Monday, November 18, 2013

রাজনৈতিক মারেফাত এই নেই এই আছে by বেগম জাহান আরা

মিছিল, হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, গুলি, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, মানুষের চিৎকার-চেঁচামেচি, দুই নেত্রীর বক্তৃতা, আতিনেতা-পাতিনেতা-নাতিনেতা-ছাতিনেতাদের রকমারি কথার উচ্চকিত জিকির-আসকারে দিনগুলো বয়ে যাচ্ছিল। টিভি তো দেখতেই হয়। সময়ের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী। নাটকের সিরিয়াল না দেখার কারণে খবর-টকশো দেখা-শোনাটা একটু বেশি হয়। হঠাৎ দেখি, সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকের শুরুতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা তাদের পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিচ্ছেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, দফতরবিহীন মন্ত্রীদের পদত্যাগের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল ক’দিন থেকেই। এটা নাকি নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তুতি প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু জানা গেল, পদত্যাগপত্রে কেউ তারিখই লেখেননি। টিভির সামনে বসে একা একাই হাসলাম। ভাবলাম এমন ঘটনার অর্থ কী? প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন বলেই তো সবাই একযোগে, মানে পুরো ক্যাবিনেট পদত্যাগ করেছে। সংবিধান মতে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সব মন্ত্রীর পদ শূন্য হয়ে গেল। আরও দুই-এক মন্ত্রী তো এ পদ্ধতিতেই পদত্যাগ করেছেন। মন্ত্রীশূন্য ক্যাবিনেটে রইলেন শুধু প্রধানমন্ত্রী। কী হল ঘটনাটা? ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। ক্যাবিনেট আছে, মন্ত্রীরা নেই। ক্যাবিনেট তো আর ভাঙা হয়নি! তাহলে পরদিন থেকে দেশের কাজকর্ম চলবে কেমন করে? এক প্রধানমন্ত্রী ‘দশভুজা’ হয়ে কাজ করলেও পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব নয়। সব আমলা এগিয়ে এলেও লাভ নেই। তারা চাইলেও আসতে পারবেন না। এই শূন্যতার বাস্তবতা অনুধাবন করে মন্ত্রিপরিষদের সচিব ওহি নাজেলের মতো ঘোষণা করলেন, মন্ত্রিসভা ভাঙা হচ্ছে না বরং পুনর্গঠিত হচ্ছে। আর সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, পদত্যাগী মন্ত্রীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাবেন, অফিস করবেন এবং যথারীতি ফাইলপত্রে সইও করবেন। প্রশ্নটা উঠেছে এই দুটি ব্যাপারে। পদত্যাগপত্র জমা নেয়ার পর বলা হচ্ছে, সবই ঠিক আছে। কাজ চালিয়ে যাবেন মন্ত্রীরা। সুযোগ-সুবিধা পাবেন। সই-সাবুদ দিয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করতেও পারবেন। মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের এমন অভিনব প্রক্রিয়ার ঘটনা আর তো ঘটেনি কখনও। তাই এভাবে ক্যাবিনেট শূন্য করার পর পদবিহীন মন্ত্রীদের বহাল মনে করা (কারণ সবই তারা পাবেন এবং করবেন আগের মতোই) এবং সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটা (মানে হঠাৎ করে মন্ত্রীশূন্য করে দেয়া দেশের প্রশাসন কাজকর্মকে) সাংবিধানিক কিনা- এ প্রশ্ন তুলতেই পারেন কেউ কেউ। তুলছেনও।
আমরা আমজনতা। কিছু তেমন জানিও না, বুঝিও না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা যখন ঘটনা বিশ্লেষণ করেন, তখন শুনি মন দিয়ে। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, ‘মন্ত্রীরা কেউ পদত্যাগ করেননি। তারা অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। তারা তারিখবিহীন যে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, তা সংবিধান অনুযায়ী নেয়া হয়নি’ (যুগান্তর, ১৩.১১.১৩)। প্রশ্ন হল, রীতিমতো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার পূর্বশর্ত নাকি এই অভিপ্রায়পত্র জমা দেয়া? সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কি এটাই? অথবা তারিখবিহীন পদত্যাগপত্রকে এখন থেকে অভিপ্রায়পত্রই বলা হবে? সংবিধানের আকুল ভক্তদের কাছে প্রশ্ন, সংবিধান কী বলে এক্ষেত্রে? যদি জানা থাকে, তাহলে বলুন। আর যদি জানা না থাকে, তাহলেও বলুন। মারেফাতের রহস্য সৃষ্টি করবেন না।
অন্যদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলছেন, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগপত্র প্রদান করলেই মন্ত্রীপদ শূন্য হয়ে যাবে। সাংবিধানিক পদধারীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা বা না করার কোনো বিধান সংবিধানে নেই। তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধানের ৫৮(১) অনুচ্ছেদটিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, এ বিধান অনুযায়ী পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মন্ত্রীর পদ শূন্য হয়ে যাবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’ পদত্যাগপত্রে তারিখ না থাকা প্রসঙ্গে ড. শাহদীন বলেন, তাতে কিছু আসে যায় না। পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার তারিখই থাকবে পত্রে। অর্থাৎ সত্যিকার পদত্যাগ হয়ে গেছে। মন্ত্রীরা আর মন্ত্রী নন।
অবস্থাটা কী দাঁড়াল? কেউ বলছেন মন্ত্রিত্ব নেই, কেউ বলছেন আছে। এই নেই, এই আছে। এখানে কথার মায়াজাল বিস্তার করা হচ্ছে। বস্তুগত সত্যকে সামনে রেখেও বলা হচ্ছে, এটা সে বস্তু নয়। কিন্তু এই মারেফতি আপেক্ষিক তত্ত্বের মতো খোলা খোলা কথা অনেকেই মানতে চাইছেন না। যুক্তিমতে পদত্যাগ করলেই যদি সেই পদ শূন্য হয়, তাহলে মন্ত্রিত্ব থাকে কীভাবে? খুব সরল প্রশ্ন। যতক্ষণ না পুনর্বহাল হচ্ছেন মন্ত্রী, ততদিন তিনি মন্ত্রী নন। পদত্যাগপত্র গ্রহণের যে যুক্তি দেখানো হচ্ছে, সেখানেও ক্রান্তিকালীন ফাঁক থেকে যাচ্ছে। ধরা যাক, পত্র গৃহীত হল ক’দিন পরে। সেই ক’দিন তো পদত্যাগী মন্ত্রী ক্যাবিনেটের কেউ নন। এ যুক্তির ওপর যারা জোর দিচ্ছেন, তাদেরই সমর্থন করি আমি। আর যারা বলতে চান যে, পদত্যাগপত্রগুলো আসলে পদত্যাগের অভিপ্রায়পত্র, তাদের কথায় মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। কিংবা আইনমন্ত্রী যখন বলেন, ‘এটা কোনো পদত্যাগপত্রই না। সর্বদলীয় সরকার গঠনে প্রধানমন্ত্রীকে সবার সাপোর্ট হিসেবে একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এটা এক ধরনের প্রশাসনিক সাপোর্টের অংশ মাত্র’, তখন অধিক শোকে পাথর হয়ে যাই। পদত্যাগপত্র, মন্ত্রীর শূন্য পদ এবং মন্ত্রিত্ব লুপ্ত, অসাংবিধানিকভাবে মন্ত্রীর সুযোগ-সুবিধা, বেতন-ভাতাদি নেয়ার অধিকার, ফাইলে সই করার ক্ষমতা, দাখিল করা পদত্যাগপত্রকে পদত্যাগের অভিপ্রায়পত্র নাম দেয়া, একযোগে ক্যাবিনেট সদস্যদের পদত্যাগপত্র প্রদানের ব্যাপারকে প্রশাসনিক সাপোর্ট বলা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে দেশে। সমাধানের কথা এখনও বলতে পারছেন না কেউ। মানে এই ঝড় থামবে কখন ও কী উপায়ে, তার দিশা পাওয়া যাচ্ছে না। একটা বাজে উত্তাল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে পড়েছি আমরা।
সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সর্বদলীয় সরকারের সদস্য হবেন যারা, তাদের পত্রই শুধু পদত্যাগপত্র হিসেবে গ্রহণ করা হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, যারা সর্বদলীয় সরকারে থাকবেন না, তাদের আবার পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে কি? এই অকাট্য যুক্তিসই প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, নতুন করে পদত্যাগপত্র দিতে হবে না। মৌখিকভাবে জানালেই হবে। মানেটা কী দাঁড়াল, বুঝতে সময় নিলাম। অর্থাৎ মুখের কথায় অভিপ্রায়পত্রগুলো, যা সংবিধান অনুযায়ী হয়নি, তা পদত্যাগপত্রে রূপান্তরিত হয়ে যাবে? এ কেমন মারেফাত?
আলোচনায় বসলে আমরা, অকর্মা বয়সী মানুষেরাও বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের কারণ খুঁজি। বক্তৃতার সময় জনদরদের চোটে চোখে প্রায় পানি এসে যায় নেতাদের। আমজনতাকে সেবা দেয়ার জন্য প্রতিশ্র“তির ঝড় বয়ে যায়। আবেগের বাহুল্যে প্রধানমন্ত্রী বলেই বসলেন যে, তিনি মানুষের সেবা করতে চান। দেশের সুখ-সমৃদ্ধি চান। প্রধানমন্ত্রিত্বের চেয়ে দেশবাসীর কল্যাণই তার কাছে বড়। চান না তিনি এমন প্রধানমন্ত্রিত্ব। কথাটা শুনতে ভালো লাগছিল। বর্তমানের দমবন্ধ করা অবস্থায় দেশের শান্তিকে যারা বড় করে ভেবেছেন, তারা দেখেছিলেন আশার আলো। আমরাও। কিন্তু কী অর্বাচীন আমরা! ওসব যে মাঠ গরম করার কথা, তা জেনেও ভালো কিছু আশা করি। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান অস্থির অবস্থার জন্য দুই নেতাই দায়ী। আমজনতার জন্য যতই অশ্র“ ঝরান তারা, তাদের আসল উদ্দেশ্য ক্ষমতা। সার্বিক ক্ষমতা। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সাংবিধানিকভাবে বাতিল করার পেছনেও ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যই প্রধান। অথচ প্রধানমন্ত্রী একদা এ ব্যবস্থা কায়েমের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। সেটা ভুলে গেলেন কীভাবে? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা এবং তা বাতিল করার মধ্যে নিপাট রাজনীতির খেলা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছাড়া আর কী আছে? হ্যাঁ, আছে। এবার সংবিধানের কর্মটা প্রধানমন্ত্রীর মুঠোর মধ্যে। জনগণের কোন স্বার্থের বিবেচনায় এই খেলা? কথায় কথায় সংবিধানের ডুগডুগি বাজানো কেন? সংবিধান কি কোনো দলের বা কোনো নেতার একার সম্পদ? চিরকাল কেউ কি ক্ষমতায় থেকেছেন? আইয়ুব খান ও এরশাদকেও ক্ষমতা ছেড়ে যেতে হয়েছে। আর চিরকাল কেউ কি ক্ষমতায় থেকেছেন? লিবিয়া, মিসর তো হালের কথা। এত পরাক্রম যে ব্রিটিশ রাজা, তাদেরও ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যেতে হয়েছে। আমজনতার কথা কতটা কে ভাবে, সেটা লেখা আছে ইতিহাসে। অথচ এই আমজনতাই প্রাণ দেয় রাজনৈতিক সংকটে, মুক্তিযুদ্ধে এবং ক্ষমতার লড়াইয়ে। একই কথা বিরোধীদলীয় নেতার জন্য। আবেগ নয়, ফাঁকি নয়, সত্যি সত্যি দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসুন আপনারা। আমাদের দেশটা সোনার দেশ। কী নেই আমাদের? খেলতে গেলে খেলার নিয়ম মানতে হয়। নইলে পণ্ড হয় খেলা। তেমনি রাজনীতিরও নিয়ম আছে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির। সেটা তো মানতেই হবে। আজকাল তো নেতাদের ভাষিক শালীনতারও স্খলন দেখা যায় মাঝে মাঝে। এটা একেবারেই মানা যায় না। শেষ কথা, একটা সমঝোতায় আসুন আপনারা। সদিচ্ছা থাকলে পথও খুলে যায়।
গত দুই-তিন সপ্তাহে তড়িঘড়ি কয়েকটা বিল পাস হয়েছে সংসদে। সময়ের সীমা লংঘন করে বর্ধিত সংসদে ‘দলে নাম লেখালেই সংসদ সদস্যের প্রার্থিতা’ এবং ‘গ্রামীণ ব্যাংক’ সংক্রান্ত বিল পাস হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে সংসদে কিছু পাস করিয়ে নেয়াটা কোনো ব্যাপারই নয়। তাহলে দেশ ও জনগণের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্বন্ধীয় গঠনমূলক ও সমঝোতামূলক কোনো প্রস্তাব পাস করানো তো কঠিন কিছু নয়। সংবিধান তো সংশোধন, পরিমার্জন হতেই পারে। সংশোধনীর মাধ্যমেই সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে, সংশোধনীর মাধ্যমেই তারও পরিবর্তন আনা সম্ভব। কথাটা এখন হাবাগোবা আমজনতাও বোঝে। কারণ জীবন সংগ্রামের ঝুঁকিতে নিতান্ত এতিমের মতো কাল কাটাচ্ছেন তো তারাই! মারেফাতের চিন্তা করলে সাধারণ মানুষের পেট চলে না। সহিংস হরতালে মানুষ মারা যাচ্ছে। এর দায় কিন্তু নেতাদেরই।
ড. বেগম জাহান আরা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, গবেষক

