Tuesday, February 11, 2014

নির্বাচনী হলফনামা- আমি আজ চোর বটে! by বদিউল আলম মজুমদার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার কথা অনেকেরই মনে আছে। মনে আছে, মিথ্যা দেনার দায়ে জমিদার ডিক্রি করে উপেনের দুই বিঘা জমি হাতিয়ে নেন।
সেই জমির কথা ভুলতে না পেরে ১৫ থেকে ১৬ বছর পরে উপেন ফিরে আসেন তাঁর হারানো বাড়িতে। প্রাচীরসংলগ্ন পুরোনো আমগাছটির নিচে কুড়িয়ে পান দুটি পাকা আম। এ কারণে জমিদার তাঁকে আম চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। এমনই প্রেক্ষাপটে উপেন আফসোসের সুরে বলেন:
‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ,
আমি আজ চোর বটে।’

আমাদের সমাজে ‘ভিকটিমকে’ দোষ দেওয়ার মতো ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে, বিশেষ করে ক্ষমতাধরেরা তা সচরাচরই করে আসছেন। সম্প্রতি এমন একটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতার শিকার আমাকেও হতে হয়েছে। গত কয়েকটি সিটি করপোরেশন ও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে উপেনের মতো করুণ অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছে।
স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছরের ১৫ জুন বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে অতীতের মতো আমরা ‘সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের হলফনামার মাধ্যমে এবং তাঁদের আয়কর বিবরণীতে প্রদত্ত তথ্য ভোটারদের অবগতির জন্য প্রকাশ করি। একই সঙ্গে আমরা ‘ভোটার-প্রার্থী মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করি।
প্রসঙ্গত, প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে বাংলাদেশ হাইকোর্টের প্রদত্ত আবদুল মোমেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ে। রায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হলফনামার মাধ্যমে নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, মামলার বিবরণী এবং নিজেদের ও নির্ভরশীলদের আয়-ব্যয়, সম্পদ এবং দায়-দেনার তথ্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য সম্পূর্ণ গোপন ও অকল্পনীয় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল আবু সাফা বলে এক কাল্পনিক ব্যক্তির নামে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। সুজনের অনুসন্ধানী প্রচেষ্টায় এ জালিয়াতির তথ্য উদ্ঘাটিত হয় এবং বহু নাটকীয়তার পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। (সর্বোচ্চ আদালতের সম্পৃক্ততায় ঘটিত এ জালিয়াতির ইতিহাস জানতে হলে দেখুন ‘ভূমিকা’, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০৮: অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের তথ্যাবলি প্রথমা প্রকাশন, ২০১০)।
প্রসঙ্গত, সুজনের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এসব তথ্য প্রদানের ও প্রকাশের বাধ্যবাধকতার উদ্দেশ্য হলো ভোটারদের তথ্য দিয়ে ক্ষমতায়িত করা, যাতে তাঁরা জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।
উল্লেখ্য, প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। পিইউসিএল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া [(২০০৩)৪এসসিসি] মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে ‘এ কথা সত্য যে, রাজনৈতিক দলগুলোই নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তবে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হবে, যদি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে ভোটাররা না জানে। তাদের ‘এ’ কিংবা ‘বি’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার কোনো ভিত্তি থাকবে না। এ ধরনের নির্বাচন সুষ্ঠুও হবে না, নিরপেক্ষও না।’ আদালত আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র যাতে গুন্ডাতন্ত্র (mobocracy) এবং উপহাসে (mockery) বা প্রহসনে (farce) পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ভোটাদের তথ্য পাওয়া জরুরি।’ আমাদের আদালতের রায়েও প্রায় একই ধরনের যুক্তি উত্থাপন করা হয়।
চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে যে ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তাঁদের আটজন ২০০৮ সালের নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী, চার বিদায়ী মেয়র যার অন্যতম। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও এসব প্রার্থীকে তাঁদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামার মাধ্যমে তথ্য প্রদান করতে হয়েছিল।
আমরা সুজনের পক্ষ থেকে সাতজন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীর ২০০৮ ও ২০১৩ সালে দাখিল করা হলফনামায় অন্তর্ভুক্ত আয় ও সম্পদের তথ্যের তুলনামূলক চিত্র সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করি। প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায় যে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে চারজন বিদায়ী মেয়রের, যাঁরা সবাই ছিলেন সরকারদলীয়, গড়ে আয় বেড়েছে ৬৭৪৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে বাকি তিনজন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী, যাঁরা বিরোধী দলের
এবং এবার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের গড়ে আয় কমেছে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায় সম্পদের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ ক্ষমতার সঙ্গে যে জাদুর কাঠি জড়িত, তা প্রকাশিত তথ্য থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।
আমাদের সংবাদ সম্মেলনের পর সরকারদলীয় চার বিদায়ী মেয়রের পক্ষ থেকে সুজন এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করা হয় যে আমরা তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছি। প্রসঙ্গত, সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত সব তথ্যই ছিল প্রার্থীদের হলফনামা থেকে নেওয়া এবং এগুলো সম্পূর্ণ সঠিক। এগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল প্রার্থীদের সততা-অসততা সম্পর্কে কোনোরূপ মন্তব্য ছাড়াই। অর্থাৎ প্রার্থীদের নিজেদের প্রদত্ত তথ্য প্রকাশ করে আমরা ‘চোর’ বনে গেলাম!
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়েও আমাদের একই ধরনের দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হয়েছে। নির্বাচনের আগে, অতীতের মতো, আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হলফনামা ও আয়কর বিবরণীতে প্রদত্ত তথ্য সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার প্রমুখের ২০০৮ ও ২০১৩ সালের হলফনামা ও আয়কর বিবরণীতে প্রদত্ত তথ্যের তুলনামূলক চিত্র আমরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করি। প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায়, এসব ক্ষমতাধরের অনেকেরই আয় ও সম্পদ গত পাঁচ বছরে আকাশচুম্বী হয়েছে। উল্লেখ্য, এবারও প্রার্থীদের প্রদত্ত তথ্য তাঁদের সততা-অসততা সম্পর্কে কোনোরূপ মন্তব্য ছাড়াই প্রকাশ করা হয়।
প্রসঙ্গত, দাবি করা হয় যে সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ গয়না ও জায়গা-জমির মূল্যবৃদ্ধি। এ দাবি সঠিক নয়। কারণ, হলফনামায় গয়না ও জায়গা-জমির ক্ষেত্রে অর্জিত মূল্যই দেখানো হয়। আবার অনেকে এসবের কোনো মূল্যই দেখাননি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পদ বৃদ্ধির হার অহেতুকভাবে কমে যায়। এ ছাড়া এটি জানা কথা যে অনেকেই তাঁদের হলফনামায় সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তাই প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সম্পদ বৃদ্ধির হার প্রকৃত সম্পদ বৃদ্ধির হার থেকে কম হতে বাধ্য।
কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের পর থেকে আমরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছি। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নিগ্রহের হুমকি ছাড়াও আমরা আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হচ্ছি। এ পর্যন্ত আমরা একাধিক ‘উকিল নোটিশ’ পেয়েছি, যেগুলোর পেছনে কোনোরূপ যৌক্তিক কারণ নেই। যেমন, আমাদের ক্যালকুলেশন অনুযায়ী, একজন অতি সম্মানিত ব্যক্তির গত পাঁচ বছরে আয় ও সম্পদ বেড়েছে যথাক্রমে ৪,৪৩৫ শতাংশ ও ২৩৮ শতাংশ। তাঁর উকিল নোটিশে আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির হার সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। অর্থাৎ আমাদের ক্যালকুলেশনে কোনো ভুল নেই, তবু তিনি আমাদের বিরুদ্ধে তাঁর মানহানি হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
আমরা শুনেছি যে আমাদের এসব তথ্য প্রকাশ এবং গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন এবং কারও কারও বিরুদ্ধে দুদক ব্যবস্থা নিচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে দেশকে সত্যিকারার্থে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে দুদককে শক্তিশালী এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সরকারের উচ্চ পদ থেকে সব বিতর্কিতকেও বাদ দিতে হবে।
পরিশেষে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ও যথার্থ ‘সিস্টেম’ বা পদ্ধতি আবশ্যক। কিন্তু সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিরা এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা না করলে গণতন্ত্র অকার্যকর ও সাধারণ জনগণের জন্য অকল্যাণকর হতে বাধ্য। এ জন্যই সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার এবং নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি করা আবশ্যক। সুজনের প্রচেষ্টায় এবং আদালতের নির্দেশে প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাধরদের পক্ষ থেকে রক্তচক্ষু প্রদর্শন ও হয়রানির অবসানের, যা নাগরিক সক্রিয়তার জন্য অপরিহার্য।
আমাদের রাজনীতিকে পরিচ্ছন্ন করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে একাধিক উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, কমিশনকে হলফনামার ছকটিতে পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন, ছকটিতে প্রার্থীদের ‘প্রাইভেন্ট ইন্টারেস্ট’ ও আয়ের বিস্তারিত উৎস প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিরুদ্ধ হলফনামা প্রদানের বিধান সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তৃতীয়ত, হলফনামার তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে এবং মিথ্যা তথ্য প্রদানকারী ও তথ্য গোপনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুততার সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রসঙ্গত, হলফ করে মিথ্যা তথ্য দেওয়া ফৌজদারি অপরাধও বটে। চতুর্থত, সাম্প্রতিক নির্বাচনে কিছু ব্যক্তি নির্বাচিত হয়েছেন, যাঁরা সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে নির্বাচিত হওয়ার এবং সাংসদ থাকার অযোগ্য। তাঁদের সাংসদ পদ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পঞ্চমত, হলফনামাসহ মনোনয়নপত্র ‘ইলেকট্রনিক ফাইলিং’-এর বিধান করা জরুরি, যাতে তথ্যগুলো দ্রুততার সঙ্গে ভোটারদের কাছে পৌঁছানো যায়।

বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

দুর্নীতি দমন- চাই দুদকের দৃপ্ত পদচারণ by আলী ইমাম মজুমদার

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে তাদের ক্ষমতায় কিছু সীমাবদ্ধতা এনে একটি সংশোধনী বিল সংসদে যায় বছর তিনেক আগে।

দক্ষিণ এশিয়া- কবে নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত হবে? by মহিউদ্দিন আহমদ

ফেব্রুয়ারির পয়লা সপ্তাহে নেপালের কারভে জেলার পাহাড়ের ঢালে একটা পান্থনিবাসে দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের একটা সভা অনুষ্ঠিত হলো।
এঁরা সবাই ‘দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্য বিমোচন জোট’-এর সদস্য। এ অঞ্চলে এ ধরনের অনেক সংগঠন বা নেটওয়ার্ক আছে। প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করে। উল্লিখিত জোটটির মূল লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য অনুকূল রাজনীতির প্লাটফর্ম তৈরিতে সাহায্য করা। এর সদস্যরা এসেছেন সমাজের বিভিন্ন স্রোতোধারা থেকে। তবে যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এঁরা ১২ বছর ধরে এ জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আছেন তার মূল প্রতিপাদ্য হলো উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা, সমাজের অবহেলিত অংশের প্রতি দায়িত্ববোধ ও তাদের সহযাত্রী হওয়া এবং নয়া উদারবাদী অর্থনীতির বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

