Friday, January 18, 2019

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দৃষ্টিতে সৌদি, বাহরাইন ও আমিরাতে মানবাধিকার পরিস্থিতি

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা পিজিসিসিভুক্ত তিনটি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে 'ভয়াবহ' বলে উল্লেখ করেছে। এই তিনটি দেশ হলো সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন।
পিজিসিসিভুক্ত অপর তিন দেশ কাতার, কুয়েত ও ওমান সবসময় পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে চায়। আর সৌদি, বাহরাইন ও আমিরাত চায় উত্তেজনা ও সহিংসতা জিইয়ে রাখতে। এই তিন দেশ ইয়েমেনের ওপর চার বছর ধরে যে আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে, তা গত কয়েক দশকে মানবিক বিপর্যয়ের অন্যতম উদাহরণ। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করাসহ তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগে সহযোগিতা করা, কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পাশাপাশি দোহার ওপর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা, সিরিয়া ও ইরাকসহ  এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ ইত্যাদি ওই তিন দেশের উত্তেজনা ও সহিংসতা সৃষ্টিকারী নীতির প্রমাণ।
এই তিন দেশের সরকার অন্যান্য দেশে বিশেষ করে সিরিয়া ও ইয়েমেনে নির্লজ্জভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। হেগে'র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য চার ধরনের অপরাধই তারা করেছে। এই চারটি অপরাধ হলো মানবতাবিরোধী অপরাধ, শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং ধর্ষণ। এইসব অপরাধ তারা যে কেবল বাইরের দেশেই করছে তা নয় বরং সংস্থাটির মতে নিজ নিজ দেশেও তারা খোলাখুলি মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে।
বাক-স্বাধীনতা হরণ, সমালোচনাকারী ও বিক্ষোভকারীদের চরম শাস্তি দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে বিভিন্ন আদেশ দেওয়া, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর জেল-জুলুম চালানোসহ আরও বহু রকমের নির্যাতন চালানো সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষুদ্র চিত্র। বাহরাইনে তো জেল-জুলুমের মতো অন্যায়ের পাশাপাশি বিরোধীদের নাগরিকত্বও হরণ করা হয়।
বাহরাইনে ২০১১ সাল থেকে ১৭০ বিক্ষোভকারী অথবা কারাবন্দি নিহত হয়েছে। আলে-খলিফার কারাগারে বন্দি আছেন ৫ হাজারের বেশি রাজনৈতিক নেতাকর্মী। বিনা বিচারে বছরের পর বছর তারা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে কারাগারে। শিয়া মুসলমানদের ওপরও আলেখলিফা সরকারের জুলুমের শেষ নেই।
আলেসৌদ, আলেনাহিয়ান আর আলেখলিফাদের বিরুদ্ধে যে-ই দাঁড়াবে তাকেই প্রাণ অথবা নাগরিকত্ব হারাতে হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের উপ নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ মনে করেন গণসচেতনতা সৃষ্টির কারণে জামাল খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে।

কৃষকদের বিদ্রোহ by শশী থারুর

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যখন ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়েছিল, তখন তিনি ভারতের সব ভোটারকে ‘আচ্ছে দিন’ এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এসব ভোটারের মধ্যে দেশের কৃষকেরাও ছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ২০২০ সালের মধ্যে তাঁদের আয় দ্বিগুণ করে দেবেন। সেই প্রতিশ্রুতি যে পূরণ হয়নি, সে তো দেখাই যাচ্ছে।
ভারতের কৃষি খাত এখন গভীর সংকটে। কৃষকেরা ক্ষুব্ধ। নরেন্দ্র মোদির গত পাঁচ বছরের শাসনামলে কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সরঞ্জামের দাম অনেক বাড়ার ফলে চাষাবাদের খরচও বেড়ে যায়। ফলে কৃষকেরা ঋণ নিতে বাধ্য হন। কিন্তু উৎপাদিত ফসল ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে না পারায় তাঁরা ঋণও শোধ করতে পারেননি। সরকার-প্রতিশ্রুত সহায়তাও তাঁরা পাননি। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তা শোধ করতে না পেরে ২০১৬ সালে গোটা ভারতে ১১ হাজার ৪০০ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। ফলে সারা দেশের কৃষকেরা এখন মোদি সরকারের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।
বিজেপি সরকার কৃষি খাতকে অবহেলা করার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা। এ ছাড়া ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকেরাও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির বিবেচনাহীন ও হঠকারিতাপূর্ণ নোটবন্দী প্রকল্পের (১০০০ ও ৫০০ রুপির নোট বাতিল) ফলে তাঁরা একেবারে পথে বসে যান। যেহেতু তাঁদের মজুরি দেওয়া হতো নগদ অর্থে, নোটবন্দীর ফলে তা আর সম্ভব হচ্ছিল না। আবার বাতিল হওয়া ১০০০ ও ৫০০ রুপির নোটের পরিবর্তে যে নোট দেওয়ার কথা ছিল, তা যথেষ্ট পরিমাণে ছাপানো হয়নি। ফলে লাখ লাখ কৃষিশ্রমিক তখন কাজ হারান। এ ছাড়া ছোট ও মাঝারি শিল্পের এত ক্ষতি হয়েছে যে সেই ক্ষতি এখনো পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
নরেন্দ্র মোদি আগের সরকারের চালু করা মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি স্কিম (এমজিএনআরইজিএস) নিয়েও গন্ডগোল পাকিয়েছেন। এটি একটি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প, যা দেশের গ্রামীণ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবিকা নির্বাহের সুযোগ করে দেয়। প্রকল্পটি প্রতিটি গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারকে প্রতি আর্থিক বছরের ১০০ দিন ন্যূনতম কাজের নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই প্রকল্প গ্রামের দরিদ্র মানুষের কেনার ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করেছে এবং গ্রামের লোকদের কাজের সন্ধানে শহরে আসার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এই প্রকল্পের অর্থছাড়ের বিলগুলো বিজেপি সরকার সময়মতো অনুমোদন না করায় বহু গ্রামীণ শ্রমিক বেশ কয়েক মাস ধরে কোনো টাকা পাননি।
মোদি সরকারের ক্রমাগত ব্যর্থতার কারণে ভারতের কৃষকেরা আজ চরমভাবে হতাশ। আর এ কারণে তাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করছেন তাঁদের কথা শুনতে।
২০১৭ সালে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা রাজধানী নয়াদিল্লিতে গিয়ে ১০০ দিনের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় অনেক কৃষক তাঁদের পরনের কাপড় ছুড়ে ফেলে দিয়ে দেখিয়েছেন যে এ ছাড়া তাঁদের কাছে আর কিছু নেই। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে বিজেপিনিয়ন্ত্রিত রাজ্য মহারাষ্ট্রে প্রায় ২৫ হাজার কৃষক ঋণ মওকুফ, তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং ভূমির অধিকার দাবিতে মিছিল বের করেন। গত নভেম্বর মাসে একই রাজ্যে খরার কারণে ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিতে প্রায় ২০ হাজার কৃষক বিক্ষোভ করেন।
নভেম্বরের শেষ দুই দিনে সারা দেশ থেকে এক লাখের বেশি কৃষক রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ দেখান। তাঁরা ঋণ মওকুফের পাশাপাশি কৃষকদের দুরবস্থা নিয়ে সংসদে জরুরি অধিবেশন ডাকার দাবি জানান। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে সংসদের সাম্প্রতিক অধিবেশনগুলোতে কৃষকদের সংকট নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়েছে এবং তাঁদের সংকট নিরসনে কোনো প্রস্তাব জমা দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
কৃষকদের এই বিক্ষোভের মুখে মোদি সরকার ঠিক কী করবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া না গেলেও এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের প্রচারণায় বিজেপিবিরোধী জোট দলটির ব্যর্থতার বিষয়টিকেই বড় করে তুলে ধরবে। ভারতের তিনটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস জয়লাভ করার পর কৃষকদের ঋণ মওকুফসহ নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
তবে ঋণ মওকুফই একমাত্র সমাধান নয়। ভারতের কৃষকদের মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করতে হবে। কৃষি বিষয়ে সরকারের নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। আগামী নির্বাচনে যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের দেশের কৃষির বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত
শশী থারুর ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গারা ভারতীয় পাসপোর্টে যাচ্ছে সার্বিয়া -ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট

ভারতে অবৈধ অভিবাসনে নতুন এবং অতিশয় অভিনব  অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। কেরালার কোচি প্রশাসন দাবি করছে, বাংলাদেশি ও  রোহিঙ্গারা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভারতীয় পাসপোর্ট যোগাড় করে তারা ভারত হয়ে সার্বিয়ার মতো ইউরোপীয়  দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু বাংলাদেশি আটক হয়েছে। আরো বেশি সংখ্যায় ধরা পড়তে যাচ্ছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে পুলিশ একটি আন্তঃরাজ্য আদম পাচারকারী চক্রকে ধরেছিল। তারা স্কুল সার্টিফিকেট,  ভোটার আইডি, প্যান কার্ড/আধার প্রদান করে অবৈধ অভিবাসীদের ভারতীয় বানানোর চেষ্টায় ছিল। কেরালা বিমানবন্দরে এই ঘটনা ঘটে। ১৫ই জানুয়ারি প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে তারা কলকাতায় পৌঁছায়। তাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল হায়দরাবাদ হয়ে কেরালা রাজ্যের কোচি। তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য অবশ্য অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডা থেকে সার্বিয়ার মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে বিস্তৃত। এই অভিযানের আন্তর্জাতিক পদচিহ্ন উন্মোচিত করে কেরালা পুলিশ। এরপর তাতে যুক্ত হয় গোয়েন্দা ব্যুরো এবং জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)। উভয়ই সংস্থাই তদন্ত শুরু করেছে।
উদ্বেগজনকভাবে ডজনখানেক বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গার কানাডা এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে অবৈধ অভিবাসনের পরিকল্পনায় কোচি মুখ্য পাচার পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে।  এই অবৈধ অভিবাসীরা তাদের গন্তব্যস্থলে  পৌঁছানোর সময় তারা সবাই ‘‘বৈধ ভারতীয় দলিল’’ দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সজ্জিত থাকবে। মাত্র কয়েক মাস আগেই কেরালা পুলিশ এই অবৈধ মাইগ্রেশন চক্রের বিরুদ্ধে একটি সাফল্যজনক পদক্ষেপ নিতে  পেরেছিল। অথচ এখন দেখা গেল এই দালালদের হাত অনেক লম্বা। কেরালা পুলিশ দল হায়দরাবাদ থেকে সুমিত বড়ুয়াকে  গ্রেপ্তার করেছে। তাকেই মূল চাবিকাঠি বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তারা আগামী দিনগুলোতে আরো গ্রেপ্তার করার আশংকা করছে। তাদের আশঙ্কা হলো হায়দরাবাদের সরকারি কর্মকর্তা এবং পুলিশ এতে জড়িত। মি. বড়ুয়া এখন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাজ্য পুলিশ  হেফাজতে রয়েছে।
এরনাকুলাম জেলা পুলিশ প্রধান রাহুল আর নায়ার এবিষয়ের অগ্রগতি তদারক করছে।  ২০১৮ সালের নভেম্বরে উত্তর প্রদেশ পুলিশ কর্তৃক একই ধরনের একটি চক্রকে আটক করেছিল। পাঁচ বাংলাদেশি অভিবাসী ও তাদের হ্যান্ডলারকে তখন আটক করা সম্ভব হয়। তারাও বাংলাদেশিদের স্কুল সার্টিফিকেট এবং ভোটার আইডি সহ  বেশ কয়েকটি দলিল বহন করছিল। মি. নায়ার বলেন,  ‘সারা দেশজুড়ে একই চক্র সক্রিয় রয়েছে। আমরা এটির বিস্তারিত তদন্ত করছি।’’
এদিকে  ডিএসপি কে এস উদধারণু, যিনি এই মামলার তদন্তকারী পুলিশ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তার কথায়, ‘‘আমাদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী গত কয়েক বছরে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় অনেক বাংলাদেশি নাগরিক ভারতীয় নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে শুরু করেছে। গত দুই বছরে এই প্রতারণামূলক মাইগ্রেশন বিভিন্ন ভারতীয় বিমানবন্দর থেকে ঘটে চলেছে। এর মধ্যে কোচি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক । যে কেউ এই চক্রের মাধ্যমে ভারত থেকে মাইগ্রেশন করতে পারেন।
একজন সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা যেই  হোন না কেন, এই চক্রের পরিষেবা ব্যবহার করে যে কেউ ভারত থেকে মাইগ্রেট করতে পারেন। এজন্য  পেমেন্ট প্রতি ব্যক্তির জন্য এক লাখ  থেকে দেড় লাখ রুপি খরচ করতে হবে। আমাদের তদন্ত অনুযায়ী, কমপক্ষে এক ডজন অবৈধ অভিবাসী গত পাঁচ থেকে ছয় মাসে এই চক্রের সহায়তায় কোচি বিমানবন্দর থেকে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। তবে এই  সংখ্যা বাস্তবে অনেক বেশি হতে পারে। তদন্ত দলটি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে বলেছে,  প্রথমত কলকাতা থেকে স্কুল সার্টিফিকেট আসে যা ভারতীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার প্রমাণ দেয়। স্কুল  রেকর্ডের মাধ্যমে দেখানো হয় তারা  বেশিরভাগই সপ্তম থেকে অষ্টম  শ্রেণি পাস করেছে। এরপর তাদের কর্মস্থল দাঁড়ায় হায়দরাবাদ। যেখানে তাদের নামে বসবাসের সার্টিফিকেট জারি করা হয়। তদন্ত দল বলছে, স্পষ্টতই সরকারি কর্মকর্তারা জড়িত বলে মনে হচ্ছে। গত এক বছরের বা তার চেয়েও বেশি সময় একটি বিশেষ ঠিকানায় তাদের আবাসিক ঠিকানার সাক্ষ্য বহন করে। আর এই দলিলটিই তাদেরকে ভোটার আইডি, আধার কার্ড এবং একটি ভারতীয় পাসপোর্ট পেতে সহায়তা  দেয়। পুলিশ ভেরিফিকেশন তারা যে  পেয়ে যায়, সেটা প্রমাণ করে যে, পুলিশের একটি চক্র এর সঙ্গে জড়িত।

কেনিয়া কেন আল-শাবাবের লক্ষ্য হয়ে উঠছে?

গত ৫ বছরে জঙ্গি সংগঠন আল-শাবাব কেনিয়ায় ২০টিরও অধিক সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। এতে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০০ মানুষ। আল-শাবাব মূলত আফ্রিকার শিঙ হিসেবে খ্যাত সোমালিয়ার জঙ্গি সংগঠন। এদের উদ্দেশ্য সোমালিয়ায় ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ২০১১ সাল থেকে তারা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র কেনিয়াতেও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। ২০১৩ সালে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে একটি শপিং কমপ্লেক্সে আল-শাবাবের হামলায় ৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। আল-শাবাবের ক্ষোভ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রতিও। ২০১৫ সালের এপ্রিলে কেনিয়ার গারিসা শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গি সংগঠনটির ভয়াবহ হামলায় নিহত হন কমপক্ষে ১৪৭ জন।
আর এ সপ্তাহে, নাইরোবির একটি হোটেল কমপ্লেক্সে আল-শাবাবের হামলায় নিহত হয় কমপক্ষে ২১ জন। এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি আরো অর্ধ শতাধিকের।
আল-শাবাব যদিও সোমালিয়ায় ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে কেনিয়ায় কেনো সংগঠনটি হামলা করে যাচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে চলে যেতে হবে ২০১১ সালে। তখন উপকূল এলাকা থেকে নারীসহ কেনিয়ার নাগরিকদের অপহরন শুরু করে আল-শাবাব। এর প্রেক্ষিতে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র সোমালিয়ায় আল-শাবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সেনা পাঠায় কেনিয়া। সোমালিয়ার সেনাদের সঙ্গে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে জঙ্গিদের হাত থেকে দক্ষিনাঞ্চলীয় বেশ কয়েকটি শহর উদ্ধার করে কেনিয়া। এরপর থেকেই কেনিয়ায় হামলা চালাতে শুরু করে সংগঠনটি। আল-শাবাবের মুখপাত্র শেখ আলি ধিয়ারি ২০১৪ সালে জানিয়েছিল, ‘মুসলিমদের ভূমি’ সোমালিয়ায় অভিযান চালিয়েছে কেনিয়া। তাই এর প্রতিশোধ নেয়া আমাদের কর্তব্য।
সংগঠনটি জিবুতি ও উগান্ডাতেও হামলা চালিয়েছে। সোমালিয়ায় স্থিতিশীলতা আনতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে এ দেশদুটি সেনা পাঠিয়েছিল। ২০১০ সালে উগান্ডার রাজধানী কামপালাতে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণে ৭০ জন নিহত হয়েছিলেন। এর চার বছর পর আল-শাবাব জিবুতির একটি রেস্টুরেন্টে হামলা চালায়। কেনিয়ার সঙ্গে সোমালিয়ার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। বেশিরভাগ হামলা এর ৬০০ কিলোমিটারের মধ্যেই হয়ে থাকে। আল-শাবাব জঙ্গিরা সীমান্ত অতিক্রম করে হামলা চালিয়ে থাকে। তবে আল-শাবাবে কেনিয়ার মুসলিমদের যোগদান কেনিয়ার জন্য আরো ঝুকির সৃষ্টি করে। গারিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পরিকল্পনাকারী মোহাম্মদ কুনো দুলিয়াদায়ন ছিল কেনিয়ার নাগরিক। সম্প্রতি সোমালিয়ার সেনারা তাকে হত্যা করে।

প্রতি তিনজনে একজন নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার -অ্যাকশন এইডের প্রতিবেদন

দেশে নারীদের প্রতি তিনজনের একজন পারিবারিক সহিংসতার শিকার। সহিংসতার শিকার হওয়া নারীদের মাত্র তিন ভাগের মতো বিচার পান। এসব ঘটনায় মামলা হয় মাত্র ১০ শতাংশ। অধিকার সংস্থা অ্যাকশন এইডের এক গবেষণায় এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষণার সংক্ষেপ গতকাল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। দুপুরে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের হল রুমে এই গবেষণা প্রবন্ধ উন্মোচন করা হয়। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, প্রচলিত ধারণা এবং পিতৃতান্ত্রিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিশ্বাস হচ্ছে ‘নারীরা ঘরেই বেশি নিরাপদ’।
কিন্তু, প্রকৃত সত্য হচ্ছে নারীদের প্রতি বেশির ভাগ সহিংসতা বাড়িতে সংগঠিত হয়। ঘরের প্রতি তিন জনের মধ্যে দুই জন নারীই নানাভাবে পরিবারের লোকজনের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন।
বাংলাদেশের ২০টি জেলায় সংঘটিত সহিংসতার তথ্য, পুলিশের কাছে রিপোর্ট হওয়া অভিযোগ, বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম, জে এন এন পি এফ এর নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বিরোধী সরকারি সংস্থা এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মিডিয়া প্রতিবেদন থেকে নেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন।
এ গবেষণায় বলা হয়েছে, নারীরা ঘরেই বেশি নিরাপদ এই প্রচলিত বিশ্বাস এমন একটি অনুমানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে, জনপরিসরে নারী নিরাপত্তাকে তা আরো বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। এখন পর্যন্ত কোনো আইনই এটা মানতে রাজি নয় যে, বিয়ের পর নারীরা ধর্ষণের শিকার হতে পারে।
গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা সম্পর্কিত মামলাগুলোর প্রতি পাঁচটির মধ্যে চারটি মামলাই আদালতে উত্থাপিত হতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তারপর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সহিংসতায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৩ দশমিক ১ শতাংশ নিজেদের পক্ষে বিচার পায়, ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না বা গেলেও বাতিল হয়ে যায়।
আদালত মামলা খারিজ করে দেয়ার বা আসামিকে খালাস দেয়ার সম্ভাবনা ৩২ শতাংশ। শুধু মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ মামলা থাকে পারিবারিক বিরোধ সংক্রান্ত। যদিও বেশির ভাগ অভিযোগ পারিবারিক সহিংসতা সম্পর্কিত। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৭৫ শতাংশ প্রতিবেদনে ধর্ষণ বা সংঘবদ্ধ ধর্ষণ সম্পর্কিত। গবেষণার তথ্য মতে, সহিংসতা প্রতিবেদন কম হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- অভিযোগ দাখিল সংক্রান্ত কোনো তথ্য থাকে না, এলাকার ক্ষমতাসীনদের বাধা এবং হস্তক্ষেপ, সুশাসনের অভাব, ঘরে নারী নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো সচেতনতামূলক কার্যক্রম না থাকা, মামলার ধীর গতির কারণে ভুক্তভোগীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে অভিযোগ নিয়ে যেতে চায় না, বেশির ভাগ সময়ই ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে রায় যায়, যা তাদের আরো সমস্যায় ফেলে দেয়।
অনুষ্ঠানে ‘কর্ম এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ২০০৯ বাস্তবায়ন’ বিষয়ক পৃথক একটি গবেষণাপত্রও উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাটি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন। এতে বলা হয়েছে, কর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন একটি তাৎপর্যপূর্ণ রায় বা নির্দেশনা ঘোষণা করে। তবে এ নির্দেশনা প্রণয়নের দীর্ঘ নয় বছর পরেও কর্ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা বা কৌশল হাতে নিতে দেখা যায়নি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি প্রতিরোধসংক্রান্ত কমিটির কথা জানেন না। ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা সম্পর্কে জানেন না।  কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অসচেতনতার উল্লেখযোগ্য অভাবের কথা ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৪ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা নির্দেশনা সম্পর্কে জানলেও এ বিষয়ে কোনো পরিষ্কার ধারণা তাদের নেই। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে।
এর মধ্যে  উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং নিজ ঘরে এর ব্যাপকতা নির্মূল করার জন্য একটি আইন করা এবং তার বাস্তবায়ন করা, নারীরা যেন ঘরে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলো চিহ্নিত করতে পারে সেজন্য তাদের সচেতন করতে হবে ও ক্ষমতা বাড়াতে হবে, নারীরা যাতে সহিংসতার ঘটনার প্রতিবাদ, প্রতিরোধ কিংবা অভিযোগ করতে পারেন সেজন্য সব তথ্য দেবেন এবং সহযোগিতা নিশ্চিত করবে সরকার। সুপারিশে গণমাধ্যমকে পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারে নজর দেয়ার জন্য এবং সরকারকে দেশের আইনে বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে  এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ এর ডেপুটি ডিরেক্টর ফারিয়া চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল করিম, দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ হারুন উর রশীদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামিয়া হক, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের উপকমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কাজী রিয়াজুল হক বলেন, নারীদের প্রতি সহিংসতা ও যৌন হয়রানি এটা আমাদের সমাজে নতুন কিছু নয়। এটা শুধু আমাদের দেশের নয় এটা বৈশ্বিক সমস্যা। এই সমস্যা সামাধানে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও সচেতন হতে হবে। আমাদের সংবিধানে পরিষ্কার করে বলা আছে নারী-পুরুষের সমান অধিকার সম্পর্কে। সবাইকে সচেতনার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে আরো সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রশাসন যদি সচেতন হয় তাহলে আরো গভীরভাবে এই সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে।

‘নিষিদ্ধ হলেও অসুবিধা নাই’ by নাজনীন আখতার

‘আপনার এখানে সব পলিথিন ব্যাগ পাওয়া যায়?’
‘হুঁ, কোনটা চান! সব ধরনের আছে।’
‘হাতলওয়ালাও আছে? ধরে বহন করা যায়?’
‘হ আছে, এই যে, কোন সাইজ লাগব?’
‘এগুলো না নিষিদ্ধ!’
‘হ।’
‘তাহলে বিক্রি করেন কেন?’
‘বিক্রি করলে কোনো অসুবিধা নাই।’
‘কোত্থেকে আনেন এগুলো?’
‘কারখানা থেইকা।’
‘কারখানা কোথায়?’
‘জানি না।’
কথা হচ্ছিল কারওয়ানবাজারে পলিথিনের পাইকারি দোকান মাহিন প্যাকেজিং স্টোরের কর্মী ফেরদৌসের সঙ্গে। শুরু থেকে গা–ছাড়া একটা ভাব নিয়ে জবাব দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। জানালেন, ১৩-১৮ ইঞ্চি আকারের রঙিন পলিথিন পাইকারি দরে প্রতি কেজি ১৬০ টাকায় বিক্রি করেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর এই প্রতিবেদক ক্রেতা না বুঝতে পেরে ‘খামাখা’ কথা বলা থেকে বিরত রাখলেন নিজেকে। সরাসরি কথা না বলে হুঁ–হাঁ করে যেতে লাগলেন।
ঢাকার কারওয়ান বাজারে এই দোকানের মতো সারি সারি পলিথিনের দোকান রয়েছে। কেউ হাতলওয়ালা পলিথিনের স্মৃতি খুঁজতে চাইলে এখানে আসতে পারেন। কারণ, এখানে প্রায় ১৭ বছর আগে নিষিদ্ধ পলিথিনের সেই হারানো ‘শপিং ব্যাগ’ খুঁজে পাওয়া যায়। শুধু এখানে পাওয়া যায়—বললে ভুল হবে। পুরো শহর, সারা দেশের বিভিন্ন জায়গা এখন নিষিদ্ধ পলিথিন শপিং ব্যাগে সয়লাব।
প্রায় হারিয়ে যাওয়া সেই পলিথিন ব্যাগ খুঁজে পেয়ে কেউ স্মৃতি কাতর হবেন, নাকি ক্ষুব্ধ হবেন—তা ব্যক্তি–ইচ্ছার ওপর ছেড়ে যাওয়া যায়। স্বরূপে হাতওয়ালা সেই পলিথিনের শপিং ব্যাগ এখন আমার আপনার হাতেই পণ্যবোঝাই হয়ে ঘোরে।এর কিছু ‘সুবিধা’ তো আছেই! সেসব সুবিধার কথাও তো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা যায় না। মাঝে বাজারে যেতে হলে বাসা থেকে চটের ব্যাগ বহন করে নিয়ে আসার ‘ঝামেলা' ছিল। সেই ‘ঝামেলা থেকে মুক্তি’ দিচ্ছে এই পলিথিন। মনে হতে পারে, ফুড চেইনের মাধ্যমে এই পলিথিন ঘুরে ঘুরে কত বছরে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে সমূহ বিপদ ঘটাবে, তা নিয়ে এত তাড়াতাড়িই কেন মাথা ঘামানো! এর পরও মারাত্মক স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকির বিষয়টা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পলিথিন ব্যাগের পাইকারি দোকানগুলোর ওপর পণ্যের দোকান নির্ভরশীল। বিক্রি হওয়া পণ্য পলিথিনের ব্যাগে ভরে ক্রেতার হাতে তুলে দিচ্ছেন দোকানি। তএগুলোর চেহারা কিছুটা ভিন্ন। এই পলিথিনের ব্যাগগুলো হাতলহীন, ধরার মতো আলাদা সুবিধা নেই্। পণ্য ভরে ওপরে গিঁঠ মেরে ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি তুলে ধরতে মেসার্স আহাদ জেনারেল স্টোরের মালিক মো. জহির হোসেন তুমুলবেগে মাথা নাড়িয়ে বললেন, ‘এইগুলা ওইগুলা না। আমরা ওইগুলা রাখি না, নিচের দোকানে রাখে।’
ওই সময় পলিথিনের ব্যাগে করে পণ্য কিনে যাচ্ছিলেন এক ক্রেতা। পলিথিনের এই ব্যাগ ব্যবহার প্রশ্নে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলেন, ‘বাসা থেকে ব্যাগ আনা হয় না। এই জন্যই...।’

২০০২ সালের ৮ এপ্রিল পরিবেশ অধিদপ্তর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কিছু শর্ত সাপেক্ষে পলিথিনের সব ধরনের শপিং ব্যাগ উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রি, বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুত ও বিতরণ নিষিদ্ধ করে। সেই সময় আইনটি বেশ সফলভাবে প্রয়োগও হয়। কাগজের ঠোঙা আর কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন ক্রেতারা।
আইন প্রয়োগে ব্যর্থতার কারণেই নিষিদ্ধ পলিথিন শপিং ব্যাগ ফিরে এসেছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক আবদুস সোবহান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, যারা আইন প্রয়োগ করবেন, এটা সম্পূর্ণ তাদের ব্যর্থতা। জানতে চাইলেই তাঁরা বলবেন, ‘লোকবল নেই, পলিথিন ব্যাগের বিকল্প নেই’। এসব অজুহাত অগ্রহণযোগ্য।
আবদুস সোবহান বলেন, পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর এটা বেশ সফলতা পেয়েছিল। পলিথিনের ব্যাগের জায়গায় কাগজের ঠোঙা বিক্রি হতো। নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ আবার বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প ব্যবস্থাটিও বন্ধ হয়ে গেল। সারা দেশ পলিথিনের ব্যাগে ছেয়ে গেছে। সুপার শপগুলোতে যেসব কাপড়ের ব্যাগের মতো দেখতে ব্যাগে পণ্য দেয়, সেগুলো কাপড় নয়। ওই ব্যাগগুলো পোড়ালেই বোঝা যায় যে, তা কাপড় নয়, পলিথিন। কাপড় পোড়ালে যেমন ছাই হওয়ার কথা, সেগুলো পোড়ালে তেমন হয় না। তিনি বলেন, ভোক্তাদেরও পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার বন্ধে সচেতন হতে হবে। পলিথিন পচনশীল না হওয়ায় তা নালা–নর্দমা বন্ধ করে ফেলে। পানিতে পলিথিনের বর্জ্যের স্তূপ দেখা যায়। পলিথিন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে যাওয়ার পর সেগুলো মাছ খায়। সেই মাছ আমরা চাই। এভাবে ফুড চেনের মাধ্যমে ক্ষতিকর পলিথিন আমাদের দেহে প্রবেশ করছে।
পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধে আবার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সুলতান আহমেদ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ৫৫ মাইক্রন পুরুত্বের নিচে পলিথিনের শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ। বাজার থেকে এই ব্যাগগুলো নির্মূল করতে অভিযান চালানো হচ্ছে। বাজার মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। পলিথিন তৈরির অনেক অবৈধ কারখানা সিলগালা করে দেওয়া হচ্ছে। এখন যেসব পলিথিন উৎপাদন হচ্ছে তা গোপনে তৈরি করে ভাসমান অবস্থায় বিক্রি করা হয়। খুব শিগগিরই নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর বড় ধরনের অভিযানে নামবে বলে তিনি জানান।
পলিথিনের ব্যাগ ফিরে আসার কারণ সম্পর্কে সুলতান আহমেদ বলেন, মানুষের হাতে বিকল্প কিছু দেওয়া যায়নি। মানুষকেও সচেতন হতে হবে। অনেকে বাজারে ব্যাগ ছাড়া চলে যান। বিক্রেতারা বিনা মূল্যে এই পলিথিন ব্যাগ দিয়ে থাকে।
মহাপরিচালক বলেন, পাটের তৈরি সোনালি ব্যাগ বাজারে এসেছে। এটা পলিথিনের ব্যাগ বন্ধে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। পলিথিন থেকে জ্বালানি তেল তৈরি করে এক তরুণ সাফল্য দেখিয়েছেন। প্রতি জেলায় পলিথিন ব্যাগ থেকে জ্বালানি তেল তৈরির ব্যবস্থা নিলে বর্জ্য পলিথিনগুলো কাজে লাগানো যাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পলিথিনের সব ধরনের শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করে সাজার ব্যাপারে বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে প্রথম অপরাধের দায়ে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে অন্যূন দুই বছর, অনধিক দশ বছরের কারাদণ্ড বা ন্যূনতম দুই লাখ টাকা, অনধিক দশ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন অপরাধীরা।
বিক্রি, বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুত, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের দায়ে অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের দায়ে অন্যূন দুই বছর, অনধিক দশ বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন দুই লাখ টাকা, অনধিক দশ লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন অপরাধীরা।

৮৮ ‘বাংলাদেশির’ ভারতীয় নাগরিকত্বের দরখাস্ত বিবেচনাধীন -ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট

ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসে যারা ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছেন এমন ৮৮ জনের রেকর্ড এখন ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে। এই হিসাব ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। গতকাল ১৭ই জানুয়ারি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দেয়া হয়েছে।
সূত্রগুলো ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে নিশ্চিত করেছে যে, ৩৪০০ এর বেশি সংখ্যক আবেদনকারী ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছে। তারা পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানের বাসিন্দা। বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে  তাদের আবেদনগুলো বিবেচনাধীন রয়েছে। এসব আবেদনের মধ্যে ২৬শ’ পাকিস্তান থেকে এবং সাত শ’ এসেছে আফগানিস্তান থেকে। যদিও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ধর্মভিত্তিক পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করে না।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে ২০১৬ সালে ভারত সরকার ভারতের পার্লামেন্টে নাগরিকত্ব সংশোধন বিল উপস্থাপন করে।
এই বিলের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভারদতের প্রতিবেশী দেশগুলোর ছয়টি নির্যাতিত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়কে নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এই ছয়টি সংখ্যালঘু সমপ্রদায় হচ্ছে, হিন্দু, জৈন, শিখ, পার্সি, খ্রিষ্টান এবং বৌদ্ধ। পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে ২০১৪ সালের আগে যারা ভারতে নাগরিকত্ব পেতে আবেদন করেছেন তাদের  বিষয়ে ভারতে বিশেষ করে আসাম এবং উত্তর পূর্ব ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলিতে ব্যাপক প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। আসামের অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন এবং নর্থ ইস্ট স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন এই বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ দেখিয়ে চলেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে যে নির্যাতন চলছে এবং সেকারণে তারা যে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের বোঝা আসাম অসমানুপাতিক হারে বহন করছে। এই বোঝা শুধু একা আসামের পক্ষে বহন করা উচিত নয়।
ইন্ডিয়ান নাগরিকত্ব বিলে ২০১৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের আগে ভারতে পৌঁছানো হাজার হাজার অভিবাসীকে নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয় আছে। আর এই বিলটি ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির বিরুদ্ধ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনলাইনে দেখা যাচ্ছে ২০১৫ সালে ৬০৫ জনকে ২০১৬ সালে ১১৬ জনকে এবং ২০১৭ সালে ৮১৬ জনকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, অনলাইনে নাগরিকত্বের জন্য আবেদনের জমা নেয়া শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। এর আগে এই ধরনের দরখাস্ত নেয়া হতো তবে তা ছিল অফলাইন। ২০১০ সালের আগে যেসব দরখাস্ত অফলাইনে করা হয়েছিল, তার মধ্যে কিছু সংখ্যক এখনো বিভিন্ন রাজ্য সরকার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিবেচনাধীন রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে আরো বলেছে, ২০১৮ সালে ১০ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে লং টার্ম ভিসা বা দীর্ঘমেয়াদি ভিসা (এলটিভি) দেয়া হয়েছে। ১৪ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে ১০ হাজারের বেশি জনকেই এলটিভি মঞ্জুর করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তারা আরো বলেছেন গত চার বছরে পাকিস্তান থেকে নির্যাতিত হয়ে ভারতে আসা ১১ হাজার জনকে এলটিভি দেয়া হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কত জনকে এলটিভি দেয়া হয়েছে তার পরিসংখ্যান পত্রিকা রিপোর্টে উল্লেখ নেই। বরং বলা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে আসা কতজনকে এলটিভি দেয়া হয়েছে এবং তাদের মধ্যে কতজন আসামে বসবাস করছেন, সেই সংখ্যা এখনো আলাদা করা হয়নি।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে যারা এলটিভি ভিসা পেয়েছেন তাদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। যেমন তারা ভারতে সম্পত্তি ক্রয়, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং প্যান এবং আধার কার্ড সংগ্রহ করতে পারেন।

যে বাজারে গবেষণা কেনাবেচা হয় by সাদিকুর রহমান

(স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণার কোর্স থাকেঃ নীলক্ষেতের দোকানগুলোতে চুরি করা গবেষণাপত্র বিক্রিঃ মৌলিক গবেষণা চুরি করে নতুন থিসিসের রূপ দেওয়া হয়ঃ ইন্টারনেট থেকেও বিভিন্ন গবেষণার কপি সংগ্রহ করা হয়ঃ ফরমাশ করলে শিক্ষার্থীদের সাহায্যে তাও বানায় দোকানিরা)
‘ভাই কী লাগবে? এই দিকে আসেন!’
‘থিসিস আছে?’
‘প্লাস্টিক কার্ড তো?’
‘হুম’
‘এই দিকে আসেন।’
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পরিচয়ে নীলক্ষেতের সিটি করপোরেশন মার্কেটের তৃতীয় গলিতে ছাপা ও বাঁধাইয়ের একটি দোকানে গবেষণাপত্রর খোঁজ করছিলেন এই প্রতিবেদক। দোকানির ভাষায় সেটাই প্লাস্টিক কার্ড।
কিন্তু সাংকেতিক ভাষা কেন? নীলক্ষেতের এ দোকানগুলোতে চুরি করা গবেষণাপত্র তথা থিসিস বিক্রি হয়। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থী পানির দরে তা কিনে নিজের গবেষণা হিসেবে জমা দেন। এ অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের শেষে প্রমাণ সংগ্রহের জন্যই গত ১৬ নভেম্বর ছদ্মপরিচয়ে সেখানে প্রতিবেদকের যাওয়া।
ক্রিকেট অথবা সামাজিক বিজ্ঞানের যেকোনো বিষয়ে থিসিস চাইলে দোকানি কম্পিউটার ঘেঁটে একটি পিডিএফ কপি দেখান। সেটায় মূল লেখকের নাম ছিল না। দোকানি সফট কপির দাম চাইলেন ১৫০ টাকা। আর সম্পাদনা, প্রিন্ট ও বাঁধাই বাবদ ৮০০ টাকা। দাম রফা হলে তিনি থিসিসটিকে পিডিএফ থেকে ওয়ার্ড ফাইল করলেন। তারপর গবেষণার সূচনা ও সাক্ষাৎকারদাতাদের নাম রদবদল আর বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ওপর-নিচ করা বা বাদ দেওয়ার কাজ চলল। ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে তৈরি হয়ে গেল স্নাতকোত্তর শ্রেণির একটি গবেষণাপত্র।
গত ১২ ও ১৪ নভেম্বর এই বাজার ঘুরে এমন অন্তত ২১টি দোকানের খোঁজ পাওয়া যায়। সাইনবোর্ডগুলোতে লেখা ‘এখানে থিসিস, মনোগ্রাফ, টার্মপেপার প্রিন্ট ও বাঁধাই করা হয়’।
পরিচিত একজন দোকানি বলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মৌলিক গবেষণাপত্র চুরি করে নতুন থিসিসের রূপ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা দোকানে গবেষণাপত্র ছাপাতে ও বাঁধাই করতে এলে সেটার একটি সফট কপি তাঁরা রেখে দেন। ইন্টারনেট থেকেও বিভিন্ন গবেষণার কপি সংগ্রহ করেন।
কয়েকজন দোকানি বলেন, বিশেষ চাহিদা জানিয়ে ফরমাশ করলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সাহায্য নিয়ে তাঁরা সেটাও বানিয়ে দেন। দাম পড়ে চার হাজার টাকা। সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই ছয় মাস বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার কোর্স পড়ানো হয়। এটাই ব্যবসার মৌসুম।
দুদিনে চার ঘণ্টা নীলক্ষেতে বিভিন্ন দোকানে ঘুরেছেন এই প্রতিবেদক। তখন তিনটি দোকান থেকে সাতজনকে থিসিস কিনতে দেখেছেন। তাঁদের চারজনের পরিচয় জানা যায়। দুজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, একজন স্ট্যামফোর্ড আর একজন প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী।
শেষোক্ত শিক্ষার্থী পর্যটনবিষয়ক থিসিস খুঁজছিলেন। দোকানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একটি থিসিস দেখান। পছন্দ না হওয়ায় শিক্ষার্থী দুই নম্বর গলির আরেকটি দোকানে যান। সেখানে ২০১২ সালে করা একটি থিসিস তাঁর পছন্দ হয়। দাম ঠিক হয় ৮০০ টাকা। তাঁর চাহিদামতো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও তারিখসহ রদবদল করে দেন দোকানি।
দুই দিন পর মুঠোফোনে এ শিক্ষার্থীর সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়ে কথা বলতে চাইলে নাম না প্রকাশের অনুরোধ করে তিনি বলেন, ‘ওই থিসিস জমা দেইনি। আমার গবেষণার বিষয়ের সঙ্গে মিলে নাই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ড হলো গবেষণা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘কিন্তু এখন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে পিএইচডি চুরির অভিযোগ ওঠে, শিক্ষার্থীদের থিসিস বিক্রি হয় রাস্তার ধারের দোকানে। রাস্তাতেই যদি গবেষণা হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কি দরকার?’
মৌলিক জ্ঞানচর্চা শেখানোর জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গবেষণার কোর্স থাকে। মৌলিক বিষয় নির্বাচন থেকে মাঠে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা এবং গবেষণা প্রতিবেদন লেখার কাজটি শিক্ষার্থী করেন একজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে। তিনি ছয় মাস থেকে এক বছর সময় পান। নীলক্ষেতে গবেষণাপত্র কিনলে এর কিছুই করতে হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকেরা রচনাচুরি (প্লেজ্যারিজম) ধরার জন্য বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করেন। কিন্তু দোকানিরা বলেছেন, তাঁরাও একই ধাঁচের সফটওয়্যার ব্যবহার করে রচনাচুরি ধরা পড়ার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো শনাক্ত করেন। তারপর সেগুলো এদিক-সেদিক করে রচনাচুরির আলামত কমানো হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের গবেষণা তত্ত্বাবধান করেছেন অধ্যাপক ফাহমিদুল হক। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা জালিয়াতি শিখে পাশ করলে কর্মক্ষেত্রেও তাঁরা জালিয়াতির আশ্রয় নেবেন। এই দুই শিক্ষকেরই মত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন খুব কম গবেষণা হয়। চুরি করা গবেষণাপত্রের কেনাবেচা চলতে থাকলে সেটুকুও হবে না।
২০১৭ সালের নভেম্বরে এই অনুসন্ধানের গোড়ায় নীলক্ষেতে একই বাজারের দুই নম্বর গলিতে গিয়ে প্রতিবেদক এক দোকানিকে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর জন্য থিসিস সম্পাদনা করতে দেখেন। প্রতিবেদক জরুরি ভিত্তিতে ক্রিকেটবিষয়ক একটি থিসিসের সফট কপি কিনতে চান। দোকানি ‘প্রেডিক্টিং এ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ম্যাচ রেজাল্ট হোয়াইল দ্যা ম্যাচ ইজ ইন প্রোগ্রেস’ নামের একটি গবেষণাপত্র দশ মিনিটের মধ্যে কিছু রদবদল করে পেনড্রাইভে দিয়ে দেন।
গবেষণাপত্রের প্রচ্ছদে লেখক হিসেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের চার শিক্ষার্থীর নাম ছিল। তাঁরা ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে থিসিসটি জমা দিয়েছিলেন। আর দোকানটির কম্পিউটারে এর ফাইল ঢুকেছিল (ক্রিয়েটেড) ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর।
গত ১৬ নভেম্বর গিয়ে দেখা যায়, এ যাবৎ থিসিসটি ছয়বার সম্পাদিত ও বিক্রি হয়েছে। গবেষণাটির সহ-তত্ত্বাবধায়ক প্রভাষক মঈন মোস্তাকিম বলছেন, গবেষণাটি করতে এক বছর লেগেছিল। গবেষণাপত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়। সেখান থেকে অথবা প্রিন্ট করার সময় সেটি চুরি হয়ে থাকতে পারে।
এই শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, ‘গবেষণায় বেশ কিছু জটিল গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। সাধারণ একজন দোকানি কীভাবে গবেষণা সম্পাদনা করেছেন, সেটিই তো মাথায় ঢুকছে না।’
শিক্ষার্থীরা কেন নীলক্ষেতমুখী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ সালে স্নাতকোত্তর পাস করা এক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিচিত বড়ভাইয়ের মাধ্যমে নীলক্ষেতে গবেষণা তৈরির কথা শুনি। পরে সেখান থেকে কিনে বিভাগে জমা দিয়েছিলাম।’ রচনাচুরি ধরা পড়ায় প্রথমে তাঁর গবেষণাপত্রটি গৃহীত হয়নি। শিক্ষকেরা সংশোধন করে আনতে বললে তিনি দোকান থেকে রচনাচুরির হার কমিয়ে এনে জমা দেন। আর সমস্যা হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর গবেষণা জালিয়াতি ধরা পড়লে বিভাগীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়াটাই রেওয়াজ। নৃবিজ্ঞান বিভাগ ২০১৬-১৭ সালে চারজন শিক্ষার্থীকে জালিয়াতির জন্য জরিমানা করেছিল। তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান হাসান আল শাফী প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছরই পাঁচ-ছয়জন শিক্ষার্থীর মনোগ্রাফ ও থিসিস জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে তাঁদের সফটওয়্যার বাংলা লেখায় রচনাচুরি ধরতে পারে না।

বিশ্বে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সমাবেশ

ভারতে শুরু হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় আয়োজন কুম্ভমেলা। ১৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই মেলা চলবে ৪ মার্চ পর্যন্ত। মেলায় প্রতিবার ১০ কোটির বেশি তীর্থযাত্রী পূণ্য স্নান করতে আসেন।  এ বছর হিন্দুদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উৎসব কুম্ভমেলায় খরচ করা হবে ৭৫০ কোটি রুপি। এ প্রসঙ্গে ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রী মহেশ শর্মা বলেন, ইউনেস্কো সম্মানের পর, এটি আমাদের প্রথম বৃহত্তম কুম্ভমেলা। ২০১৬ সালের মেলার সরকারি বাজেট ছিল ১০০ কোটি টাকা। এবার এই মেলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে তার ৭ গুণ বেশি খরচ করা হবে। ডয়চে ভেলের খবরে বলা হয়েছে, বাহুবলী ছবির সেট জিজাইনার টিম ১০০ কোটি রুপি ব্যয়ে তৈরি করেছে বিশেষ জাদুঘর। ১৫ একর জমি জুড়ে তৈরি হয়েছে সেটি, যার পুরোটা জুড়ে থাকবে ভারতীয় সংস্কৃতির নানা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের দৃশ্যায়ন।
মিউজিয়ামের প্রচারের দায়িত্বে থাকবে একটি আন্তর্জাতিক ব্যালে টিম।এবার উত্তর প্রদেশের এই কুম্ভমেলা একটি পূর্ণকুম্ভ।
সাধারণ কুম্ভমেলা ভারতের ৪টি স্থানে প্রতি চার বছর অন্তর আয়োজিত হয়। প্রতি ছয় বছর অন্তর অর্ধকুম্ভ আযয়োজিত হয়। প্রতি ১২ বছর পরপর পূর্ণকুম্ভ আয়োজিত হয়। বারোটি পূর্ণকুম্ভ, অর্থাৎ প্রতি ১৪৪ বছর অন্তর প্রয়াগে আয়োজিত হয় মহাকুম্ভ। ২০১৬ সালে একটি মহাকুম্ভ আয়োজিত হয়েছিল। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানায়, ৫৫ দিনের এই মেলায় প্রায় ১৫ কোটি মানুষ অংশ নেবে। এ বছর কুম্ভ মেলার জন্য ১০,০০০ একর খোলা জায়গার বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রচারের জন্য ভারতের সমস্ত বিমানবন্দরে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। বিদেশে ভারতের বিভিন্ন দফতর এবং দূতাবাসকেও প্রচারের কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। এই বছরের কুম্ভমেলায় বিশেষভাবে নিরামিষভোজী নিরাপত্তাকর্মীদেরই নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের মুখমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কার্যালয় থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
মদ ও মাংস যাতে কুম্ভমেলার থেকে দূরে থাকে, তা নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। ৪৫ দিনের এই মেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয় ৬ দিনকে। এদিন পূণ্যার্থীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে। ১৫ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তি দিয়ে মেলার শুরুর দিন এর মধ্যে একটি দিন। ২১ জানুয়ারি পৌষ পূর্ণিমা, ২ ফেব্র“য়ারি মৌনি অমাবশ্যা, ১০ ফেব্র“য়ারি বসন্ত পঞ্চমী, ১৯ ফেব্রুয়ারি মাঘী পূর্ণিমা এবং ৪ মার্চ মহা শিবরাত্রি। এর মধ্য দিয়েই মেলা শেষ হবে।উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নির্দেশে মেলার সার্বক্ষণিক আপডেট প্রচারে ওয়েবসাইট খোলা হয়েছে। তাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাণী রয়েছে। পাশাপাশি কুম্ভমেলা, প্রায়োগরাজের নানা ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং পূজার নিয়ম-কানুনসহ সব তথ্য রয়েছে। এটি অ্যাপ আকারেও পাওয়া যাচ্ছে। তুমুল নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে কুম্ভমেলায়। ১৪ জানুয়ারি দিগম্বর ঘাটের কাছে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও মেলা শুরুর আগে এমন আগুন আতঙ্ক সৃষ্টি করে জনমনে। পুলিশ জানায়, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনে কয়েকশ’ তাঁবু পুড়ে গেছে। মকর সংক্রান্তির দিনে প্রথম স্নানে অংশ নেন প্রায় ৩৫ লাখ পুণ্যার্থী। এদিনের স্নানকে শাহী স্নানও বলা হয়। কারণ, প্রয়োগরাজ তথা সাবেক এলাহাবাদের এই স্থান গঙ্গা, যমুনা ও স্বরস্বতী এই তিন নদীর মিলনস্থল। চার পবিত্র কুম্ভস্থানে এখানেই তিনটি নদীর সম্মীলন ঘটেছে। অন্যদিকে হরিদ্বার, উজ্জয়ন, নাসিক প্রতিটি স্থানই একটি করে নদী তীরে অবস্থিত।
কুম্ভমেলায় যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করতে ইতোমধ্যে ট্রাফিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। শুধু উত্তর প্রদেশের প্রায়োগরাজেই ৫০০ টি বাড়তি বাস কুম্ভমেলা উপলক্ষে চালু করা হয়েছে। যাতায়াত সুগম করতে স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করেছে, যাতে শিক্ষার্থীদের চলাচলও ব্যহত না হয়। অ্যাপস থেকে জেনে নেওয়া যাবে কোথায় কোন অঞ্চলে সহজে যাতায়াত করা যাবে।

সাইকেলে মায়ের লাশ বহন করলেন অসহায় ছেলে

বাবা নেই, মা মারা গেছে। কোনো প্রতিবেশী সহযোগিতা না করায় মাকে সৎকার করতে সাইকেলে করে মায়ের লাশ জঙ্গলে করব দিতে নিয়ে যাচ্ছে ছেলে। ভারতের উড়িষ্যার কড়পাবাহাল গ্রামে এমনই ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি এমন একটি ছবিসহ সংবাদ ভারতীয় গণমাধ্যম প্রকাশ করে। আর এতেই হইচই পড়ে যায় ভারতজুড়ে।
প্রতিবেদনে জানা যায়, হঠাৎ পানি আনতে গিয়ে ৪৫ বছর বয়সী মা জানকী দেবী মারা যান। সতেরো বছরের কিশোর সুরুজ তার মায়ের মৃত্যুতে প্রতিবেশীদের সহযোগিতা চান। ‘নিচু জাতের’ বলে সুরুজের মায়ের শেষকৃত্যে এগিয়ে আসেননি গ্রামের কেউ। বাবা আগেই মারা যান।
পরে ছেলে সাইকেলে লম্বালম্বি দুটি বাঁশ বেঁধে মায়ের লাশ চাপিয়ে গ্রাম থেকে প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটি জঙ্গলে কবর দেয়।
এর আগে ২০১৬ সালে দেশটির উড়িষ্যায় হাসপাতাল অ্যাম্বুলেন্স দিতে না পারায় স্ত্রীর লাশ মাদুর জড়িয়ে কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরেছ্নে দানা মাঝি নামে এক ব্যক্তি। ওই সময়ে এটি আলোচিত ঘটনা হয়।

রাতের ‘আতঙ্ক’ by রুদ্র মিজান

রাতের শহর। ফাঁকা সড়ক। লাইটপোস্ট থেকে যেন ছিটকে পড়ছে আলো। দু’পাশের মার্কেটগুলো বন্ধ। হাতেগোনা কয়েকটি চা-সিগারেট ও খাবারের দোকান খোলা থাকলেও ভিড় নেই। মাঝে মধ্যে দেখা মেলে নিরাপত্তাকর্মী, পুলিশ আর জরুরি প্রয়োজনে বাসার বাইরে বের হওয়া পথচারীদের। কোথাও কোথাও নির্জন। এরমধ্যেই নির্জনতা ভেঙে কেঁপে উঠে রাতের সড়ক।
বাজে বিকট হর্ণ। দুরন্ত গতিতে ছুটে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ। এই গতি অনেকটা ভয়ঙ্করও। পণ্য নিয়ে অল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছার প্রতিযোগিতায় নামেন চালকরা। রাতের সড়কে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে ট্রাকের বেপরোয়া গতির কারণে। প্রতিদিনই রাজধানীর কোথাও না কোথাও ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রাণ হারাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ঢাকা শহরের সড়কে থাকে ট্রাকের আধিপত্য। এই আট ঘণ্টায় রাজধানীতে দুর্ঘটনায় ৫০ শতাংশের বেশি হতাহত হন। ঢাকা মেডিকেল সূত্রে জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় ঢাকায় প্রতি মাসে গড়ে ৩০ জন নিহত হন। রাতে দায়িত্বপালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও থাকেন বেপরোয়া ট্রাক আতঙ্কে। রাতের শহরের আতঙ্কের নাম ট্রাক।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় নিবন্ধিত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ রয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৮২৫টি। এরমধ্যে ট্রাক ৬৭৯৮৩, পিকআপ ৮১৪০৪ ও কাভার্ডভ্যান ২৪৪৩৮টি। নিবন্ধন ছাড়া রয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণ। এ ছাড়াও প্রতিরাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় অন্তত অর্ধলক্ষাধিক ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ যাতায়াত করে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত তিন  হাজার কেজি ওজনের বেশি গাড়িগুলো রাত ১০টার আগে শহরে  ঢোকার নিয়ম নেই। তারপরও রাত ৮টার পরেই এই গাড়িগুলো ডিএমপি এলাকায় ঢুকতে শুরু করে। তখনই যানজটের সৃষ্টি হয় ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে। আব্দুল্লাহপুর, গাবতলী, কাঁচপুর, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, মাওয়া সড়কে বাঁধে তীব্র যানজট। ওই সময়েও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে এসব এলাকায়। গত ৫ই জানুয়ারি রাত ৯টার দিকে শ্যামপুর থানার সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন এক তরুণী। আফরোজা আক্তার নামে ওই তরুণী বিকাশের এজেন্ট থেকে টাকা উত্তোলন করতে বাসার বাইরে বের হয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রাকের চাপায় প্রাণ হারান এই তরুণী।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে এসব গাড়ির গতি। রাত ১০টার পর অধিক সংখ্যক ভারী গাড়ি ঢুকে শহরে। রাতের সড়কে কাউকে পরোয়া করেন না ট্রাকচালকরা। পরদিন ভোর পর্যন্ত সড়ক থাকে ট্রাকসহ ভারী গাড়ির দখলে। ডিএমপির তেজগাঁও জোনে দায়িত্বপালনকারী সার্জেন্ট দুর্জয় জানান, রাতে সড়ক ফাঁকা পেয়ে ট্রাকগুলো বেপরোয়া গতিতে চলে। গভীর রাতে ট্রাকচালকরা নিয়ম-নীতির পরোয়া করেন না। ট্রাক চলাচলে পুলিশের বেঁধে দেয়া গতিসীমা ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার। কিন্তু বাস্তবে ৭০  থেকে ৮০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে দেখা যায়। বেপরোয়া গতিতেই রাজধানীর বিভিন্ন মোড় পার হয় ট্রাকগুলো। এ সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকে ছোট যানবাহনগুলো। রাতে ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা থাকে অল্প। ঢাকার সড়কের বিশেষ মোড়গুলোতে ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন। তখন অনেক ঝুঁকি নিয়ে ট্রাফিক পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে জানান সার্জেন্ট দুর্জয়।
রাজধানীর মিরপুরের টেকনিক্যাল মোড়ে দায়িত্ব পালনকালে ট্রাকের ধাক্কায় আবদুল মজিদ নামের এক ট্রাফিক কনস্টেবল নিহত হন। ভোরে সিগন্যাল অমান্য করে একটি ট্রাক মজিদকে ধাক্কা দিলে তিনি নিহত হন। ঘটনাটি ঘটেছিলো গত বছর মার্চে। এভাবেই সাধারণ মানুষ থেকে ট্রাফিক পুলিশ কেউই নিরাপদ না এই গতি দানবের কাছে। গত ৮ই জানুয়ারি রাতে গুরুতর আহত হয়েছেন টিভি অভিনেত্রী অহনা। পুরান ঢাকায় একটি অনুষ্ঠান শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ড্রাইভ করে উত্তরার বাসায় ফিরছিলেন তিনি। রাত তখন প্রায় ৩টা। উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে লেক ড্রাউভ রোডে পাথর বোঝাই একটি ট্রাক অহনার গাড়িকে চাপা দেয়। তখন ট্রাককে থামাতে চেষ্টা করলে গুরুতর আহত হন অহনা।
এ ছাড়াও ট্রাক শ্রমিকরাও শিকার হচ্ছেন দুর্ঘটনার। গত ২৬শে ডিসেম্বর ভোরে রাজধানীর শনির আখড়ায় ট্রাকের চাপায় নিহত হন দুজন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রাক থেকে ইট নামানোর সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির আরেকটি ট্রাক ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ইটের মালিক হারুন এবং ট্রাকচালকের সহকারী বাশার নিহত হন।
ঢাকা-যশোর রুটের ট্রাকচালক রহিম উদ্দিন জানান, রাস্তায় তীব্র জ্যাম থাকে। বিশেষ করে আরিচা ঘাটে প্রতিরাতেই জ্যামে পড়তে হয়। এরমধ্যেই দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছতে হয় রহিম উদ্দিনকে। তাই বাধ্য হয়েই গতি বাড়াতে হয় বলে জানান তিনি।  এ ছাড়াও পথে পথে ট্রাক থামিয়ে চাঁদাবাজি করা হয়। এসব কারণেও দ্রুতগতিতে চালান রহিম। তবে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো উচিত না স্বীকার করে এই চালক বলেন, ট্রাক লোড থাকে। গতি বাড়লে হঠাৎ থামানো প্রায় কঠিন। এসময় ট্রাক উল্টে যেতে পারে। যে কারণে ট্রাকের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।
ডিএমপি’র ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মীর রেজাউল আলম বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগে হয়তো সম্ভব না। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টি করতে ট্রাফিক পুলিশ কার্যক্রম চালাচ্ছে। এজন্য সমাজের সবাইকে সচেতনভাবে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

স্বৈরাচারদের নির্বাচনী রঙ্গ by ভ্লাদিমির কারা-মুর্জা

দারুণ সব নির্বাচনী ফলাফল উপহার দেওয়ার এক বিশেষ প্রতিভা রয়েছে স্বৈরাচারী শাসকদের। ইন্দোনেশিয়ার স্বৈরাচার সুহারতো নিজের লড়া সর্বশেষ নির্বাচনে মোট ভোটের ৭৫ শতাংশ পেয়েছিলেন। মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পেয়েছিলেন ৮৯ শতাংশ ভোট। রোমানিয়ার কম্যুনিস্ট নেতা নিকোলে সিউজেসকু পেয়েছিলেন ৯৮ শতাংশ ভোট! রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের নেতৃত্বস্থানীয় বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতা ও আমার বন্ধু বরিস ভিশনেভস্কি ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর অবদি ৯৯ শতাংশ জনসমর্থন ভোগ করছিলেন! এর এক সপ্তাহ পরই তার বিচার হয়। এই সব ‘বিজয়ী’রা শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন যে, কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় কারসাজির ‘নির্বাচন’ প্রকৃত জনমত বোঝার ক্ষেত্রে খুবই বাজে সূচক।
রাশিয়ায় যে প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচন’ হলো তাতে নিয়মমাফিক ‘ভোটগ্রহণের পদ্ধতি’ দেখা গেছে। ওপেন রাশিয়া, গোলোস ও অ্যান্টি করাপশন ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থার করা পর্যবেক্ষণে নানা ধরণের অনিয়ম উঠে আসে। গণহারে ব্যালট ঢুকানো, মৃত মানুষের ভোটপ্রদান, স্ফীত ভোটার তালিকা, জোরাজুরি, নির্বাচন পর্যবেক্ষক বহিষ্কার, জালভোট - সবই দেখা গেছে। এই নির্বাচনে কার্যত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভ্লাদিমির পুতিনের চতুর্থ মেয়াদের পথ খুলে দেয়।
তিনি আনুষ্ঠানিক হিসাবে মোট ভোটের ৭৭ শতাংশ পেয়েছেন!
শেষ পর্যন্ত, ভোটাভুটির দিনে কতটা সহিংসতা হয়েছে, সেটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায়। এই নির্বাচনে প্রথম ভোট পড়ার বহু আগে থেকেই এটি পাতানো ছিল। রাশিয়ার ২০১৮ সালের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এটি এমন এক নির্বাচন ছিল, যেখানে কোনো বিকল্প ছিল না। যে দুই প্রথিতযশা বিরোধী প্রার্থী পুতিনের বিরুদ্ধে লড়তে চেয়েছিলেন তাদের নাম রোববার ব্যালটে ছিল না। ২০১৫ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বাসভবন ক্রেমলিনের সামনে একটি সেতুতে গুলি করে হত্যা করা হয় সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ও পিপল’স ফ্রিডম পার্টির নেতা বরিস নেমতসভকে। প্রখ্যাত দুর্নীতিবিরোধী প্রচারক অ্যালেক্সেই নাভালনিকে নির্বাচনে লড়তে দেয়া হয়নি। এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাশিয়ার আদালতের একটি দ-াদেশ। এই রায়কে ইউরোপিয়ান মানবাধিকার আদালত ‘বাছবিচারহীন’ হিসেবে আখ্যা দেয়। যখন আপনার প্রতিপক্ষের নামই ব্যালট পেপারে থাকবে না, জেতাটা খুব কঠিন নয়।
‘সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতা ছাড়া যদি কাউকে বিকল্প হিসেবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয় তারা আসলে প্রকৃত বিকল্প নন, যেমনটা এখানে দেখা গেছে,’ বলছিলেন অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কোঅপারেশন ইন ইউরোপের পর্যবেক্ষক মিশনের প্রধান মাইকেল জর্জ লিঙ্ক। এছাড়া সভা সমাবেশ, সংগঠন করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রার্থী নিবন্ধনের সুযোগ, ইত্যাদি মৌলিক অধিকারের ওপর কড়াকড়ি আরোপের কারণে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হয়নি।
এই যখন পরিস্থিতি, যেসব বিদেশী নেতা পুতিনকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছেন তাদের তালিকার দিকে একবার চোখ বুলানো যাক: বাশার আল আসাদ, নিকোলাস মাদুরো, শি জিনপিং, রাউল ক্যাস্ত্রো, নুর সুলতান নাজারবায়েভ ও আলেক্সান্দার লুকাশেঙ্কো। নির্বাচন আয়োজন নিয়ে তাদেরও জানাশোনা কম নয়।
ক্রেমলিন-বিরোধী ও ওপেন রাশিয়া’র প্রতিষ্ঠাতা মিখাইল খোদরকোভস্কি বলেন, ‘এই ক্ষমতা ব্যবস্থা আর ৬-১০ বছরের জন্য থাকবে। পুতিনের স্বাস্থ্য আর দেশের অর্থনৈতিক শক্তিমত্তা কোনোটিই এর বেশি টিকবে না। সুতরাং, এই কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন অনিবার্য। কিন্তু এর সঙ্গে যেন পুরো দেশই ধ্বংসের কবলে না পড়ে সেজন্য আমাদের অনেক কাজ করা বাকি।’ তার এই সংগঠন রাশিয়ায় নাগরিক সমাজের উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়া, রাজনৈতিক শিক্ষা কর্মসূচি প্রণয়ন করা ও নির্বাচনে গণতন্ত্রপন্থী প্রার্থীদেরকে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রাখবে।
প্রকৃত প্রতিযোগিতা হয়নি এমন নির্বাচনে সরকারি পরিসংখ্যান দেখে কারও বিভ্রান্ত হওয়া উচিৎ নয়। এই পরিসংখ্যান থেকে এই তথ্য লুকানো যাবে না যে, রাশিয়ান নাগরিকরা যখনই প্রকৃত সুযোগ পেয়েছে তখন তারা বিরোধী প্রার্থীদেরকে নির্বাচনে জয়ী করেছে। ইয়ারো¯¬াভলে আঞ্চলিক পার্লামেন্টে জয় পেয়েছেন নেমতসভ। মস্কোর মেয়র পদে লড়ার সময় ৩০ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন নাভালনি। ইয়েকাতেরিংবার্গে জিতেছেন ইয়েভজেনি রইজম্যান, পসকভে জিতেছেন লেভ শ্লোসবার্গ। মস্কোর পৌরসভায় প্রায় ৩০০ বিরোধী দলীয় আইনপ্রণেতা রয়েছেন।
এই পরিসংখ্যানের কারণেই ক্রেমলিন নির্বাচনের আগে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হতে দিতে চায় না। যেই সরকার রাজপথের আন্দোলনকে এত ভয় পায় তারা ব্যালটের মাধ্যমেও জনগণকে নিজের ভিন্নমত প্রকাশ করতে দিতে চায় না। এর চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে!
(ভ্লাদিমির কারা-মুর্জা একজন বিরোধী দলীয় রাশিয়ান রাজনীতিক। তার এই নিবন্ধ ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত হয়েছে)

ধর্ষিতার কান্না বললেন, আমি বিচার চাই

প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী বয়স তার ১৯। চেহারায় কিশোরী বয়সের ছাপ স্পষ্ট। দাঁড়িয়ে আছেন স্বামী ও শ্বশুর শাশুড়ির সঙ্গে। মুখে নীল মাস্ক। দুঃখের প্রতীক নীল রংটি দিয়েই ঢেকে রেখেছেন মুখ। চোখে ভয় স্পষ্ট। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না বেশি সময়। খানিক বাদে বসে পড়লেন মেঝেতে।
১৯ বছরের মেয়েটির বাড়ি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গায়। বিয়ে হয়েছে সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নে। তার স্বামীর রয়েছে একটি সেলুন। এই সেলুনই তাদের আয়ের একমাত্র উৎস। তার স্বামী স্থানীয় বাসিন্দা রায়হানের কাছ থেকে টাকা ধার করে একটি মোবাইল ফোন কিনেছিলেন।
সেই টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় ক্ষিপ্ত হয় রায়হান। গত ১১ই জানুয়ারি বাড়ি ফিরছিলেন তারা। এই সময় রাত ৮টার দিকে পথ রোধ করে রায়হান ও আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আলামিন। নিয়ে যায় নির্জন স্থানে। এরপর মেয়েটির জীবনে নেমে আসে দুঃস্বপ্ন। তার স্বামীকে আটকে রেখে পাঁচজন ধর্ষণ করে মেয়েটিকে। সে রাতেই পরিবারটি বিচারের আশায় ছুটে যায় স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে। সেদিনই সাভার থানায় একটি মামলা করেন। মামলা নং ৪৪। পরদিন চিকিৎসার জন্য আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)। ১২ই জানুয়ারি থেকে ১৫ই জানুয়ারি পর্যন্ত চিকিৎসা নেন এখানে। একদিন পরেই গতকাল শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে ফের আসেন হাসপাতালে।
কিন্তুশুধুমাত্র চিকিৎসাপত্র দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় তাদের। হাসপাতালে পুনরায় ভর্তির কথা বলা হলে ওসিসি ও থানা থেকে কাগজ আনতে বলা হয়। এই অবস্থায় গতকাল তারা ফের বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন। নির্যাতিতা মেয়েটির কথা বলতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। তার পরেও কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, চিকিৎসা শেষে একদিনের জন্য বাড়িতে ফিরে যেন অন্যায় করে ফেলেছেন। তাকে এলাকাবাসী সব সময় আড় চোখে দেখছে। আবার নানা জনের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে যেন ক্লান্ত। অনেকে নির্মম ঘটনা নিয়ে হাসি তামাশাও করেছে। এই কথা বলতে যেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। জানান, পুলিশের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেয়াটা ছিল আরো বিব্রতকর। নির্যাতিতা মেয়েটি উচ্চস্বরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমি বিচার চাই। আমি বিচার চাই।
বর্তমানে মামলার দুই আসামি রায়হান ও আলামিন গ্রেপ্তার রয়েছে। বাকি তিনজন পলাতক। তার স্বামী জানান, মামলাটি মিটিয়ে নেবার জন্য তাগাদা দেয়া হচ্ছে তাকে। শুধু তাই নয় মামলা উঠিয়ে নেবার জন্য টাকার প্রস্তাব দেয়া হয়। তার কাছে এসেছে নামে বেনামে বেশ কিছু ফোন। আবার গ্রেপ্তার দু’জন থানাতে আটক থাকা অবস্থাতেও তাকে হুমকি দেয় বলে জানান তিনি। সাভার থানার এসআই কৃষ্ণ রায় মামলা ও গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আটক দুইজন দুই দিনের রিমান্ডে রয়েছে।

জানুয়ারিতে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ১৩০০ রোহিঙ্গা

এ বছরের শুরু থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত থেকে কমপক্ষে ১৩০০ রোহিঙ্গা মুসলিম প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। ভারত তাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাবে- এমন আতঙ্কে তারা সীমান্ত অতিক্রম করেছে। এমন কথা বলেছেন ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসসিজি) মুখপাত্র নয়না বোস। এ সংস্থাটি জাতিসংঘের এজেন্সিগুলো ও অন্যান্য বিদেশি মানবিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করে। নয়না বলেছেন, এ বছর ৩রা জানুয়ারি থেকে এভাবে নতুন আসা রোহিঙ্গার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালানোর জন্য সেদেশের সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়। সেই নৃশংসতা বা নির্যাতন এখনো হচ্ছে না তা নয়।
মাঝে মাঝেই খবর পাওয়া যায়, সেখানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। এমন অবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে নির্যাতিত এই সম্প্রদায়ের বেশকিছু সংখ্যক সদস্যকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে ভারত। এ জন্য তাদের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। জাতিসংঘ থেকে এ বিষয়ে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘ ও অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো ভারতকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অসম্মান করার অভিযোগ উত্থাপন করেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয় ভারত। তারা ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার করেছে ২৩০ রোহিঙ্গাকে।  রোহিঙ্গাদেরকে এভাবে গ্রেপ্তার ও তাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর আতঙ্কে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছে। তারা আশ্রয় নিয়েছে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরে। এএফপিকে নয়না বোস বলেছেন, ৩০০ পরিবারের প্রায় ১৩০০ সদস্য ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তাদেরকে জাতিসংঘের ট্রানজিট সেন্টারে আশ্রয় দেয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক এজেন্সি ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ফিরাস আল খতিব বলেছেন, এ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত জাতিসংঘের এ এজেন্সি। সম্প্রতি যেসব রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশ করেছেন তাদেরকে আটক করেছে পুলিশ এবং পাঠিয়ে দিয়েছে কক্সবাজারে শরণার্থীদের শিবিরে।
উল্লেখ্য, ভারতে বসবাস করছেন প্রায় ৪০০০০ রোহিঙ্গা মুসলিম। দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমারে বসবাসকারী রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী ভয়াবহ নির্যাতন ও অবহেলার শিকার। তাদের কোনো নাগরিকত্ব নেই দেশে। মিয়ানমার তাদেরকে দেখে থাকে বাঙালি হিসেবে। এর মধ্য দিয়ে তারা বোঝাতে চায় যে, রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি। তাদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট থেকে যে নৃশংসতা শুরু করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাকে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা গণহত্যা বলে অভিহিত করেছেন। এমন নৃশংসতার কারণে বাধ্য হয়ে তাদের কমপক্ষে ৭ লাখ ২০ হাজার  রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। আগে থেকেই প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা একই রকম নৃশংসতার শিকার হয়ে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা এখন কমপক্ষে ১০ লাখ।

কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাস ঘেরাও, ভাঙচুর by দীন ইসলাম

কুয়েতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন চার শতাধিক বাংলাদেশি। দেশটির লেসকো নামের একটি কোম্পানিতে কর্মরত এসব বাংলাদেশি গত তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। কাজ করার বৈধ কাগজপত্র বা ‘আকামা’ও পাচ্ছেন না তারা। গতকাল এসব শ্রমিক কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ঘেরাও করে ভাঙচুর করেছে। দূতাবাসের এইচওসি এবং কনস্যুলার আনিসুজ্জামানকে তারা মারধর করেছে। আঘাত গুরুতর হওয়ায় কনস্যুলারকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া কনস্যুলারকে বাঁচাতে গিয়ে পাসপোর্ট ও ভিসা শাখার আরো তিন কর্মকর্তা মারধরের শিকার হয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ দূতাবাস ঘিরে রেখেছে কুয়েত পুলিশ।
দূতাবাস ঘেরাও ও ভাঙচুরের বিষয়টি স্বীকার করে রাষ্ট্রদূত এস এম আবুল কালাম মুঠোফোনে মানবজমিনকে বলেন, সকালে অফিসে এসেই দেখতে পাই দুই থেকে তিনশ’ লোক দূতাবাসের ভেতরে ও বাইরে জমায়েত করেছে। আমি গাড়ি থেকে নামার পরই আট থেকে ১০ জন তাদের সমস্যার কথা বলতে শুরু করেন।
আমি তাদের জানাই তোমরা ৫ থেকে সাত জনের একটি টিম আমার সঙ্গে কথা বলতে রুমে আসো। কথামতো তারা আমার রুমে আসে। রুমে এসে তারা লেসকো কোম্পানিতে তাদের তিন মাসের বেতন বকেয়াসহ বিভিন্ন কথা জানায়। আমি ও দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শুনি এবং নোট নেই। তিনি বলেন, প্রতিনিধিদলের সামনেই লেসকো কোম্পানির কর্মকর্তাদের ডেকে আনি। ওই সময় লেসকো’র কর্মকর্তা জানান, গত বছরের জুলাই থেকে লেসকো’র ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ (ফ্রিজ) রয়েছে। দুইদিন আগে লেসকো’র জব্দ অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া হয়েছে। তাই আগামী ৫ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে বকেয়া বেতন- ভাতা পরিশোধ করা হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের আকামার অগ্রগতির বিষয়টিও জানায় তারা। লেসকো কোম্পানির কর্মকর্তার কথায় প্রতিনিধিদলটি আশ্বস্ত হয়। এরপরও দূতাবাসের কনস্যুলার আনিসুজ্জামান ও তিন কর্মকর্তাকে মারধর করা হয়েছে।
পাসপোর্ট ও ভিসা শাখার কম্পিউটারসহ সব জিনিস ভেঙে ফেলা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে ভিড় করতে শুরু করেন লেসকো কোম্পানিতে কর্মরত বাংলাদেশিরা। রাষ্ট্রদূত এস এম আবুল কালাম অফিসে এসে গাড়ি থেকে নামার সময়ই শ্রমিকরা স্লোগান দিতে থাকেন। এরপর সাত সদস্যের প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন। মাঝখানে লেসকো কোম্পানির প্রতিনিধি এসে যোগ দেন। আলোচনা ফলপ্রসূ হওয়ার পরই লেসকো কোম্পানির প্রতিনিধিকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যান কনস্যুলার আনিসুজ্জামান। তখন ঘেরাও করে রাখা বাংলাদেশি শ্রমিকরা কনস্যুলারকে মারধর করে। তাকে বাঁচাতে গিয়ে আরো তিনজন কর্মকর্তা শ্রমিকদের হাতে আক্রান্ত হন। এ ছাড়া পাসপোর্ট ও ভিসা শাখার আসবাবপত্র ও কম্পিউটার তছনছ করা হয়। দূতাবাসের অনেক কম্পিউটার ভেঙে ফেলা হয়েছে। ঘটনার সময় কুয়েত পুলিশকে খবর দেয়া হয়।
তারা এসে বাংলাদেশ দূতাবাস ঘিরে রেখেছে। দূতাবাসের এমন অবস্থায় রাষ্ট্রদূত এস এম আবুল কালাম বলেন, কম্পিউটারগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাই কি দিয়ে কনস্যুলার শাখার কার্যক্রম চলবে? এটা মাথায় আসছে না। দেশের সম্পদ দেশের মানুষ নষ্ট করা কী ঠিক? এদিকে প্রায় পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি ৭ থেকে আট লাখ টাকা খরচ করে কাজের সন্ধানে কুয়েত যান। দালালদের মিষ্টি কথায় গ্রামের সহজ সরল মানুষ ভিটেমাটি বিক্রি করে একটু শান্তি ও উন্নত জীবনে বসবাসের জন্য বুক ভরা আশা নিয়ে কুয়েত যান। দালালরা নিরীহ বাংলাদেশিদের জানান, আপনাদের মাসিক বেতন হবে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
আরামদায়ক কাজের সঙ্গে ওভারটাইম ও থাকা-খাওয়া কোম্পানি বহন করবে। এ ছাড়া বার্ষিক বোনাসসহ নানা সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে। এসব কথা বলে পাঠালেও রিক্রুটিং এজেন্সি তাদের বৈধ ভিসায় কুয়েতে পাঠায়নি। এজন্য চরম বিপদে আছেন তারা। সেই সঙ্গে দালালদের টাকা দিয়েও আকামা নবায়ন করতে পারেন নি। এজন্য চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। শ্রমিকরা জানান, লেসকো কোম্পানিতে কাজ করতে কুয়েতে আসেন তারা। চার মাস ধরে তারা বেতন পাচ্ছেন না। তাদের আকামা বা পরিচয়পত্র দেয়া হয়নি। এজন্য সমস্যার মুখে পড়েছে। এসব সমস্যার কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন চার শতাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক।

ব্রেক্সিটের চাবি করবিনের হাতে

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের প্রস্থান অর্থাৎ ব্রেক্সিট নিয়ে যে পরিকল্পনা হাজির করেছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে, তা ঐতিহাসিক ব্যবধানে প্রত্যাখ্যান করেছেন পার্লামেন্টের সদস্যরা। এর কিছুক্ষণ পরই বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন পার্লামেন্টে উঠে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে প্রধানমন্ত্রীর ওপর অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
মৃদুভাষী করবিন একসময় দলে ব্রাত্য ছিলেন। তিন বছর আগে তিনি বিরোধী দলের প্রধান হন। ব্রেক্সিট ইস্যুতে কয়েক বছর তিনি চুপচাপ ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি বিতর্কের কেন্দ্রে। আর তাকে এখন একটি বিকল্প বেছে নিতেই হবে। তার এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে ব্রেক্সিটের কী হবে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে এমনটা বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, নিজেকে সাচ্চা বামপন্থী ও তৃণমূলের সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করে দলের ক্ষমতায় আসেন করবিন। তাই এই তৃণমূলকে অগ্রাহ্য করে ব্রেক্সিট নিয়ে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে আসা থেকে বিরত থাকাটা তার জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
‘আনাদার ইউরোপ ইজ পসিবল’ নামে বামপন্থী একটি গ্রুপের নেতা মাইকেল চেসাম বলেন, ‘মানুষ যদি ভাবতে শুরু করে করবিন আর দশজন রাজনীতিকের মতোই একজন রাজনীতিক, তাহলে করবিন ম্যানিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে।’ চেসামের গ্রুপ চায় লেবার দল ব্রেক্সিট নিয়ে দ্বিতীয় গণভোটের দাবি তুলুক।
কিন্তু করবিন কি দ্বিতীয় গণভোটের দাবি তুলবেন নাকি ব্রেক্সিট কার্যকরের দিকেই মনোনিবেশ করবেন? এ নিয়ে যেকোনো একটি সিদ্ধান্তে আসাটা তার জন্য জরুরী হয়ে পড়েছে। করবিন যে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, তা প্রায় ব্যর্থ হয়েছে। ফলে পার্লামেন্ট ফের অসাড় হয়ে পড়ছে। কিন্তু আগামী কয়েক সপ্তাহে যে-ই পরিকল্পনাই আসুক পার্লামেন্টে, তার ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকবে করবিনের।
যদি তিনি মৃদু ব্রেক্সিট সমর্থন করেন, অর্থাৎ ইইউ থেকে বের হয়ে এলেও সংস্থাটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে থাকেন, তাহলে সেই প্রস্তাব হয়তো পার্লামেন্টে পাস হবে। তিনি যদি দ্বিতীয় গণভোটের প্রস্তাব দেন, যার ফলে হয়তো ব্রেক্সিটই বাতিল হয়ে যেতে পারে, সেই প্রস্তাবনারও পাস হওয়ার একটা সুযোগ রয়েছে। তিনি যদি নিজে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে, লেবার দলীয় এমপিদেরকে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনার কোনো সংশোধিত সংস্করণ সমর্থন দেওয়ার অনুমতি দেন, তাহলেও সেই ব্রেক্সিট পরিকল্পনা উতরে যাবে। আর তিনি যদি উপর্যুক্ত কোনো বিকল্পই বেছে না নেন, অর্থাৎ সিদ্ধান্তহীনতায় থাকেন, তাহলে কোনো চুক্তি ছাড়াই বৃটেনের ইইউ ত্যাগের সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। সেই ক্ষেত্রে দেশটি অর্থনৈতিক মন্দা, এমনকি অর্থ ও ঔষুধ সঙ্কটেও পড়ে যেতে পারে! অর্থাৎ করবিনের যেকোনো সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে অনেক কিছু।
কিন্তু যেকোনো একটি বিকল্প বেছে নেওয়া সহজ কিছু নয়। তেরেসা মের কনজারভেটিভ দলে ব্রেক্সিট নিয়ে যতটা বিরোধ আছে, ততটা বিরোধ লেবার পার্টিতে নেই। কিন্তু এরপরও দলটি এই ইস্যুতে বেশ বিভক্ত। কিন্তু লেবার দলকে ক্ষমতায় ফেরানো ও কয়েক দশকের নব্য-উদারবাদী নীতি পাল্টে দেওয়ার যে চূড়ান্ত লক্ষ্য করবিনের, তা বাস্তবায়ন করতে হলে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখাটা অপরিহার্য। এটিই তার জন্য উভয় সংকট।
করবিন সারাজীবন ইইউ’র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এটি হলো ব্যাংকারদের একটি ক্লাব যেটি কিনা বামপন্থী নীতি আটকে দিয়েছে। ব্রেক্সিট উলটে দেওয়ারও পক্ষে নন তিনি। কর্মজীবী যেসব লেবার ভোটার ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন তাদেরকে ক্ষুব্ধ করতে চান না তিনি। কিন্তু তাকে বিস্ময়করভাবে লেবার দলের নেতা বানিয়েছে যে অ্যাক্টিভিস্টরা, তারা করবিনকে ব্যাপক চাপ দিচ্ছেন যাতে তিনি ব্রেক্সিট বাতিল করার দিকে যান।
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি প্রতিদিন আরও তীব্র হচ্ছে। আর এই উভয় সংকট যেন পুরো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বামপন্থী আন্দোলনেরই। জনতোষণবাদী আন্দোলনের বিপক্ষে লড়তে গিয়ে এই প্রশ্নেই পড়েছে বামপন্থীরা। জনতোষণবাদীরা মানুষের মধ্যে ক্রমেই তীব্র হওয়া অভিবাসন-বিরোধী সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করছে। সুতরাং, বামপন্থীরা কি তাহলে উন্মুক্ত সীমান্ত, বহুসংস্কৃতিবাদের পক্ষে অবস্থান নেবে? তা করতে গেলে দীর্ঘদিনের বামপন্থী আন্দোলনের সমর্থক শ্বেতাঙ্গ কর্মজীবীরা ক্ষুব্ধ হবে। এরা হয়তো অভিবাসন-বিরোধী ডানপন্থার দিকে ঝুঁকবে। নাকি বামপন্থীরা বৈশ্বিক সংগঠন, বাণিজ্য চুক্তি ও অভিবাসনের বিরুদ্ধে উদারবাদী কায়দায় লড়াই করে ওই সমর্থকদের ফের কাছে টানার চেষ্টা করবে?
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক টিম বেল বলেন, ‘আপনি যদি ইউরোপের দিকে তাকান, দেখবেন যে মধ্য-বামপন্থী দলগুলো এই উভয় সংকটের সম্মুখীন।’ ব্রেক্সিট ইস্যুতে লেবার দলের সদস্যদের নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা অধ্যাপক টিম বেল আরও বলেন, ‘কর্মজীবী ও মধ্যবিত্ত ও অধিক শিক্ষিত ভোটারদের কীভাবে তারা কাছে টানবে?’ এক পক্ষকে কাছে টানলে আরেক পক্ষ দূরে সরে যাবে। এই রাজনৈতিক সমীকরণই করবিন কিছু ইস্যুতে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে আসছেন না।
এই কৌশলের অনেক সমর্থকও আছে লেবার দলে। তারা ব্রেক্সিট ইস্যুর চেয়েও সরকারের কৃচ্ছতাসাধনের নীতি বন্ধ ও বৃটিশদেরকে দারিদ্র্য থেকে রক্ষা করাটাই বড় ইস্যু বানিয়েছেন। করবিন সমর্থক লেবার নেতা ক্যালাম ক্যান্ট বলেন, এই দেশ যে সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি, তার তুলনায় ব্রেক্সিট আসলে ছোট ইস্যু। ইইউ নিয়ে মানুষের অবস্থান যা-ই হোক না কেন, সামাজিক রূপান্তরের জায়গায় আমাদের এক সাথে লড়াই করতে হবে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ব্রেক্সিটে সমর্থন দিলে মাত্র এক-পঞ্চমাংশ ভোটারের সমর্থন পাবে লেবার। দ্বিতীয় গণভোটের দাবিকে সমর্থন দিলে, এক-তৃতীয়াংশ ভোটার লেবারকে সমর্থন দেবেন। ক্যালাম ক্যান্ট মনে করেন, ইউরোপ-পন্থী ভোটাররা সাধারণত লেবার দলের সমর্থক। এদেরকে ধরে না রাখলে কোনো সমীকরণেই কাজ হবে না। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময়ে আমেরিকান ভোটাররা অভিবাসন ইস্যুতে কিছুটা বাম দিকে ঘেঁষে গেছেন। ঠিক তেমনই, ব্রেক্সিট গণভোটের পর অভিবাসন ইস্যুতে বৃটিশদের মনোভাব নরম হয়েছে।

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার নির্দেশ -জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রী

টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর প্রথমেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে  দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজের কঠোর অবস্থানের কথা জানালেন। দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে সরকারের বার্তা প্রশাসনের তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, সুনির্দিষ্ট একটা নির্দেশনা যেতে হবে একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত, কেউ দুর্নীতি করলে সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। যে লক্ষ্য আমরা নিয়েছি তা পূরণ করতে পারব। তার জন্য প্রয়োজন সুশাসন, তার জন্য দরকার দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা।
গতকাল সকালে সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতার শুরুতেই সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কথা স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা এত বেশি বৃদ্ধি করে দিয়েছি- সেই ক্ষেত্রে আমি তো মনে করি, দুর্নীতি হবে কেন? যা প্রয়োজন এর সব তো আমরা মেটাচ্ছি, তাহলে দুর্নীতি কেন হবে? কাজেই এখানে মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধেও আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা দিয়েছি। তেমনি দুর্নীতির বিরুদ্ধেও আমি জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা দিয়েছি। কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা সরকার পরিচালনার মূল জায়গাটায় হলো আপনাদের এই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। অনেক বিশাল এক কর্মযজ্ঞ এখানে। সেক্ষেত্রে আপনাদের দায়িত্ব কিন্তু অনেক অনেক বেশি। রাষ্ট্র পরিচালনার হার্ট জনপ্রশাসন। আপনাদের সেভাবে কাজ করতে হবে, আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করবেন। পদোন্নতির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রে শুধু জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়, এখানে দক্ষতাটাকে প্রাধান্য দিতে হবে। কে কত বেশি কাজ করতে পারে, সততার সঙ্গে কাজ করতে পারবে এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলবে- সবকিছু বিবেচনা করে পদোন্নতি হওয়া উচিত। পদ ফাঁকা পেলেই পদায়ন নয়- মন্তব্য করে যার যে বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ রয়েছে তাকে সেই জায়গায় পদায়ন করারও নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সবক্ষেত্রে ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করার মাধ্যমে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত হতে পারে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা সময় বাংলাদেশে দরপত্রের বাক্স ছিনতাই হতো। আমরা ই- টেন্ডারে চলে গেলাম। এখন আর টেন্ডার বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা শোনা যায় না।
এভাবেই আমি মনে করি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি অনেকটা নিশ্চিত করা যায়, আমরা সেটাও করব। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হলেও এটা ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য থাকবে, প্রবৃদ্ধি এই পাঁচ বছরের মধ্যে যেন ১০ ভাগে তুলতে পারি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বলব, আমরা যে লক্ষ্য স্থির করেছি সেটা আমরা করতে পারব। এজন্য দরকার সুশাসন, দরকার দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা। আমরা সরকারি কর্মচারী আইন পাস করেছি ২০১৮ সালে। এখন এ আইনটা কার্যকর হবে। কার্যকর করার সময় অনুশীলন করতে থাকব। এ সময় এর সমস্যাটা চোখে পড়তে পারে। তখন প্রয়োজন মতো এটা সংশোধনও করা যাবে। দেশের অগ্রগতি ধরে রাখতে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে সারা বিশ্বে একটা সম্মানজনক জায়গায় আসতে পেরেছি। এখন সেই পাকিস্তানও বলে আমাদেরকে বাংলাদেশ বানিয়ে দাও।
আজকে কিন্তু আর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলার সাহসও তাদের নেই। বলতেও তারা পারবে না। কারণ, আমরা অনেক এগিয়ে আছি। এই এগিয়ে যাওয়াটা, এই যাত্রাটা আমাদের কিন্তু অব্যাহত রাখতে হবে। কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার পরিচালনার মূল জায়গাটা হলো আপনাদের, এই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের। সেটা মাথায় রেখে আপনাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আপনারা ভালোভাবে পালন করবেন। মতবিনিময় সভায় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বক্তব্য দেন। স্বাগত বক্তব্য দেন জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহম্মদ। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম উপস্থিত ছিলেন। এদিকে দশম জাতীয় সংসদের মতো এবারও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ পরিদর্শন শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সেই কার্যক্রম শুরু করলেন তিনি। এ মাসেই আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ পরিদর্শনের কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

ঐক্যফ্রন্টের জাতীয় সংলাপ ৬ই ফেব্রুয়ারি

আগামী ৬ই ফেব্রুয়ারি নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব। তিনি বলেন, ৩০শে ডিসেম্বর যে নির্বাচন হয়েছে তাতে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না। এই নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলন চালিয়ে যাবে। আন্দোলনে সব মানুষের অংশগ্রহণের অংশ হিসেবে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, অবস্থান কর্মসূচি পালনের কথাও ভাবছে ঐক্যফ্রন্ট। এছাড়া নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রক্রিয়াও চলছে। আ স ম রব বলেন, ৩০শে ডিসেম্বর যে তাহাজ্জতের নামাজের নির্বাচন হয়েছে। এটা জাতিকে একেবারে হতবাক করে দিয়েছে।
সর্বস্তরের মানুষকে হতবাক করে দিয়েছে। আমরা মনে করি, এর বিরুদ্ধে যারা আছেন, যারা মতপ্রকাশ করবেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ খুঁজে দেবেন, বাংলাদেশের এমন সব মানুষের এই সংলাপে দাওয়াত। তিনি বলেন, ধানের শীষে ভোট দেয়ায় নোয়াখালীর সুবর্ণচরে একজন নারীকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু ওই নারীকে ধর্ষণ করা হয়নি। ১০ কোটি ভোটারকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সারা পৃথিবীর মানুষ আজ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে, কী হলো বাংলাদেশে। জামায়াতকে ঐক্য থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে কি না- সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জামায়াতে ইসলামী ঐক্যফ্রন্টে আগেও ছিল না, এখনো নেই। জাতীয় সংলাপেও জামায়াত থাকছে না। জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব বলেন, এটা একটা পুরনো প্রশ্ন। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর এই প্রশ্নের সমাধান হয়ে গেছে। এখন বারবার এই প্রশ্ন তুলে ইস্যু তৈরি করা উচিত নয়। আমরা মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম।
আ স ম আবদুর রব, মোস্তফা মোহসিন মন্টু ও মাহমুদুর রহমান মান্না মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যেতে পারে না। এক প্রশ্নের জবাবে গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব দল অংশ নিয়েছে তাদের সবাইকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হবে। জামায়াত এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তাই তাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে না। এর আগে ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের মতিঝিল চেম্বারে বিকাল ৪টায় বৈঠক শুরু হয়, চলে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। তবে বৈঠকে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিল না। এ বিষয়ে আ স ম রব বলেন, বিএনপি ঐক্যফ্রন্টে ছিল, আছে এবং থাকবে। আজকের বৈঠকে তাদের একজন আসছেন, এখনো পৌঁছাতে পারেননি। রব বলেন, আমাদের প্রত্যেকের কাজ আছে। ট্রাইব্যুনালে মামলা করার জন্য কিছু কাজ রয়েছে। এই জন্য দেরি না করে আমরা চলে যাচ্ছি। এ বিষয়ে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু বলেন, বিএনপির সঙ্গে আমাদের আলাপ-আলোচনা হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অসুস্থ। এই জন্য আসতে পারেননি।
আজকের বৈঠকে অংশ নেয়ার কথা ছিল দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ড. আবদুল মঈন খানের। কিন্তু যানজটে আটকে যাওয়ায় এখনো পৌঁছাতে পারেননি। বিএনপির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের কোনো দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্টু বলেন, ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির মধ্যে কোনো দূরত্ব তৈরি হয়নি। আমরা প্রথম দিন যেমন ছিলাম, এখনো আমাদের ঐক্য তেমনি আছে। মন্টু বলেন, আজকের বৈঠকের আলোচনার মূল বিষয় ছিল- জাতীয় সংলাপ। আমরা আগামী ২৮শে জানুয়ারি একটি জাতীয় সংলাপ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটার ভেন্যু নিয়ে জটিলতার কারণে দিনটি পরিবর্তন করেছি। আজ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ভেন্যু পাওয়া সাপেক্ষে আগামী ৬ই ফেব্রুয়ারি আমরা জাতীয় সংলাপ করব। তিনি বলেন, আমরা মনে করি- ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণ পরাজিত হয়েছে। তাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। সুতরাং এর বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধ জনগণকে নিয়েই আমাদের করতে হবে।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো জটিলতা নেই, দূরত্বও তৈরি হয়নি। এ বৈঠকে বিএনপির দুজন প্রতিনিধির অংশগ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু রাস্তায় যানজটে পড়ে তাদের বিলম্ব হয়েছে বলেই তারা বৈঠকে অংশ নিতে পারেননি। আমি নিজেও যানজটের কারণে এক ঘণ্টা বিলম্বে বৈঠকে উপস্থিত হয়েছি। এখানে অন্য কিছু খোঁজা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, আমরা যে জাতীয় সংলাপটি করতে চাই, সেটার জন্য একটি স্থান বা হলের প্রয়োজন। কিন্তু পুলিশের অনুমতিও পাওয়া যাচ্ছে না, আবার হল কর্তৃপক্ষও বুকিং নিতে চাইছে না। ফলে আমরা জাতীয় সংলাপটির দিন-তারিখ পিছিয়ে দিয়েছি। তবে অনুমতি না পেলে আমরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে রাস্তায় হলেও সংলাপটি করব। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমরা এখন ব্যস্ত হচ্ছি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা নিয়ে। আগামী ৩০শে জানুয়ারির মধ্যে মামলা করতে হবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা সকল আসন থেকে ইন্ডিভিজ্যুয়ালি মামলা করবেন।
ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু, গণফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা সুলতান মোহাম্মাদ মনসুর ও নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখ অংশ নেন।

ভোটের আগে বিরোধীদলের বড় নেতাদের আটক করা হয় -এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদন

বাংলাদেশে গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে প্রধান বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আটক করে কারাগারে পাঠিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে হাজার হাজার কর্মী-সমর্থকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরডব্লিউ বৈশ্বিক প্রতিবেদন -২০১৯-এ এসব কথা বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন অংশে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জোরদার হচ্ছে।
প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে বলা হয়, গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে দেশটির কর্তৃপক্ষ প্রধান বিরোধী দলগুলোর জ্যেষ্ঠ সদস্যদের আটক কিংবা গ্রেপ্তার করেছে। হাজার হাজার বিরোধীদলীয় সমর্থকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দিয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচক নাগরিক সমাজের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মৃত কিংবা গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ব্যক্তির বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত জুলাইয়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ক্ষমতাসীন দলের সদস্য এবং দলটির ছাত্র শাখার সদস্যরা লাঠিসোঁটা নিয়ে চড়াও হয়। ওই হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করায় ‘সহিংসতায় উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। আলোকচিত্রী শহীদুল আলম গ্রেপ্তার হন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনার মুখেও তিনি ১০৭ দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত সেপ্টেম্বরে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের নিপীড়নমূলক ধারাগুলো চিহ্নিত করার কথা থাকলেও নতুন আইনেও পুরোনো আইনের বিধানগুলো রাখা হয়। একই সঙ্গে নতুন নতুন বিধানও যুক্ত হয়েছে। সরকারের সমালোচনা বন্ধে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা এখনো ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকেরা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম অব্যাহত রয়েছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণে মানবিক, চিকিৎসাসহ অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করেছে সরকার। তবে এই জনগোষ্ঠীকে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেওয়ায় শিবির ও শিক্ষার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি কর্তৃপক্ষ। মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন আলোচনা সফল না হওয়ায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করেছে সরকার। তবে এই চরে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বেশি।
এইচআরডব্লিউ জানায়, বাল্যবিয়ের হারের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। যদিও সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে বাল্যবিয়ে মুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের স্বীকৃতি দিয়ে আইন প্রণয়নসহ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তবে লিঙ্গভিত্তিক সংখ্যালঘুরা এখনো চাপ ও হুমকির মধ্যে রয়েছে।