Tuesday, July 9, 2013

এডিপি বাস্তবায়নে যা করা দরকার by ড. মিহির কুমার রায়

অর্থনীতির ভাষায় উন্নয়ন মানেই ইতিবাচক পরিবর্তন। এ পরিবর্তন যদি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জনকল্যাণমুখী ভূমিকা রাখে, তাকেই বলা হয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সার্বিক উন্নয়ন। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন তার আয় ও ব্যয় গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কেবল আয় বাড়লেই উন্নয়ন হবে না, তার সঙ্গে সঙ্গে সমাজে আয়ের সুষম বণ্টন থাকতে হবে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে, সুশাসনের সুযোগ অবশ্যই সবার কাছে পৌঁছাতে হবে, আÍসম্মান বোধ নিয়ে বেঁচে থাকার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তখনই হবে সত্যিকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বিগত সাড়ে চার বছরে সরকার যে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ করেছে, তাতে কয়েকটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে সত্য যেমন- দারিদ্র্যের হার কমা, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস পাওয়া, সবার জন্য বিশেষত মহিলাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হওয়া, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি। এসব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে উন্নয়ন খাতে বাজেট বৃদ্ধির কারণে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় (২০১২) উল্লেখ আছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং ব্যয় হয়েছে ২৫ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা, যা শতকরা হারে ৯১ শতাংশ। এর পরবর্তী বছরে এ বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা এবং ব্যয় হয় ৩৩ হাজার ৭ কোটি টাকা, যা শতকরা হারে ৯২ শতাংশ। একইভাবে ২০১২-১৩ অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে সংশোধিত বরাদ্দ দাঁড়ায় ৫২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা এবং ধরা যাচ্ছে, এই নির্বাচনী বছরে প্রায় শতভাগের কাছাকাছি উন্নয়ন বরাদ্দের ব্যবহার চলে আসবে।
এবারের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা এবং এই প্রথমবারের মতো উন্নয়ন বাজেটের অংশ হিসেবে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে ৮ হাজার ১১৪ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৫ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের বরাদ্দ থেকে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। এডিপির অর্থের ৬৩ ভাগ সরকারের নিজস্ব তহবিল এবং বাকি ৩৭ ভাগ প্রকল্প সাহায্য থেকে পাওয়া যাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে আগামী বছর মোট ১০৪৬টি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫০টি নতুন প্রকল্প এবং বাকিগুলো চলমান প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। নতুন অর্থবছরের এডিপির আরেকটি চকমপ্রদ দিক হল, নিজস্ব অর্র্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং এর ফলে পরিবহন খাতে মোট উন্নয়ন বরাদ্দ দাঁড়ায় মোট এডিপির ২৩.৩৪ শতাংশ। এই যাতায়াত খাতে পদ্মা সেতুর অংশ দাঁড়ায় ৪৫ শতাংশ। এই সেতুর উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে সরকারের ভেতর-বাইরে, সুশীল সমাজ, গবেষক, অর্থনীতিবিদ- সবার মধ্যে একটি আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলেছে, এভাবে বছরওয়ারি বাজেট বরাদ্দ দিয়ে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন হাস্যস্পদ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে বলা হয়, পদ্মা সেতুর মতো বৃহদাকার নির্মাণ কাজ অবশ্যই আন্তর্জাতিক নির্মাণ সংস্থার দ্বারা সম্পন্ন করতে হবে, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার উপস্থিতি অপরিহার্য এবং সার্বিক ব্যয়ের অর্থ একসঙ্গে জোগান দিতে হবে, যা বর্তমান সরকারি ব্যবস্থায় সম্ভব কি-না তাও প্রশ্নের দাবি রাখে। এ ছাড়া ওই সেতুতে নিজস্ব অর্থায়নের ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি দেখা দিতে বাধ্য, যা সরকার ঘোষিত ৭.২ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
এখন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অন্যান্য খাতওয়ারি বিভাজন নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রাধিকার অনুসারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৯০৫৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই খাতের বরাদ্দের চেয়ে ১৪ ভাগ বেশি। এর পরই রয়েছে শিক্ষা খাতের ৮ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ, যা আগের বছরের একই খাতের চেয়ে ১৮ ভাগ বেশি। এছাড়াও বরাদ্দের ক্রমানুসারে বিভিন্ন খাতওয়ারি বিভাজন হল- পল্লী উন্নয়ন (৬ হাজার ৬২২ কোটি টাকা), স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা (৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা), কৃষি খাত (৩ হাজার ৭২১ কোটি টাকা)।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি হল বাজেটের অলংকার এবং এর সফল বাস্তবায়ন কাম্য বিশেষত দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতার জন্য উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করা যায় না। ফলে এডিপির বরাদ্দ ফেরত চলে যায়, যা বিশেষ করে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের ক্ষেত্রে বেশি হয়ে থাকে। এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এডিপি বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংস্থাগুলোর অদক্ষতা ও নিষ্ঠা। প্রকল্প বাস্তবায়নের যে কৃষ্টি রয়েছে তাতে দেখা যায়, প্রকল্পের শুরুর ও শেষ বছরটি অত্যন্ত সংকটাপন্ন বছর। এক্ষেত্রে প্রকল্প ব্যবস্থাপক বা প্রকল্প পরিচালকের ভূমিকা থাকে মুখ্য এবং কর্তৃপক্ষের আগে থেকেই উচিত সেসব ব্যক্তিকে এ কাজের দায়িত্ব দেয়া, যারা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক থেকে জ্ঞানসম্পন্ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিজেদের আগে থেকেই খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তির যথেষ্ট অভাব রয়েছে সরকারি কাঠামোতে, যা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পূরণ করা জরুরি। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে অনেক জাতীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেমন- পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি (এপিডি), বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি) ইত্যাদি।
পরিকল্পনা কমিশনকে বলা হয় প্রকল্পের বাজার, যেখানে বছরের একটা নির্দিষ্ট মৌসুমে (মার্চ থেকে মে) প্রকল্পের কেনাবেচা হয়। এ বাজারে ক্রেতা হল এডিপিভুক্ত বিভিন্ন সংস্থার প্রকল্প এবং বিক্রেতা হল অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা কমিশন। এ প্রক্রিয়ায় কেনাবেচা শেষে কমিশন থেকে প্রকল্পের চূড়ান্ত তালিকা বই আকারে বরাদ্দসহ প্রকাশ করা হয়, যা একটি বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপ। পরবর্তীকালে এটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার পরিকল্পনা কোষে প্রেরণ করা হয়। এ কাঠামোগত পদ্ধতির বাস্তবায়ন একদিকে যেমন সহজ অন্যদিকে ঠিক ততটুকুই কঠিন, যদিও তুলনামূলক বিচারে কঠিন বলে কোনো কিছুই নেই।
এ পরিপ্রেক্ষিতে এটা সহজেই অনুমেয় যে, অন্যান্য বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে এডিপির বাস্তবায়ন বৈশিষ্ট্য ও চরিত্রগত দিক থেকে কিছুটা ভিন্নতর হবে। এর কারণ, বর্তমান সরকারের এটি শেষ বছর এবং নতুন অর্থবছরে সরকারের সময় আছে সর্বোচ্চ ছয় মাস (যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদ্ধতি চালু না হয়)। এ সময়টা নির্বাচনের জন্য একটি প্রস্তুতিমূলক সময় এবং এডিপির বাস্তবায়ন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের কোনো অগ্রাধিকার বিষয় নয়। তার পর শুরু হবে জাতীয় নির্বাচন এবং নির্বাচনের ফলাফল যদি বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পক্ষে যায় তা হলে এক ধরনের চিত্র, আর যদি বিপরীতমুখী হয়, তা হলে আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এডিপি বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার আসবে, সরকার যাবে এটাই নিয়ম। কিন্তু সরকারি প্রশাসনিক কাঠামো, যারা এডিপি বাস্তবায়নের সঙ্গে থাকবে, তাদের অবস্থান থাকবে অপরিবর্তিত। তাহলে এডিপির সফল বাস্তবায়ন নিয়ে আশংকা কেন? এ পরিস্থিতির একটা নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ হল, যারা সরকারি কাঠামো (সচিবালয়কেন্দ্রিক প্রশাসন যন্ত্র) পরিচালনা করে, তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত (যদিও কাজটি সংবিধান পরিপন্থী)। এটার ফলে প্রশাসনিক কাজের গতি এবং তার সঙ্গে এডিপি বাস্তবায়নের গতি একই সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রতীয়মান হয়, যা আসলেই একটি সমস্যা। এর সমাধান একদিনে সম্ভব নয়, যেহেতু সমস্যাটি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এর স্বল্পমেয়াদি একটি সমাধান হতে পারে, মন্ত্রণালয়ের সচিবরা সব রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থেকে এই সংকটাপন্ন সময়ে তাদের দাফতরিক কাজ পরিচালনা করবেন। আর এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার সরকারি প্রশাসন তথা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবে। তাহলেই কেবল নতুন অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের লক্ষ্য অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব হবে।
ড. মিহির কুমার রায় : অর্থনীতিবিদ ও গবেষক, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

