Monday, August 3, 2015

বিএনপিতে নেই বিএনপি! by সোহরাব হাসান

দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সবকিছুই এখন রহস্যজনক বলে মনে হয়। দলের বেশির ভাগ নেতা বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলখানায় কিংবা গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে থাকলেও কোনো কোনো নেতার প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো, দলের সাংগঠনিক সভা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে যোগদান নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাহলে কি এসব নেতার সঙ্গে সরকারের সমঝোতার ‘অলিখিত’ চুক্তি আছে? চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার পর সাদেক হোসেন খোকার মামলা সচল হলো। কিন্তু তিনি দেশে থাকতে কেন তাঁর বিরুদ্ধে আনা মামলা গতি পেল না?
সাদেক হোসেনকে হটিয়ে মির্জা আব্বাস মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক পদটি দখল করলেও সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির। শুরু থেকেই সদস্যসচিব হাবিব–উন–নবী খানের সঙ্গে তাঁর বনিবনা হচ্ছিল না। সিটি নির্বাচনের আগমুহূর্তে মির্জা আব্বাস ‘হঠাৎ প্রকাশিত’ হয়ে আবার অন্তরালে চলে গেছেন। সে সময় তিনি নিজে কেন উচ্চ আদালতে জামিনের শুনানি পিছিয়ে দিয়েছিলেন, তা রহস্যজনক। গত জানুয়ারি থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারাগারে। কিন্তু চেয়ারপারসন ভারপ্রাপ্তের অনুপস্থিতিতে কাউকে ‘ভার’ দেননি। তাঁর মুক্তির দাবিতে দলের তেমন কর্মসূচিও দৃশ্যমান নয়। অবৈধ প্রবেশের দায়ে মেঘালয়ে বন্দী সালাহ উদ্দিন আহমদকে দেখতেও দলের গুরুত্বপূর্ণ কোনো নেতা সেখানে যাননি। এ কারণেই বলা হয়, বিএনপিকে এখন বাঁচিয়ে রেখেছেন খন্দকার মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে একদল আইনজীবী। এর বাইরে ম্যাডামের ইফতার অনুষ্ঠান ছাড়া কোনো তৎপরতা নেই।
৫ জানুয়ারি-পরবর্তী ‘নিষ্ফল’ অবরোধ কর্মসূচির দায় এখন কেউ নিতে চান না। দলের কোনো কোনো জ্যেষ্ঠ নেতার দাবি, এ কর্মসূচি নেওয়ার আগে কোনো দলীয় ফোরামে আলোচনা হয়নি। আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ঘোষণাও করা হয়নি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘অবরোধ চলবে।’ যতদূর জানি বিএনপির লাগাতার অবরোধ কর্মসূচিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়নি। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের সময় বিএনপির নেতারা এই দুই শহরের বাসিন্দাদের জন্য অবরোধ শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর কোনো বার্তা নেই।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, যদি বিএনপির দলীয় ফোরামে ‘সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে’ সিদ্ধান্ত না-ই হয়ে থাকে, তাহলে সিদ্ধান্তটি কে নিলেন? খালেদা জিয়া এককভাবে নিয়েছেন, না লন্ডনপ্রবাসী তারেক রহমান? না চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের অতি উৎসাহী কর্মকর্তারা? দুই বছর ধরে তারেক রহমান লন্ডনে বসে বেলাগাম কথাবার্তা বলে যাচ্ছেন, আর দেশের ভেতরে বিএনপির কর্মীরা সরকারের দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন। অথচ দলীয় নীতি-পরিকল্পনা ও কর্মসূচি সম্পর্কে বিএনপির অধিকাংশ নেতা-কর্মী অন্ধকারে। এভাবে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন চলতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন খোদ বিএনপির নেতারাই। তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি, একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দেশ শাসনের পাশাপাশি বিএনপির লাগাতার অবরোধও চলছিল ব্যক্তিবিশেষের খেয়ালখুশিমতো। কর্মসূচির যৌক্তিকতার চেয়েও সামনে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হলো, দেশব্যাপী লাগাতার অবরোধ চালানোর জন্য কোনো প্রস্তুতি কি বিএনপির ছিল? না জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের ওপর নির্ভর করেই এই কর্মসূচি দিয়েছিলেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব? দুই দলের এজেন্ডা বা লক্ষ্য এক নয়।
লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির পর খালেদা জিয়া একবারই দলের নেতাদের নিয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করলেন ৭ জুলাই, যেখানে স্থায়ী কমিটির সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিলিয়ে ১৯-২০ জন উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকের আলোচনার বিষয় নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। দলের কোনো কোনো সূত্র বলেছে, দল পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যেই বৈঠকটি আহ্বান করা হয়। অন্যদের মতে, সন্দেহভাজন কয়েক নেতাকে সতর্ক করে দিতেই খালেদা জিয়া বৈঠকটি ডেকেছিলেন। বিএনপির সমর্থক বলে পরিচিত একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘খালেদা জিয়া নেতাদের এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে যদি কেউ সরকারের সঙ্গে হাত মেলাতে চায়, তাহলে যেন দল ছেড়ে দেয়।’ এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘সম্প্রতি খালেদা জিয়ার কাছে দলে ভাঙন ধরানোর এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য বার্তা পেয়েই তিনি নড়েচড়ে বসেন। তিনি জানতে পারেন, সৌদি আরবে ওমরাহ করতে গেলে এই তৎপরতা আরও বেড়ে যাবে। তাঁর অনুপস্থিতিতে চাপের মধ্যে থাকা ক্লিন ইমেজধারী সিনিয়র কয়েকজন নেতাকে সামনে এনে বিএনপির নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে কমপক্ষে ৬০-৭০ জন নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’ পত্রিকাটি আরও বলেছে, সদ্য কারামুক্ত একজনসহ আন্দোলনের সময় নিরাপদ দূরত্বে থাকা কয়েকজন নেতার ভূমিকা রহস্যজনক। (নয়া দিগন্ত, ১০ জুলাই, ২০১৫)
খালেদা জিয়া কারও নাম উল্লেখ না করলেও কয়েকজন সন্দেহভাজন নেতাকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আপনাদের কোনো কথা থাকলে দলীয় ফোরামে বলবেন। গণমাধ্যমে বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবেন না। বিএনপি জিয়ার পথেই চলছে।’ উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, মাহবুবুর রহমান ও মঈন খানের টেলিফোন কথোপকথন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ওই তিন নেতাই দলের বর্তমান হাল নিয়ে প্রচণ্ড হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, বর্তমান বিএনপিকে দিয়ে কিছু হবে না। বিএনপিকে জিয়াউর রহমানের ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। একই কথা বলেছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ও বর্তমানে বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীও।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান চীন ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলার যে পররাষ্ট্রনীতি নিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া তাঁর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেননি। চীন ও আরব বিশ্ব—কেউ মনে করে না আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি তাদের ভালো বন্ধু জামায়াতের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার পর থেকেই বিএনপিতে একধরনের অস্বস্তি লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে দলের অবস্থান অনেকে সহজভাবে নিতে পারেননি। কেননা, এই দলে এখনো অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন। তাঁরা চান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। দলের একাংশ মনে করে, পশ্চিমা শক্তি ও ভারতের সঙ্গে বিএনপির আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীই প্রধান অন্তরায়। গত জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের পর গুঞ্জন উঠেছিল যে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগও করতে পারে। কিন্তু খালেদা জিয়া জামায়াতে ইসলামীর ইফতার অনুষ্ঠানে গিয়ে এই বার্তাই দিলেন যে দুষ্ট লোকেরা যা-ই বলুক না কেন, বিএনপি ও জামায়াতের বন্ধন অটুট থাকবে। এরপর নামসর্বস্ব কয়েকটি ডানপন্থী দলের ইফতার অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি নতুন করে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেন। জবাবে আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরাও মাঠ গরম বক্তৃতা দিতে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে খালেদা জিয়ার বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করার কথা বলেন। খালেদা জিয়া কি সত্যি সত্যি গণ-অভ্যুত্থানের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন?
৫ জানুয়ারির পর থেকেই বিএনপির রাজনীতিতেও একধরনের অস্থিরতা চলছে। তারেক রহমান সেই অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে উসকানিমূলক কথাবার্তা বলে। দলের নেতা-কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, ‘উনি লন্ডন থেকে আবোলতাবোল কথাবার্তা বলেন, আর সরকারের খড়্গটি পড়ে আমাদের ওপর।’ এর প্রতিকার কী—জানতে চাইলে দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলেই অদৃশ্য শক্তি কাম্য নয়। বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন, দলের সমর্থক পেশাজীবীরা যেভাবে চিন্তা করেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান তার বিপরীতে। যাঁরা পেশাগত মর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে জি হুজুর জি হুজুর করেন, খালেদা জিয়া তাঁদেরই ডাকেন। পেশাজীবীদেরও যে আলাদা একটি সত্তা আছে, সেটি তিনি মানতে চান না। হয়তো কোনো নেত্রীই মানেন না।
বিএনপির চেয়ারপারসনের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও মধ্যম পর্যায়ের নেতাদের দূরত্ব ক্রমে অনতিক্রম্য হয়ে পড়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, দলকে টিকিয়ে রাখতে হলে খালেদা জিয়ার গুলশান অফিসকে ঘিরে যে ‘অনুগত’ ও ‘সাবেক’ বলয় তৈরি হয়েছে, তা থেকে তাঁকে বের করে আনা প্রয়োজন। এই চক্রটির কারণেই নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নেত্রীর দূরত্ব বাড়ছে। সন্দেহ-অবিশ্বাস ডানা মেলছে। সাধারণ কর্মী তো বটেই, কেন্দ্রীয় নেতারাও অনেক সময় গুলশান অফিসে গিয়ে তাঁর সাক্ষাৎ পান না। খালেদা জিয়ার সৌদি আরব সফর স্থগিত করার সিদ্ধান্ত সম্পর্কেও তাঁদের কিছু জানানো হয়নি। তাঁরা জেনেছেন গণমাধ্যম থেকে।
অবশ্য এবার খালেদা জিয়ার সৌদি বাদশাহর রাজকীয় মেহমান হওয়ার বিষয়টি খুব স্বস্তিদায়ক ছিল বলে মনে হয় না। তার আগেই প্রথম আলোয় উইকিলিকসের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশিত হয় যে শেখ হাসিনা সরকার অসন্তুষ্ট হবে—এই আশঙ্কায় আরাফাত রহমান কোকোর চিকিৎসা কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে খালেদার প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি সৌদি সরকার। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান চীন ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলার যে পররাষ্ট্রনীতি নিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া তাঁর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেননি। চীন ও আরব বিশ্ব—কেউ মনে করে না আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি তাদের ভালো বন্ধু।
সার্বিকভাবেই দেশের রাজনীতিতে এখন খরা চলছে। তবে সেই খরাটা বেশি অনুভূত হচ্ছে বিএনপিতে। দলের কেন্দ্রীয় ও মাঝারি পর্যায়ের অনেক নেতার সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তাঁরা খুবই হতাশ। এই হতাশা খানিকটা সরকারের দমন–পীড়নের কারণে, আর বাকিটা ২০১৩ সাল থেকে দলের ভুল নীতি ও ভুল কর্মসূচির কারণে। অর্থাৎ বিএনপিতে নেই বিএনপি!
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

ফাঁসিতে ঝুলতেই হলো মেমনকে by সৌম্য বন্দে্যাপাধ্যায়

ইয়াকুব মেমন
নজিরবিহীন আইনি লড়াইয়ের পর গত বৃহস্পতিবার সকালে ফাঁসি হয়ে গেল মুম্বাই বিস্ফোরণের অন্যতম অভিযুক্ত ইয়াকুব মেমনের। মহারাষ্ট্রের নাগপুর শহরের কেন্দ্রীয় কারাগারে ভোর সাড়ে ছয়টায় ফাঁসিতে ঝোলানো হয় ৫৩ বছরের এই সাবেক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে।
মুম্বাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ প্রায় একই সময়ে ঘটা মোট ১৩টি মারাত্মক বিস্ফোরণে ২৫৭ জন নিহত ও ৭১৩ জন আহত হয়েছিলেন। ইয়াকুব ছিলেন সেই ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনাকারী। ২০০৬ সালে আদালত ইয়াকুবসহ ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
দীর্ঘ ২২ বছর ধরে চলা এই মামলার শেষ দুই দিন নাটকীয় হয়ে ওঠে ঘটনার ঘনঘটায়। বিশেষ আদালতের রায় সুপ্রিম কোর্ট বহাল রাখলে রায় পর্যালোচনার আবেদন জানান ইয়াকুব। পর্যালোচনার পরেও আদালত রায় অপরিবর্তিত রাখলে ইয়াকুব প্রাণভিক্ষার আবেদন জানান রাষ্ট্রপতির কাছে। রাষ্ট্রপতি সেই আরজি খারিজ করে দিলে তিনি আবার রায় পর্যালোচনার দাবি জানান। ১০ দিন ধরে চলা সেই প্রকাশ্য পর্যালোচনাতেও ব্যর্থ হয়ে ইয়াকুব দাখিল করেন ‘কিউরেটিভ পিটিশন’। এরপর সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির মধ্যে পদ্ধতিগত বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে কিউরেটিভ পিটিশনের দায়িত্ব তিন বিচারপতির এজলাসে পাঠানো হয়। বুধবার সন্ধ্যায় তিন বিচারপতি প্রাণদণ্ড বহাল রাখলে ইয়াকুব আবার রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন জানান। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় গভীর রাতে আবেদন অগ্রাহ্য করেন। ইয়াকুবের আইনজীবীরা মাঝরাতে সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম বিচারপতি দীপক মিশ্রর শরণাপন্ন হয়েছিলেন। রাত তিনটা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত শুনানির পর বিচারপতি আবেদন খারিজ করে দিলে নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী গতকাল সকাল সাড়ে ছয়টায় ফাঁসি দেওয়া হয় ইয়াকুবকে। মিছিল না করা, মৃতদেহের ছবি প্রচারমাধ্যমে না দেওয়া ও কবরস্থানে স্মৃতি মিনার না গড়ার শর্তে ইয়াকুবের মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ইয়াকুবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিয়ে ব্যাপক বিবৃতির লড়াই চলেছে। হায়দরাবাদের মজলিস ই ইত্তেহাদুল মুসলিমিন দলের নেতা লোকসভা সদস্য আসাউদ্দিন ওয়াইসি বলেন, রাজীব গান্ধীর খুনি, বাবরি মসজিদ ধ্বংসকারী বা গুজরাট দাঙ্গার খলনায়কদের ফাঁসি হলো না। অথচ ইয়াকুবকে মারা হলো। কংগ্রেস সাংসদ দিগ্বিজয় সিং ও শশী থারুর বলেন, সরকার দল, ধর্ম ও বর্ণ-নির্বিশেষে সন্ত্রাসীদের ফাঁসি দিয়ে দেখাক তারা সবার ক্ষেত্রে ন্যায় করে।
ইয়াকুবকে ধরা হয়েছিল নাকি তিনি আত্মসমর্পণ করেছিলেন, সেই বিতর্কের চূড়ান্ত মীমাংসা হয়নি। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাবেক কর্তা বি রামনের ধারণায় ইয়াকুব নেপালে ভারতীয় কর্তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন তদন্তে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে। যদিও তদন্তকারীরা তা অস্বীকার করেন।
অ্যামনেস্টির নিন্দা: ইয়াকুব মেমনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গতকাল এক বিবৃতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনাটিকে নিষ্ঠুর ও অমানবিক হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি।