এবারের আলোচনায় যা প্রাধান্য পেয়েছে তা হলো আফগানিস্তানে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, পাকিস্তানে ধর্মীয় উগ্রবাদ, মালদ্বীপে বিবদমান দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যা কিনা দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির পারস্পরিক লড়াইয়ের একটা নতুন ক্ষেত্র, শ্রীলঙ্কায় উগ্র সিংহলি জাতীয়তাবাদ, নেপালে ক্ষমতার লড়াই এবং সংবিধান প্রণয়নে অনিশ্চয়তা, ভুটানে রাজকীয় গণতন্ত্রের আড়ালে নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের দেশছাড়া করা, ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান এবং বাংলাদেশে ভোটারবিহীন নির্বাচন। এ ধরনের সভায় ‘দেশপ্রেমিক’ হয়ে নিজেদের ‘কালো’ বিষয়গুলো ‘সাদা’ করে দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। সেই সুযোগটা থাকে সাধারণত আমলা ও রাজনীতিকদের মধ্যে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এখানে নিজেদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এখানে সবাই দক্ষিণ এশীয়। তাই ধর্মীয় ও আঞ্চলিক উগ্রবাদের মোড়কে একজন ইমরান খান কিংবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে একজন রাজাপক্ষে কিংবা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ হয় আধুনিক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। নেপালে একটা টেকসই সংবিধান তৈরির ব্যাপারে টালবাহানা থেকে একজন নেপালির সঙ্গে সঙ্গে একজন আফগান বা একজন বাঙালিও মনে কষ্ট পান। আবার ‘আম আদমি পার্টি’র আপাত সাফল্য দেখে এবং একজন অখ্যাত অরবিন্দ কেজরিওয়াল প্রথাগত রাজনীতিতে সামন্ত নেতাদের যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, তাতে সবাই আনন্দিত হন এবং একই সঙ্গে হন আশাবাদী।
নাগরিক সমাজের এ ধরনের সভা ও আলোচনার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত নন, তাঁদের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন যে মুক্তমনের আধুনিক ও সংস্কৃতিমান মানুষ এ অঞ্চলের দেশগুলোতে আছেন অনেক। তাঁরা নিজেদের নিছক পাকিস্তানি, বাংলাদেশি কিংবা ভারতীয় অথবা হিন্দু, মুসলমান কিংবা বৌদ্ধ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন না। একজন ব্যক্তির বহুমাত্রিক পরিচয় থাকতে পারে। তিনি একই সঙ্গে একজন বাঙালি কিংবা তামিল, অথবা হিন্দু কিংবা মুসলমান, অথবা দলিত কিংবা ভূস্বামী, অথবা নারী কিংবা পুরুষ। সব ছাপিয়ে তিনি একজন মানুষ। আর মানুষে মানুষে ভেদরেখা টানা অন্যায় ও অনৈতিক।
দুঃখজনক হলেও এটা সত্য যে এ অঞ্চলে এ ধরনের ‘আইডেন্টিটি পলিটিকস’ চলে আসছে দশকের পর দশক। এখানে সামন্ত প্রভুরা গণতন্ত্রের উর্দি পরে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কিংবা ক্ষমতায় চিরস্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার জন্য মানুষকে বিভক্ত করেন, তাঁদের নিয়ে দলাদলি করেন, বিভিন্ন নামের তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করেন এবং অবশেষে তাদের ব্যালট পেপারটি নিজের আঁচলে কিংবা পকেটে পুরে জনগণের কাঁধে সিন্দবাদের দৈত্যের মতো চেপে বসেন। এই একই গল্প টেকনাফ থেকে হিরাটে, লাদাখ থেকে মালে পর্যন্ত।
কয়েক দশক ধরে আমরা একটা কথা শুনে আসছি: ‘ট্রান্স-বর্ডার ডেমোক্রেসি’। মোদ্দা কথা হচ্ছে, গণতন্ত্র এমন একটা চলমান প্রক্রিয়া, যা সীমানা মানে না। অথবা বিষয়টা এমন করে ব্যাখ্যা করা যায়: একটা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে গণতন্ত্র পুরোপুরি বিকশিত হয় না, তা ডালপালা মেলে বড় হতে পারে না। এখানে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শর্তগুলো পরস্পরের ওপর অভিঘাত ফেলে। একটি দেশে যদি গণতন্ত্রের বিকাশ হতে থাকে, তা তার পাশের দেশের অবিকশিত গণতন্ত্রকে নানাভাবে সাহায্য করতে পারে। এ আন্তসীমান্ত গণতন্ত্রায়ণ আমরা ইদানীং লক্ষ করছি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে। এতে নাগরিক সমাজের অবদান অনেক।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ২০০১ সাল থেকে বিশ্ব সামাজিক সম্মেলন বা ‘ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম’ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রথম তিন বছর এটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ব্রাজিলের বন্দরনগর পোর্তো এলেগ্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। এটা হলো নাগরিক সমাজের বৈশ্বিক সম্মেলন। পরপর দুই বছরের সম্মেলনের পরে দেখা গেল লাতিন আমেরিকাজুড়ে নাগরিক আন্দোলনের উল্লম্ফন। এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হলো ব্রাজিলের রাজনীতিতে। প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলেন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা লুলা ডি সিলভা। সেই থেকে শুরু। একে একে কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, পেরু ও আর্জেন্টিনায় নির্বাচিত হলো জনগণের সরকার। নতুন সরকারগুলো জানিয়ে দিল, ‘বানানা রিপাবলিকের’ দিন শেষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তর্জনী দেখে কেউ আর আগের মতো ভয়ে গুটিসুটি হয়ে যায় না।
দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা একটু আলাদা। দীর্ঘদিন উপনিবেশ থাকার কারণে এখানে ‘জাতীয়তাবাদ’ বেশ চড়া মেজাজের। নানাভাবে এ জাতীয়তাবাদের চারাগাছে জল ছিটানো হয়েছে। এর অনুষঙ্গ হিসেবে মনের মধ্যে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে বায়বীয় দেশপ্রেম, যা সীমান্তের অপর দিকের মানুষকে শত্রু হিসেবে ঘৃণা করতে শেখায়। এসব দেশে সুস্থ ও বিবেকবান মানুষের অভাব নেই। তাঁদের একদিকে নিজ নিজ দেশের সরকারের ও সামন্ত রাজনীতিকদের কাছে শুনতে হয় তাঁরা নাকি বিদেশি এজেন্ট! অন্যদিকে তাঁদের নিজেদের মধ্যে রয়েছে যোগাযোগের অভাব। বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং রাষ্ট্র আরোপিত নানা রকম প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে পরস্পরের সঙ্গে বিবেক ও মননের লেনদেন করা সহজ নয়। সেই কাজটি করা খুবই জরুরি।
নেপালের পরিবেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো থেকে একটু আলাদা। এটাই এই অঞ্চলের একমাত্র দেশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো দেশের নাগরিক আগাম ভিসা না নিয়ে প্রবেশাধিকার পান। তাই নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তাঁদের আঞ্চলিক সভাগুলো করার জন্য এই দেশটিকেই বেছে নেন। হিমালয়ের গৌরীশঙ্কর পর্বতচূড়ার পাদদেশে দক্ষিণ এশীয় দারিদ্র্য বিমোচন জোটের সভায় বসে অংশগ্রহণকারীরা এটাই ভাবছিলেন, কবে পুরো অঞ্চলটি তাঁদের নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত হবে? কাঁটাতার আর বর্ডার গার্ড দিয়ে মানুষকে আর কত দিন অবরুদ্ধ করে রাখা হবে?
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।

বাঘা তেঁতুল- ক্যাশ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

পারস্যের কবি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ওমর খৈয়াম বলে গেছেন: ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাকির খাতায় শূন্য থাক...’।

আজ-কাল-পরশু- একটাই এজেন্ডা: দ্রুত নির্বাচন by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

আপাতদৃষ্টিতে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সরকার, জাতীয় সংসদ, অর্থনৈতিক কাজকর্ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন—প্রায় সবই এখন স্বাভাবিক। কিন্তু সবাই জানেন, এই ‘স্বাভাবিকের’ পেছনে রয়েছে ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘অস্বস্তিকর’ পটভূমি।
তাই প্রচলিত অর্থে যাকে আমরা ‘স্বাভাবিক’ বলি, বর্তমান পরিস্থিতি সেই অর্থে ‘স্বাভাবিক’ নয়। তবে গায়ের জোরে (বা দলের জোরে) এই অস্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করা যায়। যেমন এখন অনেকে করেছেনও। তাতে অস্বাভাবিকতাকে মাটিচাপা দেওয়া যায় না। বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ ও সংসদ সদস্যদের দিকে তাকালেই ভোটের পুরো চিত্রটি জনমানসে ভেসে ওঠে। গায়ের জোরে তা মুছে ফেলা সম্ভব হয় না।

তবে দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এ রকম অস্বাভাবিক ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ যে আগে কখনো হয়নি, এমন নয়। তবে সেগুলো হয়েছিল সেনাশাসনের সময়। আমাদের দুর্ভাগ্য, এবার এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে গণতান্ত্রিক আমলে এবং আরও কষ্টের হলো, তা হয়েছে গণতন্ত্রের নামে, গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য।
পুরোনো কাসুন্দি বেশি ঘেঁটে লাভ নেই। তবু দু-একটি কথা বলতেই হবে বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ নির্বাচনপূর্ব অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীই বলেছিলেন: ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচন সংবিধান রক্ষা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার নির্বাচন। প্রকৃত নির্বাচন পরে অনুষ্ঠিত হবে।’ এই বক্তব্যকে ভিত্তি ধরে এখনকার রাজনৈতিক আলোচনা, কলাম লেখা, টক শো ইত্যাদি আবর্তিত হওয়া উচিত। অন্য যেকোনো আলোচনা এখন অর্থহীন ও সময় নষ্ট করা মাত্র। আমাদের ধারণা, ২০১৪ সালে এটাই প্রধান এজেন্ডা হতে হবে। কার্যকর সংসদ, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, সরকারের ছয়টি অগ্রাধিকার মেগা প্রকল্প ইত্যাদি বিষয় এখন আলোচনায় প্রাধান্য পেতে পারে না। এগুলো বাংলাদেশের জন্য খুবই জরুরি, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি একটি সঠিক, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক সংসদ নির্বাচন। যে সংসদে জনগণ (ভোটার) ভোট দিয়ে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের সরকার গঠন করবেন। সেই নির্বাচনে কে জিতবে, তা কেউ বলতে পারে না। আওয়ামী লীগ যদি জেতে, তাহলে তারা তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার অবশ্যই বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু এখন যে সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, তারা নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন শুরু করলে তা সঠিক কাজ হবে না। তা জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার বরখেলাপ করা হবে।
প্রকৃত অর্থে বর্তমান সরকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। একটি অর্থপূর্ণ সংসদ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করাই বর্তমান সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত। এখন প্রশ্ন হলো, সেই কাজ কীভাবে শুরু হতে পারে। এ ব্যাপারে সরকার তথা মন্ত্রিসভার সদস্যরা ভালো জানেন। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমরা কয়েকটি প্রস্তাব দিতে পারি। আমরা মনে করি, ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক দেশের প্রধান সব দলের কয়েকজন প্রতিনিধিকে একটি সভায় আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। সভার এজেন্ডা হবে: ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনের আয়োজন।’ সেই সভা থেকেই আমরা জানতে পারব, বিএনপিসহ বিভিন্ন দল কীভাবে নির্বাচন চায়। বিষয়টা শুধু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমস্যা নয়। জাতীয় সমস্যা। কাজেই প্রধান রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, সক্রিয় নাগরিক ফোরাম, মিডিয়া ফোরাম ইত্যাদির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা হওয়া উচিত। গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী বেশির ভাগ দল ও ফোরাম যেভাবে আগামী নির্বাচন আয়োজন করার পরামর্শ দেবে, সরকারের উচিত হবে সেটাই বাস্তবায়ন করা। গণতন্ত্র হলো আলাপ-আলোচনা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া। আমরা কিন্তু কেউ জানি না, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা বিভিন্ন ফোরাম ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর নতুন নির্বাচন আয়োজন সম্পর্কে কী মতামত বা মনোভাব পোষণ করে। শুধু এটুকু আমরা দেখেছি, ১৪-দলীয় জোট ও আওয়ামী ঘরানার সংগঠন ও ব্যক্তিরা ছাড়া দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন নাগরিক ফোরাম, বেশির ভাগ মিডিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রহসনের নির্বাচন, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বা নিয়মরক্ষার নির্বাচন বলে অভিহিত করেছে। আশা করি, সরকারের তথ্য ও গবেষণা বিভাগ এ ব্যাপারে অবহিত।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, সরকার যদি ফেব্রুয়ারি মাসে এ ব্যাপারে কোনো সভা না ডাকে, তাহলে কী হবে? বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ফোরাম ও মিডিয়া সরকারকে এই সভা ডাকার জন্য নানাভাবে চাপ দিতে হবে। নানা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সরকারকে চাপ দিতে হবে। এসব কর্মসূচিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিদেশি বন্ধুদের বলতে হবে, তারাও যেন সরকারকে এ ব্যাপারে প্রভাবিত করে।
তৃতীয় প্রশ্ন হলো, নানামুখী চাপের পরও যদি সরকার এ ব্যাপারে কোনো সভা না ডাকে, অনড় থাকে, তাহলে বিভিন্ন দল কী করতে পারে? বিভিন্ন দল ও ফোরামকে তখন আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করতে হবে, তাদের পরবর্তী কর্মসূচি কী হতে পারে। নানা গণতান্ত্রিক, স্বীকৃত ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ছাড়া সরকারকে নতি স্বীকার করানোর আর কোনো পথ নেই।

