Saturday, March 4, 2017

বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধতা দেখেছে যুক্তরাষ্ট্র



বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, শিক্ষাবিদ, বিদেশী কিংবা আলোচিত হত্যাকাণ্ড গুলোর জন্য আইএস কিংবা আল কায়েদার সাথে যোগসূত্র আছে বলে দাবি করে উপমহাদেশে সক্রিয় এমন উগ্রপন্থী সংগঠন গুলো‌র সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র।
দেশটির বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ করা প্রতিবেদনে এ ধরনের অভিমতই উঠে এসেছে।
তবে দেশটি মনে করে জঙ্গি বিরোধী কঠোর অবস্থান নিয়েছে তবে এর ফলে বিচার বহির্ভূত হত্যাও বেড়েছে বলে মনে করে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
প্রতিবেদনে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বেআইনি আটক, নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা গুম ও নির্যাতনের ঘটনা, রাজনৈতিক সহিংসতা দুর্বল কর্ম পরিবেশ এবং শ্রমিক হয়রানিসহ বেশ কিছু বিষয়গুলোকে।
রিপোর্টে বলা হয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বেসামরিক প্রশাসনের পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে। সরকার পুলিশ বাহিনীকে আরও পেশাদার করতে কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে।
এতে আরও বলা হয় বাংলাদেশের সংবিধানে মত প্রকাশের ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে তবে সরকার অনেকসময় এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতায় অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
"হয়রানির ভয়ে অনেক সাংবাদিক সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্রে সেলফ সেন্সর আরোপ করছে। সরকার নিজের সহযোগী বা অরাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে সমাবেশের অনুমতি দিলেও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষকে সমাবেশ বা বিক্ষোভ করতে দিচ্ছেনা"।
"সমবেত হওয়া বা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সরকারের বাধানিষেধের কারণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিরোধীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত করেছে"।
প্রতিবেদনে বলা হয় সরকার অনেক ক্ষেত্রেই বিরোধীদের কর্মসূচি আয়োজন ও প্রচারে বাধা দিয়েছে।

নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করেই নির্বাচনে যাবে বিএনপি: মোশাররফ

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, বিএনপির নিবন্ধন বাতিলের যে আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে, তার চেয়ে হালকা কথা আর নেই। বিএনপি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করেই নির্বাচনে যাবে। সুতরাং, বিএনপির নিবন্ধন না থাকলে কারও নিবন্ধনই থাকবে না। আজ শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় খন্দকার মোশাররফ এসব কথা বলেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে নাগরিক দল নামের একটি সংগঠন ওই আলোচনা সভার আয়োজন করে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী কোনো দল পরপর দুটি সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলে তার নিবন্ধন বাতিল হবে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি পূরণ না হওয়ায় গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। এবারও এখন পর্যন্ত তাদের দাবি পূরণ হয়নি। সরকারি দলের নেতারা বলছেন, বর্তমান সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন হবে। বিএনপি নির্বাচনে না গিয়ে নিবন্ধন হারানোর ঝুঁকি নেবে না। এর জবাবে খন্দকার মোশাররফ বলেন, এর চেয়ে হালকা কথা আর নেই।
বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করবে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। আর যদি নৈরাজ্যের দিকে দেশকে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে তার দায় প্রধানমন্ত্রীকে নিতে হবে। মোশাররফ বলেন, বিএনপি একটি বৈধ গণতান্ত্রিক দল। বিএনপি নির্বাচনে বিশ্বাস করে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি যেকোনো সময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জনগণকে সঙ্গে বিএনপি নিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। স্বাধীন ও মুক্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। তখন বর্তমান দখলদার সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিচার করা হবে। বিএনপির এই নেতা অভিযোগ করেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নেতারা দুটি প্রচারণা নিয়ে মাঠে নেমেছেন। একটি হচ্ছে দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হবে, বিএনপি দুর্বল হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে। এই ‘অপপ্রচার’ বন্ধের দাবি জানিয়ে মোশাররফ বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও এ ধরনের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মামলা ছিল। তাঁর মামলায় সাজা না হলে খালেদা জিয়ার মামলায়ও সাজা দেওয়ার সুযোগ নেই। সরকার খালেদা জিয়াকে সাজা দিতে পারবে না। কারণ, মামলার অভিযোগ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। অন্যদের মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান, কেন্দ্রীয় সদস্য নিপুন রায় প্রমুখ বক্তব্য দেন।

জর্ডানে ১৫ জনের ফাঁসি

জর্ডানে আজ শনিবার ভোরে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া ১৫ জন আসামির ফাঁসি হয়েছে। রাজধানী আম্মানের দক্ষিণে সুয়াগা কারাগারে তাঁদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাঁরা সবাই জর্ডানি। খবর এএফপির। দেশটির তথ্যমন্ত্রী মাহমুদ আল মোমেনি জানান, জর্ডানে এ ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিয়ে যে বিরতি চলছিল,
এই ফাঁসি কার্যকর করার মাধ্যমে পুনরায় এর ছেদ ঘটানো হলো। মোমেনি পেত্রা সংবাদ সংস্থাকে বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ১০ জনকে সন্ত্রাসমূলক অপরাধের দায়ে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। পাঁচজনকে ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধের দায়ে ফাঁসি দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্যের পর এবার মমতার নজরে শিক্ষা খাতে

কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও নার্সিংহোমে চিকিৎসার খরচে লাগাম টেনে ধরতে ও চিকিৎসায় গাফিলতি নিয়ন্ত্রণে গতকাল শুক্রবার রাজ্য বিধানসভায় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ উদ্যোগে রাজ্যের সর্বস্তরের মানুষ অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছে। স্বাস্থ্যের পর এবার মুখ্যমন্ত্রীর নজর কলকাতাসহ রাজ্যের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশাল অঙ্কের অনুদান ও ফি নেওয়ার দিকে। গতকালই বিধানসভায় স্বাস্থ্য বিল নিয়ে সমাপনী ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, বেসরকারি হাসপাতালের লাগাম ধরতে তিনি যেভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, এবার বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষার নামে লাখ লাখ টাকা ডোনেশন নেওয়া আটকাতে তিনি উদ্যোগী হবেন। প্রয়োজনে তিনি এ-সংক্রান্ত বিল বিধানসভায় পেশ করে তা পাস করাবেন। বলেন, এ নিয়ে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন। এ জন্য তিনি শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে নির্দেশ দিয়েছেন।
মমতা বলেন, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করবেন। কলকাতার বাংলা দৈনিক ‘এই সময়’ আজ শনিবার একটি প্রতিবেদনে কলকাতার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ভর্তি ফির একটা তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ক্যালকাটা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ভর্তি ফি নেয় ৩ লাখ ১১ হাজার রুপি। একইভাবে লা মার্টিনিয়ার বয়েজ স্কুল ২ লাখ ৩৬ হাজার, হেরিটেজ বোর্ডিং ১ লাখ ৭০ হাজার, এপিজে স্কুল ১ লাখ ১৫ হাজার, গার্ডেন হাইস্কুল ১ লাখ, ক্যালকাটা গার্লস ৯৬ হাজার, ক্যালকাটা বয়েজ ৯৫ হাজার, মডার্ন হাইস্কুল ৮৫ হাজার রুপি ভর্তি ফি নিয়ে থাকে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে আইসিএসসি বোর্ডের অধীনে ৩৯০টি স্কুল ও সিবিএসই স্কুল রয়েছে ৪০টির মতো। আবার ১৮০টি স্কুল রয়েছে, যেগুলো বেসরকারি স্কুল হলেও মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সিলেবাস অনুযায়ী চলে। এসব বেসরকারি স্কুলে ছাত্রছাত্রী ভর্তি এবং ডেভেলপমেন্ট ফির নামে ইচ্ছেমতো টাকা নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, সরকারকে ফাঁকি দিতে টিউশন ফি কমিয়ে ডেভেলপমেন্ট ফির নামে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়।

আটক করাকে ‘চক্রান্ত’ বললেন উ. কোরিয়ার নাগরিক

উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং-উনের সৎভাই কিম জং-নাম হত্যায় জড়িত সন্দেহে আটক হওয়া ব্যক্তি তাঁকে পাকড়াও করার বিষয়টিকে ‘চক্রান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, প্রজাতন্ত্রের সম্মান ক্ষুণ্ন করতে এ চক্রান্ত করা হয়। আজ শনিবার সকালে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসের বাইরে তিনি এ মন্তব্য করেন। রয়টার্সের খবরে জানানো হয়, রি জং চল নামের উত্তর কোরিয়ার ওই নাগরিকের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁকে মালয়েশিয়ার পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার মালয়েশিয়া থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর রি জং চল চীন চলে যান। আজ সকালে সাংবাদিকদের কাছে রি জং চল অভিযোগ করেন, মালয়েশীয় পুলিশ হত্যার ব্যাপারে স্বীকারোক্তি আদায়ে তাঁকে চাপ দিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘যদি আমি তাদের কথা মেনে নিতাম, তাহলে আমার জন্য মালয়েশিয়ায় তারা সুন্দর জীবন কাটানোর ব্যবস্থা করত।
এখন আমি বুঝলাম যে ওটা একটা ফাঁদ ছিল। আমার দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে আমাকে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল।’ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে রি জং চল স্বীকার করেন, তিনি রসায়ন বিশেষজ্ঞ। কিন্তু তিনি ‘সাবান তৈরিতে প্রয়োজনীয় উপাদান আমদানিতে’ মালয়েশিয়ায় কাজ করতেন। মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ কিম জং-নাম হত্যায় তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। তিন সপ্তাহ আগে দেশটির রাজধানী কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে কিম জং-নামকে হত্যা করা হয়। রি জং চল দাবি করেছেন, হত্যাকাণ্ডের দিন তিনি এয়ারপোর্টে ছিলেন না। রি জং চলই একমাত্র উত্তর কোরীয়, যাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। মালয়েশিয়া আরও কয়েকজন উত্তর কোরীয় ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খুঁজছে।

মসুলে রাসায়নিক অস্ত্র হামলা!

ইরাকের মসুলে এক হামলায় ১২ জন আহত হওয়ার ঘটনায় ধারণা করা হচ্ছে, এটি রাসায়নিক হামলা ছিল। তা যদি হয়, তাহলে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত মসুলে এটাই হবে প্রথম রাসায়নিক অস্ত্র হামলা। আন্তর্জাতিক রেডক্রসের (আইসিআরসি) এক চিকিৎসক বলছেন, এতে ১২ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছে। কারা এই হামলা চালিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ বছরের ও এক মাসের শিশুও রয়েছে।
আঘাতের ধরন দেখে আইসিআরসির চিকিৎসক বলছেন, রাসায়নিক অস্ত্র হামলায় এমন হতে পারে। মসুলে পৃথক দুটি হামলায় আহত হয় বেসামরিক নাগরিকেরা। মসুলের পূর্বে ঘরবাড়ি লক্ষ্য করে মর্টার হামলা চালানো হয়। আহত ব্যক্তিরা বলছেন, সে সময় তাঁরা রাসায়নিক উপাদানের গন্ধ পেয়েছেন। আইসিআরসির মধ্যপ্রাচ্য–বিষয়ক পরিচালক রবার্ট মারদিনি বলেন, আহত ব্যক্তিদের লক্ষণ দেখে রাসায়নিক অস্ত্র হামলা হয়েছে বলে সন্দেহ হয়। তাদের শরীরে ফোসকা, চোখের লালচে ভাব, বমি, কাশি ও চুলকানি দেখে এমনটাই মনে হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ বলে তিনি জানান। হামলার জন্য কারা দায়ী, তা জানা যায়নি। তবে মসুলের পশ্চিমাঞ্চল থেকে মর্টার হামলা হতে দেখা যায়। ওই অঞ্চল এখনো আইএসের দখলে।

নির্বাচনী তদন্ত থেকে সরে দাঁড়ালেন জেফ সেশন্স

২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে মস্কোর হস্তক্ষেপ নিয়ে বিচার বিভাগীয় যে তদন্ত চলছে, তা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার কথা ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্স। ওয়াশিংটনে মস্কোর রাষ্ট্রদূত সের্গেই কিসলিয়াকের সঙ্গে তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় অন্তত দুবার সাক্ষাৎ করেছেন, এই তথ্য ফাঁস হওয়ার পর প্রবল সমালোচনার মুখে তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হলো। সেশন্স হলেন ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় ব্যক্তি, যাঁর মস্কোর সঙ্গে গোপন ও অবৈধ যোগাযোগের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হলো। এর আগে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ফ্লিন একই অভিযোগে পদত্যাগে বাধ্য হন। অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে চলতি তদন্ত দেখভালের দায়িত্ব ছিল সেশন্সের। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, সেশন্সের ব্যাপারে তাঁর পুরো আস্থা রয়েছে। কিন্তু মস্কোর সঙ্গে গোপন সম্পর্ক বজায় রাখায় তাঁর পক্ষে এই তদন্ত নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা সম্ভব হবে না, কংগ্রেসের উভয় দলের একাধিক সদস্যের এই বক্তব্যের মুখে সেশন্স নিজেই তদন্ত থেকে নিজেকে বিযুক্ত রাখার ঘোষণা দিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের অন্য নেতারা পুরো ব্যাপারটাকে নির্বাচনে পরাজিত ডেমোক্র্যাটদের নোংরা খেলা বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর দলের ভেতর থেকেই যখন একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা সেশন্সের ব্যাপারে তাঁদের সন্দেহের কথা তোলেন এবং এই তদন্ত থেকে তাঁর সরে দাঁড়ানোর দাবি সমর্থন করেন, তখন সেশন্সের পক্ষে দায়িত্বে টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মাইক ফ্লিনের পদত্যাগের মতো সেশন্সের নাটকীয় বিযুক্তির পেছনেও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যমাধ্যম, যাকে ট্রাম্প অনবরত অসৎ ও তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। চার দিন আগে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা প্রথম জানায়, সেশন্স ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় কিসলিয়াকের সঙ্গে দুবার সাক্ষাৎ করেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে মার্কিন সিনেটে যে শুনানি হয়, তাতে সেশন্স এই তথ্য জানাতে ব্যর্থ হন। এই শুনানির সময় ডেমোক্রেটিক সিনেটর আল ফ্রাঙ্কেন তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন, ট্রাম্প ক্যাম্পেইনের সঙ্গে যুক্ত কেউ রুশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, এই তথ্য জানতে পারলে তিনি কী ব্যবস্থা নেবেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাকে দু-একবার ট্রাম্পের উপদেষ্টা হিসেবে বলা হয়েছে, কিন্তু আমি রুশদের সঙ্গে কখনোই কোনো রকম যোগাযোগ করিনি।’ গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যদের উদ্ধৃত করে কিসলিয়াকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বিবরণ প্রকাশিত হলে সেশন্স প্রথমে তা সরাসরি অস্বীকার করেন, পরে যুক্তি দেখান যে তিনি সিনেটের সামরিক বিষয়সংক্রান্ত কমিটির একজন সদস্য হিসাবে রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু এই কমিটির সদস্য হিসেবে তাঁর বিদেশি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা সংগত হলেও বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে নয়। ওয়াশিংটন পোস্ট এই কমিটির বাকি ২৫ জন সদস্যের প্রত্যেকের কাছে জানতে চান, তাঁরা কেউ নির্বাচনী প্রচারের সময় রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না। তাঁরা সবাই জানান, কেউ কখনোই কিসলিয়াকের সঙ্গে কথা বলেননি। তাহলে সেশন্সকে একা কেন রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলতে হলো?
সেশন্স সরে যাওয়ার পর মস্কোর হস্তক্ষেপ প্রশ্নে তদন্তকাজ পরিচালনার দায়িত্ব বর্তাবে ওবামা আমলে নিয়োগ পাওয়া ভার্জিনিয়ার সাবেক ফেডারেল অ্যাটর্নি, বর্তমানে অস্থায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল ডানা বেন্টের ওপর। জানা গেছে, শুধু ফ্লিন ও সেশন্সই নন, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও রাষ্ট্রদূত কিসলিয়াকের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের সময় নিউইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারে কথা বলেছেন। ট্রাম্পের একজন আইনজীবীও রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগের কথা স্বীকার করেছেন। এর আগে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছিল, ট্রাম্পের সাবেক ক্যাম্পেইন চেয়ারম্যান পল মানাফোর্টেরও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এখন প্রশ্ন হলো, শুধু তদন্ত থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলকে বাদ দিলেই কি ডেমোক্র্যাটরা সন্তুষ্ট হবে? একাধিক ভাষ্যকারের ধারণা, কোণঠাসা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে তাঁরা সেশন্সের পদত্যাগ ছাড়াও এই তদন্ত পরিচালনায় একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি বা কমিটি নিয়োগের দাবি করবেন। সত্য বলবেন, এই শপথ নেওয়ার পর তিনি মিথ্যাচার করেছেন, একাধিক ডেমোক্রেটিক নেতা এই অভিযোগে শুধু এই তদন্ত থেকে সরে দাঁড়ানোই নয়, তাঁর পদত্যাগের দাবি তুলেছেন। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ন্যান্সি পেলোসি যুক্তি দেখিয়েছেন, অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি দেশের ‘প্রধান পাহারাদার’। গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটদের নেতা ন্যান্সি পেলসি কিঞ্চিত রহস্যের হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘মস্কোর কাছে ট্রাম্পের গোপন কী থাকতে পারে?’ ওয়াশিংটনে এখন এটাই লাখ টাকার প্রশ্ন।