তাদের কাছে কালাম একজন ত্রাণকর্তা

গোটা ভারত অমূল্য এক রত্ন হারিয়ে শোকস্তব্ধ। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালাম ছিলেন ‘সর্বসাধারণের প্রেসিডেন্ট’। প্রেসিডেন্ট হলেও, দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি ছিলেন মাটির খুব কাছাকাছি। তিনি ভারতকে বদলে দিয়েছিলেন। এক শক্তিশালী ভারতের রূপকার আবদুল কালাম হতদরিদ্র জনগণের ডাকে সাড়া দিতেন আপনজনের মতোই। এরকমই দুটি ঘটনা প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা পিটিআই। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ওড়িশা প্রদেশের দূরবর্তী এক গ্রামের এক পিতৃ-মাতৃহীন অনাথ কিশোরীর রঙহীন, বিবর্ণ, কষ্টবিধুর জীবনকে তিনি পাল্টে দিয়েছেন। আজ সেই কিশোরী পরিণত তরুণী। ১০ বছর আগে ওই কিশোরী তার এইডস আক্রান্ত ভাইবোনকে নিয়ে দিশেহারা ছিলেন। তারপর কি ঘটলো তার জীবনে? ওই তরুণীর ভাষায়, আমার জন্য তিনি ছিলেন ত্রাণকর্তা। আমার ছোট ভাই ও বোন তাদের শরীরে এইচআইভি/এইডসের জীবাণু বহন করছিল। আমার আক্রান্ত সেই ভাই-বোনরা আজ বেঁচে আছে। কালাম চাচার যথাসময়ে হস্তক্ষেপকে ধন্যবাদ। তিনি না থাকলে হয়তো ওদের বাঁচাতেই পারতাম না। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। বুকটা ভেঙে যাচ্ছে কষ্টে। একবারের জন্যও তাকে আর কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেলাম না। ওই তরুণী তার নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। কেন্দ্রপাড়া জেলার ওলাভের গ্রামের ওই তরুণী স্মৃতিচারণ করছিলেন এভাবে- ডাকপিওন ২০০৫ সালের জুন মাসে তৎকালীন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ও ২০ হাজার রুপির একটি ড্রাফট আমাকে যখন দিলেন, আমি আনন্দে অভিভূত হয়েছিলাম। আমি কালাম চাচাকে আমার ভাইবোনের গুরুতর অবস্থার কথা জানিয়ে একটি চিঠি লিখেছিলাম। তিনি বলছিলেন, সে সময় আমার বয়স মাত্র ১১ বছর এবং আমার ভাইবোনের বয়স ৬ ও ৪ বছর। পিতা-মাতার মৃত্যু হওয়ায় তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। গণমাধ্যমে জেনেছিলাম যে, আবদুল কালাম সর্বসাধারণের প্রেসিডেন্ট। তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন। আমি তার কাছে একটি চিঠি লিখেছিলাম। সে সময় প্রেসিডেন্ট কালামের মধ্যস্থতায় স্থানীয় প্রশাসন পরিবারটিকে রক্ষায় এগিয়ে আসে। ওই তরুণী বলছিলেন, এরপর বিভিন্ন স্থান থেকে সাহায্য আসতে শুরু করে। মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও ২০ হাজার রুপির অর্থ-সহযোগিতা বরাদ্দ করা হয়। প্রেসিডেন্টের ইশারায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাও দয়াপরবশ হয়ে এগিয়ে এলেন। ওই তরুণী বলছিলেন, আমার ভাই ও বোনের প্রতি তারা আরও বেশি মনোযোগী হয়ে চিকিৎসা শুরু করলেন। আমার ভাইবোন গত এক দশক এইডসের বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়াই চালিয়ে গেছে। প্রেসিডেন্টের সহযোগিতা তাদের নবজীবন দান করেছে। আমরা তার প্রয়াণে গভীরভাবে ব্যথিত। আমার মনে হচ্ছে যেন আমি আমার পরিবারেরই ঘনিষ্ঠ কোন সদস্যকে হারিয়েছি। কালামকে রামনগর জেলার এক বাসিন্দা প্রফুল্ল মিস্ত্রিও প্রয়াত প্রেসিডেন্টের উপকারের কথা স্মরণ করলেন এবং তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করলেন। আমরা এ দেশের প্রকৃত নাগরিক। কিন্তু, প্রশাসন আমাদের বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং ২০০৫ সালের ১৫ই জানুয়ারি ভারত ত্যাগের নোটিস দিয়েছিল। আমরা দ্রুত তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কালামকে পোস্ট কার্ড পাঠাই। প্রফুল্ল বলছিলেন, প্রেসিডেন্ট এ ঘটনায় হস্তক্ষেপ করলেন এবং একটি রিপোর্ট চাইলেন। এক মাস পর আমাদের বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া স্থগিত করা হলো। আমরা বিশ্বাস করি যে, ইউনিয়ন সরকার আমাদের বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছিল প্রেসিডেন্টের হস্তক্ষেপের কারণে। প্রফুল্ল মিস্ত্রির ভাষায়, তার মৃত্যু আমাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি।

শিক্ষকের অমর্যাদা এবং সমাজের অন্ধকার by শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা, একজন কলেজ অধ্যাপককে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পা ছুঁয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয় যে, ৯ এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে বাক-বিতণ্ডাকে কেন্দ্র করে পিরোজপুর ভাণ্ডারিয়া সরকারি কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্রের অধ্যক্ষের কক্ষে অধ্যক্ষ ও ইউএনও’র উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে সহকারী অধ্যাপক মোনতাজ উদ্দিনকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পা ছুঁয়ে ক্ষমা চেয়ে নিজেকে রক্ষা করতে হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয় যে, সহকারী অধ্যাপক মোনতাজ উদ্দিনের পাঁচ বছরের জুনিয়র সহকারী কমিশনারের (ভূমি) (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) পা ছুঁয়ে ক্ষমা চাওয়াটা সহজেই মেনে নিতে পারছিলেন না বলেই, তিনি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচ বছরের মেয়ের মুখ তার চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তিনি তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করেন। আমরা সাধারণত কোনো সন্তান যদি তার মায়ের সঙ্গে কিংবা কোনো বখাটে ছেলে যদি কোনো ভদ্র মহিলার সঙ্গে বেয়াদবি করে, তখন আমরা বলে থাকি যে, সেই বেয়াদব বখাটে ছেলেটা কি কোনো মায়ের গর্ভে জš§গ্রহণ করেনি? ঠিক তেমনি কোনো আমলা যদি তার শিক্ষা-দীক্ষার নৈতিক অহংকার বিসর্জন দিয়ে কোনো শিক্ষকের সঙ্গে বেয়াদবি করে কিংবা কোনো শিক্ষককে যদি নিজের পা ধরিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন তখন কেউ যদি বলে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কি কোনো শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করেননি। যে শিক্ষিত লোক একজন শিক্ষকের সঙ্গে চরম বেয়াদবি করেন, তিনি তো শিক্ষিত সমাজে বসবাস করার যোগ্যতাই রাখেন না। আর যাদের সামনে কিংবা যারা একজন অধ্যাপককে একজন এসি ল্যান্ডের পা ছুঁয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছেন তারা তো এই দায় এড়াতে পারেন না। ইউএনও এবং কলেজ অধ্যক্ষের অর্থাৎ যাদের সামনে সহকারী অধ্যাপককে এসি ল্যান্ডের পা ছুঁয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছে, তাদেরও হতে হবে। কেননা তাদের উপস্থিতিতেই কিংবা বলা যায় তারাই সমাজের সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন শিক্ষককে এসি ল্যান্ডের পা ছুঁয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছেন। শুধু লেখাপড়া করে বড় চাকরি নিলেই যে ভদ্রলোক হওয়া যায় না, তার প্রমাণ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যকলাপ। লেখাপড়া না করেও ভদ্রলোক হওয়া যায়। অনেক সময় দেখা যায় লেখাপড়া না করে, রিকশা-সিএনজি চালিয়েও অনেক মননশীল, আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হওয়া যায়। আমাদের সমাজে এমন মানুষও বাস করেন, যারা মানুষের মঙ্গল কামনা করে থাকেন। আবার বিএ, এমএ অর্থাৎ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পাস করেও ভদ্রলোক হওয়া যায় না। ছোটকাল থেকেই শুনে এসেছি ভদ্রলোক হতে হলে, জ্ঞানের পবিত্র জলে তিন পুরুষের রক্ত ধৌত হয়ে পরিষ্কার হতে হয়। আগে নাকি চাকরি দেয়া হতো বংশের মর্যাদা দেখে। এ কথা কখনো বিশ্বাস করতাম না যে, তিন পুরুষ শিক্ষিত না হলে ভদ্রলোক হওয়া যায় না। এখন কিছু কিছু শিক্ষিত মানুষের কর্মকাণ্ড দেখে কেন জানি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে যে, তিন পুরুষ শিক্ষিত না হলে ভদ্রলোক হওয়া যায় না। এখানে যে কথা বলতে চাই, তা হলো শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মতোই আচরণ করতে হবে। তারা যদি অশিক্ষিত বর্বরদের মতো আচরণ করেন তাহলে আর মানুষ যাবে কোথায়। এখানে আরেকটি কথা বলতে চাই, একজন মানুষের কর্মকাণ্ড দিয়ে হয়তো বা সবকিছুর বিচার করা যায় না। ভদ্রলোক হতে হলে তিনপুরুষ শিক্ষিত হতে হবে, এটা বিশ্বাস করতে চাই না। কেননা প্রত্যেক ব্যক্তিই চান নিজেকে সুন্দরভাবে সমাজে উপস্থাপন করতে। করেও থাকেন। দু’একজন ব্যক্তির বর্বর কর্মকাণ্ডকে আমরা ধরে নিতে পারি কোনো বাঁদরের বিশেষ কর্মকাণ্ড। ফুলের বাগানে যদি কোনো বাঁদরকে ছেড়ে দেয়া হয়, সেই বাঁদর কি আর ফুলের বাগানের মূল্য বুঝবে। বাঁদরের কাছ থেকে তো আর মানুষের আচরণ আশা করা যায় না। আশা করাটাও বোকামি। যখন মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিরা অশিক্ষিত লোকের মতো আচরণ করবেন তখন একজন হৃদয়বান ব্যক্তি রাগে ক্ষোভে, অভিমানে বলতেই পারেন, অমানুষের মতো আচরণ করা লোকটির পারিবারিক ঐতিহ্যই বা কী। একজন ভালো বংশের মানুষ তিনি যতই দরিদ্র কিংবা কম লেখাপড়া জানা হোন না কেন, তিনি কিন্তু মানুষই থাকেন। তার কাছ থেকে মানুষের আচরণই মানুষ পেয়ে থাকে। একজন অধ্যাপককে অপমানকারী ব্যক্তিরা কি জানেন না একজন শিক্ষক হলেন সমাজের মানুষ গড়ার কারিগর? অর্থাৎ একজন শিক্ষককে যখন কোনো শিক্ষিত ব্যক্তি বা আমলা তার পা ছুঁয়ে মাফ চাইতে বাধ্য করবেন, তখন একজন হৃদয়বান ব্যক্তি বলতেই পারেন, উনি একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে অভদ্রের মতো আচরণ করলেন কেন। তার পরিবার থেকে কি তিনি এই শিক্ষা পাননি যে, একজন শিক্ষকের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়। কিংবা তার পরিবারের মধ্যে কি তিনি একাই শিক্ষিত ব্যক্তি। এমন প্রশ্ন কিংবা বক্তব্য যখন কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মনে আসবে কিংবা কেউ যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে নেতিবাচক বক্তব্য প্রদান করে, তখন কি সেই মানুষদের দোষ দেয়া যাবে। একজন আমলা যদি মনে করেন যে উনিই সমাজের সর্বেসর্বা, তাহলে বিরাট ভুল করবেন। কেননা সমাজের মানুষ এখন অনেক অগ্রগামী চিন্তা-চেতনা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ কথাটাও আমলাতান্ত্রিক সমাজের কর্তাব্যক্তিদের জেনে রাখা উচিত। এখন কেউ কারো প্রজা নয়। পরিশেষে আরেকটি কথা বলতে চাই, একজন বিসিএস ক্যাডারের লোককে আজকালের দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে লেখাপড়া করে আসতে হয়। প্রশ্ন হলো সংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ড অর্থাৎ অভিযুক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেও এই শিক্ষা পাননি যে, একজন শিক্ষকের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়? জানতে বড় ইচ্ছে করে, এটা কি তার ব্যর্থতা নাকি আমাদের সমাজের দলবাজি রাজনীতির ভয়াবহ চেহারা?
লেখক : আইনজীবী

১৬ হাজার ফুট উচ্চতায় ভারত-চীন সীমান্ত বৈঠক

ভারত ও চীনের পঞ্চম সীমান্ত বৈঠক হিমালয় পর্বতের ১৬ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ বিমানক্ষেত্র দৌলত বেগ ওলদাইতে (ডিবিও) অনুষ্ঠিত হয়েছে। এনডিটিভি জানিয়েছে, রোববার ভারতীয় কাশ্মীরের লাদাখ সীমান্তের ওই বিমানক্ষেত্রে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকটিতে ভারত ও চীনের সামরিক কমান্ডাররা উপস্থিত ছিলেন। ভারতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বৈঠকটিকে ‘জটিল’ বলে উল্লেখ করেছেন। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকটিতে টহলদার সীমান্তরক্ষীদের ‘অসাবধানতাবশত অনুপ্রবেশ’ ও তা নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসন করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা) কোনো ফল পাওয়া যায়নি। ২০১৩ সালে ডিবিও সীমান্তের ভারতীয় অংশ চুমুরে স্থাপনা তৈরি সময় চীনারা আপত্তি জানায়। এ নিয়ে সীমান্তে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
তিন সপ্তাহ ধরে দু’পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে থাকলে সীমান্তজুড়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়। উত্তর লাদাখের ১৬ হাজার ফুট উচ্চতার ডিবিও বিমানক্ষেত্রটি থেকে কারাকোরাম পাসের ওপর নজরদারি করা যায়। কাশ্মীরের লেহ ও চীনের শিনজিয়াংয়ের মধ্যে বাণিজ্যপথ হিসেবে পাসটি প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গত এক বছরে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত বৈঠকের নতুন যে দুটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে ডিবিও তার একটি। অপরটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের পূর্ব প্রান্তের জেলা আনজ-র কিবিথু। চলতি বছরের মে-তে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চীন সফরকালীন সময়ে ভারত ও চীনা সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে দু’দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমান্ত বৈঠকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সীমান্তে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে ভারতের নতুন বিজেপি সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি। ভারত-চীন সীমান্ত বিতর্ক দীর্ঘদিনের। পূর্ব ও পশ্চিম মিলিয়ে চীনের সঙ্গে ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত ভাগ করে ভারত। বেইজিংয়ের দাবি, সমস্যাটা মূলত পূর্ব সীমান্তেই সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ অরুণাচল প্রদেশের অংশ নিয়ে যে বিবাদ, যাকে চীন তিব্বতের অংশ বলে দাবি করে আসছে। কিন্তু ভারত পাল্টা জানিয়ে দেয়, সমস্যা রয়েছে পশ্চিমেও। নয়াদিল্লির মতে, ১৯৬২ সালের যুদ্ধে অকসাই চীনের যে অংশ বেইজিং দখল করে রেখেছে, সেই নিয়েও সমাধান প্রয়োজন।

সর্বদলীয় বৈঠক আজ

ভারতের পার্লামেন্টের চলমান অচলাবস্থা নিরসনে আজ (সোমবার) সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছে সরকার। বিরোধী দল কংগ্রেস বলেছে, সংকট কাটাতে হলে বিজেপির শীর্ষ তিন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি অবশ্যই আলোচ্যসূচিতে থাকতে হবে। এ বৈঠকের আগেই কৌশল নির্ধারণে সোমবার সকালে সংসদীয় দলের সঙ্গে বসবেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। খবর পিটিআই ও এনডিটিভির। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত লন্ডন পলাতক সাবেক আইপিএল চেয়ারম্যান ললিত মোদিকে সহায়তার অভিযোগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে এবং ব্যেপাম কেলেঙ্কারিতে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের পদত্যাগের দাবি কংগ্রেসসহ কয়েকটি বিরোধী দলের। এ দাবিতে চলতি বর্ষা অধিবেশনে পার্লামেন্ট অচল করে রেখেছে দলগুলো। অধিবেশনের তৃতীয় সপ্তাহে এসেও কোনো কাজই করতে পারেনি পার্লামেন্ট।
অথচ এ অধিবেশনেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। এ অচলাবস্থা কাটাতে সোমবার সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছে বিজেপি সরকার। তার আগে কংগ্রেস ওই নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে রাখার শর্ত জুড়ে দিল। শনিবার কংগ্রেস সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের এ অবস্থান জানান গোলাম নবি আজাদ। দলের মুখপাত্র আনন্দ শর্মা বলেন, ‘আমরা ছবি তোলা আর চা-স্যান্ডউইচ খাওয়ায় আগ্রহী নই। প্রধানমন্ত্রীকে আগে বলতে হবে আমাদের দাবির বিষয়ে তিনি কী ব্যবস্থা নেবেন।’ পার্লামেন্টে সর্বদলীয় বৈঠককে সামনে রেখে সোমবার সকালেই দলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বসবেন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। সেখানে পার্লামেন্টে দলীয় কৌশল নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। চলতি অধিবেশনে এটিই কংগ্রেসের প্রথম সংসদীয় দলের বৈঠক। অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই ওই দাবিতে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ অচল করে রেখেছেন কংগ্রেসের সংসদ সদস্যরা। তাদের হইচই, হট্টগোলের কারণে প্রতিদিনই দফায় দফায় অধিবেশন স্থগিত রাখতে হচ্ছে। কংগ্রেস বলছে তারাও কার্যকর সংসদ চায়, তবে আগে তাদের দাবির বিষয়ে সরকারকে প্রতিশ্র“তি দিতে হবে।

নিখোঁজ বিমানের দ্বিতীয় ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার

ফরাসি মালিকানাধীন ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ রিইউনিয়নের সৈকতে জোয়ারের সঙ্গে ভেসে আসা বিমানের আরেকটি খণ্ডাংশের সন্ধান পাওয়া গেছে। রিইউনিয়নের সেন্ট ডেনিস শহরের দক্ষিণ প্রান্তের সৈকতে বিমানের খণ্ডাংশটি আবিষ্কৃত হয় বলে রোববার জানিয়েছে বিবিসি। এবারে পাওয়া অংশটিকে একটি বিমানের দরজা বলে মনে করা হচ্ছে। খণ্ডাংশটি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটিতে বিদেশী কোনো ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে আর সম্ভবত কিছু ছবিও আঁকা আছে। বুধবার একই দ্বীপের সৈকতে বিমানের অপর একটি খণ্ডাংশ পাওয়া যায়। দুই মিটার লম্বা ওই খণ্ডাংশটি গত বছর রহস্যময়ভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মালয়েশীয় ফ্লাইট এমএইচ ৩৭০’র কিনা, তা নির্ধারণ করতে ফ্রান্সে পরীক্ষা চলছে।
সৈকতে পাওয়া বিমানের প্রথম খণ্ডাংশটি বোয়িং ৭৭৭ বিমানের অংশ বলে প্রাথমিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। অপরদিকে মালয়েশীয় এয়ারলাইন্সের হারিয়ে যাওয়া বিমানটিও ছিল বোয়িং ৭৭৭। ২০১৪ সালের মার্চে যাত্রী ও ক্রুসহ ২৩৯ জন আরোহী নিয়ে কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং যাওয়ার পথে রহস্যজনকভাবে পুরোপুরি উধাও হয়ে যায় মালয়েশীয় এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ ৩৭০। রাডারের তথ্যে বিমানটি নির্দিষ্ট রুট ছেড়ে পুরোপুরি উল্টোদিকে ভারত মহাসাগরের দিকে চলে যায় বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তারপর থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানেও বিমানটির কোনো হদিস আবিষ্কার করা যায়নি। ঘটনাটি বিশ্বের বিমান চলাচল ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য হয়ে রয়েছে। এখন ভারত মহাসাগর থেকে ভেসে আসা বিমানের এই খণ্ডাংশগুলোকে হারিয়ে যাওয়া মালয়েশীয় বিমানের ধ্বংসাবশেষ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

রাজধানীতে বাড়তি ৩০০ চিকিৎসক তবু চলছে পদায়ন by শেখ সাবিহা আলম

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ঢাকার বাইরে পাঠাতে চাইছেন। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, চিকিৎসকদের জন্য বদলির নীতিমালা হচ্ছে। কিন্তু, ঢাকায় সংযুক্তির নামে তিন শতাধিক বাড়তি চিকিৎসক থাকার পরও এ মাসের প্রথম ১৫ দিনে কমপক্ষে সাতজনকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছে। ঢাকায় এসব বাড়তি সংযুক্তি ও পদায়নের অন্যতম কারণ রাজনীতি—বলছে একটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান।
৮ জুলাই কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দুজনকে ঢাকার ৫০০ শয্যার মুগদা জেনারেল হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছে। সচিবালয় ক্লিনিকে সংযুক্তিতে থাকা চর্ম ও যৌন রোগের পরামর্শককে পদায়ন করা হয়েছে সচিবালয় ক্লিনিকেরই জ্যেষ্ঠ পরামর্শক হিসেবে। এ ছাড়া রক্তসঞ্চালন, প্রাণরসায়ন, নাক, কান, গলা ও মেডিসিন বিভাগে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে সংযুক্তিতে থাকা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়মিত পদে পদায়ন করা হয়েছে। জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিনে ঢাকা থেকে বাইরে বদলি হয়েছেন মাত্র একজন—সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকার সরকারি ১০টি হাসপাতাল ও চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে সংযুক্ত বাড়তি চিকিৎসকের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞ এসব চিকিৎসক নিজ বিষয়ের বিভাগে সংযুক্তি পাচ্ছেন। আবার কেউ সংযুক্তি পাচ্ছেন অন্য বিভাগেও।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া নথিতে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সংযুক্তিতে থাকা কমপক্ষে ২৫ জন চিকিৎসক সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাঁরা এক যুগের বেশি সময় ধরে ঢাকায় আছেন। অথচ নতুন মেডিকেল কলেজ ও জেলা-উপজেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ঢাকার বাইরের মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠানোর কথা বলে আসছেন।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রথম আলোকে বলেন, দেশের সব হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ থেকে তথ্য চাওয়া হয়েছে। বদলির একটি নীতিমালা করা হচ্ছে। নীতিমালায় চার বছর পরপর চিকিৎসকদের বদলির বিধান রাখা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ে চিকিৎসকদের বদলি-পদায়নের সঙ্গে যুক্ত কমপক্ষে তিনজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চিকিৎসকদের ধারাবাহিকভাবে ঢাকায় পাঠানোর বিষয়টি এখনো চিন্তাভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। এটা নিয়ে খুব দৌড়ঝাঁপ আছে, সে কথা বলা যাবে না।
চিকিৎসকদের সংযুক্তি বা বদলির বিষয়টি দেখভাল করে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর। সংযুক্তিতে থাকা চিকিৎসকেরা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে প্রথম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যোগ দেন। পরে অধিদপ্তর থেকে তাঁদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।
অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি চাকরিতে তিন বছর পরপর বদলির একটি প্রথা থাকলেও চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। সংযুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘জনস্বার্থ’ বিবেচনা করা হয়। তবে জনস্বার্থ বলতে আসলে কী বোঝায়, তার কোনো ব্যাখ্যা মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলতে পারেননি।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এহতেশামুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকায় সংযুক্তিতে থাকা চিকিৎসকের সংখ্যা বেশি। আমরা চাই ঢাকার বাইরে চিকিৎসকেরা সংযুক্তি নিয়ে যাক। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’
তথ্য অধিকার আইনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে পাওয়া কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত ৩০০ চিকিৎসকের মধ্যে কয়েকটি নির্দিষ্ট বিভাগের বিশেষজ্ঞদের ঢাকায় সংযুক্তির সংখ্যা বেশি। এই বিভাগগুলো হলো স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা, হৃদ্রোগ, অর্থোপেডিক সার্জারি, রেসপিরেটরি মেডিসিন, নিউরোসার্জারি ও শিশু। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগে পদের অতিরিক্ত ৩২ জন, হৃদ্রোগে ৩০ জন, অর্থোপেডিক সার্জারিতে ২৩ জন, রেসপিরেটরি মেডিসিনে ১৭ জন, নিউরোসার্জারিতে ১২ জন, সার্জারি ও শিশু বিভাগে ১০ জন করে অতিরিক্ত শিক্ষক আছেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া কাগজপত্রে দেখা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতাল এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক পদে সংযুক্তিতে আছেন ২৯০ জন চিকিৎসক। এর বাইরে জুনিয়র ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদে সংযুক্তিতে আছেন শতাধিক চিকিৎসক।
তবে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইএনটি, জাতীয় বাতজ্বর ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং সেন্টার ফর মেডিকেল এডুকেশনে সংযুক্তিতে কোনো চিকিৎসক নেই।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল শীর্ষে: এই প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত শিক্ষকের পদের সংখ্যা ১০১টি, আছেন ১৭০ জন। স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যার শিক্ষকের পাঁচটি পদের বিপরীতে শিক্ষকসংখ্যা ২১। এর বাইরে নয়জন পরামর্শক চিকিৎসক সংযুক্তিতে আছেন। এ ছাড়া শিশু বিভাগে সাত, সার্জারি ও চর্ম বিভাগে পাঁচজন করে, রেসপিরেটরি মেডিসিনে চারজন, মেডিসিন ও নাক-কান-গলায় তিনজন করে, হেপাটোলজি, চক্ষু, নবজাতক ও শিশু বিভাগে দুজন করে, ব্লাড ট্রান্সফিউশন, অবেদনবিদ, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, শিশু সার্জারি, দন্ত, রেডিওথেরাপি ও অর্থোপেডিক সার্জারিতে একজন করে সংযুক্তিতে আছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মাকসুদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, অধ্যাপক পদে থাকা চিকিৎসকেরা একেকটি ইউনিটের (নির্দিষ্টসংখ্যক রোগীর দেখভাল) দায়িত্ব নেন। তবে সংযুক্তিতে থাকা চিকিৎসকদের ইউনিট পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয় না। মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরে সব বিভাগের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চাহিদা পাঠানো হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নিয়ম অনুযায়ী, হাসপাতালে চিকিৎসকদের সকাল আটটা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত সাড়ে ছয় ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর বাইরে চিকিৎসকেরা সরকারি হাসপাতালে ‘অন কল’-এ থাকেন (প্রয়োজন হলে ডাকা যাবে)। তবে আড়াইটার পর সাধারণত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বেশির ভাগই থাকেন না বা আসেন না। গত ৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত বৈঠকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সন্ধ্যাকালীন রাউন্ড চালুর সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ও ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল: জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেসপিরেটরি মেডিসিনে সংযুক্ত আছেন ১৮ জন। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ৫৫টি পদ রয়েছে। সংযুক্ত আছেন নয়জন।
দেশজুড়ে মৌলিক বিজ্ঞানের শিক্ষকসংকট: ঢাকার বাইরে মেডিকেল কলেজগুলোতে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, প্রাণরসায়ন, কমিউনিটি মেডিসিন ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে শিক্ষকের সংকট রয়েছে। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে এই পাঁচটি বিষয়ে পদের অতিরিক্ত শিক্ষক আছেন ১২ জন। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে মৌলিক বিজ্ঞানে পদের অতিরিক্ত শিক্ষক আছেন ১২ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে সাতজন।
সংযুক্তির মূলে রাজনীতি?: গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ ‘দ্য অ্যাসেসমেন্ট অব রুরাল রিটেনশন পলিসিস ফর হেলথ ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর বাইরে প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং চিকিৎসকদের গ্রামাঞ্চলে বাধ্যতামূলক সেবা দিতে হবে। রাজনীতির কারণে দুটির কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।
চিকিৎসকদের বদলির বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল-সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন প্রভাব বিস্তার করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব এম ইকবাল আর্সলান চিকিৎসকদের বদলি বা পদায়নে স্বাচিপ কোনো প্রভাব বিস্তার করে না বলে দাবি করেন।

