Monday, January 6, 2014

ইংলিশ লজ্জা!

মাইকেল ক্লার্ককে সিডনি টেস্টের টসে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন দু'জন অধিনায়ক ৫-০ ব্যবধানে অ্যাশেজ জয়ে অস্ট্রেলিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছেন? ক্লার্ক সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন_ ওয়ারউইক আর্মস্ট্রং ও রিকি পন্টিং। এবার সেই ইতিহাসে নাম লিখিয়ে ক্লার্ক লজ্জায় ডোবালেন ইংলিশদের। ব্যর্থতা নাকি সাফল্যের স্তম্ভ। কিন্তু এই সিরিজে ইংল্যান্ডের ধারাবাহিক ব্যর্থতা হয়েছে ব্যর্থতার স্তম্ভ। সবেধন নীলমণি ছিল পঞ্চম ও শেষ টেস্টটা। সেটাতে ইংল্যান্ড আরও বাজেভাবে হারল। তিন দিনেই শেষ সিডনি টেস্ট! ইংল্যান্ড হেরে গেল ২৮১ রানে। ভস্মাধার তো তৃতীয় টেস্টেই হাত থেকে ফসকে গেছে। এবার সম্ভ্রান্তের সম্মানটাও গেল! লজ্জার হোয়াইটওয়াশ হলো ইংল্যান্ড! অস্ট্রেলিয়ানরা সবক্ষেত্রেই ইংলিশদের চেয়ে এগিয়ে সিরিজে। ব্যাটিংয়ে তার প্রমাণ অস্ট্রেলিয়ার সেঞ্চুরি ১০টি, ইংল্যান্ডের মাত্র ১টি, বেন স্টোকসের! চতুর্থ টেস্ট বাদে প্রতিটি টেস্টেই অস্ট্রেলিয়া আগে ব্যাটিং করেছে, ব্যাপারটাকে প্রতীকীও ধরা যেতে পারে। সেই টেস্টগুলোতে ইংল্যান্ডকে অপেক্ষায় রাখতেন ক্লার্ক। ইনিংস ঘোষণার অপেক্ষা। বিশেষত দ্বিতীয় ইনিংসে। যখন দল নিরাপদ স্থানে পেঁৗছে যেত, তখনই আসত ইনিংস ঘোষণা। কিন্তু যে টেস্টটাতে ইংল্যান্ড প্রতিরোধ করতে না পারলে নিশ্চিত ধবলধোলাই হবে, সেই টেস্টে ক্লার্ক আর নিরাপদে পেঁৗছারই কোনো প্রয়োজন মনে করলেন না। সময় তো অফুরন্ত! তাই আর ইনিংস ঘোষণা দিলেন না। প্রথম ইনিংসে ৩২৬ রান করা স্বাগতিকরা দ্বিতীয় ইনিংসে ইংলিশ বোলারদের কৃতিত্ব ও নিজেদের তাড়াহুড়ার কারণে করতে পারল ৪.৪৬ ওভাররেটে ২৭৬ রান। তারপরও টার্গেট ৪৪৮। এই সিরিজে ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে ওঠা ইংলিশ ব্যাটিং প্রথম ইনিংসে ১৫৫ রানে অলআউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট হলো আরও বাজেভাবে। রান হয়তো প্রথম ইনিংসের চেয়ে ১১ বেশি হয়ে ১৬৬, কিন্তু সিরিজে ষষ্ঠবারের মতো ২০০ রানের নিচে অলআউট কুক বাহিনী! আর সিরিজটা তারা শেষ করল ৩১.৪ ওভারে অলআউট হয়ে!
সকালে সিরিজের টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করেছেন ক্রিস রজার্স (১১৯)। সবাই ভালো বোলিং করলেও ৩৩ রানে ৩ উইকেট নিয়ে সবচেয়ে সফল স্টক বরউইক। ইংল্যান্ড ব্যাটিংয়ের শুরু থেকেই ধস। তবে আবারও প্রথম ইনিংসের মতো আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে সফল হয়েছেন ৯ নম্বরে নামা স্টুয়ার্ট ব্রড (৪২)। কিন্তু ততক্ষণে ম্যাচ ও সিরিজ প্রায় শেষ। আর শেষটা এত দ্রুত এনে দিয়েছেন রায়ান হ্যারিস ও মিচেল জনসন। হ্যারিস ২৫ রানে পঞ্চমবারের মতো নিয়েছেন ৫ উইকেট। ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা। আর ইংলিশ-ত্রাস জনসন ৩ উইকেট নিয়ে সিরিজে শিকারসংখ্যা বাড়িয়ে করেছেন ৩৭। সিরিজটাকে চাইলে জনসন বনাম ইংল্যান্ডও বলা যায়! সিরিজসেরা জনসনেই তো সর্বাধিক ধরাশায়ী ইংলিশরা!
অস্ট্রেলিয়া আয়োজিত এই অ্যাশেজটা আদতেই পরিণত হলো 'দ্য অসি অ্যাশেজে'। ২০০৭ সালের পর অস্ট্রেলিয়া শুধু ভস্মাধার পুনরুদ্ধারই করেনি, একেবারে ভূপতিত করে ছেড়েছে ইংলিশদের। তার প্রমাণ হয়ে দেখা দিল এই টেস্ট। এই টেস্ট সিরিজ। পন্টিংয়ের ২০০৬-০৭ মৌসুমের অ্যাশেজ জিততে লেগেছিল ২২ দিন। আর্মস্ট্রংয়ের ২৪ দিন। আর ক্লার্কের অস্ট্রেলিয়ার সময় লাগল ২১ দিন। ইংল্যান্ড একেবারে ক্লিন বোল্ড! সেই ১৮৮২ সালের মতো ব্রিটিশ মিডিয়া না আবার লেখে বসে 'দ্য ইংলিশ ক্রিকেট ডাইড...'!
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া : ৩২৬ ও ২৭৬। রজার্স ১১৯; বরউইক ৩৩/৩
ইংল্যান্ড : ১৫৫ ও ১৬৬। কারবেরি ৩৩; হ্যারিস ২৫/৫, জনসন ৪০/৩
ফলাফল : অস্ট্রেলিয়া ২৮১ রান ও সিরিজে ৫-০ ব্যবধানে জয়ী।
ম্যাচসেরা : রায়ান হ্যারিস। সিরিজসেরা : মিচেল জনসন।

জয় দিয়ে বছর শুরু বার্সার

অ্যালেক্সিস সানচেজের হ্যাটট্রিকে এলচের বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয় দিয়ে নতুন বছর শুরু করেছে বার্সেলোনা।
বাংলাদেশ সময় রোববার রাতের এই জয়ে আবারো গোল ব্যবধানে অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদকে হটিয়ে লীগ টেবিলের শীর্ষে উঠে এসেছে কাতালানরা।
এখন ১৮ ম্যাচে বার্সেলোনা ও অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের সংগ্রহ সমান ৪৯ পয়েন্ট। আগামী সপ্তাহে এ মৌসুমে প্রথমবারের মত ভিসেন্টে ক্যালডেরনে মুখোমুখি হবে দুই দল।
হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে বার্সা তারকা লিয়নেল মেসি এ ম্যাচেও মাঠের বাইরে ছিলেন। আর বড়দিনের ছুটি কাটিয়ে সদ্য ব্রাজিল থেকে ফেরা নেইমার ছিলেন বিশ্রামে। তবে এই দুই তারকার অনুপস্থিতি মোটেই টের পেতে  দেননি সানচেজ ও পেড্রো রডরিগুয়েজ। ম্যাচের ১৫ মিনিটের মধ্যেই এই দু'জন গোল করে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন।
দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য জাভি হার্নান্দেজ পেনাল্টির সুযোগ নষ্ট করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই পেড্রোর পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন সানচেজ। ম্যাচের ২১ মিনিট বাকি থাকতে এই চিলিয়ান স্ট্রাইকার ফ্রি-কিক থেকে ক্লাবের পক্ষে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন।
বার্সা এখন রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে ৮ পয়েন্ট এগিয়ে। কিন্তু সোমবার সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে জয় দিয়ে এই ব্যবধান কমানোর সুযোগ রয়েছে রিয়ালের সামনে।
ম্যাচ শেষে বার্সা কোচ জেরার্ডো মার্টিনো বলেছেন, "আমরা সত্যিই খুব ভাল ফুটবল খেলেছি। আমাদের খেলার মধ্যে বৈচিত্র্য ছিল, বেশিরভাগ সময় বলের নিয়ন্ত্রণও আমাদের কাছেই ছিল।"
খেলা শুরুর ৭ মিনিটের মধ্যেই বছরের প্রথম গোলের দেখা পায় বার্সা। বামদিক থেকে জোর্ডি আলবার ক্রস থেকে সানচেজের নিখুঁত শট এলচের জালে আঘাত হানে। 
বিরতির ৪ মিনিটের মধ্যেই ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া করে কাতলানরা। গোল এরিয়ার মধ্যে ফ্যাব্রেগাসকে ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টি বাঁশি বাজালেও ক্রিস্টিয়ান সাপুনারুকে লাল কার্ড না দেখানোয় উত্তেজনা তৈরি হয়। কিন্তু জার্ভির স্পট কিক লক্ষভ্রষ্ট হলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সফরকারীরা।
অবশেষে ৬৩ মিনিটে বার্সেলোনার পক্ষে তৃতীয় গোল করেন সানচেজ। পেড্রোর দারুণ একটি পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন এই চিলিয়ান তারকা। এর ৬ মিনিট পর ২৫ গজ দূর থেকে দারুণ এক কার্লিং ফ্রি-কিক থেকে মৌসুমের প্রথম হ্যাটট্রিকসহ ১১ গোল পূর্ণ করেন সানচেজ।

গিনেস বুকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব পতাকার স্বীকৃতি পেল বাংলাদেশ

মহান বিজয়ের ৪২তম বর্ষপূর্তিতে বাংলাদেশের তৈরি মানব পতাকাটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ সময় আজ ৪ জানুয়ারী ২০১৪ এ স্বীকৃতির খবর প্রকাশ করা হয় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে। সেনা বাহিনীর সহায়তায় মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩ ইং শেরে বাংলা নগরের জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে এ মানব পতাকা নির্মাণ করে, যাতে ২৭ হাজার ১১৭ জন মানুষ অংশ নেন। বিশ্ব রেকর্ডের জন্য মানব পতাকাটি ৫ মিনিট ধরে দেখানোর কথা থাকলেও বাংলাদেশ এটি ৬ মিনিট ১৪ সেকেন্ড ধরে প্রদর্শন করে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কেবল একটি দিনকে উদযাপনই করেনি একই সাথে বিশ্বের সামনে দেশের মানুষের ঐক্যকে তুলে ধরেছে। মানব পতাকা তৈরিতে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ ও সেনা সদস্যরা অংশ নেন। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন বয়সে তরুণ।
গিনেস অনুমোদিত একটি প্রতিনিধি দল এটি দেখে রিপোর্ট দেয়ার পর কর্র্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এর স্বীকৃতি প্রদান করার খবরটি তাদের ওয়েবসাইটে এবং ফেসবুক ও টুইটারে একযোগে প্রকাশ করে। সর্বশেষ সবচেয়ে বড় মানব পতাকার রেকর্ডটি ছিল পাকিস্তানের দখলে। ২০১২ সালের ২১ অক্টোবর লাহোরের জাতীয় হকি স্টেডিয়ামে পাঞ্জাব ইয়থ উৎসবে এ রেকর্ডটি করেছিল ২৪ হাজার ২০০ জন মানুষ। রবি মানুষের ভেতরের শক্তিতে বিশ্বাস করে। জ্বলে উঠুন আপন শক্তিতে স্লোগান নিয়ে রবি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

জনশক্তি রফতানি কমেছে ৩২ শতাংশ by কিসমত খোন্দকার

দেশের জনশক্তি রফতানি ২০১৩ সালে আগের বছরের চেয়ে ৩২ শতাংশ কমেছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ ১০ হাজার কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গেছেন। ২০১২ সালে জনশক্তি রফতানি হয়েছিল ৬ লাখ ৭ হাজার জন। বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট ছাড়াও সরকারি উদ্যোগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বেসরকারি পর্যায়ে জনশক্তি রফতানি বন্ধ থাকাকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। গত বছর জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব ড. জাফর আহমদ খান সমকালকে বলেন, ২০১২ সালের তুলনায় গত বছর বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি কিছুটা কম হয়েছে। তবে প্রতি বছর সমহারে জনশক্তি রফতানি হবে এমনটা আশা করা ঠিক নয়। জনশক্তি রফতানিতে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রচলিত বাজারের বাইরেও নতুন বাজার অনুসন্ধান করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, চলতি বছর রফতানি বেশি হবে।
ড. জাফর আহমদ খান বলেন, দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা থাকায় তা মোট জনশক্তি রফতানির ওপর প্রভাব ফেলেছে। দুবাইয়ে রফতানি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে এই বড় বাজারটি বন্ধ ছিল। সৌদি আরবে অবৈধ অবস্থানকারী বিদেশি কর্মীদের বৈধতা নেওয়ার সময় আরও দুই মাস বেড়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া আবার শুরু হয়েছে। এসব দিক বিবেচনা করে এ বছর জনশক্তি রফতানি বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
গত বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ৪ লাখ ১০ হাজার কর্মী রফতানি হয়েছে বলে দাবি করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব। তবে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষন ব্যুরোর (বিএমইটি) নভেম্বর পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৩ সালে মোট ৩ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৭ জন কর্মী রফতানি হয়েছে।
বিএমইটির পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০৯ সালে ৪ লাখ ৭৫ হাজার, ২০১০ সালে ৩ লাখ ৯০ হাজার এবং ২০১১ সালে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কর্মী রফতানি হয়েছে।
বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন ওমানে। এর সংখ্যা ১ লাখ ২৩ হাজার ১৬৩। এরপর সিঙ্গাপুরে ৫৫ হাজার ৪৪৯, কাতারে ৫২ হাজার ৬১১, বাহরাইনে ২৩ হাজার ৫০৬, জর্ডানে ১৯ হাজার ৬৫৫ ও লেবাননে ১৩ হাজার ৭৬৯ জন। রফতানির বড় বাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১২ হাজার ৬২৬, সৌদি আরবে ১২ হাজার ৫৬৯, লিবিয়ায় ৬ হাজার ৯০৩ এবং ইরাকে ৬ হাজার ৪৩৮ কর্মী রফতানি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশেও ২০১২ সালের চেয়ে কম কর্মী কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
জনশক্তি রফতনির বড় বাজার সৌদি আরবে গত ২০০৮ সালের পর থেকেই ক্রমাগত কমছে। ২০১২ সালে ২ লাখ ১ হাজার ২৩২ জনের বিপরীতে ২০১৩ সালে তা কমে ১২ হাজার ৫৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০১২ সালে যান ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৫২ জন। গত বছর সেখানে গেছেন মাত্র ১২ হাজার ৬২৬ জন। কুয়েতে গত কয়েক বছর ধরেই জনশক্তি রফতানি প্রায় বন্ধ রয়েছে। মালয়েশিয়ায় রফতানি হচ্ছে খুবই ধীরগতিতে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের ব্যাপক অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ কাজে লাগিয়ে জনশক্তি রফতানি বাড়ানোর বিষয়টি অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য 'ওয়ার্ল্ড এক্সপো ২০২০' এর বিশাল আয়োজন উপলক্ষে কর্মী পাঠানোর সুযোগ এখনও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কাতারে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ-২০২২ কে কেন্দ্র করে দেশটিতে রফতানির সুযোগ কাজে লাগাতেও জোরালো কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের দুটি আয়োজনকে কেন্দ্র করে ভারত, নেপাল, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এর মধ্যেই নিজেদের জনশক্তি রফতানির বিষয় নিশ্চিত করছে। সরকারি পর্যায়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হলে এ দেশ দুটিতে বিপুলসংখ্যক কর্মী রফতানি সম্ভব হবে বলে রফতানিকারক এজেন্সির কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন।

