Tuesday, September 20, 2016

বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি

পাঠক, সহজেই বুঝবেন শিরোনামটি রবিঠাকুরের একটি জনপ্রিয় গানের প্রথম কলি। শুষ্ক হৃদয় নিয়ে যখন নর-নারী দাঁড়িয়ে আছেন, তখন বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারিকে স্বাগত জানানোরই কথা। খবরের কাগজ খুললে বিভিন্ন খারাপ খবর মনটা বিষিয়ে দেয়। বিশেষ করে, কোনো কোনো কর্মকর্তাকে নিয়ে গণমাধ্যম যেসব তথ্য পরিবেশন করে তা লজ্জাজনক। কেউ পাথরকোয়ারিতে বোমামেশিন ব্যবহার করতে গিয়ে স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে টাকা নেন। কেউ অফিসে বসে ঘুষ নেন গুনে গুনে। সেবাদানকারী সংস্থাগুলোতে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। দূরের কথা বাদ থাক, রাজধানী ঢাকার খাল-বিল, নদী-নালা, সরকারি উন্মুক্ত প্রান্তর দখল হয়ে যাচ্ছে। মনে হয় দেখার কেউ নেই। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান হয় বটে, তবে থাকে না তার ধারাবাহিকতা। ফলে প্রভাব হয় ক্ষণস্থায়ী। পরিবহনব্যবস্থায় নৈরাজ্য জনজীবনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। লাখ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে রাজপথে। সীমিত সম্মানজনক ব্যতিক্রম বাদ দিলে গড়ে স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষার মান নিম্নমুখী। বলতে গেলে কোচিং সেন্টারনির্ভর হয়ে পড়েছে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা যতটা হয়, তার চেয়ে বেশি হয় ছাত্র-শিক্ষকদের রাজনীতি।
সরকারি হাসপাতালগুলোর পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও রোগী সেবা পায় না। মফস্বলে থাকেন না বেশির ভাগ সরকারি ডাক্তার। অথচ বেতন নেন রাজকোষ থেকে। সাগর-রুনি, মিতু আর তনু হত্যার তদন্ত–প্রক্রিয়া একরূপ অচল হয়ে পড়ে আছে। সরকারি এমনকি বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে জালিয়াতিতে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের তো কোনো হিসাবই নেই। ঋণখেলাপিরা বরং বুক ফুলিয়ে চলেন সমাজে। রাজনৈতিক অঙ্গনে অনৈক্য পীড়াদায়ক। আবার অন্য দিকে উগ্র জঙ্গিবাদ আমাদের সব অর্জনকে ম্লান করতে তৎপর। ভালো খবরও আছে অনেক। বৈরী পরিবেশে এ দেশের কৃষক খাদ্য উৎপাদনে চমক সৃষ্টিকারী অবদান রাখছেন। তেমনটা ঘটছে পোলট্রি ও মৎস্য উৎপাদনে। আর ঘটতে যাচ্ছে পশুপালনেও। এগুলোতে সরকারের নীতিসহায়তা ছাড়াও রয়েছে বৈষয়িক প্রণোদনা। তৈরি পোশাকশিল্প খাত ক্রমবিকাশমান। প্রচুরতর কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। এখানে উদ্যোক্তা ও শ্রমিক শ্রেণির যৌথ প্রয়াস আর সরকারি সহায়তার সমন্বয় ঘটেছে। তবে পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে দেশটির। আমরা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছি। কিন্তু দেশে বেঁচে থাকা যাবে কি না—এ নিয়ে সংশয়বাদীদের দোষ দেওয়া যাবে না। সংরক্ষিত বনভূমি বিরান করে ফেলা হয়েছে অনেকাংশে। সামাজিক বনায়নের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর সুফলও মিলছে ক্ষেত্রবিশেষে। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু লাভজনক বৃক্ষরোপণের প্রবণতায় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। সমতল করে ফেলা হয়েছে পাহাড় কেটে।
সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় ভুগছে দেশের প্রধান প্রধান সব শহর। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু মানুষ তাঁর ক্ষুদ্র বলয় থেকে বিচ্ছিন্ন প্রয়াস চালাচ্ছেন পরিস্থিতির অবনতি রোধে কিংবা উন্নতি ঘটাতে। সেগুলোও গণমাধ্যম গুরুত্ব দিয়েই জনগণের নজরে আনে। থাকে কিছু আশাজাগানো ঘটনাও। সেই সংখ্যাও একেবারে কম নয়। কোনো কোনোটি তো আলোড়নও তুলেছে জনজীবনে। আর এর একটি স্থান নেওয়ার কথা গিনেস বুকে, বিশ্ব রেকর্ডের দাবি নিয়ে। ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব বড় না-ও হতে পারে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এর সুফল ভেবে যে কেউ চমৎকৃত হবেন। দেশের নিম্নতম প্রশাসনিক ইউনিট উপজেলা। এর প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)। দেশের প্রত্যন্ত জেলা রংপুরের একটি উপজেলা তারাগঞ্জ। এর ইউএনওর নেতৃত্বে একটি দুঃসাধ্য কাজ সম্পন্ন হয়েছে অতি সম্প্রতি। সেই উপজেলায় সাধারণ মানুষকে তিনি সংগঠিত করেছেন। সহায়তা নিয়েছেন স্থানীয় নেতাদের। উপজেলা পর্যায়ের অন্য কর্মকর্তাদের নিয়েছেন আস্থায়। আর নিরঙ্কুশ প্রেরণা ও সমর্থন পেয়েছেন জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের। প্রথম আলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে ইউএনও একটি পরিকল্পনা নেন ‘সবুজ তারাগঞ্জ গড়ি’ নামে। পরিকল্পনা করেন,
এক ঘণ্টায় আড়াই লাখ গাছ লাগাবেন তারাগঞ্জের বিভিন্ন রাস্তার পাশে। এ সংখ্যার কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যে এক ঘণ্টায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৯০টি গাছ লাগিয়ে গিনেস রেকর্ড করেছে ফিলিপাইন। ইউএনও সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে অগ্রসর হন। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পাওয়া একটি সম্মানজনক বিষয়। গিনেস বুক অব রেকর্ডস নামে মানুষের শ্রেষ্ঠ কার্যক্রম ও অসাধারণ প্রাকৃতিক বিষয়াদি অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৫৫ সাল থেকে প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের জিম প্যাটিসন গ্রুপ কর্তৃক প্রকাশিত হয়ে আসছে। ১৯৯৮ সালে এসে এর বিষয়বস্তু ও প্রকাশনা পদ্ধতি অপরিবর্তিত রেখে নাম দেওয়া হয় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। এই বইটিই একটানা ৬২ বছর ধরে অবিতর্কিতভাবে সব সময়ের সেরা প্রকাশনার মর্যাদা লাভ করেছে। একজন ইউএনওর এতে স্থান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমাদের পুলকিত করে। এতে স্থান হোক আর না হোক, এ ধরনের সাংগঠনিক প্রতিভাও কিন্তু চমক সৃষ্টিকারী। প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানেন ইউএনওরা মূলত বৈরী পরিবেশে কাজ করেন। তাঁদের ওপর প্রায় ক্ষেত্রেই কারণে-অকারণে ছড়ি ঘোরান স্থানীয় সাংসদ। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা তো আছেনই। আর বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির ক্ষমতার দ্বন্দ্বের দায়ও অনেক ক্ষেত্রে ইউএনওর ওপর বর্তায়। উপজেলায় দ্বৈত কর্তৃত্বের সৃষ্টি হওয়ায় তাঁরা একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করেন।