সিএমপি নিজের কাজে কতটা সফল? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

শত শত যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তায়। গণপরিবহনের অপেক্ষা। কিন্তু বাস-মিনিবাস-টেম্পোর দেখা নেই। ষোলোশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় নারী-শিশুসহ নানা বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের এই দুর্ভোগের সময়টাতে ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল। গাড়ি থেকে নেমে এলেন তিনি। মানুষের সঙ্গে কথা বললেন। তাঁদের দুরবস্থার বিবরণ শুনে তাৎক্ষণিক পুলিশের একটি বাস দিয়ে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। এরপর রমজান মাসজুড়ে যাত্রীদের দুরবস্থা লাঘবের কথা বিবেচনা করে বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ষোলোশহর থেকে বারিক বিল্ডিং মোড় পর্যন্ত বিনা মূল্যে যাত্রী পরিবহনের জন্য পুলিশের দুটি বাস দিলেন। এই ‘সৌজন্য বাস’ সার্ভিসের উদ্বোধন করেন তিনি গত ২২ জুন। এসব কাজে তাৎক্ষণিক বাহবা পাওয়া যায়, এমনকি নিজেকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসার সুযোগও তৈরি হয়। কিন্তু নগরের যান চলাচলব্যবস্থা ও যাত্রীসাধারণের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের জন্য টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ না করে দুটি বাস দেওয়ার এই ‘বদান্যতা’কে দূরদৃষ্টির পরিচায়ক বলা যাবে না কিছুতেই। প্রায় ৬০ লাখ জনসংখ্যা-অধ্যুষিত ৬০ বর্গমাইলের এই নগরে কখন কোন পথ দিয়ে পুলিশ কমিশনার যাতায়াত করবেন এবং কখন কোনো অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা চোখে পড়লে তিনি তার তাৎক্ষণিক সমাধান করবেন—এর জন্য অপেক্ষা করে থাকা নগরবাসীর কাম্য হতে পারে না।
পত্রপত্রিকায় এর আগেও নানাভাবে সংবাদ শিরোনাম হওয়ার সুযোগ হয়েছে আবদুল জলিল মণ্ডলের। সাত-আট মাস আগে কমিশনার হিসেবে নগর পুলিশের দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু বিলবোর্ডে নগরবাসীকে নিজের ছবিসমেত ঈদ ও পূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। এর মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। ফলে অল্প দিনের মধ্যেই অপসারিত হয়েছিল সেই ‘সচিত্র শুভেচ্ছাবাণী’।
এর কিছুদিন পরই ডিএমপি কমিশনার চট্টগ্রাম শহরের ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়ে সাফল্যও পেয়েছিলেন। রাস্তায় যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বন্ধ করে, রাস্তার দুই পাশা রাখা ইট-বালুর ব্যবসা বন্ধ করে একদিকে নগরের সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজ যেমন করেছিলেন, তেমনি নগরের যান চলাচলব্যবস্থায়ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন। বিমানবন্দর ও শহরের মধ্যে যাতায়াতের সময় মাত্র ৩০-৪০ মিনিটে নেমে এল।
এ ছাড়া নগরের অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদের কাজে যখন সিটি করপোরেশন অসহায়, তখন পুলিশ কমিশনার এগিয়ে এলেন এ কাজে সহযোগিতা দিতে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের দখলে থাকা এসব বিলবোর্ড উচ্ছেদের ব্যাপারে দৃঢ় মনোভাব তাঁকে রীতিমতো ‘অদম্য’ এক ভাবমূর্তি দিয়েছে। পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ঝাড়ু-কোদাল-বেলচা হাতে পরিচ্ছন্নতা অভিযানেও নেমেছেন ডিএমপি কমিশনার। তবে সে সময়ে ‘আপনারা এমন মেয়র নির্বাচন করুন, যাতে আমার ঝাড়ু হাতে নামতে না হয়’ মন্তব্যের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে প্রচারণার অভিযোগ ওঠে।
একটি শৃঙ্খলিত বাহিনীর কিছু নির্দিষ্ট দায়দায়িত্ব থাকে। সেসব দায়িত্ব যথাযথ পালনের পর তারা যদি জনসেবায় অতিরিক্ত কোনো ভূমিকা পালন করতে চায়, সেটা নিশ্চয় প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু চট্টগ্রাম শহর সত্যিই সে রকম নিরাপদ ও নিরুপদ্রব শহরে পরিণত হয়েছে কম না, যাতে অন্য কাজে মনোযোগ দেওয়ার যথেষ্ট অবসর পুলিশের আছে, সেটা ভেবে দেখা দরকার সর্বাগ্রে।
নগরের অধিকাংশ মোড়ে পথনির্দেশিকা আলো জ্বলে না, জ্বললেও তার হলুদ, লাল বা সবুজ আলোর কোনো অর্থই যেন নেই চালকের কাছে। ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় যেটুকু সম্ভব যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে ইদানীং চলচ্চিত্রে নায়ক চরিত্রে প্রায়ই পুলিশ কর্মকর্তাদের দেখা যায়। এসব ছবির ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য থেকে আঁচ করা যায়, সাধারণ মানুষ পুলিশকে দেখতে চায় প্রকৃত নায়কের চেহারায়, তাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনমনীয়, জীবন বাজি রেখে অসহায়-নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে দৃঢ়সংকল্প। কিন্তু সিনেমার সঙ্গে বাস্তবের যে দুস্তর ব্যবধান আছে, তা নগরবাসী বুঝতে শুরু করেছেন ধীরে ধীরে। চট্টগ্রাম শহরটা আবার ফিরে গেছে তার পুরোনো চেহারায়। এখন ফুটপাতগুলো আবার সেই হকারের দখলে। রাস্তার দুই পাশা গাড়ি পার্কিংয়ের পুরোনো অভ্যাসগুলোও ফিরে পেয়েছেন চালকেরা। এমনকি নির্মাণাধীন বাড়ির নির্মাণসামগ্রী রাস্তার পাশা রাখা বা ইট-বালুর ব্যবসাটাও চালু হয়েছে আগের নিয়মে। সত্যি কথা বলতে কম, শহরের যান চলাচলের বিশৃঙ্খলা ও যানজট স্মরণকালের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি। এই ব্যর্থতা কীভাবে এড়াবে সিএমপি?
গত ১৮ জুন শুলকবহর এলাকায় বেপরোয়া মিনি ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন সিটি কলেজের মেধাবী ছাত্র সত্যপ্রিয় দাশ (২৪)। এর মাত্র পাঁচ দিন আগে একইভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও দুজন ছাত্রের প্রাণহানি ঘটেছে এই নগরে। এসব ট্র্যাজিক ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অনিয়ম ও অদক্ষতাকেই দেখিয়ে দেয়।
নগরের অধিকাংশ মোড়ে পথনির্দেশিকা আলো জ্বলে না, জ্বললেও তার হলুদ, লাল বা সবুজ আলোর কোনো অর্থই যেন নেই চালকের কাছে। ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় যেটুকু সম্ভব যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়েও বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা পেয়ে কিছুদিন এসব রিকশা পথে নামে, আবার নির্দিষ্ট সময়ান্তে পুলিশ এই রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেয়। প্রায় ৭০ হাজার রিকশা কিছুদিন চলাচল করে, আবার একদিন সকালে হঠাৎ করে এই বিরাটসংখ্যক রিকশা রাস্তা থেকে উধাও হয়ে যায়। একদিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকেরা ইচ্ছামতো দাম হাঁকান ও অন্যদিকে পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাবে মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষেরা চরম দুর্ভোগের শিকার হন। অর্থাৎ পুলিশের এসব তৎপরতার মধ্যে সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনার ছাপ পাওয়া যাচ্ছে না।
নগর আবর্জনামুক্ত রাখার উদ্যোগ, বিলবোর্ড উচ্ছেদ করে সিএমপি কমিশনার নিজের ও পুলিশ বাহিনীর যে ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের কেন্দ্র দখলসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারায় তা নিষ্প্রভ হয়েছে। নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক এক মাসের পরিসংখ্যান হাতে নিলেও তাঁর ব্যর্থতার পাল্লাটাই ভারী হয়ে ওঠে। ২০১৪ সালের মে মাসে নগরে খুন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল যথাক্রমে ১০টি ও ১টি, ২০১৫ সালের মে মাসে এই সংখ্যা যথাক্রমে ১৫ ও ৯টি।
গত ১০ জানুয়ারি নার্সিং কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অঞ্জলি রানী দেবীকে তাঁর বাসভবনের সামনের গলিতে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। অপরাধীদের গ্রেপ্তার দূরে থাক, এ ঘটনার কোনো সূত্রই বের করতে পারেনি পুলিশ। আসল কথা, নাটক-সিনেমার পুলিশের পক্ষে জনমনোরঞ্জনের জন্য অসাধ্যসাধন করা যত সহজ, বাস্তবের পুলিশের পক্ষে বিষয়টা তত সহজ নয়। পুলিশ যদি তার নিয়মিত দায়িত্বের পরিধি ছাড়িয়ে জনকল্যাণের কাজে এগিয়ে আসে, তাতে আপত্তির কিছু নেই, কিন্তু নগরবাসী চাইবে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বটুকু সুষ্ঠুভাবে পালন করবে।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

রাজধানীতে জলাবদ্ধতা অন্তহীন জনদুর্ভোগ by ইফতেখার আহমেদ টিপু

একটু বৃষ্টি হলেই দেশের প্রধান নগরীগুলোতে জলজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় দেখা দিচ্ছে চরম অচলাচস্থা। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশনের অভাবে রাজধানীতে বর্ষা হলেই জলাবদ্ধতা নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়ায়। ভারী বর্ষণ হলে তো কথাই নেই। জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ একের পর এক পরিকল্পনা নিলেও তাতে চোখে পড়ার মতো সুফল অর্জিত হচ্ছে না। রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সম্প্রসারণ, খাল সংস্কার, নর্দমা ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের কাজে গত চার অর্থবছরে কয়েকশ’ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তার পরও এ বিপুল অর্থ ব্যয় জলাবদ্ধতা হ্রাসে দৃষ্টিগ্রাহ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে রাজধানীর অনেক এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ যানজট। অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ঘণ্টাখানেক বৃষ্টি হলেই রাজধানীতে যেখানে জলাবদ্ধতা দেখা দেয় সেখানে কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাত হলে অবস্থা কেমন দাঁড়ায় সহজেই অনুমেয়।
রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত প্রাকৃতিক খালের বেশির ভাগই বেদখল এবং ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি সরার ক্ষেত্রে অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। ভরাটকৃত খালগুলোর পুনরুদ্ধারের পথও প্রায় বন্ধ। খাল এমনকি নদীও বেদখল হয়ে যাচ্ছে। যারা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত হন, সরকারের ভূমি দফতরের সেই অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে তা আত্মসাতের কৃতিত্ব দেখাচ্ছে একশ্রেণীর স্বেচ্ছাচারী। ফলে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় নগর জীবনে। অপরিকল্পিত নগরায়নের কুফল ভোগ করছে রাজধানীর মানুষ। এত মানুষের এই দুর্ভোগ যদি রাজধানীতে প্রতিবারই সৃষ্টি হয় আর এর পরেও যদি যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া হয় তবে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! ক্রমাগত সৃষ্টি হওয়া রাজধানীর এই জলাবদ্ধতা যেভাবে ঘটে চলেছে তা নিরসনে সঠিক উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা একটি স্বাধীন দেশে গণতান্ত্রিক সরকার থাকতে এভাবে বৃষ্টির পানি আটকে পুরো শহরের মানুষের স্বাভাবিক গতি থমকে যাবে, তা হতে পারে না। ফলে এ অবস্থাকে কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতেই হবে। গড়ে তুলতে হবে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ-ব্যবস্থা। পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক পাম্প বসানো, নর্দমা, কালভার্ট এবং খালগুলো পরিষ্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। আর এগুলো যত দিন না বাস্তবায়ন করা হবে, তত দিন এই দুর্ভোগের কবলে পড়তে থাকবে রাজধানীবাসী। বৃষ্টি নামলেই যানজটের সৃষ্টি হয়। এর প্রধান কারণ জলাবদ্ধতা। সামনের এক-দুই মাস ধারাবাহিক বৃষ্টি হতে পারে। জলাবদ্ধতা দূর করা না গেলে যানজট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। আরেকটা বিষয় খুব গুরুত্বের আমলে সঙ্গে নিতে হবে। বর্ষাকাল মানেই যেন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির মৌসুম। এ সময় এমনিতেই অনেক রাস্তা বৃষ্টি-কাদায় হয়ে যায় চলাচলের অনুপযোগী। উন্নয়নের প্রয়োজনে বেশির ভাগ সড়কই কাটা বা গর্ত করা হয়। আবার এক সময় নামকাওয়াস্তে ভরাটও করা হয়। এটা দীর্ঘদিনের চর্চা। এই অপচর্চা বন্ধ হওয়া উচিত। বর্ষাকালে এমন উন্নয়ন (?) কাজ যেন না হয় তা নিশ্চিত করা দরকার।
রাস্তায় যান চলাচলে এখনো শৃঙ্খলা আসেনি। বেশিরভাগ গাড়িই আইন মেনে চলাচল করছে না। যে যেভাবে পারছে গাড়ি চালাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় যান্ত্রিক গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে রিকশাও। অথচ ট্রাফিক আইন মানলেই যানজটের সমস্যা অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব। বছরের পর বছর ধরে সামান্য বৃষ্টিতেই এ নগরীর অধিকাংশ রাস্তায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। দুর্বল ও অপ্রতুল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাই এর প্রধান কারণ। কর্তৃপক্ষকে সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। নাগরিকদের ভোগান্তি দূরীকরণে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অধীনে অতি সহজেই রাজধানীর মধ্যকার লেকগুলোকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রয়োজনীয় খননকাজ করে গভীর করতে হবে। গুলশান, ধানমণ্ডি, বনানী ও উত্তরার লেক তদুপরি হাতির ঝিলের মতো প্রাকৃতিক জলাধারগুলোকে রক্ষা করার মাধ্যমেও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে অগ্রগতি অর্জন করা যায়। রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার এবং ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। নির্বাচনের আগে দুই মেয়র জলাবদ্ধতা সমাধানে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এর বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে। দখলকৃত খালগুলো উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে জরুরিভিত্তিতে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ ঘটিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক নবরাজ এবং চেয়ারম্যান, ইফাদ গ্রুপ

আমরা তালা মারতে পারি না, পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় -বিশেষ সাক্ষাৎকার: আবদুল মান্নান by মিজানুর রহমান খান

আবদুল মান্নান
নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানের মুখোমুখি হয় প্রথম আলো।
প্রথম আলো : আপনি মনে করেন যে মুদি ও গার্মেন্টসের মতো বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। এরা কারা? কীভাবে চলছে?
আবদুল মান্নান : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ২০১০ আইনে তারা কতগুলো শর্ত মেনে অনুমোদন নেয়। পরে দেখা যায়, কেউ কেউ শর্ত মানেন না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যাওয়া, নিজস্ব ভবন নেই, ভাড়া করা ভবনে শুরু করেছিল, তাদের নিজস্ব ভবনে ফিরে যাওয়ার শর্ত পূরণ করা। আইনে আছে কোনো আউটার ক্যাম্পাস হবে না। কেউ কেউ এসব বাধ্যবাধকতার ব্যত্যয় ঘটিয়ে তারা কেবল ঢাকায় নয়, ঢাকার বাইরেও আউটার ক্যাম্পাস করেছে।
প্রথম আলো : ২০০৬ সালে কিশোরগঞ্জে প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবৈধ আউটার ক্যাম্পাস বন্ধ করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে এ রকম পদক্ষেপ আর নিতে দেখি না। নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয় কি?
আবদুল মান্নান : দেখা যায় না তা ঠিক নয়। কমিশন এমন উদ্যোগ নিলেই সাধারণত উচ্চ আদালতে রিট করে। বর্তমানে এ রকম প্রায় ২০টি মামলা আছে।
প্রথম আলো : এগুলোর যাতে দ্রুত শুনানি হয় সে জন্য আপনি কি প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ চাইবেন?
আবদুল মান্নান : আমরা বিশেষ চেষ্টা করে ইতিমধ্যে ১০টি মামলাকে একটি বেঞ্চে এনেছি, বাকিগুলোও আনার চেষ্টা চলছে। এর একটির সুরাহা হলেই বাকিগুলোর সুরাহা সহজ হতে পারে। এর বেশির ভাগই আউটার ক্যাম্পাস এবং মালিকানার দ্বন্দ্ব-সংক্রান্ত। আমি গত মে মাসে যোগদানের আগেই এটা করা হয়েছিল। কিন্তু এখনো এর শুনানি শুরু হয়নি।
প্রথম আলো : বর্তমানে ৮টি বেসরকারি, ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আরও ১০৮টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দরখাস্ত পাইপলাইনে আছে? কতটি আপনারা বিবেচনা করবেন?
আবদুল মান্নান : বিবেচনার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের। তবে নতুনরা যখন অনুমোদনের জন্য দরখাস্ত করে, মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে পাঠায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শর্ত পূরণ করে কি না দেখার জন্য।
প্রথম আলো : এটা প্রতিষ্ঠার আগে না পরে? আগে হলে আপনাদের সুপারিশ গ্রাহ্য বা অগ্রাহ্য করার অনুপাত কেমন?
আবদুল মান্নান : আগে। মন্ত্রণালয় বলে এই দরখাস্তকারীরা পূর্বশর্ত পালন করেছে কি না, তা যাচাই করে আমাদের বলুন। কমিশন যদি না বলে তাহলে সরকার কিন্তু অনুমোদন দেয় না। প্রাথমিক শর্ত মানলে তবে অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রথম আলো : তাহলে আপনি নিজেই যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে মুদি দোকান বলছেন, সেগুলো কি প্রতিষ্ঠার পরে মুদি দোকানে পরিণত হয়েছে নাকি তাদের অনেকে শুরুই করেছিল মুদি দোকান হয়েই?
আবদুল মান্নান : কেউ কেউ ভাড়া নিয়েছে একটি দালান। আমি মুদি দোকান ওই অর্থে বলেছি, বিশ্ববিদ্যালয়কে যে আঙ্গিকে সৃষ্টি করা হয়, তার উদ্দেশ্য থাকে এগুলো অ-মুনাফাভোগী থাকবে। এসব প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে যাঁরা থাকেন, তাঁদের বলা হয় ট্রাস্টি। তার মানে একটি ট্রাস্ট আইনের আওতায় তারা চলে। এখন দেখা যায়, একটি দালানের নিচে মুদি দোকান, ওপরে বিশ্ববিদ্যালয় চালু করেছে। বছরের পর বছর ধরে এটা চলছে, সেখানে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই। তারা নানা অজুহাতে অর্থ তুলে নিচ্ছে। যারা এটা করছে তাদের সংখ্যা একেবারে কম নয়।
প্রথম আলো : আপনি কি একটি সমীক্ষা করবেন যে এ রকম মুদি দোকানরূপী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কত? তাদের চিঠি দেবেন?
আবদুল মান্নান : হ্যাঁ, দেব। ঈদের পরে পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে এই উদ্যোগ নেব। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান এবং উপাচার্যকে নিয়ে তিন থেকে চারটি পর্যায়ে বৈঠকে বসব।
প্রথম আলো : আপনি বলছেন আদালতের রায় ছাড়া অবৈধ ক্যাম্পাস বন্ধ করতে পারবেন না। কিন্তু অনেকের মতে, এটা নেতৃত্বের প্রশ্ন। আপনারা আইন প্রয়োগ করে তালাবদ্ধ করে দিতে পারেন। যাঁরা প্রতিবাদী হবেন, তাঁরা বৈধতার সনদ দেখিয়ে খুলিয়ে নেবেন।
আবদুল মান্নান : আমরা তালা মারতে পারি না। পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আমরা সব সময় কিন্তু বিভিন্ন অনিয়মের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে থাকি।
প্রথম আলো : তার মানে দাঁড়াল, শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ?
আবদুল মান্নান : ব্যর্থ আমি বলব না। তার নানা কারণ থাকতে পারে। মন্ত্রণালয়ের তো অনেক কাজ, তার মধ্যে এটা অন্যতম। সেখানে পর্যাপ্ত লোকবল না থাকতে পারে। তবে মন্ত্রণালয় যদি আরও একটু সক্রিয় হয়, তাহলে আমরা যৌথভাবে একটা উত্তরণ ঘটাতে পারব।
প্রথম আলো : শিক্ষার মানের অধঃপতিত দশা চলছে? বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত নিচে।
আবদুল মান্নান : এক শ ভাগ একমত। আমরা শিক্ষার মানের গভীরতা বাড়াতে পারিনি। তবে যেভাবে র্যাঙ্কিং করা হয়, তাতে আমরা কখনো ওপরে উঠব না। পাঁচটি সূচকের অন্যতম হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির মিথস্ক্রিয়া কেমন? ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে গবেষণা করে তোমরা কত টাকা পাও? গবেষণার জন্য শিল্পসমূহ তোমাদের নিয়োগ করে কি না? আমরা সবে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকল্প দিয়ে এই কাজে হাত দিয়েছি। এই মুহূর্তে আমাদের বড় ফোকাস হচ্ছে উচ্চশিক্ষায় মান উন্নয়ন ও যুগোপযোগী করা। এ জন্য সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্প চলছে, ২০১৮ সালের মধ্যে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে এর আওতায় আনা হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোয়ালিটি নিশ্চয়তা সেল থাকবে।
প্রথম আলো : সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেমন চলছে? সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?
আবদুল মান্নান : এখানে আবার অন্য রকম সমস্যা। সব থেকে বড় সমস্যা ছাত্র নামধারী কিছু সংগঠন, যারা নিয়মিত বিরতি দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
প্রথম আলো : সরকারদলীয় ছাত্রলীগ ছাড়া এখন আর কার কথা বলবেন?
আবদুল মান্নান : আমি ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল কিছুই বলব না। আরেকটি বড় সমস্যা যা পাবলিক ও প্রাইভেট উভয়ের জন্য প্রযোজ্য, তা হলো তারা আর শিক্ষক নিয়োগে মেধা আকর্ষণ করতে পারে না।
প্রথম আলো : তার কারণ দলীয় ও আত্মীয়স্বজন বিবেচনায় বিপুলসংখ্যক, এমনকি কৃত্রিম পদ সৃষ্টি করে অতিরিক্ত নিয়োগ ঘটছে, শিক্ষামন্ত্রী অনেক উন্নতির দাবি করেন। অথচ বহু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এই কারণে ভারাক্রান্ত। বাড়তি নিয়োগের খরচ মেটাতে তারা উন্নয়ন খাত থেকে টাকা নিচ্ছে। কতটা সত্যি?
আবদুল মান্নান : দলীয় বিবেচনায় মেধাবীর চেয়ে অ-মেধাবী নেওয়া অনেক বেশি গর্হিত মনে করব। আর নির্দিষ্টভাবে বলব, আগে কিছুটা ছিল এখন নিয়োগে বাইরের হস্তক্ষেপ খুবই উদ্বেগজনক। অনেক সময় বাইরের হস্তক্ষেপের কারণে উপাচার্যদের অপ্রীতিকর সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। আর উন্নয়ন খাত থেকে নেওয়ার সুযোগ নেই, নেওয়া হচ্ছে পৌনঃপুনিক খাত থেকে। অতিরিক্ত পদে নিয়োগ দিতে গিয়ে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাটতি হচ্ছে। কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাটতি ৩০-৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত হয়েছে।
প্রথম আলো : আইন বলছে, মঞ্জুরি কমিশনের আগাম অনুমোদন ছাড়া নতুন পদ সৃষ্টি করা যাবে না। তাই এই যে তথাকথিত ঘাটতি তা বৈধ নয়।
আবদুল মান্নান : বৈধ নয় বলব না, অনাকাঙ্ক্ষিত বলব।
প্রথম আলো : তার মানে কোনো রুলস বা আপনার আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে না?
আবদুল মান্নান : তা হচ্ছে।
প্রথম আলো : তাহলে এত বড় বেআইনি কাজকে আপনি বেআইনি বলবেন না কেন? জনগণের টাকার অপব্যবহার ফৌজদারি অপরাধ।
আবদুল মান্নান : (হাসি) না। নিশ্চয় বেআইনি বলব। এটি একেবারেই প্রত্যাশিত নয়, গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
আবদুল মান্নান : ধন্যবাদ।

ইউজিসির ক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: নজরুল ইসলাম by মশিউল আলম

