Thursday, March 20, 2025
‘সংবিধান, নির্বাচন ও গণতন্ত্র’ প্রসঙ্গে আবুল মনসুর আহমদ by ইমরান মাহফুজ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার পতনের পর সংবিধান, নির্বাচন ও গণতন্ত্র- এই ৩টি বিষয়ের আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে। কারণ, বিদ্যমান সংবিধান ইচ্ছামতো ব্যবহারে স্বৈরাচার তার বৈধতা তৈরি করেছিল। এর মাঝে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা থেকে ‘সংবিধান সংস্কার’ সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
এ প্রসঙ্গে সামনে এসেছে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আবুল মনসুর আহমদের চিন্তা। বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের মধ্যে যারা রাজনীতিকে উপজীব্য করে ইতিহাস রচনা করেছেন, আবুল মনসুর তাদের প্রথম সারির একজন। তার বহুল পঠিত রচনা ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইয়ে বাংলাদেশের ‘সংবিধান, নির্বাচন ও গণতন্ত্র’ বিষয়ে অনেক অমীমাংসিত বিষয়ে মীমাংসার ইঙ্গিত রয়েছে। যা ৫৪ বছরেও সমাধান হয়নি বলে বারবার সামনে আসছে। আর সাধারণ মানুষ ‘বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নে’ রক্ত দিয়ে যাচ্ছেন।
১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার পর আবুল মনসুর ‘সংবিধানের বিধানিক ত্রুটি’ প্রসঙ্গে অসাধারণ একটি বিষয় হাজির করেছেন। তিনি লিখছেন- ডেমোক্রেসি, সোশ্যালিজম, ন্যাশনালিজম ও সেক্যুলারিজম- এই চারটিকে আমাদের রাষ্ট্রের মূলনীতি করা হয়েছে। এর সবক’টির আমি ঘোরতর সমর্থক। কিন্তু আমার মত এই যে, এর কোনোটাই সংবিধানে মূলনীতিরূপে উল্লিখিত হওয়ার বিষয় নয়। গণতন্ত্র ছাড়া আর বাকি সবক’টিই সরকারি নীতি-রাষ্ট্রীয় নীতি নয়। দেশে ঠিকমতো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেই আর সব ভালো কাজ নিশ্চিত হওয়া যায়। জাতীয়তাবাদ, সমাজবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা সবই জনগণের জন্য, সুতরাং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য, কল্যাণকর। নিরংকুশ গণতন্ত্রই সে কল্যাণের গ্যারান্টি। গণতন্ত্র নিরাপদ না হলে এর একটাও নিরাপদ নয়।
বাস্তবেও তাই। গণতন্ত্র যথাযথ চর্চা হয়নি বলে বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে আমাদের। রাজনৈতিক দলেও গণতন্ত্রহীনতা, দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা, কখনো কখনো সামরিক শাসন, রাজনৈতিক সরকারের একক কর্তৃত্ব। সংবিধান সংশোধন হয়েছে নিজেদের স্বার্থে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নির্বাচন এবং ভেঙে পড়েছে সংবিধান, বছরের পর বছর আশাহত গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা। যেন কেউ দেখার নেই!
রাজনৈতিক নেতারা স্বপ্ন দেখিয়ে কেবল ধোঁকা দিয়েছে। আর সেটার শুরু স্বাধীনতার পর থেকেই। আবুল মনসুর আহমদের কলমে উঠে এসেছে সে নির্মম সত্য। তিনি লিখছেন- ‘১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও কয়েকটি আসনে নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। আবুল মনসুর আহমদের পর্যবেক্ষণ হলো, ‘তিনশ’ পনের সদস্যের পার্লামেন্টে জনা-পঁচিশেক অপজিশন মেম্বার থাকলে সরকারি দলের কোনোই অসুবিধা হতো না। বরঞ্চ ওইসব পার্লামেন্টারিয়ান অপজিশনে থাকলে পার্লামেন্টের সৌষ্ঠব ও সজীবতা বৃদ্ধি পেতো।...বাংলাদেশের পার্লামেন্ট পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের একটা ট্রেনিং কলেজ হয়ে উঠতো। আর এসব শুভ পরিণামের সমস্ত প্রশংসা পেতেন শেখ মুজিব।’
অনেক আশার নেতা কাজ করলেন হতাশার। অথচ গণতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম উপাদান পার্লামেন্ট নির্বাচন। আর সেটা নিয়েই বানচাল। তারা ভুলে গেছে গণতন্ত্র কেবল সংবিধানে রাখার বিষয় নয়, চর্চার বিষয়। আবুল মনসুর পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন- ‘নির্বাচন জনগণের রাজনৈতিক বিদ্যালয়। নেতারা ও নির্বাচন প্রার্থী সে বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তারা ছাত্রদের সুশিক্ষার বদলে কুশিক্ষা দিবেন না। যা নিজেরা বুঝেন না, ছাত্রদের তা বোঝাবার চেষ্টা করবেন না। নিজেরা যাতে বিশ্বাস করেন না, ছাত্রদের তা বিশ্বাস করতে বলবেন না। যদি করেন, তবে তার কুফল শুধু ছাত্ররাই ভুগবে না, শিক্ষকদেরও ভুগতে হবে।’
আমাদের সর্বনাশ সেই থেকে শুরু। বিশ্বাসের ঘরেই চুরি। আর সুন্দরের চর্চা বাদ দিয়ে সংকটের রাজনীতি চর্চা করেই যাচ্ছেন নেতারা। আর যখনই প্রয়োজন হয়েছে নির্দ্বিধায় আবুল মনসুর সত্য উচ্চারণ করেছেন পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদকে। তিনি প্রায় দেড় দশক আগে লিখেছিলেন- দেশের হতভাগ্য মানুষ প্রায় পৌনে এক শতাব্দী ধরে গণতন্ত্রের পাঠ নিচ্ছে বিভিন্ন গণতন্ত্রের গুরু ও ওস্তাদদের কাছ থেকে। পাঠ তারা নিয়েই যাচ্ছে, কিন্তু পাস করতে পারেনি। আদু ভাইয়ের মতো একই ক্লাসে পড়ে রয়েছে। তবে অন্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে গণতন্ত্রের বাঙালি তালবেলামদের পার্থক্য এখানে যে স্কুল-মাদ্রাসায় ছাত্ররাই পাস বা ফেল করে, এ ক্ষেত্রে ফেল করছেন শিক্ষকেরাই বেশি (প্রথম আলো, ২রা সেপ্টেম্বর ২০১০)।
আসলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা ফেল করে; লেখক বলছেন রাজনীতির পাঠশালায় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা ফেল করেছে। আবুল মনসুর আহমদের কলামে শেখ মুজিবের ফেলের নমুনা পেলাম। এই সত্য জাতির জন্য অত্যন্ত বেদনার। এমন অনেক ঐতিহাসিক চিত্র পাবো তার রচনায়। বইটি ১৯২০ সাল থেকে ১৯৭০ দশকের মধ্যবর্তী সময়ের অসামান্য দলিল বলা যায়।
আবুল মনসুর আহমদের রাজনীতির যাত্রা আরও অনেকের মতো শুরু হয়েছিল কৃষক-প্রজা সম্মেলনে অংশ নেয়ার মধ্যদিয়ে। পরে তারা সবাই মুসলিম লীগের রাজনীতিতে এগিয়েছেন। তবে তারা যে পাকিস্তান চেয়েছিলেন, বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। বাঙালি মধ্যবিত্তের মোহমুক্তি ঘটতে বেশি দেরি হলো না। আবারও সংগ্রাম লড়াইয়ের গল্প। পাওয়া না পাওয়ার রাজনীতি। কিন্তু থেমে থাকেননি আবুল মনসুর। কথা বলেছেন, লিখেছেন, সুযোগমতো প্রয়োগ করেছেন- কখনো আইনজীবী, কখনো সাহিত্যিক বা সাংবাদিক হিসেবে, আবার কখনো রাজনৈতিক হিসেবে।
যেমন রাজনীতির অভিভাবক হিসেবে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিয়ে সতর্ক করেছেন। যদিও এখনো ধর্মের ব্যবহার যাচ্ছেতাইভাবে হচ্ছে। ‘বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’ শিরোনামের একটি বইয়ের পর্ব ‘ধর্ম শাসিত রাষ্ট্র, না রাষ্ট্র শাসিত ধর্ম’। সেখানে তিনি নির্মহ সত্য বলছেন। ‘যারা ধর্মের দ্বারা রাষ্ট্র শাসন করিতে গিয়াছেন, পরিণামে তাঁরা ধর্মকেই রাষ্ট্রের দ্বারা শাসন করাইয়াছেন। ধর্ম-শাসিত রাষ্ট্র সম্ভব হইলে ভালোই হইতো। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, তা সম্ভব নয়। ইতিহাসের এ শিক্ষা অগ্রাহ্য করিয়া যারা রাজনীতিতে ধর্মকে টানিয়া আনিতে চান, তারা ধর্ম ও রাজনীতি উভয়কেই অনিষ্ট করিতেছেন।’
এর কারণ কি? ব্যাখ্যা পরের অংশে দিচ্ছেন নিজেই এইভাবে- ‘ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে অনেকগুলো মৌলিক পার্থক্য আছে। তার মধ্যে প্রধান পার্থক্যটি এই যে, রাষ্ট্র চলে শক্তিতে, ধর্ম চলে ঈমানে। অর্থের সঙ্গে পরমার্থের, দেহের সাথে আত্মার, শক্তির সঙ্গে নীতির যা সম্পর্ক, রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্কও তাই। কাজেই যারা রাষ্ট্রের ও ধর্মের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘটাইতেই চান, তারা আসলে পাহলোয়ানের সঙ্গে ঋষি দরবেশকে পাঞ্জা লড়িতে বলেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে মোহাম্মদ আলী ক্লের সঙ্গে বক্সিং লড়িতে বলেন। এমন প্রতিযোগিতা স্পষ্টতই অসঙ্গত।’
আবুল মনসুর আহমদ এ ধরনের অনেক রূঢ় সত্য উচ্চারণ করেছেন বহু প্রসঙ্গে। সমাজের বৈষম্য নিরসনে বাহাত্তরের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তার ব্যবহার যথাযথ হয়নি বলে আমাদের বঞ্চনা। কথা ছিল আইনের চোখে সবার সমতা নিশ্চিত হবে। বাস্তবে তা ঘটেনি। আর তা ঘটেনি বলে বাংলাদেশের ‘ভোটবঞ্চিত তারুণ্য’ অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেললো ৩৬ জুলাই। আষাঢ়-শ্রাবণে এমন প্লাবন দেশে আর হয়নি। এ যেন নজরুলের উষার দুয়ারে আঘাত হেনে রাঙা প্রভাত আনার ছন্দময় বিপ্লব। এইভাবে পাল্টে যায় চেনা দুনিয়া। যার পূর্বাভাস পাঠ্য বইয়ে থাকে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠশালায় থাকে না বিপ্লব। তবে ইতিহাসের পাঠ ভুলে গেলে পদে পদে হোঁচট খায় জনতা। তবে সমাজ জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে- রাজনীতি। ব্যক্তি রাজনীতিতে যুক্ত থাকুন আর না-ই থাকুন, রাজনীতি তার পিছু ছাড়ে না।
এই প্রেক্ষাপটে চেনা রাজনীতির বাইরেও ভবিষ্যতের শাসন ও প্রশাসনব্যবস্থা নিয়ে অনেক কিছু আলোচিত হচ্ছে। কখনো গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে কখনো পত্রিকার পাতায় দেখা যায়। দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রথম সংবিধান পেতে সময় লাগে নয় বছর। কার্যকর ছিল মাত্র দুই বছর।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দ্রুত সময়ে সংবিধান পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালের ১০ই এপ্রিল গণপরিষদের যাত্রা। বিল গৃহীত হয়েছিল ৪ঠা নভেম্বর। কার্যকর হয়েছিল ওই বছরের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে। দুই একটি বিতর্কছাড়া গত ৫২ বছরে এই সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে ১৭ বার অনাদরে (পড়ুন নিজেদের স্বার্থে)। আবারো সংস্কার/পরিবর্তনের দাবি উঠেছে শাসনব্যবস্থার দিকনির্দেশক এই সংবিধানের। যে শাসন করবে, সেই শাসিত হয়েছে। এর কারণ- এই সংবিধানের অস্পষ্টতা ও পরস্পর সাংঘর্ষিক ধারা-উপধারায়।
এ প্রসঙ্গে আবুল মনসুর আহমদের বই থেকে উদ্ধৃত করে আকবর আলি খান বলেছিলেন, বাংলাদেশের সংবিধান সম্পর্কে আবুল মনসুর আহমদের চূড়ান্ত সমাধান হলো সংবিধান গণতান্ত্রিক হতে হবে। তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সংবিধান রচনার সময়েও আমি বলিয়াছিলাম, পাকিস্তানে ইসলাম রক্ষা না করিয়া গণতন্ত্র রক্ষার ব্যবস্থা করুন। গণতন্ত্রই ধর্মের গ্যারান্টি। বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় আমি বলিয়াছিলাম, বাংলাদেশের সমাজবাদের কোনো বিপদ নাই। যত বিপদ গণতন্ত্রের, গণতন্ত্রকে রোগমুক্ত করুন, সমাজবাদ অবশ্যই সুস্থ হইয়া যাইবে।’
‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ লেখার সঙ্গে একমত পোষণ করে খান আরও বলেন, ‘আমি একটু বিস্মিত হয়ে গেছি, বেশ কিছু দিন ধরেই এ কথাগুলো বলে আসছি। আমি মনে করেছি, এগুলো আমার বক্তব্য। দেখলাম, আমি আবুল মনসুর আহমদের বক্তব্যই প্রচার করছি। আমাদের সংবিধানে চারটি স্তম্ভ আছে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমার বক্তব্য হলো, যে দেশে গণতন্ত্র নেই, সে দেশে টেকসইভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা চালু করা সম্ভব নয়।’
এইভাবে আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা আড়ালে থেকে গেছে। আলাপ হয়েছে ‘ফরজ’র পরিবর্তে ‘নফল’ নিয়ে। সংশোধনী ও তার বাতিলকরণে উচ্চ আদালত ও জাতীয় সংসদ মুখোমুখি অবস্থানে গেছে অনেকবার এবং এতে স্পষ্ট হয়েছে রাজনৈতিক বিভক্তি। বলা যায়- অমীমাংসিত রক্তের সংবিধান। আমরা যেন কয়েকটা বিষয় নিয়ে দশকের পর দশক ঘুরপাক খাচ্ছি। বেরোনোর পথ পাচ্ছি না। দুলছি সরল দোলকের নামে জটিল দোলকে।
যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের সময়েও আবুল মনসুর সংবিধান নিয়ে যথাযথ ভুল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন তুলেছিলেন। যার অধিকাংশ আজও অমীমাংসিত। আবুল মনসুর আহমদের রাজনীতিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বা গ্রন্থাগারে হয়নি। হয়েছিল মাঠে-ঘাটে, সংবাদপত্রের টেবিলে ও মানুষ পাঠে। বছরের পর বছর লেগে থেকে অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে।
‘কালচার’ সূত্রে আবুল মনসুর আহমদ নিজের মতো করে সমাজ রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা করেছেন। চিন্তা করেছেন ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য সব কিছু নিয়ে এবং ওই সময়কার পরিস্থিতি বদলাতে হবে, সে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি। এইভাবে ইতিহাসে স্বতন্ত্র ভাবনায় অবদান রেখে গেছেন এই রাষ্ট্রচিন্তক। আমরা আমাদের প্রয়োজনে তার চিন্তা ব্যবহার করে সংকট কাটাতে পারি। পারি তার চিন্তা চর্চায় নিজেদের ‘বেশি দামে কেনা’র সমাজ কাঠামো বদলাতে। না হলে গণতন্ত্রহীনতায় আমাদের আবারো রক্ত দিতে হবে।

Monday, February 3, 2025
সাক্ষাৎকার: বিদ্যমান সংবিধান এক ব্যক্তির শাসনের পথ তৈরি করেছে -আলী রীয়াজ
প্রশ্ন: দেশের নাম পরিবর্তন করে জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। সংবিধান সংস্কার কমিশন কেন এটি পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছে?