এখানে একটা কথা আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই। সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে নতুন নির্বাচন ছাড়া বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে অন্য কোনো বিষয়ে কথা হতে পারে না। এই সরকারের অন্য কোনো নীতি বা কাজের সমালোচনা করাও অপ্রয়োজনীয়। মনে রাখতে হবে, এই সরকার কোনো বড় কাজ করার জন্য নির্বাচিত হয়নি। তারা শুধু নিয়মরক্ষার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। যদি তারা বড় বা ছোট কোনো প্রকল্প হাতে নেয়, তা নিয়ে পরে নানা সমস্যা হতে পারে, যদি অন্য দল ক্ষমতায় আসে। বর্তমান সরকার শুধু সরকার পরিচালনার রুটিন কাজ করবে। এবং সত্যিকার অর্থে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করবে। এটাই একমাত্র কাজ। সেই নির্বাচনে ১৪-দলীয় জোট বিজয়ী হলে তারা তখন তাদের স্বপ্নের সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে। কেউ তাদের বাধাও দেবে না, সমালোচনাও করবে না।
চতুর্থ প্রশ্ন হলো, সব রকম গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেও যদি সরকার নির্বাচন না দেয়, তাহলে কী করতে হবে? কিছুই করার নেই। তখন সরকার ও ১৪-দলীয় জোটের শক্তির কাছে বাকি সব দল, ফোরাম, মিডিয়া, গণতন্ত্রকামী জনগণ পরাজয় মেনে নেবে। যেমন ১৮-দলীয় (এখন ১৯-দলীয়) জোট ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহত করতে না পেরে পরাজয় মেনে নিয়েছে। রাজনীতিতে কৌশল ও শক্তিরও জয়-পরাজয় আছে এবং তা মেনে নিতে হয়। তবে কোনো জয় বা পরাজয় চিরস্থায়ী নয়। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের এ জন্য ধৈর্য ধারণ করতে হবে।
বর্তমান সরকার যদি গায়ের জোরে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে চায়, তাহলে বুঝতে হবে, তারা বাস্তবতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা গায়ের জোরে একটা ‘অস্বাভাবিক অবস্থা’ জিইয়ে রাখতে চায়। জনগণ এগুলো পছন্দ করে না। নেতার জোরে, দলের জোরে, সরকারের জোরে, নানা বাহিনীর জোরে কোনো ‘অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড’ জনগণ কখনো পছন্দ করে না। সব মানুষ রাস্তার প্রতিবাদে শামিল হয় না নানা কারণে। তবে মনের মধ্যে পুষে রাখে যত ক্ষোভ ও প্রতিবাদ। সময় হলে তার প্রকাশ ঘটে। বাংলাদেশে অতীতের রাজনৈতিক ঘটনাবলি তারই সাক্ষ্য দেয়।
অনেক মন্ত্রী পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার জন্য হুংকার দিচ্ছেন। এসব হুংকারকে গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই। তৃণমূলের দলীয় কর্মীদের আশ্বস্ত করার জন্য এসব হুংকার দিতেই হয়। এসব মন্ত্রীও জানেন, কীভাবে তাঁরা এমপি হয়েছেন। তা ছাড়া পাঁচ বছর থাকার কথা না বললে ক্লায়েন্টের কাছ থেকে ‘অগ্রিম’ পাওয়া যাচ্ছে না। ছয় মাসের মন্ত্রীকে কে ‘অগ্রিম’ দেবে? সরকার বড় বড় প্রকল্প হাতে নিচ্ছে।
দেশে-বিদেশে অনেকে ভান্ড নিয়ে বসে আছে। বারবার ‘পাঁচ বছরের’ হুংকার না দিলে ক্লায়েন্টের আগ্রহ চলে যায়। যারা বেশি বেশি ‘পাঁচ বছর’ ধ্বনি তুলছে, বুঝতে হবে ‘অগ্রিম’ নিয়ে তাদের সমস্যা হচ্ছে। দেশি-বিদেশি ক্লায়েন্টরা এখন অনেক সচেতন। তারা প্রশ্নবিদ্ধ সরকারের নড়বড়ে মন্ত্রীকে সহজে ‘অগ্রিম’ দিতে রাজি হয় না। কখন কী হয়! সুতরাং নিজেদের ‘স্বার্থেও’ একটা প্রকৃত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করা দরকার।
আমাদের ধারণা, তা ২০১৪ সালের মধ্যেই সম্পন্ন করা উচিত।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: উন্নয়ন ও মিডিয়াকর্মী।

আজ-কাল-পরশু- একটাই এজেন্ডা: দ্রুত নির্বাচন by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

আপাতদৃষ্টিতে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। সরকার, জাতীয় সংসদ, অর্থনৈতিক কাজকর্ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন—প্রায় সবই এখন স্বাভাবিক। কিন্তু সবাই জানেন, এই ‘স্বাভাবিকের’ পেছনে রয়েছে ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘অস্বস্তিকর’ পটভূমি।

দক্ষিণ এশিয়া- কবে নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত হবে? by মহিউদ্দিন আহমদ

ফেব্রুয়ারির পয়লা সপ্তাহে নেপালের কারভে জেলার পাহাড়ের ঢালে একটা পান্থনিবাসে দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের একটা সভা অনুষ্ঠিত হলো।

দুর্নীতি দমন- চাই দুদকের দৃপ্ত পদচারণ by আলী ইমাম মজুমদার

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে তাদের ক্ষমতায় কিছু সীমাবদ্ধতা এনে একটি সংশোধনী বিল সংসদে যায় বছর তিনেক আগে।
দুদকের ক্ষমতা সীমিতকরণ-সংক্রান্ত প্রস্তাবটিতে দেশের সুশীল সমাজ ব্যাপক আপত্তি জানায়। আপত্তি জানায় দুদক। তদানীন্তন দুদক চেয়ারম্যান বলেছিলেন, এ সংশোধনী আনা হলে সংস্থাটি একটি নখ, দন্তহীন ব্যাঘ্রে পরিণত হবে। আইনটি দীর্ঘকাল পড়ে ছিল সংসদে। দুদকের নখ, দাঁত ছিল অক্ষত। কিন্তু সেগুলো কতটুকু, কীভাবে প্রয়োগ হয়েছে, দেশবাসীর তা জানা। হঠাৎ করে গত নভেম্বরে সংশোধনী বিলটি পাস হয়ে যায়। দুদক আইনে নতুন সংযোজিত ৩২ ধারায় বিধান করা হয়, এ আইনে কোনো জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা পাবলিক সার্ভেন্টকে অভিযুক্ত করতে হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা অনুসরণ করতে হবে। সে বিধি অনুসারে আবশ্যক রয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন। এতে দুদকের স্বাধীন সত্তা সীমিত হয়। কার্যকারিতা কমে যাবে বলে আশঙ্কা করেন অনেকেই। সুশীল সমাজ এবারও তীব্র আপত্তি করতে থাকে।

শেষ পর্যন্ত এ বছরের জানুয়ারি মাসে এক জনস্বার্থ মামলার রিটে হাইকোর্ট বিভাগ বিধানটি বেআইনি ও বৈষম্যমূলক বলে বাতিল করে দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে তাদের নখ আর দাঁত অক্ষতই রইল। দেশবাসী আশা করতে পারে, এ নখ আর দাঁতের ব্যবহার তারা করবে মনুষ্য রূপধারী হিংস্র কিছু দানবের প্রতি। যে দানবেরা ঘুষ, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি আর ক্ষমতার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে জনস্বার্থ বিপন্ন করে নিজেরা লাভবান হচ্ছে।
এখানে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের পটভূমিকা কিছুটা আলোচনার দাবি রাখে।
আমরা অনেক চড়া মূল্যে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছি। স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনাগুলোর মধ্যে ছিল আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর আমাদের অর্জন ও ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশ করলে দেখা যাবে, শাসনব্যবস্থা কার্যকর হলে অর্জন আরও বেশি হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার আমাদের শাসনব্যবস্থার অংশ হয়ে পড়েছে—এমনটাই দেখা যায়। এ বিষয়ে আমাদের প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অকার্যকর বলেই প্রতিপন্ন হয়। দাবি ওঠে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার। দাবি ওঠায় সুশীল সমাজ। পাশাপাশি দাবিটির প্রতি সমর্থন দেয় উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলো। এর মাঝে বাংলাদেশ জাতিসংঘের দুর্নীতি দমন কনভেনশন অনুসমর্থন করে। এসব কিছুর ফলে ২০০৪ সালে সংসদে গৃহীত হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন আইন।
আইন প্রণয়নের পর কয়েক দফায় কমিশন গঠন-পুনর্গঠন হয়েছে। চারদলীয় জোট সরকারের সময়কার প্রথম কমিশন তো নিজদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি করে দিব্যি দুই বছর কাটিয়ে দিয়েছিল। নিষ্ফলা ছিল সে কমিশনটি। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুনভাবে আরেকটি কমিশন গঠিত হয়। এটার ওপর আবার তখনকার সরকারের একটি অংশের প্রবল নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে অতি সক্রিয় ছিল সে সময়কার কমিশন।
অভিযোগ আছে পক্ষপাতিত্বসহ আরও অনেক কিছুর। কিছু অভিযোগের সত্যতা থাকতেও পারে। তবে দুর্নীতি করলে কোনো না কোনো সময় আইনের আওতায় আসতে হবে—এ চরম বার্তাটি সে কমিশন সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাফল্যের সঙ্গে দেশবাসীকে দেয়। দুর্ভাগ্যজনক হলো, তবে বিভিন্ন কারণে তাদের সে প্রয়াস স্থায়ী রূপ পায়নি। বরং ২০০৯ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর একশ্রেণীর লোক দলবল নিয়ে নেমে পড়লেন দুর্নীতির মহোৎসবে। এটাই আমরা দেখলাম। আগেকার জোট সরকার থেকে ভিন্ন কিছু ঘটল—এমন দেখা গেল না। ফলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে তাঁদের কারও কারও সম্পদের নিট স্ফীতি ক্ষেত্রবিশেষে কয়েক সহস্র গুণ হওয়ার অবিশ্বাস্য ঘটনা আমাদের সামনে এল। আর তা এল নির্বাচন কমিশনে ২০০৮ ও ২০১৩ সালে তাঁদের দাখিল করা সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করেই।
প্রথমত, দুদক এ বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই বলে এড়িয়ে যেতে চাইল। পরে তীব্র সমালোচনার মুখে জানাল, তারা এই জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের উৎস নিয়ে তদন্ত করবে। দু-একটি ক্ষেত্রে তা শুরু হয়েছে বলেও মনে হয়। তবে এ ‘কৃষ্ণগহ্বর’ থেকে দুদক উল্লেখযোগ্য কিছু বের করতে পারবে—এমনটা বিশ্বাস করতে ভরসা হয় না। তাদের বরাবরের মতো সরকারের সন্তুষ্টি বিধান করেই চলতে হবে। অন্তত নিকট অতীতের ঐতিহ্য তারা ভাঙতে সক্ষম হবে—এমন মনে হয় না। এ আশঙ্কা করলে আমাদের সংশয়বাদী বলে গাল দিতে পারে। কিন্তু কঠোর বাস্তবতা সামনে চোখ রাঙাচ্ছে।
২০০৯ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রথমত আগের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন। নিযুক্ত হন নতুন চেয়ারম্যান। মেয়াদ সম্পন্ন হলে কমিশনার দুজনও নতুনদের দ্বারা স্থলাভিষিক্ত হলেন। এ নতুন কমিশন সরকারের বিরুদ্ধে যাঁরা আছেন, তাঁদের মামলাগুলো গুরুত্ব দিয়ে করার চেষ্টা করছে। এর বেশি কিছু নয়। ২৭০ কোটি ডলারের পদ্মা সেতু প্রকল্পটি আটকে যায় মূলত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। এ অভিযোগের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই দুদক জাতির কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করেনি। বরং দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ প্রসঙ্গে সরকারের যে বক্তব্য, তার আগ বাড়িয়ে আরও জোরালো বক্তব্য দিচ্ছেন তদানীন্তন দুদক চেয়ারম্যান। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে অকারণে ফাঁসিয়ে দিতে কেউ বলবে না। তবে সম্ভাব্য সন্দেহের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান, মামলা দায়ের আর তদন্ত দোষের কিছু নয়। বিষয়টি নিয়ে কানাডার আদালতে কিন্তু একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
পদ্মা সেতু নিশ্চয়ই একদিন হবে। স্বাভাবিকভাবেই এর ব্যয় বৃদ্ধি পাবে দুই-তিন গুণ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে অবশিষ্টাংশের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রয়াসও পিছিয়ে গেল। এখানে মূল দায় যাদেরই হোক, স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দুদকের কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত দেশবাসীর কাম্য ছিল। এমন আশা করছিল উন্নয়ন সহযোগীরাও। এতে ঋণ চুক্তিটি হয়তো বা রক্ষা পেত। আইন ও অবয়বে ভিন্ন রূপ নিলেও কাজেকর্মে দুদক কিন্তু তার পূর্বসূরি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর ছায়াই অনুসরণ করে চলছে। অথচ কমিশনারদের নিয়োগ-প্রক্রিয়া অনেক মর্যাদাসম্পন্ন। তাঁদের অপসারণও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো একটি জটিল প্রক্রিয়াসাপেক্ষ। দায়িত্ব পালনে তাঁদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। সামান্য সময়ের জন্য যেটুকু আইনি জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তা-ও অপসারিত। তা সত্ত্বেও সংস্থাটি তার স্বাধীন ও নিরপেক্ষতার ছাপ রাখতে কিছুমাত্র সক্ষম হয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না।
আমাদের দেশে এ-জাতীয় অবস্থা শুধু দুদকেই, তা নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানেই এ ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার কিসে তুষ্ট হবে, সেটা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে চায় অনেকে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ভেঙে পড়েছে। জাতীয় প্রয়োজনে তারা সাড়া দিতে সক্ষম হচ্ছে না। দুদক প্রসঙ্গ এখানে বারবার আসবে। দুর্নীতির ব্যাধি আজ গোটা জাতিকে গ্রাস করে ফেলছে। সংবর্ধনা সভায় সরকারের উচ্চ পদাধিকারী ‘ঠাট্টা করে’ আজ মাইক্রোফোনে ক্রেস্টের পরিবর্তে ক্যাশ চাইছেন। এ ধরনের ‘ঠাট্টা’ ক্ষমতার অপব্যবহার তথা দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে কি না, তা দুদকেরই দেখার কথা। তারা কিছুটা সক্রিয় হলে এর আংশিক নিরাময়ও সম্ভব। আইনি সমর্থন, অবকাঠামো ও লোকবল সবই আছে তাদের। কোথাও অপূর্ণতা থাকলে এটা মেটাতে দাবি জানাতে পারেন। একটু নড়েচড়ে উঠলেই সতর্ক হতে শুরু করবেন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা।
তবে জানা যায়, দুদকের নিম্নপদস্থ ব্যক্তিদের হাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনাবশ্যক হয়রানির শিকার হয় কিছু ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’। প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ পর্যায়ে এ বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও নিবিড় তদারকির ব্যবস্থা থাকলে এ-জাতীয় অবস্থার অবসান ঘটাতে সহায়ক হবে। আর যেসব ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’ দুর্নীতি করে না, তারা কোনো স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির দ্বারা সাময়িক হয়রানি হলেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কমিশনের অনুমোদন ব্যতীত এ আইনে কোনো মামলা রুজু করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। তবে নিজে লোভের বশীভূত হয়ে বা অন্যের চাপে বেআইনি কাজ করলে যথাযথ ফল ভোগ করতেই হবে।
পরিশেষে থাকছে, প্রতিষ্ঠানটিকে সবাই স্বাধীন ও সক্রিয় দেখতে চায়। আশা করে, সব জড়তা কাটিয়ে এরা আইনের বাতাবরণে এ-জাতীয় দায়িত্ব পালনে তৎপর হবে। এখন কিন্তু নখ, দাঁত সবই রয়ে গেল তাদের। তাই অক্ষমতার কোনো অজুহাত দেওয়া যাবে না। অবশ্য নখ-দন্তধারী কিছু হিংস্র প্রাণীও পোষা থাকতেই পছন্দ করে। দুদক অন্তত নিজেদের এ ধরনের সন্দিহান অবস্থা থেকে বাইরে আনতে সচেষ্ট হবে—এ প্রত্যাশা রইল।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হতে যাচ্ছে : ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন, আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান রাজনীতিকরা ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখছেন। এটাই প্রমাণ করে তারা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হতে যাচ্ছে।
মানবজমিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, একের পর এক বিরোধী নেতাকর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে বিচারবহির্ভূতভাবে। আর বলা হচ্ছে এরা সবাই সন্ত্রাসী। আসাদুজ্জামান নূর তো এখন সত্যি সত্যিই বাকের ভাই হয়ে গেলেন। আমাদের নামেও তো বোমা মারার অভিযোগে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মামলা আছে। আমাদেরও তাহলে সন্ত্রাসী বলে হত্যা করে ফেলুক। তাদের চিন্তাচেতনায় গণতন্ত্র নেই এটা তারই প্রমাণ। ১৯ দলের তরুণ এ নেতা বলেন, সংবিধান বলছে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ। আর এখন প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার উৎস হয়ে গেছে আওয়ামী লীগ। বিরোধী জোটের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলন তো শেষই হয়নি। মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচিতে বিরোধীদলীয় নেতাকে তার বাড়িতে অবরোধ করে রাখার পর এটা স্পষ্ট হয়েছিল, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের চেয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকাই আওয়ামী লীগের বড় বিষয়। ওই দিন কর্মীরা রাস্তায় নামলে অনেকগুলো প্রাণ হারাতো। বিরোধী দল রাস্তায় না নেমে অনেকগুলো জীবন বাঁচানো গেছে। এমন একটা সরকার গঠন করেই খেলা শেষ মনে করছে আওয়ামী লীগ। আসলে খেলা তো শেষ নয়। সামনে আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে অহিংস আন্দোলন করে কোন সরকার পতনের আন্দোলন সফল হয়নি। আমরা কোন সহিংসতা সমর্থন করি না, কিন্তু সহিংসতা হচ্ছে তা দেখতে হবে। তিন বছর ধরে দেশে আর লাঠিচার্জ বলে কিছু নেই। এখন সিনিয়র নেতাদেরও রাস্তায় নামলেই গুলি করে দেয়া হচ্ছে। কঠোর আন্দোলন শুরু হলে আর কিছু বলার থাকবে না কারও। তিনি বলেন, যারা জনগণের ইচ্ছার কথা চিন্তা করে না তাদের সঙ্গে তো লড়াই করা মুশকিল। তারা তো ভোটের কথা চিন্তাই করে না। জনগণের কাছে তো তাদের জবাবদিহির ভাবনা নেই। তারা যা খুশি করতে পারে। আমরা তো পারি না। আমাদের জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, সুখ-শান্তির বিষয় ভাবতে হয়। বারবার পাঁচ বছর থাকার কথা বলে আওয়ামী লীগ নেতারা স্পষ্ট করছেন তাদের পাঁচ বছর থাকার বৈধতা নেই। বিদেশী কোন বাধা নেই- এ কথা বলেই তারা প্রমাণ করছেন বিদেশীদের চাপে সরকার বিব্রত। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে পুতুল প্রার্থীদের দিয়ে নির্বাচন করা হয়েছে উল্লেখ করে সাবেক এ সংসদ সদস্য বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্ভব নয় এটা প্রমাণ হয়েছে। আমাদের আন্দোলন এখনও শেষ হয়নি। সরকার এখন নানাভাবে মিডিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একটা মিডিয়া বন্ধ করে ১০০টা মিডিয়াকে নার্ভাস করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আসলে সরকার নিজেই চাপে আছে। গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন যে ব্যর্থ এটা মিডিয়ার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়েছে। আমরা বুঝি যে, মিডিয়া অনেক চাপের মধ্য দিয়ে কৌশল করে চলছে। কিছু কিছু ডিজিটাল বিটিভি আছে যারা সম্পূর্ণ সরকারের তোষামোদী করছে। তা ছাড়া সবাই সাহসী ভূমিকা রাখছে।

আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হতে যাচ্ছে : ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন, আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান রাজনীতিকরা ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখছেন। এটাই প্রমাণ করে তারা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হতে যাচ্ছে।

সফলদের স্বপ্নগাথা- দশে দশ: মার্ক জাকারবার্গ

ফেসবুকের পথচলা এক অবিস্মরণীয় গল্প, যার অংশ হতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। এত মানুষের জীবন ছুঁয়ে যেতে পারাটা এক বিরল সৌভাগ্যের বিষয়।
তাই আমি নিজেকে বারবার মনে করিয়ে দিই—প্রতিটি দিনের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে, সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে দিতে হবে।

অনেকে আমাকে প্রশ্ন করে, ফেসবুকের আজকের অবস্থান আমি কখনো ভাবতে পেরেছিলাম কি না। অসম্ভব! মনে পড়ে ফেসবুকের যাত্রা শুরুর কিছুদিন পর এক রাতে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে পিৎজা খাচ্ছিলাম। খেতে খেতে আমি তাদের বলছিলাম, আমি আমাদের কলেজের অল্প কিছু মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করার চেষ্টা করছি। তবে দেখে নিয়ো, একদিন কেউ না কেউ সারা পৃথিবীর মানুষকে একসুতোয় গাঁথবে।
মানুষ একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, খুব সহজে তাদের জীবনের টুকরা গল্পগুলো শেয়ার করতে পারবে, নিজেদের মতো করে তাদের সামাজিক সম্পর্কগুলো সাজিয়ে নিতে পারবে—এসব আমার সব সময়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো। আজ ১০ বছর পর যখন পেছনে ফিরে তাকাই, নিজেকে প্রশ্ন করি—ঠিক কী জন্য আমাদের হাতেই ফেসবুকের সূচনা হয়েছিল? আমরা তখন ছিলাম সাধারণ শিক্ষার্থী, বড় কোম্পানিগুলোর তুলনায় আমাদের হাতে সম্পদ বলতে একদম কিছুই ছিল না। তারা যদি এই ধারণা নিয়ে কাজ করত, তবে হয়তো তারাই ফেসবুক বানিয়ে ফেলত।
এই প্রশ্নের কেবল একটি সম্ভাব্য উত্তরই আমার জানা আছে, আমরা পুরো ব্যাপারটাকে অনেক বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলাম। যখন অন্যরা বুঝে উঠতে পারছিল না যে পৃথিবীর সবাইকে সংযুক্ত করার আদৌ কোনো দরকার আছে কি না, ততক্ষণে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। যখন তারা সন্দেহ করছিল এমন একটি ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারবে কি না, তখন আমরা এটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সব রকম বন্দোবস্ত করে ফেলছিলাম। পৃথিবীকে একসুতোয় গাঁথার প্রচেষ্টা আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। আজ ১০ বছর পরও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
তাই আগামী ১০ বছর নিয়ে আমি আরও বেশি আশাবাদী। এখন আমরা বিশ্বজুড়ে মানুষকে আরও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে সাহায্য করতে পারব। আজ পৃথিবীর জনসংখ্যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছে। আগামী এক দশকে আমাদের দায়িত্ব হবে বাকিদেরও এই সুবিধার আওতায় আনা।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো মূলত জীবনের টুকরা মুহূর্তগুলো ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে। আগামী দশকে মানুষের নানা প্রশ্নের উত্তর আর জটিল সব সমস্যার সমাধানেও সহায়তা করবে এই মাধ্যমগুলো। আজ আমরা হাতে গোনা কিছু উপায়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে শেয়ার করি। আমাদের অনুভূতি আর স্মৃতিগুলোকে ধরে রাখা, কিংবা পরস্পরের সঙ্গে আদান-প্রদানের আরও অনেক নতুন উপায় নিয়ে আসবে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি।
আপনারা সবাই যেভাবে আমাদের উদ্ভাবনগুলো ব্যবহার করে নিজেদের সামাজিক জগৎ গড়ে তুলেছেন, তা সত্যি আমাদের হূদয় ছুঁয়ে গেছে। ফেসবুকে আপনারা যেমন জীবনের আনন্দময় মুহূর্তগুলো শেয়ার করেছেন, তেমনি দুঃখগুলোও একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। নতুন সম্পর্কের সূচনা হয়েছে, পুরোনো বন্ধনগুলো আরও দৃঢ় হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনেও এর প্রভাব পড়েছে। নানা নতুন পণ্য আর সেবা উদ্ভাবিত হচ্ছে, অনেকে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করতে পারছে। সবাই একে অন্যকে অসংখ্য উপায়ে সাহায্য করছে। আপনাদের এই প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ। আপনাদের সর্বোচ্চ সেবা পৌঁছে দেওয়া আমার দায়িত্ব, আর তা পালনে আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাব। আমাকে এই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।
সূত্র: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ফেসবুকের দশম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে মার্কের স্ট্যাটাস।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: অঞ্জলি সরকার

সফলদের স্বপ্নগাথা- দশে দশ: মার্ক জাকারবার্গ

ফেসবুকের পথচলা এক অবিস্মরণীয় গল্প, যার অংশ হতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। এত মানুষের জীবন ছুঁয়ে যেতে পারাটা এক বিরল সৌভাগ্যের বিষয়।

ভালোবাসা দিবসে স্ট্যাটাস-বৈষম্য- হতভাগ্য তরুণেরা কী করবে?

