Tuesday, October 29, 2024
তৃতীয় সংসারও টিকছে না মমতাজের by রিপন আনসারী ও আতাউর রহমান
সংরক্ষিত আসনসহ টানা তিনবারের সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের তৃতীয় স্বামী হচ্ছেন তারই চক্ষু হাসপাতালের (মমতাজ চক্ষু হাসপাতাল) চিকিৎসক ডাক্তার চঞ্চল। সুদর্শন চেহারার অধিকারী ডাক্তার চঞ্চল যেদিন মানিকগঞ্জ মমতাজ চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পান সে থেকেই মমতাজ বেগমের দৃষ্টিতে পড়ে যান। তখনো মমতাজ মানিকগঞ্জ পৌর মেয়র মো. রমজান আলীর স্ত্রী। মমতাজ-রমজানের ঘরে তখন ছিল দুই কন্যা সন্তান। রমজানের সঙ্গেও তখন মমতাজের দাম্পত্য কলহ চলছিল। তারই মধ্যে ডাক্তার চঞ্চলের সঙ্গে মমতাজের ভালোবাসা আদান-প্রদান চলতে থাকে। ২০০৯ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ ১০ বছরের অধিক সময় বেশ সুখেই চলছিল মমতাজ-চঞ্চল দম্পতির সাংসারিক জীবন। রমজান-মমতাজের ঘরের দুই সন্তানকে নিজের সন্তানের মতোই আদর সোহাগ দিয়ে বড় করেছেন ডাক্তার চঞ্চল।
সূত্রমতে, ২০২০ সালের পর থেকেই মমতাজ- চঞ্চলের দাম্পত্য জীবনে কলহ দেখা দেয়। দুজনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বনিবনা হচ্ছিল না। কোনো এক রমজান মাসে তাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদের সৃষ্টি হলে মমতাজের স্বামী চঞ্চলের বাসা থেকে চলে আসেন। এরপর থেকেই টানা তিন বছরেরও অধিক সময় তাদের মধ্যে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় মমতাজ চক্ষু হাসপাতাল ছেড়ে দেন ডাক্তার চঞ্চল। এসবের সত্যতা মানবজমিনের কাছে নিশ্চিত করেছেন ডাক্তার চঞ্চল। চঞ্চল এবং মমতাজের জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক অজানা তথ্য উদ্ঘাটন করেছে মানবজমিন। ২০২২ সালের ২৩শে আগস্ট সিংগাইর থেকে ঢাকা যাবার পথে ডাক্তার চঞ্চলের গাড়িতে আকস্মিক হামলা চালায় মমতাজের অনুসারীরা।
ডাক্তার চঞ্চল তার পেছনের ইতিহাস টেনে মানবজমিনকে বলেন, মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া অবস্থায় এক সহপাঠীকে বিয়ে করেছিলাম। দুজনেই লন্ডনে ছিলাম। সেখানে দেড় বছর সংসার করার পর আমাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায়। এরপর ২০০৪ সালে আমি লন্ডন থেকে বাংলাদেশে চলে আসি। ২০০৫ সালের জুলাই মাসে মানিকগঞ্জ শহরের মমতাজ চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করি। যোগদানের পরপরই মমতাজ আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তখনো আমি মমতাজের পেছনের সব ইতিহাস খুব ভালো জানতাম না। যখন দেখলাম একটা সংসার ছেড়ে বাচ্চাদের নিয়ে মমতাজ আমার সঙ্গে সংসার করতে চায় তখন আমার মধ্যে ইমোশন কাজ করতে শুরু করে। ফাইনাল সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমরা দুজন দীর্ঘদিন সময় নেই। তারিখটা এই মুহূর্তে মনে না পড়লেও ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। আমিও ওর দু’টি শিশু সন্তানদের নিজের সন্তানের মতোই দেখতাম। ওরা আমাকে বাবা বলে ডাকতো। আমাকে সন্তান নেয়ার কথাও সে বলেছিল। কিন্তু আমি ওর দুই শিশু সন্তানের দিকে তাকিয়ে সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। এরপর মমতাজ সংরক্ষিত আসনের সংসদ সহ আরও দুইবার এমপি হলেন। বেশ ভালো মতোই চলছিল সংসার। আমিও সারা জীবন ওর সঙ্গে সংসার করতে চেয়েছিলাম। দেশ-বিদেশে ওর গানের অনুষ্ঠানের সবখানেই আমাকে নিয়ে যেত।
এরপর নানা কারণেই সাংসারিক কলহ শুরু হতে থাকে। বছর তিনেক আগে আমাদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। সময়টা ছিল কোনো এক রমজান মাস। আমি সেদিন এক কাপড়ে ওর বাসা থেকে বের হয়ে যাই। এরপর থেকেই মমতাজের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। এরই মাঝে অনেক কিছুই শুনেছি, সেগুলো নিয়ে আমি কাউকে বিতর্কে জড়াতে চাই না।
ডিভোর্সের বিষয়ে চঞ্চল জানান, আমরা কেউ কাউকে ডিভোর্স দেইনি। পরবর্তীতে বিয়ে নিয়ে কোনো ভাবনা আছে কিনা- এ বিষয়ে চঞ্চল বলেন, নাকে খত দিয়েছি আর বিয়ে করবো না। পেরেশান থেকে মুক্ত হয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ এখন ভালো আছি। হাসপাতাল ও রোগীদের নিয়েই ব্যস্ত সময় কেটে যাচ্ছে।
এদিকে এলাকায় গুঞ্জন উঠেছে মমতাজ বেগমের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত এপিএস মাহমুদুল হাসান জুয়েলের একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। তাকে নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন কণ্ঠশিল্পী মমতাজ। এ বিষয়ে চঞ্চল বলেন, এ নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। সেটা আপনারা সবই জানেন।
মমতাজ বেগমের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯০ সালের পর রশিদ সরকার মমতাজকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী মিলে বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে বেড়াতেন। মমতাজ ও রশিদের ঘরে রয়েছে এক বাকপ্রতিবন্ধী ছেলে। গ্রাম থেকে উঠে এসে মমতাজ যখন গানের জগতে দেশে খ্যাতি অর্জন করতে থাকেন তখন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়। ওই সময় মমতাজের সঙ্গে মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. রমজান আলীর সম্পর্ক গড়ে ওঠায় ২০০০ সালের পরে রশিদ সরকারের সঙ্গে বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। সেই সময় মমতাজের জীবনে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভাব হন মানিকগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. রমজান আলী। ২০০১ সালে রমজান ও মমতাজ বেগম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পৌর মেয়র রমজান আলীও বিবাহিত ছিলেন। সে ঘরেও একাধিক সন্তান রয়েছে। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সাবেক সংসদ সদস্য ও কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাবেক মেয়র মোহাম্মদ রমজান আলীও আত্মগোপনে রয়েছেন।

Friday, November 6, 2020
গল্প- 'ঈর্ষার রং ও রূপ' by আতাউর রহমান
প্রথম আলো এর সৌজন্যে
লেখকঃ আতাউর রহমান
ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক। রম্যলেখক।
Thursday, February 11, 2016
গর্দভ সমাচার by আতাউর রহমান
আর একাত্তরে করাচিতে বসে গল্প শুনেছিলাম: গাধার কণ্ঠস্বর হচ্ছে, ‘হে-হে, ম্যায়-ম্যায়।’ তো শয়তান নাকি এসে গাধাকে উর্দুতে বলে, ‘তোমহারা মালিক মর গায়া (তোমার মালিক মারা গেছেন)।’ তখন গাধা স্বাভাবিক ঔৎসুক্যবশত বলে, ‘হে-হে (কী বললে, কী বললে)?’ অতঃপর শয়তান জিজ্ঞেস করে, ‘উনকি বেওয়া কো শাদি করেগা কৌন (ওনার বিধবাকে কে বিয়ে করবে)?’ তখন গাধা বলতে থাকে, ‘ম্যায়-ম্যায়’; অর্থাৎ ‘আমি-আমি।’
যা হোক, গল্পটির এক বাংলা সংস্করণও আছে: ধোপার গাধাকে ধোপা ঠিকমতো খেতে দেয় না, কিন্তু কাজ করিয়ে নেয় অতিরিক্ত। তবু গাধাটা তার মালিককে ছেড়ে যায় না। এ ব্যাপারে অপর এক গাধা তাকে প্রশ্ন করলে প্রত্যুত্তরে সে বলল, ‘আমি একদিন শুনলাম মালিক তার বউকে বলছেন, আজকেও তরকারিতে লবণ বেশি দিয়েছিস। আরেক দিন যদি লবণ বেশি দিস তা হলে তোকে ওই গাধাটার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেব। আমি আশায় আছি, খোদা চাহে তো আরেক দিন বউটা তরকারিতে লবণ বেশি দিয়ে দেবে।’
ধোপার গাধার গল্প বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল: শহরে গ্রীষ্মকালে মশার খুব উপদ্রব। তাই মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে ধোপার গাধাটা দোয়া করে শীতকাল আসুক। কিন্তু শীতকাল এলে আশপাশের পুকুরে পানি শুকিয়ে যায় বলে বিরাট কাপড়ের বোঝা দূরের জলাশয়ে নিয়ে যেতে-আসতে খুব কষ্ট হয়। তাই গাধা দোয়া করে গ্রীষ্মকাল আসুক। অতএব শীত-গ্রীষ্ম কোনো ঋতুতেই গাধার কপালে সুখ নেই। আর আমরা আমজনতা তথা ‘ম্যাংগো পাবলিক’ হচ্ছি গিয়ে সেই গাধা।
ভিন্নার্থেও আমরা গাধা। বাপ ছেলেকে নিয়ে গেছেন চিড়িয়াখানায়। ছেলের বয়স অল্প, তাই তার কৌতূহলের শেষ নেই। বাপকে সে প্রশ্ন করে করে অতিষ্ঠ করে তুলল। এক জায়গায় এসে একটি জন্তুকে দেখে সে বাপকে ‘ওটা কী’ জিজ্ঞেস করতেই তিনি জবাব দিলেন, ‘ওটা হচ্ছে গাধা’।
‘আর ওই যে গাধার পাশে দেখতে ঠিক গাধার মতো?’ ছেলে আবারও প্রশ্ন করল।
‘ওটা হচ্ছে গাধার বউ,’ বাপ প্রত্যুত্তরে বললেন।
‘গাধারাও কি বিয়ে করে?’ ছেলে এবারে শুধাল।
‘গাধারাই কেবল বিয়ে করে,’ বাপ একগাল হেসে জবাব দিলেন।
সে যাকগে। পাকিস্তান আমলে, এমনকি বাংলাদেশের সূচনালগ্নেও ঢাকার তোপখানা রোডে ছিল ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরমেশন সার্ভিসের অফিস কাম লাইব্রেরি। এটাকে ইংরেজিতে সংক্ষেপে বলা হতো ‘ইউ-এস-আই-এস (USIS)’। তো ষাটের দশকে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন ঠাট্টাচ্ছলে বলতাম ‘ইউএসআইএস’-এর মানে হচ্ছে ‘তুমি গাধা আমি গাধা।’ আর স্কুলে পড়াকালীন ইংরেজি Psychology শব্দের বানান যেমন মনে রাখার চেষ্টা করতাম ‘পিসি-চলো-যাই’ কথাটা স্মরণ রেখে, তেমনিভাবে Assassination শব্দের বানানের বেলায়ও স্মরণ রাখার চেষ্টা করতাম ‘গাধার পর গাধা, তারপর আমি, তারপর জাতি’ বাক্যাংশের সাহায্যে।
আর আরবি ভাষায় দুটি উল্লেখযোগ্য প্রবচন আছে এবং দুটিতেই গাধার সম্পৃক্ততা লক্ষণীয়। একটি হচ্ছে, ‘আত্ তাক্রারু য়ুআল্লিমুল হিমার;’ যার মানে হচ্ছে: গাধা তো খুব নির্বোধ প্রাণী, যেটা পরিষ্কার পানিকেও ঘোলা করে খায়। কিন্তু সেই গাধাও একটা জিনিস বারবার করলে শিখে যায়। আরেকটি হচ্ছে, ‘আনা আমির, আন্তা আমির; মান্ ইয়াসুকাল হামির?’ অর্থাৎ ‘আমি প্রিন্স, আপনিও প্রিন্স; তা হলে গাধা চালাবে কেটা?’ তার মানে, সবাই প্রিন্স হয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে সংসার চলে না।
এবারে গাধা–সংক্রান্ত বীরবলের গল্প: যুবরাজ সেলিমের ইচ্ছায় সম্রাট আকবর প্রাসাদের বাইরে সরোবরে গোসল করতে সেলিম বীরবলসহ রওনা দিয়েছেন। সম্রাট ও যুবরাজের সব পোশাক-পরিচ্ছদ বীরবলের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো। তাঁদের পোশাক তো আর অল্প হতে পারে না। কাজেই পথে যেতে যেতে সেলিম বীরবলকে উদ্দেশ করে টিপ্পনী কাটলেন, ‘আপনাকে দেখে একটি ভারবাহী গাধা মনে হচ্ছে।’ বীরবল সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘তা তো মনে হবেই, আমি যে দুটি গাধার ভার বইছি।’ সেলিম তাতে অপমানিত বোধ করলেও সম্রাট হো-হো করে হেসে উঠেছিলেন।
তা হলে মোল্লা নাসিরুদ্দিনই বা বাদ যাবেন কেন? মোল্লার একমাত্র গাধাটা জনৈক প্রতিবেশী দিন কয়েকের জন্য ধার চেয়েছিলেন। মোল্লা বললেন, ‘কী করে দেব, ভাই? ওটা যে আমি আরেকজনকে ধার দিয়ে দিয়েছি।’ এমন সময় তাঁর গাধা আস্তাবল থেকে ডেকে উঠতেই প্রতিবেশী বললেন, ‘এই তো আপনার গাধার ডাক শুনছি; আর আপনি বলছেন ওটা নেই?’ মোল্লার তাৎক্ষণিক উত্তর: ‘আমার কথার চেয়ে গাধার ডাক যে লোক বেশি বিশ্বাস করে, তাকে গাধা ধার দেওয়া যায় না। আপনি এখন আসতে পারেন।’
ইশপের নীতিগল্পেও গাধা যথারীতি বিদ্যমান। বাপ ও বেটা তাদের গাধাটাকে বিক্রি করার জন্য হাটে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে ভিন্ন লোকজনের কথামৃত শুনতে ও রাখতে গিয়ে তাঁরা প্রথমে পালাক্রমে ও পরে উভয়ে একসঙ্গে গাধার পিঠে সওয়ার হলেন। অতঃপর প্রায়শ্চিত্ত করতে গাধার পাগুলো দড়ি দিয়ে বেঁধে বাঁশ ঢুকিয়ে বয়ে নিতে গিয়ে হাটসংলগ্ন সাঁকো পাড়ি দেওয়ার সময় গাধাটা দড়িসুদ্ধ পানিতে পড়ে স্রোতের মুখে ভেসে গেল। বাপ-বেটা তখন সম্যক উপলব্ধি করতে পারলেন, সংসারে সবাইকে সন্তুষ্ট করতে গেলে কাউকেই সন্তুষ্ট করা যায় না। ইশপের সেই গল্পটি অতিশয় জীবনধর্মী ও জনপ্রিয়।
ভারতীয় সাংবাদিক ও সুলেখক কৃষণ চন্দরের আমি গাধা বলছি শীর্ষক বইটি আমি বহু বছর আগে পড়েছি। মানুষের জীবনের ভালোমানুষি ও বোকামির অপর নাম হচ্ছে গাধা। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি গাধা তার নিজস্ব জবানিতে শুনিয়েছে এক শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনি। কৃষণ চন্দর যথার্থই বুঝিয়েছেন, মানুষ যদি গাধার ভাষায় কথা বলতে পারে, তা হলে গাধা মানুষের ভাষায় কথা বলতে দোষ বা আশ্চর্যের কিছুই নেই।
প্রিয় পাঠক! পত্রিকার পাতায় বেরিয়েছে, দেশে গাধার সংখ্যা কমে যাওয়ায় সরকার বিদেশ থেকে গাধা আমদানির চিন্তাভাবনা করছে। তা বেশ। তবে আমার মতে, পাকিস্তানে গাধার অভাব নেই, ওখান থেকে গাধা আমদানি করাই সর্বোত্তম।
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Thursday, January 14, 2016
গরু সম্পর্কিত রচনা by আতাউর রহমান
এবং গ্রামের এক লোকের গরু হারানো গিয়েছিল; বহু চেষ্টা করেও সেটার খোঁজ পাওয়া গেল না। প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ সাহেবের মতে, প্রতিটি গ্রামেই একজন করে পাগল থাকে। তো সেই পাগল এক ঘণ্টার মধ্যে গরুটি খুঁজে বের করে নিয়ে এসে বলল, ‘আমি চিন্তা করে দেখলাম, আমি গরু হলে কোথায় কোথায় যাইতাম। সেই সব জায়গায় গেছি, গরু পাইয়া গ্যাছিগা।’ আর গ্রামের অপর একজনের গরু হারালে পরে সে সকালে খুঁজতে বেরিয়ে দুপুরে শুষ্ক মুখে বাড়িতে প্রত্যাবর্তনের পর পুত্রকে ‘ভাই’ সম্বোধন করে এক গ্লাস পানি আনতে বললে স্ত্রীর জিজ্ঞাসার জবাবে নাকি বলেছিল, ‘মা, গরু হারালে এমনই হয়।’
ছাত্রাবস্থায় ‘জরাসন্ধ’ রচিত কারাগার সম্পর্কিত গ্রন্থ লৌহকপাট-এ পড়েছিলাম, গরু চুরির অপরাধে ধৃত অপরাধীকে কারাগারে সবচেয়ে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা হয়। কেননা, গরু চুরি নাকি সবচেয়ে সহজ কাজ, গরুকে গোয়ালঘর থেকে বের করে রাতটা কোনোরকমে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রেখে ভোরের আলোয় মানুষের হাঁটাচলার রাস্তায় তুলে দিয়ে গরুর পেছনে পেছনে হাঁটা দিলেই ব্যস, আর কিছু করার দরকার নেই।
মানবদেহের জন্য প্রোটিন অত্যাবশ্যক, আর প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে গরুর মাংস ও ডাল এবং একসময় ডাল অনেক সস্তা ছিল বিধায় ডালকে বলা হতো ‘পুওর ম্যানস বিফ’ তথা গরিবের গরুর মাংস; কিন্তু এখন আর সেই সুদিন নেই। আর আমাদের মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব কোরবানির ঈদ উপলক্ষে জবাইকৃত গরুর মাংসই সারা বছরের প্রোটিনের ঘাটতি বহুলাংশে পুষিয়ে দেয়। তো গল্প আছে: পাশাপাশি মুসলমান ও হিন্দুর বাড়ি। মুসলমানের বাড়িতে কোরবানির মাংস রান্না করায় হিন্দু প্রতিবেশী কোর্টে কেইস করে দিলেন যে যেহেতু ঘ্রাণে অর্ধভোজন হয়ে যায়, অতএব তাঁর জাত গেছে। সময়টা ছিল ব্রিটিশরাজের; ব্রিটিশ বিচারক রায় দিলেন—মুসলমান প্রতিবেশীকে ৫০০ টাকা জরিমানা করা হলো; তবে ২০০০ টাকার পরিমাণ মুদ্রার ঝনঝনানি অভিযোগকারীর কানের কাছে এক ঘণ্টা শোনালেই তা আদায় হয়ে যাবে, যেহেতু ঘ্রাণে অর্ধভোজন আর শ্রবণে সিকি।
বাংলা ভাষায় অনেক শব্দ বা শব্দগুচ্ছও এসেছে গরু থেকে। উদাহরণস্বরূপ: গোবেট, গোমূর্খ, গোধূলি, গোবর-গণেশ, মাথায় গোবর, গো-বেচারা, গোগ্রাসে গেলা, গোবরে পদ্মফুল, ওগায়রা-ওগায়রা
আমাদের দেশে ‘টল-টক্’ তথা লম্বা-চওড়া কথা বলায় ওস্তাদ একজন একবার গল্প করছিলেন, ‘আমার দাদার গোয়ালঘর এত বিশালাকৃতির ছিল যে তার এক প্রান্তে গাভি বাছুর বিয়ালে সেটা অপর প্রান্তে হেঁটে যেতে যেতে নিজেই আরেকটা বাছুর বিয়ানোর উপযুক্ত হয়ে যেত।’ এটা শুনে আরেকজন বলল, ‘আমার দাদার একটি বিশাল লম্বা বাঁশ ছিল, যেটা দিয়ে তিনি মেঘাচ্ছন্ন সকালে মেঘ সরিয়ে রোদ পোহাতেন।’ ‘তা তোমার দাদা এত লম্বা বাঁশটি মাটিতে রাখতেন কোথায়’? প্রথমোক্ত ব্যক্তির এই প্রশ্নের উত্তরে দ্বিতীয় ব্যক্তি জানালেন, ‘তোমার দাদার গোয়ালঘরে।’
গল্পটির একটি চায়নিজ সংস্করণও আছে: জনৈক চায়নিজ বললেন, ‘আমাদের বাড়িতে একটা দারুণ ঢাক আছে, যেটা বাজালে আওয়াজ ১০০ মাইল দূর থেকেও শোনা যায়।’ শুনে অপর চায়নিজ বলে উঠলেন, ‘আমাদের বাড়িতে একটি বিশালাকৃতির গরু আছে, যেটা নদীর এপারে যখন পানি খায়, তখন তার মুখ চলে যায় ওপারে।’ আগের ওস্তাদের ‘এত বিশালাকৃতির গরু কি থাকতে পারে’ প্রশ্নের উত্তরে এবার তিনি বললেন, ‘না থাকলে আপনাদের ওই ঢাকের চামড়া আসবে কোত্থেকে?’
