Tuesday, March 30, 2021

আল আকসা মসজিদ ইসলাম ও ফিলিস্তিনিদের আসল পরিচিতি

বিশ্ব কুদস দিবস। গত প্রায় ৭০ বছর ধরে ইহুদিবাদী ইসরাইল ফিলিস্তিন ভূখণ্ড জবর দখল করে আছে। ফিলিস্তিন জবর দখলের এতো বছর পরও ইসরাইল বর্বর নির্যাতনের ধারা অব্যাহত রেখেছে।

ইহুদিবাদী ইসরাইলের এই ন্যক্কারজনক আগ্রাসনের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা শক্তিগুলো। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের মজলুম জনতা তাদের দেশের ভূখণ্ডকে স্বাধীন করার তথা ইহুদিবাদী দখলমুক্ত করার দৃঢ় ইচ্ছা বাস্তবায়নে বিন্দুমাত্রও হাল ছাড়ে নি। বরং ফিলিস্তিনিদের মনোবল ও সংগ্রাম আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেগবান হয়েছে। ইরানের জনগণ সেই বিপ্লব বিজয়ের আগে থেকেই ফিলিস্তিনের মজলুম জনগোষ্ঠীকে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। কিন্তু ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয় ছিল ইহুদিবাদী ইসরাইলের জন্য চপেটাঘাত। কেননা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) কেবল ইরানের জনগণকেই নয় বরং বিশ্বের সকল মুসলমান ও স্বাধীনচেতা মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন ফিলিস্তিনদের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য। ইমামের ওই ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতি বছর রমজানের শেষ শুক্রবার বিশ্ব কুদস দিবস পালিত হয়।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ) ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বিষাক্ত টিউমার বা ক্যান্সার বলে অভিহিত করেছেন। ফিলিস্তিনের সংগ্রামী জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের অধিকারের প্রতি সাহায্য-সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার জন্যে রমযানের শেষ শুক্রবারে নানা কর্মসূচি, অনুষ্ঠান ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি পরিপূর্ণ সমর্থন ঘোষণার আহ্বান জানান। বিশ্ববাসী বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব তাঁর এই আহ্বানে ব্যাপক সাড়া দেয় এবং এই দিনকে কুদস দিবস হিসেবে পালন করতে থাকে। এই দিনে বিশ্বজুড়ে জনগণের এই ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ফিলিস্তিনিদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত রাখা এবং ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রতি বিশ্ব মুসলমানের ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

এ বছর এমন সময় বিশ্ব কুদস দিবস পালিত হতে যাচ্ছে যখন মার্কিন নতুন ষড়যন্ত্রের কারণে ফিলিস্তিন সংকট অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সমাজের ব্যাপক প্রতিবাদ সত্বেও তেলআবিব থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসে দূতাবাস স্থানান্তর করে আমেরিকা। আমেরিকার এ পদক্ষেপ দখলদার ইসরাইলের সম্প্রসারণকামীতাকে পূর্ণতা দিয়েছে যা কিনা মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক পরিণতি ডেকে আনবে। বায়তুল মোকাদ্দাসে দূতাবাস স্থানান্তরের মাধ্যমে আমেরিকা ফিলিস্তিনিদেরকে এ বার্তাই পৌঁছে দিয়েছে যে, ইসরাইলের স্থিতিশীলতা ও দখলদারিত্বের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন রয়েছে। আল আকসা মসজিদ ইসলাম ও ফিলিস্তিনিদের আসল পরিচিতি। এটি মুসলমানদের প্রথম কেবলা হওয়ার কারণে শুধু ফিলিস্তিন নয় বরং সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে এর ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। মুসলমানদের সবচেয়ে তিনটি পবিত্র স্থানের মধ্যে বায়তুল মোকাদ্দাস হচ্ছে অন্যতম। অথচ আমেরিকা দূতাবাস স্থানান্তরের মাধ্যমে শুধু যে মুসলমানদের অবমাননা করেছে তাই নয় একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রীতি ও জাতিসংঘের ২৩৩৪ ও ৪৭৮ নম্বর প্রস্তাবও লঙ্ঘন করেছে।

দূতাবাস স্থানান্তরের মাধ্যমে আমেরিকা দু'টি লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য গঠনের যে পরিকল্পনা রয়েছে সেটা বাস্তবায়ন করা। আর দ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে, লেবানন ও ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগ্রামীদেরকে নির্মূল করা যাতে দখলদার ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

বর্তমানে আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন নিয়ে দখলদার ইসরাইল পূর্ব বায়তুল মোকাদ্দাসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। ইসরাইল গাজার নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে তা তারা গত সাত দশক ধরে চালিয়ে আসছে। অথচ জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী আগ্রাসীদের মোকাবেলায় অস্ত্র ধারণা করার অধিকার ফিলিস্তিনিদের রয়েছে।

আমেরিকা তেলআবিব থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসে দূতাবাস স্থানান্তর করায় এর প্রতিবাদে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইলি সেনাদের হামলায় প্রথম দিনেই ৬০ জন ফিলিস্তিনি শহীদ হন। প্রকৃতপক্ষে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞের প্রধান শরীক হচ্ছে আমেরিকা। এ কারণে ফিলিস্তিনের স্বশাসন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গাজা উপত্যকায় ইহুদিবাদী ইসরাইলের গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, "ফিলিস্তিনি জনগণ আর তাদের সংকট সমাধানের জন্য আমেরিকাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নেবে না।" তিনি বলেন, "এই অপরাধযজ্ঞের ঘটনায় 'ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ায়' আমেরিকার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কার্যত শেষ হয়ে গেছে।" তবে সব ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ ও অন্যায় আচরণ সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চালিয়ে যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বর্তমানে আমেরিকা নতুন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের আসল পরিচয় অর্থাৎ বায়তুল মোকাদ্দাসের পরিচিতি ধ্বংসের চেষ্টা করছে যাতে ফিলিস্তিনিদের আর কিছুই অবশিষ্ট না থাকে। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইল-মার্কিন ষড়যন্ত্রে নতুন করে যোগ দিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক এতদিন গোপন থাকলেও এখন তা প্রকাশ্যে এসেছে। সৌদি আরবের সাবেক সামরিক কমান্ডার জেনারেল আনোয়ার এশকি বলেছেন, তার দেশ ইসরাইলি দখলদারিত্বের মুখে ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করতে বাধ্য নয়।" তিনি বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, "ফিলিস্তিনিদের রক্ষার বিষয়ে সৌদি আরবের বাড়তি কোনো দায়িত্ব নেই। ফিলিস্তিনিরা যেহেতু সৌদি নাগরিক নন সে কারণে রিয়াদের কাছ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার তারা রাখেন না।"  তিনি বলেন, "ইসরাইলকে শুধু শুধু শত্রু ভাবা হয়।”

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইমাম খোমেনি দখলদার ইসরাইলের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন। বিশ্ব কুদস দিবস পালন সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, "কুদস দিবস কেবল ফিলিস্তিনিদের দিবস নয়। এটি এমন একটি দিবস যে, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে এটা বুঝিয়ে দেয়া, তারা আর কোনো মুসলিম ভূখণ্ডকে এভাবে গ্রাস করতে পারবে না।" ইমাম খোমেনি(র.) আরো বলেছিলেন, "বিশ্ব কুদস দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা বলদর্পী শক্তিগুলোকে এমন একটি হুঁশিয়ারি সংকেত দিতে চাই যে তারা মুসলমানদের ওপর আর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না এবং কুদস দিবস বিশ্ব মুসলমানদের প্রেরণা ও বেঁচে থাকার দিবস।"

ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, "ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করা সব মুসলমানের দায়িত্ব।"

ইহুদিবাদী ইসরাইলের নির্যাতনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে, আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে কখনোই দমানো যায় নি বরং কুদস দিবস পালন কিংবা মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ চাপের মাধ্যমে তাদেরকে কিছুটা দমানো সম্ভব হয়েছে। এবারের বিশ্ব কুদস দিবস ইসরাইল ও তাদের মিত্রদের জন্য এ বার্তাই পৌঁছে দেবে যে, ফিলিস্তিনের ওপর দখলদারিত্ব ও জুলুম নির্যাতনের দিন শেষ হয়ে এসেছে। সারা বিশ্বের মুসলমানদের উচিত মুসলমানদের প্রথম কেবলা আল আকসা উদ্ধারে বিশ্ব কুদস দিবসে শরীক হওয়া যাতে ইসরাইলের দখল থেকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড উদ্ধারকে আরো তরান্বিত করা যায়।

Monday, March 29, 2021

চাপের মধ্যেও হৃদযন্ত্র ভালো রাখার ১০টি উপায়

এখন মানসিক চাপ বা এক কথায় যাকে বলে স্ট্রেস আমাদের নত্য সঙ্গী। পারিবারিক সমস্যা হোক কিংবা অর্থনৈতিক চাপ, বৈবাহিক সম্পর্কের অবনতি হোক কিংবা কাজের চাপ- একটা না থাকলে অন্যটা সঙ্গী হয়েই দাঁড়ায়। আর সেই কারণেই স্ট্রেস এখন সমাজবিজ্ঞানী থেকে চিকিৎসক, সবার কাছেই অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। আর স্ট্রেসের প্রভাবে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হার্ট বা হৃদযন্ত্র।
তাই যদি আপনি স্ট্রেসে আক্রান্ত হন, অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ করুন হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখার জন্য।
*মেডিটেশনঃ
ঘুম থেকে উঠেই হলে ভালো, না হলে দিনের অন্য সময়ও কে নিতে পারেন মেডিটেশন বা প্রাণায়ম। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এই প্রাণায়মের কারণে। তাই হৃদযন্ত্রেও চাপ কম পড়ে। স্ট্রেস থেকে শরীর বাঁচাতে এটা হোক প্রথম পদক্ষেপ।
*একসারসাইজঃ
একটু ফ্রিহ্যান্ড, বা একটু স্ট্রেচ শরীরের জন্য খুব ভালো। এতে যে পেশির নমনীয়তা বাড়ে, তাই নয়, রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে থাকে, হৃদযন্ত্রেও চাপ কম পড়ে। তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে একসারসাইজ শুরু করা উচিত। কারণ সবার শরীরে সব ধরনের একসারসাইজ সঠিকভাবে কাজ করে না।
*হাসি থাকুকঃ
দিনের একটা সময় বরাদ্দ রাখুন এমন কোনও বই বা সিনেমার জন্য, যা আপনাকে নির্মল আনন্দ দেবে। তারচেয়েও ভালো হয় যদি এমন কোনও সঙ্গীর সঙ্গে দিনের একটা সময় কাটাতে পারেন, যার সঙ্গ আপনাকে খুশি রাখে, তাহলেও আপনার স্ট্রেস কমবে। কারণ হাসি শরীরের জন্য খুব উপকারি।
*কান্নাও থাকুকঃ
স্ট্রেসে আক্রান্ত হলে নিজেকে বাকি সব কিছু থেকে সরিয়ে নিয়ে একা কাঁদতে পারেন। কান্নায় স্ট্রেস অনেকটাই বেরিয়ে যায় মন থেকে। দ্রুত মন সাফ করার সহজ সমাধান এটি। চিকিৎসকরা অনেক সময়ই বাচ্চাদের জোর করে কাঁদাতে বলেন। কারণ কাঁদলে হৃদযন্ত্রের শক্তি বাড়ে। বড়দের ক্ষেত্রেও কথাটা মিথ্যে না।
*পোষ্যর সঙ্গঃ
স্ট্রেস কমানোর ক্ষেত্রে পোষ্যর বড় ভূমিকা রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, যাদের বাড়িতে পোষ্য রয়েছে, তাদের হৃদরোগের আশঙ্কা অন্যদের থেকে অনেকটাই কম হয়। শুধু কুকুর বা বিড়াল নয়, বাড়িতে অ্যাকোয়ারিয়াম থাকলেও, তার সামনে সময় কাটান। মন ভালো হবে।
*শারীরিক সম্পর্কঃ
পরিসংখ্যান বলছে, যে সব পুরুষরা সপ্তাহে দু’দিন যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হন, তাদের হৃদযন্ত্রের সমস্যা অনেকটাই কমে যায়। নারীদের ক্ষেত্রেও কথাটা সত্যি। তবে সংখ্যার হিসাবে বিষয়টা তাদের ক্ষেত্রে কত, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। তবে নারীদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন হরমোন হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে সাহায্য করে, তা প্রমাণিত।
*পর্যাপ্ত ঘুমঃ
প্রতিদিন নিয়ম করে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমোতেই হবে। তারচেয়ে বেশি ঘুম যেমন ভালো নয়, তেমনই তার চেয়ে কম ঘুমও স্ট্রেস বাড়িয়ে দেবে। যারা স্ট্রেসে বেশি পরিমাণ আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রে ঘুমের সময় নিয়ে কোনও কার্পণ্য করা যাবে না।
*হাঁটায় জোরঃ
প্রতিদিন কিছুটা সময়- অন্তত ১৫ মিনিট- বরাদ্দ রাখুন হাঁটার জন্য। তবে মনে রাখবেন, এই হাঁটাটা যেন দিনের আলোতে হয়। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর শরীরের মেটাবলিক রেট কমে যায়। তখন হাঁটলে হৃদযন্ত্রের লাভ অতটাও হয় না, যতটা রোদে হাঁটলে হয়।
*দলগত সময়ঃ
কোনও না কোনও দলে নিজেকে জুড়ে নিন। হতে পারে সেটা কোনও ফিল্মওয়াচার ক্লাব, বা হাইকিং টিম। আগেকার দিনে অনেকেই ডাকটিকিট ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সপ্তাহের একটা নির্দিষ্ট সময় কাটাতেন। এখন তার পরিমাণ কমেছে। কিন্তু এই ধরনের হবি সংক্রান্ত কোনও একটা দলের সঙ্গে যুক্ত হলে স্ট্রেস কমে। ভালো সময় কাটানোর সম্ভাবনা বাড়ে।
*লিখে রাখুনঃ
স্ট্রেসের কারণ যেটা, সেটা লিখে ফেলুন। মনোবিদরা বলেন, স্ট্রেস নিয়ে লেখার সময় যেহেতু আপনাকে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখা দিতে হয়, তাই স্ট্রেসের কারণটা আরও বেশি পরিষ্কার হয়ে যায় আপনার কাছে। তাই তাদের মত, যেটা নিয়ে মানসিক চাপ হচ্ছে, সেটা লিখে রাখুন। তাতেই চাপের অর্ধেকটা কমে যাবে।