উৎসবের নির্বাচন হয়নি by শামস রাশীদ জয়

(দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমকালের ফেসবুক পাতা ও ব্যক্তিগত টাইমলাইনে প্রকাশিত মতামত) ভোটদানে কোথাও কোনো সরকারি বাধার খবর পেলাম না। সরকারি পক্ষপাতিত্বের খবরও না। বাধা যা আসছে তা সবই মানুষ পোড়ানো, স্কুল জ্বালানো, বই পোড়ানো, শিক্ষক খুন করা সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে। তাহলে যে সংখ্যালঘুরা 'একতরফা ভোট. হায় হায় হায়' বলে মাতম করছে, তারা কি সেই সন্ত্রাসীদের পক্ষাবলম্বনই করছে না? ব্যালট পেপারে শিবিরের মার্কা ও শিবিরের অর্থে লালিত দলের মার্কা থাকা না থাকায় গণতন্ত্রের কী আসে যায়?
মেহেদী হাসান সুমন
কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার সঙ্গে সঙ্গেই ভোট কারে দিমু সেই বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেছে। সেই সিদ্ধান্ত প্রয়োগের কোনো সুযোগই পাইলাম না। আজ (গতকাল) সারাদেশে ভোট হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন প্রতিবেশীর বাড়িতে পিকনিক হচ্ছে।
সুব্রত দেবনাথ
এই নির্বাচন হয়তো সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সেটা ঠেকানোর জন্য যে জ্বালাও-পোড়াও শুরু হয়েছে, সেটা গ্রহণযোগ্য তো নয়ই, বরং ঘৃণ্য ছাড়া আর কোনো শব্দ মাথায় আসে না।
নুরুদ্দীন আহমেদ বাপ্পী
শেখ ফজলে নূর তাপস আমার এলাকা থেকে আবার নির্বাচিত হলেন। অভিনন্দন। এ জন্য আপনাকে বিন্দুমাত্রও কষ্ট করতে হয়নি! গত ৫ বছরে যেমন এলাকার কাজে কোনো কষ্ট করতে হয়নি, তেমনি জয়ী হতেও কষ্ট করতে হয়নি। এই যে আপনার সম্পদের পরিমাণ ৯১ গুণ হয়ে গেল, এটাও তো তারই ইচ্ছা। আপনার এলাকার একজন আম আদমি হিসেবে খুশি হলাম। এলাকার উন্নতি হয়নি তো কী হয়েছে? এলাকার অন্তত একটা পরিবারের তো আয় বাড়ছে!
একুশ তপাদার
আমি সিলেট-১ আসনের ভোটার। অর্থমন্ত্রী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। ভোট দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও দরকার না থাকায় আফসোস হচ্ছে। যে ১৫৩ আসনে নির্বাচনের দরকার হচ্ছে না_ সহজ চিন্তা যদি করি, তাহলে দায় কার? যারা নির্বাচনে এসেছে তাদের? নাকি যারা আসেনি তাদের? যারা নির্বাচনে আসেনি তারা এলেই তো আর একতরফা হতো না।
শেরিফ আল সায়ার
বিএনপি টিভি দেখতেছে আর হাসতেছে। আওয়ামী লীগও হাসতেছে। জনগণ 'হাঁ' হয়ে তামাশা দেখতাছে। আর বিদেশিরা ঘটনা অবজারভ করতেছে। জামায়াত তাদের রশি ছাইড়া লোহার শিকল রেডি করতেছে। পল্গ্যান করতেছে কেমনে আরও শক্ত কইরা বিএনপিরে বাইন্ধা রাখা যায়।
আরিফ আর হোসেন
'তান্ত্রিক নির্বাচন'। 'গণ' তো বাসাতেই বসে আছে।
সাইফুল ওয়াদেদ হেলাল
সালটা '৭৭ কিনা মনে নেই, খুবই ছোট ছিলাম। জিয়াউর রহমানের হ্যাঁ/না ভোট। জীবনে প্রথম নিজ হাতে দুইখান ভোট দিছিলাম! আদমজী জুট মিলের এক নম্বর ক্যান্টিনের ভোটকেন্দ্রে ভোট হইছিল। ভোটকেন্দ্রের কাছে গিয়ে দারোয়ান কিসিমের একজনের কাছে গিয়ে ভোট দেওয়ার আবদার ধরলাম। কতক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করার পর ধমক দিয়ে হাতে ব্যালট ধরিয়ে দিয়ে বলল, যা যা তাড়াতাড়ি দিয়ে আয়। ছালার চট দিয়ে ঘেরা বুথের ভেতরটা দেখতে কেমন সেটাই আবিষ্কার করা ছিল উদ্দেশ্য। ভোট ছিল হ্যাঁ/না; কিন্তু বাক্স ছিল একটা, আরেকটা বাক্সা খুঁজে পাইনি। একবার ভোট দেওয়ার পর কতক্ষণ ঘুরেটুরে আরও কয়েক বন্ধু মিলে আবারও ভোট দিতে গেলাম।
আমাদের ছোটবেলায় ভোট ছিল ঈদের মতো আনন্দের। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হতো বিটিভিতে ননস্টপ ভোটের অনুষ্ঠান। আহা কী যে আনন্দ! প্রায় তিন দিন ধরে ডাবল দৈর্ঘ্যের ছায়াছন্দ, দুই দুইটা বাংলা সিনেমা, ইংরেজি সিনেমা, ভোট উপলক্ষে পূর্ণ দৈর্ঘ্য বিশেষ নাটক, আধুনিক গান, ব্যান্ড শো ও বাচ্চাদের বিশেষ অনুষ্ঠান। হায়রে মজার ভোট! মনে আছে, এ ধরনের বেশ কয়েকটা ভোটের অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে আমাদের শৈশব আনন্দময় হয়ে উঠেছিল। বড় হয়ে জানলাম, ভোট আসলেই বাঙালির জীবনে উৎসবের মতো। পুরনো সেই ভোটের কথা বলব কিরে ভাই, সেই রাত জেগে টিভি দেখা সে কি ভোলা যায়।
সবাইকে ভোটের দিনে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। মনের আনন্দে সবাই ভোটকেন্দ্রে যান আর দুই হাতে ভোট দিয়ে আসুন। ভোট আনন্দে একে অন্যকে আলিঙ্গন করুন। মনে রাখবেন, দল যার তার ভোট সবার। সবাইকে প্রাণঢালা (জানি না কার প্রাণ যাবে আর কারটা থাকবে!) ভোট মোবারক!
আরাফাত শান্ত
একদলীয় ভোট আমাদের দেশে নতুন না, কমবেশি সবাই করেছে নানা উছিলায়। খালেদা জিয়ার চাটুকাররাও তার নামের আগে বলে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, মইন ইউরা না এলে হতো চারবার। এখন শেখ হাসিনাও দানে দানে তিনবার! তবে অনেক দিন পর টিভি দেখে বুঝলাম এবার সাচ্চা আওয়ামী লীগের ভোটার ও কর্মীরাও ভোট দিতে কেন্দ্রে যায়নি। দল হিসেবে এটাই আওয়ামী লীগের বড় ব্যর্থতা!
নুরুন্নবী চৌধুরী হাছিব
আজকে থাকার কথা ছিল গ্রামের বাড়িতে. উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়ার কথা ছিল। হলো না। আমার জেলা চাঁদপুরের কোনো আসনেই নির্বাচনের প্রয়োজন হয়নি। ভাগ্যিস সব আসনে অন্তত একজন করে প্রার্থী ছিলেন. যদি অন্তত একজনও না থাকতেন? কী যে হতো. বলা হতো অমুক আসনে কোনো প্রার্থীই নেই।
এইচ এম বাবুল চৌধুরী
হাজারো বাধা সৃষ্টি করেও নির্বাচন ঠেকানো গেল না_ এটাই শেষ কথা। কে বা কারা ভোটদানে বাধা দিয়েছে জনগণ দেখেছে। তারপরও নির্বাচন হচ্ছে এটাই সরকারের বড় জয়।
প্রবীর শিকদার
বিচ্ছিন্ন সহিংসতার মধ্যেও মানুষ ভোট দিতে কেন্দ্রে আসছেন। এই মানুষগুলো যেন একেকজন যোদ্ধা। স্যালুট ওই মহান মানুষদের।
গোলাম মুর্তজা
বিএনপির নির্বাচন প্রতিহত করার ক্ষমতা কতটুকু আছে, সেটা তো বোঝাই গেল। আবার এই ক্ষমতা দিয়েই ভোটারশূন্য এবং কিছুটা রক্তাক্ত নির্বাচন করতে বাধ্য হলো সরকার। নির্বাচনটিকে সত্যিকার অর্থে হাস্যকর করে দিলেন আসলে এরশাদ। জাতীয় পার্টি যদি নাটক ছাড়া নির্বাচনে থাকত, তবে এতটা হাস্যকর হতো না নির্বাচন। এরশাদ সাহেব হাসপাতালের ফাইভ স্টার মানের ভিভিআইপি কেবিনে অবসরযাপন করছেন। আছে বিনোদনের সব ব্যবস্থা। গলফ খেলছেন নিয়মিত। তিনি নিজে কমপক্ষে একশ' কোটি টাকা ইতিমধ্যে পেয়ে গেছেন। তারপরও জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে তাকে রাজি করানো গেল না। তার মাঠের নেতারা যারা এখনও প্রার্থী আছেন, একেকজন ২৫ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পেয়েছেন। ভোট নেই, ভোটার নেই, আছে শুধু টাকা। বেশ ভালো নির্বাচনই করল আওয়ামী লীগ সরকার। নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকল। বিএনপি প্রমাণ করল, ভোট থাকলেও আন্দোলনে তার অবস্থা বড়ই করুণ। জামায়াত যে সন্ত্রাসী শক্তি, সেটা আর একবার প্রমাণ হলো।
যে কোনো সময়, যে কোনো দিকে যাওয়ার পথ খোলা রেখে, আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে, স্বৈরাচার এরশাদ তার গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা বাড়িয়ে নিলেন আওয়ামী লীগের কাঁধে বন্দুক রেখে। হায়! ২০০৮-এর সেই আওয়ামী লীগ, আর ২০১৪'র এই আওয়ামী লীগ!
জিয়াউদ্দিন সরকার
আমার ভোট আমার অধিকার, যাকে খুশি তাকে দেব! কিন্তু... গতবার 'না' ভোট দিয়েছিলাম যোগ্য প্রার্থীর অভাবে আর এবার সেই কষ্টটুকুও করতে হয়নি।
হাসিবুল হাসান শারদ
বিএনপি নির্বাচনে আসেনি, এক হিসেবে ভালোই হয়েছে: দেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্বার্থের বিবেচনায় দলটি অবাঞ্ছিতই। এই দলটি নির্বাচনে এলে নির্বোধদের ভোটে জিতে যেত খুব সম্ভবত, যা দেশের ভালো বয়ে আনত না, বরং অনেক বেশি খারাপির কারণ হতো। বিএনপি ক্ষমতায় আসা মানে জামায়াতসহ মৌলবাদী জঙ্গিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতো দেশ এবং আহমদ শফী-জাতীয় লোকজনও হয়ে যেত দেশের নীতিনির্ধারক স্থানীয় ধর্মীয় নেতা, যা কোনোমতেই ভালো হতো না। বিশেষত দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যেখানে নারী, সেখানে শফীদের উত্থান নারীর জন্য যারপরনাই ভয়ঙ্কর হতো। বিএনপি বলেছিল, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা তারা বাস্তবায়ন করবে। যদি মধ্যযুগীয় ওই ১৩ দফা বাস্তবায়ন করে বসার সুযোগ পেত তারা, দেশ কত বছর পেছাত জানতে আসিফ নজরুল হওয়া লাগে না। আর মোল্লাতন্ত্রের বলি হতো আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও সৃজনশীল সব শিল্পকলা। সংস্কৃতি ও শিল্পকলা ধ্বংসে এবং সব পাঠ্যপুস্তক থেকে বাঙালির ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তুলে দিতে বিএনপি একটুও কুণ্ঠিত হতো না। হেফাজতের চাপে হয়তো দেশের অসংখ্য শহীদ মিনার ও ভাস্কর্য ভাংচুর হতো এবং পাকিস্তানপন্থি নানা উদ্ভট, আপত্তিকর ও স্বাধীনতাবিরোধী কথাবার্তায় ছেয়ে যেত মোল্লাদের মাইক। দল বেঁধে বেরিয়ে আসত একেকটি জঙ্গিচক্র, যুদ্ধাপরাধী চক্র এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার হতেন দেশের অসংখ্য মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী।
মাইনুদ্দিন ফিরোজ
আমি একটি শব্দ খুঁজছিলাম, যা সবকিছুকে সংজ্ঞায়িত করে। উন্মুক্ত রাস্তায় একটি গাড়ি হাতের কাছে পেয়ে হঠাৎ করে নিজেকে মহাবীর একিলিস মনে করা, জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার মহান ব্রত নিয়ে ট্রাকচালকের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়ার ব্যাপারগুলো তখন ঘটে, যখন মানুষের আর কোনো চক্ষুলজ্জা অবশিষ্ট থাকে না। আমরা যথেষ্ট বেশরম হয়ে পড়েছি প্রতিটি গোষ্ঠী, প্রতিটি শ্রেণী এবং প্রায় প্রতিটি মানুষ। আগামীতে হয়তো নির্লজ্জতা মানে হবে বিরোধী দলের কোনো কাণ্ড। অথবা এ কথাটি খালেদা জিয়ার বক্তব্যের নিচে লিখলে নির্লজ্জতার মানে হতো ইংরেজি না জানা। কিন্তু ৫ জানুয়ারি বলে নির্লজ্জতা শব্দটা নির্বাচনকে সংজ্ঞায়ন করে ফেলে। হয়তো আমিও নিরপেক্ষ নই বলেই বেছে বেছে ৫ জানুয়ারি দুপুরেই কথাটা লিখেছি। যতই আড়াল করতে চাই, একচক্ষুবিশিষ্ট চরিত্র আমাদের জাহান্নামে নিয়ে ছাড়বে।
মাসুদা ভাট্টি
নির্বাচন বর্জন করেছি, নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি, এখন সকলে মিলে নির্বাচনের ছিদ্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি_ সন্ধ্যার সময় রায় দেব, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি! আমরা বিএনপি-জামায়াত, আমরা সুশীল, আমরা বিদেশি পর্যবেক্ষক, আমরা কূটনীতিক।
মশিউর রহমান
নওগাঁ শান্তিপ্রিয় একটি রাজনৈতিক এলাকা, এখানে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নেই বললেই চলে আর এই শান্তিপ্রিয় রাজনৈতিক চর্চার গুরু প্রয়াত জননেতা আ. জলিল। নওগাঁ সদর আসনে প্রয়াত জননেতা আ. জলিলের দুই শিষ্যের মধ্যে লড়াই চলছে। নওগাঁ সদর আসনে ভোট শান্তিপূর্ণভাবেই চলছে, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি ভোট দিয়ে এলাম।
প্রশান্ত রায়
পাবনায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সন্ত্রাসী বাহিনীর ফিল্মি স্টাইলে ভোট ছিনতাই। এ ধরনের নির্বাচনেও ফিল্মি স্টাইলের দরকার হয়?