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশ আমোদ-আনন্দ ও বেদনার কিছু স্মৃতি by মহিউদ্দিন আহমদ

গত ১৮ অক্টোবর শুক্রবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ চেম্বারে ‘Women, peace and securit’ বিষয়টির ওপর আলোচনা আমি শুনতে থাকি, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত আসনগুলোর একটিতে বসে। আমার পাশে আরও দুই বাংলাদেশী কূটনীতিবিদ- জাতিসংঘের জেনেভা অফিসে আমাদের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত হান্নান এবং নিউইয়র্কে আমাদের স্থায়ী মিশনের উপস্থায়ী প্রতিনিধি- ডেপুটি পারমান্যান্ট রিপ্রেজেনটেটিভ (ডিপিআর) মুস্তাফিজ। নিউইয়র্কে আমাদের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. আবদুল মোমেন এখানে আমাদের সঙ্গে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু পাশের অন্য এক কামরায় অন্য একটি মিটিংয়ে চলে গিয়েছেন। বছরের এই সময়টাতে নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দফতরে একই সময় কয়েক ডজন সভা চলতে থাকে কখনও কখনও।
ড. মোমেন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বর্তমান মহাজোট সরকারের প্রায় শুরু থেকেই জাতিসংঘে আমাদের স্থায়ী প্রতিনিধি। ছিলেন বোস্টনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাসিনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সেই আশির দশকের মাঝামাঝি থেকেই। বোস্টনে থাকাকালেও বলতে গেলে, সার্বক্ষণিক ‘একটিভিস্ট’ ছিলেন। সেই এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড মেরে হত্যাচেষ্টা, কিবরিয়া হত্যাসহ বাংলাদেশের সবগুলো জাতীয় ইস্যুতে তিনি সংশ্লিষ্ট থেকেছেন গভীরভাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী জনগোষ্ঠী এবং মার্কিনিদের মধ্যে মূলত গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জনমত এবং সমর্থন সৃষ্টিতে সচেষ্ট থেকেছেন তিনি। শেখ হাসিনা ২০০৯-এর ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ড. মোমেনকে যখন ডাকলেন, ড. মোমেন প্রধানমন্ত্রীর সেই আহ্বানে সাড়া দিতে বাধ্য হলেন, যেমন বাধ্য থাকেন যে কোন দেশপ্রেমিক নাগরিক।
জাতিসংঘে তার প্রায় এই সাড়ে চার বছর অবস্থানকালে, তার নেতৃত্বে আমাদের নিউইয়র্কে মিশনের বেশ কতগুলো সাফল্য আছে। এই সিরিজের সর্বশেষ সাফল্য হল, গত ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে বাংলাদেশ ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৮১টি ভোট পেয়ে ‘ইকোসক’,Ñ ইকোনমিক অ্যান্ড সোস্যাল কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। বাংলাদেশের চেয়ে কয়েক ভোট বেশি পেয়েছে চীন; ৫৪ সদস্যবিশিষ্ট এই ইকোসকের সদস্য পদ তিন বছরের জন্য, টার্ম শুরু হবে আগামী ১ জানুয়ারিতে।
বলতেই হবে এসব সাফল্যের পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির আগ্রহ-উৎসাহ এবং নির্দেশনা অবশ্যই প্রবল ভূমিকা রেখেছে।
রাষ্ট্রদূত হান্নান জেনেভা থেকে নিউইয়র্ক এসেছেন সরকারি কাজে। তার স্ত্রী সেলিনা এখন আমাদের মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়ের সচিব। আমাদের বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক এবং হান্নান দম্পতি একই ব্যাচের কর্মকর্তা। সেলিনার অভিযোগ, হান্নান জেনেভাতে বছরের কোনো কোনো সময় এত ব্যস্ত থাকে যে তার সঙ্গে কথা বলতে হলে সেলিনাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে হয়। ফরেন সেক্রেটারি শহীদুল হককে জেনেভা থেকে ডেকে এনে ফরেন সেক্রেটারি করা হয়েছে বছরের শুরুতে। আইএমও ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব মাইগ্রেশন দীর্ঘদিন কাজ করেছে শহীদ, প্রথমে ঢাকায় তারপর ব্যাংককে, তারপর জেনেভাতে, সদর দফতরে। ইরাক, লিবিয়া, এমন সব দেশে যুদ্ধের সময় আমাদের হাজার হাজার বাংলাদেশীকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এই সংস্থাটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এখানে শহীদুল হকের প্রশংসনীয় ভূমিকাও ছিল। মুস্তাফিজ নিউইয়র্ক যাওয়ার আগে কলকাতায় আমাদের ডেপুটি হাইকমিশনার ছিল, ডেপুটি হাইকমিশন হলেও এটি আমাদের বৃহত্তম মিশন। কাজের প্রচণ্ড চাপ এখানে।
আর আমি? ২৩ বছর আগে আমিও এখানে উপস্থায়ী প্রতিনিধি ছিলাম। বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমেদের সরকার আমাকে এখানে পাঠিয়েছিল; কিন্তু টিকতে পারিনি বেশি দিন, ১০ মাসের মাথায় আমাকে ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়। টেনেটুনে দেড় বছর ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে গুরুতর ‘অভিযোগ’, নিউইয়র্ক মিশনে আমার অফিসে আমি প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবি রেখেছিলাম। ছবিটি ছিল বঙ্গভবনের, ১৯৯৩-এর ৬ ডিসেম্বরের, সাহাবুদ্দীন সাহেব অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর তিনজন একই ফ্রেমে, অসাধারণ একটি ছবি, দুই নেত্রী মাথায় ঘোমটা দিচ্ছিলেন। কয়েকশ’ টাকা দিয়ে একটি প্রদর্শনী থেকে ছবিটি কিনে পরে আরও কয়েকশ’ টাকা দিয়ে সিলভার ফ্রেমে ছবিটি বাঁধাই করে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ছিল জিয়াউল হক জিয়া, খালেদা জিয়ার তখনকার এক ‘মিলিট্যান্ট’ সংসদ সদস্য।
১৯৯১-তে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে একজন সদস্য হিসেবে যোগ দিতে গিয়েছিল সেই বছর সদস্য হিসেবে আরও গিয়েছিল নাসিরউদ্দিন পিন্টুও। তখন ছাত্রনেতা এবং বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় সদ্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী। এই দুই ব্যক্তি একজনও একদিনের জন্যও জাতিসংঘ ভবনে যাননি, তবে দৈনন্দিন ভাতা ঠিকই নিয়েছেন।
‘অভিযোগ’ আরও গুরুতর রূপ নিল যখন এই জিয়াউল হক জিয়া প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছে অভিযোগ করেন, নিউইয়র্কে আমার অফিসে আমি বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙিয়েছি। জিয়াউল হক জিয়ার অভিযোগকে বাতাস দিতে থাকল নিউইয়র্কের ইনকিলাব নামে পরিচিত বাংলা সাপ্তাহিক ঠিকানা এবং তার মালিক এমএম শাহীন। পরে কুলাউড়া থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য এবং আরও পরে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত। জিয়াউল হক জিয়াও বহিষ্কৃত, ওখানকার বিএনপি নেতা নাজিমুদ্দীন আলমের সঙ্গে প্রায়ই সংঘর্ষে লিপ্ত। দুজনই ফেরদৌস কোরেশীর দলে যোগ দিয়েছিল, এখন আবার তওবা পড়ে ফিরে আসতে চেষ্টা করছে। তবে এমএম শাহীনের জন্য প্রবল হুমকি- মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি সভাপতি এবং মরহুম সাইফুর রহমান পুত্র নাসের রহমান এবং লক্ষ্মীপুরে জিয়াউল হক জিয়াকে বিএনপিতে ঢুকতে দেবে না নাজিমুদ্দীন আলম। দুজনই সন্ত্রাসী চরিত্রের, এই দৈনিক যুগান্তর পত্রিকাতেই ২০০৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শাহীনের ওপর প্রথম পৃষ্ঠায় একটি খবর ছিল- ‘সংসদে শাহীনের অভব্য আচরণ।’
দুই.
প্রায় ২২ বছর পর আমার নিউইয়র্ক আসা, সরকারি প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য হিসেবে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চলমান বিতর্ক আমি দেখি এবং শুনি। পেছনের দুটো পর্দায় দেখতে পাই নাভি পিল্লাইকেও জেনেভা থেকে তাকে ভিডিওর মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়েছে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক, একজন বিচারপতি ছিলেন ওই দেশের; এখন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। জেনেভাতে তার অফিস।