তাই দায়িত্ব নিয়ে নতুন কোনো সৃজনশীল কাজে হাত দিতে থাকেন দ্বিধান্বিত। এ অবস্থাকেও নিজের অনুকূলে এনে সব মহলের সমর্থনে অনেক বড় কাজ করা যায়, তারই একটি নজির সৃষ্টি করলেন তারাগঞ্জের ইউএনও জিলুফা সুলতানা। এটা তাঁর অন্য সহকর্মীদের জন্যও প্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি সবুজ তারাগঞ্জ গড়ার একটি প্রচেষ্টা নিয়েছেন। কাজটি করেছেন কিন্তু সেই উপজেলার মানুষ। এখন ইউএনও তাঁদের বিবেচনা করছেন সত্যিকারের তারকা হিসেবে। ১৫৩টি রাস্তায় ৪০ প্রজাতির আড়াই লাখ গাছ রোপণে অংশ নিয়েছেন সমাজের সব স্তরের মানুষ। নারী ও পুরুষ, যুবা-কিশোর ও বৃদ্ধ, শিক্ষক-কর্মচারী, খেতমজুর থেকে শুরু করে সবাই। তাঁরা এ উপজেলাকে স্বপ্নের উদ্যান হিসেবে গড়তে চান। ভোরে ফজরের নামাজের পর সব মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়কেরা বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে ড্রামে শব্দ তুলতেই গর্ত খুঁড়ে গাছের চারা লাগানো শুরু করেন তাঁরা। এর আগেই সব সাংগঠনিক প্রস্তুতি ছিল। প্রস্তুত ছিল গাছের চারাও। সেই গাছ পরিবেশবান্ধবও বটে। আম, কাঁঠাল, আতা, বেল, জলপাই, জামরুল, লটকন, আমলকী, নিম, অর্জুনসহ সবই দেশীয় প্রজাতির। এগুলো বড় হলে বৃক্ষনির্ভর প্রাণিকুল সহায়ক হবে। মানুষের জন্য হবে বড় সম্পদ। তবে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে পরিবেশ। সন্দেহ নেই, তারাগঞ্জের খবরটির ন্যায় বিভিন্ন পরিসরে আরও অনেক প্রচেষ্টা চলছে।
সেই সব প্রচেষ্টাকে খাটো করে দেখারও সুযোগ নেই। এসব সাফল্যের মধ্যে তারাগঞ্জবাসী বিভিন্ন কারণে একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। আর এটা সংগঠিত করেছেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। এতসংখ্যক গাছের চারা জোগাড় থেকে শুরু করে সমাজের সব মানুষকে সংশ্লিষ্ট করা সহজসাধ্য নয়। আর গোটা সমাজ যেখানে সংশ্লিষ্ট, তখন এর সাফল্য তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও অমূলক মনে হয়। ইউএনও একটি বদলিযোগ্য চাকরি। তিনি ইতিমধ্যে এক বছর পার করেছেন তারাগঞ্জে। হয়তো থাকবেন আরও কিছুদিন। এই সময়কালেই গাছগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তিনি নিতে পারবেন এমনটা আশা করেন। গিনেস বুকে স্থান পেলেন কি না, এটা আমাদের প্রধান বিবেচ্য নয়। আমরা দেখলাম সদিচ্ছা থাকলে আর কুশলী হলে অনেক বড় কাজেও গোটা সমাজকে সম্পৃক্ত করা যায়। আর তা করতে পারেন ইউএনও পর্যায়ের একজন কনিষ্ঠ কর্মকর্তাও। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা স্বপ্নের উদ্যান হবে বলে তাঁর এ আশাবাদের সঙ্গে তো গোটা সমাজই অংশীদার। তারাগঞ্জবাসীর এ সম্মিলিত উদ্যোগ আমাদের অসংখ্য হতাশার মধ্যে অবশ্যই বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

মমতার সিঙ্গুর জয় এবং টাটাকে আমন্ত্রণ

দীর্ঘ ১০ বছর আন্দোলনের পর অবশেষে মমতা জয় করে নিয়েছেন সিঙ্গুর। তুলেও নিয়েছেন এই আন্দোলনের ফসল। প্রথমে রাজ্যপাটে অধিষ্ঠিত হওয়ার পথ। আর দ্বিতীয়ত, সিঙ্গুর আন্দোলনকারীদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন তাঁদের জমি। দীর্ঘ ১০ বছর লড়াইয়ের পর তাই মমতা পশ্চিমবঙ্গের একচ্ছত্র নেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের লক্ষ্যে বামফ্রন্ট সরকার টাটাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এই রাজ্যে শিল্পে বিনিয়োগের জন্য। টাটাও সম্মত হয়েছিল এই রাজ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তার ন্যানো গাড়ি নির্মাণের জন্য একটি কারখানা গড়তে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেদিন সিঙ্গুরের ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে টাটার হাতে তুলে দিয়েছিল। টাটাও শুরু করেছিল গাড়ির কারখানা নির্মাণের কাজ। কিন্তু আপত্তি তোলেন এই ৯৯৭ একর জমির অন্তত ৪০০ একর জমির মালিকেরা। তাঁরা দাবি তোলেন, না কিছুতেই তাঁরা তাঁদের জমি তুলে দেবেন না টাটার হাতে। শুরু হয় আন্দোলন। হাল ধরেন মমতা। সঙ্গে আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল। রাজ্যব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। মমতা নাছোড়বান্দা, ‘না কিছুতেই এই জমি দেওয়া যাবে না টাটাকে। মানি না রাজ্য সরকারের জমি অধিগ্রহণকে। ফিরিয়ে দিতে হবে এই জমি কৃষকদের।’ তাই এ জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মমতা একটানা ২৬ দিন অনশন করেন সিঙ্গুরে।
