Monday, December 7, 2015

চিকিৎসার ব্যয়ে বছরে সর্বস্বান্ত ৬৪ লাখ মানুষ

পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম মুজাহেরুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৬৪ লাখ মানুষ চিকিৎসার ব্যয় মিটাতে পারছে না। সর্বস্বান্ত হয়েন পড়ছেন। শুধু তাই নয় ক্যান্সার ও কিডনি বিকল রোগে আক্রান্ত বহু মানুষ চিকিৎসার-ব্যয় মেটাতে পারছে না। সোমবার রাজধানীর মহাখালীতে আইসিডিডিআরবি মিলনায়তনে দুইদিন ব্যাপী স্বাস্থ্য বিষয়ক  বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের প্রথম দিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে  তিনি এই তথ্য পরিবেশন করেন। সম্মেলনের প্রথম দিন বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি, শিশুস্বাস্থ্য, সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আরও ২৫টি গবেষণা প্রতিবেদন ও নিবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন,অধ্যাপক ডা. সর্দার মাহমুদ হোসেন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ডা. রজত দাশগুপ্ত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, অধ্যাপক ডা. সাজিয়া হক, অধ্যাপক ডা. শারমিন ইয়াসমিন     প্রমুখ। সম্মেলনে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে পূর্ণবয়স্ক মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। অধ্যাপক এম মুজাহেরুল হক বলেন, বাংলাদেশে যথেষ্ট স্বাস্থ্যসেবাদানের প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক ও কর্মী থাকলেও নাগরিকরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। সম্মেলনের অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে যতটুকু স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা রয়েছে,তা জনগণকে দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অনুষ্ঠানে বলা হয়, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগের চিকিৎসা গ্রহণের জন্যও বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা যথেষ্ট নেই। ফলে রোগ প্রতিরোধের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাদকগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ অন্যের ব্যবহৃত সূঁচের সাহায্যে মাদক গ্রহণ করেন। ফলে তারা এইচআইভি/এইডস ও হেপাটাইটিস বি-এর মতো সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ মাত্রার ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। হেপাটাইটিস বি বিষয়ে মানুষের জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও চর্চা মূল্যায়নের লক্ষ্যে নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ঢাকার একটি চিকিৎসা কেন্দ্রে দেড়শ রোগীর ওপর চলতি বছর এ গবেষণা চালায়। ডা. সাজিয়া হক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ বহুগামী যৌনাচারে অভ্যস্ত যাদের মধ্যে ৬১ দশমিক ২ শতাংশ শারীরিক সম্পর্কের সময় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না। তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণায় বেরিয়ে আসছে যারা অন্যের রক্ত গ্রহণ করেছেন, তাদের ১ দশমিক ৩ শতাংশ পরীক্ষাহীন রক্ত নিয়েছেন। ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরপ্রদানকারী জানিয়েছেন, তারা কখনো হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা নেয় না। তৃতীয় পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন দিবস উপলক্ষে পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এবং ফেইথ বাংলাদেশ এ সম্মেলনের আয়োজন করে। আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় উল্লেখ করেন, ডায়ারিয়া, জ্বর ও নিউমোনিয়া এখন শিশু মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণ। চলতি বছরের জুনে ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ২০৮টি ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর ওপর ওই গবেষণা চালানো হয়। ওইসব শিশুর ২৬ শতাংশ ডায়রিয়া, ২১ শতাংশ জ্বর, ১৬ শতাংশ নিউমোনিয়া, ১৩ শতাংশ সাধারণ ঠাণ্ডা ও ১১ শতাংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। অন্য একটি গবেষণায় দেখা যায়, ধূমপান, হতাশা, চাকরি-সম্পর্কিত মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের সঙ্গে  সন্তান জন্মদানে অক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা-সম্পর্কিত ১৬০টি ঘটনা নিয়ে ওই গবেষণা চালায় এবং সংশ্লিষ্ট ৪৫ শতাংশ উত্তরকারী জানান তারা ধূমপায়ী। এছাড়া ৩৮ দশকিম ৫ শতাংশ উত্তরপ্রদানকারী তাদের মধ্যে হতাশা, ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ চাকরি নিয়ে মানসিক চাপ, ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপ, ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ ডায়াবেটিস এবং ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ পারিবারিক সমস্যার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছ।

সাক্ষী সুরক্ষা আইন করতে হাইকোর্টের নির্দেশ by কুন্তল রায়

সাক্ষী সুরক্ষা আইন করার উদ্যোগ নিতে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এবং নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীর উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই আইন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার একটি হত্যা মামলার আসামির জামিন শুনানির সময় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইন সচিবকে এই আদেশ পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একটি হত্যা মামলায় ২০১০ সালের ১০ জুলাই হীরা ওরফে হারুনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মহানগর দায়রা জজ আদালত এই মামলায় ২০১২ সালের ৫ জুন তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এখন পর্যন্ত ১০ দিন ওই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ পড়লেও সাক্ষীরা কেউ সাক্ষ্য দিতে আসেননি। এ অবস্থায় আসামি হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন। আদালত জামিন আবেদন খারিজ করে দেন এবং কেন সাক্ষীরা আসছেন না, তা অনুসন্ধান করতে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আসাদুজ্জামানকে তলব করেন। আসাদুজ্জামান আজ আদালতে হাজির হয়ে বলেন, ‘আসামি প্রভাবশালী। সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এই কারণে আসছেন না।’
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ এ কে এম মনিরুজ্জামান কবির প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি কৌঁসুলি আসাদুজ্জামানের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই আইন করার নির্দেশ দেন। আদালত আইনে সমন পাওয়ার পর সাক্ষী না এলে সে ব্যাপারে সরকারি কৌঁসুলি ও সংশ্লিষ্ট পুলিশকে জবাবদিহির আওতায় আনার ধারা সংযুক্ত করতে বলেন।

কেয়ামতের ঘণ্টা বাজতে তিন মিনিট বাকি!

কেয়ামতের ঘণ্টা বাজতে আর মাত্র ৩ মিনিট বাকি। দৈনন্দিন সময় গণনার কোনো ঘড়ির সময় নয় এটি। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সময়সীমা পর্যালোচনায় নির্মিত ‘ডুমসডে ক্লক’ (কেয়ামতের ঘড়ি) অনুযায়ী সময় রাত ১১টা ৫৭ মিনিট, রাত ১২টা বাজতে ৩ মিনিট বাকি। তার মানে পৃথিবী ধ্বংস হতে আর ৩ মিনিট বাকি। কিন্তু জলবায়ু রক্ষায় উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। এজন্য একটি টেকসই জলবায়ু চুক্তির দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব।
১৯৪৫ সালে হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলার পর শিকাগোর কিছু পারমাণবিক বিজ্ঞানী ‘বুলেটিন অব দ্য এটোমিক সাইন্টিস্ট’ নামে একটি নিউজলেটার বের করেন- যার মাধ্যমে বিশ্ব পরিস্থিতির প্রতীকী সময়সীমা দেখানো হয়। এ সময়সীমা বিশ্বের ভারসাম্যতার ওপর নির্ভর করে কমবে ও বাড়বে বলে উপস্থাপন করেন বুলেটিনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হেইম্যান গোল্ডস্মিথ। এর পরেই ১৯৪৭ সালে ঘড়ির আঙ্গিকে বৈশ্বিক দুর্যোগ পরিস্থিতি পরিচালনা করতে প্রতীকী ‘কেয়ামত ঘড়ি’ তৈরি করা হয়। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত বুলেটিন অফিসের দেয়ালে ঘড়িটি ঝুলানো রয়েছে। ‘বুলেটিন অব দ্য এটোমিক সাইন্টিস্টসে’র বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বোর্ডের সদস্যরা ঘড়িটি নিয়ন্ত্রণ করেন। ১৮ জন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী নিয়ে গঠিত ‘গভর্নিং বডি’ ঘড়িটির নিয়ন্ত্রণে ও পরামর্শ প্রদানে সহায়তা করে থাকেন। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ঘড়িটিতে দেখানো হয়েছে কেয়ামতের ঘণ্টা বাজতে আর মাত্র ৩ মিনিট বাকি।
রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমার আধুনিকীকরণকেই দায়ী করেছেন বুলেটিনটির গভর্নিং বডি। বিশ্বের বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তন ও পারমাণবিক অস্ত্রাগারের কারণে বৈশ্বিক পরিস্থিতি হুমকির মুখে বলে মনে করেন বুলেটিনের বোর্ড সদস্যরা। শনিবার সানডে টাইমসের পত্রিকার এক বিবরণীতে এমন তথ্য দিয়েছে তারা। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করতে প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলনে একত্রিত বিশ্ব নেতারা। একটি ফলপ্রসূ চুক্তি হওয়ার অপেক্ষায় বিশ্বের বিজ্ঞানীদের একটি দল। যারা ‘কেয়ামত ঘড়ি’র কাঁটা নিয়ন্ত্রণ করেন। কারণ, বিশ্ব থেকে অশুভ শক্তি তাড়িয়ে দিলে ঘড়ির সময়সীমা বৃদ্ধি পাবে। কেয়ামত ঘড়ির সময় বিবর্তন ১৯৪৭ সালে স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে এ পর্যন্ত ২৩ বার কেয়ামত ঘড়িটির কাঁটা ওঠা-নামা করেছে। কেয়ামত ঘড়ির সময় বিবর্তন নিুে দেয়া হল-
১৯৪৭ : কেয়ামত ঘড়িটি স্থাপন করা হয়, ঘড়িতে রাত ১১টা ৫৩ মিনিট।
১৯৪৯ : সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার কারণে সময় বাড়ে রাত ১১টা ৫৭ মিনিট।
১৯৬০ : ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সমতায় এলে, ঘড়ির সময় হয় রাত ১১টা ৫৩ মিনিট।
১৯৬৮ : ভিয়েতনাম যুদ্ধ, সিক্স ডে যুদ্ধ ও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে সময় দাঁড়ায় রাত ১১টা ৫৩ মিনিট।
১৯৭৪ : ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার কারণে সময় দাঁড়ায় রাত ১১টা ৫১ মিনিট।
১৯৮৪ : যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল টেস্টের ফলে সময় হয় রাত ১১টা ৫৭ মিনিট।
১৯৮৮ : পারমাণবিক মিসাইলের ক্ষমতা হ্রাস করলে সময় কমে দাঁড়ায় রাত ১১টা ৫৪ মিনিট।
১৯৯০ : বার্লিন দেয়াল ভেঙ্গে যায় ও স্নায়ু যুদ্ধ প্রায় শেষের সম্ভাবনা দেখা দিলে তখন সময় রাত ১১টা ৫০ মিনিট।
১৯৯৮ : পাক-ভারত পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করায় রাত ১১টা ৫১ মিনিট।
২০০২ : যুক্তরাষ্ট্রের এন্টি ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তির অস্বীকারে সময় রাত ১১টা ৫৩ মিনিট।
২০০৭ : দক্ষিণ কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করলে সময় রাত ১১টা ৫৫ মিনিট।
২০১২ : পারমাণবিক অস্ত্রাগার ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে না পারায় সময় রাত ১১টা ৫৫ মিনিট।
২০১৫ : জলবায়ু পরিবর্তন ও যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকীকরণের ফলে ঘড়ির সময় এখন রাত ১১টা ৫৭ মিনিট।

নতুন বছরেই কংগ্রেসের সভাপতি হচ্ছেন রাহুল

রাহুল গান্ধী নিজেকে বদলে ফেলেছেন। দলে নবীন ও প্রবীণদের মধ্যে সংঘাতের অবসান ঘটাতে এখন তৎপর তিনি। পাল্টে ফেলেছেন জোট রাজনীতি সম্পর্কে তার পুরনো আপত্তিও। এবার দলের শীর্ষ পদে অভিষেক ঘটতে চলেছে তার। শেষ মুহূর্তে কোনো বাধা উপস্থিত না হলে, জানুয়ারি মাসেই কংগ্রেস সভাপতি হতে চলেছেন তিনি। অনেক সময় রাজনীতিতে প্রত্যাশিত ঘটনাও ঠিক কখন বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকেই যায়। এবার কিন্তু কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি সেই ধোঁয়াশা কাটিয়ে রাহুল গান্ধীকে সভাপতি করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে চলেছে। ২০১৩ সালের জানুয়ারির এক শীতের সকালে, জয়পুরের বিড়লা সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অডিটোরিয়ামে ওয়ার্কিং কমিটি তাদের চিন্তন বৈঠকের পরে রাহুল গান্ধীকে দলের সহ-সভাপতি ঘোষণা করেছিল। তখন মনমোহন সিং ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল একেবারেই আলাদা। আর এখন বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতাসীন। এই পরিস্থিতিতে সোনিয়া গান্ধী নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে রাহুলকেই এগিয়ে দিচ্ছেন। গত বছরেই সভাপতির পদ ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধী। কিন্তু পরিস্থিতির বিচারে শেষ পর্যন্ত এক বছর ওই পদে থেকে যেতে রাজি হন তিনি। আগামী জুলাইয়ে শেষ হচ্ছে তার পদের মেয়াদ। তারপর আর দায়িত্ব নিতে নারাজ সোনিয়া। সুতরাং রাহুল। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যে ক্রমেই রাহুলের হাতে যাচ্ছে তার ইঙ্গিত মিলছে বিভিন্ন ঘটনায়। যেমন বিহারে নিতীশ কুমারের শপথে নিজে না গিয়ে রাহুলকে পাঠিয়েছিলেন সোনিয়া। তারপর চিকিৎসার প্রয়োজনে আমেরিকা পাড়ি দিয়েছেন তিনি। আর অসহিষ্ণুতা, পণ্য-পরিষেবা কর নিয়ে বিতর্কে সংসদে কংগ্রেসের ভূমিকা কী হবে, তা ঠিক করছেন রাহুল। ফলে ১৯৯৮ থেকে টানা ১৭ বছর কংগ্রেসের সভাপতি থাকা সোনিয়ার কাছ থেকে নেতৃত্বের হাতবদলের প্রক্রিয়া নিঃশব্দে শুরু হয়ে গেছে।

