Showing posts with label কাদির কল্লোল. Show all posts
Showing posts with label কাদির কল্লোল. Show all posts

Saturday, March 7, 2020

৭ই মার্চের ভাষণ: শেখ মুজিব যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন by কাদির কল্লোল

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ এসেছিল এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে।
আন্দোলনের একপর্যায়ে মার্চের প্রথম দিন থেকেই উত্তাল হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাজপথ।
এর মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উড়ানো হয়েছে।
পাঠ করা হয়েছে স্বাধীনতার ইশতেহার এবং নির্বাচন করা হয়েছে জাতীয় সঙ্গীত।
কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার প্রশ্নে বা আন্দোলনের ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত কবে দেবেন, সেজন্যই ছিল মানুষের অধীর অপেক্ষা।
আওয়ামী লীগের প্র্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবের ঘনিষ্ট ছিলেন।
২০১৬ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মি. আহমেদ বলছিলেন, আন্দোলন এবং মানুষের আকাঙ্খা বিবেচনায় নিয়েই শেখ মুজিব ৩রা মার্চ পল্টনে ছাত্র সমাবেশে ৭ই মার্চ ভাষণ দেয়ার ঘোষণা করেছিলেন।
একদিকে আন্দোলনের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার ব্যাপারে চাপ ছিল।
সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণার দাবিতে ছাত্র নেতাদের একটা অংশ চাপ তৈরি করছিল।
অন্যদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখা হয়েছিল।
ফলে শেখ মুজিব ছাত্র নেতা থেকে শুরু করে জাতীয় নেতা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ সেই ঐতিহাসিক ভাষণ দিচ্ছেন। (ফাইল ফটো)
৬ই মার্চ রাতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দিন আহমেদসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতার সাথে আলোচনা করেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, "সামরিক শাসন তুলে নেয়া এবং সৈন্যদের ব্যারাকে ফেরত নেয়াসহ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি চারটি শর্তের ব্যাপারেই শুধু বঙ্গবন্ধু তাঁর সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করেছিলেন।"
"ভাষণ দিতে বাসা থেকে বেরোনোর সময় শেখ মুজিবকে তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বলেছিলেন - তুমি যা বিশ্বাস করো, তাই বলবে। ৭ই মার্চের সেই ভাষণ তিনি নিজের চিন্তা থেকেই দিয়েছিলেন। ভাষণটি লিখিত ছিলো না।''
৭ই মার্চ সকাল থেকেই ঢাকায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা এবং ছাত্র নেতাদের ভিড়।
দুপুর দু‌'টার দিকে আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদসহ তরুণ নেতাকমীদের সাথে নিয়ে শেখ মুজিব তাঁর বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিলেন জনসভার উদ্দেশ্যে।
এদিকে সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সে সময় রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল।
সেই রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ মানুষের অপেক্ষার পালা শেষ করে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী এবং হাতাকাটা কালো কোট পড়ে শেখ মুজিব উপস্থিত হয়েছিলেন।
মি. আহমেদ বলেছেন, আগের নির্ধারিত রাস্তা বাদ দিয়ে ভিন্নপথে তাঁকে সেখানে নেয়া হয়েছিল।
মঞ্চে সকাল থেকেই গণসঙ্গীত চলছিল। সেদিন শেখ মুজিব সেই মঞ্চে একাই ভাষণ দিয়েছিলেন।
৭ই মার্চে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা আসতে পারে । মানুষের মধ্যে এ ধরণের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, প্রায় ১৮ মিনিটের এই ভাষণে সবদিকই উঠে এসেছিল।
''যাতে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা না হয়, সেজন্য তিনি চারটি শর্ত দিয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার দায় নেননি।"
"অন্যদিকে, এই একটি ভাষণের মাধ্যমে তিনি একটি জাতিকে সশস্ত্র বাঙ্গালী জাতিতে রূপান্তর করেছিলেন। স্বাধীনতার বীজ তিনি বপন করেছিলেন,'' বলেছেন তোফায়েল আহমেদ।
আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ (ফাইল ফটো)
তিনি আরও বলেছেন, ''এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকো - এই বক্তব্যের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু একটা গেরিলা মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন।''
জনসভায় ছিলেন এমন অনেকে বলেছেন, লাঠি, ফেস্টুন হাতে লাখ লাখ মানুষ উত্তপ্ত শ্লোগানে মুখরিত থাকলেও শেখ মুজিবের ভাষণের সময় সেখানে ছিল পিনপতন নিরবতা।
ভাষণ শেষে আবার স্বাধীনতার পক্ষে শ্লোগান মুখর হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাস্তাগুলো।

Friday, December 6, 2019

এরশাদের পতন: পর্দার আড়ালে যা ঘটেছিল by কাদির কল্লোল

নয় বছর ক্ষমতায় ছিলেন এরশাদ
লাস্ট আপডেট- ৬ ডিসেম্বর ২০১৮: ১৯৯০ সালের এই দিনে, ৬ই ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। দিনটিকে আওয়ামী লীগ 'গণতন্ত্র মুক্তি দিবস', বিএনপি 'গণতন্ত্র দিবস' এবং এরশাদের জাতীয় পার্টি 'সংবিধান সংরক্ষণ দিবস' হিসেবে পালন করে থাকে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এই দিনকে 'স্বৈরাচার পতন দিবস' হিসেবেও পালন করে থাকে।
গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হলেও প্রায় তিনদশক ধরে রাজনীতিতে কিভাবে টিকে রয়েছেন জেনারেল এরশাদ? বিবিসি নিউজ বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন:
১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসের এক তারিখে ঢাকা সেনানিবাসে এক জরুরী বৈঠকে বসেন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা।
সে বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদ যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, সে প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে আলোচনা করা।
জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এর কয়েকদিন আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় চিকিৎসক নেতা ডা: শামসুল আলম মিলনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
সেনানিবাসের ভেতরে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে দেশের চলমান সংকট একটি রাজনৈতিক বিষয় এবং এ সঙ্কট সমাধানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।
ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা আরো সিদ্ধান্ত নিলেন যে চলমান রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর করনীয় কিছু নেই।
এমন অবস্থায় প্রেসিডেন্ট এরশাদ সেনা সদরকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে দেশে সামরিক আইন জারী করা হবে।
এরপর ডিসেম্বরের তিন তারিখে তখনকার সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন প্রেসিডেন্ট এরশাদের সাথে দেখা করতে যান।
সেনা কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন যে সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন যেন প্রেসিডেন্ট এরশাদকে পদত্যাগের জন্য সরাসরি বলেন।
কিন্তু সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি পদত্যাগের কথা না বললেও তিনি জানিয়ে দেন যে দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অফিসাররা কোন দায়িত্ব নিতে রাজী হচ্ছে না।
তখন ঢাকা সেনানিবাসে ব্রিগেডিয়ার পদে কর্মরত ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, যিনি পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। মি: চৌধুরী ২০১৩ সালে পরলোকগমন করেন।
২০১০ সালে বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাতকারে জেনারেল চৌধুরী বলেন, " উনি (সেনাপ্রধান) প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন আপনার উচিত হবে বিষয়টির দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান করা। অথবা বিকল্প কোন ব্যবস্থা নেয়া।"
জেনারেল এরশাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সামরিক শাসন জারীর বিষয়ে সেনাবাহিনী একমত নয় বলে প্রেসিডেন্টকে পরিষ্কার জানিয়েছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান।
প্রেসিডেন্টের সাথে সেনাপ্রধানের বৈঠক নিয়ে তখন দেশজুড়ে নানা গুঞ্জন। সেসব বৈঠক নিয়ে নানা অনুমান তৈরি হয়েছিল সে সময়।
একদিকে ক্যান্টনম্যান্টের ভেতরে নানা তৎপরতা অন্যদিকে রাস্তায় এরশাদ বিরোধী বিক্ষোভ। সব মিলিয়ে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির তৈরি হয়েছিল।
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি বলেন যে তার পদত্যাগ করা উচিত।
"পদত্যাগের কথাটা জেনারেল সালামই প্রথম সরাসরি বলেন। অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। আর্মি অধৈর্য হয়ে যাচ্ছে," বলছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী।
জরুরী অবস্থা এবং কারফিউর মতো কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমেওে যখন গণআন্দোলন দমানো যাচ্ছিল না তখন সেনাবাহিনীর দিক থেকে নেতিবাচক মনোভাব দেখলেন মি: প্রেসিডেন্ট এরশাদ।
এমন অবস্থায় ডিসেম্বরের চার তারিখ রাতেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন জেনারেল এরশাদ।
তখন এরশাদ সরকারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন মওদুদ আহমেদ. যিনি বর্তমানে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা। মি: আহমেদ জানালেন সেনাবাহিনীর মনোভাব বোঝার পরেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি মি: এরশাদ।
সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন মোকাবেলার জন্য তিনি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলো এরশাদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে তখনকার ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমেদকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবার জন্য বাংলাদেশে টেলিভিশনে পাঠিয়েছিলেন মি: এরশাদ।
উদ্দেশ্য ছিল, প্রেসিডেন্টের পরিকল্পিত নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা।
বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচনের প্রস্তাব আগেই বর্জন করার পরেও মি: এরশাদ চেয়েছিলেন ভাইস-প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরার মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত করা।
মি: এরশাদের নির্দেশ মতো ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমদ সন্ধ্যার সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে গিয়েছিলেন ভাষণ রেকর্ড করার জন্য। সে ভাষণ তিনি রেকর্ডও করেছিলেন।
সে ভাষণ রেকর্ড করার পর মওদুদ আহমদ যখন বাসায় ফিরে আসেন তখন তিনি জানতে পারেন প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এরপর কয়েক ঘন্টা পর মধ্যরাতে মওদুদ আহমেদকে আবারো বাংলাদেশ টেলিভিশনে যেতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেবার জন্য।
১৯৯০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মওদুদ আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, " প্রথম ভাষণ রেকর্ড করে আমি যখন বাসায় ফিরে আসলাম, তখন আমার স্ত্রী বললেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোন করেছিলেন। তখন আমি ওনাকে ফোন করলাম। উনি তখন বললেন, আমি এখনই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তখন আমি ওনার বাসায় গেলাম। তখন রাতে নিউজের পরে ওনার পদত্যাগের ঘোষণা দেয়া হলো।"
এরশাদ সরকারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন মওদুদ আহমেদ
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন সময় ছন্দপতন হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে একটি মিছিলে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হবার ঘটনা আন্দোলনে গতি এনেছিল।
আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি'র নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোট একই সাথে আন্দোলন কর্মসূচী নিয়ে এগিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও মাঠে ছিল।
১৯৯০ সালের অক্টোবর মাস থেকে ছাত্র সংগঠনগুলো 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের' ব্যানারে আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল।
সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বিএনপি সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের নেতা খায়রুল কবির খোকন।
তিনি বলছিলেন, ২৭শে নভেম্বর চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে হত্যার পর আন্দোলনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল।
"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে দখল করার জন্য বহিরাগত মাস্তানরা পরিকল্পিতভাবে ডা: মিলনকে হত্যা করা হয়েছিল। এটা ছিল আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট, " বলছিলেন মি: খোকন।
ডা: মিলন যখন রিক্সায় করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ডা: মিলনের সাথে একই রিক্সায় ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের তখনকার মহাসচিব ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।
অভিযোগ রয়েছে জেনারেল এরশাদ সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল চেষ্টার অংশ হিসেবে ডা: মিলনকে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, " আমার রিক্সাটা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় উপস্থিত হয়েছে তখন মিলন আরেকটি রিক্সায় করে আমাকে ক্রস করে সামনে চলে যাচ্ছিল। তখন আমি মিলনকে বললাম তুমি ঐ রিক্সা ছেড়ে আমার রিক্সায় আসো। এরপর মিলন আমার রিক্সায় এসে ডানদিকে বসলো। রিকশাওয়ালা ঠিকমতো একটা প্যাডেলও দিতে পারে নাই। মনে হলো সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের দিকে থেকে গুলি আসলো। গুলিটা মিলনের বুকের পাশে লেগেছে। তখন মিলন বললো, জালাল ভাই কী হইছে দেখেন। একথা বলার সাথে সাথে সে আমার কোলে ঢলে পড়লো। "
ডা: মিলনকে হত্যার পর জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন আরো তুঙ্গে উঠে। তখন জনগণের ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে শুরু করেছিল সেনাবাহিনী।
একইসাথে জেনারেল এরশাদের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল সেনাবাহিনী।
ডা: মিলন হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলন সামাল দিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ।
সেনা মোতায়েনের জন্য জেনারেল এরশাদ যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করেছিল।
প্রয়াত মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরীর বর্ণনা মতে, সেনাবাহিনী সৈনিকদের পাঠিয়ে রাস্তায় মোতায়েন করার পরিবর্তে রমনা পার্কে সীমাবদ্ধ করে রাখে। কমান্ডিং অফিসাররা সরকারের 'অপকর্মের' দায়িত্ব নিতে রাজী ছিলেন না।
জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা ছাড়লে কী হবে সে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনকারী দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ফর্মুলা ঠিক করে রেখেছিল।
সে ফর্মুলা মতে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিনমাস মেয়াদী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কথা ছিল।
কিন্তু সে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন সেটি তখন নির্ধারিত ছিলনা ।
ড: কামাল হোসেন তখন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন।
তিনি জানালেন, জেনারেল এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেবার পর আন্দোলনকারী দলগুলো তখনকার প্রধান বিচারপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন আহমদের বিষয়ে একমত হয়েছিল।
অস্থায়ী সরকার প্রধানের নাম আসার পর ৬ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দপ্তরে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হয়েছিল।
ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, " পাঁচ তারিখে বিরোধী দল থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আসলো যে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেব উপ-রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে তারপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির কাজ করবেন তিনি এবং তার অধীনেই একটি নির্দলীয় সরকার হবে। ছয় তারিখ বিকেল তিনটায় আমি রিজাইন করলাম। আমি রিজাইন করার পরে সাহাবুদ্দিন সাহেবকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট এপয়েন্ট করলেন প্রেসিডেন্ট সাহেব। তারপর প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিজে রিজাইন করলেন এবং তারপর সাহাবুদ্দিন সাহেব ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু করলেন।"
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে জেনারেল এরশাদ যখন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন রাস্তায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল সেটি ৬ই ডিসেম্বর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের কাছে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত বজায় ছিল।
ড: কামাল হোসেন তখন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন।