নির্বাচনী রাজনীতিতে পেন্ডুলামের দুলুনি by একেএম শাহনাওয়াজ

মাস দুই আগে এক কলামে আমি আমাদের রাজনৈতিক বড় দুই দলের অবস্থা বোঝাতে তেলতেলে বাঁশের গল্পের উদাহরণ টেনেছিলাম। আমার অনেক পাঠক বন্ধুর মনে ধরেছিল ব্যাখ্যাটি। তারা ই-মেইলে, টেলিফোনে সমর্থন দিয়েছিলেন। এখন চলমান রাজনীতির প্রসঙ্গ টানতে গেলে এ ব্যাখ্যাটিই সামনে চলে আসে। আসলে প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক অভিলাষের দিক থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বের মধ্যে তফাত খুব কম বলেই বোধহয় তেলতেলে বাঁশের উদাহরণ বারবার ব্যবহার করা যায়। ব্যাখ্যাটি অসাধারণ কিছু নয়। সচেতন মানুষ সবাই হয়তো এভাবেই ভাবেন। আমি শুধু এর লিখিত রূপ দিয়েছি। আসলে রাজনীতিতে বর্তমানে দু’দল নম্বরের বিচারে খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিচারে তাদের দল অনেক বেশি নম্বরে এগিয়ে আর বিএনপির নেতাকর্মীদের বিচারে তাদের দল। তবে নির্বাচনের মাঠে এখন স্থির নয় কোনো দল। পেন্ডুলামের দুলুনিতে অস্থির। বিষয়টি আর কিছু নয়, নির্বাচনের রাজনীতিতে কোনো দল কর্মভূমিকায় এগিয়ে যাচ্ছে অথবা পিছু হটছে। দুটি ঘটনাই কোনো দলের জন্য একরৈখিকভাবে ঘটছে না। এক দল কর্মভূমিকা ও সময়ের সুবিধায় কখনও মনে হচ্ছিল তেলতেলে বাঁশ বেয়ে অনেকটা উপরে ওঠে পড়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই একটি-দুটি ভুলে আবার এক ঝটকায় নেমে এসেছে নিচে। অন্য দলের ক্ষেত্রেও অবস্থা অভিন্ন। দুলুনি চলছেই।
বিগত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় এবং বিএনপির অপশাসনের স্মৃতি থেকে মনে হয়েছিল, আওয়ামী লীগ কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই বাঁশের উঁচুতে ওঠে যাবে। এ জন্য দলটিকে বিশেষ কিছু করতে হবে না। মানুষ যেসব আচরণে কষ্ট পেয়ে বিএনপি-জামায়াত জোটকে বর্জন করেছিল, সেসব পঙ্কিল পথ থেকে আওয়ামী লীগকে দূরে সরে থাকতে হবে। অর্থাৎ সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটতে হবে। ছাত্রদলের সন্ত্রাসী ভূমিকার শিক্ষা ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। কার্যকর ভূমিকা রাখবে প্রশাসনিক দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে। কঠিন দলীয়করণের বলয় ভেঙে বন্ধু বাড়াবে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। মানুষ বিশ্বাস করেছিল, ১/১১-এর শিক্ষার পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব আলোকিত পথেই হাঁটবেন। ফলে বিধ্বস্ত বিএনপির কোমর সোজা করে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তেমন কিছুই ঘটল না। আওয়ামী লীগ ও সরকার ঘুরে দাঁড়াল না। হাঁটতে থাকল গতানুগতিক পথেই। ছাত্রলীগ সন্ত্রাস আর অনাচারে ছাত্রদলের কালো অধ্যায়কেও যেন অতিক্রম করতে থাকল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কার্যত এর কোনো প্রতিবিধান করতে পারলেন না। জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়তে থাকল। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষণ ফুটে উঠল না আওয়ামী লীগের সরকার পরিচালনায়। প্রশাসনিক দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত ভুক্তভোগী মানুষদের হতাশ করে তুলল। গণতন্ত্র বিকাশের স্বাভাবিক পথ কেবল বন্ধুর হতে থাকল। এভাবেই ক্ষমতার চার বছরের মাথায় তেলতেলে বাঁশ থেকে পিছলে নেমে এলো তলানিতে।
এ বাস্তবতা বিএনপিকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল। বাঁশ বেয়ে উপরে ওঠার শক্তিও তৈরি হতে লাগল। এ সময় জামায়াতের বন্ধুত্ব বর্জন করে সাধারণ মানুষের আস্থায় আসা জরুরি ছিল বিএনপির জন্য। কিন্তু মানসিক জোর না থাকায় সাহসী হতে পারল না বিএনপি। বিএনপির বিশ্বাস করা উচিত ছিল, ক্ষমতায় থাকাকালীন কৃতকর্মের কারণে জনগণের একটি বড় অংশ দলটিকে ভোটের মাঠে বর্জন করেছিল। তাই গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে জনমতকে শ্রদ্ধা করা উচিত ছিল। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক পথে না হেঁটে বিএনপি কঠিন ইস্যু না পেয়েও জনদুর্ভোগ বাড়ানোর হরতাল-অবরোধের দিকে হাঁটতে চাইল। খুব জমাতে পারল না, তবুও বাস্তব উপলব্ধি থেকে দূরে রইল। জামায়াতের সঙ্গে বন্ধুত্ব অটুট রাখার জন্য অবলীলায় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রশ্নে জামায়াতের পক্ষাবলম্বন করল। জামায়াত-শিবিরের হরতাল ও অমানবিক পিকেটিংয়ের সমর্থক ও সঙ্গী হয়ে নিজের অবস্থানকে আবার প্রশ্নবিদ্ধ করল।