ইসমাইলিয়া শিয়া সম্প্রদায়ের বর্তমান গুরু প্রিন্স করিম আগা খানের দাদা প্রিন্স আলী আগা খানকে একবার নাকি ইউরোপে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘এটা কি সত্যি যে আপনার ধর্মানুসারীরা আপনাকে পূজা করেন?’ তদুত্তরে তিনি মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘আরে, আমি যে ভারতবর্ষের অধিবাসী, সেখানে লোকজন গরুকে পূজা করে; আর আমি তো মানুষ।’
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের বেলায়ও গরুর একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। সিপাহিদের বন্দুকে যে কার্তুজ ব্যবহৃত হতো, সেটা দাঁত দিয়ে কাটতে হতো। তো গুজব রটে যায় যে এর সঙ্গে গরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রিত আছে; তাই কার্তুজ ব্যবহার করলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সৈন্যদেরই জাত যাবে। তাই দানা বাঁধে বিদ্রোহের, যেটা ব্রিটিশরা অনেক কষ্টে সামাল দিতে পেরেছিল।
গরু সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দেরও (যাঁর পারিবারিক নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত) একটি মজার উপাখ্যান আছে: একবার গিরিধারী লাল নামক এক ব্যক্তি স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎপূর্বক বলল যে সে গো-রক্ষিণী সমিতির সম্পাদক; দুর্বল, রুগ্ণ, জরাগ্রস্ত গো-মাতাদের সেবা করাই তাদের ব্রত। এটা শুনে বিবেকানন্দ বললেন, ‘শুনেছি মধ্য ভারতে দুর্ভিক্ষে প্রায় নয় লাখ লোক মারা গেছে। এ ব্যাপারে আপনারা কী করেছেন? লোকটি বলল, ‘মানুষ মরছে নিজের কর্মফলে। তাদের বাঁচার দরকার কী? আর গাভি হচ্ছে আমাদের মাতা।’
এবারে স্বামীজি সহাস্যে মন্তব্য করলেন, ‘হ্যাঁ, গাভি যে আপনাদের মাতা, সেটা বিলক্ষণ বুঝেছি। কেননা, তা নইলে এমন সব ছেলে জন্মাবে কেন?’
আর গোপাল ভাঁড়ের গল্পেও গরু যথারীতি বিদ্যমান। একদা নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর ভাঁড় গোপালের বুদ্ধি পরীক্ষা করার জন্য বললেন, ‘কাল তুমি আমাকে একসের ষাঁড়ের দুধ এনে দিও।’ গোপাল তো চিন্তায় চিন্তায় অস্থির। তাঁর বউ বললেন, ‘চিন্তার কোনো কারণ নেই; আমি এটা সামাল দিচ্ছি।’ তিনি এক বোঝা কাপড় নিয়ে রাজবাড়ির সামনে নদীর ঘাটে কাচতে শুরু করে দিলেন। রাজা দেখতে পেয়ে প্রশ্ন করাতে তিনি বললেন, ‘আমার স্বামী প্রসব বেদনায় কাতর। তাই আমাকে এ কাজ করতে হচ্ছে।’ রাজা এটা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করাতে গোপাল-পত্নী এবার বললেন, ‘রাজা মশায়, যে দেশে ষাঁড়ের দুধ পাওয়া যায়, সে দেশে ওটা এতই কি অসম্ভব!’ রাজা তখন বিষয়টা বুঝতে পেরে উচ্চ স্বরে হেসে উঠেছিলেন।
বাংলা ভাষায় অনেক শব্দ বা শব্দগুচ্ছও এসেছে গরু থেকে। উদাহরণস্বরূপ: গোবেট, গোমূর্খ, গোধূলি, গোবর-গণেশ, মাথায় গোবর, গো-বেচারা, গোগ্রাসে গেলা, গোবরে পদ্মফুল, ওগায়রা-ওগায়রা (ইত্যাদি ইত্যাদি)।
সুধী পাঠক, গরু এখন আর শুধু নিরীহ গৃহপালিত পশু নয়, রাজনীতির নিয়ামকও বটে। ভারতের বহু রাজ্যে গরু জবাই আইন করে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, বহু রাজ্যে গরু জবাইতে শর্তও আরোপ করে দেওয়া আছে। সর্বোপরি সম্প্রতি ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা হয়েছে—এই অভিযোগে নয়াদিল্লির নিকটস্থ উত্তর প্রদেশের দাদরি এলাকার বিসাদা নাম গ্রামে আখলাক নামের একজনকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। পত্রিকার পাতায় প্রতিবেদনটি পড়ে গরু সম্পর্কিত কতিপয় মুখরোচক গল্প ও কথামৃত আপনাদের মনোরঞ্জনার্থে এ-স্থলে পেশ করে দিলাম।
ভালো থাকুন। বেঁচে থাক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি!
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Sunday, October 11, 2015
অভিবাসন ও প্রত্যাশা পূরণ by আতাউর রহমান
আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছেলেকে নাকি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ‘অভিবাসন’ শব্দের অর্থ কী? প্রত্যুত্তরে ছেলেটি বলে, ‘অভি আর ওর বন্ধু বাসন, দুজনে মিলে হয়েছে অভি-বাসন; এর মধ্যে আবার অর্থ খোঁজাখুঁজির কী আছে?’ ছেলেটির বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়!
সে যাহোক, অভিবাসন শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘ইমিগ্রেশন’ এবং এখানেও বেশ গোলমেলে ব্যাপার আছে—নিজ দেশ ছেড়ে যখন কেউ পরদেশে স্থায়ীভাবে বাস করতে যায়, তখন তাকে ইংরেজিতে বলে ‘এমিগ্র্যান্ট’ আর ওখানে গিয়ে সে হয়ে যায় ‘ইমিগ্র্যান্ট’ এবং বাংলা ভাষায় ‘অভিবাসী’ ও ‘শরণার্থী’ প্রায় সমার্থক হলেও সব শরণার্থীই অভিবাসনপ্রত্যাশী, কিন্তু সব অভিবাসীই শরণার্থী নয়। এসব ব্যাপার একটু চিন্তাভাবনার বিষয় বটে।
অন্তর্জাল অনুসারে অভিবাসন হচ্ছে সেই সমস্ত লোকের ‘মুভমেন্ট’ তথা চলাচল, যাঁরা নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে বসবাসের জন্য, বিশেষত স্থায়ী নিবাস অথবা অস্থায়ী ভিত্তিতে পরিযায়ী কর্মচারী হিসেবে কাজ করার জন্য গমন করে থাকেন। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের গণনা অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রায় ২৫ কোটি লোক অর্থাৎ পৃথিবীর মোট লোকসংখ্যার প্রায় ৪ চার ভাগ হচ্ছে অভিবাসী। আর অভিবাসন-প্রক্রিয়াটা বোধ করি সেই আদিকাল থেকেই চলছে; নইলে কলম্বাস ১৪৯২ সালে যখন আমেরিকা আবিষ্কার করেন, তখন তিনি সেথায় মনুষ্য-বসতি পেতেন না। ধারণা করা মোটেই অযৌক্তিক নয় যে বেরিং প্রণালি, যেটা আমেরিকা ও রাশিয়াকে বিযুক্ত করেছে, তা একসময় বেরিং যোজক তথা জলভাগের পরিবর্তে স্থলভাগ ছিল এবং ওটার মধ্য দিয়েই আদমের সন্তানেরা এশিয়া থেকে আমেরিকায় মাইগ্রেট করে থাকবেন।
আর আমেরিকানদের তো বলাই হয় ‘আ নেশন অব ইমিগ্র্যান্টস’ তথা অভিবাসীদের জাতি; কেননা ওখানে সবাই ইমিগ্র্যান্টস ও তাদের বংশধর—কেউ আগে ওখানে পৌঁছেছেন আর কেউ পরে, তফাত শুধু এটুকুই। আমার বেশ কিছু আত্মীয় সাম্প্রতিক কালে ইমিগ্র্যান্টস হিসেবে দারা-পুত্র-পরিবারসহ সে দেশে গেছেন। গিয়ে তাঁরা অনেকেই লিঙ্গ-সমতার সে দেশে যে বিপর্যস্ত অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন, সেটার পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নের এই গল্পটি স্মর্তব্য:
তিনি নরকের কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘আমি ইতিপূর্বে যখন এসেছিলাম, তখন তো এখানকার অবস্থা এরূপ ছিল বলে নজরে আসেনি’
একটি অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশি দম্পতি বেশ কয়েক বছর যাবৎ আমেরিকায় বসবাস করছিলেন। তাঁদের একটাই স্বপ্ন—আমেরিকান সিটিজেন হওয়া। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও দেশেও আছে; অতএব ওদের ধৈর্যসহকারে অপেক্ষা করে যেতে হচ্ছিল। অতঃপর একদিন স্বামীপ্রবর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সুসংবাদটি নিয়ে দৌড়ে পাকঘরে গিয়ে সেখানে কর্মরত স্ত্রীকে সম্বোধন করে বললেন, ‘শাহানা, শাহানা! অবশেষে আমরা আমেরিকান হলাম।’
‘বেশ’, প্রত্যুত্তরে স্ত্রী তাঁর গা থেকে কাজের অ্যাপ্রোন খুলে স্বামীর গায়ে চড়াতে চড়াতে বললেন, ‘তাহলে এখন তুমি ডিশগুলো ধুয়ে দাও।’
তদুপরি দূর থেকে দেশটির প্রাচুর্যের কথা শুনে কিংবা পর্যটক হিসেবে বেড়াতে গিয়ে বাইরের চাকচিক্য দেখে বিমোহিত হলেও ইমিগ্রেশন-উত্তর রূঢ় বাস্তবতা কিন্তু প্রায়ই ভিন্ন হয়ে থাকে। আর এ সম্পর্কেও একটি মজার গল্প আছে:
একজন বৃদ্ধ ভালো মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটল। কিন্তু সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর তিনি একঘেয়েমিজনিত বিরক্তি বোধ করতে লাগলেন এবং নরক পরিদর্শনের ইচ্ছা প্রকাশ করায় তাঁর ইচ্ছা পূরণ করা হলো। সেখানে তাঁর ইচ্ছানুরূপ খাওয়াদাওয়া, সেবাযত্ন ও খাতির-তোয়াজ ইত্যাদি পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্টচিত্তে স্বর্গে ফিরে এলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না-যেতেই তিনি স্বর্গের পরিবর্তে নরকে স্থানান্তরিত হতে চাইলেন। তাঁকে বারবার নিবৃত্ত করার চেষ্টা বিফলে গেল; তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। অবশেষে তাঁর অনুরোধ গৃহীত হলো এক শর্তে যে ওখানে যাওয়ার পর পরবর্তীকালে তিনি চাইলেও তাঁকে আর স্বর্গে নিয়ে আসা হবে না।
এবারে নরকে পৌঁছার অব্যবহিত পরেই তাঁর মোহমুক্তি ঘটল। তিনি দেখতে পেলেন, ওখানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অহরহ ঘটছে, যে যাকে পারছে হত্যা করছে; চতুর্দিকে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজমান। তিনি নরকের কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘আমি ইতিপূর্বে যখন এসেছিলাম, তখন তো এখানকার অবস্থা এরূপ ছিল বলে নজরে আসেনি।’
উত্তর এল, ‘তখন তো আপনি এসেছিলেন টুরিস্ট ভিসায়, আর এখন এসেছেন ইমিগ্র্যান্ট ভিসায়।’
বিদগ্ধ পাঠককে গল্পটির অন্তর্নিহিত মর্মার্থ আশা করি বুঝিয়ে বলতে হবে না। আর রসগল্প তো গল্পই; এর মধ্যে ছিদ্রান্বেষণের চেষ্টা করাটাও নেহাত বাতুলতা।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Wednesday, August 26, 2015
পঞ্চতন্ত্র ও হিতোপদেশ: দুই দু’গুণে পাঁচ by আতাউর রহমান
তা শিশুমনের উপযোগী এ কাহিনি ভারতবর্ষে তো বটেই, সারা পৃথিবীতেই সমাদৃত হয়েছে। মধ্যযুগ পঞ্চতন্ত্রের কাহিনি পারস্য হয়ে আরব দেশে পৌঁছায় এবং ওখানে ওটার নামকরণ করা হয় কালিলা ওয়া দামনা। পঞ্চতন্ত্রে বিবৃত কাহিনির অন্যতম কুশীলব হচ্ছে দমনক ও করটক নামের দুটো বুদ্ধিমান শিয়াল এবং বলাই বাহুল্য, কালিলা ও দামনা হচ্ছে যথাক্রমে করটক ও দমনকের আরব্য সংস্করণ। প্রফেসর হিট্টি তাঁর হিস্ট্রি অব দ্য সারাসেনস (History of the Saracens) গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরণ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, গুটি কয়েক গীতিগল্পও উদ্ধৃত করেছেন; আর আমাদের সৈয়দজাদা মুজতবা আলী সাহেবও দেশ পত্রিকায় রম্য সিরিয়াল লেখার সময় ‘পঞ্চতন্ত্র’ শিরোনামটি বেছে নিয়েছিলেন।
সে যাকগে। এস্থলে আমি পঞ্চতন্ত্রের বিভিন্ন তন্ত্রে বিবৃত কাহিনিগুলোর অন্তর্নিহিত কতিপয় হিতোপদেশ পরিবেশন করছি—
(১) বিষমিশ্রিত অন্ন, শিথিল দন্ত এবং দুষ্টু মন্ত্রীকে পরিত্যাগ করাই উচিত।
(২) প্রভুর সামনে ভৃত্য নীরব থাকলে সে মূর্খ, বেশি কথা বললে বাতুলতা, সহনশীল হলে ভীরু, অসহিষ্ণু হলে সদ্বংশজাত নয়, সব সময় কাছে থাকলে ধৃষ্ট আর দূরে থাকলে অযোগ্য।
(৩) দুশ্চরিত্রা ভার্যা, মুখের ওপর জবাব দেওয়া ভৃত্য আর ঘরে সাপ নিয়ে বাস মৃত্যুতুল্য।
(৪) ধর্মে আটটি পথ আছে। তা হচ্ছে যজ্ঞ, তপস্যা, দান, অধ্যয়ন, সত্য বাক্য, সন্তোষ, ক্ষমা ও লোভশূন্যতা। প্রথম চারটির জন্য মানুষ গর্ব করে আর শেষের চারটি থাকে ধার্মিকদের জন্য।
(৫) উৎসবে, বিপদে, দুর্ভিক্ষের সময়ে, রাষ্ট্রবিপ্লব উপস্থিত হলে এবং শ্মশানে (গোরস্থানে) যে উপস্থিত থাকে, সেই তো প্রকৃত বন্ধু।
(৬) যে দেশে সম্মান নেই, জীবিকা নির্বাহের উপায় নেই, বন্ধু নেই, বিদ্যাশিক্ষার কোনো উপায় নেই, সে দেশ ত্যাগ করাই ভালো।
(৭) পরশ্রীকাতর (এবং পরস্ত্রীকাতরও বটে), অত্যন্ত দয়ালু, অসন্তুষ্ট, ক্রোধী, অন্যের অন্নে জীবনধারণকারী ও সর্বদা শঙ্কামুক্ত—এরা সব সময়ই দুঃখ ভোগ করে থাকে।
(৮) অর্থনাশ, মনস্তাপ, গৃহ কলঙ্ক, বঞ্চনা ও অপমান বুদ্ধিমান মানুষ কখনো প্রকাশ করে না।
(৯) যুদ্ধের সময় বীরকে, ঋণ পরিশোধের সময় সজ্জনকে, ধর্মকর্মের সময় স্ত্রীকে আর বিপদের সময় বন্ধুবান্ধবদের ব্যবহারেই প্রকৃত স্বরূপ জানতে পারা যায়।
(১০) কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ ও মাৎসর্য—এই ছয় রিপু ত্যাগ করলে মানুষ সুখী হয়।
(১১) প্রণয় দ্বারা স্ত্রীকে, সম্ভ্রমের দ্বারা আত্মীয়-জ্ঞাতিবর্গকে, স্ত্রী এবং ভৃত্যদের অর্থ ও সরল ব্যবহার দ্বারা বশীভূত করবে।
(১২) যে স্ত্রী গৃহকর্মে নিপুণা, পুত্রবতী, পতিপ্রাণা এবং পতিব্রতা, সেই হচ্ছে প্রকৃত স্ত্রী।
পরিশেষে পরিবেশন করছি পঞ্চতন্ত্রের অন্তর্গত হরিণ ও কাকের বন্ধুত্ব-সংক্রান্ত সরস নীতি গল্পটি:
মগধ দেশে চম্পকবতী নামক বনে একটি হরিণ ও একটি কাক বন্ধুভাবে বাস করত। এক দিন হরিণকে দেখে এক শিয়ালের মনে খুব লোভ হলো। সে হরিণের মাংস খাওয়ার জন্য মনে মনে ফন্দি-ফিকির করতে লাগল। হরিণের বিশ্বাস অর্জন করতে সে হরিণের কাছে গিয়ে তার কুশল-সংবাদ জিজ্ঞেস করতেই হরিণ জিজ্ঞাসুনেত্রে তাকানোয় বলে উঠল, ‘আমি হচ্ছি শিয়াল। আমি বন্ধুহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, সারা বনে একজনও প্রকৃত বন্ধু খুঁজে পেলাম না। তোমাকে দেখে আমার মনে হলো, তুমি বুঝি আমার প্রকৃত বন্ধু।’ শিয়ালের কথায় হরিণের মন গলে গেল। বলল, ‘ঠিক আছে, আজ থেকে আমরা দুজনে বন্ধু হলাম।’ শিয়াল মনে মনে খুব খুশি। অতঃপর ওরা দুজনে মিলে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে লাগল। সন্ধ্যা হয়ে এলে হরিণ শিয়ালকে তার নিজের বাসায় নিয়ে গেল, সেখানে তার বন্ধু কাকও চম্পকগাছে থাকত। তো শিয়ালকে দেখে ও বৃত্তান্ত শুনে কাক হরিণকে বলল, অজ্ঞাত কুলশীলের সঙ্গে বন্ধুত্ব! না-না, এ কাজটা তুমি মোটেই ভালো করোনি বন্ধু। অজ্ঞাতকুলশীলদের কখনো বাসস্থান দেওয়া ঠিক নয়। বৃদ্ধ শকুনও তো বিড়ালকে বাসস্থান দিয়েই নিহত হয়েছিল। বলেই সে শকুন ও বিড়ালের কাহিনি শোনাল।
ভাগীরথী নদীর তীরে পাহাড়ের চূড়ায় একটা পাকুড়গাছে অনেক পাখি একসঙ্গে বাস করত এবং তাদের সঙ্গে একটা বুড়ো শকুনিও ছিল। শকুনি বয়সের কারণে নিজে খাবার জোগাড় করতে পারত না বিধায় অন্যান্য পাখি খাবারের খোঁজে বেরিয়ে গেলে সে তাদের বাচ্চাগুলো পাহারা দিত আর পাখিগুলো ওর খাবার জোগাত। এভাবেই ওদের সুখের দিনগুলো যাচ্ছিল। কিন্তু একদিন অশনিসংকেতস্বরূপ এক বিড়ালের আগমন ঘটল। বিড়ালের ইচ্ছা পাখির বাচ্চাদের ধরে খাবে; কিন্তু তাকে দেখেই শকুনি তেড়ে এল। বিড়াল তখন বলল, ‘আমি নিরামিষভোজী। পাখিদের কাছে আপনার প্রশংসা শুনে আপনার কাছে ধর্মকথা জানতে এসেছি, আর আপনি অতিথি সৎকার না করে আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন?’ তার কথায় বিশ্বাস করে শকুনি বিড়ালকে থাকতে দিল; আর বিড়াল রোজই একটা করে পাখির বাচ্চা ধরে আহার করতে লাগল। কিন্তু এক দিন ব্যাপারটা ধরা পড়তেই বিড়াল বিপদ বুঝে পালিয়ে গেল এবং পাখিরা শকুনিকে ভুল বুঝে তাকে মেরে ফেলল।
কিন্তু শিয়াল তর্কাতর্কিতে ওস্তাদ। সে কাকের সঙ্গে তর্ক করে হরিণকে আশ্বস্ত করে ফেলল এবং অতঃপর তিনজনে মিলে বন্ধুর মতো বাস করতে লাগল। একদিন শিয়াল বুদ্ধি করে হরিণকে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকিয়ে দিল। ওর ধারণা, শিকারিরা যখন হরিণকে কাটবে তখন ওর ভাগ্যে দু-একটা হাড় অবশ্যই জুটবে। হরিণ ফাঁদে আটকা পড়ে শিয়ালকে ডেকে বলল, ‘উৎসবে, বিপদে, দুর্ভিক্ষের সময়ে এবং শ্মশানে যে উপস্থিত থাকে, সে-ই তো প্রকৃত বন্ধু। তুমি বুদ্ধি করে আমাকে বাঁচাও।’ কিন্তু ধূর্ত শিয়াল হরিণের কথায় কর্ণপাত না করে গাছের আড়ালে লুকিয়ে গেল।
শেষাবধি কাক বিষয়টা জানতে পেরে অনেক বুদ্ধি করে বন্ধুর প্রাণ বাঁচিয়েছিল, আর শিকারির ছুড়ে মারা লাঠির আঘাতে লুকিয়ে থাকা শিয়ালকে প্রাণ দিতে হলো। ওর উচিত শিক্ষাই হয়ে গেল।
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Friday, July 3, 2015
ব্যুরোক্রেসি ও বাংলাদেশ by আতাউর রহমান
আর আমাদের দেশে বর্তমানে বিদ্যমান ব্যুরোক্রেসি প্রসঙ্গে আমার বিবেচনায় এই পরাবাস্তব গল্পটিকে স্ট্যান্ডার্ড জোক হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে: চিড়িয়াখানা থেকে দুটি বাঘ পালানোর পর একটি যায় উত্তরবঙ্গে, অপরটি প্রবেশ করে বাংলাদেশ সচিবালয়ে। বহুদিন পরে বাঘ দুটি চিড়িয়াখানায় ফিরে এলে তাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হচ্ছিল। উত্তরবঙ্গে যে গিয়েছিল সে বলল, ‘ওখানে খাদ্যের খুব অভাব, বন-বাদাড়ও প্রায় উজাড়; তাই ভেবে দেখলাম চিড়িয়াখানার বন্দিত্বই ভালো, অন্তত দুই বেলা পেট ভরে খেতে পারব।’ তখন সচিবালয়ের অভ্যন্তরে যে প্রবেশ করেছিল সে বলল, ‘আমি একটা সিঁড়ির নিচে লুকিয়ে ছিলাম। রোজ একজন করে কর্মচারী খেতাম, কেউই টের পেত না। কিন্তু একদিন ভুল করে বসলাম, যে চেয়ারে একজন জুনিয়র কর্মকর্তা বসতেন, সেই চেয়ারে একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বসা ছিলেন। তাঁকে আমি জুনিয়র কর্মকর্তা মনে করে খেয়ে ফেললাম। এতে প্রচণ্ড হইচই পড়ে গেল। আমি ভয় পেয়ে পালিয়ে এলাম।’
উপরন্তু জোক নিয়ে যে স্ট্যান্ডার্ড জোকটি আছে, সেটাতেও ব্যুরোক্রেসির প্রকৃত স্বরূপই পরিলক্ষিত হয়: সরকারি অফিসে মাঝারি পর্যায়ের এক কর্মকর্তা দুপুরে টিফিনের টেবিলে জোকস বলতেন এবং তাঁর অধীনস্থ সবাই সেগুলো শুনে হাসিতে ফেটে পড়তেন। একদিন সবাই হাসছেন, কিন্তু একজনকে হাসতে না দেখে তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘আপনি হাসছেন না কেন? আপনার কি মন খারাপ?’ ‘আমার মন খারাপ হবে কেন?’ কর্মচারীটি প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘আমি হাসছি না এ জন্য যে আমি আর আপনার আন্ডারে কাজ করছি না, গতকাল থেকে অন্য সেকশনে বদলি হয়ে গেছি। যাঁরা হাসার তাঁরা তো ঠিকই হাসছেন।’ অর্থাৎ আগে তিনি হাসতেন বসকে খুশি করার জন্য। এখন অন্য সেকশনে বদলি হওয়ায় তাঁর আর হাসির প্রয়োজন নেই।
আমলাতন্ত্রে কোনো কর্মকাণ্ডের গতি স্তব্ধ করে দিতে হলে সর্বাগ্রে সচরাচর যেটা করা হয় সেটা হচ্ছে, একটা কমিটি করে দেওয়া। আর একদা কে যেন বলেছিল, ‘কমিটির সন্ধি-বিচ্ছেদ হচ্ছে: কাম-মিট-অ্যান্ড টি; এসো দেখা করো এবং চা খাও।’
সে যা হোক। ব্যুরোক্রেসির অপর নাম সিভিল সার্ভিস। আর সিভিল সার্ভেন্টদের সম্পর্কে সেই চল্লিশের দশকে যাযাবর তাঁর দৃষ্টিপাত শীর্ষক রম্য পুস্তকে বলে গেছেন, ‘দে আর নিদার সিভিল নর সার্ভেন্ট’; অর্থাৎ তারা সুশীলও নয়, সেবকও নয়। এবং আমাদের দেশের এক ছেলে তার পিতৃপরিচয় দিতে গিয়ে যে বলে ফেলেছিল, ‘হি ইজ এ সিভিল সারপেন্ট’, অর্থাৎ তিনি ‘একজন ভদ্র সাপ’, সেটাও বোধ করি নেহাত অমূলক নয়। সর্বোপরি, আমলাতন্ত্রের নিশ্চিত লক্ষণ হচ্ছে এই যে টেলিফোনে প্রথম যে ব্যক্তি আপনাকে জবাব দেবেন, তিনি গ্রামোফোন রেকর্ডের মতো বলে দেবেন, স্যার ‘মিটিংয়ে’ আছেন, যেটা অনেক সময় তাঁর উচ্চারণ-বিভ্রাটের কারণে শোনা যাবে ‘মেটিংয়ে’ তথা সঙ্গমরত আছেন। তা ছাড়া আমলাতন্ত্রে কোনো কর্মকাণ্ডের গতি স্তব্ধ করে দিতে হলে সর্বাগ্রে সচরাচর যেটা করা হয় সেটা হচ্ছে, একটা কমিটি করে দেওয়া। আর একদা কে যেন বলেছিল, ‘কমিটির সন্ধি-বিচ্ছেদ হচ্ছে: কাম-মিট-অ্যান্ড টি; এসো দেখা করো এবং চা খাও।’
‘ল্যাম্বস টেইলস ফ্রম শেক্সপিয়ার’ খ্যাত ইংরেজ লেখক চার্লস ল্যাম্ব ছিলেন একটু তোতলা। তো তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লন্ডনস্থ অফিসে কর্মরত থাকাকালে প্রায় প্রতিদিনই অফিসে দেরি করে আসতেন আবার চলে যেতেনও সবার আগেভাগে। একদিন তাঁর বস অফিসে দেরিতে আসার জন্য তাঁকে তিরস্কার করলে তিনি আড়ষ্ট জিহ্বা নিয়ে বলে উঠেছিলেন, ‘কি-কিন্তু আ-মি যে অ-অফিস সময়ের পূ-পূর্বে চলে যা-ই, সেটা বি-বিবেচনা করবেন (Co-Consider how ea-early I go)’। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমাদের দেশে অনেকেই ল্যাম্বের মতানুসারী। তাঁদের বক্তব্য নাকি হচ্ছে, অফিসে এক দিনে দুবার লেট হওয়া যায় না।
আর নব্বইয়ের দশকে আমি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরিচালক পদে কর্মরত ছিলাম। সুনির্দিষ্ট শূন্য পদের বিপরীতে সমানসংখ্যক পদোন্নতির প্রস্তাব আসত। এটার ব্যত্যয় ঘটানো হলো প্রথম ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার কর্তৃক দুর্নীতির মাধ্যমে শূন্য যুগ্ম সচিব পদের প্রায় দ্বিগুণসংখ্যক প্রমোশন দিয়ে; রাতারাতি পোস্ট আপগ্রেড করেও সেটা সামাল দেওয়া গেল না। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার এসে সেটার সংশোধন ও বিচার করার পরিবর্তে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করল। যেন তুমি ভুল করেছ, তাই বলে আমি ভুল করব না কেন? একই ভুলের পুনরাবৃত্তি অদ্যাবধি চলছে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে—সচিবালয়ে সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ইত্যাদি পদের সংখ্যা প্রশ্নাতীত বাড়িয়েও স্থান সংকুলান হচ্ছে না, অনেককে ওএসডি হিসেবেই রিটায়ার করতে হচ্ছে।
আর উদাহরণস্বরূপ, জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব থেকে দুই দফায় প্রমোশন পেয়ে যুগ্ম সচিব হলেও অনেকের নেমপ্লেট পরিবর্তন ছাড়া আর কোনো পরিবর্তন হয়নি, এমনকি কামরা পর্যন্ত না (নিবন্ধের প্রারম্ভিক দ্বিতীয় গল্পটি স্মর্তব্য)। একটি উল্লেখযোগ্য মন্ত্রণালয়ে নাকি তিনজন অতিরিক্ত সচিবের জায়গায় নয়জন কাজ করছেন। কথায় আছে, অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট। অধিক আর বলার প্রয়োজন নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমরা কিছুতেই ব্যুরোক্রেসির বারোটা না বাজিয়ে ছাড়ব না। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন!
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Sunday, May 31, 2015
ডিজিটাল যুগের নব্য দাসত্ব by আতাউর রহমান
জাহাজটি যখন উত্তর আমেরিকার অ্যানোপলিস বন্দরে ভেড়ে, তখন জাহাজের ১৪০ জন দাসের মধ্যে কুন্তা কিন্তেসহ ৯৮ জনকে জীবিত পাওয়া যায়, অবশিষ্ট ৪২ জনের পথেই সলিল সমাধি ঘটে। অতঃপর জীবিত ব্যক্তিদের জীবজন্তুর মতো নিলামে চড়ালে জনৈক শ্বেতাঙ্গ সাহেব তাঁর প্ল্যান্টেশন কাজ করার জন্য কুন্তাকে কিনে নেন। বারাক হোসেন ওবামা স্বেচ্ছায় খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে বারাক ওবামা হয়েছেন, আর কুন্তাকে গায়ের জোরে খ্রিষ্টান বানিয়ে নাম দেওয়া হয়েছিল টবি। কিন্তু তিনি এই নতুন নামকরণ ও দাসত্ব—কোনোটাই মেনে নিতে পারেননি; তাই বারবার পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিলেন। চতুর্থবার ধরা পড়ার সময় তাঁর পায়ের পাতার অর্ধেক কেটে ফেলে তাঁকে নিরস্ত করা গিয়েছিল। মি. হেলি প্রায় ২০০ বছর পর শিকড়ের সন্ধানে জ্যুফুর গ্রামে উপস্থিত হলে তাঁর পরিচয় পেয়ে সেই গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা যখন তাঁকে ‘মিস্টার কিনতে’ বলে সম্বোধন করতে লাগল, তখনকার মনোভাব হেলি ব্যক্ত করেছেন এভাবে: ‘আমার মনে হলো যেন ইতিহাসে মানুষ-ভাইদের বিরুদ্ধে মানুষের অবিশ্বাস্য নৃশংসতা, যেটা বোধ করি মানব জাতির সবচেয়ে বড় বিচ্যুতি, সেটার জন্য আমি বিলাপ করে কাঁদছিলাম।’
কুন্তার দাসত্ব শুরুর সাল ছিল ১৭৬৭; আর এটা ২০১৫ সাল, ডিজিটাল যুগ। পেছনে ফেলে আসা আড়াই শ বছরে মিসিসিপি-মিসৌরি আর পদ্মা-যমুনা দিয়ে কত সহস্র কোটি কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়েছে; মহাত্মা আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৭ সালে আমেরিকায় দাস প্রথার বিলোপও সাধন করেছেন, যে কারণে কুন্তার উত্তরসূরিরা স্বাধীন ও সুশিক্ষিত হতে পেরেছে। দাসত্ব প্রথা আজ পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায়; কিন্তু কিছু লোভাতুর অমানুষের কারণে আজও সেটা নব্যরূপে বিদ্যমান। পত্রিকার প্রতিবেদনে প্রকাশ, থাইল্যান্ডের সংখলা প্রদেশের সাদাও উপকূল হচ্ছে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ তথা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের বেচাকেনার হাট। সমুদ্রপথে ট্রলারে করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে যাওয়া লোকদের জঙ্গলে জিম্মি করে দালালরা মুক্তিপণ আদায় করে এবং যাদের বেলায় মুক্তিপণ আদায় করা সম্ভব হয় না, তাদের হয় বিক্রি করে দেয় নতুবা মেরে ফেলে। অনুজার নামের জীবিত উদ্ধার এক বাংলাদেশি যুবক বলেছেন, তাঁকে নাকি কক্সবাজার থেকে অপহরণ করা হয়েছে, ঠিক যেমন কুন্তা কিন্তেকে তাঁর গ্রাম থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েই থাকে এবং ইতিহাস প্রায়ই বড় নির্মম।
প্রসঙ্গত মনে পড়ে গেল, আমি সৌদি আরবের রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে লেবার কাউন্সিলর পদে কর্মরত থাকাকালে এক মধ্যবয়সী নারী আমার কাছে ঘটনাচক্রে এলেন, যাঁর দেশের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। তিনি বাংলাদেশে প্রথম সৌদি রাষ্ট্রদূত কর্তৃক গৃহকর্মী হিসেবে সে দেশে নীত হন এবং ওই সময়ে রাষ্ট্রদূতের মেয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেড় দশক যাবৎ তিনি দেশের খবরাখবর পান না, দেশে যেতেও পারেন না। দেশে তাঁর দুই ভাই আছেন, যাঁদের কেবল ডাকনাম তিনি জানেন। তবে নিকটতম শাখা ডাকঘরটির নাম তাঁর জানা থাকায় আমি ক্লু পেয়ে গেলাম। সরাসরি পোস্টমাস্টারের কাছে চিঠি লিখলাম, ভাইদের খুঁজে বের করে বোনের উদ্দেশে লেখা তাঁদের চিঠি আমার কাছে পাঠাতে। ১৫ দিনের মধ্যেই ঈপ্সিত ফল পাওয়া গেল। ওই নারীকে দূতাবাসে ডেকে এনে আমি যখন তাঁর ভাইয়ের দীর্ঘ চিঠি পড়ে শোনাচ্ছিলাম, তখন পুঁথির ভাষায়, তাঁর ‘কপোল বহিয়া যায় নয়নের জলে’। সে দৃশ্য আমি আজও ভুলতে পারিনি এবং বলাই বাহুল্য, আমি ডাক বিভাগের ওপরতলার কর্মকর্তা ছিলাম বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। সৌদিরা ফিলিপাইন আর নেপাল থেকে ইদানীং নারী গৃহকর্মী না পেয়ে আমাদের দিকে হাত বাড়িয়েছে এবং আমরাও সম্মতি জ্ঞাপন করেছি। ভবিষ্যতে কত ধরনের মানবিক ঘটনার উদ্ভব হবে, কে জানে!
যাকগে। ফিরে আসি রুট্স-এ। কুন্তাকে শৈশবে তাঁর দাদি আয়িশা একটা মজার গল্প শুনিয়েছিলেন: একটি বাচ্চা ছেলে একদিন নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে গিয়ে দেখতে পেল যে এক কুমির শিকারিদের পাতা জালে আটকা পড়েছে। কুমির তাকে সাহায্যের আবেদন জানালে সে কাছে যেতেই কুমিরটা খপ্ করে দাঁতের ফাঁকে তাকে আটকে দিল। ‘তুমি কি এভাবে ভালোকে মন্দ দিয়ে প্রতিদান দিতে চাও?’ ছেলেটি এই প্রশ্ন করতেই কুমির জবাব দিল, ‘অবশ্যই, এটাই তো সংসারের নিয়ম।’ ছেলে এটা মানতে রাজি না হওয়ায় কুমির ওই পথ দিয়ে গমনরত প্রথম তিনজন সাক্ষীর মতামত না নিয়ে তাকে খাবে না বলে আশ্বস্ত করল। প্রথমেই এল এক বুড়ো গর্দভ। গর্দভ ছেলেটার মুখে সবটা শুনে শুধু বলল, ‘আমি বুড়ো হয়ে গেছি এবং কাজ করতে পারি না বলে আমার মালিক আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, যাতে আমি চিতাবাঘের পেটে যাই।’ অতঃপর এল এক বুড়ো ঘোড়া। সেও একই কথা বলল। ‘দেখলে তো?’ কুমির ছেলেটিকে বলল। এই সময়ে এগিয়ে এল এক স্পষ্টভাষী খরগোশ। সে সবটা শুনে বলল, ‘বেশ তো, আমি প্রথম থেকে ব্যাপারটা যেভাবে ঘটেছে সেটা না দেখে মতামত দিতে পারব না।’ কুমির তাতে অখুশি হয়ে সজোরে প্রতিবাদ করার জন্য যেই না মুখ খুলেছে, অমনই ছেলেটি লাফ দিয়ে ডাঙায় উঠে এল।
শৈশবে আমি দাদিকে পাইনি, তবে আমার মা অনুরূপ একটি মজার গল্প বলেছিলেন, যেটা চূড়ান্ত বিশ্লেষণে প্রমাণ করে যে পৃথিবীতে আমরা সবাই আদম ও হাওয়ারই সন্তান:
ব্রাহ্মণ ঠাকুর সকালে জঙ্গলে ঢুকেই দেখতে পেলেন এক বাঘ। শিকারিদের পাতা ফাঁদে আবদ্ধ। বাঘ তাকে মুক্ত করার জন্য মিনতি জানালে ব্রাহ্মণ দয়াপরবশ হয়ে বাঘকে মুক্ত করে দিতেই সে ব্রাহ্মণকে দিয়ে সকালের নাশতা সারতে চাইল এবং যুক্তি দেখাল, ‘তোমাদের মনুষ্য সমাজে এটাই তো নিয়ম, তোমরা উপকারীর অপকার করে উপকারের শোধ দাও।’ ব্রাহ্মণ এটা মানতে রাজি না হওয়ায় তিনজন সালিসের রায় নেওয়ার মতৈক্যে পৌঁছা গেল। তো প্রথমে যাওয়া হলো এক বিরাট বৃক্ষের কাছে। বৃক্ষ সবটা শুনে বলল, ‘আমি মানুষকে ছায়া দিই, ফল-ফসল দিই, অথচ তোমরা আমার বুকের ভেতর দিয়ে করাত চালাও। বাঘ তোমাকে খাবে।’ এরপর এক গাভির কাছে গেলে গাভিও বলল, ‘আমি মানুষকে দুধ দিই, বাছুর দিই, সেই বাছুর বড় হয়ে হালচাষে সাহায্য করে। অথচ তোমরা আমাকে শান্তিতে মরতেও দাও না, একটু বয়স হলেই গলায় চাকু চালাও। বাঘের কথাই সঠিক।’
অতঃপর তৃতীয় সালিসের মতামতের আর তেমন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু ব্রাহ্মণ মরিয়া হয়ে এক শিয়ালের কাছে যেতেই শিয়াল সবটা শুনে বলল, ‘আমি সরেজমিনে সবকিছু প্রত্যক্ষ না করে কিছু বলতে পারব না। যে যে অবস্থানে ছিলে সেখানে ফিরে যেতে হবে, তারপর আমি বুঝে-শুনে রায় দেব।’ বাঘ রাজি হয়ে ফাঁদের ভেতর ঢুকতেই শিয়াল ব্রাহ্মণকে পালিয়ে যেতে ইশারা করল। এভাবে বুঁদিয়াল বুদ্ধি প্রয়োগে বোকা মানুষটিকে বাঁচিয়ে দিল।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Friday, April 24, 2015
পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর by আতাউর রহমান
গল্পটার অন্তর্নিহিত হিউমার যা-ই হোক, আসল কথা হচ্ছে এই যে পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর সংসদীয় গণতন্ত্রের একটা প্রত্যাশিত ও প্রয়োজনীয় অংশ। কেননা, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের খবরাখবরও যেমন পাওয়া যায়, তেমনি আমজনতা তথা ম্যাংগো-পাবলিকের কাছে সরকারের জবাবদিহিরও পরিচয় মেলে। তো মনে পড়ে, স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানী যখন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেবিনেট মন্ত্রী তখন আমি ছিলাম ডাক অধিদপ্তরে সহকারী উপমহাপরিচালক (জনসংযোগ) এবং সেই সুবাদে সংসদ চলাকালে ডাক বিভাগ-সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরের সুরাহার দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘কাউন্সিল অফিসার’। আমি তারকাচিহ্নিত প্রশ্নগুলোর সম্ভাব্য সম্পূরক প্রশ্নাবলির উত্তরসহ ডাক-সংক্রান্ত সব প্রশ্নের উত্তর তড়িঘড়ি তৈরি করে সময়ের স্বল্পতার কারণে খসড়া হাতে হাতে ডাক বিভাগের ডিজি ও মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়ের দ্বারা অনুমোদন করিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জেনারেল ওসমানীর কাছে নিয়ে যেতাম এবং তিনি সেটা দেখে দিলে পর চূড়ান্ত করে কপি তাঁর কাছে দিয়ে আসতাম; তিনি সেটা সংসদে যথাসময়ে পাঠ করে শোনাতেন।
তা একবার হয়েছে কী, একটি মনি অর্ডারের বিলি-বণ্টনসংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরের বেলায় আমরা ইচ্ছেপূর্বক কিছু প্রচ্ছন্ন হাসির খোরাক রেখে দিয়েছিলাম বিধায় জেনারেল ওসমানী যখন সংসদে ওটা পড়ে শোনাচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত সবাই হো-হো করে হেসে উঠেছিলেন। আমি স্বয়ং গ্যালারিতে বসে তা প্রত্যক্ষ করেছি; তখন অবধি টিভি পার্লামেন্টে পৌঁছায়নি। সত্যি বলতে কি, সে সময় পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর পর্ব প্রায়ই খুব প্রাণবন্ত হতো এবং সরকারও সেটাকে খুব গুরুত্ব দিত। আর শুধু প্রশ্নোত্তর পর্বের কথাই বা বলি কেন, অতীতে সংসদের কার্যপ্রবাহে যথেষ্ট প্রাণ ও হাস্যরসের ব্যাপারও আমরা লক্ষ করেছি। এই যেমন সংসদে একবার জাতীয় পার্টির জনৈক সাংসদ একটি বক্তব্য দিয়ে প্রচুর হাস্যরসের সৃষ্টি করেছিলেন। এর আগে বিএনপি সরকারের আমলে মূলত সার নিয়ে কেলেঙ্কারির কারণেই নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঘন ঘন লোডশেডিং হওয়ায় মাননীয় সাংসদ সংসদে দাঁড়িয়ে কাব্য করে বলেছিলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, বিএনপি গেছে সারে আর আওয়ামী লীগ যাবে (ইলেকট্রিসিটির) তারে; কেবল জাতীয় পার্টিই পারে।’ সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন সদস্য দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মাননীয় সদস্য বলেছেন, জাতীয় পার্টি পারে। কিন্তু কী পারে সেটা তো বললেন না।’ সবাই তখন হো-হো করে হেসে উঠেছিলেন। তা জাতীয় পার্টি কী পারে, সেটা তখন বোধগম্য না হলেও এখন আমরা বিলক্ষণ বুঝতে পারি—জাতীয় পার্টি যুগপৎ সরকারে ও বিরোধী দলে থাকতে পারে, যার নজির বোধকরি দুনিয়ার আর কোথাও পাওয়া যাবে না।
দুঃখজনক হলেও সত্য, ইদানীং পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর আগের মতো অতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না। কেননা, প্রায়ই দেখা যায়, সংসদে প্রশ্নকর্তা ও উত্তরদাতার মধ্যে কেউ কেউ অনুপস্থিত; যার ফলে একজনের পরিবর্তে আরেকজন ‘প্রক্সি’ দিয়ে থাকেন। আর কাঁহাতক হাস্যরসের সওয়াল, বিশ্বনন্দিত চেক কথাসাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরা যথার্থই বলেন, সংসারে সবকিছুরই এমনকি মৃত্যুরও একটা রসিকতার দিক আছে; অতএব সংসদের অধিবেশন চলাকালে হঠাৎ হঠাৎ যে হাসির ফোয়ারা ছুটবে, সেটাই তো স্বাভাবিক এবং সেই পাকিস্তান আমল থেকেই এটা চলে আসছে। সংসদ শুরু হলে পর পত্রিকার পাতায় ‘গ্যালারি থেকে ক্ষণিক দৃষ্টি’ শীর্ষক কলাম নিয়মিত বের হতো। কিন্তু ইদানীং আর তেমনটা দেখা যায় না, আর সংসদে বিরোধী দল ‘গৃহপালিত’ হলে তেমনটা ঘটার কথাও না।
তবে হ্যাঁ, সদ্যসমাপ্ত সংসদ অধিবেশনে জনৈক সরকারদলীয় সাংসদের কিছু বক্তব্য আমাদের যথেষ্ট হাসির খোরাক জুগিয়েছে বটে। বিদ্রোহী কবি নজরুলের ‘নারী’ শীর্ষক কবিতার দুটো লাইন ‘বিশ্বে যা–কিছু মহান সৃষ্টি চির–কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন যে ওটা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা।
সে যা হোক। মাননীয় সাংসদ সেদিন সংসদে নাকি আরও বলেছেন, দেশে বিদ্যমান পুরুষ কর্তৃক নারী নির্যাতনবিরোধী আইনের পাশাপাশি নারী কর্তৃক পুরুষ নির্যাতনবিরোধী আইন পাস করা উচিত। তো পত্রিকার পাতায় এটা পাঠ করে তাৎক্ষণিক আমার মনে পড়ে গিয়েছিল সেই বিদেশি মুখরোচক গল্পটি:
রোববারে গির্জায় প্রার্থনার শুরুতে পাদরি সাহেব সমবেত পুরুষ প্রার্থনাকারীদের উদ্দেশ করে বললেন, ‘আজকাল প্রায়ই স্ত্রীদের দ্বারা স্বামীরা অত্যাচারিত হওয়ার ঘটনা শোনা যাচ্ছে। তা যাঁরা এরূপ ঘটনার শিকার তাঁরা অনুগ্রহপূর্বক উঠে দাঁড়াবেন কি?’ সঙ্গে সঙ্গে সবাই হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়ালেন। কেবল একজন প্রার্থনাকারী চেয়ারে ঠায় বসে রইলেন দেখে পাদরি সাহেব তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি অনেক ভাগ্যবান। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।’ লোকটি তখন অনেক কষ্টে কোমরটা চেয়ার থেকে তুলে বলল, ‘ধন্যবাদ, ফাদার। তবে আসল ব্যাপার তা নয়। আসল ব্যাপার হচ্ছে, ‘আমি একজন প্যারালাইসিসের রোগী; নইলে আমি সবার আগেই উঠে দাঁড়াতাম।’
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Thursday, April 2, 2015
চুরিবিদ্যা বড় বিদ্যা by আতাউর রহমান
তো রাজশাহীতে আমার টু-আইসি তথা সেকেন্ড–ইন–কমান্ড ছিলেন একজন অতিরিক্ত পিএমজি, যিনি আমার মতো বৃহত্তর সিলেটের অধিবাসী; বাড়ি সুনামগঞ্জে। তিনি একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে বলেছিলেন যে তাঁদের সুনামগঞ্জের দিরাই অঞ্চলে পাশাপাশি দুটি গ্রাম আছে; গ্রাম দুটির সব লোকই চোর, ওরা চুরি না করে থাকতে পারে না। আমি প্রথমে কথাটায় পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারিনি। পরে এ ব্যাপারে একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন বেরোলে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিলাম। ব্যাপারটা অনেকটা সেই গল্পের মতো আরকি:
এক মজলিসে একবার একজন একটি গল্প বলেছিলেন: এক লোক তাঁর কোঁচড়ে করে ১০টি ডিম নিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় এক পূর্বপরিচিত বোকার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটলে সে নেহাত মজা করার উদ্দেশ্যে বলল, ‘তুমি যদি বলতে পারো আমার কোঁচড়ে কী আছে, তাহলে তোমাকে তা থেকে একটা ডিম দিয়ে দেব। আর যদি বলতে পারো কয়টা আছে, তাহলে ১০টার ১০টাই দিয়ে দেব।’ বোকা লোকটি তখন বলল, ‘ভাই, আমি তো গণক নই; আমাকে একটুখানি ক্লু দাও।’ সে প্রত্যুত্তরে বলল, ‘বাইরে সাদা আর ভেতরে হলুদ রঙের জিনিস।’ ‘ও বুঝেছি’ বোকাটি এবার বলল, ‘তুমি কিছু মুলা নিয়ে যাচ্ছ আর ভেতরে কয়েকটা গাজর আছে।’ তো এই গল্পটি শোনার পর সবাই একচোট হেসে নিলেন। কিন্তু হাসি স্তিমিত হলে ওই মজলিসেরই একজন গম্ভীর গলায় বলে বসলেন, ‘আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো, লোকটির কোঁচড়ে কী ছিল?’ তখন সবাই আবার নতুন করে হাসলেন এবং যাঁরা প্রথমে গল্পটি সত্যি হওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন, তাঁরাও এটা সত্যি বলে বিশ্বাস করতে বাধ্য হলেন।
উপরন্তু আমার ওই সহকর্মী আমাকে বলেছিলেন, গ্রাম দুটির সবাই চুরি করে বিধায় অন্যান্য গ্রামের লোকেরা ওগুলোকে ‘চোরের গ্রাম’ বলে অভিহিত করে থাকে। এবং আমরা যেভাবে এবং যে হারে সম্প্রতি বিদেশি মেহমানদের দেওয়া সম্মানসূচক পদক থেকে সোনা চুরি করেছি, তাতে আমার ভয় হয়, বিদেশিরা না আমাদের ‘চোরের দেশ’ বলে আখ্যায়িত করতে শুরু করে দেন আর বাংলা ভাষায় এযাবৎ বড় ধরনের চুরি বোঝাতে ‘পুকুরচুরি’ কথাটা ব্যবহৃত হয়ে থাকে, ভবিষ্যতে না ওটার জায়গায় বলা শুরু হয় ‘পদকের সোনা চুরি’। এমনিতেও চুরি সম্পর্কে বাংলা ভাষায় অনেক সুন্দর সুন্দর প্রবচন প্রত্যক্ষ করা যায়। এই যেমন চুরিবিদ্যা বড় বিদ্যা, ঠেকলে বিদ্যা দমাদম; চোরের মন পুলিশ পুলিশ; দশ দিন চোরের আর এক দিন সাধুর; চুরি তো চুরি, তার ওপর সিনাজুরি; কিংবা চোরের মায়ের বড় গলা, খালি মাংগে দুধ আর কলা, ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলোর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে সময়ের প্রয়োজন।
সে যা হোক। এবার তাহলে নিশিকুটুম্ব তথা চোরদের সম্পর্কে মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত কিছু খোশগল্প নিবেদন করা যাক:
এক রাতে এক গরিব লোকের বাড়িতে একাধিক চোর একসঙ্গে প্রবেশ করল। তারা তন্নতন্ন করে খুঁজেও নেওয়ার মতো কিছু না পেয়ে নিরাশ হয়ে যখন চলে যাচ্ছিল, তখন জাগ্রত গৃহস্বামী তাদের উদ্দেশ করে বাক্যবাণ ছুড়ল, ‘তোমরা কী আহাম্মকের দল! আমি দিনের বেলায় এই বাড়িতে যেসব জিনিস খুঁজে পাই না, সেগুলো তোমরা রাতের বেলা খুঁজতে এসেছ।’ আরেকবার আরেক চোর মধ্যরাতে ওই লোকের বাড়িতে ঢুকে প্রথমেই তার জোব্বাটি মেঝেতে বিছিয়ে রেখে জিনিস খুঁজতে গেল, যাতে জোব্বায় বেঁধে নিয়ে যেতে পারে। ঘরে কিছুই ছিল না, সামান্য আটা পেয়ে ওটা নিয়ে এসে জোব্বায় ঢালতে গিয়ে সে দেখে যে জোব্বা নেই, কেননা ততক্ষণে গৃহস্বামী জেগে উঠে চুপিসারে ওটা সরিয়ে নিয়েছে। প্রস্থানোদ্যত চোরকে ধরার জন্য গৃহস্বামী ‘চোর, চোর’ বলে চিৎকার করতেই চোর বলে উঠল, ‘আমি চোর না তুমি চোর, সেটা নিরূপণের ভার তোমার বিবেকের ওপর ছেড়ে দিলাম।’
আরেকবার এক চোর একজন ধনী লোকের ফলের বাগানে প্রবেশ করে কোঁচড়ভর্তি ফল চুরি করে পালিয়ে যেতে উদ্যত হতেই বাগানের মালিক এসে উপস্থিত। অতঃপর তাদের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল, তা এ রকম।
: তুমি এখানে অনাহূত কীভাবে এলে?
: আমি স্বেচ্ছায় আসিনি। একটা ঘূর্ণিঝড় আমাকে এখানে বয়ে নিয়ে এসেছে।
: ওহ্, বুঝলাম ঘূর্ণিঝড় তোমাকে এখানে বয়ে নিয়ে এসেছে এবং গাছের ফলগুলোও ঝড়ের কারণে ঝরে পড়েছে। কিন্তু এগুলো তোমার কোঁচড়ে এল কী করে?
: জনাব, আমি আপনার আত্মার কসম করে বলছি যে আমার কাছেও এটা একটা ধাঁধার মতো ঠেকছে।
তবে আমার বিবেচনায় এ-সংক্রান্ত সবচেয়ে মজার গল্প হচ্ছে এর পরেরটি: এক রাতে একটি চোর একজন বিত্তশালী লোকের বাড়িতে প্রবেশ করে অনেক দামি জিনিস হাতিয়ে রওনা দেবে, এমন সময় তার নজরে এল দুজন নৈশপ্রহরী তার দিকে আসছে। সে তৎক্ষণাৎ একটি ঝাড়ু নিয়ে রাস্তা ঝাড়ু দিতে শুরু করে দিল এবং নৈশপ্রহরীদের প্রশ্নের উত্তরে জানাল যে বাড়ির মালিক সন্ধ্যারাতে পটল তুলেছে; রাস্তা নোংরা ও পরদিন ভোরে অনেক কাজ; তাই সে রাতে রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে কাজ এগিয়ে রাখছে। মৃত ব্যক্তির বাড়ি থেকে কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না কেন, এই প্রশ্নের উত্তরে সে বলল, ‘আগামীকাল ভোরে আপনারা কান্নার আওয়াজ শুনবেন।’ অতঃপর দুই নৈশপ্রহরী তাদের পথে ও চোর বমাল তার পথে চলে গেল।
পরদিন ভোরে সেই বাড়িতে কান্নার আওয়াজ উঠেছিল ঠিকই, তবে বাড়ির মালিকের মৃত্যুর জন্য নয়, মূল্যবান সামগ্রী খোয়া যাওয়ার জন্য।
পাদটীকা: প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টা নগরে নাকি কেউ চুরি করে ধরা পড়লে চুরির জন্য নয়, বরং ধরা পড়ার বোকামির জন্য তার শাস্তি হতো। আমাদের দেশেও এই ব্যবস্থার প্রচলন করা যেতে পারে।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Tuesday, February 24, 2015
কে নেবে দায়ভার by আতাউর রহমান ও বিপ্লব চক্রবর্তী
গতকাল দুর্ঘটনাস্থলে বারবারই ঘুরেফিরে এসেছে একটি প্রশ্ন, কার বা কাদের কারণে ঝরে গেল এসব প্রাণ। কে নেবে এর দায়ভার। এভাবে আর কত লাশ যাবে পদ্মায়-মেঘনায়। দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস বলেন, 'চালকদের অদক্ষতা আর প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এটা কখনোই কাম্য নয়। তারা সতর্ক ছিলেন না। দুই চালকই নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে। তবে পুরো বিষয়টি পৃথক তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখছে। এর আগে রোববার ঘটনাস্থলে গিয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানও একই ধরনের কথা বলেছেন।
এদিকে, পদ্মায় লঞ্চডুবিতে নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গতকাল তিনি টুইটারের মাধ্যমে এক শোকবার্তায় নিহতদের পরিবারের স্বজনের প্রতি সমবেদনা জানান। এ ছাড়া এক শোকবার্তায় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান। শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট ডবি্লউ গিবসনও।
রোববার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া থেকে ছেড়ে যাওয়া এমভি মোস্তফা নামে পদ্মা নদীতে যাত্রী পারাপারের লঞ্চটি অন্য একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ডুবে যায়। এর পর রোববার গভীর রাত পর্যন্ত ৪১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। গতকাল ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে লঞ্চটি টেনে তোলার পর ভেতরে পাওয়া যায় আরও ২৯ জনের মরদেহ। নিহতদের মধ্যে পুরুষ ২৭ জন, নারী ২৪ ও শিশু ২০ জন। গতকাল বিকেল পর্যন্ত ৬৯ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও এক নারীর পরিচয় শনাক্ত হয়নি। তার মরদেহ ঢামেক মর্গে রয়েছে। গতকাল রাত ১০টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ভাটির ৬ কিলোমিটার দূরে মান্দারখোলা এলাকায় এক শিশুর লাশ পাওয়া যায় বলে জানান শিবালয় উপজেলার নির্বাহী কমকর্তা এ কে এম গালিব খান। লঞ্চটি টেনে পদ্মার তীরে নেওয়ার পর গতকাল সকাল ১০টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে লাশের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন।
শিশু রাইসানকে কোলে নিয়ে দাদি রিক্তা বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, রাইসান তার মা আর বোনের সঙ্গে গাজীপুর থেকে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সাওতা গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিল... এ কথা বলেই রিক্তা ভেঙে পড়েন কান্নায়। রাইসানের বাবা ফারুক হোসেন জানান, সকালে ছেলে রাইসান, ১৪ বছরের মেয়ে বীথি আর তার স্ত্রী রেবেকাকে লঞ্চে তুলে দেন। সঙ্গে তার বৃদ্ধ চাচা গোলাম মোস্তফাও ছিলেন। লঞ্চডুবির পর সন্ধ্যায় স্ত্রী, মেয়ে আর চাচার লাশ পান। তাদের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে খুঁজছিলেন ছেলেটাকে। তীর থেকে মাঝনদী পর্যন্ত কোথায়ও খুঁজে পাননি। অবশেষে ছেলেকে পেলেও সে কোনো কথা বলে না। শোকে পাথর হয়ে যাওয়া ফারুক তথ্যগুলো দিতে দিতে একপর্যায়ে বিলাপ করতে থাকেন। স্ত্রী, আদরের মেয়ে, ছেলে আর চাচাকে হারিয়ে অনেকটা পাগলের মতোই আচরণ করেন পেশায় মুদি দোকানি ফারুক।
বডিব্যাগে মোড়ানো একেকটা মানুষের মরদেহ নিয়ে সেখানে ঢুকতে থাকেন স্বেচ্ছাসেবকরা। মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে ২৯টি মরদেহ নেওয়া হয় সেখানে। আবারও হুমড়ি খেয়ে পড়েন নিশ্চিত দুঃসংবাদের প্রতীক্ষায় থাকা স্বজনরা। সারি সারি লাশ উল্টেপাল্টে খুঁজতে থাকেন নিজের স্বজনকে। ভোররাতে কান্না আর গগনবিদারী আর্তনাদে ভারি হয় পাটুরিয়ার চারপাশ। পাটুরিয়া লঞ্চঘাট ছাড়াও মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাগুরাসহ কয়েকটি জেলার পরিবেশ শোকাবহ। ডুবে যাওয়া লঞ্চে মূলত এসব এলাকার বাসিন্দাই বেশি ছিলেন। গতকাল পাটুরিয়া লঞ্চঘাটের পাশে নির্বাক হয়ে বসেছিলেন পুলিশ কনস্টেবল নুরুল ইসলাম। তিনি মানিকগঞ্জ জেলার গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত। লঞ্চডুবির ঘটনায় তার মুখের সব ভাষা বন্ধ হয়ে গেছে, কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে। লঞ্চডুবির পর কনস্টেবল নুরুল ইসলামের স্ত্রী রুমা বেগম, সাত বছরের ছেলে উৎসব আর আড়াই বছরের ছেলে উৎসের লাশ মিলেছে।
নুরুল ইসলামের শ্যালক মুনসুর আলী শেখ জানান, তার বোন ও ভাগ্নেরা মানিকগঞ্জে ভাড়া থাকত। তবে রোববার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীতে যাওয়ার জন্য দুলাভাই নিজেই দুই ছেলে আর স্ত্রীকে লঞ্চে তুলে দিয়েছিলেন। এর আধাঘণ্টা পরই খবর পান দুর্ঘটনার। ভোররাতে লঞ্চ উদ্ধারের পর পাওয়া যায় বোন আর দুই ভাগ্নের লাশ।
গতকাল দুপুরে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের সামনে স্বামী লিটন মিয়ার (৩০) লাশের পাশে বসে কাঁদছিলেন মারুফা বেগম। আর নিজের কাপড়ের আঁচল দিয়ে অতি যত্নে মুছে দিচ্ছিলেন নিথর দেহের মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি। বিলাপ করে মারুফা বলছিলেন, তার স্বামী ঢাকায় স্কুলভ্যান চালাতেন। তাদের সংসারে দুটি মেয়ে রয়েছে। সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন তার স্বামী। সাভারের নবীনগরের বাসিন্দা বিউটি পারভীন রাতভর কান্নায় পদ্মার তীর ভারি করলেও গতকাল সকালে জানালেন, তার একমাত্র মেয়ে কেয়ামণির লাশটি পেয়েছেন। সাত বছরের কেয়ামণির লাশ পেলেও বিউটির মা আনোয়ারা বেগম তখনও নিখোঁজ। রাতভর বিলাপের পর শোকে পাথর বিউটি জানান, নানি ও নাতনি মিলে নড়াইলে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিল। এরপরই সব শেষ।
রাতভর উদ্ধার অভিযান :রোববার দুপুর ১২টার দিকে পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া এমভি মোস্তফা ডুবে যাওয়ার পর প্রথমে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। এর পর চার ডুবুরি নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ২৫ সদস্যসহ, নৌ পুলিশ, নৌবাহিনী ও বিআইডবি্লউটিএর উদ্ধারকর্মীরা কাজে যোগ দেন। রাত সোয়া ১১টায় উদ্ধারযান রুস্তম ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর মূল উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে লঞ্চটিকে টেনে তোলা সম্ভব হয়। এর পর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সেটিকে টেনে পাটুরিয়া ঘাটের অদূরে বড়রিয়া এলাকায় পদ্মাতীরে রাখা হয়।
ভোর সাড়ে ৪টার দিকে লঞ্চটি পানি থেকে টেনে তোলার সময় ভেতরে কয়েকজনের লাশ ঝুলতে দেখা যায়। উদ্ধারকর্মীরা সেগুলো দ্রুত উদ্ধার করেন। লঞ্চটি উদ্ধারের পর দেখা যায়, কার্গোর ধাক্কায় লঞ্চটির মাঝামাঝি অংশ দুমড়ে-মুচড়ে গছে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা পরিদর্শক জিহাদ মিয়া সমকালকে বলেন, লঞ্চটি টেনে তোলার পর দোতলার কেবিনে একসঙ্গে ২৫টি লাশ পাওয়া যায়।
মানিকগঞ্জ জেলার সার্কেল এএসপি হারুনার রশিদ জানান, লঞ্চ ও কার্গোর চালকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। তিনজনকেই ওই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চচালক আফজাল হোসেনসহ তার কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একই ধারায় সোমবার বিকেলে মামলা করা হয়েছে। তবে তাদের এখনও আটক করা যায়নি।
এখনও নিখোঁজ যারা :স্বজনদের দাবি অনুযায়ী এখনও ছয়জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের ঢাকা হেড অফিসের কর্মকর্তা মোস্তফা মাহাফুজ দানা (৪৫), কুষ্টিয়ার লিপি বেগম (২২), মানিকগঞ্জের শিবালয়ের আবুল হাশেম (৫৫), ঝিনাইদহের মারুফা খাতুন (৫), ফরিদপুরের জুয়েল রানা (২৭) ও দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চের বাবুর্চি সোহরাব হোসেন (৪৫)।
নিহতদের পরিচয় :লঞ্চডুবির ঘটনায় লাশ উদ্ধারের পর পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৬৯ জনের মধ্যে রাজবাড়ী জেলার ২০ জন, কুষ্টিয়ার ১৯, ফরিদপুরের ১১, মানিকগঞ্জের ৮, নড়াইলের ৫, গোপালগঞ্জের ৩, ঢাকা জেলার দু'জন এবং কুমিল্লা জেলার একজন রয়েছেন। পরিচয় শনাক্ত না হওয়া এক নারীর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে রাখা হয়েছে।
তাদের মধ্যে রাজবাড়ী জেলার নবিজান (৬৫), হালিমা বেগম (৪৫), অসিমা রানী (৪০), নাসিমা আক্তার (৩৬), রহমান (৫৪), ইনামুল (১৪), নুশরাত (১৮ মাস), মনজিলা বেগম (৪৫), রত্না আক্তার, উৎসব (৭), সাফেরা (৫০), ফাতেমা (২), রেখা রানী হালদার (৪৭), হালিমা বেগম (৪৫), মঞ্জিলা বেগম (৪৪), হলিমা বেগম (৪৪), রুমা (২৫), উৎসব (৭), সাফেরা বেগম (৫০), রেখা মালাকার (৪৭) ও জয়নাল শেখ (৫০) রয়েছেন। কুষ্টিয়ার ১৯ জনের মধ্যে রয়েছেন_ মধুসূদন সাহা (৩০), নাছির হোসেন (৪০), মেহেদি হাসান বাপ্পী (৩০), মোস্তফা খাতুন (৩৩), বীথি খাতুন (১৫), আসাদুল (২০), ইনামুন হক (১৮), ইমামুল (১৮), মদিনা (৭০), রাইসান হক (২), ডলি খাতুন (৩৪), গোলাম মোস্তফা (৫৫), নবনীতা পাল (২৮), নায়না (৬), ফাতেমা (২), শরিফুল ইসলাম (২৪), শরিফ (২৪), বানেজ আলী (৫৫) ও সাগু (২৫)। ফরিদপুরের ১১ জন হলেন_ পাপন (৫), রতন সরকার (৩৪), স্বপন সরকার (৫০), চম্পা রানী (৫৮), অর্চনা মালো, নারগিস আক্তার, শারমিন (২৫), মারজানা (৬), দেবনাথ মালো (৫৫), অনিমা মালো (৪৫) ও মমতা বেগম (৪৭)। মানিকগঞ্জের আটজন হলেন_ লতা (২২), আবুল কাশেম (৪৫), অঞ্জলি সূত্রধর (৬০), ইমরান (৮), ইমন (৪), সেলিম (২২), হোসাইন মোল্লা (১৮ মাস) ও রতন সরকার (১৮)। নড়াইলের পাঁচজনের মধ্যে রয়েছেন_ আমেনা বেগম (৩৫), হাফসা (৮), হোসাইন কবির (২৮), কেয়ামনি আদুরি (৭) ও রিয়া (৩)। গোপালগঞ্জের তিনজন হলেন_ নোয়াব শেখ (১৩ মাস), শাহানাজ (৪৫) ও রিনা বেগম (২৭)। এ ছাড়া ঢাকা জেলার দু'জন হলেন নবাবগঞ্জ উপজেলার সুফিয়া (২৮) ও দেড় বছরের শিশু ফারজানা স্মৃতি এবং কুমিল্লার আবুল হাসেম।
হরতাল না ভয়তাল! by আতাউর রহমান
আর গান্ধীজিকে একবার এক নৌবন্দরে শুল্ক কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে ডিক্লারেশন দেওয়ার মতো কিছু আছে কি না জিজ্ঞেস করায় তিনি নাকি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমার পার্থিব সম্পদের মধ্যে আছে ছয়টি চরকা, একটি ছাগদুগ্ধ রাখার জগ, ছয়টি হাতে বোনা লেংটি ও একটি তোয়ালে, আর আছে আমার খ্যাতি, যেটা পরিমাপ করা যায় না।’ আমাদের বাংলাদেশের কথা না-হয় বাদই দিলাম, ভারতের আর কয়জন রাজনীতিবিদ বুকে হাত দিয়ে এভাবে বলতে পারতেন বা পারবেন?
তো গান্ধীজি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন মহাত্মা। এর সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ: তিনি ছিলেন নীতিগতভাবে ভারতবর্ষ বিভাজনের বিপক্ষে; কিন্তু এতৎসত্ত্বেও বিভাজন হয়ে গেলে পরে নেহরু-প্যাটেল প্রমুখ যখন রিজার্ভ ব্যাংক থেকে পাকিস্তানের হিস্যা ৫০০ কোটি রুপি দিতে গড়িমসি করছিলেন, তখন তিনি অনশন-ধর্মঘট শুরু করেন। এক্কেবারে খাঁটি অনশন; হালের এরশাদ সাহেব মার্কা অনশন নয়। তাঁর অনশনের ফলে ওঁরা ওই টাকা অবমুক্ত করতে বাধ্য হন।
আর স্বাধীনতার প্রাক্কালে, ছেচল্লিশের আগস্টে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার শিরোনাম অনুসারে ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর পর কলকাতায় শান্তি বজায় রাখতে তিনি স্বয়ং মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় এসে বাস করতে শুরু করেছেন। সর্বোপরি, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে তিনি অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়ার পর একপর্যায়ে সেটা সহিংস আন্দোলনে রূপ নিলে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। হায়! এতদ্দেশীয় রাজনীতিবিদেরা কবে গান্ধীজির জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন। আর আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায়, এ দেশের প্রত্যেক শিক্ষিত দেশপ্রেমিক নাগরিকের উচিত গান্ধীজির আত্মজীবনীমূলক বই মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ পাঠ করা।
‘যাকগে, বলতে যাচ্ছিলাম হরতালের ব্যাপারটা। আমাদের সময়কার ছাত্রনেতা ও পরবর্তী সময়ে অনেকবার ডিগবাজি খাওয়া রাজনীতিবিদ শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন স্বৈরাচারী সরকারের মন্ত্রী থাকাকালে একবার বলেছিলেন, ‘হরতাল তো নয়, ওটা ভয়তাল!’ সে সময় তিনি আরেকটি অশালীন উক্তির মাধ্যমে বলতে চেয়েছিলেন, দুই নারী একজোট হয়েও এরশাদের পতন ঘটাতে পারবেন না। তাঁর ওই উক্তি অশালীনতার কারণে সর্বত্র সমালোচিত হয়েছিল। যা হোক, সেবার তিনি ভুল প্রমাণিত হয়েছিলেন, দুই নেত্রীর ঐকে্যর ফলেই এরশাদীয় স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল। কিন্তু এখন তাঁদের একজনের অবস্থান উত্তর মেরুতে হলে অপরজনের অবস্থান দক্ষিণ মেরুতে।
স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হলে নাকি সর্বত্র মাছি দেখতে পাওয়া যায়। তদ্রূপ পত্রিকার পাতায় রম্য কিছু প্রকাশিত হলে রম্যলেখকের দৃষ্টি সেখানটায় অবিচ্ছেদ্যভাবে আটকায়। আত্মজপ্রতিম একজন ইদানীং ‘রস+আলো’র পাতায় লিখেছে: লাগাতার হরতাল মানে হলো লাগা তার, অর্থাৎ তার লাগা; হরতালে অনেকের মাথার তার ছিঁড়ে যায় তো, সেটা লাগানোর জন্যই লাগাতার হরতাল। ওর এই বিশ্লেষণটা আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই তৎসঙ্গে আমি যোগ করতে চাই, হরতাল মানে হচ্ছে তাল হরণ করা। বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই।
আর পত্রিকার পাতায় ‘গাধা মানুষের মতো কথা বলে’ শিরোনাম দেখতে পেয়ে জনৈক রসিক ব্যক্তি মন্তব্য করেছিলেন, ‘মানুষ যদি গাধার মতো কথা বলতে পারে, তাহলে গাধা মানুষের মতো কথা বলায় অবাক হওয়ার কী আছে?’ তো আগেকার দিনে রাজনৈতিক সংকটকালে সরকারি কর্মচারীরা দৃশ্যত নিরপেক্ষ ও নির্বাক থাকতেন; আজকাল তাঁরা রাজনীতিবিদদের মতো বক্তব্য দিতে শুরু করেছেন। সরকারের এক ডানার কাজ আরেক ডানা করতে শুরু করে দিলে ফলাফল কী হয়, সেটা বোঝাতে গিয়ে অনেক আগে ঈশপের এই গল্পটা বলেছিলাম:
এক কৃষকের ছিল একটি গাধা ও একটি কুকুর। গাধার কাজ ভার বহন করা আর কুকুরের কাজ রাতে বাড়ি পাহারা দেওয়া। কৃষক তাদের ভালোমতো ভরণপোষণ করে না বিধায় অসন্তুষ্টি একেবারে চরমে। একদিন গভীর রাতে বাড়িতে নিশিকুটুম্বের আগমন ঘটল। কুকুর বলল, ‘মালিক আমাদের ভালোমতো খেতে দেয় না। চোর চুরি করে নিয়ে যাক, তাতে আমাদের কী? আমি ডেকে মালিকের ঘুম ভাঙাব না।’ কিন্তু গাধা কুকুরের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলল, ‘হাজার হোক তিনি আমাদের মালিক। তুমি না ডাকলেও আমি ডেকে তাঁর ঘুম ভাঙাবই।’ সে তার হেঁড়ে গলায় চিৎকার শুরু করলে চোর পালিয়ে গেল। এদিকে মালিক মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে কিছুই দেখতে না পেয়ে অহেতুক ঘুম ভাঙানোর অপরাধে গাধাকে আচ্ছাসে পিটুনি লাগাল।
এ স্থলে সম্প্রতি সংগৃহীত আরেকটি মজাদার গল্প উপস্থাপন করতে চাই। অবশ্য পূর্বাহ্নে বলে রাখি, আমাদের এক ঢাকাইয়া ভাই যথার্থই বলেছিলেন, ‘আইজকাল রাজনীতিতে পলিটিকস ঢুইক্যা গ্যাছেগা।’ তবে সেই সঙ্গে ঘেন্না ও প্রতিহিংসা যে ঢুকে গেছে, ওটাই চিন্তার বিষয়। আর দোহাই লাগে, এই গল্পটিতে কেউ রাজনীতির গন্ধ খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা করবেন না। আব্বাসীয় যুগের এক শাসক একদিন দামেস্কে জনগণের উদ্দেশে বক্তৃতাকালে বলছিলেন, ‘হে লোকসকল! আপনারা আল্লাহর শোকর গোজার করুন যে তিনি আমাকে আপনাদের শাসনকর্তা বানিয়েছেন। ইতিপূর্বে অনেকবার প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে, কিন্তু আমার রাজত্বকালে একবারও প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি।’
পেছন থেকে এক মুসল্লি ফোড়ন কাটলেন, ‘আল্লাহ অত্যন্ত মহান ও মেহেরবান। তিনি এতটা নির্দয় নন যে একই সঙ্গে আপনাকে ও প্লেগ ব্যাধিকে আমাদের ওপর আরোপ করবেন।’
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Monday, February 23, 2015
কাঁদছে পদ্মাপাড়, ৪১ লাশ উদ্ধার by আতাউর রহমান ও বিপ্লব চক্রবর্তী
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বার্তায় লঞ্চডুবিতে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন এবং দুর্ঘটনায় দায়ীদের শাস্তির দাবি জানান।
মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা সমকালকে জানান, নিহত ৪১ জনের মধ্যে ৩৮ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাতটি শিশু ও ১৮ জন নারী। শনাক্ত না হওয়া তিনজনের মধ্যে এক নারী, এক শিশু ও একজন পুরুষ।
দুর্ঘটনার পর পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাটে ভিড় করেছেন নিখোঁজদের স্বজনরা। তারা উৎকণ্ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন পদ্মার তীরে। গতকাল দুপুরে যাত্রা শুরুর মিনিট দশেক পর মাঝনদীতে কার্গোর ধাক্কায় উল্টে যায় লঞ্চটি। এর আগে গত বছরের ৪ আগস্ট পদ্মার মাওয়া পয়েন্টে যাত্রীবাহী লঞ্চ পিনাক-৬ ডুবে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় সন্ধান মেলেনি আরও ৬১ যাত্রীর। পদ্মাপাড়ের মানুষের স্বজন হারানো সেই কান্না না থামতেই এবার পাটুরিয়া পয়েন্টে ঘটল আরেক হৃদয়বিদারক ঘটনা।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নৌবাহিনীর ডুবুরি দল, ফায়ার সার্ভিস ও নৌ পুলিশ ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছিল। লঞ্চটির সন্ধান পাওয়া গেলেও টেনে তোলা সম্ভব হয়নি। উদ্ধার যান 'রুস্তম' রাত সোয়া ১১টায় ঘটনাস্থলে পেঁৗছে। এর আগে বিকেলে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও বিআইডবি্লউটিএর কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা জানান, যে কার্গোর ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবে গেছে, নারগিস-১ নামের সেই কার্গো জাহাজের লস্কর শাহিনুর রহমান, শহীদুল ইসলাম ও জহিরুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে।
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস সমকালকে জানান, লঞ্চটির ভেতরে আর কোনো লাশ রয়েছে কি-না, তা তল্লাশি করা হচ্ছে। লাশ শনাক্তের পর বহন ও দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বজনদের ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। রাত ৮টা পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিআইডবি্লউটিএর পাটুরিয়া লঞ্চঘাটের পেট্রোল ইন্সপেক্টর ফরিদুল ইসলাম সমকালকে জানান, দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে এমভি মোস্তফা লঞ্চটি দৌলতদিয়া ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। তার দাবি, লঞ্চটির ধারণক্ষমতা ১৪২ জন হলেও যাত্রীসংখ্যা এর কম ছিল।
অবশ্য পাটুরিয়া ঘাটের অন্যান্য লঞ্চের কর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় লোকজন বলছেন, লঞ্চটিতে ১৬০ জনের বেশি যাত্রী ছিল। এর মধ্যে গোপালগঞ্জগামী কমফোর্ট পরিবহনের একটি বাসের অন্তত ৪২ যাত্রী ছিল লঞ্চটিতে।
ঘাটের কর্মীরা জানান, কার্গোর ধাক্কার পর লঞ্চটি ডুবে যেতে দেখে তারা ঘাটে নোঙরে থাকা ৮ থেকে ১০টি লঞ্চ ও ট্রলার নিয়ে মাঝনদীতে উদ্ধার অভিযানে যান। বিভিন্ন লঞ্চ থেকে বয়া ফেলে যাত্রীদের উদ্ধারের চেষ্টা চালান। এতে অন্তত ১০০ যাত্রী প্রাণে রক্ষা পান। তা ছাড়া দুর্ঘটনায় দায়ী কার্গো জাহাজেও ডুবে যাওয়া যাত্রীদের উদ্ধার করে তুলে দেওয়া হয়। পরে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী এমভি নারগিস-১ কার্গো জাহাজটি উদ্ধার করা হয়। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানান, খবর পেয়ে ঘটনার আধা ঘণ্টার মধ্যেই তারা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।
যেভাবে ডুবল লঞ্চটি :ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে জীবিত উদ্ধার যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লঞ্চটি ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার ১০ মিনিটের মাথায় দুর্ঘটনায় পড়ে। মাঝনদীতে গিয়ে লঞ্চটি ঘাট থেকে আড়াআড়িভাবে নদী পাড়ি দিয়েছিল। এতে ঢাকামুখী সারবোঝাই কার্গো জাহাজটি লঞ্চের মাঝখানে ধাক্কা দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই লঞ্চটি উল্টে যায়।
