Friday, August 21, 2026
ইরানকে কোনঠাসা করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা আটকে দিতে পারে চীন ও রাশিয়া
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খাটানোর সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। রাশিয়া ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় তারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। অন্যদিকে চীন বারবার প্রমাণ করেছে যে, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ জানান, ট্রাম্পের পক্ষে এই চাপ প্রয়োগের অভিযান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। তিনি বলেন, ট্রাম্প এককভাবে এমন একটি সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন, যার জন্য ঐতিহাসিকভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যসহ চীন ও রাশিয়ার যৌথ বহুপাক্ষিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।
ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হবে যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অভিযান।
তিনি জানান, তেল চোরাচালান, মুদ্রা বিনিময়, নগদ অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা রুপান্তর, ভুয়া কোম্পানি ও জাহাজের নিবন্ধনের মাধ্যমে যেসব দেশ ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করবে, তাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে। এর আগে একই দিনে তেহরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ব্রান্ডেইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতি বিষয়ক অধ্যাপক নাদের হাবিবি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিতে যুক্তরাষ্ট্র জোরালোভাবে প্ররোচিত করেছে এবং ওয়াশিংটন এখন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ওপরও একই ধরনের চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে।
তবে চীন ও ইরানের বাণিজ্য সম্পর্কে বিঘ্ন ঘটানোর মার্কিন পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে। ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশই কিনেছে চীন। এই তেল প্রক্রিয়াকরণ করা চীনের বেশিরভাগ শোধনাগার স্বাধীন এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তারা নির্ভরশীল নয়। এছাড়া ইরানি লেনদেন নিষ্পত্তির অভিযোগে চীনের প্রধান ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় ধাক্কা দিতে পারে। চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জিয়ে জানান, ট্রাম্পের এই হুমকি ইরানের সাথে চীনের বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আনবে না। তিনি উল্লেখ করেন, বেইজিং যেমন ওয়াশিংটনের সাথে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়, ট্রাম্পও চীনের সাথে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে আগ্রহী। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানান, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ কোনো সমস্যার সমাধান করবে না। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পথেই এই সংকট সমাধানের আহ্বান জানান তিনি। আগামী মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ওয়াশিংটন সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্রও বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের অবনতি চাইছে না।
অন্যদিকে রাশিয়ার সাথে ইরানের সমান্তরাল কৌশলগত সম্পর্ক ওয়াশিংটনের জন্য ভিন্ন একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মস্কো ও তেহরান বহু বছর ধরেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক বন্ধন গড়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে দুই দেশ একটি ২০ বছর মেয়াদী অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার ফলে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই তাদের বাণিজ্য বেড়ে ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এমনকি কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে রাশিয়া ইরানকে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি সরবরাহ করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ নীতির ধারাবাহিকতা বলে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। এদিকে ব্রিকস জোটের সদস্য হিসেবে ইরান বিকল্প অর্থনৈতিক পথের সন্ধান করছে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মতি জানিয়েছেন, পশ্চিমা বাজারের বাইরে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে ইরান ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দেয়ার পরিকল্পনা করছে এবং জোটের দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক লেনদেন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিচ্ছে।

Tuesday, August 18, 2026
ইরান ও ইউক্রেন যেভাবে সমুদ্রপথে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করছে by ওমর আশুর
সাম্প্রতিক সময়ের হামলা ও পাল্টা হামলা এই বাস্তবতা তৈরি করেনি, বরং এটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ওয়াশিংটন হয়তো এখন স্থলভাগে সেনা অভিযান, ইরানের বিদ্যুৎ-জ্বালানির মতো জরুরি অবকাঠামোতে হামলা, কিংবা ইসফাহান প্রদেশের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর গভীরে লুকিয়ে থাকা পরমাণু কেন্দ্রে আঘাত হেনে সংঘাত বাড়াতে পারে।
এসব পদক্ষেপে ইরানের ব্যাপক ক্ষতি হবে এবং যুদ্ধও ছড়াবে, সন্দেহ নেই। তবে এতে সমুদ্রজুড়ে ছড়িয়ে রাখা ইরানের নৌ প্রতিরক্ষাব্যূহ ধসে পড়বে না, কিংবা প্রণালি হিসেবে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্বও কমবে না।
গত মাসেই তেহরানে দেখা গেছে এই যুদ্ধের এক রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবন। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল শোক পালনের অনুষ্ঠান ছিল না; ভয়াবহ হামলা, শীর্ষ নেতৃত্ব হারানো আর বোমাবর্ষণের পর ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধারাবাহিকতা কতখানি বজায় রাখতে পেরেছে, এটি ছিল তারই এক শক্তি প্রদর্শন।
এই টিকে থাকার শক্তি কেবল সমুদ্র তৈরি করেনি, তবে সমুদ্র সেই শক্তিকে ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নিজের আকাশসীমা সুরক্ষিত না থাকা সত্ত্বেও ইরান পশ্চিমাদের ভারী আক্রমণ হজম করতে পেরেছে একটি বড় কারণে—সমুদ্রে তাদের একটি জবরদস্তিমূলক দর-কষাকষির ক্ষমতা ছিল। আকাশে চালানো প্রতিটি হামলার একটি বিশাল মূল্য দিতে হবে ওয়াশিংটন, উপসাগরীয় রাজধানী, বিমা কোম্পানি ও বিশ্ব জ্বালানির বাজারকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশাসন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে বিষের পেয়ালায় চুমুক দিতে বাধ্য করতে পারেনি—যেমনটা একসময় রুহুল্লাহ খোমেনি করেছিলেন।
দেখা গেল, ট্রাম্প নিজেই নিজের তৈরি করা ফাঁদে পড়েছেন। ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা শতভাগ ধ্বংস করা হয়েছে’—নিজের এই অসত্য দাবির পর একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি পিছু হটেছেন। ইরানের সঙ্গে ১৪ দফার যে মধ্যবর্তী চুক্তি হলো, তা কিন্তু ওয়াশিংটনের কাছে তেহরানের আত্মসমর্পণ নয়; বরং এটি ছিল সমুদ্রের এক কঠিন বাস্তবতার কূটনৈতিক রূপান্তর।
একে হয়তো চিরাচরিত অর্থে কোনো ‘জয়’ বলা যাবে না। তবে এটি ছিল ওয়াশিংটনের যুদ্ধচেষ্টাকে কৌশলগতভাবে নস্যাৎ করে দিয়ে নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর এক নিখুঁত উদাহরণ।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানশক্তি ইরানের বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করতে পেরেছে, অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে, শীর্ষ সামরিক কর্তাদের হত্যা করেছে। কিন্তু সরকার পতন, ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা কিংবা পুরোপুরি সামরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো উদ্দেশ্যগুলো অর্জিত হয়নি।
ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী ‘অরতেশ’-এর পদাতিক শক্তিতে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরেনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ইরান তাদের সামরিক কাঠামোর যে অংশকে সুরক্ষিত আকাশের ওপর নির্ভর না করে তৈরি করেছিল—অর্থাৎ তাদের উপকূলীয় নৌ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনব্যবস্থা—তা তার সামরিক কার্যকারিতা ও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার ক্ষমতা, দুটোই অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
ইতিহাসের শিক্ষা
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যে কতটা বিপজ্জনক, ইতিহাস তা বহুবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে হ্যানয়ে এক মার্কিন কর্নেল হ্যারি জি সামারস জুনিয়র তাঁর উত্তর ভিয়েতনামি প্রতিপক্ষকে বলেছিলেন, ‘তোমরা কিন্তু আমাদের যুদ্ধের ময়দানে কখনোই হারাতে পারোনি।’
উত্তর ভিয়েতনামের কর্নেল টু এর উত্তর দিয়েছিলেন খুব সংক্ষেপে, ‘কথাটা সত্যি হতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিকতাহীন।’
২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধের যেকোনো মূল্যায়নে কথোপকথনটি বড় এক শিক্ষা হয়ে ওঠার কথা। এ কথার পেছনের যুক্তি খুব সহজ, আকাশপথে আপনি কতটা একচ্ছত্র আধিপত্য দেখাচ্ছেন, তা দিয়ে যুদ্ধ জয় নিশ্চিত হয় না, যদি না আপনি শত্রুর কৌশলগত অবস্থান ও তার মানসিক শক্তিতে ফাটল ধরাতে পারেন।
একই কথা সমুদ্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ১৯৮০-এর দশকের ট্যাংকার যুদ্ধের কথা ধরা যাক। সাত বছরের রক্তক্ষয়ী ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরান যখন এমনিতেই ক্লান্ত, ঠিক তখন আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে একাধিক অভিযানের মাধ্যমে—আর্নেস্ট উইল, প্রাইম চ্যান্স, নিম্বল আর্চার এবং সর্বশেষ প্রেয়িং ম্যান্টিস।
১৯৮৮ সালের এপ্রিলে এক দিনের অভিযানে মার্কিন বাহিনী মূল ইরানি নৌসম্পদ ও তেল প্ল্যাটফর্মের কমান্ড পোস্টগুলো ধ্বংস করে এক বিরাট জয় পেয়েছিল। কিন্তু সেই জয় এসেছিল এক অভিজ্ঞতাশূন্য, ক্লান্ত ইরানি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ এসকর্ট, মাইন অপসারণ ও আক্রমণের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল।
সেগুলো ছিল শাসনক্ষমতা বদলানোর মতো বড় উদ্দেশ্যের তুলনায় অনেকটাই সীমিত এবং এক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত মিশন।
কিন্তু আজকের পরিস্থিতি মার্কিন বাহিনীর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান তাদের নৌশক্তিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। একদিকে নিয়মিত নৌবাহিনী ‘নেদাজা’, যারা গভীর সমুদ্রে নিজেদের অবস্থান জাহির করতে চায়; অন্যদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী ‘নেদসা’, যারা পারস্য উপসাগরকে এক কঠিন ও অনিশ্চিত রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
নেদাজা মূলত একটি প্রথাগত ও মর্যাদার নৌবাহিনী। কিন্তু নেদসা হলো এমন এক ব্যবস্থা, যা শত্রু প্রতিরোধ, হয়রানি, ধোঁয়াশা ও কৌশলগত কার্যকারিতার জন্য তৈরি।
প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ের মতো ভৌগোলিক অবস্থানও এক নিরপেক্ষ ব্যাপার। এটা বন্ধু বা শত্রু, যে কারোর কাজেই লাগতে পারে। কিন্তু কৌশল, কাজের পদ্ধতি, যুদ্ধ উপকরণের অভিযোজন এবং কমান্ড কালচার দিয়ে সেই ভূগোলকে কতটা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়। ইরান এ শিক্ষা আকাশের চেয়ে সমুদ্রেই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে।
