Friday, October 25, 2019

সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশিরাই বাংলাদেশিদের ক্ষতির কারণ! by মিজানুর রহমান

সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশিরাই বাংলাদেশের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন! শ্রমিক কিংবা মেডিকেলসহ নানা কারণে ভ্রমণকারী বাংলাদেশিরা ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছেন। তবে অপরাধীদের সংখ্যা বা ঘটনাগুলো এখনো সহনীয় মাত্রায় রয়েছে। পুলিশি রেকর্ড তাই বলছে। আইনের কঠোর প্রয়োগে বিশ্বাসী সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশিদের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। সরকারি হিসাব মতে, এখানে প্রায় সোয়া লাখ বাংলাদেশির বসবাস। যাদের বেশির ভাগই সাধারণ শ্রমিক। তারা মূলত ৩টি সেক্টরে কাজ করেন। কন্সট্রাকশন বা নির্মাণ কাজ, ল্যান্ড স্ক্যাপিং অ্যান্ড কনজারভেন্সি বা বাগানের কাজ এবং মেরিন বা শিপিং সেক্টর।
তবে পড়াশোনা ও হাতে কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজেকে সাধারণ শ্রমিক থেকে ক্রমে দক্ষ শ্রমিকে রূপান্তর, ছোট, বড় ব্যবসা এবং পেশাদার বাংলাদেশিদের সংখ্যাও সামপ্রতিক সময়ে বাড়ছে। বেশ ক’দিন অবস্থান, রাত-দিন খবরের সন্ধানে ঘুরাঘুরি, দেশি- বিদেশিদের সঙ্গে আড্ডা এমনকি স্থানীয় পুলিশের বয়ানেও শোনা গেল বাংলাদেশিদের প্রশংসা। সিঙ্গাপুর প্রাচ্যের একমাত্র নগরী যেখানে পুরোপুরি পশ্চিমা ফ্লেভার রয়েছে। এখানে রাত- দিন সমান। পার্থক্য শুধু একটাই রাত পৌনে ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত মেজর পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অর্থাৎ মেট্রোরেল বা এমআরটি এবং সিটি বাস আর রাত ১০টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ব্র্যান্ডের দোকান ও মেগা শপিংমলগুলো বন্ধ থাকে। বাকি সব খোলা।
এমনকি বাংলাদেশিদের বহুল পরিচিত মোস্তাফা সেন্টার, সেভেন ইলেভেনও। নিরাপদ এই নগরীতে বাংলাদেশি নারী-পুরুষ নির্বিঘ্নে দিন-রাত কাজ করেন। তাদের কাজের প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা। সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজারে ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়ার অবস্থান অনেকটাই পোক্ত। ওই দেশগুলোর সঙ্গে সিঙ্গাপুরের বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক সম্পর্কও সুদৃঢ়। দেশগুলো তাদের শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যবসায়িক সম্পর্ককে টুলস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। দেনদরবারও করার সুযোগ রয়েছে। এ দুটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারের প্রয়াস রয়েছে। তবে এই ক’বছরে পেশাদার কূটনৈতিক কার্যক্রম এবং উচ্চ পর্যায়ের সফর বিনিময়ে ঢাকা-সিঙ্গাপুর রাজনৈতিক সম্পর্ক বেশ ভালো বোঝাপড়ার মধ্যেই রয়েছে। যা শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থানের স্থিতিশীলতা ধরে রাখার পাশাপাশি সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর সুযোগ অবারিত করেছে। সিঙ্গাপুরে নিযুক্ত বাংলাদেশের কূটনীতিকরা তা-ই বলছিলেন। তাদের মতে, এখানে থাকা বেশির ভাগ বাংলাদেশিরই সফলতার বা গর্ব করে বলার মতো গল্প আছে। কিন্তু কতিপয় দুষ্কৃতকারী, যারা দালাল বা ভায়া মিডিয়ায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে সিঙ্গাপুরে আসে, কিংবা এখানে আসার পর অবৈধ বা শটকাট পথে অর্থ উপার্জনকারী স্বজাতির কুমন্ত্রণায় বা নিজে থেকে উৎসাহী হয়ে বাঁকা পথে অর্থ কামাইয়ের জন্য অস্থির হয়ে যায়; তারাই সাধারণ বাংলাদেশি তথা বাংলাদেশের বিপদ ডেকে আনছেন। তাদের ধান্ধা বহুমুখী। চুরি, লুট, জুয়া-ক্যাসিনো, লটারি, নারী কেলেঙ্কারি, স্বর্ণ ও মোবাইল চোরাচালান, মানবপাচার, হুন্ডি-মানিলন্ডারিংসহ গুরুতর অপরাধের সঙ্গে বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততার প্রবণতায় প্রায়শই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় সাধারণ বাংলাদেশিদের। বাজে কাজে বাংলাদেশিরা ধরা পড়লেও কনস্যুলার একসেস বা আইনি সহায়তা দিতে হয় হাইকমিশনকে। জেনেভা কনভেনশন মতে হোস্ট কান্ট্রির তরফে সংশ্লিষ্ট দেশের মিশনকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়। তখন ওই দেশের তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে হয়, কনভেনশনে এর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একজন বাংলাদেশির জন্য হলেও পেশাদার কূটনীতিককে তখন ছোট হতে হয়। যা সিঙ্গাপুরের মতো আইনের শাসনের কঠোর বাস্তবায়নকারী দেশে বড়ই লজ্জার!
বাংলাদেশিদের প্রসঙ্গে কথা বলতে যেয়ে এক কূটনীতিক বারবার বলছিলেন, এখানে যে পরিমাণ বাংলাদেশি রয়েছেন বা ভ্রমণ করেন, সেই তুলনায় অপরাধে ধরা পড়া বাংলাদেশির সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য, পয়েন্ট এক পারসেন্ট হবে। কিন্তু সিঙ্গাপুর এমন একটা দেশ এখানে সংখ্যা বা ঘটনা বিবেচ্য নয়, ভাবমূর্তিই আসল। ৩ বছর আগে ৮ জন বাংলাদেশি উগ্রবাদের মতাদর্শে প্রভাবিত হতে যাচ্ছেন সন্দেহে ধরা পড়েছেন। তাদের বিচার হয়েছে। দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ওই ঘটনার কাছাকাছি সময়ে জঙ্গি অর্থায়নের দায়ে দু’জন সিঙ্গাপুরিয়ানেরও জেল হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের খাতায় কেবল ওই ৮ ব্যক্তি নয়, বাংলাদেশের নামও রয়ে গেছে। এ জন্য বহুদিন ভুগতে হবে। সিঙ্গাপুরে শ্রমিকদের স্বার্থ দেখভাল কাজে যুক্ত বাংলাদেশি জিয়া বলছিলেন, এখানে বাংলাদেশিদের সুনাম নানা কারণে। প্রথমত এরা বিশ্বস্ত, দ্বিতীয়ত এরা কর্মঠ। তৃতীয়ত তারা সরল এবং কষ্ট করে স্কেল বা উন্নতির পথে থাকে। কিন্তু কতিপয় বিভ্রান্ত মানুষ ওই সরল কর্মঠ বিশ্বাসীদের প্রতিনিয়ত প্ররোচনায় ব্যস্ত। তাদের আহ্বানে সাড়া দিলেই সর্বনাশ। কিন্তু এর মধ্যে সবাই ঠিক থাকতে পারে না। তারা বিভ্রান্ত হয়ে যায়। অপরাধে যুক্ত হয়ে যায়, কিন্তু আবার ভালো পথে ফিরেও আসে। তাছাড়া বড় অপরাধে শ্রমিকদের সম্পৃক্ত হাতেগোনা ঘটনা। যা হেড লাইন হয় বছরে ২-৩ বার! তার মতে, সিঙ্গাপুর সরকার এবং পুলিশও জানে বেশির ভাগ বাংলাদেশি সরল, নির্ভেজাল। নিরিবিলি জীবন ও কর্ম করতে চায়। আর কতিপয় দুষ্ট রয়েছে, এরা অতিমাত্রায় চালাক। ঘুরেফিরে তারাই ধড়া পড়ে, শাস্তি পায়, ফের অপরাধে যুক্ত হয়।
আজব কাণ্ড ঘটিয়ে খবরের শিরোনাম: এক বাংলাদেশি আজব কাণ্ড ঘটিয়ে শিরোনাম হয়েছেন গত আগস্টে। স্টেইট টাইমসসহ গোটা পূর্ব এশিয়ায় খবরটি প্রচার পেয়েছে। হামিদ মাতব্বর চুন্নু নামের ওই বাংলাদেশি পাসপোর্ট ছাড়াই গোপনে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে সিঙ্গাপুর ছেড়ে যাচ্ছিলেন। তার এ কাজে সহযোগী ছিলেন দু’জন মালয়েশিয়ান নারী। একজন নারী প্রাইভেটকার ড্রাইভ করছিলেন, অন্যজন যাত্রী। চুন্নু ছিলেন গাড়ির পেছনের সিটের নিচে, পাপোশের নিচে। ইমিগ্রেশন পুলিশ গাড়িটি সার্চ করতে গিয়ে চুন্নুকে খুঁজে পায় এবং সহযোগীদেরসহ আটক করে। পাসপোর্ট দেখাতে না পারায় ইমিগ্রেশন আইনের ৩টি ধারায় চুন্নুর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তার সহযোগীদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিদ্যমান আইনে চুন্নুর বিচার হবে এবং শাস্তি কার্যকর হওয়ার পর তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন- চুন্নুর বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আনা হয়েছে তা হাতেনাতে প্রমাণিত। তার জেল-জরিমানা নিশ্চিত। দেখার বিষয় সিঙ্গাপুরের আইনে বৃটিশ আমল থেকে বেত্রাঘাতের শাস্তির যে বিধান চালু রয়েছে সেটা তার বেলায় হতে পারে। এমন কঠোর শাস্তি খুব কম বাংলাদেশি পেয়েছেন। সামপ্রতিককালে তো নয়ই। পুলিশি রেকর্ড মতে, ২৯ বছর বয়সী চুন্নু ২০১৬ সালে অপরাধের জন্য সিঙ্গাপুর থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। তিনি এখানে নিষিদ্ধ ছিলেন।
ফলে অবৈধ পথেই তাকে দেশটিতে ঢুকতে হয়েছে এ ব্যাপারে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। কাছাকাছি আরো দু’জন বাংলাদেশি আটক হয়েছেন এক সেক্সওয়ার্কারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে। গেলানের একটি হোটেলের ওই ঘটনাটি পুলিশ অভিযুক্তদের ডরমিটরি থেকে আটক করেছে, তবে তাদের মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। আগস্টেই ইমিগ্রেশন আইন ভাঙার দায়ে ২ সিঙ্গাপুরের নাগরিকসহ ২২ বিদেশি আটক হয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশিও রয়েছেন।
হাইকমিশনার যা বললেন: এদিকে বাংলাদেশিদের বিষয়ে জানতে চাইলে সিঙ্গাপুরে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, তুলনামূলক বাংলাদেশের জন্য সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজার স্থিতিশীল। কিছু ঘটনা বাদ দিলে বাংলাদেশিরা সুনামের সঙ্গেই আছেন। এখানে ন্যূনতম দৈনিক ১৮ ডলার মজুরিতে তারা কাজ করেন। তাদের ডরমিটরিতে থাকাসহ জীবনযাত্রা মোটামুটি ভালো। মিশনের প্রতিনিধিরা নিয়মিত ডরমিটরি ভিজিট করেন জানিয়ে হাইকমিশনার মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধ পথে টাকা ইনকাম, রেমিটেন্স পাঠানো এবং সিঙ্গাপুরের আইন মেনে চলার জন্য উৎসাহিত করা হয়। কাউন্সেলিং হয় নিয়মিত। কিন্তু তারপরেও দুষ্টরা অপরাধ করে গোটা দেশকে কালিমাযুক্ত করে দেয়। আমরা হই বিব্রত।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বিষয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন সম্ভব হলে তা উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষায় অবদান রাখবে বলে মনে করেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত সহকারী মন্ত্রী অ্যালিস জি. ওয়েলস। যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগর বিষয়ক সাব-কমিটিতে দক্ষিণ এশিয়ায় মানবাধিকার বিষয়ে একটি জবানবন্দিতে তিনি এমন মতামত দেন। এতে তিনি বলেন, একাধিক সমমনা অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচন অবাধ কিংবা সুষ্ঠু হয়নি। ওইসব নির্বাচনের আগে  সিভিল সোসাইটি, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি পুলিশি নিপীড়ন এবং ভয় ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি পূর্ণমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় উন্নতি করা সম্ভব হলে তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ইচ্ছা পূরণে সরাসরি অবদান রাখবে বলেও মনে করেন ওয়েলস। সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন মার্কিন সহকারী মন্ত্রী।

জি. ওয়েলস এর জবানবন্দির পূর্ণ তরজমা নিচে দেয়া হলো:  
বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিচিত।
তার সহিষ্ণুতা, বিচিত্রতা এবং সেইসঙ্গে একজন নারী সরকার প্রধান হিসেবে তার গর্ব রয়েছে। বিশ্বের অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত। উপরন্তু, অর্থনীতির উন্নয়নে এবং দারিদ্র্যবিমোচনে যথেষ্ট ভালো অগ্রগতি করেছে। এখন যদি গণতন্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন সম্ভব হয়, তাহলে তা তার উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষায় অবদান রাখবে।

গত এক দশকে বাংলাদেশ সমাজ স্বাস্থ্যবান এবং সমৃদ্ধতর হয়েছে। ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটি তার এলডিসি মর্যাদা ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ ৭ শতাংশের বেশি জিডিপির প্রবৃদ্ধি রক্ষা করতে পেরেছে এবং লিঙ্গ সাম্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সামাজিক উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। যদিও পাঁচজন বাংলাদেশির মধ্যে একজন দারিদ্র্যসীমায় বাস করেন। কিন্তু সেটাও গত দুই দশক আগে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অবস্থা থেকে একটি উল্লেখযোগ্য দারিদ্র্য হ্রাস নিশ্চিত করছে। এই সময়ে অন্য যেসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটেছে, তার মধ্যে রয়েছে শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস এবং মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি ৫০ ভাগ বেড়ে যাওয়া।
আমরা অবশ্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং দেশটির গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা অব্যাহতভাবে বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলোকে কাজ করতে দেয়া, অনলাইনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোকে অবাধে তাদের মতামত প্রকাশ করতে দেয়া এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় রাজনৈতিকবিরোধী দলকে তার আইনসঙ্গত ভূমিকা রাখতে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। সংকুচিত হয়ে পড়া পরিবেশ এবং নিষেধাজ্ঞামূলক খসড়া নিয়ম-কানুনের কারণে সিভিল সোসাইটি হুমকিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এসবের কারণে এমনকি তারা রোহিঙ্গা সংকটের মোকাবিলায় নিয়োজিত কর্মীসহ জনগণের কাছে সমালোচনার মুখে পড়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের কারণে সাংবাদিকরা সেলফ সেন্সরশিপ চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৮ সালে জারি করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের লক্ষ্য ছিল সাইবার অপরাধ দমন করা। কিন্তু এর মাধ্যমে বাকস্বাধীনতা সংক্রান্ত কিছু বিষয় আইনানুগভাবে ক্রিমিনালাইজ বা দণ্ডনীয় করা হয়েছে।

এসবের অবসানে, আমরা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনের উন্নয়নে এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে একটি উত্তম ভারসাম্য সৃষ্টি করার জন্য কাজ করছি। এর মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং শ্রমনীতি বিষয়ে নিয়মিতভাবে আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করা। আমরা বাংলাদেশে নেতৃবৃন্দের প্রতি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করাতে আহ্বান জানিয়েছি। একাধিক সমমনা অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচন অবাধ কিংবা সুষ্ঠু হয়নি। এবং আমরা এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি যে, ওইসব নির্বাচনের আগে  সিভিল সোসাইটি, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি পুলিশি নিপীড়ন এবং ভয়-ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। আমরা একইসঙ্গে সারা বাংলাদেশে যাতে শাসনগত উন্নয়ন ঘটে, সেজন্য আমরা বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহায়তা দিয়েছি।  মানবপাচার রোধে যাতে বিশেষ আদালত গঠিত হয়, সেজন্য আমরা বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে উৎসাহিত করেছি।

বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন চাহিদা মেটানোয় টানাপড়েন সত্ত্বেও  বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের আগস্টে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর জন্য দেশের সীমান্ত খুলে দিয়েছিলেন। এই বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের তরফে স্বীকৃতির দাবি রাখে। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয়দানের ঘটনায় বাংলাদেশের ওপর একটি প্রকৃত প্রভাব সৃষ্টি করেছে। কারণ বাংলাদেশ সব থেকে ঘনবসতিপূর্ণ দেশের অন্যতম। বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্কলন অনুযায়ী, কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে রোহিঙ্গারা ইতিমধ্যে সংখ্যালঘু করে দিয়েছে। এখন দুজন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর বিপরীতে একজন স্থানীয় এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। প্রতিবেশের ক্ষতি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মতো স্থানীয়দের ভবিষ্যৎও হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। তবে এই  মানবিক সংকট মোকাবিলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যদের সঙ্গে বাংলাদেশের পাশে পুরোভাগে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ৬৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। আমরা যেহেতু ইতিমধ্যেই জরুরি প্রয়োজনে সাড়া দিয়েছি এবং আমরা একইসঙ্গে মনে করি যে, রোহিঙ্গাদের জন্য আনান কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বার্মাকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের অধিকার দেয়া এবং একটি স্বেচ্ছাসেবী, নিরাপদ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৌনঃপুনিকভাবে স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে ভাষানচরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতে একটি অনুকূল সমাধান হিসেবে সমর্থিত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে তাদের পাঠানো স্থগিত রাখার জন্য আমরা বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানাই।

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাস দমন, দ্বিমুখী বাণিজ্য, উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনসহ সাত লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দানের দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে এক মুখ্য অংশীদার হিসেবেই গণ্য করে। আমরা গুরুত্ব আরোপ করতে চাই যে, গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি পূর্ণমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় উন্নতি করা সম্ভব হলে সেটা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ইচ্ছাপূরণে সরাসরি অবদান রাখবে।

বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যা: ছাত্রলীগ ও যুবলীগে ‘টর্চার সেল’ নিয়ে যে উদ্বেগ by আবুল কালাম আজাদ

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রলীগের নির্যাতন এমনকি টর্চার সেল গড়ে তোলার কথা জানা যাচ্ছে। কিছুদিন আগে যুবলীগের নেতাদের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে পাওয়া গেছে নির্যাতনের জন্য টর্চার সেলের অস্তিত্ব।
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের মধ্যে এই টর্চার সেল বা নির্যাতনের একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে চলছে সমালোচনা।
বুয়েটের হলে থাকা এক ছাত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাকেও শিবির সন্দেহে রাতভর দফায় দফায় পেটানো হয়েছিল। কিন্তু ভয়ে আতঙ্কে বিষয়টি গোপন করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ছাত্র বলেন নির্মম ভাবে তাকে পেটানো হয়।
টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হতো এমন অভিযোগে সম্প্রতি বুয়েটের ছাত্রাবাসের একাধিক কক্ষ সিলগালা করে দেয়া হয়েছে।
"আমি আমার এলাকার এক নেতার দুর্নীতি আর ব্যাংকের অর্থ চুরির খবর ফেসবুকে দিয়েছিলাম। এটাই ছিল আমার অপরাধ।"
"রাতে রুমে দশ বারোজন এসে আমাকে জেরা করে। বলে আমি শিবির কিনা! প্রথমে চড় মারে। এরপর স্ট্যাম্প দিয়ে মারে। আমার পেছনে মারছিল পায়ে মারছিল। ধরেন রাত ১২টা থেকে ফজরের আজানের আগ পর্যন্ত এভাবে চলেছে।"
ভুক্তভোগী ছাত্ররা বলছেন, সরকারের সমালোচনা, অন্যায়ের প্রতিবাদ বা দুর্নীতি অনিয়মের খবর কেউ ফেসবুকে প্রচার করলেই সে ছাত্রলীগের জেরার নামে নির্যাতনের টার্গেট হয়েছেন।
তুচ্ছ অপরাধেও নানারকম হয়রানি আর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বহু ছাত্রকে। এমনকি প্রতিবাদ করলে ছাত্রলীগের হল শাখার নেতারাও আক্রান্ত হয়েছেন।
ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের অপসারণ এবং আবরার ফাহাদের ঘটনার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্যাতনের শিকার ছাত্রদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে আসছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের পূর্বের কমিটির হল শাখার একজন পদধারী নেতা জানান, ফেসবুকে একটা পোস্টের কারণে তাকে যিনি নির্যাতন করেন তার দখলে থাকা রুমটি সিলগালা করে দিয়েছে হল প্রশাসন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলে টর্চার সেল নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়।
"আমাকে চড়থাপ্পড় মারা হয়। পিস্তল মাথায় ঠেকিয়েছিল। কিন্তু মারে নাই। আমিও অনেক ভয় পেয়েছিলাম। এদের কারণেই ছাত্রলীগের দুর্নাম।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মশিউর রহমান জানান, প্রথম বর্ষেই ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি। পরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যোগ দেয়ার পর তাকে পিটিয়ে আহত করে পুলিশে দেয়া হয়। এরপর থেকে হল ছাড়া হয়েছেন তিনি।
"আপনি একটু ভিন্নমতের হলে আপনাকে প্রথম যেটা বলা হবে যে আপনি শিবির! এই শিবির বলে নির্যাতন করা হয়। আর শিবির বলার পর আর কেউ কোনো কথা বলার সাহস পায় না।"
শুধু বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রলীগের হাতে এমন নির্যাতনের একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছ বলেই অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে শুধু ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনই নয়, নির্যাতন বা টর্চার সেল সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে সরকারি দলের যুব সংগঠনেও।
বুয়েটের হলে থাকা এক ছাত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাকেও শিবির সন্দেহে রাতভর দফায় দফায় পেটানো হয়েছিল। কিন্তু ভয়ে আতঙ্কে বিষয়টি গোপন করেছেন
সম্প্রতি ঢাকায় র‍্যাবের অভিযানে যুবলীগ নেতাদের অফিসে অবৈধ অস্ত্র ছাড়াও নির্যাতনের জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জামের সঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেয়ার মেশিন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে।
অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগের এক নেতার মাধ্যমে একজন ভুক্তভোগী জানান, রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে আইন আদালত, পুলিশ প্রশাসন কিছুই তোয়াক্কা করতেন না যুবলীগের আটক নেতা। বেআইনিভাবে তার সম্পত্তি আরেকজনকে দখল করে দিয়েছেন যুবলীগের আটক নেতা।
যুবলীগ নেতার অফিসে কয়েকবার ডেকে নেয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে এই ভুক্তভোগীর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ ব্যক্তি জানান, তাকে শারীরিক নির্যাতন না করলেও মানসিক নির্যাতনের শিকার তিনি।
"একাধিকবার আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে যায় এবং সরাসরি আমাকে বলে দেয় কোনো কিছু করে কোনো লাভ হবে না।"
"যদি আপনি আইনের আশ্রয় নেন পুলিশের কাছে যান আপনার আরো ভয়ানক পরিস্থিতি হবে। এ এলাকার সর্বেসর্বা বলতে তাকেই বোঝাতো। সেটাকে মাফিয়া নাম দিবেন না ডন নাম দিবেন বা সন্ত্রাসী নাম দিবেন সেটা আপনারাই ভাল বোঝেন"!
র‍্যাবের অভিযানে যুবলীগ নেতাদের অফিসে ইলেকট্রিক শক দেয়ার মেশিন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র এবং যুব সংগঠনের সদস্যদের মাধ্যমে এমন নির্যাতনের সংস্কৃতি জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজ বলেন বিষয়টি শঙ্কার।
"এই অল্প তরুণ বয়সে তারা কেন এমন নির্দয় নিষ্ঠুর ভূমিকা পালন করবে। আমার মনে হয় আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এটা থেকে পরিত্রাণ পেতেই হবে।"
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ছাত্রলীগের টর্চার সেল বা নির্যাতনকারীদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দেখছে ছাত্রলীগ।
আর অভিযানে আটক হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে যুবলীগ তাদের বহিষ্কার করছে।
সরকারি দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, এসব ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং ছাত্রলীগের মধ্যে অনেকে এসব নিয়ে বিব্রত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় এরা কি প্রশ্রয় পেয়েছে?
বুয়েটে নির্যাতনের কারণে নিহত আবরারের বিচার দাবিতে গ্রাফিতি
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ বলেন, "যখনই কোনো ছাত্র বা যুবলীগ বা যেকোনো সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আমরা কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেইনি।"
ক্ষমতাসীন দল দায় এড়াতে চাইলেও অনেকের প্রশ্ন তাহলে এই যে নির্যাতন আর টর্চার সেলের সংস্কৃতি কিভাবে গড়ে উঠলো?
শীপা হাফিজ বলেন, দুর্বলের ওপর শক্তিমানের নির্যাতনের ঘটনা সবক্ষেত্রেই বেড়েছে।
"মুখে বলা হচ্ছে আমরা সমর্থন করি না কিন্তু এটা বন্ধ করার জন্য যদি কোনো ব্যবস্থা না দেখি আমরা মনে করি যে সমর্থনই করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক দেশ এভাবে টিকতে পারে না বাঁচতে পারে না।"
শিপা হাফিজ

পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধ ২০২৫ সালে, সাড়ে ১২ কোটি মানুষের প্রাণহানি: যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা by মিজানুর রহমান খান

পরমাণু বোমার বিস্ফোরণে সৃষ্ট ধোঁয়া
যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, কাশ্মীর বিরোধের জের ধরে ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক যুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। গবেষকরা বলছেন, এর ফলে জলবায়ুর ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে তাতে অনাহারে মারা যাবে আরো বহু কোটি মানুষ। এরকম এক বিপর্যয়ের ধারণা দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর এই দুটো দেশের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। আমেরিকার রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এসব আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এই যুদ্ধ কীভাবে শুরু হবে তার কিছু সিনারিও বা কাল্পনিক দৃশ্যও গবেষকরা তৈরি করেছেন।

দৃশ্য-কল্প ১:

ভারতীয় পার্লামেন্টে বোমা হামলা চালাবে একজন সন্ত্রাসী। নিহত হবেন ভারতীয় নেতারা। জবাবে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের ভেতরে প্রবেশ করে আক্রমণ চালাবে। নিজেদের রক্ষার্থে পারমানবিক বোমা ব্যবহার করবে পাকিস্তান। এরপর ভারতও তাদের পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করবে। দুটো দেশই তখন তাদের কাছে যতো পরমাণু অস্ত্র আছে সেসব নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হবে।

দৃশ্য-কল্প ২:

কাশ্মীরে আক্রমণ করবে ভারত। তার পর শুরু হয়ে যাবে পারমাণবিক যুদ্ধ। তবে উভয় দেশে যদি বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন নেতারা ক্ষমতায় থাকেন তাহলে হয়তো এরকম কিছু হবে না, এবং একারণেই এখনও পর্যন্ত সেরকম কিছু হয়নি। কিন্তু এরকম আরো নানা রকমের কাল্পনিক দৃশ্য তৈরি করা যায় যার ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. অ্যালান রোবোক, যিনি এই গবেষণার সাথে যুক্ত ছিলেন, বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ভারত ও পাকিস্তান তাদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার বাড়িয়ে চলেছে। শুধু সংখ্যার বিচারেই নয়, এসব অস্ত্রের বিস্ফোরণের শক্তিও তারা ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে। ফলে তাদের আশঙ্কা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেই এই যুদ্ধের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
যুদ্ধের এসব দৃশ্য-কল্প কিভাবে তৈরি করা হয়েছে? এসব কী নিছকই কিছু নাটক?
গবেষক অ্যালান রোবোক বলছেন, কিছু পেশাজীবীকে নিয়ে তারা ওয়ার্কশপ করেছেন যেখানে এসব সম্ভাব্য কারণের কথা উঠে এসেছে।
"ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া কয়েকজন জেনারেলকে আলাদা আলাদা দুটো কক্ষে বসিয়ে দেওয়া হয়। এক পক্ষকে বলা হয় যেসব কারণে যুদ্ধ হতে পারে তার কিছু ধারণা দিতে। তার পর সেগুলো অন্য আরেকটি কক্ষে অপর গ্রুপের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় সেরকম কিছু হলে তারা কী করবেন? এরকম আলোচনার ভিত্তিতেই এসব সিনারিও তৈরি করা হয়েছে।"
তবে তিনি বলেন, "এগুলো কিছু দৃশ্য-কল্প। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়তো কিছু হয় না। নেতারা ঠাণ্ডা মাথায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখেন। কিন্তু কখনো কখনো পরিস্থিতি তো নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে!"

কেন ২০২৫?

গবেষণা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালেই যুদ্ধে জড়াতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার চির-বৈরি দুটো দেশ: ভারত ও পাকিস্তান। যুদ্ধের এই সময় কীভাবে নির্ধারণ করা হলো?
অধ্যাপক রোবোক বলছেন, ভবিষ্যৎ থেকে তারা শুধু একটি বছরকে বেছে নিয়েছেন।
"এই যুদ্ধ যেকোনো সময়ে লাগতে পারে, হতে পারে আগামীকালও। ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোন তথ্য থাকে না। কখন কী হবে সেটাও কেউ বলতে পারে না। সেকারণে আমরা কিছু দৃশ্য-কল্প ব্যবহার করেছি কী হতে পারে সেটা বোঝার জন্যে। সেই সম্ভাবনার কথা চিত্রিত করতে আমরা শুধু একটা সময়কে বেছে নিয়েছি।"

আসলেই কি ২০২৫ সালে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হতে পারে?

ভারতীয় সেনা বাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জি বলছেন, এই গবেষণা একেবারেই কাল্পনিক, যার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
"লোকেরা ভাবছেন দুটো দেশের আণবিক বোমা আছে, তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো নয়, তার মানে পাঁচ ছ'বছর পর তাদের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাবে। "
তবে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে না হলেও যেকোনো সময় এই দুটো দেশের মধ্যে যুদ্ধ হতে পারে।
১৯৯৮ সালে ভারত ও পাকিস্তান আণবিক বোমা পরীক্ষা চালিয়েছে। এর পরে গত ১১ বছর চলে গেছে। এর মধ্যে কারগিল যুদ্ধ হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেসময় এবং তার পর থেকে কখনোই আণবিক বোমা ব্যবহারের কথা উঠেনি।
"কোন দেশ ইচ্ছে করে কিছু করতে চায় না। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত বিভিন্ন কারণে - যেমন ভয়ে, রাগে অনেক সময় অনেক কিছুই হয়ে যায়," বলেন মি. ব্যানার্জি।
এই গবেষণার সাথে একমত প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানে কায়দে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু বিজ্ঞানী ড. পারভেজ হুডভাই। তিনি বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধের সম্ভাবনা সবসময়ই আছে।
"কোন পরিকল্পনা থেকে নয়, বরং দুর্ঘটনাবশতই এরকম যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। দুটো দেশের মধ্যে যদি অনন্তকাল ধরে উত্তেজনা বিরাজ করে, এবং তাদের কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকে, তাহলে তো অনেক কিছুই ঘটতে পারে।"
উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, "কাশ্মীরের পুলওয়ামার পর বালাকোটে যা হয়েছে, পাকিস্তান ‌এর আরো কঠোর জবাব দিতে পারতো। তখন ভারতও কিছু একটা করতো। এরকম একের পর এক ঘটনায় উত্তেজনা এতোটাই ছড়িয়ে পড়তে পারতো যে পারমাণবিক যুদ্ধও শুরু হয়ে যেতে পারতো।"
"শীতল যুদ্ধের সময় যা হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধ তার চাইতেও খারাপ। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কয়েক হাজার মাইলের দূরত্ব কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্ত একই, যেখানে প্রায় প্রতিদিনই একে অপরকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়, ফলে উত্তেজনা শীতল যুদ্ধের চাইতেও বেশি।"

কারণ কাশ্মীর?

গবেষক অ্যালান রোবোক বলেন, "শুধু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নয়, হতে পারে ভারত ও চীনের মধ্যেও। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে হওয়ারও অনেক কারণ আছে। তবে আমরা ভারত ও পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছি, কারণ কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে এ-দুটো দেশের মধ্যে অব্যাহত বিরোধ চলছেই। সামরিক যুদ্ধে জড়ানোর অতীত ইতিহাসও তাদের রয়েছে।"
তবে পাকিস্তানের পরমাণু বিজ্ঞানী মি. হুডভাই মনে করেন, অন্যান্য কারণ থাকলেও কাশ্মীরই হবে প্রধান কারণ।
"কাশ্মীরের পরিস্থিতি যতোই শান্ত করা যাবে, পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকিও ততোটা কমে আসবে। দুর্ভাগ্যজনক হলো সেরকম কিছুই হচ্ছে না। এছাড়াও পরিবেশগত কিছু পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে দিতে পারে।"
"পাকিস্তানের বেশিরভাগ পানি আসে হিমালয় থেকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের সব হিমবাহ গলে উধাও হয়ে গেলে কাশ্মীর পাকিস্তানের জন্যে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে পানির উৎসের জন্যে। এনিয়ে যদি সমঝোতা না হয় তাহলে তো যুদ্ধের আশঙ্কাও বেড়ে যায়।"
সাবেক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ব্যানার্জি বলছেন, সন্ত্রাসবাদের মতো আরো কিছু ইস্যুও যুদ্ধের কারণ হতে পারে।
"২০০৮ সালে পাকিস্তান থেকে সন্ত্রাসীরা এসে মুম্বাই-এ আক্রমণ করেছিল। এরকম আক্রমণ আবারও হলে তখন পরিস্থিতি অন্য রকমের হয়ে যেতে পারে।"
তিনি মনে করেন, পানির কারণেও এই যুদ্ধ হতে পারে। "১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল তাতে দুটো দেশের কেউই খুশি নয়। যখন উভয়পক্ষ সমান সমান অখুশি হয় তখন মেনে নিতে হয় যে আমি যদি আরো বেশি খুশি হতে চাই তাহলে আমার প্রতিপক্ষ আরো বেশি অখুশি হবে। তখন যুদ্ধের সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে।"
সুইডিশ একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসেবে পাকিস্তানের ১৬০টি আর ভারতের আছে ১৫০টির মতো পারমাণবিক বোমা। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান ৪০০ থেকে ৫০০ পারমাণবিক অস্ত্র মজুত করে ফেলবে।
ইসলামাবাদে কায়দে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু বিজ্ঞানী মি. হুডভাই বলছেন, এই দুটো দেশের মধ্যে পরমাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে।
"যদিও এসব তথ্য অত্যন্ত গোপনীয় তারপরেও ধারণা করা হয় যে পাকিস্তানের কাছে হয়তো দশ/বিশটি বেশি বোমা আছে। ভারতের এখন পারমাণবিক ডুবোজাহাজও আছে। পাকিস্তানও এরকম ডুবোজাহাজ নির্মাণ করছে। ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এসব অস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা ও সংখ্যা দুটো দেশেরই বৃদ্ধি পাচ্ছে।"

অন্য কোথাও?

পারমাণবিক অস্ত্র আছে বিশ্বের মোট ন'টি দেশের। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র এই অস্ত্র তৈরি করে, তার পরে আজকের রাশিয়া। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীনেরও পরমাণু অস্ত্র রয়েছে। কাকতালীয় হলেও এই পাঁচটি দেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য।
এর বাইরে ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল এবং উত্তর কোরিয়ারও পরমাণু অস্ত্র রয়েছে।
এর মধ্যে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করেছে।
রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালান রোবোক বলছেন, পরমাণু শক্তিধর এসব দেশের যেকোনো দু'টোর মধ্যেই পরমাণু যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার পরমাণু শক্তিধর একটি দেশ এমন আরেকটি দেশে আক্রমণ করতে পারে যাদের পরমাণু অস্ত্র নেই।"
"পরমাণু অস্ত্র যখন আছে তখন পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কাও আছে। ইতোমধ্যেই এরকম একটি যুদ্ধ হয়ে গেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমায় পারমাণবিক অস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, যা থেকে আমরা ভবিষ্যতেও এরকম যুদ্ধের আশঙ্কা করতে পারি।"
ভারতের সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জিও বলছেন, কোথায় পরমাণু যুদ্ধ শুরু হবে এটা কেউই বলতে পারে না।
"চীনের পরমাণু অস্ত্র আছে, জাপানের নেই। কিন্তু তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়। তাদের মধ্যে অনেক রকমের উত্তেজনা আছে। আমেরিকা জাপানকে বলেছে, চীন যদি তোমাদের আণবিক অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখাতে চায় তাহলে আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি। তাদের মধ্যে সেরকম চুক্তিও আছে। তাই এই নয়টি দেশের বাইরেও পারমাণবিক যুদ্ধ হতে পারে।"
"মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ছাড়া এখনও পর্যন্ত অন্য কোন দেশের আণবিক বোমা নেই। ইরানের আরো সময় লাগবে। তার পরেও আমেরিকা, রাশিয়া যদি এই লড়াই-এ মিশে যায় তাহলেও আণবিক বোমার ব্যবহার হতে পারে।"

যুদ্ধ হলে কী হবে?

গবেষক অ্যালান রোবোক বলছেন, এর আগেও বেশ কয়েকবার পারমাণবিক যুদ্ধ লেগে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।
"ভবিষ্যতে কী হবে সেটা তো আমি বলতে পারবো না। আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান যে গত ৭৪ বছরে এই বোমা আর ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্বের অর্থ হচ্ছে এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে। আমরা যদি এসব ব্যবহার না করি, এগুলো ব্যবহারের যদি যৌক্তিক কোন কারণ না থাকে, তাহলে এসব ধ্বংস করে ফেলা উচিত।"
তিনি বলেন, "২০১৭ সালে জাতিসংঘে পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধে একটি চুক্তি সই হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত ৩২টি দেশ এই চুক্তি অনুমোদন করেছে। ৫০টি দেশ অনুমোদন করলেই এটি কার্যকর হবে। তাই এখন বাকি বিশ্বের এগিয়ে আসা উচিত।"
গবেষকরা বলছেন, পারমাণবিক বোমা যেখানে পড়বে, শুধু সেখানকারই মানুষই নয়, পুরো বিশ্বের জন্যেই সেটা হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
জলবায়ু বিজ্ঞানী অ্যালান রোবোক বলছেন, "পারমাণবিক বোমার ফলে আগুন লেগে যাবে, সেই আগুন থেকে যে পরিমাণ ধোঁয়া তৈরি হবে সেটা ছড়িয়ে পড়বে সারা পৃথিবীতে। এই ধোঁয়ার কারণে আমাদের এই গ্রহে সূর্যের আলোও ঠিক মতো এসে পৌঁছাতে পারবে না। ফলে পৃথিবী অনেক ঠাণ্ডা আর অন্ধকারময় হয়ে পড়বে।"
"ধোঁয়া যখন পৃথিবীর আরো উপরের আবহমণ্ডলে চলে যাবে তখন সেটা সূর্যের আলোতে উত্তপ্ত হয়ে আরো বেশি ছড়িয়ে পড়বে যা সেখানে স্থায়ী হবে কয়েক বছর। বৃষ্টিপাত কমে যাবে। তেজস্ক্রিয়তার ঘটনা ঘটবে। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদনের ওপর। ফলে যুদ্ধের পরেও অনাহারে আরো বহু মানুষের মৃত্যু হবে।"
কিন্তু তার পরেও কি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ লাগতে পারে?
পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যাপারে ভারতের নীতি হচ্ছে তারা এই অস্ত্র আগে ব্যবহার করবে না। কিন্তু তারাও এখন এই নীতি পুনর্বিবেচনার কথা বলছে। পাকিস্তান সবসময় বলেছে, এরকম অঙ্গীকার করতে তারা রাজি নয়।
ফলে দুটো দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর ফলে পারমাণবিক যুদ্ধ যে কখনোই ঘটবে না, তার কোন গ্যারান্টি নেই।

'আমার হৃদয়টা আমার মা ও বোনদের সাথে সেই কবরেই মারা গেছে': গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া এক ব্যক্তির ন্যায়বিচারের দাবি

"এ এক ভয়াবহ অনুভূতি। আমি দেখলাম আমার চোখের সামনে মা'কে মেরে ফেলা হচ্ছে। আমার কোনও শক্তি ছিল না। আমি তাকে রক্ষা করতে পারিনি। এরপরে আমি দেখলাম আমার দুটি বোনকে মেরে ফেলা হচ্ছে।"
"শুধু আমার মা আর বোনেরা নয়, তারা আমার সব আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করেছিল।"
তাদের অপরাধ এটাই ছিল যে - তারা সাদ্দাম হোসেনের ইরাকে কুর্দি পরিচয়ের মানুষ।
তৈমুর আবদুল্লা আহমেদ ১৯৮৮ সালের মে মাসে সেই দিনের কথা প্রায় প্রতিটি দিন মনে করেন, সে সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর।
তখন তিনি প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন - তবে সেই ফেরা হয়েছে শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে নয়।
তিনি বিবিসিকে বলেন, "আমি ওইদিনই আসলে মারা গিয়েছিলাম। সেই কবরস্থানে আমার মা ও বোনদের সাথে আমার হৃদয়ের মৃত্যু হয়েছিল।"
তবে তিনি যে পুরোপুরি অক্ষত ছিলেন তা নয়। বাহুতে ও পিঠে গুলি লেগেছিল তার।
কিন্তু তারপরেও তিনি অন্ধকারের মধ্যে গর্ত থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হতে পেরেছিলেন এবং এ কারণেই তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।
ওই নৃশংসতার স্মৃতি আহমেদের মনে এখনও খুব স্পষ্টভাবে গেঁথে আছে এবং সেদিনের পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষ বর্ণনা দিতে পিছপা হন না।
১৯৮৮ সালে সাদ্দাম হোসেন বাহিনীর অভিযানে নিজ স্বজনদের হারান তৈমুর আবদুল্লা আহমেদ
"আমি দেখলাম একটি গুলি আমার মায়ের মাথায় আঘাত করল এবং এর প্রভাবে তার স্কার্ফ খুলে গেল। আরেকটা বুলেট আমার বোনের গালের ভেতরে ঢুকে তার মাথা থেকে বেরিয়ে যায়।"
"আমার অন্য বোনের বাহুতে গুলি করা হয়েছিল এবং রক্ত পানির মতো প্রবাহিত হচ্ছিল," তিনি বলেন।
যখন তৈমুর ঘুমাতে যান বা কোনও শিশু বা তরুণ বয়সী মেয়েদের দেখেন, তখন এই দৃশ্যগুলো বারবার তার মনে ফ্ল্যাশব্যাক হয় এবং তিনি চিন্তা করতে থাকেন যে তার পরিবারের সাথে কী হয়েছিল।
"আমি আর কখনও একজন সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে পারব না," তিনি বলেন, "যতবার আমি এসব নিয়ে ভাবি, আমি মরে যাই।"
তৈমুরের এখন বয়স ৪৩ বছর। বিবিসিকে তিনি জানান তাঁর বেঁচে থাকা এবং ন্যায়বিচারের দাবির এক অসাধারণ গল্প।

সচেতনতা নেই

জুনে, ইরাকি কর্তৃপক্ষ সেই জায়গাটি খনন করতে শুরু করে যেখানে আহমেদ বিশ্বাস করেন যে তার পরিবারের মানুষদের মাটিচাপা দেয়া হয়েছে।
কিন্তু তারা এই খোঁড়াখুঁড়ির বিষয়ে তৈমুরকে কিছু জানাননি। তারা কুর্দি অঞ্চলে লাশগুলো পুনরায় দাফনের পরিকল্পনা করছে।
তোপজায়া সামরিক ঘাঁটি।
এতে তৈমুর ভীষণ রেগে যান - তিনি জানান যে এমন গোপনীয়ভাবে দেহাবশেষগুলো স্থানান্তরিত করার কোন অর্থ নেই।
"আমি চাই সমগ্র বিশ্ব আমাদের লোকদের সাথে কী ঘটেছিল তা দেখুক। আমি চাই যে গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগ মুহূর্তে যে নিরীহ শিশুটি মা'কে আঁকড়ে ধরে ছিল, তাদের মৃতদেহ ক্যামেরা জুম করে দেখাক।"
তিনি মনে করেন যে এই গণহত্যার বর্বরতা সম্পর্কে খুব কম মানুষ অবগত আছে এবং তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে কাউকে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখেননি।
আহমদ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, কিন্তু বন্ধুরা যখন তাকে খবর দেন যে ওই গণকবরটি খোঁড়াখুঁড়ি করা হবে তখন তিনি দ্রুত ইরাকে ফিরে আসেন।
তিনি এখন গণকবরটি তোলা রোধে লড়াই করছেন যেখানে তাঁর মা, বোন এবং নিকটাত্মীয়দের দেহাবশেষ রয়েছে।

কুর্দি গণহত্যা

গত এক দশকে ইরাকে অনেক কুর্দি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে।
ইরাকি সরকার বলেছে যে, এমন অন্তত ৭০ টি গণকবর রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ১৭ টি খোলা হয়েছে।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সাদ্দাম হুসেইন ইরাকের উত্তরে বসবাসকারী কুর্দিদের বিরুদ্ধে "আল-আনফাল" নামে একটি সামরিক অভিযান চালিয়েছিলেন।
উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি গোষ্ঠীকে শাস্তি দেয়া, যারা ইরানীদের সহযোগিতা করেছিল এবং আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল কুর্দিদের স্ব-শাসিত সমাজ ভেঙ্গে দেয়া।
গণকবরে নিহতদের পরিচয় অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে যে, পদ্ধতিগত জাতিগত নির্মূলে প্রায় এক লাখ মানুষ নিহত হন, যাদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে কুর্দি সূত্রগুলো বলছে যে মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। প্রায় এক লাখ ৮২ হাজার জন।

বদলে গিয়েছিল গ্রামের মেজাজ

সাদ্দাম হোসেইনের বাহিনীর হামলা চালাতে পারে এমন আশঙ্কার কথা শুনে ১৯৮৮ সালের এপ্রিল মাসে তৈমুরের পরিবার ও গ্রামের মেজাজ কীভাবে বদলে গিয়েছিল তা এখনও তার স্পষ্ট মনে আছে।
"ইরাকের উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলো একে একে ঘেরাও করা হয়েছিল।"
তৈমুরে যতদূর মনে আছে যে তাঁর গ্রামে পুরোপুরি তাঁর বর্ধিত পরিবারের সদস্যরা ছিলেন, যারা বেশিরভাগ কৃষক ছিলেন।
কুলাজো গ্রামটি ছিল অনেক জনবহুল এবং চারিদিকে পাহাড়ের মাঝখানে ছোট এই গ্রামটি ছিল।
তৈমুর বলেন, "যদি ওই অঞ্চলটি কেউ ভালোভাবে না চেনেন তাহলে আমাদের গ্রাম খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন।,"
ওই গণহত্যায় তৈমুর একমাত্র ব্যক্তি যিনি বেঁচে ফিরেছিলেন
তবে সাদ্দামের শাসনামলে সরকারের সাথে কাজ করতে ইচ্ছুক কুর্দিদের অভাব ছিল না।
"ইরাকের সহযোগী এই কুর্দিরাই আমাদের গ্রামগুলোয় ইরাকি বাহিনীকে পথ দেখিয়ে এনেছিল।"
এপ্রিল মাসের একটি দিনে গ্রামের ১১০ জনের সবাইকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
"তারা বলেছিল: 'আমরা জনগণের জন্য একটি শিবির খুলেছি এবং আপনারা সেখানে খুব আনন্দের সাথে বাস করতে পারবেন। সেখানে পানি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সব ধরণের সেবা রয়েছে"
কেউ কেউ দল বেঁধে সামরিক গাড়িতে চড়ে বসেছিল। তবে তৈমুরের পরিবার তাদেরকে নিজের ট্র্যাকটারে করে অনুসরণ করে।

পৃথকীকরণ

অবশেষে তাদের উত্তর ইরাকের তোপজায়ার একটি সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে, সবার থেকে পুরুষদের আলাদা করে ফেলা হয়।
সেইসঙ্গে তাদের সঙ্গে থাকা সব জিনিষপত্র লুট করে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। বাবা আবদুল্লা আহমেদকে ওই শেষ বারের মতো দেখেছিলেন তৈমুর।
পরে সামরিক বাহিনী তাকে তাঁর দুই বোন, মা, খালা এবং অন্যান্য তরুণ-তরুণীদের সাথে প্রায় এক মাস ধরে আটকে রাখে।
মে মাসের এক উত্তপ্ত দিনে, সব নারী এবং শিশুদের তিনটি সম্পূর্ণ ঢাকা সামরিক ট্রাকে তুলে দক্ষিণের অজানা গন্তব্যে কয়েক ঘণ্টা চালিয়ে নিয়ে যায়।
আহমেদ বলেছেন, "ট্রাকের ভেতরে খুব গরম ছিল। উত্তাপ ও ক্লান্তির কারণে দুটি মেয়ে সেখানেই মারা যায়।"
একটি সামরিক ঘাঁটিতে তৈমুর কে তার বাবার থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। সেটাই ছিল তাদের শেষ দেখা।
"এরপর তারা মাঝখানে কোথাও থামে এবং আমাদের কিছু পানি খেতে দেয়।"
"পানিতে কিছু রাসায়নিক মেশানো ছিল - যা আমাদের অসাড় করে দেয়। এরপর তারা আমাদের চোখ বেঁধে, হাত বেঁধে আবারও ট্রাকে ধাক্কা দিয়ে তুলে নিয়ে যায়।"
তৈমুর কোনভাবে নিজেকে মুক্ত করতে এবং চোখে বাঁধা কাপড় সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হন।

গোলাগুলি

পাঁচ মিনিট পরে, ট্রাকগুলো তাদের চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
দরজাগুলি খোলার পরে তিনি দেখতে পান বুলডোজার দিয়ে পাশাপাশি তিনটি গর্ত খোঁড়া হচ্ছে।
"আমি দেখলাম দুজন ইরাকি সেনা একে-৪৭ রাইফেল হাতে নিয়ে ওই গর্তের দিকে তাক করে আছে।"
নারী এবং শিশুদের- এমনকি এক মাস বয়সী শিশুদের ট্রাক থেকে নামিয়ে গর্তে ধাক্কা দিয়ে ফেলা হয়।
"হঠাৎ সৈন্যরা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে - তারা একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকেও গুলি করে হত্যা করে, যিনি আর ক'দিন পরেই হয়তো জন্ম দিতে চলেছিলেন। তার পেট ছিঁড়ে টুকরো হয়ে যায়।"
তৈমুরকে তার বাম বাহুতে গুলি করা হয়েছিল। তিনি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না।
গণকবর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
"আমি মারা যাওয়ার ভান করলাম। আমার মাথার আশেপাশে কাঁধে এবং পায়ের পাশ দিয়ে গুলিবর্ষণ হচ্ছিল। পুরো মাটি যেন কাঁপছিল। এক মুহূর্তে জায়গাটা রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়।"
তৈমুর পিঠে আরও দু'বার গুলিবিদ্ধ হন এবং আজও তিনি তার শরীরে সেই গুলির দাগ বয়ে বেড়াচ্ছেন।
"আমি আমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম," তিনি বলেন।

অব্যাহতি

আহমেদ বিশ্বাস করেন, তার অন্য বোনকে পাশের গর্তে হত্যা করা হয়েছিল।
"তখন আমার বয়স বারো বছর ছিল, আমার বোনদের মধ্যে বড়জনের বয়স ছিল ১০ বছরের মতো। আর বাকি দুজনের বয়স সম্ভবত আট এবং ছয় বছর।"
গোলাগুলি বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পরে তৈমুর গর্ত থেকে বের হয়ে আসেন।
তিনি হেঁটে হেঁটে, হামাগুড়ি দিয়ে মরুভূমির দিকে ছুটতে থাকেন এবং একটি তাঁবুর কাছে এসে থামেন। ওই তাঁবুটি ইরাকি বেদুইন পরিবারের ছিল।
"যেহেতু আমাকে হাসপাতালে নেওয়া বিপজ্জনক ছিল, তাই তারা আমাকে ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য কবিরাজের কাছে নিয়ে যায়, তাদের ওষুধগুলোয় আমার গুলির ক্ষত সেরে ওঠে," -তিনি বলেন।
ওই ইরাকি পরিবার একটি কুর্দিশ ছেলেকে আশ্রয় দেওয়ার মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিল, তবুও তারা তাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে তৈমুরের যত্ন নিয়েছিল।
একটি বেদুইন পরিবার নিজেদের জীবন বাজি রেখে তৈমুরকে আশ্রয় দিয়েছিল।
"আমি জানতাম যে আমার একজন আত্মীয় ইরাকি সেনাবাহিনীতে চাকরি করছেন। আমি তার সাথে যোগাযোগ করি এবং তিন বছর পর কুর্দি অঞ্চলে চলে আসি।"

সংগ্রাম

১৯৯১ সালে তিনি কুর্দি অঞ্চলে পৌঁছানোর পরে শীঘ্রই তার বেঁচে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
"যখন আমার বেঁচে থাকার গল্পটি প্রকাশ পায় তখন থেকেই ইরাকি বাহিনী এবং কুর্দি সহযোগীরা আমার সন্ধান করতে শুরু করে। তখন আমার বয়স হয়েছিল ১৫ বছর।"
তৈমুর তার অত্যাচারীদের থেকে বাঁচতে লুকোচুরি শুরু করেন। এক পর্যায়ে, তাকে তার আত্মীয়ের বাড়ি ছেড়ে পুড়ে যাওয়া গ্রামগুলোর ধ্বংসাবশেষে লুকিয়ে থাকতে হয়।
"আমি কুর্দিদের খালি গ্রামগুলোয় একা থাকতাম। আমার কোনও খাবার ছিল না। মাঝে মাঝে আমাকে গাছের পাতা খেতাম," সে বলে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়, এবং যুক্তরাষ্ট্রে তার আশ্রয়ের আবেদন গৃহীত হয়।
"১৯৯৬ সালে, আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাই এবং একটি গাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করি। আমি এখনও এই ব্যবসাই করছি," তিনি বলেন।

কবর সন্ধান করা

২০০৯ সালে, তৈমুর ইরাকে ফিরে যান। সে সময় তিনি তাঁর মা ও বোনদের মাটিচাপা দেয়া স্থানটি সন্ধান করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
আনফাল অভিযানে সাদ্দাম বাহিনী কুর্দিদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল
তিনি বাগদাদের ২৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে সামাওয়াহ অঞ্চলে গিয়ে ওই বেদুইন পরিবারকে খুঁজে পান যারা তাকে আশ্রয় দিয়েছিল।
"আমি তাদের বলেছিলাম যে আমাকে সেই তাঁবুর স্থানে নিয়ে যেতে যেখানে আমি তাদের সাথে প্রথম দেখা করেছিলাম।
তারা যখন আমাকে সেই জায়গায় নিয়ে যায়, তখন আমি আমার অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার করি এবং কবরের সন্ধান পেতে সক্ষম হই।"
ধূ ধূ মরুভূমিতে কোন কিছুর অনুসন্ধান করা কোনও সহজ কাজ ছিলনা।
"কবরটি যখন দেখলাম আমি কাঁপছিলাম। আমি কাঁদছিলাম।"
"আমি অনুভব করলাম যে ঈশ্বর আমাকে হয়তো এই একটি কারণে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ঈশ্বর আমাকে একটি বড় লক্ষ্য দিয়েছেন এবং সেটা হল সেই নিরীহ মানুষদের নিয়ে কথা বলা, যাদের আর কথা বলার শক্তি নেই।"
তৈমুর তার পরিবারের সদস্যদের দেহাবশেষ সাবধান ফিরিয়ে আনতে রাজনীতিবিদদের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন।
কর্মকর্তারা জানান নিহতের ব্যক্তিগত জিনিষপত্র লাশের পরিচয় সনাক্তে কাজে আসে
"আমি ইরাকি সরকারের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম এবং তাদের বলেছিলাম যে এই কবর সংক্রান্ত কোনও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তারা যেন আমাকে অবহিত করেন।"
"আমার মা ও বোনদের একটি ছবিও আমার কাছে নেই। আমি কবরস্থানে থাকতে চেয়েছিলাম কোনটি আমার মা এবং আমার বোন এবং আমি তাদের দেহাবশেষ নিয়ে একটি ছবি তুলতে চাই।"
তবে ইরাকি কর্তৃপক্ষ অপেক্ষা করেনি। "তারা আমার উপস্থিতি ছাড়াই কবরস্থানের কাজ শুরু করেছে," তিনি বলেন।

অসম্ভব কাজ

ওই কবরটি থেকে ১৭০টিরও বেশি লাশ উদ্ধার করা হয়। যেখানে তৈমুর বিশ্বাস করেন যে তার আত্মীয়দের হত্যা করা হয়েছিল।
ইরাকি কর্মকর্তারা বলেছেন যে আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগের বিষয়টি কুর্দি প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে।
কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের মুখপাত্র ফাওদ ওসমান তাহা বলেছেন," প্রত্যেক ভুক্তভোগীর স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করা আমাদের পক্ষে কঠিন। তৈমুর [আহমেদ] যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। আমরা এই দেশে বসবাসকারী লোকদের প্রতি মনোনিবেশ করছি।"
দক্ষিণ ইরাকে একটি গণকবর তোলার কাজ চলছে
"স্বজনদের জানানোর আগে লাশগুলি প্রথমে আমাদের পরীক্ষা করতে হবে। আমরা এমন কোনও ক্লু খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছি যা লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে সাহায্য করবে যেমন পোশাক বা আইডি কার্ড বা তারা কোথা থেকে এসেছেন এমন কোন চিহ্ন।"
তিনি বলেন যে, আরও পরীক্ষার জন্য দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ নমুনা নেওয়া হবে এবং প্রতিটি মরদেহকে আলাদা কোড নম্বর দেওয়া হবে।
"পরিবারগুলো সনাক্ত করার পরে আমরা তাদের মৃতদেহগুলি তাদের নিজ শহর বা গ্রামে নিয়ে যেতে এবং একটি বিশেষ শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের কবর দিতে সহায়তা করব।"
"আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায়বিচার চাই। তবে আমার মন্ত্রণালয়ের কাজ যুদ্ধাপরাধীদের অনুসরণ করা নয়। আমরা প্রমাণ সংগ্রহ করি এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করার জন্য বিশেষ আদালতে পাঠাই," তাহা বলেছেন।

বিচার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছুটে আসার পরে, তৈমুর মরুভূমির মাঝখানে শিবির স্থাপন করেন।
তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের গর্তটি খনন করতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যেখানে তাঁর মা ও দুই বোনের দেহাবশেষ রয়েছে বলে তারা বিশ্বাস।
"আমি এখানেই থাকবো। আমি কবর রক্ষা করতে সব ধরণের চেষ্টা করে যাব।"
তৈমুর জানান যে তিনি স্থানীয় রাজনীতিবিদদের মনোভাব দেখে বিরক্ত হয়ে আছেন।
যারা আরও একটি গণকবর সন্ধানের কৃতিত্ব নিতে আগ্রহী।
"কুর্দি গণহত্যার স্বীকৃতি দিতে হবে। আমাদেরকে এই ঘটনার পেছনে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।"
গণকবরে অসংখ্য মানুষের লাশ

‘আমি এখন এক আফগান’: আগ্রাসন চালানোর পর আর দেশে ফিরে যাননি যে সোভিয়েত সেনা

উত্তরাঞ্চলীয় আফগান নগরী কন্দুজে ১৯৮৪ সালের এক তারাভরা রাত। ১৮ বছর বয়সী তরুণ সেনা গেন্নেদি সেভমা চুপিসারে মাতাল ও ঘুমে ঢুলতে থাকা সেনাদের মাঝ থেকে উঠে গেলেন। ক্যাম্পের উপর নজর রাখার দায়িত্ব ছিলো এসব সেনার।
সেভমা’র ভাষায়, ‘সোভিয়েত আর্মির নির্যাতন’ থেকে পালাবো বলে ঠিক করেছিলাম। সামনে কি আছে জানি না।
ঘাঁটি ত্যাগ করার পর ইউক্রেনের সেনাটি সোজা মুজাহিদিনদের তাবুতে গিয়ে ঢোকেন। তখন সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ছিলো এসব মার্কিন সহায়তাপুষ্ট মুজাহিদ।
১৯৮৯ সালে সেনা প্রত্যাহারের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন নিশ্চিত ছিলো যে তাদের সব সেনা আফগানিস্তান ছেড়ে এসেছে। কিন্তু না, সেভমার মতো আরো ২২৬ জন পক্ষত্যাগকারী সেনা পেছনে থেকে যায়।
১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশক ধরে চলা ওই যুদ্ধে দুই মিলিয়ন আফগান নাগরিক ও ১৫,০০০ সোভিয়েত সেনা প্রাণ হারায়। সেভমা বেঁচে যান। শুধু তা-ই নয়, নিজের অতীত জীবন কবরস্থ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
এক সময়ের নাস্তিক, ইউক্রেনের দনবাস এলাকা থেকে আসা সেভমার বয়স এখন ৫৫ বছর। তিনি এখন নিজেকে নিক মোহাম্মদ নামে পরিচয় দেন। তিনি চার সন্তানের জনক, দারি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। এটি ফার্সি মিশ্রিত আফগান উপভাষা। তিনি এখন একনিষ্ঠ মুসলমান।
নিজের বাড়িতে ঘরের বাইরে একটি খাটিয়ায় বসে তার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন তার দুই নাতী অদূরেই খেলা করছে এবং তার মনযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছিলো।
দারি ভাষাতে তিনি বলেন, আমি এখানেই জীবন সাজিয়ে নিয়েছি, আমি এখন আফগান।
তার ভাষায় কোই ইউক্রেনিয় টান নেই।
মাঝে মধ্যে ঠাণ্ডা বিয়ার ছাড়া এখানে আর কিছুর টান তিনি অনুভব করেন না বলে জানান।
সাবেক সোভিয়েত সেনা গেন্নেদি সেভমা এখন মোহাম্মদ আলী। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন এই দারিভাষী আফগান
১৯৮৪ সালের যে রাতে তিনি পালিয়েছিলেন সে রাতেই মুজাহিদিনদের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক হন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে তাকে মুজাহিদিন হিসেবে দলে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়।
তিনি বলেন, তারা আমাকে ভাষা ও নামাজ শেখানোর জন্য একজন শিক্ষক দেয়। আমার স্ত্রী হিসেবে বিবি হাওয়াকে ঠিক করে। তখন তার বয়স ছিলো ১৪ বছর।
তিনি সাত বছর মুজাহিদিন দলে ছিলেন। পরে লরি চালকের কাজ নেন।
তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছে। তাই আর ইউক্রেনে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করেনি মোহাম্মদ। রুশ দূতাবাস থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ২,০০০ ডলার ভাতাও দেয়া হয়েছে কিন্তু তিনি রাজি হননি।
তিনি স্মরণ করেন, ‘আমার ভয় হয়েছিলো, তাছাড়া তখন আফগানিস্তানে আমার পরিবার ছিলো।’
আট বছর আগে তিনি তার আফগান পাসপোর্ট নিয়ে দনবাস ঘুরে এসেছেন। এখন তার আফগান সরকারের আইডি কার্ড বা ‘তাসকিরা’ রয়েছে। সেটাই ছিলো তার প্রথম ও শেষ যাওয়া।
নিক মোহাম্মদ বলেন, আমার পিতামাতা গত হয়েছে। আমি আমার ভাই ও তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাত করি। আবেগঘন পরিবেশ ছিলো সেটা। আমরা জড়াজড়ি করে কান্নাকাটি করেছিলাম।
মোহাম্মদ দুই সপ্তাহ পর আফগানিস্তানে তার পরিবারের কাছে ফিরে আসেন। তাদেরকে সফরের ছবি দেখান, সন্তানদের কাছে গল্প বলেন। তিনি আর ইউক্রেনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। তবে মাঝে মধ্যে টিভি চ্যানেল ঘুরিয়ে ইউক্রেনের সংবাদ জানার চেষ্টা করেন।
২০১৪ সালে দনবাসে ইউক্রেনিয়ান বাহিনী ও সোভিয়েতপন্থী মিলিশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ তাকে ব্যথিত করে। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন আর কখনো ইউক্রেন ফিরবেন না।
মোহাম্মদের ছেলে ফাইজালের বয়স ২৬ বছর। তার ইউক্রেন দেখার সখ থাকলেও অনেক দূরের পথ। তাছাড়া সে ইউক্রেনিয় শব্দও তেমন বোঝে না।
কন্দুজের একটি বড় মহল্লায় এই পরিবারের বাস। মাসে ৭,০০০ আফগানি ভাড়া গুণতে হয়। মোহাম্মদ এখন বাড়ির আঙ্গিনায় বসে বেড়ে ওঠা বাগান পরিচর্যা করে সময় কাটান। এখনো বিস্ফোরণের শব্দ অথবা আমেরিকান, আফগান বিমান হামলার শব্দে তার ঘুম ভেঙ্গে যায়।
দশকের পর দশক যুদ্ধে এই লোকটির উপর অনেক ধকল গেছে। প্রকৃত বয়সের চেয়ে তাকে অনেক বুড়ো দেখায়। তালেবানরা কাছাকাছি চলে আসায় কন্দুজে যুদ্ধের ঘনঘটা বেড়ে গেছে। ২০১৫ সালে দুই সপ্তাহের জন্য নগরটি দখল করেছিলো তালেবান। পরে তারা চলে যায়।
পুরনো ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় ধ্বংসপ্রাপ্ত সোভিয়েত ট্যাংক
আফগান প্রতিরক্ষামন্ত্রণালয়ের দাবি যে সেনাবাহিনী এখন রক্ষণাত্মক থেকে আক্রমনাত্মক অবস্থানে যাচ্ছে। মার্কিন বাহিনী বিমান হামলার পরিমাণ ২০% বাড়িয়েছে।
তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে মোহাম্মদ বলেন, আমি এখানে একটি যুদ্ধে লড়তে এসেছিলাম কিন্তু এখন যুদ্ধই আমার সঙ্গে লড়াই করছে।
থেকে যাওয়া সোভিয়েত সেনাদের মধ্যে আরেক ইউক্রেনিয় হাজি আহমেদ ছাড়া আর কাউকে মোহাম্মদ চেনেন না বলে জানিয়েছেন। মোহাম্মদের মতো একই বছর সেও পালায়। এখন সে ট্রাক চালিয়ে কন্দুজে মালামাল আনা নেয়ার কাজ করে।
আমাদের দেখা হলে আমরা দারিতেই বাতচিত করি, বললেন মোহাম্মদ। আহমেদের আসল নাম ছিলো আলেক্সান্ডার উরিভিচ। তিনিও পালিয়ে মুজাহিদিন দলে যোগ দেন। আহমেদ কখনো আর ইউক্রেন যাননি। তার সফর করার মতো সামর্থ্য নেই বলে জানান। এর বদলে তিনি টাকা জমিয়ে ছয় বছর আগে হজ্ব করে এসেছেন। আরেকবার হজ্বে যাওয়ার টাকা জমাচ্ছেন তিনি। এবার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার আশা করছেন। তিনি যেখানে থাকেন সেই হযরত সুলতান গ্রামটি তালেবানের নিয়ন্ত্রণে। তবে তালেবানরা তাকে সম্মান করে বলে আহমেদ জানিয়েছেন।
মোহাম্মদের মতো আহমদেকে একটি রাশিয়ান প্রতিনিধি দল ইউক্রেনে ফিরে যাওয়ার জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলো। তবে তিনি ওই অর্থ অন্য কাজে খরচ করেন।
আহমেদ জানান যে ইউক্রেন ফিরে যাওয়ার মতো তেমন কোন কারণ তার নেই। তার পিতামাতা ও ভাইবোন গত হয়েছেন। তিনিও অন্য আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেননি।
নতুন যাত্রী নিয়ে পরের গন্তব্যে রওয়ানা হওয়ার আগে আহমেদ বলেন, আমি ইউক্রেনকে মিস করবো না। আফগানিস্তানই আমার বাড়ি, এটাই আমার সংস্কৃতি। এখানে আমি খারাপ নেই, আমি সুখী।
আলেক্সান্ডার উরিভিচ এখন হাজি আহমেদ (৫৪), সাবেক এ সোভিয়েত সেনা এখন কন্দুজ শহরে ট্যাক্সি চালান

দৃষ্টান্তমূলক রায় by নাজমুল হক শামীম

চাঞ্চল্যকর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে ১৬ জনের জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসে। রায়ে এদের সবাইকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়েছে। মাত্র ৬১ কার্য দিবসে মামলার কার্যক্রম শেষ করে দেয়া এই রায় বিচার বিভাগের জন্য একটি মাইলফলক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে রাফির পরিবার। দ্রুত রায় কার্যকর ও নিরাপত্তা দাবি করা হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে।
হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের শাস্তির আওতায় আনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকারও প্রশংসা করেন আদালত। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা সন্তুষ্ট নন, রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী সাত কার্য দিবসের মধ্যে তারা আপিল করতে পারবেন। গত ৬ই এপ্রিল আলিম পরীক্ষার হল থেকে ছাদে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ১০ই এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়। হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাত মাসের মাথায় গতকাল রায় ঘোষণার দিনে জনাকীর্ণ ছিল আদালত প্রাঙ্গণ। ভিকটিম ও আসামিদের স্বজন এবং সাধারণ মানুষ আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন রায় শুনতে।

কড়া নিরাপত্তার মধ্যে প্রিজনভ্যানে করে ফেনী জেলা কারাগার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে মামলার ১৬ আসামিকে আদালতে আনা হয়। আদালতে আসামিদের তোলার সময় হাসতে হাসতে বিচারকের এজলাসে প্রবেশ করেন অধ্যক্ষ সিরাজ। ১১টা ৭ মিনিটে বিচারক আদালতে প্রবেশ করেন। এ সময় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ আলোচিত এ মামলার বিচারকাজ চলার সময় উপস্থিত আইনজীবী, পুলিশ, পিবিআই, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ১১টা ৯ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন বিচারক। মূল রায়ের সারসংক্ষেপ (তিনপৃষ্ঠা) পড়ে শোনান তিনি। রায় পড়তে বিচারক সময় নেন ১২ মিনিট ৪০ সেকেন্ড।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো: সানাগাজীর চরকৃষ্ণজয়ের কলিম উল্যাহ সওদাগার বাড়ির কলিম উল্যার ছেলে এসএম সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৭), চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মো. আহসান উল্যাহর ছেলে ও মাদ্রাসা ছাত্রদলের কথিত সভাপতি নুর উদ্দিন (২০), চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ভূঁইয়া বাজারে এলাকার নবাব আলী টেন্ডল বাড়ির মো. আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে ও মাদ্রাসা ছাত্রলীগের কথিক সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর, পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (সদ্য সাবেক) ও চরগণেশ গ্রামের পাণ্ডব বাড়ির আহসান উল্যাহ ছেলে মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ আল কাউন্সিলর (৫০), উপজেলার পূর্ব তুলাতলী গ্রামের খায়েজ আহাম্মদ মোল্লা বাড়ির আবুল বাশারের সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের সৈয়দ সালেহ আহাম্মদের বাড়ির রহমত উল্যাহ ছেলে জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ (১৯), সফরপুর গ্রামের খান বাড়ির আবুল কাশেমের ছেলে হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ও উত্তর চারচান্দিয়া গ্রামের সওদাগর বাড়ির ইবাদুল হকের ছেলে আবছার উদ্দিন (৩৩), চরগণেশ গ্রামের আজিজ বিডিআর বাড়ির আব্দুল আজিজের (পালক বাবা) মেয়ে কামরুন নাহার মনি (১৯), লক্ষ্মীপুর গ্রামের সফর আলী সর্দার বাড়ির শহিদুল ইসলামের মেয়ে ও মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ-উদ-দৌলার ভাগ্নি উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা (১৯), পূর্ব চরচান্দিয়া গ্রামের সোজা মিয়া চৌকিদার বাড়ির আব্দুল শুক্কুরের ছেলে আব্দুর রহিম শরীফ (২০), চরগণেশ গ্রামের হাজি ইমান আলীর বাড়ি ওরফে মালশা বাড়ির জামাল উদ্দিন জামালের ছেলে ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), চরগণেশ গ্রামের এনামুল হকের নতুন বাড়ির এনামুল হক ওরফে মফিজুল হকের ছেলে ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), তুলাতলী গ্রামের আলী জমাদ্দার বাড়ির সফি উল্যাহ ছেলে মোহাম্মদ শামীম (২০), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চরচান্দিয়া গ্রামের ভূঁইয়া বাজার এলাকার কোরবান আলী বাড়ির কোরবান আলীর ছেলে রুহুল আমিন (৫৫), উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের বোর্ড অফিস সংলগ্ন রুহুল আমিনের নতুন বাড়ির মো. রুহুল আমিনের ছেলে মহিউদ্দিন শাকিল (২০)।

আদালতের বক্তব্য: রায় ঘোষণার সময় আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘সোনাগাজী ইসলিামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা ফেনী জেলার অন্যতম বৃহৎ বিদ্যাপীঠ। দুই হাজারেরও অধিক ছাত্র-ছাত্রী তথায় অধ্যয়নরত। এলাকার শিক্ষা সম্প্রসারণে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলোকোজ্জ্বল ভূমিকায় কালিমালিপ্তকারী এ ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় ভিকটিম নুসরাত জাহার রাফি তেজদীপ্ত আত্মত্যাগ তাকে ইতিমধ্যে অমরত্ব দিয়েছে। তার এ অমরত্ব চিরকালে অনুপ্রেরণা। পাশাপাশি আসামিদের ঔদ্ধত্য কালান্তরে মানবতাকে লজ্জিত করবে নিশ্চয়। বিধায়, দৃষ্টান্তমূলক কঠোরতম শাস্তিই আসামিদের প্রাপ্য। এরই প্রেক্ষিতে বিচার্য বিষয়ত্রয়ে রাষ্ট্রপক্ষের অনুকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণপূর্বক, আসামিবৃন্দকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অত্র মামলায় ভিকটিম নুসরাত জাহান রাফিকে বিগত ০৬/০৪/২০১৯ সকাল ৯.৪৫-৯.৫০ মিনিটের মধ্যে ফেনীস্থ সোনাগাজী ইসলিামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ৩য় তলার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে তাকে পুড়িয়ে হত্যা করায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত/০৩) এর ৪ (১)/৩০ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে সকল আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা প্রদান করা হয়েছে।

রায়ে আরো বলা হয়, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা ও জরিমানার অর্থ আইন মোতাবেক আদায় করে ভিকটিমের বাবা-মা বরাবরে প্রদান করতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফেনীকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। মামলার জব্দকৃত সকল আলামত রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আলামত হিসেবে জব্দকৃত জেলখানার দর্শনার্থী রেজিস্ট্রার ফেনী জেলখানায় প্রেরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়। জব্দকৃত আলামত ছাই বিধি মোতাবেক ধ্বংস করা হোক। মৃত্যুদণ্ডাদেশের অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় কার্যক্রম হাইকোর্ট বিভাগে সত্বর প্রেরণ কার নির্দেশ দেয়া হয়। আসামিদের সাজা পরোয়ানা ইস্যু করার পাশাপাশি রায়ের অনুলিপি চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেল সুপারকে প্রেরণ করার জন্য বলা হয়েছে।

রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া: রায় ঘোষণা শেষে ১১টা ৩০ মিনিট থেকে একে একে আসামিদের এজলাস থেকে বের করা হয়। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে আসামিরা। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে। ১১টা ৪৫ মিনিট সকল আসামিকে প্রিজনভ্যানে তুলে কারাগারে দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে প্রিজনভ্যান। এ সময় ভ্যানের দু’পাশে আসামিদের স্বজনরা কথা বলার চেষ্টা করে। অনেক স্বজনকে ভ্যানের পাশে ঝুলতেও দেখা যায়। একপর্যায়ে প্রিজনভ্যানটি চলা শুরু করলে আসামির স্বজনরা ভ্যানের পেছন পেছন ছুটতে থাকে।

রাষ্ট্রপক্ষের জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি ও যুক্তিতর্কের বিজ্ঞ আইনজীবী আকরামুজ্জামন জানান, রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, আসামিরা নুসরাতকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। সবমিলিয়ে আসামিদের অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় সাজা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে সন্তোশ প্রকাশ করছে।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাদীপক্ষের কৌঁসুলি এম শাহজাহান সাজু রায়কে দৃষ্টান্তমূলক উল্লেখ করে বলেন, ৬২ কার্যদিবস শুনানির পর এই রায় দেয়া হয়েছে, যাকে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘নজিরবিহীন’ বলেছেন।
নুসরাতের ভাই মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, আসামিরা আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে আমাদের হুমকি দিয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন মাধ্যমে তারা আমাদের হুমকি দিচ্ছে। অতীতের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সেই দাবিও জানান নোমান। এদিকে রায় ঘোষণার সময় কিংবা রায় ঘোষণার পরও আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়নি মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ফরিদ উদ্দিন খাঁন নয়নকে।

আসামিদের কার কী ভূমিকা :

১. সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ না নিলেও, তার চেয়েও বেশি করেছেন। নুসরাতের যৌন হয়রানির মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ, তাতে কাজ না হওয়ায় ভয়ভীতি দেখানো এবং পরে নুসরাতকে হত্যার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে।

২. নূর উদ্দিন নুসরাত হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার আগে রেকি করা ছিল তার দায়িত্ব। আর ভবনের ছাদে আগুন দেয়ার সময় নিচে থেকে পুরো ঘটনার তদারকি করা ছিল তার দায়িত্ব।

৩. শাহাদাত হোসেন শামীম নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। সেজন্য ছিল তার ক্ষোভ। হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে কার কী ভূমিকা হবে সেই পরিকল্পনা সাজান শামীম। কাউন্সিলর মাকসুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে তিনি তার বোরখা ও কেরোসিন কেনার ব্যবস্থা করেন। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার সময় তিনি হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরেন। তার জবানবন্দির ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বোরখা ও কেরোসিন ঢালতে ব্যবহৃত গ্লাসটি উদ্ধার করে পিবিআই।

৪. সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা গ্রেপ্তার হলে ২৮শে মার্চ তার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নেন। বোরখা ও কেরোসিন কেনার জন্য তিনিই ১০ হাজার টাকা দেন। পিবিআই বলছে, পুরো ঘটনার আগাগোড়াই তিনি জানতেন।

৫. সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের বোরখা ও হাতমোজা পরে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় জোবায়ের। নুসরাতের ওড়না ছিঁড়ে দুই ভাগ করে পা বাঁধা এবং কেরোসিন ঢালার পর ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরানোর কাজটি সে করে।

৬. জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ বোরখা পরে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়। পা বাঁধা হলে পলিথিন থেকে কেরোসিন গ্লাসে ঢেলে সে নুসরাতের গায়ে ছিটিয়ে দেয়। সব কাজ শেষে বোরখা খুলে পরীক্ষার হলে ঢুকে যায়।

৭. হাফেজ আব্দুল কাদের নুসরাতের ভাই নোমানের বন্ধু কাদের সেদিন মাদ্রাসার মূল ফটকে পাহারায় ছিল। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়া হলে দুই মিনিট পরে সে ফোন করে নোমানকে বলে, তার বোন গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।

৮. আবছার উদ্দিন ঘটনার সময় গেটে পাহারায় ছিল। মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়াও তার দায়িত্ব ছিল।

৯. কামরুন নাহার মনি আসামি শামীমের দূর সম্পর্কের ভাগ্নি। মনি ২ হাজার টাকা নিয়ে দুটি বোরকা ও হাতমোজা কেনে। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়। ছাদের ওপর নুসরাতের হাত বাঁধা হলে তাকে শুইয়ে ফেলে বুকের ওপর চেপে ধরে মনি। আগুন দেয়া হলে নিচে নেমে এসে আলিম পরীক্ষায় বসে।

১০. উম্মে সুলতানা ওরফে পপি অধ্যক্ষ সিরাজের ভাগ্নি। সেদিন নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে যায়। পরে মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। তাতে রাজি না হওয়ায় নুসরাতের ওড়না দিয়ে তার হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে। নুসরাতকে ছাদে শুইয়ে চেপে ধরেন পা। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়া হয়ে গেলে পপিও নিচে নেমে পরীক্ষার হলে বসে।

১১. আবদুর রহিম শরীফ ঘটনার সময় মাদ্রাসার ফটকে পাহারায় ছিল। পরে ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার চালায়।

১২. ইফতেখার উদ্দিন রানা মাদ্রাসার মূল গেটের পাশে পাহারায় ছিল।

১৩. ইমরান হোসেন ওরফে মামুন  মাদ্রাসার মূল গেটের পাশে পাহারায় ছিলো।

১৪. মোহাম্মদ শামীম সাইক্লোন সেন্টারের সিঁড়ির সামনে পাহারায় ছিল।

১৫. মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি রুহুল আমীন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা।  রুহুল আমীন শুরু থেকেই এ হত্যা পরিকল্পনায় ছিল। ঘটনার পর পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সে। ঘটনার পর শামীমের সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়। ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টাতেও তার ভূমিকা ছিল।

১৬. মহিউদ্দিন শাকিল ঘটনার সময় সাইক্লোন সেন্টারের সিঁড়ির সামনে পাহারায় ছিল।

সেদিন যা ঘটেছিল: অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নুসরাতের শ্লীলতাহানির মামলায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ গ্রেপ্তার হলে তার অনুগত লোকজন ক্ষিপ্ত হয়। ১লা এপ্রিল শাহাদাত হোসেন শামীম, নূরু উদ্দিন, ইমরান, হাফেজ আবদুল কাদের ও রানা জেলখানায় গিয়ে সিরাজের সঙ্গে দেখা করে। তখনই অধ্যক্ষ সিরাজ তার মুক্তির চেষ্টা চালাতে এবং মামলা তুলে নিতে নুসরাতের পরিবারকে চাপ দিতে বলে।

হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের পরও মামলা না তোলায় আসামিরা আলোচনা করে ‘প্রয়োজনে যে কোনো কিছু’ করার পরিকল্পনা করে। কাউন্সিলর মাকসুদ এ কাজে শাহাদাত হোসেনকে ১০ হাজার টাকা দেয়। এর মধ্যে দুই হাজার টাকা দিয়ে মনি দুটি বোরকা ও চার জোড়া হাতমোজা কেনে।

৩রা এপ্রিল শামীম, নূর উদ্দিন, আবদুল কাদেরসহ কয়েকজন কারাগারে গিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজের সঙ্গে দেখা করে। সিরাজ তখন নুসরাতকে ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রয়োজনে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দেয় এবং ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালানোর নির্দেশ দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩রা এপ্রিল বিকালে মাদ্রাসার পাশে টিনশেড কক্ষে শাহাদাত হোসেন শামীম, নূর উদ্দিন, জোবায়ের, জাবেদ, পপি ও মনিসহ কয়েকজন বৈঠক করে। সেখানে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

৪ঠা এপ্রিল রাতে মাদ্রাসার ছাত্র হোস্টেলে বসে আবারো পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে আসামিরা। পরদিন ভূঁইয়া বাজার থেকে এক লিটার কেরোসিন কিনে নিজের কাছে রেখে দেয় শাহাদাত হোসেন শামীম।
৬ই এপ্রিল সকাল ৭টার পর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে চলে যায় শাহাদাত হোসেন শামীম, নূর উদ্দিন ও হাফেজ আবদুল কাদের। সোয়া ৯টার মধ্যে আসামিরা পরিকল্পনা অনুযায়ী যার যার অবস্থানে চলে যায়। শাহাদাত হোসেন শামীম পলিথিনে করে আনা কেরোসিন অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে থেকে একটি কাচের গ্লাস নিয়ে ছাদের বাথরুমের পাশে রেখে দেয়। মনির কেনা দুটি এবং বাড়ি থেকে নিয়ে আসা একটি বোরকা এবং চার জোড়া হাতমোজা নিয়ে সাইক্লোন সেন্টারের তৃতীয় তলায় রাখা হয়। শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ ও জোবায়ের সাড়ে ৯টার দিকে বোরকা ও হাতমোজা পরে তৃতীয় তলায় অবস্থান নেয়। নুসরাত পরীক্ষা দিতে এলে পরিকল্পনা অনুযায়ী উম্মে সুলতানা পপি তাকে মিথ্যা কথা বলে ছাদে নিয়ে আসে। নুসরাত ছাদে যাওয়ার সময় পপি তাকে ‘হুজুরের’ বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। নুসরাত তাতে রাজি না হয়ে ছাদে উঠে যায়। মনি, শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের, ও জাবেদও তখন নুসরাতের পিছু পিছু ছাদে যায়।

ছাদে তারা নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেয় এবং কয়েকটি কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলে। নুসরাত স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানালে শামীম বাঁ হাত দিয়ে নুসরাতের মুখ চেপে ধরে এবং ডান হাত দিয়ে নুসরাতের হাত পেছনে নিয়ে আসে। উম্মে সুলতানা পপি তখন নুসরাতের ওড়না খুলে জোবায়েরকে দেন। জোবায়ের ওড়না দুই ভাগ করে ফেলে। পপি ও মনি এক অংশ দিয়ে নুসরাতের হাত পেছন দিকে বেঁধে ফেলে। অন্য অংশ দিয়ে নুসরাতের পা বেঁধে ফেলে জোবায়ের। জাবেদ পায়ে গিঁট দেয়। সবাই মিলে নুসরাতকে ছাদের ওপর শুইয়ে ফেলে। শাহাদাত তখন নুসরাতের মুখ ও গলা চেপে রাখে। নুসরাতের বুকের ওপর চাপ দিয়ে ধরে মনি। পপি ও জোবায়ের পা চেপে ধরে। জাবেদ বাথরুমে লুকানো গ্লাস নিয়ে এসে কেরোসিন ঢেলে দেয় নুসরাতের গায়ে। শাহাদাতের ইশারায় জোবায়ের ম্যাচ জ্বেলে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন ধরানোর পর প্রথমে ছাদ থেকে নামে জোবায়ের। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী মনি ‘ওরফে চম্পা/শম্পা’ বলে ডেকে পপিকে নিচে নিয়ে যায়। তারা নিচে নেমে পরীক্ষার হলে ঢুকে যায়। জাবেদ ও শাহাদাত হোসেন শামীম সাইক্লোন সেন্টারের তৃতীয় তলায় গিয়ে বোরকা খুলে ফেলে। তারপর জাবেদও পরীক্ষার হলে ঢুকে যায়। শাহাদাত হোসেন শামীম তার বোরকা ফেলে দেয় মাদ্রাসার পুকুরে। জোবায়ের মাদ্রাসার মূল গেট দিয়ে বের হয়ে যায় এবং বোরকা ও হাতমোজা ফেলে দেয় সোনাগাজী কলেজের ডাঙ্গি খালে।

এদিকে অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জীবন বাঁচাতে দৌড়ে নিচে নেমে এলে কর্তব্যরত পুলিশ কনস্টেবল ও নাইটগার্ড তার গায়ের আগুন নেভায়। নূর উদ্দিনও ওই সময় নুসরাতের গায়ে পানি দেয়। আর হাফেজ আবদুল কাদের ফোন করে নুসরাতের ভাই নোমানকে বলে, তার বোন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল পরে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। সেখানে চার দিন চিকিৎসা নিয়ে ১০ই এপ্রিল মারা যান নুসরাত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দেন নুসরাত। সেখানেও গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনা তিনি একইভাবে বর্ণনা করেন বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

নুসরাত হত্যা হামলার কার্যক্রম: গত ৮ই এপ্রিল নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৪-৫ জনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর এটি হত্যা মামলায় পরিণত নেয়। এর আগে গত ৭ই এপ্রিল দগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকদের কাছে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি (ডায়িং ডিক্লেরেশন) দেন। নুসরাত হত্যার মামলাটি তদন্ত প্রথমে করছিলেন সোনাগাজী থানার পরিদর্শক কামাল হোসেন। কিন্তু ওই থানার ওসিসহ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের সময় গাফিলতির অভিযোগ উঠলে তদন্তভার আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর। ১০ই এপ্রিল মামলাটির তদন্তভার পিবিআই গ্রহণ করে। ঘটনার পর সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশ ও দায়িত্ব পাওয়ার পর পিবিআই বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মামলায় এজাহার নামীয় ৮ জনসহ ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে।

পিবিআই মামলা তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার ৩৩ কার্যদিবস শেষে (মোট ৫০ দিনের মধ্যে) গত ২৯শে মে ফেনীর সিনিয়র বিচারিক হাকিম (আমলী আদালত সোনাগাজী) মো. জাকির হোসেনের আদালতে মোট ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলম। ৮০৮ পৃষ্ঠার ওই অভিযোগপত্রে ‘হুকুমদাতা’ হিসেবে সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে ১ নম্বর আসামি করা হয়। অভিযুক্ত ১৬ জন আসামির মধ্যে ১২ জন আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৯২ জনকে। এদের মধ্যে কার্যবিধির ১৬১ ধারায় ৬৯ জনকে সাক্ষী করা হয়। ৭ জন সাক্ষী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিমূলক সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রের সারমর্ম বিচারকের কাছে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে হত্যার পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, হত্যার সময়কালীন ঘটনার ডিজিটাল স্কেচও আদালতে তুলে ধরেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। পিবিআই অভিযোগপত্রে ১৬ আসামির সবার সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছিল।

গত ৩০শে মে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। গত ১০ই জুন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করে চার্জগঠনের জন্য ২০শে জুন ধার্য করে। অভিযোগপত্রে নাম না থাকায় ওই সময় গ্রেপ্তার পাঁচজনকে অব্যাহতি দেয়া হয়। নুসরাত হত্যা মামলার ৭২ দিনের মধ্যে গত ২০শে জুন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালত ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (চার্জগঠন) করে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২৭শে জুন নির্ধারণ করে। গত ২৭শে জুন মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের সাক্ষ্য নেয়ার মধ্যে দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর পর টানা ৩৭ কর্মদিবসে নুসরাত হত্যা মামলায় ৯২ সাক্ষীর মধ্যে আদালতে বাদীসহ ৮৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করে। গত ২৭শে আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হলে গত ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষ ও বাদী পক্ষের যুক্তি তর্ক শেষে গত ৩০শে সেপ্টেম্বর বিচারক রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করে। এদিকে, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে প্রথম মামলায় নুসরাতের জবানবন্দি নেয়ার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ায় সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঢাকার বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে আলাদা মামলা হয়েছে। এ মামলায় তিনি কারাগারে আছেন। এ ছাড়া ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপারসহ আরো দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।

বই পড়া কি আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে?

চিন্তায় শৃঙ্খলা আনতে সাহায্য করে বই
যখন জীবনে চলার পথ অনেক কঠিন হয়ে যায় তখন ঠিক কী করা উচিত?
এ অবস্থায় ভাল একটি সাহিত্যের বই খুঁজে বের করে, সেটা পড়া হতে পারে, সবচেয়ে ভাল কোন প্রচেষ্টা।
তাহলে মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে বই কীভাবে আপনার জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে?
এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিবিসি, 'বিবলিওথেরাপিস্ট' এর একটি প্যানেলকে একত্রিত করে যারা তাদের জীবনের নানা সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহার করেছে এই বইগুলোকে। তাদের থেকে নেয়া কিছু অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ জেনে নেয়া যাক।

মানসিক চাপ কমিয়ে পুনর্জীবিত করে তোলে:

সঠিক ধরণের সাহিত্য আপনাকে যেকোনো বিষয় সম্পর্কে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ দিতে সক্ষম।
যেটা কিনা আপনার মনকে সতেজ করে তুলতে সাহায্য করে।
সাহিত্যিকদের মতে "একটি বই মূলত আপনাকে যে বার্তাটি দেয়, সেটি হল নিজের নীতিতে অটল থাকার। এ কারণে নানা ধরণের মানসিক পীড়া থেকে মুক্তি মেলে আর মন পুরো পরিশুদ্ধ নতুনের মতো হয়ে যায়।"

পালিয়ে যাওয়া

বই কীভাবে আপনার জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে?
লেখকদের মতে, "গল্প, উপন্যাস, সাহিত্য আপনাকে সবকিছু থেকে পালাতে সাহায্য করে। ইংরেজি ভাষায় যাকে বলা হয় এস্কেপিজম বা পলায়নবাদ। এই পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অন্য যেকোনো শিল্পের চেয়ে তীব্র ও শক্তিশালী।"
"একটি চলচ্চিত্র বা টিভি অনুষ্ঠানে আপনাকে ছবি দেখানো হয়, যেখানে একটি উপন্যাসের সাহায্যে আপনি সেই ছবি বা দৃশ্যপট নিজেই তৈরি করেন। সুতরাং বই আসলে অন্য যেকোনো মাধ্যমের চাইতে অনেক শক্তিশালী। কারণ এতে আপনি অনেক বেশি জড়িত।"

অগোছালো জীবন শৃঙ্খলায় আনুন

বই তার কাঠামোগত বিশ্লেষণের সাহায্যে একটি অগোছালো মনে শৃঙ্খলা আনতে পারে।
ঔপন্যাসিকদের অনেকেই নিজেরা যখন কোন ঝামেলায় পড়েন তখন তারা বইয়ের সাহায্য নেন।
তাদের মতে, "আপনি নিজেকে চেষ্টা করতে ও সমাধান করতে পারেন বইয়ের মধ্যে ডুবে যাওয়ার মাধ্যমে।"
"বইয়ের কোন অতিপ্রাকৃত গল্পের সঙ্গে সাথে নিজেকে যুক্ত করতে পারলে আপনার নিজের মনে থাকা নানা বিষয়কে এক জায়গায় এনে সমাধানের চেষ্টা করা যায়।"

হতাশ মনকে প্রবোধ দেয়

একটি শক্তিশালী সাহিত্যের শেষটি আনন্দের না হলেও - বাস্তবে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
হুইটল নামের এক ঔপন্যাসিক বিবিসিকে জানান যে, তিনি যখন ছোট ছিলেন তখন তার বাবা তাকে জ্যামাইকাতে তাঁর নিজের শৈশব সম্পর্কে বলতেন, যখন একজন গল্পকার ফসল কাটার সময় গ্রাম থেকে গ্রামে যেতেন এবং তারা দাস প্রথার গল্প বলে বেড়াতেন।"
"দাসপ্রথার এই বিষয়টি অনেক কষ্টের আর হতাশাজনক। তবে এটি ইঙ্গিত করে যে মানুষকে কতো সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে টিকে থাকতে হয়েছে।" বলেন মিস্টার হুইটল।

পুনরাবৃত্তির আনন্দ

প্রিয় উপন্যাসগুলি বার বার পড়লে সেটি বিশেষ ধরণের 'বিবলিওথেরাপি' বা পুস্তকীয় চিকিৎসা সরবরাহ করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে 'টেস অব ডি'উরবারভিল' বইটির কথা।
বইটির এক পাঠক খুব সুন্দরভাবে নিজের উপলব্ধি ব্যাখ্যা করেন, যিনি কিনা নিজেও একজন লেখক।
"আমি প্রথম যখন বইটা পড়ি, তখন আমার বয়স ছিল ১৫ বছর। আমি সত্যিই গল্পের মূল চরিত্র টেসের সাথে নিজেকে মিলিয়ে ফেলেছিলাম; দ্বিতীয় বার বইটা পড়লাম আরও ১০ বছর পরে, আমি দেখতে পেলাম যে টেস আসলে কতটা প্যাসিভ ছিলেন বা অসাড় ছিলেন। এর আরও ১০ বছর পর পুনরায় আমি বইটি পড়ি - তখন আমি টেসের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে বুঝতে শুরু করি", তিনি বলেন।
বই আপনার মেজাজ ঠিক করতে আর মনের ব্যাটারি রিচার্জে সাহায্য করে।
এই পাঠক কিংবা লেখকের মতে , জীবনে চলার পথে মাঝে মাঝে আপনাকে পেছনের সময়গুলোতে টেনে নিতে পারে বই- যা অনেক বড় একটি পাওয়া। আপনি নিজেকে আরও ভালভাবে জানতে পারবেন কারণ আপনি নিজের মনের স্তরগুলোয় বিচরণের সুযোগ পাবেন এই বইয়ের মাধ্যমে। যেগুলো আপনার মাথায় এতদিন পেঁয়াজের স্তরের মতো একটার সঙ্গে একটা জুড়ে ছিল।"

তরুণদের মনকে সহায়তা করছে

তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কট মোকাবেলায় সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তরুণদের জন্য এখন আরও বেশি সংখ্যক উপন্যাস লেখা হচ্ছে যা কিশোর-কিশোরীদের তাদের প্রতিদিনের জীবনে যে বিষয়গুলি মোকাবেলা করতে পারে, সেগুলি মোকাবিলায় সাহায্য করবে। সেটা হত পারে বুলিং বা কটূক্তি, মাদক, সমকামিতা, সামাজিক বর্জনসহ আরও নানা ইস্যু।"
বিবিসির সঙ্গে কয়েকজন লেখক
"যে বিষয়গুলি তাদের জীবনে ঘটতে পারে, অথচ এতদিন হয়তো তারা সেটা বুঝতেই পারেনি। আমি সত্যিই মনে করি যে একটি বই আমাদের মধ্যে থাকা হিমায়িত সমুদ্রকে ভেঙে দেওয়ার কুড়াল হিসেবে কাজ করতে পারে এবং এটি যে কোনও যুগের ক্ষেত্রেই সত্য।"- বলেন সেই লেখক।
লেখা কি মনের জন্য ভাল?
বই পড়ার যেমন মানসিক উপকার রয়েছে, তেমনটা কি লেখার ক্ষেত্রেও আছে?
আসলে একজন লেখকের জীবন মানসিক স্বাস্থ্যের বিবেচনায় অনেকটা একটি মিশ্র ব্যাগের মতো।
যার মধ্যে অনেক প্রয়োজনীয় কিছু থাকে।
লেখালেখি আপনাকে আবেগের রোলারকোস্টারে ঘোরাতে থাকে।
এর মধ্যে একটি হল অনেক মানসিক ট্রমা বা আবেগ বের করে দেয়ার ক্ষমতা। এক্ষেত্রে লেখা লেখি দুর্দান্তভাবে কাজে আসে।
পরিশেষে এটা বলতেই হয় যে, যখন কোন বই পাঠকের সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলে বা পাঠককে সুস্থ করে তোলে। ওই বইয়ের লেখকের জন্য এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারেনা।
কিশোর কিশোরীরা সংকোচের কারণে যেসব কথা সবার সঙ্গে বলতে পারেনা সেটা তারা বইয়ের মাধ্যমে পড়ে নিতে পারে নিঃসংকোচে।