নজরুল ইসলাম
নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মুখোমুখি হয় প্রথম আলো।
প্রথম আলো : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ ও শিক্ষার মানের অনেক অবনতি ঘটেছে। আপনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ছিলেন। এ ব্যাপারে ইউজিসির কি কিছু করার নেই?
নজরুল ইসলাম : পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারে ইউজিসির খুব বেশি কিছু করার নেই। কারণ, এগুলো চলে নিজস্ব আইন অনুযায়ী। চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রয়েছে সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসনের বিধান। আইনত তাদের স্বায়ত্তশাসন প্রাপ্য এবং তারা তা ভোগ করে। বাকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও প্রতিটি নিজস্ব আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তারাও স্বায়ত্তশাসিত, স্বাধীন।
প্রথম আলো : অর্থায়নের ক্ষেত্রে তো ইউজিসির ভূমিকা থাকে?
নজরুল ইসলাম : হ্যাঁ, থাকে। কিন্তু দেখা যায়, একটি বিশ্ববিদ্যালয় আদর্শভাবে পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ অর্থায়নের প্রয়োজন হয়, তার ধারেকাছেও আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া হয় না। সেই হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়া খুবই কঠিন। মঞ্জুরি কমিশন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য অর্থ বণ্টন করে দেয়। আর শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য কতগুলো জিনিস করে দিয়েছে; যেমন শিক্ষকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা সামগ্রিকভাবে নির্ধারণ করা আছে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্রিয়া ও মান একই রকম। তবে ন্যূনতম মাপকাঠিগুলো আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বেশ শিথিল। যেমন, একজন শিক্ষকের পিএইচডি ডিগ্রি থাকলে তাঁর চাকরির বয়স ১২ বছর হলে তিনি অধ্যাপক হতে পারেন এবং হচ্ছেনও। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা অসম্ভব।
প্রথম আলো : ইউজিসি এটা বন্ধ করতে পারে না?
নজরুল ইসলাম : ইউজিসি ন্যূনতম সূচকগুলো নির্ধারণ করে দেয়। এ ছাড়া কোনো আর্থিক বা নৈতিক অব্যবস্থার ক্ষেত্রে ইউজিসি মাঝেমধ্যে হস্তক্ষেপ করতে পারে, অথবা ইউজিসির দেওয়া টাকাপয়সা তারা ঠিকমতো ব্যবহার করছে কি না, এ ক্ষেত্রে একধরনের তদারকি ইউজিসি করতে পারে, কিন্তু সাধারণত করে না, স্বাধীনতা দেয়। সেই হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপরে ইউজিসির তদারকি বা খবরদারি একেবারেই ন্যূনতম, ভারতে এর চেয়ে একটু বেশি আছে।
প্রথম আলো : বেশি হওয়া উচিত কি না?
নজরুল ইসলাম : আমরা যদি মনে করি যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত হবে, তাহলে দায়দায়িত্বটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া উচিত।
প্রথম আলো : তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রয়োজনীয়তা কী?
নজরুল ইসলাম : মঞ্জুরি কমিশন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়নের প্রতিষ্ঠান। অর্থায়ন ছাড়াও মঞ্জুরি কমিশন মাঝেমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য, শিক্ষকসহ ঊর্ধ্বতন যাঁরা আছেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা-মতবিনিময়ে বসতে পারে, অর্থাৎ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের মান উন্নত করে নিক।
প্রথম আলো : আপনার সময় কি এটা করা হতো?
নজরুল ইসলাম : আমার সময় আমরা এটা অনেক করেছি।
প্রথম আলো : আপনারা কি কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন, বা সুপারিশ করেছিলেন?
নজরুল ইসলাম : হ্যাঁ, আমরা অনেক পরামর্শ দিয়েছি, বেশ কিছু সুপারিশও করেছি।
প্রথম আলো : সুপারিশগুলো কি বাস্তবায়ন করা হয়েছে?
নজরুল ইসলাম : অনেক ক্ষেত্রে হয়েছে। যেমন, এখন প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নারী নির্যাতনসংক্রান্ত সেল আছে, এটা হয়েছে ইউজিসির কারণে। ইউজিসি থেকে নিয়ম করে দেওয়া হয়েছে যে প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী নির্যাতনসংক্রান্ত সেল থাকবে। আরেকটা হলো, শিক্ষার মান বৃদ্ধি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পক্ষ থেকে উদ্যোগী হয়ে গবেষণা-সহায়তা দেওয়া।
প্রথম আলো : মানে কি অর্থায়ন করা?
নজরুল ইসলাম : অর্থায়ন করা এবং গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেওয়া। এটা ইউজিসি মাঝে মাঝেই করে। আমার সময় ইউজিসি একটি উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৬৮১ কোটি টাকার এই প্রকল্প আমার সময় শুরু হয়। এখন এই প্রকল্প তৃতীয় পর্যায়ে চলে এসেছে, এই প্রকল্পে এখন মোট বরাদ্দ প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা।
প্রথম আলো : ফল কী?
নজরুল ইসলাম : আমি আমার সময়ে ফল দেখে আসতে পারিনি, তবে ফল নিশ্চয়ই ভালো হবে।
প্রথম আলো : আপনি কী বলতে চাইছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা হতাশাব্যঞ্জক নয়?
নজরুল ইসলাম : মোটেও নয়। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদে সারাক্ষণ ল্যাবরেটরিতে কাজ হচ্ছে, কোনো ক্লাস কামাই যায় না, বন্ধ থাকে না...
প্রথম আলো : কিন্তু রাজনীতি আছে, অনেক শিক্ষার্থী হলে থাকতে পারে না...
নজরুল ইসলাম : এটা একটা বড় সমস্যা, কিন্তু ছাত্রদের সমস্যা। শিক্ষকদের জন্য অত বেশি সমস্যা নেই।
প্রথম আলো : কিন্তু শিক্ষকেরা তো রাজনীতি করেন?
নজরুল ইসলাম : সবাই তো করেন না। একটি দলকে সমর্থন দেন, ভোট চাইতে এলে ভোট দিতে যান, কিছু শিক্ষক নির্বাচনে অংশ নেন। দুই হাজার শিক্ষকের মধ্যে কতজন নির্বাচন অংশ নেন? বাকিরা তো নিজ নিজ কাজ করছেন।
প্রথম আলো : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান কেমন?
নজরুল ইসলাম : দশ-বারোটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক মান ও ক্যাম্পাস মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। অধিকাংশই মানহীন বলা উচিত।
প্রথম আলো : রাজনৈতিক ও আর্থিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়?
নজরুল ইসলাম : হ্যাঁ, এভাবে হচ্ছে, তবে ন্যূনতম ক্রাইটেরিয়া সবাইকেই মানতে হয়।
প্রথম আলো : কিন্তু ইউজিসিকে পাশ কাটিয়ে তো কেউ অনুমোদন পেতে পারে না?
নজরুল ইসলাম : না, সেটা হয় না।
প্রথম আলো : তাহলে ইউজিসির ওপরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়?
নজরুল ইসলাম : কেউ যদি ইউজিসির ওপরে প্রভাব খাটাতে পারে তাহলে খাটাবে, অথবা মন্ত্রণালয়ে প্রভাব খাটাবে।
প্রথম আলো : ইউজিসির কার্যকারিতা যদি আমরা মাপি, তাহলে সেটা কতটা?
নজরুল ইসলাম : যথেষ্ট নয়। ইউজিসি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক মান বিবেচনা করে, পর্যালোচনা করে সুপারিশ করতে পারে, এটা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এই সুপারিশ যাবে মন্ত্রণালয়ে, মন্ত্রণালয় সেই সুপারিশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারে, না-ও পারে। মন্ত্রণালয় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে আদালতে মামলা হয়, আদালত স্থগিতাদেশ দেন, এভাবে দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয় চলতে থাকে। আদালতের স্থগিতাদেশের অবসান ঘটানোর দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের, সে ক্ষেত্রে তাদের অতটা তাগিদ থাকে না। তারপরেও প্রশাসনিকভাবে ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেওয়া যায়, সেটা হচ্ছেও। ইউজিসি অবশ্য একটা কাজ করতে পারে, নতুন বিভাগ খুলতে না দেওয়া।
প্রথম আলো : ইউজিসিকে আরও কার্যকর করা যায় কীভাবে?
নজরুল ইসলাম : বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সংস্কার করা প্রয়োজন। এটা এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অর্থ দেয় আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনুমোদন দেয়, তদারকি করে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য তো এটা অর্থ প্রদানের কর্তৃপক্ষ নয়। তাই এর নাম হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষা কমিশন, আর এর ক্ষমতা হওয়া উচিত আরেকটু বেশি। যেন উচ্চশিক্ষা কমিশন নিজেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে, মন্ত্রণালয়ে যেতে না হয়। এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটি অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন করা প্রয়োজন, যে কাউন্সিল অনেকগুলো সূচকের ভিত্তিতে সরকারি ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং করবে।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
নজরুল ইসলাম : ধন্যবাদ।

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০: প্রয়োগ ও কার্যকারিতা

৯ জুলাই ২০১৫, প্রথম আলোর আয়োজনে ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০: প্রয়োগ ও কার্যকারিতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হলো।
আলোচনা
আব্দুল কাইয়ুম: আমাদের আজকের বিষয় পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০-এর প্রয়োগ ও কার্যকারিতা। আমরা এ বিষয়ে কত দূর অগ্রসর হতে পেরেছি, আমাদের সমস্যা কোথায়, এই আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে আমরা আর কী কী করতে পারি—এসব বিষয়েই আমরা আজ আলোচনা করব।
একটা সময়ব্যাপী অনেক নারী সংগঠন, বেসরকারি সংগঠন এ নিয়ে আন্দোলন করেছে। শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালে এই আইনটি হয়। তারপরও অনেক দিন আইনটি সুপ্ত অবস্থায় ছিল, সংশ্লিষ্ট বিধি প্রণয়ন করতে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেছে।
 ২০১১ সালে বিবিএস অর্থাৎ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটি জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, দেশের ৮৭ শতাংশ বিবাহিত নারী কোনো না কোনোভাবে পরিবারে স্বামী বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আর ৮০ শতাংশ নারী মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব বিষয় আজকের আলোচনায় আসবে। এখন আলোচন করবেন আবুল হোসেন।
আবুল হোসেন
আবুল হোসেন
ভারতে ২০০৫ সালে এ রকম একটা আইন প্রণীত হয়। এরপর আমাদের দেশেও এমন একটি আইন প্রণয়নের ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি আসতে থাকে। তখন এ লক্ষ্যে একটি জোটও গঠন হয়, পারিবারিক সহিংসতা রোধে নাগরিক জোট। এরপর সেই জোট আর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা এই আইনের খসড়া প্রণয়ন করি। বর্তমান মাননীয় স্পিকার তখন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সে সময় তিনি এই আইন প্রণয়নকেই তাঁর অগ্রাধিকার হিসেবে ঠিক করেন। এরপর সব প্রক্রিয়া শেষ হলে ২০১০ সালে সংসদে আইনটি পাস হয়।
তবে আইনটির বিধি প্রণয়ন করতে আরও তিন বছর লেগে যায়। তিনটি সংস্থা মূলত এই আইনটি নিয়ে কাজ করে। প্রথমত, উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আইনটির প্রয়োগকারী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তারা কাজ করেন, তৃতীয়ত, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও (এনজিও) এর সঙ্গে সম্পৃক্ত।
কোন এনজিওগুলো কাজ করবে, আমরা তাদের তালিকা গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশ করেছি। আর বিধিতে যে রেজিস্ট্রারের কথা বলা হয়েছে, সেটা আমরা করে ফেলেছি। আমরা আবেদন ফরম ছাপিয়েছি, যেখানে অভিযোগকারীর কথা লিপিবদ্ধ করা হবে। আমরা এই ফরমটি প্যাড আকারে ছাপিয়ে ৬৪টি জেলার প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।
পাশাপাশি আমরা প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তথ্য সংরক্ষণের রেজিস্ট্রার দেশের সব থানায় পাঠিয়ে দিয়েছি। ফলে এখন কেউ চাইলে মামলা করতে পারবেন, আগে যে জটিলতা ছিল, সেটা আর এখন নেই। পিএইচআর ও বিএনডব্লিউএলকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ, তারা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাদের এই আইন ও তার প্রয়োগের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
একই সঙ্গে তারা সংশ্লিষ্টদের জন্য পরিচিতিমূলক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেছে। আমার কথা হচ্ছে সরকার আইন করেছে। এখন বড় এনজিওগুলো দায়িত্ব নিলে মানুষ আইনটি সম্পর্কে জানতে পারবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একসঙ্গে বসে আইনের দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারে। 
ফারহানা আফরোজ
ফারহানা আফরোজ
শুরুতে প্রটেক্টিং হিউম্যান রাইটস প্রকল্প সম্পর্কে ধারণা দেওয়া দরকার। এটি একটি পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প। এর লক্ষ্য হচ্ছে কর্ম এলাকায় পারিবারিক সহিংসতার উচ্চহার কমিয়ে আনা। এটি বাংলাদেশের ছয়টি জেলার আটটি উপজেলার ১০২টি ইউনিয়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১০ সালের আগে পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো না। আমাদের লক্ষ্য ছিল, আইনটি বাস্তবায়নে কাজ করা। এর সঙ্গে যঁারা সংশ্লিষ্ট আছেন, তঁাদের দক্ষতা বাড়ানো ও আইনটি বাস্তবায়নে তঁাদের সংবেদনশীল করে তোলা।
আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখন কর্ম এলাকার নারীরা অভিযোগ নিয়ে আমাদের কাছে তেমন একটা আসতেন না। প্রথম বছর ইউনিয়ন পর্যায়ে মাত্র ২৫৬ জন নারী অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন, আর আজ চার বছর পর সেই সংখ্যা ৫৪ গুণ বেড়েছে, সাড়ে ১৩ হাজার নারী আমাদের কাছে তঁাদের অভিযোগ জানিয়েছেন।
আমরা তঁাদের আইনি সহায়তা প্রদান করেছি। যেসব নারী সন্তানসহ পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়েছেন, আমরা তঁাদের সুরক্ষাসহ ভরণপোষণ লাভ করতে সহায়তা করেছি। তালাকের পর নারীরা তঁাদের মালামাল নিয়ে যেতে পারতেন না, আমরা এখন তঁাদের সেই মালামাল উদ্ধার করতে সহায়তা করছি।
এই আইন সে ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পেরেছে। পাশাপাশি এই আইনে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে বিচারকদের অবারিত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে।
তৌহিদা খন্দকার
তৌহিদা খন্দকার
পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০-এর প্রয়োগ ও কার্যকারিতা নিয়ে আমি একটি উপস্থাপনা পেশ করছি। এই আইনটি হওয়ার আগে সাধারণ আইনজীবীরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এই মামলাগুলো করতেন। এতে পরিবারে আরও বেশি সমস্যা সৃষ্টি হতো। কারণ, ওই আইনে মামলা হলে ৬০ দিনের মধ্যে জামিন পাওয়ার সুযোগ ছিল না।
আর দেখা যেত, পরিবারের প্রায় সবাইকে, এমনকি যারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল না, তাদেরও আসামি করা হতো। ফলে নানা সমস্যা হতো। এ কারণে নারী আইনজীবীদের প্রত্যাশা ছিল, সংসার ধরে রাখতে পারে এমন একটি আইন করা হবে। এই আইনটির মাধ্যমে সে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।
পিএইচআর প্রকল্প শুরু হওয়ার এক বছর আগে একটি জরিপ করা হয়েছিল। সেই জরিপে দেখা যায়, ৫৩ শতাংশ নারী স্বামীর দ্বারা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন। সেই জরিপে আরও দেখা যায়, ৩৮ শতাংশ নারী মনে করেন, স্ত্রীকে নির্যাতন করার অধিকার স্বামীর আছে। এমনকি এখনো যে কর্ম এলাকায় আমরা কাজ করি, সেখানকার নারীরা বলেন, স্ত্রীকে ছোটখাটো চড়-থাপড় মারা, সকালে উঠে গালাগাল করার অধিকার স্বামীর আছে।
ফলে এই আইনের বাস্তবায়ন কত দূর হয়েছে, আমরা তা এখান থেকে বুঝতে পারি। প্রথমত, আমরা পারিবারিক সহিংসতা যে অপরাধ, আর এ–সংক্রান্ত যে একটি আইন আছে, সে বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছি। ইউনিয়ন পর্যায়ে সুরক্ষা দল তৈরি করা হয়েছে, আর তারা কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিচারব্যবস্থাকে প্রতিটি ইউনিয়নে মানুষের দোরগোড়ায় পেঁৗছে দেওয়ার জন্য আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
আইন যঁারা বাস্তবায়ন করবেন, তঁাদের দক্ষতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অন্য কোনো আইনে মানসিক নির্যাতনের বিচার করার সুযোগ নেই, এই আইনে সেটা করা সম্ভব হয়েছে।
আর আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগও এ অাইনে আছে। এই আইনে আমরা পারিবারিক সহিংসতার সংজ্ঞা পেয়েছি। এই আইনে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা সত্ত্বেও স্ত্রীকে স্বামীর ঘরে বসবাসের আদেশ দিতে পারেন আদালত, এটা খুবই ইতিবাচক একটা ব্যাপার।
 সালিসের ক্ষেত্রে নারীর সুরক্ষা নেই, আদালত এই আদেশও দিতে পারেন। মামলা চলাকালীন তঁাকে কেউ হয়রানি বা নির্যাতন করতে পারবে না। আবার শেল্টার সাপোর্টের  বিধান আছে এই আইনে। বিচারক যদি মনে করেন, অভিযোগকারী স্বামীর ঘরে নিরাপদ নন, তাহলে নিরাপত্তার জন্য তঁাকে শেল্টার সাপোর্টে রাখার আদেশ দিতে পারেন।
 এমনকি সন্তানের সুরক্ষার বিধানও এই আইনে আছে। অনেকগুলো ভালো দিক থাকা সত্ত্বেও আইনটির প্রয়োগ হচ্ছে না। পিএইচআরের অ​াটটি উপজেলায় তিন বছরে মামলা হয়েছে ১৭১টি আর একই জেলার অন্য ৫৭টি উপজেলায় মামলা হ​ে​য়ছে ৮১টি।
নারীরা স্বামী ও তঁার আত্মীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে চান না। ফলে অনেক অভিযোগই দেরিতে আসে, আর সেটা এই আইনের আওতায় আনা যায় না, তখন সেটা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় আনতে হয়। কিছু ঘটলে দেখা যায়, নারীরা তাৎক্ষণিকভাবে স্বামীকে শাস্তি দিতে চান। সেটা এই আইনে সম্ভব নয়। আবার অনেক সময় আদালতের পরিবেশ এই আইনের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৬০ শতাংশ মামলার ক্ষেত্রে মানুষ দ্রুত সালিসের মাধ্যমে বিচার চায়। কিন্তু এই আইনে সুস্পষ্টভাবে সালিসের কথা নেই। আর মালামাল উদ্ধারের বিষয়ে এখানে সুস্পষ্ট কিছু বলা নেই, কে উদ্ধার করবে, কীভাবে নিয়ে যাবে সে বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। কিছু সুপারিশ পেশ করছি: আইনের ধরন বিবেচনা করে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের পরিবর্তে দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে পারিবারিক আদালতকে দেওয়া যেতে পারে।
আর তদন্তের সময়সীমা ১০-১৫ দিন নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত, বিধিমালা আরও বিস্তারিত হওয়া উচিত। আর সংবাদমাধ্যমকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে, আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। চলমান মামলা মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখা উচিত।
গৌরাঙ্গ চন্দ্র মণ্ডল
গৌরাঙ্গ চন্দ্র মণ্ডল
দুই বছরে ২৫টি মামলার তদন্ত করেছি। এর মধ্যে ১৭টি মামলার তদন্ত শেষে মালামাল বিবাদীকে  বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। মামলায় তদন্তের সময়সীমা নির্ধারিত থাকে, কিন্তু আমাদের কাছে চিঠি আসে থানা হয়ে। ফলে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর চিঠি আমাদের হাতে আসে। সে ক্ষেত্রে তদন্ত করতে একটু সময় লেগে যায়।
এ ছাড়া বিবাদীদের নোটিশ দেওয়া হয় না। আর মালামাল উদ্ধার করে বিবাদীকে চিঠির কপি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আদেশ নেই, তারপর সোনাদানার ক্ষেত্রে আমরা ঝামেলায় পড়ি, কারণ এটা দৃশ্যমান নয়। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চান না। ফলে মালামাল উদ্ধার করতে সমস্যা হয়।
বিবাদীরা নানা চাতুরীরও আশ্রয় নেয়। আবার বিবাদীরা থানাকে প্রভাবিত করে চিঠি প্রেরণে বিলম্ব সৃষ্টি করে। আদালত চিঠি দেন না বলে বিবাদীরা স্বাক্ষর করতে চায় না। এ ছাড়া আরও নানা বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি হয়। মালামাল জব্দ করে কোথায় রাখা হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা নেই।
মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে অত জায়গা নেই, আবার থানা বলে তাদের তো মালামাল রাখার কথা নয়। অনেক মামলায় দেখা যায়, স্বামী বিদেশে থাকে। পারিবারিক সহিংসতার অন্যতম কারণ বাল্যবিবাহ রোধেও কাজ করছি।
জিনাত আরা হক
জিনাত আরা হক
আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে কাজটা স্রেফ প্রকল্পের মধ্যে যেন সীমিত না থাকে। কারণ, প্রকল্পের মধ্য দিয়ে মানুষের প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়। আমাদের বর্তমান স্পিকার এই আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আইন মানেই কি শাস্তি দেওয়া? মানুষ মনে করত, নির্যাতন হয় ঘরের বাইরে। এ রকম একটা ভ্রান্ত ভাবনা আমাদের ছিল। কিন্তু আমরা বলেছি, পরিবারেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতন হয়।
বিবিএসের জরিপের আগে আইসিডিডিআরবির একটি জরিপ ছিল। যেখানে ৬০ ভাগ নারী বলেছিলেন, তঁারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। কথা হচ্ছে এই আইনটি আমরা ধারণ করতে পারছি কি না। এই আইনটি প্রতিরোধমূলক। কিন্তু দেখা যায়, নারীরা এই আইনের দ্বারস্থ হলে স্বামীরা স্ত্রীকে তালাক দেয়।
এই আইনটি আসলে চরিত্র সংশোধনমূলক, যেটা পাশ্চাত্যে আছে। কিন্তু আমাদের দেশে সে রকম বিধান নেই বললেই চলে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের মানদণ্ড নেই, এটা এই আইনের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। শুধু মালামাল উদ্ধার নয়, কেউ সহিংসতায় আহত হলে তার ক্ষতিপূরণ তো দিতে হবে, সেটা নির্ধারণের একটি মানদণ্ড থাকতে হবে।
এই আইনের অনেক ভালো দিক আছে, সেগুলো ঠিকঠাক প্রয়োগ হচ্ছে না। এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অংশীজনের সংখ্যা অনেক, অনেকগুলো সংস্থা একত্রে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে দেখেছি, সেখানে একটি পৃথক আদালত সেটি পরিচালনা করছেন। কারণ, এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটু ভিন্ন মানসিকতা থাকতে হবে। এখানে একজন নারী তঁার স্বামী, শ্বশুরের বিচার চাচ্ছেন, আবার তিনি ঘরও ভাঙতে চাচ্ছেন না। আমাদের সমাজে সেটা করা খুব কঠিন। ফলে এটা নিছক ফৌজদারি মামলার মতো চোর-পুলিশের ব্যাপার নয়।
বেসরকারি সংস্থাগুলো সাধারণত আলাদাভাবে কাজ করে, এটা আমার এক দুঃখের জায়গা ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করতে পারছি। গণমাধ্যমও এ বিষয়টিতে জোর দেবে আশা করি।
হোমায়রা আজিজ
হোমায়রা আজিজ
নারী নির্যাতনের রূপ হিসেবে আমরা শারীরিক নির্যাতন ও যৌতুক—এ দুটোকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। কিন্তু পরিবারের মধ্যে যৌন নির্যাতন যে পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে পড়ে, সে বিষয়ে আমরা এখনো সচেতন নই। ফলে এটা যে প্রতিকারমূলক আইন, তার সুবিধা তারা নিতে পারছে না।
এমনকি মানসিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনও যে পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে পড়ে, সেটা সবাইকে বুঝতে হবে। ফলে শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নয়, স্থানীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম ও আইনজীবী তঁাদেরও এটা বুঝতে হবে। দ্বিতীয় ব্যাপার হচ্ছে এই আইনে নারীরা কোন ধরনের প্রতিকার পাবেন, সেটাও নারীদের জানাতে হবে।
প্রান্তিক নারীদের কাছে এই তথ্য পৌঁছানোর ভালো ব্যবস্থা নেই। সরকার ও কিছু এনজিও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু শুধু এটুকুই যথেষ্ট নয়। সমাজের সবাইকে এ নিয়ে কাজ করতে হবে। তৃতীয়ত, পারিবারিক সহিংসতা নারীসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমরা মনে করি, এ ধরনের আইন শুধু আইনিভাবে কার্যকর করা সম্ভব নয়, এর জন্য সমাজের অংশগ্রহণ দরকার। অর্থাৎ সমাজে মানুষের সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আবার এর কারণে শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তার মানসিক বিকাশ হচ্ছে না, পুষ্টি চাহিদা মিটছে না, শিক্ষা গ্রহণ ভালো হচ্ছে না, মায়েরা আমাদের কাছে এমন অভিযোগ করেছেন।