আলী রীয়াজ: দু’টো কারণে। এক নম্বরে রিপাবলিক শব্দের বাংলা ‘প্রজাতন্ত্র’ বলে আমাদের কাছে সঠিক মনে হয় না। প্রজা কথাটার মাঝে এক ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব আছে। আর ইংরেজি নামটা হচ্ছে পিপলস রিপাবলিক। সেই ক্ষেত্রে আমরা জনগণের কথাটা আগে আনতে চেয়েছি। তদুপরি বাংলাদেশের ইতিহাস যদি আপনি দেখেন, ১৯৬৯ সালে যখন প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলা হয় তখন কিন্তু ‘জনগণতান্ত্রিক স্বাধীন পূর্ব বাংলা’র কথাই বলা হয়েছে। আমরা যেটা প্রস্তাব করেছি সেটার ভিত্তি হচ্ছে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
প্রশ্ন: জাতি হিসেবে বাঙালি কেন পরিবর্তন করতে বলছে কমিশন?
আলী রীয়াজ: জাতি হিসেবে সবাই বাঙালি হওয়া তো অবাস্তব। সকলকে আপনি বাঙালি বানানোর চেষ্টা করছেন কেন? এটার মধ্যে এক ধরনের জাতিবাদী চেতনা থাকে- যে আমাদের সবাইকে বাঙালি হতে হবে। বাংলাদেশ একটা বহুজাতিক দেশ। এখানে বহু জাতি, বহু ধর্ম, বহু ধরনের মানুষ আছে। আমরা কেউ সমতলে থাকি, কেউ পাহাড়ে থাকি। আমরা এক ধরনের বিশ্বাসের মধ্যে থাকি। কিন্তু জাতিগতভাবে বড় জাতির পরিচয় চাপিয়ে দেয়া তো অগ্রহণযোগ্য। আমরা কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে যে পরিচয় বিদ্যমান সংবিধানে আছে তাই রেখেছি। আমরা বলছি যে, জাতি হিসেবে যিনি চাকমা, মারমা, গারো, তারা কিন্তু বাঙালি না। তাহলে সাংবিধানিকভাবে জোর করে আপনি বাঙালি বলছেন কেন? আমরা মনে করি, সেটা সঠিক নয়। আমাদের অংশীজনরা যারা এসেছেন তারাও এটা বলেছেন। এটা সঠিক নয়। আমরা নাগরিকের পরিচয় নিয়ে কোনো প্রশ্নই তুলিনি, এটা আমাদের পরামর্শও নয়। সেটা সংবিধানে সঠিক আছে- বাংলাদেশের নাগরিকরা বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবেন।
প্রশ্ন: রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ বাদ দেয়া কেন জরুরি বলে মনে করছেন, আর বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
আলী রীয়াজ: আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে যেতে চেয়েছি। আমাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে- প্রথম সংবিধান যেটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। সেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার। আমরা মনে করি, এটাই রাষ্ট্রের মূলনীতি হওয়ার কথা ছিল। ১৯৭২ সালে এটাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এটা আমাদের কাছে মনে হয়েছে অগ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয়ত আপনি যদি দেখেন যে, চারটা মূলনীতির কথা বলা হয়েছে- গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের কথা। এ চার নীতি প্রকৃতপক্ষে একটি দলীয় নীতি। সেটাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিবর্তন করা হয়। এটার উদাহরণ হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশের সংবিধান লেখা শেষ হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বলা হচ্ছিল এগুলো চারটি মূলনীতি। তখনো কিন্তু ড্রাফটিং হয়নি। তাছাড়া এই চার নীতি যে আদর্শের লক্ষ্য সেটা হচ্ছে মুজিববাদ। সেই মুজিববাদের পরিণতি কী হয়েছে আমরা জানি। একবার যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে একদলীয় ব্যবস্থা ও এক ব্যক্তিতান্ত্রিক একটা স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে গেছি। সে সময় এক নেতায় এক দেশে পরিণত করা হয়েছিল। আবার আওয়ামী লীগের সেই চার নীতির ভিত্তিতে একটা স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে গেছি। আবার দেশে একনায়কতান্ত্রিক একটা শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়। মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। তাহলে সংবিধানের এগুলো রাখার কোনো যৌক্তিকতা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নটা অনেকেই তুলছেন। আমরা প্রস্তাব করেছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে ভিত্তি, তিনটাকে আমরা যুক্ত করতে বলেছি। আমরা চতুর্থ প্রস্তাবে বলেছি গণতন্ত্রের কথা। কারণ গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষার জন্যই বাংলাদেশের মানুষ লড়ে যাচ্ছে। গত ১৬ বছর লড়েছে, অতীতে লড়েছে। আর যেটা বলেছি বহুত্ববাদের কথা। কারণ বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে একটা বহু জাতের সমাজ। এটা বলার মধ্যদিয়ে যেটা হয় সেটা হচ্ছে ধর্মের বাইরেও আমরা চলে যাচ্ছি। একটি ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন রকমের জাত-পাত আছে। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, বহুত্ববাদী সমাজ সমস্ত ভিন্নতাকে ধারণ করতে পারে। শুধু ধারণ করে না, সম্মানের সঙ্গে ধারণ করে। কেউ যেন রাষ্ট্রের চোখে অসমভাবে বিবেচিত হতে না পারে। আমরা বলছি- আমাদের দ্বিতীয় মূল আদর্শ মানবিক মর্যাদা। তাহলে মানবিক মর্যাদাকে আমরা যেন আরও বিশালভাবে দেখতে পারি। সকলকে যেন অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। সেটা শুধু ধর্মের ভিত্তিতে নয়, জাতির ভিত্তিতে, সংস্কৃতির ভিত্তিতে। হিন্দু ধর্মের মধ্যেও তো বিভিন্ন রকম জাত-পাত আছে। ইসলাম ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন রকম মাযহাব আছে। তাহলে সবকিছুকে আমরা ধারণ করতে চাই। বাংলাদেশের মধ্যে এটা শত শত বছর ধরে আছে। আমরা বলছি যে, আসুন সবাইকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসি। রাষ্ট্র সকলকে সমান মর্যাদায় যেন অভিষিক্ত করতে পারে।
প্রশ্ন: মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে ভোটাধিকার, ইন্টারনেট ও তথ্য প্রাপ্তি, ভোক্তা সুরক্ষা, গোপনীয়তাসহ বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
আলী রীয়াজ: গণতান্ত্রিক সমাজে ভোটের অধিকার হচ্ছে একটা মৌলিক অধিকার। খুব বিস্ময়কর যে, এখনকার বিদ্যমান সংবিধানে সেটা নাই। আমরা দেখেছি এই মৌলিক অধিকারটা কীভাবে লুণ্ঠিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে। আমরা যে আদালতে গিয়ে বলবো যে, আমার অধিকার লুণ্ঠিত হয়েছে। আমার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছে। আদালত যদি এটা আমাকে বলতো যে, এই অধিকার তো আপনার ছিলই না। আমরা মনে করি ভোটাধিকার একটা নাগরিকের থাকতেই হবে। রিপাবলিক যদি আপনি তৈরি করেন সেখানে অধিকারটা থাকতেই হবে। ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের কথা আমরা বলছি এই কারণে যে, আজকের যুগে তথ্যপ্রাপ্তির একটা বড় জায়গা হচ্ছে ইন্টারনেট। বেশিদিন আগের কথা না, এই জুলাই মাসে কী পরিস্থিতি হয়েছিল সেটা কি আমরা জানি না। সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে এখানে একটা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। এগুলো তো অধিকার মানুষের। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সংবিধানেও আপনি যদি দেখেন এগুলোকে একেবারে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। একটা গণতান্ত্রিক সমাজের নাগরিক হিসেবে এগুলো আমাদের পাওয়ার কথা।
প্রশ্ন: নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ন্যূনতম বয়স ২৫ থেকে কমিয়ে ২১ করার প্রস্তাব করেছেন, এটি কি খুব আরলি হয়ে যাচ্ছে? আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এটা করা হয়েছে কি-না?
আলী রীয়াজ: কাউকে সুবিধা দেয়ার জন্য এটি করা হয়নি। বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফির দিকে তাকান দেখবেন বিশাল সংখ্যক তরুণ। তাদের কীভাবে রাজনীতিতে আনবেন। তাদের কণ্ঠস্বর কি শুধু রাজপথেই থাকবে না সংসদেও আসবে। আমরা সেই পথটা আনতে চাচ্ছি। আমরা চাচ্ছি তাদের যেন প্রতিবার রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবির কথা বলতে না হয়। জুলাই মাসের আন্দোলনেও সমাজের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে বেশির ভাগ তরুণ মাঠে নেমে এসেছেন। তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯০-এর আন্দোলনেও একই বিষয় ছিল। তাদের সেই কণ্ঠস্বর কি শুধু রাজপথে থাকবে, কেন তারা আইন প্রণয়নে যুক্ত হতে পারবে না। তাদের আইন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত করুন। কারণ ভবিষ্যৎ রাজনীতিটা তারাই করবে। কোন ধরনের দেশ তারা দেখতে চান তাদের সেই জায়গাটা তৈরি করে দিতে হবে। স্থায়ীভাবে বলার জায়গাটা করে দিতে হবে। এর মানে তো এমন না যে, ৩০০ আসনে সবাই ২১-২২ বছর বয়সে নির্বাচন করবেন। আমরা কেবল পথটা তৈরি করে দিতে চেয়েছি। যেন তরুণদের অংশগ্রহণটা নিশ্চিত করা যায়। রাজনৈতিক দলের কাছেও আমাদের আহ্বান থাকবে যে আপনাদের এক দশমাংশ পারলে তরুণ দেন। যেন তরুণদের অংশগ্রহণের একটা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকে। আমরা আশা করছি, রাজনৈতিক দলগুলো এটা বিবেচনায় নেবে। বিশেষ কারও পক্ষপাতের ব্যাপার নেই। কে সংসদে আসবে- সেটা জনগণ নির্ধারণ করবে।
প্রশ্ন: আইনসভার স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি বিরোধী দল থেকে মনোনীত করার প্রস্তাব করেছেন। বাস্তবায়ন কতোটুকু সম্ভব বলে মনে করেন?
আলী রীয়াজ: আমরা আশাবাদী। করবেনই এমন মনে করার কারণ নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত সরকার আলোচনা করবেন, রাজনৈতিক দলগুলোও এ বিষয়ে তাদের মত দেবে। তবে এটার উদ্দেশ্য হচ্ছে জবাবদিহিতা। স্থায়ী কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে নজরদারি করে। আমরা দেখেছি এ নজরদারিটা নেই। সেটি গত বছরগুলোতেই নয়, আমরা যদি দেখি একেবারে শুরু থেকেই ছিল না। আমাদের সংবিধানে এতটা শক্তিশালী বিষয় নেই যে, কমিটিগুলো নজরদারি করবে। তাই আমরা নজরদারির কথা বলেছি। একটা স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় সরকারের তো কোনো বিষয় লুকানোর কথা না। তাদের প্রতিনিধিও তো থাকবেন। তারা চাইলে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর প্রধানদের ডাকতে পারবেন। এ ছাড়া সারা পৃথিবীতে যেখানে ওয়েস্ট মিনিস্টার স্টাইলে সরকার আছে সেখানে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (পিএসসি) সব সময় বিরোধী দলের হয়। এর মূল কারণ হচ্ছে যাতে করে সরকারের ওপর একটি নজরদারি ব্যবস্থা থাকে। আমরা এ নজরদারি বাড়াতে চাচ্ছি।
প্রশ্ন: অর্থ বিল ছাড়া অন্যসব বিলে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়ার প্রস্তাব রেখেছেন।
আলী রীয়াজ: বাংলাদেশের সংবিধানে যে ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। বৃটেনে দেখেন সর্বশেষ কতোজন প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে। দল ক্ষমতায় আছে কিন্তু ব্যক্তি সরে যেতে হয়েছে। কারণ সে সব দেশে ঐরকম ব্যবস্থা তারা গড়ে তুলেছে। আমাদের সংবিধানের আর্টিকেল ৭০-এ সে রকম ব্যবস্থা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। এ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের তাদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অপসারণ মানেই তো সে দল ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়া নয়। কনজারভেটিভ পার্টির প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ২/৪ জন চলে গেলেন। কিন্তু দল ক্ষমতায় থেকেছেন। আমরা জবাবদিহিতার জায়গা থেকে এটা অপসারণের জন্য বলেছি। প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহিতার আওতায় থাকতে হবে, এমনকি তার নিজ দলের কাছেও জবাবদিহি থাকতে বাধ্য হবে। বাজেটের বিষয়টা পুরোপুরি লোয়ার হাউজের, কোনোভাবেই এটা আপার হাউজে যাবে না। জনগণকে কোনোভাবেই জিম্মি করা যাবে না। একটা দল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আছে। কিন্তু তার কিছু সদস্য বাজেটের বিপক্ষে ভোট দিলো তাহলে তো বাজেট আটকে যাবে। জনগণ ভোগান্তির শিকার হবে। তাই এক্ষেত্রে আমরা বলেছি, না অর্থ বিলে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়া যাবে না।
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের ক্ষেত্রে নানা প্রস্তাবনা থাকলেও সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের জন্য কোনো সংরক্ষিত আসনের কথা বলা হয়নি। যদিও দাবিটি পুরনো?
