Saturday, February 28, 2026

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আগ্রাসনে কি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আজ শনিবার সকালে যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়েছে। ইরানও পাল্টা জবাব দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক সংঘাতের মধ্যে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার হুমকি দূর করবে। একই সঙ্গে ইরানিদের জন্য তাঁদের শাসক উৎখাত করার সুযোগ তৈরি করবে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে পেন্টাগন জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন এ হামলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।

ইরান ও তার দীর্ঘদিনের শত্রুদের মধ্যে এ নতুন সংঘাত তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের আশাকে আরও ক্ষীণ করে তুলেছে।

১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকটের উল্লেখ ট্রাম্পের

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের বিরোধের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন, যেখানে ছাত্ররা ৫২ জন মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন ধরে জিম্মি করে রেখেছিল। এ ছাড়া ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে বিভিন্ন হামলার জন্য তিনি ইরানকে দায়ী করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সব জায়গায় বোমা পড়বে’। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন। এটি আপনাদেরই হবে। সম্ভবত পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এটিই আপনাদের একমাত্র সুযোগ।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে বেশ কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করেছে। আকাশ ও সমুদ্রপথে এ অভিযানের পরিধি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হওয়া যায়নি। তবে এক কর্মকর্তা জানান, এ অভিযান কয়েক দিন ধরে চলতে পারে।

তেহরানকে পারমাণবিক আলোচনায় নমনীয় করতে ট্রাম্প এ অঞ্চলে বিশাল মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ‘ব্যাপক ও চলমান’ অভিযান শুরু করেছে।

তেহরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে না পারে, তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার একটি বড় বাধা ছিল। ট্রাম্প বলেন, ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি। তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানি শাসনের “আসন্ন হুমকি” নির্মূল করে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা।’

ইরানিদের প্রতি ‘স্বৈরশাসনের জোয়াল’ সরানোর আহ্বান ইসরায়েলের

ইরানিদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন উগ্রবাদী ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এ যৌথ হামলা ‘সাহসী ইরানি জনগণের জন্য তাঁদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করবে’।

যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইরানের সব স্তরের মানুষের জন্য সময় এসেছে...স্বৈরশাসনের জোয়াল ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলার এবং একটি মুক্ত ও শান্তিকামী ইরান গড়ে তোলার।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তেহরানে নেই। তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এ হামলা হলো। ইরান যদি তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যায়, তবে আবারও হামলা করা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বারবার হুমকি দিয়ে আসছিল।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, ইসরায়েল রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে এবং হুমকি দূর করতে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ‘আগাম প্রতিরোধমূলক’ হামলা শুরু করেছে।

ইসরায়েল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরানে পবিত্র রমজান মাসে এ হামলা চালিয়েছে। আবার এ হামলা ইহুদি সম্প্রদায়ের উৎসব ‘পুরিম’-এর ঠিক আগে করা হলো। পুরিম উৎসব প্রাচীন পারস্যে (বর্তমান ইরান) ইহুদিদের ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে ফেরার স্মৃতিতে পালন করা হয়, যা আগামী সোমবার শুরু হতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক মাসের পরিকল্পনা

ইসরায়েলের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করে কয়েক মাস ধরে এ অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। হামলার তারিখ কয়েক সপ্তাহ আগেই ঠিক করা হয়েছিল।

আজ তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে পুরো ইসরায়েলে সাইরেন বেজে ওঠে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলছে, সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য জনগণকে প্রস্তুত রাখতে এ আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জরুরি খাত বাদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে উপস্থিতি বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া আকাশপথ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। বেসামরিক ফ্লাইটের জন্য ইসরায়েল তাদের আকাশপথ বন্ধ করে দিয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জনগণকে বিমানবন্দরে না যেতে অনুরোধ করেছে।

কয়েক দশকের পারমাণবিক বিরোধ কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করতে পারে, এমন সামরিক সংঘাত এড়াতে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার আলোচনা শুরু করেছিল।

তবে উগ্রবাদী নেতানিয়াহু সরকার বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যেকোনো চুক্তিতে তেহরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করার শর্ত থাকতে হবে। শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করলে হবে না। তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের জন্যও ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।

ইরান বলেছিল, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে তারা ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি এর সঙ্গে যুক্ত করতে রাজি হয়নি।

তেহরান আরও বলেছিল, যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে তারা নিজেদের রক্ষা করবে। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করেছিল, যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেখান থেকে হামলা হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানবে।

গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় যোগ দিয়েছিল, যা ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ।

তেহরান তখন কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি আল–উদাইদ বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পাল্টা জবাব দিয়েছিল।

পশ্চিমা শক্তিগুলো দাবি করে আসছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম হতে পারে। যদিও তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কথা অস্বীকার করে আসছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-28%2F1bvoc597%2Firan-israel-us-conflict-070728.jpg?rect=0%2C0%2C6061%2C4041&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানের রাজধানীর আকাশে ধোঁয়া। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, তেহরান। ছবি: এএফপি

অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে নজর ঘোরাতেই কি পাকিস্তান–আফগানিস্তান সংঘাত by শুভজিৎ বাগচী

সপ্তাহখানেক আগে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে শুরু হওয়া লড়াই এখন বড় আকার ধারণ করেছে। গত অক্টোবরে এই দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতকে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা ‘মিনি ওয়ার’ বা নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তবে ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হওয়া বর্তমান লড়াই এতটাই তীব্র যে একে তাঁরা এখন ‘ওপেন ওয়ার’ বা প্রকাশ্য যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করছেন।

কারণ, এই লড়াই এখন আর শুধু পদাতিক বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের অন্তত তিনটি শহরে পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে আফগানিস্তান। আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা পাকিস্তানের ভেতরে একাধিক সামরিক স্থাপনায় আঘাত করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একের পর এক জঙ্গি হামলা। বিশেষ করে ইসলামাবাদের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং বাজৌরে সেনাচৌকিতে হামলা। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার যে প্রচেষ্টা তৃতীয় কয়েকটি দেশ শুরু করেছিল, এই হামলার ফলে সেগুলোও ব্যর্থ হয়। শুরু হয় ‘ওপেন ওয়ার’।

পাকিস্তানের দাবি, কাবুল আফগান তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, যারা সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। এরপর আফগানিস্তানের ভেতরে গিয়ে তারা আশ্রয় নিচ্ছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দিয়ে জঙ্গিরা পাকিস্তানে প্রবেশ করছে।

পাকিস্তানের বরাবরের বক্তব্য, ১৮৯৩ সালে এই সীমান্ত (ডুরান্ড লাইন নামেও পরিচিত) নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত। পরিবর্তন করার কোনো উপায় নেই। অন্যদিকে আফগানরা এই সীমান্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয় না। এর কারণ, ১৮ শতকের মাঝামাঝি আফগান সাম্রাজ্য বর্তমান পাকিস্তানের পূর্ব দিকেও বিস্তৃত ছিল। অবশ্য সে সময় পাকিস্তানের জন্ম হয়নি। আফগানদের দাবি, ওই অংশ তাদের।

পাকিস্তানকে যদি এই দাবি মেনে নিতে হয়, তাহলে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ আফগানিস্তানের হাতে তুলে দিতে হয়, বেলুচিস্তানেরও কিছুটা চলে যায়। এটা পাকিস্তানের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এই নিয়েই লড়াই। পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের যখন সম্পর্ক ভালো থাকে, তখন সীমান্ত নিয়ে বিবাদ সামনে আসে না। বর্তমানে পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে ঠেকেছে।

সম্পর্কের সর্বশেষ এই অবনতির শুরুটা গত বছরের অক্টোবর মাসে আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের পর থেকে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতিকে সার্বিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন আফগানিস্তান-পাকিস্তান সংঘাত বিশেষজ্ঞরা।

কাবুলে আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। আফগানিস্তানের একটি সরকারি সূত্র এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, এ কথা যেমন ঠিক যে কিছু আফগান তালেবান আফগানিস্তানে আছে, তেমনি এটাও ঠিক যে প্রধানত পাকিস্তানের বসবাসকারী তালেবান বা পাকিস্তানি তালেবানরা এই হামলা মূলত চালাচ্ছে।

২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান পূর্ব আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাকতিতায় টিটিপি আস্তানা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। এর প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবান পাল্টা স্থল অভিযান শুরু করে এবং দাবি করে যে তারা পাকিস্তানের বেশ কিছু সামরিক চৌকি দখল করেছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সাধারণভাবে বক্তব্য, বিভিন্ন দেশ অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে জনগণের নজর ঘোরাতে বাইরের শত্রুর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে পাকিস্তান একাধিক অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে রয়েছে, সেই কারণে তারাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে।

তালেবান কাবুলে ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পর্যায়ে হামলা (টিটিপি ও বালুচ স্বাধীনতাকামী) বেড়েছে। পাকিস্তানের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের বক্তব্য, এর পেছনে ভারতের ভূমিকা রয়েছে। এই বক্তব্যকে ভারত সব সময় ভিত্তিহীন বলেছে। পাকিস্তানের ভেতরে ২০২২ সালে ইমরান খানকে সরানো, জেলে রাখা নিয়ে এবং তাঁর ওপর অত্যাচারের অভিযোগ নিয়ে পাকিস্তান সরকার অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে সে দেশের মানুষের নজর সরাতেও নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে। পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদের একটা হাওয়া তৈরি করেছে অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরাতে।

অন্যদিকে সেই একই কথা আফগানিস্তান সম্পর্কেও খাটে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ২০২৬ সালের আগস্টে পাঁচ বছর পূর্ণ করবে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা তারা কিছুটা সংহত করতে পেরেছে। আত্মঘাতী হামলা, বোমা বিস্ফোরণ বা সংখ্যালঘুদের ওপর সরাসরি আক্রমণ প্রায় হচ্ছে না। কিন্তু মৌলিক সমস্যাগুলো তারা সমাধান করতে পারেনি, যার অন্যতম ভঙ্গুর অর্থনীতি। আফগানিস্তানের অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ।

প্রতি মার্কিন ডলার সমান ৬৬ আফগানির মুদ্রা হলেও তা দিয়ে অর্থনীতির চেহারা বোঝা সম্ভব নয়। অর্থনীতির সার্বিক উন্নতি হচ্ছে না। চরম দারিদ্র্য, বিশেষত খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে, যুবকদের অধিকাংশই কর্মহীন, তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিত্যনতুন আইন প্রণয়ন করছে সরকার, যার অধিকাংশই দমনমূলক এবং অনেক ক্ষেত্রে তা নারীদের বিরুদ্ধে। উত্তর আফগানিস্তানে উজবেক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরকারের ছোটখাটো সংঘাত চলছে। এটাও কাবুলকে চাপে রাখছে।

এই অবস্থায় এখন একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হলে তালেবান নেতৃত্বাধীন ইসলামি আমিরাতের সরকারের কিছুটা সুবিধাই হয়। আফগান সরকারের তরফে অবশ্য অভিযোগ করা হয়েছে যে তারা বারবার ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটাতে চেয়েছিল, যা ইসলামাবাদ চায়নি। দুই দেশের মধ্যে অবশ্য গত কয়েক মাসে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে, অন্তত ছয়টি দেশের মধ্যস্থতায়। কিন্তু গতকাল শুক্রবার বিকেলে এই যাবতীয় মধ্যস্থতা ব্যর্থ হয়েছে বলেই ধরে নিতে হচ্ছে।

রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি তালেবান সেনাদের। গতকাল আফগানিস্তানের তোরখাম সীমান্তে
রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি তালেবান সেনাদের। গতকাল আফগানিস্তানের তোরখাম সীমান্তে। ছবি: রয়টার্স

এপস্টিন ফাইলে দালাই লামার নাম যেভাবে কাজে লাগাচ্ছে চীন by তেনজিন ডালহা

চীনের প্রোপাগান্ডা ওয়ার বা তথ্যযুদ্ধ এখন আর কেবল প্রচলিত প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি রূপ নিয়েছে সুসংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক বয়ান নিয়ন্ত্রণের কৌশলে। ডিজিটাল নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি কনটেন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌশলী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বেইজিং আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে পরিশীলিত তথ্যযুদ্ধের একটি গড়ে তুলেছে। বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রচেষ্টা এখন চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। লক্ষ্য একটাই—কর্তৃত্ববাদী শাসনকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ধীরে ধীরে বাস্তবতাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা।

এই অভিযানের একটি প্রধান লক্ষ্য তিব্বত এবং বিশেষ করে দালাই লামা। চীনের তথ্য অভিযান তিব্বতি সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে দিতে চায় এবং জোরপূর্বক একীভূতকরণকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ তাদের ২০২৪ সালের এশিয়া–প্যাসিফিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা মূল্যায়নে এসব উদ্যোগকে একটি পরিকল্পিত ‘কূটকৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই কৌশলের উদ্দেশ্য সমাজের ভেতরের বিভাজনকে কাজে লাগানো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা দুর্বল করা এবং প্রকাশ্য ও গোপন নানা পদ্ধতিতে চীনের ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়া।

এই প্রেক্ষাপটে জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত আদালতের নথিতে দালাই লামার নাম ৬৯ থেকে ১৬৯ বার আছে বলে যে দাবি সম্প্রতি ভাইরাল হিসেবে, তা আধুনিক তথ্যযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এই সংখ্যা কোনো যাচাইকৃত আইনি বিশ্লেষণ থেকে আসেনি। এটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট থেকে ছড়িয়েছে। তবু স্বাধীন তথ্য যাচাইকারী ও আইন বিশ্লেষকেরা নথি পর্যালোচনা করে বারবার ভুয়া প্রমাণ করার পরও দাবিটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

