Tuesday, September 3, 2013

আশায় বুক বাঁধি by মোহিব্বুল মোক্তাদীর তানিম

মঙ্গলবার কক্সবাজারবাসীর জন্য আশার ও অনেক কিছু অর্জনের দিন। প্রধানমন্ত্রী তার ব্যস্ততম কক্সবাজার সফর করছেন।

বোরকা, মিতা হক ও তসলিমা নাসরিন by শামান সাত্ত্বিক

১৯৫২ এর একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে `৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের)

প্রেম করে বিয়ে, অত:পর? by অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

অনেক সময় ছেলে-মেয়েরা তাদের ভালোবাসাকে বাস্তবে রূপ দিতে একে অপরকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ের এ ধরণের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও আইনগত অধিকার আছে।

পাঁচ বছর বয়সেই পাইলট!

মাত্র পাঁচ বছর বয়স! এত্তটুকুন বয়সে মামা-চাচার কিনে দেওয়া ছোট্ট বাই-সাইকেলটিও ঠিকভাবে চালাতে পারার কথা নয়।

হেফাজতি তাণ্ডবের নির্দেশদাতা ওয়াক্কাস by ইমরান আলী

গত ৫ মে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধ চলাকালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরের মঞ্চ থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাস।

সিরিয়া সংকট থেকে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ? by আসীফ রশীদ

সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন হামলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া বিরোধ স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে- এমন আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়ায় সামরিক হামলার অনুমোদন সংক্রান্ত যে কোনো প্রস্তাবে ভেটো প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাশিয়া। এ ভেটো যুক্তরাষ্ট্রকে সিরিয়ায় হামলা থেকে বিরত রাখবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে ওয়াশিংটন। বস্তুত, সিরিয়া সংকট রাশিয়ার সঙ্গে ওবামার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে সবচেয়ে খারাপ পর্যায় নিয়ে গেছে। দুই পরাশক্তির এ বৈরী সম্পর্ক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত চলবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি স্নায়ুযুদ্ধকালীন সোভিয়েত-মার্কিন বিরোধের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য ছিল দ্বিমেরুকেন্দ্রিক। ১৯৪৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সময়ে সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন পূর্ব এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিম ব্লকের মধ্যে যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বিরাজমান ছিল, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সেটাই স্নায়ুযুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৯৯১ সালে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর সে পরিস্থিতি পাল্টে গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং আরও পরমাণু অস্ত্র হ্রাসকরণে অনীহার ব্যাপারে রাশিয়া এখনও অসন্তুষ্ট। বর্তমানে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য ফাঁসকারী এডওয়ার্ড স্নোডেনকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরে মস্কোর অস্বীকৃতি দুই পরাশক্তির সম্পর্ককে আরও শীতল করেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র মস্কোর ওপর এতই ক্ষুব্ধ যে, এ মাসে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠেয় জি-২০ সম্মেলনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। আর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় হামলা করতে চাওয়ায় রাশিয়া ওবামাকে ‘নতুন বুশ’ নামে অভিহিত করেছে। এসব কিছু রুশ-মার্কিন সম্পর্কের অবনতিই নির্দেশ করে। অনেকে তো সিরিয়াকে কেন্দ্র করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেরই আশংকা করছেন।
রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত সিরিয়ায় মার্কিন হামলার ব্যাপারে রাশিয়ার বিরোধিতার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। সিরিয়া সরকারের প্রতি মস্কোর সমর্থনের অর্থ অবশ্যই এই নয় যে, রুশরা অমানবিক অথবা বাশার সরকারের প্রতি মোহাচ্ছন্ন। তবে পশ্চিমা বিশ্বের কথিত উদ্দেশ্যের ব্যাপারে রুশদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। পশ্চিমারা বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ব্যাপারে যে ওকালতি করে থাকে, রাশিয়া তাকে ভণ্ডামিপূর্ণ এবং বিশৃংখলা সৃষ্টির পাঁয়তারা বলে মনে করে। পশ্চিমাদের ভণ্ড মনে করার কারণ, নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে সমস্যা হলে তারা তাদের কথিত গণতান্ত্রিক উদ্দেশ্য ‘স্থগিত’ রাখতেও দ্বিধান্বিত হয় না। মিসরের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিই তার প্রমাণ। আর বিশৃংখলা সৃষ্টির পাঁয়তারা মনে করার কারণ, পশ্চিমারা স্থিতিশীল সরকারগুলোকে অস্থিতিশীল করে কেবলই নতুন নতুন দানবের আবির্ভাব ঘটায়। যেমন- আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার পর সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে সেখানে আল কায়দার উত্থান ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার ককেশীয় অঞ্চলেও মৌলবাদীদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার পেছনে পশ্চিমের ইন্ধন ছিল। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার দুই বন্ধুভাবাপন্ন সরকার- ইরাকের সাদ্দাম ও লিবিয়ার গাদ্দাফি সরকারকে উৎখাত করেছে পশ্চিমা বিশ্ব। সিরিয়ার বন্ধুভাবাপন্ন সরকারের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটুক, স্বভাবতই রাশিয়া তা চায় না। মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার একমাত্র নৌঘাঁটিটি সিরিয়ায় অবস্থিত। সিরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের দখলে চলে গেলে এটি নিশ্চিতভাবেই হুমকির সম্মুখীন হবে। যুক্তরাষ্ট্র যতই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে বাশার সরকারকে শাস্তি দিতে ‘সীমিত যুদ্ধ’ এবং ‘সরকার পরিবর্তনের ইচ্ছা না থাকা’র কথা বলুক, বাস্তবতা হল, পশ্চিমারা একবার সিরিয়ায় সামরিক হামলা চালালে দেশটিতে তাদের হস্তক্ষেপ আরও গভীরে প্রবিষ্ট হবে। সিরিয়ার পরিস্থিতি তখন ইরাক ও লিবিয়ার চেয়ে ভিন্ন কিছু হবে না। রুশ বিরোধিতার আরেকটি বড় কারণ, গণতান্ত্রিক অধিকারের ব্যাপারে পশ্চিমা হস্তক্ষেপকে রাশিয়া নিজ সরকারের প্রতি সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখে থাকে। যেমনটা দেখে থাকে সিরিয়া হামলার অপর বিরোধিতাকারী চীন।
তবে ঘটনা যা-ই ঘটুক না কেন, সিরিয়ায় হামলা হওয়ার পর রাশিয়া যদি নীরবও থাকে তাতেও মস্কোরই লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। সিরিয়ায় স্থল হামলা চালানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। হামলা হবে প্রথমত যুদ্ধবিমান থেকে। ইরান ও হেজবুল্লাহর সহায়তায় সিরিয়া সরকার মার্কিন বিমান হামলার জবাব দিতে থাকলে পাইলটদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে। আর পাইলটদের প্রাণহানি ঘটলে পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের কাছে এটা গ্রহণযোগ্য হবে না। সবচেয়ে সম্ভাব্য পন্থা হল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ। এতে সিরিয়ার বাশার আল আসাদের সরকার ক্ষতির সম্মুখীন হবে, সন্দেহ নেই। তবে রাশিয়া ও ইরান যে-কোনো ক্ষতি থেকে উত্তরণে সিরিয়াকে সহায়তা করতে পারবে। ফলে বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বৈরিতার অবসান ঘটাবে না। অর্থাৎ এ হামলা সিরিয়ায় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে আসতে সক্ষম হবে না।
অন্যদিকে নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে সমর্থন বাশার আল আসাদের সরকারই পাবে, অন্তত উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং নিশ্চিতভাবেই রাশিয়ার কাছ থেকে। সিরিয়ায় হামলার বিরুদ্ধে প্রচারণার ধরন ১০ বছর আগের ইরাক হামলার মতোই হবে। যুক্তরাষ্ট্র এ আগ্রাসনের জন্য বৈশ্বিক উৎপীড়ক হিসেবে চিত্রিত হবে। ইরান হবে উল্লসিত। আর সিরিয়ার অসংখ্য মানুষ পশ্চিমের নতুন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তুলবে প্রতিরোধ।
এ পরিস্থিতিতে বেশি লাভবান হবে রাশিয়া। পশ্চিমা শক্তি যত বেশি এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, সে পরিস্থিতি একটি ‘বৈধ কর্তৃপক্ষ আক্রান্ত’ বিবেচনায় বাশার সরকারকে সহায়তা করতে রাশিয়ার জন্য তত বেশি সুবিধা এনে দেবে। যেহেতু স্থল অভিযানের সম্ভাবনা নেই, সেহেতু ঘটনার শেষে হয়তো দেখা যাবে, বাশারের সরকারই কেবল টিকে যায়নি- পশ্চিমা শক্তি, তুরস্ক ও আরব লীগের বিরুদ্ধে এ বৈশ্বিক সংঘাতে জয়ী হয়েছে রাশিয়া ও ইরান।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা বোঝাতে চাইছেন, শাস্তিমূলক হামলার উদ্দেশ্য সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তন নয়, কিংবা বাশারের সঙ্গে সরকারবিরোধীদের বোঝাপড়ার একটা সুযোগ করে দেয়াও নয়। তারা বলছেন, ‘আমরা শুধু একনায়ককে শাস্তি দিতে চাই এবং তাকে একটি বার্তা দিতে চাই : আর কখনও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা যেন তারা চিন্তাও না করে।’ ধরে নেয়া গেল, বাশার আর কখনও এসব অস্ত্র ব্যবহার করবেন না। কিন্তু এর মানে কি এ যুদ্ধে তার পরাজিত হওয়া?
কোনো কোনো পর্যবেক্ষক মনে করেন, সিরিয়ায় পশ্চিমা হুমকি বা হামলার পর বাশার আল আসাদ ছাড় দেয়ার ব্যাপারে নমনীয় হবেন। এ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, তিনি একটি শান্তি সম্মেলনের বিষয়ে রাজি হবেন এবং সরকারবিরোধীদের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিকে তাদের সঙ্গে আলোচনা করার কর্তৃত্ব দেবেন। তবে সেক্ষেত্রে এটা নিশ্চিত যে বিদ্রোহীরা, বিশেষ করে যারা আল কায়দার সঙ্গে যুক্ত, তারা কখনও এ আয়োজন মেনে নেবে না।
অনেকে জোর দিয়ে বলে আসছেন, সিরিয়া সমস্যার একমাত্র সমাধান হল বাশারকে নমনীয় পথে আনা। হতে পারে সেটা ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি করানোর জন্য ভ­াদিমির পুতিনকে চাপ দেয়া। তবে খুব কম লোকই বিশ্বাস করে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এ ধরনের কিছু করবেন এবং বাশার আল আসাদ তৎক্ষণাৎ পদত্যাগ করে সিরিয়া ছেড়ে চলে যাবেন। বরং যখন তিনি দেখবেন ইরান ও হেজবুল্লাহর কল্যাণে ভাগ্যের চাকা তার অনুকূলে, তখন তিনি আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। আসলে তিনি যথেষ্ট শক্ত অবস্থানেই রয়েছেন এবং এখন তাকে যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে।
অন্যদিকে পুতিনের আপসহীনতা দেখে মনে হয়- শেষ পর্যন্ত বাশারের সরকার যদি ভেঙেও পড়ে, তাতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পরাজিত হিসেবে বিবেচিত হবেন না, অন্তত নিজ দেশের জনগণের কাছে, যা তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুতিন যদি কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা আপস করেন, তাতেই বরং তাকে পরাজিত মনে হবে। কারণ তখন এর ব্যাখ্যায় বলা হবে, তিনি মার্কিন চাপের কাছে নতিস্বীকার করেছেন। এটা রুশ জনগণের কাছে হবে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। সিরিয়ায় মার্কিন হামলা হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ হবে না। তবে তা বিশ্ব ব্যবস্থায় স্নায়ুযুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হবে স্বয়ং হামলাকারীরই। মার্কিন খবরদারি থেকে বিশ্ব কিছুটা হলেও রেহাই পাবে তখন।
আসিফ রশীদ : সাংবাদিক ও লেখক