এগুলো কোনো বিমানবাহী রণতরি নয়। এগুলো হলো সমুদ্রে বসানো একেকটি অদম্য দুর্গ এবং অনিশ্চয়তা তৈরির কারখানা।
সমুদ্রের দাবার চাল
ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে সমুদ্রের লড়াই স্থলযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া হাতছাড়া হওয়ার পর ইউক্রেন তাদের নৌসম্পদের বড় অংশ হারায়, আর ২০২২ সালের মধ্যে তাদের প্রথাগত কোনো নৌবাহিনীই অবশিষ্ট ছিল না।
তা সত্ত্বেও ইউক্রেন উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইল, বিশেষ অভিযান, ড্রোন বোট এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভর করে কৃষ্ণসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশকে রাশিয়ার জন্য এক নিষিদ্ধ এলাকায় পরিণত করে।
এর ফলাফল শুধু কৌশলগত নয়, ছিল সুদূরপ্রসারী। ইউক্রেন রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে তাদের সেভাসতোপোল ঘাঁটি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এতে রাশিয়ার অবাধ নৌ চলাচল বন্ধ হয়েছে এবং ইউক্রেন ওদেসা বন্দর দিয়ে নিজেদের পণ্য রপ্তানি পথ আবার চালু করতে পেরেছে।
মূলত সাগরে সম্পূর্ণ আধিপত্য না থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেন রাশিয়ার বড় বড় উদ্দেশ্য—যেমন ইউক্রেনকে অবরুদ্ধ করা, ওদেসায় চাপ সৃষ্টি করা এবং ক্রিমিয়াকে সুরক্ষিত রাখা—ব্যর্থ করে দিতে পেরেছে।
ইরানের উপসাগরীয় রণকৌশলও ঠিক আমেরিকার বিরুদ্ধে এই একই ব্যবস্থার এক রূপ। তেহরানের উদ্দেশ্য মার্কিন নৌবাহিনীকে সম্মুখযুদ্ধে হারানো নয়। তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বিশাল শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে এসেও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে হেরে যেতে পারে।
এ থেকে শিক্ষা স্পষ্ট, দুর্বল শক্তির জন্য সমুদ্রকে অবরুদ্ধ করা কেবল এক বিকল্প পথ নয়, এটিই এখন যুদ্ধ জয়ের বড় অস্ত্র। কৃষ্ণসাগরে এই কৌশল ব্যবহার করে ইউক্রেন যেমন এক পরাশক্তিকে রুখে দিয়েছে, ঠিক তেমনি উপসাগরে ইরানও কোনো বড় নৌযুদ্ধ না জিতেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
অবশ্য ইউক্রেন ও ইরানের ঘটনা হুবহু এক নয়। ইউক্রেন সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে এবং বাণিজ্যপথ সচল রাখতে এসব ব্যবহার করেছে। আর ইরান তা ব্যবহার করেছে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে—বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে, বিমা মাশুল বাড়াতে এবং ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দিতে যে বিমান হামলার একটা বড় আর্থিক মূল্য সমুদ্রেই চোকাতে হবে।
ইরানের এই পথ কোনো প্রথাগত নৌসংগ্রাম নয়; এটি হলো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে নৌ অবরোধের এক চতুর মিশ্রণ।
পরিস্থিতি তাই এক বড় বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ইরান হয়তো আকাশে অনেক লড়াইয়ে হেরেছে, কিন্তু সমুদ্রের কারণে তাদের কৌশলগত দর-কষাকষির ক্ষমতা কমেনি। যুক্তরাষ্ট্র আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখালেও সমুদ্রকে অপ্রাসঙ্গিক করতে পারেনি।
ইউক্রেন বিশ্বকে দেখিয়েছে, নৌবহর না নিয়েও একটি বিশাল নৌবাহিনীকে ঠেকিয়ে দেওয়া যায়। আর ইরান দেখিয়ে দিল, একটি বড় নৌযুদ্ধ না জিতেও কীভাবে এক পরাশক্তির মূল উদ্দেশ্যগুলোকে সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দেওয়া যায়।
* ড. ওমর আশুর, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
![]() |
| হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌযানের টহল। ফাইল ছবি: এএফপি |
Friday, August 14, 2026
রাশিয়ার যে কৌশল প্রয়োগ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙছে ইরান
টানা পাঁচ দিন ধরে জর্ডানে থাকা তিনটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। এর উদ্দেশ্য ছিল ওয়াশিংটনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং মার্কিন বাহিনীকে তাদের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য করা।
ইরান এমন কিছু ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করেছে, যেগুলো হঠাৎ দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম। ফলে সেগুলোকে আকাশে শনাক্ত করে ভূপাতিত করা মার্কিন বাহিনীর জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রথম চার দিন মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। তবে ১৭ জুলাই একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করে একটি মার্কিন ঘাঁটির অস্থায়ী আবাসনে আঘাত হানে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘আমরা প্রায় সব ক্ষেপণাস্ত্রই ভূপাতিত করেছি। একটি ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছিল।’
ওই হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হন। একই সপ্তাহে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় কয়েকটি বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দুজন মার্কিন অস্ত্র মজুত-সংক্রান্ত তথ্য সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তির বরাতে জানা গেছে, যুদ্ধ চলাকালে পেন্টাগন ১ হাজার ৫০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলেছে। আর এখন তাদের হাতে ১ হাজার ৭০০টিরও কম ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট রয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের প্রেসিডেন্ট সেথ জি. জোন্স বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন একসঙ্গে আসায় ইরান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলছে।’
ইউক্রেন যুদ্ধও ইরানের এই কৌশলকে প্রভাবিত করেছে। ইউক্রেনে রাশিয়া বারবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহার করেছে।
যুদ্ধের প্রথম পাঁচ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালায়। এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ছিল ভূগর্ভস্থ। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ইরান কয়েকটি স্থাপনা পুনরুদ্ধার করে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করতে সক্ষম হয়।
জোন্স বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা আরও কঠিন করে তুলতে তারা কার্যকরভাবে রাশিয়ার কৌশল কাজে লাগিয়েছে।’
ইরান তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত রাখতে ভূগর্ভস্থ ও গোপন অবস্থান ব্যবহার করছে। দেশটির সেনা সদস্য এবং শীর্ষ নেতারাও বিভিন্ন গোপন আশ্রয়স্থলে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় রাখা হয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। স্থাপনাটি একটি পাহাড়ের ৩০০ ফুটেরও বেশি গভীরে অবস্থিত বলে ধারণা করা হয়।
এসব কারণে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সূত্র: এনডিটিভি।
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Tuesday, August 11, 2026
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে টান, চীন-রাশিয়ার পোয়াবারো
সিনিয়র মার্কিন ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ইরানে হামলা এবং পাল্টা হামলা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ উচ্চমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব অস্ত্রের অনেকগুলো তৈরিতে জটিল ও নির্ভুল প্রযুক্তি প্রয়োজন হয় এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে অস্ত্রভাণ্ডার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
দুই বছরে ফিরবে না প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত। সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে ১ হাজার ৭০০টিরও কম।
উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে দুই বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন অস্ত্রভাণ্ডারের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—এমন প্রত্যাশা থেকে ট্রাম্প অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরুর পর ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পরও যুদ্ধের অবসান ঘটেনি। বরং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপ আরো বাড়িয়েছে।
ইউরোপ-এশিয়ায় কমছে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা
ইরান যুদ্ধের জন্য ইউরোপ ও এশিয়া থেকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে মার্কিন বাহিনীর সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, সেনাদের মনোবল এবং সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়ছে।
বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলে উদ্বেগ বেশি। চীনের সম্ভাব্য তাইওয়ান অভিযান মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা মোতায়েন করে রেখেছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধের সময় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে টমাহকসহ বিভিন্ন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া ও এশিয়ার অন্যান্য স্থান থেকেও শত শত উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অঞ্চলটি থেকে একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ও উন্নত প্রযুক্তির কয়েকটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারও ইরান যুদ্ধের সহায়তায় মোতায়েন করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনারাও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কারণ কিছু আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নজরদারি সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইউক্রেনেও পড়েছে অস্ত্রসংকটের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রসংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে ইউক্রেনে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে এ বছর তার দেশ যে পরিমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে, তা ২০২৫ সালের তুলনায় তিনগুণ কমেছে।
একই সময়ে রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়িয়ে চলেছে। ফলে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তুলনায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
একটি হামলার উদাহরণ দিয়ে জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার ছোড়া ২৮টি ক্ষেপণাস্ত্রের একটিও ইউক্রেন প্রতিহত করতে পারেনি। ওই হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হন। তার মতে, আরো বেশি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে নিহতদের অনেকের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাও এখন বিশ্বব্যাপী আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সংকটের মধ্যে নিজেদের মজুত ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ইউক্রেনকে আরো ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার আহ্বান জানানো হলে ট্রাম্পও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদেরও ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।
রাশিয়া-চীন হিসাব কষছে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের এই দুর্বলতা রাশিয়া ও চীনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দুই দেশই বিভিন্ন প্রকাশ্য তথ্য, প্রতিরক্ষা বাজেট, অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাশিয়া ও চীনের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধে এ ধরনের অস্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ইরান যুদ্ধে কিছু ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র—যেমন আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটিএসিএমএস) ও প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল—এর মজুতও অনেকটাই কমে গেছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক টম কারাকোর ভাষায়, এই অস্ত্রভাণ্ডার ক্ষয় প্রচলিত সামরিক প্রতিরোধ সক্ষমতার জন্য ‘এক প্রজন্মের বিপর্যয়’। তার মতে, অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে কয়েক বছর লাগবে—এ বিষয়টি রাশিয়া ও চীনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এশিয়ায় বাড়ছে মিত্রদের উদ্বেগ