কুষ্টিয়ার বাসিন্দা মিলন মিয়া জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। তার তিন বছরের মেয়ে নীলিমাকেও জীবিত উদ্ধার করতে পেরেছেন। মিলন সমকালকে জানান, তিনি মেয়েকে নিয়ে লঞ্চের সামনের অংশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ দেখেন, একটি কার্গো লঞ্চটির দিকে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লঞ্চের সঙ্গে কার্গোটির ধাক্কা লাগে। সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটি উল্টে গেলে তিনি নদীতে পড়ে যান। তবে তার স্ত্রী লিপি বেগমকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর সোহরাব হোসেন তিন বছরের ছেলে জুনায়েদ আর স্ত্রী শিরিনকে নিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে যাচ্ছিলেন। ছেলের লাশ পাওয়া গেলেও স্ত্রীর হদিস নেই। সোহরাব জানান, কার্গো জাহাজটি জোরে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই লঞ্চটি ডুবে যায়। জীবন রক্ষায় লঞ্চের ছাদে ও সামনে থাকা মানুষ নদীতে লাফিয়ে পড়েন। তবে ভেতরের কেউ বের হতে পারেননি। তারা জানান, দোতলা লঞ্চটি পুরো বোঝাই ছিল।
পাটুরিয়া ঘাট লঞ্চ মালিক সমিতির টিকিট ম্যানেজার মঞ্জু মিয়া জানান, ঘাট থেকেই ডুবে যাওয়ার দৃশ্যটি দেখা যাচ্ছিল। লঞ্চটি ডুবতে পাঁচ থেকে সাত মিনিট সময় নিয়েছে। ভেতরের কোনো যাত্রী বের হতে পারেননি। তারা শুধু নদীতে লাফিয়ে পড়া লোকজনকে উদ্ধার করতে পেরেছেন।
নিহত যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে :মাগুরার লাইলী বেগম, মানিকগঞ্জের লাবণী আক্তার মুক্তা, লতা, দৌলতপুরের শিশু ইমরান, সেলিম, কুষ্টিয়ার মেহেদী হাসান, ইউসুফ, ইমামুল, রেবেকা, বীথি খাতুন, কুষ্টিয়ার মিলনপাড়ার নাসির উদ্দিন, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের সুফিয়া বেগম, রাজবাড়ীর নবীজান, সাবু, রাবেয়া বেগম, নাসিমা আক্তার, জয়নাল শেখ, মধুখালীর মধুসূদন সাহা, ঢাকার নবাবগঞ্জের শিশু ফারজানা আক্তার স্মৃতি, ফরিদপুরের ভাঙ্গার ইমামুল, ফরিদপুরের কিশোরী নারগিস, ফরিদপুরের কোতোয়ালির রতন, পাঁচ বছরের শিশু পাবন, নগরকান্দার রথীন সরকার, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর শিশু জুনায়েদ শেখ ও ফরিদপুরের অর্চনা।
নিখোঁজের সংখ্যা কত :তলিয়ে যাওয়া লঞ্চে যাত্রীর সংখ্যা ছিল কত, কতজন উদ্ধার হয়েছেন_ তার পুরো হিসাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। ঘাটে দায়িত্বরত বিআইডবি্লউটিএ, ঘাটকর্মী এবং উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। ঘাটের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর জানান, যাত্রীসংখ্যা কোনোভাবেই ১৪০ জনের বেশি হবে না। ঘাটের কর্মী ও উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা বলছেন, যাত্রী ১৬০ জনের বেশি হবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর স্থানীয় লোকজন একশ'র মতো যাত্রীকে উদ্ধার করেছেন। সে হিসাবে এখনও অন্তত ২০ যাত্রী নিখোঁজ। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জেলা প্রশাসন নিখোঁজদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেনি।
সারি সারি লাশের পাশে আহাজারি :ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে ডুবুরিরা লাশ উদ্ধার করে ট্রলার দিয়ে পাটুরিয়া ঘাটে পাঠাচ্ছেন। সেখান থেকে রেড ক্রিসেন্ট ও স্থানীয় লোকজন পাটুরিয়া মোড়ে বিআরটিসি বাসের যাত্রী ছাউনিতে লাশগুলো সারি করে রাখছেন। একেকটি লাশ আসছে আর হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন স্বজনরা। প্রিয় স্বজনের নিথর দেহ চিনতে পেরেই গগনবিদারী কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তারা। এখনও যাদের লাশ পাওয়া যায়নি সেই স্বজনরা উৎকণ্ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন পদ্মার দুই পাড় পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাটে।
যাত্রী ছাউনির ভেতর এক শিশুর লাশ নিয়ে গড়াগড়ি করছিলেন উজ্জ্বল। তার দুই ছেলে ইমরান (৮) ও ইমন (৪) সেলিম নামে এক আত্মীয়র সঙ্গে এমভি মোস্তফা লঞ্চটিতে ফরিদপুরে যাচ্ছিল। লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর ইমরান ও সেলিমের লাশ পাওয়া গেলেও ছোট্ট ইমনের খোঁজ পাওয়া যায়নি এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত। এই বাবার কান্নায় যে কারোরই চোখের পানি ধরে রাখা দায়। আহাজারি করে তিনি বলেন, ছেলে দুইটা মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার সমেতপুর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। স্কুল খোলায় মামাতো ভাই সেলিমের সঙ্গে ফরিদপুর যাচ্ছিল। উজ্জ্বল ফরিদপুর মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মচারী। তিনি সেখানেই থাকেন।
৫৫ বছর বয়সী ফজলুর রহমান বিআইডবি্লউটিএর ফরিদপুর অফিসের সহকারী পরিচালক ছিলেন। রাক্ষসী পদ্মা তারও প্রাণ নিয়েছে। ফজলুর রহমানের লাশের পাশে তার ছোট ভাই ফারুক হোসেন আহাজারী করছিলেন।
স্কয়ার টেক্সটাইলের সিনিয়র অপারেটর সোহরাব হোসেন শেখ। ঢাকা থেকে তিন বছরের ছেলে জুনায়েদ শেখ আর স্ত্রী রিনা বেগমকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি কাশিয়ানি যাচ্ছিলেন। সোহরাব বেঁচে গেলেও ছেলে আর স্ত্রী নিহত হয়েছেন। ছোট্ট ছেলের লাশ কোলে নিয়ে এই বাবা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। আহাজারি করে বলছিলেন, দুনিয়ায় তার আর কিছুই রইল না।
মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়েই জেলা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে যায়। পরে ঢাকা থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চটিতে তল্লাশি শুরু করে।
ফিটনেসের মেয়াদ ছিল দু'দিন :সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শফিউর রহমান সমকালকে জানান, দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ছিল আর মাত্র দু'দিন। ২৪ ফেব্রুয়ারির পর সনদের মেয়াদোত্তীর্ণ হতো। আর দুর্ঘটনায় দায়ী কার্গো জাহাজের ফিটনেস সনদের মেয়াদ রয়েছে ২০ জুন পর্যন্ত। সুতরাং ফিটনেসের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে আপাতত বলা যাচ্ছে না। তবে জাহাজ দুটির চালক প্রশিক্ষিত ছিলেন কি-না সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নূর উর রহমান সমকালকে বলেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চটিতে দিনে ধারণক্ষমতা ১৪০ যাত্রী, রাতে ৬২ জন। ডুবে যাওয়ার সময় লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী ছিল কি-না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শিবালয় থানার ওসি রকিবুজ্জামান সমকালকে জানান, লঞ্চডুবির ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। তবে রাত ১২টা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। দুর্ঘটনায় দায়ী কার্গোর তিন কর্মচারীকে আটক করা হয়েছে। কার্গোটিও জব্দ করে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।
পাটুরিয়া লঞ্চঘাট সূত্র ও নৌপুলিশ জানায়, ডুবে যাওয়া লঞ্চটির মালিক মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রহিম খান। তিনি পাটুরিয়া লঞ্চ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। স্থানীয় লোকজন জানান, রহিম খান একসময় জাকের পার্টি করলেও বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সর্বশেষ তিনি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে শিবালয় উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে পরাজিত হন। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে তার অন্তত সাতটি লঞ্চ রয়েছে। এ ছাড়া তার একাধিক কার্গো ছাড়াও নানা ব্যবসা রয়েছে।
তদন্তে তিন কমিটি :লঞ্চ ডুবে যাওয়ার ঘটনা তদন্তে পৃথক তিনটি কমিটি করা হয়েছে। নৌ মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটিতে বিআইডবি্লউটিএ চেয়ারম্যান ড. শামসুজ্জোহা খন্দকারকে প্রধান করে আরও চারজন সদস্য রাখা হয়েছে। এ কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর অন্য একটি কমিটি করেছে। এতে সংস্থাটির নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন মো. শাহজানকে প্রধান করা হয়েছে। এ কমিটিতে আরও দুই সদস্য রয়েছেন। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া নৌ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নূর উর রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন রাজবাড়ী প্রতিনিধি সৌমিত্র শীল চন্দন, মানিকগঞ্জ (শিবালয়) প্রতিনিধি নিরঞ্জন সূত্রধর, রাজবাড়ী (গোয়ালন্দ) প্রতিনিধি আসজাদ হোসেন আজু, সালথা (ফরিদপুর) মো. মজিবুল হক।
Thursday, October 23, 2014
মনোব্যাধির চিকিৎসক by আতাউর রহমান
যাহোক, সাইকোলজিস্ট তথা মনোবিজ্ঞানী সম্পর্কে গল্প প্রচলিত আছে: রাস্তায় হঠাৎ দুই মনোবিজ্ঞানীর সাক্ষাৎ ঘটলে একজন অপরজনকে উদ্দেশ করে বলে উঠলেন, ‘আপনি ভালো আছেন। আমি কেমন আছি?’ অর্থাৎ, তিনি অপরের চেহারা দেখে সেই ব্যক্তি কেমন আছেন বলে দিতে পারেন। কিন্তু নিজের চেহারা তো দেখা যায় না, তাই অপর মনোবিজ্ঞানীকে তাঁকে বলে দিতে হয়, তিনি কেমন আছেন। আর সাইকিয়াট্রিস্ট তথা মনোব্যাধির চিকিৎসক সম্পর্কে গল্প প্রচলিত আছে যে জনৈক রোগী তাঁর কাছে গিয়ে নিজেকে জীবনে ব্যর্থকাম বলে অভিহিত করলে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনার ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই, আমার এখানে চিকিৎসা প্রলম্বিত ও ব্যয়বহুল জেনেই তো আমার কাছে এসেছেন এবং আমার এখানে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে যিনি সক্ষম, তিনি জীবনে ব্যর্থকাম হতে পারেন না।’
প্রসঙ্গত মনে পড়ল, নিউইয়র্ক শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে একবার নাকি দিনের বেলায় আগুন লাগলে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় এক মহিলা তাঁর প্রতিবেশীকে লোহার খাঁচায় করে একটি গৃহপালিত মোরগকে নিয়ে নামতে দেখে অজ্ঞান হয়ে যান এবং খানিকক্ষণ সেবা-শুশ্রূষার পর জ্ঞান ফিরলে তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমি পূর্বে কখনো জ্ঞান হারাইনি। কিন্তু দেখুন, বিগত এক বছর যাবৎ আমি একজন মনোব্যাধি-চিকিৎসকের চিকিৎসাধীন আছি। কারণ আমি প্রতিনিয়তই কংক্রিটের এই শহরে একটা মোরগের ডাক শুনে আসছিলাম।’
সাইকোএনালিস্ট তথা মনঃসমীক্ষক সম্পর্কেও গল্প প্রচলিত আছে: এক লোকের ‘ক্লেপ্টোমেনিয়া’ রোগ ছিল। জনৈক মনঃসমীক্ষকের চিকিৎসায় আরোগ্যলাভের পর সে বলল, ‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি বিনিময়ে আপনার কী সেবা করতে পারি, বলুন?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘আপনি আমার ফি পরিশোধ করেছেন, আর কোনো সেবার প্রয়োজন নেই।’ কিন্তু লোকটি পীড়াপীড়ি করায় তিনি বললেন, ‘আপনার এই রোগটি যদি ফিরে আসে তাহলে জানবেন, আমার ছেলেটার বহুদিন থেকে একটি ছোট্ট বহনযোগ্য কালার টিভির শখ।’
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমেরিকায় সাইকিয়াট্রিস্টকে বিকল্পভাবে বলা হয় ‘শ্রিংক’ (shrink) এবং, আমরা জানি, শ্রিংক মানে হচ্ছে সংকুচিত হওয়া; যেমন, কোনো কোনো কাপড় ধোয়ার পরে শ্রিংক করে। বাস্তবে সাইকিয়াট্রিস্ট চিকিৎসা করে আপনার মানসিক ব্যালান্স বা ভারসাম্য বজায় রাখেন বটে, তবে আপনার ব্যাংক ব্যালান্স অবশ্যই সংকুচিত করে ফেলেন। আর বর্তমানের যে হতাশাগ্রস্ত যুগে আমরা বাস করছি, তাতে সাইকিয়াট্রিস্টরা নিজেরাই এতটা স্নায়বিক দৌর্বল্যে ভোগেন যে তাঁদের বোধ করি একে অন্যের কাছে চিকিৎসার জন্য ধরনা দিতে হচ্ছে।
এবারে তাহলে নিজের কথায় আসি। দীর্ঘমেয়াদি রোগভোগের একপর্যায়ে ডিপ্রেশন তথা বিষণ্নতা রোগ আমাকে পেয়ে বসে। একদিন প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে অনুভব করি, এযাবৎ যা কিছু পছন্দ করে আসছি তার কিছুই ভালো লাগছে না, ইচ্ছে হচ্ছে গভীর জঙ্গলে নিয়ে একাকী বসে থাকি। বিলেতে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পর্কে একটা কৌতুক আছে: জনৈক সরকারি কর্মকর্তা ঘুম কমের অনুযোগ নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে এবং ‘আপনার রাতের ঘুম কি কম হচ্ছে?’— ডাক্তারের এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, ‘না, আমার রাতের ও সকালের ঘুম ঠিকই হচ্ছে, দুপুরে খাবারের পরে যে ঘুমাই, আসলে ওটা কম হচ্ছে।’ তা আমারও দীর্ঘদিনের দিবানিদ্রার অভ্যাস, সেটা তো উবে গেলই, রাতের ঘুমও হারাম হয়ে গেল।
অনন্যোপায় হয়ে গেলাম রাজধানীর নামকরা এক মনোব্যাধি চিকিৎসকের কাছে। তিনি প্রথম আলোর নিয়মিত পাঠক। তাই পরিচয় পেয়েই মন্তব্য করে বসলেন, যিনি মানুষকে হাসান, তিনি কেন বিষণ্নতায় ভুগবেন? আমি তখন তাঁকে বিবিসির ‘মি. বিন’ খ্যাত রোয়ান এটিকনসনের উপাখ্যান শোনালাম। এটিকনসন সাহেব বিচিত্র অঙ্গভঙ্গিসহকারে সবাইকে হাসান। কিন্তু কয়েক বছর আগে পত্রিকায় বেরিয়েছিল, তিনি বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্যে আমেরিকায় গেছেন। যাহোক, তিনি একটা ব্যবস্থাপত্র দিলেন। স্রষ্টার অশেষ কৃপায় তাতেই কাজ হলো, আর প্রলম্বিত ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ল না। অনেকটা সেই গল্পের মতো আরকি।
মার্কিন নাগরিক জ্যাকসন জনৈক মনোব্যাধি চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বললেন, ‘ডক্টর, আমি বড় বিপদে পড়েছি। যখনই আমি বিছানায় শুতে যাই, আমার ধারণা হয় বিছানার নিচে কেউ একজন শুয়ে আছে। আবার বিছানার নিচে গেলে মনে হয় বিছানার ওপরে কেউ একজন শুয়ে আছে। এই ওপর-নিচ করতে করতে আমি পাগল হয়ে যাব।’ ‘আপনি দুবছর আমার চিকিৎসাধীন থাকেন’, প্রত্যুত্তরে চিকিৎসক বললেন, ‘সপ্তাহে তিন দিন আমার এখানে আসেন; আমি আপনাকে সুস্থ করে তুলব।’
‘আপনার ফি কত?’