সরকার পরিচালনায় এসে নানা ব্যর্থতায় জর্জরিত আওয়ামী লীগ বিএনপির বেসুরো পথ চলাকে সুযোগ হিসেবে নিতে পারত। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুশাসন ও সুস্থিরতার জন্য ইতিবাচক রাজনীতির পথে হাঁটতে পারত। রাজনৈতিক প্রয়োজনেই মহাজোটকে শক্তিশালী করতে পারত। কিন্তু পুরনো স্বভাব মতো আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বিশাল বিজয়ে দিকহারা হয়েছিল। মহাজোটের শরিকদের প্রত্যাশিত সম্মান দেখাল না। ভোটের রাজনীতিতে এরশাদকে প্রয়োজন ছিল বলে নির্বাচনের আগে তার সমর্থন পেতে অনেক শ্রম ব্যয় করেছিল। বিজয়ের পর তেমন পাত্তা পায়নি জাতীয় পার্টি। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে যখন আওয়ামী লীগ সংকটে, তখন আবার মূল্য বেড়ে গেল এরশাদের। শুরু হল ধরনা দেয়া। এসবে হয়তো রাজনৈতিক কূটনীতির লাভ-ক্ষতি আছে, তবে সুস্থ রাজনীতির মাঠে একটি বড় দলের জনআস্থা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির বিশাল বিজয় স্বাভাবিক ধারায় প্রত্যাশা মতো হয়নি। কারণ নির্বাচনে দাঁড়ানো আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা সবাই (গাজীপুর ছাড়া) সাবেক মেয়র ছিলেন। সিটি কর্পোরেশন পরিচালনায় খুব একটা খারাপ ভূমিকা রাখেননি। বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা প্রতিপক্ষকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো বিশাল পরিচিতি নিয়ে মাঠে নামেননি। তারপরও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয় একটি গভীর মূল্যায়নের বিষয়। তবে এ বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্ব যতটা সংযত হয়ে হাঁটবে বলে মনে হয়েছিল, তেমনভাবে হাঁটতে পারছে না। বিএনপি বিজয়কে যদি নিজ দলের জনপ্রিয়তা ভাবে, তবে বড় ভুল করবে। উল্লিখিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলো স্থানীয় নির্বাচনের বলয়ে থাকেনি। থাকলে ফলাফল হয়তো অন্যরকম হতে পারত। এটি জাতীয় নির্বাচনের আদল পেয়েছিল। অর্থাৎ জাতীয় ইস্যুগুলো সামনে চলে আসে। তাই সরকারের নানা ব্যর্থতা এবং সরকারি দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর নানা অনাচার সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। সুতরাং বলা যায়, আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা বা দুর্বলতার কারণে সুযোগের সুবিধা পেয়ে যায় বিএনপি। এ প্রেক্ষাপট বিএনপিকে আবার বাঁশ বেয়ে উপরে ওঠার সুযোগ এনে দেয়। কিন্তু পতাকা দিলেই হবে না, তা বহন করার শক্তি যদি বিধাতা না দেন তবে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয় না। তাই এবার অসময়ে বিএনপি নেতৃত্বের যেন পায়াভারি হয়ে গেল। সংসদে নিজ দলের বাক-অসংযত নারী সংসদ সদস্যদের থামানোর চেষ্টা করল না বিএনপি। বাজেট পাসের আগে ছল ছুতোয় ওয়াকআউট করে নিজেদের দীনতা প্রমাণ করল।
সাধারণ মানুষের সামনে বিএনপি সবচেয়ে বেকায়দা দশায় এখন ওয়াশিংটন টাইমসে প্রকাশিত লেখা নিয়ে। লেখক হিসেবে সেখানে নাম ছাপা হয়েছিল বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার। জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়ার পর সরকারি দল এজন্য খালেদা জিয়ার লেখাকে অংশত দায়ী করে। মহান সংসদে প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হল কুশলী শব্দে দায় এড়ানো যেত। কিন্তু সে পথে হাঁটলেন না বিএনপি নেত্রী। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে সরাসরি অস্বীকার করলেন এ লেখাটি তিনি পাঠাননি বলে। অবশ্য এখানে একটি কৌশল ছিল। তিনি বলেননি যে, তিনি লেখেননি। বলেছেন পাঠাননি! তার পক্ষ থেকে কেউ পাঠালেও বক্তব্যটিকে অসত্য বলা যাবে না। যাই হোক, বিএনপি নেত্রীর এ সাফাই মেনে নেয়া সচেতন মানুষের জন্য সহজ নয়। কারণ কয়েক মাস আগে লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিতর্ক উঠেছিল। তখন কিন্তু খালেদা জিয়া বা বিএনপি নেতারা বিষয়টি অস্বীকার করেননি। বরঞ্চ প্রকাশিত লেখাটি যথার্থ হয়েছিল বলে তাদের কেউ কেউ বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলেছিলেন। সত্যি সত্যি জিএসপি সুবিধা স্থগিত হয়ে যাওয়ায় বিপদে পড়ে এখন অস্বীকার করাটা কি শোভন বা নৈতিকভাবে ঠিক হল? আবার হাটে হাঁড়ি ভেঙে ওয়াশিংটন টাইমসের সম্পাদকও নিশ্চিত করলেন, লেখাটি স্বয়ং খালেদা জিয়ারই।
এ ঘটনাটি বিএনপির জন্য বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক স্খলন। অন্য কোনো গণতান্ত্রিক সভ্য রাজনীতির দেশ হলে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অমন নেতা-নেত্রী দায় মাথায় নিয়ে (যদি সত্যতা প্রমাণিত হয়) রাজনীতি ছেড়ে অবসরে যেতেন। আমাদের দেশের রাজনীতিতে অমন শোভন সংস্কৃতি নেই। তাই আবার সদম্ভে নানা কথার ফুলঝুরি হতে থাকবে বক্তৃতার মঞ্চে। তবে পেন্ডুলামের দুলুনি থামবে না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর তরতর করে বাঁশের অনেকটা উপরে ওঠে গেছে বিএনপি। শাসন দুর্বলতার কারণে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একটি জোয়ার তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এ সুবিধাটি বিএনপির ঘরে আসবে বলে অনেকের বিশ্বাস। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে নিজ দলের পক্ষে বিজয় আনতে পারবে এমন বিশ্বাস তৈরি করেছে। এ অবস্থা ধরে রাখতে চাইলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নৈতিকতার বিষয়ে তাদের সজাগ থাকতে হবে।
নির্বাচনের আগে ঠাণ্ডা মাথায় দুই বড় দলকেই নির্মোহভাবে বাস্তব অবস্থার মূল্যায়ন করতে হবে। হাম্বরা ভাব, মিথ্যার বেসাতি, জনদুর্ভোগ বাড়ানো, জনগণকে মূল্যায়ন না করা- এসব কিছু ভোটারের বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এসব অস্বীকার করা বর্তমান বাস্তবতায় যে কোনো দলের জন্যই আত্মহত্যার শামিল।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষকদের বেতনভাতা নিশ্চিত করুন by ড. ইকবাল হোসেন

শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদণ্ড, একজন সুশিক্ষক হবে সেই শিক্ষার মেরুদণ্ড। এক প্রবীণ শিক্ষক নেতা কোনো এক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। প্রায় সময়ই স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পত্রিকায় লিখে থাকেন। যখনই চোখ পড়ে, লেখাগুলো একটু ভিন্ন গুরুত্বের সঙ্গে পড়ার আগ্রহ জন্মে। একটি লেখা আমাকে শুধু ভাবিয়েই তোলেনি, রীতিমতো আঁতকে দিয়েছিল। তিনি তুলে ধরেছিলেন তারই এক সময়ের ছাত্র ও বর্তমান সময়কার এক স্কুল শিক্ষকের একটি করুণ আবেদন। তুলে ধরেছিলেন মানবেতরভাবে দিন কাটানো একটি পরিবারের চিত্র। কোনো এক ঈদের ঠিক কিছুদিন আগের ঘটনা। শিক্ষক নেতাকে ফোন করলেন সেই স্কুল শিক্ষক। বললেন, স্যার, আপনি আমার শিক্ষক ছিলেন, শিক্ষা দিয়েছিলেন, ‘সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’। আমি আপনার সেই শিক্ষা গ্রহণ করেছিলাম। আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্ততপক্ষে কিছুটা হলেও সৎ থাকার চেষ্টা করেছি। নিজের আদর্শগত অবস্থান, সৎ থাকার আকাক্সক্ষা ও অবশেষে নিজের যোগ্যতা- সবকিছু মিলিয়েই আজ শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছি। নিজের অর্জিত শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে আসছি। আপনি ছোটবেলায় আমাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন- ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে সে।’ আপনার কথা মনে রেখে লেখাপড়া করেছিলাম আমি, স্বপ্নও দেখেছিলাম একদিন গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ার। স্যার, আমার ভাগ্যে গাড়ি-ঘোড়া আসেনি। সামান্য রিকশায় চড়ার ভাগ্যও আমার হয়নি। আমাকে চৈত্রের প্রখর রোদের মাঝেও হেঁটে হেঁটে কর্মস্থল স্কুল থেকে বাসায় ফিরতে হয়। বাসায় ঢোকার ঠিক আগে কৌশলে আমার ঘর্মাক্ত মুখখানি ভালো করে মুছে নিতে হয় আমাকে। আমার ছোট্ট মেয়েটিকে আমার ঘর্মাক্ত মুখ দেখিয়ে দেখিয়ে আর কষ্ট দিতে পারি না। মাস শেষে সময়মতো বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে পারি না আমি। প্রায় নিয়মিতভাবেই বাড়িওয়ালার শক্ত শক্ত কথা শুনতে হয় আমাকে। এতে করে এক রকম অভ্যস্তই হয়ে পড়েছি আমি। কিন্তু ব্যথিত হই, যখন আমার মেয়েটিকে এ যন্ত্রণা থেকেও রক্ষা করতে পারি না। ঈদ আসছে। নিজের সাধ্যমতো বাজেট নিয়ে সপরিবারে গিয়েছিলাম ঈদের কেনাকাটায়। মেয়ে আমার হয়তো তার বাবার আর্থিক অবস্থা ভুলেই গিয়েছিল বাজারের চাকচিক্য দেখে। পছন্দ করে বসল নিজের মতো করে একটি ড্রেস। দাম শুনে পরক্ষণেই মুখখানি মলিন হয়ে এলো তার, হয়তো বাবার আর্থিক-অক্ষমতা বুঝতে পেরে। সন্তানের মলিন মুখ দেখার কষ্ট অনেক ভারি। চেয়েছিলাম পুরো পরিবারের জন্য রাখা অর্থ দিয়ে হলেও মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করতে। কিন্তু কোনোভাবেই তা সম্ভব হয়ে উঠল না। সমাজের আর পাঁচ-দশটা পরিবারের মতো স্বাভাবিকভাবে ঈদ করাটাও আমাদের ভাগ্যে জোটে না। লোকটি ফোনে সশব্দে কাঁদতে থাকেন।
কী নির্মম বাস্তবতা, যা যে কোনো স্বাভাবিক বোধসম্পন্ন মানুষের দু’চোখ আর্দ্র করে তোলে। ভদ্রলোক কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, স্যার যদি সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের জাতীয়করণ করে নেয়া হতো, হয়তো আমাদের দুঃখ-দুর্দশার অনেকটাই লাঘব হতো। না হয় আপনার একজন ছাত্র হিসেবেই আমাদের কথাগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরুন। প্রবীণ সেই শিক্ষক নেতা তার ছাত্রের কথাগুলো লিখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাতে আদৌ কোনো কাজ হয়েছিল কি-না জানা হয়নি।
এই তো সেদিন শুনলাম এক হারিছ ভাইয়ের কথা। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বহিরাগত পরিদর্শক হিসেবে ছয়-ছয়টি ভর্তি পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন করে পাওয়া যাবে তিন হাজার টাকা। খবরটি জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গেই যথানিয়মে আবেদন করেন কলেজ-শিক্ষক হারিছ সাহেব। হারিছ সাহেব জানতে পারেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা জীবনের তারই এক পরিচিত জুনিয়র। যথানিয়মে আবেদন করা সত্ত্বেও বেশ কয়েকবার কথা বলেন সেই পরিচিত জুনিয়র শিক্ষকের সঙ্গে, কাজটির ব্যাপারে। বিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে একদিন সরাসরি হাজির হন হারিছ সাহেব সেই শিক্ষকের অফিসে। উদ্দেশ্য, বহিরাগত পরিদর্শকের তালিকা থেকে তার নামটি যাতে কোনোভাবে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন লোক, যিনি কিনা এক কলেজে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন, মাত্র তিন হাজার টাকার একটি কাজের জন্য এমন করে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। বিষয়টি সেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে ভাবিয়ে ও কৌতূহলী করে তোলে। তিনি জানতে চান হারিছ সাহেবের এত আগ্রহী ও ব্যস্ত হয়ে ওঠার কারণ। জানতে পারেন, হারিছ সাহেব এক কলেজে শিক্ষকতা করছেন, কিন্তু বিগত দশ বছর ধরে কোনো বেতন পাচ্ছেন না। এটাও কি সম্ভব হতে পারে? এক নয়, দুই নয়, দশ-দশটি বছর ধরে একজন শিক্ষক বিনা পারিশ্রমিকে আমাদের সন্তানদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে চলেছেন! তিনি জানতে পারেন, কিছু শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে পড়িয়ে এবং এ ধরনের অনিয়মিত কিছু কাজ থেকে প্রাপ্ত ‘সামান্য’ উপার্জন দিয়েই কোনোভাবে চলছে হারিছ সাহেবের পরিবার। সুতরাং হারিছ সাহেব আগ্রহী ও ব্যস্ত না হয়ে পারবেন কী করে? বরং তিনি তো মুখিয়েই থাকবেন এ ধরনের সুযোগের আশায়; হোক না তা ‘তিন-হাজার’ বা ‘তিনশ’ টাকার কাজ। হারিছ সাহেব বলছিলেন, কাজটি পেলে প্রাপ্ত পারিশ্রমিক দিয়ে মেয়ের কোনো এক ‘বড় আবদার’ পূরণ করবেন তিনি। মেয়ে যদি জানতেন, তার পিতা নিজ ব্যক্তিত্ব উপেক্ষা করে বিশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তারই এক জুনিয়রকে অনুরোধ করে কাজ নিয়ে সেই অর্থে তার আবদার পূরণ করবেন; হয়তো তার সেই আবদার কখনও সে পিতাকে জানাতেন না।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজও এমন ঘটনা থেকে খুব একটা মুক্ত নয়। শিক্ষকতা অনেকটাই ভিন্ন আদর্শের এক পেশা। শিক্ষকরা যতই কষ্ট আর সমস্যায় থাকেন না কেন, নিজেদের বিষয়গুলো চেপে যেতেই চেষ্টা করে থাকেন। তথাপি দু’চোখ আর্দ্র করে তোলার মতো অনেক ঘটনাই আজ প্রকাশ পাচ্ছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সর্বকনিষ্ঠ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, অনেকটা বর্তমান সরকারের হাতেই গড়া। তথ্যমতে, বিগত তিন মাস ধরে প্রায় ৯০ জন শিক্ষক সেখানে কোনোরকম বেতন পাচ্ছেন না। ভাবা যায়, কী অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে সেই পরিবারগুলো?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূলত একটি অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক খাতে সরকারের বরাদ্দ নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ সুফলের এক কার্যকর বিনিয়োগ। কাজেই চেষ্টা থাকতে হবে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণ করার। নিয়মিতভাবেই প্রদান করতে হবে সবস্তরের শিক্ষকদের বেতনভাতা। এটা বোধগম্য, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে অনেকটাই সম্পর্কিত। আমাদের অর্থনীতি আদৌ কি পারবে বঞ্চিত সেই শিক্ষকদের বেতনভাতার ভার বহন করতে? খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করব, আমাদের অর্থনীতি কি বিশাল বিশাল দুর্নীতি আর অদূরদর্শী অলাভজনক ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তগুলোর ভার বছরের পর বছর বহন করে এগিয়ে চলছে না? আমাদের অর্থনীতি কি অনাবশ্যকীয় রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ভার বহন করে করছে না? আমাদের অর্থনীতি কি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ‘বাণিজ্যিক’ প্রতিষ্ঠানকে দেয়া ভর্তুকির ভার বছরের পর বছর বহন করে আসছে না?
যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২২টি রাষ্ট্রীয় ‘বাণিজ্যিক’ প্রতিষ্ঠানকে ৩৭ হাজার ১৮৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঋণ দিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর ইতিমধ্যে ৬২৬ কোটি টাকা খেলাপির হিসাবে চলে এসেছে। এহেন ২২টি প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই বছর বছর ধরে চলছে লোকসান দিয়ে। এদের মধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০১১-১২ অর্থবছরে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩১৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সেই ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৮১ কোটি ৮৩ লাখ টাকায়। রাষ্ট্রীয় এসব প্রতিষ্ঠানে যথাযথ সততা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা না থাকাকেই এহেন হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির পেছনের কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ আমরা রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই কেবল আমাদের যথাযথ সততা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে প্রতিবছর রক্ষা করতে পারি হাজার হাজার কোটি রাষ্ট্রীয় অর্থ। যার সামান্য অংশই হয়তো বাঁচাতে পারে হাজারও শিক্ষক পরিবারকে, মানবেতর জীবনের এক কঠিন বোঝা থেকে। সংশ্লিষ্টদের প্রতি সবিনয়ে অনুরোধ থাকবে বিষয়টির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রতি কিছুটা হলেও মনোযোগী হওয়ার।
শিক্ষায় গুণগত উন্নয়ন-অগ্রগতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের অংশ হিসেবে সর্বস্তরের শিক্ষকদের বেতনভাতা রাষ্ট্রকেই আজ নিশ্চিত করতে হবে; যা সহজেই হতে পারে রাষ্ট্রীয় অর্থের সুব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে।
ড. ইকবাল হোসেন : সহকারী অধ্যাপক, কেমিকৌশল বিভাগ, বুয়েট