আলী রীয়াজ: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শব্দটিই আপত্তিকর। আমরা যে উচ্চকক্ষে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে ৫ জনের মনোনয়নের কথা বলেছি- আশা করছি প্রেসিডেন্ট সেটি বিবেচনায় নেবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে আমরা বলেছি যে, তারাও যেন ৫ শতাংশ সমাজে বঞ্চিত শ্রেণি থেকে মনোনয়ন দেয়। কিন্তু তালিকায় তো সবাইকে যুক্ত করা যাবে না। যুক্ত করতে গেলে এটা তো অনেক লম্বা হয়ে যাবে। আমাদের সেন্সটা হলো যারা সুবিধাবঞ্চিত, যাদেরকে আমরা সংখ্যালঘু বলি। শুধু সংখ্যালঘুর বিষয়টি একটি ধর্মীয় বিষয় হয়ে যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের সংসদে দলিতদের প্রতিনিধিত্ব থাকুক এটি চাই। এই সমাজে তাদের একটা স্টেক আছে। তাহলে এ রকম অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত আছে। আমরা বলছি রাষ্ট্রপতি যখন দেবেন তখন এবং রাজনৈতিক দল যখন দেবেন তারা যেন অন্তত পাঁচজনকে দেন। নারীদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও বলতে গেলে সকলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সকলের প্রতিনিধিত্ব করা। আসুন, আমরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা করি, সকলের প্রতিনিধিত্ব করি। আমরা যে ৪০০ জন প্রতিনিধির কথা বলেছি; তার মধ্যে ১০০ জন নারীর বিষয়টা অনেকদিন থেকে আলোচিত। অতীতে যে ৫০ জনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তারা প্রতিনিধিত্বশীল নয়। আমি মনে করি নারীদের অবমাননার মধ্যদিয়ে গেছে। এই ১০০ জনের প্রতিনিধিত্ব একই জাতি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবে- এমন নয়। সকলের অংশগ্রহণের সব জায়গায় তার প্রতিনিধিত্ব থাকবে। আমাদের এই জায়গায় এসে দেখুন কেন বহুত্ববাদের কথা বলেছি। একটা বহুত্ববাদের সমাজ সবাইকে প্রমোট করবে। আইনের মধ্যে করবে, সংসদের মধ্যে ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে করবে- সব জায়গায় সমান প্রতিনিধিত্ব করবে।
প্রশ্ন: প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী দুইবারের বেশি নয় প্রস্তাব করেছেন। একই সঙ্গে তাদের ক্ষমতার ভারসাম্যের দাবি ছিল। সেটি কতোটুকু বাস্তবায়ন হবে?
আলী রীয়াজ: আমাদের বিদ্যমান সংবিধানে প্রেসিডেন্টের দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় না থাকার বিধান রয়েছে, নতুন করে এ বিষয়ে কোনো সুপারিশ করিনি। আমরা সুপারিশ করেছি প্রধানমন্ত্রীর দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় রাখা যাবে না। যেটি দীর্ঘদিন যাবৎ আলোচনা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে ক্ষমতার এককেন্দ্রিক শাসন চলে আসে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি প্রস্তাব করেছি যে, তিনি দলের প্রধান ও সংসদ নেতা হতে পারবেন না। এটার কারণ হচ্ছে যাতে করে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকরণ না হয়। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতা যেন এক ব্যক্তির হাতে চলে না যায়। সে বিবেচনা থেকে আমরা বলেছি যে, প্রধানমন্ত্রী দুই মেয়াদের বেশি থাকা ঠিক নয়। এটা নাগরিকদের মধ্যেও চাওয়া আছে। আমরা সেটিরই প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করেছি। এটা অনিবার্য হয়ে উঠেছে; কারণ আমরা ক্ষমতার এককেন্দ্রিকরণ দেখেছি। তাই ক্ষমতার এককেন্দ্রিকরণের বিভাজনটা আমরা করতে চেয়েছি। ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়ে বিগত বছরে বলা হয়েছে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ভাগ করে দেয়া হলেই ভারসাম্য হবে আমরা সেদিকে যাইনি। প্রেসিডেন্টের কিছু ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। কারণ সংবিধানে আছে সকল ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেবেন। প্রেসিডেন্টের সুনির্দিষ্ট দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই তার প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেয়ার দরকার নেই। এর বাইরে ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য আমরা ন্যাশনাল কন্সটিটিউশনের কথা (এনসিসি) বলেছি। এনসিসি বলার দুটো কারণ রয়েছে, এক নম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের সঙ্গে কখনোই বসে না। পার্লামেন্টে যখন বসে একে অপরকে আক্রমণ করে কথা বলেন। এর জন্য আমরা রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করেছি। নির্বাহী বিভাগের দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট আসছেন, আবার আইনসভার দিক থেকে বিরোধীদলীয় নেতা আসছেন। আবার প্রধানমন্ত্রীও আসেন সেখান থেকে। আমরা প্রধান বিচারপতির কথা বলেছি। সংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা বিষয়টি এনসিসিতে নিয়ে গিয়েছি। যাতে সবাই পরামর্শ করে সবকিছু করতে পারেন। প্রতিরক্ষা বাহিনীর তিন বিভাগের নিয়োগের বিষয়টিও আমরা এনসিসিতে যুক্ত করেছি। যাতে ন্যাশনাল ইস্যুতে আমরা একসঙ্গে কাজ করবো।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকারের সুপারিশ করেছেন। এটি নিয়ে তো বিতর্কও ছিল। আবার কেন অনির্বাচিত সরকারের পরামর্শ করতে হয়েছে। আমরা কি স্থায়ী কোনো ব্যবস্থায় যেতে পারি না?
আলী রীয়াজ: বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্রের কাঠামোগুলো তৈরি হয়নি। হঠাৎ করে একটি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। গণতন্ত্র চর্চার বিষয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে অনেক ভুলভ্রান্তির মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে। আমি তো বলি যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ২৫০ বছরের দিকে আগাচ্ছে আমরা প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি ৫০ বছরে। তাতে আমাদের প্রাণ দিতে হয়েছে, লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু দুর্বল জায়গাগুলো হচ্ছে আমরা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারিনি। গণতন্ত্রের চর্চাটা প্রতিষ্ঠান দিয়ে করতে হয়। একটা স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকতে হবে। যে কারণে আমরা বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সেক্রেটারিয়েট দেয়ার কথা বলেছি। আমরা বলেছি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা দরকার। এগুলো যখন আস্তে আস্তে দাঁড়াবে তখন আর এটার প্রয়োজন হবে না। বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পৃথিবীতে একটি ইউনিক জিনিস বাংলাদেশ অফার করেছে। অন্যত্র কিন্তু ছিল না। এরপর কোথাও কোথাও এটি অনুসরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা এত সব সমস্যার মধ্যে থেকেও একটা পথ বের করেছেন। অনেকে রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করেন। কিন্তু আমি বলি তারা তো সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটা পথ বের করেছেন। এটার জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ লাগেনি। তাহলে আমরা এখন ওটা থেকে বের হতে পারছি না কেন, কারণ আমরা এখনো প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করতে পারিনি। ধরুন, আগামী দশ বছর যদি এনসিসি (জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ) ঠিকমতো কাজ করে, দুটো ভালো নির্বাচন হয়, বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারি দলের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক হয়, আস্থার জায়গা তৈরি হয়, তখন এটার দরকার হবে না। এটা তারাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কারণ পথ কেউ বন্ধ করেনি। দশ বছর পর বিরোধী দল, সরকারি দল সবাই যদি দেখেন যে, আমার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এত শক্তিশালী যে তত্ত্বাবধায়কের দরকার নেই, তুলে দেবেন। কিন্তু এ মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থার যে সংকট গত ৩০ বছর ধরে চলছে সে জায়গা থেকে বের হতে এটা প্রয়োজন। যখন প্রয়োজন হবে না, তখন বাতিল হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি করতে পারাটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হবে রাষ্ট্রের জন্য...
আলী রীয়াজ: আমরা মনে করি এটি বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে মানবাধিকার কমিশনের কথা বলেছি এ কারণে যে, আমরা যদি জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি করতে চাই তখন দেখতে হবে এমন প্রতিষ্ঠান আছে কিনা- যারা এ প্রশ্নটা তুলতে পারে। আমাদের দেশে গুম হয়েছে, বিচার বহির্ভূত হত্যা হয়েছে- মানবাধিকার কমিশন কিচ্ছু করতে পারেনি। আমি আবার তাকে প্রশ্নও করতে পারি না। এখন মানবাধিকার কমিশন যদি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হয়, তার যদি জবাবদিহিতা থাকে, সে জবাবদিহিতার ক্ষেত্র যদি সংসদ হয়, আমরা যদি একটি ভালো সংসদ পাই। তাহলে বিরোধী দল সেই প্রশ্নটা সত্যিই করতে পারবে। রাষ্ট্র যদি সত্যি নিপীড়ক হয়ে ওঠে তখন বিরোধী দল মানবাধিকার কমিশনকে প্রশ্ন করতে পারবে। আমরা এটাও বলছি- মানবাধিকার কমিশন যেকোনো জায়গা থেকে তথ্য চাইলে সরকার দিতে বাধ্য থাকবে। তাতে করে আমরা চেয়েছিলাম, তারা দেননি এ বলে পার পাওয়ার সুযোগ হবে না। সংবিধান, প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা করা। নাগরিকের সবচেয়ে বড় অধিকার হচ্ছে বেঁচে থাকার অধিকার। একটা গণতান্ত্রিক সমাজে সে যেন কথা বলতে পারে, সমাবেশ করতে পারে। যখন সেটি লঙ্ঘিত হবে তখন মানবাধিকার কমিশন বলবে এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনের জুডিশিয়ারি ক্ষমতা নেই। কিন্তু নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে আদালতে যেতে পারবেন।
প্রশ্ন: অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন, এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো কতোটা শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন?
আলী রীয়াজ: আমি পুরোপুরি আশাবাদী। এই কারণে যে, গত ১৬ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা, প্রাণঘাতী অভিজ্ঞতা। কী মর্মান্তিক পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে আমরা গেলাম। আমরা কি শিখিনি? নিশ্চয় শিখেছি। রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি সবাই তো শিখেছে। তাহলে এ রকম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করার ক্ষেত্রে তারা কেন প্রতিবন্ধক হবেন। তারাও তো চান। আজকে যারা রাজনীতিক আছেন তারা তো বিরোধী দলে ছিলেন ৫ই আগস্ট পর্যন্ত। কী নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যদিয়ে তারা গেছেন- তারা জানেন না। আমার থেকে তো তারা বেশি জানেন। কারণ তারা সেটির শিকার হয়েছেন। তাই তারাই তো এরকম পরিস্থিতি বন্ধ করার পথ খুঁজবেন। ভবিষ্যতে তাদেরও তো সে জায়গায় যেতে হবে। সবাই তো অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকে না। যারা স্বপ্ন দেখেন তাদের কী হয় তা তো আমরা ৫ই আগস্ট দেখেছি। যারা অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখেন তাদের শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে হয়।
প্রশ্ন: আপনাদের প্রস্তাবনা নিয়ে তো রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্টদের অনেকের আপত্তি আছে। এ বিতর্কের অবসান হবে কীভাবে?
আলী রীয়াজ: আলোচনা তো হবেই। আলোচনা করার জন্যই তো আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। ৫২ বছর আমরা সংবিধান নিয়ে কথা বলতে পারিনি। আজকে যদি আমরা একটু বেশিই বলি, সে বলার তো আমার অধিকার রয়েছে। যতগুলো সংশোধনী হয়েছে কারও সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। পঞ্চদশ সংশোধনীতে অধিকাংশ মানুষ বলেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করবেন না। কারও কথায় কর্ণপাত করা হয়নি। এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সবকিছু হয়েছে। আজকে সারা দেশ কথা বলতে পারে। আপনি, আমি সবাই কথা বলতে পারছি। আসুন আলাপ আলোচনা করি। আমি যেকোনো সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে দেখি। তার মানে এটার একটা গুরুত্ব বিবেচিত হচ্ছে। আমার প্রস্তাব হিসেবে নয়, বিষয় হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ বলে সকলে যুক্ত হচ্ছে। তাহলে আসুন সকলে কথা বলি।
প্রশ্ন: ছাত্ররা ১৯৭২-এর সংবিধানকে মুজিববাদী সংবিধান বলছে, যেটি শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার করে তুলেছে। আপনারা কী মনে করেন?
আলী রীয়াজ: আজকের বিদ্যমান সংবিধান ৭২-এর সংবিধান নয়। ৭২-এর সংবিধানের প্রথম পুনর্লিখন হয়েছে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিব যখন চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে একদলীয় ব্যবস্থা প্রেসিডেন্সিয়াল রুল চালু করেছেন। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রথম লঙ্ঘিত হয়েছে আওয়ামী লীগ দ্বারা। যারা ’৭২-এর সংবিধানের মর্যাদা নিয়ে কথা বলেন তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ ’৭৫-এর চতুর্থ সংশোধনী কি ’৭২-এর সংবিধানের লঙ্ঘন নয়। আবার পঞ্চদশ সংশোধনীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আপনি সমস্ত ব্যবস্থা বদলে দিচ্ছেন। জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই। নির্বাচনের আগে কোনো ম্যান্ডেট নেই, সংবিধান সংশোধনীর জন্য কোনো গণভোট হচ্ছে না। ছাত্ররা রাজনৈতিক শক্তি। তাদের কথা বলার অধিকার রয়েছে। এটা বাস্তবতা যে, বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান এক ব্যক্তির শাসন তৈরির পথ তৈরি করেছে। অন্যথায় বাংলাদেশ এই পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যেতো না। সংবিধানকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যেটা ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৬ বছর বাংলাদেশের মানুষ তা হাড়ে হাড়ে, শিরায় শিরায় অনুভব করেছে।
প্রশ্ন: সংবিধান সংস্কার কমিশনে সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি- এ নিয়েও তো বিতর্ক রয়েছে।
আলী রীয়াজ: এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক আমাদের কমিশনে কাঠামোগতভাবে সকলের প্রতিনিধিত্ব আমরা অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি। এটা আমাদের দুর্বলতা। এতে ধর্মীয়ভাবে যারা সংখ্যালঘু, জাতি গোষ্ঠীর বিবেচনায় যারা তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। এই কমিশনের এ দুর্বলতা থেকে গেছে। এটা আমি প্রথম দিন থেকেই স্বীকার করি। কিন্তু অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করতে হয়েছে। তাতে ওই দুর্বলতা শেষ হয়ে যায় না। তারপর আমরা কী করেছি। আমরা যখন জানি এটা আমাদের দুর্বলতা, আমরা চেষ্টা করেছি সে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সমস্ত রকম মানুষকে যুক্ত করার। তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। যারা ভিন্ন ভিন্ন জাতি গোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করেন তাদেরকে আমরা ডেকেছি, তাদের কথা শুনেছি। ধর্মীয় বিবেচনায় যারা সংখ্যালঘু বিবেচিত হন তাদেরকেও ডেকেছি। তাদের কথা তো শুনতে হবে। তারা তো এ দেশের নাগরিক। সংবিধান তো তাদের জন্যও।
প্রশ্ন: জাতীয় ঐকমত্য গঠনের প্রক্রিয়া কবে থেকে শুরু হবে?