‘প্রতি ভিজিটে এক শ ডলার।’
‘আমি ভেবে দেখি’, এই বলে মি. জ্যাকসন যে গেলেন আর তাঁর খোঁজ নেই। মাস ছয়েক পরে রাস্তায় হঠাৎ চিকিৎসকের সঙ্গে তাঁর দেখা হলো। চিকিৎসক তাঁকে ফিরে না আসার কারণ জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, ‘প্রতি ভিজিটে এক শ ডলারের’ কথা শুনেই মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। একজন মদের দোকানের পরিবেশক মাত্র ১০ ডলারে আমাকে রোগমুক্ত করে দিয়েছে। সে আমাকে পরামর্শ দিল, খাটের পায়াগুলো কেটে ফেলতে। আমি তাই করলাম, ফলে আমি এখন রোগমুক্ত।’
শেষ করছি রিডার্স ডাইজেস্ট-এ প্রকাশিত এ–সংক্রান্ত আরেকটি মজার গল্প দিয়ে: মনোব্যাধির চিকিৎসক নতুন রোগীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন। ‘আপনি বলছেন আপনি এখানে এসেছেন’, তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কারণ আপনার পরিবারের সদস্যবৃন্দ আপনার মোজা আসক্তির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন?’ ‘হ্যাঁ তাই’, রোগী প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘আমি উলেন মোজা পছন্দ করি।’
‘কিন্তু সেটা তো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক’, চিকিৎসক এবারে বললেন, ‘অনেক লোকই তো তুলা বা নাইলনের মোজার চাইতে উলেন মোজা বেশি পছন্দ করেন। সত্যি বলতে কি, আমার নিজেরও উলেন মোজাই পছন্দ।’
‘তাই নাকি!’ রোগী উল্লসিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘তা তেল ও ভিনেগার নাকি শুধু লবণ আর লেবু দিয়ে?’
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Sunday, September 14, 2014
মহাসড়ক সমাচার by আতাউর রহমান
সম্প্রতি হাইওয়ে তথা মহাসড়ক দিয়ে নিজের গাড়িতে করে জন্মস্থান সিলেটে যাওয়া-আসার সময় কথাটা মনে পড়ল। সরকারি চাকরির সুবাদে বহু দেশ সফর করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে; কোথাও মহাসড়কের গোলচত্বরে দিকনির্দেশনাসংবলিত ফলকগুলোকে রাজনৈতিক পোস্টার ও বিজ্ঞাপন দিয়ে ঢেকে ফেলতে দেখিনি। এক জায়গায় চোখে পড়ল, দিকনির্দেশনার ফলকটি একটি চুলকানির ওষুধের বিজ্ঞাপন দিয়ে আবৃত। আমার মনে পড়ল, আমাদের ছোটবেলায় একবার গ্রামবাংলায় চুলকানির প্রাদুর্ভাব ঘটলে পল্লির চারণকবি গীত রচনা করেছিলেন: ‘ওগো সজনী, এবারকার বছর আইছে চুলকানি/ মায়ে চুলকান, বাপে চুলকান আরও চুলকায় চাকরানি/ ওগো সজনী, এবারকার বছর আইছে চুলকানি।’ এসব রোগ আমাদের দেশে এখন নির্মূলপ্রায়; কিন্তু এগুলোর তথাকথিত প্রতিষেধকের বিজ্ঞাপনের অত্যাচার থেকে বুঝি আর রেহাই পাওয়া গেল না।
সে যা-ই হোক। আজকাল প্রাইভেট কার, ট্রাক ও গণপরিবহনের যাতায়াত মহাসড়কগুলোতে ধারণাতীত বেড়ে গেছে। সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)–এর মাজারসংলগ্ন মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে প্রত্যক্ষ করা গেল উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মাজার জিয়ারতকারীদের নিয়ে আসা বাসের সুদীর্ঘ লাইন। এসব বাস ও ট্রাকের চালকেরা গোলচত্বরসমূহের দিকনির্দেশনামূলক ফলকগুলো আবৃত থাকায় ওগুলোতে দু-একবার চক্কর খেয়ে থাকবেন, এটা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে। আমি নিজেই এটার শিকার হয়েছি এবং একবার তো একজন পথচারী ভুল তথ্য দিয়ে আমাদের বিভ্রান্তই করে ফেলেছিল প্রায়। প্রসঙ্গত, বিদেশে সংঘটিত এ–সংক্রান্ত কিছু সরস ঘটনা মনে পড়ে গেল:
মহাসড়ক দিয়ে মোটরগাড়ি চালনাকালে জনৈক চালকের মনে সন্দেহ হওয়ায় তিনি পথিপার্শ্বস্থ বাড়ির দাওয়ায় উপবিষ্ট বৃদ্ধাকে প্রশ্ন করে সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে বেশ কিছুদূর এগোনোর পর গাড়ির আয়নায় প্রত্যক্ষ করলেন বৃদ্ধা তাঁকে হাতের ইশারায় ডাকছেন। তিনি গাড়ি নিয়ে ফিরে এসে বৃদ্ধার দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাতেই বৃদ্ধা এবার স্মিতহাস্যে বললেন, গৃহে অবস্থানরত আমার স্বামীকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনিও আপনার প্রশ্নের উত্তর জানেন না। বারান্তরে আরেক মোটরচালক পথ হারিয়েছেন সন্দেহ হওয়ায় পথিপার্শ্বস্থ শস্যক্ষেত্রে কর্মরত কৃষককে সড়কটির পরিচয় ও সেটা কত দূর পর্যন্ত গেছে জিজ্ঞেস করে না-বোধক উত্তর পাওয়ায় ঈষৎ উষ্মার ভাব দেখিয়ে যখন মন্তব্য করলেন, ‘আপনি দেখছি কিছুই জানেন না,’ তখন কৃষক ঝটপট জবাব দিল, ‘তা বটে, তবে আমি কিন্তু পথ হারাইনি।’
আরেক মোটরচালক নিজের গাড়িতে করে দেশভ্রমণে বেরিয়ে অনেক দূর যাওয়ার পর তাঁর ইচ্ছে হলো জায়গাটার নাম জানবেন। তিনি একজন পথচারীকে থামিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘বলতে পারেন, আমি কোথায় আছি?’ প্রত্যুত্তরে সে যা বলল তাতে তিনি একেবারে থ। ‘আমাকে বোকা বানাতে পারবেন না’, লোকটি আকর্ণবিস্তৃত হাসি হেসে বলল, ‘আপনি একটি গাড়ির ভেতরে আছেন।’ পরবর্তী ঘটনাটি প্রসঙ্গে জনৈক রসিক ব্যক্তির মন্তব্য ছিল: উত্তরটি একেবারে আমাদের দেশের সংসদীয় প্রশ্নোত্তরের মতো হয়েছে। প্রথমত, উত্তরটা টু দ্য পয়েন্ট হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি শব্দও বলা হয়নি। আর তৃতীয়ত, প্রশ্নকর্তা উত্তরের আগে যে অবস্থানে ছিলেন, ঠিক সেই অবস্থানেই রয়ে গেছেন।
তো মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের সংখ্যা ধারণাতীত বেড়ে গেছে বিধায় অচিরেই ওগুলোকে চার লেনে উন্নীত করে সড়ক-বিভাজক স্থাপন করা অত্যাবশ্যক। কেননা, আমাদের দেশের যানচালকদের মধ্যে স্বল্প পরিসরে ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। এভাবে সামনের গাড়িকে ডিঙ্গাতে গিয়েই বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসা কোনো মোটরযানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এবারকার সিলেটযাত্রায় আমার গাড়িচালক আর কী গাড়ি চালাল, চালালাম তো আমিই—সর্বক্ষণ তার পেছনে সতর্ক বসে থেকে নির্দেশ দিয়ে গেলাম, ‘আস্তে চালাও’, স্পিড আর বাড়িয়ো না’, ‘এখন ওবারটেক কোরো না,’ ইত্যাদি। ইংরেজিতে এটাকেই বুঝি বলে ‘ব্যাকসিট ড্রাইভার’!
আর মানলাম, আমাদের দেশের অধিকাংশ লোকই অশিক্ষিত ও গোঁয়ার, তাই তাঁরা সড়কদ্বীপগুলোকে ওভাবে কলুষিত করে থাকেন। কিন্তু সড়ক ও জনপথ বিভাগের মাঠকর্মীরা ও হাইওয়ে পুলিশ কি ভেরেন্ডা ভাজে? এগুলো দেখার দায়িত্ব তো তাদেরই, তাই নয় কি?
হাইওয়ে পুলিশের প্রসঙ্গে আরও দুটো মজার গল্প: এক বিলেতি সাহেব স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মহাসড়ক দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বেগে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হাইওয়ে পুলিশ আটকালে তিনি তর্ক জুড়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনাদের রাডারের যন্ত্রাংশে ত্রুটি থাকতে পারে।’ এই পর্যায়ে ওর স্ত্রী গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বের করে পুলিশের উদ্দেশে বলে বসলেন, ‘ওর কথায় কান দেবেন না, অফিসার। ও মদ খেয়ে গাড়ি চালালে এ রকম জেদি হয়ে যায়।’ আরেক মহিলা মহাসড়কে ৬০ মাইল বেগে গাড়ি চালানোয় হাইওয়ে পুলিশ তাঁর পিছু নিল। তিনি সেটা বুঝতে পেরে স্পিড আরও বাড়িয়ে পথে সার্ভিস স্টেশন পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করে তড়িঘড়ি নারীদের শৌচাগারে ঢুকে পড়লেন। খানিকক্ষণ পর বেরিয়ে এসে দুই মূর্তিমান পুলিশকে দেখে মহিলা বললেন, ‘আমি বাজি ধরতে পারি, আপনারা ভেবেছিলেন আমি টয়লেট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব না।’
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
Saturday, July 12, 2014
ইংরেজি ভাষার জ্ঞান! by আতাউর রহমান
সে যা হোক, সৌদি আরবে অবস্থানকালে আমি নিয়মিত সেখানকার সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক আরব নিউজ পড়তাম। তো একবার ওই পত্রিকায় ইংরেজি ভাষায় ব্যুৎপত্তিজনিত একটি সরস গল্প বেরিয়েছিল: রিয়াদের এক হাসপাতালে ডাক্তার সৌদি ও নার্স ইংরেজ। পাঁচ মিনিট আগে ডাক্তার দেখে গেছেন জনৈক রোগী কোমায়, একেবারেই চলনশক্তিরহিত। পাঁচ মিনিট পর নার্স দৌড়ে এসে তাঁকে জানালেন, ‘ডক্টর, ডক্টর, দ্য পেশেন্ট হ্যাজ কিকড দ্য ককেট।’ ‘কিক দ্য ককেট’—ইংরেজি একটি বাগ্ধারা, সেটা বাংলায় ‘পটোল তোলা’ তথা মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার সমতুল্য; এটা সৌদি ডাক্তারের জানা ছিল না। তাই তিনি কথাটাকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে সবিস্ময়ে নার্সকে ইংরেজিতে যা বললেন, সেটা বাংলায় ভাষান্তরিত করলে দাঁড়ায়, ‘পাঁচ মিনিট পূর্বে আমি রোগীকে মুমূর্ষু অবস্থায় রেখে এলাম। এই সামান্য সময়ের মধ্যে সে শরীরে এত শক্তি কোত্থেকে পেল যে বালতিকে লাথি মেরে ফেলে দিল?’
আর আরবি ভাষা খুব প্রাচীন ও প্রাচুর্যময়; অথচ আরবিতে বাংলা ‘প’ ও ইংরেজি ‘পি’র উচ্চারণ নেই। এ কারণে আরবদের উচ্চারণে ‘পাকিস্তান’ হয়ে যায় ‘বাকিস্তান’, ‘পার্কিং’ হয়ে যায় ‘বার্কিং’। তো এ নিয়েও একটি মজার গল্প আছে: জনৈক আরব পরিব্রাজক বিলেতে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে কর্তব্যরত পুলিশকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ক্যান আই বার্ক হিয়ার (আমি কি এখানে পার্ক করতে পারি)?’ বিলেতের পুলিশও রসিকতায় কম যায় না, সে একগাল হেসে জবাব দিল, ‘ইউ ক্যান বার্ক, এজ লং এজ ইউ লাইক, বাট ইউ কান্ট পার্ক হিয়ার।’ অর্থাৎ ‘আপনি, যতক্ষণ খুশি এখানে ঘেউ ঘেউ করতে পারেন, তবে এখানে পার্ক করতে পারবেন না।’
মাত্র ১৯ মাইল প্রশস্ত ইংলিশ চ্যানেলের দুই পাশে অবস্থিত দুই দেশ—ব্রিটেন ও ফ্রান্স। অথচ দুই দেশের ভাষায় বিস্তর ফারাক। তো এক ফ্রেঞ্চম্যান বিলেতে বেড়াতে গেছে। যথারীতি ইংরেজি ভাষায় তার দখল খুবই সীমিত। তার ইংরেজ বন্ধু তার সম্মানার্থে একটি নৈশভোজের আয়োজন করে তাকে বলল, তুমি তো জানো, ভোজ-উত্তর দাঁড়িয়ে কিছু বলা নিয়ম। তুমি শুধু বলবে ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফ্রম দ্য হার্ট অব মাই বটম’ অর্থাৎ ‘আপনাদের আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ।’ কিন্তু যথাসময়ে সে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যা বলল, তাতে উপস্থিত সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। সে বলে বসল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফ্রম দ্য হার্ট অব মাই বটর্ম, যেটার অর্থ দাঁড়ায় ‘আপনাদের আমার পায়ুপথ থেকে ধন্যবাদ।’
একই ব্যাপার জাপানিদের বেলায়ও প্রযোজ্য। জাপানিদের ইংরেজি ভাষায় ব্যুৎপত্তিও খুবই সীমিত। তো জনৈক জাপানি গিয়েছিল আমেরিকায়। যাওয়ার আগে সে শুনে গেছে, আটলান্টিক মহাসাগরে টাইটানিক জাহাজ ডুবে সহস্রাধিক যাত্রী মারা যাওয়ার জন্য দায়ী ছিল একটি আইসবার্গ।তাই আমেরিকায় গিয়ে জনৈক মি. গোল্ডবার্গের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটতেই সে বলে বসল, ‘ও, তাহলে আপনার কাজিন মি. আইসবার্গই বুঝি টাইটানিক জাহাজ ডুবিয়েছিল।’
ফিরে আসি নিজের দেশের কথায়। আমাদের দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গিয়েছিল’, এই বাক্যের ইংরেজি কী? প্রত্যুত্তরে ছেলেটি নাকি বলেছিল, ‘ইংরেজি কী, তা জানি না; তবে বাক্যটির আরবি জানি—‘আরবি হচ্ছে, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’
ছেলেটিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের দেশের এক প্রয়াত সিভিল সার্ভেন্ট নাকি সরকারি সফরে বিলেতে গিয়ে রাতে ডিনারের টেবিলে পাশে উপবিষ্ট মধ্যবয়সী ইংরেজ মহিলাকে আমাদের দেশীয় স্টাইলে ‘আপনার শইলটা কেমন’ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম, হাউ ইজ ইওর বডি টু-নাইট?’ আর সাম্প্রতিককালে জনৈক সচিব একটি জেলা পরিদর্শনে গেলে জেলা প্রশাসক তাঁকে সার্কিট হাউসে রেখে খাতির-যত্ন তো করলেনই, বিদায়লগ্নে বলে বসলেন, ‘স্যার, আপনাকে ভালোমতো হসপিটালাইজ করতে পারলাম না বলে দুঃখিত।’ সচিব সাহেব তদুত্তরে কী বলেছিলেন, সেটা জানা যায়নি; তবে জেলা প্রশাসক মহোদয় যে ইংরেজি ‘হসপিটালিটি’ (আতিথেয়তা) ও ‘হসপিটালাইজ’ (হাসপাতালে ভর্তি)—এ দুটো শব্দের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলেন, সেটা সহজেই অনুমেয়।
‘সিভিল সার্ভেন্ট’ বলতে মনে পড়ে গেল, সেবারে মালদ্বীপে গিয়ে শুনেছিলাম ‘সার্ভেন্ট’ ও ‘সার্পেন্ট’ নিয়ে বিভ্রান্তির গল্প: ইংরেজ টুরিস্ট প্রাচ্যের সাপের ভয়ে ভীত। কাজেই হোটেল রুমে প্রবিষ্ট হয়েই তিনি সামনে দাঁড়ানো বেল-বয়কে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখানে সার্পেন্ট আছে?’ উত্তর এল, ‘হ্যাঁ।’ এবারে প্রশ্ন, হোটেলের কামরায় আসে? উত্তর ‘হ্যাঁ’ আসে। আবারও প্রশ্ন, ‘কীভাবে আসে?’ উত্তর এল, ‘কলবেল টিপলেই আসে।’ এভাবে খানিকক্ষণ প্রশ্নোত্তরের পর বোঝা গেল, তিনি বোঝাচ্ছিলেন ‘সার্পেন্ট’ তথা সাপ; অপরদিকে বেল-বয় বুঝেছিল ‘সার্ভেন্ট’ তথা সেবক।
আর এবারে মালয়েশিয়ায় গিয়ে শুনলাম হোটেল ম্যানেজারের ইংরেজি ভাষাজ্ঞানের গল্প। হোটেলের লবিতে ইংরেজিতে নোটিশ টাঙানো, ‘দ্য ওয়াটার অব দিস হোটেল ইজ হানড্রেড পারসেন্ট পিওর। ইট হ্যাজ অল বিন পাসড বাই দ্য ম্যানেজার অব দ্য হোটেল।’
বলা বাহুল্য, ইংরেজি ভাষায় যথাযথ জ্ঞানের অভাবে ‘সার্টিফায়েড’-এর পরিবর্তে ‘পাসড’ শব্দটি লেখায় বোঝাচ্ছিল, হোটেলটির পানি ম্যানেজার মহোদয়ের প্রস্তাব বৈ আর কিছুই নয়।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







