Monday, March 2, 2015

মা-মেয়ে দগ্ধ, সংকটে পরিবার- শায়েস্তাগঞ্জে ট্রেনে পেট্রলবোমা হামলা by উজ্জ্বল মেহেদী

(শনিবার রাতে শায়েস্তাগঞ্জে চলন্ত ট্রেনে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন আমেনা বেগম (বাঁয়ে)। তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন বলে চিকিৎ​সকেরা জানিয়েছেন। পাশের শয্যায় মা–ও যন্ত্রণায় কাতর। ছবি দুটি সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট থেকে গতকাল সকালে তোলা l প্রথম আলো) ‘আমি বাঁচমুনি?...আমি তো মনে অয় আর বাঁচতাম না!’ অস্ফুট স্বরে গোঙানির মতো করে কথা কটা বলছিলেন আমেনা বেগম (২৫)। আর তাঁর পাশের শয্যায় মা মায়া বেগম (৫০)। আক্রান্ত মাও। মেয়ের কথা শুনে তিনি যেন সান্ত্বনার কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। নিজের যন্ত্রণা ছাপিয়ে কাঁদছিলেন শুধু মেয়ের জন্য।
মা-মেয়ে দুজনই সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। চলন্ত ট্রেনে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন তাঁরা। মেয়ের মুখ-চোখ আর মায়ের বাঁ হাতে দগ্ধ, ক্ষত। গত শনিবার রাত নয়টার দিকে সিলেটগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের একটি বগিতে দুর্বৃত্তরা পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করলে দগ্ধ হন মা-মেয়ে। রাতেই দুজনকে সিলেটে পাঠানো হয়।
গতকাল রোববার দুপুরে মা-মেয়ের শয্যাপাশে গেলে মেয়ের অস্ফুট স্বরে গোঙানি আর মায়ের কান্না ছাড়া তাঁদের আর বলার মতো যেন কিছুই ছিল না। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার এরাইলা গ্রামে তাঁদের বাড়ি। মেয়ে আমিনা হবিগঞ্জের লাখাইয়ের একটি ক্লিনিকে মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা বেতনে আয়া পদে চাকরি করেন। মা মায়া গৃহকর্মী। কুমিল্লার এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন তাঁরা। রাতে ট্রেনে করে ফিরছিলেন। ওই বগিতে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে গল্প করার সময় হঠাৎ দগ্ধ হন তাঁরা। মায়া বলেন, ‘কোচ্ছু (কিছুই) কইতে পারি না। হাত পুড়ছিল, চাইয়া দেখি মেয়ের মুখ ঝলসি গেছে!’
রাতেই দুজনকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পাঠানো হয় সিলেট ওসমানী হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। গতকাল বিকেলে তাঁদের অবস্থা সম্পর্কে ওসমানী হাসপাতালের উপপরিচালক মো. আবদুছ ছালাম প্রথম আলোকে জানান, আমেনার মুখ, কান, চোখ ও গলার একাংশে দগ্ধ। মায়ার বাঁ হাতের কনুই পর্যন্ত পুড়েছে। এর মধ্যে আমেনার অবস্থা সংকটাপন্ন। ২৪ ঘণ্টা পর তাঁর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়টি জানানো হবে।
মা-মেয়ের রোজগারে চলে সংসার। আমেনার বাবা বছর কয়েক আগে মারা গেছেন। পরিবারে তাঁর ছোট দুই ভাই রয়েছে। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, অপরজন বাক্প্রতিবন্ধী। তাঁদের (মা-মেয়ের) এই অবস্থায় পরিবারটি কীভাবে চলবে, সে চিন্তায় মায়া বেগমকে বেশি উদ্বিগ্ন দেখা গেল। ‘আমি তো বাসা-বাড়িত কাম-কাজ করি। মেয়েটা তো মাস পুরলে টেখা পায়। ই-অবস্থায় আমি মেয়েরে দেখমু না পরিবার চালাইমু?’ কেঁদে কেঁদে এভাবেই বলছিলেন মায়া বেগম।
শায়েস্তাগঞ্জ ও শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা যায়, শনিবার রাত নয়টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে সিলেট অভিমুখী আন্তনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ প্রবেশকালে দুর্বৃত্তরা একটি বগি লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে। বগির জানালা খোলা থাকায় পেট্রলবোমায় মা ও মেয়ে ছাড়াও দগ্ধ হন মাধব রুদ্র (৩০) নামের আরেক যাত্রী।
ঘটনার তদন্তের দায়িত্বে থাকা শ্রীমঙ্গল জিআরপি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইফতেখার উদ্দীন চৌধুরী জানান, হামলার পর শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশের সহায়তায় ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হবিগঞ্জের সাটিয়াজুড়ি ইউনিয়ন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. নোমান হোসেনসহ ছয়জনকে আটক করা হয়েছে।

জুয়ার আখড়ায় বাংলাদেশ দলের ম্যানেজারও!

জুয়ার বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে খালেদ মাহমুদসহ তিনজন। ছবি: মাছরাঙা টিভি
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচের আগে জুয়ার আখড়ায় (ক্যাসিনো) যাওয়ার অভিযোগে পাকিস্তান দলের প্রধান নির্বাচক মঈন খানকে দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে পিসিবি। এবার একই অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদের বিরুদ্ধেও। খবরটি নিয়ে এরই মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
বেসরকারি টিভি চ্যানেল মাছরাঙায় ক্যাসিনোতে যাওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন খালেদ মাহমুদ। টিভি সংবাদে জানা যায়, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলবোর্নের একটি ক্যাসিনোতে কয়েকজন প্রবাসীর সঙ্গে দেখা গিয়েছে খালেদকে। টিভি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি জুয়ার বোর্ডের সামনে দুজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে জুয়া খেলা দেখছেন তিনি। মাছরাঙা কথা বলেছে দুজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে। তাঁরা দাবি করেন, বাংলাদেশ দলের ম্যানেজারকে জুয়া খেলতে দেখেছেন।
ওই টিভি চ্যানেলকে খালেদ মাহমুদ বলেছেন, ‘খেলার পর তো আমরা খেতে যাই। সেখানে গিয়েছিলাম খেতে।’ তবে তিনি দাবি করেন, জুয়া খেলায় অংশ নেননি। এমন ঘটনায় সাধারণত নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দলে। খালেদ অবশ্য তা মনে করেন না, ‘আমি তো আর দলে খেলি না। আমার কারণে দলে প্রভাব পড়বে, এমন কিছু নয়। আমার সম্পর্কে খেলোয়াড়দের ভালো ধারণা আছে। মনে করি না, এটা অনেক বড় ইস্যু। আসলে খাওয়ার জায়গার সঙ্গেই ওই ক্যাসিনো।’
কদিন আগেই টিম ম্যানেজমেন্টের অনুমতি ছাড়া রাতে হোটেলের বাইরে যাওয়ার অপরাধে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বাংলাদেশ দলের পেস বোলার আল আমিন হোসেনকে। আল আমিনের প্রসঙ্গ তুলতেই টিভি চ্যানেলকে বাংলাদেশ দলের সাবেক এ অধিনায়ক বললেন, ‘আল আমিন একজন খেলোয়াড়। তার জন্য অবশ্যই নিয়মনীতি রয়েছে। নিয়মনীতি সম্পর্কে আমি ভালোই অবগত আছি। আমার খাওয়ার দরকার ছিল, খেতে গিয়েছি। দলের ম্যানেজার হিসেবে আমাকে কাউকে বলতে হবে, সেটা মনে করি না।’

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন ফারাবী গ্রেপ্তার

(বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যার প্রধান সন্দেহভাজন শফিউর রহমান ফারাবীকে আটক করেছে র‍্যাব। ছবিটি সোমবার উত্তরায় র‌্যাব কার্যালয় থেকে তোলা। ছবি: সাজিদ হোসেন) বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যার অন্যতম সন্দেহভাজন শফিউর রহমান ফারাবীকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। আজ সোমবার দুপুরে র‍্যাব সদর দপ্তরে সংবাদ ব্রিফিং করে এ তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান জানান, আজ সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ফারাবীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ফারাবী তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি মাহমুদ খান জানান, কোনো অপরাধীই প্রথমে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে না। জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে; তবে কৌশলগত কারণেই এখনই সব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না বলে জানান র‍্যাবের এই কর্মকর্তা।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ফারাবী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করতেন। তবে তিনি পড়াশোনা সম্পন্ন করতে পারেননি। প্রথমে তিনি বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখি করতেন, পরে নিজের নামে ‘ফারাবী ব্লগ’ চালু করেন।
র‍্যাবের ভাষ্য, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফারাবী দাবি করেছেন, ব্লগে লেখালেখির সূত্রে অভিজিৎ রায়ের লেখার সঙ্গে তিনি পরিচিত হন। একপর্যায়ে লেখালেখি নিয়ে অভিজিতের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ দেখা দেয়। অভিজিৎ​ দুই বছর আগে ফারাবীকে ‘ব্লক’ করে দেন। কিন্তু ফারাবী থেমে থাকেননি, বিভিন্ন মাধ্যমে অভিজিতের কাছে বার্তা পাঠাতেন ও হুমকি দিতেন।
র‍্যাব জানায়, অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ফারাবীর সম্পৃক্ততার নানা তথ্য-প্রমাণ তারা পেয়েছে। যেমন অভিজিৎ রায় ও তাঁর পরিবারের বিভিন্ন তথ্য ফারাবী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অনুসারীদের মাঝে প্রচার করতেন। তাঁকে হত্যার জন্য উসকানি দিতেন। ফারাবী তাঁর ফেসবুকে জানিয়েছেন, অভিজিৎ রায় তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে যু​ক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তাঁর ব্যাপারে যু​ক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তাঁর অনুসারীরা খোঁজখবর রাখছেন। আরেকবার ফারাবী অভিজিতের পরিবারের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে বলেছেন, ‘অভিজিৎ রায় যু​ক্তরাষ্ট্রে থাকে। তাই তাকে এখন হত্যা করা সম্ভব না। তবে সে যখন দেশে আসবে, তখন তাকে হত্যা করা হবে।’
সংবাদ ব্রিফিংয়ের সময় শফিউর রহমান ফারাবীকে র‍্যাবের সদর দপ্তরে হাজির করা হয়।
বিকেলে ফারাবীকে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অভিজিতকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হামলার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ গুরুতর জখম হন। তিনি এখন রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
অভিজিতের ঘনিষ্ঠজনদের অভিযোগ, লেখালেখি করার কারণে তাঁকে বিভিন্ন সময় ব্লগ ও ফেসবুকে হুমকি দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে শফিউর রহমান ফারাবীও রয়েছেন।
পুলিশ জানায়, ব্লগারদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার জন্য ফারাবীকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে বেরিয়ে যান। র‍্যাবের ব্রিফিংয়েও আজ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
অভিজিৎ খুনের ঘটনায় তাঁর বাবা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক অজয় রায় বাদী হয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ থানায় মামলা করেছেন। মামলায় তিনি কোনো আসামির নাম বা কোনো কারণ উল্লেখ করেননি। প্রথম আলোকে তিনি জানান, ব্লগে লেখালেখির কারণে উগ্রপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠী এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এদের মদদ দিয়েছে জামায়াত-শিবির।
অভিজিৎ হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্ব ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখাকে (ডিবি) দেওয়া হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ডিবির একাধিক সূত্র জানায়, পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে তাঁরা মনে করছেন, এ ঘটনায় কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী জড়িত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে সন্দেহের শীর্ষে রাখা হয়েছে। ডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ছাড়াও আরও কয়েকটি সন্দেহকে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। টুইটারে ‘আনসার বাংলা-৭’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে অভিজিৎ হত্যার দায় স্বীকার করার মাধ্যমে কেউ প্রকৃত ঘটনা আড়ালের চেষ্টা করছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া ফেসবুকে অভিজিৎকে হুমকিদাতা শফিউর রহমান ফারাবীকেও সন্দেহের তালিকায় রেখেছে ডিবি।
অভিজিৎ রায় ও রাফিদা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। অভিজিৎ ‘মুক্তমনা’ ব্লগের সম্পাদক ও লেখক। ‘কুসংস্কার ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে’ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৭ সালে জাহানারা ইমাম পদক পায় মুক্তমনা। রাফিদা আহমেদ লেখালেখি করেন বন্যা আহমেদ নামে। অভিজিৎ রায়ের প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী, মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে, স্বতন্ত্র ভাবনা: মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি, অবিশ্বাসের ভাইরাস।
অভিজিৎ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাস করার পর সেখানে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। আট বছর আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানকার একটি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার প্রকৌশলী তিনি। এ বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্ত্রীকে নিয়ে দেশে ফেরেন। চলতি মাসে স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল।

পাড়া মহল্লায় সংগ্রাম কমিটি গঠন করুন : খালেদা জিয়া

‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’র বিরুদ্ধে দেশের সকল পাড়ায় মহল্লায় বিশ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জোটের পক্ষে আজ সোমবার এক বিবৃতিতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস প্রতিরোধে ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্বে দেশের সকল পাড়া-মহল্লায় প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। জনগণের স্বত:স্ফুর্ত প্রতিরোধের মুখেই অবৈধ লুটেরা সরকারের পতন অনিবার্য। সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, একদলীয় সংসদ, একদলীয় জনপ্রশাসন ও একদলীয় বিচারব্যবস্থা কায়েমের নীল নকশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই আওয়ামী লীগ প্রহসণমূলক একদলীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। দৃশ্যত: রাষ্ট্রের সকল অঙ্গই এখন একীভূতভাবে শাসন বিভাগের অধীনস্থ হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের আলাদা অস্তিত্ব ও ভারসাম্যতা কার্যত এখন বিরাজমান নেই। ফলে অনিবার্যভাবেই রাষ্ট্রীয় নৈরাজ্যের কবলে নিপতিত হয়েছে দেশ ও জাতি। প্রজাতন্ত্রের জনগণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট ক্ষুন্ন হলেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমতাবস্থায় দেশের সকল স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই দেশ ও জাতিকে এই বিপন্ন অবস্থা থেকে মুক্ত করতে হবে। চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলন কারো ক্ষমতারোহণের আন্দোলন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়েই জাতির গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যতা অবশ্যই ফিরিয়ে আনতে হবে।
তিনি বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিঘ্নত করে আওয়ামী লীগ সংবিধানকেই একটি ফ্যাসিবাদী একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে বিচারপতিদের অভিশংসনের বিধান যুক্ত করে বিচার বিভাগকে পরোক্ষভাবে শাসন বিভাগ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অধীনস্থ অঙ্গে পরিণত করা হয়েছে।
সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া আওয়ামী লীগকে রক্ষা করতে এবং অবৈধ ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার কু-মানসে গণহত্যার প্রকাশ্য দাম্ভিক ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই সকল গণহত্যার হুকুমের আসামী হওয়া নিশ্চিত করেছেন। পুলিশী তাণ্ডবের কল্যাণে অবৈধ ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার আওয়ামী চক্রান্ত কখনোই সফল হবে না।
সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিব আরো বলেন, রক্ষীবাহিনীর গণহত্যাও বাকশাল এবং আপনার (প্রধানমন্ত্রী) পিতা কাউকেই রক্ষা করতে পারেনি। অতএব, গণহত্যা, দমণ-পীড়ণ, জুলুম-নির্যাতন বন্ধ করুন।
তিনি বলেন, অবিলম্বে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিতকল্পে নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের গণদাবির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শণ করুন। তাহলেই আপনাদের নিরাপদ অবতরণের বিষয়টি জনগণ সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করবে।