নিরাপত্তা পরিষদের বিবেচ্য বিষয়টি গরম কিছু নয়। তাই আমি ভাবতে থাকি, ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে আমাদের বাংলাদেশ ইস্যুতে কত সব গরম গরম বক্তৃতা, উত্তেজনা, তৎপরতা। ভারতীয় সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট থেকে এগিয়ে আসছে- আকাশে বাতাসে যুদ্ধ। একই সময় নিউইয়র্কের এই ৩৮ তলা জাতিসংঘ ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে সিকিউরিটি কাউন্সিল চেম্বারেও চলছে অন্য রকমের এক প্রচণ্ড যুদ্ধ- কূটনৈতিক যুদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন চাইছে যুদ্ধবিরতি। ভারতকে সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে তখন সমর্থন করছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। যুদ্ধবিরতি হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধটাও তখন থেমে যায়। আমরা তা কিছুতেই তা হতে দিতে পারি না। হতে দিতে পারে না ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপের তখনকার সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো। আমাদের ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদে আক্রমণ প্রতি-আক্রমণ যত না ভারত পাকিস্তানের মধ্যে, তার চেয়ে অনেক বেশি চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে। চীন প্রবলভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করছে, আর প্রবলভাবে সমর্থন দিচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। আমাদের সমর্থনে সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন মাত্র ১০ দিনের মধ্যে তিন-তিনটি ভেটো দেয় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন পাল্টা প্রস্তাব দিচ্ছে, শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার নেতৃত্বে ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথাও থাকতে হবে নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবে। কিন্তু এমন কিছু একেবারেই মানছিল না পাকিস্তান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে ছেড়ে দিয়ে তার হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর, ইয়াহিয়া খান এবং তার অন্যসব জেনারেল জন্য ছিল চরম অবমাননাকর।
সুতরাং ১৯৭১-এর ৪ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থাপিত প্রস্তাবে প্রথম সোভিয়েত ভেটো, পর দিন ৫ ডিসেম্বর আবার সোভিয়েত ভেটো। এবার প্রস্তাব উত্থাপনকারী ছিল আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম, বুরুন্ডি, ইতালি, জাপান, নিকারাগুয়া, সিয়েরালিওন এবং সোমালিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের তৃতীয় ভেটোটি দেয়া হয় ১৩ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্থাপিত আরেকটি প্রস্তাবে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এই সোভিয়েত ভেটোগুলোই আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের বিজয়কে নিশ্চিত করেছিল তখন। নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস করাতে ব্যর্থ পাকিস্তানপ্রেমিক দেশগুলো, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং আরব দেশগুলো তখন ছুটে গেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। ১৩১টি সদস্য রাষ্ট্র তখন জাতিসংঘের এবং এই ১৩১টি সদস্য রাষ্ট্রের ১০৪টিই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব সমর্থন করে প্রথমবার। যুদ্ধবিরতি এবং ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে বিপুল জনসমর্থন জাতিসংঘে। কিন্তু সৌভাগ্য আমাদের, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব মানাটা বাধ্যতামূলক নয়, যেমন বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব। চলমান সিরিয়া সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অন্যান্য পশ্চিমা ইউরোপীয় দেশ, সৌদি আরব, কাতার এবং তুরস্ক সিরিয়াকে গুঁড়িয়ে দিতে পারছে না; কারণ নিরাপত্তা পরিষদে এমন কোনো প্রস্তাব পাস হবে না। চীন এবং রাশিয়া সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান যুদ্ধে সিকিউরিটি কাউন্সিলে গৃহীত প্রস্তাবে কেউ ভেটো দেয়নি। কিন্তু ইরাকে যে আক্রমণ চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা দোস্তরা, সেখানে কোনো প্রস্তাব নেই নিরাপত্তা পরিষদের। তাই এটি একটি অবৈধ যুদ্ধ ছিল। তবে বাস্তব কথা হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন সব প্রস্তাবের তোয়াক্কা করে না সব সময়। তাদের শক্তি আছে, দুনিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই দেশটি যা ইচ্ছা, বলতে গেলে, তাই করতে পারে। এখন তো আর সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করবে। তাই এই জামানায় প্রায় উন্নয়নশীল দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেজাজ-মর্জি বুঝে কাজ করে চলে। এই দেশটিকে চ্যালেঞ্জ করলে বিপদে পড়তে হতে পারে।
তিন.
নিরাপত্তা পরিষদের এসব বিতর্কে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান জোরদার করতে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে নিউইয়র্কে পাঠানো হয়। কিন্তু ’৭১-এর ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে নিরাপত্তা পরিষদে একটি বক্তৃতা দিয়ে তার হাতে যে কাগজগুলো ছিল, সেগুলো টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে তিনি ঝড়ের বেগে পরিষদ চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসেন। বক্তৃতায় তিনি এই নিরাপত্তা পরিষদকে ‘দি ফ্যাশন হাউস হয়ার দি আগলিনেস অব দি ওয়ার্ল্ড ইজ ড্রেসড আপ ইন প্রেটি ওয়ার্ডস’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে তখন জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহী পরে পাকিস্তানের ফরেন সেক্রেটারি, তার এক সহকর্মী পেশাদার কূটনীতিবিদ রাষ্ট্রদূত ইকবাল আখুন্দকে (ড. কামাল হোসেনের স্ত্রী ড. হামিদা হোসেনের বড় ভাই) বলেছিলেন, ‘আই অ্যাম সিউর হি হ্যাড রিহার্সড ইট অল ইন ফ্রন্ট অব অ্যা মিরর বিফোর কামিং টু দি মিটিং’। ইউটিউবে আগ্রহীরা ভুট্টোর এমন অমার্জনীয় আচরণ এখনও দেখতে পাবেন।
জাতিসংঘেও পাকিস্তানের এমন বিপর্যয় এবং পরাজয়ের পর ভুট্টো নিউইয়র্কে তার হোটেলে একটি লাঞ্চ দিয়েছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে যেসব দেশ সমর্থন জানিয়েছিল, তাদের ধন্যবাদ জানাতে। এই লাঞ্চে পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের এক বাঙালি সদস্য জুলমত আলী খান পাকিস্তানের এমন পরাজয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন, লিখেছিলেন লাঞ্চে উপস্থিত ইকবাল আখন্দ তার মেমোয়ার্স অর অ্যা বাইস্ট্যান্ডার, অ্যা লাইফ ইন ডিপ্লোম্যাসি বইটিতে। বেগম খালেদা জিয়া তার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম টার্মে এই জুলমত আলী খানকে প্রথমে ভুটান এবং পরে থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত করেছিলেন।
আর যে চীন এমন প্রবলভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করল, সেই চীন এখন জামায়াত ও জাতীয়তাবাদীদের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’!!।
জাতিসংঘের এই নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্যের মধ্যে ৫টি দেশ- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া স্থায়ী সদস্য, তাদের কোনো নির্বাচনে খাড়া হতে হয় না, ১৯৪৬-এ জাতিসংঘের জন্ম থেকেই তারা স্থায়ী সদস্য, ভেটো ক্ষমতার অধিকারী। মানে, এই ৫টি দেশের যে কোনো একটিও যদি আপত্তি তোলে সেই প্রস্তাব পাস হবে না, যেমন হয়নি ৭১ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া এখন উত্তরাধিকারী হিসেবে স্থায়ী সদস্য। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেই দাপট বা ক্ষমতা কোনোটাই রশিয়ার নেই।
চার.
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এই গুরুত্বপূর্ণ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে দুইবার, দুই বছর মেয়াদি অস্থায়ী সদস্য হিসেবে; প্রথমবার ৭৯ ও ৮০, বছর দুটির জন্য। আবার নির্বাচিত হয় বাংলাদেশ, শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম টার্মে, ২০০০ ও ২০০১ বছর দুটির জন্য। বাংলাদেশ আবার প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে ২০১৬ ও ২০১৭ বছর দুটির জন্যও। আমাদের ঘোষণার পর জাপানও প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে আমাদের প্রতিযোগী হিসেবে। গত ১৮ অক্টোবর খুব আমোদজনক একটি ঘটনা ঘটেছে জাতিসংঘের এই নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচনে। সৌদি আরব এই প্রথমবারের মতো নিরাপত্তা পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হল, ১ জানুয়ারিতে আসন গ্রহণ করার কথা। নির্বাচিত হওয়ার পর নিউইয়র্কে সৌদি মিশনে যখন উৎসব চলছে, তখন রাজধানী রিয়াদ থেকে ঘোষণা এলো, তারা এই আসন গ্রহণ করবে না। সিরিয়া এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শক্ত ব্যবস্থা নেয়নি বলে প্রতিবাদে এই বর্জন। সৌদিরা শেষ পর্যন্ত কি করে তা জানা যাবে আরও কয়েক দিন পর। জাতিসংঘে বছরের পর বছর কূটনৈতিক তৎপরতা, তারপর নির্বাচন, তারপর সাফল্য। সৌদি আরবের মতো সাফল্য এবং বর্জনের এমন কোনো অতীত উদাহরণ জাতিসংঘে নেই। সৌদি আরব জাতিসংঘ সচিবালয়কে তাদের এই বর্জনের সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে এখনও জানায়নি। নিউইয়র্কে কোনো কোনো কূটনীতিবিদকে বলতে শুনেছি মার্কিনিরা এবং ৭৭ জাতি গ্র“প যদি একটু সাধাসাধি করে, তাহলে ‘তাহারা খাইবে’।
মহিউদ্দিন আহমদ : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সচিব