নথিগুলোর বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, এপস্টিন দালাই লামার সঙ্গে যোগাযোগ করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু সেই আগ্রহ বাস্তবে পূরণ হয়েছিল এমন কোনো প্রমাণ নেই। দালাই লামার নাম যেসব জায়গায় এসেছে, সেগুলো মূলত গণহারে পাঠানো নিউজলেটার, প্রশাসনিক যোগাযোগ তালিকা বা তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে আলাপচারিতার প্রসঙ্গে। কোথাও ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ, আর্থিক সম্পর্ক বা এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে দালাই লামার কোনো সম্পৃক্ততা থাকার প্রমাণ নেই। তথাকথিত ১৬৯টি উল্লেখের বড় একটি অংশ আসলে একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি।

তবু অভিযোগটি ছড়িয়েছে। এর কারণ ডিজিটাল তথ্যপরিবেশের একটি বড় দুর্বলতা। নির্দিষ্ট সংখ্যা ব্যবহার করলে তা বিশ্বাসযোগ্যতার ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে, যদিও প্রেক্ষাপট অনুপস্থিত থাকে। এমন পরিবেশে যাচাইয়ের জায়গা নেয় বারবার পুনরাবৃত্তি।

সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে, যখন দালাই লামা তাঁর স্পোকেন ওয়ার্ড অ্যালবামের জন্য গ্র্যামি পুরস্কার পান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কারটিকে ‘চীনবিরোধী রাজনৈতিক অপচেষ্টা’ বলে নিন্দা জানায়। তিব্বতি পরিচয় বা নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে অতীতেও এমন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

এর আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালে একটি তিব্বতি সাংস্কৃতিক অভিবাদন ভঙ্গিকে তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনলাইনে অশোভন আচরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়ায়। পরে তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি গবেষকেরা এই ব্যাখ্যাকে বিকৃত বলে স্বীকার করেন।

এপস্টিন–সংক্রান্ত বয়ানটির বিশেষত্ব হলো এর বিস্তার ও সমন্বয়। ডিজিটাল ভুয়া তথ্য গবেষক ও ওপেন সোর্স অনুসন্ধানকারীরা দেখেছেন, এতে অস্বাভাবিক আচরণের স্পষ্ট ছক রয়েছে। হঠাৎ তৈরি হওয়া নতুন অ্যাকাউন্ট, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা প্রোফাইলের একসঙ্গে সক্রিয় হওয়া এবং একেবারে একই বা প্রায় একই বার্তা একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হিসেবে। অনেক অ্যাকাউন্ট নিজেদের পশ্চিমা ব্যবহারকারী হিসেবে তুলে ধরেছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি প্রোফাইল ছবি বা চুরি করা পরিচয় ব্যবহার করেছে। এসব কৌশল আগে থেকেই চীন-সম্পর্কিত প্রভাব বিস্তার অভিযানে নথিভুক্ত।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও এতে ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম সিজিটিএন প্রথম দিকেই বিভ্রান্তিকর ‘১৬৯ বার’ সংখ্যাটি তুলে ধরে। এতে দাবিটি একধরনের সাংবাদিক বৈধতা পায় এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যেন স্বতঃস্ফূর্ত বলে মনে হয়।

তথ্যযুদ্ধ নিয়ে গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, এই পদ্ধতিতে প্রথমে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বয়ানের ভিত্তি তৈরি করে, পরে সমন্বিত অনলাইন নেটওয়ার্ক সেটিকে দৃশ্যমান করে তোলে।

এই ঘটনাগুলো তিব্বত নিয়ে চীনের বহির্মুখী বয়ান ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারের সঙ্গেই মিলে যায়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লাসায় তিব্বত ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন সেন্টার চালু করে বেইজিং। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, এর কাজ হলো তিব্বত নিয়ে বিদেশি বয়ান ও গল্প বলার একটি নিজস্ব কাঠামো গড়ে তোলা। এটি প্রতিক্রিয়াশীল প্রচার থেকে সক্রিয় বয়ান প্রকৌশলের দিকে স্পষ্ট সরে আসার ইঙ্গিত দেয়।

এই ধরনের অভিযানের লক্ষ্য একক কোনো তথ্য বিশ্বাস করানো নয়। বরং বিতর্কের সঙ্গে নাম জুড়ে দিয়ে নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষয় করা। তথ্যের ভিড়ে কাছাকাছি থাকাই সন্দেহ হয়ে ওঠে এবং পুনরাবৃত্তিই স্মৃতিতে রূপ নেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহই হয়ে ওঠে ফলাফল। তিব্বতি জনগোষ্ঠীর জন্য এটি কেবল রাজনৈতিক দমন নয়। এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের গল্প বলার সক্ষমতা এবং মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক টিকে থাকার প্রশ্নে নৈতিক অবস্থান বজায় রাখার ওপর সরাসরি আঘাত।

গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর জন্যও ঝুঁকি কম নয়। উন্মুক্ত তথ্যব্যবস্থা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা না থাকা শক্তিগুলোর কাছে বিশেষভাবে দুর্বল। যখন কৃত্রিমভাবে তৈরি প্রচার বাস্তব জনমতের মতো দেখাতে পারে, তখন প্রকৃত উদ্বেগ আর সংগঠিত হস্তক্ষেপ আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইন প্রভাব বিস্তার নিয়ে গবেষকেরা বারবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

দালাই লামার বিরুদ্ধে চীনের এই অভিযান দেখায়, ঘরোয়া বয়ান নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে এসে এখন বৈশ্বিক ডিজিটাল পরিসরে বৈধতা নিয়েই লড়াই চলছে।

এপস্টিন নথির ঘটনা কোনো জবাবদিহির চেষ্টা নয়। এটি ছিল বয়ান নিয়ন্ত্রণের একটি উদাহরণ, যেখানে তুচ্ছ ও প্রসঙ্গবহির্ভূত উল্লেখকে ইচ্ছাকৃতভাবে বড় করে দেখিয়ে সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হিসেবে। গুরুত্ব নথিতে কী আছে, তা নয়। গুরুত্ব হলো কীভাবে কর্তৃত্ববাদী শক্তি গণতান্ত্রিক তথ্যব্যবস্থার খোলা দরজা ব্যবহার করে সামান্য সংযোগকে স্থায়ী সন্দেহে রূপ দেয়। এ ধরনের অভিযান যদি চিহ্নিত না হয়, তবে প্রমাণ নয়, বরং তৈরি করা বিতর্কই ভবিষ্যতে মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক বৈধতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ধারণা গড়ে দেবে।

* তেনজিন ডালহা, চীনের সাইবার নিরাপত্তা নীতি, নজরদারি ব্যবস্থা এবং তিব্বতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গতিবিধি গবেষক
- দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

দালাই লামা
দালাই লামা। ফাইল ছবি

ট্রাম্পবিরোধী আন্দোলন কি ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে

সিএনএন, বিশ্লেষণঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে যা খুশি তা–ই করার অধিকার আমার আছে।’ তবে ট্রাম্পের সেই দিন এখন আর আগের মতো যাচ্ছে না। সব সময় আর নিজের ইচ্ছা খাটাতে পারছেন না তিনি।

ট্রাম্প অবশ্য এখনো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার বাসনা ছাড়েননি। তবে এখন তিনি প্রতি পদক্ষেপে ছোট ছোট কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছু প্রতিরোধের মুখে পড়তে শুরু করেছেন।

প্রতি সপ্তাহেই ট্রাম্পের প্রতি মানুষের ভয় একটু একটু করে কমছে। এমনকি নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের মধ্যেও এখন জড়তা কাটতে শুরু করেছে। তিনি এখন রাজনৈতিক তৎপরতা, আদালত, সাধারণ নাগরিক এবং নির্বাচনী রাজনীতির ক্ষেত্রেও বাস্তবতার মুখোমুখি। তাঁর প্রিয় কিছু নীতি ও ব্যক্তিগত লক্ষ্যকে অনেকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন।

ট্রাম্পের পিছুটান

গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প প্রশাসনের ‘বর্ডার জার’ টম হোম্যান মিনেসোটা থেকে হাজারো ফেডারেল কর্মকর্তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, চার হাজারের বেশি গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায় থেকে এমন আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে সরে আসা একধরনের পিছু হটাই বলা যায়। রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি নামে দুই মার্কিন নাগরিককে হত্যার ঘটনায় চলা ব্যাপক বিক্ষোভ ও জনরোষের মুখেই এমন সিদ্ধান্ত এল। মূলত মিনেসোটাতে ট্রাম্পের শুদ্ধি অভিযানের রাজনীতি আর টেকসই হচ্ছিল না।

মিনেসোটার ডেমোক্রেটিক গভর্নর টিম ওয়ালজ একে ‘নজিরবিহীন আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে এর অবসানের ঘোষণা দেন। এই সংঘাতের ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওয়ালজ বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা বলা এখন নিরাপদ যে পুরো দেশ আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। কারণ, আমরা দেখিয়েছি ন্যায়ের পক্ষে কীভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়।’

বড় বাধা আদালত

ট্রাম্পের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পথে আদালতও এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কিছু বড় সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষেই গেছে। গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের একটি আদালত নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন ও অ্যারিজোনার ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলির বিরুদ্ধে আনা ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কেলিকে শাস্তি দেওয়ার এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

এক বিবৃতিতে কেলি বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন আমাকে শাস্তি দিতে বা অন্যদের মুখ বন্ধ করতে যত কঠোরভাবেই লড়াই করুক না কেন, আমি তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলব। এটি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ এর আগে একটি গ্র্যান্ড জুরিও কেলি ও অন্য পাঁচ ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের আনা অভিযোগপত্র গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।

ট্রাম্পের বিরোধিতা

কানাডার ওপর ট্রাম্পের চাপানো শুল্ক বাতিলের পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন ছয় রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা। তাঁদের এই পদক্ষেপ মূলত ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির ফলে ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে দলের ভেতরে থাকা উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ।

এর পাশাপাশি হাউস স্পিকার মাইক জনসনের একটি প্রচেষ্টাও ব্যর্থ করে দিয়েছেন তিন রিপাবলিকান সদস্য। জনসন চেয়েছিলেন ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো ভোটাভুটির পথ বন্ধ করতে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও দেশটির মিত্ররা এখন ট্রাম্পকে ছাড়াই চলার পথ খুঁজছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বিশ্বের মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে বড় শক্তিগুলোর দাদাগিরির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন।

ট্রাম্পের ক্ষমতা

দেশের অভ্যন্তরে ট্রাম্পের প্রতাপ এখনো প্রবল। গত বৃহস্পতিবার তিনি পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নিজের সেই শক্তিরই মহড়া দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ওবামা এবং বাইডেন প্রশাসনের জলবায়ুবিষয়ক অর্জনগুলোকে কার্যত ধূলিসাৎ করে দেবে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করতে মার্কিন বাহিনীর দুঃসাহসিক অভিযানই প্রমাণ করে, ট্রাম্পের হাতের মুঠোয় কতটা ক্ষমতা রয়েছে। দলের ভেতরে ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ এখনো অটুট।

ট্রাম্পবিরোধীদের এই ছোট ছোট জয় হয়তো স্বল্প মেয়াদে তাঁর ক্ষমতাকে টলাতে পারবে না। তবু ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত নিজেদের অথবা নিজ এলাকার ভোটারদের স্বার্থ রক্ষায় অনেক আইনপ্রণেতাই হয়তো প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন। বর্তমানে জরিপগুলোতে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার নিম্নমুখী অবস্থান বিরোধীদের আরও উৎসাহিত করছে। সিএনএনের সব জরিপের গড়ে ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা এখন ৩৯ শতাংশে আটকে আছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

নরসিংদীতে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নূরা গ্রেপ্তার

নরসিংদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর এক কিশোরীকে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাকে (২৮) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ শুক্রবার রাত ৯টার দিকে গাজীপুরের মাওনা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সদর উপজেলার মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিলপাড় ও দড়িকান্দীর মধ্যবর্তী একটি শর্ষেখেত থেকে ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে ৯ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২-৩ জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা করেন ওই কিশোরীর মা।

মামলার এজাহারে নামোল্লেখ করা ৯ জন আসামি হলেন, নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা (২৮), এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), মো. গাফফার (৩৭), আহাম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), ইমরান দেওয়ান (৩২), ইছহাক ওরফে ইছা (৪০), আবু তাহের (৫০) ও মো. আইয়ুব (৩০)। আহাম্মদ আলী দেওয়ান মহিষাশুড়া ইউপির সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি। তাকেসহ পাঁচ আসামিকে এই বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাকি চারজন হলেন ইমরান দেওয়ান, এবাদুল্লাহ, আইয়ুব ও গাফফার।

এদিকে অভিযোগ ওঠার পর আহাম্মদ আলী দেওয়ানকে দলীয় প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব ধরনের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে সদর উপজেলা বিএনপির এক নোটিশে এই তথ্য জানানো হয়। সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু সালেহ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত নোটিশে উল্লেখ করা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় আহাম্মদ আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