সংকট উত্তরণে কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি দিন by ইমতিয়াজ মোহাম্মদ তালুকদার

দেশে গণতন্ত্রের সূচনালগ্ন থেকেই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে কমবেশি সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যায়। যখন যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিজ দলের স্বার্থে নেয়ার খেলায় মেতে ওঠে। এ কারণে বর্তমানেও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এক সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দেশ জাতি রসাতলে যাক, সেদিকে কোনো দলের ভ্রুক্ষেপ নেই। জনগণ এর যাঁতাকলে পড়ে পিষ্ট হতে চলেছে। তবু স্বার্থের কারণে যে যার অবস্থানে অটল। দুই দলের সংলাপ নিয়ে বিশিষ্টজন, সুশীল সমাজ, সাধারণ মানুষ- প্রায় সবাই একই কথা বলছেন। আমার মতে, সংলাপ হতে হবে বর্তমান সংসদের প্রতিনিধিত্বকারী দলের প্রতিনিধির মাধ্যমে। শুধু জননেত্রী ও দেশনেত্রী নয়। নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা হতে হবে। বিষয়বস্তু ছাড়া আলোচনা ঝগড়াঝাটির মধ্যেই শেষ হবে, কোনো ফলাফল পাওয়া যাবে না। দেশ ও জনগণের স্বার্থে যা যা করার, তাই করতে হবে। আমরা প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে অহেতুক পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেখেছি, যেমন জিয়া ঘোষক না মুজিব ঘোষক। ডিম আগে না মুরগি আগে- এসব তর্ক কোনোদিনও শেষ হবে না। আমাদের সুশৃংখলভাবে সামনে এগিয়ে যেতে যা যা করার দরকার, তাই করতে হবে। ধরে নেয়া যাক, সব দলই দেশপ্রেমিক, দেশের মঙ্গলের জন্য সবাই কাজ করতে চায়, সেজন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দরকার। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হল সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। অভিজ্ঞতা বলে, ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করলে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। এটা প্রমাণিত। তাই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির প্রচলন করা হয় এবং প্রয়োগ করা হয়। এ পদ্ধতির সরকার-ব্যবস্থায় নির্বাচন নিয়ে সামান্য বিতর্ক থাকলেও গ্রহণযোগ্যতা মোটামুটি ভালো। এটাও প্রমাণিত। সূক্ষ্ম কারচুপি, স্থূল কারচুপি, পুকুর চুরি, মিডিয়া ক্যু, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পাতানো নির্বাচন- এ পদ্ধতির নির্বাচনকে ঘিরেও এসব অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে সেসব ধোপে টেকেনি। তাই গ্রহণযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির সঙ্গে অন্য দেশের তুলনা করলে চলবে না। ইদানীং পাকিস্তানেও এর সফল প্রয়োগ দেখা গেছে।
বর্তমানে সাংবিধানিকভাবে এ পদ্ধতিটি জটিলতার আবর্তে পড়ে গেছে। তবে সব জটিলতার অবসান হতে পারে সব দলের আন্তরিকতার ওপর। বর্তমান সংকট উত্তরণের জন্য সংলাপের একটি তাগিদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ কারণে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার চিন্তা-চেতনা থেকে কিছু আলোকপাত করতে চাই।
১. বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দেশের অভিভাবক। আমার ধারণা, যিনি এ পদ অলংকৃত করেন, তিনি যে দলেরই হোন না কেন, চিন্তা-চেতনা এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে তিনি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেন। আমি মনে করি, নির্বাচনকালীন তিনি রাষ্ট্রের সিইও বা প্রধান নির্বাহী হিসেবে যাবতীয় নির্দেশনা প্রদান করবেন। সংসদের মেয়াদান্তে সংসদ ভেঙে দেবেন এবং এ কারণে সব দলের মনোনীত প্রার্থীরা লেভেল প্লেইং ফিল্ডে চলে আসবেন। রাষ্ট্রপতির অধীনে একটি ছোট আকারের উপদেষ্টা পরিষদ/কেবিনেট থাকবে এবং তারা কেবল রাষ্ট্রের রুটিন কার্য পরিচালনা করবেন। তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। যোগ্যতাসম্পন্ন যে কোনো নাগরিককে নিয়োগ দিতে পারবেন। মেয়াদকাল ২-৩ মাসের বেশি নয়।
২. বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিষয়ে বলার কিছু নেই। শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তারা যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। দেশে যত প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ এসেছে, তার সবই সুনামের সঙ্গে তারা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছেন। এর সর্বশেষ উদাহরণ রানা প্লাজা দুর্ঘটনার উদ্ধার কাজ পরিচালনা। আমার ধারণা, বর্তমানে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যে কর্মকাণ্ড চলছে, তাও এক ধরনের দুর্যোগ। এ দুর্যোগ মোকাবেলায় সেনাবাহিনী এগিয়ে আসতে পারে, সহযোগিতা করতে পারে। তাদের সহযোগিতায় আমরা একটি নির্ভুল জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের তদারকির ভার সম্পূর্ণভাবে সেনাবাহিনীর ওপর অর্পণ করা যায়। তাদের কাজ হবে, নির্বাচন চলাকালীন যেসব ঝামেলার সৃষ্টি হয়, তা সুষ্ঠুভাবে মোকাবেলা করা; যেমন- সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ, গণনা, ফলাফল প্রকাশ, ভোটারদের যাতায়াত নির্বিঘœ করা, শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখা, জাল ভোট বন্ধ করা, ভোট কেন্দ্র দখল, বাক্স ছিনতাইসহ সব ধরনের অবাঞ্ছিত কার্যকলাপ মোকাবেলা করা। অন্যান্য আইন-শৃংখলা বাহিনীও এসব কাজে সহযোগিতা করবে। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সেনাবাহিনী কর্মস্থলে ফিরে যাবে।
৩. নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে এবং তাদের সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে। নির্বাচন পরিচালনায় তাদের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রশংসিত হোক এ প্রত্যাশা দেশবাসীসহ আন্তর্জাতিক মহলেরও। যেসব প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, তাদের সবাইকে লেভেল প্লেইং ফিল্ডে আসতে হবে, কোনোভাবেই ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন নয়। প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী ব্যয় যাতে অতিক্রম না করেন, তা মনিটর করতে হবে কমিশনকে। যেসব প্রার্থী মনোনয়ন পাবেন, তাদের অবশ্যই যোগ্য হতে হবে। সংসদ, আইন প্রণয়ন ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে। জনগণের নার্ভ বুঝতে হবে। মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত, বক্তব্য এবং সব তথ্য গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে। আমার ধারণা, বর্তমানে যে পদ্ধতিতে নির্বাচন হচ্ছে তা মার্কাকেন্দ্রিক প্রার্থীকেন্দ্রিক নয়। অনেক ভোটার প্রার্থীকে চেনে না, কিন্তু মার্কাকে ঠিকই চেনে। এর ফলে উপযুক্ত প্রার্থীরা অনেক সময় নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন না। তাই আমার প্রস্তাব, নির্বাচনী প্রতীক বিতরণ নিরপেক্ষভাবে লটারির মাধ্যমে করা অর্থাৎ চিরাচরিত প্রতীকগুলো বাদ দেয়া। আমার মনে হয়, এ পদ্ধতিতে ভোটাররা প্রার্থীর যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারবে। দলগুলোও তখন উপযুক্ত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে।
সবশেষে দেশের সম্মানিত ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের প্রতি আমার আবেদন, আর হিংসা-বিদ্বেষ নয়, অতীতের তিক্ততা ভুলে গিয়ে অমিয় সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশের দিকে তাকান। আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই। ১৬ কোটি মানুষ আপনাদের চেনে। আপনারাই পারেন দেশে শান্তির নহর বইয়ে দিতে। আপনারা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন, চাওয়া-পাওয়ার অবশিষ্ট আর নেই বললেই চলে। সুতরাং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যারাই ক্ষমতায় যাবেন, তারা সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে নতুন প্রত্যয়ে দেশ পরিচালনা করবেন। তাহলেই দেশের উন্নতি নিশ্চিত হবে।
ইমতিয়াজ মোহাম্মদ তালুকদার : প্রাবন্ধিক

