Friday, May 15, 2020

বিপ্রতীপ by জুয়েল দেব

আমি আর অংশৈলুক দাঁড়িয়ে আছি থুইসাপাড়ার একদম শেষপ্রান্তে। ঢালু জায়গাটা শেষ হয়েছে রেমাক্রি নদীতে গিয়ে। মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। অংশৈলুকের চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে এত রাত অবধি জেগে থাকতে সে অভ্যস্ত নয়। মাথার উপর চাঁদটা বিশাল এক গোলাকার বাতির মত ঝুলে রয়েছে। জোছনায় পাহাড়কে ভেজা ভেজা মনে হয়।

থুইসাপাড়া পর্যন্ত পৌঁছার জন্য আমাদের হাঁটতে হয়েছে পুরো বারো ঘন্টা। থানছি থেকে পদ্ম ঝিরি হয়ে আমরা যখন হাঁটতে শুরু করলাম তখন বিকাল চারটার মত বাজে। ঘন্টাখানেক পরেই সূর্যটা হারিয়ে গেল পাহাড়ের ওপাশে। আমরা হাঁটুসমান পানিতে ঝিরিপথ ধরে হেঁটে চলেছি।
পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে হয় পিঁপড়ার মত সারিতে। একজনের পেছনে আরেকজন। হাঁটতে শুরু করার দু’ঘন্টা পরেই রাজেশদা বসে গেলেন। একটা খাড়া পাহাড়ের মাঝ বরাবর এসে তিনি আমাদের বললেন, ‘তোরা চলে যা। আমি আর হাঁটতে পারছি না।’
সামনে পেছনে যেদিকে তাকাই শুধুই পাহাড়। কাউকে কোথাও ফেলে যাওয়ার উপায় নেই। আমরা বসে ঘন্টাখানেক জিরিয়ে নিলাম।
পাহাড় ধরে আমাদের হাঁটা শেষ হয় না। মধ্যরাতে পাহাড়ি রাস্তায় আমরা যখন হেঁটে চলেছি মাথার ওপর তখন বৃষ্টির মত ঝরে পড়ছে জোছনা। নরম আলোয় সবকিছু অপার্থিব লাগে। পাহাড় শেষ হয়ে গিয়ে আবার ঝিরিপথ শুরু হয়। পিচ্ছিল পাথরের উপর আমরা একেকজন ধুপধাপ শব্দে আছাড় খেয়ে পড়ি। আমাদের সাতজনের দলটি কাদামাটি মেখে মোটামুটি ভূত হয়ে গেছি।
থুইসাপাড়াতে যখন পৌঁছলাম তখন রীতিমত ভোর হয়ে গেছে। ঝগড়–র বাড়িতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে আমার মনে হল অংশৈলুককে খুঁজে বের করতে হবে। দশ বছর আগে দেখেছি। এখন দেখে চিনতে পারব কিনা কে জানে!
আমাদের আসার খবর পেয়ে অংশৈলুকই আমাদের খুঁজে বের করল। পরদিন সন্ধ্যায় সে আমাদের ঘরের দরজায় এসে হাজির। আমি তাকে দেখে একদমই চিনতে পারলাম না। তাগড়া শরীর, পেটানো স্বাস্থ্য। যেন নিয়মিত ব্যায়াম করে। চেহারায় একটা ভারিক্কী ভাব এসেছে। পরনে জিন্সের প্যান্ট আর হাতে দামী ঘড়ি। দেখে বোঝা যায় অংশৈলুকের জীবনে পরিবর্তন এসেছে।
আমি ঘর থেকে বের হয়ে এসে অংশৈলুকের সামনে দাঁড়াই। এই তাগড়া যুবককে কী বলে সম্বোধন করব ভেবে পাই না। আমি কথা খুঁজে না পেয়ে বলি, ‘আমাকে চিনতে পেরেছ?’
অংশৈলুক হাসে, ‘চিনতে পারব না কেন দাদা! আপনাদের সবাইকে আমি চিনতে পেরেছি। আপনারা এসেছেন শুনে দেখা করতে ছুটে এলাম।’
অংশৈলুকের হাসি মাখা মুখ দেখে আমার কোন সংশয় থাকে না। সময়ে মানুষের সবকিছু বদলায়, কিন্তু হাসিটা বদলায় না। যে হাসতে পারে, সে সারাজীবন একইভাবে হাসতে পারে।
অংশৈলুককে বলি, ‘তুমি তো বড় হয়ে গেছ। কী করছ এখন?’