অস্ত্রসংকটের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর। এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যদি মনে করে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রচলিত অস্ত্রের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, তাহলে নিজেদের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তারা আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ার ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন তারা।
ইউরোপেও যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের দীর্ঘ অপেক্ষা মিত্র দেশগুলোকে বিকল্প সরবরাহকারীদের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের বাজার ও মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কেও পরিবর্তন আসতে পারে।
রাশিয়ার জন্য ‘সুযোগের জানালা’
রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করা কার্নেগি এনডাওমেন্টের বিশেষজ্ঞ দারা ম্যাসিকটের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের গত চার বছরেই রাশিয়া বুঝতে শুরু করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশার তুলনায় ধীরে অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে পারে। ইরান যুদ্ধ সেই ধারণাকে আরো শক্তিশালী করতে পারে।
অন্যদিকে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক টড হ্যারিসন মনে করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রসংকট তত গভীর হবে এবং দেশটির দুর্বলতার সুযোগ তত স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
রাশিয়ার একজন জনপ্রিয় যুদ্ধপন্থী ব্লগার আলেকজান্ডার কটসও মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার কমে যাওয়াকে ইউক্রেনের জন্য নেতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভুল-নির্দেশিত অস্ত্র যত কম থাকবে, ইউক্রেনে পৌঁছানো অস্ত্রের পরিমাণও তত কমবে।
সংকট অস্বীকার হোয়াইট হাউসের
তবে ট্রাম্প প্রশাসন অস্ত্রসংকটের খবরকে অস্বীকার করেছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে প্রেসিডেন্টের নির্দেশিত অভিযান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র রয়েছে।
তিনি আরো দাবি করেছেন, মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অস্ত্র তৈরি করছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেলও অস্ত্রসংকটের খবরকে ‘মিথ্যা’ বলে দাবি করেছেন। তার বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট যখন যেখানে হামলার নির্দেশ দেবেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তা করার জন্য প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতা রয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিপুল পরিমাণ তুলনামূলক কম উন্নত অস্ত্র থাকলেও উচ্চক্ষমতার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের মজুত দ্রুত পূরণ করা কঠিন। ফলে ইরান যুদ্ধের বর্তমান প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; ইউরোপ, এশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশলেও এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক কৌশলগত চাপে ফেলছে, যার প্রভাব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বহু বছর থাকতে পারে। আর সেই সময়টিই রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য হয়ে উঠতে পারে নতুন সুযোগের জানালা।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
![]() |
| ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন। |
Sunday, July 26, 2026
সিআইএ ঘাঁটিতে ইরানের হামলা: রাশিয়া যেভাবে ‘কলকাঠি’ নাড়ল by ইদনা মোহামেদ
তবে রুবিও ও লাভরভের বৈঠকটি এমন এক সময়ে হলো, যার নেপথ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে নতুন কিছু চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থানগুলোতে ইরানের হামলা নিয়ে প্রকাশ্যে যতটুকু স্বীকার করা হচ্ছে, রাশিয়া আসলে তার চেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুর দিকেই প্রথম খবর আসে যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে তেহরান। যুদ্ধ শুরুর তিন দিনের মাথায়, ৩ মার্চ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এ–সংক্রান্ত বিষয়ে অভিজ্ঞ দুটি সূত্রের বরাতে জানায়, রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে থাকা একটি সিআইএ স্টেশনে হামলা চালানো হয়েছে। এরপর ৬ মার্চ মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, পারস্য উপসাগরে মার্কিন সেনাসদস্য ও যুদ্ধবিমানের অবস্থান শনাক্ত করতে তেহরানকে সহায়তা করছে মস্কো।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত বুধবার এক প্রতিবেদনে জানায়, সিআইএর অবকাঠামো, বিশেষ করে সৌদি আরবের মার্কিন দূতাবাসে ইরানি ড্রোন হামলার ঘটনার পর মার্কিন গোয়েন্দারা এতে রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। হামলার নির্ভুল নিশানা ও নিখুঁত কার্যকারিতা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এর পেছনে হয়তো রুশ সহায়তার প্রমাণ রয়েছে।
প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেভস্কি জানান, ইরানের এই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়ার জড়িত থাকার তথ্যটি বেশ ‘বাস্তবসম্মত’। গ্রাজেভস্কি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘বিষয়টি অনেকটা এমনই সন্দেহ করা হচ্ছিল। কারণ, ইরান আগে যেসব হামলা চালিয়েছে, এবারের হামলাগুলো ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও আধুনিক।’
নিকোল গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘রাশিয়ার মতো ইরানের কাছে মহাকাশভিত্তিক উচ্চ সক্ষমতা নেই। রাশিয়ার তুলনায় সাধারণ নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক মানের স্যাটেলাইটও ইরানের পর্যাপ্ত নেই...তাই মনে হচ্ছে, তারা রাশিয়ানদের সঙ্গেই হয়তো কোনো চুক্তি করেছে।’
তবে নিকোল গ্রাজেভস্কি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজস্ব কিছু হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (সোর্স বা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক) রয়েছে ইরানের, যা প্রায়ই অনেকে এড়িয়ে যান।
ইরানকে রাশিয়ার সহায়তা
যুদ্ধ আর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে মস্কো ও তেহরান তাদের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। অনেক বিশ্লেষক দাবি করেন, দুই দেশের এই সম্পর্ক কোনো স্থায়ী জোট নয়, বরং পশ্চিমের বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক সাময়িক সুবিধাভিত্তিক সমঝোতা। তবে এতে দ্বিমত পোষণ করেন গ্রাজেভস্কি।
নিকোল গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘দুই দেশই নিজেদের বৈশ্বিক রাজনীতিতে একই ধরনের হুমকির মুখে আছে বলে মনে করে। আর ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে তাদের সহযোগিতা সত্যি বেশ জোরালো হয়েছে, যা সম্প্রতি আরও বেড়েছে। তারা এখন একে অপরের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।’
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তেহরান মস্কোকে শাহেদ ড্রোন ও ফাতেহ-১১০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহ করায় দুটি দেশ সামরিকভাবে আরও কাছাকাছি আসে।
গত বছর দুই পক্ষ ২০ বছর মেয়াদি একটি ‘সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছিল।
তবে সেই সময় রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে রুদেনকো স্টেট দুমায় দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, এই চুক্তির অর্থ এই নয় যে ‘ইরানের সঙ্গে কোনো সামরিক জোট বা পারস্পরিক সামরিক সহায়তা গড়ে উঠেছে।’ দ্য মস্কো টাইমস এ তথ্য প্রচার করে।
এ ছাড়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা ‘কোমেটা-এম’ অ্যান্টি-জ্যামিং নেভিগেশন সিস্টেম সরবরাহ করে ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের নির্ভুল নিশানা বাড়াতে সহায়তা করছে।
গত মার্চ মাসের খবরের বরাতে জানা যায়, সাইপ্রাসে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) একটি ঘাঁটিতে ইরানের ব্যর্থ হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা শাহেদ-১৩৬ ড্রোনে একটি রুশ জ্যামিং-প্রতিরোধী প্রযুক্তি পাওয়া গেছে।
যদিও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর এই ‘কোমেটা-এম’–সংক্রান্ত রিপোর্টটিকে সম্পূর্ণ ভুয়া খবর বা ‘ফেক নিউজ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়া।
তা সত্ত্বেও গ্রাজেভস্কি ব্যাখ্যা করে বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ একদিক থেকে মস্কোর জন্যই সুবিধাজনক। কারণ, এটি ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয় এবং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি দুর্বল করার ক্ষমতা রাখে।
গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘আমার মনে হয়, রাশিয়ানরা এটিকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার এক বৃহত্তর লড়াই হিসেবে দেখছে। আর তারা মনে করে, এই ঘটনাই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।’
‘অবশ্যই তারা চায় না ইরান পুরোপুরি ধসে পড়ুক। তাই তারা সব সময় একটা সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করে—ইরান একদিকে একাই যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হোক, আবার একই সাথে তাদের ইতিহাসের এই কঠিন সময়ে টিকে থাকার মতো যথেষ্ট সহায়তাও যেন তারা পায়।’
সাম্প্রতিক হামলা
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা টানা ১২তম রাতের মতো অব্যাহত ছিল। গত বৃহস্পতিবার সকালে ইরাক সীমান্তবর্তী শালামচে ক্রসিংয়ে এক হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়। এর জবাবে গত কয়েক দিনে জর্ডানসহ পারস্য উপসাগরীয় একাধিক দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান।
তবে গ্রাজেভস্কির মতে, রাশিয়ার কোনো গোয়েন্দা সহায়তার চেয়ে বরং ইরানের নিজস্ব কৌশল ও সমরাস্ত্রই যুদ্ধের গতিপথে বেশি প্রভাব ফেলছে।
গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘রাশিয়ার সম্পৃক্ততা কিন্তু ইরানিদের জন্য একমাত্র মূল চালিকা শক্তি বা মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বিষয় নয়। ইরানের এই সক্ষমতা আগেই ছিল। তারা ইতিমধ্যেই বিশাল ড্রেন ও ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে। যা ঘটেছে তা হলো রাশিয়ার সহায়তা ইরানকে সামান্য বাড়তি সুবিধা দিয়েছে ও শক্তিশালী করেছে।’
* ইদনা মোহামেদ, আল–জাজিরার লন্ডনভিত্তিক সাংবাদিক
- আলজাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ
![]() |
| ভ্লাদিমির পুতিন এবং মোজতবা খামেনি। ফাইল ছবি |
Friday, July 24, 2026
ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করল রাশিয়া
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে লাভরভ রুবিওকে জানান, কিয়েভ সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রায় আধাঘণ্টার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে ভালো ও খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। তবে আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করেননি তিনি।
ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের মাধ্যমে অস্ত্র বিক্রি করে এবং এ নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
গত বছর চালু হওয়া একটি কর্মসূচির আওতায় ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা সামরিক সরঞ্জাম ইউক্রেনকে সরবরাহ করতে পারে।
রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন এখনো যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তার ভাষায়, আমরা শান্তিচুক্তি চাই। আমরা চাই যুদ্ধের অবসান হোক। তবে এমন একটি সমাধান প্রয়োজন, যাতে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই সম্মত হতে পারে। এজন্য আরও অনেক কাজ করতে হবে।
অন্যদিকে, রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে লাভরভ বলেন, ইউক্রেন সংকটের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানে মস্কো এখনো প্রস্তুত রয়েছে।
বৈঠকের কিছুক্ষণ আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, স্থবির হয়ে পড়া শান্তি প্রচেষ্টা পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে এসব হামলা যুদ্ধের অবসান ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হতে পারে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার অগ্রযাত্রা কিছুটা ধীর করতে সক্ষম হয়েছে এবং একই সঙ্গে রুশ ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কমে যাওয়ার সুযোগে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও জোরদার করেছে রাশিয়া।
বৃহস্পতিবার রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে তিনজন নিহত হন। একই দিনে রাশিয়া ও রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের হামলায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় আসে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইরানবিরোধী হামলার নিন্দা জানিয়েছে মস্কো।
![]() |
| বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার আলোচকবৃন্দ। ছবি : সংগৃহীত |
Tuesday, July 14, 2026
পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই তেহরানে রাশিয়ার সামরিক উড়োজাহাজ ডুমসডে
ফ্লাইটরাডার২৪–এর তথ্য অনুযায়ী, আরএ-৬৪৫৩১ নিবন্ধন নম্বরধারী টুপোলেভ টিইউ-২১পিইউ উড়োজাহাজটি আরএসডি৪২০ কলসাইন ব্যবহার করে মস্কো থেকে উড্ডয়ন করে এবং সোমবার সকালে তেহরানে অবতরণ করে।
সংবাদমাধ্যমে অনেক সময় একে ‘ডুমসডে প্লেন’ বা ধ্বংসাত্মক বিমান বলা হলেও টিইউ-২১পিইউ মূলত রাশিয়ার বিশেষ যোগাযোগব্যবস্থাসম্পন্ন একটি উড়োজাহাজ। তবে এটি পারমাণবিক হামলা মোকাবিলার জন্য কোনো আকাশভিত্তিক কমান্ড প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং এটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহৃত হয়। উড়োজাহাজটি রাশিয়ার স্পেশাল ফ্লাইট স্কোয়াড্রনের অংশ।
যদিও এবারের সফরের উদ্দেশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে অতীতে এই উড়োজাহাজকে রাশিয়ার শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফরের সময় নিয়মিত দেখা গেছে।
গত ১৬ জুন একই উড়োজাহাজ উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দে অবতরণ করেছিল। ওই দিনই রুশ প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন উজবেক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এছাড়া ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার কয়েক দিন আগে টিইউ-২১পিইউ তেহরান সফর করে এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে। তখন ধারণা করা হয়েছিল, রাশিয়ার জ্বালানিমন্ত্রী সের্গেই সিভিলেভের সফরে সহায়তা করতেই উড়োজাহাজটি সেখানে ছিল। এর কয়েক দিন পর রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভও তেহরান সফর করেন।
একইভাবে, গত বছরের নভেম্বরে উড়োজাহাজটি পাকিস্তানের ইসলামাবাদেও গিয়েছিল। তখনও সিভিলেভ দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে পাকিস্তান সফর করেছিলেন।
গত এক বছরে উড়োজাহাজটির প্রকাশ্য সফরের ধরন বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, এবারও এটি কোনো উচ্চপর্যায়ের রুশ প্রতিনিধিদলের সফরের প্রস্তুতির অংশ হতে পারে অথবা রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সম্ভাব্য তেহরান সফরের পথ প্রস্তুত করছে।
এদিকে, ১৩ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ল্যাভরভের সম্ভাব্য সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Tuesday, July 7, 2026
ইরানকে রাতারাতি শক্তিশালী করতে ২০টি সুখোই-৩৫ দিচ্ছে রাশিয়া
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিমানগুলো রাশিয়ার কোমসোমলস্ক-অন-আমুর অ্যাভিয়েশন প্ল্যান্টে তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সেগুলো রাশিয়াতেই রয়েছে এবং চূড়ান্ত হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।
সুখোই-৩৫ রাশিয়ার অন্যতম অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার কমব্যাট রেডিয়াসের এই ফাইটার জেট শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে প্রবেশ করে নির্ভুল হামলা চালাতে সক্ষম। পাশাপাশি অস্থায়ী বা স্বল্প দৈর্ঘ্যের রানওয়ে থেকেও উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা বাড়ায়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এফ-৩৫-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান না হলেও সুখোই-৩৫ এখনো বিশ্বের অন্যতম কার্যকর ও যুদ্ধ-পরীক্ষিত ফাইটার জেট। আধুনিক আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজনের মাধ্যমে বিমানটির সক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরান ইতোমধ্যে সুখোই-৩৫ পরিচালনার জন্য পাইলটদের প্রশিক্ষণ শুরু করেছে। এ উদ্দেশ্যে আগে থেকেই রাশিয়ার তৈরি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুখোই-৩৫ অন্তর্ভুক্ত হলে দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো এফ-১৪, এফ-৪ ও এফ-৫ যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরশীল ইরানের বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে দূরপাল্লার আকাশ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে তেহরানের কৌশলগত শক্তি রাতারাতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এদিকে বিভিন্ন সূত্রের দাবি, রাশিয়ার কাছে মোট ৪৮টি সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমানের অর্ডার দিয়েছে ইরান। ভবিষ্যতে আরও সুখোই-৩০এসএম২ এবং পঞ্চম প্রজন্মের সুখোই-৫৭ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়েও তেহরানের আগ্রহ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
Sunday, June 21, 2026
বলশেভিকরা কেন দ্বিতীয় বিপ্লব বেছে নিয়েছিল by মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাব সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ঘটনা। এই রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের শুরু হয়েছিল সে বছরের গোড়ার দিক থেকে। এর মধ্য দিয়ে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা দীর্ঘদিনের জার শাসনকে উচ্ছেদ করে নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে। লেনিনের অনুসারী বলশেভিকদের এই বিপ্লব খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন মার্কিন সাংবাদিক জন রিড। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেছিলেন, ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’।
এই বিপ্লবের পর রাশিয়ায় গড়ে ওঠে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর গঠিত হয় সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রসমূহের ইউনিয়ন—সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল দুই মেরুর আদর্শিক বিশ্বের পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা আর সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। সেই সময় থেকে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন অবধি বলশেভিক বিপ্লবের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও মতাদর্শগত দাপট ছিল বিশ্বজুড়ে।
বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল যেভাবে
কৃষক অসন্তোষ: রুশ কৃষকেরা বিশ্বাস করতেন, জমি কেবল তাঁদেরই হওয়া উচিত, যাঁরা তা চাষ করেন। জার দ্বিতীয় আলেক্সান্দার কর্তৃক ১৮৬১ সালে যদিও ভূমি দাসপ্রথা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তবু গ্রামীণ কৃষকদের মধ্যে এক গভীর ক্ষোভ ছিল। কারণ, তাঁদের সামান্য যে জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল, সে জন্য সরকারকে অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু তাঁরা যে জমিতে কাজ করতেন, সেটার মালিকানা দাবি করতে থাকেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে দুর্বল ভূমি সংস্কারের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ভূমির মালিকানার ক্ষেত্রে ছিল এক চরম বৈষম্য। দেশের মোট জমির ২৫ শতাংশ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশের দখলে।
শ্রমিক অসন্তোষ: উনিশ শতকের শেষের দিকে দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে লাখো মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরাঞ্চলে চলে আসায় নতুন ‘প্রলেতারিয়েত’ বা ‘শ্রমিকশ্রেণি’ তৈরি হয়। শিল্পবিপ্লব রাশিয়ার শ্রমিকদের জন্য অনিরাপদ কাজের পরিবেশ, কম মজুরি এবং সীমিত শ্রমিক অধিকার নিয়ে এসেছিল। পশ্চিম ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকেরা শিল্পবিপ্লবের কারণে যে সম্পদ ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছিলেন, রুশ শ্রমিকদের ভাগ্যে তা জোটেনি। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। কৃষকশ্রেণির তুলনায় এই নতুন শ্রমিকশ্রেণি ধর্মঘটে যাওয়া এবং প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার প্রবণতা বেশি দেখায়। ১৯১৪ সালে যখন রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন যুদ্ধসামগ্রী উৎপাদনের জন্য কলকারখানার ওপর পড়া বিশাল চাপ আরও বেশি শ্রমিক দাঙ্গা ও ধর্মঘটের জন্ম দেয়। যুদ্ধের প্রতি এমনিতেই রাশিয়ার বেশির ভাগ মানুষের বিরোধিতা ছিল। ফলে তারা এই শ্রমিকদের সমর্থন জানায়।
অজনপ্রিয় সরকার: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেও রাশিয়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জার দ্বিতীয় নিকোলাসের স্বৈরাচারী শাসনের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাঁর স্লোগান ছিল, ‘এক জার, এক চার্চ, এক রাশিয়া।’ তাঁর বাবা তৃতীয় আলেক্সান্দারের মতোই দ্বিতীয় নিকোলাস একটি অপ্রিয় নীতি—‘রুশিফিকেশন’ বা রুশকরণ নীতি প্রয়োগ করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় বেলারুশ ও ফিনল্যান্ডের মতো অজাতিগত রুশ সম্প্রদায়গুলোকে তাদের নিজ সংস্কৃতি ও ভাষা ত্যাগ করে রুশ সংস্কৃতি গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
গির্জা ও জারতন্ত্র সম্পর্ক: জার ছিলেন রুশ অর্থোডক্স চার্চেরও প্রধান। চার্চ স্বৈরাচারী শাসনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করত। জারের কর্তৃত্বকে আরও সুদৃঢ় করতে চার্চ ঘোষণা করে, জার ঈশ্বর কর্তৃক নিযুক্ত। তাই ‘খুদে পিতা’র প্রতি যেকোনো চ্যালেঞ্জ ঈশ্বরের অবমাননা হিসেবে গণ্য করা হতো। ওই সময়ে রাশিয়ার অধিকাংশ মানুষ ছিল নিরক্ষর। তারা চার্চের বক্তব্য মেনে চলত। জারের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য প্রায়ই পাদরিদের আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে কৃষকেরা পাদরিদের প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে শুরু করেন। কারণ, তাঁরা ক্রমেই পাদরিদের দুর্নীতিগ্রস্ত ও ভণ্ড হিসেবে দেখতে পান। সামগ্রিকভাবে দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনামলে চার্চ এবং এর শিক্ষা প্রত্যেক মানুষের শ্রদ্ধা হারাতে শুরু করে।
সেনা অসন্তোষ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার দ্বিতীয় নিকোলাসের অধীনে রুশ সেনাবাহিনীর যুদ্ধের ক্ষতি দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯১৬ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যে ৫০ লাখের বেশি রুশ সেনা নিহত, আহত বা বন্দী হয়েছিলেন। এর ফলে সেনাদের মধ্যে বিদ্রোহ ও দলত্যাগ শুরু হয়। খাদ্য, গোলাবারুদ এবং এমনকি অস্ত্রের অভাবে অসন্তোষ আর দুর্বল মনোবল আরও ভয়াবহ সামরিক পরাজয়ের কারণ হয়েছিল। এই যুদ্ধ রুশ জনগণের ওপরও এক বিধ্বংসী প্রভাব ফেলেছিল। এ জন্য সবাই জারকে দুষতে থাকে।
বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা: রাশিয়ায় দীর্ঘদিনের স্বৈরতান্ত্রিক জার শাসন, রাশিয়া-জাপান যুদ্ধে পরাজয় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্যর্থতা রাশিয়ার মানুষের মনে অসন্তোষ তীব্র হয়। তা ছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মারাত্মক খারাপ হওয়ায় অনেক মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে ফেলে। ফলে রাশিয়ায় একটি বিপ্লব অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ সময় কার্ল মার্ক্সের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত লেনিন রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণির প্রথম বিপ্লব ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন।
যেভাবে জারতন্ত্রের পতন
অক্টোবর বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বছরের পর বছর। ১৯০৫ সালে রাশিয়ায় একের পর এক শ্রমিক ধর্মঘট সংঘটিত হয়। ‘রক্তাক্ত রবিবার’-এ জারের প্রাসাদ অভিমুখে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ অভিযাত্রায় হাজারো শ্রমিক নিহত হন। শ্রমিক বিদ্রোহে কেঁপে ওঠে রাশিয়া। স্বতঃস্ফূর্তভাবে কারখানায় কারখানায় গড়ে উঠতে থাকে সংগ্রাম কমিটি তথা সোভিয়েত।
১৯১৭ সালে বিপ্লবের সূচনা হয় জুলিয়ান বা পুরোনো পঞ্জিকা অনুযায়ী ৯ জানুয়ারি (২২ জানুয়ারি/গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা) ‘রক্তাক্ত রবিবার’-এর ১২ বছর পূর্তি উদ্যাপনের মাধ্যমে। ১১৪টি শ্রমিক সংগঠন ধর্মঘট আহ্বান করে। পরের মাসে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীরা রাস্তায় নামে খাদ্যের দাবিতে। মাসের শেষ দিকে সশস্ত্র শ্রমিক ধর্মঘটে রূপ নেয়। শ্রমিকেরা পুলিশ ও সেনাদের অস্ত্র কেড়ে নেয়। লেনিন ছিলেন সুইজারল্যান্ডে। জোসেফ স্তালিন ছিলেন সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে। পেত্রোগ্রাদে পার্টির সদর দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন কমরেড মলটভ। সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ প্রচারিত হলো, ‘অভ্যুত্থান চালিয়ে যাও, জারতন্ত্র উচ্ছেদ করো।’
এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি (১২ মার্চ/গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা) সকালে অভ্যুত্থানে যোগ দেওয়া সেনার সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। সন্ধ্যায় তা হয়ে যায় ৬০ হাজার। সাধারণ জনতা, কৃষক ও শ্রমিকেরা পেত্রগ্রাদ দখল নেয়। সেনারা জারের মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করে এবং রাজবন্দীদের মুক্ত করে দেয়। ২ মার্চ (১৫ মার্চ/গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা) জার দ্বিতীয় নিকোলাস পদত্যাগ করেন। জারতন্ত্রের অবসান ঘটে। রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হয়।
কেন দ্বিতীয় বিপ্লব
১৯১৭ সালে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর ক্ষমতায় আসে সাময়িক (অন্তর্বর্তী) সরকার। একপর্যায়ে মেনশেভিক ও কৃষকদের পার্টি সোশ্যালিস্ট রেভ্যলুশনারিরা সেই সরকারে বুর্জোয়াদের সঙ্গে যোগ দেয়। মেনশেভিকরা ছিল অনেকটা পশ্চিমা ভাবধারার। জারতন্ত্রের পতন ঘটানোর বাইরে তেমন রাজনৈতিক এজেন্ডা তাদের সেই অর্থে ছিল না। জারতন্ত্রের জায়গায় পশ্চিমা ভাবধারার একটি উদারনৈতিক শাসনব্যবস্থার মধ্যেই মেনশেভিকদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ ছিল।
বিপরীতে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার বলশেভিকরা সাময়িক সরকারে যোগ দেয়নি। লেনিন রাশিয়ায় ফিরে এসে লেখেন বিখ্যাত ‘এপ্রিল থিসিস’। এতে তিনি লেখেন, বিপ্লবের প্রথম পর্বে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে বুর্জোয়াদের হাতে। এখন দ্বিতীয় পর্বে শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষকদের মেহনতি অংশের ঐক্য গড়ে তাদের কাছে ক্ষমতা দিতে হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সাময়িক সরকারকে কোনো সহযোগিতা নয়, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে। লেনিন ঘোষণা করেন, রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কোনো প্রয়োজন নেই, রাশিয়ার সরকার পরিচালিত হবে শ্রমিক ও কৃষকের দ্বারা।
১৯০৫ সালেই লেনিন সোভিয়েতের বিপ্লবী সক্ষমতা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। মেনশেভিক ও সোশ্যাল রেভল্যুশনারিদের বিপরীতে বলশেভিকদের ‘রুটি, জমি, শান্তি’ এবং ‘সমস্ত ক্ষমতা বুর্জোয়া পার্লামেন্টের বদলে চাই সোভিয়েতের হাতে’ স্লোগান মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। এভাবে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর/গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা) বলশেভিকদের নেতৃত্বে রাশিয়ায় সংঘটিত হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। জুলিয়ান পঞ্জিকা অনুযায়ী অক্টোবরে হয়েছে বলে এটি ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামে পরিচিত। আর লেনিনের কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থকদের বলশেভিক নামে ডাকা হতো। ফলে এই বিপ্লবকে ‘বলশেভিক বিপ্লব’ও বলা হয়ে থাকে।
মার্কিন সাংবাদিক জন রিড তাঁর ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ বইয়ে লিখেছিলেন, মার্চে জারের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটার সময় রাশিয়ার বিত্তশালী শ্রেণিগুলো শুধু রাজনৈতিক বিপ্লব চেয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা চলে আসবে তাদের হাতে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত রাশিয়ার শ্রমিক, কৃষকসহ শ্রমজীবী জনগণের বড় অংশই তাতে সন্তুষ্ট ছিল না। তারা চাইছিল যুদ্ধের সমাপ্তি আর শিল্প এবং কৃষিক্ষেত্রের ব্যাপক গণতান্ত্রিকীকরণ। সেই আকাঙ্ক্ষারই ফল ‘রাজনৈতিক বিপ্লবের’ পরে আরেকটি ‘সামাজিক বিপ্লব’ ঘটে, যার মধ্য দিয়ে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।
১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আঁতুড়ঘর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলেও নানা আদলে বিশ্বের নানা প্রান্তে এখনো এই লাল ঝান্ডা উড্ডীন রয়েছে। এর প্রভাব বাড়ছে খোদ পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও। অর্থনৈতিক বৈষম্য, পরিবেশ ধ্বংস, বিশ্ব উষ্ণায়নসহ যুদ্ধবাজ নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এখন বহুমুখী সংকটে। এই সংকট থেকে বের হতে এবং ভবিষ্যতে একটি স্থিতিশীল ও জনমুখী আর্থসামাজিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে মার্ক্সবাদ প্রভাবিত ‘অক্টোবর বিপ্লব’ সাম্যবাদে বিশ্বাসীদের জন্য যুগের পর যুগ প্রেরণা হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: থট কো, সাপ্তাহিক একতা, বিবিসি, আনন্দবাজার
![]() |
| ১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের সময় ভ্লাদিমির লেনিন। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস |
Sunday, June 14, 2026
রাশিয়ায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে অভিযান, গণহারে মুফতি-আলেমদের গ্রেপ্তার
চলতি বছরের মে মাস থেকে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মুফতি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিকে আটক ও গ্রেপ্তারের খবর আসতে শুরু করে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব গ্রেপ্তারের খবর দেশটির রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে সীমিত আকারে প্রচার হলেও অনলাইনে এ নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা সামনে এসেছে। রাশিয়ার উগ্র-ডানপন্থি সংগঠন ও চ্যানেলগুলোর কাছে এসব গ্রেপ্তার ও আটকের ঘটনা ক্রেমলিন-সমর্থিত স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (ডিইউএম) ভেঙে দেয়ার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত অভিযানের সূচনা।
বিবিসি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ছিলেন কারেলিয়ার সাবেক মুফতি উইসাম বার্দভিল। রুশ সংবাদসংস্থা তাস জানায়, গত ১৪ মে শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে ‘পুলিশের সঙ্গে অবাধ্যতা’র অভিযোগে তাকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ফোরতাঙ্গার তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার এফএসবি সংস্থা ১২ মে ধর্মযাজক ও বারর্দভিলের ডেপুটি আখমাদ তাঙ্গিয়েভকেও আটক করে।
দেশটির জনপ্রিয় সংবাদ সাইট লেন্তা ডট রু জানায়, মর্দোভিয়া প্রজাতন্ত্রের মুফতি রয়াল আসেনভকে গত ১৯ মে ‘ঘুষ চাওয়ার’ সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তীতে গত ২৩ মে ব্যবসাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দৈনিক কোমেরসান্ত বিচার বিভাগের প্রেস অফিস এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্তকারীদের উদ্ধৃতি দিয়ে আটক ব্যক্তিদের একটি দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করে।
কোমেরসান্তের তথ্য অনুযায়ী, ‘মুসলিম কমিউনিটি অব দ্য নর্থওয়েস্ট’ নামের কেন্দ্রীয় ধর্মীয় সংগঠনের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খেনিকে সেন্ট পিটার্সবার্গে তার এক আত্মীয় এবং রাশিয়ার সারাতভ অঞ্চলের ডেপুটি মুফতি আল-খেইখ নিদাল আওয়াদুল্লাহ আহমদের সঙ্গে আটক করা হয়।
এ ছাড়া ওয়েবসাইটটি আরও চারজন আটক ব্যক্তির আদ্যক্ষর ও পদবী প্রকাশ করেছে।
গ্রেপ্তারের নেপথ্যে?
রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী গ্রেপ্তারকৃত আলেমদের বিরুদ্ধে ‘ঘুষ’ থেকে ‘অবাধ্যতা’ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগ এনেছে। তবে দেশটির কিছু ব্লগার ও গণমাধ্যম আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছে।
কোমেরসান্তের দাবি, ২৩ মে তারা সংশ্লিষ্ট মামলার নথি দেখেছে। নথির বরাতে কোমেরসান্ত জানিয়েছে, কয়েকজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাশিয়া ২০০৩ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রভাবশালী প্রচারক রুসলান অস্তাশকোও এই অভিযোগ পুনরাবৃত্তি করেছেন। তিনি আলেমদের নতুন ‘পঞ্চম স্তম্ভ’ হিসেবে দেখান, যারা ‘বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা’ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন।
তিনি হুমকির সুরে বলেন, প্রশ্নটি বাড়ছে- এটি কি একটি ধর্মীয় কাঠামো, নাকি বিদেশ থেকে
নিয়ন্ত্রিত একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক?
১৯ মে উগ্র-ডানপন্থি চ্যানেল ‘সন্স অব মনার্কি’ লিখেছে, সাহসী রুশ নিরাপত্তা বাহিনী অবশেষে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে, যারা রাশিয়ায় ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিভেদ উসকে দিচ্ছে। তারা আরও লিখেছে, আমি আশা করি এটি কেবল শুরু!
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার মুসলিম আলেমদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত একটি মামলা সামনে আসে গত ২৯ মে। এটি ছিল ডিইউএম চেয়ারম্যান মুফতি রাভিল গনুতদিনের প্রথম ডেপুটি দামির মুখেতদিনভের বিরুদ্ধে। তিনি ‘ঘৃণা বা শত্রুতা উসকে দেয়ার’ অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ব্যবসায়িক দৈনিক আরবিসি।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে দমন অভিযানের ইঙ্গিত
গত মে মাসের শুরুতে রাভিল গনুতদিন আবাসিক ভবনে ধর্মীয় সমাবেশ ও জামাতবদ্ধ নামাজ কার্যত নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত একটি বিলের প্রতিবাদে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে আবেদন জানান।
এই বিলটি ২০২৪ সালে উত্থাপিত হয় এবং শাসক দলের বিশিষ্ট রাজনীতিক পিওতর তলস্তয়, জ্যেষ্ঠ এমপি সের্গেই মিরোনভ এবং এলডিপিআর নেতা লিওনিদ স্লুতস্কির সমর্থন পায়।
নির্বাসিত পত্রিকা নোভায়া গাজেতা গত ১১ মার্চ পূর্বাভাস দিয়েছিল, এর মানে এবার বিলটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ।
এরপর ৬ মে পুতিনের কাছে খোলা চিঠিতে গনুতদিন বলেন, এর মানে হলো কেবল নিবন্ধিত বাসিন্দারাই অ্যাপার্টমেন্টে নামাজ পড়তে পারবেন। এমনকি আপনি যদি আত্মীয় বা বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে একসঙ্গে নামাজ পড়েন, তবুও আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।
নির্বাসিত গণমাধ্যম নোভায়া গাজেতা ইউরোপা বলেছে, বিলটিতে ‘অভিবাসীবিরোধী প্রবণতা’ রয়েছে এবং ২০২৩ সালে দেশজুড়ে মুসলিম উপাসনালয়ে চালানো একাধিক ‘অভিযান’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
রাশিয়ায় দুই কোটিরও বেশি মুসলিম বাস করে, যা ইউরোপের মধ্যে বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা এবং তাদের অধিকাংশই দেশটির উত্তর ককেশাস ও ভলগা অঞ্চলে বাস।

Friday, June 12, 2026
প্রথম বিশ্বযুদ্ধকেও ছাড়িয়ে গেল রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত
গত বৃহস্পতিবার সেই অচিন্তনীয় বিষয়টিই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ আজ ১,৫৬৯তম দিনে পদার্পণ করেছে, অর্থাৎ এই সংঘাত ৪ বছর ৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এর মাধ্যমে স্থায়িত্বের দিক থেকে এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে পেছনে ফেলে দিল।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেনে সেনা পাঠিয়েছিলেন, তখন তার ধারণা ছিল মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দেশটির পতন ঘটবে। কিন্তু ইউক্রেনীয় বাহিনী রুশ সেনাদের প্রতিহত করার পর যখন এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে রূপ নেয়, তখন খোদ যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা লড়াকু সৈনিকেরাও ভাবেননি যে এই সংঘাত এতটা দীর্ঘ হবে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের ছদ্মনাম ‘ফ্রান্স’ ব্যবহার করা এক ইউক্রেনীয় সেনা বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম বড়জোর দুই বা তিন বছর চলবে, তারপর রাজনীতিবিদরা কোনো একটি সমঝোতায় পৌঁছাবেন।’
কিন্তু যুদ্ধ থামেনি। শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় অদূর ভবিষ্যতে এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণও নেই। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ইউক্রেনীয় বিশ্বাস করেন যে আগামী বছরের আগে এই যুদ্ধ শেষ হবে না। আর তেমনটা হলে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্থায়িত্বের (৬ বছর) কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। অনেক ইউক্রেনীয় অবশ্য মনে করেন, এই যুদ্ধ আসলে ২০১৪ সালেই শুরু হয়েছিল, যখন রুশ সেনারা ক্রিমিয়া দখল করে নেয়।
আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে দুই যুদ্ধের প্রভাব
ইতিহাসবিদরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে এই সংঘাতের হুবহু তুলনা করার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্বযুদ্ধের পরিধি ছিল বৈশ্বিক এবং সেখানে একাধিক যুদ্ধক্ষেত্র ও বিশাল সেনাবাহিনী জড়িত ছিল, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির তুলনা করা কঠিন। তাছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
তবুও, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো ইউক্রেন যুদ্ধও আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে মনে করেন ইউক্রেনীয় ইতিহাসবিদ ইয়ারোস্লাভ রিৎসাক। দুটি যুদ্ধই সামরিক জোটের পুনর্গঠন এবং গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর মাধ্যমে ইউরোপের ভূরাজনীতিকে বদলে দিয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, উভয় যুদ্ধই প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে যুদ্ধকৌশলের ধরন বদলে দিয়েছে। এক শতাব্দী আগে যেখানে যুদ্ধবিমান এবং ট্যাঙ্কের আবির্ভাব ঘটেছিল, আজ সেখানে আকাশ, সমুদ্র এবং স্থলে ড্রোনের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। দুই ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির এই অগ্রগতি মানুষের জন্য যুদ্ধকে আরও বেশি নির্মম করে তুলেছে।
ফরাসি সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল ও সামরিক ইতিহাসবিদ মিশেল গোয়া বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই ইউক্রেনের এই যুদ্ধটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।’
শুরুর ধাক্কা থেকে ট্রেন্স যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি
উভয় যুদ্ধের শুরুর দিকের কৌশলে দারুণ মিল রয়েছে। ১৯১৪ সালে জার্মানি দ্রুত প্যারিস দখলের উদ্দেশ্যে একটি ঝটিকা অভিযান শুরু করেছিল। ২০২২ সালে কিয়েভ অভিমুখে রাশিয়ার অভিযানের উদ্দেশ্যও ছিল একই। দুই ক্ষেত্রেই আক্রমণকারীরা লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
পরবর্তীতে দুটি যুদ্ধই একটি স্থবির ও প্রায় হিমায়িত ফ্রন্টলাইনে পরিণত হয়। ২০২২ সালের শেষের দিকে যখন ইউক্রেনীয় সেনারা পরিখা এবং বাঙ্কারে অবস্থান নেয়, তখন ইতিহাসবিদরা একে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আমলের 'ট্রেঞ্চ ওয়ারফেয়ার'-এর প্রত্যাবর্তন হিসেবে আখ্যা দেন।
পূর্ব ইউক্রেনের পরিখাগুলোর দৃশ্য এক শতাব্দী আগের উত্তর ফ্রান্সের যুদ্ধক্ষেত্রের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল। ইউক্রেনীয় এবং রুশ সেনারা মাত্র কয়েকশ গজ দূরত্বে অবস্থান করত, কখনও কখনও একে অপরকে দেখাও যেত। তীব্র কামানের গোলাবর্ষণের মাধ্যমে শত্রুকে কোণঠাসা করে পদাতিক বাহিনী দিয়ে পরিখা দখল করাই ছিল প্রধান কৌশল।
মিশেল গোয়া বলেন, ‘সাধারণত ফ্রন্টলাইন যখন স্থবির হয়ে যায়, তখন আপনি আবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধেই ফিরে যান।’ তিনি আরও যোগ করেন, কামানের গোলার তীব্রতার কারণেই মূলত দুই পক্ষ পরিখা খনন করতে বাধ্য হয়। ‘নিজেকে বাঁচাতে আপনাকে মাটির নিচে লুকিয়ে যেতেই হবে।’
ড্রোন যুগের আগমন: বদলে যাওয়া রণকৌশল
ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পরিখার সেই চেনা সমীকরণটি বদলে গেছে। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ড্রোনের নজরদারি এবং নিখুঁত হামলার কারণে উন্মুক্ত পরিখাগুলো এখন আর নিরাপদ নয়।
ইউক্রেনীয় সেনারা জানিয়েছেন, এখন টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো আরও ছোট এবং আরও গভীরে অবস্থান নেওয়া। বিশাল পরিখা ব্যবস্থার পরিবর্তে সেনারা এখন এমন ছোট ডাগআউট বা বাঙ্কারে আশ্রয় নিচ্ছে যেখানে মাত্র কয়েকজন সেনা থাকতে পারে। এই বাঙ্কারগুলো আকাশ থেকে সহজে চেনা যায় না এবং বোমার আঘাত সহ্য করার মতো গভীর।
ড্রোনের আধিপত্যের কারণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো মুখোমুখি পরিখা ব্যবস্থার পরিবর্তে এখন মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত একটি ‘কিল জোন’ তৈরি হয়েছে। এই জোনের মধ্যে যেকোনো ধরনের নড়াচড়া দেখলেই ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। ফলে এক শতাব্দী আগের মতো বিশাল সৈন্যদল নিয়ে একসঙ্গে আক্রমণ করা এখন অসম্ভব। তার বদলে মাত্র এক বা দুজন সেনা নিয়ে ছোট ছোট আক্রমণ চালানো হচ্ছে।
এমনকি ১৯১৬ সালে প্রথম ব্যবহার হওয়া ট্যাঙ্ক, যা এই যুদ্ধের প্রথম দিকেও বেশ ভীতি জাগানিয়া অস্ত্র ছিল, তা এখন ড্রোন হামলার সহজ নিশানা হয়ে উঠেছে। ফলে রণক্ষেত্রে ট্যাঙ্কের ব্যবহার অনেক কমে গেছে।
ধ্বংসযজ্ঞের তীব্রতা ও বর্তমান গতিহীনতা
রণক্ষেত্রের কৌশল বদলে গেলেও ধ্বংসের পরিমাপ কিন্তু একই রয়ে গেছে। ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইন থেকে ড্রোনের পাঠানো লাইভ ফুটেজে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই চেনা দৃশ্যই দেখা যায়—ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া গাছপালা, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি এবং কামানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া ফসলের মাঠ।
ন্যাটোর সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার ট্রান্সফরমেশন অ্যাডমিরাল পিয়েরে ভ্যান্ডিয়ার এই বসন্তে ইউক্রেন সফর শেষে জানান, ড্রোনের ব্যবহার ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতোই মারাত্মক ও প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
এই যুদ্ধ কতটা ধীরগতির হয়ে পড়েছে তা রাশিয়ার অগ্রযাত্রার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্প্রতি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর পোক্রোভস্ক দখলে রাশিয়ার দৈনিক গড় অগ্রযাত্রা ছিল মাত্র ৭৫ গজ—যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ‘ব্যাটল অব দ্য সোম’-এর অগ্রগতির চেয়েও ধীরগতির।
অচলাবস্থা ভাঙার উপায় কী?
প্রশ্ন হলো, এই অচলাবস্থা কে ভাঙবে? প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনী জার্মানির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং একের পর এক সামরিক চাপ প্রয়োগ করে জয়লাভ করেছিল।
ইউক্রেনের বর্তমান কৌশলও কিছুটা সেই পথেরই প্রতিফলন। রাশিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তেল শোধনাগার ও সম্পদগুলোর ওপর ড্রোন হামলা চালিয়ে মস্কোর যুদ্ধকালীন তহবিল সংকটে ফেলার চেষ্টা করছে কিয়েভ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো বিশাল সৈন্যবাহিনী দিয়ে আক্রমণ করার মতো জনবল ইউক্রেনের নেই, তবে তারা যুদ্ধক্ষেত্রকে ছোট ছোট আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে, যাতে রুশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন করা যায়।
ইতিহাসবিদ রিৎসাক সংক্ষেপে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটি মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধই, তবে ড্রোনের সংস্করণে।’ -নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

Sunday, May 24, 2026
রাশিয়ায় দেখা গেল আগামী বছরের বিশ্ব ফ্যাশনের একঝলক by সুমন ইউসুফ
মস্কো ফ্যাশন উইক ২০২৫-এর আসর বসেছিল রাশিয়ার মস্কোর জারইয়াদিয়া পার্কে। ২৮ আগস্ট ২০২৫ থেকে ২ সেপ্টেম্বর ৬ দিনের এই আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোয়ে রাশিয়ার মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ, কাজান, ইয়াকুতস্ক থেকে শুরু করে আর্মেনিয়া, নিকারাগুয়া, ব্রাজিল, চীন ও ভারতের ডিজাইনাররা মিলে যেন এক নতুন বিশ্বভাষা তৈরি করলেন, যার নাম ফ্যাশন।
ছয় দিনের এই ফ্যাশন মিলনমেলায় শহরটি রূপ নিয়েছিল নন্দননগরীতে। পার্কিং গ্যালারির আর্ট স্পেস, ভাসমান সেতুর ওপর স্বচ্ছ আকাশ, ঐতিহাসিক কিতাইগারোদস্কাম, পুশকিন স্টেট মিউজিয়াম, লিও তলস্তয় স্টেট মিউজিয়াম, বলোতনাইয়া স্কয়ার—এসব স্থান ফ্যাশনের ছন্দে হয়ে উঠেছিল একেকটি কবিতা।
যেখানে ঐতিহ্য, প্রযুক্তি ও সৃষ্টিশীলতা মিলেমিশে তৈরি করেছে পোশাকের নতুন নকশা আর ভাবনা। একই সঙ্গে ২৮ থেকে ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্রিকস+ ফ্যাশন সামিট। যেখানে বিশ্বের উদ্ভাবনী ডিজাইনার, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকেরা মিলিত হয়েছিলেন। আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ভবিষ্যৎ ফ্যাশনের পথরেখা।
এ বছরের ফ্যাশন উইকের একটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল ওয়াইল্ডবেরিজ প্রদর্শনী, যেটা রাশিয়ার সমৃদ্ধ আঞ্চলিক ঐতিহ্য উদ্যাপন করে। এই কিউরেটেড প্রদর্শনীতে ছয়জন রুশ ডিজাইনার অংশ নেন, যাঁরা তাঁদের আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পোশাক বানান।
এর বাইরে যে কজন ডিজাইনার প্রশংসা পেয়েছেন মস্কো ফ্যাশন উইকে, তার মধ্যে অন্যতম মান্দ্রাগর এআইয়ের সংগ্রহ। ভাসমান সেতুর ওপর যেন গড়ে উঠেছিল এক মায়াবী বন, যেখানে পাইয়োটা ইলিভ চাইকোভস্কির অসমাপ্ত অপেরা মিশে গিয়েছিল ডিজিটাল জাদুর ছোঁয়ায়।
সেন্ট পিটার্সবার্গের লস্ট জিনোম, মস্কোর ক্যাটিস কিডস, গুয়াতেমালার মারিয়ান্দ্রে গাইটান লস্ট, দ্য নয়ার কোলেকটিভ ফ্যাশনের র্যাম্পে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছরও তাঁদের পোশাকের নকশা অনুসরণ করবেন অনেকেই। পিটার্সবার্গের জিনোম লিলি ফুলের পবিত্রতায় খুঁজেছে শক্তি ও জ্ঞান। যুক্তরাষ্ট্রের পিয়া লিন্ডসে স্টুডিও উপস্থাপন করেছে নারীর আত্মবিশ্বাসের নিখাদ বন্দনা।
মস্কোর সোরোকা অন কোর্স সংগ্রহ উপস্থাপন করেছে পুশকিন স্টেট মিউজিয়ামের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে। স্থানটির প্রতীকী অর্থ ছিল গভীর, কস্টিউম ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এই সংগ্রহের পোশাকগুলো অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের একটি সংলাপ তুলে ধরেছিল।
পোশাকের প্রতিটি স্তর, প্রতিটি ড্রেপ যেন বলছিল রুশ শিল্প–ঐতিহ্যের নীরব কাব্য। লিও তলস্তয় স্টেট মিউজিয়ামের শান্ত পরিবেশে মস্কোর রুবান ব্র্যান্ড উপস্থাপন করল তাদের স্প্রিং-সামার ২০২৬ সংগ্রহ। তলস্তয়ের দর্শন, প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেম এবং মানবিক সরলতার অনুপ্রেরণায় এই সংগ্রহ ছিল আত্মমগ্ন, অথচ সমসাময়িক। মস্কো ফ্যাশন উইক ২০২৫ প্রমাণ করল, ফ্যাশন এখন কেবল পোশাক নয়, এখানে ঐতিহ্য মিশে যায় প্রযুক্তির সঙ্গে আর ভবিষ্যতের ছায়া পড়ে রেশমের ভাঁজে। এভাবেই মস্কো ফ্যাশন উইক সমাপ্ত হলো আলো, ইতিহাস আর কল্পনার এক বৃত্ত সম্পূর্ণ করে। ফ্যাশন এখানে শুধু ট্রেন্ড নয়; এটি উত্তরাধিকার, এটি যেন সময়ের সঙ্গে এক অনন্ত আলাপ।
![]() |
| মস্কো ফ্যাশন উইকে ঐতিহ্য, প্রযুক্তি ও সৃষ্টিশীলতা মিলেমিশে তৈরি করেছে পোশাকের নতুন নকশা আর ভাবনা। ছবি: স্ট্রাজিন ইগোর, মস্কো |
Sunday, May 10, 2026
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় নিয়ে সংরক্ষণ করার প্রস্তাব দিলেন পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পরিবহন ও সংরক্ষণ করতে মস্কো প্রস্তুত।
মস্কোতে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে পুতিন এ কথা বলেন। তিনি বলেন, রাশিয়া ২০১৫ সালে ইরান থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম স্থানান্তর করেছিল, মস্কো সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি করতে প্রস্তুত।
সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধে জড়িত সব পক্ষই তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশটির বাইরে স্থানান্তরের বিষয়ে একমত হয়েছিল বলে জানান পুতিন। তিনি বলেন, ‘কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান কঠোর করে এবং দাবি করে যে (ইরানের) ইউরেনিয়াম শুধু মার্কিন ভূখণ্ডেই পরিবহন করতে হবে। এরপর ইরানও কঠোর অবস্থানে চলে যায়।’
মস্কো ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে জানিয়ে পুতিন আরও বলেন, যত দ্রুত সম্ভব এ যুদ্ধ শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন।
ইরান তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
![]() |
| ২০২১ সালে ইরানের পরমাণু শক্তি দিবসে প্রদর্শন করা সেন্ট্রিফিউজ। এগুলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে ব্যবহার করা হয়। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Sunday, April 26, 2026
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছেন কারা
এসব নেতার কেউ কেউ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আছেন, কেউ কেউ দমননীতির মধ্য দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছেন, আবার কেউ ক্ষমতার মেয়াদ বৃদ্ধি করতে রাজনৈতিক কৌশল ও সাংবিধানিক সংশোধনীর আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা ১০ রাষ্ট্রনেতা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
১
তেওদোরো ওবিয়াং এনগুয়েমা
১৯৭৯ সালে এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ইকুয়েটরিয়াল গিনির ক্ষমতায় আসেন তেওদোরো ওবিয়াং এনগুয়েমা। এরপর ৪৬ বছর ধরে দেশটির ক্ষমতায় টিকে আছেন তিনি। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ারও এক দশক আগে থেকে গিনির শাসনক্ষমতায় আছেন ওবিয়াং।
এনগুয়েমার ৪৬ বছরের শাসনামলে দমনপীড়ন নীতির জন্য তিনি বেশ সমালোচিত হয়েছেন। এ কারণে তাঁর শাসনামলে ইকুয়েটরিয়াল গিনি আফ্রিকার ‘উত্তর কোরিয়া’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
২
পল বিয়া
সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় আছেন এমন নেতাদের তালিকায় ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়ার অবস্থান দ্বিতীয়। তিনি ১৯৮২ সালের নভেম্বর থেকে পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশের শাসনক্ষমতায় আছেন। অর্থাৎ বিয়া ৪৩ বছর ধরে ক্ষমতায় টিকে আছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানও তিনি।
বর্তমানে পল বিয়ার বয়স ৯২ বছর। ২০১৮ সালের নির্বাচনে টানা সপ্তমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। যদিও ওই নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ আছে। পরবর্তী সাত বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হতে অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন বিয়া।
৩
ডেনিস সাসু এনগুয়েসো
সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বর্তমান রাষ্ট্রনেতাদের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে আছেন ডেনিস সাসু এনগুয়েসো। তিনি মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট। সাসু এনগুয়েসো শুরুতে ১৯৭৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
পরে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শেষে ১৯৯৭ সালে এনগুয়েসো আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন এবং তখন থেকে আজ পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে আছেন। অর্থাৎ এই নেতা সব মিলিয়ে ৪১ বছর দেশটির শাসনক্ষমতায় আছেন।
৪
ইউয়ারি মুসেভেনি
টানা পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসানের মধ্য দিয়ে ১৯৮৬ সালে উগান্ডায় ক্ষমতায় বসেছিলেন ইউয়ারি মুসেভেনি। এর পর থেকে ৩৯ বছর ধরে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে আছেন।
মুসেভিনি ২০২১ সালের নির্বাচনে বিতর্কিতভাবে ষষ্ঠ মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত হন। আগামী বছর দেশটিতে আবারও নির্বাচন হবে। ওই নির্বাচনেও সপ্তম মেয়াদের জন্য প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মুসেভিনি। বর্তমানে এই নেতার বয়স ৮১ বছর।
৫
এমোমালি রাহমন
তাজিকিস্তানের একটি সমবায় খামারের প্রধান ছিলেন এমোমালি রাহমন। সোভিয়েত ইউনিয়নে ভাঙনের পরপরই তিনি দেশটির রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। ৩৩ বছর ধরে তিনি দরিদ্র ও পাহাড়ি এ দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে এমোমালি রাহমনের বয়স ৭৩ বছর।
৬
ইসাইয়াস আফওয়ারকি
সাবেক বিদ্রোহী নেতা ইসাইয়াস আফওয়ারকি ৩২ বছর ধরে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের দেশ ইরিত্রিয়ার শাসনক্ষমতায় আছেন। ইরিত্রিয়া ১৯৯৩ সালে ইথিওপিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে এই নেতার বয়স ৭৯ বছর।
৭
আলেকসান্দার লুকাশেঙ্কো
১৯৯৪ সাল থেকে বেলারুশের রাষ্ট্রপ্রধান আলেকসান্দার লুকাশেঙ্কো। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত বেলারুশের এই শাসক। ৭১ বছর বয়সী আলেকসান্দার লুকাশেঙ্কো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
সোভিয়েত যুগের দমননীতি ব্যবহার করে লুকাশেঙ্কো ইউক্রেনের প্রতিবেশী দেশ বেলারুশে ৩১ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছেন।
৮
ইসমাইল ওমর গেলে
ইসমাইল ওমর গেলে ১৯৯৯ সাল থেকে জিবুতির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অর্থাৎ ২৬ বছর ধরে তিনি দেশটির শাসনক্ষমতায় আছেন। ২০২১ সালে তিনি পঞ্চম দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২৬ সালে দেশটিতে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। বর্তমানে ওমর গেলের বয়স ৭৮ বছর। গত মে মাসে দ্য আফ্রিকা রিপোর্টের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন কি না? জবাবে ওমর গেলে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তবে ওই নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলে তাঁকে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
৯
ভ্লাদিমির পুতিন
ভ্লাদিমির পুতিন ২৬ বছর ধরে রাশিয়াকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পুতিন ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। পুতিন তখন থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে রাশিয়ার সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, ওই সময় কোনো প্রেসিডেন্টের পরপর দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালনের সুযোগ ছিল না।
পুতিন তখন প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ করে দেন। ২০১২ সালে পুতিন আবারও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
২০২০ সালে এসে আবারও ধারাবাহিক দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট না থাকার সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়েন পুতিন। তবে তখন তিনি সংবিধান সংশোধন করেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর কমপক্ষে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১০
পল কাগামে
রুয়ান্ডার সাবেক তুতসি বিদ্রোহী নেতা পল কাগামে ১৯৯৪ সালে তুতসিবিরোধী গণহত্যার অবসানে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। এরপর ২০০০ সালের এপ্রিলে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট হন।
ওই সময় থেকে মধ্য আফ্রিকার ছোট দেশ রুয়ান্ডার শাসনক্ষমতায় আছেন পল কাগামে। অর্থাৎ পল কাগামে ২৫ বছর ধরে রুয়ান্ডাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তথ্যসূত্র: এএফপি, আল–জাজিরা, বিবিসি
![]() |
| ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি |
Monday, April 13, 2026
রুশ দার্শনিকতা by অনীলা শহজাদ
পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আসে কঠোর মার্ক্সবাদ, সমাজতন্ত্র, সমতাবাদ, এবং লেনিন ও ট্রটস্কির বিপ্লবী চিন্তা। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, রাশিয়াকে তার রাজনৈতিক দর্শন পুনর্গঠনের পাশাপাশি নতুন এক একমেরু বিশ্বে নিজের পরিচয় খুঁজে নিতে হয়।
সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ের গোয়েন্দা প্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভগেনি প্রিমাকভ একমেরুতার বিপরীতে বহুমেরুতার পক্ষে যুক্তি দেন- সেই সময় যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের একমাত্র আধিপত্যশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছিল।
প্রিমাকভ মতবাদ বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন একমেরু বিশ্ব অস্থিতিশীল ও অন্যায্য; শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, মূলত অসম্ভব। তিনি রাশিয়া, চীন ও ভারতের মধ্যে একটি ‘কৌশলগত ত্রিভুজ’-এর স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে ভারসাম্যে রাখবে এবং ইউরেশিয়ার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। প্রিমাকভ স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের কমনওয়েলথ (সিআইএস) অঞ্চলকে রাশিয়ার কৌশলগত বলয় হিসেবে দেখতেন এবং পশ্চিমা হস্তক্ষেপবাদে দৃঢ়ভাবে আপত্তি করতেন। বিধ্বস্ত সোভিয়েত পরবর্তী বাস্তবতায় তিনি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার এবং বাস্তববাদী সহযোগিতা ও অনাক্রমণনীতিতে নির্ভর করার শিক্ষা নেন।
তার পরের প্রজন্মে আসেন আধুনিক রুশ রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আলেকজান্ডার দুগিন, যাকে অনেকেই ‘পুতিনের মস্তিষ্ক’ বলে উল্লেখ করেন। দুগিন প্রিমাকভের বহুমেরুতার ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি রুশনেতৃত্বাধীন ইউরেশীয় সভ্যতার ধারণা দেন, যা পশ্চিমা আটলান্টিকতাবাদের বিপরীতে দাঁড়ায়। তার মতে, রাশিয়া ‘প্ল্যাটফর্মভিত্তিক বহুমেরুতার’ ধারণার নেতৃত্ব দিচ্ছে- যেখানে ব্রিকস, এসসিও ও স্পিফ-এর মতো কাঠামো পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প হয়ে উঠেছে। দর্শনগতভাবে তিনি পশ্চিমা উদারনীতির ‘সর্বজনীনতার’ ধারণার পরিবর্তে ‘সভ্যতাগত বহুত্ববাদ’ স্থাপন করেন, যা প্রতিটি জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়কে স্বীকার করে।
দুগিন পশ্চিমের পতন সম্পর্কেও এক থিসিস উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, পশ্চিমের ‘অতিরিক্ত ব্যক্তিবাদ’ই তার ধ্বংসের কারণ। প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন ও নামমাত্রবাদী দর্শন, যা সার্বজনীন সত্যের পরিবর্তে কেবল ব্যক্তিগত বাস্তবতায় বিশ্বাস করেছিল, পশ্চিমকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার পথে ঠেলে দেয়। ফলস্বরূপ একে একে সমষ্টিগত কাঠামোগুলি- ক্যাথলিক চার্চ, সাম্রাজ্য, জাতিরাষ্ট্র এবং পরিবার- অগ্রাহ্য হতে থাকে। উদারনীতি হয়ে ওঠে ‘সমস্ত সমষ্টিগত পরিচয় ও কর্তৃত্ব থেকে মুক্তির আন্দোলন’। ব্যক্তির সুখ, আনন্দ ও তৃপ্তিই হয়ে ওঠে মূল লক্ষ্য। আর এই ব্যক্তির পূজাই, দুগিনের মতে, পশ্চিমা সভ্যতার আত্মবিনাশ ডেকে এনেছে।
এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার আগুন এখনো থামেনি। এর বিবর্তনে পশ্চিম এগিয়েছে খ্রিস্টধর্ম থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্রাজ্য থেকে জাতিরাষ্ট্র, জাতিরাষ্ট্র থেকে বৈশ্বিক নাগরিক সমাজ, এবং পরিবার থেকে যৌন ও লিঙ্গ স্বাতন্ত্র্যবাদে। কিন্তু এই আগুন থামতে চায় না। আগে এটি সব সমষ্টিগত বা অতীন্দ্রিয় পরিচয় থেকে মুক্তি চেয়েছিল; এখন এটি ‘লিঙ্গ’ পরিচয় থেকেও মুক্তি চাইছে।
দুগিন বলেন, পুরুষ/নারী ঐতিহ্যবাহী পরিচয় বিলুপ্ত করার পর, এই উন্মাদনা পরবর্তী ধাপে ‘মানব পরিচয়’-কেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে- মানুষ হওয়া কি প্রয়োজন? এই ‘ট্রান্সহিউম্যানিজম’ ব্যক্তিকে মানবতার ধারণা থেকে মুক্তি দেবে, আর ‘পোস্টহিউম্যানিজম’ হবে এমন এক যুগ, যেখানে মানুষ তার সার্বজনীনতাকে হারিয়ে ফেলবে এবং ‘বাস্তবতা’ থেকেও মুক্তি চাইবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ভার্চুয়াল বাস্তবতার আগমনের সঙ্গে এই মুক্তি আরও গভীর হবে- যেখানে মানুষ কোনো বাস্তব জগতেই আর বাঁচতে চাইবে না। দুগিন বলেন, এটি হবে মানব সভ্যতার শেষ ধাপ- ‘মানুষ হতে চাও বা না চাও- এই স্বাধীনতাই হবে উদারনীতির চূড়ান্ত পরিণতি।’
তিনি যুক্তি দেন, প্রাচীন উদারনীতি যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও যুক্তিনির্ভর ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে ছিল, সেখানে আধুনিক উদারনীতি- অর্থাৎ ‘ওয়োক প্রগ্রেসিভিজম’- সংখ্যালঘুর শাসন প্রতিষ্ঠা করছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর, যাকে এখন ‘পপুলিজম’ বা ‘ফ্যাসিবাদ’ বলে অপমান করা হয়। ফলে গণতন্ত্রের মূল আদর্শটাই উল্টে যাচ্ছে- যে সাধারণ মানুষের ভোটই স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই আজ প্রত্যাখ্যাত। ওয়োক সংস্কৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠের ঐকমত্যকে অবজ্ঞা করে নিজেই হয়ে উঠেছে নতুন এক ‘বুদ্ধিবাদী স্বৈরতন্ত্র’।
দুগিন বলেন, মানবজাতি এখন ব্যক্তিস্বাধীনতার ৫০০ বছরের যাত্রার ‘শেষ স্টেশনে’ পৌঁছেছে। এআই, সাইবারনেটিক উন্নয়ন, ডিজিটাল চেতনা- সবই মানুষকে মানব পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। এই পোস্টহিউম্যান ফিউচারিজম কোনো কল্পনা নয়, বরং এক রাজনৈতিক ও দার্শনিক প্রকল্প, যেখানে প্রগতিশীলতা কেবল পছন্দ নয়, বরং বাধ্যতামূলক।
পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা তাদের ভবিষ্যৎ ইতিমধ্যেই লিখে ফেলেছেন- ‘এবং সেটি অন্ধকার।’
এখন প্রশ্ন হলো- পশ্চিমের সাধারণ মানুষ কি এই সমস্যাকে বুঝছে? তারা কি উপলব্ধি করছে যে তাদের সামাজিক কাঠামোর ভেতরের এই ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’ কোনো রাজনৈতিক চাল নয়, বরং এক অস্তিত্বের যুদ্ধ- মানবতা টিকবে না বিলীন হবে তার লড়াই? এই আত্ম-অগ্নিসংযোগ, পরিচয়ের সন্ধানে পরিচয় হারানোর যাত্রা, শেষমেশ প্রত্যেক মানুষকে এক নিঃসঙ্গ, আত্মমগ্ন শূন্যতায় ঠেলে দেবে- যার তিক্ততা হয়তো তাকে ধ্বংস করবে, নয়তো ফিরিয়ে আনবে বিশুদ্ধ সম্পর্ক, বিশুদ্ধ নীতি ও বিশুদ্ধ মানবতা।
দুগিন মনে করেন, পশ্চিমের পুতিনবিদ্বেষের মূল কারণও এখানেই- পুতিনের প্রগতিশীল ও গ্লোবালিস্ট চিন্তা থেকে সরে গিয়ে তিনি ঐতিহ্য, খ্রিস্টান বিশ্বাস এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো পরিচয়ের দিকে ঝুঁকেছেন। আধুনিক রাশিয়ান রাজনীতি পরিবার, দেশপ্রেম ও সভ্যতাগত স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকৃতি দেয়।
আজকের যুদ্ধ আর পুঁজিবাদ বনাম সাম্যবাদের নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষাকারী ঐতিহ্যবাদ বনাম মানব বিলুপ্তির প্রগতিবাদ। এই যুদ্ধ একসঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও দার্শনিক সব ক্ষেত্রেই চলছে। আর মানবজাতির সামনে প্রশ্ন হলো- নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের কতটুকু আমরা ‘পরীক্ষার’ নামে ত্যাগ করতে পারি? ব্যক্তিস্বাধীনতা কি এতদূর যেতে পারে যে, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যার সব সীমারেখাই মুছে যায়? নাকি যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রোগ ও ক্ষুধায় ভরা এই বিশৃঙ্খল মানবসমাজ এখনো কিছুটা হলেও টিকে আছে- তার নিজের সামান্য, ত্রুটিপূর্ণ সততা, বিশ্বাস ও শৃঙ্খলার ওপর?
(অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন থেকে অনুবাদ)
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...