আলী রীয়াজ: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজ এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রধানরা নিয়মিত আমরা বসছি। কিছু ভিন্নমত থাকলে সেটার সমন্বয় করছি। যাতে আমাদের সুপারিশগুলোতে সামঞ্জস্য থাকে। এটার কাজ প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে শেষ করতে পারবো। অন্তত চার পাঁচটি কমিশনের পুর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে পারবো। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে। তার আগে রাজনৈতিক দলগুলো পুরো প্রতিবেদন পেয়ে যাবে। সে আলোকে তারা তাদের মত দিতে পারবে।

Wednesday, December 4, 2024
সংবিধান পুনর্লিখনে ৬৯ দফা প্রস্তাব জাতীয় নাগরিক কমিটির
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব করে জাতীয় নাগরিক কমিটি বলছে, উচ্চকক্ষের নাম হবে জাতীয় পরিষদ ও নিম্নকক্ষের নাম হবে আইনসভা। তিনশ’ আসনের আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হবে জনগণের ভোটে। আর ১০০ সদস্যের জাতীয় পরিষদ হবে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে। এরমধ্যে ৩৩টি আসনে পেশাজীবী-কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-আইনজীবী- চিকিৎসক- প্রকৌশলী-কৃষিবিদ-সাংবাদিকসহ আইনে তফসিলভুক্ত পেশা এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানুষকে মনোনয়ন দিতে হবে। আইন পাসে উভয় কক্ষের অনুমোদনের বিধানের প্রস্তাব করে তারা। তাদের প্রস্তাব- নতুন লিগ্যাল ফ্রেম অর্ডারের অধীন গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা, সংবিধান প্রণয়ন সম্পন্ন হলে গণপরিষদই আইনসভায় রূপ নেবে, সংবিধানে প্রত্যেক জাতিসত্তার স্বীকৃতি থাকা, বাংলাদেশের নাগরিকগণ ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে পরিচিত করা, সংবিধানের প্রস্তাবনায় গণ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির বিধান রাখার পাশাপাশি গণভোটের বিধান রাখার প্রস্তাব করেছে সংগঠনটি। একইসঙ্গে সংবিধানে পরিবর্তনও শুধু গণভোটে করার প্রস্তাব করেছে নাগরিক কমিটি। স্বাধীন বিচার বিভাগ গঠনে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রস্তাব করে নাগরিক কমিটি বলছে, এর প্রধান হবেন প্রধান বিচারপতি। একইসঙ্গে প্রধান বিচারপতির অধীনে আলাদা সচিবালয় ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। তারা মনে করে রাষ্ট্র সরকারের নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপের বাইরে আনা গেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আর প্রয়োজন হয় না। তবে আগামী দুই নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলেও মত দিয়েছে তারা। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রশাসন নির্বাচনের আগের তিন মাস নির্বাচন কমিশনের অধীনে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংবিধান কীভাবে পুনর্লিখন হবে, এমন প্রশ্নে জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আগের সংবিধান বাতিল হয়ে গেছে বলে আমরা মনে করি। আমরা দীর্ঘসময় ধরে নতুন সংবিধানের দাবি জানিয়ে আসছি। সেটা গণপরিষদের মাধ্যমে বা অন্যকে বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই দাবি ও প্রস্তাবনা আমরা করছি। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো যে সংবিধান সংস্কারের কথা বলছেন, তাদের সঙ্গে আমরা একমত নই।
আখতার হোসেন বলেন, বর্তমান সংবিধানের সজ্জা, গঠন দেখলে মনে হয় এটা যেন আওয়ামী লীগের কোনো দলিল। আমরা আওয়ামী দলিল এবং যে সংবিধানের মধ্যে একজন ব্যক্তিতে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট গড়ে তোলার উপাদান রয়েছে, সেরকম সংবিধান রাখতে চাই না। আমরা জনগণের কাছে এ আহ্বান রাখছি। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। গণপরিষদ গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে গণপরিষদ হবে। সেখানে যারা অংশীজন আছেন, তারা সেটা ঠিক করবে। এক্ষেত্রে গণপরিষদ নির্বাচনে যারাই নির্বাচিত হয়ে আসবেন, সংবিধান প্রণয়নের পরে তারাই আইনসভার সদস্য হিসেবে কাজ করবেন। এ ক্ষেত্রে নতুন করে সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজন থাকছে না। সংবিধান পুনর্লিখনের প্রস্তাব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকেও দেয়া হয়েছে বলে জানান এই সংগঠনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল। তিনি বলেন, আমরা পুনর্লিখনের কথা বলেছি। গণপরিষদ লাগবে। গণপরিষদ নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের লিখিত স্বীকৃতি থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাব বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা করেছে বলে জানান আরিফ সোহেল।
তার ভাষ্য, সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট, বিচারপতি নিয়োগের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন, একইসঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দল অগণতান্ত্রিক আচরণ করলে তাদের আদালত থামিয়ে দিতে পারে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য তরিকুল ইসলাম বলেন, সংবিধান এমনভাবে সংস্কার করা হোক, যাতে রাষ্ট্রের তিনটি অর্গানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। বিচারপতি নিয়োগের বিধান নিশ্চিতে আইন প্রণয়ন, বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় না থাকায় প্রধানমন্ত্রীর কুক্ষিগত হয়ে কাজ করে, তাই আলাদা সচিবালয় করার প্রস্তাব দিয়েছি। সংবিধানে ছাত্রদের মতামতের প্রতিফলন সংবিধানে রাখার পরামর্শ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দিয়েছে। মতবিনিময় সভায় জাতীয় নাগরিক কমিটির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মুখপাত্র সামান্তা শারমিন, কেন্দ্রীয় সদস্য সারোয়ার তুষার, মুকুল মুস্তাফিজ, জহিরুল ইসলাম মুসা, আতিক মুজাহিদ ও সালেহ উদ্দিন সিফাত। আর সংবিধান সংস্কার কমিশনের পক্ষে ছিলেন কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য ফিরোজ আহমেদ, মুস্তাইন জহির, সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকরামুল হক, মইন আলম ফিরোজি, ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকী।

Tuesday, December 3, 2024
সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ হবে কিনা জানতে চাইলেন এক কূটনীতিক by মিজানুর রহমান
ইসকন এবং চিন্ময় দাশ প্রসঙ্গ: বিফ্রিংয়ে ইসকন পুরোহিত চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে জানানো হবে বলে দাবি করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। সেই সঙ্গে ইসকনসহ সংখ্যালঘু ইস্যুতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে নানা রকম খবর ছাপা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর বেশির ভাগই অসত্য। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে উপদেষ্টা বলেন, সব ধর্ম-বিশ্বাসের লোকজনের নিরাপত্তায় সরকার যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে তা বিশ্ব সমপ্রদায়ের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে হামলা করা হচ্ছে মর্মে ভারতীয় গণমাধ্যম অরকেস্ট্রেইটেড ওয়েতে যে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে তার কোনো ভিত্তি নেই বলে ফের দাবি করেন তিনি। তবে উপদেষ্টা বলেন- ঘটনা যে নাই বা সমস্যা নাই তা আমরা বলছি না। বরং যেসব ঘটনা ঘটেছে তা কো-ইনসিডেন্ট, ব্যক্তিস্বার্থ, পুরনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বা প্রতিহিংসা থেকে। কূটনৈতিক ব্রিফিংটি পুরোপুরি ফ্লেক্সিবল ছিল জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, এতে কেবল রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বা মিশনপ্রধানই নন, যেকোনো ডিপ্লোম্যাট ব্রিফিংয়ে অংশ নিয়েছেন। তারা খোলামেলা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। চা-খেতে খেতে অনেকে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে নির্বিঘ্নে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, আমি তাকে সেই গল্পটা তার অন্য সহকর্মী এবং হেডকোয়ার্টারের রিপোর্টে লিখতে অনুরোধ করেছি।
মমতাকে চিনি, তার বাড়িতে যাতায়াত ছিল আমার, তিনি তার স্টাইলেই বক্তব্যটি রেখেছেন- পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
এদিকে বাংলাদেশে শান্তিরক্ষী মোতায়েনের আহ্বান সংবলিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যকে ‘তার ধরনের একটি বক্তব্য’- হিসেবে দেখতে চান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিসেনা পাঠানোর আরজি জানাতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তার ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। সোমবার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যকে মমতা ব্যানার্জির ধরনের হিসেবে দেখতে চাই।’ মমতাকে চেনাজানা এবং তার বাড়িতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, মমতা ব্যানার্জি কেন এমন বক্তব্য দিলেন, আমরা জানি না। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তার রাজনীতির জন্য বিষয়টি ঠিক হয়নি। পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে আমরা স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে চাই।’ এ সময় চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের গ্রেপ্তার নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তাকে গ্রেপ্তার এবং আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। সঙ্গে বলা হয়েছে, তার অনুসারীরা বিক্ষোভ করতে পেরেছেন। কারণ, এই স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশেষ গোষ্ঠী বৈশ্বিক প্রচারণা চালাচ্ছে উল্লেখ করে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং এক্ষেত্রে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। আমরা মেনে নিচ্ছি, তাদের এক্ষেত্রে শক্তি আমাদের চেয়ে বেশি। তবে আমরা সবাইকে বিষয়টি স্পষ্ট করার চেষ্টা করছি।’ ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রধানত ভারতীয় গণমাধ্যমে অপপ্রচার চাালানো হচ্ছে। এর বাইরেও অনেক গণমাধ্যম ভারতীয় গণমাধ্যমকে উপজীব্য করে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। তবে আমরা বলতে চাই, সব সরকারের আমলেই বছরে দু’-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। তবে সরকারের কাজ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। আমরা সেটি করেছি। তবে দেশ ও দেশের বাইরে এ নিয়ে মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।’ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার বদ্ধপরিকর জানিয়ে উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা বার্তা দিতে চাই, বর্তমান সরকার সামপ্রদায়িক কোনো অপতৎপরতা বরদাশ্ত করবে না। আমরা হিন্দু-মুসলিম কোনো ভেদ করতে চাই না। কোনো বিশৃঙ্খলা দেখা গেলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো।’
অন্যান্য প্রসঙ্গ: এক প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘বৃটেনের অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের প্রতিবেদন একপেশে হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে সেখানে অবস্থানরত একটি বিশেষ গোষ্ঠীর মানুষ প্রভাব রেখেছে। বৃটেনের আওয়ামীপন্থি সাংসদের সংখ্যাও বেশি। তারা প্রতিবেদনকে প্রভাবিত করেছে। তারা আমাদের দূতাবাসকে এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, আসলেই ৫ই আগস্টের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে সমস্যা চলছে। এটা স্বীকার করতেই হবে। তবে আমরা স্বাভাবিক, ভালো সুসম্পর্ক চাই। এই সম্পর্ক অন্তরের চেয়ে স্বার্থই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের সম্পর্ক স্বার্থের মধ্যদিয়ে দেখতে হবে। তিনি বলেন, আমি কাল একটা হাসপাতালে গেলাম দেখি রোগী ভর্তি। আর কলকাতার দোকানপাট এখন খালি, যেহেতু ভিসা বন্ধ। এখন ভারতের স্বার্থ তো আমি বুঝতে পারবো না। তারা তাদের স্বার্থ বুঝবে। উপদেষ্টা বলেন, হিন্দু সমাজের পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের মনে হয়েছিল ভুল ধারণা যাতে সৃষ্টি না হয়, ভুল ধারণা সৃষ্টি করার সুযোগ আছে। বিশেষ করে মিডিয়া, কোন দেশের মিডিয়া বলছি না। তারা যতটুকু পারা যায় খারাপ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কাজেই আমাদের মনে হয়েছে যে কূটনীতিক যে প্রতিনিধিরা আছেন তাদের ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন যাতে তারা প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারে। তাদের কিছু ম্যাকানিজম আছে, কিন্তু আমরা আমাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছি। তৌহিদ হোসেন বলেন, আমরা বলেছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের সমাজের অংশ। সরকার এটি বজায় রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কোন মানুষ তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিগৃহীত হবে না সেটা আমরা নিশ্চিত করবো। সরকার এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে গত চার মাসে। যদিও অনেক মাল-মসলা ছিল অনেক বেশি গণ্ডগোল হওয়ার মতো। সেটি আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি। দুর্গাপূজার মতো উৎসব শান্তিপূর্ণ হয়েছে। এক-দুইটি ঘটনা যে ঘটেনি তেমনটা তো না। সেগুলো প্রতি বছরই দুই-একটা ঘটে। কোন দেশের মিডিয়ার অপপ্রচারের কথা বলছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমি খুব স্পষ্ট। প্রধানত ভারতের মিডিয়া। কিন্তু এর বাইরেও অনেক মিডিয়া ভারতের মিডিয়ার বক্তব্য ধরে নিয়ে প্রচার করেছে। মিডিয়া ছাড়াও ভারতের সরকার বা রাজনীতিবিদদের কোনো কড়া বার্তা দিতে চান কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা যে বার্তাটা দিতে চাই এই সরকার কোন ধরনের কোন সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপ বরদাশত করবে না। সেটা হিন্দু বা মুসলিম বলে কথা নয়। আমরা সবাইকে সমান চোখে দেখবো। এই বার্তাটি আমরা সবাইকে দিতে চেয়েছি। এ ব্যাপারে আইন তার গতিতে চলবে। যদি কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে তাদের শক্ত হাতে দমন করা হবে। এই বার্তাটি সবার কাছে গেছে। সরকারিভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলে সেটি সরকারিভাবেই প্রতিবাদ জানাই। বাকিটুকু সাধারণভাবেই বলেছি। তিনি বলেন, আজকের ব্রিফিংয়ে ভারতকে নিয়ে সেভাবে কিছু বলিনি। আমি মিডিয়ার সম্পর্কে বলেছি। বৈঠকে ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা ভুলে গেলে চলবে না যে একটা গ্লোবাল ক্যাম্পেইন চলছে। সবাই পার্টিসিপেট করছে তা না। কিন্তু গ্লোবাল ক্যাম্পেইনটা চলছে একটা বিশেষ গোষ্ঠীর কারণে। চেষ্টা করছে সব জায়গায় হিট করার। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটাও মেনে নিতে হবে তাদের রিচ আমাদের তুলনায় বেশি, আমাদের তাদের মোকাবিলা করতে হবে। বর্ডারে ভারতীয় প্রতিবাদকারীরা বাংলাদেশের বর্ডারে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, সেটিকে কীভাবে দেখেন- এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, এটাকে আমি একটা প্রভোকেশন হিসেবেই দেখি। প্রভোকেশন দেয়ার মতো লোকজন তো আছে, সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। এটাকে প্রভোকেশন হিসেবে ততক্ষণ দেখবো যতক্ষণ না তারা বর্ডার অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। বিএসএফ তাদের সেখানে থামাতে সক্ষম হয়েছে। প্রোটেস্ট তারা করতেই পারেন, তাদের দেশের আইনও সেটাকে অ্যালাউ করে। তবে বর্ডার পার হওয়া মানে আইন ভঙ্গ করা। সেটা তারা ব্যবস্থা নিবেন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক চায় জানিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দেখতে চায় বাংলাদেশ। চলতি মাসে নির্ধারিত ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি) অনুষ্ঠিত হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এটি অনুষ্ঠিত হবে।’