Thursday, March 25, 2021

বাংলাদেশ ১৯৭১: ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক কেন ব্যর্থ হয়েছিলো? by তাফসীর বাবু

একাত্তরের মার্চ মাস ছিলো আন্দোলন-সংগ্রামে উত্তাল, উত্তেজনায় ভরপুর। ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাচ্ছিল দৃশ্যপট। একদিকে নির্বাচনে জিতে আসা আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানী সামরিক জান্তার গড়িমসি, অন্যদিকে দেশব্যাপী প্রতিরোধ-সংগ্রাম।
এমনি এক প্র্রেক্ষাপটে সংকট সমাধানের কথা বলে দৃশ্যপটে এলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। ঢাকায় শুরু হলো ইয়াহিয়া-মুজিব শীর্ষ বৈঠক।
কিন্তু ১৬ই মার্চ থেকে ২৪শে মার্চ পর্যন্ত আলোচনায় সময় গড়িয়ে গেলেও সমাধান মিললো না। উল্টো ২৫শে মার্চের রাত থেকে হামলা শুরু করলো পাকিস্তানি বাহিনী।
কিন্তু সংকট নিরসনে ইয়াহিয়া-মুজিব আলোচনা কেন ব্যর্থ হলো?
আর আদতে পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে আলোচনার এই উদ্যোগ কি সমস্যার সমাধান নাকি সময় ক্ষেপনের জন্য ছিলো?

কঠোর গোপনীয়তায় ঢাকায় নেমেছিলেন ইয়াহিয়া খান

ঢাকা তখন একরকম শেখ মুজিবের নির্দেশে চলছে। অসহযোগ আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ক্ষোভে উত্তাল পুরো দেশ।
আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোন নমুনা দেখা যাচ্ছে না।
এরই মধ্যে একাত্তরের ১৫ই মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এলেন। তার সফরসূচি নিয়ে ছিলো কঠোর গোপনীয়তা।
কলকাতার বেতারে ইয়াহিয়া খানের করাচি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার খবর প্রচার হলেও রেডিও পাকিস্তান এ বিষয়ে ছিলো নীরব।
মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদন।
বিমানবন্দরে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাংবাদিকদের সাক্ষাতেরও কোন ব্যবস্থা ছিলো না।
কিন্তু কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনি উপেক্ষা করেই প্রেসিডেন্ট হাউসের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বিক্ষোভ মিছিল করে।
পরদিন দৈনিক ইত্তেফাকে সে ছবি ছাপা হয়।

ধারাবাহিক বৈঠকে এজেন্ডা কী ছিলো?

১৬ই মার্চ প্রেসিডেন্ট ভবনে বৈঠকে বসলেন ইয়াহিয়া-মুজিব। রুদ্ধদ্বার বৈঠক। বৈঠকে দুই শীর্ষ নেতা ছাড়া আর কেউ নেই। বৈঠক চললো প্রায় আড়াই ঘণ্টা।
বৈঠকের বিষয়বস্তু তখনো অজানা।
বৈঠক শেষে শেখ মুজিব সাংবাদিকদের জানান, "আলোচনা দুই-এক মিনিটের ব্যাপার নয়, যথেষ্ট সময় প্রয়োজন। তাই আলোচনা আরো চলবে।"
পরদিন ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক ও অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে একের পর এক প্রশ্ন হলেও সেসব এড়িয়ে যান শেখ মুজিব।
দ্বিতীয় দিনের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে শেখ মুজিবকে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছিলো বলে রিপোর্ট করে ইত্তেফাক।
আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে কি-না, সে বিষয়ে শেখ মুজিব সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোন জবাব দেননি।
তবে তিনি জানান, আলোচনার মধ্যেই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
১৫ ই মার্চ, ১৯৭১। ঢাকার রমনায় প্রেসিডেন্ট হাউজের সামনে স্বাধীন বাংলা দেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিক্ষোভ।
এভাবে আরো চার দিন ইয়াহিয়া-মুজিব শীর্ষ বৈঠক চলে। আলোচনা হয় সংবিধান নিয়েও। তবে কোন সমাধান আসেনি।
অবশ্য এই আলোচনায় সমাধান অসম্ভব ছিলো বলেই মনে করেন ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।
তিনি বলছিলেন, "কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন দলিল কিন্তু আমরা কখনো পাইনি। পাকিস্তানিরা মূলত: আলোচনার একটা ভান করেছিলো। শাসনতন্ত্র নিয়েও কথা বলেছিলো। তবে বঙ্গবন্ধু শুরু থেকেই ৬-দফার ভিত্তিতে আলোচনা এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।"
একদিকে যখন আলোচনা চলছে, তখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শিপিং করপোরেশনের জাহাজে করে পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র ও সৈন্য আনার খবর প্রকাশ হয়।
রংপুর, সৈয়দপুর ও জয়দেবপুরে অসহযোগ আন্দোলনে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর সেনাসদস্যদের গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
২৪শে মার্চ এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ জানায়, তাদের পক্ষ থেকে সকল বক্তব্য উপস্থাপন শেষ। এখন প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পালা।
তবে প্রেসিডেন্টের সে ঘোষণা আর আসেনি।
ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের মতে, বঙ্গবন্ধু আলোচনায় সংবিধান কেমন হবে সে বিষয়ে ছয় দফার উপরই গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
তেইশ তারিখেই এ বিষয়ে একটি খসড়া হস্তান্তর করা হয় ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের কাছে।
চব্বিশ তারিখে চূড়ান্ত বিবৃতি কী হবে সেটা আওয়ামী লীগ নেতা ড. কামাল হোসেনকে টেলিফোন করে জানানোর কথা ছিলো পাকিস্তানী পক্ষের।
১৬ই মার্চ, ১৯৭১। প্রথম দিনের আলোচনা শেষে শেখ মুজিব।
কিন্তু সেই টেলিফোন আরে আসেনি। উল্টো ২৫শে মার্চ রাত থেকে হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
ইয়াহিয়া, ভূট্টোসহ অন্যান্যরা এর আগেই ঢাকা ত্যাগ করেন।
ফলে আলোচনা ব্যর্থ হলো। পাকিস্তানীরা রাজনৈতিক সমস্যার পরিবর্তে সামরিক সমাধানের পথে হাটলো।
কিন্তু এটি কি আদৌ আলোচনা ছিলো? আর এর মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের ইচ্ছাই বা কতটা ছিলো পাকিস্তানী সামরিক জান্তার?
ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলছিলেন, আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানীরা মূলত: রণসাজে সজ্জিত হয়েছে।
ক্ষমতা হস্তান্তরেরও কোন ইচ্ছা পাকিস্তানীদের ছিলো না।
একই মত মুক্তিযুদ্ধ গবেষক আফসান চৌধুরীরও।
তিনি বলছিলেন, "৭০ এর সাধারণ নির্বাচনের পরই পাকিস্তানী সামরিক জান্তা বাঙ্গালির উপর হামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়া মানেই শেখ মুজিবকে ক্ষমতা দেয়া হবে না।"

শেখ মুজিব কেন এই সময়ক্ষেপণের আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন?

আফসান চৌধুরী বলছেন, এখানে শেখ মুজিবেরও কৌশল ছিলো।
"তিনি আলোচনা অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু আলোচনা ভেস্তে যাওয়া, যেটা ইয়াহিয়া খানের পূর্ব পরিকল্পনা ছিল, সেটাতে শেখ মুজিবের কোন দায় আসেনি।"
মি. চৌধুরী বলেন, "ফলে যখন মিলিটারির হামলা শুরু হলো, তখন খুব সহজেই বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন তিনি পেয়েছেন। যেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।"
একই মত ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনেরও। তিনি বলছিলেন, "শেখ মুজিবের লক্ষ্য ছিলো বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তাটি পৌঁছে দেয়া যে, তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী নন। তিনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ্য দলের নেতা। এবং তিনি আলোচনার মাধ্যেই সমস্যার সমাধান চান।"
"কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানতেন, পাকিস্তানি শাসকরা তার একটি শর্তও মানবে না। সেজন্য আগে থেকেই ৭ই মার্চের ভাষণেই তিনি বাঙ্গালিকে সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।"
মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক নিয়ে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি খবর।

Wednesday, March 24, 2021

পোস্টমর্টেম বা ময়না তদন্ত: কেন আর কীভাবে করা হয়?

অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় মৃতদেহ বিশ্লেষণ করে মৃত্যুর কারণ জানার যে চেষ্টা করা হয়, তাকেই পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত বলা হয়।
পোস্টমর্টেম শব্দটি অটোপসি, নিক্রোপসি ইত্যাদি দ্বারাও বোঝানো হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর কয়েকশো ময়না তদন্ত হয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালে আলাদা আলাদাভাবে সেটি হওয়ায় এর মোট সংখ্যাটি কারো জানা নেই।

পোস্টমর্টেম কেন করা হয়?

নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা: মমতাজ আরা বিবিসি বাংলাকে বলছেন, 'মৃত্যুর কারণ জানার জন্য পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত করা হয়।
''কোন ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে বা তার মৃত্যু নিয়ে কোন সন্দেহ তৈরি হলে, মৃত্যুর সঠিক কারণটি জানার জন্য মৃতদেহের পোস্টমর্টেম করা হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে মৃতদেহ বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করা হয়, ঠিক কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে।''
তিনি বলছেন, অনেক সময় শরীরের ভেতরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখা হয়। যেমন ধর্ষণের অভিযোগে সিমেন সংগ্রহ করে ডিএনএ ম্যাচ করা হতে পারে। আবার আত্মহত্যার মতো অভিযোগে ভিসেরা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বোঝা যায় যে বিষপ্রয়োগের কোন ঘটনা ঘটেছে কীনা।
অনেক সময় কোন ব্যক্তি অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করার পরেও যদি ওই মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে তখন যে পোস্টমর্টেম করা হয়, তাকে বলা হয় ক্লিনিক্যাল পোস্টমর্টেম।

ময়নাতদন্ত নাম কীভাবে এলো?

অটোপসি শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ অটোপসিয়া থেকে। যার অর্থ মৃতদেহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার করার মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করা।
ডা: মমতাজ আরা বলছেন, ময়না শব্দটি ফার্সি বা উর্দু থেকে এসেছে, যার অর্থ ভালো করে খোঁজা বা অনুসন্ধান করা। ফলে ময়না তদন্ত মানে হলো ভালো করে তদন্ত করে দেখা।
যেহেতু মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকরা এই কাজটি করে থাকেন, এ কারণেই এর নাম হয়েছে ময়না তদন্ত।

কীভাবে ময়না তদন্ত করা হয়

হত্যা, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনার মতো যেকোনো অপমৃত্যু বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় পোস্টমর্টেম বা ময়না তদন্ত করা হয়ে থাকে।
এ ধরনের ঘটনায় প্রথমেই পুলিশ একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। অর্থাৎ মৃতদেহ কী অবস্থায় পাওয়া গেছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এরপর মৃত্যু সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য ময়না তদন্ত করতে পাঠানো হয়।
মর্গে ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকরা সেই সুরতহাল প্রতিবেদন দেখে, প্রথমে মৃতদেহের বাহ্যিক অবস্থার বিশ্লেষণ করেন। সেখানে কোন আঘাত বা ক্ষত আছে কিনা, ত্বক ও জিহ্বার রঙ ইত্যাদি দেখে প্রথম প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।
এরপরে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে মস্তিষ্ক, ফুসফুস, লিভারসহ শরীরের ভেতরটা যাচাই করে দেখা হয়। ফলে শরীরের ভেতরে কোন আঘাত থাকলে, রক্তক্ষরণ বা বিষক্রিয়া থাকলে, সেটি চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন। কোথাও আঘাতের চিহ্ন থাকলে সেটি কীভাবে হয়েছে, তা ভালো করে যাচাই করা হয়।
এই কাজটি করতে গিয়ে মৃতদেহের নানা অংশ কেটে দেখতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা। এ সময় শরীরের নানা প্রত্যঙ্গও সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়ে থাকে।
ময়না তদন্ত শেষে মৃতদেহ আবার সেলাই করে আগের মতো অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। তবে শরীরের অভ্যন্তরীণ কোন কোন অংশ কেটে আরো পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হতে পারে।

ময়না তদন্ত থেকে কী জানা যায়?

ময়না তদন্তে বেশ কয়েকটি বিষয় জানার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি বিষয় হলো মৃত্যু কীভাবে হয়েছে এবং কখন মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কিনা, আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে কিনা, বিষ খাওয়ানো হয়েছে কিনা, রক্তক্ষরণের কোন ঘটনা আছে কিনা- ইত্যাদি বিষয়ও ময়না তদন্তে বেরিয়ে আসে।

কোন মৃত্যুর ময়না তদন্ত করা হয়?

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, কোন মৃত্যুর ঘটনাগুলোয় ময়না তদন্ত করা হবে।
''হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনায় মৃত্যু, বিষপানে মৃত্যু, শরীরের যদি কোন আঘাতের দাগ থাকে, অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি বলে সন্দেহের অবকাশ থাকলেই সেখানে মৃত্যুর কারণ জানার জন্য পোস্টমর্টেম করতে হবে।''
এ ধরনের ঘটনায় প্রথমে পুলিশ একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। অর্থাৎ পুলিশ কর্মকর্তা কী অবস্থায় মৃতদেহটি দেখেছেন, মৃতদেহের বিস্তারিত বর্ণনা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এরপর থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়রির পরে পুলিশ মৃতদেহটি ময়না তদন্ত করার জন্য পাঠিয়ে থাকে।
তবে পুলিশের হেফাজতে মৃত্যু হলে একজন ম্যাজিস্ট্রেট সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। এরপর মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।

ময়না তদন্ত কোথায় হয়?

বাংলাদেশের ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বেশ কয়েকটি মেডিকেল কলেজে মর্গ রয়েছে। সেখানে ময়না তদন্তের জন্য বিশেষ স্থান থাকে। সেখানে ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা ময়না তদন্ত করে থাকেন।
এর বাইরে যেসব জেলা শহরে আড়াইশো শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল রয়েছে, সেখানে ময়না তদন্ত করা হয়ে থাকে। মেডিকেল কলেজগুলোয় ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপকরা ময়না তদন্ত করলেও, জেলা শহরে সিভিল সার্জনের তত্ত্বাবধানে আবাসিক সার্জনরা সেটা করে থাকেন।
অধ্যাপক ডা. মমতাজ আরা বলছেন, যত দ্রুত ময়না তদন্ত করা যাবে, তত ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।
তবে অনেক সময় মৃত্যুর অনেক পরেও, দাফন হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ সময় পরেও পুনরায় ময়না তদন্তের উদাহরণ রয়েছে।

ময়না তদন্তের প্রকারভেদ

মৃত্যুর কারণ জানার জন্য মূলত ময়না তদন্ত করা হলেও এর আরো কয়েকটি ভাগ রয়েছে। যেমন:
মেডিকেল: অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ জানতে এই ময়না তদন্ত করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি একটি প্রচলিত পদ্ধতি।
একাডেমিক: চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করা হয়ে থাকে।
ক্লিনিক্যাল: অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুর পরেও কারো মৃত্যু নিয়ে যদি বিতর্ক তৈরি হয়, তখন ক্লিনিক্যাল পোস্টমর্টেম করা হয়।

ময়না তদন্তের ব্যতিক্রম

অনেক সময় অস্বাভাবিক মৃত্যু হলেও পরিবারের স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়না তদন্ত ছাড়াও মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়ে থাকে।
পুলিশ সুপার মোঃ মাসুদুর রহমান বলছেন, ''বাস দুর্ঘটনার মতো অনেক অস্বাভাবিক মৃত্যুর মতো ঘটনায় যখন মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকে না, তখন পরিবারের অনুরোধে ময়না তদন্ত ছাড়াই মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়ে থাকে। কারণ পরিবারের সদস্যরা চান না, তাদের স্বজনদের মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করা হোক। তখন ম্যাজিস্টেটের অনুমতি নিয়ে মৃতদেহ হস্তান্তর করা হতে পারে।''
কিন্তু মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে অবশ্যই ময়না তদন্ত করা হবে, তিনি বলছেন।

ময়না তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

সম্প্রতি পুলিশ বেশ কয়েকটি হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ময়না তদন্তের ভুল দেখতে পেয়েছে।
এ বিষয়ে ডা: মমতাজ আরা বলছেন, '' আমার বিশ্বাস, কোন চিকিৎসক পক্ষাবলম্বনের জন্য ভুল প্রতিবেদন তৈরি করেন না। হয়তো অনেকদিন পরে মৃতদেহের ময়না তদন্ত করা হয়েছে, ফলে সঠিক চিত্রটি বেরিয়ে আসেনি। কিন্তু ইচ্ছা করে কেউ এটা করেছেন বলে আমি মনে করি না।''

ময়না তদন্তের ইতিহাস

সহকারী অধ্যাপক ডা: মমতাজ আরা বলছেন, সতেরশো শতক থেকেই অস্বাভাবিক মৃত্যুর পোস্টমর্টেমের রীতি চালু রয়েছে।
তবে তখনকার তুলনায় এখন অনেক আধুনিকভাবে ময়নাতদন্ত করা হয়ে থাকে।
অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ জানার জন্য পোস্টমর্টেম বা ময়না তদন্ত করা হয়ে থাকে

Monday, March 22, 2021

চুল পড়ছে? ব্যবহার করুন ক্যাস্টর অয়েল

আঠালো ক্যাস্টর অয়েল ব্যবহার প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকেই দ্বিধান্বিত হয়ে যান। সাধারণত বিভিন্ন তেলের সঙ্গে মিশিয়ে পাতলা করে ব্যবহার করতে হয় ক্যাস্টর অয়েল। এই তেলের রয়েছে অনেক গুণ। চুলের গোড়া মজবুত করে চুল পড়া বন্ধ করে ক্যাস্টর অয়েল। পাশাপাশি ঘন ও কালো চুলের জন্যও নিশ্চিন্তে ব্যবহার করতে পারেন এটি। জেনে নিন কীভাবে চুলে ব্যবহার করবেন এই তেল।
  • *২ টেবিল চামচ নারকেল এল, ২ টেবিল চামচ তিলের তেল ও ২ টেবিল চামচ আমন্ড তেলের সঙ্গে ১ টেবিল চামচ ক্যাস্টর অয়েল মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি সামান্য গরম করে চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ম্যাসাজ করুন। সারারাত রেখে পরদিন ধুয়ে ফেলুন ভেষজ শ্যাম্পু ব্যবহার করে।
  • *২ চা চামচ ক্যাস্টর অয়েলের সঙ্গে আধা কাপ অ্যালোভেরা জেল, ১ চা চামচ তুলসি পাতার গুঁড়া ও ২ চা চামচ মেথির গুঁড়া মেশান। মিশ্রণটি সম্পূর্ণ চুলে লাগিয়ে রাখুন ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। কুসুম গরম পানি ও মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
  • *সমপরিমাণ ক্যাস্টর অয়েল ও পেঁয়াজের রস মিশিয়ে চুলে লাগান। ২ ঘণ্টা পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। পেঁয়াজের গন্ধ দূর করতে চাইলে কয়েক ফোঁটা এসেনশিয়াল অয়েল মিশিয়ে নিতে পারেন হেয়ার প্যাকে।
  • *সমপরিমাণ ক্যাস্টর অয়েল ও অলিভ অয়েল গরম করে ২টি ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল মেশান। আঙুলের সাহায্যে চুলের গোড়ায় ম্যাসাজ করুন। আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলুন।
  • *সমপরিমাণ ক্যাস্টর অয়েল, সরিষার তেল ও অলিভ অয়েল মিশিয়ে ১ ঘণ্টা চুলে লাগিয়ে রাখুন। ভেষজ শ্যাম্পুর সাহায্যে ধুয়ে ফেলুন
তথ্য: স্টাইল ক্রেজ

Sunday, March 21, 2021

মন্দির সংখ্যায় ভারতকে ছাড়িয়ে, বাংলাদেশে ইসকনের প্রভাব বাড়ছে by শফিক রহমান

কেন্দ্র ভারতে হলেও বাংলাদেশে প্রভাব বাড়ছে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস- ইসকনের। তা ভক্ত অনুসারির সংখ্যার বিচারে, আচার অনুষ্ঠান আয়োজনে এবং প্রচার প্রাচরনায়ও। এমনকি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের লোক নিয়োগের আবদারও বাড়ছে।
১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। অভিযোগ রয়েছে ইসকনের ভক্ত-অনুসারি বা দিক্ষিত এমন কমপক্ষে তিন জনকে নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ওপর চাপ রয়েছে সংগঠনটির। প্রসঙ্গটি তোলা হলে ইসকনের কেন্দ্রীয় স্বামীবাগ আশ্রমের ব্রহ্মচারী ঈশ্বর গৌরহরিদাস কোন রাখ ঢাক ছাড়াই বললেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকদের ৩/৪ জন করে ইসকনের ভক্ত-অনুসারি রয়েছেন। আর নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব ক্ষেত্রেই ২/৩ জন করে থাকছেন।
হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ওখানেও আমাদের একজন নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। সব প্রক্রিয়া শেষ। এখন শুধু ফলাফলের অপেক্ষা।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৮-২০১৩ মেয়াদে গণিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করা তরুণ এই ব্রহ্মচারী আরও জানান, তার বিভাগে ইসকনের অনুসারি কোন শিক্ষক না থাকলেও উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগে একজন শিক্ষক ছিলেন যিনি পরে বিভাগীয় প্রধানেরও দায়িত্ব পালন করেন।
কৃষ্ণ ভত্তির নতুন ধারা নিয়ে সৃষ্ট এই সংগঠনটির যাত্রা শুরু ১৯৬৬ সালে নিউ ইয়র্কে। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এসি ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। তবে বাংলাদেশে ইসকনের কার্যক্রম নিয়ে প্রথম ১৯৭৫ সালে আয়ারল্যান্ডের একজন ও কানাডার দুই নাগরিক আসেন। প্রথমে তারা ঢাকার ৬১ তেজকুনিপড়ায় অফিস খুলে কার্যক্রম শুরু করেন। কিন্তু সে সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তারা আর বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেননি।
পরে আবার ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে শুরু হয় ইসকনের প্রচার কার্য। এ যাত্রায়ও প্রথমে তারা তেজকুনিপাড়ায় এবং পরে ঢাকার ওয়ারি ও চিটাগং-এর হাটাজারিতে মন্দির স্থাপন করে। অল্প সময়ের মধ্যে হাটাজারিতে তাদের প্রভাব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, ওই এলাকায় একটি গ্রামের নাম ‘ইসকন নগর’ রাখা হয়েছে।
১৮৯৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভারতের উত্তর কলকাতার ১৫১ নং হ্যারিসন রোডে জন্মগ্রহণ করা এসি ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে ১৯৬৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে যান। বলা হয়, সেখানে তিনি যে জায়গাটিতে সর্ব প্রথম ওঠেন সেটির নিয়ন্ত্রণ ছিল হিপ্পিদের। বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মই ছিল যাদের জীবনের অংশ। কিন্তু প্রভুপাদের কির্তন ও বিভিন্ন বাদ্য যন্ত্রের বাজনায় আকৃষ্ট হয়ে হিপ্পিরা তার কাছে জড়ো হতে থাকে এবং শিষ্যত্ব গ্রহণ করে স্বাভাবিক জীবন যাপন শুরু করে। একই সঙ্গে স্বামী প্রভুপাদের কৃষ্ণ ভক্তের নতুন ধারার সূচনা ঘটে।
পরে ১৯৭২ সালে তিনি যান রাশিয়াতে এবং সেখানেও তিনি কৃষ্ণ ভক্তির বিভিন্ন নমুনা প্রচার করতে থাকেন। ইসকনের দাবি, বর্তমানে রাশিয়াতে তাদের মন্দিরের সংখ্যা দুই শতাধিক। আর বাংলাদেশে গত এক দশকে মন্দিরের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১টিতে। এর মধ্যে ঢাকাতেই ছয়টি। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের দিকে এর সংখ্যা ছিল ৩৫টি।
অথচ, ইসকনের কেন্দ্রীয় দপ্তর ভারতের মায়াপুরে এবং এসি ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ শেষ নিঃশ্বাসও ত্যাগ করেছেন ওখানে। সেই গোটা ভারতেই এখন পর্যন্ত ইসকনের মন্দিরের সংখ্যা ৬৪টি। ফলে তুলনামূলক বিচারে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে ইসকনের প্রচার ও প্রসার অনেকটাই বেড়েছে জানিয়ে সংগঠনটির সাবেক সম্পাদক কৃষ্ণ কির্তন আচার্য বলেন, ভারতে হিন্দু বেশি কিন্তু ধার্মিক হিন্দু কম। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে বলে ইসকনের প্রসারটাও বেশি হচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশের তুলনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ভারতে অধিকাংশই রাম ভক্ত। সেখানে বাংলাদেশে ইসকনের মাধ্যমে বাড়ছে কৃষ্ণ ভক্তের সংখ্যা।
ইসকনের দর্শন
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস শ্রী কৃষ্ণ ভগবান যুগে যুগে মর্ত্যে আসেন। আদিকাল থেকে সময়কে অগ্নি, দাপর, ত্রাতা ও কলি- এই চার যুগে ভাগ করে বর্তমান যুগকে তারা কলি যুগ বলছেন। আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে কৃষ্ণের অবতারের মাধ্যমে কলি যুগ শুরু হয়েছে।
তবে ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা এসি ভক্তিভেদান্ত প্রভুপাদের বিশ্বাস, প্রায় ৫০০ বছর আগে শ্রী কৃষ্ণ বৃন্দা বনে অবতার হয়েছেন ‘নিমাই সন্যাস’ নাম নিয়ে। ওই সময়ের দর্শনকে তারা ‘শ্রী চৈতন্য মহা প্রভু দর্শন’ বলে মেনে আসছে। ইসকনের মুল ভিত্তি হচ্ছে সেই ‘শ্রী চৈতন্য মহা প্রভু দর্শন’।
ঢাকার স্বামীবাগ আশ্রমে গিয়ে দেখা গেছে গেরুয়া ও সাদা বসনে ন্যাড়া মাথায় এক গোছা চুলের ঝুটি নিয়ে কেউ জপমালা জপছেন, কেউ মন্দিরের কাজ করছেন, কেউ ব্যস্ত সন্ধ্যারতি নিয়ে। যাদের সবাই তরুণ যুবক। কথা বলে জানা গেলো তারা সবাই কম বেশি শিক্ষিত। ইসকনের শর্ত হচ্ছে, দিক্ষা নিতে কেউ আগ্রহী হলে তাকে কমপক্ষে এসএসসি পাস ও বয়সে তরুণ হতে হবে। এই তরুণদের দিয়েই চলছে ইসকনের কৃষ্ণভক্তির প্রচার কাজ। বর্তমানে বাংলাদেশে ইসকনের মোট স্থায়ী বা আজীবন সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। ২০০৩/২০০৪ সালের দিকেও তা ছিল মাত্র ১৯০০ জনের মধ্যে।
এদিকে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে উপস্থিতি রয়েছে হিন্দুদের। কিন্তু কৃষ্ণ ভক্তিই হোক আর পূজা অর্চনাই হোক সব কিছুই বছরের বিশেষ কয়েকটি পূজা যেমন, দূর্গা পুজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মী পূজা এবং শ্রী কৃষ্ণের জন্মতারিখে পালিত জন্মাষ্টমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও ইসকন এর ব্যাপ্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহর ও গ্রাম সর্বত্রই চোখে পরে ইসকনের ভক্ত ও অনুসারিদের বিশেষ করে যুবক ছেলেরাই কাপড়ের থলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে সার্বক্ষণিক ‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ’ বলে জপমালা গুনছে। অথচ, বাংলাদেশর এই অংশে এই প্রক্রিয়ায় উপসনার প্রচলন ছিলোনা।
১৯৯০ সালে ঢাকায় প্রথম ইসকনের আয়োজন করা জগন্নাথ দেবের রথ যাত্রা এখন একটি আলোচিত অনুষ্ঠান। ব্রহ্মচারী ঈশ্বর গৌরহরিদাস জানান, প্রতি বছর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে দেশের ৫৪টি জেলায় এক সঙ্গে রথ যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, আয়োজন, লোক সমাগম ও মন্ত্রীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান এখন রথ যাত্রা।
প্রচারের কৌশল
প্রচারনার মাধ্যম হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে কির্তন পরিবেশনাকে। স্বামীবাগ আশ্রম ও মন্দিরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে তাদের কির্তন পরিবেশনার দল। সাথে গীতা থেকে পাঠ ও আলোচনার আয়োজন করছে তারা।
এছাড়া ইসকনের ভক্তরা কৃষ্ণ ভক্ত তৈরির জন্যে সারা দেশে ঘুরে ঘুরে বিষয় ভিত্তিক ছোট ছোট নাটিকা প্রচার করছে। এর আগেও সনাতন ধর্ম প্রচার কাজে যেসব নাটক মঞ্চায়ন করা হতো সেগুলোর সবটাই ছিল মহাভারতের গল্প বা কোন কোন অধ্যায় ভিত্তিক। কিন্তু ইসকন যে সব নাটিকা মঞ্চায়ন করে সেগুলো সমসাময়িক ঘটনা, সমাজ, সংস্কৃতি কেন্দ্রীক। ইসকনের একজন ব্রহ্মচারী বলেন, ‘নাটিকাগুলোর রচনায়, নির্দেশনায় এবং অভিনয়ে আমরাই থাকি। তবে সব সময় মনে রাখতে হয়- আমরা বিনোদনের জন্য করছি না। কৃষ্ণের দর্শন প্রচারের জন্যই কাজ করছি। সেই দিকটিই যাতে ফুটে ওঠে।”
এছাড়া স্বামীবাগ আশ্রম থেক ২৯ বছর ধরে প্রকাশ হচ্ছে মাসিক পত্রিকা ‘হরেকৃষ্ণের সমাচার’ ও ২৩ বছর ধরে প্রকাশ হচ্ছে ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘অমৃতের সন্ধানে’।