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং তারপর by ড. মাহবুব উল্লাহ্

সাংবাদিকদের ভাষায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনটি ছিল একটি হাইভোল্টেজ নির্বাচন। ইদানীং সাংবাদিকরা কোনো বিষয় বা ঘটনার বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার জন্য নতুন নতুন বিশেষণ ব্যবহার করছেন। যেমন হাইব্রিড নেতা। এসব বিশেষণের প্রয়োগ কতটা সার্থক ও সঠিক, সেটি ভাষাবিদরাই বলতে পারবেন। তবে এসব শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলা ভাষার দ্যোতনা যে অনেকটা সম্প্রসারিত হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন একটি সদ্য গঠিত সিটি কর্পোরেশন। রাজধানী ঢাকা নগরী ক্রমান্বয়ে তার আশপাশের এলাকাগুলোতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এসব সম্প্রসারিত অঞ্চলের মধ্যে গাজীপুর বেশ গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে এর শিল্প-কারখানার জন্য। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনটি আয়তনের দিক থেকে বেশ বড়। এ কর্পোরেশনে ভোটারের সংখ্যা ১০ লাখেরও অধিক। কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত ৪টি সিটি কর্পোরেশনে ভোটারের সংখ্যা সম্মিলিতভাবে ১০ লাখের মতোই ছিল। এ বিচারে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও খুলনায় সরকার সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুল ভোটে পরাজিত হওয়ার পর গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনটি একটি টেস্ট কেসে রূপান্তরিত হয়। এ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন আরও স্পষ্ট করে জানান দিল, সরকারের গণভিত্তি সত্যিকার অর্থেই নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন। স্বাভাবিকভাবে এ নির্বাচনে স্থানীয় ইস্যুগুলোরই প্রাধান্য পাওয়ার কথা। কিন্তু সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কোনো সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেই স্থানীয় ইস্যু তেমন গুরুত্ব পায়নি। তাই যদি হতো তাহলে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফল ভিন্নতর হতে পারত। বিশেষ করে বরিশাল ও রাজশাহীর ক্ষেত্রে। শুনেছি এ দুটি কর্পোরেশনেই ক্ষমতায় থাকা মেয়ররা তাদের দায়িত্ব পালনকালে নিজ নিজ কর্পোরেশনভুক্ত এলাকায় প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। কিন্তু সেসব উন্নয়ন তাদের কাক্সিক্ষত বিজয় লাভে কোনো কাজে আসেনি। এ থেকে প্রশ্ন উঠেছে, ভোটের রাজনীতিতে কোন বিষয়টি নির্ধারক ভূমিকা পালন করে- উন্নয়ন না রাজনীতি?
এবারের সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনগুলোতে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল সরাসরি তাদের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে এবং প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণ করেছে। এর ফলে সবকিছু ছাপিয়ে এসব সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের আমেজ লাভ করেছে। এ নিয়ে অনেকে হতাশা ব্যক্ত করলেও এতে দোষের কিছু আছে বলে মনে হয় না। প্রতিবেশী ভারতেও স্থানীয় নির্বাচন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ পরিগ্রহ করে। কাজেই গাজীপুরসহ ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন কার্যত পরিণত হয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের রিহার্সেলে।
গাজীপুর এলাকাটি ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের এলাকা। বলা হয়ে থাকে, গোপালগঞ্জের পরেই গাজীপুরে আওয়ামী লীগের অবস্থান দ্বিতীয় প্রধান। সেজন্যই কোনো কোনো সংবাদপত্র শিরোনাম করেছিল, আওয়ামী লীগের দুর্গে হানা দিতে চায় বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেল বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট অত্যন্ত সফলভাবে আওয়ামী দুর্গ দখল করেছে। কীভাবে এ দুর্গ দখল সম্ভব হল, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। নির্বাচনটি দুটি প্রধান দলের রাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। গত সাড়ে ৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে। এ সাড়ে চার বছরের ইতিহাস বহুলাংশে আওয়ামী লীগের জনবিচ্ছিন্ন হওয়ারই ইতিহাস। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং তার জোট ভূমিধস বিজয় লাভ করে। জাতীয় সংসদে তাদের তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। এ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে আওয়ামী লীগ প্রণোদিত হয়েছে ঔদ্ধত্য, ক্ষমতার দেমাগ, যথেচ্ছভাবে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দখল, দলীয়করণ ও দুর্নীতিতে লিপ্ত হতো। ক্ষমতায় আসার আগে নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দিনবদলের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দিনবদল তো দূরের কথা, বাংলাদেশ বহু যুগ পিছিয়ে গেছে। গুম, খুন, নির্যাতন, নিপীড়ন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের ওপর কারানির্যাতন, রিমান্ডের নির্যাতন এবং ডাণ্ডাবেড়ির নির্যাতন একটি আধুনিক সভ্য সমাজের জন্য কলংক তিলকচিহ্ন হিসেবে প্রতিনিয়ত জনগণকে আওয়ামী লীগের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছে। তদুপরি আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠনগুলোর যথেচ্ছাচার এবং দুর্বিনীত আচরণ ভুক্তভোগীদের বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। এছাড়াও ছিল লাঠি, গুলি, টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, পিপার স্প্রেসহ নানাবিধ মারণাস্ত্র এবং মানব নির্যাতনের হাতিয়ারের বহুল প্রয়োগ। সব মিলিয়ে এসব অস্ত্র প্রয়োগের ফলে ডজন ডজন লোক প্রাণ হারিয়েছে অথবা আহত হয়ে প্রতিবন্ধিত্ব বরণ করেছে। কথায় বলে ‘পেটে খেলে পিঠে সয়’। ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির ফলে মধ্যবিত্ত, নিুবিত্ত ও গরিব মানুষরা পেটেও খাওয়া পায়নি, পিঠে আর সইবে কীভাবে? রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের দিক থেকে বর্তমান শাসনপর্ব অতীতের অনেক শাসনপর্বকে বিশালভাবে ছাড়িয়ে গেছে। শাসকগোষ্ঠীর কারও কারও লোভের বলি হয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্পটি।