মাইক পেন্সের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ই–মেইল ব্যবহারের অভিযোগ

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর থাকার সময় সরকারি কাজে ব্যক্তিগত ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছেন বলে খবর দিয়েছে মার্কিন প্রচারমাধ্যম। ইন্ডিয়ানাপোলিস স্টার পত্রিকার সংগৃহীত ই-মেইলে দেখা গেছে, মাইক পেন্স কখনো কখনো ‘স্পর্শকাতর বিষয়’ ও ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়’ নিয়ে আলোচনা করতে ওই ব্যক্তিগত ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছেন। ইন্ডিয়ানাপোলিস স্টার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, গত বছরের মাঝামাঝি মাইক পেন্সের ব্যক্তিগত ই-মেইল অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করা হয়েছিল। ‘পাবলিক রেকর্ডস’ অনুরোধের আওতায় পত্রিকাটি ই-মেইলগুলো সংগ্রহ করেছে। পত্রিকাটির কর্তৃপক্ষ বলেছে, তাদের অনুসন্ধানের জবাবে ভাইস প্রেসিডেন্টের দপ্তর তাঁর ‘একটি সরকারি ও একটি ব্যক্তিগত ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করার’ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে পেন্সের দপ্তর এ-ও বলেছে,
‘গভর্নর হিসেবে তিনি ই-মেইল ব্যবহারের বিষয়ে ইন্ডিয়ানার আইন পুরোপুরি মেনে চলতেন।’ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ২০১৬ সালের প্রচারণার সময় মাইক পেন্স সরকারি কাজে ব্যক্তিগত ই-মেইল সার্ভার ব্যবহার নিয়ে তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। পুরো প্রচারণার সময়জুড়ে ওই কেলেঙ্কারি হিলারিকে তাড়া করেছে। খবরটি ফাঁস করা প্রতিবেদক টনি কুক সিএনএনকে বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র বলেছেন, তাঁর ঘটনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় হিলারি ক্লিনটনের ব্যক্তিগত ই-মেইল সার্ভার ও ব্যক্তিগত ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করার মতো গুরুতর নয়। ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের আইনে সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়। তবে সাধারণত এগুলো সরকারি তথ্য হিসেবে সংরক্ষণ করার নিয়ম রয়েছে। পেন্সের কার্যালয় ইন্ডিয়ানাপোলিস স্টার পত্রিকাকে বলেছে, তাঁর নির্বাচনী ব্যবস্থাপক দল বাইরের কাউন্সেলরদের দিয়ে সরকারি বিষয়ে করা ব্যক্তিগত ই-মেইলগুলো অঙ্গরাজ্যের সরকারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেছিল।

লো পেনের রক্ষাকবচ বাতিল

ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রধান এবং আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অন্যতম প্রার্থী মারি লো পেনের পার্লামেন্টারি রক্ষাকবচ কেড়ে নিয়েছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। ফলে এখন তাঁর বিরুদ্ধে বিচারকাজ চালানোর ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকবে না। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য (এমইপি) মারি লো পেনের বিচার থেকে রক্ষাকবচ-সংক্রান্ত ভোটাভুটি হয় গত বৃহস্পতিবার। এতে অধিকাংশ সদস্য তাঁর পার্লামেন্টারি রক্ষাকবচ বাতিলের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ফ্রান্সের উগ্র জাতীয়তাবাদী, অভিবাসী ও ইসলামবিরোধী এই নেত্রীর বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কার্যক্রমের তিনটি বীভৎস ছবি প্রকাশের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন গোয়েন্দারা।
ফ্রান্সের আইন অনুযায়ী এ ধরনের ছবির প্রকাশ ও প্রচারণা নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘন করলে দুই থেকে তিন বছরের জেল এবং ৭৫ হাজার ইউরো জরিমানার নিয়ম রয়েছে। লো পেন তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে সিরিয়ায় আইএসের শিরশ্ছেদ করা মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফলির লাশের ছবি, খাঁচাতে বন্দী করে একজনকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার দৃশ্য ও একজন বন্দীকে ট্যাংক দিয়ে পিষে ফেলার ভিডিও শেয়ার করেছিলেন।

অসুস্থ শিশুদের বই পড়ে শোনালেন মেলানিয়া

অসুস্থ শিশুদের বই পড়ে শোনালেন মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার তিনি নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি হাসপাতালে গিয়ে সেখানে চিকিৎসাধীন শিশুদের বলেন, ‘বই পড়ায় তোমাদের উৎসাহ দিতে এসেছি। আমরা আজ কিছু পড়ব। তোমরা কি জানো আজ বই পড়ার দিন?’ বই পড়ে শোনানোর সময় অসুস্থ শিশুদের নিজ নিজ পছন্দের জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার পরামর্শ দেন মেলানিয়া। শিশুদের বলেন, ‘তোমরাও বিখ্যাত হবে। টিভিতে তোমাদের দেখবে সারা বিশ্ব।’
হাসপাতালে যাওয়ার সময় মেলানিয়া ড. সিউসের লেখা শিশুতোষ বই ভরা একটি সাদা বাক্স সঙ্গে নেন। দৃশ্যত বিশ্ব বইপড়া দিবস উপলক্ষে এটি করেন মেলানিয়া। সম্প্রতি এক আকাশযাত্রায় প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করলেও ফার্স্ট লেডি পুরোটা সময় নীরব ছিলেন। তাই একা একা তাঁর হাসপাতাল পরিদর্শন ও শিশুদের সঙ্গ দেওয়ার ঘটনা বেশ চমক জাগিয়েছে।

দুর্বৃত্তের হামলা ও গ্রামবাসী-পুলিশ সংঘর্ষ, নিহত ২

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় গতকাল শুক্রবার গ্রামবাসীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মফিজ মিয়া (৫০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। পুলিশসহ বেশ কয়েকজন আহত। পুলিশ ও গ্রামবাসী বলছেন, গতকাল দিবাগত রাত তিনটার দিকে মোস্তফানগর গ্রামের জিলু মিয়ার (৫৫) বাড়িতে কয়েকজন দুর্বৃত্ত গরু চুরির উদ্দেশে ঢোকে। তাদের বাধা দেন জিলু মিয়া। এ সময় জিলু মিয়াকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। এলাকাবাসী সোনাই মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে আটকে বেঁধে ফেলে। অন্যরা পালিয়ে যায়। সকাল নয়টার দিকে কোম্পানীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুর রকিবের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।
এ সময় সোনাই মিয়াকে পুলিশে সোপর্দ করা নিয়ে গ্রামবাসীদের দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজ্ঞান চাকমার ভাষ্য, গ্রামবাসীর এক পক্ষ সোনাইকে গণপিটুনি দিয়ে শাস্তি দিতে চায় এবং অন্য পক্ষ পুলিশে সোপর্দ করতে চায়। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় গ্রামবাসীর। এতে মফিজ মিয়া নিহত হন। মফিজ মিয়ার আত্মীয় পূর্ব ইসলামপুরের ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মাসুক মিয়ার ভাষ্য, পুলিশের গুলিতে মফিজ মিয়া মারা গেছেন। আহত ব্যক্তিদের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। আহত চার পুলিশ সদস্যকে সিলেট পুলিশ লাইন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

৩৬তম বিসিএসের ফল পুনর্নিরীক্ষণ চান তাঁরা

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স, মাস্টার্স—দুটোতেই আমি সেরা পাঁচের মধ্যে ছিলাম। ৩৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা আমার খুব ভালো হয়েছে। আমি জানতাম, আমি উত্তীর্ণ হব। কিন্তু প্রকাশিত ফলাফলে দেখি, আমার রোল নেই। কোনোভাবেই বিষয়টা মেনে নিতে পারছি না। সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি) আমি খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছি।’ আজ শনিবার সকালে প্রথম আলোকে কথাগুলো বলছিলেন ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ফারহানা ইয়াসমিন। তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ থেকে স্নাতকে ৩.৭৭ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৯৫ পেয়ে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেছেন। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ননক্যাডারে একটি চাকরিও পেয়েছেন। কিন্তু বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য ৩৬তম পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তাঁর দাবি, কোথাও কোনো ভুল হয়েছে।
কেবল ফারহানা নন, ৩৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন শতাধিক প্রার্থী। তাঁরা সবাই ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জানিয়েছেন। আবেদনকারীদের একজন ০৪৭৩৯৩ রোল নম্বরধারী তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ৩৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় ০৪৬৯৭৮ থেকে ০৪৭৫২৬ রোল নম্বরের মধ্যে ৬০ জন প্রার্থীর কেউই সাধারণ ক্যাডারের জন্য উত্তীর্ণ হননি। আর মাত্র দুজন পেশাগত ক্যাডারের জন্য উত্তীর্ণ হয়েছেন। আবার ০৪৭০৭২ থেকে ০৪৭৫২৬ রোল নম্বরের মধ্যে ৪৭ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু এই ৪৭ জনের কেউই কোনো ক্যাডারের জন্য উত্তীর্ণ হননি। বিষয়টা অস্বাভাবিক। কারিগরি ত্রুটির কারণে এমনটি ঘটতে পারে। প্রথম শ্রেণির ২ হাজার ১৮০ জন গেজেটেড কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে ২০১৫ সালের ৩১ মে ৩৬তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। গত বছরের ৮ জানুয়ারি প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অনুষ্ঠিত হয়। দুই লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী এতে অংশ নেন। উত্তীর্ণ হন ১৩ হাজার ৬৭৯ জন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তাঁদের লিখিত পরীক্ষা হয়েছিল। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ৩৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এতে ৫ হাজার ৯৯০ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। ১২ মার্চ থেকে তাঁদের মৌখিক পরীক্ষা শুরু হবে। ওই ফলাফলে উত্তীর্ণ হননি—এমন শতাধিক প্রার্থীর অভিযোগ, ফলাফল প্রকাশে কোনো ভুল হয়েছে। নয়তো তাঁদের ফেল করার কথা নয়। ইতিমধ্যে তাঁরা ফলাফল পুনর্বিবেচনার জন্য পিএসসিতে আবেদনও দিয়ে এসেছেন। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পিএসসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তাঁদের আবেদন পেয়েছি। বিষয়টা খতিয়ে দেখা হবে।’ ০৪৭২৩১ রোল নম্বরধারী সুব্রত কুমার ঘোষ, ০৪৭৪১০ রোল নম্বরধারী তানমিরা খন্দকার ও ০৪৭২৭৩ রোল নম্বরধারী রেজাউল ইসলাম পিএসসিতে ফল পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেছেন বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন। আলাদাভাবে আবেদন দেওয়া ছাড়াও ৮১ জন প্রার্থী সম্মিলিতভাবেও পিএসসিতে একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। ০১৬২০৩ রোল নম্বরধারী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করা শরীফ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনার্সে আমি ৩.৮৩ আর মাস্টার্সে ৩.৯৬ পেয়েছি। আমার খুব ভালো পরীক্ষা হয়েছিল।
৫৪০ থেকে ৫৫০ নম্বর পাব বলে আমি নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু ফলে দেখলাম আমার রোলই নেই। বিষয়টা অস্বাভাবিক। কোথাও কোনো ভুল হয়েছে।’ স্বাস্থ্য ক্যাডারে অংশ নেওয়া প্রীতম চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ৫২০ থেকে ৫৩০ পাব বলে ধারণা করি। কিন্তু আমার রোল নম্বর নেই। কোথাও একটা ভুল হয়েছে।’ নাম প্রকাশ না করে একজন প্রার্থী বলেন, তিনি ৩৩, ৩৪, ৩৫—প্রতিটি বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছেন। ননক্যাডারের জন্য সুপারিশকৃতও হয়েছেন। এই প্রথম কোনো বিসিএসে তিনি ফেল করলেন। বিষয়টা তাঁর কাছে অস্বাভাবিক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) আ ই ম নেছারউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ওই প্রার্থীদের আবেদন পিএসসি পেয়েছে। এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পিএসসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিকের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, মেধাবী প্রার্থীরা যাতে চাকরির সুযোগ পায়, সে জন্য প্রার্থীদের উত্তরপত্র সঠিকভাবে দেখতে, এমনকি প্রয়োজনে প্রার্থীর উত্তরপত্র পুনরায় দেখতে হবে।

যশোরে রেললাইনের পাশ থেকে শিশুর লাশ উদ্ধার

যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় রেললাইনের পাশ থেকে ১০ বছরের এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার নাম-পরিচয় জানা যায়নি। আজ শনিবার সকালে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের যশোর ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) ইদ্রিস আলীর ভাষ্য, শিশুটির শরীরে কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। শিশুটির পরনে পাঞ্জাবি, পায়জামা ও টুপি ছিল। পাঞ্জাবির পকেটে ট্রেনের টিকিট ছিল। তা দেখে বোঝা যায়, শিশুটি নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছে। এসআই ইদ্রিস বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য শিশুটির লাশ যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