নির্বাচনী ট্র্যাপে আমলাদের কাছে ধরাশায়ী দুদক by আলমগীর স্বপন

‘ক্ষমতার অপব্যবহার মানে যদি দুর্নীতি হয়’ তাহলে প্রশ্ন আসে ক্ষমতাবান কারা? এর উত্তরে নিশ্চয়ই নিমিষেই আমাদের মাথায় চলে আসে সরকারের কথা। কেননা সরকারই ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রে থাকে। আর এর চালিকাশক্তি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে সরকারের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বা নির্বাচনের মাধ্যমে যারা সরকার কাঠামোয় যুক্ত হয়, সাদা চোখে তাদের ক্ষমতাই বেশি দৃশ্যমান। কিন্তু আখেরে আমলা মানে সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা ক্ষমতার পালাবদলেও থেকে যান ক্ষমতার কেন্দ্রে, বলা যায় তারাই প্রকৃত ক্ষমতাবান। এর প্রমাণ দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের সংশোধন নিয়ে আমলাদের ক্ষমতার চর্চা এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে টেক্কা দিয়ে এক্ষেত্রে বিজয়ী হওয়া। গত ১০ নভেম্বর সংসদে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) বিল-২০১৩ পাস হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা আবশ্যিকভাবে পালন করতে হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির এ ধারায় বলা আছে, সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো ফৌজদারি আদালত কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিতে পারবেন না। এর অর্থ সংশোধিত বিল অনুযায়ী সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুদক আর মামলা করতে পারবে না। এছাড়া সংশোধিত আরও একটি ধারা দুদকের ক্ষমতা খর্ব করবে। দুদক আইনের ১৬(১) অনুযায়ী সচিব নিযুক্ত হন কমিশনের মাধ্যমে। কিন্তু সংশোধিত বিলে এ ক্ষেত্রে সচিব নিযুক্ত হবেন সরকার কর্তৃক। এতে আগের আইনে দুদক চেয়ারম্যান, প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টিং অফিসার বা প্রধান নির্বাহী হলেও রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর বিলটির গেজেট প্রকাশিত হলে সচিবই হবেন দুদকের সর্বসেবা। এর ফলে দুদকের ওপর সরকারি প্রভাব যেমন বাড়বে, তেমনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও কমিশনারের পদ এক অর্থে আলঙ্কারিক হয়ে যাবে। এছাড়া দুদকের নিজস্ব বিধিতে শাস্তির বিধান থাকলেও সংশোধিত বিলে কিছু ধারা যুক্ত করে দুদকের তদন্ত ও অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রও সংকুচিত করা হয়েছে। এ জন্য সংসদে বিল পাসের পরের দিন সারাদেশে দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনানুষ্ঠানিকভাবে কর্মবিরতিও পালন করেছেন। তারা এখন এই ভেবে হতবিহ্বল যে, দাতা দেশ ও সংস্থার শক্ত অবস্থান, সংসদীয় কমিটির সুপারিশ, অর্থমন্ত্রীর চিঠি ও প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও আমলারা কীভাবে কৌশলে তাদের পক্ষে দুদক আইনের সংশোধনী বিল পাস করিয়ে নিয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংখ্যা প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ। এর মধ্যে সবাই ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত এমনটা বলা অন্যায্য। কেননা এমনও অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন যারা চাকরির বাইরে টিউশনি করেও সংসার চালান। কিন্তু মোটা দাগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা কী? একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন পুলিশ বিভাগের কথা কিংবা ভূমি অফিসের কথাই একটু চিন্তা করা যাক, টাকা ছাড়া এসব অফিসে কারও কোনো ফাইল নড়েছে কি? এরকম সরকারি যত সেবা খাত আছে- সব জায়গায়, সব ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি যে কম-বেশি হয় তা কি কেউ অস্বীকার করবে? বিগত এক দশকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির গবেষণা রিপোর্ট তো এ ধরনের চিত্রই তুলে ধরে। তাই দুদক আইনের সংশোধনীর ফলে দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষের রেট আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা যায়?
অথচ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে দুর্নীতিতে লাগাতার পাঁচবার চ্যাম্পিয়নের (!) কলংকতিলক বাংলাদেশের ললাটে লাগার পরই বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার বাধ্য হয়ে তখনকার দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করেছিল। ২০০৪ সালে নতুন আইনের মাধ্যমে গঠিত হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন। এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ব্যুরোর আমলে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন নিতে হতো। এতে তখনকার ব্যুরো অনেক দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আবার দুদক যাদের প্রকৃত আসামি ভেবেছে, তাদের বাদ দিয়েই অনেক ক্ষেত্রে মামলার অনুমোদন দেয়া হয়েছে- এমন ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে বলে জানিয়েছেন দুদকের কর্মকর্তারা। তাই নতুন সংশোধনী এনে দুদককে আবার পূর্বতন ব্যুরোতে পরিণত করা হয়েছে বলে মনে করেন তারা। আর এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি, ২০০৪-এর আইন অনুযায়ী দুদক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এখন যদি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে মামলার জন্য সরকারের অনুমোদন নিতে হয় তাহলে তো আর এর স্বাধীনতা থাকবে না। আবার সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৩ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কেন পৃথক হবেন? দেশের পৌনে ষোল কোটি মানুষের জন্য এক আইন আর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতি করলে তাদের জন্য আইন ভিন্ন হবে কেন?
এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেয়া যায়। হলমার্কসহ ৬টি প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ করে দিয়েছেন সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা, তারা সরকারি কর্মকর্তাও বটে। এ অর্থ কেলেংকারির ঘটনায় তারা নিজেরা লাভবান হয়েছেন। কিন্তু নতুন সংশোধনী অনুযায়ী দুদক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হতো। এ ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই অনেকের নাম থাকত না আসামির তালিকায়? কেননা হলমার্ক অর্থ কেলেংকারির মামলায় সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি হুমায়ুন কবির ও সাবেক ডিএমডি মাঈনুল হকের বিরুদ্ধে যেন মামলা না হয় এজন্য দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের অনেক ধকল-চাপ সহ্য করতে হয়েছিল। আর এই চাপ এ কারণে ছিল, হুমায়ুন কবির সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর নতুন পাওয়া ব্যাংকের প্রধান হিসেবে সব কাজ গোছানোর দায়িত্বে ছিলেন। আর মাঈনুল হক এক সাবেক প্রধান বিচারপতির ভাই। তাই ১৯৭ ধারা যদি হলমার্ক অর্থ কেলেংকারির মামলার সময় কার্যকর থাকত, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন কি আদৌ সহজ হতো? পরিস্থিতি যখন এমন সে ক্ষেত্রে সংশোধিত বিল আইন হিসেবে কার্যকর হলে ভবিষ্যতে এ রকম বড় মামলার কী পরিণতি হবে তা সহজেই অনুমেয়।
দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে শোনা তথ্য অনুযায়ী ২৮ অক্টোবর দুদক আইনের সংশোধনী বিলটি পাসের জন্য সংসদে উত্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু বিলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলার আগে সরকারের অনুমোদনের বিষয়টি দেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ হন। তিনি সে সময় সংশ্লিষ্টদের বলেন, দুদকের চেয়ারম্যান-কমিশনারদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এ নিয়ে আলোচনা করতে পরে সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের অফিসে যান দুদকের চেয়ারম্যান মোঃ বদিউজ্জামান, কমিশনার মোঃ শাহাবুদ্দিন ও নাসির উদ্দিন আহমেদ। মন্ত্রীর রুমে আগে থেকেই ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোশাররাফ হোসেন ভূইঞা ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু আলম শহীদ খান। বৈঠকে দুদকের কর্তাব্যক্তিরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলার আগে সরকারের অনুমোদনের বিরোধিতা করেন। দুদকের পক্ষ থেকে উপস্থিত আমলাদের বলা হয়, তিন বছর আগে এ ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা যুক্ত করলে দুদক আর স্বাধীন থাকবে না। সে কারণে দাতা দেশ ও সংস্থা এর বিরোধিতা করেছিল। পরে অন্যান্য দেশের আইনে এ ক্ষেত্রে কী আছে তা দেখতে আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্যরা অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াও সফর করেছেন। এরপর সংসদীয় কমিটি তাদের সুপারিশে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার আগে সরকারের অনুমোদনের প্রস্তাব বাদ দিয়ে দেয়। তাহলে সবকিছু সুরাহার পরও কেন আবার সেই ধারা যুক্ত করা হচ্ছে? এ নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সেই বৈঠকে দু’পক্ষই যুক্তি পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেন। শেষে আইনমন্ত্রীর সামনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলার আগে সরকারের অনুমোদনের বিষয়টি কেটে দেয়া হয়। বিষয়টি সেখানেই সুরাহা হয়ে যায় বলেও জানান দুদকের কর্মকর্তারা। কিন্তু বিলটি সংসদে উত্থাপনের আগে প্রভাবশালী আমলা গ্র“প শেষবারের মতো সক্রিয় হয়। তারা কৌশলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর মাধ্যমে তাদের সেই শেষ চেষ্টায় সফল হন। মতিয়া চৌধুরী সংসদে বিলটি উত্থাপন করলে সংশোধনী আনেন সাবেক আমলা এবং বর্তমানে এমপি র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির। আর তা কণ্ঠভোটে পাস করে দেন উপস্থিত সংসদ সদস্যরা। কেন এমন হল এ নিয়ে পরের দিন দুদকের একজন কমিশনার ২০ থেকে ২৫ জন সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথাও বলেছেন, কীভাবে তারা এমন একটি বিল পাস করলেন। যেখানে আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সুপারিশও উপেক্ষিত হল। এর ফলে দুদক কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হবে। এর জবাবে নাকি সংসদ সদস্যরা তাকে জানিয়েছেন, যেহেতু সরকারের একজন মন্ত্রী বিল উত্থাপন করেছেন, তাই বিলটি ক্ষতিকর কিনা সে বিষয়টি তারা বিবেচনা করেননি। অথচ যে পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ, মন্ত্রীর হাত দিয়ে বিলটি সংসদে পাস হল, ক্ষমতার পালাবদলে তার বিরুদ্ধে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই মামলা করতে পারবে দুদক। মামলা করতে পারবে তাদের বিরুদ্ধে যারা সংসদে ‘হ্যাঁ’ বলে কণ্ঠভোটে পাস করেছেন দুদকের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা খর্বকারী বিলটি। দুদক আইনে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারার সংযুক্তি নিয়ে আমলাদের যে তৎপরতার কথা জানলাম দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে, বিষয়টি যদি সত্যি হয় তা সুশাসনের জন্যও বড় হুমকি। সেই সঙ্গে সংসদে আইন পাসের প্রক্রিয়া এবং এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের ভূমিকার বিষয়টিকেও তা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সেই সঙ্গে আরও একটি ভয়াবহ প্রবণতা দুদক আইনের সংশোধনী পাসের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই অনেকেই লক্ষ্য করেছেন। বিলটি পাসে আমলারা এমন একটা সময় বেছে নিয়েছেন যখন নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে চাপে রয়েছে বর্তমান সরকার। সরকারের এ দুর্বলতার সুযোগ হাতছাড়া করেননি আমলারা। কেননা একতরফা নির্বাচন করতে হলে বা নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সরকারকে আমলাদের পক্ষ নিতেই হবে। আর শেষ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে আমলাদের কৌশলই জয়ী হয়েছে তা তো স্পষ্ট।
তবে আমলাদের ইচ্ছায় দুদক আইনের সংশোধনী যেভাবে পাস হল, তাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান এখন বিরাট প্রশ্নের মুখে। পদ্মা সেতু, হলমার্ক, ডেসটিনি ও রেলওয়ের অর্থ কেলেংকারির ঘটনায় সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টাদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে এমনিতে সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক মনোভাব ছিল। আর এবার ষোলকলা পূর্ণ করা হল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধা দিতে গিয়ে দুদক আইনের সংশোধিত বিলটি পাস করে। তাই মহাজোট সরকারের ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে মিঠা মিঠা বুলি ছিল, তা এখন শুধুই কথার কথা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। তবে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) বিল-২০১৩ পুনর্বিবেচনার সুযোগ এখনও রয়েছে, যদি রাষ্ট্রপতি বিলটিতে স্বাক্ষর না করে পুনর্বিবেচনার জন্য আবারও সংসদে পাঠান। এরই মধ্যে শেষ চেষ্টা হিসেবে দুদক চেয়ারম্যান ও দুজন কমিশনার রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতিও দুদকের ঊর্ধ্বতনদের এ ক্ষেত্রে সমবেদনা জানিয়েছেন বলেই জেনেছি। কিন্তু দুর্নীতির বিষবৃক্ষ উপড়াতে হলে, প্রতিরোধ করতে হলে এখন সমবেদনার চেয়ে জরুরি দুদক আইনের সংশোধনী পুনর্বিবেচনা করা।
আলমগীর স্বপন : সাংবাদিক

বিএনপির একটি দাবি মানলেই কি সন্ত্রাস বন্ধ হবে? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী



আমরা লন্ডনের কয়েকজন বন্ধু ঢাকার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত খবর শুনছিলাম। সঙ্গে খবরের ছবি, তাও দেখছিলাম। বিএনপির সাম্প্রতিক হরতালে বাসে অগ্নিসংযোগ করায় কয়েক ব্যক্তি মারাত্মকভাবে পুড়েছে, তাদের কেউ কেউ মারা গেছে। সেই অগ্নিসংযোগে এক তরুণের মৃত্যুতে তার স্বজনদের আহাজারির দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় দেখছিলাম। হৃদয়বিদারক দৃশ্য। আমার বন্ধুদের মধ্যে একজন এ দৃশ্য দেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন না, বলে উঠলেন, এটা তো পৈশাচিক কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, সরকার কেন এ সম্পর্কে কিছু করছে না? আরেক বন্ধু বললেন, সরকার এ সম্পর্কে কী করতে পারে? প্রথম বন্ধু বললেন, হয় এই দুষ্কৃতদের কঠোর হাতে দমন করা হোক, নয় বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সরকার মেনে নিক। এই নিত্য মর্মন্তুদ মৃত্যু চোখে দেখা যায় না। বলেই তিনি আমার দিকে তাকালেন। বললেন, এ সম্পর্কে আপনি কী বলেন? বিপদে পড়লাম, একটা কিছু জবাব দিতে হয়। বাকি বন্ধুও আমার দিকে চেয়ে আছেন জবাবের প্রতীক্ষায়।
সেদিন বিএনপির ডাকা হরতালের নিত্য হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে লন্ডনের বন্ধুদের যা বলেছি, আজ তৃতীয় মতে সেই কথাগুলোই পাঠকদের কাছে তুলে ধরছি। আমার সেদিনের কথায় বর্তমানের মানুষ মারা হরতালের অবসান সম্পর্কে কোনো পথের দিশা দিতে পারিনি, কেবল পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছি, আজ তৃতীয় মত লিখতে বসেও তাই করছি।
প্রথম, সরকারের কঠোর হওয়ার কথা। বিএনপির বর্তমান কর্মকাণ্ড যদি রাজনৈতিক সংজ্ঞাসম্মত হরতাল বা আন্দোলন হতো, তাহলে সরকার হয় তা কঠোর হাতে দমন করতে পারত অথবা আন্দোলনের দাবি মেনে নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে পারত। কিন্তু হরতালের নামে চোরাগোপ্তা হামলা, বিক্ষিপ্তভাবে অগ্নিসংযোগ, নিরীহ মানুষ হত্যা- এককথায় সন্ত্রাস দমন কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষেই সহসা সম্ভব হয় না।
রাজনৈতিক আন্দোলনে জনতা রাস্তায় নামে, পুলিশ বা শান্তিরক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়, কিন্তু বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াত যা করছে, তা জনতার সমর্থনপুষ্ট আন্দোলন নয়, পুলিশের দৃষ্টির বাইরে পালিয়ে থেকে সময় ও সুযোগ মতো হঠাৎ বেরিয়ে এসে বাস, প্রাইভেট কার, দোকানপাট, নিরীহ পথচারী বা বাসের চালক ও আরোহীদের ওপর অতর্কিত হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং তারপর পালিয়ে যাওয়া। অতর্কিত পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েও তারা পুলিশ হত্যা করেছে। ঘুমন্ত বাসযাত্রীকেও আগুনে পুড়িয়ে মারায় তাদের বিবেকে বাধেনি।
এই দুর্বৃত্তরা রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত, কিন্তু আসলে তারা ট্রেনিংপ্রাপ্ত সন্ত্রাসী। তাদের সঙ্গে একদল ভাড়াটে গুণ্ডাও আছে। পয়সা পেলে যে কোনো ধরনের মানবতাবিরোধী কাজে তাদের দ্বিধা নেই। বর্তমান বাংলাদেশে এদের সংগ্রহ করাও সহজ। দেশে বিরাটভাবে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকার-যুবকদের সংখ্যা বাড়ছে। পয়সা দিলেই বিভিন্ন অপরাধে তাদের অনেককে ব্যবহার করা যায়। বিএনপি ও জামায়াত এখন তা-ই করছে।
মাঝে মাঝে টিভির নিউজে বা খবরের কাগজে এই সন্ত্রাসীদের ছবি দেখলেই বোঝা যায়, এরা রাজনৈতিকভাবে ক্ষুব্ধ জনতার অংশ নয়, এরা প্যান্ট-শার্ট পরা সশস্ত্র দলীয় ক্যাডার অথবা ভাড়াটে তরুণ। জামায়াতের ক্যাডাররাও এখন আর তাদের শরীরে দাড়ি-টুপির জামায়াতি ট্রেডমার্ক রাখে না, রীতিমতো প্যান্ট-শার্ট অথবা জার্সিপরা ক্রিকেট প্লেয়ার সাজে। যাত্রী সেজে বাসে-ট্রেনে ওঠে। তারপর গাড়িতে বোমা মেরে, আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়। নিরীহ মানুষ মরে। তাতে বিএনপির নেতানেত্রীদের একবারও সামান্য দুঃখ প্রকাশ করতেও দেখা যায়নি।
অধুনা বিএনপি ও জামায়াত যে হরতাল ডাকে, তা অতীতের হরতালগুলোর মতো রাজনৈতিক চরিত্রমণ্ডিত নয়। জনতাও এর সঙ্গে যুক্ত নয়। এই হরতাল আসলে কেবল সরকারবিরোধী নয়, সমাজবিরোধী সন্ত্রাস। এর সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক এরা সমাজবিরোধী, সমাজ-শত্র“ সন্ত্রাসী।
কোনো দেশে অগণতান্ত্রিক ও অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে ‘ব্র“টাল ফোর্স’ প্রয়োগে তারা এ ধরনের সন্ত্রাস দমন করেন। এ জন্যই বাংলাদেশেও স্বৈরাচারী বা সামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাদের বিরুদ্ধে জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হয়। কিন্তু এই সমাজবিরোধী সন্ত্রাসীদের রাস্তায় দেখা যায় না। এরা তখন পার্বত্য মূষিকের মতো গর্তে পালায়।
যে কোনো দেশের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার যেহেতু সহিষ্ণু এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির সরকার, সেহেতু যথেচ্ছ বল প্রয়োগ দ্বারা কোনো সমস্যার সমাধান তাদের পক্ষে সব সময় সম্ভব হয় না। এ জন্যই ব্রিটেনে আইআরএ বা আইরিশ সন্ত্রাসীদের সৃষ্ট ভয়াবহ সন্ত্রাস ব্রিটিশ জনগণকে বছরের পর বছর সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনকে তার প্রমোদতরীতে গ্রেনেড মেরে হত্যার পরও এই সন্ত্রাস দমন ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে সহসা সম্ভব হয়নি। ভারতেও এক সময় নকশাল সন্ত্রাস বছরের পর বছর চলেছে। সহজে দমন করা যায়নি। বর্তমানে চলছে মাওবাদী সন্ত্রাস। তাও কত দিনে দমন করা যাবে, ভারত সরকার নিজেরাও তা জানে না।
এই সমাজবিরোধী, গণবিরোধী সন্ত্রাসের বড় প্রতিকার হচ্ছে, জনগণের ধৈর্য এবং গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা। শুধু পুলিশ ও র‌্যাব দিয়ে এই সন্ত্রাস দমন করা যাবে না, তার সঙ্গে যদি সচেতন জনপ্রতিরোধ গড়ে না ওঠে। গণপ্রতিরোধে এই সন্ত্রাস নিরুৎসাহিত হবে, এমনকি বন্ধও হবে। প্রকৃত রাজনৈতিক আন্দোলনে যারা নামেন, তারা সাহসী। দাবি আদায়ে পুলিশ, এমনকি সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে নেমে তারা নিজেরা প্রাণ দেন। নিরীহ স্বদেশবাসীর প্রাণ হরণ করেন না।
সন্ত্রাসীরা সাহসী নয়, তারা কাপুরুষ। চোরাগোপ্তা হামলা, ককটেল ছোড়া, গ্রেনেড ছুড়ে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া তারা সম্মুখ লড়াই করতে ভীত। জনপ্রতিরোধ দেখলে তাদের অবস্থা হয় ভীত মূষিকের মতো। সন্ত্রাসকে রাজনীতির লেবাস পরিয়ে যেসব দল লালন করে, সরকারের উচিত কালবিলম্ব না করে সেসব দলকে নিষিদ্ধ করা এবং দলের শীর্ষ নেতা, যারা এই সন্ত্রাসের পেট্রন, তাদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা। জনগণের জানমাল নিয়ে যারা দায়িত্বহীন খেলা চালায়, তারা রাষ্ট্রের বা জনগণের মিত্র নয়, বরং শত্র“। এদের প্রতি নমনীয়ভাব দেখানো অন্যায়।
সরকারের কঠোর ব্যবস্থার সঙ্গে জনগণের প্রতিরোধ যদি যুক্ত হয়- অর্থাৎ সাধারণ মানুষ এই সন্ত্রাসের মুখে ঘরে পালিয়ে বসে না থেকে যদি পাড়ায় পাড়ায় ভিজিলেন্ট কমিটি গঠন করে সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে তাদের প্রতিরোধে আগায়, তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান সন্ত্রাস খুব শিগগিরই অতীতের দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে। শেখ হাসিনা সম্প্রতি সেই ডাক দিয়েছেন।
এর অনেক উদাহরণ আছে। একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করছি। ভারতের ছত্রিশগড় রাজ্যে এক সময় মাওবাদী সন্ত্রাস চরমে পৌঁছেছিল। কেন্দ্রীয় সরকার সেনাবাহিনী নামিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছিল না। ছত্রিশগড়ে এই সন্ত্রাস অবশ্য এখনও আছে, কিন্তু তাদের হামলা এখন পুলিশ, সেনাঘাঁটি ইত্যাদিতে চলে। সাধারণ মানুষের ওপর হামলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তার কারণ, ছত্রিশগড়ের কয়েকটি এলাকায় সাধারণ নাগরিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভিজিলেন্ট কমিটি গঠন করে মাওবাদীদের চোরাগোপ্তা হামলা প্রতিরোধ করতে শুরু করেন। এমনকি মাওবাদীদের পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিতে শুরু করেন। ফলে মাওবাদী উৎপাত বন্ধ হয়।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যদি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন, মসজিদ-মাদ্রাসাগুলো সন্ত্রাসের ঘাঁটি করার কাজে বাধা দেন (দুই দিন আগেও খবর পেয়েছি, যশোরে এক মসজিদের ছাদে লুকানো বোমা-বারুদ উদ্ধার করা হয়েছে) এবং পাড়ার যে মাস্তানরা সন্ত্রাসের কাজে ভাড়া খাটে, তাদের খোঁজ পুলিশকে দিতে শুরু করেন, তাহলে এই সন্ত্রাস উচ্ছেদে খুব বেশি দিন যে লাগবে না তা বিনাদ্বিধায় বলতে পারি।
যারা আমার এ কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন, তাদের ঢাকার অতীত ইতিহাসের দিকে তাকাতে বলি। ব্রিটিশ আমলে ১৯২৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ একুশ বছর ঢাকা ছিল একটি জেলা শহর এবং এই শহরে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ছিল একটি নিত্যদিনের ঘটনা। ঢাকা শহরের শাঁখারীবাজার বা রায়েরবাজারে যদি দু’জন মুসলমান ছুরিকাঘাতে নিহত হন, কিংবা তাদের গাড়িতে আগুন দেয়া হয়, তাহলে পরের দিনই ইসলামপুরে বা নবাবপুরে তিনজন হিন্দু ছোরার আঘাতে মরত। তাদের গাড়ি, দোকান পুড়ত।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত এবং স্বাধীন হল। ঢাকা হল সদ্যগঠিত পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী। সাম্প্রদায়িক দলের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর হল, হিন্দু-মুসলমানের মিলিত প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হল। ফলে এক বছরের মধ্যে ঢাকার ‘দুঃস্বপ্নের শহর’ (City of nightmare) এই দুর্নামটি ঘুচে যায়। বর্তমানেও সরকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর আহ্বানে আছে। তার সঙ্গে গণপ্রতিরোধ যুক্ত হওয়া দরকার। তা না হলে কেবল সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিলে একশ্রেণীর মিডিয়া ও সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক রাজনৈতিক দলগুলো- বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত মায়াকান্না শুরু করবে- ‘আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে।’ অর্থাৎ গুণ্ডামি ও সন্ত্রাস দমনকেও বলা হবে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ।
এবার আসি আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক বিএনপি জোটের দাবি মানার ব্যাপারে। বিএনপি রাজনীতির চরিত্র ও ভাঁওতাবাজি যারা জানেন, তারা কী করে বিশ্বাস করেন, তাদের একটি দাবি- অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা হলেই তারা সুবোধ বালকের মতো নির্বাচনে অংশ নেবেন? এখন তারা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা হলেই তারা আলোচনায় বসবেন। নির্বাচনে যাবেন সে কথা বলছেন না। আলোচনায় বসে তারা আবার নতুন নতুন দাবি তুলবেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, নির্বাচন কমিশনে সম্পূর্ণ রদবদল, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে হবেন ইত্যাদি নানা ইস্যু নিয়ে আবার বিতর্কের জট তৈরি করা হবে। আলোচনা-বৈঠক ভেঙে দেয়া হবে অথবা ভেঙে দেয়ার হুমকি দেয়া হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ও নির্বাচন কমিশনের প্রধান পদে বিএনপির পছন্দসই ব্যক্তি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নিরপেক্ষ লোক পাওয়া যাবে না, অথবা তার নিরপেক্ষতা স্বীকার করা হবে না। বিএনপির অতি উচ্চ মহলের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানতে পেরেছি, তা হল- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা হলেই যে বিএনপি নির্বাচনে যাবে তা নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই তারা নতুন সরকারের কাছে দাবি তুলবেন, নির্বাচন শেষ না হওয়া এবং নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতায় না বসা পর্যন্ত ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং যাদের দণ্ড ঘোষিত হয়েছে, তাদের দণ্ড কার্যকর করা ইত্যাদি সব কিছু মুলতবি রাখতে হবে।
শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান থাকলে এই শেষের দাবিটি সরকারকে দিয়ে মানানো যাবে না এই ভয়ে শেখ হাসিনাকে সরকারপ্রধান পদে না রাখার জন্য বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপি জোটের এত জেদ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার একান্ত অনুরোধ, তিনি দেশের ও গণতন্ত্রের বৃহত্তর স্বার্থে বিএনপির সব দাবি যদি মেনেও নেন, নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধানের পদ থেকে তিনি যেন কোনো কারণেই সরে না যান।
গত শনিবার (১৬ নভেম্বর) এই লেখাটি শেষ করে এনেছি, এমন সময় ঢাকা থেকে খবর পেয়েছি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসতে প্রস্তুত। তার বক্তব্যে অদলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই কথাটির বদলে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ এ কথাটি এই প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হওয়ায় একটু বিস্মিত হয়েছি। তাহলে কি তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে? তারা অদলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসে শেখ হাসিনার প্রস্তাব অনুযায়ী ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠনের ব্যাপারে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছেন? নাকি আমেরিকার দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য শনিবারই ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন, তার কাছে নিজেদের আপসবাদী চেহারা দেখানোর জন্য এটা আবার চতুর কোনো চাল?

হরতালের আগুন: মারা গেলেন অগ্নিদগ্ধ আরও দুজন- পুড়ে গেছে তাঁদের সংসারও by কাজী আনিছ

পিকআপ ভ্যানে কফিন। কফিনের ভেতরে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন আসাদুল গাজী। সেদিকে তাকিয়ে ‘বাবা, বাবা’ বলে ডাকছিল সাত বছরের শিশু মাইনুল ইসলাম।
কিন্তু বাবা জাগলেন না। মাইনুলের প্রশ্ন, ‘বাবা কি উঠবে না?’