Friday, March 19, 2021

আড়াই শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী যশোরের মুড়লি ইমামবাড়া by শাহাদত হোসেন কাবিল

যশোরের মুড়লি ইমামবাড়া প্রায় আড়াই শ’ বছরের এক ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। দানবীর হাজী মুহম্মদ মহসীনের বৈপিত্রেয়ী বোন মন্নুজান খানম তার জমিদারির আমলে (১৭৬৪-১৮০৩ সালে) এই ইমামবাড়া নির্মাণ করেন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৮৭ সালের ১৯ মার্চ প্রতিষ্ঠানটিকে প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ বলে ঘোষণা করেছে।
এর ইতিহাস খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় তৎকালীন বাংলার মুসলমানদের এক অতিমানবের উচ্চশ্রেণীর সাত্ত্বিক সর্বস্ব দানের কথা, যে দানের কল্যাণকর কর্ম চিরপ্রবহমান। মুড়লির ইমামবাড়া স্মৃতির স্মারক হিসেবে আজো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের হুগলির মন্নুজান খানমের বাবা আগা মুতাহার পারস্যের ইস্পাহান থেকে দিল্লি আসেন। পরে তিনি রাজকার্যে প্রবেশ করে নিজের যোগ্যতাবলে বাদশাহ আওরঙ্গজেবের প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। এই সূত্রে তিনি কলকাতার কাছে জায়গির লাভ করেন। প্রথম জীবনে তার কোনো সন্তান ছিল না। মন্নুজান খানম তার বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র সন্তান। ১৭১৯ সালে মৃত্যুর সময় আগা মুতাহার তার জায়গিরসহ স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি মেয়েকে দিয়ে যান।
এদিকে আগা মুতাহারের মৃত্যু পর তার বিধবা স্ত্রী পারস্য থেকে আগত ও হুগলিতে বসবাসকারী হাজী ফৈজউল্লাহর সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের একমাত্র সন্তান হলেন দানবীর হাজী মুহম্মদ মহসীন। তিনি ১৭৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কিছু দিন পর মহসীনের মা-বাবা উভয়ই মারা যান। ১৭৫২ সালে মন্নুজান খানমের বিয়ে হয় হুগলির নায়েব ফৌজদার মির্জা মহম্মদ সালাহ উদ্দিনের সাথে। তিনি ছিলেন মন্নুজান খানমের বাবা আগা মুতাহারের ভাতিজা।
তিনিও চাচা (পরে শ্বশুর) আগা মুতাহারের জীবদ্দশায় ইস্পাহান থেকে হুগলিতে আসেন এবং আলিবর্দী খাঁর সময়ে নবাব সরকারের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। কর্মক্ষেত্রে প্রজ্ঞার কারণে তিনি নবাবের প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। তাকে হুগলির নায়েবে ফৌজদার নিযুক্ত করা হয় ও একটি জায়গির দেয়া হয়। মির্জা সালাহ উদ্দিনের এই জায়গির ও বাবার কাছ থেকে পাওয়া মন্নুজান খানমের জায়গির কলকাতার কাছেই ছিল।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে স্বাধীন বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলার করুণ মৃত্যুর পর ক্ষমতার অধিশ্বর হন বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর। শর্তানুযায়ী তিনি ২৪ পরগনার কর্তৃত্ব ইংরেজদের হাতে তুলে দেন, যার মধ্যে সালাহ উদ্দিন-মন্নুজান দম্পতির জায়গিরও ছিল। এর পরিবর্তে মীরজাফরের আদেশে যশোরের চাঁচড়া জমিদারির বেওয়ারিশ তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী চার আনা সম্পত্তি সালাহ উদ্দিন ও মন্নুজানকে দেয়া হয়। এই সম্পত্তি সৈয়দপুর জমিদারি নামে পরিচিত।
মির্জা সালাহ উদ্দিন নতুন জমিদারি পাওয়ার ছয়-সাত বছর পর ১৭৬৪ সালে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর মন্নুজান খানম নির্মল জীবনযাপন ও সব সম্পত্তি সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করেন। তার আমলে তিনি মুড়লিতে একটি কাছারি ও সুন্দর একটি ইমামবাড়া নির্মাণ করেন।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ইমামবাড়া নির্মিত হয় ১৮০২ সালে। কাছারিটি পরে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়; কিন্তু ইমামবাড়াটি আজও আছে। মন্নুজান খানম কর্তৃক এই ইমামবাড়া নির্মিত হলেও এটি হাজী মুহম্মদ মহসীনের ইমামবাড়া বলে পরিচিত।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্যানুযায়ী আয়তাকার এই ইমামবাড়া একটি সভাকক্ষ। এর আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ১৮ দশমিক ২৯ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫ দশমিক ২৪ মিটার। ইমামবাড়ার অভ্যন্তর ভাগ ১০টি স্তম্ভের দ্বারা তিন সারিতে বিভক্ত।
মন্নুজানের কোনো সন্তান ছিল না। এ কারণে মৃত্যুর আগে ১৮০৩ সালে তিনি বিপুল সম্পত্তির পুরোটাই হাজী মুহম্মদ মহসীনের নামে লিখে দেন।
হাজী মুহম্মদ মহসীন ছিলেন অকৃতদার ত্যাগী ও ধর্মনিষ্ঠ মানুষ। সম্পত্তির মোহ তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। মাত্র তিন বছরের মধ্যে ১৮০৬ সালে তার মালিকানাধীন যশোরের সৈয়দপুর জমিদারির সব সম্পত্তি, হুগলি ইমামবাড়া, ইমামবাজার ও হাটসহ স্থাবর-অস্থাবর সব কিছু কল্যাণকর কাজে উৎসর্গ করেন তিনি।
তিনি আরবিতে লেখা দাসপত্রে এই সম্পত্তি থেকে আয়লব্ধ অর্থ কোথায় কিভাবে খরচ করা হবে তাও উল্লেখ করে যান। সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করে যে টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে তা ৯ ভাগ করে তিন ভাগ মহররম উৎসব, ইমামবাড়া ও মসজিদ সংস্কারকাজে, দুই ভাগ মুতাওয়াল্লিদের পারিশ্রমিক এবং চার ভাগ কর্মচারী বেতন ও শিক্ষাবৃত্তির জন্য নির্ধারিত হয়। দানপত্রটি লিখে যান ‘সৈয়দপুর ট্রাস্ট স্টেটেট’-এর নামে, যা আজ মৌখিকভাবে মহসীন কল্যাণ ট্রাস্ট নামে পরিচিত।
১৮১২ সালের ২৯ নভেম্বর হাজী মুহম্মদ মহসীন ইন্তেকাল করেন। এর পরপরই সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটে অনিয়ম দেখা দেয়। তৎকালীন ভারত সরকারের হস্তক্ষেপে সেসব অনিয়ম দূর হয় এবং পরিচালনার ভার পড়ে যশোরের কালেক্টরের ওপর। ভারত বিভাগের পর ট্রাস্টের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার এলআর ১৭৪৬০ নম্বর গেজেট বিজ্ঞপ্তি মারফত সৈয়দপুর ট্রাস্ট হুকুম দখল করে নেয়। এতে এর আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়।
পরে সরকার ১৯৫৬ সালের ২২ আগস্ট এলআর ১০২৯১ নম্বর গেজেট বিজ্ঞপ্তি মারফত যশোরের কালেক্টরকে ট্রাস্টের যশোর অংশের ট্রাস্টি নিয়োগ করে। রাজস্ব বোর্ড এই ট্রাস্টি অনুমোদন করে ১৯৬০ সালের ২২ জুন (স্মারক নম্বর ৩৭০/কমপ/এফ)। জেলা কালেক্টরেট সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে ট্রাস্টের জমাকৃত তহবিল অক্ষুন্ন রেখে তার লভ্যাংশ দিয়ে হাজী মুহম্মদ মহসীনের দানপত্র অনুযায়ী জনহিতকর কাজ আবার শুরু হয়। এ জন্য জেলা প্রশাসককে প্রধান করে সরকারি-বেসরকারি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বিভিন্ন সময় পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়ে থাকে।
যশোরে এই ট্রাস্টের কাজ শুরু করতে গিয়ে স্থায়ী তহবিল হিসেবে ৯ লাখ ৮৪ হাজার ৫২৩ টাকা ৭৫ পয়সা পাওয়া যায়। এই টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে জমা আছে। এ ছাড়া মুড়লিতে আছে এক একর ৬৩ শতক জমি। এই জমির ওপর হাজী মুহম্মদ উচ্চবিদ্যালয়, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠিত। একটি ছোট পুকুরও আছে। স্থায়ী আমানতের লভ্যাংশের টাকায় এখন জনহিতকর কাজ করা হয়ে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৫ সাল থেকে ট্রাস্টের যশোর অংশের ট্রাস্টি ‘ সৈয়দপুর ট্রাস্ট স্টেটেট’ খুলনায় জমা হত। ফলে যশোরের কালেক্টরকে ট্রাস্টেও আয় বন্ধ হয়ে যায়। স্থগিত করা হয় জনহিতকর কাজ। ট্রাস্টে আগের স্থায়ী আমানত বেড়ে বর্তমানে ১৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০০০ সালে থেকে ট্রাস্টের নামে শিক্ষাবৃত্তির দেয়া শুরু হয়। এ বছর ১২৫ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয়া হয়েছে।
আর মুড়লির ইমামবাড়া স্মৃতির স্মারক হিসেবে আজো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৮৭ সালের ১৯ মার্চ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রতিষ্ঠানটিকে প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ বলে ঘোষণা করেছে।

Thursday, March 18, 2021

ইরানে অবস্থিত ৪০০ বছরের পুরোনো ভবন

ইরানের ইয়াজদ প্রদেশে প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ভবন যা এখনো বিদ্যমান আছে। এ ভবনের আয়তন ৭৭৯০ বর্গমিটার। সাসানীয় যুগে এ ভবনটি তৈরি করা হয়। ইরান সরকার ১৩৫৪ ফার্সি সনে এটি জাতীয়করণ করে। ইরানের পুরাতত্ত্ব বিভাগ এটির রক্ষণাবেক্ষণ করে যাচ্ছে।
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন জরুরি

পৃথিবীকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে একটি ডায়েট প্রস্তুত করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা দিয়ে সামনে দশকগুলোতে একশ’ কোটিরও বেশি মানুষকে খাওয়ানো যাবে। আর এটা সম্ভব হবে আমাদের গ্রহের কোনো ক্ষতি না করেই। সামনের দশকগুলোতে কোটি কোটি মানুষের খাদ্য সরবরাহ কিভাবে করা যাবে সেটা নিয়েই এতদিন গবেষণা করছিলেন বিজ্ঞানীরা। আমরা যেসব খাবারে আমাদের প্লেট ভরিয়ে রাখি, সেখানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার বলে মনে করেন তারা। অবশেষে তারা একটি উপায় বের করেছেন। আর সেটা হল ‘দ্য প্লানেটারি হেলথ ডায়েট’ অর্থাৎ পৃথিবী সুরক্ষায় স্বাস্থ্যকর ডায়েটের মাধ্যমে। এই ডায়েটটি তৈরি করা হয়েছে মাংস এবং দুগ্ধজাতীয় খাবার বাদ না দিয়েই। তবে প্রোটিন চাহিদার একটা বড় অংশ মেটাতে সেখানে বাদাম, বিভিন্ন ধরনের ডাল আর বীজ যুক্ত করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের পরামর্শ হলো ডায়েট থেকে মাংসের পরিমাণ কমিয়ে বিকল্প প্রোটিনের উৎস খোঁজা।
যেসব পুষ্টিকর খাবার আমরা এড়িয়ে যেতে চাই সেগুলোর প্রতি আগ্রহ জন্মানোর ওপরও তারা জোর দেন। আপনি যদি প্রতিদিন মাংস খেয়ে থাকেন তাহলে আপনার ডায়েটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি। তার মানে এই নয় যে, আর মাংসই খাবেন না। মাংস খাবেন, তবে পরিমিত হারে।
যেমন রেড মিটের কোনো খাবার যেমন বার্গার যদি খেতেই হয় তাহলে সেটা সপ্তাহে একদিন খাবেন। বড় আকারের স্টেক মাসে একবারের বেশি খাবেন না। এ ছাডা সপ্তাহের অন্য আরেকদিন মাছ বা মুরগির মাংস দিয়ে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারেন। আর বাকি দিনগুলোতে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে হবে বিভিন্ন উদ্ভিদজাত খাবার খেয়ে। এক্ষেত্রে গবেষকরা প্রতিদিন বাদাম, বীজ বা ডাল খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। নানা ধরনের ফল এবং সবজি খাওয়া বাড়ানোর কথাও জানান তারা। যেন সেটা প্রতিবেলার খাবার প্লেটের অন্তত অর্ধেক অংশ জুড়ে থাকে। শ্বেতসারযুক্ত খাবার যেমন আলু বা কাসাভাও ডায়েটে যুক্ত করা যেতে পারে।
ডায়েটের পূর্ণ তালিকা:
আপনি প্রতিদিন কোন কোন খাবার কি পরিমাণে খেতে পারবেন সেটা জেনে নিন।
১. বাদাম- দিনে ৫০ গ্রাম।
২. সিমের বিচি, ছোলা, বিভিন্ন ধরনের ডাল- দিনে ৭৫ গ্রাম।
৩. মাছ- দিনে ২৮ গ্রাম।
৪. ডিম- প্রতিদিন ১৩ গ্রাম (সপ্তাহে একটি অথবা দুটি ডিমের বেশি নয়)
৫. মাংস- লাল মাংস দিনে ১৪ গ্রাম এবং মুরগির মাংস দিনে ২৯ গ্রাম।
৬. কার্বোহাইড্রেট অর্থাৎ শস্যজাতীয় খাবার যেমন রুটি এবং চাল দিনে ২৩২ গ্রাম খাওয়া যাবে। এ ছাডা আলুর মতো অন্যান্য শ্বেতসার সবজি দিনে ৫০ গ্রাম।
৭. ডেইরি বা দুগ্ধজাত খাবার দিনে ২৫০ গ্রাম। যা কিনা এক গ্লাস দুধের সমান।
৮. শাকসবজি- দিনে ৩০০ গ্রাম এবং ফল ২০০ গ্রাম।
এ ছাড়া এই ডায়েটে চাইলে ৩১ গ্রাম চিনি এবং ৫০ গ্রাম তেল যেমন জলপাই তেল যোগ করা যাবে।
এগুলোর স্বাদ কি অনেক খারাপ হবে?
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক ওয়াল্টার উইলেট বলেছেন, না এসব খাবার মানেই যে স্বাদ ভালো নয়, এমনটা ভাবা ঠিক না। তিনি নিজেও এক সময় তিন বেলা লাল মাংস খেতেন। অথচ এখন তিনি নিজেকে এই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের আওতায় নিয়ে এসেছেন। মিস্টার উইলেট বলেন ‘খাবারের প্রচুর বৈচিত্র রয়েছে, আপনি হাজারো উপায়ে একটার সঙ্গে আরেকটা মিশিয়ে ওই খাবারগুলো গ্রহণ করতে পারেন।” “আমরা কাউকে স্বাদ থেকে বঞ্চিত করতে এই ডায়েট প্রস্তুত করিনি। বরং এমন কিছু তৈরির চেষ্টা করেছি যেটা খাওয়া সহজ এবং উপভোগ্য।”
এই খাদ্যাভ্যাস কেন প্রয়োজন?
ইট-ল্যান্সেট কমিশনের অংশ হিসাবে বিশ্বের প্রায় ৩৭ জন বিজ্ঞানীর একটি দলকে একত্রিত করা হয়। সেখানে কৃষি থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন সেইসঙ্গে পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা ছিলেন। টানা দুই বছর গবেষণার পর তারা এই ডায়েট তালিকা তৈরি করেছেন, যেটা পরবর্তীতে ল্যানসেটে প্রকাশ করা হয়। এখন তাদের লক্ষ্য বিভিন্ন দেশের সরকার এবং ডাব্লুএইচওর মতো সংস্থাগুলোর কাছে এই গবেষণা ফলাফল পাঠানো। যেন সব জায়গায় এই খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আনা যায়।
২০১১ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭০০ কোটিতে পৌঁছেছে এবং বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ৭৭০ কোটি। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা এক হাজার কোটিতে পৌঁছাতে পারে। যা কিনা বাড়তেই থাকবে। এই বাড়তি জনগোষ্ঠীর খাবারের যোগান নিশ্চিত করতে তারা এই গবেষণাটি করেন।
এই খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন কি জীবন বাঁচাবে?
গবেষকরা বলছেন, যে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে যেসব অসুস্থতা হয়ে থাকে যেমন, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং কয়েক ধরনের ক্যানসার, এগুলো উন্নত দেশের মানুষ মৃত্যুর সবচেয়ে বড কারণ। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে সেই হার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
এই ডায়েট কি পৃথিবীকে রক্ষায় সাহায্য করবে?
গবেষকদের লক্ষ্য হলো সামনের দশকগুলোয় বিশ্বের বাড়তি জনসংখ্যার সবার খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করা সেটা পরিবেশের ক্ষতি না করেই। যেখানে বরং,
১ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো যাবে।
২. জৈববৈচিত্র্যের যেসব প্রজাতি বিলুপ্ত যাচ্ছে সেগুলো রক্ষা করা যাবে।
৩. কৃষিজমি আর বাডাতে হবে না।
৪. পানি সংরক্ষণ করা যাবে।
তবে, শুধু খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনাই যথেষ্ট নয়। এক্ষেত্রে খাদ্যের ফলে সৃষ্ট বর্জ্যের হার কমিয়ে আনা সেইসঙ্গে বিদ্যমান জমিতে খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। এই খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন কতটা বাস্তবসম্মত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় লাল মাংস খাওয়ার হার ব্যাপকভাবে কমাতে হবে। পূর্ব এশিয়াকে মাছের ওপর নির্ভরতা এবং আফ্রিকায় শ্বেতসার সবজির খাওয়ার পরিমাণ কমানো প্রয়োজন। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টকহোম রেসিলিয়েন্স সেন্টারের পরিচালক লাইন গর্ডন বলেন, “আগে কখনোই এই হারে এবং এই গতিতে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়নি।” লাল মাংসের ওপর কর বাড়ানো ডায়েটে পরিবর্তন আনার একটা উপায় হতে পারে বলে মনে করেন গবেষকরা।
খাদ্য উৎপাদন গ্রহের জন্য কত খারাপ?
বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের প্রায় এক চতুর্থাংশের জন্য দায়ী খাদ্য উৎপাদন ও বনের জন্য জমি ব্যবহার। এ ছাডা বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপন্নের জন্যও যে পরিমাণ গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হয় সেটা বিশ্বের সব রেলগাড়ি, উড়োজাহাজ বা অন্যান্য যানবাহনের চাইতেও অনেক বেশি। খাদ্য খাতের পরিবেশগত প্রভাব যদি আরও কাছ থেকে বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, মাংস এবং দুগ্ধজাত খাবারের উৎপাদন পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশ্বব্যাপী, গবাদি পশুর কারণে ১৪% থেকে ১৮% গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হয়ে থাকে। এছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য দায়ী অন্যান্য গ্যাস যেমন মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের নির্গমন সবচেয়ে বেশি হয় কৃষিখাতের কারণে।
বায়ু দূষণের একটি প্রধান কারণ এই কৃষিজমি। কেননা এসব খামার থেকে অ্যামোনিয়ার সৃষ্টি হয়। যেটাকে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লুএইচও)। একইভাবে পানির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের হুমকি এই কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন খাত। কেননা বিশ্বের ৭০% পরিষ্কার পানি ব্যবহার হয়ে যায় কৃষিজমি সেচের কাজে।

এরশাদ কেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন by আহমদ ছফা

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আমি একবার অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। দেড় বছর আগের কথা। বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ে কামরাঙ্গীর চরে হাফেজ্জি হুজুরের মাদরাসার বার্ষিক সভায় আমাকে কিছু বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমাদের দেশের মুখচেনা বুদ্ধিজীবীদের একটা বিরাট অংশ মোল্লা-মাওলানাদের মানুষ করতে চান না। আমি এই মনোভাবটির বিরুদ্ধে অনেকদিন থেকেই প্রতিবাদ করে আসছি। একজন মানুষ টুপি পরে, দাড়ি রাখে, লম্বা জামা পরে এ সকল কারণে মানুষটি অমানুষ হয়ে যায়- এ রকম একটি ধারণা সৃষ্টির করার জন্যে এক ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। নাটক সিনেমায় একজন ক্রিমিনাল দেখাতে হলে একজন টুপিপরা, দাড়িওয়ালা মানুষকে স্টেজে হাজির করতে হয়। এই মনোভাব বর্ণবৈষম্যবাদের মতেই জঘন্য এবং নিন্দনীয়।

যা হোক, আসল কথায় ফিরে আসি।
আমি যখন হুজুরদের সভায় গিয়ে বসলাম, তার অল্পক্ষণ পরেই দেখা গেল সভার উপস্থিত লোকজনদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। তার একটু পরেই এলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একেবারে নিকট থেকে এই প্রথম তাঁকে দেখার সুযোগ হলো। ছিমছাম চেহারার দীঘলদেহী মানুষ। পাঞ্জাবি পায়জামা এবং টুপিতে এরশাদ সাহেবকে সত্যি সত্যি একজন মুসল্লির মতন দেখাচ্ছিল। এরশাদ সাহেব এত সুন্দর চেহারার মানুষ আগে কোনো ধারণা ছিল না।

দীর্ঘ এক ঘণ্টা ধরে তার বক্তৃতা শুনলাম। আমার ধারণা হলো, এই ভদ্রলোক ইচ্ছা করলে অত্যন্ত নরম জবানে গুছিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন। এরশাদ সাহেব অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে একটানা প্রায় ১০ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছেন। একজন স্বৈরাচারী একনায়কের পক্ষে একটানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকা কম কৃতিত্বের কথা নয়। এরশাদ সাহেবের ক্ষেত্রে এটি সম্ভব হয়েছিল। কারণ, তিনি সামরিক শাসনের কড়াকড়ির সঙ্গে নরম জবানের একটা সুন্দর সমন্বয় সাধন করতে পেরেছিলেন। আমার ধারণা, এরশাদ সাহেবের মানুষকে বোকা বানানোর ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছিল। একটা পর্যায়ে বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং এগার দলসহ সব রাজনৈতিক দল এরশাদ সাহেবকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে রাজপথে নেমে এসেছিল। সে বিষয়ে কোনোকিছু পুনরাবৃত্তি করার কোনো প্রয়োজন নেই। সকলে জানেন বিক্ষুব্ধ জনগণের দুর্বার গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদকে ক্ষমতা ছেড়ে কারাগারে যেতে হয়েছিল।

আমি এরশাদ সাহেবের ওপর শুরু থেকেই একটা বিরোধী মনোভাব পোষণ করে আসছিলাম। কারণটা রাজনৈতিক নয়। তিনি ক্ষমতা দখল করার পর কবিতা লিখতে আরম্ভ করলেন। সবগুলো দৈনিকের প্রথম পাতায় তাঁর লেখা পদ্য ঘটা করে ছাপা হতে থাকল। এটুকুর মধ্যে যদি এরশাদ সাহেব সীমাবদ্ধ থাকতেন আমার ক্ষোভটা হয়তো অত তীব্র আকার ধারণ করত না। তিনি তাঁর অধীনস্থ আমলাদের মধ্যে কবিতা লেখার বাতিকটা এত অধিক পরিমাণে সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন যে সেক্রেটারিদের মধ্যে কেউ কেউ অফিসে আসামাত্রই অন্য সেক্রেটারিদের বিগত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কত লাইন কবিতা লেখা হয়েছে সেটা পাঠ করে শোনাতেন।

এরশাদ সাহেব রাজনীতিতে যেমন একটা দল গঠন করলেন, কবিদের নিয়েও আর একটা কবিতার দল বানালেন। সে এক মহা রমরমা কা-। বঙ্গবভনে কবিতা পাঠের আসর বসে। সেখানে এরশাদ সাহেব স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন এবং মোসাহেব কবিরা দাড়ি নেড়ে মাথা দুলিয়ে কর্তাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, আপনার কবিতা বাংলা কাব্যে নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। কথাগুলো পত্র-পত্রিকায় এত জোরের সঙ্গে প্রচারিত হয় যে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হতো, ক্ষমতা দখল করার পর থেকে এরশাদ সাহেবের সঙ্গে অন্যান্য স্বৈরাচারী একনায়কের ফারাক কোথায় সে ব্যাপারেও সামান্য ধারণা জন্মাল। এরশাদ সাহেব রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পর শুধু কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন না, দিকে দিকে একজন মস্ত প্রেমিক হিসেবেও তার সুনাম রটে গেল। এরশাদ সাহেব যখন ক্ষমতার মধ্যগগনে সে সময়ে আমরা কতিপয় বন্ধু মিলে ‘উত্তরণ’ নামাঙ্কিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা চালাতাম। বাংলা একাডেমির এক তৎকালীন কর্মকর্তা আমাকে একটা গান দেখালেন। গানটির লেখক ছিলেন সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা। এই ভদ্রলোক রাঙ্গামাটিতে উপজাতীয় একাডেমির একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি একটি গান লিখেছিলেন, সে গানটির প্রথম পক্তি ছিলÑ ‘নতুন বাংলাদেশ গড়ব মোরা/ নতুন করে আজ শপথ নিলাম।’ এই গানটি উপজাতীয় একাডেমি থেকে প্রকাশিত বার্ষিক সংকলনটিতে ছাপা হয়েছিল। এই বার্ষিক সংকলনটি দেখে আমি ভীষণ ক্ষিপ্ত এবং মর্মাহত হয়েছিলাম। কারণ, প্রায় প্রতিদিন এ গানটি রেডিও টেলিভিশনে গাওয়া হতো এবং রচয়িতা হিসেবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাম দেখান হতো। একটি দেশের প্রেসিডেন্ট একজন সাধারণ নাগরিকের লেখা একটি গানকে নিজের গান বলে চালিয়ে দিয়ে গীতিকার খ্যাতি পেতে চান, এটা আমার কাছে অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ বলে মনে হয়েছিল।

আমি এটাও অনুভব করছিলাম, এই গানচুরির সংবাদটি দেশের মানুষদের জানানো প্রয়োজন। অনেক দৈনিক সাপ্তাহিকের সম্পাদকদের পেছনে আমি ছোটাছুটি করেছি। দেখলাম তাদের অনেকেই এই গানচুরির বিষয়টি জানেন। কিন্তু খবরটি ছাপাতে কেউ রাজি নন। রাঙ্গামাটির এক চাকমা বন্ধু জানালেন, আমি যদি এ গানটি নিয়ে বাড়াবাড়ি করি তাহলে সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরাকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে। একাডেমি থেকে তার চাকরিটা যাবে এবং মাথা বাঁচানো দায় হয়ে পড়বে। অগত্যা আমাদের কাগজে সংবাদটি ছাপলাম। ‘এরশাদ সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরার গান চুরি করেছে।’ সংবাদটি এভাবে ছাপলে আমাদের পত্রিকার সেটি শেষ প্রকাশিত সংখ্যা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই উল্টো করে খবরটা ছাপতে হলো। আমরা ছাপলাম, সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা দেশের রাষ্ট্রপতি গীতিকার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গান চুরি করে উপজাতীয় একাডেমির বার্ষিক সংকলনে ছেপেছে। সুতরাং, সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরার শাস্তি হওয়া উচিত। এই ঘটনাটির পর থেকে এরশাদ সাহেবের প্রতি আমার মনে একটা ঘৃণা এবং অনুকম্পা গভীরভাবে রেখাপাত করেছে।

এরশাদ সাহেব গণ-আন্দোলনের দাপটে বাধ্য হয়ে ক্ষমতা ছাড়লেন। বেগম খালেদা জিয়া সরকার তাঁকে কারাগারে পাঠাল। তাঁকে কি ধরনের করুণ জীবনযাপন করতে হচ্ছে, সে সংবাদ মাঝেমধ্যে কাগজে ছাপা হতো। পাঠ করে আমার মনে একধরনের কষ্ট জন্ম নিত। আহা, মানুষটা অল্প কিছুদিন আগেও প্রচ- দাপটের সঙ্গে ১২ কোটি মানুষকে শাসন করেছে। আজ তাঁর কি দুর্দশা।

এরশাদ অনেক ধরনের নালিশ করতেন। তাঁকে ঘিঞ্জি সেলে রাখা হয়েছে। সংবাদপত্র দেওয়া হয় না। যে সব খাবার দেওয়া হয় সেগুলো মুখে দেওয়ার অযোগ্য ইত্যাদি ইত্যাদি। এরশাদের কারাবাসের সময়ে কারারুদ্ধ রাষ্ট্রপতির প্রতি বেগম জিনাত মোশাররফের উথলানো দরদের কথাও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। বেগম জিনাত এরশাদকে প্যান্ট, শার্ট, পাজামা, পাঞ্জাবি, গেঞ্জি এবং অন্তর্বাস জেলখানায় নিয়মিত পাঠাতেন এবং তার মন কম্পাসের কাঁটার মতো কারারুদ্ধ এরশাদের প্রতি হেলে থাকত। এরশাদের জন্যে কষ্ট পেতাম ঠিকই, কিন্তু তাঁর সৌভাগ্যে একধরনের ঈর্ষাও বোধ করতাম।

এরশাদ এখন ক্ষমতায় নেই। তিনি কারাগারে দুঃখ দুর্দশার মধ্যে দিন অতিবাহিত করছেন। এই চরম দুঃসময়েও সুসময়ের বান্ধবী জিনাত মোশাররফ অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে এরশাদের সুখ-সুবিধার দিকে মনোনিবেশ করছেন। বেগম জিনাত এরশাদের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করতে গিয়ে তার নিজের সংসারটি ভাঙতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমি মনে মনে এই মহিলার খুব তারিফ করতাম। এরশাদ যখন জেল থেকে মুক্তি পেলেন তখন পত্র-পত্রিকার সাংবাদিকদের কাছে পাঁচকাহন করে জিনাতের প্রতি তাঁর অনুরাগের কথা প্রকাশ করলেন। কিন্তু একটা সময়ে যখন তিনি অনুভব করলেন, তিনি জিনাতকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন না, তখন তাকে পচা কলার খোসার মতো নির্মম অবজ্ঞায় ছুড়ে দিলেন। এরশাদের এই কাজটিকে আমার গানচুরির কাজটির চাইতেও অধিক জঘন্য মনে হয়েছিল।

এরশাদ লোভী, প্রতারক এবং ভ- নয় শুধু একজন কাপুরুষও বটে। পশ্চিমা দেশগুলোতে নারী-পুরুষের সম্পর্ক অধিকতর খোলামেলা। সেখানে কোনো রাজনীতিবিদ যদি কোনো নারীর সঙ্গে এই ধরনের কাপুরুষোচিত আচরণ করত তা হলে সেখানেই তার রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটত। আমি মনে মনে এরশাদকে এইভাবে মূল্যায়ন করেছিলাম। এরশাদে কবিতা নকল, গান নকল, পুত্র নকল, প্রেম নকল এমন কি আস্ত এরশাদ মানুষটাই একটা নকল মানুষ। আমাদের এই জাতি অত্যন্ত ভাগ্যবান কারণ একজন আগাগোড়া নকল মানুষ এই জাতিকে দশটি বছর শাসন করেছে।
আমার মূল্যায়নের পদ্ধতিটা কিছুটা ভাবাবেগজনিত। যে সমস্ত মানুষ খুব ঠা-া মাথায় চিন্তাভাবনা করতে অভ্যস্ত, এরশাদ সম্পর্কে যে রকম অনেক মানুষের মতামত আমি জানতে চেষ্টা করেছি। তাদের মধ্যে যে সমস্ত মানুষ সরাসরি এরশাদের দ্বারা বিশেষভাবে উপকৃত হয়নি সে সমস্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য সকলেই আমাকে বলেছে, এরশাদ অত্যন্ত খারাপ মানুষ। আর এরশাদ যে খারাপ মানুষ সে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ একমত।

এখন এরশাদের সম্পর্কে আমার মনে যে একটা বিস্ময়বোধ জন্ম নিয়েছে, সে বিষয়ে কিছু কথা বলব। এরশাদকে যখন মামলার পর মামলায় অভিযুক্ত করে খালেদা জিয়া সরকার জেলখানায় ঢোকাল, অনেকের মতো আমিও ধরে নিয়েছিলাম এরশাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ। যে কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে এরশাদ ঢুকেছেন সেখান থেকে কোনোদিন বেরিয়ে আসতে পারবে না। দু’বছর না যেতেই আমার ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর হাসিনা এবং খালেদা দুই নেত্রীকে করজোড়ে এরশাদের সামনে হাজির হতে হলো। খালেদা জিয়া বললেন, আপনি আমার দলকে সমর্থন করুন, আপনার সমর্থনে আমার দল যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়, আপনাকে রাষ্ট্রপতি বানাব। এরশাদ খালেদার আবেদনের কর্ণপাত করলেন না, কারণ এই মহিলার ওপর তিনি ভয়ানক ক্ষুব্ধ ছিলেন। মহিলা তাঁকে জেলখানায় পাঠিয়েছেন। সুতরাং, তাঁর সঙ্গে কোনো রকমের বোঝাপড়া কিছুতেই হতে পারে না।

হাসিনা বললেন, আপনি আমার দলকে সমর্থন করে আমাদের সরকার গঠন করার সুযোগ করে দিন। আমরা আপনার সবগুলো মামলায় জামিনের ব্যবস্থা করব এবং আপনাকে মুক্ত মানব হিসেবে কারাগারের বাইরে নিয়ে আসব। বাস্তবিকই হাসিনা এরশাদের সমর্থন নিয়ে ঐকমথ্যের সরকার গঠন করলেন এবং এরশাদ সাহেব বাইরে চলে এলেন। এরশাদ সাহেবের সমস্ত রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে টান টান দড়ির ওপর দিয়ে চীনা এ্যাক্রোব্যাট মেয়েরা যেভাবে সাইকেল চালায় তার সঙ্গে তুলনা করা যায়। পরিস্থিতি যতই খারাপ এবং অনিশ্চিত হোক না কেন, তিনি ঠিকই নিরাপদে তাঁর কাজটি করে যাবেন।

বেশ কিছুদিন বাইরে থারার পর এরশাদ আবার নতুন একটা মোচড় দিলেন। সর্বত্র বলে বেড়াতে লাগলেন আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে রসাতলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখন থেকে তিনি এই সরকারের বিরোধিতা করবেন। কারণ এই সরকারের ইতিবাচক কোনকিছু অবদান রাখার ক্ষমতা নেই। তারপরে বেগম খালেদা জিয়া জামাতের সঙ্গে মিলে চারদলীয় জোট গঠন করলেন। চারদলীয় ঐক্যজোটের কর্মপদ্ধতি এবং রূপরেখা যখন আকার পেতে শুরু করেছে সে সময়ে একটি পুরনো মামলায় এরশাদকে পাঁচ বছরের কারাদ- এবং পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করা হলো। জরিমানার টাকা যদি শোধ করতে না পারে, তাহলে আরও দু’বছর জেল খাটতে হবে।

এরশাদ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে যাচ্ছেন। এ সময়ের মধ্যে আদালত থেকে জানানো হয়েছে তাকে দু’বছর কম সময় জেলের মধ্যে থাকতে হবে। কেননা আগে যতটা সময় তিনি জেলে ছিলেন, তাতে পাঁচ বছরের মেয়াদ থেকে সে সময়টা কাটা যাবে। এরশাদের আপিলে কি রায় দেওয়া হবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলার উপায় নেই। হয়তো এরশাদের দ-াদেশ বহাল থাকবে। হয়তো তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু আমি আমার একটা আশঙ্কার কথা উচ্চারণ করতে চাই। এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের তেজষ্ক্রিয়তা অনন্তকাল ধরে টিকে থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ একটা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছেন। হাসিনা-খালেদার সাধ্য নেই এরশাদকে কোথাও ছুড়ে ফেলে দেয়ার।

কারণ হাসিনা-খালেদা যে ধরনের রাজনীতি করছেন এরশাদের অবস্থান সে ধরনের রাজনীতির মধ্যেই। আমাদের দেশে অনেক লোক ব্যক্তি হিসেবে এরশাদের নিন্দা করে থাকেন। হাসিনা-খালেদা ব্যক্তি হিসেবে ভালো কি মন্দ সেটা পুরোপুরি আমরা জানিনা। কিন্তু তাঁদের রাজনীতি এরশাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের রাজনৈতিক নিয়তির নিয়ন্ত্রক ভূমিকা এরশাদই পালন করেন। এই দেশের ভাগ্য, দেশের জনগণ অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে সামরিক শাসনের কব্জা থেকে দৃশ্যত একটা গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেই সামরিক শাসনের একনায়ক মানুষটিকে কিছুতেই সরানো যাচ্ছে না।

>>>সূত্র : আজকের কাগজ, ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০০০ / ‘হারানো লেখা’ বই থেকে নেয়া

ধূসর চুল নিয়ে বিপাকে?

বয়সের আগেই কপালের কাছের চুলগুলো ধূসর হয়ে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন? জেনে নিন প্রাকৃতিক উপায়ে কীভাবে ধূসর চুল কালো করবেন।
  • ২৫০ মিলি নারকেল তেল চুলায় গরম করুন। গরম তেলে ৪ টেবিল চামচ কারিপাতা পাউডার, আধা কাপ আমলকীর পাউডার ও ৪ চা চামচ মেথি গুঁড়া দিয়ে নাড়তে থাকুন। কয়েক মিনিট পর নামিয়ে রাখুন। ২৪ ঘণ্টা পর মিশ্রণটি ছেঁকে নিন পাতলা কাপড় দিয়ে। তেল সংগ্রহ করুন বোতলে। চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত তেল লাগান। পরিষ্কার চুলে লাগাবেন। এটি ধুয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই। সপ্তাহে দুইবার ব্যবহার করুন। ধূসর চুল দূর হবে।
  • আধা কাপ বিটরুটের রসের সঙ্গে ১ টেবিল চামচ আদার রস ও কয়েক ফোঁটা এসেনশিয়াল অয়েল মেশান। মিশ্রণটি ধূসর চুলে লাগান। আধা ঘণ্টা পর নরমাল পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে একবার ব্যবহার করুন।
  • ৫টি আলুর খোসা নিন প্যানে। ২ কাপ পানি ও ৩ টেবিল চামচ কালোজিরার তেল দিন। মিশ্রণটি আধা ঘণ্টা জ্বাল দিন। নামিয়ে ঠাণ্ডা করে ছেঁকে নিন। শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধোয়া শেষে এই পানি দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। আবার নরমাল পানিতে ধোয়ার প্রয়োজন নেই। সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার ব্যবহার করতে পারেন এটি।
>>>তথ্য: গ্লোপিঙ্ক

Wednesday, March 17, 2021

মলদ্বার না কেটে রেকটাম ক্যান্সার অপারেশন by অধ্যাপক ডা: এ কে এম ফজলুল হক

রেকটাম বা মলাশয় ক্যান্সার হলে প্রচলিত অপারেশন হচ্ছে রেকটাম বা মলাশয় ও মলদ্বার কেটে ফেলে পেটে Colostomy বা কৃত্রিম মলদ্বার বানিয়ে সেখানে ব্যাগ লাগিয়ে দেয়া, যার মধ্যে সব সময় মল জমা হবে এবং রোগী মাঝে মধ্যে এটি পরিষ্কার করে নেবেন। তার স্বাভাবিক মলদ্বার থাকবে না এবং সারা জীবন ওই পথে আর পায়খানা হবে না কিন্তু অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ফলে এখন স্বাভাবিক মলদ্বার রেখেই ক্যান্সারটি অপসারণ করা যায়। রোগী স্বাভাবিক পথেই পায়খানা করতে পারবেন। এ প্রযুক্তির ফলে ৭০-৮০ শতাংশ রেকটাম ক্যান্সার রোগী উপকৃত হবেন।

লক্ষণ কী?
মলদ্বারের দৈর্ঘ্য ৪ সেন্টিমিটার। মলদ্বারের ওপরের ১২ সেন্টিমিটার অংশের নাম রেকটাম। মলদ্বারে রক্ত যাওয়া এ রোগের প্রধান লক্ষণ। এ লক্ষণটিকে রোগীরা আমল দেন না। রোগী যদি এই রক্ত যাওয়ার কারণ ডাক্তার দিয়ে পুরোপুরি তদন্ত না করেই সিদ্ধান্ত নেন যে, এটি পাইলস থেকে হচ্ছে- সবচেয়ে বিপদটি তখনই ঘটে। এরপর মাসের পর মাস কেটে যায় পাইলস মনে করে। ইতোমধ্যে ক্যান্সার তার ডালপালা বিস্তার করতে থাকে। পেটে ব্যথা হতে থাকে, মল আটকে গিয়ে পেট ফুলে উঠতে পারে। তখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে বিশেষ ধরনের পরীক্ষায় এ রোগ ধরা পড়ে। ততক্ষণে এ রোগটি সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলার সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যায়।

প্রথম দিকে রোগীর মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন আসে। মলত্যাগের বেগ হলে রোগী টয়লেটে যান এবং শুধু রক্ত ও মিউকাস যেতে দেখেন। এটি সাধারণত ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথে হয়। রোগীরা এটিকে রক্ত আমাশয় বলে ধারণা করেন। ক্যান্সার যখন মলদ্বারের দিকে সম্প্রসারিত হয়, তখন মলত্যাগের পর ব্যথা শুরু হয়ে দীর্ঘক্ষণ চলতে পারে। রোগীদের যখন বলা হয় আপনাকে বিশেষ ধরনের পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে, কোনো ক্যান্সার আছে কি না। তখন তারা বলেন যে, স্যার আমি জানি এটি পাইলস। অনেক বছর ধরে চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে যে এখানে ক্যান্সার শুরু হতে পারে তা তারা খতিয়ে দেখতে চান না। সবচেয়ে অসুবিধা হলো পাইলস, ক্যান্সার, এনাল ফিশার সব রোগেই রক্ত যাওয়াই প্রধান লক্ষণ। আসলে কোন রোগটি হয়েছে তা বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে একজন অভিজ্ঞ সার্জনই কেবল বলতে পারেন। এই ক্যান্সার যদি মূত্রথলি অথবা মূত্রনালী আক্রমণ করে তখন রোগী প্রস্রাবের কষ্টে ভোগেন এবং বারবার প্রস্রাব হয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে এ ক্যান্সার যৌনপথে ছড়িয়ে পড়ার কারণে ওই পথ দিয়ে রক্ত ও মিউকাস এমনকি মলও বেরিয়ে আসতে পারে।

বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সমলের সুপ্ত রক্ত পরীক্ষা সমলদ্বারের ভেতর আঙুল দিয়ে পরীক্ষা সপ্রকটসিগময়ডোস্কপি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সকোলোনসকপি সবেরিয়াম এনেমা সসি-ই-এ (কার্সিনোএম্রাইওনিক এন্টিজেন) সআল্ট্রাসনোগ্রাম অব লিভার স আইভিইউ এক্স-রে সপেটের সিটি স্ক্যান।

প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি ও অত্যাধুনিক চিকিৎসা
অপারেশনই এ রোগের একমাত্র চিকিৎসা। এ রোগে ঐতিহ্যবাহী অপারেশন হচ্ছে রেকটাম বা মলাশয় ও মলদ্বার কেটে ফেলে পেটে নাভির বাম দিকে কলোস্টমি বা কৃত্রিম মলদ্বার তৈরি করে দেয়া। যেখানে একটি ব্যাগ লাগানো থাকে যার ভেতর মল জমা হতে থাকে। যখন রোগীকে এ জাতীয় অপারেশনের ধারণা দেয়া হয় তখন অনেক রোগীই বলেন যে, স্যার মরে যাব তবু এমন অপারেশন করাব না। এসব রোগী এরপর হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন অপারেশন ছাড়াই চিকিৎসার জন্য। কিছু দিন চিকিৎসার পর হতাশ হয়ে যখন ফিরে আসেন তখন সম্পূর্ণরূপে সারিয়ে তোলার অবস্থা আর থাকে না। তখন রোগী মিনতি করে বলেন, স্যার ভুল হয়ে গেছে এখন কিছু একটা করুন।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আমরা ৭০-৮০ শতাংশ রেকটাম ক্যান্সার রোগীর মলদ্বার না কেটেই অপারেশন করতে পারি। যার ফলে স্বাভাবিক পথেই পায়খানা করতে পারবেন। এ প্রযুক্তিটির নাম হচ্ছে Stapling Technique (Disposble Circular Stapler, Proximate ILS, Proximate Linear Stapler এবং Roticulator)। ইতোমধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ’৯৮ তারিখ আমি দেশের ঐতিহ্যবাহী হাসপাতাল হলিফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে এরূপ একটি জটিল অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সফল অপারেশন করেছি। অপারেশনটি করতে আমাকে আমন্ত্রণ জানান দেশের বিশিষ্ট সার্জন ও আমাদের শ্রদ্ধাভাজনব্যক্তিত্ব ডা: জিয়াউল হক। রোগীর বয়স ৫০। বাংলাদেশ বিমানের অফিসার। অনেক দিন মলদ্বারে রক্ত যাচ্ছিল। হঠাৎ পেট ফুলে যাওয়ায় তাকে জরুরিভিত্তিতে অপারেশন করে এ ক্যান্সারটি শনাক্ত করেন ডাক্তার জিয়াউল হক।

এ অপারেশনের জন্য একবার ব্যবহার যোগ্য দু’টি যন্ত্র আমরা সিঙ্গাপুর থেকে এনেছিলাম আগেভাগেই। যন্ত্রটি কিছুটা ব্যয়বহুল। অপারেশনের সময় আমরা বৃহদান্ত্র ও রেকটামের নির্ধারিত অংশটুকু কেটে ফেলে দেই এবং এই যন্ত্রের সাহায্যে বৃহদান্ত্র ও রেকটামের অবশিষ্টাংশ সংযুক্ত করে দেই। তলপেটের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এই যন্ত্র ছাড়া এ জাতীয় অপারেশন করা প্রায় অসম্ভব। বিগত নয় বছর আমরা এ জাতীয় অত্যাধুনিক অপারেশন অনেক করেছি। এ অপারেশনের পর সাধারণত পেটে অস্থায়ী ভিত্তিতে ২-৩ মাসের জন্য একটি ব্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয়। তিন মাস পর ওই ব্যাগটি (কলোস্টমি বা আইলিওস্টমি) আবার অপারেশন করে বন্ধ করে দিতে হয়। তখন রোগী স্বাভাবিক মলদ্বার দিয়ে মলত্যাগ করতে পারেন। যখন রেকটামের ক্যান্সার খুবই গভীরে থাকে, তখন হাত দিয়ে সেলাই করে খাদ্যনালী জোড়া লাগানো যায় বলে এ যন্ত্র ব্যবহার প্রয়োজন হয় না।

রেকটাম ক্যান্সার কেন হয়?
ধনী লোকদের এ রোগ বেশি হয়। মদ্যপান ও ধূমপান এর সম্ভাবনা বাড়ায়। খাবারে যথেষ্ট আঁশজাতীয় উপাদান থাকলে, যেমন- সবজি, ফলমূল এ রোগের সম্ভাবনা কমায়। ৪০ বছর বয়সের পরে এ সম্ভাবনা বাড়তে থাকে।

>>>লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, (অব:) কলোরেকটাল সার্জারি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
>>>চেম্বার : ইডেন মাল্টি-কেয়ার হসপিটাল, ৭৫৩, সাত মসজিদ রোড (স্টার কাবাবসংলগ্ন) ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭৫৫৬৯৭১৭৩-৬

বাইসাইকেল যেভাবে বদলে দিয়েছে পৃথিবী

লণ্ডনের ফুটপাথে রাইড শেয়ারিং কোম্পানি ওফুর বাইসাইকেল
১৮৬৫ সালের শরৎকাল। যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের ছোট্ট এক শহর আনসোনিয়া। একটি সরাইখানায় বসে দুজন লোক পান করছেন। একটু আগের এক পিলে চমকানো অভিজ্ঞতার পর নিজেদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন তারা।
কাছের এক পাহাড় থেকে ঘোড়া চালিত ওয়াগন চালিয়ে আনসোনিয়ার দিকে আসছিলেন তারা। পাহাড়ের ঢালু পথ বেয়ে যখন নামছেন, তখন হঠাৎ পেছন থেকে এক তীব্র চিৎকারে তারা চমকে গিয়েছিলেন। পেছন ফিরে তারা যা দেখেছিলেন, তাতে তাদের রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল।
মনে হয়েছিল স্বয়ং শয়তান বুঝি তাদের পেছনে ধাওয়া করছে। পাহাড় থেকে দ্রুতবেগে নেমে আসছে কিছু। মাথাটি দেখতে মানুষের মতই, কিন্তু শরীরটি যেন কোন অজানা প্রাণীর।
ভয়ে তারা আরও জোরে চাবুক চালালেন ঘোড়ার পিঠে। আর পেছনের সেই অদ্ভূত প্রাণী তীব্র বেগে এসে রাস্তার ধারের খাদে গিয়ে পড়লো।
কল্পনা করুন তো সেই অদ্ভূত প্রাণী সেখান থেকে উঠে এসে এই দুজনের কাছে যখন নিজের পরিচয় দিলেন, তাদের কী অবস্থা দাঁড়িয়েছিল। কালো চুলের সেই ফরাসী লোকটির শরীর কেটেকুটে গেছে, রক্ত ঝরছে। সমস্ত শরীর কাদা-পানিতে মাখামাখি। তার নাম পিয়ের লেলমো।
পিয়ের লেলমোর তৈরি ভেলোসিপেডে। ১৮৬৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এটি পেটেন্ট করেন।
এই তরুণ ফরাসী মেকানিক যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন মাত্র কয়েক মাস আগে। তিনি ফ্রান্স থেকে বয়ে নিয়ে এসেছেন নিজের তৈরি এক যন্ত্র। দুই চাকার পেডাল চালিত এই যন্ত্রটির তিনি নাম দিয়েছেন 'ভেলোসিপেডে।' এখন আমরা একে বলি বাইসাইকেল।
মঁশিয়ে লেলমো এর কিছুদিন পরেই তার এই আবিস্কার পেটেন্ট করেন। তবে তার সেই সাইকেলে তখনো কোন গিয়ার নেই। নেই কোন চেইন। ব্রেকও তখনো লাগানো হয়নি, যে কারণে সাইকেল নিয়ে পড়লেন রাস্তার ধারের খাদে।
তবে পিয়ের লেলমোর এই বাইসাইকেল মডেলটিকে কিছুদিনের মধ্যে ছাড়িয়ে গেলে নতুন এক বাইসাইকেল 'পেনি ফার্দিং'। এটির সামনের চাকাটি বিশাল বড়। পেছনেরটি ছোট। মঁশিয়ে লেলমোর ভেলোসিপেডের তুলনায় এটি চলে দ্বিগুণ গতিতে।
তখনকার দিনে কেবল কিছু দুরন্ত ছেলেই এই সাইকেল চালানোর সাহস করতো। পাঁচ ফুট উঁচু একটা দুই চাকার জিনিসে চড়ে দ্রুতবেগে চলার বিপদ ছিল অনেক। সামান্য বাধাতেই তারা সাইকেল থেকে ছিটকে পড়তো।
কিন্তু এর পর যে ধরনের 'নিরাপদ বাইসাইকেল' বাজারে এলো, সেটি বেশ জনপ্রিয় হলো। প্রযুক্তির দিক থেকে এটি আগেরগুলোর চেয়ে উন্নত। অনেকটা আজকের যুগের বাইসাইকেলের মতোই। দুটি চাকাই সমান, চেইন আছে, ডায়মন্ড আকৃতির ফ্রেম।
শিল্পীর আঁকা ছবিতে ১৮৬০ সালে লণ্ডনে পেনি ফার্দিং বাইকেল রেসের দৃশ্য।
তবে এই সাইকেলের গতি আসতো বড় চাকা থেকে নয়, গিয়ার থেকে। ভালো কাপড়-চোপড় পরেও এই সাইকেলে চড়া যেত। তবে একজন নারী প্রথমবারের মতো প্যান্ট পরে এই সাইকেল চালিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। অ্যাঞ্জেলিন অ্যালেন। ১৮৯৩ সালে তিনি নিউ ইয়র্ক নগরীর উপকন্ঠে নিউওয়ার্কে এভাবে সাইকেল চালান।
সেসময় পুরুষদের একটি সাময়িকী তাকে নিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনী করেছিল। শিরোনাম ছিল, "পুরুষদের প্যান্ট পরেছে এই মহিলা!" অ্যাঞ্জেলিনা অ্যালেন ছিলেন তরুণী, সুন্দরী এবং ডিভোর্সী। কাজেই তাকে নিয়ে ছিল সবার বিপুল আগ্রহ।
বাইসাইকেল যেন মেয়েদের জন্য মুক্তি নিয়ে এসেছিল। আঁটোসাঁটো কোমরবন্ধ আর ফুলানো-ফাঁপানো স্কার্টের ঘেরাটোপ থেকে বেরুনোর দরকার ছিল তাদের। বাইসাইকেল সেই সুযোগ করে দিল। কারণ এসব পোশাক পরে তো আর বাইসাইকেল চালানোর সুযোগ নেই। আর সাথে নিয়ে কোন সঙ্গীও নিতে হচ্ছে না।
কিন্তু সমাজের রক্ষণশীলরা আঁতকে উঠেছিল। মেয়েরা এরকম পোশাকে বাইসাইকেল চালালে নৈতিক অধপতন ঘটবে বলে হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল অনেকে। তারা বলছিল স্বমেহন বেড়ে যাবে, সমাজে পতিতাবৃত্তির বিস্তার ঘটবে। কিন্তু তাদের এসব প্রতিবাদ কিছুদিনের মধ্যেই হাস্যকর প্রমাণিত হলো।
সাইক্লিং ইতিহাসবিদ মার্গারেট গুরোফের মতে, মিজ অ্যালেন কী পোশাক পরেছিলেন সেটা নিয়েই কেবল মানুষ কথা বলছিল। কিন্তু তিনি কী করেছিলেন, সেটা নিয়ে কেউ ভাবছিল না। একটি মেয়ে একাকী রাস্তায় সাইকেলে চড়ছে, এটাকে অত বড় কেলেংকারি মনে হয়নি।
বাইসাইকেলে কাজে যাচ্ছে বেইজিং এর মানুষ। ১৯০০ সালের ছবি।
এর তিন বছর পর সুজান বি অ্যান্থনি নামের এক নারী অধিকার নেত্রী ঘোষণা করলেন যে বিশ্বে নারী মুক্তির জন্য অন্য যে কোন কিছুর চাইতে বাইসাইকেল অনেক বেশি বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছে।
বাইসাইকেল আজকের যুগেও নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম অস্ত্র।
২০০৬ সালে ভারতের বিহার রাজ্যের সরকার মাধ্যমিক স্কুলগামী ছাত্রীদের বাইসাইকেল কেনার জন্য ভর্তুকি দেয়া শুরু করলো। মেয়েরা যাতে দূরের স্কুলে যেতে পারে, সেটা ছিল এর উদ্দেশ্য।
এই প্রণোদনা বেশ সফল হলো। মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুলে যাওয়ার হারই শুধু বাড়লো না, তাদের ঝরে পড়ার হারও কমলো।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও মানুষের দিগন্ত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য বাইসাইকেল বেশ সহজ একটা উপায়। বাস্কেটবল সুপারস্টার লেব্রন জেমস ওহাইওতে তার নিজ শহরে একটি স্কুল স্থাপন করেছেন। এই স্কুলে প্রতিটি ছাত্রকে একটি করে বাইক দেয়া হয়।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, ছোটবেলায় যখন তিনি এবং তার বন্ধুরা বাইক চালাতেন, তখন তাদের মনে হতো তারা মুক্ত, স্বাধীন। পুরো পৃথিবী তাদের হাতের মুঠোয়।
এটা সত্যি যে সমাজের দরিদ্রদের জন্য বহু যুগ ধরেই বাইসাইকেল ছিল এমন এক প্রযুক্তি, যেটি তাদের স্বাধীনতা দিয়েছে। শুরুর দিকে এটি ছিল দামে ঘোড়ার চেয়ে সস্তা। অথচ ব্যবহারের দিক থেকে এটি দিয়ে একই ধরনের স্বাধীনতা পাওয়া যেত, অনেক দূরত্ব পাড়ি দেয়া যেত।
বাইসাইকেল নিয়ে একদল নারী। ১৯০০ সালের ছবি।
কিন্তু এই বাইসাইকেল কেবল সামাজিক পরিবর্তনই ঘটায়নি, এটি শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়।
উনিশ শতকের শুরুর দিকে মার্কিন সেনাবাহিনীর সমরাস্ত্র তৈরির জন্য এমন ধরনের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছিল, যেগুলো একদম একই মাপের, ফলে অদল-বদল করেও কাজে লাগানো যায়। কিন্তু বেসামরিক কারখানায় এ ধরনের যন্ত্রাংশ ব্যবহার তখনো বেশ ব্যয়বহুল ছিল।
এক্ষেত্রে বাইসাইকেল খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করলো। উচ্চ মানের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জন্য নানা জটিল পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা, এই দুয়ের মাঝে বাইসাইকেল শিল্প একটি সংযোগ তৈরি করলো।
বাইসাইকেল বানানো হতো যেসব কারখানায়, সেখানে বেশ কিছু সহজ প্রযুক্তি এবং কৌশল উদ্ভাবন করা হয়। যেমন ঠান্ডা ধাতব পাতকে কিভাবে একটি আকৃতি দেয়া যায়, যা কীনা কম খরচেই করা সম্ভব মান বজায় রেখেই। বল বিয়ারিং, নিউমেটিক টায়ার, গিয়ার এবং ব্রেকের নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলো তারা।
পরবর্তীকালে কিন্তু বাইসাইকেল শিল্পের এসব প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হয়েছে গাড়ি শিল্পে। হেনরি ফোর্ড তার কারখানায় এসব প্রযুক্তি এবং কৌশল ব্যবহার করেছেন।
নিরাপদে ব্যবহার করা যায় এমন ধরনের বাইসাইকেল বিশ্বে প্রথম তৈরি করা হয় ১৮৮৫ সালে ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রিতে রোভারের কারখানায়।
ভারতের বিহারে বাইসাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে মেয়েরা।
এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে পরবর্তীকালে রোভার গাড়ি নির্মাণ শিল্পে একটি কোম্পানিতে পরিণত হয়।
সাইকেল তৈরি দিয়ে শুরু করে গাড়ি নির্মাণ শিল্পে উত্তরণের পথটি বেশ স্পষ্ট।
জাপানে শিল্পের আধুনিকীকরণে একইরকম ভূমিকা রেখেছিল বাইসাইকেল।
জাপানের আধুনিক শিল্পায়নের প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে ১৮৯০ সালে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে বাইসাইকেল আমদানি করা হতো। এরপর এসব বাইসাইকেল সারাই করার দোকান হতে থাকে। এর পরের ধাপে স্থানীয়ভাবে বাইসাইকেলের খুচরো পার্টস তৈরি শুরু হয়। একজন দক্ষ কারিগরের জন্য যা মোটেই কোন কঠিন কাজ নয়।
এর মাত্র দশ বছরের মধ্যেই জাপানের নিজস্ব বাইসাইকেল শিল্প দাঁড়িয়ে যায়, যেখানে সবকিছুই তৈরি হতো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়ে গেল, ততদিনে জাপানে বছরে তৈরি হচ্ছে প্রায় বিশ লাখ বাইসাইকেল। জাপানে এক নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে তখন।
বাইসাইকেল কারখানার জন্য উদ্ভাবন করা প্রযুক্তি পরে ব্যবহৃত হয়েছে গাড়ি তৈরির কারখানায়।
বাইসাইকেলকে পুরোনো দিনের প্রযুক্তি বলে ভাবার একটা প্রবণতা আছে। কিন্তু তথ্য এবং গবেষণা বলে ভিন্ন কথা।
মাত্র ৫০ বছর আগেও পৃথিবীতে গাড়ি আর বাইসাইকেল তৈরি হতো প্রায় সমান সমান সংখ্যায়। কিন্তু এরপর গাড়ির উৎপাদন বাড়তে থাকে, বাইসাইকেলের কমতে থাকে। এক সময় বাইসাইকেলের তুলনায় গাড়ি তৈরি হতে থাকে তিনগুণ বেশি। কিন্তু এখন আবার সময় পাল্টাচ্ছে। বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বাইসাইকেলের উৎপাদন গাড়ির তুলনায় আবার দ্বিগুণ হয়েছে। বছরে এখন বাইসাইকেল তৈরি হচ্ছে প্রায় ১২ কোটি।
সামনের দিনে বাইসাইকেলই আবার আমাদের পথ দেখাবে, কথাটা যতই অদ্ভুত শোনাক না কেন।
আমরা এখন আগাচ্ছি এমন এক যুগের দিকে, যেখানে চালকবিহিন গাড়ি চলবে রাস্তায়। কেউ আর গাড়ি রাখবে না, দরকার হলে স্মার্টফোনে গাড়ি ডাকবে, বা ভাড়া নেবে।
যদি সেরকমই ঘটে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যতের বাহন কী হবে?
উত্তরটা খুব সহজ- বাইসাইকেল।
জাপানের একটি কারখানায় তৈরি করা হচ্ছে বাইসাইকেল। ১৯৫৩ সালের ছবি।
বিশ্বে এখনই এক হাজারের বেশি বাইক শেয়ারিং স্কীম আছে। আছে কোথাও জমা দিতে হয় না এমন ধরনের লাখ লাখ বাইসাইকেল, যেগুলো সহজেই ভাড়া নেয়া যায়। এরকম বাইকের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। চলে এসেছে ব্যাটারি চালিত বাইসাইকেলও।
রাইড শেয়ারিং কোম্পানি উবার তো ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে যে তারা এখন গাড়ির পরিবর্তে তাদের ব্যবসায় ইলেকট্রিক স্কুটার এবং বাইকের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেবে।
তবে এই বাইক ব্যবসায় কিছু সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে কয়েকটি কোম্পানি। তাদের বিপুল সংখ্যাক বাইক চুরি হয়েছে বা নষ্ট করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেয়া হয়েছে। ফলে কোন কোন শহরে তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু এই ব্যবসা সামনে বাড়বে, তেমনটাই মনে হচ্ছে। কারণ যানজটে অচল হয়ে পড়া শহরগুলোতে বাইসাইকেলই পথ চলার সবচেয়ে সহজ উপায়।
বড় বড় শহরে গাড়ির দূষণের কারণেই অনেকে বাইসাইকেল চালাতে চান না। অনেকে দুর্ঘটনার ভয় পান।
কিন্তু ভবিষ্যতের নগরীগুলোতে যদি দূষণবিহীন ইলেকট্রিক কার চলে, যে গাড়ি কোন মানুষ চালাবে না, চালাবে অত্যন্ত সতর্ক রোবট, তখন হয়তো বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে।
ভবিষ্যতে আবার বাড়বে বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা।