Friday, January 15, 2021
গল্প- বৃক্ষদের করুণ গান by নাসরীন জাহান
নীলিমার ঝাঁক পাখিরা গতি হারিয়ে বিহবল হলো
দুর্ঘটনার পৈশাচিক নখর অনন্তকে জীবনের জন্য কেড়ে নিয়ে গেল এই ধরিত্রী থেকে।
দিনরাতগুলো কাটে অগ্নিঝরা নিঃশ্বাসে চারপাশ পোড়াতে পোড়াতে। সেতুর চক্ষুকোটরে একবিন্দু আলো নেই, আত্মাপিঞ্জরে একফোঁটা জল নেই।
সে দিন-রাত্রির ওপর দিয়ে চলে না, যেন এক বিবশ প্রস্তরখ- সেতু, দিনরাত্রিগুলো কীভাবে তার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঠাহর হয় না তার।
এদিকে ঘাগরা ঢেউ তোলে শিশু বাতাস
সূর্য সাগরের প্রকা-তাকে ঢেকে রাখে তুমুল ধূসর ছায়া। চূর্ণ-বিচূর্ণ অবস্থার মধ্যে অনন্তর মুখটি স্থিত ছিলো।
কাফনে ঢাকা সেই মানুষটার মুখটা দু-আঁজলায় ধরে সেতু…।
একরাতে তেমনই নিঃসাড় পড়ে থেকে জাগ্রত রাত্রিকে বলছিল সেতু, আমাকে তুলে নাও,
দরজায় অনন্ত,
তুমি আমাকে এইভাবে মৃত ভেবে মাতম করবে, অনন্ত আহত, এ যে আমার কল্পনার বাইরে ছিল। একমাত্র তোমাকেই আমি বলে দেশের বাইরে গেছি, তুমি সেতু…।
সেতু ছিলাটান দিয়ে সোজা হয়। এরই ধারাস্রোতে সে দাঁড়ায়ও, এক আজব বিহবলতায় তার নিঃশ্বাস আটকে আসতে থাকে, তবে যে আমি নিজে তোমার লাশ দেখলাম, নিজ হাতে আমি।
সে তো তোমার স্বপ্ন। এ-জীবনে স্বপ্ন আর বাস্তবকে কম গুলিয়েছো তুমি!
তুমি এই এতো রাতে? চারপাশে তাকায় সেতু, আলো-আঁধারের অদ্ভুত প্রচ্ছায়া।
বিছানায় বসে অনন্ত সেতুকে আঁকড়ে ধরে, আমার ফ্লাইট ডিলে ছিলো, ভালো করে বাতিগুলো জ্বালাও সেতু, কতদিন তোমার মুখটা দেখি না।
উত্তেজনা, কম্পমানে দিশেহারা সেতু কাঁপতে কাঁপতে বাতিগুলো জ্বালায়, আমি চক্ষু ভরে দেখব তোমাকে, চিমটি কাটছি বারবার এই দেখো, এমনও বাস্তব হতে পারে? যেন ঘরে জ্বলজ্বল করছে বাতি নয়, সূর্যের স্ফটিক আলো। যেন পূর্ণ চন্দ্রাকাশে দুজন নিবিড় জ্যোৎস্নায় আসন পেতেছে, বিছানায় বসে অনন্তর মুখটার ওপর যেন হাতড়ে নয় হামলে পড়ে সেতু, এমন দুঃসহ স্বপ্ন কারো জীবনে যেন না আসে…
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে রাত তিনটে স্পর্শ করেছে। আচমকা সেতুর বুক খালি করে ফের অনন্ত হারিয়ে যায়।
এই যে বাতিগুলো আমি নিজ হাতে জ্বেলেছি। বিছানার যে-জায়গাটায় বসেছিল, স্পষ্ট কুঁচকে আছে। এ কী করে স্বপ্ন হয়?
গলা উজাড় করে চিৎকার করে সেতু।
এইভাবে দিনগুলো রাত্রিগুলো যায়।
সবাই পিকনিকে এসেছে। অনন্তর মৃত্যুর মাস পরেও সেতুর কোনো বিবর্তন নেই। সবাই চেয়েছে, তাই এসেছে পিকনিকে।
সেতুকে আচ্ছন্ন করেছিলো প্রগাঢ় বিষাদের ছায়া। রৌদ্র-উজ্জ্বল দিনেও তার আত্মার করোটিতে কেবলই গাঢ় অন্ধকার। সবার হুল্লোড় ছেড়ে সে অরণ্যের এক অদ্ভুত নির্জনে এসে দাঁড়ায়।
হুজ্জতে মাতা কেউ খেয়াল করে না।
হৃদয় আচ্ছন্ন করা ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। তক্ষুনি যেন এতোক্ষণ পাশেই ছিলো এমনভাবে সেতুর ঘাড়ে হাত রেখে বলে অনন্ত, নির্জন অরণ্যের নিজেরও যে আলাদা একটা গান আছে, সত্যিকারভাবে কান পাতলে বোঝা যায়।
ফের ভূকম্পন, ফের আত্মার আরক্ষেতে ধুকপুক, এ যে সত্যিই জ্যান্ত অনন্ত – অরণ্যের ছায়াছায়া আলোয় স্পষ্ট দেখে ফের তার শরীর হাতড়ায় সেতু, তুমি ফের চলে যাবে, ফের ফাঁকি দেবে আমাকে, সাবধান স্বপ্ন বলো না, আমি তা শুনতে চাই না,
তুমি আমাকে দেখে এভাবে চমকে উঠলে আমার অসম্মান হয় না, যেন গানের ঘোরে অনন্ত বলে, অথচ আমরা বিয়ের রাতেই পরস্পরকে কথা দিয়েছিলাম, আমরা একজন আরেকজনের পরিপূরক থাকবো। যেন আমি অচেনা, এভাবে যদি চমকে ওঠো…।
তুমি জানো না অনন্ত, তুমি জানো না, সেতু কাঙালের মতো আঁকড়ে ধরে অনন্তকে, এইভাবে খেলো না তুমি আমার সঙ্গে, এমন মজা করো না, আমি এরকম বারবার মরতে পারবো না অনন্ত।
তুমি মরছো? ওপরের গাছেদের মাথার ফালির ভাঁজে ভাঁজে ছলকে ছলকে রোদ্দুর গড়িয়ে পড়ছে। আর সত্যিই অরণ্যে মিহি বাতাস ওঠায় এক অদ্ভুত মিহি দেহমন আচ্ছন্ন করা সুর উঠেছে।
এমন মাতাল করা সুর, অভিভূত বোধে মাঝখানের সময়টা পুরো ভুলে সেতু আমূল জড়িয়ে ধরে অনন্তকে। অনন্তের গায়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর মাতাল করা ঘ্রাণ, সব বেদনা রশ্মির ওপর গিয়ে অনন্তকে পুরোটাই উপভোগ করার স্পৃহায় সেতু আচমকা চুম্বন করে তাকে।
এখানে না, এখানে না, অনন্ত সচকিত হয়ে ওঠে। ভুলে যেয়ো না, আমরা দম্পতি। বনের মধ্যে এসব কা- করে প্রেমিক-প্রেমিকারা।
যেন ঝিল্লিমুখর পূর্ণিমারাত্রির গায়ে কেউ ঢিল ছুড়ল। যেন ছলকে এক কালো মেঘ ঢেকে দিলো সেতুর মুখ, তার মানে, বিয়ের পর প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতো আমাদের স্পৃহা থাকতে নেই, আমাদের লিগ্যাল ঘর আছে বলে আমাদের মধ্যে আর প্রেম থাকতে নেই।
কেন তা থাকবে না? এইবার অনন্ত জড়িয়ে ধরে সেতুকে, আমি জানতাম এই পয়েন্টে এমনই রিঅ্যাক্ট করবে তুমি, বলে দুজন যখন একজন আরেকজনের খোলসগুলো খুলছে… তখন কাছেই কোথাও হলো রোল আর আর্তনাদ-ধ্বনি, শুনে সচকিত হতেই সেতু দেখে, তার প্রাণকে শূন্য করে অনন্ত চলে গেছে।
বিমূঢ় বিস্ময়ে আত্মার কান্নার হলাহল নিয়েও সে স্থবিরের মতো সেই কোরাসের দিকে এগিয়ে যায়, এতো রকম চিৎকার-ধ্বনির মধ্যে একটাই উচ্চকিত বেশি, এ কী করে হয়?
চিত্রার্পিতের মতো আলুথালু সেতু ভিড়ের কাছটায় যেতেই ওকে দেখে অনেকে সরে যায়।
ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দেখে সেতু, একটা রক্তেভেজা ডালের কাছে হুবহু কিছু আগের অনন্ত মরে পড়ে আছে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
দেশ দেশের হয়ে ভাববে ২ যৌনতা by আফসার আমেদ

নবীনের সঙ্গে এমনসব কথা হয় সেসব কথা বিগত স্ত্রী রণিতাকে বলতে পারত না। সে মনে করে দেখেছে সব মানুষের দাম্পত্যের জীবনেই স্ত্রীকে না বলতে পারার কিছু কথা থেকে যায়। তার সঙ্গে যৌনমুহূর্ত যাপন করার মধ্যেও আনন্দবোধের অনেক কিছু গোপন রেখে যেতে হয়। সেখানে কখনো কখনো মুহূর্তে মনে হয় সে স্বেচ্ছাচারী। নিজের আনন্দটুকুর ভেতরে স্বার্থপরও। সেখানে সে তার অপরাধ ও অক্ষমতা গোপন করে যায়। সেই রকম অনেক কিছু কথা বন্ধুকে বলা যায়, সে-রকম বন্ধু হলেই। নবীন সে-রকম এক বন্ধু। জীবনে বন্ধু এক-দুজনই থেকে যায়। এই পৃথিবীতে বন্ধুর অভাব প্রত্যেক মানুষই বোধ করে হয়তো। এখন সে বসবাসের পাড়াতে নির্বান্ধব।
তার এখন সঙ্গী হয় কিছু স্মৃতি ও টিভির নিউজ চ্যানেল। রাষ্ট্র ও রাজনীতি, সামাজিক অপরাধ, সন্ত্রাস এসবের আপডেট রাখে। তার মধ্যে অনেকটা সে অসুখী ও ক্ষুভিত হয়ে ওঠে। নিজের মধ্যেই সে প্রতিবাদ নিরুচ্চার ও লুকিয়ে রাখে। সে-সব কথা নবীনের সঙ্গে শেয়ার করে। এইটুকুই। তার এই রাষ্ট্রিক জীবনের অসূয়া বোধগুলিতে আহত হয়ে নিজেকে রাখে। সে এসবের কিছু নয়, কেউ নয় বলে মনে মনেই সাজায় তার প্রতিক্রিয়া। সে-সব কথা সমাজে রাষ্ট্রে পৌঁছয় না, সে একা থাকার ঘরে তখন নিজেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের নিকটবর্তী মনে করেও অপ্রকাশিত থেকে যায়। সে মনে করে এই অপ্রকাশিত প্রতিবাদের ইতিহাস আছে, ঘরে ঘরে অনেক নিঃসঙ্গ নিরুচ্চার মানুষের প্রতিবাদ সংগঠন গোপন সক্রিয় আছে। দেশ দেশের হয়ে ভাববে!
সন্ধ্যায় শুরু করে রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত ঠাকুমা আশা দেবীর কাছে, মুখোমুখি নয়, পাশাপাশি বসে অনেকটা সময় কাটে। তারা তখন টিভির সামনে অভিমুখী থাকে। ঠাকুমা একটার পর একটা সিরিয়াল দেখে যায়। এতেই আশা দেবী সময় কাটায়। নিজেকে রাখে। আশা দেবীর সঙ্গ দেবার কারণেই অমৃত সে-সব সিরিয়াল দেখেও। যেন দেখেও দেখে না। দেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর মনেও থাকে না। মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে নবীনের সঙ্গে কথা বলে। কথা বলে ফিরে এসে আবার যখন সিরিয়াল দেখাতে যোগ দেয়, মোবাইলে এতক্ষণ কথা বলার বিয়োগ সময়টুকুর জন্য সিরিয়াল না দেখাটুকুর জন্য কোনো খেদ জন্মায় না।
এখন বিকেল। মার্চের প্রথম সপ্তাহ। এখন অমৃত এ ঘর থেকে এ ঘরে, তিনটে ঘর ও ডাইনিং বারান্দা, রান্নাঘর বাথরুম একটা থেকে আরেকটা ঘরে যায়। যাওয়া-আসা তার চলতে থাকে, এমনভাবে তার যাওয়া হয় যে সে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে যাওয়া-আসা করছে। যেন তার স্ত্রী রণিতার কাছে যাচ্ছে। যে-ঘরে সে রণিতাকে খুঁজে পাচ্ছে না, সে তখন অন্য ঘরে যাচ্ছে। যেন এক সম্মোহিতের মধ্যে যাওয়া-আসা করছে। এই যাওয়াকে যাওয়া করছে, ব্যর্থযাত্রা কখনো মনে করছে না। কেন না। সে যাওয়াটাকে বাস্তবতার ধ্যানে প্রেমে-ভালোবাসায় বিগত যাওয়া ও খুঁজে পাওয়ার জাদুকরি মুহূর্তের টানে করছে। এটাকে সে বেঁচে থাকার ভেতর মিশিয়ে দিচ্ছে। সে জানে রণিতার মৃত্যু হয়েছে কয়েক বছর আগে। তবুও তার এভাবে যাওয়া ও খোঁজার মুহূর্তগুলিকে প্রাণ মনে করছে। এই বুঝি তাকে দেখে হেসে ফেলবে। বলবে, ‘আর একবার চা খাবে তো? দিচ্ছি।’ অমৃতর মনে হলো রণিতাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। কিংবা তাকে নিজের দিকে টেনে এনে ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে চুমু খেল। অমৃতর হৃদয় তখন বলে উঠল, ‘আজ রাতে কিন্তু’ – রণিতা তাকে ছদ্মরাগ করে ঠেলে সরিয়ে দিলো। মুখ তার লাল হয়ে উঠল। বলল, ‘এখান থেকে এখন যাও, রান্না পুড়ে যাবে।’
অমৃত বলল, ‘এইভাবে তোমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ চুমু খেতে থাকি না কেন, রান্না পুড়ে যাক, আমরাও পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাই এসো।’
‘এত পাগলামি’ –
‘ভালোবাসায় পাগলামি তো লাগেই।’
‘তুমি মজা মারতে এসেছ এখন আমার সঙ্গে।’
‘জীবনে মজারও মানে আছে। এখন এই মুহূর্তে আমাকে সরিয়ে দিতে চাইলে, অস্বীকার করতে চাইলে পৃথিবীর কত মানুষের বিষণ্ণতার ভেতর থাকা কত মানুষের হাসি হারিয়ে যাবে, দেখতে পাচ্ছ কি?’
‘কত মানুষের?’
‘আট কোটি, দশ কোটি আরো বেশি হতে পারে।’
কথার জাদুতে আকৃষ্ট হয়ে রণিতা বলে, ‘তাই?’
‘আমি যখন কল্পনা করতে পারছি, আমার এই মুহূর্তের প্রেমে তারাও থাকতে পারে, আট কোটি দশ কোটি বলাটা হয়তো ভুল হলো। তারও অনেক বেশি।’
‘তোমার এই হাবিজাবি কথা বলা’ – মুখ আরো লাল হয়ে উঠল রণিতার।
‘শুনতে খারাপ লাগছে।’
‘খুব খুব ভালো লাগছে!’
‘কোটি কোটি মানুষের তেমনটাই লাগে।’
‘আঠারো বছর বিয়ে হয়েছে আমাদের। আমরা সমত্মান পাইনি বলেই কি’ –
‘সমত্মান পাওয়ার জন্যই যে নারী-পুরুষ মিলিত হয়, এটা একটা ধ্বংসাত্মক কথা। হাজার বছর আগে মৃত মানুষকে মাটি খুঁড়ে বের করে আনলে, সেই কঙ্কালও প্রমাণ করবে না এই কথা।’
‘কি যে বলো তুমি, তোমার কথার মানে বুঝতে পারি না।’
‘আমার এই কথার কোনো মানে নেই, কথার ভেতর আর এক কথা খুঁজি। এই সব কথায় তোমার কি খুব রাগ হয়?’
‘মনে হয় কথা দিয়ে তুমি আমাকে ভালোবাসছ।’
‘আর কী?’
‘আর কিছু নয়, বলার ভাষা পাচ্ছি না।’ ডুকরে কেঁদে ওঠে রণিতা।
‘ভালোবাসায় তোমার কান্না পায়?’
‘পায়।’
‘আনন্দিত হও তো?’
‘হই।’
সেই কাল্পনিক দৃশ্যের সামনে অমৃত চুপ করে থাকে। সে যেন রণিতাকে দেখতে পায়। কতবার তো তারা কাছাকাছি থেকে কিছু না বলে বলা-অতিরিক্ত বলা তৈরি করেছে। সেই প্রেমময়তার আস্বাদ শীতে রোদ পোহানোর মতো করে গ্রহণ করে চলেছে। যেন তারা চাইছে এই মুহূর্ত নিরবচ্ছিন্ন থেকে যাক পাথর কেটে ভাস্কর্যের রূপ নিয়ে, অনন্তকাল সৌন্দর্যের মহাঘ্রাণ দিয়ে যাক পৃথিবীর সবকালের সব দেশের সব মানুষের কাছে।
রণিতা তেমনই দাঁড়িয়ে আছে।
অমৃত তার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে চাইছে তার না-বলা কথাগুলিকে। স্থির নিষ্কম্প দাঁড়িয়ে আছে তারা। সময় গড়িয়ে যেতে থাকে। একসময় অমৃত বলে ওঠে, ‘তাহলে তুমি মরে গেলে কেন?’
রণিতা বলল, ‘তা তো জানি না, মরে গেছি কিনা?’
‘তাই তো মনে হচ্ছে, মরে যাওনি। কোনোদিন কোনো মানুষই মরে যায় না।’
‘আমি আছি, তোমার কাছেই আছি। তুমি খুঁজতে থাকো বলে আমাকে পাও।’ ডুকরে কেঁদে ওঠে রণিতা।
অমৃত তার এই কান্নায় থাকা রণিতাকে দেখতে চায় না বলে সেই সম্মোহিত বাস্তবতা সরিয়ে দিয়ে ফিরতে থাকে রান্নাঘরের দিক থেকে।
আর সেই মুহূর্তেই কাজের মেয়ে আরতি এসে রান্নাঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, অমৃতের বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়।
তখন সন্ধ্যা নেমেছে। চোখের মনে অমৃতের অশ্রম্নর মতো যত তার ভাবমোক্ষনের বেদনা ছিল, অশ্রম্ন উপমার আধারিত যত সব প্রেম ছিল, সে সমস্ত দ্রম্নততার সঙ্গে সরিয়ে ফেলে। রণিতাকে লুকিয়ে রাখে চোখের মনে, যৌনতার অনুষঙ্গকে শরীরের মনে লুকিয়ে রাখে।
আরতি চা দেবে এখনই। সেই অপেক্ষার সময়টা মুছবার জন্য চলে যায় অমৃত বাথরুমে আয়নার মুখোমুখি। তার মুখ থেকে বিষণ্ণতা এখনো সরে যায়নি? সরে যেতে দেয়। সেটাকে চেষ্টাকৃতভাবে সরিয়ে রাখে। এবং আরশিতে একটি হাসি রাখে, সেটাকে দর্পণে রেখেই ডাইনিংয়ে বেরিয়ে এসে বসে ডাইনিংয়ের সোফায়। ধূমায়িত চা দিয়ে গেছে আরতি। দুখানা বিস্কুটও। বাহ্!
আশা দেবী সিরিয়াল দেখেই চলেছে। ঠাকুমার পাশে সে বসেনি। তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য সে যখন গিয়ে তার পাশের চেয়ারে বসে তখনই টিভির মুখোমুখি হয় অমৃত। এখন টিভির কথা সে শুনছে। কাল্পনিক, বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই, মিল থাকলেও তা কাকতালীয়। এটা একটা অসত্য নিয়ে মিথ্যা বাস্তবতার বাণিজ্যযাত্রার বমন। শিল্পবোধ সাহিত্যবোধ কিছুই থাকে না। থাকে গৃহসিংসা। ধনী পাত্রপাত্রীর সঙ্গে কখনো গরিব পাত্রপাত্রীর বিয়ে। সে-সব বিয়ে কনট্রাকচুয়াল, কখনো বারবার বিয়ের রীতি ও লোকাচার থাকে। একবার বিয়ে হওয়ার পর একই পাত্রপাত্রীর একাধিক বিয়ে হয়। সমস্ত পাত্রপাত্রী যারা দাম্পত্যে থাকছে তাদের মধ্যে যৌনজীবন নেই। যৌনতার প্রেম ও আনন্দসৌন্দর্য এতই জীবনসংলগ্ন যে তাকে এড়িয়ে যায়। অমৃত মধ্যপঞ্চাশে পৌঁছে যৌনতার বোধ, স্ত্রী বিয়োগের দশায় থেকেও সে-বোধ সে হারিয়ে ফেলে না। দাম্পত্যসংসর্গের এই শারীরিক প্রেমময়তার ক্ষুণ্ণতায় থাকে। সিরিয়ালে সেই বোধ নিরুদ্দেশ। তবুও সবাই দেখে। কোটি কোটি মানুষকে সে-সব দিয়ে বাণিজ্য করে। এটাই আমাদের দেশ। ‘আকাশ কুসুম’ সিরিয়ালে দাম্পত্যের মধ্যে যৌনতা নেই। আছে যৌনহিংসা। ‘জয় রবীন্দ্র’ সিরিয়ালেও, ‘আহ্লাদি’তেও। কত আর বলবে। সেসব সিরিয়াল শেষ হয়ে গেলে দ্রম্নত সিরিয়ালের নাম ও পাত্রপাত্রীর নাম ভুলে যায়। তখন চরিত্র-নামে নায়ক-নায়িকার নাম আত্মপরিচয় পেয়ে থাকে না। আমাদের পাশের ঘরের, পাড়ার ও বৃহত্তর সমাজের মানুষ থাকে না। তারা কারা? কোন দেশের মানুষ? দেশ নেই, কাল নেই, চেনা মানুষের ভেতর পাত্র-পাত্রীরাও নেই। এ-বিষয়ে দেশ কি দেশের কথা ভাববে।
অমৃতর ঠাকুমা আশা দেবী এসব দেখে। তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য অমৃতও দেখে। সারাক্ষণই সে নিজেকে তুলে নিয়ে চলে যায় বাথরুমে যাওয়ার ছলনায়। কখনো নবীনের ফোন এলে মোবাইল নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বাঁচে। কখনো নিজে থেকেই বারান্দায় চলে গিয়ে বাঁচে।
এখনই অমৃতর অসহ্য বোধ হলো। মোবাইল হাতে সে পৌঁছে গেল বারান্দায়।
‘হ্যালো নবীন, তুই কী করছিস?’
‘এই পড়ছিলাম।’
‘কী বই?’
‘ধুলোমাটি। ননী ভৌমিকের।’
‘কেমন লাগছে?’
‘বেশ উত্তেজিত হবার মতো।’
‘দেশভাগ নিয়ে আরও উপন্যাস আছে।’
‘হাসান আজিজুল হকের আগুন পাখি পড়েছি। বেশ ভালো। তুই কী করছিলি?’
‘টিভির সামনে বসে কিছু কথা ভাবছিলাম।’
‘কী ধরনের কথা ভাবছিলি?’
‘সে-এক অদ্ভুত বিষয়।’
‘কী অদ্ভুত?’
‘যৌনতা নিয়ে?’
‘ভালো বিষয় তো। সমাজে জীবনে সাহিত্যে এর কদরই নেই। তোর বউ নেই, তুই-ই বুঝতে পারবি যৌনতার গুরুত্ব। সমাজ তাকে যেমন গোপন রাখতে চেয়েছে, তার সৌন্দর্যের বোধকে আড়াল করে গেছে বেশি। এই নীরবতা নিরুচ্চার রাষ্ট্রও গোপন রাখছে। মানুষের জীবনের এই অত্যাবশ্যিক বিষয়টা সমাজে নান্দনিকতার পরিসরে না গিয়ে ধর্ষণ, গণধর্ষণে চলে গেছে। সমাজে যত ধর্ষণ হয় বিবাহিত পুরুষের কাছে স্ত্রীরা বেশি ধর্ষিত হয়ে চলেছে। এত বেশি গোপন অপরাধের কথা দেশ দেশের হয়ে ভাববে!’
‘কি জানি।’
‘তুই রণিতাকে হারিয়ে আছিস – বেঁচে থাকার মন্ত্র তুই হয়তো জানিস।’
‘জানি। আমি কল্পনার ভেতর নিজ দেহরূপকে কাজে লাগাই। ভালো লাগে। শান্ত হই। বেঁচে থাকার মুহূর্তগুলির ভেতর পবিত্র শমিত হই।’
‘বেশ বেশ। ঠাকুমা কী করছে?’
‘সারাক্ষণ বসে বসে টিভি সিরিয়াল দেখছে।’
‘হ্যাঁ, সেটাতেও তার বিকল্প বেঁচে থাকার কোনো কিছু।’
‘কী রান্না হচ্ছে?’
‘আরতি বাজার থেকে যা এনেছে তার একটা কিছু দিয়ে খাব।’
‘তুই তো নিজে বাজারে গিয়ে পছন্দমতো মাছ কিনে আনতিস।’
‘এখন আর যাই না।’
‘কেন?’
‘চেনা মানুষগুলো অচেনা মানুষ হয়ে উঠেছে বলে। অপরিচয়ের সমাজ এখন আমার মনে হয় ভেংচি দেয়।’
‘তুই তাদের পাত্তা দিবি না। না দেখার ভান করবি।’
‘কবে আসবি আমার কাছে?’
‘দুদিন পর শনিবারেই দুটো বিয়ার নিয়ে যাব। স্ট্রং?’
‘না, লাইট।’
‘এখনই বউ দোকানে যেতে বলেছে, জিরে গুঁড়ো কিনতে। রাতে শোবার আগে তোর সঙ্গে আমি নিজেই ফোন করে কথা বলব।’
‘ঠিক আছে রাখছি। ফোন করবি কিন্তু।’
নবীন ফোন কেটে দেয়।
বাধ্যত অমৃত আশা দেবীর পাশে বসে এসে। টিভি সিরিয়ালের মুখোমুখি তাকে বসতেই হয়।
আর সেই সময় লোডশেডিং হয়ে যায়। ঘর অন্ধকার হয়ে যায়। টিভি দেখা থেকে নিষ্কৃতি পায়।
আশা দেবী বলল, ‘বুড়ো, তুই মোমবাতি খুঁজে জ্বালাতে পারবি না?’
‘কোথায় রেখেছে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজতে খুঁজতে জেরবার হয়ে যাব। মোমবাতি আর দেশলাইকে একসঙ্গে করতে সে খুব হাঙ্গামা। একটু পরেই কারেন্ট এসে যাবে। তার চেয়ে অন্ধকারে থাকা কি ভালো নয়? তোমার ভয় করবে?’
‘একটাই ভয়, বয়েস হলো সবসময়ই মনে হয় এই এক্ষুনিই মৃত্যুর সময় এসে পড়বে।’
‘ভয় পাও কেন, আমি তো তোমার পাশে বসে আছি।’
‘আমার বাঁ হাতটা ধরে রাখ।’
অমৃত আশা দেবীর বাঁ হাতটা চেপে ধরে মুঠোর মধ্যে রাখে।
জরার হাত মৃতপ্রায় মানুষের মতো। অমৃত চুপ করে থাকে।
আশা দেবী বলে, ‘বুড়ো ভাই চুপ করে আছিস কেন? কথা বল।’
অমৃত কিছু ভেবে নিয়ে বলল, ‘আমি যা জিগেস করব, তার ঠিকঠিক উত্তর মনের ভেতরের সঞ্চিত কথা সত্যির অক্ষরে বীণার সুরের মতো বলবে?’
‘কী কথা বুড়ো? এমন কী কথা বুড়ো তুই আমার কাছ থেকে জানতে চাস? তোর প্রশ্নের ধরনের ভেতরে আমার ভয় করছে। আমি নারী তো! আমি নিঃশব্দতার ভেতর অনেক কিছু শুনতে পাই। পুরুষের চাহনির ভেতর আমি সেই পুরুষের অভিসন্ধি পড়ে ফেলতে শিখে এসেছি।’
‘তুমি তো এখনো নারীই। সেজন্যে চাইছি।’
‘তুই তো আমার হাত ধরে আছিস বুড়ো, এই বয়সেও পুরুষের স্পর্শের প্রেমময় অনুভূতি পাচ্ছি।’
‘তুমি কি নিজের পুরুষের কাছে খেলনার মতো ছিলে?’
‘কখনো ছিলাম, কখনো নয়।’
‘যৌন সংসর্গের অনুভূতি কেমন ছিল?’
‘আমাকে কাঁদতে দিস না বুড়ো।’
‘কেন?’
‘সেই সব অনুভূতি অনন্তকালীন হলো না বলে।’
‘তুমি কি যৌন অনুভূতিকে খুঁজে পাও নিজের মধ্যে?’
‘তোর হাতের স্পর্শের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছি। এখন স্মৃতিতে পাই, কল্পনায় পাই, প্রকৃতির নানা রূপ আলোছায়া এসব মাথার ভেতর আমি এখনো চিরযৌবনা হতে চাই। কিন্তু আমি জানি আমার জীবনের আলো ফুরিয়ে এসেছে।’
‘এ-কথা মৃত্যুর শেষ শ্বাস পর্যন্ত বলতে নেই। তোমার বাঁচাটা তোমার কাছে চিরকালীন হয়।’
‘বুড়ো, বুড়ো, ও বুড়ো, তুই এত কথা কী করে জানলি?’
‘এক কথায় তা বলা যায় না, বাঁশি জানে, সেতার জানে, সরোদ জানে। রাগে, খেয়াল ঠুমরির ভিতর দিয়ে ওস্তাদ ও প–ত গায়করা জানিয়ে যেতেই থাকে। থাকে শিল্পে সাহিত্যে ভাস্কর্যে।’
আশা দেবী চুপ করে যায়। কিছু বলে না। নিঃশব্দতার ভেতর কত কথা বলে যেন।
অমৃত হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইছে, এই অনুভূতি পেয়ে আশা দেবী আর্তনাদের মতো বলে উঠল, ‘হাত ছাড়িস না বুড়ো, আমার হাত ধরে রাখ।’ কেঁদে উঠল আশা দেবী, অমৃতর মনে এলো পৃথিবীর সব নারীই এমনভাবে কাঁদে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1402)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ▼ 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...