মামলার এজাহারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত নূরা নামের এক তরুণের সঙ্গে কিশোরীর কথাবার্তা ছিল। ১৫ দিন আগে নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন তরুণ কিশোরীকে তুলে নেয়। তখন তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। এ ঘটনার বিচারের জন্য কিশোরীর পরিবার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহাম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে যায়। তবে পরিবারটি বিচার পায়নি। সাবেক ইউপি সদস্যের কাছে অভিযোগ করায় নূরাসহ সংশ্লিষ্ট তরুণেরা ক্ষুব্ধ হন।

এমন পরিস্থিতিতে গত বুধবার রাতে মেয়েকে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন বাবা। পথে বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ছয় তরুণ বাবার কাছ থেকে কিশোরীকে অপহরণ করে নিয়ে যান। রাতভর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও মেয়েটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বিলপাড় ও দড়িকান্দী এলাকার মাঝামাঝি একটি শর্ষেখেতে কিশোরীর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে মাধবদী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।

কিশোরীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ধর্ষণের বিচারের দায়িত্ব নিয়ে আহম্মদ আলী দেওয়ান অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা করে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং কোনো বিচার না করেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। পাশাপাশি কিশোরীর পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে চাপ দেন। বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর জেরেই গত বুধবার রাতে বাবার সামনে থেকে কিশোরীকে অপহরণের পর শর্ষেখেতে নিয়ে হত্যা করা হয়।

গ্রেপ্তার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা
গ্রেপ্তার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা। ছবি: পুলিশের সৌজন্যে

শুধু পুলিশের বাড়িতে চুরি করতেন তিনি

ভারতের মধ্যপ্রদেশের খান্ডওয়া জেলায় ধরা পড়েছেন অদ্ভুত এক ‘চোর’। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে তিনি শুধু পুলিশের বাড়িতে চুরি করে আসছিলেন। কারণ হিসেবে পুলিশ বলছে, ১৫ বছর আগের এক ঘটনার ক্ষোভ তাঁকে এমন পথে ঠেলে দিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম দীপেশ। তাঁর বাড়ি আলিরাজপুর জেলায়। গত ২০ জানুয়ারি খান্ডওয়ার পুলিশ লাইনে চুরির ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়েই তাঁর খোঁজ মেলে। সেদিন গভীর রাতে কনস্টেবল করণপাল সিং ও সুরেশ খাটের বাড়িতে চুরি হয়। কয়েক লাখ টাকার গয়না ও নগদ অর্থ খোয়া যায়।

ঘটনার পর পুলিশ লাইনের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়। সেখান থেকে সন্দেহভাজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে অভিযান চালিয়ে দীপেশকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ও কিছু গয়না উদ্ধার করা হয়।

তদন্তকারীরা জানান, দীপেশ দীর্ঘদিন ধরে বারবার স্থান বদল করছিলেন, যাতে পুলিশ তাঁকে ধরতে না পারে। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে ঝাবুয়া, আলিরাজপুর ও ধর জেলায় তল্লাশি চালানো হয়। প্রযুক্তিগত তথ্য ও নজরদারির ভিত্তিতে জানা যায়, তিনি বুরহানপুরের দিকে যাচ্ছেন।

পুলিশ যখন দীপেশকে ধরতে যায়, তখন তিনি একটি বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এতে তাঁর হাত ও পায়ে আঘাত লাগে। আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে খান্ডওয়া আদালতে তোলা হলে তাঁকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়।

খান্ডওয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহেন্দ্র তারনেকর এই গ্রেপ্তারকে বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে আরও কয়েকটি ঘটনার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত অন্য সহযোগীদের খোঁজও চলছে।

পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে দীপেশ স্বীকার করেছেন, তিনি চুরির জন্য শুধু পুলিশ সদস্যদের বাড়ি নিশানা করতেন। কারণ, হিসেবে তিনি ১৫ বছর আগের এক ঘটনার কথা বলেন। তখন আলিরাজপুরে এক পুলিশ সদস্য তাঁকে মারধর করেছিলেন। সেই ঘটনার পর থেকে তাঁর মনে ক্ষোভ জন্মায়।

খান্ডওয়ার কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রবীণ আর্য জানান, দীপেশ নাকি চুরির আগে ছদ্মবেশ ধারণ করতেন। কখনো রাস্তার ফেরিওয়ালা সেজে পুলিশ লাইনের আশপাশে ঘোরাফেরা করতেন। পরিস্থিতি বুঝে রাতের অন্ধকারে বাড়িতে ঢুকে পড়তেন। এ ঘটনায় রমেশ ও ভুরালিয়া নামের আরও দুজনকে খোঁজা হচ্ছে। তাঁরা পলাতক বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি। এআই/প্রথম আলো

পাকিস্তান-আফগানিস্তান কী কারণে ‘যুদ্ধ’ করছে, এটা কি অনিবার্য ছিল

প্রকাশ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সীমান্ত এলাকায় বেশ কিছু দিন ধরে থেমে থেমে সংঘর্ষ হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ দেশটির অন্য কয়েকটি শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।

আজ শুক্রবার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের ওপর ইসলামাবাদের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে। পাকিস্তান এখন থেকে ‘কার্যত যুদ্ধাবস্থা’ নামবে।

এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে তালেবানের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ একটি বক্তব্য দেন। তিনি অভিযোগ করেন, দুই দেশকে বিভক্তকারী ‘ডুরান্ড লাইন’ বরাবর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগানিস্তান ‘বড় আকারের সামরিক অভিযান’ চালাচ্ছে।

উভয় দেশের সীমান্তজুড়ে কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষের পর এই পরিস্থিতি তৈরি হলো। দুই পক্ষই দাবি করেছে, এই সংঘর্ষে এরই মধ্যে কয়েক শ মানুষ নিহত হয়েছেন।

২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের এই শত্রুতা ও সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আসলে কী ঘটেছে

আজ পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বলেছেন, আফগান বাহিনী সীমান্তের কাছাকাছি সামরিক অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা শুরু করে। রাজধানী কাবুলসহ অন্যান্য শহরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।

আল-জাজিরার সংবাদদাতা নাসের শাদিদ জানান, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে পাকিস্তান প্রথম হামলা চালায়। জবাবে আফগান বাহিনী বিমানবিধ্বংসী গোলাবর্ষণ করে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন আমাদের ও আপনাদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলো।’

পাকিস্তান এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’।

আফগানিস্তানের কোথায় পাকিস্তান হামলা চালাল

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার এক্সে লিখেছেন, রাজধানী কাবুল, দক্ষিণ-পূর্বের পাকতিয়া প্রদেশ এবং দক্ষিণের কান্দাহারে ‘আফগান তালেবানের প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, পাকিস্তান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ‘কার্যত যুদ্ধাবস্থায়’ রয়েছে।

আফগান সরকারের মুখপাত্র মুজাহিদ এক্সের একটি পোস্টে এই তিন প্রদেশে হামলার খবর নিশ্চিত করেছেন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, হামলায় আফগানিস্তানের দুটি ব্রিগেড ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন ঊর্ধ্বতন পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পাকিস্তান টিভি এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, তাদের বাহিনী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তালেবানের বেশ কিছু অবস্থান ‘গুঁড়িয়ে’ দিয়েছে।

ওই সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, আফগানিস্তানে আক্রান্ত স্থানগুলোর মধ্যে কান্দাহারের একটি তালেবান ব্রিগেড সদর দপ্তর ও গোলাবারুদ ডিপো রয়েছে। এ ছাড়া ওয়ালি খান সেক্টর, শাওয়াল সেক্টরের পার্শ্ববর্তী এলাকা, বাজাউর সেক্টর এবং আঙ্গুর আড্ডার তালেবান চৌকিতেও হামলা চালানো হয়েছে।

পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বেশ কিছু জেলায়ও আফগান তালেবান বাহিনীকে লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে। জেলাগুলো হলো চিত্রল, খাইবার, মোহমান্দ, কুররাম এবং বাজাউর।

আজ বিকেলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ তোরখাম সীমান্ত পারাপারের কাছে গোলাবর্ষণ ও বন্দুকযুদ্ধের খবর পাওয়া গেছে।

ইসলামাবাদ থেকে আল-জাজিরার কামাল হায়দার এবং বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আজ সকালে সীমান্ত পারাপারের কাছে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। আফগান সেনারা সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।

গত অক্টোবর থেকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে লড়াইয়ের কারণে স্থলসীমান্ত অনেকটা বন্ধ রয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তান থেকে বিপুলসংখ্যক আফগানিস্তানের নাগরিকের ফেরার জন্য তোরখাম ক্রসিংটি খোলা রাখা হয়েছে।

হতাহতের বিষয়ে যা জানা যাচ্ছে

উভয় পক্ষের দেওয়া হতাহতের তথ্যে ব্যাপক গরমিল রয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি আজ ভোরে এক্সে লিখেছেন, সকালের হামলায় আফগান তালেবানের ১৩৩ সদস্য নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। তিনি আরও জানান, তালেবানের ২৭টি চৌকি ধ্বংস এবং ৯টি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এ ছাড়া ৮০টির বেশি ‘ট্যাংক, কামান ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সাঁজোয়া যান ধ্বংস করা হয়েছে’।

ডন জানিয়েছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চলমান ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’ অভিযানে এখন পর্যন্ত ২৭৪ জন আফগান তালেবান সেনা ও ‘খারিজি’ জঙ্গি নিহত হয়েছেন। আজ ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী এ তথ্য জানিয়েছেন।

শরিফ চৌধুরী আরও বলেন, অভিযানে ৪ শতাধিক আফগান সেনা আহত হয়েছেন। এ ছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় তালেবানদের ৭৩টি চৌকি ধ্বংস হয়েছে এবং ১৭টি চৌকি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী আফগান বাহিনীর অন্তত ১১৫টি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং কামানের গোলা (আর্টিলারি) ধ্বংস করা হয়েছে।

অন্যদিকে তালেবান সরকার জানিয়েছে, তাদের মাত্র ৮ জন যোদ্ধা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন।

আফগানিস্তান জানিয়েছে, গত রোববার আফগান সীমান্তের ভেতরে পাকিস্তানের হামলার প্রতিবাদে তারা শুক্রবার ভোরে সীমান্তজুড়ে পাকিস্তানি ঘাঁটি ও চৌকিতে পাল্টা হামলা শুরু করে। তাদের দাবি, আফগান বাহিনী ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে এবং দুটি সামরিক ঘাঁটি ও ১৯টি চৌকি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। পাকিস্তান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

গত রোববারের বিমান হামলার পর পাকিস্তান দাবি করেছিল, তারা অন্তত ৭০ জন ‘জঙ্গি’ হত্যা করেছে। তবে সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তালেবান মুখপাত্র মুজাহিদ এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ কয়েক ডজন মানুষ হতাহত হয়েছে।

নঙ্গরহার প্রদেশের আফগান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রাদেশিক পরিচালক মৌলভি ফজল রহমান ফাইয়াজ জানান, রোববারের হামলায় ১৮ জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বর্তমানে কোনো দাপ্তরিক পদে না থাকলেও তিনি এখনো বেশ প্রভাবশালী। তিনি বলেছেন, দেশবাসী ‘যেকোনো পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ থেকে প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা করবে এবং সাহসের সঙ্গে আগ্রাসনের জবাব দেবে’।

আজ শুক্রবার এক পোস্টে কারজাই আরও লিখেছেন, ‘পাকিস্তান নিজের তৈরি করা সহিংসতা ও বোমা হামলা থেকে মুক্তি পাবে না। তাদের উচিত নীতি পরিবর্তন করা এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ, সম্মান ও সভ্য সম্পর্কের পথ বেছে নেওয়া।’

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান কেন যুদ্ধ করছে

এই দুই দেশের মধ্যে বর্তমান এই সহিংসতার বিস্ফোরণ গত কয়েক মাসের উত্তেজনার চূড়ান্ত পরিণতি।

২০২৫ সালের অক্টোবরে সীমান্তে সপ্তাহব্যাপী ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় আফগানিস্তান ও পাকিস্তান তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের এই সীমান্ত ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত, যা ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ। আফগানিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাদের যুক্তি, এটি একটি ঔপনিবেশিক সীমানা, যা জাতিগত পশতুন এলাকাগুলোকে অন্যায়ভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।

তালেবান ২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতা দখলের পর থেকে প্রতিবেশী এই দুই দেশ ঘন ঘন সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সামি ওমারি আল-জাজিরাকে জানান, ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর থেকে আফগান ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

পাকিস্তান চায়, আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করুক। পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তান এসব গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে। ২০০৭ সালে পাকিস্তানে টিটিপির উদ্ভব হয়। তারা আফগান তালেবান থেকে আলাদা। কিন্তু দুই গোষ্ঠীর মধ্যে গভীর আদর্শিক, সামাজিক ও ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে।

বেশ কয়েক বছর ধরে টিটিপি এবং খনিজ সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান প্রদেশে সক্রিয় বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) পাকিস্তানে সশস্ত্র হামলা বৃদ্ধি করেছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং বেলুচিস্তান প্রদেশে তারা বেশি হামলা চালায়।

নিরপেক্ষ সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার (এসিএলইডি) দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পার্ল পান্ড্য আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আফগান তালেবান টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সম্ভবত ইচ্ছুক নয়। দুই গোষ্ঠীর পুরোনো সখ্যের পাশাপাশি টিটিপির যোদ্ধারা আফগানিস্তানে তালেবানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সে (আইএসকেপি) যোগ দিতে পারে—এমন একটি ভয় আফগান তালেবানের রয়েছে।’

পান্ড্য যোগ করেন, আফগান তালেবান টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের সংঘাত ‘অপরিহার্য’।

ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড আল-জাজিরাকে বলেন, এই সংঘর্ষ অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। এটি পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে কয়েক মাসের ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ সম্পর্কের ফল।

থ্রেলকেল্ডের মতে, পাকিস্তানের এই ‘অধিকতর আক্রমণাত্মক ও জোরালো হামলা’ সম্ভবত তাদের কৌশল পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা পাকিস্তানের ভেতরে বেশ কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলা হতে দেখেছি। তাই ক্রমাগত হামলার পর উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছানো এবং পরিস্থিতির এমন অবনতি হওয়া দুর্ভাগ্যজনক হলেও বিস্ময়কর নয়।’

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া

পবিত্র রমজান মাসে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারত। এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এই হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে। এটি মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার পাকিস্তানের আরেকটি চেষ্টা।’

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক বিবৃতিতে বলেন, মহাসচিব উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে আলোচনা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের ভিত্তিতে মতভেদ দূর করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘পবিত্র রমজান মাস সংযম এবং মুসলিম বিশ্বের সংহতি বৃদ্ধির মাস। এই সময়ে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের উচিত আলোচনার মাধ্যমে তাদের বর্তমান সমস্যার সমাধান করা।’

রাশিয়ার বার্তা সংস্থা আরআইএ দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানিয়েছে, রাশিয়া উভয় পক্ষকে অবিলম্বে আন্তসীমান্ত হামলা বন্ধ এবং কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ মেটানোর আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।

পাকিস্তানের বিমান হামলার ওপর নজর রাখছেন তালেবানের এক নিরাপত্তাকর্মী। খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পাকিস্তানের বিমান হামলার ওপর নজর রাখছেন তালেবানের এক নিরাপত্তাকর্মী। খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি

টিটিপি বা পাকিস্তান তালেবান কারা, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতের কেন্দ্রে কেন তারা

আফগানিস্তানের মূল তালেবান গোষ্ঠী ১৯৯৪ সালে দেশটি শাসন শুরু করে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন আগ্রাসনে তাদের পতন ঘটে। ক্ষমতা হারানোর পর তালেবান যোদ্ধারা পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় পালিয়ে যান। সেখানে ২০০৭ সালে বেশ কিছু জঙ্গিগোষ্ঠী একটি জোট গঠন করে। তারা নিজেদের নাম দেয় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। এটিই মূলত পাকিস্তান তালেবান হিসেবে পরিচিত।

টিটিপি পাকিস্তানে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান সরকারকে উৎখাত করতে চায়। এ উদ্দেশ্য হাসিলে টিটিপি সরাসরি সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে এবং রাজনীতিবিদদের হত্যার মাধ্যমে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

টিটিপি ও আফগানিস্তানের তালেবান আলাদা সংগঠন হলেও তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা রয়েছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফিরেছে আফগান তালেবান।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, সীমান্ত পেরিয়ে তাদের দেশে হামলা চালানো সন্ত্রাসীদের আশ্রয়–প্রশ্রয় দিচ্ছে আফগানিস্তান। তবে আফগান তালেবান শুরু থেকেই পাকিস্তানের এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে আফগান বাহিনী পাকিস্তান সীমান্তে দেশটির সামরিক বাহিনীর অবস্থানে হামলা চালায়। এতে দুই সেনা নিহত হওয়ার খবর জানায় ইসলামাবাদ। এর পরপরই কাবুল, কান্দাহারসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায় পাকিস্তান।

এর আগে ২২ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাকতিকা প্রদেশে হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। এতে ১৩ বেসামরিক মানুষ নিহত হন বলে জানিয়েছিল আফগানিস্তানে জাতিসংঘের মিশন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-27%2Fgdsq388n%2F00-4.jpg?rect=0%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র হাতে একজন তালেবান যোদ্ধা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Friday, February 27, 2026

ইরানেও কি ইরাকের মতো ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

সিএনএনঃ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানকে একের পর এক হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। চলতি শতকের শুরুর দিকে ইরাকে হামলার আগে অস্ত্র নিয়ে একই ধরনের কথা বলেছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। যদিও পরে তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ইরাক অভিযান–পরবর্তী সময়টাও হিসাব–নিকাশ অনুযায়ী চলেনি। এখন ট্রাম্পও ইরান ঘিরে একই ধরনের ফাঁদের দিকে এগোচ্ছেন কি না, তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সিএনএনের প্রতিবেদক স্টিফেন কলিনসন। প্রথম আলো পাঠকদের জন্য লেখাটি কিছুটা সংক্ষেপিত আকারে বাংলা করে প্রকাশ করা হলো।

ইরাক যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দাদের মধ্যে একধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। ভেঙে পড়েছিল দেশটির প্রতিষ্ঠিত নেতাদের প্রতি মানুষের আস্থা। এমনটি না হলে হয়তো ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন না।

বিষয়টি এখন একটি পরিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিহাস বলা হচ্ছে, কারণ ট্রাম্প এখন এমন কিছু বক্তব্য দিচ্ছেন এবং এমন কিছু কৌশলগত ভুল করতে পারেন, যে ধরনের ভুল ২০০৩ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে কি না, তার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেননি ট্রাম্প। তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর বিপুল সমাবেশ ঘটিয়েছেন তিনি। ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মার্কিন অভিযানের পর এটিই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ।

বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেখানে তেহরানকে কিছুটা পিছু হটতে চাপ হিসেবে কাজ করতে পারে এই সেনা সমাবেশ। তবে শেষ পর্যন্ত যদি কূটনৈতিকভাবে বড় কোনো সাফল্য না আসে, আর গুলি চালানো বাদেই এই সেনা সমাবেশ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নিতে হয়, তাহলে তা হবে ট্রাম্পের জন্য সম্মানহানিকর।

ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসনের ভিত্তি হলো ‘মাগা’ বা ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলুন’ শীর্ষক আন্দোলন। এ আন্দোলন বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানোর বিপক্ষে। যুদ্ধের ক্ষেত্রে একটি সমস্যা রয়েছে। সেটি হলো, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীন মার্কিন বাহিনী হয়তো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে দেশের মানুষ এর জন্য প্রস্তুত নন।

ইরাকে হামলা শুরুর আগে বুশ কয়েক মাস ধরে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তবে সেগুলো ছিল ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে। ইরানে হামলার বিষয়ে এখন পর্যন্ত ট্রাম্পও অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর যুক্তি দেখাচ্ছেন। যদিও মঙ্গলবার রাতে স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে নিজের অবস্থান কিছুটা স্পষ্ট করেছেন তিনি। তবে এর মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে আরও কোণঠাসা করে ফেলতে পারেন।

যেমন আগের মতোই ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে ইরানকে কখনোই পারমাণবিক বোমা বানাতে দেওয়া হবে না। তাঁর এ বক্তব্য কিছু প্রশ্ন সামনে আনে। একটি হলো, তিনি আগেই দাবি করেছেন যে গত বছর হামলা চালিয়ে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকে শত শত মার্কিন সেনার মৃত্যুর জন্য ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো দায়ী বলেও উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।

ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে বাড়িয়ে বলা

ইরাক হামলার দিনগুলোর প্রতিধ্বনি সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে, যখন ট্রাম্প ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে আলাপ শুরু করেন। তিনি বলেন, তারা এরই মধ্যে এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলেছে, যেগুলো ইউরোপকে এবং বিদেশে থাকা আমাদের ঘাঁটিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। আর তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কাজ করছে, যেগুলো শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যাবে।

ট্রাম্প হয়তো ইরানের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে বলছেন। তবে হুমকিটা যখন তিনি নিজের দেশের ওপর টেনে আনছেন, তখন তিনি সেই বিতর্কিত পথই বেছে নিচ্ছেন, যা ইরাক যুদ্ধের বৈধতা দেওয়ার জন্য বুশের প্রশাসন এবং যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সরকার ব্যবহার করেছিল।

বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একই ধরনের হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন, নিজেদের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়াচ্ছে তারা। আর তারা যে পথের দিকে এগোচ্ছে, তাতে স্পষ্টতই এক দিন এমন অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হবে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যাবে। তাদের কাছে এখন এমন অস্ত্র আছে, যেগুলো ইউরোপের বেশির ভাগ জায়গায় পৌঁছাতে পারে।’

কথাগুলো পরিচিত। ২০০২ সালে বুশ বলেছিলেন, সৌদি আরব, ইসরায়েল, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশে মার্কিন নাগরিকেরা ইরাকের ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ–ও দাবি করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রে রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার উপায় খুঁজছে বাগদাদ। একই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে হুমকি দিচ্ছে ইরাক।

বুশ প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি ছিল ইরাকের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি পরিকল্পনায় অবহেলা। ফলে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল। ইরাকের চেয়ে ইরান শক্তিশালী দেশ। কিন্তু মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের কারণে ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কী হতে পারে, তা নিয়ে ট্রাম্প এখনো মার্কিনদের খোলাখুলি কিছু বলেননি।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরানে শাসন পরিবর্তনের ফলে কী হবে, তার আভাস দিতে পারছেন না যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। আর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ক্ষমতার এ শূন্যতা পূরণে সবচেয়ে সম্ভাব্য শক্তি হতে পারে বিপ্লবী গার্ড কোর। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী একটি শক্তির জায়গায় একই ধরনের আরেকটি শক্তি আসতে পারে।

ভিন দেশে শাসক পরিবর্তন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের। এ বছরেই তারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। মাদুরোর পতনের পর দেশটিতে ক্ষমতায় বসা দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ উদ্ধারে নেমে পড়েছেন। তবে ইরানে সরকার পতন হলে দেলসির মতো যুক্তরাষ্ট্র কাউকে খুঁজে পাবে—এমন সম্ভাবনা অনেক কম বলেই মনে হচ্ছে।

প্রতিপক্ষ কীভাবে আচরণ করবে, তা নিয়ে ভুল ধারণার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনও একই ধরনের ভুল–বোঝাবুঝির মধ্যে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। যদিও গত বছরে সৌদি আরবে গিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের সময় যাঁরা হামলা চালিয়েছিলেন তাঁরা এমন জটিল সব সমাজের ওপর সেটা করেছিলেন, যে সমাজকে তাঁরা নিজেরাই বুঝতেন না।

চলতি মাসে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, ট্রাম্প বুঝতে পারছেন না কেন ইরান তাঁর চাপে নতি স্বীকার করছে না। এই বক্তব্যের পেছনে একটি কারণ থাকতে পারে। সেটি হলো ইরান দেখেছে, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো যেসব স্বৈরশাসকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না, তাঁদের কীভাবে পতন হয়েছে। তাই শাসন টিকিয়ে রাখতে তেহরান অস্ত্র রাখতে চাইবে।

তবে ২০০৩ সালের মতোই এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বড় ঝুঁকি হলো অহংকার। ইরাকের ক্ষেত্রে শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, কম সময়েই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। দেশটিতে মার্কিন সেনাদের মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানানো হবে। ২০ বছরের বেশি সময় পর ট্রাম্পও মনে করছেন, ইরানে সহজ জয় পাবে মার্কিন বাহিনী। এ ক্ষেত্রে পুরোনো দিনের কথাগুলো মনে রাখা দরকার।

কী ধরনের চুক্তি ট্রাম্প মেনে নিতে পারেন

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য কূটনীতি এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আজকেও (বৃহস্পতিবার) জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। তবে এই আলোচনার সাফল্য নির্ভর করবে ট্রাম্পকে ইরান কোনো ছাড় দিতে রাজি হয় কি না, তার ওপর। এই ছাড়কে নিজের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

এরই মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আপসের ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান; কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে সমঝোতা কঠিন হতে পারে। ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তিনি এমন কোনো চুক্তি মেনে নিতে পারবেন না, যা সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলের পারমাণবিক চুক্তির মতো দেখায়। ওই চুক্তি তিনি নিজেই বাতিল করেছিলেন।

এ কারণে ইরানে সামরিক পদক্ষেপ ট্রাম্পের কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। যদিও এতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। আর ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখনই সঠিক সময় হতে পারে। কারণ, ইসরায়েলের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইরানের ভেতরেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে।

এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারে, তাহলে দেশটির সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের দেওয়া নিজের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবেন ট্রাম্প। চীনের প্রভাববলয় থেকে একটি দেশকে বের করেও আনতে পারবেন। তাই চলতি শতকের শুরুর দিকে ইরাকে মার্কিন সামরিক বিপর্যয়ের মতো সতর্কবার্তা থাকলেও ট্রাম্প হয়তো সুযোগটি কাজে লাগাতে চাইবেন।

আদালতে বিচার চলাকালে ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন
আদালতে বিচার চলাকালে ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাজ্যের ‘সবচেয়ে একাকী ভেড়া’ জন্ম দিল যমজ বাচ্চার

প্রকাশ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ একসময় যাকে বলা হতো ‘যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে একাকী ভেড়া’, সেই ফিওনা এখন আর একা নয়। স্কটল্যান্ডের একটি খাড়া গিরিখাতে টানা দুই বছর নিঃসঙ্গ বন্দিজীবন কাটানো আলোচিত ভেড়াটি প্রথমবারের মতো যমজ দুই বাচ্চার জন্ম দিয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাতে স্কটল্যান্ডের ডামফ্রিসের ডালসকোন খামারে দীর্ঘ ৯ ঘণ্টার প্রসববেদনা সয়ে একটি পুরুষ ও একটি মেয়ে বাচ্চার জন্ম দেয় ফিওনা। খামার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মা ও দুই বাচ্চাই বর্তমানে সুস্থ আছে।

২০২১ সালে স্কটিশ হাইল্যান্ডসের ক্রোমার্টি ফার্থের এক দুর্গম উপকূলীয় গিরিখাতের নিচে আটকা পড়া অবস্থায় প্রথম দেখা মিলেছিল ফিওনার। কায়াকিং করতে যাওয়া জিল টার্নার এটিকে প্রথম দেখেন।

দুই বছর পর আবারও ফিওনাকে একই অবস্থায় একা দেখে জিল বুঝতে পারেন, দুর্গম পাহাড় থেকে নামতে না পেরে অসহায়ভাবে দিন কাটছে প্রাণীটির। এরপরই গণমাধ্যমে তাকে ‘যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে একাকী ভেড়া’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে একদল দুঃসাহসিক উদ্ধারকর্মী দড়ি ব্যবহার করে খাড়া পাহাড় থেকে ভেড়াটিকে উদ্ধার করেন।

উদ্ধারের পর ফিওনাকে ডালসকোন খামারে রাখা হয়। তবে খামারের অন্যান্য ভেড়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে ফিওনার কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল। খামার ব্যবস্থাপক বেন বেস্ট জানান, ফিওনার নিঃসঙ্গতা কাটাতে এবং তাকে একটি স্থায়ী সঙ্গী দিতেই ভেড়াটিকে মা হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বেন ব্রেস্ট বলেন, ‘সারা বিশ্বের নজর ছিল তার ওপর। তাই গত পাঁচ মাস আমাদের প্রচণ্ড চাপের মধ্যে কেটেছে। কিন্তু এখন আমরা স্বস্তিতে। ফিওনা এখন “বিশ্বের সেরা মা” হওয়ার পথে।’

বিখ্যাত অ্যানিমেটেড সিনেমা ‘শ্রেক’-এর রাজকুমারী ফিওনার নামানুসারে এই ভেড়ার নাম রাখা হয়েছিল। সিনেমায় শ্রেক ও ফিওনার সন্তানদের নাম ছিল ফারগাস, ফার্কেল ও ফেলিসিয়া।

খামার কর্তৃপক্ষ এখন ভাবছে, নতুন দুই বাচ্চার নাম সিনেমার চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে ফারগাস ও ফেলিসিয়া রাখা হবে, নাকি ফিওনার উদ্ধারের জায়গার সঙ্গে মিল রেখে ক্লিফ ও ব্রোরা রাখা হবে। দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে ফিওনার এই নতুন মাতৃত্বের গল্প এখন বিশ্বজুড়ে পশুপ্রেমীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে।

দুই বাচ্চার সঙ্গে ফিওনা নামের ভেড়াটি
দুই বাচ্চার সঙ্গে ফিওনা নামের ভেড়াটি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

কখনো বরফ, কখনো ঝুম বৃষ্টি, কখনো মিষ্টি রোদ—দেখুন একই জায়গার ১২ মাসের ১২ রূপ

দেশ থেকে কানাডায় আসার পর খুব মন খারাপ থাকত সাখাওয়াত হোসেনের। ম্যানিটোবা অঙ্গরাজ্যের উইনিপেগে তাঁর বাসার পাশ ঘেঁষেই বয়ে গেছে সেইন নামের ছোট্ট এক নদী। মন খারাপ হলেই সেই নদীর ধারে গিয়ে বসতেন। এমনই একদিন একটা গাছের সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁর। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রকৃতি পরিবর্তনের সময়ই এই গাছের বদলে যাওয়া রূপ চোখে পড়ল সাফাত নামে পরিচিত এই তরুণ আলোকচিত্রীর। হুট করে মনে হলো, বছরচক্রে এই গাছের সঙ্গে প্রকৃতির নানা রূপের বদলে যাওয়া ছবি তুলে রাখলে কেমন হয়? সেই ভাবনা থেকেই শুরু করলেন গাছের বছরচক্রের ছবি তোলার। ১২ মাসের ১২ ছবিতে দেখুন সেই গল্পই।

এপ্রিল

প্রথম ছবিটা তোলা এপ্রিল মাসে। উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটির একপর্যায়ে দেখলাম, বরফ সব গলে গেছে, কানাডা গুজ বা কানাডা রাজহংসী ফিরে এসে নদীতে মনের আনন্দে সাঁতার কাটছে। হুট করেই দৃশ্যটা ভালো লাগে, কিন্তু পরেরবার হাঁটতে গিয়ে কী আবিষ্কার করব, সেটা তখনো আমার ভাবনায় আসেনি
প্রথম ছবিটা তোলা এপ্রিল মাসে। উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটির একপর্যায়ে দেখলাম, বরফ সব গলে গেছে, কানাডা গুজ বা কানাডা রাজহংসী ফিরে এসে নদীতে মনের আনন্দে সাঁতার কাটছে। হুট করেই দৃশ্যটা ভালো লাগে, কিন্তু পরেরবার হাঁটতে গিয়ে কী আবিষ্কার করব, সেটা তখনো আমার ভাবনায় আসেনি
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন

মে

খুব সম্ভবত মে মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে তোলা ছবি এটা। ধূসর-মরা গাছ ভেদ করে সবুজ ঘাস নিজেদের রাজত্ব করে নিচ্ছে সদর্পে, গাছটাও সবুজে ভরে উঠেছে, সামনে নদীর জল ছুঁইছুঁই গাছেও দেখা দিয়েছে সবুজ পাতা। হঠাৎ করে দেখলে সত্যিই বোঝার উপায় থাকে না যে প্রকৃতির রূপের পরিবর্তন সবকিছু এত বদলে দিতে পারে। এই সময়ই জায়গাটার বছরচক্র শুরু করার ভূত মাথায় চাপে
খুব সম্ভবত মে মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে তোলা ছবি এটা। ধূসর-মরা গাছ ভেদ করে সবুজ ঘাস নিজেদের রাজত্ব করে নিচ্ছে সদর্পে, গাছটাও সবুজে ভরে উঠেছে, সামনে নদীর জল ছুঁইছুঁই গাছেও দেখা দিয়েছে সবুজ পাতা। হঠাৎ করে দেখলে সত্যিই বোঝার উপায় থাকে না যে প্রকৃতির রূপের পরিবর্তন সবকিছু এত বদলে দিতে পারে। এই সময়ই জায়গাটার বছরচক্র শুরু করার ভূত মাথায় চাপে
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন

জুন

জুন, বছরের সবচেয়ে বড় দিন। উইনিপেগে এই সময় সূর্যাস্ত হয় প্রায় রাত ১০টায়। সূর্যালোক বেশিক্ষণ পেয়েই কি চারদিকে এত প্রাণের সঞ্চার হয়? নদীর ধার ঘেঁষে জংলা বাড়তে থাকে, গাছগুলোও তরতরিয়ে বড় হতে থাকে। এই সময়টায় সত্যিই বিশ্বাস করা কঠিন যে এই জায়গাটাই একসময় বরফের সাদা চাদরে ঢাকা ছিল
জুন, বছরের সবচেয়ে বড় দিন। উইনিপেগে এই সময় সূর্যাস্ত হয় প্রায় রাত ১০টায়। সূর্যালোক বেশিক্ষণ পেয়েই কি চারদিকে এত প্রাণের সঞ্চার হয়? নদীর ধার ঘেঁষে জংলা বাড়তে থাকে, গাছগুলোও তরতরিয়ে বড় হতে থাকে। এই সময়টায় সত্যিই বিশ্বাস করা কঠিন যে এই জায়গাটাই একসময় বরফের সাদা চাদরে ঢাকা ছিল
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন

জুলাই

বৃষ্টি এখানে ঠিক বাংলাদেশের মতো ঝমঝমিয়ে আসে না। কেন যেন এখানে বৃষ্টি এলেই আমার স্ত্রী শিখা আর আমি খুঁজতে বসি যে আজকের বৃষ্টিটা বাংলাদেশের মতো। তেমনই এক ঝুম বৃষ্টির দিন ছাতা মাথায় চলে গেলাম ছবি তুলতে। জুলাই মাস আবার বাংলাদেশের শ্রাবণ মাসের শুরু। মিল খুঁজছিলাম বলেই কি না জানি না, জুলাইয়ের জন্য প্রিয় বৃষ্টির ছবিটাই পেয়ে গেলাম
বৃষ্টি এখানে ঠিক বাংলাদেশের মতো ঝমঝমিয়ে আসে না। কেন যেন এখানে বৃষ্টি এলেই আমার স্ত্রী শিখা আর আমি খুঁজতে বসি যে আজকের বৃষ্টিটা বাংলাদেশের মতো। তেমনই এক ঝুম বৃষ্টির দিন ছাতা মাথায় চলে গেলাম ছবি তুলতে। জুলাই মাস আবার বাংলাদেশের শ্রাবণ মাসের শুরু। মিল খুঁজছিলাম বলেই কি না জানি না, জুলাইয়ের জন্য প্রিয় বৃষ্টির ছবিটাই পেয়ে গেলাম
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন

আগস্ট

আগস্ট। সামারের শেষ কটা দিন, যতটা প্রাণভরে সবুজ দেখা যায়, যতটা সময়টা উপভোগ করা যায়—সেই বার্তাটাই মনে আসে তখন বারবার। সবুজের শেষ কটা দিনের একদিনই তুলে রাখলাম আমার বছরচক্রের ডায়েরিতে
আগস্ট। সামারের শেষ কটা দিন, যতটা প্রাণভরে সবুজ দেখা যায়, যতটা সময়টা উপভোগ করা যায়—সেই বার্তাটাই মনে আসে তখন বারবার। সবুজের শেষ কটা দিনের একদিনই তুলে রাখলাম আমার বছরচক্রের ডায়েরিতে
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন

সেপ্টেম্বর

সামনের পাতা ঝরে যাওয়া গাছটা দেখেই সেপ্টেম্বরের ছবি তুলতে গিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। পেছনের গাছটাও হলুদ হতে শুরু করেছে একটু একটু করে। মে মাসে যেমন সবুজ পাতা নিজেদের রাজত্ব গড়ে নিচ্ছিল, এবার যেন সেই রাজত্ব আবার ধূসর ঘাসের হাতে তুলে দেওয়ার পালা
সামনের পাতা ঝরে যাওয়া গাছটা দেখেই সেপ্টেম্বরের ছবি তুলতে গিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। পেছনের গাছটাও হলুদ হতে শুরু করেছে একটু একটু করে। মে মাসে যেমন সবুজ পাতা নিজেদের রাজত্ব গড়ে নিচ্ছিল, এবার যেন সেই রাজত্ব আবার ধূসর ঘাসের হাতে তুলে দেওয়ার পালা
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন

অক্টোবর

প্রকৃতি পরিবর্তনের ধাক্কাটা ঠিক মে মাসের মতো অক্টোবরে এসেও খুব ভালোভাবে লাগল। গত মাসের সবুজ-হলুদ গাছটা পুরোটাই হলুদে রূপ নিয়েছে তখন। সবুজ ঘাসের সংখ্যাও যেন হাতে গোনার মতো। শীত আসি আসি করছে...
প্রকৃতি পরিবর্তনের ধাক্কাটা ঠিক মে মাসের মতো অক্টোবরে এসেও খুব ভালোভাবে লাগল। গত মাসের সবুজ-হলুদ গাছটা পুরোটাই হলুদে রূপ নিয়েছে তখন। সবুজ ঘাসের সংখ্যাও যেন হাতে গোনার মতো। শীত আসি আসি করছে...
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন

নভেম্বর

তুষারপাত শুরু হয়ে গেল নভেম্বরে। এখানে যে একটি নদী কিংবা পানির অস্তিত্ব আছে, সেটা ভুলিয়ে দিতেই পুরো নদীই যেন শুভ্র-সাদা চাদরে ঢাকা পরছে। ছবিতে ঠিক বোঝা যাচ্ছে কি না জানি না, কিন্তু যখন এই ছবি তুলছিলাম, তখন একটু একটু করে ঘাসগুলো বরফে ঢেকে পরেছে, দেখতে কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল
তুষারপাত শুরু হয়ে গেল নভেম্বরে। এখানে যে একটি নদী কিংবা পানির অস্তিত্ব আছে, সেটা ভুলিয়ে দিতেই পুরো নদীই যেন শুভ্র-সাদা চাদরে ঢাকা পরছে। ছবিতে ঠিক বোঝা যাচ্ছে কি না জানি না, কিন্তু যখন এই ছবি তুলছিলাম, তখন একটু একটু করে ঘাসগুলো বরফে ঢেকে পরেছে, দেখতে কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন

ডিসেম্বর

ডিসেম্বরের তীব্র ঠান্ডায় যেন গাছটাও কাবু হয়ে গেছে। বরফ জমা হতে হতে ধূসর ঘাসও ঢাকা পরে যাচ্ছে। গাছের ডালপালা, পাতায় সাদা বরফ জায়গা করে নিয়েছে
ডিসেম্বরের তীব্র ঠান্ডায় যেন গাছটাও কাবু হয়ে গেছে। বরফ জমা হতে হতে ধূসর ঘাসও ঢাকা পরে যাচ্ছে। গাছের ডালপালা, পাতায় সাদা বরফ জায়গা করে নিয়েছে
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন

জানুয়ারি

বরফের যেন আর শেষ নেই। সবকিছু বরফের চাদরে মুড়িয়ে দিয়ে আগামী কয়েক মাস শুভ্রসাদা বরফই হবে সবকিছুর রাজা, জানুয়ারির ছবি আর তাপমাত্রা দুটোই এই কথাই বলে
বরফের যেন আর শেষ নেই। সবকিছু বরফের চাদরে মুড়িয়ে দিয়ে আগামী কয়েক মাস শুভ্রসাদা বরফই হবে সবকিছুর রাজা, জানুয়ারির ছবি আর তাপমাত্রা দুটোই এই কথাই বলে
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন
১১

ফেব্রুয়ারি

বরফের স্তূপ জমা হতে হতে এতটাই শক্ত হয়ে গেছে যে হেঁটে নদী পার হওয়া কোনো ব্যাপারই না। ফেব্রুয়ারির ছবি তুলতে গিয়ে জুতার ছাপগুলো যেন সেই কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। এই সময়টার মজার একটা স্মৃতি হলো, গাড়ি কেনার পর প্রথম গাড়ি নিয়ে গেলাম নদীর ধারে। কিন্তু সেই খুশি খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; কারণ, সেখান থেকে আসার পরপরই ঠান্ডায় গাড়ির ব্যাটারি বসে গিয়েছিল
বরফের স্তূপ জমা হতে হতে এতটাই শক্ত হয়ে গেছে যে হেঁটে নদী পার হওয়া কোনো ব্যাপারই না। ফেব্রুয়ারির ছবি তুলতে গিয়ে জুতার ছাপগুলো যেন সেই কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। এই সময়টার মজার একটা স্মৃতি হলো, গাড়ি কেনার পর প্রথম গাড়ি নিয়ে গেলাম নদীর ধারে। কিন্তু সেই খুশি খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; কারণ, সেখান থেকে আসার পরপরই ঠান্ডায় গাড়ির ব্যাটারি বসে গিয়েছিল
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন
১২

মার্চ

মার্চ মাস, তাপমাত্রা একটু একটু করে বাড়তে থাকা আর বরফ একটু একটু করে গলার সময়। দুটোই চলতে থাকে সমানতালে। পাখিরাও ফিরে আসছে বসন্তের আগমনী ঘ্রাণ পেয়ে
মার্চ মাস, তাপমাত্রা একটু একটু করে বাড়তে থাকা আর বরফ একটু একটু করে গলার সময়। দুটোই চলতে থাকে সমানতালে। পাখিরাও ফিরে আসছে বসন্তের আগমনী ঘ্রাণ পেয়ে
ছবি: সাখাওয়াত হোসেন

Thursday, February 26, 2026

সৌদি আরব যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে গড়তে চায় by ডেভিড হার্স্ট

মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ যখন নির্ভয়ে নিজেদের মতপ্রকাশের সুযোগ পায়, তখন ইসরায়েলকে ঘিরে গড়ে ওঠা পশ্চিমা ঐকমত্যের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়।

সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেওয়ার মতো পদক্ষেপগুলো অনেকের চোখে আঞ্চলিক ক্ষোভ ও অপমানবোধের ওপর অতিপাতলা প্রলেপ ছাড়া আর কিছু নয়। মূল প্রশ্নটি থেকেই যায়, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড কীভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এতটা সহনীয় হয়ে উঠল?

সম্প্রতি সৌদি আরবের একাডেমিক ও লেখক ড. আহমেদ আলতুয়াইজরি ইসরায়েল ও তার ঘনিষ্ঠ আরব অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে খোলামেলা মতপ্রকাশের সুযোগ পান। সৌদি আরবে উচ্চপর্যায়ের অনুমতি ছাড়া কিছু প্রকাশিত হওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই ধরা হয়।

সেই প্রেক্ষাপটে আলতুয়াইজরির বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি আবুধাবির শাসকদের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তুলে বলেন, তারা জায়নবাদী প্রকল্পের প্রতি ঝুঁকে পড়ে বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় কার্যত ‘ট্রয়ের ঘোড়া’য় পরিণত হয়েছে।

সৌদি আরবে এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের বিরুদ্ধে এতটা সরাসরি ও কঠোর ভাষায় সমালোচনা শোনা যায়নি। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ইয়েমেন, মিসর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও সিরিয়ায় আরব বসন্ত-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি রিয়াদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।

ড. আহমেদ আলতুয়াইজরির লেখা প্রকাশিত হয় সৌদি কর্তৃপক্ষ–ঘনিষ্ঠ একটি পত্রিকায়। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এটি তাঁর ব্যক্তিগত মতামত। তিনি সরকারের হয়ে কথা বলেননি। জাতীয় সংকটের মুহূর্তে সত্য উচ্চারণের দায়বোধ থেকেই তিনি লেখাটি লিখেছেন।

লেখাটি প্রকাশের পরপরই তা সরিয়ে নেওয়া হয়। তেল আবিব ও ওয়াশিংটনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ইসরায়েল–সমর্থক নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে লেখকের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তোলে। অ্যান্টিডিফেমেশন লিগও দাবি করে, তাদের আপত্তির পরই লেখাটি নামিয়ে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এরপরই পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত মোড় নেয়। ওপরের নির্দেশে লেখাটি আবার প্রকাশিত হয়। সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভাষ্যকার দাবি করেন, লেখাটি কখনো সরানোই হয়নি।

ঘটনাপ্রবাহে নতুন প্রশ্ন সামনে আসে। উপসাগরীয় দুই ঘনিষ্ঠ দেশের এই দূরত্ব কি কেবল সাময়িক আবেগের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কৌশলগত বিচ্ছেদ?

আলতুয়াইজরির মতে, ঘটনাটি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি একটি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত। গাজায় গণহত্যা এবং ইয়েমেনসহ সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ঘটনাবলি এই রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। সৌদি আরবে প্রকাশ্যে প্রতিবাদের সুযোগ সীমিত থাকলেও ভেতরে ভেতরে অপমান ও ক্ষোভ জমা হয়েছে।

রাজা ফাহদ এবং পরে যুবরাজ থাকা অবস্থায় রাজা আবদুল্লাহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেগুলোর ভিত্তি ছিল ভূমির বিনিময়ে শান্তি এবং ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে সমঝোতার প্রচেষ্টাতেও সৌদি আরব মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু গাজায় সাম্প্রতিক ধ্বংসযজ্ঞের ব্যাপ্তি অতীতের সব ঘটনার চেয়ে অনেক বড়, যা রিয়াদের অবস্থান পুনর্বিবেচনায় প্রভাব ফেলেছে।

আলতুয়াইজরির ভাষায়, ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্বের মানসিকতা বহাল থাকলে শান্তি বা সহযোগিতার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। ইসলামি বিশ্বের কেন্দ্র এবং একটি প্রভাবশালী আরব রাষ্ট্র হিসেবে সৌদি আরব নীরব দর্শকের ভূমিকা নিতে পারে না। এ কারণেই তাদের কূটনৈতিক ভাষা ও অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে।

ট্রাম্পের কথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ সৌদি আরবের অংশগ্রহণকে আলতুয়াইজরি মূলত ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, এটি কোনো নীতিগত ঐকমত্য নয়, বরং পরিস্থিতি আরও অবনতির হাত থেকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা।

আলতুয়াইজরির অভিযোগ, গাজা ধ্বংসের প্রেক্ষাপটকে ইসরায়েল বৃহত্তর আঞ্চলিক সামরিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। এই চিন্তাধারা নতুন নয়। আশির দশক নিয়ে লেখা এক প্রবন্ধে ইসরায়েলি লেখক এবং সাবেক নেতা এরিয়েল শ্যারনের উপদেষ্টা ওদেদ ইয়িনন আরব রাষ্ট্রগুলোকে ভেঙে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বিভক্ত করার কৌশলের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’আর কুর্দি ও দ্রুজ সম্প্রদায়কে ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা দুর্বল করার ইঙ্গিতপূর্ণ নীতিও সামনে এসেছে। যদিও পরবর্তী সময়ে সিরিয়ার সরকার কুর্দি–অধ্যুষিত এলাকা ও তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূত টম বারাক সিরিয়ার ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ও মোহাম্মদ বিন জায়েদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে সৌদি আরব তাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছে।

আলতুয়াইজরির অভিযোগ, ইয়েমেনে আমিরাতকে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানোর পর রিয়াদ দেখেছে, আবুধাবি নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থে দেশটিকে বিভক্ত করার পথে এগোচ্ছে। সুদানেও র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) প্রতি আমিরাতের সামরিক সহায়তা এবং সোমালিয়ার উত্তরাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশ সোমালিল্যান্ডে তাদের সক্রিয়তা সৌদি নেতৃত্বের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

আলতুয়াইজরির মতে, আয়তন, জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিচারে দুই দেশ তুলনীয় নয়। তবে নেতৃত্বের পর্যায়ে দূরত্ব অনেক দিন ধরেই বাড়ছিল। মোহাম্মদ বিন সালমানের উত্থানে মোহাম্মদ বিন জায়েদের ভূমিকা থাকলেও পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের দিকে ঝুঁকেছে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথও খোলা রেখেছে। ইরানের ওপর সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কা ঘিরে অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাসকাটে চলমান আলোচনাকে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ৯ আরব নেতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করেছেন বলে জানা গেছে। আলতুয়াইজরির মতে, এই উদ্যোগে সৌদি আরবই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।

আলতুয়াইজরি সতর্ক করে বলেন, ইরান ভেনেজুয়েলা নয়; অস্তিত্বের হুমকি অনুভব করলে তারা অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি, হরমুজ প্রণালি কিংবা সরাসরি ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে। এমন সংঘাত পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

এদিকে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম প্রকাশ্যে সৌদি আরবকে সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি যেন তারা আরও উত্তপ্ত না করে। কিন্তু উপসাগরীয় রাজনীতিতে যে ভেতরগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে, তা ওয়াশিংটনের জন্য সহজে উপেক্ষা করার মতো নয়।

কারণ সম্ভাব্য নতুন সংঘাত সবচেয়ে বেশি লাভবান করতে পারে সেই শক্তিকে, যে আকারে ছোট হলেও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধারণ করে।

* ডেভিড হার্স্ট, মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2018%2F06%2F29%2F93785a98c5cb351400540732797e5164-5b35ed860516e.jpg?rect=0%2C0%2C3648%2C2432&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ কাজে লাগাতে চায় সৌদি আরব। ছবি: উইকিমিডিয়া

‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’, এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশে নেই by শিশির মোড়ল

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের একটি বক্তব্য অনেকের নজর কেড়েছে। অনেকে মনে করছেন, মন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব চিত্র কিছুটা ফুটে উঠেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এতে চিকিৎসকদের কিছুটা হেয় করা হয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার তিন দিন পর গত শুক্রবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার হাফিজপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মানুষকে যাতে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে না হয়, ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে। সহজলভ্য ও সর্বজনীন করার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’ তবে ‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’—এই পরিস্থিতি দেশে নেই।

চিকিৎসাসেবা পাওয়া বা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন চিকিৎসক। সেবার জন্য নার্সসহ আরও অন্য ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীও প্রয়োজন। কিন্তু ১০ হাজার মানুষের জন্য দেশে চিকিৎসক আছে সাতজন। নার্স আরও কম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে। বছরের পর বছর স্থায়ী জনবলসংকটের মধ্যে আছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জনবল কম রেখে মানসম্পন্ন সেবা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে চিকিৎসকসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব দূর করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রুমানা হক বহু বছর ধরে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত বর্তমান মানবসম্পদ তথ্যপদ্ধতিকে হালনাগাদ ও শক্তিশালী করা এবং একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা। জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মী, চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মীর শূন্যপদ পূরণ করা। মনে রাখতে হবে, গ্রামীণ সেবাকে পদোন্নতির মানদণ্ডে যুক্ত করলে প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসক ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করি।’

পরিস্থিতি কী

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের (এমবিবিএস পাস) সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার। এর মধ্যে কত চিকিৎসক মারা গেছেন, কত চিকিৎসক বিদেশ আছেন, কত চিকিৎসক পেশা চর্চা করেন না—এই তথ্য বিএমডিসির কাছে নেই।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩০ হাজারের মতো চিকিৎসক কর্মরত আছেন।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন দলিলে বাংলাদেশের অনুমিত জনসংখ্যা ১৮ কোটি ধরা হচ্ছে। সেই হিসাবে দেশে ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক ৭ দশমিক ২ জন। ভারতে ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক ৯ দশমিক ৯ জন, নেপালে ১০ দশমিক ৯ জন, শ্রীলঙ্কায় ১১ দশমিক ৪ জন, পাকিস্তানে ১২ দশমিক ৮ জন এবং মালদ্বীপে ২৩ জন। বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে শুধু আফগানিস্তান (৩ দশমিক ২) ও ভুটান (৫ দশমিক ৫)। একইভাবে দেখা যায়, দেশে নার্সের সংখ্যাও প্রয়োজনের চেয়ে কম।

বাস্তবে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া শুধু একা চিকিৎসকের কাজ নয়। স্বাস্থ্যসেবায় বড় ভূমিকা রাখেন নার্স, মিডওয়াইফ, টোকনোলজিস্টসহ আরও অনেকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রধান বা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। মানসম্পন্ন সেবার জন্য চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর দক্ষতার মিশ্রণের প্রয়োজন হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপাত ১: ৩: ৫ হওয়া বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ একজন চিকিৎসক থাকলে নার্স থাকবেন তিনজন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন পাঁচজন।

২০২৫ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ কোটি মানুষের জন্য সরকারি খাতে চিকিৎসক প্রয়োজন ১ লাখ সাড়ে ৩ হাজার। সেই হিসাবে নার্স দরকার ৩ লাখ সাড়ে ১০ হাজার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী দরকার ৫ লাখ সাড়ে ১৭ হাজার। ওই প্রতিবেদন আরও বলছে, দেশে প্রয়োজনের চেয়ে ১৭ শতাংশ চিকিৎসক কম আছে। অন্যদিকে নার্স ৮২ শতাংশ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ৫৬ শতাংশ কম। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩২ শতাংশ পদ শূন্য।

চিকিৎসক অনুপস্থিতির ১৮ কারণ

দক্ষিণের জেলা খুলনার সুন্দরবন–সংলগ্ন দাকোপ উপজেলায় সরকারি চিকিৎসকের পদ আছে ৪০টি। রোববার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে চিকিৎসক আছেন ১২ জন। অর্থাৎ ২৮টি পদে চিকিৎসক নেই বা ৭০ শতাংশ পদ শূন্য। এ রকম উদাহরণ আরও আছে।

নানা কারণে চিকিৎসকেরা কর্মক্ষেত্রে থাকেন না, থাকতে চান না বা থাকতে পারেন না। ২০২৪ সালের মার্চে স্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট–এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রবন্ধে দেখা গেছে, ১৮ কারণে চিকিৎসকেরা কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকেন। এর মধ্যে আছে:

অবকাঠামোগত দুর্বলতা: রোগী দেখার কক্ষগুলো ছোট, এক কক্ষে একাধিক চিকিৎসককে বসতে হয়, রোগী দেখার সময় গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব হয় না। হাসপাতালে রোগীর আত্মীয়স্বজনের ভিড় অনেক বেশি থাকে। হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ প্রয়োজনমতো থাকে না। ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি থাকে। পর্যাপ্ত পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে না। চিকিৎসকদের সহায়তাদানকারী সব ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীর স্বল্পতা দেখা যায়। হাসপাতালগুলোতে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘটতি থাকায় চিকিৎসকদের নোংরা পরিবেশে কাজ করতে হয়।

প্রভাবশালীদের চাপ, সহিংসতা: হাসপাতালে সরকারি চিকিৎসকেরা সব সময় স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চিকিৎসকদের কাজে বাধা দেন, নানা অনৈতিক চাপ দেন। এসব চাপের কারণে কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অনেক সময় রোগীর আত্মীয়রা চিকিৎসকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অনেক সময় শারীরিক সহিংসতার মুখে পড়েন চিকিৎসকেরা।

আবাসন ও পারিপার্শ্বিক সমস্যা: উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের আবাসন সমস্যা বেশি। কর্ম এলাকায় তাঁদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ভালো সুযোগ নেই। তাঁরা যে এলাকায় কাজ করেন, সেই এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ।

নীতি–সম্পর্কিত: সরকারি নীতিই অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পেশাগত উন্নয়নের বাধা হয়ে দেখা দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা চার ধরনের সমস্যার কথা গবেষকদের বলেছেন—চাকরির সুযোগ–সুবিধায় ক্যাডারদের মধ্যে অন্যায্যতা রয়েছে, অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানো যায় না, বদলির ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা যায় এবং উচ্চশিক্ষা বা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগের ঘাটতি আছে।

গবেষকদের একজন ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসকদের সমস্যাগুলো পুরোনো, পরিচিত ও বহুল আলোচিত। প্রয়োজন আন্তরিকতার সঙ্গে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা।’

‘অটোমেশন’ একটি সমাধান

চিকিৎসকেরা নিজের পছন্দের এলাকায় থাকতে বা পেশা চর্চা করতে চান। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বদলি ও পদায়নে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে চিকিৎসকেরা নিজেদের পছন্দের বেশ কিছু বিকল্প স্থানের নাম উল্লেখ করতে পারেন। এর সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য দক্ষতা মেলালে চিকিৎসকদের পদোন্নতি হবে নিরপেক্ষভাবে।

এই পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসকের পদায়ন হয়েছে। এই পদায়নে এখনো কোনো অনিয়ম বা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। একই পদ্ধতিতে ৪৪তম বিসিএসের ২১৭ জন চিকিৎসকের পদায়ন হবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

গত রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বহাল থাকলে বা সর্বস্তরে চালু হলে নিয়োগ ও বদলিতে স্বচ্ছতা আসবে, অর্থ লেনদেন বন্ধ হবে।

জনবলসংকট সমাধানে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কমিশন প্রতিবেদনের সুপারিশ নতুন সরকারের আমলে নেওয়া উচিত।

বিএনপি কী করবে, মন্ত্রীর ব্যাখ্যা

নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, চিকিৎসকেরা অসমভাবে বণ্টিত। হাসপাতালে চিকিৎসকদের চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। তাঁদের মধ্যে উৎসাহের ঘাটতি আছে।

ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, ‘দেশজুড়ে সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে প্রায় এক লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে একটি সভা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুর রহমানসহ আরও একাধিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সূত্র জানিয়েছে, সভায় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচিত হয়।

চিকিৎসকেরা মানুষের পেছনে ঘুরবে, এমন বক্তব্যের কিছু সমালোচনা হতে দেখা গেছে। ওই প্রসঙ্গে গত রোববার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজ কার্যালয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে রোগী কোনো চিকিৎসককে পাননি, এমন অভিযোগ শোনা যায়। আমরা এই ধরনের অভিযোগের অবসান ঘটাতে চাই। আমরা কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে চাই। চিকিৎসকের উপস্থিতি রোগীর সেবা নিশ্চিত করবে। চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণে রোগীর চিকিৎসা হয়নি, এমন অভিযোগ আর শোনা যাবে না।’

‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’, 
এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশে নেই

চীন হয়ে উঠছে সবুজশক্তির সুপারপাওয়ার

চীন নতুন একটি মরুভূমি সৃষ্টি করেছে। তা এখন আর সূর্যের রশ্মিকে প্রতিফলিত করে না। সূর্যের আলোকে শোষণ করে। ইনার মঙ্গোলিয়ার সোনালি বালিয়াড়িতে তৈরি করা অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল সূর্যের রশ্মি শোষণ করছে। এটিই বিশ্বের বৃহত্তম সৌর খামারগুলোর একটি। স্থানীয় বাসিন্দা শিন গুইই সারা জীবন এখানে কাটিয়েছেন। তিনি দেশের প্রয়োজনে এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, আগে খুব শুকনো ছিল সবকিছু। মরুভূমিও বড় হচ্ছিল। অতিরিক্ত চারণভূমি ব্যবহার ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাটি ক্ষয়ে যাচ্ছিল। ঘাস কমছিল। গত দশকে কুবুচি মরুভূমির ৪৬,০০০ হেক্টরের বেশি জমি সৌর প্রকল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সৌর প্যানেল ছায়া ও বাতাবরণ তৈরি করে ঘাস রক্ষা করতে সাহায্য করছে। এ নিয়ে অনলাইন বিবিসি একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২০ সালে জাতিসংঘে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের শীর্ষে পৌঁছানো এবং ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য পূরণের ঘোষণা দেন। বিশ্লেষক সংস্থা কার্বন ব্রিফ জানিয়েছে, চীনের কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন গত ২১ মাস ধরে স্থিতিশীল বা নিম্নমুখী। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জলবায়ু নীতিতে পিছিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে নির্গমন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক রায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিপ্লবের নেতৃত্বে এখন বেইজিং।

সৌর শক্তিতে চীনের উত্থান
২০১০ সালে চীন সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে জার্মানি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার পেছনে ছিল। তখন বড় সৌর খামার ছিল হাতে গোণা। গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, এখন চীনের মোট সৌর সক্ষমতা ১,০৬৩ গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে। কয়েক বছর ধরে সৌর ও বায়ুশক্তি যোগে নতুন সক্ষমতা যুক্ত করার ক্ষেত্রে চীন একাই বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সমান বা বেশি যোগ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) জানিয়েছে, বিশ্বে উৎপাদিত প্রতি সাতটি সৌর প্যানেলের একটি তৈরি হয় চীনের একটি মাত্র কারখানায়। চীন বৈদ্যুতিক যান (ইভি), ব্যাটারি ও সৌর প্যানেল- এই তিন খাতে বিশেষভাবে বিনিয়োগ করেছে। রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও ঋণ এই খাতকে দ্রুত এগিয়ে নিয়েছে।

অতিরিক্ত সরবরাহ ও মূল্যযুদ্ধ
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন হয়েছে। প্যানেল ও যন্ত্রাংশের সরবরাহ বেশি হওয়ায় মূল্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালে শীর্ষ সৌর কোম্পানিগুলো প্রায় ৩৮.৪ বিলিয়ন ইউয়ান ক্ষতির আশঙ্কা করছে বলে নিক্কেই জানিয়েছে। কয়েকটি প্রদেশ গত বছর ১০.৬৭ গিগাওয়াট ক্ষমতার ১৪৩টি প্রকল্প বাতিল করেছে। চীনের বিদ্যুৎ গ্রিড এখনও বড় অংশে কয়লার ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে বিদ্যুতের ৫৮ ভাগ এসেছে কয়লা থেকে, যদিও সৌর ও বায়ুশক্তির অংশ বেড়ে ১৮ ভাগ হয়েছে।

স্থানীয়দের উদ্বেগ
ইউনান প্রদেশে ঐতিহ্যবাহী চা বাগানের জায়গায় সৌর প্যানেল বসানো হচ্ছে। চাষি দুয়ান তিয়ানসং বলেন,
আমার মন কাঁদে। রাতে ঘুমাতে পারি না। তিনি আশঙ্কা করছেন, মাটি আলগা হয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক গ্রামবাসী ক্ষতিপূরণ বা জমি হারানোর বিষয়ে অসন্তুষ্ট। আনহুই প্রদেশে এক সময়কার বড় কয়লাখনির কারণে জমি ধসে নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালে সেখানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাসমান সৌর প্রকল্প গড়ে ওঠে। কিন্তু বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে।
চীন একই সঙ্গে দুটি প্রতিযোগিতায় আছে। ১. বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি ও ১৪০ কোটির বেশি মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ। ২. কয়লার বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তি গড়ে তোলা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিতে চীন এতটাই এগিয়ে গেছে যে অন্য দেশগুলোর পক্ষে তা ধরতে দশক লেগে যেতে পারে। এশিয়া সোসাইটির ক্লাইমেট হাবের লি শৌ বলেন, এটি চীনের জন্য এক বিশাল জয়। এখন প্রশ্ন হলো- অন্যান্য দেশ চীনের সঙ্গে কীভাবে কাজ করবে। তবে এই দ্রুত পরিবর্তনের মাঝেও অনেক সাধারণ মানুষের জন্য এটি আরেকটি অস্থির রূপান্তর- যেখানে তাদের মতামত বা জীবিকার নিরাপত্তা সবসময় অগ্রাধিকার পায় না। চীন এখন বৈশ্বিক সবুজ শক্তির অপরিহার্য কেন্দ্র। কিন্তু এই বিপ্লবের সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য কত- সে প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি মিটেনি।

চীন হয়ে উঠছে সবুজশক্তির সুপারপাওয়ার

মন্ত্রীদের কথায় লাগাম টানতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ সোহেল রানার

প্রকাশ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র কয়েক দিন পেরিয়েছে। এরই মধ্যে দু-একজন মন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নজরে এসেছে মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্রের বরেণ্য অভিনয়শিল্পী ও রাজনীতিবিদ সোহেল রানার। তিনি এ নিয়ে ফেসবুকে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘কিছু মন্ত্রীর বক্তব্যে এখনই “লাগাম টানতে” হবে।’

ফেসবুক পোস্টের শুরুতে সোহেল রানা লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান, গত তিন দিনে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের জনসাধারণ অত্যন্ত আনন্দ এবং আশার সঙ্গে গ্রহণ করেছে আপনাকে।’ এরপরই তিনি সতর্ক করেন, নতুন সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বক্তব্যে সংযম প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ‘কিছু মন্ত্রীদের বক্তব্যে এখনই লাগাম টানানো দরকার। কোন বিশেষ সংবাদ ব্যতিরেকে তাঁদের সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে টিভি ও প্রিন্ট মিডিয়ায় চেহারা দেখানোর প্রয়োজন নেই। মন্ত্রণালয়ের কোন সংবাদ ওই মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দিলেই চলবে। বিশেষ প্রয়োজনে তাঁদের আসা দরকার হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে অনুমতি নিয়ে আসা যেতে পারে।’

‘সময়ের আগে সমালোচনা নয়, সতর্কবার্তা’
পোস্টের পর প্রথম আলোর সঙ্গে কথা হয় সোহেল রানার। তিনি বলেন, ‘যেকোনো জিনিসের সময় দেওয়া উচিত। সময়ের আগে সমালোচনা করা অন্যায়। আমি সমালোচনা করিনি, বরং অনুরোধ করেছি কয়েকটা বিষয়ে নজর দিতে। শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসার আগে দ্রুত চিকিৎসা করা দরকার—এই কথাটাই বলতে চেয়েছি।’
সোহেল রানা মনে করেন, ইতিহাসে ‘অতিকথন’ বা অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য অনেক সময় বড় রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের দেশে আগেও দেখেছি, ইতিহাসেও দেখেছি, অতিকথন বাংলাদেশের সর্বনাশের অন্যতম কারণ। সরকারে যাঁরা থাকেন, তাঁদের বক্তব্যের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারপ্রধানের ওপরই বর্তায়।’

‘মন্ত্রী মানেই আর দলের নেতা নন’
সোহেল রানা বলেন, সরকারে গেলে একজন এমপি বা মন্ত্রী আর কেবল দলের প্রতিনিধি থাকেন না, তিনি তখন পুরো দেশের প্রতিনিধি। তাই তাঁকে হিসাব করে কথা বলতে হয়।

‘আমরা তো পৃথিবীর অনেক দেশের মন্ত্রীদের এভাবে প্রতিদিন মিডিয়ার সামনে কথা বলতে দেখি না। মুখপাত্ররাই কথা বলেন। খুব জরুরি কোনো বিষয় হলে তবেই তাঁরা সামনে আসেন। আমাদের এখানে অনেক সময় মন্ত্রীদের হিরো হওয়ার মানসিকতা কাজ করে। একসঙ্গে অনেক মাইক্রোফোন দেখলে কেউ কেউ ভাবেন, আমি তো হিরো হয়ে গেছি! তখন ভুলে যান, তিনি সরকারের অংশ। কথাবার্তা এমনভাবে বলেন, শুনলে রাজনৈতিক কর্মী মনে হয়। কিন্তু এটা তো বক্তৃতার মঞ্চ না,’ বললেন সোহেল রানা। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন সরকারের দু-একজন মন্ত্রীর দু-একটা কথা আমার ভালো লাগেনি। শুরুতেই যদি এসব বিষয়ে লাগাম টানা না হয়, তাহলে সামনে আরও অনেকে উল্টাপাল্টা কথা বলতে শুরু করবে।’

‘বিনিয়োগ নিয়ে হুট করে শত্রু বানানো ঠিক না’
বিএনপি সরকার গঠন করেছে মাত্র কয়েক দিন। কয়েক দিন না হলে মানুষ তাদের নিয়ে আরও ভয়াবহরকম প্রতিক্রিয়া দেখাত। প্রথম প্রথম বিধায় হয়তো মানুষ বলছে, দেখা যাক, সামনে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। কোন বক্তব্য নিয়ে তাঁর আপত্তি—জানতে চাইলে সোহেল রানা নির্দিষ্ট করে দু-একজন মন্ত্রীর মন্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ‘সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী কী বলতে চেয়েছেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে এ ধরনের কথা বলা তাঁর উচিত হয়নি। একজন প্রতিমন্ত্রীর কথাও আমার নজরে এসেছে, যাকে নিয়ে কথা বলাটা খুব মুশকিল। কারণ, তার বাবা আমার ছোট ভাইয়ের মতো (সাদেক হোসেন) খোকা, তারই ছেলে ইশরাক হোসেন এই কথাটা বলেছে, যা মোটেও ঠিক না।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের কয়েকটা বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিয়ে ইশরাক বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে “জিহাদ ঘোষণা”করলাম! আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি তো বিরোধী দলের নেতা না, আপনি সরকারে। যে বিভাগ নিয়ে কথা বলেছেন, তা-ও আপনার না। এসব বড় বড় সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে যদি লাগামহীন কথা বলে শুরুতেই শত্রু বানিয়ে ফেলে, তাহলে তো বিপদ। বিনিয়োগ যদি বন্ধ হয়ে যায়, দেশের উন্নতি হবে কীভাবে? মানুষজনের চাকরি হবে কীভাবে? যেসব ব্যবসায়ীর কথা বলা হয়েছে, তাদের একটা বলয় আছে, সিন্ডিকেটে তারা এসবের নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারের উচিত, কৌশলে সেই বলয়টাকে ভাঙা। এত বড় বড় সব প্রতিষ্ঠানকে হুট করে যদি সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে এটা মোটেও ভালো কথা না। কোনো বিষয়ে যদি কোনো মতামত থাকেও, সেটা নিজেদের মন্ত্রিসভায় আলোচনা করতে পারে, কীভাবে এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া যায়, সে বিষয়েও আলাপ হতে পারে।’
সোহেল রানা মনে করেন, যদি কোনো সিন্ডিকেট বা অনিয়ম থাকে, তাহলে তা মন্ত্রিসভায় আলোচনা করে কৌশলগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রকাশ্যে লাগামহীন মন্তব্য পরিস্থিতি জটিল করতে পারে।

‘শৃঙ্খলা দরকার’
ফেসবুক পোস্টে সোহেল রানা লিখেছেন, ‘বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মন্ত্রীদের মিডিয়ার সামনে আসার দরকার নেই। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রই কথা বলুক। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে বক্তব্য দেওয়া যেতে পারে।’ প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, ‘আমি কিন্তু বলেছি, জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে কথা বলতেই হলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়েই বলুক। এতে একটা শৃঙ্খলা থাকে এবং প্রধানমন্ত্রীর নজরেও সব থাকে। এই কয়েক দিনে কেউ কেউ জঘন্য রকমের কথা বলে ফেলেছে।’ তাঁর ভাষায়, ‘প্রথমবার এমপি হয়ে মন্ত্রী-এতে কেউ কেউ হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। এখনই সরকারপ্রধানকে লাগাম টানতে হবে। নাহলে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে ফেলবে।’

শুরুতেই সতর্কবার্তা

সোহেল রানা বলেন, নতুন সরকার গঠনের মাত্র কয়েক দিন হয়েছে বলেই হয়তো সাধারণ মানুষ এখনো অপেক্ষা করছে। ‘কয়েক দিন না হলে প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হতে পারত। মানুষ ভাবছে, দেখা যাক সামনে ঠিক হয় কি না।’ তাঁর মতে, শুরুতেই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে সরকার ও দলের জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে। ‘আমি সমালোচনা করিনি, অনুরোধ করেছি—এখনই লাগাম টানুন। এতে সরকার শক্ত হবে, শৃঙ্খলাও থাকবে।’ নতুন সরকারের পথচলার শুরুতেই একজন প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনীতিবিদের এই সতর্কবার্তা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এ বার্তাকে কীভাবে গ্রহণ করে।

‘ওরা ১১ জন’ ছবির প্রযোজক মাসুদ পারভেজ, অভিনেতা হিসেবে যিনি সোহেল রানা নামে পরিচিত
‘ওরা ১১ জন’ ছবির প্রযোজক মাসুদ পারভেজ, অভিনেতা হিসেবে যিনি সোহেল রানা নামে পরিচিত। কোলাজ

Wednesday, February 25, 2026

ইরান নিয়ে যে কারণে ট্রাম্পের হিসাব মিলছে না by রঞ্জন সলোমন

বহু বছর ধরে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করেছে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে। একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। উপসাগরে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক ভাষ্যে ইরানকে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেটি অর্থনৈতিক চাপে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করবে। ধারণা ছিল, দীর্ঘমেয়াদি চাপ ইরানের ভেতরের স্থিতিশীলতা ভেঙে দেবে এবং ইরানকে শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করবে। সেই প্রত্যাশা বাস্তবে পূরণ হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বা পরমাণু চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে হিসাব ছিল স্পষ্ট। কঠোর অর্থনৈতিক চাপ হয় ইরানের ভেতরের ঐক্য ভেঙে দেবে, নয়তো ওয়াশিংটনের শর্তে তাকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য করবে।

কিন্তু ইরান ভিন্ন পথ বেছে নেয়। তারা তাদের পরমাণু কর্মসূচিকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করে। পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার করে। অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ কাঠামো শক্তিশালী করে। নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের ওপর গভীর কষ্ট চাপিয়ে দিয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি। সরকার নতি স্বীকার করেনি।

অর্থনৈতিক যুদ্ধ দীর্ঘদিন চালালে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া রাষ্ট্র তখন বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। আর্থিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সব ক্ষেত্রেই নতুন পথ তৈরি হয়। এতে নিষেধাজ্ঞা যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেটিই বদলে যেতে থাকে।

পশ্চিমা নিরাপত্তা আলোচনায় ইরানের সঙ্গে যুক্ত আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে প্রায়ই ‘প্রক্সি’ বলা হয়। এই শব্দ তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তাকে আড়াল করে। অথচ হামাস, হিজবুল্লাহ বা আনসার-আল্লাহ নিজেদের সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। দখল, আগ্রাসন, অবরোধ ও রাজনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস তাদের উঠে আসার পেছনে কাজ করেছে। তাদের সব কৌশলের সঙ্গে কেউ একমত হবেন কি না, সেটি প্রশ্ন নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব শক্তির সামাজিক ভিত্তি রয়েছে। তাদের বৈধতা ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলসে নির্ধারিত হয় না।

ইতিহাসে শক্তিশালী রাষ্ট্র বা প্রভাবশালী পক্ষই সাধারণত ঠিক করে দেয়, কোন প্রতিপক্ষকে কী নামে ডাকা হবে। তারা কোনো গোষ্ঠীকে ‘সন্ত্রাসী’, ‘উগ্রপন্থী’ বা ‘প্রক্সি’ বললে সেই পরিচয়ই আন্তর্জাতিক আলোচনায় প্রতিষ্ঠা পায়। কিন্তু শুধু একটি শব্দ ব্যবহার করলেই নৈতিক উচ্চতা বা নৈতিক সঠিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না।

ইরান এসব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে। এর ফলে প্রতিরোধের ক্ষেত্র বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে যায়। সংঘাতকে একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি প্রচলিত যুদ্ধ নয়। এটি ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও সামাজিক শিকড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক নেটওয়ার্কভিত্তিক প্রতিরোধ কৌশল।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আলোচনায় এখনো বিমানবাহী রণতরি, নজরদারি ব্যবস্থা ও জোট কাঠামোকে শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। এগুলো নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। কিন্তু সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব সব সময় স্থায়ী রাজনৈতিক ফল দেয় না। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকে বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু কাগজে-কলমে ‘বিজয়’ দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করতে পারেনি।

পশ্চিমা নীতিনির্ধারকেরা ন্যাটোকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘায়িত পরিস্থিতিতে জোটের ভেতরের চাপ ও মতভেদও প্রকাশ পেয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন ও জ্বালানি উদ্বেগ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তুলেছে। কাগজে জোট আছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধের জন্য রাজনৈতিক আগ্রহ এখন আর আগের মতো শক্তিশালী নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ডলার এখনো বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার কেন্দ্র। তবে ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে নিষেধাজ্ঞার পুনরাবৃত্ত ব্যবহার অনেক দেশকে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করেছে। স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে। ব্রিকসের মতো প্ল্যাটফর্মে বিকল্প লেনদেন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। কয়েকটি নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত দেশ সোনা মজুত বাড়িয়েছে আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায়। এটি ডলারের আকস্মিক পতন নয়। বরং ধীরে ধীরে পুনর্বিন্যাস। আর্থিক ক্ষমতা এখনো শক্তিশালী, কিন্তু আর প্রশ্নাতীত নয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্ত্র বানালে বিকল্প পথ তৈরি হবেই।

ইরান জানে, তার ভূগোল ও সম্পদ তাকে আলোচনায় কিছু কাঠামোগত শক্তি দেয়। যুক্তরাষ্ট্রও জানে, বৈশ্বিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল অস্থিতিশীল হলে তার প্রভাব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলের নিরাপত্তাকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সহায়তা প্যাকেজ, কূটনৈতিক সমর্থন ও গোয়েন্দা সহযোগিতা তার কৌশলগত ভিত্তির অংশ। ফলে আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশেও এই সম্পর্ক প্রভাব ফেলে।

গাজায় সামরিক অভিযানে বিপুল ধ্বংসক্ষমতা দেখা গেছে। কিন্তু শক্তি প্রয়োগ চূড়ান্ত রাজনৈতিক সমাধান এনে দেয়নি। বোমাবর্ষণে প্রতিরোধ মুছে যায়নি। ধ্বংস সব সময় স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। এই বাস্তবতা অঞ্চলে এমন ধারণা জোরদার করেছে যে রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সামরিক প্রাধান্য কেবল চক্রকে দীর্ঘায়িত করে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো শক্তিশালী রাষ্ট্র। তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জোটব্যবস্থা বিস্তৃত। ইরান অর্থনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ হলেও কৌশলগতভাবে টিকে আছে। কেউই পূর্ণ আধিপত্যের অবস্থানে নেই।

পরিবর্তন এসেছে একতরফা পদক্ষেপের সীমায়। চূড়ান্ত বিজয় ছাড়া চাপ প্রয়োগ নিজের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে। যখন সামরিক, আর্থিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি একসঙ্গে বাড়ে, তখন আলোচনা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ইরান চায় স্থিতিশীলতা, যাতে অর্থনীতি পুনর্গঠন ও অভ্যন্তরীণ চাপ মোকাবিলা করা যায়। যুদ্ধ তার স্বার্থে নয়। যুক্তরাষ্ট্রও চায় নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আরেকটি সংঘাতে জড়িয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয় মেনে নিতে চায় না।

বর্তমান আলোচনা উভয় পক্ষের সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি। একসময় যে ধারণা ছিল, ওয়াশিংটন পরিণতি ছাড়াই শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে, সেটি ক্ষীণ হয়েছে। তার জায়গায় এসেছে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে শক্তি ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন হাতে এবং সমাধানের পথ হয়ে উঠছে আলোচনা।

* রঞ্জন সলোমন, গোয়াভিত্তিক রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও মানবাধিকারকর্মী
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজিতে থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

গত বছরের জুন মাসে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। অভিযানের ঘোষণা  দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত বছরের জুন মাসে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। অভিযানের ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স