এসব দুঃশাসন ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে বিএনপি আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই আন্দোলন কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেনি। কারণ মূল্যস্ফীতি এবং নির্যাতন-নিপীড়নে সন্ত্রস্ত জনগোষ্ঠী আন্দোলন থেকে দূরে অবস্থান করে আত্মরক্ষা করাই শ্রেয় মনে করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ মধ্যবিত্ত। তারাই জনমত গঠনে নেতৃত্ব দেয়। তবে এ শ্রেণীটি আন্দোলনের ঝুট-ঝামেলায় জড়িত হতে ভয় পায়। তাছাড়া জাতীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি এখন প্রাইভেট সেক্টর। খুদে, মাঝারি ও বড়সহ নানা ধরনের ব্যক্তি-উদ্যোক্তাদের নিয়ে এ প্রাইভেট সেক্টর গড়ে উঠেছে। তারাও চায় না আন্দোলন কিংবা প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাদের ব্যবসা ও উদ্যোগকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে। এ কারণে বাস্তব পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হচ্ছে না। যেমনটি ঘটেছে হাল আমলে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। এছাড়া বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন। তারা চায় না রাজনৈতিক আন্দোলন শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত হোক। তারা জানে, ভারতবেষ্টিত বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ হলে সেটি কত ভয়াবহ ও মর্মান্তিক হতে পারে। এসব কারণেই সব বস্তুগত উপাদান থাকা সত্ত্বেও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কোনো অভ্যুত্থান সংঘটিত হচ্ছে না। কিন্তু জনগণ সবকিছু বোঝে ও জানে। তারা অপেক্ষা করছে তাদের হাতে যে মোক্ষম অস্ত্রটি রয়েছে, যার কোনো সংহারক ক্ষমতা নেই, সেই অস্ত্রটি প্রয়োগ করার জন্য। এটি হল ভোটাধিকার। এ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেই জনগণ গাজীপুরসহ পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। সুযোগ পেলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা অনুরূপ বিপ্লব ঘটাতে পারে।
প্রশ্ন হল, সর্বশেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কী করবে? তারা কি গভীর আÍজিজ্ঞাসায় মনোনিবেশ করবে? তারা কি অবশিষ্ট যেটুকু সময় হাতে আছে সেই সময় যাদের তারা অপমানিত করেছে, আহত করেছে, সর্বস্বহারা করেছে, কষ্ট দিয়েছে- তাদের কাছে টানার চেষ্টা করবে? কিংবা তাদের পিঠে হাত বুলিয়ে বলবে, ‘ভাই, অনেক অন্যায় করে ফেলেছি, মাফ করে দিও, আর কখনও এরকমটি হবে না।’ এ পথে তারা যদি এগোয়, তাহলে দেশে শান্তি ও স্বস্তি অনেকটাই ফিরে আসবে। তাদেরও বেশ লাভ হবে। ভোটের লড়াইয়ে বিপর্যয়ের মাত্রা কিছু হলেও কমে আসবে। কিন্তু অন্য সম্ভাবনাও রয়েছে। সেটা হল, আতংকগ্রস্ত হয়ে আরও মারমুখী হয়ে ওঠা। সেক্ষেত্রে দেশ আরও সংঘাতময় হয়ে উঠবে।
৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফল এটাও জানিয়ে দিচ্ছে যে, জনগণ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে গিয়ে সেই পুরনো কথারই পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি বললেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতোই বাংলাদেশে নির্বাচন হবে। কিন্তু বাংলাদেশ যে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো হয়ে ওঠেনি- এ সত্যটি তিনি উপলব্ধি করতে চান না। যে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট রয়েছে, সে দেশে ক্ষমতার পালাবদল হয় যে জাতীয় নির্বাচনে তা পরিচালনার দায়িত্ব কেন দলীয় সরকারের হাতে থাকবে? আওয়ামী লীগ দলীয় নেতারা বলতে চাইছেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার ফলে আগামী জাতীয় নির্বাচনও একইভাবে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু তারা যে প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে চান সেটি হল, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের চরিত্রগত পার্থক্য। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন হয় না, কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। সে কারণেই জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই হওয়া উচিত।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকার বা সরকারি দলের নগ্ন হস্তক্ষেপের ঘটনাও লক্ষ্য করা গেছে। একজন মেয়র প্রার্থীকে যেভাবে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ডেকে নিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার আদায় করলেন, সেটা আর যাই হোক গণতান্ত্রিক রীতিনীতির দিক থেকে শুদ্ধ ছিল না। এছাড়া ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনের দু’-তিন দিন আগে এনবিআর গৃহীত পদক্ষেপও নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করার অসৎ উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছিল বলে সাধারণ মানুষের ধারণা। একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যদি এরকম ঘটনা ঘটতে পারে, তাহলে ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আরও অনেক ভয়াবহ ঘটনা যে ঘটবে তার আঁচ-অনুমান করা যায়। সেজন্যই প্রয়োজন সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রণয়ন। তাহলেই দেশ বড় রকমের সংকটের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

যেভাবে ওসামাকে খুঁজে পায় মার্কিন বাহিনী

ওসামা বিন লাদেন
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার সাবেক প্রধান প্রয়াত ওসামা বিন লাদেনের অবস্থান সম্পর্কে মার্কিন গোয়েন্দারা প্রথম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছিলেন আল-কায়েদার সদস্য খালিদ বিন আত্তাশের কাছ থেকে। আত্তাশ যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেন হামলা এবং আফ্রিকায় একাধিক দূতাবাসে বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত ছিলেন। ওসামাকে খুঁজে বের করতে মার্কিন বাহিনী যেসব কৌশল নিয়েছিল তার বিস্তারিত উঠে এসেছে পাকিস্তানের বিচার বিভাগীয় তদন্তে। ওই ঘটনা তদন্তে গঠিত অ্যাবোটাবাদ কমিশনের ওই প্রতিবেদন অবশ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। করাচি থেকে ২০০২ সালে আত্তাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর মাধ্যমে শনাক্ত করা হয় ওসামার ডান হাত বলে পরিচিত কুয়েতি নাগরিক আবু আহমেদ আলি কুয়েতিকে। আর এই কুয়েতির সূত্র ধরেই মার্কিনরা ওসামাকে খুঁজে পায়। কুয়েতির খোঁজে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ নজরদারির জন্য পাকিস্তানকে চারটি ফোন নম্বর দেয়। তবে এসব ফোন ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাকিস্তানের কাছেও গোপন রেখেছিল সিআইএ। এসব ফোন অধিকাংশ সময় বন্ধ পাওয়া যেত। ২০০১ সালের অক্টোবর বা নভেম্বরে ওসামা পরিবার করাচিতে অবস্থান নেয়। কুয়েতি তখন সঙ্গেই ছিলেন। ওসামা ২০০২ সালে সপরিবারে পেশোয়ারে যান। ওই বছরের মাঝামাঝি তাঁদের সঙ্গে আবার যোগ দেন কুয়েতি। সেখান থেকে তাঁরা সোয়াত উপত্যকায় চলে যান। সেখানে ওসামার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন তাঁর সহযোগী খালিদ শেখ মোহাম্মদ। তিনি এক মাস পরই রাওয়ালপিন্ডিতে গ্রেপ্তার হন। এতে আতঙ্কিত ওসামা পরিবার নিয়ে হরিপুরে চলে যান। পরিবারটির সঙ্গে হরিপুরে ২০০৫ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন কুয়েতি ও তাঁর ভাই ইব্রার। তখনই সবাই মিলে অ্যাবোটাবাদে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কুয়েতি ভুয়া পরিচয়ে অ্যাবোটাবাদে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের কাজ তত্ত্বাবধান করেন। বাড়িটি নির্মাণে বিভিন্ন অনিয়ম হলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তিনতলা বাড়িতে একাধিক স্ত্রীসহ ওসামা পরিবারের পাশাপাশি কুয়েতি পরিবারের জন্যও জায়গা রাখা হয়। ওসামা কখনোই টেলিফোন, ইন্টারনেট বা কেব্ল সংযোগ ব্যবহার করতেন না। তবে বিভিন্ন শহরে অবস্থানকালে তিনি মাঝে মাঝে ডিশ অ্যান্টেনার মাধ্যমে আল-জাজিরা টেলিভিশন দেখতেন। মার্কিন কমান্ডো বাহিনী যখন লাদেনের ঘরে ঢুকে পড়ে, তখন তিনি সশস্ত্র ছিলেন এবং গ্রেনেড খুঁজছিলেন। ডন।