অংশৈলুক আবারও হাসে, ‘কী যে বলেন দাদা! বয়স বেড়েছে না! আমি একটা দোকান চালাই। দোকানটা পাড়ার একদম শুরুতে। আশেপাশের দু’চারটা পাড়ার মধ্যে আমার দোকানের মত আর কোন দোকান নেই। এখন তো সারাবছর ধরেই অনেক পর্যটক আসে এখানে। আপনাদের আশীর্বাদে বেচাকেনা ভালোই হয়।’
আমি অংশৈলুকের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। দশবছর কত দীর্ঘ সময়! এর মধ্যে রেমাক্রি নদী ভরা বর্ষায় যৌবনবতী হয়েছে দশবার। পিচ্ছিল পাথরগুলো দশবার শুকিয়েছে জ্যৈষ্ঠের খড়খড়ে রোদে। দশ বছর আগে অংশৈলুক ছিল সদ্য কৈশোর পার করা এক টগবগে তরুণ। বাংলা ভাষাটা ঠিকমত বলতে পারত না। আধো আধো বাংলায় যা বলত আমরা তা কষ্ট করে বুঝে নিতাম।
থুইসাপাড়াতে এসে আমরা ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আশেপাশে অনেকগুলো ঝর্ণা আর জলপ্রপাত রয়েছে। কিন্তু পরিচিত কেউ ছাড়া সেগুলো আমাদের পক্ষে খুঁজে বের করা সম্ভব না।
সাঈদ ভাই অংশৈলুককে দেখতে পেয়ে তাকে আটকালেন, ‘এই ছেলে, তুমি অমিয়াখুম চেন?’
অংশৈলুক মাথা নাড়তেই সাঈদ ভাই আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদেরকে সেখানে নিয়ে যেতে পারবে? তোমাকে আমরা টাকা দেব।’
অংশৈলুকের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। সে একদৌড়ে কোথায় যেন চলে যায়। আমরা অবাক হয়ে দেখি একটু পরেই হাতে একটা চকচকে ধারালো দা নিয়ে সে আবার ফেরত এসেছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে আধো আধো বাংলায় বলল, ‘আমার পেছনে পেছনে হাঁটেন।’
পাহাড়ের সরু পথ ধরে অংশৈলুকের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে আমি আবিষ্কার করলাম এই ছেলে তার দুই হাতকে একদম স্থির রাখতে পারে না। আশেপাশে যা দেখে তাতেই দা দিয়ে কোপ মারে। কখনো বাঁশঝাড়ে কোপ মারে, কখনো গাছের গায়ে কোপ মারে। আশেপাশে কিছু না থাকলে সাঁই সাঁই করে শূন্যে দা চালায়।
আমি কিছু না ভেবেই অংশৈলুককে বলি, ‘তুমি বিয়ে করেছ?’
অংশৈলুক হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে বলে, ‘হ্যাঁ একমাস হয়ে গেছে।’
আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম। এতটুকুন একটা ছেলে একমাস আগে বিয়ে করে ফেলেছে। আমি খুব কৌতূহল বোধ করি। রাজেশদা বলেন, ‘তোমার বিয়ে কীভাবে হয়েছে? কোন অনুষ্ঠান করতে হয়নি?’
অংশৈলুক এবার লাজুক হাসে, ‘আমি টিঙরিকে বলেছি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আকাশে চাঁদ উঠলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আস্তে আস্তে পাড়ার শেষ মাথায় আসতে। আমি গিয়ে ওকে নিয়ে আসব।’
আমি হেসে বলি, ‘টিঙরির সাথে বুঝি তোমার আগে থেকেই ভালোবাসা ছিল?’
অংশৈলুক লজ্জা পায়। মাথাটা নিচু করে বলে, ‘হ্যাঁ আমি তো ওদের পাড়ার উপর দিয়ে পাহাড়ে যেতাম পাখি মারতে। তখন কয়েকবার দেখেছি। তারপর একদিন ওকে দেখলাম রেমাক্রি নদী থেকে স্নান করে পাড়াতে ফিরছে।’