টার্নিং পয়েন্ট হবে কোনটি? by সাজেদুল হক

হ্যামলেটের হাতে খুন হন মন্ত্রী। মৃত্যু হয় প্রেমিকা ওফেলিয়ারের। সব শেষে আবার মৃত্যু। এনকাউন্টারের শব্দ। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। উইলিয়াম শেকসপিয়ারের হ্যামলেট নাটকের দৃশ্যপট ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। মৃত্যুর মিছিল চলছে। পেট্রলবোমা, গুলি, লঞ্চডুবি, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মারা যাচ্ছে মানুষ। গত দু’মাসে অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন কমপক্ষে দু’শতাধিক আদম সন্তান। সর্বশেষ ব্লগার অভিজিৎ রায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ড তোলপাড় তুলেছে সারা দুনিয়ায়। তিন বন্ধুর অনলাইন কথোপকথনে বার বার ফিরে আসে বাংলাদেশের এই সময়। ঢাকা থেকে সুমন, সিডনি থেকে মহিউদ্দিন আর নিউ ইয়র্ক থেকে শারমিন যোগ দেয় এ কথোপকথনে-
শারমিন: অভিজিৎ রায়ের খুনিরা কি ধরা পড়েছে?
সুমন: না এখন পর্যন্ত আমরা এমন কোন খবর পাইনি। যদিও তুমি হয়তো জেনেছো অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় বলেছেন, পুলিশ চাইলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার ছেলের খুনিদের গ্রেপ্তার করতে পারে। এত কাছে পুলিশ থাকার পরও তার ছেলের হত্যাকাণ্ডে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বিশেষ করে এত কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতর খুন করে খুনিরা কিভাবে পালিয়ে গেলো তা নিয়ে এরই মধ্যে নানা মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বাংলাদেশে এখন এমনিতেই বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্কট চলছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে চাচ্ছেন না। এ অবস্থায় লেখক অভিজিতের নিষ্ঠুর মৃত্যু আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্কটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। আচ্ছা, মহিউদ্দিন অভিজিতের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সারা দুনিয়ায় এত তোলপাড় কেন?
মহিউদ্দিন: আমরা এখন গ্লোবাল ভিলেজে বাস করি। এ গ্লোবাল ভিলেজের কোথাও কোন একটি দুর্ঘটনা ঘটলে সবখানেই কোন না কোন প্রতিক্রিয়া হয়। তবে অভিজিতের বিষয়টি আলাদা। প্রথমত, বাংলাদেশে জন্ম হলেও তিনি একজন মার্কিন নাগরিক। যে কারণে এফবিআই তার হত্যার তদন্তে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দ্বিতীয়ত, তিনি একজন বিজ্ঞানমনস্ক লেখক। পশ্চিমা দুনিয়াতে মানুষের মত প্রকাশের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সহিংসতার মধ্যেও যে কারণে এ মৃত্যু বিশ্ব মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি স্থান পাচ্ছে। তবে আমাদের উচিত এফবিআইসহ সকলের সহযোগিতা নিয়ে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা। কারণ দোষীরা বিচারের আওতায় না আসলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
সুমন: শুধু পশ্চিমা দুনিয়া নয়, সবখানেই মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত। যে বিবেকের স্বাধীনতার কথা জন মিল্টন বলে গেছেন। মানুষ যখন মত প্রকাশের স্বাধীনতা হারায় তখন সমাজে নানা সঙ্কটের তৈরি হয়।
শারমিন: বাংলাদেশে তো প্রায় দু’মাস হলো হরতাল-অবরোধ চলছে। জাতিসংঘ, পশ্চিমা দুনিয়া সঙ্কট সমাধানের জন্য বারবার আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু দৃশ্যত কোন পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কি শুধু মুখে মুখেই উদ্বেগ প্রকাশ করছে না কোন কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। সহিংসতা বন্ধ ও সংলাপের পক্ষে তারা শক্ত কোন ভূমিকা রাখবেন কি না- তা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে না। প্রতিবেশী ভারত দৃশ্যত এখনও নীরবতা পালন করছে। তাহলে এ হরতাল-অবরোধের কি কোন শেষ হবে না?
সুমন: এ হরতাল-অবরোধের শেষ কিভাবে হবে তা আসলে সম্ভবত বাংলাদেশে কেউই জানেন না। সহিংসতা কিছুটা কমে এসেছে। সরকারের মন্ত্রী এবং তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, বিরোধীদের নির্মূল করে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনবেন। তার কিছু প্রক্রিয়া এরই মধ্যে দেখা গেছে। অন্যদিকে, বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তিনি আসলেই গ্রেপ্তার হন কি না তাই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। অনেকেই বলছেন, তার গ্রেপ্তার রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। এরই মধ্যে ঢাকার একটি আদালত তার গুলশান কার্যালয়ে তল্লাশি করতে পুলিশকে অনুমতি দিয়েছে।
মহিউদ্দিন: খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারের ব্যাপারে খুব সম্ভবত সরকার নানা ইকুয়েশন হিসাব করে দেখছে। তার গ্রেপ্তার সরকারের জন্য লাভজনক না ক্ষতিকর হবে তার অঙ্ক কষা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক চাপের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। জরুরি জমানার শেষ দিককার ইকোনমিস্টের একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সেসময় পর্দার অন্তরালে তৃতীয়পক্ষ যখন দুই নেত্রীর সঙ্গে আলোচনা করছিল, এমন একটা আলোচনাও হয় নির্বাচনে জয়ী নেত্রী পরাজিত নেত্রীকে কারাগারে পাঠাবেন না।
সুমন: তাহলে সঙ্কটের সমাধান কোথায়?
শারমিন: আপাতত সঙ্কট সমাধানের কোন পথ দেখা যাচ্ছে না। বিরোধীরা চেষ্টা করবেন তাদের আন্দোলনকে কোন একটি পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে। সরকার চেষ্টা করবে নির্মূলের। খালেদা জিয়ার ওপর চাপ বাড়ানো হবে। তবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিতে খেলা হবে একাধিক কার্ড। কোনটি টার্নিং পয়েন্ট হয় তা-ই এখন দেখার বিষয়।
লিখেছেন: সাজেদুল হক  

প্রতিবাদ যখন গাছে

বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা বন্ধের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গাছে উঠে বসে আছেন জালাল উদ্দিন মজুমদার নামে এক বৃদ্ধ। তিনি নিজেকে একজন দার্শনিক হিসেবে বর্ণনা করেন। গাছে উঠার সময় তিনি সাথে নিয়েছেন একটি হারিকেন, হ্যান্ড মাইক, দুটি ফেস্টুন ও কিছু শুকনো খাবার।
তার বক্তব্য, মানুষ মাটিতে দাঁড়িয়ে কথা বলার অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। তার প্রতিবাদেই তিনি অবস্থান নিয়েছেন গাছের ডালে। তিনি জানান, হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ করার জন্য তিনি এ কর্মসূচি পালন করছেন। তিনি আগামী ২৪ ঘণ্টা এই গাছে অবস্থান করে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবেন বলে জানান।