Sunday, November 17, 2024
বিপ্লবের পর সংবিধানের কার্যকারিতা নেই
সংবিধানের খসড়া প্রস্তাবনায় সালেহ উদ্দিন জাতীয় পরিষদ নিয়ে বলেন, জাতীয় পরিষদের সদস্য সংখ্যা হবে ২০০। তারা জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে অভিহিত হবেন। তাদের মধ্যে ৬৪ জন নির্বাচিত জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ১২ জন নির্বাচিত সিটি করপোরেশনের মেয়র, ২৫ জন সংরক্ষিত মহিলা এবং ১০ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায় ও তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ২৫ জন সংরক্ষিত নারী সংসদ-সদস্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হবেন। অবশিষ্ট ৮৯ জন জাতীয় সদস্য নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে নির্বাচিত হবেন। এরূপ বণ্টনের ফলে যে রাজনৈতিক দল আনুপাতিক হারে যত আসন পাবে, এর ভিত্তিতে তারা মনোনয়ন দেবে। তবে শর্ত থাকে, রাজনৈতিক দলগুলো যত আসন পাবে, এর অর্ধেক সদস্য নিজ দলীয় সদস্যদের মধ্যে থেকে, বাকি অর্ধেক সদস্য বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নির্বাচিত করবে। তবে তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না। সংরক্ষিত অপর ১০ জনকে প্রেসিডেন্ট সরাসরি মনোনয়ন দেবেন। এ মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট যতদূর সম্ভব সমতাবিধান করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমপ্রদায় ও তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করবেন। খসড়ায় বলা হয়, জাতীয় পরিষদ হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ও আইনপ্রণয়ন সভা, যা অর্থনৈতিক নীতি, জাতীয় নিরাপত্তা নীতি, বৈদেশিক সম্পর্কের নীতি এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিকাশে পথরেখা প্রণয়ন করবে। জাতীয় বাজেট (অর্থবিল) ছাড়া জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইন চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে জাতীয় পরিষদ। জাতীয় সংসদে বাজেট উত্থাপনের ছয় মাস আগে জাতীয় পরিষদে প্রাক-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় পরিষদের মেয়াদ হবে চার বছর। জাতীয় সংসদ নিয়ে বলা হয়, জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা থাকবে ৩০০। কোনো সংরক্ষিত মহিলা আসন থাকবে না। তবে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল দশ ভাগ নারী সদস্যকে মনোনয়ন দিতে হবে। সরকার গঠন, সরকারের প্রতি অনাস্থা এবং অর্থবিল পাসের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে থাকবে। এর বাইরে রাষ্ট্রের সকল আইন প্রণয়ন জাতীয় সংসদের প্রাথমিক অনুমোদনের পর জাতীয় পরিষদ চূড়ান্ত অনুমোদন দিবে। জাতীয় পরিষদ এবং সংসদ নিজেদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা নিজেরাই বৃদ্ধি করতে পারবেন না। কোনো শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবেন না। তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আবেদন সাংবিধানিক আদালত বিবেচনা করবে। নাগরিকের অধিকার বিষয়ে বলা হয়, আদালতের অনুমতি ব্যতিরেকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দণ্ড হতে পারে-এমন অপরাধে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে আদালতের অনুমতি ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। তবে গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করবে-এমন সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি ছাড়া কাউকে আটক রাখা যাবে না। তবে সন্দেহের উপযুক্ত ভিত্তি থাকতে হবে। আদালতে হাজিরের সময় প্রতিবেদনে উপযুক্ত কারণগুলো উল্লেখ করতে হবে। অহেতুক হয়রানি করা যাবে না। আদালতের অনুমতি ছাড়া নাগরিকের গৃহে প্রবেশ ও তল্লাশিতে পুলিশের অধিকার থাকবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রস্তাবনায় তিনি বলেন, জাতীয় পরিষদের যেসব রাজনৈতিক দলের অরাজনৈতিক সদস্য আছেন তাদের এক জন করে প্রতিনিধি নিয়ে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধাবধায়ক সরকার গঠন’ বিষয়ক একটি সার্চ কমিটি গঠিত হইবে। ওই কমিটিতে সংসদের সরকারি দলের নেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতা অথবা তাহাদের একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। জাতীয় পরিষদের অধ্যক্ষ এই সার্চ কমিটির সভাপতি হইবেন। তাহারা ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় পরিষদের একজন নির্দলীয় সদস্যকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে এবং পনেরো জন উপদেষ্টার মধ্যে দশ জন নির্দলীয় জাতীয় পরিষদ সদস্যকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করিবেন। সুপারিশ পাওয়ার পর তিনি প্রধান উপদেষ্টা এবং দশ জন উপদেষ্টাকে নিয়োগ দিবেন। তারা ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা ও দশ উপদেষ্টার তালিকা চূড়ান্ত করতে ব্যর্থ হইলে কমিটির সদস্যদের দুই তৃতীয়াংশ মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে। প্রধান উপদেষ্টা এবং দশ জন উপদেষ্টা নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা অন্যান্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে অবশিষ্ট পাঁচ জন উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে লিখিতভাবে সুপারিশ করিবেন। তাহারা জাতীয় পরিষদ অথবা জাতীয় সংসদের নির্দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকেও হইতে পারিবেন অথবা আইনসভার বাহিরে সমাজের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও হইতে পারবেন। তবে তাদের কেউই কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হইতে পারিবেন না। জাতীয় সংসদের কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিতে পারিবেন না। সাংবিধানিক আদালত নিয়ে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি সাংবিধানিক আদালত থাকবে। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত একজন প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের তিন জন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এবং হাইকোর্টর দুই জন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি লইয়া এই আদালত গঠিত হইবে। সাংবিধানিক আদালতে কেউ মামলা দায়ের করতে পারবে না। আদালত শুধু নিজ উদ্যোগে সংবিধান লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা নিজ উদ্যোগে পর্যবেক্ষণ করিতে এবং এহেন কার্য হইতে বিরত রাখিতে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান করিতে কিংবা এই ধরনের কোনো কার্যসম্পাদন হইলে তাহা অবৈধ ঘোষণা করিতে পারিবে। সংবিধানের কোনো ব্যাখ্যার প্রশ্ন উত্থাপিত হইলে প্রেসিডেন্ট, জাতীয় পরিষদ অধ্যক্ষ ও স্পিকার সাংবিধানিক আদালতের মতামত গ্রহণ করিতে পারিবেন। এমনকি নির্বাহী কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনের কোনো চাহিদা পূরণে অনীহা দেখালে কমিশন সাংবিধানিক আদালতে অভিযোগ করতে পারবে।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন নিয়ে বলা হয়, উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ দিবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে কমিশনে সদস্য হবেন আইনমন্ত্রী, আপিল বিভাগের একজন এবং হাইকোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারক। অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনজীবী সমিতির সভাপতি, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং সরকারি ও বিরোধী দল ও জাতীয় পরিষদের অধ্যক্ষ মনোনীত একজন করে সদস্য থাকবেন। ভোটের অধিকার নিয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ভোটের অধিকার নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র করলে কিংবা ভোট প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটের ৫০ ভাগ প্রদত্ত না হলে নির্বাচন বাতিল হবে এবং পুনরায় দুই মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। জন্মসূত্রে বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক দেশে ১৮ বছর পর্যন্ত বসবাস করলে জাতীয় সংসদ ও জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে বলা হয়, রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক ও গঠনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কমিটি গঠন হয় কিনা তা নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করবে। রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন বা ছদ্মনামে কোনো সংগঠন থাকবে না। জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল নিয়ে বলা হয়, সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ রেখে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কাউন্সিলের প্রধান হবেন রাষ্ট্রপতি। সরকার প্রধান, আইন সভার অধ্যক্ষ, স্পিকার, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা, তিন বাহিনী প্রধান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব কাউন্সিলের সদস্য হবেন। ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে বলা হয়, সরকারের প্রতি আস্থা-অনাস্থা ভোট এবং অর্থ বিল ছাড়া আর সকল কিছুতে স্বাধীনভাবে মত প্রদান ও ভোট দেয়ার অধিকার আইন সভার সদস্যদের থাকবে। এ ছাড়াও সরকারি দপ্তরে নেতা-নেত্রী বা সরকারপ্রধানের বদলে জাতীয় পতাকা ও জাতীয় প্রতীক থাকবে। রাষ্ট্রের শত্রু ছাড়া কোনো নিবর্তনমূলক আইন থাকবে না। প্রেসিডেন্টের দণ্ড মওকুফের কোনো স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা থাকবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নির্দলীয় ভিত্তিতে। এক ব্যক্তি সংসদের একাধিক আসনে নির্বাচন করতে পারবে না। ন্যায়পাল থাকবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিপ্লবত্তোর বাংলাদেশে যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা সংবিধান সংশোধনের কথা ভাবছি সেটা তাদের (শহীদদের) প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা জানানো। কিন্তু আমাদের কিছু সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার বিষয় চিন্তায় রাখতে হবে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে যদি তাকাই তাহলে এই প্রস্তাবনাগুলো (খসরা) এই সরকারের জায়গা থেকে সংবিধান সংশোধনের কোনো সুযোগ আছে কিনা সেটা ভেবে দেখা দরকার। কেন না এই অনুচ্ছেদে আপনি সবকিছু করতে পারবেন শুধু সংবিধান সংশোধন ছাড়া। তিনি বলেন, এখন সংসদ নেই, গণভোট নেই- এসব প্রশ্নগুলো এখানে যৌক্তিক ও আইনগতভাবে আসবে। গণতন্ত্র যদি ঠিক থাকে, যদি ভোটাধিকার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সব ঠিক থাকবে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম. এ মতিন বলেন, যে সংবিধান ফ্যাসিস্টদের জন্ম দিয়েছে, বিপ্লবের পর সেই সংবিধান গুরুত্ব হারিয়েছে। কেন না বিপ্লব তো সংবিধানের আওতায় হয়নি। এই বিপ্লব ব্যর্থ হলে তো বিপ্লবীদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হতো। এখন যারা জীবন দিলো, তাদের যে চিন্তা-ভাবনা, তাদের যে চাওয়া-পাওয়া এগুলোকে ধারণ করে সংলাপের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা করা এবং একটি নির্বাচন করাই হোক লক্ষ্য। নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা এসে সংবিধানের বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। তাহলে আমরা একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে যেতে পারবো। সংবিধানের আকার ছোট করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সংবিধান পুনর্লিখন নাকি সংশোধন হবে, সেটা জনগণের সিদ্ধান্ত। তবে সেটা তো সংবিধানে লেখা থাকবে না। সবসময় মানুষের অলিখিত অধিকার অসংখ্য থাকবে, কিন্তু কিছু কিছু অধিকার থাকবে লিখিত। তবে লিখিত থাকার অর্থ এই নয় যে এর বাইরে আমাদের কোনো অধিকার থাকবে না।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার বিষয়ক কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংবিধান শুধু আইনজ্ঞদের বিষয় নয়, এটি জনগণের বিষয়। এখানে নাগরিকদেরও মতামত থাকতে হবে। তিনি বলেন, সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। ওই সংশোধনী ছিল একটা ধৃষ্টতা। এর মাধ্যমে সংবিধানকে কলুষিত করা হয়। এর মাধ্যমে সংবিধানের এক-তৃতীয়াংশ পরিবর্তন করে ফেলা হয়। এক সংসদকে আরেক সংসদের বেঁধে ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে উচ্চ আদালতে চলমান মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ সংশোধনী বাতিল হলেই তত্ত্বাবধায়ক ফিরে আসবে না। এজন্য পরবর্তী সংসদ বিষয়টি তুলতে হবে। বদিউল আলম মজুমদার জাতীয় সংসদে ৪৫০ আসন এবং এর মধ্যে নারীদের জন্য ১০০ আসন বরাদ্দ রাখার দাবি জানান। একই সঙ্গে শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেন দেন। সংবিধানের পুনর্লিখন আদৌ সম্ভব নয় এবং সে প্রক্রিয়াও সংবিধানে নেই উল্লেখ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি অতিক্রম করেছে। এখন একটা নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। এখন সংবিধানের কিছু জায়গায় নতুন চিন্তা-ভাবনা হতেই পারে। তাই মৌলিক মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত কি কি ধরনের প্রতিকার আমরা পেতে পারি, ভবিষ্যতে কি করতে পারি সেটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। তিনি বলেন, একটা জিনিস আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, গণতন্ত্রে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তারাই তো সরকার গঠন করে। কিন্তু ওই অবস্থায় যারা সংখ্যালঘু, শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু নয়, ভিন্ন মত ও ভিন্ন গোষ্ঠীর যারা তাদের অধিকার তো রক্ষা করতে হয়। সেটার জন্যই কিন্তু সংবিধান এবং সেজন্য আমাদের সংবিধানে যারা সুবিধাবঞ্চিত, প্রান্তিক, সেটা ভাষার কারণে, লিঙ্গের কারণে, প্রতিবন্ধিতা ও জাতিসত্ত্বার কারণে হতে পারে, তাদের অধিকার শুধুমাত্র সংবিধানের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারবো। জেষ্ঠ আইনজীবী হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ৫৩ বছরে আমরা একটা ভালো নির্বাচনী ব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি। গত ১৫ বছরে আইন করে লুটপাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জাতীয় সংসদকে একটা চুরির আইন বানানোর সংস্থায় পরিণত করা হয়েছে। মৌলিক অধিকার চর্চার মতো পরিস্থিতি তৈরি না করলে কোনো চেষ্টাই ফলপ্রসূ হবে না। অনুষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, আমাদের রাজনীতিবিদরা নাগরিকদের প্রজা মনে করেন। আমরা আসলেই প্রজা হয়ে গেছি। সংবিধান বার বার ব্যর্থ হয়েছে। নাগরিকের ক্ষমতা নেই। তাই জনগণের ক্ষমতার চর্চার সুযোগটা আসেনি। সংসদ সদস্যরা যতক্ষণ পর্যন্ত জবাবদিহিতার আওতায় না আসবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের প্রজা হয়েই থাকতে হবে।