আমার কৌতূহল কমে না, ‘তখন তুমি তাকে ভালোবাসার কথা বলেছ?’
অংশৈলুকের তামাটে মুখটা কেমন যেন রক্তবর্ণ হয়ে যায়, ‘তাকে বলেছি ও যদি আমাকে বিয়ে না করে তাহলে সামনের উঁচু পাহাড়টাতে উঠে লাফিয়ে পড়ব রেমাক্রি নদীতে। শক্ত পাথরের উপর পড়লে থেঁতলে যাবে পুরো শরীর। তখন লাশটা ভেসে যাবে সাঙ্গু পর্যন্ত।’ অংশৈলুক একটু দম নিয়ে বলে, ‘এরপর সাঙ্গু নদী কোথায় গেছে সেটা আমিও জানি না, টিঙরিও জানে না। তাই লাশ কতটুকু পর্যন্ত যাবে সেটা আর বলতে হয়নি।’
অংশৈলুকের কথা শুনে আমরা সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠি। আমরা থামতেই অংশৈলুক বলে, ‘তখন টিঙরি আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে বলল, আমি তাকে নিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত সে আমার জন্য অপেক্ষা করবে।’
রাজেশদা আবার কথা বলেন, ‘তুমি তো বললে না টিঙরিকে কীভাবে নিয়ে এসেছ!’
অংশৈলুক একমনে হাঁটতে থাকে। একবারও পেছন ফিরে তাকায় না। হাঁটতে হাঁটতেই সে বলে, ‘আমি আমার পাড়ার কয়েকজনকে নিয়ে ওদের পাড়ার মাথা পর্যন্ত যাই। টিঙরি দৌড়ে আমার কাছে চলে আসে।’
আমি আবার কৌতূহলী হই, ‘কেউ তোমাদের আটকায় নি?’
অংশৈলুক বলে, ‘ওদের পাড়ার যুবক ছেলেরা তো সবসময় পাহারা দেয়। ধরতে পারলে ওদেরকে তিরিশটা শুয়োর দিয়ে পরব খাওয়াতে হত। আমাদেরকে ধরতে পারেনি। আমার তাই শুয়োর কেটে খাওয়াতে হয়নি। তাছাড়া আমি গরীব মানুষ। ধরলেও কিছু করার ছিল না। আমার তো একটা শুয়োর কেনার মত পয়সাই নেই।’
নোমান ভাই বললেন, ‘আমরা তিন চারদিন এখানে ঘুরে বেড়াব। পাড়াতে ফিরব না। আমরা এখানে ক্যা¤িপং করব। তুমি তো ঘরে নতুন বউ রেখে এসেছ। আমাদের সাথে থাকতে পারবে, নাকি পাড়াতে ফিরে যাবে?’
অংশৈলুক হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকে অনেক দূরে হাতছানি দেয়া কেওক্রাডং-এর দিকে। তারপর আবার হাঁটতে হাঁটতে বলে, ‘বউ তো সারাজীবন থাকবে। কিন্তু ঘরে আমার ভালো লাগে না। পাহাড়ের মধ্যে কী যেন একটা আছে। পাহাড় ধরে হেঁটে বেড়াতে আমার ভালো লাগে। নতুন কোন ঝর্ণা দেখলে বুকের মধ্যে ধুকপুক করে।’
অংশৈলুকের কথা শুনে আমরা সবাই চুপ করে থাকি। কেমন এক ঝিম ধরা অলস দুপুর। বিচিত্র রঙের প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে চারপাশে। এর মধ্যে আমরা হেঁটে চলেছি। আমার কাছে মনে হতে লাগল এই সরু পথ শেষ হয়েছে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে।
আমি নীরবতা ভেঙে অংশৈলুককে বলি, ‘তুমি কখনো ঢাকা শহরে গিয়েছ?’
অংশৈলুক হাসে, ‘বান্দরবান শহরেই তো যাইনি কখনো। আমার তো শহরে কোন দরকার নেই। শুধু শুধু কেন যাব!’
ঠিকই তো বলেছে। আমি দমে যাই। এই ছেলেকে শহরে নিয়ে গেলে এর অবস্থা হবে ডাঙ্গায় তোলা মাছের মত।

