Saturday, June 13, 2015

রোহিঙ্গাদের ওপর ‘গণহত্যা’ বন্ধে হস্তক্ষেপ করুন -আসিয়ানের প্রতি মাহাথির

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বলেছেন, মিয়ানমারে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর ‘গণহত্যা’ চলছে। এটি বন্ধে মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর হস্তক্ষেপ করা উচিত। গতকাল শুক্রবার কুয়ালালামপুরে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি এই আহ্বান জানান। খবর দ্য মালয়মেইলঅনলাইনের।
মিয়ানমার থেকে নারী, শিশুসহ হাজারো রোহিঙ্গা সম্প্রতি মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের দিকে পাড়ি জমায়। মানব পাচারকারীদের শিকার হওয়া ছাড়াও দমনপীড়নের কারণে তারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।
মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে সম্প্রতি অভিবাসনপ্রার্থীদের বেশ কিছুসংখ্যক কবরের সন্ধান পাওয়া গেলে সারা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে ‘রোহিঙ্গাদের দুর্দশা-২: মানবতাবিরোধী অপরাধ’ শিরোনামের ওই সম্মেলনে এ অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মাহাথির বলেন, ‘এটি শুধু নৌকার সমস্যা নয়।’ কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়—এমন বিবেচনায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর চুপ করে থাকার সমালোচনা করেন তিনি।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর বৈষম্য ও ‘গণহত্যার’ বিষয়ে ইঙ্গিত করে মাহাথির বলেন, ‘হতে পারে এটি কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু জনগণের ওপর এমন নিষ্ঠুর অত্যাচার করার অধিকারও কোনো দেশের নেই।’ আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে পরিচিত মাহাথির আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পবিত্রতা সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা পাল্টাতে হবে। আর মালয়েশিয়ার সরকারের উচিত হবে, রোহিঙ্গাদের বিষয়টি আসিয়ানে তোলা। গণহত্যা চালায়, এমন কোনো দেশ আসিয়ানের সদস্য থাকুক, আমরা তা সমর্থন করতে পারি না। এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ আমাদের করতেই হবে।’
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের বিষয়টি আসিয়ানের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে তোলারও পরামর্শ দেন মাহাথির। সেই সঙ্গে দেশটিকে একঘরে করতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমরা জাতিসংঘে তুলতে পারি...দেশটিকে (মিয়ানমার) একঘরে করা উচিত।’
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চে অন্তত ২৫ হাজার রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিকে পাচারকারীরা নৌকায় করে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
এদিকে নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক খবরে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সরকার বলছে, তারাও চায় না হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করতে যাক। কিন্তু রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সরকারের নীতির কোনো পরিবর্তন করা হবে না।
চলতি সপ্তাহে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের উপ-মহাসচিব ইউ জাউ তাই এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাঙালিদের (রোহিঙ্গা) বিষয়ে সরকারের নীতির কোনো পরিবর্তন করা হবে না।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি নেই। দেশটির সরকার তাদের ‘বাঙালি’ বা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে দাবি করে।
গতকাল শুক্রবার যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী।

ডালাস পুলিশ সদর দপ্তরে বন্দুকধারীদের হামলা

গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি জানালা। ছবি: এএফপি
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহরে পুলিশ সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে বন্দুকধারীরা। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও পাওয়া গেছে বিস্ফোরক ভর্তি ব্যাগ। তাই নিরাপত্তার স্বার্থে ওই এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ডালাস পুলিশ প্রধান ডেভিড ব্রাউন প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বিবিসিকে বলেন, স্থানীয় সময় গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টায় (বাংলাদেশ সময় শনিবার বেলা সাড়ে ১১ টা) অন্তত চারজন বন্দুকধারী গুলি ছোড়া শুরু করে। তবে হামলাকারীর সংখ্যা ঠিক কতজন তা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।
এদিকে সিএনএনের খবরে বলা হয়, একজন বা কয়েকজন বন্দুকধারী এ হামলা চালিয়েছে। হামলাকারী ওই ব্যক্তি একটি ভ্যানে করে পালিয়ে যায়। তবে পুলিশ ভ্যানটিকে ধাওয়া করে উপশহর হুচিনে একটি রেস্তোরাঁর কাছে ঘিরে ফেলে। সেখানে তারা ভ্যান চালকের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পুলিশ জানিয়েছে ভ্যানের চালক নিজেকে জেমস বৌলওয়ের বলে দাবি করেছেন। তবে পুলিশ তাঁর পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। তবে এই নামের এক ব্যক্তির পারিবারিক সহিংসতার তিনটি ঘটনায় জড়িত বলে কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এই ব্যক্তি দাবি করেন পুলিশ তাঁর সন্তানকে নিয়ে গেছে ও তাঁকে সন্ত্রাসী বলে অভিযুক্ত করায় তিনি পুলিশ সদর দপ্তর ‘উড়িয়ে’ দিতে চেয়েছেন।
বিবিসির ভাষ্য, একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর টুইটারে লিখেছেন, সদর দপ্তরের বাইরে কয়েকটি ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এর মধ্যে একটিতে পাইপ বোমাসহ বিস্ফোরক দ্রব্য ছিল।
তবে সিএনএন জানিয়েছে, সদর দপ্তরের বাইরে দুটি পাইপ বোমা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী রোবটের সাহায্যে বোমা সরিয়ে নিতে গেলে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এর ফলে পুলিশের কয়েকটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুলিশ সেই ছবি টুইটারে প্রকাশ করেছে। আর স্থানীয় সময় আজ শনিবার সকাল সাতটায় দ্বিতীয় বোমাটি নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয় তারা।
ঘটনার ভিডিও ধারণ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। প্রত্যক্ষদর্শীরা পুলিশকে জানান, একজনের বেশি হামলাকারী বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ সদর দপ্তর ভবনে হামলা চালায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের বিপরীতে বাড়ি হোসুয়া গিলবাদের। তিনি বিবিসিকে বলেন, গুলির শব্দে তিনি জেগে ওঠেন। রাস্তা দিয়ে ভ্যানটি যাওয়ার সময় অন্তত ২০০টি গুলির শব্দ পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে পুলিশ তাঁকে ও তাঁর ফ্ল্যাট মেটকে ভবন ছেড়ে যেতে বলেন। এর কিছুক্ষণ পরেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে জানালার কাচ কেপে ওঠে। ‘এখন আমরা ভবনের নিচতলায় আশ্রয় নিয়ে আছি। সেখানে খাবার ও পানি নেই।’

যেখানে রাজনীতিবিদেরা এক by সাজেদুল হক

ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে দুনিয়া। টেলিভিশন সারা পৃথিবীকে পরিণত করেছে এক বিশ্বগ্রামে। তাহলে ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া কী দুনিয়াকে একটি বাড়িতে পরিণত করেনি?
কয়েকদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর আলোচনার ঝড় তোলে। তিনি যে বাঙালি আবেগে হাওয়া দিতে পুরোমাত্রায় সক্ষম হন, তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, টুইটার দুই মিডিয়াতেই সরব হালআমলে দুনিয়া কাঁপানো এ নেতা। ঢাকায় আসার আগে আগেই টুইটার আর ফেসবুকে এ সফর নিয়ে মন্তব্য করা শুরু করেন তিনি। বাংলাদেশের পথে রওনা দেয়ার আগেই টুইটে তিনি লেখেন, বাংলাদেশে রওনা দিচ্ছি। এ সফর আমাদের দুই দেশের বন্ধন আরও শক্তিশালী করবে, যার ফলে উপকৃত হবেন আমাদের দুই দেশের মানুষ তথা এ অঞ্চলের মানুষ। এ টুইটের ঘণ্টা তিনেক পর মোদি বাংলায় টুইট করেন, বাংলাদেশ, আমি আমার সঙ্গে ভারতের মানুষের ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা নিয়ে আসছি। আর ৩৬ ঘণ্টা ঢাকা সফর শেষে মোদির টুইট বার্তাটি ছিল এমন- ‘ধন্যবাদ বাংলাদেশ। এই সফর আমার স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকবে। এই সফর ভারত-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব সুদৃঢ় করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আমরা অতীতের অমীমাংসিত বিষয় সাফল্যের সঙ্গে কাটিয়ে উঠেছি। এটি আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করবে।’ মন্তব্যের পাশাপাশি টুইটার আর ফেসবুকে সফরের বিভিন্ন ছবিও শেয়ার করেন নরেন্দ্র মোদি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা থেকে ডেভিড ক্যামেরন প্রায় সবাই সরব রয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। তাদের প্রতিদিনের কর্মকা-ের চিত্র ফুটে উঠছে সেখানে।
সারা দুনিয়ায় এই যখন অবস্থা তখন কেমন চলছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কতটা সক্রিয় আমাদের রাজনীতিবিদেরা। এমনিতে টুইটার এখনও বাংলাদেশে খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে ফেসবুক এদেশে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
দুনিয়ার অন্যান্য দেশের রাজনীতিবিদেরা যেখানে প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করছেন সেখানে বাংলাদেশের নেতারা নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে দূরে রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই। তেমনিভাবে সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমেদ কারোরই কোন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই। প্রধানমন্ত্রীর নামে ফেসবুকে একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকলেও এর কোনটিই তার নয়। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে অনেক সময়ই বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হয়। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নামেও ফেসবুকে একাধিক অ্যাকাউন্ট আছে। যদিও এর কোনটিই তার নয়। এসব অ্যাকাউন্ট থেকেও অনেক সময় নানা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন স্ট্যাটাস দেয়া হয়। রওশন এরশাদের নামে অবশ্য ফেসবুকে তেমন কোন অ্যাকাউন্ট চোখে পড়েনি। তাকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় হইচইও নেই। তবে রওশন এরশাদের স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা রয়েছে বিপুল। তার দেয়া বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে ফেসবুকে তৈরি হয়েছে নানা কোলাজ কার্টুন। যদিও অন্য শীর্ষ রাজনীতিবিদদের মতো তিনি নিজে ফেসবুকে অনুপস্থিত।
রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা অন্য বেশিরভাগ রাজনীতিবিদেরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন তৎপরতা নেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ফেসবুকে কোন অ্যাকাউন্ট নেই। যদিও মাঝে মাঝে তার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। বর্তমানে কারাবন্দি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরেরও কোন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই। যদিও তার বিভিন্ন কোলাজ ছবি ছড়িয়ে রয়েছে ফেসবুকে। জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন বাবলুরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন তৎপরতা দেখা যায় না।
প্রচলিত ধারার রাজনীতিবিদদের মতো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতারাও সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুপস্থিত। জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমেদ, দলটির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানসহ কোন শীর্ষ নেতাই ফেসবুকে সক্রিয় নেই। আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা আহমদ শফি, মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী কারোরই কোন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই। যদিও নারী ও তেঁতুল প্রসঙ্গে আহমদ শফির দেয়া একটি বক্তব্য এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল আলোচিত। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মতো বামপন্থি শীর্ষ রাজনীতিবিদেরাও ফেসবুকে অনুপস্থিত।
শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরই মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি। রাজনীতি সামাজিক নানা ইস্যুতে নিজের মতামত প্রকাশ করছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। সাধারণত একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই স্ট্যাটাস দেন তিনি। তার সর্বশেষ স্ট্যাটাসটি বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি সংক্রান্ত। এর আগের স্ট্যাটাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ওই স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছিলেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই সফর সফল এবং ঐতিহাসিক। বাণিজ্য এবং সহযোগিতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যা পুরো উপমহাদেশকে উপকৃত করবে। তিনি কথায় এবং কাজে সর্বোচ্চভাবে আন্তরিক। সবচেয়ে মজার বিষয় এটাই যে, বিএনপি এখন চরমভাবে তাদের ভারতবিরোধী অবস্থানকে অস্বীকার করছে। তারা জনগণকে বোকা ভাবে। আপনাদেরকে শুধু খালেদা জিয়ার ভারতবিরোধী বক্তব্যগুলো খুঁজতে হবে। খালেদা জিয়া এমনকি ভারতীয় প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরকালে তাকে উপেক্ষা করেছেন এবং তার সঙ্গে একটি পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎ বাতিল করেছেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার কোন সাক্ষাৎ নির্ধারিত ছিল না। বিএনপি মরিয়া হয়ে এ সাক্ষাতের জন্য তদবির করেছিল।
বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরেই বৃটেনে অবস্থান করছেন। হাইকোর্টের আদেশের কারণে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তার খবর প্রচার বন্ধ রয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তারেক রহমানের কোন অ্যাকাউন্ট নেই। যদিও তার নামে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারেক রহমানের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচার করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে নানা প্রচারণাও চালানো হয়। তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানের নামেও ফেসবুকে একাধিক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া স্ট্যাটাসের ভিত্তিতে কখনও কখনও সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। তবে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, এর কোনটিই তার নয়।
শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে সক্রিয় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি তার দৈনন্দিন বিভিন্ন কার্যক্রম ফেসবুকের মাধ্যমে জনগণকে অবগত করেন। কখনও ছবির মাধ্যমে কখনও স্ট্যাটাসের মাধ্যমে তুলে ধরেন নিজের অবস্থান। নানাক্ষেত্রে তার আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রশংসিত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যদিও কখনও কখনও তাকে নিয়ে সমালোচনাও হয়। বর্তমানে কারাবন্দি ডাকসুর সাবেক ভিপি ও নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাও ফেসবুকে বেশ সক্রিয় ছিলেন। নানা ইস্যুতে তিনি তার মতামত প্রকাশ করতেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এমনকি গ্রেপ্তারের আগেও তিনি তার অবস্থান ফেসবুকে পরিষ্কার করে যান। সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনিও ফেসবুকে খুবই সক্রিয়। এখন দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখছেন তিনি। এসব কলাম দ্রুতই স্ট্যাটাস আকারে দিয়ে দেয়া হয় তার ফেসবুক পেইজ এবং অ্যাকাউন্টে। রাজনীতি, ইতিহাস, সমকালীন নানা প্রসঙ্গে নিজের মতামত প্রকাশ করেন তিনি। এসব মতামত কখনও প্রশংসিত হয়, কখনও হয় আলোচিত। বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন।

১৫ দিন আগেই অভ্যুত্থানের আশঙ্কা -মার্কিন নথি: জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড by মিজানুর রহমান খান

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
৩০ মে জিয়া হত্যাকাণ্ডের ৩৪ বছর পূর্তি হবে। দীর্ঘ সময় পরে মার্কিন গোপন দলিলে উদ্ঘাটিত হলো জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কাহিনি। এ বিষয়ে প্রথম আলোর বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজনের তৃতীয় কিস্তি প্রকাশিত হলো আজ।
জনপ্রিয় থাকতেও জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সামরিক নেতৃত্ব কমবেশি সব সময় ভঙ্গুর ছিল। আর এই ভঙ্গুরত্বকে যিনি নানাভাবে ছায়ার মতো অনুসরণ করেছেন, তিনি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। মার্কিন নথিগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছে, ১৯৭৭ সাল থেকেই জিয়া-মঞ্জুর-মীর শওকত ও এরশাদের মধ্যে নানামাত্রিক দ্বৈরথ দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। মঞ্জুর ও এরশাদের দূরত্ব মার্কিন দূতাবাস ১৯৭৮ সালের গোড়ায় জানতে পেরেছিল। অনুগত ও নিরাপদ ভেবে জিয়া এরশাদকে সেনাপ্রধান করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু জিয়া মন্ত্রিত্ব দিয়ে এরশাদকেও সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তা সফল হয়নি। তবে ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রামে যা ঘটেছিল, তার প্রেক্ষাপট তৈরির বীজ নিহিত ছিল ‘আর্মি পলিটিকসে’ই। দুই বছর আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই মহাপরিচালক এম এ হাকিম: ‘জিয়ার জনপ্রিয়তা হ্রাস পেলেই তার ওপর আঘাত আসতে পারে।’ ৩০ মে ৮১-তে কি তা-ই ঘটল?
জিয়ার জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন এবং বিএনপির ভেতরে অসন্তোষ ধূমায়িত হচ্ছিল, এমনকি একটি অভ্যুত্থানের আশঙ্কাও যে রয়েছে, সেটা মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড টেলর স্নাইডার ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন ১৫ মে ১৯৮১ অর্থাৎ অভ্যুত্থানের ১৫ দিন আগে। মার্কিন নথি পর্যালোচনায় বিস্ময়করভাবে জিয়া-মঞ্জুর-মীর শওকত-এরশাদের মধ্যকার টানাপোড়েনের একটা দীর্ঘ চিহ্ন-রেখা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকার অারেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত এডওয়ার্ড ই. মাস্টার্স ১৯৭৭ সালেই মঞ্জুরকে চট্টগ্রামে জিওসি করে প্রেরণকেই একটা বিরোধের সূচনা বলে ইঙ্গিত করেছিলেন। এর তিন বছর পর ১৯৮০ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ খবরও পৌঁছে যায় যে জেনারেল মঞ্জুর জিয়ার প্রকাশ্য বিরোধিতায় নেমেছেন।
জিয়া হত্যাকাণ্ডের পরে অবমুক্ত না করা একটি সূত্রের বরাতে মার্কিন নথিতে উল্লেখ পাই, ‘১৯৮০ সালের শেষের দিকে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে “মঞ্জুর প্রকাশ্যেই জিয়ার সমালোচক হয়ে পড়েছিলেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহ দমনে মঞ্জুরের প্রতি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। চট্টগ্রামে সৈন্যদের মধ্যে মঞ্জুর অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন বলে জানা যায়। আমাদের তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অনেক কর্মকর্তা তাঁর ক্যারিশমায় অভিভূত হয়েছিলেন”।’
জনপ্রিয়তা হ্রাসের প্রশ্ন: ১৯৮১ সালের ১৫ মে মার্কিন দূতাবাসের ‘ঢাকার রাজনৈতিক বিদ্বেষ’ শীর্ষক এক তারবার্তায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অভ্যুত্থানের আশঙ্কা বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। এখন ঢাকার অবস্থা গুমটের চারটি কারণ আছে। প্রথমত, দেশ শাসনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সামর্থ্য হ্রাস পাচ্ছে বলে অনুভূত হচ্ছে। মার্কিন দূতাবাস এটা সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষ থেকেই শুনছে। জিয়া আগে যেভাবে দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন, সেভাবে এখন আর পারছেন না। একজন বিএনপি এমপির কথায়, ‘তিনি এখন একনায়কসুলভভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তিনি সঠিক পরামর্শ পাচ্ছেন না কিংবা সরকারি সিদ্ধান্ত শিথিলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, বিএনপিতে ‘মার্কিন কন্টাকটস’ সর্বদা সক্রিয় ছিল। ১৫ মে, ৮১ স্নাইডার লিখেছেন, ‘বিএনপির ভেতরে মার্কিন কন্টাকটসগুলো বলেছে, জিয়া এখন কারও কথা শোনা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছেন কিংবা তিনি কেবলই তাঁর উপদেষ্টাদের নিয়ে মশগুল থাকছেন। এক রাজাকারকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর আসনে বসিয়েছেন। জিয়া অত্যধিক বিদেশভ্রমণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মন্ত্রীরা তাঁর কাছ থেকে নির্দেশনা লাভের সুযোগ পাচ্ছেন না।’ বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী গত ২৮ মে এক আলোচনা সভায় যদিও তথ্য দেন যে দেশ পরিচালনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে জিয়া প্রতিদিন তিন-চারটি সভা করতেন।
মার্কিন দূতাবাসের ওই তারবার্তা বলেছে, ‘উল্লিখিত মন্তব্যে অতিরঞ্জন থাকলেও আমরা এটা বুঝতে পারছি যে জিয়া আগে যেভাবে সতর্কতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেন, তাতে ঘাটতি পড়ছে। বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছাড়া জিয়া ইদানীং যে আর কার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, সেটাও তাঁরা বলতে পারছেন না। এর আগে জিয়ার ইনার সার্কেল দ্রুত পরিবর্তন হতো। ঢাকা গুমোট হওয়ার দ্বিতীয় ও তৃতীয় কারণ হলো যথাক্রমে দুর্নীতি বলগাহীন হয়ে ওঠা এবং দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলার অবনতি। অপরাধের সরকারি পরিসংখ্যানে সত্য প্রতিফলিত হচ্ছে না। কারণ, পুলিশ স্টেশনগুলো তাদের ইচ্ছামতো অপরাধ রেকর্ড করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। আর চূড়ান্তভাবে অর্থনৈতিক সংকট প্রবল হয়ে উঠছে। মুদ্রাস্ফীতিকে অনেকেই মুখ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন। দ্রব্যমূল্যেরও ঊর্ধ্বগতি ঘটছে’।
স্নাইডার তাঁর ওই বার্তায় আরও উল্লেখ করেন, ‘দূতাবাসের কতিপয় নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, গ্রাম এলাকায় জিয়ার জনপ্রিয়তা কমেছে। অনেক গ্রামবাসী বিশ্বাস করেন, জিয়ার আর নতুন করে কিছুই বলার নেই। আমরা মনে করি, জিয়ার জনপ্রিয়তা সামান্য কিছুটা কমতে পারে। আমাদের বিশ্বাস, জিয়া এখনো গ্রামে জনপ্রিয়। তাঁকেই একমাত্র নেতা মনে করা হয়, যিনি কিছুটা স্থিতিশীল নিরাপত্তা দিতে পারেন। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, বর্তমানে যে অস্থিরতা চলছে, তাতে জিয়ার জন্য আশঙ্কাজনক বিপদের বীজ রয়েছে। এটা সামরিক বাহিনীতে একটি সামরিক অভ্যুত্থান জাগিয়ে তুলতে এবং পরিণতিতে সরকারের জন্য হুমকি বয়ে আনতে পারে। অবশ্য এ ধরনের আশঙ্কা সম্ভবত আপাতত স্তিমিত হয়েছে। আমরা এ মুহূর্তে অভ্যুত্থান-চেষ্টা কিংবা উল্লেখযোগ্য সামরিক অসন্তোষের গুজব শুনতে পাই না।’
পেছন ফেরা: জিয়া হত্যার তিন বছর আগেই এরশাদ ‘হতাশ’ হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল স্নাইডার তাঁকে অনুগত সমর্থক বিবেচনায় জিয়া তাঁকে সেনাপ্রধানের পদ দেবেন বলে উল্লেখ করেন। ৭৮ সালের ২৫ জুন বার্গেনসেন বলেন, দূতাবাসের কর্মকর্তারা এরশাদের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝতে পেরেছেন, তিনি শক্তিশালী রাষ্ট্রপতিব্যবস্থার পক্ষে। ২৯ মার্চ ৭৮ মসিউর রহমান যাদু মিয়া স্নাইডারকে বলেন, মধ্য এপ্রিলে জিয়া সেনাপ্রধানের পদ ছেড়ে সেখানে এরশাদকে আনবেন, এ বিষয়ে তিনি কথিতমতে শওকত আলীর সমর্থন নিয়েছেন। যদিও এ পদটি শওকত আলীই চাইছিলেন। ১৯৭৭ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রদূত মাস্টার্সের আরেক মন্তব্য: ‘জিয়া সেনাপ্রধান পদ ধরে রাখলে তিনি এরশাদের মতোই এক হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিতে পরিণত হবেন। এরশাদ ভাবেন, সেনাপ্রধান হওয়া এখন তাঁর “কর্তব্য”। আর দস্তগীর জিয়ার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হতে পারেন।’ মাস্টার্স আরও বলেছিলেন, ‘আমাদের জন্য এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে ভুট্টোর পরিণতি জিয়া মনে রেখেছেন। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ “আর্মি পলিটিকস” তাঁকে গুরুত্বের সঙ্গে মনে রাখতে হবে।’
সায়েমকে সরানোর পরে ১৫ নভেম্বর ১৯৭৭ মাস্টার্স এক সিক্রেট তারবার্তায় লিখেছিলেন, শক্তিশালীতম গুজবের কেন্দ্রস্থল সামরিক বাহিনীর উচ্চতম পর্যায়। মঞ্জুরকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে। মেজর জেনারেল হলে তাঁকে ডিভিশন কমান্ড করতেই হবে। সাভারে নবম ডিভিশন থেকে যশোরে বদলির বিরোধিতা মীর শওকত করতেই পারেন। আবার জিয়া তাঁর সিদ্ধান্তে স্থির থাকলে তিনি তা মেনেও নেবেন। এরপরই মাস্টার্স লেখেন: ‘বেশ কিছুটা সময় মীর শওকত ও মঞ্জুরের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না। কিন্তু তাঁরা উভয়ে জিয়ার প্রতি অনুগত ছিলেন। তবে বিশেষ করে ৩০ সেপ্টেম্বর ও ২ অক্টোবরে সেনা বাহিনীতে বিদ্রোহের (মিউটিনি) পরে এ দুজনের মধ্যকার ঝগড়াঝঁাটি বিবেচনায় জিয়া হয়তো উভয়কে ঢাকা থেকে বিদায় করে দেওয়াকেই অভিপ্রেত মনে করেছেন।’ মাস্টার্সের কথায়: ‘রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে যে মীর শওকত এরশাদের সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত। এরশাদ অবশ্য ডেপুটি চিফের পদেই থাকছেন, যদি পদোন্নতি বা তাঁর সরাসরি সেনা পদে না থাকা জিয়া দরকারি মনে করেন। অন্যদিকে গুজব হলো, একটা ভীতি আছে যে মীর শওকত ও মঞ্জুর (তাঁর সৈন্য কম) তাঁদের অধীন সৈন্যদের নিয়ে লড়াইয়ে নামতে পারেন। কিংবা কতিপয় “দুর্বৃত্ত” বা গ্রেপ্তার না হওয়া বিদ্রোহী সেনারা নগরে আঘাত হানতে পারেন।’
‘এরশাদ ইজ দ্য ম্যান নেক্সট ইন লাইন।’ মাস্টার্স ১৯৭৭ সালের নভেম্বরে এটা কীভাবে লিখেছিলেন? মার্কিন রাষ্ট্রদূত সেই সঙ্গে আরও বলেছিলেন, এরশাদের একটি অসুবিধা ও আরেকটি সুবিধা আছে। অসুবিধা হলো তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি, রিপ্যাটরিয়েট। আর সুবিধা হলো মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতরের সরাসরি বিরোধে তাঁকে জড়াতে হয় না।
পাঁচ পৃষ্ঠার ওই সিক্রেট তারবার্তার শেষে মাস্টার্স জিয়ার জন্য একটি প্রার্থনা করেছিলেন: ‘জিয়াকে অবশ্যই এমন চ্যানেল বের করতে হবে, যাতে মুজিবের শেষ দিনগুলোর প্রায় নৈরাজ্যকর অবস্থা কিংবা ১৯৫৮ সালে আইয়ুবেরÿ ক্ষমতা দখলের আগের অবস্থার দিকে পরিস্থিতি না গড়ায়।’
জিয়া তাঁর মন্ত্রিসভায় (উপদেষ্টা পরিষদে) অ্যাডমিরাল খান, এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ, বিডিআর–প্রধান জেনারেল দস্তগীর ও ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এরশাদকে নিতে চাইলেন। কিন্তু শর্ত হলো এরশাদ ও দস্তগীরকে মন্ত্রী হতে হলে তাঁদের উর্দি ছাড়তে হবে। ১৯৭৭ সালের ২ জুলাই সেনানিবাসে সভা হলো। দস্তগীর বললেন, আমরা চারজনই চাকরি ছাড়ব। আপনাকেও সেনাপ্রধানের পদ ছাড়তে হবে। জিয়া তা নাকচ করেন।
বার্গেনসেন ৭ জুলাই, ৭৭ এক তারবার্তায় লিখেছেন, জ্যেষ্ঠদের তরফে জিয়াকে কিছুটা ‘সক্রিয় শত্রুতা’ সইতে হয়। এরশাদের অধীন সেনারা কম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তদুপরি তা ভাবার বিষয়। গণভোটে নিরঙ্কুশ বিজয় ও বিপুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও জিয়া তাঁর সহকর্মীদের দ্বারাই চ্যালেঞ্জের কবলে পড়তে পারেন।
২২ এপ্রিল ১৯৭৭ রাষ্ট্রদূত মাস্টার্স নিয়তির লিখন লিখেছিলেন? ‘এরশাদের পদোন্নতি হয়তো যৌক্তিক। কিন্তু জিয়ারÿ ক্ষমতার ঘাঁটি সেনানিবাস। এরশাদ বা অন্য কেউ ওপরে উঠলে তা আরও অনেকগুলো রদবদল বয়ে আনে, তখন জিয়াকে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে রাখতে হবে।’
১৯৭৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মার্কিন পলিটিক্যাল কাউন্সিলর তৎকালীন এনএসআই মহাপরিচালক এম এ হাকিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। হাকিম তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমরা সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের বিভক্তি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। জিয়া স্পষ্টতই এরশাদকে চিফ অব স্টাফ করতে চান। কিন্তু রিপ্যাটরিয়েট ও মুক্তিেযাদ্ধাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে।’ উল্লেখ্য, মঞ্জুর ও শওকত উভয়ে সেনাপ্রধান হতে আগ্রহী ছিলেন।
হাকিম মার্কিন কূটনীতিককে বলেছিলেন, মঞ্জুরের সঙ্গে শওকতের, আবার উভয়ের সঙ্গে এরশাদের বিরোধ আছে। জিয়া যতক্ষণ জনসমর্থন ধরে রাখতে পারবেন, শীর্ষ সেনা পদের বিরোধ ততক্ষণ নিমজ্জিত থাকবে। এ সমস্যা কঠিন হবে তখনই, যখন জিয়া সমস্যায় পড়বেন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

জোড়া খুন- যানজটে বিরক্ত হয়ে গুলি চালান এমপিপুত্র রনি

পহেলা বৈশাখের আগের রাত ছিল। তাই মধ্যরাতেও রাস্তায় কিছুটা যানজট ছিল। সামান্য এই যানজটেই বিরক্ত হয়ে কোমর থেকে লাইসেন্সকৃত পিস্তল বের করেন তিনি। ছিলেন মদ্যপ। তাই নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। রাস্তায় এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়েন। মুহূর্তেই রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। গাড়ি নিয়ে চলে যান তিনি। নিজে জানতেনও না তার ছোড়া গুলিতেই নিভে গেছে দুজনের প্রাণ। চার দিনের রিমান্ডের তৃতীয় দিনে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে এসব স্বীকার করেছেন এমপিপুত্র বখতিয়ার আলম রনি। তিনি মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি পিনু খানের ছেলে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় রনির সঙ্গে গাড়িতে আরও তিন বন্ধু ছিল। ওই তিন বন্ধুকেও শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের আটকের জন্য পুলিশ খুঁজছে। পুলিশ বলছে, ওই তিন বন্ধুকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে পুরো ঘটনাটি আরও পরিষ্কার হবে।
গত ১৩ই এপ্রিল রাত পৌনে ২টার দিকে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে একটি সাদা মাইক্রোবাস থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়লে তাতে দৈনিক জনকণ্ঠের অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম নিহত হন। এ ঘটনায় নিহত হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম বাদি হয়ে ১৫ই এপ্রিল রাতে অজ্ঞাত আসামিদের নামে রমনা থানায় একটি মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত করলেও পরে তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে স্থানান্তর করা হয়।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (দক্ষিণ) উপ-কমিশনার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, রনিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই চলছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ২৪শে মে এই জোড়া খুনের মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। অবশ্য এর আগে থেকে ডিবির একটি টিম ঘটনার রহস্য উদঘাটনে ছায়া তদন্ত করছিল। একপর্যায়ে প্রযুক্তির সহায়তা ও অন্যান্য সোর্সের মাধ্যমে রনির ব্যবহৃত গাড়িটি শনাক্ত করা হয়। গত ৩১শে মে প্রথমে সেই গাড়িচালক ইমরান ফকিরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই ইমরান ফকির পুরো ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দেয়। পরে রনিকে একই দিন ধানমন্ডি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুজনকে একসঙ্গে আদালতে পাঠানো হলে ইমরান ফকির আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তবে রনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে অস্বীকার করলে রিমান্ড আবেদন করে ৪ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় তাকে। কিন্তু রিমান্ড হওয়ার পরপরই এমপিপুত্র রনি অসুস্থতার ভান করে। পরে তাকে প্রথমে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালে চিকিৎসা দেয়া হয়। চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার থেকে তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে বখতিয়ার আলম রনি তার লাইসেন্সকৃত পিস্তল দিয়ে গুলির কথা স্বীকার করেছে। তবে সে সময় সে মদ্যপান অবস্থায় ছিল বলে তার দাবি। এ ছাড়া গাড়িতে তার সঙ্গে রনির আরও তিন বন্ধু ছিল। পুলিশ ওই তিন বন্ধুকে আটকের চেষ্টা করছে। সূত্র জানায়, ঘটনাটি পরিকল্পিত না হলেও কেন সে গুলি করলো এবং এর পেছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, রনির তিন বন্ধুকে আটক করতে পারলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। তারা হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী না হলে তাদের সাক্ষী বানানো হতে পারে বলেও ওই সূত্র জানিয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক দীপক কুমার জানান, রনি গুলির কথা স্বীকার করেছে। তবে সেটি পরিকল্পিত না অন্য কিছু তা জানার জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

যে নির্যাতনের সীমা নেই

মাজিদ খান। ছবি: রয়টার্স
যৌন নির্যাতন তো ছিলই, ছিল অন্য ধরনের নিপীড়নও। নগ্ন করে খুঁটির সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখা হতো। পুরষাঙ্গে ঢালা হতো বরফ গলা পানি। দু-দুবার নগ্ন করে ভিডিও করা হয়েছে। চলত নির্ঘুম রাখার নিপীড়ন। দেওয়া হতো পোকার কামড়। এভাবে দিনের পর দিন চলেছে নির্যাতন।
কিউবার কুখ্যাত মার্কিন বন্দীশিবির গুয়ানতানামো বে-তে এই অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দাবি মাজিদ খানের (৩৫)। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এই নাগরিককে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের অধীনে গুয়ানতানামোতে দফায় দফায় অবমাননাকর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘জিজ্ঞাসাবাদের উন্নত কৌশলের’ মুখোমুখি হতে হয় মাজিদকে। সন্দেহভাজন শীর্ষ পর্যায়ের আল কায়েদা বন্দীদের মধ্যে মাজিদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টিই গণমাধ্যমে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্র​তিবেদন মতে, মাজিদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁকে কবে কোথায় কী অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এ ব্যাপারে সিআইএ সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয় এবং অভিযোগে উল্লেখ করা বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার মধ্যেও অসঙ্গতি রয়েছে।
মাজিদের আইনজী্বীর দাবি, মাজিদের পায়ুপথ ও যৌনাঙ্গে বরফ শীতল পানি ঢালা বা নগ্ন করে শরীরের গোপন অঙ্গে আঘাত করার মতো নির্যাতনের ঘটনা গুয়ানতানামো বে নিয়ে করা যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। মাজিদের নির্যাতনের সম্পর্কে রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমনটাই উল্লেখ হয়েছে।
আইনজীবীকে মাজিদ সাত বছর ধরে তাঁর ওপর চালানো দুঃসহ যন্ত্রণার বর্ণনা দেন। এর সঙ্গে তাঁর আইনজীবীর মন্তব্য যোগ করে সিনেট সেই প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার পর সরকার গত মাসে তা প্রকাশ করে।
গত ডিসেম্বরে সিআইএর জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতিগুলো সিনেটের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। এর আগে বন্দীদের জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল বা পদ্ধতির বিষয়টি প্রকাশ করা নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি বন্দীদের আইনজীবীরাও এটি প্রকাশ করতে পারতেন না।
রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, মাজিদ যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১২ সালে ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাসের সরঞ্জাম সরবরাহ, হত্যা ও চরবৃত্তির অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তী সময়ে দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর ১৯ বছরের কারাদণ্ড হয়। তাঁকে যেদিন থেকে আটক করা হয়, সেদিন থেকে তাঁর সাজা হিসেব করা হয়।
সিআইএ কর্মকর্তার দাবি, ইন্দোনেশিয়ায় আল-কায়েদা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি ৫০ হাজার ডলার দিয়েছিলেন। সেই অর্থ জাকার্তার ম্যারিয়ট হোটেল চত্বরে ট্রাকবোমা হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়। ওই বোমা হামলায় ১১ জন প্রাণ হারান, আহত হন আরও ৮০ জন। এ ছাড়া মজিদ ৯ / ১১ হামলার অন্যতম সহযোগী খালিদ শেখ মোহাম্মদের সঙ্গে পানি সরবরাহ কেন্দ্র, গ্যাস স্টেশন উড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আল কায়েদার ‘নীরব চর’ হিসেবে কাজ করছিলেন। এসবের সঙ্গে মাজিদ জড়িত ছিলেন বলে সিআইএ দাবি করছে।
সিনেটের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৩ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে পাকিস্তানে সিআইএর ‘কালো তালিকাভুক্ত’ স্থান থেকে মাজিদকে আটক করা হয়। কিন্তু কোত্থেকে মাজিদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা খোলাসা করেননি আইনজীবী।
আইনজীবীর কাছে নির্যাতনের কথা এভাবে তুলে ধরেন মাজিদ, যখন সিআইএর নির্যাতনকেন্দ্রে তাঁকে নিয়ে আসা হয়, সেখানে যেন নির্যাতনের মহোৎসব চলছিল। নগ্ন করে যখন খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হতো। অসহ্য ব্যথা-যন্ত্রণা ছিল সেই নির্যাতনে। বরফ শীতল পানির মধ্যে মাথা চোবানো হতো। সেই নারকীয় অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে মাজিদ বলেন, ‘খুব করে চেয়েছিলাম, আমাকে যেন তারা মেরে ফেলে।’
এ সময় জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তা তাঁকে বলেন, ‘ছেলে, আমি তোমাকে একটু আদর করতে যাচ্ছি। এমন জায়গায় তোমাকে পাঠাব, যা কোনো দিন তুমি কল্পনাও করনি।’
মাজিদের ভাষ্য, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে আসা কর্মকর্তাদের মুখে মদের গন্ধ পাওয়া যেত। তাঁরা হাতুড়ি, বেসবলের ব্যাট, লাঠি আর চামড়ার বেল্ট দিয়ে পেটানোর অনবরত হুমকি দিত।
তবে সিআইএর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা এ বিষয়টি অস্বীকার করেন। গত পাঁচ বছর ধরে সিআইএর ৬৩ লাখ গোপণ নথি পর্যালোচনা করেন ডেমোক্র্যাটদের কর্মীরা। সেখানে মাজিদের ওপর নির্যাতনের কথা ফুটে ওঠে। রিপাবলিকানদের দাবি, ঘটনাগুলোকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে।
এক বছর আগে যখন এ বিষয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়, তখন মজিদ তাঁর আইনজীবীদের কাছে দাবি করেন, জোর করে তাঁর পায়ুপথ দিয়ে খাবার-পানি প্রবিষ্ট করানো হতো। সিনেটের প্রতিবেদনেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
সিআইএর কর্মকর্তাদের দাবি, মাজিদ অনশন করে তাঁর নাকের মধ্যে দিয়ে প্রবিষ্ট খাবারের নল বের করে ফেলে। এতে তাঁর পায়ু পথ দিয়ে খাবার প্রবিষ্ট করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সিনেটের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাজিদ সহযোগিতা করতেন এবং খাবারের নলও বের করেননি।
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, পায়ুপথ দিয়ে প্রবিষ্ট খাবারের চিকিত্সা বিজ্ঞানের ভাষায় কোনো মূল্য নেই। আইনজীবীরা এটিকে এক ধরনের ধর্ষণ বলে অভিহিত করেন।
মাজিদের দেওয়ার ভাষ্যর বরাত দিয়ে আইনজীবী বলেন, ২০০৩ সালে তাঁকে যখন জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে করে, প্রহরীরা তাঁকে নগ্ন করে তিন দিন ধরে কড়িকাঠে ঝুলিয়ে রাখে। মাঝে মাঝে পানি দিত, কিন্তু খাবার দিত না। একদিন বিকেলে তাঁকে নামানো হয়। এরপর হাতকড়া-বেড়ি পড়ায়। মাথাটি একটি কাপড়ে মুড়িয়ে বরফ শীতল পানির মধ্যে চোবানো হয়। এতে দম বন্ধ হয়ে মরার জোগাড় হতো তাঁর। জিজ্ঞাসাবাদের সময় বার বার এ কৌশল প্রয়োগ করত তারা। এসব নির্যাতনের এক পর্যায়ে মাজিদ বাস্তব জগৎ থেকে হারিয়ে যেতেন। জেগে জেগেই দেখতেন দুঃস্বপ্ন। এভাবে আরও অনেক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন মাজিদ।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিআইএর কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, মাজিদ যা বলেছেন, সবই মিথ্যা।

যুক্তরাজ্যে জাতীয় পাখির মর্যাদা পাচ্ছে দোয়েল

জাতীয় পাখি না থাকার লজ্জা ঘোচাতে ভোটের আয়োজন করেছিল যুক্তরাজ্য। আর সেই ভোটের ফলে জাতীয় পাখির মর্যাদা পেতে যাচ্ছে কমলা বুকের দোয়েল, যুক্তরাজ্যের ভাষায় রবিন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় পাখি রয়েছে। বাংলাদেশ ও সুইডেনে দোয়েল, জাপানে গ্রিন ফিসেন্ট, ফ্রান্সে ফরাসি মোরগ এবং ভারতে ময়ূর জাতীয় পাখির স্থান দখল করে রয়েছে।
এ সম্পর্কে সেখানকার স্প্রিংওয়াচ এবং কান্ট্রিফাইলের উপস্থাপক ডেভিড লিন্ডো (৫১) বলেন, ‘এটি খুবই লজ্জাজনক একটি ব্যাপার। যুক্তরাষ্ট্রে ১৭৮২ সাল থেকে পালকহীন ঈগল পাখি জাতীয় স্থান দখল করে আছে। অথচ যুক্তরাজ্যের কোনো জাতীয় পাখি নেই।’ বৃহস্পতিবার দ্য গার্ডিয়ান জানায়, দেশটিতে এটিই ছিল প্রকৃতি সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় ভোট আয়োজন। ওই ভোটে দেশটির ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৩৮ জন অংশ নিয়েছিলেন। একটি বিশেষ ওয়েবসাইটে এবং দেশটির বিভিন্ন স্কুলে পোস্টাল ভোট এবং ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হয়েছিল। ওই ভোটে বিজয়ী হয়েছে রবিন (কমলা বুকের দোয়েল পাখি)। সেখানে শিশুদের জন্যও আলাদা ভোটের ব্যবস্থা ছিল। শিশু ভোটেও রবিনই প্রথম হয়েছে। এতে অবাক উপস্থাপক লিন্ডো। তিনি বলেন, এ পাখি বহু আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিল। বড়দিনের কার্ডে এবং আরও অনেক কিছুতেই রবিনের ছবির ব্যবহার হয়ে আসছে সেই কবে থেকেই।

জোট সরকারে আগ্রহী এরদোগান

জোট সরকার গঠনে আগ্রহ প্রকাশ করলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান। প্রায় চারদিন ধরে নিরব থাকার পর এমন প্রস্তাব পুনঃনির্বাচনের সম্ভাবনাকে দূরে ঠেলতে পারে। খবর এএফপির। যার যার ‘জেদ’ ভুলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সরকার গঠনের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে জনগণ তাদের মত দিয়েছে। জনগণের চাওয়া পূরণ করাই রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব। অতএব, এক মুহূর্তের জন্যও তুরস্ক সরকারবিহীন দেখতে চাই না।
এরদোগান তার দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর বৃহস্পতিবার প্রথম ভাষণ দেন। এদিকে নির্বাচনে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর তার দল একটি কোয়ালিশন গঠনের লক্ষ্যে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। রোববারের অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি অপ্রত্যাশিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে কম আসন পাওয়ার পর বলেছে, বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে তারা আগাম নির্বাচনসহ সব বিকল্প বিবেচনা করবে। প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতোগ্লু বলেন, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে সম্ভাব্য নতুন নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘কেবল একেপি কোয়ালিশন আলোচনায় নেতৃত্ব দেবে। তবে, অন্যরা এর পথ রোধ করলে আমরা সব বিকল্প বিবেচনা করব।’ দাভুতোগ্লু বলেন, কুর্দিপন্থী পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টিসহ (এইচডিপি) পার্লামেন্টে আসন পেয়েছে এমন তিনটি বিরোধী দলের সঙ্গেই তিনি আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আন্তরিকতার সঙ্গেই সব বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলব।
আমাদের কোনো রেড লাইন নাই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় বলেছি, কোয়ালিশন সর্বোত্তম বিকল্প নয়। কিন্তু জনগণ যদি তা চায় তাহলে আমাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায় এটিকে সর্বোত্তম করে তোলার।’ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ী গত ১৩ বছর ধরে শাসন ক্ষমতায় থাকা একেপি ৫৫১ আসনের পার্লামেন্টে ২৫৮ আসন পাবে। রিপাবলিকান পিপল’স পার্টি (সিএইচপি) পাবে ১৩২ আসন, ন্যাশনালিটি মুভমেন্ট পার্টি (এমএইচপি) ও এইচডিপি প্রত্যেকে ৮০ আসন পাবে। দাভুতোগ্লু বলেন, নির্বাচনে কি ভুল হয়েছে এবং ভোটাররা কি ধরনের কোয়ালিশন চায় তা জানতে তা খুঁজে বের করতে একেপি একটি জরিপ পরিচালনা করবে। তবে তিনি বলেন, তার দল নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে তাও একটি ‘সাফল্য’। এএফপি।

ঈশ্বর আমাকে নিখুঁত করে তৈরি করেছেন : পুতিন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, জীবনে তিনি কখনও ভুল করেননি। কারণ, ঈশ্বর চেয়েছিলেন তিনি নিখুঁত হবেন। ইতালি সফরের কয়েকদিন আগে দেশটির একটি সংবাদ মাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন।
এক্সপো ২০১৫ শীর্ষক আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নিতে বুধবার ইতালির মিলানে পৌঁছেছেন পুতিন। সেখানে তিনি ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজির সঙ্গে রাশিয়ার ওপর আরোপিত পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ কী করে সরানো যায় সে ব্যাপারে আলাপ করবেন। চলতি সপ্তাহে শেষ হওয়া জার্মানির বাভারিয়ায় জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে একমাত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজি রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপের বিরোধিতা করেছিলেন। সাক্ষাৎকারে পুতিনকে প্রশ্ন করা হয়, ‘জীবনে এমন কি কোনো কাজ করেছেন, যার জন্য আপনাকে সবচেয়ে বেশি আক্ষেপে পুড়তে হয়, এমন কিছু যা আপনি ভুল হিসেবে বিবেচনা করেন এবং সে ভুলের পুনরাবৃত্তি আর কখনও ঘটাতে চান না?’
কিছুক্ষণ ভেবে পুতিন উত্তর দেন, ‘আমি আপনার কাছে অকপটেই বলছি আমি সে ধরনের কোনো কিছুই স্মরণ করতে পারছি না। ঈশ্বর আমার জীবন তৈরি করেছেন এমনভাবে যে আমার আক্ষেপ করার কিছুই নেই। ঈশ্বর চেয়েছিলেন, আমি নিখুঁত হব।’

নিজেদের স্বার্থে আমাকে ব্যবহার করেছেন রাজনীতিবিদরা

বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন বললেন, সুইডেনে একটি নারীবাদী দল রয়েছে। ভারতে নেই কেন? সুইডেনের চেয়ে নারীবাদী দলের প্রয়োজনীয়তা ভারতে অনেক বেশি। সম্প্রতি ভারত ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো এই লেখিকা এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন টাইমস অব ইন্ডিয়াকে। ভারত ছাড়ার পর বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, তিনি স্থায়ীভাবে ভারত ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছেন। তবে তসলিমা নাসরিন এ খবরের সত্যতা অস্বীকার করেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ব্লগারদের খুনিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বদলে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ সরকার। তারা ইসলাম-বিরোধী তকমা পেতে চায় না। এর ফলে ভোট হারানোর ভয় রয়েছে তাদের। এখানে তার সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: আপনি যুক্তরাষ্ট্রে কেন?
উত্তর: আমি বক্তৃতা দেয়ার জন্য দেশটিতে প্রায়ই আসি। এ ছাড়া পরিবারের সঙ্গে দেখা করতেও আসি। কিন্তু সমপ্রতি বাংলাদেশের একটি পত্রিকা পুলিশের একটি প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে জানায়, নাস্তিক ব্লগারদের হত্যাকারী একটি সন্ত্রাসী সংগঠন ভারতে গিয়ে আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। এ খবরটি আমাকে বিচলিত করেছে। আমি বন্ধুদের সঙ্গে কথা বললাম। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, যদি আমি কিছুদিনের জন্য ভারত ছেড়ে যাই, তাহলে ভাল হবে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ছাপিয়েছে যে, আমি পাকাপাকিভাবে যুক্তরাষ্ট্রে চলে এসেছি। এসব কাণ্ডজ্ঞানহীন কথাবার্তা। ভারত সব সময়ই আমার হৃদয়ে থাকবে। আমার সব বই, জিনিসপত্র ও পোষা বিড়ালটি পর্যন্ত এখনও ভারতে। যাই হোক। নিরাপত্তা হুমকির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ চলছে। আমেরিকার একটি মানবতাবাদী সংগঠন বাংলাদেশের হুমকিপ্রাপ্ত ব্লগারদের যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তহবিল সংগ্রহ করছে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে ব্লগারদের কেন খুন করা হচ্ছে?
উত্তর: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। একই উপায়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সন্ত্রাসীরা নাস্তিক বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস কায়দায় হত্যা করে যাচ্ছে। ওই দলটি ইয়েমেনভিত্তিক সাবেক আল কায়েদা নেতা আনওয়ার আল আওলাকির দ্বারা প্রভাবিত। এসব খুনির উদ্দেশ্য একই। তারা ধর্মান্ধ ও নারীবিদ্বেষী ব্যতিত কাউকে দেশে রাখতে চায় না। তারা ইসলামের সমালোচনার কারণে রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায় সহ অনেক মুক্তমনা ব্লগারকে হত্যা করেছে। খুনিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বদলে, সরকার তাকিয়ে আছে। সরকার ইসলামবিরোধী তকমা পেতে চায় না, এর ফলে ভোট হারানোর ভয় রয়েছে তাদের।
প্রশ্ন: আপনি কি ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন?
উত্তর: সরকারের কারো সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা আমার ছিল। আমি যদি তাদের কাছ থেকে কোন নিশ্চয়তা পেতাম, তাহলে ভারত ছেড়ে যেতাম না। কোন ব্লগার বন্ধুকে কুপিয়ে খুন হতে দেখে আমার অবস্থা যখন বিপর্যস্ত, তখন আমার একটি যত্নমাখা হাতের দরকার ছিল। কিন্তু ভারতে আমার অবস্থান শেষ হয়ে যায় নি। ইউরোপে আমার নির্বাসন শেষে আমি কলকাতায় যাই। আমি কলকাতা অনেক উপভোগ করেছিলাম। কিন্তু নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে আমাকে ব্যবহার করেছে রাজনীতিবিদরা। আমাকে গৃহবন্দি অবস্থায় থাকতে হয়েছে। সাজানো দাঙ্গার পর আমাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। আমাকে দিল্লিতে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে। ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু আমি হাল ছাড়ি নি। আমি ভারতে প্রবেশ করা অব্যাহত রাখলাম। সরকার অবশেষে আমাকে ভারতে বাস করার অনুমতি দেয়। ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে দিল্লিই একমাত্র জায়গা যেখানে আমি বাস করতে পারি। আমি খুশি যে, আমি উপমহাদেশেই আছি। এ জায়গাটাকে আমার বাড়ি মনে হয়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে নারীরা কি মুক্তভাবে বাস করে না?
উত্তর: এটা খুব কঠিন। নারীদের বোরকা ও হিজাব পরতে বাধ্য করা হয়। তাদের সঙ্গে আধা-মানবের মতো আচরণ করা হয়। পুরুষরা এখনও তাদের প্রভু।
প্রশ্ন: আপনি মাঝে বলেছিলেন, ‘আম আউরাত পার্টি’র প্রয়োজন। বিষয়টি ব্যাখ্যা করুন।
উত্তর: মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী ও তারা নির্যাতিত। তাদের সমস্যাগুলো অবশ্যই সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। সুইডেন বিশ্বের সবচেয়ে লিঙ্গ-সমমাত্রিক দেশগুলোর অন্যতম। দেশটি একটি দৃঢ় ধারণার ওপর পরিচালিত হয়, যা হলো, পুরুষ ও নারীদের ক্ষমতা সমানভাবে ভাগাভাগি করা উচিত। সুইডেনের একটি নারীবাদী দল রয়েছে। ভারতে নেই কেন? সুইডেনের চেয়ে নারীবাদী দলের প্রয়োজনীয়তা ভারতে অনেক বেশি।

মিয়ানমারে ভারতীয় সেনা অভিযানে জীবন সিংহের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা by পরিতোষ পাল

মিয়ানমারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিতর্কিত অভিযানে যারা নিহত হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশন তথা কেএলও-র প্রধান জীবন সিংহ সহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। অন্য নিহত নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমানে কেএলও-ও সেকেন্ড ইন কমান্ড নিত্যানন্দ ওরফে জামাই। মিয়ানমারে ভারতীয় সেনার অভিযান নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে তখনই বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে মৃত জঙ্গিদের কয়েকজনের পরিচয়। তবে সরকারিভাবে কোন কিছু না জানানোয় প্রবল ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। গতকালই গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজে জীবন সিংহে মৃতদেহের ডিএনএ পরীক্ষার পর নিশ্চিত হলেই তার লাশ পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ারে পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হবে। তবে সেনা অভিযান নিয়ে পরস্পরবিরোধী নানা সংবাদ জানাজানির ফলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও কোন তথ্যই জানানো হচ্ছ না। তবে জীবন সিংহের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল আলোড়ন তৈরি হয়েছে। উত্তরবঙ্গে প্রশাসনিক মহলেও প্রবল চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে এই খবরে। অবশ্য বিতর্ক এড়াতে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, নিহত জঙ্গিদের পরিচয় মেলেনি। ফলে তাদের মধ্যে কেএলও প্রধান রয়েছেন কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গত বৃহস্পতিবার ভোরে মিয়ানমারের কয়েকটি জঙ্গি ঘাঁটিতে অতর্কিতে হামলা চালায় ভারতীয় সেনার কমান্ডো বাহিনী। হামলায় নিহত জনা চল্লিশেক জঙ্গির মধ্যে ২০ জন কেএলও কর্মী মারা গেছে বলে সেনাবাহিনী দাবি করেছিল। আহতও হয় অনেকে। পরে গোয়েন্দাদের একটি সূত্র জানায়, হামলায় নিহতের মধ্যে কেএলও প্রধান জীবন সিংহও রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামের বাসিন্দা জীবন সিংহ ১৯৮৮ সাল থেকে কেএলও’র সঙ্গে যুক্ত। কয়েক বছরের মধ্যেই সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে সংগঠনের প্রথম সারির নেতা হয়ে ওঠেন। বছর দশেক আগে ভুটানে সেনা অভিযানে বড়োসড়ো ধাক্কা খাওয়ার পর থেকেই কার্যত ভেঙে পড়ে এই সংগঠনটি। তার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে জঙ্গিরা। কিন্তু জীবন সিংহের নাগাল মেলেনি। এক সময় জানা গিয়েছিল সে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। পরে অবশ্য মিয়ানমারের দিকেই তার যাতায়াত ছিল বলে গোয়েন্দারা জেনেছেন। তার বিরুদ্ধে ৫০টিরও বেশি মামলা রয়েছে বিভিন্ন থানায়। একাধিক খুনেরও অভিযোগ রয়েছে তার  বিরুদ্ধে। এদিকে সেনা অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার ঘন ঘন বৈঠকে বসে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেনা অভিযান পরবর্তী পরিস্থিতি এবং জঙ্গিদের মিথ্যে প্রচার নিয়ে পর্যালোচনায় বসেছিলেন। সেই বৈঠকের পরে উত্তর পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জীতেন্দ্র সিং এবং জয়েন্ট ইন্টেলিজেন্স কমিটির চেয়ারম্যান আর এন রবিকে পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মণিপুর ও নাগাল্যান্ডে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন। তারা সেখানে গিয়ে সিভিল সোসাইটির কাছ থেকে সেনা অভিযান সম্পর্কে মতামত যেমন সংগ্রহ করবেন তেমনি জঙ্গিদের মিথ্যা প্রচারণাও খণ্ডন করেন। অন্যদিকে জঙ্গিদের প্রত্যাঘাতের আশঙ্কায় গতকাল দিল্লিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর পারিক্কও, স্বরাষ্ট্র সচিব এল সি গোয়েল, সেনা প্রধান দলবীর সিং ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ আধিকারিকরা। বৈঠকে সতর্কতামূলক সবরকম ব্যবস্থা নেয়র নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে আগামী দিনে আরও এই ধরনে সেনা অভিযান নিয়ে কোন আলোচনা হয়েছে কিনা তা জানা যায় নি।

পৃথিবী আশঙ্কামুক্ত: নাসা

পৃথিবীর সঙ্গে আগামী কয়েক শ বছরে বড় ধরনের কোনো গ্রহাণুর
সঙ্গে সংঘর্ষ হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন নাসার গবেষকেরা।
আগামী তিন মাসের মধ্যে মহাকাশ থেকে আসা বিশাল পাথুরে পিণ্ডের আঘাতে মানব সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি ভিত্তিহীন তত্ত্ব দিয়ে কিছু গবেষকেরা দাবি করেছেন, ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে। এ বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর মহাকাশ থেকে আসা এক বিশাল পাথর পৃথিবীতে আছড়ে পড়তে পারে। বিভিন্ন ব্লগ ও ওয়েবসাইটেও বিষয়টি নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ছে।
ওই তাত্ত্বিক গবেষকেদের মতে, পৃথিবীর শীর্ষ দেশগুলোর সরকার বিষয়টি অবগত থাকলেও জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে ভেবে তথ্য প্রকাশ করছে না। কিন্তু এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে বিত্তশালীরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, ‘এখন পৃথিবীর কক্ষপথের দিকে কোনো গ্রহাণু বা ধূমকেতু আসার আশঙ্কা নেই, সেটা নাসা ভালো করে জানে। তাই বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা খুবই সামান্য।’
নাসার গবেষকেরা জানিয়েছে, ‘আমরা যে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলতে পারি তা হচ্ছে, আগামী কয়েক শ বছরের মধ্যেও বিশাল আকারের কোনো বস্তু পৃথিবীতে আঘাত হানার আশঙ্কা নেই।’ জিনিউজ ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস অবলম্বনে

এত সংবর্ধনা কেন? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

চট্টগ্রামের নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন
র‌্যাডিসন হোটেল থেকে লালদীঘির ময়দান, কমিউনিটি সেন্টার থেকে শিল্পকলা একাডেমী—চট্টগ্রাম শহরের সর্বত্র আয়োজন করা হচ্ছে নবনির্বাচিত মেয়রের সংবর্ধনা সভা। নাগরিক কমিটি, চেম্বার, বিজিএমইএ, সিজেকেএস থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক কর্মীদের সংগঠন পর্যন্ত সবাই শামিল এই সংবর্ধনা জ্ঞাপনের প্রতিযোগিতায়। এতে নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে নবীন নেতৃত্বের প্রতি প্রত্যাশা আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর গত এক মাসেরও কম সময়ে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, আয়োজনের ঘনঘটায় যেন ধন্দ জাগে মনে। এর সবটাই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ও উৎসাহ, নাকি এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্যও আছে অন্তত কারও কারও মনে।
আ জ ম নাছির উদ্দিন দীর্ঘদিন রাজনীতি করা মানুষ, এই সন্দেহ তাঁর মনেও জাগছে না, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। ধারণা করি, বুঝেশুনে অনেক সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ‘এই মনিহার’ গ্রহণ করতে হচ্ছে তাঁকে। তবে আমাদের ধারণা, তাঁর নিজেরই এখন ভক্তিতে গদগদ আয়োজক-সমর্থকদের উদ্দেশে বলার সময় হয়েছে, এনাফ ইজ এনাফ, এবার দয়া করে সরে দাঁড়ান, আমাকে কাজ করতে দিন।
নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলররা এখনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পাননি। পূর্বেকার নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ পূর্তি হবে আগামী ২৬ জুলাই। তার পরই দায়িত্ব বুঝে নেবেন তাঁরা। আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন না করলেও মেয়র যে হোমওয়ার্ক শুরু করেছেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর কিছু কাজকর্ম থেকে। নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও নতুন মেয়র ওয়াকিবহাল বলে মনে হয়। ইতিমধ্যেই তিনি জানিয়েছেন, এ বছর বর্ষার মৌসুম প্রায় এসে পড়েছে, এত দ্রুত তাঁর পক্ষে জলাবদ্ধতা সংকট নিরসন অসম্ভব।
আ জ ম নাছির একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র। এই বিরল সৌভাগ্য এর আগের মেয়রদের ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই আশা করা যায়, উন্নয়নকাজের জন্য সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দপ্রাপ্তির দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন তিনি। সুতরাং সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে আগামী পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে এবং আধুনিক বিশ্বমানের একটি নগর হিসেবে গড়ে উঠবে—এই আশা করা যেতেই পারে।
নির্বাচিত হওয়ার দিন কয়েকের মধ্যেই এক বক্তৃতায় ‘জিরো টলারেন্সে’র কথা বলেছিলেন আ জ ম নাছির। বলা বাহুল্য, করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশেই এ কথা বলেছিলেন তিনি। সম্প্রতি এই সংস্থার রাজস্ব ও সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেছেন, এই দুটি বিভাগের প্রচণ্ড দুর্নাম রয়েছে। স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘করপোরেশনে কর্মরতদের কোথায় কী আছে, আমার জানা আছে।’ তাঁর বক্তব্য নিঃসন্দেহে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে সংশ্লিষ্টদের। আমরা চাই, এই কঠোর মনোভাবের বাস্তব প্রতিফলন ঘটুক তাঁর কর্মকাণ্ডে, যাতে নগরবাসী এই সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্য ও প্রত্যাশিত সেবা পায়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করি, সদ্য সাবেক মেয়র মনজুর আলমের সুনাম ছিল সৎ, সজ্জন ও নির্বিরোধী ব্যক্তি হিসেবে। তাঁর আগের মেয়াদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে তিনি নির্বিচারে অনুমোদন যেমন দিয়েছেন, তেমনি প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর পরিবর্তন এনে নিজের মতো করে পরিচালনা করার উদ্যোগ নেননি বা নিতে পারেননি। এতে নানা ক্ষেত্রে অনিয়ম, শৈথিল্য বা আদেশ অমান্য করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ফলে সদিচ্ছা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন করতে পারেননি মনজুর।
কিন্তু শুরু থেকেই নাছিরের কঠোর মনোভাব প্রশাসনে গতি সঞ্চারের পথ সুগম করেছে বলে আমাদের ধারণা। দুর্নীতির বিষয়ে নাছির বলেছেন, ‘কেউ যদি মনে করেন মহিউদ্দিন ভাইয়ের আত্মীয়, মনজুর আলম ভাইয়ের লোক কিংবা আমাদের এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে, এই সূত্রে পার পেয়ে যাবেন, তাহলে তাঁরা বোকার স্বর্গে বাস করছেন।’ খুবই ন্যায্য কথা। কিন্তু নাছির একটা কথা স্পষ্ট করেননি, স্বয়ং তাঁর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে কেউ পার পাবেন কি না। এ কথা উঠছে এ কারণে যে শহরজুড়ে এই যে সংবর্ধনার বহর, পোস্টারে-বিলবোর্ডে অভিনন্দনবার্তা জ্ঞাপনের হিড়িক, তাতে আবেগ ও সমর্থন ছাপিয়ে উদ্দেশ্য সিদ্ধির কোনো গোপন অভিসন্ধি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে।
বিলবোর্ড উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে মেয়র বলেছেন, ‘যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, বিলবোর্ড উচ্ছেদে আপনি কাউকে ছাড় দেবেন না। অভিযান শুরু করেন। প্রয়োজনে আগামীকাল থেকে শুরু করেন। কে মন্ত্রীর স্বজন বা কে প্রভাবশালীর স্বজন, তা দেখবেন না। অবৈধ বিলবোর্ড হলেই উচ্ছেদ।’
অবৈধ বিলবোর্ড প্রকৃতপক্ষেই চট্টগ্রামের এক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতিশোভিত এই নগরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য ঢেকে দিয়ে এসব বিলবোর্ড ঘনবসতিপূর্ণ এ অঞ্চলের মানুষের মুক্ত নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগও কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু দিনের পর দিন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হলেও এর প্রতিকার মেলেনি। বর্তমান পুলিশ কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু বিলবোর্ড উচ্ছেদ করলেও এখনো বহু অবৈধ বিলবোর্ড রয়ে গেছে। নতুন মেয়র এ ব্যাপারে কতটা সফল হন, সেটা দেখার অপেক্ষায় আছে নগরবাসী। তবে এখন শহরের অনেক বিলবোর্ডে ঝুলছে মেয়রের প্রতি অভিনন্দনবার্তা। বিলবোর্ড তো বটেই, রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্যানার-ফেস্টুনে আ জ ম নাছিরের হাসিমাখা মুখের ছবিতে শহর সয়লাব। এই ছবির নিচে আবার অভিনন্দন জ্ঞাপনকারীর ছবিসমেত নাম-পরিচয়ও লেখা রয়েছে। সবার আগে এসব বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন অপসারণ করার নির্দেশ দিয়ে মেয়র একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেন। এতে তোষামোদকারীদের প্রতি একটি সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করি আমরা।
মেয়রের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে আ জ ম নাছিরকে। তিনি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার অব্যবহিত পরই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরই সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগের দুটি অংশ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। লালদীঘি ময়দান ও রীমা কনভেনশন সেন্টারে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেই ছুরি–চাপাতি নিয়ে পরস্পরের ওপর হামলা করেছেন ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপের কর্মীরা। আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের এসব তৎপরতার কারণে সরকারের ভাবমূর্তি নানা সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, চাপা পড়ে গেছে উন্নয়নের কৃতিত্ব। এসব দিকে নজর দিয়ে দলকে শৃঙ্খলায় আনতে না পারলে তাঁর নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে।
শিরোনামে বলেছি, এত সংবর্ধনা কেন? আসলে সংবর্ধনা আমরা দিতেই চাই। তবে আজ নয়। মেয়র হিসেবে মেয়াদ পূর্তির পর যখন দেখব আ জ ম নাছির একটি আধুনিক পরিচ্ছন্ন ও শান্তিতে বসবাসযোগ্য নগর আমাদের উপহার দিয়েছেন, সেদিন অকুণ্ঠচিত্তে দলমত-নির্বিশেষে তাঁর সংবর্ধনার আয়োজন করবে এই নগরের মানুষ। সেটাই হবে তাঁর প্রকৃত ও প্রাপ্য সংবর্ধনা।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

সমাধান হলো মানচিত্রের অসঙ্গতি

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তিকে বার্লিন পতনের সঙ্গে তুলনা করেছেন মোদি। কিন্তু ছিটমহল নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছা এক জিনিস, আর দুদেশের মধ্যে অবাধ যাতায়াত সমপূর্ণ ভিন্ন জিনিস। বৃটেনের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। এতে আরও বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রাঙ্কনে বেশ কিছু অদ্ভুত ব্যাপার রয়েছে। তবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের সীমান্তের যে ব্যাপ্তি, তার চেয়ে অদ্ভুত খুব কমই আছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর, বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ ছিল। তখন থেকেই সীমান্তের উভয় পাশে ১৬২টি খণ্ড খণ্ড জমি, যেগুলো বস্তুত সীমান্তের অপর পাশের দেশটির মালিকানাধীন। ৬ই জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে ওই অসঙ্গতি এখন সমাধানের পথে। ওই ছিটমহলগুলো দেশভাগের আগেও যার যার জায়গায় ছিল। কথিত রয়েছে, কয়েক শতাব্দী আগে ২ মহারাজার মধ্যে দাবা খেলার ফলেই ওই ছিটমহলগুলোর সৃষ্টি। মহারাজদ্বয়ের দাবা খেলার বাজি ছিল জমির টুকরোগুলো। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল লাইব্রেরির ব্রেন্ডন হোয়াইট অবশ্য বিশ্বাস করেন, বৃটিশদের আবির্ভাবের আগে ১৮ শতাব্দীর দিকে কোচবিহারের মহারাজা ও মোগল সাম্রাজ্যের মধ্যে কয়েকটি চুক্তির ফলে জন্ম হয়েছে ছিটমহলগুলোর। বিশ্বের মধ্যে একমাত্র ওই অঞ্চলেই পাল্টাপাল্টি ছিটমহলের (কাউন্টার-কাউন্টার এনক্লেভ) অস্তিত্ব রয়েছে। বাংলাদেশী ভূখণ্ডের মধ্যে এক খণ্ড ভারত অর্থাৎ বাংলাদেশের মধ্যে ভারতের ছিটমহল। আবার একইভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশী ছিটমহল।
মোদি বিমান থেকে অবতরণের পর হাসিনা তার মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে বিমানবন্দরে উপস্থিত হন। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতন্ত্র বলে পরিচিত ভারতের নেতার কাছ থেকে অনুমোদনের দলিল গ্রহণের জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। সফরের সময় মোদি ২০টির মতো অন্যান্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্ত পেরিয়ে বাস সেবা, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগসহ আরও অনেক কিছু।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে সাহায্য করার জন্য ভারতকে বাংলাদেশে একসময় সাদরে গ্রহণ করা হতো। কিন্তু এরপর থেকে অনেক বাংলাদেশী দেশটিকে কতৃত্বপরায়ণ, এমনকি বিদ্বেষী বিমাতা হিসেবে বিবেচনা করে। মোদির সফরের উদ্দেশ্য ছিল, এটা দেখানো যে, ভূখণ্ড, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ে বিরোধ জিইয়ে রাখার বদলে আরও বাণিজ্য ও আস্থার মাধ্যমে দুদেশের সমপর্ক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।
বহু দশকের দ্বিধার পর, উভয় দেশ নিজেদের মধ্যকার সীমান্তের উদ্ভট সমস্যা দূর করতে পেরেছে। এখন পর্যন্ত, ছিটমহলে বসবাসকারী ৫০ হাজার মানুষ কার্যত রাষ্ট্রহীন। তারা এমন কিছ ভূখণ্ডের বাসিন্দা, যেখানে নেই কোন বিদ্যালয়, হাসপাতাল বা আদালত। এখন তাদের যে কোন এক দেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়া হবে। সঙ্গে রয়েছে নাগরিকত্বসহ মৌলিক সুবিধাদি। পুরো চুক্তিটি হংকং দ্বীপের অর্ধেক অর্থাৎ ৪০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট অঞ্চলকে নিয়ে।
মোদি বলেন, ছিটমহল নিয়ে এ চুক্তিটির গুরুত্ব বার্লিন দেয়াল পতনের সমান গুরুত্ব বহন করে। তবে সীমান্তের অন্যত্র ভারতের কার্যকলাপ এ ধরনের বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্যের সঙ্গে যায় না। অভিবাসী ও চোরাচালানিদের উপদ্রব ঠেকাতে সীমান্ত যতদূর সম্ভব কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলতে ব্যস্ত দেশটি। জানুয়ারি ও মে মাসের মধ্যে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সময় ২০ বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে ভারতীয় বাহিনী। ছিটমহল নিয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছা এক জিনিস। কিন্তু দুদেশের মধ্যে অবাধ যাতায়াত সমপূর্ণ ভিন্ন জিনিস।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন অর্থসংকটে by তানভীর সোহেল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তহবিলে নেই কোনো টাকা। উল্টো এর কাছে বিভিন্ন সংস্থা, ব্যক্তি ও ঠিকাদারের পাওনা প্রায় সাড়ে তিন শ কোটি টাকা। অর্থের অভাবে দৈনন্দিন কাজ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তাব্যক্তিরা।
দক্ষিণের চেয়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের অবস্থা ভালো। এর দেনা নেই। তবে প্রতিবছরই উদ্বৃত্ত তহবিলে টাকার পরিমাণ কমছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উত্তরের চেয়ে দক্ষিণের রাজস্ব আদায় কম। নতুন ঢাকা ও ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো উত্তরে হওয়ায় সরকারি ও বিদেশি অনুদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সংখ্যা উত্তর সিটি করপোরেশনে বেশি। আবার রাজস্ব আদায় কম হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণের অলিগলি, ড্রেনেজ-ব্যবস্থা, বর্জ্য অপসারণ, বেতন-ভাতা বাবদ খরচ বেশি। তহবিলে অর্থ না থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারদের দিয়ে বাকিতে কাজ করানোর কারণে দক্ষিণ করপোরেশন বেশি দেনায় পড়েছে।
২০১১ সালে যখন ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করা হয়, তখন দুই সিটি করপোরেশনের আর্থিক অবস্থা ভালোই ছিল। কাউকেই দেনা নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়নি। উল্টো অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের প্রায় ৩৮০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের টাকা সমান ভাগ করে নেয় দুই করপোরেশন। কিন্তু গত চার বছরের মধ্যে উদ্বৃত্ত টাকার পরিমাণ ক্রমাগত কমেছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এখন দেনাদারে পরিণত হয়েছে। আর উত্তর দেনাদার না হলেও আর্থিক সংকটে আছে।
দক্ষিণের এক কর্মকর্তা বলেন, কম প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রকল্প গ্রহণ ও সড়ক নির্মাণ-উন্নয়নের কারণে দক্ষিণের আর্থিক অবস্থা ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন প্রথম আলোকে বলেন, সিটি করপোরেশনের দেনা প্রায় সাড়ে তিন শ কোটি টাকা। করপোরেশন চলছে ধুঁকে ধুঁকে। কোনো রকমে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর জন্য বড় কোনো কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। তিনি হেসে বলেন, ‘টানাপোড়েনের মধ্যেই চলছে দক্ষিণের সংসার।’ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী, জানতে চাইলে নবনির্বাচিত এই মেয়র বলেন, অর্থমন্ত্রীকে পুরো বিষয়টি জানানো হয়েছে। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আয়ের লক্ষ্য ধরা হয় ১ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। অথচ ওই অর্থবছরে তাদের আয় ছিল মাত্র ৪১৯ কোটি টাকা। সিটি করপোরেশনের একটি সূত্র বলছে, আয়ের চেয়ে ব্যয় করে ফেলা হয়েছে বেশি। গত চার বছর এভাবেই চলছে। ফলে করপোরেশনের তহবিলে উদ্বৃত্ত ছিলই না, বরং প্রতিবছর দায় বাড়ছে। তবে করপোরেশন প্রতিবছরের হিসাবে এই দেনার কথা উল্লেখ করছে না। আয়কেই ব্যয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে। উল্টো চলতি অর্থবছরে করপোরেশন তহবিলে প্রারম্ভিক স্থিতি ১০ কোটি টাকা দেখিয়েছে। তা ছাড়া এবার তারা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭৪৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। এবারের আয়ও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হবে না।
ব্যয়ের দিক থেকে উত্তর সিটি করপোরেশন অনেক হিসেবি। আয় ও তহবিলে থাকা অর্থের পরিমাণ বুঝেই খরচ করছে তারা। ফলে এখন পর্যন্ত তাদের দেনায় পড়তে হয়নি। চলতি অর্থবছরেও তারা তহবিলে কিছু টাকা উদ্বৃত্ত রাখতে পারবে। যদিও তহবিলে উদ্বৃত্ত টাকার পরিমাণ প্রতিবছরই কমছে।
উত্তরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, উত্তর সিটি করপোরেশন অর্থের ব্যবস্থা বুঝে তারপর খরচ করেছে। ফলে গত চার বছরে তাদের উদ্বৃত্তের পরিমাণ বছর শেষে কমলেও দেনায় পড়তে হয়নি। চলতি বছরের বাকি দিনগুলো সব ধরনের খরচ মিটিয়ে তহবিলে কিছু টাকা থাকবে। এর পরিমাণ ১০ কোটি টাকার মতো হতে পারে। তবে দৈনন্দিন কাজ চললেও পর্যাপ্ত টাকা উত্তরের তহবিলে নেই। প্রতিবছর জোগাড়ও হচ্ছে না। ফলে উন্নয়নকাজ ও নাগরিকদের সেবা বাড়ানো যাচ্ছে না।
করপোরেশনের হিসাব শাখার একজন কর্মকর্তা জানান। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে উদ্বৃত্ত বা প্রারম্ভিক স্থিতি ধারা হয় ৫৮ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৫২ কোটি হয়। অথচ ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে উদ্বৃত্ত বা স্থিতি হলো ৪০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এটা আরও কমবে। ফলে আয় না বাড়লে উত্তর সিটি করপোরেশনকে দেনায় ডুবতে হবে।
উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, উত্তরের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রী ২০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা বলেছেন। উন্নয়নমূলক কাজের জন্য এই টাকাটা কাজে দেবে। তিনি বলেন, বড় প্রকল্প নেওয়ার মতো অর্থ করপোরেশনের নেই, এটা সত্য। তবে করপোরেশনের আয় বাড়াতে তিনি চেষ্টা করবেন। দেনা নয়, বরং করপোরেশনকে আর্থিক দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতেই তিনি বেশি মনোযোগ দেবেন।
উত্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি অর্থবছরে করপোরেশনের বাজেট ২ হাজার ৪১ কোটি টাকা। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। ওই বছর আয় হয় মাত্র এক হাজার নয় কোটি টাকা। এই কর্মকর্তা জানান, এভাবে চললে উত্তরকেও দেনায় পড়তে হবে।

কৃষক এখনো ধানের দর পাচ্ছেন না by ইফতেখার মাহমুদ ও রোজিনা ইসলাম

এপ্রিলে বোরো ধান কাটা শুরু হওয়ার পর থেকে সেই একই চিত্র। দাম কমছে প্রতি সপ্তাহে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়া হতাশ কৃষকের কষ্ট জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে। সরকার থেকে বলা হয়েছিল, মে মাসে সরকারি সংগ্রহ শুরু হলেই দাম বাড়বে। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো আগের মতোই।
এরই মধ্যে বাজার দরের চেয়ে কম দামে ভারতীয় চাল আমদানি বেড়েছে। আর হাটে ধান নিয়ে এসে ফিরে গেছেন কৃষক। সরকার ১০ মে চাল আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। কিন্তু মে মাসে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ পুরোদমে শুরু করা যায়নি। চাল আমদানিও থেমে থাকেনি। ফলে ধানের দামের ওপর এর প্রভাব পড়েনি।
১০ লাখ টন চাল ও ১ লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে খাদ্য বিভাগ গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মাত্র ২ লাখ ৩২ হাজার টন চাল সংগ্রহ করতে পেরেছে। খাদ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত চাল আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। আরও ১৬ লাখ টন চাল আমদানিপত্র খোলা হয়েছে।
এতে ধান-চালের দর প্রতি সপ্তাহেই কমছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্যশস্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেল সপ্তাহে চিকন ও মাঝারি মানের চালের দর দেড় শতাংশ কমেছে। আর মোটা চালের দর টানা দেড় মাস ধরে ক্রমাগত কমার পর এ সপ্তাহে স্থির হয়েছে।
ধানের দাম কমার প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকেও একাধিক প্রতিবেদন ও চিঠি পাঠানো হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) দেশের ১৫টি জেলার ধানের মূল্য হ্রাসসংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সরকার ধানের যে সংগ্রহমূল্য ঘোষণা করেছে, বাজারে তার প্রায় অর্ধেক দামে ধান বিক্রি হচ্ছে। এ নিয়ে কৃষকের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। সরকারি ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কৃষকের এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বা উসকানি দিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে জন্য সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা ধরেননি। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর কাছে ধানের দামের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ধানের দাম নিয়ে কোনো বিশেষ সংস্থার প্রতিবেদন তার কাছে আসেনি। মতিয়া চৌধুরী বলেন, দেশে প্রতিদিন চালের চাহিদা প্রায় এক লাখ টন। যে ১৩ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে, তা মাত্র ১৩ দিনের চাহিদা পূরণ করবে। ফলে বাজারে তা তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ ধান ৬৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। গত এক মাসের টানা রোদ ধান শুকাতে সহায়তা করেছে। ফলে কৃষকের পক্ষে ওই ধান দীর্ঘদিন ধরে রেখে দাম বাড়লে বিক্রি করা সম্ভব হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যেভাবে ধান-চালের সংগ্রহ করছে তাতে খাদ্য বিভাগের কিছু কর্মচারী ও চালকল মালিকেরা লাভবান হচ্ছেন। কেননা, তাঁরা বাজার থেকে অল্প দামে চাল কিনে বেশি দামে সরকারি গুদামে সরবরাহ করছেন। যদিও সরকারি গুদামগুলোতে এখন ধান সংগ্রহ করার মতো অবকাঠামো রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকার যদি দ্রুত প্রতিটি গুদামের গেটে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা শুরু করে, তাহলে দাম বাড়বে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের প্রতিটি কৃষকের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার সরাসরি ওই ব্যাংক হিসাবে মূল্য পরিশোধ করলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও কমে আসে।
গত ২৭ মে দেওয়া প্রতিবেদনে কিশোরগঞ্জ জেলার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘ধানের বিক্রয়মূল্য আশানুরূপ না হওয়ার কারণে কৃষকদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।’ আর দিনাজপুরের প্রতিবেদনের বক্তব্য হচ্ছে, ‘সরকার নির্ধারিত মূল্যে (প্রতি মণ ৮৮০ টাকা) ধান বিক্রি করতে পারলে কৃষকদের অসন্তোষ প্রশমিত হতো।’ শূন্য শুল্কের সুযোগ নিয়ে গুটি কয়েক ব্যবসায়ী অল্প দামে ভারত থেকে চাল আমদানি করায় এবং সরকারি সংগ্রহ সঠিক সময়ে শুরু না হওয়ায় ধানের দাম কম বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, কৃষকের হাত থেকে ধান যায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাতে। তারপর যায় মোকামের ফড়িয়াদের হাতে। মোকামের ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে যায় চালকল মালিকের কাছে। সাধারণত ওই তিন হাত ঘুরেই চাল সরকারি গুদামে যায়। ফলে সরকার প্রতি মণ ধানের দাম ৮৮০ টাকা নির্ধারণ করলেও তা থেকে কৃষকেরা প্রায়ই বঞ্চিত হন। গত বছর কৃষক মোটা ধানের দর পেয়েছিলেন ৬৫০ টাকা। এবার তা ৫৫০ টাকার বেশি উঠছে না।
দেশের প্রধান ধান উৎপাদনকারী জেলা ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, ঝিনাইদহ, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার চিত্র প্রতিবেদনটিতে দেওয়া রয়েছে। প্রায় প্রতিটি জেলাতেই ধানের দর নিয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি জেলার মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা একটি নির্দিষ্ট দামে ধান মজুত করে রেখেছেন।
প্রতিবেদনে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি সুপারিশও করা হয়েছে। যেমন, সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে বরাবরই মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা নিয়ে থাকে। এ পরিস্থিতিতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হলে কৃষকেরা ধানের ন্যায্যমূল্য পেয়ে লাভবান হতে পারেন। এতে ক্ষোভ প্রশমিত হওয়া ছাড়াও কৃষকেরা ধান চাষে আগ্রহী হবেন। এ ছাড়া দ্রুত কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল সংগ্রহ করার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এর আগে বিনিয়োগ বোর্ড থেকে খাদ্যসচিবের কাছে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। বিনিয়োগ বোর্ডের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. মাহবুব কবীর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছিল, সরকার চাল কেনে চাতাল ও মিল মালিকদের কাছ থেকে। ফলে খুব কম কৃষকই সরকারের কাছে ধান বিক্রির সুযোগ পান। এ বছর প্রতি মণ বোরো ধান উৎপাদন করতে কৃষকের খরচ হয়েছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। আর বাজারে ওই ধান বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকায়। সরকার ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে ৮৮০ টাকায়। সেই হিসাবে প্রতি মণ ধান বেচে কৃষকের লোকসান ৩৫০ টাকা।
বিনিয়োগ বোর্ডের ওই চিঠিতে সরকারি সংগ্রহ অভিযানে গত বছরের অবিক্রীত পুরাতন ও আমদানি করা চাল খাদ্যগুদামগুলোতে সরবরাহ হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এ বিষয়টিকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা পুরোনো অবিক্রীত এবং স্বল্প মূল্যে আমদানি করা চাল গছিয়ে দিতে না পারে।

বাক্স আছে অভিযোগ নেই -সরজমিন শিক্ষাভবন by নূর মোহাম্মদ

শিক্ষাভবনের নিচ তলার মূল গেটের কলাপসিবল গেট। বাম পাশেই অভিযোগ বাক্স। ২০১১ সালের ২৩শে আগস্ট। ঢাকঢোল পিটিয়ে এটির উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী। সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন শিক্ষাসচিব, ওই ভবনের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উদ্দেশ্য শিক্ষাভবনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তথ্য ধরা পড়বে এই বাক্সে। শিক্ষামন্ত্রী এটি উদ্বোধন করে বলেন, প্রতিদিন ওই বাক্স খোলা হবে। অভিযোগের তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর এর চাবি থাকবে স্বয়ং আমার কাছে। শিক্ষাভবনে কাজ করতে এসে ঘুষ লাগে না শিক্ষকদের এ ধারণা সৃষ্টি করবে এ বাক্স। এরপর ৪ বছর পেরিয়ে গেছে। একদিনও খোলা হয়নি এই বাক্স। এর চাবি এখন সিন্ডিকেটের হাতে। শিক্ষাভবনের দুর্নীতি বন্ধ করতে শিক্ষামন্ত্রণালয় এখানেই থেমে থাকেননি। কর্মকর্তাদের দুর্নীতি রুখতে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ৩২টি রুমে বসানো হয় ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। এই সিসি ক্যামেরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করেন মহাপরিচালক,  কলেজ ও প্রশাসনের পরিচালক। এতেও কোন কিছু কাজ হচ্ছে না। কোন ওষুধ ধরছে না দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তার। বরং গত বছর শিক্ষামন্ত্রী ঝটিকা অভিযানে  গিয়ে হাতেনাতে ধরেন তাদের। সাময়িক বরখাস্ত করেন কয়েক কর্মকর্তাকে। বৃহস্পতিবার সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মূল গেটে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন বরগুনার ঘটাখালি বন্দর হোসানিয়া সিনিয়র মাদরাসা শিক্ষক আমিনুল ইসলাম। কি কাজে এসেছেন জানতে চাইলে বলেন, ৫ তলার একজন কর্মকর্তা আমার এমপিও করে দিবে বলে ৩০ হাজার টাকা নিয়েছেন। তিন বছর ধরে ঘুরাচ্ছেন। এখন ফোনও ধরেন না। শুনেছি তাকে নাকি বদলি করা হয়েছে। আমার কাগজপত্র তার কাছে। এই বিষয়টি মহাপরিচালককে (ডিজি) লিখিতভাবে জানাতে এসেছি। বুধবার ডিজি ম্যাডাম প্রোগ্রামে ছিলেন। তাই দেখা করতে পারেনি। আজ আমাকে গেটের দায়োয়ান ঢুকতে দিচ্ছে না। বৃহস্পতিবার নাকি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া ঢোকা নিষেধ। আপনি তো অভিযোগ করতে এসেছেন তাহলে নিচতলায় অভিযোগ বাক্সে ফেলে গেলেই তো হয়। এমন প্রশ্নে আমিনুল ইসলামের সোজাসাপ্টা উত্তর- এর আগে দুই বার ফেলে গেছি। কোন কাজ হয়নি। তাই এবার নিজে ডিজি ম্যাডামকে বলবো। শুধু আমিনুল ইসলাম নয়, এমপিও, গ্রেড পরিবর্তন, টাইম স্কেল, বদলি, পদোন্নতিসহ নানা কাজ নিয়ে এখানে প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে আড়াই শ’ শিক্ষক-কর্মচারী আসেন। এদের বেশির ভাগই কাজ করাতে হয় টাকার বিনিময়ে। টাকা ছাড়া কোন ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যায় না।
মাউশি সূত্র জানায়, টাকা দিলেই যে কাজ হয়ে যায় বিষয়টি এরকম না। টাকা দেয়ার পরও শতকরা ৬০ ভাগের বেশি কাজ হয় না। কিন্তু ঘুষ হিসেবে দেয়া এই টাকা ফেরত পাওয়া তো দূরের কথা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাক্ষাৎ পর্যন্ত পায় না ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারীরা। এসব অভিযোগ নিয়ে মহাপরিচালক ও প্রশাসনের পরিচালকের রুমে প্রতিদিন শিক্ষকদের ভিড় লেগে থাকে। আর মহাপরিচালক বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত সাক্ষাৎ দেন। এর মধ্যে নানা প্রোগ্রাম ও প্রশাসনিক কাজ থাকায় প্রায়ই  তাকে পাওয়া যায় না। দিনের পর দিন তার সাক্ষাৎ পাওয়ার আশায় তার রুমের সামনে বসে থাকেন শিক্ষকরা। তারপরও অভিযোগ বাক্সে অভিযোগ দেন না। এর কারণ জানতে চাইলে শিক্ষা ভবনের একজন উপ-পরিচালক বলেন, কেন অভিযোগ দিবেন? একটি অভিযোগ কি উপরের তলা ওঠে। নিচতলার অভিযোগ নিচতলায় গায়েব হয়ে যায়। বরং অভিযোগ বাক্সে যে শিক্ষক অভিযোগ করেন তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন হয়। ২০১২ সালে এরকম একটি ঘটনার বিচার করেছেন স্বয়ং মহাপরিচালক। এরপর থেকে শিক্ষকরা এখানে কোন অভিযোগ দেন না। দিলেও পড়ে সিন্ডিকেটের হাতে। কারণ চাবি তাদের হাতে। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষাভবনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর অদক্ষতা, দুর্নীতি, দুর্ব্যবহারের কারণে এই ভবনের খারাপ ইমেজ সৃষ্টি হয়েছে। ‘খারাপ ইমেজ’ উদ্ধার করে এই ভবনকে একটি স্বচ্ছ, দক্ষ, গতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দ্রুত গড়ে তোলার জন্য এখানে কি না উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সবই মাঠে মরা। কোন হুঁশিয়ারি পরোয়ার করেন না এখানকার কর্মকর্তারা।
মাউশির অধীনে বর্তমানে প্রায় ৩৮ হাজার স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত। আর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী আছেন প্রায় পৌনে ৫ লাখ। এর বাইরে সরকারি ৩৩০টি স্কুল ও দুই শতাধিক কলেজ এবং মাদরাসাসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী আছেন আরও প্রায় ২২ হাজার। এসব শিক্ষক-কর্মচারীর প্রয়োজনীয় নানা কাজকর্ম পরিচালিত হয় এ ভবনেই।
গেট থেকে হয়রানি শুরু: ঝিনাইদহের দখলপুর সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদরাসার শিক্ষক মোতালিব। তিন মাস ধরে ঘুরছেন শিক্ষাভবনে। তার এমপিও ও সার্টিফিকেট বয়সের গরমিল। এটি ঠিক করাতে ৫ম তলার এক কর্মকর্তাকে ২০ হাজার টাকাও দিয়েছেন। কিন্তু আজ না কাল না পরশু। এসব বলে ঘুরাচ্ছেন তিন বছর ধরে। ভুক্তভোগী এই শিক্ষক বলেন, আগামী সেপ্টেম্বরে আমার চাকরির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর মধ্যে জুলাইয়ের মিটিং সমাধান না করতে পারলে ঝামেলায় পড়তে হবে। মাদরাসা শাখার খবর নিয়ে তিনি জেনেছেন, নরমাল প্রক্রিয়ায় নাকি এটি ১৫ দিনেই হয়ে যাওয়া সম্ভব। তিনি জানান, আমাদের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলার সুযোগটুকু পাচ্ছি না। গেটে কর্তব্যরত আনসাররা ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছেন না। বলেন, আগে শিডিউল নেন তারপর। ওই আনসারকে বারবার অনুরোধ করায় বিরক্ত হয়ে বলেন, সোজা বের হয়ে যান। না হয় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো। অসহায় কণ্ঠে ওই শিক্ষক বলেন, একজন শিক্ষককে যখন আনসার সদস্যের হাতে ঘাড় ধাক্কা করার হুমকি পেতে হয় তখন আর কিছু থাকে না।
বাইরে লেনদেন: শিক্ষাভবনের দুর্নীতিবাজ রুম হিসেবে পরিচিত প্রায় ২ ডজন রুমে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এটি প্রতিনিয়ত মনিটরিং করেন মহাপরিচালক ও প্রশাসন পরিচালক।
মাউশির সূত্র বলছে, শিক্ষাভবনে এখন প্রকাশ্যে লেনদেন হয় না। এখন লেনদেন হয় বাইরে। দেশের প্রত্যেক জেলায় তাদের এজেন্ট রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষকরা আগে থেকেই মুঠোফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষা ভবনে আসেন। এ ছাড়া ৯টি আঞ্চলিক কেন্দ্র তাদের প্রকাশ্য এজেন্ট আছে।
সিন্ডিকেটের কবলে শিক্ষা ভবন: পুরো শিক্ষাভবন নিয়ন্ত্রিত হয় কয়েকটি সিন্ডিকেটে। এ কারণে বারবার নানা উদ্যোগ নিয়ে দুর্নীতির রাহুগ্রাস দূর করা যাচ্ছে না। অতীতে একাধিক সিন্ডিকেট থাকলেও শিক্ষাভবনে বর্তমানে  একটি সিন্ডিকেট বিদ্যমান। সেটি হলো মহাপরিচালকের সিন্ডিকেট। বর্তমান মহাপরিচালক ঢাকা বোর্ডে চেয়ারম্যান থাকাকালে সেখানের কর্মরতকে তিনি শিক্ষাভবনে নিয়ে এসেছেন। উদ্দেশ্য তার বলয় গড়ে তোলা। তবে বর্তমান মহাপরিচালকের বেশ সুনাম রয়েছে। কিন্তু তার নাম ব্যবহার করে সিন্ডিকেটের কর্মকর্তারা নামে-বেনামে  দুর্নীতি-অনিয়ম করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। এর আগে ডিজির সময় শিক্ষা ভবনের ৬টি বেশি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ছিল। সিন্ডিকেট যন্ত্রণায় কাজ করতে পারতেন না তিনি। বর্তমান ডিজি আসার পর শাখা ও উপশাখায় কিছু সিন্ডিকেট কমানো গেলে মূল ধারার দুটি সিন্ডিকেট এখনও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য: কলেজ ও প্রশাসনের পরিচালক প্রফেসর ড. এসএম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, আমি যতক্ষণ  অফিসে থাকি পুরো সময় সিসি টিভি মনিটরিং করি। কিছু আগে গেটের বাইরে এক আনসার সদস্য একজন শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিল। তাৎক্ষণিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। অভিযোগ বাক্সে বিষয়টি আমি আসার পর খোঁজ খবর নেইনি।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম রনি বলেন, এই ভবনে দুর্নীতি করে প্রমোশন পেয়েছেন এরকম দৃষ্টান্ত ছিল। এখানে যতদিন সিন্ডিকেট মুক্ত না হবে ততদিন দুর্নীতি হয়রানি বন্ধ করা যাবে না। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে ২৮৭ শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও মাউশির একটি সংঘবন্ধ চক্র অবৈধভাবে করেছিল। বর্তমানে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা কোথায় আছেন? তারা কিন্তু শিক্ষাভবনের সঙ্গে যুক্ত।

মানব পাচারের প্রধান কারণ ‘রোহিঙ্গা’ -থাইল্যান্ড সম্মেলনে অভিমত

মানব পাচারের প্রধান কারণ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা। গত ২৯শে মে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসী সমস্যা নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ বিষয়টিই ঘুরেফিরে তুলে এনেছেন সম্মেলনে অংশ নেয়া বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা। ১৭টি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে মানব পাচাররোধে করণীয় এবং এই অঞ্চলে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেয়া বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আলোচনা হয়। জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা সমস্যাটি মানব পাচারের মূল কারণ বলে উল্লেখ করেন। সম্মেলনে বলা হয়, নিপীড়নের কারণে মিয়ানমারের হাজার হাজার মানুষ নিজ আবাসভূমি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এদের সঙ্গে কাজের সন্ধানে বাংলাদেশ থেকে কিছু মানুষও অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছে। এসব মানুষ বিদেশে পৌঁছে দেয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র জড়িত রয়েছে। সম্মেলন শেষে দেশে ফিরেই গত ৩১ শে মে বিষয়টি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদকে লিখিত আকারে সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান ও আলোচনা সম্পর্কে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়ার জন্য মুখ্য সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি। সম্মেলনে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (প্রটেকশন) মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী বা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধানের উপর জোর দেন। তিনি বলেন, বিষয়টি শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিক করার মাধ্যমে মানব পাচার সমস্যার টেকসই সমাধান খোঁজা উচিত। পররাষ্ট্র সচিব মানব পাচার রোধে বাংলাদেশের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, উদ্ধারকৃত ভিকটিমদের মধ্যে বাংলাদেশী হিসেবে শনাক্ত করা ব্যক্তিদের যথাশিগগির, সম্ভাব্য ক্ষেত্রে আগামী এক মাসের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেয়া হবে। মানব পাচার দমনে বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কোন ব্যত্যয়কে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন আইনি, প্রশাসনিক ও প্রচারণামূলক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতামূলক কার্যক্রমে সরকারের সক্রিয় ও সচেষ্ট কর্মতৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রপথে মানব পাচার সমস্যার গঠনমূলক ও স্থায়ী সমাধান করতে দেশের বাইরে কিছু বাস্তবতা ও নিয়ামকগুলোর বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিত মূল কারণ হিসেবে রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে যথেষ্ট সাহস ও দূরদর্শিতার সঙ্গে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। পররাষ্ট্র সচিবের চিঠিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মানব পাচারের মূল কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড ও পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশ সরাসরিভাবে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। তবে মিয়ানমারের প্রতিনিধি রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে পুরোপুরিভাবে আড়াল করে মানব পাচারের বিষয়টিকে মূলত একটি অর্থনৈতিক অভিবাসন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। অন্যদিকে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এ ব্যাপারে খুব খোলামেলাভাবে বক্তব্য না দিলেও রোহিঙ্গা সমস্যাটি যে সমুদ্রপথে মানব পাচার প্রবণতার প্রধানতম কারণ, ওই বিষয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের মতৈক্য পরিলক্ষিত হয়। এর ফলে মানব পাচারের ভিকটিমদের বাঙালি বা অবৈধ বাংলাদেশী হিসেবে ঢালাওভাবে চিহ্নিত করার ব্যাপারে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক অপকৌশল আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। চিঠিতে জানানো হয়, বৈঠকের শেষে আয়োজক দেশের পক্ষ থেকে মূল আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি খসড়া সার-সংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়। সার-সংক্ষেপটিতে অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচার রোধে তাৎক্ষণিক, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী কিছু কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয়। সার-সংক্ষেপে রোহিঙ্গা সমস্যাটি সরাসরিভাবে উল্লেখ করা না হলেও পরোক্ষভাবে এতে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, আত্মপরিচয়, মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। মানব পাচার প্রতিরোধে সম্ভাব্য ভিকটিমদের মানবাধিকার সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়গুলোতে আন্তর্জাতিকভাবে সহযোগিতা বাড়ানোর উপর জোর দেয়া হয়। একই সঙ্গে নিয়মিত অভিবাসন বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব তার চিঠিতে জানান, মিয়ানমারে রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও জাতীয়তা সম্পর্কিত সমস্যাটি জোরালোভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে। আপাত দৃষ্টিতে বাংলাদেশের জন্য সৃষ্ট বিব্রতকর পরিস্থিতি সাময়িকভাবে কিছুটা সামাল দেয়া গেলেও জাতীয় পর্যায়ে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনে জোরালো, দৃশ্যমান ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। এই সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে এবং মূল সমস্যার বিষয়ে সৃষ্ট ঐকমত্য আবারও দুর্বল হয়ে পড়বে।  উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত মহাসাগর এলাকায় মানব পাচারের ঘটনার উদ্বেগজনক বৃদ্ধি, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দুঃসহ ও মানবেতর পরিস্থিতি এবং থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় আবিষ্কৃত ভিকটিমদের গণকবর ও নির্যাতন শিবিরের কথা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে আসার প্রেক্ষিতে থাইল্যান্ডের সরকার এই বিশেষ বৈঠকটি আহ্বান করে। এতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডসহ মোট ১৭টি দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিগণ অংশ নেয়।