গতকাল শনিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মীর হাজীরবাগে এ দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে ভাসিয়েছে চোখের জলে। মাইনুল জানে না অভিশপ্ত হরতালের আগুন বাবা সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আসাদুল গাজীর (৪০) প্রাণ নিভিয়ে দিয়েছে।

হরতালের আগের দিন, ৩ নভেম্বর রাতে সাভার সেনানিবাস এলাকায় আসাদুলের যাত্রীবাহী অটোরিকশায় হরতালকারীরা পেট্রলবোমা ছুড়লে অগ্নিদগ্ধ যাত্রী মোস্তাফিজুর রহমান (৩৫) নিহত হন। এ সময়ই দগ্ধ হন আসাদুল ও মোস্তাফিজুরের সহকর্মী হাসু আহমেদ। তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। টানা ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে মারা যান আসাদুল। এর প্রায় ১৮ ঘণ্টা আগে শুক্রবার সকালে হাসপাতালেই  চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরেকজন অগ্নিদগ্ধ মন্টু পাল (৩৮)। ১০ নভেম্বর সূত্রাপুর থানার লক্ষ্মীবাজারে লেগুনায় পেট্রলবোমায় ঝলসে গিয়েছিল মন্টুসহ পাঁচজনের শরীর।

গত ২৬ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত হরতালের আগুন, পেট্রলবোমা ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় এ পর্যন্ত নিহত হলেন ছয়জন। আসাদুল, মন্টু পাল ও মোস্তাফিজুর ছাড়া এই তালিকায় আছেন পোশাককর্মী নাসিমা আক্তার ও কিশোর মনির হোসেন। আর ‘বোমা বানাতে গিয়ে বিস্ফোরণে’ নিহত হন ফেনীর আবুল কাশেম। এঁরা সবাই হতদরিদ্র। আসাদুল, মন্টু ও মোস্তাফিজুর পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। আগুনে শুধু তাঁদের মৃত্যু হয়নি, পুড়িয়ে মারছে তাঁদের পরিবারকেও।

বার্ন ইউনিট ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে হতাহতের সংখ্যা ৭৬ জন। এর মধ্যে তিনজন প্রতিবন্ধী ও ১৩ জন শিশু-কিশোর। ১৮টি ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন ৩০ জন। তাঁদের মধ্যে তিন শিশু-কিশোরসহ ১৯ জন বর্তমানে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।


‘লেখাপড়া করমু কীভাবে?’: ভাগ্য বদলাতে প্রায় ২০ বছর আগে ঢাকা এসেছিলেন আসাদুল। ছিলেন রিকশাচালক। সংসার গড়ার পর খরচ বেড়ে যাওয়ায় ইঞ্জিনচালিত গাড়ি চালনা শেখেন। পাঁচ-ছয় বছর ধরে চালাচ্ছিলেন অটোরিকশা। যাত্রাবাড়ীর মীর হাজীরবাগে স্ত্রী মর্জিনা আক্তার এবং সন্তান তানজিলা আক্তার (১০) ও মাইনুলকে নিয়ে থাকতেন। কিন্তু খরচ সামাল দিতে না পারায় স্ত্রী-সন্তানদের পটুয়াখালীর বাউফলের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

স্বজনেরা জানান, প্রতি সপ্তাহে গ্রামের বাড়িতে হাজার দুয়েক টাকা পাঠাতেন আসাদুল। হরতাল ও অন্য রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে আয় কম থাকায় কয়েক সপ্তাহ টাকা পাঠাতে পারেননি। তাই ওই রাতে সাভারের নবীনগরে যাত্রী নিয়ে যাচ্ছিলেন।

গতকাল মীর হাজীরবাগে গিয়ে দেখা যায়, একটি মাদ্রাসার সামনে পিকআপ ভ্যানে কফিনে আসাদুলের লাশ। মাদ্রাসার পাশেই একটি গ্যারেজ থেকে ভেসে আসছিল কান্নার শব্দ। ওই গ্যারেজেই সিএনজি রাখতেন আসাদুল। গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায়, এক স্বজনকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মেয়ে তানজিলা বলছিল, ‘বাবা নাই। লেখাপড়া করমু কীভাবে। সামনে পরীক্ষা দিমু কীভাবে?’। ‘আমার সন্তানদের দেখব কে?’ বলে বিলাপ করেই চলেছেন স্ত্রী মর্জিনা।

 তানজিলা গ্রামের স্থানীয় একটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী। একই স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে মাইনুল। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ তো আছেই, আছে ঋণের বোঝাও। এখন কী করবেন, কী হবে—কিছুই বুঝতে পারছেন না মর্জিনা।


আমি আর বাঁচতে চাই না’: শোকের সাগরে ভাসছেন নিহত মন্টু পালের পরিবারও। পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারে একটি স্বর্ণের দোকানের কারিগর মন্টু পাল স্ত্রী সঞ্জু রানী পালকে নিয়ে ফতুল্লার কামালপুর পাগলায় থাকতেন। ১০ নভেম্বর লেগুনায় চড়ে বাসায় ফিরছিলেন। তার পরই পেট্রলবোমায় ঝলসে যায় শরীর। শুক্রবার সকালে মন্টুকে মৃত ঘোষণার পর স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে বার্ন ইউনিটের পরিবেশ। মেঝেতে গড়িয়ে স্ত্রী সঞ্জুর বিলাপ, ‘আমি আর বাঁচতে চাই না।’

তিন বছর আগে জন্মের সময় মন্টু দম্পতির সন্তান মারা যায়। এখন সঞ্জু রানীর আর কেউ রইল না। টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ফতেহপুর ইউনিয়নে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে শুক্রবার রাত ১২টার দিকে মন্টুর লাশ গোড়াকী শ্মশান ঘাটে দাহ করা হয়।


ছবির ফ্রেমে কান্নার জল: ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর বাজার থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে বড় কাঞ্চনপুর গ্রাম। টিনশেড ঘরের উঠোনে একটি ছবির দিকে তাকিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মনোয়ারা বেগম। মনোয়ারা হতভাগা কিশোর মনির হোসেনের (১৫) মা। মনির স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ত। চিকিৎসা ও বেড়ানোর জন্য কাভার্ড ভ্যানচালক বাবা রমজান আলীর সঙ্গে বের হয়েছিল সে। ফিরল লাশ হয়ে। হরতালের দিন ৪ নভেম্বর গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তায় রমজান আলীর কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। অগ্নিদগ্ধ হয় ঘুমন্ত মনির। ৭ নভেম্বর ভোর চারটার দিকে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে মারা যায় সে।

গতকাল বিকেলে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মনিরের ছবি হাতে স্মৃতিচারণা করে চোখের জল ঝরাচ্ছেন মা মনোয়ারা। আর কেবলই বলছেন, ‘আমার ছেলেরে যারা আগুন দিয়া পুইড়া মারছে তাগো বিচার চাই।’


সংসারও পুড়ে ছাড়খার হয়ে গেছে’: হরতালের আগুনে শুধু মোস্তাফিজুর রহমান নন, পুড়ে গেছে তাঁর সংসারও। তাঁর মৃত্যুতে দুই সন্তান নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন স্ত্রী বিনা সুলতানা। আছেন অজানা আশঙ্কায়। গতকাল সাভার নবীনগরের বাসায় গেলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আগুনে শুধু স্বামীকে হারাইনি, সংসারও পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে।’

৩ নভেম্বর পুরান ঢাকা থেকে মালামাল কিনে নিহত আসাদুল গাজীর অটোরিকশায় চড়ে নবীনগরের বাসায় ফিরছিলেন মোস্তাফিজুর ও সহকর্মী হাসু। পেট্রলবোমায় গুরুতর দগ্ধ হয়ে মারা যান তিনি। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গ্রামের বাড়িতে তাঁকে দাফন করা হয়।

স্বজনেরা জানান, মোস্তাফিজুর দম্পতির দুই মেয়ে মাহিম মোস্তাফিজ (৬) এবং মৌসুমী মোস্তাফিজ (৩)। মাহিম সাভার সেনানিবাস এলাকার ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বালিকা বিদ্যালয়ের নার্সারির ছাত্রী। সন্তানের লেখাপড়া ও সংসার খরচ তো ছিলই, নিজের বাবা-মায়ের খরচও পাঠাতেন মোস্তাফিজুর। ভবিষ্যতের জন্য কোনো সঞ্চয় ছিল না তাঁর। কাঁদতে কাঁদতে বিনা বলেন, ‘এখন দুই সন্তান নিয়ে আমি কী করব, কোথায় যাব জানি না।’


মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে শোকের ছায়া: সাত সন্তান নিয়ে অভাবের সংসার ছিল মুক্তিযোদ্ধা সফিজ উদ্দিনের। অভাবের কারণে ২০০৫ সালে বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি। অভাব-অনটনে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পরের বছরই ঢাকা এসেছিলেন সফিজের মেয়ে নাসিমা বেগম। কাজ নেন পোশাক কারখানায়। ২৬ অক্টোবর রাতে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে বাসে হরতালকারীদের দেওয়া আগুন কেড়ে নিয়েছে তাঁর জীবন। ১৪ নভেম্বর মারা যান নাসিমা।


গতকাল বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আরজি কালিকাপুরে নাসিমার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। ৭০ বছর বয়সী নাসিমার মা জহুরা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘একটু সুখ দেয়ার লাইগ্যা ঢাকা যাইয়া মোর মায় লাশ অইয়া গ্রামে ফিইররা আইল। মোগো গরিবগো মাইররা যারা রাজনীতি করে ও আল্লাহ তুই তাগো বিচার করিস।’

২০০২ সালে পাশের উপজেলার মানিক সরদারের সঙ্গে নাসিমার বিয়ে হয়েছিল। মানিক দ্বিতীয় বিয়ে করায় বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন নাসিমা। কিন্তু নাসিমার আর জীবনই থাকল না।

নাসিমার বাবা সফিজের দুই ভাইও মুক্তিযোদ্ধা। চাচা শামসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে স্বপ্ন নিয়ে জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, স্বাধীনতার পর কিছুই পাইনি। বরং হারাতে হলো অনেক কিছু। জীবন-জীবিকার তাগিদে সন্তানেরা নিরাপত্তাহীনতায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রতিহিংসার বলি হলো আমাদের মেয়ে নাসিমা।’


প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সাভার প্রতিনিধি; বরিশাল গৌরনদী প্রতিনিধি; গাজীপুর প্রতিনিধি ও টাঙ্গাইল মির্জাপুর প্রতিনিধি।

নির্বাচন- আমরা কেন ভোট দেব? by শাকিলা নাছরিন

ক্ষমতায় থাকা, আর ক্ষমতায় যাওয়ার নীতিহীন রাজনীতির খেলায় ঝলসে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন। রাজপথে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা।

অর্থনীতি- সমৃদ্ধি সূচকে পথ হারায়নি বাংলাদেশ by ফারুক মঈনউদ্দীন

বিষয়টি অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের কয়েক বছরের মাথায় যখন দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দেয়,

বিশেষ সাক্ষাৎকার: তারিক আলি- নতুন রাজনীতি ছাড়া পরিবর্তন আসবে না by ফারুক ওয়াসিফ

তারিক আলি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার। নিউ লেফট পত্রিকার সম্পাদকীয় কমিটির সদস্য। জন্ম ১৯৪৩ সালে, পাকিস্তানের পাঞ্জাবে।

বাংলাদেশ কোন পথে-১- ভঙ্গুর গণতন্ত্র থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসন? by আলী রীয়াজ

এখন দেশের সব আলোচনাই নির্বাচনকেন্দ্রিক। ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, উপর্যুপরি হরতাল, সরকার ও বিরোধীদের অনমনীয় অবস্থানের কারণে সবার মনেই প্রশ্ন,

বিএনপিকে সর্বদলীয় সরকারে আহ্বান এরশাদের

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ মহাজোট ছেড়ে সর্বদলীয় সরকারে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন আজ সোমবার।

সমৃদ্ধি সূচকে পথ হারায়নি বাংলাদেশ

বিষয়টি অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের কয়েক বছরের মাথায় যখন দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দেয়, দেশের বেশির ভাগ মানুষ যখন ভাতের পরিবর্তে আটার রুটি খাওয়া শুরু করে, ঢাকার রাস্তায় যখন গ্রাম থেকে উঠে আসা ছিন্নমূল কঙ্কালসার মানুষের সমাগম বেড়ে যায়, সেই দুর্দিনেই বাংলাদেশ থেকে একটা বড়সংখ্যক চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীর বহরকে মালয়েশিয়ায় নিয়োগ দিয়ে সে দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
বলা বাহুল্য, সে সময় দেশটিতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক এবং প্রকৌশলী ছিল না বলেই আমাদের দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া হয় এসব পেশাজীবীকে। সে সময় বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজ এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মালয়েশিয়ার ছাত্রছাত্রীও পাওয়া যেত, কারণ বাংলাদেশের শিক্ষার মান তখন দেশটির তুলনায় উচ্চমানের ছিল। অথচ স্বাধীন মালয়েশিয়ার বয়স স্বাধীন বাংলাদেশের চেয়ে ১৪ বছর বেশি, আর পাকিস্তানের চেয়ে ১০ বছর কম। ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর দেশটি দ্রুততম সময়ে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির মহাসড়কে উঠে আসতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭০ সালে মালয়েশিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৩৩৯ ডলার, ২০১২ সালে এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৯০০ ডলারে। ৪০ বছর আগে যে দেশটিকে বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসক ও প্রকৌশলী নিয়ে যেতে হয়েছিল তাদের উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য, যে দেশের ছাত্রছাত্রীদের উচ্চ কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করতে বাংলাদেশে আসতে হতো, আজ সেই দেশটি বাংলাদেশে আসছে সেই দেশের স্বাস্থ্যসেবা বিপণনের জন্য। সে দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বাংলাদেশে এসে সরাসরি প্রচারণা চালাচ্ছেন তাঁদের দেশের উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা এবং দক্ষ চিকিৎসকদের পক্ষে। মালয়েশিয়ার কোনো শিক্ষার্থী এখন আর দেশে পড়াশোনা করতে আসে কি না জানি না,
তবে বাংলাদেশের বহু ছাত্রছাত্রী এখন মালয়েশিয়াতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যায়। আমাদের এই উল্টোরথে চড়ার কারণ অনুসন্ধান করার সময় পেরিয়ে যায়নি এখনো। কিংবা কারণ উপলব্ধি করলেও সেসবের সামনে আমরা বড় অসহায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন চীন এবং মার্কিন পরাশক্তির প্রকাশ্য বিরোধিতা সত্ত্বেও স্বাধীনতাযুদ্ধে অবতীর্ণ এবং সে যুদ্ধে বিজয় যখন আসন্ন, তখন বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’তে পরিণত হবে—মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এমন একটি কথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তবে তিনি এই মন্তব্যটা কখন বা কোথায় করেছিলেন, এমন সুনিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ২০০৫ সালে সুইজারল্যান্ডের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম সম্মেলনে বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক কিসিঞ্জারকে তাঁর এই কথিত মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নাকি স্মরণ করতে পারেননি। পরে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে তিনি নতুনভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করে কেবল বলেছিলেন, ‘চুয়াত্তরে সে একটা সময় ছিল।’ এখানে উল্লেখ করা দরকার, কিসিঞ্জার আদৌ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন কি না, সে ব্যাপারে কোনো সমর্থিত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না।
ইংরেজিতে যে বিশেষণ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা যায়, সেটি হচ্ছে ‘বাস্কেট কেস।’ এই শব্দবন্ধের অর্থ হচ্ছে নৈরাশ্যজনক বা অকার্যকর কিংবা অপ্রতিকার্য অবস্থা, (সরকার বা প্রতিষ্ঠানের) খুব খারাপ অবস্থা বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কাছাকাছি—ইত্যাদি। এ বিষয়ে সাংবাদিক মোহাম্মদ রেজাউল বারি এক নিবন্ধে বিষয়টির ওপর আলোকপাত করে ফরেন রিলেশনস অব দি ইউনাইটেড স্টেটস-এর ‘সাউথ এশিয়া ক্রাইসিস, ১৯৭১’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে জানান যে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো ‘বাস্কেট কেস’ হিসেবে পরিচিত করার ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের এক সভায়। সে সভায় কিসিঞ্জার ইউএস এইডের উপপ্রশাসক উইলিয়ামের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ হবে কি না। জবাবে উইলিয়াম জানান যে নিকট ভবিষ্যতে না হলেও অদূরভবিষ্যতে হবে। এবং বাংলাদেশের তখন সব ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন হবে। কিসিঞ্জার এই পর্যায়ে জানতে চান, তখন বাংলাদেশকে উদ্ধার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হবে কি না। এর জবাব হিসেবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি জনসন মন্তব্য করেন যে তারা (বাংলাদেশ) একটা আন্তর্জাতিক বাস্কেট কেস হবে। কিসিঞ্জার তখন মন্তব্য করেছিলেন, কিন্তু অবশ্যম্ভাবীরূপে আমাদেরই বাস্কেট কেস হবে এমন নয়। (সূত্র: ফোরাম, দি ডেইলি স্টার, তৃতীয় সংখ্যা, ২০০৮)।
উল্লিখিত নিবন্ধেই জানা যায়, বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের নয় মাসের মাথায় নিউইয়র্ক টাইমস এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে মন্তব্য করে: ‘বাংলাদেশ যে একটা আন্তর্জাতিক অপ্রতিকার্য অবস্থায় (বাস্কেট কেস) পতিত হবে, গত বছর একজন মার্কিন কূটনীতিবিদের এমন কথিত পূর্বাভাস অন্ততপক্ষে আপাত সত্যে পরিণত হয়েছে। গত ডিসেম্বরে বাঙালিদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, তা শেষ হওয়ার পর থেকে নতুন দেশটি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যাপক ত্রাণ কার্যক্রমের গ্রহীতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।...আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হুমকি বিদেশি সাহায্যের স্বল্পতা থেকে উদ্ভূত যতটুকু নয়, তার চেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি থেকে।’ এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেরই ধারণা ছিল না যে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে টিকে থাকতে পারবে। যাই হোক, মন্তব্যটি কিসিঞ্জার কিংবা অন্য কেউ করে থাকুক, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং এমনকি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক বলয়ে এমনই ছিল মনোভাব এবং পূর্বাভাস। এ রকম বিরূপ মনোভাবাপন্ন প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক প্রচারণা এবং দাতাগোষ্ঠীর প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অসহযোগিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সদ্যোজাত শিশুর মতো একটু একটু করে এগিয়ে গেছে। তার পরের ইতিহাস সবারই কমবেশি স্মরণে থাকার কথা। বঙ্গবন্ধু হত্যা, সেনাশাসন,
সেনা-সমর্থিত শাসন, গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা, রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং অস্থিতিশীলতা, উপর্যুপরি কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এত সব প্রতিকূলতা থামাতে পারেনি বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক মৌল ভিত্তিসমূহের অগ্রযাত্রাকে। অর্থনীতির মধ্যকার অন্তর্নিহিত শক্তির সহজাত তাড়নাতেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের যে ক্রান্তিরেখায় পৌঁছেছে, তাতে বিশ্বব্যাংকসহ অনেক আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী মনে করে ২০১৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশ একটা মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে পারে সহজেই, যদিও এই অর্জনের জন্য দরকার হবে প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের ওপর উন্নীত করা। তবে আশার কথা এই যে বহুবিধ প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কয়েক বছর ধরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার ৬ শতাংশ থেকে নিচে নামেনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যখন বিশ্বমন্দায় আক্রান্ত, কিংবা আরব বসন্তের কবলে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি যখন টালমাটাল—তখনো আমাদের প্রবৃদ্ধির ধারা ব্যাহত হয়নি। যে বাংলাদেশকে সাত-আট কোটি লোকের খাদ্য জোগানোর জন্য নির্ভর করতে হতো বিদেশি সাহায্যের ওপর, সেই বাংলাদেশ আজ খাদ্যে অর্জন করেছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, ‘বাস্কেট কেস’ পরিণত হয়েছে ‘ফুড বাস্কেট’-এ।
অতি সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লেগাটাম-এর সমৃদ্ধি সূচকে ভারতকে অতিক্রম করে ১০৩তম অবস্থানে পৌঁছে গেছে, পক্ষান্তরে ভারত নেমে এসেছে ১০৬তম অবস্থানে। উল্লেখ্য, এই সূচক প্রস্তুত করা হয় ১৪২ দেশের সম্পদ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মান ইত্যাদির ভিত্তিতে। গবেষণায় উঠে এসেছে পাঁচ বছর ধরে সমৃদ্ধির আটটি সূচকের মধ্যে সাতটিতেই ভারতের অবস্থান ছিল নিম্নগামী, পক্ষান্তরে একই সময়ে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক সাতটি সূচকে ঘটেছে অগ্রগতি। গবেষণার রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়েছে, মাথাপিছু আয় ভারতের অর্ধেক হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের এই অতিক্রম এক বড় অর্জন। গড় আয়ু, অপুষ্টি, শিশুমৃত্যুর হার, স্যানিটেশন, মাধ্যমিক শিক্ষা, নিরাপত্তা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইত্যাদি সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এমন অর্জন থেকে বোঝা যায় যে উন্নয়ন এবং অগ্রগতি কেবল দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল নয়। ভারতের দৃষ্টান্তই বলে দেয় যে একমাত্র জিডিপির প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, দেখা গেছে ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত ভারতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার বরাবরই বাংলাদেশের তুলনায় গড়ে ১.২ শতাংশ এগিয়ে ছিল। অর্থনীতির আকার, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার, মাথাপিছু আয় এসব সূচকের সব কটিতেই ভারতের চেয়ে পিছিয়ে থেকেও বাংলাদেশ সমৃদ্ধি সূচকে এগিয়ে গেছে তার বৃহৎ এই প্রতিবেশী দেশটি থেকে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয়,
১৯৪৭ সালে ত্রিখণ্ডিত ব্রিটিশ ভারতের আরেকটি দেশ পাকিস্তান পড়ে আছে সূচকের ১৩২ নম্বরে। যে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ অর্জন করেছিল স্বাধীন একটি রাষ্ট্র, সেই দেশটি থেকে সূচকের প্রায় ৩০ পয়েন্ট এগিয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য আরও একটি বিজয়ের গৌরব এনে দেয়। তবে আলোচ্য রিপোর্টে বাংলাদেশের অর্জনসমূহকে স্বীকার করা হলেও মন্তব্য করা হয়েছে, যদিও সূচকে বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রযাত্রা অংশত সফল উন্নয়ন কৌশলের প্রতিফলন—আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে দেশটির নিজস্ব অনেক সমস্যা রয়েছে। এত সব সাফল্যের পরও এখনো বাংলাদেশের তীব্র সমস্যাসমূহ রয়ে গেছে, বিশেষ করে রাষ্ট্রশাসনে...। আজ বিশ্বসভা নির্দ্বিধায় স্বীকার করছে যে বাংলাদেশের একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা সফল হতে পারে যদি নিশ্চিত করা যায় উৎপাদনসক্ষমতা ও দক্ষতা, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা নিম্ন ও মধ্য আয়ের বহু দেশেই থাকে সমাজের সহজাত অনুষঙ্গ হিসেবে, কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অধিকারের নামে যে বিধ্বংসী প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা দীর্ঘায়িত হলে বা স্থায়ী রূপ নিলে ম্লান হয়ে যাবে আমাদের যাবতীয় অর্জন। এই অবিশ্বাস্য আত্মঘাতী পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছার দিকে চেয়ে আছে সাধারণ মানুষ।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।
fmainuddin@hotmail.com

আমরা কেন ভোট দেব?