চার স্থানে ৪ আ'লীগ নেতার হাত-পায়ের রগ কর্তন

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, শেরপুরের শ্রীবরদী, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও ঝিনাইদহের মহেশপুরে পৃথক ঘটনায় চার আওয়ামী লীগ নেতার রগ কেটে দিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
বরিশাল ব্যুরো জানায়, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় গতকাল ভোট দেওয়ায় এক আওয়ামী লীগ নেতার হাত-পায়ের রগ কেটে দিয়েছে স্থানীয় বিএনপির সন্ত্রাসীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা মতিয়ার রহমানকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মতিয়ারের স্বজনরা জানান, গতকাল জাতীয় সংসদ নিবার্চনে ভোট দেওয়ায় তার দুই হাত ও দুই পায়ের রগ কর্তন করা হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. নাসির উদ্দিন, হাবিবুল ইসলাম ও কালামসহ ৫-৬ জন উপজেলার চালিতাবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র থেকে আসার পথে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মতিয়ারের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। পরে স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে।
শেরপুর প্রতিনিধি জানান, শ্রীবরদী উপজেলার পোড়াগড় ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি বিল্লাল হোসেনের দু'পায়ের রগ কেটে দিয়েছে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল সকালে পোড়াগড় এলাকায় জামায়াত-শিবিরের ১৫-২০ কর্মী হামলা চালিয়ে তার দু'পায়ের রগ কেটে দেয়।
কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ইউনিয়ন যুবলীগ নেতার হাত-পায়ের রগ কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত শনিবার রাত ৯টায় মোগরা নামক স্থানে সিরাজপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক খাজা নুর উদ্দিনকে গুলি করে একদল দুর্বৃত্ত। এতে নুর উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হন। পরে দুর্বৃত্তরা তার হাত-পায়ের রগ কর্তন করে। তাকে ফেনী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহের মহেশপুরে ভোট দিতে যাওয়ার সময় দুর্বৃত্তরা নাটিমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অলিয়ার রহমানেরকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে হাত ও পায়ের রগ কেটে দিয়েছে। রোববার সকাল ৮টার দিকে উপজেলার নোয়ানীপাড়া মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মহেশপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে যশোর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

পীরগাছায় সংঘর্ষে জামায়াত শিবিরের দুই নেতা নিহত

(অগি্নসংযোগে ৪০ কেন্দ্রে ভোট স্থগিত) পীরগাছায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জামায়াত-শিবিরের দুই নেতা নিহত ও ২৫ জন আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন_ পারুল ইউনিয়ন জামায়াতের ওয়ার্ড সভাপতি মেরাজুল ইসলাম ও দেউতি বাজার ছাত্রশিবিরের সভাপতি হাদিউজ্জামান।
শনিবার গভীর রাতে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, কেন্দ্রে ও গাড়িতে অগি্নসংযোগ, পুলিশ, আনসার এবং প্রিসাইডিং অফিসারের ওপর হামলার সময় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ৪০টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।
পীরগাছার দেউতি বাজার এলাকায় শনিবার সন্ধ্যা থেকেই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী জড়ো হয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় মিঠাপুকুর উপজেলা থেকে আসা জামায়াত-শিবির ক্যাডাররা। এরপর রাতে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা এবং দেশি অস্ত্র নিয়ে দেউতি উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ঢুকে পড়ে। এরপর তারা ভাংচুর ও অগি্নসংযোগ এবং ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে তারা পিছু হটে যায়। পরে তারা ফের সংগঠিত হয়ে রাত ২টার দিকে ৪০-৫০টি ককটেল বিস্টেম্ফারণ ঘটিয়ে আবারও ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করে। প্রবেশ করেই তারা কেন্দ্রে থাকা পুলিশসহ সবাইকে মারধর শুরু করে। এ সময় পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান ও কয়েকটি ভটভটিতে আগুন দেয় তারা। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়ে।
এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে পীরগাছা উপজেলার দেউতি গুঞ্জরখাঁ এলাকার মৃত আজিমুদ্দিনের ছেলে মেরাজুল ইসলাম ও বিরাহিমপুর এলাকার ওজায়ের মিয়ার ছেলে হাদিউজ্জামান মারা যান। আহত হন প্রিসাইডিং অফিসার মনোয়ার হোসেন, এসআই জুলফিকার আলী, এএসআই বিধান চন্দ্র, কনস্টেবল মনিরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, এনামুল হক এবং জামায়াত-শিবিরকর্মী ইছাহাক আলী, রোকন, সামু, কবির, লেবু, মোস্তাক, কবিরসহ ২৫ জন।
দেউতি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের আহত প্রিসাইডিং অফিসার মনোয়ার হোসেন জানান, যত লোক এসে আমাদের ওপর হামলা করেছে তাতে আমাদের বেঁচে থাকার কথা নয়। পুলিশ সদস্যরা গুলি চালানোর পর তারা একটু শান্ত হয়।
নিহত মেরাজুলের স্ত্রী মমতাজ বেগম জানান, লোকমুখে শুনতে পান তার স্বামী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। তবে সকাল ১০টায় ওই বাড়িতে গিয়ে কোনো লাশ দেখা যায়নি। পরে বিকেলে লাশ দাফন করা হয়েছে। পীরগাছা থানার ওসি মকবুল হোসেন জানান, জামায়াত-শিবির ও বিএনপি ক্যাডারদের হামলায় দেউতিতে পুলিশের ৫ সদস্য আহত হন।
এদিকে শনিবার সন্ধ্যা থেকে রাতভর পীরগাছা উপজেলার ৯০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৮০টিতে হামলা চালায় জামায়াত-শিবির ও বিএনপি। তারা ব্যালট পেপার এবং ব্যালট বাক্সে অগি্নসংযোগ করে। এ কারণে পীরগাছায় ৪০টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।
পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলিয়া ফেরদৌসী জানান, নিরাপত্তা ও ঘন কুয়াশার কারণে বেশির ভাগ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করতে কিছুটা দেরি হয়েছে।
রংপুর-৪ পীরগাছা-কাউনিয়া আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগের টিপু মুনশি ও জাপার করিম উদ্দিন ভরসা। তবে করিম উদ্দিন মাঠে নেই।

প্রতিষ্ঠান পোড়ে, পোড়ে না বিবেক!

শিক্ষাঙ্গনে আগুন
নির্বাচন ঠেকানো ও যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধের নামে কোরআন শরিফ পোড়ানো হলো, শহীদ মিনার ভাঙা হলো, মন্দির ভাঙা হলো, জাতীয় পতাকা পোড়ানো হলো আর প্রতিনিয়ত মানুষ মারা হচ্ছে অস্ত্রে, আগুনে। বাকি ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া। রাজনীতির দগদগে আগুনে পুড়ছে সময়, শ্রম, অর্থ, পুড়ছে জীবন্ত মানুষ। আর এবার পোড়ানো হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগুনে পুড়েছে, তার সংখ্যা প্রায় ২০০ জানা গেলেও তা আরও বেশি বলেই মনে করা হচ্ছে। শিক্ষা ধ্বংস হোক—এটাই চায় একশ্রেণীর মানুষ। যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দিয়েছে, তাদের দুর্বৃত্ত বললে হালকা করে বলা হয়। আমরা সাধারণ মানুষ জোট-মহাজোট বুঝি না। আমরা দেশ বুঝি, দেশের মানুষ বুঝি। ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়া বুঝি না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস বুঝি। হায় গণতন্ত্র। গণতন্ত্র মানে কি নিষ্ঠুরতা?
পাথরহূদয় রাজনীতিক? টিভি খুলতে ভয় হয়, পেপার খুলতে ভয় হয়। কোনো বীভৎস খবর যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি’, যা আমাদের জাতীয় সংগীত। দেশমাতা আজ ডুকরে কাঁদছে, পুড়ে অঙ্গার আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ রাষ্ট্রের অভিভাবকেরা নির্বিকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়াকে আমরা আক্ষরিক ও প্রতীকী, দুই অর্থেই বিবেচনা করতে পারি। আক্ষরিক অর্থে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো পুড়েছে, সেগুলোর ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনায় এক রকম। আর যদি প্রতীকী অর্থে বিবেচনা করা যায়, তাহলে অন্য রকম। শিক্ষার প্রতি অবরোধকারীদের ক্ষোভ লক্ষণীয়। তারা পরীক্ষার দিনগুলোতে টানা অবরোধ দিয়ে পরীক্ষা ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে। তা সত্ত্বেও সরকার মাধ্যমিক পর্যায়ের সব পরীক্ষা শেষে যথাসময়ে ফল প্রকাশ করে স্কুলগুলোতে বই পৌঁছে দিয়েছে। হরতাল-অবরোধ সত্ত্বেও শিক্ষাবর্ষের প্রথম কার্যদিবসেই বই তুলে দেওয়া হলো শিক্ষার্থীদের কাছে। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার অর্থ শুধু ভোট বন্ধ করা নয়। একটি ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার কারণে যদি সেখানে মেরামত করে ভোট নেওয়া যায়, তাহলে ভোট হবে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ওই কেন্দ্রে ভোট স্থগিত থাকবে। এতে করে ভোট বন্ধ হলো না, কিন্তু ক্ষতি হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের।
এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার কারণে যে ক্ষতি হলো, তার প্রভাব পড়বে শিক্ষার ওপর। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে সংখ্যক মানুষ ভোট দিয়েছেন, তার চেয়ে হয়তো কিছু বেশি মানুষ ভোট দিতে আসতেন। আতঙ্ক সৃষ্টির কারণে কিছু ভোটার কেন্দ্রে আসেননি। কিন্তু এতে করে নির্বাচন তো বন্ধ হলো না। জনগণ হরতাল-অবরোধ মানে না, মানতে বাধ্য করা হয়। যাঁরা ভোট দিতে চান, তাঁদের না দেওয়ার জন্য বাধ্য করতে আতঙ্ক সৃষ্টির নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া কি একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করতে পারবেন—তাঁর প্রিয় বিদ্যাপীঠ দিনাজপুর মিশন স্কুল কিংবা দিনাজপুর গার্লস স্কুল পুড়ে যাচ্ছে, শেখ হাসিনা কি কল্পনা করতে পারবেন, তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় পুড়ে যাচ্ছে বৈরী রাজনীতিরই কারণে। রাজনীতিকদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়াশোনা করে, তাদের জন্য না হয় দেশে বিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ, গরিব মানুষ, গ্রামের মানুষের ছেলেমেয়েরা কোথায় যাবে? নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যতই বিবাদ থাকুক, নির্বাচন ঠেকাতে বিরোধী দল যতই হরতাল-অবরোধ ডাকুক, তাই বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন, শিক্ষার্থীদের বই ও আসবাবপত্র পুড়িয়ে দেওয়া কী ধরনের রাজনীতি? এর মাধ্যমে বিরোধী দল কী ফায়দা তুলে নিতে চায়? যদি প্রশ্ন তুলি, যে নির্বাচনে জনগণ ভোট দেয়নি সেই নির্বাচন প্রতিহত করা কিংবা প্রতিরোধ করার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়ার কী প্রয়োজন? বিরোধী দল নির্বাচন বন্ধ করতে না পেরে সব আক্রোশ ঝেড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর। এটি কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। তারা তো নির্বাচন বন্ধ করতে পারল না। তাহলে নির্বাচন বন্ধ করার চেষ্টায় যে দীর্ঘ অবরোধ দীর্ঘ প্রাণহানি হলো, আমাদের শিক্ষা-অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হলো, 
এই দায় কে নেবে? ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ বলেছেন, দশম সংসদ নির্বাচনের পর বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে। তাঁদের কাছে আমাদের প্রশ্ন, যদি শুধুই সংবিধান রক্ষার নামে একটি নির্বাচন হয়, তাহলে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে এতগুলো মানুষের প্রাণ গেল, এত সম্পদ নষ্ট হলো, তার দায় তাঁরাও এড়াতে পারেন না। তবে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক সরকার বা বিরোধী দল নয়। এগুলোর মালিক জনগণ। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষায় তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। যারা আমাদের বিদ্যালয় পুড়িয়ে দেয়, তাদের আমরা সমর্থন দিতে পারি না। আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, জোটকে না বলার অর্থ মহাজোটকে হ্যাঁ বলা নয়। মহাজোটকে না বলার অর্থ জোটকে হ্যাঁ বলা নয়। সাধারণ মানুষের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে, যারাই শিক্ষাশত্রুতে পরিণত হবে, তাদেরই ‘না’ বলা। আমরা যদি শিক্ষাশত্রুদের চিহ্নিত করতে না পারি, তাহলে দেশে নাশকতার সংখ্যা বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। বাড়তে থাকবে দগ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ড নির্মাণকেন্দ্র ধ্বংসের চেষ্টা শুরু হলো। আগের দিনের নতুন বইয়ের গন্ধ নিতে নিতে বাড়ি ফিরেছে শিক্ষার্থীরা। পরের দিনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগুন। প্রতিষ্ঠান পুড়লেও রাজনীতিবিদদের বিবেক পোড়ে না। যে রাজনীতিবিদদের বিবেক পোড়ে না, তাঁদের থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

হায়রে নির্বাচন! হায়রে দেশ!

৫ জানুয়ারির ভোটের আগের দিন রাস্তায় নেমেছি। রাস্তায় মানুষ নেই বেশি, যানবাহন আরও নেই। ফুলার রোড থেকে ধানমন্ডি পর্যন্ত কোনো চিহ্নমাত্র নেই নির্বাচনেরও! কোনো ভোট, কোনো সাড়াশব্দ, কোনো পোস্টার-ব্যানার ছাড়াই এই দুই এলাকার সাংসদেরা ইতিমধ্যে নির্বাচিত হয়ে গেছেন! ভোটের আগে উৎসব নামে এই এলাকায়, সারা শহরে। এবার নিস্পৃহতা, বিতৃষ্ণা আর আশঙ্কার বিষাদ গ্রাস করেছে শীত, কুয়াশা আর আবছা আলোর ঢাকাকে। এই শহরে আর এই দেশে এক অদ্ভুত নির্বাচন হয়েছে। এমন নির্বাচন নিয়ে কথা বলার রুচি হয় না। তবু চোখের সামনে গণতন্ত্রের এই শবযাত্রা পুরোপুরি এড়িয়ে যাই কীভাবে! আমার একসময়ের এক ছাত্রী বর্তমানে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে কর্মরত। তার কম্পিউটারের ডেস্কটপে নেত্রী শেখ হাসিনা আর তাঁর সুযোগ্য পুত্রের ব্যাডমিন্টন খেলারত ছবি।
সে একনিষ্ঠ আওয়ামী লীগভক্ত। তার এলাকায় ভোট হবে। ভোটে অংশ নেবে আওয়ামী লীগ, তার প্রতিদ্বন্দ্বীও আওয়ামী লীগ। সে যাবে ভোট দিতে? খুবই লজ্জা পায় এ প্রশ্ন শুনে। বলে, ‘না স্যার, ভোট দেব না এবার, এটা কোন ভোট!’ এটি আসলেই কোনো ভোট নয়, কোনো নির্বাচন নয়। এই নির্বাচনে একটিমাত্র ভোট পড়ার আগেই নির্বাচিত হয়ে গেছে পরবর্তী সরকার! এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের। যাঁদের আছে, তাঁদেরও সুযোগ নেই আওয়ামী লীগ বা তার লেজুড়বৃত্তিকারী বাদে অন্য কোনো প্রার্থীকে পছন্দ করার। এই নির্বাচনে ভোট দেননি প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা স্পিকার। কারণ, তাঁদের এলাকায় ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়ে গেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এই নির্বাচনে ভোট দেননি প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী খালেদা জিয়া ও দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দলের নেতা এরশাদ। কারণ, তাঁরা গৃহ বা হাসপাতালবন্দী। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই নির্বাচনে ভোট দেননি দেশের আরও অসংখ্য মানুষ। কারণ, তাঁরা বিবেকের কাছে বন্দী। সংসদ নির্বাচনের নামে পৃথিবীর ইতিহাসে অভূতপূর্ব এই নির্বাচনী তামাশা তবু নীরবে সহ্য করতে হয়েছে মানুষকে। এই নির্বাচনেরও অবশ্য সমর্থক আছে! ভোটের দিন সাড়ে ১২টার দিকে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল খুলে দেখি, সেখানে প্রবল উৎসাহে নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন একজন নারী পর্যবেক্ষক। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ বাদ দিয়েছে ভারত আর ভুটান বাদে পৃথিবীর বাকি সব দেশ। পর্যবেক্ষণে নেই দেশের সিংহভাগ পর্যবেক্ষকও। আছে যে গুটি কয়েক সংগঠন, তিনি তার একটির প্রধান। তিনি আমাদের জানালেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে লোকে ভোট দিতে না গেলেও বড় শহরগুলোতে লোকে ভোট দিয়েছে! তাঁর উপস্থিতিতে সেই টিভি চ্যানেলের একজন প্রতিবেদক মিরপুর বাঙলা কলেজ থেকে লাইভ প্রতিবেদনে জানালেন সেই ভোটের বিবরণ। এই কেন্দ্রে ভোটার আড়াই হাজারের বেশি। তখন পর্যন্ত ভোট দিয়েছেন ৩০৭ জন! হ্যাঁ, ভোট দিচ্ছে বটে কিছু মানুষ! এই নির্বাচনের সমর্থকেরা বলেছেন, জামায়াত আসেনি বলে বিএনপি আসেনি নির্বাচনে। এটি অসত্য, কারণ বিএনপি একবারও দাবি তোলেনি জামায়াতকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার।
এই নির্বাচনের সমর্থকেরা বলেছেন, জামায়াতকে বাদ দিলে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করা হবে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে। এটি বিভ্রান্তিকর, কারণ নির্বাচনের জন্য ইতিমধ্যে আদালতের রায়ে অযোগ্য ঘোষিত হয়েছে জামায়াত। বাকি কাজ অর্থাৎ জামায়াতকে ১৮ দলের জোট থেকে বের করে দেওয়া সম্ভব স্রেফ দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই ক্ষমতা আওয়ামী লীগ সরকারের আছে, চাইলেই একমুহূর্তে তারা করতে পারে এটি। বিচিত্র এই দেশে সরকারের স্তাবকেরা সরকারের কাছে এই দাবি না তুলে বিএনপিকে বলছে নিজে নিজে কাট্টি নিতে জামায়াতের সঙ্গে! এই নির্বাচনের সমর্থকেরা বলেছেন, নির্বাচনে বিএনপি জিতে এলে বিঘ্নিত হবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এই রব গত কয়েক বছরে হাজারোবার তুলেও তাদের ভয় তবু নির্বাচনে জিতবে বিএনপিই! যদি তা-ই হতো, সেটাই হচ্ছে গণতন্ত্র! গণতন্ত্র মানলে এই ভয় আর আশঙ্কা মেনেই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এককাট্টা হওয়া উচিত ছিল তাদের। বিএনপি জিতে এসে বিচার বিঘ্নিত করলে বিএনপি হটাও আন্দোলনে মানুষকে শামিল করার চেষ্টা করা উচিত ছিল তাদের। এই নির্বাচনের সমর্থকেরা তা করেননি, জনগণের মতামত আর বিচার বিবেচনাবোধের ওপর আস্থা নেই তাঁদের। নির্বাচনহীন নির্বাচনের পরও তাই আমরা তাঁদের দেখব এই নির্বাচনের জয়গান গাইতে। দেশের সিংহভাগ মানুষের ভোটাধিকার হত্যা করার এক আততায়ী সরকারকে সমর্থন করতে! ৫ জানুয়ারি তবু বাংলাদেশের ইতিহাসে নিখাদ কলঙ্কজনক এক দিন হয়ে রইবে। এই নির্বাচনের পর যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তার বৈধতা প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং জনসমর্থন অতিসামান্য। সেই সরকার হবে আন্তর্জাতিকভাবেও একঘরে। সেই সরকারের অধীনে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা পিছিয়ে যাবে বহুদূর। আমার মনে হয় না মুক্তিযুদ্ধ আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বারবার জয়ী বাঙালি জাতির প্রাপ্য হতে পারে এমন একটি সরকার।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