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে গণতন্ত্রের জয়জয়কার। প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার নিয়ে সোচ্চার সবাই। কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারিতেই পুরো দুনিয়ায় পালিত হয় এক অগণতান্ত্রিক দিবস।
যেখানে বৈষম্যের শিকার অগুনতি তরুণপ্রাণ। এই তরুণসমাজ পরিচিত ‘সিঙ্গল’ নামে। দোকলারা যখন যথাযোগ্য মর্যাদা ও তুমুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পালন করে ভ্যালেটইনস ডে, তখন এই তরুণেরা রেকর্ড করে পৃথিবীর দীর্ঘতম নিঃশ্বাস ত্যাগের। অথচ ভালোবাসা দিবস নিয়ে সবাই এমন ব্যস্ত হয়ে থাকে যে সেই রেকর্ড লেখা হয় না পৃথিবীর কোনো বইয়ে! কী নির্মম বৈষম্য ও অবহেলা!

কেবল দীর্ঘতম নিঃশ্বাসই নয়, এই নিপীড়িত তরুণেরা বিশ্বের অর্থনীতিকেও রাখে ভারসাম্যপূর্ণ। প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি এলে প্রেমিক-প্রেমিকারা কার্ড, চকলেট, ফুল ও অন্যান্য উপহারসামগ্রীর যত্রতত্র অপচয় করে। অথচ সিঙ্গল তরুণ-তরুণীরা দিনটিতে ঘরে বসে থেকে রোধ করে অর্থের নিদারুণ অপচয়। মানুষের প্রেমে না পড়লেও এই তরুণ-তরুণীরা খাঁটি প্রকৃতিপ্রেমী। কারণ, প্রেমিক-প্রেমিকারা ভালোবাসা দিবসে একে অপরকে উপহার হিসেবে দেয় ফুল। আর সিঙ্গলরা একটা ফুলও না ছিঁড়ে প্রকৃতিকে রাখে সুরক্ষিত। কেবল প্রকৃতিই নয়, জড়বস্তুর প্রতিও তাদের অসীম ভালোবাসা। প্রেমিক-প্রেমিকা না থাকায় ভালোবাসা দিবসে এদের সর্বক্ষণের সঙ্গী হয় টিভি, ল্যাপটপ কিংবা গেমস। এই জড় বস্তুগুলো যে মানবজীবনের কত নিঃসঙ্গ প্রহরের সঙ্গী, তার মর্ম কেবল এই তরুণেরাই উপলব্ধি করে।
এই নির্যাতিত তরুণেরাই সত্যের কান্ডারি। ভালোবাসা দিবসে ‘ডেট’ করার জন্য প্রেমিক-প্রেমিকারা অভিভাবকদের সঙ্গে কত মিথ্যাচারই না করে! আর এই তরুণসমাজ সেদিন বাধ্য সন্তানের মতো বাসায় বসে খায় মায়ের হাতের রান্না, খায় বাবার ঝাড়ি আর বোনের খোঁটা! এত কিছুর পরও এই ‘সিঙ্গল’ সমাজের পাশে দাঁড়াচ্ছে না কেউ। ভালোবাসা দিবসে একটু মিষ্টি হাসিও উপহার পায় না তারা। অথচ একটি গণতান্ত্রিক বিশ্বে আমরা এমন বৈষম্য চাইনি। এমন বৈষম্যের শিকার হওয়ার ফলে এই তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’-এর পাশাপাশি ‘বিশ্ব একাকী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করারও জোর দাবি জানাই আমরা। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখবে।

ভালোবাসা দিবসে স্ট্যাটাস-বৈষম্য- হতভাগ্য তরুণেরা কী করবে?

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে গণতন্ত্রের জয়জয়কার। প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার নিয়ে সোচ্চার সবাই। কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারিতেই পুরো দুনিয়ায় পালিত হয় এক অগণতান্ত্রিক দিবস।

সাগর-রুনি হত্যা- আমরা শপথ রাখতে পারিনি by দিপন দেওয়ান

কী ঘটেছিল সেদিন? যে ঘটনার পর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন হত্যাকারীদের খুঁজে বের করার?
যে ঘটনার পর পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতির আশ্বাস দিয়েছিলেন? মামলার প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতির জন্য তদন্তের ভার গোয়েন্দা বিভাগের কাছ থেকে সরিয়ে র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। র‌্যাবের দায়িত্ব গ্রহণের পর কবর থেকে ঘটা করে লাশ ওঠানো হয়, ডিএনএ সংগ্রহের নামে বয়ে গেল দুটি বছর। লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান তদন্ত কর্মকর্তারা।
আরও একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, যিনি সেই ঘটনা উদ্ঘাটন করতে না পারলেও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে পিছপা হননি। সচিবালয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেছিলেন একজন সাংবাদিক নেতা। শেষ ভরসা ছিল সরকারপ্রধানের কাছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই সেই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বলেছিলেন, সবার বেডরুমে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কি বিচারের বাণী নিভৃতেই কেঁদে যাবে?

যে ঘটনা নিয়ে এত নাটকীয়তা, আসলে কী ঘটেছিল সেদিন? আজও জানা হলো না। প্রতিদিন কত ঘটনাই তো ঘটে, সব খবর কি আমরা জানতে পারি? তবে সাংবাদিক হিসেবে সহকর্মীর এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর অন্তরালে লুকিয়ে আছে কোন রহস্য, তা জানতে আজও উদ্গ্রীব আমরা। মনের মধ্যে একটি প্রশ্ন সব সময় ঘুরপাক খায়, সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ দম্পতি, ফটোসাংবাদিক আফতাব হত্যা, পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজ দম্পতির মতো অনেক হত্যার জট খুলতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কারণ, এসব হত্যার পেছনে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল না। তাহলে কি ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার-মেহেরুন রুনি হত্যার পেছনে কোনো স্বার্থ লুকিয়ে আছে?
সাগর-রুনি হত্যার পর সাংবাদিকেরা এক হয়ে লাগাতার আন্দোলনে রাস্তায় নামেন। একের পর এক কর্মসূচি দেওয়া হয় হত্যার নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটনে, যেসব কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিয়েছেন সাধারণ সংবাদকর্মীরা। প্রেসক্লাবের সামনে বিভিন্ন অংশের বিভিন্ন মতাদর্শের সাংবাদিকেরা বিক্ষোভ কর্মসূচিতে হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, সাগর-রুনি, তোমাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। এই ঐক্য অটুট থাকবে। তখনকার একটি শপথের কথা খুব বেশি কানে বাজে আজও—যারা সাংবাদিকদের এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করবে, ফাটল ধরানোর চেষ্টা করবে, তারা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।
কিন্তু সেই সাগর-রুনির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নেওয়া ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ ভঙ্গ করেছেন নেতৃত্বে থাকা সাংবাদিকেরা। খোলস পাল্টিয়েই ক্ষান্ত হননি, সেই সঙ্গে বোল পাল্টাতেও দেরি করেননি।
নিঃস্বার্থভাবে আমরা যারা সাগর-রুনিসহ সব সাংবাদিক হত্যার বিচার চেয়েছি, একই দাবিতে অটল রয়েছি। নিজেদের অধিকার আদায়ে আমরা এক থাকতে পারি না, নিজেদের গুণের প্রকট অভাব থাকলেও দোষের ছড়াছড়ি, তাহলে অন্যের কথা তুলে ধরব কীভাবে আমরা? সাগর-রুনির একমাত্র বংশধর ‘মেঘ’ আজ সবার মধ্যেও একা। আলোচিত এই সাংবাদিক দম্পতির হত্যার নেপথ্য নায়কদের পর্দার আড়াল থেকে বের করে আনা হবে কি না, জানি না মেঘ মা-বাবার হত্যার বিচার পাবে কি পাবে না। তাতে কারও কোনো ক্ষতি না হলেও সাংবাদিকতার জগতে যে এক বিশাল ক্ষতি হলো, তা নিশ্চিত। সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা নেই, এটা সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার। শুধু মেঘের জন্য বলতে চাই, অনিশ্চিত এই পেশা থেকে শত মাইল দূরে থাকো। ঝড়ের আকাশে কালো মেঘ নয়, তুমি এক ফালি সাদা মেঘ হয়ে ভেসে থেকো বিশাল আকাশে।
দিপন দেওয়ান: স্টাফ রিপোর্টার, বাংলাভিশন।

সাগর-রুনি হত্যা- আমরা শপথ রাখতে পারিনি by দিপন দেওয়ান

কী ঘটেছিল সেদিন? যে ঘটনার পর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন হত্যাকারীদের খুঁজে বের করার?

তালেবানের সাড়ার জন্য সরকারের অপেক্ষা

ইরফান সিদ্দিকী
জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) কাছ থেকে জবাবের অপেক্ষায় রয়েছেন তাদের সঙ্গে সংলাপে নেতৃত্ব দেওয়া পাকিস্তান সরকারের আলোচকেরা। বিশেষ করে সংলাপের ব্যাপারে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে জবাব প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সরকারের গঠিত কমিটির একজন সদস্য গতকাল রোববার বলেন, ‘আমরা দুটি শর্ত দিয়েছি: সংবিধানের গণ্ডির ভেতরেই সংলাপ হতে হবে এবং উপজাতি-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর জঙ্গি-প্রভাবিত এলাকাগুলোতেই তাদের ব্যাপ্তি সীমাবদ্ধ থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, বল এখন তালেবানের কোর্টে। গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া সংলাপের ভবিষ্যৎ এখন তালেবানের জবাবের ওপরেই নির্ভর করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সংলাপ চলাকালে সংবিধানের পবিত্রতাকে সমুন্নত রাখা।’ সরকারি আলোচক দলের ওই সদস্য জানান, তালেবানের আলোচক দলের সদস্য আবদুল আজিজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী জঙ্গিরা সংবিধান মানতে অস্বীকৃতি জানালে উদ্ভূত পরিস্থিতি সরকারকে সীমিত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে। আলোচিত লাল মসজিদের ইমাম আবদুল আজিজ তালেবানের তিন সদস্যের আলোচক দলের অন্যতম সদস্য। গত শুক্রবার তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, সরকার যদি শরিয়া আইন চালু করতে সম্মত হয়, তবেই কেবল তালেবান আলোচনায় অংশ নেবে। তবে সরকারের ওই আলোচক বলেন,
‘আমি আশা করি, তালেবান এমন কোনো শর্ত নিয়ে আসবে না, যা শান্তি-প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করবে। উভয় পক্ষ যাতে কিছু সাধারণ ক্ষেত্র খুঁজে পায়, তালেবানকে তাদের কমিটিকে সেটাই করতে দেওয়া উচিত এবং অবশ্যই তা করতে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, টিটিপি যদি অস্ত্রবিরতি এবং বন্দী বিনিময়ের দাবি জানায়, তবে সংলাপ অব্যাহত থাকতে পারে। প্রথম দফা সংলাপের সময় টিটিপির আলোচক দলটি সরকারি দলের এখতিয়ারের বিষয়ে পরিষ্কার বক্তব্য জানতে চায়। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রধানের সঙ্গে বৈঠকেরও দাবি জানিয়েছিল। সরকারের আলোচক দলটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ইরফান সিদ্দিকী, আফগানিস্তানে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত রুস্তম শাহ মোহমান্দ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রহিমাতুল্লাহ ইউসুফজাই ও আইএসআইয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর আমির খান। অন্যদিকে, টিটিপির দলটিতে আবদুল আজিজের পাশাপাশি রয়েছেন সামিউল হক ও মোহাম্মদ ইব্রাহিম। পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরেই জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে টিটিপি। তবে গত নভেম্বর মাসে মার্কিন চালকবিহীন বিমানের (ড্রোন) হামলায় টিটিপির প্রধান হাকিমুল্লাহ মেহসুদ নিহত হওয়ার পর থেকে জঙ্গি সংগঠনটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই শুরু করে। গত কয়েক মাসে তাদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু সেনাসদস্যসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। পাকিস্তান সরকার তালেবানের সঙ্গে শান্তি-প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকে বিষয়টিকে বিভিন্ন মহল স্বাগত জানালেও এ নিয়ে সমালোচনাও কম নেই। ডন।