রুশ-তুরস্ক উত্তেজনায় আরেক পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন? by মাসুম খলিলী

সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক অভিযানের জের ধরে তুরস্কের আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং তুর্কি আঘাতে রুশ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে রুশ শীর্ষ রাজনীতিবিদ ঝিরিনস্কি পারমাণবিক বোমা ফেলে ইস্তাম্বুলের ৯০ লাখ মানুষ হত্যার আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি। ভ্লাদিমির ঝিরিনভস্কি বলেছেন, একটি পারমাণবিক আক্রমণ খুব সহজেই ইস্তাম্বুুল ধ্বংস করে দিতে পারে। ইস্তাম্বুল প্রণালীতে শুধু একটি পরমাণু বোমা ফেলে দিলে তাতে ১০ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত সুনামি হয়ে ইস্তাম্বুলের ৯০ লাখ মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। ঝিরিনভস্কি রাশিয়ার এক নম্বর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তুরস্ককে। রাশিয়ার শীর্ষ নিরাপত্তা বিশ্লেষক পাভেল ফেলজেনহাউয়ার তুরস্কের রুশ জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় পারমাণবিক যুদ্ধ সৃষ্টির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, গতানুগতিক যুদ্ধে রাশিয়া ন্যাটোর সাথে পেরে উঠবে না। ফলে মস্কোর জন্য পারমাণবিক যুদ্ধ শুরুর কোনো বিকল্প থাকবে না। তুরস্ক ন্যাটোর পঞ্চম ধারা দ্বারা সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও খুব সম্ভবত রাশিয়া যুদ্ধবিমান ধ্বংসের ঘটনায় একটি পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করবে। ফেলজেনহাউয়ার মন্তব্যটি এ রকম- ‘সম্ভবত একটা যুদ্ধ হবে। অন্য কথায়, রাশিয়ান বোমারু বিমান রক্ষার জন্য রুশ বিমান যখন তুর্কি বিমানে আঘাত করবে তখন সঙ্ঘাত আরো বিস্তৃত হবে। এটা সমুদ্রে রাশিয়ান এবং তুর্কি নৌবহরের মধ্যে সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে পারে।’
পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা ও বিভীষিকা কী হতে পারে এ বিষয়ে কারো অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু এরপরও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে এমন এক অচলাবস্থার দিকে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে, যার পরিণতি যেন হতে চলেছে পারমাণবিক সঙ্ঘাত। তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ বা সঙ্ঘাত সেই জার ও উসমানিয়া শাসন আমলে বারবার দেখা গেলেও এখন প্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। তুরস্ক এখন আর পরাশক্তি নয়। কিন্তু তুরস্ক সোভিয়েত ইউনিয়নবিরোধী সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য দেশ। ন্যাটো চুক্তির পাঁচ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে এই নিরাপত্তা জোটের একটি সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সব দেশ আক্রান্ত হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। এ ধারা অনুসারে নাইন-ইলেভেনের পর আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের পতন ঘটাতে ন্যাটোর সব মিত্র দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ায়। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার যেকোনো আক্রমণে দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক সদস্য দেশ তুরস্কের পাশে থাকার কথা ন্যাটোর। ইতোমধ্যে রুশ জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় ন্যাটো আনুষ্ঠানিকভাবে রুশ বিমানের তুর্কি আকাশসীমা লঙ্ঘনের স্বীকৃতি দিয়ে বলেছে, ন্যাটোর সদস্য দেশটির নিজ আকাশসীমার নিরাপত্তা রক্ষার অধিকার রয়েছে।
কৌশলগত টানাপড়েন
রাশিয়ার সাথে প্রতিবেশী তুরস্কের সম্পর্ক গত দেড় দশকে ক্রমেই ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়েছে। আঙ্কারা রাশিয়ান গ্যাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। রুশ পর্যটকদের একটি বড় সংখ্যা প্রতি বছর তুরস্ক ভ্রমণ করে। এ দুই দেশের এক দেশের নাগরিকদের অন্য দেশ ভ্রমণের জন্য ভিসার প্রয়োজন হয় না। দুই দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অঙ্কও ক্রমেই বাড়ছিল। এ অবস্থার মধ্যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদবিরোধী বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে। রাশিয়ার একমাত্র উষ্ণ পানির নৌঘাঁটির অবস্থান সিরিয়ার লাতাকিয়ায়। সোভিয়েত আমল থেকেই রুশ নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে এটি বিবেচিত হয়ে আসছিল। বাশারের পতন ঘটলে এ ঘাঁটির স্থায়িত্ব হুমকির মধ্যে পড়তে পারে। ফলে যখনই বাশার আল আসাদের পতন ঘটার মতো অবস্থা দেখা দিয়েছে, তখন রাশিয়া বর্ধিত সামরিক সহায়তা দিয়েছে দামেশককে।
সর্বশেষ বাশারবিরোধী আন নুসরা ফ্রন্ট রাজধানী দামেস্কের চার পাশে চলে এলে বাশার প্রশাসনের টিকে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ইরানের আল কুদস বিশেষ বাহিনী ও হিজবুল্লাহর প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণের পরও দামেস্কে আসাদের পতন ঘটার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। অন্য দিকে, আমেরিকান নেতৃত্বাধীন আইএসবিরোধী কোয়ালিশনের হাঁকডাক যতই শোনা যাক না কেন, আইসিসের শক্তি ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়া সিরিয়ায় তার ঘাঁটি ও অন্যান্য স্বার্থ রক্ষার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে প্রত্যক্ষভাবে।
সিরিয়ায় রাশিয়ার সর্বাত্মক সামরিক হস্তক্ষেপ যে তুরস্কের সাথে সম্পর্কে একটি বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে তা হিসাব-নিকাশের বাইরে থাকার কথা নয়। কিন্তু রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল ও ইউক্রেনের প্রক্সি যুদ্ধে রুশ বংশোদ্ভূূত সংখ্যাগুরু অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর যে অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়ে, তা থেকে উত্তরণে আগ্রাসী ভূমিকা নেয়ার হয়তোবা প্রয়োজন দেখা দেয়।
ইউক্রেনের পরিবর্তে সিরিয়াকে প্রক্সিযুদ্ধের জন্য বেছে নেয়ার মধ্যে অবশ্য কৌশলগত বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে রাশিয়ার। প্রথমত এই সঙ্ঘাতে আঞ্চলিক শক্তি ইরানের সর্বাত্মক সমর্থন লাভ করবে মস্কো। দ্বিতীয়ত তুরস্ক ন্যাটোভুক্ত দেশ হলেও আঙ্কারার কিছু ভারসাম্যমূলক স্বাধীন নীতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশের পছন্দ নয়। ক্রিমিয়া দখলের পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের অংশ হতে তুরস্ক অস্বীকৃতি জানায়। ফলে তুরস্ককে ন্যাটো মিত্ররা সমর্থন দিলেও এই সমর্থন নিরঙ্কুশ হবে না। বিশেষত ফ্রান্স প্যারিসে হামলার আগে ও পরে মধ্যপ্রাচ্যে সার্বিকভাবে ইসলামিক শক্তির প্রতি বৈরী মনোভাবের পরিচয় দেয়। তৃতীয়ত তুরস্কের একেপির উত্থানকে ইউরোপের অনেক দেশই উৎকণ্ঠার সাথে দেখছে। ইকোনমিস্টসহ প্রভাবশালী বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম এরদোগান শাসনকে তুর্কি সালতানাতের নব্য সংস্করণ হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছে। তুরস্কের সাথে সঙ্ঘাতে জড়ালেও ইউরোপ আঙ্কারার পক্ষে সেভাবে নাও জড়াতে পারে। চতুর্থত বসফরাস প্রণালীতে রুশ জাহাজের আনাগোনার জন্য উন্মুক্ত রাখা মস্কোর স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইএস ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার এই অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আঙ্কারা বসফরাস বন্ধ করার বিষয়টি সহজে ভাববে না।
সঙ্ঘাতে দুই দেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি
তুরস্কের সাথে সঙ্ঘাতে নেমে রাশিয়াও কম ঝুঁকি নেয়নি। রাশিয়ার ওপর যেমন তুরস্কের অর্থনীতির বিকাশ খানিকটা নির্ভর করে, তেমনিভাবে রাশিয়ার জ্বালানির বাজার বেশ খানিকটা তুরস্কনির্ভর। গ্যাস পাইপলাইন ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেশ কিছু বিনিয়োগ প্রকল্প রয়েছে দুই দেশের। ইতোমধ্যে এসব প্রকল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। রাশিয়াও সিরিয়ার যুদ্ধ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে নেই। এককভাবে ইরান রাশিয়ার অবস্থানকে ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারবে না।
রাশিয়া তুরস্কের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের ব্যাপারে নানা পদক্ষেপের কথা বললেও একাধিক কারণে দুই দেশের মধ্যে এই সম্পর্কচ্ছেদ বেশ বিরূপ হয়ে উঠতে পারে। প্রথমত, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে রাশিয়ার বন্ধুর সংখ্যা একেবারে সীমিত। দেশটির সীমিত কয়েকটি মিত্র দেশের মধ্যে একটি ছিল তুরস্ক। ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের অর্থনৈতিক অবরোধে তুরস্ক অংশ নেয়নি। দেশটি ২০২০ সালের মধ্যে রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য তিন গুণ করে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। বর্তমান উত্তেজনা দুই দেশের এই সম্পর্কে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রাশিয়া তুরস্ক থেকে খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপের কথা বলেছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংস্থা বলেছে, তারা তুরস্কের কাপড় ফার্নিচার শোধন সামগ্রীর গুণগত মান নিয়ে উদ্বিগ্ন।
দ্বিতীয়ত কৌশলগত জ্বালানি সংযোগ দুই দেশের সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মাত্র এক বছর আগে দুই দেশ কৌশলগত একাধিক জ্বালানি চুক্তি সম্পাদন করেছে। রাশিয়ান গ্যাস তুরস্কে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে ইউরোপে নেয়ার জন্য একটি নতুন পাইপলাইন প্রকল্প ‘টার্কিশ স্ট্রিম প্রজেক্ট’-এর মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ পাইপলাইন দিয়ে ইউক্রেনের ওপর দিয়ে যে সাউথ স্ট্রিম প্রজেক্ট রয়েছে, তার বিকল্প হিসেবে রাশিয়ান গ্যাস ইউরোপে নেয়ার পরিকল্পনা ছিল। জার্মানির পরে তুরস্ক রাশিয়ার বড় গ্যাস ক্রেতা। রাশিয়া একই সাথে তুরস্কের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও নির্মাণ করছে। গত এপ্রিলে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে এবং আগামী ২০২০ সালে এটি শেষ হওয়ার কথা। ২২ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে রাশিয়ার অর্থায়ন, নির্মাণ এবং এরপর পরিচালনা করার কথা। এই উভয় প্রকল্পই এখন অবরোধের মধ্যে রয়েছে বলে রুশ অর্থমন্ত্রী অ্যালেক্সি উলিয়াকায়েভ উল্লেখ করেছেন।
তৃতীয়ত তুরস্কের জন্য রাশিয়ান পর্যটকপ্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালে ৪৫ লাখ রুশ পর্যটক তুরস্কে গেছে। সরকারি ডেটা অনুযায়ী তুরস্কের মোট পর্যটকের ১২ শতাংশ হলো রাশিয়ান। তুরস্ক ভ্রমণকারীদের মধ্যে জার্মানির পরেই রাশিয়ানদের স্থান। পুতিন রুশদের তুরস্কে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। রাশিয়ান টুরিজম এজেন্সিগুলোকে তুরস্কে ভ্রমণের প্যাকেজ বিক্রি না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। শারম আল শেখের বিমান দুর্ঘটনার পর মিসরে রাশিয়ান পর্যটক যাত্রা বন্ধ হওয়ার ফলে তুরস্কে ব্যাপক হারে রাশিয়ান পর্যটক ভ্রমণ শুরু হয়েছিল। এখন আর সে চিত্র নেই।
চতুর্র্থত রাশিয়া ও তুরস্ক- দুই দেশই এখন বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে। এ সময় সঙ্কট উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ছিল একে অন্যের সহযোগিতা বাড়ানো। তেলের দাম কমে যাওয়া এবং পশ্চিমা অবরোধের কারণে রাশিয়ান জিডিপি ৩.৮ শতাংশ সঙ্কুচিত হয়েছে। আর ২০১৬ সালে আরো ০.৬ শতাংশ সঙ্কুচিত হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। তুরস্কের অর্থনীতির অবস্থাও ভালো নয়। তুরস্কের এবারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.১ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ৩.৮ শতাংশ হবে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এটি ২০১০ ও ২০১১ এর ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশ কম। ডলারের বিপরীতে তুর্কি লিরার মূল্য এর মধ্যে ২০ ভাগ কমে গেছে। এটি তুরস্কের ১২৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণের দায়কে স্থানীয় মুদ্রায় অনেক বাড়িয়ে দেবে।
রাশিয়ার মিত্র জোগাড়ের চেষ্টা?
একাধিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার আসন্ন যুদ্ধের আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। মস্কো ইতোমধ্যে ন্যাটো ও এর মিত্রশক্তির মোকাবেলা করতে পারমাণবিক স্থাপনা বিন্যাসের কাজ শুরু করেছে বলেও উল্লেখ করা হচ্ছে। একই সাথে দেশটি অন্য পারমাণবিক শক্তিগুলোর সাথে বিশেষ বন্ধন তৈরিরও চেষ্টা করছে। চীনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সাথে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করতে মস্কো একটি ব্যাপকভিত্তিক সামরিক সহায়তা চুক্তি করেছে ইসলামাবাদের সাথে। গত সপ্তাহে মস্কো ও ইসলামাবাদের এই সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের পর রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোয়াইগো বলেছেন, বিশ্ব সম্প্রদায় এখন পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা করতে চায়। প্রাথমিকভাবে ভারত রাশিয়ার বলয় থেকে ক্রমেই আমেরিকামুখী হওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটি ঘটছে বলে উল্লেখ করা হলেও এর সাথে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির যোগসূত্র থাকতে পারে। ইতোমধ্যে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় রাশিয়া সামরিক সরবরাহে পিছিয়ে পড়েছে। অচিরেই এটি যে শূন্যের কাছাকাছি চলে আসবে তা এক প্রকার নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ত্রিভুজ পরাশক্তি অক্ষের উত্থান ঘটার ব্যাপারে বিশ্ব মিডিয়ায় নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ ধরনের পরাশক্তি অক্ষের গঠনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ব্লুমবার্গ পত্রিকা ইতার-তাসকে উদ্ধৃত করে বলেছে, রাশিয়া ও পাকিস্তান ইতোমধ্যেই সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতার অংশ হিসেবে আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা আনতে বন্দরে সামরিক জাহাজ আনাগোনা বৃদ্ধি করেছে। রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের গত সপ্তাহে বৈঠককালে দুই দেশের মধ্যে ৫৪ কোটি ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে আরো বাড়ানোর ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। বেইজিং ও মস্কো উভয়ে তাদের স্বার্থের প্রতি ওয়াশিংটনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। বিশ্বব্যাপী আমেরিকান আধিপত্য বন্ধ করার স্বার্থে তাদের অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ বলে মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের উল্লেখযোগ্য কোনো মতবিরোধ দেখা যায় না। তবে ভারতের সাথে ওয়াশিংটনের কৌশলগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং নিজস্ব অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য চীনা এবং রাশিয়ান প্রভাববলয়কে পাকিস্তান এখন নিরাপদ মনে করছে। আর সিরিয়া থেকে ইরাক ইরান আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় মিত্রবলয় তৈরির প্রতি দৃষ্টি রয়েছে ক্রেমলিনের।
নতুন উত্তেজনায় বহুমুখী প্রভাব?
রাশিয়ার জঙ্গিবিমান গুলি করে ধ্বংস করার ঘটনার পর তুরস্কের সাথে সম্পর্কে যে নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব অনলগর্ভ মধ্যপ্রাচ্যের বহুমুখী সঙ্ঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে সিরীয় সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের যে কিছুটা সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল, সেটিও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। রাশিয়ার জঙ্গিবিমান ভূপাতিত করার ঘটনাকে পুতিন যে কতটা মারাত্মকভাবে নিয়েছেন, তা স্পষ্ট হয় তার প্রতিক্রিয়া দেখানোকে সামনে রাখলে। এটাকে কেন্দ্র করে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভের আঙ্কারা সফর বাতিল ঘোষণা করা হয় শুরুতে। রুশ বিমান ভূপাতিত করার ঘটনাকে পিঠে ছুরিকাঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন পুতিন। একই সাথে তুরস্কের সাথে সব ধরনের সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়ন করার ঘোষণাও দিয়েছেন। তিনি এমন কথাও বলেছেন, তুরস্কের বর্তমান নেতৃত্বের ইসলামীকরণের চেষ্টা তার জন্য বিরক্তিকর। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয় তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের পক্ষ থেকে। তিনি ৯৯ শতাংশ মুসলিমের দেশে ইসলামীকরণের অভিযোগকে ঔদ্ধত্য হিসেবে বর্ণনা করেন। সিরিয়ার যে প্রেসিডেন্ট তিন লাখ ৮০ হাজার মানুষের হত্যার জন্য দায়ী, তার পক্ষ সমর্থনকে সন্ত্রাসের সহযোগিতা হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান রাশিয়া সফর করার দুই দিনের মাথায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ করে বসেন। এই হস্তক্ষেপের বিষয় এরদোগানের সাথে আলোচনায় এসেছিল বলে মনে হয়নি এ ঘটনায় তুরস্কের প্রতিক্রিয়া দেখে। সিরিয়ায় সামরিক হামলার পর রুশ জঙ্গিবিমান একাধিকবার তুর্কি আকাশসীমা লঙ্ঘন করে। এসব ঘটনার কোনো কোনোটি অনিচ্ছাকৃত মনে হলেও কিছু ঘটনা আঙ্কারাকে বার্তা দেয়ার জন্য বলে মনে হয়েছে। তুরস্ক বলেছে, সর্বশেষ দফা আকাশসীমা লঙ্ঘনের পর তুর্কি বিমান থেকে পাঁচ মিনিট ধরে ১০ বার সতর্কবাণী উচ্চারণ করার পর রুশ বিমানে গুলি করা হয়েছে। মস্কোর বক্তব্য হলো রুশ বিমানটি আদৌ তুরস্কের আকাশসীমায় প্রবেশ করেনি। পরে বিমানটির গতি পথের এক মানচিত্রে দেখা যায় বিমানটি স্বল্পসময়ের জন্য তুরস্কের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। তবে গুলি বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে এটি ধ্বংস হওয়ার পর সিরিয়ার ভূ-সীমায় এটি পতিত হয়েছে।
সিরিয়া ১৫১৬ সাল থেকে ছিল তুর্কি খেলাফতের অধীনে, উসমানিয়া সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সেভাবেই ছিল। ‘তুর্কম্যান’ বিদ্রোহীদের ওপর বোমা বর্ষণ করার সময় যে রুশ সু-২৪ বিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে, তারা জাতিগতভাবে তুর্কি। ১৯২১ সালের চুক্তির আলোকে সীমান্ত আরোপ করার সময় এই তুর্কিরা তুরস্ক সীমান্তের বাইরে পড়ে যায়। দীর্ঘ দিন আগে কেটে বাদ দেয়া হলেও সাবেক সাম্রাজ্যগুলো তাদের অদ্ভুত মানসিক কারণে এখনো মনে করে, ওইসব এলাকায় হস্তক্ষেপ করার তাদের বিশেষ অধিকার রয়েছে। পুতিন বলছেন, তিনি তুর্কমেন পর্বতমালায় ইসলামিক স্টেটের ওপর বোমা ফেলছে, যদিও সেখানে বা তার কাছাকাছি কোনো এলাকাতেও ইসলামিক স্টেট বাহিনীর কোনো উপস্থিতির রেকর্ড নেই। তারা হলো আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়া তুরস্ক সমর্থিত মধ্যপন্থী বিদ্রোহী।
এরদোগানের লক্ষ্যগুলোর একটি ক্রেমলিনের কাছেও পরিচিত। এটি হলো রাশিয়ার সাথে অভিন্ন কৌশল গ্রহণে সমঝোতায় আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশকে বেশ জোরালোভাবে দেখানো যে, তুরস্কের স্বার্থ পুরোপুরি বিবেচনায় না নেয়া হলে সিরিয়ায় কোনো সমাধানই ফলপ্রসূ হবে না। তুর্কি স্বার্থগুলোর মধ্যে রয়েছে, আসাদের সাথে সমাঝোতা হলে যাতে তুর্কম্যানই হোক আর আরবই হোক, কোনো সুন্নি শক্তিকে ধ্বংস করা না হয়। রাশিয়ার জন্য সঠিক কাজ হতে পারে এটা স্বীকার করে নেয়া যে, সে তুর্কি স্পর্শকাতরতাকে দেশটি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি। পুতিনের অনেক বৈরী প্রতিবেশী যেমন রয়েছে তেমন আছে সাবেক মিত্রও। কিন্তু আরো অগ্রসর হওয়ার প্রলোভনও রয়েছে তার সামনে। আবার হয়তো এরদোগানের হিসাবেও ভুল রয়েছে। অথবা রয়েছে ক্ষমতাধরদের কাছে তার অজ্ঞাত কোনো বাধ্যবাধকতা। এটি অনস্বীকার্য যে, পুতিন ইউক্রেনে যতটা দুর্বল, এরদোগান সিরিয়ায় তার চেয়েও বেশি দুর্বল।
বর্তমানে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাশিয়া অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে যাচ্ছে, উত্তর সিরিয়ায় বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা মোতায়েন করতে যাচ্ছে, তুর্কমেন পর্বতমালায় বোমাবর্ষণ দ্বিগুণ করতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় এরদোগানের করণীয় নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। রাশিয়ার সাথে এরদোগানের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে অনেক পশ্চিমা মিত্র ভালোভাবে নেয়নি। এ জন্য এরদোগানকে নানাভাবে চাপে রাখতে চেয়েছে তারা। জুনের নির্বাচনে তার বিপর্যয়কর ফলাফল এবং সিরিয়ায় রাশিয়ান হস্তক্ষেপকে গোপনে অনুমোদন করার যে অভিযোগ আমেরিকার ব্যাপারে উঠছে, সেটি সঠিক হলে এরদোগানকে রাশিয়ার মুখোমুখি করে রাখার একটি প্রচেষ্টা অন্তরালে সক্রিয় থাকতে পারে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পরিণামদর্শী নীতি দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যা এখনো সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। তা না হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থতি আরো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার জের ধরে যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলা হচ্ছে সেটিও অসম্ভব নয়।
mrkmmb@gmail.com

এটা সীমানাবিহীন পৃথিবীর ব্যাপার by রবার্ট ফিস্ক

বুলডোজার দিয়ে ইরাক–সিরিয়ার সীমান্তপ্রাচীর ভেঙে ফেলছে আইএস
২০১৪ সালে আইএস তার অন্যতম প্রথম ভিডিওবার্তা প্রকাশ করে, এই ভিডিওটি ইউরোপের মানুষের নজরে একরকম পড়েইনি। এই ভিডিওটির মান অতটা উন্নত ছিল না, এমনকি আবহসংগীত হিসেবে ‘নাশিদ’ও সেখানে ছিল না, যেটা আইএসের পরবর্তী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ভিডিওগুলোতে পাওয়া যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি বুলডোজার ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্ত চিহ্নিতকারী বালুর দেয়ালটি ভেঙে ফেলছে। পুরো দৃশ্যটি হাতে ধরা ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল, আর সেই বালুর মধ্যে একটি পোস্টার পড়ে ছিল, যেখানে লেখা ছিল ‘সাইকস-পাইকটের শেষ’।
লাখো আরবের মতো আমি এই ভিডিওটি প্রথম দেখি বৈরুতে, এই সাইকস-পাইকট চুক্তিটি আরবের মানুষের কাছে দুষ্টক্ষতের মতো। ব্রিটিশ ও ফরাসি কূটনীতিক মার্ক সাইকস ও ফাঁসোয়া জর্জ-পাইকত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গোপনে এই সীমানা চিহ্নিত করেছিলেন, যেখানে ফ্রান্সকে সিরিয়া, মাউন্ট লেবানন ও উত্তর ইরাক দেওয়া হয়েছিল আর ব্রিটিশদের দেওয়া হয়েছিল ফিলিস্তিন, ট্রান্সজর্ডান ও ইরাকের বাকি অংশ। এ অঞ্চলের সব মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদি সে কথা জানে। এই দুই কূটনীতিক ক্ষয়িষ্ণু অটোমান সাম্রাজ্যকে ছিঁড়েখুঁড়ে কৃত্রিম জাতি সৃষ্টি করেন, যেখানে সীমানা, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও পাহাড়ের মাধ্যমে পরিবার, গোত্র ও মানুষকে বিভক্ত করা হয়েছিল। এটা ছিল ইেঙ্গা-ফরাসি উপনিবেশবাদের ফসল।
যেদিন এই ভিডিওটি দেখেছিলাম, সে রাতেই আমি লেবাননের দ্রুজ নেতা ওয়ালিদ জামব্লাতের সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমার উদ্দেশে গর্জন করে বলেন, ‘সাইকস-পাইকটের শেষ’। আমি কিছুটা অধৈর্য হয়ে ফোঁস ফোঁস করলাম। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দেখা গেল, জামব্লাতের কথাই সত্য হলো। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরেছিলেন, লাখ লাখ আরব ১০০ বছর ধরে যেটা প্রত্যাশা করছিল, আইএস সেটা প্রতীকীভাবে দ্রুতই করে ফেলেছিল: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তি ব্রিটিশ ও ফরাসিরা যে মিথ্যা সীমান্ত দিয়ে আরবদের বিভক্ত করেছিল, সেই সীমান্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া।
আমরা চালাকি করে আরবদের ওপর রাজা গছিয়ে দিয়েছিলাম, ১৯২২ সালে ইরাকের হাশেমি রাজা ফয়সালের পক্ষে গণভোট করে তাঁকে ৯৬ শতাংশ ভোট পাইয়ে দিয়েছিলাম। আমরা আরবদের জেনারেল ও একনায়ক উপহার দিয়েছি। ব্রিটিশরা ১৯ শতকে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও মিসর দখল করেছিল, পরবর্তীকালে যাদের ভাগ্যে মিথ্যাবাদী সরকার, পাশবিক পুলিশ বাহিনী, মিথ্যুক সংবাদপত্র ও ভুয়া নির্বাচন জুটেছিল। মোবারকও ফয়সালের মতো মহাকাব্যিক ৯৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিলেন। আরবদের কাছে গণতন্ত্র মানে বাক্স্বাধীনতা বা নিজের নেতা নির্বাচন করার অধিকার ছিল না, তার মানে ছিল ‘গণতান্ত্রিক’ পশ্চিমা সরকারগুলোর আরব একনায়কদের সমর্থন দেওয়া, যারা তাদের নিপীড়ন করেছে।
ফলে ২০১১ সালে আরবে যে বিপ্লবের হাওয়া বইতে শুরু করে, সেখানে কিন্তু তারা গণতন্ত্রের দাবি তোলেনি, ‘আরব বসন্তের’ কথা ভুলে যান, সেটা ছিল হলিউডের সৃষ্টি। কায়রো, তিউনিস, দামেস্ক ও ইয়েমেনের রাস্তায় যেসব পোস্টার দেখা গেছে, সেখানে মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের কথাই ছিল, যে দুটি বস্তু আমরা নিশ্চিতভাবে আরবদের জন্য খুঁজিনি।
আমি নিজের প্রতিবেদনেও এই উপলব্ধির কারণ হিসেবে বলেছিলাম, আরবদের শিক্ষার হার ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ভ্রমণ বেড়েছে। আর ইন্টারনেট ও সামাজিক গণমাধ্যমের ভূমিকা স্বীকার করে বলেছিলাম, এর গভীরে কোনো না–কোনো একটা ব্যাপার কাজ করছে। আরবেরা গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠেছে, তারা আর নিজেদের নাসের, সাদাত, মোবারক, আসাদ, গাদ্দাফি ও সাদ্দামের মতো পিতৃতান্ত্রিক নেতার সন্তান হিসেবে বিবেচনা করে না, বরং মনে করে সরকার তাদের মতো সন্তানদের নিয়েই গঠিত হয়। আরবেরা তাদের বাসস্থানের মালিকানা চেয়েছে।
কিন্তু এখন মনে হয়, আমি কতটা ভুল ছিলাম। আমি এই বিপ্লবের বার্তা অনুধাবন করতে মারাত্মক ভুল করেছিলাম। আমি এখন বিশ্বাস করি, ২০১১ সালে আসলে এটাই উদ্ভাসিত হয়েছে যে আমরা পশ্চিমারা ১০০ বছর আগে এই মানুষের জন্য যে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছিলাম, সেটা মূল্যহীন। যে কৃত্রিম জাতি ও ততোধিক কৃত্রিম সীমান্তের ওপর আমরা রাষ্ট্র আরোপ করেছিলাম, তা অর্থহীন ছিল। অর্থাৎ তাদের ওপর আমরা যা গছিয়ে দিয়েছিলাম, তারা সেটার পুরোটাই খারিজ করে দিয়েছে।
গাজার হামাস ও ব্রাদারহুড এক হয়ে গেছে, সিনাই-গাজা সীমান্ত ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ওদিকে লিবিয়ার পতনের কারণে গাদ্দাফির আগের সীমান্ত খুলে গেছে, যেটা এখন অস্তিত্বহীন। গাদ্দাফির অস্ত্রগুলো এখন মিসর ও সিরিয়ার বিদ্রোহীদের কাছে বিক্রি হচ্ছে, রাসায়নিক শেলসহ। তিউনিসিয়া ‘গণতন্ত্রের’ প্রতি আসক্ত হওয়ায় সে এখন পশ্চিমের প্রিয় পাত্র, কিন্তু লিবিয়া ও আলজেরিয়ার সঙ্গে তার যে সীমান্ত আছে, সেটা ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সরবরাহের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় দেশটি বিপদে পড়েছে। আইএস সীমানাবিহীন ভূমি দখলে আনতে পেরেছে, যার মানে হচ্ছে, সে তার অন্তর্দেশীয় অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে: ইরাক হয়ে সিরিয়ার আলেপ্পোর প্রান্ত, ওদিকে নাইজেরিয়া থেকে নাইজার ও চাদ।
আইএস এই নতুন ব্যাপারটা আমাদের আগেই বুঝতে পেরেছে। কিন্তু আধুনিক যুগে সীমান্ত নিরাপত্তাহীন—আইএসের এই উপলব্ধি আর আরবদের স্বসৃষ্ট জাতির অসারতা-বিষয়ক উপলব্ধি কিন্তু যুগপৎভাবে একই সময়ে হয়েছে। আমরা ইসরায়েলকে সমর্থন দিই, কিন্তু এটা স্বীকার করি না যে দেশটির পূর্ব সীমান্ত আরব বিশ্বের পাশ ঘেঁষে চলে গেছে, তবে আমাদের স্বার্থের সঙ্গে মিলে গেলে আমরা তা স্বীকার করি। সর্বোপরি আমরাই তো ‘বালুতে রেখা’ বা ‘লাল রেখা’ আঁকার সুযোগ পেয়েছি। আমরা ইউরোপীয়রাই সিদ্ধান্ত নিই, সভ্যতা কোথায় শুরু হয়, আর কোথায় গিয়ে শেষ হয়।
হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নেন, ‘খ্রিষ্টান সভ্যতা রক্ষা’ করতে তিনি কোথায় সেনাবাহিনী নামাবেন। হ্যাঁ, আমাদের পশ্চিমাদেরই তো সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চারিত্রিক সাধুতা আছে, মধ্যপ্রাচ্যের জাতীয় সীমানা মানা হবে কি হবে না।
কিন্তু যখন আরবেরাই ঠিক করেছে যে তারা আর এই নাচ নাচবে না এবং ‘আমাদের’ ভূমিতেই নিজ ভবিষ্যৎ খুঁজে নেবে, ‘তাদের ভূমিতে’ নয়, তখন এই নীতি ভেঙে পড়ে। এটা সত্যিই কেমন অনন্যসাধারণ বিষয় যে আমরা খুব সহজেই ভুলে যাই, আধুনিক যুগের সীমান্ত ভঙ্গকারী ব্যক্তি কিন্তু একজন ইউরোপীয়, যিনি ইউরোপের ইহুদিদের নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। হিটলার নিজের আত্মজীবনী মেইন ক্যাম্প–এ মুসলমানদের সম্পর্কে বর্ণবাদী মন্তব্য করেছিলেন, সেই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, তাঁর হত্যাযজ্ঞ আরবেও সম্প্রসারিত হয়েছে।
আমরা সব সময় ঘোষণা করছি, আমরা ‘যুদ্ধে লিপ্ত’ হয়েছি। বলা হচ্ছে, আমাদের নির্দয় হতে হবে। আমাদের তাদের ভূখণ্ড আক্রমণ করতে হবে, তা না হলে তারা আমাদের ভূখণ্ড আক্রমণ করবে। কিন্তু সেই দিন আর নেই যে আমরা অন্যের দেশ আক্রমণ করে নিজ দেশে নিরাপদ থাকতে পারব। নিউইয়র্ক, প্যারিস, মাদ্রিদ, লন্ডন ও ওয়াশিংটনে হামলার ঘটনা আমাদের সে কথাই জানান দেয়। আমরা যদি ন্যায়বিচারের জন্য কণ্ঠ ছাড়ি, অর্থাৎ হন্তারকদের বিচার-প্রক্রিয়া ও আদালতের মুখোমুখি করি, তাহলে হয়তো আমরা আমাদের রাজদণ্ডধারী মহাদেশে নিরাপদ থাকতে পারব। না, শুধু নিজের ও শত্রুর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করলেই চলবে না, মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জন্যও তা নিশ্চিত করতে হবে, যারা এক শতাব্দী ধরে আমাদের সৃষ্ট একনায়কতন্ত্র ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের খপ্পরে পড়ে যারপরনাই ভুগেছে, যার কারণে আইএসের উত্থান হয়েছে।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া।
সংক্ষেপিত অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসাই সাফল্য -তোফায়েল আহমেদ by সোহরাব হাসান

তোফায়েল আহমেদ, বাণিজ্যমন্ত্রী,
উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, আ.লীগ
প্রথম আলো: ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে আপনারা নেতৃত্ব দিয়েছেন। নব্বইয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন। ফল কী হলো?
তোফায়েল আহমেদ: ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রাম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই তিনি দেখলেন, পশ্চিমারা বাঙালিদের স্বার্থ রক্ষা করবে না। তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। সেই লক্ষ্যেই তিনি ৬ দফা কর্মসূচি দিলেন, এরপর ছাত্রসমাজের ১১ দফা যুক্ত হলো। মানুষের হৃদয়ের দাবিকে যুক্ত করেছিলাম বলেই তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছিল, আন্দোলন সফল হয়েছিল। একই ঘটনা ঘটে নব্বইয়েও।
প্রথম আলো: আন্দোলন তো সফল হয়েছিল। কিন্তু মানুষ কী পেল?
তোফায়েল আহমেদ: গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে যে সংসদ গঠিত হয়, সেই সংসদ সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। আর সেটি ছিল আওয়ামী লীগেরই প্রস্তাব। বিএনপি প্রথমে সংসদীয় ব্যবস্থায় যেতে চায়নি। পরে তারা মেনে নেয়। আমরা সর্বসম্মতভাবে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আগের ধারায় দেশ শাসন করলেও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরিয়ে আনে। এটাও নব্বইয়ের আন্দোলনের বিজয়।
প্রথম আলো: নব্বইয়ে আপনারা স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সফল হয়েছিলেন। সেই স্বৈরশাসকের এখনকার অবস্থান কী?
তোফায়েল আহমেদ: এটাও সত্য যে এরশাদ ১৯৯১ সালেও কারাগারে থেকে নির্বাচন করে পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। তাঁর দল ৩৫টি আসন পেয়েছিল। এ ভোট তো আমরা দিইনি। ১৯৯৬-এও তিনি পাঁচটি আসনে জয়ী হন। দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ায় ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি। আমরা তাঁকে বলি স্বৈরাচার, কিন্তু জনগণ তো তাঁকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। সেখানে আমরা কী করতে পারি?
প্রথম আলো: আমরা সাংসদ এরশাদের কথা বলছি না। আমরা বলছি সেই এরশাদের কথা, যিনি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ: অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখলের পালা শুরু হয় জাতির জনককে হত্যার পর। এরপরই সামরিক শাসকেরা গায়ের জোরে ক্ষমতায় এসে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তো আমরা ভাবিনি বাংলাদেশে এ রকমটি হবে। বঙ্গবন্ধু ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। সামরিক শাসকেরা তা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন; স্বাধীনতাবিরোধীদের গাড়িতে পতাকা তুলে দিয়েছেন। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের এটাও কারণ।
প্রথম আলো: নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন তথা তিন জোটের রূপরেখায় আপনারা কার্যকর সংসদের কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখছি?
তোফায়েল আহমেদ: আমরা তো এখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই আছি। নবম সংসদে তো বিএনপি ছিল, তাদের আসন যত কমই হোক না কেন। ক্ষমতায় থাকতে তারা বলেছিল, আওয়ামী লীগ ৩০টি আসনও পাবে না। কিন্তু আমরা তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করি। সেই সংসদে তাঁরা কথা বলতেন, আমরা তার জবাব দিতাম। সংসদ কার্যকর হয় সরকারি ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণে। তাঁরা প্রায়ই সংসদে গরহাজির থাকতেন। এখন জাতীয় পার্টির সাংসদেরা বিরোধী দলের আসনে। আমি মনে করি, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে যে নির্বাচন হবে, সেটি সব দলের অংশগ্রহণেই হবে এবং সংসদীয় ধারা এগিয়ে যাবে।
প্রথম আলো: তখন আপনারা স্বৈরাচারকে সঙ্গে রাখবেন না?
তোফায়েল আহমেদ: আমি তাঁকে এভাবে দেখি যে তিনি পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছেন। তিনি নিজেও ভুল স্বীকার করেছেন।
প্রথম আলো: তিন জোটের রূপরেখার অঙ্গীকার ছিল সংসদের সার্বভৌমত্ব। সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি?
তোফায়েল আহমেদ: আমরা রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে এসেছি। এটা কম অর্জন নয়। গণতন্ত্রের বিকল্প কিছু নেই। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ও দশম সংসদ নিয়ে অনেকই প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু সারা বিশ্ব তো এটি মেনে নিয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সাবের হোসেন চৌধুরী, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সভাপতি স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এটাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল আছে। আজ দেশের যে এত উন্নতি হয়েছে, বিএনপির আমল থেকে রপ্তানি তিন গুণ বেড়েছে, রিজার্ভ সাত গুণ বেড়েছে; গণতন্ত্রের কারণেই সেটি সম্ভব হয়েছে।
প্রথম আলো: আপনি সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চাইছেন। কিন্তু বিরোধী দলকে তো সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
তোফায়েল আহমেদ: এটি তারা নিজেরা নষ্ট করেছে। আগে তো বিএনপি সভা-সমাবেশ করত। তারা আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে, পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ হত্যা করেছে, মানুষকে পঙ্গু করেছে; এটি তো রাজনীতি নয়। এ জন্যই বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা হচ্ছে। এখনো জনসভার অনুমতি চাইলে অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রথম আলো: তিন জোটের রূপরেখায় রাষ্ট্রায়ত্ত বেতার-টিভির স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এখন কী অবস্থা?
তোফায়েল আহমেদ: আসলে রাষ্ট্রায়ত্ত বেতার-টিভির আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। তবে এখন অনেক প্রাইভেট টিভি চ্যানেল আছে, এফএম রেডিও আছে; সেগুলো জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। বেসরকারি টিভি ও সংবাদপত্র তো অনেক সমালোচনা করে সরকারের।
প্রথম আলো: কিন্তু এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটছে না। জঙ্গিবাদ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
তোফায়েল আহমেদ: জঙ্গিবাদ এখন বিশ্বব্যাপী প্রবণতা। বিশ্বের অনেক দেশই জঙ্গিবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। ইউরোপের মতো উন্নত দেশেও তারা হামলা চালাচ্ছে। কদিন আগে প্যারিসে হামলা হয়েছে, তার আগে তুরস্কে হয়েছে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ অনেক নিরাপদ। সম্প্রতি মার্কিন জরিপেও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে বাংলাদেশ বেশি নিরাপদ।
প্রথম আলো: কিন্তু যে স্বৈরশাসককে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিতাড়িত করে গণতন্ত্রের সূচনা করলেন, সেই স্বৈরশাসন এখন আপনাদের সহযোগী। বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
তোফায়েল আহমেদ: দক্ষিণ আফ্রিকায়নেলসন ম্যান্ডেলাকে যে শ্বেতাঙ্গ শাসক ২৭ বছর কারাগারে বন্দী রেখেছিল, তিনি ক্ষমতায় এসে তো তাদের নিয়েই সরকার গঠন করেছিলেন। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ কালোদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করত। এটি করেছিলেন দেশের উন্নয়নের জন্য। মানুষের কল্যাণের জন্য। সেটি করেছিলেন জাতীয় সমঝোতার জন্য।
প্রথম আলো: জাতীয় সমঝোতায় কি বিএনপির জায়গা নেই?
তোফায়েল আহমেদ: বিএনপির চিন্তা, ধ্যানধারণা গণতান্ত্রিক নয়। তাদের ধ্যানধারণা গণতান্ত্রিক হলে একটি নির্বাচনকে বন্ধ করার জন্য তারা এভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালাত না। পৃথিবীর অনেক দেশেই অনেক দল নির্বাচন বর্জন করে, কিন্তু বিএনপি তো শুধু নির্বাচন বর্জন করেনি, তারা নির্বাচন বানচাল করতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে খুন করেছে, ৫০০ ভোটকেন্দ্র ধ্বংস করেছে, ২৪ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে। এমনকি স্কুলশিক্ষিকাকেও রেহাই দেয়নি।
প্রথম আলো: আশির দশকে তাদের নিয়েই তো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন?
তোফায়েল আহমেদ: আমরা তাদের এই চেহারা বুঝতে পারিনি।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
তোফায়েল আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান

শহীদ নূর হোসেন ভাইয়ের চাওয়া পূরণ হলো না by শাহানা বেগম

১৯৮৭ সালে আমি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। ফলে নূর হোসেন ভাইয়ের কথা যে খুব বেশি মনে আছে, তা নয়। কিন্তু এটা মনে আছে যে ৯ নভেম্বর রাতেই আব্বা বলছিলেন, দেশের অবস্থা ভালো নয়, আগামীকাল কিছু একটা হতে পারে। নূর হোসেন ভাই বাসায় থাকতেন না, ডিআইটির কাছে একটা জায়গায় থাকতেন। এক অজানা উদ্বেগ ও আশঙ্কা থেকে ১০ নভেম্বর সকালে ফজরের নামাজ পড়েই আব্বা ও আম্মা নূর হোসেন ভাইয়ের আস্তানায় চলে যান। পরে তাঁদের মুখে শুনেছি, তাঁদের দেখে নূর হোসেন ভাই আঁতকে ওঠেন, তড়িঘড়ি করে শরীরটা চাদরে মুড়ে দেন। কিন্তু আব্বা ঠিকই খেয়াল করেছিলেন, ভাইয়ের বুকে কী যেন লেখা আছে। তাঁরা ভাইকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে বাসায় আনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তবে বাসায় ফেরার সময় আব্বার মনে এক অজানা আশঙ্কা ঘনীভূত হতে থাকে। নূর হোসেন ভাইও অনেকটা পথ তাঁদের এগিয়ে দিয়ে যান। আর তারপরের ইতিহাস আপনারা সবাই জানেন।
এখনো ছবি দেখে ভাইয়ের মুখটা মনে পড়ে, চাক্ষুষ স্মৃতি অনেকটাই ঘোলাটে হয়ে গেছে। নূর হোসেন ভাইকে সব সময় খুব রাগী মনে হতো। মনে হতো তিনি কিছু একটা খুঁজছেন আর সেটা না পেলে বাড়ি ফিরবেন না। হ্যাঁ, তিনি গণতন্ত্রের খোঁজে পথে নেমেছিলেন, সেই পথ তাঁকে জীবন থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে।
আমার ভাই দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছেন, সে জন্য আমরা গর্বিত। আমার আব্বা যত দিন জীবিত ছিলেন, তত দিন তিনি নিজের শহীদ পুত্রকে নিয়ে গর্বই করতেন। আমরা গরিব ছিলাম কিন্তু আব্বা কখনো নিজের মৃত ছেলেকে বিক্রি করেননি, কারও দরজায় গিয়ে ধরনা দেননি। আমরা গর্বিত, ১০ নভেম্বর দেশে এখন নূর হোসেন দিবস পালিত হয়। দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান ভাইকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। এ গর্ব কতজনের ভাগ্যে জোটে।
তবে আজ বুকের মাঝখানটা হাহাকার করে ওঠে: যে গণতন্ত্রের জন্য আমার ভাই জীবন দিলেন, সেই গণতন্ত্র আজ কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলতে পারি না। কিন্তু দেশের সার্বিক অবস্থা ভালো নয়, সেটা বলতে পারি। আমি মনে করি, দেশের সব মানুষ যদি ভালোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারে, তাদের জীবনের নিরাপত্তা থাকে, তাহলে সেটাই গণতন্ত্র। আমরা সেই গণতন্ত্রই চাই। এই গণতন্ত্র বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে, দেশের মধ্যে বিভেদ থাকলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
আব্বা মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগেই বড় ভাই আলী হোসেনের কাছে দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘ছেলেটা যা চেয়েছিল, তা তো হলো না। এখনো দেশে এত হানাহানি, এত সন্ত্রাস!’
অভাবের সংসার ছিল আমাদের। আব্বার রোজগারের সঙ্গে বড় ভাই আলী হোসেন ও নূর হোসেন রোজগার করতেন, তাঁরাও সংসারে টাকা দিতেন। নূর হোসেন ভাই মারা যাওয়ার পর আব্বা এ নিয়ে কখনো আক্ষেপ করেননি, বরং শেষ দিন পর্যন্ত ছেলেকে নিয়ে গর্বই করতেন। মারা যাওয়ার আগে আব্বা কাউকে চিনতে পারতেন না, কিন্তু নূর হোসেন ভাইয়ের ছবি দেখলে তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠত।
দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অনেকেই জীবন দিয়েছেন। কিন্তু আমরা তাঁদের সবাইকে মনে রাখিনি। সেদিক থেকে আমরা ভাগ্যবান, আমার ভাইকে আপনারা সবাই মনে রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রীও আমাদের খোঁজখবর নেন। এমনকি আমার বড় ভাই আলী হোসেন এখন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত গাড়ির চালক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি আমাদের মিরপুরে মাজার রোডে একটি জমি দিয়েছেন, ফলে আমরা এখন একরকম ভালোই আছি। একইভাবে আমাদের অন্য শহীদদেরও স্মরণ করতে হবে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে আমার আব্বা ও আম্মাকে অনেক সভা-সেমিনারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাঁরা সেখানে এই কথাই বলেছেন।
এর সঙ্গে আমি আরেকটি কথা বলতে চাই। আমার ভাইসহ যাঁদের এভাবে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, আমরা তাঁদের হত্যার বিচার চাই। বিচার হলে আমরা অন্তত বলতে পারব, তাঁদের আত্মা শান্তি পেয়েছে। আর বিচার হওয়াটাও গণতন্ত্রের অন্যতম মানদণ্ড।
অনুলিখন: প্রতীক বর্ধন
শাহানা বেগম: শহীদ নূর হোসেনের বোন।

রাজনীতির ধারা বদলায়নি - রাশেদ খান মেনন by মিজানুর রহমান খান

রাশেদ খান মেনন, পর্যটনমন্ত্রী,
সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি
প্রথম আলো: তিন জোটের রূপরেখায় নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি ছিল। ২৫ বছর পর কীভাবে দেখছেন?
রাশেদ খান মেনন: ওই রূপরেখায় ‘সার্বভৌম’ সংসদের কথা ছিল। দ্বিতীয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ চলবে। তৃতীয় ছিল অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর। এই রূপরেখা তার জন্মেই হোঁচট খেল। বেগম খালেদা জিয়া জামায়াতকে সঙ্গে নিলেন। পর্দার আড়ালে আগেই আঁতাত করেছিলেন।
প্রথম আলো: রূপরেখায় সংসদীয় পদ্ধতি কেন ছিল না?
মেনন: ওটা আপস ছিল। কারণ, বিএনপি সংসদীয় গণতন্ত্র চায়নি। তাই রূপরেখায় উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে ‘সার্বভৌম’ কথাটি লেখা হলো। আমাদের মনে ছিল সংসদীয় গণতন্ত্র। সাহাবুদ্দীন সাহেব ধমকের সুরে বলেছিলেন, বিএনপি যদি সংসদীয় ব্যবস্থায় না ফেরে, তাহলে তিনি থাকবেন না।
প্রথম আলো: তার মানে আপনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে আওয়ামী লীগ একাই নয়, সাহাবুদ্দীন সাহেব ব্যক্তিগতভাবেও চাপ সৃষ্টি করেছিলেন?
মেনন: হ্যাঁ। তিনিই আমাদের ডেকে বললেন, আপনারা এ জন্য বিএনপির ওপর চাপ সৃষ্টি করুন। বড় দলগুলো এটা করবে না, এই ভাষাতেই বলেছিলেন। তবে সমস্যা বাধল অন্যত্র। আমরা বামেরা ছিলাম ১১ জন। বললাম, সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরলে সরকার গড়তে আমরা আপনাদের নিঃশর্ত সমর্থন দেব। বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগও হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এ জন্য আমাদের প্রতিÿক্ষুব্ধ হয়েছিল। কিন্তু ওদিকে বিএনপি জামায়াতকে টানল। আর এভাবে বিএনপি প্রথমেই বিশ্বাসঘাতকতা করল। প্রথমে তারা মিরপুরের উপনির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করল। এরপর মাগুরায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর কফিনের শেষ পেরেক হিসেবে দেখা দিল। এ কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সামনে এল।
প্রথম আলো: রেডিও-টিভির স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কি একেবারে ফুরিয়েছে?
মেনন: বিএনপির মন্ত্রী নাজমুল হুদা সংসদে বলেছিলেন, আমাদের খাসি আমরা আগা দিয়ে কাটব, না লেজ দিয়ে কাটব, তা আমাদের ব্যাপার। কমিশন হয়েছিল। পরে আসাফ্উদ্দৌলাহ্কমিশন ভালো রিপোর্ট দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নটা বাকি থাকল। শেখ হাসিনা দুটো বড় কাজ করেছেন। উন্মুক্ত আকাশনীতি নিলেন। আর এক লাখ টাকায় সিটিসেল মোবাইল ফোন কেনার অবসান ঘটালেন।
প্রথম আলো: ২৫ বছরে প্রেস ফ্রিডম কতটা এগোল?
মেনন: বাংলাদেশের প্রেস অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে স্বাধীন। এরশাদ আমলের সঙ্গে কোনো তুলনাই হবে না। হয়তো কিছুটা সেলফ সেন্সরশিপ আছে।
প্রথম আলো: সেটা অতীতের চেয়ে ব্যাপকতর কোনো মাত্রা পাচ্ছে কি?
মেনন: সরকারের তরফে কোনোভাবেই নেই, কোথাও হস্তক্ষেপ করা হয় না। তবে এখন তো ঘরানার পত্রিকার চল দেখি, তারা যদি ঘরানা মতে খবর লেখে, সে জন্য তো সরকারকে দায়ী করা যাবে না।
প্রথম আলো: ঘরানা কি গণতন্ত্রের পরিপূরক হচ্ছে?
মেনন: (হাসি) বলতেই হয়, সেটা কখনো হয় না।
প্রথম আলো: ব্যক্তি এরশাদ, না তাঁর শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন?
মেনন: শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
প্রথম আলো: কিন্তু তাতে বড় গলদ চোখে পড়ে। রাষ্ট্রপতি শব্দ মুছে প্রধানমন্ত্রী বসালেন। লাভ কী হলো?
মেনন: এই ত্রুটি বাহাত্তরের সংবিধানেই ছিল।
প্রথম আলো: কিন্তু বামেরা ঢালাওভাবে বাহাত্তরের সংবিধান পুনরুজ্জীবনে সোচ্চার থেকেছেন।
মেনন: দ্বাদশ সংশোধনী পাসের বিশেষ কমিটির একজন সদস্য ছিলাম। রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত কাজ হতো। কিন্তু বিএনপি এসব প্রশ্নে কখনো ছাড় দিতে রাজি ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর হাতে এককভাবে নির্বাহী ক্ষমতা রাখার সমস্যার বিষয়ে আমি ছাড়াও যত দূর মনে পড়ে সুধাংশু শেখর তুলেছিলেন। আমি ৭০ অনুচ্ছেদেরও সংশোধনী চেয়েছিলাম, উল্টো তারা সেটি আরও শক্ত করেছিল। দ্বাদশ সংশোধনী দলগুলোর সমঝোতার ফল।
প্রথম আলো: এটা সামনে কী করে তোলা যাবে?
মেনন: না তোলার কিছু নেই, কথা বলা যাবে। কিন্তু এখন যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, আমরা তো কতগুলো অভ্যস্ততার মধ্য দিয়ে যাই। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সেখান থেকে বেরোতে একটা বড় ধাক্কা লাগে। সেই ধাক্কা দেওয়ার মতো বাস্তবতা এখন নেই।
প্রথম আলো: কে বদলেছে, এরশাদ, না তাঁর শাসনব্যবস্থা? কেন এরশাদ আপনাদের পাশে?
মেনন: স্বৈরাচারের ফেলে যাওয়া জুতার মধ্যে আমাদের শাসকেরা তাঁদের পা ঢুকিয়ে হেঁটেছেন। যার কারণে আজ আমাদের এই পরিণতি। পিএসএফ হয়েছে এসএসএফ, সবটাই প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তবে এরশাদ সাহেব বদলেছেন। ছিয়াশিতে সংসদ বাতিলের আগে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরতে সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করেছিলেন। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সাক্ষ্য দেবেন যে সাকা চৌধুরী ও আনোয়ার জাহিদ তাঁর বিরোধিতা করেছিলেন। গত মন্ত্রিসভা বৈঠকে গল্পচ্ছলে পুরোনো দিনের কথা আলোচিত হয়েছিল।
প্রথম আলো: মওদুদ আহমদ লিখেছেন, বামেদের সমর্থন না পেয়েই বিএনপি জামায়াতকে কাছে টেনেছে।
মেনন: এটা ঠিক, তারা আমাদের সমর্থন চেয়েছিল। কিন্তু তিনি পুরোটা বলেননি। অধ্যাপক বি. চৌধুরীর উপস্থিতিতে এক বৈঠকে বিএনপি বলল, আমাদের আসন দেওয়া হবে। কিন্তু ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করতে হবে। আমরা বললাম, না, তা করব না। মজিদ উল হক চূড়ান্তভাবে ৩৫ আসন নিতে বললেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৫-দলীয় নেতারা তা নাকচ করলেন। পরে আওয়ামী লীগ দিতে চাইল ৬টি। আর নির্বাচনের পরে আমরাই প্রস্তাব দিলাম। কিন্তু বিএনপি তা মানল না। ততক্ষণে সাইফুর রহমান এবং এম কে আনোয়ার জামায়াতের সঙ্গে আপস করে ফেলেছেন।
প্রথম আলো: এরশাদের মতো কি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় আসা সম্ভব নয়?
মেনন: তিনি জামায়াত ছাড়বেন না। কারণ, তিনি সব সময় দক্ষিণপন্থীদের দিকেই থেকেছেন। শেখ হাসিনা ওপরে যা-ই করুন, শেষতক গণমুখী থাকেন। বেগম জিয়া বৃত্তের ভেতরে ষড়যন্ত্র করেন, আর ইতিমধ্যে জামায়াত তাঁকে জয় করে নিয়েছে। মওদুদ, খোকারা একসময় কর্তৃত্ব করেছেন, এখন হেরে গেছেন। বিএনপির সবচেয়ে খারাপ হচ্ছেন তারেক রহমান।
প্রথম আলো: বিএনপি-জামায়াতের ন্যুব্জ হওয়ায় সমাজে একটা রূপান্তর শুরু হয়েছে। আমরা ভালো কিছুর দিকে যাচ্ছি কি না?
মেনন: আপনি জানেন, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত, সেই সম্ভাবনা তো সব সময় রয়ে যাচ্ছে। এ বিপদ সব সময় থাকে। হ্যাঁ, বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম থেকে যদি কিছু বেরিয়ে আসতে পারে, রাজনীতির ধারা বদলাবে। এখনো সেটা দেখি না। গণজাগরণ মঞ্চ হঠাৎ আশা জাগিয়েছিল। আজ সত্য বলতে হয়, সেখানে চেতনাটা ছিল, কিন্তু এটা ছিল চামচে করে খাওয়ানো, বাইরে থেকে তাদের শক্তি জুগিয়েছিল, তাই হয়নি। আমরা কিন্তু শূন্য থেকে উঠে এসেছিলাম। তরুণেরা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে উঠে আসবে, তার অপেক্ষা করব।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
মেনন: আপনাকেও ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান

অপরিণত শিশুর জন্মহার বাড়ছে by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

বাংলাদেশে অপরিণত শিশুর জন্মহার বাড়ছে। বছরে মোট শিশু জন্মের ১৪ শতাংশ অপরিণত হয়ে জন্মায়। বছরে চার লাখ ৩৯ হাজার শিশু অপরিণত হয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্মায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৬ হাজার ১০০ জন নানা জটিলতার কারণে অকালে বা সরাসরি মারা যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অপরিণত হয়ে জন্মালেও খুব সহজ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব শিশুর মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। গর্ভকালীন উন্নত পরিচর্যা ও চিকিৎসার মাধ্যমে অপরিণত শিশুর জন্ম রোধ করা যায়। ঠিক কী কারণে অপরিণত শিশু জন্মায় তা বলতে না পারলেও সম্ভাব্য কিছু কারণের কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, এসব কারণ এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ৩৭ সপ্তাহের কম সময়ের আগেই অপরিণত শিশুর জন্মের হার ১৪ শতাংশ। এসব শিশুর ওজনও কম হচ্ছে। জন্মের সময়ে ২২ শতাংশ শিশুর ওজন আড়াই কেজিরও কম থাকে। অপরিণত বয়সে জন্ম নেয়া শিশুদের মধ্যে ছেলে ও মেয়ে অনুপাত ১ দশমিক ২ শূন্য। অর্থাৎ ছেলে ১ দশমিক ২ শূন্য হলে মেয়ে শিশু একজন অপরিণত বয়সে জন্ম নিচ্ছে। প্রতি বছর বাংলাদেশে ২৮ সপ্তাহেরও কম সময়ে জন্ম নেয় এমন শিশুর সংখ্যা ২২ হাজার।
অপরিণত শিশুর জন্মের সম্ভাব্য কিছু কারণ উল্লেখ করে শিশু বিশেষজ্ঞরা জানান, কিশোরী বয়সে বিবাহ বা বাল্যবিবাহ, সাধারণত একটি শিশু জন্মের দু’বছর আগে আরেকটি শিশুর জন্ম হলে, মা স্থুলকায় হলে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে, হাইপারটেনশন থাকলে, গর্ভাবস্থায় মা একলাম্পশিয়ায় (খিচুনি) ভুগলে, গর্ভাবস্থায় মা রান্নার ধোঁয়ায় কাজ করলে, অ্যাজমা, গর্ভকালীন অবস্থায় পানি আগে ভাঙলে, গর্ভ অবস্থায় রক্তপাত, হঠাৎ পড়ে যাওয়া, ধূমপান বা তামাক গ্রহণ করা, মায়ের রক্তশূন্যতা ইত্যাদি কারণে সন্তান অপরিণত হয়ে জন্মায় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। অপরিণত শিশু দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিবন্ধিতায় ভুগে থাকে।
কিভাবে ঝুঁকি কমানো যায়:  চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কিশোরী বয়সে গর্ভবতী হলে অপরিণত বয়সের শিশু জন্মের ঝুঁকি থাকে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে তা কমানো সম্ভব। কমপক্ষে দু’বছর অন্তর সন্তান নিলে এই ঝুঁকি এড়ানো যায় বলে চিকিৎসকরা মনে করেন। গর্ভকালীন সঠিক যত্নবান হওয়া, সময় মতো ক্লিনিকে চেকআপ এবং নিরাপদ ডেলিভারি বা প্রসব অপরিণত শিশুর জন্মদান কমাতে সাহায্য করে। বিশ্বব্যাপী গুণগত স্বাস্থ্যসেবাই পারে অপরিণত বয়সে জন্মানো শিশুর মৃত্যু ঠেকাতে। মায়ের বুকের দুধ, প্রত্যেক মা ও  তার শিশুর উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা এ ধরনের শিশুমৃত্যু রোধে কাজ করে। ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) অপরিণত বয়সের শিশু ও কম ওজনের শিশুকে সুরক্ষা দেয়ার অন্যতম পন্থা বলে তারা মনে করেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, ইনকিউবেটর নয়, মায়ের কাছে রেখেই অপরিণত শিশুকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে বাড়ি পাঠানো হচ্ছে। ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (সিএমসি) পদ্ধতির এ চিকিৎসা ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউনেটালজি বিভাগ, ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে অপরিণত শিশুকে মায়ের কাছে রেখেই, মায়ের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দিয়ে সাফল্য পাওয়া গেছে। এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত একটি পদ্ধতি। মায়ের কাছে থাকলে বা ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার থাকলে শিশু উষ্ণতা পায়। মা শিশুর অবস্থা বুঝতে পারেন। বাংলাদেশ ১৯৯০ সালের পরে সর্বপ্রথম দিনাজপুরে সিএমসি পদ্ধতি চালু করে।  রাজধানীর শিশু হাসপাতালে এই পদ্ধতি চালু হয় ২০১৩ সালে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল সিএমসি চালুর প্রস্তুতি নিয়েছে। এছাড়া, ঢাকার বাইরের জেলা শহরের হাসপাতালগুলোও ধারাবাহিকভাবে এই পদ্ধতি চালু করবে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। সমপ্রতি বিশ্বের উন্নয়নশীল ১৫টি দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার পদ্ধতিতে শিশু ইনকিউবেটরের চেয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে বা এ পদ্ধতি অধিক কার্যকর।
সাধারণত গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহের আগে জন্ম নেয়া শিশুকে অপরিণত শিশু বলছেন চিকিৎসকরা। আর এ ধরনের শিশুর স্বাস্থ্যগত অধিক সমস্যা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। বিশ্বে বছরে ১৫ মিলিয়ন তথা দেড় কোটি শিশু অপরিণত বয়সে জন্মগ্রহণ করে (মোট ডেলিভারির বা প্রসবের ৫ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশ)। আর পাঁচ বছরের মধ্যে যেসব শিশু মারা যাচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে এটাই সাধারণ কারণ বলে চিকিৎসকরা উল্লেখ করেছেন। বিশ্বে ২০১৫ সালে অপরিণত এক মিলিয়নের উপর  শিশু মারা গেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
কেইস স্ট্যাডি: ডা. তানভিরুল আলম ও ডা. ইমা দম্পতির একমাত্র অপরিণত বয়সের শিশুর জন্ম হয় চলতি বছরের ২৯শে জুন। অত্যন্ত ওজন কম হওয়ায় (৯শ’ ৮০ গ্রাম) ১লা জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)-এর নবজাতক আইসিইউতে (নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র) ভর্তি করা হয় শিশুকে। এরপর থেকে শিশুটি নানা সমস্যায় ভুগতে থাকে। শিশুটিকে নিয়ে বাবা-মা দীর্ঘ প্রায় দু’মাস অবস্থান করেন হাসপাতালটির নিউনেটালজি বিভাগে। সাবেক বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সহিদুল্লাহ ও একই বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আব্দুল মান্নানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল শিশুটি। রাজধানীর তেজগাঁওস্থ নাক, কান, গলা ইনস্টিটিউটে কর্মরত ডা. তানভিরুল জানান, তার বাচ্চা স্বাভাবিক জন্মের আড়াই মাস আগেই জন্ম নিয়েছে। অপরিণত বয়সে জন্ম নেয়ায় এক মাসের অধিক সময়ে শিশুটি ইনকিউবেটরে রাখা হয়। এক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তার শিশুটি ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ পদ্ধতিতে রাখার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই শিশুটিকে ইনকিউবেটরে, কখনওবা মায়ের কাছে কেএমসি পদ্ধতিতে প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা রাখা হতো। এতে শিশুটির শারীরিক অবস্থা দ্রুত উন্নতি হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ চিকিৎসক জানান, কেএমসি ইনকিউবেটরের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। এ সময়ে শিশুর শরীরের গরম, তাপমাত্রা কমে না কিন্তু স্বাভাবিক থাকে (হাইফোথারমিয়া), মায়ের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক তৈরি, শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার ক্ষেত্রে উন্নতি হতে থাকে। হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক গতি ফিরে পায়। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে মানানসই হয়ে ওঠে। চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সহযোগিতা এবং নার্সরা মায়ের মতো মমতায় সেবা-শুশ্রূষা দিয়েই তার বাচ্চাকে সুস্থ করে তুলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শিশু বিশেষজ্ঞ, বিএসএমএমইউর নিউনেটালজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আব্দুল মান্নান এই বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, কিশোরী বয়সে বিবাহ বা বাল্যবিবাহ, অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, গর্ভাবস্থায় পানি আগে ভাঙলে, গর্ভকালীন রক্তপাত, হঠাৎ পড়ে যাওয়া, ধূমপান বা তামাক গ্রহণ করা, মায়ের রক্তশূন্যতা ইত্যাদি কারণে অপরিণত শিশুর জন্ম হয়। কম বয়সে বিবাহ রোধ করা, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে গিয়ে চেকআপ করা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করলে অপরিণত শিশুর জন্ম কমানো সম্ভব বলে এই শিশু বিশেষজ্ঞ মনে করেন। তিনি আরও জানান, আমাদের বিভাগের আইসিইউতে ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে ৬০ শতাংশই হলো অপরিণত বয়সে জন্মা নেয়া শিশু। এই বিভাগে অপরিণত শিশু আসলে আমরা খুব জটিল না হলে ইনকিউবেটরে রাখি না। আমরা শিশুটিকে মায়ের কাছেই রাখি। মা শিশুকে আদর করে নিজের গায়ের সঙ্গে লাগিয়ে রাখেন। এতে করে শিশুটি মায়ের গায়ের উষ্ণতা পায় এবং বুকের দুধ পান করতে পারে প্রয়োজন হলে। শিশুটি কোন জটিলতায় ভুগলে মা-ই দ্রুত বুঝতে পারেন এবং চিকিৎসককে জানাতে পারেন। এতে শিশুটি দ্রুত সুস্থ হয়ে যায় এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে বাড়তি নার্সের প্রয়োজন হয় না। খরচের পরিমাণ অনেক কম হয়।

গণতন্ত্রের আন্দোলনে বিজয়ী দুই নেত্রী

শেখ হাসিনার ডান পাশে বর্তমান সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও খালেদা জিয়ার বাঁ পাশে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদার। ছবি: ইউসুফ সা’দ
দীর্ঘ ৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ১৯৯০ সালের এই দিনে গণ-আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার এইচ এম এরশাদের পতন হয়। আজ ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার পতনের ২৫ বছর। প্রায় সব রাজনৈতিক দল ওই সময় আন্দোলনে নেমেছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছিলেন ওই আন্দোলনের অগ্রভাগে।
বঙ্গভবনের দরবার হলে কথা বলছেন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। ছবি: ইউসুফ সা’দ
সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিকেরাও তাঁদের দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণকে ঘিরে গড়ে ওঠে আইনজীবীদের আন্দোলন। সামরিক ফরমানে সংবাদপত্র বন্ধ হওয়ায় সাংবাদিকেরাও রাস্তায় নামেন। আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের জোট ১৫ দল এবং বিএনপি ও কয়েকটি ডানপন্থী দলের জোট ৭ দল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অভূতপূর্ব সমঝোতায় পৌঁছায়। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া বৈঠক করে অভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলন পরিচালনার পথে অগ্রসর হন।
ফটো সাংবাদিকেরা ছবি তোলার সময় তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন শেখ হাসিনা। ছবি: ইউসুফ সা’দ
’৯০-এর ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন হওয়ার পর দেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। বঙ্গভবনে সেই শপথ অনুষ্ঠানে ছিলেন গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া।
কিছু একটা নিয়ে আলোচনার সময় হাস্যোজ্জ্বল শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া। পেছনে তাঁদের দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। ছবি: ইউসুফ সা’দ
আন্দোলনে বিজয়ী দুই নেত্রী সেদিন ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল। বসেছিলেন পাশাপাশি। তাঁদের সঙ্গে দলের নেতারাও ছিলেন। সেখানে আসা অতিথিদের সঙ্গে কথাও বলেছেন, কখনো কখনো হাসি-ঠাট্টায় মেতেছেন সাংবাদিকদের সঙ্গেও। সেদিন দুজনই পরেছিলেন ‘অফ হোয়াইট’ রঙের শাড়ি।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে কথা বলছেন শেখ হাসিনা। ছবি: ইউসুফ সা’দ

'ঘুমিয়ে পড়লেই আমার স্বপ্ন সত্যি হয়ে যায়'

মোহাম্মদ ইমরান খান। পেশা শিক্ষকতা। নিস্বার্থভাবে কাজ করা ভারতের রাজস্থানের ৩৬ বছর বয়সী এই শিক্ষক রাতারাতি 'তারকা' বনে গেছেন।
কিভাবে?
বলছি শুনুন।
তথ্য-প্রযুক্তির ওপর তিনি হাতে-কলমে কোনো শিক্ষা নেননি ইমরান খান। কিন্তু নিজের চেষ্টায় গত তিন বছরে তিনি সাধারণ জ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, ইতিহাস, ইংরেজি ও রাজস্থানের প্রশাসনিক সেবার ওপর ৫২টি অ্যানড্রয়েড অ্যাপস বানিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা কোনো খরচ ছাড়াই অ্যাপসগুলো ব্যবহার করছে।
অ্যানড্রয়েড ফোন থেকে 'প্লে-স্টোর' এ ক্লিক করে ‘gktalk’ লিখে সার্চ দিলেই শিক্ষামূলক এই অ্যাপসগুলো পাওয়া যাবে। এ পর্যন্ত তিন মিলিয়নেরও বেশি গ্রাহক অ্যাপসগুলো ডাউনলোড করেছেন। এর মধ্যে সাধারণ জ্ঞানের অ্যাপসটি ডাউনলোড হয়েছে সবচেয়ে বেশি, সাত লাখ বার।
মোহাম্মদ ইমরান খান। কখনো দেশের বাইরে পা না রাখলেও এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে তার নাম
সম্প্রতি ব্রিটেন সফরের সময় লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে এক ভাষণে মোহাম্মদ ইমরান খানের কাজের প্রশংসা করেন নরেন্দ্র মোদি। ভারত প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "আপনারা 'পত্রিকার শিরোনামে' এবং 'টিভিতে যা দেখেন' ভারতে তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু আছে। আমাদের আলওয়ারে (রাজস্থান) ইমরান খান আছেন!"
পরিবারের সাথে ইমরান
মোদির এ প্রশংসার পরই ইমরানের টেলিফোন বেজেই চলছে, বন্ধ আর হচ্ছে না।
সাবই ফোন করে 'মোদির ওই প্রশংসা বাক্য শোনাচ্ছেন'। টেলি-যোগাযোগ মন্ত্রী রবী শঙ্কর প্রসাদ তো রাষ্ট্রীয় টেলি-যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান 'ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড (বিএসএনএল) থেকে তাকে ফ্রি ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করেছেন।
এক স্বাক্ষাৎকারে গালফ নিউজকে তিনি বলেন, 'মোদি জি যখন লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে আমার প্রশংসা করছিলেন তখন আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এখন অবশ্য আমি বলতে পারি, আমি যখন ঘুমিয়ে পড়ি কখন আমার স্বপ্ন সত্যি হয়ে যায়।'
ভারতের একটি টিভি চ্যানেলকে
স্বাক্ষাৎকার দিচ্ছেন ইমরান খান
গালফ নিউজ : তাহলে আপনি কিভাবে এবং কার কাছ থেকে এ ঘটনা জানলেন? এবং এ কথা শোনার পর ওই মুহূর্তে আপনার অনভূতি কেমন ছিল?
ইমরান খান : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমার নাম উচ্চারণের পর পরই আমার বন্ধু রাজেশ লাওয়ানিয়া ফোন করেন এবং পুরো ঘটনা জানান। কিন্তু সত্যি করে বলতে, আমি ওর কথা বিশ্বাসই করিনি। ও তারপর আমাকে টিভি অন করে লাইভ টেলিকাস্ট দেখতে বলল। কিন্তু কোথাও না দেখতে পেয়ে আমি অনিচ্ছাস্বত্ত্বেও লেপটপ অন করলাম। আধা ঘণ্টা পর আমি ইউটিউবে ভাষণটি দেখলাম। এটি অবিশ্বাস্য একটি অভিজ্ঞতা ছিল! এর মধ্যেই আমার বন্ধু-বান্ধব ও সাংবাদিকদের ফোন আসতে শুরু করেছে।
গালফ নিউজ : আপনার পরিবারের অনুভূতি কেমন?
ইমরান খান : আমার বাবা কৃষক। আমরা চার ভাই, তিন বোন। আমাদের গ্রামে পড়াশোনার ভালো কোনো সুযোগ না থাকলেও মা-বাবা সব সময় অনুপ্রেরণা দিতেন। আমার বড় ভাই একটি কলেজের লেকচারার, বাকী দুই ভাই ইঞ্জিনিয়ার। মনে আছে শিক্ষক আমাকে বলতেন, বিজ্ঞানী হওয়ার সব গুণ তোমার আছে। তুমি বিজ্ঞানী হবে। কিন্তু মা-বাবা চাইতেন সংস্কৃতির শিক্ষক হই। সেই হিসেবে উচ্চ মাধ্যমিকের পর শিক্ষকতার ওপর দুই বছরের একটি প্রশিক্ষণ কোর্স করি। এবং ১৯৯৯ সালে শিক্ষকতা শুরু করি। এর পাশাপাশি বাকি পড়াশোনাও চালিয়ে যাই।
উল্লেখ্য, মোহাম্মদ ইমরান খান রাজস্থানের আলওয়াল জেলার খারেদায় ১৯৭৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। সরকারি স্কুল থেকে পড়াশোনার পর ২০০১ সালে রাজস্থান ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরে ইংলিশে মাস্টার্স (২০০৪) এবং ইকোনমিকসের (২০০৬) ওপর ডিগ্রী নেন।
গালফ নিউজ ইন্ডিয়া অবলম্বনে সাবরিনা সোবহান