শিশুর লাশ উদ্ধার, অপহরণের পর হত্যার অভিযোগ

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পৌর এলাকায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া এক শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। তার লাশ বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে খড়ের গাদায় পাওয়া গেছে। শিশুটি গতকাল শুক্রবার থেকে নিখোঁজ ছিল। পরিবারের সন্দেহ, তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। আজ শনিবার সকালে তাওহীদ শামীম শুভ নামের ওই শিশুর লাশ পাওয়া যায়। তাওহীদ কালাই পৌরসভার কাকলী শিশু নিকেতনের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিল।এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, গতকাল তাওহীদ বাড়ির পাশে খেলতে গিয়েছিল। সকাল ১০টার পর থেকে তাকে আর খুঁজে পায়নি পরিবার। বাবা তোতা মিয়া গতকাল রাতে কালাই থানায় শিশুটিকে অপহরণ করার অভিযোগে মামলা করেন।
এতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুজ্জামান চৌধুরীর ভাষ্য, পুলিশ আজ সকালে তাওহীদের লাশ উদ্ধার করে। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করার পর সেখানে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে বলে পুলিশের সন্দেহ। ময়নাতদন্তের জন্য তাওহীদের লাশ জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

স্বামীর নির্যাতনের কথা গোপন রাখেন ৭২ শতাংশ নারী

সরকারের সর্বশেষ জরিপ বলছে, স্বামীর নির্যাতনের শিকার হলেও ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ নারী তাঁদের ওপর নির্যাতনের কথা কখনোই অন্যদের জানাননি। শহর ও গ্রামের চিত্র প্রায় একই। নির্যাতনের কথা নারীরা জানান নিজের পরিবার, শ্বশুরবাড়ির লোকজন ও প্রতিবেশীদের কাছে। আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ, চিকিৎসক, ধর্মীয় বা এলাকার মুরব্বিদের কাছে তা জানানোর সংখ্যা খুব কম। নির্যাতনের পর আইনি সহায়তা নিয়েছেন মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। এর মধ্যেও সালিসব্যবস্থা প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০১৫’ শীর্ষক দ্বিতীয় জরিপের ফলাফলে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জরিপ বলছে, নির্যাতনের কথা গোপন করার দিক থেকে বরিশাল এগিয়ে। এখানকার প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী কাউকে জানাননি নির্যাতনের কথা। এ জরিপেই বলা হয়েছে, বর্তমানে বিবাহিত নারীদের ৮০ দশমিক ২ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময় স্বামীর হাতে কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার। ২০১১ সালে প্রথম জরিপে এ সংখ্যা ছিল ৮৭ দশমিক ১ শতাংশ। জরিপ বলছে, ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ নারী কাউকে জানানোরই প্রয়োজন মনে করেননি নির্যাতনের কথা। এ ক্ষেত্রেও শহর ও গ্রামের চিত্র প্রায় একই। নির্যাতনের পর পুলিশের কাছে যান ১ দশমিক ১ শতাংশ নারী। স্থানীয় নেতাদের কাছে যান ২ দশমিক ১ শতাংশ আর এনজিওর সহায়তা চেয়েছেন মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশ নারী। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সহায়তা চাওয়ার সংখ্যাও কম। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় পরিচালিত জরিপে নির্যাতনের কথা গোপন করার কারণগুলোও তুলে ধরা হয়েছে। নির্যাতনের পর পরিবারের সম্মানের কথা চিন্তা করে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ, স্বামীর কাছে আরও বেশি নির্যাতনের ভয়ে ১২ শতাংশ, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং লজ্জায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ নারী প্রকাশ করেননি নির্যাতনের কথা। স্বামীর ভয়ে নির্যাতনের কথা গোপন করার বিষয়টি মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রংপুর ও রাজশাহীতে। চট্টগ্রামে পরিবারের সুনাম নষ্ট হওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। দেশের সাতটি বিভাগের শহর, গ্রাম, সিটি করপোরেশন এবং সিটি করপোরেশনের বাইরের শহরকে এ জরিপের আওতায় আনা হয়েছে। শারীরিক, যৌন, অর্থনৈতিক, স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ বা মনোভাব এবং আবেগজনিত নির্যাতনকে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ১৫ বছরের বেশি বয়সী ২১ হাজার ৬৮৮ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ২০১৫ সালের ১৩ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণাতেও স্বামীর নির্যাতনের কথা গোপন করার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। গত বছর প্রকাশিত ‘ডিসক্লোজার অ্যান্ড হেল্প সিকিং বিহেভিয়ার অব উইমেন এক্সপোসড টু ফিজিক্যাল স্পাউজাল ভায়োলেন্স ইন ঢাকা স্লাম’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার বস্তিতে স্বামীর হাতে নারী নির্যাতনের হার খুব বেশি। কিন্তু এখানেও নির্যাতনের কথা প্রকাশ করার হার কম। ওই গবেষণায় ২০১১ সালের আগস্ট থেকে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ২ হাজার ৬০৪ জন বিবাহিত নারীর কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়। এই নারীদের ৬০ শতাংশ জরিপের আগের বছর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানান। কিন্তু মাত্র ২১ শতাংশ নারী প্রকাশ করেন নির্যাতনের কথা এবং ১৯ শতাংশ কোনো না কোনো সহায়তা নেন। ৮৯ শতাংশই সহায়তা চান অনানুষ্ঠানিক সূত্রের কাছে। নির্যাতন মেনে নেওয়ার যে প্রবণতা, তার কারণেই এই গোপন করার সংস্কৃতি বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন নির্যাতনের কথা গোপন করার যে সংস্কৃতি তা আগের তুলনায় কমেছে বলে মনে করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নির্যাতনের পর পুলিশ বা আদালতের কাছে গেলে প্রতিকার পাবেন কি না, তা নিয়ে একধরনের ভয় কাজ করে। পরিবার থেকেও ওই নারীকে ততটা উৎসাহ দেয় কি না, তাও দেখার বিষয়।
তবে ২০ বছর আগে যে চিত্র ছিল, তা বর্তমানে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। নারীরা কথা বলছেন বলেই গণমাধ্যমে প্রায় দিনই নির্যাতনের খবর প্রকাশ পাচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানমও মনে করেন, নির্যাতনের কথা প্রকাশ করার সংখ্যা বেড়েছে। মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের কাছে সহায়তা চাইতে আসা নারীর সংখ্যাও একেবারে কম নয়। তবে এখন পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার নারীর অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের বিষয়টি প্রকট থাকে। অভিযোগ যে করবেন, তাঁর পায়ের নিচে তো মাটি থাকতে হবে? দেশে আইনের অভাব নেই, কিন্তু আইনের প্রচার ও যথাযথ প্রয়োগ নেই। থানা, আদালতগুলো কতটা নারীবান্ধব হয়েছে, তাও দেখতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা তো আছেই। সরকারের হেল্পলাইন সরকারের সর্বশেষ জরিপমতে, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইন নম্বর ১০৯২১ (বর্তমানে ১০৯) সম্পর্কে জানেন মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১২ সালের জুন মাসে সরকার এ সেবা চালু করে। নির্যাতনের শিকার বা নির্যাতনের আশঙ্কায় থাকা যে কেউ এ নম্বরে ফোন করে সহায়তা নিতে পারেন। চলতি বছরের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ৬১টি পাঠ্যবইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় নম্বরটি দেওয়া হয়। তবে ১ মার্চ থেকে হেল্পলাইন নম্বরটি (১০৯) পরিবর্তন হয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের পরিচালক আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বব্যাপী হেল্পলাইন নম্বরটি যাতে মানুষ সহজে মনে রাখতে পারে, সেভাবে করা হয়। এ চিন্তা থেকেই বিটিআরসির কাছ থেকে বিশেষ বিবেচনায় নতুন নম্বরটি পাওয়া গেছে। আবুল হোসেন সরকারের জরিপ প্রসঙ্গে বলেন, হয়তো হেল্পলাইন নম্বরটি প্রতিটি ঘরে পৌঁছাতে পারেনি। তাই নম্বরটির প্রচার বাড়িয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। যে নারীরা আর কারও কাছেই নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারেন না, তাঁরা একটি ফোন করেই নির্যাতনের তথ্য জানিয়ে সহায়তা পেতে পারেন।

শাহ আবদুল করিম লোক উৎসব শুরু

বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের জন্মভিটা সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের মাঠে গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী শাহ আবদুল করিম লোক উৎসব। শাহ আবদুল করিমের ১০১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই উৎসবের আয়োজন করেছে শাহ আবদুল করিম পরিষদ। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় পায়রা উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ও শাহ আবদুল করিমের ছেলে শাহ নূর জালালের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. রুকন উদ্দিন আহমদ। মুখ্য আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর। এ ছাড়া বক্তব্য দেন দিরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান, ভাটিবাংলা সাংস্কৃতিক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোকাম্মেল হোসেন, সাংস্কৃতিকর্মী শামসুল ইসলাম সরদার, এ কে কুদরত পাশা প্রমুখ।
ফকির আলমগীর তাঁর বক্তব্যে বলেন, শাহ আবদুল করিম জীবনভর মানুষের মুক্তির জন্য গান করে গেছেন। মানুষের কল্যাণ ও মুক্তিই তাঁর দর্শন ও গানের মূল কথা। তাঁর সৃষ্টিকর্মের চর্চা বাড়াতে হবে। শুদ্ধ স্বর ও কথায় তাঁর গান গাইতে হবে, এটা তিনি নিজেও চাইতেন। সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে মোকাবিলায় তরুণ প্রজন্মকে তাঁর চেতনায় জাগিয়ে তুলতে হবে। উদ্বোধনী আলোচনার পর শাহ আবদুল করিমের ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘আমি বাংলা মায়ের ছেলে’, ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে, দিওয়ানা বানাইছে’, ‘গাড়ি চলে না চলে না রে’, ‘মন মজালে ওরে বাউলা গান’, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু’, ‘তুমি বিনে আকুল পরাণ’, ‘তুমি মানুষ আমি মানুষ’, ‘রঙের দুনিয়া তরে চাই না’, ‘মাটিরও পিঞ্জিরায় সোনার ময়না রে’, ‘তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো’সহ বেশ কিছু জনপ্রিয় গান পরিবেশন করেন বাউল রনেশ ঠাকুর, আবদুর রহমান, শাহ আবদুল তোহায়েদ, সিরাজ উদ্দিন, সাবিনা ইয়াসমীন, সূর্যলাল দাস, রওশন জামিল, ফারুক আহমদ, আসকর আলী, তোতা মিয়া প্রমুখ।

রাজশাহীতে বধ্যভূমি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই

যখন জ্ঞান ফিরল, আবদুল মান্নান সরকার দেখলেন তিনি পড়ে আছেন গলিত লাশের স্তূপের ওপরে। তাঁর চোখ ঝাপসা। অনেকক্ষণ কিছু দেখতে পাননি। আস্তে আস্তে চোখ পরিষ্কার হলে দেখলেন, তাঁর শরীরে কোনো কাপড় নেই। লাশের এই স্তূপ একটি নিচু গর্তের মতো জায়গায়। চারপাশে ইটের সারি। সেদিন ছিল ১৯৭১ সালের ২১ অক্টোবরের বিকেল। আবদুল মান্নান নিজেকে যেখানে আবিষ্কার করলেন, তার কিছু দূরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন জোহা হল। তাঁর মনে পড়ল, ছয় দিন আগে তাঁকে ধরে নিয়ে ওই হলেই আটকে রাখা হয়েছিল। হলটি ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প বা সামরিক দপ্তর। আসলে নির্যাতন কেন্দ্র। এখানে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে যাদের হত্যা করা হতো, তাদের লাশ ফেলে দেওয়া হতো পেছনের ইটভাটায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা সাদেকুল ইসলাম বলেন, জোহা হল নির্মাণের জন্য প্রচুর ইট এনে রাখা হয়েছিল কাছেই নিচু গর্তমতো একটি জায়গায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী লোকজনকে হত্যা করে ওই গর্তের মধ্যে ফেলে রাখত।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওই বধ্যভূমি থেকে বহু মানুষের হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়। সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার তিনটি আলমারিতে তুলে রাখা হয়েছে। জায়গাটিতে পরে তৈরি করা হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিফলকে লেখা রয়েছে: ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ঘাতক পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে যাঁরা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, সেই সব মৃত্যুহীন শহীদ এই গণকবরে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। বাঙালি জাতি তাঁদের অমর স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।’ ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল রাতে পাকিস্তানি বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলে তাদের ক্যাম্প গড়ে তোলে। বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বাধীনতাকামী মানুষকে ধরে এনে এই ক্যাম্পে নির্যাতন করা হতো। তারপর হত্যা করে পাশের বধ্যভূমিতে ফেলে দিয়ে আসা হতো। রাজশাহী নগরের বালিয়াপুকুর এলাকার আবদুল মান্নান সরকারকে তাঁর বাসা থেকে তুলে আনা হয় একাত্তরের ১৬ অক্টোবর ভোররাতে। তখন তাঁর বয়স ছিল ২১ বছর। গত মঙ্গলবার কথা হয় তাঁর সঙ্গে। আঁকশি (প্লাস) দিয়ে তাঁর নখ তুলে ফেলার চেষ্টার কারণে হাত-পায়ের আঙুলগুলো এখনো কুঁকড়ে আছে। তিনি বলেন, চোখ বেঁধে জোহা হলে নিয়ে গিয়ে যখন তাঁর চোখ খুলে দেওয়া হলো, তখন তিনি বুঝতে পারেননি কোথায় আনা হয়েছে। তাঁকে দোতলার একটি ঘরে ছুড়ে দেওয়া হয়। আবদুল মান্নান সরকার জানান, যে ঘরে তাঁকে আটকে রাখা হয়, সেটার মেঝেতে প্রায় দুই ইঞ্চি পুরো হয়ে মানুষের মাথার চুল-রক্ত জমাট বেঁধে ছিল। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। ভালো করে তাকিয়ে দেখেন, তারও আগে বন্দী আরও একজন মেঝেতে পড়ে আছেন। সেই বন্দীর কাছ থেকেই তিনি জানতে পারেন, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হল। তাঁর সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁর আত্মীয় মীর রহমত আলীকেও। ওই কক্ষে তাঁদের নিয়মিত নির্যাতন করা হতো। বেয়নেট দিয়ে মীর রহমত আলীর একটি চোখ তুলে নেওয়া হয়। পরে তাঁর কী হয়েছিল, আর জানা যায়নি। আবদুল মান্নান সরকার বলেন, ২১ অক্টোবর তাঁকে নিচে মেজর সাহেবের কক্ষে নেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তথ্য দিতে তাঁকে প্রচণ্ড নির্যাতন করা হতে থাকে। নির্যাতনের একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। যখন জ্ঞান ফেরে, নিজেকে তিনি লাশের স্তূপে আবিষ্কার করেন। আবদুল মান্নান ভাগ্যচক্রে বেঁচে গেছেন।
রাজশাহী শহরের লিয়াকত আলী তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। সদ্য ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হয়েছেন। পাকিস্তানি সেনাদের হাতে আটক হয়ে তিনিও তিন মাস বন্দী ছিলেন জোহা হলে। লিয়াকত আলী বর্তমানে ওয়ার্কার্স পার্টির রাজশাহী মহানগর শাখার সভাপতি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বন্দীদের মধ্য থেকে প্রতিদিন চার-পাঁচজনকে চোখ বেঁধে বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো। কিছুক্ষণ পরই গুলির শব্দ শোনা যেত। যাদের নিয়ে যাওয়া হতো, তারা আর ফিরে আসত না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই হলের পূর্ব পাশে বিরাট গণকবর পাওয়া যায়। বধ্যভূমির পাশেই এখন একটি বটগাছ বেড়ে উঠছে। চারজন পুলিশ সদস্য পাহারায় থাকেন। গত মঙ্গলবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চারদিক সুনসান। স্মৃতিস্তম্ভের দুই পাশে বটলব্রাশের সারি। ফুলের বাগানে সালভিয়া, করবী, পপি, ফায়ারবল, গাঁদা ও নয়নতারা। আজ যাঁরা এই সৌম্য স্মৃতিস্তম্ভের সামনে এসে দাঁড়ান, তাঁদের পক্ষে কল্পনাও করা সম্ভব নয়, একাত্তরে কী বীভৎস দৃশ্যের সূচনা হয়েছিল এখানে। তবে যাঁরা প্রাণে বেঁচে ফিরে এসেছেন, আর যাঁরা স্বজনদের খুঁজতে গিয়ে লাশের স্তূপ হাতড়ে বেরিয়েছেন, তাঁদের স্মৃতিতে ওই দুঃস্বপ্নের দৃশ্য আজও জ্বলজ্বল করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও হেরিটেজ বাংলাদেশের ইতিহাস আর্কাইভসের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বলেন, এই বধ্যভূমিতে মোট কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তা নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। প্রকৃত অনুসন্ধানের জন্য গণকবরের খননকাজও ঠিকমতো করা হয়নি। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিগুলোর এটি একটি।

বর্জ্য নেওয়ার বিষয়ে চুক্তি সই আরও পিছিয়েছে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপজ্জনক তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেরত নেওয়াসহ চারটি চুক্তি সই আরও পিছিয়ে গেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং পরমাণু শক্তি কমিশনের সূত্র জানায়, চুক্তিগুলো সইয়ের জন্য আসলে কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। এই চুক্তিগুলো সই না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের মূল চুক্তিও (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) কার্যকর হবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্রগুলো জানায়, ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর প্রকল্পের মূল চুক্তি সই হওয়ার পর সম্পূরক চারটি চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য ছয় মাসের একটি পথনকশা তৈরি করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী গত বছরের (২০১৬) জুন-জুলাই মাসে চুক্তিগুলো সই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত বছরের জুলাই মাসে সই হয় প্রকল্পের ঋণ চুক্তি। তখন এই চুক্তিগুলো ডিসেম্বরে সই হবে বলে জানা গিয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এই চারটি চুক্তির বিষয়বস্তু হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল জুড়ে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সরবরাহ নিশ্চিত করা; স্পেন্ট ফুয়েল (পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি বর্জ্য) ফেরত নেওয়া; যেকোনো বিষয়ে বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত সার্ভিস সরবরাহ এবং পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়ন। এর মধ্যে স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কারণ এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে অতিমাত্রায় তেজস্ক্রিয় বিপজ্জনক পারমাণবিক বর্জ্য ফেরত নেওয়ার বিষয়ও। তা ছাড়া এর প্রতিটি চুক্তির বিষয়বস্তুর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি জড়িত রয়েছে, যা মূল চুক্তির অন্তর্ভুক্ত নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি কিনতে যেমন অর্থ ব্যয় হবে, তেমনি স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত পাঠানো, পরিশোধন করা প্রভৃতির জন্যও অর্থ ব্যয় করতে হবে। চাহিদা অনুযায়ী যেকোনো সার্ভিস অর্থ ছাড়া পাওয়া যাবে না। এসব বিষয় চূড়ান্ত করতে সময় লাগছে।
এগুলো সবই চুক্তি সই পিছিয়ে যাওয়ার কারণ বলে মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেরত নেওয়া প্রসঙ্গে পরমাণু শক্তি কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা (সাবেক ও বর্তমান) প্রথম আলোকে বলেন, রূপপুর কেন্দ্রটি স্থাপনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ২০১১ সালে যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়, তাতে রাশিয়া স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেবে বলে উল্লেখ আছে। কিন্তু স্পেন্ট ফুয়েল আর পারমাণবিক বর্জ্য যে এক নয়, বাংলাদেশের আসল চাওয়া যে পারমাণবিক বর্জ্য রাশিয়াকে ফিরিয়ে দেওয়া—এ বিষয়টির ফয়সালা করতে হবে আলাদা একটি চুক্তির মাধ্যমে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্পেন্ট ফুয়েল পরিশোধন (রিসাইকেল) করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য কিছু ইউরেনিয়াম, কিছু প্লুটোনিয়াম এবং অতিমাত্রায় তেজস্ক্রিয় কিছু বর্জ্য পাওয়া যায়। সাধারণভাবে স্পেন্ট ফুয়েল নেওয়ার অর্থ হলো ইউরেনিয়াম সরবরাহকারী দেশ এই ফুয়েল নিয়ে পরিশোধন করে ইউরেনিয়াম ও বর্জ্য সংশ্লিষ্ট দেশকে ফেরত দেবে। প্লুটোনিয়াম যেহেতু আণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, সেহেতু তা ফেরত দেওয়া হয় না। আর এক দেশের পারমাণবিক বর্জ্য সাধারণভাবে অন্য কোনো দেশ সংরক্ষণের জন্য নেয় না। এই অবস্থায় উল্লিখিত চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিশ্চিত হতে হবে যে রাশিয়া স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নিয়ে শুধু পুনর্ব্যবহারযোগ্য ইউরেনিয়াম ফেরত দেবে। প্লুটোনিয়াম ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তারা রেখে দেবে। বাংলাদেশ এই চেষ্টাই করছে বলে পরমাণু শক্তি কমিশনের সূত্র জানায়। কারণ অতিমাত্রায় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বিশেষ ব্যবস্থায় শত শত বছর ধরে সংরক্ষণ করতে হয়, যা বাংলাদেশের পক্ষে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ। চারটি চুক্তির অন্যগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি।
এই চুক্তির বিষয়বস্তু হচ্ছে, শুরুতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে (রিঅ্যাক্টর) পারমাণবিক জ্বালানি ভরা যে ১৬০টি রড (বান্ডেল) স্থাপন করা হবে, সেগুলোর এক-চতুর্থাংশ করে প্রতিবছর বদলাতে বা প্রতিস্থাপন করতে হবে। এভাবে তিনবার বদলানো, অর্থাৎ কেন্দ্রটির প্রায় চার বছর চলা পর্যন্ত যে জ্বালানি লাগবে, তার দাম মূল চুক্তিমূল্যের মধ্যে ধরা হয়েছে। তারপর থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুরো আয়ুষ্কালে এই জ্বালানি প্রয়োজনীয় পরিমাণে (ইউরেনিয়াম) কিনতে হবে। চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া এই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী সার্ভিস নিশ্চিত করার চুক্তিতে থাকবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে জ্বালানি রড স্থাপন করা থেকে কেন্দ্রটি চালু করা এবং পরিচালনের যেকোনো পর্যায়ে সব বিষয়ে চাহিদা অনুযায়ী সার্ভিস সরবরাহ করা। আর পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়ন চুক্তি করা হবে দেশে পারমাণবিক ল্যাবরেটরি স্থাপন ও উন্নয়ন, পারমাণবিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি প্রভৃতির লক্ষ্যে। এই চারটি চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের মূল চুক্তি (জেনারেল কন্ট্রাক্ট) কার্যকর হবে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, এই চুক্তিগুলোর সই পিছিয়ে গেলেও তাতে বিদ্যুৎ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন পেছাবে না। কারণ মাঠপর্যায়ে ও ল্যাবরেটরিতে এই প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই চলছে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী অক্টোবরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল নির্মাণ পর্ব শুরু হবে। প্রতিটি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিটের প্রথমটি ২০২৩ সালে এবং দ্বিতীয়টি ২০২৪ সালের শেষ ভাগে চালু হওয়ার কথা।

কাশেম নাকি সারোয়ার?

‘নব্য জেএমবি’র নেতা মাওলানা আবুল কাশেমকে (৬০) রাজধানীর সেনপাড়া এলাকা থেকে গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এদিকে আদালতে কাশেম দাবি করেছেন, তাঁকে ১০ মাস আগে আটক করে ডিবি কার‌্যালয়ে রাখা হয়েছিল। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের দাবি, এই কাশেম নব্য জেএমবির আধ্যাত্মিক নেতা, যাঁকে সবাই ‘বড় হুজুর’ বলে ডাকত। গত বছর পুলিশের অভিযানে নিহত তামিম চৌধুরী ও আবুল কাশেমদের যৌথ প্রয়াসে ২০১৩ সালে বাংলাদেশে নব্য জেএমবির সূচনা হয়। কিন্তু এর আগে গত বছরের ২১ অক্টোবর র‌্যাব সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে এই সংগঠনের সূচনা করেন তামিম চৌধুরী ও সারোয়ার জাহান। গত বছরের ৮ অক্টোবর আশুলিয়ায় র‌্যাবের অভিযানে সারোয়ার জাহান নিহত হন। এই সারোয়ার জাহানই গুলশান হামলায় জড়িত ‘জেএমবির তামিম-সারোয়ার গ্রুপের’ প্রধান বলে দাবি করে র‌্যাব।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে আবুল কাশেমকে গ্রেপ্তারের কথা জানান কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ রাজধানীর সেনপাড়া পর্বতা এলাকা থেকে মাওলানা কাশেমকে গ্রেপ্তার করে। তখন তিনি বিকাশের মাধ্যমে দলেরই একজন সমর্থকের পাঠানো ১৫ হাজার টাকা আনতে যাচ্ছিলেন। মনিরুল বলেন, ২০১৫ সালে তাঁরা প্রথম আবুল কাশেমের নাম জানতে পারেন। পরে ২০১৫ সালের শেষের দিকে এবং ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানে হামলার আগে-পরে গ্রেপ্তার হওয়া বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গির কাছ থেকেও আবুল কাশেম সম্পর্কে জানতে পারেন। আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে আবুল কাশেম হলি আর্টিজান হামলা অনুমোদন করেছিলেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, ‘আমরা যতটুকু শুনেছি করেছেন। তারপরও তাঁকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদে আমরা নিশ্চিত হতে পারব।’ তবে গতকাল আদালতে নেওয়া হলে আবুল কাশেম আদালতকে বলেন, হলি আর্টিজান হামলার আগে গত বছরের মে মাসে তাঁকে আটক করে ডিবি কার‌্যালয়ে রাখা হয়। এ সময় তিনি আদালতকক্ষে থাকা জিয়াউল হক নামের এক আইনজীবীকে দেখিয়ে বলেন, ডিবি কার‌্যালয়ে থাকার সময় ওই আইনজীবীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। পরে যোগাযোগ করা হলে আইনজীবী জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্ত্রী জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সে জন্য চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে স্ত্রীসহ তাঁকে ডিবি কার‌্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে একটি সেলে কাশেমের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। পরে অবশ্য কোনো মামলা ছাড়াই স্ত্রীসহ জিয়াউলকে ছেড়ে দেয় ডিবি। গত বছরের মে মাসে কাশেমকে আটক করার বিষয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, এটা সঠিক নয়। আসামিরা তো অনেক কথাই বলে। তাদের কথা অনেক ক্ষেত্রেই গ্রহণ করা যায় না। কারণ, গতকাল রাতেই তাঁকে ধরা হয়েছে। র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গত ২১ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ৮ অক্টোবর সাভারের আশুলিয়ায় র‌্যাবের অভিযানের সময় নিহত সারোয়ার জাহানই নব্য জেএমবিকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁর সাংগঠনিক নাম আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। তিনি জানান, সারোয়ারের বাসা থেকে জঙ্গিদের বেশ কিছু সাংগঠনিক চিঠি ও কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। এগুলোর মধ্যে ছিল নব্য জেএমবি গঠনের একটি ঘোষণাপত্র, যাতে আবু ইব্রাহিম আল হানিফ ও আবু দোজানা নামের দুজনের সই রয়েছে। আবু দোজানা হলেন তামিম চৌধুরী। আইএসের অনলাইন ম্যাগাজিন ‘রুমাইয়া’র এক নিবন্ধেও নিহত তামিম চৌধুরীকে আবু দোজানা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সারোয়ার জাহান আইএসের আরেক সাময়িকী দাবিক-এ প্রকাশিত ‘আবু ইব্রাহিম আল হানিফ’ একই ব্যক্তি কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা। তখন সারোয়ার জাহানকে নব্য জেএমবির তৃতীয় সারির নেতা বলেছিল কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। ‘আবু আল হানিফ’ মাওলানা কাশেমের সাংগঠনিক নাম কি না, জানতে চাইলে গতকাল মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘কাশেমের একটা নাম হচ্ছে শাইখ আবু মোহাম্মদ আইমান হাফিজুল্লাহ।
আরও কী কী নামে তিনি পরিচিত ছিলেন, সেটি জানার চেষ্টা চলবে।’ তিনি বলেন, মাওলানা কাশেম জেএমবির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এর সঙ্গে জড়িত। কয়েক বছর আগে মাওলানা সাইদুর রহমানের (পুরোনো জেএমবির আমির) সঙ্গে তিনি একাধিকবার আদালতে হাজিরার সময়ে গিয়ে দেখা করেছে, এ রকম তথ্যও পাওয়া গেছে। মাদ্রাসাশিক্ষকতার আড়ালে জঙ্গি তৎপরতা আবুল কাশেমের বাড়ি কুড়িগ্রামে। প্রথম আলোর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিকে জেলার চিলমারী উপজেলার অষ্টমীর চর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তালেব ফকির জানিয়েছেন, তাঁর ইউনিয়নের ডাটিয়ারচরে কাশেমের বাড়ি ছিল, নদীতে সব ভেঙে গেলে তিনি পরিবার নিয়ে রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি এলাকায় চলে যান। প্রথম আলোর দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, আবুল কাশেম ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে চিরিরবন্দর উপজেলার ওকড়াবাড়ি হামিদিয়া কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ওই মাদ্রাসার বর্তমান অধ্যক্ষ আবদুল খালেক বলেন, কাশেম যখন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, তাঁর তিন ছেলেও ওই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিল। ২০১৬ সালের ৫ মার্চ আবুল কাশেম চাকরি ছেড়ে তিন ছেলেকে নিয়ে চলে যান। অধ্যক্ষের ধারণা, জেএমবির সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবরের কথা জানতে পেরে কাশেম মাদ্রাসা ছেড়ে চলে যান। চিরিরবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আবুল কাশেমের জেএমবি-সম্পৃক্ততার বিষয়ে তাঁদের গত বছরের মার্চে ‘ওপর থেকে’ জানানো হয়। তখন ওই মাদ্রাসায় গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন যে তিনি চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম বলেন, জেএমবির আমির মাওলানা সাইদুর রহমান কারাগারে যাওয়ার পর আবুল কাশেম আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে এই সংগঠনের হাল ধরেন। একপর‌্যায়ে আমির হিসেবেও কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে জেএমবির বিদ্রোহী অংশ নব্য জেএমবির আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়, তখন এই বিদ্রোহী অংশের সঙ্গে যোগ দেন কাশেম। মনিরুল বলেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরী দেশে আসার কিছুদিন পরে ২০১৩ সালের শেষ দিকে রাজশাহীতে যে বৈঠক হয়েছিল, সেখানেও আবুল কাশেম উপস্থিত ছিলেন। কাশেমসহ অন্যদের সঙ্গে তামিমের বৈঠক হয়। এই তথ্যটিও কতিপয় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ২০১৪ সালের দিকেই পুলিশকে দেয়। তখন তারা কাশেমের নামটা বলতে পারেনি, শুধু বলেছিল কোনো এক মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। মনিরুল বলেন, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী গ্রেপ্তার হওয়ার পর কাশেমের বিস্তারিত ঠিকানা পাওয়া যায়। তখন সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তিনি এক থেকে দেড় বছর আগে মাদ্রাসার চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। বাড়ির সঙ্গে, স্বজনের সঙ্গেও ওইভাবে সম্পর্ক নেই। পরে দু-তিন দিন আগে নব্য জেএমবির সদস্য বড় মিজান গ্রেপ্তার হওয়ার পর কাশেমের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। রিমান্ড কাশেমকে গত বছরের ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের ঘটনায় করা মিরপুর থানার একটি মামলায় গতকাল আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ। আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

ভারত থেকে পানি না পাওয়ায় গড়াইয়ে পানি কমেছে

পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে নির্ধারিত পানি পাওয়া যাচ্ছে না বলেই গড়াই নদে পানির প্রবাহ আগের তুলনায় কমে গেছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সুলতানপুর এলাকায় গতকাল শুক্রবার দুপুরে শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ী রক্ষা প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ জানাতে গিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ভারতের অংশে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগে পানি আসত ৫২ থেকে ৫৪ হাজার কিউসেক। এখন সেটা নেমে গেছে ২০ থেকে ২৫ হাজার কিউসেকে। এ ছাড়া প্রতিবছর গড়াইয়ের উৎসমুখ বালুতে ভরে যায়। এটি দূর করতে গঙ্গা ব্যারাজ করা হচ্ছে। এরও (গঙ্গা ব্যারাজ) ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক আছে। সে ব্যাপারে সমীক্ষা করা হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোতে ‘কোটি কোটি টাকা খননেও পানির প্রবাহ নেই’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গড়াই নদে পানির প্রবাহ অব্যাহত রাখার জন্য ২০০৯-১০ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত আট বছরে সরকারি প্রকল্পে খরচ হয়েছে ৬৫৪ কোটি টাকা। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় লোকজন।
আনিসুল ইসলাম বলেন, ‘আমি নিজেও দেখেছি পানি দৃশ্যত দেখা যায় না, এটা সত্য। পরিমাপ করে দেখা গেছে, খুলনা অঞ্চলে পানির লবণাক্ততা অনেকটা কমেছে।’ নদ খনন হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডে এ ধরনের কাজে দুর্নীতি করা অসম্ভব। সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে সফলতাও পাওয়া গেছে। শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্মৃতিবিজড়িত কুঠিবাড়ী রক্ষায় ২০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কুমারখালী উপজেলার সুলতানপুর এলাকা থেকে শিলাইদহ ঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকারি অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম, ঢাকার সাবেক সাংসদ এইচ বি এম ইকবাল, কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সাংসদ আবদুর রউফ, পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম, কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহেদুল ইসলাম প্রমুখ।

আরেক আসামি গ্রেপ্তার

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে সাংবাদিক আবদুল হাকিম হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মো. দুলাল হোসেনকে (৪৪) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাবনার ফরিদপুর উপজেলা সদর থেকে গতকাল শুক্রবার ভোরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুলাল শাহজাদপুর পৌরসভার বাড়াবিল গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে। তিনি মামলার প্রধান আসামি পৌর মেয়র হালিমুল হকের সহযোগী। শাহজাদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিক হত্যা মামলায় দুলাল এজাহারভুক্ত আট নম্বর আসামি।
আজ শনিবার আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হবে। শাহজাদপুরে গত ২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন দৈনিক সমকাল-এর স্থানীয় প্রতিনিধি আবদুল হাকিম। পরদিন ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় নিহত হাকিমের স্ত্রী নুরুন্নাহার শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র হালিমুল হককে প্রধান আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।

সুন্দরবনের থোরমোচা মাছরাঙা

মোংলা থেকে যাত্রা করে পশুর নদ পেরিয়ে কুঙ্গা নদী। কুঙ্গা নদী তিনকোনা দ্বীপের কাছে যেখানে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে কোকিলমণির দিকে গেছে, সেই পয়েন্ট দিয়ে কিছুটা ভেতরে ঢুকতেই মরা পশুর নদ, খেজুরবাড়ি খাল, কাগাবগা খাল ও জাফা গাঙের মোহনা। পরপর দুই রাত চমৎকার এই মোহনায় আমাদের লঞ্চ নোঙর করল। এমন সুন্দর জায়গা সুন্দরবন ছাড়া আর কোথাও আছে কি না, জানা নেই। দ্বিতীয় দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মোহনা থেকে বের হয়ে মরা পশুর নদ দিয়ে কিছুক্ষণ এগিয়ে একটি খালের সামনে লঞ্চ নোঙর করল। লঞ্চ থেকে আমরা ছয়জন ডিিঙতে উঠে বাঁ দিকের একটি সরু খালে ঢুকলাম। সুন্দর এই খালের নাম ক্ষেতখেরা। খালে ঢোকার মুখেই নানা ধরনের মাছরাঙা দেখলাম। এ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম থোরমোচা মাছরাঙার দেখাও মিলল এখানে। এরা ইংরেজিতে Brown-winged Kingfisher নামে পরিচিত। Alcedinidae পরিবারের মাছরাঙাটির বৈজ্ঞানিক নাম pelargopsis amauroptera. ঠোঁটের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত দৈর্ঘ্যে থোরমোচা ৩৬ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ৭.৬ সেমি ও ওজন ১৬২ গ্রাম (পুরুষ)। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা, ঘাড়, গলা, বুক,
পেট ও লেজের তলা কমলা-বাদামি। পিঠ ও কোমর নীল। ডানা ও কাঁধ-ঢাকনি কালচে-বাদামি, তবে ডানার কিনারার পালকগুলো গাঢ় বাদামি। চোখ বাদামি ও চোখের পাতা ইটের মতো লাল। পা ও পায়ের পাতা লাল। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহে কমলার আধিক্য বেশি। ডানার পালক-ঢাকনি ও কাঁধ-ঢাকনির কিনারা ফিকে। দেহতল কালো, ঘাড়ে কালো ডোরা রয়েছে। থোরমোচা সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি হলেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় লোনাজলের বন ও সুন্দরবন ছাড়া দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। কিন্তু দিনে দিনে সুন্দরবন বিপন্ন হওয়ার কারণে এদের আবাস এলাকা হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ছে। আর সে কারণেই সম্প্রতি এদের IUCN বাংলাদেশ সংকটাপন্ন (Vunerable) বলে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের সুন্দরবন এবং মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত এদের দেখা পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে বিশ্বে এরা প্রায়-বিপদগ্রস্ত (Near Threatened) বলে বিবেচিত। পানির সামান্য ওপর দিয়ে দ্রুত উড়ে চলে। সচরাচর নদী-খালপাড়ের গাছের নিচু ডালে বসে পানিতে মাছ খোঁজে ও মাছ দেখলে দ্রুত পানিতে ঝাঁপ দিয়ে শিকার করে। মূল খাদ্য ছোট মাছ হলেও কাঁকড়া ও জলজ পোকমাকড় খেতে পারে। এরা মার্চ-এপ্রিলে প্রজনন করে। এ সময় নদী-খালের খাড়া পাড়ে ৩০-৪০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ১০ সেন্টিমিটার চওড়া সুড়ঙ্গ তৈরি করে বাসা বানায় এবং তাতে চারটি গোলাকার সাদা ডিম পাড়ে। এরা ৫-৬ বছর বাঁচে।

প্রকৃতিগতভাবে অবশ্যই খুনিদের বিচার হবে

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে যারা নৃশংসভাবে খুন করেছে, প্রশাসনিকভাবে তাদের আইনের আওতায় না আনা গেলেও প্রকৃতিগতভাবে অবশ্যই তাদের বিচার হবে। ত্বকী হত্যার চতুর্থ বার্ষিকী স্মরণে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের তিন দিনব্যাপী কর্মসূচির প্রথম দিনে গতকাল শুক্রবার বিকেলে নগরের দেওভোগে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইভী বলেন, সাত খুনের সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক রায় সারা বিশ্বে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। ত্বকী হত্যার বিচারও একদিন না একদিন হবেই। ত্বকীকে যারা খুন করেছে, তারা এখন অনেকটাই ভীত। এক ত্বকীর বিনিময়ে নারায়ণগঞ্জের মানুষ খুনিদের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ প্রতিবাদ করতে শিখেছে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ ত্বকীকে যেমন চেনে, তেমন ত্বকীর খুনিদেরও চেনে। ত্বকী হত্যার পাশাপাশি ছাত্রলীগ নেতা মিঠু, নাট্যকার চঞ্চল, ব্যবসায়ী আশিক,
ভুলু সাহা হত্যার বিচারের দাবি জানান তিনি। সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক ও ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বির সভাপতিত্বে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন নাট্যজন মামুনুর রশিদ, ত্বকী মঞ্চের সদস্যসচিব কবি হালিম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি জিয়াউল ইসলাম, চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ সামসুল আলম আজাদ প্রমুখ। নাট্যজন মামুনুর রশিদ বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ১৯৬৫ সাল থেকে। একদা শিল্প-সংস্কৃতির শহর নারায়ণগঞ্জ খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির কারণে সারা দেশে নেতিবাচক ইমেজ হিসেবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু যে শহরে আইভীর মতো মেয়র, সেই শহরের মানুষ সাহসের সঙ্গে যেকোনো অন্যায় প্রতিরোধ করতে পারে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সারা দেশ প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছেন আইভী। ত্বকী হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তি হলে সারা দেশে শিশু হত্যা ও নির্যাতন বন্ধে অনেকটা সহায়ক হবে।’ রফিউর রাব্বি বলেন, ত্বকীর খুনিরা এখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মরণকামড় দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ঘাতক কোনোভাবেই রক্ষা পাবে না। এটি ইতিহাসের শিক্ষা।

বিডিপির পণ্যের প্রদর্শনী

সেনাবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশ ডিজেল প্ল্যান্ট (বিডিপি) লিমিটেডের উৎপাদিত পণ্যের ওপর এক প্রদর্শনী গত বৃহস্পতিবার ঢাকার র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ডিজেল প্ল্যান্ট লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আনোয়ার হোসেন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদসহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ছবিতে প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আনোয়ার হোসেন (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) ও অন্য কর্মকর্তারা।

সাবেক অধ্যক্ষসহ ৮ জন নিহত

সিরাজগঞ্জে ট্রাক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংঘর্ষে গতকাল শুক্রবার দুজন নিহত হয়েছেন। এদিনই শরীয়তপুরে ট্রাকের চাপায় কলেজের একজন সাবেক অধ্যক্ষ নিহত হন। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও চার জেলায় সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় শিশুসহ পাঁচজন প্রাণ হারান। এ নিয়ে গত ২২ দিনে বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন অন্তত ২২৩ জন। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের বরাত দিয়ে ঢাকার বাইরে থেকে প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর: সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার শ্রীখোলা মোড় এলাকায় গতকাল সকালে বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়কে ট্রাক একটি অটোভ্যানকে (ব্যাটারিচালিত রিকশা) পেছন থেকে ধাক্কা দিলে অটোভ্যানের চালকসহ দুই ব্যক্তি নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিরা হলেন উল্লাপাড়ার পূর্বদেলুয়া গ্রামের আকাশ ভৌমিক (১৮) ও সাইফুল ইসলাম (২৮)। ঘটনার পর ট্রাকচালক ও তাঁর সহকারী ট্রাক সড়কের ওপর রেখে পালান। এ ঘটনায় হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানায় মামলা হয়েছে। শরীয়তপুর জেলা স্টেডিয়ামের সামনে ট্রাকচাপায় নিহত হয়েছেন শরীয়তপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ লিয়াকত হোসেন তালুকদার। গতকাল সকালে ট্রাকচাপায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকায় পাঠানোর পথে শ্রীনগর এলাকায় দুপুরে তিনি মারা যান। পুলিশ ট্রাক জব্দ করলেও চালক পালিয়েছেন। লিয়াকত হোসেনের বাড়ি শরীয়তপুর সদরে। মোটরসাইকেলযোগে বাসা থেকে শহরে যাওয়ার পথে বেপরোয়া ট্রাক তাঁকে পেছন থেকে চাপা দেয়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বৃহস্পতিবার রাতে সড়ক পার হওয়ার সময় গাড়ির চাপায় মোহাম্মদ ইদ্রিস (২৩) নামের এক দিনমজুর নিহত হন। এ ছাড়া আনোয়ারার কালা বিবির দীঘির মোড়ে গতকাল বিকেলে অটোরিকশা ও পিকআপ সংঘর্ষে স্বপ্না রানী দাশ (২৮) নামের একজন পোশাককর্মী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত চারজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। হতাহত ব্যক্তিরা সবাই অটোরিকশার যাত্রী। পুলিশ পিকআপ জব্দ করলেও চালক পালিয়েছেন।
গাজীপুর সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর এলাকায় গতকাল ভোরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ট্রাকের সঙ্গে কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ট্রাকচালক মানিকগঞ্জের সদর এলাকার রুবেল মিয়া (৩৫)। মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাভার্ড ভ্যানটিকে একটি ট্রাক পেছন থেকে ধাক্কা দিলে ট্রাকটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এ অংশে চাপা পড়ে থাকা রুবেল মিয়াকে মৃত অবস্থায় টেনে বের করেন। গাইবান্ধার ফুলছড়ির পাকারমাথা এলাকায় গাইবান্ধা-বালাসী সড়কে গতকাল দুপুরে অটোরিকশার ধাক্কায় মোমিন মিয়া (৭) নামের এক শিশু নিহত হয়েছে। সে পাকারমাথা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলীর ছেলে। বাড়ির কাছে সড়ক পার হওয়ার সময় বেপরোয়া গতিতে চলা অটোরিকশা মোমিনকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে সড়কের পাশে ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই শিশুটি মারা যায়। বগুড়ার আদমদীঘির ছাতিয়ানগ্রাম বাজার এলাকায় বৃহস্পতিবার সকালে অটোরিকশার ধাক্কায় আহত পিয়াল হোসেন (৪) নামের এক শিশু রাতেই শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। সে ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়ার বেলাল হোসেনের ছেলে। রাজবাড়ী সদর উপজেলার সাইনবোর্ড এলাকায় খুলনা-দৌলতদিয়া মহাসড়কে বৃহস্পতিবার একটি অটোরিকশা উল্টে মহাসড়কের পাশে মাইলফলকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এর যাত্রী দুই স্কুলশিক্ষকসহ চারজন আহত হয়েছেন। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বসন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মইনুল ইসলাম (৩৮) ও লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজিয়া বেগমকে (৩০) গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো মানবসম্পদ–বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন

‘পরিবর্তনের জন্য বিনিময়’ প্রতিপাদ্য নিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক মানবসম্পদ-বিষয়ক সম্মেলন। বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্টের (বিএসএইচআরএম) উদ্যোগে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দিনব্যাপী ‘বিএসএইচআরএম মেটলাইফ ইন্টারন্যাশনাল এইচআর কনফারেন্স-২০১৭’ অনুষ্ঠিত হয়।
গতকাল সকালে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন মেটলাইফের বাংলাদেশ, নেপাল ও মিয়ানমারের প্রধান মো. নুরুল ইসলাম। বিএসএইচআরএমের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে কনফারেন্স চেয়ার এস এম জহির উদ্দিন হায়দার ও বিএসএইচআরএমের সহসভাপতি মো. মাশেকুর রহমান স্বাগত বক্তব্য দেন। এ সম্মেলনের গণমাধ্যম সহযোগী প্রথম আলো। দিনব্যাপী এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী লোকজনের জন্য মূল বিষয় ছিল মানবসম্পদ-বিষয়ক বিভিন্ন উপস্থাপনা ও আলোচনা। সম্মেলনে ‘পরিবর্তনের জন্য বিনিময়’ ধারণা এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ উপস্থাপন ও প্যানেল আলোচনার আয়োজন করা হয়।
এ ছাড়া ছিল এইচআর বিতর্ক। বিতর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে হারিয়ে বিজয়ী হয়। সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। কনফারেন্স সেক্রেটারি এম আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা চর্চাকে সুসংগঠিত করা, কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো, সর্বোপরি মানবসম্পদ উন্নয়ন। তিনি বলেন, এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে অনেকে অংশ নিয়েছেন। ১৫০ জন ডেলিগেটসহ ৭০০ জন ষষ্ঠবারের এই সম্মেলনে অংশ নেন।

সম্পদে এগিয়ে মনিরুল, মামলাও আছে দুটি

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে সম্পদে এগিয়ে আছেন বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী মো. মনিরুল হক সাক্কু। দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা। মনিরুল হক ছাড়া অন্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। মনিরুলের বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অন্য তিন প্রার্থী হলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি-রব) শিরিন আক্তার, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের (পিডিপি) সোয়েবুর রহমান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মামুনুর রশীদ। গত বৃহস্পতিবার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও কুমিল্লার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মণ্ডলের কাছে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা ঘেঁটে এ তথ্য পাওয়া গেছে। মনিরুল হকের সম্পদ সবচেয়ে বেশি। তাঁর স্ত্রীর সম্পদ তাঁর চেয়েও বেশি। বাড়িভাড়া থেকে পান ৭২ হাজার টাকা, ব্যাংক সুদ ২ লাখ ১২ হাজার টাকা ও সম্মানী ভাতা ১১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে নগদ রয়েছে ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকা।
তাঁর স্ত্রীর নামে নগদ আছে ৫৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ও ব্যাংকে জমা ৮৭ হাজার টাকা। সঞ্চয়পত্র বাবদ মনিরুলের রয়েছে ২ লাখ টাকা। তাঁর স্ত্রীর এ খাতে আছে ২৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। তাঁর গাড়ি আছে দুটি। দুজনের স্বর্ণ আছে ১০ তোলা করে। তাঁর স্ত্রী ব্যবসায় পুঁজি খাটিয়েছেন ২ কোটি ১২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে মনিরুলের অকৃষি জমি আছে দশমিক ০৯২৩ একর। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রীর রয়েছে দশমিক ০৫ একর জমি। তাঁর স্ত্রীর আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্পদের মধ্যে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকায় সেল নিশা টাওয়ারে রয়েছে তিনটি বাণিজ্যিক দোকান, দ্বিতীয় তলায় ১২টি দোকান, তৃতীয় ও চতুর্থ তলার ৭ হাজার ২৫৬ বর্গফুটের দুটি স্পেস, ফাতেমা জাহানারা টাওয়ারে ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় দুটি ফ্ল্যাট এবং ৩ হাজার ২২৯ বর্গফুটের স্পেস। মনিরুল হকের বিরুদ্ধে বর্তমানে ঢাকার রমনা থানায় দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে একটি এবং আয়কর অধ্যাদেশ আইনে কুমিল্লায় একটি মামলা রয়েছে। আঞ্জুম সুলতানার বাড়ি ও দোকান ভাড়া থেকে আয় ৫৪ হাজার টাকা। তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে আয় করেন আড়াই লাখ টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ ৫০ হাজার টাকা, ব্যাংকে জমা ৪৬ লাখ টাকা, সঞ্চয়পত্র বাবদ ২০ লাখ টাকা ও স্বর্ণ ৩০ তোলা। এ ছাড়া তাঁর স্বামী নিসার উদ্দিন আহমেদের রয়েছে ৩০ তোলা সোনা। আঞ্জুম সুলতানার স্থাবর সম্পদের মধ্যে আছে অকৃষি জমি ১০ শতক ও টিনশেড দালান।
তাঁর স্বামীর অকৃষি জমি আছে ২০ শতক, ২ হাজার বর্গফুটের দ্বিতলবিশিষ্ট আবাসিক দালান ও ১ হাজার ২০০ বর্গফুট তিনতলা আবাসিক দালান। জেএসডির শিরিন আক্তারের অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ রয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, স্বর্ণ ৩০ ভরি ও ঋণপত্র ৫০ হাজার টাকা। আর তাঁর স্থাবর সম্পদ আছে ১৪ শতক জমি। পিডিপি প্রার্থী সোয়েবুর রহমানের পেশা থেকে আয় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তাঁর অস্থাবর সম্পদের মধ্যে আছে নগদ ১ লাখ টাকা ও ব্যাংকে জমা ২ লাখ টাকা। স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদের বাড়ি ভাড়া থেকে আয় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। এ ছাড়া তাঁর স্ত্রীর শিক্ষকতা পেশা থেকে আয় ৬০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে দেড় লাখ টাকা। মামুনুর রশীদের অস্থাবর সম্পদ রয়েছে নগদ ১ লাখ টাকা, স্ত্রীর নামে ২ লাখ টাকা ও স্ত্রীর স্বর্ণ ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকার। আর স্থাবর সম্পদের মধ্যে কৃষিজমি ১১ শতক, অকৃষি জমি ৬০ শতক ও স্ত্রীর একটি বাড়ি। প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশা: আঞ্জুম সুলতানার শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ ও বিএড। পেশা শিক্ষকতা। মনিরুল এসএসসি পাস ও পেশায় ব্যবসায়ী। শিরিন আক্তার এসএসসি পাস ও পেশায় মৌসুমি ব্যবসায়ী। সোয়েবুর রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা এলএলবি। তিনি পেশায় আইনজীবী। মামুনুর রশীদ এমবিএ পাস। তাঁর পেশা ওষুধের ব্যবসা।

কীর্তিমতী সম্মাননা পেলেন তিন নারী

নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য তিন কৃতী নারী পেয়েছেন ‘রাঁধুনী কীর্তিমতী সম্মাননা-২০১৬’। এই তিন নারী হলেন সাংবাদিকতায় লাইলী বেগম, হিতৈষী শাখায় মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক রমা চৌধুরী আর ব্যবসায় উদ্যোক্তা হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন নারী কৃষক নুরুন্নাহার বেগম। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে এই তিন নারীকে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড সম্মাননা দিয়েছে। এই তিন নারীর কীর্তি হলো—লাইলী বেগম সংগীত শিক্ষা, কৃষি যোগাযোগব্যবস্থা এবং অবহেলিত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযুদ্ধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছেন। নিজের লেখনীর মাধ্যমে একক সংগ্রামে দেশের মানুষের কাছে স্বাধীনতার বাণী পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন রমা চৌধুরী।
আর পাবনার ইশ্বরদীতে কৃষিক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জনকারী নুরুন্নাহার বেগম। তিনি জাতীয় স্বর্ণপদকও পেয়েছেন। অনুষ্ঠানের এই তিন কীর্তিমতীর হাতে ক্রেস্ট ও ১ লাখ টাকা করে তুলে দেন স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক ও কালের কণ্ঠ-এর সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকার সভাপতি নিহাদ কবির এবং বেসরকারি সংস্থা জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান করভি রাখশান্দ। অঞ্জন চৌধুরী স্বাগত বক্তৃতায় বলেন, এ ধরনের সম্মাননা ভবিষ্যতে নারীদের আরও উদ্বুদ্ধ করবে। তিনি বলেন, স্কয়ারে ২৫ শতাংশ কর্মী নারী। নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথে সবাইকে যার যার অবস্থানে থেকে সহায়তা করতে হবে, নারীদের পাশে থাকতে হবে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তৃতা করেন সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, নিহাদ কবির প্রমুখ। সংগীত পরিবেশ করেন তপন চৌধুরী।

তুরস্ক পেছায়, আমরা নই!

গত বছরের নভেম্বরের কথা। আমরা অনেকে খবরটি হয়তো খেয়াল করিনি। তবে তা বিশ্ব সংবাদের শিরোনাম হয়েছিল। কিশোরী কিংবা বালিকাদের ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্ষিতাকে বিয়ে করলে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাবেন—এ রকম একটি আইনের খসড়া নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা চলছিল। পার্লামেন্টে খসড়াটির প্রথম পাঠ অনুমোদনের পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উত্থাপনের প্রস্তুতির সময়ে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে প্রতিবাদে নামলেন।
আইনের খসড়ায় ছিল কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে বা কিশোরীর সঙ্গে ভীতি প্রদর্শন কিংবা জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক না হলে তাকে ধর্ষণের অপরাধে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। বরং তা সম্মতির ভিত্তিতে যৌন সম্পর্ক হিসেবে গণ্য হবে। নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং নারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই আইন ধর্ষণকে উৎসাহিত করবে। অবশেষে ব্যাপক জনবিক্ষোভের মুখে সরকার সেই আইন প্রণয়ন থেকে পিছিয়ে আসে। যে দেশ এই সর্বনাশা পথ থেকে ফিরে এসেছে সেটি হচ্ছে সুলতান নামে অধিক পরিচিত প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের দেশ তুরস্ক। দেশটির পার্লামেন্টে এখন এরদোয়ানের দল ইসলামপন্থী একেপির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং গত বছরের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর তাঁর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। অন্যান্য অনেক দেশের মতোই তুরস্কেও মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর। কিন্তু আইন থাকলেও বাল্যবিবাহের চল ব্যাপক। যে কারণে ওই আইন তৈরির উদ্যোগে নাগরিক সমাজে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুমোট অস্বস্তির মধ্যেও স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংগঠিত হতে থাকে। তুরস্কের প্রস্তাবিত আইনটি ঘিরে বিতর্কের অন্য আরেকটি দিকও উল্লেখযোগ্য। ওই আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ২০১৬ সালের ১১ নভেম্বরের আগে অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো মেয়েকে যৌন নির্যাতনের জন্য অভিযুক্ত পুরুষ ধর্ষিতার সম্মতির ভিত্তিতে তাকে বিয়ে করলে অপরাধের দায় থেকে তাকে মুক্তিদান। আইনটি অনুমোদিত হলে প্রায় তিন হাজার পুরুষ এই দায়মুক্তির সুবিধা পেতেন (ফিউরি অ্যাট টার্কিশ বিল টু ক্লিয়ার মেন অব চাইল্ড সেক্স অ্যাসাল্ট ইফ দে ম্যারি ভিকটিমস, দ্য গার্ডিয়ান, ২২ নভেম্বর ২০১৬)।
তুর্কি আইনমন্ত্রী বেকির বোজদাগ আইনটির পক্ষে তাঁর যুক্তি দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাল্যবিবাহ আমাদের দেশের বাস্তবতা এবং যেসব পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁরা ধর্ষক বা যৌন আগ্রাসী নন। আইনটির বিরোধিতাকারীরা অবশ্য আইনমন্ত্রীর ওই বক্তব্য মানতে পারেননি। আইনটির খসড়ায় ভবিষ্যতের অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য না থাকলেও প্রতিবাদকারীরা ভূতাপেক্ষ অপরাধের দায়মুক্তি মানতে রাজি ছিলেন না। তাঁদের আশঙ্কা যে ভবিষ্যতেও অতীতের দৃষ্টান্তকে কাজে লাগানো হতে পারে। তুরস্কের সর্বাধিক বিক্রীত উপন্যাসের লেখিকা এলফ সাফাক সে সময়ে বিবিসিকে বলেছিলেন, তাঁর প্রধান উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে ‘সম্মতি’ শব্দটিতে। পরিবারকে ভয় দেখিয়ে অথবা টাকাপয়সা দিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহারের সম্মতি আদায় করা খুবই সহজ। আন্দোলনকারীদের যুক্তি হলো, এর ফলে শিশুটি আবারও অন্যায়ের শিকার হবে। আশা করি, পাঠক এতক্ষণে আমাদের সদ্য পাস হওয়া বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের সঙ্গে তুরস্কের অভিজ্ঞতার মিল-অমিলগুলো স্পষ্ট বুঝতে পারছেন। আইনটি পাস হওয়ার পর আমাদের একজন নারীনেত্রী, ক্ষমতাসীন জোটের ছোট শরিক, জাসদের একাংশের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার প্রশ্ন রেখেছেন, ‘আমার কন্যাকে কি তবে ধর্ষক, অপহরণকারীর কাছে বিয়ে দিতে হবে?’ তিনি আরও বলেছেন, ‘তবে’ যুক্ত করে আইন না করে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে (আমার কন্যাকে কি তবে ধর্ষকের কাছে বিয়ে দিতে হবে? প্রথম আলো অনলাইন, ২ মার্চ ২০১৭)। জাসদ নেত্রী নিজে যা বললেন তাঁর নেতা কিন্তু তেমনটি বললেন না।
ওই একই সেমিনারে জাসদ নেতা ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বরঞ্চ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে মূল আইনের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে সমালোচকেরা নাকি শুধু বিশেষ বিধানের দিকে নজর দিচ্ছেন। তিনি বিশেষ ধারার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেছেন যে একটি মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর সে যদি অন্তঃসত্ত্বা হয় তাহলে মেয়েটির কী হবে? এ রকম ক্ষেত্রে আদালতের আদেশে দুই পরিবারের ‘সম্মতি’তে বিয়েই সমাধান। এর আগে জাতীয় সংসদে যেদিন বিলটি পাস হয়, সেদিনও সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির কয়েকজন সদস্য আইনটির জন্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করেছিলেন। এসব সাংসদদের কাছে কেউ অবশ্য এখনো পাল্টা প্রশ্ন রাখেননি যে আইনটি পাসের সময় সংসদে আপনার ভোটটি প্রস্তাবের বিপক্ষে রেকর্ড হলো না কেন? কারণ, তাঁরা জানেন যে ভোটটি বিপক্ষে দিলে সরকারে থাকা আর সম্ভব হবে না। তাঁরা বিপক্ষে ভোট দিলেই যে আইনটির অনুমোদন ঠেকে থাকত তা নয়, কিন্তু তাঁদের যে বিরোধী দলের তকমা বজায় রাখার কোনো নৈতিক অধিকার নেই, সে কথাটি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া ভালো। এ ধরনের সুবিধাবাদী খিচুড়ি রাজনীতির দেউলিয়াত্ব তুলে ধরার দায় সংবাদমাধ্যমের রয়েছে। আইনের বিশেষ বিধানের দিকে নজর না দিয়ে যদি মূল আইনটির প্রসঙ্গ আলোচনা করি তাহলে প্রথমেই প্রশ্ন উঠবে—এই আইনে আমরা নতুন কী পেলাম। আর নতুন যা পেলাম তাতে কি অবস্থার উন্নতি ঘটবে নাকি বাল্যবিবাহের ঝুঁকি বা প্রবণতা বাড়বে? যদি ঝুঁকি বাড়ে তাহলে তাকে কি অগ্রগতি বলা যাবে, নাকি পশ্চাদ্মুখী বলতে হবে? এই আইনটি হওয়ার আগে বাল্যবিবাহ নিরোধে দেশে কি কোনো আইন ছিল?
তাতে বিয়ের ন্যূনতম বয়স কী ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তরে দেখা যাচ্ছে, দেশে বাল্যবিবাহ নিরোধের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত শূন্যতা ছিল না। দ্য চাইল্ড ম্যারেজ রেস্ট্রেইন্ট অ্যাক্ট, ১৯২৯ নামে একটি আইন ছিল, যা ১৯৩০ সালের এপ্রিল থেকে কার্যকর ছিল। ওই আইনের ১৯৮৪ সালে এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংশোধনী এনে শিশুর সংজ্ঞায় ছেলেদের ক্ষেত্রে বয়স ২১ বছর এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের নিচে নির্ধারণ করা হয়। ওই আইনে সাজার পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য, যা বর্তমান যুগে প্রতিরোধক হিসেবে কাজে আসছিল না। ফলে সাজার পরিমাণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থেকে আইনটির সংশোধন যে জরুরি ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ওই আইনে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের ‘সম্মতি’র অবকাশ ছিল না। আর ধর্ষণের মতো অপরাধের চিকিৎসা বা ওষুধ হিসেবেও তখন আইনটির কথা কেউ ভাবেনি। এখন মন্ত্রীদের কারও কারও কথায় স্পষ্টতই বোঝা যায় শিশু ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ মোকাবিলায় ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা হিসেবে এই আইনে বিশেষ বিধান যুক্ত করার ভুল পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর চিত্র কি আলাদা কিছু? জাতিসংঘের শিশু তহবিল, ইউনিসেফের ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে যত বাল্যবিবাহ হয় তার প্রায় ৪২ শতাংশই হয় দক্ষিণ এশিয়ায়। আর ভারতে হয় বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ বাল্যবিবাহ (সূত্র: এন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ: প্রোগ্রেস অ্যান্ড প্রসপেক্টাস)। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের চেয়েও বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার বেশি। তবে গত দুই দশকে এই হার একটু একটু করে কমছিল। পরিসংখ্যান আরও বলছে যে বাল্যবিবাহের শিকার প্রায় ৮০ শতাংশই হচ্ছে মেয়ে। নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী অধিকারের নীতির সঙ্গে বাল্যবিবাহের এই বিশেষ বিধান কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়। ঢাকায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেগবেইডার জানিয়েছেন,
বাল্যবিবাহ সবচেয়ে বেশি কমেছে ২০০৬ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যকার সময়টিতে। এখন আশঙ্কা এটি আবার বাড়বে এবং হয়তো নাটকীয় হারে। সামাজিক সম্মান, ধর্মীয় মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাসহ নানা ধরনের জানা এবং অজানা কারণে এটি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াবে সেই সব বখে যাওয়া ছেলে, যারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে অথবা পরিবারের সম্মতি না পেয়ে সবচেয়ে খারাপ পথটি বেছে নেওয়ার মতো বেয়াড়া। আর এ ধরনের বখে যাওয়া বেয়াড়া বা দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতারও অভাব হয় না। আইনে বিশেষ বিধানের পক্ষে এমন যুক্তির কথাও শোনা গেছে যে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ১৮-এর নিচে এমনকি ১৬ বছরেও অনেক মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে কথিত অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক সমস্যা এড়াতে পারিবারিক সমঝোতার ভিত্তিতে বিশেষ ছাড় দিলে খুব বড় একটা সমস্যা হবে না। এটি যে একটি মন্দ যুক্তি সেটা তাঁরা ভালোই জানেন। পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সামাজিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে বিয়ের বাইরেও কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হলে তা নিয়ে সামাজিক সমস্যা হয় না। ক্ষমতার রাজনীতিতে যেখানে হেফাজত অথবা জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার বৃত্তে প্রধান প্রধান দলগুলো বাঁধা পড়ে আছে, সেখানে পাশ্চাত্যের মতো অবাধ যৌনতার সমাজকে দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনার অবকাশ কই।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

চলছেই রাজনৈতিক মেগাসিরিয়াল

যখন শ্রমিক ধর্মঘট ওরফে অবরোধে সারা দেশে জনগণের পা মাটিতে গিয়ে ঠেকেছে, তখন আমাদের নৌপরিবহনমন্ত্রী কাম শ্রমিকনেতা শাজাহান খান বললেন, ‘ধর্মঘট কই, শ্রমিকেরা তো অবসরে গেছে।’ মন্ত্রীর কাছে অবসরে যাওয়াই যদি এ রকম হয়, তাহলে ধর্মঘট-অবরোধ-হরতালে না জানি কী হবে! মনে পড়ল সুকুমার রায়ের বই হযবরল-এর ছড়া, ‘ঠাস্ ঠাস্ দ্রুম্ দ্রাম্, শুনে লাগে খটকা—
ফুল ফোটে? তাই বল! আমি ভাবি পটকা!’
একজন শ্রমিকের দুঃখজনক মৃত্যু দিয়ে অবসর নাটক আপাতত শেষ। কিন্তু যে মানুষটি মারা গেলেন, তাঁর পরিবারের দুর্ভাগ্যের ইতিহাস শুরু হলো কেবল। আমরা ভুলে যাব, নতুন কোনো ঘটনা এসে উত্তেজিত করে রাখবে আমাদের। সুন্দরবন আন্দোলন ঢেকে দিল নাসিরনগরের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস। গ্যাসের দাম বাড়ার ক্ষোভ গৌণ হয়ে গেল শ্রমিক ধর্মঘটজনিত গণ-অসহায়ত্বে। অপেক্ষমাণ সারি থেকে এখন আবার উঠে এসেছে উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণের ভাস্কর্য নিয়ে বিবাদ। আমাদের জাতীয় জীবন যেন এক রাজনৈতিক মেগা সিরিয়াল; প্রতিটি পর্বেই নতুন নতুন চমক। ধর্মঘট শেষ না হতেই ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিরাপত্তাপ্রহরীদের বিরাট গন্ডগোল হয়ে গেল। তার আগে গ্যাসের দাম বাড়ার প্রতিবাদে বামপন্থীদের হরতাল। তারও আগে সাংসদ মনজুরুল হত্যার অভিযোগে সাবেক সাংসদ কাদের খানের নাটকীয়ভাবে আটক হওয়া এবং গণমাধ্যমে তৎসম্পর্কিত গল্প–কাহিনির প্রচার। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনীতে কোনো নিস্তরঙ্গ সুদিন পাওয়ার উপায় নেই। আমাদের কোনো দিন নিরুত্তেজিত থাকা কঠিন। কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের একটা গল্পের নাম ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’। সেখানে মনমরা এক ধনীর দুলাল জীবনে আনন্দের খোঁজে প্রতিদিন একটি করে ‘নারী শিকার’ করে। বাংলাদেশের মানুষের প্রতিদিনকার জীবন বিভিন্নভাবে শিকার হওয়ার গল্পে ভরপুর। একটি ঘটনা এসে আরেকটি ঘটনাকে সরিয়ে দেয়। সেই শাহবাগ আন্দোলন দিয়ে শুরু।
তারপর এল হেফাজতের মতিঝিলপর্ব। তারপর এল পেট্রলবোমার মৌসুম। পেট্রলবোমা শেষ হতে না হতেই শুরু হলো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অঘটন। সেটা চলতে চলতেই এল জঙ্গিবাদের নতুন পর্যায়। ইত্যবসরে নিয়মিতভাবে সড়ক দুর্ঘটনা, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মৃত্যু ঘটেই চলছে। এখানে কোনটি দুর্ঘটনা আর কোনটি সচেতন অবহেলার ফল, তা যেমন প্রমাণ করা যায় না, তেমনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহত লোকজনের প্রকৃত অপরাধেরও উন্মোচন ঘটে না। এ ধরনের মৃত্যু মেগা সিরিয়ালের মতো চলতেই থাকে। এহেন গোলমালে কোনো কিছুরই মীমাংসা হয় না, কোনো ঘটনার রহস্য উন্মোচন হয় না। আর বাংলাদেশের মানুষের অবস্থা হয়েছে লুইস ক্যারলের বিখ্যাত রূপকথা ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর অ্যালিসের মতো। ওয়ান্ডারল্যান্ডে ঢোকামাত্রই অ্যালিসকে বিবিধ বিপদে কেবলই দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। অ্যালিসের সঙ্গী বিড়ালটি তাকে তখন বোঝায়, ‘খুকুমণি, এখানে আমাদের এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হলে যত জোরে পারা যায় তত জোরে দৌড়াতে হবে। আর তুমি যদি কোথাও পৌঁছাতে চাও, তাহলে এর থেকে দ্বিগুণ বেগে ছুটতে হবে।’ ঘটনা ঘটে আর আমরা যথাসাধ্য প্রতিক্রিয়া করে যাই। একটি ঘটনার সুরাহা না হতেই আরেকটি অঘটন ঘটে বসে। তখন আবার সেটা নিয়ে সরব হই। সেটার গোড়া ধরতে না ধরতেই চলে আসে আরেক উত্তেজনা। মোগল সম্রাট আকবরের দরবারের প্রধান মনীষী আবুল ফজল বোধ হয় এ জন্যই বাংলাকে বলেছিলেন বুলঘাকখানা বা চির অশান্তির দেশ।
এ রকম পরিস্থিতিতে দূরদর্শী চিন্তা বা বড় পরিকল্পনা করা কঠিন। মানুষ হয়ে পড়ে মুহূর্তবাদী। প্রতিদিনকার জীবনযন্ত্রণা তার উদ্যম, তার জীবনীশক্তি শুষে নেয়। একসময় তারা হয়ে পড়ে উত্তেজনাভুক। পরিবর্তনের চিন্তা ও শক্তি তারা হারিয়ে ফেলে। দিনের পর দিন এমন উদ্বেগ, হতাশা, বিরক্তি জমতে জমতে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রকম বিকারের জন্ম হয়। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বাংলাদেশে ৬৩ লাখ ৯১ হাজারের বেশি মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছে, যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ১ শতাংশ। এ ছাড়া উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগছে ৬৯ লাখ মানুষ। এটা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। মাত্রাটা বিপজ্জনক। আমরা রাষ্ট্র-রাজনীতি নিয়ে যত চিন্তিত, সমাজ জিনিসটা আমাদের মনোযোগে ততটা থাকে না। কিন্তু আমাদের বাঁচা-মরা, ভালো-মন্দ সব সমাজ সমতলেই ঘটে। সেই সমতলে কিছু একটা ঘটছে, যা জীবনবিরোধী; যা সুস্থ নয়। সামাজিক সহিংসতাও মাত্রা ছাড়াচ্ছে। যখন মা বা বাবা কিংবা নিকটাত্মীয়রা শিশুসন্তানকে হত্যা করে, তার ব্যাখ্যা সরল চিন্তা দিয়ে হওয়ার নয়। বন্ধু বন্ধুকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। নিষ্ঠুরতা আর শত্রুতার জলবায়ুতে চলাফেরা করতে হচ্ছে সবাইকে। এগুলো গড়পড়তা অপরাধমূলক হত্যা নয়। অনেক সময় ঘাতক ও নিহত ব্যক্তি উভয়ই জীবন দিয়ে কোনো না কোনো দুঃসহ যন্ত্রণার ইতি টানছেন। হিংসা, অসহায়ত্ব, হঠাৎ জেগে ওঠা রাগ এবং স্বার্থচিন্তা থেকে হত্যা হচ্ছে। এগুলো একধরনের সামাজিক হত্যাকাণ্ড, যার কার্যকারণ ও প্রকাশ হয়তো বিচিত্র। আবার এগুলোর মধ্যে আমাদের সময়ের গনগনে সামাজিক সহিংসতার আঁচ পাওয়া যায়। কখন দুর্দশায় থাকা দুজন মানুষের মধ্যে পরস্পরকে হত্যার ইচ্ছা জেগে ওঠে, তা নিয়ে কাজ করেছিলেন আলজেরীয় বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক ফ্রাঞ্জ ফ্যানো। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে দার্শনিক ও মনস্তত্ত্ববিদ। সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানসিক গন্ডগোলের সম্পর্ক দেখানোয় তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি ছিলেন আলজেরিয়ার একটি হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রধান।
 আলজেরিয়ায় তখন চলছে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক দুঃশাসন। তাঁর কাছে চিকিৎসার জন্য আসা লোকজনের ওপর গবেষণা থেকে তিনি একটি বই লেখেন, ব্ল্যাক স্কিন, হোয়াইট মাস্ক (১৯৫২)। তাঁর বিখ্যাত রেচেড অব দ্য আর্থ বইতেও (১৯৬১ সালে প্রকাশিত বইটির বাংলা অনুবাদ পাওয়া যায়) প্রসঙ্গটা এসেছে। সেটা হলো দীর্ঘদিন চাপ, অবদমন, অসম্মান ও নির্যাতনের পরিবেশে থাকলে সমাজে পারস্পরিক হিংসা বেড়ে যায়। ফ্যানো দেখিয়েছেন, যখন মনে হচ্ছে দেশ তুলনামূলক শান্ত, তখন জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক অপরাধপ্রবণতা দেখা দিচ্ছে। আবার যখন স্বাধীনতাযুদ্ধ এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কমে যাচ্ছে সামাজিক অপরাধ। সমাজ মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা যায় ট্রান্সফারড অ্যাগ্রেশন বা স্থানান্তরিত ক্রোধ। এটা এমন এক মানসিক দশা, যখন আপনি সমস্যার মূল কারণে হাত দিতে না পেরে বা তা খুঁজে না পেয়ে চারপাশের ওপর আক্রোশ বোধ করবেন। তাই এড়িয়ে গিয়ে ভালো থাকার উপায় নেই। প্রতিদিনের উত্তেজনার মধ্যে মন ডুবিয়ে রাখার বাইরে আসতে হবে। হ্যাঁ, আমাদের পরিস্থিতির চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে। নাকের ডগার বাস্তবতার চেয়ে আরও বেশি দূর দেখতে পারতে হবে। কারা করবে সেটা? সে, তুমি, আমি করব। আমি-তুমি-সে মেলানো আমরা যদি এটা করি, তাহলে আমাদের নেতা–নেত্রী, প্রতিষ্ঠানের প্রধানজনেরাও সেই আমাদের সঙ্গে তাল মেলাতে বাধ্য হবেন। ওই অ্যালিসের বিড়ালের ভাষায়, ‘তুমি যদি কোথাও পৌঁছাতে চাও তাহলে এর থেকে দ্বিগুণ বেগে ছুটতে হবে।’
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
faruk.wasif@prothom-alo.info