কলকাতার ধর্মতলার সমাবেশে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা টাটার পণ্য বর্জনের ডাক দেন। কর্মীরা সভামঞ্চে টাটার পণ্য পুড়িয়ে নষ্ট করে টাটাকে এ বার্তা দেন, এই রাজ্যে টাটার ঠাঁই নেই। অন্যদিকে সিঙ্গুরে ন্যানো গাড়ির কারখানা নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলতে থাকে। নির্মাণ করা হয় বহু কাঠামো। কিন্তু মমতার তীব্র আন্দোলনের মুখে টাটার তৎকালীন কর্ণধার রতন টাটা ঘোষণা দেন, তারা সিঙ্গুরে আর ন্যানো গাড়ির কারখানা করবেন না। এই কারখানা সরিয়ে নিয়ে যান গুজরাটের সানন্দে। এদিকে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে প্রথম মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে। রায় যায় টাটার পক্ষে। মামলা ওঠে সুপ্রিম কোর্টে। সেই মামলার রায় হয় গত ৩১ আগস্ট। সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে জানিয়ে দেন, বামফ্রন্ট আমলে ২০০৬ সালে সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ ছিল অবৈধ। তাই সব জমি ফিরিয়ে দিতে হবে কৃষকদের। শুরু হয়ে যায় তৃণমূলের বিজয় উৎসব। মমতা সিঙ্গুর বিজয় করে তাঁর প্রতিপক্ষ টাটা গোষ্ঠীকে ফের পশ্চিমবঙ্গে শিল্পে বিনিয়োগের ডাক দেন। বলেন, ‘আসুন আপনারা। আরও জমি আছে পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে আপনারা শিল্প গড়ুন। গাড়ির কারখানা গড়ুন।’ এর আগে মমতা মাদার তেরেসার সন্ত হওয়ার দিন ছুটে গিয়েছিলেন ভ্যাটিকান সিটিতে। সেখান থেকে জার্মানির মিউনিখে। মিউনিখে তিনি একটি বৈঠক করেন দেশ-বিদেশের শিল্পপতিদের সঙ্গে।
সেই বৈঠকে টাটার প্রতিনিধিও ছিলেন। এখানেই মমতা টাটার প্রতি শিল্প গড়ার ডাক দিয়ে বলেন, ‘একটা জায়গার কথা ভুলে যান। অনেক জায়গা আছে। সেখানে আপনারা বিনিয়োগ করুন।’ এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর সিঙ্গুরের বিজয় উৎসব মঞ্চ থেকে মমতা ফিরিয়ে দেন সিঙ্গুরের জমি কৃষকদের হাতে। যাঁরা ক্ষতিপূরণের টাকা নেননি, তাঁদের হাতে তুলে দেন অর্থের চেক। পাশাপাশি টাটাকে এই রাজ্যে শিল্প গড়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা এক মাস সময় দিলাম, আপনারা ভাবুন। এখানে শিল্প গড়ুন। আমাদের গোয়ালতোড়ে এক হাজার একর জমি আছে। জমি আছে পানাগড় ও হাওড়ায়। আপনারা পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে শুরু করুন শিল্প স্থাপনের কাজ।’ মমতা এ কথাও জানান, আর জোর করে কৃষকদের কাছ থেকে কোনো জমি অধিগ্রহণ করা হবে না। প্রয়োজনে আমরা কৃষকদের কাছ থেকে জমি কিনে নেব। যদিও মমতার এই ডাকে টাটা সাড়া দেয়নি এখনো। এদিকে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সিঙ্গুরের মতো পশ্চিমবঙ্গের আরও কয়েকটি এলাকায় বাম আমলে অধিগ্রহণ করা জমি ফিরিয়ে দেওয়ার আন্দোলন শুরু করেছেন জমিদাতারা। তাঁরা দাবি করেছেন, সিঙ্গুরের মতো তাঁদের অধিগৃহীত জমিও ফিরিয়ে দিতে হবে। এ ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলে একটি প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি আর পশ্চিমবঙ্গে অধিগ্রহণ করা জমিতে শিল্প স্থাপন করা যাবে না?
বর্ধমান শহরের উপকণ্ঠে উল্লাস উপনগরী-সংলগ্ন আলিশা মৌজায় তৎকালীন রাজ্যসরকার একটি ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল মিষ্টি তৈরির কারখানাগুলোর জন্য মিষ্টিহাব বানানোর উদ্দেশ্যে। সিঙ্গুর মামলার রায় ঘোষণার পর এই জমি ফেরত দেওয়ার জন্য জমিদাতারা আন্দোলন শুরু করলে মুখ্যমন্ত্রী দাবি মেনে নিয়ে মিস্টিহাব অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। একইভাবে শিলিগুড়ির কাওয়াখালীতে উপনগরী গড়ার জন্য বামফ্রন্ট আমলে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এই জমিও ফেরত দেওয়ার দাবিতে শিলিগুড়িতেও শুরু হয়েছে আন্দোলন। পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুরেও অধিগৃহীত প্রায় ৩ হাজার একর জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন জমিদাতারা। ২০০৭ সালে এখানে রিলায়েন্স গোষ্ঠী, ইমামি গোষ্ঠী, জয়বালাজি গোষ্ঠী, ডিভিসি ও ভারতীয় রেলকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এই জমি দেওয়া হয়েছিল। শেষ কথা, মমতা সিঙ্গুর বিজয় করেছেন। কিন্তু ইতিমধ্যে যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে তা হলো, এভাবে যদি অধিগৃহীত জমি ফিরিয়ে দেওয়ার আন্দোলন চলে, তবে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের ভাগ্য কী হবে? শিল্পপতিরা কোন বিশ্বাসে এই রাজ্যে পা দেবেন? যদিও মমতা তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, রাজ্য সরকারের ভূমিব্যাংকে রয়েছে প্রচুর জমি। সেখান থেকেই দেওয়া হবে শিল্প স্থাপনের জমি। কিন্তু সেই জমি শিল্পপতিদের পছন্দ হবে কি না, সেই প্রশ্নটিও এখন অবশ্য ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

নিউইয়র্কে ‘সন্ত্রাসী হামলায়’ আহত ২৯

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ‘সন্ত্রাসী হামলায়’ কমপক্ষে ২৯ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় গত শনিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে চেলসি এলাকার ২৩ নম্বর স্ট্রিটে এ বিস্ফোরণ ঘটে। এ অবস্থার মধ্যে আজ সোমবার থেকে এই শহরে শুরু হচ্ছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। বিস্ফোরণের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট না হলেও কর্তৃপক্ষ এ ঘটনাকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করছে। তবে কোনো পক্ষ দায় স্বীকার করেনি। এক সপ্তাহ আগে বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ১৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী সতর্কাবস্থায় ছিল। সে পরিস্থিতির রেশ কাটতে না কাটতেই এ ঘটনা ঘটল। নিউইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুইমো ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা ছিল বোমা বিস্ফোরণ এবং সন্ত্রাসীদেরই কাজ। তবে এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ এর আগে নিউইয়র্কের মেয়র বিল দ্য ব্লাসিও বলেন, বিস্ফোরণের সঙ্গে এখন পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করছি, হামলার ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত।’
একটি অসমর্থিত সূত্র থেকে বিবিসি জানিয়েছে, স্থানীয় একটি ডাস্টবিন থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ওই ডাস্টবিনের ছবি দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশ এ বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করেনি। নিউইয়র্কের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত পুলিশপ্রধান জেমস ও’নেইল বলেন, এটি ছিল বড় ধরনের বিস্ফোরণ। যেখানে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সে এলাকায় অনেকগুলো বার, রেস্তোরাঁ এবং বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। লোকজন সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে সেখানে ভিড় জমায়। বিস্ফোরণের পরে উদ্ধারকাজ চালায় অগ্নিনির্বাপক বাহিনী। আহত ব্যক্তিদের অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের কমিশনার ড্যানিয়েল নিগ্রো বলেন, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের বেশির ভাগই কাচ ও ধাতব পদার্থের আঘাতে আহত হয়েছেন। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, আহত সবাই চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে চলে গেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলেন, বিস্ফোরণের শব্দে তাঁদের কানে তালা লেগে যায়। আশপাশের বিভিন্ন ভবনের জানালার কাচ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। স্থানীয় একটি নাইটক্লাবের কর্মী রুডি অ্যালসিড বলেন, প্রচণ্ড শব্দে আশপাশের সবকিছু কাঁপছিল।
বিস্ফোরণের পরপর সেখানে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি তল্লাশি অভিযান শুরু করে পুলিশ। তবে আশপাশের ভবনগুলো খালি করা হয়নি। ঘটনাস্থলের কয়েক ব্লক দূরে তল্লাশির সময় একটি প্রেশার কুকার উদ্ধার করা হয়। সেটিতে তার জড়ানো ছিল। এদিকে শনিবার দুপুরে নিউজার্সির বিচ টাউনে পাইপবোমার বিস্ফোরণ ঘটেছে। সেখানে একটি চ্যারিটি র্যা লির প্রস্তুতি চলছিল। র্যা লি শুরুর কিছুক্ষণ আগে ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেখানে অবশ্য কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে ওই বিস্ফোরণের সঙ্গে নিউইয়র্কের ঘটনার কোনো সংযোগ নেই বলে জানিয়েছেন, মেয়র বিল দ্য ব্লাসিও। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিস্ফোরণের বিষয়টি অবগত রয়েছেন এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। বিস্ফোরণের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘বলেছিলাম না, আমাদের আরও কঠোর হতে হবে!’ তবে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটন বিপরীত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘আমার মনে হয় কোনো ঘটনায় দ্রুত উপসংহার না টেনে পুরো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ।’

দেশকে ভয়ংকর পথে ঠেলে দেবেন হিলারি

টেক্সাসের নির্বাচনী সভায় ট্রাম্প l এএফপি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের অভিবাসন নীতি খুব নরম। শনিবার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাতে গিয়ে হিলারির অভিবাসন নীতির কঠোর সমালোচনা করে এ কথা বলেন ট্রাম্প। আগামী ৮ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, দেখা যাচ্ছে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই কমছে। সাত সপ্তাহ আগেই দুজনের মধ্যে জোর লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠছে। প্রচারণার ভাষাও ক্রমেই বেশি করে তিক্ত হয়ে উঠছে। টেক্সাসের সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, হিলারি ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট হলে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ একেবারে বন্ধ করে দেবেন। আর এর ফলে পুরো দেশ এক ভয়ানক পরিস্থিতির মুখে পড়বে। অভিবাসন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী লড়াইয়ের একটি বড় হাতিয়ার। অভিবাসীদের বিষয়ে তিনি প্রথম থেকেই কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্যও করেছেন আকছার। কয়েক মাস আগে ট্রাম্প বলে বসেন, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তের প্রতিবেশী মেক্সিকো থেকে আসা অনেক অভিবাসীই মাদক চোরাচালানি ও ধর্ষক। শনিবারের সভায় ট্রাম্প দৃশ্যত এটা নিশ্চিত করলেন, অভিবাসীদের মুখের কথায় আক্রমণ তিনি চালাতেই থাকবেন। তাতে স্প্যানিশভাষী ভোটারদের বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও সে পথ ছাড়ছেন না।
সভায় ট্রাম্প অভিযোগ করে বলেন, অনিবন্ধিত অভিবাসীদের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা প্রতিদিন নিহত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দিন দিন আমাদের সীমান্ত উন্মুক্ত হচ্ছে। নির্দোষ মার্কিন নাগরিকেরা হামলার শিকার হচ্ছে, মারা যাচ্ছে বিনা কারণে।’ ট্রাম্প সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হচ্ছি। স্নেহময় বাবা তাঁর সন্তান হারানোর ঝুঁকির মধ্যে থাকছেন।’ রিপাবলিকান প্রার্থী আরও বলেন, হিলারি প্রেসিডেন্ট হলে নির্বাহী আদেশের ক্ষমতাবলে অবৈধ অভিবাসীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে দেবেন। ক্ষমতায় আসার ১০০ দিনের মধ্যে তিনি অবৈধ অভিবাসীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করার বন্দোবস্ত করবেন। লঙ্ঘন করবেন সংবিধান। পুরো দেশকেই ভয়ংকর পথে ঠেলে দেবেন তিনি। সভায় থাকা ট্রাম্প সমর্থকদেরও কেউ কেউ বলেন, তাঁদের বন্ধু বা পরিবারের সদস্যরা অবৈধ অভিবাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন অভিবাসন নীতি শিথিল করার পক্ষে। এ বিষয়ে তিনি একাধিকবার বলেছেন, কেবল ভয়ানক সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের তিনি ফেরত পাঠাবেন। হিলারির এ নীতি ট্রাম্পের নীতির ঠিক বিপরীত। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্তে দেয়াল দেবেন। আবার অবৈধ অভিবাসীদের ঢালাওভাবে ধরে ধরে ফেরত পাঠাবেন। এদিকে হিলারির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে অধিকতর উদার বলে পরিচিত বার্নি স্যান্ডার্স ও এলিজাবেথ ওয়ারেন। দুজন গত শনিবার ওহাইওতে নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দেন।