সস্তা সফটওয়্যার দিয়েই বাজিমাত স্নোডেনের

এডওয়ার্ড স্নোডেন
সস্তা ধরনের সফটওয়্যার দিয়েই মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) নেটওয়ার্ক থেকে গোপন নথি সংগ্রহ করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এ কথা জানিয়েছেন। স্নোডেন কীভাবে গোপন নথি সংগ্রহ করেছেন, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত করছে ওয়াশিংটন। ওই তদন্তকাজে সম্পৃক্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এ কাজের জন্য স্নোডেন ‘ওয়েব ক্রলার’ সফটওয়্যার ব্যবহার করেন। এ জাতীয় সফটওয়্যার কম দামি ও সারা বিশ্বেই পাওয়া যায়। এমন সফটওয়্যার নিজের কাছে রাখতে এনএসএর কর্মকর্তাদের চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়েন তিনি। নিউইয়র্ক টাইমস।

আমি আজ চোর বটে!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার কথা অনেকেরই মনে আছে। মনে আছে, মিথ্যা দেনার দায়ে জমিদার ডিক্রি করে উপেনের দুই বিঘা জমি হাতিয়ে নেন। সেই জমির কথা ভুলতে না পেরে ১৫ থেকে ১৬ বছর পরে উপেন ফিরে আসেন তাঁর হারানো বাড়িতে। প্রাচীরসংলগ্ন পুরোনো আমগাছটির নিচে কুড়িয়ে পান দুটি পাকা আম। এ কারণে জমিদার তাঁকে আম চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। এমনই প্রেক্ষাপটে উপেন আফসোসের সুরে বলেন: ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’ আমাদের সমাজে ‘ভিকটিমকে’ দোষ দেওয়ার মতো ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে, বিশেষ করে ক্ষমতাধরেরা তা সচরাচরই করে আসছেন।
সম্প্রতি এমন একটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতার শিকার আমাকেও হতে হয়েছে। গত কয়েকটি সিটি করপোরেশন ও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে উপেনের মতো করুণ অভিজ্ঞতা আমারও হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছরের ১৫ জুন বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে অতীতের মতো আমরা ‘সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর উদ্যোগে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের হলফনামার মাধ্যমে এবং তাঁদের আয়কর বিবরণীতে প্রদত্ত তথ্য ভোটারদের অবগতির জন্য প্রকাশ করি। একই সঙ্গে আমরা ‘ভোটার-প্রার্থী মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। প্রসঙ্গত, প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে বাংলাদেশ হাইকোর্টের প্রদত্ত আবদুল মোমেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ে। রায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হলফনামার মাধ্যমে নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, মামলার বিবরণী এবং নিজেদের ও নির্ভরশীলদের আয়-ব্যয়, সম্পদ এবং দায়-দেনার তথ্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য সম্পূর্ণ গোপন ও অকল্পনীয় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল আবু সাফা বলে এক কাল্পনিক ব্যক্তির নামে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। সুজনের অনুসন্ধানী প্রচেষ্টায় এ জালিয়াতির তথ্য উদ্ঘাটিত হয় এবং বহু নাটকীয়তার পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন।
(সর্বোচ্চ আদালতের সম্পৃক্ততায় ঘটিত এ জালিয়াতির ইতিহাস জানতে হলে দেখুন ‘ভূমিকা’, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০৮: অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের তথ্যাবলি প্রথমা প্রকাশন, ২০১০)। প্রসঙ্গত, সুজনের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফলে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এসব তথ্য প্রদানের ও প্রকাশের বাধ্যবাধকতার উদ্দেশ্য হলো ভোটারদের তথ্য দিয়ে ক্ষমতায়িত করা, যাতে তাঁরা জেনে-শুনে-বুঝে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। উল্লেখ্য, প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য। পিইউসিএল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া [(২০০৩)৪এসসিসি] মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে ‘এ কথা সত্য যে, রাজনৈতিক দলগুলোই নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তবে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হবে, যদি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে ভোটাররা না জানে। তাদের ‘এ’ কিংবা ‘বি’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার কোনো ভিত্তি থাকবে না। এ ধরনের নির্বাচন সুষ্ঠুও হবে না, নিরপেক্ষও না।’ আদালত আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র যাতে গুন্ডাতন্ত্র (mobocracy) এবং উপহাসে (mockery) বা প্রহসনে (farce) পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ভোটাদের তথ্য পাওয়া জরুরি।’ আমাদের আদালতের রায়েও প্রায় একই ধরনের যুক্তি উত্থাপন করা হয়। চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে যে ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তাঁদের আটজন ২০০৮ সালের নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী, চার বিদায়ী মেয়র যার অন্যতম।
২০০৮ সালের নির্বাচনেও এসব প্রার্থীকে তাঁদের মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামার মাধ্যমে তথ্য প্রদান করতে হয়েছিল। আমরা সুজনের পক্ষ থেকে সাতজন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীর ২০০৮ ও ২০১৩ সালে দাখিল করা হলফনামায় অন্তর্ভুক্ত আয় ও সম্পদের তথ্যের তুলনামূলক চিত্র সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করি। প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায় যে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে চারজন বিদায়ী মেয়রের, যাঁরা সবাই ছিলেন সরকারদলীয়, গড়ে আয় বেড়েছে ৬৭৪৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে বাকি তিনজন গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী, যাঁরা বিরোধী দলের এবং এবার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের গড়ে আয় কমেছে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায় সম্পদের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ ক্ষমতার সঙ্গে যে জাদুর কাঠি জড়িত, তা প্রকাশিত তথ্য থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। আমাদের সংবাদ সম্মেলনের পর সরকারদলীয় চার বিদায়ী মেয়রের পক্ষ থেকে সুজন এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করা হয় যে আমরা তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছি। প্রসঙ্গত, সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত সব তথ্যই ছিল প্রার্থীদের হলফনামা থেকে নেওয়া এবং এগুলো সম্পূর্ণ সঠিক। এগুলো প্রকাশ করা হয়েছিল প্রার্থীদের সততা-অসততা সম্পর্কে কোনোরূপ মন্তব্য ছাড়াই। অর্থাৎ প্রার্থীদের নিজেদের প্রদত্ত তথ্য প্রকাশ করে আমরা ‘চোর’ বনে গেলাম! সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়েও আমাদের একই ধরনের দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হয়েছে। নির্বাচনের আগে, অতীতের মতো, আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হলফনামা ও আয়কর বিবরণীতে প্রদত্ত তথ্য সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করি।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার প্রমুখের ২০০৮ ও ২০১৩ সালের হলফনামা ও আয়কর বিবরণীতে প্রদত্ত তথ্যের তুলনামূলক চিত্র আমরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করি। প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায়, এসব ক্ষমতাধরের অনেকেরই আয় ও সম্পদ গত পাঁচ বছরে আকাশচুম্বী হয়েছে। উল্লেখ্য, এবারও প্রার্থীদের প্রদত্ত তথ্য তাঁদের সততা-অসততা সম্পর্কে কোনোরূপ মন্তব্য ছাড়াই প্রকাশ করা হয়। প্রসঙ্গত, দাবি করা হয় যে সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ গয়না ও জায়গা-জমির মূল্যবৃদ্ধি। এ দাবি সঠিক নয়। কারণ, হলফনামায় গয়না ও জায়গা-জমির ক্ষেত্রে অর্জিত মূল্যই দেখানো হয়। আবার অনেকে এসবের কোনো মূল্যই দেখাননি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পদ বৃদ্ধির হার অহেতুকভাবে কমে যায়। এ ছাড়া এটি জানা কথা যে অনেকেই তাঁদের হলফনামায় সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তাই প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সম্পদ বৃদ্ধির হার প্রকৃত সম্পদ বৃদ্ধির হার থেকে কম হতে বাধ্য। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের পর থেকে আমরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছি। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নিগ্রহের হুমকি ছাড়াও আমরা আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হচ্ছি। এ পর্যন্ত আমরা একাধিক ‘উকিল নোটিশ’ পেয়েছি, যেগুলোর পেছনে কোনোরূপ যৌক্তিক কারণ নেই। যেমন, আমাদের ক্যালকুলেশন অনুযায়ী, একজন অতি সম্মানিত ব্যক্তির গত পাঁচ বছরে আয় ও সম্পদ বেড়েছে যথাক্রমে ৪,৪৩৫ শতাংশ ও ২৩৮ শতাংশ।
তাঁর উকিল নোটিশে আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির হার সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। অর্থাৎ আমাদের ক্যালকুলেশনে কোনো ভুল নেই, তবু তিনি আমাদের বিরুদ্ধে তাঁর মানহানি হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। আমরা শুনেছি যে আমাদের এসব তথ্য প্রকাশ এবং গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন এবং কারও কারও বিরুদ্ধে দুদক ব্যবস্থা নিচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে দেশকে সত্যিকারার্থে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে দুদককে শক্তিশালী এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সরকারের উচ্চ পদ থেকে সব বিতর্কিতকেও বাদ দিতে হবে। পরিশেষে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ও যথার্থ ‘সিস্টেম’ বা পদ্ধতি আবশ্যক। কিন্তু সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিরা এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা না করলে গণতন্ত্র অকার্যকর ও সাধারণ জনগণের জন্য অকল্যাণকর হতে বাধ্য। এ জন্যই সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার এবং নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি করা আবশ্যক। সুজনের প্রচেষ্টায় এবং আদালতের নির্দেশে প্রার্থীদের সম্পর্কে ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাধরদের পক্ষ থেকে রক্তচক্ষু প্রদর্শন ও হয়রানির অবসানের, যা নাগরিক সক্রিয়তার জন্য অপরিহার্য। আমাদের রাজনীতিকে পরিচ্ছন্ন করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে একাধিক উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, কমিশনকে হলফনামার ছকটিতে পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন, ছকটিতে প্রার্থীদের ‘প্রাইভেন্ট ইন্টারেস্ট’ ও আয়ের বিস্তারিত উৎস প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিরুদ্ধ হলফনামা প্রদানের বিধান সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তৃতীয়ত, হলফনামার তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে এবং মিথ্যা তথ্য প্রদানকারী ও তথ্য গোপনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুততার সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রসঙ্গত, হলফ করে মিথ্যা তথ্য দেওয়া ফৌজদারি অপরাধও বটে। চতুর্থত, সাম্প্রতিক নির্বাচনে কিছু ব্যক্তি নির্বাচিত হয়েছেন, যাঁরা সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে নির্বাচিত হওয়ার এবং সাংসদ থাকার অযোগ্য। তাঁদের সাংসদ পদ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পঞ্চমত, হলফনামাসহ মনোনয়নপত্র ‘ইলেকট্রনিক ফাইলিং’-এর বিধান করা জরুরি, যাতে তথ্যগুলো দ্রুততার সঙ্গে ভোটারদের কাছে পৌঁছানো যায়।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

ডিগ্রির সঙ্গে লড়াই পরিশ্রমের?

কংগ্রেস ও বিজেপির রাজনৈতিক দ্বৈরথের শনিবারের শিরোনাম যদি রাহুল গান্ধী বনাম নরেন্দ্র মোদি হয়ে থাকে, রোববারে সেই পাল্লায় তৃতীয় চরিত্র হিসেবে ঢুকে পড়লেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম। ইংরেজিতে শিরোনাম হতে পারে ‘হার্ভার্ড বনাম হার্ড ওয়ার্ক’। অর্থাৎ দামি ডিগ্রির সঙ্গে পরিশ্রমের লড়াই। শনিবার মোদি ছিলেন কংগ্রেসের গড় উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, রাহুল ছিলেন মোদি-রাজ্য গুজরাটে। দুই দলের খাসতালুকে দুই শীর্ষ নেতার চাপান-উতোর উপভোগ্যতার যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল, রোববার তা আরও উপভোগ্য হয়ে উঠল আসরে চিদাম্বরম এসে পড়ায়। উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে তামিলনাড়ু গিয়ে মোদি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীকে ‘রিকাউন্ট মন্ত্রী’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গতকাল চিদাম্বরম বলেন, এই রকম আরও ‘মেকি মোকাবিলার’ মাধ্যমে মোদি দেশের মানুষকে হাসাবেন। ২০০৯ সালের ভোটে শিবগঙ্গা কেন্দ্র থেকে চিদাম্বরম জিতলেও তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। প্রতিপক্ষ রিকাউন্ট বা পুনর্গণনার দাবি জানালেও তা গ্রাহ্য হয়নি। সেই প্রসঙ্গটি তুলেই মোদির কটাক্ষ। জবাবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বলেন, গণনা আসলে একবারই হয়েছিল। এটাও মোদির ‘ফেক এনকাউন্টার’। মোদির সঙ্গে চিদাম্বরমের এ ধরনের খটাখটির ইতিহাস বেশ পুরোনোই।
উন্নয়নের মডেল নিয়ে তাঁরা পরস্পরকে বিদ্রূপ করে থাকেন। সম্প্রতি ডাভোস সম্মেলনে মোদিকে কটাক্ষ করে চিদাম্বরম বলেছিলেন, মোদির অর্থনীতির জ্ঞানের বহর একটা ডাকটিকিটের পেছনে লিখে ফেলা যায়। বিদ্রূপের জবাব মোদি দেন শনিবার। তিনি বলেন, এই রাজ্য থেকে আপনারাই একজন রিকাউন্ট মন্ত্রী দিয়েছেন। তিনি হার্ভার্ডের কৃতী ছাত্র। কিন্তু তাঁর ঔদ্ধত্য ও অর্থনীতি দেশকে উচ্ছন্নে পাঠিয়েছে। তুলনায় আমি গ্রামের ছেলে। চা বিক্রি করে লেখাপড়া করেছি। আমার কঠিন শ্রম দিয়ে অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে গুজরাটকে উন্নত থেকে উন্নততর করেছি। গুজরাটের প্রবৃদ্ধি আজ ১০ দশমিক ১ শতাংশ, কংগ্রেসের আমলে দেশের প্রবৃদ্ধি সেখানে কমতে কমতে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে ঠেকেছে। দেশের মানুষই ঠিক করবে, হার্ভার্ড না হার্ড ওয়ার্ক কোনটা দেশের পক্ষে প্রয়োজন। ডাকটিকিটের জবাবে এত অল্পে অবশ্য চিদাম্বরমকে ছেড়ে দেননি মোদি। তাঁর কথায়, ‘লোকটা নিজেকে সবজান্তা মনে করেন। ঈশ্বর যখন বুদ্ধি বিলি করছিলেন, তখন লাইনে সবার আগে তিনিই ছিলেন। খামের ওপর ডাকটিকিট না সাঁটলে চিঠি ডেলিভারি হয় না। ডেলিভারিটাই আসল কথা। গুজরাটে উন্নয়নের সেই ডেলিভারি আমি দিয়েছি।’

মার্কিন সমুদ্রসীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইরানি যুদ্ধজাহাজ

যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রসীমার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় নৌবহরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইরানি নৌবাহিনীর উত্তরাঞ্চলীয় বহর ও চতুর্থ নৌ-জোনের অধিনায়ক অ্যাডমিরাল আফশিন রেজায়ি হাদ্দাদ শনিবার এ ঘোষণা দিয়েছে। ইরানি বার্তাসংস্থা ফরাসের বরাতে রোববার বার্তাসংস্থা আলজাজিরা ও বিবিসিতে এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ জাহাজের অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। অ্যাডমিরাল আফশিন রেজায়ি হাদ্দাদ বলেছেন, ‘ইরানি সামরিক নৌবহর যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রসীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এই পদক্ষেপের মধ্যে একটি বার্তা আছে। তাহল ‘সতর্ক বার্তা’। ফারস্ বলেছে, ‘পারস্য উপসাগরে ওয়াশিংটনের নৌ-শক্তির উপস্থিতির ইরানি প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে রওনা হওয়া যুদ্ধ জাহজগুলো কী ধরনের বা তাদের ক্ষমতা কেমন, তা ফারসের প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রসীমার দিকে ইরানি যুদ্ধজাহাজ এগিয়ে আসছে, এমন খবরে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। তবে মন্তব্যে বলেছেন, ‘যে কোনো জাহাজ আন্তর্জাতিক জলসীমায় মুক্তভাবে চালচল করতে পারে।’ পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলো নিয়মিত নৌ-মহড়ার আয়োজন করে থাকে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, বিশ্বের তেল সম্পদের ৪০ শতাংশ যে জলসীমা দিযে রফতানি করা হয়, তার অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতেই এসব নৌমহড়া চালানো হয়। পারস্য উপসাগরের দ্বীপদেশ বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি আছে।
ঘাঁটি ৫০০০ মার্কিন নৌ সেনা রয়েছে। আক্রান্ত হলে পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়া হবে বলে ইরানি কর্মকর্তারা প্রায়ই বলে থাকেন। পশ্চিমা নৌ-মহড়াগুলো ইরানি এই হুমকি থেকে হরমুজ প্রণালীকে মুক্ত রাখার প্রত্যয়েই আয়োজন করা হয়। ফারস জানিয়েছে, ২০১০ থেকেই ইরানি যুদ্ধ জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক নৌ-সীমায় টহল দিয়ে আসছে। ইরানের সরকার উৎখাতের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লাহ আলী খামেনী বলেছেন, ‘তার দেশের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন করার ক্ষমতা আমেরিকার নেই। আমেরিকার কর্মকর্তারা বলে থাকেন, তারা ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন চান না- এটা ডাহা মিথ্যা। কারণ, ইরানের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন করার সুযোগ পেলে তারা এক মুহূর্ত দেরি করবে না।’ ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের ৩৫তম বার্ষিকীর ১০ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা উদযাপিত হচ্ছে। শনিবার ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্থপতি ইমাম খোমেনী (রহ.)-এর প্রতি ইরানের বিমান বাহিনীর আনুগত্য ঘোষণার বার্ষিকী। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্র“য়ারি ইসলামি বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় হলেও ৮ ফেব্র“য়ারি বিমান বাহিনী বিপ্লবের আদর্শের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেছিল। এ উপলক্ষে ইরানের বিমান বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কমান্ডাররা তেহরানে সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লাহ আলী খামেনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিমান বাহিনীর কমান্ডারদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভরতা এবং ইরানি জনগণের ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা টিকে থাকবে বহুকাল। তিনি বলেন, একজন প্রেসিডেন্ট এসে সরকারের কৌশল পরিবর্তন করতে পারেন, কিন্তু ইসলামি শাসন ব্যবস্থার মূলনীতিগুলো অটুট ও অপরিবর্তিত থাকবে।
একটি পরমাণু কেন্দ্রও বন্ধ করা হবে না : এইওআই
ইরানের কোনো পরমাণু কেন্দ্রই বন্ধ করা হবে না। এ তথ্য জানিয়েছেন ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার (এইওআই) উপ-মহাপরিচালক আসগার যারেয়ান। তিনি আরও বলেছেন, একটি পরমাণু স্থাপনাও বন্ধ হবে না। বিদেশী গণমাধ্যমের অপপ্রচারে প্রভাবিত না হতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ইরানের আরাক পরমাণু কেন্দ্রে কয়েকটি প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে শত্র“দের বিদ্বেষের কোনো শেষ নেই। শত্র“দের হতাশ করতে আমাদের ভেবে-চিন্তে কাজ করতে হবে।’ এর আগে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ হাসান আসফারি বলেছেন, পরমাণু কেন্দ্র থেকে কোনো সেন্ট্রিফিউজই সরানো হবে না।

জাপানে প্রবল তুষার ঝড় নিহত ১১ আহত ১২০০

জাপানে কয়েক দশকের মধ্যে প্রবল তুষার ঝড়ে দেশজুড়ে ১১ জনের প্রাণহানি ও ১২০০ লোক আহত হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া দফতর এ কথা জানিয়েছে। শনিবার পর্যন্ত রাজধানী টোকিওতে সর্বোচ্চ ২৭ সেন্টিমিটার বরফ পড়েছে যা ৪৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এদিকে টোকিওতে তুষার ঝড়ের মধ্যেই চলমান গভর্নর নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে মনোনীত প্রার্থী ইয়োইচি মাসুজো ভোটে জয়লাভ করেছেন। ১৯৮৯ সালে এক ম্যাগাজিনে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ঋতুস াবের সময় নারীরা মোটেও স্বাভাবিক থাকেন না ফলে দেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব তাদের দেয়া সম্ভব নয়।
তারপর থেকেই নারীদের চক্ষুশূল ইয়োইচিকে টোকিওর গভর্নর হতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে। একদিকে, নারী সংগঠনের প্রচারণা ইয়োইচিকে যে পুরুষরা ভোট দেবেন তাদের সঙ্গে নারীরা যৌন সম্পর্কে যাবে না। অন্যদিকে প্রবল তুষার ঝড়। তবে কোন বাধাই শেষ পর্যন্ত বাগে আনতে পারেনি ইয়োইচিকে। উল্লেখ্য, রাজধানী টোকিওতে এক কোটি ৩০ লাখ লোকের বসবাস। ওদিকে দেশটির সেন্দাই শহরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় শনিবার ৩৫ সেন্টিমিন্টার বরফ পড়ে যা ৭৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

‘ওঁদের মতো লোক আমাদের নেতা’