Wednesday, October 30, 2019

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ: জেনারেল থেকে রাজনীতিক হিসেবে উত্থান ও আস্থার সংকট by কাদির কল্লোল

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আপডেট- ১৪ জুলাই ২০১৯: বাংলাদেশে গণআন্দোলনের মুখে জেনারেল এরশাদের নয় বছরের শাসনের পতন হলেও তিনি রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছেন।
তিনি সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখলের পর জাতীয় পার্টি নামে দল গঠন করেন।
তবে তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে অন্য সব দলের বিরোধীতার বিষয়টি ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করাসহ কিছু সংস্কারের পদক্ষেপ নিলেও তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
জেনারেল এরশাদের শাসনের সময় ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী আনা হয়।
শেষপর্যন্ত তাঁর সরকারের পতনের পর তিনি জেলে গিয়েও সবদলের অংশগ্রহণে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এবং সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন পেয়ে ভোটের রাজনীতিতে একটা প্রভাব ফেলেছিল।
জেনারেল এরশাদের ঘনিষ্ট ছিলেন এমন একজন রাজনীতিক , যিনি পরে অন্য দলে গেছেন, তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, আন্দোলনের মুখে জেনারেল এরশাদকে যখন ক্ষমতা ছাড়তে হয়, তখন তাঁকে বিদেশে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। তিনি জেলে যাওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়েছেলেন। এটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল বলে ঐ রাজনীতিক মনে করেন।
তিনি উল্লেখ করেছেন, "জেনারেল এরশাদ বিদেশে না গিয়ে দেশে ছিলেন বলেই পরে রাজনীতিতে টিকে গেছেন।"
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, প্রায় তিন দশক ধরে দেশের ভোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির একটা প্রভাব থাকলেও বিভিন্ন সময় জেনারেল এরশাদের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে দলটি আস্থার সংকটেও পড়েছে।

এরশাদ উকিল হতে চেয়েছিলেন

জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ জন্মগ্রহণ করেন রংপুরে তাঁর নানার বাড়িতে ১৯৩০ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি।
তবে তাঁর শৈশব এবং স্কুলজীবন কেটেছে বাবা মা'র সাথে ভারতের কুচবিহারের দিনহাটায়।সেখান থেকেই তিনি এসএসসি পাস করেছেন।
স্কুল শেষ করে তিনি রংপুরে কারমাইল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছেন।
তাঁর ভাই এবং জাতীয় পার্টির নেতা জি এম কাদের জানিয়েছেন, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী নেয়ার পর উকিল হওয়ার চিন্তা থেকে ল'কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু আইন পড়া শেষ হওয়ার আগেই ১৯৫২ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়ে তাতে যোগ দেন।

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পরিবারিক আরেকটি নাম ছিল

তাঁর বাবা-মা এবং ভাই বোন বা কাছের আত্নীয়রা তাঁকে পেয়ারা নামে ডাকতেন।
এটি তাঁর ডাক নাম।
জি এম কাদের জানিয়েছেন, তাদের চার ভাই পাঁচ বোনের মধ্যে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ছিলেন মেজো। সবার বড় বোনের নাম ছিল পেয়ারী এবং সেই নামের সাথে মিলিয়ে মি: এরশাদের পরিবারে নাম ছিল পেয়ারা।
তাদের এক ভাই এবং দুই বোন আগেই মারা গেছেন।
মি: কাদের বলেছেন, তাদের বাবা মকবুল হোসেন পেশায় আইনজীবী ছিলেন এবং তিনি বাড়ি করেছিলেন কুচবিহারের দিনহাটায়। আর তাদের মা মজিরা খাতুন গৃহিনী ছিলেন।সেকারণে কুচবিহারের দিনহাটাতেই তাঁর বেড়ে ওঠা।
জেনারেল এরশাদের প্রথম স্ত্রী রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির নেত্রী এবং গত সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন।
নানা গুঞ্জনের প্রেক্ষাপটে ২০০০ সালে জেনারেল এরশাদ একজন ফ্যাশন ডিজাইনার বিদিশা ইসলামকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর এই নারী বিদিশা এরশাদ নামে পরিচিত হন। তবে সেই ঘর বেশি দিন টেকেনি।

জেনারেল এরশাদের ছাত্রজীবন কেমন ছিল?