বুদ্ধ গয়ায় মন্দিরে বিস্ফোরণের ঘটনায় একজন গ্রেপ্তার

ভারতের বিহার রাজ্যের বুদ্ধ গয়া শহরের মহাবোধি মন্দির কমপ্লেক্সে বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ সিসিটিভিতে ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখছে। ভিডিও ফুটেজে দুই ব্যক্তিকে সেখানে বোমা স্থাপন করতে দেখা যায়। mমন্দিরে বিস্ফোরণের প্রতিবাদে ডাকা বনেধ গতকাল সোমবার অচল হয়ে পড়ে গয়া জেলার জনজীবন। সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরাপত্তায় অবহেলার অভিযোগ তুলে পৃথকভাবে বনেধর ডাক দিয়েছিল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও বিহার রাজ্যভিত্তিক দল রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি (আরজেডি)। গত রোববার সকালে ওই মন্দিরে পর পর নয়টি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দুজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আহত হন। এই ‘সন্ত্রাসী হামলা’র তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারতের সরকার। পুলিশের স্থানীয় মেগাধ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) নায়ের হাসনিয়ান খান বলেন, মন্দিরের আঙিনা থেকে উদ্ধার করা একটি পরিচয়পত্রের সূত্র ধরে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আটক ব্যক্তির নাম বিনোদ মিস্ত্রি। এএফপি ও পিটিআই।

জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ

জ্যোতি বসু
ভারতজুড়ে গতকাল সোমবার থেকে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও প্রয়াত জননেতা জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ পালন শুরু হয়েছে। ১৯১৪ সালের এই দিনে কলকাতায় জ্যোতি বসুর জন্ম হয়। তবে তাঁর শৈশবের বড় একটা সময় কেটেছে পৈতৃক ভিটা বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের বারদি গ্রামে। ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি মারা যান সিপিআই-এমের জনপ্রিয় এই নেতা। গতকাল সিপিআই-এমের উদ্যোগে জ্যোতি বসুর স্মরণে কলকাতার মহাজাতি সদনে শতবর্ষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিপিআই-এমের কেন্দ্রীয় সম্পাদক প্রকাশ কারাত, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসুসহ বাম দলের নেতারা। জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে গতকাল কলকাতার বিভিন্ন সংবাদপত্র বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে রাজ্য সচিবালয়ে জ্যোতি বসুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানো হয়। রাজ্য বিধানসভায়ও আয়োজন করা হয় জ্যোতি বসুর স্মরণ উৎসবের। গতকাল সকালে জ্যোতি বসুর সল্ট লেকের বাসভবনে স্মরণ উৎসবের আয়োজন করে পথের পাঁচালী। এ ছাড়া ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও সিপিআই-এম জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষ পালন করে।

ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে আইনি বিতর্ক

ডিউক অব কেমব্রিজ প্রিন্স উইলিয়াম ও ডাচেস অব কেমব্রিজ কেট মিডলটন দম্পতির সন্তান আসছে মধ্য জুলাইয়ে। ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রিন্স চার্লসের পরে রয়েছেন উইলিয়াম। তাঁর অনাগত সন্তান মেয়ে হলে সে উত্তরাধিকারী হতে পারবে না—এমন একটি আইন প্রণয়ন নিয়ে কমনওয়েলথে বিতর্ক চলছে। মূলত সিংহাসনে আসীন রাজার কন্যাসন্তান যাতে রাজার ছোট ভাইয়ের উত্তরাধিকারের পথে বাধার সৃষ্টি না হন—সেটি নিশ্চিত করতেই নতুন ওই আইন প্রণয়নের কথা চলছে। বর্তমান ব্যবস্থায় ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পর বড় ছেলে প্রিন্স চার্লস সিংহাসনে বসার কথা। চার্লসের পর বসবেন তাঁর বড় ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম। উইলিয়ামের পর এখন পর্যন্ত সিংহাসনের উত্তরাধিকারী তাঁর ছোট ভাই প্রিন্স হ্যারি। তবে এ মাসেই উইলিয়াম-কেটের সন্তান জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই সন্তান উত্তরাধিকারী হিসেবে তার চাচা হ্যারিকে পেছনে ফেলে দেবে। তবে উইলিয়ামের প্রথম সন্তান মেয়ে হলে সেই মেয়ে হ্যারিকে পেছনে ফেলবে না—এমন একটি আইন প্রণয়ন নিয়ে বিতর্ক চলছে। ২০১১ সালের অক্টোবরে কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটা খুব জটিল। কারণ, এই আইন করতে হলে যে ১৬টি দেশ প্রতীকী অর্থে ব্রিটিশ রাজত্ব মানে, তাদের সবাইকে একমত হতে হবে। এএফপি।

লাতিনে স্নোডেনকে আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে রাউল

মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসএ) সাবেক কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেনকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের আগ্রহের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো। অবশ্য কিউবায় স্নোডেনকে আশ্রয় দেওয়া বা তাঁকে নিরাপদে লাতিনের যেকোনো একটি দেশে যাওয়ার নিরাপদ পথ তৈরি করে দেবে কি না, সে ব্যাপারে তিনি পরিষ্কার কিছু বলেননি। এদিকে রাশিয়ার পার্লামেন্টের প্রভাবশালী সদস্য আলেক্সি পুশকোভ বলেছেন, ভেনেজুয়েলাই স্নোডেনের ‘শেষ সুযোগ’। অ্যালেক্সি রুশ পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্রধান। তিনি স্নোডেনকে উৎসাহ দেওয়ার ব্যাপারে বিভিন্ন সময় ক্রেমলিনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এক টুইটার বার্তায় অ্যালেক্সি বলেন, ‘ভেনেজুয়েলা স্নোডেনের জবাবের অপেক্ষা করছে। সম্ভবত, এটাই তাঁর রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের শেষ সুযোগ।’
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া ও নিকারাগুয়া ইতিমধ্যে স্নোডেনকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিউবার জাতীয় পরিষদে গত রোববার এক ভাষণে কাস্ত্রো বলেন, ‘যাঁরা নিজেদের আদর্শ বা গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন, তাঁদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে ভেনেজুয়েলাসহ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের...সার্বভৌম অধিকারকে আমরা সমর্থন করি।’ স্নোডেনের বিষয়ে এই প্রথম প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করলেন রাউল কাস্ত্রো। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন মার্কিন নাগরিককে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে কিউবা। তবে স্নোডেন কিউবায় আশ্রয় চেয়েছেন কি না বা চাইলেও এ বিষয়ে দেশটির অবস্থান কী, সে সম্পর্কে ভাষণে কিছুই বলেননি রাউল। রাউল তাঁর বক্তব্যে স্নোডেনকে আশ্রয়দানকারী দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মার্কিন হুমকির নিন্দা জানান। একই সঙ্গে স্নোডেন আছে সন্দেহে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের বিমানকে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ইউরোপীয় দেশগুলোর নিন্দা জানান তিনি। রাউল বলেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ প্রমাণ করে, আমরা এমন বিশ্বে বাস করছি, যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো মনে করে, তারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে, অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করতে পারে এবং জনসাধারণের অধিকার পদদলিত করতে পারে।’ রয়টার্স ও এপি।

