Showing posts with label শিক্ষা. Show all posts
Showing posts with label শিক্ষা. Show all posts

Wednesday, August 19, 2026

পাঠ্যবই থেকে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাদ দিল সৌদি আরব

মিডল ইস্ট আইঃ সৌদি আরবের স্কুলের পাঠ্যবই থেকে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’—এমন একটি বাক্য বাদ দেওয়া হয়েছে। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইল, ইহুদি ও জেরুজালেম নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্যে পরিবর্তন আনার ধারাবাহিকতায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইসরাইলভিত্তিক পাঠ্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইমপ্যাক্ট-সী -এর এক পর্যালোচনায় এসব পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের সৌদি পাঠ্যবই পর্যালোচনা করেছে।

একাদশ শ্রেণির আরবি ভাষার বইয়ের ২০২৩-২৪ সংস্করণে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাক্যটি ছিল। পরবর্তী সংস্করণে, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে, বাক্যটি পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে।

শুধু জেরুজালেমের প্রসঙ্গই নয়, সৌদি পাঠ্যবইয়ে ইসরায়েল ও ইহুদিদের নিয়ে ব্যবহৃত কিছু ভাষাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। কোথাও ‘জায়নবাদী শত্রু’ শব্দের পরিবর্তে ‘ইসরাইলি দখলদারত্ব’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েকটি মানচিত্র থেকেও ফিলিস্তিনের নাম সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা কিছু এলাকা নামহীন রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠী সম্পর্কে আগের কিছু কঠোর ভাষাও বাদ বা পরিবর্তন করা হয়েছে। ইমপ্যাক্ট-সী-এর দাবি, এসব পরিবর্তনের ফলে সৌদি পাঠ্যক্রমে সহাবস্থান, সহনশীলতা ও মধ্যপন্থার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, কিছু বিতর্কিত বিষয় এখনো পাঠ্যবইয়ে রয়ে গেছে।

সৌদি আরবের এই পরিবর্তনকে ঘিরে ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাব্য উদ্যোগের সঙ্গে এসব পরিবর্তনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

তবে সৌদি আরব প্রকাশ্যে এখনো বলে আসছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করার নিশ্চয়তা ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না। ফলে পাঠ্যবইয়ের এই পরিবর্তনকে সরাসরি সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

সৌদি আরবের পাঠ্যবইয়ে জেরুজালেম ও ইসরাইল নিয়ে দীর্ঘদিনের কিছু কঠোর বক্তব্য পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাক্যটি বাদ দেওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এর রাজনৈতিক প্রভাব কতটা হবে এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে সৌদি নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

পাঠ্যবই থেকে ‘মুসলমানরা কখনো জেরুজালেম ছাড়বে না’ বাদ দিল সৌদি আরব

Thursday, July 30, 2026

মুসলিম নেতার গড়া মোহাম্মদ আলী বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলতে কেন উঠেপড়ে লেগেছে বিজেপি সরকার

আল–জাজিরাঃ ভারতের উত্তর প্রদেশে একটি এলাকায় শতাধিক মানুষ মাটিতে বিছানো চাটাইয়ের ওপর পা গুটিয়ে বসে আছেন। জুলাইয়ের প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে তাঁরা স্লোগান দিচ্ছেন এবং জাতীয় পতাকা নাড়াচ্ছেন।

রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে ২০০ কিলোমিটার (১৩২ মাইল) দূরের ওই এলাকাটির নাম রামপুর। কয়েক দিন আগে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে নয়াদিল্লিতে হাজারো তরুণের বিক্ষোভের মুখে দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগে বাধ্য হন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর নয়াদিল্লির বিক্ষোভকারীরা ঘরে ফিরে গেলেও রামপুরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে।

সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি দল অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। তাদের দাবি, মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি ভবনের মধ্যে ৩৮টি ভেঙে ফেলার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা বাতিল করতে হবে।

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা স্বাধীনতা সংগ্রামী মোহাম্মদ আলী জওহরের নামানুসারে বিশ্ববিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের রামপুর জেলায় বিশিষ্ট মুসলিম রাজনীতিক আজম খান এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

আজম খান ২০০৩ সালে মোহাম্মদ আলী জওহর ট্রাস্ট গঠন করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫ জুলাই রামপুর জেলা প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়টির অধিকাংশ ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ জারি করেছে। অথচ সে সময়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের তুমুল বিক্ষোভ চলছিল।

রামপুর প্রশাসনের অভিযোগ, এ ভবনগুলো নির্মাণে প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা ও বিধিমালা ঠিকমতো মানা হয়নি।

কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজ ভবনসহ মাত্র দুটি স্থাপনা বৈধ অনুমোদন নিয়ে নির্মিত হয়েছে। এ দাবি তুলে তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে কথিত ‘অবৈধ’ ভবনগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে।

প্রশাসন আরও জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনগুলো অপসারণে ব্যর্থ হলে তারা বুলডোজার নিয়ে অভিযান চালাবে এবং ভাঙার পুরো খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকেই আদায় করা হবে।

গত সোমবার রাজ্য প্রশাসন তাদের আদেশের ওপর একটি অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ (ইন্টারিম স্টে) জারি করেছে। তবে এতে স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে ভবন ভাঙার কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করা হয়েছে কি না।

জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরউদ্দিন আল–জাজিরাকে বলেন, এই স্থগিতাদেশের অর্থ এই নয় যে ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে।

উপাচার্য বলেন, ‘এর অর্থ হলো, আরডিএ (রামপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) নির্ধারিত ৫ আগস্টের সময়সীমার মধ্যে ভবন ভাঙার কাজ হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় এখন এমন একটি রায়ের চেষ্টা করছে, যাতে ভাঙার আদেশটি সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে যায়।

‘ভাঙচুর বন্ধ করুন’

২৫০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করেন। তাঁদের কাছে সরকারের এই পদক্ষেপ একেবারেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো অপ্রত্যাশিত আঘাত হিসেবে এসেছে।

১৫ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রধান ফটকের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। তাঁদের দাবি, ভবন ভাঙার আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে।

জওহর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করা উসামা তাইয়্যাব প্রশ্ন তোলেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের ফলে যদি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা যায়, তাহলে এখানে এত শিক্ষার্থী আন্দোলন করার পরও উত্তর প্রদেশ সরকারকে কেন বিশ্ববিদ্যালয় ভাঙার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য করা যাবে না?’

প্রায় ২৪ কোটি মানুষের আবাসস্থল উত্তর প্রদেশে ২০১৭ সাল থেকে হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শাসন চলছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী। তিনি মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতির জন্য পরিচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবনের চ্যান্সেলর ৭৭ বছর বয়সী আজম খান উত্তর প্রদেশে বিজেপির অন্যতম কড়া সমালোচক। তিনি সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন।

এই রাজনৈতিক দলটি রাজ্যের ৩ কোটি ৮০ লাখ মুসলিমের মধ্যে জনপ্রিয়। পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত হিন্দু জাতিভুক্ত ভোটারদের একটি বড় অংশও দলটিকে সমর্থন করে।

‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’

সমাজবাদী পার্টির আইনপ্রণেতা জাভেদ আলী খান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের (প্রায় সব ভবন) ভেঙে ফেলার নির্দেশটি শিক্ষাবিরোধী এবং মানুষকে অশিক্ষিত রাখার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির অংশ।’

জাভেদ আলী খান আরও বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিশানা করার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি আজম খান প্রতিষ্ঠা করেছেন। দ্বিতীয়ত, এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সমাজবাদী পার্টির শীর্ষ নেতা মুলায়ম সিং যাদব। তৃতীয়ত, এর উদ্বোধন করেছিলেন রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। আর চতুর্থত, এটি একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়।’

সমাজবাদী পার্টির প্রধান প্রতিষ্ঠাতা মুলায়ম সিং যাদব ২০২২ সালে মারা যান। তাঁর ছেলে অখিলেশ যাদব বর্তমানে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তিনি বিজেপিবিরোধী জোটের এক সদস্য। এই জোটে ভারতের প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসও রয়েছে।

এ বিষয়ে বিজেপির মুখপাত্র রাকেশ ত্রিপাঠী বলেন, ভবন ভাঙার নির্দেশটি ‘অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’। তিনি সমাজবাদী পার্টির বিরুদ্ধে ‘তোষণমূলক রাজনীতি’ করার অভিযোগও তোলেন।

রাকেশ ত্রিপাঠী আল–জাজিরাকে বলেন, ‘কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন, আজম খান অবৈধ জমির ওপর এই বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছেন? সমাজবাদী পার্টির সরকার থাকাকালে তিনি নিজের পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে দখল করা জমিতে এই বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেছেন এবং অবৈধ ভবনও তৈরি করেছেন। আমরা যা করছি, তা হলো অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। আর এর অর্থ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলা উচিত।’

‘মেয়েরা জীবনে আর দ্বিতীয় সুযোগ পাবে না’

রামপুরের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলার আশঙ্কায় জনমনে ক্ষোভ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সাক্ষরতার হারের দিক থেকে উত্তর প্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে রামপুরের অবস্থান নিচের দিক থেকে মাত্র চারটি জেলার চেয়ে ভালো।

এ ছাড়া জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই নারী বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রক্টর গুলরেজ নিজামী।

আইন বিষয়ের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী ইকরা আল–জাজিরাকে বলেন, তিনি একটি নির্দিষ্ট কারণেই এই বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছিলেন। সেটা হলো নারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ।

এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘এখানকার পরিবেশ ও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় নারী শিক্ষার্থীদের এখানে যে নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাতে আমাদের অভিভাবকেরা সন্তুষ্ট। এই বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভেঙে ফেলা হয়, তাহলে আমাদের মতো মেয়েরা আর কোথাও পড়াশোনা করার সুযোগ পাব না। আমাদের অন্য কোথাও পড়ার জন্য পাঠাতে অভিভাবকদের রাজি করানো সম্ভব হবে না। তাঁরা এই জায়গা বেছে নিয়েছিলেন, কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন, এখানে মুসলিম মেয়েরা নিরাপদে থাকতে পারবে।’

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অন্য কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিতে সরকার একটি কাউন্সেলিং ক্যাম্প পরিচালনা করছে বলে জানান ইকরা।

এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘কিন্তু আমরা সেখানে যেতে চাই না। আমরা একটি নির্দিষ্ট কারণেই এই প্রতিষ্ঠান বেছে নিয়েছিলাম।’

শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, এমনটি নয়। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক–তৃতীয়াংশের বেশি হিন্দু।

প্যারামেডিক্যালে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী চাঁদনি দিবাকর আল–জাজিরাকে বলেন, ‘তারা এটিকে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় বলতে পারে এবং হ্যাঁ, আইনি মর্যাদার দিক থেকে এটি একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয়, এখানে অন্যরা পড়াশোনা করে না।’

চাঁদনি দিবাকরও বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচাতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। অবস্থান কর্মসূচির স্থানে তিনি বলেন, ‘আমি এক বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ। সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকেও একবারের জন্যও আমার নিজেকে অমুসলিম বলে মনে হয়নি। এখানকার সবাই বন্ধুত্বপূর্ণ—শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, সবাই।’

আরডিএ বলছে, এক আঞ্চলিক কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। ওই কর্মকর্তা অনিয়মগুলোর বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।

১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ও আরডিএ—উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা আইনজীবীদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। সেদিন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও আরডিএর ভাইস চেয়ারম্যান অজয় কুমার দ্বিবেদী সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাদের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং এরপর তারা লিখিত জবাবও দিয়েছে। জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত ৪০টি ভবনের মধ্যে মাত্র দুটিকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বাকি ৩৮টি ভবন অবৈধ বলে প্রমাণিত হয়েছে।’

কিন্তু উপাচার্য জহিরউদ্দিন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, রামপুরের সিঙ্গনখেড়া গ্রামে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠান আরডিএর আওতায় আসে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থাৎ ভবনগুলো নির্মাণের বহু বছর পর। তাই নির্মাণের সময় সেসব অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল না এবং এখন তা দাবি করা যেতে পারে না।

উপাচার্য আল–জাজিরাকে আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় সিঙ্গনখেড়া এলাকায় আরডিএর কোনো এখতিয়ার ছিল না। আমরা বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদিত কোর্স পরিচালনা করছি, আর এসব সংস্থা তাদের সব শর্ত পূরণ করার পরই অনুমোদন দেয়।’

উপাচার্য জহিরউদ্দিন আরডিএর এই পদক্ষেপকে শিক্ষার সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, তারা শুধু দূরদর্শী চিন্তার অধিকারী আজম খানের বিরুদ্ধে এটিকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি সংখ্যালঘু, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নতির জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কথিত এ অনিয়মগুলোকে বৈধ করা সম্ভব নয়। ফলে আইনগতভাবে একমাত্র সমাধান হিসেবে ভবন ভেঙে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

আল–জাজিরা রামপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিবেদীর বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে, এমনকি রামপুরে তাঁর কার্যালয়েও গিয়েছে। কিন্তু তিনি সাক্ষাৎ করতে বা সাক্ষাৎকারের অনুরোধের কোনো জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান।

‘পুলিশ আমাদের বাড়িতে আসছে’

ভবন ভেঙে ফেলার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরডিএর আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্নাতক উসমান আলী আল–জাজিরাকে বলেন, ‘অন্যরা যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের দাবি আদায় করতে পারে, তাহলে আমরা মুসলিম শিক্ষার্থীরা কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলা বন্ধ করার বৈধ দাবি পূরণ করতে পারব না? এর জন্য যদি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, আমরা তা করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে এই অন্যায় আমরা আর মেনে নেব না।’

উসমান আলী অভিযোগ করেন, ধর্মঘটে থাকা শিক্ষার্থীদের বাড়ি গিয়ে পুলিশ পরিবারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে তারা আন্দোলন বন্ধ করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করে।

উসমান বলেন, ‘পুলিশ আমাদের বাড়ি আসছে এবং আমাদের অভিভাবকদের পরিণতির হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু আমরা পিছু হটব না।’

গত শনিবার সমাজবাদী পার্টির আইনপ্রণেতাদের একটি প্রতিনিধিদল বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেয়। ওই দলে ছিলেন জাভেদ আলী খান, সাম্ভল আসনের জিয়া উর রহমান বার্ক ও কৈরানার ইকরা চৌধুরী।

বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসা ও নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ভারতে মুসলিমদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, দোকান ও অন্যান্য স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপের প্রভাব অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মুসলিমদের ওপরই বেশি পড়ছে।

তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা শুধু ‘অবৈধ দখল’ উচ্ছেদের লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এ নিয়ে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি সাহিত্যের শিক্ষক অপূর্বানন্দ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘বিষয়টিকে (ভবন ভাঙার পদক্ষেপ) একাধিক দিক থেকে দেখা যায়। প্রথমত, এটি হিন্দু ভোটারদের সামনে মুসলিমদের প্রভাবকে দমন করার একটি প্রদর্শনী। দ্বিতীয়ত, এই সরকারের মেয়াদজুড়ে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একটি ধারাবাহিক প্রচার চালানো হয়েছে। আর তৃতীয়ত, তারা হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে মেলামেশা চায় না, আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এমন মেলবন্ধনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।’

জওহর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক আবদুল কালিম আনসারি যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সদ্য তিনি রামপুরে ফিরেছেন।

উভয় আন্দোলনে অংশ নেওয়া আনসারি বলেন, তিনি বিস্মিত যে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে রাস্তায় নামা ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ আন্দোলনের কর্মসূচিতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলার আসন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

আনসারি বলেন, ‘এটা বিস্ময়কর যে তারা শিক্ষা সংস্কারের কথা বলছে। কিন্তু দিল্লি থেকে মাত্র কয়েক শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে জারি করা ভবন ভাঙার নোটিশ নিয়ে তারা কিছুই বলছে না।’

আনসারি আরও বলেন, ‘এর ফলে বর্তমান ও প্রাক্তন সব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর এখন আমরা জানি না, এখান থেকে আমাদের কোথায় যেতে হবে।’

মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার মুমতাজ সেন্ট্রাল লাইব্রেরি
মোহাম্মদ আলী জওহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার মুমতাজ সেন্ট্রাল লাইব্রেরি। ছবি: আসাদ আশরাফের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া।

Wednesday, July 15, 2026

ফার্মের মুরগিরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি আজ শিক্ষামন্ত্রী -সোনারগাঁয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি

এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, আমরা এমন একজন শিক্ষামন্ত্রী পেয়েছি যিনি স্ট্যান্ডবাজি ও টেন্ডারবাজিতে ওস্তাদ। শিক্ষামন্ত্রী সব জায়গায় গিয়ে বলেন, নকল আর হবে না। ২০২৬ সালের শির্ক্ষাথীরা কিন্তু আপনাদের দেখিয়ে দিচ্ছে এ স্ট্যান্ডবাজি এদেশে আর চলবে না। হাটুঁ সমান পানিতে, বুক সমান পানিতে ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের আপনি ডুবিয়ে ডুবিয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করেছেন।

একটি পরীক্ষায় আপনি দুইটা সৃজনশীল ভুল দিয়ে রেখেছেন। পরীক্ষার্থী যখন পরীক্ষা কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নে উত্তর মেলাতে চেষ্টা করে সে যখন উত্তর মেলাতে পারে না, তখন তাদের কী ধরনের মানসিক অবস্থা হয়, বুঝতে পারেন?

