Wednesday, June 10, 2026
হাওরের তাজা মাছের দুই বেলার হাট by আকমল হোসেন
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার একাটুনা ও আখাইলকুরা ইউনিয়নের সংযোগস্থল কাউয়াদীঘি হাওরপারের কালাইপুরা এলাকার একটি কালভার্টের ওপর এই হাট বসেছে। সকালে ও বিকেলে কাউয়াদীঘি হাওরে মাছ ধরে মৎস্যজীবীরা এ ঘাটে মাছ বিক্রি করতে আসেন। খুচরা মৎস্য ব্যবসায়ীরা ওখান থেকে পাইকারি দরে মাছ কিনে ছড়িয়ে পড়েন ছোট-বড় গ্রামীণ হাটের দিকে, শহরের দিকে। শ্রাবণ থেকে কার্তিক মাস—এ সময়ে এই অস্থায়ী হাট বসে। এখানে শুধু কাউয়াদীঘি হাওরের তাজা মাছই ওঠে।
কাউয়াদীঘি হাওরপারের গ্রাম কালাইপুরা। ওখানে গিয়েই দেখা মেলে এই হাটের। হাট বলতে সাধারণত যে চেহারাটা ধরে নেওয়া হয়, এ হাটে সে রকম কিছু নেই। এখানে শুধু ছোট ছোট বাঁশ–বেতের পাত্রে সাজিয়ে রাখা আছে মাছ। নৌকা থেকে মাছ নামানোর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় টানাটানি, দামাদামি। এবার পানি কম, মাছও কম। হাওরের মাছের চাহিদা বেশি থাকে, তাই দামটাও অনেক চড়া।
মাছ নিয়ে আসা কালাইপুরার মাসুম মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সকাল বেলা ৫০০ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। বিকেলে যে মাছ পেয়েছেন, তা হয়তো ৪০০ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে করমউল্লাপুর কালভার্টে এই অস্থায়ী হাট বসছে। আগে এখানে কোনো হাট ছিল না। যাঁরা মাছ ধরতেন, তাঁরা নিজেরাই কাছের হাটবাজারে, নয়তো মৌলভীবাজার শহরে গিয়ে মাছ বিক্রি করতেন। অস্থায়ী হাট হওয়ায় এখানেই বেচে দেন।
এখানে যাঁরা মাছ নিয়ে আসেন, তাঁদের বেশির ভাগই কালাইপুরা গ্রামের। এটি মৎস্যজীবী–অধ্যুষিত একটি গ্রাম। দুই বেলাতেই এখানে এখন হাট বসে। রাতে যাঁরা হাওরে মাছ ধরেন, তাঁরা সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে এই ঘাটে মাছ নিয়ে আসেন। সকাল আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে বেচাকেনা শেষ, হাটও শেষ। দুপুরের পরে যাঁরা হাওরের দিকে মাছ ধরতে যান, তাঁরা বিকেল পাঁচটার দিকে হাটে আসেন। সন্ধ্যাতেই হাট শেষ। হাটে ছোট মাছই বেশি ওঠে। একদম তাজা মাছ, হাটে নিয়ে আসার পরও অনেক মাছ নড়াচড়া করে। পুঁটি, টেংরা, মলা, ভেদা, চান্দা–জাতীয় মাছই বেশি। মাঝেমধ্যে রুই–জাতীয় ছোট আকারের কিছু মাছ পাওয়া যায়। প্রতিদিন শুধু কালাইপুরা গ্রাম থেকেই অর্ধশতাধিক মানুষ হাওরে মাছ ধরতে যান। প্রতিদিন এই অস্থায়ী ঘাটে ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকার মাছ বেচাকেনা হয়।
মো. আমির নামের এক ক্রেতা বলেন, তিনি প্রায়ই এখানে মাছের জন্য আসেন। এক হাজার টাকার ছোট মাছ কিনে বললেন, ‘হাওরের তাজা মাছের স্বাদই আলাদা।’
কালাইপুরা গ্রামের আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এখানে হাট বসছে। আগে এখানে এ রকম বেচাবিক্রি হতো না। প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০ জন হাওরে মাছ ধরতে যান। তাঁরাই ঘাটে মাছ এনে বিক্রি করেন। সকাল ও বিকেলে হাট বসে। শ্রাবণ মাস থেকে হাট শুরু হয়েছে, কার্তিক মাস পর্যন্ত যত দিন হাওরে পানি থাকবে, তত দিন চলবে।’
![]() |
| সাজিয়ে রাখা হয়েছে হাওরের তাজা মাছ। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের করমউল্লাপুর কালভার্ট ঘাটে। ছবি: প্রথম আলো |
Friday, June 5, 2026
খামারের মাছ-মাংস আর ফল-ফসলে স্বপ্নের মতো জীবন হান্নানের by আকমল হোসেন
আবদুল হান্নান ছিলেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মাটির প্রতি টান ছিল শৈশব থেকেই। পড়াশোনার সময় ধান চাষে হাতেখড়ি। পরে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংকের সিলেট অঞ্চলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৮ সালে অবসর নেন। অবসরজীবনে তিনি মাটির টানেই ফিরে গেছেন চাষাবাদে। শুরু করেন শাকসবজি, মসলা, দেশি-বিদেশি ফল, মাছ এবং দেশি জাতের মোরগ পালন। তাঁর বাগানে শোভা পাচ্ছে সৌদির খেজুর থেকে শুরু করে অ্যাভাকাডো, জলপাই, আতাসহ দেশি-বিদেশি নানা ফল।
সম্প্রতি এক দুপুরে বাহারমর্দ্দানে আবদুল হান্নানের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, একজন শ্রমিক নিয়ে তিনি নিজেই গাছের পরিচর্যা করছেন। বাগানে দেশি-বিদেশি অনেক জাতের গাছ লাগানো। কোনোটাতে ফল এসেছে। কোনোটা নতুন লাগানো। বাগানের চৌহদ্দির মধ্যে পুকুর। পুকুরেই চাষ হচ্ছে রুই-কাতলা, মৃগেল, কার্ফু, পাঙাশসহ বিভিন্ন জাতের মাছ। প্রয়োজন হলেই পুকুরে বড়শি ফেলেন তিনি।
এই সৌখিন খামারি বলেন, চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর চাষাবাদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেন। প্রায় ৬০ শতাংশ জমিতে শাকসবজি ও মসলার চাষ শুরু করেন। ধান চাষ আগে থেকেই করতেন। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, শর্ষে, দারুচিনি, মরিচ, ধনিয়া, তেজপাতা—সবই নিজে উৎপাদন করেন। শর্ষে থেকে পরিবারের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। এবার মাছের খাবারের চাহিদা মেটাতে ভুট্টা চাষও শুরু করবেন। ৬০ শতাংশ জমিতে দেশি-বিদেশি ফলের চাষ করেছেন। সৌদি খেজুরের একটি গাছে এবার এক থোকা খেজুর এসেছে। অনেক খেজুরগাছ নিজেই চারা তৈরি করে লাগিয়েছেন। বাড়ির আশপাশের ৬০ শতাংশ জমিতেও আছে নানা প্রজাতির গাছ। ১০০ থেকে ১৫০টি দেশি জাতের মোরগ–মুরগি পালেন। সেখান থেকেই ডিম ও মাংসের চাহিদা পূরণ হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রথম আলোকে বলেন, যখন যে মৌসুম, তখন সেই রকম সবজি চাষ করেন আবদুল হান্নান। ফসল, ফল আর মাছে ভরা সংসার তাঁর। তেমন কিছু তাঁকে কিনে খেতে হয় না।
আবদুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুরুর সময় তেমন কিছু জানতাম না। ধীরে ধীরে শিখেছি, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। এখন অনেকে আমার কাছ থেকে চাষাবাদের পরামর্শ নিতে আসেন। আমি নিজের মতো করে মাছের খাবার বানাই, ওষুধ দিই, জৈব সার উৎপাদন করি। বাগান ও খামারের সব কাজ নিজেই তদারক করি।’
পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ফল ও পণ্য বাজারেও বিক্রি করেন আবদুল হান্নান। জানালেন, এখন পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এখন শুধু পরিচর্যার খরচ। বেশ তৃপ্তি নিয়ে তিনি বলেন, ‘লবণ-চিনি ছাড়া আর কিছু কিনি না। মাছ-মাংস, ফল-ফসল—সব নিজেরই উৎপাদন। চেষ্টাটাই আসল। খুব বেশি টাকা খরচ না করেও অনেক কিছু সম্ভব।’
![]() |
| আবদুল হান্নানের বাগানে আছে নানা জাতের দেশ–বিদেশি ফল। ছবি: প্রথম আলো |
Friday, October 17, 2025
মৌলভীবাজারের যে বাড়ি পাখিদের ‘আপন ঠিকানা’ by আকমল হোসেন
মৌলভীবাজারের মোকামবাজার-অফিসের বাজার সড়ক ধরে যাওয়ার পথে তখন এ রকমই সকালের পরিবেশ। একঝলকে খানিকটা দূরে ধানখেতের এক প্রান্তে চোখে পড়ে, একটি বাড়ির গাছে গাছে যেন সাদা কাঠগোলাপের মতো থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে। হাওয়ায় সেই ফুলের পাপড়ি দুলছে।
এরপরই কাছে যাওয়া, এসব ফুলের সঙ্গে পরিচয়। তবে ওই বাড়ির গাছে গাছে সাদা কোনো ফুল ফোটেনি, ফুল হয়ে ফুটে আছে সাদা বক। এখানে বক পাখি সংসার পেতেছে। সঙ্গে আছে কালো পানকৌড়ির দল, শালিকসহ নানা রকমের পাখিও।
সকালবেলা মাত্র ঘুম থেকে উঠছেন বাড়ির লোকজন। পাখিরা সমবেত ডাকে সরগরম করে রেখেছে সারা বাড়ি। বাড়ির লোকজন অনেকটা বছর ধরে এসব পাখির সঙ্গে আছেন, পাখিরা তাঁদের সঙ্গে আছে। ওই ডাককে তাঁরা আর আলাদা করতে পারেন না। পাখি, পাখির ডাক—সবকিছুই এখন তাঁদের বাড়ির অংশ হয়ে গেছে, সংসারযাপনের অংশ হয়ে গেছে।
এটি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরু গ্রামের একটি বাড়ি। বাড়ির তিন দিকেই ফসলের খোলা মাঠ। পূর্ব দিকে মাঠ শেষে আছে খাইঞ্জার হাওর।
বাড়ির কর্তা মো. এরশাদ মিয়া বলেন, ‘অনেক বছর ধরি পাখিরে রাখছি। পাখিরে পাহারা দিই। রাইতে ডাক শুনলে জানের দিকে চাই না, ঘর থাকি বাইর অই যাই। অনেকে শিকার করতো চায়। দিনের বেলায়ও কেউ কেউ আয়। কেউরে পাখি মারতে দিই না। আরও তো বাগান আছে। তারা যায় না। এখানে আশ্রয় পাইছে বলে আইছে। তারারে যত্ন করি রাখি।’
সম্প্রতি সকালে দূর থেকে যে রকমটা দেখা গেছে, গাছে গাছে সাদা সাদা ফুল হয়ে আছে পাখি। কাছে গেলে তার পরিমাণ যেন আরও বেড়ে যায়। এরশাদ মিয়ার বাড়ির পশ্চিম দিকের একটি পুকুরের পাড় ঘেঁষে আম, তেঁতুল, সুপারিসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ আছে। প্রায় সব কটি গাছেই বসে আছে ছোট-বড় অসংখ্য বক।
কাছেপিঠে আছে পানকৌড়ি। সাদার ফাঁকে ফাঁকে সবুজের সঙ্গে মিশে থাকা কালো রঙের পাখি। পানকৌড়ি নড়লে-চড়লেই ভালো করে চোখে পড়ে। মানুষ, বক ও পানকৌড়ি ওই বাড়িতে ‘মিলেমিশে আত্মীয় যেন’।
প্রায় গাছেই আছে পাখির বাসা। কোনোটিতে এখনো পাখির ছানা বসে আছে। কাছেই মা-বাবার মধ্যে কোনো না কোনোটি পাহারায়। দূর থেকে মা অথবা বাবা আধার নিয়ে আসছে, ছানার হাঁ করা মুখের ভেতর খাবার ঠেলে দিচ্ছে। সন্তান বাৎসল্যে ভরপুর বাড়ির সব কটি গাছ। বাড়ির পশ্চিম দিকটাতে চলার উপায় নেই। পাখির বিষ্ঠায় সাদা সাদা হয়ে আছে গাছতলা।
ওই গ্রামেরই মাদ্রাসাছাত্র মো. তারেক জানিয়েছে, সে প্রায়ই পাখি দেখতে ওই বাড়িতে যায়। বাড়ির লোকজন যেমন, প্রতিবেশীরাও তেমন পাখির প্রতি নজর রাখেন। প্রতিবেশীরা মনে করেন, এই পাখি তাঁদের সবার। কেউ পাখিকে বিরক্ত করেন না।
বাড়ির লোকজন ও স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ৮ থেকে ১০ বছর ধরে ওই বাড়িতে পাখি আশ্রয় নিয়েছে। কমবেশি সারা বছরই বাড়িতে পাখি থাকে। তবে কার্তিক মাসে পাখির সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। তখন অসংখ্য পাখিতে সব কটি গাছ সাদা হয়ে ওঠে। ভোরের দিকে পাখিরা জেগে যায়, তারপর ডাকতে শুরু করে। ডাকতে ডাকতে বাসা ছেড়ে মাঠের দিকে, কিংবা হাওরের দিকে উড়াল দেয়। সারা দিন বাইরে থাকে। বিকেল হলে আবার বাড়িতে ফিরতে শুরু করে।
| ঝাঁক বেঁধে পাখি নীড়ে ফিরছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরু গ্রামের একটি বাড়িতে। ছবি: প্রথম আলো |
Thursday, November 7, 2019
নাশপাতি চাষের অপার সম্ভাবনা by আকমল হোসেন

মৌলভীবাজারের আকবরপুরে অবস্থিত আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে নাশপাতির চাষ হয়েছে। তাতে ফল ধরেছে। বাগানের গাছে ঝুলে আছে থোকা থোকা নাশপাতি। ফলের আকার ও স্বাদ ভালো। আমদানি করা নাশপাতির চেয়ে একটু বেশিই মিষ্টি।
আকবরপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, কেন্দ্রের একটি এলাকায় নাশপাতির বাগান। সেখানে অনেকগুলো গাছ। তখন শ্রাবণের রোদে পুড়ছে বাগানটি। নাশপাতি ঝুলে আছে শাখায় শাখায়। রোদ, পোকামাকড় ও কাঠবিড়ালি থেকে নাশপাতি রক্ষা করতে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যাগিং প্রযুক্তি। প্রতিটি গাছে সাদা সাদা ব্যাগে মোড়ানো নাশপাতি।
আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, নাশপাতির মাতৃবাগানটি করা হয়েছিল ২০১০ সালে। এতে এখন ৩৫টি গাছ আছে। ফল আসবে কি না, এলেও ফলন কতটা ভালো হবে, স্বাদ হবে কি না—এমন নানা প্রশ্ন ছিল কৃষিবিজ্ঞানীদের মাথায়। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে ২০১৭ সাল থেকে নাশপাতিবাগানে ফল আসতে শুরু করেছে। চৈত্র মাসে ফুল আসে। আর শ্রাবণ-ভাদ্রে ফল তোলার উপযোগী হয়ে ওঠে। ফলনও ভালো, ফলের আকারও বড়। প্রতিটি গাছে ৬০ থেকে ৭০টি নাশপাতি ধরছে। প্রতিটি ফলের গড় ওজন ১৩৫ গ্রাম। ফল বাদামি রঙের। ফলের উপরিভাগের ত্বক কিছুটা খসখসে। শাঁস সাদাটে। খেতে কচকচে ও সুস্বাদু। বিদেশ থেকে যেসব নাশপাতি আনা হয়, তার স্বাদ কিছুটা পানসে। কিন্তু আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের নাশপাতির স্বাদ কিছুটা নোনতা ও বেশ মিষ্টি।
আকবরপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরফ উদ্দিন জানিয়েছেন, নাশপাতি মূলত শীতপ্রধান অঞ্চলের ফল। ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়ায় এর ব্যাপক চাষ হয়ে থাকে। ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়া থেকেই নাশপাতি এ দেশে আমদানি করা হয়। তবে শীতপ্রধান অঞ্চলের হলেও এর কোনো প্রজাতি বা জাত অপেক্ষাকৃত উচ্চ তাপমাত্রায় জন্মাতে ও ফলন হতে পারে। দেশে এই ফলের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি নাশপাতি-১ নামের নাশপাতির একটি জাত অবমুক্ত করে। সেই জাতেরই মাতৃবাগান আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। জাতটি নিয়মিত ফল ধারণে সক্ষম ও উচ্চফলনশীল। নাশপাতির গাছ খাড়া ও অল্প ঝোপ থাকে। পানি নিষ্কাশিত হয়—এমন মাটিতে নাশপাতির চাষ করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে পানিনিষ্কাশনে ভালো সুবিধা ও দোআঁশ মাটি এবং মাটির পিএইচ মান ৫ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৫ নাশপাতি চাষের জন্য উত্তম। তবে এর চেয়ে কমবেশি হলেও নাশপাতি জন্মাতে ও ফলন দিতে পারে। নাশপাতি চাষের জন্য সূর্যালোক দরকার। শুষ্ক গরম বাতাস নাশপাতির জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে নাশপাতির গাছ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না। সাধারণত শাখা কর্তন এবং গুটি কলমের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার হয়ে থাকে। বর্ষাকাল কলম করার উপযুক্ত সময়। ফল সংগ্রহ এবং গাছের ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করার জন্য গাছের উচ্চতা ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার হলে ভেঙে বা ছেঁটে দিলে ভালো। নাশপাতির খাড়া ডালে নতুন শাখা-প্রশাখা কম হয়ে থাকে। শাখা-প্রশাখা কম হলে ফলন কম আসবে। যে কারণে ভারী কিছু বা দড়ি টানার সাহায্যে ঊর্ধ্বমুখী ডালকে মাটির দিকে নুইয়ে দিলে ভালো হয়। এতে করে ডালের বিভিন্ন স্থানে টান বা হালকা ভাঁজের সৃষ্টি হয়ে থাকে এবং ওই সব টানের স্থানে নতুন কুঁড়ি বা শাখার সৃষ্টি হয়। এতে ফলন ও ফলের গুণগত মান বৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে কড়া রোদে নাশপাতির ত্বক নষ্ট হবে না। ফল সুন্দর থাকবে। পোকামাকড়ও আক্রমণ করতে পারবে না। কাঠবিড়ালি ফসল নষ্ট করতে পারবে না। এ অঞ্চলে কাঠবিড়ালি একটি বড় সমস্যা। কিন্তু ব্যাগিং করা ফল কাঠবিড়ালি নষ্ট করে না। প্রতি হেক্টরে ছয় থেকে সাত টন ফলন হতে পারে। আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে সফল জাতটি চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের টিলা ও পাহাড়ি এলাকায় চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এসব এলাকায় নাশপাতি হতে পারে নতুন মৌসুমের একটি ফসল। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে যখন আম-কাঁঠাল, আনারস ফুরিয়ে যাবে, তখন এটি বাজারে আসবে। এই ফলের আমদানিনির্ভরতা কমবে।
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরফ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, এ দেশে এখনো বাণিজ্যিকভাবে নাশপাতির চাষ শুরু হয়নি। কিন্তু এটি একটি অপার সম্ভাবনাময় ফসল। পোকামাকড়, রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম। বৃহত্তর সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকাতে নাশপাতির চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া পানি জমে না, এমন মাটিতেও এই ফলের চাষ হবে।
Tuesday, August 18, 2015
দুর্লভ মর্মর বিড়াল by আকমল হোসেন
![]() |
| মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে মর্মর বিড়াল l প্রথম আলো |
প্রাণীটির নাম মর্মর বিড়াল বা Marbled Cat (বৈজ্ঞানিক নাম Pardofelis Marmorata)। ছোট পাখি খায় বলে সিলেট অঞ্চলে প্রাণীটিকে ‘ছোট পাখি খাওড়া’ নামেও ডাকা হয়।
শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে যত্ন-আত্তিতেই বেড়ে উঠছে প্রাণীটি। বছরাধিক কাল ধরেই এটি সেখানে রয়েছে। অথচ এত দিন কেউ জানতই না, এটি মর্মর বিড়াল। তার পরিচিতি ছিল সাধারণ বনবিড়াল হিসেবেই। বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ শরীফ খান শনাক্ত করলেন দুর্লভ মর্মর বিড়ালটি।
বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে আসার আগে প্রাণীটি ছিল ভারত সীমান্তঘেঁষা আদিবাসী খাসিয়াদের দুর্গম গ্রাম নিরালাপুঞ্জিতে। বছর খানেক আগে খোঁজ পেয়ে সেটিকে নিয়ে আসেন ফাউন্ডেশনেরই চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেব।
গত ৬ জুলাই কথা হয় সীতেশ রঞ্জনের সঙ্গে। তিনি জানান, নিরালাপুঞ্জিতে আদিবাসী খাসিয়াদের কাছ থেকে তিনি বিড়ালছানাটি পেয়েছিলেন। তখন এর বয়স চার কি পাঁচ দিন। চোখও ফোটেনি। ছানাটিকে বাঁচিয়ে রাখাই ছিল এক কঠিন বাস্তবতা। প্রথমে ড্রপার দিয়ে গরুর দুধ খাওয়ানো হয়। কিছুটা শক্তপোক্ত হলে দুধ খাওয়ানো হয় ফিডার দিয়ে। মানবশিশুর মতো তোয়ালে দিয়ে জড়িয়ে ঘুম পাড়ানো হয়। সেই ছানাটির বয়স এখন ১৪ মাস। এখন সে নিজেই নিজের খাবার খেতে পারে। পছন্দের খাবার কবুতর বা কোয়েল। ছোট পাখি খেতেই সে বেশি পছন্দ করে। দু-একবার মোরগও দেওয়া হয়েছে।

প্রাণিবিশেষজ্ঞ শরীফ খান এবং প্রাণিবিদ মনিরুল এইচ খান জানান, সিলেট, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর বনে মর্মর বিড়ালের বিচরণ রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর ৪৪ বছরে কোথাও এই প্রাণীটির জীবিত দেখা মিলেছে বলে জানা নেই। নিশাচর প্রাণীটি গাছে থাকতেই ভালোবাসে। খাবারের সন্ধানে মাটিতে নেমে আসে। বুনো ছোট পাখি, পাখির ডিম ও বাচ্চা, বুনো খরগোশ, বড় ইঁদুর, ব্যাঙ ইত্যাদি খেয়ে বেঁচে থাকে। একটি মা মর্মর বিড়াল একসঙ্গে এক থেকে চারটি বাচ্চা দিয়ে থাকে। ২১ মাসে পরিণত হয়ে ওঠে। পরিণত মর্মর বিড়াল নাকের ডগা থেকে লেজ পর্যন্ত তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট হয়ে থাকে। তবে লেজটাই প্রায় অর্ধেক। এদের গড় আয়ু প্রায় ১২ বছর। বাংলাদেশের বাইরে ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়সহ পাহাড়ি অঞ্চলে এবং মিয়ানমার, নেপাল, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশে মর্মর বিড়ালের বাস রয়েছে।
প্রাণী বিশেষজ্ঞ শরীফ খান বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে মর্মর বিড়ালকে জীবিত পাওয়া যায়নি। কোথাও আছে, তা–ও জানা যায়নি। শুধু চামড়া পাওয়া গেছে। ফলে অনেকে মনে করতেন, এটি দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গত ৪৪ বছরে দুর্লভ প্রাণীটিকে দেশে জীবিত পাওয়ার এটাই প্রথম ঘটনা।
Saturday, June 13, 2015
‘আম–কাঠলি’ by আকমল হোসেন
![]() |
| মৌলভীবাজারের চৌমোহনা এলাকায় বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে আম l প্রথম আলো |
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, প্রাবন্ধিক এবং ছোটকাগজ খনন সম্পাদক মো. আবদুল খালিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ছোটকাল থেকেই এই আম-কাঠলি দিতে দেখে আসছি। দেওয়ার আগে মেয়ে বা বোনের বাড়ি জানানো হয়। দুই পক্ষের সম্মতিতে নির্দিষ্ট তারিখে ঠেলা বা ট্রাকে করে যার যার মতো আম-কাঁঠাল, আনারস, খই-মিষ্টি নিয়ে যাওয়া হয়। তারাও (যার বাড়ি দেওয়া হবে) এদিন সামর্থ্যমতো খাসি-বকরি জবাই করে। আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত করে। এটা এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের রেওয়াজ।’
গত শুক্রবার সকালে কোর্ট মার্কেট বাজারে ফল কিনছিলেন সদর উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামের রাশিদ মিয়া। মেয়ের বিয়ে হয়েছে সম্প্রতি। ‘মেয়ের বাড়ি আম-কাঠলি দিব, তাই কিনছি’ বললেন তিনি। সদর উপজেলার জগৎসী গ্রামের মুহিদ মিয়া বলেন, ‘ভাতিজির বাড়িতে আম-কাঠলি দিব। এবারই প্রথম দিচ্ছি।’ তিনি জানালেন, ৩ হাজার ২০০ টাকার আনারস, ৪ হাজার টাকার কাঁঠাল, ১ হাজার ৮০০ টাকার আম, ৪০০ টাকার লিচু, ৪৫০ টাকার খই এবং ১ হাজার ২০০ টাকার মিষ্টি কিনেছেন। এসব দিয়ে সাজানো হচ্ছে তাঁর ‘আম-কাঠলি’।
জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই বিশেষ করে নববধূরা শ্বশুরবাড়িতে প্রতীক্ষায় থাকেন, কখন বাবা বা ভাইয়ের বাড়ি থেকে পাঠানো হবে ‘আম-কাঠলি’। মেয়ের চুলে পাক ধরলেও অনেকের বাবার বাড়ি থেকে যায় আম-কাঠলি। বিয়ের প্রথম বছর ‘আম-কাঠলি’ দেওয়া হয় ধুমধাম করে। এই উপলক্ষে দুই পক্ষের আত্মীয়স্বজনদের ঘটে মহামিলন। মেয়ের (শ্বশুর) বাড়িতে ছোটখাটো একটা বিয়ের মতো আয়োজন করা হয়। বিত্তবানদের ক্ষেত্রে এই উৎসব যতটা আনন্দের, হতদরিদ্র বাপ-ভাইদের পড়তে হয় ততটাই বেকায়দায়। তবু মেয়ের মান রাখতে, জামাই, নাতি-নাতনি ও মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকদের খুশি করতে দুই-চারটা কাঁঠাল, দুই-চার হালি আনারস, এক-দুই কেজি আম ও এক কেজি খই হলেও ‘আম-কাঠলি’ পাঠানো হয়।
![]() |
| আম-কাঠলির জন্য ট্রাকে তোলা হচ্ছে কাঁঠাল। মৌলভীবাজার শহরের কোর্ট মার্কেট থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো |
সদর উপজেলার জাকান্দি মুন্সীবাড়ির মৌসুমি ফল বিক্রেতা মো. মছদ্দর মিয়া বলেন, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে প্রতিদিন সকাল হলেই জেলার আদমপুর, ব্রাহ্মণবাজার, মুছাই, মির্জাপুর, শমশেরগঞ্জ, শমশেরনগর থেকে কাঁঠাল ও আনারস এই মার্কেটে এনে স্তূপ করা হয়। প্রতিদিন অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ছোট ট্রাক এখান থেকে বোঝাই করে আত্মীয়বাড়ি নিয়ে যান লোকজন। এ ছাড়া অটোরিকশা, ঠেলা, টমটম—এসব তো আছেই। খই বিক্রেতা ননী গোপাল বণিক বলেন, ৫ কেজি থেকে ৩০-৩২ কেজি করে খই নেওয়া হয়। এটা নির্ভর করে কাঁঠালের ওপর। কাঁঠাল যত বেশি। খইও তত বেশি নেওয়া হয়।
এই অঞ্চলের মানুষদের সংসারে যতই থাক টানাপোড়েন, অর্থকষ্ট, ‘আম-কাঠলির’ এ উৎসব উদ্যাপন করেন ঘটা করে। এর সঙ্গে মিশে আছে এক অন্যরকম আবেগ, উচ্ছ্বাস, যা পারিবারিক বন্ধনকে নতুন রূপ দেয়।
Sunday, May 24, 2015
হাটজুড়ে কাঁঠাল, বাতাসে ম-ম ঘ্রাণ by আকমল হোসেন
![]() |
| মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কের ব্রাহ্মণবাজারে প্রতিবছর বসে মৌসুমি কাঁঠালের হাট। কাঁঠালের সরবরাহও হয় প্রচুর |
সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে বাজারবসলেও সোম ও বৃহস্পতিবার এখানে সাপ্তাহিক হাটের দিন। তবে এই হাটটি আম-কাঁঠালের মৌসুমে অন্যদিনের মতো থাকে না। পায় আলাদা চেহারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রাহ্মণবাজারের পূর্ব দিকে রাস্তার দুপাশে কাঁঠাল আর কাঁঠাল। শুধু স্তূপ করা কাঁঠালই নয়, কাঁধে করে এবং সাইকেলে ঝুলিয়ে কাঁঠাল নিয়ে হাঁটে আসছেন চাষিরা। ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, হাঁকাহাঁকিতে বাজার গমগম করছে। বাতাসে ছড়াচ্ছে পাকা কাঁঠালের ঘ্রাণ।
গত সোমবার ওই হাটে গিয়েক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুলাউড়া উপজেলার গাজীপুর, লংলা, বুধপাশা, কাজলধারা, ব্রাহ্মণবাজারের ৮ নম্বর এলাকা, বিভিন্ন টিলা, বাড়ি ও চা-বাগান থেকে চাষিরা কাঁধে, ঠেলাগাড়িতে ও সাইকেলে করে কাঁঠাল নিয়ে সকাল থেকে হাটে আসা শুরু করেন। এসব চাষির কাছ থেকে স্থানীয় পাইকারেরা কাঁঠাল কিনে নিয়ে রাস্তার পাশে স্তূপ করেছেন। একেকটি স্তূপে ৫০ থেকে ৩০০ কাঁঠাল। সন্ধ্যা পর্যন্ত কাঁঠাল কেনাবেচা চলে। বৈশাখ থেকে শুরু হয়। আষাঢ় পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাজারে কাঁঠালের হাট বসে।
দুপুরে রাস্তার পাশে কাঁঠালের বিশাল স্তূপ নিয়ে বসে থাকা কুলাউড়ার হিংগাজিয়া গ্রামের করুণাময় দাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার এখানে (স্তূপ) ১০০ কাঁঠাল আছে। হাটে আসা লোকজনের কাছ থেকে এই কাঁঠাল সাড়ে সাত হাজার টাকায় কিনেছি। এখন দরদামে পোষালে পাইকারের কাছে বিক্রি করব।’
ব্রাহ্মণবাজারে করুণাময় দাসের মতো এ রকম অর্ধশতাধিক পাইকার আছেন, যাঁরা স্থানীয় চাষিদের কাঁঠাল কিনে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকারের কাছে বিক্রি করেন। এভাবে দুই-তিন হাত ঘুরে পাইকারি দরের চেয়ে প্রায় দেড়-দুই গুণ বেশি দামে কাঁঠাল পৌঁছে খুচরা ক্রেতার কাছে।
অপর ব্যবসায়ী মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমি ২৫০টি কাঁঠাল কিনেছি সাড়ে ১২ হাজার টাকায়। এখন ক্রেতার অপেক্ষায় আছি।’ সময়টা তখন এমন—সবার চোখ ক্রেতার দিকে। বাড়তি কথা বলার ফুরসত কারও নেই।
কয়েকজন পাইকার জানান, এই হাটে কাঁঠাল কিনতে মৌলভীবাজার, সিলেটের বিশ্বনাথ, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, ছাতকসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারেরা আসেন। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ১০টি ছোট ট্রাককে কাঁঠাল নিয়ে হাট ছাড়তে দেখা গেল। পাইকারেরা জানান, হাটবারে এখান থেকে প্রায় ৫০ ট্রাক কাঁঠাল দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়।
লংলা থেকে নিজের গাছের আটটি কাঁঠাল সাইকেলে ঝুলিয়ে নিয়ে এসেছেন সুখময় ধর। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ক্রেতার অপেক্ষায়। সুখময় বলেন, ‘প্রত্যেক বাজারবারে কাঁঠাল নিয়ে আসি। আজ আটটা কাঁঠাল এনেছি। দাম চাইছি বারোশ টাকা। আট-নয় শ টাকা পেলে বিক্রি করে দেব।’ তাঁর মতো এভাবে সাইকেলে কাঁঠাল নিয়ে এসেছেন প্রায় অর্ধশত কাঁঠালচাষি। হাটটির যেদিকেই চোখ যায়, শুধু ছড়ানো-ছিটানো কাঁঠাল আর কাঁঠাল। চাষিরা জানালেন, এ বছর কাঁঠালের উৎপাদন বেশ ভালো হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক আবুল কালাম চৌধুরী বলেন, এ জেলার টিলার মাটি কাঁঠাল চাষের উপযোগী। জেলায় এ বছর ২ হাজার ১৯৯ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২৪ হাজার ৩৫ মেট্রিক টন।
Tuesday, December 16, 2014
ঐতিহ্য- গয়ঘর খোজার মসজিদ by আকমল হোসেন

Thursday, November 27, 2014
শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না by আকমল হোসেন
প্রত্যেক শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো একটি ঘোষণা প্রকাশ করে থাকে, যা সম্মেলনস্থলের নামে পরিচিত হয়ে থাকে। যেমন এবার কাঠমান্ডু ঘোষণা সম্মেলনের শেষদিন প্রকাশ করা হবে। প্রতিটি সম্মেলনের ঘোষণায় সহযোগিতা সম্পর্কে অনেক প্রত্যয়দীপ্ত কথার সঙ্গে নতুন নতুন লক্ষ্যও স্থির করা হয়। তবে সেসব ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে দেখা যায় দুস্তর পার্থক্য। সহযোগিতার কথা মুখে যত উচ্চারণ করা হয়, কার্যক্ষেত্রে সে অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ না করায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি সবল হয়নি এবং এ অঞ্চলের জনগণের জীবনে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। এটা বলা কোনো অতিকথন হবে না যে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হলেও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে নিজস্ব স্নায়ুযুদ্ধ বিদ্যমান থাকায় এ অঞ্চলে আঞ্চলিক সহযোগিতার বলিষ্ঠ ছাপ পড়ছে না।
আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে দক্ষিণ এশিয়া পিছিয়ে আছে- এ উপলব্ধি থেকে যে দুটি বাণিজ্য সহযোগিতা চুক্তি যথাক্রমে সাপটা ও সাফটা স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে দেশগুলো ব্যর্থ হওয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এর পেছনে যেমন কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা, তেমনি মনস্তাত্ত্বিক বাধাও কাজ করে থাকে। বিশেষ করে ভারতের বৃহৎ বাজারে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার সহজ না হলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক পিছিয়ে থাকবে। পাকিস্তান ছাড়া সার্কের অন্য সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি ক্ষুদ্র থাকার প্রেক্ষাপটে তাদের বাজারে ভারতের প্রবেশাধিকারের তুলনায় ভারতের বাজারে তাদের সহজ প্রবেশাধিকারের তাৎপর্য ভিন্ন।