অংশৈলুকের কথায় আমার সম্বিৎ ফিরে আসে, ‘দাদা রাত হয়েছে তো। ঘুমাতে যাবেন না?’
আমি হেসে বলি, ‘আমি শহরের মানুষ। মধ্যরাতেও বাইরে ঘুরে বেড়ানো আমার অভ্যাস আছে। আমার অত সহজে ঘুম আসে না।’ একটু গলা খাঁকারি দিয়ে আবার বলি, ‘তার চাইতে তোমার কথা বল। দশ বছর পরে তোমাকে দেখলাম। যখন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম তখন সদ্য বিয়ে করেছিলে। এতদিনে নিশ্চয় কয়েকটা বাচ্চাকাচ্চার বাপ হয়ে গেছ।’
অংশৈলুক ঘুম ঘুম চোখে হাসে, ‘দুটো ছেলে আর একটা মেয়ে। বড় ছেলেটার বয়স আট বছর হয়ে গেল। একদমই ঘরে থাকতে চায় না। সারাক্ষণ পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়।’
আমি মুচকি হাসি, ‘তোমার স্বভাব পেয়েছে। তুমিও তো কমবয়সে এরকম পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে।’
একটু থেমে গোপন কথার ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলি, ‘আমরা কিন্তু এবারও তিন চারদিনের জন্য বেরিয়ে পড়ব। পাড়াতে ফিরব না। পাহাড়ে ক্যা¤িপং করব আর ঝর্ণা খুঁজে বেড়াব। ঠিক দশ বছর আগের মত। তুমি আমাদের সাথে যাবে নাকি?’
অংশৈলুকের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়। এই প্রথম আমার তাকে একদম অচেনা মানুষ মনে হতে থাকে। অংশৈলুক ধীরে ধীরে বলে, ‘আপনারা যান দাদা। এখন হারিয়ে যাওয়ার কোন ভয় নেই। অনেক পর্যটক ঘোরাফেরা করছে। আমার দোকান আছে, ব্যবসা-বাণিজ্য আছে, ছেলেমেয়েরা আছে। এসব ফেলে কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না।’
আমি খুব অবাক হই, ‘পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে তোমার ভালো লাগে না?’
অংশৈলুক হাসে। সেই একই সারল্যমাখা হাসি। তারপর বলে, ‘আপনারা শহুরে মানুষ। দু’দিনের জন্য পাহাড়ে ঘুরতে এসেছেন। আপনাদের কাছে সবকিছুই ভাল লাগবে। যা দেখবেন তাতেই মুগ্ধ হবেন। নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দটা অন্যরকম। আমি তো এখানেই থাকি সারাজীবন। আমার কাছে তাই আবিষ্কারের কোন আনন্দ নেই। সেই একঘেয়ে পাহাড় আর পাহাড়। তার চেয়ে বরং বছর-দু’বছরে একবার শহরে যাই। ঘুরে বেড়িয়ে চলে আসি। শহরের রাস্তায় অসম্ভব ধুলোবালি। তাতেও অবশ্য খুব একটা খারাপ লাগে না। রাস্তা পেরোতে গেলে তো ভয়ে দম আটকে আসে। আমি সেই ভয়টা উপভোগ করি।’
অংশৈলুকের কথা শুনে আমি দাঁড়িয়ে থাকি স্থাণুর মত। সময়ে সবকিছুই পাল্টায়। আমার হঠাৎ মনে হয় রেমাক্রি নদীটাও কি পাল্টে গেছে! কিংবা পাহাড়ের ওপাশে ডুবতে বসা চাঁদটা! যে চাঁদটা প্রতি পূর্ণিমায় ঝলসিয়ে দেয় রেমাক্রি নদীতে জেগে থাকা ডুবো পাথরগুলোকে।