দুই বেয়াইয়ের অবাক কাণ্ড

দুই বেয়াইয়ের কাহানি শোনাব।
তবে তার আগে বলি সার্বিক নির্বাচনী আঁচ গতকাল কীভাবে গায়ে লাগল। লাল সিরামিকের ভবনটিতে তখন সন্ধ্যা। আধা ভুতুড়ে, আধা নিস্তরঙ্গ পরিবেশ। তবে হ্যাঁ, প্রার্থী ও ভোটারের আকাল পড়লেও মিডিয়া কর্মীদের ভোট কাভারের প্রস্তুতি ছিল অভূতপূর্ব। বেসরকারি ফলাফল টানানোর কাঠ বোর্ডে শিট লাগল সাড়ে ছয়টায়। দেখি প্রথমেই জেনারেল এরশাদের নাম। সংসদীয় গণতন্ত্র, তাই তাঁকে বলতে পারি ছায়া প্রধানমন্ত্রী। ফলাফলের ফিতা কাটার জন্য একদম উপযুক্ত ব্যক্তি। দেখি রংপুর-৩ আসনের ১০ কেন্দ্রের ফল। এক হাজার ৭৯৯ ভোট পেয়েছেন। নির্বাচন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে এই প্রাণঘাতী প্রাণহীন নির্বাচনে ভোটার অনুপস্থিতির ভয়ানক দুরবস্থার কারণ খুঁজলাম। ১. প্রতিদ্বন্দ্বিহীনতাই মূল। সহিংসতাও এতটা হতো না। ১৯৯৬-এর চেয়েও খারাপ হতো না। যদি একতরফা ভোট ৩০০ আসনেই হতো। ২. বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের কাছে ধরনা দেওয়া হয়নি। তাদের ভোটকেন্দ্রে আনতে টাকাপয়সাও কম খরচ হয়েছে। ৩. আওয়ামী লীগের কর্মীরা ভোটার স্লিপ পর্যন্ত দেননি। ভোটাররা এ জন্য দারুণ বিপাকে পড়েছেন।
৪. ১৫৩টি আসনে নির্বাচন না হওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ৫. স্থানীয় দাবিদাওয়া পূরণ না হওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। যেখানেই দাবিদাওয়া কম পূরণ হয়েছে সেখানে ভোটাররা তুলনামূলক কম গেছেন। একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা আমাকে বলেন, জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা সরকারবিরোধী ছিলেন। বিশেষ করে, বিচার বিভাগ পৃথক্করণের কারণে। এ ছাড়া অতীতের তুলনায় বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতাও বেড়েছে। বিএনপি এর সুবিধা পেত। কমিশন সচিবালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উপেক্ষিত হয়েছে। এর আগে কখনো রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেননি। লোকবলের ঘাটতি ছিল। এবার তা ছিল না। তাই কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন ১৪৭ আসনের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কমিশনের ক্যাডার কর্মকর্তারাই দায়িত্ব পাবেন। ক্ষমতাসীনেরা কথায় কথায় যে ছয় হাজার নির্বাচনের কৃতিত্ব দাবি করে থাকেন, তা তাঁদেরই অর্জন। অথচ তাঁদের বিশ্বাস করা হলো না। ডিসিরাই নির্ভরযোগ্য থাকলেন। ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুজন বিভাগীয় কমিশনারসহ ৫৯ জন ডিসি রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। সচিবালয় থেকে বলা হয়েছিল, ডিসিরা সরকারের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ। তাই নিজস্ব কর্মকর্তাদের দিয়ে দায়িত্ব পালন করালে বেশি সুফল মিলবে। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়া হয়নি। এমনকি ১৪৭ আসনের ২৮৭ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার প্রায় আড়াই শ ছিলেন ইউএনও। বাকিরা ইসি কর্মকর্তা। শুনলাম দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৪৯টি কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তথ্য নিলেন। ওই নির্বাচনের বিস্তারিত তথ্য কমিশন সচিবালয়ে নেই। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তখন ৪৯ জন নির্বাচিত হয়েছিলেন। সহিংসতা ও অন্যান্য কারণে ৩০০ থেকে ৪০০ ভোটকেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত হয়েছিল। ইতিহাসে এবারই প্রথম ইসি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়ে নির্বাচন সামগ্রী কেন্দ্রগুলোতে পাঠিয়েছে। ’৯৬-তেও যথারীতি নির্বাচন কর্মকর্তারা নিজ দায়িত্বে বুঝে নিয়েছেন।
বিকেল চারটার পরে প্রশ্নের জবাবে একজন কমিশনার জানালেন, সেনারা দিনভর ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হয়েই থেকেছেন। তাঁদের ডাকতে হয়নি। গতকালের নির্বাচনে ১৪০টি নির্বাচন তদন্ত কমিটি সক্রিয় ছিল। যুগ্ম জেলা জজ পর্যায়ের বিচারক ও একজন সহকারী জজের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির ম্যান্ডেট ৩ থেকে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা। কিন্তু আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে তেমন কারও বিরুদ্ধে তাঁদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়নি। তার মানে ইসি ও ‘আইনের’ দৃষ্টিতে তেমন কোনো নির্বাচনী অপরাধ ঘটেনি। অথচ সংক্ষিপ্ত বিচার করে অনধিক ১০ বছরের জেল দেওয়ার ক্ষমতা ওই কমিটির ছিল। তার মানে দাঁড়াল এই রাষ্ট্রে শুধু ইসি অসহায় তা-ই নয়; বিচার বিভাগও অসহায়। নইলে গত কয়েক দিনে যত নাশকতা ঘটল, ব্যালট ছিনতাই ঘটল, তা শত শত আদালত সদা সক্রিয় ও সতর্ক থাকলেও কেন কাউকে শাস্তি দেওয়া গেল না? সেনা না থাকলে সহিংসতা আরও তীব্র হতো। এবার দুই বেয়াইয়ের প্রসঙ্গ। যশোর-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান সাংসদ শেখ আফিল উদ্দিন। তাঁর বেয়াই উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে যশোর-২ আসনে আওয়ামী লীগের টিকিট পেয়েছেন। নাম অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম। আফিল উদ্দিন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই তিনি প্রকাশ্যে যশোর-২ আসনের তাঁর বেয়াইয়ের পক্ষে প্রচারণায় নামেন। ‘প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের ১০০ জন কর্মী ভোটকেন্দ্র দখল করে বেলা ১১-৫৯ মিনিটের মধ্যে নৌকা প্রতীকের জয় সুনিশ্চিতকরণ’-এর ফর্মুলা দেন। এটা ওই অঞ্চলে আলোড়ন তোলে। বাজারে তাঁর বক্তৃতার সিডি বিক্রি হয়। ২ জানুয়ারি প্রথম আলোতে ‘আ.লীগ সাংসদের নির্দেশ ১০০ কর্মী কেন্দ্রে থাকবে, পালাক্রমে ভোট দেবে’ মর্মে খবর ছাপা হয়। কর্মীদের সাহস দিয়ে আফিল উদ্দিন বলেছিলেন, ‘আপনারা যদি কোনো প্রশাসনিক সমস্যায় পড়েন আমাকে বলবেন, আমি জবাব দেব। তার (বেয়াই) জন্য যা যা করণীয় ভোটের মধ্যে তা কিন্তু করা লাগবে। কী করা লাগবে, আমি তা মাইকে বলতে পারব না। একা একা জিজ্ঞেস করবেন, বলে দিব।’ ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এখানে কলকে না পাওয়ার কথা। যাঁর বিরুদ্ধে এই প্রস্তুতি, তিনি আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। নিজেকে বিদ্রোহী নয়, শেখ হাসিনার স্নেহধন্য দাবি করেন। তাঁকে নাকচ করা যাবে না। সপ্তম সংসদে তিনি জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে সরকারদলীয় হুইপ এবং সংসদে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি ছিলেন।
তিনি আমাকে গত রাতে টেলিফোনে বলেন, ঝিকরগাছায় ৯৪টি কেন্দ্রের মধ্যে ১২টি এবং চৌগাছায় ৮০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৬টি কেন্দ্রে ব্যালট ছিনতাই করে সিল মারার ঘটনা ঘটেছে। যশোরের নির্বাচনী তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান মো. জামাল হোসেন তদন্ত করে এর সত্যতা প্রমাণ পান। গতকাল তিনি ইসিকে দেওয়া চিঠিতে আইনি জটিলতার প্রসঙ্গ তোলেন। অথচ আজই তাঁর শেষ কর্মদিবস। তিনি ইসিকে জানিয়েছেন, সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত দণ্ড প্রদানের বিধান আছে। এখন তিনি কী করবেন। অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৮৯-ক ধারা নির্দিষ্ট করে বলেছে, এই অপরাধের বিচার করতে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে না। অথচ তিনি এই বিষয়ে নির্দেশনা চেয়েছেন। এই অপরাধের বিচার হলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৮১ ধারা অনুযায়ী দুই বেয়াইয়ের তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। এটা হোক। তাহলে আমরা আইনের শাসন দেখব। এটা হতে পারে না যে, আফিল উদ্দিন এবং তদন্ত কমিটি উভয়ে সঠিক। ইসি মনে করে এই অপরাধ আচরণবিধির অধীনে পড়ে না। সরকারি নথিতে লেখা হয়েছে, ‘নির্বাচনের দিন কেন্দ্র দখলের ষড়যন্ত্রকারী ৮৬ যশোর-১ আসনের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জনাব আলহাজ শেখ আফিল উদ্দিন এবং অ্যাডভোকেট জনাব মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী তদন্ত কমিটি তাদেরকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৮৯-এ অনুচ্ছেদ মোতাবেক প্রদত্ত প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা ব্যবহার করে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১২০বি (১) ধারাসহ পঠিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের অনুচ্ছেদ ৮১ (১) (এফ) এ বর্ণিত অপরাধ ফৌজদারী কার্যবিধি এর ১৯০ ধারায় আমলে নিয়ে অভিযোগ গঠন করে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার সম্পাদন করতে পারেন।’ আফিল উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। মুঠোফোনে বার্তারও উত্তর মেলেনি। অবশ্য তাঁর সম্পাদিত যশোরের দৈনিক স্পন্দন-এর সহকারী সম্পাদক গতকাল প্রথম আলোর যশোর প্রতিনিধির কাছে একটি বিবৃতি পাঠিয়েছেন। স্বাক্ষরবিহীন ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, আফিল উদ্দিনের কণ্ঠ নকল করে ভিডিও করা হয়েছে। আমরা এই নির্বাচনী অপরাধের বিচার চাই।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

যা হলো তা মুখ রক্ষার নির্বাচন

অনেক বিরোধিতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেল। নির্বাচনের পরদিন এটাই বলার আছে যে অপারেশন সাকসেসফুল, বাট পেশেন্ট ইজ ডেড। নির্বাচনের নামে গণতন্ত্রের দেহে যে অস্ত্রোপচার হলো, তা আইনত ঠিক থাকলেও গণতন্ত্র নামক রোগীর জীবন আরও বিপন্নই হলো। বিএনপির বর্জনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় খালি মাঠে গোল দেওয়ার সুবাদে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীরা প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি আসনে বিজয়ী হয়েছে। ১৫৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ছিল না। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নামে এ নির্বাচন করা হলো। এর মাধ্যমে আসলেই কি সংবিধান সমুন্নত থাকবে? এই নির্বাচন কি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্ত করবে, নাকি আরও সংকটে ফেলে দেবে? সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে, অবশ্যই আমাদের সংসদ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ৯০ দিন সময়সীমার মধ্যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এমন নির্বাচনের উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত করা। সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র’। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনের সূচনা হয়। তবে যেনতেনভাবে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে গণতন্ত্র কায়েম হয় না। এটি হতে হবে মানসম্মত ও সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য। আর মানসম্পন্ন নির্বাচন মানেই, সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের ভাষায় ‘প্রত্যক্ষ’, অবাধ ও সুষ্ঠু নিরপেক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক তথা ‘জেনুইন’ বা সঠিক নির্বাচন। অর্থাৎ আমাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার হলো সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা।
আমরা নিজেরাও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইন অনুযায়ী সত্যিকার নির্বাচন করতে বাধ্য। উদাহরণস্বরূপ, ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের নামের যে চুক্তি বাংলাদেশ ২০০০ সালে স্বাক্ষর করেছিল, তাতে প্রত্যেক নাগরিকের ‘ভোট প্রদানের ও নির্ধারিত সময়ের পর সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার’ অধিকার প্রদানে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ (ধারা ২৫)। একইভাবে সর্বজনীন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের ২১ ধারা অনুযায়ীও আমরা সত্যিকার নির্বাচন করতে বাধ্য। আর ভোটারদের সম্পৃক্ততা ও প্রধান দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালিত হলেই সেই নির্বাচনকে সঠিক বলা যাবে। এবং সেই নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করবে। আমাদের সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সাংসদদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আর এ নির্বাচন হতে হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তথা মানসম্মত। আর মানসম্মত নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে ‘রিজার্ভয়্যার অব পাওয়ার’ অর্থাৎ অগাধ ক্ষমতা দিয়েছে। (সূত্র: আফজাল হোসেন বনাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার, ডিএলআর ৪৫)। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ১১৯ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমনকি আইনি বিধানের সঙ্গে সংযোজন করার—যে ক্ষমতা সাধারণত নির্বাচিত সংসদের জন্য নির্ধারিত—‘ইনহেরেন্ট’ বা অন্তর্নিহিত ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে (আলতাফ হোসেন বনাম আবুল কাশেম, ৪৫ ডিএলআর)। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠানই নয়, বরং সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। দুর্ভাগ্যবশত, ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৫২ শতাংশ ভোটার নির্বাচনের দিনের আগেই তাঁদের ভোট প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ১৫৩ প্রার্থী জনগণের ভোট ছাড়াই ‘জনপ্রতিনিধি’ নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ১৪৭টি আসনে মাত্র ৩৯০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন,
যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এমনকি ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও প্রার্থী সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এবারকার নির্বাচনে আমাদের ৪১টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে মাত্র ১২টি দল অংশ নিয়েছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে আমাদের সাংবিধানিক মূল চেতনা তো কেবল নির্বাচন করা নয়, একটা মানসম্মত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং এই নির্বাচনে যা মোটেই অর্জিত হয়েছে বলে বলা যায় না। তাই, আমাদের নির্বাচন কমিশন এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এই নির্বাচনকে সংবিধান রক্ষার নির্বাচন না বলে, মুখরক্ষার নির্বাচন বলাই শ্রেয়। আমাদের আশঙ্কা, যে সহিংসতা শুরু হয়েছে বা অব্যাহত আছে, তা ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। সহিংসতা বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ হলো, জামায়াত-শিবিরের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ফলে জামায়াত-শিবির সংক্ষুব্ধ। তারা যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে চায় এবং যারা ইতিমধ্যে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে শাস্তিপ্রাপ্ত হয়েছে, তাদের মুক্ত করতে চায়। তাই তারা সংগত কারণেই সহিংসতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে। তবে আমরা মনে করি যে যেহেতু যুদ্ধাপরাধের বিচার একটি জাতীয় অগ্রাধিকার, বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হলে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়, তারা সুবিধা করতে পারবে না। এটা সুস্পষ্ট যে অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দশম সংসদের অবস্থান হবে অত্যন্ত দুর্বল। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর সামনে দুটি পথ খোলা থাকবে। একটি হলো, বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া এবং সমঝোতার ভিত্তিতে অনতিবিলম্বে একাদশ সংসদের জন্য নির্বাচন করা। অন্য বিকল্প হলো, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো; যার জন্য প্রয়োজন হবে বল প্রয়োগের।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা হবে সুষ্ঠু ও সুষম: কেরি