এ ঘটনায় আপনি একবারও দুঃখ প্রকাশের প্রয়োজন মনে করলেন না। বরং এ শিক্ষার্থীদের আপনি বললেন মাদকাসক্ত। শিক্ষামন্ত্রী আপনি আজ যাদের ফার্মের মুরগী বলছেন। এ ফার্মের মুরগীরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি আজ শিক্ষামন্ত্রী হতে পেরেছেন। এ ফার্মের মুরগীরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই শিলং থেকে এসে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হয়েছেন।

এ ফার্মের মুরগীরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আজ লন্ডন থেকে এসে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সোনারগাঁ উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ পথযাত্রা নারায়ণগঞ্জ জেলা এনসিপি আয়োজিত এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, শিক্ষামন্ত্রীকে বলব শিক্ষার্থীরা গিনিপিগ নয়। তাদের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ করুন। কিছুদিন পর পর আপনাদের ইচ্ছা হয় আর সেটাই শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেন। আপনাদের সন্তানরা দেশে পড়াশুনা করে না। তাদের বিদেশে রেখে পড়াশুনা করান।

পরের সন্তানকে রাস্তায় নিয়ে রাজনীতি করবেন, এক্সপিরিমেন্ট করবেন- এ বাংলায় আর এসব হতে দেওয়া হবে না। ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করার অনুরোধ করছি, তা না হলে তারা রাস্তায় নামলে আপনাদের অস্থিত্ব থাকবে না। আপনাদের পাটাতন যে কত দুর্বল তা শিক্ষার্থীদের অর্ধবেলার আন্দোলনেই বুঝা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এখানে বাপ হচ্ছে এমপি আর তার ছেলে করে চাঁদাবাজি। থানায় গিয়ে দিতে হয় মুচলেকা। আমরা সারা দেশে দেখি গ্যাসের হাহাকার আর সোনারগাঁয়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান অবৈধ সংযোগ নিয়ে কোটি কোটি টাকা সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

চুনা কারখানাগুলো কোটি টাকার অবৈধ গ্যাস পোড়াচ্ছে। সোনারগাঁয়ের নদী ও খালগুলো রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দখল করে ফেলেছে। চব্বিশ পরবর্তী এ বাংলাদেশ আমরা চাইনি। ব্যবসায়ীরা, হকাররা ও রিকশাচালকরা হাহাকারের মধ্যে রয়েছে। দুইশত টাকা ইনকাম করলে পঞ্চাশ টাকা ছাত্রদল যুবদলকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। স্থানীয় এমপিদেরকেও চাঁদা দিতে হয়। এ চাঁদাবাজি বাংলাদেশ আর চলবে না।

আপনারা এভাবে চাঁদাবাজি করে বেশি দিন আর খেতে পারবেন না। আবার যদি জুলাই হয় পালানোর জায়গা পাবেন না। হাসিনার জন্য ইন্ডিয়া ছিল। আপনারা বলেন আপনারা বাংলাদেশপন্থি। আপনাদের কিন্তু ভারতে জায়গা হবে না। পাকিস্তানেও জায়গা হবে না। আমাদেরকে এদেশেই থাকতে হবে, সুতরাং মানুষের আকাঙ্খার বাইরে গেলে জনগণ রাস্তায় বিচার করবে।

তিনি বলেন, আমরা হাসিনা ব্যবস্থার পরির্বতন চেয়েছি কেবল হাসিনার পরিবর্তন চাইনি। বর্তমান সরকার জন আকাঙ্খার বিপক্ষে গিয়ে, গণভোটের বিপক্ষে গিয়ে এমন অবস্থান নিয়েছেন যা সরাসরি আমাদের আকাঙ্খার পরিপন্থি।

তিনি চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, বন্যা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রতিমন্ত্রী হজ্ব করতে চলে গেছেন। একই সময় দেখেছি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ বন্যায় কষ্ট পাচ্ছে আর প্রধানমন্ত্রী বরিশাল সফর করছেন।

চট্টগ্রাম থেকে এ বছর নব্বই হাজার কোটি টাকার বেশি জাতীয় রাজস্ব জমা দেওয়া হয়েছে। পরিতাপের বিষয় এ সংকটকালে বন্যার জন্য চট্টগ্রামে জনপ্রতি ত্রিশটারও কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেছেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি নাকি সংবিধানে নাই। যদি এটি সংবিধানে না থেকে থাকে তাহলে ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনও কোনো সংবিধানে নেই। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে। আপনার থাকার কথা ছিল শিলংয়ে, প্রধানমন্ত্রীর থাকার কথা ছিল লন্ডনে, আপনার নেতাকর্মীর থাকার কথা ছিল ধানক্ষেতে, আপনার নেতাকর্মীর ঢাকা শহরে চালানোর কথা ছিল রিকশা।

এ সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, ছাত্রজনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আপনাদের পায়ের তলায় কিন্তু মাটি নেই।

পরে হাসনাত আব্দুল্লাহ জাতীয় যুবশক্তির সিনিয়র সহ-সভাপতি তুৃহিন মাহমুদকে আসন্ন সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থী ঘোষণা করেন।

অনুষ্ঠানে জাতীয় যুবশক্তির সিনিয়র সহ-সভাপতি তুৃহিন মাহমুদের সভাপতিত্বে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন ও জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তরিকুল ইসলামসহ উপজেলা এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ফার্মের মুরগিরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি আজ শিক্ষামন্ত্রী
ছবি: আমার দেশ

Monday, June 15, 2026

মধ্যযুগ : বহুমুখী জ্ঞানচর্চার স্বর্ণসময় by ইলিয়াস মশহুদ

বর্তমানে ‘মাদরাসা’ শব্দটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে মাদরাসার ধারণা ছিল অনেক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। সে সময়ের মাদরাসাগুলো শুধু ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল না, সেগুলো আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে ওঠা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। সেখানে ধর্মীয় বিদ্যার পাশাপাশি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং প্রশাসনিক বিদ্যারও চর্চা হতো। এসব প্রতিষ্ঠান ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈশ্বিক বিকাশের প্রধানকেন্দ্র। মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আইয়ুবি শাসকদের (৫৬৯-৬৪৮ হি./ ১১৭১-১২৫০ খ্রি.) অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মিসর ও শামজুড়ে গড়ে ওঠে অসংখ্য মাদরাসা, দারুল হাদিস ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। এসব প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বহুমুখী জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। আইয়ুবি যুগে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মাদরাসা নিয়ে লিখেছেন ইলিয়াস মশহুদ

৫৭২ হিজরিতে (১১৭৬ খ্রি.) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি বৃহত্তর সিরিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি যখন মিসরে ফিরে আসেন, তখন সেখানে শিক্ষার বিস্তার ও সুন্নি ভাবধারার প্রচারের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের বিশেষ উদ্যোগ নেন।

আইয়ুবি শাসনামলে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এবং তার উত্তরসূরিদের তত্ত্বাবধানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও শিক্ষাকাঠামো প্রণয়নে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ফাতেমি আমলের শিয়া মতাদর্শের প্রভাব কাটিয়ে বৃহত্তর সুন্নি মতাদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ক্ষেত্রে এ সময়টি গুরুত্বপূর্ণ।

আইয়ুবি শাসনামলে শিক্ষাবিপ্লবের প্রধান কেন্দ্র ছিল কায়রো, দামেস্ক এবং আলেকজান্দ্রিয়া। ফাতেমিদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব মুছে সুন্নি মতবাদ রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তিশালী করা ছিল এই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। এসব মাদরাসা থেকে বিজ্ঞ আলেম, দক্ষ বিচারক, প্রশাসক এবং আমলা তৈরি হতেন। তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখতেন। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহুমুখী জ্ঞানচর্চার সুযোগ ছিল। কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), সাহিত্য এবং অলংকার শাস্ত্র (বালাগাত); যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ গণিতশাস্ত্রের চর্চাও অব্যাহত ছিল।

সালেহিয়া মাদরাসা

মিসরের কায়রো শহরে ইমাম শাফেয়ির মাকবারার কাছে ৫৭২ হিজরিতে (১১৭৬ খ্রি.) এই মাদরাসার নির্মাণকাজ শুরু হয়। এই মাদরাসার শিক্ষাধারা শাফেয়ি মাজহাব অনুযায়ী পরিচালিত হতো। ইমাম সুয়ুতি বলেন, ‘এই মাদরাসা হচ্ছে সব মাদরাসার তাজ। খ্যাতিমান আলেম নাজমুদ্দিন খুবুশানির তত্ত্বাবধানে এখানে শিক্ষাদান শুরু হয়।’

৫৭৮ হিজরিতে (১১৮৩ খ্রি.) জিলহজের শেষদিকে, যখন এর উন্নয়নকাজ চলছিল, তখন প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে জুবায়ের এই মাদরাসা পরিদর্শন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘এ অঞ্চলে সালেহিয়া মাদরাসার মতো অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়নি। মাঠের বিশালতা এবং নির্মাণশৈলীর অনন্যতার দিক দিয়ে এটি অতুলনীয়। দর্শকের মনে হবে, এ যেন স্বাধীন একটি রাজ্য। এটি নির্মাণে অনেক অর্থ ব্যয় করা হয়। শায়খ খুবুশানি নিজেই এ মাদরাসার পরিচালক ছিলেন। সুলতান সালাহুদ্দিন তাকে এর দায়িত্ব দিয়ে বলেছিলেন, ‘এর সৌন্দর্যবৃদ্ধিতে আপনি ইচ্ছামতো ব্যয় করুন, খরচ বহনের দায়িত্ব আমাদের।’

ইবনে জুবায়েরের এই বক্তব্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, সুলতান সালাহুদ্দিন এসব মাদরাসার জন্য সৎ, যোগ্য, বিজ্ঞ এবং প্রসিদ্ধ আলেমদের শিক্ষক নির্বাচন করতেন।

হুসাইনি মাদরাসা

সুলতান সালাহুদ্দিন কায়রোতে (তথাকথিত) মাশহাদে হুসাইনি তথা হুসাইনের সমাধির পাশে একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন এবং এই মাদরাসার জন্য বিপুল সম্পদ ওয়াকফ করেন। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘সুলতান আন-নাসির (সালাহুদ্দিন) ক্ষমতালাভের পর সেখানে দরস-তাদরিস এবং ফকিহদের অবস্থানের ব্যবস্থা করেন। তিনি বিখ্যাত ফকিহ বাহাউদ্দিন দিমাশকির হাতে এর পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি যে মিম্বরে বসতেন, এর পেছনেই ছিল (তথাকথিত) হুসাইন (রা.)-এর সমাধি।’

সুলতান আল-মালিকুল কামিলের শাসনামলে মুইনুদ্দিন হাসান ইবনে শায়খুশ শুয়ুখ উজিরের দায়িত্ব লাভ করলে তিনি এই মাদরাসার জন্য ওয়াকফ জমা করেন। এর দ্বারা বিশাল শিক্ষাভবন এবং ফকিহদের জন্য (আবাসিক) উঁচু বাড়িগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল।

ফাতেমি যুগে বিস্তার ঘটা শিয়া মতবাদের ইতি টানা এবং সুন্নি মতাদর্শের বিস্তারের লক্ষ্যে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি একাধিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই মাশহাদে হুসাইনিতে মাদরাসা নির্মাণের বিশেষ তাৎপর্য ছিল।

ফাজিলিয়া মাদরাসা

এ সময়ে নির্মিত অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ফাজিলিয়া মাদরাসা। ৫৮০ হিজরিতে (১১৮৪ খ্রি.) কাজি আল-ফাজিল এই মাদরাসা নির্মাণ করেন এবং শাফেয়ি ও মালেকি মাজহাব পাঠদানের জন্য ওয়াকফ করেন। এই মাদরাসার জন্য অসংখ্য গ্রন্থও ওয়াকফ করা হয়েছিল। এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখে পৌঁছে গিয়েছিল। পাশাপাশি এতিমদের শিক্ষার জন্যও জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছিল। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘এই ফাজিলিয়া ছিল কায়রোর সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।’

কামিলিয়া মাদরাসা

আল-মালিকুল কামিল ইবনে আদিল হাদিস শাস্ত্রের প্রতি খুব আগ্রহী ছিলেন। কায়রোতে তিনিই কামিলিয়া মাদরাসা নামে সর্বপ্রথম হাদিসের জন্য বিশেষায়িত মাদরাসা নির্মাণ করেন। ৬২২ হিজরিতে (১২২৫ খ্রি.) এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমে হাদিস শাস্ত্রে অভিজ্ঞ আলেমদের কাছে, পরে শাফেয়ি মাজহাবের ফকিহদের কাছে এর দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। বিখ্যাত হাদিসবিশারদ হাফিজ ওমর ইবনে হাসান আন্দালুসিকে এই মাদরাসার পরিচালক নিযুক্ত করা হয়।

সমন্বয়ধর্মী মাদরাসা

বাগদাদের মুসতানসরিয়া মাদরাসার আদলে আস-সালেহ নাজমুদ্দিন আইয়ুব ইবনে কামিল ফাতেমিদের পূর্ব-প্রাসাদের কাছে ৬৩৯ হিজরিতে (১২৪১ খ্রি.) একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠানে সমন্বিতভাবে চার মাজহাবের পাঠদান করা হতো। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বৃহত্তর মিসরে স্থানে এক ছাদের নিচে চার মাজহাবের শিক্ষা চালু করেছিলেন।’

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা

আইয়ুবি শাসনামলে শিক্ষা ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং রাষ্ট্রীয় বা ওয়াকফ করা সম্পদ দ্বারা পরিচালিত। শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা-খাওয়া এবং মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল। শ্রেষ্ঠ আলেম ও বিজ্ঞদের এসব মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো। তাদের সামাজিক মর্যাদা ও বেতন ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক। সালেহিয়া মাদরাসার অধ্যাপক নাজমুদ্দিন আল খুবুশানিকে মাসিক ভাতা হিসেবে ৪০ দিনার, মাদরাসার ওয়াকফ সম্পদ দেখাশোনার জন্য ১০ দিনার, প্রতিদিন ৬০ রিতিল রুটি এবং দুই মশক নীলনদের পানি বরাদ্দ ছিল। প্রতিটি বড় মাদরাসায় গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ছিল।

আইয়ুবি রাজবংশের নারীরাও শিক্ষাবিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। সালাহুদ্দিনের বোন জুমুররুদ খাতুন এবং পরিবারের অন্য নারীরা দামেশকে বহু মাদরাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আইয়ুবি শাসকদের এই শিক্ষাবিপ্লবের ফলে আড়াই শতাব্দী পর মিসর আবার বাগদাদ ও কর্ডোভার মতো ইসলামি সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

শিক্ষার বিস্তার ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সোনালি অধ্যায়

আইয়ুবি শাসকদের মাদরাসা নির্মাণের প্রচেষ্টা শুধু কায়রোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মিসরের অন্যান্য শহরেও তা বিস্তৃত হয়েছে। ফাইয়ুম শহরে দুটি মাদরাসা নির্মাণ করা হয়। ৫৭৭ হিজরিতে (১১৮১ খ্রি.) আলেকজান্দ্রিয়াতে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন। ওয়াকফ সম্পদের মাধ্যমে এসব মাদরাসার শিক্ষকদের জীবিকার ব্যবস্থা হতো।

ইবনে জুবায়ের বলেন, ‘এ অঞ্চলের (আলেকজান্দ্রিয়া) গর্ব এবং এ অঞ্চলের সুলতানের কৃতিত্বের অনন্য নিদর্শন হচ্ছে, এখানকার মাদরাসাগুলো এবং শিক্ষার্থী ও ইবাদতগুজার ব্যক্তিদের জন্য নির্মিত সরাইখানা।’

তারা দূরদূরান্ত থেকে এখানে আসতেন। তাদের প্রত্যেকেই আশ্রয়ের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা ছিল। বিষয়ভিত্তির শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষকের উপস্থিতি ছিল। একজন কর্মকর্তা সবসময় তদারকি করতেন।

ইবনে জুবায়ের বলেছেন, ‘আলেকজান্দ্রিয়ায় অধিকাংশ মসজিদ ছিল যৌথ (অর্থাৎ, মসজিদ ও মাদরাসার সমন্বয়ে গঠিত)। তার প্রত্যেকটিতেই সুলতানের পক্ষ থেকে ইমাম নিয়োজিত ছিল। তাদের কারো মাসিক বেতন ছিল পাঁচ মিসরি দিনার, আবার কারো এর চেয়ে বেশি বা কম। এ ছিল সুলতানের অন্যতম মহৎ কর্ম।’

সুলতান সালাহুদ্দিন বাইতুল মাকদিসে শাফেয়ি মাজহাবের এবং দামেশকে মালেকি মাজহাবের অনুসারীদের জন্য মাদরাসা নির্মাণ করেছিলেন। তাকিউদ্দিন ওমর এডেসায় একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন। আল-আজিজ ওসমান ইবনে সালাহুদ্দিন দামেশকে ভাই আল-আফজালের মাধ্যমে আজিজিয়া মাদরাসা; মুয়াজ্জম ঈসা মুয়াজ্জামিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একইভাবে সালাহুদ্দিনের ভাই সাইফুল ইসলাম দামেশকে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ শহরেই আল আশরাফ মুসা ইবনে আদিল দারুল হাদিস আশরাফিয়া নির্মাণ করেন।

জামে বনু উমাইয়ার কাছে কাজি আল-ফাজিল দারুল হাদিস ফাজিলিয়া নির্মাণ করেন। সালাহুদ্দিনের বোন সিত্তুশ শাম দামেশকে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এমনিভাবে তার আরেক বোন রাবেয়া খাতুনও দামেশকে একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন।

আলেপ্পো শহরও আইয়ুবিদের প্রচেষ্টায় অনেক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়। আল-মালিকুজ জাহির হানাফি এবং শাফেয়িদের জন্য একটি যৌথ মাদরাসা নির্মাণ করেন। শুধু শাফেয়ি মাজহাবের জন্য ইবনু শাদ্দাদ সালেহিয়া নামে আরেকটি মাদরাসা নির্মাণ করেন।