জি এম কাদের জানিয়েছেন, তাঁর ভাই মি: এরশাদের খেলাধূলায় আগ্রহ বেশি ছিল। তিনি ছাত্রজীবনে ফুটবলার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
তখন ফুটবল জনপ্রিয় খেলা ছিল।
স্কুল এবং কলেজ জীবনে মি: এরশাদ রংপুর অঞ্চলে বিভিন্ন ক্লাবে ভাড়ায়ও ফুটবল খেলতে যেতেন। এছাড়া তিনি তখন থেকেই কবিতা লিখতেন এবং কারমাইকেল কলেজের সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেছিলেন বলে জি এম কাদের জানান।
জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দৈনিক বাংলায় তাঁর অনেক কবিতা ছাপা হয়েছিল। তা নিয়ে অবশ্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নানারকম আলোচনা ছিল।
তিনি আত্মজীবনী লিখেছেন। সেই বইয়ের নাম, ''আমার কর্ম আমার জীবন''। এছাড়া তিনি কয়েকটি কবিতার বইও বের করেছেন।

এরশাদের ক্ষমতা দখল

১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। সে সময় জেনারেল এরশাদ সেনাপ্রধান ছিলেন।
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর সে সময়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন এবং তাঁর নেতৃত্বে বিএনপিরই সরকার গঠিত হয়েছিল।
কিন্তু সেই সরকার বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি।
সে সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ে উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ছিলেন, বেশ আগে অবসর নেয়া সেই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিচারপতি আব্দুস সাত্তার সরকারের দু'মাস পরই জেনারেল এরশাদ কয়েকজন জেনারেলকে নিয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করে মন্ত্রীদের ব্যাপারে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেছিলেন এবং এভাবে দেশ চলতে পারে না বলে বার্তাও দিয়েছিলেন।
সাবেক ঐ সেনা কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, বিচারপতি সাত্তারকে বার্তা দেয়ার পর জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন।
শেষপর্যন্ত ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ জেনারেল এরশাদ বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন।

জেনারেল থেকে তাঁর রাজনীতিক হওয়ার গল্প

ক্ষমতা দখলের পর দেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে তিনি বাংলাদেশে দ্বিতীয় বারের মতো সামরিক শাসন জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
তিনি নতুন এক শ্লোগান চালু করেছিলেন, সেটি ছিল ''নতুন বাংলাদেশ, গড়ব মোরা...।''
তিনি তাঁর সেই শ্লোগান দিয়ে গানও লিখেছিলেন।
তবে তাঁর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্র্রতিবাদ করেছিলেন ছাত্ররা।
১৯৮২ সালেই ১১ই সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসকে কেন্দ্র করে মজিদ খানের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি বাতিলের দাবি নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিল। সে বছরই নভেম্বরে তৈরি হয়েছিল সব ছাত্র সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ ফোরাম ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।
পরের বছর ১৯৮৩ সালের ১৪ এবং ১৫ ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্ররা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নামলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছিল।
জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনে সেই প্রথম রক্ত ঝরেছিল ঢাকার রাজপথে।
এরপরও তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ থেকে আন্দোলন গড়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন।
জেনারেল এরশাদ আন্দোলন দমনের চেষ্টার পাশাপাশি নিজে রাজনীতিক হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তৎপর হলেন।
তিনি ১৯৮৬ সালের শুরুতে বিভিন্ন দল থেকে মিজানুর রহমান চৌধুরী, শাহ আজিজ এবং মওদুদ আহমেদসহ অনেক রাজনীতিককে নিয়ে জাতীয় পার্টি নামের দল গঠন করেন।
সেই দল থেকে মনোনয়ন নিয়ে তিনি নির্বাচন দিয়ে রাষ্ট্রপতি হন।
এরই মাঝে রাজনৈতিক দলগুলো তাঁর বিরুদ্ধে যৌথভাবে আন্দোলন শুরু করেছিল।
জেনারেল এরশাদ তখন সেই ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচন করেছিলেন। সেই সংসদ মাত্র এক বছর টিকেছিল।
১৯৮৮ সালে তিনি মূল ধারার দলগুলোর বয়কটের মুখে একতরফা নির্বাচন করলেও তিনি বেশিদিন টিকে থাকতে পারেননি।
দুই বছর পরই আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং বামপন্থী দলগুলোর অর্থ্যাৎ তিনি জোটের গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদের শাসনের পতন হয়।
তাঁর শাসনের সময় আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে অনেকে নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে নূর হোসেন এবং ডা: মিলনের নাম এখনও মুখে মুখে উচ্চারিত হয়।
জেনারেল এরশাদের পতনের দিনটি স্বৈরশাসকের পতন দিবস হিসেবে এখনও বিভিন্ন দল ও সংগঠন পালন করে থাকে।
তিনি মোট নয় বছর ক্ষমতায় ছিলেন।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম

জিয়াউর রহমান যেমন ১৯ দফা কর্মসূচি নিয়েছিলেন, তার আদলে জেনারেল এরশাদ ১৮ দফা উন্নয়নের কর্মসূচি নিয়ে রাজনীতিতে নেমেছিলেন।
তিনি ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেছিলেন এবং দেশকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
হাইকোর্ট বা উচ্চ আদালতকে রাজধানী ঢাকার বাইরে অন্য বিভাগীয় শহরগুলোতেও স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, বিরোধীতার মুখে সেই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।
তাঁর সময়ই প্রথম উপজেলা এবং জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছিল। তাঁর ক্ষমতার শেষদিকে উপজেলা নির্বাচনও হয়েছিল।
তাঁর এই পদক্ষেপগুলোকে বিশ্লেষকদের অনেকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেন।
তাঁর সময়ে ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী আনা হয়েছিল।
তখন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-প্রধান দুই দলই এর বিরোধীতা করেছিল।
কিন্তু পরে কোন দলই আর এর পরিবর্তন করেনি।
এরশাদ সরকারের একজন প্রভাবশালী নেতা, যিনি এখন অন্য রাজনৈতিক দলে আছেন, তিনি বলেন যে রাজনৈতিক সংকট সামাল দেবার জন্য একটি কৌশল হিসেবে মি: এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করেন।

রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব

জেনারেল এরশাদের শাসনের পতনের পর তাঁকে জেলে নেয়া হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা এবং দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ডজনখানেক মামলা হয়েছিল।
১৯৯১ সালে গণতন্ত্র আবার ফিরে আসার পর তিনি জেলে থেকেই সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে তাঁর দল জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন পেয়েছিল। তিনি রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপরের সংসদ নির্বাচনগুলোতে তিনি নিজে কখনও পরাজিত হননি।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি জেলে থেকেই আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের জন্য সমর্থন দিয়েছিলেন।
তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ছয় বছর জেল খাটার পর জেনারেল এরশাদ জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।
তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলোর কয়েকটিতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। কোনটিতে খালাসও পেয়েছেন।
এসব মামলার কারণে তিনি স্বাধীন অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করতে পারেন নি।
জাতীয় পার্টি কয়েকটি ভাগে বিভক্তও হয়েছে।
এরপরও ভোটের রাজনীতিতে তাঁর দল জাতীয় পার্টির একটা অবস্থান তৈরি হয়। রংপুর অঞ্চলের ১৭টি আসনে জাতীয় পার্টির ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।
নির্বাচন এলেই আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি - প্রধান দুই দলই তাঁকে সাথে নেয়ার চেষ্টা করে। তবে গত কয়েকটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের সাথেই থাকতে হয়েছে।
জাতীয় পার্টি গত কয়েকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাথে জোট থেকে অংশ নিয়েছে। যদিও দলটি তাদের দলীয় প্রতীক লাঙল নিয়ে লড়েছে।

আস্থার সংকট

জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে টিকে গেলেও জেনারেল এরশাদ এবং তাঁর দল নিয়ে মানুষের মাঝে আস্থার কিছুটা অভাব আছে।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের সময় জেনারেল এরশাদ তাঁর বক্তব্য বা অবস্থান বার বার বদল করেছিলেন। ফলে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।
গত দশম সংসদে তাঁর দলের তিনজন নেতা সরকারের মন্ত্রিসভায় ছিলেন এবং তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ছিলেন।
একইসাথে তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ ছিলেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা।
সর্বশেষ ২০১৮সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হিসেবে অংশ নিয়ে ২২টি আসন পায়।
এরপর ৮৯ বছর বয়সে জেনারেল এরশাদ এই সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হন এবং জাতীয় পার্টি বিরোধীদলের আসনে বসে।
জেনারেল এরশাদ তাঁর অনুপস্থিতিতে ছোট ভাই জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টির দায়িত্ব দিয়ে গেছেন।
তিনি উত্তরসূরি নির্ধারণ করতে গিয়েও কয়েকবার সিদ্ধান্ত বদল করেছেন।
২০১৯ সালের শুরুতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সময় জি এম কাদেরকে দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন।
মাসখানেক পর চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেই জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে জেনারেল এরশাদ তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদকে তাঁর পরবর্তী অবস্থানে নিয়ে আসেন।
অল্প কিছুদিন পরই মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মধ্যরাতে জেনারেল এরশাদ হুইল চেয়ারে করে অসুস্থাবস্থায় সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে হাজির হন।
তখন তিনি আবার জিএম কাদেরকে তাঁর উত্তসূরি হিসেবে ঘোষণা করেন।
এনিয়ে দলটিতে জেনারেল এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং ভাই জে এম কাদেরের সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট থেকে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং আরেক সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দল ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।

Friday, October 18, 2019

রাজনীতিতে আবারও ভারত বিরোধিতা, বিএনপি সবচেয়ে সরব by কাদির কল্লোল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও ভারত বিরোধিতা প্রকাশ্যে জোরালোভাবে দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় পর বিরোধীদল বিএনপি সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছে।
দলটির নেতারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলো বাদ দিয়ে একতরফা কিছু সিদ্ধান্ত হওয়ায় বিএনপি তার প্রতিবাদ করছে।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের সাথে সিদ্ধান্ত বা চুক্তিগুলো নিয়ে বারবার ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও কেন ভারত বিরোধিতা, এই প্রশ্নে দলগুলোর পাশাপাশি বিশ্লেষকরাও বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরছেন।