Friday, November 15, 2024
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল চায় জামায়াত
শিশির মনির মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদে স্বাধীন ভোটাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদটি সংসদ সদস্যদের তাদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখে। অনুচ্ছেদটি ব্যক্তির পছন্দ অপছন্দের সুযোগ থাকে না। তিনি স্বাধীনভাবে কোনো মতামত দিতে পারেন না। সংসদ সদস্যরা তাদের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের সংসদীয় আসন হারায়। শিশির মনির আরও বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আর এই কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, এমনকি বিচার বিভাগকে এক প্রকার ধ্বংস করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনী বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক যে ভিত্তি আছে, তার সঙ্গে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিক। আমরা এও বলেছি, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেটি বাংলাদেশের বাইরে সকল মানবাধিকার সংগঠন, গবেষণা সংগঠন এবং বাংলাদেশকে নিয়ে যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লেখালেখি করেন, সকলেই বাংলাদেশকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচন পদ্ধতিটাকে ধ্বংস করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের যে প্রক্রিয়া, সেই প্রক্রিয়াকে ইচ্ছা করে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যেখানে নির্বাচন আর নির্বাচন থাকেনি। এজন্য পঞ্চদশ সংশোধনী বাংলাদেশের মানুষের আশা ও আকাক্সক্ষা ধ্বংস করেছে। বাংলাদেশের মানুষ ভোটকে উৎসব হিসেবে নিতে পারেনি। সেই নির্বাচনী উৎসবকে ধ্বংস করে আমরা এটিকে একটি কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারে পরিণত করেছি। আমরা নির্বাচন করেছি কিন্তু সেখানে বিচার বিভাগের কাছে কোনো প্রতিকার পায়নি। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছিল। এই পঞ্চদশ সংশোধনী বাংলাদেশের সাংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সিস্টেমের কথা বলে। এটা কোনো কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের কথা বলে না। এ জন্য এই পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া উচিত। দু’একটি বিধান রেখে বাকি সবগুলোই কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার ব্যবস্থাকে স্থায়ী করেছে। এগুলো সংবিধানের অংশ হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাংলাদেশের সংবিধানে এসেছিল, সকল রাজনৈতিক দল, কৃষক, শ্রমিক, জনতা, ছাত্র সকলের মতামতের ভিত্তিতে। এবং সেটি হয়েছিল এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রথম বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা চালু হয়। এরপর সংবিধানের ১১তম সংশোধনী আনা হয়। সেখানে সব কথা বলা আছে। যে সংশোধনী মতৈক্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে তা কেন ধ্বংস করা হলো। এটিকে ধ্বংস করা সংবিধানকে ধ্বংস করার শামিল। অপরদিকে এদিন সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধানের তুলনা করে পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে শুনানি করেন। আগামী বুধ ও বৃহস্পতিবার পরবর্তী শুনানির জন্য রাখা হয়েছে।

Tuesday, November 5, 2024
সংবিধানে যেনতেনভাবে হাত দেয়া যাবে না
ড. কামাল হোসেন বলেন, সংবিধানের হেফাজতকারী জনগণ। তাই সংবিধান নিয়ে জনগণকে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে। গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘সংবিধান জনগণের জন্য এবং জনগণই এটার হেফাজতকারী। প্রতিটি মানুষই কিন্তু ক্ষমতার মালিক হিসেবে ভূমিকা রাখি। আমরা যদি মনে করি যে, এভাবে সংবিধানের ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্ট ব্যাখ্যা করছে। কোনো ভুল হলে আমরা ধারণা রাখতে পারি। আমরা বিষয়টা তুলে ধরবো এবং একটা ঐক্যমত গড়ে তুলবো এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেটা করণীয় সেটা করা হবে। তিনি বলেন, জনগণের ভূমিকা হলো সতর্ক থাকা। যেভাবে সংবিধানের ব্যাখ্যা করা হবে, যেভাবে কোর্টের কাছে তুলে ধরা হবে, সব ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। সরকার যদি মনে করে যে, ভুল হয়েছে তাহলে ভুলকে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে যে ভুল হয়েছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানে হাত দেয়া যেতে পারে উল্লেখ করে ড. কামাল হোসেন বলেন, কোনো ব্যক্তির কলমের খোঁচা দিয়ে সংবিধান বদলানো যাবে না। একজন ব্যক্তি যদি মনে করেন, প্রেসিডেন্টও যদি মনে করেন যে এটা ভুল, এটা তারও উচিত হবে না যে, কলমের খোঁচা দিয়ে এটাকে পরিবর্তন করা। জনগণের মতামতও জানতে হবে। যখন দেখা যাবে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার মত গড়ে উঠেছে, তখন সংবিধানে হাত দেয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, সংবিধানের যে পবিত্রতার কথা আমরা বলি, মৌলিক আইনের যে কথা আমরা বলি, সব আইনের ঊর্ধ্বে সংবিধান। তাই যেনতেনভাবে এটাতে হাত দেয়া যায় না।
আলোচনায় অংশ নিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশ্লেষক ড. শাহদীন মালিক বলেন, দেশ ও রাষ্ট্র চালাতে গেলে সব সরকারেরই সমস্যা হয়। কিন্তু সমস্যায় পড়ে এই যে এত বার, গত ৫২ বছরে বিভিন্ন নামে ১২ বার সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন আমরা করেছি। এটা আমরা কেন জানি করেই চলেছি। এগুলো রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা সম্পর্কে আমাদের অপরিপক্বতার বহিঃপ্রকাশ। সমস্যায় পড়লেই আমরা সমাধান খুঁজি সরকার পদ্ধতি পরিবর্তনের। এটা পৃথিবীর আর কোথাও হয় না।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন- অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এম. মাহবুব উদ্দিন খোকন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী প্রমুখ। ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, আগে যে কয় বার সংবিধান সংশোধন হয়েছিল, তার বেশির ভাগই হয়েছে শাসকের ইচ্ছায়, জনগণের ইচ্ছে অনুযায়ী নয়। সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সংবিধান রাষ্ট্রীয় দলিল। দলীয় বা ব্যক্তি স্বার্থে যদি সংবিধান পরিবর্তন করতে চায়, তাতে লাভ হবে না। যারা সংবিধান সংশোধন করতে চান, তাদের উচিত সকল রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করা।
জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, সংবিধান ৫৩ বছর আগে প্রণয়ন হয়েছে। কামাল হোসেন তখন ছিলেন তরুণ আইনজীবী। ৫৩ বছর পর সংবিধানের বানান এখনো ভুল। যা তৈরি করা হয়েছিল তার আর অবিকল নেই। সরকার বা শাসকরা তাদের স্বার্থে এটি করেছে। সংবিধানের নাম ভুল আছে। এদেশে রাজা নেই রানী নেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান হবে না। একশ’ বছর আগে গণতন্ত্র ছিল। এখন সেটি নেই।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সংবিধান নিয়ে যে বিতর্ক আসছে, তা আমাদের সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি নির্বাচনের জন্য কালো মেঘ দেখছি। এখন সংবিধান কিছু করলে অ্যাপ্রুভ করবে কে? এসব আলোচনা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা চাই, কথায় নয় কাজে। ব্যক্তি স্বার্থে কিংবা দলীয় স্বার্থে সংবিধান সংশোধন করলে তা টেকে না।

Monday, November 4, 2024
৭ উদ্দেশ্যে সংবিধান সংস্কার -ড. আলী রীয়াজ
সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলী রীয়াজ বলেন- ক. দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুত উদ্দেশ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আলোকে বৈষম্যহীন জনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। খ. ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে প্রকাশিত অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো। গ. রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বস্তরে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা। ঘ. ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার উত্থান রোধ। ঙ. রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ- নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা এবং বিচার বিভাগের পৃথক্করণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন। চ. রাষ্ট্র ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের বিকেন্দ্রীকরণ ও পর্যাপ্ত ক্ষমতায়ন। ছ. রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক এবং আইন দ্বারা সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যকর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
তিনি আরও বলেন, আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ করবো লিখিত মতামত এবং সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠানোর জন্য। সরকার বিভিন্ন কমিশনের কাছ থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে। ফলে কমিশনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করবে না। কিন্তু তাদের দেয়া প্রতিটি লিখিত প্রস্তাব ও মতামত কমিশন নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করবে এবং কমিশনের সুপারিশে তার যথাসাধ্য প্রতিফলন ঘটাতে সচেষ্ট থাকবে।
লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ সংস্কারের পরিধি নিয়ে বলেন, সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত হবে বর্তমান সংবিধান পর্যালোচনাসহ জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের লক্ষ্যে সংবিধানের সামগ্রিক সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন, পুনর্বিন্যাস এবং পুনর্লিখন। সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুত উদ্দেশ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আলোকে বৈষম্যহীন জনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে প্রকাশিত অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো হবে সুপারিশে। পাশাপাশি রাজনীতি এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় সর্বস্তরে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা, ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান রোধ, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের পৃথক্করণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, রাষ্ট্র ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ ও পর্যাপ্ত ক্ষমতায়নের সুপারিশ থাকবে কমিশনের। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক এবং আইন দ্বারা সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ থাকবে বলে জানায় কমিশন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, কমিশন সংস্কারের সুপারিশ তৈরিতে বিভিন্ন অংশীজনদের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করবে। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মতামত ও প্রস্তাব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। সংস্কারের অংশ হিসেবে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের লিখিত মতামত এবং সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ করবে। সুপারিশ পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসবে কমিশন। এ ছাড়া সংবিধান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সিভিল সোসাইটির সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, তরুণ চিন্তাবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করবে। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনায় বসবে কমিশন। তবে, যেসব ব্যক্তি, সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, বা দল জুলাই-আগস্ট ছাত্র- জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সক্রিয়ভাবে হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ছিল, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নকে সমর্থন করেছে, ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমকে বৈধতা প্রদানে সহযোগিতা করেছে কমিশন তাদের সংস্কার প্রস্তাবের সুপারিশ তৈরিতে যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

Friday, November 1, 2024
আল্লাহর নামে কতল হয়ে যাব : ফরহাদ মজহার
শুক্রবার (০১ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সেন্টার ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড পিস স্টাডিজ আয়োজিত ‘দুর্নীতি ও রাষ্ট্রপতি বা সংস্কার’ শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।
ফরহাদ মজহার বলেন, অনেকে বলেন বাংলাদেশে ইসলাম কায়েম করতে হলে ফরহাদ মজহারকে নাকি কতল (হত্যা) করতে হবে। আমি কিন্তু বিষয়টা জেনে গেছি। আমাকে যেখানে বলবেন আমি যাব, আমাকে কতল করে ফেলবেন। আমাকে কতল করলে যদি ইসলাম কায়েম হয় তবে ইনশাআল্লাহ আল্লাহর নামে কতল হয়ে যাব। আমাকে ভয় দেখাবেন না। কিন্তু ফ্যাসিজমকে ইসলাম বলে প্রচার করবেন না। আপনারা কোথা থেকে আসেন, সেটা আমরা জানি। আপনাদের কারা পাঠায়, সেটাও আমরা জানি।
তিনি বলেন, আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি তবে জনগণকে উপেক্ষা করে। আমরা গণঅভ্যুত্থানের পরেও জনগণকে উপেক্ষা করি, এটা অদ্ভুত ব্যাপার। এতগুলো মানুষ শহীদ হয়ে গেল, এতগুলো মানুষ পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে, তারপরেও কিন্তু আমরা জনগণকে উপেক্ষা করেছি। আপনি ধরে নিচ্ছেন তথাগত রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের প্রতিনিধি। এটা ঠিক নয়।
তিনি আরও বলেন, সংবিধান শব্দটা সঠিক নয়। এটা ঔপনিবেশিক শক্তি ব্যবহার করে। তারা যাদেরকে শাসন করবে, তাদের শাসন করার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়। এটাকেই বলা হয় সংবিধান। কনস্টিটিউশনের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে গঠন। কনস্টিটিউশনের লিগ্যাল এবং পলিটিক্যাল অর্থ হচ্ছে যুগপৎ। আপনারা কনস্টিটিউশন শব্দটা বাদ দেওয়ার চেষ্টা করবেন। এটার ব্যবহার ইংরেজ আমল থেকে শুরু হয়েছে। আমি একটা আইন দেব, সে আইনের দ্বারা আমি শাসন করব। আপনি শাসিত এবং আমি শাসক। গণতন্ত্রে শাসিত এবং শাসক বলে কোনো পার্থক্য থাকতে পারে না। গণতন্ত্রে জনগণ নিজের শাসক। আইন এবং রাজনীতির সম্পর্ক আমরা বুঝি না বলে এবার গণঅভ্যুত্থানটা ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হওয়াটা জরুরি ছিল। যাতে আমরা টের পাই আমাদের অজ্ঞতা, আমাদের বেহুঁশ অবস্থা, এটা আমাদেরকে ভুল দিকে নিয়ে যাবে। আমরা বারবার সংস্কার সংস্কার বলছি। আপনি তো বাড়িই গঠন করেন নাই, সংস্কার কীভাবে করবেন?