‘হবু প্রধানমন্ত্রী’ হলেন দেশদ্রোহী

ইয়াহিয়া খান ঢাকায় নেমে বিজয়ী দলের নেতা শেখ মুজিবু্র রহমানকে হবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেটি তাঁর মনের কথা ছিল কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। তিনি যদি নির্বাচনী ফল সানন্দে গ্রহণই করবেন, তাহলে গোয়েন্দাপ্রধানের ওপর খেপে যাবেন কেন? কেনই বা পিপিপি নেতা ভুট্টোর সঙ্গে লারকানা ষড়যন্ত্রে মিলিত হবেন? করাচির পথে ঢাকা ত্যাগের আগে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালামকে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন, যাতে তিনি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করেন। ইয়াহিয়ার দাবি, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাস্তবতার ভিত্তিতে সমস্যাগুলো সমাধান করতেই তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা করতে ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের নেতাকে মীমাংসায় পৌঁছাতে দেয়নি। আরশাদ সামি লিখেছেন, ‘আমরা করাচি পৌঁছানোর পরই জেনারেল পীরজাদা চাইছিলেন প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করুন। পীরজাদা আমাকে দুবার ডেকে জানতে চান এ ব্যাপারে ভুট্টোর পক্ষ থেকে কোনো অনুরোধ এসেছে কি না কিংবা প্রেসিডেন্ট নিজে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন কি না।
একদিন সকালে ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি নিজেই আমাকে বললেন, প্রেসিডেন্ট ভবনে ভুট্টোর সম্মানে একটি ছোট নৈশভোজের আয়োজন করা হবে।’ আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া-ভুট্টোর মধ্যে যে আঁতাত গড়ে উঠেছিল, সেটি আবার পুনর্জীবিত হলো এবং এই আঁতাতই পাকিস্তান ও ইয়াহিয়াকে বিপর্যয়ের দিক ঠেলে দিল। এই ব্যক্তিগত নৈশভোজে ভুট্টো জুনগড়ের নবাব মোহাম্মদ দিলওয়ার খানজি ও বেগম জুনাগড়কে নিয়ে এসেছিলেন। সেই নৈশভোজে ইয়াহিয়া ও বেগম জুনাগড়ের সখ্য সম্পর্কে সামি লিখেছেন, ‘আকর্ষণীয় বেগম জুনাগড়ের অঙ্গভঙ্গির ওপর ইয়াহিয়ার প্রলুব্ধ চাহনি নিবদ্ধ ছিল। প্রত্যুত্তরে বেগম জুনাগড় এমনভাবে তাকালেন, যাতে অনুমোদনের চেয়ে বেশি কিছু ছিল।’ পরের সপ্তাহে ইয়াহিয়া ভুট্টোর লারকানার বাড়িতে গেলে সেখানেও জুনাগড় দম্পতি যোগ দেন। লারকানায় ভুট্টো ইয়াহিয়ার কাছে জানতে চান, মুজিব ও আওয়ামী লীগ চরমপন্থা নিলে তাঁর কাছে কী বিকল্প থাকবে? ইয়াহিয়া জবাব দিলেন, ‘মাত্র দুটি। এক. জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা, যাতে রাজনীতিকেরাই তাঁদের অরাজকতা দূর করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান ভাঙার দায়ে মুজিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’ এরপর ইয়াহিয়া পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করবে?’ ভুট্টোর জবাব ছিল, ‘কখনো না, কখনো না।’ তিনি আরও যোগ করলেন, ‘পাকিস্তান ভাঙার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নীলনকশা আছে। কিন্তু আমি পাকিস্তান ভাঙার দায় নিতে পারি না।’ লারকানা বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং জেনারেলদের মধ্যে তাঁর নিজস্ব চক্রটি ইতিমধ্যে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। দলের ভেতরের লোকদের মতে, আওয়ামী লীগ ও মুজিব সরকার গঠন করলে ভুট্টো ও পিপিপি সংসদীয় ভূমিকা রাখতে এবং বিরোধী দলের আসনে বসতে ইচ্ছুক নয়। দুই দলই পৃথকভাবে সরকার গঠনে আগ্রহী।
এ প্রসঙ্গে ভুট্টো বলেছিলেন, ‘এ ধার হাম ও ধার তোম।’ তুমি পূর্বাংশ নিয়ে থাকো, আর আমি পশ্চিমাংশ। প্রস্তাবটি আওয়ামী লীগের জন্য খানিকটা রাজনৈতিক সুযোগ এনে দেয়। অন্যদিকে ইয়াহিয়া চক্রের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও চলতে থাকে। সামি খানের ভাষ্য, ‘আমরা প্রায়ই পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শক্তি যাচাই করতে সদর দপ্তরে যেতাম এবং আওয়ামী লীগেই চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে বাড়তি কী প্রয়োজন, তা খতিয়ে দেখতাম। এটি জানা কথা যে পূর্ব পাকিস্তান সামরিক দিক দিয়ে ছিল খুবই ভঙ্গুর।’ এর পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর দুই অংশে সমান ভাগ করলে ভারতের শক্তিশালী বাহিনীর কাছে তা অধিকতর দুর্বল হতো যেকোনো অংশের জন্য। ভারতীয় বাহিনী সহজেই পশ্চিম পাকিস্তানকে ধ্বংস করে দিতে পারত।’ অর্থাৎ পাকিস্তানি শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা পশ্চিম পাকিস্তানের শক্তির ওপরই নির্ভরশীল করে রেখেছিল। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে নাকি এই কৌশল কাজে লেগেছিল। কিন্তু সামরিক দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে দুর্বল রাখার কারণে যে বাঙালিদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল, সেটি সামি খানসহ পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তারা আমলেই আনেননি। আওয়ামী লীগের ছয় দফা জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল পঁয়ষট্টির যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের অরক্ষিত থাকা। এর আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে শেখ মুজিব সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘ছয় দফা অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত।’
জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানেও তিনি ঘোষণা করেন, ছয় দফা এখন জনগণের সম্পত্তি। এটি পরিবর্তনের ক্ষমতা কারও নেই। সামি স্বীকার করেছেন, ‘এটাই অগণতান্ত্রিক রীতি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তিনি সেই দাবি করতেই পারেন।’ কিন্তু পাকিস্তানি শাসকেরা গণতান্ত্রির রীতির তোয়াক্কা করতেন না। মুজিবের সঙ্গে টেলিফোনে কথা শেষ হতেই ইয়াহিয়ার পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডমিরাল গভর্নর আহসানকে সংযোগ লাগিয়ে দিতে বলেন। প্রেসিডেন্ট তাঁকে বললেন, ‘মুজিবের কণ্ঠ খুবই অবাধ্যতার সুর।’ এরপর তিনি ইয়াকুব আলী খানের সঙ্গে কথা বলেন। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা কর্মকর্তাদের বৈঠকেই সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। ২৫ মার্চ সামরিক অভিযানের পর ইয়াহিয়া খান বেতার–টিভিতে দেওয়া ভাষণে শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর হবু প্রধানমন্ত্রী হলেন ট্রেইটর। তবে তাঁর শেষ রক্ষা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের পর তিনি নিজেও ক্ষমতাচ্যুত হন। ইয়াহিয়া যেভাবে আইয়ুবকে হটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, ভুট্টোও একইভাবে তাঁকে মসনদ থেকে বিতাড়িত করেন। আগামী কিস্তিতে সে বিষয়ে বিস্তারিত থাকবে। তার আগে আইয়ুবের এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সামি খান দুই পীরের যে ঘটনা বিবৃত করেছেন, সেটাই এখানে তুলে ধরছি। ‘প্রেসিডেন্টের এডিসি হিসেবে যোগদানের (১ এপ্রিল ১৯৬৬) পরপরই যখন আমি কাজ শিখছি মাত্র, একদিন সকালে প্রবেশফটক থেকে টেলিফোনে জানানো হলো, দেউল শরিফের পীর সাহেব এসেছেন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে।
তাঁর সঙ্গে শ-খানেক অনুসারী আছেন। নিরাপত্তাকর্মী জিজ্ঞেস করলেন, নির্ধারিত সময়সূচির দুই ঘণ্টা আগে তিনি এসেছেন, তাঁকে আসতে দেওয়া হবে কি না। আমি আমার সহকর্মী লে. খালিদ মিরের পরামর্শ চাইছিলাম। তিনি হাসলেন এবং জানালেন, প্রেসিডেন্ট সত্যিকারভাবে কোনো পীরে বিশ্বাস করেন না। অন্য রাজনীতিকদের ব্যাপারে তাঁর যতটা আগ্রহ, তাঁদের প্রতি তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। আমার উচিত তাঁকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া। তবে তিনি আমাকে সজাগ করে দিয়ে বললেন, নির্ধারিত সময়ের আগে যেন পীর সাহেব সরাসরি প্রেসিডেন্ট অফিসে যেতে না পারেন। তিনি আরও যোগ করলেন, ‘তুমি দেখতে পাচ্ছ সামি, পীর সাহেব শ-খানেক বা দুই শ লোক নিয়ে আসেন এবং প্রেসিডেন্ট মধ্যাহ্নভোজের জন্য অফিস ত্যাগ করার পর জায়গা ছেড়ে যান, এটাই তাঁদের বৈশিষ্ট্য।’ ‘এর মাধ্যমে তাঁরা অনুসারীদের বোঝাতে চান যে প্রেসিডেন্ট নিজেও পীর সাহেবের অনুগত এবং তিনি প্রাতঃরাশে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান এবং দুপুরের খাবারও তাঁর সঙ্গে খান। প্রেসিডেন্ট আরও বেশি সময় তাঁকে সেখানে রাখতে চেয়েছিলেন; কিন্তু বাইরে অপেক্ষমাণ শিষ্যদের কারণেই তিনি চলে এসেছেন। ‘নির্দেশনামতে, আমি শুধু পীর সাহেবকে ভেতরে আসার অনুমতি দিতে বলি, তাঁর সঙ্গীদের নয়। কয়েক মিনিট পর আবারও ফটক থেকে জানানো হলো, মানকি শরিফের পীর সাহেব এসেছেন। তাঁকেও প্রেসিডেন্ট সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছেন। আগের মতোই তাঁকে আসার অনুমতি দিলাম। ‘সাড়ে আটটায় দুই পীর প্রেসিডেন্টের অতিথিকক্ষে এলেন। তাঁদের একজনের নির্ধারিত সময় ১০টা, আরেকজনের সাড়ে ১০টা। দ
বিতীয় পীর আসার আধা ঘণ্টা পর আমার অফিসের বাইরে শোরগোল শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি দ্রুত বেরিয়ে এলাম এবং দেখতে পেলাম যে অতিথিকক্ষে দুই পীর মল্লযুদ্ধে রত। আমি তাঁদের দুজনকে বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করলাম। তাঁরা এক হাতে একে অন্যের দাড়ি ধরে আছেন, আরেক হাতে জামার কলার। তাঁদের পদযুগলও অলস বসে ছিল না। পা দিয়ে তাঁরা ক্যাঙারুর মতো একে অন্যকে লাথি মারছেন। আমি যখন তাঁদের নিবৃত্ত করতে পারছিলাম না, তখন নিরাপত্তাকর্মীদের ডাকলাম। তাঁরা কার্যত বন্দুকের মুখে তাঁদের বিচ্ছিন্ন করলেন। এরপর আমি বিষয়টি প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মোহাম্মদ রাফিকে জানালাম। তিনি তাঁদের থামালেন এবং কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীকে এনে নির্দেশনা দিলেন যে তাঁরা যদি একে অন্যকে মারতে যান, তাহলে তাঁদের গ্রেপ্তার করে স্থানীয় থানায় নিয়ে যাওয়া হবে। প্রেসিডেন্ট অতিথিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষ করলে সামরিক সচিব আমাকে নিয়ে তাঁর কাছে বিষয়টি জানালেন। উত্তেজনা শেষ হলে দেউল শরিফের পীরকে আনার জন্য প্রেসিডেন্ট আমাকে হুকুম দিলেন। যদিও তখনো তাঁরা শান্ত হননি। এর ১০ মিনিট পর মানকি পীরকে আনা হলো। আমি যখন দ্বিতীয় পীরকে নিয়ে এলাম, প্রথম পীর গজগজ করতে লাগলেন। প্রেসিডেন্ট তাঁকে থামিয়ে দিলেন এবং তাঁদের দুজনকে পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলাতে এবং ক্ষমা চাইতে বললেন। দুজনই অস্বীকৃতি জানালেন। এরপর প্রেসিডেন্ট আমাকে উদ্দেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের ডেকে দুজনকে হাতকড়া পরাতে এবং প্রেসিডেন্ট ভবনে গোলযোগ করার জন্য স্থানীয় থানায় গিয়ে মামলা ঠুকতে বললেন। এতে কাজ হলো। প্রেসিডেন্ট কথা শেষ না করতেই দুই পীর উঠে দাঁড়ালেন। একে অন্যের কাছে মাফ চাইলেন। এরপর তাঁরা প্রেসিডেন্টের ডেস্কের সামনে দুটি সোফায় বসলেন। তিনি উভয় পীরকে প্রেসিডেন্ট ভবন ত্যাগ করতে বললেন, যদিও তাঁরা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত থাকতে চেয়েছিলেন।
তাঁদের আর কখনো প্রেসিডেন্ট ভবনে দেখা যায়নি।’
আগামীকাল: ‘ইয়াহিয়া বললেন, খেলা শেষ’
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com