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি
মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা ‘সুষ্ঠু ও সুষম’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা পাল্টাপাল্টি দাবি করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য পক্ষের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। এর জবাবে কেরি গতকাল রোববার ওই মন্তব্য করেন। কেরি গত বৃহস্পতিবার নতুন দফা সফরে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে পৌঁছান।
এর পর তিনি ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। এতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। গতকাল কেরি প্রথমে জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে বাদশাহকে অবগত করেন। এক বছর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এ নিয়ে কেরি দশমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্য সফরে গেলেন। তিনি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে উভয় দেশের কর্মকর্তারাই দাবি করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব অন্য পক্ষের জন্য অনুকূল হয়েছে। এর জবাবে কেরি গতকাল বলেন, ‘আমি সব পক্ষকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং আমি একটি সুষ্ঠু ও সুষম ধারণা নিয়ে এগিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা এই অঞ্চলের সব মানুষের নিরাপত্তা বাড়াবে।’
এর আগে কেরি তাঁর শান্তি-প্রক্রিয়ার কৌশলে সমর্থন আদায়ে জর্ডান ও সৌদি আরবের যাওয়ার জন্য বিমানে ওঠার সময় পশ্চিম তীরের রামাল্লায় সাংবাদিকদের বলেন, উভয় পক্ষই ‘কাঠামোগত সমঝোতা’র দিকে এগোচ্ছে। এই কাঠামো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তির আলোচনায় দিকনির্দেশনা দেবে। ‘জর্ডান উপত্যকা নিয়ে ছাড় দেবে না ইসরায়েল’: ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দাবিয়ষক মন্ত্রী ইউভাল স্টেইনিৎজ বলেছেন, ফিলিস্তিনি সীমান্তসংলগ্ন জর্ডান উপত্যকায় নিরাপত্তা-ছাড়সংক্রান্ত কোনো মার্কিন প্রস্তাব তাঁরা মানবেন না। সেখানে নিরাপত্তায় ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি যৌথ বাহিনী মোতায়েনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দিয়েছে—এই মর্মে খবরের পর এ মন্তব্য করলেন তিনি। এএফপি ও রয়টার্স।

মিশেলকে ব্যতিক্রমী উপহার ওবামার

বারাক ওবামা তাঁর স্ত্রী মিশেল ওবামা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর স্ত্রী মিশেল ওবামাকে আসন্ন জন্মদিন উপলক্ষে ব্যতিক্রমধর্মী এক উপহার দিয়েছেন। এ উপহার হচ্ছে একান্ত নিজস্ব কিছু সময়। বড়দিনের ছুটি কাটাতে দুই সপ্তাহের জন্য সপরিবারে হাওয়াই অঙ্গরাজ্যে গিয়েছিলেন বারাক ওবামা। ছুটি শেষ। দুই মেয়েকে নিয়ে গত শনিবার রাতে হোয়াইট হাউসের পথে রওনা হন।
গতকাল রোববার সকালেই রাজধানীতে পৌঁছানোর কথা তাঁদের। ফার্স্ট লেডি মিশেলকে প্রেসিডেন্ট হাওয়াই দ্বীপে একা রেখে এসেছেন নিজের মতো করে সময় কাটাতে। মিশেলের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে এই বিশেষ উপহার দিয়েছেন ওবামা; যাতে বন্ধুদের সঙ্গে নিজের মতো করে সময় কাটাতে পারেন মিশেল। তাঁর এ সময়ে ভাগ বসাবে না কেউ। স্বামী ওবামা তো ননই, এমনকি দুই মেয়েও না। হোয়াইট হাউস কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। হাওয়াই দ্বীপে ছুটি কাটানোর সময় নির্ভার ওবামা গলফ খেলেন। স্ত্রী ও দুই মেয়ের সঙ্গে ঘরোয়াভাবে উদ্যাপন করেন বড়দিন। রয়টার্স।

মমতার পশ্চিমবঙ্গে আবার ‘দুঃস্বপ্ন’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতার এক ব্যবসায়ী একটি স্থাপনা নির্মাণকাজের অনুমতি চাইলে মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিএম) লোকজন তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করেছিল। তিনি ওই চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ঘটনাটি ছিল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগের। ২০১১ সালের ওই নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দল তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল বিজয় অর্জন করে।
এতে ওই রাজ্যে বামফ্রন্টের টানা ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের আস্থালাভে সমর্থ হয়েছিলেন ‘দিদি’। তাঁর জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ওই ব্যবসায়ী তখন সিপিএমের লোকজনকে বলেছিলেন, প্রয়োজনে তিনি নিজের ব্যবসা বন্ধ করে দেবেন, কিন্তু চাঁদা দেবেন না। ওই ব্যবসায়ীর প্রত্যাশামতোই নির্বাচনে হেরেছিলেন বামফ্রন্ট নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তবে মজার ব্যাপার হলো, কয়েক দিন পর সেই একই চাঁদাবাজের দল আবারও সেই নির্মাণ-ব্যবসায়ীর দরজায় কড়া নাড়ে। এবার তারা অবশ্য দল পাল্টে তৃণমূল কংগ্রেসের লোক হয়ে গেছে। মাধব নায়ার নামের একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী কলকাতায় কাজ করছেন আট বছর ধরে। তিনি ৫০ লাখ রুপি দামে সল্টলেক এলাকায় সম্প্রতি একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। নতুন বাড়িতে ওঠার তিন দিনের মাথায় একদল তরুণ নিজেদের তৃণমূলের লোক দাবি করে তাঁর ফ্ল্যাটে গিয়ে দলীয় তহবিলের জন্য ৫০ হাজার রুপি দাবি করে। মাধব জিজ্ঞেস করেন, কেন তাঁকে ওই অর্থ দিতে হবে? জবাবে তারা বাড়ির বাইরের রাস্তা দেখিয়ে বলেছিল, ‘ওই রাস্তাটি আপনাকে ব্যবহার করতে হবে, তাই না? তাই রাস্তার কর হিসেবেই আপনাকে চাঁদা দিতে হবে।’ পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান চিত্র কী? সেখানে মানুষের কান কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয়, চোখ উৎপাটন করা হয়, ধর্ষণের শিকার নারীরা যৌনকর্মী হিসেবে চিহ্নিত হয়, আর দলের প্রতি অনুগতদের স্বার্থ রক্ষায় সৎ পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা এখন অন্ধকার ও আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। ভিন্নমতাবলম্বীদের উপেক্ষা করেই তিনি ‘স্বৈরশাসন’ চালাচ্ছেন। চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ হচ্ছে, ব্যঙ্গচিত্র বন্ধ করে দিয়ে শিল্পীদের কারাবন্দী করা হচ্ছে।
কেউ ন্যায়বিচারের কথা বললেই তাঁকে ‘মাওবাদী’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীকে তুষ্ট করতে গান পর্যন্ত রচিত হচ্ছে। সুমন মুখোপাধ্যায়ের চলচ্চিত্র কাঙাল মালসাট আটকে দিয়েছে সেন্সর বোর্ড। কারণ, ছবিটিতে মমতার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু এখন মহাশ্বেতা দেবী ও কবীর সুমনের মতো ব্যক্তিরা মমতার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছেন। অথচ তাঁরাই একসময় সিপিএমকে উৎখাত করতে মমতার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। জনসাধারণের মধ্যেও এখন তৃণমূলবিরোধী মনোভাব ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। বিষয়টি সবখানেই নজরে পড়ছে। সরকারি নীতির পাশাপাশি তৃণমূলের লোকজনের অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করেছে মানুষ। মধ্যমগ্রামে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে খুন হওয়ার পর কলকাতার রাস্তায় নেমেছে জনতা। রাজ্যের নারী কমিশনের প্রধান সুনন্দা মুখোপাধ্যায় বলেছেন, বাংলায় এখন একটি ‘সামাজিক বিপ্লব’ প্রয়োজন। কমিশনের সাবেক সদস্য ভারতী মুৎসুদ্দি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ধর্ষণকারীরা জানে, তারা ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিলে পার পেয়ে যাবে। তৃণমূলে অনেক অপরাধী ঠাঁই নিয়েছে। এ অবস্থায় শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা নেই। তাই আতঙ্কের মধ্যে বসবাসই এখন জনগণের নিয়তি। তবে কি তিন দশকের কমিউনিস্ট শাসনের অবসান চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভুল করেছিল? আর সেই ভুলের পরিণামেই এখন তারা দুঃস্বপ্নের মধ্যে বসবাস করছে? টাইমস অব ইন্ডিয়া।

পুলিশ-মুরসিপন্থী সংঘর্ষ, নিহত ১৭

মিসরের নসর সিটিতে পুলিশ ও মুরসিপন্থীদের মধ্যে শুক্রবার
সংঘর্ষের একপর্যায়ে বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ
সময় যাত্রীরা দৌড়ে বেরিয়ে প্রাণ বাঁচান। এএফপি
মিসরে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে পুনর্বহাল করার দাবিতে গত শুক্রবার নতুন করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন তাঁর সমর্থকেরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ খবর নিশ্চিত করেছে। আগামী বুধবার মুরসির মামলার শুনানি সামনে রেখে তাঁর সমর্থক ইসলামপন্থীদের একটি জোট শুক্রবার নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দেয়।
তবে মুরসির সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডকে গত সপ্তাহে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে ঘোষণার পর পুলিশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল, তারা ব্রাদারহুডের কোনো বিক্ষোভ সহ্য করবে না। তাই শুক্রবার ইসলামপন্থীরা রাস্তায় নামার পরপরই পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে গুলি চালায়। মিসরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সংঘর্ষে রাজধানী কায়রোতে ১০ জন নিহত হন। এ ছাড়া ফাইউম শহরে তিনজন, আলেক্সান্দ্রিয়ায় দুজন এবং ইসমালিয়া ও মিনায়া শহরে একজন করে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ৫৭ জন। তবে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। অবশ্য হতাহত ব্যক্তিরা বিক্ষোভকারী, পথচারী, নাকি পুলিশ, তা নিশ্চিত করেনি মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১২২ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা কায়রোতে একটি পুলিশের গাড়িতে পেট্রলবোমা মেরে আগুন ধরিয়ে দেন বলে জানান একজন নিরাপত্তাকর্মী।
পরে স্থানীয় বাসিন্দারা আগুন নেভান বলে গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়। কায়রোর মাদি এলাকার একটি সামরিক হাসপাতালের কাছে পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি করেন বিক্ষোভকারীরা। পরে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। বিক্ষোভকারীরা ‘সামরিক শাসন নিপাত যাক’ বলে স্লোগান দেন। দেশটির সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির বিরুদ্ধেও স্লোগান দেন তাঁরা। এই সিসিই গত ৩ জুলাই মুরসিকে উৎখাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মুরসিকে উৎখাতের পর থেকে তাঁর সমর্থকেরা প্রায় প্রতিদিন বিক্ষোভ করে আসছেন। বিশেষ করে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর তাঁরা জড়ো হয়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ করছেন। তবে সরকার দমন-পীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ায় বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা কমে আসছে। মুরসি উৎখাত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সংঘর্ষে এক হাজারের বেশি ব্যক্তি নিহত হয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই ইসলামপন্থী। এ ছাড়া হাজার হাজার মুরসি-সমর্থককে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এএফপি ও আল-জাজিরা।

উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেই আটকা

অ্যান্টার্কটিকায় বরফে আটকে পড়া রুশ জাহাজ
অ্যান্টার্কটিকায় বরফে আটকে পড়া রুশ জাহাজ উদ্ধার করতে গিয়ে এবার আটকে গেছে চীনের জাহাজ। বরফ কেটে পথ তৈরি করতে গিয়েছিল ওই চীনা জাহাজ। গতকাল শনিবার অস্ট্রেলিয়া এ তথ্য জানিয়েছে। আটকে পড়া রুশ জাহাজ আকাদেমিক শোকালস্কির আরোহীদের গত বৃহস্পতিবার হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁদের একটি অস্ট্রেলীয় জাহাজে নেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়ার মেরিটাইম নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গতকাল এক বিবৃতিতে জানায়, রুশ জাহাজটিকে উদ্ধার করতে গিয়ে সকালে চীনের শু লং জাহাজ বরফে আটকে গেছে। তবে পরে নিজে নিজেই পথ তৈরি করতে সক্ষম হবে জাহাজটি। চীনা জাহাজের আরোহীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাৎক্ষণিক বিপদের কিছু নেই। তাঁদের কাছে কয়েক সপ্তাহের খাদ্য মজুত রয়েছে। আটকে পড়া রুশ জাহাজটিতে এখনো ২২ জন ক্রু রয়েছেন। এতে বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, আরোহীসহ অন্তত ৫২ জন ছিলেন। তাঁদের হেলিকপ্টারের সাহায্যে উদ্ধার করা হয়েছে। জাহাজটি উদ্ধারে কয়েক দফা চেষ্টা চালানো হলেও তা ব্যর্থ হয়। এএফপি।

ডুপ্লেক্স বাড়ি নিলেন না মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল

অরবিন্দ কেজরিওয়াল
সমালোচনার মুখে ভারতের দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল গতকাল শনিবার ঘোষণা দিয়েছেন, পাঁচটি শয়নকক্ষসহ দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট নিচ্ছেন না তিনি। এর পরিবর্তে তাঁর জন্য ছোট একটি বাড়ি বরাদ্দ দিতে বলবেন তিনি। কেজরিওয়াল গতকাল নিজ দল আম আদমি পার্টির (এএপি) একটি কৌশলগত বৈঠকে অংশ নেন। এ সময় বলেন, ‘আমার নতুন বাড়িতে ওঠা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। আমার জন্য ছোট একটি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বলব। সে পর্যন্ত আমার গাজিয়াবাদের বাড়িতে থেকেই দায়িত্ব পালন করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত শুক্রবার থেকে আমার বন্ধু ও সমর্থকেরা আমাকে ফোন করছেন এবং বার্তা পাঠাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, আমার পাঁচটি শয়ককক্ষের ফ্ল্যাটে ওঠা উচিত হবে না। তাই আমি এ ধরনের ফ্ল্যাট বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আমি আমার জন্য একটি ছোট বাড়ি খোঁজ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ এর আগে কেজরিওয়ালের জন্য নয়াদিল্লির ভগবান দাস রোডে দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর একটি কেজিরিওয়ালের দপ্তর হিসেবে ব্যবহারের কথা ছিল। অন্যটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাসের কথা ছিল। শুক্রবার কেজরিওয়ালই বিষয়টি পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে দুটি পৃথক বাড়ি দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি পাঁচটি শয়নকক্ষবিশিষ্ট। আপনারা ক্যামেরা নিয়ে বাড়ি দুটি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। এর একটিতে আমি পরিবার নিয়ে বাস করব। অন্যটি দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করব। সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি চারটি শয়নকক্ষের একটি অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস করছি। এটা পাঁচ কক্ষের। পার্থক্য এতটুকুই।’ তবে এ নিয়ে কেজরিওয়ালের বিরোধীরা সমালোচনা শুরু করে দেন। বিশেষ করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কড়া ভাষায় তাঁকে আক্রমণ করে। বিজেপির বিধায়কেরা শুক্রবার দিল্লির বিধানসভায় মন্তব্য করেন,
এএপি ব্যয় সংকোচনের নীতি চর্চা করবে বলে যে ঘোষণা দিয়েছিল, কেজরিওয়ালের দুটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট গ্রহণের সিদ্ধান্ত তার সঙ্গে ‘সম্পূর্ণভাবে সাংঘর্ষিক’। বাড়ি নিয়ে সমালোচনার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে কেজরিওয়াল বলেন, ‘এটা প্রকৃতই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নোংরা রাজনীতি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করতে এসেছি। আমাদেরও সন্দেহের মধ্যে থাকতে হবে। আমাদের ওপরও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।’ দুই সপ্তাহের মধ্যে লোকসভার প্রার্থী তালিকা: দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্যের পর আম আদমি পার্টির (এএপি) জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যরা গতকাল নয়াদিল্লিতে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে লোকসভা নির্বাচনে দলের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের আগে এএপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের জন্য এএপির প্রথম প্রার্থী তালিকা দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ করা হতে পারে। আরেক নেতা বলেন, তাঁর স্বপ্ন হচ্ছে কেজরিওয়ালকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা। এএপির জ্যেষ্ঠ নেতা যোগেন্দ্র যাদব সাংবাদিকের বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে অবশ্যই রাহুল গান্ধী বা নরেন্দ্র মোদির চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প থাকতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেজরিওয়াল এ পদে আসবে, তা বলার মতো অবস্থানে আমরা রয়েছি।’ টাইমস অব ইন্ডিয়া

স্কুল পোড়ানোর বিশ্বরেকর্ড এখন আমাদের! by শেখ রোকন

যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা স্টেটের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র নরম্যান ট্রান্সক্রিপ্টের সিনিয়র রিপোর্টার জয় হ্যাম্পটন প্রশ্নটি তখনই তুলেছিলেন, যখন বহুল প্রত্যাশিত বা অপ্রত্যাশিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরুর অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে ফেনীর দাগনভূঞার পাঁচটি স্কুলে আগুন দিয়ে বাংলাদেশে 'ওয়ার এগেইনস্ট এডুকেশন' শুরু হয়েছিল। ফেনী ও চট্টগ্রামের কয়েকটি স্কুলের আগুন-দগ্ধ ছবি দেখে ফেসবুকে রাজনীতি নিয়ে মনের ক্ষেদ থেকেই বলেছিলাম যে, মহাসড়ক-সড়কধারের গাছ হত্যার পর 'ওরা' এখন বিদ্যালয়ে আগুন দেওয়া শুরু করেছে। জয় ঠিক বুঝতে পারছিলেন না যে, নির্বাচনের সঙ্গে স্কুলে আগুন দেওয়ার সম্পর্ক কী। বলেছিলাম, এগুলোর 'অপরাধ' একটিই_ অস্থায়ী পোলিং বুথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া। তিনি চিন্তিত হয়েছিলেন, এতে করে শিশু শিক্ষার্থীদের মনের অবস্থা কী হবে! তারপর গত ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ১২০টি স্কুলে আগুন দিয়েছে 'দুর্বৃত্তরা'।
জয় যে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাস করেন, সেখানে এভাবে স্কুলে আগুন দেওয়ার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারে না কেউ। তিনি ঢাকায় ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশ নিতে এসে রাজনীতির 'বিস্ময়কর' চেহারা দেখে ফেলেছেন। রাজনৈতিক সংঘাত বিবেচনায় স্বাগতিকরা নিরাপত্তা নিয়ে তাকে সতর্কও করেছে। কিন্তু স্কুলে যে এভাবে আগুন দেওয়াও রাজনীতির অংশ হতে পারে, সেই আভাস কেউ তাকে দেয়নি। একই কর্মসূচির আওতায় আমি নিজেও গত বছরের এপ্রিল-মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলাম। জয়ের সংবাদপত্রে 'কর্মরত' ছিলাম মাসখানেক। আমার আগ্রহের বিষয় ছিল সেখানকার সংবাদপত্র কীভাবে পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদকীয় নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করে থাকে। ওকলাহোমার পরিবেশ সংক্রান্ত ইস্যু, রিপোর্টিং, নাগরিক সংগঠন প্রভৃতি সম্পর্কেও অভিজ্ঞতা নিতে চেয়েছি। জয় হ্যাম্পটন এ সংক্রান্ত এসাইনমেন্টে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এর বাইরে সেখানকার একটি 'গ্রিন স্কুল' দেখতেও গিয়েছিলাম দু'জনে। এক কর্তা ব্যক্তি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমাদের দেখাচ্ছিলেন, স্কুলের ডিজাইন কতটা পরিবেশ ও শিক্ষার্থীবান্ধব। কোনদিক দিয়ে কীভাবে আলো আসে, হাওয়া আসে; স্কুলের বাইরের অনভিপ্রেত আবহ যাতে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে বিরূপ প্রভাব না ফেলে সেজন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া আছে। আমি কৌতুক করে বলেছিলাম_ আমাদের দেশের স্কুলগুলো গরক্লেশেই 'গ্রিন'। অনেক স্কুলেই দরজা-জানালা-বেড়ার দুরবস্থার কারণে আলো-হাওয়া প্রবেশের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে। চারপাশ ও যাতায়াত ব্যবস্থাও যথেষ্ট 'প্রাকৃতিক'। সীমিত সাধ্যের মধ্যেও বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে আমরা কতটা সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছি, সেই কথাও অবশ্য তাদের জানিয়েছিলাম।
কেবল ওই স্কুলে নয়; আমেরিকান 'হার্টল্যান্ডের' এই জনপদের, যাদের অধিকাংশের কাছে বাংলাদেশ বিশ্বমানচিত্রে দেখা একটি নামমাত্র, যেখানেই গেছি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য, সম্প্রীতির সমাজ ও শান্ত-সহিষুষ্ণ জনগোষ্ঠীর কথা তুলে ধরতে চেয়েছি। জানিয়েছে বাংলাদেশ যদিও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল' পলিসির ফাঁদে পড়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ২৩ বছর কাটিয়েছে; এই দেশের মাটি ও মানুষ পাকিস্তানিদের মতো নয়। এক রবীন্দ্রনাথই পাকিস্তানি ও বাঙালি মুসলমানের মধ্যে গৌরবজনক ভেদরেখা এঁকে দিয়েছেন। যদিও আফগানিস্তানের সঙ্গে আমরা একই দক্ষিণ এশিয়া বা সার্কের অংশ; সেখানকার গেরুয়া প্রকৃতির ধর্মীয় চরমপন্থা সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলায় এসে কীভাবে মিইয়ে যায়। এখানেও ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিতে চেয়েছে বটে, শান্তিপ্রিয় সমাজের চাপে কোণঠাসা হতে সময় লাগেনি। কিন্তু এখন জয় হ্যাম্পটন নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন, আফগানিস্তানের মতো আমরাও কীভাবে বিদ্যালয়ে আগুন লাগাচ্ছি। প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে জাতির মেরুদণ্ড বিবেচিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান অবকাঠামো স্কুলই পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছি!
এখানেই শেষ নয়; দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আগে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় যেভাবে আমরা শতাধিক বিদ্যালয় পুড়িয়ে দিলাম, সেই 'রেকর্ড' আফগানিস্তানেরও আছে কি? সানডে টাইমসের একটি প্রতিবেদনে দেখেছিলাম, তালেবান জঙ্গিরা আফগানিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় দুই শতাধিক বিদ্যালয় জ্বালিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য এ জন্য তারা সময় নিয়েছিল দুই বছর, ২০০৭-০৮। এর আগে-পরে আফগানিস্তানে আরও স্কুল নিশ্চয়ই জ্বালানো হয়েছে, পশ্চিমা মিডিয়ায় এমন 'শকিঙ' খবর এখনও দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় শতাধিক বিদ্যালয় জ্বালিয়ে দেওয়ার 'রেকর্ড' বোধহয় বাংলাদেশই প্রতিষ্ঠা করতে পারল। এমন আশঙ্কাও অমূলক নয় যে, যদি সরকার দ্রুততম সময়ে ভোটকেন্দ্র হিসেবে নির্ধারিত ১৮ হাজারের বেশি স্কুল-মাদ্রাসা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কড়া প্রহরা না বসাত, তাহলে এই সংখ্যা গাণিতিক হারে বাড়তে পারত। এসব অঘটনের পরও যদি আমরা দাবি করি যে বাংলাদেশে চরমপন্থি তালেবানসুলভ প্রপঞ্চ নেই, কেউ বিশ্বাস করবে?
নির্মম পরিহাস হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট এবং জনসাধারণের মধ্যে তীক্ষষ্ট বিভাজন নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন এতটাই মগ্ন যে, শিক্ষা অবকাঠামো ধ্বংসের এত বড় কাণ্ড হয়তো নজরেই পড়বে না। আফগানিস্তানে বিভিন্ন সময়ে স্কুল পোড়ানোর ঘটনা কিংবা মিসরের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় স্কুলে আগুন দেওয়া ও বোমা মারার ঘটনা কীভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নাড়িয়ে দিয়েছে, ওয়াকিবহালরা জানেন। এ বিষয়ে ১৯৯৮ সালেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রেজুলেশন গ্রহণ করেছিল যে স্কুল ও হাসপাতালের মতো স্থাপনাকে বিবদমান সব পক্ষকে 'সেফ হ্যাভেন' বিবেচনা করতে হবে। কোনো পরিস্থিতিতেই এগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা যাবে না। যারা এ ধরনের স্থাপনায় হামলা চালাবে, তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশে এতগুলো বিদ্যালয় যারা পুড়িয়ে ফেলল, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ওই রেজুলেশনবলে তাদের এখন আন্তর্জাতিক বিচারের সম্মুখীন করা যায় না?
বিদ্যালয় পোড়ানোর বিষয়টি কিন্তু ফৌজদারি অপরাধের তুলনায়ও অনেক বেশি গুরুতর। এর বিরূপ প্রভাব বহুমাত্রিক হতে বাধ্য। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে স্কুল ভবন ও তার আসবাবপত্র কতটা কষ্ট ও অপেক্ষার পর বরাদ্দ বা সংগৃহীত হয় কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। আমরা দেখতে পাই, ঝড়ে ভেঙে পড়া কিংবা নদীভাঙনের কবলে পড়া স্কুল ভবন পুনর্নির্মাণে বছরের পর বছর লেগে যায়। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে খোলা আকাশের নিচে কিংবা গাছের তলায় শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। হয়তো ভবন আছে; কিন্তু চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চ না থাকায় মেঝেতে ক্লাস পরিচালনার খবর ও চিত্রও এই একুশ শতকের বাংলাদেশে এসেও সংবাদপত্র থেকে বিদায় নেয়নি। ভোটের আগুনে পুড়ে যাওয়া এসব স্কুল শিক্ষা অবকাঠামোর বিবর্ণ চিত্র আরও ধূসরই করে তুলবে, সন্দেহ নেই।
যে দেশে অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা এখনও সুলভ নয়, সেখানে রাজনৈতিক কারণে এভাবে স্কুল পোড়ানো উচিত হয়েছে কি-না, যুযুধান 'নির্বাচনবিরোধী' গোষ্ঠীর কাছে সেই প্রশ্ন তোলা অবান্তর। যারা জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারে, নির্বিচারে গাছের গোড়ায় করাত চালাতে পারে, তাদের কাছে শিক্ষার মূল্য ও সম্ভাবনা নিয়ে সুবিবেচনা আশা করা মূঢ়তা। কিন্তু সরকার কি এগুলো রক্ষা করতে পারত না। প্রধান বিরোধীদলীয় জোট যেখানে আগে থেকেই নির্বাচন ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছিল, বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী কার্যক্রমে সহিংস বাধা প্রদান করছিল; সেখানে ভোটকেন্দ্র হিসেবে নির্ধারিত স্কুল, মাদ্রাসা বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো নিরাপত্তাহীন রাখা কোনোভাবেই উচিত হয়নি। দেখা গেছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির পর কোনো বিদ্যালয় কাম পোলিং বুথে নাশকতার ঘটনা ঘটেনি।
যাই হোক, এখন সরকারের উচিত হচ্ছে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পুড়ে যাওয়া ভবনগুলো সংস্কার এবং আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা। বিদ্যালয় ভবনে পুড়ে যাওয়া বই ও নথিপত্র আর পাওয়া যাবে না, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরগুলোর কর্তব্য হচ্ছে, প্রয়োজনীয় নথির অভাবে যাতে বিদ্যালয়টির শিক্ষা ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম বিঘি্নত না হয়, সেদিকে আন্তরিক নজর রাখা। প্রাণপ্রিয় বিদ্যালয় পুড়তে দেখে মানসিক হোঁচট খাওয়া শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাময়ের দায়িত্ব নিতে হবে সমাজের সবাইকে। যারা রাজনৈতিক উন্মত্ততায় বিদ্যালয় পোড়ানোর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়েছিলেন, তারাও সংস্কার প্রক্রিয়া ও স্বাভাবিককরণ কাজে যুক্ত হয়ে পাপের খানিকটা প্রায়শ্চিত্ত করতে পারেন বৈকি! তবে যারা প্রত্যক্ষভাবে এই সভ্যতা ও মানবতাবিরোধী অপকর্মে যুক্ত, তাদের বিচার করতেই হবে। রাজনৈতিক কারণে এভাবে যে জাতীয় ও সামাজিক সম্পদে আগুন দেওয়া যায় না, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া সেই বোধ তারা অর্জন করতে পারবেন বলে মনে হয় না। যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সম্পৃক্ততা বিভিন্ন সময়েই কামনা করে এসেছেন, তাদের উচিত হচ্ছে বিদ্যালয় পোড়ানোর হোতাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশনটি কাজে লাগানোর চেষ্টা চালানো।
শেখ রোকন : সাংবাদিক ও গবেষক
skrokon@gmail.com

শিকারি ও নেকড়ে এবং একটি বাঘ by অজয় দাশগুপ্ত

নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হয়েই গেল_ এমন কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশে পক্ষ-বিপক্ষ দাঁড়িয়ে যাবে। এ ধরনের আরও অনেক মন্তব্যেই মুহূর্তে এক পক্ষ খুশি হবেন, আরেক পক্ষ মনোক্ষুণ্ন কিংবা এমনকি ক্ষুব্ধ হবেন। আপনি যদি বলেন, প্রায় চার কোটি ছাত্রছাত্রীকে পাঁচ বছর ধরে বছরের প্রথম দিনেই নতুন বই দিতে পারা খুব ভালো কাজ। সঙ্গে সঙ্গে আরেক দল বলবে_ বইয়ের ছাপার মান মোটেই ভালো নয় এবং অনেক ভুল রয়ে গেছে। যদি আমি বলি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের উন্নয়ন ঘটাতে পেরেছে_ এক দল তাতে খুশি হয়ে সাফল্যের তালিকা বাড়াতে থাকবে। সঙ্গে সঙ্গে আরেক দল বলে উঠবে_ দেশে সুশাসন বলতে কিছু নেই এবং দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। পদ্মা সেতু, হলমার্ক, শেয়ারবাজার... তালিকা বড় হতে থাকবে। রাজনৈতিক নিপীড়ন, খালেদা জিয়াকে কার্যত গৃহবন্দি করে রাখা_ এসবও আসবে। বাংলাদেশ আমাদের সবার অলক্ষ্যেই যেন এভাবে সবকিছুতে পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে গেছে। বিশিষ্ট নাগরিক হিসেবে যাদের পরিচয়, তাদের মধ্যেও এই বিভাজন। তারা টেলিভিশনের টক শোতে কিংবা বিবিসি বাংলার 'বাংলাদেশ সংলাপ' অথবা সংবাদপত্রের লেখায় নিজের 'পছন্দ-ঝোঁক' গোপন রাখতে পারেন না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে_ হয় এ পক্ষ, না হয় অন্য পক্ষ। আপনাকে কেউ নিরপেক্ষ থাকতে দেবে না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পক্ষ-বিপক্ষ অবস্থান হলে সেটাকে স্বাভাবিক বলা যেত না। 'পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যা করছে নিন্দনীয়', মুক্তিযোদ্ধাদের 'খানসেনা-রাজাকার-দালাল' মারাও সমর্থন করা যায় না_ এমন 'ভালমানুষি' মন্তব্য প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পক্ষে যেত। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শুধু পাশে থাকেনি, তাদের সঙ্গে গণহত্যায় অংশ নিয়েছে; তাদের বিচারের উদ্যোগে নিরপেক্ষতাও এ কারণে কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।
৫ জানুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের মিত্র দলগুলো নির্বাচন বর্জনের আহ্বানের পাশাপাশি প্রতিহতেরও ডাক দিয়েছিল। নির্বাচনের পর ভোটার উপস্থিতি কম_ এ বিষয়টিকেই তারা বেশি করে সামনে আনবে_ সন্দেহ নেই। অন্যদিকে, সরকারপক্ষ বলবে_ বিরোধীদের নির্বাচন প্রতিহত করার আহ্বানে সাড়া মেলেনি। তারা কেবল নাশকতা-সহিংসতা সৃষ্টি করে গুটি কয়েক স্থানে ভোট গ্রহণ স্থগিত করতে পেরেছে। দুই পক্ষের এই বাগ্যুদ্ধে নাগরিক সমাজও জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু কেবলই কি আলোচনা, নাকি সমাধান-সূত্রও আমাদের খুঁজে পেতে হবে? শনিবার রাজধানীতে অর্থনীতি সমিতির আলোচনায় অনেকের কণ্ঠে আহ্বান এসেছে। 'জামায়াতকে বর্জন করে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য আলোচনায় বসুন।' বিএনপি কিংবা তার সমর্থকদের এটা আদৌ পছন্দ হবে না। বিএনপির জনসমর্থন যথেষ্ট_ তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আন্দোলন মোকাবেলায় সরকার কঠোর মনোভাব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে রাজপথে আন্দোলন পরিচালনায় তারা পুরোপুরি নির্ভর করেছে জামায়াতে ইসলামীর ওপর। এ দলটি একদিকে সভা-সমাবেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক নিয়ে আসতে পেরেছে; অন্যদিকে নাশকতার কাজেও দেখাতে পেরেছে দারুণ দক্ষতা। বেশ কিছু মাদ্রাসার বিপুল জমায়েত ক্ষমতার কারণে হেফাজতে ইসলামও বিএনপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গত বছর ৬ এপ্রিল ও ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে তারা বড় ধরনের সমাবেশ ঘটাতে পেরেছিল। গত বছরে আলোচিত ৫টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হওয়ার পর হেফাজতে ইসলাম বলতে শুরু করে, তারা এখন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি এবং ভোটের হাওয়া কোন দিকে যাবে সেটা তারা নির্ধারণ করে দিতে পারে।
কিন্তু সবকিছুর পরও এটাই বাস্তব যে, বিএনপি এবং তার মিত্ররা নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারলেও ভণ্ডুল করতে পারেনি। অপরদিকে, সরকারপক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করে নিতে পারলেও ভোটারদের মোটামুটি সংখ্যায় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেনি। এমন অবস্থায় দুই পক্ষ নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন কীভাবে করবে? তারা কি যা করেছি, ঠিক করেছি_ এমন অবস্থান থেকেই শুরু করবে, নাকি ভুলভ্রান্তি নির্ণয়ের চেষ্টা করবে এবং দেশের স্বার্থকে অন্য সবকিছুর ওপরে স্থান দিতে সচেষ্ট হবে? বিএনপির জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামী। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার পর বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেকেই বলতে থাকেন, একাত্তরের দোসররাই এ পরাজয়ের প্রধান কারণ। নির্বাচনের পর তারা ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীকে তেমন কাছে টানেনি। কিন্তু হঠাৎ সামনে চলে এলো জামায়াতে ইসলামী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্ররাই কেবল করতে পারে_ এমন আস্থা দেশবাসী, বিশেষ করে তরুণ বয়সীরা পর্যন্ত করেছে এবং সেটা যথার্থভাবেই। গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে অনেকে মনে করেছে জামায়াতে ইসলামীকে বিএনপি থেকে দূরে সরিয়ে আনার জন্য আওয়ামী লীগের আপসের কৌশল হিসেবে। শাহবাগে ওই সন্ধ্যায় যে কয়েকশ' তরুণ সমবেত হয়েছিল, সেটা এই ধারণা থেকেই। এর পরের দুই সপ্তাহ সারাদেশে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বেশির ভাগ সংবাদপত্র ও টেলিভিশন যুদ্ধাপরাধীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পক্ষ নেয়। জামায়াতে ইসলামী মরিয়া হয়ে ওঠে অস্তিত্বের শঙ্কা থেকে। বিএনপি পড়ে যায় উভয় সংকটে। তারা প্রথমে বলে, তরুণদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির পাশাপাশি শেখ হাসিনার সরকারের ব্যর্থতার দাবিও তুলতে হবে। এ অবস্থান ছিল যৌক্তিক। কিন্তু হঠাৎ বেগম খালেদা জিয়া তরুণ প্রজন্মের এ আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের 'নাস্তিক' আখ্যায়িত করলেন। বিএনপি সমর্থক পত্রিকা 'আমার দেশ' এবং জামায়াতে ইসলামীর দিগন্ত টেলিভিশন 'নাস্তিক' ইস্যুটি সামনে নিয়ে আসে এবং কুৎসা রটনার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তাদের পাশাপাশি রাজনীতির মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম। তাদের ৫ মে শাপলা চত্বরের সমাবেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বেগম খালেদা জিয়া তার দলের নেতাকর্মী এবং ঢাকাবাসীদের প্রতি আবেদন জানান। এতে বিন্দুমাত্র সাড়া মেলেনি। কিন্তু ওই রাতে সমাবেশ ভেঙে দেওয়ার কঠোর পদক্ষেপকে ইস্যু করে বিএনপি এবং তাদের ধর্মান্ধ সহযোগীরা ফের অপপ্রচারে নামে এবং তাতে আপাতভাবে সফলও হয়। আওয়ামী লীগ কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকে। বিএনপি এই ধর্মান্ধ শক্তির উত্থানকে পুঁজি করেই আন্দোলন সফল এবং নির্বাচন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু করে।
মাত্র ৫ বছর আগেই তরুণ প্রজন্ম দলে দলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুটিকে মুখ্য করে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে। এ প্রজন্মই ছিল শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের প্রধান শক্তি। এরা তো বাংলাদেশের সমাজেরই অংশ এবং তাদের শক্তিকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। আওয়ামী লীগ যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে যে কোনো বাধা মোকাবেলার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে পেরেছে, তার পেছনে কাজ করেছে এই শক্তির সমর্থন। এই তরুণদের জামায়াতে ইসলামীর মতো অর্থবিত্ত নেই। মাদ্রাসা থেকে যেমন 'বড় হুজুর-ছোট হুজুরদের' কথায় দলে দলে ছাত্ররা বের হয়ে এসে সমাবেশকে বড় করে তোলে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। শাহবাগসহ দেশের সর্বত্র তাদের জমায়েত ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। সমাজের অভ্যন্তরে অবস্থান করা এ শক্তিকে উপেক্ষা করলে বিএনপি আবারও ভুল করবে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের জনগণ যে শক্তিকে 'অপশক্তি' হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাদের ওপর কেন বেগম খালেদা জিয়া এতটাই নির্ভর করতে গেলেন_ সে মূল্যায়ন এখন তাদের করতেই হবে। এ শক্তির অর্থবিত্তের এত দাপট কীভাবে, সেটাও কিন্তু আলোচনায় আসতে হবে। নাশকতা পরিচালনায় সাংগঠনিক শক্তি যেমন অপরিহার্য, তেমনি চাই অর্থের জোর। জামায়াতে ইসলামী সেটা দেখাতে পেরেছে। ১৯৭১ সালের প্রত্যক্ষদর্শীরা এখন বলতে পারেন_ এটাই গোলাম আযম-মতিউর রহমান নিজামীর আসল চেহারা। বর্তমান তরুণ প্রজন্মও তাদের কর্মকাণ্ড দেখে স্পষ্ট ধারণা পেল_ জামায়াতে ইসলামী কী ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক একটি রাজনৈতিক শক্তি! বিএনপিকে তাদের এভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এবং আন্দোলন ও নির্বাচনে তাদের ওপর এ নির্ভরতার অবসান ঘটাতেই হবে।
তবে এ কাজটি মোটেই সহজ নয়। বিএনপি তাদের স্ট্রাইক ফোর্সকে হারাতে চাইবে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জনসমর্থন মোটামুটি সমানে সমান। জামায়াতে ইসলামীর ভোট তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও কর্মী বাহিনী উল্লেখযোগ্য এবং আর্থিক ক্ষমতা বিপুল। আর যেখানে সহিংসতার প্রয়োজন, সেখানে এ শক্তি যথেষ্ট কার্যকর। এখন বিএনপি কী করবে?
আওয়ামী লীগের আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন পড়বে অনেক বেশি। তারা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অনেক সফল। অর্থনীতির অঙ্গনে তাদের পারফর্ম্যান্স যে কোনো সরকারের জন্য ঈর্ষণীয় হতে পারে। হায়! তারা যদি পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারত! তারা যদি শেয়ারবাজারের 'দুষ্টুদের' শায়েস্তা করতে পারত!
তারা 'সুশীল সমাজের' অনেককে অপছন্দ করছে এবং সেটা বলছে প্রকাশ্যে। এ বিচ্ছিন্নতা কীভাবে কাটাবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক সমাজেও তাদের বিস্তর কাজ করার রয়েছে। তারা এই দুই অঙ্গনে যথেষ্ট বিচ্ছিন্ন হয়েছে_ এটাই নিষ্ঠুর বাস্তব। যুক্তরাষ্ট্রে সেই ১৯৭১ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের বিরোধী এবং বিএনপি তাদের অপেক্ষাকৃত পছন্দের দল। জামায়াতে ইসলামীকেও তারা গ্রহণ করে নিতে আগ্রহী। যে দলটি এত সহিংস রাজনীতি করছে, তাদের নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে রাখা হলে আরও হিংসার পথে চলবে_ এটা বলে তারা কি ব্ল্যাকমেইল করতে চায়_ এ প্রশ্ন যৌক্তিক মনে হতে পারে। শেখ হাসিনা 'চমকের মন্ত্রিসভা' (অনেকের কাছে কচিকাঁচার দল) দিয়েও এত সফলতা পেয়েছেন বলে আত্মতৃপ্ত থাকার লোকও মিলবে অনেক। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে উঠবে এবারের নির্বাচনের প্রশ্ন। দেশ-বিদেশে সবাই বলবে_ এটা আদৌ গ্রহণযোগ্য হয়নি। অতএব, তাগিদ আসবে আরেকটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের, যেখানে সব দল অংশগ্রহণ করবে। আওয়ামী লীগের অতিউৎসাহী কোনো কোনো নেতা বলছেন, 'পাঁচ বছরের আগে নির্বাচন নয়।' এসব বাহুল্য কথা। দলকে আরও বিব্রত করার কথা। আওয়ামী লীগকে দেশ-বিদেশের বিচ্ছিন্নতা কাটাতে হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পথে যেতে হবে।
দুটি দলকে একটি মৌলিক প্রশ্নেও সমঝোতায় আসতে হবে_ নির্বাচনকালীন সরকার। কেবল ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনেই কোনো সমস্যা হয়নি। সেবার আওয়ামী লীগ শান্তিপূর্ণভাবে বিচারপতি লতিফুর রহমানের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিল। অন্যথায় গত প্রায় দুই দশকে প্রতিটি নির্বাচনেই এ সরকার নিয়ে ফ্যাসাদ হয়েছে। নতুন একটি নির্বাচন দ্রুত হোক_ সেটা প্রায় সবাই বলছেন। কিন্তু তার আগে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে অবশ্যই ফয়সালা হতে হবে এবং সেটা হতে হবে অনেক বছরের জন্য। কিংবা আরও ভালোভাবে বলতে পারি, এটা হতে হবে 'সব সময়ের' জন্য। এ সময়ে বিএনপি এবং তার মিত্ররা সরকারের ওপর চাপ রাখার জন্য কী ধরনের রাজনৈতিক কৌশল নেয়, সেটাই দেখার বিষয়। তাদের হরতাল-অবরোধের রাজনীতি এতদিন জনগণকে উৎসাহিত করতে পারেনি। নির্বাচনের পরপরই পারবে_ সেটাও মনে হয় না। তাদের আন্দোলনের যে কোনো কর্মসূচি এখন 'শিথিল ও ঢিলেঢালা' হতে বাধ্য। এর পরিবর্তে তারা যদি গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করে দেশবাসীর কাছে বক্তব্য রাখতে থাকে, সেটা বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মধ্যে যারা ১৯৭১ সালে সরাসরি হত্যা-লুণ্ঠন ও অন্যান্য ধরনের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, তাদের বিচার প্রশ্নেও চাই সমঝোতা। বিএনপির জন্য সবচেয়ে বিব্রতকর ইস্যু ছিল_ ক্ষমতায় এলে কি বিচার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে? গোলাম আযম-নিজামীদের কি ছেড়ে দিয়ে ফের মন্ত্রী বানানো হবে? তবে আওয়ামী লীগ এবং তাদের মিত্রদের এটাও মনে রাখা চাই যে, জামায়াত-হেফাজত সমাজেই রয়েছে এবং তাদের হীনবল করার জন্য দমন-পীড়ন কৌশল খুব একটা কার্যকর নয়। এজন্য বেশি প্রয়োজন সমাজের অভ্যন্তরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাওয়া এবং শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ধরনের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ প্রদান। সব সময় এ সংগ্রাম রাজপথে হবে না। এজন্য ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যেতে হবে, কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে যেতে হবে। কৃষক-দিনমজুরদের কাছে যেতে হবে। গত পাঁচ বছর আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে এ কাজটি নিতান্তই গৌণ হয়ে পড়েছিল। তারা মনোযোগী ছিল সরকারি কাজের ঠিকাদারি, চাঁদাবাজি ও দখলের কাজে। আগামী পাঁচ বছর বা তার কাছাকাছি সময় পর্যন্ত তারা 'নির্বিঘ্নে' দেশ পরিচালনা করে যাবে_ সে ভাবনাতে মশগুল হয়ে থাকলে তার চেয়ে বড় ভুল আর কিছু হবে না। অতি সহজে যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন, তারা 'যত দ্রুত পারি কামিয়ে নিই'_ এ মনোভাব নিয়ে থাকলে সেটাও হবে শেখ হাসিনার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
বিএনপি নির্বাচন ভণ্ডুল করতে পারেনি। এখন তারা 'অবৈধ' সরকার বাতিলের আন্দোলনে যাবে। কিন্তু কৌশল কি সেই হরতাল-অবরোধ এবং নাশকতা-হিংসাত্মক উন্মত্ততা প্রদর্শন? এ থেকে তারা সরে না এলে দেশের পরিণতি আরও খারাপ হবে। আওয়ামী লীগ সমঝোতা-সূত্র খুঁজতে উৎসাহ না দেখালে এবং দমন-পীড়ন কৌশল অনুসরণ করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করলে নিজেদের বিচ্ছিন্নতাই শুধু বাড়াবে না, আরও বিপর্যয়ের জন্য তাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
উপসংহারে আমরা সেই গল্পের কথা স্মরণ করতে পারি। এক নেকড়ে ও এক শিকারি লড়েছে হাতাহাতি, প্রাণপণে। দু'জনেই ক্লান্ত-বিপর্যস্ত। এক পর্যায়ে এমন শক্তিহীন তারা যে, কেউ কাউকে একেবারে শেষ করে দেওয়ার মতো আঘাতটি করতে পারছে না। এ সময়ে এক বাঘ এগিয়ে এলো এবং শিকারি ও নেকড়ে উভয়কেই বিনা বাধায় তার ডেরায় টেনে নিয়ে গেল নিশ্চিন্তে আহারের জন্য।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিশ্চয়ই এমনটি চাইবে না।
ajoydg@gmail.com
সাংবাদিক

ভোটের দিনে বর্জনের ঘোষণা ৩১ প্রার্থীর

ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও পোলিং এজেন্টদের মারধর করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে আওয়ামী লীগের একজনসহ মোট ৩১ প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণকালে বিভিন্ন সময়ে তারা নির্বাচন বর্জনের এ ঘোষণা দেন। তবে নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোট গ্রহণের দিন এভাবে বর্জনের কোনো সুযোগ নেই। ইসি সচিবালয়ের উপসচিব মিহির সারওয়ার মোর্শেদ বলেছেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় পার হওয়ার পর ভোটে না থাকার কোনো সুযোগ নেই। আইনগতভাবে তারা প্রার্থী। সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারাই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি। বর্জন করা প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন স্বতন্ত্র ১৯ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ৪ জন, জাতীয় পার্টি (জেপি) ৪ জন এবং জাসদের ৩ জন। ঢাকা অফিস, ব্যুরো অফিস ও জেলা প্রতিনিধিদের প্রতিবেদন :
ঢাকা :দুপুরে নির্বাচন কমিশনে হাজির হয়ে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন ঢাকা-১৫ (কাজীপাড়া, সেনপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলার একটি অংশ ও ইব্রাহীমপুর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এখলাস উদ্দিন মোল্লা। সরকার সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েও তা করতে না পারা এবং সরকারি দলের প্রার্থীর সমর্থকরা ভোটকেন্দ্র দখল করেছে বলে অভিযোগ করেন এখলাস।
এদিকে দুপুর আড়াইটার দিকে সংবাদ সম্মেলন ডেকে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইদুর রহমান শহীদ। তিনি জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। লাঙ্গল প্রতীকের সমর্থনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কর্মীরা নির্বাচন প্রভাবিত করছে অভিযোগ করে এ বর্জনের ঘোষণা দেন শহীদ।
বরিশাল :জেলার তিনটি আসনের মধ্যে দুই আসনের দুই প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবিনা আখতার দুপুরে উজিরপুর
উপজেলা চত্বরে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার মো. ইউনুসের সমর্থকদের বিরুদ্ধে তার এজেন্টদের বের করে দেওয়া, জাল ভোট প্রদান ও ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেন। বিকেল ৩টায় একই অভিযোগ তুলে বাবুগঞ্জের দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন বরিশাল-৩ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপু এমপি।
গাইবান্ধা :স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ভোট ছিনতাই ও সন্ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন গাইবান্ধা-৪ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রকৌশলী মনোয়ার হোসেন চৌধুরী। এদিকে ভোট কারচুপি ও আগেই সিল মেরে ভোট বাক্স ভর্তির অভিযোগ এনে গাইবান্ধা-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জাসদ নেতা এসএম খাদেমুল ইসলাম দুপুরে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া :ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনে জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী ফরিদ আহমেদ সকাল ১০টার দিকে শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখেন তার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। এর পরই ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ভোট কারচুপির একটা সীমা আছে, এখন যেভাবে হচ্ছে, তা ভাবা যায় না।
জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের রেজোয়ান আহমেদ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের কাজী মামুনুর রশিদ ভোট কারচুপি ও পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার একই ধরনের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।
মুন্সীগঞ্জ :মুন্সীগঞ্জের দুটি আসনে তিনজন প্রার্থী মাঝপথে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বিকেল ৩টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে প্রথমে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে জাতীয় পার্টি (জেপি) প্রার্থী নুর মোহাম্মদ এবং এর কিছুক্ষণ পর স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট নাসিরুজ্জামান নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। দুপুর ১টার দিকে কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে জাসদের প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম।
শেরপুর :শেরপুর-২ (নকলা ও নালিতাবাড়ী) আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী মতিয়া চৌধুরীর বিরুদ্ধে এজেন্টদের বের করে দিয়ে ৫০টি কেন্দ্র দখল ও ভোট ডাকাতির অভিযোগ এনে দুপুরের দিকে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন তারই এক সময়ের সহযোগী স্বতন্ত্র প্রার্থী বদিউজ্জামান বাদশা।
নারায়ণগঞ্জ :ভোট শুরু হওয়ার ৫ ঘণ্টা পর নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শওকত আলী। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজীর সমর্থকরা অর্ধশতাধিক কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টদের মারধর করে বের করে দিয়েছে।
লক্ষ্মীপুর :ভোট কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেছেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ উদ্দিন। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল্লাহর সমর্থকরা ২৫টি কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টদের বের করে দিয়েছে। একই অভিযোগে অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী আজাদ উদ্দিন চৌধুরী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে সমর্থকদের নিয়ে রামগতি উপজেলা সদরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
সিরাজগঞ্জ :সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালি) আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবদুল মজিদ ম লের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান রতন। বেলকুচির সোহাগপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে এ ঘোষণার সময় তার এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ারও অভিযোগ এনেছেন তিনি।
বরগুনা :দুপুরে বরগুনা-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল হোসেন শিকদার নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তার অভিযোগ, দুপুর ১২টার দিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শওকত হাচানুর রহমান রিমন ও তার সমর্থকরা পাথরঘাটা উপজেলার ৫১টি ও বামনা উপজেলার দুটি কেন্দ্র দখল করে তার নির্বাচনী এজেন্টদের বের করে দিয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে এ বিষয়ে কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লালমনিরহাট :ভোট কারচুপি, পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতিবান্ধা) আসনের জাসদের (ইনু) প্রার্থী সাদেকুল ইসলাম নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। দুপুর আড়াইটার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেন তিনি।
চট্টগ্রাম :দুপুর সোয়া ১টায় চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও বিকেল ৩টায় জাল ভোটের অভিযোগে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাহমুদ হাসান নির্বাচন বয়কট করার ঘোষণা দেন।
জামালপুর :আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে সিল মেরে ভোট নেওয়া ও এজেন্টদের মারধরের অভিযোগ করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন জামালপুর-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আজিজ আহমেদ হাসান, জামালপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুর রহমান এবং জামালপুর-৫ আসনের জাতীয় পার্টি (জেপি) প্রার্থী বাবর আলী খান। দুপুরের দিকে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এ বর্জনের ঘোষণা দেন তারা।
মানিকগঞ্জ :৬০ কেন্দ্র থেকে তার পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার মাত্র ৩০ মিনিট আগে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন মানিকগঞ্জ-১ আসনে জাসদের প্রার্থী আফজাল হোসেন খান জকি।
নোয়াখালী :দুপুরে ১টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) স্বতন্ত্র প্রার্থী আমিরুল ইসলাম।
ঝিনাইদহ :ঝিনাইদহ-১ (শৈলকূপা) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত নায়েব আলী জোয়ার্দার আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন বিকেল ৩টায়।
সিলেট :নজিরবিহীন কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সিলেটের দুই আসনের স্বতন্ত্র দুই প্রার্থী। গতকাল দুপুরে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানান সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর) আসনের প্রার্থী মুহিবুর রহমান ও সিলেট-৪ (জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ) আসনের প্রার্থী ফারুক আহমদ।
খুলনা :বিকেল ৩টার দিকে পৃথক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন খুলনা-২ আসনের জাতীয় পার্টি (জেপি) প্রার্থী রাশিদা করিম ও খুলনা-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুজ্জামান খান খোকন।

দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার পথে বাংলাদেশ

জামায়াতের সহিংসতা ও বিএনপির বর্জনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন হলেও দৃশ্যত দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পথেই এগোচ্ছে বাংলাদেশ। গতকাল রোববার অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তাজা খবরের পাশাপাশি একাধিক বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে এ রকম মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। বিরোধী দলের বর্জনের মুখে জৌলুসহীন অনেকটা নিয়মরক্ষার নির্বাচন হলেও এ নিয়ে দিনভর সরব ছিল বিশ্ব মিডিয়া। বিবিসি, আলজাজিরা, সিএনএনসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সহিংসতার মধ্যে ভোট গ্রহণের খবরের সঙ্গে প্রচার করা হয়েছে নানা বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন। সময়ে সময়ে হালনাগাদ (আপডেট) সংবাদ প্রকাশ করে সক্রিয় ছিল বিশ্বখ্যাত টেলিভিশন ও সংবাদপত্রগুলোর অনলাইন ভার্সনও। বিকেল সাড়ে ৪টায় টাইমস অব ইন্ডিয়ার সর্বশেষ আপডেট সংবাদ 'বাংলাদেশের নির্বাচনে সহিংসতায়
নিহত ১২ :ভোটার উপস্থিতি কম'। একই সঙ্গে 'বাংলাদেশ অ্যাপিয়ার্স হেডেড ফর পলিটিক্যাল ইনসটেবিলিটি' শিরোনামে একটি মন্তব্য প্রতিবেদনও ছিল টাইমস ইন্ডিয়া অনলাইনে। ইন্দ্রানী বাগচির লেখা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বিএনপির বর্জন এবং
জামায়াতের সহিংসতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নির্বাচন করছেন। কিন্তু দৃশ্যত, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে একটা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দিকে।
এতে আরও বলা হয়, ভোটের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন নির্বাচিত হওয়ায় এ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভোটের দিনও বিরোধীদলীয় নেতারা নিরাপত্তা হেফাজতে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের যে কোনো অস্থিতিশীলতা ভারতের জন্য হতে পারে দুঃসংবাদ। বাংলাদেশ থেকে যে নিরাপত্তাজনিত হুমকি ভারতের প্রতি ছিল, তা মোকাবেলায় ভারত গত পাঁচ বছর হাসিনা সরকারের সঙ্গে কাজ করেছে। বিএনপি-জামায়াত সরকার হলে সম্ভবত ভারতের দুশ্চিন্তা ততটা সহানুভূতি পাবে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা এখন বিতর্কের বিষয় যে, অস্থিতিশীল বাংলাদেশ ভারতের জন্য ভালো হবে কি-না।
সময়ের ব্যবধানে নির্বাচনের আপডেট নিউজ প্রকাশের পাশাপাশি বার্তা সংস্থা এএফপির বিশ্লেষণ :'আনরেস্ট থ্রেটেন বাংলাদেশ হার্ড ওন প্রগ্রেস' বা অস্থিতিশীলতায় হুমকির মুখে বাংলাদেশের কষ্টার্জিত অগ্রগতি। এতে বলা হয়, নির্বাচনের পরও বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে ব্যাহত হতে পারে দেশটির সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি। এশিয়ার দরিদ্রতম দেশগুলোর অন্যতম হলেও গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৬ শতাংশ। এ সময়ে দারিদ্র্য কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। একসময়ের তলাহীন ঝুড়ি বাংলাদেশের পরিচয় এখন এশিয়ার উদীয়মান বাঘ বা ইমার্জিং টাইগার হিসেবে। কিন্তু এখন বিরোধী দলের বর্জনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
'পোলিং স্টেশন অ্যান্ড পুলিশ অ্যাটাকড অ্যাজ বাংলাদেশ ভোটস' শিরোনামে নির্বাচনের আপডেট এক খবরে এএফপির মন্তব্য, 'এই নির্বাচন সহিংসতাকে আরও উস্কে দিতে পারে_ গত বছরজুড়েই যে সহিংসতা অব্যাহত ছিল'। পাকিস্তানের 'ডন'সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির এই সংবাদ হুবহু প্রকাশ করেছে।
'ভায়োলেন্স মারস কন্ট্রোভার্সিয়াল বাংলাদেশ পোলস' শিরোনামে আলজাজিরা অনলাইনের বিশ্লেষণ :নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। ভোটের পর আরও সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রধান দুই দলের দ্বন্দ্ব এই আশঙ্কার পাশাপাশি একটা অর্থনৈতিক স্থবিরতা তৈরি হতে পারে বলেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, গত কয়েক মাসে আমরা যে অচলাবস্থা দেখছি এ নির্বাচন কোনোভাবেই তার সুরাহা করবে না। 'ক্ল্ল্যাসেজ অ্যান্ড বয়কট মারড বাংলাদেশ ইলেকশন' শিরোনামে ভোটের খবর প্রকাশ করে বিবিসি অনলাইন। বিবিসি বাংলার সম্পাদক সাবির মুস্তাফা বলেন, (আজ) ৬ জানুয়ারি সকালে এটা বড় প্রশ্ন হবে না যে ভোটে কে জিতেছে, বরং বড় প্রশ্ন হবে এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে? বিবিসির মাহফুজ সিদ্দিক তার বিশ্লেষণে বলেন, নির্বাচনের পর শাসক দলের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে দেশ-বিদেশে আইনগত বৈধতার বিষয়টি। আর রাজনৈতিক সংকট থেকে যাবে সেই তিমিরেই। একমাত্র স্বস্তির কারণ হতে পারে প্রধান দুই দলের সম্ভাব্য সংলাপ।
'বাংলাদেশ ইলেকশন মারড বাই অপজিশন বয়কট, ভায়োলেন্স' শিরোনামে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, দুই প্রধান দলের মধ্যে অচলাবস্থা নিরসনের কোনো ইঙ্গিত নেই। ফলে প্রশ্নের মুখে নির্বাচনের আইনগত বৈধতা। আর আশঙ্কা রয়েছে আরও সহিংসতা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা তৈরি হওয়ার। 'বাংলাদেশ ভোটস অ্যামিড ভায়োলেন্স, অপজিশন বয়কট' শিরোনামে সিএনএনের বিশ্লেষণ : নির্বাচনী অস্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির মৌলিক সমস্যাটাই সামনে নিয়ে এসেছে। এমনিতেই যে দেশটি মোকাবেলা করছে দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ। ভারতের ডিজিটাল নিউজ এজেন্সি ডিএনএর বিশ্লেষণ : 'বাংলাদেশ ইলেকশনস : আওয়ামী লীগ উইনস ডেমোক্রেসি লসেজ'। অর্থাৎ বাংলাদেশের এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলেও পরাজয় ঘটবে গণতন্ত্রের। 'বাংলাদেশ ইলেকশনস : ১২ কিলড, ২০০ পোলিং স্টেশনস সেট অ্যাবলেজ ইন ভায়োলেন্স' শিরোনামে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, নির্বাচনের পর ক্ষমতায় ফিরে অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে সমস্যাটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমাদেশ এ নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নয়াদিলি্লতে এখন যে আশঙ্কাটা কাজ করছে তা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশ শেখ হাসিনা সরকারকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। যার অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশটির ওপর। ১৯৯৬ সালে এমনটা হয়েছিল খালেদা জিয়া সরকারের। কিন্তু ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সেই সরকারের পতন হয়েছিল। 'ফাইট ফর বাংলাদেশ : কান্ট্রি সিকস টু রিটেইন ইটস আইডেনটিটি অ্যামিড গ্রোয়িং ইসলামিক ইনফ্লুয়েন্স' (বাংলাদেশের জন্য লড়াই : ইসলামী প্রভাব বৃদ্ধির মধ্যে নিজের আসল পরিচয় বহাল রাখতে চাচ্ছে দেশটি) শিরোনামে আরেকটি মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের বরাত দিয়ে এতে বলা হয়, এই নির্বাচনে শুধু দুর্নীতি, অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলার মতো সাধারণ বিষয়গুলোই ইস্যু নয়। বরং বাংলাদেশের মূল চেতনাটাই এখানে মূল ইস্যু। বাংলাদেশ কি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক না ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত হবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।