Thursday, April 15, 2021
গল্প- অন্ধ চীনা সিপাহীদের কথা by টাইকো হিরাবায়সি

১৯৪৫ সালের ৯ মার্চ। গুমা জেলার পরিষ্কার আকাশে উত্তরীয় হাওয়ায় উড়ে আসে একটি এরোপ্লেন। কাকতালীয়ভাবে ঐ দিনে বিরাট রকমের বিমান হামলা হয়ে যায়। আমি—বুদ্ধিজীবি থেকে রূপান্তরিত হওয়া এক কৃষক, এদিনে নাসিকি থেকে সড়ক ধরে তুষারে আচ্ছাদিত আকাগি পর্বতের কাছাকাছি চলে আসি। তারপর কাকিকামবারা থেকে আশিনো রেলপথের ট্রেইন ধরে কাইরু পর্যন্ত এসে, রয়োজ রেললাইনে ট্র্যান্সফার হয়ে তাকাসাকিতে নামি। আমাকে আজ আবার সিংগে রেললাইন ধরে উয়েনের দিকে যেতে হবে।
বেলা যদিও অপরাহ্ন, চারটা তিরিশের কাছাকাছি, তবু কলকারখানাময় এ শহরের ধূলি ধূসরিত ছাদগুলোর ওপরে আকাশ এখনো আলোয় উজ্জ্বল। কিন্তু এখানে সেখানে চিরসবুজ গাছপালার পত্রালির ফাঁকে শূন্যসমূহ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। প্ল্যাটফর্মের ওয়েটিং রুমটি অন্ধকারই, তবে বিস্তর লোকজনে ঠাসা। এদের কেউ কেউ শাকসবজিতে পরিপূর্ণ বৃহৎ সব বাঁশের ঝুড়ি বাঁকে বা কাঁধে ঝুলিয়ে কিংবা মেঝেতে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। এসব কিছু থেকে সমস্ত আবহে প্রতিধ্বনিত হয় এক ধরণের কোলাহল ও চঞ্চলতা।
আমি দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটির দিকে এক নজর তাকিয়ে ওয়েটিং রুম ছেড়ে যাওয়ার উদ্যোগ নি। ঠিক সে সময় উর্দিপরা পুলিশের একটি ছোট্ট দল স্টেশনের ওভারব্রীজ পার হয়ে প্ল্যাটফর্মে নামে। এদের মধ্যে আছেন পুলিশের চিফ ও ডেপুটি, দু’জনেই হাতে সাদা দস্তানা ও মাথায় লোহার হেলমেট পরে আছেন। ডেপুটি পুলিশ অফিসার স্টেশন মাস্টারের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটেন। পুলিশ চিফ তাদের সহসা থামিয়ে দিয়ে বোধকরি বিষয়টি নিজ হাতে তুলে নেন। স্টেশন মাস্টার দ্রুত টিকিটঘরে ফিরে গিয়ে একখণ্ড সাদা চক হাতে ফিরে আসেন। এসেই তিনি মানুষজনকে ঠেলে সরিয়ে চক দিয়ে প্ল্যাটফর্মে সাদা দাগ কাটতে শুরু করেন।
আমি প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ির সামনে এক পা বাঁকিয়ে দাঁড়াই। দিন কয়েক আগে ভিড়ে ঠাসা রয়োজ রেলপথে চলাচলের সময় কেউ একজন পেরেকের একটি বস্তা ফেলে দিলে আমার পা আহত হয়েছিলো। স্টেশন মাস্টার আমার কাছে এসে আমাকে জোরে ঠেলে ধাক্কিয়ে, চক দিয়ে সাদা দাগটিকে আরো বিস্তৃত করেন। ঐ সময়ে রেলপথে যা নিত্যদিনের ঘটনা অর্থাৎ ট্রেইনটি আসতে বিস্তর বিলম্ব হয়। যাত্রীরা স্টেশন মাস্টারের উদ্ধত আচরণে মোটামুটি অভ্যস্থ বলে কোনরূপ প্রতিবাদ ছাড়াই সরে দাঁড়িয়ে কী ঘটছে কৌতূহল নিয়ে তা দেখে।
কিছুক্ষণের মধ্যে অপরিচ্ছন্ন, বরফে ছাদ ছাওয়া একটি ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আসে। আমি কিছু লক্ষ্য করার আগেই পুলিশের দলটি দু’ভাগে বিভক্ত হয়। আমি যে বগিতে ওঠার কথা ভাবছি, তারা তার দু’টি দরোজার কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। ঠিক এখানেই প্ল্যাটফর্মে চক দিয়ে সাদা দাগ কাটা হয়েছে।
বগিটি মনে হলো মোটামুটি খালিই, কিন্তু আমি তাতে ওঠার চেষ্টা করতেই পুলিশ রূঢ়ভাবে আমাকে থামিয়ে দেয়। তখন সহসা আমি দেখতে পাই—কামরাটির মাঝামাঝি সুদর্শন তরুণ একজন উচ্চপদস্থ অফিসার তার ডেপুটিকে সাথে নিয়ে বসে আছেন। আমি তার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নাসিকার দিকে তাকিয়ে ততক্ষণাৎ তাকে রাজকুমার তাকামাতসু বলে চিনতে পারি।
কুমার তাকামাতসুকে আমি চর্মচক্ষে দেখবো, তা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। এতদিন যাকে কল্পলোকের চরিত্র হিসাবে ভাবতাম, তাকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে আমার মনে এক ধরনের তীব্র আবেগজনিত আলোড়নের সৃষ্টি হয়। আমি সুদর্শন কুমারের দিকে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকানোর চেষ্টা করি। ভাবি, চিৎকার করে উঠে সবাইকে বলবো, ‘দ্যাখো হে, রাজকুমার সত্যি সত্যিই এখানে এসেছেন।’ কিন্তু আমি কিংবা অন্য যাত্রীদের এখন আবেগ প্রকাশের সময় নয়। আমরা যদি ভীড়ে ঠাসা কোন না কোন বগিতে জান বাজী রেখে উঠতে না পারি, তাহলে আমাদের পরবর্তী ট্রেনের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, তা কেউ বলতে পারবে না।
আমি ততক্ষণাৎ ট্রেনের মাঝামাঝি একটি বগির দিকে দৌড়াই। কিন্তু সহসা জলজ্যান্ত রাজকুমারকে চাক্ষুষ করার উত্তেজনা আমার গতিকে শ্লথ করে দেয়। আমি ট্রেনে পড়িমরি করে ওঠার জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ সারির শেষে দাঁড়িয়ে ভাবি, এ কামরায় কি আজ কোনমতে উঠতে পারবো?
অবশেষে এক পর্যায়ে কোনক্রমে কামরাটির কাছে চলে আসি। বগিটি মারাত্মক রকমের অপরিচ্ছন্ন। জানালার কাচ ভাঙা, দরজায় কাচের বদলে একটি তক্তা পেরেক দিয়ে আটকানো। এক বৃদ্ধা যাত্রী তার মালামালের গাট্টির উপর ঠায় বসে আছেন। তার পাশে ক্রন্দনরত একটি শিশু। এদিকে-ওদিকে অগোছালোভাবে ছড়ানো ফুরোসিকি কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা একটি দেরাজ ও বাঁধন খুলে যাওয়া কয়েকটি ঝাড়ু। এসব বিভ্রান্তির মাঝে আমার চোখে কেবলই ভাসে, একটু আগে এক পলকের জন্য দেখা নীলাভ কুশন দিয়ে সাজানো রাজকুমারের কামরাটি। একজন পুলিশ অফিসার এসে চিৎকার করে সবাইকে আরো সরে জায়গা করে দিতে নির্দেশ দেন। কেউ তার কথা না শুনে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে।
অবশেষে আমি এখানে ওঠার আশা ছেড়ে দিয়ে সর্বশেষ বগিটির দিকে দৌড়াই। কামরাটিতে কোন যাত্রী দাঁড়িয়ে নেই। একজন সৈনিক, সম্ভবত নিচু র্যাংকের কোন অফিসার হবেন; কামরা থেকে নীরবে বেরিয়ে আসা সাদা পোষাকের সৈন্যদের মাথা গুনছেন। সৈন্যদের শরীর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তাদের সকলের কাঁধে আড়াআড়ি করে রাখা কম্বল। ভালো করে তাকিয়ে আমি তাদের গায়ে ময়লার পুরু স্তর দেখতে পাই। আমি বগিটির দরোজার দিকে তাকিয়ে সৈন্যদের এরকম বেহাল অবস্থা কেন, তা ভাবি! একটু ভালো করে নজর করতেই তীব্র ভয় ও বিভ্রান্তিতে আমার পা দু’টি কাঁপতে শুরু করে।
আমি পরিষ্কার দেখতে পাই, এই সৈনিকদের সকলেই অন্ধ! তারা হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে অন্য সৈনিকদের পেছন দিক স্পর্শ করে কায়-ক্লেশে হাঁটছে। তাদের সকলকে প্রচণ্ড রকমের ক্লান্ত ও ফ্যাকাশে দেখায়। অনেক দিন ধরে না ছাঁটার কারণে তাদের চুল দীর্ঘ হয়েছে। তাদের মির-মির করা চক্ষুকোটর থেকে ক্রমশ অশ্রু ঝরছে। বলা মুশকিল—এ সিপাহীদের বয়স ঠিক কত? আমি আন্দাজ করি, পয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশের মাঝামাঝি। আরেকটু সাবধানে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারি—প্রতি পাঁচজন অন্ধ সেনার পেছনে একজন করে স্বাভাবিক দৃষ্টিওয়ালা সিপাহী। ছড়ি হাতে স্বাভাবিক সিপাহীটির পরনে প্রথাগত জাপানি সৈনিকদের থেকে কিছুটা ভিন্ন রঙের ইউনিফর্ম। তারা যেভাবে অন্ধ সিপাহীদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এতে মনে হয়—তারা এদের থেকে উঁচু র্যাঙ্কের।
একজন সৈনিক, ‘কোয়াই কোয়াইডে, কোয়াই কোয়াইডে’, বা ‘জলদি হাঁটো, জলদি হাঁটো’, রব তুলে সামনের অন্ধ সিপাহীকে ছড়ি দিয়ে খোঁচা দেয়। সহসা আমি বুঝতে পারি, এই অন্ধ সিপাহীদের দলটি জাতীয়তায় চৈনিক। এখন আর বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না, তাদের কেন এত অপরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর ও আজব দেখাচ্ছে।
ট্রেন থেকে নেমে অন্ধ চীনা সিপাহীরা সকলে প্ল্যাটফর্মে দলবেঁধে জমায়েত হয়। তাদের সংখ্যা পাঁচ শতের কাছাকাছি। আমি যেন নিজের চোখকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না, তাই আবার গভীর মনঃসংযোগ করে সাবধানে তাকাই। সিপাহীগুলো তাদের ক্ষত-বিক্ষত চোখ আধবোজা করে রেখেছে, বোধ করি আলোর তীব্রতা সইতে না পেরে। প্রতিটি দৃষ্টিহীন চক্ষুকোটর থেকে ক্রমশ গড়িয়ে নামছে অশ্রুজলের ধারা। এদের প্রত্যেকেই যে সম্পূর্ণরূপে অন্ধ, এ নিয়ে আমার কোন সন্দেহ থাকে না। তলোয়ার ঝোলানো একজন উচ্চপদস্থ জাপানি অফিসার অন্ধ সিপাহীদের জমায়েতের কাছাকাছি হঠাৎ করে চলে আসলে, গুটি কয়েক দৃষ্টিওলা ব্যবস্থাপক গোছের সেনা তাকে স্যালুট দেয়। তিনি জানতে চান, ‘অন্যদের আসার কী হলো?’ ‘তারা পরের ট্রেনে আসছে স্যার’, বলে অন্ধ সিপাহীদের মাথা গুনতি থামিয়ে জবাব দেয় নিচু র্যাঙ্কের এক জাপানি অফিসার।
এসব ধুন্দুমারের মাঝে বিভ্রান্ত এক যাত্রী অন্ধ চীনা সিপাহীদের দিকে তাকিয়ে, ‘এ দুনিয়াতে কী হতে চললো?’ বলে আক্ষেপ করে। একজন মধ্যবয়সী মহিলা-যাত্রী চোখে রুমাল দিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। এ বিষয়টা যাত্রী সকলের কাছে পরিষ্কার হয় যে, জাপানি কমান্ডার ও অন্যান্য অফিসাররা চীনা অন্ধ সিপাহীদের সাধারণ যাত্রীদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে চান। কিন্তু তাদের সংখ্যা এতো বৃহৎ ও গতি এতো শ্লথ যে, এদের লুকিয়ে রাখার কোন উপায়ই থাকে না। তাদের চারপাশে কৌতূহলী যাত্রীদের ভীড় কেবলই বাড়তে থাকে।
অবশেষে ট্রেন ছেড়ে দিলে আমরা সাধারন যাত্রীরা পড়িমড়ি করে বগির দিকে দৌড়াই। আমি চলমান কামরার পাদানীতে দাঁড়িয়ে ভেতরের দিকে তাকাই। পুলিশ দলটির যারা প্ল্যাটফর্মে অন্ধ চীনা সিপাহীদের পাহারা দিচ্ছিলো, তারাও লাফিয়ে ট্রেনে উঠে পড়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারা পরস্পরের সাথে কানাকানি করে। তাদের একজন বলে, ‘আমার মনে হয় এদের ওপর বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে কোনো পরীক্ষা নিরিক্ষা চালানো হয়েছে’। ‘এরা হয়তো কোন রকমের বিস্ফোরণের শিকার’ মন্তব্য করে হেলমেট পরা এক পুলিশ। ‘কিন্তু বিষাক্ত গ্যাস নিয়ে সত্যিই পরীক্ষা-নিরিক্ষা করার কোন কী প্রয়োজন ছিল?’ পাল্টা মন্তব্য ছুড়ে দেয় তার সঙ্গীটি। আমি তাদের আলাপচারিতার রেশ ধরে কাছে দাঁড়ানো মাঝবয়সী এক মহিলাকে জিজ্ঞেস করি, ‘অন্ধ সিপাহীরা কোথা থেকে ট্রেনে চেপেছে?’ মহিলা একটু ভেবে নিরাসক্ত গলায় জবাব দেন, ‘মনে হয় সিনোনই এলাকা থেকে’। ‘তাহলে এরা নিশ্চয়ই নগোয়া অঞ্চল থেকে আসছে’। আমি স্বগোক্তি করি। কামরার যাত্রীরা দ্রুত বিষয়টি ভুলে গিয়ে গালগল্পে মেতে ওঠে। মাঝবয়সী মহিলা, যার সাথে আমার একটু আগে কথা হয়েছে, আলগোছে জানায়, ‘আমি ইচিগো থেকে আসছি, আমার মেয়েকে নিয়ে চিবাতে যেতে হচ্ছে’। মহিলাটি আরো বলেন যে, তার মেয়ে স্বেচ্ছাসেবী সৈনিক, গলায় বিচ্ছিরি রকমের ফোঁড়া হওয়ার কারণে সে ডিউটিতে সময়মতো যোগ দিতে পারেনি। প্রায় সপ্তাহখানেক দেরিতে কাজে যোগ দিতে যাচ্ছে। কিন্তু চিবাতে যাওয়ার সরাসরি ট্রেন পায়নি, তাই এ ট্রেনে করে যতদূর যাওয়া যায়, তারপর কোন স্টেশনে নেমে অপেক্ষা করবে, যদি সরাসরি যাওয়ার কোন ব্যবস্থা করা যায়। মহিলাটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বারবার এই ট্রেন যাত্রার ক্লান্তি ও ক্লেশের কথা বলে। একটু আগে মহিলাটি যে রকম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চীনা সিপাহীদের বিষয়ে আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন, তাতে আমি মনে মনে আহত হয়েছিলাম। এখন আমি তার নিস্পৃহতার কারণ বুঝতে পারি। জাপানিরা তাদের নিজস্ব সমস্যা নিয়ে এমনই মেতে আছে যে, তাদের অন্য বিষয়ে ভাবার কোন অবকাশই নেই।
ট্রেনটি একটি স্টেশনে এসে থামে। আমি বসার জায়গা খুঁজে পাওয়ার জন্য যে কামরাটিতে অন্ধ চীনা সিপাহীরা বসে ছিল তাতে এসে উঠি। কামরাটি খালি, কিন্তু দুর্গন্ধের জন্য বেশীক্ষণ টেকা যায় না। আমি আবার আগের কামরায় ফিরে আসি। ট্রেনের কন্ডাকটার,‘পরবর্তী স্টেশন জিম্বেবারা’, হাঁকতে হাঁকতে যাত্রীদের মধ্য দিয়ে চলে যায়। এতক্ষণে কামরার পশ্চিমদিকে জানালাগুলো অস্তগামী সূর্যরশ্মির প্রতিসরণে জ্বলে যাচ্ছে। প্রকাণ্ড রক্তিম সূর্য যেন ধীরগামী ট্রেনের সাথে তাল মিলিয়ে দিগন্ত জুড়ে আস্তে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে।
ট্রেনের সিজিলে কিঞ্চিত পরিবর্তন হয়, আমি বুঝতে পারি যে, অন্ধ চীনা সিপাহীদের বয়ে আনা বগিগুলো কেটে রাখা হয়েছে, তাতে আমার কামরাটি হয়ে পড়েছে ট্রেনের সর্বশেষ বগি। আর হ্যাঁ, আমার মনে পড়ে, রাজকুমার এখনো বসে আছেন আমার কামরাটির খানিক আগের একটি কম্পার্টমেন্টে। এতবড় ঘটনাটি সহযাত্রী কাউকে বলতে আমার ইচ্ছা হয় না, ভীষণ ক্লান্ত লাগে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হলে পর আমি তাকাসাকি স্টেশনের সামনের দোকানদারদের জিজ্ঞেস করি যে, তারা অন্ধ চীনা সিপাহীদের আর কখনো ট্রেনে উঠতে দেখেছে কি? দোকানীরা সকলে আমাকে জানায়, এরকম কোন ঘটনা কখনো তাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। আমি ভাবি, মনে হয়, তারা এখান থেকে কখনো ফিরে যায়নি।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গল্প- নিদারুণ সময়ের বিহ্বলতায় by রুমা মোদক

উৎসব শেষ হয়ে যাবার পর যে আবশ্যিক নীরবতা নামে, তাতে লেগে থাকে কাঙ্খিত বিষণ্ণতা। ভাদ্রের ঘামঝরা উত্তাপের মতো যে আয়োজনের উন্মাদনা, তার শেষে কার্তিকের হিম নামার আগে আশ্বিনের ঝিমমারা বাতাস। সাথে আবশ্যিক কিছুটা ক্লান্তি। আয়োজনের সাফল্যের উত্তাপের সাথে শেষ হয়ে যাওয়ার শীতলতা। ঘরময় সব রয়েছে। উজ্জ্বল আলো, ঝুলে থাকা রঙিন বেলুন। কিন্তু উৎসব শুরুর আগের ঔজ্জ্বল্যটুকু কেমন উৎসব শেষের পর যাদুর মতো উধাও! আমন্ত্রিত অতিথিরা সব বিদায় নিয়েছে একে একে। তাদের রেখে যাওয়া উচ্ছ্বিস্ট প্লেটের মতোই উজ্জ্বল আলোর নিচেও থ মারা উচ্ছিষ্ট নীরবতা!
সাজ পোশাক পাল্টাতে পাল্টাতে নূরুল হাবীব সামনে অপেক্ষা করে থাকা বাকি রাতটার কথা ভাবে। বিয়ের একযুগে রুমেলার গায়ে থলথলে চর্বি। আকর্ষণহীন বুক পেট প্রায় সমান। এক যুগ আগেও যখন কলেজে যাবার জন্য রিক্সায় চড়তো, তার শরীরের বাঁকে যে ঢেউ খেলতো, পাড়ার মোড়ে হোন্ডা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নুরুল হাবীবের মনে হতো—সে ঢেউয়ে সাঁতার না কাটলে জীবনই বৃথা। রুমেলার পলক ফেলা চোখের ইশারায়, নির্দিষ্ট মাপের বুক থেকে নেমে যাওয়া পেট, কূল থেকে নদীতে নেমে যাওয়ার আহ্বান রাতে ঘুমাতে দিতো না নূরুল হাবীবকে। এখন তার আকর্ষণহীন বুক পেটের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে নুরুল হাবীব অতীতের নূরুল হাবীবকে খোঁজে। বারো বছর আগে এই মেয়ের জন্য দেয়াল টপকে জানালার ফাঁক গলিয়ে একটু দেখা, একটু স্পর্শের জন্য পাগল হয়ে যেতো। ধরা পড়ে তার ভাইদের হাতে মার খেতো। আকর্ষণটি কোথায় ছিলো ঠিক? ঐ বুক-পেটে, নিপুন সাজিয়ে রাখা চোখজোড়ায়, নাকি এখন কলাগাছের গোড়ার মতো স্ফীত হয়ে উঠা বাহুদ্বয়ে, যেখানে প্রথম সে ঠোঁট ছুঁয়েছিলো, সে জানালার শিক গলে!
এখন কপোলে জমে উঠা মেছতার ছোপ, পান খেয়ে রক্তখেকো ড্রাকুলার মতো বীভৎস লাল হয়ে ওঠা জিহ্বা, দাঁত, স্ফীত তলপেট দেখে সে নিজেকে খুঁজে পায়না যে, আসলে ঠিক কিসের জন্য এমন উন্মাদ হয়েছিলো সে!
এস.আই নূরুল হাবীব বিয়ের যুগপূর্তি উপলক্ষে স্ত্রী রুমেলাকে কোটি টাকার ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছে। আনন্দে আর অহংকারে ডগমগ করেছে রুমেলা। সকাল থেকেই শুরু হয়েছে ন্যাকা ন্যাকা গলায় ফোন। কুশলাদি জিজ্ঞাসার অভিনয়ের ফাঁকে ফ্ল্যাটের বিস্তারিত জানানো...ফিটিংস সব বাইরের ভাবি, ইন্টিরিয়র পুরো সেগুন কাঠের আপা, সন্ধ্যায় মিস কইরেন না ভাবি।
সব ভালো করে শোনেও না নূরুল হাবীব। শোনার আগ্রহও বোধ করে না। তার এ ফ্ল্যাট কেনা যতোটা না স্ত্রী রুমেলাকে খুশি করার জন্য তার চেয়ে অধিক স্ট্যাটাস সিম্বল। সহকর্মী সবাইকে একহাত দেখিয়ে দেয়া। আর দেখানোর জন্যই এই বিশেষ দিনটাকে বেছে নেয়া, এক ঢিলে দুই পাখি মারা। সহকর্মী সবাই অনেক আগেই ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছে, সেদিক থেকে পরে কিনে সর্বাধুনিক ফ্ল্যাটটাই নিয়ে সবার থেকে এগিয়েই গেছে সে। এ নিয়ে এতকাল রুমেলার যে খোঁচা-টিপ্পনি-অশান্তি ছিলো, আজ পার্টিতে সবার চোখ টাটানো দেখে সব তীব্র অহংকারের বাষ্প হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেছে। অতিথি আপ্যায়নে গলায় আহ্লাদের সুর আর ধরছিলো না তার। আজ রাতটা স্বামীকে উজাড় করে দেবে সে, দুপুরে ব্যস্ততার ফাঁকে নুরুল হাবীবের গায়ের উপর ঢলে পড়ে বেখাপ্পা কিশোরী গলায় কথা দিয়েছে রুমেলা। কিন্তু এটা ভাবতেই সুখের বদলে একটা বাড়তি চাপ যুক্ত হয়েছে নূরুল হাবীবের মাথায়। এই আকর্ষণহীন মাংসপিণ্ডে কী করে উপগত হবে সে?
শারীরিকভাবে গত একবছর ধরে খুব ফুরফুরে আছে নূরুল হাবীব। মেঘ না চাইতে জলের মতো এক অতি আকর্ষনীয় নারী উদয় হয়েছে তার জীবনে। আহা! শরীর যেখানে যে মাপের থাকার কথা কোথাও কম বা বেশি নেই এক ইঞ্চি। কেমন পাকা আমের মতো গায়ের রং দেখলেই ছিলে খেতে ইচ্ছে করে। বেশ জড়িয়ে গেছে সে মেয়েটার সাথে। একটু অদ্ভুত, কিন্তু নূরুল হাবীবের জন্য তার দরজা সবসময় খোলা। তাই বলে নূরুল হাবীব যখন তখন হানা দিয়ে নিজের ওজন কমায় না মোটেই। পোস্টের একটা ইমেজের ব্যাপার আছে। শহরের শেষ মাথায় মেয়েটার ঠিকানা—ঠিক শহরতলী যাকে বলে। যখন তখন গেলেও কারো নজরে পড়ার কথা নয়। বাণিজ্যিক নার্সারির পর নার্সারি, ঘন গাছের ঝোপ লালিত-পালিত সব গাছের ঝাড় বিক্রির জন্য তৈরি। সে সবের ফাঁকে মেয়েটার ঘরটা বাইরে থেকে ঠিক চোখেও পড়েনা সহজে। হয়তো আড়াল করার জন্যই এভাবে এখানে বানানো। হয়তো পেশার খাতিরেই...। যদিও মেয়েটার চেহারা-ছবি পেশাটার সাথে একদমই যায় না। কিন্তু নূরুল হাবীব এসব কিছু ঘাটায় না, তাছাড়া কোন কমপ্লেন না এলে ঘাটিয়েই বা তার কী দরকার। তার উপরেই নিজেই এসে জুটেছে যখন!
সেও এক আজব ঘটনা। এক লোকের শার্টের কলার ধরে টানতে টানতে একদিন সন্ধ্যায় মেয়েটি থানায় এসে হাজির। সরাসরি তার রুমে। সাজ-পোশাক চেহারা দেখে বাইরে কনস্টেবলদের হৈ চৈ থামিয়ে মেয়েটিকে ভেতরে এসে বসতে বলতে বাধ্য হয় নূরুল হাবীব। মেয়েটি লোকটির শার্টের কলার ছেড়ে হাঁফায় দু’-এক মিনিট। নূরুল হাবীবের সামনের চেয়ারে বসে। একেবারে নূরুল হাবীবের মুখের উপর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, একে হাজতে ঢোকান, ঢোকান প্লিজ। কিন্তু অভিযোগ কী? ডায়েরি করতে হবে। অভিযোগকারী হিসেবে আপনার নাম ঠিকানা লাগবে। নূরুল হাবীবের জেরার প্রাথমিক ধাক্কায় মেয়েটা একটু থমকে যায়, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড। তারপর কেমন স্বভাবসুলভ স্মার্টনেসে সব থমকানো ফু মেরে উড়িয়ে দিয়ে গড়বড় করে বলতে থাকে, লোকটা ধর্ষক। ধর্ষক!
কোথায় কাকে ধর্ষণ করেছে? ভিকটিম কে, ডাক্তারি পরীক্ষা হয়েছে? সার্টিফিকেট আছে? আবারো একসাথে অনেকগুলো জেরায় মেয়েটা উত্তর দিতে মূহুর্তমাত্র ভাবে। বলে, ধর্ষণ করবে। মেয়েটার উত্তরে লোকটিসহ পুরো কক্ষে এবড়ো থেবড়ো দাঁড়ানো দুয়েকজনসহ নূরুল হাবীব নিজেও হো হো করে হেসে ওঠে। সম্মিলিত হাসিতে মেয়েটি বিব্রত হবার বদলে নতজানু হয়, প্লিজ প্লিজ…আকুতিতে গলে পড়ে মেয়েটি। পারলে সব স্মার্টনেসের দ্বিধা ঝেড়ে পায়ে ধরে। সে সুযোগ দেয়না নূরুল হাবীব। মেয়েটার আকুতির পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে সে জানায় লোকটিকে সে নিশ্চয়ই হাজতে পুরবে। নূরুল হাবীবের আশ্বাসে এমন কোনো ফাঁকই থাকে না যে, মেয়েটি অবিশ্বাস করে। তারপর কৃতজ্ঞতা স্বরূপই কিনা কে জানে নিজের ফোন নম্বর আর সাথে অমোঘ এক ইশারা ছুঁড়ে দিয়ে চলে যায় মেয়েটি...।
মূলত লোকটিকে হাজতে ঢোকানোর কোনোই আইনগত ভিত্তিই নেই। কোথায় কীভাবে মেয়েটি তাকে পাকড়াও করেছে লোকটির মুখে শুনে নূরুল হাবীব হাসবে, না কাঁদবে ঠিক করতে পারে না। বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝে একটা সূক্ষ্ম প্রশ্নবোধক চিহ্ন মাথা তুলে রাখে। মেয়েটিকে সে টিজও করেনি। দিব্যি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলো। হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হয়ে মেয়েটি, তাকে কলার ধরে টানতে টানতে এই থানায় নিয়ে এসেছে। লোকটিকে হাজতে ঢোকানোর কোন যৌক্তিক কারণ থাকে না বলে নূরুল হাবীব লোকটিকে ছেড়ে দেয়।
তারপর ঘটনার দুয়েকদিন পর যতোটা না মেয়েটির আচরণের কৌতূহলে তারচেয়েও বেশি মেয়েটির আকর্ষণে শহর পেরিয়ে মেয়েটির ঠিকানায় দিকে হাঁটে হাবীব। নারীদের প্রতি তার বিশেষ আকর্ষণ ঘরে, বাইরে, ডিপার্টমেন্টে সর্বজনবিদিত। অভূতপূর্ব একটা রাত কাটে তার—হাস্যে-লাস্যে-পরিতৃপ্তিতে। ব্যাপারটা তেমন সমস্যা নয়। কোন অভিযোগ না এলেই হলো। বহুগামী চরিত্রে নারীসঙ্গ কম হয়নি জীবনে। তবে এই মেয়েটির সঙ্গে আর কারো তুলনা চলে। পরপর দুয়েকটা সুখস্মৃতি নিয়ে মেয়েটিকে সে অনায়াসেই ভুলে যেতে পারতো। প্রায়ই সে যা করে। কিন্তু প্রথমত অমোঘ আকর্ষণীয় শরীরের কারণে মেয়েটিকে সে ভুলতে পারেনা। আর দ্বিতীয়ত পরবর্তী ঘটনার পরম্পরা মেয়েটিকে তার কাছে আরো জীবন্ত এবং অনিবার্য করে তোলে।
ফুলবিক্রেতা রিজভী মিয়ার দশ বছরের মেয়েটি নিখোঁজ। থানায় ডায়েরি করার তিনদিন পর মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু জীবিত নয়, মৃত— একটা নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে। রোদে ততক্ষণে লাশ ফুলে উঠে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, গায়ে পিঁপড়ার সারি। ডাক্তারি পরীক্ষার সার্টিফিকেটে স্পষ্ট উল্লেখ : হত্যার আগে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে।
সদর আসনের এম.পি যে গাঁয়ের, সে গাঁয়েই স্থায়ী ঠিকানা রিজভী মিয়ার। শুধু তাই নয়, নির্বাচনের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে খেয়ে না খেয়ে ক্যানভাস করেছে সে। ফলে এম.পি স্বয়ং বিষয়টাকে গুরুত্ব সহকারে নেন এবং একশনে যান। কিন্তু তথ্য প্রমাণ সাপেক্ষে দিন সাতেক পর ধর্ষক হিসেবে যখন ধরা পড়ে সেই লোকটি, যাকে মেয়েটি থানায় ধরে এনেছিলো তখন নূরুল হাবীব প্রথমে ‘থ’ মেরে যায়। ঘটনার কাকতালীয়তা কিংবা আকস্মিকতায় তার চাকুরি জীবনের সব অভিজ্ঞতা ম্লান হয়ে যায়। লোকটি ধর্ষক। ফলবিক্রেতা রিজভী মিয়ার মেয়েটি নিখোঁজের ডায়েরি হবার তিনদিন পর উদ্ধার হয়েছে মৃতদেহ আর তার সাতদিন পর ধরা পড়েছে ধর্ষক লোকটি। সবমিলিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে ১০ দিন। কিন্তু মেয়েটি লোকটিকে ধরে এনেছিল প্রায় একমাস আগে। সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যায় নূরুল হাবীবের। যাবতীয় আইনী প্রক্রিয়া শেষ করে লোকটিকে কোর্টে চালান দিতে যে কয়দিন লাগে, ভেতরে ভেতরে এক অস্থির উত্তাপ তাড়া করে তাকে। ঘোরগ্রস্ত লাগে মাতালের মতো...।
সেদিন সন্ধ্যায় মেয়েটির ঠিকানার উদ্দেশ্যে যেতে যেতে নূরুল হাবীব আকাঙ্খিত শরীরের মোহ নাকি ঘটনার বিস্ময় কিসে যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। শহর থেকে বের হয়ে আসার পর পুরো রাস্তা কেউ দেখেছে কিনা, কখন তার রিক্সা ঠিকানাটির সামনে দাঁড়িয়েছে সে টেরই পায় না। রিক্সাচালকের ডাকে তার হুশ ফেরে। মেয়েটিকে ঘটনার রহস্য জিজ্ঞেস করার সকল প্রস্তুতি ছিলো তার, গত কয়েকদিন সব ব্যস্ততার ভীড়ে ভেতরে ভেতরে জেরার প্রশ্ন তৈরি করেছে সে। মেয়েটার শারিরীক সান্নিধ্যে যাবার অজুহাত যতোটা, তার চেয়েও বেশি বিস্ময়ের কৌতুহল। কিন্তু ঘরে ঢুকেই সব পূর্বপ্রস্তুতি ঝুরঝুরিয়ে ভেঙে পড়ে। মেয়েটার অলঙ্ঘনীয় আকর্ষণে সব গুড়ো হয়ে সোহাগে-আদরে-আহ্লাদে মিশে বিলীন হয়ে যায়। কিছুই জিজ্ঞাসা করা হয় না।
হয়তো আর জিজ্ঞাসা করার দরকারও পড়তো না। মেয়েটার দুর্দমনীয় আকর্ষণে সে বারবার ছুটে ছুটে যেতো। পরিতৃপ্ত হয়ে নাক ডেকে ঘুমাতো বেঢপ রুমেলার পাশে।
এদিকে আইনও তার নিজস্ব গতিতেই চলছিল। ধৃত ধর্ষকের জামিনের আবেদন বারবার নাকচ হচ্ছিলো।
কিন্তু দ্বিতীয়বার ঘটনাটা ঘটলো। সেদিন মেয়েটি কখন কীভাবে তাকে ভুলিয়ে পাশের উপজেলায় নিয়ে গেলো সে টেরই পেলো না। আচ্ছা তার হয়েছেটা কী? নিজেকেই নিজে চিমটি কাটে নূরুল হাবীব। গত রাতটা সে মেয়েটির ঘরে কাটিয়েছে, এটুকু তার মনে আছে। রুমেলা জানে, কিংবা জানার ভান করে, নানা অপারেশানের কাজে তার প্রায়ই এমন বাইরে রাত কাটাতে হয়। কোন সন্দেহ-আপত্তি-উচ্চবাচ্য করে না। কিন্তু রাতের পর সকালবেলা এই পাশের উপজেলা পর্যন্ত আসার ঘটনাটা কিছুতেই মনে করতে পারে না সে। মেয়েটি তাকে নিয়ে দাঁড়ায় যে লোকটির সামনে, রাস্তার মোড়ে বসে পান-সুপারি বিক্রি করছে সে। হাঁটুর উপর তোলা লুঙ্গি, গায়ে ময়লা চিটচিটে স্যান্ডো গেঞ্জি। গেঞ্জি ফুঁড়ে বেরিয়ে থাকা কলসির তলার মতো ভুঁড়ি, কুতকুতে চোখের কোনায় সাদা বর্জ্য। মেয়েটির আবদার তাকে এক্ষুনি গ্রেফতার করতে হবে। সেই পুরোনো অভিযোগ—লোকটি ধর্ষক। আরে কবে কোথায় কখন কাকে ধর্ষণ করেছে সে? এবারও কিছুই বলতে পারেনা মেয়েটি। আরে পাগল নাকি! যখন পরিপূর্ণ হুঁশ ফেরে নূরুল হাবীবের, দ্রুত রিক্সায় উঠে বসে সে। এই মেয়েটিকে না চেনার কথা নয় কারো, তার সাথে প্রকাশ্য দিনের আলোতে পুলিশ অফিসার নূরুল হাবীবকে দেখা গেছে। বলা যায়না কাল স্থানীয় পত্রিকায় খবর হয়ে যেতে পারে। আর মফস্বলের পত্রিকাতো এসব খবরের জন্য তীর্থের কাকের মতো ওৎ পেতে থাকে।
‘আরে পাগল নাকি’ বলে মেয়েটিকে উপেক্ষা করে চলে এলেও নূরুল হাবীব আগের ঘটনাটা ভোলেনি। বরং পুনরায় সেই আকস্মিক কাকতাল ঘটে কিনা সে ভাবনায় অফিসে ঠিকঠাক মন:সংযোগ করতে পারে না। এবং যথারীতি দিন তিনেক পর পদ্মবিলের পাড় থেকে ধর্ষিত-রক্তাক্ত মেহেরুন্নেছা নামের মেয়েটির মৃতদেহ উদ্ধার হলে, সে আর প্রমাণের অপেক্ষা না করে তৎক্ষনাৎ সেই উপজেলার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ফোন করে সেই পানওয়ালার গ্রেফতার নিশ্চিত করে।
গ্রেফতারের পর সব তথ্য-প্রমাণে এই পানওয়ালাই ধর্ষক প্রমাণিত হলে সবাই দ্রুত আসামী ধরার কৃতিত্বের মূল রহস্যটা ভুলে যায়। নূরুল হাবীব কী করে ঘটনা জানলো আর আসামী ধরতে সহায়তা করলো কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেনা, কিংবা তুলতে ভুলে যায়। ভুলতে পারেনা শুধু নূরুল হাবীব। সে যথারীতি মেয়েটির কাছে যায়। মেয়েটি কোন প্রসঙ্গ ওঠায় না। বারবার তার কৌতুহল নিবৃত্তির সকল প্রস্তুতি ভেস্তে যায়। কিছুই জিজ্ঞাসা করা হয় না।
কিন্তু আজ! আজ এতো রাতে মেয়েটি এস.পি স্যার পর্যন্ত কেনো? উত্তরটা এস.পি স্যার নিজেই দেয়। বলে শোনেন, মহিলার অভিযোগ: এর আগে আরো দু’জন ধর্ষককে আপনার কাছে নিয়ে গিয়েছিলো আপনি গুরুত্ব দেন নি। এবার তাই সে সরাসরি আমার কাছে এসেছে। স্যার...স্যার...উদভ্রান্তের মতো কিছুটা আদব ভুলে এস.পি স্যারকে থামায় সে। মেয়েটি যে তার সাথে রাত কাটানোর জন্য অভিযোগ নিয়ে আসে নি, বিষয়টি তাকে যতোটা নির্ভার করে তৃতীয়বারের মতো মেয়েটির অদ্ভুত অভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আসার ঘটনায় সে বিভ্রান্ত বোধ করে। সে হড়বড় করে পূর্বের ঘটনাগুলো বলতে থাকে এস.পি স্যারকে, বলতে বলতে ঘামতে থাকে নূরুল হাবীব। দরদর করে সে ঘাম ঘরের এসির ঠান্ডা বাতাসকে অগ্রাহ্য করে ইউনিফর্ম গলে পা বেয়ে কার্পেটে শুষে যেতে থাকে।
এস.পি নিজেও কিছুটা ঘেমে যায় বৃত্তান্ত শুনে। ঠিক এরকমই একটা অভিযোগ নিয়েই এসেছে মেয়েটি। নূরুল হাবীবতো এখনো শোনেইনি সেটা, কিন্তু মিলে গেছে বর্তমান অভিযোগটির সাথে। এবার একেবারে শহরের সম্ভ্রান্ত এক ঘরের ভেতরে। কী করে বিনা অভিযোগ, বিনা ঘটনায় সেই বাড়িতে প্রবেশ করে তারা। অথচ পূর্বের দুই দুইটি ঘটনা প্রমাণ দিচ্ছে, এমন ঘটনা অবাস্তব নয়।
দুশ্চিন্তায় পড়ে যান এস.পি সাহেব। নানা ধাপের চাকুরি জীবনে নানা বৈচিত্র্যময় বীভৎস ভয়াবহ ক্রাইম মোকাবেলা করেছেন তিনি। কিন্তু এমন অদ্ভুত সমস্যায় পড়েননি কখনো। নূরুল হাবীবকে চোখ-কান খোলা রাখতে আদেশ দেন সে রাতে। আর ঠিক দুদিনের মাথায় সেই সম্ভ্রান্ত বাড়িতে বারো বছরের মেয়েটিকে ধর্ষিত রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করার ঘণ্টা পার না হতেই মেয়েটির গৃহশিক্ষককে গ্রেফতার করে পুলিশ।
ডায়েরি, কোর্টে চালান দেয়া ইত্যাদির দায়িত্ব অন্য অফিসারের হাতে দিয়ে এবার নূরুল হাবীব লক্ষ্য নির্দিষ্ট ও দৃঢ় করে ছোটে সেই রহস্যময়ী মেয়েটির সন্ধানে। এস.পি স্যারের রুম থেকে বের হওয়ার পর থেকে আর মেয়েটিকে খুঁজে পায়নি সে। শহরতলীর নার্সারির পেছনের ঘরটি তালাবদ্ধ। নার্সারির মালিককে জিজ্ঞেস করে উত্তর পায়, এতো শহর ছেড়ে চলে যাওয়া ডাঃ হাফিজউদ্দিনের চেম্বার। এখানে বসে রোগী দেখতেন তিনি। চলে যাবার পরতো এ ঘর আর খোলা হয়নি।
খটকা লাগে নুরুল হাবীবের। সে সব খুলে বলতেও পারেনা। বলতে না পারার অস্বস্তি, আর নার্সারির মালিকের দেয়া তথ্যের আকস্মিকতা তাকে অস্থির করে। তার দমবন্ধ লাগে। গত একবছরে রাতের পর রাত কাটিয়েছে সে এ ঘরে। কেমনে এ কথা সে এই আম পাব্লিককে বলে! মেয়েটিই বা কোথায় উধাও হলো! ঘুমের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে লাফিয়ে উঠে সে এক অজানা আতঙ্কে। না, এর রহস্য তাকে জানতেই হবে।
পুলিশী দায়িত্বের সব ভাবভঙ্গ, কাঁটাতার গুটিয়ে সে একান্তে চা সিগারেট খেয়ে ভাব জমায় নার্সারির মালিকের সাথে। একথা সেকথায় নানা প্রসঙ্গে ডাঃ হাফিজ উদ্দিনের প্রসঙ্গ উঠায়। কিন্তু নার্সারির মালিক চতুর লোক, কিছুতেই মুখ খুলে না। সপ্তাহ খানেক চেষ্টা করার পর, অর্ধেক বাড়ি ডাঃ হাফিজউদ্দিন বিক্রি করতে পারেন নি আর তিনি এখন ঢাকায় ছেলের কাছে থাকেন ছাড়া আর কোন খবরই উদ্ধার করতে পারে না নূরুল হাবীব।
হাল ছেড়ে দেবে যখন, তখন একদিন পুলিশ ধর্ষণ প্রবণ এলাকা হিসেবে গত পাঁচ বছরে ডায়েরিকৃত ধর্ষণ মামলার হিসেব চেয়ে পুলিশ সদর দফতর থেকে জরুরি মেইল পাঠায় তিন কর্মদিবসের সময় দিয়ে। দ্রুত উত্তর তৈরি করতে তথ্য উপাত্তের সন্ধানে পুরনো ফাইল ঘাটতে গিয়ে বছর পাঁচেক আগের এক এজহার হঠাৎ হাতে আসে তার। ডাঃ হাফিজউদ্দিনের করা মামলা। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েটি তার শহরতলীর বাড়িতে ফেরার সময় রাস্তায় ধর্ষিত হয়েছে। সেখানেই সে আবিষ্কার করে ডাঃ হাফিজউদ্দিনের মোবাইল নম্বর। তৎক্ষণাৎ সাত রাজার ধন প্রাপ্তির মতো অভূতপূর্ব আনন্দ অনুভব করে নূরুল হাবীব।
দেরি করে না নূরুল হাবীব। সাথে সাথে নম্বরটাতে ফোন দেয়। রোগী হিসেবে পরিচয় দেয় নিজেকে। পুলিশ শুনলে ডাঃ হাফিজউদ্দিন দেখা করতে নাও রাজি হতে পারেন। সাবধানের মার নেই। ফোনেই ঠিকানা জেনে পরদিনই রওয়ানা হয় ঢাকার উদ্দেশ্যে। পরদিন তিনি যখন মোহাম্মদপুর শাহজাহান রোডে ডাঃ হাফিজউদ্দিনের সাইনবোর্ড খুঁজে পায় তখন সন্ধ্যা প্রায় অতিক্রান্ত। চেম্বারেই পাওয়া যায় তাকে। টিমটিমে আলোয় পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছেন ডাঃ হাফিজউদ্দিন, গলায় একটা স্টেথো। সামনে-পাশে গোটাকয় চেয়ার থাকলেও মানুষ বা রোগী কেউ নেই। নূরুল হাবীব ভনিতা না করে নিজের আসল পরিচয়টা দেয়। কিন্তু একটা মিথ্যে তাকে বলতে হয়, পাঁচ বছর আগের ধর্ষণ মামলাটি পুনঃতদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে সে। শোনে ডাঃ হাফিজউদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, বলেন, আমিতো কোন পুনঃতদন্ত চাইনি কে আপনাকে আবার দায়িত্ব দিলো, কেনো দিলো! নূরুল হাবীব মিথ্যে বলতে পারে অনায়াসে। কিন্তু এবার একটু আটকে আটকে যায়। বুকের ভেতরে কোন অচেনা আতঙ্ক হাতুড়ি পেটায়। পুলিশের চাকরিতে কত গলা কাটা, মাথা কাটা, নাড়িভুড়ি বের করা মৃতদেহ হাতিয়েছে সে, ঘাবড়ায়নি কখনো। আজ একটা সামান্য ধর্ষণ ঘটনার কেসে এক নড়বড়ে বৃদ্ধের কাছে ঘাবড়ে যেতে থাকে ভেতরে ভেতরে। কিন্তু বুঝতে দেয় না। কণ্ঠে যথাসাধ্য আত্মবিশ্বাস সংহত করে বলে, আপনি চান না ধর্ষকের বিচার হোক, আর কোন মেয়ে ধর্ষণের শিকার না হোক? ধর্ষনের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স, আপনি জানেন বোধহয়, এবার আপনার মেয়ের ধর্ষকের শাস্তি হবেই হবে, নিশ্চিত থাকুন।
এই উত্তেজিত ভাষণ স্থিতধী ডাঃ হাফিজউদ্দিনকে মোটেই বিচলিত করে না। তিনি নির্বিকার। নির্মোহ কণ্ঠে বলেন, শোনেন আমার মেয়েটা নেই। কাজেই আর কোন মেয়ে নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আপনি আসুন।
নেই মানে! হাফিজউদ্দিন পুনরায় পত্রিকাটা চোখের সামনে খুলে ঠাণ্ডা গলায় বলে, নেই মানে নেই। আত্মহত্যা করেছে। কেন যারা পুনতদন্তের নির্দেশ দিয়েছে তারা জানায়নি আপনাকে? আমার মেয়েটা আমার চেম্বারের কড়িকাঠে ঝুলে গলায় দড়ি দিয়েছে!
নূরুল হাবীব চমকে উঠে দাঁড়ায়। চেম্বারের কড়িকাঠে ঝুলে, নার্সারির মালিক জানিয়েছিল ডাঃ হাফিজউদ্দিন শহর ছেড়ে যাবার পর ঐ চেম্বারের দরজা আর খোলা হয়নি।
হাঁটুকাঁপা আতঙ্ক নিয়ে নুরুল হাবীব জানতে চায়, আমি আপনার মেয়ের একটা ছবি দেখতে পারি। ফ্যানের বাতাসে উড়তে থাকা পত্রিকাটিকে এক হাতে চেপে ধরে অন্য হাতে টেবিলের ড্রয়ার খুলে ডাঃ হাফিজউদ্দিন। ড্রয়ারের ভেতরে রাখা খয়েরি রং এর ডায়েরি থেকে একটা লেমিনেট করার ফটোগ্রাফ এগিয়ে দেয় নূরুল হাবীবের দিকে। নূরুল হাবীবের মনে হয় তার পায়ের নীচে মাটি প্রচণ্ড ভূমিকম্পে দ্বিখণ্ডিত হচ্ছে আর সে তলিয়ে যাচ্ছে ঠিকানাহীন অতল গহীনে...
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গল্প- একটি দিন by হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

উত্তর বাবাকে আর দিতে হয় না— মা ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন, 'খাবি আবার কী? মেয়ের জ্বর তা যেন বোঝেন না৷ হাড়মাস আমার জ্বালিয়ে খেলে৷'
রামরতনবাবু মৃদুস্বরে বলেন, 'আহা ছেলেমানুষ ওকে অমন করে বকছ কেন? ওরে রমা এবার তোর জ্বর ছেড়ে যাবে রে৷ তার পর তোকে ভাত দেব৷ এই দেখ না আর কটা দিন৷'
বাবার আশ্বাসবাণী শুনে রমার মুখে হাসি দেখা দেয়— বিছানার ওপরে উঠে বসে বলে, 'হ্যাঁ বাবা তাড়াতাড়ি আমার জ্বর সেরে দাও না, তার পর—'
রমা তার কথা শেষ করতে পারে না৷ কথার মাঝেই মা বলেন, 'হ্যাঁ গো, আজকে একটা ডাক্তার ডাকবে তো? আর তো পারা যায় না মেয়েটাকে নিয়ে৷ রোগে ভুগে ভুগে দেখ না মা আমার আধখানা হয়ে গেছে৷'
রামরতনবাবু কোনও উত্তর দেন না৷ ওদিক থেকে বড় মেয়ে রানী ডাকে, 'মা উনুন জ্বলে যাচ্ছে শিগগির এস— চায়ের জল হয়ে গেছে৷' সুরমার আর কথা বলা হয় না৷ মেয়ের ডাকে চলে যেতে হয়৷
রানী চা এনে দেয়৷ রামরতনবাবু তাঁর হোমিওপাথি চিকিৎসার বই এবং বাক্স নিয়ে বসেন৷ সুতোবাঁধা চশমাটা চোখে লাগিয়ে বইটাতে গভীর মনোনিবেশ করেন৷ খানিকটা পড়ে মুখে তুলে জিজ্ঞাসা করেন, হ্যাঁ রে, তোর গায়ে-হাতে ব্যথা আছে?'
রমা মাথা নেড়ে জবাব দেয়, হ্যাঁ বাবা, খু-উ-ব৷'
'কই গো, এখনও যে বাজারে গেলে না?' বলতে বলতে সুরমা এসে পড়ে৷ রামরতনবাবু যেন একটু থতমত খেয়ে গেছেন বলে মনে হয়৷ একদৃষ্টে কয়েক সেকেন্ড রামরতনবাবুর দিকে তাকিয়ে থেকে সুরমা বলে 'কী নুড়োর চিকিচ্ছে হচ্ছে তোমার? এই একটু আগে কথা হল ডাক্তার আনবার জন্যে তা সব বুঝি গুলে খেয়ে ফেললে? আচ্ছা তুমি কি মেয়েটাকে মেরে ফেলতে চাও? তোমার ওই ছাই-এর চিনি খেয়ে কি ওই অসুখ সারে? এত সস্তায় যদি অসুখ-বিসুখ সারত, তা হলে পয়সা খরচ করে আর কেউ ডাক্তারি পড়ত না৷ তোমার ওই মুন্ডুর চিকিচ্ছে শিকেয় তুলে রাখ৷ যদি মেয়েটাকে বাঁচাতে চাও তো ডাক্তার ডাক৷' শেষের দিকে গলা ভারী হয়ে আসে৷ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে সুরমা সশব্দে পা ফেলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়৷
রামরতনবাবুর মনটা খারাপ হয়ে যায়৷ ডাক্তার ডাকতে তাঁর অসাধ, না সত্যই তিনি মেয়েটাকে মারতে চান? মাসের শেষ— এখন টাকা হাতে নেই৷ শুধু তো ডাক্তার ডাকলেই হল না, তার সঙ্গে দামি দামি ওষুধের দাম জোগাবেন কোথা থেকে? এ-মাসে আবার বাড়ির ট্যাক্স, ইনসিওরেন্স প্রিমিয়াম সব পড়ল এক সঙ্গে৷ রানীর বিয়ের জন্য তিনি ইনসিওর করেছেন৷ রানীর বয়স এখন বারো৷ বাংলাদেশে মেয়ের বিয়ে তো দিতেই হবে৷ সেই জন্য তিনি আগেই কাজ গুছিয়ে নিচ্ছেন৷ ভেতরে ভেতরে তিনি আবার নাকি পাত্রের চেষ্টাও করেন৷ যদি মেয়েটাকে কোনওক্রমে বাগদত্তা করে রাখা যায় তা হলে অনেকটা নিশ্চিত৷ এখন কেবল ভাবনা ছোট মেয়েটাকে নিয়ে৷ বারো মাসের মধ্যে ছ'মাস মেয়েটির অসুখ লেগেই আছে৷ একে তো দেখতে তেমন ভাল নয়, তার ওপর রোগে রোগে মেয়েটির শ্রী দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷ কী যে করবেন এটিকে নিয়ে— রামরতনবাবু আর ভেবে কূল কিনারা পান না৷ অগত্যা চটের থলিটা নিয়ে বাজারে চলে যান৷
ঠিক অফিস যাওয়ার সময়টিতে বৃষ্টি নামে৷ এই টিপটিপুনি কেরানি-ভেজানো বৃষ্টি লোককে একেবারে জ্বালাতন করে মারে৷ এ যেন নিয়ম করে আসে৷ অফিস যাওয়ার সময়টাতে বৃষ্টি, তার পরেই ধরে যায়৷
রামরতনবাবু কী আর করেন৷ অফিস তো যেতেই হবে৷ ছাতাটাকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ করেন৷ হঠাৎ সুরমা বলে ওঠেন, 'ডালিম আর কমলালেবু আনতে ভুলো না যেন৷ এবারে বড় মাগ্গি৷ ফলওলাগুলো যেন সব গলা কাটে৷ সেদিন ওই চাটুজ্যেরা কিনলে চার পয়সা জোড়া নেবু৷ তুমি তো পয়সা পয়সা বেশ নেবু আনো৷ ভুলো না যেন৷'
রামরতনবাবু দ্বিতীয়বার রাস্তায় পা বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে রানী বলে, 'আজ আমার রিবন আনতে ভুলো না যেন৷ লাল রঙের আনবে, বুঝলে বাবা? আর যদি লাল না-পাও তো আসমানি৷ দাঁড়াও বাবা লিখে দিচ্ছি, নয় তো তুমি আবার ভুলে যাবে৷'
একটুকরো সাদা কাগজে 'লাল কিংবা আসমানি রিবন' কথা কয়টি লিখে বাবাকে কাগজটা দেওয়ার জন্য বাইরে এসে রানী দেখে বাবা চলে গেছেন৷ রানীর মুখ গম্ভীর হয়ে যায়৷ পরক্ষণে চৌকিটার দিকে চেয়ে রানী চিৎকার করে ওঠে, 'মা বাবা খাবারের ডিবেটা ফেলে গেছে৷'
সুরমা মাছ রান্না ফেলে তাড়াতাড়ি উঠে এসে বলেন, 'যা, যা, দৌড়ে যা, এখনও বোধহয় মোড় পেরোয়নি, যা শিগগির যা৷ হ্যাঁ, শোন পেছনে ডাকিস না যেন৷'
এক হাতে খাবারের ডিবে আর এক হাতে কাগজের টুকরোটা নিয়ে রানী দৌড়তে থাকে৷ রামরতনবাবুর একটু আস্তে চলা অভ্যেস৷ রানী গিয়ে একেবারে সামনে হাজির হয়৷ খাবারের ডিবেটা হাতে দিয়ে বলে, 'বাবা তুমি খাবার ফেলে এসেছিলে কেন?' ডিবেটা হাতে নিয়ে রামরতনবাবু বলেন, 'যা, যা, বাড়ি যা, বৃষ্টিতে ভিজিসনি, অসুখ করবে৷'
রানী ফিরে যায়৷ বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই সুরমা বলে, 'বৃষ্টিতে ভিজলি তো? তোরা আমার হাড়মাস জ্বালিয়ে খেয়ে তবে ছাড়বি৷ কেন, ছাতাটা নিয়ে যেতে কী হয়েছিল৷ ছাতা ছাতা করে তো প্রাণ অস্থির করে তুলছিল তখন৷ নতুন ছাতাটাকে তো এক বার মাথায় দিতে দেখলাম না এ পর্যন্ত৷'
রানী মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে তাকে৷ তার যে কী দোষ হল, তা বুঝতে পারে না৷ ছাতা নেওয়ার সময়ই বা তখন কোথায়? দেরি হয়ে যাবে যে?
মাছের কড়াটা কলতলায় রাখার সময় সুরমার দৃষ্টি পড়ে মেয়ের হাতের দিকে— জিজ্ঞাসা করেন, 'হাতে ওটা কী দেখি?'
রানী হাতের দিকে চেয়ে দেখে— ওই যা! সেই কাগজটাই দেওয়া হয়নি বাবাকে৷ বাবা নিশ্চয়ই ভুলে যাবেন রিবন আনতে— হয়ত বা নীল রঙের এনে হাজির করবেন৷ রানীর চোখের কোণে জল দেখা দেয়৷ কাগজটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে কাঁদতে থাকে৷
কাগজের টুকরোর লেখা কয়টি পড়ে মা বললেন, 'আজ না-হয় কাল হবে তাতে কাঁদিস কেন? একটুতেই মেয়ের আলগা চোখের পানি বেরিয়ে আসে৷'
অফিস থেকে ফিরতে আজ রামরতনবাবুর একটু দেরি হয়৷ রানী বাবার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকে৷ রমা বাবার প্রতীক্ষায় থেকে থেকে ঘুমিয়ে পড়ে৷ রানী বলে, 'মা, বাবার আসতে আজ দেরি হচ্ছে কেন?' সুরমা ছেঁড়া সেমিজটা সেলাই করতে করতে বলেন, 'জানিনে বাপু৷' কার যেন জুতোর শব্দ শোনা যায়৷ অবশেষে রামরতনবাবু এসে পড়েন৷ হাতে তাঁর ফল তো নাই, রিবনও না৷ আছে কেবল একতাড়া কাগজ৷ রানী ছুটে আসে, 'কই বাবা, আমার রিবন?'
বিরক্ত হয়ে রামরতনবাবু উত্তর দেন, 'যা, যা, জ্বালাতন করিসনে বাপু৷ আমার কি মরবার সময় আছে? অফিসের কী কাজই না পড়েছে৷ নাকে দড়ি দিয়ে খাটিয়ে নিচ্ছে৷ আজ সাহেব কী বকুনি না দিলে৷ বাড়িতে কাজ এনে করতে হবে, এখন এত কাজ৷'
সুরমা আর কোনও কথা জিজ্ঞাসা করে না৷ মুখ গম্ভীর করে থাকে৷ রামরতনবাবু ততক্ষণে কাগজের তাড়াটা আলমারির মাথায় রেখে হাত-পা ধুয়ে আসেন৷ সুরমা একটা রেকাবিতে করে একটা সন্দেশ, এক গ্লাস জল এনে হাতে দেয়৷ কোনও কথা বলে না৷ রামরতনবাবু জিজ্ঞাসা করেন, 'আজ সমস্ত দিন রমা কেমন ছিল?' বারুদে আগুন পড়লে যেমন হয়, সুরমা জ্বলে উঠে বলে, 'তার সঙ্গে তোমার কী দরকার? তোমার কাছে তো তার বাঁচা-মরা দুই-ই সমান৷ মেয়েটির চিকিচ্ছে করাবে না, পথ্য দেবে না, ওকে তুমি মেরেই ফেলবে বলে ভেবেছ৷ আহা, মেয়েটা এত ফল ভালবাসে, তা একরত্তি ফল আনতে প্রবৃত্তি হল না?'
রামরতনবাবুর মেজাজও আজ তেমন ভাল থাকে না৷ অফিসে সাহেবের বকুনি খেয়ে অবধি তাঁর মন খরাপ৷ সুতরাং এক পশলা হয়ে যায়৷ অবশেষে সুরমা কেঁদে ফেলে৷ রামরতনবাবু আর বেশিদূর অগ্রসর হন না৷ আলমারির মাথা থেকে কাগজের তাড়াটা নিয়ে অফিসের কাজে বসে যান৷
রানী বলে, 'মা ভাত দাও না গো, বড় খিদে পেয়েছে৷' মা চিৎকার করে ওঠে, 'আমায় খাবি রাক্ষসী৷ তোদের সব নুন গিলিয়ে মারতে হয়৷ সন্তান পেটে ধরা যে কত জন্মের পাপ— এমন কেউ যেন না-করে, তোদের জন্যই না আমার আজ এই দশা৷ বেরিয়ে যা আমার সামনে থেকে৷'
রানী অবাক হয়ে যায়৷ এমন সময় ঝি এসে বলে, 'দিদিমণি, কড়াটা বার করে দাও না, ততক্ষণে মাজি৷' কী জানি কেন রানীও রেগে ওঠে৷ ঝাঁঝের সুরে উত্তর দেয়, 'যা, আমি পারব না, আমি তোর চাকর নই৷'
অগত্যা সুরমাকেই উঠতে হয়৷ ঝি গজগজ করতে করতে কড়া মাজে৷ ভাত বেড়ে সুরমা রানীকে বলে, 'যা বলগে যা, ভাত বাড়া হয়েছে৷' রানীকে আর বলতে হয় না৷ রামরতনবাবু উত্তর দেয়, 'হ্যাঁ যাচ্ছি৷'
খেতে খেতে রামরতনবাবু বলেন, 'বাঃ, চিংড়ির ডালনাটা তো বেশ হয়েছে৷' অমনি সুরমা বলে ওঠে, 'আর একটু দেব হ্যাঁ গা৷'
রামরতনবাবু বলেন, 'না না তোমাদের কম পড়বে৷' সুরমা বলে, 'না গো না৷ খাবার মধ্যে কেবল আমি, নাও না আর একটু৷'
কিছুক্ষণ নীরব থেকে রামরতনবাবু বলেন, 'হ্যাঁ ভাল কথা, আজ সলিলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল৷' সুরমা উৎসাহের সুরে বলে, 'কী বলে সে? পাস-টাস দিতে পারবে না? তোমার চেহারা দিনকে দিন যা হচ্ছে তা আর চোখে দেখা যায় না, মেয়েটারও অসুখ৷ চল না গো এই সামনের পুজোর ছুটিতে মধুপুরে ঘুরে আসি? তুমি কী বল?'
রামরতনবাবু বলেন, হ্যাঁ, সে তো রেলের পাস দেবে বলেছে৷ কিন্তু, শুধু পাস দিলেই তো আর যাওয়া হয় না৷ চেঞ্জে যেতে কত খরচ৷'
সুরমা জিজ্ঞাসা করে, 'কত খরচ হিসেব করে দেখ না৷ আজ রাত্তিরেই হিসেব কর কেমন!'
রামরতনবাবু ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন৷
সুরমা বলে, 'আমি এক্ষুনি খেয়ে আসছি, তুমি ততক্ষণ কাগজ-পেন্সিল নিয়ে বস না?'
এতে রানীরও উৎসাহ দেখা দেয়, বলে, 'হ্যাঁ বাবা চল না বেড়াতে অন্য কোথাও, কলকাতা যেন পুরনো হয়ে গেছে৷ হ্যাঁ মা, চল না?'
'কত দিন যে রেলে চড়িনি!'
খাওয়াদাওয়া সেরে সুরমা ঘরে গিয়ে দেখে রামরতনবাবু অঘোরে ঘুমোচ্ছেন৷
রানী বলে, 'মা, দেখলে মা, বাবা আর হিসেব করলে না৷'
সুরমা বলে, 'চুপ চুপ, চেঁচাসনি৷ সারাদিনের খাটুনির পর মানুষটাকে তোরা একটু ঘুমোতেও দিবি নে? যা গোলমাল করিসনি, শুয়ে পড়৷'
>>>২৪ এপ্রিল ১৯৮৮ আজকাল রবিবাসর-এ প্রকাশিত৷ (প্রথম প্রকাশ তিরিশ বছর আগে 'দেশ' পত্রিকায়৷)
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1403)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ▼ 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...