সব কথা সবার মুখে শোভা পায় না by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সপ্তাহটা ছিল দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ নানা ঘটনায় ভরা। ষড়যন্ত্রের অভিযোগে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না গ্রেফতার হয়েছেন। রাষ্ট্রের মতা আছে আইনের দ্বারা নাগরিকদের গ্রেফতার করার। কিন্তু যেনতেনভাবে আইনবহির্ভূত কিছু করলে মানুষ অসন্তুষ্ট না হয়ে পারে না। যদিও আমাদের দেশে এখন মানুষের অসন্তুষ্ট হওয়ার মতাও হারিয়ে গেছে। পরাধীন ভারতেও সূর্য ওঠার আগে কাউকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা যেত না। কাউকে গ্রেফতার করতে গ্রেফতারি পরোয়ানা লাগত। সাক্ষী হিসেবে প্রতিবেশী নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে হতো। ঢোকার সময় পুলিশদের দেহ তল্লাশি করে নেয়া হতো, যাতে অভিযুক্তের বাড়িতে কোনো জিনিস রেখে তাকে হ্যারাজ করতে না পারে। এখন আর আইনের কোনো বালাই নেই। সব কিছু চলছে গায়ের জোরে। যদিও এমন গাওজুরি কখনো জয়ী হয় না। অন্তঃসারশূন্য গাওজুরির পরাজয় ঠেকানোর মতা কারো নেই। ব্রিটিশ ভারতে দেখা গেছে, দেখা গেছে পাকিস্তানে। মাহমুদুর রহমান মান্না এবং সাদেক হোসেন খোকার কথোপকথনের দু-চার কথা নিশ্চয়ই আপত্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু অমন আলাপ এখন ঘরে-বাইরে সবাই করছে। কারণ, ওই ধরনের আলাপ-আলোচনার পরিবেশই এখন দেশে বিদ্যমান। সেনাবাহিনীর সাথে কথা বলা আর ষড়যন্ত্রের উসকানি দেয়া এক কথা নয়। আমাদের দেশের সেনাবাহিনী অন্য গ্রহের জীব নয়, তারা আমাদেরই সন্তান। তাই তাদের সাথে কথাবার্তা হওয়া কোনো দোষের নয়, দোষের হলো তাদের বিপথগামী করা বা বিপথগামী করার চেষ্টা করা। মাহমুদুর রহমান মান্নাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা নিশ্চয়ই আশা করব, তার সাথে আইনের ব্যবহার করা হবে। গভীর রাতে উঠিয়ে নিয়ে ২০-২২ ঘণ্টা কাউকে আড়ালে রাখা একজন মানুষের নাগরিক অধিকার হত্যার শামিল। বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশের প্রধানমন্ত্রী, তার বাবাকে কতবার গ্রেফতার করা হয়েছে। তার কন্যা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে কোনো রাজনৈতিক মানুষকে গ্রেফতারের সময় মানবিক দিকগুলো ল করবেন না- এটা ভাবতেই যেন কেমন লাগে। জনাব মান্নাকে গ্রেফতার করে যখন কোর্টে নেয়াই হলো- তখন কেন তাকে এক দিন ওভাবে লুকিয়ে রেখে তার আত্মীয়স্বজন, পরিবার-পরিজন; উপরন্তু দেশবাসীকে শঙ্কার মধ্যে রাখা হলো? এটা কি আইনের লঙ্ঘন নয়? মানবাধিকারের প্রতি অবজ্ঞা নয়? ঠিক বুঝতে পারছি না। কোনো রাজনৈতিক সরকারের রাজনৈতিক লোকদের প্রতি কেন এত রূঢ় আচরণ?
ক’দিন আগে বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক রহমান সীমা ছাড়া লাগামহীন কথাবার্তা বলে দেশবাসীকে দারুণ মর্মাহত করেছেন। আবার ইদানীং আমার ভাগ্নে সজীব ওয়াজেদ জয় কেমন যেন তার মুখে যা শোভা পায় না তাই বলে আমাদের মর্মাহত করছেন। জয় কেন ড. কামাল হোসেনকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলতে যাবেন? ওসব কথা বলার আওয়ামী লীগে কি লোকের আকাল পড়েছে? জয়-তারেকরা তো আমাদের প্রিয়। রাজনীতির বাইরেও তো একটা সম্পর্ক আছে। স্বাধীনতার পরের একটা ঘটনা বলি। এখন তো আমরা নাম-গোত্রহীন। কিন্তু ’৭২, ’৭৩ সালে আমাদের নাম ছিল বিশ্বজোড়া। রাস্তাঘাটে শত-সহস্র মানুষ ছুটে আসত, কথা বলত। ’৭২-এর শেষে অথবা ’৭৩-এর শুরুতে দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনের জন্য কয়েকজনের সাথে এক লিকলিকে ছাত্র এসে আমার মোহাম্মদপুরের বাড়িতে হাজির, দিনাজপুর ছাত্রলীগের সম্মেলনে যেতে হবে। আমি তখন খুব একটা সভা-সমাবেশে যেতাম না। ওদের হাত যে এত লম্বা জানা ছিল না। পরদিন গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা। তিনি বললেন, দিনাজপুরের সম্মেলনে সবাই তোকে চায়। তুই যা। পরদিন রওনা হয়েছিলাম ঢাকা থেকে দিনাজপুরের পথে। এখনকার মতো তখন রাস্তা ছিল না। ঢাকা থেকে আরিচা যেতেই ৩-৪ ঘণ্টা, আরিচা থেকে নগরবাড়ি ঘাট উজান যেতে সেখানেও ৩ ঘণ্টা। বাঘাবাড়ি ফেরি পার হয়ে বগুড়া পৌঁছতে অনেক রাত হয়েছিল। রাত সাড়ে ৩-৪টায় পৌঁছেছিলাম রংপুর সার্কিট হাউজে। সেখান থেকে ৭টায় আবার দিনাজপুরের পথে রওনা। মনে হয় দিনাজপুর পৌঁছতে সাড়ে ৯ অথবা পৌনে ১০টা বেজেছিল। দিনাজপুর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লিকলিকে মকসুদ যে প্রায় হাতে-পায়ে ধরে দিনাজপুর নিয়ে গিয়েছিল। মনে হলো সে আমাদের চেনে না। প্রথম দেখাতেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিল। অতিথির সাথে অমন বেয়াদবের মতো ব্যবহার কেউ করতে পারে, জানা ছিল না। মকসুদের কথাবার্তায় কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। হাতমুখ ধুয়ে১০টা-সাড়ে ১০টায় ছাত্রলীগের  মিছিলে শরিক হয়ে তাজ্জব বনে গেলাম, না হলেও ১০ হাজার ছাত্রজনতার মিছিল। ঘণ্টা দেড়েক মিছিলে ছিলাম। মিছিল শেষে সম্মেলনস্থলে গিয়ে বুঝলাম মকসুদের রাগারাগির কারণ। সাড়ে ৯টায় জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। মিছিল শুরু হয়েছে ১০টায়। আমরা দিনাজপুরে পৌঁছেছি পৌনে ১০টায়। আমাদের না দেখে লোকজন সমালোচনা করেছে, গালাগাল করেছে। ভণ্ড, প্রতারক বলে মকসুদকে বকাঝকা করেছে। তখন ফোনের ছড়াছড়ি ছিল না। তাই আমরা পৌঁছেছি, এটাও তারা জানতে পারেনি। অসম্ভব সুন্দর সম্মেলন হয়েছিল। অনেক কিছু মনে নেই, কিন্তু পঞ্চগড়ের অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ছিলেন তুখোড় নেতা। তার ছোট ভাই সুজন তখনো আলোচনায় ছিল না। দিনাজপুর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিল মকসুদ, সভাপতি বর্তমান এটিএনের চেয়ারম্যান ড. মাহফুজের বড় ভাই মাহমুদুর রহমান। ছয়-সাত দিন সেখানে ছিলাম। ফেরার পথে বগুড়ার সাত রাস্তার মোড়ে এক জনসভা ছিল। সেই জনসভায় হুজুর মওলানা ভাসানীর সমালোচনা করে বক্তৃতা করেছিলাম। তখন উত্তরবঙ্গের সবচাইতে প্রচারিত পত্রিকা করতোয়ার সম্পাদক ছিলেন আমানউল্লাহ। ৮ কলামের ব্যানার হেডিং করেছিলেন, ‘ভাসানীর ভীমরতি ধরেছে- কাদের সিদ্দিকী।’ পরদিন আমরা ছিলাম ঢাকার পথে। বাঘাবাড়ি ফেরি পাড় হয়ে কয়েক কিলোমিটার এগিয়েছিলাম। মনে হয় আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলাম। হঠাৎই শক্ত ব্রেকে তন্দ্রা ভেঙে যায়। মুছু ড্রাইভার ইউসুফ বলছিল, হুজুর যাচ্ছেন। হুজুর মানে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আমাদের গাড়ি পেছাচ্ছিল, হুজুরের গাড়িও। কাছাকাছি হতেই আমি গিয়ে হুজুরকে সালাম করতেই তার ডান পাশে দৈনিক করতোয়ায় বড় বড় করে লেখা : ‘ভাসানীর ভীমরতি ধরেছে- কাদের সিদ্দিকী’ চোখে পড়তেই আমার হাত-পা-শরীর কেঁপে ওঠে, মাথা ঘেমে যায়। কদমবুচি করার সময় হুজুর আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করছিলেন। বলছিলেন, ‘মনে হয় খুব সফর করলা? সভা সমাবেশ করলা? ভালো ভালো। কাজ করো। তোমাকে দেশের মানুষ খুব ভালোবাসে। দোয়া করি অনেক বড় হও।’ হুজুর চলে গেলেন। আমার সারা শরীর ঘেমে ভিজে গিয়েছিল। গাড়িতে বসে বারবার মনে হচ্ছিল, এসব আমি কী করছি। আমি কি হুজুর মওলানা ভাসানীর সমক। তার সমালোচনা করা আমার শোভা পায়? সেই যে হুজুরের সমালোচনা বন্ধ করেছিলাম, আর কোনো দিন বড়দের সম্পর্কে কোনো আলোচনা করতে যাইনি। মামা জয়, ভাতিজা তারেককে এসব বলা যাবে কি না জানি না, কিন্তু তাদের এ ব্যাপারে যত্নবান হওয়া উচিত। বাঙালি কৃষ্টি-সভ্যতা, আচার-ব্যবহারের বাইরে চলে গেলে এক সময় আমাদের গর্ব করার কিছুই থাকবে না। জাতি হিসেবে আমরা তখন বড়ই গরিব হয়ে যাবো।
বাঙালির হাজার বছরের গর্ব তার কৃষ্টি-সভ্যতা, আচার-ব্যবহার, বড়কে সম্মান, ছোটকে আদর-সোহাগ-ভালোবাসা। কিন্তু দুই নেত্রীর দুই পুত্র যেভাবে বড়দের অসম্মান করে চলেছেন, তাতে ভাবীকাল তাদের বাঙালির সভ্যতার ধারক-বাহক হিসেবে স্বীকার করবে না। তাই সময় থাকতে সংশোধন হওয়া উচিত। সবাইকে বলতে হবে কেন, এই জগৎ সংসারে শোনার লোক তো কিছু থাকতে হবে। দুই নেত্রীর দুই সন্তান তারা যদি জাতির দুঃসময়ে জাতিকে আরো অন্ধকারে ঠেলে দেয়ার পথ প্রশস্ত না করে যন্ত্রণাকিষ্ট জাতির শিয়রে বেদনানাশকের ভূমিকা নিতে পারতেন- সেটাই কি ভালো হতো না? তারেক রহমান বঙ্গবন্ধুকে রাজাকার বলবে, সজীব ওয়াজেদ জয় ড. কামাল হোসেনকে বলবে দেশদ্রোহী- এসব জাতি শুনতে চায় না।
এসব শোনার কথাও নয়। একজন বিদেশে লেখাপড়া করেছে, তার তো চেতনা-চৈতন্যে সেসবের একটা শুভ প্রভাব পড়বে, যে প্রভাবে অন্যরা সামান্য হলেও প্রভাবিত হবে। তা না হয়ে কুপ্রভাবে তাদের অন্তরাত্মা কলুষিত হোক, এটা আমরা চাই না। আজ ৩৪ দিন মতিঝিলের ফুটপাথে। কত শত হাজার লোকের সান্নিধ্য পেলাম, কত অভিজ্ঞতা অর্জিত হলো যা আরো অনেক বছরে হতো না। তাই কবি দার্শনিকেরা অযথা বলেননি, রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করে অমূল্য রতন কুড়িয়ে নিতে। আজ দু-তিন সপ্তাহ বারবার মনে হচ্ছে, কেন ঘরে থেকে এমন একটা লম্বা জীবন কাটালাম। আরো কিছু সময় রাস্তায় থাকলে জ্ঞানের কাঙ্গাল থাকতাম না। ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে হঠাৎ শুনলাম, বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী হৃদরোগে আক্রান্ত। ৩২ দিন হেঁটে বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়তে যাওয়া ছাড়া কোথাও যাইনি। লম্বা মানুষ বসে থাকতে থাকতে মাজা লেগে আসে। হঠাৎই বড় ভাইয়ের হৃদরোগের কথা শুনে মনটা ভারী হয়ে গিয়েছিল। সাথে সাথে ছুটেছিলাম বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। ৩২ দিন পর গাড়িতে বসে কিছুটা নতুন নতুন ঠেকছিল। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীকে দেখলাম প্রায় ছয় মাস পর। তিনি যখন আমেরিকার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন তার এক-দুই দিন আগে দেখা হয়েছিল। তখন তিনি ছিলেন মন্ত্রী। কিন্তু গত শনিবার সাড়ে ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের বিছানায় প্রায় অচেতন যাকে দেখলাম তিনি আমার মতো সর্বহারা। কারণ সারা জীবন যে দল করেছেন আজ তিনি সে দলের কেউ নন, দেশের কেউ নন। আমার সাথে কোনো কথা হয়নি। আমি যে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম তা বুঝতে পেরেছেন কি না জানি না। আমার সাদামাটা স্ত্রী নাসরীনকে হাসপাতালে আসতে বলেছিলাম। মোহাম্মদপুর থেকে এলিফ্যান্ট রোড ধরে আসতে বেশ সময় লেগেছিল। মতিঝিলের অবস্থানস্থল থেকে শুধু শুক্রবারে জুমার নামাজের জন্য ঘণ্টা দেড়-দুই করে দূরে থেকেছি। শনিবারে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালেও দুই ঘণ্টার মতো ছিলাম। সে অল্প সময়ে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ, ভিসিপ্রাণ গোপাল, লতিফ ভাইকে যিনি দেখাশোনা করেন অধ্যাপক সজল ব্যানার্জী এবং  অধ্যাপক নাজির আহমেদ রঞ্জুর সাথে দেখা। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি, তিনি যেন তাকে সুস্থ করে তুলেন। তবে তার অচৈতন্য অবস্থা দেখে বারবার মনে হয়েছে, মানুষ কত দুর্বল, যার এক মুহূর্তের ভরসা নেই। রক্ত এক দিক থেকে আরেক দিকে যেতে সামান্য হেরফের হলে কত বিভ্রাট। সেই তারাই মানুষের সাথে এত নির্দয় ব্যবহার করে কী করে? যে স্রষ্টা এই জগৎ সংসার সৃষ্টি করেছেন, তাঁর সৃষ্টিকে নিয়ে কিভাবে এমন সব নকশা করেন। ভাবীকে, নুরু ভাইকে দেখলাম। হয়তো উন্নত চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের বাইরে কিংবা দেশের বাইরে নেয়ার পরিকল্পনা আছে। যেহেতু কারাবন্দী, সেহেতু সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হবে, কোর্ট-কাচারির ব্যাপার স্যাপারও আছে। তবে হাসপাতালে গিয়েও মনে হলো সত্যিই দেশটা কেমন যেন ভাগ হয়ে গেছে। এক দিকে মতাবান আওয়ামী লীগ, অন্য দিকে মতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া বিএনপি- মাঝে ল কোটি অসহায় মানুষ। চারদিকে শ্রমজীবী বেকার মানুষের হাহাকার। কাদা মাটির সুজলা সুফলা, শস্য শ্যামলা সোনার বাংলার কেন এমন হলো।  প্রতিদিন বসে বসে কত কিছু দেখি, কত কিছু শুনি, কতজনের সাথে দেখা হয়, কতজন রাস্তায় বসে থাকার কষ্টে কান্নায় বুক ভেজায়, আবার কতজন আরো শক্ত কর্মসূচি চায়। শুক্রবার ভাটি বাংলা সুনামগঞ্জের ইন্টারমিডিয়েটের দুই ছাত্র এসেছিল। তার মধ্যে মহিউদ্দিন মানিক দুই শ’ টাকার ডায়েরি, চমৎকার একটি কলম ও গামছা দিয়ে গেছে। দেখতে শুনতে দু’জনই রাজপুত্রের মতো। মহিউদ্দিন মানিক ডায়েরিতে নাম লিখে গেছে তাই তার নাম উল্লেখ করতে পারলাম, আরেকজন লেখেনি। আমিও ছেলে দু’টিকে গামছা উপহার দিয়েছি। মহিউদ্দিন মানিকেরা তিন বোন চার ভাই। ভাইয়ের মধ্যে সে তিন নম্বর। বাবা মো: আব্দুল হক কৃষিকাজ করেন। আমার বড় ভালো লেগেছে ছেলেটিকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম তার বাবা কী করে। সে খুব সহজভাবে বলেছিল, কৃষিকাজ। যা সাধারণত অনেকেই সহজভাবে বলতে চায় না। যাদের বাবা জজ ব্যারিস্টার তারা যত সহজে বলে গরিবের সন্তানেরা বাবা কৃষক এটা বলতে কেন যেন দ্বিধাবোধ করে। কিন্তু মানিকের মধ্যে তা দেখিনি। বহু দিন পর গতকাল আবার হঠাৎই আমি আমার এক পুরনো মানিক পেয়েছি। ’৯০-এ ঢাকা বিমানবন্দরে নেমেই মিরপুরের মোস্তফা আরিফ বাবুকে পেয়েছিলাম। সে এক অসাধারণ মতার অধিকারী। আরো ছিল দেওয়ান মান্নান, ওবায়েদ, জিয়া, তৌফিক, শাহাব উদ্দিন, বাবুর শ্বশুর সুরুজ খান। ১৬ বছর পর ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা ফিরে ১৮ ডিসেম্বর জীবনের প্রথম টুঙ্গিপাড়া গিয়েছিলাম। তার আগে বঙ্গবন্ধুর কবর দেখিনি। টাঙ্গাইল ঘ-১ পৌরসভার টয়োটা গাড়িতে বড় কষ্ট করে প্রায় ২০ ঘণ্টায় ২০০-৩০০ কর্মীর লটবহর নিয়ে সে যাত্রায় টুঙ্গিপাড়ায় গিয়েছিলাম। সে যাত্রায় হ্যান্ডমাইক নিয়ে বাবু সাথী হয়েছিল। মনে হয় যাওয়া আসায় ২৫-৩০ ঘণ্টা মাইক চালিয়েছিল, কোনো কান্তিবোধ করেনি। আগে কী সব অসাধারণ কর্মী ছিল। আল্লাহর পরম মহিমা ধীরে ধীরে সবাই ফিরে এসে একত্র হচ্ছে। জানি না দয়াময় আমায় দেশের শুভদিন দেখার সুযোগ দেবেন কি না। কিন্তু শুভদিন যে আসবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জানি ৩৪ দিনেও দুই নেত্রীর মান ভাঙেনি। দেখা যাক কত দিনে ভাঙে। কিন্তু দেশের যে সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে।