চীনা গণমাধ্যমে মসজিদের শহর বাগেরহাট by জনি হক

মসজিদের শহর হিসেবে বাগেরহাটের আলাদা সুনাম রয়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের এই জেলায় অবস্থিত। বাগেরহাটে ৫০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে ৩৬০টি মসজিদ। তাই জেলাটিকে মসজিদের শহর হিসেবে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে চীনা ইংরেজি ভাষার সংবাদ চ্যানেল সিজিটিএন। চীনা এই গণমাধ্যমের শিরোনাম ‘দ্য লস্ট সিটি উইথ কমপ্লিট মেমোরিস: মস্ক সিটি অব বাগেরহাট’। এর বাংলা করলে দাঁড়ায়— স্মৃতিঘেরা হারানো শহর: মসজিদের শহর বাগেরহাট।
চীনা গণমাধ্যমটি মনে করিয়ে দিয়েছে, মার্কিন ব্যবসা-সংক্রান্ত ম্যাগাজিন ফোর্বসের দৃষ্টিতে বিশ্বের ১৫ হারানো শহরের তালিকায় বাগেরহাট অন্যতম। সেজন্যই তারা প্রতিবেদনটির এমন শিরোনাম করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘১৪৫৯ সালে খান জাহানের মৃত্যুর পর বাগেরহাট পরিণত হয় জঙ্গলে। শতাব্দী পর এটি আবিষ্কৃত হয়েছে।’
ষাটগম্বুজ মসজিদ
ষাটগম্বুজ মসজিদ
সিজিটিএনের ‘নো এশিয়া বেটার’ অর্থাৎ ‘এশিয়াকে ভালোভাবে জানুন’ সিরিজের অংশ হিসেবে এবার বাংলাদেশ তথা বাগেরহাট নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাগেরহাটের মসজিদগুলো প্রাচীনকালে বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে। পঞ্চদশ শতকে ইসলাম ধর্মের প্রচারক উলুঘ খান জাহান শহরটি গড়ে তোলেন। এর আগে খলিফতাবাদ নামে পরিচিত ছিল এটি। এখানে মধ্যযুগীয় ইসলামি শহরের সব বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত আছে।
ষাটগম্বুজ মসজিদ
ষাটগম্বুজ মসজিদ
প্রতিবেদনে স্বাভাবিকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে ষাটগম্বুজ মসজিদ। বাগেরহাট শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত হজরত খান জাহানের (র.) অমর সৃষ্টি। সাড়ে ৬০০ বছরের পুরনো ঐতিহাসিক এই স্থাপনার পুরাকীর্তিগুলোতে রয়েছে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের নিদর্শন।
ষাটগম্বুজ মসজিদ
ষাটগম্বুজ মসজিদ
ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে মাইলখানেক দূরে অবস্থিত চুনা খোলা মসজিদের একটি ছবি প্রকাশ করেছে সিজিটিএন। মনে করে, খান জাহানের মাজার বাগেরহাটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ। এটি ভালোভাবে সংরক্ষিত আছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। প্রতিদিন শত শত মানুষ সেখানে গিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বলে জানান লেখক ওয়াঙ লা। তিনি আরও লিখেছেন, ‘১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান পায় বাগেরহাট।’
চুনা খোলা মসজিদ
চুনা খোলা মসজিদ
‘নো এশিয়া বেটার’ সিরিজে এশিয়ার ৪৭টি দেশের সেরা স্থাপত্য, শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের কথা জানাচ্ছে সিজিটিএন। তাদের প্রতিবেদনের সুবাদে বাগেরহাটে বিদেশি পর্যটক সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হজরত খান জাহানের (র.) মাজার
হজরত খান জাহানের (র.) মাজার
সিজিটিএন আগে সিসিটিভি-নাইন ও সিসিটিভি নিউজ নামে পরিচিত ছিল। বেইজিং ভিত্তিক চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশনের অংশ চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক গ্রুপের সংবাদ চ্যানেল এটি।

রোমের প্রাচীন নিদর্শনের পাশে ম্যাকডোনাল্ড’স নিষিদ্ধ

বাথস অব ক্যারাকাল্লা
বিশ্বের প্রায় সর্বত্র ম্যাকডোনাল্ড’সের রেস্তোরাঁ আছে। কিন্তু রোমে এই ফাস্টফুড আউটলেটের নতুন কোনও শাখা খোলা যাবে না। এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইতালির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।

প্রাচীন নিদর্শন বাথস অব ক্যারাকালায় নতুন দোকান স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল ম্যাকডোনাল্ড’স কর্তৃপক্ষের। কিন্তু তা বাতিল করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইতালির সংস্কৃতিমন্ত্রী আলবার্তো বোনিজলি লিখেছেন, ‘প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল বাথস অব ক্যারাকালায় ফাস্টফুড দোকান দেওয়ার বিপক্ষে আমার অভিমত জানিয়েছি ইতোমধ্যে। পরিষ্কারভাবে জানাচ্ছি, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে অনুমোদন দেবে না।’

মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন রোমের মেয়র ভির্জিনিয়া রাজ্জো। টুইটারে তিনি বলেন, ‘বাথস অব ক্যারাকালার প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে ফাস্টফুড দোকানের নির্মাণ বন্ধে সংস্কৃতিমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পক্ষে আমরা। রোমের এমন বিস্ময়কর সম্পদগুলো সুরক্ষা করতে হবে আমাদের।’

রোমের ঐতিহাসিক নিদর্শন কলোসিয়ামের খুব কাছে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত তৃতীয় শতাব্দীর বাথস অব ক্যারাকালা। রোমান সম্রাট ক্যারাকালা ১৯৮ থেকে ২১১ সন পর্যন্ত বাবার সঙ্গে যৌথভাবে রাজত্ব করেছিলেন। ২১৭ সনে নিহত হওয়ার আগে একাই রোমের শাসক ছিলেন তিনি।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরও রোমে ম্যাকডোনাল্ড’সের বিগ ম্যাক খেতে ভোজনরসিকদের খুব বেশিদূর যেতে হবে না।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইতালির রাজধানীতে ম্যাকডোনাল্ড’সের ৪০টি শাখা আছে। এর মধ্যে কয়েকটির অবস্থান ভ্যাটিক্যান ও স্প্যানিশ স্টেপসের মতো বিখ্যাত ল্যান্ডমার্কের কাছাকাছি।

জার্মান পরিসংখ্যান বিষয়ক পোর্টাল স্ট্যাটিস্টা জানিয়েছে, ইতালিতে ম্যাকডোনাল্ড’সের মোট আউটলেট ৫৭৮টি। ইউরোপে ইতালির চেয়ে কেবল জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যে এই ব্র্যান্ডের রেস্তোরাঁ বেশি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোমে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ মোকাবিলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। এ কারণে প্রাচীন শহরটি সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বেশ কয়েকটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। যেমন, পর্যটকদের কাউকে রোমান যোদ্ধাদের সাজে দেখলে নগদ ৪৫০ ইউরো (৪৩ হাজার টাকা) জরিমানা নেওয়া হয়ে থাকে।

শুধু তাই নয়, রাস্তাঘাটে পানীয় বহনের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালু করেছে রোম। এখন রাত ২টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত পানশালায় অ্যালকোহল বিক্রি করা অবৈধ। এছাড়া রাস্তায় রাত ১০টার পরে কারও কাছে খোলা মদের বোতল ও বিয়ারের ক্যান পাওয়া গেলে গুনতে হতে পারে জরিমানা।

স্মরণে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর by অমিয় পি সেন

বলা হয় স্মৃতি হয় বাছাইপটু। এর সঙ্গে আরো বলতে হয় যে, এটা হতে পারে সংক্ষিপ্তভাবে বাছাই করা। এটা অনেকটাই পরিহাসের বিষয় যে বহু বাঙ্গালী যাদেরকে ২০১৯ সালের ১৫ মে গুন্ডাদের হাতে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গা নিয়ে বিচলিত মনে হচ্ছে তারা সেই ১৯৭০-এর দশকের ঘটনাবলী উপেক্ষা করতে চাচ্ছেন। তখন চরম বাম বাঙ্গালী আদর্শবাদী এবং তাদের সংগঠন দেশভারতী ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবে’র নামে প্রকাশে বিদ্যাসাগরের মূর্তির মাথা ভেঙ্গেছিলো। এই ভাঙ্গচুরকে ক্ষুদ্ধ বাঙ্গালীরা বলছেন- বাঙ্গালীর সংস্কৃতির উপর অবাঙ্গালীদের বড় আকারের সুপরিকল্পিত হামলা। এরপরও অনেকে বলছেন যে এ জন্য বাঙ্গারীরা নিজেরাই দায়ি কারণ তারা বিদ্যাসাগরকে তাদের ‘পবিত্র গরু’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বিদ্যাসাগরকে স্মরণের জন্য উপযুক্ত উপলক্ষ হতে পারতো ২০২০ সালে তার ২০০তম জন্মদিন উযযাপন। কিন্তু সাম্প্রতি যে দু:খজনক ঘটনা ঘটেছে তা তার জন্মভূমি পশ্চিম বঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়েও বেশি আত্মদর্শন ও স্বপ্রতিক্রিয়শীলতার দিকে ডাকছে।
বিদ্যাসাগর ও তার কাজ সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো রচনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘বিদ্যাসাগর চরিত্র’, যা চরিত্রপূজায় (১৯০৭) সংকলিত হয়। তীব্র আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী কবি দেখিয়েছেন, বিদ্যাসাগরের ‘শিক্ষাবিদ থেকে সংস্কারক’ চরিত্র সমসাময়িক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কতটা অমীল।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, গড়ে বাঙ্গালীরা বিশ্বাস স্থাপন করে কিন্তু সেগুলো কাজে পরিণত করার ইচ্ছা তাদের নেই। গড়ে বাঙ্গালীরা তার ইংলিশ সুপিরিয়রদের অনুসরণ করে গর্ববোধ করেন, তাদের দ্বারা প্রশংসিত হয়ে পুলকিত বোধ করেন, মোটের উপর সবাই ফাঁকাবুলি আওড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব চতুরতার জন্য তৃপ্ত হন।
বিদ্যাসাগরের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি হলো তিনি ছিলেন এসব বৈশিষ্ট্যের জীবন্ত এনটনিম বা বিপরীতার্থক শব্দ। নিদারুণ অধ্যাবসায় ও দৃঢ়সংকল্পের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা একজন আত্মকৃত মানুষ, যাতনা ও উন্নতি ছিলো যার আপ্তবাক্য এবং যা তার নৈতিক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট রীতিগুলো বিনির্মাণ করেছে, এবং আরো ভালোভাবে বলতে গেলে, তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যার কারণে আত্ম-সম্মান ও আত্ম-সংকল্প মানবজীবনকে গুরুত্বপূর্ণ অর্থ দিয়েছে। সমসাময়িক সমস্যাগুলোর ব্যাপারে এটা ছিলো একটি দেশীয় দৃষ্টিভঙ্গী এবং বিচ্ছিন্নতাজনিত অজ্ঞতা, ঔপনিবেশিক শিক্ষা এবং পশ্চিমা অনুপ্রাণিত সংস্কারের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি।
দৃশ্যত, এটা খুব অসাধারণ মনে হয়। তা নাহলে বিদ্যাসাগর ঐতিহ্যগত হিন্দু শিক্ষার পেছনে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বিরোধিতা করতেন এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিম থেকে আসা নতুন শিক্ষার গ্রহণ করে হিন্দু শিক্ষার্থী ও বিজ্ঞজনদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা প্রয়োজন।
বিদ্যাসাগর মূলত বাঙ্গালী অজ্ঞরজ্ঞান বা বর্ণপরিচয় শিক্ষায় অবদানের জন্য স্মরণীয়। হিন্দু নারী ও স্ত্রীদের অবস্থার উন্নতির জন্য তিনি ব্যাপক ও নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ধর্মের ব্যাপারে তার তেমন আগ্রহ ছিলো না, মনযোগ কেন্দ্রিভূত ছিলো সামাজিক ইস্যুগুলোতে। তার অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান না জানানো কোন মানুষের চত্রিত্রের সঙ্গে মেলে না । সম্ভবত এর সঙ্গে কিছু সত্যতাও জড়িত কারণ তিনি দক্ষিণেশ্বর থেকে আসা শ্রী রামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাত করতে পাল্টা সফরে যাননি, যিনি একসময় এই লোকটির সঙ্গে পরিচিত হতে, তার সঙ্গে সাক্ষাত করেছিলেন যাকে তারা জ্ঞানের সাগর (বিদ্যাসাগর) উপাধি দিয়েছিলেন।
সম্ভবত এ কারণেই ঈশ্বরের উপর বিদ্যাসাগরের তেমন কোন বিশ্বাস ছিলো না, যে ঈশ্বর দুর্বলের উপর সবলের অবাধ অন্যায় ও নিপীড়ন প্রতিরোধ করতে পারে না। তার বন্ধু ও সমসাময়িক বাঙ্গালী চিন্তাবিদ অক্ষয় কুমার দত্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের উপর জোর দেন। দুই বন্ধুই মূলত ছিলেন যুক্তিবাদি এবং তারা বেকনিয়ান চিন্তুাধারাকে উৎসাহিত করতেন। দত্ত চাইতেন ধর্মের জায়গায় নীতিশাস্ত্রকে স্থান দিতে। যা স্পষ্টতই সমসাময়িক ইংল্যান্ডে বুর্জোয়া চিন্তুাধারাকে রূপদান করছিলো। যা স্কটিশ লেখক স্যামুয়েল স্মাইলসের বই সেল্ফ হেল্প (১৮৫৯), ক্যারেক্টার (১৮৭১) ও থ্রিফট (১৮৭৫)-এ ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বিদ্যাসাগর বাঙ্গালী প্রাথমিক শিক্ষার বই লিখলেও বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে তেমন কিছু করেননি। বামদের কাছে তিনি অজনপ্রিয় হওয়ার আংশিক কারণও তাই। সামাজিক বিধি প্র্রণয়নের জন্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থকে আশ্রয় করার জন্য বঙ্কিম চন্দ্র চট্টপধ্যায়ের মতো সমসাময়িক ঔপন্যাসিকেরাও তার সমালোচনা করেছেন। বঙ্কিম ও অন্যরা মনে করতেন এটা লোকটির সঙ্গে মানানসই নয় এমন একটি অধ:পতনশীল পদক্ষেপ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (২৬ সেপ্টেম্বর ১৮২০-২৯ জুলাই ১৯৮১)