এই সামগ্রিক সামাজিক ক্ষতির দিকটা বুঝতে না পারলে আমরা এই আইনের সুফল পাব না। আর আইনের আশ্রয় নিতে গেলে তো নারীদের নানা কলঙ্কের ভাগীদার হতে হয়। ফলে যে পুরুষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, তাদের জন্য  পরামর্শ সহায়তার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
আর ভরণপোষণের ক্ষেত্রে দেখেছি, আদালত দ্বারা নিশ্চিত করা না গেলে সেটা বাস্তবায়ন করা যায় না। সে কারণে শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গ্রামে-গঞ্জে কাজ করে মনে হয়েছে, আদালতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত আরও বাড়াতে হবে, তার পরিবেশ আরও বন্ধুত্বপূর্ণ করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট আদালতের প্রক্রিয়া কেমন হবে, তা নিয়েও ভাবার অবকাশ আছে। আর নারী অধিকার–সংক্রান্ত অন্যান্য আইনের সঙ্গে এটিকে কীভাবে সংগতিপূর্ণ করা যায়, তা-ও আমাদের ভেবে দেখতে হবে, আইন প্রণয়নের সময়ও আমরা এ কথা বলেছি।
তালাকের ক্ষেত্রে তো স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির মালিকানার অধিকার পান, এ বিষয়ে কিছু করা যায় কি না তা ভেবে দেখতে হবে। যদি তালাকের পরিমাণ বাড়তে থাকে, তাহলে এই আইনের অধীনে মামলা চলাকালে তালাক দেওয়া যাবে না, এমন বিধান করা যায়।
 শেষ কথা হলো ক্ষতিপূরণের জন্য প্রশাসনিক নীতিমালা ও হাতিয়ার তৈরি করা দরকার, তাহলে নারীরা এই আইনের দ্বারস্থ হতে উৎসাহী হবেন। সামগ্রিকভাবে এ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকারের সীমিত অংশগ্রহণ থাকতে পারে, সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। 
সাব্বির মাহমুদ চৌধুরী
সাব্বির মাহমুদ চৌধুরী
এই আইনে ধারা ৪(ঘ), ৬(ঙ)​েত লিগ্যাল এইডের সাহায্য নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমি বলব, এই আইনের সঙ্গে লিগ্যাল এইডের সম্পর্ক খুবই নিবিড়। নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে লিগ্যাল এইড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
আমরা আইনি তথ্য সরবরাহ করি। মামলার খরচ নির্বাহ করি, সালিসের মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি করি, সেটা মামলার আগেও হতে পারে, আবার পরেও হতে পারে। একজন নারী পরামর্শের জন্য আমাদের কাছে আসতে পারেন।
তিনি মামলা না করে অপর পক্ষের সঙ্গে সালিস করতে চাইলেও আমাদের মাধ্যমে তা করতে পারেন। এমনকি মামলা করার পরও তঁারা আসতে পারেন। এই আইনটি আমাদের দেশের একটি অনন্য আইন। এই আইনে শাস্তির বদলে প্রতিকারের কথা বলা হয়েছে। কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, এই আইনে তত্ত্বাবধানের অভাব রয়েছে, সমন্বয় ও যোগাযোগ করা হচ্ছে কি না, তা আমরা জানি না। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন আইনজীবীরা।
যঁার সামর্থ্য আছে, তিনি তো আর এনজিওগুলোর কাছে যাবেন না, তঁাকে আমরা সহায়তাও দেব না। এই মানুষেরা আইনজীবীদের কাছে গেলে তঁারাই সিদ্ধান্ত নেন, কোন মামলা করা হবে। আবার এই আইনে শিশুদের ব্যাপারে বিস্তারিত বলা হয়নি। আলাদা আদালতের কথা এসেছে। আমার মনে হয়, পারিবারিক আদালতের বিষয়টি চিন্তা করা উচিত ছিল।
কিন্তু পারিবারিক আদালতের আংশিক ফৌজদারি চরিত্র আছে। এই মামলাগুলো ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও যায়, ফলে একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব তৈরি হয়। মামলার ধারা কী, প্রকৃতি কী—সেগুলো আর বিবেচ্য বিষয় থাকে না। ফলে এই ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালতই ভালো।
তদন্তের বিষয়ে যে মতামত এসেছে, আমাদের সে ব্যাপারে দ্বিমত আছে। কারণ, আপসের সম্ভাবনা থাকলে হঠাৎ করে আদেশ দিয়ে দিলে তো শেষ, আর কিছু থাকল না।
সে কারণেই মামলাটা আমাদের সময় সময় একটু দীর্ঘায়িত করতে হয়। আদালতের আদেশের কপির কথা এসেছে। কথা হচ্ছে, আদালত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সব বলে দিলে সমস্যা হতে পারে। অনেক সিদ্ধান্ত ঘটনাস্থলে না গেলে নেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে আপনাকে নিজের বিচক্ষণতা কাজে লাগাতে হবে।
সৈয়দা শিরীন আকতার
সৈয়দা শিরীন আকতার
এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে সিলেটে ৮০ জন আইনজীবীকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এমনকি আমরা বিজ্ঞ বিচারক মহোদয়ের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছি। তবে এটাও যথেষ্ট নয়। এই প্রকল্পের প্যানেল আইনজীবী হিসেবে আমি সিলেটে ২৮টি মামলা পরিচালনা করেছি।
৬০ ভাগ ক্ষেত্রে সালিসের মাধ্যমে সমস্যার সমধান হয়ে গেছে। কিছু তালাক হয়েছে, আর বেশির ভাগ নারীই নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ভুক্তভোগী নারীরা অনেক দেরি করে আসেন, তঁারা আসেন পরিস্থিতি তালাকের পর্যায়ে চলে গেলে।
অনেক ক্ষেত্রে ওয়ারেন্ট জারি হলে প্রতিপক্ষ এসে বলে, তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, সেখানে তঁার সন্তান হয়েছে। ফলে সে আর এই স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে এই আইনে প্রতিকার দেওয়া সম্ভব নয়।
তখন দেনমোহর ও ভরণপোষণ আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে যেতে হচ্ছে। অন্যদিকে ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনজীবীদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, তঁারা অনেক সময় এসব মামলা গতানুগতিকভাবে পরিচালনা করেন। শাস্তি বা খালাস—এর মধ্যেই তঁারা সীমাবদ্ধ থাকতে চান। প্রতিকার বা সুরক্ষার দিকে তঁাদের নজর নেই।
এই আইনে ভরণপোষণের কথা বলা আছে, কিন্তু না জানার কারণে সেটা অনেক সময় প্রয়োগ করা হয় না। এই আইনের প্রয়োগের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট, আইনজীবী, পুলিশ, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা—সবারই সমন্বিত প্রশিক্ষণ দরকার। বিচ্ছিন্নভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে লাভ নেই।
এই মামলার জন্য জেলা পর্যায়ে আলাদা আদালত থাকা দরকার। তা না হলে মামলা দীর্ঘায়িত হয়। আলাদা আদালত থাকলে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) প্রক্রিয়ায় এসব মামলা আরও ভালোভাবে চালানো সম্ভব হতো।
এই আইনে এ রকম একটি বিধান যুক্ত করা যেতে পারে যে ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিটি মামলায় একটি বা দুটি সেশন এডিআর করতে বাধ্য। গত চার বছরে বালাগঞ্জ উপজেলা থেকে আমরা এডিআরের মাধ্যমে ভরণপোষাণ ও দেনমোহরের ১ কোটি ১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আদায় করতে পেরেছি, আদালতের মাধ্যমে সেটা হয়তো সম্ভব হতো না বা দীর্ঘায়িত হতো।
 প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে তো মানুষকে লিগ্যাল এইডের কাছে যেতে হবে। কিন্তু মানুষ বিনা মূল্যে আইন সহায়তার বিষয়টি মানুষ জানে না। ফলে এ–বিষয়ক প্রচার–প্রচারণা চালাতে হবে। এই সেবাটিকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।
শাহনাজ হুদা
শাহনাজ হুদা
সত্যি কথা বলতে, এখন পর্যন্ত স্নাতক পর্যায়ে এই আইনে তেমন জোর দেওয়া হয়নি। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তুলনামূলক পারিবারিক আইনের ওপর একটি অধ্যায় আছে। সেখানে পারিবারিক সহিংসতা ও লৈঙ্গিক সহিংসতার বিষয়ে পড়ানো হয়। আমাদের গ্রাম আদালতকে অনেকে আদালত বলতে চান না।
কারণ, এটি পুরোপুরি বিচারিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি আংশিক বিচারিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে বিচারক থাকেন না, ইউনিয়ন পরিষদের পাঁচজন সদস্য এখানে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। গ্রাম আদালতের আইনে একটি বিধান যুক্ত করা হয়েছে, কোনো নারীর মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে সেখানে একজন নারী থাকতেই হবে। জেলা আদালত অনেক দূর, নারীরা আবার সেখানে নানা কারণে যেতে চান না। ফলে গ্রাম আদালতে কিছু কাজ হয়ে গেলে ভালো হয়। পারিবারিক আদালতের বিচারককে যেন অন্য মামলা পরিচালনা করতে না হয়। এটা বোধ হয় শুধু ঢাকাতেই আছে, অন্য জায়গায় নেই।
এই আইনে সহিংসতার শাস্তির বিধান নেই। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে শুধু যৌতুকের বিচার হয়। কিন্তু যদি এমন হয়, তখন স্বামী স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে বা তার অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে, আর তা নিয়ে সহিংসতা হয়, তাহলে সেই নারীর প্রতিকার চাওয়ার জায়গা থাকে না।
সে কারণে তঁাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়, বলতে হয়, স্বামী যৌতুক চেয়েছিল, দেওয়া হয়নি বলে সে স্ত্রীকে মেরেছে। এমনও হয়েছে, আদালত এ ধরনের মামলা তঁার এখতিয়ারভুক্ত নয় বলে সেশন আদালতে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
এ জন্য সহিংসতার বিচার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নিয়ে আসা উচিত। আর স্বামীর স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি সেটা আদালতের মাধ্যমে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা যায়, তাহলে একটা সংযোগ সৃষ্টি করা যাবে।
সালমা আলী
সালমা আলী
এই আইনের প্রতিটি লাইন নিয়ে অনেক চিন্তা করা হয়েছে। কিন্তু আইনটি বাস্তবে প্রয়োগ করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে আমরা বলেছিলাম, পারিবারিক আদালতে এই আইনটি প্রয়োগ করা হোক।
তারপর আমরা গ্রাম আদালতের কথা বলেছিলাম, এই প্রতিষ্ঠানটিকে আরও উন্নত ও কার্যকর করা যায় কি না। আইনটির উন্নয়ন ঘটানোর এখনো সময় আছে। মুসলিম দেশগুলোতে তালাকের সময় সব মিটিয়ে ফেলা হয়, দেনমোহর, ভরণপোষণ প্রভৃতি। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয় না। সারা পৃথিবীতেই নারীবান্ধব ভালো আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই।
আমরা এটা প্রমাণ করতে পেরেছি, পারিবারিক নির্যাতন আর শুধু ঘরের ব্যাপার নয়, এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মেয়েরা সংসার টিকিয়ে রাখতে চায় বলে তারা এটা ঘরের বাইরে আনতে চায় না
এদিকে আইনের বিধিতে কিছু পরিবর্তন আনা দরকার। বিশেষ করে মামলাটা দ্রুত গ্রহণ করতে হবে। কারণ, একটি মেয়ে অনেক ধাপ পেরিয়ে মামলা করতে আসে। ফলে সে যেন আইনজীবী ছাড়াই মামলা করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে, বিধিতে এটা আনা দরকার।
বিচারক নাইমা হায়দারের আদালতে এমন দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি, সেখানে ই-মেইলের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে। এই আইন প্রয়োগ, নারীর সুরক্ষা, প্রতিকার প্রভৃতি সবকিছুর জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ লাগবে। সর্বোপরি, আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আইন বাস্তবায়নে সমন্বয় ও মনিটরিং প্রয়োজন হবে। দেখা যায়, যেখানে প্রকল্প আছে, সেখানে ভালো কাজ হয়, ভারতেও সেটা হয়েছে।
মালিক আব্দুল্লাহ্‌ আল-আমিন
মালিক আব্দুল্লাহ্‌ আল-আমিন
আমাদের সুন্দর একটি আইন আছে। এই আইনকে আরও বেশি কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। তা না হলে আমাদের অভিষ্ট লক্ষ্যে পেঁৗছাতে সময় লাগবে। এটি একটি ফলপ্রসূ আইন। আমরা এই আইনটিকে অরও বেশি কার্যকর করতে চাই। এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত হলে ভুক্তভোগীরা বিশেষভ​​াবে উপকৃত হবে। তবে বাস্তবতা হলো আমরা এখনো সবার দোরগোড়ায় যেতে পারিনি। এ ​ি্বষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।  কিন্তু প্রকল্প এলাকায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। প্রকল্প এলাকার মতো সারা দেশে এ অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন।
সরকার এ ক্ষেত্রে সচেতন রয়েছে। সরকার এ​​ ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকাও র​াখছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনা মূল্যে দরিদ্রদের আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। তবে সবাইকে সচেতন করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম: অামরা পারিবারিক সহিংসতামুক্ত সমাজ দেখতে চাই। এ​ ক্ষে​েত্র সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। পারিবারিক সহিংসতার বিচারের উদ্দেশ্য হলো সম্ভব হলে পরিবারের মধ্যে রেখেই সমাধান বের করা। এ দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন। প্রথম আলোর পক্ষ​ থেকে সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।  
পারিবারিক সহিংসতা একটি অপরাধ। এর প্রতিকারের জন্য আইন রয়েছে। ইউএসএআইডির অর্থায়নে প্রটে​ক্টিং হিউম্যান রাইটস (পিএইচআর) পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প। এ প্রকল্পে কাজ শুরুর সময় ইউনিয়ন পর্যায়ে মাত্র ২৫৬ জন নারী অভিযোগ করেন। আজ চার বছর পর এ সংখ্যা ৫৪ গুণ বেড়ে হয়েছে সাড়ে ১৩ হাজার
* ৫৩ শতাংশ নারী স্বামীর দ্বারা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের ​শিকার হন
* ৮৭ শতাংশ নারী জীবনে একবার হলেও স্বামীর দ্বারা কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হন
  সূত্র: পিএইচআর ভিত্তি জরিপ ২০১১ এবং বিবিএস জরিপ ২০১১ 
আলোচনায় সুপারিশ
* এই আইনের অধীনে মামলা পরিচালনার ক্ষে​েত্র আইনি সহায়তা প্রদান সংস্থার ভূমিকা আরও বেগবান করা
* মানুষ বিনা মূল্যে আইন সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি জানে না। এ বিষয়ে প্রচার–প্রচারণা চালাতে হবে। এই সেবাটিকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে
* মামলা চলার স​ময়ে তালাক দিতে হলে তা আদালতের মাধ্যমে করতে হবে‍—আইনে এমন বিধান অন্তর্ভুক্তকরণ 
* সকল পর্যয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করতে হবে
* মহিলা–বিষয়ক কর্মকর্তার দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন, লজিস্টিক সাপোর্ট ও বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন 
যাঁরা অংশ নিলেন
মালিক আব্দুল্লাহ্‌ আল-আমিন: পরিচালক (জেলা জজ), জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা
শাহনাজ হুদা                 :  সাবেক চেয়ারপারসন, আইন অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আবুল হোসেন               :  প্রকল্প পরিচালক, নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রকল্প
সালমা আলী                  :  নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি
সাব্বির মাহমুদ চৌধুরী              :  জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সহকারী জজ), জেলা ও দায়রা জজ অফিস ঢাকা      
সৈয়দা শিরীন আকতার  :  প্যানেল আইনজীবী, পিএইচআর প্রোগ্রাম, সিলেট
হোমায়রা আজিজ          :  পরিচালক, নারী ও কন্যাশিশুর ক্ষমতায়ন, কেয়ার বাংলাদেশ
জিনাত আরা হক           :  ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর, আমরাই পারি, পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট
গৌরাঙ্গ চন্দ্র মণ্ডল          :  উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা, বালাগঞ্জ সিলেট
তৌহিদা খন্দকার           :  পরিচালক, আইন সহায়তা, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি
ফারহানা আফরোজ       :  প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপক, পিএইচআর প্রোগ্রাম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ  
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম           : সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো