Monday, July 21, 2014

গাজায় পড়ে বোমা, দেখে ফুর্তি করে তারা! by গোলাম মর্তুজা

প্রতিদিন সূর্যটা যখন ভূমধ্যসাগরে হেলে পড়ে, তখন একদল ইসরায়েলি গাজা সীমান্তসংলগ্ন একটি পাহাড়ের ওপরে ওঠে। কয়েক মাইল দূরে গাজার ওপর যখন বোমা বর্ষণ শুরু হয়, তখন তারা সে দৃশ্য রীতিমতো উপভোগ করে। তারা পৈশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়ে। আনন্দধ্বনি করে, চিত্কার করে, শিস বাজায়।

>>গাজায় বোমা পড়ার দৃশ্য আয়েশি ভঙ্গিতে দেখছে তিন ইসরায়েলি: গার্ডিয়ান
এমন কিছু ইসরায়েলির নৃশংস হামলার দৃশ্য উপভোগ করা নিয়ে গার্ডিয়ান একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সাংবাদিক হ্যারিয়েট শেরউডের ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ইসরায়েলিদের ধর্ষকাম মনোবৃত্তির কুিসত চেহারা।

>>সোফা পেতে ধ্বংসদৃশ্য দেখতে বসেছেন এক ইসরায়েলি: ছবি : গার্ডিয়ান
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেই পাহাড়ের ওপরে কিছু পুরোনো সোফা, গাড়ির জীর্ণ আসন, গার্ডেন চেয়ার ও ওল্টানো ক্রেট ‘দর্শনার্থীদের’ বসার জন্য রাখা হয়েছে। পাহাড়ের ওপরে পাইন গাছের ডালে দোলনাও টাঙানো হয়েছে, যাতে এখানে আসা লোকজন স্নিগ্ধ বাতাসে দোল খেতে খেতে গাজার ধ্বংসদৃশ্য ‘উপভোগ’ করতে পারেন। অনেকে বিয়ার অথবা কোমল পানীয়ের বোতল ও হালকা খাবার নিয়েও আসেন।
প্রতিবেদনে শেরউড বলেছেন, শনিবার একদল লোককে একটি সিসার পাইপ নিয়ে ভিড় জমাতে দেখা গেল। তাদের প্রায় সবারই স্মার্ট ফোন রয়েছে। (জ্বলন্ত গাজার) কালো ধোঁয়া পেছনে রেখে তারা হাসিমুখে সম্ভবত জয়সূচক চিহ্ন দেখিয়ে সেলফির জন্য পোজ দিচ্ছিল।
গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, হামাসের রকেটের ভয়ে লাখ লাখ ইসরায়েলি সন্ত্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। তবে এসব কিছুই এই পাহাড়চূড়র ‘যুদ্ধ দর্শক’দের দমাতে পারেনি। যদিও তারা সবচেয়ে প্রাথমিক বা অনগ্রসর প্রযুক্তির মিসাইলের আওতার মধ্যেই রয়েছে। এমনকি এদের কেউ কেউ তাদের শিশুদেরও সঙ্গে এনেছে।
সীমান্ত শহর সেরতে বিগত বছরগুলোতে গাজা উপত্যকা থেকে প্রচুর রকেট হামলা হয়েছে। এখানকার একটি বাড়ির সবচেয়ে ওপরের তলার ব্যালকনিতে ইসরায়েলি পতাকা আর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ঐতিহ্যবাহী গোলানি ব্রিগেডের ব্যানার হাতে একটি পরিবার (যুদ্ধ দেখতে) জড়ো হয়েছিল। এখনকার দিনে যুদ্ধ দেখা যায় এমন বাড়ির দামও বেশি প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ বদলে যায়। একটা প্রত্যাশিত উত্তেজনাময় পরিস্থিতি তৈরি হয় এই আশায় যে, হামাস ‘জঙ্গি’রা সন্ধ্যায় ইফতারি করে রকেট ছুঁড়তে শুরু করবে আর তখনই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তার শক্তি প্রয়োগ করে পাল্টা হামলা চালাবে।
ইসরায়েলি বাহিনীর ছোড়া রকেট শেলের বিস্ফোরণ আর কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠা কালো ধোঁয়াকে স্বাগত জানিয়ে আশ্চর্যমিশ্রিত অনুমোদন দিয়ে একজন দর্শক বলে ওঠে, ‘আহা কী সুন্দর!’
১৯ বছরের শিমরিট পেরেজ এসেছিল তার সেনাসদস্য (ছুটিতে থাকা) বন্ধু রাজ সাসনের সঙ্গে। রাজের কাঁধে তখনও সেনাবাহিনী থেকে পাওয়া অ্যাসল্ট রাইফেলটা ঝুলছিল।
পেরেজ বলল, ‘আমরা বোমা বর্ষণ দেখতে এসেছি। এটা খুবই ইন্টারেস্টিং।’ ওই পাহাড়চূড়ায় এটা তাদের চতুর্থ ভ্রমণ। এবার তারা কয়েক ঘণ্টা এখানে থাকবে। ওই জুটি সঙ্গে থাকা ব্যাক প্যাকে কয়েক বোতল পানি ও চিপস নিয়ে এসেছিল।
পেরেজ বলল, বোমার শিকার ফিলিস্তিনের বেসামরিক মানুষদের জন্য তার কোনো উদ্বেগ নেই। তবে তার সেনাসদস্য বন্ধু এ কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে। হামলার শিকার ফিলিস্তিনের সাধারণ নাগরিকদের জন্য উদ্বেগ সত্ত্বেও ওই তরুণ সেনাসদস্য ফিলিস্তিনে অভিযানে তার সতীর্থদের সঙ্গে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করছিল। সে জানায়, ‘আমি ফিলিস্তিন অভিযানে যেতে চাই, আমার দেশকে সাহায্য করার জন্য সেখানে থাকা সেনাদের সাহায্য করার জন্য।’
গণমাধ্যমের কর্মীরা যুদ্ধের ছবি নিতে ওই পাহাড় চূড়ায় আসছিলেন। এর মধ্যে একটি পাহাড়চূড়ায় একটি বাজে ঘটনা ঘটল। একজন ইসরায়েলি এক ফটোগ্রাফারকে ‘বামপন্থী’ হিসেবে অভিযুক্ত করে হুমকি দিয়ে বসল। সাক্ষাত্কার চাইতে গেলে আমাদেরও সাবধান করে দেওয়া হলো, কারণ তখনই সেখানে আরেকবার উল্লাসধ্বনি শোনা গেল।

(গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অবলম্বনে গোলাম মর্তুজা)

ঈদে নতুন জামা আর পুরোনো কাপড়ের কাফন >> ইসরাইলের বর্বর ও নৃশংস বোমা হামলায় গাজার মৃত-অর্ধমৃতদের নিয়ে একটি ছবি গ্যালারী

ইসরাইলের বর্বর ও নৃশংস বোমা হামলায় গাজার মৃত-অর্ধমৃতদের নিয়ে একটি ছবি গ্যালারী > ঈদে নতুন জামা আর পুরোনো কাপড়ের কাফন
মৃত-অর্ধমৃতের ভিড়ে পা রাখার জায়গা নেই
গাজাবাসীর প্রাণের কেন্দ্র আল শিফা হাসপাতাল। জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সেবা দিয়ে যাচ্ছে এই চিকিৎসা কেন্দ্র। ইসরাইলের নৃশংস বোমা হামলায় আহতদের সার্বক্ষণিক পাশে থাকছে এই হাসপাতাল। কর্মকর্তা, ডাক্তার, পুলিশ, নার্স ও কর্মীদের বিরাম নেই কর্তব্যে। কিন্তু এই প্রাণ কেন্দ্রই এখন রূপ নিয়েছে মরদেহ রাখার হিমাগারে! লাশে গিজ গিজ করছে হাসপাতাল কমপাউন্ড। মৃত আর অর্ধমৃতের ভিড়ে পা রাখার জায়গা নেই। অসহায় শিফা হাসাপাতালের চালচিত্র তুলে ধরলেন চিকিৎসকরা। ইসরাইলের গাজা আক্রমণে মুহুর্মুহু বিমান হামলা ও স্থল হামলায় প্রতিদিনই বাড়ছে নিহতের সংখ্যা। তবু মেডিকেল টিম তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেষ্টা করছে রোগীর জীবন বাঁচাতে। বর্তমানে এই হাসপাতালটি মেডিকেল সরঞ্জামাদি ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই টিকে আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ডা. আশলাফ আল কিদরা বলেন, ‘কম বেতন ও জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও আমাদের মেডিকেল টিম গাজার সব জনগণকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।’ সবচেয়ে করুণ ও বেদনার ব্যাপার হচ্ছে চোখের সামনে নিহত হচ্ছে ডাক্তরদের প্রিয়জন স্বজনরাই। ডা. কিদরা বলেন, ‘আমাদের হাসাপাতালের একজন ডাক্তার মাজদি নাইম দেখেন ইসরাইলের হামলায় তার ছেলে আবেদ আল রহমান নিহত হয়েছে।’ আল শিফা হাসপাতালে এখন নিদারুণ ওষুধ সংকট। প্রয়োজনীয় জরুরি মেডিকেল সরঞ্জামাদির পর্যাপ্ত ব্যবস্থাই নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অত্যন্ত মৌলিক ওষুধগুলোর ৩০ শতাংশ সরবরাহ নেই। অন্যান্য মেডিকেল উপকরণের ৫৫ শতাংশই সংগ্রহে নেই। এছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ জেনারেশনের অসুবিধায় জরুরি চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিগ্নিত হচ্ছে। টেলিগ্রাফ।

হাসপাতালে হতাহতের ভিড়

গাজা শহরের একটি হাসপাতালে গতকাল ইসরায়েলি গোলায়
আহত দুই শিশুর চিকিৎসায় ব্যস্ত এক স্বাস্থ্যকর্মী। রয়টার্স
গাজার উত্তরাঞ্চলের প্রধান হাসপাতাল কামাল আদওয়ানের সামনে গুরুতর আহত একজনকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো। উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে তাঁকে আরেক হাসপাতালের নিতে হবে। সাইরেন বাজানো শুরু করল অ্যাম্বুলেন্সটি। কিন্তু পথ আগলে থাকা ছয় থেকে সাতজন নারীর কারণে অ্যাম্বুলেন্স এগোতে পারছে না। ওই নারীদের মধ্যে একজন অ্যাম্বুলেন্সের পাশের দরজা খোলার চেষ্টা করছেন। একপর্যায়ে দরজা খোলা হলে অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে থাকা আহত স্বজনকে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি। চোখের জলে আবেগ কিছুটা হালকা হওয়ার পর অন্যরা ওই নারীকে সরিয়ে নিলেন। ছেড়ে দিলেন অ্যাম্বুলেন্সটি।
খবর নিউইয়র্ক টাইমসের। এটা শুধু কামাল আদওয়ান হাসপাতালের সামনের দৃশ্য নয়। গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর সেখানকার ছোট-বড় সব হাসপাতালেই এ দৃশ্য নিয়মিত হয়ে উঠছে। রক্তাক্ত নারী, পুরুষ, শিশুকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে, আহতদের আর্তনাদ আর স্বজনদের আহাজারি চলছে, চিকিৎসকসহ হাসপাতালের কর্মীরা আহত লোকজনকে দ্রুত ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন। পরে বাইরে থাকা কোনো কোনো স্বজনকে খবর দেওয়া হচ্ছে, ‘...আর বেঁচে নেই।’ আবার স্বজনদের আহাজারি... শোক। গাজায় তিন দিন ধরে স্থল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সব মিলিয়ে ৭ জুলাই থেকে গাজায় ইসরায়েলি অভিযান শুরুর পর গতকাল রোববার পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৪৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে; যার অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। এ সময়ে আহত হয়েছে দুই হাজার ৪০০ জন। সাধারণ সময়েই গাজার হাসপাতালগুলোতে ওষুধের সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকে। গাজায় স্থলবাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর তা আরও প্রকট হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ও যন্ত্রপাতির জোগান না থাকায় হতাশ হতে হয় চিকিৎসকদের। কামাল আদওয়ান হাসপাতালে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র ও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের সুবিধাসহ মাত্র দুটি শয্যা রয়েছে।তাই আশঙ্কাজনক অনেক ব্যক্তিকে প্রয়োজন সত্ত্বেও শয্যা দেওয়া যাচ্ছে না। অথচ অন্য সময় হলে এ ধরনের ব্যক্তিদেরও হাসপাতালে ভর্তি করানো হতো। ইসরায়েলি হারেৎজ পত্রিকার খবরে বলা হয়, ইসরায়েল গত শনিবার ইরেজ সীমান্ত ক্রসিং খুলে দিয়ে পাঁচ টন পরিমাণ চিকিৎসা-সরঞ্জাম গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলি অভিযান কত দিন চলবে, তা কেউ জানে না।
তাই গাজার হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, খুব দ্রুতই ওষুধ ও চিকিৎসা-সরঞ্জাম ফুরিয়ে যাবে। আহত লোকজনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্থান সংকুলান হচ্ছে না বলে অপেক্ষাকৃত কম আহত ব্যক্তিদের ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না হাসপাতালে। এটা করা হচ্ছে গুরুতর আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়ার পথ খোলা রাখতে। গাজার উত্তরাঞ্চলের জরুরি স্বাস্থ্যবিষয়ক পরিচালক সাইদ সালেহ জানান, স্থল অভিযান শুরু হওয়ার পর হাসপাতালে আহত লোকজনের আসার সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘আহত অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক। মৃতের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।’ গাজার উত্তরাঞ্চলের আরেক হাসপাতাল বেইত হানাউনে আগের তুলনায় ছিন্নভিন্ন মরদেহ বেশি আসছে। ওই এলাকায় ইসরায়েলি স্থল অভিযানের ব্যাপ্তিও অনেক বেশি। ট্যাংকের পাশাপাশি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার গানশিপ ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। জরুরি স্বাস্থ্যবিষয়ক পরিচালক সাইদ সালেহ বলেন, ওই মরদেহগুলো হয় গুলি, নয়তো ট্যাংকের গোলায় ছিন্নভিন্ন হয়। আসলে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় স্থল অভিযান শুরু করার পর নির্বিচারে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আল-শিফা হাসপাতালে ভর্তি ছয় বছর বয়সী শিশুকন্যা নূরের শয্যাপাশে বসে গাজার বাসিন্দা আবু জারাদ বলেন, ‘এখানে নিরাপদ আশ্রয় বলতে কিছু নেই। আমরা কোথায় যাব? তারা রাস্তাঘাটে পর্যন্ত মানুষ হত্যা করছে।’ গত শুক্রবার রাতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আহত হয় শিশু নূর। রাতে তাদের বাড়ির এক পাশে বিমান থেকে ফেলা বোমায় নিহত হয় নূরের তিন স্বজন।তার একটু পরেই আরেকটি বোমায় বিধ্বস্ত হয় তাদের থাকার ঘরসহ পুরো বাড়ি। রক্তাক্ত হয়েও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় নূর ও তার বাবা-মা।

হিটলারের চেয়েও বর্বর ইসরায়েল: এরদোয়ান

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, ইসরায়েলের কোনো বিবেক নেই, সম্মান নেই, গর্ব করার কিছু নেই। যারা দিনরাত হিটলারের নিন্দা করে, সেই ইহুদিদের বর্বরতা হিটলারকেও ছাড়িয়ে গেছে। তুর্কি প্রধানমন্ত্রী গতকাল রোববার ওর্দু শহরে এক নির্বাচনী জনসভায় এ কথা বলেন। তুর্কি প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সরব। খবর দি ইন্ডিপেনডেন্টের। এরদোয়ান গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর শক্তি প্রয়োগকে অসম বলে উল্লেখ করে বলেন, গাজায় আগ্রাসনের ফলে ইসরায়েল-তুরস্ক সম্পর্ক উন্নয়নের যেকোনো চেষ্টা ব্যাহত হবে। গাজায় ইসরায়েলের টানা ১৩ দিনের আকাশ ও স্থলপথে হামলায় নিহতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে তুরস্কে বিক্ষোভকারীরা কয়েক দিন ধরে ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারাসহ তুরস্কের বড় বড় শহরে বিক্ষোভ করছে।
গত শুক্রবার হাজার হাজার বিক্ষোভকারী ইস্তাম্বুলে ইসরায়েলি দূতাবাসে ঢুকতে চাইলে দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বেধে যায়। এক খবরে বলা হয়, বিক্ষোভকারীরা দূতাবাসে ইসরায়েলের পতাকা ছিঁড়ে ফিলিস্তিনের পতাকা লাগিয়ে দেয়। এ অবস্থায় নিরাপত্তার অভাবে তুরস্কে ইসরাইলি দূতাবাসে কর্মীর সংখ্যা কমানো হয়েছে। তবে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাবের পরও এরদোয়ান তুরস্কের ইহুদি সম্প্রদায়ের ব্যাপারে তাঁর সমর্থকদের সতর্ক করে বলেন, ‘তুরস্কের ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর কোনো খারাপ আচরণ মেনে নেওয়া হবে না। কারণ সবকিছুর পরও তারা এই দেশেরই নাগরিক।’ তুরস্কের এক সংবাদপত্রে গাজায় হতাহতের ব্যাপারে ক্ষমা চাইতে তুরস্কে বসবাসরত ইহুদিদের প্রতি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে এরদোয়ানের প্রতি আহ্বান জানান। ফিলিস্তিনে মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তুরস্কের ইহুদিদের প্রতি বৈরী মনোভাবও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সরকারও নাগরিকদের প্রতি তুরস্ক সফরের ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছে।

দুবারই বেঁচে গেলেন তিনি

দুবারই বেঁচে গেলেন তিনি
মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের দুর্ঘটনার শিকার দুটি উড়োজাহাজেরই (ফ্লাইট এমএইচ৩৭০ ও এমএইচ১৭) টিকিট কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু দুবারই যাত্রার ঠিক আগে টিকিট পাল্টে ফেলেছিলেন ২৯ বছর বয়সী ডাচ নাগরিক সাইকেলবিদ মর্টেন ডি জংগে। আর এভাবেই তিনি কপালের জোরে দুবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। খবর দ্য স্টারের। টেরেংগানু সাইক্লিং টিমের সদস্য ও ওল্ডেনজাল শহরের বাসিন্দা ডি জংগে নেদারল্যান্ডসের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে জানান, তুলনামূলক কম ভাড়ায় গিয়ে কিছু খরচ বাঁচানোর জন্য তিনি ফ্লাইট এমএইচ১৭-এর টিকিট পরিবর্তন করে নিয়েছিলেন।
আর তাইওয়ানে একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে তিনি গত ৮ মার্চ নিখোঁজ উড়োজাহাজটির (ফ্লাইট এমএইচ৩৭০) টিকিটও নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি ট্রানজিট এড়ানোর কথা ভেবে অন্য একটি ফ্লাইটের যাত্রী হন। নিজের ওয়েবসাইটে ডি জংগে লিখেছেন, ‘এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আমি ওই দুটি ফ্লাইটের সব যাত্রীর জন্য শোক ও তাদের স্বজনদের জন্য সমবেদনা প্রকাশ করছি। কিন্তু আমি সত্যিই ভাগ্যবান। কারণ, দুটি দুর্ঘটনা থেকেই আমি রক্ষা পেয়েছি।’ তবে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসে আবার যাতায়াতের ব্যাপারে ভীত নন ডি জংগে। তিনি শিগগিরই ফ্রাংকফুর্ট হয়ে মালয়েশিয়ার পথে ওই বিমান সংস্থার যাত্রী হবেন। তিনি বলেন, ‘যা ঘটেছে, ভয়াবহ। এত বেশি প্রাণহানি, অভাবনীয়। নিজের পরিবারের কথা ভেবে আমি খুশি। বেদনাদায়ক দুটি ঘটনায় যেসব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের দুঃখবোধের তীব্রতার তুলনায় আমার গল্পটি কিছুই নয়।’

ফিলিস্তিন : মানবতার মৃত্যুকূপ by মোঃ মাহমুদুর রহমান

ফিলিস্তিনের ইতিহাস ও আজকের গাজা উপত্যকার দিকে তাকালে যে কোনো মানুষ বর্তমান বিশ্বের ভণ্ডামিপূর্ণ, বর্বর, অসভ্য ও অসহায় রূপটি দেখতে পাবেন। গাজার নারী ও শিশুদের অসহায় আর্তনাদ যেন বিশ্ব মানবতার মৃত্যু যন্ত্রণার চিৎকার ধ্বনি। তবুও বিশ্ব শক্তিগুলো নির্বিকার। ইসরাইলের প্রতি দায়সারা যুদ্ধবিরতির আহ্বান ছাড়া অসহায় মানুষদের বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই তারা করছে না। মুসলিম বিশ্ব হয় নীরব অথবা খুব নরম সুরে নিন্দা জানাচ্ছে, যাতে এ নিন্দা জানানোর ভাষায় ওরা কোনোক্রমেই কষ্ট না পায়! কারণ ওরা কষ্ট পেলে ইহুদি নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব মিডিয়া এবং রাষ্ট্র শক্তিগুলো মুসলিম বিশ্বের রাজা-বাদশাহ ও তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর ক্ষমতার মসনদ নড়বড়ে করে ফেলতে পারে।
বর্তমান হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় ১২ জুন পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারী তিন কিশোরের অপহরণ ও হত্যার মধ্য দিয়ে। দুষ্কৃতকারীদের এ নিন্দনীয় অপরাধের দায় গাজার নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে বহন করতে হচ্ছে। ইসরাইল এ ঘটনার জন্য ফিলিস্তিনের হামাসকে দায়ী করে প্রথমেই তল্লাশির নামে শ’খানেক বাড়িঘর ধ্বংস করে এবং কয়েকশ’ ফিলিস্তিনিকে আটক করে। পরে ফিলিস্তিনি আরেক কিশোরকে অপহরণ করে পুড়িয়ে হত্যা করে। কিন্তু হামাস কিংবা ফিলিস্তিনি অন্য কোনো গ্র“প ইহুদি বসতি স্থাপনকারী তিন কিশোরের হত্যার দায়িত্ব স্বীকার করেনি কিংবা ইসরাইলও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। তাই গায়ের জোরে কোনো অপরাধকে অন্যের গায়ে ট্যাগ করে তাদের নিশ্চিহ্ন করার কৌশলকে অপকৌশল ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। ইসরাইলি হামলায় যখন নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীসহ নিরপরাধ মানুষ নির্বিচারে বর্বর হত্যাযজ্ঞের শিকার হচ্ছে, তখন হামাস মিসাইল ছুড়ে ব্যর্থ প্রতিরোধের চেষ্টা করে। এতে ইসরাইল নতুন প্রচারণা শুরু করে, হামাসকে শক্তিহীন না করা পর্যন্ত তাদের আক্রমণ স্তিমিত হবে না।
নিরপেক্ষ ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বিশ্লেষকদের ধারণা, এসবই ইসরাইলের অজুহাত। তারা আসলে ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করতে চায় যাতে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন নির্বিঘ্ন হয়। একই সঙ্গে বিগত দিনে নতুন তৈরি অস্ত্রগুলোর ধ্বংস ক্ষমতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরে অস্ত্র বিক্রি বৃদ্ধির মাধ্যমে ইসরাইলি অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে চায়। এর পক্ষে বিশ্লেষকদের যুক্তি হচ্ছে, নির্দিষ্ট বিরতিতে ইসরাইল বিভিন্ন অজুহাত খাড়া করে ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিমতীরে হামলা করছে। চলমান অপারেশন ‘প্রটেক্টিভ এজ’, ২০১২ সালে ‘অপারেশন পিলার অব ডিফেন্স’, ২০০৮-০৯ সালে ‘অপারেশন কাস্ট লিড’, তারও আগে ২০০৬ সালে লেবাননের হিজবুল্লাহদের বিরুদ্ধে যুদ্ধসহ নিকট অতীতের ইসরাইলি কর্মকাণ্ড এ ধারণাকেই সমর্থন করে। প্রতি দুই বছরে নতুন আবিষ্কৃত অস্ত্রগুলোর ধ্বংস ক্ষমতা পরীক্ষা ও প্রদর্শন করে অস্ত্র বিক্রি বৃদ্ধির পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে নতুন নতুন এলাকায় অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনের মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করছে তারা।

বিশ্ব নেতাদের নীরবতার সুযোগে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল যুগের পর যুগ ধরে তাদের এ বর্বর কৌশল প্রয়োগ করে যাচ্ছে অসহায় ফিলিস্তিনিদের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনীতির প্যাঁচে ইসরাইলের জন্য এ মুহূর্তে কাজটি বিগত দিনের চেয়ে সহজ হয়ে গেছে বলেই মনে হয়। ২০১২ সালের ইসরাইলি বর্বরতাকে আলোচনার মাধ্যমে থামাতে সক্ষম হয়েছিল প্রতিবেশী মিসরের মুরসি সরকার। সময়ের পরিবর্তনে জেলে বন্দি মুরসি আজ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অসহায় ফিলিস্তিনি ও গাজাবাসীর পক্ষে গান গাচ্ছেন। কিন্তু যারা মুক্ত তারা ব্যস্ত গদি রক্ষায়। এর অর্থ কি ফিলিস্তিন ধ্বংস হয়ে যাবে? না ইতিহাস তা বলে না। ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে বর্বর জালিমরাই ধ্বংস হয়, মজলুমদের বিজয় হয় সময়ের ব্যবধানে। সম্ভবত এটি উপলব্ধি করেই সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট আহমেদনিজাদ বলেছিলেন, পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ইসরাইলের মুছে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
থিওডোর হার্জেলের স্বপ্ন ও ১৮৯৭ সালের জায়নবাদী ইহুদিদের সম্মেলনের দাবি এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোরের স্বীকৃতি (বেলফোর ঘোষণা) এবং তুর্কি খেলাফতের পতনের পথ ধরে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এগিয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এডলফ হিটলারের ব্যাপক ইহুদি নিধনযজ্ঞের ফলে বিশ্ব নেতাদের কাছে পৃথক ইহুদি রাষ্ট্রের যৌক্তিকতা ভিত্তি পায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ তার ১৮১ নম্বর প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ৫৫ ভাগ ভূমির ওপর ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা পায় ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল। জন্মের পর থেকেই ফিলিস্তিনের মুসলমানরা তাদের জবরদস্তিমূলক উচ্ছেদের মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসছে। কারণ ইহুদিদের দুর্দশার জন্য মুসলমানরা দায়ী ছিল না। অথচ তাদের এজন্য খেসারত দিতে হচ্ছে। এর প্রতিবাদে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)। জাতিসংঘ ফিলিস্তিনে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের প্রস্তাব পাস করলেও শুধু ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় ইহুদিদের জন্য। আরবদের ফিলিস্তিন আজও স্বাধীন হয়নি। উল্টো ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর থেকে ইসরাইল ফিলিস্তিনের ভূমি দখল শুরু করে।
পরাশক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আস্কারা এবং মুসলিম বিশ্বের অনৈক্যের সুযোগে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর ও অমানবিক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে ফিলিস্তিনে যুগের পর যুগ। হিংস্র জানোয়ারের সামনে কালো মানুষদের ছেড়ে দিয়ে গ্যালারিতে বসে তাদের আর্ত-চিৎকারে যেভাবে একসময় শ্বেতাঙ্গরা উল্লাস করত, ঠিক সেভাবে ইসরাইলের উঁচু পাহাড়ে বসে গাজায় বিমান হামলায় মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর মানুষের দুর্দশা দেখে আনন্দ-উল্লাস করছে জায়নবাদীরা, যা একজন ডেনিশ সাংবাদিকের টুইটারে প্রচারিত হয়েছে। তারা উল্লাস করবেই। কারণ তাদের মানসিকতায় মানবীয় কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। তাদের পার্লামেন্টের সদস্য আলিয়াত শাকিদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে নিষ্ঠুরভাবে ফুটে উঠেছে এ চিত্র। ফিলিস্তিনের সব মানুষকে তিনি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শুধু মানুষ নয়, সব স্থাপনাও তার দৃষ্টিতে শত্র“ সম্পত্তি। এমনকি ফিলিস্তিনি নারীদের তিনি সর্প জন্মদানকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ দৃষ্টিভঙ্গি ইসরাইলের অপরাধী চরিত্র বিশ্ববাসীর কাছে পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
হিটলারের সময়ের জার্মানির ইহুদিদের দুর্দশা এবং আজকের ফিলিস্তিনি মুসলমানদের দুর্দশার মিল দেখে আশ্চর্য হই। হিটলার কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদিদের জড়ো করে গ্যাস চেম্বারে নিয়ে হত্যা করত। আর বর্তমানে গাজা নামক উন্মুক্ত জেলে ফিলিস্তিনিরা এক অর্থে বন্দি। বিমান হামলার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। ছোট্ট বালিকা আনা ফ্রাংকের ডায়রিতে জার্মানির ওই সময়ের যে করুণ চিত্র ফুটে উঠেছিল, তা গাজার অসহায় শিশুদের ভয়ার্ত চেহারায় আবার ফিরে এসেছে। হিটলার ও বর্তমান ইসরাইলের রাজনীতিকরা একই রকম ঘৃণ্য নর্দমার কীট। তফাৎ হচ্ছে হিটলার বিশ্বের সব বিবেকবান মানুষের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরাশক্তিগুলোর ঘৃণাও কুড়িয়েছিলেন। আর বর্তমান ইসরাইল বিবেকমান মানুষের ঘৃণা কুড়ালেও পরাশক্তিগুলোর আশীর্বাদে টিকে আছে। তাই ফিলিস্তিন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে আর অক্ষত আছে ইসরাইল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ফিলিস্তিনের প্রতিটি শিশুর রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন দেহ বর্তমান বিশ্ব বিবেকের প্রতিচ্ছবি।
তবে পরাশক্তিগুলো ঘুমিয়ে থাকলেও সাধারণ মানুষ ঘুমিয়ে নেই। ইসরাইলকে যার যার অবস্থান থেকে সবাই বয়কট ও ঘৃণা করছে। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ইসরাইলের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ ইসরাইলের নিষ্ঠুরতার নিন্দা জানাচ্ছে। এমনকি যে মার্কিন ইহুদিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি নিষ্ঠুরতাকে সমর্থন করার অভিযোগ রয়েছে, তাদেরও কেউ কেউ ইসরাইলকে নিন্দা জানাতে শুরু করেছে। এভাবে ইহুদিবাদী ইসরাইল সময়ের ব্যবধানে একঘরে হয়ে পড়বে। তখন হয়তো তারা সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হবে।
মোঃ মাহমুদুর রহমান : ব্যাংকার
mahmudpukra@gmail.com

সাকিবের ভুল স্বীকার : দুঃখ প্রকাশ

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) শাস্তি দেয়ার পর থেকেই সাকিব আল হাসান সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি। কাল শাস্তি পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেছেন এই অলারাউন্ডার। তবে কালও সাকিবকে প্রশ্ন করে কোনো উত্তর পেলেন না সাংবাদিকরা। রোববার দুপুরে বিসিবির কাছে আপিল করার পর একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করে সোজা বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সাংবাদিকরা তার সঙ্গে লিফটে উঠে যান। সেখানেও বিভ্রন্তি। নিচে না নেমে উঠে যান তৃতীয় তলায়। পরে নিচের নামার সময় এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন সাকিব অনুশীলন তো চালিয়ে যাবেন নাকি? সাকিব রসিকতা করে উত্তর দেন, ‘রোজা রমজানের মাস ইবাদতের কথা বলুন।’ এরপর সাকিবের মুখ থেকে আর কোনো কথা বের করা যায়নি। তবে বিকেলে সাকিব নিজের ফেসবুক ফ্যান পেজে একটি লেখা পোস্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘অনেকদিন পর আমি স্টেডিয়ামে (মিরপুর শেরেবাংলা) গিয়েছিলাম। অনেক মিস করছিলাম। এটা নয় যে আমি ঢাকায় ছিলাম না কিন্তু অনেকদিন পর সেখানে গেলাম। দয়া করে সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। আশা করছি দ্রুতই ক্রিকেট মাঠে আবার ফিরে আসব।’

এদিকে লিখিত বক্তব্যে সাকিব যা বলেছেন তা নিচে তুলে ধরা হল-
আসসালামুআলাইকুম
আমার কোনো আচরণে বোর্ড এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বিব্রত হয়ে থাকলে তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে দর্শক এবং সমর্থক যারা সব সময় বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে আছেন, তাদের কাছেও আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি স্বীকার করছি যে, একজন পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে এবং বোর্ডের চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার হিসেবে আমি অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ শৃংখলা ও সংযত আচরণ প্রদর্শন করতে পারিনি। ভবিষ্যতে আমি আরও পরিণত আচরণ করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমার ব্যাপারে বোর্ডে যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা আমি সম্মান করি, কিন্তু ক্রিকেট খেলা থেকে দূরে থাকার মতো কষ্টকর বিষয় আমার মতে আর কিছু হতে পারে না। ক্রিকেট আমার জীবন এবং অনূর্ধ্ব-১৫ পর্যায় থেকে আমি বাংলাদেশের রং এবং বিসিবির লোগো ব্যবহার করে আসছি। এটা আমার জন্য সবচেয়ে গর্বের বিষয়। বাংলাদেশ দল আমার কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আমি জাতীয় দলের জন্য নিজের সবকিছু উজার করে দিয়ে খেলি। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ দলের জন্য আমার সবকিছু উজাড় করে দেব। সবাইকে ধন্যবাদ।

গাজার বিভীষিকাময় একটি রাত -বর্বরতায় হিটলারকে ছাড়িয়ে গেছে ইসরায়েল

রাতের গাজা হয়ে উঠেছে আরো বিভীষিকাময়। রাতভর ইসরায়েলের বোমা হামলা আর কানফাটা শব্দ। বিদ্যুৎ নেই। ইসরায়েলের ট্যাংক থেকে ছোড়া গোলা বাড়িঘরের ওপর এসে পড়ছে। পালানোর কোনো পথ নেই। প্রতিবেশীদের মরণ-চিৎকার ভেসে এলও তাদেরকে উদ্ধারের কোনো উপায় নেই। রাত ৯টা থেকে এই ভয়ঙ্কর বোমা হামলা শুরু হয় আর রাত যত বাড়ে ততই হামলার তীব্রতা বাড়তে থাকে। রাতটা গাজাবাসীর জন্য হয়ে ওঠে আরো ভয়ঙ্কর। সারারাত চলতে থাকে এ হামলা। আর ভয়ঙ্কর মৃত্যুপুরি হয়ে ওঠে গাজার উত্তরের শেজাইয়া এলাকাটি। খবর : এএফপির

প্রতিটির মানুষ তার চাপাশে গোলা বর্ষণের শোঁ শোঁ শব্দ আর বিস্ফোরণের কান ফাটা শব্দে থর থর করে কেঁপে উঠে ঘরবাড়ি। আর তীব্র কেঁপে উঠে প্রতিটি ঘুমহীন ভয়ার্ত মানুষের প্রাণ। পাশের বাড়ি থেকে কারো আহত হওয়ার ভয়ঙ্কর চিৎকার ভেসে এলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আহতদের সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না। রাতের অন্ধকারে রাস্তায় বেরিয়ে অ্যাম্বুলেন্স খোঁজার চেষ্টা চলে, কিন্তু তীব্র গোলাবর্ষণের ভেতরে অ্যাম্বুলেন্সের দেখা পাওয়া অসম্ভব। আর এলাকা ছেড়ে পালানোর জন্য কোনো গাড়িঘোড়া নেই। রাতের অনিরাপদ ফাঁকা রাস্তা কেবল প্রাণ হারানোর ঝুঁকিই বাড়িয়ে দেয়।

তাই শেষ পর্যন্ত আহতদের বাঁচানোর আশা ছেড়ে নিজেরাই প্রাণে বাঁচতে ভোরের আলো ফোঁটার আগমূহূর্তে বেরিয়ে এসেছে রাস্তায়। হাজার হাজারে ফিলিস্তিনি গাজা থেকে পালানো চেষ্টা করতে গিয়ে খালি পায়ে, পোশাক-আশাক ছাড়াই কেবল পাজামা পরা অবস্থায় বাইরে বেরিয়ে এসেছে। প্রাণ হারানোর ঝুঁকি নিয়ে দু'ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে কোনো রকমে গাজা শহরে পেঁৗছাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তারা নাজাফ, শাফসহ গাজা সিটি এবং ইসরায়েলের সীমান্তের তীব্র সংঘাতময় এলাকা থেকে তারা শহরেটির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়া হাজার হাজার নিরীহ গাজাবাসীদেরই একজন আহমেদ। সে নিজের স্ত্রী এবং তাদের সন্তানদের নিয়ে এলাকা থেকে পালাচ্ছে। তার ছোট্ট মেয়েটির পা খালি। গাজা শহরের পূর্ব এলাকাতে শিশুটি যখন হাঁটছে তখনও তার চোখে ঘুমের ভার। আহমেদ জানালেন, 'আমাদের চারপাশে কেবলই বোমা বিস্ফোরণের কানফাটা শব্দ। কোনো আলো নেই, আমরা কোন উপায়ই খুঁজে পাচ্ছি না।'

এদিকে গাজা সিটির সিফা হাসপাতালে প্রতি পাঁচ মিনিট পর পরই আসছে অ্যম্বুল্যান্স। তবে অ্যম্বুলেন্স ছাড়াও গাড়ি বা ট্রাকে করেও আহত কিংবা মৃতদেহ এসে পেঁৗছাচ্ছে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে। বেশিরভাগ আহতরাই বিস্ফোরিত বোমার টুকরো টাকরায় বিক্ষত দেহ নিয়ে। একটি বালকের সারা শরীরই আঘাতের চিহ্নে ঢাকা পড়ে গেছে_ তীব্র আর্তনাদ করছে। আহত অনেকেরই শরীর ধুলোয় ঢাকা। কেউ আবার তারে পোশাকের ভেতররে রক্তে চুপসে গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ডাক্তার সৈয়দ হাসান জানালেন, বেশির ভাগই তীব্রভাবে আহত রক্তাক্ত অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে হেঁটে হাসপাতালে আসতে হচ্ছে। রাস্ততেও আহত রক্তাক্ত মানুষ শুয়ে অপেক্ষা করছেন কেউ যদি তাকে হাসপাতালে পেঁৗছে দেয়। তিনি বললেন, এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি এর আগে কখনো দেখেননি।
'বর্বরতায় হিটলারকে ছাড়িয়ে গেছে ইসরায়েল' -এরদোগান
'বর্বরতার দিক দিয়ে ইসরায়েল হিটলারকেও ছাড়িয়ে গেছে। এদের কোনো লজ্জা-সম্মান নেই, মানবতাবোধ নেই। তাদের নৃশংসতার সঙ্গে তুলনা দেওয়ার মতো আর কিছুই নেই।' তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান গাজায় ইসরায়েলের অমানবিক হামলার সমালোচনা করতে গিয়ে এসব কথা বলেন। এর আগে ইসরায়েল তার নাগরিকদের তুরস্ক ভ্রমণে সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেয়। এরদোগান তার জবাবে ক্ষুব্ধ হয়ে এসব মন্তব্য করলেও তিনি তুরস্কের অধিবাসীদের তাদের দেশে যে সব ইহুদি ধর্মাবলম্বী রয়েছে তাদের প্রতি যেন কোনো রকম আক্রমণ না করা হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। খবর এএফপি, রয়টার্স, এপি।

বিহারি ক্যাম্পে হত্যাযজ্ঞ : আতঙ্কে একমাসেও মামলা করেনি কেউ

রাজধানীর কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে আগুন ও গুলিতে ১০ জন নিহতের ঘটনায় একমাসের বেশি সময় পার হলেও ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ মামলা করেনি।
পল্লবী থানায় যে ছয়টি মামলা হয়েছে, তাতে আসামি করা হয়েছে আক্রান্ত ৩ হাজারের অধিক উর্দু ভাষা-ভাষীদের।

এর মধ্যে দুটি পুলিশ বাদী হয়ে এবং অপর চারটি বিভিন্ন ব্যক্তি বাদী হয়ে করেছেন। সবগুলোতেই আসামি করা হয়েছে হামলার শিকার ক্যাম্পের বাসিন্দাদের।
উল্লেখ্য, গত ১৪ জুন কালশীর বিহারি ক্যাম্পে বাইরে থেকে ঘরের দরজায় তালা দিয়ে আগুন দিলে একই পরিবারের আটজনসহ ৯ জন দগ্ধ হয়ে এবং পরে গুলিতে একজন (কারচুপি শ্রমিক আজাদ) নিহত হয়।
নির্মম এ হত্যাকাণ্ডে এখনো কেউ গ্রেফতার হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা-১৬ আসনের এমপি ইলিয়াস মোল্লার মদতে এই হামলার ঘটনা ঘটে। এ কারণে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে ভয় পাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এমনকি সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের আসামি করে যাতে কোনো মামলা না হয় সেজন্য বিহারিদেরই একটি অংশ তাদের হয়ে তত্পরতা চালাচ্ছে।
তবে শিগগিরই বিহারিরা এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে একটি সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানা গেছে। সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের কাছে নিরাপত্তা দাবি করবেন উর্দু স্পিকিং পিপলস ইউথ রিহ্যাবিলিটেশনের নেতৃবৃন্দ।
এ ঘটনায় জড়িতদের আজ পর্যন্ত গ্রেফতার না করার বিষয়টিও এতে তুলে ধরা হবে। তবে ওই সংবাদ সম্মেলনের আগেই কুর্মিটোলা ক্যাম্পে হামলাকারীদের আসামি করে মামলা দায়ের করা হতে পারে।
সূত্র মতে, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের শাস্তি চাইলেও আতঙ্কে মামলার বাদী হতে চাইছেন না নিহতদের স্বজনেরা। হামলাকারীদের দেয়া আগুনে পুড়ে নিহত ৯ জনের পরিবারের সদস্য ইয়াসিন আলী জানান, হামলাকারীরা প্রভাবশালী। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করলে আমার বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।
অগ্নিদগ্ধ হয়ে বেঁচে যাওয়া ইয়াসিনের মেয়ে ফারজানাকে নিয়েই এখন তিনি ব্যস্ত আছেন বলে জানান। একইভাবে মামলা করতে সাহস পাচ্ছেন না হামলায় নিহত আজাদের স্বজনরা।
সূত্র মতে, কূর্মিটোলা ক্যাম্পের বিহারিদের যে কেউ বাদী হয়ে মামলা করা হবে। বিষয়টি এমপি ইলিয়াস মোল্লা ও তার লোকজন ইতোমধ্যে টের পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে মোল্লার লোকজন ও মোল্লার পক্ষে অবস্থানকারী বিহারি নেতারা তত্পরতা চালাচ্ছেন। তারা চাইছেন মামলায় কোনোভাবেই যেন এমপি ইলিয়াস মোল্লা এবং যুবলীগের পল্লবী থানার সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানাসহ নেতৃবৃন্দ কাউকে আসামি করা না হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত কি হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে খোদ বিহারিদের মধ্যেই। তবে মামলা দায়েরের বিষয়টি জানা নেই বলে জানান উর্দু স্পিকিং পিপলস ইউথ রিহ্যাবিলিটেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহীদ আলী বাবলু।
তিনি বলেন, কে বাদী হয়ে মামলা করবে তা জানি না। তবে শিগগিরই এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান প্রকাশ করে ও সরকারের সহযোগিতা চেয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হবে।
ঘটনার পর এমপি ইলিয়াস মোল্লা ও যুবলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা ও হত্যার অভিযোগ তুলেন বিহারিরা। কিন্তু পরবর্তীতে বিহারিদের সংগঠন এসপিজিআরসির নেতারা ইলিয়াস মোল্লার পক্ষে সমঝোতার চেষ্টা চালান।
নানাভাবে হুমকি দেয়া হয় ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে অবস্থানকারী বিহারি নেতাদের। গত ১৪ জুন সকালে রাজধানীর মিরপুরের কুর্মিটোলা ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা।
ক্যাম্পবাসী অভিযোগ করেন, পার্শ্ববর্তী বাউনিয়াবাদ এলাকার যুবলীগ নেতাকর্মীরা এ হামলা চালায়। তাদের দেয়া আগুনে পুড়ে মারা যায় ইয়াসিনের পরিবারের শিশু-নারীসহ ৯ জন। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আজাদ।
ঘটনার আগে ১০ জুন রাতে নতুন ক্যাম্পের ট্রান্সফরমার থেকে রাজু বস্তির জন্য বিদ্যুত্ সংযোগ নিতে এসে লাঞ্ছিত হন এমপি ইলিয়াস মোল্লা। এ ঘটনার জের ধরেই কুর্মিটোলা ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে বলে দাবি বিহারিদের।

ইসরাইলি নৃশংসতায় লাশের শহর গাজা

গাজায় রক্তস্রোত থামছে না। ইসরাইলি নৃশংসতায় ক্রমেই বাড়ছে নিহতের সংখ্যা। নিরপরাধ নারী-শিশুর লাশের পাহাড় উঠছে। সঙ্গে সঙ্গে বেদখল হয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর। স্থল আক্রমণের পাশাপাশি থেমে থেমেই চলছে ইসরাইলের বিমান হামলা।

গত ৮ জুলাই শুরু হওয়া ইসরাইলের ‘অপারেশন প্রটেকটিভ এজ’ এ এখন পর্যন্ত নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা সাড়ে তিনশ’ ছাড়িয়ে গেছে। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। আহতদের আর্তচিৎকারে ভারি গাজার আকাশ। মুমূর্ষুদের গুদাম হয়ে উঠেছে গাজার আল শিফা হাসপাতাল।
এদিকে, গাজার নিচে আরেক গাজা! স্থলপথ অভিযানে হামাস জঙ্গিদের একের পর এক সুড়ঙ্গের সন্ধান পাওয়ার পর এমনটাই অভিমত ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সের (আইডিএফ)। ইসরাইলের দাবি, এই সুড়ঙ্গগুলোই যত নষ্টের গোড়া। এগুলোকে কাজে লাগিয়েই রকেট ছোড়ে হামাস। ইসরাইলে অনুপ্রবেশের চেষ্টায় তো বটেই, ইসরাইলিদের অপহরণ এবং হত্যা করতে সুড়ঙ্গগুলো ব্যবহার করা হয়। বিমান হানায় গোলকধাঁধার মতো এই ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা সম্ভবপর নয় বলেই স্থলপথে আক্রমণে নেমেছে ইসরাইল। তবে জঙ্গিদের নিকেশ করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ৭০ জন শিশুসহ ৩৩৩ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন জাতিসংঘও।
ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু শনিবার জানিয়েছিলেন, গাজায় জঙ্গিঘাঁটি এবং সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত তারা স্থলপথে অভিযান চালাবেন। সেই মতো রোববার গাজার পূর্বপ্রান্তের আড়াই কিলোমিটার প্রশস্ত একটি এলাকায় ইসরাইলি সেনা সুড়ঙ্গ সন্ধানে নামে। আইডিএফে’র মুখপাত্র পিটার লার্নার বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১৩টি সুড়ঙ্গের সন্ধান মিলেছে। কয়েকটির অবস্থান মাটির ৯০ ফুট গভীরে। সুড়ঙ্গগুলো একটি অন্যটির সঙ্গে যুক্ত। যেন গাজা ভূখণ্ডের নিচে আরও এক গাজা লুকিয়ে রয়েছে।’
রোববার কয়েকজন জঙ্গি সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে ইসরাইলে ঢোকার চেষ্টা করলে আইডিএফ একজনকে গুলি করে মারে। বাকিরা পালায়। সংঘর্ষে চারজন ইসরাইলি সেনাও আহত হয়েছেন। দিনকয়েক আগে একই কায়দায় ঢুকতে গিয়ে ১৩ জন জঙ্গি ইসরাইলি সেনার হাতে ধরা পড়েছিল।
আরব লীগ-হামাস নেতার বৈঠক
ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে আরব লীগের প্রধান ও কুয়েতের শাসক শেখ সাবাহ আল-আহমেদ আল-সাবাহ’র সঙ্গে বৈঠক করেছেন হামাসের প্রধান খালেদ মিশাল। কুয়েত সিটিতে রোববার অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে গাজায় অস্ত্রবিরতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। খবর এএফপি’র।
কুয়েতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কুনা বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি। তবে এক কূটনীতিকের সূত্রে এএফপি জানায়, গাজায় ইসরাইলি হামলার ১৩ দিনে এ পর্যন্ত ৪০০ জন নিহতের পর হামলা বন্ধে পদক্ষেপের ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
দিনের শুরুতে সাবাহ’র সঙ্গে আলোচনার জন্য কাতার থেকে কুয়েতে পৌঁছান মিশাল। বৈঠক শেষে তিনি আবারও কুয়েতে ফিরে আসেন। সেখানে তার ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
এর আগে মিসরের মধ্যস্ততায় ইসরাইলের সঙ্গে এক অস্ত্রবিরতি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে হামাস। তাদের দাবি ছিল, চুক্তিতে শুধু বিনা শর্তে অস্ত্রবিরতিই নয়, বরং তাদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও যৌক্তিক কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এদিকে আগামী সোমবার ফিলিস্তিন সংকটের বিষয়ে কুয়েতে দেশটির আমীর ও আরব লীগ প্রধান সাবাহ’র সঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বৈঠক করার কথা রয়েছে।

বিএনপির আন্দোলনের ডাক ও বাস্তবতা by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন এক যুদ্ধ, আর যুদ্ধ হচ্ছে রাজনীতির বিকৃত রূপ। আমরা সুস্থ রাজনীতির পক্ষে, আমরা গণতন্ত্রের পক্ষে। আমরা সংলাপের পক্ষে, আমরা চাই সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান। আমরা আন্দোলন চাই না, কেননা আন্দোলন ও জ্বালাও-পোড়াও সহ্য করার সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। এমনিতেই বাংলাদেশের অর্থনীতির রক্তক্ষরণ হচ্ছে, অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এটা একজন রাজনীতিকের চিন্তায় থাকতে হবে। যদি না থাকে তাহলে তিনি কিসের রাজনীতিক। একজন সৎ রাজনীতিকের কাছে রাষ্ট্র, সমাজকর্ম কিংবা সমাজ সংস্কারের সর্বোচ্চ অবলম্বন হচ্ছে রাজনীতি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, এ রাজনীতি এখন অনেকটা জনগণের কাঠগড়ায়। এর জন্য কিন্তু রাজনীতি দায়ী নয়, দায়ী নেতৃত্ব। মুষ্টিমেয় কিছু লোকের উচ্চাভিলাস ও অপ-আকাক্সক্ষার জন্য রাজনীতি বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে। রাজনীতি দিয়ে রাজনীতিকে বিতর্কিত করার হোতাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এরা রাজনীতির মূলধারাও নয়। রাজনীতিতে মেধা যোগ হলে পিছু হটে যাবে তারা। পিছু হটে যাবে পেশিশক্তি, দুর্বৃত্তায়ন ও কালো টাকার দাপট। রাজনীতিকরা পাবেন মিশনারির মর্যাদা।
দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল এখন ভেতরে ভেতরে দুর্বল। যার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকট গ্রাস করেছে বাংলাদেশকে। রাজনৈতিক দুর্বলতা থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং ৫ জানুয়ারির একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের পথে পা বাড়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে বিএনপি এ নির্বাচন বর্জন করে। এক্ষেত্রেও একটা রাজনৈতিক দুর্বলতা কাজ করেছে। বিএনপি শক্তিশালী হলে আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচন করার সাহস পেত না বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন ঈদের পর সরকারবিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। এর জন্য তার দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকারও নির্দেশ দিয়েছেন। অধিকার আদায়ের জন্য রাজনৈতিক দল আন্দোলন করবে- এতে দোষের কিছু নেই। আর বিএনপি দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক শক্তি। গণআন্দোলন গড়ে তোলার শক্তি-সামর্থ্যও বিএনপির আছে। কিন্তু বিএনপির কাছে মানুষ চায় দায়িত্বশীল আচরণ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আন্দোলন স্থগিত করে বিএনপি সেই আচরণ দেখিয়েছেও।
কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল আচরণ নিয়ে প্রশ্ন আছে সর্বমহলে। সরকারি দলের নেতারা বলছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপে তারা আর বসবেন না। এমনটি হলে দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটবে কী করে? আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা না কাটলে দেশইবা ঠিকভাবে চলবে কী করে? রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কুফল তো ভালোভাবেই পড়তে শুরু করেছে সর্বক্ষেত্রে। ব্যবসায়ীরা তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যতেই মন্দাভাব বিরাজ করছে। এর জন্য রাজনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তাই দায়ী বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন। এ অবস্থায় বিএনপিকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়া সরকারের কোনোভাবেই উচিত হবে না। আমরা সরকারের কাছে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি। বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসব না- এ ধরনের উক্তি মোটেও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। এমন উক্তিতে মানুষ ভরসা হারিয়ে ফেলে ও আতংকিত হয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করতে সংলাপের বিকল্প নেই- এটি সরকারকে অনুধাবন করতে হবে।
খালেদা জিয়া ১৩ জুন এক ইফতার মাহফিলে সরকারকে আবার সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগেও বেশ কয়েকবার তিনি এ আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি এও বলেছেন, সংলাপে না বসলে আন্দোলন ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প থাকবে না। আমরা জানি খালেদা জিয়া অত্যন্ত দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। দেশের রাজনীতিকে যে কোনো দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার সক্ষমতাও তার রয়েছে। সরকারের উচিত তার আহ্বানের গুরুত্ব দেয়া। তাকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। তাতে সরকারের লাভ, বিএনপির লাভ এবং দেশের লাভ।
সরকারকে অনুধাবন করতে হবে সুশাসন উপহার দিতে তারা শুধু ব্যর্থই নয়, অত্যন্ত চরমভাবেই ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের আমলে শেয়ার মার্কেট লুট হয়েছে, পথে বসেছে লাখো পরিবার। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক লুট হয়েছে। এমএলএম ব্যবসার নামে লাখ লাখ মানুষ নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হয়েছে। ৬ বার বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম, যা মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন গত ৬ বছরে সরকার করতে পারেনি, যা ব্যর্থতার একটি নজির। আর আইনশৃংখলার অবস্থা বলতে গেলে সামনে এসে যায় নারায়ণগঞ্জের লোমহর্ষক ও নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড, ফেনীর বর্বরতা, মীরপুরের নৃশংসতা এবং দেশব্যাপী অব্যাহত গুম-খুন-অপহরণসহ নানা ঘটনা।
এত কিছুর পরও কি বিএনপি সরকারকে বিন্দুমাত্র বেকায়দায় ফেলেছে? অংশগ্রহণবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেও কি আওয়ামী লীগ অত্যন্ত শান্তি ও স্বস্তির সঙ্গে দেশ পরিচালনা করছে না? বিএনপির সহযোগিতা ছাড়া সরকার কি এটি করতে পারত? কাজেই বিএনপির দুর্বলতার সুযোগ নেয়া সরকারের মোটেও উচিত হবে না। কারণ এতে শুধু রাষ্ট্রই ক্ষতির সম্মুখীন হবে না, ক্ষতিগ্রস্ত হবে আওয়ামী লীগও। সুতরাং সরকারের উচিত সংলাপের মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণে দেশে দ্রুত একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা। একটি মন্দ কাজ ১০টি ভালো কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে- ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য তেমনই একটি মন্দ কাজ। দ্রুত নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী হবে। চূড়ান্তভাবে জনগণ আবার আওয়ামী লীগকেই বেছে নিতে পারে।
জাতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যদি ন্যূনতম ঐকমত্যে আসতে না পারে, তাহলে রাজনীতির পরাজয় হবে। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া ব্যাহত হবে। কাজেই রাজনীতিকে ঐক্যের ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসতেই হবে। তাহলেই দেশ পৌঁছতে পারবে অভীষ্ট লক্ষ্যে।
রাজনৈতিক বিভাজন সব দেশেই আছে, আছে আদর্শগত বিরোধও। কিন্তু দেশের স্বার্থের প্রশ্নে সবাই এক। কারণ দেশ বাঁচলে তবেই রাজনীতি, দেশই যদি না থাকে তাহলে রাজনীতি কার জন্য? দেশের রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে, বৈদেশিক মুদ্রা না এলে দেশ চলবে কী করে? বাংলাদেশ রফতানি আয় ও রেমিটেন্সের ওপর নির্ভশীল একটি দেশ। এটি নির্ভর করে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তির ওপর। প্রকৃত গণতন্ত্রকে দূরে সরিয়ে রেখে দেশের ভাবমূর্তি ধরে রাখা অসম্ভব।
রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে দেশে নেমে আসবে বিপর্যয়। তখন বাইরের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। এমনটি হোক আমরা তা চাই না। দেশকে রক্ষা করতে হবে বিপর্যয় থেকে। আর এ দায়িত্ব নিতে হবে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে। গড়ে তুলতে হবে জাতীয় ঐক্য। সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ অপরিহার্য। সেই সংলাপ শুরু করতে হবে এখনই। এজন্য নিয়ামকের ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকেই। বিএনপি সংলাপের জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু প্রতিপক্ষ কোনো সাড়া দিচ্ছে না। তারা বলছে ঠিক উল্টো কথা। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাহলে কি সরকার সংলাপ চায় না? সরকার দেশে অস্থিরতা চায়? চায় উগ্র রাজনীতির প্রসার? সরকারকে বুঝতে হবে, দেশের জনগণসহ বিদেশীরাও সংলাপ চায়। সরকার এটি উপেক্ষা করতে পারে না। সংলাপ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। আমরা চাই, বিবদমান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে অতি দ্রুত সংলাপ শুরু হোক। দেশে আসুক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কেটে যাক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
belayet-1@yahoo.com

আকাশপথে এই মর্মান্তিক ট্রাজেডির জন্য দায়ী কে? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আরব ভূখণ্ড গাজায় ইসরাইলের ফ্যাসিস্ট নেতা নেতানিয়াহু যে বর্বর গণহত্যা চালাচ্ছে তাকে চাপা দেয়া এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে গণহত্যার পাল্টা প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্য পশ্চিমা মিডিয়া ইউক্রেনের আকাশসীমায় একটি মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমান (এমএইচ-১৭) মিসাইল হামলায় ধ্বংস হওয়ার মর্মান্তিক ট্রাজেডিকে ব্যবহার করার চমৎকার মওকা পেয়েছে অথবা মওকাটি নিজেরাই সৃষ্টি করেছে। কয়েক দিন ধরে পশ্চিমা মিডিয়ায় ইসরাইলি বর্বরতায় গাজার মতো জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার খবর ও মৃত অসংখ্য নারী-শিশুর রক্তাক্ত দেহের ছবি আর তেমন নেই। এখন প্রথম পাতা থেকে ভেতরের পাতা পর্যন্ত শুধু বিমানটি ধ্বংস হওয়ার খবর ও মৃতযাত্রীদের ছবি। একটি নিরপেক্ষ তদন্তে এ মিসাইল হামলার জন্য রাশিয়া যে দায়ী তা প্রমাণিত হওয়ার আগেই জোরেশোরে প্রচারবাদ্য বাজানো হচ্ছে- রাশিয়া এই ম্যাসাকারের জন্য দায়ী। সানডে টাইমস (২০ জুলাই) প্রথম পাতাজুড়ে খবরের হেডিং দিয়েছে রাশিয়া ইন দ্য ডক (রাশিয়া আসামির কাঠগড়ায়)।
অধিকাংশ পশ্চিমা মিডিয়ায় এখন রাশিয়া ও পুতিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহি ভাব। সানডে টাইমসের প্রধান সম্পাদকীয়র হেডিং হচ্ছে মেক পুতিন দ্য ব্যারিয়াহ্ পে ফর দিস আউটরেজ (পুতিনকে একঘরে করে এই ধ্বংসকাণ্ডের খেসারত দিতে বাধ্য করা হোক)। এই মিসাইল হামলার পেছনে যে রাশিয়ার প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে এ খবরের একমাত্র সূত্র হল মার্কিন মদদপুষ্ট ইউক্রেন সরকারের ভাষণ। তাদের দাবি, গত বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) বিমান দুর্ঘটনার দিন সকালে মিসাইল লঞ্চারটি রাশিয়া থেকে পূর্ব ইউক্রেনে চোরাচালান হয়। কাজটি করে ইউক্রেনের রাশিয়া সমর্থক বিদ্রোহীরা।
এখন পশ্চিমা মিডিয়া দুয়ে দুয়ে চার করে প্রচার চালাচ্ছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনই নিজ হাতে মিসাইলটি রাশিয়াপন্থী বিদ্রোহী ইউক্রেনিয়ানদের হাতে তুলে দিয়েছেন। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের হাতে বিশ্ব ধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে বলে যে পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছিল, তা যেমন পরে প্রমাণিত হয়েছে সর্বৈব মিথ্যা; তেমনি মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস করার পেছনে পুতিন বা রাশিয়া সরাসরি জড়িত রয়েছে, এই প্রচারটিও অদূর ভবিষ্যতে মিথ্যা প্রমাণিত হলে পশ্চিমা নেতারা বা মিডিয়া লজ্জা পাবে মনে হয় না।
মাত্র কিছুদিন আগে একটি মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমান রহস্যজনকভাবে অসংখ্য যাত্রী নিয়ে নিখোঁজ হয়েছে। তখনও রাশিয়াকে জড়িয়ে পশ্চিমা মিডিয়ায় অনেক কনস্পিরেসি থিয়োরি শোনা গেছে। তা সঠিক প্রমাণিত হয়নি। এর কিছুদিন পরই আরেকটি মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমানের মিসাইল আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস হওয়া এ যুগের একটি মর্মান্তিক ট্রাজেডি। এই যে আকাশপথে মানবতা বারবার বিপন্ন হচ্ছে তার প্রতিকারের কোনো কার্যকর পন্থা ও ব্যবস্থার কথা না ভেবে আমেরিকা ও অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ তার রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণের জন্য ডে ওয়ান থেকেই তৎপর হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের প্রতিপক্ষকে অসাধু উপায়ে হটানোর জন্য একটি যাত্রীবাহী বিমানের অসংখ্য যাত্রীর (যাদের মধ্যে অনেক শিশুও রয়েছে) মর্মান্তিক মৃত্যুকে তাদের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার মূলধন করেছে। মানবতার প্রতি এর চেয়ে বড় অবমাননা কী হতে পারে?
এই যাত্রীবাহী বিমানটি যদি ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীরা ভুল করেও ধ্বংস করে থাকে, তাহলেও নিরপেক্ষ তদন্তে তা প্রমাণিত হলে তাদের বিচার ও দণ্ডদানের জন্য ওবামা ও ক্যামেরন সাহেব পুতিনের সহযোগিতাও চাইতে পারেন। ভবিষ্যতে আকাশপথে যাতে এভাবে গণহত্যা না চলে তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করার জন্য রাশিয়া, চীন, ইরান, ভারতসহ সব দেশের সহযোগিতায় প্রেসিডেন্ট ওবামা একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন এবং তা বলবৎ করার ব্যবস্থাও করতে পারেন। তা না করে রাশিয়াকে একতরফাভাবে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে আবার বিশ্বব্যাপী শীতল যুদ্ধ শুরু করা কি যাত্রীবাহী মালয়েশিয়ান বিমানের হতভাগ্য যাত্রীদের জীবন ফিরিয়ে আনবে, না ভবিষ্যতে এ ধরনের আকাশ-মৃত্যুর ট্রাজেডি বন্ধ করবে? পুতিন ও রাশিয়াকে তখনই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে, যখন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হবে।
রাশিয়ান বাক মিসাইল-লঞ্চার দ্বারা যাত্রীবাহী বিমানটি ধ্বংস হয়ে থাকলে তার দ্বারা কি প্রমাণিত হয় লঞ্চারটি রুশপন্থী বিদ্রোহীদের হাতে রাশিয়াই তুলে দিয়েছে? তাহলে ইসরাইল গাজায় মধ্যপ্রাচ্যের আরব ভূখণ্ডে যে ভয়াবহ গণহত্যা চালাচ্ছে, তা কি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আমেরিকার সরাসরি যুদ্ধ বলে গণ্য হওয়া উচিত নয়? খবরেই বলা হয়েছে, পূর্ব ইউক্রেনে রুশ মিসাইল চোরাচালান হয়েছে। ইসরাইলে তো মার্কিন মারণাস্ত্র চোরাচালান হচ্ছে না। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যুদ্ধ করা এবং তাদের হত্যা করার জন্য আমেরিকাই সরকারিভাবে অঢেল অর্থ ও অস্ত্রভাণ্ডার ইসরাইলের হাতে তুলে দিচ্ছে। এই গণহত্যায় সহযোগিতা দান এবং মানবতাবিরোধী ভূমিকার জন্য ওবামা-ক্যামেরন সাহেবদেরই কি আগে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো উচিত নয়?
সানডে টাইমসসহ অধিকাংশ পশ্চিমা মিডিয়ার খবরে স্বীকার করা হয়েছে- যাত্রীবাহী বিমানটি ইউক্রেনের যুদ্ধলিপ্ত এলাকার ৩৩ হাজার ফুট ঊর্ধ্বাকাশ পথে উড়ছিল। রুশপন্থী বিদ্রোহীদের রাডারে বিমানটি ধরা পড়ে এবং বিদ্রোহীরা ভেবেছিল, ইউক্রেন সরকারের সামরিক সরঞ্জামবাহী এটি একটি কার্গোপ্লেন বা মালবাহী বিমান। এই ভ্রম থেকে তারা যাত্রীবাহী বিমানটির ওপর মিসাইল হামলার নির্দেশ দেয়। পশ্চিমা মিডিয়ার এ খবর যদি সত্য হয়, তাহলে প্রথমেই প্রশ্ন, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত বিপজ্জনক এলাকার আকাশসীমা মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমানটি কেন পরিহার করেনি? এর পেছনেও কোনো পশ্চিমা চক্রান্ত কাজ করেছে কিনা? দ্বিতীয়ত, এই মিসাইল হামলার অভিযোগ পুতিন অত্যন্ত ক্রোধের সঙ্গে অস্বীকার করেছেন। আবার রুশ মিসাইলটি পূর্ব ইউক্রেনে চোরাচালান হয়েছে বলে পশ্চিমা মিডিয়াতেই বলা হয়েছে। চোরাচালান এবং সরকারিভাবে বিদ্রোহীদের অস্ত্র সাহায্যদান কি এক কথা? আর রাশিয়া যদি নিজের নিরাপত্তা ও
স্বার্থরক্ষার জন্য ইউক্রেনে রুশপন্থীদের অস্ত্র সাহায্য দেয় তাহলে দোষের কী আছে? আমেরিকা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের অস্ত্র সাহায্য জোগাচ্ছে না? ইউক্রেনের তাঁবেদার সরকারকে সামরিক সাহায্য ও সমর্থন জোগাচ্ছে না?
পশ্চিমা প্রোপাগান্ডায় বারবার বলা হচ্ছে, পূর্ব ইউক্রেনের যুদ্ধ হচ্ছে 'Russian-sponsored war' (রাশিয়া-প্ররোচিত যুদ্ধ)। অথচ এ কথা সবারই জানা ইউক্রেন (ক্রিমিয়াসহ) ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ইউক্রেন স্বাধীন দেশ হয় এবং তখন থেকেই আমেরিকা সেখানে রাশিয়ার নিরাপত্তা-বিরোধী সামরিক তৎপরতা শুরু করে। কিছুকাল আগে ক্রিমিয়ায় গণভোট হয় এবং ক্রিমিয়া ইউক্রেন থেকে বেরিয়ে এসে রাশিয়ান ফেডারেশনে যোগ দেয়। এটাকে পশ্চিমা মিডিয়া রাশিয়ার ক্রিমিয়া-গ্রাস বলে আখ্যা দেয়। ইউক্রেনে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তারা রুশপন্থী সরকারের পতন ঘটায়। ফলে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশপন্থীরা বিদ্রোহী হয়। ইউক্রেনে শুরু হয় তাঁবেদার সরকারের কাঁধে চেপে আমেরিকার প্রক্সিওয়ার। আর সেই যুদ্ধের দায় এখন রাশিয়ার কাঁধে চাপানো হচ্ছে।
পশ্চিমা মিডিয়াতেই মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমানটি ধ্বংস হওয়া সম্পর্কে সন্দেহের তীরটি কেউ কেউ আমেরিকার দিকে নিক্ষেপ করেছেন। অতীতের ইতিহাস বলে রাশিয়াকে জব্দ করার জন্য আগেও যাত্রীবাহী বিমান মিসাইল-হামলার মুখে ঠেলে দিতে আমেরিকার যুদ্ধবাজ প্রশাসনের বিবেকে বাধেনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ জমানায় সাইবেরিয়ার একটি রুশ এলাকা ছিল দেশটির নিরাপত্তামূলক প্রোটেক্টেড এলাকা। তার আকাশপথে বহিঃদেশীয় বিমান চলাচল নিষিদ্ধ ছিল। এখানে সোভিয়েতের গোপন সামরিক ঘাঁটি আছে সন্দেহ করে আমেরিকা সেখানে প্রথমে গোয়েন্দা-প্লেন পাঠায়। অতঃপর সোভিয়েত নেতাদের মনোবল ও ক্ষমতা পরীক্ষার জন্য ওই আকাশসীমার কাছ দিয়ে যাত্রীবাহী বিমান পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এই বিমানে যাত্রী হিসেবে একজন মার্কিন সিনেটরও ছিলেন। তাকেও জানতে দেয়া হয়নি, এই বিপজ্জনক বিমান যাত্রায় তিনি যাচ্ছেন।
এই যাত্রীবাহী বিমানটিতে রাশিয়া মিসাইল হামলা চালায় এবং ওই মার্কিন সিনেটরসহ সব যাত্রী মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন। আমেরিকার মনস্কামনা সিদ্ধ হয়। তারা প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে নামেন এই বলে যে, সোভিয়েত নেতারা ইচ্ছাকৃতভাবে একটি যাত্রীবাহী বিমানে মিসাইল হামলা চালিয়ে মানবতা-বিরোধী অপরাধ করেছেন। পরে জানাজানি হয়ে যায়, ওই যাত্রীবাহী বিমানটি মার্কিন সিআইএর চক্রান্তে ওই বিপজ্জনক আকাশসীমায় পাঠানো হয়েছিল এবং তৎকালীন শীতল যুদ্ধের স্বার্থে অসংখ্য যাত্রী (নিজেদের সিনেটরসহ) হত্যায় মার্কিন প্রশাসন দ্বিধা করেনি।
ইরাক-ইরান আট বছরব্যাপী যুদ্ধের সময়েও আমেরিকা ইরানকে ধ্বংস করার জন্য (এই চক্রান্ত এখনও চলছে) ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে বিষাক্ত গ্যাসসহ নানা ধরনের মারণাস্ত্র সরবরাহ করে। তাতেও সন্তুষ্ট না থেকে ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমানে মিসাইল হামলা চালিয়ে তিনশর মতো নির্দোষ যাত্রীকে (নারী ও শিশুসহ) হত্যা করে। পরে বলা হয় ভুল করে নাকি এই মিসাইলটি ছোড়া হয়েছিল। সেদিন এই গণহত্যা নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ায় কোনো হা-মাতম শুরু হয়নি।
মালয়েশিয়ার এই যাত্রীবাহী বিমানটি আকাশপথে ধ্বংস হওয়াকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পুতিনকে একঘরে করার চেষ্টা হবে। অর্থনৈতিক বয়কট আরও কঠোর করা হবে। চাই কি সাময়িক ব্যবস্থা গ্রহণের পাঁয়তারা চলবে। রাশিয়াকে জব্দ করা গেলে সিরিয়া ও ইরানের পাশ থেকে এক শক্তিশালী মিত্রকে অপসারণ করা সম্ভব হবে। ইসরাইলকে অবাধ হত্যাকাণ্ড চালানো এবং আরব ভূমি দখলের সুযোগ দেয়া যাবে। আমেরিকার পতন্মুখ অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সামরিক আধিপত্য রক্ষার ব্যবস্থা হবে।
কিন্তু এই চক্রান্ত সফল হবে কি? মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমানটি ধ্বংস হওয়ার পেছনে কাদের নেপথ্য চক্রান্ত দায়ী, সাইবেরিয়ায় যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস হওয়ার রহস্য ফাঁস হওয়ার মতো সে রহস্যও শিগগিরই ফাঁস হয়ে যেতে পারে। বিশ্বময় এই ধ্বংসযজ্ঞ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরই মৃত্যুযন্ত্রণার লাথি। এই লাথি ব্যুমেরাং হয়ে আমেরিকার কাছেই ফিরে আসতে পারে।
লন্ডন, ২০ জুলাই, রোববার ২০১৪

অনুতপ্ত সাকিবের শাস্তি পুনর্বিবেচনার আপিল

অনুমিতই ছিল অনুতপ্ত সাকিব আল হাসান শাস্তি মওকুফের জন্য আবেদন করবেন। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের সঙ্গে আগেই সাক্ষাৎ করে আবেদন করার অনুমতি নিয়েছিলেন তিনি। রোববার বিসিবি সভাপতি বরাবর ইংরেজিতে লেখা আবেদন করেন এই অলরাউন্ডার। বল এখন বিসিবির কোর্টে। তারা সিদ্ধান্ত নেবে তার শাস্তির মেয়াদ কমানো হবে কিনা। ছয় মাসের জন্য সব ধরনের ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হয়েছেন সাকিব।

শাস্তি পুনর্বিবেচনা আবেদনে সাকিব লিখেছেন, ‘আমার আচারণের জন্য আমি অনুতপ্ত। ভবিষ্যতে বোর্ডের নিয়মকানন সঠিকভাবে মেনে চলব। আমার শাস্তি পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ করছি।’ বিসিবি ৭ জুলাই শাস্তি দেয়ার পর ফেসবুকে ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু এতদিন সাংবাদিকদের সামনে মুখ খোলেননি তিনি। কাল দুপুরে বিসিবিতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করার মাধ্যমে নিজের আচরণগত সমস্যার কথা স্বীকার করেন তিনি। সাকিব বলেন, ‘আমি স্বীকার করছি যে, একজন পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে এবং বোর্ডের চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ শৃংখলা ও সংযত আচরণ প্রদর্শন করতে পারিনি। ভবিষ্যতে আমি আরও পরিণত আচরণ করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’ এদিন ফেসবুকেও সাকিব অনেকদিন পর মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেছেন, ‘অনেকদিন পর আজ (রোববার) মিরপুরে গেলাম। খুব মিস করেছি এই কয়েকদিন। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি দ্রুত আবার ক্রিকেটে ফিরতে চাই।’
এদিন দুপুরে বিসিবি কার্যালয়ে এসেই ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান আকরাম খান এবং শ্রীলংকান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের সঙ্গে কথা বলেন সাকিব। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিসিবি মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমাম, ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির ম্যানেজার সাব্বির রহমান ও ট্রেনার মারিও ভিল্লাভারায়ন। তবে আপিল করলেও বোর্ডের সিদ্ধান্তর জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে সাকিবকে। শাস্তি কমানোর প্রক্রিয়া কি হবে এমন প্রশ্নের জবাবে বিসিবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আপনারা জানেন, এটা বোর্ডের সিদ্ধান্ত। অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাব। বোর্ড এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।’ প্রক্রিয়া শেষ হতে কত সময় লাগবে এটা জানতে চাইলে নিজামউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সময় কত লাগবে তা এখনোই বলা যাচ্ছে না। আমার তরফ থেকে আমি পাঠিয়ে দেব। তারপর বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে।’
শাস্তি ঘোষণার পর সাকিব একবার আকরাম খানের সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসার কথা জানিয়েছেন। কয়েকদিন বাইরে থেকে ক্রিকেটে ফিরে আসার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন এই অলরাউন্ডার। অনুশীলনে ফিরতে চান তিনি। সঙ্গে সব ধরনের ক্রিকেটেও খেলতে মুখিয়ে আছেন। কিন্তু এখন সাকিব অনুশীলনের সুযোগ পাবেন কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সাকিবের অনুশীলন নিয়ে আকরাম খান বলেন, ‘সাকিব চায় সে অনুশীলন করুক এবং ক্রিকেটে ফিরুক। কিন্তু বোর্ড কোচের সঙ্গে আলোচনা করে পারিকল্পনা তৈরি করবে। এরপর সিদ্ধান্ত হবে সে কিভাবে অনুশীলন করবে।’ তিনি বলেন, ‘বিসিবির পরবর্তী সভায় সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হবে তার শাস্তি মওকুফ হবে কিনা।’
আচারণগত সমস্যার কথা তুলে ধরে সাত জুলাই সাকিবকে ছয় মাসের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে বহিষ্কার করে বিসিবি। একই সঙ্গে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাকে বিদেশে কোনো লীগ খেলার জন্য অনাপত্তিপত্র দেয়া হবে না বলেও জানায় বিসিবি। বিভিন্ন সময়ে সাকিবের অসদাচরণের কথা মাথায় রেখে বোর্ডের সর্বসম্মিতিক্রমে শাস্তি ঘোষণা করেন বিসিবি সভাপতি। সাকিবের সর্বশেষ অপরাধ, তিনি কোচের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিলেন। এছাড়া টেস্ট থেকে অবসর নেয়ারও ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে শাস্তি ঘোষণার দিন বিসিবি সভাপতি এটাও জানিয়ে দেন, আপিল করার সুযোগ থাকছে সাকিবের। তবে শাস্তি চলাকালীন সাকিব অনুশীলন চালিয়ে যেতে পারবেন।
গত সপ্তাহে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের কাছে শাস্তি কমানোর অনুরোধ জানান সাকিব। নাজমুল হাসান সাকিবকে শাস্তি কমানোর ইঙ্গিত দিয়ে বোর্ডের কাছে আবেদন করতে বলেন। বোর্ড সভাপতির ইঙ্গিত পেয়েই সাকিব আপিল করেছেন। বিসিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, সাকিবের শাস্তি কমবে।


গাজায় লাশের স্তূপ, ঘর-বাড়ি ছাড়ছেন হাজার হাজার বাসিন্দা

বিশ্বব্যাপী তীব্র নিন্দা আর কূটনৈতিক তৎপরতার পরও গাজায় হামলা বন্ধের কোনো লক্ষণ নেই, বরং হামলা আরও বিস্তৃত করেছে ইসরাইল। রোববার গাজায় নতুন করে সেনা পাঠিয়েছে দেশটি। এদিন গাজার পূর্বাঞ্চলীয় শহর শেজাইয়াতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরাইলি সেনারা। এতে শিশুসহ ৪০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় শতাধিক লোক। এ নিয়ে গত ১৩ দিনে ৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত ও ২৫ হাজার আহত হন। একের পর এক গোলা ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে শেজাইয়ার বহুতল ভবনগুলো মিশে যায় মাটির সঙ্গে। মনোরম শহর মুহূর্তেই পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। চারদিকে শুরু হয় আহাজারি আর আর্তনাদ। জীবন বাঁচাতে এলাকা ছাড়েন হাজার হাজার বাসিন্দা। আল-জাজিরা, বিবিসি ও এএফপিসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম এসব তথ্য দিয়েছে।
শনিবার গভীর রাত থেকে গাজার পূর্বাঞ্চলীয় শেজাইয়া শহরে কামান ও ট্যাংকের গোলাবর্ষণ শুরু করে ইসরাইলি সেনারা। হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা খলিল আল হাইয়ার বাড়ি লক্ষ্য করে ইসরাইলি বিমান হামলায় হাইয়ার ছেলে, ছেলের স্ত্রী ও তাদের দুই শিশুসন্তান নিহত হয়েছেন। এছাড়া একজন ফিলিস্তিনি ফটোসাংবাদিক ও একজন স্বাস্থ্যকর্মীও ওই হামলায় নিহত হন। হামলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় রেডিও স্টেশন থেকে লোকজনকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে অনুরোধ করা হয়। স্থানীয় অধিবাসী আহমেদ রাবিয়া বলেন, শহরের কাছে ইসরাইলের ট্যাংক পৌঁছানোর পর মধ্যরাত থেকে প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু হয়। ওই অঞ্চলে অ্যাম্বুলেন্স এবং চিকিৎসক দলের যাতায়াত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। রাস্তায় অনেক হতাহত পড়ে আছেন কিন্তু তাদের সাহায্য করা বা উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। শতাধিক আহত ফিলিস্তিনিকে গাজার কেন্দ্রীয় হাসপাতাল আশ-শেফায় ভর্তি করা হয়েছে বলে জানায় দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবরে দেখা গেছে, শেজাইয়া শহরের বড় বড় ভবনগুলো ভেঙে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। লোকজন আতংকিত হয়ে ছোটাছুটি করছেন। কোথাও পড়ে আছে মৃতদেহ, কোথাও চলছে স্বজনদের আহাজারি। কোথাও দেখা গেছে উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতা। গাজার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, লড়াই শুরু হওয়ার পর এদিনই সবচেয়ে বেশি গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। ভোর রাতে ইসরাইলি নৌবাহিনীর জাহাজগুলো থেকে নিক্ষিপ্ত গোলার বিস্ফোরণে ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটি ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠে। শেজাইয়ার পার্শ্ববর্তী শহর রাফায়ও হামলা হয়েছে। এখানে গোলাবর্ষণে চার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
অসহায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটেন। গাজার আল-জাজিরার প্রতিনিধি স্টেফনি ডেকার জানান, ‘আমরা যখন ব্যুরোতে ফিরছিলাম তখন দেখেছি শত শত ফিলিস্তিনি তাদের সন্তানদের কোলে নিয়ে হেঁটে এলাকা ছাড়ছেন।’ তাদের কেউ আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ জাতিসংঘের স্কুলগুলোতে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন। দুই সপ্তাহ আগে ইসরাইলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই এসব স্কুলকে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তবে জাতিসংঘের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তারা। জাতিসংঘের শরণার্থী শিবিরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই অঞ্চলে ওষুধ, পানি, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
সাময়িক অস্ত্র বিরতি : রোববার দুপুরে রেডক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটির আহ্বানে গাজার শেজাইয়ায় দুই ঘণ্টার জন্য অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয় ইসরাইল। দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, মানবিক সহায়তা কর্মকাণ্ড পরিচালনায় স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অস্ত্রবিরতি করা হয়েছে। এ সময় ওই অঞ্চলে কোনো বিমান বা স্থল হামলা চালানো হবে না বলে জানায় তারা। হামাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারাও এই সাময়িক অস্ত্রবিরতি মেনে চলবে।
হামাসের প্রতিরোধ : হামাস বলেছে, গাজায় স্থল অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত তারা রকেটচালিত গ্রেনেড দিয়ে ইসরাইলের ছয়টি ট্যাংকে হামলা চালিয়েছে। রোববার তারা একটি ট্যাংক ধ্বংস করেছে। হামাসের সামরিক শাখা ইজাদ্দিন আল-কাসসাম বিগ্রেড বলেছে, তাদের যোদ্ধারা শেজাইয়া ও তার আশপাশের এলাকা থেকে ইসরাইলের সঙ্গে গুলি বিনিময় চালিয়ে যাচ্ছেন। ইসরাইল দাবি করেছে, চলমান ‘যুদ্ধে’ ইসরাইলের ৫ সেনা ও ২ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া হামাস এ পর্যন্ত ইসরাইলের অভ্যন্তরে ১ হাজার ৭০০ রকেট ছুড়েছে। এসব রকেট তেল আবিব, হাইফা, আশকেলোন, এশকোল ও আশদোদসহ বিভিন্ন শহরে আঘাত হেনেছে এবং এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা : চলমান ইসরাইলি হামলা বন্ধের জন্য মিসর, কাতার, ফ্রান্স এবং জাতিসংঘ কূটনৈতিক তৎপরতা চালালেও তারা এতে সফল হয়নি। ইসরাইল হামলা বন্ধ তো দূরের কথা, বরং তা আরও জোরদার করেছে। কাতারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, রোববার ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের মধ্যে কাতারে একটি বৈঠক হয়েছে। এছাড়া আরব লীগের প্রধান ও কুয়েতের শাসক শেখ সাবাহ আল-আহমেদ আল-সাবাহর সঙ্গে বৈঠক করেছেন হামাসের প্রধান খালেদ মিশাল। কুয়েত সিটিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে গাজায় অস্ত্রবিরতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টায় বান এখন মধ্যপ্রাচ্যে আছেন। এ লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহে তিনি কুয়েত, মিসর, ইসরাইল, ফিলিস্তিন এবং জর্দান সফর করবেন বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

এরশাদের ভারত যাওয়া বন্ধ, নেপথ্যে!

সব প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ভারত যাওয়ার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাতিল করলেন সফর। দলের ভেতরে ও বাইরে নানা জল্পনা। দলের নানা সূত্র বলছে, দিল্লির সিগন্যাল না পাওয়ায় এরশাদের সফর বাতিল করতে হয়েছে। এ নিয়ে দিনভর আলোচনা ছিল দলের ভেতরে ও বাইরে। যদিও এরশাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় অসুস্থতার কারণেই সফর স্থগিত করা হয়েছে। এ কারণে গতকাল খানিক সময়ের জন্য হাসপাতালেও গিয়েছিলেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে বাসায় ফিরে আসেন। অসুস্থতার কারণে এরশাদ সফর স্থগিত করেছেন- এমন যুক্তির বাইরে দিল্লির সিগন্যাল না পাওয়াকেই বড় কারণ বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল সূত্র। সিনিয়র এক নেতা আরও জানান, এর বাইরে শারীরিক অসুস্থতাও একটি কারণ। ছেলের ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নিতে ভারত যাওয়ার কথা বলা হলেও ভারত সরকারের সঙ্গে সরকারের পক্ষে যোগাযোগের লক্ষ্যও ছিল প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এরশাদের। এর আগে সফরের প্রস্তুতি নিয়ে শনিবার দুপুরে প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসায় দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর সঙ্গে বৈঠক করেন এরশাদ। দলের  কোষাধ্যক্ষ  ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মেজর (অব.) খালেদ আখতার মানবজমিনকে জানান, এরশাদ সকালে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই তিনি ভারতে যাচ্ছেন না। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর সকাল ১১টার দিকে তাকে সিএমএইচে নেয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা শেষে তাকে ২৪ ঘণ্টা  বিশ্রামে থাকতে বলা হয়েছে। এদিকে, এরশাদের এ সফর বাতিল নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কি কারণে হঠাৎ এই সফর বাতিল করা হয়েছে তা নিয়ে ধোঁয়াশার মধ্যে আছেন  খোদ দলের  নেতারাই। তবে জাপার বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, এরশাদের ভারত সফর বাতিলের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে অনেকটা দূরত্ব তৈরি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে চিঠি লিখে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন এরশাদ। এছাড়া জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ নিয়ে চিন্তিত সাবেক এই সেনাশাসক। এমন অবস্থায় তার ভারত সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল ব্যাপক আলোচনা। শেষ মুহূর্তে এই সফর বাতিল নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তালেবান রুখতে দরকার যৌথ প্রচেষ্টা by কুলদীপ নায়ার

ভারত গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চায় না, ব্যাপারটা আসলেই করুণার উদ্রেক করে। সন্দেহ নেই, সে খুব খতরনাক লোক, তাঁর সঙ্গে বোঝাপড়া করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু আমরা যদি ১০ বছর পরের কথা চিন্তা করি, তাহলে এই ব্যক্তির ভারতবিরোধী কথাবার্তা হজম করা উচিত। এসব কিছুই এখন ইতিহাস। এই দুই দেশ, বিশেষ করে ভারতের উচিত তালেবানদের প্রচণ্ড আক্রমণকে রুখে দেওয়ার জন্য নীতি প্রণয়ন করা। আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমা শক্তিগুলো হাত গুটিয়ে নিলে তারা একদম খাপখোলা তরবারির মতো ভয়ংকর হয়ে উঠবে।

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো সেনা প্রত্যাহার করা হলে কী ঘটবে, তা নিয়ে নয়াদিল্লি এখনো কোনো চিন্তাভাবনা করেনি, ব্যাপারটা কিছুটা বিস্ময়কর ঠেকে আমার কাছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে কাবুল সফর করেছেন সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হলে তার পরের পরিকল্পনা কষতে।কিন্তু এই পুরো চিত্রের মধ্যে নয়াদিল্লি একেবারেই দৃশ্যমান নয়।
আফগানিস্তান সব সময় ভারতের শুভকামনাই করবে। ভারত সেখানে হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও সড়ক নির্মাণে সহায়তা করেছে। তবে ইসলামাবাদ আফগানিস্তানকে তার ‘কৌশলগত ডেরা’ হিসেবে দেখে থাকে, দেশটিকে তারা নিজেদের স্যাটেলাইট বানাতে চায়। নয়াদিল্লি ইসলামাবাদকে বোঝাতে চেয়েছে, কাবুলকে স্বাধীন ও মুক্ত থাকতে দেওয়া হোক। কিন্তু পাকিস্তান এতে সায় দেয়নি।
এসব কিছুর মূলে রয়েছে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন, তারা এই মুসলিম দেশটিতে তাদের আদর্শ কায়েম করতে গিয়েছিল। এই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র মৌলবাদীদের পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ দিয়ে আফগানিস্তানে ঢোকায়, সোভিয়েত ইউনিয়নকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে এলে যুক্তরাষ্ট্র এদের সম্পর্কে সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু এদের হাতে সেই অস্ত্র রয়ে যায়। এই মৌলবাদীরা অস্ত্রের জোরে তাদের কঠোর অনুশাসননির্ভর ইসলামের প্রচারণা চালাতে থাকে।
ইসলামাবাদের চিন্তায় এই সশস্ত্র জঙ্গিদের ব্যাপারটি রয়েছে, যাদের হয়তো ভারতের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো যায়। কাশ্মীরের বিদ্রোহ অমুসলিমদের শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার লক্ষ্যেই করা হয়েছে, এই দাবির সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এটা এক অন্ধবিশ্বাসের উপজাত হিসেবে এসেছে, তবে সেই দাবিটি করা হয়েছে অজ্ঞাতসারে। মাসুদ গ্রুপের এক নেতার সঙ্গে আমার কাবুলে কথা হয়েছিল, তিনি আদর্শিকভাবে তালেবানবিরোধী, তাঁর তরিকা কিছুটা ভারতমুখী। তিনি আমাকে বলেছিলেন, কাবুলের সড়ক ইসলামাবাদ হয়েই গিয়েছে, ফলে ভারত যদি মৌলবাদের রাশ টেনে ধরতে চায়, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে।
সবচেয়ে অনভিপ্রেত ঘটনা হচ্ছে তেহরিক-ই-পাকিস্তান তালেবানের (টিটিপি) উত্থান। এই দেশীয় বাহিনীতে এমন অবস্থানে আছে যে এরা চাইলে যখন যেখানে খুশি হামলা চালাতে পারে। এই সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি করাচি বিমানবন্দরের হামলা তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে করাচির এই ঘটনা রোগের উপসর্গ মাত্র, রোগ নয়। রোগটি হচ্ছে মৌলবাদ, এমনকি পাকিস্তানের মধ্যপন্থী মানুষ এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও এটি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এক সহজ পথ বেছে নিয়েছেন। তলেবানদের দাবি গ্রহণের লক্ষ্যে তিনি তাদের সঙ্গে আপসরফা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এটি বেশি দূর এগোয়নি, কারণ তারা পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে প্রমাণ চেয়েছে যে সরকার নারীশিক্ষা বন্ধ ও নারীদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করতে আন্তরিক। এরপর তারা দাবি করবে, নারীদের গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করা হোক, সৌদি আরবে ঠিক যেমনটি করা হয়েছে। মৌলবাদের যূপকাষ্ঠে সংগীতের বিসর্জন হয়ে গেছে। পুরোনো দিনের গায়ক ও যন্ত্রীরা এখন ভাতের খোঁজে ভারতে আসছেন—এসব দেখে হৃদয়ে দুঃখের নিনাদ বেজে ওঠে।
অতীত অনেক তিক্ত হলেও ভারত ও পাকিস্তানের হাতে এখন বেছে নেওয়ার মতো নানা সুযোগ রয়েছে, যৌথ বাহিনী গড়ে তুলে তালেবানদের পরাজিত করার ব্যাপারটি ছাড়াও। ফলে এখন আর অতীতের রোমন্থন করে লাভ নেই। নয়াদিল্লির বুঝতে হবে, তালেবানরা আফগানিস্তানে পরাজিত না হলে তারা অমৃতসর সীমান্ত পর্যন্ত চলে আসতে পারে। দুই দেশ যদি প্রকাশ্যে নিজেদের কৌশল নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পায়, তাহলে কাশ্মীরে যেমন পেছনের দিক দিয়ে আলোচনা করেছিল, এ ক্ষেত্রেও তারা তেমনটা করতে পারে।
তালেবানরা যদি প্রথমে আফগানিস্তান ও পরে পাকিস্তানকে নিজেদের কবজায় নিয়ে আসে, তাহলে ভারতের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন হুমকির মুখে পড়বে। এর মাধ্যমে আফগানিস্তান নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যে যৌথতা গড়ে উঠতে পারত, সেই সম্ভাবনা তিরোহিত হবে। কাশ্মীরের কারণে দুই দেশের মধ্যে গুরুতর আলোচনা না হলেও আফগানিস্তান প্রশ্নে এই তিক্ততা ঝেড়ে ফেলে দুই সেনাপ্রধানকে বসে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ঠিক করতে হবে: কী করে আফগানিস্তানকে স্বাধীন রাখা যায়।
এমনিতে উদার হলেও জুলফিকার আলী ভুট্টোই প্রথম মৌলবাদীদের আস্থায় নিয়ে আসেন। তাঁর সরকারের আমলে মসজিদের প্রধান মৌলবিদের ভাতা দেওয়া শুরু হয় এবং আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়। আজ পাকিস্তানে আহমদিয়াদের কবর রচনা হয়েছে, যা কিছু অবশিষ্ট ছিল, সেগুলোও ছুড়ে ফেলা হয়েছে। পাকিস্তানি ক্ষমতাচক্র স্যার জাফরুল্লাহ খানের মতো মানুষকেও অপমান করতে কসুর করেনি। অথচ এই ব্যক্তি জাতিসংঘে কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের অবস্থান দুর্বল করে দিয়েছিলেন। নেহরু কাশ্মীরে ‘পাকিস্তানের আগ্রাসন’-এর বিরুদ্ধে জাতিসংঘে যে নালিশ জানিয়েছিলেন, এই ব্যক্তি ব্রিটেনের সহায়তায় তা নস্যাৎ করে দেন।
অবশ্যই, ইসলামাবাদকে তার কৌশল পাল্টাতে হবে। আফগানিস্তানকে আর ‘কৌশলগত ডেরা’ হিসেবে দেখা চলবে না। পাকিস্তানে নিজের স্বার্থেই সেটা করতে হবে। তালেবানরা যেভাবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করেছে, তাতে পাকিস্তানকে এখনই সতর্ক হতে হবে, তালেবানরা দেশটিকে উদার ইসলামি দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেবে না।
বলা হচ্ছে, ভারত বিপদটা আঁচ করতে পারছে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তো একজন কঠোর শাসক, তাঁর উচিত ব্যাপারটি নওয়াজ শরিফের কাছে পাড়া। দিল্লিতে নওয়াজ শরিফ যখন এলেন, দুজনের বন্ধুত্ব তখন চোখে পড়ার মতো ছিল। মোদির কাছে এক পত্রে নওয়াজ শরিফ সেটা স্বীকারও করেছেন। পাকিস্তানের তালেবানীকরণ রুদ্ধ করতে কি কোনো যথাযথ নীতি নেওয়া হবে? এর সপক্ষে পাকিস্তানে একটি জনমতও গড়ে উঠতে শুরু করেছে।
তালেবানবিরোধী নীতি প্রণয়নে নয়াদিল্লির উচিত যুক্তরাষ্ট্রকেও সঙ্গে রাখা। এই পরিকল্পনায় তালেবানরা যদি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে পরাজিত হয়, তাহলে অন্যান্য ইসলামি দেশেও তারা আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না, যদিও এখন বিভিন্ন ইসলামি দেশে তালেবানরা প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক।

ইউক্রেনের আকাশে গণহত্যা - এই বর্বরতার ব্যাখ্যা কী? by মশিউল আলম

গত বৃহস্পতিবার ২৮৩ জন যাত্রী ও ১৫ জন ক্রু নিয়ে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং ৭৭৭ (এমএইচ ফ্লাইট ১৭) উড়োজাহাজ পূর্ব ইউক্রেনের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যে হৃদয়বিদারক ঘটনার অবতারণা হলো, এমনটি নিকট অতীতে আর ঘটেছে বলে মনে পড়ে না।
ইউক্রেনের রাশিয়া সীমান্তবর্তী ওই অঞ্চলে প্রায় ছয় মাস ধরে যুদ্ধ-পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে পৃথিবীর অন্য একাধিক অঞ্চলে। ২০০১ সাল থেকে আফগানিস্তানে এবং ২০০৩ সাল থেকে ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আর গ্রায় তিন বছর ধরে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে সিরিয়ায়। ইসরায়েলেও মাঝেমধ্যেই ভয়াবহ সংঘাত বেঁধে যাচ্ছে; উভয় পক্ষে রকেট ছোড়াছুড়ি চলছে। এসব অঞ্চলের আকাশসীমা দিয়ে বিভিন্ন দেশের যাত্রীবাহী বিমান চলাচল করছে। কিন্তু কোথাও কোনো পক্ষ যাত্রীবাহী কোনো উড়োজাহাজে আঘাত হানেনি।

তাই ইউক্রেনের আকাশে সংঘটিত এই ট্র্যাজেডিকে এমন এক বর্বর গণহত্যা বলে মনে হয়, যা বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করেছে। প্রশ্ন জাগে, ঘটনাটি যারাই ঘটিয়ে থাকুক, তারা কি আসলে মানুষ? কী করে তারা ২৯৮ জন আরোহীসহ একটি বেসামরিক যাত্রীবাহী বিমান লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়তে পারল, রাশিয়া-ইউক্রেন বিবাদের সঙ্গে যে মানুষগুলোর কোনো সম্পর্কই ছিল না?
বিমানটির ধ্বংসাবশেষ এবং নিহত আরোহীদের ছিন্নভিন্ন দেহ ও দেহাংশ ছড়িয়ে পড়েছে পূর্ব ইউক্রেনের দানিয়েৎস্ক শহর থেকে কিছু দূরে ১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে।ওই অঞ্চলটি এখন রয়েছে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী ইউক্রেনীয় যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে, যারা অঞ্চলটিকে দানিয়েৎস্কায়া নারোদনায়া রিসপুবলিকা (দানিয়েৎস্ক পিপলস রিপাবলিক) হিসেবে ঘোষণা করেছে।ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগের তির নিক্ষেপ করেছে তাদের দিকেই।কিন্তু স্বঘোষিত দানিয়েৎস্ক রিপাবলিকের ‘প্রধানমন্ত্রী’ আলেকসান্দর বারাদোই সে অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, ‘ওই বিমান লক্ষ্য করে মিসাইল নিক্ষেপের ইচ্ছা আমাদের ছিল না, সে রকম সামর্থ্যও আমাদের নেই।’ কিন্তু তাঁর এই বক্তব্য হালে পানি পাচ্ছে না।বিশেষত পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে তাদেরই দায়ী করা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে যে বিমানটিকে মিসাইল নিক্ষেপ করে ভূপাতিত করার সামর্থ্য তাদের আছে।
আমেরিকান সামরিক গোয়েন্দাদের বরাত দিয়ে নিউইর্য়ক টাইমস লিখেছে, বিমানটিতে আঘাত হেনেছে এসএ-১১ নামের একটি মিসাইল, যা রাশিয়ার তৈরি।ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ও রাডার-নিয়ন্ত্রিত এই মিসাইলের দৈর্ঘ্য হয়ে থাকে ১৮ ফুট এবং তা ৭২ হাজার ফুট পর্যন্ত উঁচু দিয়ে উড়ে যাওয়া লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম, আর মালয়েশীয় বিমানটি উড়ে যাচ্ছিল ৩৩ হাজার ফুট ওপর দিয়ে। এসএ-১১ মিসাইল অতি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরকসমৃদ্ধ ওয়ারহেড বহন করে এবং তা ছোটে শব্দের বেগের চেয়ে তিন গুণ বেশি দ্রুতবেগে।এটি নিক্ষেপ করার জন্য বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণ ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন, যা কেবল রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনীগুলোর সদস্যদের থাকে।
নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, এই মিসাইল রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর কাছে যেমন আছে, তেমনি আছে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর অস্ত্রভান্ডারেও।পত্রিকাটি আরও লিখেছে, ইউক্রেনের রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছেও এগুলো আছে। তারা এ রকম দাবি করছে মার্কিন গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। গোড়া থেকেই মার্কিন কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে আসছে, ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করছে রাশিয়া। কিন্তু তারা বলছে না যে ইউক্রেনের রুশবিদ্বেষী উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর কাছেও এই মিসাইল থাকার সম্ভাবনা আছে এবং এ ঘটনা তাদের দ্বারাও ঘটে থাকতে পারে।
এ ঘটনার আগে পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষের সংশ্লিষ্টদের জানা ছিল যে পূর্ব ইউক্রেনের রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধাদের কাছে আছে ম্যানপ্যাড নামে পরিচিত একধরনের মিসাইল, যা কাঁধে রেখে নিক্ষেপ করা যায়। এই মিসাইল সর্বোচ্চ ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।সে কারণে ওই অঞ্চলের সব ধরনের আকাশযান চলাচল করছিল ১২ হাজার ফুটের ওপর দিয়ে। কিন্তু গত সপ্তাহে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ইউক্রেনের সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী একটি আন্তনোভ-২৬ বিমান ২১ হাজার ফুট উঁচু থেকে ভূপাতিত করলে প্রকাশ হয়ে পড়ে যে তাদের হাতে আরও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মিসাইল আছে। তখন ইউক্রেন সরকার নিরাপদ আকাশসীমা নির্ধারণ করে দেয় ৩২ হাজার ফুট উচ্চতা।রাশিয়াও ঘোষণা করে যে এখন থেকে তাদের সব ধরনের আকাশযান ইউক্রেনের ওই অঞ্চল পার হবে ৩২ হাজার ফুটের বেশি উঁচু দিয়ে।
যদিও এই উচ্চতা বেসামরিক যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক ফ্লাইটের জন্য প্রযোজ্য ছিল না, তবু মালয়েশিয়ার বিমানটি ওই অঞ্চল অতিক্রম করতে যাচ্ছিল আরও এক হাজার ফুট উঁচু দিয়ে। তা সত্ত্বেও যখন বিমানটি মিসাইলের আঘাতে ধ্বংস হলো, তখন আমেরিকানরা দাবি করতে লাগল যে রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে এখন এসএ-১১ মিসাইল আছে।
ঘটনাটির অল্প পরেই ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দায়ী করে গোপনে আড়ি পেতে রেকর্ড করা দুটি টেলিফোন সংলাপ প্রকাশ করে। রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদী এক যোদ্ধা ও রাশিয়ার একজন সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে এক সংলাপে এক বিচ্ছিন্নতাবাদীকে রুশ ভাষায় বলতে শোনা যায়, ‘আমরা এইমাত্র একটা এএন-২৬ বিমান ভূপাতিত করেছি।’ উল্লেখ্য, এএন-২৬ বিমান আছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর। আরেক টেলিফোন সংলাপে শোনা যায়, দুই রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী রুশ ভাষায় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে রাশিয়ার এসএ-১১ মিসাইল নিয়ে, যেটি পাঠানো হয়েছে মালয়েশীয় বিমানটি আক্রান্ত হওয়ার অল্প সময় আগেই। আমেরিকান গোয়েন্দা সদস্যরা বলেছেন, এ দুটি টেলিফোন সংলাপের সত্যতা নিয়ে তাঁদের কোনো সন্দেহ নেই। যদি এটাই সত্য হয়, তাহলে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে, ইউক্রেনের রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ওই মালয়েশীয় বিমানটিকে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর বিমান মনে করে মিসাইল নিক্ষেপ করেছিল।
উল্লেখ করা যেতে পারে, মালয়েশীয় বিমানটি যে পথে উইক্রেনের আকাশসীমা অতিক্রম করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছে, ওই একই পথে জার্মানির লুফথানসা, হল্যান্ডের কেএলএম, থাই এয়ারওয়েজসহ আরও অনেক দেশের বিমান সংস্থার বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল করছিল। কিন্তু অন্য সব বিমান বাদ দিয়ে হামলাকারীরা কেন মালয়েশীয় বিমানটিকে বেছে নিয়েছিল, তার উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
এতে করে রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলোর কিছু ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচারে সুবিধা হয়েছে। মস্কো থেকে রুশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘রাশিয়া ২৪’-এর বরাত দিয়ে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি লিখেছে, ঘটনাটি আসলে ছিল রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে হত্যা করার ব্যর্থ প্রয়াস। মালয়েশীয় বিমানটি যে সময় ও যে আকাশপথ দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, প্রেসিডেন্ট পুতিনকে নিয়ে একটি জেট বিমানও সেই সময়ে একই আকাশপথে লাতিন আমেরিকা থেকে মস্কো ফিরছিল। মালয়েশীয় বিমানটির পাখায় মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের যে লোগো আছে, তা নাকি দূর থেকে দেখতে রুশ ফেডারেশনের তিন রঙা পতাকার মতোই।
এই জল্পনাকে জোরালো করতে ওই টিভি চ্যানেল থেকে ইউক্রেনের সাবেক উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রতিরক্ষামন্ত্রী আনাতোলি গ্রিৎসেনকোর একটা পুরোনো উক্তির ফুটেজ পুনঃপ্রচার করা হয়, যেটিতে তিনি বলেন, ‘কারও উচিত পুতিনকে হত্যা করা।’
কিন্তু এসব জল্পনা-কল্পনা প্রচার করে ক্রেমলিন খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। পুতিনসহ রুশ নেতৃত্ব বড়ই বেকায়দায় পড়ে গেছে। বৃহস্পতিবার সকালেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পুতিনকে ফোন করে প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেছেন। রাশিয়া ইউক্রেনের রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে—এই অভিযোগ তিনি পুতিনের মুখের ওপর সরাসরি করেছেন। তারপর আমেরিকা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও নতুন অবরোধ আরোপ করেছে।
এটা সাধারণভাবে বোধগম্য যে এই রোমহর্ষক ঘটনা যারাই ঘটাক, শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার ওপরই দায় বর্তানোর কথা। ইউক্রেনের সরকার, সামরিক বাহিনী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর এটা ভালো করে জানা ছিল। তবে তারা সেই সুযোগ গ্রহণ করেছে, এটা মনে হয় না। রাশিয়া ও রুশপন্থী ইউক্রেনীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে তাদের আচরণ আক্রমণাত্মক নয়, বরং বেশ রক্ষণাত্মক। রুশবিদ্বেষী ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মাথাগরম কিছু লোক যদিও আছে, তবু এটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয় না যে তারা প্রেসিডেন্ট পুতিনকে হত্যা করার কথা ভাবতে পারে।
রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরও অজানা থাকার কথা নয় যে এ ঘটনার জন্য বিশ্ববাসী অভিযোগের আঙুল তাক করবে ক্রেমলিনের দিকেই। ঘটনা ঘটার পরে নয়, আগে থেকেই জানা থাকার কথা। আর ক্রেমলিনের উপলব্ধি সম্ভবত সবচেয়ে প্রবল। এ ঘটনা ঘটার পরপরই প্রেসিডেন্ট পুতিন পূর্ব ইউক্রেনে সহিংসতা বন্ধ করার জন্য উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্তের কাজে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কিন্তু ২৯৮টি নিরীহ প্রাণ ঝরে পড়ার মধ্য দিয়ে যে ক্ষতি হয়ে গেছে, তা আর কোনো কিছুতেই পূরণ হওয়ার নয়।
বিমানটির ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করা গেছে বলে খবরে প্রকাশ। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল ঘটনার তদন্ত করছে। আসলে কী ঘটেছে, কাদের দ্বারা কীভাবে ঘটেছে তা হয়তো সব তদন্তের পরে জানা যাবে। নানা যুক্তি বিবেচনা করে এমন অনুমান করা যায় যে ঘটনাটি রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারাই ঘটে থাকতে পারে এবং সেটা ভুলবশত। তারা ইউক্রেনীয় সামরিক বিমান ভেবেই যাত্রীবাহী মালয়েশীয় বিমানটি লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়েছিল।
শেষ পর্যন্ত এই অনুমানই যেন সত্য হয়। তাহলে এই ট্র্যাজেডির একটা ব্যাখ্যা মিলবে, যদিও সেই ব্যাখ্যায় এ ঘটনার দুর্বহ দুঃখভার লাঘব হওয়ার নয়।

মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@prothom–alo.info

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট - আমারি বধুয়া আঁন বাড়ি যায় by মুনির হাসান

বাংলাদেশ থেকে ভারতে ব্যান্ডউইথ রপ্তানির প্রায় সব আনুষ্ঠানিকতা নাকি সম্পন্ন হয়েছে। আগস্ট মাস থেকেই সেটি কার্যকর হবে বলে জানা গেছে। পত্রিকান্তরে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথের পরিমাণ ২৫০ গিগাবাইট। এর মধ্যে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) রয়েছে ২০০ গিগাবাইট। আর ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেব্ল (আইটিসি) অপারেটরসহ অন্যদের রয়েছে ৫০ গিগাবাইট।মোট ২৫০ গিগাবাইটের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেশে ব্যবহৃত হয় মাত্র ৪২ গিগাবাইট। বাকি ২০৮ গিগাবাইট পুরোটাই অব্যবহৃত থেকে যায়।অনেকের ধারণা, আগামী কয়েক বছরে এই পুরো ২৫০ গিগাবাইট দেশের মধ্যে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। কাজেই রপ্তানি করাটা দোষের নয়।
তবে মুশকিল হচ্ছে, আমাদের চাহিদা আসলে কতটুকু, সেটা কি আমরা জানি? আমরা কি মোবাইলের বিকাশের ব্যাপারটি কোনো গণনায় পেয়েছিলাম? কিন্তু সাধারণের নাগালে আসার পরপরই দেশে মোবাইলের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। কাজেই ব্রডব্যান্ড সাধারণ মানুষের নাগালে চলে এলে সেটির ব্যবহার যে দ্রুত বাড়বে না, সেটা কি কেউ হলফ করে বলতে পারে?

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এখন বিশ্বজুড়ে মৌলিক অধিকারের পর্যায়ে চলে গেছে। এর অন্যতম কারণ হলো এর বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও দিন বদলের শক্তি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি হাজার নতুন সংযোগের ফলে আটটি নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং মানুষের জীবনমানও বাড়ে। আবার তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের প্রভাবে শিক্ষাক্ষেত্রেও একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুক্ত দর্শনের বিকাশ।ফলে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ইচ্ছে করলেই (এবং ব্র্যডব্যান্ডে প্রবেশাধিকার থাকলে) বিশ্বের বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সে অংশ নিতে পারে। এমআইটি, স্ট্যানফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে ইন্টারনেটে উন্মুক্ত করছে।
অন্যদিকে, ইন্টারনেটের কারণে উন্নত বিশ্বের অনেক কাজ এখন আমাদের মতো দেশের তরুণ-তরুণীরা ঘরে বসেই করতে পারে। একটি বড় পারিবারিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান বিগত ৫০-৬০ বছরে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। অথচ ইন্টারনেটে স্বাধীন ব্যবসার মাধ্যমে মাত্র পাঁচ বছরেই প্রায় ৩০ হাজার ছেলেমেয়ে নিজেদের আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। এর বাইরেও গড়ে উঠছে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প, যা গত বছর ১০ কোটি ডলারের রপ্তানি করেছে বলে দেশের সফটওয়্যার ব্যবসায়ীদের সংগঠন জানিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ১৯৯৮ সালে মোবাইল ফোনের একচেটিয়া কার্যক্রম ভেঙে দেওয়ার পর থেকে দেশের প্রবৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে মোবাইল ফোনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পটি জ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম বলে এর প্রকৃত মূল্যায়ন করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর ২০ বিলিয়ন ডলারের একটা রিজার্ভ গড়ে তুলতে আমাদের প্রায় ৪২ বছর লেগেছে। অথচ কয়েক দিন আগে হোয়াটস আপ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ১৯ বিলিয়ন ডলারে বেচাকেনা হয়েছে। ‘অ্যাংরি বার্ড’ নামের একটি গেমস বিক্রি হয়েছে মাত্র ৮০ মিলিয়ন ডলারে! তার মানে হলো, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ও উদ্ভাবনী ব্যবহার বাড়াতে পারলে জাতীয় আয় বৃদ্ধির যে স্বপ্ন আমরা দেখি, তার পথে এগোনোর একটা সুরাহা হয়।
আর এ কারণেই দরকার সারা দেশে ব্রডব্যান্ডকে ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা আগে শুনেছিলাম, ব্যান্ডউইথের উচ্চমূল্যের কারণে এটি সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু সরকারের নানা চেষ্টায় ২০০৬ সালে যে ব্যান্ডউইথের দাম ছিল ৮৪ হাজার টাকা, সেটি এখন নেমে এসেছে মাত্র দুই-তিন হাজার টাকায়। অথচ তার পরও রাজধানীর বাইরে বলতে গেলে ব্র্যডব্যান্ড সেবার কোনো প্রসার নেই। সম্বল বলতে মোবাইল অপারেটরদের উচ্চমূল্যের দুর্বল সেবা এবং কোথাও কোথাও ওয়াইম্যাক্সের সেবা। সত্যিকারের ব্রডব্যান্ড বিকাশের জন্য দরকার ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি। আশ্চর্য হলেও সত্য যে বাংলাদেশের প্রায় সবখানেই এখন ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক পৌঁছে গেছে। কেবল ‘শেষ মাইল সংযোগ’ বা ব্যবহারকারীর কাছে সংযোগ পৌঁছানোর সমাধান করতে পারলেই সবখানে ব্রডব্যান্ডকে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতো।
যেসব বাণিজ্যিক সংস্থা ব্রডব্যান্ডকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করছে, তাদের বক্তব্য হলো, অবকাঠামোগত সুবিধা তৈরি করে একটি জেলা বা উপজেলা শহরে ব্রডব্যান্ড সেবা চালু করে সেটি বাণিজ্যকভাবে লাভজনক করার মতো পর্যাপ্ত গ্রাহক সেখানে নেই। গ্রাহক তৈরি হলেই কেবল এই সেবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে দেখা যায়, দেশের আনাচে–কানাচে তরুণ-তরুণীরা ব্রডব্যান্ডের আশায় চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছে।
এ ক্ষেত্রে সরকারকেই একটি বড় উদ্যোগ নিতে হবে। একটি দুই বছর মেয়াদি উদ্যোগ হতে পারে, দেশের সব জেলা ও উপজেলা সদরে অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ বিনা তারের ও বিনা মূল্যের ব্রডব্যান্ড সেবা চালু করা। সরকারের কাজ হবে এই সেবাগুলো চালু করে সেখানে দুই বছরের জন্য ব্যান্ডউইথ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ দেওয়া। তবে এই সেবাগুলো নামকাওয়াস্তে চালু করলে হবে না। কমপক্ষে সেকেন্ডে ১০ মেগাবিট ব্যান্ডউইথের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই এই সেবা চালু রাখার জন্য তা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে তারাই এটি চালু রাখবে। অন্যদিকে, এই কার্যক্রমের ফলে প্রতিটি স্থানে ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। ফলে ইন্টারনেট সেবাদানকারী সংস্থাও বাণিজ্যিকভাবে সেবা দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কার্যক্রম সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য সরকারকে কোনো দাতা সংস্থার কাছে হাত পাততে হবে না।
দেশের মোবাইল ফোন সেবা প্রদানকারী অপারেটররা ইউনিভার্সাল সার্ভিস অবলিগেটরি ফান্ডে প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার মতো জমা দেন। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) এই টাকা নিয়ে বসে আছে। গত দুই বছরের এই
খাতে কমপক্ষে কয়েক শ কোটি টাকা জমা হয়েছে, কিন্তু কোনো টাকা খরচ হয়নি। এই টাকা থেকেই সারা দেশের এই হট স্পটগুলো তৈরি করে ফেলা সম্ভব। পাবলিক স্পটের পাশাপাশি সব বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় কলেজগুলোতেও এই বিনা মূল্যের ব্রডব্যান্ড সেবা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
কাজেই রপ্তানিযোগ্য হলে রপ্তানি করা হোক, তবে তার আগে দেশের সবখানে সাধারণের নাগালমূল্যে ব্রডব্যান্ড ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগটা আমরা দেখতে চাই।

মুনির হাসান: যুব কর্মসূচি সমন্বয়কারী, প্রথম আলো ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

বিজ্ঞাপনাটক by মো. সাইফুল্লাহ pic আঁকা: জুনায়েদ

ঈদ অনুষ্ঠানমালার প্রধান আকর্ষণ বিজ্ঞাপন। কিন্তু দর্শকের চাপে বিজ্ঞাপনের ফাঁকে টিভি চ্যানেলগুলোকে মাঝে মাঝে নাটকও দেখাতে হয়। কীভাবে নাটকের ভেতরেই বিজ্ঞাপন দেখানো যায়, সে উপায় বাতলে দিচ্ছি আমরা।

দৃশ্য ১
‘তেল কিনব, টাকা দে।’ ঘুমকাতুরে গলায় বলল মিমি।
‘ঝামেলা করিস না তো।’ মুমুর কণ্ঠে ঝাঁজ।
‘দেখাচ্ছি’ বলে মিমি ততক্ষণে মুমুর পার্সটা হাতিয়ে নিয়েছে।
‘অ্যাই, আমার ব্যাগ ধরবি না...মিমি, ইটস টু মাচ!’ বোনকে বাধা দিয়েও কোনো লাভ হলো না। টাকাগুলো হাতিয়ে নিয়ে মিমি ততক্ষণে দাঁতের দোকান খুলে বসেছে।
‘শোন, কিছু দিবি আর কিছু পাবি না, তাই কি হয়? গ্যারাইম্যা ফোনের অফারটাই দেখ, যত টাকার কথা বলবি, ঠিক তত টাকা বোনাস। তুই আমাকে টাকা দিলি, বিনিময়ে আমিও তোকে কিছু দিই। এই নে, ছাতা। বাইরে যা রোদ, ছাতা মাথায় দিয়ে অফিসে যা। আমরা আমরাই তো!’ বলে ফিচিক হাসে মিমি।
‘হুহ, রোদ! আমার আছে ডিভাইস ট্যালকম পাউডার। রোদে কিচ্ছু হবে না!’ পাউডারের বোতল হাতে মুমু কিছুটা সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করে।
(সতর্কতা: পুরো দৃশ্যে নীল রঙের প্রকোপ থাকতে হবে। বিছানার চাদর নীল, জানালার পর্দা নীল। কোথাও লাল অথবা কমলা রং থাকা চলবে না।)

দৃশ্য ২
ঘরে নীল জামা পরে থাকলেও মিমি বাইরে বেরিয়েছে লাল জামা গায়ে। লাল রঙের একটা রিকশায় চড়ে সে ভার্সিটিতে পৌঁছায়।
রিকশাভাড়া দিতে গিয়ে হলো বিপত্তি। রিকশাওয়ালার কাছে ভাঙতি নেই। ৩৫ টাকার জায়গায় ৫০ টাকা ভাড়া দিতে হলো। রিকশাওয়ালা হলুদ দাঁত বের করে বলল, ‘আফা, আমার মুখে তো হাসি ফুটাইলেন। আজকে আর কার মুখে হাসি ফুটাইবেন?’
হাসি ফোটানোর কথা শুনে মিমির মাথায় বোম ফুটে যাচ্ছিল। রিকশাভাড়ার রাগ সে ঝাড়ে জামিলের ওপর, ‘হ্যালো, কোথায় তুমি? তোমার না গেটে থাকার কথা?’
‘আর বোলো না, অবস্থা খুবই খারাপ। এখনো বিছানায়।’ ওপাশে জামিলের কণ্ঠটা কাহিল শোনায়। কিন্তু হঠাৎই পাশ থেকে ‘আজিমপুর আজিমপুর...’ শুনতে পেয়ে মিমির রাগ সপ্তমে ওঠে।
‘একটু চেপে শোও। নইলে আজিমপুরের টেম্পো তোমার বিছানায় উঠে যাবে। মিথ্যুক কোথাকার! তুমি জানো না আমি কবি সিম ব্যবহার করি। ক্লিয়ার নেটওয়ার্কে তোমাকে একটা ক্লিয়ার কথা বলি, তোমার সাথে আমার সব শেষ। মামলা ডিসমিস।’ মোবাইল ফোন তো ‘ঠাস’ করে রাখা যায় না, তাই টুস করে লাইনটা কেটে দেয় মিমি।

দৃশ্য ৩
‘হ্যালো, হ্যালো...’ মনটাই খারাপ হয়ে যায় জামিলের। কী মুশকিল! তাকে পুরো কথা শেষও করতে দিল না। জামিলের বলা হলো না, সে শুয়ে আছে রাস্তার পাশে। বাসের টিকিটের জন্য অনেক লোকের সঙ্গে সে-ও মাঝরাত থেকে টিকিট কাউন্টারের সামনে বিছানা পেতেছে। ধ্যাত!

যাক, কাউন্টার খুলেছে। এতক্ষণে টিকিট দেওয়া শুরু হয়েছে।
কিন্তু এ কী! ওরা সবাই রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ এক লোক কি না পেছন থেকে এসে সুড়সুড় করে টিকিট নিয়ে চলে যাচ্ছে? হইহই করে সবাই তেড়ে গেল। কাছে গিয়ে আরও বড় চমক, আরে, এ তো বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের একজন খেলোয়াড়!
‘ঘটনা কী ভাই, আপনি কীভাবে টিকিট পেলেন?’ সবার আগে জামিলই জানতে চায়।
ক্রিকেটার হাসে, ‘ক্রিকেটারদের কত কিছুই না পটাতে হয়। কখনো বোলার, কখনো আম্পায়ার। মাঝে মাঝে টিকিট কাউন্টারের লোককেও পটাতে হয়। এই নিন, পেয়ার অ্যান্ড পাগলি ম্যাক্স ফেয়ারনেস। এটা মাখলেই সবাইকে পটাতে পারবেন।’ যেতে যেতে সে আবার পেছনে ফিরে তাকায়, ‘বয়স তো মাত্র ২৩, এখন না পটালে কখন?’
মাঠে ভদ্রলোকের পারফরম্যান্সের যে দশা, কেউই তার কথায় খুব একটা ভরসা পায় না। সবাই আবার লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়।

দৃশ্য ৪
অবশেষে কাউন্টারের সামনে পৌঁছাল জামিল। টিকিট হাতে নিয়ে যখন টাকা দেবে...একি, টাকা গেল কই? হায় হায়! জামিল পকেট হাতড়ায়। সঙ্গে করে আনা বিছানা-বালিশও হাতড়ে দেখে।
‘অ্যাকাউন্ট বালিশে খুলছেন নাকি?’ পাশ থেকে একটা চেনা কণ্ঠ শুনে ফিরে তাকায় জামিল। ওমা, এ তো একজন জনপ্রিয় অভিনেতা।
‘বালিশে অ্যাকাউন্ট না খুলে কিউ ক্যাশে অ্যাকাউন্ট খোলেন। ভালো থাকুক আপনার টাকা।’ বলতে বলতে অভিনেতা হাসে।
‘আরে ভাই সেইটা তো পরের হিসাব। এখন আমি টাকা কই পাব, সেইটা বলেন।’
অভিনেতা দেখলেন ভাবগতিক বেশি সুবিধার না। শেষে তাঁর কাছেই জামিল টাকা ধার চেয়ে বসতে পারে। তিনি সুড়সুড় করে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন।

দৃশ্য ৫
লোকজনের ঝাড়ি-ধাক্কা খেয়ে জামিল লাইন থেকে ছিটকে পড়েছে। মনটা তাঁর বড়ই বেজার। জামাকাপড় ময়লা হয়ে একশেষ। এমন সময় সামনে দেখা গেল এক রূপসী নারীকে। আরে, চেনা চেনা লাগে, এ যেন কে? মেঘলা না বৃষ্টি, কী যেন নাম! আজ দিনটা তো বেশ, একের পর এক সেলিব্রেটির সঙ্গে দেখা হচ্ছে!
জামিল হাসিমুখে এগিয়ে যাচ্ছিল কথা বলতে। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই রূপসী জামিলকে একটা ঘুষি মেরে বসল! তারপর শার্টের কলার ধরে সে কী মার! মার খেয়ে জামিল বেচারা দু–একটা দাঁতও হারাল।
‘আরে আমি কী করলাম, আমাকে মারছেন কেন?’ সে এবার কেঁদেই ফেলল।
রূপসী এবার বেশ ভাব নিয়ে দাঁড়ায়, ‘ময়লাকে দিন স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ ধোলাই! এই নিন, বাঁকা ওয়াশিং পাউডার!’
‘আরে ময়লা তো আমার জামা, আমি কী দোষ করলাম?’
‘ও, জামার ভেতর যে আপনিও ছিলেন, খেয়াল করিনি!’ রূপসীর সরল জবাব।

শিক্ষিত বা শিক্ষাহীন বেকার—কোনোটাই নয় by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

একটি কাগজের প্রথম পৃষ্ঠার খবর, ‘দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে’। অন্য একটি কাগজের পেছনের পৃষ্ঠার সংবাদ, ‘রাজধানীতে অবাধে ঢুকছে ইয়াবার চালান’। প্রথম খবরটিকে গুরুত্ব দিলেও খুব বেশি জায়গা দেয়নি, কাগজটি এর কলাম কয়েক ইঞ্চিতেই তা শেষ করে দিয়েছে। দ্বিতীয় খবরটি অবশ্য সে তুলনায় একটুখানি দীর্ঘ, তবে তাতে নানান পরিসংখ্যানের পাশাপাশি ইয়াবার চালান কাদের জন্য আসছে, সে সম্বন্ধে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানী মন্তব্য রয়েছে। তাঁর মতে, প্রধানত হতাশাগ্রস্ত তরুণেরাই এই মাদকের শিকার, বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারেরা।

খবরের কাগজগুলোর কাছে সংবাদের একটা সংজ্ঞা থাকে, শিরোনাম হওয়ার জন্য কোনো ব্যক্তি বা ঘটনাকে সেই সংজ্ঞার ভেতরে পড়তে হয়। যত সদ্য হবে সংবাদ, তত আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারবে। যত তাৎক্ষণিক হবে এর অভিঘাত, তত তার মূল্য। সেই বিচারে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নয়। এটি গতকালও ঘটেছে, আজকেও ঘটছে, আগামী দিনেও ঘটবে। এটি নতুন কিছু নয়। এই সংবাদ মানুষের মনে আলোড়ন তুলবে না। ইয়াবার প্রবাহ বেড়ে যাওয়াটাও সেই অর্থে নতুন কোনো সংবাদ নয়। যেদিন ওই অদ্ভুত নামের মাদকটি প্রথম ঢুকল আমাদের দেশে, আমি শুনেছি মিয়ানমার থেকে, সেদিন থেকেই এটি পুরোনো সংবাদ। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আমরা সমুদ্রযুদ্ধে জয়ী হয়েছি, এমনটিই ধারণা দিচ্ছে আমাদের সরকার ও মিডিয়া, কিন্তু মিয়ানমার আমাদের নুলো করে দিচ্ছে ইয়াবা দিয়ে। ভারত ফেনসিডিল দিয়ে।
এ জন্য অবশ্য এই দুই দেশের মাদক ব্যবসায়ীদের চেয়ে অনেক বেশি দায় বর্তায় আমাদের দেশের কিছু মানুষের ওপরই। যারা এসব আনছে দেশের ভেতর, বিপণন করছে, তারা বাংলাদেশেরই মানুষ। তাদের অনেকেই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তাদের পিঠে আছে আরও গুরুত্বপূর্ণদের হাত। এই যে অবাধে ইয়াবা ঢুকছে রাজধানীতে, তার পেছনে সক্রিয় একটি বিশাল চক্র। এই চক্রে যারা আছে, তারা প্রতিদিন হাসতে হাসতে দেশি-বিদেশি ব্যাংকে যায়। অথচ এদের লোভের কাছে বলি হচ্ছে অসংখ্য তরুণ। যাদের একটি অংশ শিক্ষিত বেকার।
শিক্ষিত বেকার শব্দ দুটিতে একটা কষ্ট ও হাহাকার আছে, গ্লানি ও লজ্জা আছে। সেটি প্রতিমুহূর্ত অনুভব করে যারা বেকার তারা; এবং তাদের আপনজনেরা।আমরা যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের পড়িয়ে, পরীক্ষা নিয়ে তাদের হাতে একটা সনদ ধরিয়ে দিয়ে জীবনযুদ্ধে পাঠাই, তারা হয়তো কিছুটা এই কষ্ট, দুঃখ, গ্লানি বুঝতে পারি, কিন্তু আমাদের সাধ্য সীমিত। চাকরির বাজারে তাদের ঠেলে দেওয়ার পর তাদের আর কোনো কাজে আমরা আসি না। আমাদের আরও বড় ব্যর্থতা, যে শিক্ষা পেলে এরা প্রত্যাশামতো চাকরি পেত, নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারত, আত্মকর্মসংস্থান করতে পারত, সেই শিক্ষা আমরা দিতে পারছি না। প্রতিবছর আমরা অসংখ্য তরুণকে শিক্ষা শেষের সনদ দিচ্ছি এবং এই সংখ্যায় এখন ঊর্ধ্বগতি, কিন্তু যে মানের শিক্ষা তাদের আমরা দিচ্ছি, তা আন্তর্জাতিক তো দূরের কথা, আঞ্চলিক পর্যায় থেকেও পিছিয়ে আছে।
আমাদের দেশের তৈরি পোশাক খাত শুরু করে বড় বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোতে এখন কাজ করছেন এক বিরাটসংখ্যক ভারতীয় ও শ্রীলঙ্কান এক্সিকিউটিভ।বড় বড় বেতন দিয়ে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেন এই বিদেশি–নির্ভরতা, যেখানে আমাদের দেশে ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, প্রকৌশলবিদ্যা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের অভাব নেই? এই প্রশ্নটি আমি করেছিলাম একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে, যিনি নিয়োগ বাজারের ভালো খবর রাখেন। যোগ্যতার অভাব, তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন।আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে শিক্ষা দেয়, তা সনদমুখী, জীবনমুখী নয়। তিনি বললেন, প্রতিটি পেশায় সর্বোচ্চ সক্ষমতা অর্জনের যে জ্ঞান থাকার কথা, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তা দিতে পারে না। আমাদের স্নাতকদের ভাষাজ্ঞান, বিশেষ করে ইংরেজির ওপর দখল মোটেও পর্যাপ্ত নয়।‘বাজার খুব হৃদয়হীন একটা জায়গা’, তিনি জানালেন, ‘যোগ্যতা না থাকলে বাজার-দর্শনের কাছে আপন ভাইও কল্কে পায় না।’
তাঁর যুক্তি আমাদের মানতেই হয়। মুক্তবাজার অর্থনীতি, যার চাবুক ছুটিয়ে নিচ্ছে আমাদের বাজারের ঘোড়া, একটা ‘বৈশ্বিক’ মান চাপিয়ে দেয় আমাদের ওপর। যারা সেই মানে পৌঁছে যায়, তারা তার আশীর্বাদ পায়।তবে পাশাপাশি একধরনের ডারউইনীয় অদৃষ্টবাদও এখানে কাজ করে—সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট—সবচেয়ে যোগ্যরাই এখানে টিকে থাকে।
অথচ শিক্ষার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মান অর্জনের দিকে না গিয়ে আমরা যে শুধু শিক্ষার পরিমাণ বাড়াতেই ব্যস্ত এবং এ জন্য প্রতিবছর যে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা, এ বিষয়টা নিয়ে আমরা ভাবি না।আমি তো মনে করি, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়া একটি জাতীয় লজ্জা এবং এর নিরসনে সব উদ্যোগ নেওয়াটা হওয়া উচিত জাতীয় একটি অগ্রাধিকার।সর্বোচ্চ পর্যায়ের অগ্রাধিকার।
কীভাবে এই সমস্যাটির সমাধান করা যায়? প্রশ্নটি আমি এক অর্থনীতিবিদ বন্ধুকে বলেছিলাম।বন্ধু জানালেন, দেশের প্রবৃদ্ধি যদি ৮-৯ শতাংশে পৌঁছানো যায়, যদি কৃষি থেকে নিয়ে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি থেকে নিয়ে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, সব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো যায় কয়েক গুণ, যদি নতুন নতুন প্রবৃদ্ধি ও অভিঘাত ক্ষেত্র (তাঁর ভাষায় গ্রোথ এবং থ্রাস্ট সেক্টর) তৈরি ও সেগুলোর বিকাশ সাধন করা যায়, তাহলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা নূ৵নতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়।
আমি অর্থনীতিবিদ নই—এসব কীভাবে সম্ভব তা আমার ধারণায় তেমন স্পষ্ট হয় না। তবে এটুকু বুঝতে পারি, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করার জন্য সরকারের যেমন সদিচ্ছা এবং স্পৃহা থাকতে হবে, তেমনি থাকতে হবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের। অভাবটা এখানেই, যদিও বেসরকারি উদ্যোক্তারা তাঁদের মতো করে সক্রিয়, তাঁদের চিন্তায় থাকে বাজারমন্ত্র। কিন্তু লাভটা শুধু ব্যক্তিগত হলে চলবে না, লাভটা হতে হবে দেশের। তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন ৩০০ টাকা বাড়ানোর কথা উঠলেই যেখানে মালিকদের একটা বড় অংশ বেঁকে বসেন, তাতে বেসরকারি খাতের ওপর ভরসা রাখা যায় না। তার পরও অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এগিয়ে আসছেন। একদিন এ ক্ষেত্রেও একটা পরিবর্তন আসতে পারে কে জানে।
তবে সত্যিকারের পরিবর্তনটা হতে পারে শিক্ষা দিয়েই। আমরা যদি শিক্ষার ক্ষেত্রে একটা ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন করতে পারি, তাহলে অন্য অনেক কিছুই আপনা থেকে বদলে যাবে। যদি সংস্কৃতির এবং নীতির শিক্ষা পায় কেউ, তার পক্ষে ইয়াবার ব্যবসা করাটা গর্হিত মনে হবে। সেই শিক্ষা যে উদ্যোক্তা পাবেন, তিনি নিজের লাভ কমিয়ে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাড়াবেন। একসময় আমাদের শিক্ষকেরা এই শিক্ষাই দিতেন, যদিও এর অভিঘাত থাকত সীমিত, যেহেতু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ছিল কম, দেশের জনগোষ্ঠীর ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মাত্র সাক্ষরতা ছিল।
আমি বিশ্বাস করি, আমাদের বাজেটের ২৫ শতাংশ এবং জাতীয় উৎপাদনের ৬-৮ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দিয়ে আমরা তা করতে পারি। তারপর ক্রমান্বয়ে এই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রতিটি গ্রামে একটি মানসম্পন্ন প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও তাঁদের সামাজিক মর্যাদা কয়েক গুণ বাড়িয়ে, তাঁদের ক্রমাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, পাঠ্যপুস্তক আকর্ষণীয় করে। পাঠদান আনন্দময় করে, গ্রন্থাগার-কম্পিউটার সুবিধা ইত্যাদি নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের এক বেলার আহার দিয়ে, পর্যাপ্ত বৃত্তি দিয়ে, তাদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীলতা বিকাশের পথ নিশ্চিত করে আমরা যাত্রা শুরু করতে পারি। শিক্ষা যে একটি জাতিকে উৎকর্ষের শক্তি জোগাতে পারে, তা তো পৃথিবীর যেকোনো উন্নত দেশের দিকে তাকালেই দেখা যাবে। মালয়েশিয়া অথবা দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি পঞ্চাশ-ষাটের দশকে আমাদের থেকে বেশি এগিয়ে ছিল না। অথচ শিক্ষায় বিনিয়োগ করে এখন তারা কোথায় গেছে, আর আমরা কোথায়! এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে, উচ্চশিক্ষায় দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ উঠলে দ্রুত
তা অস্বীকার করা হয়। অথচ শিক্ষিত বেকার তৈরির পেছনে এ দুই ব্যাধির প্রভাব অনস্বীকার্য।
কোনো দেশে শিক্ষিত বেকার থাকতে নেই, শিক্ষাহীন বেকারও। আমাদের দেশটা তো সব সম্ভবের দেশ। নানা অসম্ভব অপকর্মকে আমরা সম্ভব করেছি। এখন সত্যিকার কিছু সুকর্মকে সম্ভব করে বেকারত্ব নিরসন করার প্রতিজ্ঞা নিলে কেমন হয়?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।