Showing posts with label Lead. Show all posts
Showing posts with label Lead. Show all posts

Thursday, August 27, 2026

ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ইসলামের ওপর আঘাত’

ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি স্কুলছাত্রীর ইউনিফর্মের সঙ্গে হিজাব পরার আবেদন খারিজের রায়ের সমালোচনা করেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) সভাপতি আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। তিনি এ রায়কে ‘ইসলামের ওপর আঘাত’ বলে মন্তব্য করেছেন।

মঙ্গলবার এআইএমআইএমের দারুস সালাম কার্যালয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আয়োজিত ‘জালসা-এ-রহমাতুল লিল আলামিন’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ওয়াইসি এ মন্তব্য করেন।

ওয়াইসি বলেন, স্কুলে কোনো ছাত্রী হিজাব পরতে পারবে না—আদালতের এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত নন। তিনি প্রশ্ন করেন, সুপ্রিম কোর্টের নয় বিচারপতির বেঞ্চে সাবরিমালা-সংক্রান্ত বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় হাইকোর্ট কেন কোনো ধর্মীয় অনুশীলন ইসলামের জন্য অপরিহার্য কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিল।

তিনি বলেন, “আজকের রায় ভারতের সংবিধানের ২৫ ও ১৯ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। ইসলামের জন্য কোনটি অপরিহার্য, তা নির্ধারণ করার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে? মেয়েরা মাথায় হিজাব পরে, মনে নয়।”

এর আগে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বলেছিল, বৈষম্যহীন ও সৎ উদ্দেশ্যে নির্ধারিত ইউনিফর্ম নীতিমালা স্কুল কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। ওই ছাত্রী আগের বছরগুলোতে কোনো আপত্তি ছাড়াই মাথায় স্কার্ফ পরলেও এবার পোশাকবিধির কারণ দেখিয়ে তাঁকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি দেওয়া হয়নি।

এদিকে আসাম ও উত্তরাখণ্ডে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি প্রণয়নের উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন ওয়াইসি। তার দাবি, ইউসিসির নামে হিন্দু ব্যক্তিগত আইন, যেমন হিন্দু বিবাহ আইন, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত আইন অনুসরণে মুসলমানদের বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মুসলমানদের কেন এসব আইন অনুসরণ করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, ধর্মীয় বিশ্বাসে অটল মুসলমানরা কোরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করেই চলবেন।

‘বন্দে মাতরম’ নিয়েও বক্তব্য দেন ওয়াইসি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষচন্দ্র বসু ও মহাত্মা গান্ধীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, গানটির প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁদের চেয়ে নিজেকে বেশি জ্ঞানী মনে করেন কি না—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।

ওয়াইসি বলেন, ভারত সবার এবং পরিণতি যা-ই হোক, তিনি কালেমা ঘোষণা করে যাবেন।

এ সময় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও বিজেপিরও সমালোচনা করেন এআইএমআইএম সভাপতি। তার দাবি, ভারতের সংবিধান গৃহীত হওয়ার কয়েকদিন পরই আরএসএসের মুখপত্র সংবিধানের পরিবর্তে মনুস্মৃতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

তিনি আন্দামান কারাগারে বিনায়ক দামোদর সাভারকারের আচরণের সঙ্গে মুসলিম স্বাধীনতাসংগ্রামীদের ভূমিকার তুলনা করেন এবং দাবি করেন, মুসলিম স্বাধীনতাসংগ্রামীরা কখনো ব্রিটিশদের অনুগ্রহ চাননি। স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএস কোনো ত্যাগ স্বীকার করেনি বলেও দাবি করেন তিনি।

সূত্র: এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, মুসলিম মিরর

ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ইসলামের ওপর আঘাত’
ছবি: সংগৃহীত।

Monday, August 24, 2026

গাজায় মরদেহ দাফনের জায়গা পাননি, দাদার কবরে বাবাকে দাফন করলেন ছেলে

আল–জাজিরাঃ মৃত বাবাকে কোথায় কবর দেবেন, তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহি। তাঁর বাবা মোহাম্মদকে (৪০) গাজার ইয়েলো লাইনের কাছে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলিরা।

মোহাম্মদ গাজা নগরীর জায়তুন এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। গত ১০ জুন ইসরায়েলিদের নির্ধারিত সামরিক এলাকা ইয়েলো লাইনের পাশে ফুটপাতের একটি দোকানে চা ও কফি বিক্রি করছিলেন। আচমকা একটি বুলেট এসে তাঁর ঘাড়ে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মারা যান।

ওমর তাঁর বাবার মরদেহ দাফনের জন্য জায়তুন করবস্থানে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, একের পর এক মরদেহে ঠাসা পুরো কবরস্থান। কোথাও একটুকরা জায়গা ফাঁকা নেই। এখানে শায়িত বেশির ভাগই গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর জাতিগত নিধনের শিকার।

জায়গার অভাব এবং যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে বেশির ভাগ কবর শুধু একটি পাথর দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। আর সেই পাথরে নিহত ব্যক্তির নাম লেখা একটি কাগজ সেঁটে দেওয়া হয়েছে।

ওমর আল-জাজিরাকে বলেন, ‘আমি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেখলাম, চারদিকে শুধু কবর আর কবর। চারদিকে বালুর স্তূপ, আর তার নিচেই দাফন করা হয়েছে মানুষের মরদেহ।’

ওমর আরও বলেন, যুদ্ধের আগে যেভাবে একটি কবর তৈরি বা প্রস্তুত করা হতো তার ছিটেফোঁটাও এখন নেই। একটি কবরের ওপর শুধু পাথরের টুকরা রেখে দেওয়া হয়েছে। তার ওপর এক টুকরা কাগজে নিহত ব্যক্তির নাম-পরিচয় লিখে রাখা হয়েছে।

বর্তমানে গাজায় একটি কবর প্রস্তুত করতে প্রায় ৫০০ শেকেল (১৬৭ মার্কিন ডলার) খরচ হয়। ওমরের পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তাই তাদের বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল।

ওমর বলেন, ‘সেখানে নতুন কোনো কবরের জায়গা ছিল না। তাই দাদার কবরেই বাবাকে দাফন করতে বাধ্য হয়েছি।’

গাজায় সব ধরনের নাগরিক পরিষেবা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া এবং অনবরত ইসরায়েলি হামলার ঝুঁকির কারণে যুদ্ধের সময় নিহত হাজারো ফিলিস্তিনির মরদেহ শনাক্ত বা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অনেক পরিবার তাঁদের স্বজনদের মরদেহ বাড়িঘরের আঙিনায়, তাঁবুর পাশে, উদ্বাস্তু শিবিরের মাঠে, স্কুল কিংবা হাসপাতালের চত্বরে দাফন করতে বাধ্য হয়েছেন।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর গাজায় ইসরায়েলি সহিংসতার মাত্রা কিছুটা কমে আসে। তখন পরিবারগুলো বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এবং অস্থায়ী কবর থেকে তাঁদের স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করে কবরস্থানে নিয়ে দাফন করার সুযোগ পান।

তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত আরও অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের জন্য দাফনের জায়গার প্রয়োজন ছিল। গাজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন হাসপাতালের চত্বরে থাকা ৭টি গণকবর থেকে এ পর্যন্ত ৫২৯ জন ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সহিংসতা কমায় মোহাম্মদের পরিবার তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে যথাযথ মর্যাদায় দাফনের জন্য কবরস্থানে নিয়ে যায়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত সেখানে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামলা থেকে রক্ষা পায়নি কবরস্থানগুলোও। ফলে এত মানুষের মরদেহ দাফনের জন্য কবরের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস করা হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোয় কবরস্থানে প্রবেশেও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। এতে পরিবারগুলোর জন্য স্বজনদের দাফনের জায়গা খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইসরায়েলি হামলায় লাখো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের আশ্রয় দিতে কবরস্থানের জন্য নির্ধারিত অনেক জায়গাকে উদ্বাস্তু শিবিরে পরিণত করা হয়েছে।

গাজার কর্তৃপক্ষ বলেছেন, কবরের ফলক তৈরির পাথরসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকট রয়েছে। এ কারণে এখন একটি কবর তৈরিতে ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেল বা প্রায় ২৩৫ থেকে ৩৩৫ ডলার খরচ হচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদা কিংবা ঢেউটিন দিয়ে অস্থায়ীভাবে কবর চিহ্নিত করা হচ্ছে। পরে অর্থের ব্যবস্থা হলে স্থায়ী কবরের ফলক বসানো হচ্ছে।

গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলোই যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদালাল বলেন, নতুন কবরস্থান তৈরি করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

মন্ত্রণালয় নতুন কবরের জায়গা খুঁজছে। একই সঙ্গে অস্থায়ীভাবে দাফন করা মরদেহগুলো কবরস্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে। তবে ইচ্ছেমতো মরদেহ সরানো যায় না। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে এ কাজ করতে হয়।

গাজার খান ইউনিস কবরস্থানে ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করেন তাফেশ আবু হাতাব। তাঁর পুরো কর্মজীবনে গাজা যুদ্ধের মতো এত কঠিন সময় আর কখনো আসেনি।

যুদ্ধ শুরুর সময় কবরস্থানটিতে ছিল প্রায় ৬০টি কবর। এখন সেখানে কবরের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। যুদ্ধের একপর্যায়ে তাফেশকে দিনে প্রায় ৩৫টি পর্যন্ত কবর খুঁড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এত ভয়াবহ রক্তপাত আমরা কখনো দেখিনি। প্রতিদিনই কয়েক ডজন শহীদকে এখানে দাফন করতে হচ্ছে।’

তাফেশ যাঁদের জন্য কবর খুঁড়েছেন তাঁদের বড় একটি অংশ নারী ও শিশু। কখনো কখনো একটি পরিবারের সব সদস্যকে একসঙ্গে দাফন করতে হয়েছে।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত ছেলেকে দাফন করা হয়েছে। ছেলের কবরের পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা। খান ইউনিস, দক্ষিণ গাজা, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪
ইসরায়েলি হামলায় নিহত ছেলেকে দাফন করা হয়েছে। ছেলের কবরের পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা। খান ইউনিস, দক্ষিণ গাজা, ১৮ জানুয়ারি ২০২৪ ছবি: রয়টার্স

সামরিক দিক থেকে তুরস্ক এত শক্তিশালী হলো কীভাবে

তুরস্ক এখন শুধু ন্যাটোর বড় সামরিক শক্তি নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলেও নিজেদের সামরিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। দেশটির হাতে বিপুলসংখ্যক সেনা, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও ড্রোন রয়েছে। একই সঙ্গে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পও দ্রুত শক্তিশালী করছে আঙ্কারা।

২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, তুরস্কের সক্রিয় সেনাসদস্য প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার। এর সঙ্গে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার রিজার্ভ সেনা এবং দেড় লাখের মতো আধাসামরিক সদস্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা ১০ লাখের বেশি।

স্থলবাহিনী তুরস্কের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশটির কাছে প্রায় ২ হাজার ২৮৪টি ট্যাংক এবং প্রায় ৯৮ হাজার বিভিন্ন ধরনের সামরিক যান রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে এক হাজারের বেশি স্বচালিত কামান, ৬৩৫টি টানা কামান এবং ২৩৭টি রকেট লঞ্চার।

আকাশপথেও তুরস্কের শক্তি বড়। দেশটির সামরিক বহরে প্রায় ১ হাজার ১০১টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ২০১টি যুদ্ধবিমান, ৮৪টি পরিবহন বিমান, ৩০১টি প্রশিক্ষণ বিমান এবং ৫০৯টি হেলিকপ্টার রয়েছে। তুরস্কের যুদ্ধবিমান বহরের মূল শক্তি এখনো এফ-১৬। পাশাপাশি নিজেদের তৈরি কেএএএন যুদ্ধবিমানও উন্নয়ন করছে দেশটি।

তবে তুরস্কের সামরিক শক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ড্রোন। দেশটির বায়কার কোম্পানির তৈরি বায়রাকতার টিবি-২ বিশ্বের পরিচিত সামরিক ড্রোনগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। তুরস্ক এখন বিভিন্ন দেশে এসব ড্রোন রপ্তানিও করছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।

নৌবাহিনীতেও তুরস্কের বড় উপস্থিতি রয়েছে। দেশটির নৌবহরে প্রায় ১৯২টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি ফ্রিগেট, ৯টি করভেট এবং ১৪টি সাবমেরিন। কৃষ্ণসাগর, এজিয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের নৌবাহিনী সক্রিয়। বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালির নিয়ন্ত্রণও দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

তুরস্ক এখন নিজের অস্ত্র নিজেই তৈরির দিকে এগোচ্ছে। দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে বর্তমানে ৪ হাজার ৫০০টির বেশি কোম্পানি কাজ করছে এবং প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। দুই দশক আগে যেখানে স্থানীয়ভাবে তৈরি সামরিক সরঞ্জামের অংশ ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, এখন তা ৮৫ শতাংশের বেশি বলে তুরস্কের সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

তুরস্কের সামরিক শক্তির পেছনে ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থান করার পাশাপাশি দেশটির সীমান্ত রয়েছে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, জর্জিয়া ও বুলগেরিয়ার সঙ্গে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস, বলকান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্কের সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা। তুরস্ক বহু বছর ধরে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে এবং সিরিয়া ও ইরাকের উত্তরাঞ্চলেও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সামরিক প্রযুক্তির সুবিধাও পাচ্ছে দেশটি।

তবে শুধু ট্যাংক, বিমান বা যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা দিয়ে কোনো দেশের সামরিক শক্তি পুরোপুরি বোঝা যায় না। এসব অস্ত্রের কতগুলো কার্যকর, আধুনিক যুদ্ধে কতটা সক্ষম এবং বিভিন্ন বাহিনী কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: ওয়াইনেট নিউজ

ছবি: এপি
ছবি: এপি

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে তিন ধাপে ব্যবস্থা নেবে তেহরান

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ কোনো দেশ যোগ দিলে তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা শত্রু হিসেবে বিবেচিত হবে তাদের বিরুদ্ধে ‘ভূমিকম্পসম’ পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে তেহরান তিনটি ধাপ অনুসরণ করবে।

গত শনিবার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব রেজাই এ হুঁশিয়ারি দেন।

তিনি বিশ্বের সব দেশ, বিশেষ করে ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানান। রেজাই বলেন, কোনো দেশ ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে অংশ নিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান।

ইরানের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে কোনো প্রতিবেশী দেশ যুক্ত হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ‘এক ফোঁটা তেলও’ বের হতে দেওয়া হবে না। এমনকি হরমুজ প্রণালির বিকল্প রপ্তানি পথও এর আওতায় আসতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

তিন ধাপে পাল্টা ব্যবস্থা

ইরানের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কৌশল তিন ধাপে এগোবে বলে জানিয়েছেন রেজাই। প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে তেহরান।

তিনি বলেন, প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে আসার আহ্বান জানানো হবে। তারা এতে সাড়া না দিলে পরবর্তী ধাপে হামলা চালিয়ে ওই দেশের স্বার্থে আঘাত করা হবে।

রেজাইয়ের বক্তব্যে বিকল্প রপ্তানি পথের কথা উল্লেখ করায় বিশ্লেষকদের ধারণা, এর মধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। লোহিত সাগরে প্রবেশের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ এবং এর ওপর আরোপিত অবরোধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে, যার ফলে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক ক্লিঙ্গেনডেল ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক গবেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, তেহরান আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক বার্তা দিতে চাইছে। তার ভাষ্য, কোনো সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতিকেও ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

আজিজির মতে, ইরানের নতুন সামরিক কৌশলে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একটি হলো সম্ভাব্য হুমকি বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই তা ঠেকাতে আগাম পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যটি হলো হামলা হলে তার চেয়ে বেশি মাত্রায় পাল্টা আঘাত করে প্রতিপক্ষের জন্য ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া।

তার ভাষায়, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ দিলে ইরানের হুঁশিয়ারি মূলত একটি ‘চূড়ান্ত সতর্কবার্তা’। ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো আরও এক দফা সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।

চাপে উপসাগরীয় দেশগুলো

ইরানের প্রতিবেশী এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংঘাতের কারণে ক্রমেই কঠিন অবস্থার মুখে পড়ছে। তারা একদিকে ইরানের হামলার নিন্দা করছে, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতেও চাইছে না।

কারণ ভৌগোলিক বাস্তবতায় ইরানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিও হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিচালিত হয়।

গত সপ্তাহে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে ওই হামলার দায় অস্বীকার করেছে ইরান। এর আগে ২০২২ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছিল।

অন্যদিকে চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করে। স্থায়ী সংঘাতের চেয়ে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখাই নিরাপদ, এমন হিসাব থেকেই ওই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে ভৌগোলিক বাস্তবতা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। ইরানের সঙ্গে তাদের পাশাপাশি বসবাস ও কাজ করতেই হবে।

তার মতে, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে, উপসাগরীয় দেশগুলো তা চায় না। বরং তারা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কট্টরপন্থী অংশকে দুর্বল করতে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে থাকতে পারে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, সংকট সমাধানে কূটনীতির ওপর আস্থা কম থাকলেও এ অঞ্চলের কোনো দেশই আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে পারবে না।

তার মতে, এই বাস্তবতাই সংঘাতকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া থেকে ঠেকাবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তেল মজুতের পরিমাণও কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কারও জন্যই আকর্ষণীয় নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি

ইরানের হুঁশিয়ারির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আজ সোমবার (২৪ আগস্ট) নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হতে পারে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ‘ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান’ চালানোর ঘোষণা দেন। ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা বা ‘লাইফলাইন’ দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

পরদিন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও একই সুরে বলেন, ‘আপনি হয় আমাদের সঙ্গে, নয়তো আমাদের বিরুদ্ধে।’

ইরানের অন্যতম বড় তেল ক্রেতা চীনের প্রতিও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানের তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনে থাকে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান রোববার বলেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা যুদ্ধে’ রয়েছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল, মার্কিন হামলার মুখে ইরানের সরকার ভেঙে পড়বে এবং দেশটি ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতিতে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বরং ইরানের প্রতিরোধ, সংহতি ও ঐক্য বিশ্বকে বিস্মিত করেছে বলে দাবি করেন তিনি।

কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে ইরান। জাতিসংঘও বিভিন্ন সময়ে তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ইরানি বিপ্লবের পর মার্কিন দূতাবাসে মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ এবং দেশটির প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি পণ্য আমদানিও নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে মার্কিন বিনিয়োগ এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পরের বছর মার্কিন কংগ্রেস এমন আইন পাস করে, যাতে ইরানের জ্বালানি খাতে বছরে ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রাখা হয়।

২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপকরণ ও প্রযুক্তি বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদও জব্দ করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোয় জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

২০১৫ সালে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) সই করে। চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল।

তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন এবং ইরানের ওপর আবারও সব নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনেন। তেহরানের বিরুদ্ধে শুরু করেন ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি।

২০১৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামা খাত এবং দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

২০২০ সালে বাগদাদে ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ইরানের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জো বাইডেনের প্রশাসনও ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত অধিকাংশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে।

গত সেপ্টেম্বরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও পুনর্বহাল করা হয়। এর ফলে দীর্ঘ কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বর্তমান সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা।

এ পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নতুন করে বড় ধরনের কৌশলগত চাপ তৈরি করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কতটা অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হবে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ধরে রাখবে, সেটিই এখন আঞ্চলিক উত্তেজনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সূত্র: আল জাজিরা

ছবি: আলজাজিরা থেকে নেওয়া।
ছবি: আল জাজিরা থেকে নেওয়া।

মধ্যপ্রাচ্যে কম খরচে ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) একটি ছোট গুদামে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করছেন শ্রমিকেরা। তাদের কাজ—থ্রিডি প্রিন্টেড বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জোড়া দিয়ে 'ইন্টারসেপ্টর' তৈরি করা, যা ঘণ্টায় ২০০ মাইল গতিতে উড়ে এসে আকাশে ধ্বংস করতে পারে ইরানি ড্রোন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাভিত্তিক স্টার্টআপ কোম্পানি ‘পাওয়ারআস’ কম খরচে ড্রোন ধ্বংসকারী এই অস্ত্র তৈরির জন্য গত মাসে আরব আমিরাতে এই কারখানা চালু করেছে। বিশ্বজুড়ে অস্ত্র সরবরাহের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে এটি তাদের প্রথম প্রবেশ। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী কারখানাগুলো বর্তমানে মাসে প্রায় ৩ হাজার ড্রোন ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছে। ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বজুড়ে উৎপাদন বাড়িয়ে মাসে ১৫ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। তবে আমিরাতে তাদের গ্রাহক ও চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ্যে আনেনি কোম্পানিটি।

প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর

প্রতিরক্ষা শিল্প সাধারণত ধীরগতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও উচ্চ খরচের জন্য পরিচিত। কিন্তু মিত্রদেশগুলোর জরুরি চাহিদা মেটাতে সেই ধারা বদলাচ্ছে পাওয়ারআস। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কারখানা তৈরি করে অস্ত্র রপ্তানি করার পরিবর্তে তারা যে অঞ্চলে প্রয়োজন, সেখানকার স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের সঙ্গেই অংশীদারত্ব তৈরি করছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমিরাতের বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি হামলা চালায় ইরান। যুদ্ধে এ পর্যন্ত আমিরাতের বিভিন্ন লক্ষ্যে ৫০০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০টির বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত ও শত শত মানুষ আহত হয়েছেন, বন্ধ হয়েছে একটি তেল শোধনাগার এবং ধ্বংস হয়েছে অ্যামাজনের দুটি ডাটা সেন্টার। মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে আসায় এখন বিকল্প ও দ্রুত সরবরাহের ইন্টারসেপ্টরের চাহিদা সেখানে তীব্র।

লোগো খেলনার মতো সহজে জোড়া দেওয়া প্রযুক্তি

ইন্টারসেপ্টর হলো ছোট আকারের এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই আকাশে ড্রোন বা হুমকিকে ধ্বংস করে। পাওয়ারআস ‘গার্ডিয়ান’ নামের যে ইন্টারসেপ্টর তৈরি করেছে, তার প্রতিটির খরচ মাত্র ৫ হাজার ডলার (প্রায় ৬ লাখ টাকা)। ইউক্রেনে রাশিয়ার 'শাহেদ' ড্রোনের বিরুদ্ধে কার্যকর হওয়া এক নকশার ওপর ভিত্তি করে এটি তৈরি।

এই গার্ডিয়ান ইন্টারসেপ্টরগুলো তৈরি করা বেশ সহজ, সাধারণ 'লোগো' খেলনার মতো যন্ত্রাংশগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি আটকে দেওয়া যায়। এতে সহজে বাজারে পাওয়া যায় এমন মাইক্রোচিপ ও জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি লকহিদ মার্টিনের প্যাক-৩-এর মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে না পারলেও, ইরানের বহুল ব্যবহৃত শাহেদ ড্রোন ধ্বংসে দারুণ কার্যকর।

যৌথ উৎপাদন ও বিশ্ববাজার

পাওয়ারআসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল সিনেনস্কি জানান, আমিরাতের কারখানায় মূলত ফিলিপাইন ও চীনের শ্রমিকেরা দিনে প্রায় ৩০টি ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছেন, যা শিগগিরই ১০০-তে উন্নীত করা হবে।

কোম্পানিটি সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো সুরক্ষায় ২২ মিলিয়ন ডলারের একটি বাণিজ্যিক চুক্তি সই করেছে। এছাড়া ভারতের মুম্বাইয়ের কাছে একটি প্রতিরক্ষা কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়েও তারা ইন্টারসেপ্টর তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

এমনকি বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘লকহিদ মার্টিন’ ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে মিলে কম খরচে ইন্টারসেপ্টর তৈরির পরিকল্পনা করছে। তবে তাদের ২০ লাখ ডলার মূল্যের সেই মডেলটির পরীক্ষা ২০২৮ সালের আগে সম্ভব নয়।

অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘রেথিয়ন’ আমিরাতে তাদের ‘কয়োটি’ ইন্টারসেপ্টর তৈরির ঘোষণা দিয়েছে, যার প্রতিটির আনুমানিক খরচ ১ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ ডলার। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক স্টার্টআপ ‘নেরোস’ ৫ হাজার ডলারে ‘ব্যান্ডিট’ নামে আরেকটি ইন্টারসেপ্টর ড্রোন বানাচ্ছে।

ব্যবসার পেছনের ট্রাম্প সংযোগ

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই 'পাওয়ারআস' শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত গলফ কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ওরিয়াস গ্রিনওয়ে হোল্ডিংস’-এর সঙ্গে একীভূত হয়। এই চুক্তির মধ্যস্থতা করে 'ডোমিনারি সিকিউরিটিজ' নামে একটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, যার অংশীদার ও উপদেষ্টা বোর্ডে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই বড় ছেলে—ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প।

এছাড়া কোম্পানিটির উপদেষ্টা বোর্ডে যোগ দিয়েছেন সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল কিথ কেলগ। গত জুনে ট্রাম্প জুনিয়রের উপদেষ্টা থাকা ‘আনইউজুয়াল মেশিনস’ নামে একটি ড্রোন যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পাওয়ারআসে ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। চলতি মাসে মার্কিন বিমান বাহিনীর কাছে ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের জন্য ৯০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মূল্যের একটি চুক্তিও সই করেছে তারা।

যেভাবে শুরু হয়েছিল পাওয়ারআস

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালালে পাওয়ারআসের বীজ বপন করা হয়। চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান 'উইশিল্ড'-এর মালিক মাইকেল সিনেনস্কি ও তার বন্ধু রোমান ভিনফেল্ড ইউক্রেনে গিয়ে ড্রোন যুদ্ধের তীব্রতা চাক্ষুস করেন এবং তাদের নিজেদের মানবিক সহায়তার গুদামটিও ধ্বংস হয়ে যায়।

পরবর্তীতে সেখানে মার্কিন সেনা স্পেশাল অপারেশনের সাবেক সদস্য ব্রেট ভেলিকভিচ, অ্যান্ড্রু ফক্স এবং জিব মারমের সঙ্গে পরিচয় হয়। পাঁচজন মিলে গঠন করেন পাওয়ারআস। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের প্রযুক্তি লাইসেন্স করে এবং 'ট্যান্ডেম ডিফেন্স' ও 'কাইজেন অ্যারোস্পেস'-এর মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য নর্থ ক্যারোলিনা ও ক্যালিফোর্নিয়ার কারখানায় কাজ শুরু করেন।

সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম খরচের গার্ডিয়ান ইন্টারসেপ্টর মূল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সম্পূরক হতে পারে, তবে বিকল্প নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র ফেলো স্টেসি পেটিজন বলেন, ইরান হয়তো দ্রুতগতির জেটচালিত 'গেরান-৩' ড্রোনসহ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বড় করছে। রাশিয়া ইউক্রেনে যেভাবে একযোগে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, ইরানও সেদিকে যেতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইআইএসএস) গবেষণা সহযোগী অ্যালবার্ট ভিডাল মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো লাখ লাখ ডলারের প্যাক-৩ ব্যবহার করে মাত্র ৪০ হাজার ডলারের শাহেদ ড্রোন ধ্বংস করার অর্থনৈতিক ঝুঁকি আর নেবে না। তাদের লক্ষ্য এখন যেকোনো উপায়ে নিজস্ব প্রযুক্তি গড়ে তোলা ও স্থানীয়ভাবে কম খরচে উৎপাদন করা। 

মধ্যপ্রাচ্যে কম খরচে ইন্টারসেপ্টর তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

Saturday, August 22, 2026

ইরানের বড় বাণিজ্য অংশীদার কারা?

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় বিচ্ছিন্ন করার হুমকি ট্রাম্পেরঃ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে সহায়তা করা যে কোনো দেশের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের এমন হুমকিতে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা কয়েকটি দেশ হলো :

চীন

ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা চীন। গত বছর ইরান থেকে গড়ে প্রতিদিন ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তেল কিনেছে চীন বলে জানিয়েছে জ্বালানি বাজারবিষয়ক প্রতিষ্ঠান কেপলার। ইরানের রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীনে যায়।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চীনের কিছু স্বাধীন শোধনাগার দীর্ঘদিন ধরে ইরানের তেল কিনে আসছে। এসব লেনদেনে চীনা মুদ্রা ব্যবহার ও বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয়।

এপ্রিল মাসে ইরানের তেল কেনার অভিযোগে একটি চীনা স্বাধীন শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তা করা চীনা ব্যাংকগুলোকেও ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সমস্যার সমাধান করবে না। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংযুক্ত আরব আমিরাত

ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০২৪ সালে ইরানের মোট আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার, এসেছে আমিরাত থেকে। একই বছরে ইরানের রপ্তানির ১৩ শতাংশের গন্তব্যও ছিল দেশটি।

২০২৪ সালে দুই দেশের তেলবহির্ভূত বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। এর বড় অংশই ছিল পুনঃরপ্তানি।

তবে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের আর্থিক ও অর্থনৈতিক লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে আমিরাত।

তুরস্ক

ইরান ও তুরস্কের মধ্যে দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্ক ইরান থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে এবং ইরানে বিভিন্ন শিল্পপণ্য রপ্তানি করে।

দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে তুরস্কের রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। তুরস্কের মোট গ্যাস আমদানির প্রায় ১৩ শতাংশ আসে ইরান থেকে।

ইরাক

ইরাকও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল।

ইরান থেকে খাদ্যপণ্য, ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে ইরাক। তবে ২০২৬ সালে সংঘাত শুরু হওয়ার পর সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে দুই দেশের বাণিজ্য কমেছে।

ওমান

ইরানের সঙ্গে ওমানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করেছে মাসকাট।

২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪৫ মিলিয়ন ডলারে।

পাকিস্তান

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়িয়ে ১০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে পাকিস্তান। তবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিলে ইসলামাবাদ চাপের মুখে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

আগের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সময় দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আদান-প্রদান হয় বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে তেল, গম, চাল, গবাদিপশু ও ওষুধের বাণিজ্য রয়েছে।

ভারত

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২০ সাল থেকে ভারত-ইরান বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য যেখানে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার ছিল, ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ আরও কমে ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এর বড় অংশই ভারতের রপ্তানি, যার মধ্যে রয়েছে শস্য, চা, কফি ও মসলা।

ভারতীয় কর্মকর্তারা অতীতে এসব পণ্য রপ্তানিকে মানবিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

আর্মেনিয়া

২০২৫ সালে আর্মেনিয়ার মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭৬৮ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ইরানের সঙ্গে হয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দুই দেশের বাণিজ্য ৩৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।

ইরান-আর্মেনিয়ার মধ্যে ‘গ্যাসের বিনিময়ে বিদ্যুৎ’ চুক্তিও রয়েছে। ইরান আর্মেনিয়ায় গ্যাস সরবরাহ করে এবং এর বিনিময়ে আর্মেনিয়া বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

আজারবাইজান

চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে ইরান ও আজারবাইজানের বাণিজ্য ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৩১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৯৯ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার।

এ সময়ে ইরান থেকে আজারবাইজানের আমদানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ২৯৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আজারবাইজানের ইরানে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।

ইরানের সঙ্গে এসব দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে শুধু তেহরান নয়, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ব্যাংক, তেল ব্যবসা ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: রয়টার্স 

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ। ওমানের মুসান্দাম থেকে ড্রোনের সাহায্যে ছবিটি তুলেছে রয়টার্স
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ। ওমানের মুসান্দাম থেকে ড্রোনের সাহায্যে ছবিটি তুলেছে রয়টার্স

Thursday, August 20, 2026

টেক্সাসে বাড়ছে মুসলিমদের সংখ্যা, তীব্র হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষও

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষ করে ডালাসের আশপাশে। ভালো স্কুল, তুলনামূলক সাশ্রয়ী আবাসন এবং শক্তিশালী মুসলিম সম্প্রদায়ের কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম পরিবারগুলো সেখানে বসতি গড়েছে। ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ এলাকায় গড়ে উঠেছে কয়েক ডজন মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠান। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের এই বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অঙ্গরাজ্যটিতে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য, সামাজিক বৈরিতা এবং রাজনৈতিক প্রচারণাও জোরালো হয়েছে।

বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

জুনের শুরুর দিকে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম থেকে উঠেছিলেন গুলাম কেহার। টেক্সাসের আরভিংয়ে নিজের স্থানীয় মসজিদ ভ্যালি র‍্যাঞ্চ ইসলামিক সেন্টারে দিনের প্রথম নামাজ আদায় করে কয়েক মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডে দায়িত্ব পালনে যাওয়ার কথা ছিল তার।

এর আগেও তিনি দায়িত্ব পালনে গিয়েছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে টেক্সাসে রেখে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।

টেক্সাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মুসলিমবিরোধী বক্তব্য তখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং সেগুলোর প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছিল। বিভিন্ন মসজিদের মুসল্লি ও ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে নামাজ পড়ার সময় কিংবা পার্কে বসে থাকার সময় তাদের উদ্দেশে করা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছিলেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হিউস্টনের একটি বড় ইসলামিক সেন্টারে সন্ত্রাসী হুমকি দেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কনরো শহরে এক নারী মুসলিম ক্রেতাদের বলেন, তারা ‘এই অঙ্গরাজ্য বা এই দেশে স্বাগত নয়’। ওই মন্তব্যের ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর নারীটি চাকরি হারান। পরে সমর্থকদের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পান তিনি।

ডালাসের উপশহর ম্যাককিনিতেও একটি মসজিদ সম্প্রসারণ নিয়ে উত্তপ্ত সিটি কাউন্সিলের শুনানির সময় এক নারী সাবেক মেয়রের জামার ভেতরে ইসলামবিরোধী বার্তা লেখা কাগজ ঢুকিয়ে দেন।

‘এমন পরিবেশে তাদের একা রেখে যাওয়া কিছুটা উদ্বেগের বিষয় ছিল,’ নিজের পরিবারের প্রসঙ্গে বলেন কেহার। ‘বাইরে যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোই ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিল।’

পরে দায়িত্ব পালনের এলাকায় তার পরিবারকে যত দ্রুত সম্ভব তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি।

কেহারের মতো গত কয়েক দশকে টেক্সাসে বসতি গড়া মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে। ডালাসের দক্ষিণে ‘ডিসোটো হাউস অব পিস’-এর মতো প্রতিষ্ঠানও মুসলিম সম্প্রদায়ের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।

‘আমেরিকান মুসলিমদের জন্য এটাই থাকার সবচেয়ে ভালো জায়গা,’ বলেন তাম্মাম আলওয়ান। ডেট্রয়েট থেকে আরভিংয়ে চলে আসা এই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি প্রার্থনা করেছিলাম—হে আল্লাহ, আমাকে আরভিংয়ে পাঠান।’

কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায় যত বেড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভও তত বেড়েছে।

‘র‍্যাডিক্যাল ইসলাম’ মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকান রাজনীতির অংশ। জাতীয় পর্যায়েও এই বক্তব্য আরও তীব্র হয়েছে। মুসলিম রাজনীতিকদের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয় এবং মুসলিমদের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

তবে টেক্সাসের রাজনীতিকরা শুধু বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা কিছু মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতাও প্রয়োগ করেছেন।

২০২৫ সালের শুরুর দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। পূর্ব প্লানোর ইসলামিক সেন্টার বা এপিকের সদস্যরা ডালাসের পূর্বদিকে প্রায় ৪০০ একর জমিতে মসজিদকেন্দ্রিক একটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রকাশ করলে তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় এপিক সিটি । পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘দ্য মেডো’ রাখা হয়। প্রকল্পটিতে এক হাজারের বেশি বাড়ি, মসজিদ, স্কুল, দোকান, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদনমূলক স্থাপনা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটি নিয়ে ইসলামবিরোধী প্রভাবক অ্যামি মেকেলবার্গ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, টেক্সাসের বারবিকিউ রেস্তোরাঁগুলোকে একটি সমন্বিত ‘দখল’-এর অংশ হিসেবে ‘আরব শপিং প্লাজা’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এপিক সিটি নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘এভাবেই পশ্চিমা বিশ্বের পতন হয়।’

তার প্রচারণা টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর অ্যাবট প্রস্তাবিত প্রকল্প ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রাজ্যীয় তদন্ত শুরু করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনও প্রকল্পটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেন।

প্রকল্পটির সমালোচকেরা এটিকে ‘শরিয়াহ-নিয়ন্ত্রিত’ বা মুসলিমদের জন্য আলাদা এলাকা হিসেবে তুলে ধরলেও প্রকল্পের উদ্যোক্তারা বলেছেন, এটি সব ধর্ম ও পটভূমির মানুষের জন্য উন্মুক্ত।

রিপাবলিকান কনভেনশনে শরিয়াহবিরোধী প্রপাগাণ্ডা

মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের বিস্তার টেক্সাসের রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জুনে অনুষ্ঠিত টেক্সাস স্টেট রিপাবলিকান কনভেনশনে ‘Don’t Sharia Our Texas’ বা টেক্সাসকে শরিয়াহমুক্ত রাখার বার্তা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়। একাধিক প্যানেলে মুসলিম ‘আগ্রাসন’ নিয়ে সতর্ক করা হয় এবং শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করাকে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়। গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও সম্মেলনে শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান।

সম্মেলনস্থলে টেক্সাস হাউসের নতুন ‘শরিয়াহ-মুক্ত ককাস’-এর একটি বুথও ছিল। সেখানে অ্যামি মেকেলবার্গের সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রচারণা চালানো হয়।

এক নারীর হাতে থাকা একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমার টেক্সাসকে শরিয়াহ আইনে শাসিত করো না। স্বাধীনতা রক্ষা করো। টেক্সাস রক্ষা করো।’

এরই মধ্যে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রিপাবলিকান প্রার্থী বো ফ্রেঞ্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি থামব না।’

২০১৫ থেকেই শরিয়াহবিরোধী রাজনীতি

টেক্সাসে মুসলিমদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে আরভিংয়ের তৎকালীন মেয়র বেথ ভ্যান ডুইন শরিয়াহ আইনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসেন। তিনি বর্তমানে কংগ্রেসের সদস্য।

এর দুই বছর পর, ওয়াশিংটনভিত্তিক কট্টর ডানপন্থী থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসি-র উদ্যোগে আনা একাধিক বিলের অংশ হিসেবে টেক্সাসের রিপাবলিকানরা শরিয়াহবিরোধী আইন পাস করেন।

এরপর কিছু সময়ের জন্য কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিতে ইসলাম ইস্যুর গুরুত্ব কমে যায়। অভিবাসন, মহামারি ও লিঙ্গ রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পায়।

কিন্তু পরে কট্টর ডানপন্থীদের একটি অংশ নতুন করে এমন একটি বিতর্কিত ধারণা সামনে আনে—ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, বরং একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ।

এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এপিক সিটি নিয়ে নতুন করে প্রচারণা শুরু হয়।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ

রিপাবলিকান রাজনৈতিক পরামর্শক অ্যান্থনি হোমের মতে, ইসলাম নিয়ে রিপাবলিকান ভোটারদের উদ্বেগ মূলত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে তাদের ভীতিরই সম্প্রসারণ। গভর্নর অ্যাবটের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি যা কিছু করেন, তা জনমত জরিপ দ্বারা চালিত।’

এদিকে অ্যাবট মুসলিম যাত্রীদের ধর্মীয় অজুর জন্য ব্যবস্থা রাখা টেক্সাসের বিমানবন্দরগুলোর সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করার হুমকি দেন। মুসলিমদের একটি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত একটি ব্যক্তিগত ওয়াটার পার্ক অনুষ্ঠান বাতিলের নির্দেশও দেন তিনি।

একই সঙ্গে অ্যাবট জাতীয় নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেন। সংগঠনটি আদালতে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, সিএআইআর-কে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি অন্যান্য ইসলামি প্রতিষ্ঠানকেও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মুসলিম নেতাদের অবস্থান

টেক্সাসের মুসলিম নেতারা কীভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ আন্তঃধর্মীয় যোগাযোগ ও জনসম্পৃক্ততার পক্ষে। আবার কেউ মনে করছেন, শুধু নিজেদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়।

ভ্যালি র‍্যাঞ্চ মসজিদে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট মুসলিম স্কলার ড. ওমর সুলেইমান বলেন, ‘আমরা সবসময় আমাদের কর্মকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে আশা করেছি, আমাদের কর্মকাণ্ডই স্বাভাবিকভাবে আমাদের পক্ষে কথা বলবে। আমরা সেটা চেষ্টা করেছি, কিন্তু এতে আমাদের কোনো লাভ হয়নি।’

তার মতে, এখন পরিস্থিতির জন্য ‘শক্ত অবস্থান’ প্রয়োজন এবং মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।

‘আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলাকে এসব মানুষের জন্য আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল করে তুলতে হবে,’ বলেন তিনি। ‘আমাদের তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।’

তিনি এমন প্রতিরোধের ভিত্তি হিসেবে মার্কিন সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষার কথা উল্লেখ করেন। তবে কট্টর রক্ষণশীলরা কীভাবে সেই সুরক্ষা সীমিত করা যায়, তার পথ খুঁজছেন।

টেক্সাসে এমন একটি উদ্যোগ হিসেবে কিছু ইসলামি সাংস্কৃতিক চর্চা—যেমন বিবাহ ও অন্যান্য বিষয়ে ধর্মীয় বিধানভিত্তিক সালিশি ব্যবস্থা—নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণে রাজ্য আইন ব্যবহারের কথা আলোচনা হচ্ছে।

সান অ্যান্টোনিওর রিপাবলিকান স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালান স্কুলক্রাফট বলেন, ‘আমরা প্রথম যে বিষয়গুলো করার চেষ্টা করব, তার একটি হলো—ধর্ম বলতে কী বোঝায়, সেটি সংজ্ঞায়িত করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়। এটি একটি ধর্মের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।’

মুসলিম অধিকারকর্মীদের মতে, পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক প্রচারণা, আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এবং সরকারি পদক্ষেপের মধ্য দিয়েও এর প্রকাশ ঘটছে।

সিএআইআর-এর অস্টিন শাখার শাইমা জায়ান বলেন, ‘আমরা ইসলামোফোবিয়ার ঢেউয়ের সম্মুখীন হচ্ছি। এটি সবচেয়ে ভয়াবহ ঢেউ।’

সব মিলিয়ে, টেক্সাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিস্তারের পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক প্রচারণাও নতুন মাত্রা পেয়েছে। মসজিদ ও মুসলিম অধ্যুষিত কমিউনিটি গড়ে ওঠা থেকে শুরু করে শরিয়াহ আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক—সবকিছু মিলিয়ে অঙ্গরাজ্যটির মুসলিমদের ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হচ্ছে। 

টেক্সাসে বাড়ছে মুসলিমদের সংখ্যা, তীব্র হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষও
ছবি: সংগৃহীত।

ভারতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৫৯ বছরের পুরোনো মাদরাসার একাংশ, তীব্র ক্ষোভ

ভারতের উত্তরপ্রদেশের সিদ্ধার্থনগর জেলায় ৫৯ বছরের পুরোনো একটি মাদরাসার অর্ধেকের বেশি অংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দল ও নেতাকর্মীরা এ ঘটনাকে ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি প্রকাশ্য ঘৃণার এজেন্ডা’ এবং ‘অসাংবিধানিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

মঙ্গলবার জেলার পিপরা রামলাল গ্রামের আরাবিয়া জিয়া-উল-উলুম মাদরাসা, যা মক্তব মাদরাসা নামেও পরিচিত, ভাঙা হয়। প্রায় ১৪ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে থাকা মাদরাসাটির সাতটি কক্ষ, একটি দোকান এবং হলের অর্ধেক অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের দাবি, মাদরাসাটির একটি অংশ সরকারি জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছিল। আদালতের আদেশের ভিত্তিতেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।

আদালতের আদেশে উচ্ছেদ

২০২২ সালে গ্রামের পাঁচ বাসিন্দা কথিত সরকারি জমি দখলমুক্ত করার দাবিতে ডোমরিয়াগঞ্জ তহসিলদারের আদালতে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

মাদরাসার তত্ত্বাবধায়ক আবদুল সালাম একই বছর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেন। প্রায় তিন বছর ধরে শুনানি চলার পর ১৪ আগস্ট ২০২৬ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত তহসিলদারের আদেশ বহাল রাখেন এবং মাদরাসার আবেদন খারিজ করে দেন।

এরপর প্রশাসন কথিত দখল সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দখল সরানো হয়নি দাবি করে মঙ্গলবার মাদরাসা ভাঙার অভিযান চালানো হয়।

সকাল ৭টার দিকে ডোমরিয়াগঞ্জের এসডিএম বিবেকানন্দ মিশ্র, ডোমরিয়াগঞ্জের সিও ব্রিজেশ ভার্মা ও বানসি সিও শিবেন্দু সিংয়ের উপস্থিতিতে অভিযান শুরু হয়। ঘটনাস্থলে পাঁচটি থানার প্রায় ১০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।

বিক্ষোভ

মাদরাসা ভাঙার খবর পেয়ে ডোমরিয়াগঞ্জের সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক সৈয়দা খাতুন, এসপি জেলা সভাপতি লালজি যাদবসহ ৫০ জনের বেশি দলীয় নেতা-কর্মী ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিক্ষোভ করেন। তারা মাদরাসা ভাঙার বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং অভিযান বন্ধের দাবি জানান।

পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বাধা দিলে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে সামান্য ধস্তাধস্তিও হয়।

এসপি নেতা কামাল আহমেদ খান মাদরাসার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ডোমরিয়াগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্রী প্রকাশ যাদব তাকে বাধা দেন। পুলিশ জোর করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়।

জবাবে খান বলেন, ‘ঠিক আছে, যা করার করুন। আপনারা কি আমার গায়ে হাত তুলবেন?’

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অন্য পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। বিধায়ক সৈয়দা খাতুনও দলীয় কর্মীদের শান্ত থাকার এবং আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের আহ্বান জানান।

পরে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেয়।

প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে মাদরাসাটির সাতটি কক্ষ, একটি দোকান এবং হলের অর্ধেক অংশ ভেঙে ফেলা হয়।

‘অসাংবিধানিক’ বলল আম আদমি পার্টি

আম আদমি পার্টির উত্তরপ্রদেশ শাখা এই অভিযানকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে দাবি করেছে। দলটির উত্তরপ্রদেশের বুদ্ধিস্ট প্রদেশের সভাপতি ইমরান লতিফ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

আপ প্রশ্ন তুলেছে, কখন নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।

দলটি এক বিবৃতিতে বলেছে, এই পদক্ষেপ “বাবাসাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকরের সংবিধানে আঘাত করেছে”, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আইনের সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

আপের দাবি, বিষয়টি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে নয়; বরং এটি আইনের শাসন ও সংবিধান রক্ষার লড়াই।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্বেষের এজেন্ডা

কংগ্রেস নেতা জাভেদ আশরাফ খান এই ঘটনাকে ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্বেষের এজেন্ডা’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিজেপি ও আরএসএসের কাছে “ধ্বংস করা ছাড়া আর কোনো সমাধান আছে কি না”। একই সঙ্গে তিনি এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

রাজনৈতিক কর্মী আবদুর রকীব খান বলেন, “আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।”

মাদরাসা ভাঙার আগে সব সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ ‘শিশুদের শিক্ষা, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব এবং জনআস্থার’ বিনিময়ে হওয়া উচিত নয় এবং রাস্তা বা সরকারি জমি দখল করে থাকা সকল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থাপনার বিরুদ্ধে “সমান, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা” নেওয়ার আহ্বান জানান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সিদ্ধার্থনগর জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ডোমারিয়াগঞ্জ তহসিলে অবস্থিত মাদ্রাসাটি ১৯৩৮ সালে গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ১৯৬৭ সালে পিপড়া রামলালের প্রধান সড়কে স্থানান্তরিত হয়।

কর্মকর্তাদের মতে, মাদ্রাসাটিতে প্রায় ৪০০ শিশু পড়াশোনা করছিল।

প্রশাসন দাবি করেছে যে, মাদ্রাসাটি প্রথমে ব্যক্তিগত জমিতে নির্মিত হলেও ক্রমান্বয়ে এর সামনের খালি সরকারি জমিতে তা সম্প্রসারিত করা হয়।

সূত্র: মক্তব মিডিয়া

ভারতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৫৯ বছরের পুরোনো মাদরাসার একাংশ, তীব্র ক্ষোভ
ভারতের উত্তরপ্রদেশের সিদ্ধার্থনগর জেলায় ৫৯ বছরের পুরোনো একটি মাদরাসার অর্ধেকের বেশি অংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত।

Sunday, August 16, 2026

১৫ হাজার কিমি পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে ইরান : প্রযুক্তি দিচ্ছে কে?

সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) তৈরির পরিকল্পনা করছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার এক প্রতিনিধির বক্তব্য থেকে এই তথ্য সামনে এসেছে। বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হলো 'খোররামশহর', যার সর্বোচ্চ পাল্লা ৪ হাজার কিলোমিটার। তবে হুট করে এই পাল্লা বাড়িয়ে ১৫ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করার উদ্দেশ্য মূলত মার্কিন ভূখণ্ডকে সরাসরি নিশানা করা।

ইউক্রেনের কিয়েভভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় স্বাধীন সামরিক মিডিয়া ও কনসালটিং কোম্পানি 'ডিফেন্স এক্সপ্রেস' সম্প্রতি এই খবরের বিস্তারিত সামরিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি মূলত সামরিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প নীতি, অস্ত্রশস্ত্রের বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান অবস্থান থেকে ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে হামলা চালানো সম্ভব।

চলতি মাসের ৭ তারিখে জুম্মার খোতবায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির প্রতিনিধি, তেহরানের জুম্মার নায়েবে ইমাম আবদুল-নবী মুসাভি ফার্দ প্রথম এই ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার কথা জানান। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে সরাসরি অসীম পাল্লার আইসিবিএম তৈরিতে হঠাৎ এই লাফ দেয়া স্বাভাবিক ও প্রচলিত কৌশলের সাথে ঠিক মেলে না। সাধারণত ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার অতিক্রম করে প্রথম ধাপের আইসিবিএম এবং এরপর মার্কিন ভূখণ্ডের ওয়াশিংটন বা নিউ ইয়র্কে আঘাত হানার জন্য ১০ হাজার থেকে ১৩ হাজার কিলোমিটার পাল্লার প্রযুক্তি তৈরি করা হয়। সেখান থেকে সরাসরি ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার কথা ঘোষণা ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান হয়তো আগের মতোই অন্য কোনো মিত্র দেশের তৈরি প্রযুক্তি হাতে পেতে যাচ্ছে।

প্রযুক্তি নেয়ার এই ইতিহাস ইরানের জন্য নতুন নয়। উদাহরণস্বরূপ, তাদের 'খোররামশহর' ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত উত্তর কোরিয়ার 'হুয়াসং-১০' (মুসুদান)-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এদিকে এ ক্ষেপণাস্ত্র আবার সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের 'আর-২৭' সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা থেকে নেয়া।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া অন্তত তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে যার পাল্লা ১৫ হাজার কিলোমিটার বা তার বেশি। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ১২ জুলাই উৎক্ষেপণ করা হয় 'হুয়াসং-১৮।' এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ছিল ১৫ হাজার কিলোমিটার। এছাড়া, আরো শক্তিশালী 'হুয়াসং-১৯' ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১৭ হাজার কিলোমিটারের বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার 'হুয়াসং-১৮' তৈরিতে সরাসরি রাশিয়ার ভূমিকা ছিল পরিষ্কার। রাশিয়ার তিন স্তরের কঠিন জ্বালানিচালিত 'তোপোল-এম' আইসিবিএমের নকশা অনুকরণেই এটি তৈরি, ধারণা করা হয়। পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার তরল জ্বালানিচালিত ১৫ হাজার কিমি পাল্লার 'হুয়াসং-১৭' ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি হয়েছে সোভিয়েত আমলের 'আর-৩৬' ক্ষেপণাস্ত্রের ভিত্তিতে। ন্যাটো এ ক্ষেপণাস্ত্রের নাম দিয়েছিল 'শয়তান।'

উত্তর কোরিয়ায় অত্যন্ত দ্রুত ও সফলভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিকাশ প্রমাণ করে যে এতে পরীক্ষিত রুশ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারও একই পথ ধরে রাশিয়া থেকে উত্তর কোরিয়া হয়ে সেই ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ইরানের হাতে পৌঁছানোর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অথবা আন্তর্জাতিক কোনো চাপ না মেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে তেহরানকে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জনে এবার সরাসরি সহায়তা দিতে পারে মস্কো।

খোররমশাহর ক্ষেপণাস্ত্র
খোররমশাহর ক্ষেপণাস্ত্র। ইরানের প্রেসটিভি

‘আজান আমেরিকান সংস্কৃতির অংশ নয়’

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে প্রকাশ্যে আজান প্রচারের বিরোধিতা করেছেন অঙ্গরাজ্যটির লেফটেন্যান্ট গভর্নর মিকাহ বেকউইথ। তার দাবি, গির্জার ঘণ্টাধ্বনি আমেরিকার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ হলেও ইসলামের আজান আমেরিকান সংস্কৃতি বা ইতিহাসের অংশ নয়।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যের অলাভজনক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ানা সিটিজেন এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নিজের ‘আস্ক মিকা এনিথিং’ ভিডিও সিরিজে এক দর্শকের প্রশ্নের জবাবে বেকউইথ বলেন, গির্জার ঘণ্টা বাজানো যদি অনুমোদিত হয়, তাহলে ইসলামের আজান কেন নীরব রাখতে হবে—এমন প্রশ্নের পর তিনি আজানের প্রকাশ্য সম্প্রচারের বিরোধিতা করেন।

বেকউইথ কোনো নির্দিষ্ট মসজিদ বা স্থানীয় বিরোধের কথা উল্লেখ করেননি এবং কোনো নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব করেননি। সাধারণত প্রকাশ্যে ধর্মীয় শব্দ সম্প্রচারের ক্ষেত্রে স্থানীয় আইন প্রযোজ্য হতে পারে। তবে আদালতের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে, এসব আইন ধর্মীয় বক্তব্যের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক হতে পারে না।

ইন্ডিয়ানা মুসলিম অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক মালিহা জাফর বলেন, তার জানা মতে ইন্ডিয়ানার কোনো মসজিদই লাউডস্পিকারে বাইরে আজান সম্প্রচার করে না।

জাফর আরো জানান যে যে, মুসলিম সম্প্রদায় বর্তমানে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষত জনসমক্ষে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কারণে মুসলিমরা নিজেদের অনিরাপদ মনে করছে।

তিনি বলেন, মসজিদগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে এবং সক্রিয় বন্দুকধারী মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে প্ল্যাকার্ড নিয়ে এসে ভাঙচুর ও অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, তিনি প্রতিটি মসজিদের সঙ্গে তার যোগাযোগে নেই এবং তাই এ ধরনের ঘটনার ব্যাপকতার সঠিক হিসাব তিনি দিতে পারবেন না।

জুন মাসে স্টেটহাউসে অনুষ্ঠিত ‘ফেইথ ওভার ফিয়ার’ অনুষ্ঠানে জাফর বলেন, ইন্ডিয়ানা জুড়ে মুসলিম পরিবারগুলো ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষপূর্ণ জনমত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

জাফর বলেন, ‘যখন কুসংস্কার এবং অপতথ্যকে বিনা প্রতিবাদে চলতে দেওয়া হয়, তখন তা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে মানুষ নিজেদের অবাঞ্ছিত, বিচ্ছিন্ন এবং ভীত বোধ করে।’

বেকউইথ সোমবার যুক্তি দিয়েছেন যে, ইসলামি আযান আমেরিকান সংস্কৃতির জন্য একটি বহিরাগত বিষয়। তিনি একজন দর্শকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, যিনি জানতে চেয়েছিলেন যে গির্জার ঘণ্টা বাজানোর অনুমতি থাকলেও কেন ইসলামিক আজানকে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে।

বেকউইথ পরামর্শ দিয়েছেন যে, যারা ইসলামিক আজান শুনতে চান, তাদের এমন দেশে যাওয়া উচিত যেখানে এই প্রথাটি স্থানীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের অংশ। তিনি আরও পরামর্শ দিয়েছেন যে, মসজিদগুলো প্রকাশ্যে আজান সম্প্রচার করার পরিবর্তে নামাজের সময় হলে সদস্যদের কাছে টেক্সট মেসেজ পাঠাতে পারে।

বেকউইথ বলেছেন, ‘ইসরাইল এবং ইন্ডিয়ানার বাকি অংশের সম্প্রদায়গুলোতে উচ্চস্বরে ইসলামিক আজান বাজানোর কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই’।

মে মাস থেকে তীব্রতর হওয়া ইসলামের বিরুদ্ধে তার ব্যাপক সমালোচনা অব্যাহত অংশ হিসেবেই বেকউইথ এই মন্তব্যগুলো করেন।

খ্রিস্টান রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ফ্ল্যাশপয়েন্টে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বেকউইথ ইসলামের সমালোচনা করেন এবং বলেন যে আমেরিকানদের ‘আবার ঘৃণা করার অনুমতি’ থাকা উচিত। একই মন্তব্যে তিনি ইসলামকে একটি ‘শয়তানের উপাসক গোষ্ঠী’ হিসেবেও বর্ণনা করেন। পরে তিনি দাবি করেন যে এই ধর্মটি ‘নাৎসিবাদের চেয়েও খারাপ’, । পরে তিনি আজান নিষিদ্ধ করার জন্য প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস

তবে বেকউইথের দাবি করা ‘ইসলাম আমেরিকান সংস্কৃতি বা ইতিহাসের অংশ নয়’ এর সঙ্গে দেশটির ইতিহাসের বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখা যায়।

ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আফ্রিকান আমেরিকান হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার এবং লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয়দের বসতি স্থাপনের প্রাথমিক সময় থেকেই উত্তর আমেরিকায় মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল।

১৫০০-এর দশক থেকেই উত্তর আমেরিকায় ইসলামের উপস্থিতি রয়েছে এবং ক্রীতদাস হিসেবে আসা আফ্রিকান মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় চর্চা বজায় রেখেছিলেন

এমনকি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধেও মুসলমানরা উপনিবেশগুলোর পক্ষে লড়াই করেছিলেন। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ওয়াশিংটন ও থমাস জেফারসন ধর্মীয় স্বাধীনতার বিতর্কের সময় ইসলামকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিলেন।

থমাস জেফারসন লিখেছিলেন যে ভার্জিনিয়ার ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানসহ সবার সুরক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছিল।

আমেরিকান সংস্কৃতিতে প্রাথমিক আফ্রিকান মুসলিমদের প্রভাব ব্লুজ সঙ্গীতের সুরের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়।

ফলে ইন্ডিয়ানায় প্রকাশ্যে আজান প্রচার নিয়ে বেকউইথের মন্তব্য নতুন করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।

‘আজান আমেরিকান সংস্কৃতির অংশ নয়’
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মিকা বেকউইথ। ছবি: সংগৃহীত।

ট্রাকে চড়ে, সামরিক বিমানে চড়ে তুরস্ক ত্যাগের আগে কী কী করেছিলেন ট্রাম্প, মানসিক অবস্থাই-বা কেমন ছিল

তুরস্কে গত মাসে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মঞ্চে উঠছিলেন, ততক্ষণে তাঁকে গোপনে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

ওই দিন (ন্যাটো সম্মেলনের শেষ দিনে, ৮ জুলাই) সকালেই মার্কিন কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে একটি উদ্বেগজনক তথ্য নিয়ে আসেন। ইরানিরা জানত, আঙ্কারার কোন বিলাসবহুল চেইন হোটেলে ট্রাম্প অবস্থান করছিলেন। তুরস্কের রাজধানীতে তাঁর মোটর শোভাযাত্রা কীভাবে চলাচল করছে, সে সম্পর্কেও তারা অবগত ছিল।

মার্কিন কর্মকর্তারা সিএনএনের কাছে দাবি করেছেন, ইরান ট্রাম্পকে হত্যা করার পরিকল্পনায় অনড় ছিল। এমনকি তারা এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানটিকে ভূপাতিত করার জন্য কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করার ছক কষছিল।

তুরস্কের রাজধানীতে ট্রাম্পের নিরাপত্তা ও যাতায়াতের খুঁটিনাটি তথ্য ইরান যেভাবে জোগাড় করেছিল, তা তাঁর পুরো দলকে আতঙ্কিত করে তোলে। যদিও কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, অত্যন্ত সুরক্ষিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পকে হত্যার ইরানিদের চেষ্টা সফল হওয়াটা অসম্ভব।

একজন কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলি সরকার ইরানের এ সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার গোয়েন্দা তথ্য মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সঙ্গে ভাগাভাগি করেছিল। তবে সিআইএ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ইসরায়েলের এই গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।

সিআইএর কয়েকজন কর্মকর্তা এ তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইরান আদৌ এ ধরনের হামলা চালানোর ক্ষমতা রাখে কি না, তা নিয়েও তাঁরা সন্দিহান ছিলেন বলে ওই কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান।

তা সত্ত্বেও এ তথ্য পাওয়ার পর মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে সতর্কতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়া মার্কিন কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ট্রাম্পের ওপর তিনটি পৃথক হত্যাচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তার ওপর ইরানের এই ক্রমাগত হুমকির কারণে তাঁর নিরাপত্তা দল সব সময়ই একধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ছিল।

তাই বিষণ্ন মুখে এবং বাঁ হাতে একটি ফোল্ডার ধরে ট্রাম্প নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই ঘণ্টা দেরিতে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন। সেখানে তিনি সম্মেলনটিকে একটি বড় সাফল্য বলে ঘোষণা করেন। তবে আগের দিনের মতোই ট্রাম্পের কথাবার্তায় ইরান তাঁকে হত্যা করার যে চেষ্টা করছে, তা নিয়ে একধরনের দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠছিল।

ট্রাম্পের পাশে এ সময় মন্ত্রিসভার তিনজন সদস্য এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে ছিলেন। ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের জীবন অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি পেশা।’

কয়েক মিনিট পরই ট্রাম্প মঞ্চ ত্যাগ করেন। তাঁর মোটর শোভাযাত্রাটি আঙ্কারা বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়। এটি প্রেসিডেন্ট কমপ্লেক্স ত্যাগ করার ঠিক চার মিনিট পর একটি সাদা রঙের ক্যাটারিং ট্রাক এসে এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানের পাশে থামে।

হুমকি মূল্যায়ন ও নতুন কৌশল

প্রেসিডেন্টকে কীভাবে নিরাপদে দেশ থেকে বের করে নেওয়া যায়, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি ছোট দল দিনভর ব্যস্ত ছিল। কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা সকাল ও বিকেলজুড়ে তুরস্কের বিভিন্ন বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। এ সময় ট্রাম্প বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করছিলেন এবং কর্মকর্তারা তাঁকে প্রতিমুহূর্তের খবরাখবর জানাচ্ছিলেন।

দীর্ঘ আলোচনার জন্য কর্মকর্তাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল না। ৮ জুলাই সন্ধ্যায় ট্রাম্পের তুরস্ক ত্যাগ করার কথা ছিল। এই সুনির্দিষ্ট হুমকির বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই তাঁর রওনা হওয়ার সূচি নির্ধারিত ছিল।

আঙ্কারার কারুকার্যখচিত ও অত্যন্ত সুরক্ষিত বেশতেপে প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সের ছোট ছোট কক্ষে বসে এ পরিকল্পনা করা হয়। ট্রাম্পের পৌঁছানোর আগেই তুরস্কে চলে এসেছিলেন মার্কিন জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। তিনি সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক করেন এবং একটি জরুরি পরিকল্পনা সাজান।

কর্মকর্তারা হুমকির ধরনসহ বেশ কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখছিলেন। ইসরায়েল প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছিল, ইরান তার সহযোগীদের ব্যবহার করে ট্রাম্পকে হত্যার জন্য একটি নতুন পরিকল্পনা করছে। তবে এ তথ্য ছিল বেশ অস্পষ্ট। ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা সে সময় এক সংবেদনশীল পর্যায়ে ছিল। তাই কিছু কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, এটি হয়তো ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার একটি চেষ্টা হতে পারে।

এ বিষয়ে অবগত তিনটি মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের এ সফরের আগে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে ইরানের নতুন কোনো নির্দিষ্ট হত্যা পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। এর পরিবর্তে কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ইরানের বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে ট্রাম্পের মৃত্যুর জন্য ক্রমাগত আহ্বান জানানোর সাধারণ ঘটনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

ট্রাম্পকে নিশানা করার এ ইচ্ছা কেবল ইরানের নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগের সপ্তাহে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক দিন ধরে চলা সেই জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের হাতেও ট্রাম্পকে হত্যা করার আহ্বান–সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা গিয়েছিল।

একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, শীর্ষ সম্মেলন শুরুর পর মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে আরও তথ্য আসতে শুরু করে। এতে বিমানবন্দর এলাকার কাছাকাছি কোনো স্থান থেকে উড্ডয়নের সময় এয়ারফোর্স ওয়ান লক্ষ্য করে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কার কথা বলা হয়।

কিছু কর্মকর্তার কাছে এই আশঙ্কা একটু অতিরঞ্জিত মনে হয়েছিল। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং তুরস্কের সঙ্গে ইরানের ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের নিরাপত্তা ছিল নজিরবিহীনভাবে কঠোর। বিশ্বনেতাদের অন্যান্য সম্মেলনের চেয়েও এখানে অনেক বেশি নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

আঙ্কারাজুড়ে হাজার হাজার তুর্কি নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিল। প্রায় প্রতিটি রাস্তার মোড়ে বসানো হয়েছিল অস্থায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা। শীর্ষ সম্মেলনস্থল এবং বিমানবন্দরকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছিল বহুমাত্রিক নিরাপত্তাবলয়। এই বিমানবন্দর দিয়েই ন্যাটোর ৩২টি সদস্যদেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা যাতায়াত করছিলেন।

কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার এ তথ্য ঠিক কোথা থেকে এসেছে, তা স্পষ্ট নয়। মার্কিন এবং আঞ্চলিক কর্মকর্তারা পরে জানান, প্রেসিডেন্টের প্রস্থানের পর কোনো সন্দেহভাজন উগ্রবাদীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

তবু সিক্রেট সার্ভিস মনে করেছিল, সময় কম থাকলেও এই সম্ভাব্য ঝুঁকিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘হুমকিটি এতটাই গুরুতর ছিল যে সেদিন আমাদের চরম কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। পরিস্থিতি তেমন না হলে আমরা কখনোই এ পদক্ষেপগুলো নিতাম না।’

এ বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র জানায়, কিছু নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, ট্রাম্পকে তুরস্ক থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় ছিল সকালেই গোপনে দেশ ত্যাগ করা, যখন ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি প্রথম শনাক্ত হয়।

তবে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়। ট্রাম্প তাঁর পূর্বনির্ধারিত সূচি বজায় রাখেন। তিনি সংবাদ সম্মেলন ডাকার আগে ইউক্রেন ও সিরিয়ার নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেন।

তবে এটি স্পষ্ট ছিল, এই জীবননাশের হুমকি তাঁর ওপর একধরনের মানসিক চাপ তৈরি করছিল। ন্যাটোর মহাসচিবের সঙ্গে এক সকালের বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ সকালে আমি একটি বিষয় লক্ষ করলাম। আমি তাদের সব তালিকার শীর্ষে রয়েছি। এ পর্যন্ত মনে হচ্ছে, আমি কিছুটা ভাগ্যবান। কিন্তু ভাগ্য হয়তো সব সময় সহায় থাকে না।’

খাবার সরবরাহের ট্রাকের আড়ালে ছদ্মবেশ

যখন সিক্রেট সার্ভিস, হোয়াইট হাউস এবং সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে গোপনে দেশ থেকে বের করার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন ট্রাম্প নিজেও একটি ভিন্ন চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন। তিনি তুরস্কে আসতে যে ৪০ কোটি ডলার মূল্যের জাম্বো জেট বিমানটি ব্যবহার করেছিলেন, সেটি কেন ফেরতযাত্রায় ব্যবহার করছেন না, তার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা তাঁকে দাঁড় করাতে হতো।

কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজটি প্রেসিডেন্টের কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয় ছিল। তবে কিছু কর্মকর্তা গোপনে ইরানের প্রতিবেশী দেশে এই বিমানে করে ভ্রমণ করার বিষয়ে আগে থেকেই বেশ শঙ্কিত ছিলেন।

ওয়াশিংটন থেকে ফ্লাইটটি সফলভাবেই তুরস্কে অবতরণ করে। ট্রাম্প নিজের পছন্দের রঙে সাজানো নতুন উড়োজাহাজটি নিয়ে বেশ গর্বিত ছিলেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি আনন্দের সঙ্গে উড়োজাহাজটি দেখান। ট্রাম্প টারমাকে দাঁড়িয়ে তাঁর সমকক্ষ এরদোয়ানকে বলেছিলেন, তাঁর পুরোনো বিমানটি এখন কেবল একটি ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে রয়েছে।

তবে এর এক দিন পরই নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন, ট্রাম্পকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন বিমান বা অতি পরিচিত হালকা নীল ও সাদা রঙের পুরোনো মডেল—কোনোটিই নিরাপদ হবে না। ট্রাম্প দ্রুত বুঝতে পারেন, বিশ্বসেরা বলে দাবি করা তাঁর সাধের বিমানটি কেন ফেরতযাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে না, তা নিয়ে মানুষ অপ্রীতিকর প্রশ্ন তুলতে পারে।

বেলা ৩টা ৪২ মিনিটে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসার ঠিক আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, কাতার থেকে পাওয়া নতুন উড়োজাহাজটি যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটিতে পাঠানো হচ্ছে, যাতে সেখানকার সেনারা এটি ঘুরে দেখার সুযোগ পান।

ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘সবাই দারুণ উত্তেজিত। আমরা ভাবলাম, প্রথম সুযোগটি সেনারাই পাক।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, তিনি নিজে পুরোনো বিমানটিতে করে ফিরে যাচ্ছেন।

বাস্তবে ট্রাম্প কোনো উড়োজাহাজেই ফিরছিলেন না। তাঁর উপদেষ্টারা এবং সিক্রেট সার্ভিস মিলে এক চতুর ছদ্মবেশের পরিকল্পনা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সুরক্ষার জন্য কৌশলটি আগে থেকেই তাদের গোপন নীতিমালায় ছিল।

সিক্রেট সার্ভিসের যোগাযোগপ্রধান অ্যান্টনি গুগলিয়েলমি বলেন, ‘মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস যেকোনো জায়গায় আমাদের সুরক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য রিয়েল-টাইমে সব ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্টের ওপর হওয়া হত্যাচেষ্টা এবং উল্লেখযোগ্য হুমকি বৃদ্ধির কারণে আমরা আমাদের মিশন সফল করতে সব সময় অনড় রয়েছি।’

এই চতুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ট্রাম্পকে প্রথমে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানে চড়তে হয়েছিল। এরপর তাঁকে বিমানের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে দ্রুত হেঁটে অন্য পাশের একটি বিকল্প বহির্গমন পথ দিয়ে বের করে নেওয়া হয়, যেখানে একটি সাদা রঙের খাবার সরবরাহের (ক্যাটারিং) ট্রাক অপেক্ষা করছিল।

তুর্কি এয়ারলাইনসের সুস্বাদু খাবারের বেশ সুনাম রয়েছে। বিমানের কেবিন ক্রুরা শেফের টুপি ও সাদা জ্যাকেট পরে ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার পরিবেশন করেন। বিমানের এই খাবারগুলো সাধারণত হাইড্রোলিক ট্রাকের মাধ্যমে উড়োজাহাজে ওঠানো হয়।

তবে এ বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি জানান, এবার নির্দিষ্ট সময়ে ক্যাটারিং ট্রাকটি পুরোপুরি খালি ছিল। মার্কিন কর্মকর্তারা ওই দিন সকালেই ঠিক কী কাজে লাগবে, তা বিস্তারিত না জানিয়েই গোপনে ট্রাকটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন।

আগে থেকেই পরিষ্কার করে রাখা ট্রাকের ভেতরের খালি বাক্সে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন তাঁর সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত সহকারী নাটালি হার্প। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ওভাল অফিসের বর্তমান অপারেশন ডিরেক্টর ও একসময়ের বিশ্বস্ত বডিগার্ড ওয়াল্ট নাউটা এবং হোয়াইট হাউসের পার্সোনেল প্রধান ড্যান স্কাভিনো, যিনি কয়েক দশক ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের সুরক্ষায় কয়েকজন সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টও সেই ট্রাকের কনটেইনারের ভেতরে ছিলেন।

সবাই ট্রাকে ওঠার পর স্যুট পরা একজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট সামনের কেবিনে চালকের পাশের আসনে বসেন। এরপর টারমাক পেরিয়ে মাত্র ১৬২ সেকেন্ড ড্রাইভ করে ট্রাকটি ট্রাম্পকে নিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি সি-৩২এ বিমানের পাশে গিয়ে থামে।

খাবার সরবরাহের এই ট্রাকে কারা কারা চড়বেন, তা ঠিক কীভাবে ঠিক করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। পরে যুক্তরাজ্যের মিল্ডেনহল বিমানঘাঁটির উদ্দেশে রওনা হওয়া এই সি-৩২এ সামরিক বিমানে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগ দেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

বড় উড়োজাহাজেই রয়ে যান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তাঁদের সঙ্গে ট্রাম্পের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সহযোগীও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শীর্ষ নীতি উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার, যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেং, স্টাফ সেক্রেটারি উইল শার্ফ, উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল নিধাম এবং ডেপুটি চিফ অব স্টাফ রিচার্ড ওয়াল্টার্স।

জনসংখ্যা ও অগ্রবর্তী দলের অন্য স্টাফরাও বড় উড়োজাহাজেই অবস্থান করছিলেন। তাঁদের অনেকেই জানতেন না, ট্রাম্প সামনের কেবিনে নেই এবং আসলে তিনি এই উড়োজাহাজের যাত্রীই নন। তাঁদের সবাইকে উড়োজাহাজের পর্দা টেনে রাখতে বলা হয়েছিল।

সাবেক সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট ও সিএনএনের বিশ্লেষক জনাথন ওয়াক্রো বলেন, প্রেসিডেন্টের যাতায়াতের সময় সিক্রেট সার্ভিসের পক্ষে এমন বিভ্রান্তিকর কৌশল নেওয়া নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য প্রায় সময়ই এমন মেকি বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্ট যখন কোনো হেলিকপ্টারে ওঠেন, তখন একই রকম তিনটি হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ে, যাতে সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে চিহ্নিত করা না যায়।’

ট্রাম্প অবশ্য চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, তুরস্ক ছাড়ার সময় আসলে তাঁর প্রধান উড়োজাহাজটিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিল। যদিও সেখানে তাঁর না থাকার কথা কেউ জানতেন না। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা যে দুটি বিমানকেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন, তার প্রমাণ মেলে আরেকটি পদক্ষেপে। তুরস্কের আকাশসীমা পার না হওয়া পর্যন্ত দুটি বিমানের সুরক্ষার্থে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ। ছবির বাঁয়ে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাবহর দেখা যাচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ। ছবির বাঁয়ে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাবহর দেখা যাচ্ছে

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ নিহত ১১

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের কয়েক দফা বিমান হামলায় দুই নারী, তিন শিশুসহ অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। শনিবারের এ হামলায় আহত হয়েছেন আরও ১৯ জন।

গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর এটি লেবাননে অন্যতম প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, শনিবার দক্ষিণ লেবাননের আনসার গ্রামে একটি বাড়িতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের হামলায় সাতজন নিহত হন। এ ছাড়া দেইর আল-জাহরানি গ্রামে পৃথক এক হামলায় নিহত হন আরও চারজন।

লেবাননের সরকারি বার্তা সংস্থা এনএনএ জানায়, দক্ষিণ লেবাননজুড়ে আরও বেশ কয়েকটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে, যা গত দুই মাসের মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে সবচেয়ে গভীরে চালানো হামলা।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, তারা আনসারে হিজবুল্লাহর অভিজাত রাদওয়ান বাহিনীর একটি ‘কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরে’ হামলা চালিয়েছে। এতে রাদওয়ান বাহিনীর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার আলী সামির আল-হাজ হাসান নিহত হন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও জানায়, হামলার সময় হাসানের পরিবারও ওই সামরিক সদর দপ্তরের ভেতরে ছিল। তবে তাঁরা লক্ষ্যবস্তু ছিলেন না বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে বলেছে, লেবাননের ওপর এই হামলার ‘উপযুক্ত জবাব’ দেওয়া হবে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের এ হামলা ‘আলোচনা পিছিয়ে দেবে না, বরং তা নতুন করে শুরু করতে এবং আরও ফলপ্রসূ করতে সাহায্য করবে।’

স্পিলম্যান বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি কাজে দেবে। আশা করা যায়, এই পদক্ষেপ আলোচনাকে এগিয়ে নেবে। কারণ, এখানে আমাদের শত্রু কে, তা স্পষ্ট; আর সেই শত্রু হলো হিজবুল্লাহ।’

এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম। তিনি বলেন, আনসার গ্রামে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ব্যক্তিরা কোনো ‘সামরিক স্থাপনায়’ ছিলেন না এবং সেখানে নিহত নারী ও শিশুরা কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছিল না।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি ‘স্পষ্ট বার্তা’ বলে উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না বলে জানিয়েছে, যা ‘আত্মসমর্পণের শামিল’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে হিজবুল্লাহ।

উল্লেখ্য, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর দুই দিনের মাথায় গত ২ মার্চ ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। জবাবে লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে দক্ষিণ লেবাননের একাংশ নিয়ন্ত্রণে নেয় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকা থেকে তোলা ছবিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলি আল-তাহের পাহাড়ি এলাকায় ইসরায়েলি হামলার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। ১৪ আগস্ট ২০২৬
দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকা থেকে তোলা ছবিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলি আল-তাহের পাহাড়ি এলাকায় ইসরায়েলি হামলার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। ১৪ আগস্ট ২০২৬ ছবি: এএফপি

অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার চেয়ে বেশি কিছু ভাবেনি by মিজানুর রহমান খান

১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনার ইঙ্গিত এবং সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের নানা উপাদান পাওয়া যায় মার্কিন নথিতে। সেই সব নথি বিশ্লেষণ করে ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান। ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থান এবং শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাঁর একটি লেখা প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য পুনঃপ্রকাশ করা হলো।

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মূল্যায়নধর্মী অন্তত সাতটি তারবার্তা পাঠান মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। ১৬ আগস্ট এ সম্পর্কে প্রাথমিক মন্তব্য শীর্ষক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘১৫ আগস্ট স্থানীয় সময় ভোর সোয়া পাঁচটায় অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল। ২৪ ঘণ্টা পরের ঘটনা এই আশাবাদ সৃষ্টি করেছে যে এ অভ্যুত্থানকে চ্যালেঞ্জ করা হবে না।’

ওই সময় ওয়াশিংটনেও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ঢাকার খবর জানতে উদ্‌গ্রীব ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার ১১-১২ ঘণ্টা পর তিনি তাঁর স্টাফ বৈঠকে উল্লেখ করেন, ‘আমি আইএনআর (ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ) থেকে এ বিষয়ে ভালো তথ্য পাই।’

এ সময় ব্যুরোর পরিচালক উইলিয়াম জি হিল্যান্ড বলেন, ‘আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলি, মুজিব তখনো মারা যাননি।’ সিআইএর সাবেক চৌকস কর্মকর্তা হিল্যান্ড ৭৯ বছর বয়সে গত বছরের ২৫ মার্চ মারা যান। ‘তিনি ছিলেন এক ভালো বিশ্লেষক। আমাদের গ্রুপে তিনি ছিলেন অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ তাঁর মৃত্যুর পর এ মন্তব্য করেন কিসিঞ্জার (ওয়াশিংটন পোস্ট, ২৮ মার্চ ২০০৮)। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ওয়াশিংটন সময় সকাল আটটার আগে মুজিবের মৃত্যুর বিষয়ে কিসিঞ্জার-হিল্যান্ড কথোপকথনের বিস্তারিত জানা যায়নি।

তবে ১৫ আগস্ট কিসিঞ্জার যখন তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে শুনলেন, বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ছিল সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত, তাৎক্ষণিক বললেন, ‘তার মানে কী? মুজিবুর কি জীবিত, না মৃত?’ নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলফ্রেড আথারটন এ সময় বলেন, ‘মুজিবুর নিহত। তাঁর নিকটতম আত্মীয়স্বজন, যাঁদের অধিকাংশই পরিবারের সদস্য, তাঁরা বেঁচে নেই।’

এ-সংক্রান্ত দলিল থেকে জানা যাচ্ছে, হার্ভার্ড স্নাতকোত্তর ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আথারটন এবং ১৯৬৯ পর্যন্ত সিআইএতে থাকা হিল্যান্ড বাংলাদেশের এই অভ্যুত্থানের খুঁটিনাটি জানতেন। ১৯৬২-৬৫ সালে কলকাতায় কর্মরত আথারটন ২০০২ সালের ৩০ অক্টোবর মারা গেছেন।

১৯৭৮-৭৯ সালে তিনি মিসরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সোভিয়েত বিশেষজ্ঞ হিল্যান্ড প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে খ্যাতি কুড়ান। তিনি ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিলেন।

ওই দিন হিল্যান্ডের মুখে ‘মুজিব তখনো মারা যাননি’ শুনে কিসিঞ্জার পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘সত্যিই তাই? তারা তাহলে মুজিবকে কিছু সময় পরে হত্যা করেছিল?’ এর জবাব দেন নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটন। তিনি বলেন, ‘আমরা যত দূর জানি—আমি বলতে পারি না যে আমরা বিস্তারিত সবকিছু জেনে গেছি। কিন্তু ইঙ্গিত ছিল তাঁকে হত্যা পরিকল্পনা বিষয়েই। এবং তারা তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলে। ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাঁকে হত্যা করে।’

লক্ষণীয়, বোস্টারের পাঠানো তারবার্তাগুলোয় বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে যে তিনি ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সংবেদনশীল ও সতর্ক ছিলেন। তিনি ১৬ আগস্ট লিখেছেন, ‘জনসাধারণ যদিও মুজিবের পতনে আনন্দ প্রকাশ করেনি কিন্তু গ্রহণসূচক শান্ত অবস্থা বজায় রয়েছে এবং সম্ভবত তাতে স্বস্তির নিশ্বাসও রয়েছে।

শেখ মুজিব ও বাঙালিরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এর কারণ ছিল তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে তাঁর ব্যর্থতা। এবং দৃশ্যত তাঁর ক্ষমতায় থাকাটা হয়ে পড়েছিল মূলত ব্যক্তিগত ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে। অবশ্য এর সঙ্গে যুক্ত হয় “ডাইন্যাস্টিক রিজনস” অর্থাৎ রাজবংশীয় শাসকদের পরম্পরাসংক্রান্ত কারণ। বাঙালিদের কাছ থেকে মুজিবের বিচ্ছিন্নতা ক্রমশ বাড়ার বড় কারণ ছিল তিনি যথাযথ পরামর্শ গ্রহণ থেকে দূরে সরছিলেন। এমনকি মুজিবের মধ্যে স্বৈরশাসকের চিরায়ত বৈকল্য ফুটে উঠতে শুরু করেছিল।’

বোস্টারের কথায়, ‘জুনের গোড়া থেকে শেখ মুজিব ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর ভাগনে শেখ মনির ক্রমবর্ধমান প্রভাব। এসবই অভ্যুত্থানকারীদের সন্দেহমুক্ত করে যে পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব করা আর সমীচীন হবে না। তবে অভ্যুত্থানের জন্য ভারতীয় স্বাধীনতা দিবস বেছে নেওয়ার বিষয়টি হয়তো শুধুই কাকতালীয়। এই কাকতালীয় বিষয়টি কিন্তু আমাদের বিবেচনায় লক্ষণীয়।’

বোস্টার এরপর লেখেন, ‘এটা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার সামান্যই উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পেরেছে। যদিও শেখ মুজিবের সঙ্গে যাঁরা ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁদের অনেকেই হত্যার শিকার কিংবা বাদ পড়েছেন। কিন্তু তারপরও বর্তমান সরকারে সেসব পরিচিত মুখই রয়ে গেছেন, যাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্বল প্রশাসনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। স্পষ্টতই মন্ত্রিসভায় এখন যাঁরা রয়ে গেছেন, তা থেকে মনে হয়, মোশতাকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলবে। কিন্তু সেখানে বৃহত্তর মডারেশন থাকবে। ১৫ আগস্ট দেওয়া তাঁর প্রথম বেতার ভাষণে এই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করে।

শেখ মুজিবের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের নিন্দা করলেও মোশতাক জানিয়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা অনেকটাই অব্যাহত থাকবে। ইতিমধ্যে কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে নতুন সরকার পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইবে।

মোশতাকের সঙ্গে ভারতের সদ্ভাব না থাকার বিষয়টি প্রকাশ্য বিষয় হলেও এটাও পরিষ্কার যে নতুন সরকার ভারতের মনে বাড়তি কোনো সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার দিকে যাবে না। মোশতাকের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার দিকে তাকালে সেই ইঙ্গিত মেলে। পুরোনো মুখগুলো রেখে দেওয়ার পেছনে নতুন সরকার কার্যত ভারতের কাছে সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চায়।

মোশতাকের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্ব সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিত মেলে। এভাবে সরকার সোভিয়েত প্রভাব কিছুটা স্তিমিত করতে চাইছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রভাব সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে বোস্টার লিখেছেন, ‘নতুন সরকারের সঙ্গে আমাদের নিজেদের সম্পর্ক মুজিব সরকারের চেয়ে “এমনকি আরও অন্তরঙ্গ ভিত্তি”র ওপর প্রতিষ্ঠা পাবে। নতুন রাষ্ট্রপতি অতীতে অত্যন্ত লক্ষণীয় ও প্রকাশ্যে “প্রো–আমেরিকান” দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।

বড় কথা হচ্ছে, মুজিব সরকারের মধ্যে শেখ মনি ও সামাদের (আবদুস সামাদ আজাদ) মতো যাঁরা বামপন্থী ও আমেরিকাবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁরা আর নেই। আরও জোরালো সম্ভাবনা হচ্ছে, বাংলাদেশ আমাদের কাছে এখন বেশি পরিমাণে সাহায্য চাইতে পারে। ইতিপূর্বে মোশতাক আমাদের বলেছিলেন, শুধু আমেরিকাই আমাদের সত্যিকারের সাহায্য করতে পারে। সুতরাং আমাদের প্রতি নতুন সরকারের উচ্চাশার বাঁধ নিয়ন্ত্রণই হতে পারে বড় সমস্যা।’

মোশতাক সরকার এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক মূল্যায়ন করতে গিয়ে ইউজিন বোস্টার লক্ষণীয়ভাবে উল্লেখ করেন, ‘এটা আমরা বিচার করতে পারি না।’ তাঁর কথায়, ‘আমরা কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ করি যে প্রত্যেক সরকারি বিবৃতিতে ক্ষমতা গ্রহণের অনুকূলে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লিখিত হচ্ছে। আমাদের বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী বর্তমানে সামরিক আইন আদেশ এমএলও প্রস্তুত করছে এবং এ ক্ষেত্রে যদি পাকিস্তানি ধাঁচ অনুসরণ করা হয়, তবে তা-ই হবে দেশের আইনের ভিত্তি।

এর ফলে সামরিক ও বেসামরিক লোকের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াবে কি না, তা আমরা এখন বলতে পারি না। কিন্তু আমরা এটা ভাবতে পারি, মোশতাক বিবৃতিতে ইতিমধ্যে যা বলেছেন, তাতে গত জানুয়ারিতে মুজিব যা চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তার চেয়ে একটি নতুন ও অধিকতর উদার সংবিধান পাওয়া যাবে।’

বোস্টার এ পর্যায়ে আরও উল্লেখ করেন, ‘মুজিবকে উৎখাতে সামরিক বাহিনীর সাফল্যের প্রেক্ষাপটে আমাদের এই ধারণা জন্মেছে যে অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার চেয়ে বেশি কিছু ভাবেনি। যাহোক, সামরিক বাহিনী—বিশেষ করে যেসব তরুণ কর্মকর্তা, যাঁরা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁরাই শেখ মুজিবকে উৎখাত করেছেন এবং আমরা সন্দেহ করি এবং যেহেতু তাঁরা রক্তের স্বাদ পেয়েছেন, তখন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাঁরা কিছু ভূমিকা রাখতে চাইবেন।

অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে কোনো বাঙালি গাদ্দাফিকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো। তার চেয়ে বরং এটা ভাবাই সংগত যে চাকরিমুখো মধ্যবিত্ত শ্রেণির পুরোনো সদস্য—যাঁরা শেখ মুজিব দ্বারা হুমকিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা হয়তো একটি অধিকতর উদারপন্থী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। পাকিস্তানি জমানায় পূর্ব বাংলায় যেমনটা দেখা গিয়েছিল, তার চেয়ে এটা হতে পারে ভিন্ন।’

বোস্টার লেখেন, ‘এখানে একটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা উচিত যে রক্তস্নাত হলেও শেখ মুজিবের উৎখাত যখন সফল হয়েছে, তখন আরও অনেক কিছুই করা বাকি রয়েছে। মোশতাকের ভাষণ প্রধানত সাধারণ বিবরণগত দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ এবং এতে আওয়ামী লীগের ইতিপূর্বেকার বাগাড়ম্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে কিন্তু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ এ পর্যন্ত যা নেওয়া হয়েছে, তা অল্পই।

দেশ পরিচালনায় সীমিত পদক্ষেপ দেখে আমরা বিস্মিত হইনি। তবে যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে নতুন সরকারের কর্তৃত্ব হ্রাস পেতে শুরু করবে। সে ক্ষেত্রে আমরা খুবই অস্থিরতাপূর্ণ একটি ক্ষমতার লড়াই প্রত্যক্ষ করতে পারি। বাঙালির রাজনৈতিক মঞ্চে শেখ মুজিবের মতো আজ আর কোনো কমান্ডিং পারসোনালিটি বা আদেশদানকারী ব্যক্তিত্ব নেই, যা কিনা মুজিবকে দীর্ঘকাল টিকিয়ে রেখেছিল। বেসামরিক সরকারের পদস্খলন ঘটেছে। আমরা এখন সামরিক বাহিনীর দিকে তাকাতে পারি। জাতিকে বাঁচাতে সেটাই আবশ্যিক।’

* মিজানুর রহমান খান, প্রয়াত সাংবাদিক

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা

Friday, August 14, 2026

হরমুজ নয়, সেনাদের বিশৃঙ্খলা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে মানসিক স্বাস্থ্য ও রসদ সংক্রান্ত সমস্যার খবরের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠাচ্ছে। আব্রাহাম লিংকন রণতরীটি এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধে সহায়তা করে আসছিল। খবর এনডিটিভির।

নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ওয়াশিংটন বর্তমানে প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী মালাক্কা প্রণালিতে রয়েছে। সেখান থেকে রণতরীটিকে ভারত মহাসাগরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর একটিকে আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে।

লিঙ্কন জাহাজে থাকা সৈন্যদের মনোবল নিয়ে উদ্বেগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে হরমুজ প্রণালীর ওপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তিনি তা ‘রক্ষা করবেন’।

মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্বেগ

সাধারণত, মার্কিন নৌবাহিনীর মোতায়েন ছয় থেকে নয় মাসের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু সংঘাতের সময় তা বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু এই সপ্তাহ পর্যন্ত লিঙ্কন ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে রয়েছে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘতম বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন। এই জাহাজে মোতায়েন থাকা সৈন্যদের পরিবার এবং মার্কিন আইনপ্রণেতারা জাহাজে ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যার ফলে জানা গেছে যে একাধিকবার সেনাসদস্যরা জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে লিংকন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়, এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়।

মার্কিন নৌবাহিনী স্বীকার করেছে যে এই সংঘাত একটি ‘অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ’ তৈরি করেছে, যেখানে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী সরবরাহ কেন্দ্রগুলো যুদ্ধকালীন কার্যকলাপের কারণে ব্যাহত হয়েছিল।’ নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, এর ফলে বিমানবাহী রণতরীটিতে ঘাটতি দেখা দেয় এবং চিঠিপত্র হারিয়ে যায়।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘নেতৃত্ব মিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিয়েছে—প্রথমে খাবার, এরপর স্বাস্থ্যবিধির সামগ্রী এবং সবশেষে ডাক। এরপর আশ্বাস দেওয়া হয় যে, জাহাজের নাবিকরা এখন বিশুদ্ধ পানি এবং ‘স্বাস্থ্যকর খাবারের বিকল্প’ পাচ্ছেন।

উদ্বেগ খারিজ করে দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ লিঙ্কন জাহাজের খারাপ পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো খারিজ করে দিয়েছেন এবং সেগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে অভিহিত করেছেন।

পানামা সফরের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি ক্রু এবং প্রতিটি ক্যাপ্টেনকে প্রতিটি মুহূর্তে যতটা সম্ভব সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করি। কিছু অভিযান অন্যগুলোর চেয়ে দীর্ঘ হয়, এবং আমি সেই নাবিকদের প্রতি অন্য সবার চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা পোষণ করি। উত্তাল সমুদ্রে, সেই কঠোর পরিস্থিতিতে এবং কম বন্দরে নোঙর করে তারা যা করে—তা অবিশ্বাস্য।’

তার এই মন্তব্যটি এসেছে দুটি সামরিক-কেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম, নেভি টাইমস এবং স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস-এর প্রতিবেদনের পর। যেখানে ৫,০০০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজটিতে আত্মহত্যার চেষ্টা এবং কর্মীদের মনোবল হ্রাসের খবর প্রকাশিত হয়। জাহাজটি ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে সমুদ্রে রয়েছে।

জবাবদিহির দাবি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের

হেগসেথের মন্তব্যের পর বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতা বিমানবাহী রণতরীটির ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে পেন্টাগনের কাছে জবাবদিহিতার আহ্বান জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতারা জাহাজটির ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত, আরও তথ্য এবং স্বচ্ছতার আহ্বান জানাচ্ছেন। জাহাজটির মূলত মে মাসে দেশে ফেরার কথা ছিল।

সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য, কানেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল নৌবাহিনীর নেতৃত্বকে লেখা এক চিঠিতে বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব চেয়ে লিখেছেন, ‘লিঙ্কনের এই দীর্ঘায়িত মোতায়েন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ঘটছে এবং এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপুল সংখ্যক মার্কিন নৌবাহিনীর প্রয়োজন হতে পারে।’

অ্যারিজোনার সিনেটর রুবেন গ্যালেগো, যিনি মেরিন কোরের একজন সাবেক সৈনিক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন তিনি দুই দলের আইনপ্রণেতাদের নিয়ে জাহাজটিতে আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের পরিকল্পনা করছেন। তিনি আরো বলেন নাবিকদের সাথে যে আচরণ করা হচ্ছে তা ‘শুধু জঘন্যই নয়, বিপজ্জনকও।’

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ি থেকে দূরে থাকা সামরিক সদস্যদের উপর এর প্রভাব এবং সেইসাথে জাহাজ ও এর সরঞ্জামের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনী আবারও অবরোধ আরোপ করেছে। যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা জানায়নি। এমনকি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘অনির্দিষ্টকাল’ এই অবরোধ বজায় রাখতে পারবে।

হরমুজ নয়, সেনাদের বিশৃঙ্খলা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাজ্যকে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ বললেন নেতানিয়াহু

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাজ্যকে কটাক্ষ করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলে মন্তব্য করেছেন। ইসরাইল নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও দেশটির সরকারের নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বৃহস্পতিবার প্রচারিত ইসরাইলি পডকাস্ট ‘মেলেখ ব্লিৎসার হাইম’-এ দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু ব্রিটিশ লেখক র‍্যান্ডলফ চার্চিলের উদাহরণ টানেন। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের সময় ইসরাইল সম্পর্কে চার্চিলের ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, আজকের ব্রিটেনে এ ধরনের কভারেজ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এরপর ব্যঙ্গাত্মক সুরে নেতানিয়াহু বলেন, আপনি আজকের ব্রিটেনকে ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন বলতে পারেন।

পডকাস্টের পরবর্তী অংশে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের ২০২২ সালের একটি মন্তব্যেরও উল্লেখ করেন। ভ্যান্স সে সময় ব্রিটেনকে ভবিষ্যতের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রধারী ‘ইসলামপন্থী দেশ’ হিসেবে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন নেতানিয়াহু।

নেতানিয়াহু বলেন, কেউ একজন বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রথম ইসলামিক রিপাবলিক হবে ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন। এরপর ইরানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা নিশ্চিত করছি, এখানে ইরানের মত আরেকটি এমন দেশ হবে না।

ব্রিটিশ ইহুদি নেতাদের সমালোচনা

নেতানিয়াহুর মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে ব্রিটিশ ও আইরিশ ইহুদিদের একটি সংগঠন। মুভমেন্ট ফর প্রগ্রেসিভ জুডাইজমের সহ-নেতা রাবাই চার্লি বাগিনস্কি ও রাবাই জশ লেভ বলেন, দেশে যখন ইহুদিবিদ্বেষ, মুসলিমবিদ্বেষ ও সামাজিক বিভাজন মানুষের মধ্যে বাস্তব ভয়ের সৃষ্টি করছে, তখন এ ধরনের ভাষা ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’। তারা আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ব্রিটিশ ইহুদিদের প্রতিনিধিত্ব করেন না। তার বক্তব্য আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।

সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের সময় ডাউনিং স্ট্রিটের চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা গ্যাভিন বারওয়েলও নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে ‘স্পষ্ট ইসলামবিদ্বেষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, আশা করা যায়, এখন সবাই বুঝতে পারবেন—কেউ কেউ যে ভান করে আসছেন, নেতানিয়াহু ব্রিটেনের বন্ধু—তা আর ধরে রাখার সুযোগ নেই।

ইসরাইল-যুক্তরাজ্য সম্পর্কে বাড়ছে টানাপোড়েন

ঐতিহাসিকভাবে ইসরাইল ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। সাবেক লেবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারের সময়ে ইসরাইলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করা হয় এবং দেশটিতে অস্ত্র রপ্তানির কয়েকটি লাইসেন্সও স্থগিত করে যুক্তরাজ্য। ফ্রান্সের মতো যুক্তরাজ্যও ইসরাইল সরকারের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোটরিচের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

এ ছাড়া গত বছর ফ্রান্স ও কানাডাসহ কয়েকটি মিত্র দেশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়।

সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম গাজায় ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে লেবার পার্টির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া নিয়েও দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে দলটি খুব ধীরগতির ছিল।

বার্নহ্যাম আরো বলেন, গাজায় সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের ওপর আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং অবৈধ ইসরাইলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা প্রয়োজন। ইসরাইল সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রদওয়ান আবুহারব নেতানিয়াহুর মন্তব্যকে যুক্তরাজ্য-ইসরাইল সম্পর্কের ‘নতুন নিম্নস্তর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে তার মতে, ইরান ইস্যুতে দুই দেশের নীতিগত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে এখনও উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।

আবুহারবের ভাষ্য, নেতানিয়াহুর এই মন্তব্যের পেছনে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে। তার মতে, ভঙ্গুর হয়ে পড়া ক্ষমতাসীন জোটকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যেও নেতানিয়াহু এমন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারেন।

সূত্র: আল জাজিরা

যুক্তরাজ্যকে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ বললেন নেতানিয়াহু
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

রাশিয়ার যে কৌশল প্রয়োগ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙছে ইরান

জর্ডানে ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় এটি স্পষ্ট যে, পেন্টাগনের বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার বিপরীতে তেহরান দ্রুতই তাদের যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করেছে। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে রাশিয়া প্রায়ই ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করে। ইরানও এখন একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করছে। কোনো একটি একক অস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে একসঙ্গে ড্রোন ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে তারা।

টানা পাঁচ দিন ধরে জর্ডানে থাকা তিনটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর উদ্দেশ্য ছিল ওয়াশিংটনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং মার্কিন বাহিনীকে তাদের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য করা।

ইরান এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করেছে, যেগুলো হঠাৎ দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম। ফলে সেগুলোকে আকাশে শনাক্ত করে ভূপাতিত করা মার্কিন বাহিনীর জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথম চার দিন মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। তবে ১৭ জুলাই একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে একটি মার্কিন ঘাঁটির অস্থায়ী আবাসনে আঘাত হানে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘আমরা প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্রই ভূপাতিত করেছি। একটি ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছিল।’

ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হন। একই সপ্তাহে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় কয়েকটি বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দুজন মার্কিন অস্ত্র মজুত-সংক্রান্ত তথ্য সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তির বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধ চলাকালে পেন্টাগন ১ হাজার ৫০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলেছে। আর এখন তাদের হাতে ১ হাজার ৭০০টিরও কম ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট রয়েছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রেসিডেন্ট সেথ জি. জোন্স বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন একসঙ্গে আসায় ইরান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলছে।’

ইউক্রেন যুদ্ধও ইরানের এই কৌশলকে প্রভাবিত করেছে। ইউক্রেনে রাশিয়া বারবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহার করেছে।

যুদ্ধের প্রথম পাঁচ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালায়। এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ছিল ভূগর্ভস্থ। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ইরান কয়েকটি স্থাপনা পুনরুদ্ধার করে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করতে সক্ষম হয়।

জোন্স বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা আরও কঠিন করে তুলতে তারা কার্যকরভাবে রাশিয়ার কৌশল কাজে লাগিয়েছে।’

ইরান তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখতে ভূগর্ভস্থ ও গোপন অবস্থান ব্যবহার করছে। দেশটির সেনা সদস্য এবং শীর্ষ নেতারাও বিভিন্ন গোপন আশ্রয়স্থলে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় রাখা হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। স্থাপনাটি একটি পাহাড়ের ৩০০ ফুটেরও বেশি গভীরে অবস্থিত বলে ধারণা করা হয়।

এসব কারণে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সূত্র: এনডিটিভি।

রাশিয়ার যে কৌশল প্রয়োগ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙছে ইরান
ছবি: সংগৃহীত।

Sunday, August 9, 2026

ফিলিস্তিনপন্থি মার্কিনিদের ইসরায়েলে প্রবেশের অনুমতি বাতিল

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা ও তাদের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন মার্কিন ইহুদি অধিকারকর্মীর ইসরায়েলে প্রবেশের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। শুক্রবার মার্কিন ইহুদি সংবাদমাধ্যম দ্য ফরওয়ার্ডের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন অধিকারকর্মী স্যাম শেরম্যান অধিকৃত পশ্চিম তীরের মাসাফের ইয়াত্তা এলাকায় সাত সপ্তাহের একটি স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছিলেন। সেখানে তিনি ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় কাজ করছিলেন। ওই সময় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তার ভ্রমণ অনুমতি বাতিলের একটি ই-মেইল পান তিনি।

শেরম্যান জানান, একই সময়ে তার দলের আরও কয়েকজন কর্মীও একই ধরনের ই-মেইল পেয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ইসরায়েলি সেনা, পুলিশ ও সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা তার পাসপোর্টের ছবি তুলেছিলেন।

তিনি বলেন, তারা মূলত স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন এবং তাদের সহায়তা করছিলেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে, যেন সেখানে উপস্থিত থাকাই প্রায় অপরাধ।

শেরম্যান আরও জানান, অভিজ্ঞ কয়েকজন ইহুদি অধিকারকর্মী তাকে বলেছেন, স্থায়ীভাবে ইসরায়েলে অভিবাসন না করলে ভবিষ্যতে তাকে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া নাও হতে পারে।

তবে মার্কিন ইহুদি কর্মীদের ভ্রমণ অনুমতি বাতিলের বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ প্রকাশ করেনি।

এদিকে, ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ফিলিস্তিনি নাগরিক ও তাদের সম্পত্তির বিরুদ্ধে ৩ হাজার ৪৮৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনার মধ্যে ব্যক্তিদের ওপর হামলা, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি, নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের ফাঁড়ি তৈরি এবং ফিলিস্তিনি কৃষকদের নিজ জমিতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

ইসরায়েলের একটি চেকপোস্টে তল্লাশি। ছবি: সংগৃহীত

Thursday, August 6, 2026

কার্টার থেকে রিগ্যান, ক্লিনটন থেকে ট্রাম্প—কীভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ধাঁধায় ফেলেছেন ইরানের নেতারা

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদনঃ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ইরান ‘অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারণা’ করছে বলে গত সোমবার অভিযোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী তেহরানের নেতাদের আচরণ বুঝতে না পারারই একটি নতুন লক্ষণ।

ট্রাম্প নিজেকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতা চেনার এবং তা কাজে লাগানোর একজন দক্ষ কারিগর মনে করেন। তবে ইরানের নেতারা তাঁকে পুরোপুরি ধাঁধায় ফেলে দিয়েছেন।

গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁরা শুধু আমার ক্ষোভই বাড়াচ্ছেন। তাঁরা শুধুই আমাকে রাগাচ্ছেন।’

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সামনে হয়তো আরও বড় হতাশা অপেক্ষা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি নতুন চুক্তি খুব কাছাকাছি। কিন্তু সেখানে শুল্ক আদায়ের বিষয়ে নিজেদের দাবিতে অনড় ইরান।

ট্রাম্প অবশ্য আগেই এ শুল্কের দাবিকে অগ্রহণযোগ্য বলে নাকচ করে দিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে একটি সুবিধাজনক চুক্তি করতে না পারার খেসারত ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত ভোটারদের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ওই নৌপথ নিয়ে চলমান দ্বন্দ্ব বিশ্ববাজারে তেলের দামকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর মাশুল দিতে হচ্ছে মার্কিন ভোক্তা ও বিশ্ব অর্থনীতিকে।

ইরানকে বুঝতে গিয়ে ট্রাম্পই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন যিনি এমন সংকটে পড়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইরানের ধোঁয়াশাপূর্ণ শাসনকাঠামো এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছেন, কেউ কেউ বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কাও খেয়েছেন।

এ ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে তাঁর করা পরমাণু চুক্তিটি ছিল ২০ মাসের দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল। রিপাবলিকান ও কিছু ডেমোক্র্যাট সদস্য অবশ্য সমালোচনা করেছিলেন যে ইরান ‘উদারতার ভান’ করে ওবামাকে একটি ত্রুটিপূর্ণ চুক্তিতে প্রলুব্ধ করেছে। তবে সব সমালোচনা সত্ত্বেও ওবামা এ চুক্তিকে তাঁর একটি বড় অর্জন বলে মনে করতেন।

সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ও মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের কর্মকর্তা কেনেথ পোলাক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পই হয়তো ইরানের নেতৃত্বকে সবচেয়ে কম বুঝতে পেরেছেন।

কয়েক দশক ধরে ইরানকে নিয়ে গবেষণা করা এ বিশ্লেষক বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের হতাশার এক চরম প্রতীক হলেন ট্রাম্প। তিনি একদিকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যাকুল ছিলেন, আরেকদিকে দেশটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শক্তিও প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু দেখলেন, কোনো পথেই তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই এমনভাবে কথা বলেন, যেন ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করলেই খুব দ্রুত একটি চুক্তি করা সম্ভব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে হামলা চালানোর মাধ্যমে তেহরান–ওয়াশিংটন যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর পরপরই ইরানের জনগণকে তাঁদের সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান ট্রাম্প।

ট্রাম্প সে সময় আরও বলেন, তিনিই ইরানের পরবর্তী নেতা ‘বেছে দেবেন’। পরে মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন। তবে ট্রাম্পের আশা অনুযায়ী ইরানে কোনো গণ-অভ্যুত্থান ঘটেনি। উল্টো দেশটির কট্টরপন্থী সরকার নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।

গত মার্চ মাসে আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মোজতবা খামেনি তাঁর বাবার চেয়েও অনেক বেশি কট্টর এবং পারমাণবিক বোমা অর্জনের বিষয়ে আগ্রহ আরও বেশি। নতুন খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া ‘অগ্রহণযোগ্য’ হবে বলে ট্রাম্প জনসমক্ষে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরান তা পাত্তাই দেয়নি। এমনকি সশরীর বৈঠকের জন্য ট্রাম্পের দেওয়া একটি প্রকাশ্য প্রস্তাবের কোনো জবাবই দেননি নতুন এ সর্বোচ্চ নেতা।

এ পরিস্থিতি সত্ত্বেও ট্রাম্প ইরানে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা ছাড়েননি। গত এপ্রিলের শেষের দিকে তিনি বলেন, ‘ইরান যদি একটি চুক্তি করে, তবে তারা নিজেদের খুব ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে।’ তাঁর মতে, চুক্তি করলে ইরান ‘একটি বৈধ দেশে পরিণত হতে পারে, মৃত্যু আর আতঙ্কের কোনো দেশ হিসেবে নয়।’

অবশ্য ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন যে তাঁরা হরমুজ প্রণালি এবং নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিষয়গুলো নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। তবে ট্রাম্পের মূল দাবিগুলোর একটি বড় অংশ তাঁরা শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছেন।

‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চেয়ে ইরানিরাই ভালো বোঝেন’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্র বিদ্বেষের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেশটির কোনো নেতাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় কোনো সমঝোতা বা সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আগ্রহী নন। মাসের পর মাস ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের লেনদেন চললেও, দেশটির শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা পাননি বলেই মনে হয়।

চলমান সংঘাতের পুরোটা সময় ট্রাম্প ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও তাঁর প্রতিনিধিদের মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান প্রতিনিয়ত বদলেছেন। তিনি কখনো তাঁদের ‘পাগল’, কখনো ‘যৌক্তিক’, কখনো ‘উন্মাদ স্বভাবের’, ‘অত্যন্ত বুদ্ধিমান’ কিংবা ‘একেবারেই উন্মাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ইরানের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি করার আশা নিয়ে ট্রাম্পের পূর্বসূরি কয়েকজন প্রেসিডেন্টও ঠিক একই ধরনের হতাশাজনক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক পরিচালক সুজান ম্যালোনি বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আদর্শিক প্রতিশ্রুতি এবং তাদের গভীরভাবে গেঁথে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামোকে ক্রমাগত অবমূল্যায়ন করে এসেছেন।’

নীতিনির্ধারকদের এ ব্যর্থতার একটি বড় কারণ, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ নেতাদের সরাসরি যোগাযোগের অভাব। কোনো মার্কিন কর্মকর্তা কখনোই ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, সদ্যপ্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কিংবা তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির সঙ্গে সশরীর সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাননি।

সুজান ম্যালোনির মতে, চলমান যুদ্ধ ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্বের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে দেশটিতে এই মুহূর্তে বিকল্প কোনো শক্তিশালী ক্ষমতা কেন্দ্র গড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ।

ইরানের আধা-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একজন প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট থাকলেও, সবকিছুই মূলত সর্বোচ্চ নেতার পূর্ণ ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীন পরিচালিত হয়। অতীতে এ ব্যবস্থার ভেতরেই কখনো কখনো এমন কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উত্থান ঘটেছে, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে ছিলেন। বিভিন্ন সময় ওয়াশিংটন তাঁদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলেও, শেষ পর্যন্ত তা শুধু অনুশোচনা আর ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

দুই মার্কিন রাজনৈতিক দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) প্রেসিডেন্টদের অধীনেই মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতিতে দীর্ঘকাল কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রবীণ কূটনীতিক ডেনিস রস পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চেয়ে ইরানিরাই হয়তো অনেক ভালো বোঝেন।’

‘তিক্ত হতাশা’

১৯৮০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তেহরানের মার্কিন দূতাবাস থেকে আগের বছর জিম্মি হওয়া ৫২ জন মার্কিনকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একটি গোপন আলোচনার অনুমোদন দেন। কার্টারের ডায়েরির পাতা থেকে জানা যায়, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই তিনিও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশল এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যকার কোন্দলের মতো খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত গভীরভাবে ভাবতেন।

১৯৮০ সালের শুরুর দিকে কার্টার ভেবেছিলেন যে তিনি জিম্মিদের মুক্ত করার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পেরেছেন। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ইরানের অবরুদ্ধ শত কোটি ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেওয়া ও দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনো হস্তক্ষেপ করবে না—এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কার্টারের ভাষায় এটা ছিল এক ‘তীব্র হতাশা’।

কেননা, ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি সেই প্রস্তাব এক ঝটকায় নাকচ করে দেন। খোমেনির এ আকস্মিক সিদ্ধান্ত মার্কিন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাঁর নিজের অধীনস্থদেরও পুরোপুরি অন্ধকারে ফেলে দিয়েছিল। পরে কার্টার জিম্মিদের উদ্ধারে একটি সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলেও তা ব্যর্থ হয়। অবশেষে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর কার্টারের প্রেসিডেন্ট পদের শেষ দিনে এসে এক চুক্তির মাধ্যমে ওই মার্কিনরা মুক্তি পান।

গোপন অস্ত্রচুক্তি

এ ঘটনার ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৯৮৫ সালে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁর সহযোগীদের একজন ইরানি অস্ত্র ব্যবসায়ীর পাঠানো একটি বার্তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।

বার্তায় দাবি করা হয়েছিল যে খোমেনি মারা যাওয়ার পর ইরানের কিছু মধ্যপন্থী কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হতে পারেন। রিগ্যান এটিকে পরবর্তী সময়ে একটি ‘কৌশলগত সুযোগের সন্ধান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। লেবাননে জিম্মি থাকা মার্কিনদের মুক্তির বিনিময়ে ইরানের কাছে গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেন। তবে এ পুরো প্রক্রিয়াটি পরে ইতিহাসে কুখ্যাত ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিতি পায়। কারণ, মার্কিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওই অস্ত্র বিক্রির টাকা গোপনে নিকারাগুয়ার একটি কমিউনিস্ট-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘কন্ট্রাস’-এর তহবিলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ গোপন লেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর রিগ্যানের প্রেসিডেন্সি এক বড় কেলেঙ্কারির মুখে পড়ে। ঘটনার জেরে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন এবং রিগ্যানের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত মরীচিকা বলেই প্রমাণিত হয়। তেহরানে কোনো মধ্যপন্থী নেতার দেখা পাওয়া যায়নি। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) পরে জানতে পারে যে পুরো প্রক্রিয়ার ‘হোতা’ সেই ইরানি অস্ত্র ব্যবসায়ী আসলে একজন ‘প্রতারক’ ছিলেন।

এদিকে এ ঘটনার প্রধান বিষয়গুলো নিজের অজানা ছিল দাবি করে প্রেসিডেন্ট রিগ্যান পরবর্তী সময় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে ক্ষমা চান। তবে ইরানি মধ্যপন্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির মূল লক্ষ্যটির পক্ষে তিনি নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরও একটি বাস্তব সুযোগ আসে। সে বছর ইরানে সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং এমনকি দূতাবাসে মার্কিন জিম্মি সংকটের ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। এটি ছিল একটি প্রকৃত ও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

জবাবে ক্লিনটনও ইরানের পেস্তা ও কার্পেট আমদানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন। একই সঙ্গে ইরানের পুরোনো কিছু ক্ষোভ ও অভিযোগের যৌক্তিকতা স্বীকার করে সমঝোতামূলক বক্তব্য দেন। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইট তো ১৯৫৩ সালে ইরানে এক সামরিক অভ্যুত্থানে সিআইএর সমর্থন দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমাও চান। এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, যিনি দেশটির পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত তেলশিল্পকে জাতীয়করণ করেছিলেন।

তবে ইরানের শক্তিশালী কট্টরপন্থী নেতারা প্রেসিডেন্ট খাতামির এ উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হলে তাঁদের পশ্চিমা–বিরোধী আদর্শের মূল ভিত্তিই হুমকির মুখে পড়ত।

অলব্রাইটের সেই বক্তব্যের কয়েক দিন পর, ইরানের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে আসা) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সব সম্ভাবনা এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেন।

আন্তর্জাতিক শান্তিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটনের কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ করিম সাদজাদপুরের মতে, প্রেসিডেন্ট খাতামি পরে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছিলেন যে খামেনি বিশ্বাস করতেন—ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ছাপিয়ে গেছে ইরান

ইরানের সঙ্গে বড় কোনো কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছেন শুধু সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। এর বিনিময়ে শিথিল করা হয় দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।

ওবামা প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা আশা করেছিলেন, আরেক মধ্যপন্থী ইরানি নেতা হাসান রুহানির সঙ্গে করা ওই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রথম ধাপ হবে। কিন্তু সেটি আর হয়নি। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি চুক্তির অনুমোদন দিলেও সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখাননি।

ওবামার সমালোচকেরা তখন বলেছিলেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির এ আচরণই প্রমাণ করে যে রুহানির ওপর ভরসা করা আর অতীতে খাতামির ওপর ভরসা করা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

যুক্তরাষ্ট্রকে যে বিশ্বাস করা যায় না—ইরানের এমন দীর্ঘদিনের সন্দেহ খুব দ্রুতই সত্য বলে প্রমাণিত হয়। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (তাঁর প্রথম মেয়াদে) হুট করেই সেই পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন এবং চুক্তির আগের চেয়েও আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তেহরানের ওপর চাপিয়ে দেন। জবাবে তেহরানও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরদার করে।

এমন পরিস্থিতি দুই দেশকে গত বছর এক সহিংস সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। ওই সংঘাতের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রস বলেন, তখন থেকেই ইরান প্রতিনিয়ত ওয়াশিংটনকে কূটনীতিতে টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে এবং যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের স্পষ্ট অধৈর্য মনোভাব ইরানের কৌশলকে আরও সহজ করে তুলেছে।

রস পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমাদের তাড়াহুড়াকে তারা একধরনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমরা সব সময় সবকিছু দ্রুত শেষ করতে চাই। আর তারা এ নীতিতে কাজ করে যে—সময় আমাদের চেয়ে তাদের স্বার্থকেই বেশি রক্ষা করবে।’

* অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্‌

সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি ই-৩ সেন্ট্রি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি ই-৩ সেন্ট্রি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়। ফাইল ছবি: রয়টার্স