ম্যান্ডেলার অবস্থা সংকটাপন্ন তবে স্থিতিশীল

নেলসন ম্যান্ডেলা
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নন্দিত নেতা ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হলেও স্থিতিশীল রয়েছে। অবশ্য তাঁর সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। ফুসফুসের সংক্রমণে আক্রান্ত ম্যান্ডেলার সুস্থতার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বজুড়ে প্রার্থনা চলছে। দেশটির গণ-উদ্যোগমন্ত্রী মেলুসি গিগাবা জোহানেসবার্গের ক্যাটলহং গির্জায় গতকাল এক প্রার্থনা সভায় বলেন, ম্যান্ডেলা কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করছেন। ম্যান্ডেলা ‘স্থায়ীভাবে বোধশক্তিহীন অবস্থায়’ চলে গেছেন এবং তাঁকে বিশেষ ব্যবস্থায় বাঁচিয়ে রাখা (লাইফ সাপোর্ট) হয়েছে বলে তাঁর বড় মেয়ে ম্যাকাজিওয়ে, স্ত্রী গ্রাসা ম্যাশেল এবং সাবেক স্ত্রী উইনির আইনজীবী ডেভিড স্মিথ আদালতকে জানিয়েছেন। ম্যান্ডেলার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। রুদ্ধদ্বার আদালতে গত ২৬ জুন এসব তথ্য জানানো হলেও বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে গত সপ্তাহে প্রকাশিত হয়। ম্যান্ডেলা পরিবারের সদস্যরা এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ম্যান্ডেলার সহযোদ্ধা ও বন্ধু ডেনিস গোল্ডবার্গ বলেন, তিনি গত সপ্তাহে ম্যান্ডেলাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তখন ম্যান্ডেলা চোখ মেলে তাকিয়েছেন এবং কথা বলার চেষ্টা করেছেন। গ্রাসা ম্যাশেল তখন গোল্ডবার্গকে বলেন, ম্যান্ডেলার সেরে ওঠার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ২৭ বছর কারাগারে ছিলেন। বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর ১৯৯০ সালে তিনি মুক্তিলাভ করেন। আইরিশ ইনডিপেনডেন্ট, বিবিসি ও এপি।

মিসরে আবার ব্রাদারহুড!

কায়রোয় সেনাবাহিনীর অভিযানের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট
মোহাম্মদ মুরসির এক সমর্থক দুই হাত তুলে সংবাদকর্মীদের
কার্তুজ দেখাচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, সেনাবাহিনী নির্বিচারে
গুলি করে ৪২ সমর্থককে হত্যা করেছে ষ রয়টার্স
মিসরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে সেনাবাহিনী ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর রাজপথে অবস্থান নিয়েছে মুরসির সমর্থক ও বিরোধীরা। দুই পক্ষে চলছে ব্যাপক সংঘাত। গত কয়েক দিনে নিহত হয়েছে অন্তত ৮০ জন। এ অবস্থায় মিসর কোন পথে এগোচ্ছে, তা নিয়ে চলছে বিচার-বিশ্লেষণ। সেনাবাহিনী মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর তিনিসহ তাঁর কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টাকে আটক করে। তাঁর মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং স্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। তাঁদের জন্য এটা চরম অবমাননাকর। মুরসি মোটেও জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। রাজনৈতিক ক্যারিশমা বলতে যা বোঝায়, তার ছিটেফোঁটাও তাঁর মধ্যে ছিল না। দেশের অন্যতম সমস্যা দারিদ্র্য এবং বেকারত্বের সমাধানে তিনি কোনো সাফল্য দেখাতে পারেননি। দীর্ঘ তিন দশকের স্বৈরশাসনের পর মিসরে গণতন্ত্র এসেছিল এবং তা মানুষের প্রত্যাশা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। কোনো প্রেসিডেন্টের পক্ষে এ প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব নয়। আর মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মুরসির মধ্যেও এমন কোনো বাড়তি গুণ ছিল না, যা দিয়ে তিনি মানুষের ওই প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করতে পারতেন। এর পরও একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে এমনভাবে সরিয়ে দেওয়াটা ভালোভাবে নেয়নি মিসরের জনগণের একটা বড় অংশ। তাই বলে এ জন্য তারা যে খুব ক্ষুব্ধ, তা নয়। তারা এটাকে সোজা কথায় ‘সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থান’ হিসেবে ধরে নিয়েছে। তবে এ ‘অভ্যুত্থানের’ বিরুদ্ধে তারা কথা বলছে একটু নরম সুরে। মুরসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিসরের দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের মাথায় বিরোধীদের বিক্ষোভের মুখে গত বুধবার রাতে সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েদেয়। মুরসিকে অপসারণকারী সেনাবাহিনীকে যারা সমর্থন করছে, তারা নিজেদের ভাবছে জাতীয় চেতনার জিম্মাদার। তাদের ভাবটা এমন, দেশের সংকটময় মুহূর্তে অসাংবিধানিক কিছু করার অধিকারও তারা রাখে। তাদের দাবি, দেশের মানুষ যা চাইছে, তারা শুধু সেটাই করছে। এ অবস্থায় মিসরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভয়ংকর প্রশ্ন হলো নতুন করে নির্বাচন হলে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থীই কি আবার বিজয়ী হবেন? এর জবাব হলো সেটা এখন প্রায় অসম্ভব। কারণ, মুরসির অদক্ষ শাসনের সময়ই ব্রাদারহুড জনপ্রিয়তা খুইয়েছে। এর পরও মনে রাখতে হবে, মুসলিম ব্রাদারহুডই দেশের সবচেয়ে সংগঠিত শক্তি। আর এখন তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, সাধারণ মানুষ তাতে ক্ষুব্ধ হতে পারে এবং এতে করে ব্রাদারহুডই লাভবান হতে পারে। আর সাধারণ মানুষের এ ক্ষোভ আবার তাদের ক্ষমতায় নিয়ে আসতে পারে। মুরসির সমর্থকেরা মনে করে, সেনাবাহিনী তাঁকে সরিয়ে দেওয়ায় পশ্চিমারা খুশি হয়েছে। যদিও তাঁর সঙ্গে কাজ করতে পশ্চিমাদের কোনো অস্বাচ্ছন্দ্য ছিল না। ওয়াশিংটন, লন্ডন আর প্যারিস এখন সম্ভবত মিসরে এমন একজন নতুন নেতার অপেক্ষায় আছে, যার সঙ্গে কাজ করা আরও সহজ হবে। বিশেষ করে সিরিয়া সংকটের মতো বিষয়ে তাঁকে পাশে পাওয়া যাবে। এখন সবকিছু নির্ভর করছে কতটা দ্রুততার সঙ্গে মিসর নতুন নির্বাচনের দিকে এগোবে এবং সেই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হবে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী সেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে কি না তার ওপর। কেননা, ক্ষমতার অদলবদলে প্রভাব রাখার পেছনে মিসরের সেনাবাহিনীর ব্যাপক অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।