বিএনপির ভারত বিরোধী অবস্থান প্রকাশ্যে

দলটি দু'দিন আগে ঢাকায় যে সমাবেশ করেছে, এর মূল বিষয়ই ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রতিবাদ করা।
সমাবেশে বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যেই ছিল ভারতের সাথে সম্পর্ক নিয়ে কড়া সমালোচনা।
সাত আট বছর পর বিএনপি আবার প্রকাশ্যে ভারত বিরোধী অবস্থান নিয়ে এই সমাবেশ করে।
২০১২ সালের অক্টোবরে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সে সময় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে ভারত সরকারের আমন্ত্রণে দিল্লি সফর করেছিলেন। এরপর থেকে জেলে যাওয়া পর্যন্ত বিএনপি নেত্রী ভারতের বিরোধিতা বা সমালোচনা করে কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি দেননি।
এমনকি চট্টগ্রাম এবং মংলা বন্দর নিয়ে বিএনপি আগে রক্ষণশীল অবস্থানে থাকলেও গত বছর যখন এই বন্দর ভারতকে ব্যবহার করতে দেয়ার ব্যাপারে চুক্তি হয়, তখন দলটি সতর্ক বক্তব্য তুলে ধরেছিল বিবৃতির মাধ্যমে।
কিন্তু এখন আবার ভারত বিরোধী অবস্থান নিয়ে মাঠে নামার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লী সফরে ভারতের স্বার্থে একতরফা সব চুক্তি হয়েছে, সেকারণে তারা প্রতিবাদ করছেন।
"একতরফাভাবেতো বন্ধুত্ব হয় না। বন্ধুত্ব হচ্ছে টু ওয়ে ট্রাফিক। দেয়া নেয়ার ক্ষেত্রেতো একটা সমতা থাকতে হবে, একটা ন্যায্যতা থাকতে হবে। সেখানে আমরা দেখছি একটা বড় ধরণের অভাব বা ঘাটতি থাকছে।"
"তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে কিছু করা হলো না। কিন্তু হঠাৎ করে ফেনী নদী থেকে পানি দিয়ে দেয়া হলো। এখানেই মানুষের মাঝে সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে।"
বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী আরও বলেছেন, "বাংলাদেশের জনগণ মনে করে, দুই দেশের জনগণের মাঝে বন্ধুত্ব নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দলকে তারা আস্থায় নিয়ে তাদেরকে দিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বিষয়গুলো করিয়ে নেয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের যে প্রতিক্রিয়া, সেই প্রতিক্রিয়াই আমরা তুলে ধরছি।"

বিএনপির ভারত বিরোধী অবস্থান পরিচিত ছিল, এখন তাহলে তাদের অবস্থান কেন আলোচনায় আসছে?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে তিস্তা নদীর পানি বন্টন ইস্যুসহ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়গুলোতে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি।
এর বিরোধিতা করে ইসলামপন্থী কয়েকটি দল মাঠে নামে।
এরমধ্যে ভারত ইস্যুতে দীর্ঘসময় সতর্ক থাকা বিএনপি আবার মাঠে নামায় তাদের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
কারণ দলটির পক্ষ থেকে গত কয়েক বছর ভারতের সাথে একটা ভাল সম্পর্ক তৈরি চেষ্টা অনেকসময় দৃশ্যমান হয়েছে।
বিএনপি সিনিয়র কয়েকজন নেতা গত বছর ভারত সফরেও গিয়েছিলেন।
দলটির একাধিক সিনিয়র নেতা বলেছেন, তাদের সম্পর্ক তৈরির চেষ্টায় ভারতে সেভাবে সাড়া দেয়নি, সেকারণে দলটির এমন চেষ্টার সাথে জড়িত অংশটি কিছুটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। ফলে বিএনপিতে ভারত বিরোধিতার বিষয়টি আবার মাথা চাড়া দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে আবার বলছেন, ভারতের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যও এটি বিএনপির একটি কৌশল হতে পারে।

আওয়ামী লীগ কেন বারবার ব্যাখ্যা দিচ্ছে?

আওয়ামী লীগ বা সরকারও ভারতের সাথে চুক্তিগুলো নিয়ে যুক্তি বা ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছে।
দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলছেন, "বিএনপি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ইস্যু পাচ্ছে না। সেকারণে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে তারা মাঠে নেমেছে। এটা তাদের সস্তা রাজনীতি।"
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে বিএনপি জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সেজন্য সরকার সঠিক তথ্য তুলে ধরছে।
তবে দলটির অন্য একাধিক নেতার সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, আওয়ামী লীগ এবং সরকার ভারতের সাথে ভাল সম্পর্ক বহাল রাখছে। একইসাথে মানুষের মাঝে আবার ভারত বিরোধী মনোভাব জোরালো হচ্ছে কিনা, সেটাও তারা নজরে রাখছে।

বিশ্লেষকদের বক্তব্য:

বড় প্রতিবেশি দেশ হিসেবে ভারতের সাথে ভাল সম্পর্ক তৈরির বিষয়টি বিএনপিও বিবেচনায় নিয়েছিল। সেকারণে লম্বা সময় বাংলাদেশে রাজনীতিতে ভারত বিরোধিতা সেভাবে ছিল না।
কিন্তু বিএনপির সেই কৌশলে ফল তারা পাচ্ছে না। সেকারণে এখন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়গুলোর সুযোগ নিয়ে বিএনপি মাঠে নেমেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক রুকসানা কিবরিয়া বলেছেন, বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলোতে ভারতের উদাসীনতার কারণে ভারত বিরোধিতা পুরোনো পরিবেশ ফিরে আসছে।
"আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে ভারত সফর করলেন, তারপর রাজনৈতিক একটা ইস্যু তৈরি হয়ে গেছে। একটা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের বিষয়গুলোতে সমাধান আসেনি। এখন এটা রাজনীতি। এগুলো এখন যে যেভাবে পারবে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে।"
২০১২ সালের অক্টোবর মাসে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে খালেদা জিয়ার ভারত সফর। ছবিতে আরো দেখা যাচ্ছে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদকে (ফাইল চিত্র)

Sunday, October 6, 2019

জামিন আর প্যারোলের টানাহেঁচড়ায় ঝুলে গেছে খালেদা জিয়ার মুক্তির চেষ্টা by কাদির কল্লোল

বাংলাদেশে বিরোধীদল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তির প্রশ্নে সরকার ইতিবাচক সাড়া না দিলেও দলটির এমপিদের সমঝোতার সেই উদ্যোগ বা চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে।
তবে খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তির ব্যাপারে সরকারের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য তাঁর দলের এমপিদের চেষ্টা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়।
বিএনপির একাধিক এমপির সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, প্যারোলে নাকি জামিনে মুক্তি -- এই প্রশ্নের মুখে পড়েছিল তাদের সেই চেষ্টা।
তারা সরকারের আগ্রহ দেখেছেন প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে। কারণ তাতে শর্ত জুড়ে দেওয়া যায় এবং সরকারের আনুকূল্য দেখানোর বিষয় সরাসরি দৃশ্যমান হয়।
কিন্তু প্যারোলে মুক্তি হলে সেটা খালেদা জিয়া এবং বিএনপির জন্য রাজনৈতিক মৃত্যু হবে বলে দলটির নেতারা মনে করেন।
তারা চাইছেন, জামিনে মুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের নমনীয় অবস্থান।
এই সমঝোতার চেষ্টা যারা করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ। তার দলের নেত্রীর মুক্তির বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাথে দেখা করে আলোচনা করেছিলেন।
হারুনুর রশিদ বিবিসিকে বলেন, "প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আমিই ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছি, উনার (খালেদা জিয়া) জামিনে মুক্তির জন্যে। তো উনারা বারবার বিষয়টি এড়িয়ে যান। তারা আদালতের কথা বলেন যে এটা আদালতের এখতিয়ার এবং তাদের কিছু করার নেই।"
"আসলে আমাদের দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বয়স এখন ৭৬। উনি সাংঘাতিকভাবে অসুস্থ। উনার উন্নত চিকিৎসা দরকার। সেটা দেশের ভেতরে হোক আর দেশের বাইরে হোক। সেজন্য আমাদের এই উদ্যোগটা অব্যাহত থাকবে।"

এখন বিএনপি কেন এই উদ্যোগ নিয়েছে?

বিএনপির এমপিদের এই উদ্যোগ নিয়ে দলটির ভিতরে অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে মনে হয়।
তবে দলটির সব পর্যায়ের নেতা কর্মীরাই মনে করেন যে, এখন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নমনীয় অবস্থান ছাড়া খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তি সম্ভব নয়। কারণ বিএনপি তাদের নেত্রীর মুক্তির ইস্যুতে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক দিক থেকে চাপ সৃষ্টির তাদের চেষ্টাতেও কোন ফল হয়নি।
অন্যদিকে, জিয়া অরফানেজ এবং চ্যারিটেবল ট্রাস্টে দুর্নীতি যে দু'টি মামলায় খালেদা জিয়ার ১৭ বছরের সাজা হয়েছে, সেই দু'টিতেই হাইকোর্টে তাঁর জামিনের আবেদন নাকচ হয়েছে।
এখন তারা জামিনের আবেদন নিয়ে আপিল বিভাগে যাবেন। আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের পর আর কোথাও যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
সেখানে সরকারি আইনজীবী যাতে নমনীয় অবস্থানে থাকেন, সরকারের কাছ থেকে সেই সহযোগিতা চাইছে বিএনপি।
সেজন্য সরকারের সাথে সমঝোতা প্রয়োজন বলে দলটির অনেকে মনে করেন। সেখানে রাজনৈতিকভাবে কোন পরাজয় যাতে না হয়, সেটাও দলটির নেতৃত্ব বিবেচনা করছে।
শেষ পর্যন্ত বিএনপি নেতারা দেখাতে চান যে, খালেদা জিয়া আইনগত প্রক্রিয়ায় জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড: খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলছেন, তারা আইনগত প্রক্রিয়াতেই তাদের নেত্রীর মুক্তি চান।
"মানবিক দিক এবং তাঁর অসুস্থতার জন্য জামিনে মুক্তি দিয়ে আমরা তাঁর উন্নত চিকিৎসার দাবি জানিয়ে আসছি। আমরা আন্দোলন করছি, সমাবেশ করছি, মানববন্ধন করছি।"
"অতএব আমাদের দলের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আমরা নেত্রীর উন্নত চিকিৎসার জন্য জামিনে মুক্তি চাই। তিনি যেখানে মনে করবেন, সেখানে চিকিৎসা করাবেন। তবে তার আগে তাঁর মুক্তি প্রয়োজন।"

খালেদা জিয়ার কোথায় চিকিৎসা করাবেন - কোন শর্ত হয়েছে?

মুক্তি পেলে খালেদা জিয়া বিদেশে যাবেন নাকি দেশেই থাকবেন - এই প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে।
তাঁর দলের এমপিরাও বলেছেন, তিনি মুক্তি পেলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবেন।
তাঁর একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, ডায়াবেটিস, আর্থরাইটিস সহ বিভিন্ন রোগে এখন বয়সের কারণে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ হয়েছে এবং এই অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশেই নিতে হতে পারে।
বিএনপি নেতাদের অনেকে বলেছেন, তাদের দল এখন খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা করানো বা তাঁকে সুস্থ রাখার বিষয়কেই এক নম্বর অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে।
খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর পরই তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছে। কিন্তু মি: রহমানও মামলা-মোকদ্দমার কারণে এখনও বিদেশে নির্বাসনে রয়েছেন।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নীতি-নির্ধারণী ফোরামের সদস্যদের সাথে আলোচনা করে এবং তারেক রহমানের পরামর্শ নিয়ে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কৌশল ঠিক করছেন।
কিন্তু বিএনপির অনেক নেতা বলছেন, যৌথ পরিচালনার কারণে দলের কার্যক্রম চালাতে সমস্যা হচ্ছে। তারা মনে করেন, এ কারণে দীর্ঘ সময়েও সরকারের বিরুদ্ধে শক্ত কোন অবস্থান নিয়ে দাঁড়াতে পারছে না বিএনপি।
তারা বলেছেন, খালেদা জিয়াই তাদের দলের ঐক্যের প্রতীক। ফলে তিনি মুক্তি পেয়ে দেশে বা বাইরে যেখানেই থাকুন না কেন, তাদের দলের নেতা-কর্মীরা সাহস পাবেন। তাদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়া এবং তা বাস্তবায়নের তাগিদও সৃষ্টি হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেছেন, সরকার সাড়া দিক বা না দিক—দু'টোই বিএনপির জন্য রাজনৈতিক দিক থেকে ইতিবাচক হবে।
"মানবিক কারণে বিএনপি সরকারের সহযোগিতা চাইছে। সরকার সাড়া না দিলে বিএনপি সে বিষয়টি মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারবে। একইসাথে এই ইস্যুতে দলের নেতা-কর্মীরাও উজ্জীবিত হতে পারে।"
তবে অনেক বিশ্লেষক এটাও বলছেন যে, বিএনপি যেহেতু সরকারের ওপর কোন দিক থেকেই চাপ সৃষ্টি করতে পারে নি, ফলে সরকারও খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নে কোন তাগিদ অনুভব করছে না।

সরকার সাড়া না দিলে

বিএনপি নেতাদের অনেকে মনে করেন যে, সরকার যেহেতু বেকায়দায় পড়েনি, সেকারণে খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তির ব্যাপারে কোন ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে না।
সেজন্য বিএনপি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠে তাদের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
সরকার-বিরোধী সব শক্তিকে এক জায়গায় আনার চেষ্টাও তাদের মধ্য রয়েছে।
কিন্তু এতে অনেক সময় প্রয়োজন। আর সেজন্যই এখন জরুরি কৌশল হিসেবে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার মতো মানবিক বিষয়কে তুলে ধরে জামিনে মুক্তির জন্য এগুতে চাইছে বিএনপি।
বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া প্রায় ছয় মাস ধরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে

Monday, September 30, 2019

দুর্নীতি বিরোধিী অভিযানের দায়িত্ব পুলিশকে বাদ দিয়ে কেন র‍্যাবের কাঁধে by কাদির কল্লোল

বাংলাদেশে পুলিশকে বাদ দিয়ে বিশেষ বাহিনী র‍্যাবকে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্যসহ দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের একক দায়িত্ব দেয়ার বিষয় নিয়ে এখন বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা চলছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিভ্রান্তি এড়াতে অভিযানের পুরো দায়িত্ব র‍্যাবকে দেয়া হয়েছে।
তবে এতদিন ধরে অবৈধভাবে ক্যাসিনো বাণিজ্য চলার পেছনে পুলিশ প্রশাসনের কারও যোগসাজশ ছিল কিনা, এমন প্রশ্ন উঠছিল গত কয়েকদিন ধরে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দল এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর কিছু নেতা কর্মীর দুর্নীতিসহ নানা অপরাধে জড়ানোর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযান চালানোর কথা বলেছিলেন সিনিয়র নেতাদের সাথে বৈঠকে।
এরপর প্রথমে র‍্যাব ঢাকায় চারটি নামকরা ক্লাবে অভিযান চালিয়ে অবৈধ জুয়ার আসর বা ক্যাসিনো বাণিজ্য বন্ধ করেছিল গত ১৮ই সেপ্টেম্বর। দু'দিন পর পুলিশও অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্লাবে অভিযান শুরু করেছিল।
তারপর থেকে পুলিশ এবং র‍্যাব একের পরে এক অভিযান চালিয়ে আসছিল।
তবে এখন পুলিশকে বাদ দিয়ে র‍্যাবকে এককভাবে এই অভিযানের দায়িত্ব দেয়া হলো।
অভিযানে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্যের গল্প একের পর এক যখন বেরিয়ে আসছে, তখন এনিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বড় প্রশ্ন হিসেবে এসেছে, এতদিন ধরে অবৈধভাবে ক্যাসিনো বাণিজ্য চলেছে কিভাবে?
পুলিশ র‍্যাব এবং সরকারসহ সংশ্লিষ্ট এর দায় নিতে রাজি নয়।
কিন্তু সরকারের অর্থমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী বা প্রশাসনের নজরের বাইরে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য চলেছে কিভাবে ? সেই প্রেক্ষাপটে অভিযানের দায়িত্ব থেকে পুলিশ বাদ পড়লো।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো: শফিকুল ইসলাম বলছিলেন, একই কাজ বিভিন্ন বাহিনী করলে ভাল ফল আসবে না, এই যুক্তিতে র‍্যাবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
"একই কাজ একটা বাহিনী করা ভাল। একটা কাজ যদি পাঁচজনকে ভাগ করে দেয়া হয়, পাঁচজন পাঁচটা ফলাফল দেখাবে। একারণে র‍্যাবকে দায়িত্ব দিয়েছে।"
কিন্তু প্রশাসনের নজরের বাইরে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য চলছিল কিভাবে-এমন প্রশ্ন যে উঠেছে, এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকার পুলিম কমিশনার বলেছেন, "শুধু পুলিশের কথা বলেনি যে, পুলিশের চোখের সামনে এসব চলছিল। র‍্যাবতো এই এলাকার বাইরে ছিল না। সবার চোখের সামনেই চলছিল। তো র‍্যাবকে দায়িত্ব দিয়েছে, তারা দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের বলা হয়েছে, একাসাথে এককাজ একাধিক বাহিনী করলে সমস্যা হতে পারে। সুতরাং তারাই করবে।"
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সাংবাদিকদের প্রশ্নে এটুকুই বলেছেন যে, র‍্যাব এই অভিযান শুরু করেছে, সেকারণে তাদেরকেই এর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
এছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণারয়ের কর্মকর্তারা যুক্তি দিয়েছেন , বিভ্রান্তি এড়াতে র‍্যাবকে অভিযানের একক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
তবে ঢাকায় পুলিশ ষ্টেশন থেকে অল্প দূরত্বেই বিভিন্ন জায়গায় ক্লাবগুলোতে অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য ধরা পড়েছে। ফলে এসব চলার পেছনে পুলিশ প্রশাসনের দিকেই আঙুল তোলা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।
ঢাকার পুলিশ কমিশনার অবশ্য বলেছেন যে, পুলিশের কেউ জড়িত ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
র‍্যাব পুলিশেরই একটা বিশেষ বাহিনী। সাধারণ পুলিশ থেকেই উর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা র‍্যাবের প্রধানের দায়িত্ব পান। র‍্যাবে অন্যান্য পদে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্যে যেখানে বড় অংকের অর্থে বিষয় ছিলো, ফলে এটি আগে কারোই নজরে আসেনি, এই যুক্তি খাটে না বলে তারা মনে করেন।
দুর্নীতি বিরোধী বেসরকারি সংস্থা টিআইবি'র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাসিনো বাণিজ্য চলার দায় পুলিশ বা র‍্যাব কেউই এড়াতে পারে না।
"যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেটার জন্য যদি আমরা মনে করি যে পুলিশ এখানে সেভাবে কাজ করেনি, তাদের অবহেলা যদি আমরা ধরতে চাই, তাহলে কারও অজান্তে না হওয়ার প্রতিফলন র‍্যাবের ওপরও পড়তে পারে। এটা নিয়ে আমরা প্রশ্ন করতে পারি যে, এখানে সরকারের কৌশলগত কোন কারণ আছে কিনা?"
র‍্যাবের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সর্ম্পকিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকু বলছিলেন, কোন একটি বাহিনীকে দিয়ে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করানো হলে তাতে সমন্বয়ের অভাব থাকে না। এটাকে তিনি সরকারের একটা কৌশল বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

Friday, September 20, 2019

চাঁদাবাজি-দুর্নীতি: দায় কি শুধু ছাত্রলীগ-যুবলীগের? by কাদির কল্লোল

বাংলাদেশে চাঁদাবাজির অভিযোগে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরানোর পর এখন যুবলীগের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, চাঁদাবাজি, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ নিয়ে অনেক দেরিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে সহযোগী সংগঠনগুলোর ব্যাপারে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, তাদের দলের সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলে এবং সহযোগী সংগঠনগুলোতে জবাবদিহিতার জন্য কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
তবে নানা অভিযোগ নিয়ে পরিস্থিতি যে উদ্বেগজনক অবস্থায় এসেছে, সেজন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ব্যর্থতা আছে কিনা বা এর দায় কার ওপর বর্তায়-এসব প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
আওয়ামী লীগের আরেক সহযোগী সংগঠন যুবলীগের একজন নেতা জানিয়েছেন, তাদের সংগঠনেরও ঢাকা নগরীর দু'জন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি সহ বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সেজন্য অভিযুক্ত দু'জনের বক্তব্য শুনতে তাদের ডেকেছে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের অনেক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ বা সরকারকে বিব্রত করেছে। তবে এবার চরম বিপদজনক পরিস্থিতি হওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রী নিজে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকে বলছেন।
দুর্নীতি বিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি'র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলছিলেন, চাঁদাবাজিসহ গুরুতর নানা অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে অনেক বিলম্ব করা হলো।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "এত সময় লাগলো কেন এই বিষয়টাকে চিহ্নিত করতে এবং এটার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে? আমি আশা করবো যে, শুধু প্রধানমন্ত্রী একা নন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যারা আছেন, তারা প্রত্যেকে এই কথাটা ভাববেন যে, এপর্যন্ত কত ক্ষতি হয়েছে- সেই ক্ষতির জন্য তারা একটু অনুতপ্ত বোধ করেন কিনা?"
রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার পিছনে বড় অভিযোগ ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বড় অংকের চাঁদা দাবি করা।
যুবলীগের ঢাকার দু'জন নেতার বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের কথা তুলে ধরছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা বলেছেন, এবার এসব অভিযোগ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী পেয়েছেন এবং তিনি দলীয় ফোরামে ক্ষোভ প্রকাশের পর ব্যবস্থা নেয়ার প্রশ্ন এসেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলেছেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ই নানা অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু সেগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য চেষ্টা সেভাবে দৃশ্যমান ছিল না বলে তাদের মনে হয়েছে।আর সেকারণে বিশ্লেষকরা মনে করেন, পরিস্থিতি খারাপ অবস্থায় পৌঁছানোর পিছনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলছিলেন, সবকিছু এককেন্দ্রিক হওয়ার কারণে পরিস্থিতি এমন হয়েছে।
"এটিতো একদিনে তৈরি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটাকে সাধুবাদ জানাই। তবে এমন পদক্ষেপ ১০ বছর আগে থেকে নেয়া হলে হয়তো এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।"
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমাদের সমস্যা হচ্ছে, এখন সবকিছু প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে হয়। জবাবদিহির বিষয়টা প্রত্যেক পর্যায়ে থাকতে হবে। সেই পর্যায়গুলো অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই যদি সব দায়িত্ব দেয়া হয়, এত কাজের ভিতর সবতো তাঁর দেখা সম্ভব নয়।"
মিস্টার ইসলাম আরও বলেছেন, "এগুলো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠিকভাবে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ করতে পারতেন।কিন্তু কেউ সেরকম হস্তক্ষেপ করতে সাহস পান না।সবার ধারণা, যদি একারণে বা কোন কারণে প্রধানমন্ত্রী বিরাগভাজন হয়ে যান।এখনতো দেখা যাচ্ছে, কাজটি প্রধানমন্ত্রী করলেন। সেটি অনেক আগে আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও করতে পারতেন।"
তবে পরিস্থিতি নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এবং দায়ভারের ইস্যুতে এসব বক্তব্য মানতে রাজি নন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ।
তিনি বলছিলেন, "ছাত্রলীগের অতীতে যে দু'একটা ছোটখাটো ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ছোটখাটো মারামারি ঘটনা। সেগুলোকে শক্তভাবেই শাসন করা হতো। কিন্তু এই শিষ্টাচার বহির্ভূত এধরণের অভিযোগ আগে কখনও আসেনি। এবং নানান শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।"
তিনি বলেন, "আওয়ামী লীগ অভিভাবক হিসাবে কখনই ছাত্রলীগ বা যুবলীগের কোন ধরণের অন্যায়ে সমর্থন করেনি।তারা শাসন করেছে। শাসনের মাত্রাটা হয়তো ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।আমরা কখনও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেইনি।"
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, এখন কঠোর যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেগুলো নিয়ে সাময়িকভাবে সমালোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত মানুষ ইতিবাচক হিসেবে নেবে।
শোভন-রাব্বানী সরে যেতে বাধ্য হয়েছে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে, নতুন নেতারা ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন

Thursday, September 19, 2019

ছাত্রলীগের শোভন-রাব্বানী বাদ: অন্যদের জন্য কী হুঁশিয়ারি বার্তা? by কাদির কল্লোল

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের শীর্ষ দু'জন নেতাকে চাঁদাবাজির অভিযোগে সরিয়ে দেয়ার পর এ নিয়ে এখন নানা আলোচনা চলছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, ক্ষমতাসীনদের সাথে থাকা ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত থাকে বলে বিভিন্ন সময় যে অভিযোগ ওঠে, এবারের পরিস্থিতি সেই ধারণা বা অভিযোগ প্রমাণ করেছে।
তারা মনে করেন, চাঁদাবাজির অভিযোগে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে পদ ছাড়তে হয়েছে, এটি ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগকেই ভাবমূর্তির সংকটে ফেলেছে।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, ছাত্রলীগের দুই নেতাকে সরিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দল এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের প্রতি হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন।

ছাত্রলীগের ইতিহাসে প্রথম

চাঁদাবাজির অভিযোগে ছাত্রলীগের শীর্ষ দু'জন নেতার পদ হারানোর ঘটনা সংগঠনটির দীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথম ঘটলো।
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটির নীতিনির্ধারকদের এক বৈঠক হয় গত শনিবার। সেই বৈঠক থেকে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আল নেহিয়ান খান এবং ভারপ্রাপ্ত সাধাণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য রোববার সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ছাত্রলীগ চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ বা কোন অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় দেবে না।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন,ছাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ নিয়ে শীর্ষ নেতাদের সরে যেতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগকে ভাবমূর্তির সংকটে ফেলেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড: আকতার বানু বলছিলেন, নেতৃত্বের এই অন্যায়ের জন্য ছাত্র সংগঠনটিকে নিয়েই সাধারণ ছাত্রদের মাঝে একটা খারাপ ধারণা তৈরি হতে পারে।
"পুরো ঘটনাটি নি:সন্দেহে খুবই বিব্রতকর। কারণ এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো যে, ছাত্রনেতারা এইসব করছেন। যদি না করতেন, তাহলে এমন অভিযোগও আসতো না। তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটতো না।"
"পাশাপাশি একটা ভাল দিকও আছে যে, প্রধানমন্ত্রী কারও কথায় কান না দিয়ে পরিস্থিতিটার লাগাম টেনে ধরার জন্য এমন একটা উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটা খুবই ইতিবাচক।"

ভাবমূর্তি সংকট

ছাত্রলীগের নেতাকর্মিদেরও অনেকে মনে করেন, পুরো ঘটনাটি তাদের সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে।
ছাত্রলীগের ঐ দু'জন নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠে। তবে তাদের সরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বড় অংকের চাঁদা দাবির অভিযোগকে।
বিষয়টি আওয়ামী লীগকেই ভাবমূর্তির সংকটে ফেলেছে বলে দলটির নেতাদের অনেকে মনে করেন।
তবে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সিনিয়র মন্ত্রী ড: আব্দুর রাজ্জাক বলছিলেন, ভাবমূর্তি সংকটের বিষয়টি সাময়িক বলে তিনি মনে করেন।
"সাময়িকভাবে হয়তো মানুষ বলবে যে ছাত্রলীগে আগে কখনও এমন ঘটনা ঘটেনি। তবে আমি মোটেই মনে করি না যে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে। ছাত্রলীগ একটা আদর্শ সংগঠন হিসেবে সবসময় ভাবমূর্তি ধরে রেখেছে।"
একইসাথে তিনি বলেছেন, "কিছু অনিয়ম হয়। তবে এবার এটা ব্যাপক পর্যায়ে গিয়েছে বলেই আমাদের দলের সভানেত্রী এবং আমরা সবাই মিলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"

যুবলীগের কয়েকজন নেতার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ

ড: আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, তাদের নেত্রী আরও দু'একটি সহযোগী সংগঠনের ব্যাপারেও বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
"ছাত্রলীগের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু এই বার্তাটা আমার জন্যও প্রযোজ্য এবং আমাদের দলের ও সহযোগী সংগঠনের সকলের জন্য অত্যন্ত জোড়ালো বার্তা।"
"আরও দু'একটা সহযোগী সংগঠন সম্পর্কে উনি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলেছেন যে, প্রচলিত আইনে সবাইকে দেখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চাঁদাবাজি করবে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াবে, আবার আমার দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া করবে, এটা হয় না। চাঁদাবাজি করে যদি সেই টাকা দিয়ে মিলাদ করে দোয়া করে, সেই দোয়ায় কি আমার দীর্ঘ জীবন হবে নাকি সর্বনাশ হবে। এই ধরণের কথাও কিন্তু কালকে উনি বলেছেন।"
আওয়ামী লীগের অন্য একাধিক সূত্র বলছে যে, যুবলীগের ঢাকা নগরীর একাধিক নেতার ব্যাপারে দলীয় সিনিয়র নেতাদের কাছে প্রধানমন্ত্রী এমন মন্তব্য করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী কী অন্যদেরও কোন বার্তা দিলেন?

আওয়ামী লীগ নেতা ড: আব্দুর রাজ্জাক যেমনটা বলছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী একটা বার্তা দিলেন।
বিশ্লেষকরাও একই ধারণা করছেন।
৬০ এর দশকের মাঝামাঝি ডাকসু'র ভিপি ছিলেন অধ্যাপক মাহফুজা শফিক। তিনি পরিস্থিতিটাকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তিনি মনে করেন, শুধু ছাত্রলীগ নয়, প্রধানমন্ত্রী সকলকে হুশিয়ার করে একটি বার্তা দিলেন।
"আমি টেন্ডারবাজি বা মাদকের সাথে যুক্ত হতে পারি না। আমি কোন অন্যায় করতে পারি না। এই বার্তাটি প্রধানমন্ত্রী দিলেন ছাত্রলীগ, দল এবং এমপি, মন্ত্রী সবার প্রতি।"
বিশ্লেষকদের অনেকে এটাও বলেছেন যে, আওয়ামী লীগ এখন টানা তৃতীয়দফায় ক্ষমতায় রয়েছে।এই লম্বা সময় একটি দল ক্ষমতায় থাকার কারণে দল এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর অনেকের লোভ বা স্বার্থের বিষয়গুলো সামনে আসছে। সেজন্য হয়তো প্রধানমন্ত্রী একটা কঠোর অবস্থান তুলে ধরছেন।
এদিকে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত নেতারা বলেছেন, ভাবমূর্তি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে তারা তাদের কর্মকাণ্ড স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা করবেন।
চাঁদাবাজীর অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে

Thursday, September 5, 2019

রোহিঙ্গা শিবিরে দেশি-বিদেশি কিছু এনজিও’র তদন্ত হচ্ছে by কাদির কল্লোল

বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা শিবিরে কিছু দেশি-বিদেশি এনজিও'র কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, মিয়ানমারে না ফেরার জন্য রোহিঙ্গাদের ইন্ধন দেয়াসহ তিনটি অভিযোগে স্থানীয় প্রশাসন এবং গোয়েন্দারা বেশ কিছু দেশি- বিদেশী এনজিও'র বিরুদ্ধে তদন্ত করবেন।
পাশাপাশি, শিবিরে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হচ্ছে কিনা তা নিয়েও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
সরকারের এনজিও বিষয়ক ব্যুরো বলেছে, পুরোনো একটি তালিকায় ৪১টি এনজিও কর্মকাণ্ডে নানান অভিযোগ এসেছিল। সেগুলোও খতিয়ে দেখা হবে।
সম্প্রতি দিনক্ষণ ঠিক করেও প্রত্যাবাসন শুরু করতে না পারা এবং এরপর রোহিঙ্গাদের একটি সমাবেশ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তিনটি প্রশ্নে তদন্ত

নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্রে জানা গেছে বেশ কিছু দেশি-বিদেশি এনজিওর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগের তদন্ত করা হবে :
এক, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা মিয়ানমারে ফেরত যেতে না চাওয়ার পিছনে কোন ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে কিনা।
দুই, সম্প্রতি শরণার্থী শিবিরের ভেতরে রোহিঙ্গাদের বড় একটি সমাবেশ করার ক্ষেত্রে অর্থ যোগান বা অন্যান্য সহযোগিতা করা হয়েছে কিনা ।
এবং তিন, শরণার্থী শিবিরের ভেতর রাষ্ট্রবিরোধী কোন কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে কিনা।
এ তদন্ত করছে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।
এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক কে এম আব্দুস সালাম বলেছেন, পুরনো একটি তালিকায় ৪১টি এনজিও বিরুদ্ধে নিয়মভঙ্গসহ নানান তৎপরতা চালানোর যে অভিযোগ এসেছিল, সেগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
"৪১টার মতই আমাদের তালিকায় ছিল। আপাতত সেটিই আছে। নতুন যে প্রক্রিয়া চলছে বা সর্বশেষ যে ইস্যুগুলো এসেছে, তাতে সংখ্যা বাড়তে বা কমতে পারে।"

কিছু এনজিও বন্ধ

সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিবিরে মুক্তি নামের একটি এনজিও'র কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
এই এনজিওটি জমি নিড়ানির জন্য বেশ কয়েক হাজার যন্ত্র তৈরি করেছিল। এসব যন্ত্র শিবিরে সন্ত্রাসের কাজে ব্যবহার হতে পারে এমন অভিযোগে সরকার তার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।
এরও আগে গত কয়েকমাসে বিভিন্ন কারণে আরও ৬টি এনজিওর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। এগুলো দেশি এনজিও।
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার দুই বছর পুরো হয় গত ২৫শে আগস্ট। দুই বছর পুরো হওয়ার সেদিন শিবিরে রোহিঙ্গারা সমাবেশ করে বিভিন্ন দাবি জানিয়েছিল।
এর কয়েকদিন আগে রোহিঙ্গাদের আপত্তির কারণে তাদের ফেরত পাঠানোর দ্বিতীয় দফার একটি চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সহ সরকারের অনেকেই রোহিঙ্গাদের এসব কর্মকাণ্ডে ইন্ধন বা উস্কানি দেয়ার অভিযোগ তোলেন।
এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর কে এম আব্দুস সালাম বলেছেন, বার বার সতর্ক করার পরও কিছু এনজিও বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছে।
"গত বছর আমরা বার বার বলেছি যে, এনজিওরা মানবিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এর বাইরে তারা যেন কোন কিছুতে না জড়ায়।"
"এখন বিভিন্ন দিক থেকে জানা গেছে যে, কিছু কিছু এনজিও তাদের ডিসকারেজ করেছে প্রত্যাবাসনে ব্যাপারে। আমরা খুঁজে দেখছি কারা এটা করেছে?"

কী বলছে এনজিওরা

কক্সবাজারে শিবিরগুলোতে ১৩০টির বেশি দেশি বিদেশী এনজিও কাজ করছে।
তাদের একটি ফোরামের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেছেন, এনজিওদের নিয়ে ঢালাও অভিযোগ করে ভিন্ন পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত একটি এনজিও'র একজন কর্মকর্তা শিউলী শর্মা বলেন, ঢালাও অভিযোগ না করে সুনির্দিষ্টভাবে তদন্ত করা উচিত।
"যাচাই করতে হবে। একজনে বললো নিয়ম ভঙ্গ করেছে, আর সবাই তাতে লাফাচ্ছে, বিষয়টি এমনই হয়েছে আর কি। এই অভিযোগ ঢালাওভাবে করা যাবে না। মানে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সুনির্দিষ্টভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে" - বলেন তিনি।
২৫শে আগস্ট শরনার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের বিশাল এক সমাবেশ। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন সরকারের উঁচু পর্যায়ের অনেকে

Friday, August 30, 2019

বাংলাদেশে নামে মাত্র সংসদীয় গণতন্ত্র আছে -_টিআইবি by কাদির কল্লোল

বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবি'র এক গবেষণায় বলা হয়েছে, গত ১০ম সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকায় ঐ সংসদ থেকে ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলেছেন, এর প্রভাবে সংসদীয় গণতন্ত্র নামেমাত্র একটা অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত গত সংসদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি তাদের গবেষণা প্রতিবেদন বুধবার প্রকাশ করেছে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা এই বক্তব্য নাকচ করেছেন।
তারা বলেছেন, দশম সংসদ কার্যকরভাবেই সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছে।
আগের সংসদগুলো থেকে দশম সংসদকে আলাদা এবং ব্যতিক্রমী বলে অভিহিত করেছে টিআইবি।
তাদের গবেষণায় গত সংসদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বিরোধীদলের পরিচয় সংকট এবং সরকারি দলের একচ্ছত্র ক্ষমতা বিস্তারের বিষয়কে।
বাংলাদেশ সর্বশেষ দুটো সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে
তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি এবং তাদের শরিকরা।
তবে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ঐ দশম সংসদে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারে মন্ত্রী সভায় যোগ দিয়েছিল। একইসাথে জাতীয় পার্টি বিরোধীদলের আসনে বসেছিল।
টিআইবি'র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরায় প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিরোধীদলের সংসদ বর্জন করা একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল।
দশম সংসদ সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে চড়া দামে বিরোধীদলের অনুপস্থিতিতে। কিন্তু ঐ সংসদ থেকে সংসদীয় পদ্ধতিই হুমকির মুখে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
"বিরোধীদল বলতে যা বোঝায়, সেটারই উপস্থিতি থাকলো না। ....যার ফলে বিরোধী দল হিসেবে যাদেরকে বলা হলো, তারা একদিকে সরকারি দলে এবং আরেকদিকে বিরোধীদলে। ফলে তাদের একটা আত্মপরিচয় সংকট প্রথম দিন থেকেই ছিল," বলছিলেন মি: জামান।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান
তিনি বলেন, "এটা একটা মকারির (প্রহসন) মতো জায়গায় চলে গেছে। এটা নামে সংসদীয় গণতন্ত্র রয়েছে।কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে আইন প্রণয়ন এবং সরকারকে জবাবদিহিতার জায়গায় আনা, সেক্ষেত্রে কিন্তু এটা মোটেই কার্যকর হয়েছে, সেটা বলা যাবে না।"
যদিও দশম সংসদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। বিরোধীদল দাবিদার জাতীয় পার্টিও একইসাথে ছিল সরকারের অংশীদার।
এরপরও অন্যান্য সংসদের মতো ঐ সংসদে একটা বড় সমস্যা ছিল কোরাম সংকট। টিআইবি তাদের গবেষণায় বলেছে, গত সংসদে কোরাম সংকটের কারণে প্রায় ২০০ ঘণ্টা অপচয় হয়েছে।
সংস্থাটি এর আর্থিক মূল্য দেখিয়েছে প্রায় ১৬৪ কোটি টাকা।
এছাড়া তাদের গবেষণায় আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিএনপি গত সংসদে না থাকলেও তাদের বিরুদ্ধেই অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করে সমালোচনা বেশি করা হয়েছে।
টিআইবি'র বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেত্রী মতিয়া চৌধুরী। তিনি বলেছেন, গত সংসদের কার্যকর ভূমিকার কারণেই সংসদীয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
মতিয়া চৌধুরী বলেন, "পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের জনক হলো গ্রেট ব্রিটেন। তারা কমনওয়েলথভুক্ত দেশ। সেই কমনওয়েলথ পার্লামেন্ট এসোসিয়েশন চেয়ারপার্সন হয়েছিলেন আমাদের দশম সংসদের স্পিকার এবং আইপিইউ এর প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন আমাদের সংসদসদস্য।বিদেশীরা কেউ এটা নিয়ে প্রশ্ন করলো না।কিন্তু টিআইবি'র কাছে এটা অপাক্তেয় হয়ে গেলো।"
"বিএনপি না আসলেই যে পার্লামেন্টে আর কেউ আসে নাই তাতো নয়।"
সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়াও টিআইবি'র বক্তব্য মানতে রাজি নন।
তিনি বলেছেন, দশম সংসদ আইন প্রণয়নসহ মৌলিক কাজগুলো জবাবদিহিতার সাথেই করেছে।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, "বিরোধীদল পার্লামেন্টে ছিল। এখন বিরোধীদল ওয়াক-আউট বা হৈচৈ না করলে তাকে যদি বিরোধীদল মনে না হয়, তাহলে সেটা দু:খজনক"
আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা মতিয়া চৌধুরী
"গত দশম সংসদে যত আইন পাশ করেছে এবং যত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সবই গণতান্ত্রিক-ভাবে হয়েছে। যদি ফাইল স্পিকারের দিকে ছুঁড়ে মারাটা গণতন্ত্র হয়, তবে সেই গণতন্ত্র আমরা করি নাই," বলছিলেন ডেপুটি স্পিকার।
তবে টিআইবি'র ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য হচ্ছে, আইন প্রণয়নের মৌলিক কাজটি করার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যদের আগ্রহ কম ছিল এবং সংসদীয় কমিটিগুলোর কার্যকারিতা সেভাবে ছিল না।
"গত সংসদে যে আইনগুলো পাশ হয়েছে তার ৭১ শতাংশ আইনই এক থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে পাশ হয়েছে। সংসদ সদস্যরা আগ্রহ নিয়ে আইন প্রণয়নে অংশ নেননি। তারা আলোচনায়ও সেভাবে অংশ নেননি।ফলে সংসদ কার্যকর বা জবাবদিহি হচ্ছে বলা যায় না," বলছিলেন মি: জামান।
এদিকে বর্তমান একাদশ সংসদে কয়েকজন হলেও বিএনপিরও প্রতিনিধি রয়েছে।
সেখানে সরকারি দলকে এখন একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংসদে সব দলের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন করা উচিত বলে টিআইবি সুপারিশ করেছে।

Sunday, July 28, 2019

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায়ভার মাথায় নিতে রাজি না সরকার, দু্ই মেয়র by কাদির কল্লোল

ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে অপেক্ষায় মা
বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ে জনমনে উদ্বেগ যেমন বাড়ছে, সেই সাথে এ ধরণের বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে সেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
অভিযোগের তীর প্রধানত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং সরকারের দিকে। অনেকেই সরসারি তাদের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছেন।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেও বলছেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলেই এই পরিস্থিতি হয়েছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কোনা কারণ নেই, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৩৯০ জন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন গত ২৪ ঘন্টায়। এই তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
তাদের হিসাব অনুযায়ী এ নিয়ে এবছর সাড়ে নয় হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
বেসরকারিভাবে এই সংখ্যা আরও অনেক বলা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভিড় বেড়েই চলেছে।
আতঙ্ক আর উদ্বেগের পরিস্থিতি কেন হলো, এর জন্য দায়ী কে - এসব প্রশ্ন এখন উঠছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহীনা তাবাসসুম বলেছেন, এডিশ মশা মারার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি এত খারাপ হয়েছে বলে তার ধারণা।
"মশা দ্বারা এটা একজন থেকে আরেকজনের মাঝে ছড়াচ্ছে। এটা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়াচ্ছে না। এখানে ট্রান্সমিশন সাইকেলটা বন্ধ করতে চাইলে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।এটাতে ব্যর্থতা আছে, যারই ব্যর্থতা হোক।"
সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং সংক্রমণ ব্যধি নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক ড: সনিয়া তাহমিন বলছিলেন, ২০০০ সালে ডেঙ্গু ভাইরাস ধরা পরার পর থেকে বাংলাদেশে এর চিকিৎসা এগিয়েছে। কিন্তু মশা মারায় ব্যর্থতা থাকলে এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলে তিনি মনে করেন।
"আমরা প্রিভেশন না করে আমরা ট্রিটমেন্টের দিকে নজর দিয়েছি। কিন্তু প্রেভেশনের ব্যাপরটায় হেলথ সেক্টর যেটা করতে পারে বা করছি আমরা, সেটা হচ্ছে, ডাক্তারদের ট্রেনিং দিচ্ছি। মানুষকে সচেতন করছি। কিন্তু মশা মারতে না পারলে সমাধান হবে না। সিটি করপোরেশনের এটা দায়িত্ব ছিল। আমি বলবো এই ম্যানেজমেন্টে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।"
এখন ব্যর্থতার অভিযোগের ক্ষেত্রে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ার প্রশ্ন অনেকে জোরালোভাবে তুলছেন।
রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মশা মারার ঔষধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা প্রশ্ন উঠছে।
তবে ঢাকার দুই মেয়র ব্যর্থতার অভিযোগ মানতে রাজি নন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো: তাজুল ইসলামও অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, সময়মতোই তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
"এখানে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম। অন্য দেশের সাথে তুলনা করলে এটা দেখা যায়। থাইল্যান্ডে বা ভারতে আমাদের থেকে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। এখানে প্রতিদিনই মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছে এবং ভাল হচ্ছে। আবার নতুন নতুন কেউ কেউ আক্রান্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি মহামারি রূপ নেয়নি। নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।"
কিন্তু মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অনেকে বলেছেন, এই ব্যর্থতার দায় সরকারের।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মন্ত্রী মো: তাজুল ইসলাম বলেন, "আমি এই বিষয়ের সাথে একমত না। কারণ মশাতো নিধন হচ্ছে। মশার ডেনসিটি যথেষ্ট কমেছে। এটা সবাই স্বীকার করবেন। এখন এডিস মশাটা পরিস্কার পানিতে বাড়ির আঙিনায় বা ভিতরে জন্মায়। এজন্য আমরা মানুষকে সচেতন করার কর্মসূচিও জোরদার করেছি।"
"মশা মারা ঔষধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও আমরা সেই প্রশ্নের কোন ভিত্তি পাইনি।"
এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকার দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মন্তব্য নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
ফলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলন করে পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য তুরে ধরেন।
"আমাদের জনগণ ডেঙ্গু নিয়ে আতংকে আছে, উদ্বেগের মধ্যে আছে। আসলে কাজটা আমাদের সমন্বিতভাবে করতে হবে।"
ওবায়দুল কাদের উল্লেখ করেন যে, সরকার এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে মশার মারা অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি তাদের পদক্ষেপে সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে চাইছেন।
হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর ভিড় বেড়েই চলেছে

Monday, July 8, 2019

বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে বিভিন্ন বাহিনীকে সতর্ক করেছে আদালত by কাদির কল্লোল

বাংলাদেশে বরগুনা শহরে স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যার মামলার প্রধান অভিযুক্তের বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে হাইকোর্ট আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক হতে বলেছে।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আদালত বলেছে, বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আদালত সমর্থন করে না।
বরগুনার ঘটনার ব্যাপারে সেখানকার স্থানীয় প্রশাসনের যে প্রতিবেদন আদালতে পেশ করা হয়, তাতে বলা হয়, পুলিশ আত্ম-রক্ষার্থে গুলি চালিয়েছিল।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর কখনও তদন্ত হয় কিনা, তা জানা যায় না।
হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বরগুনার পুলিশ প্রশাসন রিফাত শরিফকে কুপিয়ে হত্যার মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদন পেশ করে।
সেই প্রতিবেদনে মামলার প্রধান অভিযুক্ত সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে তার পক্ষে যুক্তি দেয়া হয়।
ডেপুটি এটর্নি জেনারেল আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বিবিসিকে বলেছেন, "আদালত বলেছেন, বিচার-বহির্ভূত যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়, সেগুলো উনারা পছন্দ করেন না, সমর্থন করেন না। আইনে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আত্মরক্ষায় গুলি করার যে সুযোগ দেয়া আছে, তার যেন অপপ্রয়োগ না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছে।"
"এই আত্মরক্ষার বিষয় সামনে রেখে যাতে কেউ অযাচিত বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড না ঘটানো না হয় সেব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছে আদালত," বলেন তিনি।
বরগুনায় রিফাত শরিফকে তার স্ত্রীর সামনে কুপিয়ে হত্যা করার ভিডিও থেকে নেওয়া
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কমপক্ষে ২০৪ জন নিহত হয়েছে এবং প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই বাহিনীগুলো আত্মরক্ষায় গুলি চালানোর একই কথা বলে আসছে।
সম্প্রতি কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন, এমন দু'জনের পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেছেন, তাদের স্বজনদের মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তাদের কোন মামলা করতে দেয়া হয়নি।
বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোর কোন তদন্ত হয় কিনা সেই প্রশ্ন করে আসছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজা বলেন, বিভিন্ন সময় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেও তারা কোন জবাব পাননি।
"আমরা জানি না, বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোন তদন্ত হয় কিনা। আমাদের একটা বড় দাবি, এগুলোর তদন্ত করা। আমরা বিভিন্ন ঘটনার ব্যাপারে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে জানতে চেয়েছি, কিন্তু জানতে পারি নি। আমার মনে হয়েছে, তারা আমাদের কোন জবাব দেবে না।"
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দাবি করেছেন, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করা হয়।
তিনি এটুকুই বলেছেন যে, তদন্তের ভিত্তিতে কোন সমস্যা চিহ্নিত হলে তাতে তারা ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।
"অবশ্যই তদন্ত হয়। এগুলো একজন ম্যাজিস্ট্রেটের আন্ডারে তদন্ত হয়। ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত হওয়ার পরে এগুলোর নিষ্পত্তি হয়। এবং তার তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়," বলেন মি. খান।
পুলিশ এবং র‍্যাবের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বললে তারাও এই একই বক্তব্য দেন। এর বাইরে আর কোন প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় না।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ বহু দিনের