এভাবে আইয়ুবি আমলে সাম্রাজ্যের নানা প্রান্তে অসংখ্য মাদরাসা নির্মিত হয়েছে। এমনকি ইজ্জুদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ শুধু দামেশকেই চার মাজহাবের ৯২টি মাদরাসা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন।

মধ্যযুগ : বহুমুখী জ্ঞানচর্চার স্বর্ণসময়
১২৩৬ সালে নির্মিত আলেপ্পোর ফেরদৌস মাদরাসা

Friday, June 12, 2026

উত্তর প্রদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘ধর্মান্তরবিরোধী’ সেল গঠন হচ্ছে, কাকে লক্ষ্য করে এই পদক্ষেপ

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রাজ্যপাল আনন্দীবেন প্যাটেল রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজসহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তথাকথিত ‘ধর্মান্তরবিরোধী সেল’ গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের ক্ষমতাসীন উগ্র হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে।

রাজ্যপালের সচিবালয় থেকে রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য এবং পরিচালকদের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটসহ সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কাউন্সেলিং সেবা, নজরদারিব্যবস্থা, ছাত্রকল্যাণ পদ্ধতি, তথ্য জানানোর প্রোটোকল জোরদার করতে এবং প্রতিরোধমূলক সুরক্ষাকবচ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তথাকথিত প্রলোভন, মানসিক চাপ বা অন্য কোনো অনৈতিক উপায়ে শিক্ষার্থীদের (ধর্মান্তর করার জন্য) প্রভাবিত করার অভিযোগ আসার পর রাজ্যপালের দপ্তর থেকে এই নির্দেশ দেওয়া হলো।

আরেক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে, ভয় দেখিয়ে, মানসিক চাপ তৈরি করে বা অনৈতিক প্রলোভন দেখিয়ে যেকোনো ধরনের অবৈধ বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য, অনৈতিক এবং আইনবিরোধী।’

চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, ‘প্রলোভন বা মানসিক চাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার’ বিষয়ে ঘন ঘন প্রতিবেদন বা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে ‘র‌্যাডিক্যালাইজেশনবিরোধী’ (উগ্রবাদবিরোধী) ইউনিট বা ছাত্রকল্যাণ সেলগুলোকে অত্যন্ত সক্রিয় করতে হবে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ‘নৈতিক মূল্যবোধ, যৌক্তিক চিন্তাভাবনা এবং আইনি অধিকার’ বিষয়ে বক্তৃতা ও সেমিনারের আয়োজন করে, চিঠিতে সেই পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোনো সংস্থা, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি যদি ধর্মান্তরের চেষ্টার সঙ্গে জড়িত কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের ক্ষেত্রে রাজ্যের ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’ এর আগেও প্রতিবেদন করেছিল, কীভাবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এবং রাজনৈতিক নির্দেশে এই ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অপব্যবহার করেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও অন্যান্য সংগঠনের নজরদারি দলগুলো সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের হয়রানি করতে এই আইন ব্যবহার করছে।

কোনো অ-হিন্দু প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী যদি বিনা মূল্যে ক্লিনিক, বৃত্তি বা এমনকি একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রার্থনাসভার আয়োজন করে, তবে তা নজরদারির আওতায় আসে এবং এরপর আইনি ও বেআইনি পথে হিন্দুত্ববাদীরা প্রশাসনের সহায়তায় হয়রানি শুরু করে।

এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা দেখা গেছে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী কোনো গোষ্ঠী অভিযোগ দায়ের করেছে এবং প্রমাণ দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। কম সাজা হওয়ার হারের কারণে এ ধরনের গ্রেপ্তার, আদালতের মামলা এবং সহিংসতা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করছে। আইনগুলো ধর্মান্তর রোধ করার জন্য নয়, বরং সংখ্যালঘুদের ভয় দেখানোর একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে ভারতের উত্তর প্রদেশের বেআইনি ধর্মান্তরকরণ নিষেধাজ্ঞা আইন, ২০২১-এর অধীনে মিথ্যা এফআইআর দায়ের করার বিষয়টিকে ‘উদ্বেগজনক প্রবণতা’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট। রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য সচিবকে (স্বরাষ্ট্র) এ ধরনের মামলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা উল্লেখ করে একটি ব্যক্তিগত হলফনামা (এফিডেভিট) দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

ভারতের উত্তর প্রদেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ধর্মান্তরবিরোধী সেল’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
ভারতের উত্তর প্রদেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ধর্মান্তরবিরোধী সেল’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে. ছবি। এএনআই

Sunday, May 3, 2026

বইয়ের বোঝায় চাপা পড়া শৈশব অথবা একালের ‘তোতাকাহিনী’ by মেহেদি রাসেল

ফল দেখে বৃক্ষের পরিচয় জানা গেলেও ফলাফল দেখে বাংলাদেশের শিক্ষার বর্তমান হাল বোঝা বেশ জটিল। প্রায় শতভাগ পাস আর জিপিএ–৫–এর ছড়াছড়িতে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘উচ্চফলনশীল’ মনে হলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনায় হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। শিক্ষার মান নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্সের (জিকেআই) ২০২২ সালের তালিকায় ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৫তম। এমনকি জিকেআইয়ের বৈশ্বিক গড় স্কোরেরও (৪৬.৫) বেশ নিচে বাংলাদেশের স্কোর (৩৬.৮)। সুতরাং হরেদরে জিপিএ-৫ দেখে যাঁরা ভাবছেন, আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাট বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছি, তাঁরা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে দেখতে পারেন। শুধু শিক্ষার মান পরিমাপক আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং নয়, দেশীয় মানে পরিচালিত এ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে ভর্তি পরীক্ষা, সেখানকার ফলাফলেও জিপিএ-৫–ধারীদের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। গত কয়েক বছরে উচ্চ জিপিএ অর্জনকারী অনেক শিক্ষার্থী ওই পরীক্ষাগুলোতে ‘পাস’ মার্ক পর্যন্ত তুলতে পারেনি।

দেশে যে–সংখ্যক শিক্ষার্থী, সে তুলনায় সরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কম। ফলে বেসরকারি উদ্যোগে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসবের মধে৵ কতগুলো প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্যে আর কতগুলো স্রেফ ব্যবসার জন্য, সে ব্যাপারে আলাপ হওয়া দরকার। আমাদের দেশের অন্য সব ব্যবসায়ীর মতো ‘শিক্ষা ব্যবসায়ী’রাও ব্যবসার প্রকৃত নীতিনৈতিকতা মেনে চলেন না। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা আসলে উপকৃত হয় না। নামমাত্র সার্টিফিকেট তারা পায় বটে, সঠিক শিক্ষাটা পায় না। দেশের প্রতিটি শহরের অলিগলিতে নানা ধরনের স্কুল দেখতে পাওয়া যায়।

বাংলা, ইংরেজি, আরবি, গান, নাচ, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন ইত্যাদির একটি প্যাকেজ মনে হয় এসব বিদ্যালয়কে। শিশুকে যত ধরনের ‘শিক্ষা’ দেওয়া যায়, তারই যেন চূড়ান্ত এগুলো। আমাদের অভিভাবকেরাও ‘একের ভেতরে সব’ পেয়ে ছোটেন বাচ্চাদের এসব স্কুলে ভর্তি করাতে। যে বয়সে শিশুদের শেখার কথা সহযোগিতা, সেই বয়সে তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় প্রতিযোগিতা। খোলা মাঠ নয়, ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়ার ইঁদুর দৌড়ের মাঠে আচমকা এসে পড়তে হয় তাদের। ফলাফলের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লে আবার শিক্ষার্থীদের মা-বাবার ‘ইজ্জত’ থাকে না।

কোমলমতি বাচ্চারা এখন বড় হয় ‘মা-বাবার ইজ্জত বাঁচানো প্রকল্পের’ বিরাট বোঝা মাথায় নিয়ে। শুধু তাই নয়, মাথার বোঝার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের পিঠেও একটা প্রকাণ্ড বোঝা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ওই বোঝার নাম ‘বইয়ের বোঝা’। সে স্কুলে যত বেশি বই, সেই স্কুল তত ভালো—এমন একটা ধ্যানধারণা নিয়ে বেসরকারি স্কুলগুলোতে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও অনেক বই বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হয়। দেশে সরকারি একটা পাঠ্যক্রম আছে, শিক্ষাক্ষেত্রের অভিজ্ঞ মানুষদের নিয়ে তা তৈরি হয়, বছর বছর পর্যালোচনা, পরিবর্তন, পরিবর্ধনও করা হয়। সেই সিলেবাসের বই ছাড়া ক্লাসে অন্য বই পড়ানো আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি স্কুল কমিটির লোকজন সেটি থোড়াই কেয়ার করে। তারা তাদের ইচ্ছেমতো বই পড়তে বাধ্য করে শিক্ষার্থীদের। কোনো স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে তিনটি বই, কোনো স্কুলে পড়ানো হয় সাতটি।

বেশি বই পড়ানোতে স্কুলের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির ব্যাপার যেমন থাকে, তেমনি থাকে ব্যবসায়িক ফায়দা লোটার চেষ্টাও। কোনো কোনো স্কুল সরাসরি বই-খাতা বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকে, বাকিরা বইয়ের দোকানির সঙ্গে কোনো একটা ‘বন্দোবস্ত’ করে নেয়। অনেক সময় ইচ্ছা না থাকলেও অভিভাবকেরা অতিরিক্ত বই ও খাতা কিনতে বাধ্য হন। কিন্তু এনসিটিবির আইনে বলা আছে, ‘বোর্ড কর্তৃক পাঠ্যপুস্তক প্রণীত ও প্রকাশিত নয় অথবা পাঠ্যপুস্তক হিসেবে অনুমোদিত নয়, এমন কোনো পুস্তককে কোনো বিদ্যালয়ের জন্য পাঠ্যপুস্তক হিসেবে নির্ধারণ করা যাবে না। কেবল সরকারি প্রজ্ঞাপন দিয়ে কোনো বিদ্যালয় বা কোনো শ্রেণির বিদ্যালয়কে এ ধারার প্রয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ আছে।’

কিন্তু কোনো প্রকার প্রজ্ঞাপন ছাড়া বছরের পর বছর বিদ্যালয়গুলো অতিরিক্ত বই পড়িয়েই যাচ্ছে। শিক্ষাবিষয়ক সব কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে দিনের পর দিন চলছে এসব। আইন আছে প্রয়োগ নেই। কাজির গরুর মতো এসব আইন কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই। কিন্তু এর কারণে ভুক্তভোগী হচ্ছে আমাদের কোমলমতি শিশুরা। আমরা তাদের কাছ থেকে তাদের শৈশব ছিনিয়ে নিচ্ছি। স্কুল শুরু কিংবা ছুটির সময়ে দেখা যায়, বইয়ের ব্যাগের ভারে নুয়ে পড়া ছোট ছোট শিশু অতি কষ্টে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। যারা একেবারে অপারগ বা যাদের সাহায্যকারী আছে, তাদের ব্যাগ বয়সে বড় কারও পিঠে দেখা যায়। ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত এ ব্যাপারে একটি নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেখানে শিশুর শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী ব্যাগ বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বলাই বাহুল্য, সব স্কুল এখনো এই নির্দেশ মানে না।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থা ঢাকাসহ প্রধান প্রধান শহরের স্কুলগুলোর। গলির মোড়ে মোড়ে চার দেয়ালের মধে৵ গজিয়ে উঠেছে প্রচুর স্কুল। এসব স্কুলে মাঠ তো দূরের কথা, পর্যাপ্ত আলো–বাতাস পর্যন্ত নেই। বাসার চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে স্কুলের চার দেয়াল—এই হলো আমাদের শিশুদের চলাফেরা।

শিশুদের মানসিক বিকাশ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই আমাদের নীতিনির্ধারক ব্যক্তিদের। ফলে বিষণ্নতা ও হতাশাপ্রবণতাই এখন তাদের নিত্যসঙ্গী। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আঁচল ফাউন্ডেশন জানাচ্ছে, দেশে গত বছর স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতি মাসে গড়ে ৩৭ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। তাদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছর। এই শিশুদের মধ্যে একটি অংশের আত্মহত্যার কারণ হলো, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া এবং শিক্ষকের দ্বারা অপমানিত হওয়া। এই অচলায়তনের শেষ কোথায়? কত দিন এমন অনিয়মের বোঝা বইতে বাধ্য হবে আমাদের শিশুরা?

মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তোতাকাহিনী’ গল্পের সেই তোতা পাখির কথা। রাজার নির্দেশে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাকে সোনার খাঁচায় বন্দী করা হয়েছিল। পাখির চেয়ে পাখিকে শেখানোর কায়দাটা এত বড় ছিল যে রাজা পাখিটিকে দেখতেই পাননি। পুঁথির পাহাড়ের আড়ালে পাখিকে দেখতে না পেয়ে বরং খুশিই হয়েছিলেন রাজামশাই। পণ্ডিতেরা পাখিটিকে হাঁ করিয়ে জোর করে পুঁথির পৃষ্ঠা তার মুখের মধ্যে পুরে দিত। অতিরিক্ত শিক্ষার ভার সইতে না পেরে একদিন প্রাণ যায় পাখিটির। আমাদের শিশুদেরও কি আমরা এভাবে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছি না? প্রাণে না মরলেও তারা যে ‘মনে’ মরে যাচ্ছে দিনে দিনে!

* মেহেদি রাসেল, কবি ও প্রাবন্ধিক
- mehedirasel32@gmail.com

Friday, November 21, 2025

জম্মুতে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাতিলের দাবিতে উগ্রপন্থী বজরং দল ও ভিএইচপির বিক্ষোভ

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসঃ ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা এবার জম্মুর মেডিকেল কলেজ থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীদের থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছে। জম্মু অঞ্চলে সংঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন কাটরাভিত্তিক শ্রীমাতা বৈষ্ণদেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্সের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ভর্তির তালিকা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেছে। তাদের মূল দাবি, নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯০ শতাংশ মুসলিম এবং তাঁরা কাশ্মীরের বাসিন্দা।

বিজেপির বিধায়ক আর এস পাঠানিয়া এই বিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে রয়েছে ভিএইচপি এবং বজরং দল। তাঁর প্রধান যুক্তি হলো, বৈষ্ণদেবী মন্দিরের দান করা অর্থ দিয়ে যে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হয়েছে, সেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের আধিপত্য থাকা উচিত নয় এবং হিন্দু শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষিত রাখতে হবে।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বৈষ্ণদেবী মেডিকেল ইনস্টিটিউটকে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি। তাই বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী সেখানে হিন্দুদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

ভর্তির তালিকা ও বিক্ষোভের কারণ

জম্মু ও কাশ্মীর বোর্ড অব প্রফেশনাল এন্ট্রান্স এক্সামিনেশনস (জেকেবিওপিইই) বৈষ্ণদেবী মেডিকেল ইনস্টিটিউটের জন্য ৫০ জন প্রার্থীর একটি তালিকা প্রকাশের পরই এই বিক্ষোভ শুরু হয়।

নির্বাচিত ৫০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪২ জন কাশ্মীরের এবং ৮ জন জম্মুর। কাশ্মীর থেকে ইতিমধ্যে ৩৬ জন এবং জম্মু থেকে ৩ জন ভর্তি হয়েছেন।

উগ্র হিন্দু্ত্ববাদী ভিএইচপি ও বজরং দল কাটরা ইনস্টিটিউটের বাইরে আজ বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ করেছে এবং বৈষ্ণদেবী মন্দির বোর্ডের প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তার কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে।

ভিএইচপির জম্মু ও কাশ্মীর শাখার সভাপতি রাজেশ গুপ্তা দাবি করেছেন, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি স্থগিত রাখতে হবে এবং কর্তৃপক্ষকে তাদের ‘ভুল সংশোধন’ করে পরবর্তী ব্যাচে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শিক্ষার্থী ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি এবারের ৫০ জনের তালিকাটিকে ‘মেডিকেল কলেজটিকে ইসলামীকরণের ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন।

বজরং দলের জম্মু ও কাশ্মীর শাখার সভাপতি রাকেশ বজরঙ্গি জেকেবিওপিইইর তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতের অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, মন্দির বোর্ড যেহেতু সারা দেশের ভক্তদের দানে চলছে, তাই কলেজটির উচিত ছিল কেন্দ্রীয় এনইইটি পুল থেকে সারা ভারতের প্রার্থীদের ভর্তি করা।

বিজেপির বিধায়ক পাঠানিয়া যুক্তি দেন, ‘যেহেতু এই প্রতিষ্ঠান সরকারের থেকে এক পয়সাও অনুদান নেয় না এবং সম্পূর্ণরূপে তীর্থযাত্রীদের দানে চলে, তাই এখানে হিন্দু শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা উচিত।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও বিধিমালা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ন্যাশনাল মেডিকেল কাউন্সিলের (এনএমসি) নির্দেশিকা অনুযায়ী ভর্তিপ্রক্রিয়া হয়েছে এবং এটি সম্পূর্ণ বৈধ। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী—

জম্মু ও কাশ্মীরের ১৩টি মেডিকেল কলেজের ১ হাজার ৬৮৫টি আসনে এনইইটির তালিকার ভিত্তিতে ভর্তি করতে হবে।

৮৫ শতাংশ আসন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং ১৫ শতাংশ আসন দেশের বাকি অংশের প্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

জেকেবিওপিইইর কাজ হচ্ছে এনইইটি র‍্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে সরকারি কলেজগুলোতে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দাদের কোটা এবং বেসরকারি কলেজগুলোর সব আসনের জন্য তালিকা তৈরি করা।