১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ক স্লোগান হচ্ছে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যে কোনো আঞ্চলিক সহযোগিতার পেছনের তাগিদ হচ্ছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, যা জনগণের জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম। শাসকশ্রেণীর জীবনের উন্নতি বা সমৃদ্ধিকে রাষ্ট্রের ভিত্তি গণ্য করার দিন অনেক আগেই গত হয়েছে। বর্তমান যুগের কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণা এর জনগণের সার্বিক জীবনমানের উন্নতির ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে শান্তি প্রত্যয়টি দ্বারা শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি বোঝায় না। এর সঙ্গে জনগণের জীবনমানের উন্নতিও সম্পর্কিত। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের বসবাস। অতএব সার্ক সহযোগিতা কাঠামো ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের জীবনে সমৃদ্ধি আনার আকাক্সক্ষা স্বাভাবিক।
এবার আঞ্চলিক সংযোগ বা কানেক্টিভিটির ধারণা অবলম্বন করে সার্ক সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রেল যোগাযোগ এবং পণ্য ও যাত্রীবাহী মোটরযান চলাচল সংক্রান্ত দুটি চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বাণিজ্য বৃদ্ধির তাগিদ থেকে এ ধরনের সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে। রাজনৈতিক সীমানা টানার আগে এ অঞ্চলে মানুষ ও পণ্য চলাচলের অবাধ গতি ছিল। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর রাজনৈতিক জটিলতা ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলায় এ গতি বাধাগ্রস্ত হতে হতে এক পর্যায়ে বন্ধ হয়েও গিয়েছিল। সবচেয়ে সফল আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়ন আজ যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, তা দীর্ঘকালের প্রচেষ্টার ফল। সংযোগের এ ধরনের ধারণার সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যের সম্পর্ক যে ঘনিষ্ঠ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পারস্পরিক অবিশ্বাস-সন্দেহ থেকেই যার যার সীমান্ত সুরক্ষা করার চিন্তার উদ্ভব হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় সুরক্ষিত সীমান্ত তৈরির চিন্তার উপস্থিতি প্রবল। যেমন, ভারত ও পাকিস্তান নিজ নিজ নিরাপত্তা চিন্তা থেকে সীমান্তকে সুরক্ষা করার উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখার ভারতীয় চিন্তার উদ্ভব এভাবেই হয়েছে।
অন্যদিকে বাণিজ্য সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে অর্থনীতিকে সবল করার ভাবনা প্রকাশ পায়। মানুষের সহজ গমনাগমনের মাধ্যমে পারস্পরিক চেনাশোনা বাড়ে বলে তারও গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জনগণ সহজে একে অপরের দেশে যেতে পারলে নানা ধরনের কল্পিত ধারণার অবসান হয়। তাই এবারের শীর্ষ সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে কানেক্টিভিটির যে আলোচনার কথা আছে, তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ১৯৪৭ সালের পর থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেল সংযোগ বিদ্যমান ছিল। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর অন্যান্য সহজ সংযোগের মতো রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নতুন করে এ ধরনের সংযোগের উদ্যোগ জনগণের মধ্যে আস্থা যেমন তৈরি করতে পারে, একই সঙ্গে তা নেপাল ও ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশের জন্য সমুদ্রপথে বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে পণ্য চলাচলে বাংলাদেশকে যেমন দিল্লির প্রয়োজন, তেমনি পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগের জন্য ঢাকার প্রয়োজন ভারতের রেলপথ ও সড়কপথ ব্যবহারের সুযোগ। তাই পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে এ ধরনের সংযোগের কথা চিন্তা করা যেতে পারে।
আশির দশকে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাসংবলিত যে ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করেছিল, তাতে সহযোগিতা যাতে একপেশে না হয়ে যায় তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। আজ ২৯ বছর পরও তা প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। তবে সহযোগিতাকে এগিয়ে নিতে সদস্য দেশগুলোর যে পরিমাণ উদ্যোগ নেয়া দরকার ছিল তার অভাব আছে। বিশেষত ভারত এক্ষেত্রে যে নেতৃত্ব দিতে পারত, সেটা লক্ষ্য করা যায়নি। ভারতে দল নির্বিশেষে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তারা ভারতের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা বলে প্রতিবেশীদের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি করতে চায় তা একপেশে হয়ে যায়। পাকিস্তান তার চির বৈরী প্রতিবেশী ভারতকে মোকাবেলা করার নামে যে বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করে, তাও আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখে না।
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতাকে শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে প্রকৃত অর্থে জনগণের স্বার্থ অর্জনের মাধ্যমে পরিণত করতে হলে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিক আধিপত্য কায়েমের চিন্তা বাদ দিয়ে ইতিমধ্যে চিহ্নিত সহযোগিতার বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগী হতে হবে। তা না হলে শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতার জন্য জনগণের করের অর্থ খরচ করার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
ড. আকমল হোসেন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Saturday, August 3, 2013
আরব বসন্ত ও মিসর : গন্তব্য কোথায়? by আকমল হোসেন

যেভাবে ‘আরব বসন্ত’ শব্দগুচ্ছ সংবাদপত্রের পাতায় ব্যবহার করা হয়েছিল, তাতে মনে হতে পারে এসব দেশে গণআন্দোলনে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের ফলে গণতন্ত্রের ফুল ফুটতে যাচ্ছে। শীতকালীন নির্জীব অবস্থা কেটে জীবনের সূত্রপাত হতে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা যেমন বেড়েছে, তেমনি ভবিষ্যৎও হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত।
মোহাম্মদ মুরসি সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক শক্তির দিক থেকে তার বিরোধীরা প্রায় সমান ছিল। মুরসি প্রস্তাবিত সংবিধানের বিরোধিতা করেছে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী অসাম্প্রদায়িক লিবারেল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো। কপটিক খ্রিস্টানরা এ সংবিধানের অধীন নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারেনি যেমন, তেমনি নারী অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন গোষ্ঠীও তাতে নারী স্বাধীনতার প্রতি হুমকি দেখতে পেয়েছে। প্রস্তাবিত সংবিধানে শরিয়া আইন প্রচলনের বিষয়ে বিরোধিতার সূত্রপাত। পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা কেন্দ ীভূত করার চেষ্টা বিরোধীদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
বর্তমানে মিসরে যে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা ব্রাদারহুডের একাধিপত্য আরোপের নীতি থেকে তৈরি হয়েছে বললে অতি কথন হবে না। মিসরে দীর্ঘকালের অগণতান্ত্রিক-স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় সমাজের সব মানুষ পীড়িত হয়েছিল। সে ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে তাই সব শ্রেণী-পেশা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। মিসরের সামরিক বাহিনী থেকে স্বৈরাচারী শাসকরা আসতেন বলে সামরিক বাহিনী সেই শাসন ব্যবস্থার অংশীদার ও সমর্থক ছিল। ইসরাইলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকায় দেশ রক্ষার নামে সামরিক বাহিনী সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জাতীয় ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিল। সামরিক বাহিনী মোবারকের পেছনে দাঁড়াতে চাইলেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। তবে মোবারকের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের নামে তাদের হাতে ক্ষমতা থেকে যায়। পার্লামেন্ট নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হলে সামরিক বাহিনীর চাপে তা বাতিল ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে ব্রাহারহুড নির্বাচনে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি তাকে মেনে নিতে চায়নি, যেহেতু তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্রাদারহুডের প্রায় সমান ছিল। এবং তারাও মোবারককে বিতাড়ন করার ‘বিপ্লবে’ অংশগ্রহণ করেছে। ব্রাদারহুড গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় এলেও মিসরীয় সমাজ যে বিভক্ত তা আমলে না নেয়ায় তাকে ক্ষমতা সংহত করতে শক্তি প্রয়োগ করতে হয়েছে শেষ অবধি। এবং অন্য রাজনৈতিক শক্তিকে আস্থায় নিয়ে ক্ষমতা প্রয়োগের নীতিতে বিশ্বাসী না হওয়ার মনোভাব তার জন্য ইতিবাচক পরিণতি নিয়ে আসেনি।
মুসলিম ব্রাদারহুড (ইখওয়ানুল মুসলিমিন) মিসরের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল, যার জš§ হয়েছিল ১৯২০-এর দশকে মিসর যখন ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। দলটি মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের যেমন বিরোধী ছিল, তেমনি পাশ্চাত্য জীবনধারার বিরোধী ছিল। রাজনৈতিক আদর্শ ও সাংগঠনিক ক্ষমতার কারণে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার এবং নাসেরের জাতীয়তাবাদী সরকারের সময় সংগঠনটি রাষ্ট্রের কোপানলে পড়ে নিষিদ্ধ ছিল। সে সময় উভয় পক্ষ পরস্পরের প্রতি সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছিল। নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় সংগঠনটি তার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল এবং ভিন্ন নামে (ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি) রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছে। মোবারক-পরবর্তী নির্বাচনে ব্রাহারহুড ভালো ফলাফল করায় দলটির সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রকাশ পাওয়া গেছে। অবশ্য কোনো ‘হেজিমনিক’ শক্তি না হওয়ায় এবং অন্যদের সঙ্গে তার রাজনৈতিক প্রভেদ বিশাল হওয়ায় তাদের পক্ষে এককভাবে দেশ শাসন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মুরসির বিরোধিতায় অপর ইসলামী দল আল নূর পার্টিরও সক্রিয় ভূমিকা মিসরীয় সমাজে রাজনৈতিক বিভেদকে স্পষ্ট করে তোলে।