‘চিৎকার শুনেও কেউ আসেনি’ by রুদ্র মিজান

‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিলেন অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। বন্যার মাথা ও হাত থেকে তখন ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। ঘটনাস্থলের আশপাশ দিয়ে লোকজন হেঁটে যাচ্ছে। কেউ অদূরে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছেন একজন পুলিশ সদস্যও। কিন্তু তাদের কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে যায়নি। এরই মধ্যে বন্যাও রাস্তায় পড়ে যান।  দৃশ্যটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটি চায়ের দোকান থেকে দেখছিলেন আলোকচিত্রী জীবন আহমেদ। দোকানটি ঘটনাস্থলের কাছে হলেও উদ্যানের ফটক দিয়ে বের হয়ে ঘটনাস্থলে যেতে হয়। এজন্য একটু সময় লাগে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে। জীবন জানিয়েছেন আহত অবস্থায় অভিজিৎ ও তার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যান ঝুঁকি নিয়ে। হাসপাতালে নেয়ার সময় বন্যা ভেবেছিলেন আমিই তাদের ওপর আক্রমণ করেছি। এজন্য তিনি ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিলেন। গতকাল দুপুরে মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ওই দিনের বীভৎস ওই ঘটনার বর্ণনা দেন। জানান, অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রীকে কিভাবে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি। এ ঘটনার পর থেকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন জীবন।
ফটো এজেন্সি বাংলার চোখের নবীন এ কর্মী জানান, বৃহস্পতিবার রাত তখন প্রায় পৌণে ৯টা। বন্ধুদের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেঞ্চে বসে চা পান করছিলেন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শী কেউ সাহায্যের হাত না বাড়ালেও জীবন ছুটে যান। তিনি ভেবেছিলেন বন্যাকে কেউ চাপাতি দিয়ে আঘাত করেছে। তিনি তার হাত ধরে বলেন, আপা আপনি  উঠেন। আপানাকে হাসপাতালে নিয়ে যাব। চোখ খুলে তাকিয়ে অসংলগ্ন প্রশ্ন করেন বন্যা। তিনি বলেন, কেন, এখানে কি হয়েছে। কারা এখানে কাকে মেরেছে? তাৎক্ষণিকভাবে কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না জীবন। এর মধ্যেই বন্যা ছুটে যান ফুটপাতে পড়ে থাকা রক্তাক্ত অভিজিতের কাছে। মুখে হাত বোলাতে বোলাতে বন্যা ডাকেন, ‘অভি ওঠো, ওঠো অভি...।’ ঠিক তখনই জীবন বুঝতে পারেন যে শুধু বন্যাই না, অভিজিৎকেও আঘাত করেছে সন্ত্রাসীরা। অভিজিৎ তখন নড়চড়া করছিলেন। তার মাথা থেকে রক্ত পড়ছিল। ফুটপাত, রাস্তা রক্তে ভেসে যায়।
মূল রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটি অটোরিকশা থামান জীবন। ওই অটোরিকশায় দুই যাত্রী ছিলেন। তাদের অনুরোধ করলে তারা নেমে যান। এরই মধ্যে অনেকেই এসে জড়ো হন। দীর্ঘদেহী অভিজিৎকে অটোরিকশায় করে নিয়ে যাওয়া যাবে না বলে আপত্তি জানান উপস্থিত অনেকে। জীবন বলেন, এটাতেই নিতে হবে। সময় ব্যয় করলে তাকে বাঁচানো যাবে না। তখন চার-পাঁচজন এগিয়ে যান। তাদের সহযোগিতায় অটোরিকশায় তোলা হয় অভিজিৎকে। দুই হাত দিয়ে অভিজিতের ক্ষত-বিক্ষত মাথা ধরে রাখেন জীবন। তার পেট-কোমর ছিল বন্যার বাহুর ওপরে। অভিজিতের দুই পা অটোরিকশার বাইরে ছিল। তাই অতি সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছিলেন চালক। জীবন চিৎকার করে সামনের যানবাহন চালকদের সাবধান করছিলেন। অটোরিকশা দোয়েল চত্বরের দিকে এগুতে থাকে। অটোরিকশাটি যখন বাংলা একাডেমির ফটকের সামনে তখন অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন বন্যা। জীবনের কাছে জানতে চান, কে আপনি, কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, আপনি কি আমাদের মেরে ফেলবেন?
জীবন নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, আপা আমি আপনাদের মেডিক্যালে নিয়ে যাচ্ছি। তা বিশ্বাস করতে চান না বন্যা। জীবনের পা ছুঁয়ে বলেন, আপনার পায়ে ধরি আপনি আমাদের মারবেন না। যা চান তাই দেব। শুধু আমাদের ছেড়ে দেন। বন্যা তখন ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। ওই সময়ে আতঙ্কের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে জীবন বলেন, একটা চরম ঝুঁকি নিয়ে তাদের উদ্ধার করেছি। বন্যা যখন চিৎকার করছিলেন তখন ভেবেছি, অটোরিকশা থামিয়ে বন্যার কথা শুনে গণপিটুনি দিয়ে আমাকে মেরে ফেলতে পারে পথচারীরা। অটোরিকশা যখন দোয়েল চত্বরে তখন পেছনে তাকিয়ে একজন পুলিশকে দেখে ভরসা পাই। ঘটনাস্থলে তাকে দেখেছি দাঁড়িয়ে থাকতে। তিনি মোটরসাইকেলযোগে আমাদের পেছনে আসছিলেন। বন্যাকেও তিনি আশ্বস্ত করতে চান। বলেন, আপা, তাকিয়ে দেখেন পেছনে পুলিশ আছে। বন্যার চোখের নিচে ধারালো অস্ত্রের আঘাত। রক্ত লেগে আছে। যে কারণে তিনি পেছনে তাকিয়েও তা দেখতে পাননি। বন্যা বলেন, কোথায় পুলিশ। পুলিশ নেই। এ অবস্থাতেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে পৌঁছে যায় তাদের অটোরিকশা। অভিজিৎকে ধরে নামায় হাসপাতালের লোকজন। বন্যা চিৎকার করে বলছিলেন, ডাক্তার অভিকে বাঁচান। তার চিকিৎসা করুন। জীবনের তখন মাথা ঘুরছে। রক্তে ভিজে গেছে শরীরের অর্ধেক। তাৎক্ষণিকভাবে রক্তভেজা নীল রঙের টি-শার্ট পরিবর্তন করে ক্যামেরা মুছার জন্য ব্যাগে রাখা পুরনো টিশার্ট পরেন তিনি। জীবন জানান, কর্তব্যরত আনসাররা তাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। জরুরি বিভাগের ফটকের বাইরে বসে ছিলেন তিনি। রাত ১০টা পর্যন্ত ঢামেক হাসপাতালে ছিলেন। অফিসে গিয়ে জানতে পারেন তিনি যাকে উদ্ধার করেছেন তিনি লেখক, ব্লগার অভিজিৎ রায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১০টায় তিনি মারা গেছেন।
জীবন বলেন, আমি তাদের পরিচয় জানতাম না। দুজন আহত মানুষ রাস্তায় পড়ে আছেন। কেউ তাদের সাহায্য করছে না। এটা দেখে একজন মানুষ হিসেবে আমি উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেছি। এই ঘটনার পর সাহায্যকারী হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কে আছেন তিনি। এছাড়া এ রকম নির্মম দৃশ্য এর আগে দেখেননি তিনি। যে কারণে গত দুই রাত তিনি ঘুমাতে পারেননি বলে জানান।
দায় স্বীকারের সেই ‘টুইট’ করা হয়েছিল ইউকে থেকে
ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে টুইটটি ইউকে থেকে করা হয়েছিল বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে অভিজিৎকে হত্যার কিছুক্ষণ পরই ‘আনসার বাংলা ৭’ পরিচয়ে দায় স্বীকার করে একটি টুইট করা হয়। এদিকে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের দায়িত্ব পালনে অবহেলা ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া তদন্তে সহযোগিতার জন্য সাত সদস্যের পৃথক আরেকটি কমিটিও গঠন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম জানান, হত্যার দায় স্বীকার করে যে টুইটটি করা হয়েছিল তা ইউকে থেকে আপলোড করা হয় বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। এছাড়া স্পর্শকাতর এই ঘটনার সঙ্গে ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের বিষয়টি মাথায় রেখেই তদন্ত কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অভিজিৎকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার কিছুক্ষণ পরই ‘আনসার বাংলা ৭’ একটি আইডি থেকে টুইটারে দায় স্বীকার করা হয়। টুইটারে বলা হয় ‘আল্লাহু আকবর, এ গ্রেট সাকসেস হেয়ার ইন বাংলাদেশ, টার্গেট ইজ ডাউন ইন ঢাকা’। এর কিছুক্ষণ পর অপর একটি টুইটে অভিজিতের রক্তাক্ত মাথা ধরে বসে থাকা স্ত্রী রাফিদার ছবি আপলোড করে বলা হয়, ‘এক্সক্লুসিভ, মে বি ইটস অভিজিৎ রায়’স ব্লাডি ওয়াইফ উইথ হাজব্যান্ড হেড। বিহেডেড, হি ওয়াজ এ টপ টার্গেট ফর লাস্ট ৩/৪ ইয়ারস।’ তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত দ্রুত টুইট করা মানেই যে টুইট করেছে তার সঙ্গে হত্যাকারীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই কিলিং মিশনে থাকা কেউ এই খবরটি তাকে জানায়। ইউকেতে বসে সে দায় স্বীকার করে টুইটটি আপলোড করে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন উগ্রপন্থি জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতাকর্মীরা উচ্চ শিক্ষিত। বিশেষ করে ইংল্যান্ডে প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেকেই এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। ওই সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীরা অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করেছে। এ কারণে চাপাতির হাতলে যেন হাতের ছাপ না পড়ে এজন্য হাতলে আগে থেকেই কাগজ ব্যবহার করেছিল। ব্যবহারের পর সেই কাগজও দুমড়ে-মুচড়ে নষ্ট করে দিয়ে গেছে। যাতে আঙুলের কোন ছাপ ধরা না পড়ে। তদন্ত সূত্র জানায়, গোয়েন্দারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অপারেশনাল উইংসের প্রধান রানাকে গ্রেপ্তারের জন্য হন্যে হয়ে চেষ্টা করছে। রানা সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, খুনিদের চিহ্নিত করতে তারা একুশে বইমেলা থেকে সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের ধারণা, হত্যকাণ্ডে অংশ নেয়াদের সহযোগীরা আগে থেকেই অভিজিতের পিছু নিয়েছিল। এমনকি সহযোগীদের কেউ কেউ সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থেকে মোবাইলে ছবি তুলে আপলোড করেছে। এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ঢাকা মেডিক্যাল থেকেও ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে একুশে বইমেলা থেকে সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ দেখে কয়েকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে তাদের বিস্তারিত কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের পরপর নিহত অভিজিতের বাবার মুঠোফোন নম্বরে যে হুমকিটি এসেছিল তা বাংলাদেশের গাইবান্ধা এলাকা থেকে করা হয় বলে জানা গেছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মোবাইলে হুমকি দেয়া ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তারের পর জানা যাবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোন সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না? গোয়েন্দা সূত্র জানায়, তারা অনুসন্ধান করে দেখেছেন মোবাইলে হুমকি দেয়া নম্বরটিতে বেশিরভাগ সময় রাতের বেলায় কথা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, নিহত অভিজিতের পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে সংশ্লিষ্ট থানাকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
পুলিশের অবহেলা খতিয়ে দেখতে কমিটি: এদিকে চারপাশে পুলিশ থাকার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় অভিজিৎ রায়কে খুনের ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব পালনে কোন অবহেলা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মীর রেজাউল করিমের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়। অপরদিকে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে ও তদন্তে সহায়তার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে সাত সদস্যের আরেকটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলামকে।

হুমকির কথা আইজিকে আগেই জানানো হয়েছিল

অভিজিতের শেষ যাত্রায় খুনিদের শাস্তি দাবি
শেষবারের মতো পুত্রকে দেখছেন পিতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ব্লগার অভিজিৎ রায়ের দেহ দান করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অনুষ্ঠিত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন অনুষ্ঠানে অভিজিৎ রায়ের বাবা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, এ হত্যাকাণ্ড সরকারের একটি ব্যর্থতার প্রতীক। এর আগে মৌলবাদী শক্তি অভিজিৎকে ধ্বংস করবে, হত্যা করবে বলে হুমকি দিয়েছিল। এ সমস্ত মেসেজ তখন আমি পুলিশের আইজি-ডিআইজি সবাইকে জানিয়েছিলাম। তারা বলেছে, তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তিন স্তরের, চার স্তরের। কিন্তু জঙ্গি গোষ্ঠী কতটা শক্তিশালী তাদের কাছে আমাদের তথাকথিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা দরিদ্র- অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড তার প্রমাণ। অধ্যাপক অজয় রায় খুনিদের চিহ্নিত করে বিচার করতে সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়ে বলেন, এফবিআই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা বলেছে, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে তারা সহযোগিতা করতে চায়। এ বিষয়ে তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে অভিজিতের মরদেহ অপরাজেয় বাংলায় নির্মিত অস্থায়ী বেদিতে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আনা হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এর আয়োজন করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মরদেহের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মীজানুর রহমান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক হারুন-অর রশীদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, চারুকলা অনুষদ, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, অধ্যাপক সদরুল আমিন, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির, গণফোরাম, বাসদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, গণজাগরণ মঞ্চ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গণসংহতি আন্দোলন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, প্রগতিশীল ছাত্রজোট, স্থপতি রাজীব হায়দারের বাবা-মাসহ আরও বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এসময় অভিজিতের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা জানানোর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী অভিজিৎকে হত্যা করেছে। অনেকে ফেসবুকে তাকে হত্যা করা হবে বলে স্ট্যাটাস দিয়েছে। তিনি অভিযুক্তদের দ্রুত চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, লেখক হুমায়ুন আজাদ ও অভিজিতের হত্যাকাণ্ড একই সূত্রে গাঁথা। সামাজিকভাবে এসব ঘটনা মোকাবিলা করতে হবে। শাহরিয়ার কবির বলেন, অভিজিৎকে দীর্ঘদিন ধরে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়া হলেও দেশে ফেরার পর তাকে কেন নিরাপত্তা দেয়া হয়নি। সরকারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাই। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও এখনও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে নি। অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করে তাদের উৎসাহ দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এর জন্য আমরা সবাই দায়ী। তবে সরকার বেশি দায়ী। কারণ তারা অভিজিতের নিরাপত্তা দিতে পারে নি। এছাড়া জঙ্গি নির্মূলে তারা আমাদের আশ্বস্ত করতে পারে নি। স্থপতি রাজীব হায়দারের বাবা ডা. নাজিম উদ্দিন বলেন, যারা হত্যা করেছে তারা ধর্মীয় উগ্রপন্থিতে বিশ্বাসী। মৌলবাদীদের মূলশক্তির বিচার না হলে এদের বিচার হবে না। তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে মৌলবাদী গোষ্ঠী জামায়াতের কি সম্পর্ক রয়েছে জনগণ তা জানতে চায়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর বেলা ১২টায় অভিজিতের মরদেহ নেয়া হয় টিএসসি সংলগ্ন হামলার স্থানে। সেখান থেকে মরদেহ বাবা অজয় রায়ের সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় আনা হয়। পরে বিকালে অভিজিতের ইচ্ছানুযায়ী মরদেহ শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হস্তান্তর করা হয়।
ঢাবিতে আজ ধর্মঘট: অভিজিৎ হত্যার প্রতিবাদে প্রগতিশীল ছাত্রজোট আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট আহ্বান করেছে। একই সঙ্গে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোট নেতৃবৃন্দ।

ঘৃণা ও বমনের অরুচি by গোলাম মাওলা রনি

আদি বেলা থেকেই আমার মাথায় হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত সব বিষয় চেপে বসে। তখন নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে ওসব হাবিজাবি চিন্তা করতে থাকি এবং একাকী নীরবে চেষ্টা করতে থাকি- কী করে ওসব বাস্তবায়ন করা যায়। গ্রামে থাকতে ছোটবেলায় প্রায়ই শুনতাম- ‘গাব মারার জায়গা পাও না’, আর ‘গাব মারাইও না’ ইত্যাদি ইঙ্গিতপূর্ণ কথা। গাব মারার রহস্য উন্মোচনের জন্য প্রায়ই কোনো জঙ্গলে ঢুকে গাবগাছে উঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম আর আনমনে কাঁচা-পাকা গাব নিচের দিকে ছুড়ে মারতাম। এ ছাড়াও আমরা অনেক কিছু নিয়ে গবেষণা করেছি। একবার গবেষণা করলাম কেছুয়ার তেল নিয়ে। কেঁচোকে আমাদের এলাকায় বলা হতো ‘কেউচ্চা’। কেউ কেউ আবার একটু শুদ্ধ করে বলত ‘কেছুয়া’। গ্রাম্য ডাক্তারেরা বোতলে করে একধরনের তেল নিয়ে গ্রামগঞ্জে ফেরি করতেন আর বলতেন, এইগুলো কেছুয়ার তেল। এই তেল মালিশ করলে এটা হয় কিংবা ওটা হয়- শেষমেশ মহামর্দ হওয়া যায়। হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ছোট ছোট শিশিতে ভরা সামান্য একটু তেলের দাম ওই আমলে অর্থাৎ ১৯৭৩-৭৪ সালে বিক্রি করা হতো পাঁচ টাকা করে। কেছুয়ার তেল বানানোর প্রকল্প হাতে নিলাম এবং বিরাট এক লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে মুরুব্বিদের হাতে ন্যক্কারজনকভাবে অপমানিত হয়ে প্রকল্প স্থগিত করতে বাধ্য হলাম।
ইদানীং খুব করে ভাবছিলাম মানুষের ঘৃণা করার প্রবণতা এবং বমি করার কারণগুলো নিয়ে। কেন মানুষ ঘৃণা করে এবং কেন মানুষের বমি করার ইচ্ছা জাগে- এমনতরো সরল ও স্বাভাবিক বিষয় নিয়ে আমি ভাবছিলাম না। ভাবছিলাম মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক পচনশীলতা এবং চারিত্রিক অধঃপতনের বিভিন্ন দিক নিয়ে। কেন একজন শিক্ষিত মানুষের চিন্তাশক্তি পচে যায় কিংবা লোকটি কেনই বা নিজে বহু কষ্ট ও কসরত করে তার অর্জিত জ্ঞান-বুদ্ধি-প্রজ্ঞাকে পচিয়ে ফেলে এবং নিকৃষ্টতর চরিত্রের অধিকারী হওয়ার জন্য পাগলামো শুরু করে। মানুষ যখন আপন চেষ্টায় চিন্তা ও চরিত্রে পচন ধরিয়ে দেয়, তখন সমাজের অপরাপর সুস্থ মানুষেরা ওই লোকটিকে ঘৃণা করতেও ঘৃণাবোধ করে। পচা লোকটির ওপর বমন উদ্গিরণ করতেও অরুচি প্রকাশ করে।
ঘৃণা ও বমনবোধের অরুচি নিয়ে ভাবতে ভাবতে যখন কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না, তখন হঠাৎ একটি টেলিভিশনের অনুষ্ঠান আমার চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দিলো। সুন্দরী এক যুবতী হলুদ শাড়ি পরে চমৎকার মেকআপ নিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করছিলেন। আলোচনার ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছিল না ওটা কি টকশো, নাকি কৃষিবিষয়ক কোনো অনুষ্ঠান। দু-তিনজন বক্তার বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছিল, তারা চিঁচিঁ গলায় গালাগাল-জাতীয় বিভিন্ন শব্দমালা উচ্চারণ করে কাউকে অভিশাপ দিয়ে দানব বানাচ্ছেন, আবার কাউকে আশীর্বাদের প্রসাদ দিয়ে দেবতা বানাচ্ছেন। বক্তাদের বক্তব্য শুনে যুবতীটি মুখের মধ্যে কলমের কিপসহ পেছনের দিকটা বারবার ঢুকিয়ে দিচ্ছেন এবং সামনের দুটো দাঁত দিয়ে হালকাভাবে কামড় দিয়ে জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব দেখাচ্ছেন। কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে আয়েশ করে পা দোলাচ্ছেন এবং চোখেমুখে কখনো রোদ আবার কখনো বৃষ্টির একটি আমেজ ফুটিয়ে তুলে বক্তাদের উৎসাহ জোগাচ্ছেন।
বক্তাদের মধ্যে একজনের বয়স ৬৫-৬৬ বছর। পেশায় একটি অখ্যাত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। গলার স্বর মেয়েদের মতো। কিন শেভ করা। লক্ষ করলে দেখা যাবে, ভদ্রলোকের থুতনির নিচের মাংস এবং চামড়া বয়সজনিত কারণে ঝুলে পড়েছে। গলার চামড়াও বেশ কুঁচকে গেছে। তিনি অতি দ্রুত কথা বলছেন এবং সারা দুনিয়ার অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাহিত্যের ভাণ্ডার থেকে পছন্দমতো উদাহরণ টেনে এনে নিজের বক্তব্যের সাথে জুড়ে দিয়ে বিরাট কিছু করে ফেলার জন্য কসরত করছেন। উপস্থাপিকা মুচকি মুচকি হেসে হালকা করে ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক করে কিছু একটা বলতে গিয়েও বারবার থেমে যাচ্ছেন বৃদ্ধ অধ্যাপকের বেপরোয়া গতির কারণে। দেখলাম, ভদ্রলোক তার ঈষৎ লম্বা চুলগুলো একটি রাবারের ব্যান্ড দিয়ে পেছনের দিকে ঝুঁটি বানিয়ে রেখেছেন। মহিলাদের মতো লম্বা ঝুঁটি নয়, আবার একেবারে ছোটও নয়। দু-তিন ইঞ্চি লম্বা।
টিভি বন্ধ করে নতুন করে ভাবতে বসলাম- কেন একজন ৬৫-৬৬ বছরের বুড়ো লম্বা চুলে কলপ মেখে কুচকুচে কালো করে তাতে আবার ঝুঁটি বাঁধতে যাবেন, কেনই বা জীবনসায়াহ্নে এসে সত্য-মিথ্যা দিয়ে বানিয়ে বানিয়ে কথা বলে কাউকে বড় এবং কাউকে ছোট বানানোর চেষ্টা করবেন? নিজের অর্জিত জ্ঞান কেন তিনি অন্যকে ঢেলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবেন? চিন্তায় রাতে ঠিকমতো ঘুম এলো না। পরের দিন বিষয়টি নিয়ে এক পণ্ডিত বন্ধুর সাথে আলাপ করলাম। বন্ধুটি আমার অসাধারণ মেধাবী এবং একটি সরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মাঝে মধ্যে কবিতা তিনি লেখেন। টুকটাক মনোবিজ্ঞানের চর্চা এবং বন্ধু মহলে তা বিনামূল্যে বিতরণ করেন। আমার বর্ণনা শুনেই তিনি বললেন, বৃদ্ধ লোকটি ঝুঁটি বেঁধে অল্পবয়সী টিনএজ মেয়েদেরকে আকর্ষণ করতে চান। নিজেকে ব্যতিক্রমী হিসেবে উপস্থাপন করে অল্পবয়সী ছাত্রীদের কাছে আকর্ষণীয় সাজার চেষ্টা থেকেই বুড়ো বয়সে লোকটিকে অদ্ভুত ভীমরতিতে ধরেছে।
মনে মনে বৃদ্ধকে ঘৃণা করতে গিয়ে তার পেশার আরো অনেকের কথা ভাবতে শুরু করলাম। বেচারা একটি অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। টাকা-পয়সা কিংবা খ্যাতির মোহ অথবা সারা জীবনের অপ্রাপ্তির উদগ্র বেদনা থেকে তিনি হয়তো মেয়েদের মতো নাকিসুরে ‘চোয়া চোয়া’ শব্দে ক্ষমতাসীনদের পদলেহনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারই স্বগোত্রীয় ব্যক্তিরা যারা কিনা দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ইতোমধ্যে যশ, খ্যাতি, অর্থ, বিত্ত ইত্যাদি সবই পেয়েছেন- তারা কেন ক্ষমতার পেছনে ছোটেন? বাংলাদেশের সেরা মেধাবী মানুষদের মাথায় যদি পচন ধরে, তবে এ জাতি আশ্রয় নেবে কোথায়! যারা দুর্বল, অকর্মণ্য, অপদার্থ, লোভী, চরিত্রহীন, মেধাহীন এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল, তারা যদি স্বার্থসিদ্ধির জন্য কারো পদলেহন করে, তখন হয়তো তাকে ঘৃণা জানানো যায়। কিন্তু মেধাবীরা যদি অপকর্ম করে, তবে তো তারা ঘৃণিত হওয়ারও অযোগ্য হয়ে পড়েন!
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে দু’টি অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে যাবো। এক শিক্ষিকার সাথে টকশো করতে গিয়ে তার হাজারো নীতিকথার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়লাম। ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে তিনি শুধু বলেই গেলেন যে, এ দেশের পলিটিশিয়ানরা চরিত্রহীন, অশিক্ষিত, বর্বর, দেশপ্রেমবর্জিত ও দুর্নীতিবাজ। পরের দিন ভদ্রমহিলা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে যা জানলাম, তাতে চক্ষু ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম। একাধিক বিয়ে ও বিচ্ছেদের বাইরেও রয়েছে তার বহুমুখী স্ক্যান্ডাল। আরেকটি টকশোতে তিনি যখন আগের মতো বলা শুরু করলেন, তখন বেশ আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সাথে বললাম, ‘দয়া করে চুপ করুন। একটি ছোট প্রশাসনিক পদ, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা সামান্য সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য আপনারা যেভাবে তৃতীয় শ্রেণীর রাজনীতিবিদের পেছনে ঘুরঘুর করেন, তা দেখে গৃহপালিত ইতর প্রাণীরাও লজ্জা পেয়ে যায়।’ ভদ্রমহিলা একদম চুপ হয়ে গেলেন। শো শেষ হলে তিনি প্রশ্ন করলেন- রনি ভাই! কথাগুলো কি আমাকে বললেন?
হাসিমুখে বললাম- ‘না, আপনাকে বলিনি। কমনলি বলছি।’ তিনি সহাস্যে উত্তর করলেন, যাক বাবা বাঁচা গেল।
অন্য একটি অনুষ্ঠান চলছিল টিএসসিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা কয়েকজন শিক্ষকের সাথে আমিও মঞ্চে বসা। একজন শিক্ষক যিনি কিনা আমার ছাত্রজীবনে হলের প্রভোস্ট ছিলেন এবং একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হওয়ার জন্য তখন তুমুল লবিং করে যাচ্ছিলেন- তিনি বক্তব্য দিতে এগিয়ে গেলেন। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তিনি সরকারি দলের এমন সব এজেন্ডা বর্ণনা করলেন, যা শুনে কট্টরপন্থী সরকার সমর্থকেরাও লজ্জা পেতে শুরু করলেন। বক্তৃতা শেষে তিনি আমার পিঠচাপড়ে জিজ্ঞেস করলেন- রনি, কেমন হলো! বললাম- স্যার, আপনি নিশ্চিত ভিসি হবেন। তবে বক্তৃতার শেষে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বললে ভিসি হওয়াটা আরো একটু তাড়াতাড়ি নিষ্পন্ন হতো। তিনি সরল বিশ্বাসে বললেন, আমি কি পুনরায় ডায়াসে ফিরে গিয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে আসব। আমি বললাম, আজ আর লাগবে না! আগামীতে সতর্ক হলেই চলবে! সম্মানিত পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, তিনি এখন একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর!
শিক্ষাঙ্গনের ঘৃণার অযোগ্য মানুষের পরে আমার কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর উপাদান হলো ভণ্ডপীর, ফকির ও ধর্মব্যবসায়ীরা। মুখে লম্বা দাড়ি, পরনে বিশাল জোব্বা, গায়ে আতর, চোখে সুরমা, হাতে তসবি, মাথায় পাহাড়ের মতো উঁচা টুপি, পরনে বিশেষ রঙের লুঙ্গি বা পাজামা এবং আগে-পিছে কয়েকজন সাগরেদ। কপালে বিশাল কালো দাগ এবং মুখভর্তি পান নিয়ে বেশ কয়েকজন লোককে দেখতাম সংসদের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে। কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার মুখোমুখি হতেই তারা লম্বা করে একটা সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিতেন হ্যান্ডশেক করার জন্য। এরপর আরো একটু পাত্তা পেলে কোলাকুলি না করে ছাড়তেন না। পরিচয়ের পর্ব শুরু হতো নিজের মরহুম আব্বা হুজুরের বংশলতিকা বর্ণনার মাধ্যমে। তারপর নিজের এলমে মারেফাত এবং ভবিষ্যৎ বলার দক্ষতার প্রমাণস্বরূপ কিছু আকর্ষণীয় তথ্য-উপাত্ত হাজির করতেন। নেতাদের মধ্যে যাদের চিত্ত নরম এবং যারা মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তারা অতি সহজেই এদের টোপ গিলে ফেলতেন। এর বাইরে যারা আগামীতে মন্ত্রিত্ব হারানোর ভয় এবং পুনরায় নমিনেশন না পাওয়ার শঙ্কার মধ্যে থাকতেন, তারাও ধরা খেতেন। এরপর শুরু হতো তদবিরের পালা। প্রাথমিক তদবির হলো- বাবে রহমত বা আবে রহমত জাতীয় আতর ব্যবহার। তারপর রুবি, ক্যাটস আই, পান্না ইত্যাদি পাথর দিয়ে আংটি ব্যবহারের নির্দেশ। তৃতীয় ধাপে থাকে আরো সব অপ্রকাশ্য ভয়াবহ তদবিরের সুপারিশ। এদের খপ্পরে পড়ে কত বড় বড় মানুষ যে প্রতারিত হয়েছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
ধর্মের নাম করে এবং ধর্মের লেবাস পরে রাজনৈতিক দলের হোতা সেজে নেতা-নেত্রীর নির্দেশমতো কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যাদানকারী ভণ্ডের সংখ্যা এই বঙ্গে দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে। তারা দলের চামচা হিসেবে টিভিতে যান- আবার সভা-সমিতিতেও সমানতালে গলাবাজি করেন। নেতা-নেত্রীর নির্দেশে তারা মাঝে মধ্যে রাজপথে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেন এবং যাকে-তাকে ঘায়েল করতে রাজনৈতিক ফতোয়া দিয়ে বসেন। এসব লোকের বাড়াবাড়ি দেখে অনেক সময় রাগে-অপমানে নিজের চুল নিজেই ছিঁড়তে ইচ্ছে করে।
আলেম বা ওলামা শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমার মানসপটে ফুটে ওঠে ইমাম আবু হানিফা রহ:-এর নাম। অর্ধবিশ্বের অধিকর্তা এবং দোর্দণ্ড প্রতাপশালী খলিফা আল মনসুর চাইলেন ইমাম আবু হানিফা রহ:কে সাম্রাজ্যের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিতে। ইমাম সাহেব সাফ জানিয়ে দিলেন, তিনি কোনো স্বৈরাচারীর অধীনে চাকরি করবেন না। অপমানিত খলিফা ইমাম সাহেবকে জেলে ঢুকালেন, এমনকি চাবুক পর্যন্ত মারলেন। কিন্তু সম্মানিত আলেম মাথা নোয়াননি। অন্য দিকে পীর শব্দটি শোনার সাথে সাথে মনে পড়ে গাউসুল আজম আবদুল কাদির জিলানী রহ:-এর কথা। জীবিকার প্রয়োজনে হালচাষ করতেন, মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। কিন্তু হারাম উপার্জনের দান গ্রহণ করতেন না। কোনো হারাম উপার্জনকারী কোনো দিন তার দরবারে হাজির হতেও সাহস পেতেন না। এমনকি বাগদাদের খলিফাও নন।
অন্য দিকে, ওলি আল্লাহর কথা বললে এই পাক ভারতে সবাই খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি ও খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার নাম স্মরণ করে থাকেন। কই তারা তো কোনো দিন কোনো রাজা-বাদশাহর দরবারে যাননি! বরং উল্টো রাজা-বাদশাহরা ফকিরের মতো তাদের দরবারে উপস্থিত হতেন।
এখন উপসংহার টানার পালা। শিরোনাম প্রসঙ্গে আবার চলে যাই। সাধারণ মানুষ যখন সাধারণভাবে গুনাহ করে, তখন অপরাপর সাধারণ মানুষ তাদের ঘৃণা করে। কিন্তু মনুষ্য সমাজে যারা নিয়ত বিশ্বাস, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার আসনে বসে গুনাহ করে, তখন সেসব মানুষকে ঘৃণা করতেও রুচিতে বাধে। সাধারণত ময়লা-আবর্জনা কিংবা দুর্গন্ধের কবলে পড়লে মানুষের বমি চলে আসে। কিন্তু কিছু মানুষ তাদের কৃত অপরাধের দ্বারা এমনই ঘৃণার বস্তুতে পরিণত হয়ে যায় যে, তাদের দেখলে অন্যদের বমি করার প্রবণতাও বন্ধ হয়ে যায়- অর্থাৎ বমনেও অরুচি চলে আসে।

কংগ্রেসে ভাষণ দিতে ওয়াশিংটন যাচ্ছেন নেতানিয়াহু

ইরানের পারমানবিক কর্মসূচী নিয়ে সম্ভাব্য কোন চুক্তির ক্ষতিকর দিকগুলোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বক্তব্য দিতে এখন আমেরিকার পথে রয়েছেন ইজরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
এই বক্তব্যের বিষয়টি নিয়ে ইজরাইল ও হোয়াইট হাউজের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠেছে। হোয়াইট হাউজকে না জানিয়েই, কংগ্রেসে বক্তব্য দেয়ার জন্য নেতানিয়াহুকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন রিপাবলিকানরা। মঙ্গলবার কংগ্রেসে তাঁর বক্তব্য দেয়ার কথা রয়েছে। নেতানিয়াহু মনে করেন, ইরানের সাথে চুক্তি হলে, সেটি আসলে তেহরানকে পারমানবিক বোমা বানানোর সুযোগ করে দেবে। তাই ইজরাইলকে নিরাপদ করার জন্য সবকিছুই তিনি করবেন বলে জানান। তবে তার এই বক্তব্যের বিষয়ে ওবামা প্রশাসনকে আগে কিছুই জানানো হয়নি, যা হোয়াইট হাউজকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
ইজরাইলি প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্য দেয়ার পরিকল্পনাকে স্বাগত জানালেও, আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলছেন, তিনি আশা করছেন, এটা কোন রাজনৈতিক খেলার হাতিয়ারে পরিণত হবে না। মি. কেরি বলছেন, ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে সবসময়েই স্বাগত জানানো হবে। কিন্তু আমরা আশা করি না, এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক একটি রাজনৈতিক খেলার বস্তুতে পরিণত হবে। কারণ, আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য পারমানবিক অস্ত্র তৈরিতে ইরানকে বাধা দেয়া, যা সবার জন্যই কল্যাণকর।
অনেক ডেমোক্রেট সদস্য কংগ্রেসের ওই বৈঠকে অংশ নেবেন না বলেও জানিয়েছেন। নেতানিয়াহু এমন সময় এই বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন, যার মাত্র দুই সপ্তাহ পরে ইজরাইলের সাধারণ নির্বাচন হবে, যেখানে তার দল চাপে রয়েছে।
এ দিকে, এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরান বলেছে, এটি ইজরাইল আর তার মিত্রদের মধ্যে দূরত্বই বাড়িয়ে দেবে এবং তাকে ইরান উপকৃত হবে। পারমানবিক কর্মসূচী বন্ধে জেনেভায় ইরানকে একটি সমঝোতায় রাজি করানোর চেষ্টা করছে আমেরিকাসহ ছয়টি পশ্চিমা দেশ।
সূত্র : বিবিসি।

সংকট পেরুবো কিভাবে? by ফরহাদ মজহার

অন্ধ হয়ে রাজনৈতিক বিভাজন ও বিভক্তি রেখা যেভাবে আমরা পরস্পরের বিরুদ্ধে টেনে দিচ্ছি এবং ভিন্ন চিন্তাকে দুষমন গণ্য করে তাকে নির্মূল ও কতল করবার জন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছি, তার পরিণতি সহিংস ও আত্মঘাতী হতে বাধ্য। বাংলাদেশের জন্য সেটা ইতোমধ্যেই মারাত্মক হয়ে উঠেছে। শুনতে অনেকের ভালো নাও লাগতে পারে- এই বিভাজন ও বিভক্তি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশকে বিলয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। অবশ্য বিশ্বে আমরা এখন টিকে আছি শুধু সস্তা দাসের দেশ হিসাবে। সেটা এক দিকে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জীবনের বিনিময়ে; তাদের পুড়িয়ে কিম্বা জ্যান্ত কবর দিয়ে আমরা জিডিপি বৃদ্ধির বড়াই করি। আর অন্য দিকে আনন্দের সঙ্গে নিজের দেশের নাগরিকদের নিজেরা দাস বানিয়ে অন্য দেশে চালান করে দিয়ে তাদের রেমিটেন্সের ওপর উচ্চবিত্ত ও ধনীদের একটি গণবিচ্ছিন্ন শ্রেণিকে টিকিয়ে রাখাই আমাদের প্রধান জাতীয় কর্তব্য হয়ে উঠেছে। গত দেড় দশক ধরে আমি বিভাজন, বিভক্তি ও নির্মূলের রাজনীতির বিপদের কথাগুলোই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলবার চেষ্টা করেছি। কোথাও জাতীয় ঐক্যের কোনো ক্ষেত্র তৈয়ার করা যায় কি না সেটাই আমি সন্ধান করেছি। আমি বিশেষভাবে জোর দিয়েছি দুটো ক্ষেত্রে। এক. মুক্তিযুদ্ধ; কারণ, একাত্তর হচ্ছে সেই সন্ধিবিন্দু, যাকে বাদ দিলে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে আমাদের কোন অস্তিত্ব আর থাকে না। দুই. ইসলাম প্রশ্ন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্ন বাদ দিয়ে যেমন বাংলাদেশের কথা ভাবা যায় না, ঠিক তেমনি ইসলাম প্রশ্ন বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মানসিক ও সাংস্কৃতিক ভূগোলের কোনো কূলকিনারা পাওয়া যাবে না। একে উপো করার অর্থ বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাইরে ইসলামকে একটি প্রতিপ শক্তি হিসাবে দাঁড়াতে বাধ্য করা, যার ফল বিভক্তি ও বিভাজনের মধ্যেই নিরন্তর খাবি খেতে থাকবে। আমি সফল হয়েছি দাবি করি না। কারণ, এখন টের পাচ্ছি আমরা সেই স্তরে পৌঁছে গিয়েছি যার পরে রয়েছে বড় ও বিশাল একটি খাদ বা গহ্বর। এই গহ্বরে বাংলাদেশের পড়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। আমার এখনকার লেখালেখির উদ্দেশ্য একটাই- এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার শেষ চেষ্টাটা চালিয়ে যাওয়া। লেখালেখির মধ্য দিয়ে সেই ধরনের মানুষগুলোর কাছে প্রাণপণ পৌঁছানোর চেষ্টা করা, যারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণকে একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে জানপ্রাণ রক্ষা করবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। ঐক্য ও সন্ধির ক্ষেত্রগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে পারে এবং চূড়ান্ত পতনের আগে বাস্তবোচিত পদপে গ্রহণ করতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান বিভাজন ও বিভক্তির মধ্যে এই কাজ রীতিমতো জীবন বাজি রেখে করবার মতোই কাজ। কারণ, বিভাজনের দুই তরফ থেকেই হামলার সম্ভাবনা প্রচুর। কিন্তু কাউকে না কাউকে তো কোনো একটা জায়গা থেকে কাজটি করতেই হবে।
---- দুই
বাংলাদেশের জন্মের গোড়ায় রয়েছে বিভাজন ও বিভক্তির রক্তাক্ত চিহ্ন। তবে গত দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশের রূপান্তর বীভৎস রূপ নিয়েছে। এটা ঠিক যে এই রূপান্তরের সঙ্গে বিশ্বব্যবস্থার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের সম্পর্ক আছে। একে অনেক সময় নিউ-লিবারেলিজম বলা হয়। এই ধারণাটি দিয়ে বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তরের ঠিক কোন দিকটির ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয় সে বিষয়ে বাংলাদেশে আমরা যথেষ্ট আলোচনা করি নি। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা কিভাবে বিশ্বব্যবস্থার নৈর্ব্যক্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও বদ্ধমূল চিন্তাচেতনার আধিপত্যের কারণে ঘটেছে সে সম্পর্কে সমাজে কোনো তর্কবিতর্ক বা স্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠে নি। এই ধরনের প্রভাব বা আধিপত্যের প্রসঙ্গ এলে আমরা একে ষড়যন্ত্র আকারেই গণ্য করি। এ কথা ভেবে আমরা হা-হুতাশ করি যে বাংলাদেশ একটি দুর্বল দেশ। গরিবের বউ সকলের ভাবী। আমাদের নিয়ে আঞ্চলিক আর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা খুবই ভালো, এতো নির্দোষ যে ভাজা মাছ উল্টিয়ে খেতে জানি না। বিদেশিদের ষড়যন্ত্রের কারণেই বাংলাদেশের এই দুর্দশা। নইলে আমরা ব্লাহ ব্লাহ ব্লাহ... ইত্যাদি।
আসলে এই ব্লাহ ব্লাহ ঠিক না। বাংলাদেশ যদি কিছু আসলেই করতে চায় সেটা বাংলাদেশকেই করতে হবে, বাইরের কেউই সেটা করে দেবে না। ওপরের মনস্তত্ত্বের উল্টা পিঠ হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান সংকট থেকে মুক্তির জন্য আমাদের কোন চেষ্টা নাই। আমরা ভাবছি ওয়াশিংটন কি করল, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কি করছে? যুক্তরাজ্যের কি অবস্থা? তারা কেন শেখ হাসিনাকে চাপ দিয়ে একটি নির্বাচন করিয়ে দিচ্ছে না আমাদের। এই যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে, তা বন্ধ করবার জন্য কোন হিউমেনিটারিয়ান ইন্টারভেনশন হচ্ছে না কেন?
ইন্টারেস্টিং দিক হলো নিজেদের দুর্দশার জন্য আমরা বিদেশিদের দোষ দেই। আবার সেই দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য আমরা আবার বিদেশিদের হস্তক্ষেপই কামনা করি। নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ণয় করবার জন্য যে আত্মমর্যাদা বোধ ও হিম্মত দরকার সেটা আমরা অনেক আগেই সম্ভবত হারিয়েছি। তাহলে আমাদের দুটো কর্তব্য রয়েছে। এক. বিভাজন ও বিভক্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটা ঐক্যের রাজনীতি গড়ে তুলবার চেষ্টা করা; দুই. নিজেদের হীনম্মন্যতা কাটিয়ে উঠে নিজেদের আত্মমর্যাদা উপলব্ধি ও নিজেদের হিম্মতে নতুন ধরনের রাজনীতির সম্ভাবনা তৈরি করা। আমি কোনো তৃতীয় ধারার রাজনীতির কথা বলছি না। সমাজের দ্বন্দ্বসংঘাত নিজের অন্তর্গত প্রক্রিয়ার কারণেই দুটো প্রধান রাজনৈতিক ধারা হিসাবে হাজির হয়। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিও দুটি ধারায় বিভক্ত। এই দুই অধিপতি ধারাকে মেনে ও তাদের পরিমণ্ডলে থেকে মাঝখানে কোন তৃতীয় ধারা গড়ে তোলা যায় বলে আমি মনে করি না। যা গড়ে উঠবে তা বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বদ্ধমূল ধ্যানধারণাকে ভেঙ্গে নিজেই জাতীয় হয়ে উঠবে। অর্থাৎ জনগণের মধ্যে নতুন চিন্তা এবং দেশ ও রাষ্ট্রকে গড়ে তুলবার নতুন পরিকল্পনা ও ছক কিঞ্চিত দানা বেঁধে উঠতে থাকলেই তা রাজনীতির প্রধান জাতীয় ধারা হিসাবে দানা বাঁধতে শুরু করবে। তাকে ঠেকানোর শক্তি কারুরই থাকবে না।
এর আগে আমি আমার একটি লেখায় বলেছি, যারা আমার এই পর্যালোচনা মানতে রাজি নন, তারা তৃতীয় ধারা বা তৃতীয় শক্তি বলতে মূলত রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকাই বুঝিয়ে থাকেন। তাদের বাসনা রাজনীতির প্রধান দুই পক্ষ ছেড়ে সেনাবাহিনী তাদের সমর্থন করুক, তারা ক্ষমতায় যাক। রাজনীতির কঠিন ও বিপদসংকুল পথকে সংক্ষেপে করবার জন্যই তারা এভাবে ভাবেন। এটা ভুল পথ ও বিপজ্জনক।
রাজনীতিতে বল প্রয়োগের ভূমিকা আছে। সমাজের শক্তিশালী শ্রেণিগুলো তাদের প্রতিপ শ্রেণি ও শক্তিকে দমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ, আইন আদালত ও সশস্ত্র বল প্রয়োগের প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই তত্ত্ব নতুন কিছু নয়। রাষ্ট্র শ্রেণি শোষণের হাতিয়ার- লেনিনের এই বাক্য শুধু বামপন্থীদের মুখস্থ তা নয়, ধনী শ্রেণিও মনে করে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমর্থন থাকে বলেই তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই মৌলিক তত্ত্ব মেনেই শোষক যেমন শোষণব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে, একইভাবে সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের পথও ভিন্ন কিছু হয় না। লেনিন সহজেই বুঝেছিলেন বিপ্লবী গণ-অভ্যুত্থানের রাজনীতির কাজ সশস্ত্রতার বন্দনা গাওয়া নয়, কিম্বা সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় যাওয়া নয়।
মজলুম সব সময়ই তার হাতের কাছে যা আছে তাই দিয়ে জালিমের বিরুদ্ধে লড়ে। মজলুমের লড়াই হাতে ইট বা লাঠি থাকলেও তা সব সময়ই সশস্ত্র। এর সঙ্গে সৈনিকের কাঁধে ঝোলানো বন্দুকের সঙ্গে গুণগত ফারাক থাকলেও চরিত্রগত পার্থক্য নাই। কিন্তু লাঠি আর বন্দুক তো এক নয়। সেনাবাহিনী সমাজ ও জনগণেরই অংশ, তারা আকাশ থেকে প্যারাসুট দিয়ে নেমে আসেনি। সমাজ ও রাষ্ট্রের দুঃখ-কষ্টে তারাও আন্দোলিত হয়। অতএব বিপ্লবী রাজনীতির প্রধান কাজ হচ্ছে বন্দুকের নল উল্টা দিকে ফিরিয়ে দেওয়া। শোষক এই নল তাক করে রাখে জনগণের দিকে, হত্যা করে সাধারণ মানুষকে। তাহলে সেই রাজনৈতিক সচেতনতা ও উপলব্ধি জনগণের মধ্যে সঞ্চারিত করা দরকার, যাতে সেই নল শোষকের পাহারাদার না হয়ে জনগণের মুক্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠে এবং নিমেষে গণশক্তির রূপ পরিগ্রহণ করে। শুধু  ক্ষমতার হাত বদল নয়, সেই শক্তিকেই গড়ে তোলা দরকার, যাতে বন্দুকের সেই নল- এত দিন যা শোষককে রা করেছে, তা জনগণকে রক্ষা করবার জন্য শোষকের বিরুদ্ধেই উল্টে যায়। ষড়যন্ত্র নয়, রাজনীতি ও গণসচেতনতাই এখানে প্রধান কাজ। ইতিহাসের যেকোনো বৈপ্লবিক রূপান্তরের সারকথা হচ্ছে, সৈনিক ও জনগণের বৈপ্লবিক মৈত্রী। এই মৈত্রীই যুগে যুগে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশেও সাতই নভেম্বর খানিক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসাবে দেখা দিয়ে হারিয়ে গিয়েছে। আমরা এই মৈত্রীর রাজনীতির সুফল পরিপূর্ণভাবে ভোগ করতে পারি নি। কারণ, সৈনিক আবার শোষকের পাহারাদারিতে নিয়োজিত হতে বাধ্য হয়েছে। ফলে শোষক শ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান চেষ্টা থাকে বলপ্রয়োগের প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোকে যে কোন মূল্যে নিজেদের হুকুম তামিল করবার অবস্থায় রাখা। সেখানে গড়বড় হয়ে গেলে ক্ষমতা চলে যাওয়া মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু এ ধরনের পরিবর্তনে সমাজ, রাজনীতি বা সংস্কৃতির মৌলিক কোন পরিবর্তন ঘটায় না। সমাজের কাঠামোতে বা চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন ঘটাতে পারে না বলে ক্ষমতার হাত বদল সমাজের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতকে আরো দীর্ঘস্থায়ী করে মাত্র। তা যদি সমাধানের অতীত অবস্থায় চলে যায় তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কেন ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই বাস্তব সত্য আমাদের মনে রাখা দরকার। ঠিক যে তার বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু গণ-আন্দোলনের বিজয় হয়েছে বলে তিনি ক্ষমতা ছেড়েছেন, সেটা সত্যি নয়। তিনি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ, প্রতিষ্ঠান হিসাবে সেনাবাহিনী তার পেছনে থাকতে আর রাজি ছিল না।
রাজনৈতিক ক্ষমতার পেছনে বলপ্রয়োগের হিম্মত না থাকলে সেটা মুহূর্তে ভেঙ্গে পড়ে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ট্রাজেডি তার ভালো উদাহরণ। দীর্ঘকাল সেনাশাসন একটি দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না, এই বিবেচনাটুকু সৈনিক ও সেনাপতি সকলের মধ্যে কাজ করেছে। তবে রাজনীতির এই বাস্তব সত্যকে আমরা কিশে মার্কা কথাবার্তা বা নীতিকথার ভাঁড়ামি দিয়ে আড়াল করতে পারি না। এটা সত্যি যে, সেনাবাহিনী এক-এগারোর ঘটনাবলির জন্য চরমভাবে নিন্দিত হলেও বিএনপির ক্ষমতাচ্যুতি এবং বর্তমান অবস্থাকে আমরা একই ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। জাতীয় পর্যায়ের দুটি প্রধান দলের ক্ষমতায় থাকা না থাকা একান্তই সেনাবাহিনীর সমর্থন দেওয়া না দেওয়ার ওপর এখন নির্ভর করছে। এর জন্য বিশাল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবার প্রয়োজন নাই। কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট যতোই তীব্র হচ্ছে সেনাবাহিনীর প্রশ্ন ততোটাই স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। শেখ হাসিনা খামাখাই ‘উত্তরপাড়া’ নিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে কটাক্ষ করেছেন। পরিস্থিতিই তাকে এই ধরনের মন্তব্য করতে বাধ্য করেছে। তিনি খেয়াল করেন নি, তার তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য খুবই স্পর্শকাতর হয়েছে, কারণ, তা সেনাবাহিনীর মর্যাদাকেও হেয় করেছে।
----- তিন
গুম-খুন, আইনবহির্ভূত হত্যাসহ নাগরিক ও মানবিক অধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়ার লক্ষণগুলো আমাদের ভাঙ্গনের বাহ্যিক বা দৃশ্যমান দিক। ভেতরের দিক হচ্ছে প্রগতি, আধুনিকতা, গণতন্ত্র ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের নানান মনগড়া অনুমান ও ধারণা। আধুনিক হওয়া বলতে আমরা পাশ্চাত্যের অর্জন ও তার বাছবিচারের মধ্য দিয়ে গ্রহণ-বর্জন বুঝি না। পাশ্চাত্যের নির্বিচার গ্রহণ করাই বুঝি। যে কারণে আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার নামে ইসলামবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়াই আমরা চর্চা করি। প্রগতির নামে যা রেসিজম বা বর্ণবাদ ছাড়া কিছুই না। এ কালে ইসলামসহ ধর্মের কোনো পর্যালোচনা বা গঠনমূলক ভূমিকা থাকতে পারে আমরা তা মনে করি না। আমি সব সময়ই এই রাজনীতির বিরোধিতা করে এসেছি। এর জন্য কাউকে ইসলামি মোজাদ্দিদ হবার প্রয়োজন পড়ে না। এই কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট যে‘রাজনীতি’ বা রাজনীতির পরিসর বলতে বোঝায় অন্যের বা অপরের কণ্ঠস্বরকে অন্তর্ভুক্ত করা, অপরের কথা শোনা এবং তার সঙ্গে কথোপকথনে নিযুক্ত হওয়া। যারা রাজনীতির পরিসর থেকে ভিন্ন চিন্তা ও তার নিজের আদর্শের বিরোধী মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর নীরব করে দেয়, তারা রাজনীতির জন্য বিপদ ডেকে আনে এবং সমাজকে এমন এক বিভাজন ও বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়, যা ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক গৃহযুদ্ধের রূপ পরিগ্রহণ করে। বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে পাশ্চাত্যে খবর হচ্ছে। তার জন্য প্রগতি ও আধুনিকতার নামে নির্মূলের রাজনীতিই দায়ী। ইসলাম প্রশ্ন মীমাংসার কাজ সহজ বা সরল বলে আমি মনে করি না। কিন্তু রাজনৈতিক পরিসর থেকে জনগণের বিশাল একটি অংশকে বাদ দেবার ধারণাটাই অবাস্তব ও বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের বড় একটি কারণ।
রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য লড়াইয়ে জয়ী হওয়া এক কথা আর জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় ধারণ করতে সম একটি রাষ্ট্র গঠন করার ঐতিহাসিক কর্তব্য আলাদা। কিন্তু এই ফারাক আমরা অনুধাবন করতে পারি না। জনগণের অভিপ্রায় ধারণ করা গঠনতন্ত্র বা কনস্টিটিউশন ছাড়া কোন গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র গঠন করা যায় না। অথচ এখনও আমরা বলি বাংলাদেশের সংবিধান জনগণ নয়, এর প্রণেতা ডক্টর কামাল হোসেন। একই মুখে বলি সংবিধান হচ্ছে- ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি’। সংবিধানে শেষের কথাটাই লিখা আছে, কামাল হোসেন সংবিধান লিখেছেন সে কথা লেখা নাই। সংবিধানে কারো নাম লেখা থাকে না। সংবিধান প্রণেতা হিসাবে ডক্টর কামাল হোসেন নিজের নাম এভাবে উচ্চারিত হওয়া এনজয় করেন কি না জানি না, কিন্তু টেলিভিশনে তাকে যখন এভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, তিনি কখনো প্রতিবাদ করেন নি। সংবিধান প্রণেতা হিসাবে ডক্টর কামাল হোসেনের অবদান থাকতেই পারে। কিন্তু তার লেখনীতে ‘জনগণের পরম অভিপ্রায়’ ব্যক্ত হয়েছিল সেটা ঠিক না। ফলে গোড়ার প্রশ্ন আজও থেকে গিয়েছে যে আমরা স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ করেছি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে, এই রকম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
তাহলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সংবিধানে কোন যুক্তিতে যুক্ত করা হয়েছিল? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে দলীয় কর্মসূচি সংবিধানে যুক্ত হোল কেন? আইনের দিক থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা গাঠনিক বা ফাউন্ডেশনাল হলেও পরবর্তীতে সংবিধান প্রণয়নের সময় তাকে অস্বীকার করা হোল কেন?
এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা একটি ঐক্যের ক্ষেত্র চিহ্নিত করবার জন্য বলতে পারি স্বাধীনতার ঘোষণা এমন একটি ঐতিহাসিক দলিল, যাকে আশ্রয় করে আমরা বিভাজন ও বিভক্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার একটা শেষ চেষ্টা করতে পারি। যদি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ কায়েম করা যায় এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের কর্তব্য সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে সঞ্চারিত করা যায়, তাহলে জাতীয় রাজনীতির প্রধান দুই ধারাকে অক্ষুণ্ন রেখে মাঝখানে আমাদের কোনো দুর্বল তৃতীয় ধারা তৈয়ারির বেগার খাটতে হবে না। নতুন বাংলাদেশ গঠনের কর্তব্য পালনের অভিপ্রায়ই রাজনীতির পরম অভিব্যক্তি হিসাবে হাজির হবে। এটাই রাজনীতির প্রধান ধারা হতে বাধ্য। সামরিক কিম্বা বেসামরিক, সৈনিক কিম্বা নাগরিক সকলের মনের ইচ্ছার কথা যদি আমরা জাতীয় ইচ্ছায় রূপ দিতে পারি তাহলে কারো সমর্থন স্কাইপে বা ভাইবারে কাউকে চাইতে হবে না। জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের গুণে তারা আপনাতেই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। ইতিহাস তো তাই বলে। এই ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি।
জনগণের ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ই নিজের শক্তি ও গতির কারণে সকলকে ভাসিয়ে নিতে সক্ষম।
এই বিশ্বাসটুকুই আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ১৪ ফাল্গুন ১৪২১। শ্যামলী।
ফরহাদ মজহার: কবি: কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
ই-মেইল : farhadmazhar@hotmail.com

খালেদার কার্যালয়ে খাবার আসে যেভাবে by কমল জোহা খান

পুলিশের বাধায় আসছে না খাবার—এমন অভিযোগ করে আসছে বিএনপি। বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং বরাবরের মতো গত শনিবারও বলেছে, খাবার আনায় পুলিশের বাধা রয়েছে। অধিকাংশ সময়ই তাঁদের শুকনো খাবার খেয়ে থাকতে হচ্ছে। তাহলে কীভাবে আছেন এই কার্যালয়ের বাসিন্দারা?
আজ সোমবার সরেজমিনে গিয়ে বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবীর ও ওই কার্যালয়ের বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে খাবার আসছে তিনভাবে। খালেদা জিয়ার জন্য খাবার আসছে তাঁর ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দরের বাসা থেকে। অন্যদের খাবার বাইরে থেকে নিয়ে আসছেন খালেদার নিরাপত্তা দল সিএসএফের সদস্যরা।
আর যে পুলিশ সদস্যরা খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে খাবার ঢুকতে দিতে বিভিন্ন সময় বাধা দিয়েছেন, তাঁদেরই খাবারের ব্যাগ এনে কার্যালয়ের ভেতরে সিএসএফ সদস্যদের কাছে পৌঁছে দিতে দেখা গেছে। তবে তাঁদের সবাই সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্য। সিএসএফ, অর্থাৎ চেয়ারপারসনস সিকিউরিটি ফোর্স এর সদস্যরা খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত।
খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবন থেকে এর মধ্যে পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে গুলশানের কার্যালয়ে পুলিশ প্রহরা একই রকম রয়েছে। আদালত ওই কার্যালয়ে তল্লাশি পরোয়ানা জারি করেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শামীম ইস্কান্দরের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়ার জন্য খাবার আনার কাজ করেন খায়ের নামে এক যুবক। তিনি একসময় খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানের গাড়ি চালাতেন। শামীমের বাসার রান্না করা খাবার নিয়ে প্রতিদিন চার বার বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের ভেতর যান খায়ের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কার্যালয়ে অবস্থানকারী অন্যদের জন্য খাবার রান্না করা হয় খালেদা জিয়ার গুলশান-২ এর বাসভবন ‘ফিরোজায়’। রান্না করা সেই খাবার সিএসএফ সদস্যরা নিয়ে আসেন। আনার সময় গুলশান লেকের রাস্তা দিয়ে ৮৮ নম্বর সড়ক দিয়ে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে আসেন তাঁরা। দিনের প্রথমে সকালের পালাবদলের সময় সাত-আটজন সিএসএফ সদস্যদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে ব্যাগ থাকে। সেই ব্যাগ নিয়ে তাঁরা কার্যালয়ের ভেতরে ঢোকেন। একইভাবে প্রতিদিন দুপুর দুইটার পর দ্বিতীয় দফা ও সবশেষ রাত ১০টার সময় ব্যাগে করে খাবার নিয়ে আসা হয়।
এর আগে গত শনিবার দেখা গেছে, ঢাকা বারের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের বিজয় উপলক্ষে বিরিয়ানির প্যাকেটগুলো কয়েক দফায় গুলশান কার্যালয়ে ভেতরে নেওয়া হয় সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায়। ভেতরে দেওয়ার পর কয়েকটি প্যাকেট গেটের পাশের নিরাপত্তা ঘরে রেখে দেন তাঁরা। দুপুরে পালাবদলের সময় বেশ কয়েকটি বিরিয়ানির প্যাকেট একটি ব্যাগে করে নিয়ে চলে যান সাদা পোশাকধারী দুই পুলিশ।
গত শনিবার দুপুর তিনটা পর্যন্ত ব্যাগ নিয়ে বিএনপি কার্যালয়ের ভেতরে কাউকে যেতে দেখা যায়নি। সিএসএফেরও কোনো বদল হয়নি। একইদিন শায়রুল কবীর অভিযোগ করেন, খাবার আনায় পুলিশের বাধা রয়েছে।
চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ৫০ জন অবস্থান করছেন জানিয়ে শায়রুল কবীর দাবি করেন, পুলিশ বাধা দেওয়ার আগে কার্যালয়ের ভেতরে আগের জমানো খাবার তাঁদের খেতে হচ্ছে। মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্টক করা খাবার আমরা খাচ্ছি। আর সিএসএফের লোকজন বাইরে থেকে খেয়ে আসছেন। এ ছাড়া চিড়া-মুড়িসহ শুকনা খাবার খেতে হচ্ছে।’
ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখ থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের ভেতরে পুলিিশ বাধায় খাবার ফেরত চলে যায়। এর পর ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে একাধিক বার খাবার আনায় পুলিশ বাধা দেয়। সেদিন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান দাবি করেন, খালেদা জিয়া পাঁচ দিন ধরে অভুক্ত আছেন। সবশেষ ২১ ফেব্রুয়ারি ১২ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাও খালেদার জন্য আনা খাবার না দিতে পেরে ফেরত চলে যান।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সিএসএফ সদস্য ছাড়া ওই কার্যালয়ে আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান। আছেন শিমুল বিশ্বাস, মারুফ কামাল খান সোহেল, শিরীন সুলতানা, শায়রুল কবীর, শামসুদ্দিন দিদার ও এবিএম আবদুস সাত্তার। খালেদা জিয়ার বাসভবনের বেশ কিছু কর্মচারীও সেখানে থাকছেন।

সংলাপের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে নাগরিক সমাজ by সিরাজুস সালেকিন

দেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে তৎপরতা শুরু করেছিলেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে একটি জাতীয় সনদ প্রণয়ন করে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য দুই জোটের কাছে আহ্বান জানিয়েছিলেন তারা। এজন্য ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ নামে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। এর মধ্যে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ায় দৃশ্যত নাগরিক সমাজের তৎপরতায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবে এ উদ্যোগের সঙ্গে জড়িতরা দাবি করেছেন, বিষয়টি নিয়ে কিছু লোক বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তাদের উদ্যোগ থেকে পিছপা হবেন না। মান্নার বিষয়টি রাজনৈতিক। এর সঙ্গে নাগরিক সমাজের কোন সম্পর্ক নেই।
৭ই ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সেমিনার হলে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকরা ‘জাতীয় সংকট নিরসনে জাতীয় সংলাপ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়েছিলেন। সেমিনারের উদ্যোক্তা ছিলেন সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন। ওই সভা থেকে প্রেসিডেন্টকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছিলেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। এরপর ৯ই ফেব্রুয়ারি দেশে চলমান সঙ্কট নিরসনে প্রেসিডেন্টকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য লিখিত অনুরোধও জানিয়েছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সংলাপে বসার অনুরোধ জানিয়ে একই রকম চিঠি দিয়েছিলেন ড. হুদা। ওই চিঠির সঙ্গে কিছু প্রস্তাবনাও উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, রাজনৈতিক বিরোধ বা সঙ্কট নিরসনের শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রীতি হচ্ছে সংলাপ। এর কোন বিকল্প নেই। সংলাপ হতে হবে দেশের সকল সক্রিয় রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণের ভিত্তিতে। সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য আমরা প্রথমেই সরকারকে অনুরোধ করছি এবং এ ব্যাপারে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য অনুরোধ করছি।
বিএনপি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও আওয়ামী লীগ নেতারা এর বিরোধিতা করেন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠক থেকে নাগরিক সমাজের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরপর আবারও ১৩ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংলাপে সহায়তা দিতে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন ড. এ টি এম শামসুল হুদা। ওইদিন ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ নামে ১৩ সদস্যের একটি নাগরিক কমিটির ঘোষণা দেন তিনি। ড. এ টি এম শামসুল হুদা নিজেই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। এ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, এ এস এম শাহজাহান, ড. আকবর আলি খান, সিএম শফি সামী, রাশেদা কে চৌধুরী, রোকেয়া আফজাল রহমান, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. শাহদীন মালিক, সৈয়দ আবুল মকসুদ, আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী, ড. আহসান মনসুর, ড. বদিউল আলম মজুমদার। গত বৃহস্পতিবার এ কমিটির একটি গোলটেবিল বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে তা বাতিল করা হয়। এ প্রসঙ্গে কমিটির সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, বৃহস্পতিবারের বৈঠক আমরা করিনি। আমাদের উদ্যোগ চালিয়ে যাব। আমাদের নিজেদের মধ্যে বৈঠক চলছে। এ বিষয়ে ড. এ টি এম শামসুল হুদার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান। মান্নার ফোনালাপের ঘটনা নাগরিকদের উদ্যোগে প্রভাব ফেলবে কিনা- জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক ও ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের’ সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জাতীয় সংলাপ নিয়ে কিছু লোক বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত। মাহমুদুর রহমান মান্নার গ্রেপ্তারে আমাদের কাজে কোন প্রভাব পড়ার প্রশ্নই ওঠে না। তারা রাজনৈতিক সমাজের লোক। আমরা নাগরিক সমাজের লোক। তাদের কর্মকাণ্ডের দায় আমাদের ওপর আসতে পারে না। তিনি আরও বলেন, আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। আমাদের দাবি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করতে হবে। সে সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান করতে হবে। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। বিষয়গুলো খুব জটিল। আমরা সবকিছু নিয়ে কাজ করছি। একদিনে তো সমাধান সম্ভব নয়। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

ওয়াচডগের ভূমিকাই পালন করছে সংবাদপত্র -সাক্ষাৎকারে : সাখাওয়াত আলী খান by মশিউল আলম

সাখাওয়াত আলী খানের জন্ম ১৯৪১ সালে ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন যথাক্রমে ১৯৬২ ও ১৯৬৩ সালে। ১৯৬৩ সালে সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা ও ১৯৭০ সালে মাস্টার্স করেন। সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন ছাত্রাবস্থায়, প্রায় ১০ বছর এ পেশায় নিয়োজিত থাকার পর ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, ১৯৮৯ সালে পিএইচডি করেন এবং অধ্যাপক হন ১৯৯২ সালে। ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে। ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে একই বিভাগে অনারারি প্রফেসর হিসেবে কর্মরত।
প্রথম আলো :দেশে প্রায় দুই মাস ধরে রাজনৈতিক সংকট ও সহিংসতা চলছে। একজন প্রাক্তন সাংবাদিক, সাংবাদিকতার অধ্যাপক ও পর্যবেক্ষক হিসেবে এই সময়কালে দেশের সংবাদমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
সাখাওয়াত আলী খান :বয়সের কারণে আমার দীর্ঘদিন সংবাদমাধ্যমের কর্মসম্পাদন দেখার সুযোগ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমাদের সাংবাদিকতার অনেক অগ্রগতি হয়েছে। একটা সময় সংবাদমাধ্যমের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। একটা সময় ছিল যখন ঢাকা শহরে কোনো দৈনিক সংবাদপত্রই ছিল না। সেই অবস্থার সঙ্গে তুলনা করতে গেলে বলতে হবে, আমরা অনেক অনেক দূর এগিয়েছি। সংবাদমাধ্যমেও সেটা আছে। পৃথিবীর কোন কোন দেশে সবচেয়ে ভালো সাংবাদিকতা হচ্ছে, এটার কোনো মাপকাঠি আমার কাছে নেই, বিভিন্ন উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের সাংবাদিকতার সঙ্গে তুলনা করে বলা যায়, আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। এই উন্নতি বা অগ্রসরতা এককথায় বিস্ময়কর; গুণগত মান এবং বিস্তৃতি—উভয় দিক থেকেই।
প্রথম আলো :চলমান রাজনৈতিক সংকট ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে আমাদের সংবাদমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনা সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন...
সাখাওয়াত আলী খান :আমি সেদিকে আসছি। সাংবাদিকতার অগ্রগতির সঙ্গে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। এর মধ্যে রাজনীতি আছে, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য আছে, শিক্ষা আছে, এমনকি পরিবেশগত বিষয়ও আছে। এই সব দিক বিবেচনায় নিলে সাংবাদিকতার অগ্রগতি বেশ সন্তোষজনক। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও যদি একই সঙ্গে অগ্রগতি না ঘটে, তাহলে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যাপক অগ্রগতি আশা করাটা বোধ হয় সঠিক নয়।
প্রথম আলো :এ মুহূর্তের অনেক কিছুই নির্ভর করছে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর...
সাখাওয়াত আলী খান :আমাদের সাংবাদিকতার প্রধান উপজীব্য রাজনীতি। এই রাজনীতির ক্ষেত্রে গুণগত মান বৃদ্ধি না পেলে, তাহলে সাংবাদিকতার গুণগত মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটা সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে আজকের একজন তরুণের কাছে মনে হতে পারে, সাংবাদিকতার অনেক ঘাটতি রয়েছে। এবং আসলে ঘাটতি যে নেই, তা নয়। উন্নতির অনেক জায়গা আছে। এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, আমাদের স্বাধীনতার চেতনা, যে শব্দটা বহুল ব্যবহৃত, তার সঙ্গে সাংবাদিকতার মূলধারার কোনো বিরোধ থাকা উচিত নয়।
প্রথম আলো :কিন্তু ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের একধরনের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার, কিংবা হুমকিপূর্ণ কথাবার্তা শোনা যায়।
সাখাওয়াত আলী খান :ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে সংবাদক্ষেত্রের ছোটখাটো খিটিমিটি অহরহ লেগেই থাকবে, এটা অনেক সময় গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য উপকারী হয়। সংবাদক্ষেত্রকে বলা হয় দ্য ফোর্থ এস্টেট, যদিও এ কথাটা আজকাল আর তেমন শোনা যায় না, কিন্তু সংবাদক্ষেত্রের এই ফোর্থ এস্টেটের ভূমিকা গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সংবাদক্ষেত্র ফোর্থ এস্টেটের ভূমিকায় যদি একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে স্থিত থাকে, তাহলে ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তার মতপার্থক্য হতে পারে, এবং সেটা কোনোভাবেই খারাপ কিছু নয়, বরং গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য দরকারি।
প্রথম আলো :আমাদের সাংবাদিকতার পেশাদারির দিকে কোনো পরিবর্তন কি আপনার চোখে পড়ে?
সাখাওয়াত আলী খান :এখন সংবাদপত্রগুলোয় অনুসন্ধানী ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন ভীষণভাবে কমে গেছে। এখন এ শব্দগুলো শুধু নামেই শোনা যায়। এই দুই ধরনের সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজনীয় মেধাবী মানুষ যে এখন নেই, সে কথা আমি বলব না। আমাদের দেশে এখন বেশ কিছু সাংবাদিক আছেন, যাঁদের মেধায় আমি বিস্মিত। কিন্তু অনুসন্ধানী ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণমূলক সাংবাদিকতা বিস্ময়করভাবে কমে গেছে। এর পেছনে হয়তো রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে উদারনৈতিকতার অভাব কাজ করে। অনেক সংবাদমাধ্যমের মালিক এখন ব্যবসায়ী, তাঁদের প্রভাব যে সংবাদমাধ্যমের ওপর পড়ছে না, এটা বলা কঠিন। রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাংবাদিকতার মধ্যেকার সম্পর্ক হয়তো এখন আগের তূলনায় অনেক জটিল হয়েছে। তার ফলে হয়তো গভীর অনুসন্ধানী ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণমূলক সাংবাদিকতার অনুশীলন পেছনে পড়ে গেছে। সংবাদপত্র পরিচালনায় সাংবাদিকদের স্বাধীনতা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয়। এই ক্ষেত্রে উদারমনা মালিকদের সংখ্যা বাড়লে সাংবাদিকতার আরও অনেক উন্নতি হবে।
প্রথম আলো :কেউ কেউ বলছেন, প্রায় দুই মাস ধরে দেশের সংবাদপত্রগুলোতে শুধু পেট্রলবোমা আর রাজনৈতিক সহিংসতার খবরই বেশি পরিবেশিত হচ্ছে। দেশ-জাতির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বা ইস্যু দৃষ্টির আড়ালে থেকে যাচ্ছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
সাখাওয়াত আলী খান :এই সময়ে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, নাগরিক সেবাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয় যে কিছুটা চাপা পড়ে গেছে, তা ঠিক। কিন্তু আমাদের সাধারণ মানুষের এখনকার অবস্থাটা হচ্ছে এ রকম যে কোনো নিকটজন খুবই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, তখন তাঁর চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষাই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান বিষয়। ঠিক তেমনই এখন পেট্রলবোমার কারণেই হোক, অন্যান্য রাজনৈতিক সহিংসতার কারণেই হোক, দেশমাতৃকার অবস্থা যখন সেই রকম গুরুতর, তখন তো তার দিকে সর্বপ্রকার দৃষ্টি দেওয়াই স্বাভাবিক। এখন দেশের অবস্থা সে রকম। পেট্রলবোমা বা চলমান রাজনৈতিক অবস্থায় দেশের সব মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আক্রান্ত করে ফেলেছে। যত দিন পর্যন্ত এই অস্বাভাবিক অবস্থার অবসান না ঘটছে, তত দিন আমরা সাংবাদিকতার আদর্শ মডেল অনুসরণ করতে পারব না।
প্রথম আলো :দেশে রাজনৈতিক বৈরিতাপ্রসূত সংকট যে কানাগলিতে গিয়ে ঠেকেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের কিছু করার আছে, নাকি শুধু এই অচলাবস্থার সংবাদ পরিবেশনের মধ্য দিয়েই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
সাখাওয়াত আলী খান :খুবই কঠিনপ্রশ্ন, আবার একই সঙ্গে জরুরি প্রশ্নও বটে। সংবাদমাধ্যম কি শুধু পর্যবেক্ষক হিসেবে যা দেখবে তা-ই লিখবে? নাকি সংকট নিরসনেও ভূমিকা রাখবে? আমার বিবেচনায় সংবাদমাধ্যমের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব পর্যবেক্ষক ও সংবাদ পরিবেশকের। এটা তাদের পেশাগত দায়িত্ব, এ বিষয় তাদের একটা নীতি আছে। তবে সাংবাদিকেরা একই সঙ্গে দেশের নাগরিকও বটে। নাগরিকের দায়িত্বও তাঁদের পালন করা উচিত। সংবাদমাধ্যম যদি চলমান সংকট থেকে দেশকে মুক্ত করায় ভূমিকা রাখতে চায়, তাহলে আগে সাংবাদিকদের সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাঁরা কী পন্থায় কী ভূমিকা নিতে চান। শান্তির সময়ে সংবাদমাধ্যমের প্রধান ভূমিকা পর্যবেক্ষক ও সংবাদ পরিবেশকের। আপনি দেখবেন, জনগণকে জানাবেন। আর বিশেষ সংকটময় সময় সময় দেশের প্রতি, জাতির প্রতি, এমনকি পৃথিবী ও সভ্যতার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেও সাংবাদিকেরা সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে পারেন।
প্রথম আলো :কিছুদিন আগে দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পাদক পরিষদের এক বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে, সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে। এর এক দিন পরেই তথ্য মন্ত্রণালয় এক লিখিত বক্তব্যে বলল, সম্পাদক পরিষদের বক্তব্য বাস্তবতা-বিবর্জিত, সত্যের অপলাপ, পক্ষপাতমূলক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও দুর্ভাগ্যজনক। তথ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম স্মরণকালের মধ্যে এখন সবচেয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য?
সাখাওয়াত আলী খান :অতিশয়োক্তি করা আমাদের দেশের মানুষের একটা সাধারণ প্রবণতা। বাস্তবতা-বিবর্জিত, সত্যের অপলাপ, উদ্দেশ্যমূলক ইত্যাদিও ক্লিশে কথা। সরকার এগুলো বলতেই পারে। কিন্তু এ রকম পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেওয়া কোনো কাজের কথা নয়। কাজের কথা হলো দুই পক্ষ বসে আলোচনা করা। সম্পাদক-মালিক ও সরকার মুখোমুখি বসে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করলেই তো পারে। দুই পক্ষ তো পরস্পরের শত্রু নয়, সংবাদমাধ্যম আছে গণতন্ত্র ও সুশাসনকে সমর্থন-সহযোগিতা করতে। সরকারেরও দায়িত্ব সেই লক্ষ্যেই কাজ করা। তাহলে দুই পক্ষের ভূমিকা তো পরস্পরের পরিপূরক। শুধু একটা বিষয় সবাইকে মেনে নিতে হবে যে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সব বিতর্কের ঊর্ধ্বের বিষয়। সরকারের ভুলত্রুটি, শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক চর্চাসহ বাকি সমস্ত বিষয়ে সংবাদমাধ্যম ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করবে—এটাই তো তাদের দায়িত্ব। সে ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম যদি অনুভব করে যে তাদের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা চলছে, তাহলে সরকারের উচিত সেটা আমলে নেওয়া এবং দুই পক্ষ মুখোমুখি বসে আলোচনা করে সমস্যাগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া। কোনো রকমের ভুল-বোঝাবুঝির অবকাশ থাকা উচিত নয়।
প্রথম আলো :কিছুদিন আগেডেইলি স্টার নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীরের একটি পোস্টারের ছবিসহ খবর প্রকাশ করলে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, পত্রিকাটি জঙ্গিদের মদদ দিচ্ছে, এ জন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাখাওয়াত আলী খান :আমার ধারণা,এটা একটা ভুল–বোঝাবুঝির ফল। ডেইলি স্টার-এর পূর্বাপর আচরণ প্রমাণ করে সংবাদপত্রটির অবস্থান সন্ত্রাস ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে। তবে এ ধরনের ছবি ছাপানোর ক্ষেত্রে ভালো করে বিচার-বিবেচনা করে নেওয়াই উচিত।
প্রথম আলো :আপনাকে অনেকধন্যবাদ।
সাখাওয়াত আলী খান :আপনাকেও ধন্যবাদ।