আওয়ামী লীগকে ভোট দেব by নুরুল ইসলাম বিএসসি

আলোচনার সূচনায় আমরা কেন আওয়ামী লীগ করি, তা খতিয়ে দেখা দরকার। আমার বিশ্বাস, আমরা যারা আওয়ামী লীগ করি, কেউ মুখস্থ আওয়ামী লীগ করি না। দেখেশুনে, জেনে আওয়ামী লীগ করি। আওয়ামী লীগ যা চায়, আমরাও হৃদয়ে তা ধারণ করি বলেই হৃদয়ের চাওয়া-পাওয়ার মিলের কারণে আওয়ামী লীগ করি। আওয়ামী লীগ ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে হৃদয়ে ধারণ করে। আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস রাখে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা চর্চা করে। আওয়ামী লীগ জাতির পিতার বাংলাদেশে বিশ্বাস রাখে। আমরা যারা আওয়ামী লীগ করি, আমাদের চাওয়া ও পাওয়ার সঙ্গে আওয়ামী লীগের চাওয়া-পাওয়ার মিল আছে বলেই আমরাও আওয়ামী লীগ করি।
’৭১ সালে বিএনপির জন্মই হয়নি। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস এদের থাকবে, এ কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। বিএনপি জেনারেল জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা বলেন। আমরাও মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান অস্বীকার করি না। প্রশ্ন থাকে, মুক্তিযুদ্ধের সময় কামারুজ্জামান, সাঈদী বা গোলাম আযম জেনারেল জিয়াকে সামনে পেলে ছেড়ে দিত কি? নিশ্চয়ই দিত না। তবুও কেন এদের জন্য বিএনপির এত দরদ? এদের বাঁচাতে বিএনপির শত চেষ্টা মানুষকে আহত করে। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের জন্মই হয়নি, সেই ছাত্রশিবির কর্মীদের কাছে আহ্বান জানাতে ইচ্ছা করে, দলকে কলুষমুক্ত করুন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার চেষ্টা করুন। আপনাদের পিতা-মাতা, দাদা-দাদির কাছ থেকে জামায়াতের তাণ্ডব সম্পর্কে জেনে নিন। দেখবেন আপনাদের হৃদয় পরিষ্কার হয়েছে, জামায়াতের প্রতি ঘৃণা জন্ম নিয়েছে।
আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে এজন্যই ভোট দিতে চাই, তারা এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে, জঙ্গিবাদ দমনে এদের বিকল্প নেই। যারা নারীদের তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে, দিলে লালা পয়দাস করে, আবার এদের হয়ে সংসদে যারা সাফাই গায়, এদের ভোট দেব কেন?
বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের যে সখ্য, তা নিয়ে দেশের মানুষ বিভ্রান্ত। তেঁতুল হুজুর বলেছেন, মেয়েদের পঞ্চম শ্রেণীর বেশি পড়াতে নেই। হুজুরের কাছে প্রশ্ন, আমার মেয়ের যখন বাচ্চা হবে, হাসপাতালে যখন নিয়ে গেলাম, স্বাভাবিক কারণে আমি একজন মহিলা ডাক্তার, মহিলা নার্স চাইব। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত মহিলারা পড়াশোনা করলে আমি মহিলা ডাক্তার পাব কোথায়? হুজুর কি সব মহিলাকে পুরুষ ডাক্তার দিয়ে প্রসবকালীন সেবা দিতে চান? আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর হুজুরের কাছে আছে কি-না জানা নেই, তবে এই হুজুরের সঙ্গে হাত মেলানোর ফলে বিএনপিকে আমরা ভোট দিতে চাই না।
জামায়াত একটি যুদ্ধাপরাধী দল, সন্ত্রাসী দল। কথাটা আমার নয়, আদালতের। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যারা হাত মেলায়, এরাও সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ লালন করে। এদের সঙ্গে যারা হাত মিলিয়েছেন, এদের কেন দেশের মানুষ ভোট দেবে? এর চেয়ে বরং আওয়ামী লীগ- যারা প্রগতির স্রোতে বিশ্বাস রাখে, বিজ্ঞানের জগতে দেশবাসীকে সম্পৃক্ত করে- তাদেরই ভোট দেব।
আওয়ামী লীগ সব কাজ শুদ্ধ করেছে এমন দাবি করছি না। কিন্তু যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, একজন দল-দাসও তা অস্বীকার করতে পারবেন না। আওয়ামী লীগ সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন করে। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন করে। আওয়ামী লীগের বিগত সাড়ে চার বছরে উন্নয়নের ফলাফল জাতি যুগ যুগ ধরে ভোগ করবে। বিএনপির পক্ষে এত সব উন্নয়ন কখনও সম্ভব নয়। কারণ বিএনপির মূল শেকড় জামায়াত, যারা এদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস রাখে না। এরা দেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে মেলানোর এখনও স্বপ্ন দেখে। তাই আমরা আওয়ামী লীগকেই ভোট দেব।
সব দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে আমরা ঠিক করেছি আগামীতে আওয়ামী লীগকেই ভোট দেব এবং দেশের উন্নয়নের গতিধারাকে অব্যাহত রাখব। এর ব্যতিক্রম হলে দেশ মধ্যযুগে প্রবেশ করবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বসবাসকারীরা, সূর্য সন্তানরা এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হবে।
নুরুল ইসলাম বিএসসি : সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক

দুই নেত্রীর সমঝোতা ও নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাঙালি জনগণ বেশ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তন থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন মিলনায়তনে এ ব্যাপারে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেন এ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা? বর্তমান সংসদের মেয়াদ ২০১৪ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে সমাপ্ত হবে। অতীতে নিয়ম ছিল, সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে আনুমানিক ৯০ দিনের মধ্যে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তত্ত্বাবধায়কের মেয়াদ শেষ হয়ে যেত। এ ব্যবস্থাটির নাম ছিল নিরপেক্ষ-নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি। এ বিধান বা ব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহে। এ বিধানটি সংবিধানে প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাজপথ কাঁপিয়ে কঠোর আন্দোলন করেছিল তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। এ আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল জামায়াতে ইসলামী।
একটু পেছনে যাই। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তিনটি রাজনৈতিক জোটের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ও গণআন্দোলনের মুখে যখন পদত্যাগ করেন, তখনও একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১৯৯০ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। তিনি ১০ জন উপদেষ্টা নিয়েছিলেন। তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেন। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তরুণ পাঠকরা হয়তো জানেন না, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন শেষে আবার বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদে অধিষ্ঠিত হন। কারণ তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের আগে রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এ শর্ত দিয়েছিলেন- ‘আপনাদের অনুরোধে আমি প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু দায়িত্ব পালন শেষে আমাকে আবার প্রধান বিচারপতি পদে ফেরত যেতে দিতে হবে।’ রাজনৈতিক দলগুলো এ শর্ত মেনে নিয়েছিল। পরে এ বিষয়টি বাংলাদেশ সংবিধানে সংশোধন করা হয়। এর জন্য প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ বা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার কোনো অবকাশ নেই। কারণ ওই মুহূর্তে এটিই ছিল সময়ের দাবি এবং রাজনৈতিক সংকট এড়ানোর একমাত্র পথ। ১৯৯০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এ বিষয়টি কারও চিন্তায় আসেনি যে, বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি আবার দরকার হতে পারে।
১৯৯৬ সালের মার্চে যে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তাতে কিছু ভুল-ত্র“টি ছিল। ভুল-ত্র“টি থাকাটাই স্বাভাবিক। স্থানাভাবে আমি সে ব্যাপারে আলোচনা করছি না। ১৯৯৬ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠিত দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালের জুনে একবার, ২০০১ সালের অক্টোবরে একবার এবং ২০০৬ সালে একবার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতার পালাবদল শান্তিপূর্ণভাবে ঘটেনি। কেন ঘটেনি? তার ব্যাখ্যা সংক্ষিপ্তভাবে করছি। কেননা ব্যাখ্যা না করলে ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সংকটের কারণটি স্পষ্ট হবে না। সে সময় বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতায় থাকাবস্থায় বিএনপি সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি মহোদয়দের চাকরির বয়সসীমা দু’বছর বাড়িয়ে দিয়েছিল। এখন যেমন সরকার দেশব্যাপী সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরির বয়সসীমা দু’বছর করে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও বয়স বাড়ানোর অনুমোদন সম্পর্কে পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারছি। ২০০৬ সালে প্রশ্ন উঠেছিল, হঠাৎ বিএনপি সরকার সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের বয়স কেন বাড়াল? আওয়ামী লীগ বলেছিল, বিএনপি বয়স বাড়িয়েছে এজন্য যে, ওই সময় দায়িত্ব পালনরত বিচারপতি মহোদয়ের দায়িত্ব পালনে মেয়াদ বেড়ে যাবে। ফলে ২০০৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রশ্ন উঠবে, তখন নিয়ম অনুযায়ী সেই বিচারপতি কেএম হাসান মহোদয়ই হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান। ওই সময়ের আওয়ামী লীগের মতে, ওই সময়ের ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এমনটিই প্রত্যাশা করছে। ওই সময়ের আওয়ামী লীগের মতে, প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হলে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সুবিধা হবে, কারণ প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান বিএনপি মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি। সুতরাং জাতীয় নির্বাচনে সুবিধা তাদের দিকেই গড়াবে। অতএব বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। কিন্তু ২০১৩ সালে স্বয়ং আওয়ামী লীগ প্রধানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করা হবে এবং সেই সরকারের নেতৃত্বেই সবাইকে নির্বাচনে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ইংরেজিতে এটাকে আয়রনি বলা যায়।
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ শুরু হয়েছে। প্রায় দু’বছর চার মাস আগে হঠাৎ করেই বর্তমান সরকার সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দেয়। বাতিল করার আগে তারা একটি খোঁড়া অজুহাত দাঁড় করায়। সুপ্রিমকোর্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি গণতন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি-না এ ব্যাপারে একটি মামলা হয়েছিল। সেই মামলার বিচারকার্য চলার সময় সুপ্রিমকোর্টই আদালতের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রখ্যাত আইনজীবীদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন এ ব্যাপারে মতামত ব্যক্ত করতে। দেশের প্রখ্যাত সাতজন আইন বিশেষজ্ঞ সুপ্রিমকোর্টে দাঁড়িয়ে মতামত দিয়েছিলেন গণতন্ত্র ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির মধ্যে সম্পর্ক কী ধরনের। ওই সাতজনের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঁচ বা ছয়জন বলেছিলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ও গণতন্ত্রের মধ্যে কোনো সংঘাত নেই।’ একজন অথবা দু’জন বলেছিলেন, না, সংঘাত আছে। সুপ্রিমকোর্টের বেঞ্চের যারা শুনেছিলেন, তাদের মধ্যেও মতভেদ ছিল। বেঞ্চের তিনজন বিচারপতি বলেছিলেন, সংঘাত আছে। দু’জন বিচারপতি বলেছিলেন, সংঘাত নেই। বাংলাদেশের সংবিধানকে সংশোধন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ ব্যাপারে সংবিধান সংশোধনী সুপারিশ কমিটি নামে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ কমিটি দেশের বিভিন্ন পেশাজীবী, সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি-না এ ব্যাপারে মতামত চায়। ওই জরিপে একজনকেও পাওয়া যায়নি, যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি গণতন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বা সাংঘর্ষিক এমন মতামত ব্যক্ত করেছেন। সাজেদা চৌধুরী ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যারা এর নেতৃত্বে ছিলেন, তারাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিপক্ষে কোনো কথা উচ্চারণ করেননি। তাহলে সংবিধান সংশোধনী কমিটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে সুপারিশ উপস্থাপন করল, সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির প্রতিকূলে কিছু না থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে সেটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের সুপারিশসহ কীভাবে বের হয়ে এলো? জবাবে বলতেই হয়, অদৃশ্য গায়ের জোরে বা অপ্রকাশিত পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে। আর তা বাস্তবায়নের জন্য সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো আছেই। এ ইতিহাস বর্ণনা না করলে বর্তমান তরুণ সমাজের কাছে এ ঘটনা অজানা থেকে যেত। তাই এখানে তুলে ধরলাম।
এভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধান থেকে বাতিল হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী প্রচার করতে থাকলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি গণতন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তাই একে বাতিল করা হল। আসলে সুপ্রিমকোর্ট মৌখিকভাবে ৭-১০ লাইনের একটি রায় দিয়েছিলেন এবং সেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির আওতায় আরও দুই মেয়াদে নির্বাচন হতে পারে। শুধু তাই নয়, এ মৌখিক রায়ের প্রায় দেড় বছর পর তারা লিখিত রায় প্রকাশ করেন। শুধু মৌখিক রায়ের ওপর ভিত্তি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। সুতরাং গায়ের জোরে কী করা যায় বা যায় না তার উদাহরণ যদি পৃথিবীর সংবিধান রচনাকারীরা দেখতে চান, তাহলে তাদের অবশ্যই বাংলাদেশে আসতে হবে গবেষণার জন্য।
বিভিন্ন মিডিয়ায় বারবার বলা হচ্ছে, দুই নেত্রী তাদের নীতিতে অনড় থাকলে দেশ কঠিন সংকটের মুখে পতিত হবে। এই দুই নেত্রীর মধ্যে একজন নেত্রীর সহকর্মী হিসেবে আমি কাজ করে যাচ্ছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে আমি একটি প্রশ্ন তুলতে চাই। প্রশ্নটি অনড় থাকার ব্যাপারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে নিয়ম ভেঙেছেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধান থেকে বাতিল করে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছেন। বেগম খালেদা জিয়া তো কোনো সংকট সৃষ্টি করেননি। তিনি শুধু নিয়মের আবর্তে থেকে জাতীয় নির্বাচন চাইছেন। সুতরাং বেগম খালেদা জিয়া অনড়ও নন, নড়ও নন। তিনি স্বাভাবিকতা তথা যা ছিল তা-ই চাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী যদি এ সমস্যা সৃষ্টি না করতেন, তাহলে বেগম খালেদা জিয়া কর্তৃক নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি পুনরায় উত্থাপনের প্রশ্নটি আসত না। সুতরাং যিনি সমস্যা সৃষ্টি করেছেন, তাকেই তার অনড়ত্ব ভাঙতে হবে। এতে দেশ এক কঠিন সংকট থেকে রক্ষা পাবে। আমি দুটি আপাত অবিশ্বাস্য বিষয়ের বর্ণনা দিতে চাচ্ছি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের সারমর্ম ছিল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি স্থাপন করতে না পারলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক চেতনা ধ্বংস হয়ে যাবে।’ ২০১৩ সালে সরকারে অধিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি স্থাপিত হলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক চেতনা ধ্বংস হয়ে যাবে।’। ইংরেজিতে এটাকেও আয়রনি বলা যায়।
শেষে দু’-একটি কথা না বললেই নয়। পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে যাওয়ার পর তারা জবাব দিল- ‘আওয়ামী লীগ হেরেছে, গণতন্ত্র জয়ী হয়েছে’। এ মুহূর্তে চলমান সংকটে মানুষের নিরাপত্তা ও দেশের শান্তি বড়, নাকি সাংবিধানিক গণতন্ত্র বড়? আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রণীত, আওয়ামী সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করা পঞ্চদশ সংশোধনী, যার উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগকে সুবিধা দেয়া, সেই সংশোধনীর অধীনে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে জেতানোর জন্য ১৮ দলীয় জোট হাসতে হাসতে নির্বাচনে যাবে, এটা কল্পনা করা অবান্তর। ২২টি টিভি চ্যানেলে এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মানুষের মতামত জরিপ করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তার উপদেষ্টামণ্ডলী সবাই পত্রিকা পড়েন, টিভি দেখেন। নিশ্চয়ই জনমত জরিপগুলোও তাদের নজরে আসে। এসব জরিপে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান কী, সেটা নিশ্চয়ই তারা জানেন। তারা যদি এসব জরিপকে না মানেন বা অগ্রাহ্য করেন, তাহলে তাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা নির্বাচন কমিশন ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে এ মুহূর্তে একটি গণভোটের ব্যবস্থা করুন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে কী হবে না, তার জন্য হ্যাঁ অথবা না মতামত দেবে জনগণ। জনগণ যে রায় দেবে, আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের মানুষ তথা সারা বিশ্বের মানুষ সেটা মেনে নেবে। অতএব শুধু জেদের বশবর্তী হয়ে দেশের মানুষকে আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রাখবেন না- এটাই কামনা ও প্রার্থনা।
মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক : কলাম লেখক; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

হামলা ভোটে বিচক্ষণ হোন : সিরিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান রেখে সিরিয়া বলেছে, হামলা ভোটে বিচক্ষণ হোন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা শনিবার সিরিয়া হামলার ব্যাপারে কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের সিদ্ধান্ত নেবেন বলে ঘোষণা দেয়ার পর রোববার সিরিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল মুকদাদ সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। এ সময় তিনি ২১ আগস্ট রাসায়নিক হামলার অভিযোগ সরকারের পক্ষ থেকে আবারও প্রত্যাখ্যান করেন। খবর এএফপির। ফয়সাল মুকদাদ আরও বলেন, ফ্রান্স সরকার সিরিয়া হামলার ব্যাপারে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। হামলার জন্য ফরাসিদের সমর্থন আদায়ে তাদের সরকার প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। এদিকে সিরিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী কাদরি জামিল বলেছেন, তার দেশের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। তিনি লেবাননের আল-মিয়াদিন টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সিরিয়ায় মার্কিন হামলার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তার দেশের সেনাবাহিনী আগ্রাসী শক্তির দাঁতভাঙা জবাব দেবে।
যুদ্ধ পিছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত থেকে মার্কিন কর্মকর্তাদের হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে- উল্লেখ করে সিরিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার বিষয়টিও স্বীকার করে নেয়া উচিত। তিনি বলেন, আমেরিকার বর্তমান অবস্থা দেখে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার প্রভাব কমে গেছে এবং দেশটি সব ক্ষেত্রে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। এদিকে জাতিসংঘের অনুমতি থাকলেই সিরিয়ায় সামরিক অভিযানকে সমর্থন দেবে ভারত। জাতিসংঘের বাইরে গিয়ে যদি যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় অভিযান চালায় তাতে সমর্থন জানাবে না ভারত। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ সিরিয়া প্রসঙ্গে পশ্চিমাদের তোড়জোড় নিয়ে এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানালেন। তিনি বলেছেন, সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালাতে হলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন লাগবে। তখনই ভারত তাতে সমর্থন দেবে। দামেস্কে রাসায়নিক হামলায় কয়েকশ’ মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারের দায়ী করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুরশিদ শনিবার বলেন, আমরা এমন কোনো অভিযানে সমর্থন দিতে পারি না, যেখানে জাতিসংঘের অনুমোদন নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে সিরীয়রা এফবিআই’র নজরদারিতে : সিরিয়ায় সম্ভাব্য মার্কিন সেনা অভিযানকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সিরীয়দের নজরদারিতে রেখেছে দেশটির আভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। রোববার নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়। আভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ও ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় হামলা চালালে প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাইবার হামলা হতে পারে। রোববার এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সমর্থক সিরিয়ান ইলেক্ট্রনিক আর্মি টাইমসসহ বেশ কয়েকটি আমেরিকান কোম্পানিতে সাইবার হামলা চালিয়েছে। পত্রিকাটি জানায়, আগামী দিনগুলোতে এফবিআই’র এজেন্টরা কয়েকশ’ সিরীয়র সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছে। সিরিয়ায় যে কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে ইসরাইলে হামলা করা হবে বলে সিরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরান হুশিয়ার করায় মার্কিন কর্মকর্তারা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন।
নমুনা পরীক্ষায় ৩ সপ্তাহ লাগবে : সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার জন্য ৩ সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করছে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক দল। হামলার স্থান থেকে সংগ্রহ করা নমুনা এখন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষাধীন রয়েছে। সঠিক নিয়ম মেনে বস্তুনিষ্ঠভাবে এর ফলাফল হাতে পেতে লাগবে তিন সপ্তাহ এমনটিই দাবি করেছে জাতিসংঘ রাসায়নিক অস্ত্র নিরোধ সংস্থা। ফলাফল পাওয়া মাত্রই তা জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের হাতে তুলে দেয়া হবে।
সিরিয়ার যেকোনো পরিস্থিতির জন্য ইসরাইল প্রস্তুত : ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, সিরিয়ার যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ইসরাইল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সিরিয়া হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা দেয়ার পর রোববার ইসরাইলের অবস্থান পরিষ্কার করে একথা বলেন নেতানিয়াহু। তিনি আরও বলেন, ইসরাইলি জনগণ জানে ও তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, সিরিয়া হামলার উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাদের দেশ একপাও পিছপা হবে না।