মিসরের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রভাব জামাল আবদুল নাসের কর্তৃক রাজা ফারুক বিরোধী অভ্যুত্থানের সময় থেকে। নাসেরসহ পরবর্তী সব প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনী থেকে এসেছেন। নাসের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী শাসক ছিলেন। কিন্তু তার উত্তরসূরি সাদাত ও মোবারক কেউ সে স্থান ধরে রাখতে চাননি। তারা বরং মার্কিন সমর্থনপুষ্ট থাকতে চেয়েছেন। নাসের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি ত্যাগ করে তারা মিসরকে মার্কিন প্রভাব বলয়ে নিয়ে গেছেন। মার্কিন প্রভাবে মিসর ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। এর বদলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার দুয়ার খুলে যায় মিসরের জন্য। অন্যদিকে মিসরের সামরিক বাহিনী সব সময় ধর্মীয় রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইসরাইলের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ধর্মীয় রাজনীতির বিরোধিতা মিসরের সামরিক বাহিনীকে ব্রাদারহুড নিয়ন্ত্রিত সরকারের সঙ্গে সংঘাতে নিয়ে গেছে। ব্রাদারহুডের ক্ষমতারোহণ প্রতিবেশী ইসরাইলের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল না। এ সরকারের সঙ্গে হামাস গোষ্ঠীর সখ্য তাদের নজরে ছিল। মুরসির অপসারণকে তাই ইসরাইলের শাসকদের জন্য স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখা যেতে পারে।
মিসরের সামরিক বাহিনী সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা নেয়নি স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সামরিক হস্তক্ষেপের নতুন নিয়ম ও ধারার সঙ্গে মিল রেখে। নব্বইয়ের দশকের পূর্ববর্তী সময়ে এশিয়া-আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় যখন কোনো সামরিক অভ্যুত্থান হতো, তখন তার প্রতি পাশ্চাত্যের বিশেষ করে মার্কিন সমর্থন প্রায় খোলামেলা ছিল। নতুন সামরিক শাসকরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে রাজনৈতিক প্রশ্রয় পেতেন। তাদের জন্য মার্কিন অর্থনৈতিক-সামরিক সহায়তার নিশ্চয়তা থাকত। তখনকার আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে এসব সামরিক শাসক মার্কিন সমর্থক বনে যেতেন। কিন্তু বর্তমান যুগে সামরিক শাসনের প্রতি শক্তিশালী বিরোধিতা থাকায় সামরিক বাহিনী সরাসরি শাসনক্ষমতা হাতে নেয় না। রাজনীতিকদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নিয়ে পরোক্ষভাবে সামরিক বাহিনী ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মিসরের বেলায় এবার তা-ই দেখা যাচ্ছে। লক্ষ্য করার বিষয়, মিসরে ক্ষমতার পরিবর্তন সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো মন্তব্য করছে না। এ পরিবর্তনকে সামরিক অভ্যুত্থান বলেও কোনো মন্তব্য করেনি। কারণ তার আইন অনুযায়ী যে রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেয়, সেখানে সামরিক সহায়তা সে দিতে পারে না। মিসরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সখ্যের কারণে সে সহায়তা দেয়ার কথা রয়েছে।
মুরসিকে বিরোধিতা করে তার প্রতিপক্ষরা যে সমাবেশ করছিল, তা মোকাবিলার জন্য মুরসি সরকার ও ব্রাদারহুড শক্তি প্রয়োগের যে নীতি গ্রহণ করেছিল, তাতে কোনো সমাধান আসেনি। সরকারকে পরিস্থিতি সামলাতে সামরিক বাহিনী ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে পরে নিজেরা হস্তক্ষেপ করে বসে। এতে রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে অতীতের সামরিক হস্তক্ষেপের ভ্রান্ত উদাহরণের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। কিন্তু মিসরে সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সরকার গঠন করে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে মুরসির পক্ষাবলম্বনকারী দু’শর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে। ব্রাদারহুডের সমর্থকরা রাজপথে থেকে যেভাবে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে, তাতে মনে হয় না তারা সহজে হার মানবে। বরং দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। এ রকম কিছু মিসরবাসীর জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলজনক হতে পারে না। এ পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে আলোচনা শুরু করতে হবে। বৃহত্তর সমঝোতার ভিত্তিতে সরকার গঠনের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতার অবসান হতে পারে।
ড. আকমল হোসেন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Friday, November 23, 2012
ক্রিকেট-অন্তঃপরিবার- ‘মামা দেখিস, দেখিয়ে দিব’ by আকমল হোসেন
ক্রিকেট-অন্তঃপরিবার- ‘মামা দেখিস, দেখিয়ে দিব’ by আকমল হোসেন
Tuesday, November 6, 2012
চারদিক- প্রাণখোলা এক সন্ধ্যা by আকমল হোসেন
Wednesday, September 12, 2012
সফল সিমসাকা by আকমল হোসেন
Tuesday, August 28, 2012
চারদিক- আরোগ্যকুঞ্জ by আকমল হোসেন
Monday, July 16, 2012
চারদিক-সাঁওতালপল্লি পারুয়াবিল by আকমল হোসেন
Wednesday, July 4, 2012
চারদিক-‘এখন নাম লিখতে পারি’ by আকমল হোসেন
Friday, June 22, 2012
চারদিক-ডলুছড়ার শান্ত পল্লি by আকমল হোসেন
Tuesday, June 5, 2012
চারদিক-পাখির নিরাপদ ঘর by আকমল হোসেন
Monday, June 4, 2012
চারদিক-নৌকাবাইচ by আকমল হোসেন
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...





