Saturday, January 31, 2026

হিন্দুত্ববাদ কাশ্মীরকে যেভাবে গ্রাস করে ফেলছে by জাওয়াদ খালিদ

হিন্দুত্ববাদের ছায়া ধীরে ধীরে কাশ্মীরে নেমে আসছে। সম্প্রতি মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোর ওপর অধিক নজরদারি, আর মুসলিম শিক্ষার্থী-অধ্যুষিত একটি মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এ বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়।

কাশ্মীরে যা ঘটছে, তা আলাদা কোনো ঘটনা নয়। এটি ভারতের মুসলমানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামবিদ্বেষের মাধ্যমে তাদের ধীরে ধীরে বঞ্চিত ও কোণঠাসা করা হচ্ছে। গত ১০ বছরে ভারতের রাজনীতি ও সমাজে হিন্দুত্ববাদের প্রভাব এতটাই গভীর হয়েছে যে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো এখন এর শিকার।

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গেরুয়াকরণ করার চেষ্টা নতুন নয়। তবে ভারতীয় জনতা পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতা ও গণমাধ্যমের বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পর এই প্রক্রিয়া নজিরবিহীন গতি পেয়েছে। গেরুয়াকরণ বা হিন্দুকরণ কখনোই ইসলামবিদ্বেষ থেকে আলাদা নয়; এটি সরাসরি মুসলমানদের প্রান্তিককরণের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

বারবার স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে দেশের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার নয়। গরু রক্ষা নামের সহিংসতা, লাভ জিহাদ ও ল্যান্ড জিহাদের মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, মসজিদ ভাঙা, প্রকাশ্য গণপিটুনি কিংবা দরিদ্র মুসলিম মহল্লায় বুলডোজার চালানো—সব ক্ষেত্রেই হিন্দুত্ববাদের ঘৃণার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য মুসলমানরাই।

এখন এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আঘাত গিয়ে পড়ছে কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপর। ভারতের অন্য অঞ্চলের তুলনায় কাশ্মীরে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভয়, আতঙ্ক ও বর্জনের রাজনীতির মাধ্যমে তাদেরও সন্দেহভাজন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ উপত্যকাজুড়ে মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে লক্ষ্য করে একটি অনধিকারমূলক অভিযান শুরু করেছে। বহু পৃষ্ঠার ফরম বিতরণ করে ইমাম, ধর্মশিক্ষক ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির লোকদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য চাওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ। কিন্তু কাশ্মীরের অনেক মানুষের কাছে মনে হচ্ছে, এটি নিরাপত্তার চেয়ে সামষ্টিক সন্দেহ আর নজরদারির হাতিয়ার।

ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে। উপাসনালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে নজরদারির আওতায় আনা পুরো সম্প্রদায়ের কাছে একটি বার্তা দেয় যে তাদের বিশ্বাস ও উপাসনার স্থান রাষ্ট্রের চোখে সন্দেহের বিষয়।

জম্মুর শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্স বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা বঞ্চনার আরেকটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম এমবিবিএস ব্যাচে ভর্তি হওয়া ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪২ জনই ছিলেন মুসলিম। তাঁরা সবাই ভারতের জাতীয় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর ডানপন্থী উগ্র গোষ্ঠীগুলো বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, একটি হিন্দু তীর্থস্থানের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সুবিধা নেওয়ার কোনো অধিকার মুসলমানদের নেই। এর কিছুদিন পর জাতীয় মেডিকেল কমিশন অবকাঠামোগত ঘাটতির অজুহাতে কলেজটির স্বীকৃতি বাতিল করে দেয়।

এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয়, মুসলমানদের জীবন ও সাফল্যকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাশ্মীরে এই বাস্তবতা আরও তীব্র। কারণ, অঞ্চলটি আগেই তল্লাশি অভিযান, চেকপোস্ট ও সার্বক্ষণিক নজরদারির ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার–বিশেষজ্ঞরা জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বিষয়ে গুরুতর সতর্কবার্তা দেন। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পেহেলগামে হামলার পর প্রায় ২ হাজার ৮০০ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরাও ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বিচার ছাড়াই দীর্ঘ সময় আটক, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, বাড়িঘর ভেঙে ফেলা এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের হয়রানির তথ্য উঠে আসে।

কাশ্মীর ক্রমেই সারা ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রবণতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব সোসাইটি অ্যান্ড সেক্যুলারিজমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। এসব সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশই ছিলেন মুসলমান। ওই বছর নথিভুক্ত ৫৯টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মধ্যে ৪৯টিই ঘটেছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ধর্মভিত্তিক ঘৃণাজনিত অপরাধের প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটেছে ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর।

ঘৃণামূলক বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে। ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই ১ হাজার ৩০০টির বেশি ঘৃণামূলক ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর বেশির ভাগই ঘটেছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে এবং মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমান ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। গরু রক্ষার নামে সন্ত্রাসী দল, বুলডোজার দিয়ে শাস্তি দেওয়া এবং নাগরিকত্ব ও ধর্মান্তর–সংক্রান্ত বৈষম্যমূলক আইন সমষ্টিগত শাস্তি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।

কাশ্মীরে যা ঘটছে, তা আসলে বর্জন ও ভয়ের রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পেরই স্বাভাবিক পরিণতি। যারা আগে থেকেই অবিরাম অবরোধ ও নজরদারির মধ্যে বসবাস করছে, সেই মুসলমানদের এখন আরও বেশি প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ধর্মের ভিত্তিতে তাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের মুসলমানদের ভবিষ্যৎ আশাব্যঞ্জক মনে হয় না।

হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প ধীরে হলেও নিষ্ঠুরভাবে এগিয়ে চলেছে। এটি একদিকে প্রতিষ্ঠান দখল করছে, অন্যদিকে মানুষের চিন্তা ও বোধবুদ্ধিকেও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ভারতের জনগণেরই। তারা কি ঘৃণা ছড়ানো শক্তি ও ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রকে ছেড়ে দেবে এবং সাভারকারের কল্পিত ঘৃণা ও ভয়ের রাষ্ট্রে রূপ নিতে দেবে, নাকি গান্ধী ও নেহরুর কল্পিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করবে।

এ মুহূর্তে সেই উত্তরের ভেতরে খুব একটা আশার কারণ দেখা যাচ্ছে না।

* জাওয়াদ খালিদ, পাকিস্তানভিত্তিক লেখক ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষক
- মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-22%2Fy3gmsw5r%2FkashmirbjpAFP.jpg?rect=14%2C0%2C1049%2C699&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাশ্মীরে বিজেপির বিস্তার। ফাইল ছবি: এএফপি

সংস্কারের উদ্যোগে বাধা ‘ডিপ স্টেট’

বিআইজিডির প্রতিবেদনঃ সংসদ নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা দরকার মনে করেন দেশের ৫১ শতাংশ মানুষ। কিন্তু গত দেড় বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ‘ডিপ স্টেট’ ও আমলাতন্ত্রের প্রতিরোধের মুখে পিছিয়ে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আসন্ন নির্বাচনের পর আমলাতন্ত্র তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংস্কারের প্রক্রিয়া থামিয়ে দিতে পারে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ‘২০২৪-এর অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতির রূপান্তর’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের একটি অংশে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।

ডিপ স্টেট বলতে বোঝায় অনির্বাচিত ব্যক্তিদের সংগঠিত বলয়, যারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে এবং নিজেদের স্বার্থকে সমুন্নত রাখে।

জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশের ৫১ শতাংশ মানুষ মনে করেন, নির্বাচনের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের ৭১ শতাংশ মানুষ মনে করতেন, দেশ রাজনৈতিকভাবে সঠিক পথে আছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এমন মনে করেন ৪২ শতাংশ মানুষ। ২০২৪ সালের আগস্টে ৬০ শতাংশ মানুষ মনে করতেন, দেশ অর্থনৈতিকভাবে সঠিক পথে আছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা মনে করেন ৪৫ শতাংশ মানুষ।

বিআইজিডির প্রতিবেদনে গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের চরিত্র বিশ্লেষণ করে অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘দুর্বল শক্তির ভারসাম্য (ইকোলিব্রিয়াম অব দ্য উইক)’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন বলছে, শুরুতে সংস্কারের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার যে বৈধতা ও জনসমর্থন ছিল, তা তিনি ব্যবহার করতে পারেননি। অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও আমলাতন্ত্র বা ডিপ স্টেটের বাধার মুখে তা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেদনের ভাষ্য, প্রধান উপদেষ্টা একেক সময় একেক দিকে তাঁর মত পরিবর্তন করেছেন।

প্রতিবেদন বলছে, সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকার বিএনপির বিরোধিতা সামলাতে পারলেও আমলাতন্ত্রের শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে সংস্কারের ক্ষেত্রে পিছু হটেছে। এমন বাস্তবতায় এটা ধরে নেওয়া যায় যে নির্বাচনের পর আমলাতন্ত্র সংস্কারবিরোধী ভূমিকা নিতে পারে। গণতান্ত্রিক শাসনপ্রক্রিয়ায় রূপান্তরের যে সম্ভাবনা, আমলাতন্ত্র তার ক্ষমতা ব্যবহার করে সে রূপান্তরপ্রক্রিয়া থামিয়ে দিতে পারে।

সংস্কারের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে নির্বাচনের পর, যা পরবর্তী সংসদ ও রাজপথে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের একটা উৎস হয়ে থাকবে বলে বিআইজিডির প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলোর ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আদর্শিক অবস্থান পরিবর্তনের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ১৯৯১ সালে সেন্টার-লেফট (মধ্যবাম) অবস্থানে থাকলেও ২০২৪ সালে এসে তার রাজনৈতিক আদর্শিক অবস্থান পরিবর্তন হয়ে সেন্টার-রাইট বা মধ্যডানে রূপ নিয়েছে। বিএনপি ১৯৯১ সাল থেকে তার রাজনৈতিক অবস্থান মধ্যডান বা সেন্টার-রাইট এখনো ধরে রেখেছে। প্রতিবেদনে নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিকে মধ্যপন্থী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

অভ্যুত্থানের তিন শক্তি

বিআইজিডির প্রতিবেদনে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে তিন শক্তির ভূমিকাকে নির্ণায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এ তিন শক্তি হলো শহুরে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী, শিল্পশ্রমিক ও শিক্ষার্থী। এ তিন শক্তির সম্মিলনে জনগণের একটা অজেয় শক্তি তৈরি হয়েছিল, যা সেনাবাহিনীকে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিতে বাধ্য করেছে।

প্রতিবেদন জানাচ্ছে, জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী দলগুলোর প্রভাব কমে এসেছে। বিপরীতে ইসলামি দলগুলোর প্রভাব বেড়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সহযোগী হিসেবে নয়, নিজেরাই স্বতন্ত্রভাবে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের ব্যাপক সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও রাষ্ট্রগঠনে তাদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর তৎপরতার মুখে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনকে কার্যকর রাখার বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

‘মবক্রেসি’ শক্তিশালী হয়েছে

গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে দেশে ভয়ংকর একধরনের গণপিটুনি ও সংঘবদ্ধ সহিংসতার প্রবণতা দেখা গেছে। এতে জড়িয়ে পড়েছে নানা পক্ষ—স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণ গোষ্ঠী, প্রভাবশালী ক্ষমতাকেন্দ্রের দালাল, উগ্র ইসলামপন্থী নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি পাওয়া জনতা, সুযোগসন্ধানী লুটেরা এবং তথাকথিত স্বেচ্ছা বিচারকারীরা। এসব সহিংসতা কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাড়াই বিভিন্ন খণ্ডিত গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংঘটিত হচ্ছে, যা আবেগের সংক্রমণ, নৈতিক ক্ষোভ এবং নতুন করে অর্জিত ক্ষমতা প্রদর্শনের তাড়নায় পরিচালিত।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ২৯৫ জন। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই নিহত হয়েছেন ১৯৭ জন। অন্যদিকে বিআইজিডির জরিপে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা গণপিটুনি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ৬২ শতাংশ নারী নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছেন।

জানতে চাইলে বিআইজিডির উপদেষ্টা মির্জা হাসান বলেন, প্রধান উপদেষ্টার পেছনে পুরো ছাত্রসমাজ ছিল, জনসমর্থন ছিল। তিনি চাইলে ব্যাপক সংস্কারের পক্ষে একটি অবস্থান নিতে পারতেন। মির্জা হাসান বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত যে যেদিক দিয়ে চাপ দিয়েছে, তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) সেদিকে চলে গেছেন। তিনি ঘোষণা দিচ্ছেন এটা করব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল সেটা করলেন না। সমঝোতা করে ফেললেন বিএনপির সঙ্গে, ছাত্রদের সঙ্গে বা আমলাতন্ত্রের সঙ্গে।’

সংস্কার
সংস্কার। প্রতীকী ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কেন আস্থা হারাচ্ছে মিত্ররা, কেন তারা চীনের দিকে ঝুঁকছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বছর আগে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে যাত্রা শুরু করেন। তখন অনেকে ধারণা করেছিলেন, ট্রাম্পের এ নীতির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে চীনের ধীরগতির অর্থনীতি। কিন্তু বাস্তবে ভিন্নচিত্র দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যেই চীন অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করে রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্য উদ্বৃত্তি অর্জন করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে নিজেদের পুরোনো মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু কানাডা ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের দিকে মনোযোগ দিয়েছে চীন। ফলে ২০২৫ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার।

একই সময়ে চীনের মাসিক বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ ছুঁয়েছে ১০ হাজার কোটি ডলার, যা চীনের এযাবৎকালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি বৈশ্বিক লেনদেনে চীনের মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় চীনে পৌঁছেছেন। চীনের সঙ্গে গত কয়েক বছরে কিছুটা শীতল হয়ে পড়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক চাঙা করাই তাঁর সফরের মূল লক্ষ্য। বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই সফর কাজে লাগিয়ে চীন তার বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বোস্টন কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক আলেকজান্ডার টমিক বলেন, প্রায় ২০ লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতি এবং ৪৫ লাখ কোটি ডলারের শেয়ার ও বন্ডবাজারের জোরে চীন অনেক দেশের কাছে এখন ‘স্থিতিশীল অংশীদার’ হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অলস্প্রিং গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টসের উদীয়মান বাজারের ইকুইটি বিভাগের সহপ্রধান ডেরিক আরউইনের ভাষায়, ‘চীন খুব সচেতনভাবেই নিজেকে নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে।’

আরউইনের ভাষ্যমতে, ‘তারা মূলত বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বিশাল বাণিজ্য অংশীদার এখন অনেক বেশি অনিশ্চিত। আমরা তার বিকল্প দিচ্ছি, অনুমানযোগ্যতার পাশাপাশি যার নিশ্চয়তা আছে।’

স্টারমারের চার দিনের চলতি সফর ২০১৮ সালের পর কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চীন সফর। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি চীন সফর করেন। ২০১৭ সালের পর কানাডার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বেইজিং সফর করেন। তাঁর সফরে দুই দেশ বাণিজ্য বাধা কমানো এবং নতুন কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি অর্থনৈতিক চুক্তি করেছে। সফরে কার্নি চীনকে ‘আরও বেশি অনুমানযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ বলে মন্তব্য করেন।

শুধু যুক্তরাজ্য বা কানাডা নয়, অন্যান্য দেশও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নতুন অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির চেষ্টা করছে। গত মঙ্গলবার ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা একটি বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করেছে। এই চুক্তির ফলে অধিকাংশ পণ্যে শুল্ক কমবে এবং ২০৩২ সালের মধ্যে ইউরোপ থেকে ভারতে রপ্তানি দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

চাপেও টিকে আছে চীনের অর্থনীতি

বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কয়েক বছর ধরে ভূরাজনৈতিক বিরোধ চলছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তিসহ একাধিক ক্ষেত্রে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।

গত বছরের এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ১০০ শতাংশের বেশি করেছিলেন। কিন্তু এক সমঝোতার পর তা কিছুটা কমানো হয়েছে। চীন এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্যান্য বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাত ও আর্থিক বাজারে সহায়তা জোরদারের উদ্যোগ নেয়।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালে চীনের রপ্তানি ২০ শতাংশ কমলেও আফ্রিকায় তা ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ, লাতিন আমেরিকায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বোস্টন কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক আলেকজান্ডার টমিক বলেন, ‘যেসব দেশ আগে চীনের প্রতি খুব একটা সহানুভূতিশীল ছিল না, তারাও এখন চীনের দিকে ঝুঁকছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে পূর্বানুমান করাটা দিন দিন কমছে।’ তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র যত কঠিন হয়ে উঠছে, চীনের জন্য ততই সুযোগ বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেও চীনের অর্থনীতি ২০২৫ সালে সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করেছে। একই সময়ে দেশটি ঘরোয়া বাজারের দুর্বল চাহিদা এবং দীর্ঘস্থায়ী আবাসন খাতের মন্দার কারণে দরপতনের (ডিফ্ল্যালেশন) চাপে ছিল।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে গত কয়েক মাসে চীন একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বেইজিং, সাংহাইসহ বিভিন্ন অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে (বিদেশিদের) বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

গত ডিসেম্বরে চীনের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ছিল ১০ হাজার ১০ কোটি ডলার, যা মাসওয়ারি হিসেবে দেশটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার কোটি ডলার, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

শেয়ারবাজারেও চীনের অবস্থান শক্তিশালী। গত এক বছরে সাংহাই সূচক ২৭ শতাংশ বেড়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারকেও ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে ইউয়ানের বৈশ্বিক ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

ট্রাম্পের অস্থিতিশীল বাণিজ্য ও কূটনৈতিক নীতির কারণে অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে ডলার ক্রমে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এই সুযোগে চীন ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে আরও শক্ত অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকারদের মতে, বড় বড় বৈশ্বিক ব্যাংক এখন বিদেশি বাজারে ইউয়ানের তারল্য বাড়াতে এবং দ্রুত লেনদেন নিষ্পত্তির অবকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যস্ত।

বৈশ্বিক একটি ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘চীন আগেও কয়েক দফা ইউয়ান আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা করেছে, আবার পিছু হটেছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ট্রাম্পের নীতিই ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে সহায়ক হয়ে উঠেছে।’

বর্তমানে চীনের আন্তসীমান্ত লেনদেনের অর্ধেকের বেশি ইউয়ানে হচ্ছে। অথচ ৫ বছর আগে তা ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। একই সঙ্গে চীনের আন্তর্জাতিক ব্যাংকঋণের প্রায় অর্ধেকই দেওয়া হয়েছে রেনমিনবিতে (ইউয়ানে)।

চীন নিয়ে সতর্কতা

চীনের এই নতুন বন্ধুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে সবাই আশ্বস্ত নয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনাস্থা থাকলেই যে তার মিত্ররা চীনের ওপর আস্থা রাখবে, তা কিন্তু নয়।

কিম বলেন, ‘অনেক দেশে চীনের বাণিজ্যনীতি, অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের প্রবণতা এবং সামুদ্রিক ও ঐতিহাসিক বিরোধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।’

কিমের মতে, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের চরম বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য ও আচরণের বিপরীতে চীনকে আপাতত সংযত ও বাস্তববাদী বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বেইজিংয়ের প্রকৃত আচরণ এখনো পুরোপুরি আশ্বস্ত করার মতো হয়নি।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-28%2Fmswbs9n8%2FUntitled-4.png?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার চার দিনের সফরে বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন। ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

মিসরে বিপ্লবীরাই এখন কারাগারে

প্রকাশ ২৫ জানুয়ারি ২০১৫ঃ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বুঝি একেই বলে! মিসরে চার বছর আগে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনে লাখো বিপ্লবী রাজপথে নেমেছিলেন। তাঁদের অনেকেই এখন কারাগারে। আর কারাগারে বন্দী ক্ষমতাচ্যুত মোবারক মুক্তির অপেক্ষায়।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, আজ ২৫ জানুয়ারি ২০১৫ মিসরে মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনের চার বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু গত চার বছরে মিসরে কিছু বদলায়নি। বিফলে গেছে সাড়াজাগানো ‘বিপ্লব’।

২০১১ সালে আরব বসন্তের অন্যতম ঘটনা ছিল মিসরে মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলন। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ওই গণ-আন্দোলনে পতন ঘটে এক সময়ের লৌহমানব মোবারকের। নিহত হন আট শতাধিক বিক্ষোভকারী।

বিপ্লব শেষে বন্দী হন মোবারক ও তাঁর বেশ কয়েকজন সহযোগী। বিক্ষোভকারীদের হত্যা, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁদের বিচার শুরু হয়। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে এখন মিসরের শাসন ক্ষমতা এসেছে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির হাতে। তিনি ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান। মোবারকের শাসনামলের এই সেনা কর্মকর্তা উর্দি ছাড়লেও স্বৈরশাসনের দুর্গন্ধ থেকে মুক্ত নন। বরং তাঁর কর্মকাণ্ডে যেন মোবারকের অপচ্ছায়াই মূর্ত হয়ে উঠছে। হত্যা ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ থেকে মোবারকের একের পর এক খালাস পাওয়ার ঘটনাকে এখন অনেক বিশ্লেষকই বাঁকা চোখে দেখছেন।

বিক্ষোভকারীদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ২০১১ সালের ২৪ মে মোবারককে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর আদেশ দেওয়া হয়। বিচারে ২০১২ সালের ২ জুন তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয়। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে আপিল কোর্ট মোবারকের ওই দণ্ডাদেশ প্রত্যাখ্যান করে মামলাটির পুনর্বিচার করার নির্দেশ দেন। গত বছরের নভেম্বরে ওই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে মোবারক ও তাঁর সাতজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রীয় তহবিলের অর্থ আত্মসাতের একটি মামলায় ২০১৪ সালে মিসরের একটি আদালত মোবারককে কারাদণ্ডাদেশ দেন। কিন্তু আপিল আদালত ওই দণ্ড বাতিল করে পুনর্বিচারের আদেশ দেন।
দিন কয়েক আগেই মোবারকের দুই ছেলে কারাগার থেকে বেরিয়েছেন। মোবারকসহ তাঁদের বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলা পুনর্বিচারাধীন রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব হিউম্যান রাইটসের অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের অব্যাহতি এবং রাজনৈতিক কর্মীদের কারাদণ্ড দিয়ে মিসরের বিচার বিভাগ দ্বৈতনীতি প্রদর্শন করছে।
বিপ্লবে অংশ নেওয়া জিয়াদ আল-এলাইমি বলেন, মোবারকের রায় আমাদের এই বার্তা দেয় যে কর্তৃপক্ষ যতই দুর্নীতি ও নিপীড়ন করুক না কেন, তা কোনো বিষয় নয়। তাঁরা সব সময় শাস্তির বাইরে থাকবেন। এটা খুবই কষ্টদায়ক।’

এলাইমি বলেন, ২০১১ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হলে আমাদের ফাঁসি হতো। এখন আমরা আমাদের সেই রাজনৈতিক অবস্থানের মূল্য দিচ্ছি।

বিপ্লবীরা বলছেন, ২০১১ সালে তীব্র গণ-আন্দোলনে তিন দশকের শাসক মোবারকের পতনের আনন্দ এখন নিরানন্দে পরিণত হয়েছে। মিসরের এখনকার শাসক মোবারকের চেয়েও বেশি স্বৈরাচারী। বিনা অনুমতিতে বিক্ষোভ করার অভিযোগে মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক বিপ্লবী এখন কারাগারে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মোবারক-বিরোধী আন্দোলনের নেতা আহমেদ মাহের ও মোহাম্মদ আদেল। এ দুজনকে তিন বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

মোবারকের পতনের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি। ২০১৩ সালে সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান সিসি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মোবারকের চেয়েও নিপীড়নমূলক শাসন প্রবর্তন করেছেন। দমন-পীড়নে সাবেক স্বৈরশাসককে ছাড়িয়ে গেছেন এই নব্য শাসক। সিসির আমলে নৃশংস অভিযানে মুরসি-সমর্থক ও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে কারাবন্দী করা হয়েছে। গণহারে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ।

মোবারক-বিরোধী বিপ্লবী জিয়াদ আল-এলাইমির ভাষ্য, ‘গত চার বছরে কিছুই বদলায়নি। আমরা এখনো একই স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ দেখছি। দেখছি একই দুর্নীতি, স্বাধীনতা হরণ।’

মিসরে হোসনি মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনের চার বছর পূর্ণ হয়েছে আজ ২৫ জানুয়ারি। গত চার বছরে দেশটিতে কিছুই বদলায়নি। বরং আরও বেশি স্বেচ্ছাচারী শাসন কায়েম হয়েছে। ছবি: এএফপি
মিসরে হোসনি মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনের চার বছর পূর্ণ হয়েছে আজ ২৫ জানুয়ারি। গত চার বছরে দেশটিতে কিছুই বদলায়নি। বরং আরও বেশি স্বেচ্ছাচারী শাসন কায়েম হয়েছে। ছবি: এএফপি

ইরানে সামরিক অভিযানের প্রয়োজন পড়বে না: ট্রাম্পের আশা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে যেতে চান। সম্ভাব্য একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে আরও আলোচনা করার পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে।

বৃহস্পতিবার স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রের উদ্বোধনীতে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমার প্রথম মেয়াদে আমি সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছি, আর এখন আমাদের একটি বাহিনী ইরান নামের একটি স্থানের দিকে এগোচ্ছে। আশা করি আমাদের সেটি ব্যবহার করতে হবে না।’

ইরানের সঙ্গে তিনি আলোচনা করবেন কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আগেও আলোচনা করেছি, আবার করার পরিকল্পনাও রয়েছে। হ্যাঁ, এই মুহূর্তে আমাদের অনেক বড় ও অত্যন্ত শক্তিশালী জাহাজ ইরানের দিকে যাত্রা করছে। তবে সেগুলো যদি ব্যবহার করতে না হয়, সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো।’

ইরানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, কয়েক দিন ধরেই এমন জল্পনা-কল্পনা চলছে। এরই মধ্যে গত সোমবার মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরিসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান অভিমুখে আরও নৌবহর পাঠানোর কথা জানিয়েছে দেশটি। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে সামরিক মহড়া চালানোরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

গত মঙ্গলবার এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আরও একটি সুসজ্জিত নৌবহর ইরানের পথে আছে। আমি আশা করছি, তারা (ইরান) সমঝোতা করতে রাজি হবে।’

অবশ্য ট্রাম্পের এমন হুমকিকে পাত্তা দিচ্ছে না ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত বুধবার বলেছেন, ইরানকে হুমকি দিলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সামরিক হুমকি দিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো কোনো ফলপ্রসূ উপায় হতে পারে না। যদি তারা আলোচনায় বসতেই চায়, তাহলে হুমকি ও অযৌক্তিক প্রসঙ্গ তোলা বাদ দিতে হবে।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) বিমানবাহিনীর শাখা এয়ার ফোর্সেস সেন্ট্রাল মঙ্গলবার জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে একটি প্রস্তুতিমূলক সামরিক মহড়া চালাবে। কয়েক দিন চলবে মহড়া। সেন্টকমের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় যুদ্ধবিমান মোতায়েন ও সক্ষমতা প্রদর্শন করা এ মহড়ার উদ্দেশ্য। আঞ্চলিক অংশীদারত্ব জোরদার করা ও হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিতে মহড়ার নকশা করা হয়েছে।

তবে মহড়ার দিন-তারিখ, স্থান ও কী ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে, তার কোনো তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা দেখানোর উদ্দেশ্যে মহড়াটি সাজানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

গত সোমবার সেন্টকম জানিয়েছে, পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে একটি বড় নৌবহর ওই অঞ্চলে পৌঁছেছে। কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ও প্রায় ৫ হাজার নাবিক বহনকারী এ বিমানবাহী রণতরিতে একাধিক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ডেস্ট্রয়ার রয়েছে। যেকোনো হামলা থেকে নৌবহরকে সুরক্ষা দিতে এ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।

ইরানে সামরিক অভিযান চালাতে কোনো দেশকে সৌদি আরবের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না রিয়াদ। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এক ফোনালাপে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। মঙ্গলবার দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ এমন তথ্য দিয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-30%2F9mxyr86s%2FTrump.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করতে চাইছে। ছবি: কোলাজ

Friday, January 30, 2026

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় রয়েছে: সামরিক মুখপাত্র

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইরানকে সময় বেঁধে দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইজিআরসি) ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এসব ঘটনায় ইরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, যেকোনো হামলার জবাবে তারা সরাসরি মার্কিন ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজে হামলা চালাবে।

ইরানের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর অনেক ‘দুর্বলতা’ আছে। এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা অসংখ্য মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ইরানের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যেই রয়েছে।

এদিকে তেহরান থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক আলী হাশেম জানিয়েছেন, আঞ্চলিক দেশগুলো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে, যাতে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যায়; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো নিয়ে সমস্যা রয়ে গেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন ইরান যেন পুরোপুরি পারমাণবিক কার্যক্রম এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে। সেই সঙ্গে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও পাল্লা কমিয়ে ফেলে।

এসব বিষয় ইরানের জন্য ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমা, যা তারা কোনোভাবেই মানতে রাজি নয়।

ফলে দুই পক্ষ আলোচনার কথা বললেও তাদের শর্তের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। বর্তমানে সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে কোনো সমঝোতায় আসার সম্ভাবনা খুব কম দেখা যাচ্ছে।

ওই অঞ্চলের ভয়াবহ সংকট এড়াতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আবার পরমাণু আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

কাতার নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ফোনে কথা বলেছেন। তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: এএফপি

ট্রাম্প যে কারণে ইরানিদের ‘ত্রাতা’ হতে চান by বেলেন ফার্নান্দেজ

ইরানজুড়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভের প্রায় দুই সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পছন্দের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথে একটি বার্তা দেন। তিনি লেখেন, ‘ইরান এমন এক স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে, যা (ইরান) আগে কখনো দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প।’

বরাবরের মতোই ট্রাম্পের লেখাটিতে ছিল বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার আর অতিরিক্ত বিস্ময়সূচক চিহ্ন, যা কোনো পরাশক্তির নেতার চেয়ে বরং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর লেখাই বেশি মনে হয়। কিন্তু এর চেয়ে গুরুতর সমস্যা হলো তাঁর ‘সাহায্য’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ‘সাহায্য’ খুব একটা গৌরবের বিষয় নয়, বিশেষ করে সেই ব্যক্তির নেতৃত্বে, যিনি গত গ্রীষ্মেই ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছিলেন। ক্ষমতায় ফেরার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন।

এর ওপর ট্রাম্পই ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা বজায় রেখেছেন, যা দেশটিতে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে এবং বর্তমান বিক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ফলে সাধারণত সবচেয়ে বেশি ভোগে সাধারণ মানুষ, অভিজাত শ্রেণি নয়। ইরানেও তা–ই হয়েছে।

এটি যেমন ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তেমনি ইরানকে ঘিরে তাঁর বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একধরনের পরিবর্তন। আগে ট্রাম্পের ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল পারমাণবিক অস্ত্র ও রাসায়নিক কিংবা জীবাণু অস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা। এসবকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেমন হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হতো, তেমনি ইসরায়েলের জন্যও বিপজ্জনক বলে প্রচার করা হতো।

কিন্তু এখন ট্রাম্প নিজেকে ‘ত্রাতা’ হিসেবে তুলে ধরছেন। চলতি মাসে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় এবং সহিংসভাবে হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানিদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে।

মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘সাহায্য আসছে।’ তবে এই সাহায্য কী ধরনের, সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী গণমাধ্যমগুলো উৎসাহব্যঞ্জক শিরোনাম দিয়ে বিষয়টি আরও উসকে দিয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন বলেছেন, ইসরায়েল ইরানের বিক্ষোভকারীদের স্বাধীনতাসংগ্রামকে সমর্থন করে এবং নিরপরাধ বেসামরিক মানুষদের ‘গণহত্যা’র তীব্র নিন্দা জানায়। কথাটি এসেছে এমন একজন মানুষের মুখ থেকে, যিনি নিজে দুই বছরের বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই সাহায্যের প্রতিশ্রুতি শুনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তিনি কি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের পুরোনো নীতির বই থেকেই পাতা ওলটাচ্ছেন না! বুশ ছিলেন তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর মুখপাত্র। তিনি এমন এক প্রশাসনের প্রধান, যারা নব্য রক্ষণশীল মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে নিবেদিত ছিল। ট্রাম্প ওই মতাদর্শের বিরোধিতা দীর্ঘদিন ধরে করে এসেছেন।

নব্য রক্ষণশীলদের লক্ষ্য হলো গণতন্ত্র প্রচার কিংবা জুতসই অজুহাত বানিয়ে বিশ্বজুড়ে সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো এবং সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার ঘটানো। ট্রাম্প একসময় বহু মার্কিন ভোটারকে আকৃষ্ট করেছিলেন এই বলে যে তিনি দূরদেশের এমন অভিযান ত্যাগ করবেন এবং পুরো মনোযোগ দেবেন ‘আমেরিকাকে আবার মহান’ বানানোর কাজে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নব্য রক্ষণশীল প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা এত সহজ নয়।

সত্যি বলতে, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সঙ্গে বুশের সময়ের মিল একাধিক জায়গায় পাওয়া যায়। দুজনেরই আচরণ অনেকটা ভাঁড়ামিপূর্ণ। ইংরেজি ব্যাকরণ ও বানানের সঙ্গে তাঁদের অদ্ভুত সম্পর্কও আছে। এসব বিষয় হাস্যকরই লাগত, যদি না তাঁদের শাসনামলে এত ব্যাপক রক্তপাত ঘটত। একইভাবে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ঈশ্বরকে নিজের পক্ষে টানার প্রবণতাও দুজনের মধ্যেই অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখা গেছে।

শাসন পরিবর্তনের নীতির এবং ইরাক ও আফগানিস্তানে বুশ আমলের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা ট্রাম্প বহুবার করেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় ফিরে প্রথম বছরেই তিনি একের পর এক দেশে বোমা হামলা চালিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণ করার ঘটনাও তিনিই ঘটিয়েছেন।

এদিকে ফ্লোরিডার কংগ্রেসম্যান র‍্যান্ডি ফাইন সম্প্রতি ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড দখলের অনুমতি দেওয়ার একটি বিল উত্থাপন করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমাদের হয়তো খামেনিকে মাদুরো করা উচিত।’ এখানে ‘খামেনি’ বলতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে বোঝানো হয়েছে, আর ‘মাদুরো’ শব্দটি কার্যত একটি নতুন ক্রিয়াপদে পরিণত হয়েছে, যার অর্থ কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাকে অপহরণ করা।

এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প যখন আবার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সাহায্য করতে ‘প্রস্তুত’, তখন ইরানে মার্কিন ‘সাহায্যে’র অতীত উদাহরণগুলো মনে করা জরুরি। যেমন ১৯৫৩ সালে সিআইএ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। ওই ঘটনার ফলেই নির্যাতনপ্রবণ ইরানের শাহর দীর্ঘ শাসনের পথ খুলে যায়, যার অবসান ঘটে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবে।

মজার বিষয় হলো, প্রয়াত শাহর ছেলে এখন ওয়াশিংটন ডিসির বাইরে বিলাসী নির্বাসিত জীবনে বসে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে ট্রাম্প হয়তো বুঝে ফেলেছেন যে বিদেশে মানুষকে ‘সাহায্য’ করার কথা বলে দেশের ভেতরের কিছু গভীরভাবে অগণতান্ত্রিক বাস্তবতা থেকে মনোযোগ সরানো যায়। যেমন যুক্তরাষ্ট্র কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে অভিবাসন কর্মকর্তারা নির্বিঘ্নে মার্কিন নাগরিকদের হত্যাও করতে পারছেন।

সব মিলিয়ে ট্রাম্প যখন ক্রমেই বুশের ছায়ায় হাঁটছেন, তখন ইরানিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই তথাকথিত ‘উদ্ধার’ সম্ভবত সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর একটি।

* বেলেন ফার্নান্দেজ, লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (ডানে)
ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (ডানে) ফাইল ছবি

রাজার ছেলে রাজা হবে, সেই সংস্কৃতি আমরা পাল্টে দিতে চাই: জামায়াত আমির

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘রাজার ছেলে রাজা হবে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে, সেই সংস্কৃতির ধারা আমরা পাল্টে দিতে চাই।’ আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফেনীতে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জেলা শহরের ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এ জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।

জামায়াতের আমির বলেন, ‘অতীতের বস্তাপচা রাজনীতি ফ্যাসিবাদ উপহার দিয়েছে, একনায়কতন্ত্র উপহার দিয়েছে, দুর্নীতিতে দেশকে চ্যাম্পিয়ন করেছে। ওই রাজনীতিকে আমরা লাল কার্ড দেখাতে চাই। আমাদের কাছে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই সমান। আমরা তাদের সবার অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ইনশা আল্লাহ এই কাজে কেউ বাধা দিয়ে আমাদের আটকাতে পারবে না।’

দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতার দিকে ইঙ্গিত করে জনসভায় জামায়াতের আমির বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় আমরা মাথা গরম দেখতে পাচ্ছি। শীতের দিনে মাথা গরম করলে, চৈত্র মাসে কী করবেন? একটু মাথাটা ঠান্ডা রাখেন। একটু জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান করেন, এতগুলো শহীদের প্রতি একটু শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুলির সামনে যাঁরা বুক পেতে দিয়েছিল, তাদের সম্মান করুন। সেই সম্মানটা করলে মাথা গরমের কোনো সুযোগ নেই।’

নারীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গায় মা-বোনদের ওপর হাত তোলা হচ্ছে। আমরা তাদের অতি বিনয়ের সঙ্গে আহ্বান জানাব, মা-বোন আপনাদেরও রয়েছে। নিজেদের মা-বোনকে সম্মান করুন, তাহলে বাংলার সবগুলা মা ও বোনকে আপনি সম্মান করতে পারবেন।’

১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষে ভোট চেয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লার মার্কা হচ্ছে স্বাধীনতা রক্ষার মার্কা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মার্কা। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মার্কা। এর পক্ষে গোটা দেশে একদম চাষ করে ফেলতে হবে। একটা মানুষও বাদ যাবে না।’

জামায়াতের আমিরের আগমন উপলক্ষে সকাল থেকেই স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয় জনসভাস্থল। বেলা ১১টায় তিনি মঞ্চে ওঠেন। এ সময় তিনি গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন। বেলা ১১টা ১২ মিনিটে তিনি বক্তব্য শুরু করেন। ১১টা ৩৫ মিনিটে বক্তব্য শেষ করে ফেনীর তিনটি আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা ও ঈগল প্রতীক তুলে দেন।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির পরিচালক এ টি এম মাসুম। তিনি বলেন, ‘আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়ে তুলব এর ফয়সালা হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। বৈষম্যমুক্ত, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গড়তে হলে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোটে জয়ী করতে হবে।’

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের কোনো পরিবর্তন আসেনি। গুম-খুনের শাসনের কারণে জুলাই আন্দোলনের প্রয়োজন হয়েছিল। গত দেড় বছরে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনসাফের পক্ষে রায় দিয়েছেন তরুণেরা।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বিএনপির উদ্দেশে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড না দিয়ে চাঁদাবাজি থেকে বেঁচে থাকার কার্ড দেবেন। ইভটিজিং ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধের কার্ড দেবেন। তাহলে মানুষের কাজে লাগবে। রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব কার্ড দেওয়া নয়। এটি ইউনিয়ন পরিষদ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাজ। নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা শুরু হলে আরেকটি ৫ আগস্ট ফেনী থেকে শুরু হবে।’

সমাবেশে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, ‘ফেনীর মেয়ে খালেদা জিয়া, সেই খালেদার আসনে বিএনপি আর নেই। শহীদ জিয়ার বিএনপি আর নেই। বিএনপি এখন চাঁদাবাজের দল। বিএনপির সঙ্গে জোটের সাবেক নেতারা আর কেউ নেই। জোটের সব নেতা বিএনপি ত্যাগ করেছে। বিএনপি এখন অনিবন্ধিত দল নিয়ে জোট গঠন করেছে। কয়েকটি দলের প্রধান বিএনপির হয়ে ভোট করছে৷’

জামায়াতের জেলা শাখার সেক্রেটারি মাওলানা আবদুর রহিমের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সাবেক জেলা আমির এ কে এম শামসুদ্দিন, ফেনী-৩ (দাগনভূঞা ও সোনাগাজী) আসনে জামায়াতের প্রার্থী ফখরুদ্দিন মানিক, ফেনী-১ (ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া) আসনের প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন, জাতীয় শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কবির আহম্মদ প্রমুখ।

ফেনীতে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে
ফেনীতে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। ছবি: প্রথম আলো

তবে কি ইরানকে ভয় দেখাতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

আল-জাজিরা এক্সপ্লেইনারঃ ইরানের উপকূলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটন দেশটির ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে, তাদের এই তৎপরতা সেটারই একটি বড় সংকেত হতে পারে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে যেতে চান। সম্ভাব্য একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে আরও আলোচনা করার পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে।

তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ এই ঘোষণার বেশ আগে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিশাল বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ বর্তমানে আরব সাগরে মোতায়েন করা হয়েছে। গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র যেসব সামরিক সরঞ্জাম ওই এলাকায় পাঠিয়েছে, এটি তার মধ্যে একটি।

তাহলে ট্রাম্পে কি ইরান সরকারকে ভয় দেখাতেই ইরান উপকূলে বড় আকারের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছেন? ট্রাম্প যা–ই করুন, সংঘাত না হলেই এই অঞ্চলের জন্য মঙ্গল। কারণ, ইসরায়েলের নির্বিচার গাজা হামলা এমনিতেই এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে।

যাই হোক, গত বছরের জুনে ১২ দিনব্যাপী ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাদের সামরিক শক্তি এই অঞ্চলে মোতায়েন করেছিল। তখন ওয়াশিংটন তাদের মিত্র ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়েছিল।

এরপর গত বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় সাগরে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করেছিল। এর কয়েক সপ্তাহ পরই তারা ভেনেজুয়েলার নৌযানের ওপর হামলা চালাতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, সেগুলো মাদক পাচারের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অবশ্য এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ তারা দেয়নি।

শেষ পর্যন্ত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে রাজধানী কারাকাসের সেফ হোম থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ শুরু হয়। শুরুতে সাধারণ মানুষ মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে বিক্ষোভে নামলেও পরে তা সরকার পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়।

অভিযোগ ওঠেছে, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক দমন–পীড়ন চালিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ দূত জানিয়েছেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সুযোগে ইরানের ধর্মীয় নেতাদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘সাহায্য আসছে’। তিনি হুমকি দেন, ইরান যদি বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তবে তিনি সামরিক ব্যবস্থা নেবেন।

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প তাঁর হুমকি কিছুটা কমিয়ে আনেন যখন ইরান সরকার তাঁকে আশ্বাস দেয়, কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না। গত সপ্তাহে যখন বিক্ষোভ পুরোপুরি দমে আসে, তখন ট্রাম্প দাবি করেন তাঁর চাপের কারণেই মৃত্যুদণ্ড বন্ধ হয়েছে, তবে ইরান তাঁর এই দাবি অস্বীকার করেছে।

তা সত্ত্বেও ট্রাম্পের কঠোর কথাবার্তা এবং ইরানের উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই অস্বাভাবিক অবস্থান দেখে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যেকোনো সময় হামলা শুরু হতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ উড়োজাহাজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, এই সামরিক সরঞ্জামগুলো ‘সতর্কতা হিসেবে’ নেওয়া হয়েছে। দরকার পড়লে ব্যবহারের জন্য সেগুলো মোতায়েন করা হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের বিশাল একটি নৌবহর ওই দিকে যাচ্ছে। হয়তো আমাদের এটি ব্যবহার করতে হবে না।’ তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেন, ইরান বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দিলে যুক্তরাষ্ট্র এমন হামলা চালাবে, যা গত জুনের হামলাকেও তুচ্ছ প্রমাণ করবে।

আমেরিকা কোন কোন সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করেছে, সে সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে কোন কোন মার্কিন সামরিক সম্পদ পৌঁছেছে

গত সোমবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে নিশ্চিত করেছে, ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখতে পারমাণবিক শক্তিচালিত রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে গত নভেম্বরে রওনা দেওয়া এই জাহাজ গত সপ্তাহ পর্যন্ত দক্ষিণ চীন সাগরে ছিল। এটি মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ।

সেন্ট্রাল কমান্ড এই নৌবহর মোতায়েনের সুনির্দিষ্ট কারণ জানায়নি, তবে এটি স্পষ্ট, ইরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চরম উত্তেজনার সময়েই এই বড় নৌবহর পাঠানো হয়েছে।

গত মঙ্গলবার মার্কিন বিমানবাহিনীও (অ্যাফসেন্ট) তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে (মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ২০টি দেশ যেখানে মার্কিন ঘাঁটি আছে) কয়েক দিনব্যাপী যুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে।

বিবৃতিতে বিমানবাহিনী জানায়, এই মহড়া তাদের দ্রুত সরঞ্জাম ও কর্মী মোতায়েনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এবং যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডেরেক ফ্রান্স বলেন, ‘এটি মূলত আমাদের বিমানসেনাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখার একটি প্রক্রিয়া, যাতে যখনই প্রয়োজন হয়, তখনই আকাশপথে শক্তি প্রদর্শন করা যায়। তবে এই মহড়ার নির্দিষ্ট স্থান বা সময় সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।’

২০২৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েই চলেছে। মূলত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের দমন করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। গাজার ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছিলেন হুতি যোদ্ধারা।

২০২৫ সালের জুন নাগাদ এই অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল বলে জানা যায়। বাহরাইন, মিসর, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আটটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

এ ছাড়া ওমান ও তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সামরিক স্থাপনা রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ জুন ইরান কাতারের আল-উদাইদ মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। এর আগের দিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালানোর কারণে তারা এই হামলা চালিয়েছিল। সে হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। কারণ, আগেভাগেই সেখান থেকে মার্কিন বিমান সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ইরানের ওই হামলাকে মূলত নিজেদের মান বাঁচানোর একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের ক্ষমতা কী

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন একটি ভাসমান বিমানঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। এতে ছয় থেকে সাত হাজার সেনা ও নাবিক থাকেন। এটি মার্কিন নৌবাহিনীর ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ৩’-এর প্রধান জাহাজ।

৩৩৩ মিটার লম্বা এই জাহাজ বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজগুলোর একটি। এটি পারমাণবিক শক্তিতে চলে, যার ফলে এটি ডিজেল ছাড়াই দশকের পর দশক চলতে পারে।

বিশাল আকার হওয়া সত্ত্বেও এটি বেশ দ্রুতগতিতে (ঘণ্টায় ৫৬ কিলোমিটারের বেশি) চলতে পারে, যার ফলে এটি দ্রুত আক্রমণ এড়াতে সক্ষম হয়।

এই জাহাজের সঙ্গে অন্তত তিনটি ছোট ও দ্রুতগতির ডেস্ট্রয়ার জাহাজ রয়েছে, যেগুলো এই বড় জাহাজকে পাহারা দেয়। এসব জাহাজ ইস্পাত দিয়ে তৈরি এবং এগুলো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে ও শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম।

এই ডেস্ট্রয়ার জাহাজগুলো হলো

-ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই পিটারসেন জুনিয়র: এতে অত্যন্ত উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

-ইউএসএস স্প্রুয়েন্স: এটি শক্তিশালী রাডার এবং সেন্সর সিস্টেমের জন্য পরিচিত। এটি সাবমেরিনবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে।

-ইউএসএস মাইকেল মারফি: এটি আগের জাহাজটিরই একটি নতুন মডেল।

এই নৌবহরে সাধারণত একটি ক্রুজার জাহাজ, একটি অ্যাটাক সাবমেরিন এবং একটি মালামাল সরবরাহকারী জাহাজও থাকে।

এই রণতরির সঙ্গে থাকা বিমানবাহিনীতে প্রায় ৬৫টি যুদ্ধবিমান থাকে। এর মধ্যে ‘এফ/এ-১৮ই সুপার হর্নেট’ প্রধান, যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে পারে।

২০২৫ সালের জুনের হামলায় কী ঘটেছিল

২০২৫ সালের ২২ জুন রাতে চার হাজার মার্কিন সেনা ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর মাধ্যমে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে (ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান) হামলা চালান।

ওই হামলায় ইরানের ওই কেন্দ্রগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, তারা সফলভাবে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নষ্ট করতে পেরেছে।

ফর্দো পারমাণবিক কেন্দ্রটি পাহাড়ের অনেক গভীরে অবস্থিত। সেটি ধ্বংস করতে ১২টি ‘বাংকার–বাস্টার’ বা বাংকারবিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল, যা মাটির ৬০ মিটার গভীর পর্যন্ত গিয়ে বিস্ফোরিত হতে পারে। এগুলো বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান থেকে ফেলা হয়েছিল।

নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রেও এই বাংকারবিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ইসফাহান গবেষণাকেন্দ্রে একটি মার্কিন সাবমেরিন থেকে ২৪টির বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তখন জানিয়েছিলেন, সে সময় এফ-৩৫ এবং এফ-২২ যুদ্ধবিমানও ইরানের আকাশে ঢুকেছিল। মোট ১২৫টি বিমান সেই অভিযানে অংশ নিয়েছিল এবং ইরান পাল্টা হামলা করার আগেই তারা ফিরে এসেছিল।

এটি ছিল ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি হামলা। এর আগে ২০২০ সালে কাশেম সোলাইমানিকে ইরাকের মাটিতে ড্রোন হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই মার্কিন সেনাদের অস্বাভাবিক তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। যেমন মূলত ইরানকে বিভ্রান্ত করার জন্য ২০ জুন তারা কিছু বোমারু বিমান গুয়াম ঘাঁটিতে পাঠিয়েছিল।

হামলার আগে ইউএসএস কার্ল ভিনসন ও ইউএসএস নিমিটজ নামের দুটি রণতরিও আরব সাগরে অবস্থান নিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও হামলার জন্য প্রস্তুত

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান প্রস্তুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরানে আবারও হামলা হতে পারে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের এলি গেরানমায়েহ মনে করেন, ট্রাম্প হয়তো বলবেন তিনি সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে এই হামলা চালিয়েছেন। তবে এই হামলার ঝুঁকি অনেক বেশি। ইরান যদি মনে করে তাদের অস্তিত্ব সংকটে, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা করতে পারে। এটি ট্রাম্পের জন্য নির্বাচনের বছরে বড় বিপদ হতে পারে।

ইরান পাল্টা আঘাত হিসেবে তেলের খনিগুলোতে হামলা করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ বন্ধ করে দিতে পারে। এ ছাড়া তারা ইসরায়েলের ওপরও হামলা চালাতে পারে।

গেরানমায়েহ আরও বলেন, গত জুনে হামলার পর ইরান বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায়নি। কিন্তু এবার তারা তেমনটা করবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অবশ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ভায়েজ মনে করেন, এখনই হামলা না–ও হতে পারে। কারণ, ইতিমধ্যে বিক্ষোভ ইরান সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এ ছাড়া এ ধরনের হামলা অনেক ব্যয়বহুল। এর উদ্দেশ্যও পরিষ্কার নয়।

ভায়েজ সতর্ক করে বলেন, যেকোনো সামরিক সংঘাতের চূড়ান্ত ফল ভোগ করতে হবে ইরানের ৯ কোটি সাধারণ মানুষকে। এতে দেশটির সরকার টিকে থাকলেও তারা জনগণের ওপর আরও কঠোর হবে এবং এই অঞ্চলে আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। ছবি: ইউএস নেভি

ট্রাম্প যেভাবে আমেরিকাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন by মো. আবু নাসের

২০০৩ সালের ১ মে। সন্ধ্যার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ যুদ্ধজাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, ইরাকে বড় ধরনের যুদ্ধপর্ব শেষ হয়েছে। তাঁর মাথার ঠিক ওপরে ঝুলছিল বিশাল ব্যানার, যেখানে লেখা: ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’।

জাহাজটি ইরাকের ধারেকাছে কোথাও ছিল না। সেটি প্রায় সাড়ে বারো হাজার কিলোমিটার দূরে ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগো শহরের সমুদ্রপাড়ে নিরাপদে অবস্থান করছিল।

টেলিভিশনের পর্দায় আর সংবাদপত্রের পাতায় দিনের পর দিন ‘মিশন অ্যাকমপ্লিশড’লেখা হলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অতিরিক্ত শক্তিপ্রদর্শন আর বিজয়োল্লাস বড় ধরনের যুদ্ধ বন্ধ করতে পেরেছিল, কিন্তু ওই ঘোষণা ইরাকের নিরাপত্তা আর দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের বৈধতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

বুশের ওই নাটকীয় ভাষণের পর শুরু হয় বিদ্রোহ আর আঞ্চলিক অস্থিরতা। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটা ছিল বড় ধরনের একটা শিক্ষা।

এই শিক্ষা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নিজেকে ‘আয়রনম্যান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছেন। বিভিন্ন দেশ আর ব্যক্তিকে ভয় দেখাচ্ছেন। ব্যবহার করছেন আক্রমণাত্মক ভাষা। অন্যায্য শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যান্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করছেন। বিশ্বে আমেরিকার অবস্থান ক্রমে ক্ষয় হচ্ছে। শক্তি যখন রুক্ষ বা অসংগতভাবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা প্রতিপক্ষকে বশ মানায় না; বরং মিত্রদের দূরে ঠেলে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের শেখায় কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটাতে হয়।

শক্তির সঙ্গে সংযম, আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে শৃঙ্খলা—এ মিশ্রণই হয়ে উঠেছিল আমেরিকান নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য। আজ সেই ঐতিহ্য গভীর চাপের মুখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা টিকে আছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি তা থেকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। পরিহাস হলো, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামে প্রচারিত এসব নীতি শেষ পর্যন্ত আমেরিকার গুরুত্বই কমিয়ে দিতে পারে।

বহু দশক ধরে বিশ্বনেতৃত্বের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল প্রশ্নাতীত। অতুলনীয় সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়েছে। শুধু শক্ত আঘাত হানতে পারার ক্ষমতার কারণে নয়, বরং নানা দেশকে নিজের জোটে এনে যুক্তরাষ্ট্র শত্রুদের নিবৃত্ত করেছে। জোটভুক্ত দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভারসাম্য রক্ষা করে চলছিল। কিন্তু শক্তি আর ভীতিপ্রদর্শনকে কৌশলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্প এই ভারসাম্য ভেঙে দিচ্ছেন।

ট্রাম্পের ভাষা প্রায়ই উত্তেজনা বাড়ায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, বিশ্বাসযোগ্যতা শব্দের উচ্চতায় মাপা যায় না। শীতল যুদ্ধের সময় ট্রুম্যান থেকে রিগ্যান পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বুঝেছিলেন যে সংযম অনেক সময় স্থিতিশীলতা আনে। কিউবান ক্ষেপণাস্ত্রসংকট সমস্যার সমাধান হয়েছিল গোপন কূটনীতি ও পারস্পরিক ছাড়ের মাধ্যমে, হুমকির মাধ্যমে নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা হঠাৎ গড়ে ওঠেনি। ১৯৪৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও ন্যাটোর মতো প্রতিষ্ঠান গঠনে নেতৃত্ব দেয়।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে যেমন আমেরিকার প্রভাব নিশ্চিত করে, অন্যদিকে মিত্রদের আশ্বস্ত করে। প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও স্থিতিশীল রাখে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও কূটনৈতিক রীতিনীতি দানশীলতার নিদর্শন নয়; এগুলো ছিল ক্ষমতার হাতিয়ার।

নিয়ম নির্ধারণের মাধ্যমে ওয়াশিংটন নিশ্চিত করেছিল, বৈশ্বিক বাণিজ্য, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা এমন কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হবে, যা তারা মূলত নিয়ন্ত্রণ করে।

ট্রাম্পের নীতিগুলো এই কাঠামোর ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করছে। জোটের প্রতি সন্দেহ, বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি বৈরিতা এবং স্বল্পমেয়াদি, লেনদেনভিত্তিক চুক্তির প্রতি ঝোঁক—এসবই আমেরিকান আধিপত্য টিকিয়ে রাখার দীর্ঘদিনের যুক্তির সঙ্গে তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক। ট্রাম্প যখন ন্যাটোকে ‘খারাপ চুক্তি’ বলে আক্রমণ করেন বা মিত্রদের বোঝা হিসেবে দেখেন, তখন তিনি আসলে সেই নেটওয়ার্কগুলোই দুর্বল করেন, যা আমেরিকার শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একা দাঁড়ানো আমেরিকা শক্তিশালী নয়; সে কেবল বিচ্ছিন্ন।

ট্রাম্প ভীতিপ্রদর্শনকে কূটনীতির বিকল্প বানানোয় আমেরিকার নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি কেবল ধ্বংস করার ক্ষমতা থেকে প্রসূত নয়, বরং আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো আমেরিকাকে শক্তি জুগিয়েছে।

ট্রাম্প যখন শক্তিশালী স্বৈরশাসকদের প্রশংসা করেন, মানবাধিকারসংক্রান্ত উদ্বেগ উড়িয়ে দেন বা আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে যান, তখন তিনি মার্কিন নেতৃত্বের আকর্ষণই কমিয়ে দেন।

ইতিহাস বলে, পরাশক্তিগুলো দুর্বল হয় শক্তি হারিয়ে নয়, বরং শক্তির অপব্যবহার করে। জাহাজ বা সৈন্যের অভাবে ব্রিটেনের পতন ঘটেনি, বরং অতিরিক্ত বিস্তার ও অংশীদারদের দূরে ঠেলে দেওয়ার কারণে পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নও কেবল সামরিক দুর্বলতার জন্য ভেঙে পড়েনি; ভীতিপ্রদর্শন দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষয়কে ঢাকতে পারেনি।

বাণিজ্যের কথাই ধরা যাক। দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্র উন্মুক্ত বাজারের পক্ষে ছিল। অন্য অর্থনীতিগুলোকে আমেরিকার সঙ্গে বেঁধে রাখত। ট্রাম্পের শুল্ক আর বাণিজ্যযুদ্ধ অন্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নিয়ে ভাবছে। এশীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনকে পাশ কাটিয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্য জোরদার করছে। এমনকি দীর্ঘদিনের অংশীদাররাও প্রশ্ন করছে, আমরা কি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারি?

এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্ষমতার শূন্যতা টিকে থাকে না। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ায় অন্যরা সামনে এগিয়ে আসছে। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ থেকে শুরু করে নতুন উন্নয়ন ব্যাংক পর্যন্ত বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে।

পশ্চিমা ঐক্যের ফাটল কাজে লাগিয়ে রাশিয়া কম খরচে নিজের প্রভাব বাড়াচ্ছে। তুরস্ক, ভারত, ব্রাজিলের মতো মাঝারি শক্তিগুলো এমন এক বহুমুখী বিশ্বের পরীক্ষা করছে, যেখানে আমেরিকার পছন্দ-অপছন্দের গুরুত্ব কম।

ট্রাম্প আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে নয়, বরং শূন্যসম প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেন—যেখানে কেউ জেতে, কেউ হারে। এই দৃষ্টিতে নিয়ম মানে শৃঙ্খল, কূটনীতি মানে দুর্বলতা, আর পূর্বানুমেয়তা ঐচ্ছিক। কিন্তু ক্ষমতার এক বড় বৈপরীত্য হলো, আধিপত্য টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপর। মিত্ররা শুধু শত্রুকে ভয় করে, অনুসরণ করে না; তারা অনুসরণ করে, কারণ তারা বিশ্বাস করে, নেতার কথার মূল্য আছে। যখন মার্কিন অঙ্গীকার একক নেতার মেজাজের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে হয়, তখন প্রজন্মের পর প্রজন্মে গড়ে ওঠা বিশ্বাস দ্রুত ভেঙে পড়ে।

ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলেন, পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা এমনিতেই ব্যর্থ হচ্ছিল; বৈশ্বিকীকরণ আমেরিকান সমাজকে ফাঁপা করে দিয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের শক্তিশালী করেছে। তারা সমস্যার বিষয়ে সঠিক, কিন্তু সমাধানের বিষয়ে ভুল। ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার উত্তর সেটিকে পরিত্যাগ করা নয়, বরং সংস্কার করা। টেবিল ছেড়ে উঠে গেলে প্রতিপক্ষ শাস্তি পায় না; বরং তারা চেয়ারগুলো নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ পায়।

এটা ঠিক, ট্রাম্পের পথ যুক্তরাষ্ট্রকে তাৎক্ষণিক পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে না। কিন্তু তাঁর নীতি দেশটিকে ধীরে ধীরে গুরুত্বহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কৌশলের বদলে দাম্ভিকতা এবং নেতৃত্বের বদলে জবরদস্তি বেছে নিয়ে তিনি আমেরিকার নিরাপত্তার ভিত্তিই দুর্বল করছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি মানে কে কত জোরে হুমকি দেয় তা নয়, বরং কতজন বিশ্বাস করে যে তার পাশে দাঁড়ানো সার্থক।

শেষ পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তা কেবল ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এটি টিকে থাকে বিশ্বাস, বিশ্বাসযোগ্যতা ও সংযত শক্তি ব্যবহারের ওপর। এই মানদণ্ডে ট্রাম্পের কঠোরতার রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে আগের চেয়ে কম নিরাপদ—এবং কম সম্মানিত—করে তুলেছে।

* ড. মো. আবু নাসের, চেয়ারপারসন, কমিউনিকেশনস বিভাগ, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ড

https://media.prothomalo.com/prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2019%2F03%2F25%2Fee9d5c94baa39e9c6bdbb0ebf4e400c8-5c986062b77d6.jpg?rect=61%2C0%2C659%2C439&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র, ২৪ মার্চ ২০১৯। ছবি: রয়টার্স

দেয়াল বেয়ে ১০১ তলা ভবনের চূড়ায় অ্যালেক্স হনোল্ড

প্রকাশ ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ঃ পরিষ্কার আকাশ আর ঝকঝকে রোদের মধ্যে তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে কয়েক হাজার মানুষ টান টান উত্তেজনা আর উদ্বেগ নিয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁরা দেখছেন অ্যালেক্স হনোল্ডকে। হনোল্ড খালি হাতে একটু একটু করে আকাশচুম্বী এক ভবনের দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠছেন।

গতকাল রোববার সকালে হনোল্ড যে ভবনের দেয়াল বেয়ে উঠছিলেন, সেটি তাইপে নগরের বিখ্যাত ‘তাইপে–১০১’। সুউচ্চ এই ভবন বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবনগুলোর একটি। শেষ পর্যন্ত এই ভবনের চূড়ায় উঠতে সক্ষম হন তিনি।

হনোল্ড একজন পর্বতারোহী। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি কোনো দড়ি, নিরাপত্তা জাল বা অন্য কোনো সরঞ্জাম ছাড়াই শুধু খালি হাতে তাইপে ১০১ ভবন বেয়ে উঠেছেন। হাত পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া এড়াতে তাঁর সঙ্গে শুধু এক ব্যাগ চকের গুঁড়া ছিল।

রোববার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৪৩ মিনিটে তিনি ১ হাজার ৬৬৭ ফুট (৫০৮ মিটার) উঁচু ভবনের চূড়ায় পৌঁছান, নিচে তাঁর ভক্ত–দর্শকেরা করতালি দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। পুরো ভবন বেয়ে উঠতে তিনি ৯২ মিনিট সময় নেন।

অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই আরোহণের পর এক সংবাদ সম্মেলনে হনোল্ড বলেন, ‘এটা সত্যিই অসাধারণ। আমি নিশ্চিত, অনেক দিন ধরে এ আনন্দ আমার ভেতর জ্বলজ্বল করবে—এটা অবিশ্বাস্য!’

নিজের অনুভূতির বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আপনি এটা নিয়ে দীর্ঘদিন ভাববেন, মনে হবে, এটা অসম্ভব। কিন্তু বাস্তবে যখন আপনি কাজটি করে ফেলবেন, সে সময়ের অনুভূতিটা সত্যিই আলাদা।’

হনোল্ডের বয়স ৪০ বছর। প্রায় দুই দশক ধরে পর্বতারোহীদের মধ্যে তিনি পরিচিত মুখ। তবে ২০১৭ সালে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইওসেমিটি ন্যাশনাল পার্কের ‘এল কেপিট্যান’ বেয়ে উঠে সারা বিশ্বের পরিচিতি পান। তাঁর শ্বাসরুদ্ধকর ওই অভিযানের তথ্যচিত্র ‘ফ্রি সলো’ পুরস্কার জিতেছে। তার পর থেকে তিনি একের পর এক রেকর্ড গড়ে চলেছেন। প্রায় এক দশক ধরে তিনি তাইপে–১০১ ভবন বেয়ে ওঠার পরিকল্পনা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত নেটফ্লিক্স তাঁকে এ সুযোগ করে দেয়।

হনোল্ড গত শনিবার তাইপে–১০১ ভবন বেয়ে ওঠার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেই পরিকল্পনা এক দিন পেছাতে হয়।

হনোল্ডের আগে ২০০৪ সালে ফরাসি পর্বতারোহী আলাঁ রবার্ট তাইপে–১০১ ভবনের দেয়াল বেয়ে উঠেছিলেন, তবে তিনি ভবন বেয়ে উঠতে রশি ব্যবহার করেছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-26%2F8ugfcac8%2FCapture.PNG?rect=0%2C23%2C871%2C581&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কোনো কিছুর সাহায্য ছাড়া খালি হাতে তাইপের আকাশচুম্বী ভবনের দেয়াল বেয়ে উঠছেন অ্যালেক্স হনোল্ড। ছবি: রয়টার্স

কারাগারে দুই খুনির প্রেম, বিয়ে করতে পাচ্ছেন প্যারোলে মুক্তি

খুনের দায়ে কারাগারে সাজা খাটতে গিয়ে দুজনের জানাশোনা, তারপর শুরু হয় প্রেম। এতটুকুতেই শেষ নয়। রীতিমতো বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। বিয়ে সারতে কারাগার থেকে সাময়িক সময়ের জন্য মুক্তিও পাচ্ছেন এ যুগল।

শুনতে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের মতো মনে হলেও ভারতের রাজস্থান রাজ্যের আলওয়ারে ঘটেছে এমন ঘটনা।

প্রিয়া শেঠ (আরেক নাম নেহা শেঠ) নামের এক নারী এবং তাঁর হবু বর হনুমান প্রসাদ বিয়ের জন্য রাজস্থানের হাইকোর্ট থেকে ১৫ দিনের জরুরি প্যারোল পেয়েছেন। আজ শুক্রবার আলওয়ারের বারোদামেভে তাঁদের গাঁটছড়া বাঁধার কথা।

প্রিয়া যেভাবে খুনে জড়ান

প্রিয়া শেঠ পেশায় মডেল ছিলেন। দুশ্যন্ত শর্মা নামের এক তরুণকে খুনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে তাঁর। সাঙ্গানের ওপেন জেল নামে এক উন্মুক্ত কারাগারে সাজা ভোগ করছেন প্রিয়া। এ কারাগারটি প্রচলিত কারাগারের তুলনায় খোলামেলা এবং বন্দীরা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনতা পেয়ে থাকেন। ছয় মাস আগে একই কারাগারে প্রসাদের সঙ্গে প্রিয়ার পরিচয় হয় এবং তাঁরা প্রেমে পড়েন।

যে খুনের মামলায় প্রিয়া শেঠ দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তা ২০১৮ সালের ঘটনা। ওই বছরের ২ মে প্রিয়া শেঠ তাঁর প্রেমিক দীক্ষান্ত কামরা এবং অপর এক ব্যক্তির সঙ্গে মিলে দুশ্যন্তকে হত্যা করেন। দুশ্যন্তের সঙ্গে তাঁর ডেটিং অ্যাপে পরিচয় হয়েছিল।

প্রিয়ার পরিকল্পনা ছিল দুশ্যন্তকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা এবং সে অর্থ দিয়ে তাঁর প্রেমিক দীক্ষান্ত কামরার ঋণ পরিশোধ করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ডেটিং অ্যাপে দুশ্যন্তের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন প্রিয়া। এরপর তাঁকে বাজাজ নগরের একটি ফ্ল্যাটে ডেকে নেন এবং তাঁর বাবার কাছ থেকে ১০ লাখ রুপি মুক্তিপণ দাবি করেন।

দুশ্যন্তের বাবা তিন লাখ রুপি পাঠাতে পেরেছিলেন। তবে একপর্যায়ে প্রিয়া এবং তাঁর প্রেমিক দীক্ষান্তের মনে হলো, তাঁরা দুশ্যন্তকে ছেড়ে দিলে তিনি তাঁদের পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারেন।

গ্রেপ্তার এড়াতে প্রিয়া শেঠ, কামরা ও তাঁর বন্ধু লক্ষ্য ওয়ালিয়া মিলে দুশ্যন্তকে হত্যা করেন। তাঁরা মরদেহ স্যুটকেসে ভরে একটি পাহাড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। দুশ্যন্তকে যেন না চেনা যায়, তা নিশ্চিত করতে তাঁরা তাঁর মুখ ছুরি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিলেন। প্রমাণ ধ্বংসের জন্য ফ্ল্যাটটিও পরিষ্কার করেছিলেন তাঁরা।

পরদিন ৩ মে রাতে পাহাড় থেকে দুশ্যন্তের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শেষ পর্যন্ত প্রিয়া, দীক্ষান্ত ও ওয়ালিয়া ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার হন।

পাঁচ হত্যাকাণ্ডের পেছনে হনুমান প্রসাদ

হনুমান প্রসাদ তাঁর প্রেমিকার স্বামী ও সন্তানদের হত্যার দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। আলওয়ারের তায়কোয়ান্দো খেলোয়াড় সন্তোষ ছিলেন তাঁর প্রেমিকা। ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর রাতে সন্তোষ তাঁর স্বামীকে হত্যা করতে হনুমানকে তাঁর বাড়িতে ডেকেছিলেন। হনুমান একজন সহযোগীকে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। পশু জবাইয়ের জন্য ব্যবহৃত ছুরি দিয়ে সন্তোষের স্বামী বনওয়ারী লালকে খুন করেন তিনি।

সন্তোষের তিন সন্তান ও তাঁদের সঙ্গে থাকা এক ভাতিজা জেগে ওঠে এবং খুনের ঘটনা দেখে ফেলে। ধরা পড়ার ভয়ে সন্তোষ তাঁর সন্তান ও ভাতিজাকেও হত্যা করতে বলেন। হনুমান প্রসাদও তা–ই করেন। সেই রাতে চার শিশু ও এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছিল। এটি আলওয়ারের কুখ্যাত হত্যা মামলাগুলোর একটি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-23%2Flu2zccar%2FUntitled-1.png?rect=53%2C0%2C564%2C376&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বিয়ের প্রতীকী ছবি। ছবি: এএনআই

হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে আরব বসন্তের কথা কি ৩ কোটি মিসরীয় জানেন

প্রকাশ ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ঃ মিসরে আরব বসন্ত শুরুর পর ১৫টি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। এর মাত্র ১১ দিন আগে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলীকে ক্ষমতাচ্যুত করেন আন্দোলনকারীরা। সেখানকার সফল গণ-অভ্যুত্থান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মিসরের জনগণও মুক্তি চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন তাঁদের কথাও যেন শোনা হয়।

বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ১৮ দিন ধরে সড়কে অবস্থান নেন মিসরের লাখ লাখ বিক্ষোভকারী। তাঁরা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবি জানান।

মিসরের জনগণের গড় বয়স প্রায় ২৪ বছর। বিশ্বের যেসব দেশে তরুণদের সংখ্যা বেশি, মিসর তার মধ্যে একটি। দেশটির প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের কম। এই শিশুদের জন্য আরব বসন্ত এক ঐতিহাসিক ঘটনা, যা তারা বড়দের কাছ থেকে জেনেছে।

মিসরের তরুণ জনগণ

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে মিসরের জনসংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৩০ লাখ। বেকারত্বের হার ১২ শতাংশ। মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২ হাজার ৫৯০ মার্কিন ডলার। ওই সময় ১ ডলারে ৫ দশমিক ৮ মিসরীয় পাউন্ড পাওয়া যেত।

১৫ বছর পর মিসরের জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ বেড়ে ১২ কোটি হয়েছে। দেশটির বেকারত্বের হার কমে এখন ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। আর মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৩ হাজার ৩৩৯ মার্কিন ডলার। তবে এ সময় ডলারের বিপরীতে মিসরের মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন হয়েছে। বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারে প্রায় ৪৭ মিসরীয় পাউন্ড পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি অনেক মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।

মিসরের জনগণ তুলনামূলক তরুণ। দেশটির অর্ধেকের বেশি নাগরিকের বয়স ২৪ বছরের নিচে, যা বিশ্বের সব দেশের তরুণদের গড় বয়স ৩১ বছরের চেয়ে প্রায় ৭ বছর কম।

ইকোনমিক রিসার্চ ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, মিসরে প্রতিবছর ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান দরকার। কিন্তু গত দুই দশকে দেশটিতে বছরে মাত্র ছয় লাখের কর্মসংস্থান হয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন কারিগরি ইনস্টিটিউটসহ প্রায় ৩৬ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। আধুনিক অর্থনীতির চাহিদা পূরণ করতে ২০৩২ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৫৬ লাখে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

মিসরে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। এর প্রায় পুরোটাই তরুণদের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে মোবাইল সংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার বড় ভূমিকা রাখছে।

মিসরের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থার (সিএপিএমএএস) তথ্য অনুযায়ী, বেকারত্বের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এলেও ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখনো প্রায় ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ।

আরব বসন্তের সময় ১৮ দিনে মিসরে কী কী ঘটেছিল

২৫ জানুয়ারি ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে মিসরে আরব বসন্তের শুরু হয়, যা ১৮ দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। অবশেষে ১১ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগ করে সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেন।

আরব বসন্তের সময় মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মিসরীয়রা তাঁদের লড়াই-সংগ্রামের ছবি ও ভিডিও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন।

সে সময়ের ১৮ দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রধান ঘটনা সংক্ষিপ্ত আকারে নিচে তুলে ধরা হলো—

২৫ জানুয়ারি: পুলিশের বার্ষিক অনুষ্ঠানের দিন সারা দেশে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেন। ৩০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবি ওঠে।

২৮ জানুয়ারি: জুমার নামাজের পর হাজার হাজার মানুষ কায়রোর তাহরির স্কয়ারের দিকে রওনা দেন। প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক প্রথমবার টেলিভিশনের সামনে হাজির হন এবং গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

১ ফেব্রুয়ারি: দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা যাতে কায়রো পৌঁছাতে না পারেন, তা ঠেকাতে সব ধরনের ট্রেন পরিষেবা বন্ধ করে দেয় সরকার।

২ ফেব্রুয়ারি: হোসনি মোবারকের সমর্থকেরা কেউ উটে চড়ে কেউ–বা ঘোড়ায় চড়ে কায়রোর বিক্ষোভ দমন করতে নিষ্ঠুর চেষ্টা চালান। তাঁরা ব্যাট ও ছুরি ব্যবহার করে তাহরির স্কয়ারে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু করেন।

১০ ফেব্রুয়ারি: হোসনি মোবারকের পদত্যাগের গুঞ্জন ওঠে। তিনি ওই দিন এক ভাষণে ঘোষণা দেন, তিনি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। এতে তাহরির স্কোয়ারে জনতার ক্রোধ ফেটে পড়েন।

ফেব্রুয়ারি ১১ (মোবারকের পদত্যাগ): ১৮ দিনের ব্যাপক বিক্ষোভের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেইমান ঘোষণা করেন, হোসনি মোবারক পদত্যাগ করে সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন।

আরব বসন্তে অন্যান্য দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী

মিসরের মতো, আরব বসন্তের সময় আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশের সরকারপ্রধানদের উৎখাত করা হয়েছে। সেসব দেশের বড় একটি অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী।

তিউনিসিয়ায় মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ২২ লাখ। তার মধ্যে ২০ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ অর্থাৎ ২৪ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে। অন্যদিকে লিবিয়ায় বর্তমান জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ বা ৭৪ লাখের বয়স ১৫ বছরের নিচে।

সিরিয়ায় আড়াই কোটি মানুষের মধ্যে ৭২ লাখ কিংবা ২৯ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের কম। ইয়েমেনে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশে ৪ কোটি মানুষের মধ্যে ৪১ শতাংশ বা ১ কোটি ৭০ লাখের বয়স ১৫ বছরের কম।

মিসরে হোসনি মোবারকবিরোধী গণ-আন্দোলনের ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে
মিসরে হোসনি মোবারকবিরোধী গণ-আন্দোলনের ১৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। ফাইল ছবি: এএফপি

অরণ্যের দেবী বনবিবির পূজা: পুঁথির ছন্দে বেঁচে থাকার প্রার্থনা by ইমতিয়াজ উদ্দীন

প্রকাশ ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ঃ
‘বিপদে পড়িয়া বনে যে জনে ডাকে,

মা বলিয়া বনবিবি দয়ার মা তাকে

উদ্ধারিও তারে তোর আপনার গুণে...’

একটানা ছন্দে পুঁথিপাঠ চলছে। চারপাশে গোল হয়ে বসে আছেন বনজীবী নারী-পুরুষ। এটি কেবল তাঁদের কাছে পুঁথিপাঠ নয়, বিশ্বাস, ভরসা ও বেঁচে থাকার প্রার্থনা। সামনে মন্দিরের ভেতর বনবিবির থান (বেদি)। তাঁর নারীমূর্তির পাশে ভাই শাহ জঙ্গলি, গাজী আউলিয়া, শিশু দুঃখে ও বনবিবির দুই চাচা ধনাই ও মনাই। একটু দূরে দক্ষিণ রায়—বাঘের প্রতীকী মূর্তি।

বৃহস্পতিবার খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন-সংলগ্ন চরামুখা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এই দৃশ্য। সুন্দরবন উপকূলের মানুষের বিশ্বাস, বনবিবি অরণ্যের দেবী। বাঘ, কুমিরসহ সব হিংস্র প্রাণী তাঁর অনুগত। তাই প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে কয়রার সুন্দরবনঘেঁষা গ্রামগুলোতে হয় বনবিবির পূজা ও মেলা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কয়রার চরামুখা গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে উৎসবের রং। কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ঘেঁষে বনবিবির মন্দির, সামনে খোলা মাঠজুড়ে মেলার আয়োজন। মন্দিরে নারী-পুরুষের ভিড়। কেউ পুঁথিপাঠ শুনছেন, কেউ প্রসাদ নিচ্ছেন, কেউ নীরবে প্রার্থনায় মগ্ন। প্রার্থনা শেষে মানুষ ঢুকছেন মেলা প্রাঙ্গণে। মন্দিরের সামনের মাঠ আর বেড়িবাঁধের পাশে দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সাজিয়েছেন পসরা—খাবার, খেলনা, মৃৎশিল্পসহ নানা পণ্যে জমজমাট বেচাকেনা।

বনবিবি মন্দিরের সভাপতি ভোলানাথ মাঝি বলেন, চরামুখা গ্রামে ১২৮৩ বঙ্গাব্দ থেকে প্রতিবছর পয়লা মাঘে বনবিবির পূজা ও মেলা হয়ে আসছে। বনবিবি সুন্দরবন উপকূলের বনজীবীদের মনে ভক্তি ও বিশ্বাসের প্রতীক। বনে গিয়ে যেন নিরাপদে ফেরা যায়, ভালো আয় হয়—এই কামনাতেই আদিকাল থেকে এই পূজা হয়।

মন্দির থেকে বেরিয়ে কথা হয় স্থানীয় বনজীবী সুভাষচন্দ্র মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাঘ-কুমিরসহ সব জন্তু বনবিবির কথা মানে—এইডাই আমাগের বিশ্বাস। জন্মের পর থেইকে আমরা মা বনবিবির পূজা কইরে আসটিছি। তাঁর আশীর্বাদে বিপদ কাটে।’

চরামুখা বনবিবি মেলার অন্যতম আয়োজক স্বরূপ মাঝি বলেন, একসময় এই এলাকায় বাঘের অত্যাচার ছিল। তখন তাদের বংশের পূর্বপুরুষ মধু মাঝি স্বপ্নে বনবিবির নির্দেশ পান পূজা দেওয়ার। সেই থেকেই মন্দির স্থাপন ও মেলার সূচনা। তিনি বলেন, ‘বংশপরম্পরায় আমরা এই আয়োজন করছি। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে যুগ যুগ ধরে এই উৎসব চলছে। মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে এই দিনের জন্য।’

চরামুখা ছাড়াও কয়রার ঘড়িলাল, ১ নম্বর কয়রা, বানিয়াখালী, নয়ানীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে একই চিত্র। গ্রামবাসীরা মণ্ডপ তৈরি করে পুঁথি পাঠের মধ্য দিয়ে বনবিবিকে স্মরণ করছেন। কয়রা নদীর তীরবর্তী নয়ানী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মন্দিরে চলছে বনবিবির পূজার বয়ান। পুরোহিত নীলকণ্ঠ মিস্ত্রি ছন্দে ছন্দে পড়ছেন ‘বনবিবি জহুরানামা’—বনবিবির মায়া, শিশু দুখের উদ্ধারের কাহিনি, বনজীবীদের রক্ষার আখ্যান।

মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে নয়ানী গ্রামের শিবপদ মণ্ডল বলেন, ‘আমাগের গ্রামে ১০০ বছরের বেশি সময় ধইরে এই পূজা হয়ে আসটিছে। আগে সুন্দরবনের ভেতর গিয়ে বনবিবির থান বানায়ে পূজা হুতো। কিন্তু এখন গ্রামেই আয়োজন করা হচ্ছে। শত শত মানুষ নিয়ে বনে ঢোকা এখন বড্ড ঝুঁকির কাজ।’

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁর ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে সুন্দরবন অঞ্চলে বনবিবিসহ আরও কাহিনি প্রচলিত ছিল।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ তাঁর ‘সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার আগমনের মধ্য দিয়েই সুন্দরবনে বনবিবি-সংক্রান্ত কাহিনির বিকাশ ঘটে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে বনজীবীদের কাছে বনবিবি হয়ে ওঠেন সুন্দরবনের রানি ও অভিভাবক।

বনবিবির মন্দিরে চলছে পুঁথি পাঠ ও প্রার্থনা। বৃহস্পতিবার খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারিতে
বনবিবির মন্দিরে চলছে পুঁথি পাঠ ও প্রার্থনা। বৃহস্পতিবার খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারিতে। ছবি: সাদ্দাম হোসেন

Thursday, January 29, 2026

‘রাজনীতি নির্মূল হওয়া উচিত, কারণ এটি মানবতার জন্য ক্ষতিকর’ -সাকলায়েন মুশতাক

খেলাধুলায় রাজনীতি মেশানো ঠিক নয়—পুরোনো কথাটিই নতুন করে বললেন সাকলায়েন মুশতাক। বাংলাদেশের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলা নিয়ে যখন ক্রিকেট বিশ্ব তোলপাড়, সেই সময়ে প্রসঙ্গটা তুললেন পাকিস্তানের সাবেক অফ স্পিনার। তবে বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে নয়, ভারত–পাকিস্তান ক্রিকেট সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়েই রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করলেন বাংলাদেশের সাবেক স্পিন বোলিং কোচ।

সাকলায়েনের মতে, রাজনীতি শুধু ক্রিকেটের জন্যই নয়, মানবতার জন্যও ক্ষতিকর। তিনি বলেছেন ক্রিকেটের কাজ দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়া, বিভাজন তৈরি করা নয়।

ভারত ও পাকিস্তান সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলেছে ২০১২–১৩ মৌসুমে। সে সময় ভারত সফরে গিয়েছিল পাকিস্তান। তিনটি ওয়ানডে ও দুটি টি-টুয়েন্টি ম্যাচ খেলেছিল দুই দল। টি-টুয়েন্টি সিরিজটি ১–১ সমতায় শেষ হলেও ওয়ানডে সিরিজ ২–১ ব্যবধানে জিতেছিল পাকিস্তান। এর পর থেকে মহাদেশীয় ও বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট ছাড়া আর ক্রিকেট মাঠে দেখা হয়নি দুই দলের।

ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সাকলায়েন বলেন, ‘আমি মনে করি রাজনীতি নির্মূল হওয়া উচিত, কারণ এটি মানবতার জন্য ক্ষতিকর। রাজনীতি আমাদের শত্রু। এটি শুধু ক্রিকেট নয়, পুরো মানবসমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ক্রিকেটের উদ্দেশ্য দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য তৈরি করা, দূরত্ব বাড়ানো নয়।’

সাকলায়েনের মতে, রাজনীতি কিংবা সংঘাত নয়, ক্রিকেট শুধু বিনোদনের মাধ্যমই হওয়া উচিত। বাংলাদেশের বিশ্বকাপে না থাকা নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি সাকলায়েন, ‘ক্রিকেট মানে বিনোদন। এটি কোনো যুদ্ধ বা যুদ্ধক্ষেত্র নয়। বাংলাদেশের ভারতের মাটিতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। আমি তো আগেই স্পষ্ট করে বলেছি আমি রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।’

 সাকলায়েন মুশতাক
সাকলায়েন মুশতাক। ছবি: শামসুল হক

পশ্চিম তীরে ইতালীয় পুলিশকে বন্দুকের মুখে হুমকি, ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করল ইতালি

অধিকৃত পশ্চিম তীরে দায়িত্ব পালনকালে দুই ইতালীয় সামরিক পুলিশকে বন্দুকের মুখে হুমকি দেয়ার ঘটনায় ইসরাইলের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে ইতালি। সোমবার ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, রোববার পশ্চিম তীরের রামাল্লার কাছে একটি গ্রামে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতদের সম্ভাব্য সফরের আগে স্থান পরিদর্শনে গেলে দুই ইতালীয় সামরিক পুলিশকে এক সশস্ত্র ইসরাইলি ব্যক্তি থামিয়ে দেয়। সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ওই ব্যক্তি- যাকে একজন ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই পুলিশ সদস্যকে বন্দুকের মুখে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

ঘটনার সময় ইতালীয় পুলিশ সদস্যরা কূটনৈতিক নম্বরপ্লেটযুক্ত গাড়িতে ছিলেন এবং তাদের কাছে কূটনৈতিক পাসপোর্টও ছিল।

ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি এ ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতর উল্লেখ করে রোমে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতের কাছে কঠোর প্রতিবাদ জানাতে নির্দেশ দেন। ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইতিমধ্যে ইসরাইলে অবস্থিত ইতালির দূতাবাস ইসরাইলি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

ঘটনার পর দুই ইতালীয় সামরিক পুলিশ নিরাপদে জেরুজালেমে অবস্থিত ইতালির কনসুলেট জেনারেলে ফিরে যান বলে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় তারা শারীরিকভাবে অক্ষত রয়েছেন।

এই ঘটনা পশ্চিম তীরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে কূটনৈতিক নিরাপত্তা ও বিদেশি প্রতিনিধিদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সূত্র: রয়টার্স।

mzamin

হামলার আশঙ্কা: ইরান অভিমুখে আরও মার্কিন নৌবহর

* পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে একটি বড় নৌবহর ওই অঞ্চলে পৌঁছেছে।

* ইরানে সামরিক অভিযান চালাতে কোনো দেশকে সৌদি আরবের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না রিয়াদ।

ইরানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, কয়েক দিন ধরেই এমন জল্পনা–কল্পনা চলছে। এর মধ্যে গত সোমবার মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরিসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। এবার ইরান অভিমুখে আরও নৌবহর পাঠানোর কথা জানিয়েছে তারা। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে সামরিক মহড়া চালানোরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

গত মঙ্গলবার এক ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আরও একটি সুসজ্জিত নৌবহর ইরানের পথে আছে। আমি আশা করছি, তারা (ইরান) সমঝোতা করতে রাজি হবে।’

ট্রাম্পের এমন হুমকিকে পাত্তা দিচ্ছে না ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গতকাল বুধবার বলেছেন, ইরানকে হুমকি দিলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো আলোচনা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সামরিক হুমকি দিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো কোনো ফলপ্রসূ উপায় হতে পারে না। যদি তারা আলোচনায় বসতেই চায়, তাহলে হুমকি ও অযৌক্তিক প্রসঙ্গ তোলা বাদ দিতে হবে।

গার্ডিয়ান–এর খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) বিমানবাহিনীর শাখা এয়ারফোর্সেস সেন্ট্রাল গত মঙ্গলবার জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে একটি প্রস্তুতি সামরিক মহড়া চালাবে। কয়েক দিন চলবে এই মহড়া। সেন্টকমের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় যুদ্ধবিমান মোতায়েন ও সক্ষমতা প্রদর্শন করা এ মহড়ার উদ্দেশ্য। আঞ্চলিক অংশীদারত্ব জোরদার করা ও নমনীয় হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিতে মহড়ার নকশা করা হয়েছে।

তবে মহড়ার দিন–তারিখ, স্থান ও কী ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে, তার কোনো তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা দেখানোর উদ্দেশ্যে মহড়াটি সাজানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

গত সোমবার সেন্টকম জানিয়েছে, পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে একটি বড় নৌবহর ওই অঞ্চলে পৌঁছেছে। কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ও প্রায় ৫ হাজার নাবিক বহনকারী এই বিমানবাহী রণতরিতে একাধিক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ডেস্ট্রয়ার রয়েছে। যেকোনো হামলা থেকে নৌবহরকে সুরক্ষা দিতে এই আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।

ইরানে হামলায় আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না সৌদি আরব


ইরানে সামরিক অভিযান চালাতে কোনো দেশকে সৌদি আরবের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না রিয়াদ। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এক ফোনালাপে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। মঙ্গলবার দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ এমন তথ্য দিয়েছে।

ফোনালাপে সৌদি যুবরাজ বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য মেটানোর যেকোনো উদ্যোগকে সৌদি আরব সমর্থন করে। সৌদি আরবের যুবরাজের আশ্বাসের আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছে। তারাও বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে তারা তাদের আকাশসীমা বা আঞ্চলিক জলসীমা ব্যবহার করতে দেবে না।

ইরানে বেশ কিছুদিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এসব বিক্ষোভ দমনে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে পথচারীরাও ছিলেন। সংগঠনগুলোর মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে শিয়া ধর্মীয় নেতারা ক্ষমতায় আসার পর থেকে এটিই সবচেয়ে বড় দমন-পীড়নের ঘটনা। তবে ইরানি কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতা ও প্রাণহানির জন্য বিদেশে থাকা বিরোধীদের সমর্থনপুষ্ট ‘সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করেছে।

রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে একটি বড় নৌবহর ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে
রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে একটি বড় নৌবহর ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। ছবি: এপি

এক বছরে ১৭ লাখ শিশুর জন্ম অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে

গত বছর দেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে। একটি হিসাব বলছে, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। আন্তরিকতার অভাব ও সরকারি নজরদারির ঘাটতির কারণে দেশে সন্তান জন্মদানে অস্ত্রোপচার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

গতকাল বুধবার অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমানো বিষয়ে একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ কথা বলা হয়। ‘রিডিউসিং আননেসেসারি সিজারিয়ান সেকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতাল (এডব্লিউসিএইচ)। এতে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি এটি কমানোর বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়।

সভায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাঈদুর রহমান বলেন, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অনেক গাফিলতি আছে। দেশে শিশুজন্মে অস্ত্রোপচার অনেক বেশি হচ্ছে। ফলে মায়েরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। বাস্তবতা হলো দেশে এখন আর স্বাভাবিক প্রসব নেই বললেই চলে।

সভায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক আনজুমান আরা। তিনি বলেন, বৈশ্বিকভাবে ৫টি শিশুর জন্মের মধ্যে ১টির জন্ম হচ্ছে অস্ত্রোপচারে (প্রায় ২১ শতাংশ)। বাংলাদেশে এই হার অনেক বেশি। এখানে প্রতি ২টি শিশুর জন্মের মধ্যে প্রায় ১টি শিশুর জন্ম হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে (প্রায় ৪৫-৫২ শতাংশ)। বেসরকারি হাসপাতালগুলো এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সেখানে প্রতি ১০টি শিশুর জন্মের মধ্যে প্রায় ৮-৯টিই হচ্ছে অস্ত্রোপচারে (৮৫-৯০ শতাংশ)। অধ্যাপক আনজুমান আরা বলেন, গত বছর (২০২৫ সালে) দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

২০১৮ সালের এক গবেষণার উল্লেখ করে আনজুমান আরা বলেন, বছরে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের কারণে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দেশের বেসরকারি মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ শতাংশের বেশি পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা বা মানসম্মত লেবার রুম (প্রসবকক্ষ) নেই। ফলে আর্থিক লাভকে অগ্রাধিকার দিয়ে অস্ত্রোপচারকে সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে দেওয়া কাগজপত্রে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের ৩০ শতাংশ হতো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। ২০০৭ সালে এই হার ৫১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের ৯০ শতাংশই হবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম বলেন, স্বাভাবিক প্রসবকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে উপস্থাপন করায় গর্ভধারিণী মায়েদের মধ্যে অযৌক্তিক ভয় তৈরি হয়। তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে মায়েরা মারা যেতেন অস্ত্রোপচার না করার জন্য, আর এখন অতিরিক্ত অস্ত্রোপচারে করার জন্য তাঁরা মারা যাচ্ছেন।

কেউই সময় দিতে চান না

আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের চিকিৎসক ও গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক খুরশীদ তালুকদার বলেন, স্বাভাবিক প্রসবে সময় লাগে। কিন্তু অধিকাংশ রোগী ও চিকিৎসক এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে চান না। প্রচলিত একটি ভুল ধারণা খণ্ডন করে তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন, স্বাভাবিক প্রসবের কারণে শিশুর মস্তিষ্কে ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু প্রসব-পূর্ব সেবা যথাযথ না হওয়ার কারণে নবজাতকের মস্তিষ্কে ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটে প্রসবের আগে। আর প্রসবকালীন সমস্যার কারণে মস্তিষ্কের ক্ষতি হয় ১০ শতাংশেরও কম।

স্বাভাবিক প্রসবের গুরুত্ব তুলে ধরে খুরশীদ তালুকদার বলেন, এই প্রক্রিয়া শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের শরীরের উপকারী জীবাণু বা মাইক্রোবায়োম শিশুর শরীরে স্থানান্তরের প্রধান মাধ্যম হলো স্বাভাবিক প্রসব এবং এতে জন্মের পরপরই মায়ের সঙ্গে শিশুর ‘স্কিন-টু-স্কিন’ কন্ট্যাক্ট ঘটে। অস্ত্রোপচারে জন্ম নেওয়া শিশুরা এই মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত হয়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসবের হার ছিল ৬২ থেকে ৭২ শতাংশ। এরপর সেখানে প্রসব-পূর্ব কাউন্সেলিং, রোবসন শ্রেণিবিন্যাস, লেবার মনিটরিং, কনসালট্যান্ট অডিট এবং আগের সিজারিয়ানের পর স্বাভাবিক প্রসব (ভিএবিসি) পদ্ধতি চালু করা হয়। এর ফলে হাসপাতালটিতে অস্ত্রোপচারে সন্তান প্রসবের হার ৪২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। অবশ্য ২০২২-২৩ সালে গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আটটি প্রতিষ্ঠানে এই মডেল সম্প্রসারণ করা হলেও আশানুরূপ সাফল্য পাওয়া যায়নি।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. আবু জাফর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের (এডব্লিউসিএইচ) চিকিৎসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন আহমেদ।

এক বছরে ১৭ লাখ শিশুর জন্ম 
অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারে
প্রতীকী ছবি

আইসিজেতে শুনানিতে গাম্বিয়া: রোহিঙ্গাদের জীবন বিভীষিকাময় করে তুলেছে মিয়ানমার

প্রকাশ ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ঃ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা গাম্বিয়ার মামলাটির পূর্ণাঙ্গ শুনানি গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে। এতে আফ্রিকার দেশটি অভিযোগ করেছে, সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের নির্মূল করার লক্ষ্যে তাঁদের জীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে মিয়ানমার।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলাটি করে। মামলাটির এ শুনানি বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গত এক দশকের বেশি সময়ে জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) অভিযোগে প্রথম মামলা হিসেবে এটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ শুনানি হচ্ছে। তাই এ মামলার রায়ের প্রভাব শুধু মিয়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং অন্যান্য দেশের ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা জাতিগত নিধন মামলার ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো গতকাল আইসিজের শুনানিতে বলেন, রোহিঙ্গারা ‘সহজ–সরল মানুষ। তাঁরা শান্তি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখতেন। ধ্বংস করার জন্য তাঁদের নিশানা করা হয়েছে। মিয়ানমার তাঁদের স্বপ্নকে শুধু অস্বীকার করেনি, বরং তাঁদের জীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। তাঁরা এমন নৃশংস সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছেন, যা কল্পনাতীত।’

২০১৯ সালে মামলাটি করার পর প্রাথমিক শুনানিতেই মিয়ানমার সব অভিযোগ অস্বীকার করে। তখন মামলার অভিযোগে গাম্বিয়া বলেছিল, মিয়ানমার নিজেদের রাখাইন রাজ্যের প্রত্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলের প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন চালিয়েছে।

আইসিজেতে মামলা হওয়ার দুই বছর আগে ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা চালায়। নির্বিচার হামলার মুখে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ, ব্যাপক ধর্ষণ এবং তাঁদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে ‘জাতিগত নিধনের মতো ঘটনা’ ঘটেছে।

গাম্বিয়াকে আইসিজেতে মামলা করতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ৫৭ দেশের জোট ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সহযোগিতা করেছে। মামলাটির প্রাথমিক শুনানিতে অংশ নিয়ে মিয়ানমারের তৎকালীন নেত্রী অং সান সু চি গাম্বিয়ার জাতিগত নিধনের অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী আদেশ জারি করেন। ২০২২ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতটি মিয়ানমারের ‘প্রাথমিক আপত্তি’ খারিজ করে দেন।

চলমান শুনানি ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪ কার্যদিবস চলবে। এতে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের কথা শোনা হবে। তবে সংবেদনশীলতা ও গোপনীয়তার কারণে এসব সেশনে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত থাকতে পারবেন না।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-13%2Fv3dj2sk4%2FUntitled-1.jpg?rect=34%2C0%2C359%2C239&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। ফাইল ছবি

বিশ্বে প্রথম স্বর্ণের সড়ক নির্মাণ করবে দুবাই

বিশ্বে প্রথমবারের মতো স্বর্ণ দিয়ে সড়ক নির্মাণের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই। ‘গোল্ড স্ট্রিট’ নামে পরিচিত এই ব্যতিক্রমধর্মী সড়কটি নির্মিত হবে দুবাইয়ের নতুন গোল্ড ডিস্ট্রিক্টে। প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন সংস্থা ইথরা দুবাই। এ খবর দিয়েছে খালিজ টাইমস।

এতে বলা হয়, প্রকল্পটির বিস্তারিত তথ্য ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হবে। ‘দুবাই গোল্ড ডিস্ট্রিক্ট’-কে অভিহিত করা হচ্ছে আমিরাতের নতুন ‘হোম অব গোল্ড’ হিসেবে। এখানে স্বর্ণ ও গয়না-সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম এক ছাতার নিচে আনা হবে। এর মধ্যে খুচরা বিক্রি, পাইকারি ব্যবসা এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এই জেলায় ইতিমধ্যে এক হাজারের বেশি খুচরা বিক্রেতা ব্যবসা পরিচালনা করছে, যেখানে স্বর্ণ ও গয়নার পাশাপাশি পারফিউম, কসমেটিকস ও লাইফস্টাইল পণ্যও রয়েছে।
জাওহারা জুয়েলারি, মালাবার গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস, আল রোমাইযান ও তানিষ্ক জুয়েলারির মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ইতিমধ্যেই সেখানে তাদের ফ্ল্যাগশিপ শোরুম স্থাপন করেছে। এ ছাড়া জয়ালুক্কাস মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সবচেয়ে বড়-২৪ হাজার বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাগশিপ স্টোর চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রায় ৫৩ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের স্বর্ণ রপ্তানি করেছে। দেশটির প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ভারত, হংকং ও তুরস্ক। এই সময়ে আমিরাত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভৌত স্বর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।

mzamin

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের বড় অংশ অতিদরিদ্র

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি বড় অংশ বর্তমানে অতি দারিদ্র্য বলে জানিয়েছে দেশটির প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশন (জেআরএফ)। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের দারিদ্রতা আগের তুলনায় আরও গভীর হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে ৬৮ লাখ মানুষ অতিদরিদ্রতার মধ্যে বসবাস করছেন। যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, জেআরএফ-এর তথ্যানুযায়ী যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা দারিদ্র্যের সবচেয়ে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। কম আয়ের চাকরি, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে তাদের বড় অংশ ‘অতিদরিদ্র’ অবস্থায় বসবাস করছে।

সংস্থাটি বলছে, ‘অতি দারিদ্র্য’ বলতে আবাসন ব্যয় বাদ দেয়ার পর যেসব পরিবারের আয় যুক্তরাজ্যের মধ্যম আয়ের ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাদের বোঝানো হয়। বর্তমানে বৃটেনে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ এই ক্যাটাগরিতে রয়েছেন। যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সংস্থাটি বলেছে, দারিদ্রতার সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। এরপর রয়েছেন শারীরিক প্রতিবন্ধীরা। অপরদিকে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের মধ্যে দারিদ্রতার হার খুবই বেশি।

এছাড়া শিশু দারিদ্রতার হারও বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ শিশু দারিদ্রতার মধ্যে বড় হচ্ছে। গত তিন বছর টানা দরিদ্র শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৭ সালে বৃটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিম্নআয়ের যেসব পরিবার দুই সন্তানের বেশি সন্তান নেবে তারা সরকারি সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা পাবে না। তবে গত এপ্রিলে এই নিয়ম বাতিল করেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী রাখায়েল রিভিস।

mzamin

কাঠ কুড়াতে গিয়ে ইসরায়েলি হামলায় দুই শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ঃ শীতকালে উষ্ণতার জন্য দরকার আগুন। সেই আগুনের জ্বালানি কাঠ কুড়াতে বের হয়েছিল গাজার দুই শিশু। উত্তর গাজায় একই পরিবারের এই দুই শিশুর জীবন থেমে গেছে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায়।

স্থানীয় চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, কামাল আদওয়ান হাসপাতালের কাছাকাছি এলাকায় জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছিল তারা। ঠিক সেই সময় বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা চালায় একটি ইসরায়েলি ড্রোন। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় শিশু দুটি। হামলাটি ঘটে এমন এক সময়ে, যখন প্রতিদিন যুদ্ধবিরতির কথা বলা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে প্রতিদিনই সেই যুদ্ধবিরতি ভাঙছে।

এবার গাজায় বেশ শীত পড়েছে। রাতের তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছে প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বিদ্যুৎ নেই, জ্বালানি নেই। ফলে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে কাঠ, ভাঙা আসবাব কিংবা যা কিছু পাওয়া যায় তাই খুঁজতে বের হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই, সেগুলো জ্বালিয়ে সামান্য তাপ পাওয়া। কারণ, পাতলা ক্যানভাস আর অস্থায়ী তাঁবুগুলো ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টি ঠেকাতে পারে না।

এই সংকট আরও গভীর হয়েছে জরুরি সহায়তা প্রবেশে কড়াকড়ির কারণে। ইসরায়েল গাজায় তাঁবু, অস্থায়ী ঘর, এমনকি তাঁবু মেরামতের উপকরণও ঢুকতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের পাশাপাশি দখলদার শক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করার অভিযোগও বারবার সামনে আসছে।

চিকিৎসা কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৮১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ২০০-এর বেশি। আর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে মোট নিহত মানুষের সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়েছে। এই সংখ্যাগুলো প্রতিদিনই বাড়ছে।

গাজার শিশুরা শুধু বোমা আর ড্রোনের আঘাতে মারা যাচ্ছে না; শীতও বোমার মতোই প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, চলতি শীত মৌসুমে ঠান্ডার কারণে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০। সর্বশেষ মারা গেছে মাত্র তিন মাস বয়সী আলী আবু জুর। আল-আকসা শহীদ হাসপাতালে প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে তার মৃত্যু হয়।

এই ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতার খবর আসছে। ২৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছেন। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্র ‘নতুন গাজা’ গড়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। উঁচু আবাসিক ভবন, ডেটা সেন্টার আর সমুদ্রতীরের রিসোর্টের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে।

কাগজে-কলমে সেই ভবিষ্যৎ ঝকঝকে। কিন্তু ঠিক একই সময়ে গাজায় শিশুরা কাঠ কুড়াতে বের হচ্ছে, একটু উষ্ণতার খোঁজে। কেউ কেউ আর ফিরে আসছে না। এটাই গাজার প্রতিদিনের বাস্তবতা। এখানে শীত, অবরোধ আর ড্রোন একসঙ্গে মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।

সূত্র: আল-জাজিরা

গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলের দেইর এল-বালাহে শিল্পী ইয়াজেদ আবু জারদের তৈরি বালির ভাস্কর্যের পাশে আগুনে উষ্ণ হচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা
গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চলের দেইর এল-বালাহে শিল্পী ইয়াজেদ আবু জারদের তৈরি বালির ভাস্কর্যের পাশে আগুনে উষ্ণ হচ্ছে ফিলিস্তিনি শিশুরা। ছবি: এএফপি

গোমূত্র নিয়ে শ্রীধর ভেম্বু ও কেরালা কংগ্রেসের বাকযুদ্ধ

আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক ভি কামাকোটি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হওয়ার পর তাকে নিয়ে কটাক্ষ এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তীব্র বাকযুদ্ধে জড়িয়েছেন জোহো কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীধর ভেম্বু ও কেরালা কংগ্রেস। ২০২২ সাল থেকে আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ভি কামাকোটি শিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের জন্য পদ্মশ্রী পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। পুরস্কার ঘোষণার পর এক বিবৃতিতে কামাকোটি বলেন, ‘পদ্মশ্রী আমার কাছে একটাই অর্থ বহন করে- ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর লক্ষ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এই সম্মান কোনো একক ব্যক্তির নয়; এটি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।’ এরপরই কেরালা কংগ্রেস এক্সে কটাক্ষ করে লিখেছে, ‘ভি কামাকোটিকে অভিনন্দন। আইআইটি মাদ্রাজে তার যুগান্তকারী ‘গোমূত্র গবেষণা’র জন্যই দেশ তাকে সম্মান জানাচ্ছে, গোমূত্রকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার জন্য।’

এই মন্তব্যটি মূলত কামাকোটির সেই বক্তব্যকে ইঙ্গিত করে, যা গত বছর ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তিনি দাবি করেছিলেন, গোমূত্রে ‘এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল’ ও ‘এন্টি-ফাঙ্গাল’ গুণ রয়েছে এবং তা আইবিএস (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম)সহ নানা রোগ নিরাময়ে কার্যকর হতে পারে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন যিনি বৈজ্ঞানিক মনন ও যুক্তিবোধ গড়ে তোলার দায়িত্বে আছেন, তিনি কীভাবে এমন দাবি করতে পারেন? জবাবে কামাকোটি বলেন, গোমূত্রের এন্টি-ফাঙ্গাল, এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও এন্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত।

কেরালা কংগ্রেসের কটাক্ষের জবাবে শ্রীধর ভেম্বু বলেন, প্রফেসর কামাকোটি ডিপ টেক-এ কাজ করেন, মাইক্রোপ্রসেসর ডিজাইন তার ক্ষেত্র। তিনি আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক। এটি ভারতের সেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোর্ডের  সদস্য। এই সম্মান তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রাপ্য। ভেম্বু আরও বলেন, তিনি বৈজ্ঞানিক যুক্তির ভিত্তিতেই কামাকোটিকে সমর্থন করে যাবেন। তিনি বলেন, আমি আগেও বৈজ্ঞানিক কারণে তাকে সমর্থন করেছি, আবারও করব। গোবর ও গোমূত্রে অত্যন্ত সমৃদ্ধ মাইক্রোবায়োম রয়েছে, যা মানুষের জন্য মূল্যবান হতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, এগুলোকে গবেষণার যোগ্য মনে না করার পেছনে রয়েছে এক ধরনের দাসসুলভ ঔপনিবেশিক মানসিকতা। একদিন যখন হার্ভার্ড বা এমআইটি এ বিষয়ে গবেষণা প্রকাশ করবে, তখন এই মানসিকতার মানুষরাই সেটাকে ধর্মগ্রন্থের মতো মানবে।

এর পাল্টা জবাবে কেরালা কংগ্রেস বলে, গবেষণা মানে পশ্চিমা গবেষণাপত্র থেকে খাপছাড়া উদ্ধৃতি দেয়া নয়। এই গোবর ও গোমূত্র গবেষণার বাস্তব ফলাফল কী? আর কেন শুধু গরুর মলমূত্র? মহিষ, ছাগল কিংবা মানুষের বর্জ্য নিয়ে গবেষণা নয় কেন? তারা আরও দাবি করে, সম্প্রতি এমনই এক গোবর গবেষণার ফল সামনে এসেছে। মধ্যপ্রদেশ সরকার ক্যানসার চিকিৎসায় পঞ্চগব্য (গোবর, গোমূত্র, দুধ, দই ও ঘি) ব্যবহারের একটি গবেষণায় অর্থ দিয়েছিল।

তদন্তে দেখা গেছে, গোমূত্র ও গোবর কেনার নামে ১.৯২ কোটি রুপি খরচ দেখানো হয়েছে। যেখানে প্রকৃত খরচ ছিল মাত্র ১৫-২০ লক্ষ রুপি। প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ছিল ৩.৫ কোটি রুপি। বাকি অর্থ খরচ হয়েছে গাড়ি কেনা, জ্বালানি এবং গোয়া ও বেঙ্গালুরু ভ্রমণে। গবেষণার ফল কী? কেরালা কংগ্রেস দাবি করে, এ ধরনের প্রকল্প খতিয়ে দেখলে আরও কেলেঙ্কারি সামনে আসবে। তারা আরও বলে, ক্যানসার গবেষণার প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু কেন জোর করে বলা হচ্ছে যে শুধু গোমূত্র বা গোবরই ক্যানসার সারাতে পারে? কোভিডের সময় আমরা দেখেছি, কীভাবে প্রতারকরা গোমূত্র ও গোবর দিয়ে ভাইরাস মারার চেষ্টা করেছিল। ফল কী হয়েছিল?

শেষে কেরালা কংগ্রেস শ্রীধর ভেম্বুকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, আপনি যদি সত্যিই গোমূত্রের অলৌকিক গুণে বিশ্বাসী একজন বিলিয়নিয়ার হন, তবে আপনার কোম্পানি কেন গোমূত্র ও গোবর নিয়ে প্রকৃত গবেষণায় বিনিয়োগ করছে না? যদি গোমূত্র ক্যানসার সারাতে পারে, তবে তা হবে বিশ্বের জন্য ভারতের সবচেয়ে বড় অবদান। কথা নয়- কাজে দেখান, নিজের পকেট থেকে রুপি দিন।

mzamin