রাশিয়া-তুরস্ক উত্তেজনা: পুতিন কতটা খেপেছেন? by মশিউল আলম

সিরিয়ার আকাশে একটা রুশ বোমারু বিমান তুর্কিরা ভূপাতিত করেছে বলে মস্কোর লোকজন রেগে গিয়ে সেখানকার তুর্কি দূতাবাসে ঢিল, রং ইত্যাদি ছুড়ে মেরেছে। ডিমও বাদ রাখেনি। ডিমগুলো তুর্কি হাঁস-মুরগির ডিম হতে পারে। এবং এরপর আগামী কয়েক সপ্তাহ ডিমের কিছু ঘাটতি দেখা দিতে পারে মস্কোর বাজারে।
না, মস্কোর সব ডিম ওখানকার তুর্কি দূতাবাসের গায়ে ছুড়ে মারা হয়েছে—এ রকম খবর পাওয়া যায়নি। খবর হলো, রুশ সরকার ঘোষণা করেছে তুরস্ক থেকে আর কোনো পোলট্রি পণ্য কেনা হবে না।
ডিম ছোট্ট একটা উদাহরণ। রাশিয়ার পোলট্রি ও কৃষিজাত আমদানি-পণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে তুরস্ক থেকে। কিন্তু ব্যাপার শুধু এই খাতেই সীমাবদ্ধ নয়।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাশিয়ার নাগরিকদের তুরস্ক সফরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বলেছে, তুরস্ক এখন রুশিদের জন্য মিসরের মতোই নিরাপত্তাহীন। সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার সব পর্যটন কোম্পানি তুরস্কে পর্যটক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। পর্যটন প্যাকেজের বুকিং বাতিল করা ও উড়োজাহাজের টিকিট ফেরত দেওয়ার ধুম লেগেছে। বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছে তুরস্কের পর্যটন ব্যবসা। দেশটির পর্যটন খাতের মোট রাজস্বের ১২ শতাংশ আসে রুশ পর্যটকদের কাছ থেকে। ২০১৪ সালে ৪৪ লাখ রুশ পর্যটক তুরস্কে বেড়াতে গিয়েছিলেন। এ থেকে তুরস্ক আয় করেছে ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ বছরের প্রথম নয় মাসে ২৭ লাখ ৮০ হাজার রুশ নাগরিক তুরস্ক সফর করেছেন। এখন রুশিরা তুরস্কে বেড়াতে যাওয়া বন্ধ করলে দেশটি ২.৭৭ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে।
রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের আরও অনেক বড় বড় ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে। রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা তুরস্ক। তুরস্কের মোট গ্যাস-চাহিদার ৬০ শতাংশ মেটায় রাশিয়া। রাশিয়ার গ্যাস ছাড়া তুরস্কের অর্থনীতি স্রেফ ভেঙে পড়বে। রাশিয়ার রোসআতম কোম্পানি তুরস্কে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। ওই কেন্দ্রের চারটি রিঅ্যাক্টর মোট ৪৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।
বিগত বছরগুলোতে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমশ বেড়েছে। কখনো কখনো দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক শীতল হয়েছে, আবার কিছু সময় পরে তা কেটেও গেছে। এভাবে গত দেড় দশকে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় আট গুণ। ২০০১ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪.৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। তুরস্ক ন্যাটো জোটের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ার সঙ্গে তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ক্রমেই বাড়ছিল। গত বছর ক্রিমিয়া ও ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও তার ইউরোপীয় মিত্রদেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করলে রুশ অর্থনীতি বেশ সংকটে পড়ে যায়। নভেম্বরের শেষে রুশ প্রেসিডেন্ট তুরস্ক সফরে যান। তখন দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি খাতে বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তুরস্কের কাছে গ্যাসের দাম ছয় শতাংশ কম নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন পুতিন। তুরস্ক আরও তিন বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস চাইলে তাতেও তিনি সম্মতি দেন। দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ২০২০ সালের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৩৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেন।
ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে বিরাট মতপার্থক্য আছে। বিশেষত ইউক্রেন ও সিরিয়ার ব্যাপারে তুরস্কের অবস্থান রাশিয়ার অবস্থানের বিপরীতে। সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী সশরীরে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করার পর রুশ সামরিক বাহিনীর এটাই প্রথম নিজ ভূখণ্ডের বাইরে যাওয়া। সুতরাং বাশার আসাদের পক্ষে পুতিনের অবস্থানের দৃঢ়তা খুবই স্পষ্ট। অন্যদিকে তুরস্ক বাশারের পতন চায়; তার এই চাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আমেরিকা ও তার মিত্রদের ইচ্ছার অনুকূল। ন্যাটো জোটের সদস্য তুরস্ক ওই অঞ্চলে বস্তুত তাদের ইচ্ছামাফিক আচরণ করতেই বাধ্য। তার নিজের লাভের মধ্যে যা হচ্ছে তা হলো, ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিয়ে ইসলামিক স্টেট যে তেল তুরস্ক সীমান্ত দিয়ে চোরাই বাজারে বিক্রি করছে, তা অতি সস্তায় পাচ্ছে তুরস্ক।
কিন্তু এর মধ্যে কেন তাকে রুশ বোমারু বিমান ভূপাতিত করতে হবে, ইচ্ছা করেই সে তা করেছে নাকি ভুলবশত—
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই পাওয়া কঠিন। এমন অদূরদর্শিতা পাগলামির শামিল এবং তা বিস্ময়কর রকমের অস্বাভাবিক। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত খবর: পুতিন তুরস্কের দুঃখ প্রকাশের অপেক্ষা করছেন। আর এরদোয়ান বলেছেন, তুরস্ক রাশিয়ার প্রতিক্রিয়ায় ‘বিচলিত’।
এ কথা ঠিক যে ঘটনার পরপরই তুরস্ক রাশিয়ার ‘পিঠে ছুরি মেরেছে’ বলে ভ্লাদিমির পুতিন যে উত্তাপ ছড়িয়েছেন, তাতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবে না। অবশ্য রাশিয়ার স্পুৎনিক নিউজ এক মার্কিন পর্যবেক্ষকের এমন মন্তব্য প্রকাশ করেছে যে, ‘ন্যাটোর উন্মাদ’ এরদোয়ান রুশ বোমারু বিমান ভূপাতিত করার মধ্য দিয়ে সামরিক আক্রমণ শুরু করেছে একই সঙ্গে মস্কো ও দামেস্কের বিরুদ্ধে। এরদোয়ানের এই ‘উন্মাদনা’ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ উসকে দিতে পারে। আবার, পুতিনের রাশিয়ায় জাতীয়তাবাদী আবেগের প্রবল বহিঃপ্রকাশের মধ্যেই সুস্থির বুদ্ধি-বিবেচনারও প্রকাশ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। মস্কোর অন্যতম জনপ্রিয় পত্রিকা ভজগ্লিয়াদ বৃহস্পতিবার লিখেছে, রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে কার লাভ হবে—এটা মাথায় রাখা দরকার। নিশ্চিতভাবেই মস্কোর নয়, এবং আঙ্কারারও নয়।
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়ায় এরদোয়ানের ‘বিচলিত’ হওয়ার খবর যদি সত্য হয়, উত্তেজনা নিশ্চিতভাবেই কমে যাবে। অবশ্য লন্ডনের গার্ডিয়ান বৃহস্পতিবার সকালেই লিখেছে, রাশিয়ার দিক থেকে যে শোরগোল ও উত্তেজনা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে না।
কিন্তু ভ্লাদিমির পুতিন ও রাশিয়ার জনগণ তুরস্কের ওপর সত্যিই ক্রুদ্ধ হয়েছেন। তাঁদের গৌরবে চোট লেগেছে। এটা ভালো খবর নয়। না তুরস্কের জন্য, না রাশিয়ার জন্য।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

জলবায়ু নীতিতে বাস্তববাদিতা by অলিভার জেনডেন

জলবায়ু পরিবর্তনের রাশ টেনে ধরার জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, তার ধরন-ধারণে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯২ সাল থেকে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার মনোভঙ্গির আলোকে এই প্রচেষ্টা চলছিল, তার জায়গায় এখন ধীরে ধীরে নিচ থেকে মতামত গ্রহণের মডেল চলে এসেছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস করার জন্য আইনি মডেলের বদলে এখন চেষ্টা করা হচ্ছে, সব দেশ যেন আলাদাভাবে অঙ্গীকার করে, তারা এই নিঃসরণ কতটা কমাবে।
এক অর্থে এটা আসলে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি, এই মনোভঙ্গি দিয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা হ্রাসে ২০১০ সালে জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অর্জন করা যাবে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত অগ্রগতির শম্বুকগতি দেখে মনে হয়, বিশাল পরিসরে চুক্তি করার চেয়ে প্রতিটি দেশের পৃথকভাবে অঙ্গীকার করাটা বরং বাস্তবসম্মত, কারণ এই বড় বড় চিন্তা কখনোই বাস্তবায়িত হয় না।
গত পাঁচ বছরে এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক আলোচনাকারীরা প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন, কিন্তু জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য অর্জনের জন্য আরও অনেক কিছু করতে হবে। ফলে বৈশ্বিক চুক্তি করতে আবারও ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক এই আলোচনা প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা বিনষ্ট হবে ভেবে কূটনীতিকেরা ভীত হয়ে লক্ষ্যমাত্রা বদলে ফেলেছেন।
সুনির্দিষ্টভাবে বললে, নিঃসরণ কমানোর মাত্রা বেঁধে দেওয়ার ব্যাপারটা সবার অলক্ষ্যেই বাদ পড়ে যাচ্ছে। ফলে পরিবেশের জন্য কোনটা কাঙ্ক্ষিত, সেটা আর এখন আলোচনার বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে যা অর্জনযোগ্য, সবার দৃষ্টি এখন সে দিকেই। অর্থাৎ আলোচনা প্রক্রিয়ার সম্ভাবনা ও বাধা কী কী, যার লক্ষ্য হচ্ছে অধিকাংশ দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ১৯৯৫ সালের ইউএন ক্লাইমেট চেঞ্জ সামিটের পরবর্তী পর্যায়ে উত্তরণের ধীরগতির কারণে ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেটের সব পক্ষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে তা ঐতিহাসিক সফলতা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
সে কারণে এই নভেম্বর ও ডিসেম্বরের প্যারিসে জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক সম্মেলনে যখন বিশ্বনেতা ও পরিবেশমন্ত্রীরা একত্র হচ্ছেন, তখন আর নিঃসরণ কমানোর বহুল কথিত আইনি বাধ্যবাধকতাসম্পন্ন চুক্তি করা বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে না। বিশ্বের শীর্ষ তিন নিঃসরণকারী অর্থাৎ চীন, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটা পরিষ্কার করে বলেছে, তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তারা যেহেতু নিজেদের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে ফেলেছে, সেহেতু তারা আর বহুপক্ষীয় সমঝোতা করবে বলে মনে হয় না।
নিঃসরণ কমানোর মাত্রা বেঁধে দেওয়ার ব্যাপারটা সবার অলক্ষ্যেই বাদ পড়ে যাচ্ছে। ফলে পরিবেশের জন্য কোনটা কাঙ্ক্ষিত, সেটা আর এখন আলোচনার বিষয় নয় নিশ্চিতভাবে কিছু কূটনীতিক এ কথাটা খুব পরিষ্কারভাবে বলবেন। সেটা করলে তাঁরা যে গত ২০ বছরে ব্যর্থ হয়েছেন, সেটা স্বীকার করে নেওয়া হবে। এর বদলে তাঁরা যে নিচ থেকে মতামত নেওয়ার মনোভঙ্গি তৈরি করেছেন, সেটা আসলে আগের ওপর থেকে আরোপিত কাঠামো থেকে শুধু বেরিয়ে আসা নয়, এটা এক বাস্তবসম্মত সম্পূরণী, যার মধ্যে শীর্ষ নিঃসরণকারীরা জায়গা পাবে। এর মাধ্যমে বড় শহর ও কোম্পানির মতো সত্তাগুলোর জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক কিছু করার কাঠামো সৃষ্টি হবে।
কিন্তু সত্য হচ্ছে মানুষ এই ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার মনোভঙ্গিটি ইতিমধ্যে ত্যাগ করেছে। এটা পরিষ্কার যে প্যারিস সম্মেলনে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে না, বা অন্য কোনো কঠোর আইনি বিষয়েরও সমাধান হবে না।
১৬০টি দেশের নিঃসরণের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা একত্র করা হলে তাদের ব্যর্থতার মাত্রা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এমনকি সব দেশ যদি খুব কঠোরভাবে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালন করে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলেও সেটা সম্ভব হবে না।
হ্যাঁ, প্যারিস সম্মেলনের ঘোষিত লক্ষ্য হবে ‘২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্যমাত্রাকে আয়ত্তের মধ্যে রাখা’। কূটনীতিকেরা পরিকল্পনা করছেন, তাঁরা এমন এক প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন, যাতে ধারাবাহিকভাবে আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়। যার কারণে হতাশাজনক ফলাফলের গতিমুখ পাল্টে ইতিবাচক ধারায় প্রবাহিত হবে, আর অধিকতর উচ্চাকাঙ্ক্ষী নীতির আশা জিইয়ে থাকবে।
তথাপি, আশাবাদের আরও কারণ রয়েছে, কারণ আদর্শবাদের চেয়ে বাস্তববাদ আরও শক্তিশালী। বহুদিন ধরে বহু চেষ্টার পরেও এই ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার মনোভঙ্গি পরিষ্কারভাবেই কাজে আসেনি, ফলে নিচ থেকে মতামত নেওয়ার মনোভঙ্গি গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে এটা নীরবে মেনে নেওয়া হলো যে কোনো দেশকে জোর করে কিছু মানানো যায় না, তা সে যতই বৈজ্ঞানিক তথ্য–প্রমাণসমৃদ্ধ হোক না কেন।
এদিকে স্বেচ্ছাপ্রসূত পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে ইতিমধ্যে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সমন্বিত অঙ্গীকার করেছে। এই নিচ থেকে মতামত নেওয়ার মনোভঙ্গি সার্বভৌম দেশগুলোর কাজ করার ধরনকে শ্রদ্ধা করে বলে এমন সম্ভাবনা আছে যে এটা ইতিবাচক গতি সৃষ্টি করতে পারে। অধিকাংশ সরকারই আসলে রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক সফলতাকে গুরুত্ব দেয়, ফলে এই দেশগুলো যদি জানতে পারে যে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরাও এই কাজে হাত দিয়েছে, তাহলে তারাও জলবায়ু পরিবর্তনের রাশ টেনে ধরার কাজে হাত লাগাবে।
এখন ভারসাম্য করলে দেখা যাবে, এই নিচ থেকে মতামত নেওয়ার মনোভঙ্গির বিকাশ আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আগামী দিনের পৃথিবী যদি আজকের চেয়ে ৩ ডিগ্রি বেশি গরম হয়, তাহলে সেটা আদর্শ পৃথিবী থেকে অনেক দূরে চলে যাবে। কিন্তু সেটা জলবায়ু পরিবর্তনের গতি-প্রকৃতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাওয়ার চেয়ে ভালো।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
অলিভার জেনডেন: জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ইউরোপীয় ইউনিয়ন গবেষণা বিভাগের প্রধান।