সিরিয়া হামলা নিয়ে প্রতিবেশীদের ভাবনা

রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অজুহাত তুলে সিরিয়া হামলা চালাতে নিঃসঙ্গ যুক্তরাষ্ট্র অনঢ় অবস্থানের কথা প্রকাশ করেছে। ওবামা তার ছক কষে ফেলেছেন। এখন কংগ্রেসে অনুমোদনের অপেক্ষার পালা। গ্রীষ্মকালীন অবকাশ শেষে ৯ সেপ্টেম্বর কংগ্রেসে যোগ দিতে যাচ্ছেন সিনেটররা। এদিকে, ফ্রান্সেও অনুরূপ একটি বিল বুধবার পার্লামেন্টে বিশেষ অধিবেশনে পাস করাতে প্রস্তাব দেবেন প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোয়া ওলান্দ। বিদেশী হস্তক্ষেপ নিয়ে সিরিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো কি চিন্তা-ভাবনা করছে? এ ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়াই বা কেমন? সিএনএন-র বিশেষ প্রতিবেদনে সিরিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বিক অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি নিুরূপ-
লেবানন : সিরিয়ায় সম্ভাব্য হামলা বিবেচনায় লেবাননের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। লেবানন সরকার মনে করছে রাজধানী বৈরুত থেকে দামেস্ক’র দূরত্ব মাত্র ৭০ কিলোমিটার হওয়ায় সিরিয়ায় যে কোনো হামলায় দামেস্কের সঙ্গে সঙ্গে বৈরুত-এ অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়বে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সিরিয়ার মতো বড় দেশের পাশে লেবাননের মতো আয়তনে ক্ষুদ্র প্রতিবেশী সিরিয়ার ওপর যে কোনো হামলার সরাসরি প্রভাব পড়বে। এদিকে, লেবাননের ডেমোক্রেটিক দলের নেতা তালাল আরসালান বলেন, দামেস্কের উপকণ্ঠে বাশার সরকার রাসায়নিক অস্ত্র হামলা চালিয়েছে এ মিথ্যাচার যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক হামলার চালানোর মিথ্যাচারেরই বহিঃপ্রকাশ।
ইসরাইল : ইসরাইল সরকার মনে করে, সিরিয়ায় হামলা হলে সিরিয়াও পাল্টা রাসায়নিক অস্ত্র হামলা চালাতে পারে। তাই, আগাম সতর্কতা হিসেবে দেশটির শহরগুলোতে রাসায়নিক গ্যাসরোধী মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বার্তাসংস্থা সিএনএন-কে বলেন, যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ইসরাইল প্রস্তুত। তেলআবিব আক্রান্ত হলে আমি দামেস্ক-এ হামলা চালাব।
জর্ডান : সিরিয়ার সীমান্ত থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থান জর্ডানের। এমনকি, সিরিয়ার সব ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির মুখে জর্ডানের সবকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। তার ওপর জর্ডানের রাজা কিং আবদুল্লাহ পশ্চিমা-বিশ্বের ঘনিষ্ঠ মিত্র। আরব নেতাদের মধ্যে কিং আবদুল্লাহই সর্বপ্রথম বাশারকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জর্ডানের বাশার বিরোধীদের সমর্থন দেয়ায় সিরিয়া জর্ডানে হামলা চালাতে পারে। কারণ জর্ডানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সুন্নী এবং তারা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের প্রতি সহানুভূতিশীল।
এটা এখন প্রমাণিত সত্য যে, সৌদি আরব জর্ডানের মাধ্যমে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। তবে জর্দান বার বার বলছে তারা সিরিয়া যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। গত সপ্তাহে সিরিয়ায় হামলা বিষয় নিয়ে বিশ্বের যুদ্ধবাজ দেশগুলোর নেতারা এই জর্ডানেই মিলিত হয়েছিলেন। তবে দেশটির সরকার বলছে তারা প্রতিবেশী দেশে পশ্চিমা হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। এ বিষয়ে সরকারের মুখপাত্র মোহাম্মদ মোমেনি বলেন, ‘আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমরা কেবল আমাদের দেশের স্বার্থ নিয়ে চিন্তিত। অন্য দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা নাক গলাতে চাই না।’
ইরাক : আগস্ট মাসের শেষ দিকে গত পাঁচ দিনে কমপক্ষে ৩০ হাজার সিরীয় শরণার্থী ইরাকে আশ্রয় নিয়েছে। সম্ভাব্য মার্কিন হামলাকে কেন্দ্র করে ইরাকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। সিরিয়ায় মার্কিন হামলার বিরোধিতা করছে ইরাক। তাদের আশংকা এই হামলার ফলে প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সুন্নী বিদ্রোহীরা বাগদাদ সরকারকে টার্গেট করবে। বাগদাদের শিয়া প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে সুন্নী বিক্ষোভ মোকাবেলা করছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সিরিয়া পরিস্থিতিতে ইরাক ও এ অঞ্চলে হুমকি সৃষ্টি হয়েছে।’ এ অবস্থায় সব ইরাকি জনগণকে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
সৌদি আরব : মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নী অধ্যুষিত দেশ সৌদি আরব সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহীদের প্রধান সমর্থক। আর এ কারণে তারা সিরিয়ায় মার্কিন হামলারও অন্যতম সমর্থক। তবে সৌদি সরকার এখন অবদি সিরিয়ায় সামরিক অভিযানে প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়নি। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সউদ আল ফয়সাল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি সিরীয় জনগণের দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বিদ্রোহীদের সমর্থন করে এবং তারা আসাদ সরকারের পতন চায়। তবে তাদের ধারণা মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সিরীয় জনগণের দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি করবে।
মিসর : সমস্যায় আবর্তিত মিসর সিরিয়ায় সামরিক হামলার বিরুদ্ধে। দেশটির তামারুদ আন্দোলনের মুখপাত্র মাহমুদ বদর বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটি সাম্রাজ্যবাদী দেশ। এর আগে তারা ইরাক ধ্বংস করেছে। এখন সিরিয়াকে ধ্বংস করতে চাইছে। তারা মিসরের আভ্যন্তরীণ বিষয়েও নাক গলাচ্ছে।’ অন্য মুখপাত্র হাসান শাহিন সুয়েজ খাল বন্ধ করে দেয়ার দাবি করেন। মিসরে এই তামারুদ আন্দোলনকরীরা প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল।
ইয়েমেন : সিরিয়ায় মার্কিন হামলা নিয়ে ইয়েমেনে আতংক বিরাজ করছে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প্রতি তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও দেশটিতে এমন একজন মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে যে হামলাকে সমর্থন করে। ইয়েমেনের হাক পার্টির নেতা আহমদ বাহরি সিএনএনকে বলেন, ‘ আরবরা যুক্তরাষ্ট্রকে আর বিশ্বাস করে না। কেননা তারা অনবরত আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে। দুঃখের বিষয় কিছু আরব নেতা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে পশ্চিমাদের পক্ষে কাজ করছে।’