কর্মকর্তারা আরও বলেন, এই প্রবণতা নতুন নয়। যদিও জম্মু অঞ্চলে কাশ্মীরের তুলনায় বেশি মেডিকেল আসন (জম্মুতে ৯০০, কাশ্মীরে ৬৭৫) রয়েছে, তবু কয়েক বছর ধরে কাশ্মীরের শিক্ষার্থীরাই বেশির ভাগ আসনে ভর্তি হচ্ছেন। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং আসনগুলোর ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র দেখা যায়। সেখানে জম্মুর শিক্ষার্থীরা বেশি ভর্তি হন।

ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রতিক্রিয়া

ন্যাশনাল কনফারেন্সের জম্মু প্রদেশের সভাপতি রতন লাল গুপ্ত এই পরিস্থিতির জন্য কলেজ পরিচালনাকারী শ্রীমাতা বৈষ্ণদেবী বোর্ডকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য এনএমসিতে আবেদন করার সময় তাঁদের সংখ্যালঘু মর্যাদার জন্যও আবেদন করা উচিত ছিল।

যেহেতু মন্দির বোর্ড সংখ্যালঘু মর্যাদার জন্য আবেদন করেনি, তাই জেকেবিওপিইইর কাছে এনইইটি-এ পাওয়া মেধার ভিত্তিতে ছাত্র নির্বাচন করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। গুপ্ত বলেন, উচ্চ মেধার অধিকারী বেশির ভাগ শিক্ষার্থী কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ভুক্ত (মুসলিম) ছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-20%2F9kd8fxk5%2FUntitled-5.jpg?rect=3%2C0%2C1743%2C1162&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাটরাভিত্তিক শ্রীমাতা বৈষ্ণদেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্সের বাইরে উগ্রপন্থী বজরং দলের কর্মীদের বিক্ষোভ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের

Tuesday, October 14, 2025

একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেতন কত হওয়া দরকার by মো. মাইন উদ্দিন

আপনি ধনী না গরিব, তা শুধু আপনার সম্পদের ওপর নির্ভর করে না, এটা নির্ভর করে আপনার কাছাকাছি যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষের সম্পদ কেমন তার ওপর। আপনি হয়তো মাসিক ৫০ হাজার টাকা বেতনে পরমভাবে খুশি থাকবেন। কিন্তু যখনি আপনি দেখবেন, আপনার বন্ধু কিংবা পরিচিতজন আপনার চেয়ে কম যোগ্যতা নিয়ে আপনার থেকে বেশি টাকা বেতন পাচ্ছে, তখন আপনার মাথায় তুলনামূলক চিন্তা ঢুকে যাবে এবং আপনি নিজেকে গরিব ভাবতে শুরু করবেন, এমনকি আপনার চাকরির প্রতিও একধরনের বিরক্তি জন্ম নেবে।

ধরুন, আপনি বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করে সর্বোচ্চ সিজিপিএ নিয়ে পরবর্তী সময়ে ওখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেন। এই যে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেন, আপনার জন্য প্রণোদনা কী? আপনি চাকরিতে কেমন আছেন বা আপনার চাকরির সুযোগ-সুবিধা কেমন, তা জানবেন কীভাবে? প্রথম উপায় হলো আপনার ক্লাসমেটদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা। যারা আপনার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না পেরে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা বিসিএস দিয়ে বিভিন্ন ক্যাডারে যোগদান করেছে, তাদের সঙ্গেই আপনি প্রথমে আপনাকে তুলনা করবেন।

চাকরির শুরুতেই এ চিন্তা না এলেও কয়েক বছর পরে আসতে বাধ্য এবং আপনি এ তুলনা করতে গিয়ে প্রথমে বড় একটা ধাক্কা খাবেন। যখন দেখবেন, সরকারি কলেজের শিক্ষকও আপনার সমান বেতন পায়, তখন আপনার মন খারাপ না হয়ে পারবে না। আপনি যখন দেখবেন, যে চাকরিতে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা প্রথম শ্রেণি (যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা) তার সুযোগ-সুবিধা ওই চাকরির (যেমন বিসিএস) থেকে কম, যেখানে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা দ্বিতীয় শ্রেণি।

আবার এই বিসিএস চাকরিতে কিছুদিন আগেও ৫৬ শতাংশ কোটা থেকে আসত, যাদের যোগ্যতা ছিল নিম্নমানের। কিন্তু তারাও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের, যাঁরা বেশির ভাগ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন, চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এ অবস্থায় আপনি কোন বিবেচনায় নির্বিকার থাকবেন? ক্লাসে প্রথম হওয়ার গৌরব নিজের কাছেই আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যাবে।

আপনার মন খারাপের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে চাকরির কয়েক বছর পর। কারণ, এ সময়ের মধ্যে আপনার বিসিএস বন্ধুদের আর্থিক অবস্থা আপনাকে ছাপিয়ে যাবে। দেখবেন, তাদের অনেকেই বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যাচ্ছে সরকারি বড় বড় গাড়িতে চড়ে। কেউ কেউ ইতিমধ্যে আবার ব্যক্তিগত গাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে যাবে। আপনি ভালো করেই জানেন, তাদের এত টাকাপয়সা কোথা থেকে এসেছে। কিন্তু বেশি কিছু বলতে পারবেন না। তাহলে সমাজ ভাববে, আপনি তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত। আপনি তো শিক্ষক, আপনার অত টাকাপয়সা দরকার নেই। শুধু সালাম পেলেই চলবে। ঈর্ষান্বিত হওয়া তো যাবেই না।

আরও মন খারাপ হবে যখন দেখবেন, এ রকম একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে আপনার আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশী অপছন্দের পরিবর্তে সমীহ করছে। কোনো অনুষ্ঠানে গেলে দেখবেন, অনেকেই তার জন্য গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। তার অনুপস্থিতি কেমন যেন সবাই অনুভব করছে। দেখবেন, এ রকম দুর্নীতিবাজ লোকের কাছ থেকে অনেকেই নানা রকম সুবিধা নিচ্ছে। বিভিন্ন উৎসবে তার কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়ে দারুণ খুশি হচ্ছে। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যারা এখন পড়াশোনা করছে, তারা তাকেই আইকন হিসেবে দেখছে এবং ভবিষ্যতে তার মতো হওয়ার স্বপ্ন বুনছে।

একটা সময় ছিল যখন সরকারি চাকরিজীবীরা দুর্নীতি করলেও চাকরিকালে তার প্রকাশ খুব বেশি দেখা যেত না। আবার এত বেশিসংখ্যক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাও ছিল না। গত দেড় দশকে সরকার আমলাদের সুবিধা অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে যে রকম অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে, তা সহ্যের সব সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে। কোনো কোনো ক্যাডারে দুর্নীতি না করা কর্মকর্তার সংখ্যা প্রায় হাতে গোনা। এসব ক্যাডারে চাকরির ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে কর্মকর্তারা অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়ে যায়। এসব অসৎ কর্মকর্তাদের সম্পদের পাহাড় সৎ কর্মকর্তাদের ওপরে একধরনের চাপ তৈরি করে। একই সমাজে বসবাসের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জীবনেও এর প্রভাব এসে পড়ছে।

তুলনীয় চাকরির সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করে, এমন উৎসগুলো যথাসম্ভব কমিয়ে নিয়ে আসতে হবে। যেমন একজন ডিসির যেহেতু জেলার বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, তাই তার জন্য একটা বড় গাড়ির দরকার হতে পারে। কিন্তু কোন বিবেচনায় অসহনীয় যানজটের এ ঢাকা শহরে আজিমপুর থেকে সচিবালয়ে যেতে একজন কর্মকর্তার জন্য ঢাউস সাইজের একটা গাড়ি বরাদ্দ করতে হবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষক যদি একটা মিনিবাসে করে উত্তরা থেকে তাঁদের নিজ নিজ ক্যাম্পাসে আসতে পারেন, তাহলে আমলাদের একই রকম বাসে করে অফিসে যেতে সমস্যা কোথায়? আবার ঢাকা মেডিকেলের একজন ডাক্তারকে যদি সাত দিন আগে রিকুইজিশন দিয়ে একটা গাড়ি পেতে হয়, আর সে রকম যোগ্যতার একই ডাক্তার যখন কোনো বাহিনীতে চাকরি করে দেখেন, তাঁর জন্য দুটি গাড়ি বরাদ্দ থাকে, তাহলে ঢাকা মেডিকেল তাঁর কাছ থেকে ভালো সেবা পাবে না। গাড়িকে মর্যাদার প্রতীক হিসেবে না দেখে প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করলে বেতন–বৈষম্যের উৎসও কমে যাবে। বড় গাড়ি মানে বেশি মর্যাদা, বেশি ক্ষমতা—এ নিচুতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজের জন্য বেতন–বৈষম্য দূর করা জরুরি। সমযোগ্যতার চাকরির ক্ষেত্রে এ বৈষম্য সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, যা সারা বিশ্বে স্বীকৃত ও কর্মক্ষেত্রে অবদান বিবেচনায় নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের সামগ্রিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানকে বিবেচনায় নিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি বুয়েট, মেডিকেলও এ দেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। একইভাবে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, টাকাই মানুষের ব্যবহার পরিবর্তনের একমাত্র নিয়ামক নয়। তবে খুব গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। কারণ, টাকার ঘাটতি কোনো কিছু দিয়ে পূরণ করা যায় না। বর্তমান বেতনকাঠামোয় একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পক্ষে সচ্ছল জীবনযাপন সম্ভব নয়। তাই তাঁরা কেউ কেউ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন কোর্স পড়ান। একসময় কেউ কেউ ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেও পড়াতেন। একমাত্র আর্থিক কারণেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক চাকরি ছেড়ে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে যোগদান করেছেন। এ রকম আর্থিক অনটন থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা রকম সান্ধ্যকোর্স চালু হয়েছে, যেখানে অনেক নিম্নমানের শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পায়। কাউকে আর্থিক সংকটে রেখে তার কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না।

একটি ন্যায়ভিত্তিক বেতনকাঠামো নির্ণয়ে আর্থিক ও প্রকৃত মজুরির পার্থক্য বিবেচনায় নিতে হবে। সরকার যখন আমলাদের গাড়ি–সুবিধা, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, চালকের বেতন ও গৃহকর্মীর ভাতা প্রদান করে, তখন তাঁদের প্রকৃত মজুরি আর্থিক মজুরিকে ব্যাপকভাবে ছাপিয়ে যায়। আবার এই গাড়ি যখন অফিসবহির্ভূত কাজ, যেমন দৈনন্দিন বাজার করা, সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত, বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে গমনাগমনে ব্যবহৃত হয়, তখন প্রকৃত মজুরি আরও অনেক বেড়ে যায়। যদি মাসে ভাতাসহ কয়েকটি মিটিং থাকে, তা–ও প্রকৃত মজুরিকে বাড়িয়ে দেয়। অথচ এ রকম জীবনযাপনের জন্য একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে বাড়তি প্রতিটি টাকা অতিরিক্ত শ্রম দিয়ে আয় করতে হয়।

এ বাড়তি মজুরির সঙ্গে রয়েছে ক্ষমতা অপব্যবহারের সুযোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য কেউ কেউ আমলা হয়েছেন বলে তাঁদের মুখ থেকেই শুনেছি। তবে তাঁরা বেশির ভাগই চাকরি জীবনে সৎ ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল কম।

এ অপশাসনের দেশে ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকলে একদিকে যেমন দুর্নীতি করার সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি সামাজিক ও রাজনৈতিক অনেক হয়রানি থেকেও মুক্ত থাকা যায়। এখন এ ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন ডাক্তার ও প্রকৌশলীরা। দুর্নীতি তো করছেনই। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন ও ক্ষমতার অপব্যবহার কমানো গেলে বিসিএসের কয়েকটি ক্যাডারের প্রতি যে সীমাহীন মোহ, তা কেটে যাবে। এসব ক্যাডার চাকরির বাজারে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে, তা–ও অনেকটা কমে আসবে।

আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে একজন শিক্ষক ও আমলা যখন একই সঙ্গে বাজারে উপস্থিত হন, তাঁদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যেন বড় পার্থক্য না থাকে। পার্থক্যের উৎসগুলো বিবেচনায় নিয়ে বৈষম্য কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রাথমিক উৎস ছিল সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাপদ্ধতি। এখনই সময় সমযোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রকৃত বেতন-বৈষম্য দূর করা। যদি তা করা না হয়, তাহলে এ প্রজন্ম, যারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করে জীবন দিয়েছে, চাকরিতে ঢুকে বিদ্যমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবশ্যই রুখে দাঁড়াবে। নতুন পে কমিশন এসব বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন বলে আশা করছি।

* ড. মো. মাইন উদ্দিন, অধ্যাপক, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়
- (মতামত লেখকের নিজস্ব)

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-23%2Fdxfh1wzw%2Fjjjoo.JPG?rect=0%2C0%2C616%2C411&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Sunday, September 21, 2025

সরকার বদলায় কিন্তু শিক্ষার অবহেলা বদলায় না by মোস্তাফিজুর রহমান

স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে একের পর এক সরকার এসেছে, শিক্ষা কমিশন গঠন হয়েছে, বড় বড় নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। সরকারের রূপ পাল্টেছে, কিন্তু শিক্ষার প্রতি অবহেলা বদলায়নি। আজকের বাংলাদেশে চার কোটির বেশি শিক্ষার্থী, দেড় লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ১০ লাখের বেশি শিক্ষক রয়েছেন।

প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হার ৯৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, মাধ্যমিকেও ভর্তি বেড়েছে। সংখ্যার হিসাবে নিঃসন্দেহে ভালো শোনায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভর্তি ও পরীক্ষার সাফল্য কি শিক্ষার্থীদের দক্ষ করছে? বাস্তব উত্তর হচ্ছে ‘না’। তারা ডিগ্রি হাতে পাচ্ছে, কিন্তু শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার মতো সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা কিংবা বিদেশি ভাষার দক্ষতা, যা আধুনিক চাকরির বাজারে জরুরি—এসব দক্ষতা শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না।

কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকার শিক্ষাকে কখনোই প্রকৃত অর্থে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেনি, বরং শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে। আর শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে গিয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা গবেষণায় বিনিয়োগ না করে ভরসা করা হয়েছে প্রাইভেট টিউশন, কোচিং আর গাইড বইয়ের ওপর।

শিক্ষা বাজেটই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ (জিডিপির ২.৪৯ শতাংশ)। কিন্তু ক্রমান্বয়ে তা কমতে কমতে নেমে এসেছে বাজেটের ১২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে। আমরা আশা করেছিলাম বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে হয়তো ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হবে। বাস্তবে তা হলো না, হতাশা রয়ে গেল।

করোনা মহামারির অভিঘাত এখনো কাটেনি। গণসাক্ষরতা অভিযান-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আগস্ট ২০২৩ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ৪২৭ দিনের মধ্যে ২৭৯ দিন স্কুল বন্ধ ছিল। অর্থাৎ মাত্র ১৪৮ দিন ক্লাস হয়েছে। এত দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি শিশুদের শেখার ক্ষতি করেছে ভয়াবহভাবে। এ ঘাটতি পূরণে কোনো বিশেষ উদ্যোগ না থাকায় নতুন প্রজন্ম ‘হারানো প্রজন্মে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

শিক্ষায় বৈষম্য বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা। শহর ও গ্রামের মধ্যে, ধনী ও গরিবের মধ্যে, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার মধ্যে এই বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। প্রাথমিক স্তরে অনেক ধরনের—সরকারি স্কুল, মাদ্রাসা, এনজিও স্কুল, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম ইত্যাদি। ফলে শিক্ষার্থীদের মান, সুযোগ ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিতে বিশাল ফারাক তৈরি হচ্ছে। এই বৈষম্যকে আরও গভীর করেছে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই অংশ নিতে পারবে। অথচ দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী এনজিও ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে। এ সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে বৈষম্য তৈরি করছে।

এই পটভূমিতে সরকার পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি–৫) হাতে নিয়েছে এবং ২০২৭ সাল থেকে নতুন পাঠ্যক্রম শ্রেণিকক্ষে চালুর পরিকল্পনা করছে। এটি বড় সুযোগ হলেও আশঙ্কা রয়ে গেছে। কারণ, এর পূর্ববর্তী কর্মসূচি (পিইডিপি–৪) জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২৩–এর জন্য ডিজাইন করা হলেও পরে জুন ২০২৫ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু এখনো এর ১৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি, যা আমাদের সক্ষমতার ঘাটতিকে নির্দেশ করে। আর এবারও যদি সেই ধারাবাহিকতা থাকে, তবে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসবে না।

পিইডিপি–৫ সফল করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে একীভূত করতে হবে। পাঠ্যক্রমকে কর্মসংস্থানমুখী করতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকেই প্রযুক্তিশিক্ষা, জীবনদক্ষতা, কারিগরি জ্ঞান ও উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা বাড়ানো। এগুলো ছাড়া মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।

সরকার একা এই সংস্কার করতে পারবে না। নাগরিক সমাজ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এনজিওগুলো বহু বছর ধরে শিশুশিক্ষা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে ফিরিয়ে আনা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর সহায়তা ও কমিউনিটি স্কুলে কাজ করছে। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো দরকার। কমিউনিটির অংশগ্রহণও অপরিহার্য। শিক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক-শিক্ষক সমিতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া শিক্ষায় কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে অনেক বড় বড় কথা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো তরুণেরা ডিগ্রি পেলেও চাকরি পাচ্ছেন না, দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। সরকার বদলায়, কিন্তু শিক্ষার প্রতি অবহেলা বদলায় না।

এখন সময় এসেছে সত্যিকারের পরিবর্তনের। যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা যায়; যদি সরকার, এনজিও, শিক্ষক সংগঠন ও কমিউনিটি একসঙ্গে কাজ করে এবং বৈষম্য দূরীকরণকে মূল লক্ষ্য বানায়, তবে শিক্ষার ভবিষ্যৎ বদলানো সম্ভব। শিক্ষা শুধু ডিগ্রি নয়, এটি কর্মসংস্থান ও জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি। সেই চাবিকেই শক্ত হাতে ধরতে হবে, না হলে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল কথার ফুলঝুরিই হয়ে থাকবে।

* মোস্তাফিজুর রহমান, লেখক ও গবেষক
- smostafiz_r@yahoo.com

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-07%2F9k6q9i42%2Feducation.JPG?rect=86%2C0%2C897%2C598&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Saturday, August 30, 2025

ডিপ্লোমাধারী ও স্নাতক প্রকৌশলীদের মধ্যে কেন এই দ্বন্দ্ব by মাহবুবুর রাজ্জাক

সারা দেশের ছাত্র প্রকৌশলীরা গতকাল বুধবার তিন দফা দাবিতে শাহবাগে জমায়েত হয়েছিলেন। তাঁদের দাবিগুলোর মূল কথাটি হলো সরকারি চাকরিতে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটা বাতিল করতে হবে। প্রকৌশলী পদ ও পদবি হবে শুধু স্নাতক প্রকৌশলীদের জন্য। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই দাবিগুলোর সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই।

দেশের প্রকৌশল খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রশাসনের উচিত ছিল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসা। অথচ পুলিশ তাঁদের ওপর হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত পরিবেশ তৈরি করে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

অন্যদিকে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীরাও আন্দোলনে আছেন। তাঁরা নিজেদের প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দিতে চান এবং প্রকৌশলীদের জন্য উপযুক্ত পদগুলোয় বর্ধিত হারে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের পদায়ন চান। এর বাইরে তাঁদের কিছু কিছু দাবি স্বার্থগত দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত। দাবিগুলোর সঙ্গে আবার একমত নন স্নাতক প্রকৌশলীরা।  

দেশের শিল্পায়ন ও উন্নয়নে প্রকৌশলী ও প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের সমন্বিত টিমওয়ার্ক প্রয়োজন। প্রকৌশলীদের কাজ প্রকৌশলীদেরই করতে হবে। তেমনি প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের কাজও প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদেরই করতে হবে। দুই দলের কাজই একটা আরেকটার পরিপূরক। কাজেই রেষারেষি নয়, প্রয়োজন কাজের সুষম বণ্টন। উভয় পক্ষের উচিত আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যাগুলোর সমাধান করা এবং প্রকৌশল খাতের সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে কাজ করা।

আমাদের বুঝতে হবে ‘প্রকৌশলী’ শব্দটি কোনো বংশগত পদবি নয়। উন্নত বিশ্বে শুধু একাডেমিক সনদের বলে প্রকৌশলী পদবি ব্যবহার করা যায় না। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর পেশাগত দক্ষতার একটি স্তর অতিক্রম করে প্রফেশনাল পরীক্ষা পাস করলেই কেবল প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেওয়া যায়। প্রকৌশলী পদবিটি তিনিই ব্যবহার করতে পারেন, যিনি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও নৈতিকতার মান পূরণ করেছেন এবং নির্ধারিত সময় পরপর তাঁর লাইসেন্স নবায়ন করেছেন।

তাঁরা প্রকৌশলকাজে স্বাক্ষর, ডিজাইন অনুমোদন ও নিরীক্ষণ করলে ধরে নেওয়া যায় যে পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার মানদণ্ড নিশ্চিত করেই তা করেছেন।
প্রকৌশলীদের জন্য একটি কোড অব এথিকস অনুসরণ বাধ্যতামূলক থাকে। এতে দুর্নীতি, পক্ষপাত, গাফিলতি থেকে বিরত থাকা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার শপথ থাকে। তাঁরা তাঁদের কাজের জন্য আইনগতভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে একজন প্রকৌশলী তাঁর লাইসেন্স হারান এবং প্রকৌশলী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অধিকারও হারান।

প্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করা যায়—এমন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দেশে এখন বেড়েছে। তাই প্রকৌশল পেশায় মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন সরকারের উচিত প্রকৌশলী, প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীসহ প্রকৌশল খাতে সব পেশাজীবীর জন্য পেশাগত ট্রেনিং, রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স চালু করা।

সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে চাকরির জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। যত বড় ডিগ্রিই থাকুক, লাইসেন্সবিহীন কাউকেই প্রকৌশলী পদবি ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়। হালনাগাদ লাইসেন্স না থাকলে প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীরা কেন, কার্যত স্নাতক ডিগ্রিধারীরাও প্রকৌশল পদবি ব্যবহার করতে পারেন না।

বর্তমানে স্নাতক প্রকৌশলীদের এন্ট্রি পদ নবম গ্রেডের, আর প্রকৌশলে ডিপ্লোমাধারীদের এন্ট্রি পদ দশম গ্রেডের। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে নবম গ্রেডের ৩৩ শতাংশ পদ আবার ডিপ্লোমাধারীদের পদোন্নতি দিয়ে পূরণ করার রীতি চালু করা হয়। কার্যত কোথাও কোথাও এর চেয়েও অনেক বেশি পদ ডিপ্লোমাধারীদের দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রথমত নবম গ্রেডে স্নাতক প্রকৌশলীদের ঢোকার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত ডিপ্লোমাধারীরা পদোন্নতির মাধ্যমে এমন সব পদে পদায়িত হচ্ছেন, যেসব পদে স্নাতক প্রকৌশলীরাও বিসিএস ছাড়া যোগ দিতে পারে না। এটি স্নাতক প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে একটি বড় রকমের বৈষম্য এবং প্রকৌশল খাতের জন্য অশনিসংকেত।

প্রশ্ন হলো স্নাতক প্রকৌশলীদের কর্মক্ষেত্রে ডিপ্লোমাধারীরা পদায়িত হতে পারেন কি না? উত্তর হলো ‘না’। ডিপ্লোমাধারীরা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষিত নন। তাঁদের কর্মক্ষেত্র আলাদা। তাই উচিত হবে তাঁদের চাকরি, পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য অবিলম্বে প্রকৌশলীদের সমান্তরাল আরেকটি ধারা চালু করা।

ফলে স্নাতক প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের পদ ও কাজ সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হবে। প্রকৌশল খাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী দলের মধ্যে অকারণ রেষারেষি বন্ধ হবে। দুই দল নিঃশঙ্কচিত্তে কাজে মনোযোগ দিলে কাজের গতি ও দক্ষতাও বাড়বে।

প্রকৌশল সংস্থাগুলোয় ব্যবস্থাপনা সংকট প্রকট। প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসা কর্মকর্তারা সংস্থার প্রধান হয়ে থাকেন। তাঁরা প্রকৌশলীদের পেশাগত সমস্যার প্রতি সুবিচার করতে পারেন না।

সম্প্রতি একজন উপদেষ্টা দেশের প্রকৌশলীদের সক্ষমতা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন। অথচ এই প্রকৌশলীরাই বিদেশের মাটিতে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। সমস্যা প্রকৌশল শিক্ষায় নয়, সমস্যা প্রকৌশল সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপনায়। প্রকৌশল সংস্থাগুলোয় কাজের গতিশীলতা আনতে চাইলে স্বতন্ত্র প্রকৌশল প্রশাসন ক্যাডার সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এতে দেশের প্রকৌশল খাতে উন্নততর নেতৃত্ব তৈরি হবে। সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীদের দ্বন্দ্বে মেধার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি পেশাতেই মেধার প্রয়োজন; এমনকি যিনি ফসল ফলান তাঁরও। মেধার প্রমাণ দেখিয়েই স্নাতক ও ডিপ্লোমা সনদ অর্জন করতে হয়। তবে আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুরোর কিছু সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে।

কারিকুলামের সীমাবদ্ধতা, অভিজ্ঞ শিক্ষকের স্বল্পতা, গবেষণাগারের অভাব, যন্ত্রপাতির অভাব, সঠিক মূল্যায়নের অভাব ইত্যাদি। বলতে দ্বিধা নেই, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো বেশি অবহেলার স্বীকার। এই দায় ছাত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। ডিপ্লোমাধারীরা যেন তাঁদের কাজে মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেন, সেভাবে তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের।  
   
বলা হয়, ডিপ্লোমাধারীদের উচ্চশিক্ষার পথ সীমিত করে রাখা হয়েছে। এটি অবশ্যই অনুচিত। উচ্চমাধ্যমিক বাদ দিয়ে ডিপ্লোমা সনদের জন্য চার চারটি বছর ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক, তা–ও ভেবে দেখতে হবে।

সবচেয়ে ভালো হয়, পলিটেকনিকে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দুই বছরে কারিগরি বোর্ডের আওতায় উচ্চমাধ্যমিক সনদ দিয়ে যাঁরা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী, তাঁদের যদি সেই সুযোগ করে দেওয়া হয়। যাঁরা তারপর পলিটেকনিকে কারিগরি ধারায় থাকবেন, তাঁরা দুই বা তিন বছরে প্রকৌশলে ডিপ্লোমা নিয়ে হয় শ্রমবাজারে যাবেন, নয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফারের মাধ্যমে দুই বছরে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে পারবেন।

তবে ভুলে গেলে চলবে না, সবাই প্রকৌশলী হতে চাইলে সেটাও প্রকৌশল খাতের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সহায়ক নয়। তাই ডিপ্লোমাধারীদের জন্য প্রস্তাবিত ক্যাডারে সম্মানজনকভাবে পেশাগত বিকাশের সুযোগ থাকতে হবে, যাতে তাঁরাও সন্তুষ্টচিত্তে পেশায় মনোযোগী হতে দ্বিধান্বিত না হন।

পরিশেষে প্রকৌশল খাতে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেন তাঁরা সর্বশেষ প্রযুক্তি ও নীতিমালা সম্পর্কে হালনাগাদ থাকেন এবং সর্বোচ্চ পেশাগত দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেন।

* ড. মাহবুবুর রাজ্জাক, অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট।
- ই-মেইল: mmrazzaque@me.buet.ac.bd
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-28%2Fsz8hyf9a%2FUntitled-3.jpg?rect=2%2C0%2C1677%2C1118&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
স্নাতক প্রকৌশলী এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের বিক্ষোভ। ছবি: প্রথম আলো

Friday, July 18, 2025

প্রবন্ধ- শিক্ষার বিউপনিবেশায়ন by ন্​গুগি ওয়া থিয়োং’ও এবং অনুবাদ: নূরুল কবীর

আমি লক্ষ করেছি, ১৯৮৬ সালে আমার ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড পুস্তকটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে বিউপনিবেশায়ন ও ভাষাগুলোর ভেতরকার অসম ক্ষমতা-সম্পর্কের ব্যাপারে জগৎজুড়েই আগ্রহ বেড়েছে। কয়েক বছর আগে, ২০১৮ সালে এটিই আমাকে আয়ারল্যান্ডের মুনস্টের রাজ্যাধীন লিমেরিক শহরে টেনে নিয়ে যায়। ওই শহরে তখন ১৮৯৩ সালে স্থাপিত ‘গ্যালিক লিগ’-এর ১২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্​যাপন উপলক্ষে একটি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।

‘গ্যালিক লিগ’ খোদ আয়ারল্যান্ডে গ্যালিক বা আইরিশ ভাষার পুনরুজ্জীবনের জন্য নানা তত্পরতায় নিবেদিত একটি আইরিশ সংগঠন। আইরিশ জনগণের নিজস্ব ভাষা গ্যালিক, ইতিপূর্বে আধিপত্যশীল ইংরেজি ভাষার অধীন হয়ে পড়েছিল। পুরোদস্তুর সরকারি সমর্থনসহ নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও মর্যাদা ও প্রভাবের দিক থেকে আইরিশ ভাষা এখনো ইংরেজির অধস্তন পর্যায়ে বিদ্যমান রয়েছে। আয়ারল্যান্ডের যত মানুষ আইরিশ ভাষায় কথা বলে, তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে। কতিপয় সুবিখ্যাত আইরিশ সাহিত্যিক, যেমন ডব্লিউ বি ইয়েটস ও জেমস জয়েস, ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন এবং তাঁদের সমূহ সৃষ্টি ইংরেজি সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভার হিসেবেই সর্বত্র অধীত হয়ে থাকে। ব্রিটেনসহ পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো ‘ইংরেজি বিভাগের’ কথা ভাবা যায় না, যেখানে কোর্স হিসেবে আইরিশ বংশোদ্ভূত এই লেখকদের সাহিত্যকর্ম অন্তর্ভুক্ত নয়। যেসব লেখক ইংরেজি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে ব্যাপক অবদান রেখেছেন, এই দুজন তাঁদের অন্যতম।

গ্যালিক ও ইংরেজি ভাষার মধ্যে বিদ্যমান অসম ক্ষমতার সম্পর্কটি, যা এখন ইংরেজির অনুকূলে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, চিরদিনই এমন ছিল না। ত্রয়োদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে, যখন ইংরেজরা আয়ারল্যান্ডে, বিশেষত তার মুনস্টের রাজ্যে বসতি স্থাপন করে, তখন ধ্রুপদি জ্ঞানচর্চার প্রশ্নে ইংরেজির চেয়ে আইরিশ ভাষা বেশি সমৃদ্ধ ছিল। স্বভাবতই আয়ারল্যান্ডে আদি বসতি স্থাপনকারী ইংরেজরা তখন তুলনামূলকভাবে বেশি প্রাণশক্তিসম্পন্ন আইরিশ ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়। আইরিশ ভাষার প্রতি সেই ইংরেজদের আকর্ষণ ছিল নিতান্তই বাস্তবানুগ: ইংরেজ আবাদিরা যাঁদের ভেতর বসতি স্থাপন করেছিল, তাঁদের অধিকাংশের ভাষাই ছিল আইরিশ।

এ অবস্থায় ১৩৬৬ সালে লন্ডনভিত্তিক ইংরেজ সরকার আইরিশ বা গ্যালিক ভাষার দ্রোহাত্মক গ্রাস থেকে ইংরেজিকে রক্ষা করার জন্য তত্পর হয়ে ওঠে; আয়ারল্যান্ডের কিলকেনি নগরের জন্য জারি করে ‘কিলকেনি বিধিমালা’—যার বিভিন্ন ফরমানের অধীন একদিকে বসতি স্থাপনকারী ইংরেজ–অধ্যুষিত সেই অঞ্চলে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার জোরদার করা হয়; অন্যদিকে আইরিশ ভাষার ব্যবহারকে রীতিমতো একটি ফৌজদারি অপরাধমূলক দুষ্কৃতি হিসেবে স্থির করা হয়। কিলকেনিতে বসবাসকারী কোনো ইংরেজ বা আইরিশ ব্যক্তি একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আইরিশ ভাষা ব্যবহার করলে অভিন্ন বিধিমালার অধীন তাঁদের জমি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়ার হুমকিও জারি রাখা হয়। ওদিকে ব্রিটিশ সরকারের এসব নীতিমালার তরফে সাহিত্যিক ও দার্শনিক ন্যায্যতা জোগানোর কাজে এগিয়ে আসেন মুনস্টের রাজ্যে বসতি গাড়া ‘দ্য ফেয়ারি কুইন’-খ্যাত ইংরেজ কবি এডমান্ড স্পেন্সার। স্পেন্সার তাঁর ১৫৯৬ সালে প্রকাশিত আ ভিউ অব দ্য প্রেজেন্ট স্টেইট অব আয়ারল্যান্ড পুস্তকে ‘যুক্তি’ প্রদর্শন করেন, ‘ভাষা ও নামকরণ পদ্ধতি হচ্ছে আইরিশ জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক স্মৃতি বিলোপ-সাধনের সর্বোত্তম উপায়।’ তিনি লেখেন, ‘বিজেতা কর্তৃক বিজিতের ভাষাকে অবজ্ঞা করা এবং বিজিতের ওপর বিজেতার ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়াই জগতের স্বাভাবিক নিয়ম।’

খোদ আয়ারল্যান্ডে আইরিশ ভাষার প্রান্তিকতাপ্রাপ্তির ঘটনাটি অবশ্য মোটেও কোনো ধরনের স্বাভাবিক বিবর্তন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ঘটেনি, তা বরং (ইংরেজদের) সচেতন রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও শিক্ষাসংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবায়নের ভেতর দিয়ে সংঘটিত হয়েছে।

আয়ারল্যান্ড ছিল ইংল্যান্ডের প্রথম বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ। পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড কর্তৃক বিভিন্ন দেশের উপনিবেশায়নের ক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ড একধরনের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আয়ারল্যান্ডসহ তার অন্য উপনিবেশগুলোয় ইংরেজরা যেসব ব্যবস্থা প্রবর্তন ও চর্চা করেছে, পৃথিবীর অপরাপর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোও—তা হোক স্পেন, ফরাসি বা পর্তুগিজ—তাদের আপন আপন উপনিবেশগুলোয় অভিন্ন ব্যবস্থা ও চর্চা জারি রেখেছিল। জাপান কর্তৃক ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোরিয়া জবরদখলে রাখার সময়েও তা–ই ঘটেছে। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশায়নের ক্ষেত্রেও অভিন্ন ব্যবস্থা জারি ছিল, যেমন নরওয়ের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সে দেশের সামি জনগোষ্ঠীর ভাষার অবদমন। স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের অপরাপর দেশগুলোতেও, সামান্য রকমফের সাপেক্ষে, একই ঘটনা ঘটেছে। বিজিত জনগণের ভাষার অবদমন আর বিজেতার ভাষার উচ্চতর মর্যাদা দান ও তার আধিপত্যের বিষয়টি আবার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—যা কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির বিজয় ও জবরদখল প্রক্রিয়াকে নিষ্কণ্টক রেখে জারি থাকে।

ভাষিক অবদমন প্রকল্পটি মোটেই কোনো নন্দনতাত্ত্বিক আনন্দের জন্য গৃহীত হয়নি। স্পেন্সার খুব ভালো করেই বুঝতেন যে আইরিশ ভাষা ও নামকরণ পদ্ধতির উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াটি আখেরে আইরিশ জনগণের আত্মপরিচয় ভুলিয়ে দেবে, তাঁদের প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করবে এবং তার ফলে আইরিশদের ওপর বিজয়ী আধিপত্য কায়েম করা ইংরেজদের জন্য সহজতর করে তুলবে। একটা গোটা জনগোষ্ঠীকে সামরিকভাবে পরাজিত করে তার ওপর আধিপত্য জারি রাখার ব্যয় ও কার্যকারিতার তুলনায় ভাষাগত বিজয়ের মাধ্যমে সেই জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য কায়েম রাখা অনেক কম ব্যয়বহুল এবং অনেক বেশি কার্যকর। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিজয়ীকে শুধু বিজিত জনগোষ্ঠীর এলিট সমাজের মন ও মননকে অধিকার করার জন্য বিনিয়োগ করতে হয়, আর তারপর ওই এলিট গোষ্ঠী নিজেই অবশিষ্ট জনতার ভেতর অধীনতার বোধ ছড়িয়ে দেবে—বিজিত জনগোষ্ঠীর এলিট সম্প্রদায়টি বিজয়ী ঔপনিবেশিক শক্তির ভাষিক সেনাবাহিনীতে পরিণত হবে।

আধুনিক ব্রিটেনের সমৃদ্ধি ও শক্তিমত্তার পেছনে ভারত উপনিবেশের মুখ্য ভূমিকা থাকার কারণে ভারত এমনকি আয়ারল্যান্ডের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছিল, যার ফলাফল পরবর্তীকালে এশিয়া ও আফ্রিকার অপরাপর উপনিবেশগুলোয় রপ্তানি করা হয়। ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৮ সাল পর্যন্ত ‘সুপ্রিম কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’র সদস্য হিসেবে টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে উপনিবেশিত ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও দণ্ডবিধি প্রণয়নের মতো দুটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ প্রকল্প সম্পন্ন করেছিলেন। ম্যাকলে তাঁর ইতিহাসখ্যাত ‘মিনিটস অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন’–এ, ১৮৩৫ সালে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ভারতে প্রচলিত সংস্কৃত ও ফারসি ভাষাকে ইংরেজি দিয়ে প্রতিস্থাপন করার জন্য ওকালতি করেছিলেন। সে ক্ষেত্রে তার ঘোষিত লক্ষ৵ ছিল ভারতবর্ষে এমন একটি ‘শ্রেণি’ গঠন করা, যার সদস্যরা ‘আমাদের এবং আমাদের দ্বারা শাসিত লক্ষ লক্ষ প্রজার ভেতর ভাষাগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে—যারা রক্তমাংস আর গাত্রবর্ণে ভারতীয় হলেও রুচিবোধ, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে হবে ইংরেজ’।

এ ঘটনার ঠিক ৮৭ বছর পর উপনিবেশিত কেনিয়ার ব্রিটিশ গভর্নর স্যার ফিলিপ মিশেলের মুখে ম্যাকলের কথা পুনরাবৃত্ত হয়। ‘কেনিয়া ল্যান্ড’ ও তার মুক্তিকামী ‘ফ্রিডম আর্মি’র—ব্রিটিশদের ভাষায় মাউ মাউ—বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্রিটিশ সরকারের সামরিক অভিযানকে সহযোগিতা করার জন্য মিশেল আফ্রিকার শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি প্রবর্তনের ফজিলত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিশেল বলেছিলেন, এই নতুন ভাষাশিক্ষা ‘এমন একটি সভ্য রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সাহায্য করবে, যেখানে জন্মগত আদি পরিচয়নির্বিশেষে প্রত্যেকেই ব্রিটিশ মান ও মূল্যবোধের অধিকারী হবে, যেখানে প্রত্যেকেরই স্বার্থ নিহিত থাকবে—থাকবে অংশীদারত্ব’।

ক্যাপ্টেন রিচার্ড হেনরি প্র্যাট যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া রাজ্যের কারলিসল অঞ্চলে তাঁর কুখ্যাত কারলিসল ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে, ১৮৭৯ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী শিশুদের জন্য তার নিজস্ব শিক্ষাপদ্ধতি চালু করেন। নিজের প্রতিষ্ঠিত বোর্ডিং স্কুলের পেছনে সক্রিয় শিক্ষা-দর্শন নিয়ে ১৮৯২ সালে রিচার্ড বলেন, ‘শিক্ষার্থীর বুকের ভেতরের আদি ইন্ডিয়ানটিকে হত্যা করো, আর মানুষটাকে রক্ষা করো।’ রিচার্ডের শিক্ষা কর্মসূচি এক অভিন্ন ঔপনিবেশিক বিন্যাসকেই অনুসরণ করেছে: কিছু মানুষকে তাঁদের মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করো, ঔপনিবেশিক প্রভুদের ভাষায় দীক্ষিত করে নতুনভাবে তাদের গড়ে তোলো, তারপর শাসিত জনগোষ্ঠীর ভেতর ছেড়ে দাও।

ওয়ালটার রোডনি তাঁর হাউ ইউরোপ আন্ডারডেভেলপড আফ্রিকা গ্রন্থে ফ্রান্সের বিভিন্ন উপনিবেশ ও তার বাইরে ফরাসি ভাষা প্রচারের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, ১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের চূড়ান্ত লক্ষ৵ সম্পর্কে, সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য পিয়ের ফঁস্যাঁকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘ফরাসি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রের সঙ্গে তার উপনিবেশগুলোকে একটা শক্ত মনস্তাত্ত্বিক বন্ধনে আবদ্ধ করা প্রয়োজন ছিল। কারণ, যেদিন উপনিবেশগুলো তাদের প্রগতিশীল মুক্তির ভেতর দিয়ে একটি সম্ভাব্য ফেডারেশনে সংঘবদ্ধ হবে, সেদিনও তারা যেন ভাষা, চিন্তা ও চেতনার দিক থেকে ফরাসিই থেকে যায়।’

স্পষ্টতই এসব কর্মকাণ্ডের একটি পরিষ্কার লক্ষ৵ ছিল: উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর এলিট সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের মন ও মননের উপনিবেশায়নই ছিল সেই সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষানীতির লক্ষ৵। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাস্তবে সেই লক্ষ৵ পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হয়েছে। উপনিবেশ–উত্তর পরিবেশে আয়ারল্যান্ডের মতো স্বাধীনতা অর্জনের পরও প্রতিটি দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ স্বদেশি ভাষার তুলনায় ঔপনিবেশিক ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে। আফ্রিকার ক্ষেত্রে মহাদেশটির এমনকি পরিচয়জ্ঞাপক বয়ানগুলোও নানা ইউরোপীয় ভঙ্গি ও ভাষায়—প্রধানত ইংরেজি, ফরাসি ও পর্তুগিজ—বর্ণিত হয়। এমনকি উপনিবেশ–উত্তর যেসব দেশের এলিট সম্প্রদায় জাতীয়তাবাদী মনোভাবাপন্ন এবং নিজেদের স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর, তাঁরাও নিজেদের রাগ কিংবা আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য ঔপনিবেশিক ভাষাকেই বেছে নেন। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভাষাশিক্ষার জন্য বরাদ্দ অর্থের ৯০ শতাংশই নানা ঔপনিবেশিক ভাষা শিক্ষায় ব্যয় করা হয়, যদিও এসব দেশের জনগণের ৯০ শতাংশই আফ্রিকার বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করেন। আফ্রিকার কোনো কোনো সরকার, এমনকি আফ্রিকার ভাষাগুলোকে প্রগতি ও উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করেন। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক ভাষাগুলোকেই তাঁরা বৈশ্বিক আধুনিকতার যুগে প্রবেশের সিংহদ্বার বলে বিশ্বাস করেন।

কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এ কথা নিশ্চয় অদ্ভুত শোনাবে যে ফরাসি সাহিত্য কেবল জাপানি ভাষাতেই রচনা করা যেতে পারে, কিংবা ইংরেজি সাহিত্য জুলু ভাষায়—এমনি অদ্ভুত যেকোনো ফরাসি লেখকের সঙ্গে দেখা হলে আপনি তাঁর দিকে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘পৃথিবীতে এত ভাষা থাকতে আপনি ফরাসি ভাষায় কেন লিখছেন?’ কিংবা একজন ইংরেজ লেখককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি জুলু ভাষায় লিখছেন না কেন?’ ইতিহাসের পরিহাস এই আফ্রিকার কিংবা অপর যেকোনো উপনিবেশ–উত্তর দেশের লেখকদের ক্ষেত্রে, এখনো, এহেন অযৌক্তিক, অদ্ভুত আর অবাস্তব প্রত্যাশা জারি রয়েছে।

এমন অদ্ভুত ও অবাস্তব পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো কী করে? ব্যাপারটা তো মোটেও এমন নয় যে ঔপনিবেশিক ভাষাগুলো অন্যান্য ভাষার অধিক কোনো ভাষা। যেকোনো পরিস্থিতিতে একাধিক ভাষাজ্ঞান যেকোনো ব্যক্তিকেই বিশেষভাবে ক্ষমতায়িত করে থাকে। কিন্তু উপনিবেশের ক্ষেত্রে কিংবা অনুরূপ অন্য কোনো পরিস্থিতিতে, যেখানে একটি আধিপত্যশীল ও আধিপত্যের শিকার দুটি শ্রেণি বিদ্যমান ছিল, ব্যাপারটা মোটেই এমন ইতিবাচক কিছু ছিল না। অর্থাৎ বিষয়টি কোনো উপনিবেশিত সমাজে বিদ্যমান কোনো ভাষার সঙ্গে মোটেই আরেকটি নতুন ভাষা যোগ করার মতো নিরীহ ব্যাপারমাত্র ছিল না। কেননা কোনো বিজিত সমাজে একটি নতুন ভাষা প্রবর্তন করাই বিজয়ী ঔপনিবেশিক শক্তির জন্য যথেষ্ট ছিল না, বরং নিজের ভাষাটিকে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভাষার কবরের ওপর চাষ করেই কেবল তাকে ক্ষান্ত হতে হতো। আফ্রিকার ভাষাগুলোর মৃত্যুই সে অঞ্চলে ইউরোপীয় ভাষাগুলোকে জীবন দিয়েছে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ভাষাগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার জন্য উপনিবেশগুলোর নিজস্ব ভাষাগুলোকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। আফ্রিকার ভাষাগুলোর বিস্মৃতিই ইউরোপীয় ভাষাগুলোর জাগৃতি নিশ্চিত করেছে।

ভাষার এই দুটি অবস্থা—বিস্মৃতি ও জাগৃতি—মোটেই সংশ্লিষ্ট ভাষাগুলোর অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে জড়িত নয়, বরং উপনিবেশিত অঞ্চলে ঔপনিবেশিক শক্তির ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সমাজের ভেতর সচেতনভাবে একটি মনোভঙ্গি তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত।

------২------

আফ্রিকার শিশুরা তাদের স্কুলে নিজেদের মধ্যে মাতৃভাষায় কথা বলে ধরা পড়ে গেলে কী ধরনের দৈহিক শাস্তির শিকার হতো, তা আমি আমার ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড গ্রন্থে আলোচনা করেছি। এ রকম ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শিশুটিকে তার ‘নির্বুদ্ধিতার’ পরিচয়জ্ঞাপক একটি প্ল্যাকার্ড গলায় ঝুলিয়ে রাখতে বাধ্য করা হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘অপরাধী’ শিশুটিকে নোংরা আবর্জনা গিলতেও বাধ্য করা হতো। এভাবে আফ্রিকার ভাষাচর্চাকে একটি অপরাধমূলক, বেদনাদায়ক, এমনকি নোংরামির সঙ্গে তুল্য তত্পরতা হিসেবে হাজির করা হতো। এ ধরনের কর্মকাল শুধু আফ্রিকা মহাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

ডোভার স্যামুয়েলস নামের একজন মাওরি রাজনীতিক ওয়েটাঙ্গি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ৵ দিতে গিয়ে, ২০১৫ সালে, নিউজিল্যান্ডের এক স্কুলে মাওরি ভাষায় কথা বলে ধরা পড়ে যাওয়ার পর যা ঘটত, তার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীটিকে টেনেহিঁচড়ে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত সবার সামনে নিয়ে আসা হতো...এবং তাকে শরীর বাঁকিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়াতে বলা হতো। তারপর, (শিক্ষক মহাশয়) তার পেছনে দাঁড়িয়ে জুতাসুদ্ধ পায়ে আধা ডজন লাথি মারত। ... এ রকম অবস্থায় আমার ঊরুর পেছন দিকটায় শুধু কালশিটেই পড়ে যেত না, অনেক সময় সেখান থেকে রক্তও বেরিয়ে আসত।’

ওদিকে নরওয়ের সামি জনগোষ্ঠী ১৮৭০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সময়টি—যে সময়কে সামিরা একটি ‘নৃশংস শতাব্দী’ হিসেবে মনে রেখেছে—এক অভিন্ন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছে। নরওয়ের শাসকশ্রেণি সামি জনগোষ্ঠীকে স্বতঃস্ফূর্ত নরওয়েজিয়ান ভাষাভাষীতে পরিণত করার জন্য অভিন্ন ঔপনিবেশিক নির্মমতার চর্চা করেছে।

আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের জনগণের ভেতর, তাঁদের আপন আপন ভাষার বিপরীতে ইংরেজির চর্চা বিস্তারের জন্য ইংরেজরাও বরাবর এই অভিন্ন সহিংসতা চর্চার পথ অবলম্বন করেছে। ওয়েলসের স্কুল প্রাঙ্গণে যে শিক্ষার্থীরা ওয়েলশ ভাষায় কথা বলত, তাদের গলায় ‘ওয়েলশ নয়’ লেখা প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো।

ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তার ভেতর এই ‘মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন’ সৃষ্টিতে বা অন্য কথায়, মননের উপনিবেশায়নে সহিংসতাই নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। কারোর মনে হতে পারে যে ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতালাভের পর উদ্ভূত নতুন রাষ্ট্রগুলো, নিদেনপক্ষে, পুরোনো জমানার অসম ক্ষমতা–সম্পর্কগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। কিন্তু উপনিবেশিত মনন এ রকম প্রত্যাশিত পদক্ষেপের প্রতিবন্ধক হিসেবে হাজির থাকে। কেননা বাস্তব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে নিজেকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতাটি উপনিবেশিত জনগণের ভেতর ইতিপূর্বেই আত্তীকৃত হয়ে যায়।

এটা হচ্ছে কন্ডিশনিং বা বশীকরণের একটি চিরায়ত উদাহরণ, যা হামেশাই আচরণগত মনোবিজ্ঞানের নির্দেশিকায় পাওয়া যায়। বশীকরণ হলো পুরস্কার প্রদান ও শাস্তি বিধানের একটি পদ্ধতি—অবাঞ্ছিত আচরণের জন্য শাস্তি ও বাঞ্ছিত আচরণের জন্য পুরস্কার। শিশুপালনে কিংবা পশুকে বশীভূত করার জন্য প্রায়ই নানা মাত্রায় এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। বাঞ্ছিত আচরণের সঙ্গে ‘পুরস্কার’ প্রত্যয়টি জড়িত থাকার কারণে ‘আনন্দ’ যেমন, অবাঞ্ছিত আচরণের সঙ্গে ‘শাস্তি’র প্রসঙ্গ জড়িত থাকায় ‘বেদনা’ও তেমনি এই প্রক্রিয়ার এক অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে জারি থাকে। বশীকরণ প্রক্রিয়ার অধীনে স্বভাবতই সংশ্লিষ্ট শিশু কিংবা অন্য কোনো প্রাণী বেদনাদীর্ণ পরিসরে প্রবেশ না করার জন্য নিষিদ্ধ আচরণ চর্চা এড়িয়ে চলে এবং আনন্দময় পরিসরের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য সিদ্ধ আচরণ চর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়। শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে দখলদার ঔপনিবেশিক শক্তির ভাষা ভালোভাবে আত্মস্থ করার জন্য কোনো শিক্ষার্থী মহিমান্বিত হয়, কিন্তু অপর নিন্দিত শিক্ষার্থীটি তার মাতৃভাষার এমনকি একটি শব্দ উচ্চারণ করতেই বিপদাপন্ন হয়ে পড়ে। স্পষ্টতই মাতৃভাষাচর্চার পরিসরটি শিক্ষার্থীর জন্য তখন বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে, ফলে সে তা এড়িয়ে চলে। অন্যদিকে দখলদার ভাষার পরিসরটি তার জন্য আনন্দদায়ক হিসেবে প্রতিভাত হয়, ফলে ওই ভাষাচর্চাই তার অন্বিষ্ট হয়ে ওঠে।

এই বশীকরণ প্রক্রিয়ার পরিণতি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভেতর একধরনের ‘পাভলভীয় চেতনা’র বিকাশ ঘটে। ফলে ‘পুরস্কার’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ামাত্রই আনন্দের আতিশয্যে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আর ‘শাস্তি’ শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বেদনাবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। এভাবে বশীকৃত কোনো জনগোষ্ঠীর প্রথম প্রজন্মের এই আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের ভেতর কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই একটি স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে সঞ্চারিত হতে পারে—তারা হয়তো বুঝতেই পারবে না, কেন স্বদেশি ভাষা ও সংস্কৃতি তার জন্য আতঙ্কজনক, আর কেনই–বা বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতি তার জন্য আনন্দদায়ক হিসেবে প্রতিভাত হয়। ভাষার ক্ষেত্রে উপনিবেশ–উত্তর সমাজের এলিট সম্প্রদায় ও শিক্ষাবিদেরা ধরেই নেয় যে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ভাষাগুলো অন্তর্গতভাবেই বৈশ্বিক চরিত্রমণ্ডিত, আর বুদ্ধিবৃত্তি ও সর্বজনীনতা ধারণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উপযোগী। এ রকম প্রচলিত অনুমান থেকেই বোঝা যায়, কেন আফ্রিকার ভাষাগুলোর দুষ্কৃতায়ন এখনো অব্যাহত রয়েছে। আফ্রিকার শিক্ষাবিদেরা তাঁদের এই আত্মঘাতী কর্মকাল সম্পর্কে নিজেরাই এখনো সচেতন নন। আফ্রিকারই কোনো সরকারের নির্দেশে আফ্রিকারই কেউ আফ্রিকান ভাষাভাষী কোনো আফ্রিকানকে এখনো শাস্তি দিয়ে চলেছে।

ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা সৃষ্ট প্রাথমিক আতঙ্ক এভাবে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়। পূর্ববর্তী প্রজন্ম থেকে এই আতঙ্ক পরবর্তী প্রজন্ম উত্তরাধিকার হিসেবে লাভ করে। এভাবে অস্বাভাবিকতাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তারপর শিক্ষার বাঞ্ছিত লক্ষ৵ হিসেবে এই স্বাভাবিক অস্বাভাবিকতার জাতীয়করণ ঘটে।

মননের উপনিবেশায়ন শিক্ষার জাতিগত ক্ষমতায়নপ্রয়াসী অর্থবহ সৃষ্টিশীলতা বিকাশের পথ রোধ করে দেয়। কোনো উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর ওই জনগোষ্ঠীর ওপর ঔপনিবেশিক শক্তির নিয়ন্ত্রণপ্রক্রিয়া নিহিত থাকে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা মানুষের জ্ঞানেন্দ্রিক প্রক্রিয়াকে, এমনকি জ্ঞানকেও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে দিতে পারে।

এবার আলোচনার এই পর্যায়ে, আমাদের শিক্ষা ও জ্ঞানের মধ্যকার পার্থক্য নিরূপণ করা প্রয়োজন। আমাদের ইতিমধ্যেই ‘জ্ঞাত’ কিছুর সঙ্গে, নানা মানবীয় তত্পরতার পারস্পরিক প্রভাব ও প্রদীপ্তির দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নতুন কিছু নিরন্তর যুক্ত করে চলার ব্যাপারটিই হলো জ্ঞান। আমাদের স্বাভাবিক জ্ঞানেন্দ্রিক প্রক্রিয়া ‘জ্ঞাত’ পরিসর থেকে যাত্রা শুরু করে ‘অজ্ঞাত’ পরিসরের দিকে অগ্রসর হয়।

প্রতিটি নতুন পদক্ষেপই কিছু ‘অজানা’কে আমাদের জানিয়ে দেয়, অর্থাৎ আমাদের ইতিমধ্যে ‘জ্ঞাত’র সঙ্গে নতুন কিছু যোগ করে। এভাবেই দ্বান্দ্বিকভাবে যুক্ত পরম্পরার এক নিরন্তর অভিযাত্রায় নতুনভাবে ‘জ্ঞাত’ কিছু আমাদের ইতিপূর্বে ‘পরিজ্ঞাত’ বিষয়কে সমৃদ্ধ করে চলে। প্রত্যেকের স্থানিক অবস্থান থেকেই জগৎ সম্পর্কে তার জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়া শুরু হয়।

অন্যদিকে শিক্ষা হলো কোনো বিদ্যমান সমাজে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য, সে সমাজে কর্মক্ষম থাকার জন্য মানুষকে প্রস্তুত করার একটি পদ্ধতি। শিক্ষার সঙ্গে ‘জ্ঞান’ বিতরণের ব্যাপারটি জড়িত থাকতে পারে, কিন্তু তা হলো শিক্ষকের বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সীমাবদ্ধ জ্ঞান। একটি সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা রূপায়ণের ক্ষেত্রে, আধিপত্য ও অধীনতার, কিংবা প্রভু ও ভৃত্যের সম্পর্কে আবদ্ধ উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াটি সতর্কভাবে পরীক্ষা করাটা গুরুত্বপূর্ণ। ঔপনিবেশিক শিক্ষা কখনোই সুষম কিংবা অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না—নেতিবাচকতা থেকে পাথেয় সংগ্রহ করাই ছিল তার বৈশিষ্ট্য।

ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া, বরাবরই, স্বাভাবিক জ্ঞানেন্দ্রিক প্রক্রিয়াকে নাকচ করে অগ্রসর হয়েছে। উপনিবেশিত দেশগুলোতে বরাবর ইউরোপই—ইউরোপীয় নাম, তার ভূগোল, তার ইতিহাস ও তার জ্ঞান—ঔপনিবেশিক শিক্ষার যাত্রাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। শিক্ষার উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াটি বরাবরই উপনিবেশিত পরিসরে বিরাজমান জ্ঞানকে নাকচ করার মাধ্যমে শুরু হয়েছে। আবার ভাষার ক্ষেত্রে, জ্ঞানের উত্স হিসেবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও শৈল্পিক অনুসন্ধানের বাহন হিসেবে শুরুতেই স্থানীয় ভাষাগুলোর উপযোগিতাকে অস্বীকার করে উপনিবেশয়ান প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়েছে। এভাবে আপন ভিত্তিভূমি থেকে মূলোত্পাটনের কারণে আপন পরিমণ্ডলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, আমাদের বিভিন্ন সামর্থ্য, এমনকি আমাদের নানা অর্জন সম্পর্কেও একধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তাবোধ সৃষ্টি করেছে।

এ অবস্থায় যেকোনো সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য বিউপনিবেশায়ন একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিকল্প নেই। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা, যা চার শ বছর ধরে পৃথিবীকে বর্তমানের রূপ দিয়েছে, তা পুরোনো ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশিত—উভয় প্রকার সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াটি যা কিছু নাকচ করে অগ্রসর হয়েছিল, সেই সবকিছুকে নাকচ করেই কেবল বিউপনিবেশায়ন সংঘটিত হতে পারে। আমাদের স্থানিক বিন্দুতেই, অর্থাৎ আমরা যেখানে আছি, ঠিক সেখানেই আমাদের জ্ঞানের অভিজ্ঞতা শুরু হয়। আমাদের সব ভাষাই জ্ঞানের উত্স হিসেবে কার্যকর। আমরা সবাই নক্ষত্র ভালোবাসি, কিন্তু তাদের দেখার জন্য শারীরিক বা রূপকভাবে আমাদের ইউরোপে অভিপ্রয়াণের প্রয়োজন নেই।

পৃথিবীতে কিংবা যেকোনো দেশে অনেক ভাষা ও সংস্কৃতির, এমনকি অনেক ধর্মের, উপস্থিতি একটি সমস্যাজনক ব্যাপার—এই প্রচলিত অভিজ্ঞানকে আমাদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে। মূল সমস্যা আসলে এগুলোর ভেতর বিদ্যমান ‘মর্যাদার স্তরানুক্রমতান্ত্রিক সম্পর্কের’ মধ্যে নিহিত। আমার ভাষা তোমার ভাষার চেয়ে উচ্চতর মর্যাদাসম্পন্ন, আমার সংস্কৃতি তোমার সংস্কৃতির চেয়ে উন্নততর, আমার ভাষা বৈশ্বিক গুণসম্পন্ন আর তোমার ভাষা নিতান্তই আঞ্চলিক, আর আমার ভাষা জানতে হলে তোমার ভাষা পরিত্যাগ করতে হবে—এমন সব ধারণাই সমস্যাজনক। আমার ঈশ্বর তোমার ঈশ্বরের চেয়ে বেশি ঐশ্বরিক—এই ধারণা নিজেই খুব অনৈশ্বরিক। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে অন্যের ভাষার চেয়ে নিজের ভাষার সহজাত উত্কৃষ্টতায় বিশ্বাস করতে প্রণোদিত করে—যা আবার, জ্ঞান ও ক্ষমতার মানদণ্ড, অন্যের তুলনায় নিজের উচ্চতর মর্যাদা দাবি করতে ইন্ধন জোগায়। এই প্রপঞ্চকেই আমি বলি—ভাষিক সামন্ততন্ত্র।

এই ভাষিক সামন্ততন্ত্র থেকে মুক্ত হলে সব ভাষা, ছোট কিংবা বড়, গোটা মানবসমাজের কল্যাণে অবদান রাখতে পারে। সব ভাষাই ইতিহাস, সৌন্দর্য ও সম্ভাবনার অমূল্য ভান্ডার—এই সত্যনিষ্ঠ প্রত্যয়ের ভিত্তিতেই যাবতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা উচিত। ভাষাগুলোর ভেতর পারস্পরিক আদান-প্রদানমূলক আন্তসম্পর্ক জারি থাকলে প্রত্যেকেরই প্রত্যেককে কিছু দেওয়ার থাকে। এমনকি কোনো একটি ভাষা যদি অন্য ভাষাভাষী মানুষের ভেতর যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও আবির্ভূত হয়, সে ক্ষেত্রেও তা ওই নির্দিষ্ট ভাষাটির জাতীয়তা বা বৈশ্বিকতার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যের গুণেই সংঘটিত হয়েছে—এমন কোনো অনুমিত ধারণার ভিত্তিতে গ্রাহ্য হওয়া উচিত নয়, বরং তা প্রয়োজন ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে ঘটেছে বলেই বিবেচনা করা সংগত। সর্বোপরি ওই নির্দিষ্ট ভাষাটির বিকাশের জন্য অপরাপর ভাষাকে কবরস্থ করা উচিত নয়।

সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য একটি নতুন রণধ্বনি প্রয়োজন—মর্যাদার স্তরানুক্রমতন্ত্র নয়, আন্তসম্পর্ক নির্মাণ। আমাদের বোঝা প্রয়োজন যে ছোট-বড় সব ভাষারই একটি সাধারণ ভাষা আছে—অনুবাদ।

শিক্ষার তরফে কখনোই মানুষের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক স্ববিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত নয়। আমি জগতের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই, কিন্তু তার জন্য আমার নিজের ভিত্তিভূমিকে নাকচ করতে হবে না। আমার স্থানিক অবস্থান থেকেই আমি জগতের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই। আমি মনে করি, শিক্ষার লক্ষ৵ হলো সেই জ্ঞান, যা মানুষকে তার আপন অবস্থানে রেখেই ক্ষমতায়ন করে—যা জগতের সঙ্গে আমাদের প্রকৃত যোগাযোগকে উন্মোচিত করে। আপন ভিত্তিভূমিতে অবস্থান করেই আমরা গোটা জগতের অন্বেষণ করি—সেই জগৎ থেকে এমন কিছু খুঁজে আনি, যা আমাদের ভিত্তিভূমিকে সমৃদ্ধ করে। জ্ঞানের বিন্যাস ও বিন্যস্ত জ্ঞানকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুষম শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর সঞ্চারিত করার জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবায়নই এখন পৃথিবীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আমাদের যে ধারণাগুলো প্রত্যাখ্যান করতে হবে, তা হলো:

ঐশ্বর্য তো ঐশ্বর্যই নয়, যদি না তা পূতিগন্ধময় আবর্জনা থেকে স্ফুরিত হয়।

প্রাসাদ তো প্রাসাদই নয়, যদি না তা কারাগারের ওপর নির্মিত হয়।

কোটি টাকা অর্থহীন, যদি না লাখো গরিবের পকেট কেটে তা পুঞ্জীভূত হয়।

আমার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যদের তো বিলীন হতে হবে।

শিক্ষাকে এমন জ্ঞান সঞ্চারিত করতে হবে, যা আমাদের আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাসাদের স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য জোগায়—আমাদের একে অন্যের সত্তাকে বিকশিত করতে উদ্বুদ্ধ করে।
(শেষ)

গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

Saturday, June 28, 2025

দেশ জুড়ে তীব্র সমালোচনা, আনিসাকে উদ্বিগ্ন না হতে বার্তা: এ কেমন মানবিকতা?

আনিসা আহমেদ এইচএসসি’র প্রথম পরীক্ষায় বসতে না পারার আক্ষেপ যেন ছুঁয়ে যায় পুরো দেশের মানুষকে। পরীক্ষা দিতে না পারায় তার কান্না আর অসুস্থ মাকে হাসপাতালে রেখে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসার বর্ণনা শুনে আহত, ক্ষুব্ধ করেছে বহু মানুষকে। শিক্ষা বোর্ডের নিয়মের জালে মানবতা হেরে যাওয়ার এই ঘটনাকে বড়ই অমানবিক বলছে মানুষ। প্রশ্ন উঠেছে এমন অমানবিক ঘটনার জন্ম দেয়া পুরো শিক্ষা কাঠামো নিয়ে। ঘটনা সংশ্লিষ্টদের দায় এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এ ঘটনায় নেট দুনিয়ায় আলোড়ন ওঠার পর অবশ্য টনক নড়েছে শিক্ষা বিভাগের। ঘোষণা দেয়া হয়েছে আয়েশার পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা নেয়ার।

গত বৃহস্পতিবার সকাল। আনিসা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়ার। এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন। হঠাৎ আনিসার মা সুবর্ণা আহমেদ অসুস্থতা অনুভব করেন। বুকে ব্যথা নিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যান। বাবা নেই আনিসার। কী করবেন না করবেন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। মাকে নিয়ে প্রতিবেশীর সহযোগিতায় যান মিরপুর ১ নম্বরে বাড়ির পাশের একটি হাসপাতালে। এরপর আসেন তার আত্মীয়স্বজনরা। মায়ের পাশে স্বজনদের রেখে তিনি রওনা দেন পরীক্ষা কেন্দ্রে। প্রায় দেড় ঘণ্টা দেরি হয়ে যায় কেন্দ্রে পৌঁছাতে। কিন্তু বাদ সাধে শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা। বিলম্বের কারণে তাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি কেন্দ্রে। পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনেই বসে পড়েন তিনি। দিগ্বিদিক ছুটে বেড়ান। কান্নাভেজা কণ্ঠে আকুতি জানান কেন্দ্রে প্রবেশের। এক হাত মাথায়, আরেক হাতে ফাইল। চোখে পানি। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত লোকজন বিচলিত হলেও গলাতে পারেনি পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বরতদের মন। আনিসার কান্নার ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। নেট দুনিয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকারের তরফে অবশ্য আনিসার পরীক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। গতকাল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনিসার মা সুবর্ণা আহমেদ চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। চিকিৎসকরা তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানিয়েছেন তিনি শঙ্কামুক্ত। তবে বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। গতকাল টেলিফোনে মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলেন সুবর্ণা আহমেদ। তিনি বলেন, আল্লাহ আমার বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমাকে সুস্থ করে দিয়েছেন। আমি ভালো আছি। আমাকে জানানো হয়েছে আনিসা পরীক্ষা দিতে পারবে।

আনিসার মিরপুরে অবস্থিত ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য বেশ কয়েকটি নির্দেশনা জারি করে শিক্ষা বোর্ড। এরমধ্যে উপস্থিতির বিষয়ে বলা হয়, পরীক্ষার কেন্দ্রে নির্ধারিত কক্ষে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর জন্য নির্দিষ্ট আসনে পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে বসতে হয়। পরীক্ষার প্রথম দিন অবশ্যই সকাল ৯টার মধ্যে পরীক্ষার কেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হবে। অন্যদিন পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে প্রবেশ করলেই হবে।
তবে বিশেষ কারণে কোনো পরীক্ষার্থী দেরি করে কেন্দ্রে পৌঁছালে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ারও কেন্দ্রগুলোকে দেয়া আছে। সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র প্রধান এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে পরীক্ষায় এমসিকিউ অংশ শেষ হওয়ার পর কাউকে আর প্রবেশ করার সুযোগ না দিতে নির্দেশনা রয়েছে।

অনেকে বলছেন, মানবিক দিক বিবেচনায় আনিসার পরীক্ষা নেয়া যেতো। আনিসার সঙ্গে থাকা তার খালা গণমাধ্যমকে জানান, মেয়েটির বাবা নেই। সকালে তার মা স্ট্রোক করেছেন। পুরো পরিবারে কেউ নেই যে, দায়িত্ব নিতে পারে। তাই মেয়েটিই মাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যায়। সেখান থেকে দৌড়ে এসে পরীক্ষা দিতে এলেও হলে ঢুকতে পারেনি।

এ বিষয়ে বাঙলা কলেজের অধ্যক্ষ কামরুল হাসান বলেন, এখানে মানবিকতা ও আইন দুটোই আছে। এই ঘটনার পর আমি মেয়েকে বলেছিলাম, এমসিকিউ পরীক্ষা তো হয়ে গেছে। এখন তো তুমি পরীক্ষা দিলে পাস করতে পারবে না। কারণ এমসিকিউতে আলাদাভাবে পাস করতে হবে। আমি জানি তার খারাপ লাগছিলো। খুবই স্বাভাবিক। আবার মানবিক দিক বিবেচনায় তাকে ঢুকতে দিলে দেরি করে আসায় কেন ঢুকতে দেয়া হলো সেটা নিয়েও হয়তো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো।

তিনি আরও বলেন, আমি ওই মেয়ের কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে অনুরোধ করেছি যাতে যোগাযোগ করে পরবর্তী পরীক্ষা দিতে আসতে বলেন।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম কামাল হায়দার বলেন, মেয়েটি যখন পরীক্ষা কেন্দ্রে আসে তখন প্রায় দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এমসিকিউ পরীক্ষা শেষে এই সময় প্যাকেজিংও হয়ে যাওয়ার কথা। এই সময়ে পরীক্ষা নেয়া কতোটা সম্ভব ছিল এটাও একটা প্রশ্ন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দকার এহসানুল কবির বলেন, পরীক্ষার্থীদের জন্য যে নিয়ম আছে এটা তারা পালন করেছেন। তবে এই মেয়েটির পরিস্থিতির বিবেচনায় মানবিকতার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারতেন।

এদিকে, আনিসার বৃহস্পতিবারের পরীক্ষা না নেয়া হলে তার হয়ে বিনা পারিশ্রমিকে আইনি লড়াই করতে প্রস্তুত আছেন বলে ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস (কাজল)।

এই পরীক্ষার্থীকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার জেরে বার্তা এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকেও। শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো বার্তায় বলা হয়, সেই পরীক্ষার্থীকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন শিক্ষা উপদেষ্টা। এ বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা সিআর আবরার বলেন, মানবিক বিবেচনায় ওই শিক্ষার্থীর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা নেয়ার বিষয়টি পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ সংক্রান্ত আইন ও বিধির আলোকে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। তার এ দুঃসময়ে আমরাও সমব্যথি। এ পরীক্ষার্থীকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

mzamin

Wednesday, June 18, 2025

তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করল ইসরায়েল by বায়েজিদ আহমেদ

এক–দুজন নয়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এটির অবস্থান ইরানের রাজধানী তেহরানের আলবোরজ পর্বতমালার পাদদেশে। হত্যাকাণ্ডের শিকার ওই পাঁচ অধ্যাপক দেশটির পরমাণু গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত ছিলেন।

পরমাণু গবেষণায় ওই পাঁচ নক্ষত্রকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। এমনটাই জানিয়েছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত একমাত্র বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মো. নাকিব হাসান। তিনি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থিত আন্তর্জাতিক হোস্টেলে থাকছেন। তাঁর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের। তেহরান থেকে টেলিফোনে তিনি জানান, একসঙ্গে এতজন অধ্যাপককে হারিয়ে শোকে মুষড়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা–কর্মচারীরা। এককথায় শোকে স্তব্ধ পরমাণু গবেষণার জন্য বিশেষায়িত ইরানের শীর্ষস্থানীয় এ বিশ্ববিদ্যালয়। হামলার পর বিশ্ববিদ্যালয়টি এক মাসের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শোক জানিয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

নাকিব জানান, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা রাহিনীর ক্রমাগত হামলার কারণে তাঁরা একধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। বাংলাদেশ থেকে তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছেন, কখন যেন কী হয় এ ভাবনায়! সারাক্ষণ বাংলাদেশ থেকে স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও শুভান্যুধায়ীদের ফোনে একধরনের ট্রমা তৈরি হয়েছে নাকিবের মনে। কারণ, জীবনে তিনি কোনো দিন এমন দুঃসহ ও ভয়ার্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি।

নাকিব বলেন, ১৩ জুন ভোরে আবাসিক এলাকায় টার্গেট করে তাঁদের এই পাঁচ শিক্ষককে হত্যা করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। যদিও ওই শিক্ষকদের কেউ তাঁর বিভাগের নন, তারপরও তাঁরা তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ছিলেন। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর বেহেস্তি ইউনিভার্সিটি কখনো এমন নৃশংস ঘটনার শিকার হয়নি। একসঙ্গে এতজন অধ্যাপককে তাদের হারাতে হয়নি।

এ বছরের জানুয়ারিতে বৃত্তি নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাকিব হাসান তেহরানের শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। তিনি জানান, নিহত পরমাণুবিজ্ঞানীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করতেন। তাঁরা সবাই ছিলেন পরমাণুবিজ্ঞানী।

বাংলাদেশের শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার সন্তান নাকিব হাসান জানান, গত শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক এলাকায় ঘুমন্ত অবস্থায় ইসরায়েলি হামলায় ওই বিজ্ঞানীরা নিহত হন। রোমহর্ষ সে খবর তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতি থেকে জানতে পারেন। এ ছাড়া শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা মিডিয়া গ্রুপে হত্যাকাণ্ডের শিকার ওই পাঁচ অধ্যাপকের ছবি দেওয়া হয়েছে।

নিহত ওই পরমাণুবিজ্ঞানীদের মধ্যে ড. আহমাদরেজা জোলফাগারি, ড. ফেরেদুন আব্বাসি ও ড. আবদলহামিদ মিনুচেহর শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। বাকি দুজন পরমাণুবিজ্ঞানী ড. আমির হোসেন ফাকেহি ও ড. মোহাম্মাদ মেহদি তেহরানচি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করতেন।

শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক প্রথিতযশা পরমাণুবিজ্ঞানী ছিলেন ড. মাজিদ শাহরিয়ারি, যাঁকে ২০১০ সালে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ গাড়ি বোমা হামলায় হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের আরও চার পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। তাঁরা হলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ আকবর মোতালেবি জাদেহ, মেকানিকসের বিশেষজ্ঞ আলী বাখোরি কাতিরিমি, পদার্থবিদ্যার বিশেষজ্ঞ মনসুর আসগারি ও ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ সাইদ বার্জি।

আইডিএফ দাবি করেছে, নিহত পরমাণুবিজ্ঞানীরা ইরানের পরমাণু গবেষণার জনক মোহসেন ফাখরিজাদেহর উত্তরসূরি। ২০২০ সালে ইসরায়েল তাঁকেও হত্যা করে।

নাকিব জানান, চার দিন ধরে তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন প্রদেশের সামরিক স্থাপনাগুলোয় ইসরায়েল ক্রমাগত হামলা চালাচ্ছে। অন্যান্য বেসামরিক এলাকায় খুব একটা হামলা চালাচ্ছে না। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে কেউ বের হচ্ছেন না। ইরানি নাগরিক থেকে শুরু করে দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকেরা ভীষণ ভয়ের মধ্যে আছেন।

নাকিব হাসান জানান, তাঁর জানামতে, ইরানজুড়ে ইসরায়েলের বর্বরোচিত হামলায় দেশটির অনেক শীর্ষ স্থানীয় সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা মারা গেলেও বাংলাদেশি কোনো নাগরিক হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। রোববার তেহরানে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসের এক কর্মকর্তা টেলিফোনে যোগাযোগ করে তাঁর খোঁজখবর নিয়েছেন।

নিহত পরমাণুবিজ্ঞানীদের এই ছবি প্রকাশ করেছে তেহরানের শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ
নিহত পরমাণুবিজ্ঞানীদের এই ছবি প্রকাশ করেছে তেহরানের শহীদ বেহেস্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ

Wednesday, June 11, 2025

আমাদের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো কবে হার্ভার্ডের মতো সাহসী হবে by রউফুল আলম

ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর অনেক বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছেন। সম্প্রতি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিলিয়ন ডলার ফেডারেল ফান্ড বন্ধ করে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছেন। ট্রাম্পের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্ট হার্ভার্ডের ফান্ড বন্ধ করার নির্দেশ দেননি।

ট্রাম্প তাঁর আগের মেয়াদেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন। হার্ভার্ড ও এমআইটি মিলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের জুলাই মাসে মামলাও করেছিল। এলিট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে বিভিন্ন বিশ্লেষক বিভিন্নভাবে দেখছেন।

যদিও ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছেন, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ‘ইহুদিবিরোধী কর্মকাণ্ড বা অ্যান্টিসেমিটিজম’ বেড়ে গেছে। বস্তুত এ কথা প্রচার করে মানুষের মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করছেন। তবে স্কলার সমাজে এই যুক্তি তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো তাদের দেশের প্রেসিডেন্টকে সাধারণত আলাদা করে গুরুত্ব দেয় না; বলা চলে, আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি নেই। প্রেসিডেন্টরাও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্বে জড়াতে যান না।

বিশ্ব র‍্যাঙ্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির বেশির ভাগ বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো হলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। হার্ভার্ড, এমআইটি, প্রিন্সটন, স্ট‍্যানফোর্ড, কলোম্বিয়া, ইয়েল, ইউপ‍্যান ইত‍্যাদি সবই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বোঝায়, সেগুলো বস্তুত রাজ‍্য বা স্টেটের প্রতিষ্ঠান।

যেমন ইউনিভার্সিটি অব ক‍্যালিফোর্নিয়া-বার্কলে (ইউসি-বার্কলে), মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি, ভার্জিনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি—এমন অনেক প্রতিষ্ঠান। প্রাইভেট হোক কিংবা পাবলিক, বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলোয় প্রেসিডেন্ট কিংবা ফেডারেল সরকারের সরাসরি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সুযোগ বা সংস্কৃতি নেই।

ফলে বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত। এমনকি ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো অনেক বেশি স্বায়ত্তশাসিত ও স্বাধীন।

একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ না থাকলেও ফান্ড বা আর্থিক অনুদান এবং গবেষণানীতিতে প্রভাব রাখে। ফেডারেল সরকারের ফান্ড বা অর্থায়ন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই কমবেশি বরাদ্দ থাকে।

সেই ফান্ড বণ্টন ও প্রদানে ফেডারেল সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো ফেডারেল সরকারের ফান্ড ছাড়াও প্রাইভেট ফান্ড, স্টুডেন্টদের টিউশন ফি ও ডোনেশন পেয়ে থাকে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের গবেষণা কার্যক্রম থাকে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে অনেক টাকা পায়।

তা ছাড়া অনেক ধনী পরিবার থেকে ডোনেশন পায়। পাবলিক বা স্টেট ইউনিভার্সিটিগুলো রাজ‍্য সরকার থেকেও অর্থ পায়। যেমন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এনডোর্মেন্ট বা আর্থিক তহবিল ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। পৃথিবীর যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে তাদের আর্থিক তহবিল বেশি।

সুতরাং ট্রাম্প যে ফান্ড বন্ধ করেছেন, তাতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কার্যক্রম ব‍্যাহত হবে, তবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাবে না। ট্রাম্প বস্তুত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেডারেল ফান্ড বন্ধ করেছেন, প্রাইভেট ফান্ড বন্ধ করতে পারবেন না।

ট্রাম্প তাহলে কোন ক্ষমতাবলে হার্ভার্ডের ফান্ড বন্ধ করলেন? রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টেরও অনেক প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকে। নির্বাহী আদেশ বা এক্সিকিউটিভ অর্ডারের মাধ্যমে অনেক কিছু করার ক্ষমতা রাখেন।

সেই ক্ষমতাবলেই তিনি এই কাজ করেছেন। হার্ভার্ড প্রশাসনও চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে নেই। কারণ, প্রেসিডেন্টের কাজের বিরুদ্ধেও মামলা করার অধিকার এ দেশের প্রতিষ্ঠানের আছে।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট (উপাচার্য–তুল‍্য) এলেন গার্বার লড়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষ মামলা করেছে ও আইনি লড়াই চলছে।

ট্রাম্প চার বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না, কিন্তু হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থাকবে। ট্রাম্প হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ফান্ড বন্ধ করতে পারবেন, কিন্তু সেটা কত দিন টিকবে, সময়ই বলে দেবে।

চলমান আইনি লড়াইয়ে যদি ট্রাম্প জিতেও যান, তাতেও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির উজ্জ্বলতা বাড়বে। চার বছর পর হার্ভার্ড হয়তো আরও প্রবলভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু এই যে একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পৃথিবীর শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে লড়তে পারে—এর নামই ব‍্যবস্থাপনা, এর নামই সাহস।

এই ব‍্যবস্থাপনা যেসব সমাজে গড়ে উঠেছে, সেসব সমাজ সহজে ভেঙে পড়ে না। সব দিক দিয়ে ভেঙে পড়ে না। আর একটা প্রতিষ্ঠানের এমন সাহস, স্বতন্ত্রতা অন‍্য প্রতিষ্ঠানকে শক্তি দেয়। অন‍্য প্রতিষ্ঠানকেও স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।

যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলোর উপাচার্য (অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রেসিডেন্টও বলা হয়) নিয়োগে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্ট্রি এই নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। সার্চ কমিটি গঠনের মধ‍্য দিয়ে উপাচার্য পদের জন‍্য আবেদন চাওয়া হয়। তারপর সেখান থেকে সেরা প্রার্থী নিয়োগ দেওয়া হয়।

অন‍্যদিকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলোয় রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। সে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী, এমনকি দলের অন্য নেতাদেরও প্রত্যক্ষ সুপারিশ থাকে।

এ জন্য একজন উপাচার্য কখনোই সরকারের অনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যেতে চান না। কারণ, তাঁর চাকরি হারানোর ভয় থাকে। উপাচার্য যতটা দলীয় হয়ে উঠতে পারেন, চাকরির নিশ্চয়তা তাঁর ততই বেশি থাকে।

আহমদ ছফা ৩০ বছর আগে তাঁর গাভী বিত্তান্ত বইয়ে এমনই উপাচার্যের চরিত্র তুলে ধরেছেন এবং দুর্ভাগ‍্যজনকভাবে সেই চর্চা থেকে, সেই মানের উপাচার্যদের বলয় থেকে দেশের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো মুক্ত হয়নি আজও।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো দেশের যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে জ্ঞান–গরিমায় ভিন্ন। সেখানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক পণ্ডিত, বিশ্লেষক, গবেষক, লেখক, অধ‍্যাপক থাকেন। বিশ্ববিদ‍্যালয়ই যদি ক্রমে সরকারের হুকুমের প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে, তাহলে আর অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কি করে মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড়াবে?

যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে যায়, সে দেশের অন্য বহু প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই সরকারের অনুগত প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে, উঠতে বাধ্য।

দুর্ভাগ‍্যজনক হলো, আমাদের সরকারগুলো বিশ্ববিদ‍্যালয়কে তাদের হুকুম বা ইচ্ছার বলয়ের মধ্যেই রাখতে চায়। ফলে ইচ্ছা করেই সরকারের পছন্দমতো উপাচার্য, সহ–উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ রাখাই সরকারের মূল লক্ষ‍্য থাকে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় মূলত সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে এবং ক্ষমতা থেকে সরাতে বেশ ভূমিকা রাখে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে যে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটে গেছে, সেই সরকার ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

এ দেশের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো তাই রাজনৈতিক মাঠে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে যতটা ভূমিকা রেখেছে, জ্ঞান-গবেষণায় ততটাই পিছিয়েছে। এটা আমাদের জন‍্য ঐতিহাসিক এক অভিশাপ বলেই আমি বিবেচনা করি। এবং এই জটিলতা থেকে উত্তরণের চেষ্টা কোনো সরকারই করেনি; বরং নিজেদের দলের ছাত্রদের নগ্নভাবে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে গেছে। দলীয় শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে।

শিক্ষক সমিতিগুলো ছিল সরকারের মুখপাত্র। আর ছাত্রসংসদগুলোতে নির্বাচন না দিয়ে দলীয় ছাত্রদের দিয়ে ক‍্যাম্পাস, হল দখল একটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সবই এখন প্রতিষ্ঠিত চর্চা এবং এই চর্চার মধ‍্যে থেকে আগামীর তরুণেরাও বেরিয়ে আসতে পারছেন না।

সরকারকে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তারা কী আশা করে। কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বলয় থেকে মুক্ত হতে না পারলে দেশের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো কোনো দিনই বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠবে না।

ট্রাম্প যখন প্রথম ক্ষমতায় আসেন, আমি তখন ইউনিভার্সিটি অব প‍েনসিলভানিয়াতে (ইউপ‍্যান) পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করছিলাম। তখন ইউপ‍্যানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এমি গুটম‍্যান।

বর্তমানের মতো তখনো ট্রাম্প সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইমিগ্রেশন–বিষয়ক বিভিন্ন জটিলতা তৈরি করেছিলেন। ইউপ‍্যানের প্রেসিডেন্ট এমি গুটম‍্যান সেসব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতেন। তাঁর সেসব প্রতিবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হতো। সরকারের বিভিন্ন নিয়মনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার কথা ব‍্যক্ত করতেন।

আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, এ দেশের একজন উপাচার্য দেশের সরকারের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও তার শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান! এই সব দেশে যেন বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই একটি রাষ্ট্রতুল‍্য প্রতিষ্ঠান! দেশের ভেতর যেন এক আলাদা দেশ। সরকারের পালাবদলের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক রূপ বদলায় না।

আমাদের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো কি কখনো এমনভাবে গড়ে উঠবে? এতটুকু না হোক অন্তত কাছাকাছি? আমরা চাই, আমাদের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলোর মেরুদণ্ড কিছুটা হলেও হার্ভার্ডের মতো হোক। বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলো হোক তারুণ‍্যের ও দেশের মানুষের আলোকবর্তিকা।

* রউফুল আলম টেকসই শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক লেখক
- Rauful.alam15@gmail.com

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির আর্থিক তহবিল ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। তাই ট্রাম্প যে ফান্ড বন্ধ করেছেন, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কার্যক্রম ব‍্যাহত হবে, তবে তা বন্ধ হয়ে যাবে না।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির আর্থিক তহবিল ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। তাই ট্রাম্প যে ফান্ড বন্ধ করেছেন, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কার্যক্রম ব‍্যাহত হবে, তবে তা বন্ধ হয়ে যাবে না। ছবি: সংগৃহীত