Saturday, November 16, 2024

যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণের বৈধতা দিতে পার্লামেন্টে বিল

যুক্তরাজ্যে দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতায় ভুগছেন- এমন কোনো মানুষ যদি ইচ্ছা করেন তাহলে ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে নিজের মৃত্যু নিশ্চিত করতে পারবেন । স্বেচ্ছায় মৃত্যু নিশ্চিত করাকে আইনগত বৈধতা দিতে ‘এসিস্টেড ডায়িং’ নামক একটি বিল বৃটিশ পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হয়েছে । এই বিল আইনে পরিণত হলে অসুস্থ মানুষ ওষুধ সেবনের মাধ্যমে মারা যেতে পারবেন- ইসলাম ধর্মে যা আত্মহত্যার শামিল। তাই মুসলিম নন-মুসলিম বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ এই বিলটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

আগামী ২৯ নভেম্বর বিলটি পার্লামেন্টে সেকেন্ড রিডিংয়ের জন্য উত্থাপন করা হবে। এই বিলের বিপক্ষে অবস্থান নিতে এমপিদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের সর্বস্তরের ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদেরকে নিজ নিজ এলাকার এমপির কাছে  চিঠি লিখে বিলের বিপক্ষে ভোট দিতে আহ্বান জানাতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

১৫ নভেম্বর শুক্রবার দুপুরে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব কার্যালয়ে থার্টিন রিভার ট্রাস্ট ও মুসলিম বুরিয়াল ফান্ডের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ইডেন কেয়ারের প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাদিরা হুদা, থার্টিন রিভার্স ট্রাস্টের পক্ষে আবু মুমিন, মুসলিম বুরিয়াল ফান্ড ম্যানেজার ইউসুফ খান ও এমবিএফ অ্যাম্বসেডর আমিনুর চৌধুরী।

প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়ছে, যাদের ছয় মাস বা তার কম সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনাসহ দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা নির্ণয় করা হয়েছে- বিলটি আইনে পরিণত হলে তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে স্বেচ্ছা মৃত্যুবরণ করতে পারবেন।

এই আইন যুক্তরাজ্যে সংখ্যালঘু, নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রতিবন্ধী এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের ওপর বেশ প্রভাব বিস্তার করবে। একজন প্রতিবন্ধী কিংবা মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিকে তার পরিবার বোঝা মনে করতে পারে। সুতরাং, পরিবারই হয়তো তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দেবে।

আবু মুমিন বলেন, ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী খুবই অবহেলিত। অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানরা মা বাবাকে দেখাশোনা করতে চায় না । তাই একজন মা কিংবা বাবা যখন দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতায় ভুগবেন এবং পরিবারের সদস্যরা তার পাশে থাকবে না, তখন তিনি ওষুধ সেবনের মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করতে রাজি হতে পারেন।

তিনি বলেন, এই আইন বর্তমানে কানাডা এবং নেদারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে চালু আছে। কানাডায় অভিবাসী, মুসলিম, সংখ্যালঘু কমিউনিটির মানুষই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই আইনের সুবিধা নিচ্ছে । কারণ এই শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন কারণে স্বাস্থ্য বৈষম্যের শিকার।

নেদারল্যান্ডসের আইনটি এখন আরো সম্প্রসারণ হচ্ছে । আগে সেখানে শুধু দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্তদের ওষুধ সেবনের মাধ্যমে মৃত্যুবরণে আগ্রহী করা হতো, এখন অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও একই আইন প্রয়োগ হচ্ছে । যেমন যারা মানসিক সমস্যায় ভুগছেন তারা এবং ১২ বছর বয়সীরাও স্বইচ্ছায় মারা যেতে পারবেন।

আবু মুমিন আরো বলেন, খুবই ভয়াবহ একটা বিষয় হচ্ছে যে, চিকিৎসকরা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অকেজো করে দিতে ওষুধ খেতে দিবে । তাই ওষুধ সেবনের পর মারা যেতে অনেক সময় লাগবে। তাছাড়া, ওষুধ সেবনের পর অনেকে মারা নাও যেতে পারে । সুতরাং তাদেরকে জীবন-মৃত্যূর মাঝামাঝি তীব্র যন্ত্রণার মধ্যদিয়ে দিন কাটাতে হবে। তাই আমরা ইসলাম বিরোধী, মানবতাবিরোধী এই বিল সংসদে পাস না করতে এমিপদের প্রতি আহ্বান জানাই । আমরা যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সর্বস্তুরের বৃটিশ-বাংলাদেশিদেরকে তাদের স্থানীয় এমপির বরাবর চিঠি লিখতে আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে এমপি বিলের পক্ষে ভোট প্রয়োগ থেকে বিরত থাকেন।

mzamin


অনৈচ্ছিক অন্তর্ধানের বিরুদ্ধে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম মারুফ জামানের বিবৃতি

২০২৪ সালের ১৫ নভেম্বর, ঢাকায় এশিয়ান ফেডারেশনের অনিচ্ছাকৃত নিখোঁজদের (AFAD) অষ্টমতম কংগ্রেস চলাকালীন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম মারুফ জামান একটি বিবৃতি প্রদান করেন। সেই বিবৃতিটি এখানে তুলে ধরা হলো।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন এবং আন্তর্জাতিক আধিপত্যের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য বলপূর্বক গুম-এর শিকার হওয়া মানুষগুলির পক্ষ থেকে  দেশের বীর অগ্রদূতদের জানাই অভিনন্দন। বলপূর্বক গুমের পরিবারের সদস্যদের তরফ থেকে প্রায় দুই হাজার বীর শহীদদের আমি স্যালুট জানাই। এরাই আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতার প্রকৃত নায়ক। এই সাহসী যুবকরা দৃঢ় সংকল্পের সাথে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিল, সমস্ত নির্যাতন ও যন্ত্রণা সহ্য করেছিল। কিন্তু মাতৃভূমির প্রতি তাদের প্রগাঢ় ভালোবাসার জন্য কখনোই হাল ছেড়ে দেননি।

আমরা প্রায় ২০,০০০ প্রকৃত দেশপ্রেমিক বা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানাই।  যারা বর্ডার গার্ড, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, সোয়াট টিম, প্যারা মিলিটারি ফোর্সের পাশাপাশি  সশস্ত্র আওয়ামী লীগের ছাত্র গুন্ডাদের দ্বারা নির্বিচারে গুলি চালানোর ফলে মারাত্মক বুলেটে আহত হয়েছেন।

অলিগার্কিক  শাসন রীতিমতো একটি হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। দেশব্যাপী কারফিউ জারি করা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের দমন করার জন্য সমস্ত উপলব্ধ সংস্থান মোতায়েন করা হয়েছিল। হাসিনা আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার BTR 80s মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেখান থেকে ৭.৬২ মিমি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রগুলি থেকে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছিল নিরস্ত্র জনতার ওপর।

গুলি চালানোর  জন্য স্নাইপারদের ছাদে মোতায়েন করা হয়েছিল। হেলিকপ্টার থেকে অগ্নিসংযোগকারী বোমা, কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছিল। হেলিকপ্টারের ভেতরে থাকা র‌্যাব সদস্যরা তাদের অস্ত্রগুলি নীচের ভিড়ের মধ্যে ফেলে দিচ্ছিল এবং ছাদে যাদের দেখা গিয়েছিল তারা নিচে থাকা জনতাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল, এমনকি  শিশুদেরও বাদ দেয়নি তারা। এককথায় , নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রায় ২০,০০০ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী বন্দুকের গুলির আঘাতে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারিয়েছে, শটগানের গুলির আঘাতে শত শত মানুষ স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। কাশ্মীরি স্বাধীনতাকামী নাগরিকদের উপর ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি যে আচরণ দেখিয়েছিলো ঠিক অনুরূপ একটি কৌশল। জুলাইয়ে আমাদের রক্তক্ষয়ী বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী সত্যিকারের নায়করা এই ধরনের সমস্ত প্রতিকূলতাকে অস্বীকার করে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে। এইভাবে ৫ আগস্ট আমাদের বিজয় প্রাপ্তি ঘটে।

এই নিরস্ত্র যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। অন্যায় ও বঞ্চনা থেকে মুক্ত করে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য তাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্খা প্রতিফলিত হয়েছে, যা তুলে ধরে আমাদের পরবর্তী সংবিধান কেমন হওয়া দরকার। এই আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে  যা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য মেহনতি মানুষের সাথে জেনারেশন জেডের স্বপ্নকে প্রতিফলিত করে।

বলপূর্বক নিখোঁজদের পরিবারের পক্ষ থেকে আমি  ‘অধিকার’ সহ বিশ্বব্যাপী এবং এশিয়ার সকল মানবাধিকার সংস্থার প্রতি আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, বিশেষ করে অনিচ্ছাকৃত নিখোঁজদের জন্য গঠিত এশিয়ান ফেডারেশন (AFAD) এবং তাদের সদস্য সংস্থার প্রতি। ‘অধিকার’ তাদের অটল সাহসী অবস্থান, অবিরাম এবং জোরালো প্রচারণার জন্য একাধিকবার শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দ্বারা নিপীড়নের শিকার হয়েছে।   আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশ্বব্যাপী দর্শকদের সামনে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে AFAD একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।

আমরা সকলেই সচেতন যে, ‘জোরপূর্বক গুম’ একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ। দমনের  হাতিয়ার হিসেবে এই কৌশল  ব্যবহার করা হয়। যার লক্ষ্য ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠস্বর নীরব করা এবং জনসাধারণের মধ্যে ভয় ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করা। ফ্যাসিস্ট এবং নিপীড়নমূলক কর্তৃত্ববাদী শাসনগুলি তাদের বিরোধী এবং সমালোচকদের হুমকি দিতে বলপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার কৌশল  ব্যবহার করেছে। আমরা  জানি যে, জোরপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলো ক্ষমতাবান রাষ্ট্রনায়কদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সংগঠিত হয়। শেখ হাসিনার গত ১৬ বছরের বর্বর শাসনামলে  ‘বলপূর্বক গুম’ তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) এর মহাপরিচালক সেই সময়কালে কিছু দুর্নীতিবাজ অফিসার এবং তাদের অধস্তনদের সাথে ক্ষমতার প্রতি ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠে। আইনের ত্রুটিগুলিকে কাজে লাগিয়ে তারা বিচারবহিৰ্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (RAW) নামে পরিচিত ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলো। এই প্রসঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০১২ এবং ২০১৭ সালে গোপনে ‘মউ’ স্বাক্ষরিত হয়। অন্যান্য সমস্ত চুক্তির সাথে বাংলাদেশের সকল নাগরিকদের সামনে এই তথ্য উন্মোচন করা প্রয়োজন।

এই ভাড়াটেদের বেসরকারি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং সামরিক বাহিনীর  মতো একই লাইনে পরিচালিত করা হয়েছিল যা সাধারণত ‘ব্ল্যাক ওয়াটারস’ বা রাশিয়ান ‘ওয়াগনার’স নামে পরিচিত। এই সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারেরা তাদের অশুভ সাম্রাজ্য বাড়িয়ে চলেছে এবং ‘ব্ল্যাক ফান্ড’ এর অধীনে বিলিয়ন বিলিয়ন অডিট মুক্ত তহবিল আত্মসাৎ করেছে। তারা নিজেদের  ‘দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড কিংস’ বা  ‘নাইট কিং’ বলে ডাকত। অতিরিক্ত বিচারিক ক্ষমতা ব্যবহার করার পাশাপাশি  প্রয়োজনে বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা, কোনো চিহ্ন ছাড়াই মৃতদেহকে স্থায়ীভাবে নিষ্পত্তি করার অধিকার ছিল তাদের হাতে। প্রায় ১৬ মাস ধরে গোপন কারাগারে বন্দী থাকার সময় বিষয়গুলি আমি জানতে পারি। এই কারাগারে চলতো অকথ্য নির্যাতন, একমাত্র রাশিয়ান গুলাগ বা কারাগারের সাথেই এর তুলনা করা যেতে পারে।

সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের জন্য গড়ে ওঠা একটি আধাসামরিক ইউনিট - র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন নিজেদের নৃশংস জার্মান এসএস-এর প্রতিরূপে রূপান্তরিত করেছিল। অ্যাডলফ হিটলারের কালো ইউনিফর্মধারী বাহিনীর মতো এই অভিজাত বাহিনী আওয়ামী লীগের ‘রাজনৈতিক সৈনিক’ হিসাবে কাজ করেছিল। অতিরিক্ত বিচারিক ক্ষমতা পেয়ে র‌্যাব সদস্যরা আরো ভয়ংকরে হয়ে ওঠে। ১০ ডিসেম্বর, ২০২১-এ, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে বাংলাদেশের অভিজাত আধাসামরিক বাহিনী, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এবং এর সাতজন বর্তমান ও  সাবেক অফিসারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। শেখ হাসিনার পতনের সাথে সাথে কালো ইউনিফর্মধারী ‘কুখ্যাত’ বিশেষ পুলিশ বাহিনী প্রশ্নের মুখে পড়ে। পরবর্তীকালে অসংখ্য টর্চার সেলের সন্ধান পাওয়া যায়।

‘ছাত্রলীগ’ নামে পরিচিত আওয়ামী লীগের সশস্ত্র  ছাত্র ফ্রন্ট ছিল সত্যিকারের কুখ্যাত ডেথ স্কোয়াডের প্রতিরূপ। এই ডেথ স্কোয়াড ফ্যাসিস্ট কসাই অ্যাডলফ হিটলারের সময় গড়ে ওঠে , নাম ছিল ‘ব্রাউন কোটস’।  একইভাবে বেনিটো মুসোলিনির নেতৃত্বে মাথাচাড়া দেয় ‘কালো শার্ট’ যা ইতালিতে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সহিংসতা এবং ভীতি প্রদর্শন করেছিল।

ডিজিএফআই-এর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তারা সারা বাংলাদেশে ২৩টি   এরকম কারাগার  স্থাপন করেছে। আমাকে ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বন্দুক দেখিয়ে  জোরপূর্বক অপহরণ করা হয়। শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের কৌশলগুলো ছিল বর্ণনাতীত। প্রাথমিকভাবে থার্ড ডিগ্রি শারীরিক নির্যাতনের সাথে তুলনীয়। সহজ ভাষায় ফাঁসিতে ঝুলানোর সমান। কারাগারে মারাত্মকভাবে মারধর চলতো বন্দিদের ওপর যতক্ষণ না ভিকটিম অজ্ঞান হয়ে পড়ে। বন্দিদের শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে বৈদ্যুতিক প্রবাহ প্রয়োগ করা, ওয়াটার বোর্ডিং, ট্রুথ সিরাম ইনজেকশন ব্যবহার করা হতো। সৌভাগ্যবশত, বার্ধক্যের কারণে আমি এই ভয়ঙ্কর অত্যাচারের  হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম।  

যেহেতু এই সাইটগুলির স্মৃতিগুলি আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে আমি যা শুনেছি এবং অনুভব করেছি তা আজও মনে করতে পারি। ভুক্তভোগীদের উপর প্রয়োগ করা নির্যাতনের পদ্ধতিগুলি বিখ্যাত গুয়ানতানামো বে বন্দী শিবিরের কথা বা  ইরাকের আবু ঘ্রাইবের বন্দীদের কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে সৈন্যরা  হাসিমুখে বন্দিদের ওপর  নির্যাতন চালাতো। এই নৃশংসতা বিশ্বকে হতবাক করেছিল। তবুও অত্যাচারী আ.লীগ শাসন বারবার ও  সুস্পষ্টভাবে বলপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে।  কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রকাশ্যে এসব অপব্যবহার নিয়ে আবার বড়াই করেছেন। পরিবর্তে, কর্তৃপক্ষ প্রায়শই দাবি করে যে কিছু ব্যক্তি যাদেরকে জোরপূর্বক নিখোঁজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে বা গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে তা প্রমাণ করে যে তারা কখনই জোরপূর্বক নিখোঁজ হয়নি।  

 এই হত্যাকাণ্ডগুলিকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেন ভিকটিম নিজেই তার পরিবারকে  পরিত্যাগ করেছিল বা কর্মসংস্থানের সন্ধানে অন্য ধনী দেশে অবৈধভাবে প্রবেশের  চেষ্টা করার সময়  সমুদ্রে ডুবে গিয়েছিল। সুপরিকল্পিত মানহানিকর প্রচারণার বানোয়াট খেলা থেকে পরিবারের নারী সদস্যরাও রেহাই পায়নি। তাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারা হুমকি ও হয়রানি করা হয়েছিল এবং মধ্যরাতে থানায় রিপোর্ট করতে বলা হয়েছিল। বলপূর্বক গুম শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনই  নয়, এটি  নিপীড়নের এমন এক হাতিয়ার যা সারা সমাজে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়ায়। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশ এই ভয়াবহ বাস্তবতার সাথে পরিচিত।

২০২৪ এর ৫ আগস্ট আয়রন লেডি হিসাবে পরিচিত শেখ হাসিনা কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভের মধ্যে পদত্যাগ করেন এবং ভারতে পালিয়ে যান। হাসিনা শাসনের পতনের পরপরই  শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়; আমরা বিশ্বাস করি এই অন্তর্বর্তী সরকার এবং তার দল অখন্ড বাংলাদেশের জন্য 'আশার আলো' প্রজ্জলিত করবে।

পান্ডোরা বক্স খোলার সাথে সাথে সামনে আসতে থাকে বলপূর্বক গুমের শিকারদের অকল্পনীয় দুর্ভোগ ও যন্ত্রণার কথা, তাদের ওপর চালানো হয় ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা। ভুক্তভোগীরা নিজের এবং তাদের  প্রিয়জনের জীবনের কথা ভেবে  ক্রমাগত ভয়ের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতো। তাদের সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল এবং আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা  হয়েছিল। আমাদের মতো কয়েকজনকে যাদের হত্যা না করে জীবিত রাখা হয়েছিল  মুক্তি পাওয়ার পরেও সেই মানসিক এবং শারীরিক ক্ষত ছিল নিখোঁজদের পরিবারের যন্ত্রণার সমান গভীর। সেই পরিবারগুলো জানতো-ও  না তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছে নাকি মৃত। এই অনিশ্চয়তা নিখোঁজদের পরিবারগুলিকে অর্থনৈতিক কষ্ট এবং হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত করেছিল। পরিবারের নারীদের কষ্ট ছিল সবথেকে বেশি। একদিকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, অন্যদিকে খুঁজে না পাওয়ার জ্বালা দুটোই তাদের সহ্য করতে হয়েছে। জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়ার প্রভাব সেই শিশুদেরও প্রভাবিত করেছে যারা  হয়তো তাদের বাবা-মাকে হারিয়েছে এবং এই আঘাতের দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি ভোগ করছে। অনেক ক্ষেত্রে, শিশুদের কোনো আইনি বা আর্থিক সহায়তা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ।

২০২৪ এর ৩০ আগস্ট বলপূর্বক নিখোঁজদের উদ্দেশে পালিত আন্তর্জাতিক দিবসে বাংলাদেশের  বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অফ অল পার্সন ফ্রম এনফোর্সড ডিসপিয়ারেন্স (ICPPED) এ যোগদান করে একটি স্বাক্ষরকারী দেশ  হয়ে ওঠে। এনফোর্সড ডিসপিয়ারেন্সের আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে ইউনূস সরকার সত্য, ন্যায়বিচার এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষতিপূরণের পথ প্রশস্ত করেছে।মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ হিসাবে বলপূর্বক গুমের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে, ২৭ আগস্ট, ২০২৪ -এ অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট পর্যন্ত সমস্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের তদন্তের আওতায় নিয়ে  একটি পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন করে। কমিশন নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তারা নিখোঁজ হয়েছে তা নির্ধারণ করবে। এতে সশস্ত্র বাহিনী সহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যেকোন সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত বলপূর্বক অন্তর্ধানের সমস্ত ঘটনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

৯ নভেম্বর  কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছিলেন যে, 'আমরা ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১৬০০টি অভিযোগ পেয়েছি এবং আমরা অভিযোগের সংখ্যা দেখে বিস্মিত। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার ভয়ে এখনও অনেক লোক কমিশনে আসছেন না। এর থেকে, আমরা বুঝতে পারি যে ঘটনার সংখ্যা এখনও  পর্যন্ত রিপোর্ট করা সংখ্যার  তুলনায় অনেক বেশি। 'কমিশনের একজন সদস্য জানিয়েছেন যে, ভুক্তভোগীদের অনেকেই কারাগারে রয়েছেন, কেউ কেউ এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন।  কারণ তাদের গ্রেপ্তার দেখানোর পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। গুমের শিকার কিছু ব্যক্তি ভারতের কারাগারেও বন্দী রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।  

শেষ করার আগে আমি  বিবেচনার জন্য কয়েকটি ব্যবহারিক প্রস্তাব দিতে চাই। আমরা জীবিতরা এবং বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা যথাযথ বিচার চাই এবং প্রতিশোধ নয় বরং  আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা চাই। তার জন্য নিম্নলিখিত সুপারিশগুলি পেশ করা হচ্ছে -

বলপূর্বক গুমের শিকার জীবিত ব্যক্তিদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানসহ ক্ষতিপূরণ, পর্যাপ্ত সহায়তা জরুরি ভিত্তিতে প্রদান করা প্রয়োজন। বলপূর্বক গুমের শিকার সকলকে  কারাদণ্ড ভোগ করা থেকে বা মিথ্যা অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেবার হাত থেকে  মুক্তি দেওয়া উচিত।

বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন এবং জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ডিসপিয়ারেন্স সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দ্বারা দেশব্যাপী পর্যাপ্ত পদক্ষেপগুলি ত্বরান্বিত করা দরকার।  এমনকি প্রান্তিক অঞ্চলে হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দ্বারা তাদের নাম এবং বিবৃতি ইত্যাদি রেকর্ড করা প্রয়োজন।

মনোসামাজিক প্রভাব বিবেচনা করে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জোরপূর্বক নিখোঁজের শিকার ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।  ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার পাশাপাশি তাদের  মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানের প্রয়োজন। মানসিক সমর্থন প্রদান এই কারণে প্রয়োজন  কারণ ভুক্তভোগীরা প্রায়শই গুরুতর মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করে, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) এর মধ্যে থাকার। তাদের মাথায় আত্মহত্যার চিন্তাভাবনা, উদ্বেগ, নিদ্রাহীনতা কাজ করে।  

উপযুক্ত পুনর্বাসন কর্মসূচী ব্যবস্থা প্রয়োজন। আর্থিক  সহায়তা, চিকিৎসা সহায়তা এবং বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করা প্রয়োজন। যাতে  ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা  বিশেষ করে নারীরা  এই বোঝা বহন করতে পারে। কারণ প্রিয়জনদের অনুপস্থিতিতে  এখন তাদেরই  উপার্জনকারীর ভূমিকা  নিতে  হবে।  

জোরপূর্বক অন্তর্ধানের প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপরও , যারা পিতামাতাকে হারিয়ে এই আঘাতের দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি ভোগ করছে। অনেক ক্ষেত্রে, শিশুদের কোনো আইনি বা আর্থিক সহায়তা ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়, যা তাদের দুর্বলতা এবং প্রান্তিকতাকে বাড়িয়ে তোলে। ক্ষতিপূরণ   এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের জন্য  একটি অফিস (ওএমপি) প্রতিষ্ঠা করলে তাদের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে।

আমরা সকলেই সচেতন যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্যের প্রাথমিক উৎস ভিকটিম, তাদের পরিবারের সদস্য, সাক্ষী এবং সহযোগী ব্যক্তিরা। তাদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

বলপূর্বক গুম যেমন শুধু অপহরণ নয়, বরং এগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সুনিপুণ ও সমন্বিত অভিযান যা বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের  সাথে জড়িত। নতুন আইনি কাঠামোতে বর্তমানে খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ আইন সংশোধন করতে হবে,  যাতে জোরপূর্বক অন্তর্ধানের এই অপরাধীদের মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অধীনে এনে  বিচার করা যায়। এইভাবে ন্যায়বিচার এবং ট্রাইব্যুনালের  ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে যাতে  অপরাধীরা  উপযুক্ত শাস্তি পায়।

ভবিষ্যত সরকারগুলিকে  এই ধরনের জঘন্য অপরাধ থেকে নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে বিরত রাখার জন্য  আইনি কাঠামোর বিধানগুলি  শক্তিশালী করতে হবে। শুধু বলপূর্বক গুম নয়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনাগুলির  আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিচার বিভাগীয় তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

বিগত ষোল বছরে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে যে অপরাধগুলি সংঘটিত হয়েছে  তার বিচার এনফোর্সড ডিসপিয়ারেন্স সম্পর্কিত আইনের অধীনে  হয়েছে কিনা তা নিচিত করতে হবে। প্রস্তাবিত আইনি কাঠামোকে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে যাতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিগ্রস্ত প্রভাব থেকে বিরত রাখা যায়। তাদের অপরাধের জন্য দায়মুক্তির সংস্কৃতি   চিরতরে শেষ করতে হবে।

mzamin

যুদ্ধে কেন কুখ্যাত ‘দাহিয়া ডকট্রিন’ প্রয়োগ করে ইসরায়েল by মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

‘দাহিয়া ডকট্রিনের’ প্রবর্তক ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তৎকালীন নর্দান কমান্ডের প্রধান জেনারেল গাদি আইজেনকট। অবসরে যাওয়ার আগে তিনি ২০১৯ সালে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ হয়েছিলেন।

এক বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ফিলিস্তিনের গাজার বড় অংশই বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে। সেখানকার বড় অংশই এখন বসবাসের অনুপযোগী। গত মে মাসে জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রকল্প (ইউএনডিপি) থেকে দেওয়া এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, যুদ্ধে গাজার ধ্বংস হওয়া বাড়িগুলোর ধ্বংসাবশেষ সরাতেই ১৫ বছর তথা ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। বেসামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ নতুন কিছু নয়। বরং নিজেদের যুদ্ধনীতির অংশ হিসেবেই ইহুদি রাষ্ট্রটি এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে থাকে। তাদের এই যুদ্ধনীতি ‘দাহিয়া (দাহিয়েহ) ডকট্রিন’ হিসেবে পরিচিত।

এই যুদ্ধনীতি ইসরায়েল প্রথম গাজায় প্রয়োগ করেনি। এই যুদ্ধনীতি প্রথম প্রয়োগ করা হয়েছিল লেবাননে। অক্টোবরের শুরু থেকে সেই লেবাননে আবার কুখ্যাত এই যুদ্ধনীতি প্রয়োগ শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইতিমধ্যে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং দেশটির রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে ইসরায়েল। সেখানকার বাসিন্দারা আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠেছে।

‘দাহিয়া ডকট্রিন’ কী


ইনস্টিটিউট অব মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের (আইএমইইউ) মতে, দাহিয়া ডকট্রিন হলো ব্যাপক ও অসম শক্তি প্রয়োগ এবং বেসামরিক লোকজন ও স্থাপনার ওপর ইচ্ছাকৃত হামলার ইসরায়েলি রণনীতি।

চলমান যুদ্ধে গাজার ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে ইউএনডিপির আরব দেশগুলোর আঞ্চলিক ব্যুরোর পরিচালক আবদুল্লাহ আল-দারদারি বলেন, ‘আমরা ১৯৪৫ সালের পর এ রকমটা আর দেখিনি। গত প্রায় ৪০ বছরে গাজায় মানব উন্নয়নের জন্য যত বিনিয়োগ করা হয়েছিল, তার সবই জলে ভেসে গেছে...আমরা বলতে গেলে ১৯৮০-এর দশকে ফিরে গেছি।’

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন শাখার (আঙ্কটাড) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের ব্যাপক সেনা অভিযানে গাজায় নজিরবিহীন মানবিক, পরিবেশগত ও সামাজিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উপত্যকাটির অর্থনীতি প্রাক্‌-উন্নয়ন অবস্থা থেকে একেবারে বিধ্বস্ত অবস্থায় উপনীত হয়েছে।

জাতিসংঘ বলছে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার পর যদি গাজা ২০০৭-২০২২ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় চলতে শুরু করে, সে ক্ষেত্রেও ২০২২ সালপূর্ব (যুদ্ধপূর্ব) জিডিপি পুনরুদ্ধার করতে উপত্যকাটির বাসিন্দাদের লাগবে ৩৫০ বছর।

বিশ্লেষকদের মতে, মূলত কোনো সরকার বা গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারে সেখানকার জনগণকে বাধ্য করতেই যুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের এই ‘দাহিয়া ডকট্রিন‘ প্রয়োগ করে থাকে ইসরায়েল। যদিও এই নীতি প্রয়োগ করে তাদের উদ্দেশ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

যেভাবে ‘দাহিয়া ডকট্রিনের’ উৎপত্তি

দাহিয়া শব্দটি এসেছে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠের দাহিয়া এলাকার নাম থেকে। এলাকাটি দাহিয়েহ নামেও পরিচিত। দাহিয়াতে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সদর দপ্তর। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ২০০৬ সালের যুদ্ধে দাহিয়াকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। সেখানকার এক হাজার বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে, যাদের এক-তৃতীয়াংশই ছিল নারী ও শিশু। ওই যুদ্ধে বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানিশোধন কেন্দ্র, সেতু, বন্দর অবকাঠামোসহ লেবাননের বেসামরিক স্থাপনায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল ইসরায়েল।

‘দাহিয়া ডকট্রিনের’ প্রবর্তক ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তৎকালীন নর্দান কমান্ডের প্রধান জেনারেল গাদি আইজেনকট। অবসরে যাওয়ার আগে তিনি ২০১৯ সালে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ হয়েছিলেন।

ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ যুদ্ধ কেমন হবে, তার ধারণা দিতে গিয়ে ২০০৮ সালে আইজেনকট বলেছিলেন, ‘যেসব গ্রাম থেকে ইসরায়েলে হামলা হবে, বৈরুতের দাহিয়া এলাকায় ২০০৬ সালে যা ঘটেছিল, সেগুলোর প্রতিটির ক্ষেত্রেও একই পরিণতি হবে। আমরা এসব গ্রামে অসম শক্তি প্রয়োগ করব এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাব। আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এসব গ্রাম বেসামরিক নয়, এগুলো সামরিক ঘাঁটি। এটি কোনো সুপারিশ নয়; এটি পরিকল্পনা। আর দাপ্তরিকভাবে ইতিমধ্যে এ পরিকল্পনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’

আইজেনকটের এ কথার সত্যতা মেলে পরবর্তী সময়ে গাজার হামাস ও ইসরায়েলি বাহিনী মধ্যে চলা সংঘাতেও। ২০০৮ সালের শেষ এবং ২০০৯ সালের শুরুতে গাজায় এ নীতি প্রয়োগ করেছিল ইসরায়েল। ওই সময় ইসরায়েলের হামলায় ১ হাজার ৪০০ জনের মতো ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই যুদ্ধে বেসামরিক লোকজনকে শাস্তি দেওয়া, হেনস্তা করা এবং ভয় দেখানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অসম শক্তি প্রয়োগ করেছিল ইসরায়েল। ওই হামলার মধ্য দিয়ে গাজার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল এবং স্থায়ীভাবে সেখানকার বাসিন্দাদের পরনির্ভর করে দেওয়া হয়েছিল।

ইসরায়েল ২০১৪ সালের হামলার সময়ও গাজায় একই নীতি প্রয়োগ করেছিল। ওই যুদ্ধে প্রায় পাঁচ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছিল ইসরায়েলি বাহিনী, যাঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। ওই যুদ্ধের সময় গাজার প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্রে ধ্বংস করে দিয়েছিল ইসরায়েল। গাজার অর্ধেক বাসিন্দা পানিসংকটে পড়েছিল। হাজার হাজার মানুষ বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাস্তায় উপচে পড়েছিল পয়োনালার বর্জ্য।

গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা শুরুর পরও একই নীতি নিয়েছে ইসরায়েল। এবার অনেকটা ‘পোড়ামাটি নীতি’ নিয়েছে দেশটি। প্রায় পুরো গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৪৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহত ফিলিস্তিনিদের প্রায় ৭০ ভাগই নারী ও শিশু। ইসরায়েলে হামলায় আহত হয়েছেন এক লাখের বেশি ফিলিস্তিনি, যাঁদের অনেকেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়েছেন।

সর্বশেষ ১ অক্টোবর থেকে লেবাননে সর্বাত্মক হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। এবারও হিজবুল্লাহ অধ্যুষিত সেই দাহিয়া এলাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে ইসরায়েল। একই পরিণতির মুখে পড়েছে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলও। ইতিমধ্যে হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহসহ সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের বেশ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে। হিজবুল্লাহর প্রশাসনিক দপ্তরের পাশাপাশি ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। অনেকটা ‘দাহিয়া ডকট্রিন’ আরও একবার দাহিয়া তথা লেবাননে প্রয়োগ করছে ইসরায়েল।

কেন ‘দাহিয়া ডকট্রিন’ প্রয়োগ করে ইসরায়েল

বেশ কয়েকটি কারণে যুদ্ধে ‘দাহিয়া ডকট্রিন’ প্রয়োগ করে আসছে ইসরায়েল। এর মধ্যে অন্যতম হলো কোনো সরকার বা গোষ্ঠীকে পরাস্ত করতে পুরো জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়া। পুরো জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য, যাতে তারা ওই সরকার বা গোষ্ঠীকে সমর্থন না দেয় এবং তাদের সদস্যদের আশ্রয় দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বেসামরিক স্থাপনায় হামলার আরেকটি উদ্দেশ্য হলো বিরোধী পক্ষকে সার্বিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া বা পরনির্ভরশীল করে দেওয়া। যুদ্ধ শেষে এসব প্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে সামরিক কর্মকাণ্ডে প্রয়োজনীয় জোর দিতে পারে না প্রতিপক্ষ। বিশেষ করে এসব খাতে নতুন করে বিনিয়োগ করতে গিয়ে সামরিক খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা শত্রুপক্ষের সেভাবে আর সম্ভব হয় ওঠে না। ফলে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত শত্রুপক্ষ হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে না।

সর্বোপরি, একচেটিয়া আধিপত্য ধরে রাখতে ‘দাহিয়া ডকট্রিন’ প্রয়োগ করছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুটি বিরোধী পক্ষকে সংঘাত থেকে নিবৃত্ত রাখতে শক্তির ভারসাম্য দুভাবে কাজ করে। যদি দুটি পক্ষ সমশক্তির হয় অথবা একেবারে অসম শক্তির হয়। সমশক্তির হলে পারস্পরিক ক্ষতি বিবেচনায় সংঘাত এড়িয়ে চলে দুই পক্ষ। আবার অসম শক্তির কারণে একেবারে দুর্বল প্রতিপক্ষ নিজের ক্ষতির কথা ভেবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চায় না। ইসরায়েল দ্বিতীয় নীতিটি মেনে চলে। দেশটি প্রতিপক্ষকে একেবারে দুর্বল রেখে একচেটিয়া আধিপত্যের মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।

তথ্য সূত্র: আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, ওয়াশিংটন পোস্ট

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ঘরবাড়ি। কোনো রকম তাঁবু টানিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এক ফিলিস্তিনি নারী
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ঘরবাড়ি। কোনো রকম তাঁবু টানিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। ছবি: রয়টার্স

গাজায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিও ভাইরাল

গাজায় ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অবরুদ্ধ উপত্যকাটির খান ইউনিসের একটি জনবহুল এলাকায় এ হামলা হয়।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, দিবালোকে একটি জনবহুল এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার সাথে সাথে স্থানীয়রা প্রাণ ভয়ে ছুটাছুটি শুরু করেন।

আল জাজিরাসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ভিডিওটি প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা গেছে, হঠাৎ একটি ক্ষেপণাস্ত্র গাজায় আঘাত হানে। বিস্ফোরণে ভয়ংকর আগুনের ফুলকি তৈরি হয়। চারপাশে ধ্বংসস্তূপ ছিটকে আসতে থাকে। লোকজন প্রাণ বাঁচাতে ছুটাছুটি শুরু করেন। এরই মধ্যে বিস্ফোরণের প্রতিক্রিয়ায় অনেকে মাটিতে পড়ে যান।

ফিলিস্তিনের গাজায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। তাদের হামলায় এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ। নিহতদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু। আহতের সংখ্যাও এক লাখ ছাড়িয়েছে। বোমা হামলায় প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা উপত্যকা। প্রাণ বাঁচাতে গাজার সাধারণ মানুষকে চরকির মতো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে গাজায় যা চলছে, তা স্পষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে ইসরায়েলে গাজায় জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির নির্দেশ দিয়ে বারবার মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। এদিকে গাজায় এক মাসে ইসরায়েলি হামলায় ২০ সহায়তা কর্মী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ প্রেক্ষাপটে সহায়তা সংস্থাগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আমাদের কাছে যে তথ্যপ্রমাণ আছে, তার ভিত্তিতে সহজেই বলা যায়, গাজায় ইসরায়েল মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। কারণ তাদের বোমা হামলায় গাজায় নিরীহ নিরপরাধ মানুষ মারা যাচ্ছে। গাজা শিশু ও নারীদের একটা গণকবরে পরিণত হয়েছে। বারবার এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে তারা ছিনিমিনি খেলছে। ফিলিস্তিনিরা চরকির মতো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরছে। তাদের বেশিরভাগ খেতে পারছে না। এমনকি পানীয় জলের অভাবে তাদের দিন কাটতে হচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী অপরাধ। আর ইসরায়েল সেটাই করছে।

এদিকে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় এক মাসে ২০ সহায়তা কর্মী নিহত হয়েছেন। গত ১০ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত নিহতের এসব ঘটনা ঘটেছে। উপত্যকায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত দাতব্য সংস্থাগুলোর বরাতে আলজাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে। নতুন একটি প্রতিবেদনে দাতব্য সংস্থাগুলো বলছে, ইসরায়েলি হামলায় সহায়তা কর্মীরা নিজেদের বাড়িতে ও উদ্বাস্তুদের শরণার্থীশিবিরে কর্মরত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকে তাদের পরিবারের সদস্য ও স্বজন হারিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত ২০ জনের মধ্যে চারজন অক্সফামের একটি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ও কর্মী ছিলেন। ১৯ অক্টোবর তারা গাজার খান ইউনিস এলাকার পূর্বাঞ্চলের খুজায় পানি অবকাঠামো মেরামতের কাজ করতে যাওয়ার সময় ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন। গত বছরের অক্টোবরে গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। এর পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৩০০ জনের বেশি সহায়তা কর্মী নিহত হয়েছেন। এ সংখ্যাটি বিশ্বে কোনো একক সংঘাতে সর্বোচ্চ রেকর্ড। 
গাজায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত
গাজায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত

যে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার দিন আকাশও নীরব থাকে

১৪ নভেম্বর, দক্ষিণ কোরিয়ার আকাশও নীরব থাকে। রাস্তা সুনসান, শহর কোলাহলহীন। কারণ, এই দিনটি সুনেং দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ‘স্কলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্ট (সিএসএটি)’। যা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয় বরং পুরো জাতির জন্য এক বিশাল মাইলফলক।

সুনেংয়ের দিন, একদিনের জন্য পুরো দক্ষিণ কোরিয়া থেমে যায়। যাতে পরীক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মনোযোগ দিতে পারেন।

দক্ষিণ কোরীয় সমাজে সুনেং শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা নয়। এটি শিক্ষার্থীদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা তাদের ১৪ নভেম্বর, দক্ষিণ কোরিয়ার আকাশও নীরব থাকে। রাস্তা সুনসান, শহর কোলাহলহীন। কারণ, এই দিনটি সুনেং দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ‘স্কলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্ট (সিএসএটি)’। যা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয় বরং পুরো জাতির জন্য এক বিশাল মাইলফলক।

সুনেং এর দিন, একদিনের জন্য পুরো দক্ষিণ কোরিয়া থেমে যায়। যাতে পরীক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মনোযোগ দিতে পারেন।

দক্ষিণ কোরীয় সমাজে সুনেং শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা নয়। এটি শিক্ষার্থীদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের এক বিশেষ দিশা দেখায়। এ পরীক্ষা শুধু শিক্ষাজীবন নয়, চাকরি, আয়ের পথ এবং সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই, সুনেংয়ের দিন দেশটির সবকিছু থেমে যায় যেন কোনো রকম বিঘ্ন ঘটতে না পারে।

পরীক্ষা চলাসময়ে কেমন থাকে পরিবেশ

এদিন, পরীক্ষার্থীদের মনোযোগে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, তার জন্য একাধিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দুপুর ১টা ৫ মিনিট থেকে ১টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়, যাতে ইংরেজি শ্রবণ পরীক্ষার ২০ মিনিটের সময় সুনির্দিষ্ট নীরবতা বজায় থাকে। তাছাড়া, দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয় এবং যানবাহনের হর্ন বাজানো কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়।

বিশেষ সহায়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

এদিন শহরের রূপ বদলে যায়। দোকানপাট দেরিতে খোলে, স্টক মার্কেটও দেরিতে চালু হয়। যানজট এড়াতে অতিরিক্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং ১০ হাজারের বেশি পুলিশ কর্মকর্তা সড়কপথে মোতায়েন থাকে। দেরি করা পরীক্ষার্থীদের সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকে পুলিশ, দমকল বাহিনী এবং অ্যাম্বুলেন্স।

৮ ঘণ্টার ম্যারাথন পরীক্ষা

২০২৪ সালে সুনেং পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৫ লাখ ২২ হাজার ৬৭০ জন শিক্ষার্থী। যা গত বছরের তুলনায় ১৮ হাজার ৮২ জন বেশি। সারা দেশে ১ হাজার ২৮২টি কেন্দ্রে ৮ ঘণ্টার এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষার্থীরা ৫টি বাধ্যতামূলক বিষয়ে পরীক্ষা দেয় : কোরিয়ান ভাষা, অঙ্ক, ইংরেজি, কোরিয়ান ইতিহাস এবং সোশ্যাল স্টাডিজ। এ ছাড়াও, ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে রয়েছে ফরাসি, চীনা, জাপানি, রাশিয়ান ও আরবি ভাষা।

সুনেং : দক্ষিণ কোরীয় সংস্কৃতির প্রতীক

সুনেং শুধু একটি পরীক্ষা নয়; এটি দক্ষিণ কোরীয় শিক্ষার প্রতীক। দেশটির অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং ভবিষ্যতের জন্য ত্যাগের চিত্র। পরীক্ষায় সফল হলে শিক্ষার্থীরা এক নতুন জীবনের সূচনা করে। একজন সফল শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা জানি, আমাদের পরিশ্রমের মূল্য। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পারি।’

এই পরীক্ষা দক্ষিণ কোরীয়দের এক জাতি হিসেবে উত্থান এবং তাদের ভবিষ্যতের প্রতি এক অদম্য বিশ্বাসের প্রতীক। সুনেং, যা শুধু একটি পরীক্ষা নয়, এটি একটি জাতির শক্তি ও স্বপ্নের ঐতিহ্য।

পরীক্ষার্থীদের মনোযোগে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, তার জন্য কিছু সময় বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ছবি : সংগৃহীত।
পরীক্ষার্থীদের মনোযোগে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, তার জন্য কিছু সময় বিমান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ছবি : সংগৃহীত।

সক্ষমতার ঘাটতি থাকতে পারে, আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই -ড. আসিফ নজরুল

আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, আমাদের সক্ষমতার ঘাটতি থাকলেও আন্তরিকতার  ঘাটতি নেই। গুমের শিকার পরিবারের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। আমরা সবার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তবে গুম-অপহরণের সঙ্গে জড়িতদের বিচার করা কঠিন বলে মনে করেন আইন উপদেষ্টা। গতকাল  গুলশানের এক হোটেলে এশিয়ান ফেডারেশন অ্যাগেইনস্ট ইন ভলান্টিয়ার ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স-এর প্রোগ্রামে এ কথা বলেন তিনি।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, গত ১৫ বছরের শাসনকে কয়েক সপ্তাহে মোকাবিলা করা খুব কঠিন। গুম-বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের এক প্রশ্নের জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, এই সরকার সব সরকারের মতো না। আমরা কোনো পলিটিক্যাল ফিগার না। আল্লাহর রহমতে আমরা প্রত্যেকে আমাদের প্রফেশনে প্রতিষ্ঠিত। তাই আগের সরকারের পুনরাবৃত্তির প্রশ্নই আসে না। কোনো সরকার কিন্তু গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য কমিশন গঠন করেনি। আমাদের সরকার পরিচালনায় যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে তাহলে আপনারা নিশ্চয়ই সমালোচনা করবেন।

স্বজনদের উদ্দেশ্যে আসিফ নজরুল বলেন, আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকবো। আমাদের আন্তরিকতা নিয়ে কোনো সন্দেহ রাখবেন না, শুধু এটুকু দাবি করবো। আমাদের সক্ষমতার ঘাটতি থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের আন্তরিকতা আর সাহসের কোনো অভাব নাই। আমরা এটার শেষ দেখে ছাড়বো। খুন করার চেয়েও কাউকে গুম করাকে আরও জঘন্য অপরাধ আখ্যায়িত করে আসিফ নজরুল বলেন, একটা মানুষ যখন মারা যায়, আপনি জানেন তার ডেডবডি আছে। আর এটা কী দুঃসহ ব্যথা! আপনি জানেন না বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে। তিনি বলেন, আপনারা ছবি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন, আমিও তো মানুষ। আমারও তো সন্তান আছে। আমার বাচ্চাটা যদি গুম থাকে, আমার কী হবে? আমি যদি গুম হই, আমার স্ত্রীর কী হবে? আমি যদি গুম হই, আমার মায়ের কী অবস্থা হবে? এগুলো চিন্তা করলে মনে হয় যে, যারা এসব গুমের নির্দেশ দেয়, যারা গুম করে, আমার মনে হয় যে, তাদের পরিবারগুলোতে আমরা এসব পরিবারের সামনে নিয়ে আসি।

অনুষ্ঠানে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান বলেন, ন্যায়বিচার সবার অগ্রাধিকার। শুধু গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ব্যক্তির পরিবারের জন্য নয়, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার প্রত্যেকের জন্য। গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারের এক সদস্য কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলেন, এই সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, অন্তত একটা সন্ধান দিন আমাদের। আমাদের সাহায্য করুন। দশ বছর ধরে সন্তানকে খোঁজার বর্ণনা দিয়ে রওশন আরা বলেন, আমার ছেলেকে রাতের অন্ধকারে গুম করা হয়েছে। কতো জায়গায় খুঁজছি, কোথাও পাইনি। ফিরে পাওয়ার আশায় দ্বারে দ্বারে এখনো খুঁজছি। পাঁচ বছর আগে স্বামীকে হারিয়ে ফেলা নাসরিন জাহান জানান, অন্ততপক্ষে আমাদের একটা সন্ধান দিন যে আছে বা নাই। নামাজের বিছানায় বসে যাতে অন্তত কিছু বলতে পারি। আমরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছি।

mzamin

আসিফ নজরুলকে হেনস্তা জাতির কলঙ্ক, রাখাল চন্দ্র নাহা’র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

চারদিকে কেমন যেন এক গুমোট পরিবেশ। স্বস্তি সুন্দরের কোনো আভাস নেই। আমাদের আইন উপদেষ্টা জনাব আসিফ নজরুল একজন শিক্ষক মানুষ। দোষ-ত্রুটি সবারই থাকে। কমবেশি তারও হয়তো আছে। কিন্তু একজন পোড় খাওয়া মানুষ হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেবে মোটেই ফেলনা নন। হিংসা করবার মতো তার একটা সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। বেশ কিছু বছর তাকে নানাভাবে দেখেছি। অনেক সভা-সমাবেশে তার কথাবার্তার মধ্যে মারাত্মক একটা সাবলীলতা এবং চিন্তার খোরাক পেয়েছি। সেই মানুষ বৈষম্যবিরোধী সফল আন্দোলনে বিশ্বখ্যাত অধ্যাপক ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। ভালোই করছেন। অন্তত এটা বলা যায়, প্রাক্তন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের চাইতে হাজার গুণ ভালো করছেন। সেই মানুষটি সেদিন জেনেভা গিয়েছিলেন। সেখানে গুটিকয়েক বাঙালি অথবা হাসিনা সমর্থক তাকে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছে। এই সময় তাকে অপমান অপদস্থ করা দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করার শামিল। আমি খুবই অবাক হয়েছি, জেনেভায় আমাদের দূতাবাস কী করছে, কী করেছে? এ ব্যাপারে তাদের যথাযথ ভূমিকা আদৌ পালন করেছে কিনা? নাকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নাজেহাল করতে সর্বত্রই কেউ না কেউ ওত পেতে বসে আছে? কথাটা বলতে চাইনি তবু বাস্তবতা বলতে বাধ্য করছে। আজ যখন যেখানে যাকেই নিয়োগ দেয়া হয় বা হচ্ছে তার অধিকাংশই বিগত সরকারের তল্পিবাহক, পা-চাটা দালাল। এই একই রকম অবস্থা আমরা দেখেছি স্বাধীনতার পরপর ১৫ই ডিসেম্বর ’৭১ পর্যন্ত যারা পাকিস্তানের যে পদে ছিল ১৬ই ডিসেম্বর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার পর প্রায় সেই পদেই তারা ছিল। মাত্র ২-৪ জনকে এখানে ওখানে অদল বদল করা হয়েছিল।

কক্সবাজারের ডিসি টাঙ্গাইলে, নোয়াখালীর ডিসি হয়তো ফরিদপুর, ফরিদপুরের জনকে যশোর কিংবা দিনাজপুর। এখনো তাই হচ্ছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা আর স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ সব একাকার করে ফেলা হয়েছে। শেখ হাসিনা আর বঙ্গবন্ধু যেমন এক না, শেখ হাসিনা আর প্রকৃত আওয়ামী লীগও এক না। আমরা অনেক ডিক্টেটর দেখেছি, তার মধ্যে বিশেষ করে সামরিক ডিক্টেটর, অনেক রাজতন্ত্রও দেখেছি। কিন্তু হাসিনাতন্ত্র যারা দেখেনি তারা এক ব্যক্তি কীভাবে রাষ্ট্র চালায় বা চালাতে পারে সেটা ভাবতেও পারবে না। গত ১০ তারিখ নূর হোসেন দিবস উপলক্ষে শেখ হাসিনার তল্পিবাহকরা যা করেছে বা করলো তা অভাবনীয়। রাখালের ‘বাঘ এসেছে বাঘ এসেছে’ করতে করতে যেদিন বাঘে গিলে খাবে সেদিন কেউ ফিরাতে আসবে না। অসুবিধা হলো ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই শেখ হাসিনার সম্পর্কে কিছুই জানেন না। একজন সাধারণ মানুষের যতটা জ্ঞান গরিমা শিক্ষা দীক্ষা মেধা থাকে নেত্রী শেখ হাসিনা, বোন হাসিনার মধ্যে তার বিন্দুবিসর্গও খুঁজে পাওয়া যাবে না।  আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে এক লেখাতে লিখেছিলাম, ড. ওয়াজেদ মিয়া যদি যথাযথ সেবাযত্ন পেতেন তাহলে তিনি পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন হতে পারতেন কিনা বলতে পারবো না, তবে আমাদের দেশে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু অবশ্যই হতেন। ১০ তারিখ নূর হোসেন দিবসে কি প্রয়োজন ছিল এই নকশা করার? মানুষকে একটু শান্তিতে স্বস্তিতে থাকতে দিলে কি এমন ক্ষতি? কিন্তু না, তা তিনি থাকতে দিবেন না। তিনি সকালে আসেন, বিকালে আসেন- এটা সত্য নয়, অত সহজও নয়। শেখ হাসিনাকে নিয়ে অনেকেই হয়তো ভবিষ্যদ্বাণী করবেন। আমার তেমনটার কোনো ইচ্ছা নেই। কিন্তু তার যে বয়স, তার যে বিচার বিবেচনা, মেধা তাতে কোনোমতেই এক যুগের আগে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব না। হ্যাঁ, কিছুটা যন্ত্রণা দিতে পারবেন, গোলমাল করতে পারবেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ছবি পদদলিত করে সিনক্রিয়েট করতে পারবেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। হ্যাঁ এটা ঠিক, মানুষ বড় কষ্টে আছে। সেই কষ্ট দূর করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যতটা সাফল্য আশা করা গিয়েছিল কেন যেন ততটা হচ্ছে না। বাজার নিয়ন্ত্রণহীন, সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া, মানুষ কোনোমতেই সংসার চালাতে পারছে না।

অন্যদিকে অতি সম্প্রতি নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ অনেকের কাছেই পছন্দ হয়নি। আওয়ামী লীগ বাদ দিয়ে মানুষ পাবে কই? ক্ষমতার আওয়ামী লীগ, অর্থবিত্তের আওয়ামী লীগ- সে তো দেশব্যাপী। যার কারণে প্রকৃত দেশপ্রেমিক দীর্ঘদিন কোণঠাসা হয়েছিল। এখনো তারা কোণঠাসা। বিত্তশালী আওয়ামী লীগ সব জায়গায়। বিশেষ করে শেখ হাসিনার পাল্লায় পড়ে রাজনীতির এমন অধোগতি প্রকৃত রাজনীতিকরা কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি। তাই যখন যাকে যেখানেই বসানো হচ্ছে হাসিনার নেশপেশ অবশ্যই থাকছে। যা নিয়ে অসন্তোষও দেখা দিয়েছে। দেশের মানুষ সব সময়ই চায় সুস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হোক, মানুষ শান্তিতে থাকুক, বিচার ব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসুক। এসব ক্ষেত্রে আর সামান্য একটু গতি এলে সাধারণ মানুষ আশান্বিত হতো। আর একবার মানুষ আশান্বিত হলে কেমন কি হয়, কতোটা হয় স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাক্রমশালী পাকিস্তানি হানাদার পশু শক্তিকে পরাজিত করে আমরা দেখিয়েছি, ’৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাংলার ছাত্র-জনতা স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটিয়ে দেখিয়েছে আর এই সেদিন যে অধ্যাপক ড. ইউনূসকে সকাল বিকাল কোর্ট- কাচারির বারান্দায় দৌড়াদৌড়ি করতে হতো তাকে মসনদে বসিয়েছেন দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। এসবই আল্লাহর ইচ্ছা, সাধারণ ছাত্র-জনতার কর্মকাণ্ড। দুর্ভাগ্য আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না। এরপরও যারা অমনটা করবেন তাদের পরিণতি দু’দিন আগে আর দু’দিন পরে একই হবে। উপদেষ্টা নির্বাচনে বেশ অসন্তোষ আছে। যার বহিঃপ্রকাশ কয়েকদিন থেকে শুরু হয়েছে। তবে একটা জিনিস বলবো নেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার চাইতে কাউকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর দক্ষতা-যোগ্যতা অনেক বেশি। তা না হলে সদ্য নির্বাচিত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছবি পদদলিত করে তার কাছে পাঠানোর চিন্তা অনেকের মধ্যে হওয়ার কথা নয়। তা তিনি চিন্তা করেছেন এবং আমার বিশ্বাস তিনি অবশ্যই ওসব করে ছাড়বেন। কারণ টাকা দিয়ে অনেক কিছু করা যায়। অনেকেই করেছেন।

শেখ হাসিনার কাছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আছে। শুধু শেখ হাসিনা কেন, যারাই গত ১৫-১৬ বছর ক্ষমতার আশপাশে ছিলেন সবার কাছে অচিন্তনীয় অর্থ সম্পদ রয়েছে। সেইসব সম্পদ ব্যয় করে কতোটা কাজের কাজ করতে পারবেন হলফ করে বলতে পারি না। কিন্তু অকাজ-কুকাজ অনেকটাই করতে পারবেন। এটা বিগত দিনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া। তাই সফল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা আরামে গা এলিয়ে দিলে চলবে না। তাদের সফলতা নির্ভর করে তাদের সচেতনতার উপর। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ৫-১০ জনে মিলে জেনেভার মতো জায়গায় অপমান অপদস্থ হেরাজ করা গেলে পৃথিবীর বহু দেশ পড়ে আছে আমাদের দেড় কোটির উপর বাঙালি প্রবাসে বাস করে। তারা বিএনপি, জামায়াত যেমন করে তেমনি আওয়ামী লীগও করে। তাই অশান্তি সৃষ্টিতে খুব একটা অসুবিধা হবে না। এক সময় দেখতাম দেশের ভেতরে যত দলাদলিই থাকুক দেশের বাইরে আমরা এক দল, এক মত। কিন্তু এখন দেশের বাইরেও মারামারি কাটাকাটি হানাহানি করি। এটা খুব ভালো লক্ষণ নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এ ব্যাপারে যথাযথ সক্রিয় হতে আন্তরিক অনুরোধ জানাচ্ছি।

জন্মের পর মৃত্যু অবধারিত সত্য। মৃত্যুর স্বাদ সবাইকে গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যু থেকে কারও মুক্তি নেই। সময় এলে সবাইকে এপার থেকে ওপার যেতে হবে। তেমন একটি মৃত্যু রাখাল চন্দ্র নাহার। আমার জন্ম টাঙ্গাইল, নাহারের জন্ম কুমিল্লার দেবিদ্বার। সে হিন্দু, আমি মুসলমান। মিল শুধু একটা ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, রাখাল চন্দ্র নাহারও একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের দেশে দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিষয় সম্পত্তি নিয়ে যা হয় এখানেও তাই হয়েছে। সামান্য জমিজমা নিয়ে বিরোধে ২৬/০২/১৯৯৯ সালে দীনেশ চন্দ্র দত্তের সঙ্গে রাখাল চন্দ্র নাহার পরিবার পরিজনের ঝগড়াঝাটি হয়। লাঠিসোটা নিয়ে মারামারিও হয়। রাখাল সেদিন ঘটনাস্থলে ছিল কিনা আদৌ তার প্রমাণ হয়নি। অথচ প্রথমে তার ফাঁসি, পরে যাবজ্জীবন, সবশেষে গত ২রা জুলাই ২০২৩ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিল। গত ৯/১১/২০২৪ এ ধরাধামের সমস্ত জ্বালা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে পরপারে চলে গেছে। আমি এসবের কিছুই জানতাম না। হঠাৎই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য জায়গার ১০-১২ জন ছেলেমেয়ে ও কয়েকজন বয়সী মানুষ এসে হাজির।

রাখাল চন্দ্র নাহা নামে একজন মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি হচ্ছে। আপনি একটা কিছু করুন। সাধারণত নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে এতটা পথ এসেছি। তাই কোনো কিছুই খুব একটা বিচলিত করে না। একদিন যে চলে যাবো সেটা সব সময় বুকের মধ্যে লালন করি। সেই রাতেই গিয়েছিলাম মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সব শুনে বলেছিলেন, আপনি একজন সরল সোজা মানুষ। আপনি মনে করেন আমি সব করতে পারি। কিন্তু আমি কিছুই করতে পারি না। সরকারের কাছে যান। তখনকার সরকার প্রধান ফখরুদ্দীন আহমেদের কাছে গেলে তিনিও খুব সরল সোজা ভাবে বলেছিলেন, আমার কিছু করার নেই। যা কিছু করার ক্যান্টনমেন্ট থেকে করা হয়। আপনি সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদকে বলুন। সেনাপ্রধানের কার্যালয়েও গিয়েছিলাম। কারণ কার্যালয়টা আমার বহুদিনের চেনা। কারণ ১৬ই ডিসেম্বর ’৭১ ভারতীয় তিন সেনাপতির সঙ্গে নিয়াজির গুহায় গিয়েছিলাম। সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ যথেষ্ট সম্মান দেখিয়েছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রাখাল চন্দ্র নাহার জীবন রক্ষার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিলেন। দিনটা ছিল ৭ই এপ্রিল ২০০৮। সারাদিন মারাত্মক উত্তেজনায় কেটেছিল। রাত ১১টার পর বীর মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি হবে রাত ১০টা পর্যন্ত তেমন কিছুই জানি না। হঠাৎ রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ফোন আসে, রাখাল চন্দ্র নাহার ফাঁসির আদেশ স্থগিত করা হয়েছে। ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। বড় একটা স্বস্তি পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নির্বাচিত সরকার এলে রাখাল চন্দ্র নাহা মুক্তি পেয়ে যাবে। এরপর নির্বাচিত সরকার আসে। নেত্রী শেখ হাসিনার সরকার। এক আজব সরকার। আইনমন্ত্রী হন আনিসুল হক। আনিসুল হকের বাবা সিরাজুল হক ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী।

কলকাতার বেকার হোস্টেলে থাকতেন। তুই তুমি সম্পর্ক ছিল তাদের। একটা সোনার মানুষ সিরাজুল হক। তারই ঘরে এমন একটি মানুষ কী করে জন্মেছিল আমি কোনো কূলকিনারা পাই না।
আগে যাবজ্জীবন ছিল ২০ বছর। রেয়াত মুরীদ বাদে জেল খাটতে হতো ১৪ বছর। ’৯০-এর গণআন্দোলনে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়ে এক কলমের খোঁচায় ২০ বছরকে ৩০ বছর করে দিয়েছিলেন। একটা মানুষের জীবন থেকে একটা দিন চলে গেলে কেমন হয়- এ সমস্ত লোকেরা তা ভেবেও দেখে না। আমি অন্ততপক্ষে ১০ বার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একেবারে হতদরিদ্র নিরীহ মানুষ হিসেবে রাখাল চন্দ্র নাহাকে মুক্তি দিতে। কিন্তু মুক্তি হয়নি। অনুরোধ করেছি বিশেষ বিশেষ দিনে মুক্তি দিতে- সে মুক্ত হয়নি। নাহাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২৬/০২/১৯৯৯ সালে। তার যে মামলা এবং যখন সাজা হয় তখন যাবজ্জীবন ছিল ২০ বছর। সেই অনুসারে ২০১৪ সালে তার মুক্তি পাবার কথা। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সে যদি রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো রকম রেয়াত মুরীদ পায় তাহলে জেলের সময় আরও কমার কথা।

অন্যদিকে ৩০ বছরের জেল হলেও ২০ বছরের একদিন বেশিও কারও জেল খাটার বিধান নেই। জেলে নতুন কোনো অপরাধ না করলে ৩০ বছরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগীরা ২০ বছর একদিনের মাথায় জেল থেকে মুক্তি পেয়ে মুক্ত আকাশের নিচে আসে। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাখাল চন্দ্র নাহার ক্ষেত্রে তা হয়নি একমাত্র আনিসুল হকের মতো একজন বিচার বিবেচনাহীন আইনমন্ত্রীর কল্যাণে। সে যদি আরও কিছুদিন বাইরে থাকতো, সন্তান সন্ততি স্ত্রী আত্মীয়স্বজনের মধ্যে থাকতো তাহলে যেদিন চলে গেছে ঐদিনই চলে যেতো কিন্তু একটা শান্তি ও স্বস্তি থাকতো। কিন্তু কাউকে নাকি একবারের বেশি কোনোক্ষেত্রে ক্ষমা করা যায় না বলে রাখাল চন্দ্র নাহাকে মুক্ত হতে দেননি। আজ আনিসুল হকের দুর্গতি তো মাঝে মধ্যেই মনে হয় সেখানে রাখাল চন্দ্র নাহারও হুতাশ অনেকাংশে কাজ করেছে। রাখাল চন্দ্র নাহার জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়কে একটি বীরনিবাস বরাদ্দের অনুরোধ করেছিলাম। মাননীয় মন্ত্রী যথাযথ কর্তৃপক্ষকে সে নিবাসটি ৪/১০/২০২৩ এ প্রদানের আদেশও করেছিলেন। কিন্তু সেটা কেমন কি হয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আল আমিনই জানেন। পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন তার সৃষ্টি রাখাল চন্দ্র নাহাকে ক্ষমা করেন।

শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিরাট জয় পেলো অনুরার বামপন্থি জোট

শ্রীলঙ্কার আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে দেশটির বামপন্থি  জোট। শুক্রবার শ্রীলঙ্কার নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, দেশটির প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকের ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। পার্লামেন্টের মোট আসনের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটই পেয়েছে অনুরার নেতৃত্বাধীন এই জোট। ২২৫ আসনের মধ্যে ১৫৯ আসনে জয় পেয়েছে এনপিপি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়,  সেপ্টেম্বরে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন অনুরা। কিন্তু তখন পার্লামেন্টে তার নির্বাচনী জোট এনপিপি’র আসন ছিল মাত্র তিনটি। পার্লামেন্টে নিজ জোটের আসন সংখ্যা বাড়াতে তিনি আগাম নির্বাচন দেন। যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলো তার জোট। বিবিসি বলছে, দ্বীপ রাষ্ট্রটির দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতি এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে সার্বিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া অনুরার জন্য বেশ জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যা তিনি আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে নিশ্চিত করলেন। ভোটারদের জীবনযাপনের উচ্চ ব্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করাই এখন অনুরার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে এনপিপি জোট বেশ ভালো অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবে তা আগাম অনুমান করেছিলেন বিশ্লেষকরা। তবে তাদের সংশয় ছিল এনপিপি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কিনা। তবে সে সংশয়ও দূর করলেন অনুরা। বৃহস্পতিবার শ্রীলঙ্কায় আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়। পার্লামেন্টের আসন সংখ্যা ২২৫। এর মধ্যে ১৯৬ আসনে সরাসরি ভোট হয়। বাকি ২৯টি জাতীয়ভিত্তিক আসন। এগুলো রাজনৈতিক দলগুলো পাবে ১৯৬ আসনে প্রাপ্ত ভোটের হিস্যা অনুযায়ী। এনপিপি জোটের নেতৃত্বে রয়েছে অনুরা কুমারা দিশানায়েকের জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) পার্টি। বৃহস্পতিবার ভোট দেয়ার পর সাংবাদিকদের ৫৫ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কার এই নেতা বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন এই নির্বাচন শ্রীলঙ্কার জন্য গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে। জনগণ তাদেরকেই ম্যান্ডেট দেবে বলেও আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

বিরোধীদের জোট নেতা সজিথ প্রেমাদাসাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত করেন দিশানায়েকে। উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের সীমাহীন দুর্নীতির ফলে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দ্বীপরাষ্ট্রটি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে দেশটির জনগণ। যার তোপে ২০২২ সালে দেশ থেকে পালিয়ে যান রাজাপাকসে। এর প্রায় দুই বছর পর সেপ্টেম্বরে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। এতে জয়ী হন বামপন্থি রাজনীতিক অনুরা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। ১৪ই নভেম্বর আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করলো তার জোট এনপিপি। চীনপন্থি সমাজতান্ত্রিক নেতা হিসেবে পরিচিত অনুরা কুমারা দিশানায়েকে।

mzamin


বিশৃঙ্খলা ছাড়াই মারকাজে সাদপন্থিরা, মহাসমাবেশের ডাক

বিশৃঙ্খলা ছাড়াই কাকরাইলে মারকাজ মসজিদে অবস্থান নিয়েছেন তাবলীগ জামাতের একাংশ সাদপন্থিরা। দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীরা ‘সমঝোতার ভিত্তিতে’- দুই সপ্তাহের দায়িত্ব বুঝে পান। এ ছাড়াও তাবলীগ জামাতের আরেকপক্ষ বাংলাদেশের মাওলানা জুবায়েরপন্থিদের কাছ থেকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বুঝে নেন। দায়িত্ব নিয়েই গতকাল জুমার নামাজ আদায় করেন তারা। এ সময় বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য উপস্থিত ছিল সেখানে। কয়েক বছর ধরেই দুইপক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। গত ৫ই নভেম্বর সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশে সাদপন্থিদের নিষেধাজ্ঞার দাবিতে সরকারকে আল্টিমেটাম দেয় জুবায়েরপন্থিরা। পক্ষটি গত ১২ই নভেম্বর কাকরাইল মসজিদ ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার মাঠে সাদপন্থিদের প্রবেশের সুযোগ দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা অচলের হুঁশিয়ারি দেয়। এরই প্রেক্ষিতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হয়। মারকাজ মসজিদে প্রবেশের পর সাদপন্থিরা ৭ই ডিসেম্বর সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছেন।

গতকাল ভোর থেকেই সাদপন্থিরা ঢাকায় আসতে শুরু করেন। তারা কাকরাইল মসজিদের দিকে রওনা দেন। সকাল ৮টার দিকে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী তারা মসজিদে প্রবেশ করেন। এই ভিড় পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে গিয়ে ঠেকে। শুরুতে কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়নি। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনের সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে কাকরাইল মারকাজ মসজিদে শুরু হয় জুমার নামাজ এবং শেষ হয় সাড়ে ১২টায়। এরপর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে শুরু হওয়া মোনাজাত শেষে দুপুর ১টার দিকে দাওয়াতি কার্যক্রমে না থাকা সাদ অনুসারীরা কাকরাইল এলাকা ছাড়তে থাকেন।
এর আগে তাদের কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। নির্দেশনাগুলো হচ্ছে, মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগের রাস্তা যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু কোনো অবস্থান করা যাবে না। অবস্থান করা যাবে কাকরাইল মসজিদের পূর্ব এবং উত্তর ও দক্ষিণে। রমনা পার্কে কোনো সাথী প্রবেশ করবে না, কাকরাইল মসজিদের উত্তর অংশ থেকে হোটেল শেরাটন পর্যন্ত কেউ চলাচল করবে না, মসজিদ থেকে মগবাজার পর্যন্ত যাতায়াত করা যাবে, কিন্তু অবস্থান করা যাবে না। শাহবাগ থেকে টিএসসি এবং পরে দোয়েল চত্বর হয়ে হাইকোর্ট মাজার পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কেউ ঘোরাঘুরি করবে না ও কোনো প্রয়োজনেই সেখানে যাবে না, মেট্রোরেল দেখার জন্য মেট্রো স্টেশনে কেউ প্রবেশ করবে না; রাস্তার আশপাশে কেউ মানবিক জরুরত (ইস্তিঞ্জা) পুরা করবে না; রাস্তায় কোনো ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না। বরং কোনো আবর্জনা দেখলে নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করে দেবো; কোনো ভাই অসুস্থ হলে মেডিকেল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করবে; কোনো স্থানে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে শুধু জিম্মাদাররাই তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করবেন। অপরাধীকে প্রয়োজনে প্রশাসনের হাতে সোপর্দ করবে। নিজের হাতে অবশ্যই কেউ আইন তুলে নেবো না।
২০১৭ সালে সাদপন্থি ও জুবায়েরপন্থিরা বিভেদে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে সংঘর্ষেও রূপ নিয়েছিল। এরপর থেকে দুইপক্ষ বিশ্ব ইজতেমা দুইবারে করার সিদ্ধান্ত নেন। মাঝে কোভিড মহামারীর কারণে ইজতেমা দুই বছর বন্ধও রাখা হয়। পরে ২০২২ সাল থেকে ফের দুই পর্বে ইজতেমা শুরু হয়।

আগের নিয়ম অনুযায়ী জুবায়েরপন্থিরা চার সপ্তাহ ও মাওলানা সাদপন্থিরা দুই সপ্তাহ করে পর্যায়ক্রমে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। মসজিদে অবস্থান নিয়েই সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশের ডাক দেন সাদপন্থিরা। সাদপন্থি কাকরাইল মারকাজ মসজিদের ইমাম মুফতি মুহাম্মদ আজিমুদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তারা প্রথম পর্বের ইজতিমার আয়োজন করতে চান।
গত ৫ই নভেম্বর সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে এক সমাবেশে মাওলানা জুবায়ের অনুসারী বলেন, দেশে ইজতেমা একবারই হবে, দু’বার নয়। টঙ্গীতে ইজতেমার মাঠ ও ঢাকার কাকরাইল মসজিদে দিল্লির মাওলানা সাদের অনুসারীদের আর ঢুকতে দেয়া হবে না। অন্যদিকে ৯ই নভেম্বর এক ভিডিও বার্তায় সাদপন্থি ইমাম মুফতি আজিমুদ্দিন আগামী শুক্রবার কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের কাকরাইল মসজিদে না আসার আহ্বান জানান। এরপর মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জুবায়েরপন্থিরা বলেন, মাওলানা সাদের অনুসারীদের মসজিদে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।

তবে বুধবার রাতে ওলামা মাশায়েখ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জরুরি এক বিবৃতিতে বলা হয়, কাকরাইল মসজিদ ও বিশ্ব ইজতেমা একক নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা থেকে সরে এসেছেন তাবলীগের জুবায়েরপন্থিরা। আগের নিয়ম মেনে বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা করবেন তারা। বিবৃতিতে বলা হয়, ১২ই নভেম্বর বর্তমান সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ওলামা মাশায়েখ বাংলাদেশের নেতাদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, ধর্ম উপদেষ্টার পক্ষ থেকে যৌথভাবে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে তাবলীগের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

mzamin

ফিরে এলো গায়েবি মামলা by শুভ্র দেব, সুদীপ অধিকারী, ফাহিমা আক্তার সুমি ও নাজমুল হুদা

ফের দেশে ফিরে এলো গায়েবি মামলা। দীর্ঘ প্রায় ষোল বছর দেশে গায়েবি মামলায় জেল খেটেছেন হাজার হাজার বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মী। এতে একদলীয় শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এরই জের ধরে জুলাইয়ে কোটার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জন্ম হয়। ধীরে ধীরে তা তীব্র হয়। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে সরকার। এর দায়ে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। হাসিনা দেশ থেকে পালালেও তার আমলে সৃষ্টি গায়েবি মামলা পালায়নি। বরং বর্তমান সময়ে এসে গায়েবি মামলা ফিরে আসার পাশাপাশি মামলা বাণিজ্যও বেড়েছে বহুগুণ। জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডে দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা করেন নিহতদের স্বজনরা। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু এসব মামলায় নিরীহ অনেক মানুষকে ব্যক্তিগত শত্রুতা, এলাকাভিত্তিক দ্বন্দ্বে আসামি করার অভিযোগ রয়েছে। কোনোদিন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলন ভিন্নদিকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা ছিল না এমন ব্যক্তিও আসামি হয়েছেন। নিহতদের যে স্বজন বাদী হয়ে মামলা করেছেন তারা নিজেরাই অনেক আসামিকে চিনেন না। কখনো তাদের নামও শুনেননি। এসব হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে হাজার হাজার ব্যক্তিকে। এ ছাড়া কোনো কোনো মামলায় অজ্ঞাত হিসেবে আরও কয়েক শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। বেশির ভাগ মামলার এজাহারের বর্ণনা একই। উপরের সারির আসামিরা একই। নিচের সারিতে যারা আসামি তাদের নামের ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও অভিযোগ আছে এসব আসামিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, হয়রানি ও শত্রুতাবশত আসামি করা হয়েছে। ঢালাওভাবে এসব মামলার কারণে ভুক্তভোগীদের সুবিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া অন্তত ৩০টি মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। আন্দোলন দমাতে ছাত্র-জনতাকে নির্মমভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলাকারী, হত্যার ইন্ধনদাতা ও নির্দেশ প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এসব মামলায় তৎকালীন সরকারি দলের নেতৃস্থানীয় হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হত্যা মামলা প্রমাণের জন্য কিছু আলামত লাগে। কিন্তু গণহত্যা মামলা আদালতে গেলে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাবে। কারণ এসব হত্যা মামলা প্রমাণের যথেষ্ট আলামত তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে নেই। অনেক ভুক্তভোগীর ময়নাতদন্তও করা হয়নি। ঢালাওভাবে শত শত আসামিকে মামলা করার জন্য এসব মামলা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও হচ্ছে ব্যাপক। কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের মতো আবারো গায়েবি মামলা ফিরে এসেছে। ওই সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের দমিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন থানায় ডজন ডজন মামলা দেয়া হতো। মূলত নেতাকর্মীদের হয়রানি করার জন্য তৎকালীন পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মামলার বাদী হতেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা এসব মামলার আসামি, স্থান, সময় নিয়ে তখন নানা বিভ্রান্তি ছিল। অনেক মৃত ও প্রবাসে থাকা ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে কখনোই উপস্থিত ছিলেন না এমন ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে অবস্থান করা এবং নিরীহ ব্যক্তিরাও মামলার আসামি হয়েছেন। ব্যক্তিগত শত্রুতাবশত টাকার বিনিময়ে অনেকের নাম এজাহারে ঢুকানোর অভিযোগও ছিল। কাল্পনিক ঘটনায় করা বেশির ভাগ মামলার এজাহারের বর্ণনাও একই ছিল। থানা পুলিশ ও ডিবি এসব মামলার রেফারেন্সে নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করতো। গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেকে বছরের পর বছর পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি ছাড়া ছিলেন। বিএনপি সভা সমাবেশ বা আন্দোলনের ডাক দিলে আগের কয়েকদিন গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে নেতাকর্মীদের আদালতে পাঠানো হতো। আওয়ামী লীগ সরকারের এসব গায়েবি মামলা নিয়ে তখন মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছিল। ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আড়ালে আবডালে থাকা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সামনে চলে আসে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আন্দোলনে নিহতদের স্বজনদের বলপ্রয়োগ করে বাদী করে বিভিন্ন থানা ও আদালতে মামলা হয়। ঢালাওভাবে আসামি করায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এসব মামলা। এসব মামলাকে আওয়ামী লীগ শাসনামলের কাল্পনিক মামলার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

বাদী চিনেন না আসামিদের: যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা কয়েকটি হত্যা মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সবগুলোতে প্রায় একই ধরনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আলাদা আলাদা হত্যা মামলা হলেও সেগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ একই মন্ত্রীদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। মামলার বাদীরা জানিয়েছেন, এসব মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের অধিকাংশকেই তারা চেনেন না। রাজনৈতিক দলের প্রভাবে ঢালাওভাবে মামলাগুলো দেয়া হয়েছে। এমনকি মামলার বাদী হওয়ার জন্য হুমকির শিকার হতেও হয়েছে অনেককে। যাত্রাবাড়ী থানার ৬/৭৯২ নং মামলার এজাহারে দেখা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইমরান হোসেন (১৯) নিহত হন। ওই ঘটনায় নিহতের মা কোহিনূর আক্তার বাদী হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ একাধিক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ২৯৮ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও অনেকের নামে মামলা দেয়া হয়। তবে মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের অনেকেই বাদী কোহিনূর আক্তার চেনেন না বলে মানবজমিনকে জানিয়েছেন। তিনি জানান, রাজনৈতিকভাবে চাপাচাপির কারণে এভাবে এতজনের নামে মামলা করতে হয়েছে তাদের। কোহিনূর বলেন, মামলা করেছি, এখন যা হওয়ার হবে। রাজনৈতিকভাবে অনেক চাপাচাপি ও ঝামেলা ছিল। যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণ না করে তখন যার যার রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল তারা। সে কারণে অনেক চাপাচাপিতে মামলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যাদের নামে মামলা হয়েছে তাদের কিছু মানুষকে চিনি। সবাইকে চিনি না। আমার ছেলেকে যে মেরেছে তা নয়, সারা বাংলাদেশে যাদের মারা হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে একই হুকুমদাতা, একই উস্কানিদাতা হিসেবে মামলা করা হয়েছে। আমার একজন মামা ও একজন আইনজীবী মামলা করতে সহায়তা করেছেন। মামা জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করেন। যাত্রাবাড়ী থানার ৪৫/৮৩১ নং মামলাতেও অজ্ঞাতনামাসহ শতাধিক আসামি করে মামলা দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে ৪৬ জনের নাম উল্লেখ করা হলেও তাদের সবাইকে ঠিকমতো চেনেন না বলে জানান মামলার বাদী মামুনুর রশিদ। তাকে হুমকি দিয়ে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা যাত্রাবাড়ী এসে আসামিদের নাম উল্লেখ করে মামলা দিয়েছে। বাদী মামুনুর রশিদ বলেন, আমরা তখন মানসিকভাবে ভালো ছিলাম না। লাকসাম থেকে লোকজন ঢাকায় এসে তারাই এই নামগুলো দিয়েছে। তারা বলেছে, আমি বাদী হয়ে তাদের মতো করে মামলা না করলে, আমাদের বিরুদ্ধেই পুলিশকে বাদী করে মামলা দিয়ে দিতো। যাত্রাবাড়ী থানার ১০/৭৯৬ নং মামলাতে ৪৪২ জন আসামির নাম দিয়ে হত্যা মামলা করা হয়েছে। এই মামলাতেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ একাধিক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। মামলার বাদী মো. আবু বক্কর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৩ নং ওয়ার্ডের আহ্বায়ক। এক মামলায় এতজনকে আসামি করার কারণ জানতে চইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হয়ে তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় তো আপনি ছিলেন না। মাঠে আমরা আন্দোলন করেছি। গুলির শব্দ শুনেছি। অনেক কিছু চোখে দেখছি। মোবাইলে আমি কোনো স্টেটমেন্ট দিবো না।

এজাহার-আসামি একই: জুলাই- আগস্টের হত্যাকাণ্ডে নিউমার্কেট থানায় চলতি বছরের আগস্ট মাস থেকে নভেম্বর মাসে দুইটি হত্যা মামলা হয়েছে। দুইটি মামলায়ই আসামি করা হয়েছে ১৩৮ জনকে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৩৪০ জনকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আহত-নিহত হওয়ার ঘটনায় গত ২১শে আগস্ট আব্দুর রহমান নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। মামলা নম্বর-৪/৯০। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩১ জনকে আসামি করা হয়। ঘটনার দিন নিউমার্কেট থানার নীলক্ষেত এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট ৪০ থেকে ৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ব্যক্তিবর্গসহ আরও ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। মামলার বাদী আব্দুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, গত ১৯শে জুলাই আমার ভগ্নিপতি নিউমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। মাথার পেছনে গুলি লাগলে সেদিনই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় গত ২১শে আগস্ট নিউমার্কেট থানায় মামলা করি। আমাদের সন্দেহ থেকে আসামিদের নামগুলো দিয়েছি। পুলিশ তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নিবে। গত ২১শে আগস্ট নিউমার্কেট থানায় সামসি আরা জামান নামে এক নারী আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর-৩/৮৯। আন্দোলনে অংশ নিয়ে তার সন্তান তাহির জামান প্রিয় (২৭) গুলিতে নিহত হন। এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৭ জনকে আসামি করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা ৩০ থেকে ৪০ জন পুলিশ এবং বিজিবি’র কর্মকর্তা এবং সদস্যও রয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় মোট ৩৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। বেশির ভাগ মামলাতেই প্রধান আসামি শেখ হাসিনা। এ ছাড়া মামলার আসামি হয়েছে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন-অর-রশীদসহ আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে। মোট ৩৩টি মামলায় ৫ হাজারের বেশি মানুষকে আসামি করা হয়েছে। সর্বশেষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আহত হওয়ার ঘটনায় গত ১২ই নভেম্বর মিস্টার হোসেন নামে একজন বাদী হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ২৭৭ জনকে আসামি করে মামলা করেছে মোহাম্মদপুর থানায়। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হাসান বলেন, আমাদের কাজ মানুষকে সেবা দেয়া, আমরা সেটাই করছি। কার নামে কে মামলা দিচ্ছে বা তার পেছনে কী উদ্দেশ্য বা বাণিজ্য হচ্ছে কিনা আমরা তা বলতে পারবো না। আমাদের এখান থেকে কোনো মামলার কাগজও দেয়া যাবে না। মামলা সম্পর্কে আমাদের তথ্য দেয়া নিষেধ। গণমাধ্যম কর্মীরা যদি মামলার বিষয়ে বাদীর সঙ্গে কথা বলে তাহলে আমাদের তদন্ত কাজে সমস্যা হতে পারে। তাই মামলার বিষয়ে জানতে হলে আদালতে যেতে হবে। গণহত্যার ঘটনায় রামপুরা থানায় যে ১৫টি মামলা হয়েছে তার অন্তত ১৩টিতেই শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। সব মামলায় প্রায় ৮০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ঘুরেফিরে সব মামলায় আসামিরা একই। মামলায় ঘটনাস্থলও প্রায় কাছাকাছি দেখানো হয়েছে।     

বিদেশে থেকেও আসামি: গত ২৪শে জুলাই মেয়েকে দেখতে কানাডা যান এভিআর বাংলাদেশের  চেয়ারম্যান হাসিব আলম তালুকদার। কিন্তু বিদেশে থাকলেও তিনি গণহত্যা মামলার আসামি হয়েছেন। তার ছোট ভাই আশিককেও আসামি করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে গত ৫ই আগস্ট নিহত হন পিকআপ চালক মো. শাহীন। এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন তার স্ত্রী স্বপ্না বেগম। গত ৭ই সেপ্টেম্বর ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানায় এ মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় ৮৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ঐ মামলায় ১৮ নম্বর আসামি করা হয়েছে হাসিব আলমকে ও  ৪৬ নম্বর আসামি করা হয়েছে তার ভাই আশিকুর রহমানকে। হাসিব আলম তালুকদার জানিয়েছেন, তিনি ২৫শে জুলাই কানাডা চলে যান। এখনো তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।  তার ধারণা বরিশালের বাউফলকেন্দ্রিক কেউ হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই মামলার সঙ্গে তার নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে। একইভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গত ৫ই আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১৪ কাফরুলে নিহত হন ভোলার চরফ্যাশনের মো. ফজলু। এ ঘটনায় বিদেশে থেকেও হত্যার অভিযোগে মামলার আসামি হয়েছেন ওমান প্রবাসী লোকমান। মামলায় ৪৯ নং আসামি করা হয়েছে তাকে। অথচ ঘটনার সময় তিনি ওমানে ছিলেন, বর্তমানেও তিনি ওমানেই অবস্থান করছেন। জানা যায়, এই মামলায় এমন অনেকেই আছেন যারা ঘটনার সময় ঢাকায় ছিলেন না। কেউ কেউ নিজ কর্মস্থলে ছিলেন। মামলা সূত্রে জানা যায়, এ হত্যার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন জেলার ৭১ জনসহ অজ্ঞাত আরও ২/৩শ’ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এসব আসামির মধ্যে ৫ জন ভোলার লালমোহন উপজেলার বাসিন্দা। আদাবর থানায় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের নামেও মামলা হয়েছে। অথচ তিনিও আন্দোলনের সময় বিদেশে ছিলেন। শুধু বিদেশে অবস্থানরতরাই নয় রাজনীতি বা ছাত্র-জনতার আন্দোলনবিরোধী ছিলেন না, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরিসহ অন্যান্য পেশার সঙ্গে সাধারণ জীবনযাপন করেও অনেকে আসামি হয়ে এখন থানায় থানায় ঘুরছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণহত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের অনেক বেগ পেতে হবে। ঢালাওভাবে মনগড়া যেভাবে আসামি করা হয়েছে এসব মামলার তদন্ত করে চার্জশিট দেয়াই চ্যালেঞ্জ হবে। আর চার্জশিট দিলেও মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হলে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ ও আলামতের অভাবে আসামিদের শাস্তি পর্যন্ত নাও হতে পারে। এ কারণে অনেক আসামি অপরাধ করা সত্ত্বেও আইনের ফাঁকফোকরের কারণে মুক্তি পেয়ে যেতে পারে। কারণ আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছেন তাদের অনেকেরই ময়নাতদন্ত হয়নি। হত্যা মামলায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করার জন্য ময়নাতদন্ত রিপোর্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কথা বলা হলেও সরাসরি কে গুলি করে হত্যা করেছে তারও প্রমাণ নেই। তাকে শনাক্ত করাও কঠিন হবে। মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদেরকে হুকুমদাতা ও নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে করে মামলার গোড়ায়ই গলদ থেকে যাচ্ছে।  
সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক মানবজমিনকে বলেন, একটা মামলায় যদি ২০০ আসামি থাকে। কে সম্পৃক্ত ছিল আর কে ছিল না। তার কি ভূমিকা ছিল এগুলো তদন্ত করে রিপোর্ট দেয়া প্রায় অসম্ভব হবে। ফলে এসব এজাহারের মামলার বিচার হওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ মনে হচ্ছে। মামলা বাণিজ্য নিয়ে তিনি বলেন, এদিকে সরকার পর্যাপ্ত দৃষ্টি দিচ্ছে না। পুলিশের মধ্যেও অনেক ওলটপালট হয়েছে।

এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বরিশাল পুলিশ লাইন্সে এক অনুষ্ঠানে বৃহস্পতিবার বলেছেন, কারও নামে হয়রানিমূলক মামলা করা হলে বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমরা এ ধরনের একটি সার্কুলার দিয়েছি, যেন এ ধরনের মামলা না নেয়া হয়। তিনি বলেন, এখন অনেক মামলা হচ্ছে, তাতে অনেক নিরপরাধ লোকদের ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি বাহিনীর প্রধানদের বলছি, যারা এ ধরনের মামলা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও অ্যাকশন নেয়ার জন্য। যদি এ ধরনের মামলা নেয়া হয়, তাহলে বাদীর বিরুদ্ধে যেন অ্যাকশন নেয়। এর আগে ঢালাও মামলা নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা ওঠার পর সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশ বাহিনীকে যাচাই বাছাই করে মামলা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। মঙ্গলবার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও বলেছেন, দেশে ঢালাও মামলার প্রবণতা দেখা দিয়েছে যা বিব্রতকর। এসময় তিনি বলেন, দু’টি বিষয়ে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের কাছে সহায়তা চেয়েছেন। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে গায়েবি মামলা হতো। সরকারের পক্ষ থেকেও গায়েবি মামলা দিতো। আর এখন আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা দিচ্ছি না। সাধারণ লোকজন, ভুক্তভোগী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তারা অন্যদের ব্যাপারে ঢালাও মামলা দিচ্ছে। ঢালাও মামলার একটা মারাত্মক প্রকোপ দেশে দেখা দিয়েছে। এটি আমাদের অত্যন্ত বিব্রত করে।

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, বিগত সময়ে আমরা মামলা বাণিজ্য নামক একটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। ব্যক্তি ওই অপরাধের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত না, অথবা ব্যক্তি জীবিত নেই বা দেশে থাকেন না- এদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। এসকল মামলায় উদ্দেশ্য ছিল দু’টি, সেটি হলো- সরকার রাজনৈতিকভাবে বিরোধী মত অথবা তার বিপরীত যে পক্ষ ছিল অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, অথবা এলাকা বা রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে দূরে রাখা। আর পুলিশের একটি অংশ এখান থেকে আর্থিকভাবে সুবিধাভোগী হয়েছে। এসকল মামলা যাদেরকে দিয়েছে তাদের কাছ থেকে নামটাকে বাদ দিবে বা আসামির সংখ্যাটা নিচের দিকে দিবে এরকম নানা ফন্দি ফিকির অথবা উপায়গুলো উপস্থাপন ওই অভিযুক্ত ব্যক্তি বা তার পরিবারের কাছ থেকে নানা ধরনের আর্থিক সুবিধা নিয়েছে। এখন গত ৫ই আগস্টের পরে কিন্তু আমাদের এরকম হয়রানি, গায়েবি মামলা, মামলা বাণিজ্য বা অন্যান্য প্রসঙ্গ এগুলো থাকবে না এই প্রত্যাশা কিন্তু আমাদের সকলেরই ছিল। প্রথম দুই মাস আমরা এর খুব একটা বেশি উপস্থিতি দেখিনি। কিন্তু পুলিশের মধ্যে একটি অংশ হয়তো এরকম মনে করছে যে, আসলে পরিস্থিতি একটি সময় গিয়ে পরিবর্তন হবে এবং তারা আগে যা করতেন সেটি হয়তো তারা করার সুযোগ পাবেন। এই প্রসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে যে, গায়েবি মামলার সংখ্যাটা বেড়ে যাচ্ছে, মানুষের নামে মিথ্যা মামলার সংখ্যাটা বেড়ে যাচ্ছে বা মানুষকে নানাভাবে কোথাও না কোথাও হয়রানি করা হচ্ছে এবং এই মামলা দেয়া না দেয়া এই প্রসঙ্গগুলোকে নিয়ে আর্থিক ভাগ-বাটোয়ারার প্রসঙ্গগুলো তৈরি হচ্ছে। এখন এই সবকিছু মিলে আমাদের যে পরিবর্তন বা সংস্কারের মধ্যদিয়ে আমরা যদি সুবিধাটা করতে চাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আইনপ্রয়োগের প্রসঙ্গ ধরে যত ধরনের অন্যায়-অনিয়ম কিংবা মানুষের অধিকারবহির্ভূত বা বিরোধী যে সমস্ত  ব্যবস্থাগুলোর অভিযোগ আছে সেই ব্যবস্থাগুলোকে কিন্তু বাদ দিতে হবে।

তিনি বলেন, এই গায়েবি মামলা পরিমাণে বা সংখ্যায় অল্প হলেও আবার ফিরে এসেছে বা ফিরে আসার চেষ্টা করছে। যাদের মাধ্যমে ফিরে আসছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় আমরা যদি আবার সেই পুরনো সংস্কৃতিতে ফিরে যাই তখন যে বাস্তবতা দাঁড়াবে সেই প্রসঙ্গগুলো কিন্তু আমাদের এই সংস্কারের কার্যক্রমকে সাধারণ মানুষের মাঝে নানাভাবে প্রশ্ন তৈরি করবে এবং মানুষ কিন্তু আবার হয়রানি হওয়া এবং তার নাগরিক অধিকার থেকে নিরাপত্তার প্রশ্নে, মতামত প্রকাশের প্রশ্নে অর্থাৎ সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করতে গিয়ে সে কিন্তু আবার পুলিশকে দোষারোপ করবে এবং পুলিশের সঙ্গে আবার জনগণের আস্থার যে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা সেটির পরিবর্তে সংশয় ও ভয় তৈরি হবে। কোনোভাবে যাতে নাগরিকের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি না হয় এই প্রসঙ্গে সতর্ক থাকতে হবে। তৌহিদুল হক বলেন, এই মামলাগুলো আমি দেখি যে একটা আজব মামলা। যিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন যিনি বাদী তিনি আসামিদের চিনেন না। যখন একটি অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এই অনিয়মটাকে লাগাম টেনে ধরতে একটা সময় লাগে। যারা সুবিধা নিবে বা নিয়েছে তাদের অনেকেই এখন মাঠে আছে। এই অনিয়মটাকে চর্চা করার চেষ্টা করবেন বা চেষ্টা করছেন। জুলাই বিপ্লবে কোনো পরিবারের একজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এখন তাকে পুঁজি করে রাজনৈতিকভাবে অথবা অন্য কোনো স্বার্থকে পূরণ করার জন্য এইভাবে যদি আইনি কাঠামো বা ঘটনার পরিপন্থি মামলার সংখ্যাগুলো যখন তৈরি হয় এটি যখন গণমাধ্যমে আসে তখন কিন্তু মানুষের সেই আস্থার জায়গাটি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। এই ধরনের মামলার কিন্তু আইনিভাবে মেরিট বা ভিত্তি দুর্বল থাকে। যদি একজনও সত্যিকার অর্থে অভিযুক্ত থাকেন তিনিও কিন্তু একটা সময় গিয়ে ওইভাবে মামলার আসামি হওয়ার কারণে তিনিও পার পেয়ে যান। মামলা যদি করার মূল উদ্দেশ্য থাকে প্রকৃত অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করার তাহলে মামলাগুলো এমন হওয়ার কথা না। সেক্ষেত্রে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি একটি নির্দেশনা ছিল যে, মামলা করার আগে যাচাই-বাছাই করবেন- এটি আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন সেটি কিন্তু আমরা দেখছি না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যাতে কারও দ্বারা ব্যবহৃত না হন অথবা কেউ যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সামনে রেখে তার ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য এই মামলাকে সামনে রেখে যেন হয়রানি করতে না পারেন সেদিকে সতর্ক থাকলে এই অবস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

mzamin

ইমরানের কোনো চুক্তির প্রস্তাবেই রাজি না পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী

কারাবন্দি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা চুক্তিতে যাবে না দেশটির সেনাবাহিনী। সিনিয়র এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান। এতে বলা হয়, ইমরান খান গত জুন থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে নিজের কারামুক্তির বিষয়ে একটি ‘নিঃশর্ত’ চুক্তির বিষয়ে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে তার সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তি বা আলোচনায় বসতে চায় না পাকিস্তানের সামরিক কোনো কর্মকর্তা। এ বিষয়টি জানতে ইমরান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে দ্য গার্ডিয়ানের সাংবাদিক। বর্তমানে পাকিস্তানের আদিয়ালা জেলে বন্দি আছেন ইমরান খান। যদিও সেখানে তার সঙ্গে কোনো সাংবাদিকের দেখা করার অনুমতি নেই। তবে ইমরানের আইনজীবীর মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে গার্ডিয়ান। সামরিক বাহিনীর কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে ইমরানের ব্যক্তিগত পর্যায়ের কোনো যোগাযোগ নেই। তবে ইমরান খান তার প্রচেষ্টার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমটি।

গার্ডিয়ানের প্রশ্নের জবাবে ইমরান বলেন, জনগণের স্বার্থেই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। এখানে তার ব্যক্তিগত কোনো অভিলাষ নেই। পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো চুক্তি করতে চান না ইমরান খান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও যদি তাকে কারাবন্দি থাকতে হয় তবুও তিনি নীতির সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করবেন না।  গার্ডিয়ান বলছে ইমরান খান ২০১৮ সালে সেনাবাহিনীর সমর্থনেই পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছিলেন। এরপর ইমরানের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি সন্তুষ্ট করতে পারেনি সামরিক কর্মকর্তাদের। যার জেরেই তাকে ২০২২ সালে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। ইমরান সরকারের পতন এবং তাকে কারাবন্দি করার পিছনে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জড়িত বলে অভিযোগ করে আসছে তেহরিকে ইনসাফ পার্টির (পিটিআই) নেতারা। এরপর থেকেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ সরব হয়ে উঠেন ইমরান খান। তাদের বিরুদ্ধে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন তিনি।
বর্তমানে শতাধিক মামলার জেরে কারাবন্দি রয়েছেন ইমরান খান। দিন দিন তার বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে সামরিক বাহিনী এবং পাকিস্তানের সরকার। রুজু হচ্ছে নতুন নতুন মামলা। এই পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আলোচনার এই প্রস্তাবকে ইমরানের নতুন কৌশল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে সামরিক বাহিনী তাতে রাজি নয় বলে একাধিক সূত্র গার্ডিয়ানকে নিশ্চিত করেছে। এ বছরের জুনে ‘শর্তসাপেক্ষে’ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রকাশ্য আলাপের প্রস্তাব দেন ইমরান। তবে এক্ষেত্রে ইমরানের দাবি হচ্ছে সেনাবাহিনীকে ‘স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ’ নির্বাচন দিতে হবে। কেননা তিনি এবং তার দল তেহরিকে ইনসাফ পার্টি (পিটিআই) মনে করে যে, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন অগণতান্ত্রিক উপায়ে করা হয়েছিল যেখানে জনগণ তাদের পছন্দ মতো প্রার্থী বাছাইয়ের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে পপুলার ভোটে পিটিআই প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছে বলে দাবি তাদের।
তবে সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। ইমরানের এই প্রস্তাবের আড়ালে রয়েছে নিজের মুক্তির অভিলাষ। সূত্রের দাবি সামরিক বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘নিঃশর্ত’ আলোচনার যে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন ইমরান খান, তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে এর মাধ্যমে তিনি তাদের সঙ্গে নিজের মুক্তির বিষয়ে সমঝোতা করবেন। কিন্তু তাতে সামরিক কোনো কর্মকর্তাই সায় দেয়নি। তারা এ বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে ইমরান খানকে অবশ্যই আদালতে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। সামরিক এক কর্মকর্তা বলেছেন, খান চান সকলেই আইনের শাসন মেনে চলবে কিন্তু তার নিজের বেলায় তিনি সেটা চান না, এমনটি হবে না।

mzamin

কোন পথে অর্থনীতি? by এমএম মাসুদ

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের বেশির ভাগ সময়ই অর্থনীতির সূচকগুলো ছিল নিম্নমুখী। দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে দু’টি বাদে প্রায় সব সূচকই এখনো নেতিবাচক ধারায় রয়েছে।  বর্তমানে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। এর পরেই রয়েছে রপ্তানি আয়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দুর্বিষহ করে তুলেছে নিম্নআয়ের মানুষের জীবন। ডলার সংকট, আমদানি কমেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, আয়বৈষম্য বৃদ্ধি ও দেশ থেকে টাকা পাচারে নড়বড়ে দেশের অর্থনীতি। ব্যাংক  খাতের পরিস্থিতিও নাজুক। কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এসব চিত্র গত সরকার কারসাজির মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য আড়াল করে রেখেছিল। সরকারের শেষ সময়ে অর্থনীতির সূচকগুলোর সার্বিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। এ ছাড়া তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চলমান।

এমন প্রেক্ষাপটে বিগত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র জানতে একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছে। এখন প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসছে। বর্তমানে টাকা ছাপানো বন্ধ, টাকা পাচার এবং ব্যাংক খাতে লুটপাট না হলেও অর্থনীতির স্থবিরতা কাটেনি। শিল্প ও বিনিয়োগেও স্থবিরতা বিরাজমান। তবে ধীরে ধীরে অর্থনীতি স্থিতিশীল হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, খাদের কিনারে থাকা অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
তবে দেশের অন্যতম প্রধান ব্যবসায়ী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রতি মাসে পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) প্রকাশ করে, তাতে দেখা যাচ্ছে, দেশে জুলাই ও আগস্ট মাসের ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বর মাসেও অর্থনীতি সংকোচনের ধারায় ছিল। তবে আগস্ট মাসের তুলনায় সংকোচনের গতি সামান্য কমেছে। আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে পিএমআইয়ের মান ৬.২ পয়েন্ট বেড়েছে। অর্থাৎ আগস্ট মাসের তুলনায় অর্থনীতি উন্নতির দিকে। সেপ্টেম্বর মাসে পিএমআই সূচক ছিল ৪৯.৭, আগস্ট মাসে যা ছিল ৪৩.৫। পিএমআই সূচকের মান ৫০-এর নিচে থাকার অর্থ হলো, অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি: সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক সূচক হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ তথ্যমতে, অক্টোবরে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৮৭ শতাংশ হয়েছে। এর আগে সেপ্টেম্বরে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৯.৯২ শতাংশ ও আগস্টে ছিল ১০.৪৯ শতাংশ। বিবিএস বলছে, অক্টোবরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২.৬৬ শতাংশে, যা জুলাইয়ে ছিল ১০.৪০ শতাংশ। অক্টোবরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৯.৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এক মাস আগে ছিল ৯.৫ শতাংশ।

শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে: গত অর্থবছরের শেষ বা চতুর্থ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩.৯৮ শতাংশ। অথচ তার আগের অর্থবছরের একই প্রান্তিকে এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল দুই অঙ্কের (ডাবল ডিজিট) ঘরে- ১০.১৬ শতাংশ। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমে আসার কারণেই গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯১ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই প্রান্তিকে এর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ৬.৮৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল দেশে।

এফডিআই কমেছে: আয় ফেরত আনার ভোগান্তি, অস্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের নিট ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) বা বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় ৮.৮ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ১৬১ কোটি (১.৬১ বিলিয়ন) নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে দেশে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৮.৭ শতাংশ কম। 

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি: রাজনৈতিক অস্থিরতার ধকল কাটাতে পারছে না রাজস্ব খাত। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী শিথিল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব দেখা যাচ্ছে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাস (জুলাই-অক্টোবর) সময়ে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩০ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাময়িক হিসাবে এ চিত্র উঠে এসেছে।

রেমিট্যান্সে উল্লম্ফন: অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এ মুহূর্তে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবর মাসেও বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ৮৯৩ কোটি ৭১ লাখ (৮.৯৪ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি। জুলাইয়ে এসেছিল ১৯১ কোটি ৩৭ লাখ (১.৯১ বিলিয়ন)। আগস্ট মাসে প্রবাসী আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২২২ কোটি ডলারে (২.২২ বিলিয়ন)। সেপ্টেম্বর মাসে আসে ২৪০ কোটি ৪৮ লাখ (২.৪০ বিলিয়ন) ডলার, যা ছিল ৪ বছরের মধ্যে একক মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এরপর সবশেষ অক্টোবর মাসে আসে ২৪০ কোটি (২.৪০ বিলিয়ন) ডলার।
রপ্তানি আয় বাড়ছে: রপ্তানি আয়ের হিসাবে বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। এর পর চার মাস কোনো রপ্তানির তথ্য প্রকাশ করেনি ব্যুরো। এরপর গত ৯ই অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে চার মাসের তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন। তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ১ হাজার ১৩৭ কোটি (১১.৩৭ বিলিয়ন) ডলার আয় হয়েছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে এই আয়ের অঙ্ক ছিল ১ হাজার ৮২ কোটি (১০.৮২ বিলিয়ন) ডলার। তবে চলমান অস্থিরতার মধ্যে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে আছেন রপ্তানিকারকরা।

রিজার্ভের পতন থামছে না:
রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়লেও বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নকে (এসিইউ) ১৫০ কোটি ডলার পরিশোধের পর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গেছে। আইএমএফ’র বিপিএম৬ মানদণ্ড অনুযায়ী, রিজার্ভের পরিমাণ এখন ১৮.১৯ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকে তথ্যে দেখা যায়, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের কারণে গত ৭ই নভেম্বর সাময়িকভাবে ২০ বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করে দেশের রিজার্ভ। তবে এসিইউকে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর আগে, সেপ্টেম্বরে ১.৩৬ বিলিয়ন ডলার (জুলাই-আগস্টের) এসিইউ বিল পরিশোধে রিজার্ভ কমে দাঁড়ায় ১৯.৪৪ বিলিয়ন ডলার। তবে গত ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার বিক্রি করছে না। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ছে।

আমদানি কমছে: চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পণ্য আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খোলার তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা গেছে, এই তিন মাসে বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য মোট ১ হাজার ৫৫৯ কোটি ১১ লাখ (১৫.৫৯ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খুলেছেন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬.৭৪ শতাংশ কম।

বিদেশি ঋণের চেয়ে পরিশোধ বেশি: বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার মোটা অঙ্কের ঋণ-সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। কিন্তু সেই ঋণের ডলার দেশে আসেনি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, এই তিন মাসে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে মাত্র ৮৪ কোটি ৬১ লাখ ডলারের ঋণ-সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ। বিপরীতে আগে পাওয়া ঋণের সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১১২ কোটি ৬৫ লাখ (১.১৩ বিলিয়ন) ডলার। এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে যত ঋণ-সহায়তা পাওয়া গেছে তার চেয়ে ২৮ কোটি ডলারের বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।

অর্থনীতির ৪ চ্যালেঞ্জ: নতুন প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে বিশ্বব্যাংক দেশের অর্থনীতির জন্য চারটি চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো- মূল্যস্ফীতি, যা কিছুটা কমলেও উচ্চহারে থাকবে; বহিঃস্থ খাতের চাপ, যার মূল কারণ প্রয়োজনের তুলনায় কম রিজার্ভ; আর্থিক খাতের দুর্বলতা, যা দূর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন কাজ করছে এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। গত ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক গতিপথ কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কেবল বাড়ছেই।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব নেয়ার পর বলেছিলেন, বিভিন্ন কারণে দেশের অর্থনীতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। আমাদের লক্ষ্য হবে অর্থনীতিকে যত দ্রুত সম্ভব গতিশীল করা। কারণ অর্থনীতি স্তব্ধ হয়ে গেলে সেটা চালু হওয়া বেশ কঠিন। আমরা অর্থনীতিকে স্তব্ধ হতে দিতে চাই না। তবে সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা দাবি করেছেন, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। দেশীয় শিল্পের বিকাশে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের আস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে।’

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তিনটি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, যার কারণে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় একটি সমঝোতার পরও যা চলমান রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, যা ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তৃতীয়ত, জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা।
mzamin

সংকোচ নিয়ে টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াচ্ছেন তারা by মো. আল-আমিন

নিত্যপণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। শুল্ক কমানোর পরও চাল, তেল, আলু, পিয়াজ ও চিনির দাম আকাশচুম্বী। নাগালের বাইরে সবজির  দামও। এতে করে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে কিছুটা কম টাকায় পণ্য কিনতে নিম্নবিত্তরা তো বটেই, সংকোচ নিয়ে টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াচ্ছেন মধ্যবিত্তরাও। এ ছাড়া লজ্জায় লাইনে দাঁড়াতে না পেরে কেউ কেউ টাকার বিনিময়ে নিম্নবিত্তদের মাধ্যমে পণ্য কিনছেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেল ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

দুপুর ২টা। আগারগাঁও বাংলাদেশ বেতারের বিপরীতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা টিসিবি’র ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেলের সামনে দীর্ঘ লাইন। সেখানে কয়েকজন নারীকে দেখা গেল ভদ্রোচিত পোশাকে। এ সময় কথা হয় মুখ ঢেকে টিসিবি’র লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আসমা খাতুনের সঙ্গে। তার স্বামী বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। নিত্যপণ্যের দাম অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছানোয় বেতন দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন আসমা।

তিনি বলেন, প্রতিটি জিনিসের দাম অনেক বেড়েছে। এমনকি ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজিও কেনা যাচ্ছে না। এক আঁটি লাল শাকের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা। বর্তমানে আমার স্বামীর আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আর পেরে উঠছি না। এজন্য লজ্জা লাগলেও টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।

পারুল খাতুন। বয়স ৬৫ বছর। বৃদ্ধ এই নারীকে টিসিবি’র লাইনে ঢুকতে দিচ্ছিলেন না ডিলারের সহকারী। কারণ হিসেবে সহকারী জানান, উনি কিছুক্ষণ আগেই একবার পণ্য কিনেছেন। আবারো পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। একজনকে দুইবার করে পণ্য দিতে গেলে অনেকে পণ্য না পেয়ে ফিরে যাবেন। কিছু মানুষ দুইবার করে পণ্য নিয়ে বেশি দামে দোকানে বিক্রি করে দেয় বলেও জানান তিনি।

পারুল খাতুন বলেন, একজন মহিলা লজ্জায় লাইনে দাঁড়াতে পারছিলেন না। আমি লাইনে দাঁড়িয়ে তাকে জিনিস কিনে দিয়েছি। এজন্য উনি আমাকে ২০ টাকা দিয়েছেন। এখন নিজের জন্য পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়াতে গেলে তারা দাঁড়াতে দিচ্ছে না। আমি গরিব মানুষ। কম টাকায় পণ্য কিনতে না পারলে তো না খেয়ে থাকা লাগবে।

টিসিবি’র এই ট্রাকসেলে পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন সরকারি এক চাকরিজীবী। তিনি বলেন, ছোট পদে সরকারি চাকরি করি। জিনিসের দাম বাড়ার কারণে বেতনের টাকা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। এজন্য মাঝে মাঝেই টিসিবি থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনি। তিনি বলেন, টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াতে অনেকে সংকোচ বোধ করে। এজন্য বিভিন্ন এলাকার স্থায়ী কিছু দোকানে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করা উচিত। বেসরকারি একটি আইটি ফার্মে কর্মরত আশিকুর রহমান বলেন, লাইনে দাঁড়াতে লজ্জা লাগে। টিসিবি থেকে অনেক কম পরিমাণ পণ্য দেয়া হয়। আরেকটু বেশি পণ্য দেয়া হলে ভালো হতো। বারবার লাইনে দাঁড়ানো লাগতো না।
এদিকে দেশে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। পণ্যের দাম কিছুটা কমাতে বা স্থিতিশীল রাখতে বেশ কয়েকটি পণ্যের উপর শুল্ক ছাড় দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু শুল্ক ছাড়ের সেই সুবিধা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং দাম উল্টো বাড়ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২.৬৬ শতাংশে। এতে চাপে পড়েছে সাধারণ মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে নিম্ন আয়ের ১ কোটি উপকারভোগী কার্ডধারী পরিবারের মাঝে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করছে সরকার। পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তার কাছে ঢাকা মহানগরীতে ৫০ ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২০টি ট্রাকের মাধ্যমে ৫ কেজি চাল, ২ কেজি মসুর ডাল ও ২ লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি করা হচ্ছে।

mzamin

পাসপোর্ট জটিলতা কাটছেনা গুম ফেরত বিএনপি নেতা সাদাতের

পাসপোর্ট নিয়ে জটিলতা কাটছেনা গুম ফেরত বিএনপির নেতা সৈয়দ সাদাত আহমেদের। তিনি বলেন, গুমের শিকার হয়ে আয়নাঘরে ছিলেন ১৩০ দিন। আয়নাঘর থেকে মুক্তি পাওয়ার ৭ বছর হয়ে গেছে। এরপরও কোনো দেশে যেতে হলে তাকে কোর্ট থেকে ট্রাভেল পাস নিতে হয়। কেন বা কারা পাসপোর্টে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তা জানেন না তিনি। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

সাদাত আহমেদ বলেন, এভিয়েশন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে প্রায়ই তাকে দেশের বাইরে যেতে হয়। যখন ইমেগ্রেশনে যান তখন তাকে হয়রানির শিকার হতে হয়। ঘন্টার পর ঘন্টা তাকে বসিয়ে রাখা হয়। নানা ধরণের প্রশ্ন করা হয়। একপর্যায়ে কোর্টের আদেশ কপি জাস্টিফাই করে বিদেশে যাওয়ার পারমিশন দেয়া হয়। আবার যখন কাজ শেষ করে দেশে ফিরতে হয় তখনও একই রকম হয়রানির সম্মুখিন হতে হয় তাকে।
পাসপোর্ট ব্লকের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে বিশেষ করে এসবি ও ডিবিতে গিয়ে কোনো লাভ হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে আয়নাঘরের মাস্টারমাইন্ড সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে অভিযুক্ত করেন সাদাত। বলেন, জিয়াউল আহসানই এই কাজ করেছেন।

mzamin

মামলা নিয়ে কী হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়

মামলা হচ্ছে। আড়াইশ’, সাড়ে তিনশ’ কিংবা ৫-৭’শ জনের নামে। মুখে মুখে এই খবর। পাশাপাশি মামলার ড্রাফট কপি ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্য কোনো অনলাইন মাধ্যমে। এরপরই আসে মামলা থেকে নাম বাদ দিতে টাকার প্রস্তাব। রফাদফা হলেই মুক্তি। প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে বাণিজ্যের সুবিধার্থে প্রাথমিকভাবে বিত্তশালীদের নাম দিয়ে সাজানো হয় মামলার খসড়ার আসামি তালিকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মামলা বাণিজ্যের এই অভিযোগ এখন ব্যাপক আলোচিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বিস্ত্তর লেখালেখি হচ্ছে। পুলিশ বলছে, মামলা বাণিজ্যের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তিও দেয়া হয়েছে।

পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে পাওয়া হিসাবে ৫ই আগস্টের পর জেলার বিভিন্ন থানায় রাজনৈতিক মামলা হয়েছে ২৯টি। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে ১৯২৯ জনকে। প্রত্যেক মামলায় আরও এক-দেড়শো জন অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছে। এ ছাড়া আদালতেও হয়েছে বেশ কয়েকটি মামলা। থানায় হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে সদর মডেল থানায় ১৩টি। অন্য থানার মধ্যে আখাউড়ায় ৫টি, আশুগঞ্জে ৪টি, নবীনগরে ২টি এবং সরাইল, নাসিরনগর, বাঞ্ছারামপুর, কসবা ও বিজয়নগর থানায় ১টি করে মামলা হয়েছে। এসব মামলার বেশির ভাগই হত্যার অভিযোগে করা।

শহরের দক্ষিণ মোড়াইলের ওষুধ ব্যবসায়ী মো. মোবারক হোসেনকে বাদী বানিয়ে তৈরি করা একটি মামলার এজাহারের খসড়া কপি গত মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ায়। এ বিষয়ে গত ৩১শে অক্টোবর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন মোবারক। যাতে তাকে বাদী দেখিয়ে মামলার ভুয়া এজাহার তৈরি করে হোয়াটসঅ্যাপ-ফেসবুকে দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। মোবারক হোসেন জানান, মামলার কপি ভাইরাল হওয়ার পরই তার ছোট ভাই মোকাররম হোসেন রবিন ফোন করে মামলার বিষয়টি সত্য কিনা তার কাছে জানতে চান। আমি কোনো কিছু জানি না বলে তাকে জানাই এবং নিরাপত্তার জন্যে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এটি কেন করা হয়েছে তা বুঝতে পারছি না। শত্রুতামূলক কেউ করে থাকতে পারে।

গত ২৮শে অক্টোবর সাড়ে ৩’শ জনের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় একটি মামলা হয়েছে। এরআগে থেকেই অনলাইনে ভেসে বেড়াচ্ছিল এই মামলার কপি। নাম প্রকাশ না করে এক ব্যবসায়ী জানান-তিনি ওই মামলার ৫ রকম আসামি তালিকা পেয়েছেন। দেখা গেছে একটিতে কারও নাম আছে, অন্যটিতে নেই। আসামিদের নামও আগে পিছে করা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল যুক্তরাজ্য শাখার সদস্য সচিব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জাতীয়তাবাদী ফোরাম ইউকে’র আহ্বায়ক শাহ মোহাম্মদ ইব্রাহিম মিয়া বলেন, এই মামলাটি হওয়ার ৩ দিন আগে অনলাইনে ৩০০ জনের নামে মামলা হচ্ছে মর্মে একটি এজাহারের কপি পাই। আমার ছোট ভাই শাহ মোহাম্মদ ইয়াছিন মামলার কপিটা হোয়াটসঅ্যাপে আমাকে পাঠায়। পরে দেখলাম থানায় রেকর্ডকৃত মামলায় আমার দুই ভাই ইয়াছিন ও কাওসারের নাম যথাক্রমে ২৯ ও ৩০ নম্বরে রয়েছে। অথচ আমার পুরো পরিবার বিএনপি’র রাজনীতিতে যুক্ত। মামলার কপি পাওয়ার পরই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। জেলা শহরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা ইব্রাহিম আরও বলেন, এই শহরে কে আওয়ামী লীগ আর কে বিএনপি-এটা চিহ্নিত। যেসব মামলা হচ্ছে, আমার জানামতে, আসামিদের ২০ ভাগও ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। সম্প্রতি আরও একটি মামলা ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেঞ্জারে ঘুরছে। সেইসঙ্গে বাণিজ্যের কথাবার্তাও হচ্ছে। আলোচনা আছে শহরের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে দুটি মামলা থেকে তার নাম বাদ দেয়ার জন্যে ২৫ লাখ টাকা চাওয়া হয়। আরেক জনের কাছে ১৫ লাখ টাকা। মামলা থেকে বাঁচতে কেউ কেউ ২/৩ লাখ টাকা করে দিয়েছেন এমন তথ্যও চাউর আছে। নাম কাটার জন্যে সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়েও অনেকের কাছে টাকা চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে জেলা শহর থেকে গ্রামের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত এক আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ নিয়ে ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না।

মামলা বাণিজ্য চরমে ওঠার পর গত ২৯শে অক্টোবর সদর মডেল থানা পুলিশ একটি সতর্ক বিজ্ঞপ্তি দেয়। থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- সমপ্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে কতিপয় ব্যক্তি কম্পিউটার টাইপের মাধ্যমে ২০০/৩০০ বা তার অধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখপূর্বক মামলার অভিযোগ/এজাহার লিখে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। মামলায় তাদের নাম ডুকিয়ে দেয়া ও মামলা থেকে নাম বাদ দেয়ার কথা বলে টাকা-পয়সা আদায়সহ জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এরূপ এজাহার বা অভিযোগ দেখে কেউ আতঙ্কিত বা ভয় পেয়ে কোনো প্রকার টাকা পয়সা লেনদেন না করার জন্যে সতর্ক করার পাশাপাশি এমন এজাহার বা অভিযোগ দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়।

মামলা বাণিজ্য নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। জেলা হেফাজত ইসলাম নেতা মুফতি জাকারিয়া খান বলেন-যারা মামলার নামে ফায়দা হাসিল করছে তাদের যেন আইনের আওতায় আনা হয়। জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মোবারক হোসেন বলেন, ৫ই আগস্টের পর আমরা সুন্দর পরিবেশেই বসবাস করছিলাম। এখন দেখা যাচ্ছে মামলাকে পুঁজি করে বাণিজ্য করছে। এটা দুঃখজনক। একজন ব্যক্তি হত্যা হয়েছে বা কোনো ঘটনার শিকার হয়েছে। এখানে ৩৫০ জন, আড়াইশো বা ৫’শ লোক আসামি হওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান মামুন বলেন-মামলা ফাইল হওয়ার আগে অনলাইনে দিয়ে বা লিস্ট দেখিয়ে যে বাণিজ্য করা হচ্ছে তা অনৈতিক। এনিয়ে আমি খুবই বিব্রত। এ ধরনের হয়রানির শিকার কেউ হোক আমি চাই না। যারা এটা করছে এদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইদানিংকালে কিছু মামলার কপি ঘুরে ফিরে বিভিন্ন আইডিতে পোস্ট করা হচ্ছে। এসব কপি ফেসবুকে দিয়ে কেউ কেউ  ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করছে। এতে বিএনপি জড়িত নয়। আমি নিজেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই, কিছু মানুষ মামলা বাণিজ্যের জন্যে কারও কারও নাম লিস্ট করে পোস্ট করছে। এ নিয়ে অনেক মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আমি ওসি এবং পুলিশ সুপারকে বিষয়টি অবগত করে অনুরোধ করেছি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।  

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাবেদুর রহমান বলেন, বিষয়টি জানার পর থেকে আমরা বিভিন্ন জায়গায় রেইড দিয়েছি। আমি ওসিকে বলেছি যেহেতু টাইপ হয়, কম্পিউটার আকারে অনলাইনে যাচ্ছে সেজন্যে কম্পিউটারের দোকানগুলোতে রেইড দিতে বলেছি। এজন্যে আমাদের কম্পিউটার এক্সপার্টদের নিয়ে যেতে বলেছি। তারা গিয়ে কম্পিউটারে সার্চ করে দেখবে। তাদের সেইভ ফাইলে এ ধরনের কোনো কিছু আছে কিনা। বাজার কেন্দ্রিক আমরা কিছু পাইনি। পরবর্তী সন্দেহ কোর্টভিত্তিক। এজাহার লেখার জন্যে অভিজ্ঞতার দরকার পড়ে। যারা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তারা। আমরা ওই জায়গায় হাত দেবো। আমরা এ নিয়ে গোপনে কাজ করছি। যেই হোক এটা অন্যায় জিনিস। এটাকে অবশ্যই নির্বৃত্ত করতে হবে। আমি এটা করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। যে জড়িত থাকবে তাকে ছাড় দেবো না। 

mzamin

‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ আয়োজনে বেশি বাধা দেন সাবেক দুই মন্ত্রী -জিল্লুর রহমান

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান বলেছেন, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ আয়োজনে নানাভাবে বাধা দিয়েছেন। সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও শাহরিয়ার আলম বিভিন্নভাবে বাধা দিতেন। অতিথিদের এই আয়োজনে আসতে নিরুৎসাহিত করা হতো। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি। ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৪’ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। শনিবার তৃতীয়বারের মতো শুরু হচ্ছে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘একটি ভঙ্গুর বিশ্ব’। এবার আয়োজনের উদ্বোধন করবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

জিল্লুর রহমান বলেন, সাবেক সরকারের আমলে তাদের আয়োজন স্থানীয় স্পন্সর ও ব্যবসায়ীদের গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে। তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ফোন করে এমন আচরণ করেছেন যে ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাদের সঙ্গে জিল্লুর রহমানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল তারা আর কথা বলতে চাইতেন না, দেখাও করতে চাইতেন না। পরে দ্বিতীয়বারের আয়োজন কোনো অংশীদার পাননি। দুই মন্ত্রীর বাধার কারণে অনেকে চেকে টাকা দিতে চাননি। ভয়ভীতির কারণে রাস্তায় থাকা অবস্থায় নগদ টাকা দিয়েছেন।

প্রথমবার ২০২২ সালের আয়োজনের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমকে আয়োজনের খবর প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়েছে। দেশের ৫-৭টি পত্রিকা ছাড়া কেউ কোনো খবর ছাপেনি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশীয় অতিথিদের ফোন করে নিষেধ করতো। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ অনুষ্ঠানস্থলের পাশে দলবল নিয়ে এসে বসে থাকতেন। ২০২২ সালের আয়োজনের জন্য ছয় মাস আগে একটি হোটেলে বুকিং দেয়া হয়। কিন্তু সরকার চায় না বলে তারা আয়োজনের ১৫ দিন আগে বাতিল করে দেয়। সে বছর সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক আধা ঘণ্টা বসে থেকে বক্তব্য না দিয়ে চলে যান। কারণ হাছান মাহমুদ তাকে ফোন করে চলে যেতে বলেন। আরেকজন সাবেক মন্ত্রী তাজুল ইসলাম গেট থেকেই ফিরে যান। দ্বিতীয়বারের আয়োজনে শুধু সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান অংশ নেন।

জিল্লুর রহমান বলেন, এ ধরনের আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই সরকারের সমর্থন থাকে। তারা সরকারের কাছ থেকে অন্য কোনো সহায়তা চান না। সরকার যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। এ ধরনের আয়োজনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কোনো বাধা পাননি জানিয়ে তিনি বলেন, এবার পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সহযোগিতা করেছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকারের সঙ্গে কাজ করার এখন পর্যন্ত অভিজ্ঞতা সুখকর না। তাই সরকারের বাইরে থেকেই সিজিএস কাজ করতে চায়। সরকারের সঙ্গে থেকে কোনো আর্থিক সম্পর্কে সিজিএস জড়াবে না।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আগামীকাল থেকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া তিন দিনব্যাপী এই সংলাপে বিশ্বের ৮০টি দেশের লেখক, গবেষক, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, আমলা, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। ভূরাজনীতি, অপতথ্য, মানবাধিকারসহ পাঁচটি বিষয়ে সংলাপ হবে। এতে বিভিন্ন দেশের ২০০ জন বক্তা, ৩০০ জন প্রতিনিধি এবং ৮০০ জন জন অতিথি থাকবেন। এই আয়োজনে শুধু নিবন্ধিত অতিথিরাই অংশ নিতে পারবেন। এবারের আলোচনার বিষয়গুলো হচ্ছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অপতথ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, বাণিজ্য, ভূ-রাজনীতি এবং মানবাধিকার। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ৭৭টি সেশন চলবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, সিজিএসের চেয়ারম্যান মুনিরা খান, চিফ অব স্টাফ দিপাঞ্জলি রায় এবং প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সুবীর দাস।

দুদকে যাদের নাম আলোচনায় by মারুফ কিবরিয়া

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগে নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়ে সংস্থাটি। চেয়ারম্যান কমিশনার ছাড়াই চলছে দুদকের কার্যক্রম। এতে ব্যাহত হচ্ছে সিদ্ধান্ত দেয়ার মতো বড় বড় কার্যক্রম। এ অবস্থায় দুদক পুনর্গঠনে উদ্যোগও নেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। গত সপ্তাহে চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগের লক্ষ্যে একটি সার্চ কমিটিও গঠন হয়েছে। শিগগিরই ওই কমিটি ছয় জনের নাম প্রস্তাব করে প্রেসিডেন্টের কাছে জমা দেবেন। তারপর সেখান থেকে তিন জনকে বাছাই করবেন প্রেসিডেন্ট।

এদিকে দুদক গঠনের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির নাম আলোচনায় আছে। আলোচনা আছে সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হতে পারে। এ ছাড়া সরকারের দায়িত্ব পালন করা একাধিক আমলা ও বিচারকসহ ১৩ ব্যক্তির নাম আলোচনায় উঠে এসেছে। গত ২৯শে অক্টোবর পদত্যাগ করেন দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, কমিশনার মো. জহুরুল হক ও মোছা. আছিয়া খাতুন। জানা গেছে, এই তিনটি পদে নিয়োগে গঠিত কমিটি ছয় জনের নাম জমা দেবে প্রেসিডেন্টের কাছে। প্রেসিডেন্ট ওই তালিকা থেকে তিন জন নির্বাচন করবেন। তাদের মধ্য থেকে একজনকে দেবেন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব।

আলোচনায় যাদের নাম: তবে সার্চ কমিটি নাম প্রস্তাব করার আগেই দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসেবে অন্তত ১৩ জনকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। তারা হলেন- সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল মতিন ও বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া ও মো. আবদুল আজিজ, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, মেজর জেনারেল (অব.) নিজাম উদ্দিন, সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, দুদকের সাবেক ডিজি আহমেদ নাজমুল হোসেইন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মেজবা উন নবী, ঢাকা মহানগর আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক মোতাহার হোসেন, দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মুনীর চৌধুরী এবং সাবেক সচিব এ এইচ এম নুরুল ইসলাম।

সার্চ কমিটিতে যারা:
দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগে গঠিত সার্চ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হক। এতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক বিচারপতি ফারাহ মাহবুব, বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নূরুল ইসলাম, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম ও সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন।

গত ১০ই নভেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাছাই কমিটি, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে, উপস্থিত সদস্যদের অন্যূন ৩ জনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে ২ জন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। অন্যূন ৪ জন সদস্যের উপস্থিতিতে বাছাই কমিটির কোরাম গঠিত হওয়ার কথা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বাছাই কমিটির কার্য-সম্পাদনে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবে।

এদিকে চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদ শূন্য হওয়ায় দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীন গত ৩০শে অক্টোবর দুদকের সব মহাপরিচালক, পরিচালক, প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালককে নিয়ে বিশেষ সমন্বয় সভা করেন। প্রতিটি বিভাগ ও সব জেলা কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ভার্চ্যুয়ালি সভায় অংশ নেন। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, অনুসন্ধান, মামলা ও চার্জশিট অনুমোদন ছাড়া কমিশনের অন্য সব কাজ স্বাভাবিক চলবে। কেননা, কমিশনার ছাড়া কোনো অভিযোগ অনুসন্ধান, মামলা দায়ের ও চার্জশিট অনুমোদন করার সুযোগ দুদক আইনে নেই।