ফরহাদ মজদার বলেন, ১৯৭২ সালে আপনি যাদের পাকিস্তানের গঠনতন্ত্র বানানোর জন্য ভোট দিয়েছেন, তারাই ফিরে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করল। তারা শাসন করতে যেটা চেয়েছে সেটাই করেছে। তারা সমাজতন্ত্র ঢুকিয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষতা ঢুকিয়েছে। ওদের যে মতাদর্শ যেটাকে আমরা ফ্যাসিজম বলি। এটা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে এতটা বছর শাসন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ বুঝানোর চেষ্টা করেছে, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধারণ করেছি। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সাম্য মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার।
তিনি বলেন, আপনি একটা গণঅভ্যুত্থান করেছেন। কোনো অভ্যুত্থানে কখনো শপথ করা লাগে না। আপনি যদি শহীদ মিনার বা রাজু ভাস্কর্যের সামনে শপথ গ্রহণ করতেন তাহলে যারা শহীদ হয়েছে, যারা পঙ্গু হয়েছে, তাদের যথার্থ মর্যাদা আপনিই দিতে পারতেন। যখনই আপনি বঙ্গভবনে ঢুকেছেন তখনই শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। তারই কিন্তু কুফল প্রত্যেকটা দিন আপনারা দেখছেন। এর কুফল আপনারা আগামী দিনেও দেখতে পারবেন। এটা বারবার বিভিন্নভাবে আসবে।
তিনি আরও বলেন, আপনারা সরকারের দুই একটা সংস্কার নিয়ে কথা বলছেন। এটা কিন্তু এখনকার আলোচনার বিষয় না। সরকারে আজকে একজন আছে আগামীকাল আরেকজন থাকবে। মূল বিষয়টা হচ্ছে রাষ্ট্র গঠন করা। আপনার এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করতে হবে, যেখানে রাষ্ট্রের মধ্যে আমরা প্রত্যেকেই এই রাষ্ট্রের অন্তর্গত। আমাদের অভিপ্রায়টা সার্বজনীন থাকতে হবে। আমরা এমন একটা রাষ্ট্র চাই যেটা আমাদের জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করবে। আমার জীবন ও ব্যক্তির স্বাধীনতা ও মর্যাদা হরণ করতে পারবে না। একটা গঠনতন্ত্র তৈরি করা খুব কঠিন কাজ না।
![]() |
| লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার। ছবি : সংগৃহীত |
Tuesday, October 29, 2024
রাষ্ট্রপতির শপথে প্রধান বিচারপতির অনিবার্যতা by শহীদুল্লাহ ফরায়জী
কিন্তু বাংলাদেশে এর ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান জাতীয় সংসদের স্পিকার। রাষ্ট্রের প্রধানের শপথ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগকে উপেক্ষা করা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের তিন বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য বিনষ্ট করা। এতে সংবিধানের গভীর দার্শনিক ভিত্তি থেকে রাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেই দার্শনিক ভিত্তি হচ্ছে- রাষ্ট্রপতি সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে প্রধান বিচারপতির নিকট শপথ গ্রহণ করে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, এটাই হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সাংবিধানিক নির্দেশনা।
রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক এবং তিনি সংবিধানের অভিভাবকের কাছে শপথ বাক্য পাঠ করেন। তাই রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠে প্রধান বিচারপতি অনিবার্য। যেহেতু রাষ্ট্রপ্রধান রূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেন সেহেতু তাঁর শপথ রাষ্ট্রের অধীনস্থ তিন বিভাগের কোনো প্রধানের নিকট নয়, তিনি শপথ পাঠ করবেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির নিকট। এই অন্তর্নিহিত দর্শনের জন্যই প্রধান বিচারপতিকে ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রধান বিচারপতির নিকট শপথ বাক্য পাঠ করার এই বাধ্যবাধকতা এবং মহিমান্বিত সাংবিধানিক মর্যাদা প্রজাতন্ত্রের কেউ বিনষ্ট করতে পারেন না, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তা করেছে।
সংবিধানের চতুর্থ ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই আইন বলবৎ করা হয়েছে, যা প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের সাথে চরমভাবে সাংঘর্ষিক। এটা আইন ও বিচারবিভাগের প্রতি ছিলো আওয়ামী সরকারের অসম্ভব বিদ্বেষমূলক আচরণ প্রকাশের নজির— যা সাংবিধানিক ন্যায্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
এর দর্শনগত দিক হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি শপথ নেবেন তাঁর কাছে— যিনি জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র এবং সংবিধান সুরক্ষার ঘোষিত ও অনবদ্য দায়িত্বে অতন্দ্র ভূমিকায়, সেই প্রধান বিচারপতির নিকট। প্রধান বিচারপতির এই মর্যাদা এবং সম্মানের মুকুট বিচারবিভাগের মর্যাদাকে উচ্চকিত করে।
আইনবিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার বাড়াবাড়িকে সংবিধানের আলোকে নিয়ন্ত্রণ করে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারে কেবল বিচারবিভাগ। প্রজাতন্ত্রে বিচারবিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে নিশ্চিত করার জন্যই সুপ্রিম কোর্টকে সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং প্রধান বিচারপতিকে ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সংবিধানবহির্ভূত যেকোনো বিধানকে অবৈধ ঘোষণা করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের উপর ন্যাস্ত করা হয়েছে। বিচারবিভাগের এই ক্ষমতাকেই সংবিধানের অভিভাবকত্বে উন্নীত করেছে। সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার, ক্ষমতার ধরন এবং ব্যাপ্তি—যেকোনো দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সমকক্ষ। রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনা করবেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি— এটি মৌলিক এখতিয়ার।
রাষ্ট্রপতির শপথে যেহেতু উচ্চারিত হয়— ‘আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব, সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান করিব’ সেহেতু বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির নিকট শপথ বাক্য পাঠ করবেন, এর চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কোনো বিকল্প হতে পারে না। প্রধান বিচারপতির এই মর্যাদা প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত। এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় চিরকালীন ও বিশ্বজনীন নীতি।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শপথ নিয়েছেন রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভ তথা জাতীয় সংসদের স্পিকারের নিকট, যিনি শপথ গ্রহণকারীর সংবিধান রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধানে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেন না। এই বিধান কোনোভাবেই প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এমনকি মর্যাদাপূর্ণও নয়। এটা অগ্রহণযোগ্য। এতে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়নি বরং বিঘ্নিত হয়েছে!
বাংলাদেশে দু’টি পদকে সংবিধান প্রজাতান্ত্রিক মর্যাদা দিয়েছে। পদ দু’টি হলো— ১. রাষ্ট্রপতি এবং ২. প্রধান বিচারপতি। (এই দু’জনের পদ এবং পদবির সাথে প্রজাতন্ত্রের নাম জড়িত রয়েছে) সংবিধানের ৪৮(১)-এ বলা হয়েছে— ‘বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন। যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন। রাষ্ট্রপ্রধান রূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করিবেন।’ সংবিধানের ৯৪ (২)-এ বলা হয়েছে— ‘প্রধান বিচারপতি যিনি ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি’ নামে অভিহিত হইবেন।’
‘বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি’ এবং ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি’ সংবিধানে উল্লেখ করায় পদ দু’টিতে প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়েছে। সুতরাং এই দু’টি পদ পরস্পরের দ্বারা পরিচালিত শপথে রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গীকারে আবদ্ধ হবেন— এটাই প্রজাতন্ত্রের জন্য ন্যায় সঙ্গত। প্রধান বিচারপতিকে ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি’ হিসেবে অভিহিত করার মাঝে প্রজাতন্ত্রের সুমহান উদ্দেশ্য ও অভিসন্ধি রয়েছে যা অনেকেই গভীরভাবে খতিয়ে দেখেন না বা যুক্তির কষ্টিপাথরে পরীক্ষা করতে পারেন না।
রাষ্ট্রপতির শপথ প্রধান বিচারপতি কর্তৃক পরিচালিত হবে, এই আইন সারা বিশ্বব্যাপী অনুসৃত নীতি। একে লঙ্ঘন করে একদিকে বিচার বিভাগের ক্ষমতার অবনমন করা হয়েছে, অন্যদিকে বিচার বিভাগের সক্রিয়তা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
‘৭২ সালের সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য ও প্রধান বিচারপতির মর্যাদা সুরক্ষার প্রশ্নে শপথ ও ঘোষণার তৃতীয় তফসিলে বলা হয়েছিলো— ‘রাষ্ট্রপতি, স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারের শপথ প্রধান বিচারপতি কর্তৃক পরিচালিত হইবে।’ এগুলো আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগের সাথে বিচারবিভাগের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি, যা সংবিধান প্রণয়নের সময়ই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত।
গণপরিষদ কর্তৃক ‘৭২ সালে গৃহীত সংবিধান আওয়ামী লীগ অতি দ্রুতই ছিন্নভিন্ন করে ফেলে এবং চেতনা ও দর্শন থেকে বিচ্যুত হয়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো রাতারাতি পরিবর্তন করে নেয়। তারা একদলীয় শাসনব্যবস্থা তথা সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে— চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। চতুর্থ সংশোধনীতে কোনো কারণ উল্লেখ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই প্রধান বিচারপতির সাংবিধানিক অনেক ক্ষমতাকে বেআইনিভাবে কেড়ে নিয়ে বিচারবিভাগকে নির্বাহীবিভাগের অধীনস্থ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। চতুর্থ সংশোধনীর ১৪৮ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে— রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথ বাক্য পাঠ করানো থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়। এটা একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের পরিকল্পনার অংশ। পরবর্তীতে চতুর্থ সংশোধনী বাতিল হলে তা পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়, কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীতে একদলীয় শাসনব্যবস্থার অধীন— শপথ ও ঘোষণার বিষয়টি আবার পুনর্হাল করা হয়। এতে পরোক্ষভাবে সরকারের একদলীয় শাসন ব্যবস্থার প্রতি গভীর অনুরাগ ও আনুগত্য প্রকাশ পায়, যা গত প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী সরকারের আচরণে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
স্বাধীন বাংলাদেশ-রাষ্ট্র নির্মাণ হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু provisional constitutional order 1972-এর ভিত্তিতে আবু সাদাত মোহাম্মাদ সায়েমকে ‘প্রধান বিচারপতি’ নিয়োগ করেন। প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে শপথ পাঠ করান এবং এর পরপরই বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর সাময়িক সংবিধান আদেশের ৮ নং ধারা বলে আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করা হয়। অতঃপর প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে শপথ বাক্য পাঠ করান। এটাই আমাদের ঐতিহ্য।
সামসময়িক কালের রাষ্ট্রপতির শপথ নিয়ে কয়েকটা দৃষ্টান্ত উল্লেখ করছি।
ভারতের ১৫তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন দ্রৌপদী মুর্মু। সংসদের সেন্ট্রাল হলে তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান দেশের প্রধান বিচারপতি এন ভি রামানা (NV Ramana)।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) কো-চেয়ারম্যান আসিফ আলি জারদারি দেশটির ১৪তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি (সিজেপি) কাজী ফয়েজ ঈসা ইসলামাবাদের আইওয়ান-ই-সদরে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথ পাঠ করান।
মালদ্বীপের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন ড. মোহাম্মদ মুইজ্জু। তিনি মালদ্বীপ প্রজাতন্ত্রের অষ্টম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। রিপাবলিক স্কয়ারে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে নতুন রাষ্ট্রপতি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহাম্মদ লতিফ শপথ নেন। শপথ পরিচালনা করেন প্রধান বিচারপতি আহমেদ মুতাসিম আদনান।
নেপালের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন নেপালি কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা রাম চন্দ্র পাউদেল। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হরি কৃষ্ণ কার্কি তাকে শপথবাক্য পাঠ করান।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত সিঙ্গাপুরের অর্থনীতিবিদ থারমান শানমুগারত্নম (Tharman Shanmugaratnam) সিঙ্গাপুরের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন । তিনি সিঙ্গাপুরের নবম রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নিলেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধান বিচারপতি সুন্দরেশ মেনন ১৫৪ বছরের পুরনো ইস্তানা প্রাসাদে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে থারমানকে শপথবাক্য পাঠ করান।
জো বাইডেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তাঁর শপথ পরিচালনা করেছিলেন।
উপমহাদেশে ভারত এবং পাকিস্তানে ৭৫ বছর যাবত রাষ্ট্রপতিগণ শপথ নিচ্ছেন প্রধান বিচারপতিগণের নিকট।
কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এর পূর্বে ২০তম এবং ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আব্দুল হামিদ স্পিকারের নিকট শপথ নিয়েছেন।
এটা একটি বিরল ঘটনা। প্রজাতন্ত্রের প্রধান ব্যক্তি অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি শপথ নিবেন প্রজাতন্ত্রের প্রধান বিচারপতির নিকট এটাই আইনগত, দর্শনগত এবং নৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তা-ই সংবিধানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও গতিপথের সাথে সম্পৃক্ত। এ কারণেই ১৯৭২ সালের সংবিধান তা নিশ্চিত করেছিলো। সংবিধানের সৌধ এভাবেই নির্মাণ করা হয়েছে। সৌধের ভিত্তিমূলে রয়েছে প্রধান বিচারপতি বা বিচারবিভাগের অবস্থান।
কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার কোনো পর্যালোচনা ছাড়া, কোনো কারণ ছাড়া, মনগড়া ও খেয়াল-খুশিমতো প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে স্পিকারের নিকট রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণে পদক্ষেপ নিয়েছিলো। এই ধরনের রাষ্ট্রীয় পদের শপথ পরিচালনা থেকে প্রধান বিচারপতিকে অপসারণ করা— মারাত্মক আত্মঘাতী পদক্ষেপ।
রাষ্ট্রপতি এবং প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগসমূহের সর্বাধিনায়ককে শপথবাক্য পাঠ করাবেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। এর মধ্য দিয়েও প্রজাতান্ত্রিকতার বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয় এবং সুরক্ষিত হয়। শাসনবিভাগের সাথে বিচারবিভাগের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা না হলে প্রজাতন্ত্রের চরিত্র ক্ষুণ্ন হয়। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার সংবিধানের ক্ষমতা-কাঠামোকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে বিচারবিভাগকে গুরুত্বহীন করার আয়োজন করেছিলো। রাষ্ট্রপতির শপথ পাঠ— প্রধান বিচারপতির নিকট থেকে স্থানান্তর করা এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা। এতে প্রধান বিচারপতি এবং বিচারবিভাগের মর্যাদা বিপজ্জনকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী চরিত্র প্রকাশিত হয়েছে; প্রজাতন্ত্রের নয়।
বিচারবিভাগ হলো রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ, যা নাগরিকদের অধিকার ও সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করে। বিচারবিভাগের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা, খর্ব করা বা কলুষিত করার অর্থ হলো— রাষ্ট্র ধ্বংসের পথ উন্মুক্ত করা।
রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করানোর মাধ্যমে প্রধান বিচারপতিকে প্রজাতন্ত্র— যে ‘সম্মানসূচক মুকুট’ দিয়ে ছিলো তা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে কেড়ে নিয়েছে। এটা বিচারবিভাগের ক্ষমতা ও মর্যাদার উপর অন্যায়-আঘাত।
১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য এবং চরিত্র যতোটুকু সুরক্ষা দেয়া হয়েছিলো, আওয়ামী লীগ অতি দ্রুত তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ নামক প্রজাতন্ত্রকে আওয়ামী লীগ নামক দলটি কীভাবে দেখতে চায়— তার প্রতিফলন ঘটেছে তাদের আনীত সংবিধানের চতুর্থ ও পঞ্চদশ সংশোধনীতে। রাষ্ট্রপতির শপথ স্পিকারের নিকট; এমন দেশ খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর ।
বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশসমূহের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য পুনরুদ্ধারে— রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথ প্রধান বিচারপতি কর্তৃক পরিচালিত হবে, এ বিধান বাংলাদেশে আবার চালু বা পুনর্বহাল করতে হবে।
প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক ও শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকাশের স্বার্থেই তা করা প্রয়োজন।
লেখক: গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com

Sunday, October 20, 2024
সংবিধান পুনর্লিখন নয় সংশোধন করা বাঞ্ছনীয়
মতবিনিময় সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন- সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল মতিন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল এবার যাতে বেহাত না হয়, সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনকে যে নামেই ডাকেন, এটি একটি সফল আন্দোলন। যে কারণে মানুষের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসা স্বৈরশাসককে দেশ থেকে পালাতে হলো। এই যে সরানো হলো, এটি হলো সাংবিধানিক অধিকার। সব অধিকার লেখা থাকে না। এ বিষয়ে তিনি বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও উদাহরণ তুলে ধরেন। বিচারপতি মতিন বলেন, শাসনতন্ত্রের সংস্কার বলেন, পুনর্লিখন বলেন, যা-ই বলেন, এটির অধিকার কার? অধিকার তাদেরই, যারা এই পরিবর্তন (সরকার পরিবর্তন) এনেছেন।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। সে বিষয়টি উল্লেখ করে বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, পাঁচ বছর পর হলেও গণতন্ত্রের একটু স্বাদ পেতাম। (আগে) নির্বাচনের ব্যবস্থা ছিল না। একটি ব্যবস্থা করা গেল ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় দু’-তিনটি নির্বাচন ভালোই করলাম। পরে সেটি আবার বেহাত হয়ে গেল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও অপপ্রয়োগ (অ্যাবিউজ) হয়েছে উল্লেখ করে বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, এটিকে মেরামত করা যেত। কিন্তু এটিকে এমনভাবে বাধাগ্রস্ত (ব্যারিয়ার) করা হলো, নির্বাচন বলতে কিছুই থাকলো না। ২০১৪ সালে একটি নির্বাচন হলো, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো না, ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হয়ে গেলেন। এরপর ২০১৮ সালে দেখা গেল রাতের বেলায় ভোট হয়ে গেল। আর ২০২৪ সালে দেখা গেল ‘ডামি নির্বাচন’। ত্রয়োদশ সংশোধনী যদি থাকত, অন্তত মন্দের ভালো একটি নির্বাচন হতে পারতো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, যারা ক্ষমতায় যায়, তাদের নির্বাচনের প্রতি একটি ভয় যে নির্বাচন করা মানে চলে যাওয়া।
সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে গিয়ে বিচারপতি মতিন বলেন, ইতিমধ্যে যেগুলো স্বীকৃত বা মীমাংসিত বিষয়, এগুলোতে মনে হয় হাত দেয়া ঠিক হবে না। যেমন ‘রিপাবলিক’। এগুলো বিদ্যমান রেখে এখান থেকে আরম্ভ করতে হবে। যেগুলো না করলেই নয়, সেটির সংস্কার করার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে মেরামত করা, এগুলোতে হাত দিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সৈয়দ মো. দস্তগীর হোসাইন বলেন, এত সংগ্রাম করে দেশ স্বাধীন হলো, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেলাম। পরবর্তী সময়ে কী পেলাম? ফল শূন্য। এই ছাত্র-জনতা যদি এগিয়ে না আসতো, তাহলে যে গর্তে পড়েছিলাম, সেখানেই থাকতে হতো।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফলে নতুন সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্?ফুজ আনাম বলেন, একটি বক্তব্য এসেছে, আমরা কি নতুনভাবে সংবিধান লিখবো, নাকি আগেরটি সংশোধন করবো। আমার মত হচ্ছে- আগেরটার সংশোধন করাই বাঞ্ছনীয়। কেননা, আগেরটির মধ্যে অনেক মূল্যবান বক্তব্য আছে। ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি আছে। এটিকে আরও গণতান্ত্রিক করা, আরও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের সরকার না আসে, যারা সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পারে। এজন্য সংশোধন দরকার।
সংবিধান সংশোধনে কী কী করা যেতে পারে, সে বিষয়েও কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন মাহ্ফুজ আনাম। নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার পৃথক্করণের ( সেপারেশন অব পাওয়ার) ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে খর্ব হয়েছিল। আইন বিভাগ স্বাধীন দায়িত্ব পালন করেনি। সেটি ক্ষমতাসীন দলের ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে কাজ করেছে। সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে গিয়েছিল নির্বাহী বিভাগের কাছে। সেটির পরিবর্তন অবশ্যই করতে হবে। মাহ্ফুজ আনাম বলেন, বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কেননা, সর্বোপরি সংবিধান লঙ্ঘন হচ্ছে কি না, সেটি নির্ধারণ করে বিচার বিভাগ। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন দরকার। গণমাধ্যম যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেটি দরকার। নতুন নতুন আইন করে গণমাধ্যমকে কুক্ষিগত করা হয়েছিল, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না। সর্বশেষ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরে সেটির পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা আইন বলতে গেলে গণমাধ্যমকে হত্যা করার প্রয়াস। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা উচিত বলে মনে করেন মাহ্ফুজ আনাম।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, বর্তমানে যারা সংবিধান পুনর্লিখন বা নতুন সংবিধান লিখতে চাচ্ছেন, তা তাদের এখতিয়ারে নেই। তবে সংবিধান সংশোধন হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। পরামর্শ সভায় আরও বক্তব্য দেন- আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের সভাপতি সিএএফ দৌলা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উত্তম কুমার দাস, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ।
Thursday, September 19, 2024
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হয়ে আলী রীয়াজের ফেসবুক স্ট্যাটাস
ফেসবুক পোস্টে আলী রীয়াজ দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে লিখেছেন, পনেরো বছর ধরে যারা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, আত্মদান করেছেন, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, অংশগ্রহণ করেছেন তাদের আত্মদানের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা; তাদের কাছে আমি ঋণী।
তিনি লিখেছেন, এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্যে আমার এবং কমিশনের সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দেশের সর্বস্তরের মানুষের, গণমাধ্যমের, রাজনৈতিক দলসমূহের, নাগরিক সমাজের সহযোগিতা, তাদের এই সহযোগিতাই হবে নির্ণায়ক।
আলী রীয়াজ লিখেন, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গণমানুষের যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যা বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যা প্রতিফলিত হয়েছে তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ।
কালবেলা পাঠকদের জন্য অধ্যাপক আলী রীয়াজের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হল-
“সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আমাকে দায়িত্ব প্রদানের জন্যে অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। পনেরো বছর ধরে যারা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, আত্মদান করেছেন, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, অংশগ্রহণ করেছেন তাদের আত্মদানের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা; তাদের কাছে আমি ঋণী।
এই উপলক্ষ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে যারা আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন তাদের প্রতিটি বার্তা আমি পাঠ করেছি। ব্যক্তিগতভাবে তাদের প্রত্যেককে উত্তর দিতে না পারলেও তাদের বার্তাগুলো আমি আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রহণ করেছি। এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্যে আমার এবং কমিশনের সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দেশের সর্বস্তরের মানুষের, গণমাধ্যমের, রাজনৈতিক দলসমূহের, নাগরিক সমাজের সহযোগিতা, তাদের এই সহযোগিতাই হবে নির্ণায়ক। অতীতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংগ্রামে অংশগ্রহণের সূত্রে গণমাধ্যমসহ সকলের যে সহযোগিতা আমি লাভ করেছি আশা করি তা আপনারা অব্যাহত রাখবেন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গণমানুষের যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যা বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যা প্রতিফলিত হয়েছে তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ।
সকলের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে কথা বলতে পারলে আমি আনন্দিত হতাম, কিন্তু পেশাগত এবং ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না বলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আশা করি শিগগিরই আপনাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হবে। সবাইকে ধন্যবাদ।”

Sunday, September 15, 2024
বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র গড়তে সংবিধান সংস্কার করতে হবে -ফরহাদ মজহার

Friday, September 13, 2024
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ ও সংবিধান সংশোধন: প্রসাঙ্গিক ভাবনা by ড. মো. সফিকুল ইসলাম
আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরে হীন দলীয় স্বার্থে সংবিধানের পঞ্চদশ, ষোড়শ, সপ্তদশ সংশোধনীসমূহ সম্পাদন করেছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ষোড়শ সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ফিরিয়ে নিয়েছিল। যাহোক, এর মধ্যে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে। এ সংশোধনী সবচেয়ে বিতর্কিত, গণতন্ত্র, জনগণের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থি। বিশেষ করে, এ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫০টির বেশী অনুচ্ছেদকে, যার মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি টাঙ্গানোর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত, সংশোধনের অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। সংবিধানে জাতীয় সংসদকে সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিফলন। একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক। অথচ পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের একটি বড় অংশ সংশোধন অযোগ্য ঘোষণা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সার্বভৌমত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে যা অসাংবিধানিক। এটি মানবাধিকারের পরিপন্থি। কেননা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করতে চাইতে পারে। এটি কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যে পরিবর্তন করা যাবে না। এছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত ৭ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী: “(১) কোন ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোন অসাংবিধানিক পন্থায়” (ক) এই সংবিধান বা ইহার কোনো অনুচ্ছেদ রদ, বাতিল বা স্থগিত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে; কিংবা (খ) এই সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে” তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবে। (২) কোন ব্যক্তি (১) দফায় বর্ণিত” (ক) কোন কার্য করিতে সহযোগিতা বা উসকানি প্রদান করিলে; কিংবা (খ) কার্য অনুমোদন, মার্জনা, সমর্থন বা অনুসমর্থন করিলে” তাহার এইরূপ কার্যও একই অপরাধ হইবে। (৩) এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধে দোষী ব্যক্তি প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।” এই অনুচ্ছেদ পাকিস্তানের ১৯৭৩ সালের সংবিধানের ৬(১) অনুচ্ছেদেরই অনেকটা প্রতিস্থাপন। পাকিস্তানের এ সংবিধানের ৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ”যদি কোনো ব্যক্তি সংবিধানকে ক্ষমতাবলে বাতিল করে, পরিবর্তন করে, অথবা জোর করে বা শক্তি প্রদর্শন করে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন করার প্রচেষ্টা বা ষড়যন্ত্র করে, সে ব্যক্তি চরম দেশদ্রোহীতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হবে। (২) কোনো ব্যক্তি (১) ধারায় উল্লিখিত কার্যক্রমের সহায়তা বা উৎসাহ প্রদান করলে, সে ব্যক্তি ও একইভাবে চরম দেশদ্রোহীতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হবে। (৩) সংসদ আইনের মাধ্যমে চরম দেশদ্রোহীদের শাস্তি নির্ধারণ করবে।” কিন্তু, ১৯৭৩ সালের সংবিধান রচনার পর পাকিস্তানে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউল হকের মৃত্যুদণ্ড হয়নি। বরং মৃত্যুদণ্ড হয়েছে সংবিধান প্রণয়নকারী জনাব ভুট্টোর। নিয়তির কী পরিহাস! সুতরাং দেখা যায়, কঠোর শাস্তির বিধান করে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঠেকানো যায় না। একইভাবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। পঞ্চদশ সংশোধনীর পূর্বে জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান ছিল। জাতীয় সংসদের সদস্যগণ স্বপদে বহাল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী করার বিধান নজিরবিহীন। এতে নির্বাচনে যেসব প্রতিদ্বন্দ্বী সংসদ সদস্য নয় তারা বৈষম্যের স্বীকার হয়। সুতরাং, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জরুরি ভিত্তিতে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল বা সংশোধন করা উচিত।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে। কিন্তু, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় তখন ও প্রকাশিতই হয়নি। সংক্ষিপ্ত ও বিভক্ত আদেশে আদালত বলেছিলেন: ”(১) সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী ভবিষ্যতের জন্য বাতিল ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করা হলো। (২) যা সাধারণত আইনসিদ্ধ নয়, প্রয়োজন তাকে আইনসিদ্ধ করে, জনগণের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন, এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন ‘এ সকল সনাতন তত্ত্বের¡র ভিত্তিতে দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন পূর্বে উল্লিখিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।” অন্যভাবে বলা যায়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ‘প্রসপেকটিভলি’ বা ভবিষ্যতের জন্য অবৈধ ঘোষণা করে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার খাতিরে এটি আরও দুই টার্ম রাখার পক্ষে সর্বোচ্চ আদালত মত প্রকাশ করেছেন। তাই আদালতের এ রায়ের অজুহাত দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া দুরূহ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাতিল আমাদেরকে এক ভয়াবহ সংকটে মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন ছিল রাজনৈতিক দলের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের এবং দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়’ জনগণের এমন ধারণারই ফসল। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নজির নেই বললেই চলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে তা সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত না হলেও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা চলে। আওয়ামী লীগ এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ত্রুটি বিচ্যুতি ও অগণতান্ত্রিক অভিযোগ তুলে বাতিল করলেও তাদের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের উদাহরণ তো সৃষ্টি করতে পারেইনি বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচন ব্যবস্থাকে সবচেয়ে বেশী কলুষিত করেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের এ তিনটি নির্বাচন বাংলাদেশে ইতিহাসে সবচেয়ে জাল-জালাতিপূর্ণ ছিল। যাহোক, এ ব্যবস্থার যে সব ত্রুটিবিচ্যুতি সে সময়কালে দৃশ্যমান হচ্ছিল রাজনৈতিক দলগুলো তারা প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ না করে, উল্টো এর ফাঁক-ফোকর ব্যবহার করে দলীয় স্বার্থ হাসিল করার প্রতিযোগিতার কারণে এ ব্যবস্থাটির যথার্থতা নিয়েই প্রশ্ন তোলার পরিবেশ তৈরি হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কিছু লোকের বক্তব্য ছিল নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। তাই শুধু নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করলেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব। বাস্তবতা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন দলীয় সরকারের অধীনে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কাজ করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশনকে সরকারি দলের অঘোষিত নির্দেশনা মেনে কাজ করতে হয়। এর ফলে নির্বাচন পক্ষপাতমুক্ত হয় না। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন হবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা। কিন্তু, বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রাতিষ্ঠানিকরণ (ওহংঃরঃঁঃরড়হধষরুধঃরড়হ) হয়নি। প্রতিষ্ঠানসমূহ আইন ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব স্বাধীন ও যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম নয়। তাদেরকে সরকারি দলের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়। তা না হলে এসব প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি থেকে বঞ্চিতকরণ ও বরখাস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের ক্ষমতার পরিধির মধ্যে আইন ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ সরকারি দলের অনুকূলে কাজ করা স্বাভাবিক রীতিতে বা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তাই সরকারি দলের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সকল দল ও প্রার্থীদের জন্য লেবেল প্রেলিং ফিল্ড (খবনবষ চষধুরহম ঋরবষফ) তৈরি হওয়ার সম্ভবনা নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান সুবিধা হলো এর নির্দলীয় চরিত্র। এ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাগণ দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তিত্ব না হওয়ায় তারা কোনো বিশেষ দলের পক্ষে কাজ করেন না। তাদের কাছে সব দলই সমান। সব দলের প্রতি এ সরকার সমান আচরণ করতে পারে। নির্বাচনি প্রচারণা, নির্বাচনি আচরণবিধি এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কাজগুলো এ সরকার পক্ষপাতিত্ব পরিহার করে পেশাদারিত্বের সঙ্গে করতে পারে। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ সরকারের অধীনে স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে। তাই আমার প্রস্তাব হচ্ছে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান সংবিধানে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাকে সময়োপযোগী করতে হবে। যেহেতু অতীতে সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ অবসর প্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হওয়ার বিধান থাকায় উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বয়স বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল সে কারণে উচ্চ আদালতকে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টাদের বিজ্ঞ/বিশিষ্ট ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ করার বিধান করা যেতে পারে। তাছাড়া বর্তমানে সরকারের কাজের পরিধি ও মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই উপদেষ্টাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ বজায় রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি “সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং “সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র” বাদ দিয়ে শুধু সমাজতন্ত্র যুক্ত করা হয়। কিন্তু, পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্ধারিত সংবিধানের মূলনীতিসমূহ অনেক বেশী অর্থপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য ছিল। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সংহতি পূর্ণ। তাই পঞ্চদশ সংশোধনী সংশোধন করে সংবিধানের পূর্বের মূলনীতি বহাল রাখা যুক্তিযুক্ত। আইন উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে জানা যায় যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতোমধ্যে সংবিধান সংশোধন নিয়ে কাজ শুরু করেছে এবং ’সাংবিধানিক সংস্কার’ কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু, সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার বিধান সংবিধানে অন্তভর্’ক্তকরণ এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দরকার। কেননা এ সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করলে ও পরবর্তীতে নির্বাচিত আইনসভার অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি.এন.পি) ইতোমধ্যে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখা ঘোষণা করে এ বিষয়েসমূহে তাদের প্রতিশ্রুতিুতি ব্যক্ত করেছে। তারপর ও আমি মনে করি এ সরকার বি.এন.পি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্বান্ত নিলে এর একটি স্থায়ী সমাধান হবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2236)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