আ স ম ফিরোজ
অস্ত্রধারীরা সবাই ছাত্রলীগের নয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রসঙ্গে সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যতজনের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে, তারা সবাই ছাত্রলীগের নয়। ছাত্রলীগের যারা, তাদের আমরা ইতিমধ্যে বহিষ্কার করেছি। তদন্ত করে দেখা হবে, এর সঙ্গে কারা জড়িত।’ এ বক্তব্যের সমালোচনা করে পাঠক এ ডব্লিউ হক লিখেছেন: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আগে ছাত্রলীগের কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করুন ও কঠোর শাস্তি দিন। একই সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিচার করুন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আপনাদের ছেলেদের আত্মরক্ষার জন্য বোমা-পিস্তল-চাপাতি দরকার হয় কেন, যখন পুলিশ বাহিনী পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল বা থাকে? আইন দিয়ে প্রকৃত হামলাকারী ও সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি দিন। আপনি দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। আপনার কাছ থেকে নিরপেক্ষ, পক্ষপাতশূন্য ভূমিকা আশা করি। আবদুল হক: তারা যে-ই হোক বিচারের আওতায় আনতেই হবে। দলীয় পরিচয় জানার আমাদের দরকার নেই। মো. আসিফ ইকবাল: আমাদের ছেলেদের কি জীবন বাঁচানোর অধিকার নেই? তবু সন্ত্রাসী সন্ত্রাসীই। সন্ত্রাসীদের বরদাশত করা হবে না। তবে আত্মরক্ষার অধিকার সবার আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আত্মরক্ষার অধিকার ১৬ কোটি জনগণেরই আছে, তাহলে আমাদের সবাইকে একটি করে অস্ত্র দেওয়া হোক।
বিএনপি কি তাহলে হেরে যেত?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের জরিপে দেখা যাচ্ছে, সব দলের অংশগ্রহণে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি অন্তত সাড়ে ৫ শতাংশ ভোট কম পেত। এ নিয়ে পাঠক এ রহমান লিখেছেন: সরকারের উচিত সব দুষ্কৃতকারী, পুলিশ মারা, ককটেল ছোড়া, মানুষ পোড়ানো খুনিদের এক এক করে ধরে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা; তা সে যে দলেরই হোক না কেন। জনজীবনে নিরাপত্তা দেওয়া, কঠোর হাতে দুষ্কৃতকারী দমন করা, আইনশৃঙ্খলা ঠিক করা, সুশাসন ফিরিয়ে আনা সরকারের জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ, কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে করা অসম্ভব নয়। মো. তাসফিক ইসলাম: বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপের ফল দেখেছি। এসব জরিপ কখনোই সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প হতে পারে না এবং কখনোই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে কাভার দিতে পারে না। এসব জরিপ বাদ দিয়ে সবাইকে নিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কীভাবে করা যায়, সে পথে সবাইকে হাঁটতে হবে। সোহেল: যত যা-ই বলেন, ফ্রি-ফেয়ার ও গ্রহণযোগ্য ইলেকশন হলে...এবার বাংলাদেশের মানুষ জিতবে এবং আওয়ামী লীগ হারবে। রঞ্জু খান: অসাধারণ মূল্যায়ন, আশা করি বিএনপির বোধোদয় হবে। খন্দকার দিদারুল ইসলাম: ঠিক, ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন হবে না এবং তাও হবে আওয়ামী লীগের অধীনে। যেমন হয়েছে ৫ জানুয়ারিতে। বিএনপি বসে বসে দিবাস্বপ্ন দেখতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা এটাই। মোরশেদ আলম: এ মুহূর্তে জনগণ আর কোনো নির্বাচন এবং আন্দোলনের নামে নাশকতা চায় না। এখন যেমন আছি, ভালোই আছি, আমরা শান্তিতে থাকতে চাই।
ক্যাশ’ চাইলেন চিফ হুইপ
সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ প্রকাশ্যে মাইকে ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘আগামীকাল (গত শনিবার) দলীয় কার্যালয়ে বসব। যদি কারও উপঢৌকন দেওয়ার ইচ্ছা থাকে, তবে আর এই ক্রেস্ট না। ক্যাশ (নগদ টাকা) চাই, ক্যাশ।’ চিফ হুইপের এ বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে পাঠক এ রহমান বলেছেন: এসব লোক চিফ হুইপ হয় কেমন করে? আর এ রকম কথাবার্তা, কাজকর্ম করে এখনো তিনি ওই পদে থাকেন কেমন করে? মো. আতাউর রহমান: এর পরও যদি পদ ঠিক থাকে তাহলে বুঝতে হবে...সর্বদলীয় গণতন্ত্র মানে ক্ষমতা ও সম্পদ। প্রধানমন্ত্রী ও সুশীল সমাজ কী বলেন, তা শুনতে চাই। আশরাফুল: দেশটার নাম বাংলাদেশ, সত্যিই এক আজব দেশের মানুষ আমরা। আর ওঁদের মতো লোক আমাদের নেতা। আমরা জনগণই খারাপ, এ সুযোগ ওঁদের দিই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি কী ধরনের নেতাদের বিশ্বস্ত কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন? অতি দ্রুত এঁদের প্রাথমিক সদস্য পদে নামিয়ে দিন, প্লিজ! মো. হানিফ: আমি একটুও অবাক হয়নি। কারণ, শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ আর এই আওয়ামী লীগ যোজন-যোজন দূরে।
মৃত গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গু-ময়নাতদন্ত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদরূল ইমাম সমুদ্রবক্ষের একমাত্র গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গু নিঃশেষ ও পরিত্যক্ত হওয়ার কারণ এবং গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে ভবিষ্যতে আমাদের করণীয় ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। এ ব্যাপারে পাঠক সালাউদ্দিন শামসুদ্দিনের মন্তব্য: ড. বদরূল ইমাম, আপনি যা লিখেছেন তা সত্যি। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও একটি সমস্যা আছে, তা হলো—যখন কোনো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়, তখন টার্ম এবং কন্ডিশনগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে দেখি না বাংলাদেশকে। দিন শেষে এর কোনো সুফল তো পকেটে ভরতে পারেই না, উপরন্তু নিজ পকেট থেকে এর ক্ষতিপূরণ দেয়। নিয়াজ আহমেদ: বিষয়টি জনসমক্ষে আনার জন্য ধন্যবাদ। প্রাকৃতিক সম্পদ খুবই টেকনিক্যাল বিষয় হওয়ায় আমরা অনেকেই এ বিষয়ে অন্ধকারে থাকি। আবদুস সালাম খান সুজন: ব্রিটিশ তেল কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জি, তাদের লাভটা উঠিয়ে নেওয়ার পরই সাঙ্গুর সাঙ্গ হলো! এটা স্বাভাবিক বা অপমৃত্যু নয়! এটা সুপরিকল্পিত হত্যা!
কৌশল ঠিক করতে পারছে না বিএনপি
নির্বাচন প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়ার পর দলকে গোছানো, কর্মীদের মনোবল চাঙা করা এবং পুনরায় আন্দোলনের জন্য মাঠে নামতে কৌশল ঠিক করতে পারছে না বিএনপি। উপরন্তু দলটির মাঠপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের মতবিরোধ বেড়ে চলেছে। এ ব্যাপারে পাঠক সোহেল রহমানের মন্তব্য: আওয়ামী লীগ ২১ বছর দেশ শাসন বা সরকার গঠন থেকে দূরে বিরোধী দলে ছিল। আওয়ামী লীগ কিন্তু জনগণের মাঝ থেকে হারিয়ে যায়নি। তারা প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের ভুলগুলো সংশোধন করে ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনে সফল হয়। বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের মতো সেই প্রতিকূল সময় পার করছে। একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত ও জনগণের আবেগ ধারণ করেই বিএনপিকে এই প্রতিকূলতা পার হতে হবে। আর নীতি-আদর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন কোনো রাজনৈতিক দল টিকে থাকতে পারে না। সিকদার দস্তগীর: শুধু কৌশল কেন, বিএনপি কিছুই করতে পারবে না। ওরা কেবল জনগণের আশায় বসে ছিল। ওরা ভেবেছিল জনগণ বুকের রক্ত দিয়ে আর একটি এক-এগারো বানিয়ে দেবে। ওরা সেই বানানো মোয়াটি খাবে। আশঙ্কা হচ্ছে, এই অদ্ভুত এবং ভয়ংকররূপে আসা সরকার যদি আরও বেসামাল হয়ে পড়ে, তাহলে জনগণের ভাগ্যে যে আরও কত কী লেখা আছে, কে জানে? মীর মো. মোফাজ্জল হোসেইন: যেখানে জামায়াতের স্বপ্ন বাস্তবায়নেই বিএনপির রথযাত্রা, সেখানে বিএনপি কীভাবে কৌশল ঠিক করবে? শেখ মুস্তাফিজ: আপনাদের ক্ষমতায় যাওয়া কেন এত জরুরি হয়ে পড়েছে? দেশ তো চলছেই। আপনারা ক্ষমতায় এলেও দেশ এর চেয়ে ভালো চলবে না। একাদশ নির্বাচনে কী করবেন, সেটা নিয়ে ভাবেন। আর সেই নির্বাচন যত দেরিতে হয় আপনাদের জন্য মঙ্গল। কারণ, আপনারা ততক্ষণ দল গোছাতে পারবেন। আন্দোলনের
আগে দল গোছান। সরকারের ভুল সিদ্ধান্তগুলোর সমালোচনা চালিয়ে যান।

মঞ্জুরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে

এম এ মঞ্জুর
‘আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি বিচারের জন্যও তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। আমি চাই সত্য বেরিয়ে আসুক। ইতিহাসের এসব শূন্যস্থান বা ক্ষতগুলো সম্পর্কে সত্যি কথা দেশবাসীর জানার অধিকার রয়েছে।’ ১৯৯৫ সালের মার্চে ভোরের কাগজ-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ কথাগুলো বলেছেন ব্যারিস্টার আবুল মনসুর। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সামরিক বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর সেনাবাহিনীর হেফাজতে থাকাকালে নিহত মেজর জেনারেল এম আবুল মঞ্জুরের বড় ভাই তিনি। ভাইকে হত্যার বিচার চেয়ে ১৯৯৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন। ওই সময় রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় ব্যারিস্টার মনসুরের সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ভোরের কাগজ-এর তৎকালীন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সানাউল্লাহ। ১৯৯৫ সালের ১৫ মার্চ প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি পাঠক চাহিদার কথা বিবেচনা করে প্রথম আলোতে ছাপা হলো।
ভোরের কাগজ  মেজর জেনারেল এম আবুল মঞ্জুর নিহত হয়েছিলেন ১৯৮১ সালের ১ জুন। প্রায় ১৪ বছর পর মামলা করলেন কেন?
আবুল মনসুর  আসলে আমি সব সময় চেষ্টা করেছি মামলা করার জন্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, তথ্য-প্রমাণাদি আমার কাছে ছিল না। এমনকি জেনারেল মঞ্জুরের ময়নাতদন্ত রিপোর্টও খুঁজে পাইনি। গত মাসে ময়নাতদন্ত রিপোর্টটি পাওয়ার পরপরই আমি পাঁচলাইশ থানায় এফআইআর করেছি। আমি চাই সত্য বেরিয়ে আসুক। আমার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক। আইন অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি হোক।
কাগজ  কিন্তু এ রকম একটা কথা শোনা যাচ্ছে যে, আপনি মামলা করেছেন সরকারের পরামর্শে বা অন্য কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে?
মনসুর  এটা সত্যি নয়। আমার ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি বিচারের জন্যও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। জেনারেল মঞ্জুর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য তিনি লড়াই করেছেন। কিন্তু এত বছরেও তাঁর হত্যার মতো একটি জঘন্য ঘটনার তদন্ত বা বিচার হয়নি। আমি বা আমাদের পরিবার সব সময়ই এ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়েছি। এ নিয়ে আমার নিজের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বা লক্ষ্য নেই।
কাগজ  কিন্তু এ রকম একটি ধারণা সহজেই করা যায় যে, মঞ্জুর হত্যার বিচার জিয়া হত্যার বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
মনসুর  দেখুন, আমি বা আমাদের পরিবারও চায় জিয়া হত্যারও সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার হোক। মঞ্জুর হত্যার বিচার হলে অনেক সত্যি কথা বেরিয়ে আসবে। জিয়া হত্যার জন্য আমার ভাইকে দায়ী করা হয়ে থাকে। এটাও সত্যি কি না সেটা বের হয়ে আসবে। কারণ সে সময় বিচারের কোনো সুযোগ না দিয়ে জেনারেল মঞ্জুর এবং আরও কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল। তড়িঘড়ি করে চট্টগ্রাম কারাগারের অভ্যন্তরে জেনারেল কোর্ট মার্শালে গোপন বিচার করে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের ফাঁসি হয়েছিল। সে সময় সরকার যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছিল আজ তথ্য-প্রমাণে দেখা যাচ্ছে, সেটি সত্যি কথা বলেনি। তাই আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। সঠিক ইতিহাস বেরিয়ে আসুক। ইতিহাসের এসব শূন্যস্থান বা ক্ষতগুলো সম্পর্কে সত্যি কথা দেশবাসীর জানার অধিকার রয়েছে।
কাগজ  কিন্তু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড তো আরও হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা, হায়দার...
মনসুর  খালেদ মোশাররফ ব্যক্তিগতভাবে আমার বন্ধু ছিল। সে সত্যিকার অর্থে একজন দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী ছিল। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ছিল সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। তার হত্যার বিচার আজও হয়নি। বিচার হয়নি কর্নেল হুদা, হায়দার এদের হত্যার। হুদা মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল মঞ্জুরের একজন সঙ্গী ছিলেন। তাঁদের সবার অবদান, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গেও আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁর হত্যার ব্যাপারে জেনারেল কোর্ট মার্শালে যে গোপন বিচার হয়েছিল, সে সম্পর্কে এখনো দেশবাসী সন্দেহমুক্ত নন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর এবং তাঁর পরিবারবর্গের হত্যার ব্যাপারেও কোনো সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার আজও হলো না। আসলে সব হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হওয়া উচিত। জাতি হিসেবে আমাদের এর জন্য দাবি করা উচিত, ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ বিচার না হওয়ায় অনেকেই হত্যা করে পার পেয়ে গেছে। যা পরবর্তী সময়ে অন্যদেরও এ ধরনের অপকর্মে উৎসাহিত করেছে। দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এবং প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসার জন্য এসব ঘটনার বিচার হওয়া প্রয়োজন।
কাগজ  এ মামলার ক্ষেত্রে পত্রপত্রিকার লেখালেখি হচ্ছে। নানা কথা শোনা যাচ্ছে।
মনসুর  হ্যাঁ, পত্রপত্রিকায় অনেক কথাই বলা হচ্ছে। কোনোটা সত্য, কোনোটা মিথ্যা। নানা রকম তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। আমি মিডিয়ার কাছে অনুরোধ জানাব, তারা যাতে এমন কিছু না করে যাতে মামলার কোনো ক্ষতি হয়। আমাদের সবার চেষ্টা করা প্রয়োজন যাতে সত্য প্রকাশিত হয়। প্রকৃত দোষীদের বিচার হয়।