংগি লি তাড়াহুড়ো করে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর না করতে ঢাকার প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। জানুয়ারিতে তিনি বলেন, ভাসানচরে সাইক্লোন হলে কি পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে সেটা না দেখে এবং দ্বীপটির সুযোগ সুবিধা পর্যাপ্ত যাচাই না করে কোন ভাবেই রোহিঙ্গাদের সেখানে পাঠানো উচিত হবে না। একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজেদের সরাসরি সেখানে গিয়ে  দ্বীপটি দেখার সুযোগ করে দেয়ার কথাও বলেছেন তিনি, যাতে তারা নিজেরা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে সেখানে তারা যেতে চায় কি-না। ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। জাতিসংঘ মনে করে তাড়াহুড়ো করে একটি দ্বীপে রোহিঙ্গাদের পাঠানো হলে মিয়ানমারের কাছে ভুল বার্তা যাবে। মিয়ানমার এমন বার্তাও পেতে পারে যে বাংলাদেশেই রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে, তাদের ফেরত না নিলেও চলবে।

দুই শতাধিক চুরির পর অস্ত্রসহ ধরা ‘কিশোর গ্যাং’ by ইব্রাহিম খলিল

দুই শতাধিক চুরির পর অস্ত্রসহ ধরা পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগরীর পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকার একটি কিশোর গ্যাংয়ের পাঁচ কিশোর। যাদের সবার বয়স ১৭ বছরের কম।
বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে আরেকটি চুরির ঘটনা ঘটানোর প্রস্তুতির সময় গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সদরঘাট থানা পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।
এ সময় কিশোর গ্যাংয়ের আরো ৪-৫ সদস্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানান সদরঘাট থানার ওসি নেজাম উদ্দীন।
তিনি বলেন, শুধু কিশোর গ্যাংয়ের বাকি সদস্য নয়: এদের রক্ষকদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, পুলিশের হাতে ধরা পড়লে জামিন নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের কেউ ভূমিকা রাখেন। চুরির মালও কম দামে কিনে নেন তারা।
তাদের নাম ও পরিচয় জানিয়েছে কিশোররা। অভিযানের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। অভিযান চলছে। 
গ্রেপ্তারকৃত কিশোররা হলো- দলনেতা মো. বাদশা (১৮), মো. রাসেল (১৯), নুর উদ্দিন (২০), জাকির হোসেন (১৯) ও মো. সোহেল (২০)। তাদের কাছ থেকে একটি দেশীয় বন্দুক, তিনটি কার্তুজ, তিনটি ধারালো অস্ত্র ও তালা ভাঙার সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে সদরঘাট থানায় একটি মামলা করা হয়েছে বলেও জানান ওসি নেজাম উদ্দীন।
সদরঘাট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রুহুল আমিন বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা এক সময় চট্টগ্রাম মহানগরীর কদমতলি রেলস্টেশন এলাকায় কুলির কাজ করতো। সে সময় থেকে তারা মাদকের নেশায় আসক্ত ছিল। তখন নেশার টাকা সংগ্রহের জন্য মোবাইল ফোন ছিনতাই করতো তারা।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চাহিদা বাড়তে থাকে। ছায়া হিসেবে খুঁজে নেয় রাজনৈতিক নেতাদের। যারা আধিপত্য বিস্তারে এসব কিশোরদের ব্যবহার করে থাকে। এমনকি এসব কিশোরকে দিয়ে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য বিক্রি করে থাকে। এমনকি প্রতি রাতে নগরীর কোথাও না কোথাও চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই করে থাকে।
তাদের দলনেতা মো. বাদশা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তারা দুই শতাধিক চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে। বুধবার দিনগত রাতে মাদারবাড়ি এলাকায় আরেকটি চুরির ঘটনা ঘটাতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।
পরিদর্শক রুহুল আমিন বলেন, বুধবার রাতে কতিপয় চোর মাদারবাড়ি এলাকায় চুরির ঘটনা ঘটাতে সংঘবদ্ধ হয়। গোপনসূত্রে খবর পেয়ে সদরঘাট থানা পুলিশ অভিযান চালায়। এতে ৫ জনকে গ্রেপ্তারে  সক্ষম হলেও আরো ৪-৫ জন পালিয়ে যায়। এ সময়  গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে একটি দেশীয় বন্দুক, তিনটি কার্তুজ, তিনটি ধারালো অস্ত্র ও তালা ভাঙার সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই কাজে লিপ্ত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দিনের বেলায় কৌশলে বিভিন্ন ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যায়। সেখানে টার্গেট করে ফিরে আসে। রাতে ইয়াবা সেবনের পর অস্ত্র নিয়ে চুরি-ডাকাতি করতে বের হয়। ৭ থেকে ১০ জন মিলে চুরির ঘটনা ঘটায়। এদের একজন গ্রিল কাটে, দুজন ভেতরে প্রবেশ করে এবং বাকিরা অস্ত্র নিয়ে পাহারা দেয়। চুরির অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে আগেও মামলা হয়েছে বলে জানান পরিদর্শক রুহুল আমিন।

মনে হচ্ছিল কেয়ামত হতে চলেছে

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ৫ তলায় পুরুষ ওয়ার্ডের বেডে আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন ডার্ড গ্রুপের সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার তাহরীম খান নিশো। মুখে নেবুলাইজার মাস্ক। চোখে আতঙ্কের ছাপ। ক্ষণে ক্ষণে  শিশুর মতো হাত- পা কেঁপে উঠছে। পাশেই তিনজন বন্ধু তাকে মানসিক সান্ত্বনা এবং সাহস যোগাচ্ছিলেন। তিনি এতটাই মানসিক ট্রমার ভেতরে ছিলেন যে পাশে থাকা বন্ধুকে ডেকে বলেন, ‘আচ্ছা আমার বয়স কতো রে’?
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে তাহরীম বলেন, দুপুর পৌনে ১টার দিকে হঠাৎ করে এডমিনের ল্যান্ডফোন বেজে ওঠে। এডমিনের পক্ষ থেকে বলা হয় বিল্ডিংয়ে আগুন লেগেছে। সবাই নিজেদের মতো করে নিরাপদে নিচে নেমে যান।
এসময় ১২ তলায় ফ্লোরে থাকা আমরা ২০ থেকে ২২ জন একত্রে নিচে নামার জন্য সিঁড়ির কাছে যাই। সিঁড়ির কাছে গিয়ে হঠাৎ আমাদের পা আটকে যায়। কারণ তখন সিঁড়ি এতটাই গরম ছিল যে, আমরা নামতে গেলে হয়তো আগুনের তাপে গলেই যেতাম। আমরা অনেকটা জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে যে যার আত্মীয়স্বজনদের কাছে ফোন দিতে থাকি। আমি আমার কাছের এক বন্ধুকে ফোন দেই। এদিকে ফ্লোরের ভেতরে ধোঁয়ার কারণে চোখে কিছু দেখা যাচ্ছিল না।
ধোঁয়ার পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে, আমাদের দম বন্ধ হয়ে মরে যাওয়ার মতো অবস্থা। এসময় ফোনের ওপ্রান্তে থাকা বন্ধু আমাকে পরামর্শ দেয় জানালার গ্লাস ভাঙার। বন্ধুর কথানুযায়ী জানালার কাছে গিয়ে অনেক চেষ্টার পর গ্লাস ভেঙে ফেলি। মনে হচ্ছিল কেয়ামত হতে চলেছে। এসময় নিজের জীবন বাঁচাতে এতটাই মরিয়া ছিলাম যে, আমার সঙ্গে আটকা পড়া বাকিদের কথা আমার মাথায় ছিল না। জানালার কাঁচ না ভাঙতে পারলে এতক্ষণে হয়তো লাশ হয়ে যেতাম। অনেকক্ষণ চেষ্টার পরে ফায়ার সার্ভিসের লেডারের সাহায্যে নিচে নামি। আমাদের সঙ্গে একজন গর্ভবতী নারীও ছিলেন। জানি না তার ভাগ্যে কী ঘটেছে।
পাশের বেডেই শুয়ে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী ডার্ড গ্রুপের এক্সিকিউটিভ মো. রিফাত হোসেন খান। হাতে সামান্য কাটা দাগ। আরেক হাতে গামছা পেঁচানো। কখনো রিফাত অজ্ঞান হয়ে পড়েন। আবার দুই এক মিনিটের মাথায় সংজ্ঞা ফিরে পান। হঠাৎ যেন লাফিয়ে ওঠেন। পাশে থাকা বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনরা তাকে জোর করে শুইয়ে রাখেন। এভাবে কয়েক মিনিট চলতে থাকে। সংজ্ঞা ফিরে আসলে রিফাত বলেন, কিছু মনে নেই আমার। চারপাশে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া।
শ্বাস নিতে পারছিলাম না। দুপুর সোয়া ১টার দিকে বন্ধু সাইফকে ফোন দিয়ে বললাম- আর মনে হয় বেঁচে ফিরবো না। আমার জন্য দোয়া করিস। কোনো ভুলত্রুটি করে থাকলে মাফ করে দিস। এভাবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা হয়। কোনো উপায় না দেখে হাতে গামছা পেঁচিয়ে জানালায় খুব জোরে আঘাত করতে থাকি। এরপর কি হয়েছে মনে নেই। পাশে থাকা রিফাতের বন্ধু সাইফ বলেন, বিকাল ৪টার পরে আর রিফাতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি নি। পৌনে ৫টায় হঠাৎ একটি ফোন আসে। রিসিভ করতেই ফোনের ওপ্রান্তে থাকা রিফাত শুধু এতটুকুই বলে, ‘কুর্মিটোলা’। এরপর ফোন কেটে যায়। পরে আমরা তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নিচতলায় দেখতে পাই।
আহত তৌকির ইসলাম রূপকের চাচাতো ভাই তাকবির মানজার বলেন, রূপক বিল্ডিংয়ের ১১ তলায় অবস্থিত এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি ইয়োর সার্ভিস-এর এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। দুপুর ১টায় রূপক আমাকে ফোন দেয়। এসময় তাদের সঙ্গে একরুমে মোট ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তি আটকা পড়েন। ধোঁয়া ও আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার ভয়ে তাদের সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি জানালার গ্লাস ভেঙে ১১ তলা থেকে লাফ দিয়ে মারা যান। তবে আমার ভাইকে আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছে, সুস্থ আছে- এজন্য আমরা সৃষ্টিকর্তার কাছে হাজার শুকরিয়া জানাচ্ছি।
এদিকে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ করতে হন্যে হয়ে ছুটেছেন আত্মীয়স্বজনরা। নিখোঁজ মনির হোসেন সরদারের ভাগ্নি হিরা বলেন, ভবনের ১০ তলায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন মামা। গ্রামের বাড়ি বরিশালের কোতোয়ালি থানায়। স্ত্রী ও এক সন্তান ফিলিপাইনে থাকেন। ৬ বোন ও ৩ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। অগ্নিকাণ্ডের সময় লেডার দিয়ে নামানোর সময় স্লিপ কেটে পড়ে যায় মামা। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে ইউনাইটেড হাসপাতালে আসলে মামার মৃতদেহ আমরা খুঁজে পাই। আগুন লাগার পরে দুপুরে মামার সঙ্গে শেষবার আমার ফোনে কথা হয়। এসময় তিনি বলেন, আমার জন্য তোমরা দোয়া করো। আমি তোমাদের দোয়ায় হয়তো জীবন নিয়ে বের হতেও পারি, নাও হতে পারি।
ইয়োর সার্ভিস কোম্পানির এডমিন অফিসার কাজী এসকে জারিন বৃষ্টিকে খুঁজতে এসেছিলেন তার স্বামীর বন্ধু রাজীব। রাজীব বলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি যশোর। তিন বছর আগে আমার বন্ধুর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। আমার বন্ধু রিজেন্সি হোটেলে চাকরি করে। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে হন্যে হয়ে খুঁজছি তাকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা তার কোনো সন্ধান পাই নি।

কেউ ভাবেনি ওরা এভাবে ফিরবে

কেউ ভাবেনি ওরা এভাবে ফিরবে। পরিবার, পরিজন, স্বজন সবার স্বপ্নকে কবর দিয়ে ওরা ফিরেছে লাশ হয়ে। অথচ ওরা নিজে যেমন স্বপ্ন দেখেছিলেন, তেমন স্বপ্ন দেখতে পরিবারকেও ভাবিয়েছেন। কোথা থেকে কি হয়ে গেল। সন্ত্রাস তাদের জীবন কেড়ে নিল। গোটা বিশ্ব তা তাকিয়ে দেখলো। নারায়ণগঞ্জ বন্দরের ওমর ফারুক ও নরসিংদীর পলাশের জাকারিয়া ভুঁইয়া। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ আল নূর মসজিদে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত ৫০ জনের ২ জন।
মঙ্গলবার রাতে তাদের লাশ বহনকারী বিমান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ড করে। শোকে কাতর স্বজনরা অপেক্ষা করছিলেন লাশ গ্রহণে। রাতেই লাশ গ্রহণ করে তাদের নিজ নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
গত বুধবার সকাল ১০টায় বন্দর উপজেলার সিরাজদ্দৌলা মাঠে জানাজা শেষে পৌনে ১১টায় বন্দর কবরস্থানে ওমর ফারুকের দাফন সম্পন্ন হয়। ওমর ফারুকের পরিবারের স্বজনরা ছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও শত শত এলাকাবাসী এতে অংশ নেন।
মঙ্গলবার রাতে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে মধ্যরাতে বন্দর উপজেলার রাজবাড়ী এলাকায় নিজ বাড়িতে আনা হয়। তখন থেকেই নিকট আত্মীয়স্বজনরা বাড়িতে আসতে শুরু করেন। সকালে গোসল শেষে ওমর ফারুকের মরদেহ বাড়ির সামনে রাখা হলে এলাকাবাসী ও দূর-দূরান্ত থেকে তার বন্ধুবান্ধব এবং স্বজনরা বাড়িতে এসে ভিড় জমান শেষবারের মতো ওমর ফারুকের মুখটি দেখতে। জানাজার আগ মুহূর্তে কফিনের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ওমর ফারুকের মা রহিমা বেগম, তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সানজিদা জামান নিহা ও তিন বোনসহ শোকার্ত স্বজনরা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারা বলতে থাকেন, কেউই আশা করেন নি ওমর ফারুক এভাবে লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরবে। একমাত্র উপার্জনকারী ওমর ফারুককে হারিয়ে পরিবারের অসহায় অবস্থার কথাও তারা তুলে ধরেন।
নিহত ওমর ফারুকের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সানজিদা জাহান নিহা বলেন, আমার স্বামীকে তো আর আমি ফিরে পাবো না। কোনোভাবেই তার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। সে ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। তাকে হারিয়ে এই পরিবারে আমি, আমার বৃদ্ধা শাশুড়ি এবং অবিবাহিত একটি ননদ এখন নিঃস্ব। তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, সরকার যেন আমাদের এই পরিবারটির কথা ভুলে না যায়। এর বেশি আমার আর কিছু বলার নেই।
সকাল সাড়ে ৯টায় জানাজার লক্ষ্যে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সিরাজদ্দৌলা মাঠের উদ্দেশে। ১০টায় জানাজা শেষে পৌনে এগারোটায় দাফন সম্পন্ন হয় বন্দর কবরস্থানে। সেখানে ছেলেবেলার বন্ধুরা ও এলাকাবাসী ওমর ফারুকের স্মৃতিচারণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। জানাজায় অংশ নেন বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল, সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর সুলতান আহম্মেদ, কাউন্সিলর হান্নান সরকার, বন্দর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম সহ স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা।
এদিকে জানাজার পর পরিবারের স্বজনদের সমবেদনা জানাতে নিহত ফারুকের বাড়িতে যান নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এসময় তিনি নিউজিল্যান্ডের এ ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বলে উল্লেখ করেন। নিউজিল্যান্ড সরকারের তাৎক্ষণিক ভূমিকার ব্যাপারে সে দেশের সরকারকে ধন্যবাদও জানান আইভী। আইভী বলেন, ওমর ফারুক নিশ্চিত শহীদের মৃত্যুবরণ করেছে। আমি দোয়া করি আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করবেন। এই ধরনের মৃত্যু আমরা কখনোই আশা করিনি।
মেয়র আইভীকে কাছে পেয়ে এলাকাবাসী বন্দর এলাকায় ওমর ফারুকের নামে একটি সড়কের নামকরণ করার দাবি জানালে আইভী গণমাধ্যমকে বলেন, এ ব্যাপারে আমি স্থানীয় কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বলবো। কাউন্সিলর বিষয়টি নিয়ে অফিসিয়ালি প্রস্তাব করবে। তারপর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য বিবেচনা করা হবে।
গত ১৫ই মার্চ শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ আল-নূর মসজিদে জুমার নামাজের সময় বন্দুকধারী সন্ত্রাসীর গুলিতে ৫০ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হন। এ ঘটনায় নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি ছিলেন ৫ জন। এদের মধ্যে একজন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার রাজবাড়ী এলাকার ওমর ফারুক। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য ২০১৫ সালে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমান পিতাহারা তিন বোনের একমাত্র ভাই ওমর ফারুক। ২০১৭ সালে দেশে এসে বিয়ে করেন একই এলাকায়।  গেল বছরের ১৬ই নভেম্বর আবারো দেশে এসে বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়ে গত ১৮ই জানুয়ারি ফিরে যান নিউজিল্যান্ডে। এটাই ছিল পরিবারের সঙ্গে ওমর ফারুকের শেষ দেখা।
জাকারিয়া ভূঁইয়ার লাশ নরসিংদীর পলাশের জয়পুরা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে রাতেই। সকাল সাড়ে ১১টায় স্থানীয় ঈদগাহ ময়দানে মরহুমের নামাজের জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্তানে দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। নিহত জাকারিয়াকে শেষবারের মতো দেখতে বাড়িতে শত শত লোক ভিড় জমায়। এ সময় শিবপুর আসনের সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভূঁইয়া মোহন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা ইয়াসমিন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান ভূঁইয়া বদিসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংসারের সচ্ছলতা আনতে প্রায় আড়াই বছর আগে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার গজারিয়ার ইউনিয়নের জয়পুরা গ্রামের আবদুল বাতেন ভূঁইয়ার বড় ছেলে জাকারিয়া ভূঁইয়া নিউজিল্যান্ড পাড়ি জমায়। জুমার নামাজ আদায় করতে স্থানীয় মসজিদে যায়। এ সময় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয় জাকারিয়া। লাশ গ্রামের বাড়িতে ফেরার পর হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বাড়ি জুড়ে শুরু হয় শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে আশপাশের পরিবেশ।
নিহত জাকারিয়ার স্ত্রী রীনা বেগম বলেন, আমার তো সবই শেষ। স্বামীও শেষ। সংসারও শেষ। বেঁচে থাকার সম্বল শেষ। চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। স্বামী যেন বেহেস্ত নসিব হয় সেই জন্য সবার কাছে  দোয়া চেয়েছেন।
নিহতের বাবা আবদুল বাতেন ভূঁইয়া বলেন, পৌনে ১১টায় আমরা লাশ বুঝে পেয়েছি। তারপর গ্রামের বাড়ি নিয়ে আসি। লাশের সঙ্গে কিছু আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে বলে আমাদের নিউজিল্যান্ড থেকে জানিয়েছিল। কিন্তু কিছুই পাইনি।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান লাল মিয়া বলেন, পরিবারের সচ্ছলতা আনতে ধারদেনা করে  নিউজিল্যান্ড পাড়ি জমায় জাকারিয়া। কিন্তু এভাবে তার মৃত্যু হবে তা জানতাম না। তার মৃত্যুতে পুরো পরিবারের ওপর একটা আর্থিক চাপ পড়ে গেছে। এখন বাংলাদেশ সরকার ও নিউজিল্যান্ডের সরকার পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তা করে পুরো পরিবারটিকে মৃত্যুর হাত থেকে যেন বাঁচায়।
পলাশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা ইয়ামিন বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে মরদেহ গ্রহণ করে বাড়ি পৌঁছে দেয়ার সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিধিবিধান অনুযায়ী নিহতের পরিবারকে সকল ধরনের সহায়তার করা হবে।

বনানীর আগুন সার্বক্ষণিক মনিটরিং করেছেন প্রধানমন্ত্রী

তথ্যমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বনানীতে আগুন লাগার ঘটনা সার্বক্ষণিকভাবে  মনিটরিং করেছেন। প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। এ সময় আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। গতকাল বিকালে ধানমণ্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ড. হাছান মাহমুদ এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা এস এম কামাল হোসেন, সুজিত রায় নন্দী, ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, মারুফা আক্তার পপি, রেমন্ড আরেং, শামসুন নাহার চাঁপা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের জবাবে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে রাজনীতি করছে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন বা পাচ্ছেন দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত আসামি এমন সুযোগ-সুবিধা পায় না।
উপমহাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের নজির দেখা যায় না। তারপরও তাকে (খালেদা জিয়া) এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। ফখরুল ইসলাম এবং রিজভীরা দিনে তিনবার করে কথা বলেন আবার বলেন, দেশে গণতন্ত্র নাই কথা বলার অধিকার নাই। তথ্যমন্ত্রী বলেন, যে দল বন্দুকের নলের আগায় জন্ম তাদের মুখে গণতন্ত্রের কথা মানায় না। বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবিন খালি রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে তিনি যাননি।
যে হাসপাতালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জীবন সংকটাপন্ন অবস্থায় ভর্তি হয়েছিলেন সেই হাসপাতালে খালেদা জিয়া চিকিৎসা নেবেন না। তাহলে প্রশ্ন জাগে বঙ্গবন্ধুর নামের সঙ্গে হাসপাতালের নাম জড়িত বলে কি তিনি চিকিৎসা নেবেন না? ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কথা উল্লেখ করে হাছান মাহমুদ বলেন, রিজভী সাহেব একবার বলেন পরিত্যক্ত কারাগার ভবনে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে। আবার যখন তাকে নতুন কারাগারে স্থানান্তরের চেষ্টা চলছে তখন তিনি বলছেন নির্মাণাধীন কারাগারে খালেদা জিয়াকে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাহলে কি খালেদা জিয়াকে পাঁচতারকা হোটেলে রাখতে হবে?

বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুন (ছবিতে)

হেলিকপ্টারে উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়েছে। বেলা ৩টা ৪৮ মিনিটে ভবনের ছাদ থেকে সেনা বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধারকরা হয়। এর কিছুক্ষণ হেলিকপ্টারটি ওই এলাকা রেকি করে যায়। পরে ছাদের ওপর শূণ্যে অবস্থান করে একটি দড়ি ফেলে। সেই দড়ি বেয়েই আটকে পড়া একজন হেলিকপ্টারে ওঠেন।





























- ছবিগুলো তুলেছেন জীবন আহমেদ

বহুতল ভবনে মৃত্যুর হানা- বনানীতে আগুনে নিহত ২৫, মৃত্যুফাঁদে বাঁচার লড়াই

বাইশ তলা ভবনে হাজারো মানুষের কর্মস্থল। দুপুরের খাবারের আগে সবাই ছিলেন কাজে ব্যস্ত। হঠাৎই খবর আগুন লাগার। প্রাণে বাঁচতে যে যেভাবে পারেন নিচে নামার চেষ্টা। আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীর কারণে ভবনে আটকা পড়েন অনেকে। কেউ লাফ দেন। কেউ পাইপ বেয়ে নামার চেষ্টা করেন। ভবনে আটকে পড়াদের বাঁচার আকুতি।
জীবন-মৃত্যুর মাঝ  থেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা। ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় পর যখন আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে তখন অনেকটা ভস্মীভূত সুউচ্চ ভবনটি। আগুন নেভানোর আগেই লাফিয়ে পড়ে ও আগুনে পুড়ে মারা যান সাতজন। আগুন নেভানোর পর ভবন থেকে বের করে আনা হয় একের পর এক লাশ। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভবন থেকে ১২ জনের মৃতদেহ নামিয়ে আনা হয়। মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫-এ । নিহতদের মধ্যে একজন শ্রীলঙ্কান নাগরিকও আছেন।
উদ্ধারকারীরা তখনও উদ্ধারকাজ করছিলেন। ভেতরে আরো লাশ আছে কিনা তা তল্লাশি করছিলেন উদ্ধার সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর বনানীর বহুতল ফারুক রূপায়ণ (এফআর) টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দিনভর এই ভবনের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ছিল  দেশজুড়ে। দুপুরে অগ্নিকাণ্ডের পর তা ছড়িয়ে পড়ছিলো ভবনের বিভিন্ন তলায়। নিরুপায় হয়ে চিৎকার করে, জানালা দিয়ে হাত নেড়ে সহযোগিতা চেয়েছিলেন শত শত মানুষ। ফোনে স্বজনদের জানিয়েছেন বাঁচার আকুতি। তাদের অনেককেই উদ্ধার করেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ফায়ার সার্ভিস ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের ১৭ নম্বর রোডের ২২ তলা ভবনে আগুন লাগে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। একে একে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিসের ২২টি ইউনিট।  দীর্ঘক্ষণ কাজ করার পর বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে আগুন নিয়ন্ত্রণে ও উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করেন সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। এ ছাড়া রেড ক্রিসেন্ট ও রোভার স্কাউটের সদস্যরাও সহযোগিতা করেন। ধারণা করা হচ্ছে, ৮তলা থেকেই আগুনের উৎপত্তি। এসময় নিচের ফ্লোরগুলোর মানুষ বের হতে পারলেও উপরের ফ্লোরগুলোর তেমন কেউ বের হতে পারেন নি। তাদের মধ্যে একজন জাহাঙ্গীর আলম। ওই ভবনের চিলেকোঠায় ছিলেন তিনি। হঠাৎ ধোঁয়া দেখতে পান। সঙ্গে মানুষের চিৎকার কানে ভেসে আসছিলো। তখন অনেকেই সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। কিন্তু নবম তলায় পৌঁছেই তীব্র গরম অনুভব করেন। নিচতলায় যাওয়া সম্ভব না ভেবেই আবার ছাদে যান। জাহাঙ্গীর জানান, তখন বারবার চুড়িহাট্টার আগুনের কথা মনে পড়ছিলো। তিনি দোয়া পড়ছিলেন। ছাদ থেকে পাশের ভবনের ছাদে চলে যান। জাহাঙ্গীর জানান, ঝুঁকি নিয়েই লাফ দিয়ে ওই ছাদে যান তিনি। তারপর ওই ভবনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামেন।
শুরুতে অনেকেই লিফট দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। আবার অনেকে লাফ দিয়ে নিহত হন। অনেকে গুরুতর আহত হন।  ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তিনটি লেডার দিয়ে ভবনের ১৮তলা পর্যন্ত পানি দিচ্ছিলেন। উদ্ধার করা হয়েছে ১৪ তলা পর্যন্ত অবস্থানকারীদের। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানান, লেডার দিয়ে ২০ তলা পর্যন্ত অগ্নিনির্বাপণের কাজ করা সম্ভব। তবে উদ্ধার কাজ করা যায় ১৮ তলা পর্যন্ত। এফআর টাওয়ারে তিনটি লেডার সার্বক্ষণিক কাজ করেছে। এ ছাড়াও আরো ছোট আকারের আরো দুটি লেডার ছিল।
আগুন লাগার খবর পেয়ে ভবনে আটকে পড়াদের স্বজনরা বনানীর কামাল আতার্তুক এভিনিউয়ে ভিড় করেন। ভবনের আগুন ও ধোঁয়া দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। অনেকেই হাত উঁচিয়ে স্বজনদের জীবিত ফিরে পেতে দুই হাত তোলে দোয়া করছিলেন। ‘আল্লাহ আল্লাহ’ ধ্বনি শোনা গেছে তখন অনেকের মুখে। ফোনে আটকে পড়াদের ছাদে যেতে পরামর্শ দিচ্ছিলেন স্বজনরা। তারা বলছিলেন, ছাদ থেকে হেলিকপ্টার তাদের উদ্ধার করবে।
আগুন নেভাতে সহযোগিতা করতে আশেপাশে উড়ছিলো সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারও। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ জানান, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী এই উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়েছে।
জানা গেছে, বনানীর এই ২২ তলা বিশিষ্ট টাওয়ারে  অন্তত ২৫টি প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। সপ্তাহের শেষ কর্মদিন গতকাল ওই টাওয়ারে সহস্রাধিক লোক ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই টাওয়ারের দু’তলায় রয়েছে হাব বনানী রেস্টুরেন্ট, কিন্ডারড ক্যাফে অ্যান্ড বেকারি, আইএফআইসি ব্যাংক, ভিভিড হলিডে লিমিটেড, আট তলায় স্পেক্টা, নয় তলায় এম্পায়ার গ্রুপের অফিস, ১০ তলায় আমরা টেকনোলোজিস, ১২ তলায় ডার্ট গ্রুপের অফিস, ইএউআর সার্ভিস, ১৬ তলায় মিকা সিকিউরিটিজ, ১৯ তলায় আমরা আউটসোর্সিং, ২০ তলায় দ্য অয়েভ, ম্যাগনিটো ডিজিটাল, ২০ তলায় কাসেম গ্রুপের অফিস। ২১, ২২ ও ২৩ তলায় কাসেম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এই ভবনে রয়েছে তিনটি লিফট। দুটি সিঁড়ি। সঙ্গে স্থানীয় লোকজনও সহযোগিতা করেন।
তবে উৎসুক মানুষের ভিড় উদ্ধার কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সপ্তম থেকে দশম তলা। ওই চারটি ফ্লোরে বিভিন্ন অফিসে সোফাসহ আসবাবপত্র থাকায় প্রচুর ধোঁয়া সৃষ্টি হয়। তাতে আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। পানি দিয়ে আগুন একটু নিয়ন্ত্রণে আনার পর পরই আবার আগুন জ্বলতে দেখা যায়। জীবন বাঁচাতে অনেকে ভবনের ছাদে বা উপরের তলাগুলোতে উঠে যান। তাদের কেউ কেউ জানালার কাচ ভেঙে হাত নেড়ে বাঁচার আকুতি জানান। এরই মধ্যে বাঁচার জন্য মরিয়া চেষ্টায় বিভিন্ন ফ্লোর থেকে লাফিয়ে নিচে পড়ে গুরুতর আহত বা নিহত হন বেশ কয়েকজন।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা আর ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা চিৎকার করে নিষেধ করেও তাদের থামাতে পারেননি। আটকে পড়াদের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা শান্ত থাকতে পরামর্শ দিচ্ছিলেন। তাদের জন্য নিচ থেকে ভেজা তোয়ালেও কাপড় দেয়া হচ্ছিল। ধোঁয়ার জন্য লেডার উপরে না যাওয়ায় তাদের নামাতে বেগ পেতে হয়। একপর্যায়ে এফআর টাওয়ারের একপাশের আহমেদ টাওয়ার এবং অন্য পাশের আওয়াল সেন্টারেও আগুন ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্ক দেখা দেয়। দুই ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে থাকা বাসিন্দারাও ততক্ষণে বেরিয়ে আসেন। ওই দুই ভবনে থাকা দুরন্ত টিভি ও রেডিও টুডের সরাসরি সমপ্রচারও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়।
সর্বশেষ ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আহত অবস্থায় নেয়া হয় ৪ জনকে,  এর মধ্যে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন ২ জনকে। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে আহত অবস্থায় নেয়া হয় ৪২ জনকে, এর মধ্যে এক শ্রীলংকার নাগরিককে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া ইউনাইটেড হাসপাতালে আহত অবস্থায় নেয়া হয় ৫ জনকে,  এর মধ্যে মৃত ঘোষণা করা হয় ৩ জনকে। ফায়ার সার্ভিসের দেয়া হিসাব অনুযায়ী মোট নিহতের সংখ্যা ২৫ জন। এ ছাড়া চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরো ৭০ জন। অন্যদিকে, হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অ্যাপোলো হাসপাতালে মারা গেছেন আমেনা নামের এক নারী। এ ছাড়া বনানী ক্লিনিকে মারা গেছেন পারভেজ সাজ্জাদ নামের একজন।
এদিকে আগুন নেভানোর পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনের ভিতরে প্রবেশ করেন। তারা বিভিন্ন তলায় তল্লাশি চালিয়ে একের পর এক বের করে আনে লাশ। লাশগুলো উদ্ধার করে নেয়া হয় হাসপাতাল মর্গে। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উদ্ধার কাজ চলছিল। নিচে অপেক্ষা করছিলেন নিখোঁজ মানুষদের স্বজনেরা।
এদিকে আগুনের ঘটনায় হতাহতে শোক প্রকাশ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ঘটনাস্থলে ছুটে যান ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান খান কামালসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

লাশগুলো পড়েছিল রাস্তায়

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি জাঙ্গাইল্যা পাড়া এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়ে ও মাইক্রো চালকসহ ৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন।  আহত হয়েছেন অন্তত আরো ১১ জন।
বুধবার দিনগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানান লোহাগাড়ার চুনতি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) আলমগীর হোসেন।
পরিদর্শক আলমগীর হোসেন জানান, চুনতি জাঙ্গাইল্যা পাড়া এলাকায় রিলাক্স পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৮জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে সাত জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেলেও আরো একজনের পরিচয় মিলেনি।
পরিচয় পাওয়া সাত জন হলেন- কক্সবাজার জেলা সদরের পিএমখালীর ছনখোলা নয়াপাড়া এলাকার মো. জিসানের স্ত্রী তসলিমা আক্তার (২০), তার মেয়ে সাদিয়া (২), তসলিমা আক্তারের মা হাসিনা মমতাজ (৪৫), চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার সিকদারপাড়া এলাকার মো. সিরাজুল ইসলামের ছেলে আফজাল হোসেন সোহেল (৩০) ও বাঁশখালীর শেখেরখীল এলাকার মো. সিদ্দিকের ছেলে মো. সায়েম (২২)। আব্দুর শুক্কুর (২৮) ও চকরিয়ার উত্তর মেধাকচ্ছপিয়া এলাকার ভাণ্ডু মিয়ার ছেলে মো. নুরুল হুদা (২৫)। নুরুল হুদা মাইক্রো চালক ছিলেন।
হাইওয়ে পুলিশের চিড়িংগা ফাঁড়ির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইদুল ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে রিলাক্স পরিবহনের একটি বাস কক্সবাজারের দিকে যাচ্ছিল। বাসটি লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি জাঙ্গাইল্যা পাড়া এলাকায় পৌঁছলে বিপরীতমুখী একটি মাইক্রোবাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। আর বাসটি রাস্তার বাঁ-পাশে ধান ক্ষেতে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই এক শিশু ও দুই নারীসহ আটজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী। তাদের লাশগুলো রাস্তায় পড়েছিল। আহত অবস্থায় ১১ জনকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, মাইক্রোবাসটি কক্সবাজার সড়কের বিভিন্ন এলাকা থেকে যাত্রী তুলে পরিবহন করছিল। বাসের চালক ও সহকারীরা পালিয়ে গেছেন। বাস ও মাইক্রোবাসটি হাইওয়ে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। 
সাতকানিয়া ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র অফিসার মো. ইদ্রিস জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে মাইক্রো ও বাসের ভেতর থেকে নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এরপর বাসটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক জহিরুল ইসলাম ভুঁইয়া জানান, সকাল থেকে হাসপাতালে আহত ও নিহতদের স্বজনরা ভিড় করছে। যাদের পরিচয় মিলেছে তাদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। চমেক হাসপাতালে আরো ৭ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ২-৩ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান তিনি।