জনগণের ভোটাধিকারের নামে বিরোধীদের যে ধ্বংসাত্মক
কর্মকাণ্ড, তা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যত্ অন্ধকার করে দিচ্ছে।
ক্ষমতায় থাকা, আর ক্ষমতায় যাওয়ার নীতিহীন রাজনীতির খেলায় ঝলসে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন। রাজপথে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা। আতঙ্কিত পথচারীরা। তার পরও জীবন ও জীবিকার তাগিদে শত বাধা অতিক্রম করেও মানুষ ছুটে চলে কর্মক্ষেত্রে। কখন কোথা থেকে ছুটে আসবে ককটেল, পেট্রলবোমা, তা কেউ জানে না। মনের ভেতর আতঙ্ক, মৃত্যুভয় নিয়ে হরতাল নামক দানবীয় পরিস্থিতির মাঝেও মানুষকে রাস্তায় বের হতে হয়।
দেশের দুটি জোটের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা হরতালের পক্ষে-বিপক্ষে নিজ নিজ অবস্থান থেকে তর্জন-গর্জন করেন। দুই দলই জনগণের উদ্দেশে অন্য দলের নীতিহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ২০০৬ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলে থেকে যে ভাষায় কথা বলেছে, ২০১৩ সালে বর্তমান বিরোধী দল একই ভাষায় কথা বলছে। তখনো ক্ষমতাসীন দলের কাছে সংবিধান মানুষের চেয়ে বড় ছিল, আজও ক্ষমতাসীনদের কাছে মানুষের চেয়ে সংবিধানই বড়। গণতন্ত্র, সংবিধান—এ ধরনের কঠিন কঠিন শব্দ, শব্দের অর্থের সঙ্গে পরিচিত ছিল না কিশোর মনির। তার পরও আগুনে ঝলসে গিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে তাকে। মনির, কাশেম, মন্টু পাল মরে বেঁচে গেছে কিন্তু এখনো যারা আগুনে ঝলসানো শরীর নিয়ে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তাদের কী হবে? কে দেবে তাদের চিকিৎসা খচর? কে দেখবে তাদের সংসার? হরতালে যদি মানুষ না মারা যায়, সহিংসতা না হয় তাহলে ক্ষমতাসীনেরা বলেন বিরোধী দলের আন্দোলনের মুরোদ নেই।
অন্যদিকে হরতালে যত লাশ তত হরতালকারীদের লাভ। আন্দোলন কতই চাঙা। একদল যা বলছে, অন্যদল তাকে মিথ্যে বলছে। দুই দলের মিথ্যে তথ্য, মিথ্যে কথার মাঝে সত্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। যারা তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অটল থেকে দেশটাকে অস্থির করে তুলেছে, মানুষের অধিকারের কথা বলে মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে, তাদের জন্য আছে সুরক্ষিত বাড়ি, নিরাপদ রাস্তা, সুচিকিৎসা, মজাদার খাবার, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। আর আমাদের জন্য আছে মৃত্যুর ফাঁদ যানবাহন, কাজের অভাবে অনাহারে থাকা, অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ এবং সময়মতো পরীক্ষা দিতে না পারায় খারাপ ফলাফলের দায়ভার। অন্ধ এবং বধির রাজনীতি মানুষের কান্না শোনে না, মৃত্যুর মিছিল দেখে না, দানবীয় কর্মকাণ্ড অবলোকন করে না। ক্ষমতায় থাকার দম্ভ আর ক্ষমতায় যাওয়ার লালসার আগুনে ঝলসে যাচ্ছে আমাদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না। প্রতিদিনই আহত এবং নিহত মানুষে সংখ্যা বাড়ছে। কর্মহীন শ্রমিক ঘরে শুয়ে-বসে দিন কাটাচ্ছেন।
অসুস্থ রোগী ঘরে ছটফট করছে। হরতালে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারছে না। এমনই এক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জাঁতাকলে পিষ্ট আমরা দুই পক্ষকে কেন ভোট দেব? গত ৪২ বছরে আমরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে একদল থেকে অন্যদলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছি। রক্তস্নাত পথে, লাশের মিছিলের মাঝে প্রতিবারই ক্ষমতাবানেরা ক্ষমতার মসনদে অধিষ্ঠিত হয়ে তৃপ্তির হাসি হেসেছে। বিরোধী দল কিছুদিন যেতে না যেতেই খুঁজে পেয়েছে ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতা, শুরু করেছে জনগণের নামে আন্দোলন। জনগণের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার যে দেশে ভূলুণ্ঠিত হয়, সে দেশে জনগণের অধিকার রক্ষার নামে যে নির্লজ্জ আন্দোলন, সংবিধানের নামে যে ঔদ্ধত্য, তা কেন জনগণকে ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করবে না? সংবিধান রক্ষার জন্য ক্ষমতাসীনদের যে স্বেচ্ছাচারিতা, তা আমাদের সন্তানদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। জনগণের ভোটাধিকারের নামে বিরোধীদের যে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড,
তা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিচ্ছে। আমাদের ভোট রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় বসাবে। আমাদের কী হবে? প্রতি পাঁচ বছর পর পর একই সংবিধান, একই গণতন্ত্র, একই আন্দোলন। কেবল বেড়ে যায় মৃত মানুষের সংখ্যা, আহত মানুষের সংখ্যা, হিংস্রতার ছোবল। ১৫ লাখ পরীক্ষার্থীর অভিভাবকেরা এ দেশের বড় দুটি দলকে কেন ভোট দেবেন? ক্ষমতার বদল আমাদের জন্য কোন শুভ বার্তা বয়ে আনবে? আমরা কি রাজনৈতিক হিংস্রতার ছোবল থেকে মুক্তি পাব? হরতাল নামক দানবীয় অস্ত্রটি কি আন্দোলন থেকে বাদ যাবে? আমার সন্তানের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা কি আমি পাব? আমার কন্যা কি নিরাপদে রাস্তায়-ঘরে বিচরণ করতে পারবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা কি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবেন? যদি এসবের নিশ্চয়তা না দিতে পারে কেউ? তাহলে কেন আমরা ভোট দেব?
 শাকিলা নাছরিন: একজন ভুক্তভোগী নাগরিক।

সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ

ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে বরিশালের চর কাউয়ার কালীখোলা গ্রামে একজনের খুন হওয়া এবং জখম আরও একজনের হাসপাতালে মৃত্যুর গুজবের অজুহাতে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের যে ঘটনা ঘটানো হলো, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিভিন্ন অজুহাতে সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, উপাসনালয় ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা কিছুদিন পরপরই ঘটে চলেছে। কয়েক দিন আগেই পাবনার সাঁথিয়ায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে। গত বছর রামুসহ পার্বত্য তিনটি জেলায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষও একই রকম হিংসাত্মক ঘটনার শিকার হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার বরিশালের চর কাউয়ার কালীখোলা গ্রামে ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে মারামারি বেধে যাওয়ার পরিণতিতে যে এমন হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতে পারে, স্থানীয় প্রশাসনের তা আগে থেকেই বোঝা উচিত ছিল। মারামারির সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েনি; তা ঘটেছে পরদিন শুক্রবারে। এই সময়ের মধ্যে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ ওই গ্রামে পাঠানো হলে এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ ঘটানোর সুযোগ কেউ পেত না।
কিন্তু সেটা করা হয়নি। এটা পরিষ্কার যে কালীখোলা গ্রামের এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অনিবার্য ছিল না; এটা ঘটতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতা ও অবহেলার কারণে। তা ছাড়া সংখ্যাগুরু গ্রামবাসীর হিংসার উন্মাদনায় মেতে ওঠাও যারপরনাই নিন্দনীয়। কেননা, খেলার মাঠে মারামারি নতুন নয়, এবং দুর্ভাগ্যজনক হলেও মারামারি থেকে খুন-জখমও ঘটে যেতে পারে। কালীখোলার এই ঘটনায় যে যুবক নিহত হয়েছেন, তিনি ঘটনাক্রমে মুসলমান সম্প্রদায়ের সদস্য। আর যাঁদের আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তাঁরা ঘটনাক্রমে হিন্দু। এটি কোনো সম্প্রদায়গত বিষয় নয়। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এটিকে দুটি সম্প্রদায়ের শত্রুতায় পরিণত করে দুর্বল সংখ্যালঘুদের পুরো সম্প্রদায়কেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত গর্হিত অন্যায়। এটাও ন্যক্কারজনক যে তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের ঘরবাড়িতে শুধু অগ্নিসংযোগই করেনি, লুটপাটও চালিয়েছে। লুটপাটের সুযোগ নেওয়ার এমন প্রবণতা পাবনার সাঁথিয়া এবং গত বছর রামুর ঘটনায়ও লক্ষ করা গেছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী যদি তাদের সংখ্যালঘু প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে? ছোটখাটো নানা ঘটনায় কিছুসংখ্যক মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে যখন সংঘবদ্ধ হিংসার প্রকাশ ঘটাতে চায়, তখন সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানবিকতার সমস্ত বোধ ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ে। কিছুদিন পর পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ঘটনার অজুহাতে এমন হিংসা ও ঘৃণার প্রকাশ এই সমাজের চিরায়ত প্রীতিবন্ধনে বড় বড় ক্ষতের সৃষ্টি করছে। এসবের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হলে যেকোনো উত্তেজনাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া মাত্র যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষকে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, সংখ্যাগুরু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকেও শুভবুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে, সংখ্যালঘু প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়িয়ে সুরক্ষা দিতে হবে

ছেলে-মেয়েতে বন্ধুত্ব by ইরা ডি. কস্তা

‘হয়তো তোমার আলনায় থাকবে না আমার জামা, ঝুলবে না তোমার বারান্দায় আমার পাঞ্জাবি পাজামা। তবু মনের জানালায়, অবাধ আনাগোনা, দুজনায়।’

ফিলিপিন্সে খাবার নেই অর্থ মূল্যহীন!

ফিলিপিন্সে এযাবতকালে সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার টাইফুন হাইয়ানের তাণ্ডবে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ও বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়ার আটদিন পর অবশেষে দুর্গতদের কাছে খাবার ও ওষুধসহ অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছল। দুর্গম এলাকার দুর্গতদের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছে মানবিক সহায়তা দানকারী সংগঠনগুলো। দানবীয় টাইফুন হাইয়ান ৮ নভেম্বর দ্বীপরাষ্ট্রটিতে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালিয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি করেছে।
ঝড়টির ভয়াবহতায় কর্তৃপক্ষ হতবুদ্ধি হয়ে পড়ায় প্রাথমিকভাবে যথাযথ ত্রাণ তৎপরতা চালানো যায়নি। কেন্দ্রীয় দ্বীপ লেইতি ও সামামের লাখ লাখ ক্ষুধার্ত ও ছিন্নমূল মানুষকে বিদ্যুৎ ও পানি ছাড়াই দিনাতিপাত করতে হয়। ঝড় আঘাত হানার ৮ দিন পর অবশেষ লেইতির ত্যাকলোবান শহরের দুর্গতদের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছল। মার্কিন রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন থেকে ত্রাণবাহী হেলিকপ্টার দুর্গত এলাকায় পৌঁছে। শনিবার সর্বপ্রথম একটি মার্কিন সি-হক হেলিকপ্টার ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সামারের পূর্বাঞ্চলীয় ছোট শহর গিপোরলসে পৌঁছায়। হাইয়ান ১২ হাজার জনসংখ্যার শহরটিতে সর্বপ্রথম আঘাত হানে। হেলিকপ্টারটি একটি স্কুলের খেলার মাঠে অবতরণ করে। ঝড়ে স্কুলটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মারিয়া এলভি ডেপেলকো বলেন, ‘এই ত্রাণ আমাদের জন্য পর্যাপ্ত না হলেও আমরা খুব খুশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সামান্যই ত্রাণ পেয়েছি। এতে আমরা বেঁচে থাকতে পারব। কারণ এখানকার কোনো বাড়িতেই খাবার অবশিষ্ট নেই।’ কাছের শহর গুইউয়ানের একটি পুরনো সামরিক বিমানঘাঁটি থেকে কয়েক মিনিট পরপরই ত্রাণ সরবরাহকারী বিমান অবতরণ করছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি ফ্যামিলি ফুড প্যাকেজ বিতরণ করা হয়েছে। রেডক্রস ও মেডিসিনস সানস ফ্রন্টিয়ার্স (ডকটরস্ উইদাউট বর্ডার) জানিয়েছে,
চলতি সপ্তাহান্তে ত্যাকলোবানে তারা ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করবে। ত্যাকলোবান থেকে রেডক্রসের এশিয়া প্যাসিফিকবিষয়ক মুখপাত্র প্যাট্রিক ফুলার বলেন, ‘দুর্গত এলাকায় প্রচুর ত্রাণসামগ্রী প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানকার মানুষের কাছে কোনো খাবার নেই। এখনও অর্থ একেবারেই মূল্যহীন।’ মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে মার্কিন রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন ফিলিপিন্সে পৌঁছার পর থেকে ত্যাকলোবান ও অন্যান্য দুর্গত এলাকায় এ পর্যন্ত ১১৮ টন খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও অস্থায়ী আশ্রয় নির্মাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও হেলিকপ্টারে করে প্রায় ২ হাজার ৯০০ লোককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছে।